গাউন-ফ্যাশনে জমবে উৎসব

এই উৎসবের মরশুমে এখন প্রায় সব মেয়েই স্টাইলিশ এবং মডার্ন লুক-এর জন্য ওয়েস্টার্ন ড্রেসের মধ্যে গাউন-কেই বেছে নিচ্ছেন। স্টাইল এবং কমফর্ট এই দুইয়ের সমন্বয় বজায় রাখতে গাউন পরাই পছন্দ করছেন আধুনিকারা।

গাউন পরতে হলে সবথেকে আগে জানতে হবে আপনি কী ধরনের লুক চাইছেন। এই ওয়েস্টার্ন পোশাকে যাতে বেমানান না হয়ে ওঠেন এবং সকলের সামনে গাউন পরে লজ্জায় না পড়তে হয়, তার জন্য সঠিক ড্রেসিং সেন্স ও গাউন সম্পর্কে ধারণা থাকা আবশ্যক।

এ-লাইন গাউন

এ-লাইন গাউন দেখতে যেমন এলিগেন্ট তেমনি সবরকম বডি শেপ-এর জন্য এই স্টাইল মানানসই। শুধু আসন্ন উৎসবেই নয়, এই ধরনের গাউন পার্টি হোক, অন্য

যে-কোনও অনুষ্ঠান হোক অথবা বিয়ের কনেও নিজের কোনও একটা ফাংশনে পরে, নিজের সৌন্দর্য আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে। গাউনের ডিপ নেক-এর সঙ্গে ম্যাচিং করে স্মার্ট দেখতে ট্রেন্ডি শর্ট নেকপিস এবং ম্যাচিং ঝোলা কানের দুল বেছে নিতে পারেন।

এই ধরনের অ্যাকসেসরিজ গাউনের গ্রেস-কে আরও বাড়িয়ে তুলবে। গাউনের স্লিভ্স যদি লং হয় তাহলে হাতে কোনওরকম জুয়েলারি না পরাই বাঞ্ছনীয়। হাই হিল্স এবং হাতে একটা ক্লাচ ব্যাগ আপনার উৎসবের সাজকে কমপ্লিট লুক দেবে।

হল্টার নেক গাউন

ফ্যাশন ট্রেন্ডে ভীষণ ভাবে এখন ইন হল হল্টার নেক শর্ট ড্রেস এবং গাউন। এগুলো আপনার স্মার্ট এবং সেক্সি লুক-কে কমপ্লিমেন্ট করবে। উৎসবের দিনে এ ধরনের পোশাক পরতে চাইলে গলা খালি বা সিম্পল রাখুন। হাতের জন্য বেছে নিতে পারেন স্টোন ফিট করা ব্রেসলেট একটা হাতের জন্য অথবা দুটো হাতেই পরতে পারেন ড্রেসের সঙ্গে ম্যাচিং স্টোন ওয়ার্ক করা কাড়া বা বালা।

হল্টার নেক গাউনের সঙ্গে পেনসিল হিল আপনার সাজকে সম্পূর্ণতা দেবে। হাতে ক্যারি করুন পোটলি ব্যাগ। দেখবেন উৎসবের ভিড়েতে সকলের দৃষ্টি থাকবে আপনার উপর।

ফ্লেয়ারড ভেলভেট গাউন

এই ধরনের ভেলভেটের পোশাক রিচ লুক নিয়ে আসতে সাহায্য করবে। উৎসবের সন্ধ্যার জন্য আপনি এই পোশাক নির্বাচন করতে পারেন। তবে এই ধরনের পোশাকের সৌন্দর্য আরও বাড়বে যদি পোশাকের ফ্যাব্রিক এবং স্টাইল অনুসারে নিজের লুককে আপনি ম্যানেজ করেন। চুলের লেংথ যদি ছোটো হয় তাহলে চুল খুলেই রাখুন আর চুল লম্বা হলে এই পোশাকটির সঙ্গে সামঞ্জস্যতা রাখতে চুলে কার্ল করান। যদি একান্তই চুল খোলা রাখতে চান তাহলে চুলে হেয়ার অ্যাকসেসরিজ ব্যবহার করুন। এলিগেন্ট লুক-এ সকলকে মুগ্ধ করে দেবেন।

সাধারণত এই ধরনের গাউনের গলায় এবং হাতে হেভি এম্ব্রয়ডারি করা থাকে। এরকম পোশাকের সঙ্গে হাত এবং গলা সিম্পল রাখতে পারলেই ভালো। এই ধরনের গাউনের সঙ্গে স্টিলেটোজ সুন্দর ম্যাচ করবে। কাঁধে স্লিংগ ব্যাগ আপনার সাজকে পারফেক্ট করে তুলবে।

