ইন্দোনেশিয়ার ছোট্ট দ্বীপ বালি (শেষ পর্ব)

আধ ঘণ্টার মধ্যে আমরা পৌঁছোলাম জিম্বারণ। এখানেই রয়েছে সেই পৃথিবী বিখ্যাত গরুড় বিষ্ণু মূর্তি। শিল্প আর ধর্মের এক অপূর্ব সুরেলা মিশ্রণের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে ১২০ মিটার উঁচু এই মাস্টারপিস, যেটা বিশ্বের সব থেকে লম্বা মূর্তিগুলোর মধ্যে একটি। আশেপাশের ল্যান্ডস্কেপের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই তৈরি করা হয়েছে এই মূর্তি। মূর্তির সূক্ষ্ম কারুকার্য প্রথম দেখাতেই যেন চোখ ধাঁধিয়ে দিল। গরুড় তার শক্তিশালী ডানা বিস্তৃত করে ওড়ার জন্য প্রস্তুত। তার উপর বিষ্ণু দাঁড়িয়ে আছেন। ইন্দোনেশিয়াতে গরুড় জাতীয় প্রতীক। শক্তির প্রতীক।

বিকেলের দিকে এখানেই দেখার সুযোগ পেলাম বালির বিখ্যাত কেচাক ড্যান্স। এর আর এক নাম ‘অগ্নি নৃত্য’। নৃত্যশিল্পীরা খালি পায়ে আগুনের উপর নাচ করে বলেই এরকম নামকরণ। তবে আজকে আমরা দেখলাম বিষ্ণু আর গরুড় ড্যান্স। বালির অন্যান্য শিল্প ও সংস্কৃতির মতো এখানকার নৃত্যশিল্পেও ইন্ডিয়ান এবং চাইনিজ প্রভাব স্পষ্ট দেখতে পাওয়া যায়। অবাক বিস্ময়ে দেখলাম একই নাচের মধ্যে কী সুন্দর ভাবে গরুড়, বিষ্ণু আর ড্রাগন মিলে মিশে একাকার হয়ে গেছে। এখানেই হয়তো শিল্পের জয়।

এরপর যাচ্ছি সানসেট দেখতে। গাড়ি চালাতে চালাতে সলিহিন বলল, ‘এবার আপনাদের নিয়ে যাব উলুওয়াতু মন্দিরে। এটা বালির খুব জনপ্রিয় সানসেট দেখার জায়গা।’

—কিন্তু উলুওয়াতু মন্দির তো বালির খুব বিখ্যাত মন্দির বলে জানি!

—হ্যাঁ, লোকে মন্দির দেখতে আসে। সেই সঙ্গে সানসেটও দেখে যায়।

মনে মনে ভাবলাম ‘এ যাত্রায় তাহলে রথ দেখা আর কলা বেচা’ – দুটোই একসঙ্গে হয়ে যাবে।

বিকেল সাড়ে পাঁচটা নাগাদ পৌঁছোলাম উলুওয়াতু মন্দিরে। ভারত মহাসাগরের উপকূলে, সমুদ্রতল থেকে প্রায় ৭০ মিটার উপরে খাড়া পাহাড়ের উপর অবস্থিত এই মন্দির। বালিনিজ ভাষায় ‘উলু’ অর্থ ‘শীর্ষ’ এবং ‘ওয়াতু’ মানে ‘পাথর’। মন্দিরটি বালিনিজ হিন্দুধর্মের সর্বোচ্চ ঈশ্বর সাং হায়াং উইধি ওয়াসাকে উৎসর্গীকৃত। মন্দিরটি ঠিক কবে তৈরি হয়েছিল সে বিষয়ে মতবিরোধ থাকলেও এটা যে দশম শতকের আগেই কোনও সময় তৈরি হয়েছিল, সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই। উলুওয়াতু মন্দির শুধুমাত্র ধর্মীয় তাৎপর্যই বহন করে না। বরং বেশির ভাগ পর্যটক এখানে মন্দির এবং তার আশেপাশের ভারত মহাসাগরের প্যানোরামিক দৃশ্য দেখার জন্য আসে।

গাড়ি পার্ক করে প্রায় কুড়ি মিনিট হেঁটে শেষ পর্যন্ত পাহাড়ের উপর গিয়ে পৌঁছোলাম। কিন্তু অবাক হলাম ভিড় দেখে। উপরে উঠে জানতে পারলাম উলুওয়াতু মন্দিরে সাধারণ লোকের প্রবেশাধিকার নেই। তাই বুঝতে অসুবিধা হল না যে, এখানে সবাই আমার মতোই সানসেট দেখতে এসেছে। গোধূলি লগ্নে ভারত মহাসাগরের ধারে পাহাড়ের চূড়ায় এই প্রাচীন মন্দিরের চাতালে দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছিল বাতাসটা যেন ফ্রানজিপনি আর লবণের গন্ধে ভারী হয়ে আসছে। এরই মধ্যে শুরু হল সূর্যাস্তের রঙের খেলা। সূর্য যেন আজ সমুদ্রের সঙ্গে হোলি খেলায় মেতেছে। সময় যেন থমকে গেল। মহাবিশ্ব আজ আলো আর অন্ধকারের এই পবিত্র মিলনের সাক্ষী হয়ে থেমে গেছে। সূর্য শেষবারের মতো মন্দিরের চূড়ায় তার গৌরবের চূড়ান্ত আগুন নিক্ষেপ করে হঠাৎ করেই দিগন্ত রেখার নীচে ডুব দিল।

আমি বাকরুদ্ধ হয়ে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলাম। সলিহিনকে ধন্যবাদ জানালাম আমাদের এত সুন্দর একটা সন্ধ্যা উপহার দেবার জন্য। ভালো সময় তাড়াতাড়ি কেটে যায়। আমাদের ক্ষেত্রেও তাই হল।

পরেরদিন খুব সকালে উঠে বেরিয়ে পড়লাম আংসেরি হট স্প্রিং-এর উদ্দেশে। বালির সবুজ ল্যান্ডস্কেপের নরম আলিঙ্গনের মধ্যে অবস্থিত এই হট স্প্রিং প্রকৃতির এক অপরূপ সৃষ্টি। একটি অভয়ারণ্য যেখানে সময় নিজেই থেরাপিউটিক জলের অলস ছন্দে ধীর হয়ে গেছে। এখানকার প্রাকৃতিক পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পর্যটকদের আনন্দ দানের জন্য তৈরি করা হয়েছে কতগুলো উষ্ণ প্রস্রবণ পুল। পুলের পাশে রয়েছে সুপরিকল্পিত ভাবে তৈরি করা বাগান। বাগানের পাশেই রয়েছে ট্রপিকাল বুশল্যান্ড। জলের রং হালকা সবুজ, সম্ভবত জলে গ্রিন অ্যালগি থাকার জন্যই জলের রং এরকম হয়েছে। লোকে বলে ‘সর্ব রোগ হরা’ এই উষ্ণ প্রস্রবণ। শরীরের রোগ কমবে কিনা জানি না, তবে প্রায় ঘণ্টাখানেক সাঁতার কেটে যে মনের সব রোগ ভালো হয়ে গেছে, সেটা অনস্বীকার্য।

আংসেরি হট স্প্রিং-এ লাঞ্চ করে আমরা এবার রওনা দিলাম উলানডানু টেম্পল-এর দিকে। বেরাটন হ্রদের ধারে অবস্থিত এই মন্দির। উলানডানু মন্দিরটি সপ্তদশ শতকে মেঙ্গউইয়ের রাজা আই গুস্তি আগুং পুতু, হ্রদ এবং নদীর দেবী দানুকে উৎসর্গ করে তৈরি করেছিলেন। পাহাড়ি ঠান্ডা বাতাস, স্যাঁতসেঁতে মাটির গন্ধ আর সেই সঙ্গে ফ্রানজিপনি ফুলের মিষ্টি গন্ধ চারদিকে ছড়িয়ে রয়েছে। বৌদ্ধ প্যাগোডা স্টাইলে পাথর খোদাই করে তৈরি করা হয়েছে এই মন্দির। এর সুন্দর লোকেশন, নির্মল পরিবেশ এবং বেরাটন হ্রদের শান্ত জলে মন্দিরের প্রতিফলন দেখতে হাজার হাজার দর্শনার্থী এখানে আসে। মন্দিরের চারদিকে সুন্দর সাজানো বাগান, রেস্তোরাঁ— সব কিছুর ব্যবস্থা রয়েছে।

মন চাইছিল এই শান্ত পরিবেশে আরেকটু বেশি সময় কাটাতে। কিন্তু সলিহিন তাড়া দিয়ে বলল, ‘আপনার উইশ লিস্টে আরও দুটো জায়গা আছে। এখন না বেরোলে সে দুটো বন্ধ হয়ে যাবে।’ তাই গাড়িতে গিয়ে বসলাম।

উলানডানু টেম্পল থেকে খুব কাছেই আছে বালির আরেকটি হিডেন জেম, যাকে বালিনিজরা বলে “টুইন লেকস’। বুয়ান এবং তাম্বলিংগান লেক দুটো পাশাপাশি রয়েছে, দেখে মনে হয় যেন শতাব্দী ধরে দুই বোন এখানে বসে আছে কারও অপেক্ষায়। এদের অপেক্ষার কখনও শেষ হবে কিনা আমার জানা নেই, তবে আমার অপেক্ষার শেষ হল খুব তাড়াতাড়ি। আমরা দুটো লেকের ঠিক মাঝখানে রাস্তার ধারে গাড়ি পার্ক করে নেমে এলাম। এখান থেকে দুটো লেককে একসঙ্গে দেখা যায়। এখানে পর্যটকদের দেখার সুবিধার জন্য উঁচু করে স্ট্যান্ড বানিয়ে দেওয়া হয়েছে। খুব সাবধানে স্ট্যান্ডের উপর উঠলাম।

আজকের দিনটা একটু মেঘলা। তবে মেঘলা আকাশ, কুয়াশা ঢাকা লেক দুটো আর চারদিকের সবুজ ঘন বন— সব মিলিয়ে একটা অদ্ভুত মায়াবী শান্ত পরিবেশ। মাঝে মাঝে শুধু পাখির ডাক আর গাছের পাতা নড়ার শব্দ ছাড়া যেন আর কিছু নেই। নিস্তব্ধতার যে একটা নিজস্ব শব্দ আছে, আজ এখানে দাঁড়িয়ে সেটা উপলব্ধি করলাম।

আজকে আমাদের শেষ গন্তব্যস্থল হল গিটগিট ওয়াটার ফলস। বুয়ান লেক থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে, বালির উত্তরে প্রায় শেষ সীমানায় এই জলপ্রপাত। বালি শুধু মন্দিরের জন্য নয়, জলপ্রপাতের জন্যও প্রসিদ্ধ। বালিতে এসে কোনও জলপ্রপাত দেখব না, সেটা কী করে হয়। তাই গিটগিটকে লিস্টে রেখেছিলাম। এটা বালির মেন ট্যুরিস্ট স্পট থেকে বেশ অনেকটাই দূরে, তাই ভেবেছিলাম এখানে ভিড় একটু কম হবে। কিন্তু স্বপ্নেও ভাবিনি গিটটি শুধু আমার অপেক্ষাতেই বসে থাকবে।

বুয়ান লেক থেকে আমাদের যাত্রা শুরু হল। বেশ আঁকাবাঁকা আর এবড়ো-খেবড়ো পাহাড়ি রাস্তা। আধঘণ্টার উপর লাগল পৌঁছোতে। খুব খুশি মনে গাড়ি থেকে নেমে ভাবলাম পৌঁছে গেছি। কিন্তু তখনও জানি না, পৌঁছেছি শুধু পাহাড়ের নীচে। গাড়ি এই পর্যন্তই আসতে পারে। এরপর হেঁটে পাহাড়ের উপরে উঠতে হবে। এতদূর এসে ফিরে যাব, গিটগিট ফলস দেখব না! কাউন্টার থেকে টিকিট কেটে এক বোতল জল হাতে নিয়ে উপরে উঠতে শুরু করলাম। পাহাড়ের উপর সিঁড়ি দিয়ে উঠতে হয়। কোনও কোনও জায়গায় সিঁড়িগুলো খাড়া ভাবে উপরে উঠে গেছে। আবার কোথাও বেশ ফ্ল্যাট। আমরা উপরে ওঠার সময় দেখলাম কয়েকজন ট্যুরিস্ট নেমে আসছে। হাঁটছি আর হাঁটছি। পথ যেন আর ফুরোয় না। এদিকে সূর্যও প্রায় অস্ত যাবার মুখে। পা চালিয়ে হাঁটতে না পারলে সন্ধ্যা হবার আগে গিটগিট পৌঁছোতে পারব না। আরও কিছুটা পথ উপরে উঠে কানে এল গিটটি ফলসের জল পড়ার শব্দ। শেষ পর্যন্ত পৌঁছোলাম জলপ্রপাতের ঠিক নীচে। সে এক অপূর্ব অভিজ্ঞতা। এত কষ্ট করে আসাটা বিফল হয়নি। আশেপাশে কেউ নেই। শুধু আমরা তিনজন। প্রকৃতির এই অপরূপ সৌন্দর্য দু’চোখ ভরে, মন ভরে নিয়ে এলাম।

