নতুন বছরে মৈনাক ভৌমিক উপহার দেবেন রহস্যে মোড়ানো কাহিনিচিত্র ‘ভাগ্যলক্ষ্মী’

সময় বহমান। তাই অনেক সময় বদলে যায় পারিপার্শ্বিক আবহ। চমকে দেয় কিছু ঘটনা। আপাত সহজ-সরল মানুষের চলমান জীবনেও এভাবেই কখনও আচমকা ঝড় ওঠে, তছনছ হয়ে যায় সাজানো ঘরবাড়ি, মনের বাগান। আসলে লোভ, লালসা, সম্পর্কের জটিলতা এইসব বিষয়গুলিও অনেকসময় বদলে দেয় মধ্যবিত্তের পারিবারিক জীবনযাপনের প্রেক্ষাপট। এভাবেই বদলে গেল সত্য এবং কাবেরী-র দাম্পত্য-জীবনের কাহিনি।

দিল্লি পাঠিয়ে ছেলেকে পড়ানোর খরচ চালাতে গিয়ে সংসারে টানাটানি চললেও, সত্য এবং কাবেরী সবকিছু বেশ দক্ষতার সঙ্গে সামলে নিয়েছিল কিন্তু হঠাৎই বদলে গেল আবহ।

এক রাতে সত্য এবং কাবেরী-র বাড়িতে এল স্বল্প পরিচিত এক ব্যক্তি। চলল আড্ডা, হইহুল্লোড়, খানাপিনা। তারপর ঘটল এক অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনা। মারা গেল (নাকি হত্যা?) সত্য এবং কাবেরীর বাড়িতে আসা ওই আগন্তুক। তারপর ঘটল আরও চমকপ্রদ ঘটনা! ওই মৃত ব্যক্তির রেখে যাওয়া স্যুটকেশ ভর্তি টাকা উদ্ধার করল সত্য এবং কাবেরী। কাহিনি মোড় নিল অন্যদিকে। সত্য এবং কাবেরী নিজেদের অজান্তেই জড়িয়ে পড়ল অপরাধ জগতের সঙ্গে। তারপর?

লোভ, লালসা, নাকি পরিস্থিতির শিকার হল সত্য এবং কাবেরী গাঙ্গুলী? এই প্রশ্নের উত্তর পাবেন ২০২৫ সালের ১০ জানুয়ারি। কারণ, সত্য এবং কাবেরীর মর্মস্পর্শী দাম্পত্য জীবনের কাহিনি ‘ভাগ্যলক্ষ্মী’ শিরোনামে বড়োপর্দায় মুক্তি পাবে ওই দিনে। মৈনাক ভৌমিক পরিচালিত এই ছবিটির ট্রেলার আনুষ্ঠানিক ভাবে প্রকাশ করা হয়েছে কিছুদিন আগে।

‘ভাগ্যলক্ষ্মী’ ছবিতে সত্য-র চরিত্রে রূপদান করেছেন ঋত্বিক চক্রবর্তী এবং কাবেরী-র চরিত্রে রূপদান করেছেন সোলাঙ্কি রায়। অন্যান্য চরিত্রে অভিনয় করেছেন রতন সরখেল, স্বস্তিকা দত্ত,  লোকনাথ দে, নীল মুখোপাধ্যায়, সুব্রত দত্ত, দেবপ্রিয় মুখোপাধ্যায়, যুধাজিৎ সরকার এবং অনন্যা দাস।  ‘নন্দী মুভিজ’-এর ব্যানারে ‘ভাগ্যলক্ষ্মী’ ছবিটি প্রযোজনা করেছেন প্রদীপ কুমার নন্দী।

এক প্রেস বিজ্ঞপ্তি-র মাধ্যমে পরিচালক মৈনাক ভৌমিক জানিয়েছেন, ‘আসলে মাখো-মাখো কিংবা খুল্লামখুল্লা প্রেম-কাহিনির বাইরে বেরিয়ে, এবার একটু অন্যরকম থ্রিলার ছবি উপহার দিতে চেয়েছি বাংলা ছবির দর্শকদের। তাই, এক সাধারণ মধ্যবিত্ত স্বামী-স্ত্রীর জীবনে বাস্তবে যেভাবে ঝড় ওঠে, সেই ঝড়কেই থ্রিলার আকারে সিনেমার মাধ্যমে সুন্দর ভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। আমার কাছে ‘ভাগ্যলক্ষ্মী’ হল বাস্তব জীবনের ঘটনাসমূহের এক নিখুঁত মিশ্রণ। এমন একটি বিষয় নিয়ে আমাকে সিনেমা তৈরি করার সুযোগ করে দেওয়ায় জন্য ‘নন্দী মুভিজ’-কে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাই। আশাকরি আমার আগের ছবিগুলির মতো এই ছবিটিও দর্শকদের ভালো লাগবে।’

এবার ‘ফেলুবক্সী’-র চরিত্রে রুপোলি পর্দায় দেখা যাবে সোহম চক্রবর্তী-কে

ফেলু এবং বক্সী—এই দুটি শব্দের সঙ্গে বাংলার মানুষ আলাদা ভাবে পরিচিত হলেও, এবার এই দুটি শব্দ জুড়ে যেতে দেখবেন বাংলা ছবির দর্শকরা। কারণ, বড়োপর্দায় এবার দেখা যাবে ‘ফেলুবক্সী’ শীর্ষক একটি বাংলা ছবি এবং এই ছবির মুখ্য চরিত্রের নামও ‘ফেলুবক্সী’। অবশ্য ফেলু এবং বক্সী দুটি আলাদা বিখ্যাত গোয়েন্দা চরিত্র হলেও,‘ফেলুবক্সী’ ছবির পরিচালক দেবরাজ সিনহা জানালেন, তাঁর ছবির ‘ফেলুবক্সী’ আসলে সম্পূর্ণ ভিন্ন চরিত্রের একজন গোয়েন্দা।

আসলে দেবরাজের ‘ফেলুবক্সী’ ছবির গল্পটা মুখার্জি পরিবারের লোকজনকে ঘিরেই আবর্তিত হবে। একমাত্র ছেলের অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনার তদন্তের জন্য অনিমেষ মুখার্জি দায়িত্ব দেবেন তরুণ গোয়েন্দা ফেলুবক্সী-কে। আর দায়িত্ব পেয়ে ফেলুবক্সী তদন্ত  শুরু করবে তার তরুণী সহকারী দেবযানী-কে সঙ্গে নিয়ে। এরপর অবশ্য আরও তিনটি খুনের ঘটনা ঘটবে ওই এলাকায়। এই খুনগুলির পর গোয়েন্দা ফেলুবক্সী বুঝতে পারবে, শুধু পারিবারিক শত্রুতাই নয়, এই সমস্ত খুনের পিছনে আছে অনেক বড়ো চক্র।

আবার মুখার্জিবাবুর পুত্রবধূ লাবণ্য-র অসহায়তা, অন্য দিকে যাকে মুখার্জি পরিবারের লোকজনের আশেপাশে দেখা যায়, সেই গ্লোবাল বিজনেস টাইকুন মেঘনাদ চ্যাটার্জি-কে নিয়ে তৈরি হয় টানটান উত্তেজনা। ঘটনাচক্রে রহস্যের যে জাল তৈরি হয়, তার সমাধান কীভাবে করবেন ফেলুবক্সী এবং দেবযানী, সেটাই এই ‘ফেলুবক্সী’ ছবির ক্লাইম্যাক্স বলে জানালেন পরিচালক দেবরাজ।

এই ছবিতে ‘ফেলুবক্সী’-র চরিত্রে সোহম চক্রবর্তী ছাড়াও, ফেলুবক্সী-র সহকারী ‘দেবযানি’-র চরিত্রে রূপদান করেছেন মধুমিতা সরকার। অন্যান্য চরিত্রে রূপদান করেছেন পরিমণি (বাংলাদেশ), শতাফ ফিগার, সুমন্ত মুখোপাধ্যায়, মেঘ মল্লার, দেবনাথ চট্টোপাধ্যায়, অনিন্দিতা সরকার, সৃজিত আয়ুষ্মান সরকার, পূজা সরকার, নিকুঞ্জ সরকার, অমিত পাল, নিপুণ মল্লিক, স্বাগতম এবং রৌনক ভট্টাচার্য।

‘ফেলুবক্সী’ ছবিতে আছে একটি টাইটেল সং। ‘যদি হই আমি তোমার’ শীর্ষক এই গানটি লিখেছেন এবং সুরারোপ করেছেন অদিতি বোস। কণ্ঠদান করেছেন রাজ বর্মন এবং শালিনি মুখোপাধ্যায়।