নেট গাউন উইথ বিভ্স ওয়ার্ক

সেলিব্রিটিজ-দের দেখা যায় বহু ইভেন্টে নেট গাউন পরে পার্টি অ্যাটেন্ড করতে এবং তাদের দৌলতেই নেট গাউন ফ্যাশনে ইন। বিশেষ করে এই ওয়ান পিস গাউন নিজেই কমপ্লিট একটি আউটফিট। আপনি এর লুক-কে সুপারহিট বানাতে চাইলে এই ফ্লেয়ার্ড গাউনকে নিজে কাস্টমাইজ করিয়ে নিতে পারেন। ফ্লেয়ার্ড স্লিভ্স-এর সঙ্গে এর লুক আরও গ্ল্যামারাস হয়ে উঠবে।

গাউনের এই ট্রেন্ডি লুকের সঙ্গে হাতে সিংগল ব্রেসলেট মানাবে ভালো। অথবা ফিংগার ব্রেসলেট রিং-ও এই গাউনের সঙ্গে ম্যাচ করাতে পারবেন। গলায় স্লিম নেকপিস গাউনের লুককে পারফেকশন দেবে। হাতে ক্লাচ এবং হাইহিল সাজ কমপ্লিট করতে সাহায্য করবে।

সিকুইন্স ওয়ার্কের গাউন

সিকুইন্স ওয়ার্কের শাড়ি এবং গাউন, উভয়েরই এখন চড়া ডিমান্ড। আসন্ন উৎসবে পোশাকের হেভি লুক, পোশাকটিকে অপরের চোখে ঈর্ষণীয় করে তুলবেই। সকলেই চাইবেন এমন একটি পোশাক তাদের ওয়াড্রোবেও শোভা পাক। ওয়ান শোল্ডার ড্রেপ সিকুইন্স ওয়ার্কের গাউন যদি আপনি বাছেন তাহলে কানে লম্বা স্টাইলিশ দুল অথবা ড্রপ ইয়াররিং পরতে ভুলবেন না।

এই ধরনের ড্রেসের সঙ্গে লেয়ারড নেকলেস মানানসই হবে। চুল উপরদিকে তুলে লম্বা পনিটেল করতে পারেন অথবা প্রেসিং ডাউন কার্লস-ও করাতে পারেন। গাউনের সঙ্গে ম্যাচ করাতে পারেন পোটলি ব্যাগ বা বটুয়া। হাইহিল ছাড়া গাউনের সৌন্দর্য কিছুতেই খুলবে না— এই টিপস সবসময় মনে রাখতে হবে।

সেক্সি লেয়ার্ড গাউন

বার্বি ডল-এর লুক পেতে চাইলে লেয়ার্ড গাউন বেছে নিতে পারেন। গাউনের লুক এনহ্যান্স করতে পার্ল স্টাডেড চোকার ও পার্ল ড্রপ ইয়াররিং পরুন। হাতে সিলভার স্টাইল ব্রেসলেট এই সাজকে কমপ্লিমেন্ট করবে। ক্লাচ ব্যাগ এবং হাইহিলের সঙ্গে লেয়ার্ড গাউনে আপনি যখন কোনও প্যান্ডেলে এন্ট্রি নেবেন— বিশ্বাস করুন সকলের দৃষ্টি আপনার উপরেই থাকবে।

একক মায়েরা বাচ্চার যত্ন নেবেন কীভাবে?

একক মায়েদের কাছে মাতৃত্ব যেমন এক অনন্য অনুভূতির বিষয়, ঠিক তেমনই অভিভাবকত্বও এক ইউনিক চ্যালেঞ্জ বলা যেতে পারে। কারণ, মা যেমন এখানে একাই একশো, ঠিক তেমনই এক্ষেত্রে তাকে সন্তানের পিতার অভাবও পুরণ করতে হচ্ছে। আর এই দায়িত্ব পালনে মা যদি বিফল হন কিংবা দায়িত্ব পালনে ঘাটতি থেকে যায়, তাহলে সন্তান অসহায় বোধ করতে পারে— যা মা এবং সন্তান দু’জনের জন্যই ক্ষতিকারক।

এই আধুনিক যুগে একক মা হওয়া কোনও বিরল ঘটনা হয়তো নয় কিন্তু একক মায়ের যদি কোনও বিষণ্ণ অতীত থাকে, তাহলে সেই বিষণ্ণতা প্রথমে দূর করতে হবে। কারণ, একক মা বিষণ্ণ থাকলে তার কুপ্রভাব পড়বে সন্তানের মস্তিষ্কে। অতএব, সব দুঃখ- যন্ত্রণা ভুলে গিয়ে বাচ্চার সামনে অন্তত হাসিখুশি থাকতে হবে মাকে। শুধু তাই নয়, একক মাকে অনেক বেশি লড়াকু হতে হবে এবং ঝড়-ঝাপটা সামলাতে হবে শক্ত মনে। একক মা কিংবা তার সন্তানকে কেউ যদি ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ করে, তাহলে তার যোগ্য জবাব দিতে হবে হাসিমুখে এবং এই নিয়ে খুব বেশি বিচলিত কিংবা দুশ্চিন্তায় থাকা চলবে না। সন্তানও যাতে হাসিমুখে ‘ডোন্ট-কেয়ার’ করে চলতে পারে, সেই শিক্ষা দিতে হবে তাকেও।

