চোখের পাতা কাঁপে কেন?

প্রচলিত বিশ্বাসে বা কুসংস্কারে চোখের ডান বা বাম পাতা কাঁপার সঙ্গে শুভ-অশুভ যোগ আছে ধরে নেন অনেকে। কিন্তু মনে রাখবেন, চোখের পাতা খুব সংবেদনশীল, যা সারাদিনে গড়ে ১৯,০০০ বার পর্যন্ত পলক ফেলে। এটি আমাদের অজান্তেই হয়ে থাকে কিন্তু যদি অনিয়ন্ত্রিত ভাবে খুব বেশি পলক পড়তে থাকে কিংবা চোখের পাতার পেশি সংকোচনের সঙ্গে ভ্রু, মুখের মাংসপেশিও অনিয়ন্ত্রিত ভাবে কাঁপতে থাকে, তাহলে তখনই সমস্যার সূত্রপাত হয়। দিশা আই হসপিটাল-এর কনসালটেন্ট অপথালমোলজিস্ট ডা. সৌগত পোদ্দার এই বিষয়ে জানিয়েছেন বিস্তারিত।

O ঘুমের অভাবে আমাদের শরীরে যেরকম ক্লান্তি অনুভূত হয়, ঠিক সেইরকম চোখের পাতার মাংসপেশিগুলোও পর্যাপ্ত ঘুমের অভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়ে এবং চোখের পাতা কাঁপতে থাকে।

O যদি চোখের পাওয়ার-এ ভারসাম্য না থাকে কিংবা চশমা সঠিক না হয়, তাহলেও চোখের উপর চাপ বেড়ে যায় এবং চোখের পাতা কাঁপে।

O প্রেসবায়োপিয়ায় চশমা না পরলেও চোখে অত্যধিক চাপ পড়ে চোখের পাতা কাঁপতে পারে।

O যারা অনেকক্ষণ ল্যাপটপ, ডেস্কটপ, ডিজিটাল স্ক্রিনে কাজ করছেন, তাদের চোখেও এই আই ফ্যাটিগ হতে পারে, যার ফলে কাঁপতে পারে চোখের পাতা।

O অত্যধিক শারীরিক কিংবা মানসিক স্ট্রেস কিংবা উদ্বেগ থেকেও চোখের পাতা টুইচিং হতে পারে।

O অত্যধিক কফি, চা, ধূমপান কিংবা মদ্যপান নার্ভের উপর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলতে শুরু করে এবং এর ফলে চোখের পাতার ইনভলান্টারি টুইচিং প্রাথমিক লক্ষণ হতে পারে।

O ওষুধের সাইড এফেক্ট অর্থাৎ কিছু নার্ভের ওষুধ, মাইগ্রেইনের ওষুধ প্রভৃতির এফেক্ট হিসাবে এটা হতে পারে।

O চোখের অভ্যন্তরীণ সমস্যা, যেমন চোখের পাতার ভিতরে conjunctiva-র যে আবরণ থাকে, সেখানে ছোটো ছোটো পাথরের মতো কিছু জমলে, তা চোখের মধ্যে অস্বস্তি তৈরি করতে পারে এবং চোখের পাতা কাঁপতে পারে।

O মেইবোনিয়ান গ্ল্যান্ড ডিসফাংশন হলে, রেফারিটিস চোখের পাতার ইনফেকশন হলে, কোনও ফরেন বডি চোখের একদম ভিতরে গেঁথে থাকলেও চোখের পাতা কাঁপতে পারে।

O কন্ট্যাক্ট লেন্স-এর হাইজিন সঠিক ভাবে না মানলে, যেমন ধরুন যদি কেউ ভুল করে সারারাত কন্ট্যাক্ট লেন্স পরে ঘুমিয়ে পড়ে কিংবা কর্নিয়ায় কোনও আঘাত থাকে, তাহলেও আই লিড টুইচিং হতে পারে।

O ইউভাইটিস বা চোখে বাত হলে আলোর দিকে তাকাতে অসুবিধা হয়, তখনও চোখের পাতা কাঁপতে থাকে বা ব্লেফারোস্পাজম হতে পারে।

O চোখের পাতার আই ল্যাশগুলি যদি বাইরের দিকে গ্রো না করে ভিতরের দিকে গ্রো করতে থাকে, তাহলে ক্রনিক ইরিটেশন হতে থাকে, সেক্ষেত্রেও চোখের পাতা কাঁপতে পারে।

O কিছু কিছু ডেমিয়েলিনেটিং নিউরো ডিজিজের প্রাথমিক লক্ষণ হতে পারে এই পাতা কাঁপার সমস্যা। যেমন— মাল্টিপল স্ক্লেরোসিস।

O হেমি ফেসিয়াল স্পাজম অর্থাৎ চোখের পাতার সঙ্গে মুখের মাসলগুলোও কাঁপতে পারে।

O বাচ্চার চোখের পলক বেশি পড়লে অভিভাবকরা অনেক সময় চিন্তায় পড়ে যান। কিছু ক্ষেত্রে শিশুদের অন্য কোনও শারীরিক সমস্যা থাকলেও চোখের পাতা কাঁপতে পারে। তবে ওই শারীরিক সমস্যা দূর হলে কিংবা বয়স বাড়লে চোখের পাতা কাঁপা বন্ধ হয়ে যাবে।

O যদি বাচ্চাকে খাওয়ানোর সময় চোখের পাতা পড়তে থাকে, তাহলে তা মার্কাসগান জও-উইঙ্কিং সিনড্রোমও হতে পারে। এ ক্ষেত্রে উপযুক্ত চিকিৎসার প্রয়োজন।

O কিছু প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের মুদ্রাদোষ হিসাবেও চোখের পাতা কাঁপার সমস্যা হয়। এক্ষেত্রে দৈনন্দিন জীবনে অসুবিধা করে না।

প্রতিকার

সাধারণত ৫-৭ দিনের মধ্যে নিজে থেকেই চোখের পাতা কাঁপা বন্ধ হয়ে যায় কোনও চিকিৎসা ছাড়াই। এর পরেও যদি পাতা কাঁপতে থাকে, তাহলে ইগনোর না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

ঘরোয়া টোটকা হিসাবে, পরিষ্কার জলে চোখ ধোবেন, চোখে একটু হালকা গরম সেঁক দিতে পারেন, স্ট্রেস রিলিফের জন্যে ধ্যান করতে পারেন, আর্টিফিসিয়াল টিয়ার-ড্রপ দিনে তিন থেকে চার বার ব্যবহার করতে পারেন। তবে চোখ খচখচ করলেও দোকান থেকে কিনে কোনওরকম অ্যান্টিবায়োটিক বা স্টেরয়েড ড্রপ দেবেন না। সেইসঙ্গে অন্যের চশমা ব্যবহার করবেন না। নিজে থেকে ঘুমের বা নার্ভের ওষুধ খাবেন না নেটে সার্চ করে।

কখন নেবেন চিকিৎসকের পরামর্শ?

O পাতা কাঁপার সঙ্গে যদি চোখে খচখচানি অনুভূত হয়, চোখ জ্বালা করে, জল পড়ে, ব্যথা করে, লাল হয়ে যায় কিংবা আলোর দিকে তাকাতে অসুবিধা হয়

O ৫-৭ দিনেও চোখের পাতা কাঁপা যদি না থামে

O মুখ বেঁকে গেলে অথবা মুখের মাসলগুলোও অনিয়ন্ত্রিত মুভমেন্ট করলে

O অতিরিক্ত কাঁপার ফলে যখন চোখের পাতা খুলে রাখা যাচ্ছে না।

O ছোটো বাচ্চাদের চোখ কাঁপা বন্ধ না হলে অবশ্যই চোখের পুরো চেক-আপ করাতে দেরি করবেন না।

চিকিৎসা

উদ্বেগ কমানোর জন্য প্রাথমিক ভাবে ওষুধ দিয়ে ৮০ শতাংশ ক্ষেত্রে চোখের পাতা কাঁপার সমস্যা দূর করা যায়। তবে দীর্ঘদিন ধরে চোখের পাতা কাঁপার সমস্যা থাকলে, বোটক্স ইনজেকশন চোখের পাতার মাসলে দেওয়া যেতে পারে। এর ফলে বেশ কয়েক মাস নিশ্চিন্ত থাকা যায়, এটি ডে কেয়ার প্রসিডিওর। অবশ্য বোটক্স রেসপন্স না করলে চোখের পাতার ওভার অ্যাক্টিভ মাসল বা নার্ভ স্বাভাবিক রাখার উপযুক্ত ব্যবস্থা করতে হবে। ডেমিয়েলিনেটিং নিউরো ডিজিজের ক্ষেত্রে নিউরোলজিস্ট-এর সঙ্গে আলোচনা করে চিকিৎসা করারও প্রয়োজন হতে পারে।

সে এবং একটি ফানুস (পর্ব-০২)

সৌম্য মুখের উপর এক ছড়া বিকেলের রোদফেলা হাসি মেখে জীবন গোঁসাই সেই সাপ আবার কাঁধের ঝোলার ভিতর পুরে দিয়ে বললেন, ‘বাবাজি, ভয়রে কাছাকাছি রাখতি হয়। সে কী করে দেখতি হয়। দূর থেকে ওই চোখের দেখা, মনের দেখায় বিস্তর ফাঁকি থাকি যায়। তাই তো যত হিংসে হিংসি। আমার ঝোলার ভিতর চালের ওমের ভিতর সে দিব্য এবার নিদ দেবেনে। তাইতো কতিছিলাম, ভয় পাতি হবে না।’

—যদি ঝোলার ভিতর থেকে বেরিয়ে এসে কামড়ায়!

আবার হাসেন জীবনকৃষ্ণ। ‘মানুষ ছাড়া অকারণে কামড়াবার মতো প্রাণী পাবা নানে।”

—তা আপনি একে নিয়েই বুঝি বাড়ি থেকে বেরিয়েছেন?

