অটিজম দুরারোগ্য নয়

অটিজম! শব্দটা শুনলেই বুকটা ছ্যাৎ করে ওঠে! যারা জানেন এই রোগটি সম্পর্কে, তাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে একটি হাবাগোবা পাগল গোছের কেউ। অনেকে তাই মনে করেন, অটিজম-এর শিকার হলে আর কোনওদিনই সুস্থ জীবনযাপনে সক্ষম হবে না। আক্রান্ত শিশুটি হবে করুণার পাত্র! ভয়ের কারণ!

অথচ অটিজম যে সম্পূর্ণ ভালো হয়ে যেতে পারে, সেই আশ্বাস বা প্রমাণ দেওয়ার মতো বিচক্ষণ মানুষের সংখ্যা খুবই কম। বর্তমানে সর্বাধুনিক বিজ্ঞানসম্মত সহজ ও সুলভ চিকিৎসা ব্যবস্থাকে মাধ্যম করে শিশুর জন্মের কয়েকদিনের মধ্যেই ধরে ফেলা যেতে পারে ভবিষ্যতে শিশুর অটিজম হওয়ার সম্ভবনা কতটা। আর জন্মের তিন মাসের মধ্যেই যদি নির্ণয় করে ফেলা যায় অটিজম-এর শিকার হতে পারে কিনা, তাহলে বিপদ মুক্ত করা যেতে পারে।

শিশুর তিনমাস বয়স থেকে আজ পর্যন্ত যারা আধুনিক বিজ্ঞানকে মাধ্যম করে যথার্থ চিকিৎসা (Early Intervention) পরিষেবা নিয়েছেন, তাদের শিশুরা বড়ো হয়ে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক জীবনযাপন করে চলেছে। এখন প্রশ্ন হল, যাদের ইতিমধ্যে অটিজম হয়ে বসে আছে, তারা কি কখনওই সম্পূর্ণ ভালো হতে পারবে না? উত্তরে বলা যায়, অবশ্যই ভালো হতে পারবে, তবে সময় লাগবে। অর্থাৎ তাদের বাবা- মায়েরা যদি সঠিক চিকিৎসাকে মাধ্যম করার পথে হাঁটেন, তাহলে অবশ্যই অসম্ভবকে সম্ভব করে তোলা যাবে। এই সঠিক চিকিৎসার নাম ‘ডেভেলপমেন্টাল মডেল’।

‘নবজাতক চাইল্ড ডেভেলপমেন্টাল সেন্টার’-এর ডিরেক্টর ডা. অঞ্জন ভট্টাচার্য জানিয়েছেন, ‘কলকাতা ডেভেলপমেন্টাল মডেল’-এর ব্যবহারে, অটিজম আক্রান্ত শিশু, কিশোর-কিশোরীরা এখন স্বাভাবিক জীবনযাপন করছে। সমাজের মূলস্রোতেও মিশে যেতে পেরেছে। তাদের কেউ কেউ বড়ো হয়ে গেছে এবং দেশে-বিদেশে স্বাভাবিক কর্মজীবন উপভোগ করছে।

বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গেছে, নবজাতক চাইল্ড ডেভেলপমেন্ট সেন্টারে ২০১৪ সাল থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে দেখানো ৪৮৩ জন অটিস্টিক শিশুর মধ্যে ৩৮৬ জন (অর্থাৎ ৮৫ শতাংশ) শিশুই স্বাভাবিক ভাবে স্কুলে যাওয়া শুরু করেছে। এই ৩৮৬ জন শিশুর কাউকেই স্পেশাল স্কুলে যেতে হয়নি। অর্ধেক শিশুরই অটিজম শনাক্তকরণের সময়ে ডায়াগনোসিস করা হয়েছিল সিভিয়ার বা প্রোফাউন্ড হিসাবে অর্থাৎ মারাত্মক অটিজম। এই ডায়াগনোসিস করা হয়েছিল বিশ্বমানের আন্তর্জাতিক পদ্ধতি ব্যবহার করে, যাদের বলা হয়ে থাকে স্বর্ণমানের বা গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড টেস্টস, সেই পরীক্ষার মাধ্যমে।

শুধু তাই নয়, ৮৫ শতাংশ অটিস্টিক শিশু স্বাভাবিক ভাবে স্কুলে যেতে শুরু করে চিকিৎসা শুরুর গড়পড়তা ৮ মাসের মধ্যেই। গড়পড়তা মানে কেউ তিনমাস চিকিৎসার পরই স্বাভাবিক ভাবে স্কুলে যাওয়া শুরু করে, কেউ আবার স্বাভাবিক অবস্থায় পৌঁছোতে পেরেছে তিন বছর বাদে। তবে সময় যাই লেগে থাকুক না কেন, সঠিক চিকিৎসার ফলে কথা বলার ক্ষমতা এদের সবার মধ্যেই এসে যায়। আর এই সফল চিকিৎসাপ্রাপ্ত ৮৫ শতাংশের ভিতরে রয়েছেন হাসপাতালে কর্মরত ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার এবং স্কুল টিচাররা-ও।

চিকিৎসার পর অটিস্টিকরা যে শুধু লেখাপড়াতেই দুর্ধর্ষ সব রেজাল্ট করছে তাই নয়, খেলাধুলা, নাচ-গান, ডিবেটেও এরা মেডেল আনছে। তাহলে এখন প্রশ্ন, অটিজম-এর শিকার হওয়া বাকি ১৫ শতাংশ সুফল পেল না কেন?

বৈজ্ঞানিক অ্যানালিসিস দেখিয়েছে যে, তারা হল মূলতঃ সেই শিশুরা, যাদের বাবা-মা চিকিৎসকের কথা অক্ষরে অক্ষরে মানতে পারেননি। কিন্তু কলকাতা শহরে এবং ভারতে ও ভারতের বাইরে থেকে নানান দেশের যে সকল বাবা-মা নিজেদের শত অসুবিধা থাকা সত্ত্বেও সুচিকিৎসা সম্পূর্ণ ভাবে গ্রহণ করেছেন, তাদের শিশুদের দেখে আজ আর কেউ কল্পনাও করতে পারবে না যে, শিশুটির এককালে অটিজম ছিল। এদের কেউ কেউ যে একসময় কথাই বলতে পারত না, লেখাপড়া তো দূরস্থল, বদ্ধ উন্মাদের জীবন কাটাতে হবে কিনা ভেবে বাবা-মা দু’চোখের পাতা এক করতে পারতেন না।

তবে বাবা-মায়েরা এমন ভাবে সচেতন থাকুন যেন তাদের সন্তান অটিজম-এর শিকার না হয়। তাই জন্মের পর তারা যেন দু’সপ্তাহের মধ্যে শিশুটিকে নিয়ে এসে পরীক্ষা করিয়ে নেন। এই টেস্টটির নাম— ‘অ্যাডভান্সড জিএম টেস্ট’ (Advanced General Movements Test)। এই টেস্ট-এর মাধ্যমে জানা যাবে, শিশুটির অটিজম, সেরিব্রাল পলসি, ভবিষ্যতে লেখাপড়ার সমস্যা কিংবা লার্নিং ডিলে বা গ্লোবাল ডেভেলপমেন্টাল ডিলে এইসব কিছু হওয়ার সম্ভাবনা আছে কিনা। ৬৭ শতাংশ থেকে ৯৮ শতাংশ নিশ্চয়তার সঙ্গে এই টেস্ট করা সম্ভব।

বৈজ্ঞানিক গবেষণা থেকে জানা যায়, জন্মের সময় যে-শিশুগুলি স্বাভাবিক দেখতে, এমনকী তাদের মধ্যেও অন্তত দশজনের মধ্যে একজনের উপরোক্ত বিকাশজনিত রোগ হতে পারে। এই ধরনের সমস্যাটিকে বলা হয় নিউরো-ডেভেলপমেন্টাল ডিসঅর্ডারস (Neuro- Developmental Disorders or NDD)|

এতদিন যেহেতু জন্মের পরপরই বিজ্ঞানসম্মত কোনও টেস্ট আমাদের জানা ছিল না, তাই আমরা রোগ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে বাধ্য হতাম। এখন যেহেতু এত শক্তিশালী এক সহজ টেস্ট এসে গেছে, যেখানে শিশুকে একটা সুঁচ না ফুটিয়েই টেস্টটি করিয়ে নেওয়া যায়। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় হল এই যে, অনেকে এই টেস্টটিতে আস্থা রাখেন না। তবে যারা আস্থা রাখেন, তাদের শিশুর জন্য এই টেস্টটি সুফল দেবেই।

যাদের শিশুর অটিজম আছে, তাদের উদ্দেশ্যে ডা. অঞ্জন ভট্টাচার্য জানিয়েছেন, ‘আশা হারাবেন না। সব থেকে ভালো হয় যদি আপনার সন্তানের জন্মের দু’সপ্তাহ পর অ্যাডভান্সড জিএম টেস্ট-টি করিয়ে নেন। মনে রাখবেন, We have enough technology on earth to erase the disability from the planet.”