অবশ্য সমাজ বদলাচ্ছে। মানুষের চিন্তাধারাটাও চিরাচরিত নিয়মের শিকলে আজ আর আবদ্ধ নেই। কিছুটা নিজেদের ইচ্ছেতে এবং আংশিক সময়ের প্রেশারে নিজেদের মানসিকতাকে বদলে নেওয়াই বুদ্ধিমানের রাস্তা বলেই বুঝে গিয়েছেন অনেকে। তাই একক মায়েদেরও বেশি সম্মান দেওয়া শুরু হয়েছে।

একলা চলার নীতি

সন্তানের দায়িত্বে একক মায়ের অবদানের তুলনা চলে না। অতীত বর্তমান উভয়কালেই মা-ই সন্তানের সবথেকে প্রিয় মানুষ। তাই বহু যুগ থেকেই এই ধারণা মানুষের মনে বদ্ধমূল হয়ে গেছে যে, মা-কেই শিশুর পুরো দায়িত্ব নিতে হবে। সমাজের নিয়মটাই এমন রয়েছে যে, সন্তানের দেখভালের দায়িত্ব পুরোপুরি মা-কেই একা সামলাতে হবে— তা সংসার অথবা বাইরে তার যতই কাজ থাকুক না কেন। পরিবারে চার-পাঁচজন সদস্য থাকলেও, এই দায়িত্ব ভাগ করে নিতে প্রায় সকলেই নারাজ। তবে পরিস্থিতি যাই হোক-না কেন, খুশি মনে মায়েরা একাই এই দায়িত্ব নিজেদের উপর তুলে নেন আজও, কারণ তারা মাতৃত্বের সুখ উপভোগ করেন তারিয়ে তারিয়ে।

অতএব, এই বিষয়টি মাথায় রাখলেই একক মায়েদের আর একা পথ চলতে কষ্ট হবে না। তবে এর জন্য মানসিক ভাবে আরও স্ট্রং করতে হবে নিজেকে। যদি পুরোনো কোনও দুঃখ-ব্যথা থাকে, তাহলে তা মন থেকে মুছে ফেলার চেষ্টা করতে হবে সন্তানের মঙ্গলের কথা ভেবে।

উপার্জন বৃদ্ধি করতে হবে

সময়ের সঙ্গে প্রয়োজন হয়েছে অর্থ উপার্জনের। বিশেষ করে একক মায়েদের আরও বেশি আর্থিক নিরাপত্তার প্রয়োজন। তাই সঞ্চয় করতেই হবে। আর সঞ্চয় করতে গেলে আয় বাড়াতে হবে। হয় ভালো বেতনের চাকরি করতে হবে অথবা ভালো ব্যাবসা। সেইসঙ্গে, ব্যাংক-এ ফিক্সড ডিপোজিটে টাকা রেখেও সুদের টাকায় আয় বাড়াতে হবে। শুধু এখানে থেমে থাকলেই চলবে না। যদি নিজের বাড়ি থাকে এবং সেই বাড়ির একটা অংশ ভাড়া দিয়ে আয় বাড়ানো যায়, সেই চেষ্টাও করতে হবে। এছাড়া এখন নানারকম লাভজনক স্কিম চালু হয়েছে ব্যাংক ও পোস্ট অফিসে। তাই আয় বাড়ানোর জন্য ওইসব স্কিম-এর সুযোগ-সুবিধা নিতে হবে। সম্ভব হলে অবসর সময়ে বাড়িতে বসেও যদি কোনও কাজ করে আয় বাড়ানো যায়, সেই চেষ্টা করতে হবে।

টাইম ম্যানেজমেন্ট জরুরি

একা দায়িত্ব পালন মানেই চরম ব্যস্ততা। সকাল থেকে রাত্রি পর্যন্ত পরিশ্রম করতে হবে। কিন্তু বেশি পরিশ্রম করতে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়লেই বিপদ। তাই টাইম ম্যানেজমেন্ট জরুরি। কখন কোন কাজ কীভাবে করবেন, কোন কাজটা জরুরি আর কোনটা না করলেও চলে— তা ভেবে নিয়ে এগোতে হবে। প্রতিদিন ঘুমোতে যাওয়ার আগে ভেবে ঠিক করে রাখুন পরের দিন সকাল থেকে রাত্রি পর্যন্ত কী কী করতে হবে এবং সেই হিসাবে একটা লিস্ট করে রাখুন। সারা সপ্তাহের পেন্ডিং কাজ ছুটির দিনের একটা সময় করে নিয়ে চিন্তামুক্ত থাকার চেষ্টা করুন।