—না না। তা কেন! আমি তো আর সাপুড়ে নই যে সাপ নিয়ে ঘুরে বেড়াব। এই পথে আসতি আসতি তারে দ্যাখলাম। সেও ওদিকপানে যাতিছিল। তা আমি ভাবলাম, সে যাতিছে যখন সঙ্গে করে নিয়ে যাই। এরও ভালো, অন্যেরও ভালো। রাতের কালে আঁধারে সেখানে ভিড়ের ভিতর কে না জেনে গায়ে পা তুলে দেবেনে, আর এও ভয়ের চোটে ফোঁস করে গুঁতোবেনে। এর ভয় দূর করলি,অন্য মানষির ভয়ও যে দূর হয়। রাত শেষ হলি ওরে নদীর পাশে গিয়ে হলুদ বনের ভিতর ছাড়ি দেবানে।

ননীগোপালের চোখ স্বাভাবিক হয়ে এল বটে কিন্তু জীবন গোঁসাই-এর ঝোলা বাঁচিয়ে, ঝোলার উলটো দিক দিয়ে খানিকটা এগিয়ে হাঁটতে থাকে। হাওয়ায় চৈত্রের ধু ধু গন্ধ। রাস্তা সরেঙ্গা হয়ে কোনও মতলব ছাড়াই এগিয়ে গেছে। পথের সাথী যখন জুটে গেছে তখন আর পা চালাতে হিসেবনিকেশ আসে না। ধাক্কা খাওয়া ননীগোপাল কথা চালিয়ে স্বাভাবিক হতে গিয়ে বলে, “তা গোঁসাই, হাতের দোতারা পথ চলতি চলতি সচল হতি পারে না?”

জীবনকৃষ্ণ গোঁসাই মায়াবী একখান নজর মেলে বলেন, ‘কেন পারবে না বাবাজীবন। খুব পারবে। কতকাল ধরে এরা আমার দোসর হয়ে আছে। এরা কখনও বিশ্বেস ভাঙেনি বাবাজি।’

যেমন মায়াঝরা কথা বলা, তার থেকেও ঢের প্রাণ ভরানো মমতায় গোঁসাই জীবনকৃষ্ণ গান ধরেন। সঙ্গের দোতারা মানুষটিকে বুঝে সুরে আনচান হাওয়া দেয়—

‘সাঁই রাখলে আমায় কূপজল করে আন্দেলা পুকুরে। হবে সজল বরষা

রেখেছি এই ভরসা

আমার এই দশা

যাবে কত দিন পরে!”

ননীগোপাল গান শুনতে শুনতেই ঘোরের ভিতর ভাবে, এ গান তো ফেলনা নয়। এর মর্মরস আছে। ননীগোপাল একটু তন্ময় হয়। কিন্তু পা তার চলতে থাকে।

নদীয়ার সীমান্তে করিমপুরের কাছে গোরাডাঙা গ্রাম। এখানে ফকিরদের ঘাঁটি। তবে ওই এক-দু’ঘর বৈষ্ণব আছে। বৈষ্ণবরা ফকিরদের সাথে মিলমিশ করে থাকে। ওই অজয়কৃষ্ণ বৈরাগীর মতো আরও একজন আছে। তবে নাম ওই সাইকেল সারাই দোকানের মালিক অজয়কৃষ্ণের বেশি। তার ভিটেয় যে এই এতবড়ো একখান বাউল ফকির মেলা হয়। বারুণীর মোচ্ছব পড়ে। কত মানুষ যে আসে !

ননীগোপাল কথা চালনার কথা ফেলে। ‘আচ্ছা আপনি কন তো ওই সাইকেল সারানোর দোকানদার এত লোকের চাপ একা নেয় কী করে! খাতি, শুতি দেয় না? আমার যে খুব খিধে লাগতিছে।’

—হ্যাঁ হ্যাঁ, সে ব্যবস্থা আছে। একটা জগাখিচুড়ির ব্যবস্থা করে দেয় গ্রামের লোক মিলে।

—সেটা আবার কী?

—আরে জগাখিচুড়ি জানেন না বাবাজি! চাল-ডালের সাথে বিরাট বিরাট হাঁড়ির ভিতর গোটা গোটা সবজি ফেলে দেওয়া। কুমড়ো, ঝিঙে, আলু, পটল, লংকা— সব এক হাঁড়িতে। মানে গ্রামে ঘুরে এখানকার লোকজনেরা যাই ঘর থেকে বের করে দেয়, সবকিছুর মিল-মিশে ওই জগাখিচুড়ি। বেশ তৃপ্তি করে খাতি পাবেননে।

—তা অজয়কৃষ্ণ গোঁসাইয়ের নিজের কোনও গুরুপার্ট বা আখড়া নাই?

—না, সে থাকবে কী করে! এই গাঁয়ে তো বেশির ভাগই মোছলমান মানুষ। আখড়া চালাতে দেবে কেডা! মধুকৃষ্ণা তিথিতে ওই ‘অমাবস্যায় চাঁদের উদয় হয় বলে মোচ্ছবটাই শুধু সবাই মিলে গায়ে গতরে করে নেয় গ্রামবাসীরা। —ওহো, তাই বুঝি অজয়কৃষ্ণ বাবাজি সাইকেল সারাইয়ের দোকান দেছে!

—ঠিক ধরেছেন বাবাজি।

ননীগোপাল দেখে সেই সাপ থাকা ঝোলার ভিতর বাঁ হাত ঢুকিয়ে জীবন গোঁসাই কাগজে মোড়া কী যেন বস্তু বের করে আনে। ননীগোপালের খুব ভয় লাগে আবার যেন সাপের ফণা ধরে তার মুখের সামনে হাত তুলে না ধরে! জীবনকৃষ্ণ চলার ছন্দ বন্ধ না করে সরু সরু নারকেলের ছিবড়ে দিয়ে কলকের ভিতর ঠেসে দিতে দিতে বলল, ‘বাবাজির কি কিঞ্চিৎ গঞ্জিকা সেবনের অভ্যেস আছে?’

ননীগোপাল গাঁজা যে মোটেই খায়নি তা নয়। কিন্তু এই পথ চলতে চলতে গাঁজা খেলে সে কি সামলাতে পারবে! তাছাড়া সেবার এই গাঁজা খেতে গিয়েই তো বামুনডাঙার আখড়া থেকে তাকে হারিয়ে ফেলা! আট বছর কেটে গেল খোঁজা। আখড়ায় আখড়ায়, গুরুপার্টে গুরুপাটে, মোচ্ছবে মোচ্ছবে। তার দেখা নাই। এক নবীন চকচকে বোষ্টমের সঙ্গে সে সেদিন নদীর দিকে নেমে যাচ্ছিল। গাঁজার ধোঁয়ার অন্য পার দিয়ে চলে যাচ্ছিল। সেটুকু মনে আছে।

(ক্রমশ… )

সে এবং একটি ফানুস (পর্ব-০১)

রাধামাধবের ইচ্ছেয় শেষ পর্যন্ত সে গোরাডাঙা পৌঁছে গেছে। কথা মতো বাস থেকে নেমে বোমেখাওয়া বাড়ি পেরিয়ে বাম পাশে শ্যাওলালাগা দু’খানি পুষ্করিণী ছেড়ে যে-রাস্তা কুবেরের মাঠে গিয়ে ঠেলে উঠেছে, সেই পথেই পা তার। সেই পথেই যে পড়বে অজয়কৃষ্ণ বৈরাগীর সাইকেল সারানোর দোকান।

একখান হলুদ রঙের সাইনবোর্ড আছে। তবে তা চোখে নাও পড়তে পারে। বনতুলসির ঝোপ এত সেয়ানা হয়েছে যে, লকলক করে সে সবকিছু আড়াল করে দিতে চায়। অজয়কৃষ্ণের মায়ার শরীর, সে যেমন তুলসিরে সরাতে পারে না, তেমনি কলমিলতাকেও চলে যেতে বলতে পারে না। সে যেমন গানই করুক, ভারি মোক্ষম তার শরীর। তার জন্যই তো দু-একজন বোষ্টম-বোষ্টমী আসে মাঝে মধ্যে। খানিক চাল-ডাল টাকা-পয়সার উপরি আয়। নাহলে তো সেই মধুকৃষ্ণা তিথির জন্য বছরভর অপেক্ষা করে থাকা। তখন ভক্ত বাউল-বৈষ্ণবের সমাগমে যা সেবাদ্রব্য জমা হয়, তাই সারাবছরের খোরাকি। এই অজ তেপান্তরের ভিতর কত লোক আর সাইকেল চড়ে! সাইকেল সারিয়ে অজয়কৃষ্ণের তেমন কিছু হয় না। কলমিলতাকে তাই মাঝে মাঝে অন্য গাঁয়ে যেতে হয় মাধুকরি করতে। এই গাঁ ফকিরদের গাঁ। এখানে বোষ্টমের মান নেই।

দুপুর থেকেই চৈতি অমাবস্যার দিন ভিড় জমতে থাকে ওই একচিলতে উঠোনে। মানে সাইকেলের দোকানের সামনে। রাত ভারী হতে গেলে তা সে ভিড় হাজার খানেক ছাড়িয়ে যাবে। সে ভিড় সামলাতে এপাশে ওপাশের বাড়িও হাত বাড়িয়ে দেয়। রাস্তা জুড়ে বৈষ্ণব, বৈষ্ণবীর ফিসফাস। বুনো তুলসি ঝোপের সে কী আনন্দ।

চৈত্র মাসের দুপুর পিছলে বিকেল পড়েছে। সে বাঁধনহারা পথ চলছিল তো চলছিলই। ননীগোপালের বুকে ভয়, যদি চোখের মাথা খেয়ে সাইকেল দোকান হারিয়ে ফেলে! কত কী যে চোখের উপর দিয়ে বয়ে গেছে ননীগোপালের! সে ধরে রাখতে পারেনি। নিজের শিষ্য-শিষ্যা, আখড়া, গুরুকর্ম— কিছুই ধরে রাখতে পারেনি।

আর যার জন্য সব হাতছাড়া হয়েছে, সেই বাউলানিও টেকেনি। আজ যার খোঁজে পথে পথে ঘুরছে, একদিন সেই-ই তো ছিল তার সাধনসঙ্গিনী। চোখের পর থেকে সে যে কোথায় পলান দিল! মালাচন্দন করা ছিল। তাও! ওরকম সোনারবরণ! সবে ফুল ফুটেছে। প্রথমেই ভয় পেয়েছিল বলেই তো পাখিকে পিঞ্জরায় ঢোকাতে মালাচন্দন করা তড়িঘড়ি। তাও পাখি উড়ে গেল।

ননীগোপাল সতর্ক থাকে। পথের দু’পাশে চোখ রাখে। হারিয়ে ফেললে চলবে না। ভাবতে ভাবতেই রাধামাধবের ইচ্ছেয় হবে, পিছন থেকে হাঁক শোনে। ‘বাবাজি অমাবস্যায় চাঁদের উদয় দেখতি যাতিছেন বুঝি?”