উৎকণ্ঠাই ভালো (পর্ব-০২)

অবনী সায় দিয়েছিল মল্লিকার কথায়। বারিকপাড়ার অমূল্য মাস্টারকে বলেকয়ে রাজি করিয়েছিল অবনী। বকুলকে লেখাপড়া শিখিয়ে বড়ো করে শহরের কলেজে ভর্তি করানোর সাধ অবনীর দীর্ঘদিনের। অবনী চায় শহুরে মেয়েদের মতন চাকরিবাকরি করে, নিজের মতো করে ঘরসংসার করুক বকুল। এই সাধপূরণের জন্য, সবরকমের কৃচ্ছ্রসাধন করতে রাজি আছে সে।

কিন্তু গত মাসছয়েক আগে, দেশে গিয়ে অবনী মনে ধাক্কা খেল। মেয়ে ছুটে এসে খুশিতে বাবাকে জড়িয়ে ধরা তো দূরের কথা বাবার পাশে এসে বসা, বাবার হাতে চা-জলখাবার বাড়িয়ে দেওয়া, বাবার জামাকাপড় কাচাকুচি করা— সব বন্ধ করে, সারাটা দিন ঘাড় গুঁজে বারান্দায় বসে রইল বকুল।

রাতে খেতে বসে মল্লিকার কাছে অবনী জানতে চাইল, ‘কী ব্যাপার বলো তো!”

—কীসের কী ব্যাপার?

—তোমার মেয়ের হলটা কী! আমাকে দেখে পালিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। আমি তক্তপোষের উপরে গিয়ে বসলে, ও সেখান থেকে নেমে ঘরের বাইরে বেরিয়ে যাচ্ছে। সারাটাদিন মাথা গুঁজে বারান্দায় বসে রয়েছে। কথা বললে মুখে কুলুপ এঁটে, মাথা নীচু করে পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছে। হঠাৎ করে এই পরিবর্তন! কোনও অন্যায় টন্যায় করে, তোমার কাছে বকা খেয়েছে মনে হচ্ছে!

—বকুল কি আমাদের তেমন মেয়ে না-কি গো! ওকে কি কোনও অন্যায় করতে দেখেছ কোনওদিন? কাল রাত পর্যন্ত তো ঠিকই ছিল, আজ সকাল থেকে আমিও এই পরিবর্তন দেখছি ওর মধ্যে।

—কিন্তু হঠাৎ করে এই পরিবর্তন কেন! ওর কাছে জানতে চাও কী হয়েছে। অবনী সে যাত্রায় মল্লিকাকে এই নির্দেশ দিয়ে কলকাতায় ফিরে আসলেও, মল্লিকা তার মেয়ের মধ্যে এহেন পরিবর্তনের রহস্যের কোনও কূল কিনারা খুঁজে পায় না। উলটে বকুলের এই অস্বাভাবিকতা দিনকে দিন বরং বাড়তেই থাকে। একদিন স্কুল থেকে বাড়ি ফিরে মাকে সে জানায়, ‘আমি কাল থেকে আর এই স্কুলে যাব না। তোমরা আমাকে মেয়েদের স্কুলে ভর্তি করে দাও!”

রাত্রে অমূল্য মাস্টার পড়াতে এলে, মাথা গুঁজে ভয়ে ভরা চোখ মুখ নিয়ে চুপ করে বসে থাকে বকুল। মাস্টার মশাইয়ের কোনও প্রশ্নের উত্তর পর্যন্ত দিতে চায় না সে। বিরক্ত হয়ে অমূল্য মাস্টার সেদিন ফিরে যাওয়ার পরে, বকুল মায়ের কাছে গিয়ে কাঁচুমাচু মুখে জানায়— সে আর অমূল্য মাস্টারের কাছে পড়তে চায় না।

একমাস পরে অবনী ঘরে ফিরলে, মল্লিকা মেয়ের সাম্প্রতিক এইসব অস্বাভাবিকতার বিষয়ে খুলে জানায় স্বামীকে। অবনী সবকিছু জানার পরে, সেই শনিবার দিনই দুপুরবেলাতে মেয়েকে নিয়ে গ্রামের পোড়া অশ্বত্থতলার মনসাবাড়িতে গুরুবাবার কাছে গিয়ে হাজির হল। প্রতি শনিবার দুপুরে গুরুবাবার ভর হয়। বকুলকে সামনে বসিয়ে গুরুবাবা চোখ বুজলেন। তারপরে হঠাৎ করে উঠে দাঁড়িয়ে, বকুলের কাছে গিয়ে, ওর চুলের মুঠি ধরে ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে জিজ্ঞাসা করতে থাকেন, ‘বল! কী জন্য তুই এর শরীরে ঢুকেছিস? চুপ করে থাকলে চলবে না। বলতেই হবে তোকে, তুই ওর শরীর থেকে বেরোবি কি-না!”

বকুল অনেকক্ষণ চুপ করে থাকার পরে, গুরুবাবার পায়ে পড়ে কঁকিয়ে ওঠে, ‘আমাকে মারছ কেন? তুমি যা জানতে চাইছ, আমি তার কিছুই জানি না।’

ভর ভাঙলে গুরুবাবা অবনীকে ডেকে জানিয়ে দেন, “তোমার বাড়ির পিছনে খেত পাহারার জন্য তুমি যে কুঁজি বেঁধেছ, সেখানে দুপুরে খেত পাহারা দেওয়ার সময় ওর শরীরে অশরীরীর প্রবেশ হয়েছে। আজই বাড়ি ফিরে গিয়ে ওই কুঁজি ভেঙে দিতে হবে। আজ থেকে আমার দেওয়া জল, মিশিয়ে স্নান করালে শীঘ্রই তোমার মেয়ে ভালো হয়ে যাবে!”

কিন্তু ভালো হওয়া তো দূরের কথা, দিনকে দিন বকুলের অবস্থা আরও খারাপ হতে লাগল। অবনী কলকাতায় ফিরে আসার আগে, সেবার অমূল্য মাস্টারের কাছেও ছুটেছিল। সব শুনে তিনি বললেন, “মনে হচ্ছে ওর মনের মধ্যে কোনও একটা বিষয়ে বড়োসড়ো ভয় ঢুকেছে। এসব ওঝা গুণিনের কাছে না ছুটে, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব কৃষ্ণনগরে জেলা হাসপাতালের একজন ভালো মনোবিদের কাছে নিয়ে যাও মেয়েকে। ওর মনের মধ্যে হঠাৎ গজিয়ে ওঠা ভয়ের কারণের হদিশ নিশ্চয়ই খুঁজে পাবেন উনি। এত ভালো একটা মেয়ের জীবন এভাবে নষ্ট হতে দিও না!”

এইসব শোনার পরে, সোমবার সকালে ম্যাঙ্গো লেনের অফিসে অবনী ফিরে এলেও, তার মন পড়ে থাকে দেশের বাড়িতে। ‘মেয়েটাকে তার স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে পারবে তো! বকুলকে নিয়ে তার দীর্ঘদিনের স্বপ্নপূরণ হবে তো!’—এইসব সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে, মণি বাহাদুরের ঘরের দেয়ালের দিকে বিস্ফারিত চোখে একদৃষ্টে চেয়ে থাকে অবনী। নাওয়া খাওয়া ভুলে একস্থানে স্থানুবত্ বসে থাকে সারাটা দিন।

দীর্ঘদিন ধরে অবনীকে যারা দেখছে, তাদের মধ্যে অনেকেই এগিয়ে এসে প্রশ্ন করে, “কি গো অবুদা, কী হয়েছে তোমার? সারাদিন আনমনা হয়ে বসে থাকছ। চিন্তায় চিন্তায় একি চেহারা করেছ!”

