ধর্মকে মাধ্যম করে বোকা বানানো সহজ

আমাদের সমাজে আজও মেয়েদের ছোটো থেকেই শেখানো হয় যে, পূজাপাঠ, প্রার্থনা এবং ভাগ্য করে জন্মালে তবেই ধনী হওয়া যায়। আর ছোটো থেকে এইসব শিক্ষা নিতে-নিতে মেয়েদের মনে এমন বিশ্বাস জন্ম নেয় যে, ব্রত, উপবাস, মন্দিরে পূজাপাঠ প্রভৃতি করলেই পরীক্ষায় নাম্বার বাড়বে, সৌন্দর্য বাড়বে, ভালো জীবনসঙ্গী পাওয়া যাবে এবং অর্থযশও আসবে। ছোটোবেলার এই শিক্ষা বড়ো হয়ে ভুল মনে হলেও, সহজে মস্তিষ্ক থেকে মুছে ফেলতে পারেন না অনেকেই।

আজকাল সোশ্যাল মিডিয়া-র যুগেও ব্রেনওয়াশ চলছে একই ভাবে, শুধু বদলেছে ধরনটা। সোশ্যাল মিডিয়ায় এখন যে-কেউ হয়ে যাচ্ছেন মোটিভেশনাল স্পিকার। আর ওইসব মোটিভেশনাল স্পিকাররা যদি বলেন ‘এই ৭-টি কাজ করুন, জীবন সুখময় হবে’, তাহলে সেই কথা-ই বিশ্বাস করে নিচ্ছেন ছোটোবেলায় মগজধোলাই হওয়া মেয়েরা। শিক্ষিত মেয়েরাও অনেকে বিচার-বুদ্ধি দিয়ে, যুক্তি দিয়ে ভেবে দেখছেন না, কোন কথাটা সঠিক, আর কোনটা ভুল বা বুজরুকি!

এখন মনে হয়, বর্তমানে প্রতারণা আরও যেন সহজ হয়ে উঠছে। আগে তাও ধান্দাবাজরা সরাসরি ধর্মকে বিক্রি করতেন মগজ ধোলাই করে। সেই প্রক্রিয়া খুব সহজ ছিল না কিন্তু এখন অডিয়ো-ভিস্যুয়াল মাধ্যমে সহজেই মানুষের মনে প্রভাব বিস্তার করতে পারছে প্রতারকরা।

প্রতারকরা নিজেদের সাজানো লোক দিয়ে এমন ভাবে সোশ্যাল মিডিয়া-র পোষ্টে লাইক কিংবা কমেন্ট করাচ্ছে যে, অনেকেই সে-সবে প্রভাবিত হয়ে প্রতারিত হয়ে চলেছেন। বিনিয়োগ করা অর্থ খুব কম সময়ের মধ্যে ৫-৬ গুন হয়ে যাবে, এমন লোভের ফল ভুগছেন অনেকে। নিজের বোকামোর কারণে ৪৮ লক্ষ টাকা প্রতারিত হয়ে দিল্লির এক তরুণী শেষ পর্যন্ত থানায় গিয়ে পুলিশের সাহায্য চেয়েছেন।

মনে রাখবেন, সবচেয়ে বেশি লোক ঠকানো হয় ধর্মকে মাধ্যম করে। কারণ, ধর্মের মধ্যেই ‘ভয়’ শব্দটা লুকিয়ে আছে কিংবা বলা যায়, ধর্ম করলেই জীবনের সমস্ত স্বপ্ন পূরণ হবে, এমন ধারণা থেকেও প্রতারকদের ফাঁদে পা দেন অনেকে। ‘১ টাকা দান করে পূণ্যার্জন করলে ১০টাকা পাবে’–এমনটা বুঝিয়েই সর্বস্ব লুট করছে ধর্মের দোকানদাররা।

আসলে ধর্মীয় ভাবে যে যত দুর্বল হবে, মানসিক ভাবেও সে ততই দুর্বল হয়ে পড়বে। আর এই সুযোগকে সহজেই কাজে লাগাবে প্রতারকরা। মনে রাখবেন, সোশ্যাল মিডিয়ায় একবার প্রতারিত হলে, প্রতারককে খুঁজে পাওয়া খুব সহজ নয়। কারণ, এখানে প্রযুক্তিকে মাধ্যম করে লুটপাট চলে। সঠিক নাম, ঠিকানা কিংবা ছবি, কিছুই থাকে না প্রতারকের। তাই প্রতারককে চিহ্নিত করে শাস্তি দেওয়া পুলিসের পক্ষেও কঠিন হয়ে পড়ে। অতএব, ডানা মেলে উড়ে গিয়ে আগুনের উপর পড়ার আগে একটু সতর্ক হোন, নিজের ভালোমন্দ বুঝতে শিখুন।

ক্যান্সারের চিকিৎসায় রোবোটিক সার্জারি কতটা সুফলদায়ক?

বিভিন্ন কারণে মানুষের শরীরে বাসা বাঁধছে রোগজীবাণু। তাই, সাধারণ অসুখ থেকে শুরু করে জটিল রোগে হামেশাই আক্রান্ত হচ্ছেন অনেকে। এরমধ্যে কেউ যদি ক্যান্সারে আক্রান্ত হন, তাহলে দুশ্চিন্তার মাত্রা বাড়তে থাকে। কারণ, ক্যান্সার মানেই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মৃত্যু ভয় তাড়া করে বেশিরভাগ রোগীকে। কেউ ক্যান্সারে আক্রান্ত হলে, পরিবারের সদস্যরাও শান্তিতে ঘুমোতে পারেন না নানা কারণে। আর্থিক দুশ্চিন্তা ছাড়াও, সঠিক চিকিৎসা হচ্ছে কিনা, সেই ব্যাপারেও থাকে অজানা আশঙ্কা।

ওষুধ, কেমোথেরাপি নাকি সার্জারি—কোন মাধ্যমে রোগীর কষ্ট দূর হবে, সেই চিন্তা থাকে রোগী থেকে শুরু করে রোগীর আত্মীয়স্বজন সবার। যদি সার্জারির প্রয়োজন হয়, তাহলে কী ধরণের সার্জারি সুফলদায়ক হবে, তা নিয়েও থাকে দ্বিধাদ্বন্দ্ব। আর এইসব বিষয় মাথায় রেখেই, ক্যান্সার চিকিৎসায় চালু হয়েছে রোবোটিক সার্জারি।

ক্যান্সারের চিকিৎসার ক্ষেত্রে রোবোটিক সার্জারি কতটা নিখুঁত এবং সুফলদায়ক, এই বিষয়ে সঠিক বার্তা দিতে সম্প্রতি এক সাংবাদিক সম্মেলনের আয়োজন করেছিল কলকাতা-র নিউ টাউনের এইচসিজি ক্যান্সার সেন্টার। এই উপলক্ষ্যে কলকাতা প্রেস ক্লাব-এ ‘দা ভিঞ্চি এক্স’ রোবটটিও লঞ্চ করা হয় আনুষ্ঠানিক ভাবে। আর এই সাংবাদিক সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন বোবোটিক অনকো-সার্জারি বিশেষজ্ঞরা। এই তালিকায় ছিলেন এইচসিজি ক্যান্সার সেন্টার-এর এইচওডি ও সিনিয়র কনসালট্যান্ট এবং হেড অ্যান্ড নেক অনকোলজির বিশেষজ্ঞ ডা. রাজীব শরণ, জিআই অনকোলজির পরামর্শদাতা এবং বিশেষজ্ঞ ডা.  এস কে বালা, এইচওডি ও সিনিয়র কনসালট্যান্ট এবং সার্জিক্যাল ইউরো অনকোলজির বিশেষজ্ঞ ও সার্জিক্যাল ইউরো অনকোলজির বিশেষজ্ঞ ডা. গৌরব আগরওয়াল,  স্ত্রীরোগ ও প্রসূতি রোগবিদ্যা বিশেষজ্ঞ ডা. সুব্রত দেবনাথ, পরামর্শদাতা এবং বিশেষজ্ঞ থোরাসিক সার্জন ডা. প্রিয়া এশপুনিয়ানি, সহযোগী পরামর্শদাতা এবং GI সার্জিক্যাল অনকোলজির বিশেষজ্ঞ ডা. করণ সেহগাল প্রমুখ। এঁরা সকলেই ক্যান্সারের চিকিৎসায় রোবোটিক সার্জারির উল্লেখযোগ্য সুবিধার উপর আলোকপাত করেন।