—হ্যাঁ হ্যাঁ। হাঁটা থামিয়ে ননীগোপাল ঘুরে দাঁড়ায়। বারুণীর এখানকার মেলা বিখ্যাত ওই চাঁদের উদয় দিয়ে।

হাতে দোতারা, মাথায় সাদা কাপড়ের চুড়ো, কাঁধে ধুতির ঝোলা নিয়ে পরম সৌম্য দেহের সে। মানে, এক তিলকশোভিত বোষ্টম সামনে এসে বলল, ‘আমিও যাতিছি সেখানে বাবাজি। চলেন গো।”

কী মিষ্টি করে যে কথা বলছেন! ননীগোপাল গলে গেল। সংসারে এমন মিষ্টি করে, মায়া ভরে কথা বলার লোক আজও পাওয়া যায় বুঝি!

এক কথাতেই ননীগোপালের বুকের ভিতর থেকে ভয়ের পাখি উড়ে গেছে। ননীগোপাল নিজেও নিজেকে ভরসা দিতে উচ্চারণ করে, ‘যা যা, পলান দে।’ একটু জোরেই ফেলেছে বুঝি সে স্বর।

—হ্যাঁ বাবাজি, ভয় পাতি হবে না। সব ভয় তো তিনি, দীনদয়ালই তাঁর থলিতে পুরে নেন।

—আহা কী কথা! ননীগোপালের অল্পস্বরে আলাপ করার ইচ্ছে জাগে। বলছিলাম কী….

—চিন্তে করতি হবেনি বাবাজি। আমি জীবন গোঁসাই। এট্টুস গান গাই। আর মানুষ ধরি। এই চৈতি অমার মেলায় গান করতি পারলি, দীনদয়ালরে সন্তোষ দিতি পারলি গান এমন মিঠে হয় যে কী বলব! যেন গলা থেকে একখানা নদী নেমে সুরসুর করে ভক্তের কানে ঢুকে পড়ছে। আমি সঙ্গে আছি, আপনারে ঠিক নিয়ে যাব মেলায়। কোনও ভয় নাই।

ননীগোপাল বলল, “জয় নিতাই। প্রণাম হই। আপনার কথা শুনেই তো সব ভয় পলান দেচ্ছে গোঁসাই। কিন্তু প্রভু, আপনি কলেন, দীনদয়াল ভয় নিজে থলিতে ভরে নেন বলে কোনও ভয় আর থাকে না।”

—থাকে নাই তো। ভক্তদেরও থাকে না। ভগবানেরও থাকে না। ভগবান সবসময় ভয়ে থাকেন, তাঁর মন ভক্তের ভয় পাওয়া নিয়ে সদাই ব্যস্ত থাকে। একবার ভক্তের ভয় হটিয়ে দিতে পারলে তিনি চিন্তাহীন থাকেন।

—না আমি বলছিলাম, ঝোলার ভিতর কীভাবে ভয় তুলে নেন!

জীবন গোঁসাই মিষ্টি করে হেসে নিজের কাঁধের ঝোলার ভিতর টুক করে হাত ঢুকিয়ে তুলে আনেন এক গোখরো সাপ। তার প্রসারিত ফণা।

—বাপ রে! ননীগোপাল দুই পা পিছিয়ে যায়। তার দু’চোখ ঠিকরোতে থাকে। বুকে হাপর ওঠে। কোনওমতে বলে,— ‘কী করতিছেন গোঁসাই, জঙ্গলে ছাড়ি দেন। কখন কী দিয়ে কী একটা হয়ে যাবেনে, ও যে জাত সাপ!’

কর্মক্ষেত্রে সাফল্য পাবেন কীভাবে?

অনেক সময় দেখা যায়, দীর্ঘদিন চাকরি করার পরেও পদোন্নতি হচ্ছে না। কারণ খুঁজলে হয়তো দেখা যাবে, আপনার কর্মদক্ষতা, বুদ্ধি এবং কৌশলের অভাব রয়েছে। তাই, আপনার কর্মজীবনে প্রবেশের আগে আপনার স্বপ্ন কী ছিল, তা জানা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ পেশাগত দুনিয়ায় আপনি কী করতে চান, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন। সেই স্বপ্ন সফল করার জন্যও আগে থেকে প্রস্তুতি নেওয়ার প্রয়োজন আছে। আর সেই অনুযায়ী কাজ করা প্রয়োজন। রইল গুরুত্বপূর্ণ কিছু পরামর্শ।

আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে তুলুন

আপনার কর্মজীবনের অগ্রগতি নির্ভর করবে আপনার দক্ষতা এবং বুদ্ধি অনুযায়ী। একটি বিশেষ প্রতিষ্ঠানে চাকরি পাওয়ার পর থেকেই আপনার তাৎপর্য এবং অবদান আপনি বুঝতে শুরু করবেন। আপনি যা দক্ষতা অর্জন করেছেন, তাতে বিশ্বাস রাখুন এবং কাজের প্রতি আপনার দৃষ্টি তীক্ষ্ণ রাখুন। এটি আপনার কর্মজীবনের বিকাশ এবং ইতিবাচক কেরিয়ার গ্রাফ তৈরি করতে আপনাকে সহায়তা করবে।

আপনার বসএর পছন্দকে গুরুত্ব দিন

কর্মক্ষেত্রে একটি গণ্ডির মধ্যে থাকা ভালো। প্রোফেশনাল স্কিল্স আপনার কাজের অঙ্গ। আপনার স্ট্রং কোয়ালিটিগুলিই বসের সামনে তুলে ধরুন। কাজ সময়ে শেষ করুন। কোনও কাজে যদি সমস্যা হয়, আপনার সমস্যার ব্যাপারে সরাসরি আপনার বসকেই সে কথা খুলে বলুন। অন্যথায় আপনার কাজ না জানার বিষয়টা সারা অফিসের আলোচনার বিষয় হয়ে উঠবে। এই ধরনের কিছু ঘটার থেকে, নিজের না পারাটা আগেই স্বীকার করুন এবং বস-কে আশ্বাস দিন খুব কম সময়ের মধ্যে আপনি সেটা শিখে ফেলবেন। এরপর নিজের দক্ষতা বাড়াতে আর মোটেই দেরি করবেন না। এটা না করে যদি আপনি আপনার বসকে জানান যে, আপনার প্রজেক্ট জমা দিতে দেরি হবে, তাহলে তো তিনি তা শুনবেন না। কারণ আপনার অদক্ষতা আপনার নিতান্তই ব্যক্তিগত ব্যাপার। এগুলো নিয়ে কখনওই অফিসের বসের সঙ্গে কথা বলা ঠিক নয়। এটার প্রভাব খারাপ হতে পারে।

আপনার Personal Skills বাড়ান

যদি আপনার কিছু পার্সোনাল স্কিল থাকে, তবে আপনার সহকর্মীদের পক্ষেও এটি লক্ষ্য করা সহজ হবে। এই দক্ষতাগুলি আপনার জুনিয়রদের মনের উপরও দীর্ঘ প্রভাব ফেলবে, যা আপনার কেরিয়ারের জন্য নতুন সুযোগও আনতে পারে।

মানুষ যা আপনাকে বলবে, আপনি তা শুধু মনোযোগ দিয়েই শুনবেন না, বরং আপনাকে একজন দক্ষ কমিউনিকেটর-ও হতে হবে। টিম পরিচালনার ক্ষেত্রে এটা বিশেষ একটি গুণ। শক্তিশালী কমিউনিকেশন-এর দক্ষতা সুষ্ঠুভাবে আপনার কর্মজীবন গড়ে তুলবে এবং আপনার উন্নতির ক্ষেত্রে কার্যকর হবে। আপনি যদি এগুলি বাস্তবে পরিণত করেন, তবেই আপনি নিশ্চিত থাকতে পারবেন সুফল লাভের বিষয়ে।

জীবনে সাফল্য চান প্রত্যেকেই। আবার এই সাফল্যকামী লোকেরাই, সমস্যায় পড়লে ভয় পেয়ে পিছু হঠেন। কিন্তু নিজের উপর ভরসা থাকলে, জীবনে কোনও প্রতিকূলতাই চাপে ফেলতে পারবে না, সাফল্য আসবেই। অবশ্য এর জন্য সততা, নিষ্ঠা এবং কর্মকুশলতার প্রয়োজন আছে। জীবনের প্রতিটি কাজে কীভাবে সাফল্য আসবে, সেই বিষয়েই রইল কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ।