২০২৪ সালে শুটিং এবং এডিটিং শেষ হওয়া এই ছবিটির টিজার এবং মিউজিক লঞ্চ করা হল সম্প্রতি দক্ষিণ কলকাতায় অবস্থিত অভিজাত এক ক্লাবে। পরিচালক, অভিনেতা-অভিনেত্রী ছাড়াও, এই অনুষ্ঠানে অতিথি হিসাবে উপস্থিত ছিলেন গায়িকা সোমলতা আচার্য। ২০২৫ সালের ১৭ জানুয়ারি ‘ফেলুবক্সী’ বড়োপর্দায় বাণিজ্যিক ভাবে মুক্তি পাবে বলে জানানো হয়েছে আনুষ্ঠানিক ভাবে। ‘হিমানি ফিল্মস’-এর ব্যানারে ছবিটি প্রযোজনা করেছেন সন্দীপ সরকার। সহযোগিতায় আছে ‘মিডিয়ানেক্সট এন্টারটেইনমেন্ট’।

বিবাদ বাদের শিক্ষা দিন সন্তানকে

দুই শিশুর মধ্যে ঝগড়া-মারামারিতে মৃত এক।’ –বিরল হলেও, এমন ঘটনা মাঝেমধ্যে উঠে আসে খবরের শিরোনামে। আমরা শিহরিত হই। ভয়ে নিজের সন্তানকে আগলে রাখার চেষ্টা করি। কিছুদিন এই নিয়ে চর্চা চলে। কিন্তু, সমস্যার গভীরে গিয়ে সমাধানের রাস্তা খোঁজেন খুব কম বাবা-মা। তাই, সমস্যার শিকড় উৎপাটিত হয় না। আবারও কোথাও ঘটে যায় অপ্রীতিকর ঘটনা।

এই বিষয়ে মা-বাবাকে অনেক বেশি দায়িত্বশীল হতে হবে। মনে রাখতে হবে, শিশুরাই দেশের ভবিষ্যৎ। তাই ওদের ঠিকভাবে গড়ে তুলতে হবে। ওরা তো আসলে কাদামাটির মতো। যেমন গড়বেন, তেমনই গড়ে উঠবে। আর এই গড়ার কাজটা করতে হবে একেবারে ভ্রুণ অবস্থা থেকে। কীভাবে? চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, মাতৃগর্ভে ভ্রূণ থেকে ধীরে ধীরে যখন শরীর তৈরি হয়, তখনও কিন্তু নানারকম প্রভাব পড়ে শিশুর মস্তিষ্কে। ওইসময় মা-কে অনেক সতর্ক থাকতে হয়।

হবু সন্তানের জন্য মা-কে যেমন পুষ্টিকর খাবার খেতে হয়, হাঁটাচলা কিংবা উপযুক্ত ব্যায়াম করতে হয় কিংবা পর্যাপ্ত ঘুম এবং বিশ্রামের প্রয়োজন হয়, ঠিক তেমনই মানসিক শাস্তিও বজায় রাখতে হয়। কোনওরকম উত্তেজনা, শারীরিক আঘাত, শব্দদূষণ প্রভৃতি এড়িয়ে চলতে হয় মা-কে। শুধু তাই নয়, বিকৃত যৌনসঙ্গমের ফলে তৈরি ভ্রূণেও পড়তে পারে খারাপ প্রভাব। এর ফলে শিশু চঞ্চল মস্তিষ্কের হতে পারে। অবাধ্য এবং মারকুটে হতে পারে বোধবুদ্ধির অভাবে।

জন্মানোর পরও শিশুকে সঠিক আদরযত্নে মানুষ করতে হবে। ভালোবাসা দিতে হবে। শিশু যখন বোধবুদ্ধি অর্জন করবে, তখন তাকে সবার সঙ্গে মেলামেশা করা শেখাতে হবে, ভাগ করে খাওয়ার অভ্যেসও তৈরি করাতে হবে। এর জন্য সময় পেলে শিশুকে নিয়ে খেলার মাঠে যেতে হবে। সঙ্গে নিয়ে যাবেন খেলার সামগ্রী এবং কিছু খাবার। এর কারণ, ওই খেলার সামগ্রী এবং খাবার অন্যদের সঙ্গে ভাগ করে নিতে শিখবে আপনার শিশুসন্তান এবং শিশুর বন্ধুরাও ওর থেকে একই ভাবে ভালো কিছু শিখবে।

সাধারণত দেখা যায়, কোনও খেলার জিনিস (যেমন পুতুল, বল ইত্যাদি) নিয়ে কিংবা খাবার নিয়ে মাঝেমধ্যে শিশুদের মধ্যে ঝামেলা বেধে যায়। স্কুলে বেঞ্চ-এ বসা নিয়ে কিংবা ছোটোখাটো পেন-পেনসিল নিয়েও শিশুদের মধ্যে কাড়াকাড়ি, ঠেলাঠেলিতে মনোমালিন্য কিংবা অনেকসময় হাতাহাতিও শুরু হয়ে যায়। এই পরিস্থিতিতে স্কুলের ভারপ্রাপ্ত শিক্ষক কিংবা শিক্ষিকার উচিত, ওদের বুঝিয়ে বিষয়টা মিটমাট করে দেওয়া। আর যদি স্কুল কর্তৃপক্ষ বারবার কোনও শিশুর অস্বাভাবিক আচরণ লক্ষ্য করেন এবং কন্ট্রোল করতে না পারেন, তাহলে অভিভাবককে ডেকে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধানের পথ বের করেন। তবে স্কুল কর্তৃপক্ষের থেকে সন্তানের অস্বাভাবিক আচরণের অভিযোগ পেয়ে ভয় কিংবা দুঃশ্চিন্তায় মাথা খারাপ করা উচিত নয়। বরং, অভিযোগ শোনার পর সহানুভূতির সঙ্গে বিচার করুন।

প্রথমে দেখুন, সমস্যার বীজ কোথায় লুকিয়ে আছে এবং শুভাকাঙক্ষীদের সঙ্গে আলোচনা করে সমাধানের পথ খুঁজুন। যেমন ধরুন প্রতিদিনই আপনার সন্তান কোনও সহপাঠীর সব টিফিন খেয়ে নিচ্ছে জোর করে, এমন অভিযোগ যদি পান, তাহলে কেন এমন করছে তার কারণ জানার চেষ্টা করুন নিজের সন্তানের মুখ থেকে। যদি দেখেন সহপাঠীর আনা খাবার ওর খুব পছন্দ হওয়ার কারণে খেয়ে নিচ্ছে, তাহলে পরের দিন থেকে আপনার বাচ্চাকেও ওই খাবার দেওয়ার চেষ্টা করুন কিংবা ওকে বোঝান, এরকম করা ঠিক নয়— এতে অন্যরা কষ্ট পাবে। আর এরপরও যদি সমস্যার সমাধান না করতে পারেন, তাহলে মনোবিদের শরণাপন্ন হয়ে কাউন্সেলিং করান, ভালো ফল পাবেন।

সামান্য বিষয় নিয়ে যদি শিশুদের মধ্যে ঝগড়া কিংবা মনোমালিন্য হয়, তাহলে এতে বাবা-মায়ের নাক গলানো উচিত নয়। কারণ ওটা সাময়িক সমস্যা। দেখবেন, আবার ওরা সবকিছু ভুলে গিয়ে একসঙ্গে হাসছে খেলছে।

শিশুদের শেখাবেন কী কী করা উচিত আর কী কী করা উচিত নয়। ওদের প্রতিযোগী করে তুলবেন না। ‘তোমাকে প্রথম হতেই হবে’ এটা না শিখিয়ে, ‘তুমি ভালো ফল করার চেষ্টা করবে’ —এমন কথা বলাই ভালো। কারণ প্রতিযোগিতা হিংসার জন্ম দেয়।

শিশুদের মন ভালো রাখার চেষ্টা করুন। ওদের সঙ্গে বন্ধুর মতো মিশুন। ওদের অভাব অভিযোগগুলি গুরুত্বের সঙ্গে শুনুন। খারাপ কিছু শিখলে তা যাতে আর না করে, বন্ধুর মতো বোঝান শিশুকে।

কারও প্রতি শিশুর যাতে রাগ, হিংসা এসব তৈরি না হয়, সেই দায়িত্ব নিয়ে কিছু কর্তব্য পালন করতে হবে বাবা-মা- কে। যেমন—

O শিশুকে সামাজিক করে তুলতে উৎসব-অনুষ্ঠানে সবার সঙ্গে মেলামেশা করার সুযোগ করে দিন।

O প্রতিদিন খেলার মাঠে নিয়ে গিয়ে কিছুটা সময় অন্যদের সঙ্গে খেলাধুলোর সুযোগ করে দিন।

O কোনও অতিরিক্ত বায়না করলে সরাসরি ‘না’ বলবেন না। আবদার করা থেকে বিরত রাখুন কৌশলে।

O কারও সঙ্গে ঝগড়া-মারামারি করলে, তা প্রথমে বুদ্ধি করে থামান এবং এরকম আর না করলে ওর কোনও প্রিয় জিনিস উপহার দেবেন— এমন প্রস্তাব রাখতে পারেন।

O প্রয়োজনে কলহে জড়িয়ে পড়া দুই শিশুকে পরস্পরের কাছে ‘সরি’ বলান এবং হাত মিলিয়ে দিন।

