এই ধরনের প্রতারণা ক্রমশ বাড়ছে

মেট্রিমোনিয়াল সাইটস জনপ্রিয় হচ্ছে ক্রমশ। কিন্তু এই সাইটগুলোর মাধ্যমে বন্ধুত্ব কিংবা বিয়ে করলে সতর্ক থাকা উচিত। সম্প্রতি এক মামলায় সামনে এসেছে— এক বিবাহিত ব্যক্তি নিজেকে অবিবাহিত পরিচয় দিয়ে এক তরুণীকে বিয়ে করেন এবং বিয়ের পর ওই তরুণী জানতে পারেন যে, লোকটি তাকে ঠকিয়েছে। পরে ওই যুবতীর অভিযোগের ভিত্তিতে প্রতারক স্বামীকে গ্রেফতার করে পুলিশ।

সবচেয়ে ভয়ের বিষয় হল— ওই প্রতারক নিজেকে অবিবাহিত পরিচয় দিয়ে ওই মেট্রিমোনিয়াল সাইটে আবেদন করেন এবং ওই সাইট থেকে তার তথ্য সঠিক ভাবে যাচাই না করেই প্রতারণার সুযোগ দিয়েছে। সেই মেট্রিমোনিয়াল সাইট থেকে মোট ১,৪১১ জন তরুণীর প্রোফাইল থেকে বেছে নিয়ে দ্বিতীয় বিয়ে করেছিলেন ওই প্রতারক।

দুশ্চিন্তার বিষয় হল, আজকাল শুধু ইন্টারনেটকে মাধ্যম করে অনেকেই বন্ধুত্ব করছেন কিংবা জীবনসঙ্গী করে নিচ্ছেন। তারা নিজেরা সঠিক ভাবে তথ্য যাচাই না করে, শুধু মেট্রিমোনিয়াল সাইটগুলোর উপর ভরসা করে বিয়ের মতো জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলছেন। আর এই যে সঠিক ভাবে তথ্য যাচাই না করার বিষয়টি প্রতারকরা জেনে গেছেন, এর ফলে তারা নির্দ্বিধায় কাউকে ঠকানোর কাজটি করে চলেছেন। এ ক্ষেত্রে ভেবে দেখুন, লিভ-ইন রিলেশনশিপ-ই হোক কিংবা বিয়ে, পুরো বিষয়টির উপর নির্ভর করছে জীবনের ভালোমন্দের বিষয়টি। অথচ শিক্ষিত হয়েও মেয়েরা এখনও একই ভুল করে চলেছেন।

আসলে অনেকেই এখন শর্টকার্ট রাস্তায় হাঁটছেন এবং জীবনে সুখের পরিবর্তে দুঃখকেই আহ্বান করে নিচ্ছেন। খুব দ্রুত যেমন মানসিক এবং শারীরিক সুখভোগের উপায় খুঁজে নিচ্ছেন, ঠিক তেমনই খুব তাড়াতাড়ি একা হয়ে যাচ্ছেন। মা-বাবা এক্ষেত্রে বড়ো অসহায়। কারণ তারা সন্তানকে স্বাধীনতা দিতে গিয়ে আর কোনও মতামত দিতে পারছেন না।

সম্প্রতি আরও একটি ঘটনা সামনে এসেছে। যেখানে দেখা যাচ্ছে, এক যুবক দেরাদুন থেকে দিল্লি যাওয়ার পথে বাসে এক যুবতির সঙ্গে আলাপ জমান এবং খাবারের সঙ্গে নেশার দ্রব্য মিশিয়ে বেহুঁশ করে সবকিছু লুঠ করে নিয়ে পালিয়ে যান।

আসলে এই মুঠোফোনের দুনিয়ার আজকের প্রজন্ম এতটাই বিভোর থাকছেন যে, তাদের বাস্তব বুদ্ধি, বিচক্ষণতা লোপ পাচ্ছে অনেক সময়। মুঠোফোনের চক্রে পড়ে ভুল পথে পা বাড়াচ্ছেন যুবক-যুবতীরা। এখন তাই গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে খবরের কাগজ কিংবা ম্যাগাজিন পড়ার উপর। কারণ ম্যাগাজিন কিংবা খবরের কাগজে সত্য ঘটনাকে তুলে ধরা হয় এখনও।

পাশার দান (শেষ পর্ব)

রমাকান্তের পরামর্শ রবির মনেও খুব ধরেছিল। রবিও রোজ সকালে উঠে বাবাকে রান্নাঘরে কিছু না কিছু সাহায্য করতে আরম্ভ করল এবং একটু করে রান্নাও শিখতে লাগল।

আরতি আর সঙ্গীতা রান্নাঘরে এলেও রমাকান্ত তৎক্ষণাৎ ওদের বাইরে বার করে দিতেন আর ওরা মনের আনন্দে পার্কের দিকে হাঁটা লাগাত।

পার্কে মর্নিং ওয়াক আর ব্যায়াম সেরে দুজনে বাড়ি ফিরত যখন, গরম গরম ব্রেকফাস্ট ওদের জন্য অপেক্ষা করত। টেবিলে একসঙ্গে বসে নানা বিষয়ে ওদের আলোচনা হতো। সকালটা ভালো ভাবে কাটলে পুরোটা দিনটা ভালো করে কাটার সম্ভাবনা দ্বিগুন বেড়ে যেত। শ্বশুর-শাশুড়ি আসাতে সঙ্গীতার আনন্দ দিন দিন বাড়ছিল। সব কাজেই আরতি ওকে সাহায্য করতেন। ফলে সঙ্গীতারও অনেক সুরাহা হতো। অনেক কিছু নতুনও শিখল শাশুড়ির কাছে।

রবির মাঝেমধ্যেই বন্ধুদের সঙ্গে বসে মদ খাওয়ার ইচ্ছা হলেও সাহসে কুলোত না। মদের নেশার কারণে নিজের মা-বাবার ঝগড়া হোক সেটা ও একেবারেই চাইত না। ধীরে ধীরে মদ খাওয়ার অদম্য ইচ্ছা ওর মনে জাগা বন্ধ হয়ে গেল। রবির এই মানসিক পরিবর্তনে সঙ্গীতাও অত্যন্ত আনন্দিত হল।

এক সপ্তাহের উপর সকালে হাঁটা এবং ব্যায়াম করার ফলে সঙ্গীতারও মেদ ঝরতে আরম্ভ করেছিল। প্রায় দুই কেজি ওজন কম হওয়ার আনন্দসংবাদ সঙ্গীতা বাড়িতে খুব আগ্রহের সঙ্গে শেয়ার করল।

—কাল রবিবার। বউমার এই সাফল্যে আমরা কালই পার্টি করব। আমি আর সঙ্গীতা মিলে সব রান্না করব। আরতি এই ঘোষণায় সকলে হাততালি বাজিয়ে সায় দিল।

রবিবার সকালে রমাকান্ত রবির সঙ্গে গিয়ে বাজার থেকে সব প্রয়োজনীয় জিনিস এনে দিলেন। মাছ, মাংস, পোলাও, মিষ্টি – মেনুতে কিছুই বাদ রাখলেন না আরতি।

রান্নার প্রশংসায় সকলেই একমত হয়ে আরতিকে বাহবা দিতেই তিনি পরিষ্কার জানালেন— সঙ্গীতারও এতে সত্তর শতাংশ অবদান আছে।

—রেস্তোরাঁয় পাঁচ হাজার টাকা খরচ করলেও এত সুস্বাদু খাবার পাওয়া যেত না। রবি মা এবং বউকে উদ্দেশ্য করে কথাগুলো বলল।

—রবি, সুস্বাদু খাবারই বলিস আর মনের আনন্দই বলিস- চোখ জলে ভরে গেল।

—এসব কিছুই বাড়ির বাইরে খোঁজাটা মুর্খামি। বলতে বলতে মায়ের

—মা, তুমি কেন কাঁদছ? রবি মায়ের চোখের জল মুছতে মুছতে জিজ্ঞেস করল। -আমরা কি কোনও অন্যায় করেছি মা! ঘাবড়ে গিয়ে সঙ্গীতা জিজ্ঞেস করল।

—না বউমা। সঙ্গীতার গালে আলতো করে হাত ছুঁইয়ে আদর করলেন আরতিদেবী। বললেন, সবাইকে একসঙ্গে এখানে আনন্দ করতে দেখে আমি চোখের জল আটকাতে পারিনি।

—এটা তো আপনাদেরই আশীর্বাদ। সঙ্গীতা আদর করে শাশুড়ির হাত নিজের গালের উপর রাখল।

রমাকান্ত একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, “আজ সন্ধেবেলায় আমরা ফিরে যাচ্ছি, তাই হয়তো আরতির চোখে জল এসে গেছে।” —হঠাৎ তোমরা ফিরে যাওয়ার প্ল্যান কখন করলে? রবি আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করল।

—না মা, আপনাদের আমি কিছুতেই এখন যেতে দেব না। সঙ্গীতার কথাটা বলতে বলতে গলা ধরে এল।

—আমরা আজকেই ফিরে যাব ঠিক করেই এসেছিলাম বউমা। তোমার ভাসুর, ভাসুর বউও আমাদের যাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে। ছোট্ট রেহানও অপক্ষো করে আছে কখন ঠাম্মা দাদু যাবে। বলে আরতি একটু হাসার চেষ্টা করলেন কিন্তু অসফল হয়ে সঙ্গীতাকে জড়িয়ে ধরলেন।

রবি এবং সঙ্গীতার চোখ জলে ভলে গেল। “বাবা, তোমরা দু’জন এখন যেও না। তোমরা আসাতে আমাদের জীবন আনন্দে ভরে উঠেছে। তোমরা চলে গেলে আবার হয়তো আমাদের জীবন অন্ধকারে ডুবে যাবে। বলতে বলতে রবি উদাস হয়ে পড়ল।

রমাকান্ত রবির চুলে স্নেহের বশে আঙুল চালাতে চালাতে বললেন, ‘রবি নিজের সংসারের খুশি, সুখশান্তি এবং নিজেকে আনন্দে রাখতে অপরের উপর কখনও নির্ভর করে থেকো না। তোমরা যদি বুঝেশুনে ঠিকমতো চলো তাহলে আমরা চলে যাওয়ার পরেও এই ভাবেই তোমাদের সংসারে খুশি বজায় থাকবে।’