অবনীর কাছ থেকে সব শোনার পরে, তারা ভরসা দেয়, “চিন্তা কোরো না অবুদা, আমরা তো আছি। তোমার চাকরির কোনও ক্ষতি হবে না। খরচ খরচা নিয়ে চিন্তা কোরো না। প্রতি সপ্তাহের শেষে তুমি বাড়ি চলে যাও, ভালো একজন মনোবিদের কাছে নিয়ে যাও মেয়েটাকে। দেখবে সব ঠিক হয়ে যাবে।”

সবাই মিলে কিছু টাকা-পয়সাও তুলে দেয় অবনীর হাতে। তাই নিয়ে অবনী ছুটে যায় দেশের বাড়িতে। মেয়েকে নিয়ে সে হাজির হয় সদর হাসপাতালের বড়ো মনোবিদ ডাক্তার মৃন্ময় নন্দীর কাছে। ডাক্তারবাবুকে মেয়ের সব সমস্যার কথা খুলে জানায় অবনী ও মল্লিকা। মল্লিকা চোখের জল মুছতে মুছতে বলে, “আপনি আমাদের মেয়েটাকে বাঁচান ডাক্তারবাবু। মেয়েটা আমাদের বড়ো ভালো। লেখাপড়া, আচার আচরণ, ব্যবহার সবদিক থেকেই আমাদের গ্রামের মধ্যে সেরা ছিল ও। কিন্তু গত মাস ছয়েক ধরে কী যে একটা ভয় পেয়ে বসেছে ওকে; দিনরাত মাথা নীচু করে মুখ গুঁজে বসে থাকে। স্কুল যাওয়া, খেলাধূলা সব ছেড়েছে। এমনকী ঘর থেকে বেরিয়ে কারও দিকে মুখ তুলে চাইতেও ওর সব সময় ভয় করে। বিশেষ করে পুরুষ মানুষ দেখলেই ওর যত ভয়, নিজেকে গুটিয়ে রাখে সবসময়। সে স্কুলের সহপাঠী হোক, বাড়ির মাস্টারমশাই কিংবা নিজের বাবা হোক- — সব জায়গা থেকে নিজেকে গুটিয়ে রাখে, কী জানি কী এক অজানা ভয়ে!

(ক্রমশ…)

উত্তর থাইল্যান্ডের গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেল সীমান্ত (শেষ পর্ব)

এককালে মায়ানমার এবং এই পার্বত্য অঞ্চল মিলিয়ে প্রায় পাঁচশোর অধিক জিরাফ মহিলা বসবাস করত। এখন হয়তো সেই সংখ্যা অর্ধেকের কমে পৌঁছেছে। কারণ এত ভারী এই ধাতব বলয় বহন করে, এই মহিলারা নাকি মাথা ঝুঁকে হাঁটতেও পারে না। গলা এবং ঘাড়ের পেশিগুলো দুর্বল হয়ে ওদের স্পাইনাল কর্ড খুবই ক্ষতিগ্রস্থ হয়। দীর্ঘকাল ধরে এই ভারী ওজনের ধাতব বলয় বহন করার ক্ষমতা না থাকায়, রাতে শান্তিতে একটু ঘুমোতেও পারে না। শারীরিক দুর্বলতায় এদের অনেকেরই অকালমৃত্যু ঘটে। এইসব নানা কারণে বর্তমান প্রজন্মের কায়ান নারীদের মধ্যে এই প্রথা এবং ঐতিহ্যগত সংস্কৃতি, ওদের মনে সেভাবে দাগ ফেলতে না পারায়, এই সম্প্রদায় নাকি এখন প্রায় বিলুপ্তির পথে। কারণ নতুন প্রজন্মের বহু মেয়ে প্রতিবাদস্বরূপ নিজেদের অন্য কাজে নিযুক্ত করার লক্ষ্যে আপন দেশে ফিরে যাচ্ছে।

এই ধাতব রিং পরার প্রকৃত কোনও ইতিহাস সম্পর্কে জানতে চাইলে মুচকি হেসে থুয়ানথং জানালেন- সেভাবে কোনও বইয়ের পাতায় এই সম্প্রদায়ের ইতিহাস লিপিবদ্ধ নেই। তবে বেশ কিছু লোককাহিনি আজও চর্চিত রয়েছে বিশ্বজুড়ে। সেই কাহিনিটি হল, এক যুবতী নারী একবার জঙ্গলে বেড়াতে গিয়ে বৃষ্টির সময় একটি গুহায় আশ্রয় নিয়েছিল। সেখানে বসবাসকারী এক ড্রাগনের প্রেমে পড়ে যায়। ভালোবাসার নিদর্শন হিসেবে সেই ড্রাগন, মেয়েটিকে তিনটি ডিম উপহার দিয়েছিল। আর সেই তিনটি ডিম ফুটে নাকি তিনটি উপজাতি বের হয়। নামকরণের পরে এই কায়ান উপজাতি, সেই থেকে তাদের মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে ড্রাগনের মতো লম্বা গলা প্রসারিত করার কথা ভাবে।

থুয়ানথং আরও জানালেন— আরও দুটি সম্ভাব্য কারণ ওদের সংস্কৃতির ইতিহাস থেকে জনশ্রুতি হিসাবে পাওয়া গেছে। যার মধ্যে একটি হল, কায়ান পুরুষরা যখন জঙ্গলে শিকার করতে যেত অন্য উপজাতির পুরুষেরা যাতে নারীদের অপহরণ করতে না পারে তার জন্য মহিলাদের গলায় এবং পায়ে এমন বেড়ি লাগানো হত। কারণ এই ভারী ওজনের বেড়ি শরীরে থাকলে মহিলাদের খুব সহজে গ্রাম থেকে বের করে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে না।

আর দ্বিতীয় কারণ হিসাবে বললেন, এই কায়ান সম্প্রদায়ের আদি বাসস্থান ছিল মায়ানমারের কায়াহ রাজ্যে। এককালে ওখানে বাঘের খুব উৎপাত ছিল। প্রায়দিনই বাঘ গ্রামের মহিলা ও শিশুদের তুলে নিয়ে যেত। বাঘ যেহেতু শিকারের সময় গলা কামড়ে নিয়ে যায়, তাই তা রুখতে ওই নারী ও শিশুদের গলায় এই ধরণের মোটা বেড়ি পরিয়ে রাখা হতো।

উনি আরও জানালেন— আজকাল বহু পর্যটক এখানে আর আসতে চান না, এড়িয়ে যেতে চান। কারণ তাদের কাছে এই নারীদের পুতুলের মতো ব্যবহার করাটা নাকি মানব চিড়িয়াখানার মতো মনে হয়। এই একবিংশ শতকে পা রেখে কোনও ভাবেই তারা এই কষ্টদায়ক প্রথাকে মেনে নিতে চান না। এইসব অজানা তথ্য জানানোর জন্য থুয়ানথং-কে অশেষ ধন্যবাদ এবং কৃতজ্ঞতা জানিয়ে আবার আমি গ্রামের অভ্যন্তরে কায়ান নারীদের বিপণিতে প্রবেশ করলাম।

বেশ কয়েক ঘণ্টা কায়ান মহিলাদের সঙ্গে কাটালাম। ওদের শান্ত স্নিগ্ধ সৌন্দর্যের মিশেলে অচেনা দৃষ্টিগুলো আমার শরীরে বেঁধে! ওদের কষ্টমাখা হাসির আড়ালে সুখ ও অসুখে আমার শরীরময় কষ্টের ঝংকার উঠল, যেখানে পলক ফেলতেও মায়া জাগে। আমার সন্ধিৎসু চোখ, ওদের সবার ওষ্ঠাগ্রে আসন্ন হাসি বুঝিয়ে দিল— আমরা এই নিয়েই বেশ আছি, ভালো আছি, সুখে আছি।

বেশকিছু পছন্দের হস্তশিল্প কিনলাম। তবে একটা ব্যাপারে আশ্চর্য লাগল— এই কায়ান নারীদের চারপাশে ওদের উপজাতির কোনও পুরুষ বা বালক খুঁজে পাইনি। টনি জানাল, এই উপজাতির পুরুষরা কোনও কাজকর্ম করে না। এরা প্রায় সবাই তাদের স্ত্রী এবং বাড়ির মহিলাদের কষ্টার্জিত অর্থে শুয়ে বসে খেয়ে আনন্দ ফুর্তিতে দিন কাটায়।

আজকের যুগে এমন উন্নত দেশেও, নারী-শোষণের ঝলক সত্যিই বিস্ময়কর! যদিও প্রায় সব নারীর স্বীকারোক্তি- এই বেড়ি তারা স্ব-ইচ্ছেতেই গলায় ধারণ করেছে। কেউ জোর করে পরতে বলেনি। তবুও সারাদিন ধরে এই গ্রাম বেড়িয়ে যখন টনির সঙ্গে গাড়িতে চেপে চিয়াং মাইয়ের হোটেলে ফিরছিলাম, মনটা খুবই বিষণ্ণ ছিল। যাওয়ার পথে টনির সঙ্গে অনেক গল্প করলেও, ফেরার পথে আমি সম্পূর্ণ নীরব ছিলাম। হৃদয়ে শূন্যতা অনুভব করছিলাম বারবার।

যদিও প্রত্যেক জাতির ধর্ম, সংস্কৃতি ও আবেগের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়েও বারবার মনে হচ্ছিল— ধর্ম, সংস্কৃতি এবং প্রথার দোহাই দিয়ে কায়ান সম্প্রদায়ের নারীদের প্রতি এই অন্যায় সত্যিই মেনে নেওয়া খুব মুশকিল। বিশেষ করে সরকারি উদ্যোগে এই সম্প্রদায়কে দীর্ঘকাল যাবৎ অভিবাসী হিসাবে চিহ্নিত করে, ক্রীতদাসী বানিয়ে, পর্যটকের কাছ থেকে অর্থ উপার্জন করে, এই গ্রামের সফল বাণিজ্যকরণ মোটেই সুখকর উদ্যোগ নয়। তাই হয়তো বহু বিদেশি পর্যটক এই গ্রামকে মানুষের চিড়িয়াখানা আখ্যা দিয়ে এড়িয়ে যান!