  • আজকের কাজ এখনই করুন। কারণ, ‘কাল করব’ ভেবে ফেলে রাখলে সমস্যা তৈরি হতে পারে
  • সময়ের মধ্যেই হাতের কাজ সম্পূর্ণ করলে নিশ্চিন্ত থাকা যায় এবং সাফল্যের পথে এগিয়ে যাওয়া যায়
  • কাজ যাইহোক না কেন, প্রত্যেক কাজই নিষ্ঠা সহকারে করা উচিত
  • সবাই আপনার কাজের প্রশংসা করবে এটা ভাববেন না। কারণ, প্রত্যেকেরই দৃষ্টিকোণ আলাদা। তাছাড়া অন্যের কাজের প্রশংসা করার মতো উচ্চ মানসিকতা সবার থাকে না। তাই কাজ করুন ফলের আশা না করে। দেখবেন সাফল্য পাবেন অনায়াসে
  • সমস্যা এলে ভেঙে পড়বেন না, মোকাবিলা করুন। প্রয়োজনে শুভাকাঙ্ক্ষীর পরামর্শ এবং সাহায্য নিন।
  • বিপদে রক্ষা করার জন্য অনেক বন্ধু থাকতে হবে এমন নয়, কিন্তু দু-তিনজন এমন বন্ধু থাকা উচিত, যারা আন্তরিক ভাবে আপনার সুখ-দুঃখে শামিল হবে
  • সাফল্যলাভের জন্য কঠিন বাস্তববাদী হওয়ার প্রয়োজন নেই, কিন্তু আবেগকেও আয়ত্তে রাখতে হবে
  • সৎ এবং বিশ্বাসী মানুষ হিসাবে নিজের পরিচিতি গড়তে হবে। তাই কোনও কাজ না পারলে আগেই ‘না’ করুন কিন্তু কাজ কিংবা দায়িত্ব হাতে নিয়ে কারও বিশ্বাসভঙ্গ করবেন না।
  • সমস্ত কাজেই কঠিন পরিশ্রম করতে হবে। কারণ, অলস থাকলে কিংবা পরিশ্রম না করলে সৌভাগ্যও বিমুখ হতে পারে। কাজ করার সময় সতর্ক থাকতে হবে, যাতে দোষ, ত্রুটি এড়ানো যায়
  • সুশাসক হোন ক্ষতি নেই, কিন্তু অযথা অন্যের ক্ষতি করবেন না কিংবা অন্যদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করবেন না। কর্মক্ষেত্রে সদ্ব্যবহার বজায় রাখুন
  • সবরকম ক্ষতিকারক নেশা থেকে নিজেকে দূরে রাখুন
  • অযথা লোভ করবেন না এবং লোভের শিকার হবেন না
  • নিজের উপর ভরসা রাখুন। কখনও যদি কাজে অসফল হন, তাহলে ভেঙে পড়বেন না। অসাফল্যকে সংশোধনের প্রাথমিক ধাপ ধরে নিয়ে এগোতে হবে
  • সাফল্য পেতে শুরু করলেও, অহমিকা প্রকাশ করবেন না। মনে রাখবেন, সাফল্যের শুরুতে অহমিকা প্রকাশ কিন্তু পতনের সূত্রপাত হতে পারে
  • সহজে অন্যের কথা বিশ্বাস করে কোনও বড়ো ধরনের সিদ্ধান্ত নেবেন না। সবার মতামত এবং বক্তব্য শুনুন কিন্তু সিদ্ধান্ত নিন বিচারবিবেচনা করে
  • কর্মক্ষেত্রে পরনিন্দা-পরচর্চা করবেন না এবং কারওর গোপন কথা শুনে তা অন্যের কাছে বলে বিশ্বাসভঙ্গ করবেন না। এতে অযথা সমস্যায় পড়তে পারেন
  • শিক্ষার শেষ নেই। তাই প্রতি মুহূর্তে নতুন ভাবে জ্ঞান অর্জন করুন। সেইসঙ্গে, ছোটো-বড়ো সবার কাছ থেকেই ‘ভালোটা’ নেওয়ার চেষ্টা করুন
  • কর্মক্ষেত্রে সর্বদা পরিষ্কার জামাকাপড় পরে যাবেন এবং মনকে পরিচ্ছন্ন রাখবেন।
  • ব্যক্তিগত সমস্যা কিংবা কোনও চারিত্রিক দুর্বলতাকে প্রশ্রয় দেবেন না এবং প্রকাশ করবেন না। কর্মক্ষেত্রে ব্যক্তিত্ব বজায় রাখুন।

মেরুদণ্ড বিকৃতির চিকিৎসায় অভিনব উদ্যোগ ‘অপারেশন স্ট্রেইট স্পাইন’

ভারতের বিভিন্ন প্রান্তের দুঃস্থ শিশুদের সম্পূর্ণ বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করতে কলকাতা-য় ইতিমধ্যেই উপস্থিত হয়েছেন সারা পৃথিবীর অনেক চিকিৎসক।  স্কোলিওসিস এবং অন্যান্য জটিল মেরুদণ্ডজনিত সমস্যা থাকা সত্ত্বেও, যারা অর্থাভাবে চিকিৎসা পরিসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছিলেন, তাদের সুচিকিৎসা পাইয়ে দেওয়ার জন্যই এই বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে JIMS হাসপাতাল।

‘অপারেশন স্ট্রেইট স্পাইন’ (OSS) এমন এক পথপ্রদর্শক চিকিৎসা অভিযান, যা  মেরুদণ্ড বিকৃতি সারিয়ে তোলার ক্ষেত্রে আমাদের দেশে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে চলেছে। দক্ষিণ কলকাতা-য় অবস্থিত ‘দ্য টলিগঞ্জ ক্লাব’-এ আয়োজিত সাংবাদিক সম্মেলনে, পয়লা মার্চ এই বার্তা দেওয়া হল ‘জগন্নাথ গুপ্ত ইনস্টিটিউট অফ মেডিকেল সায়েন্সেস অ্যান্ড হাসপাতাল’-এর (JIMSH) পক্ষ থেকে। এই সাংবাদিক সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন জেআইএমএস-এর চেয়ারম্যান কৃষ্ণ কুমার গুপ্তা, প্রফেসর ডা. উজ্জ্বল দেবনাথ প্রমুখ। প্রসঙ্গত উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, আগামী ৩ থেকে ৮ মার্চ পর্যন্ত চলবে এই বিশেষ চিকিৎসা অভিযান।

যে সব শিশুরা স্কোলিওসিস এবং অন্যান্য জটিল মেরুদণ্ডজনিত সমস্যায় ভুগছে, অর্থনৈতিক দুরবস্থার কারণে যাদের সুস্থ জীবনের স্বপ্ন দেখা ছিল দুঃসাধ্য, তাদের সুস্থ করে তোলার উদ্দেশ্যেই এই চিকিৎসা অভিযানের আয়োজন করেছে বলে জানানো হয়েছে ‘জগন্নাথ গুপ্ত ইনস্টিটিউট অফ মেডিকেল সায়েন্সেস অ্যান্ড হাসপাতাল’-এর (JIMSH) পক্ষ থেকে।

 Innovative initiative 'Operation Straight Spine'
Doctors

বর্তমানে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তের ১১ জন শিশু, যারা গুরুতর স্কোলিওসিস ও মেরুদণ্ড বিকৃতিতে ভুগছে, তারা জীবন বদলে দেওয়া অস্ত্রোপচারের সুযোগ পাবে এবং নতুন করে সোজা হয়ে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা অর্জন করবে JIMS হাসপাতাল আয়োজিত এই চিকিৎসা উদ্যোগে।

উল্লেখ্য, স্কোলিওসিস সাধারণত বয়ঃসন্ধির আগে শরীরের বৃদ্ধির সময়কালীন ঘটে, যেখানে মেরুদণ্ডের ৩৩টি হাড় বেঁকে যায় এবং তা শুধুমাত্র দীর্ঘ (৬-১০ ঘণ্টারও বেশি) জটিল ও নিখুঁত শল্যচিকিৎসার মাধ্যমে সারিয়ে তোলা সম্ভব।

যাঁরা স্বেচ্ছায় এবং নিঃস্বার্থভাবে এই মহৎ কাজে নিজেদের নিয়োজিত করেছেন, সেইসব স্পাইন সার্জন এবং চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন JIMSH-এর চেয়ারম্যান কৃষ্ণ কুমার গুপ্তা। তিনি জানিয়েছেন, ‘এই আয়োজন শুধু চিকিৎসা দক্ষতার পরিচায়ক নয়, এটি সেই সকল অবহেলিত শিশুদের স্বর তুলে ধরার এক প্রয়াস, যারা মেরুদণ্ডজনিত সমস্যার কারণে বছরের পর বছর দুর্ভোগের শিকার। এই ঐতিহাসিক উদ্যোগের সাক্ষী হয়ে আপনিও এই আন্দোলনকে আরও শক্তিশালী করতে পারেন এবং সকলের জন্য বিশ্বমানের চিকিৎসা সেবা সহজলভ্য করার বার্তাটি ছড়িয়ে দিতে পারেন।’

স্পাইসি রেসিপিজ (শেষ পর্ব)

যারা মুখরোচক খাবার খেতে এবং খাওয়াতে ভালোবাসেন, তারা বাড়িতেই বানিয়ে নিতে পারেন পনির কোলাপুরি কিংবা কাবলি ছোলার কাবাব। সঠিক উপায়ে যদি এই দুটি খাবার বানিয়ে খান কিংবা অতিথিদের খাওয়ান, তাহলে নিজের যেমন মন ভরে যাবে আনন্দে, ঠিক তেমনই অতিথিরাও এইসব খাবার খেয়ে আপনার রন্ধন প্রতিভার প্রশংসা করবেনই। পরিবেশন করা হচ্ছে উপকরণ এবং প্রণালী।