কাল রাতে হোটেলে ফিরতে বেশ দেরি হয়ে গিয়েছিল। আজ সকালে উঠেই কুটা বিচের ধারে মর্নিং ওয়াকে বেরোলাম। কত লোক এরই মধ্যে বিচে চলে এসেছে। কেউ হাঁটছে, কেউ জলে সার্ফিং করছে। সকালের কুটা বিচকে এক সম্পূর্ণ আলাদা রূপে দেখতে পেলাম। এখন কোনও ব্যস্ততা নেই, চিৎকার চেঁচামেচি নেই, ফ্লাড লাইট-এর চোখ ধাঁধানো আলো নেই। প্রকৃতি যেন একটু সুযোগ পেয়েছে জিরিয়ে নেবার। আমরাও হোটেলে ফিরলাম। আমাদের একটু পরেই বেরোতে হবে এয়ারপোর্টের উদ্দেশে।

স্নেহের বাঁধন (পর্ব-০১)

লোকটাকে আজকাল গবুদার চায়ের দোকানে দেখা যাচ্ছে। একমাথা কোঁকড়ানো চুল। মুখ ভর্তি কাঁচাপাকা দাড়ি গোঁফ। বড়ো বড়ো দুটো সর্বগ্রাসী চোখ। কোনও কথা বলে না। গবুদা ভোরবেলা চায়ের দোকান খুললেই এসে দাঁড়ায় পায়ে পায়ে। চুপচাপ এক কোণে অপেক্ষা করে। বউনি হলেই লোকটা সামনে এসে দাঁড়ায়। গবুদার দয়ার শরীর। একটা মিষ্টি পাউরুটি আর বড়ো ভাঁড়ে এক কাপ চা। রোজকার বরাদ্দ ওর।

খেয়ে দেয়ে একটা বিড়ি ধরিয়ে নদী পাড়ে চলে যায়। সারাদিন বসে থাকে সেখানে।

পাড়ার লোকজনই দুবেলা পালা করে ভাত খেতে দেয়। শিবমন্দিরের চাতালে শুয়ে রাত কাটায় লোকটা।

মজার ব্যাপার হল ও যখন খেতে বসে তখন ক’টা কুকুর এসে জোটে আর তাদের সঙ্গেই খাবার ভাগ করে খায়। যেন আশ্চর্য এক মহাপুরুষ! মৌন সন্ন্যাসী।

আজ পর্যন্ত লোকটার নামধাম কিছুই জানা যায়নি। এই নিয়ে মাঝে মধ্যে জোর আলোচনা হয় গবুদার চায়ের দোকানে বসে থাকা মাতব্বরদের। লোকটা কথা বলতে পারে কিন্তু বলে না। খাবার সময় কুকুরদের সঙ্গে কথা বলতে দেখেছে অনেকে। তবে কেন মানুষদের সঙ্গে কথা বলতে চায় না সে? প্রশ্ন থেকেই যায়।

আজ রবিবার তাই রায়বাবুকে দিয়ে বাজার থেকে বেশ খানিকটা মটন আনিয়েছেন রায়গিন্নি। দুপুরে খেতে বসার আগে রায়বাবুকে দিয়ে পুকুর পাড়ে লোকটাকে দু’পিস মাংস আর ভাত পাঠিয়ে দেন। খানিক তৃপ্তি পান দু’জনেই।

শীতটা বেশ জাঁকিয়ে পড়েছে এবার। গ্রামগঞ্জে ঠান্ডার প্রকোপ একটু বেশি শহরের তুলনায়। রায়গিন্নি আলমারি থেকে একটা পুরোনো মোটা কম্বল বের করে রায়বাবুকে দিয়ে বললেন- – যাও এটা ওই লোকটাকে দিয়ে এসো। ঠান্ডায় বড়ো কষ্ট পাচ্ছে যে। আচ্ছা এক কাজ করলে হয় না?

—কী কাজ? রায়বাবু জিজ্ঞেস করলেন।

—বলছি আমাদের একতলার একটা ঘরে ওকে থাকতে দিলে কেমন হয় !

—না না, ওসব ঝামেলায় গিয়ে কাজ নেই। অত দয়া দেখাবার কিছু হয়নি। জানা নেই শোনা নেই, শুধু শুধু বিপদ ডেকে আনার কী দরকার।

লোকটাকে পাগল ভেবে ছেলে ছোকরারা এড়িয়ে চলে। কিন্তু স্কুলের বাচ্চাদের লোকটা বড়োই ভালোবাসে। কাছে ডেকে কী যেন বলতে চায়। বলে না। ইশারায় কীসব বলে। কাঠি দিয়ে মাটিতে আঁকিবুকি কাটে। এমনকী কে পাশ করবে আর কে করবে না তাও বলে দিতে পারে। পরীক্ষার সময় প্রায় সব ছেলে মেয়েরা লোকটার কাছে এসে দাঁড়ায়। আশীর্বাদ নিতে চায়। রায়বাবুর মন খারাপ। শ্বশুরমশাই বেশ অসুস্থ ক’দিন ধরে। স্ত্রীকে বাপেরবাড়ি পাঠিয়েও শাস্তি নেই। কেবলই দুশ্চিন্তা। হঠাৎ মনে হল একবার ওই লোকটার কাছে যাই।

শিবমন্দির চত্বরে টানটান শুয়ে ছিল লোকটা। রায়বাবু ডাকতেই উঠে বসল সে। রায়বাবুকে দেখে মাটিতে কাঠি দিয়ে একটা ক্রস চিহ্ন আঁকল সে, তারপর আবার আগের মতো শুয়ে পড়ল। কিছু বলার আগেই রায়বাবু বুঝে গেলেন গিন্নির বাবা আর বেশিদিন নেই। মন খারাপ নিয়ে ফিরে আসার মুহূর্তে একটা শব্দ করে ডাকল লোকটা, তারপর ডান হাতের বুড়ো আঙুল তুলে দেখাল সে। রায়বাবু তখন ব্যাপারটা বুঝলেন না।

পরেরদিন সকালে যথারীতি খবর এল শ্বশুরমশাই আর নেই। গত রাতে মারা গেছেন।

এরপর থেকে লোকটার কদর আরও বেড়ে গেল। সবাই সমীহ করে চলতে লাগল। আবার কেউ কেউ নিজেদের অপকর্মের জন্য ভয়ে ধারেকাছে ঘেঁষে না লোকটার। যদি বেফাঁস কিছু বলে ফেলে!

লোকটা নির্বিকার হেঁটে বেড়ায় গ্রামময়। দিব্যি কেটে যায় তার দিন।

ক’দিন পর শালাবাবুদের কাছ থেকে শ্বশুরবাড়ির সম্পত্তির বেশ মোটা ভাগ পেলেন রায়বাবু। তখন বুঝলেন লোকটা ডেকে ঊর্ধ্বমুখী বুড়ো আঙুল দেখিয়েছিল এই জন্যই বোধহয়।

সেদিন সকালে গবুদার দোকানে লোকটাকে দেখা গেল না। সারা গ্রামে কোথাও খুঁজে পাওয়া গেল না। ব্যাপারটা ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। সবার মনে একটা আশঙ্কা। হঠাৎ উধাও হল কোথায়? একটা সন্দেহ দানা বাঁধছে গ্রামের মানুষদের মনে। একটা চোরা রহস্যের গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে তলে তলে।

একটু বেলার দিকে গবুদার চায়ের দোকানে একটা ঢাউস গাড়ি এসে থামল। একজন ভদ্রমহিলা গাড়ি থেকে নামলেন। একটা ছবি দেখিয়ে খোঁজ করতে লাগলেন। জিজ্ঞাসাবাদ করতে লাগলেন। চায়ের দোকানে বসে থাকা নন্দবাবু, রায়বাবু, বিনয়বাবু সবিস্ময়ে বললেন— লোকটাকে তাঁরা চেনেন। এখানেই বেশ কিছুদিন দেখা গেছে। ব্যস এইটুকুই। আর মুখ খুলতে চাইলেন না তাঁরা। ব্যাপারটা কিছু বোঝার আগেই ভদ্রমহিলা গাড়ি নিয়ে চলে গেলেন।

একটা ভয় বাড়ছে। পুরো সকালটা লোকটাকে নিয়ে আলোচনা চলল। ভালো মন্দ নানারকম মতামত দিচ্ছেন গবুদা সমেত উপস্থিত চায়ের দোকানে আড্ডা দিতে আসা বাকি বাবুরা। লোকটার প্রতি একটা মায়া পড়ে গেছে সবার, তাই তার অনুপস্থিতিতে সবারই চিন্তা বাড়ছে। না, দিন তিনেক লোকটার কোনও হদিস নেই।

ইন্দোনেশিয়ার ছোট্ট দ্বীপ বালি (পর্ব-০৪)

তবে টেগালালও রাইস টেরাসের দোলনার কথা না বললে লেখাটাই অসম্পূর্ণ থেকে যাবে! রাইস টেরাসের মধ্যে সুদীর্ঘ পাম গাছের সঙ্গে বাঁধা হয়েছে এই দোলনাগুলো। দোলনার উপর থেকে ‘বার্ডস আই ভিউ’-এ সম্পূর্ণ রাইস টেরাসটা দেখা যায়। এত উঁচুতে দোলনায় চড়ার আনন্দ আর তার পাশাপাশি ভয়, সব মিলিয়ে এরকম অ্যাডভেঞ্চারের সুযোগ জীবনে খুব কমই আসে। সারাদিনের শেষে জীবনখাতার স্মৃতির পাতায় বেশ কিছু অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে হোটেলে ফিরলাম।

দেখতে দেখতে তিনদিন কেটে গেছে। আজ খুব সকালে উঠে বালির পূর্ব উপকূলে আমেদ বিচ দেখতে বেরোলাম। সলিহিন আগেই বলে দিয়েছিল সকালের দিকে ইস্ট কোস্ট ট্রাভেল করতে ভালো লাগবে। আমরা সাড়ে পাঁচটা নাগাদ বেরোলাম। রাতের কালো পর্দা ধীরে ধীরে সরিয়ে বালির আকাশে সূর্যের ছটা ফুটে উঠতে শুরু করেছে। তাড়াতাড়ি ফোনে ম্যাপ দেখে সন্নিহিনকে বললাম, “আমাদের সানুর বিচে নিয়ে যেতে পারবে? এখান থেকে খুব কাছেই হবে। আমি আগে ওখানেই যেতে চাই।”

সলিহিন একটু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘কেন? আমেদ বিচে যাবেন না?’