O শিশুর মন ভালো রাখতে, ওকে মাঝেমধ্যে কোথাও বেড়াতে নিয়ে যান।

O বাড়িতে থাকলে অবসর সময়ে ভালো বই পড়ার সুযোগ করে দিন। বিশেষকরে নীতিগল্প পড়তে দিন। এতে শিশু মানবিক হবে, ভালো কিছুও শিখবে।

আজকাল ছেলেমেয়েরা দিনরাতে অনেকটা সময় মুঠোফোন নিয়ে ব্যস্ত থাকে। এ বিষয়েও সতর্ক থাকুন। কারণ, নানারকম সমীক্ষার রিপোর্ট বলছে, দীর্ঘসময় মোবাইল ফোন ব্যবহারের ফলে, মস্তিষ্কে খারাপ প্রভাব পড়ছে শিশুদের। ওরা মেজাজ হারাচ্ছে। ফলে, অনেকসময় অন্য বাচ্চাদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করে ফেলছে। যা কাম্য নয়। তাছাড়া ছেলে-মেয়েরা মুঠোফোনে কী দেখছে, তাও নজরে রাখা উচিত। কারণ বিভিন্ন সিনেমা কিংবা ধারাবাহিকে হিংসা, প্রতিহিংসা, মারামারি, খুনোখুনি প্রভৃতি দৃশ্যে ভরপুর থাকে। যা দেখলে শিশুদের সুকোমল বৃত্তিগুলি হারিয়ে গিয়ে, ক্ষতিকারক মানসিক পরিবর্তন ঘটতে পারে।

এ প্রসঙ্গে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, শিশুরা যদি কোনও ভুল বা অন্যায় করে, তাহলে কী করা উচিত মা-বাবার?

এর উত্তরে জানাই, দোষারোপ করবেন না। দোষারোপ করলে অপরাধী হয়ে উঠতে পারে। ওকে ভালো খারাপের বিষয়টি বোঝান বন্ধুর মতো। ওদের নিরাপত্তা দেওয়াও মা-বাবা এবং স্কুল-শিক্ষকদের দায়িত্ব। কারণ নিরাপত্তা দিলে আত্মবিশ্বাসী হবে, অন্যদের সঙ্গে হেসে খেলে কাটাবে। ওদের লেখাপড়া, আঁকা, নাচ-গান, বাজনা কিংবা বিভিন্ন কাজের সাফল্যেও প্রশংসা করুন। কারণ প্রশংসা করলে শিশুও অন্যদের সঠিক কাজের মূল্যায়ন করতে শিখবে।

আর শিশুদের সামনে নিজেদের মধ্যে (মা-বাবা) ঝগড়া-মারামারি করবেন না। কারণ শিশুরা যা দেখে, তাই করে অনেকসময়। অতএব আপনার সন্তানকে সুসন্তান করে তোলার জন্য আপনার বোধবুদ্ধি দিয়ে তার প্রতি দায়িত্ব-কর্তব্য পালন করুন এবং সুশিক্ষা দান করুন। আর প্রয়োজনে কলহে জড়িয়ে পড়া দুই শিশুকে পরস্পরের কাছে ‘সরি’ বলান এবং হাত মিলিয়ে দিন।

বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, দর্শন এবং বিশ্ব মানবতার এক বৈচিত্র্যময় সমাবেশ

এ এমন এক সময়, যখন মানব জাতি অনুভব করছে শান্তি, মূল্যবোধ, সহনশীলতা, সহানুভূতি এবং ন্যায়পরায়ণতার প্রয়োজনীয়তা। সেইসঙ্গে, মানব কল্যাণের জন্য চাই কঠোর পরিশ্রম এবং সেবার মনোভাব। নিঃসন্দেহে এ এক অভূতপূর্ব চ্যালেঞ্জ। আর তাই কানোরিয়া ফাউন্ডেশন-এর  উদ্যোগে, ‘ইউনিভার্সাল স্পিরিচুয়ালটি অ্যান্ড হিউম্যানিটি ফাউন্ডেশন’ দ্বারা আয়োজিত হতে চলেছে —‘আধ্যাত্মিকতায় বিজ্ঞান’ শীর্ষক এক আলোচনা-চক্র। বিশ্ব মানবতা, শক্তি ও বৈজ্ঞানিক আধ্যাত্মিকতার মহামিলনের ১৫তম সংস্করণের বৈচিত্র্যময় এই সম্মেলনটির আয়োজন করা হয়েছে কলকাতা-র ধনধান্য অডিটোরিয়াম-এ।

দু’ দিনের এই আলোচনামূলক সম্মেলনের লক্ষ্য হল—মানবতার উন্নতির জন্য বিশ্বের বিশিষ্ট বিজ্ঞানী, প্রযুক্তিবিদ এবং আধ্যাত্মিক নেতাদের একত্রিত করে, ভারতকে নেতৃত্বের অবস্থানে নিয়ে যাওয়া। বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, দর্শন এবং আধ্যাত্মিকতার সংযোগের মাধ্যমে, আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিরপেক্ষ এবং নৈতিক আদর্শ গড়ে উঠবে বলে মনে করেন আয়োজকরা। আজকের বিশ্বে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বৈজ্ঞানিক অগ্রগতির একটি নিদর্শন হতে পারে কিন্তু ভবিষ্যতে হয়তো এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ক্ষতিকারক প্রমাণিতও হতে পারে। অতএব, সচতনতা জরুরি। বিশিষ্ট ব্যক্তিরা তাই তাঁদের চিন্তাভাবনা এবং জীবনের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেবেন এই দু’ দিনের আলোচনা-চক্রে। এই সমাবেশের আয়োজন করা হয়েছে ধনধান্য অডিটোরিয়াম-এ। আগামী কাল অর্থাৎ ২৭ ডিসেম্বর শুরু হবে এই সম্মেলন এবং চলবে ২৮ ডিসেম্বর (২০২৪)পর্যন্ত।

এই বছরের বৈচিত্র্যময় এই সমাবেশে সম্মানিত প্রধান অতিথির আসন অলংকৃত করবেন ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি রাম নাথ কোবিন্দ। অবশ্য শুধু রাম নাথ কোবিন্দ-ই নয়, এই আলোচনায় যোগ দেবেন বিশ্বখ্যাত বক্তারা। থাকবেন লেখক ও অ্যান্টি-এজিং বিশেষজ্ঞ (USA) ড. রবার্ট গোল্ডম্যান, ভারতের প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি কে জি বালাকৃষ্ণান, ভারতীয় সর্বধর্ম সংসদের জাতীয় আহ্বায়ক গোস্বামী সুশীল মহারাজ, কলকাতার আর্চবিশপ টমাস ডি’সুজা, ছত্তিশগড়ের প্রাক্তন গভর্নর ও  ভারতের প্রতিরক্ষা সচিব শেখর দত্ত, ভারতে স্পেনের রাষ্ট্রদূত H.E Juan Antonio March Pujol, MAAsterG, অল ইন্ডিয়া ইমাম অর্গানাইজেশনের প্রধান ইমাম ড. ইমাম উমর আহমেদ ইলিয়াসী, চিশতী ফাউন্ডেশন-এর চেয়ারম্যান হাজী সৈয়দ সালমান চিশতী, গ্যাংটক-এর নাইংমা ইনস্টিটিউটের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান রিগজিন দর্জি রিনপোচে, রামকৃষ্ণ মিশনের স্বামী সুপর্ণানন্দ মহারাজ, বিজ্ঞানী ও জিনোমিক্স (ইউএসএ) ড. প্রসূন মিশ্র, সমাজ সংস্কারক, কবি, লেখক ও অহিংস বিশ্বভারতীর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি আচার্য ড. লোকেশ মুনি,  শিক্ষক রাজযোগী বি কে অস্মিতা (ব্রহ্মাকুমারী), মাহারিকার রানী ও উই কেয়ার ফর হিউম্যানিটির প্রতিষ্ঠাতা এইচআরএইচ মরিয়ম লিওনর টরেস মাস্তুরা, মুম্বাইয়ের জরোস্ট্রিয়ান কলেজের সভাপতি ডেম প্রফেসর মেহের মাস্টার-মুস প্রমুখ।

নিরাপদ মাতৃত্ব

আজকাল বেশি কেরিয়ারমুখি হওয়ার ফলে, অনেক মেয়েই দেরিতে বিয়ে করেন। কেউ কেউ আবার দেরিতে বিয়ে করেও, কয়েক বছরের জন্য মা হওয়া স্থগিত রাখেন। আর এই দেরিতে বিয়ে করা কিংবা দেরিতে মা হওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার ফলে, অনেক সময় গর্ভধারণ করতে গিয়ে নানারকম জটিলতার শিকার হন। অনেকে আবার স্বাভাবিক ভাবে মা হতে না পারলে, আইভিএফ-এর (ইন- ভিট্রো ফার্টিলাইজেশন) সাহায্য নেন। যাইহোক, মাতৃত্বের আনন্দ উপভোগ করতে গেলে চিকিৎসা-বিজ্ঞান এবং চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলতেই হবে। সম্প্রতি, নিরাপদ মাতৃত্বের বিষয়ে বিস্তারিত জানিয়েছেন এবং পরামর্শ দিয়েছেন কলকাতা-র দু’জন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক এবং একজন মনোবিদ।