পনির কোলাপুরি

উপকরণ: ২০০ গ্রাম পনিরের ছোটো ছোটো টুকরো, ৮-১০টা কাজু বাদামের গুঁড়ো, ২ চামচ নারকেল বাটা, ২টো টম্যাটো, ২ টো কাঁচালংকা, সামান্য ধনেপাতা কুচো, ১ চামচ সাদা তিল, সামান্য আদা কুচো, ৩-৪টে দারচিনি, ২টো এলাচ, ১ চামচ গোলমরিচ গুঁড়ো, ২ টো লবঙ্গ, ২ বড়ো চামচ ঘি, হাফ চামচ হলুদগুঁড়ো, ১ ছোটো চামচ ধনেগুঁড়ো, সামান্য হিং, হাফ চামচ লাল লংকাগুঁড়ো, ১ ছোটো চামচ জিরেগুঁড়ো এবং নুন স্বাদমতো।

প্রণালী: গোটা জিরে, দারচিনি, লবঙ্গ, এলাচ পিষে নিয়ে নারকেলের পেস্ট-এর সঙ্গে মেশান। টম্যাটো, আদা, কাঁচালংকা এবং কাজু বাদাম মিশিয়ে পেস্ট তৈরি করে রাখুন। একটা ফ্রাইং প্যান-এ ঘি গরম করে, ওই গরম ঘিয়ের মধ্যে হিং, হলুদগুঁড়ো, লাল লংকাগুঁড়ো, ধনেগুঁড়ো প্রভৃতি মশলা মিশিয়ে ভাজুন। বাদামি রং নিলে নামিয়ে রাখুন। এরপর সামান্য তেল লেগে থাকা ওই ফ্রাইং প্যান-এ পনিরের টুকরোগুলো ভেজে নিন। এবার আবার সামান্য ঘি গরম করে, সমস্ত পেস্ট ঢেলে হালকা আঁচে কিছুক্ষণ নাড়াচাড়া করে নিয়ে সামান্য জল ঢেলে ঢেকে রাখুন ৪-৫ মিনিট। রান্না থেকে তেল ছাড়তে শুরু করলে, নামিয়ে নিয়ে গরম গরম পরিবেশন করুন।

কাবলি ছোলার কাবাব

উপকরণ: হাফ কিলোগ্রাম কাবলি ছোলা ভেজানো, ১০০ গ্রাম ভাঙা ছোলার ডাল, ২ বড়ো চামচ রিফাইন্ড তেল, ১ ছোটো চামচ হলুদগুঁড়ো, ১ ছোটো চামচ আদা পেস্ট, ১ ছোটো চামচ রসুন পেস্ট, সামান্য জয়িত্রি পাউডার, সামান্য গোলাপজল, ১ ছোটো চামচ এলাচগুঁড়ো, সামান্য কেশর, ১ ছোটো চামচ লাল লংকাগুঁড়ো এবং নুন স্বাদমতো।

প্রণালী: সবার প্রথমে ভিজিয়ে রাখা কাবলি ছোলার পেস্ট তৈরি করে নিন। এরপর ওই পেস্ট ভাপিয়ে নিন ২-৩ মিনিট এবং নামিয়ে ঠান্ডা করে নিন। কড়াইতে রিফাইন্ড তেল গরম করে, ১০০ গ্রাম ভাঙা ছোলার ডাল ভেজে নিয়ে ভাপিয়ে রাখা চানার পেস্ট-এর সঙ্গে মিশিয়ে রাখুন। এরপর আদা, রসুনের পেস্ট, হলুদগুঁড়ো, লংকাগুঁড়ো এবং বাকি সামগ্রী মিশিয়ে নিয়ে, সমস্ত উপকরণ মিশ্রিত চানার পেস্ট-কে ছোটো ছোটো করে চ্যাপটা রূপ দিন। সবশেষে ফ্রাইং প্যান-এ সামান্য তেল দিয়ে হালকা আঁচে সেঁকে নিয়ে ধনেপাতার চাটনি কিংবা টম্যাটো সস দিয়ে গরম গরম পরিবেশন করুন।

অতসী একটি ফুলের নাম (শেষ পর্ব)

শোভন তাঁকে আশ্বস্ত করে এই বলে— আমার অধিকাংশ লেখাই লিখতে বসার আগে থেকেই চিন্তায় থাকে। চিন্তার ভিতরে বিশ্লেষিত হতে হতে নিরাকার কল্পনা একসময় সাকারে পরিবর্তিত হয়ে যায়। এই রূপ বা কাহিনি ও বক্তব্যের সামগ্রিক চেহারা স্পষ্ট না হলে আমি লিখতে পারি না। এক কথায় এটাই আমার বিলাসিতা বলতে পারেন।

—সাধারণত কোন সময় লেখো?

—বাড়ির সবাই শুয়ে পড়লে, রাতেরবেলায় লুকিয়ে, শোভন নিজের মনের ভাব প্রকাশ করে। আবার কেউ যখন বাড়ি থাকে না সেই সময়।

পিসেমশাই জিজ্ঞাসা করেন— লিখে তৃপ্তি পাও মনে?

—গল্প শেষ না হওয়া পর্যন্ত তন্ময় হয়ে যাই যেন অর্জুনের লক্ষ্যভেদ। গল্প ছাড়া তখন কোনও কিছু ভাবতে ভালো লাগে না। কিন্তু গল্পটি লেখা যখন শেষ হয় তখন মনে হয় যেমনটি ভেবেছিলাম তেমনটি হল না। নির্ভেজাল তৃপ্তি পাই না। এ যেন মরুভূমির তপ্ত বালুর উপর দিয়ে ক্রমশ এগিয়ে যাওয়া মরুদ্যানের আশায়। যেমন একটা গানে আছে ‘মনেতে আঁকি তোমায় যেমন করে, তুলিতে হয় না আঁকা তেমন করে’।

পিসেমশাই এবার হেসে প্রশ্ন করেন— এই যে একটার পর একটা গল্প লিখেছ, ভবিষ্যতে হয়তো আরও অনেক লিখবে। কিন্তু কেন লেখো? কার জন্যে লেখো? না লিখলেই বা কার কী আসে যায়?

—লিখি নিজেরই সমস্যা সমাধান করার জন্যে। না লেখা পর্যন্ত ভীষণ অস্বস্তি বোধ করি। মনে শান্তি পাই না। কাব্য করে বললে বলতে হয়, যেন ‘বৃথা জন্ম এ সংসারে’।

অন্যমনস্ক ভাবে খাতার পাতা উলটানোর অবসরে পিসেমশাই ‘অতসী একটি ফুলের নাম’ গল্পটি বের করে বলেন— তোমার লেখা এই গল্পটি পড়ে শোনাও তো একবার।

পিসেমশাইয়ের কথামতো শোভন উক্ত গল্পটি ছাড়া আরও একটি গল্প পাঠ করে। গল্প পড়ে শোনাতে মনে মনে খুব আনন্দ হচ্ছিল। অভূতপূর্ব অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ে সে আপ্লুত হয়ে উঠেছিল। একাকী নিজের গল্প পড়তে কারওরই ভালো লাগে না যতক্ষণ পর্যন্ত বারোয়ারি না হয়। কিন্তু সেদিন ভালো লাগছিল পড়ে শোনাতে। গল্প লেখার সার্থকতা যে কী তা সেইদিনই প্রথম অনুভব করেছিল। বিশেষ করে এক বয়স্ক লোকের মুখোমুখি বসে নিজের লেখা গল্প পাঠ করে শোনানোর মধ্যে যে-রোমাঞ্চ থাকে তা এরকম কোনও মুহূর্তের সাক্ষী যারা, তারাই হৃদয়ঙ্গম করতে পারবেন ভালো।

অন্ধকার হয়ে গিয়েছিল। অক্ষরগুলো স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল না। পিসেমশাই নিজেই এক সময় বললেন— -আজ এখানেই থাক। গল্পগুলো রেখে যাও। রাতে সময় পেলে পড়ব। তবে তুমি ভীষণ আবেগপ্রবণ। আবেগ সংযত করতে শেখো। এই রোগ অনেকটা জন্ডিস রোগের মতো! অতি কথনে গল্পের মান ক্ষুণ্ণ হয় সেইদিকে যেন সজাগ দৃষ্টি থাকে। পরিমিত শব্দ প্রয়োগের দ্বারা মনের ভাব প্রকাশ করার চেষ্টা করবে।

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটা কথা আছে ‘সহজ কথায় লিখতে আমায় কহ যে সহজ কথা যায় না লেখা সহজে’। সহজ কথায় লেখার অভ্যেস করতে হবে। ভূমিকা উপন্যাস লিখতে প্রয়োজন হয়, গল্পে বেমানান লাগে। তোমার এখনও কাঁচা বয়স। লিখতে থাকো একটু একটু করে দোষ কেটে যাবে। প্রথম বয়সের লেখায় ভুল-ত্রুটি থেকেই যায় তা নিয়ে হতোদ্যম হয়ে যেও না।

নিজগৃহে ফিরে আসার সময় শোভন পিসেমশাইয়ের কথাগুলো রোমন্থন করতে করতে একটু নিস্তেজ হয়ে পড়েছিল। তাঁর উপদেশগুলো যুক্তিসঙ্গত হওয়া সত্ত্বেও কেন যেন মনে হচ্ছিল গল্পগুলো নিশ্চয়ই তাঁর ভালো লাগেনি। একবারের জন্যেও তিনি প্রশংসা করেননি। আশা করেছিল অন্তত একটু তারিফ করবেন বা সহানুভূতি দেখাবেন। কিন্তু না, তিনি আগাগোড়া কেবল ভালো না লাগারই আভাষ দিয়ে গেলেন। গল্পের বিষয়বস্তু চয়ন, উপস্থাপনা- – এসবের কিছুই তিনি উল্লেখ করলেন না। অতি সযত্নে তিনি এড়িয়ে গেলেন।

প্রায় মাস দেড়েক পরের ঘটনা। অম্লানের বাড়িতে শোভনের অবাধ যাতায়াত। একদিন ওর পড়ার টেবিলে পিসেমশাইয়ের সম্পাদিত ‘পঞ্চম’-এর সদ্য প্রকাশিত সংখ্যাটি হাতে নিয়ে বললে— এটা নতুন এসেছে বুঝি? তোর পড়া হয়ে গেছে?