তখন বোঝানোর সময় নেই। বললাম, “তুমি আগে গাড়িটা ঘোরাও, তারপর বলছি।’

গাড়ি সানুরের পথ ধরল। একটু নিশ্চিন্ত হয়ে সলিহিনকে বললাম, “আমেদ পৌঁছোতে অনেক দেরি হয়ে যাবে। চলো সানুর থেকে আজকে বালির সূর্যোদয় দেখে নিই।”

মিনিট দশেকের মধ্যেই সানুর বিচে পৌঁছোলাম। সারা রাত পার্টি, গান-বাজনা, হই-হুল্লোড়ের পর সানুর বিচ যেন ক্লান্ত হয়ে বিশ্রাম নিচ্ছে। আশেপাশে কয়েকজন প্রাতঃভ্রমণকারী ছাড়া তেমন কোনও লোকজন নজরে পড়ল না। সমুদ্রের ধারে বেশ কয়েকটা চেয়ার রাখা আছে দেখে আর সময় নষ্ট না করে একটা চেয়ার নিয়ে বসলাম। দেখতে দেখতে পুরো আকাশটা যেন একটা ক্যানভাসে রূপান্তরিত হল।

সূর্যের প্রথম আলো যেন এক লাজুক কবির মতো মঞ্চে এল। আস্তে আস্তে এপ্রিকট থেকে গোলাপি, তার থেকে অরেঞ্জ, সবশেষে সোনালি রং দিয়ে যেন পুরো ক্যানভাসটা রাঙিয়ে দিল। আর সমুদ্র? সে তো নবজাত সূর্যের নীচে এক প্রশান্ত বিস্তৃতি। আকাশের কোমল প্যালেটকে আয়না করে, প্রতিটি তরঙ্গ সামুদ্রিক কবিতায় একটি ক্ষণস্থায়ী স্তবক তৈরি করছে। দেখতে দেখতে সূর্যের রং গাঢ় হল, আশেপাশে পাখির কোলাহল শুরু হল। লোকজনের সংখ্যাও বাড়তে লাগল। বুঝতে পারলাম, এবার সময় হয়েছে যাত্রা শুরুর।

এবার ফ্রি-ওয়ে দিয়ে আমাদের গাড়ি ছুটে চলল। রাস্তায় ট্রাফিক খুব কম। বিচের ধার দিয়ে প্যারালাল ভাবে রাস্তাটা চলেছে। তাই সানুর বিচকে বিদায় জানিয়েও যেন ঠিক বিদায় নয়। সমুদ্র আমাদের সঙ্গে পাশে পাশেই চলছে। এক ঘণ্টার মধ্যেই পৌঁছে গেলাম আমেদ বিচ। এটাকে বালির ‘হিডেন জেম’ বলা যেতে পারে। আগ্নেয়গিরির শিলা আর বালি দিয়ে তৈরি এই উপকূল বালির অন্যান্য বিচগুলোর থেকে বেশ আলাদা। এখানে দুগ্ধস্নাত রেশমি কোমল বালি নেই। রয়েছে আলকাতরার মতো কালো বালি। আর সেই বালির উপর খালি পায়ে হাঁটতে গিয়ে বুঝতে পারলাম আমেদ বিচের বালি খুব একটা খুশি মনে আমাকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছে না। বরং কয়েকটা ছোটো ছোটো পাথরের কুচি পায়ে ঢুকে এ যাত্রার মতো খালি পায়ে হাঁটার শখ মিটিয়ে দিল। কিন্তু রঙে কী আসে যায়? কালো বলে কিন্তু আমেদ বিচের রূপ একটুও কম নয়। বরং বলা ভালো দিগন্তবিস্তৃত সমুদ্রের জল আর নীল আকাশের সঙ্গে এই কালো বালি বেশ সখ্যতা করে নিয়েছে। ব্যতিক্রমের মধ্যেও এক বিরল সৌন্দর্য।

আমাদের এর পরের গন্তব্যস্থল ‘তিরতা গঙ্গা’ মন্দির, বালিনিজ ভাষায় যার অর্থ “গঙ্গার জল’। দেশ থেকে এত দূরে বসেও যেন দেশের ছোঁয়া পেলাম। তিরতা গঙ্গা মন্দির কমপ্লেক্স-এর সুপরিকল্পিত ওয়াটার ফিচার, পান্না সবুজ বাগান যে কোনও পর্যটকের মনোরঞ্জন করতে বাধ্য। মন্দিরে ঢোকার মুখে মনে হল এ যেন বালিনিজ সংস্কৃতি, স্থাপত্য আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক রাজকীয় সংমিশ্রণ। মন্দিরটি ১৯৪৮ সালে কারাঙ্গাসেমের শেষ রাজা তৈরি করেছিলেন। ভিতরে ঢুকে প্রথমেই চোখে পড়বে ওয়াটার ফিচার। আর এই জলের মধ্যে আছে পাথর খোদাই করে তৈরি করা হিন্দু দেব-দেবীর মূর্তি। প্রতিটি মূর্তির সঙ্গে জড়িয়ে আছে বালির ইতিহাস আর লোক-কাহিনির গল্প। এই মন্দিরের স্থাপত্য ও ভাস্কর্যগুলিতে বালিনিজ, ইন্ডিয়ান এবং চাইনিজ সংস্কৃতির এক অপূর্ব সংমিশ্রণ রয়েছে।

জলের উপর দিয়ে হেঁটে চলার জন্য অনেকগুলো স্টেপিং স্টোন রয়েছে। দর্শনার্থীরা একের পর এক লাইন দিয়ে তার উপর দিয়ে হেঁটে বেড়াচ্ছে। ফটো তোলার জন্য এই জায়গা বেশ জনপ্রিয়। মন্দিরের চারদিকে নানারকম ট্রপিকাল গাছ। সম্পূর্ণ মন্দির কমপ্লেক্স এত সুন্দর পরিকল্পনা করে তৈরি করা হয়েছে, মনে হচ্ছে সব কিছু একে অপরের পরিপূরক। মন্দিরের নান্দনিক সৌন্দর্য আর ওয়াটার ফিচারে প্রবাহিত জলের মিষ্টি সুর এক মায়াময় পরিবেশ তৈরি করেছে। অনেকক্ষণ বাগানে ঝোলানো দোলনায় বসে কাটিয়ে এবার মনে হল ফিরতে হবে। মন না চাইলেও তিরতা গঙ্গাকে এবারের মতো বিদায় জানিয়ে আমরা ফিরে এলাম।

ফেরার পথে সলিহিন আমাদের একটা চকোলেট ফ্যাক্টরিতে নিয়ে গেল। দরজা খুলে ভিতরে ঢুকতেই পঞ্চ ইন্দ্রিয় সজাগ হয়ে উঠল। চারদিকে কোকোর গন্ধ। নানা রঙের, নানা আকারের সব চকোলেট সাজানো। আমি খুব একটা চকোলেটপ্রেমী নই কিন্তু তবুও কীরকম যেন একটা নেশাধরা পরিবেশ। ভিতরে একটা বেশ বড়ো টেস্টিং রুম রয়েছে। কত বাহারি রকমের চকোলেট সাজানো আছে। মনে হল যেন বোতলের ভিতর থেকে চকোলেটগুলো আমায় ডাকছে ওদের একবার হাতে তুলে নেবার জন্য, একবার একটু চেখে দেখবার জন্য। কিন্তু না, আমি অপারগ। ছোটো ছোটো চকোলেটের টুকরোগুলো বিরহিনীর মতো মুখ করে পিছন থেকে আমার দিকে তাকিয়ে রইল। তবুও ফেরার পথে বেশ কয়েক প্যাকেট চকোলেট কিনে নিলাম, জানি দেশে ফিরে কাজে লাগবে। চকোলেট ভালোবাসে না এমন লোক খুব কমই আছে।

সলিহিন কাল বলেছিল একটা মন্দিরে নিয়ে যাবে। তাই আর হোটেলে না ফিরে ডেনপাসার ছাড়িয়ে সাউথ বালির দিকে ড্রাইভ করতে শুরু করল। আমি আর ধৈর্য রাখতে না পরে জিজ্ঞেস করলাম, ‘আমরা কোথায় যাচ্ছি? কোনও মন্দিরে?”

সলিহিন হেসে বলল, “যদি পথে ট্রাফিক বেশি না থাকে আর আপনার ভাগ্য ভালো থাকে তাহলে দুটো জায়গায় নিয়ে যাব।”

(ক্রমশ…)

মায়েদের অবদান সীমাহীন

শিল্প-সংস্কৃতি এবং সভ্যতার অনন্য বৈশিষ্ট্যের জন্য ভারত বিশেষ ভাবে পরিচিত সারা বিশ্বে। প্রত্যেক ভারতবাসী এর জন্য গর্ব অনুভব করেন। আর এই অনন্য বৈশিষ্ট্যের জন্য বেশিরভাগ কৃতিত্বের দাবিদার ভারতীয় নারীরা। আর এই নারীদের মধ্যে অনেকটা অংশ জুড়ে রয়েছেন মায়েরা। কারণ, ‘মা’ এই শব্দটি শুনলেই ভালোবাসা, মমত্ব, করুণা, দয়া, ত্যাগ, সেবা প্রভৃতি ভাবমূর্তি ফুটে ওঠে চোখের সামনে। আসলে, মা মানেই নিরাপত্তা এবং ভালোবাসার আশ্রয়স্থল। এইসব গুণ মায়েরা পেয়েছেন প্রকৃতিগত ভাবেই।

বেশিরভাগ পরিবারে দেখা যায়, মা তার সমস্ত গুণ এবং শক্তি দিয়ে পরিবারকে সুখময় করতে চান। প্রাকৃতিক নিয়মেই মায়েরা সংসারের হাল ধরেন শক্ত হাতে। এর জন্য তারা অনেক সময় আত্মসুখ বিসর্জনও দিয়ে থাকেন। কিন্তু দুঃখের বিষয় হল এই যে, এত কিছু ত্যাগ স্বীকার করার পরও মায়েদের উপর অত্যাচার বন্ধ হয়নি আজও। আর এইসব অত্যাচারের প্রতিফলন ঘটছে, কুপ্রভাব পড়ছে তাদের দেহে-মনে। তাদের চিত্ত তাই দোলাচলে। কখনও তারা বিরক্ত, কখনও তৈরি হচ্ছে মানসিক অস্থিরতা এবং অস্তিত্বের সংকট। কিছু ক্ষেত্রে মায়েরা আজ দিশাহারা, তাই খুঁজছেন অস্তিত্বের অর্থ। কিন্তু কবে কাটবে এই অস্তিত্বের সংকট?

সন্তান প্রসঙ্গে

লিঙ্গ নির্ধারণ দণ্ডনীয় অপরাধ, তবু আজও কি তা বন্ধ হয়েছে পুরোপুরি? প্রশ্ন থেকে যায়। বিস্ময় জাগে মনে, আজও কেন বন্ধ হয়নি কন্যাভ্রূণ হত্যা! মায়েদের আত্ম-নির্ভরতা তো অনেক দূরের বিষয়, কন্যা সন্তানকে পৃথিবীর আলো দেখানোরও সুযোগ পান না কেউ কেউ। অথচ পৃথিবীর কোনও মা-ই হয়তো চান না যে, তিনি শুধু পুত্র সন্তানের মা হবেন, কন্যা সন্তান পছন্দ করবেন না।

মানসিকতার তফাৎ

স্ত্রী-র সফলতা যে ফিল্ড-এই হোক-না কেন, অনেক স্বামীর তাতে গাত্রদাহ হয়, ইগো প্রবলেম হয়। স্ত্রী যদি উপার্জনও করেন, মা হয়ে ঘরে বাইরে উদয়াস্ত পরিশ্রম করেন— তাহলেও তাকে স্বামীর হাতে মার খেতে হয় অনেকসময়।

অনেক স্বামী আছেন যারা এমনও ভাবেন যে, বাড়ি ছেড়ে আর যাবে কোথায়, দাসীর মতো-ই থাকতে হবে তার কাছে। আর যারা স্ত্রী-কে চাকরি কিংবা ব্যাবসা করার অনুমতিও দেন, তারা স্ত্রী-র উপার্জিত টাকা আত্মসাৎ করেন।

অবশ্য এটা ঠিক যে, ধনী পরিবারের অনেক মায়েরা হয়তো প্রচুর টাকা খরচ করেন নানা ভাবে। তারা হয়তো দামি শাড়ি, গয়না কেনেন, বিউটি পার্লারে যান কিংবা কিটি পার্টিতে টাকা খরচ করেন। এসব আসলে স্ত্রী-র মন ভালো রাখার জন্য স্বামীরা করতে দেন কিন্তু স্ত্রী-কে তার আনুগত্যে রাখার এও এক কৌশল। এরপর স্ত্রী হয়ে যান স্বামীর ব্যক্তিগত সম্পত্তি। যেভাবে ইচ্ছে তিনি সেই সম্পত্তি ব্যবহার করার অধিকার কায়েম করেন।

কিন্তু এটা মনে রাখা দরকার, অকারণে স্ত্রীর চরিত্র কলুষিত করার কোনও অধিকার স্বামীর নেই। এটাও মনে রাখতে হবে যে, অন্যায় করার পর আদালতের নির্দেশে স্ত্রী এবং সন্তানের জন্য ১০ হাজার টাকা খোরপোশ দিলেই স্বামী মহান ব্যক্তি হয়ে যান না।

বিষয়টা হল এই যে, যাদের স্বার্থে ঘা পড়ছে, তারাই স্ত্রীর উপর জুলুমবাজি করছেন। আর অন্যদিকে সাধারণ এক শ্রেণির মহিলা আছেন যারা পৃথিবীর যে-প্রান্তেই থাকুন না কেন, অত্যন্ত ধর্মভীরু প্রকৃতির। সংসারের শৃঙ্খলে নিজেকে আষ্টেপৃষ্ঠে এমনই বেঁধে ফেলেন যে, যেখান থেকে তাদের মানসিক উত্তরণ আর ঘটে না।

এই মানসিকতার ধর্মভীরু দুর্বল মায়েদের দৃষ্টিভঙ্গি তাদের প্রায় ১২০০ বছর পিছিয়ে দিয়েছে। হয়তো আধুনিক প্রযুক্তি সামান্য পরিমাণে তাদের জীবনযাত্রার সঙ্গে জড়িয়েছে কিন্তু মানসিক ভাবে অনগ্রসরই রয়ে গেছেন তারা।

আসল কথা

আসলে আইনের সীমাবদ্ধতা নয়, এই সীমাবদ্ধতা আমাদের সমাজের মানসিকতার এবং পরিকাঠামোগত দুর্নীতির। একবার অপরাধী পার পেয়ে গেলে, তা অন্যদের আরও সাহসী করে তোলে। ক্ষমতা ও অর্থ সব অপরাধকে লঘু করে দেয়। কখনও ধর্মের জোরে, কখনও অর্থের জোরে পুরুষশাসিত সমাজ মায়েদের আরও বেশি করে যন্ত্রণার দিকে ঠেলে দেয়। দোষ দেবেন কাকে? কে আসল অপরাধী?

