ব্যক্তিগত যত্নের A to Z

মানুষের জীবনের বেশিরভাগ সময়টাই কেটে যায় দায়িত্ব-কর্তব্য পালনে। তাই অনেকের ব্যক্তিজীবন থাকে অবহেলিত। আর যারা ব্যক্তিগত যত্নের বিষয়ে সঠিক সময়ে ভাবেননি, তারা জীবন সায়াহ্নে এসে আক্ষেপ করেন। কিন্তু পরে ভেবে লাভ কী! মনুষ্য- জীবনকে সার্থক করে তুলতে হলে সঠিক সময়ে নিজের যত্ন নেওয়া আবশ্যক। কারণ, রোগভোগ কিংবা অসুখী মন নিয়ে গুমরে থাকার কোনও মানে হয় না। তার চেয়ে বরং নিজের জন্যও ভাবুন, সময় দিন নিজেকে। যত্ন নিন নিজের স্বাস্থ্যের এবং সুখ- স্বাচ্ছন্দ্যের। সবার প্রথমে শরীরে গড়ে তুলুন রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা। তারপর, মন ভালো রাখার কৌশল রপ্ত করুন। এই বিষয়ে আপনাকে সাহায্য করার জন্য কলকাতা-র দু’জন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক এবং একজন মনোবিদের পরামর্শ তুলে ধরা হচ্ছে।

ডা. পার্থজিৎ দাস
(ডিরেক্টর- এশিয়ান ইনস্টিটিউট অফ ইমিউনোলজি অ্যান্ড রিউম্যাটোলজি)

সুস্থ-স্বাভাবিক থাকতে হলে, প্রথমে আপনার শরীরের ইমিউন সিস্টেমকে ঠিক রাখতে হবে, অর্থাৎ ইমিউনিটি পাওয়ার বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে বাড়াতে হবে। নয়তো, অটোইমিউন-এর সমস্যায় পড়তে পারেন। মনে রাখবেন, অটোইমিউন এমন একটি রোগ, যা শরীরের স্বাভাবিক কোষের উপর আঘাত হানে। বর্তমানে পুরুষদের তুলনায় নারীরা বেশি অটোইমিউন ডিজিজ-এর শিকার হচ্ছেন। আর এখন ধীরে ধীরে অটোইমিউন রোগের প্রকোপ বাড়ছে। এটি সম্ভবত হরমোনের পরিবর্তন, পরিবেশগত বিষাক্ত পদার্থ, খাদ্য, মানসিক চাপ, আঘাত, ব্যায়ামের অভাব, সংক্রমণ এবং অন্যান্য কারণে হতে পারে। রিউম্যাটিক ওষুধ ছাড়াও, জীবনধারার পরিবর্তনের ফলে স্বাভাবিক সুস্থতায় ফিরে আসা সম্ভব। এর জন্য যে-সব বিষয়ের উপর গুরুত্ব দিতে হবে, তা হল–

স্বাস্থ্যকর খাবার

পুষ্টি এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ঘনিষ্ঠ ভাবে সম্পর্কযুক্ত। যেহেতু আপনার ইমিউন সিস্টেমের ৮০ শতাংশ অস্ত্রের আস্তরণের মধ্যে রয়েছে, তাই প্রতিদিন আপনি কী খাচ্ছেন, তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যদি পুষ্টির ভারসাম্যই না থাকে, তাহলে অটোইমিউন রোগের শিকার হতে পারেন। সেইসঙ্গে, পর্যাপ্ত হাইড্রেশন বজায় রাখুন। আপনাকে প্রাকৃতিক প্রোবায়োটিক এবং প্রিবায়োটিক খাবার খেতে হবে। বিশেষকরে ফল এবং সবজি অর্থাৎ ডায়েটারি ফাইবার সমৃদ্ধ খাবার খাওয়া আবশ্যক। কিন্তু প্রক্রিয়াজাত খাবার, কৃত্রিম রং-যুক্ত মিষ্টি, সাধারণ কার্বোহাইড্রেট এবং গ্লুটেন এড়িয়ে চলতে হবে।

ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন

যাদের ওজন বেশি বা স্থূল চেহারা, তাদের রোগের ঝুঁকি বেশি। মনে রাখবেন, পেটে চর্বি হলে কোষগুলি যৌগ তৈরি করে এবং নিঃসরণ করে, যা ক্ষতিকারক। তাই আপনি যদি স্থূল চেহারার হয়ে থাকেন, তাহলে শরীরের ওজন অন্তত দশ শতাংশ কমাতে হবে সুস্থ থাকার জন্য।

মানসিক চাপমুক্ত থাকুন

স্ট্রেস কর্টিসলের বৃদ্ধি ঘটায়, যা পরে শরীরে প্রদাহ সৃষ্টি করে। গবেষণা থেকে দেখা গেছে যে, স্ট্রেস অটোইমিউন রিউম্যাটিক রোগের উৎস হতে পারে। তাই, মানসিক চাপ কমাতে হবে। অতএব, জীবনের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব রাখুন। বন্ধুবান্ধব এবং পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সুস্থ সম্পর্ক গড়ে তুলুন, শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম করুন, যেমন— প্রাণায়াম, ধ্যান, যোগব্যায়াম ইত্যাদি। সেইসঙ্গে, এড়িয়ে চলুন ধূমপান এবং মদ্যপান।

পর্যাপ্ত ঘুমের প্রয়োজন

অন্তত সাত-আট ঘণ্টা ঘুমোন প্রতি রাতে। যদি আপনি কম ঘুমোন, তাহলে আপনার ইমিউন সিস্টেম সুফল দেবে না। ঘুম শরীরের টিস্যুগুলিকে যথাযথ ভাবে নিরাময় করতে সাহায্য করে এবং অটোইমিউন রোগ আটকাতে সাহায্য করে, শরীরকে হরমোনের ভারসাম্যহীনতার সমস্যা থেকেও মুক্তি দেয়। ঘুমোনোর সঠিক সময় রাত ৯-টা থেকে ভোর ৫-টা৷

উপযুক্ত ব্যায়াম করুন

দীর্ঘস্থায়ী অটোইমিউন রোগের বিরুদ্ধে লড়াই করে সুফল দেয় শারীরিক ব্যায়াম। নিয়মিত অ্যারোবিক ব্যায়াম (যেমন— হাঁটা, জগিং, সাইকেল চালানো, সাঁতার প্রভৃতি) পেশীকে শক্তিশালী করে, টিস্যুকে সুস্থ রাখে, হাড় মজবুত করে এবং মানসিক চাপ কমায়।

ডা. এম এস পুরকাইত
(মেডিকেল সুপারিনটেনডেন্ট- টেকনো ইন্ডিয়া ডামা হাসপাতাল)

সুস্থ ও দীর্ঘ জীবন-যাপনের জন্য কিছু ভালো অভ্যাস গড়ে তোলা গুরুত্বপূর্ণ। আমরা প্রতিদিন আমাদের শরীরকে কী সরবরাহ করছি, সেই বিষয়ে আমাদের সচেতন থাকতে হবে। প্রতিদিন কিছু সুঅভ্যাস গড়ে তুলতে হবে প্রত্যেককে। স্বাস্থ্যহানির ঝুঁকি থেকে মুক্ত থাকার জন্য কী কী করা উচিত, সেই বিষয়ে জেনে নিন বিশদে।

O প্রোটিন, ফাইবার এবং ভিটামিন সমৃদ্ধ স্বাস্থ্যকর খাবার রাখতে হবে প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায়। যেমন— প্রাকৃতিক ভাবে পাওয়া ফল, সবুজ শাক-সবজি প্রভৃতি। রান্নার মাধ্যমও হওয়া উচিত স্বাস্থ্যকর। যেমন— অলিভ অয়েল, ক্যানোলা তেল, সরষের তেল কিংবা সূর্যমুখী তেল অল্প পরিমাণ দিয়ে রান্না করতে হবে। প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় মাছ, চর্বিহীন মাংস এবং ডিম অন্তর্ভুক্ত করতে পারেন নির্দিষ্ট মাত্রায়। লবণ ও চিনি খাওয়া নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।

O সপ্তাহে ৪ থেকে ৫ দিন ২০ থেকে ৪০ মিনিট ধরে হালকা থেকে মাঝারি ব্যায়াম করুন। সপ্তাহে ৫ দিন ১০,০০০ ধাপ হাঁটা আবশ্যক।

O প্রতিদিনের রুটিনে মেডিটেশন এবং যোগাসন অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। হাত জীবাণুমুক্ত রাখতে হবে সর্বদা। এর জন্য খাওয়ার আগে-পরে জীবাণুনাশক সাবান দিয়ে হাত ধুতে হবে কিংবা ভালো স্যানিটাইজার দিয়ে হাত পরিষ্কার রাখতে হবে। রাস্তার খোলা খাবার এড়িয়ে চলুন। শুধুমাত্র পরিষ্কার এবং ফিল্টার করা জল পান করুন।

O শরীরে কোনওরকম অস্বস্তি অনুভব করলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিন যত দ্রুত সম্ভব। মানসিক চাপমুক্ত থাকার জন্য নিজেকে নানারকম ভাবে ব্যস্ত রাখুন সর্বদা। হাতে কাজ না থাকলে ভালো বই পড়ুন কিংবা কমেডি ছবি দেখুন।

অপরূপা ওঝা
(ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট-মনোশিজ, টেকনো ইন্ডিয়া গ্রুপ)

O মানসিক সুস্থতা বজায় রাখতে হলে, কিছু সময়ের জন্য মুঠোফোনের স্ক্রিন থেকে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করুন এবং অফলাইন কার্যকলাপে অংশগ্রহণ করুন।

O অনেক সময় আমরা শরীর এবং মনের উপর চাপ পড়লেও অক্লান্ত পরিশ্রম করি। কিন্তু দীর্ঘদিন শরীর এবং মনের উপর চাপ পড়লে এবং সেইসঙ্গে উপযুক্ত বিশ্রাম না হলে, রোগের শিকার হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে। তাই, কর্মক্ষেত্রে আপনার ক্ষমতার বাইরে কাজের বোঝা চাপলে ‘না’ বলতে শিখুন। কারণ, সবকিছু মেনে নিলে তা ব্যক্তিত্বহীনতার পরিচয় দেয়।

O এমন জিনিস বা ক্রিয়াকলাপের জন্য সময় বের করুন, যা আপনাকে আনন্দ দেবে এবং আপনাকে মানসিক চাপমুক্ত রাখবে। এর জন্য গান, বাজনা, আঁকা, লেখা, ঘর সাজানো, বেড়ানো প্রভৃতি যে-কোনও শখ পূরণ করতে পারেন। অবসর সময়ে বই পড়াও একটা ভালো অভ্যাস হতে পারে।

O মুঠোফোনের মতো আপনার মনকেও রিচার্জ করুন। এর জন্য ভালো খাবার খান, ঘুরে বেড়ান, গান-বাজনা করুন, নাচুন, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিন, পার্টি করুন, বাগানে গাছের যত্ন নিন কিংবা যে-কোনও ক্রিয়েটিভ কাজে নিজেকে ব্যস্ত রাখুন। আর যদি কোনও কাজ না থাকে, তাহলে একটু বেশি সময় নিয়ে ঘুমোন।