(সমাপ্ত)

উৎকণ্ঠাই ভালো (পর্ব-০১)

গতমাসে দেশের বাড়ি থেকে কলকাতায় ফেরার পর থেকে অবনী কিছুতেই মনের মধ্যে একটুও যেন স্বস্তি পাচ্ছে না। দিনরাত মাটির উপরে উবু হয়ে বসে, বিস্ফারিত চোখে দেয়ালের দিকে চেয়ে থাকে সে। দেশের বাড়ি থেকে ফেরার পর থেকে অবনীর এই গুম মেরে যাওয়ার ব্যাপারটা সকলেরই নজরে পড়ছে।

অবনী কলকাতার ডালহৌসি অফিসপাড়ার কাছে ম্যাঙ্গো লেনের একটা উঁচু অফিসবাড়ির সাততলায় কাজ করে। এই সাততলায় আট-টা কোম্পানির অফিস। সেখানে অবনীর কাজ বলতে— রোজ ঘুম থেকে উঠে প্রত্যেকটা অফিসের চেয়ার-টেবিল, আসবাবপত্র, কাচের দরজাগুলো সব মুছে সাফ করে। ওয়েস্টপেপার বাস্কেটে জমা হওয়া আগের দিনের সব ছেঁড়াখোঁড়া কাগজপত্র ফেলে দিয়ে, প্রত্যেকটা অফিসঘর ঝাঁটপোছ করে দেয় অবনী। তারপরে প্রত্যেকটা টেবিলে একটা করে খাবার জলের বোতল রেখে দেয় সে।

বেলা বাড়লে, প্রতিটা অফিস ঘুরে ঘুরে অবনী জানতে চায়— কোন বাবুদের পান লাগবে, কোন বাবুদের চা লাগবে, সিগারেট লাগবে। এইভাবে দিনে তিন-চারবার

চা-পান-সিগারেটের জোগান দেয় অবনী। আবার যেসব কোম্পানির অফিসে নিজস্ব জেরক্স মেশিন নেই, তারা প্রায়ই গোছা গোছা চিঠিপত্র অবনীর হাতে দিয়ে, জেরক্স করিয়ে আনতে বলে। জেরক্স করতে যাওয়ার সময়, অবনী একবার করে দরজা ঠেলে সব অফিসে ঢুকেই জানতে চায়— -নীচে যাচ্ছি, আপনাদের কোনও কাজ আছে?

তখন কেউ বলে, ‘অবনীদা তুমি নীচে যখন যাচ্ছ, পোস্ট অফিস থেকে আমাদের জন্য কয়েকটা রেভিনিউ স্ট্যাম্প এনে দাও না। কেউ বলে আমাদের এই চিঠিগুলো পোস্ট অফিসের ড্রপবক্সে ফেলে দিও।’ কখনও কোনও কাজে না নেই অবনীর। যে যা বলে, হাসিমুখে সব করে দেয় সে। কারও অধীনে চাকরি করে না সে কিন্তু প্রতিটা কোম্পানির থেকে একটা মাসোহারা পায়। যে যা দেয় তা নির্দ্বিধায়, বিনা অসন্তোষে নিয়ে নেয় অবনী। অনেকে আবার ছোটোখাটো কাজের জন্য, হাতে দশ-বিশ টাকা বকশিশ দেয়। সব মিলিয়ে মাস গেলে আট-দশ হাজার টাকা আয় হয় অবনীর।

এই উপার্জনকে সম্বল করেই, গত পঁচিশটা বছর নির্ঝঞ্ঝাটে কাটিয়ে দিয়েছে অবনী। দিনান্তে ম্যাঙ্গো লেনের এই অফিসবাড়ির কেয়ারটেকার মণি বাহাদুরের ঘরে রাত গুজরান করে। মণি বাহাদুরের সঙ্গেই একসাথে তার খাওয়াদাওয়া, ওঠাবসা সব। কেবল মাস পড়লে প্রথম শুক্রবার রাতে দু’দিনের জন্য দেশের বাড়িতে যায় অবনী।

অবনীর দেশের বাড়ি নদীয়া জেলার করিমপুরে। বাংলাদেশের সীমান্ত লাগোয়া গ্রাম বারিকপাড়ায়। সেখানেই অবনী বারিকের বাপ-ঠাকুরদার ভিটে। অবনীর মা-বাবা যখন মারা যায় তখন অবনীর বয়স মাত্র পনেরো বছর। কাকা কাজ করতেন ডালহৌসি পাড়ার এক বেসরকারি সংস্থায়। কাকার হাত ধরেই কলকাতায় এসে, সেই যে ম্যাঙ্গো লেনের এই বাড়িতে কাজে ঢুকেছিল অবনী, তা সে এখনও চালিয়ে যাচ্ছে। কাকা গত হয়েছেন দীর্ঘদিন। শরিকি ভাগে যেটুকু বাস্তু জমি মিলেছিল, সেখানে ক্রমে ক্রমে একখানা এক কামরার ঘর তুলেছে সে। সেই ঘরেই স্ত্রী মল্লিকা আর মেয়ে বকুলকে নিয়ে অবনীর সংসার।

দেশের বাড়ির পিছনে যে বিঘেখানেক চাষের জমি পেয়েছিল, সেখানে শীতের আগে শনি-রবি দুটো দিন খেটে ফুলকপি, গাজর, বাঁধাকপি, ওলকপি লাগিয়েছে নিজের হাতে। গেল মাসে গিয়ে দেখে এসেছে, ফুলকপিগুলো বেশ ডাগর হয়েছে। জমির পাশে বাড়ির পিছনে বাঁশ ও গুটিকয়েক তক্তা, নারকেল দড়ি দিয়ে বেঁধে, একটা কুঁজি বানিয়ে দিয়েছে অবনী। শীতের দুপুরে মল্লিকা রোজ সেখানে গিয়ে বসে পাখি তাড়ায়, যাতে পাখিগুলো সবজিগুলোকে নষ্ট না করতে পারে।

এদিকে স্কুল থেকে ফিরে মায়ের পাশে গিয়ে বসে বকুল। সে সময় স্কুলের বন্ধুবান্ধবের গল্প, মাস্টারমশাইদের গল্প, আসা-যাওয়ার পথে নিজের চোখে দেখা গ্রামের মানুষজনের আলাপ আলোচনা সম্বন্ধে নানান ফিরিস্তি শোনায় মাকে। অবনীকে ছাড়াই মেয়েকে নিয়ে দিব্যি দিন কাটায় মল্লিকা।

মাসের প্রথমে অবনী ঘরে ফিরলে, সারাটাদিন সে খেতের কাজ নিয়েই ব্যস্ত থাকে। রাতের বেলায় মেঝেতে বিছানা পেতে শুতে হয় অবনীকে। মল্লিকা আর বকুল শোয় তক্তপোষের উপরে। রাতে মেয়ে ঘুমিয়ে পড়লে, মল্লিকা মেঝেতে নেমে আসে অবনীর পাশে। সারাটা মাস স্বামী-স্ত্রীর দুটো অভুক্ত শরীর নিঃশব্দে পরষ্পরের ভিতরে আহারের সন্ধানে মেতে ওঠে। শরীর-মন তৃপ্ত হলে, মল্লিকা আবার তক্তপোষে উঠে মেয়ের পাশে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে।

অবনীকে দেখলে বকুলের মনও খুশিতে নেচে ওঠে। বাবাকে দেখামাত্র তাকে জড়িয়ে ধরে, টানতে টানতে ঘরে নিয়ে গিয়ে বসায় বকুল। বাবার পাশে বসে, কলকাতা শহরের নানান গল্প শুনতে চায় সে। সারাটাদিন বাবার হাতে হাতে চা-জলখাবার বাড়িয়ে দেওয়া থেকে শুরু করে, বাবার ছাড়া জামাকাপড় কেচে উঠোনের তারে মেলে, শুকিয়ে, ভাঁজ করে আবার বাবার ব্যাগে ভরে দেয় বকুল।

মেয়েকে দেখে অবনীও খুশি হয়। বকুল যেন একেবারে মল্লিকার ছায়া। মল্লিকা তার মেয়েকে ধীরে ধীরে নিজের মতো করে গড়ে তুলছে। পড়াশোনাতেও ভালো হয়েছে মেয়েটা। প্রতিবছর প্রথম হয়ে ক্লাসে ওঠে বকুল। গেল বছর সিক্স থেকে সেভেনে উঠেছে সে। বকুল সেভেনে উঠতেই মল্লিকা জানিয়েছিল, এতদিন মেয়েটা একা একা পড়াশুনা করে এতদূর এগিয়েছে। এবার ঘরে ওর জন্য একটা মাস্টার না রাখলেই নয়। নিদেনপক্ষে ইংরাজি আর অঙ্কের জন্য। বাকি বিষয়গুলো ও নিজেই চালিয়ে নিতে পারবে।

(ক্রমশ…)

বাচ্চা মাঝেমধ্যেই সর্দিকাশিতে ভোগে, কী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত?