—ব্যস আমাদের একটাই কথা মনে রেখো দুজনে। আরতিদেবী স্নেহভরা স্বরে দুজনকে বললেন, নিজেদের মধ্যে লড়াই-ঝগড়ায় মনের মধ্যে বিদ্বেষ জমা হতে থাকে। কাউকে ভালোবাসতে কিংবা লড়াই ঝগড়া করতে অনেক এনার্জি খরচ হয়। তোমরা দু’জন লড়াই করো কিংবা প্রেম ভালোবাসায় সময় কাটাও, সবসময় লক্ষ্য রেখো এনার্জির সঙ্গে যেন মনের বিদ্বেষও জলের মতো বয়ে চলে যায়। অতীতে কী ঘটে গেছে তাই নিয়ে বর্তমান বা ভবিষ্যতের জীবনের আনন্দ নষ্ট করতে যেও না।

রবি আর সঙ্গীতা দুজনেই মায়ের কথা মন দিয়ে শুনে ঘাড় নাড়ল।

—মা আপনি যখন পরের বার আসবেন পুরো অন্য এক সঙ্গীতাকে দেখতে পাবেন। সঙ্গীতা শাশুড়ির হাত ধরে আশ্বাস দিল। আমাদের চোখে এতদিন পর্দা ঢাকা ছিল, তোমরা সেই পর্দা সরাতে আমাদের সাহায্য করেছ। তোমাদের দুজনকেই ধন্যবাদ। রবি ধরা গলায় বলল।

—মা-বাবা সবসময় বাচ্চাদের শুভ চিন্তাই করে। তোদের বাবার সঙ্গে আমার লড়াইটা নাটকই ধরে নিস। আরতি বললেন। কথাগুলো বলে রহস্যময় ভঙ্গিতে আরতি স্বামীর দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলেন।

পাশার দান (পর্ব- ০৩)

সকাল সাতটা নাগাদ রবি চা বানিয়ে এনে সঙ্গীতাকে বিছানায় দিয়ে দিত। পাশেই রবিকে ঘুমিয়ে থাকতে দেখে সঙ্গীতা বুঝতে পারল শাশুড়ি বা শ্বশুর কেউ রান্নাঘরে ঢুকেছেন।

সঙ্গীতা বুঝতে পারছিল না উঠবে না শুয়েই থাকবে ঠিক তখনই শয়নকক্ষের দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ কানে গেল৷ অগত্যা বিছানা ছাড়তে বাধ্য হল সঙ্গীতা। দরজা খুলতেই দেখল শাশুড়ি চায়ের ট্রে হাতে নিয়ে দরজায় দাঁড়িয়ে।

—রবিকে তুলে দাও বউমা। আর দু’জনে চা খেয়ে নাও। আজকে তোমার শ্বশুরমশাই নিজের হাতে চা বানিয়েছেন। মনে হচ্ছে, ব্রেকফাস্ট-টাও আজকে উনিই বানাবেন। সঙ্গীতার হাতে ট্রে-টা ধরিয়ে আরতি ফিরে গেলেন।

সঙ্গীতা কিছুটা কুণ্ঠা বোধ করছিল। তাকিয়ে দেখল রবি ঘুম ভেঙে খাটে উঠে বসেছে। রবিকে জাগতে দেখে সঙ্গীতা কিছুটা অনুযোগের সুরে বলল, “তুমি তো জানো তাড়াতাড়ি ঘুম ভেঙে গেলে আমার সারাদিন মাথাযন্ত্রণা হতে থাকে। তোমার মা-বাবাকে বলে দিও আমাকে যেন তাড়তাড়ি ঘুম থেকে তুলে না দেন।

রবি হাত বাড়িয়ে ট্রে থেকে চা নিয়ে চুমুক দিল। কিছুটা আশ্চর্য হয়ে বলল, ‘বাবা আগে তো চা পর্যন্ত বানাতে পারত না আর আজ ব্রেকফাস্টও বানাচ্ছে? কী ব্যাপার ঠিক বুঝতে পারছি না।’

সঙ্গীতার আর একটু শোয়ার ইচ্ছা ছিল কিন্তু রান্নাঘরে ক্রমান্বয়ে বাসনের আওয়াজ হওয়ার ফলে ও আর ঘুমোতে পারল না। বাড়ির বউ হওয়ায় মনে হল রান্নাঘরে গিয়ে শ্বশুর-শাশুড়িকে সাহায্য করাটা ওর উচিত।

চা খেয়ে সঙ্গীতা রান্নাঘরের দিকে পা বাড়াল, পিছনে রবি। রান্নাঘরে পৌঁছে দুজনেই দেখল রমাকান্ত আলুর দম রান্নায় ব্যস্ত। আরতি একপাশে ময়দা মাখছেন।

সঙ্গীতা রান্নাঘরে ঢুকে শ্বশুরকে হাসি মুখে বলল, ‘বাবা আপনি কেন রান্না করছেন! আমাকে দিন, আপনি বরং বাইরে একটু ঘুরে আসুন।’ রমাকান্ত হেসে ফেললেন সঙ্গীতার কথা শুনে।

—বউমা, আমি তোমার শাশুড়ির কাছ থেকে কিছু কিছু রান্না শিখেছি। এখন এসব করতে আমার বেশ ভালোই লাগে৷ এক কাজ করো ঝটপট মুখ হাত ধুয়ে জলখাবার খেয়ে তুমি আর রবি আজকে কোথাও ঘুরে এসো।

—মা, বাবা কবে থেকে রান্না করা শিখল? বাবার কী প্রয়োজন রান্না করার ঠিক বুঝতে পারলাম না! অবাক হয়ে রবি বলল।

তোর বাবার জেদের কাছে কারও জেতার উপায় আছে নাকি? বাড়ির সব কাজ মিলেমিশে স্বামী-স্ত্রী দু’জনেরই করা উচিত। কোভিডের সময় তোর বাবা যখন বাড়িতে বসে ছিল তখনই মাথায় এই ভূত চেপেছিল। এক সপ্তাহের ভিতরে মাংস, সবজি, ভাত রান্না করা— সব শিখেছে আমার কাছে। কিছু মাছও রান্না করতে পারে তবে সব নয়। বাড়িতেও এখন উনি বেশিরভাগ সময় রান্নায় সাহায্য করেন।’ বলে আরতি তাকালেন স্বামীর দিকে।

—এটা তো দারুণ ব্যাপার। প্রশংসা ভরা চোখে রবি বাবার দিকে তাকাল।

—আমরা যতদিন আছি রান্নাবান্না আমি আর আরতি সামলে নেব। রমাকান্ত বললেন।

—ঠিক আছে। আজ আলুর দম আর লুচি খেয়ে দেখি ক’দিন তোমার রান্না বরদাস্ত করতে পারব! নিজের ঠাট্টাতে নিজেই হেসে ফেলল রবি।

—বাবা, আপনি রান্নাঘরে কাজ করবেন, এটা আমি কিছুতেই মেনে নিতে পারছি না। এই বলে সঙ্গীতা ধনেপাতা কাটতে ব্যস্ত রমাকান্তর হাত থেকে ছুরিটা নেওয়ার চেষ্টা করল।

—ছাড়ো বউমা।

আরতি উঠে সঙ্গীতার হাত ধরে টেনে ওকে দরজার দিকে নিয়ে গেল। ‘চলো আমরা কিছুক্ষণ সামনের পার্কটায় ঘুরে আসি। এত সুন্দর পার্কটা। ততক্ষণ রবি ওর বাবাকে সাহায্য করুক।’

সঙ্গীতার ‘না… না…’, সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে আরতি ওকে টেনে বাড়ির বাইরে নিয়ে এলেন। এদিকে রমাকান্তও রবিকে জোর করে লুচি ভাজার দায়িত্বে নিয়োগ করলেন।

পার্কে গিয়ে আরতি সঙ্গীতাকে কিছু এক্সারসাইজ শেখালেন। ফেরার সময় সঙ্গীতা নিজেকে খুব ফ্রেশ অনুভব করছিল। মনটা ওর অনাবিল আনন্দে ভরে উঠেছিল।

—মা, বিয়ের পর থেকে আমার ওজন সমানে বেড়েই চলছিল। আপনি যেগুলো দেখালেন ওগুলো করলে আমি ফিট থাকতে পারব? আশার আলো জ্বলে উঠল সঙ্গীতার চোখে-মুখে।

—হ্যাঁ, অবশ্যই ফিট থাকতে পারবে। তবে একটা সমস্যা আছে! উদ্বেগ ভরা কণ্ঠে আরতি জানালেন।

—কী সমস্যা, মা?

—সকালে উঠে তার জন্য পার্কে আসতে হবে।

—আমি সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে পড়ব।

হঠাৎই আরতি উৎফুল্ল হয়ে বলে উঠলেন, ‘বউমা আমরা একটা কাজ করব। রোজ রবি আর তোমার শ্বশুরকে জলখাবার বানাবার দায়িত্ব দিয়ে আমরা পার্কে চলে আসব।’

—হ্যাঁ, ঠিক বলেছেন মা। বাড়ির কাজও হল আবার আমাদের শরীরচর্চাও হল। আমার ওজনও কমবে আবার বাড়ি ফিরে গরম গরম জলখাবারও পেয়ে যাব। সঙ্গীতা মনের আনন্দ চেপে রাখতে পারল না।

এদিকে রমাকান্ত রান্নাঘরে কাজ করতে করতে ছেলেকে বলছিলেন, ‘রবি আমি তোমার মায়ের কাছ থেকে অনেক কিছু বানাতে শিখেছি। কারণ আরতির শরীর সবসময় ভালো থাকে না। তোমাকেও দেখি রোজ ব্রেড-মাখন খেয়ে অফিস যাচ্ছ। আমি তোমাকে কয়েকটা রান্না শিখিয়ে দিচ্ছি যেগুলো করতে খুব কম সময় লাগে আর হেলদিও। এতে তোমার আর বউমার দুজনেরই খুব সুবিধে হবে।

—তোমাকে রান্নায় সাহায্য করতে পেরে আমারও খুব ভালো লাগছে বাবা। তুমি আমাকে আরও কিছু রান্না শিখিয়ে দাও। রবি আনন্দের সঙ্গে বলল।

—ঠিক আছে, ফ্রেশ হয়ে চলে এসো টেবিলে। বাপ-ছেলে একসঙ্গে ব্রেকফাস্ট করব।

—মা আর সঙ্গীতার আসার অপেক্ষা করব না?