আম্লান উত্তরে জানায়— আজকের বিকেলের ডাকে এসেছে এখনও খুলে দেখা হয়নি। তুই নিলে নিয়ে যা।

পত্রিকাটি শোভন বাড়িতে নিয়ে এসেছিল। কিন্তু তখনও সে জানত না যে, তার ভিতরে কী অপেক্ষা করে আছে তার জন্যে। মলাটের পাতা উলটে সূচীপত্রের উপর চোখ বোলাতেই হঠাৎ তার দৃষ্টি থেমে যায়। কিছুতেই যেন চোখ দুটোকে সে বিশ্বাস করতে পারছিল না। যেন প্রচণ্ড জোরে ধাক্কা খেয়ে শোভন চারদিক অন্ধকার দেখতে থাকে। এ যে তারই রচিত গল্প ‘অতসী একটি ফুলের নাম’! তফাৎ শুধু এই যে, তার নামের বদলে লেখকের নাম উদ্ধৃত করা আছে যজ্ঞেশ্বর মৈত্র ওরফে পিসেমশাই।

অবদমিত কৌতূহলবশত প্রকাশিত গল্পটির সঙ্গে নিজের পাণ্ডুলিপিটি মিলিয়ে দেখার উদ্দেশ্যে সে যখন ফোল্ডার খোলে, তখন পাঁচটি স্বনির্বাচিত গল্পের মধ্যে ওই নির্দিষ্ট গল্পটিই নিরুদ্দেশ। শোভন ভগ্নহৃদয়ে পরের দিনই পত্রিকাটি ফেরত দিয়ে আসে। অথচ মুখ ফুটে সে একবারের জন্যেও বলতে পারেনি যে, তার গল্প চুরি হয়ে গিয়েছে। কি করে বলবে অম্লান যে তার একান্ত হিতৈষী, অভিন্ন হৃদয় বন্ধু। এতদিনের প্রগাঢ় বন্ধুত্বে যদি হঠাৎ ফাটল ধরে যায়!

কল্পনা করতে পারেন— প্রতিশ্রুতিবদ্ধ উদ্‌গত অঙ্কুর শাখা-প্রশাখায় পল্লবিত হয়ে ওঠার আগেই যদি কেউ স্বেচ্ছায় মাড়িয়ে দেয়, তাহলে তাকে দেখতে কেমন লাগে?

(সমাপ্ত)

অতসী একটি ফুলের নাম (পর্ব-০২)

স্টেশন থেকে অটো রিকশায় বাড়ি আসার পথেই পিসেমশাই হঠাৎ একসময় প্রশ্ন করেন— তুমিই বুঝি শোভন? তুমি গল্প লেখো?

—হ্যাঁ। শোভন লাজুক হেসে জবাব দেয়।

—বাঃ! খুব ভালো কথা। বাংলার বাইরে থেকে বাংলা চর্চা? খুবই প্রশংসনীয় ব্যাপার। বাংলার গৌরব তোমরা। আমরা মিছে ভয় পাচ্ছি যে, বাংলা ভাষা বিলুপ্তির পথে। যা দেখছি তাতে ভয়ের কোনও কারণ নেই। বাংলা ভাষা বেঁচে থাকবে তার স্বকীয়তার গুণে তোমাদের মধ্যে দিয়ে, আমি নিশ্চিত। তোমাদের মতো খুদে সাহিত্যিকদের দেখে মনে ভরসা পাচ্ছি। কথা বলতে বলতে পাঞ্জাবির বাঁ-পকেট থেকে নস্যির ডিবে-সহ রুমাল বের করে তাতে টোকা মেরে পিসেমশাইয়ের দ্বিতীয় প্রশ্ন, তুমি লেখাপড়া কী নিয়ে করছ?

—ম্যাথেমেটিক্সে অর্নাস সেকেন্ড ইয়ারের পরীক্ষা দিয়েছি।

—বাঃ চমৎকার! তুমি দেখছি ‘এ্যালিস ইন দ্যা ওয়ান্ডারল্যান্ড’ প্রণেতা দ্বিতীয় লুইস ক্যারল। তিনিও গণিতের অধ্যাপক ছিলেন।

—এতে আর আশ্চর্যের কী আছে? বিশ্ববন্দিত স্বনামধন্য আইনস্টাইন ছিলেন বেহালা বাদক।

হুম শব্দ নির্গত করে পিসেমশাই তাঁর দুই নাসিকা গহ্বরে নস্যি ঠুসে গম্ভীর ভাবে প্রশ্ন করেন— এ যাবৎ আনুমানিক ক’খানা গল্প লিখেছ?

—বেশি নয়, গোটা পনেরো। এর মধ্যে পাঁচটি আমার স্বনির্বাচিত শ্রেষ্ঠ গল্প। শোভন জবাবদিহি করে।

—নিজের গল্প সম্বন্ধে তুমি তো বেশ সচেতন দেখছি। পিসেমশাই মন্তব্য করেন।

—হ্যাঁ, ওই লেখাগুলো আমার বহু বিনিদ্র রজনীযাপনের ফসল।

—কবে থেকে লিখছ?

শোভন উত্তরে জানায় — ক্লাস সেভেন-এইটে পড়ার সময় থেকে লিখতে আরম্ভ করেছি।

পিসেমশাই জানতে চান— এ যাবৎ কোথাও কোনও পত্রিকায় ছেপে বেরিয়েছে?

—না, সেরকম সুযোগ আজ অবধি পাইনি। ক্লাস টেনে পড়ার সময় স্কুল ম্যাগাজিনে একবার ছেপে বেরিয়েছিল আর ওটাই ছিল আমার জীবনের প্রথম ছাপানো গল্প। তারপর বহু বছর পরে আমার কলেজ আয়োজিত ‘ইন্টার কলেজ অন দ্যা স্পট গল্প প্রতিযোগিতায়” আমি প্রথম হয়েছিলাম।

পিসেমশাইকে নির্বাক বসে থাকতে দেখে অম্লান হঠাৎ বলে ওঠে— আপনার পঞ্চম-এ ওর লেখা একটি গল্প ছাপানো যায় না?

অম্লানের কথার জবাবে পিসেমশাই শোভনের উদ্দেশ্যে মন্তব্য করেন— এখনই প্রকাশ করার কথা ভেবে লাভ নেই। উৎকৃষ্ট লেখা কখনও কোনওকালেই অপ্রকাশিত থাকেনি, ইতিহাস সাক্ষী। পৃথিবীর ইতিহাসে এখনও পর্যন্ত কোনও লেখকের ভালো লেখা অপ্রকাশিত রয়ে গেছে তা শোনা যায়নি। সুতরাং তুমি শুধু লিখে যাও। ভালো লিখলে একদিন তা নিজগুণে ছেপে বেরোবে। সেই বিষয়ে চিন্তা কোরো না। এও এক প্রকার সাধনা, সেই কারণে বলা হয় সাহিত্য সাধনা। সাধনায় সিদ্ধিলাভ এত সহজে হয় না। চরৈবেতি, চরৈবেতি, নিজের লক্ষে এগিয়ে যাও। মনে রাখবে জীবনে সফলতা পাওয়ার নির্দিষ্ট সময় থাকে। সেই সময়ের জন্যে উদগ্রীব অপেক্ষায় থাকতে হয়।

রাস্তার দুই পাশের দৃশ্যাবলী দেখতে দেখতে পিসেমশাই বলেন— আজ বিকেলে আমার বিশেষ কোনও কাজ নেই। তোমার স্বনির্বাচিত গল্পগুলো নিয়ে এসো। পড়ে দেখব তোমার লেখার হাত কেমন? আমার হাতে কিন্তু সময় বড়োই কম। শুক্রবারে ট্রেন ধরব।

পিসেমশাইয়ের কঠোর নির্দেশ অনুযায়ী বিকেলের দিকে শোভন স্খলিত চরণে, সংকোচিত হৃদয়ে অম্লানের বাড়িতে আসে স্বরচিত গল্পপাঠের উদ্দেশ্যে। পিসেমশাই ছাদে উঠে মুগ্ধ নয়নে চারিদিকের দৃশ্য দেখছিলেন একমনে। অস্তগামী সূর্যের শেষ রশ্মিটুকু তখনও আকাশে লেগেছিল। ছাদটা সূর্যের তাপে গরম হয়েছিল। অম্লান পাইপ দিয়ে জল ছিটিয়ে ছাদটা ঠান্ডা করছিল। শোভনকে দেখতে পেয়ে পিসেমশাই কৌতূহলোদ্দীপক স্বরে প্রশ্ন করে জানতে চায়— গল্পগুলো এনেছ তো?

—হ্যাঁ। শোভনের সংক্ষিপ্ত জবাব।

—বেশ। তারপর অম্লানের দিকে তাকিয়ে বললেন, একটু পরে একটা শতরঞ্চি এনে পেতে দিও। আমেজ করে খোলা আকাশের নীচে বসে একটু সাহিত্যচর্চায় মনোনিবেশ করা যাক। ছাদে লাইটের ব্যবস্থা আছে তো? দিল্লি শহর তোমাদের বিচারে কেমন লাগে জানি না তবে আমার কিন্তু বড়ো ভালো লাগে। দিল্লির খুব শান্ত পরিবেশ। লেখাপড়া করার জন্যে আদর্শ জায়গা। এত খোলামেলা আর শান্ত পরিবেশ অন্য কোথাও নেই।

ভেজা ছাদটা শুকিয়ে যাওয়ার পরে শতরঞ্চির উপর বসে পিসেমশাই শোভনের হাত থেকে গল্পের খাতাটা নিজের কোলের উপর নিয়ে জিজ্ঞাসা করেন— তুমি গল্পের উপকরণ কোথা থেকে সংগ্রহ করো?