ডা. অরুণা তাঁতিয়া

(ডিরেক্টর এবং কনসালট্যান্ট সার্জন, স্ত্রীরোগ ও প্রসূতি বিভাগ, আইএলএস হাসপাতাল, কলকাতা)

বাইশ থেকে ছাব্বিশ বছর বয়সের মধ্যে যে-কোনও সময়, প্রথমবার মা হওয়ার জন্য সঠিক সময়। যখন শরীর গর্ভাবস্থার চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য তৈরি করে নিতে পারে। ৩০ বছর পর স্বাভাবিক গর্ভধারণ করা অনেকসময় কঠিন হতে পারে। কারণ সেই সময় PCOD কিংবা এন্ডোমেট্রিওসিস অথবা প্রাথমিক পর্যায়ে শুরু হওয়া ডায়াবেটিসে ভুগতে পারেন।

কেউ একবার গর্ভধারণের (কনসিভ) সিদ্ধান্ত নিলে, তাকে অবশ্যই একজন গাইনোকোলজিস্টের কাছে যেতে হবে এবং তার থাইরয়েড, ডায়াবেটিস, পিসিওডি কিংবা থ্যালাসেমিয়া, হেপাটাইটিস এ, বি, সি ভাইরাসের পরীক্ষাগুলি করে নিতে হবে। এক্ষেত্রে তার স্বামীকেও স্ক্রিনিং করাতে হবে। শারীরিক সবকিছু স্বাভাবিক হলে প্রয়োজনে হবু মা’কে প্রতিদিন ফলিক অ্যাসিড দেওয়া হবে।

একবার গর্ভধারণ করলে, প্রাথমিক গর্ভাবস্থার যত্ন নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। পুরো গর্ভাবস্থার সময়কাল তিনটি ভাগে বিভক্ত— প্রথম ত্রৈমাসিক ১২ সপ্তাহ পর্যন্ত, দ্বিতীয় ত্রৈমাসিক ১৩-২৪ সপ্তাহ এবং তৃতীয় ত্রৈমাসিক ২৪-৩৬ সপ্তাহ পর্যন্ত বিস্তৃত। প্রথম ত্রৈমাসিকে ১২ সপ্তাহ পর্যন্ত গর্ভাবস্থা স্থিতিশীল হয় না। এসময় বমি বমি ভাব প্রতিরোধ করতে ছোটো বিরতিতে অল্প খাবার গ্রহণ এবং পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেওয়া উচিত। গর্ভাবস্থার আগে ডায়াবেটিস কিংবা উচ্চ রক্তচাপ ধরা পড়লে, চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করে ডায়াবেটিস এবং রক্তচাপের ওষুধ খাওয়া চালিয়ে যেতে হবে।

ডা. এম এস পুরকাইত

(মেডিকেল সুপারিন্টেন্ডেন্ট, টেকনো ইন্ডিয়া ডামা হাসপাতাল)

যদি কোনও মহিলা মা হতে চান, তাহলে মেডিকেল বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী, একটি উপযুক্ত গর্ভধারণ পরিকল্পনা করা উচিত। কারণ গর্ভধারণের আগাম পরিকল্পনা সবসময়ই খুবই উপকারী। শুধু তাই নয়, প্রসবোত্তর জটিলতাগুলির সঙ্গে লড়াই করতেও সাহায্য করে আগাম পরিকল্পনা।

বিভিন্ন মাতৃত্বজনিত ঝুঁকি যেমন উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, স্থূলতা, মা কিংবা বাবার শরীরে কোনও সংক্রামক রোগের উপস্থিতি, যে-কোনও ধরনের রক্তের ব্যাধি ইত্যাদি পূর্বে চিহ্নিত করলে মা এবং শিশু উভয়ের পক্ষেই ভালো। এর জন্য চিকিৎসকের কাছ থেকে উপযুক্ত পরামর্শ নিয়ে কার্যকরী পদক্ষেপ নেওয়া দরকার। তাছাড়া ভ্রূণ গঠিত হওয়ার প্রাথমিক পর্যায়ে যে উচ্চ ঝুঁকি কাজ করে (যেমন জেনেটিক সমস্যা), তার জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ মতো সবরকম সাবধানতা এবং উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। কোনওরকম জটিলতা যাতে তৈরি না হয়, আগে থেকে সেই বিষয়ে সতর্ক থাকা উচিত।

অপরূপা ওঝা

(ক্লিনিকাল সাইকোলজিস্ট, মনশিজ— টেকনো ইন্ডিয়া গ্রুপ)

যখন আমরা গর্ভাবস্থা সম্পর্কে কথা বলি, তখন অনেকগুলি ফ্যাক্টর একজন ব্যক্তির গর্ভাবস্থার সময় কেমন কাজ করবে তা নির্ধারণে প্রধান ভূমিকা রাখে।

প্রস্তুতি: যদি কেউ পরিকল্পনা ছাড়াই গর্ভধারণ করেন, তবে তার পক্ষে শারীরিক ও মানসিক চ্যালেঞ্জগুলির সঙ্গে মোকাবিলা করা কঠিন হতে পারে। গর্ভাবস্থার সময় যখন তারা সামান্য শারীরিক পরিবর্তন অনুভব করেন, তখন তা মেনে নেওয়া কঠিন হতে পারে।

অপরদিকে যদি কোনও দম্পতি যথাযথ পরিবার-পরিকল্পনা করেন, তাহলে সেই জার্নিটা খুব মসৃণ হয়। গর্ভাবস্থায় অনেক শারীরিক জটিলতা এবং প্রত্যাশা হবু মায়ের মনে বিশাল চিন্তার ঝড় বয়ে আনে।

প্রক্রিয়াজাত উদ্বেগ স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট: গর্ভাবস্থায় মুক্ত চিন্তা করা এবং জীবনযাপন করা সমান ভাবে গুরুত্বপূর্ণ। গর্ভবতী মহিলার মনিটরিং করা মেডিকেল বিশেষজ্ঞরা এই সময় জটিল মেডিকেল শব্দ বা চ্যালেঞ্জের ব্যাখ্যা থেকে বিরত থাকেন। কারণ এতে হবু মায়ের মানসিক অবস্থার উপর প্রভাব ফেলতে পারে। এটি প্রক্রিয়াজাত উদ্বেগ বলে পরিচিত। শারীরিক উদ্বেগ: ডেলিভারির সময়, প্রসবের ব্যথা এবং মায়ের শারীরিক অবস্থা ডেলিভারির আগে-পরে কী হতে পারে, তার আগাম ধারণা চিকিৎসকের পক্ষে দেওয়া সম্ভব হয় না। ডেলিভারির পরে স্ট্রেচ মার্কস, শারীরিক ওজন বৃদ্ধি প্রভৃতি বিষয় নিয়ে কিছু দুঃশ্চিন্তা হতে পারে এবং এই নিয়ে বিচলিতও হতে পারেন হবু মা। তাই এই সময় হবু মায়েদের মনে আত্মবিশ্বাস জাগিয়ে তোলা দরকার। হবু মায়ের শারীরিক সমস্যা সম্পর্কিত উদ্বেগ কাটাতে হলে, একজন মনোবিজ্ঞানী কিংবা স্বাস্থ্য ও ফিটনেস বিশেষজ্ঞের সাহায্য নেওয়া উচিত।

নিয়মিত এবং নিরাপদ ব্যায়াম: চরম মানসিক ভয়ের পর্যায় এড়ানোর জন্য, একজন গর্ভবতী মহিলাকে সর্বদা কিছু শারীরিক ক্রিয়াকলাপ অনুসরণ করার পরামর্শ দেওয়া হয়, যা তাদের শারীরিক ভাবে সক্রিয় এবং মানসিক ভাবে তরতাজা রাখবে।

সামাজিকীকরণের গুরুত্ব: পরিবার এবং বন্ধুদের সঙ্গে আন্তরিক বন্ধন, একজন গর্ভবতী মহিলার মানসিক স্বাস্থ্যের অবস্থার ভারসাম্য রক্ষা করার জন্য অনন্য এবং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সবাই পাশে আছেন— এই বিষয়টি একজন গর্ভবতী মহিলাকে নিরাপদ এবং সুরক্ষিত অনুভব করতে সাহায্য করে।

প্রসূতি শোক: প্রসূতি শোক হল এমন একটি মানসিক দুর্দশা, যা একজন মহিলা তার সন্তান হারানোর পর অনুভব করেন। এটি আরও উচ্চ উদ্বেগ এবং অবসাদের অবস্থা সৃষ্টি করে। এই দু’টি সমস্যা সম্প্রতি যে-কোনও গর্ভপাত বা অনিচ্ছাকৃত গর্ভপাত অভিজ্ঞতা করা মহিলাদের মধ্যে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই সমস্যাগুলি ছাড়াও, একটি চরম অপরাধবোধ সমস্ত চিন্তা প্রক্রিয়া জুড়ে বিদ্যমান থাকে। এই অবস্থা খুবই সংবেদনশীল। তাই পরিবারের সদস্য এবং সন্তান হারানো মা, উভয়কেই এই নির্দিষ্ট পর্যায়ে শক্ত থাকতে হবে।