—আরে তোর বউ যতক্ষণ বাইরে ঘুরছে ততক্ষণই ভালো। মায়ের সঙ্গে ওকেও পার্কে রোজ পাঠা। দেখলাম বউমা একটু ওয়েট গেন করেছে যেটা ওর শরীরের পক্ষেও খারাপ।

পাশার দান (পর্ব- ০২)

মা-বাবার ঝগড়ায় এমনিতেই রবির নেশা পুরোপুরি কেটে গিয়েছিল। বাবার মদ খাওয়ার পুরোনো অভ্যাস নিয়েই ঝগড়া শুরু হয়েছিল। সবথেকে আশ্চর্যের ব্যাপার হল শত চেষ্টা করেও রবি মনে করতে পারল না যে, সে কখন বাবাকে মদ খেতে দেখেছে।

বিয়ের পর সঙ্গীতা শ্বশুরবাড়িতে কমদিনই থেকেছে। এখন শ্বশুর-শাশুড়ির মধ্যে ঝগড়া দেখে নিজের সঙ্গে অনেক মিল দেখতে পাচ্ছিল সে।

রবিবার সঙ্গীতা, আরতি আর রমাকান্তর নতুন একটা রূপ দেখে স্তম্ভিত হয়ে গেল।

শাশুড়ির এক প্রশ্নের উত্তরে সঙ্গীতা জানল, ‘রবির বেড়াতে যাওয়া বা সিনেমা দেখতে যাওয়ার কোনও শখ নেই। কত মাস হয়ে গেছে আমি কোনও সিনেমা দেখিনি।”

—তিন ঘন্টা সিনেমা হলে বসে আজেবাজে ছবি দেখে সময় নষ্ট করার কোনও মানে হয় না। রবি নিজের স্বপক্ষে মত প্রকাশ করল। সারাদিন টিভিতে প্রচুর ফিল্ম দেখানো হয়ে থাকে। সঙ্গীতা ওগুলো দেখেই শখ পূরণ করে।

—আসলে তোরা বাপ-বেটা কেউই বউদের শখ পূরণ করার জন্য খরচা করতে চাস না। আরতিদেবী সঙ্গীতার হাত নিজের হাতে শক্ত করে ধরে ছেলের কথায় টিপ্পনি কাটলেন।

—তুমি প্রতিটা কথায় আমাকে কেন টেনে আনো বলো তো? আমি বিয়ের এক বছরের মধ্যে তোমাকে অন্তত পঞ্চাশটা সিনেমা দেখিয়েছি। রমাকান্ত বউয়ের কথার প্রতিবাদ করে বলে উঠলেন।

—সিনেমা দেখার শখ তোমার ছিল, আমার নয়। মুখ ঝামটা দিলেন আরতি।

—তাহলে তুমি হলে গিয়ে চোখ বন্ধ করে বসে থাকতে, তাই না?

কপট রাগ দেখাতে গিয়েও হেসে ফেললেন আরতি। সঙ্গীতার দিকে তাকিয়ে বললেন, “জানো সঙ্গীতা, আমার ফিশফ্রাই, ভাজাভুজি, চপ-কাটলেট খেতে খুব ভালো লাগত আর তোমার বাবার ওগুলো খেলেই অম্বল হতো। বাইরের খাবার একেবারে পছন্দ করত না। তোমাকে একটা ঘটনা বলি শোনো।

—হ্যাঁ, বলুন না মা! উৎসাহের সঙ্গে সঙ্গীতা বলে উঠল।

—আমাদের প্রথম বিবাহবার্ষিকীতে তোমার শ্বশুররমশাই আমাকে দোকানে নিয়ে গিয়ে এক প্লেট ফিশফ্লাই কিনে দিয়েছে। ফিশ ফ্রাই-টা যখন হাতে দিচ্ছে তখন উনি বিশাল পোজ দিয়ে বলে উঠলেন, “এই নাও আজ আবার তোমার পছন্দের ফ্লাইয়ের স্বাদ গ্রহণ করো।”

—আমি তো অবাক হয়ে বলে উঠলাম, তুমি এর আগে কবে আমাকে ফিশ ফ্রাই খাইয়েছ! উত্তরে উনি বললেন, ‘কেন তোমার মনে নেই? হনিমুনে দিঘায় গিয়ে তোমাকে খাইয়েছিলাম, সেকথা ভুলে বসে আছো?’

মায়ের কথায় সঙ্গীতা আর রবি দু’জনেই হেসে উঠল। রমাকান্তও মিটমিট করে হাসছিলেন। ছদ্মকোপ দেখিয়ে আরতিও স্বামীর দিকে তাকালেন কিন্তু তাঁর চোখে স্পষ্টই স্বামীর প্রতি ভালোবাসা ও সম্মান ধরা ছিল।

হঠাৎ রমাকান্ত উঠে দাঁড়িয়ে নাটকীয় ভঙ্গিতে বুক ফুলিয়ে রবির দিকে তাকিয়ে বলে উঠলেন, “শুধু শুধু তোর মা আমার নামে মিথ্যা গল্প ফেঁদে তোদের সঙ্গে ঠাট্টা করছে, এটা আমি কিছুতেই আর মেনে নেব না।”

—তাহলে এই ব্যাপারে তোমাকেও কিছু বলতে হয় বাবা। রবি খুব কষ্ট করে হাসি চেপে রেখে গম্ভীর হয়ে বলল।

—রবি, তুই এখনই দোকানে গিয়ে চপ, ফিশফ্রাই সব নিয়ে আয় তো তোর মায়ের জন্য। তোর মা যদি চায় নিজের শরীর খারাপ হোক তাতে আমার কী বলার আছে?

—আমার কী চাই সেটা নিয়ে নয় বরং আমরা কথা বলছিলাম, রবি সঙ্গীতাকে সিনেমা দেখাতে নিয়ে যায় না, সেটা নিয়ে। আরতি মনে করান স্বামীকে।

—রবি! উত্তেজিত কণ্ঠে রমাকান্ত ছেলের নাম ধরে জোরে বলে ওঠেন।

—হ্যাঁ, বলো বাবা। বাধ্য ছেলের মতোই রবি বলে।

—তুই কি সারাজীবন বউকে সিনেমা দেখাতে নিয়ে যাস না, এই অভিযোগ শুনে যেতে চাস?

—একদম না।

—তাহলে চারটে সিনেমার টিকিট কেটে আন লক্ষ্মী ছেলে আমার।

—নিয়ে আসছি কিন্তু চারটে কেন?

—আমি আর আরতিও তোদের জন্য তিন ঘন্টার কষ্ট ভাগ করে নেব।

—ঠিক আছে নিয়ে আসব। রবির কণ্ঠস্বর কিছুটা নিস্তেজ শোনাল।

—নিজের ভাগ্যের উপর একটু কেঁদেই না হয় মনটা একটু হালকা করে নেব।

—ঠিক আছে বাবা।

—তাহলে এখনই কিছু ফ্রাই-টাই আর সিনেমার টিকিট কেটে নিয়ে চলে আয়। রমাকান্ত ছেলেকে বললেন।

—তাহলে টাকা দাও।

—এখন তুই দিয়ে দে, আমি পরে তোকে দিয়ে দিচ্ছি।

—ধার চলবে না।

—আমার কাছে সব দু’হাজার টাকার নোট। রমাকান্ত বললেন।

—আমি খুচরো করে দেব।

—কেন, আমাকে তোর বিশ্বাস হচ্ছে না? রবি মুচকি হেসে চুপ করে রইল।

আরতি স্বামীর দিকে তাকিয়ে বলে উঠলেন, ‘আবার কিপটেমি করছ?’

রমাকান্তও কপট রাগ দেখিয়ে স্ত্রীর দিকে তাকালেন কিন্তু কথাগুলো ওনাকে স্পর্শ করেছে বলে মনে হল না। হঠাৎই হেসে উঠে রমাকান্ত পার্স থেকে চারটে পাঁচশো টাকার নোট ছেলের হাতে ধরিয়ে দিলেন।

স্বামীকে পরাস্ত করতে পেরেছেন বুঝতে পেরে আরতিও হেসে উঠলেন। ঘরের পরিবেশ হাসিতে ভরে উঠল।

সেদিন রাতে সঙ্গীতা আর রবিও একে অপরের ঘনিষ্ঠ হয়ে নিশ্চিন্ত নিদ্রায় রাত কাটিয়ে দিল। দীর্ঘদিন বাদে রবি হৃদয়ের গভীরতা দিয়ে সঙ্গীতাকে আদরে ভরিয়ে দিতে পেরেছিল। প্রেমের পর আত্মসমর্পণ যেমন মানসিক শান্তি দিতে সক্ষম ঠিক তেমনি দুশ্চিন্তার ভার কম করে মানুষকে গভীর নিদ্রায় আচ্ছন্ন করতেও কার্যকরী।

পরের দিন সকাল ছ’টা নাগাদ রান্নাঘরে বাসনের আওয়াজে সঙ্গীতার ঘুম ভাঙল। এত সকাল সকাল ওর ওঠার অভ্যাস ছিল না। তাড়াতাড়ি যদি ঘুম ভেঙে যেত সারাদিন মাথাব্যথা নিয়ে সঙ্গীতা পড়ে থাকত।

ভিন্ন স্বাদের চাররকম মিষ্টি

আপনি যদি মিষ্টিপ্রেমী হন, তাহলে ভিন্ন স্বাদের এই চাররকম মিষ্টি খান জমিয়ে। সুজি-নারকেলের বরফি, গোলাপজাম, ক্যারামেল পুডিং কিংবা স্টাফড খোয়াক্ষীরের লাড্ডু সবার মন ভরিয়ে দেবে। জেনে নিন কীভাবে তৈরি করবেন।

সুজি-নারকেলের বরফি

উপকরণ: ৩ বড়ো চামচ ঘি, ৩/৪ কাপ সুজি, ১/২ কাপ নারকেল গ্রেট করা, ২ কাপ দুধ, ৩/৪ কাপ চিনি, ১ ছোটো চামচ এলাচগুঁড়ো, সাজানোর জন্য পেস্তা।

প্রণালী: প্যানে ঘি গরম করে এতে সুজি হালকা বাদামি করে ভেজে নিন। এবার এতে নারকেলকোরা দিয়ে ৫ মিনিট নাড়াচাড়া করুন। আঁচ থেকে নামিয়ে ঠান্ডা হতে দিন। একটা সসপ্যানে দুধটা ঢেলে, ঢিমে আঁচে ফুটতে দিন। এতে অল্প অল্প করে সুজি মেশাতে থাকুন এবং ক্রমাগত নাড়ুন। দুধটা শুকিয়ে এলে এই মিশ্রণে চিনি ও এলাচগুঁড়ো দিয়ে ভালো ভাবে মিশিয়ে নিন। কিছুক্ষণ নাড়াচাড়া করার পরই মিশ্রণ থেকে ঘি আলাদা হতে শুরু করবে। একটা ট্রে-তে ঘি বুলিয়ে, এই মিশ্রণ চারিয়ে দিন। কিছুক্ষণ সময় দিন সেট হবার জন্য তারপর মনের মতো আকারে কেটে নিন। পেস্তা দিয়ে সাজিয়ে পরিবেশন করুন।