আমার ১০ মাসের ছেলে প্রায়ই অসুস্থ থাকে। কখনও পেটের অসুখ তো কখনও সর্দিকাশি। এর ফলে ও শারীরিক ভাবে খুব দুর্বল। ও যাতে বারবার অসুখে না পড়ে তার জন্য আমাকে কী করতে হবে?

আপনার বাচ্চা যদি বারবার অসুস্থ হয় তার মানে ওর ইমিউনিটি কম। ইমিউনিটি কম হওয়ার কারণ খাবারে প্রয়োজনীয় জিংক-এর ঘাটতি হতে পারে। নিরামিষ ভোজনে অভ্যস্ত পরিবারের শিশুদের মধ্যে জিংক-এর অভাব দেখা যায়। যদি ইমিউনিটির জন্য বাচ্চা বারবার অসুস্থ হয় তাহলে বাচ্চার শুধু শারীরিকই নয় মানসিক বিকাশও প্রভাবিত হতে পারে। সুতরাং বাচ্চাকে জিংক-যুক্ত আহার যেমন রেড মিট, দই, বাদাম, সবজি, হোল গ্রেন ইত্যাদি দিন। এছাড়াও চাইল্ড স্পেশালিস্ট-কে দিয়ে বাচ্চাকে পরীক্ষা করান যিনি বাচ্চাকে পরীক্ষা করে বলে দেবেন, সমস্যাটা কোথায়।

কয়েকদিন আগে আমি আমার ৭ মাসের ছেলেকে ডাক্তারের কাছে চেক-আপের জন্য নিয়ে গিয়েছিলাম। ডাক্তার পরীক্ষা করে বাচ্চাকে আয়রন আর ভিটামিন দিতে বলেছেন। ভিটামিন এবং আয়রনের অভাব দূর করার জন্য সত্যিই কি ওষুধের প্রয়োজন আছে?

ডাক্তারের পরামর্শ শুনে আপনার চলা উচিত। শিশুর আহারে পর্যাপ্ত পরিমাণে ভিটামিন এবং মিনারেল থাকা বাঞ্ছনীয়। ৬ মাস বয়সের পর শিশুর শরীরে আয়রনের ঘাটতি হওয়া অসম্ভব নয়। শরীরে খাবারের মাধ্যমে পর্যাপ্ত আয়রন এবং ভিটামিন না পৌঁছোলে, বাধ্য হয়ে ডাক্তাররা তখন ওষুধ প্রেসক্রাইব করেন বাচ্চাদের জন্য।

সম্প্রতি আমি মা হয়েছি। আমার মেয়ের সবে ১ মাস বয়স হয়েছে। আমি অনেক বইতেই পড়েছি, সন্তানের জন্মের পর প্রথম ১০০০ দিন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এটা কি সত্যি?

আপনি ঠিকই পড়েছেন। বাচ্চার প্রথম ১০০০ দিনই বলুন অথবা জন্মের পর প্রথম দুই বছর— এই সময়টা বাচ্চার গ্রোথের ক্ষেত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ভবিষ্যতে বাচ্চার স্বাস্থ্যের বুনিয়াদ তৈরি হয় এই বয়সেই। সাধারণত ৬ মাস পর শিশুর ওজন জন্মের ওজনের দ্বিগুন হয়ে যায় এবং এতটাই তাড়াতাড়ি শিশুর মানসিক এবং ব্রেনের বিকাশও ঘটে। সুতরাং ৬ মাসের পর থেকে শিশুকে ভিটামিন এবং মিনারেল-যুক্ত সলিড খাবার খাওয়ানো খুব দরকার, যাতে বাচ্চার মানসিক বিকাশ সম্পূর্ণভাবে হয়। এই বয়সে স্তনপানের সঙ্গে সঙ্গে প্রোটিন, কার্বোহাইড্রেট-এর সঙ্গে ভিটামিন, আয়রন, জিংক-এর মতো মিনারেল শিশুর শরীরের জন্য অত্যন্ত জরুরি।

অগোছালো জীবনযাপন হতে পারে বেদনাদায়ক

সৈনিকদের দৈনন্দিন জীবনযাপন থেকে ভালো কিছু শিক্ষা নেওয়া যায়। কারণ, তারা দিনরাত নিয়মশৃঙ্খলার মধ্যে থাকে বলেই অনেক ঝড়ঝাপটা সামলে দেশরক্ষা করতে পারে। নির্দিষ্ট নিয়ম মেনেই ওদের যেমন খাবার খেতে হয়, ঠিক তেমনই পোশাকও পরতে হয় নিয়ম মেনে। শুধু তাই নয়, প্রতিটি পদক্ষেপই তাদের মাপা থাকে। নিয়ম ভাঙলে শাস্তিও মাথা পেতে নিতে হয় সৈনিকদের।

বাস্তবে দেখা গেছে, যেখানে কোনও নিয়ম নেই, সবকিছু অগোছালো, যত গণ্ডগোল সেখানেই। এক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে, নিয়মের পরিবর্তে যদি নিয়ম ভাঙার নিয়ম থাকে, তাহলে ভণ্ডরা সুযোগ নেবেই। আর এই নিয়মশৃঙ্খলা লঙ্ঘন করার ক্ষেত্রে আমাদের দেশ কিংবা দেশের নাগরিকরা অনেকটা এগিয়ে আছে বলেই মনে হয়।

এই যেমন যত্রতত্র মলমূত্র ত্যাগ, যত্রতত্র গাড়ি পার্কিং, নিয়ম না মেনে বাড়িঘর তৈরি, লাইন না মেনে এগিয়ে যাওয়া— এই সবকিছুই আসলে কুঅভ্যাস। রাস্তাঘাট থেকে শুরু করে জলনিকাশি ব্যবস্থা, সব ক্ষেত্রেই লক্ষ্য করা যায়। পরিকল্পনার অভাব। সব যেন কেমন এলোমেলো, অগোছালো।

সরকারের অনেক দপ্তরে গিয়ে দেখুন জনগণের অত্যন্ত প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এলোমেলো করে রাখা থাকে। আর এই অগোছালো থাকার কারণে সাধারণ মানুষ সঠিক সময়ে পরিসেবা পাওয়া থেকে অনেক সময় বঞ্চিত হন। সংসদ ভবন থেকে শুরু করে গ্রামের খেতখামার, সর্বত্রই অগোছালো, নিয়মশৃঙ্খলার অভাব।

আসলে এই অগোছালো কিংবা নিয়ম ভাঙার মানসিকতা অনেকের রক্তে মিশে গেছে। তাই প্রাইম টাইম-এ রাস্তায় যে যানজট তৈরি হয়, তাও আসলে ওই অগোছালো কিংবা নিয়ম ভাঙার মানসিকতারই কুফল।

অনেক ক্ষেত্রে তো আবার ইচ্ছে করে সবকিছু অগোছালো ভাবে রাখা হয়, যাতে গোছানোর লোক নিয়োগ করে আর্থিক মুনাফা করা যায়। কোনও ধর্মীয় স্থানে গেলে এই বিশৃঙ্খলার মাত্রা দ্বিগুণ হতে দেখা যায়৷ দু’চাকা, তিন চাকা, চার চাকা কিংবা ছয় চাকার গাড়ি রাখার যেমন নির্দিষ্ট কোনও জায়গা নেই, ঠিক তেমনই যে যেখানে পেরেছে দোকান সাজিয়ে বসে পড়েছে।

এই অগোছালো অবস্থা ভক্তরা মন্দির চত্বরে দেখে শিখে এসে, তার প্রয়োগ ঘটায় নিজের এলাকায় এবং বাড়িতেও। তাই বাড়িতে জামাকাপড় থেকে শুরু করে বইখাতা, বাসনপত্র সবকিছুই এখানে-ওখানে ছড়িয়ে রাখার প্রবণতা থাকে অনেকের।