নিম্নলিখিত মানসিক থেরাপিগুলি উপরে উল্লেখিত সমস্যাগুলির সমাধানের জন্য উপযুক্ত

কগনিটিভ বিহেভিয়ারাল থেরাপি (CBT) শোক থেরাপি: মনোবিজ্ঞানীদের দ্বারা অনুশীলন করা সিবিটি সবসময় গর্ভপাত সংক্রান্ত মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যাগুলি চিকিৎসা করার একটি কার্যকরী উপায় হিসেবে বিবেচিত হয়। সিবিটি বা শোক থেরাপি একজন মহিলার অস্বাস্থ্যকর বা অসহায় চিন্তা ও আচরণ পরিবর্তন করে। এটি একটি চিন্তা পরিবর্তন কৌশল যা একজন মনোবিজ্ঞানী একজন মহিলার মনে চলা খারাপ চিন্তাগুলি দূর করতে পারে। সিবিটি খুবই প্রভাবশালী। এটি সন্তান হারানো একজন মহিলার মনে চলা নেগেটিভ চিন্তার মান উন্নত করার জন্য একটি কার্যকরী টুল হিসেবে কাজ করে।

মাইন্ডফুলনেস টেকনিক: মাইন্ডফুলনেস টেকনিক-এ রোগীদের জন্য শান্তি প্রদানকারী ওষুধ এবং পরামর্শ অন্তর্ভুক্ত থাকে। এই প্রক্রিয়াটি রোগীদের ধীরে ধীরে বর্তমান পরিস্থিতির উপর ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে মনোনিবেশ করতে এবং ব্যক্তির জীবনধারায় যথেষ্ট স্বাস্থ্যকর পরিবর্তন আনতে সাহায্য করে।

নিরাপদ পরিবেশের ভূমিকা: একজন মহিলার গর্ভপাতের পর বিভিন্ন মানসিক স্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করার জন্য পরিবারের সদস্য এবং বন্ধুদের সাহায্য অপরিহার্য। এমনকী, নিজেকেও মেডিকেল জটিলতাগুলি সম্পর্কে শিক্ষিত করতে হবে।

আইন শুধু আদালতেই সীমাবদ্ধ নয়

শুধু আদালতেই নয়, জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই আইনকে গুরুত্ব দিতে হয়। আমজনতা বহু ক্ষেত্রেই নিজেই বিচারকের ভূমিকাও পালন করেন। মনে রাখবেন, আদালতে শুধু সেই আইন চলে, যা সংবিধানে উল্লেখ করা রয়েছে কিংবা সংসদ এবং বিধান সভাতে সম্মতি পেয়েছে। কিন্তু সাংসারিক ক্ষেত্রে, ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে, সম্পর্কে, শিক্ষা ক্ষেত্রে, ধর্মস্থানে, এমনকী শারীরিক সুখ ভোগের সময়ও কিছু আইন বলবৎ হয়ে আসছে পরম্পরাগত ভাবে।

সবচেয়ে মজার বিষয় হল এই যে, ব্যক্তিগত ক্ষেত্রেও অনেক সময় এমন আইন প্রয়োগ করা হয়, যা আদালতে অপরাধীদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। আসলে জীবনটাই যেন এক মস্ত আদালত! আদালতের বাইরের এই আদালতেও সর্বদা চলতে থাকে বিচার। সমস্যা ছোটো হোক কিংবা বড়ো, আইনের কমবেশি প্রয়োগ চলছে সব ক্ষেত্রে। আইন যেন এক অদ্ভূত জীবন-দর্শন!

আদালতে চলা মামলায় বিচার চলে তথ্যপ্রমাণ, ঘটনা, সাক্ষী ইত্যাদির উপর নির্ভর করে এবং স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা বজায় রেখে বিচারক রায়দান করেন। এক্ষেত্রে বিচারক খুব সতর্ক থাকেন এবং ভুল হওয়ার সম্ভাবনা কম থাকে। কিন্তু বাস্তব জীবনে যে আইন প্রয়োগ করা হয়, তা অনেক ক্ষেত্রে বড়ো একপেশে হয়ে ওঠে।

যেমন ধরুন স্ত্রী চাইছেন মাশরুম পনির খেতে কিন্তু এতে খরচ অনেক তাই কম খরচে বানানো যায় অথচ সুস্বাদু হবে এমন কিছু খাবার খাওয়ার প্রস্তাব দিলেন স্বামী। এক্ষেত্রে আপোশে সমস্যার সমাধান হয়ে গেলে ভালো কিন্তু তা যদি না হয়, স্বামী কিংবা স্ত্রীর মধ্যে কেউ একজন যদি আদালতের মতো তার কথা অন্যকে মানতে বাধ্য করেন, তাহলে সেই আইনের প্রয়োগ খুব সুখকর হবে না বলেই মনে হয়।

আদালতে বাদী-বিবাদী দুই পক্ষের কথা শুনে কিংবা তথ্য-প্রমাণ ও উকিলের জেরার পর বিচারক আইনি সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু ব্যক্তিগত ক্ষেত্রে তৃতীয় ব্যক্তি প্রায় থাকে না বললেই চলে। এক্ষেত্রে যে দু’জনের মধ্যে সমস্যা তৈরি হয়, তারা নিজেরাই নিজেদের বিচারক।

সবচেয়ে ভয়ের বিষয় হয়ে দাঁড়ায় ধর্মীয় বিবাদে। কারণ, ধর্মবিশ্বাসী মানুষ তার নিজের বিশ্বাসকেই চরম সত্য ধরে নিয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছোন। তাই বলা যায়, ধর্মান্ধ মানুষ বড়ো ভয়ঙ্কর! এদের বিচার-বুদ্ধি লোপ পায়। আসলে এরা নিজেরাই এতটা ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে থাকেন যে, কেউ সত্যিটা তুলে ধরলেও, তিনি তা মানতে চান না পাপ হবে ধরে নিয়ে। বিজ্ঞান কিংবা প্রযুক্তি যতই উন্নত হোক-না কেন, ধর্মান্ধ মানুষের সংখ্যা আজও খুব কম নয়। ভারত, পাকিস্তান কিংবা বাংলাদেশের বিভাজনও সেই ধর্মান্ধতারই কুফল!

আসলে আমজনতাকে সঠিক বিচার-বিবেচনার পাঠ দেওয়া হয় না জেনেবুঝেই। কারণ, সেই রাজনৈতিক হিসাব। অথচ আমরা সবাই যদি একটু ন্যায়ের পথে হাঁটি, আরও একটু সংবেদনশীল হই, একটু বিচার-বিবেচনা করে চলি, যদি নিজের ভুল সিদ্ধান্তটাকে আইনে রুপান্তরিত না করি, তাহলে সমাজ, সংসার কিংবা ব্যক্তিগত জীবনটা আরও মধুর হয়ে উঠতে পারে।

উত্তর থাইল্যান্ডের গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেল সীমান্ত (পর্ব-০২)

কয়েকটা বিপণিতে হাঁটুর উপরে থুতনি রেখে বসে থাকা অপেক্ষমান সুন্দরীদের দেখে অনুভব করেছিলাম আগুনের আঁচ, যে আঁচে পতঙ্গের ডানা পুড়ে যায়। টনি জানাল, এরা সবাই রেড কারেনের উপগোষ্ঠী পাদাউং সম্প্রদায়ভুক্ত এবং সকলেই বর্তমানে থাইল্যান্ডের অভিবাসী। আশির দশকের শেষে এবং নব্বইয়ের দশকের শুরুতে, মায়ানমার অর্থাৎ বার্মার সামরিক শাসনকালে সরকারের সঙ্গে বিরোধের কারণে নির্যাতিত হয়ে এরা সীমান্ত অতিক্রম করে এই দুর্গম পার্বত্য অঞ্চলে আশ্রিত হয়। দীর্ঘকাল ধরে বসবাস করার পরও এদের নাগরিকত্ব অনুমোদন করেনি থাই সরকার। এমনকী এই নির্দিষ্ট আস্তানার বাইরে গিয়ে মনের মতো কাজ খুঁজে নেওয়ার স্বাধীনতা, থাই জনগণের মতো পানীয় জল, বিদ্যুৎ, আবাসন, স্বাস্থ্যপরিষেবা বা শিক্ষার সীমিত সুযোগ— প্ৰায় সবকিছু থেকেই বঞ্চিত।