গোলাপজাম

উপকরণ রস তৈরির জন্য: ১ কাপ চিনি, ১ কাপ জল, অল্প এলাচগুঁড়ো, ১ বড়ো চামচ লেবুর রস, ২ বড়ো চামচ গোলাপ জল। উপকরণ গোলাপজাম তৈরির জন্য: ১ কাপ মিল্ক পাউডার, ৪ বড়ো চামচ ময়দা, ১ বড়ো চামচ সুজি, ১ চিমটে বেকিং সোডা, ১ বড়ো চামচ ঘি, ১ বড়ো চামচ দই, ৪-৫ বড়ো চামচ দুধ।

অন্য উপকরণ: ভাজার জন্য ঘি বা সাদা তেল, সাজানোর জন্য ড্রাই ফ্রুট্স।

প্রণালী: একটা প্যানে চিনি ও জল দিয়ে ঢিমে আঁচে নাড়তে থাকুন। রস ঘন হলে এলাচগুঁড়ো দিন। লেবুর রস দিয়ে দিন যাতে না রস দানা বেঁধে যায়। ঢেকে আলাদা রাখুন।

এবার গোলাপজাম তৈরি করার জন্য একটা মিক্সিং বোল-এ ময়দা, মিল্ক পাউডার, সুজি ও বেকিং সোডা দিয়ে ভালো ভাবে মেশান। সমানে নাড়তে থাকুন এবং অল্প অল্প করে দুধ ঢালতে থাকুন। নরম ‘ডো’ তৈরি হলে এর থেকে ছোটো ছোটো বল তৈরি করুন। বলগুলো বাদামি করে ডিপ ফ্রাই করুন। একটা পাত্রে তুলে এর মধ্যে তৈরি করে রাখা রসটা ঢেলে দিন। ৪০ মিনিট ঢেকে রেখে দেওয়ার পর ড্রাই ফ্রুট্স ছড়িয়ে পরিবেশন করুন।

ক্যারামেল পুডিং 

উপকরণ: ১/২ কাপ চিনি, ৩টে ডিম ফেটানো, ১⁄২ কাপ চিনি, ১১/২ কাপ ছোটো চামচ ভ্যানিলা, ২ কাপ দুধ ফোটানো, জায়ফল অল্প, সাজানোর জন্য পুদিনাপাতা।

প্রণালী: একটা গভীর তল-যুক্ত পাত্রে চিনি দিয়ে, ঢিমে আঁচে গলতে দিন। রং বাদামি হলে ক্যারামেল তৈরি হয়ে যাবে। ৪টি ছাঁচে এই চিনির রসটা ভরে আভেনে ঢুকিয়ে ১০ মিনিট রেখে দিন যাতে শক্ত হয়ে যায়।

এবার একটি মাঝারি পাত্রে, ডিম, চিনি, ভ্যানিলা এসেন্স ও জায়ফল দিয়ে ভালো ভাবে মেশান। এই মিশ্রণ ছেঁকে, ৪টি ক্যারামেল ভরা ছাঁচের ভিতর ঢেলে দিন। খেয়াল রাখবেন ছাঁচ যেন ৩/৪ অংশই ভরে। এবার আভেনে একটি রেক্টাংগুলার প্যান রেখে তাতে ছাঁচগুলি রাখুন। প্যানে অবশ্যই গরম জল ভরে দেবেন। এবার বেক করুন। পুডিং তৈরি হয়েছে বুঝলে ছাঁচ বের করে নিন ও ছুরির সাহায্যে প্লেটে ঢালুন। ক্যারামেল সিরাপ পুডিং-এর উপর ছড়িয়ে পড়লে, একটি পুদিনাপাতা দিয়ে সাজিয়ে, পরিবেশন করুন।

স্টাফড খোয়াক্ষীরের লাড্ডু

উপকরণ: ১ কাপ খোয়াক্ষীর, ১/২ কাপ গুঁড়ো চিনি, ১২ বড়ো চামচ ঘি, ১/৪ কাপ মিক্স ড্রাইফ্রুট্স, ৪ বড়ো চামচ নারকেলকোরা, অল্প পেস্তা।

প্রণালী: একটা ননস্টিক প্যানে ঘি গরম করে খোয়াক্ষীর ঢেলে ২ মিনিট নাড়াচাড়া করুন। এতে চিনি দিন এবং ভালো ভাবে মিশিয়ে আঁচ থেকে নামিয়ে আলাদা রাখুন। হাতে ঘি বুলিয়ে এই মিশ্রণ থেকে অল্প করে নিয়ে বল তৈরি করুন। বলগুলির মাঝখানটা চ্যাপ্টা করে এতে ড্রাইফ্রুট্স-এর পুর ভরে দিন। পুনরায় ভালো ভাবে বল তৈরি করুন। পেস্তা ও নারকেল কোরার উপর রোল করে সেট হতে রেখে দিন। তারপর সার্ভ করুন।

পাশার দান (পর্ব- ০১)

শ্বশুর-শাশুড়ির আসার খবরটা আসতেই সঙ্গীতার মুখ ভার হয়ে গেল। ওর স্বামী রবিরও পুরো ব্যাপারটা নজর এড়াল না। এক সপ্তাহ আগেই সঙ্গীতার বড়ো ননদ মীনাক্ষী নিজের দুটো বাচ্চাকে নিয়ে টানা দশদিন কাটিয়ে গেছে রবিদের বাড়িতে। সুতরাং এত তাড়াতাড়ি আবার শ্বশুর-শাশুড়ি আসবে শুনে সঙ্গীতা বিরক্ত বোধ করছিল।

—এরকম মুখ করে ঘুরো না সঙ্গীতা। দশ পনেরো দিনেরই তো ব্যাপার। প্রথমবার ওনারা আমাদের এখানে কিছুদিন থাকতে আসছেন। তাই আমি কিছুতেই ওনাদের না করতে পারলাম না।

রবির কথাগুলো শুনে সঙ্গীতা আরও বিরক্তি সহকারে উত্তর দিল, ‘আমার নিজের শরীরই ভালো যাচ্ছে না। ওনাদের দেখাশোনার জন্য লোক ঠিক করো আগে, তাহলে আমার কোনও নালিশ শুনতে হবে না। ওনারা যতদিন খুশি থাকুন না, আমার কিছু যায় আসে না।’ সঙ্গীতার কথা বলার ভঙ্গিতেই ওর মনোভাব স্পষ্ট হয়ে উঠল।

মা-বাবার এখানে আসা নিয়ে রবির মনেও শঙ্কার মেঘ জমা হচ্ছিল। কারণ আগে মীনাক্ষীর সামনেও সঙ্গীতার সঙ্গে ওর বেশ কয়েকবার ঝগড়া হয়েছিল। মীনাক্ষী নিশ্চই ওদের ঝগড়ার খবর মা-বাবাকেও জানিয়ে থাকবে। রবি ভালো করেই জানে মা-বাবা পুরোনো দিনের মানুষ এবং তাঁদের ধ্যানধারণা যে সবই ভুল এমনটা তো নয়।

বিয়ের পাঁচ মাস যেতে না যেতেই রবির প্রায়দিনই সঙ্গীতার সঙ্গে ঝগড়া হতো। এই পরিস্থিতি আরও ঘন ঘন তৈরি হয় এখন। এটা দুটি বয়স্ক মানুষকে যে চিন্তিত করে তুলবে এবং তাঁদের দুঃখ দেবে এটা ভাবাটা ভুল নয়। কীভাবে মা-বাবার সামনে মাথা তুলে দাঁড়াবে এই ভাবনা রবিকে ভিতরে ভিতরে অস্থির করে তুলছিল। আগে করোনার অছিলা দিয়ে ওনাদের আসা স্থগিত রেখেছিল। এখন সেই বাহানাও করা চলবে না।

সঙ্গীতার মানসিক পরিস্থিতিও কিছুটা রবির মতোই। বেশি কাজের বোঝা বাড়বে, এটা সঙ্গীতার শুধুমাত্র একটা বাহানা। সঙ্গীতা চাইছিল না শ্বশুর-শাশুড়ি প্রথমবার এসে ওর সম্পর্কে একটা খারাপ ধারণা করুক। ওনারা ওদের নিয়ে চিন্তা করবেন কিংবা ওদের বোঝাবার চেষ্টা করবেন— সেটা সঙ্গীতার পক্ষে খুবই অপমানজনক। এই পরিস্থিতি যাতে না আসে সেটাই সঙ্গীতা চাইছিল। রবিকে সেইজন্যই ও বারণ করছিল শ্বশুর-শাশুড়িকে বাড়িতে নিয়ে আসতে।

দু’দিন পর সঙ্গীতার শ্বশুর-শাশুড়ি ছেলের বাড়ি এসে পৌঁছোলেন। দুজনের কেউই ছেলে-বউয়ের মধ্যে দু’বছর ধরে চলতে থাকা ঝগড়ার কথা তুললেন না। সঙ্গীতার জন্য ওনারা দুটো শাড়ি উপহার হিসেবে নিয়ে এসেছিলেন। সেদিন সারা দিনটা নানারকম গল্প করে খুব সুন্দর ভাবে কেটে গেল। সঙ্গীতাও মনে মনে কিছুটা নিশ্চিন্ত বোধ করল।

—মা-বাবার সামনে আমি কোনও তর্ক করব না তোমার সঙ্গে আর তুমিও ওনাদের সামনে আমার সঙ্গে কোনওরকম কথা কাটাকাটি বা ঝগড়া করবে না রবি। সঙ্গীতার এই প্রস্তাবে সম্মতি জানিয়ে রবি শুতে চলে গেল।

পরের দিন যা ঘটল সেটা ওরা দুজনে কেউ-ই কল্পনাই করেনি। সেদিন সন্ধেবেলা রবি বন্ধুদের সঙ্গে আকণ্ঠ মদ খেয়ে বাড়িতে ঢুকল। সপ্তাহে প্রায় তিন-চারদিন ও এমনটাই করত এবং এটাই ছিল সঙ্গীতার সঙ্গে ওর ঝগড়ার কারণ।

রবি বাড়ি ঢুকতেই সঙ্গীতার নাকে মদের গন্ধ গেল। রাগে ওর মাথা গরম হয়ে উঠল কিন্তু ও নিজেকে সংযত করে নিল। মুখে একটা কথাও বলল না।

রবির বেশির ভাগ বন্ধু-বান্ধবই নেশাখোর প্রকৃতির। রবি নিজে মফস্সলের ছেলে এবং কিছুটা শহুরে হাবভাবের অভাব থাকাতে শহরের ছেলেরা ওর সঙ্গে খুব একটা মিশত না। ফলে নিম্নমধ্যবিত্ত স্তরের ছেলেরা ওর বন্ধু হয়ে উঠেছিল যারা কিনা সস্তার মদ খেতেই অভ্যস্ত।