আধুনিকতা আজ পুরোনো চিত্রটা বদলে দিয়েছে ঠিকই কিন্তু গ্রামের চেহারার পরিবর্তন শহরের তুলনায় কম। এখনও সেখানে পুরুষের সমান অধিকার মেয়েদের দেওয়া হয় না। পরিবারে মায়েরা স্বাধীনতা দাবি করতে গেলেই লাগে দ্বন্দ্ব। ভারতবর্ষের সমাজব্যবস্থা আজও মায়েদের সঠিক মান স্থাপন করতে পেরেছে কিনা মাঝে মাঝে সে বিষয়ে যথেষ্ট সন্দেহের অবকাশ থাকে। রাস্তায় যেতে আসতে অনেক সময়েই শুনতে হয়, ‘কীসের জন্য চাকরি করছ যখন তোমার স্বামী এত ভালো উপার্জন করছেন? সন্তানের যত্ন নাও ঠিক করে।” এইসব মানসিকতার লোকেদের এটাই হয়তো মনে হয়, ‘মা মানেই শুধু দাসীর মতো কর্তব্য পালন করে যাবে। আর যদি চাকরি করে, তাহলে সে তার সন্তানকে অবহেলা করছে নিজের স্বার্থে অর্থ উপার্জনের জন্য।’ অথচ আধুনিক মায়েরা চাকরি করব বলেই যে মনস্থির করেন, সেটা ঠিক নয় সবসময়। সংসারের আর্থিক চাহিদা মেটানোর জন্যই হয়তো পুরুষদের মতোই চাকরি করতে শুরু করেন তারা। এটাই স্বাভাবিক আজ তাদের কাছে।

বিবাহ পরম্পরায় মেয়েরা স্বামীর সম্পত্তি হিসাবে এক গৃহ থেকে অন্য গৃহে যান। কোনও কোনও জায়গায় তো বহুবিবাহ প্রথা এখনও চালু আছে। স্বামীর একাধিক স্ত্রী দ্বারা সন্তান উৎপাদনের অধিকার থাকলেও, কোনও স্ত্রী যদি পরপুরুষের সঙ্গে সম্পর্কের দরুন সন্তানসম্ভবা হয়, তাহলে সেই সন্তান অবৈধ হিসাবে গণ্য হয়। অর্থাৎ মেয়েদের মনেই বপন করা আছে এক প্রাগৈতিহাসিক ন্যায়-অন্যায়ের বোধ, যার দরুন বাস্তবটা তাদের চোখে পড়ে না।

পরিবর্তন

কিছুদিন আগে পর্যন্ত মায়েদের হাতের কলম কেড়ে নিয়ে ঘরকন্নার কাজে তাকে ঢুকিয়ে দেওয়া হতো। শিক্ষার আলোর বদলে টেনে নামানো হতো সংসার নামক অন্ধকারের জাঁতাকলে। সেটাই তাদের জীবন, বারবার মনে করানো হতো। তবে আশীর্বাদ এটাই যে, কিছু মানুষ বদলাচ্ছে, সচেতনতা বাড়ছে। কন্যাসন্তানের প্রতি মা-বাবা, সমাজের ধারণায়ও কিছু পরিবর্তন এসেছে।

অনেক সময় দেখা যায় স্বামী কর্মসূত্রে অন্যত্র থাকে। সেই পরিস্থিতিতে স্ত্রী-কেই বাড়ির পুরো দায়িত্ব পালন করতে হয়। বাড়ির বাইরের কাজ যেমন, বাচ্চাদের পড়াশোনা, স্কুলের নানা ঝামেলা, বিভিন্ন বিলের পেমেন্ট, দোকানবাজার— এসব কিছুও স্বামীর অনুপস্থিতিতে স্ত্রীকেই করতে হয়। এছাড়াও তার নিজস্ব সোশ্যাল লাইফ, বন্ধুবান্ধব, নানারকম পলিটিক্যাল কাজে যোগদান করা ইত্যাদিও তার জীবনের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য ভাবেই জড়িয়ে থাকে।

সবসময় চাকরি করতে বাড়ির বাইরেই যেতে হবে এমন কনসেপ্ট-এ বিশ্বাস করেন না আধুনিক গৃহবধূরা। নিজেদের সোশ্যাল লাইফ, স্ট্যাটাস, মডেল রোল বজায় রাখার জন্য বাড়িতে বসেই অর্থ উপার্জনের বিভিন্ন পন্থা বেছে নেন। অনেকে সফট টয়, চিত্রকলা, ফুলের বোকে বানিয়ে প্রদর্শন করেন এবং বিক্রিও করেন। আবার ছাত্র-ছাত্রী জোগাড় করে বাড়িতে ব্যাচ বানিয়ে নানা ধরনের বিষয়ের উপর ক্লাসও কনডাক্ট করেন। এর থেকেও অর্থ উপার্জনের এবং স্বাধীন থাকার একটা সহজ রাস্তা অনায়াসে বেরিয়ে আসে আধুনিক মায়েদের।

এখন অনেক বাড়ির মায়েরা এতটাই আত্মসচেতন হয়ে গেছেন যে, বাড়িতে তাদের স্বামীরাও স্ত্রী-কে খুশি ও আরামে রাখার জন্য, বাড়ির প্রতিটি কাজে শ্রমদান করতে এতটুকু ইতস্তত করেন না। শিক্ষার দৌলতে এবং সোশ্যাল এক্সপোজারের কারণে এখন অনেক মা ম্যাচিওর হয়ে গেছেন। সুতরাং তারা শক্ত হাতে ‘ঘর ও বাহির’ সামলাচ্ছেন। চাকুরিরতা মহিলা এবং গৃহবধূর মধ্যে আজ আর কোনও তফাৎ নেই। দিনের শেষে দু’জনেই নিজেদের কাজে পারফেক্ট।

মনে রাখতে হবে, এই মায়েরা মুখ বন্ধ করে পরিবারের প্রত্যেকের জীবনের ওঠা-নামার সঙ্গে নিজেকে ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে রাখেন। সোনার কাঠি ও রুপোর কাঠির ছোঁয়ায় পরিবারের প্রত্যেককে রূপকথার কাহিনির পাত্র-পাত্রী করে তোলেন। তাই তাদের দয়া নয়, সামাজিক অধিকারগুলির বিষয়ে সচেতন করা দরকার।

ইন্দোনেশিয়ার ছোট্ট দ্বীপ বালি (পর্ব-০৩)

সলিহিন বলল, ‘এরপর বালিতে ডাচদের প্রতিপত্তি কিছুটা বেড়ে যায়। তারপর ১৯০৮ সালে আবার পুপুতান শুরু হয়। এবার ডেনপাসারের কাছে এক যুদ্ধে ব্লুংকুং-এর রাজা এবং তার পরিবার-সহ অনেক বালিনিজের মৃত্যু হয়। ডাচ সেনারা ব্লুংকুং রাজপ্রাসাদও ধ্বংস করে দিয়েছিল।’

—তাহলে বালিনিজরা স্বাধীনতা পেল কবে? কী করে? আমি মনোযোগী ছাত্রীর মতো প্রশ্ন করলাম।

—তারপর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হল। তখন তো আবার আরেক সমস্যা শুরু হল। কথাটা বলে সলিহিন থামল। -কী সমস্যা?

—জাপানিজরা এবার ইন্দোনেশিয়া দখল করল। জাপানিজরা ডাচদের থেকেও বেশি অত্যাচার করেছে বালিনিজদের উপর। যাই হোক, শেষ পর্যন্ত যুদ্ধে হেরে জাপানিজরা এখান থেকে চলে যেতে বাধ্য হয়। তারপর একটু থেমে বলল, এরপর ডাচরা আবার ফিরে আসে। কিন্তু ততদিনে ইন্দোনেশিয়ার লোকেরা বুঝতে শিখেছে, লড়তে শিখেছে। শেষ পর্যন্ত ডাচ সরকার আমাদের স্বাধীনতা দিতে বাধ্য হয়। আর এই ‘বাজরা সন্ধি মনুমেন্ট’ আমাদের সেই স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতীক।

সলিহিনের কাছ থেকে অনেক কিছু জানতে পারলাম। মনে মনে খুব খুশি হলাম। ও শুধু ড্রাইভার নয়, বেশ ভালো একজন ট্যুর গাইডও বটে।

ইতিহাসের পর এবার চললাম বালির আধ্যাত্মিক জগতে মনোনিবেশ করতে। ডেনপাসার থেকে মাত্র ২০ কিলোমিটার দূরে বালির

দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের বিখ্যাত সমুদ্র দেবতার মন্দির “টানাহ লট”। মন্দিরটি ঐতিহ্যবাহী বালিনিজ স্থাপত্যের একটি অপূর্ব নিদর্শন। টানাহ লট যে শিলাটির উপর দাঁড়িয়ে আছে সেটা বছরের পর বছর ধরে সমুদ্রের ঢেউ-এর আঘাতে মেইন ল্যান্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। মন্দিরটি প্যাগোডার আকারে তৈরি করা হয়েছে। এই মন্দিরের স্থাপত্য থেকে বালিনিজ সমাজে হিন্দু আর বৌদ্ধ ধর্মের প্রভাব সুন্দর ভাবে উপলব্ধি করা যায়।

কালো আগ্নেয় শিলায় তৈরি উপকূল, এমনকী সমুদ্রের বালিও কুচকুচে কালো। নীল সমুদ্র এবং আকাশের সঙ্গে কনট্রাস্ট এই কালো বালি, আশেপাশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে যেন আরও বেশি মায়াবী এবং সুন্দর করে তুলেছে।

সলিহিন জানাল, এই মন্দিরের আসল রূপ কিন্তু সন্ধ্যাবেলায় দেখতে পাওয়া যায়। সূর্যাস্তের সময় পিছন দিক থেকে সূর্যের আলো পড়ে এই মন্দিরকে এক অলৌকিক রূপ দান করে। তারপর একটু দূরে দেখিয়ে বলল, ওই যে দেখছেন পাহাড়ের উপর জায়গাটা, কতগুলো চেয়ার, টেবিল দেখা যাচ্ছে— ওটা হল ‘সানসেট রেস্টুরেন্ট’। বিকেলের দিকে ওখানে প্রচুর লোকের ভিড় হয়। অ্যাডভান্স বুকিং না করলে ওখানে জায়গা পাওয়া যায় না। আপনারা বিকেলে এলে ভালো করতেন।

আমি সমুদ্রের ধারে দাঁড়িয়ে সানসেট দেখতে ভালোবাসি। স্বভাবতই আমার মনটা একটু খারাপ হল। সলিহিন বলল, “চিন্তা করবেন না, আমি কাল আপনাকে আরও ভালো একটা মন্দির দেখাতে নিয়ে যাব। সেখান থেকে সানসেট দেখতে হাজার হাজার লোক রোজ ভিড় করে। বালিতে পাহাড়ের উপর থেকে সানসেট দেখার ওটাই সব থেকে ভালো জায়গা।”

—কোন মন্দির?