‘হেলথ কেয়ার গ্লোবাল’-এর আঞ্চলিক ব্যবসায়িক প্রধান (ইস্ট অ্যান্ড এপি) প্রতীক জৈন প্রসঙ্গত জানিয়েছেন, ‘এইচসিজি যে রোবোটিক অনকো কনক্লেভ-এর আয়োজন করেছে, তা হল শহরের ক্যান্সার বিশেষজ্ঞদের দলকে, ক্যান্সার রোগীদের সর্বোত্তম চিকিৎসার জন্য চিকিৎসা বিজ্ঞানের উন্নয়নের সঙ্গে রোবোটিক্সের শক্তিকে কীভাবে কাজে লাগানো যায়, সেই বিষয়ে আলোকপাত করবে। এইচসিজি ক্যান্সার সেন্টার ‘দা ভিঞ্চি এক্স’ রোবোটিক সার্জারি সিস্টেম চালু করেছে। যা  ক্যান্সারের রোগীদের সার্জারির সময়কে কমিয়ে আনবে এবং ক্যান্সারের রোগীদের দ্রুত আরাম দেবে।’

এইচসিজি ক্যান্সার সেন্টার-এর সিওও অমরজিৎ সিং জানিয়েছেন, ‘এই কনক্লেভ নিঃসন্দেহে এই বার্তা ছড়িয়ে দেবে যে, ক্যান্সারের চিকিৎসা এবং যত্নের জন্য সর্বাধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তিকে কীভাবে কাজে লাগানো হচ্ছে।’

‘দা ভিঞ্চি এক্স’ রোবোটিক-সার্জারি সিস্টেমটি নিখুঁত এবং নির্ভুল সার্জারি সম্পাদনে সার্জনদের সহায়তা করে চলেছে বলেও জানানো হয়েছে সাংবাদিক সম্মেলনে। এটিতে উন্নত EndoWrist প্রযুক্তি-সহ রোবোটিক-হ্যান্ড রয়েছে, যা শরীরের হার্ড-টু-রিচ এরিয়ায় সুনির্দিষ্ট ভাবে সার্জারির সুবিধা দেয়। সার্জনরা কনসোল থেকে কিছুটা দূরে বসে রোবোটিক সার্জারি সিস্টেম নিয়ন্ত্রণ করেন। এক্ষেত্রে রোবোট 3D ভিউ প্রদান করে এবং অস্ত্রোপচারে সুবিধে হয়।

বৃত্ত যখন ছোটো (শেষ পর্ব)

নারকেলনাড়ু খেতে খেতে মল্লিকা বলল, ‘তুই এসেছিস আমি খুব খুশি হয়েছি। চোখে দেখতে তো পাই না কিন্তু অন্তর দিয়ে তোকে খুব ভালো করে দেখতে পাচ্ছি। আর আশীর্বাদ করছি এবারে একটা সুন্দর মনের মেয়ে দেখে তোর বিয়ে হোক। খুব সুখী হবি তুই।’

রাজেশ বলল, ‘ওসব কথা থাক। এবার আমি তোমাকে এখান থেকে নিয়ে যাব আমাদের বাড়িতে। আগামীকাল তুমি তৈরি হয়ে থাকবে। মা আছেন, বাবা আছেন, তুমিও থাকবে আমার সঙ্গে। তোমার কোনও সমস্যা হবে না। আমি এখন তোমাদের আশীর্বাদে সবার দায়িত্ব নিতে পারি।’ মল্লিকা হো হো করে হেসে উঠল।

—ধুর পাগল! এই বয়সে আর কোথাও যাব না রে! উপরওলার দিকে পথ চেয়ে বসে আছি।

—তুমি এমন কথা বললে কিন্তু আমি আর আসব না জেঠিমা।

-আচ্ছা ঠিক আছে। এই মুখে কুলুপ দিলাম! আজ আমি খুব খুশি।

আজ বুধবার। সকাল সকাল রাজেশ বাড়ি থেকে বেরিয়ে এল। রাজেশ গাড়িটা বৃদ্ধাশ্রমের সামনে রাখল। বড়ো আনন্দের দিন আজ। যার আশ্রয়ে ও শিক্ষায় নিজে বিকশিত হয়েছে পৃথিবীর বুকে, আজ তাকে নিজের হাতে যত্ন করে সেবা করতে চায় সে। সঙ্গে মাস্টারমশাই ও মা-বাবা-ও এসেছেন সেন বউদিকে নিজেদের কাছে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে। গেট পেরোতে ভিড় উপচে পড়ছে। বয়স্কা আলো মুখার্জি রাজেশকে দেখে এগিয়ে এল। কাঁদতে কাঁদতে বলল, ‘তোমার জেঠিমা আজ কাকভোরে চলে গেলেন। ওনার ছেলে এসেছে কিন্তু উনি শেষ ইচ্ছে আমাদেরকে জানিয়ে গেছেন।”

আলো মুখার্জি আঁচলের গিট খুলে মোটা হীরের নেকলেস রাজেশের হাতে দিয়ে বলল, “এটা দিদি তোমাকে দিতে বলেছেন। তাঁর পূর্বপুরুষের সম্পত্তি যা বহু কষ্ট করে ছেলের হাত থেকে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন। আর একটা ইচ্ছে প্রকাশ করেছেন। তুমি যেন তাঁর মুখাগ্নি করো, তবেই তাঁর আত্মার শান্তি মিলবে।’

—কিন্তু আমি তো গতকালই জেঠিমার সঙ্গে দেখা করে গেলাম, ঠিকই তো ছিলেন… হঠাৎ কী হল?

—আমাদের এই বয়সে মৃত্যু হঠাৎই আসবে বাছা। দিদির ঘুমের মধ্যে স্ট্রোক হয়েছিল।

চেক আপ করলাম। গ্রামের মাস্টারমশাই রাজেশকে বললেন, ‘বউদির শেষ ইচ্ছে তুমি পূর্ণ করো।”

মায়ের খবর পাওয়া মাত্রই নীল (নীলায়ন সেন) জামশেদপুর থেকে সোজা গাড়ি চালিয়ে এসেছে। পথে আসতে আসতে মনে হল এবার থেকে আর আশ্রমে টাকা পাঠাতে হবে না। কিছুটা স্বস্তি পাওয়া গেল! কিন্তু আশ্রমে এসে বহুদিন পর মাকে দেখে কোথা থেকে ঘনীভূত হওয়া জলীয় বাষ্প হুহু করে অন্তর কাঁপিয়ে তুলল। চারিদিক থেকে যেন মায়ের স্বর প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরে ফিরে আসছে—

“বাবু খেয়েছিস তো? কী ভীষণ পরিশ্রম করতে হচ্ছে আজকাল তোকে ! কত রোগা হয়ে গেছিস! আমাকে একবার তোর ফ্ল্যাটে নিয়ে যাবি? বউমার কোনও কষ্ট হবে না, আমি সব করে দেব। তোদের দেখেই তো আমার শান্তি।’ নীল দুই হাতে কান বন্ধ করল। আবার আস্তে করে হাত আলগা করতে শুনতে পেল, ‘এত চিন্তা করিস না, চাকরিটা ঠিক পেয়ে যাবি।’

অস্থির দলা পাকানো কষ্টটা তোলপাড় করে দিচ্ছে বুকের ভিতরে। শিরা-উপশিরা পাঁজর ভেঙে যেন রক্তের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে যন্ত্রণা। হিম হয়ে আসছে শরীর। অথচ এতদিন একবারও এমন ভাবে মাকে মনে পড়েনি তো। আজ যেন পৃথিবীটা বড়ো শূন্য। কোথায় একটা বিশাল বড়ো ক্ষতি হয়ে গেছে। নীল চোখের জল আটকে রাখতে পারল না। মায়ের পা ছুঁয়ে অঝোরে কাঁদতে কাঁদতে ভেঙে পড়ল।

রাজেশ কাছে এসে বলল, ‘নীলদাদা তুই যদি চাস তাহলে তুই জেঠিমার মুখাগ্নি করতে পারিস। আর এই বহুমূল্য হীরের নেকলেসটা তুই রাখ। এটা তোর সম্পত্তি।’

নীল বলল, ‘না ভাই, আমি বেঁচে থাকতে মায়ের জন্য কিছু করিনি। মা যখন এই দায়িত্ব তোকে দিয়ে গেছে তুই কর। আর এই উপহার মা তোকে দিয়েছেন, আমি এর যোগ্য নই। যে-সন্তান বেঁচে থাকতে মায়ের যত্ন নেয় না, সে এক পাপিষ্ঠ। মা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়ে গেছেন আমি তার কত বড়ো অপদার্থ ছেলে।’

মল্লিকা সেনের নিথর দেহের সামনে ধূপ জ্বলছে। আশ্রমবাসী একে একে রজনীগন্ধার মালায় শেষ শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন করছেন।

মাস্টারমশাই সামনে আসতেই নীল বলল, ‘আমাকে শাস্তি দিন মাস্টারমশাই। আমি ঘোর অন্যায় করেছি। তাইতো মা আমাকে মুখাগ্নি করতেও বারণ করে গেছেন। বেশ, মা যা বলে গেছেন তাই হবে। মায়ের মুখাগ্নি রাজেশ করবি, আমি পাশে থাকব। এতদিন চরম সংকীর্ণতা ও ততধিক লোভ মনের মধ্যে প্রবেশ করেছিল যে, মায়ের দিকে ফিরেও তাকাইনি। আমি আকাট মূর্খ, আমি শয়তান। আজ নিজেকে ধিক্কার জানাই!’