শোভন উত্তরে জানায়— আমার লেখা বেশিরভাগ গল্পই কোনও কবিতার লাইন বা কোনও গানের কলি বা খবরের কাগজে প্রকাশিত কোনও ঘটনা বা কোনও মনীষীর বাণী থেকে রচিত। যেমন ধরুন, আমার লেখা ‘স্থানীয় সংবাদ’ গল্পটি। এই গল্পটি আমি কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের ‘একটি মোরগের কাহিনি’ কবিতার একটি লাইন ‘খাবার নয় খাবার হিসেবে’-র উপর ভিত্তি করে লিখেছিলাম। আমার লেখা ‘আঁধারে আলো” গল্পটি খবরের কাগজে প্রকাশিত একটি খবরের উপর ভিত্তি করে লেখা। ঠিক তেমনি ‘বনস্থলী বিদ্যাপীঠ’ গল্পটি আমি রচনা করেছিলাম রামকৃষ্ণদেবের মুখনিঃসৃত চাল-কলা বাঁধা বিদ্যে কথাটির উপর ভিত্তি করে। এইরকম আর কী।

অর্থাৎ আমার দেখা-শোনা কোনও ঘটনার আড়ালে আর কোনও ঘটনা লুকিয়ে আছে কিনা তা আমাকে অস্থির করে তোলে। আসল কথা, সাহিত্য সৃষ্টির ক্ষেত্রে মানুষের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাই শেষ কথা নয়। লেখকের নিজস্ব অনুভূতি, কল্পনাশক্তি ও স্বতন্ত্র দৃষ্টিভঙ্গির একটা বড়ো ভূমিকা থাকে। এইসব কিছুই গড়ে তোলে কাহিনির পটভূমি।

—ভাবনা-চিন্তার সঙ্গে সঙ্গেই কি লিখতে বসে যাও?

(ক্রমশ…)

স্পাইসি রেসিপিজ (পর্ব-০১)

যারা মুখরোচক খাবার খেতে এবং খাওয়াতে ভালোবাসেন, তারা বাড়িতেই বানিয়ে নিতে পারেন বেসন-বড়া পোলাও, রাজকীয় ভেণ্ডি কিংবা সয়া কিমা। সঠিক উপায়ে যদি এই তিনটি খাবার বানিয়ে খান কিংবা অতিথিদের খাওয়ান, তাহলে নিজের যেমন মন ভরে যাবে আনন্দে, ঠিক তেমনই অতিথিরাও এইসব খাবার খেয়ে আপনার রন্ধন প্রতিভার প্রশংসা করবেনই। পরিবেশন করা হচ্ছে উপকরণ এবং প্রণালী।

বেসন-বড়া পোলাও

উপকরণ: ২ কাপ বেসন, ১ কাপ পোলাও চাল, হাফ কাপ দই, হাফ চামচ আজোয়ান, হাফ ছোটো চামচ ‘সুমন” ব্র্যান্ড লাল লংকাগুঁড়ো, এক বড়ো চামচ চৌকো করে কাটা পেঁয়াজ, ২ চামচ পেঁয়াজ বাটা, ৪-৫টা রসুনের পেস্ট, এক টুকরো আদা বাটা, ৪-৫টা বড়ো এলাচ, ২ টুকরো দারচিনি, ৪-৫টা লবঙ্গ, ১ চামচ গোলমরিচের গুঁড়ো, সামান্য হিং, ২ ছোটো চামচ ধনেগুঁড়ো, হাফ চামচ গরমমশলা, হাফ চামচ হলুদগুঁড়ো, সামান্য ধনেপাতা কুচো, ২ টো কাঁচালংকার কুচো, ২-৩টে তেজপাতা, পরিমাণ মতো সাদা তেল, ২ চামচ ঘি, নুন স্বাদ অনুসারে।

প্রণালী: বেসনের মধ্যে স্বাদমতো নুন, স্বাদ বাড়ানোর জন্য ‘সুমন’ ব্র্যান্ড লাল লংকাগুঁড়ো, আজোয়ান এবং চৌকো করে কাটা পেঁয়াজ মিশিয়ে নিন ভালো ভাবে। ওই মিশ্রণে সামান্য জল দিয়ে দু-মিনিট ভাপিয়ে নিন। ভাপানো হয়ে গেলে ঠান্ডা করে ছোটো ছোটো বড়ার আকার দিয়ে সামান্য ঘি দিয়ে ফ্রাইং প্যান-এ হালকা আঁচে লাললাল করে ভেজে রাখুন। এরপর ফ্রাইং প্যান-এ সামান্য ঘি গরম করে ওর মধ্যে লাল লংকাগুঁড়ো এবং গরম মশলা দিয়ে নাড়াচাড়া করে দই মেশান৷ এবার আদা, রসুন সহ সমস্ত মশলা মিশিয়ে ভালো ভাবে ভাজুন। বাদামি রং নিলে নামিয়ে রাখুন। মশলা বানিয়ে রাখার পর, চাল ধুয়ে ভাত বানিয়ে নিন। ভাতের ফ্যান ভালো ভাবে ঝরিয়ে নিয়ে রাখুন। সবশেষে, একটা হাঁড়িতে ঘি গরম করে আঁচ বন্ধ করুন এবং ওর মধ্যে ভাত এবং তৈরি করে রাখা মশলা মিশিয়ে নিলেই পোলাও তৈরি। এবার কাচ কিংবা চিনামাটির প্লেটে পোলাও দিয়ে, তার উপর বেসন বড়া, কাঁচালংকা এবং ধনেপাতার কুচো ছড়িয়ে দিয়ে গরম গরম পরিবেশন করুন।

রাজকীয় ভেণ্ডি

উপকরণ: ২৫০ গ্রাম ভেণ্ডি লম্বা টুকরো করে কাটা, ২টো কাঁচালংকা, ১টা পেঁয়াজ কুচো, ১টা টম্যাটো কুচো, ১ চামচ কাজু বাদামের গুঁড়ো, ১ বড়ো চামচ ক্রিম, হাফ ছোটো চামচ আজোয়ান, সামান্য হিং, হাফ ছোটো চামচ হলুদগুঁড়ো, হাফ ছোটো চামচ লাল লংকাগুঁড়ো, হাফ ছোটো চামচ গরম মশলা, পরিমাণ মতো সরষের তেল, সামান্য ধনেপাতা কুচো, ১ চামচ আদাকুচো, ৩- ৪টে রসুন কুচো এবং স্বাদমতো নুন।

প্রণালী: কড়াইতে তেল গরম করে কেটে রাখা ভেণ্ডি স্বাদমতো নুন দিয়ে হালকা ভেজে রাখুন। ভেণ্ডি নামিয়ে রাখার পর, ওই অবশিষ্ট তেলে কুচো পেঁয়াজ, টম্যাটো, আদা, রসুন, কাঁচালংকা, আজোয়ান, ক্রিম, হিং প্রভৃতি দিয়ে ভাজুন ভালো ভাবে। ওই মশলায় তেল ছাড়তে শুরু করলে আঁচ বন্ধ করে রাখুন। এরপর, আবার মশলা হালকা গরম করে, ওর মধ্যে কাজু বাদামের গুঁড়ো মিশিয়ে এক মিনিট নেড়ে নিয়ে, ভেজে ঠান্ডা করে রাখা ভেণ্ডিগুলো দিয়ে, একটু নাড়াচাড়া করে নামিয়ে নিন এবং ধনেপাতার কুচো ছড়িয়ে গরম গরম পরিবেশন করুন।

সয়া কিমা

উপকরণ: ১ কাপ সয়া দানা, হাফ কাপ মটর দানা, ১ বড়ো চামচ আদা-রসুনের পেস্ট, ২ টো কাঁচালংকা কুচো, ১টা বড়ো পেঁয়াজ কুচো, ২ টো টম্যাটো কুচো, হাফ চামচ গরম মশলা, হাফ ছোটো চামচ হলুদগুঁড়ো, হাফ ছোটো চামচ গোটা জিরে, হাফ ছোটো চামচ লাল লাংকাগুঁড়ো, ১ ছোটো চামচ ধনেগুঁড়ো, সামান্য ধনেপাতা কুচো, ২ চামচ ঘি এবং নুন স্বাদমতো।

প্রণালী: প্রথমে, মটরদানা আগের রাতে ভিজিয়ে রাখুন। পরের দিন মটরদানা জল থেকে তুলে নিয়ে আবার জল দিয়ে সেদ্ধ করে জল ফেলে দিন। সয়াদানা গরম জলে কিছুক্ষণ রেখে তুলে নিয়ে পিষে রাখুন। এরপর কড়াইতে ঘি গরম করে পেঁয়াজ, টম্যাটো, আদা-রসুনের পেস্ট, কাঁচালংকার কুচো, সমস্ত মশলা এবং স্বাদমতো নুন দিয়ে হালকা আঁচে ভাজুন। বাদামি রং এসে গেলে, ওই উপকরণে পিষে রাখা সয়াদানা এবং সেদ্ধ করে রাখা মটরদানা মিশিয়ে ভালো ভাবে নাড়াচাড়া করতে থাকুন। এরপর সামান্য জল ছিটিয়ে দিয়ে ঢেকে রাখুন। কিছুক্ষণ পর যখন জল শুকিয়ে যাবে, তখন নামিয়ে নিয়ে ধনেপাতার কুচো দিয়ে গরম গরম পরিবেশন করুন।