—কাল গেলেই দেখতে পাবেন।

আমি আর কথা না বাড়িয়ে রাস্তার দু’ধারের চোখধাঁধানো দৃশ্যের দিকে মনোনিবেশ করলাম।

গাড়ি উবুদ শহরের ভিতর দিয়ে যাচ্ছে। উবুদকে বালির শিল্প ও সংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্র বলা যেতে পারে। গ্লোবালাইজেশনের সঙ্গে সঙ্গে একদিকে যেমন ট্যুরিজম ইন্ডাস্ট্রি ফুলে ফেঁপে উঠেছে, তেমনই অন্যদিকে স্থানীয় লোকজন কোণঠাসা হতে হতে নিজেদের বাসস্থান হারিয়ে শহর থেকে দূরে কোথাও আশ্রয় নিতে বাধ্য হচ্ছে। বালির ফেমাস কুটা বিচ, নুসা ডুয়া, জিম্বারন, সেমিনায়েক, সানুর, গগার বিচ, লেগিয়ান বিচ এবং তার আশেপাশের জায়গাগুলো এখন স্থানীয় লোকজনের ধরাছোঁয়ার বাইরে।

উবুদ শহর কিছুটা হলেও স্থানীয় বালিনিজদের জীবনযাত্রা ও সংস্কৃতির ধারা বয়ে নিয়ে চলেছে। এখানে অনেক আর্ট গ্যালারি, জাদুঘর এবং স্থানীয় শিল্পীদের তৈরি কারুশিল্পের দোকান রয়েছে। রাতের দিকে এখানে বিভিন্ন জায়গায় ট্যুরিস্টদের মনোরঞ্জনের জন্য বালিনিজ সঙ্গীত ও নৃত্য পরিবেশন করা হয়। নাইটলাইফ আর বিচ কালচারের বাইরে বেরিয়ে বালির আসল রূপ দেখতে চাইলে উবুদ শহর হয়তো পর্যটকদের নিরাশ করবে না।

উবুদ একসময় বালির ‘ফুড বওল’ (food bowl) নামে পরিচিত ছিল। এখানকার মাটি চাষাবাদের জন্য উপযুক্ত, বিশেষত ধান চাষের জন্য। বালির পাহাড়ি ল্যান্ডস্কেপে ধান চাষ করার জন্য বালিনিজরা একটা সুন্দর পদ্ধতি ব্যবহার করে। একে বলা হয় ‘রাইস টেরাস’। পুরো ধান খেতটা সিঁড়ির মতো ধাপে ধাপে উপরে উঠে যায়। ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট-এর অন্তর্ভুক্ত ‘টেগালালও রাইস টেরাস’ বালির প্রধান ট্যুরিস্ট ডেস্টিনেশনগুলোর মধ্যে একটি। এই সব রাইস টেরাস বালির হাজার বছরের পুরোনো সেচ ব্যবস্থা ‘সুবাক’ প্রথার উপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছে। অষ্টম শতাব্দীতে মার্কণ্ডেও নামে এক ঋষি এই সেচ ব্যবস্থা শুরু করেছিলেন বলে জানা যায়।

বালির রাইস টেরাসগুলো শুধু দৃষ্টিনন্দনই নয়, এর একটি সাংস্কৃতিক তাৎপর্য রয়েছে। ‘সুবাক’ সেচ পদ্ধতি আসলে বালিনিজ দার্শনিক মতাদর্শ “ত্রি হিতা করণ’-এর উপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছিল। শব্দটি আসলে সংস্কৃত ভাষা থেকে নেওয়া হয়েছিল, যার অর্থ হল ‘সুস্থতার তিনটি কারণ’ বা ‘সমৃদ্ধির তিনটি পথ’। আর এই পথ ছিল মানুষ, প্রকৃতি আর ঈশ্বরের মধ্যে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান। ২০১২ সালে সুবাক সেচ ব্যবস্থা ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্য সাংস্কৃতিক ল্যান্ডস্কেপ হিসাবে স্বীকৃতি পেয়েছে।

টেগালালও রাইস টেরাসের ভিতরে ঢুকলে সময় যে কোথা দিয়ে কেটে যাবে সেটা বোঝার আগেই ঘড়ির কাঁটা অনেক দূর ঘুরে যাবে। ধান খেতের মধ্যে দিয়ে সরু পথ ধরে হেঁটে সম্পূর্ণ জায়গাটা ঘুরে দেখলাম। এখানে অনেকগুলো ভিউ পয়েন্ট আর ক্যাফে রয়েছে। হাঁটতে না চাইলে ক্যাফেতে বসেও টেরাসের সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়। এছাড়াও এখানে বেশ কিছু দোকান রয়েছে যেখানে স্থানীয় শিল্পীদের তৈরি নানারকম হস্তশিল্পের জিনিসপত্র কিনতে পাওয়া যায়। এরকম একটা দোকানে গিয়ে রাম-সীতার একটা পেইন্টিং আমার খুব পছন্দ হল। ছোটো পেইন্টিং, নিখুঁত হাতের কাজ, তার উপর আবার স্থানীয় ব্ল্যাক উডের কারুকার্য করা ফ্রেম। স্থানীয় কোনও আর্টিস্ট হয়তো ছবিটা এঁকেছে। প্লেনে আনতে একটু অসুবিধা হবে জেনেও পেইন্টিংটা না কিনে পারলাম না।

(ক্রমশ…)

ইন্দোনেশিয়ার ছোট্ট দ্বীপ বালি (পর্ব-০২)

একদিকে বিচ, অন্যদিকে সব আলো ঝলমলে হোটেল, রেস্তোরাঁ, নাইট ক্লাব আর শপিং মল। রাতভর পার্টির জন্য আদর্শ জায়গা। বিচের ধার দিয়ে হেঁটে চলা পথ। পাশে ছোটো ছোটো কিছু দোকান, স্থানীয় লোকেরা খাবার আর ড্রিংক্স বিক্রি করছে। বিচের ধারে চেয়ার নিয়ে বসে আছে কত লোক। এখানে কিছুটা শান্ত পরিবেশ। বিচের ধারে একটু হেঁটে নিয়ে এবার এগোলাম রেস্তোরাঁর দিকে। পর্যটন শিল্পকেন্দ্রিক অর্থনীতি বলে বালির লোকজন জানে কীভাবে পর্যটকদের খুশি করে বিদেশি মুদ্রা রোজগার করতে হয়। তাই এখানে চয়েস-এর কোনও অভাব নেই। রেস্তোরাঁর সঙ্গে লাগোয়া ক্লাব। কোনও লোকাল ব্যান্ড পারফর্ম করছে। গান শুনতে শুনতে ডিনার শেষ করে হোটেলে ফিরলাম।

আজ বালিতে দ্বিতীয় দিন। সকালে তৈরি হয়ে অপেক্ষা করছি। সলিহিন এসে বলল, ‘আজ আপনাদের একটু অসুবিধা হবে।’ আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘কেন?’

—আজ এখানে হলিডে। দোকান-পাট সব বন্ধ থাকবে। এইসময় বালির সব থেকে বড়ো রিলিজিয়াস ফেস্টিভ্যাল হয়।

আমি এ ব্যাপারে কিছুই জানতাম না। তাই আবার জিজ্ঞেস করলাম, “তোমরা এই দিন কী করো? মন্দিরে যাও? পুজো করো?”

সলিহিন হেসে বলল, “আমি মুসলিম। আমরা কিছু করি না। এটা হিন্দু বালিনিজরা সেলিব্রেট করে। তবে আমাদের বাড়িতেও ওদের মতো অনেক কিছু রান্না করা হয়। আত্মীয়স্বজন আসে। সারাদিন বেশ আনন্দে কাটে।’

—তাহলে হিন্দুরা এই দিন কী করে? আমি বেশ উৎসাহ নিয়ে জিজ্ঞেস করলাম।

সলিহিন ড্রাইভ করতে করতে আজকের মাহাত্ম্য শোনাতে লাগল। ‘গালুঙ্গান হল একটি বালিনিজ ধর্মীয় উৎসব, যা অধর্মের উপর ধর্মের বিজয় উদযাপন করে। এটা দশদিনের একটা অনুষ্ঠান। বালিনিজ হিন্দু ধর্মমতে এই সময় মৃত পূর্বপুরুষদের আত্মা পৃথিবীতে ফিরে আসে। তাই এই সময় বালিনিজরা তাদের বাড়িতে পুজো করে, ভালো ভালো খাবার রান্না করে, আত্মীয় স্বজনদের বাড়িতে নিমন্ত্রণ করে। তারপর উদ্যাপনের শেষদিন কুনিঙ্গানষ মৃত পূর্বপুরুষদের আত্মা আবার পৃথিবী ছেড়ে চলে যায়।’

আমি খুব মনোযোগ দিয়ে গল্প শুনছিলাম। কিন্তু ওর গল্পের মাঝে আমি যে কখন আমার ছোটোবেলার দুর্গাপুজো আর দীপাবলির দিনগুলোতে ফিরে গেছি খেয়াল করিনি। সত্যিই তো! দুটো দেশ, কিন্তু কত মিল।

আজ প্রথমেই উবুদ প্যালেস দেখতে যাব। এই প্যালেসের সঙ্গে বালির অনেক ইতিহাস জড়িয়ে আছে। মাজাপাহিত সাম্রাজ্য ছিল। ইন্দোনেশিয়ার সর্বশেষ এবং সবচেয়ে শক্তিশালী সাম্রাজ্যগুলোর মধ্যে একটি। ত্রয়োদশ শতকের শেষের দিকে এই সাম্রাজ্য জাভা দ্বীপে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। রাজা হায়াম উরুক এবং তার প্রধানমন্ত্রী গাজাহ মাদা-র নেতৃত্বে মাজাপাহিত সাম্রাজ্য ধীরে ধীরে বালি-সহ আশেপাশের দ্বীপগুলিতে প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করে। মাজাপাহিত সাম্রাজ্যের একটি পরিশীলিত সংস্কৃতি ছিল। বালির রাজ পরিবার এবং অভিজাত সম্প্রদায়ের বালিনিজরা খুব সহজেই এই নতুন সংস্কৃতিকে আপন করে নিয়েছিল। বালিনিজ রাজ পরিবার বৈবাহিক সূত্রে মাজাপাহিত রাজ পরিবারের সঙ্গে মিত্রতা স্থাপন করেছিল। এই সময় নির্মিত মন্দির এবং অন্যান্য স্থাপত্যে মাজাপাহিত শিল্পকলার প্রভাব বেশ স্পষ্ট দেখতে পাওয়া যায়।

ষষ্ঠদশ শতকে বালি দ্বীপের মাঝখানে এই উবুদ প্যালেস তৈরি করা হয়েছিল। প্যালেসের চারদিকে বালিনিজ স্থাপত্যকলার, বিশেষ করে মাজাপাহিত শিল্পকলার নজির স্পষ্ট। পাথর খোদাই করে তৈরি করা হয়েছিল প্যালেসের দেয়াল। আর সেই দেয়ালের সূক্ষ্ম কারুকার্য আজ চার শতক পরেও পর্যটকদের মন জয় করে চলেছে।

উবুদ প্যালেস থেকে বেরিয়ে নজরে পড়ল আরেকটি মন্দির। জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম এটা সরস্বতী মন্দির। বালিনিজ ভাষায় যাকে বলে ‘পুরা তামন সরস্বতী’। বালিনিজ স্থাপত্যে তৈরি এই মন্দির। মন্দিরের গায়ে পাথরের কারুকার্য, সামনে পদ্মপুকুর। সব মিলিয়ে একটি সুন্দর বাতাবরণ। বালির সাহিত্যপ্রেমী মানুষদের মধ্যে এই মন্দির আধ্যাত্মিক, সাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চার অপরিহার্য অঙ্গ হিসেবে বিবেচিত হয়। এই সরস্বতী মন্দিরে প্রতিবছর আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিপ্রাপ্ত লেখক এবং পাঠক উৎসব হয়ে থাকে।

উবুদ প্যালেসের খুব কাছেই রয়েছে বালির বিখ্যাত ‘মাঙ্কি ফরেস্ট”। এখানে লম্বা লেজযুক্ত ম্যাকাক প্রজাতির বানর দেখতে পাওয়া যায়। পর্যটকদের আনন্দদানের জন্য এদের কৌতুকপূর্ণ ব্যবহারের জুড়ি মেলা ভার। মাঙ্কি ফরেস্টটি একটি সুগভীর ও ঘন জঙ্গলের মধ্যে অবস্থিত। চারদিকের কয়েকশো বছরের পুরোনো লম্বা গাছ, শ্যাওলা ধরা পাথরের মূর্তি, আর প্রাচীন মন্দিরের কাঠামো আশেপাশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে শতগুন বাড়িয়ে তুলেছে। মাঙ্কি ফরেস্ট শুধুমাত্র পর্যটকদের আকর্ষণের জন্যই নয়, বালিনিজদের সংস্কৃতি ও আধ্যাত্মিকতার সাথেও অঙ্গাঙ্গী ভাবে জড়িত। বালিনিজরা বিশ্বাস করে বানর মন্দিরের রক্ষাকর্তা। তাই এই বনটি বালিনিজদের কাছে একটি পবিত্র স্থান।

বিকেলের দিকে আর কোথাও না গিয়ে হোটেলে ফিরে এলাম। কুটা বিচ থেকে সূর্যাস্ত দেখার লোভটা সামলাতে পারলাম না। বালির পশ্চিম দিকে হওয়ায় এই বিচ থেকে খুব সুন্দর সূর্যাস্ত দেখা যায়। বিচের ধারে চেয়ারে বসে সূর্যাস্ত দেখতে কার না ভালো লাগে?