O নিয়মিত ব্যায়াম করলে শরীরে এন্ডোরফিন নিঃসরণ করে, যা মেজাজ ভালো রাখতে সাহায্য করে। এর ফলে স্ট্রেস লেভেলও কমাতে পারে।

O যে-সব বিষয় মানসিক চাপ তৈরি করতে পারে, সেইরকম বিষয় থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখুন। যেমন, পরনিন্দা কিংবা অসাধু কোনও কাজ থেকে সর্বদা দূরে থাকুন। সবার সঙ্গে যতটা সম্ভব সুসম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করুন।

O স্টাইলিশ জামাকাপড় পরুন, মন চাইলে সাজুন, শপিং করুন এবং অবসর সময়ে নিজের ত্বক এবং চুলের যত্ন নিন।

গভীরে (পর্ব-০১)

দোতলার নিজের ঘরে টেবিলের কাছে চেয়ারটা টেনে নিল। কলমটা খুলে বসল রানু। সামনে খোলা জানলা। জানলা দিয়ে সামনের ওই সবুজ মাঠ দেখা যায়। একটা রাস্তা, কিছু ঘরবাড়ি, ছোটো ছোটো ছেলেমেয়েরা পুকুরে সাঁতার কাটে, একটা- দুটো সাইকেল, রিকশা— রাস্তায় লড়বর করতে করতে চলে। এখানে বসেই রানু গল্পের প্লট খুঁজে বেড়ায়।

কখনও সামনের এই পরিবেশে, মাঠে, রাস্তায়। কখনও নিজের মনের মধ্যে আকুলি-বিকুলি করে ঝাপসা আলোয় হাতড়ে বেড়ায়। বেশ অনেকদিন পর বসেছে গল্প লিখতে। নতুন করে ভাবছে। মনে ইচ্ছে আজ একটা গল্প লিখবে। পাবলিশার-রাও বলে, লিখুন দিদি লিখুন। অনেকদিন কিছু পাঠাচ্ছেন না।

রানু মনে মনে বলে, নিকুচি করেছে লেখার! লিখে কী হবে শুনি। টাকাপয়সা তো কেউ দেয় না! লিখে কি আর আমার পেট ভরবে! তবে হ্যাঁ, ভরে। রানুও জানে মন ভরে। মনটা খুশিতে নেচে ওঠে। একটা করে গল্প শেষ হয় আর মনে হয় একটা সোনার বিস্কুট। থুড়ি! সোনার বিস্কুট বলা ঠিক হবে না, কারণ চোরের বাড়িতে থরে থরে সোনার বিস্কুট থাকে। বরং মনে হয় যেন স্বর্গের পারিজাত ফুল!

গন্ধ, বর্ণ একেবারে একম অদ্বিতীয়ম। আবার মনে হয় নিজের গর্ভজাত সন্তান। নিজের মনে তাকে সাজিয়েছে, জন্ম দিয়েছে। রানু কলম শক্ত করে ধরল। মাথায় একটা প্লট ঘুর ঘুর করছে, যদিও ধরতে ধরতেই আবার পালিয়ে যাচ্ছে! কলমটা চেপে ধরল। কিছুতেই পালাতে দেবে না রানু। শুরু তো হোক।

সাদা কাগজে একটা লাইন লিখতে না লিখতেই থমকে গেল রানুর কলম। কান দুটো সজাগ হল। নীচতলায় যেন কেমন চ্যাঁচামেচি হচ্ছে। কেউ বেশ জোরে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে কথা বলছে। কান খাড়া করে শোনার চেষ্টা করল রানু। ওই তো সুনুর মায়ের গলা। একটা পুরুষের কণ্ঠও যেন !

কলম বন্ধ করে বারান্দায় এসে দাঁড়াল রানু। এবার স্পষ্ট শুনতে পেল, সেলিমের কণ্ঠস্বর। সেলিম এসেছে। সেলিম এ বাড়িতে মালির কাজ করে, মাসে দু-তিনদিন আসে। বাগানের গাছগুলো, বারান্দার ফুলের গামলাগুলোর গোড়া খুসে আগাছা পরিষ্কার করে। তারপর সার, কীটনাশক দেয়। প্রয়োজনে গাছগুলো ছেঁটে দেয়। ওর যত্নে রানুর বাগানখানা ফুলে- ফেঁপে উঠেছে।

মুশকিল হল, সুনুর মা মোটে দেখতে পারে না সেলিমকে। সেলিম যেদিন আসবে, মনের সুখে সুনুর মা তাকে বকবে। শাপ শাপান্ত করবে। এই বুঝি গামলাটা ভাঙল ! এই গাছটার ডালটা না কাটলেও চলত। বারান্দায় জল কেন ফেললে ? ফট করে নোংরা পায়ে ঘরে ঢুকলে। সুনুর মা-র গুচ্ছ গুচ্ছ অভিযোগ সেলিমের বিরুদ্ধে। মোটেও ভালো লাগে না রানুর। কিন্তু কী করবে। শাশুড়ির কড়া নির্দেশ, সুনুর মা বহু পুরোনো। ওর মা, দিদিমা এ বাড়িতে কাজ করেছে। সংসারের নাড়ি নক্ষত্র সব জানে! ওকে যেন ছাড়ানো না হয়। তা বটে।

সুনুর মায়ের মতো কাজে পটু মহিলা পাওয়া মুশকিল। তাছাড়া বিশ্বাসীও বটে। অধিকারও ফলায় এই বাড়িতে যথেষ্ট। মাঝেমধ্যে রানু ওর কাণ্ড দেখে আর হাসে। রানুর ওপর গার্জেনগিরি করতেও পিছপা হয় না। বলে, ‘বউমণি তুমি খাবে না? কখন খাবে? তুমি এত রোগা। ঠিকমতো খাওয়া দাওয়া করো। ভারী কাজ করবে না। তোমার পেটে ছোটো বাচ্চা আছে। ধৰ্ম্ম-কথা শুনবে, ধৰ্ম্ম-বই পড়বে!’

কারেন্ট চলে গেলে হাত পাখা দিয়ে বসে বসে রানুকে হাওয়া করবে সুনুর মা। মানা করলেও শুনবে না। একেবারে যাকে বলে পরম যত্ন। বলবে, ‘তুমি তো ঘেমে একেবারে ভিজে যাচ্ছ।’ আবার নিজেই আক্ষেপ করে বলবে, “ইশ। দাদাবাবু যে কেনে কেনে যায়। কত একা থাকবার লাগে তুমার।

বাগান, গাছ দিয়ে ঘেরা এই বাড়িটির নিখুঁত যত্ন নেয় সুনুর মা। গেট-এর ছিটকিনি নড়বড়ে হয়ে গেলে সুনুর মার মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ে। হায় হায়। দাদাবাবু এক্ষুণি ঠিক করা লাগব। বউমণি একা একা বাড়ি থাকে, কত রকমের আজেবাজে মানুষের আনাগোনা থাকে এই পাড়ায়। গ্যাসের পাইপ নিজেই চেক করে। কী জানি আবার যদি কোথাও ফুটো থাকে। বউমণিতো এতো খেয়াল করে না। বড়ো চিন্তা সুনুর মায়ের রানুকে নিয়ে।

রানু ভ্রু কুঁচকে মাঝে মাঝে সুনুর মাকে হেসে বলে, “বাড়িটা কার? তোর ভাব দেখে তো মনে হয় এটা তোর-ই বাড়ি!” সুনুর মা হেসে গড়িয়ে পড়ে। বলে, “বাপরে এত্ত সন্দর, এত্ত বড়ো বাড়ি আমার। এই সন্দর বাড়িতে কাজ করি জন্য মোর বড়ো গর্ব হয় গো বউমণি। আমাগো পাড়ায় আমার অনেক ইজ্জত। সবাই কয় ওই ব্যাপক, ওই বড়ো দালানবাড়ি কাজ করিস। তেনারা ভালা মানুষ বটেক! টেকাও অনেক।’ বলতে বলতে সুনুর মার মুখে তৃপ্তির হাসি ফুটে ওঠে।

রানুদের বাড়িতে পুরোনো চাকর হিসেবে সুনুর মায়ের একটা বিরাট অধিকার আছে, আদর আছে। অন্য কাউকে সেই অধিকার বা আদর কোনওটাই সুনুর মা দিতে চায় না। যদি সেলিম এসে ওর অধিকারে ভাগ বসায়! তাই সেলিমকে দেখলেই সুনুর মা খেঁকিয়ে ওঠে। আর সেলিমও তেমনই। সুনুর মাকে দেখে সাংঘাতিক ভয় পায়। একেবারে চুপসে থাকে বেচারা! মুখে রা করে না। তবু মাঝেমধ্যে মনে অনেক সাহস নিয়ে হেলে সাপের মতো লিকপিকে ফণা তুলতে চায়। কিন্তু সুনুর মা যেমন গোখরোর মতো ফোঁস করে ওঠে। সেলিম আবার ফণা নামিয়ে নিয়ে কাজে মন দেয়।

রানুর মাঝে মাঝে খারাপ লাগে! রেগে যায়। বলে, ‘সুনুর মা, সেলিমের সঙ্গে তোর কীসের শত্রুতা? এত কর্কশ ভাবে কেন কথা বলিস? তোর পেটে কি ওর জন্য একটু দয়া মায়া নেই? তুই বড়ো ঠোঁটকাটা সুনুর মা! বড়ো চাঁছাছোলা স্বভাব তোর।’

সুনুর মা চেচিয়ে ওঠে, ‘ওকে দেখলেই আমার গা পিত্তি জ্বলে যায় বউমণি।”

—কেন? কোনও কারণ ছাড়াই গা পিত্তি জ্বলে যায়। তোর পেটে আসলে বড়ো হিংসে। চুপ করে থাকে সুনুর মা। দোতলা থেকে নেমে এল রানু।

—এত চেঁচামেচি কীসের?

—কীসের আবার। ওই যে এলেন সেলিম মিয়াঁ।

—আসবেই তো। গাছগুলো কেমন শুকিয়ে গেছে। সার-জল দিতে হবে তো।

—আরে ওই দ্যাখো গেটের কাছে বেলিফুলের চারাটা ভাবলাম বাড়ি নিয়া যামু, সেলিম মিয়াঁ নিজেই ওইটা পাড়ায় মারল।

সেলিম কুই কুই করে উঠল, ‘মুই জানিবুঝি মারি নাই গো দিদিমণি। মোর নজরে আসে নাই।’

—শয়তান, মিথ্যা কথা। তুই ইচ্ছা কইরা করছিস।

—তোরা একটু থামবি সুনুর মা।

রানুর এক হুংকারে চুপ করল দু’জন। সেলিম চলে গেল সোজা বাগানে। ধাপুর ধুপুর করে পা ফেলে কাজে মন দিল সুনুর মা। বিড়বিড় করে বলতে বলতে গেল, ‘মরবে মরবে ও একদিন মরবে। মিথ্যুক একটা!”