রবি বাড়ি ফিরলে ওর মা ছেলেকে অভ্যর্থনা জানাতে রবির কাছে যেতেই ওর মুখ থেকে মদের গন্ধ পেলেন।

—তুই মদ খেয়ে বাড়ি ফিরেছিস? শঙ্কিত গলায় আরতিদেবী ছেলেকে জিজ্ঞেস করলেন।

—একজন বন্ধুর বাড়িতে পার্টি ছিল, জোর করে ওরা খাইয়ে দিল। মা-কে কোনওরকমে কাটিয়ে শোবার ঘরের দিকে পা বাড়াল রবি।

আরতি নিজের স্বামী রমাকান্তর দিকে ফিরে অভিযোগের সুরে বললেন, ‘রবির এই বদভ্যাস তোমার জন্যই হয়েছে।” -বাজে কথা বোলো না। রমাকান্ত এক কথায় স্ত্রীকে থামিয়ে দিলেন।

—আমি ঠিকই বলছি। আরতির মুখে ভয়ের লেশমাত্র দেখা গেল না! রবি যখন ছোটো ছিল ও তোমাকে রোজ মদ খেতে দেখত আর এখন সে নিজেই খাওয়া শুরু করেছে।

—দশ বছর আগেই আমি খাওয়া বন্ধ করে দিয়েছি।

—যখন ব্লাডপ্রেশার বাড়ল আর বুঝতে পারলে লিভার খারাপ হতে শুরু করেছে তখন তুমি মদ খাওয়া ছেড়েছ। আমি কত বুঝিয়েছি যে বাচ্চাদের উপর এর খারাপ প্রভাব পড়বে কিন্তু তুমি আমার একটা কথাও শোনোনি। এখন আমাদের ছেলের এই করে শরীর খারাপ হবে এবং এর জন্য তুমি দায়ী।

—আরতি, বাজে কথা বলা বন্ধ করো।

স্বামীকে রাগতে আরতি আগেও বহুবার দেখেছেন। তাই দমে না গিয়ে নিজের বক্তব্যে স্থির থেকে তর্ক চালিয়ে যাচ্ছিলেন। সঙ্গীতা অনেক চেষ্টা করল শাশুড়িকে অন্য ঘরে নিয়ে যাওয়ার কিন্তু পারল না। রবিও বাবাকে চুপ করার জন্য বারবার বলতে লাগল কিন্তু রমাকান্তও বলা বন্ধ করলেন না।

রাগ দমন করতে না পেরে রমাকান্ত আরতির গায়ে হাত তুলতে যাচ্ছিলেন ঠিক তখনই সঙ্গীতা শাশুড়ির হাত ধরে টেনে অন্য ঘরে তাঁকে নিয়ে এল। রবিও অনেক্ষণ রমাকান্তের পাশে বসে তাঁকে রাগ কন্ট্রোল করার পরামর্শ দিতে লাগল এবং রমাকান্ত চুপচাপ বসে ছেলের কথা শুনতে লাগলেন।

আপনার চুলের বিশেষ যত্ন নিন বর্ষাকালে

আমাদের শরীরের সৌন্দর্যের অন্যতম অংশ চুল। তাই চুল বাঁচানোর চেষ্টা করা উচিত। বৃষ্টির জল ক্ষারযুক্ত এবং দূষিত হয়। তাই যদি মাথার চুল ভিজে যায় বৃষ্টির জলে, তাহলে তখনই উপযুক্ত ব্যবস্থা এবং যত্ন না নিলে, চুলের ক্ষতি হতে পারে। কিছু ঘরোয়া উপায় অবলম্বন করে কীভাবে চুলের স্বাস্থ্যরক্ষা করবেন, সেই বিষয়ে জেনে নিন বিশদে।

O বৃষ্টির জলে মাথার চুল ভিজে গেলে, বাড়ি ফিরে প্রথমে ভালো জলে চুল ধুয়ে নিন

O চুলের রং এবং স্বাস্থ্য ভালো রাখার জন্য কালারসেভ শ্যাম্পু এবং কন্ডিশনার ব্যবহার করুন

O চুল ওয়াশ করার পর ভালো ভাবে শুকিয়ে নিন

O শুকনো চুলে হালকা ভাবে নারকেল তেলের প্রলেপ দিয়ে এক রাত্রি কিংবা কয়েক ঘণ্টা রেখে আবার ভালো শ্যাম্পু দিয়ে ধুয়ে নিন। এতে চুল নরম এবং স্বাস্থ্যোজ্জ্বল থাকবে।

ঘরোয়া উপায়

এগ মাস্ক: ডিমের সাদা অংশের সঙ্গে এক চা-চামচ মধু মিশিয়ে চুলে লাগান ভালো ভাবে। তিরিশ মিনিট পর শ্যাম্পু দিয়ে চুল ধুয়ে নিন।

কোকোনাট মিল্ক: ডাবের হালকা শাঁসের সঙ্গে গোলমরিচের গুঁড়ো এবং মেথিদানার গুঁড়ো মিশিয়ে মাথার চুলে মাখুন। কুড়ি মিনিট বাদে শ্যাম্পু দিয়ে চুল ধুয়ে ফেলুন।

গ্রিন টি: দু’প্যাকেট গ্রিন টি গরম জলে ভিজিয়ে রাখুন। এরপর ওই জল ঠান্ডা হলে, ধীরে ধীরে স্কাল্প-এ মাসাজ করুন। এক ঘণ্টা পর চুল ধুয়ে নিন।

ওনিয়ন অ্যান্ড আমলা: দু’টেবিল চামচ ছোটো পেঁয়াজের রসের সঙ্গে এক চা-চামচ আমলকীর রস মিশিয়ে চুলের গোড়ায় লাগান। তিরিশ মিনিট বাদে শ্যাম্পু করে নিন।

তেলে উপকার

বর্ষাকালে মাথার চুলে তেল মাখা নিয়ে নানা জনের নানা মতামত আছে। অনেকেই এই সময় চুলে তেল মাখতে চান না। কারণ তাঁরা মনে করেন এই সময় চুল এমনিতেই ভেজা ভেজা বা ড্যাম্প থাকে, তাই তেলের আর দরকার নেই। এই ধারণা ভুল। বলাই বাহুল্য আমরা মাথায় যত রকমের তেল মাখি, তার মধ্যে কোকোনাট অয়েল-এর ব্যবহার সবচেয়ে বেশি। নারকেল তেল কেন এত জনপ্রিয় জানেন? কারণ এই তেলে আছে অপরিহার্য ফ্যাটি অ্যাসিড, প্রোটিন ইত্যাদি। এগুলো আপনার স্ক্যাল্পে পুষ্টি জোগাবে এবং চুল গোড়া থেকে মজবুত করবে। বর্ষাকালে চুল নির্জীব ও ফ্রিজি বা জট পাকানো হয়ে যায়। প্রতিদিন নারকেল তেল মাখলে এই সমস্যা থাকবে না।

এছাড়া ব্যবহার করতে পারেন আমন্ড অয়েল। আমন্ড অয়েলে আছে ভিটামিন ‘ই’। এই তেল স্ক্যাল্পে মাসাজ করলে হেয়ার ফলিকল মজবুত হয় এবং শুষ্ক চুলে আর্দ্রতা আসে। আর্দ্রতা বজায় থাকলে চুল শুষ্ক হওয়ার সমস্যাও আর হয় না। এই তেলের সঙ্গে সামান্য একটু অলিভ অয়েল মিশিয়ে মাসাজ করলে আরও ভালো ফল পাবেন।

দূষণ

ধুলো, ধোঁয়ার সঙ্গে যুঝতে যুঝতে চুল হয়ে পড়ে প্রাণহীন। এই অবস্থায় চুলের জৌলুশ ফেরাতে প্রয়োজন কিছু বাড়তি যত্নের, যা আপনার চুলের নানা সমস্যায় সমাধানের পথ করে দেবে। চুলের শুষ্কতা কিংবা ডগা ফেটে যাওয়ার সমস্যা দূর করবে। চুল পড়া থামাবে। নতুন চুল গজাতেও সুফলদায়ী হবে।

দিন বদলালেও লম্বা ঘন চুলের ক্রেজ কখনও ফুরোয় না। কিন্তু সমস্যা হল লম্বা চুল মেনটেইন করা। নিত্যদিনের দৌড়ঝাঁপ, দূষণ, ঘাম, নোংরা— সবই চুলের জন্য ড্যামেজিং। তার উপর আমরা এখন প্রাকৃতিক উপাদানের বদলে কেমিক্যাল প্রোডাক্টস দিয়ে হেয়ার

কেয়ার-এর কথা ভাবি। এতে আখেরে ক্ষতি বাড়ে। চুলের ন্যাচারাল বিউটি, নরম ভাব, ঔজ্জ্বল্য— সবই আস্তে আস্তে হ্রাস পেতে থাকে। সুতরাং সময় থাকতে সচেতন হয়ে উঠুন। বেসিক জিনিস অর্থাৎ শ্যাম্পুটা এমন বায়ুন যাতে প্রাকৃতিক উপাদান রয়েছে। জেনে নিন কী উপাদান থাকলে তা চুলের জন্য উপকারী।

গ্রিন অ্যাপেল

গ্রিন অ্যাপেলে রয়েছে ভিটামিন এ, সি, ফাইবার, প্রোটিন, পটাশিয়াম, আয়রন প্রভৃতি। গ্রিন অ্যাপেল খেলেও শরীরে যেমন প্রচুর উপকার মেলে, ঠিক তেমনই এই উপাদান যদি শ্যাম্পুতে থাকে, এতে চুল হয়ে ওঠে স্বাস্থ্যোজ্জ্বল। গ্রিন অ্যাপেল এক্সট্র্যাক্ট আপনার মাথার স্ক্যাল্প পরিষ্কার করে দেয়। তাছাড়া এই এক্সট্র্যাক্ট-এ থাকা নিউট্রিয়েন্ট, চুলের বাড়তি তেল শুষে নেয় এবং চুল ফ্রেশ হয়ে ওঠে। এতে চুল ময়েশ্চারাইজ করারও কিছু তত্ত্ব থাকে, যার ফলে ড্যামেজ হওয়া চুল মেরামত হতে পারে। চুলে বাড়তি ভলিউম ও শাইন এনে দেয় গ্রিন অ্যাপেল-যুক্ত শ্যাম্পু।