আজ সকালে আমাদের দিন শুরু হল ‘বাজরা সন্ধি মনুমেন্ট’ দিয়ে। বালিনিজ ভাষায় বাজরা মানে ঘণ্টা এবং সন্ধি মানে ঐক্য। ইন্দোনেশিয়ার স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় বালিনিজদের আত্মত্যাগের প্রতীক হিসেবে ডেনপাসারের কেন্দ্রস্থল পুপুতান স্কোয়ারে তৈরি করা হয়েছিল এই স্মৃতিস্তম্ভ। সপ্তদশ শতক থেকে বালিতে ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করে। ইন্দোনেশিয়ার অন্যান্য দ্বীপে ডাচ কলোনির প্রভাব অনেক বেশি হলেও, বালিতে ডাচ প্রভাব সে তুলনায় অনেকটাই কম ছিল। বিশেষ করে বালির শিল্প, সংস্কৃতি এবং ধর্মের উপর ডাচ প্রভাব বিশেষ নেই বললেই চলে। বালিনিজরা কখনওই ডাচদের মেনে নেয়নি।

সলিহিন খুব গর্বের সঙ্গে আমাদের পুপুতান বিদ্রোহের গল্প শোনাল। বালিতে পুপুতান, যার অর্থ হল ‘মৃত্যুর লড়াই’। ডাচ বাহিনীর বিরুদ্ধে বালি রাজপরিবার ও অভিজাত পরিবারের আত্মঘাতী সংগ্রাম। ১৯০৬ সালে বাদুং-এর রাজা গুস্তি নুগুরাহ মেড আগুং সম্মুখ সমরে ডাচ কলোনির বিরোধিতা করে। বালি রাজ পরিবারের অনেকেই এই যুদ্ধে অংশ নেয় এবং আত্মসমর্পণের বদলে মৃত্যুবরণ করে।

আমি বেশ আগ্রহের সঙ্গে জিজ্ঞেস করলাম, ‘তারপর কী হল?’

(ক্রমশ…)

ইন্দোনেশিয়ার ছোট্ট দ্বীপ বালি (পর্ব-০১)

হাজার বছরের পুরোনো ইতিহাস, স্থাপত্যকলায় সমৃদ্ধ প্রাচীন মন্দির, অনন্য শিল্প ও সংস্কৃতি, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং এখানকার সহজ-সরল মিশুকে মানুষ এসবের টানে প্রতি বছর কয়েক লক্ষ ট্যুরিস্ট এখানে বেড়াতে আসেন। আমার এবারের ইন্দোনেশিয়ার বালি ভ্রমণও কিছুটা সেই কারণেই।

সিডনি থেকে সকালে রওনা দিয়ে দুপুরের মধ্যেই পৌঁছে গেলাম বালির ডেনপাসার এয়ারপোর্ট। আগে থেকেই গাড়ি বুক করা ছিল। এয়ারপোর্ট থেকে বাইরে আসতেই চোখে পড়ল বছর তিরিশের একটি ছেলে আমাদের নাম লেখা একটা প্ল্যাকার্ড হাতে নিয়ে অপেক্ষা করছে। বুঝতে অসুবিধে হল না ইনিই আমাদের ড্রাইভার, সালিহিন। ওর সঙ্গে ট্রাভেল প্ল্যান নিয়ে আগেই ফোনে কথা হয়েছে।

আমাদের হোটেল বুক করা আছে কুটা বিচের পাশে। ভেবেছিলাম আগে হোটেলে চেক ইন করে তারপর কুটা বিচের আশেপাশে একটু ঘুরে দেখব। কিন্তু এয়ারপোর্ট থেকে বাইরে বেরিয়ে সলিহিন বলল, ‘আপনারা যদি এখন হোটেলে যান তাহলে আজকের সারা দিনটাই মাটি হয়ে যাবে। এটা আপনাদের অস্ট্রেলিয়া নয়। এখানের ট্রাফিক জ্যামের কথা মাথায় রেখে ট্রাভেল প্ল্যান করতে হবে।’

প্রথমে একটু অবাক হলেও সন্নিহিনের কথার যথার্থতা বুঝতে বেশি সময় লাগল না। আমার পাঠানো লিস্ট দেখে ও বলল, “তার চেয়ে বরং এয়ারপোর্টের আশেপাশে বেশ কিছু সুন্দর জায়গা আছে, চলুন সেগুলো আগে আপনাদের দেখিয়ে দিই। তারপর রাতে আপনাদের হোটেলে পৌঁছে দেব।’ ছেলেটা স্মার্ট, সেটা বুঝতে অসুবিধা হল না।

সলিহিন প্রথমেই আমাদের নিয়ে গেল ‘নুসা ডুয়া’ বিচ দেখাতে। বালিনিজ ভাষায় যার অর্থ ‘দুটো দ্বীপ”। গগার দ্বীপ আর পেনিনসুলা দ্বীপ এখানে একসঙ্গে মিলিত হয়েছে, তাই এই নাম। নুসা ডুয়াকে অনেকটা গেটেড কমিউনিটি বলা যেতে পারে। এখানকার হোটেল, রেস্তোরাঁ, কনফারেন্স হল, গল্ফ কোর্স সব কিছুই উচ্চবিত্ত এবং সেলিব্রিটি ট্যুরিস্টদের চাহিদা এবং নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে তৈরি করা হয়েছে। ঝকঝকে সাদা সিঙ্কের মতো নরম বালির সৈকত, ফিরোজা রঙের জল, মৃদু ঢেউ, লম্বা পাম গাছ ঘেরা শান্ত পরিবেশ যে-কোনও পর্যটকের হৃদয় হরণ করতে বাধ্য। এখানকার আরেকটি আকর্ষণীয় প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য হল নুসা ডুয়া ব্লো হোল। ভারত মহাসাগরের জলের ঢেউ এসে এখানকার পাথুরে পাহাড়ের উপর আছড়ে পড়ে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই পাথরগুলোকে ক্ষয় করে ফেলেছে। জায়গায় জায়গায় ফাটল তৈরি করেছে। তাই জোরে ঢেউ এলে সমুদ্রের জল এই ফাটলের ভিতরে ঢুকে এক অপূর্ব সুন্দর জলের ফোয়ারা তৈরি করে। আর এই ফোয়ারার একটা পারফেক্ট ফটো তোলার জন্য পর্যটকরা এখানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করে।

এরপর নুসা ডুয়া থেকে বেরিয়ে আমরা চললাম পূজা মণ্ডলার দিকে। দূরত্ব মাত্র ৩ কিলোমিটার কিন্তু যেতে সময় লাগল আধ ঘণ্টা। একেই বলে বালির ট্রাফিক। বালির ইতিহাস এখানকার শিল্প, সংস্কৃতি এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মতোই বৈচিত্র্যময়। বালির আদিম অধিবাসীরা অ্যানিমিজম অর্থাৎ প্রকৃতি পূজায় বিশ্বাসী ছিল। তারপর বিভিন্ন বহিরাগত শক্তির প্রভাব পড়তে শুরু করে এই দ্বীপের উপর। ভারতীয় সংস্কৃতির প্রভাব দিয়েই বালির এই যাত্রাপথ শুরু হয় বলে জানা যায়।

ভারতীয় ব্যবসায়ী আর নাবিকরা ভারতীয় শিল্প, স্থাপত্য এবং সাহিত্যের সঙ্গে সঙ্গে হিন্দু এবং বৌদ্ধ ধর্ম প্রচার করেছিল এই দ্বীপে। সেই সময় বালিনিজ রাজপরিবার এবং অভিজাত সম্প্রদায়ের লোকেরা সানন্দে ভারতীয় সংস্কৃতি গ্রহণ করেছিল। নবম শতাব্দীর মধ্যে বালিতে একটি শক্তিশালী হিন্দু-বৌদ্ধ সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল। এই সময় অসংখ্য মন্দির তৈরি করা হয়েছিল, যারা আজও স্বমহিমায় বিরাজমান।

পূজা মণ্ডলা বালিনিজদের ধর্মীয় বৈচিত্র্য আর সহিষ্ণুতার প্রতীক। সব ধর্মের মানুষ কীভাবে একসঙ্গে সহাবস্থান করতে পারে, পূজা মণ্ডলা মন্দির তারই প্রতীক। আসলে পূজা মণ্ডলা কোনও বিশেষ ধর্মের মন্দির নয়। এখানে একই জায়গায় পাশাপাশি পাঁচটি মন্দির রয়েছে। জগন্নাথ মন্দির, বৌদ্ধ বিহার গুণ, ক্যাথলিক সান্টো থমাস চার্চ, প্রোটেস্ট্যান্ট ইমানুয়েল চার্চ এবং ইবন বতুতা গ্র্যান্ড মসজিদ— একই প্রাঙ্গণে মিলে মিশে একাকার হয়ে গেছে। বেশ কিছুটা সময় এখানে কাটালাম। ধর্মকে যেন এক অন্য রূপে দেখতে শেখাল এই পূজা মণ্ডলা কমপ্লেক্স। পারস্পরিক সহনশীলতা আর শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের সত্যিকারের রূপ হয়তো এরকমই হয়। দেখতে দেখতে সন্ধ্যা হয়ে এল। সলিহিনকে বললাম, ‘এবার হোটেলে নিয়ে চলো।’ সে-ও মাথা নেড়ে সায় দিল।

—কতক্ষণ লাগবে হোটেলে পৌঁছোতে?

—এখন বিকেলের ট্রাফিক। ঠিক বলতে পারছি না কতক্ষণ লাগবে। তারপর একটু হেসে বলল, এক্ষুনি তো ডাবের জল খেলেন, এবার নিশ্চিন্তে গাড়িতে বসে রেস্ট নিন। আমি ঠিকমতো হোটেলে পৌঁছে দেব।

সত্যিই তো৷ বালির ডাব, আমি এত বড়ো ডাব আগে কোথাও দেখিনি। সে যেন অমৃত! তাই আর কথা না বাড়িয়ে চুপচাপ জানলা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে বসে রইলাম। এক ঘণ্টার মধ্যে হোটেলে পৌঁছে গেলাম৷ হোটেলটা ঠিক কুটা বিচ-এর পাশেই। হোটেলের রুম থেকেই কুটা বিচ দেখা যাচ্ছে। হোটেলে চেক ইন করে আবার বেরিয়ে এলাম। সামনে কুটা বিচ যেন আমাকে দু’হাত তুলে ডাকছে।

(ক্রমশ…)

স্ট্রেস কমানোর ‘বেস্ট মেডিসিন’

বিনা খরচে জীবন থেকে স্ট্রেস তাড়ানোর একটি মাত্র উপায় আছে, আর সেটা হচ্ছে জমিয়ে হাসা। নির্দ্বিধায় বলা চলে, ‘দ্য ওনলি বেস্ট মেডিসিন’। মন খুলে, প্রাণ ভরে যে হাসতে পারে, তার মতো সুখী আর কেউ নয়। হাসি, মানুষকে মুহূর্তে দৈহিক, মানসিক শান্তি দিয়ে রিল্যাক্স করে দিতে সাহায্য করে। প্রাণখোলা হাসি মানুষের স্ট্রেস হরমোন কমিয়ে প্রাণচঞ্চল রাখে।

হাসতে পারার সহজ প্রবণতা মানুষকে একে অপরের সঙ্গে বেঁধে রাখতে সাহায্য করে। সকলেই মনে করে ‘হাসি’ হচ্ছে খানিকটা ছোঁয়াচে অসুখের মতো। একজনের মুখের হাসি অন্যের মুখেও হাসি ফোটায়। একজন মানুষ যদি সত্যিকারের প্রাণখোলা হাসি হাসেন, তাহলে তিনি তো উপকার পাবেনই, সঙ্গে আরও যারা আশেপাশে রয়েছেন, তারাও তার সংস্পর্শে মুড হালকা করে নিতে পারবেন। এমনই হাসির মাহাত্ম্য।

আজ প্রতিটি মানুষের কাঁধে দায়িত্ব। সংসারের দায়িত্ব, স্কুল-কলেজে পড়াশোনা এবং সর্বশেষে চাকরির সুবিশাল জগৎ এবং পেশার সম্মান রক্ষার্থে কাজের চাপ। বহু মানুষই আছেন, যারা অফিসের স্ট্রেস সহ্য করতে পারেন না। মনের মধ্যে নানা ধরনের নেগেটিভ চিন্তাধারায় তারা মানসিক ভাবে বিপর্যস্ত। কিন্তু এভাবে তো জীবন চলতে পারে না। মানসিক বিপর্যস্ততা কাজের গতিকেও হ্রাস করে ফেলে। নিজের কাজ করতে অসুবিধা হয়, উপরন্তু কাজের নিস্তেজতা অপরের কাজের ইচ্ছেকেও প্রশমিত করে।