রং-এর উৎসবে স্পেশাল মেনু

শুধু রং খেললেই তো আর রং-এর উৎসব সম্পূর্ণ হয় না, সঙ্গে চাই ভালো কিছু খাবার। তেমনই কিছু রেসিপি রইল রং-এর উৎসব উপলক্ষ্যে।

রাইস স্পেশাল সুইট ডিশ

গুড়ের সিরাপ তৈরির উপকরণ: ২ থেকে আড়াই কাপ জল, ৪৫০ গ্রাম গুড়, ২ চামচ মৌরি এবং নুন স্বাদমতো। অন্যান্য উপকরণ: ১ বড়ো চামচ ঘি, ১৫-২০টি কিশমিশ, এলাচের দানা, নারকেলের কিছু টুকরো, ৩ কাপ বাসমতি চাল জলে ভিজিয়ে রাখুন এবং আলাদা ভাবে ৪ কাপ জল নিয়ে রাখুন।

গার্নিশিং-এর উপকরণ: অল্প পেস্তার টুকরো, সামান্য পুদিনাপাতা, রুপোলি তবক, গোলাপ ফুলের পাপড়ি এবং সামান্য কেশর। গুড়ের সিরাপ তৈরির পদ্ধতি: গভীরতা যুক্ত পাত্রে গুড়, মৌরি,এলাচের দানা-র সঙ্গে জল দিয়ে মাঝারি আঁচে ফোটান। সামান্য নুন দিন। এরপর অপেক্ষা করুন গুড়ের সিরাপ তৈরি হওয়া পর্যন্ত এবং সিরাপ তৈরি হয়ে গেলে নামিয়ে রাখুন আঁচ থেকে।

রাইস স্পেশাল সুইট ডিশ তৈরির পদ্ধতি: একটি বড়ো এবং গভীরতা যুক্ত পাত্র আঁচে বসান। পাত্র গরম হলে ঘি ঢালুন এবং কিশমিশ ও নারকেলের টুকরো দিয়ে হালকা আঁচে সামান্য ভেজে নিন। এরপর ধুয়ে রাখা বাসমতি চাল ঢেলে ভালো ভাবে মেশান। ৪ কাপ জল ঢালুন। পাত্র ঢাকা দিয়ে মাঝারি আঁচে বসিয়ে রাখুন কিছুক্ষণ। জল যখন শুকিয়ে আসবে, তখন তৈরি করে রাখা গুড়ের সিরাপ মিশিয়ে দিন। ঢাকা দিয়ে কিছুক্ষণ হালকা আঁচে বসিয়ে রাখুন। চালের মধ্যে গুড় ভালোভাবে মাখামাখি হয়ে গেলে আঁচ বন্ধ করে দিন। ২-৩ মিনিট পর এর উপর ছড়িয়ে দিন পেস্তার টুকরো, পুদিনাপাতা, গোলাপ ফুলের পাপড়ি, কেশর এবং রুপোলি তবক। গরম থাকতে থাকতে পরিবেশন করুন।

স্পেশাল ভেজ বিরিয়ানি

স্পেশাল উপকরণ: ৫টি মাঝারি মাপের পেঁয়াজ এবং পেঁয়াজ ভাজা-র জন্য উপযুক্ত পরিমাণ তেল।

বিরিয়ানি মেরিনেশন-এর উপকরণ: মাঝারি মাপের দুটো গাজর, ১০-১২টা বিন্‌স, একটা ফুলকপি, ২০০ গ্রাম পনিরের টুকরো, আধা কাপ পেঁয়াজ পাতা, আধা কাপ দই, সামান্য পুদিনাপাতা, আধা কাপ ছাড়ানো কড়াইশুঁটি, ২-৩ টে কাঁচালংকা, সামান্য লাল লংকার গুঁড়ো, আধা চামচ হলুদগুঁড়ো, আধা চামচ ধনেগুঁড়ো, সামান্য ধনেপাতা, এক চামচ আদা-রসুনের পেস্ট এবং নুন স্বাদমতো।

অন্যান্য উপকরণ: ২ বড়ো চামচ ঘি, ২টি তেজপাতা, কয়েকটা দারচিনির টুকরো, দুটো বড়ো এলাচ, ২ কাপ পছন্দের সবজির টুকরো, ৩ কাপ চাল জলে ভেজানো, ৫ কাপ গরম জল, সামান্য গরম মশলা, ১ চামচ কেওড়া জল, সামান্য কেশর এবং ২ চামচ ঘি।

রায়তা-র উপকরণ: ২টো মাঝারি মাপের আলু সেদ্ধ করা, ২টো কাঁচালংকা, ১ কাপ দই, সামান্য ধনেপাতা, সামান্য পুদিনাপাতা, আধা চামচ চিনি, আধা চামচ জিরেগুঁড়ো, লাল লংকা-র গুঁড়ো আধা চামচ এবং নুন স্বাদমতো।

গার্নিশিং-এর উপকরণ: পেঁয়াজ পাতার টুকরো এবং ধনেপাতা কুচি।

স্পেশাল ফ্রাই-এর উপকরণ: পেঁয়াজ পাতলা করে কাটুন। এরপর কড়াইতে তেল গরম করে পেঁয়াজ ভাজুন লাল রং না হওয়া পর্যন্ত। পেঁয়াজ লাল লাল করে ভাজা হয়ে গেলে নামিয়ে টিসু পেপারের উপর রাখুন যাতে তেল শুষে নেয়। ভাজা পেঁয়াজ ঠান্ডা হয়ে গেলে ঢেকে রাখুন।

মেরিনেশন-এর পদ্ধতি: একটা বড়ো পাত্রে গাজরের টুকরো, কেটে রাখা বিস, ফুলকপি-র টুকরো এবং পনিরের টুকরো ফ্রাই করুন তেল দিয়ে। একটু ভাজা হয়ে গেলে কড়াইশুঁটি, দই এবং পুদিনাপাতা মেশান। কাঁচালংকার টুকরো, লাল লংকার গুঁড়ো, হলুদগুঁড়ো, ধনেগুঁড়ো এবং স্বাদমতো নুন দিয়ে নেড়ে নিন সবজিগুলো। এরপর আদা-রসুনের পেস্ট দিয়ে ভাজুন এবং সবশেষে ধনেপাতা-র কুচি মিশিয়ে নামিয়ে রাখুন।

ভেজ বিরিয়ানি তৈরির পদ্ধতি: প্রেসার কুকার আঁচে বসিয়ে ঘি ঢালুন। দারচিনি, লবঙ্গ, এলাচ এবং তেজপাতা ঘি-তে দিয়ে ভাজুন। এরপর ভেজে রাখা সবজিগুলো মিশিয়ে আবার ভালো ভাবে ভাজতে থাকুন। কুকারের ঢাকনা ব্যবহার করে ৪-৫ মিনিট রান্না করুন মাঝারি আঁচে। এরপর পুদিনাপাতা, কাঁচালংকার টুকরো দিয়ে ভিজিয়ে রাখা চাল ঢেলে গরম জল মিশিয়ে নিন। এর উপর গরমমশলা, স্বাদমতো নুন, কেওড়ার জল এবং কেশর ছড়িয়ে দিয়ে কুকারের ঢাকনা ব্যবহার করে একটা সিটি দেওয়া পর্যন্ত রান্না করুন হালকা আঁচে। চাল থেকে জল শুকিয়ে গেলে আঁচ নিভিয়ে দিন এবং রায়তা তৈরি করে গরম গরম বিরিয়ানি পরিবেশন করুন।

রায়তা তৈরির পদ্ধতি: সেদ্ধ করে রাখা আলু, পেঁয়াজ, টম্যাটো, কাঁচালংকার টুকরো এবং দই ভালোভাবে মিশিয়ে নিন। এরমধ্যে ধনেপাতা, পুদিনাপাতা, স্বাদমতো নুন, জিরেগুঁড়ো এবং সামান্য চিনি মিশিয়ে নিন ভালোভাবে, রায়তা তৈরি।

রং-এর ক্ষতিকারক যৌগ থেকে ত্বক-কে সুরক্ষিত রাখার উপায়

এসে গেল রং-এর উৎসব—দোল বা হোলি। ছোটো থেকে বড়ো সব্বাই মেতে উঠবেন এই রং-এর খেলায়। কিন্তু সাবধানিরা রং-এর ব্যবহারের বিষয়ে সতর্ক থাকলেও, এমন অনেকে আছেন, যারা জানেনই না কোন রং ত্বকের পক্ষে ক্ষতিকারক আর কোনটা নয়। কিংবা ক্ষতিকারক জেনেও, সেই বিষয়ে গুরুত্ব দেন না।

আসলে বাজারে এখন অনেক রকম রং পাওয়া যায়। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে এই যে, ভালোমানের রং-এর পাশাপাশি, ভেজাল এবং ক্ষতিকারক রং-ও বিক্রি হচ্ছে বাজারে। অর্গানিক রং-এর দাম যেহেতু একটু বেশি, তাই অনেকেই বাজার থেকে সস্তায় কিনে নিয়ে যান সিন্থেটিক রং। আর এইসব রং ব্যবহার করলে, ত্বকের ব্যাপক ক্ষতি হয়ে যেতে পারে।

তাই মনে রাখবেন, এইসব রাসায়নিক ও সিন্থেটিক রং-এর ব্যাবহারের ফলে আমাদের ত্বক, চুল ও চোখের মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে। অতএব, কোন রং কিনবেন এবং দোলের আগে কীভাবে ত্বকের পরিচর্চা করবেন, সেই বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য এবং পরামর্শ দিয়েছেন বিশিষ্ট চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. শতরূপা মণ্ডল।

দোলের আগে কলকাতায় এক আলোচনাসভায় ডা. শতরূপা মণ্ডল জানিয়েছেন, সাধারণ আবির ও রং-এর মধ্যে লেড অক্সাইড, কপার সালফেট কিংবা পারদের মতো মারাত্মক ক্ষতিকারক যৌগ থাকে। যা ত্বক, চুল ও চোখের ক্ষতি করতে পারে৷ তাই রং খেলার আগে থেকেই আমাদের সচেতন থাকতে হবে। যেমন অর্গানিক কিংবা ভালোমানের রং কিনতে হবে, ঠিক তেমনই ত্বকেরও যত্ন নিতে হবে রং খেলার আগে ও পরে।

How to protect skin health pre and post 'Holi'
Dr. Satarupa Mandal

প্রথমেই মনে রাখতে হবে, রং খেলার চার পাঁচদিন আগে কোনও ফেসিয়াল বা লেজার ট্রিটমেন্ট করা যাবে না। রং খেলার এক ঘণ্টা আগে  ত্বকে এমন ভাবে ময়েশ্চারাইজার লোশন কিংবা ক্রিম লাগিয়ে নিতে হবে, যাতে রং চামড়ার ভিতরে ঢুকতে না পারে এবং সহজে ধোয়া যায়। শুধু তাই নয়, অন্তত আধ ঘন্টা আগে ন্যূনতম এসপিএফ-৩০ অথবা তার উপরের সানস্ক্রিন ক্রিম বা লোশন মুখে, এমনকি ঘাড়ে ও হাতে পায়ের খোলা জায়গায় লাগাতে হবে, যাতে  রং-এর ক্ষতিকারক প্রভাব এড়ানো যায়।