ভাবতে অবাক লাগে, এই সম্প্রদায়ের মহিলাদের কম্পিউটার বা মোবাইল ব্যবহারের যেমন অনুমতি নেই, তেমনই বাইরের পর্যটকের কাছে নিজেদের সমস্যাজনিত কোনও আলোচনা করারও স্বাধীনতা নেই। দোভাষি টনির মুখে ওদের কাহিনি যতই শুনছি, মনের খিদে ততই বেড়ে যাচ্ছে। বড়ো ইচ্ছে করছিল মুখে পাউডার মাখা, চন্দনের উল্কি আঁকা সরল সাধাসিধে এই নারীদের সঙ্গে একান্তে সুখ-দুঃখের গল্প করি। ওদের মনের কোণে জমানো ব্যথা গলে পড়ুক মোম হয়ে! কিন্তু ওদের সবারই যে কথ্যভাষা বার্মিজ বা পাদাউং এবং এরা প্রায় কেউই ইংরেজি ভাষায় পটু নয়। বিশেষ করে প্রবীণ মহিলাদের কথ্যভাষা অতি দুর্বোধ্য। আমি ইশারার মাধ্যমেই অনুধাবন করার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলাম। তবে এটাই মঙ্গল যে, নতুন প্রজন্মের কিছু মেয়ের সামান্য থাইভাষা জ্ঞান রয়েছে। টনি তাদের কাছে গিয়ে বহু অজানা প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বেড়াচ্ছিল আর পকেট বইয়ে লিপিবদ্ধ করছিল।

টনির সঙ্গে ঘুরতে ঘুরতে শেষ প্রান্তের একটা বিপণিতে কিছু অসামান্য হস্তশিল্প পছন্দ হয়ে গেল। দরদাম করে আলাদা করে রেখে দিতে অনুরোধ করলাম হস্তশিল্পী চমদেন-কে। ওই বিপণিতে আরও দু’জন প্রবীণা মুখোমুখি বসেছিল। দু’জনেরই শীর্ণকায় ঘাড় ও গলা দেখে হঠাৎ মনে হল— ওদের শরীর থেকে মাথা সম্পূর্ণ আলাদা। তারা উভয়েই প্রায় পঁচিশটি করে ধাতব রিংয়ের কুণ্ডলী পরে আছেন যেটা প্রায় চিবুক পর্যন্ত প্যাঁচানো। জানতে পারলাম, একজনের নাম মিমা এবং অপর জনের নাম থুজার।

ওনারা ভাঙা ভাঙা থাই ভাষায় টনিকে জানাল, তাদের গর্বের সংস্কৃতি অনুযায়ী গলা লম্বা রাখার জন্য ওরা চার-পাঁচ বছর বয়স থেকেই সম্পূর্ণ নিজেদের ইচ্ছেতেই এই ধাতব রিং পরে আসছে। ওদের সম্প্রদায়ের রীতি- প্রত্যেক পরিবারে মেয়ে একটু বড়ো হলেই এই রিংগুলো তাদের গলায় পরিয়ে দেওয়া হয়। ওরা বিশ্বাস করে, বংশপরম্পরায় মেয়েরা এই বলয় পরিধান করলে নাকি মন্দ আত্মা দূরে সরে যায়, পরিবারে সৌভাগ্য ফিরে আসে এবং শান্তি বজায় থাকে।

কথার মাঝেই উলটোদিকের দোকান থেকে নাম ধরে ডাকতেই একটি বছর পাঁচেকের ফুটফুটে মেয়ে ছুটে এল। ওর নাম এইন্দ্ৰা৷ অবাক হয়ে দেখলাম, ওই শিশুটির গলাতেও তিন লেয়ারের ধাতব রিং লাগানো। একরত্তি শিশুর কোমল গলায় এমন ধাতব বলয় দেখে খুবই অস্বস্তি হচ্ছিল। ওর গলায় হাত দিয়ে দেখলাম রিংগুলো সহজে খোলার কোনও উপায় নেই। রিংগুলো গলার সঙ্গে চেপে বসে আছে।

মিমা ও থুজার জানাল— বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শারীরিক বহন ক্ষমতা অনুযায়ী এই ধাতব রিংয়ের ওজন বেড়ে চলে এবং যা মৃত্যুর আগে পর্যন্ত গলায় থাকে একই ভাবে। এই ধাতব রিং পরেই ওদের রাতে শুতে হয়। এরা চিরকাল তাদের পিঠের উপর ভর করেই চিৎ হয়ে শুতে বাধ্য হয়, যেটা খুবই যন্ত্রণাদায়ক। কোনওদিন পাশ ফিরে আরাম করে শুতে না পারায়, এদের ঘুমও ভালো করে হয় না। প্রায়ই শারীরিক দুর্বলতায় ভোগে।

স্বামীদের কাছে বেশি ভালোবাসা পেতে, কেউ পাঁচ কেজি ওজনের কেউ বা দশ কেজি ওজনের ধাতব রিং গলায় পরে নিজেদের গলাকে আরও লম্বা করতে আগ্রহী হয়। শুনলাম, যে নারীর যত লম্বা গলা থাকে এবং সেই গলায় যত ভারী এই অলঙ্কার থাকবে, সেই নারী কায়ান সমাজে তত বেশি সমাদৃত হয়ে থাকে।

উপস্থিত কয়েকজন পর্যটকের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারলাম— গলা বা ঘাড়ের অংশ লম্বা করা নিয়ে কায়ান সম্প্রদায়ের মহিলাদের মধ্যে একটা ভুল ধারণা রয়েছে। কারণ এইভাবে ধাতব রিং লাগানোর পদ্ধতিতে গলা বা ঘাড়ের অংশ কখনওই লম্বা হওয়া সম্ভব নয়। বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে ভাবতে গেলে, এই ভারী বলয়ের বিশাল ওজনে মেয়েদের কলারবোন অর্থাৎ কণ্ঠা, নীচের দিকে চেপে বসে বুকের পাঁজরকে সংকুচিত করে তোলে এবং যার ফলে আমাদের দৃষ্টি বিভ্রম হয়ে ওদের ঘাড় বা গলা লম্বা দেখতে লাগে। ভর দুপুরে ঘুরতে ঘুরতে কায়ান নারীদের অস্থায়ী আস্তানা থেকে বেরিয়ে এসে বাইরে এক চলমান ভ্যান থেকে আমি আর টনি কফি কিনে খাচ্ছি, এমন সময় পরিচয় হল স্থানীয় থাই সম্প্রদায়ের ষাটোর্ধ্ব থুয়ানথং নামে এক ব্যক্তির সঙ্গে। ইনি খুব ভালো ইংরেজি বলেন ও বোঝেন। কথা প্রসঙ্গে জানতে পারলাম, উনি এই কায়ান সম্প্রদায়ের নারীদের নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা করছেন। সুযোগ পেয়ে বহু অজানা কাহিনি জানলাম ওনার কাছ থেকে।

(ক্রমশ…)

শুধু মাইহার ঘরানায় ধ্রুপদী যন্ত্র-সংগীত পরিবেশিত হতে চলেছে জ্ঞান মঞ্চে

শীতে আর সংগীত যেন আলিঙ্গনে আবদ্ধ হয়ে থাকে। ঠিক যেন পরস্পরের দোসর। আর তাই শীতের মরসুমে সংগীতের আসর বসে সর্বত্র। বিশেষকরে শীত মানেই যেন রাগ সংগীতের দুর্দান্ত আবহ তৈরি হয় শহুরে পরিবেশে। আর বলা বাহুল্য, শীতের এই সংগীত-সংস্কৃতির অন্যতম ধারক-বাহক হয়ে খ্যাতি অর্জন করেছে কলকাতা। তিলোত্তমা এই কলকাতা-য় তাই শুরু হয়ে গেছে একের পর এক রাগ সংগীতের অনুষ্ঠান। কিন্তু শুধু ঘরানা কেন্দ্রিক রাগসংগীতের আসর সারা দেশে প্রায় বিরল বলা যায়। এবার সেই বিরল অভিজ্ঞতার সাক্ষী থাকতে চলেছে কলকাতা। শুধু মাইহার ঘরানায় সমৃদ্ধ হতে চলেছে ২৫ ডিসেম্বরের এক সংগীতানুষ্ঠান।

‘ইকোস ফ্রম মাইহার’ শীর্ষক ধ্রুপদী যন্ত্র সংগীতের এই অনুষ্ঠানটি মঞ্চস্থ হতে চলেছে কলকাতা-র জ্ঞান মঞ্চে। এই উৎসবের উদ্যোক্তা মাইহার ঘরানারই এই সময়ের অন্যতম সেতারশিল্পী পার্থ বোস। পার্থ বোসের আক্ষেপ, শুধু ঘরানাকে কেন্দ্র করে সারা দেশে খুব একটা অনুষ্ঠান হয় না। তাই তিনি আক্ষেপ মেটাতেই ‘ইকোস ফ্রম মাইহার’ উপহার দেওয়ার পরিকল্পনা করেছেন। ‘ইকোস ফ্রম মাইহার’-এর বিশেষত্ব হল এই যে, এই সংগীতানুষ্ঠানে চলবে শুধু মাইহার ঘরানার যন্ত্রসংগীত। এই ঘরানার যে ব্যাপ্তি, বৈচিত্র্য, গভীরতা, তা ছড়িয়ে দেবার উদ্দেশ্য নিয়েই এই ধরনের সংগীতানুষ্ঠান উপহার দিতে চলেছেন পার্থ। এবার দু’ বছরে পা দিল ‘ইকোস ফ্রম মাইহার’। সারা দিনব্যাপী চলবে ধ্রুপদী যন্ত্র-সংগীতের এই আসর।