কিন্তু এই অগোছালো নারীপুরুষরা ভুলে যান যে, বড়োরা অগোছালো থাকলে ছোটোরাও তাই শিখবে এবং অগোছালো থাকলে সঠিক সময়ে গুরুত্বপূর্ণ জিনিসটা নাও খুঁজে পেতে পারেন। শুধু তাই নয়, অগোছালো বিষয়টি মস্তিষ্কেও যে কুপ্রভাব ফেলে, তা অনেকেরই জানা নেই। কিন্তু মনে রাখবেন, মস্তিষ্ক যদি চঞ্চল হয়ে যায়, তাহলে যেমন মেজাজ হারিয়ে ফেলতে পারেন যখন-তখন, ঠিক তেমনই জীবনে বড়ো কোনও ভুলও করে ফেলতে পারেন।

আবেগী মন (শেষ পর্ব)

পূর্ব পরিকল্পনা মতো শিবরাত্রির সকালে মানব বড়ো একটা গাড়ি ভাড়া করে বাড়ির সবাইকে নিয়ে কসবা থেকে শুভ্রাদের নাকতলার বাড়িতে পৌঁছোলো। শুভ্রার শ্বশুর-শাশুড়ি আনন্দের সঙ্গে মানবের বউ-বাচ্চাকে দোতলার নিয়ে গিয়ে হইহুল্লোড়ে মাতলেন। সেদিন বিপ্লব ছুটি পেয়েছিল, তাই সে ডিনার পার্টির আয়োজনের জন্য সকাল থেকে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। আর সকাল ন’টা নাগাদ একটা ক্যাব বুক করে মানব এবং শুভ্রা অফিসে রওনা দিল। মানব গাড়ি আনতে পারেনি, তাই বিপ্লব ওর গাড়িটা শুভ্রাকে নিয়ে যেতে বলেছিল কিন্তু মানব মানা করল।

ঠিক সময়ে অফিসে পৌঁছে কাজ শুরু করল মানব এবং শুভ্রা। কিন্তু আজ ওদের মন উড়ু উড়ু, তাই কাজে মন বসাতে পারছে না দু’জনেই। কারণ আজ ওরা নিজের মতাদর্শ এবং মনের খোরাক মেটানোর জন্য এক নতুন জীবন শুরু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। শুধু যে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালনে অনীহার কারণে জীবনসঙ্গী এবং পরিবার ছেড়ে পালাতে চাইছে তা নয়, ওদের আবেগী মন অবহেলিত হওয়ার কারণে আজ ওরা নিষ্ঠুর হতে চাইছে। মানব এবং শুভ্রার শরীর এবং মনের চাহিদাও সঠিক ভাবে পূরণ করতে পারেনি ওদের জীবনসঙ্গীরা। শুভ্রার বর বিপ্লব এবং মানবের স্ত্রী সুমিতা দুজনেই শরীর এবং মনের থেকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে সামাজিকতাকে। আজ তাই ওদের রেখে, নতুন জীবন শুরু করার পরিকল্পনা বাস্তবায়িত করতে চলেছে মানব এবং শুভ্রা।

কোনও রকমে হাফ-ডে অফিস করে মানব ও শুভ্রা রওনা দিল বোলপুরের উদ্দেশ্যে। ট্রাভেল এজেন্সি থেকে ভাড়া করে একটা গাড়ি নিয়েছে ওরা। এক রাত্রি বোলপুরে কাটিয়ে আবার কলকাতায় ফিরে, আপাতত একটা বাড়ি ভাড়া করে থাকার ইচ্ছে ওদের। ভাড়া বাড়ির ব্যবস্থাও করে নিয়েছে ওরা। একদিন পর খালি হবে ওই বাড়ি, তাই তার আগে প্রথম রাত্রিটা বাইরে কাটানোর ইচ্ছে পোষণ করেছে দু’জনে।

এ-ও সিদ্ধান্ত নিয়েছে পরিবারের কেউ যাতে অযথা খোঁজাখুঁজি না করে, তাই বোলপুরে পৌঁছে সত্যিটা জানিয়ে দেবে।

এর মধ্যে মানব ও শুভ্রার অন্য একটা মতলবও ছিল। ওরা চেয়েছে, বিপ্লব এবং সুমিতা যেহেতু প্রায় একই মানসিকতার, তাই যখন ওরা সত্যিটা জানবে, তখন অসহায়তা কাটাতে হয়তো পরস্পরের অবলম্বন হয়ে উঠবে। কিন্তু মানুষ যা ভাবে, সবসময় তা বোধহয় বাস্তবায়িত হয় না। মানব-শুভ্রার ক্ষেত্রেও তাই ঘটল।

হাইওয়ে ধরে ঠিকঠাক ছুটে চলেছিল ওদের গাড়িটা। কিন্তু বিপত্তি ঘটল বোলপুরের রাস্তায় ঢোকার পর। রাস্তার বাঁকে শুয়েছিল একটা ষাঁড়। আচমকা সামনে এসে যাওয়ায় গাড়ির চালক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সজোরে ধাক্কা মারল একটা বড়ো গাছে। দুমড়ে মুচড়ে গেল গাড়িটা। চালক প্রাণে বাঁচলেও প্রত্যেকেই অল্প চোট পায় হাতে, পায়ে। নার্ভাস হয়ে পড়ে শুভ্রা। মানব তাকে জল খাইয়ে, চোখে মুখে জলের ঝাপটা দেয়। গাড়ি থেকে বাইরে বের করে এনে রাস্তার ধারে বসায়।

কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেওয়ার পর মানব এবং শুভ্রা সিদ্ধান্ত নেয় বাড়ি ফেরার। শুভ্রা মানবকে জানায়, ‘কাজটা বোধহয় আমরা ঠিক করছিলাম না, তাই এমন দুর্ঘটনা ঘটল। চলো, ফিরে যাই। আমার ছোট্ট মেয়েটার জন্যও মন খারাপ লাগছে।’

শুভ্রার কথা শুনে মানবও যেন চিন্তায় পড়ে গেল। কিছুক্ষণ মন খারাপ করে বসার পর বলল, ‘তুমি ঠিকই বলেছো শুভ্রা, আমরা বোধহয় সন্তানের প্রতি অবিচার করতে যাচ্ছিলাম নিজেদের সুখশান্তির জন্য। না, আর মনে হয় নতুন জীবন গড়ার সাহস হবে না। এখনও সময় আছে, চলো বাড়ি ফিরে যাই। হয়তো এখন ফিরলে বড়ো বিপর্যয় ঘটবে না। চলো আমরা আগের মতো শুধু ভালো বন্ধু হয়ে থাকি।

—তাই চলো। সম্মতি জানাল শুভ্রাও। তারপর ওরা কিছুটা হেঁটে গিয়ে, ওদের দুর্ঘটনাগ্রস্ত গাড়ির চালকের সাহায্যে একটা গাড়ি ভাড়া নেওয়ার ব্যবস্থা করল ওই অঞ্চলের এক ‘কার সাপ্লায়ার্স’ সংস্থা থেকে। ওদের গাড়ি যখন বাড়িমুখি, তখন বাড়ির লোকেদের কথা ভেবে মানব এবং শুভ্রা দু’জনেরই খুব মন খারাপ হয়ে গেল। এতক্ষণ হয়তো ওদের জন্য হুলুস্থুলু কাণ্ড ঘটে গেছে! অফিসের কারওর থেকে কোনও খবর না পেয়ে হয়তো থানায় নিখোঁজ ডায়ারি হয়ে গেছে। তারা ইচ্ছে করেই নিজেদের মোবাইল ফোন বাড়িতে রেখে এসেছে। পরিবর্তে মানব নতুন একটা মোবাইল ফোন কিনে, নতুন নম্বর ব্যবহার করছে। অতএব মানবের স্ত্রী সুমিতা কিংবা শুভ্রার স্বামী বিপ্লব, কেউই ওদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছে না। আর এটাই এখন সবচেয়ে দুঃশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়াল মানব এবং শুভ্রার কাছে।

ইতিমধ্যে বাড়িমুখি গাড়িটা অনেকটাই পথ পিছনে ফলে এসেছে। হয়তো আর এক ঘন্টার মধ্যে ওরা কলকাতায় পৌঁছেও যাবে। আর যে উদ্দেশ্যে ওরা সংসার ত্যাগ করেছিল, সেই উদ্দেশ্যের কথা যাতে বাড়ির লোকেরা কেউ বুঝতে না পারে এবং পরিস্থিতি যাতে হাতের বাইরে না চলে যায়, তাই এক উপায় বের করে মানব।