ব্র্যান্ডেড ময়েশ্চারাইজার ছাড়াও, ময়েশ্চারাইজার হিসাবে বিশুদ্ধ নারকেল তেলও লাগানো যায় ত্বকে। চুলের ক্ষেত্রেও চুলের গোড়া থেকে আগা পর্যন্ত নারকেল তেল লাগিয়ে নেওয়া ভালো। চুলে যদি বিনুনি বা খোঁপা করে নিতে পারেন, তাহলে সে ক্ষেত্রে কেমিক্যাল কিংবা রং-এর এক্সপোজার অনেক কম হয়। তার ফলে রং ধোয়ার সময় চুলে জট পাকিয়ে চুল পড়ার সম্ভবনা কমে যায়। আর চোখকে বাঁচাতে সানগ্লাস খুবই উপযোগী। কারণ,    চোখে সরাসরি রং লেগে ক্ষতি হওয়ার বিপদ থেকে বাঁচাতে পারে একমাত্র সানগ্লাসই।

আরও একটি বিষয় এক্ষেত্রে মনে রাখবেন, রং খেলার আগে থেকে বেশি করে জলপান করা ভালো। কারণ, দীর্ঘ সময় ধরে রং খেলায় মেতে থাকার জন্য অনেকে ওই সময় জলপান করেন না। আর উপযুক্ত পরিমাণ জলপান না করলে যেমন ত্বকের উপর কুপ্রভাব পড়তে পারে, ঠিক তেমনই ডিহাইড্রেশন হওয়ার সম্ভবনাও থাকে। অতএব, রং খেলার আগেই বেশি করে জলপান করে নিন।

আর রং খেলার পর বেশি দেরি না করে, ঈষদুষ্ণ জল দিয়ে ত্বক থেকে রং ধুয়ে নেওয়া দরকার। এক্ষেত্রে ক্ষার জাতীয় সাবান ব্যাবহার না করে, মাইল্ড শ্যাম্পু ব্যাবহার করাই ভালো। সেইসঙ্গে, সাবান কিংবা জালি দিয়ে না ঘষে, বডিওয়াশ অথবা মাইল্ড সোপ ব্যাবহার করতে পারেন। পরিষ্কার হওয়ার পর, শুকনো টাওয়েল দিয়ে ভালো ভাবে সারা শরীর মুছে নিয়ে, অল্প ময়েশ্চারাইজার লাগিয়ে নিতে হবে৷ এর পরেও যদি চামড়ায় কোনও সমস্যা দেখা দেয়, তাহলে নিজে থেকে কোনও কিছু না করে, ডার্মাটোলজিস্টের পরামর্শ নেওয়া আবশ্যক।

বন পলাশের দেশে (পর্ব-০১)

বদলি বাতাসে আকণ্ঠ তৃষ্ণা, একঘেয়ে ক্যানভাসে কচি সবুজের ব্যতিক্রম… প্রতীক্ষা রিনরিন। শিমুলে, পলাশে সোহাগে ঝিম হয়ে থাকা সময়ে মহুয়ামিলন।

ফাল্গুনে হাওয়ায় এবারের সফরে অন্য আমেজের পরশ। গত ফেব্রুয়ারি মাসে যাওয়ার তারিখটা চলে এলো গুনগুনিয়ে। ৯ জন ফোটোগ্রাফারের সঙ্গে আমি দশম হয়ে চললাম লাল পাহাড়ির দেশে। আমি ছাড়া এই গ্রুপের সবাই ছবি তোলেন। আমার জীবনে প্রথম ফোটোগ্রাফি ট্যুর।

রাতের দুলুনি ট্রেন ভালোই নিয়ে এলো ‘বরাভূম’ স্টেশনে। প্রথমবার আসা রাঙামাটির দেশে। স্টেশন চত্বর লাগোয়া চায়ের দোকানে সকালের চা পান। নতুন জায়গার সঙ্গে যেন চায়ের একটা অপত্য সম্পর্ক আছে! চায়ের ভাঁড় হাতে তাকিয়ে দেখি এলোমেলো নিঃসঙ্গ স্টেশনখানা ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা জঙ্গল গায়ে জড়িয়ে আছে। চা শেষ করে দুটি গাড়িতে ভাগাভাগি করে চড়ে বসলাম— গন্তব্য বাঘমুণ্ডি।

গাড়ি ছাড়ার পর মন আর বশে থাকল না। দুই চোখ আতিপাতি করে তাকে খুঁজতে লাগল। আমি তাকে অবহেলাই করেছি এতদিন। আজ তৃষিত নয়নে দেখতে চাই… ফিরে এসো প্লিজ! কালো মসৃণ পিচের রাস্তা বাঁক ঘুরতেই হালকা রোদের সকালে বহুদূরে আবছা লালচে মরচে আভা। তারপর ওয়াইড লেন্থে মাইলের পর মাইল জুড়ে প্রগাঢ় লালের আহ্বান। সে এক অপরূপ দৃশ্য!

আমি হিতাহিত জ্ঞানশূন্য অবস্থায় পাশে বসা মুধুজার কাঁধ খামচে চিৎকার করে বললাম, ‘দেখেছিস পলাশ ! পলাশ!’ মেন্টর তখন মুচকি হেসে বলল, ‘তোমাকে তো আগেই বলেছি পুরো লালে লাল দেখাব।’ অন্যদের তাকানোতে মনে হল আমি একটু বেশিই যেন বাড়াবাড়ি করে ফেলেছি মনে হয়।

সকালের অলস রোদ্দুরে গাড়ি পর পর দুটো হেয়ার পিন বাঁক নিতেই উন্মুক্ত পাখি পাহাড়, পিরামিডসদৃশ তেকোণা। নীচে তখন তুমুল লালের আলোড়ন। গাড়ির ড্রাইভার নিপেন মাহাতো এগিয়ে চলেছে নির্বিকার মুখে। পলাশ ততক্ষণে রাস্তার একেবারে কাছে এসে ঘিরে ধরেছে ফ্রেম। যেখানে সারাদিন কুয়াশা ওড়ে, নীলাভ রঙের পাহাড় থেকে আলগা হয়ে বেরিয়ে আসে বৃক্ষ, পল্লব, ফুল, পাখি, সেখানে যক্ষী পাহারা দেয়। আমি জঙ্গলের ক্ষার মাটি ঝরনা থেকে কেটে বার করে এনেছি আমার পুরুলিয়াকে৷ একটা ভিউ পয়েন্টে গাড়ি থামতেই নেমে পলাশের গা জড়িয়ে ধরতেই পলাশ টুপটাপ করে আমার মুখে শরীরে ঝরে পড়ল। বুঝলাম আমি অলরেডি পলাশে হিপনোটাইজড !

মাথার ওপর লাল পলাশের চন্দ্রাতপ, পায়ের নীচে সবুজপাতার গালিচা মাড়িয়ে পৌঁছে গেলাম বাঘমুন্ডি পঞ্চায়েত অফিসের উলটো দিকে আগে থেকে বুক করা রাখা আবাসনে। এখন এটাই আমাদের দিন তিনেকের বর্তমান ঠিকানা। হোটেলের চারপাশের খোলামেলা ধানকাটা রিক্ত প্রান্তরে মন হুহু করা ফাল্গুনি হাওয়া যেন শিশ দিচ্ছে। সাধারণ মানের আবাসনের প্রতিটি ঘর পুরুলিয়ার পরবের নামে রাখা। ভাদু, টুসু, করম, জিতুয়া, বাঁদনা ও রোহিনী।

সকলেই ফ্রেস হয়ে ব্রেকফাস্ট শেষ করে চললাম তিন কিলোমিটার দূরে চড়িদা গ্রাম দেখতে। পুরুলিয়ার আদি নৃত্যশৈলী ‘ছৌ’ নাচে ব্যবহৃত মুখোশের জন্মস্থান হল এই চড়িদা গ্রাম। গ্রামে ঢুকেই যে যার মতো ছবি তোলায় ব্যস্ত হয়ে গেল।

আমি উঁকি দিয়ে দেখি প্রায় অন্ধকার একটি খুপরি ঘরে বৃদ্ধ এক শিল্পী। তাঁর পরনে ফুটিফাটা গেঞ্জি, খয়াটে চেহারার নুব্জ্য বৃদ্ধশিল্পী একমনে নিপুণ হাতে মুখোশের জাল বুনে চলেছেন। মনটা ভারাক্রান্ত হয়ে দূরে সরতে চাইল! কিন্তু এই নীরব শিল্পকর্মের দৃশ্য আমার সঙ্গীরা লেন্সবন্দী করতে ছাড়ল না। এরই মধ্যে তারা খুঁজে পায় ক্লাসিক্যাল বিউটি। পরে এই সব ছবিই তাদের পুরস্কারের বাহক হয়।

বিকেল তিনটে নাগাদ বেরিয়ে পড়লাম কিছুটা দূরে বামনকাটা পাহাড়ের গায়ে তুর্গা ফলস দেখতে। খেয়ালবশত তরতর করে নেমে যাচ্ছি কিশোরী বেলায় ! তুর্গা প্রবল হাতছানি দিচ্ছে, কুসুম গাছ চেনাচ্ছে। পাথর বেয়ে নির্দ্বিধায় চলে এলাম বেশ উঁচুতে ঝরনার একদম কোলের কাছে।

পলাশের উৎসবে আমি তো একাই। একার মাঝে কী অকপট এই অরণ্যবোধ। অবর্ণনীয় গাঢ় সবুজ ছায়াপথ পরম মমতায় ঢেকে রাখছে আমায়। পা ছুঁয়ে বসলাম ঝরনার ধার ঘেঁষে। মনের গভীর তলদেশ স্পর্শ করা দাহ জুড়ানো কুলকুল ধ্বনি। ফলসের চারপাশে দর্শক শুধুই পলাশ। পলাশের সোহাগ, তার উচ্ছ্বাস, তাকে পাওয়ার পূর্ণতা আদরে আদরে লাল করে দিচ্ছে। ক্রমশ পথ ধুয়ে গেল চাঁদের আলোয়, ফিরছি অন্ধকারের জ্যোৎস্না মেখে। মাঝেমধ্যে দু-একজন পথচারী। কাল ভোরে আবার দেখা হবে পলাশ!