পণ্ডিত পার্থ বসুর উদ্যোগে দ্বিতীয়বার এই সম্মেলন হতে চলেছে জ্ঞান মঞ্চ প্রেক্ষাগৃহে, সকাল এগারোটা থেকে রাত ন’টা পর্যন্ত। কুহক সংস্থার আয়োজনে এই সংগীতসভা উৎসর্গ করা হবে মাইহার পরম্পরার দুই সংগীত সাধকের স্মৃতির উদ্দেশ্যে –পণ্ডিত মনোজশংকর ও ওস্তাদ আশীষ খাঁ। শিল্পী-তালিকায় থাকছেন মাইহার ঘরানার  আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিপ্রাপ্ত ছয়জন শিল্পী– সিরাজ আলী খাঁ, বসন্ত কাবরা,  কেন জুকারম্যান, নিত্যানন্দ হলদিপুর, তরুণ ভট্টাচার্য্য ও ইন্দ্রদীপ ঘোষ। পন্ডিত পার্থ বসুর কথায়, ‘মাইহার ঘরানার’ যে গভীরতা, ব্যাপ্তি এবং বৈচিত্র্য, তার উদযাপনে এই উৎসব। শুধু একটা ঘরানাকে কেন্দ্র করে এমন অনুষ্ঠান কলকাতায় এই প্রথম। কলকাতার দর্শক প্রথমবার নিরাশ করেননি, আশাকরি এবারেও মানুষের ভালো লাগবে। এমন ধরনের অনুষ্ঠান যত হবে,ঘরানা টিকে থাকবে। সারাদিনের এই আসর সংগীত-প্রেমীদের মধ্যে ইতিমধ্যেই উৎসাহ ও চর্চার সঞ্চার করেছে। অভিনব ধ্রুপদী যন্ত্র-সংগীতের সুরের মূর্ছনায় গোটা কলকাতা ভাসবে বড়োদিনে।

মাইহারের রাজদরবারে  ‘বাবা’ আলাউদ্দিন খাঁ  সাহেবের আগমন, অবস্থান ও ওই শহরে আমৃত্যু বসবাস। ‘বাবা’-র গুরুকুল থেকে উঠে এলেন এক ঝাঁক দিকপাল শিল্পী – আলী আকবর, অন্নপূর্ণা, রবিশঙ্কর, নিখিল বন্দ্যোপাধ্যায়, বাহাদুর খাঁ, পান্নালাল ঘোষ এবং আরও অনেকে। প্রতিষ্ঠিত হল ‘মাইহার ঘরানা’, যার প্রতিনিধিদের বিচরণক্ষেত্র বিশ্বব্যাপী।

যন্ত্র সঙ্গীতের একটি ঘরানায় সরোদ, সেতার, সুরবাহার, বাঁশুরি, বেহালা, সন্তুর-সহ নানারকম যন্ত্রের ব্যবহার ও বাদনশৈলীর বৈচিত্র্য সংগীতের ইতিহাসে বিরল। সেই বৈশিষ্ট্যকে তুলে ধরার প্রয়াসের মধ্যে জন্ম নিয়েছে ‘ইকোস ফ্রম মাইহার’। মাইহারের প্রতিধ্বনি কলকাতা তথা বাংলার একমাত্র ঘরানা ভিত্তিক সংগীত সম্মেলন। প্রথমবার এই অনুষ্ঠানের সূচনা করেছিলেন মাইহার ঘরানার খলিফা আশীষ খান। অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেছিলেন বিশ্বমোহন ভাট, সিরাজ আলী খান, সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়, রনু মজুমদার, শুভেন্দ্র রাও-দের মত প্রথিতযশা শিল্পীরা। এবারেও বসছে চাঁদের হাট।

আবেগী মন (পর্ব-০২)

ফাজিল হেসে বেরিয়ে গেল শুভ্রা। মানব চেয়ারে গা এলিয়ে কয়েক সেকেন্ড হাসিমুখে থাকার পর, শুভ্রার রেখে যাওয়া ফাইলটা নিয়ে কাজ করতে শুরু করে দিল।

আসলে শুভ্রা এবং মানবের এই সুন্দর বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কটা মাত্র দু’বছরের। এর আগে অফিসের অন্য ব্রাঞ্চ-এ ছিল শুভ্রা। কিন্তু পার্কস্ট্রিট-এর এই ব্রাঞ্চ-এ আসার পর থেকে কাজের সূত্রে প্রতিদিন দু’তিনবার মুখোমুখি হতে হয় মানবকে। আর কাজের ফাঁকেই দু’জনের মধ্যে কথাবার্তা এবং টুকটাক রসিকতা চলতেই থাকে। এভাবেই কখন যেন মনের কোণে একে অন্যের প্রতি হালকা দুর্বলতা তৈরি হয়ে গেছে। এখন কাজের অবসরে মাঝেমধ্যে পরস্পরের মুখোমুখি হলে ভালোই লাগে উভয়ের। হয়তো এর পিছনে মানসিক খিদেও থাকতে পারে! কারণ মানবের বউ সুমিতার যেমন স্বামী ছাড়াও অন্য নিজস্ব জগৎ রয়েছে, ঠিক তেমনই শুভ্রার বর বিপ্লবও তেমন বউ-ভক্ত নয়। হয়তো দু’জনের লাইফ পার্টনার-এর প্রতি মানসিক দূরত্ব বেড়েছে এই কারণেই।

যাইহোক মানব এবং শুভ্রা দুজনে জমিয়ে লাঞ্চ করে এসেছে একটা বড়ো রেস্তোরাঁ থেকে। তাই দুজনের মেজাজ বেশ ফুরফুরে ছিল অনেকক্ষণ। কিন্তু বাড়ি গিয়ে অপছন্দের আচার অনুষ্ঠান পালন করতে হবে ভেবে, মানবের থেকে বেশি মন খারাপ হয়ে গেল শুভ্রার। তাই বিষণ্ন মনে বাড়ি ফিরল দু’জনে।

মানব এবং শুভ্রা যে-যার বাড়ি পৌঁছোনোর পর দু’রকম ঘটনা ঘটল।

বাড়ি পৌঁছে মানব দেখল, প্রতিবেশী মেয়ে-বউদের সঙ্গে নিয়ে বাড়িতে হইহই করছে সুমিতা। ঘরভর্তি এতজনকে দেখে খুব রাগ হল মানবের। কারণ সে চায় একটু নিরিবিলি পরিবেশ। নিজের পরিবারের সদস্যরা হইহুল্লোড় করলে তার খারাপ লাগে না কিন্তু তাই বলে পাড়া-প্রতিবেশীরা এসে হুল্লোড় করে বাড়ি মাথায় তুলবে, এ যেন তার সহ্য হয় না। তাই বেডরুমে ঢুকে মন খারাপ করে শুয়ে পড়ল মানব। এরপর যখন বাড়ি খালি হল তখন মানবের মনখারাপ কাটাতে গিয়ে চোখের জল ঝরাতে হয়েছিল সুমিতাকে।

অন্যদিকে, উপোস আছে এমন ভান করে শুভ্রা বর এবং শাশুড়িকে নিয়ে দ্রুত সমস্ত নিয়মনিষ্ঠা পালন করে শিবের ব্রত শেষ করল। তারপর ওর পাঁচ বছরের মেয়েকে খাইয়ে ঘুম পাড়াল। নিজেও রাতের খাবার জমিয়ে খেলো বরের সঙ্গে বসে। শুভ্রার মধ্যে এমন পরিবর্তন দেখে বিপ্লব বেশ খুশি হল। সে বুঝতেই পারল না শুভ্রার অন্তরের আসল ইচ্ছেটা। শুভ্রা যে এইসব উপোস, ভক্তি ইত্যাদিকে সংস্কার নয়, কুসংস্কার হিসাবেই দ্যাখে, তা অনেকবার বর কিংবা শাশুড়িকে বুঝিয়েও যখন কাজ হয়নি তখন সে সবকিছু মেনে নেওয়ার অভিনয় করে গেল নীরবে। আর আপাত ভাবে সবকিছু ঠিকঠাক মনে হলেও, বিপ্লবের সঙ্গে শুভ্রার মনের দূরত্বটাও নীরবে বেড়ে চলল প্রতিদিন। শুভ্রার প্রতি মুহূর্তে মনে হতে লাগল, যাকে সে একসময় ভালোবেসে বিয়ে করেছিল, সেই বিপ্লবই তার পছন্দ-অপছন্দকে গুরুত্ব দিল না, চাপিয়ে দিল তার নিজের সিদ্ধান্তকে। আর ঠিক তখনই তার আরও আপনজন মনে হতে থাকল মানবকে। অন্তত তার সঙ্গে মতের মিল আছে মানবের, মানব তাকে সঠিক ভাবে বোঝে, তার ইচ্ছেকে মর্যাদা দেয়— এটাই অনেক বড়ো পাওয়া হয়ে উঠল শুভ্রার কাছে।