(ক্রমশ…)

অতসী একটি ফুলের নাম (পর্ব-০১)

তখন গ্রীষ্মকাল। কলেজের বার্ষিক পরীক্ষা সবে মাত্র শেষ হয়েছে। লেখাপড়ার দায়-দায়িত্ব নেই বললেই চলে। তাই অফুরন্ত অবকাশ। অম্লানের বাড়ির ছাদে বসে বিকেলের চা পান করতে করতেই ওরা দু’জনে একসঙ্গে বসে গল্প করছিল। তাঁরা একই কলেজে না পড়লেও এক সময়ের স্কুলের বন্ধু। শৈশবের বন্ধুত্বটা এখনও সজীব, সতেজ ও সবুজ হয়ে আছে— শুকনো পাতার মতো হলুদ হয়ে যায়নি।

কথা প্রসঙ্গে অম্লান হঠাৎ বলে ওঠে— তোর তো এখন ভারি মজা। চুটিয়ে গল্প লেখার সুযোগ পেয়েছিস। তাছাড়া তুই নিজেও বলিস গ্রীষ্ম ও বর্ষা ঋতু দুটো তোর খুব প্রিয়। তোকে গল্প লেখায় অনুপ্রাণিত করে। তোর বিচারে ভীষণ প্রেরণাদায়ক। তোর গল্প লেখার পক্ষে নাকি উপযুক্ত ও আদর্শ সময়। আষাঢ়স্য প্রথম দিবসে পুঞ্জিভূত মেঘ অলকাপুরীর উদ্দেশ্যে রওনা হওয়া মাত্র অভিশপ্ত যক্ষের ন্যায় তুইও রোমাঞ্চিত হয়ে গল্প লেখায় উদ্বুদ্ধ হয়ে উঠিস তাই না? বর্ষা ঋতু আসন্ন। তোর সুদিন এল বলে!

শোভন জবাবদিহি করে— হ্যাঁ, লোকে যেমন বলে, তার নাকি সময় কাটে না। আমার কিন্তু কখনও সেরকম মনে হয় না। গল্পের কথা ভাবতে ভাবতেই আমার সময় কেটে যায়। তারপর থাকে লেখার পালা। হাতে যখন গল্প থাকে তখন প্রায়শই মনে হয় কেন আটচল্লিশ ঘণ্টায় দিন-রাত্রি হয় না? অম্লান শোভনের কথায় বিশেষ গুরুত্ব না দিয়ে অন্য প্রসঙ্গ উত্থাপন করে।

—জানিস, পিসেমশাই চিঠির উত্তরে কী লিখেছেন? শোভনকে বলে রেখো সে যেন তার স্বরচিত বাছাই করা গল্পগুলো আলাদা করে গুছিয়ে রাখে। আমি আমার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধুর ছেলের বিয়েতে দিল্লি আসছি। প্রথমে তোমাদের বাড়ি উঠব। পরের দিন যাব বিয়েবাড়ি। তারপরের দিন নতুন বউকে সঙ্গে নিয়ে ট্রেনে উঠব।

শোভন দ্বিধাজড়িত স্বরে বলে ওঠে— ছিঃ! তুই আবার পিসেমশাইকেও আমার গল্পের কথা লিখে জানিয়েছিস? অতবড়ো রাঘববোয়াল সদৃশ ব্যক্তিত্বের কাছে আমার মতো ত্যালাপিয়া গোছের গল্পকারের তারিফ করেছিস? সত্যি, তোর বিদ্যা বুদ্ধি দিনে দিনে নিম্নগামী হয়ে পড়ছে দেখছি। তারপর একটু থেমে রসিকতা করে বলে, অবশ্য তোর কোনও দোষ নেই। কেমিস্ট্রি-পড়ুয়া দুনিয়ার সব ছাত্রদেরই একই অবস্থা। মাথায় একটু দোষ হয়েই যায়। করার কিছু নেই।

অম্লান কথাটা গায়ে না মেখে বললে— তাতে কী হয়েছে? পিসেমশাই কি পর? সে তো ঘরের লোক। তোর সম্পর্কে আমি বহুবার লিখেছি তাঁকে। এতদিন পরে তিনি এবার সশরীরে আসছেন। এলে তোকে প্রথমবার দেখবেন ঠিকই কিন্তু চিঠিপত্রের মাধ্যমে তুই তাঁর কাছে বহুল আলোচিত। আসল কথা কী জানিস, তোর লেখা গল্পগুলো আমার খুব ভালো লাগে। পড়লেই মনে হয় তোর প্রত্যেকটি গল্প একেবারে বাস্তব জীবন থেকে বেছে নেওয়া। গল্প যখন গল্প হিসেবে পাঠকের কাছে ধরা না পড়ে সেটাই প্রকৃত গল্প হয়ে ওঠে। ভাষার চাকচিক্য না থাকলেও ভাবের ঘরে অভাব চোখে পড়ে না। গল্পের ভালো-মন্দ কীভাবে বিচার করা হয়, অত শত বুঝি না। কিন্তু এইটুকু অন্তত স্বীকার করতে বাধ্য যে, গল্পটা যখন শেষ হয় তখন মনের কোণে একটা রেশ থেকে যায়। মনে হয় আরেকটু বড়ো হলে ভালো হতো। তখন তোর কথা ভেবে গর্বে আমার বুকটা স্ফীত হয়ে ওঠে। তাতেই মনে হয় তোর গল্প লেখার হাত ভালো। এই গুণ সবার থাকে না।

একটু থেমে সে আরও জানায়— আমার মনের ইচ্ছে কি জানিস? ‘পঞ্চম’ নামে পিসেমশাই-এর সম্পাদিত ত্রৈমাসিক পত্রিকায় তোর গল্প যেন স্থান পায়৷ লোকে পড়ুক জানুক তোকে। গল্পগুলো লোকচক্ষুর আড়ালে তোশকের তলায় রেখে কী লাভ? তোর প্রতিভার মূল্যায়ন হওয়া উচিৎ। কতদিন আর লুকিয়ে রাখবি নিজেকে?

—ওরকম ইচ্ছে তো আমারও হয়। কিন্তু কে আর ছাপতে চায় বল? জীবনে বেড়ে ওঠার পক্ষে একটা অবলম্বনের প্রয়োজন হয়। আমার ভাগ্যে সেটি জুটছে কোথায়? একেক সময় মনে হয় গল্প লেখার অভ্যেসটা ছেড়ে দেব। কিন্তু কয়েক দিন পরেই নিজের অজান্তে আবার খাতা- কলম নিয়ে বসে পড়ি। গল্প আমাকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায়। ওকে পরিত্যাগ করা যাবে না কখনও। এক কথায় আমি ওর প্রেমে পড়ে গিয়েছি।

অম্লান সান্ত্বনা দিয়ে বলে— এবার দেখিস পিসেমশাই তোর একটা গল্প নিশ্চয়ই প্রকাশ করবেন। তোর লেখা গল্প যখন অন্য সকলের ভালো লাগে তাঁরও ভালো লাগতে বাধ্য। তিনিও রক্তে-মাংসে সৃষ্ট এক মানুষ। নিজেও সাহিত্যচর্চা করেন। তিনি যখন নিজে থেকে বলেছেন তোর গল্পের সমালোচনা করবেন তাহলে আর সমস্যা কোথায়! একজন বিদগ্ধ লোকের কাছ থেকে গল্পের দোষ-ত্রুটিগুলো জেনে নিতে আপত্তি করবি কেন? তোর পক্ষে এটা এক সুবর্ণ সুযোগ। কোনও মতেই হাতছাড়া করা উচিত নয়। আমার একান্ত অনুরোধ গল্পগুলো তুই সত্ত্বর গুছিয়ে রাখিস। পরে যেন অনুতাপ করতে না হয় তোকে। মনে রাখিস আমি তোর ভালো বৈ খারাপ চাইব না কখনও।

—কবে আসছেন পিসেমশাই? শোভন নির্লিপ্ত স্বরে জানতে চায়।

—আগামী বুধবার। আর মাত্র পাঁচদিন বাকি। উনি পাটনায় থাকেন। মগধে আসছেন। তুই কিন্তু তৈরি হয়ে থাকিস। স্টেশনে যাব তাঁকে নিয়ে আসার জন্যে। সেই সুযোগে তোর সঙ্গেও পরিচয় হয়ে যাবে।

এই পাঁচটা দিন শোভনের যে কীভাবে কেটেছিল তা শুধু ওই জানে, বলে বোঝানো যাবে না। সর্বক্ষণ সে অনাগত পিসেমশাইয়ের ধ্যানে মগ্ন থাকত। তারই ফাঁকে চলত নিজের গল্পগুলোকে নিয়ে কঠিন গবেষণা। অসাবধানতাবশত যদি কোথাও কোনও বিচ্যুতি ঘটে থাকে সময় থাকতে তা সংশোধন করে নেওয়া। অর্থাৎ একাধারে সাহিত্যিক ও সমালোচক পিসেমশায়ের মুখোমুখি হওয়ার পক্ষে যথা সম্ভব নিজেকে তৈরি করে নিচ্ছিল সে। একদিকে যেমন লজ্জা-ভয় মিশ্রিত আড়ষ্টতা ছিল, অন্যদিকে আবার সমস্ত মন-প্রাণ জুড়ে শোভনের অন্তর্গভীরে বয়ে যাচ্ছিল আনন্দের ফল্গুধারা। অব্যক্ত এক শিহরণ খেলা করছিল সমস্ত সত্তা জুড়ে। জীবনে চরম কিছু পাওয়ার নেশায় মানুষ বোধহয় এমনই উদ্বেল হয়ে ওঠে।

(ক্রমশ…)

পড়ার জন্য সীমাহীন গল্প-নিবন্ধসাবস্ক্রাইব