সুতরাং কাজের গতি ফিরিয়ে আনতে কাজের চাপকে ‘স্ট্রেস’ হিসেবে নিলে চলবে না। তার উপযুক্ত মোকাবিলা করার জন্য মনকে যেমন সজাগ ও শক্ত করার প্রয়োজন আছে, তেমনই পরিবেশকে ফ্রেন্ডলি এবং লাইট রাখাটাও বাঞ্ছনীয়। হাসতে হাসতে প্রবলেম সলভ করতে পারলে মেন্টাল স্যাটিসফ্যাকশনও থাকে। প্রত্যেক মানুষেরই উচিত সর্বদা হাসিখুশি থাকার পদ্ধতি রপ্ত করা।

অফিসে প্রথম পদার্পণ ইন্টারভিউ-এর মাধ্যমে। জীবনে প্রথম নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার সুযোগ। মনের মধ্যে নানা দোলাচল, বুক ঢিপঢিপ, টেনশনে মনে হয় বুঝি হাত-পা-এর পেশি অবশ হয়ে আসছে। তবু মুখে রাখুন হাসি, দেখবেন অনেক কম নার্ভাস লাগছে। আর ইন্টারভিউ নিতে যারা বসে আছেন তারা মুখের হাসিটিই প্রথম লক্ষ্য করবেন। আপনার সেই মুহূর্তের ওই প্লেজেন্ট পার্সোনালিটি-ই হয়তো বাজিমাত করে দিতে পারে। প্রশ্ন-উত্তর পালার ভারী পরিবেশ কিছুটা হলেও সহজ হবে।

চাকরিটা আপনার হয়ে গেল। প্রোবেশনে রয়েছেন আপনি। অফিসে নতুন সহকর্মীদের মনে জায়গা করে নিতে পারলেই কাজের সুবিধা। নিশ্চিন্তে সকলের সহযোগিতাই কাম্য আপনার। সুতরাং নম্র স্বভাবের সঙ্গে মুখের হাসিটি বজায় রাখা একান্ত দরকার। দফতরে যদি কারও মনে আপনার প্রতি বিদ্বেষও থাকে, আপনার হাসিমুখ তাকে তার মনোভাব বদলাতে বাধ্য করবে।

কাজে মন আছে বুঝতে পারলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ আপনাকে কাজে বহাল রেখে দেবে। কাজের দায়িত্বর সঙ্গে ওয়ার্ক প্রেশারও বাড়বে। আর ওয়ার্ক প্রেশার বাড়া মানে আরও বেশি স্ট্রেস। তাই কাজের ফাঁকে খানিকটা মানসিক চাপ কমাতে সহকর্মীদের সঙ্গে আড্ডার ছলে কিছুটা ঠাট্টাতামাশা, হাসি-মশকরা করুন। এই হালকা মুডেই সহকর্মীদের সঙ্গে দফতরের জরুরি কোনও আলোচনাও কিন্তু অনায়াসে সেরে ফেলা যায়। এতে নিজের কাজের স্ট্রেসও কিছুটা কমবে এবং অপরের কাছেও এটি ‘চাপ দেওয়া হচ্ছে’ বলে বিবেচিত হবে না। অফিসে বন্ধুত্বের পরিবেশ বজায় থাকবে।

মানুষ নিজের ব্যক্তিত্ব হারিয়ে ফেলার ভয় পায়। অনেক পরিবারে বাচ্চাদের হাসার প্রবণতাকে দোষ বলে মেনে নেওয়া হয়। কিন্তু সময়, জায়গা এবং মানুষ বিবেচ্যে, বন্ধুবান্ধব, সহকর্মী এবং পরিচিত জনের সঙ্গে প্রাণখুলে হাসাটা কিন্তু মোটেই দোষের নয়। অনেক সময় কেউ কেউ ভেবে নেন অফিসে কোনওরকম হাসাহাসি করলেই বুঝি তার সম্মান যাবে, তাকে কেউ আর মানবে না। এরকম ধারণা থাকাটা ঠিক নয়। অফিসের পুরো সময়টা যদি গাম্ভীর্যের মধ্যে কেটে যায়, তাহলে ভুল বোঝাবুঝির একটা জায়গা আপনা থেকেই তৈরি হয়ে যায়। অফিস পলিটিক্স থাকবে না— এরকম অফিস বোধহয় নেই। তাই শত্রু-মিত্র মিলিয়ে সকলের সঙ্গেই ব্যবহার ভালো রাখতে হবে, যাতে আপনার হাসিমুখ এবং মিষ্টি ব্যবহার শত্রুভাবাপন্ন মানসিকতাকেও আপনার প্রতি আকর্ষিত হতে বাধ্য করে।

অফিসে অনেকেই হয়তো আপনাকে নিয়ে ‘জোক’ করতে পারে যাতে আপনি হার্ট হন। হেসে জোকটিকে গ্রহণ করতে চেষ্টা করুন৷ দুঃখটাকে হাসির পিছনে লুকিয়ে রাখুন। সম্ভব হলে নিজেই নিজেকে নিয়ে মজা করুন যাতে অফিসের সেই সাময়িক টেনশন মিটে যেতে পারে। সকলেই টেনশন রিলিজ্ড হতে পারবেন।

ভুলত্রুটি সকলেরই হয়৷ অফিসেও যে আমরা কোনও ভুল করি না, জোর দিয়ে সেটা বলা যায় না। অনেক সময় সকলের অলক্ষ্যে নিজেরাই নিজেদের ভুলগুলো বুঝতে পারি। যারা হেসে নিজেদের দোষ স্বীকার করতে পারে, তাদের মন পরিষ্কার জলের মতো স্বচ্ছ থাকে। অপরাধ করে ফেলার স্ট্রেসও থাকে না। কিন্তু অধিকাংশ মানুষই সচেতন ভাবে অন্যের উপর দোষ চাপিয়ে দেয়। তাই অপরাধবোধ তাদের মনের মধ্যেই চেপে বসে থাকে, ফলত স্ট্রেস বাড়তে থাকে।

সুতরাং বাইরের পরিবেশের মতোই অফিসেও স্ট্রেস কাটাবার এবং মন ভালো রাখার মূল মাধ্যম হল হাসি। হাসি যেমন আপনার মনের আয়না, তেমনি অন্যকেও তৃপ্ত করার সহজ সরল মাধ্যম। তবে কয়েকটি কথা মাথায় রাখা দরকার।

কী করা উচিত

  • হাসি মুছে যেতে দেবেন না। সবসময় হাসিমুখে থাকুন
  • সুযোগ খুঁজুন প্রাণখুলে হাসার
  • হাসিমুখে অসুবিধাগুলি কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করুন
  • সকলে যেখানে হাসিমুখে রয়েছে সেখানে মুখ গোমড়া রাখবেন না, হাসিতে যোগ দিন।

কী করা উচিত নয়

  • অপরকে দেখে হাসবেন না
  • অপরকে ছোটো করে, বাহবা পেতে হাসার চেষ্টা করবেন না
  • ইচ্ছে না করলে বোকার মতো হাসবেন না
  • অযথা, অসময়ে হাসবেন না।

বাঙালি সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে পুনরুদ্ধার করার কাহিনিতে সমৃদ্ধ হয়ে আসছে ‘রাস’

এক যৌথ পরিবারের সদস্যদের সুপ্ত ভালোবাসা, সম্পর্ক এবং হারিয়ে যাওয়া মূল্যবোধ ফিরিয়ে আনার কাহিনিতে সমৃদ্ধ হয়ে মুক্তি পেতে চলেছে ‘রাস’। ছবিটির পরিচালক তথাগত মুখোপাধ্যায়।

এক প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে ছবির কাহিনি তুলে ধরা হয়েছে বিস্তারিত ভাবে। জানানো হয়েছে, এই ছবির গল্পে নাতিকে তার ঠাকুমার সঙ্গে পুনরায় মিলিয়ে দেওয়ার মুহূর্ত তুলে ধরবে। শিকড়ের টানে গ্রামে  ফিরে আসবে পুত্র  এবং সৃষ্টি হবে এক সোনালি অধ্যায়।

দেখা যাবে, মানিকপুরের চক্রবর্তী পরিবারে চলছে উৎসবের আবহ। পরিবারটি জমকালো ‘রাস’  উৎসব এবং ঝুলন উদযাপনের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। তবে, বাড়ির ছেলে সোমনাথ ১৮ বছর পর বাড়ি ফিরলে উত্তেজনা দ্বিগুন হবে।

আসলে সোমনাথ তার জীবনের প্রথম  ১২ বছর গ্রামের বাড়িতে কাটিয়েছিলেন। সোমনাথের বাবা দিল্লিতে কাজ করতেন এবং বছরে কয়েকবার পৈতৃক বাড়িতে যেতেন। গ্রামে থাকাকালীন সোমনাথের জীবন রূপকথার থেকে কিছু কম ছিল না। গ্রামের স্কুলে পড়া, পুকুরে মাছ ধরা, আম গাছে ওঠা, বৃষ্টিতে ভিজে  ফুটবল খেলা, ঠাকুমার হাতে তৈরি আচার উপভোগ করা, দূর-দূরান্তের গল্প শোনা, ঝুলনে অংশ নেওয়া, নাটকে অংশগ্রহণ, গ্রামের মেলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান,  ক্যারাম খেলা প্রভৃতিতে বর্ণময় ছিল সোমনাথের শৈশব। সাইক্লিং অ্যাডভেঞ্চার-এও অংশ নিয়েছেন সোমনাথ। সন্ধ্যায় বিদ্যুৎ বিভ্রাটের সময় ছাদে আড্ডা, পুরো পরিবারের সঙ্গে সিনেমা দেখা এবং রাতে লেখাপড়া শেষ করে ভূতের গল্প শোনা প্রভৃতির মাধ্যমে সোমনাথের গ্রাম্য-জীবনের স্মৃতি আজও অমলিন।

চক্রবর্তী পরিবারের ‘রাস’ ছিল যৌথ পরিবারের বন্ধনে গভীরভাবে সংযুক্ত আনন্দ ও ভালোবাসার উৎসব।  সোমনাথের ঠাকুমা অলকানন্দা দেবী সংবেদনশীল এবং স্পষ্টভাষী মানুষ। পরিবারের  হাল ছিল তার হাতে এবং তিনি ছিলেন সোমনাথের সবচেয়ে ভালো বন্ধু। এমনকি তার মায়ের থেকেও বেশি। শুধু তাই নয়, সোমনাথের সমস্ত ব্যক্তিগত তথ্য ছিল ঠাকুমার কাছে। গ্রামে সোমনাথের  ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিল পাড়ার এক মেয়ে—রাই। যে তার বেশিরভাগ সময় চক্রবর্তী বাড়িতে কাটাত। তাদের বন্ধন এতটাই দৃঢ় ছিল যে, বড়োরা প্রায়ই তাদের ভবিষ্যৎ বিবাহ অনিবার্য হওয়ার বিষয়ে রসিকতা করতেন।

যাইহোক, দুঃখজনক ঘটনা ঘটে যখন সোমনাথের মা গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাকে শহরের একটি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার অনুরোধ সত্ত্বেও, তিনি যেতে চাননি। যদিও পরিবারের পুরুষরা এই সিদ্ধান্তে একমত হননি। অবশেষে,  সোমনাথের মা  মারা যান। সোমনাথের বাবা যখন বর্ষার রাস পূর্ণিমায় ফিরে আসেন বাড়িতে, তখন তিনি তার স্ত্রী-কে হাসপাতালে না নিয়ে যাওয়ার  জন্য পরিবারের সদস্যদের  দোষারোপ করেন এবং কখনও ফিরে না আসার শপথ নিয়ে, ছেলে সোমনাথকে সঙ্গে নিয়ে  বাড়ি ছেড়ে চলে যান।