(ক্রমশ…)

আশার আলো দেখিয়েছে ‘স্পাইন ডিফরমিটি সার্জারি ওয়ার্কশপ’

যদি কোনও শিশুর মেরুদণ্ড বিকৃত হয়ে যায়, তাহলে শুধু তার শারীরিক গঠনই পরিবর্তিত হয় না—প্রভাব পড়ে তার আত্মবিশ্বাস, চলাফেরা, স্বপ্ন ও ভবিষ্যতের উপরও। আর তাই এই সমস্যার সমাধানের উদেশ্যে, সম্প্রতি ‘অপারেশন স্ট্রেইট স্পাইন’ (OSS) এবং ‘কলকাতা স্পাইন ডিফরমিটি সার্জারি ওয়ার্কশপ’-এর আয়োজন করেছিল ‘জগন্নাথ গুপ্ত ইনস্টিটিউট অফ মেডিক্যাল সায়েন্সেস অ্যান্ড হসপিটাল’ (JIMSH)।

এটি এমন একটি মানবিক উদ্যোগ, যা শিশুদের ভবিষ্যৎ আলোকিত করবে। শুধু তাই নয়, যারা এতদিন ভেবেছিলেন, এই চিকিৎসা তাদের নাগালের বাইরে, সেইসব গরিব পরিবারগুলোর মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার হবে। আসলে, এটি শুধু একটি চিকিৎসা কর্মসূচি নয়, বরং এক মহৎ স্বাস্থ্যসেবার আন্দোলন, যেখানে অভিজ্ঞতা, প্রযুক্তি ও মানবতা একসঙ্গে মিলিত হয়ে মেরুদণ্ডের বিকৃতির সমস্যা দূর করবে। আর এই ‘অপারেশন স্ট্রেইট স্পাইন’ (OSS) এবং ‘কলকাতা স্পাইন ডিফরমিটি সার্জারি ওয়ার্কশপ’-এর জন্য বিশ্ববিখ্যাত স্পাইন সার্জন, অ্যানেসথেটিস্ট এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা একত্রিত হয়েছিলেন কলকাতা-য়। আর এঁদের যৌথ প্রয়াসে, শুধু মেরুদণ্ডের বিকৃতি সংশোধন-ই নয়, ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে শিশুদের স্বাভাবিক জীবন এবং সম্মান।

JIMSH-এর চেয়ারম্যান কৃষ্ণ কুমার গুপ্ত প্রসঙ্গত জানিয়েছেন, ‘আমরা স্বাস্থ্যসেবাকে কোনও বিশেষ সুবিধা হিসেবে দেখি না—এটি সকলের মৌলিক অধিকার। ‘অপারেশন স্ট্রেইট স্পাইন’ আমাদের সেই প্রতিশ্রুতি বহন করে, যা নিশ্চিত করে যে, কোনও শিশু যেন শুধুমাত্র আর্থিক অসুবিধার কারণে উন্নত চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত না হয়। আমরা কৃতজ্ঞ এই আন্তর্জাতিক চিকিৎসক দলটির প্রতি, যাঁরা তাঁদের মূল্যবান সময় ও দক্ষতা উজাড় করে দিয়ে এই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিয়েছেন। আমরা চাই–প্রত্যেক শিশুই উঁচু হয়ে দাঁড়াক, গর্বের সঙ্গে হাঁটুক এবং উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ গড়ুক।’

'Spine Deformity Surgery Workshop' shows light of hope
Chairman of JIMSH and Doctors

এই বহুমুখী চিকিৎসা মিশনে যে-সব আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন চিকিৎসকদের অবদান অনস্বীকার্য, তাঁদের মধ্যে রয়েছেন ডা. আলাএলদিন আহমদ (ফিলিস্তিন), অধ্যাপক (ডা.) মাস্সিমো বালসানো (ইতালি), ডা. গিরীশ স্বামী (যুক্তরাজ্য), ডা. নবীন সি. মুরলী (যুক্তরাজ্য) এবং অন্যান্য চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা, যেমন মিস জ্যাকলিন ক্রিচলি, মিস চেরি, মি. জাজি প্রোমিল্ডা এবং সার্জিও চেচেল্লি (যুক্তরাজ্য)। তাঁরা তাঁদের মূল্যবান দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা দিয়ে, মেরুদণ্ডের বিকৃতি-যুক্ত  শিশুদের জন্য বিনামূল্যে মেরুদণ্ডে অস্ত্রোপচার করছেন, যা এই উদ্যোগের প্রধান আদর্শ, সহমর্মিতা ও আরোগ্যের এক উজ্জ্বল প্রতীক হয়ে রইল।

এই অসাধারণ উদ্যোগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন অধ্যাপক (ডা.) উজ্জ্বল দেবনাথ, অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, অর্থোপেডিক্স বিভাগ, JIMSH, যিনি OSS-এর চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন। ইতিমধ্যেই এই কর্মসূচির মাধ্যমে ১২ জন শিশুর জীবন বদলে গেছে। যার মধ্যে ১১ জন পশ্চিমবঙ্গের। বহু দরিদ্র শিশু, যেমন ৮ বছরের আদ্রিজা মজুমদার, এই মহান উদ্যোগের সুফল পেয়েছে। আদ্রিজা ও আরও অনেক শিশু আজ নতুন করে স্বপ্ন দেখছে, হাঁটতে শিখছে, আত্মবিশ্বাস ফিরে পাচ্ছে। আর এই উদ্যোগ সফল হয়েছে ‘অপারেশন স্ট্রেইট স্পাইন’ (OSS) মিশনের জন্যই।

‘অপারেশন স্ট্রেইট স্পাইন’-এর (OSS) অধীনে পরিচালিত অস্ত্রোপচার অত্যন্ত জটিল ও নিখুঁত, যা ৬ থেকে ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত স্থায়ী হয়। এই শল্যচিকিৎসার মূল লক্ষ্য শুধু শারীরিক সুস্থতা ফিরিয়ে দেওয়া নয়, বরং শিশুদের আত্মবিশ্বাস ও স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার পথ সুগম করা। এটি কেবল চিকিৎসা নয়, বরং একটি পুনর্জন্মের সুযোগ, যা শিশুদের জীবনকে অর্থপূর্ণ ও সম্ভাবনাময় করে তোলে।

এই ঐতিহাসিক উদ্যোগের অংশ হিসেবে, ‘জগন্নাথ গুপ্ত ইনস্টিটিউট অফ মেডিক্যাল সায়েন্সেস অ্যান্ড হসপিটাল’-এ একটি বিশেষ পরিদর্শন কর্মসূচির আয়োজন করা হয়, যেখানে এই উন্নতমানের হাসপাতালের অত্যাধুনিক চিকিৎসা পরিকাঠামোর সঙ্গে পরিচয় করানো হয়।

সে এবং একটি ফানুস (শেষ পর্ব)

ননীগোপাল এসব শুনেই তো এসেছে। গত সাতবছর ধরে তো কম মেলা-মোচ্ছবে ঘোরা হল না তার! তাই সে আর বিশেষ কথা ফেলে না। মনের ভিতর যে একখান মিটিমিটি প্রদীপ জ্বালানো আছে, ননীগোপালের কাজ তাকে নিভতে না দেওয়া। আজ মন বলছে হবে। সেই চাঁপাকলির গন্ধ যেন ভেসে আসছে। ঝুমরার গায়ের গন্ধ।

নদী বা পুকুরে চানের সময় ঝুমরার কাপড়চোপড় নিয়ে সে ডাঙায় বসে থাকত। আর ঝুমরা নগ্নদেহে জলের গভীরে নেমে যেত। তার স্তনদুটি পদ্মফুলের মতো জলের উপরে ভাসত। সে সময় ননীগোপাল পাগলের মতো ঝুমরার কাপড় নিজের মুখের উপর ঠেসে ধরত। ওই কাপড়ে যে চাঁপাফুলের গন্ধ, তা দিয়েই নিজেকে আবিষ্ট রাখত। কামনা থামাত। গুরু শিখিয়েছিল প্রবৃত্তি দমন। শুক্র ধারণ। যতই কাম জাগুক, তাকে কবজা করতে না পারলে আর বোষ্টম থাকা যাবে না। ঝুমরার নগ্ন দেহলতা তাকে হাতছানি দিয়ে ডাকলেও ননীগোপাল কখনও জলে নামে না। ঝুমরা অনুযোগ করে, ‘ঢ্যামনা। অমানুষ একটা।’ কিন্তু গুরুর নির্দেশ কীভাবে অমান্য করবে ননীগোপাল!

—বুঝলেন বাবাজি, এই মেলা কেন আর আর মেলা থেকে আলাদা!

—কেন গোঁসাই?

এখানে সব বাউল, বৈষ্ণবই তার হারানিধি ফেরত পায়। কিন্তু সে ওই এক রাতের জন্য। তুলসির ঝোঁপের ভিতর আন্ধারে কেউ কারও মুখ দেখতি পায় না। কিন্তু যে যারে খোঁজে, তারে পেয়ে যায়। অঙ্গের বসন ফেলে বাউল-বাউলানি দেহ মন একাকার করে নেয় ওই এক রাতেই। সকাল হলেই কিন্তু আবার সবাই একা। ভোরের আগেই বাউলানি বা বোষ্টমী তার বাউলের আলিঙ্গন সরায়ে রেখে ভূমিশয্যা থেকে উঠে পিছনের নদীতে নেমে যায়। নদীর ওপারের ঘাটে ঠেলে উঠে তারা অন্য গাঁয়ের ভিতর দিয়ে হারিয়ে যায় আবার।

—আপনি গোঁসাই, আপনার বাউলানিরে যে পালেন তা জানলেন কেমনে। আন্ধারে তো কেউ কারে দেখতি পান না! -ওই ফানুস যে চিনোয়ে দেয়। বাউলানি ফানুস দেখে ফানুসের নীচে এসে দাঁড়ায়। আবার দীনদয়ালের কৃপায় সেই ফানুসই বাউলানিকে টেনে এনে বাউলের শরীরের কাছে ফেলে। এর অন্যথা নাই। সকলের আলাদা আলাদা ফানুস। দেখতি পালিই কৰ্ম্ম ফতে। আর কিচ্ছুটি করতি হয় না। সব আপনা আপনি হতি থাকে।

ননীগোপাল আকাশে চায়, ফানুস খোঁজে।

জীবনকৃষ্ণ আবার একটু বলেন, ‘বুঝলেন বাবাজি, আমার জন্যি দীনদয়ালের নজর যেন একটুখানি বেশি। ফানুসের টানে টানে আমি যেই আমার বোষ্টমীর কাছে যাই, আমি টের পাই আমার বোষ্টমীর গায়ের গন্ধ ভেসে আসছে। চাঁপাফুলের গন্ধ। তার শরীর তো শরীর নয়, যেন গুচ্ছ গুচ্ছ চাঁপাকলি। অন্ধকারে আমার চোখ ওই গন্ধের আবেশে বুজে আসে। আমি সম্বৎসরের মনের খোরাকি তুলে রাখি ওই গন্ধ দিয়ে।

ননীগোপাল পায়ের ছন্দে পথ চলছিল। সে তো পথ হাঁটছে না। কেউ তাকে হাঁটিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। জীবনকৃষ্ণের কথার মানে বুঝতে খানিক সময় লাগে তার। এ কী কথা কলেন গোঁসাই। গোঁসাই কলেন, তাঁর বোষ্টমীর গায়ে চাঁপা ফুলের গন্ধ। কিন্তু তা কেন হবে! ননীগোপাল তো বছর পাঁচেকের আখড়া জীবন কাটিয়েছে। ঝুমরার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হয়ে কাটিয়েছে। গুরুর আখড়ায় কত বোষ্টমী আসত কিন্তু কারওর গা থেকে চাঁপা ফুলের গন্ধ বের হতো না। তার ঝুমরা মাধুকরী করে ফেরামাত্রই ননীগোপাল টের পেত ঝুমরা ফিরেছে। তার নাকে চাঁপাফুলের তাজা ঘ্রাণ এসে যে ঘাই মারত।

রাত থমথম করছে। দু’পাশে জঙ্গল। জোনাকিও নেই। এই প্রথম ননীগোপাল চলা থামিয়ে দিয়ে পিছন ফিরে খোঁজ করে জীবনকৃষ্ণের। কিন্তু কেউ কোথাও নেই। হাওয়াও নেই। ননীগোপাল বলে, “গোঁসাই আপনি কোথায়?’