সুমিতার মোবাইল ফোনের নম্বরে ফোন করে মানব জানায়, হঠাৎ অফিসের এক সিক্রেট মিটিং-এ কলকাতার বাইরে যেতে হয়েছিল ওদেরকে। গাড়ি দুর্ঘটনার কথাটাও জানায়। কিন্তু ওদের যে কিছু হয়নি এবং ওরা যে বাড়ি ফিরছে, তা জানিয়ে আশ্বস্ত করে সুমিতাকে৷ শুভ্রাও মানবের ফোন থেকে কথা বলে বিপ্লবের সঙ্গে। আর কথা বলে জানতে পারে বাড়ির সবাই ওদের খোঁজখবর শুরু করলেও, তখনও থানায় যায়নি। তবে খুব দুঃশ্চিন্তায় ছিল এবং থানায় যাওয়ার উদ্যোগ নিচ্ছিল বলে জানায় সুমিতা এবং বিপ্লব।

পুরো ব্যাপারটা যে ম্যানেজ হয়ে গেছে এবং পরিস্থিতি যে হাতের বাইরে যায়নি তখনও, এটা বুঝতে পেরেই আনন্দে মানবকে জড়িয়ে ধরে শুভ্রা। আর মানব ততক্ষণে আবার ফোন করে সুমিতাকে জানায়, ‘আর কিছুক্ষণের মধ্যে পৌঁছোবো, চিন্তা কোরো না। আজ ডিনার পার্টি জমিয়ে দেব।’

—ঠিক আছে, তোমরা সাবধানে এসো, আমরা অপেক্ষা করছি। বলেই ফোন কাটল সুমিতা। আর সুমিতার কণ্ঠস্বরে আশ্বস্ত ভাব অনুভব করে মানব শুভ্রার চোখে চোখ রেখে মুচকি হেসে জানাল, ‘আর কোনও চিন্তা নেই। দুর্যোগ কেটে গেছে।’

বাচ্চা সলিড ফুড খেতে চাইছে না, কী করবো?

আমার ছেলের বয়স ৭ মাস। গত মাস থেকেই ওকে আমি দুধের সঙ্গে সলিড ফুড খাওয়াতে আরম্ভ করেছি। কিন্তু ও সলিড খাবার কিছুতেই খেতে চাইছে না, শুধু দুধ খাওয়ার বায়না করছে। আমি যদি ওর দুধের পরিমাণ বাড়িয়ে দিই, তাহলে কি ওর শরীরের চাহিদা মিটবে?

৭ মাস বয়সের শিশুদের দুধের সঙ্গে সলিড ফুড দেওয়াও একান্ত জরুরি। কারণ শুধু দুধে ওদের শরীরের পর্যাপ্ত পুষ্টি হয় না আপনার শিশুকে শক্ত খাবার খাওয়াবার চেষ্টা করুন কিন্তু খেয়াল রাখবেন একসাথে একগাদা খাবার খাওয়াবেন না। খুব ধীরে ধীরে কম পরিমাণে খাবার খাওয়ান যাতে শিশু খাবারের স্বাদ বুঝতে পারে। জোরজবরদস্তি বেশি পরিমাণে খাবার খাওয়াতে গেলে শিশুর খাবারের প্রতি অনীহ তৈরি হবে। আদর করে কথা বলতে বলতে বাচ্চাকে খাওয়ান এবং পুষ্টিকর খাবার দিন। বাচ্চার শরীরের নিউট্রিয়েন্টস-এর প্রয়োজন মেটাতে সাপ্লিমেন্ট ফুড বা ফর্টিফায়েড খাবার দিন যাতে সম্পূর্ণ ভাবে শিশুর বিকাশ হয়।

কয়েকদিন আগেই আমার মেয়ের ৬ মাস বয়স হয়েছে। আমার এখন ওকে সলিড ফুড দেবার সময় হয়েছে কিন্তু বুঝতে পারছি না কী খাওয়াব?

এই সময়টা বাচ্চাদের পুষ্টির উপর বেশি করে খেয়াল রাখা উচিত। স্তনপানের সঙ্গে সঙ্গে এখন সলিড ফুড দেওয়াটাও খুব জরুরি। শুরুতে গলা ভাত, ডালের জল, কলা বা আপেল সেদ্ধ করে ম্যাশ করে দিতে পারেন এবং দইও খাওয়াতে পারেন। কিন্তু রুটি, শক্ত কোনও ফল এখন খাওয়াবেন না। ভিটামিন এবং মিনারেলস-যুক্ত খাবার বেশি করে খাওয়ান যাতে বাচ্চার মানসিক বিকাশ অপূর্ণ থেকে না যায়।

কয়েকদিন আগে আমার ছেলে ৯ মাসে পড়েছে। বাড়িতে সবার জন্য যে-খাবার বানানো হয় আমি সেটাই ছেলেকে খাওয়াই। এছাড়াও ওকে তিনবার দুধ খাওয়াই। এতে কি ও সম্পূর্ণ পুষ্টি পাচ্ছে?

আমরা সাধারণত বাড়িতে যে খাবার বানাই তাতে বেশিরভাগ কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন, ফ্যাট ইত্যাদি থাকে ফলে শিশুর শারীরিক বিকাশ ঘটলেও মানসিক বিকাশের জন্য জরুরি ভিটামিন, মিনারেল-এর ঘাটতি থেকেই যায়। বাড়িতে সবুজ শাকসবজি যেমন তোফু, ব্রোকোলি ইত্যাদি রান্না কমই হয়। এছাড়াও ভুসি ছাড়া আটা আমরা রুটির জন্য ব্যবহার করি অথচ ভুসিতেই জিংক-এর মাত্রা বেশি থাকে। এর ফলে শিশুর খাবারে জিংক, আয়রন এবং ভিটামিনের অভাব ঘটে দুধে, বাচ্চার সবরকম পুষ্টিকর উপাদান থাকে না। সুতরাং শিশুকে ভিটামিন এবং মিনারেল- যুক্ত পর্যাপ্ত খাবার দিন। শিশুর পুষ্টির অভাব দূর করতে সাপ্লিমেন্ট ফুড বা ফর্টিফায়েড ফুড অথবা রেডিমেড ফুড-ও দেওয়া যেতে পারে।

গৃহশত্রু খুবই ভয়ংকর

ভাইয়ে-ভাইয়ে বিবাদ কোনও নতুন বিষয় নয়। নির্বাচন-রাজনীতির জেরেও গৃহবিবাদ তুঙ্গে উঠতে পারে। কারণ এমন অনেক পরিবার আছে, যে পরিবারে এক-একজন সদস্য ভিন্ন রাজনৈতিক দলের সমর্থক। আর সমস্যার সূত্রপাত ঠিক এখান থেকেই হয়। রাজনৈতিক কোন্দল শুরু হলে পিতা পুত্রকে, পিতা কন্যাকে, মাতা পুত্রকে, মাতা কন্যাকে, ভাই ভাইকে, ভাই বোনকে কিংবা বোন বোনকে শত্রু ভাবতে শুরু করে। পারিবারিক বিশ্বাস কিংবা গোপনীয়তা নষ্ট হয়। পরিবারের বয়স্ক সদস্যরা তখন মানসিক অস্থিরতা অনুভব করেন। বদলে যায় বাড়ির আবহ। তৈরি হয় এক শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি।

আসলে, ভাইভাই কিংবা ভাইবোনের মধ্যে বিবাদ চলে আসছে সেই পৌরাণিক যুগ থেকে। দশরথের পরিবারে তাঁর স্ত্রীদের রাজনীতির শিকার হয়েছিলেন পুত্ররা। এরজন্য বনবাসে যেতে হয়েছিল রামকে। মহাভারতে তো ভাইয়ে ভাইয়ে বিবাদ ঘটানোর মূল কাণ্ডারি ছিলেন স্বয়ং কৃষ্ণ! আর ‘ধার্মিক’ লোকেরা সেই কাহিনি আত্মস্থ করে নিয়ে মনুষ্য জীবনেও তার প্রয়োগ ঘটিয়ে চলেছেন।

আজও ঘরে-ঘরে নানা কারণে ভাইভাই কিংবা ভাইবোনের মধ্যে বিবাদ চলছে জোর কদমে৷ আসলে এই বিবাদ কিংবা বিভাজনের রাজনীতির বিষ আমাদের মনে প্রবেশ করেছে সেই পৌরাণিক কাহিনি থেকেই। যখনই অর্থ কিংবা ক্ষমতা দখলের সুযোগ এসেছে, ভাই কিংবা বোন রক্তের সম্পর্কের বিষয়টি ভুলে গিয়ে রক্ত ঝরাতেও পিছপা হয়নি। আসলে, গৃহশত্রু খুব ভয়ংকর! বিভীষণ রাবণকে ধংস করেছে, হিরণ্যকশ্যপ নিজের বোনকে জ্বালিয়ে দিয়েছে। এমন আরও অনেক ঘটনা আছে, যা গৃহশত্ৰু কতটা ভয়ংকর হতে পারে, তা প্রমাণ করেছে।