মাস্টারমশাই বললেন, ‘নীল তুমি বউদির মতো মানুষকে অশ্রদ্ধা করেছ। এটা তোমার ঘোর অন্যায়। এই অন্যায়ের ক্ষমা হয় না। ছেলে হিসেবে কোনও কর্তব্য পালন করোনি। একদিন আমি তোমাকে ক্লাসের ফার্স্ট বয় মনে করতাম। তোমাকে ক্লাসে সামনে বসাতাম, রাজবাড়ির ছেলে বলে নয়, তুমি মেধাবী ছিলে বলে। আমি ভেবেছিলাম তোমার মেধায় তুমি আকাশ জয় করবে। তোমার বুকে অসংখ্য নক্ষত্ররা স্থান পাবে। পৃথিবীর মানুষ তোমাকে মাথা উঁচু করে দেখবে। তোমার আলোয় তুমি সবাইকে ভরিয়ে রাখবে। অথচ আজ চারদিকে চেয়ে দ্যাখো— এতজন মানুষের চোখে তোমার জন্য কত ঘৃণা জন্মেছে। তোমাকে এঁরা কত গালিগালাজ করছে। তাচ্ছিল্য করছে। তুমি কতটা খারাপ হয়ে গেছ! এত পেয়েছ তুমি তাও তোমার মনে শান্তি নেই। তোমার পরিসর তো বেশ ব্যাপ্ত ছিল, তবু তোমার বৃত্ত এত ছোটো ছিল কেন বলতে পারো?’

নীল বাকরুদ্ধ হয়ে মল্লিকা সেনের নিথর দেহের পাশে স্তব্ধ হয়ে বসে আছে। একনাগাড়ে ফোন বেজে চলেছে, তবু কোনওদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই। মায়ের মুখের দিকে চেয়ে নিজের কৃতকর্মের জন্য কাতর ক্ষমা প্রার্থনা করছে সবার অলক্ষ্যে!

(সমাপ্ত)

বৃত্ত যখন ছোটো (পর্ব-০১)

—এসকিউজ মি! মল্লিকা সেনের ঘরটা কোথায়, একটু বলতে পারেন?

অফিসঘর থেকে ম্যানেজার রমানাথবাবু দোতলায় উঠে আসতে বললেন। রুম নাম্বার ৪০৮? রাজেশ দত্ত বড়ো উৎসুক হয়ে জিজ্ঞেস করল।

আটাত্তর বছরের বৃদ্ধা আলো মুখার্জি আপাদমস্তক নিরীক্ষণ করে বললেন, ‘কেন মল্লিকাদি আপনার কে হয়? এতদিন পর এসেছেন তাঁর খোঁজ নিতে? মানুষটি তো প্রায় শেষ হয়ে যেতে বসেছেন।’

লম্বা সুদর্শন যুবকটি বলল, ‘আমি ওঁর নিজের ছেলে নই, তবে ছেলের মতোনই, জেঠিমার খোঁজ নিতে এসেছি।’

বৃদ্ধা রাগ সংবরণ করে বললেন, ‘আমার নাম আলো মুখার্জি। আমি ভেবেছিলাম তুমি ওঁর ছেলে।’ রাজেশ মুচকি হাসল।

বৃদ্ধা বললেন, ‘আসলে আমরা সবাই ঠিক করেছি ওঁর ছেলে এলে বলব যে, মাকে এত কষ্ট কখনও দিতে নেই। ভগবান যদি উপরে থাকেন তিনি ঠিক বিচার করবেন। দিদি যখন প্রথমে আশ্রমে এসেছিলেন তখন আমাদের সঙ্গে গান, গল্প, আড্ডায় জমিয়ে রাখতেন। দু’বছর আগে সিঁড়ি থেকে পড়ে চোখ দুটো চলে গেল। ম্যানেজার কতবার ফোন করেছিল কিন্তু ছেলে কিছুতেই এল না। সেই সময় চোখের চিকিৎসাটা করলে দিদির চোখটা ঠিক হয়ে যেত। সারাক্ষণের জন্য একটি লোক রাখাতেও আপত্তি ছিল। ম্যানেজার ধমক দিতে অবশেষে লোক রাখল। এখন দিদি কেবল চার দেয়ালের মধ্যে স্বামীর ছবি আঁকড়ে এক মনে বসে থাকেন। কারও সঙ্গে কথা বলতে চান না। এত বড়ো বাড়ির বউ ছিলেন, কত গুণী মানুষ, আর সেই মাকে কিনা এভাবে অত্যাচার? বাড়ি নিয়েছিস, সম্পত্তি নিয়েছিস, সবই ভুল বুঝিয়ে কেড়ে নিয়েছিস। সব মানলাম না হয়! মায়ের সঙ্গে মাঝেমধ্যে কথা তো বলতে পারিস। এখানকার ব্যবস্থা যত ভালোই হোক তবু মায়ের কাছে একবার তো আসবি! মায়ের মন বলে কথা! তোকে জন্ম দিয়েছেন, পৃথিবীর আলো দেখিয়েছেন, তাঁর প্রতি কোনও কৃতজ্ঞতা নেই? দেখতে দেখতে ছয় বছর হয়ে গেল একবারও আসেনি। একজন আত্মীয়স্বজনও না। এই প্রথম তুমি দিদির খোঁজ নিতে এলে। তাই খুব অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। আমাদের সবারই যন্ত্রণা আছে। অনেক কষ্ট চেপে আমরা বৃদ্ধাশ্রমে থাকি, তারপর সবাই মিলে নিজেদের দুঃখ ভাগ করে একে অপরের আশ্রয় হয়ে দাঁড়াই। একটা সময় পর সংসারের ঘানি টানতে টানতে আমরা তোমাদের কাছে বোঝা হয়ে উঠি। তোমরা যখন এই শেষ বয়সে অসহায় অবস্থায় আমাদের একা ফেলে দাও তখন আমরা এভাবেও মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করি। কিন্তু আমাদেরও তো ইচ্ছা হয় বাড়ির লোকের ভালোবাসার ছোঁয়া পেতে। মাসে অন্তত একবার দেখা করতে এসে একটু ভালো মন্দ রান্না আমাদের জন্য যদি কেউ করে আনে! যদি মাঝে মাঝে ফোনে খোঁজখবর নেয়, এইটুকু কি অনেক বেশি চাওয়া?’

এই পর্যন্ত বলে শাড়ির আঁচল দিয়ে চোখ মুছলেন আলো মুখার্জি। কথাগুলো শেষ করে একটি ঘরের বাইরে এসে দাঁড়ালেন।

—এই যে ৪০৮ নম্বর রুম, তুমি কড়া নাড়ো, আমি যাই। আমার আবার ঘর খোলা রেখে এলাম তো !

ঘরে কড়া নাড়তেই মহিলার গুরুগম্ভীর কণ্ঠস্বর ভেসে উঠল— ‘কে আপনি?”

রাজেশ বলল, ‘আমি মল্লিকা সেনের নিকট আত্মীয়, একটিবার দরজা খুলে দিন।’

ভিতর থেকে রাসভারী মহিলা দরজা খুলে দিলেন। ‘হ্যাঁ, দিদি এই ঘরে আছেন, আসুন। ওই যে দেখুন জানলার কাছে দাঁড়িয়ে আছেন।’

—ও দিদি একবার এদিকে এসো। তোমার সঙ্গে একজন দেখা করতে এসেছেন।

মল্লিকা ধীরে ধীরে মুখ ঘোরাল। মল্লিকার করুণ স্নেহমাখা দুটি চোখ দেখে নোনাজল নেমে এল রাজেশের গাল, চিবুক বেয়ে। ছুটে গিয়ে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করতেই মল্লিকা বলে উঠল, ‘কে, রাজেশ ? আমার রাজু এসেছিস?’