মানবও যেন সুমিতার অতি সামাজিক হয়ে ওঠা, ধর্মকর্মের বাড়বাড়ন্ত আর সহ্য করতে পারছিল না। ধীরে ধীরে ওদের স্বামী-স্ত্রীর মধ্যেও দূরত্ব বাড়তে শুরু করল। মানবও তখন প্রকৃত বন্ধু, মনের মানুষ ভাবতে শুরু করল সহকর্মী শুভ্রাকে। আর তাই সময় যত এগোতে লাগল, মানবের সঙ্গে শুভ্রার ওঠাবসা, সময় কাটানো বাড়তে শুরু করল ততই। এভাবেই দিন, মাস পেরিয়ে এগিয়ে এল আরও এক শিবরাত্রির দিন। মানব এবং শুভ্রাও তাদের সম্পর্ককে আর নিছক বন্ধুত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে চাইল না। সংসারের মোহ কাটিয়ে এক অন্যরকম তৃপ্তির স্বাদ অনুভবের পরিকল্পনা করল।

পরিকল্পনা মাফিক ওরা দুই পরিবার শিবরাত্রির আগেই একদিন মিলিত হয়ে আলাপ পরিচয় করাল যে যার লাইফ পার্টনার-এর সঙ্গে। এর ফলে বেশ একটা বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে উঠল দুই পরিবারের মধ্যে। মানবের স্ত্রী সুমিতা এবং শুভ্রার বর বিপ্লব জানাল যে, মানব এবং শুভ্রার মধ্যে সহকর্মী হিসাবে ভালো সম্পর্ক আছে, তাই ওরা পারিবারিক আড্ডা জমাল।

যাইহোক প্রথম দিনের হইহুল্লোড় এবং ভুরিভোজের পর সবাই মিলে আবার গেট টুগেদারের পরিকল্পনা করল। শুভ্রা জানাল, “শোনো আগামী শিবরাত্রির দিন আমরা সবাই কারও একজনের বাড়িতে একসঙ্গে উৎসব পালন করব, খুব মজা হবে।’

শুভ্রার প্রস্তাব শুনে সবচেয়ে বেশি খুশি হল ওর বর বিপ্লব। কারণ বিপ্লব ভাবল, শুভ্রা খুব বদলে গেছে, আগের মতো আর ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালনে বিরক্ত হচ্ছে না, পরিবর্তে নিজেই প্রস্তাব দিচ্ছে। তাই অত্যন্ত খুশি হয়ে বিপ্লব জানাল, ‘তাহলে আমাদের বাড়িতেই সবাই মিলে মজা করব।’

—না না, এবারটা আমাদের বাড়িতে হোক। পরের বার না হয় আপনাদের বাড়িতে হবে। অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে জানাল মানবের স্ত্রী সুমিতা।

কার বাড়িতে সবাই মিলিত হবে শিবরাত্রির দিন, সেই নিয়ে দড়ি টানাটানি চলতে চলতে শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত হল, এবারটা বিপ্লব- শুভ্রার বাড়িতেই হবে হইহই। সেইসঙ্গে এ-ও ফাইনাল হল যে, মানবের স্ত্রী, সন্তান, মা, বাবা সবাই সকাল থেকে বিপ্লবদের বাড়িতে থাকবে। আর মানব, শুভ্রা এবং বিপ্লব যদি ছুটি না নিতে পারে, তাহলে অফিস থেকে তাড়াতাড়ি ফিরে এসে হইহুল্লোড়ে যোগ দেবে। ওদের অনুপস্থিতিতে বিপ্লবের মা-বাবা ওদের ছোট্ট নাতনিকে নিয়ে সুমিতাদের সঙ্গ দেবেন এও জানাল বিপ্লব।

(ক্রমশ……)

ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং আতিথেয়তার সঙ্গম–মুর্শিদাবাদের ‘হাউস অফ শেহেরওয়ালি’

সবুজ গাছগাছালি, ধানখেত, সবজিখেত, আম-লিচুর বাগান এবং নদী পরিবেষ্টিত হয়ে বিরাজ করছে মুর্শিদাবাদ।একসময় বাংলার নবাবদের আধিপত্য ছিল এই মুর্শিদাবাদে। তারপর মুর্শিদাবাদ ছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দখলে। তাই, ইতিহাসের গন্ধ লেগে আছে মুর্শিদাবাদের আনাচেকানাচে। আর ঐতিহাসিক স্মৃতি বিজড়িত সেই মুর্শিদাবাদের আজিমগঞ্জে এখন পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে–‘হাউস অফ শেহেরওয়ালি’।

আসলে, সারা বিশ্বের মিউজিয়াম হোটেলগুলি এখন পর্যটকদের আকর্ষণ করছে। যেখানে ইতিহাস জীবন্ত হয়ে ওঠে এবং পর্যটকরা প্রকৃত সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতায় নিজেকে সমৃদ্ধ করতে পারেন। তথ্য এবং বিনোদনকে একত্রিত করে, অতীতের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করে এবং প্রকৃত ইতিহাসকে জানতে ও বুঝতে সাহায্য করে এই মিউজিয়াম হোটেলগুলি।

শেহেরওয়ালি সংস্কৃতির সঙ্গে ইতিহাসের মেলবন্ধন ঘটিয়ে, ‘হাউস অফ শেহেরওয়ালি’ বিলাসিতা এবং ঐতিহ্যের সঙ্গম ঘটিয়েছে। এর শান্তিপূর্ণ পরিবেশ এবং ফেলে দেওয়া ঐতিহাসিক সামগ্রীর অনন্য পুনঃব্যবহার ও পুনঃসংস্করণের মাধ্যমে রাজকীয় রূপ দিয়েছে। মুর্শিদাবাদের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত এই মিউজিয়াম হোটেলটি এএসআই দ্বারা সুরক্ষিত প্রায় ৫০টি প্রধান সাইটের ৫ কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে অবস্থিত। শেহেরওয়ালি হাউসটি বিশাল স্থানবিশিষ্ট, যা প্রধান শেহেরওয়ালি সরদার পরিবারের আদলে তৈরি, আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সহ, অবসর যাপনের আরামদায়ক এক অভিজ্ঞতা অর্জন নিশ্চিত করে।

মুর্শিদাবাদের আজিমগঞ্জে অবস্থিত ‘হাউস অফ শেহেরওয়ালি’ তার শাশ্বত সৌন্দর্য এবং অতুলনীয় আতিথেয়তার জন্য বিখ্যাত হয়ে উঠেছে। পূর্ব ভারতে এই ধরণের মিউজিয়াম হোটেল প্রায় বিরল বলা যায়। ইতিহাসের গন্ধ মাখা এই মিউজিয়াম হোটেলটির অবস্থান আজিমগঞ্জের ভাগীরথী নদীর পাড়ে। শান্ত, সুন্দর পরিবেশে সময় কাটানোর জন্য একেবারে আদর্শ আশ্রয়। ঐতিহ্য, আধুনিকতা এবং সূক্ষ্ম প্রাচীন শিল্পে সজ্জিত ‘হাউস অফ শেহেরওয়ালি’ দেবে রাজকীয় অভিজ্ঞতা।

পাশেই রয়েছে একটি সুন্দর জৈন মন্দির। মিউজিয়াম হোটেলটি ব্রিটিশ, ডাচ, ফরাসি এবং পর্তুগিজ সংগ্রহশালার পাশাপাশি, শেহেরওয়ালি, মোগল এবং বাঙালি পরিবারের ঐতিহ্য তুলে ধরে, যা নান্দনিকতা এবং ঐতিহাসিক কাহিনির এক অনন্য মিশ্রণ তৈরি করে। এই শিল্পের সংমিশ্রণ প্রতিটি কোণায় ছড়িয়ে পড়ে ‘হাউস অফ শেহেরওয়ালি’-কে একটি মিউজিয়াম হোটেলে পরিণত করে, যেখানে মুর্শিদাবাদের গৌরবময় অতীতকে প্রদর্শন করা হয়।

‘হাউস অফ শেহেরওয়ালি’ও ইতিহাসের মূল্যবান স্মৃতি বহন করে চলেছে। সন্ধ্যায় এক কাপ চা পান করতে-করতে, ছাদ থেকে নদীর মনোরম দৃশ্য উপভোগ করা যায়। আশেপাশের রাস্তার দু’দিকে সবুজের সমারোহও চোখকে আরাম দেয়। সকাল থেকে সন্ধে পর্যন্ত টাটকা খাবার আর নানারকম মিষ্টি পাওয়া যায় আশপাশের দোকানগুলিতে। হাউস অফ শেহেরওয়ালির অস্তিত্ব, ঐতিহ্য এবং রক্ষকের ভূমিকায় রয়েছেন প্রদীপ চোপড়া। যিনি মুর্শিদাবাদের জৈন সম্প্রদায়ের শিকড়যুক্ত। তাঁর লক্ষ্য—এই ঐতিহ্য সংরক্ষণ এবং উদযাপন করা। শুধু তাই নয়, শিল্প এবং প্রাচীন জিনিসগুলির প্রতি রয়েছে তাঁর আবেগ মিশ্রিত সংযোগ।

পড়ার জন্য সীমাহীন গল্প-নিবন্ধসাবস্ক্রাইব