এরপর সময় এগিয়েছে তার নিজস্ব গতিতে। সোমনাথ এখন  একটি  বহুজাতিক কোম্পানির  ইঞ্জিনিয়ার।  অনির্দিষ্টকালের জন্য কানাডা চলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন তিনি। যাওয়ার আগে সোমনাথ তার বাবার বন্ধুর মেয়ে সাঞ্জকে বিয়ে করতে প্রস্তুত ছিলেন কিন্তু ভাগ্য অপ্রত্যাশিত ভাবে সোমনাথকে মানিকপুরে ফিরিয়ে আনে। সোমনাথ তার জন্মভিটে মানিকপুর গ্রামে ফিরে গিয়ে দেখেন, মানিকপুরের রাস্তাঘাট, ঘরবাড়ি বদলে গেলেও, গ্রামের  মানুষ ঠিক আগের মতোই পবিত্র হৃদয় নিয়ে অটুট। তরুণ প্রজন্ম সোশ্যাল মিডিয়া এবং ডিজিটাল যুগকে গ্রহণ করার সত্ত্বেও, চক্রবর্তী পরিবারের সাংস্কৃতিক সারাংশ অটুট ছিল। রাই, প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া সত্ত্বেও এবং শহরে একটি উন্নত জীবনের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও, বেছে নিয়েছিলেন গ্রাম্য-জীবন। তিনি এখন একটি  প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা। তিনি বিশ্বাস করতেন যে, মানুষ আধুনিক হয় অন্তরে, মননে, মানসিকতায়।

আসলে, ‘রাস’ হল  দুটি পরস্পরবিরোধী জগতের গল্প। মূল্যবোধ,  হারানো প্রেম এবং বাঙালিয়ানার নির্যাস। শিকড়ের টান, রক্তের বন্ধন এবং বাঙালি সংস্কৃতির চিরন্তন গর্বের কাহিনি তুলে ধরবে তথাগত মুখোপাধ্যায়ের ছবি ‘রাস’।

বিক্রম চট্টোপাধ্যায় (সোমনাথ) এবং দেবলিনা কুমার (রাই) অন-স্ক্রিন জুটি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে চলেছেন ‘রাস’ ছবির মাধ্যমে। এছাড়া, এই ছবিতে অভিনয় করেছেন অনির্বাণ চক্রবর্তী, অনসূয়া মজুমদার, শঙ্কর দেবনাথ, অর্ণ মুখোপাধ্যায়, রণজয়, পারিজাত চৌধুরী, দেবাশিস, সুদীপ মুখোপাধ্যায়, দেবপ্রসাদ হালদার, প্রতিম চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ। সেইসঙ্গে জানানো হয়েছে, মোট ৫০-জন অভিনেতা-অভিনেত্রী রূপদান করেছেন বিভিন্ন চরিত্রে। পরিচালক এক প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জানিয়েছেন, এই সিনেমাটি আংশিক ভাবে তাঁর জীবনীমূলক। কারণ, এই ছবির কাহিনিতে তিনি তুলে ধরেছেন তাঁর শৈশবের স্মৃতিকে।  পরিচালক এও জানিয়েছেন যে, এই ছবিটি আসলে হারিয়ে যাওয়া বাঙালি জীবনের এমন এক গল্প,  যা আমরা শীর্ষেন্দু কিংবা সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়ের রচনায় খুঁজে পাই। তাছাড়া, যৌথ পরিবারের আনন্দ উদযাপন এবং দৈনন্দিন জীবনযাপন, যা আমাদের জীবন থেকে ম্লান হয়ে গেছে, তা-ই আসলে এই চলচ্চিত্রের সারাংশ।

ছবিটির কাহিনি লিখেছেন পরিচালক স্বয়ং। শিল্প নির্দেশক আনন্দ আধ্যা। সম্পাদক আমির মণ্ডল। চিত্রগ্রহণের দায়িত্বে ছিলেন উত্তরণ দে। সাউন্ড ডিজাইন এবং মিক্সিং-এ ছিলেন অদীপ সিং মানকি ও তন্ময় সাহা। ‘ছবির মতো এন্টারটেইনমেন্ট’-এর ব্যানারে তৈরি হওয়া ‘রাস’ ছবিটি চলতি বছরের জুন থেকে জুলাই মাসের মধ্যে মুক্তি পাবে বলে জানানো হয়েছে প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে। সম্প্রতি প্রকাশ করা হয়েছে ছবিটির ডিজিটাল পোস্টার।

উৎকণ্ঠাই ভালো (শেষ পর্ব)

মল্লিকার কথার সাথে অবনী সংযোজন করে, ‘স্থানীয় ডাক্তার বদ্যি থেকে শুরু করে ওঝা গুণীন সবই করেছি। কিন্তু কোনও ফল হয়নি। অনেক কষ্টে ওকে আপনার কাছে নিয়ে এসেছি। আপনি ওকে বাঁচান ডাক্তারবাবু!”

মা-বাবা’কে বাইরে অপেক্ষা করতে বলে, ডাক্তার নন্দী বকুলকে ঘরে ডেকে নিলেন। মাথা নীচু করে ভয়ে ভয়ে এসে ঘরে ঢুকল বকুল। বকুলকে সস্নেহে পাশে বসিয়ে ঘন্টা খানেকের পেশাদারি প্রচেষ্টায় ডাক্তার উদ্ঘাটন করলেন, বকুলের মনের ভিতরে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা ভ্রান্ত ভয়ের জন্মসূত্র-রহস্য! তারপরে সেই ভ্রান্তি দূর করে, তাকে প্রকৃত সত্য জানানোর সঙ্গে সঙ্গে অনেক পেশাদারি পরামর্শও দিলেন ডাক্তার মৃন্ময় নন্দী।

এরপরে ডাক্তারবাবুর ডাকে ওনার ঘরে ঢুকে অবনী আর মল্লিকা একরাশ কৌতূহল মাখানো মুখ নিয়ে মেয়ের পাশে গিয়ে বসল। অবনী কিছু প্রশ্ন করার আগেই ডাক্তার নন্দী জানালেন— আপনারা যে বলছিলেন আপনাদের মেয়ে অজানা এক ভয়ে দিনের পর দিন গুটিয়ে যাচ্ছে সুস্থ স্বাভাবিক জীবন থেকে, এটা সম্পূর্ণ ভুল। একে ভয় বলে না। একে বলে ‘আতঙ্ক’।

—আপনারা হয়তো ভাবছেন, ভয় আর আতঙ্কের মধ্যে আবার ফারাক কীসের! বিস্তর ফারাক আছে। আমরা আমাদের দৈনন্দিন জীবনে যখন বাহ্যিক কোনও বাস্তবিক কারণে বিপদের সম্ভাবনা দেখি, তখন তাকে বলে ভয়। আর পর্যাপ্ত বাস্তবিক কারণ ছাড়াই যখন শঙ্কিত হই, তাকে বলে আতঙ্ক। ধরুন, আপনারা তিনজনে মিলে জঙ্গলে বেড়াতে গিয়েছেন আর বকুল মনে করছে যে-কোনও সময় বাঘ এসে ঘাড়ের উপরে লাফিয়ে পড়তে পারে৷ আর বেশি এগোনো উচিত নয়। এটা খুবই বাস্তবিক আশঙ্কা, একে বলে ভয়। আর শহরের কোনও দশতলা বাড়ির উপরের কোনও ঘরে বসে, বকুল যদি ভাবে, এই বুঝি বাঘ আসছে, এই বুঝি সাপ আসছে, তাহলে বুঝতে হবে এই বাঘের শঙ্কা বা সাপের শঙ্কা বাস্তবিক নয়। এটা বকুলের মনের মধ্যে বাসা বাঁধা এক রোগ, যার নাম আতঙ্ক। আর এই আতঙ্ক দীর্ঘদিন ধরে মনের মধ্যে বাসা বাঁধলে, তাকে বলে উৎকণ্ঠা!

—কিন্তু এই আতঙ্ক বা উৎকণ্ঠা বকুলের মনে হঠাৎ করে জন্মালো কোত্থেকে? ডাক্তার নন্দীর কথার ফাঁকে প্রশ্ন করল অবনী। অবনীর প্রশ্ন শুনে, হাসতে হাসতে ডাক্তার নন্দী জানালেন, ‘বকুল জীবনবিজ্ঞান পড়ার সময় শিখেছিল স্ত্রী এবং পুরুষের মিলনে স্ত্রীলোকের গর্ভে সন্তান আসে। এর পরেই ওর মনে আতঙ্ক জন্মাল – পুরুষের ছোঁয়াছুঁয়িতে, এমনকী পুরুষের বিছানা, জামাকাপড়ের ছোঁয়া লাগলেও পেটে সন্তান এসে যেতে পারে! আর পেটে সন্তান এসে গেলে ও কী করবে, দিনরাত এই ভয়েই সিঁটিয়ে রইল বকুল। পেটে সন্তান এসে গেলে ওকে পাঁচজনে কী বলবে! তাই যে-কোনও পুরুষের সংস্রবই ওর কাছে শেষপর্যন্ত ভীষণ আতঙ্কের ব্যাপার হয়ে দাঁড়াল। যার পরিণতি এই উৎকণ্ঠা!”

—কিন্তু ওর ভিতরে এমন আজগুবি উৎকণ্ঠার জন্ম হল কেন? ওর বইতে কি কোথাও লেখা আছে এমন কথা! মল্লিকা জানতে চাইল ডাক্তার নন্দীর কাছে।

মল্লিকার কৌতূহল নিরসনের উদ্দেশ্যে, ডাক্তার নন্দী জানালেন— দৈনন্দিন জীবনে রোজ তাদের ছেলেমেয়েদের দেখতে দেখতে মা- বাবা’রা অনেকসময় খেয়াল করেন না যে, তাদের সন্তানরাও ক্রমশ বড়ো হয়ে উঠছে। তাদের সন্তানের শরীরে-মনে যে পরিবর্তন হচ্ছে, তা তাদের চোখে পড়ে না। এক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। এক্ষেত্রে একটু বড়ো হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বকুলের নিজ্ঞান মনে সঞ্চারিত হয়েছে, পুরুষের ঘনিষ্ঠ সংসর্গে আসার বাসনা। সেই ইচ্ছা ছিল অবদমিত, ওর চেতনায় তা প্রবেশ করতে পারেনি। ওর শারীরিক যৌন-উন্মেষের সঙ্গে সঙ্গে, অবদমিত সেই ইচ্ছার শক্তি বৃদ্ধি পেয়েছে। আর ঠিক তখনই ওর সেই যৌনইচ্ছাকে আরও উস্কে দিয়েছে জীবন বিজ্ঞানের শিক্ষা। এতদিন যে যৌন ইচ্ছা অবদমিত ছিল, এখন তা অবদমনের শক্তিকে পরাজিত করে সজ্ঞানে উদিত হবার প্রচেষ্টা করছে। যৌন ইচ্ছার এই উন্মেষ, বকুলের অজ্ঞাতেই এমন একটা মানসিক প্রক্রিয়া তৈরি করেছে, যার থেকে ওর মনের মধ্যে উৎপন্ন হয়েছে পুরুষদের থেকে এক আতঙ্কের বা অস্বাভাবিক এক উৎকণ্ঠার!

এবার মল্লিকা আর অবনী দুজনেই বকুলের মুখের দিকে তাকায়, তীব্র এক ভয়ভরা চোখে। অবনী জানতে চায়, তাহলে এখন কী হবে ডাক্তারবাবু! মেয়েটা কী করে আবার তার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে যাবে?

অবনীর ভয় নিরসনে হাসতে হাসতে ডাক্তার বললেন, “চিন্তা করবেন না। ওর মনের মধ্যে জমে থাকা ভ্রান্ত উৎকণ্ঠা আমি দূর করে দিয়েছি। এই বিষয়ে প্রকৃত সত্যটাও ওকে আমি জানিয়ে দিয়েছি। আপাতত মাসে একবার করে বকুল আমার সাথে গল্প করতে আসবে বলে, আমাকে কথা দিয়েছে। আপনারা ওকে নিয়ে আসবেন আমার কাছে। আর একটা কথা মনে রাখবেন, ওর মনের বাসনা এই উৎকণ্ঠায় পরিবর্তিত হয়ে একদিক থেকে ওর উপকারই হয়েছে!’

—যেমন! অবনী প্রশ্ন করল।

—ওর মনের অবদমিত বাসনা উৎকণ্ঠায় পরিবর্তিত হয়ে, মুখ রক্ষা হয়েছে ওর। সমাজে ঘৃণার পাত্রী না হয়ে, এখন ও আপনাদের অনুকম্পার পাত্রী হয়েছে। ওর মনের এই অবদমিত বাসনা বেরিয়ে এলে, সেটা এক ভয়ংকর রূপ নিয়ে অবধারিত ভাবে ওর চরিত্রের স্খলন ঘটাত। তখন সমাজে মুখ দেখানোর সুযোগ পেতেন না আপনারা কেউ-ই। তাই বলছি, জানবেন অনেক সময় এই ‘উৎকণ্ঠাই ভালো’!

(সমাপ্ত)

পড়ার জন্য সীমাহীন গল্প-নিবন্ধসাবস্ক্রাইব