রাজেশ বলল, ‘জেঠিমা, তুমি আমাকে না দেখে চিনতে পারলে? আমি যে ছোটোবেলা থেকে তোমাদের আশ্রিত। তোমাদের বাড়ির কেয়ারটেকার মোক্ষদা ও রমানাথের ছেলে। তোমাদের জন্য আমি লেখাপড়া শিখেছি। এই চত্বরে হাসপাতালের দায়িত্ব আমার উপর এসে পড়েছে, আমি এখানকার ডাক্তার। আমার এই জীবন সবই তোমার দান।’

—বুকে আয় বাবা। মল্লিকা ঝরঝর করে কাঁদতে লাগল।

রাজেশ বলল, ‘কিন্তু আমি তোমার এই অবস্থা কোনওভাবেই মেনে নিতে পারছি না। আমি শুনেছিলাম নীলদাদা তোমাকে ছয় বছর আগে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে এসেছে। নীলদা’কে আমার মা অনেকবার জিজ্ঞেস করেছেন। কিন্তু দাদা আমাদের কাউকে কিছু বলেনি। তারপরে গ্রামের মাস্টারমশায়ের থেকে একদিন জানতে পারি তুমি এখানে আছো। শুনলাম দাদা তোমার অত বড়ো রাজবাড়িটাও বিক্রি করে দিয়েছে।’

মল্লিকা হাউহাউ করে কেঁদে উঠল। ‘আমি অপারগ, কিছু বাঁচাতে পারলাম না! ওটা আমার শ্বশুরবাড়ির পূর্বপুরুষের ভিটে ছিল। নীল টাকার লোভে সবকিছু ভুল বুঝিয়ে আমাকে দিয়ে লিখিয়ে নিয়েছে। ছেলের মিষ্টি কথায় এত অন্ধ হয়ে গিয়েছিলাম যে, আমি না পড়েই সব সই করে দিয়েছি। আমিই দোষী!’

রাজেশ বলল, ‘এভাবে বোলো না তুমি। আমার কাছে তুমি ঈশ্বরী। এই নাও নারকেলনাড়ু মা পাঠিয়েছে।’

—নারকেলনাড়ু তোর মা বানিয়েছে? কতদিন পরে ভালোবাসার মানুষের হাতের ছোঁয়া পাচ্ছি। আমি বিজয়া দশমীতে, লক্ষ্মীপূজায় নাড়ু বানাতাম। তোর মা-ও সঙ্গে থাকত।

—জানি তো, সব মনে আছে। রাজেশ চোখ মুছে বলল।

(ক্রমশ…)

গানে-গানে কলকাতা-র মঞ্চ মাতাতে আসছেন সোনু নিগম

‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা’-র (AI) যুগে বদলে গেছে ভালোবাসা-র সংজ্ঞা। এখন প্রেম-ভালোবাসা আর নীরবে হয় না বললেই চলে। সবকিছুই এখন উদযাপিত হয় আনুষ্ঠানিক ভাবে। অন্তত ‘প্রেম দিবস’ বা ‘ভ্যালেন্টাইনস ডে’ তো তাই প্রমাণ করে। তাই এই প্রেম দিবসে গোলাপ ফুলের চাহিদা যেমন বাড়বে, ঠিক তেমনই হই-হুল্লোড়ের মধ্যে দিয়ে দিন-রাত মেতে উঠবেন প্রেমিক-প্রেমিকারা। খানাপিনা-র পাশাপাশি নাচে-গানে উপভোগ্য করে তোলার প্রয়াস জারি থাকবে দিন-রাত।

বলা বাহুল্য, আর মাত্র কয়েকদিনের অপেক্ষা, তারপরই আসছে সেই প্রেমের দিন কিংবা বলা যায় প্রেম উদযাপনের দিন—‘ভ্যালেন্টাইনস্ ডে’। ১৪ ফেব্রুয়ারি তরুণ-তরুণীরা মেতে উঠবেন ভালোবাসা-র উৎসবে। আর ঠিক তার আগেই তৈরি হয়ে যাবে প্রেমের উপযুক্ত আবহ। অর্থাৎ, প্রেম-দিবসকে উপলক্ষ্য করে, ৯ ফেব্রুয়ারি সংগীত-মুখরিত হবে কলকাতা।

আসলে, প্রেম-দিবসের প্রাক্কালে কলকাতা শহরকে গানে-গানে ভালোবাসায় ভরিয়ে দিতে আসছেন রোমান্টিক কণ্ঠের বাদশা সোনু নিগম। তিনি তাঁর কণ্ঠের মিষ্টতা ছড়িয়ে দেবেন ‘অ্যাকুয়াটিকা’-র মঞ্চে। সোনুর গানের সুন্দর এই অনুষ্ঠানটির আয়োজক ‘বেঙ্গল ওয়েব সলিউশন’ এবং ‘হোয়াইট লাইট  ক্রিয়েশনস  প্রাইভেট লিমিটেড’।

নব্বইয়ের দশকে হিন্দি, বাংলা তথা ভারতীয় আরও নানা ভাষায় গান গেয়ে শ্রোতাদের হৃদয়ে পাকাপাকি জায়গা করে নেওয়া শিল্পী সোনু নিগম-কে ‘অ্যাকুয়াটিকা’-র মঞ্চে লাইভ পারফর্ম করতে দেখবেন জেনে নিশ্চয়ই খুশি হবেন প্রেমিক-প্রেমিকারা কিংবা বলা যায়  সোনুর ভক্তরা।

এদিকে বসন্তও জাগ্রত দ্বারে। আর সেই বসন্তের প্রেম দিবসের সন্ধ্যায় শ্রোতাদের মনকে পলাশ ফুলের রঙের মতো রাঙিয়ে দিতে আসছেন বলে এক ভিডিয়োবার্তায় নিজেই জানিয়েছেন সোনু নিগম। অতএব, সোনুর তরফ থেকে কলকাতাবাসী উপহার পাবেন তাদের ভালোলাগা গানের ডালি।

উল্লেখ্য, নব্বইয়ের দশক থেকে সমসাময়িক বিভিন্ন সংগীত পরিচালকের সুরে অনেক জনপ্রিয় গান উপহার দিয়েছেন সোনু নিগম। অনু মালিক,  যতীন – ললিত, আনন্দ-মিলিন্দ, এআররহমান, বিশাল-শেখর, শঙ্কর -এহসান-লয় সহ আরও অনেক সংগীত পরিচালকের সুরে গান গেয়ে ধারাবাহিক সাফল্য পেয়েছেন সোনু নিগম। বিনিময়ে ভারত সরকারের থেকে পেয়েছেন ‘পদ্মশ্রী’ সম্মান। মহম্মদ রফির অনুরাগী সোনুকে তাঁর যথার্থ উত্তরসূরিও বলা যায়।

আয়োজক সংস্থা ‘বেঙ্গল ওয়েব সলিউশন’-এর পক্ষ থেকে প্রশান্ত সরকার জানিয়েছেন, ‘এরকম খোলা মঞ্চে সোনু নিগমের অনুষ্ঠান সাম্প্রতিক অতীতে কলকাতায় হয়েছে বলে জানা নেই। এখনও পর্যন্ত ভালো সাড়া পাচ্ছি সোনুর ভক্তদের থেকে। কিছু দিন আর বাকি, আশা করছি ভালো দর্শক হবে।’ অন্যদিকে, আরও এক আয়োজক সংস্থা ‘হোয়াইট লাইট ক্রিয়েশনস’-এর আবীরা বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছেন, ‘শহর কলকাতার শ্রোতারা সোনুর জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন। হালকা শীতের আমেজ গায়ে মেখে, সোনু তাঁর সুরের জাদুর জাল বুনবেন।’ আর যাঁকে নিয়ে এতো কথা হচ্ছে, সেই সোনু নিগম স্বয়ং একেবারে বাংলায় জানালেন, ‘এবার আপনাদের ডাকে আমি আসছি ৯ ফেব্রুয়ারি ‘অ্যাকুয়াটিকা’-য়, দেখা হবে বন্ধুরা।’

আরও সহজ এবং সুবিধাজনক হয়ে উঠছে ডিজিটাল লেনদেন

ডিজিটাল ট্রানজাকশন ভারতের আর্থিক ব্যবস্থার দৃশ্যপটকে আমূল বদলে দিয়েছে। লেনদেনকে করেছে দ্রুত, নিরাপদ এবং সহজলভ্য। ইউপিআই-এর উত্থান এই পরিবর্তনের প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে, যা লক্ষ লক্ষ মানুষের জন্য পেমেন্টকে সহজ করে তুলেছে। এখন ইউপিআই নেপাল এবং ভুটানে সম্প্রসারিত হওয়ার ফলে, সীমান্ত পেরিয়ে যাতায়াতে ডিজিটাল লেনদেন আরও সহজ এবং সুবিধাজনক হয়ে উঠছে।