কোনও উত্তর নেই। অন্ধকার প্রশ্ন গিলে খায়। ননীগোপাল আকাশে তাকায়। কোনও তারাও নেই। থাকবে কী, কৃষ্ণা তিথি যে। তাহলে উপায়! পা যেন ভারী গাছের গুঁড়ি হয়ে গেছে। নাড়ানো যাচ্ছে না। ননীগোপাল হাঁক পাড়ে, ‘গোঁসাই।” কোনও আওয়াজ বের হয় না। অজয়কৃষ্ণের সাইকেল সারাইয়ের দোকান এই অন্ধকারে কী করে সে খুঁজে পাবে! মনে পড়ল গোঁসাইয়ের কথা। ‘দীনদয়ালের খেলায় নিজে নিজে কিচ্ছুটি করতে হয় না বাবাজি। শুধু আকাশে চোখ রাখতি হয়। সেখানে উড়তে থাকা ফানুসই পথ চিনোয়ে নে যায়।

সারাদিন আজ ননীগোপালের কিচ্ছুটি পেটে পড়েনি। তেষ্টায় গলা গনগনে উনুন হয়ে আছে। কত পথ হেঁটেছে কে জানে! তার উপর গাঁজার তেষ্টাও যোগ হয়েছে। বুকের ভিতরে কে যেন কী যেন ঠেসে ধরেছে। ননীগোপাল এবার পরিত্রাহী একটা আওয়াজ করল, ‘ফানুস, তুমি কোথায়? আমারে নিয়ে চলো। আমি কিচ্ছুটি দেখতে পাচ্ছি না যে!”

(সমাপ্ত)

সে এবং একটি ফানুস (পর্ব-০৪)

গান মাঝপথে থামিয়ে কথা চালানোর বাউল অভ্যাসে জীবনকৃষ্ণ বললেন, “বুঝলেন না বাবাজি, যে আগুনের জ্বালায় আপনি এই অজানা পথ পাড়ি দেছেন, আমিও চলতিছি। তেমনি করে আগুনের জ্বালায় সেথায় আরও বাউল-ফকিররা জড়ো হয়। এখানে তাঁর হেকমতিতে যে অনেক মানুষ নিজের অনেক না পাওয়া পেয়ে যায়।”

ননীগোপালের মেজাজ ফুরফুরে হয়েছে। খোলামেলা হয়েছে মন। সে বলল, ‘গোঁসাই, আমিও যে হারানিধির খোঁজে চলেছি সেখানে। শুনেছি ঘন কালো রাতে গৌরাঙ্গের খেলায় কত না বোষ্টম তার প্রাণের বোষ্টমীকে খুঁজে পায়। শুনেছি সেখানে এক ফানুস চলাচল করে। যে খোঁজে মনের মানুষ সেই শুধু ফানুস দেখতে পায়। ফানুস যে জায়গায় আকাশে দাঁড়ায়ে পড়ে, ঠিক সেখানেই মেলে তার পরম রতন।’ জীবনকৃষ্ণ হইহই করে ওঠেন।

—ঠিক শুনেছেন। তবে মনে হচ্ছে বাবাজির কোনও যাতনা আছে। যাতনা ধরে রাখতে নেই গো। তারে হাওয়ায় ভাসাতি হয়, নদীতে ভাসাতি হয়। বলতি হয়, যা যা দূর হ। নালে যে সারাজীবন বোঝা বইতে হয় গো। আরে দেখেন, আমি সেয়ানা পাগলের মতো কতিছি। আমিও তো বয়ে চলেছি। নাহলি সেথায় যাবই বা কেন! সেখানে যত বোষ্টম যায়, বাউল- ফকির যায় সক্কলেই তো বোঝা খালি করতে যায়। অমাবস্যায় চাঁদের উদয়।

ননীগোপাল এখানকার বারুণী উৎসবে আগে কখনও আসেনি। তার অল্প জানা। সে জানতে চায়। বলে, ‘বলেন তো গোঁসাই, আর এট্টুস বলেন। এখানকার মহিমা বলেন। অমাবস্যায় চাঁদের উদয় বলেন।”

—বাউল সাধনায় চাঁদ হল শুক্র। তার উদয়। সে তো যখন তখন যেখানে সেখানে উদয় হতি পারে। কিন্তু সাধকের কাছে যখন তখনের কোনও মূল্য নেই। গুরু ধরবার জন্য চাই যোগ। বাবাজি বাউলের কাছে বড়ো বস্তু হল গুরু। গুরু মানে নারী। —এ কী কচ্ছেন! এমন কথা তো আগে শুনি নাই।

—বাবাজি, দীনদয়ালের ঘরের করণকৌশল আর সহজিয়াদের থেকে খানিক আলাদা। সেখানে সব গুপ্ত সাধনা। মাটির কার্য, নালের কার্য, করোয়া সাধন— কত কী আছে!

ননীগোপাল এত কথার মানুষ নয়। কিন্তু তার ভিতরের আগল যেন খুলে গেছে এই সময়। সে বলল, “কিন্তু গোঁসাই আমরাও তো সহজিয়া। পাটুলি স্রোত।’

—শুনুন বাবাজি, এই জগতে সত্য হল নারীদেহ। নারীর কাছ থেকে সংকেত নিয়ে তবে সাঁতার দিয়ে রত্ন সন্ধানে যেতি হয়। তার দশমীদ্বারে লুকোয়ে থাকে মহারত্ন। পদ্ধতি জেনে তলাতল পাতাল থেকে সে মহারত্ন উদ্ধার করতি হয়। আমাদের সাহেবধনীদের গাথক কুবির গোঁসাইয়ের গান শোনেননি! ওই যে….

জীবনকৃষ্ণের গুবগুবি আর দোতারায় আবার সুর উঠল। জীবনকৃষ্ণ গান ধরলেন, ‘ডুব ডুব ডুব রূপসাগরে আমার মন।/ তলাতল পাতালে খুঁজলে পাবি রে প্রেমরত্নধন।’

ননীগোপাল ঠান্ডা স্বরে বলল, ‘এই গান তো শুনেছি। কিন্তু তার যে এত তল জানতে পারিনি।”

—বাবাজি, সেই রত্নধন খুঁজতেই তো দীনদয়ালের খেলায় এত পথ পাড়ি দিয়ে আমাদের এই মধুকৃষ্ণা তিথির পুণ্য ওঠাতে এখানে আসা। সব সময় মনে রাখবেন আলগা স্রোতে ডুবে মরলে মানুষ জীবন নষ্ট হয়ে গেল। ডুব মারতে হবে অতলে। আর সেই ডুব মারার মহাযোগ হল অমাবস্যা। নারীদেহের বাঁকে মাসে মাসে বন্যা আসে। আসে ঋতুকাল। এই বাঁকানদীর বন্যায় মহাযোগে ভেসে আসে মহামীন অধরমানুষ। তাকে ধরতে জানতে হয়। তার সঙ্গে মিলনে অটল হতে হয়। তবেই তো গুরুপ্রাপ্তি। আজ এই মধুকৃষ্ণা তিথিতে দলে দলে ঋতুময় বোষ্টমীরা আসবে। তাদের সাথে মিলিত হবে সাধক বাউল।

পথের ধুলোয় রং লেগেছে কিছুকাল হল। মানে সন্ধ্যা নামছে। দুই বাউল-বৈরাগীর পা উঠছে, পড়ছে। পথ ফুরোচ্ছে না। খালি মুখে পথ চলার বেজায় দায়। জীবনকৃষ্ণ দায়িত্ব নিয়ে পথের নির্জনতা নষ্ট করে চলেছেন। একসময় বললেন, ‘বাবাজির গোপন কথা তো শোনা হল না। যদি মন চায় বাবাজি, কতি পারেন। বাবাজির কি বাঁকা নদীর পিছল ঘাটে নাওয়া হয়েছিল?”

ননীগোপাল তখন এক অলীক ভাবনার ঘোরে। তার চোখ আকাশের দিকে। সেখানে সন্ধ্যাতারা সহ আরও দু’একটি মিটিমিটি ফুটে গেছে। তার লক্ষ্য তো তারা দেখা নয়। সে দেখতে চায় একটি ফানুস। সেই ফানুস যদি তার চোখে পড়ে আর সে সেই ফানুসের নীচে গিয়ে দাঁড়াতে পারে তবে তো কৰ্ম্ম ফতে। তার হারিয়ে যাওয়া পরমকে ফিরে পাবে আজ।

—বাবাজি, আজ মধুকৃষ্ণা তিথি। যাকে বলে বসন্ত মুচমুচে এই তিথি। চৈত্র মাসের কৃষ্ণা তিথি। মানুষের মনের ভিতর বসন্ত উপচে ওঠে গো৷ যতই কাছাকাছি পৌঁছোবে তিথি ততই আপনার ভিতরে দীনদয়ালের খেলায় প্রেম ডগমগ করে উঠবে। এট্টুস পথশ্রম হচ্ছে বটে তবে সব পুষিয়ে দেবেন দীনদয়াল।

(ক্রমশ…)

বিয়ের আগে Beauty Routine

বিয়ের আগে রাতারাতি গ্ল্যামারাস হয়ে ওঠার ইচ্ছে হয় হবু কনের। এই কারণে নিজের ত্বককে আরও সুন্দর, উজ্জ্বল ও মোহময়ী করে তোলার জন্য প্রাকৃতিক উপাদান ব্যবহার করা উচিত। অতিরিক্ত সূর্যের আলোর সংস্পর্শে থাকলে ত্বকের মেলানিন কালচে হয়ে যায়। তাই ত্বককে বাইরের দূষণ ও সূর্যের রশ্মি থেকে বাঁচাতে দৈনন্দিন যত্ন নেওয়া উচিত। পার্লারে গিয়ে ট্রিটমেন্ট করালে তা সময় ও অর্থ দুটিই ব্যয় করে। তাই বিয়ের দিন ঠিক হওয়ামাত্র একটা বিউটি রুটিন তৈরি করে নিন। ঘরে থাকা কয়েকটি জিনিসের মাধ্যমেই নিজের ত্বককে সহজেই সুন্দর করে তুলতে পারবেন।

কী কী তৈরি করবেন?