অ্যালোভেরা

অ্যালোভেরায় আছে প্রোটোলিটিক, এনজাইমস যা স্ক্যাল্পের মৃত কোশ ঝরাতে সাহায্য করে। এছাড়া মাথার ত্বকে, চুলের গোড়ায় জমে থাকা ড্যানড্রাফ ও চুলকানি সারাতেও অব্যর্থ। অনেকে অ্যালোভেরাকে বেস্ট কন্ডিশনার-এর আখ্যাও দিয়ে থাকেন। অ্যালোভেরা ফর হেয়ার রিপিয়ার — তাই প্রমাণিত এক নিরাময়। অনেক সময়ই অতিরিক্ত কেমিক্যাল-যুক্ত প্রোডাক্ট ব্যবহারে চুলে যে-শুষ্কভাব চলে আসে, তা নিরাময়ের একমাত্র রাস্তা হয়ে দাঁড়ায় অ্যালোভেরা। চুলের হারানো আর্দ্রতা ফিরিয়ে দিয়ে নরম মোলায়েম করে তোলে এই প্রাকৃতিক উপাদানটি। এতে ফলিক অ্যাসিড আর ভিটামিন বি-১২ থাকার ফলে চুল পড়াও বন্ধ হয়।

চুলের সমস্যা

বর্ষায় চুলের অনেকরকম সমস্যার মধ্যে সব থেকে কমন হল চুলের আঠা ভাব, খুসকি এবং তৈলাক্ত চুল। আবহাওয়ায় আর্দ্রতার পরিমাণ বেশি থাকায় চুল হয়ে পড়ে প্রাণহীন এবং রুক্ষ। বর্ষায় তাপমাত্রা কমে যায় ঠিকই কিন্তু অসম্ভব হিউমিডিটি বেড়ে যাওয়াতে চুলের অবস্থাও খুব খারাপ হয়ে পড়ে। বর্ষার জলে ক্লোরিনের মাত্রা বেড়ে যাওয়াতে চুল ব্লিচ হয়ে যায় এবং এটা চুলের ক্ষতিও করে।

বর্ষার জলে চুল ভিজলে এই সমস্যাগুলো আরও বেড়ে যায়। তাই বৃষ্টিতে ভিজে গেলে অবশ্যই বাড়িতে এসে প্রথমেই শ্যাম্পু করে নেওয়া দরকার। হেয়ার কেয়ার-এর বিশেষ খেয়াল রাখা উচিত যাতে বৃষ্টিতে চুল সবসময় শুকনো থাকে এবং চুল ভিজে থাকলে সঙ্গে সঙ্গে তোয়ালে দিয়ে মাথা মুছে নেওয়া উচিত। বর্ষায় লিভ-অন কন্ডিশনার চুলের জন্য ব্যবহার করতে পরামর্শ দেন ডার্মাটোলজিস্টরা।

বর্ষায় আর একটি সমস্যা হল প্রাণহীন, তৈলাক্ত, নেতিয়ে পড়া চুলের গুচ্ছ। চুল তৈলাক্ত হলে স্বভাবতই তা দেখতে খারাপ লাগে এবং এটি স্ক্যাল্পকেও রুক্ষ করে তোলে। এইরকম প্রাণবিহীন চুলে দরকার প্রতিনিয়ত শ্যাম্পু করা, যা চুলকে দেবে ভলিউম। বর্ষায় সবথেকে জরুরি হল চুল নিয়মিত পরিষ্কার রাখা।

চুল ম্যানেজেবল এবং উজ্জ্বল করে তোলার জন্য প্রত্যেকবার চুল ধোওয়ার পর সিরাম লাগানো প্রয়োজন। রোজ ব্যবহারের জন্য কী শ্যাম্পু বেছে নেবেন বিচার করা খুবই প্রয়োজন। যে-কোনও মাইল্ড পিএইচ ব্যালেন্সড শ্যাম্পু বর্ষাকালের জন্য সব থেকে ভালো। বর্ষায় চুল কীরকম থাকবে, তা অনেকটাই নির্ভর করে সঠিক শ্যাম্পু নির্বাচনের উপরে।

সপ্তাহে একদিন অন্তত হট অয়েল মাসাজ চুলের জন্য উপকারী। এতে স্ক্যাল্পে তেল ঢুকে চুলে পুষ্টি জোগাতে সাহায্য করে। রুক্ষ এবং ভঙ্গুর চুলকে তেল নতুন করে প্রাণোজ্জ্বল করে তোলে। চুল পড়ে যাওয়া অথবা ভেঙে যাওয়া আটকাতে তেলের অবদান অনেকটাই। মন এবং নার্ভাস সিস্টেম-কে রিল্যাক্স রাখতে এবং হেয়ার কেয়ার-এর জন্য তেল লাগানো খুবই প্রয়োজন।

এইক্ষেত্রে বাড়ির রূপচর্চাও কার্যকরী। যাদের চুল সাধারণ, তারা চুলে আম এবং মিন্ট একসঙ্গে পেস্ট বানিয়ে লাগালে উপকার পাবেন। এটা চুলে উজ্জ্বলতা ফিরিয়ে আনে এবং চুলকেও মসৃণ করে।

যাদের চুল খুব শুকনো, তাদের ৩টি পাকাকলা এবং মধু মিশিয়ে চুলে লাগালে এবং ৫০ মিনিট মতো চুলে লাগিয়ে রাখলে চুলের রুক্ষ ভাব চলে যাবে এবং চুল নরম হবে। যাদের চুল খুব তৈলাক্ত, তারা যদি স্ক্যাল্পে পুদিনার পেস্ট লাগিয়ে ১০-১৫ মিনিট রাখতে পারেন এবং তারপর শ্যাম্পু করে নেন তাহলে তৎক্ষণাৎ উপকার পাওয়া যাবে।

নিজেই পছন্দ করুন স্টাইল

নিজেই বেছে নিন কী ধরনের হেয়ার স্টাইল আপনাকে মানাবে এবং সঙ্গে আরামও দেবে। যদিও ছোটো চুলই বর্ষাকালের জন্য উপযুক্ত, তাও বেছে নেওয়া উচিত এমন স্টাইল, যেখানে চুল শুকিয়ে যাওয়ার পর যেন নিজের জায়গায় সহজেই সেট করে যেতে পারে। বর্ষায় চুল স্ট্রেট করা, অতিরিক্ত গরম তাপ দিয়ে চুল কোঁচকানো অথবা কার্ল করানো উচিত নয়। কারণ আবহাওয়ায় অতিরিক্ত আর্দ্রতা চুলকে প্রাণহীন করে তোলে। শহরের একজন নামি হেয়ার-স্পেশালিস্ট জানালেন, ‘বর্ষাকাল, চুলের জন্য খুব খারাপ সময়। যতরকম চুলের সমস্যা সব এই সময় বেশি হয়ে থাকে। উচিত হচ্ছে চুল ছোটো রাখা, যাতে চুল শুকোতে এবং চুলের যত্ন নেওয়া সহজ হয়। কাঁধ অবধি লম্বা চুল যত্ন করা সম্ভব হয়।”

প্রয়োজনীয় টিপস

O মাইল্ড শ্যাম্পু দিয়ে নিয়মিত শ্যাম্পু করুন যখনই চুল বৃষ্টিতে ভিজে যাবে।

O ভেজা অবস্থায় চুল বাঁধবেন না।

O ভেজা চুলে ব্রাশ ব্যবহার করবেন না।

O সীমিত সংখ্যায়, চুলে লাগাবার উপকরণ ব্যবহার করুন বিশেষত শ্যাম্পু এবং কন্ডিশনিং করার সময়।

O একই কোম্পানির প্রোডাক্ট ব্যবহার করুন।

O হেয়ার স্প্রে-র ব্যবহার না করলেই ভালো৷

O চুল শ্যাম্পু করার অন্তত দু-তিন ঘণ্টা আগে চুলে তেল লাগিয়ে রাখতে পারলে উপকার পাওয়া যাবে।

O চুল ড্রাই করার জন্য ব্লো-ড্রায়ার ব্যবহার করবেন না।

O সপ্তাহে একবার করে অবশ্যই হট অয়েল মাসাজ করুন। এতে চুল শক্ত এবং স্বাস্থ্যোজ্জ্বল হবে।

O ভিটামিন ‘ই’-যুক্ত খাবার খান এবং প্রচুর পরিমাণ জল পান করুন।

ভিন রাজ্যের সুইট ট্রিট

শেষ পাতে মিষ্টি চাই-ই চাই। রাজগিরা হালুয়া, মোদক কিংবা গুড়খোপরা পাক আপনার মন ভরিয়ে দেবে। জেনে নিন কীভাবে তৈরি করবেন।

রাজগিরা হালুয়া

উপকরণ: ১ কাপ রামদানার আটা, ২১/২ কাপ দুধ, ৮ বড়ো চামচ ঘি, ১/২ কাপ চিনি, অল্প এলাচগুঁড়ো, অল্প কাজু ও চিনাবাদাম।

প্রণালী: একটা সসপ্যানে ঢিমে আঁচে দুধ ফুটতে দিন। চিনি দিয়ে ভালো ভাবে নাড়ুন। অন্য একটি প্যানে ঘি দিয়ে এতে রামদানার আটা ঢেলে নাড়াচাড়া করুন। হালকা রং ধরলে, এতে অল্প অল্প পরিমাণে ফোটানো দুধ ঢালুন। ঢিমে আঁচে ক্রমাগত নাড়ুন যাতে সবটুকু দুধের সঙ্গে এই রামদানা বা রাজগিরা মিশে যায়। মিশ্রণটা শুকনো হয়ে এলে ঘি-টা আলাদা হতে থাকবে। তখন আঁচ থেকে নামিয়ে এতে এলাচগুঁড়ো ও বাদাম আর কাজুকুচি ছড়িয়ে দিন। গরম গরম পরিবেশন করুন।

মোদক

উপকরণ পুরের জন্য: অল্প জল, ১ কাপ গুড় গুঁড়ো করা, ২ কাপ নারকেলকোরা, অল্প এলাচগুঁড়ো, ২ বড়ো চামচ ঘি, অল্প কাজু কুচি করা।

উপকরণ মোদক তৈরির জন্য: ১ কাপ জল, ১ ছোটো চামচ ঘি, ১ কাপ চালের গুঁড়ো, নুন স্বাদমতো।

প্রণালী: একটা প্যানে জল আর গুড় দিয়ে মিডিয়াম আঁচে ফুটতে দিন। এতে নারকেলকোরা মিশিয়ে ১০ মিনিট ভালো ভাবে নাড়ুন। ভালো ভাবে মিশে গেলে এতে ঘি, এলাচগুঁড়ো ও কাজু দিয়ে নাড়াচাড়া করুন। আঁচ থেকে নামিয়ে ঠান্ডা হতে দিন।