২০২৪ সালে, ভারত থেকে নেপালে সর্বোচ্চ সংখ্যক পর্যটক নেপাল ভ্রমণ করেছেন, এই বছর ২,৯৩,০০০-এর বেশি ভারতীয় পর্যটক নেপাল গেছেন। নেপাল এবং ভুটানের সীমান্তবর্তী অঞ্চলে বসবাসকারী অনেকের জন্য অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক বিনিময় একটি সাধারণ ঘটনা। তারা প্রায়ই সীমান্ত বাজারে পণ্য বিনিময় করেন এবং পর্যটন বা তীর্থযাত্রার উদ্দেশ্যে ভ্রমণ করেন। ইউপিআই-এর ক্রমবর্ধমান গ্রহণযোগ্যতা সীমান্তের ওপারে সংযোগের নতুন দ্বার খুলে দেবে, ভ্রমণ ও বাণিজ্যকে আরও সহজ এবং সাশ্রয়ী করে তুলবে বলে জানানো হয়েছে এক প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে।

সীমান্তের অপর প্রান্তেও ইউপিআই-এর গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধির মাধ্যমে বিদেশে লেনদেন এখন আরও সহজ এবং নগদবিহীন হয়েছে। এটি নগদ বহনের ঝুঁকি কমায় এবং সুরক্ষিত লেনদেনের সুযোগ দেয়। ভারতীয় পর্যটকরা তাদের বিদ্যমান ইউপিআই অ্যাপ, যেমন ভীম, গুগল পে, ফোনপে, পেটিএম এবং অন্যান্য ব্যবহার করে নেপালের মোবাইল পেমেন্ট নেটওয়ার্ক FonePay এবং ভুটানের রয়্যাল মনিটারি অথরিটি (RMA)-এর সঙ্গে যুক্ত মার্চেন্টদের কাছে পেমেন্ট করতে পারবেন।

আন্তর্জাতিক লেনদেনের জন্য ইউপিআই সক্রিয় করা এখন সহজ এবং নিমেষেই করা যায়। এরজন্য আপনার ইউপিআই অ্যাপ খুলুন। প্রোফাইল সেকশনে যান। আপনার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নির্বাচন করুন এবং ‘UPI International’ কিংবা ‘UPI Global’ অপশনটি খুঁজুন (যদি আপনার ব্যাংক এটি সমর্থন করে)। এবার ফিচারটি সক্রিয় করুন। যদি প্রয়োজন হয়, বৈধতার সময়সীমা নির্ধারণ করুন এবং আপনার ইউপিআই পিন ক্রিয়েট করুন।

আপনার ইউপিআই এখন আন্তর্জাতিক লেনদেনের জন্য প্রস্তুত। মনে রাখবেন, এই ফিচারটি আপনার ব্যাংক অ্যাকাউন্টের সঙ্গে সংযুক্ত প্রতিটি অ্যাপে আলাদা ভাবে সক্রিয় করতে হবে। নেপাল ও ভুটানের জনপ্রিয় গন্তব্যগুলিতে ইউপিআই ব্যবহার করুন। নেপাল প্রথম আন্তর্জাতিক বাজারগুলির মধ্যে একটি, যারা ইউপিআই গ্রহণ করেছে, এটি দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।

ভারতীয় গ্রাহকেরা নেপাল ভ্রমণের সময় রিয়েল-টাইম, নিরাপদ এবং সুবিধাজনক ইউপিআই পেমেন্ট করতে পারেন নির্বাচিত FonePay ব্যবহারকারী ব্যবসায়ীদের কাছে। এটি নেপালের জনপ্রিয় স্থানগুলিতে উপলব্ধ, যেমন লুম্বিনি মঠ এলাকা, চিতওয়ান, ঝাপা, পশুপতিনাথ মন্দির, ভাটভাটেনি খুচরা চেইন ইত্যাদি। এটি পর্যটকদের জন্য নগদবিহীন লেনদেনের সুবিধা প্রদান করে, ভ্রমণকে আরও আরামদায়ক করে তোলে।

ভারতীয় পর্যটকদের জন্য ভুটান একটি জনপ্রিয় গন্তব্য। এখানে, Royal Monetary Authority (RMA)-ব্যবহারকারী ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে ইউপিআই পেমেন্টের সুবিধা পাওয়া যাবে। থিম্পুর উইকএন্ড মার্কেটে কেনাকাটা করার সময় হোক বা উল্লেখযোগ্য হোটেলগুলোতে থাকার জন্য, পর্যটকরা তাদের পরিচিত ইউপিআই অ্যাপগুলির মাধ্যমে ভুটানে নগদবিহীন ও নিরাপদ লেনদেন উপভোগ করতে পারবেন।

NPCI-এর আন্তর্জাতিক শাখা NPCI International Payments Limited (NIPL), এখনও পর্যন্ত সাতটি দেশে ইউপিআই গ্রহণযোগ্যতা সক্রিয় করেছে। এই দেশগুলি হল শ্রীলংকা, মরিশাস, ফ্রান্স (নির্বাচিত ব্যবসায়ী), সংযুক্ত আরব আমিরশাহী (UAE) এবং সিঙ্গাপুর। আর যত বেশি মানুষ ইউপিআই-র সুবিধা নেবেন, ততই ক্যাশ ক্যারি করার ঝুঁকি কমবে।

বর্ণময় ফ্যাশন শো-এ আত্ম-প্রেম জাগিয়ে তুললেন একঝাঁক মডেল

হিরে বসানো সুন্দর একটি অলংকার যেমন মন জিতে নেবে, ঠিক তেমনই স্মরণীয় করে রাখবে ভালোবাসার মুহূর্ত।  বলা বাহুল্য, ভালোবাসা, সুখ এবং শক্তির প্রতীক—হিরে। জীবনের বিশেষ মুহূর্তগুলিকেও মনে করিয়ে দেয় এই রত্ন। তাই,বহু শতাব্দী ধরে চিরন্তন প্রেম এবং প্রতিশ্রুতির সর্বজনীন প্রতীক হিসাবে ব্যাপক ভাবে পরিচিত হয়ে আছে  হিরে। এছাড়া হিরের ব্যবহার নারী-পুরুষ প্রত্যেকের ব্যক্তিগত জীবনের গল্প বলে। আসলে, হিরে—এই রত্নটির উজ্জ্বলতা এবং বিরলতা ছাড়াও, একটি অনন্য গুণ রয়েছে, যা পরিধানকারীকে সর্বদা মনে করিয়ে দেয় যে, সে কী অর্জন করেছে এবং সে প্রিয়জনের সঙ্গে কতটা ভালোবাসার সম্পর্কে বাঁধা।

ফ্যাশনেবল পোশাকের সঙ্গে হিরের অলংকারেও নিজেকে মেলে ধরা যায় দারুণ ভাবে। আর নিজের সৌন্দর্যকে সঠিক ভাবে তুলে ধরতে পারা মানেই কিন্তু ব্যক্তিত্বের অন্যতম বৈশিষ্ট্যকে লালন করা।  এই কথা মাথায় রেখেই হয়তো হিরের অলংকারে শোভিত হয়ে আত্ম-প্রেম জাগিয়ে তুললেন একঝাঁক মডেল। আসলে, ডিকেএস স্পোর্টস কমপ্লেক্স-এ, ‘শ্যাম সুন্দর কোং জুয়েলার্স’ লঞ্চ করল ‘গ্লিটেরিয়া – এভরিডে ডায়মন্ডস ফর ইউ ‘ ব্র্যান্ড।

এদিন সন্ধ্যায় হিরের গয়নার আনুষ্ঠানিক লঞ্চ-এর আগে, আটজন মডেল ফ্যাশন শো-এ ব্র্যান্ড-এর এক্সক্লুসিভ ডিজাইনের হিরের গয়না পরে র‍্যাম্প-এ হাঁটেন। ফ্যাশন শো-এর তিনটি রাউন্ড ছিল। প্রতিটি রাউন্ড নারীদের কর্মজীবন, খেলাধুলা আর পার্টির জন্য নির্দিষ্ট করা হয়েছিল।