হোম ফেসিয়াল: বাড়িতে কয়েকটি উপকরণ থাকলে, সহজেই ফেশিয়াল কিট তৈরি করতে পারবেন। পার্লারের মতোই এফেক্ট নজরে পড়বে আর ত্বকের সংক্রমণের ভয়ও থাকবে না।

কী কী লাগবে: ঈষদুষ্ণ জল, ক্লিনজার, এক্সফলিয়েন্ট, তুলো, স্কিন টনিক, মাস্ক, শসার স্লাইস (ফ্রিজে রেখে ঠান্ডা করা), পরিষ্কার তোয়ালে।

হোমমেড ক্লিনজার: হাফ কাপ ওটমিল ও পরিমাণমতো দই একসঙ্গে মিশিয়ে নিন। এমন ভাবে মেশান যেন রাফ বা দানা ভাব না থাকে।

হোমমেড এক্সফলিয়েন্ট: এক কাপ চিনির সঙ্গে হাফ কাপ কলা চটকে একটি মসৃণ পেস্ট তৈরি করুন। এটাই ত্বকের এক্সফলিয়েশনে সাহায্য করবে।

হোম মেড টোনার: শসা কুচিয়ে নিন। মুখের উপর ভেজা কাপড় রেখে, তার উপর শসার কুচিগুলো রাখুন। শসার রস ন্যাচারাল অ্যাস্ট্রিনজেন্ট হিসাবেও কার্যকরী।

হোম মেড মাস্ক: ১ টেবল চামচ মধু, ১টা ডিমের সাদা অংশ, ১ চা চামচ গ্লিসারিন এবং ২ চা চামচ ময়দা নিয়ে একসঙ্গে এই উপকরণগুলো মিশিয়ে মাস্ক হিসাবে ব্যবহার করুন।

ফেসিয়ালের টুকিটাকি

O মাত্র আধঘণ্টা সময় বরাদ্দ করলেই একটু যত্ন নিতে পারবেন নিজের। তাই ফেসিয়াল করার সময় অন্য কাজের ভাবনা ছেড়ে রিল্যাক্সড থাকুন। এতে ভালো এফেক্ট পাবেন

O ফেসিয়াল শুরু করার আগে, সমস্ত জিনিস গুছিয়ে নিয়ে বসুন, যাতে প্রক্রিয়া শুরু করার পর এটা-ওটা খুঁজতে না হয়। তাহলে পরিশ্রমটাই মাটি হবে

O ফেসিয়াল করার আগে স্টিম নেওয়া খুবই জরুরি। এতে মুখের রোমকূপ খুলবে ও মুখ পরিষ্কার হয়ে যাবে

O স্টিম নেওয়ার জন্য ৬ কাপ মতো জল ফুটিয়ে নিন। মাথায় তোয়ালে চাপা দিয়ে স্টিম নিন।

O স্টেপ অনুযায়ী প্রথমে তৈরি করা ক্লিনজার দিয়ে মুখ পরিষ্কার করুন। তারপর স্ক্রাবার লাগিয়ে এক্সফলিয়েট করুন। এরপর মাস্ক ব্যবহার করুন। সবশেষে তৈরি করা টোনার লাগিয়ে স্কিন-এর টানটান ভাব ফিরিয়ে আনুন।

চোখের সৌন্দর্য

সকলেই চান চোখের সৌন্দর্য প্রদর্শন করতে। কিন্তু বড়ো বড়ো চোখও অনেক সময় কোনও আকর্ষণ তৈরি করে না। কারণ চোখের নীচে ডার্ক সার্কল্স সৌন্দর্যহানি করে। আসলে বেশি টেনশন এবং স্ট্রেসের প্রভাব, চোখের সৌন্দর্যকে ঢেকে দেয়। তখন নষ্ট হয় চোখের স্বাভাবিক সৌন্দর্য। মহিলাদের চোখের এই সৌন্দর্য-সমস্যা আজকাল ক্রমশই বাড়ছে। বিয়ের আগে যদি আপনারও চোখের নীচে কালো দাগের সমস্যা দেখা দেয়, তাহলে সেই নিয়ে অযথা চিন্তা না করে, সমস্যামুক্ত হওয়ার চেষ্টা করুন।

অত্যধিক স্ট্রেস এবং টেনশনের ফলে অনেকেরই এখন চোখের তলায় কালোভাব ফুটে ওঠে। তবে আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতিতে কোনওরকম কাটাছেঁড়া (অপারেশন) না করেই, শুধুমাত্র থেরাপিতে এই সমস্যা দূর করা যায়।

ডার্ক সার্কল্সএর কারণ

চোখের নীচে কালো ছাপ পড়ার বেশ কয়েকটি কারণ তুলে ধরেছেন চিকিৎসকরা। তাঁদের মতে, এই সমস্যাটির মুখ্য কারণ বংশগত। যদি মা-বাবার এই সমস্যা থেকে থাকে, তাহলে সন্তানও এই সমস্যার শিকার হতে পারে। এছাড়া যদি বেশি কসমেটিক্স ব্যবহার করেন এবং সেই কসমেটিক্স যদি খারাপ মানের হয়, তাহলেও চোখের নীচে কালো ছোপ পড়তে পারে। সেইসঙ্গে, কাজের অতিরিক্ত চাপ, স্ট্রেস প্রভৃতি কারণেও চোখের সৌন্দর্য নষ্ট হতে পারে। রোদে বেশি ঘুরলেও হতে পারে ওই একইরকম সমস্যা।

চিকিৎসা পদ্ধতি

চোখের নীচে কালি দূর করার চিকিৎসা পদ্ধতির নাম ‘আন্ডার আই ট্রিটমেন্ট”। এটি খুব প্রচলিত থেরাপি। অ্যালোপ্যাথিক ওষুধ দিয়ে দূর করা হয় এই ডার্ক সার্কল্স। মলম এবং ট্যাবলেট দুই-ই থাকে এই ওষুধের তালিকায়। অন্তত ৬ মাস ব্যবহার করতে হয় এই মলম এবং সঙ্গে ওষুধও খেতে হয়। সবচেয়ে বড়ো কথা, এই থেরাপিতে কোনও সাইড এফেক্ট নেই অর্থাৎ কোনও ক্ষতি হয় না। দুই থেকে তিন হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হয় এই থেরাপিতে। তবে কোনও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শমতোই চিকিৎসা শুরু করা উচিত। চোখ যেহেতু শরীরের খুব গুরুত্বপূর্ণ অংশ, তাই ওষুধের দোকান থেকে ওষুধ কিনে নিজে কোনওরকম চিকিৎসার ঝুঁকি নেবেন না।

চোখের নীচের ত্বকের যত্ন

অনেকের চোখের নীচের ত্বকে ভাঁজ পড়তে দেখা যায় অল্প বয়সেই। এতে চোখের এবং এমনকী মুখমণ্ডলেরও সৌন্দর্য নষ্ট হয়। বয়সও একধাপে অনেক বেড়ে গিয়েছে মনে হয়। তবে এটা এখন আর তেমন সমস্যার নয়। রিংকল থেরাপির দ্বারা এই সমস্যা এখন খুব সহজেই দূর করা যায়। চোখের নীচের ত্বকে ভাঁজ দূর করার এই চিকিৎসা পদ্ধতিটিকে বলা হয় ‘নন এবিলেটিভ রেডিয়ো ফ্রিকোয়েন্সি”। তিন থেকে চারটি সিটিংয়ে ত্বক টানটান করে লাবণ্য ফিরিয়ে আনা যায়।

রূপটানের ঘরোয়া টোটকা

O বিয়ের আগে পার্লারে না যাওয়ার কথা যারা ভাবছেন, তারা বাড়িতেই শুরু করুন রূপচর্চা। একসময় ঘরোয়া পদ্ধতিতে রূপটানের নানা টোটকা আমাদের মা-ঠাকুমাদের কাছে মজুত থাকত। এতে সাইড এফেক্টস নেই, কোনও ক্ষতির সম্ভাবনা কম অথচ ত্বক হবে তরতাজা। জেনে নিন, কী সেই টোটকা।

O সকলের বাড়িতেই শ্বেতচন্দন থাকে৷ ত্বক উজ্জ্বল ও শীতল করতে শ্বেতচন্দন যে কতটা কার্যকর, তা অনেকেরই জানা। শুধু তাই নয়, ত্বকের অসমান রং, দাগছোপ কমাতেও চন্দন খুবই কাজের এবং সানট্যান কমাতে ও রোদে পোড়া ত্বক সারাতেও চন্দন সাহায্য করে

O হলুদের অ্যান্টি ব্যাকটেরিয়াল গুণ রয়েছে। ফলে ব্রণ, এমনকী ব্রণর দাগছোপ কমাতেও হলুদ দারুণ কাজ করে। ত্বকের সার্বিক সুস্থতা বজায় রাখার পাশাপাশি ত্বক উজ্জ্বল রাখতেও সাহায্য করে হলুদ

O ত্বক ও চুলের স্বাস্থ্যের পক্ষে এর অসাধারণ উপকারিতার জন্য, সৌন্দর্যচর্চার অন্যতম প্রধান উপাদান ভাত সিদ্ধ করা জল বা মাড়। চিনের হুয়াংলুও ইয়াও গ্রামের ইয়ায়ো উপজাতির মেয়েরা তাদের অত্যন্ত ঘন, দীর্ঘ ও ঝলমলে চুলের জন্য বিখ্যাত। বলা হয়, ভাতের পাতলা মাড় দিয়ে নিয়মিত চুল ধোয়াটাই তাদের এই মনভোলানো চুলের গোপন রহস্য

O সৌন্দর্যচর্চায় ভাতের মাড়ের ব্যবহার ত্বকে দ্রুত বয়সের ছাপ পড়া থেকে রেহাই দেয়। এই তরলে থাকে অ্যান্টি অক্সিড্যান্টস, ভিটামিন সি, ফ্লাভোনয়েড ও ফেনোলিকের মতো উপাদান, যা ত্বকের সুস্থতার জন্য কাজ করে থাকে।

O অন্যদিকে চুল পড়া রোধ করতে, নতুন চুল গজাতে, চুলের প্রাকৃতিক আর্দ্রতা ধরে রাখতে এবং সেই সঙ্গে ঝলমলে চুল পেতেও কার্যকরী ভাতের মাড়। তবে খেয়াল রাখতে হবে যে, তরলটি যেন ঠান্ডা বা স্বাভাবিক তাপমাত্রায় থাকে

O সিদ্ধ ভাতের মাড় যেমন ব্যবহার করা যায়, তেমনই ১৫-২০ মিনিট চাল ভিজিয়ে রাখা জলও ব্যবহার করা যেতে পারে। এতে এই জলে চালের অনেক পুষ্টি উপাদান চলে আসে। এয়ারটাইট বোতলে ও রেফ্রিজারেটরে সংরক্ষণ করে চার থেকে পাঁচদিন পর্যন্ত ব্যবহার করা যায় এই তরল