এবার ১ কাপ জল গরম করে এতে নুন আর ঘি দিন। জল ফুটতে শুরু করলে এতে চালের গুঁড়ো মেশাতে থাকুন। ক্রমাগত নাড়বেন যাতে চালের গুঁড়ো দলা না পাকিয়ে যায়। এবার আঁচ থেকে নামিয়ে ২ মিনিট ঢাকা দিয়ে রেখে দিন। এবার এই মিশ্রণ ভালো ভাবে মিশেছে কিনা দেখে ১০টি ভাগে ভাগ করুন। ছোটো ছোটো বল তৈরি করে, লুচির মতো বেলে দিন। প্রতিটা লুচির ভেতর নারকেলের পুর ভরে মুখটা আটকে দিন। স্টিমার-এ কলাপাতা বিছিয়ে, তার উপর মোদকগুলো রেখে ১০-১৫ মিনিট স্টিম করুন। গরম গরম পরিবেশন করুন।

গুড়খোপরা পাক

উপকরণ: অল্প নারকেলকোরা, ৩/৪ কাপ গুড় বা চিনি, ৩/৪ কাপ দুধ, ১/২ কাপ খোয়াক্ষীর, অল্প কেসর, অল্প এলাচগুঁড়ো, অল্প বাদামকুচি।

প্রণালী: নারকেল বাদামি রং না ধরা পর্যন্ত কড়ায় নাড়তে থাকুন। একটা পাত্রে তুলে আলাদা রাখুন। এবার একটা প্যানে অল্প জল দিয়ে গরম করুন। গুড় গলতে দিন। গুড় গলে গেলে এতে নারকেলটা দিয়ে নাড়তে থাকুন। সঙ্গে দিন খোয়াক্ষীর, এলাচগুঁড়ো ও দুধে ভেজানো কেসর। আঁচ বন্ধ করে বাদাম ছড়িয়ে দিন।

এবার ছাঁচে ঘি বুলিয়ে, এতে এই মিশ্রণ ভরে প্রায় ১ ঘন্টা ফ্রিজে রেখে দিন। ঠান্ডা হলে ফ্রিজ থেকে বের করে বাদাম দিয়ে সাজিয়ে পরিবেশন করুন।

বর্ষাকালেও বজায় রাখুন ত্বকের তারুণ্য

গ্রীষ্মের ঝলসে যাওয়া মাটিতে শাস্তির আবহ তৈরি করেছে বৃষ্টি। কিন্তু ত্বকের অবস্থা অত সহজে মেরামত হওয়ার নয়। কারণ দীর্ঘ গরমে ক্ষতির ছাপ স্পষ্ট হয়ে আছে। এদিকে বর্ষা নামতেই হিউমিডিটির কারণে ত্বকে নানাবিধ সমস্যার সূত্রপাত হতে পারে।

সমস্যা থাকলে তার সমাধানও আছে। তাই এক এক করে সমস্যার কারণগুলি নির্ণয় করার চেষ্টা করুন। ত্বকের সবচেয়ে বড়ো ক্ষতি হয় দূষণের কারণে। তার উপর গ্রীষ্মের ঘাম, ত্বকের উপর পড়া ধুলো-ময়লার আস্তরণকে বাড়িয়ে দিয়েছে। এর উপর ইউভি রশ্মির প্রভাবে ক্ষতির পরিমাণ বেড়েছে। তাই প্রথমেই ত্বককে ভালো ভাবে ক্লিনজারের সাহায্যে পরিষ্কার করুন। প্রয়োজনে একটা স্টিম বাথও নিয়ে নিন।

আপনি ভাবতে পারেন এই সময় সূর্যের তাপ কম, অতএব সানস্ক্রিনের প্রয়োজন নেই। কিন্তু মনে রাখবেন, সানস্ক্রিন না লাগালে ত্বক এসময় আরও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ত্বকে ঘাম বসতে দেবেন না। ওয়েট টিস্যুর সাহায্যে মুখ পরিষ্কার রাখুন। না হলে ঘাম জমে ত্বকে ইনফেকশন হতে পারে। এখানে এমন কয়েকটি টিপস দেওয়া হল, যার সাহায্যে বর্ষাতেও আপনি ত্বকের তারুণ্য ধরে রাখতে পারবেন।

টোনিং: দিনে অন্তত ২ বার নন-অ্যালকোহলিক টোনার-এর সাহায্যে টোনিং করুন যাতে ত্বকে পিএইচ ব্যালেন্স বজায় থাকে।

অ্যান্টিফাংগাল ক্রিম: রিং ওয়ার্ম বা চুলকানির সমস্যা নিয়ন্ত্রণে রাখতে হালকা গরম জলে স্নান করুন ও অ্যান্টিফাংগাল ক্রিম লাগান। শুকনো করে ত্বক মুছে নিয়ে অ্যান্টিফাংগাল পাউডারও ব্যবহার করতে পারেন।

ক্লিনজিং: ত্বক পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য দিনে ৩-৪ বার ব্যবহার করুন নন-সোপি ফেসওয়াশ। এর ফলে রোমছিদ্রের মধ্যে জমে থাকা ময়লা বেরিয়ে আসবে। ত্বক ভালো ভাবে জলের ঝাপটায় ধুয়ে নেবেন, এতে ত্বকের আর্দ্রভাবও বজায় থাকবে।

স্ক্রাবিং: ত্বকের উজ্জ্বল ভাব বজায় রাখতে মৃত কোশগুলি এক্সফলিয়েট করা উচিত। তাই দিনে একবার স্ক্রাবার ব্যবহার করুন।

ফেসপ্যাক: যাদের অতিরিক্ত তৈলাক্ত ত্বক, তাদের লেবুর গুণযুক্ত ফেসপ্যাক ব্যবহার করা উচিত। এতে বাড়তি তেল ত্বক থেকে নির্গত হবে না। এর ফলে ব্ল্যাকহেডস বা হোয়াইটহেডস-এর সমস্যা হবে না।

স্ট্রবেরি ফেস মাস্ক: আধ কাপ ফ্রোজেন বা ফ্রেশ স্ট্রবেরি বেটে নিন। এতে এক কাপ দই, দেড় কাপ মধু মেশান। এই প্রলেপ মুখে পনেরো মিনিট লাগিয়ে মুখ ধুয়ে ফেলুন। ত্বক লাবণ্যময় হয়ে উঠবে।

দুধ ফলের ফেসিয়াল: একটি আতা চটকে নিন। এতে এক চামচ চিনি, আধ কাপ দুধ ও অল্প কয়েক ফোঁটা ক্যামোমাইল মিশিয়ে মুখে লাগান। এতে ত্বকের হারানো ঔজ্জ্বল্য ফিরে আসবে।

ময়েশ্চারাইজিং: ত্বকের কোমলভাব অক্ষুণ্ণ রাখতে ওয়াটার বেসড্ ময়েশ্চারাইজার বা গোলাপজল কিংবা বাদামতেল ত্বকে মাসাজ করুন।

প্রচুর জল পান করুন

শরীরে যেন জলের অভাব না ঘটে, তা নিশ্চিত করতে হবে। হার্বাল টি, মরশুমি বিভিন্ন ফলের রস দারুণ লাভদায়ক। তেষ্টা পাক বা না পাক প্রচুর জল পান করুন। প্রতিদিন অন্তত ১০-১২ গেলাস জল পান করুন। অতিরিক্ত ঘাম ঝরে যাওয়ার জন্য যেমন ডি-হাইড্রেশনে ভুগতে হবে না, তেমনই ত্বকের শুকনো ভাবও দূর হবে।

হেভি মেকআপ নয়: এসময় ভারী মেক-আপ বড়ো বিসদৃশ লাগবে। তাই ওয়াটারপ্রুফ মেক-আপ এবং নো মেক-আপ লুক রাখার চেষ্টা করুন।

স্কিন অ্যালার্জি: স্কিন অ্যালার্জির পক্ষে বৃষ্টি ক্ষতিকারক। ঘরবাড়ি যথাসম্ভব পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখুন। এয়ার ফ্রেশনার্স অথবা কেমিক্যালযুক্ত এরোসোলস ব্যবহার এড়িয়ে চলুন।

সানস্ক্রিন

মেঘলা আকাশ। রোদের তেজ কম ভেবে, অনেকেই সানস্ক্রিন লাগান না, যা ত্বকের জন্য মোটেই সঠিক পদক্ষেপ নয়। এতে ত্বক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। রোদের তেজ বা গরম কম হলেও, সূর্যের আল্ট্রা ভায়োলেট রশ্মি কিন্তু রয়েছে, যার থেকে ত্বককে বাঁচাতে বর্ষার মরশুমেও সানস্ক্রিন ব্যবহার বন্ধ করবেন না। বাইরে বেরোলে ছাতা ব্যবহার করুন।

পরিষ্কারপরিচ্ছন্নতা

অতিরিক্ত ঘামের কারণে শরীরে ময়লা জমে দুর্গন্ধ তৈরি হয়। ফলে জীবাণু সংক্রমণের সম্ভাবনা থেকে যায়। তাই ত্বককে সুস্থ ও উজ্জ্বল রাখতে বেশ কিছু পদক্ষেপ জরুরি…

(১) বৃষ্টিতে ভিজলে সবার আগে পরিষ্কার জল দিয়ে মুখ, গা-হাত-পা ধুয়ে নিন

(২) সাবানের পরিবর্তে বডিওয়াশ, ফেসওয়াশ ব্যবহার করতে পারেন। প্রয়োজনে স্ক্রাবারও ব্যবহার করতে পারেন, তবে দিনে একবারের বেশি নয়

(৩) পাউডার ব্যবহার করলে দিনের শেষে তা পরিষ্কার করে নিন।

(৪) রাতে শোবার সময় ক্লিনজিং, টোনিং, ময়েশ্চারাইজিং রুটিন বজায় রাখুন

ফাংগাল ইনফেকশন

বর্ষার দিনে ফাংগাল ইনফেকশন পুরোপুরি এড়িয়ে যাওয়া কঠিন। অফিসের কাজেই হোক কিংবা বাড়ির কাজে বেরিয়ে হঠাৎই মাঝপথে কাকভেজা। দীর্ঘক্ষণ সেই ভিজে পোশাকে থাকা, ফাংগাল ইনফেকশনের মূল কারণ। শুধু তাই নয়, এইসময় জামাকাপড়ও ঠিকমতো শুকোয় না। কাপড় পরার আগে ঠিকঠাক শুকিয়েছে কিনা তা নিশ্চিত হয়ে নিন। ফাংগাল ইনফেকশনের শুরুতেই প্রতিরোধক পাউডার ব্যবহার করুন।

কেক (শেষ পর্ব)

তৃষাকে বাঁচানো যায়নি। পিনাকি কিন্তু বেঁচে গিয়েছিল। ঝরনামাসি আর মেসো পিনাকির টাকার কাছে চুপ করে গিয়েছিল। ছোটো মেয়ে তিস্তাকে বিনা পণে এমন ওজনদার পাত্রর ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া স্বপ্নের মতো। তৃষা মরে বাঁচিয়ে দিয়ে গেছে তার পরিবারকে। পিনাকিদাকে মেনে নিতে আপত্তি ছিল না তিস্তার, সে শুধু বলেছিল তিতলির দায়িত্ব সে নেবে না। ঝরনামাসি আর মেসোর কাছে আপাতত তিতলি আছে। একটু বড়ো হলে ওকে হস্টেলে পাঠিয়ে দেওয়া হবে।

—তিস্তা কেমন আছে মাসি? পিনাকি ওর গায়ে হাত তোলে না তো?