ফ্যাশন শো-এর শেষ পর্যায়ে ছিল বড়ো চমক! মডেলদের সঙ্গে পা মিলিয়ে, র‍্যাম্প-এ হেঁটে হিরের গয়নার নতুন ব্র্যান্ড সবার সামনে তুলে ধরেন ব্র্যান্ড-এর ডিরেক্টর রূপক সাহা ও অর্পিতা সাহা। জনপ্রিয় দুই সংগীতশিল্পী সুজয় ভৌমিক ও সামান্থা, তাদের গানের সুরে ওই সন্ধ্যায় যোগ করেন অন্য মাত্রা। বিশেষ অতিথি হিসেবে ছিলেন বিধায়ক তথা মেয়র পারিষদ দেবাশিস কুমার এবং ডিকেএস-এর সেক্রেটারি হিরন্ময় চট্টোপাধ্যায়। দুজনেই অনুষ্ঠানে নিজেদের বক্তব্য রাখেন। এছাড়া ছিলেন ডিকেএস ক্লাবের সদস্যরা এবং সাধারণ দর্শকরা।

প্রথমে পরীক্ষামূলক ভাবে হিরের গয়নার এক্সক্লুসিভ কালেকশনের বার্ষিক প্রদর্শনী হিসেবে ‘গ্লিটেরিয়া’-র সূচনা হয়েছিল। এরপর এই উদ্যোগ সবার মনে জায়গা করে নেওয়ায়, গ্লিটেরিয়া-কে ‘এভরি ডে ডায়মন্ড জুয়েলারি’ ব্র্যান্ড হিসাবে লঞ্চ করতে উৎসাহিত হয়েছেন গয়না ব্র্যান্ড-এর কর্মকর্তারা। বিপনির ডিরেক্টর রূপক সাহা জানিয়েছেন, ‘নারীর প্রতিদিনের মুহূর্তগুলো যাতে হিরের গয়নার সঙ্গে উজ্জ্বল দ্যূতিতে ভরে যায়, সেটা নিশ্চিত করছি।’

কেমন হওয়া উচিত মা-মেয়ের সম্পর্ক?

বাড়ির আর সকলের থেকে শিশুকন্যাটির সব থেকে কাছের মানুষ হয়ে ওঠে তার ‘মা’। প্রতিদিন একটু একটু করে বড়ো হয়ে ওঠার সমস্তটাই কিন্তু তার মা-কে ঘিরে। এইভাবেই সে ধীরে ধীরে মায়ের উপর হয়ে ওঠে নির্ভরশীল। বিশ্বাস করতে শেখে মা-কে। কারণ, তার কাছে মা-ই হচ্ছে একমাত্র ভরসার জায়গা। মায়ের কাছেই শিক্ষার নতুন পাঠে তার প্রবেশ। আর তাই মা আর মেয়ে- যুগ যুগ ধরে চলে আসা এ এক আশ্চর্য সম্পর্ক।

মেয়ে পা-রাখে শৈশবে। স্কুল জীবনের প্রারম্ভ। মায়ের নিশ্চিত আশ্রয়ের গণ্ডি ছাড়িয়ে বাইরের জগতে প্রথম পদক্ষেপ। প্রথম প্রথম আগের থেকে বেশি করে আঁকড়ে ধরে মা-কে। তারপর মুঠি আলগা হতে শুরু করে। বন্ধুবান্ধব এবং আরও অনেক সম্পর্কের ভিড়ে মা ও মেয়ের সম্পর্ক নেয় নতুন এক মোড়।

মায়ের স্নেহ মিশ্রিত শাসন শুরু হয়। এর সঙ্গে মায়ের কাছ থেকে মেয়ে জীবনের শিক্ষারও প্রথম পাঠ নিতে শুরু করে। জীবনের পাঠক্রমে শাসন এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। শিশু যা এতদিন নিজের ইচ্ছেমতোন করে এসেছে, হঠাৎ করে সেখানে বাধা পেতে শুরু করে। ‘এটা কোরো না’,  ‘ওটা করে আসা তোমার উচিত হয়নি’, ‘আমাকে জিজ্ঞাসা না করে এটা করবে না’ কিংবা ‘ওখানে যাবে না’— এরকম মায়ের নানা ‘মানা’-র সম্মুখীন হতে হয় মেয়েটিকে।

একদিকে যেমন নিজস্বতা তৈরি হতে থাকে, তেমনই নানা খুনসুটির মধ্যে দিয়ে ভালোবাসার সম্পর্ক শিকড়বাকড় ছড়িয়ে মা ও মেয়ের বন্ধনকে আরও দৃঢ় করে তোলে। মায়ের সাজগোজের জিনিস কন্যাসন্তানকে শিশু বয়সে সবথেকে বেশি আকর্ষণ করে। মায়ের লিপস্টিক, শাড়ি, গয়না এমনকী মায়ের চটিতে পা গলিয়েই কেটে যায় তার শৈশব। মা বাড়িতে হয়ে ওঠে মেয়ের খেলার সাথী।

অনেক সময় মায়ের প্রতি সামান্য ঈর্ষাও হয়তো মেশে ছোট্ট মেয়েটির মনে। মা কেন এত সাজগোজ করবে, তার কেন এই প্রসাধনের জিনিসগুলো নেই, শুধুমাত্র মা-এর ব্যবহারের জন্যই কেন এগুলি কেনা হয়— এরকম বহু অযথা প্রশ্ন এবং অনুযোগ শিশুমনে উদয় হয়। এর জন্য অনেক সময়ে ছোট্ট মেয়েটি মায়ের প্রতি কিছুটা বিদ্রোহীও হয়ে ওঠে।

এ সমস্ত আচরণগুলি-ই কিন্তু কন্যা সন্তানের বাইরের মনোভাব মাত্র। এর মধ্যে দিয়েই মা ও মেয়ের বন্ধুত্ব, ভালোবাসা, স্নেহ বাড়তে থাকে। মায়ের জিনিসপত্র নাড়াচাড়া করতে করতে কখন যেন সে কৈশোরের দোরগোড়ায় এসে পৌঁছোয়। কিশোরী মেয়ের খেয়াল রাখা, তাকে সমস্ত বিপদ থেকে রক্ষা করা যেমন মায়ের অধিকারের মধ্যে পড়ে, তেমনই মেয়েটিও কেমন করে নিজের অজান্তেই মায়ের দিকে আসা প্রতিটি বিপদের সামনে নিজেকে ঢাল হিসাবে তৈরি করতে থাকে। বাড়িতে এবং বাড়ির বাইরে মায়ের প্রতি যে-কোনও ধরনের রূঢ় আচরণ মেয়েটির মনকে নাড়া দেয়। তার ক্ষমতায় অন্যায়ের প্রতিবাদও করে সে।

এরপর কৈশোরের হাত ধরে আসে যৌবন। মা ও মেয়ে উভয়েরই জীবনের কঠিনতম সময়। এই পর্যায়ে মেয়েরা হয় মুক্তপ্রাণ। সবকিছুই তার চোখে তখন সুন্দর, নতুন। সমাজের কুৎসিত রূপটাকেও আস্বাদ করার ব্যাকুলতা তার মধ্যে হয়ে ওঠে প্রবল। মেয়ের প্রতি মায়ের সজাগ দৃষ্টি আরও প্রসারিত হয়। প্রতিমুহূর্তে পদস্খলনের ভয়। মায়ের মন মেয়ের জন্য সবসময় দুশ্চিন্তাগ্রস্ত থাকে। ফলে শাসনের মাত্রা বাড়তে থাকে। মেয়ের মনে মা-ই হয়ে ওঠে তার জীবনের পরম শত্রু।

এতদিন যে-মেয়ের জীবন ছিল মায়ের কাছে খোলা পাতা, হঠাৎ একটা দমকা হাওয়ার বেগ সেটাই এলোমেলো করে দেওয়ার উপক্রম করে। এই সময়ে মা ছাড়া আর সকলকে মনে হয় বন্ধু। জীবনের অনেক নতুন অনুভূতি মেয়েরা এইসময়ে মায়ের কাছে গোপন রাখতে চেষ্টা করে। মায়ের মনেও যে অভিমান জন্মায় না এমন নয়, কিন্তু মায়ের মন বুঝতে পারে তার সেই ছোট্ট মেয়েটি, যে ‘মাতৃকবচ’-এর সুরক্ষার বেড়ায় ধীরে ধীরে বেড়ে উঠেছে।