ভাই-ভাই কিংবা ভাই-বোনের মধ্যে বিবাদের মামলা ক্রমশ বাড়ছে আদালতে। মা-বাবার সম্পত্তি দখলের জন্য নিজেদের মধ্যেই চলছে লড়াই। যে বিষয়টি ঘরেই আলোচনার মাধ্যমে মিটিয়ে ফেলা যেত অনায়াসে, তা গড়াচ্ছে আদালত পর্যন্ত।

অবশ্য বিবাদ এখন আর শুধু ভাই-বোনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, বোনের বিরুদ্ধে বোনও লড়াই করতে শুরু করে দিয়েছে ব্যাপক ভাবে। রক্তের সম্পর্ক আজ এমন জায়গায় দাঁড়িয়েছে যে, ছোটোবেলার খেলার সঙ্গী আজ পরস্পরের মুখ দেখতে চায় না! এ বড়ো বেদনাদায়ক! আর ব্যক্তিগত এই বিবাদ বাড়ছে রাজনৈতিক কারণে।

সবাই যখন দেখছে অর্থ এবং ক্ষমতা দখলের খেলায় জয়ী হয়ে রাজনৈতিক নেতারা বিলাসবহুল জীবনযাপন করছেন, তখন সেই শিক্ষার প্রয়োগ ঘটছে সাধারণ ঘর-পরিবারেও। কিন্তু সময় এসেছে আত্মশুদ্ধির। কারণ, পরিবারের সদস্যরা প্রত্যেকে প্রত্যেকের দুর্বলতা কিংবা ঘরে কোথায় কী আছে সব জানেন। তাই গৃহবিবাদের কারণে যদি সেই ভাঙা বেড়াটা বাইরের লোকেরা জেনে যায়, তাহলে সমূহ বিপদ! অতএব সাবধান।

হিন্দি টেলিসিরিয়ালে দেবজ্যোতি মিশ্রের সুরে গান গেয়ে সাফল্য পেলেন প্রান্তিক এবং শালিনী

দুই প্রতিভাবান সঙ্গীতশিল্পী শালিনী মুখোপাধ্যায় এবং প্রান্তিক শুর এখন উপভোগ করছেন সাফল্যের আনন্দ। কারণ, তাঁদের গাওয়া তিনটি হিন্দি টেলিসিরিয়ালের টাইটেল সং এবং থিম সং সারা দেশের শ্রোতাদের মন জয় করে নিয়েছে।

কালার্স চ্যানেল-এর হিন্দি ধারাবাহিক ‘দুর্গা’, স্টার প্লাস-এর হিন্দি ধারাবাহিক ‘ঝনক’ এবং স্টার প্লাস-এরই ‘রাব রাখা’ হিন্দি ধারাবাহিকের টাইটেল সং এবং থিম সং গেয়ে অভাবনীয় সাফল্য পেয়েছেন শালিনী এবং প্রান্তিক। ‘দুর্গা’ ধারাবাহিক-এ ব্যবহৃৎ ‘দিল কি রাহো পে’ গানটি লিখেছেন চয়নিকা দত্ত গুপ্ত। সুরারোপ করেছেন দেবজ্যোতি মিশ্র। ‘তানহা সা দিল মেরা’ গানটিও লিখেছেন চয়নিকা এবং সুরারোপ করেছেন দেবজ্যোতি। এই গানটি ব্যবহার করা হয়েছে স্টার প্লাস-এর হিন্দি ধারাবাহিক ‘ঝনক’-এ। ‘রাব রাখা’ গানটি ব্যবহার করা হয়েছে স্টার প্লাস-এর হিন্দি ধারাবাহিক ‘রাব রাখা’-তে। গানটির রচয়িতা চয়নিকা এবং সুরারোপ করেছেন দেবজ্যোতি। আপাতত এই তিনটি টেলিসিরিয়ালে গান গেয়েই বিখ্যাত হয়ে উঠেছেন প্রান্তিক এবং শালিনী।

প্রান্তিক আঠারো বছর বয়সে শুরু করেছিলেন তাঁর সংগীত-সফর। শালিনী  জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করেন  একটি ট্যালেন্ট হান্ট শো-তে অংশ নিয়ে।

শালিনী মুখোপাধ্যায় এবং প্রান্তিক শুর-এর এই সাফল্যে উচ্ছ্বসিত প্রখ্যাত সুরকার দেবজ্যোতি মিশ্র। গর্বের সঙ্গে সেকথা তিনি জানিয়েছেন এক প্রেস বিজ্ঞপ্তি-র মাধ্যমে। সাফল্যের আনন্দও ভাগ করে নিয়েছেন শালিনী এবং প্রান্তিকের সঙ্গে। জানানো হয়েছে, এই দুই প্রতিভাবান শিল্পী তিনটি প্রধান জাতীয় টিভি সিরিয়ালের টাইটেল ট্র্যাকে তাঁদের কণ্ঠ দিয়েছেন এবং শ্রোতাদের মুগ্ধ করেছেন। তাই দেবজ্যোতি আবেগপ্লুত হয়ে জানিয়েছেন, ‘ভারতীয় সংগীতের জগতে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে বলে আমি মনে করি। কারণ, শালিনী ও প্রান্তিকের হৃদয়গ্রাহী সংগীত পরিবেশনে টেলিভিশনের শ্রোতারাও আমার মতো মুগ্ধ এবং আপ্লুত হয়েছেন।’

হিন্দি টেলিসিরিয়ালের টাইটেল সং এবং থিম সং-এর অবিশ্বাস্য এই সাফল্যের কৃতিত্ব একা নিতে চাননি সুরকার দেবজ্যোতি মিশ্র। দীর্ঘদিনের বন্ধু এবং প্রযোজক-পরিচালক শৈবাল বন্দ্যোপাধ্যায়-এর সঙ্গে এই সাফল্য ভাগ করে নিয়েছেন দেবজ্যোতি মিশ্র। তিনি জানিয়েছেন, ‘সবই সম্ভব হয়েছে শৈবালের সহযোগিতায়।’

সংগীতশিল্পী প্রান্তিক শুর প্রসঙ্গত জানিয়েছেন, ‘দেবুদা’(দেবজ্যোতি মিশ্র) আমাকে আমার নিজের মতো করে গান গাওয়ার স্বাধীনতা দিয়েছেন। বিশেষকরে, ‘দিল কি রাহো পে’-তে আমি আমার মতো করে রোমান্টিক টোনের সঙ্গে রাজস্থানী লোকগানের ছোঁয়া রাখার চেষ্টা করেছি। প্রতিবার আমি আমার স্টেজ শো-তে এই গানটি পরিবেশন করি। সারা ভারতে এবং বিদেশে, শ্রোতারা এই গানটির সঙ্গে এখন ভীষণ কানেক্টেড। অন্যদিকে, ‘রাব রাখা’ শিরোনামের গানটি আমার জন্য খুব-ই চ্যালেঞ্জিং ছিল। কারণ, এটির জন্য ক্লাসিক্যাল উপাদান এবং একটি আধুনিক শৈলীর সঙ্গে মিশ্রিত উপস্থাপনার প্রয়োজন ছিল। আর ‘তানহা সা দিল মেরা’ গানটি প্যাথোসে ভরা এবং দেবু-দা’ আমার পরিবেশনায় খুব খুশি হয়েছেন।’

অন্যদিকে শালিনী জানিয়েছেন, ‘এই গানগুলো ক্রিয়েট করার সময় দেবু-দা’র সঙ্গে বসে গাইতে গিয়ে, কখনও ভাবিনি গানটা লক্ষ-লক্ষ মানুষের হৃদয় ছুঁয়ে যাবে! যখনই আমি এই গানগুলো গাই কোনও স্টেজ শো-তে, তখন শ্রোতারাও আমার সঙ্গে কণ্ঠ মেলান। শুধু তাই নয়, গানের শেষে উচ্ছ্বসিত করতালির মাধ্যমে শ্রোতারা তাদের ভালোলাগা ব্যক্ত করেন। তাই এই সাফল্যের জন্য শৈবাল দা’ (শৈবাল বন্দ্যোপাধ্যায়) এবং দেবু-দা’ দুজনের কাছেই আমি কৃতজ্ঞ।’

পড়ার জন্য সীমাহীন গল্প-নিবন্ধসাবস্ক্রাইব