O রোজ যদি বেসন দিয়ে মুখ পরিষ্কার করে নেওয়া যায় স্নানের সময়, তাহলে আর আলাদা করে ফেসিয়ালের দরকার পড়বে না এখন অনেক বাড়িতেই অ্যালোভেরা গাছ থাকে। অ্যালোভেরা জেলের সঙ্গে একটু মধু বা ভিটামিন ই-ট্যাবলট মিশিয়ে মুখে মাখুন। ময়েশ্চারাইজারের কাজ করবে

O জল খাবারে এখন ওটস খান অনেকেই। সেই ওটসের গুঁড়ো আর দইয়ের পেস্ট মুখে লাগাতে পারেন। ভালো স্ক্রাবারের কাজ করবে

O চুল সুন্দর রাখতে বাড়িতে ভালো করে অয়েল মাসাজ করুন। কিছুক্ষণ গরম তোয়ালে মাথায় লাগিয়ে রেখে শ্যাম্পু করে ফেলুন। ডিম ব্যবহার করতে পারেন কন্ডিশনার হিসেবে

O বাড়িতেই অনেক ধরনের জেল, কন্ডিশনার, শ্যাম্পু ব্যবহার করি আমরা। ফলে কিছুদিন স্পা না করালে কোনও সমস্যা হবে না ফেসিয়াল হেয়ার রিমুভ করতে বা আইব্রো ঠিক করতে ছোটো ওয়্যাক্স স্ট্রিপ বা সেনসিটিভ ট্রিমার ব্যবহার করতে পারেন ত্বক উজ্জ্বল করতে এক চা চামচ হলুদ গুঁড়োর সঙ্গে দুই চা চামচ পাতিলেবুর রস আর এক চা চামচ দই মাখুন। ১৫ মিনিট মেখে মুখ ধুয়ে ফেলুন

O স্ক্রাবের জন্য চাল আর তিল সারারাত জলে ভিজিয়ে রাখুন। মিক্সিতে পেস্ট করে মুখে মাখুন। দু’মিনিট রেখে ধুয়ে ফেলুন টোনার হিসেবে ফলের রস বা ডাবের জল মুখে মাখুন। পাঁচ মিনিট পর ধুয়ে ফেলুন

O ময়েশ্চারাইজার হিসাবে অ্যালোভেরা জেল আর ভিটামিন ই দারুণ সুফল দেয়। মুখে মাখুন। ১৫ মিনিট পর ধুয়ে ফেলুন

জরুরি পরামর্শ

O পর্যাপ্ত জল পান করলে চোখের নীচের কালো দাগ কিছুটা আটকানো যায়

O চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনওরকম ওষুধ সেবন কিংবা মলম লাগানো উচিত নয়

O ত্বক ড্রাই নাকি অয়েলি— তা বিচার করে, সেইমতো ক্রিম ব্যবহার করা উচিত

O রোদে বেশি ঘোরাঘুরি করা উচিত নয়, এতে চোখের নীচে কালো দাগ পড়তে পারে। আর যদি বের হতেই হয়, তাহলে রোদচশমা এবং ছাতা ব্যবহার করা উচিত

O ত্বকে যদি লাবণ্য থাকে তাহলে অযথা প্রসাধন সামগ্রী ব্যবহার করে ত্বকের ক্ষতি করবেন না। কারণ অতিরিক্ত কসমেটিক্স ব্যবহারের ফলে ত্বকে রিংকল আসতে পারে

O রাতে অন্তত আট ঘণ্টা ঘুমাতে হবে। কারণ ঘুম কম হলে চোখের নীচে কালো দাগ পড়তে পারে

O স্ট্রেস এবং টেনশন কাটাতে হবে

O নিয়মিত শাকসবজি খেতে হবে।

সে এবং একটি ফানুস (পর্ব-০৩)

ননীগোপাল বলল, ‘না প্রভু, আপনি সেবা করুন।’

জীবনকৃষ্ণ দেশলাই জ্বালিয়ে কলকের ভিতর গুঁজে দিয়ে দু’হাতে ধরে লম্বা একটা টান দিয়ে কলকেটা এগিয়ে ধরে বললেন, “নিন বাবাজি। চরম হয়েছে। খুব আনন্দ পাবেন আনে। নিন, নিন লজ্জা করতি হবে না।”

ননীগোপাল একটু বেকায়দায় পড়ল। এখনও কতটা পথ বাকি, কে জানে! পথের সাথীরে চালে চলে না! সে হাত বাড়ায়। তারপর কষে দু’-তিনটে টান।

দমের কাজ সে শিক্ষে করেছিল কয়েক মাস এক গুরুর আখড়ায়। দমে ঘাটতি পড়ার কথা নয়। পড়েওনি। কিন্তু অনেকদিন বাদে আবার ননীগোপাল যেন নিজেরে ফিরে পেয়েছে। সেই আট বছর আগের ননীগোপাল। মনের ভিতরের ফুরফুরে বাতাস বেরিয়ে এসে সামনের রূপনারাণের জলে তিরতির কথা ফেলত তখন। তার পাশের সুন্দরী সেই জলের দিকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা তাকিয়ে বসে থাকত। দু’জনেই জলের চলন দেখত। মুখে কোনও কথা নেই। কোথা থেকে একখান বিকেল উজাড় হয়ে যেত। মাসের পর মাস। বছরের পর বছর। তার কোনও চাওয়া নেই। বাউলানি শুধু বলত, আমারে নিয়ে একটু এদিক ওদিক যাবা। তাতেই হবে। কত বৈষ্ণব-বাউলের আখড়ায় যে ঘোরা হয়েছে, কত মোচ্ছবে যে দু’জনে মিলে গেছে তা বলে ফুরোনো যাবে না।

তখন বয়স তার তিরিশের কোঠায়। গায়ে বল, বুকে বল, কণ্ঠে বল। আর সব বলের বল ওই ঝুমরা। ননীগোপাল গায়, আর সে একতারা বাজায়। বুগবুগি বাজায়। দান এলে নিজের ঝোলার ভিতর দানের চাল-ডাল, টাকাকড়ি ভরে নেয়। ননীগোপাল বৈরাগীর তখন খুব নাম। ওই ‘বাহান্ন বাজার তিপান্ন গলি’, ‘পিঁড়েয় বসে পেঁড়োর খবর’, ‘গুপ্তচন্দ্রপুর’- গোছের ঝিলিক মারা কথাবার্তা দিয়ে নাম করা নয়। ননীগোপাল নিজের কণ্ঠের জোরে নাম করেছিল। তত্ত্বগানের আসরে তাকে হারানো খুব সহজ কাজ ছিল না। আর তার যে ছিল একখান টুকটুকে বাউলানি। তার গানের সঙ্গে সঙ্গে বাউলানির ঝোলা ভরে উঠতে সময় লাগত না। এক বছরের ভিতর একখানা সোনার কাঁকন গড়িয়ে দিয়েছিল ননীগোপাল।

—কী বাবাজি, কেমন ঠাওড়ান?

ননীগোপাল কথা বলে না। সে যে কত কতদিন বাদে সুখের বাড়িতে পা রেখেছে। সে চোখ প্রায় বুজেই পা চালায়। রাস্তা টের পায় এক প্রেমিক মানুষের নরম পায়ের চাপ। রাস্তা তার ভালোলাগা বুঝিয়ে ননীগোপালের কমদামি চটির উপর থেকেই তার নিজের ধুলো দিয়ে ননীগোপালকে সাজিয়ে দেয়। ননীগোপাল হাঁটে। হাঁটে না উড়ে চলে! উড়ে যে তাকে যেতেই হবে। সেবার নসরৎপুরের এক বাবাজির আখড়ায় গিয়েও তার প্রাণপাখিকে ধরে ফেলতে পারেনি। আখড়ায় সাদা আলখাল্লা আর জনতা লুঙ্গি পরা, চূড়োকেশের এক সহজ মা কয়েছিল, ‘এই তো কয়েকদণ্ড আগে আমাদের সদাব্রত-র সঙ্গে সে টইটম্বুর বোষ্টমী গেছে বাঘনাপাড়ায়। এট্টুস আগে আলি তার দেখা পাতি পারতেন, গোঁসাই।’

জীবনকৃষ্ণ কলকের নল ঝেড়ে সব ছাই ফেলে দিয়ে আবার নিজের ঝোলার ভিতর তা চালান করে দেন। তারপর বলেন, ‘বুঝলেন বাবাজি, এট্টুস এই দমের কাজ করে নেয়া থাকলি দীনদয়ালের কৃপায় পথের কষ্ট আর কষ্টই নয়। ফুস করে দেখপানে আমরা অজয়কৃষ্ণের মোচ্ছবে হাজির হয়ে যাবানে।’

এইসময় গান জীবনকৃষ্ণের গলা ছেড়ে এমনি এমনিই বেরিয়ে আসতে চাইছে। এতে নিশ্চই গাঁজার হাত আছে। ‘ঠিকের ঘরে ভুল পড়েছে মন/ কিসে চিনবিরে মানুষ রতন।/ আপন খবর নাই আপনারে / বেড়াস পরের খবর করে।/ আপন খবর জানলে পরে/ পরকে চেনা যায় তখন।”

জীবনকৃষ্ণ মেজাজি সুর ফেলছেন। গান থামিয়ে কথা। কথার পিঠে গান। দিলখোলা স্বর হয়েছে তাঁর। বুঝলেন বাবাজি, মানুষ চেনাটা ঝকমারি ব্যাপার। আপনার একবার মনে হবে খুব চিনি। কিন্তু এট্টুস পরেই ভুল ভাঙবে।

ননীগোপাল এই জায়গাটা থেকে সরে থাকতে চায়। নিজের জীবনের ক্ষত উসকে উঠুক, সে চায় না। গাঁজা সেবন করার পর তার পা হালকা হয়েছে, শরীর পেঁজা তুলোর মতো ভাসছে। এই ভালোলাগাটা সে নষ্ট করতে চায় না। বুঝলেন গোঁসাই, শুনিচি আজকের এই মোচ্ছব নাকি মেলা বড়ো মোচ্ছব। লোকজন মানসিক করে এখানে চলে আসে তা পূরণ করতি। এখানে দিনেরবেলায় নাকি চলে হাপু গান, ধুয়োজারী গান! এখানের এত নাম-ডাক কেন বলতি পারেন?’

জীবনকৃষ্ণের বুগবুগি ক্ষেপে ওঠে। দোতারায় আঙুল পড়ে। গলা ছাড়েন জীবনকৃষ্ণ, ‘শুন সজনী রে সে আগুন জ্বলে দিবারজনি/ নীচেতে চুল্হা আছে/ তাতে হাঁড়ি বস্যা আছে/ সে আগুন জ্বলে দিবারজনি।”

পড়ার জন্য সীমাহীন গল্প-নিবন্ধসাবস্ক্রাইব