শুধুমাত্র মাতৃস্নেহে বেঁধে রাখার সময় সে পেরিয়ে এসেছে। যুবতি মনে অন্য সম্পর্কে পা রাখার আকাঙ্ক্ষা তার মনে তৈরি হয়েছে। অভিমান ঝেড়ে ফেলে মা নেমে পড়ে জীবনযুদ্ধে। মনে তখন মায়ের নতুন উদ্যোগ। এতে মায়ের প্রতি মেয়ের রাগ কমে না, বাড়েই। মায়ের দায়িত্ব থেকে মাকে টলাতে না পেরে, মেয়েরাও মায়ের প্রতি কিছুটা ঈর্ষাকাতর হয়ে পড়ে। কোথা থেকে মা পায় এত শক্তি— এই প্রশ্ন ওঠে প্রতিটি যুবতির মনে।

মেয়ের বিয়ে হয়ে যায়। মায়ের প্রতীক্ষা শেষ হয়। মায়ের মন শূন্য করে মেয়ে চলে যায় অন্য সংসারে। মায়ের কাছে মেয়ের চলে যাওয়াটা শরীরের একটা অংশ কেটে বাদ দিয়ে ফেলার মতোই বেদনাদায়ক। তবুও মায়ের মনে সান্ত্বনা যে, মেয়ে নিজের সংসারে গেছে, যেখানে তার আদরের মেয়ে সমান আদর-যত্নে স্বামীর সংসারে রাজত্ব করবে। শত কষ্টেও মেয়ের সুখের কথা ভেবে মায়ের মুখে হাসি লেগে থাকে। দূর থেকেই মেয়েকে আশীর্বাদ করে, মেয়ের খোঁজখবর রাখে। বয়সের ভার যেন মায়ের অস্তিত্বকে ধীরে ধীরে গ্রাস করতে চায়।

নিজের সংসারে এসে, সংসারের দায়িত্ব নিতে নিতে মেয়ে উপলব্ধি করতে পারে, তার জীবনে মায়ের অবদান কতখানি। মায়ের মতো প্রিয় বান্ধবীর জায়গা কেউ যে নিতে পারবে না, সেটা বুঝতে তার কষ্ট হয় না। মায়ের স্নেহ, শাসন সবটাই সন্তানের কাছে কতটা প্রয়োজনীয়, এতটা সময় পেরিয়ে যাওয়ার পর মেয়ে বুঝতে পারে। মায়ের সঙ্গে নাড়ির টানটা নতুন করে অনুভব করে। মায়ের সতর্কতা, শাসনের কড়া বুলিই যে তাকে চোরাগলির অন্ধকার থেকে বাঁচিয়ে এসেছে, সেটাতে কৃতজ্ঞ বোধ করে। মন চলে যায় মায়ের কাছে, ফিরে আসে ছোটোবেলার স্মৃতি।

মেয়ের হাত ধরে, জীবনের এতটা পথ পার করিয়ে দিয়েছে মা। ঝড়, জল মেয়েকে স্পর্শ করতে পারেনি। মেয়েকে রাস্তা দেখাবার প্রয়োজন আর নেই। সেই পাঠ তার শেষ হয়েছে। আজ মায়ের পাশে দাঁড়াবার প্রয়োজন মেয়ের।  তার এই সফরে মেয়েই একমাত্র বন্ধু হয়ে পাশে দাঁড়াতে পারে। কৈশোরে অজান্তে যে মেয়ে মায়ের ঢাল হয়ে সমাজে দাঁড়াতে চেয়েছিল, আজ সত্যি করেই সে মায়ের ঢাল হয়ে দাঁড়ায়। নতুন বন্ধুত্ব, হৃদয়ের বন্ধন নতুন করে আবার স্থাপিত হয়। মায়ের ভালোমন্দের দায়িত্ব, দেখাশোনা করার দায়িত্ব, মেয়ে নিজেই তুলে নেয় নিজের হাতে। জীবনের প্রান্তবেলায় মা ও মেয়ের সম্পর্কের সমীকরণ কিছুটা বদলে যায়। শাসন এবং দায়িত্বের গাম্ভীর্যে মেয়েই হয়ে ওঠে ‘মা’।

স্নেহের বাঁধন (শেষ পর্ব)

প্রায় সপ্তাহখানেক বাদে লোকটা আবার ফিরে এল গবুদার চায়ের দোকানে সকালবেলায়। উশকোখুশকো চুল। মুখে একটা চিন্তার রেখা। মুখ তুলে তাকাচ্ছে না। শুধু গবুদার কাছ থেকে চা রুটি নিয়ে বটগাছটার গোড়ায় বসে খেতে লাগল। রায়বাবু ও বিনয়বাবু ওর কাছে গিয়ে প্রশ্ন করলেন— এতদিন কোথায় ছিলে?

লোকটা কোনও উত্তর দিল না।

—তোমার খোঁজ করতে একজন ভদ্রমহিলা এসেছিলেন দিন দশেক আগে। কে উনি? তুমি চেনো ওনাকে? তখনও নীরব সে।

সেদিন লোকটা শিবমন্দির চত্বরে চুপচাপ বসে সারাদিন। কী যেন এক চিন্তায় মগ্ন।

ওদিকে গবুদার চায়ের দোকানে লোকটাকে নিয়ে নানান জল্পনা কল্পনা চা-খোর মানুষগুলোর। রহস্য ক্রমশ দানা বাঁধছে। লোকটা কে? কোথা থেকে এল এখানে? কেনই বা এল? কী তার উদ্দেশ্য? কোনও বদ মতলব নেই তো?

রবিবারের সকাল, গবুদার চায়ের দোকানে চাঁদের হাট। ছেলে ছোকরারাও আড্ডা জমিয়েছে পাশের বাঁশের মাচায়। এমন সময় থানার বড়োবাবু জিপ নিয়ে হাজির। ওই লোকটার ব্যাপারে নানান প্রশ্ন। আর তখনই সবাই লক্ষ্য করলেন যে, লোকটা আবার উধাও হয়েছে। সকাল থেকে পাত্তা নেই তার। গবুদাও কিছু বলতে পারল না। সে নাকি রোজকার মতো আজ আসেনি দোকানে।

বড়োবাবু চলে যেতেই সবাই হুমড়ি খেয়ে পড়ল। নিশ্চয়ই কিছু একটা ব্যাপার আছে তাহলে, পুলিশও খোঁজ করছে যখন। এবার গ্রামশুদ্ধ সবার চোখ লোকটাকে খুঁজতে থাকে। সবাইকে সতর্ক করে দেন গ্রামের মাথারা।

আবারও এক সপ্তাহ লোকটাকে গ্রামের ধারে কাছে দেখা গেল না। অনেকদিন কেটে গেলেও লোকটা আর এল না। সবাই প্রায় ভুলতে বসেছিল তাকে।

তারপর একদিন সাত সকালে হইচই ব্যাপার। গবুদা দোকান খুলতে এসে দেখে, দোকানের বেঞ্চে হাত পা ছড়িয়ে শুয়ে আছে লোকটা। প্রথমে কিছু বুঝতে পারেনি গবুদা। পরে ডেকে সাড়া না পেয়ে ভয় পেয়ে যায়। সবার মুখে চোখে একটা হালকা আতঙ্ক। গাঁয়ের প্রায় সবাই এসে জড়ো হয়েছে গবুদার দোকানের সামনে। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে গ্রামের লোকজন এসে হাজির সেখানে। লোকটা কি তাহলে শেষমেশ মারা গেল নাকি?

কে যেন বলল, থানার বড়োবাবুকে খবর দাও না একবার ।

থানায় খবর দেওয়া হল। বড়োবাবু আসতেই বিনয়বাবু পকেট থেকে চিরকুট বার করে ভদ্রমহিলার ফোন নম্বর দিলেন। বড়োবাবু ফোনে যোগাযোগ করলেন সেই ভদ্রমহিলার সঙ্গে।

সবাইকে অবাক করে দিয়ে লোকটা এবার ধীরে ধীরে উঠে বসল মাচায়।

বড়োবাবু এগিয়ে এসে নানান জিজ্ঞাসাবাদ করতে লাগলেন।

লোকটা কোনও কথার উত্তর দিল না। শুধু ডান হাতটা একটু ওপরে তুলে দু’বার নেড়ে শিবমন্দিরের দিকে সোজা হেঁটে গেল।

গবুদা চিৎকার করে বলল, ‘চা রুটি খেয়ে যাও।’

বড়োবাবু ফিরে যেতে যেতে বিড়বিড় করে বললেন, ‘পাগল একটা।’

গবুদা নিজে চা আর পাউরুটি নিয়ে মন্দিরের চাতালে গিয়ে দিয়ে এল লোকটাকে।

ঘণ্টাখানেক বাদে একটা গাড়ি এসে থামল। সবার চেনা সেই গাড়ি। সেই ভদ্রমহিলা নামলেন। সবাই দেখিয়ে দিল শিবমন্দিরের দিকে। লোকটা সটান শুয়ে চাতালে। নির্বিকার, নির্লিপ্ত। ভদ্রমহিলা পায়ে পায়ে লোকটার কাছে এগিয়ে গেলেন। সে এক দৃশ্য!