—হাত তুলবে কী রে! সোনার টুকরো ছেলে। তিস্তাকে দামি পোশাক গয়নায় মুড়ে রেখেছে। এই তো সুইজারল্যান্ড যাবার টিকিট, হোটেল বুকিং সব হয়ে গেছে।

—তিস্তা ভালো আছে তো মাসি?

—তোর বুঝি ওর ভালো থাকায় আপত্তি? কী শুনতে চাস বলতো? তৃষা নিজেই জেদি ছিল। মেয়েদের একটু আধটু মানিয়ে নিতে হয়। তিস্তা আমার বুদ্ধিমতী মেয়ে।

ফোনটা রেখে সোনালি বারান্দায় দাঁড়াল। তিস্তা ভালো আছে এটা মানতে অসুবিধা হচ্ছে কেন তার? নাহ বড্ড বেশি সে সবকিছুর মধ্যে জড়িয়ে যাচ্ছে। কিছুদিনের জন্য বাইরে চলে যেতে হবে। এবার সে সমুদ্রে যাবে। কোথাও ঘুরবে না, খাবেদাবে আর হোটেলের রুমে শুয়ে থাকবে। শুধু সূর্যোদয় আর সূর্যাস্তের সময় বাইরে বেরোবে। অনলাইনে ট্রেনের টিকিট আর হোটেল বুকিং সেরে নিল। তাজপুর আগেও গেছে, বেশ নির্জন সৈকত, নিজের মতো ক’টা দিন কাটাতে পারবে।

—আপনাকে খুব চেনা চেনা লাগছে, কোথায় দেখেছি বলুন তো? ওড়নাটা গায়ে জড়িয়ে নিয়ে সোনালি ভদ্রলোকের দিকে তাকায়, আর তারপরেই কেঁপে ওঠে। পার্থদা এখানে? এভাবে নির্জন সমুদ্র সৈকতে সূর্যাস্তের সিঁদুরে রঙে মাখামাখি হতে হতে পার্থদার সঙ্গে দেখা হয়ে যাবে স্বপ্নেও ভাবেনি সোনালি।

—ওদিকটায় একটু বসবে সোনালি? ভ্রাম্যমাণ চা-ওয়ালাকে ডেকে দু ভাঁড় চা নিল। সোনালির এ ধরনের চা খাওয়ার অভ্যাস বহুদিন গেছে। সে ইলেক্ট্রিক কেটল আর পছন্দের টি ব্যাগ ক্যারি করে বাইরে গেলে। এখন আপত্তি না জানিয়ে এই দুধে ফোটানো চায়ের ভাঁড়ে চুমুক দিল। পার্থদা গভীর দৃষ্টিতে তাকে দেখছিল।

—তোমার এমন চা খাবার অভ্যাস নেই, না?

সোনালি উত্তর দেয় না। অশান্ত হাওয়ায় তার চুল এলমেলো হয়ে যায়। পার্থদা কী যেন একটা বলতে চেয়েছিল! ঝুনুদি বারবার বলেছে, এমনকী তার ফোন নাম্বারটাও দিয়েছে। সোনালি সমুদ্র থেকে চোখ ফিরিয়ে পার্থদার চোখে চোখ রাখল। পার্থদার নীলচে মণিও সমুদ্রের মতোই অশান্ত।

—পার্থদা তুমি মনে হয় আমাকে কিছু বলতে চাও?

—হ্যাঁ বলব তো। তার আগে অন্য একটা কথা বলি, ঝুনু বলছিল তোমার এক কাজিনের মেয়েকে অ্যাডপ্ট করতে চাও। তোমার তো তেতাল্লিশ চলছে, একা এই বয়সে এত ঝক্কি সামলাতে পারবে?

সোনালি অবাক হয়ে যায়। এটা তার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত, এ ব্যাপারেও ঝুনুদি বাইরের লোকের সঙ্গে আলোচনা করে! উফ ঝুনুদিকে নিয়ে আর পারা যাচ্ছে না, জাস্ট আনটলারেবল। সোনালির মুখে অসন্তোষ ফুটে উঠতেই পার্থ চুপ করে যায়। অন্ধকার নেমে আসছে, দোকানপাট বন্ধ হয়ে আসছে। সোনালি উঠে পড়ে। দেখাদেখি পার্থদাও।

—কাল আমি চলে যাব, জানি না আবার তোমার সঙ্গে দেখা হবে কিনা! কথাটা বলার সুযোগ পাব কিনা! অন্ধকার থাকায় পার্থদার সুবিধাই হল।

—সেদিন আমি ইচ্ছা করেই তোমাকে… আসলে ঝুনুর সঙ্গে যত জড়িয়ে পড়ছিলাম তোমার প্রতি আকর্ষণ ততই বাড়ছিল। হিসহিস করে উঠল সোনালি, ‘ঝুনুদি জানে? আমার থেকে তার একথাটা জানা বেশি দরকার।”

—হ্যাঁ জানে। জানে বলেই তোমাকে নিয়ে এত ভাবছে, তোমার জীবনটা অন্য কারুর সঙ্গে জড়িয়ে দিতে চাইছে, এভাবে একা বাঁচা যায় না সোনালি। তুমি কি কিছুই বুঝতে পারো না?

হনহন করে হেঁটে যায় সোনালি। আলো ঝলমলে হোটেলের গেটটা দেখা যাচ্ছে। পার্থদার গায়ে অন্ধকারের মোটা পরদা। যত অন্ধকার ক্লাস নাইনের একটা মেয়ের গায়ে মাখিয়ে দিয়েছিল তার শতগুণ ফিরে এসেছে তার কাছে আজ এই সামুদ্রিক হাওয়ায়।

ঝুনুদি এসেছে পিন্টুর বাড়ি। ফোনে কথা হয়। আজকাল আর পার্থদার ব্যাপারে কথা তোলে না। অথচ সোনালি যেন অনেক কিছু শুনতে চায়। তিতলিকে অ্যাডপ্ট করবে মনস্থির করে ফেলেছে। শুধু মাঝেমাঝে রাত্রে ঘুম ভেঙে গেলে দুশ্চিন্তা হয়, সে একা হাতে পারবে তো সবকিছু সামলাতে। খুব ইচ্ছা করে কেউ কেউ এগিয়ে এসে শক্ত করে হাতটা ধরুক।

—জানিস আবার জন্মদিন পড়ছে ক’দিন পরেই। পিন্টুর বউ তো সেই নিয়ে মাতামাতি শুরু করে দিয়েছে। নতুন শাড়ি কিনে দিয়েছে। দুপুরে পঞ্চব্যাঞ্জন, পায়েস সব নিজের হাতে বানাবে। রাত্রে বাইরে ডিনারে নিয়ে যাবে। তুই বল এ বয়সে এইসব মানায়! কিন্তু পিউ শুনলে তো! আহ্লাদে গলে পড়ে ঝুনুদি।

সোনালি হিসেব করে নেয়, ওইদিন শনিবার। ঝুনুদি খুব শাড়ি ভালোবাসে, একটা শাড়ি কিনবে ঝুনুদির জন্য। আর নিজের হাতে একটা কেক বানিয়ে নিয়ে যাবে।

সোনালি বলে, “তার মানে সন্ধেটা বার্থডে গার্ল ফ্রি থাকবে?”

মুখ ঝামটায় ঝুনুদি, ‘এই তুই আর ন্যাকামি করিস না তো!”

কেকটা মনের মতো বানিয়েছে সোনালি। পিন্টুর ঠিকানা তো ঝুনুদির কাছে শুনে শুনে মুখস্থ হয়ে গিয়েছিল। সন্ধে সাতটার দিকে পৌঁছে গেল। দরজায় চাপ দিতেই সেটা খুলে গেল। ভিতরের ঘর থেকে চিৎকার ভেসে আসছে, ‘তোমার মায়ের কী দরকার ছিল বুড়ো বয়সে জন্মদিন, জন্মদিন করে আদিখ্যেতা করার? গুষ্টিশুদ্ধ আত্মীয়স্বজন সকাল থেকে ফোন করেই যাচ্ছে। আর জিজ্ঞেস করছে, সন্ধেটা তোমরা বাড়িতেই থাকছ তো? উনি তো নিজের ফোন বন্ধ করেই খালাস। যত ফোন ঢুকছে আমার মোবাইলে। পাগল হয়ে যাচ্ছি আমি। এই আমি বলে দিলাম কেউ এসে পড়লে আমাকে ডাকবে না।”

সোনালি ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসে। ঝুনুদির জন্য কেনা শাড়ি আর ফুলের বোকেটা সেন্টার টেবিলের উপর নামিয়ে রাখে। কী মনে হতে কেকের প্যাকেটটা সঙ্গে করে নিয়ে আসে। ফেরার পথে চিলি চিকেন আর ফ্রায়েডরাইস প্যাক করিয়ে নিল। বাড়ি ফিরে অনেকক্ষণ ধরে স্নান করল। পাটভাঙা একটা শাড়ি পরে ডিনার টেবিল সাজাল। অনেকদিন আগে কিনে রাখা সুগন্ধী মোমবাতিগুলো জ্বালাল। দামি ক্রকারি সেটটা বার করে খাবার সাজাল। তারপর কেকটার বুকে মসৃণ ভাবে ছুরি চালাল। চকোলেট কেকের একটা টুকরো নিজের মুখে তুলে দিতে দিতে ফিসফিস করে বলল, ‘হ্যাপি বার্থডে টু মি।’

হ্যাঁ আজ তার জন্মদিন, অনেক কিছুর মধ্যে জড়িয়ে যাচ্ছিল সে। আজ বুঝতে পারছে এই বেশ ভালো আছে। তার একলা জীবন আলোকিত হয়ে উঠুক, এই একলা থাকার জন্মদিন আজ, কাল আর প্রতিটা দিন।

(সমাপ্ত)

পড়ার জন্য সীমাহীন গল্প-নিবন্ধসাবস্ক্রাইব