গবুদার চায়ের দোকানে ভিড় করে আসা কৌতূহলী মানুষগুলো নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে। যেন কোনও সিনেমার শুটিং দেখছে। কোনও কথা শোনা যাচ্ছে না। লোকটা উঠে বসেছে। মুখটা অন্য দিকে ঘোরানো। ভদ্রমহিলা হাত জোড় করে ক্ষমা চাওয়ার ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে কথা বলে যাচ্ছেন। লোকটা নিরুত্তর। ভদ্রমহিলা এবার পা ধরে কাঁদতে লাগলেন। এদিকে সবার কৌতূহল ক্রমশ বাড়ছে। লোকটা নিশ্চুপ বসে।

গবুদার চায়ের দোকান ছেড়ে সবাই মন্দির চাতালে জড়ো হতেই ভদ্রমহিলা উঠে দাঁড়িয়ে সবার উদ্দেশ্যে বললেন, “আপনারাও একটু বোঝান না প্লিজ!” ভদ্রমহিলা কাঁদো কাঁদো গলায় বললেন।

ব্যাপারটা জানা গেল একটু পরেই। ভদ্রমহিলাই সব জানালেন সবিস্তারে।

লোকটা আসলে ভদ্রমহিলার শ্বশুরমশাই। বেশ কিছুদিন আগে বাড়িতে কথা কাটাকাটি হয়। তার জেরেই বিপত্নীক সন্তোষবাবু ঘর ছাড়েন নিঃশব্দে। সংসারে নিজেকে বোঝা মনে করে সংসার ত্যাগ করেন তিনি। সেই থেকেই খোঁজাখুঁজি চলছে। আজ যখন পাওয়া গেছে তখন বাড়ি ফিরিয়ে নিয়ে যাবার জন্য বউমা কাকুতিমিনতি করছে।

এবার গবুদা এগিয়ে গেল ওনার দিকে। ‘আমরা খুব লজ্জিত। দুঃখিত। আপনাকে পাগল ভেবে অপরাধ করেছি। আপনি আমাদের ক্ষমা করে দিন, সেইসঙ্গে আপনার বউমাকেও। আপনি বাড়ি ফিরে যান। সংসারে একটু অধটু…’

কথা শেষ হল না, ভদ্রলোক উঠে দাঁড়ালেন। বউমার মাথায় স্নেহের হাত রাখলেন। তারপর গাড়ির দিকে হাঁটতে শুরু করলেন।

বউমার দু-চোখে তখন অশ্রুধারা। বাকিদের চোখেও…।

বন্ধুত্বের জন্য শব্দের প্রয়োজন

‘এ দোস্তি হাম নেহি তোড়েঙ্গে, তোড়েঙ্গে দম মাগর তেরা সাথ না ছোড়েঙ্গে, এ মেরি জিত তেরি জিত, তেরি হার মেরি হার, শুন লে মেরি ইয়ার, তেরা গম মেরা গম, মেরি জান তেরি জান, অ্যায়সা আপনা প্যার’ -এই গানের কথাগুলো আজও আমরা যখন শুনি, তখন মনে প্রশ্ন জাগে, আজকের এই প্রতিযোগিতার ইঁদুরদৌড়ের যুগে এমন বন্ধুত্ব কি সম্ভব? আজ যখন লোকেরা বড়ো বাড়ি, বড়ো ব্যাবসা, বড়ো অ্যাপার্টমেন্ট, বড়ো গাড়ি-র মালিক হওয়ার স্বপ্ন সফল করতে ব্যস্ত, তখন বন্ধুত্ব তৈরি হওয়ার-ই সুযোগ নেই, তো বিচ্ছেদের প্রশ্ন আসবে কোত্থেকে!

বর্তমানে মানুষে-মানুষে এই যে ভেদাভেদ কিংবা দূরত্ব বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি কিন্তু কোনও অলৌকিক সুখ ভোগের পিছনে ছুটে চলার জন্য নয়, এর আসল কারণ লুকিয়ে আছে মুঠোফোনে, টিভি কিংবা কম্পিউটার-এর স্ক্রিন-এ। এখন বন্ধুত্ব আসলে ফেসবুকে কিংবা মোবাইল ক্যামেরা-র গ্যালারিতে জমা থাকে, হৃদয়ে নয়। তাই এই বন্ধুত্ব অস্তিত্বহীন।

৫ শতক আগে আমজনতার অক্ষরজ্ঞান ছিল না, তারা শুধু শুনতো রাজা কিংবা ধর্মের দোকানদারদের কথা। সুযোগ বুঝে বোকা মানুষগুলোর মগজধোলাই করতো ধান্দাবাজরা। কিন্তু এতকিছুর মধ্যেও, সেই যুগের বোকা মানুষগুলোর মধ্যেও বন্ধুত্ব ছিল নির্ভেজাল।

ধর্মীয় ক্ষেত্রেও বোকা বানানোর রীতি প্রচলিত। সব ধর্মেই একই শব্দ ৪-৫ বার উচ্চারণ করতে বলা হয় ভক্তদের। কিন্তু যখন থেকে মুদ্রণ প্রযুক্তি চালু হল, তখন থেকে ছবিটা বদলাতে শুরু করল। একই কথা বারবার উচ্চারণ না করেও, মুদ্রিত শব্দ মস্তিষ্কে স্টোর করা সম্ভব হল। কিন্তু সুবিধাবাদীরা এখানেই থেমে থাকল না। তারা এরপরও সভামঞ্চে বক্তৃতা দিয়ে আবার বাড়তি মগজ ধোলাই করার পথে হাঁটল।

এবার দৃষ্টি ফেরানো যাক নির্বাচনী প্রচারের দিকে। শাসক কিংবা বিরোধী, সমস্ত দলের নেতা-মন্ত্রীদের আশ্বাসবাণীতে ভরিয়ে তোলা হচ্ছে চারিদিক। সবাই এমন ভাবে নিজেদেরকে তুলে ধরছেন, যেন তারা জনগণের প্রকৃত বন্ধু! ভোটদাতাদের মন ভোলানোর জন্য এমন সব শব্দ প্রয়োগ করছেন, যেন তাদের সর্বস্ব নিবেদন করবেন জনগণের পদতলে। অথচ, নির্বাচন ফুরোলেই একেবারে উলটো ছবি দেখা যায়। এই রকম বিষাক্ত পরিবেশে বন্ধুত্ব কীভাবে বেঁচে থাকবে ভাবতে পারেন?

এখন তো সবই কপি পেস্ট চলছে কিংবা কপি ফরওয়ার্ড-এর শর্টকার্ট পথ জনপ্রিয়তা পেয়েছে। বন্ধুকে নিজের মন থেকে ৫০-টি শব্দ লিখে পাঠানোর সময় কোথায় এখন? হোয়াটস অ্যাপ কিংবা ফেসবুক-এ ‘গুড মর্নিং’ জানালেই বন্ধুত্ব বজায় থাকে না আসলে। মৃত ব্যক্তির ফেসবুক কিংবা হোয়াটস অ্যাপ থেকেও ‘গুড মর্নিং’ বার্তা পাওয়া গেছে অনেক সময়, কারণ মৃত ব্যক্তির ওই ফেসবুক কিংবা হোয়াটস অ্যাপ-এর মালিক এখন তারই পরিবারের কোনও সদস্য!

অতএব, বন্ধুর জন্য হৃদয়ের শব্দ প্রয়োজন। আর এই শব্দ এমন হবে, যা পরস্পরকে প্রেরণা জোগাবে, দুঃখ ভোলাবে, আনন্দে বেঁচে থাকতে সাহায্য করবে। যেমনটা দেখানো হয়েছে ‘শোলে’ ছবিতে। এই ছবির দুই মুখ্য অভিনেতা অমিতাভ বচ্চন এবং ধর্মেন্দ্র-র মধ্যে বন্ধুত্বকে এমন ভাবে তুলে ধরা হয়েছে, যা বন্ধুত্বকে জাগ্রত করে। ‘সঙ্গম’ ছবিতে রাজ কপূর এবং রাজেন্দ্র কুমারের চরিত্রের মাধ্যমেও বন্ধুত্বকে খুব সুন্দর ভাবে দেখানো হয়েছে।

পড়ার জন্য সীমাহীন গল্প-নিবন্ধসাবস্ক্রাইব