বন্ধুর মতো ব্যবহার করুন

একক মায়েদের সন্তানরা একটু বেশি অভিমানী হয়ে থাকে। হয়তো সে তার অভিমান কিংবা দুঃখগুলো সবসময় প্রকাশ করে না মা কষ্ট পাবে বলে, কিন্তু মনে মনে কষ্ট পায়। তাই সন্তান যাতে তার বেশিরভাগ অভাব অভিযোগ আপনার কাছে শেয়ার করে, সেই পরিবেশ তৈরি করে রাখুন। সন্তানের সঙ্গে বন্ধুর মতো আচরণ করুন। নিজের কাজের ব্যস্ততার মধ্যেও যতটা সম্ভব কোয়ালিটি টাইম দিন সন্তানকে। ছুটি পেলে কাছেপিঠে কোথাও বেড়াতে নিয়ে যান ওকে। শুধু তাই নয়, ওর প্রিয় বন্ধুদের মাঝেমধ্যে আপনার বাড়িতে ডেকে এনে হইহুল্লোড় করার সুযোগ করে দিন।

মনের জোর বাড়ান

আপনি যখনই একক মা হওয়ার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, তখন থেকেই আপনাকে মনের জোর বাড়াতে হবে। ভাবতে হবে আপনি একা নন, আপনার মতো আরও অনেকেই ‘সিংগল মাদার’। অতএব সবকিছু হাসিমুখে সামলে ওঠার সংকল্প করুন। এক্ষেত্রে মনে রাখবেন, সাধারণ মহিলা থেকে সেলিব্রিটি, অনেকেই এখন একক মা হিসাবে রীতিমতো সফল। শ্বেতা তিওয়ারি, দলজিৎ কউর থেকে শুরু করে অনেকেই উপভোগ করছেন একক মাতৃত্ব। অতএব আপনিও নাম লেখান এই সাফল্যের তালিকায়।

দায়িত্ব পালনের কিছু বিকল্প রাস্তা

এখন একক মায়েদের জন্য অনেক সুযোগ সুবিধাও হয়েছে। চাইলে আপনিও নিতে পারেন এই সুবিধাগুলো। এই যেমন— দেশ, ডে-বোর্ডিং স্কুল তৈরি হয়েছে, যেখানে বাচ্চাদের সারাদিন দেখাশোনা করা হয়। এ এক অনন্য বিকল্প।

ক্রেশ: বেশ কিছু বছর হল এ দেশেও ক্রেশ-এর কনসেপ্ট শুরু হয়েছে। সুতরাং মায়েরা ক্রেশে নিজের বাচ্চাকে নির্দ্বিধায় রেখে যেতে পারেন। কারণ ক্রেশ-এ বাচ্চাদের সারাদিনের দেখাশোনা করার সুব্যবস্থা থাকে। অর্থের বিনিময়ে এই পরিষেবা দেওয়া হয়। সংখ্যায় কম হলেও বর্তমানে এদেশে সরকারি ও বেসরকারি কিছু অফিসে নিজস্ব ক্রেশ আছে। এখানকার কর্মরতা মহিলারা নিজেদের সন্তানকে সারাদিন সেখানে রেখে কাজ করার সুবিধা পান। আবার আসার সময় সন্তানকে সঙ্গে করে বাড়ি নিয়ে চলে আসেন।

সাধারণত ক্রেশগুলিতে ২ মাস বয়স থেকেই বাচ্চাদের দেখাশোনা করার ব্যবস্থা থাকে। সদ্য মায়েরা অফিসে ৩-৪ মাসের বেশি ছুটি পান না। সুতরাং তারপর থেকেই তাদের ক্রেশের খোঁজ করা শুরু করে দিতে হয়। ক্রেশ খোলাটাও একটা কেরিয়ার অপশনে দাঁড়িয়ে গেছে। প্রতিটি বড়ো শহরে, এমনকী মফসসলেও ক্রেশের রমরমা এখন লক্ষণীয়।

ডে-বোর্ডিং স্কুল: ক্রেশের অনেক পরে ডে-বোর্ডিং স্কুলের কনসেপ্ট এসেছে। ডে-বোর্ডিং-এ ৩ বছরের বেশি বয়সের বাচ্চাদের নেওয়া হয়ে থাকে। বোর্ডিং স্কুলের সুবিধা হল, ক্রেশে যেখানে বাচ্চাদের খালি দেখাশোনাই করা হয়, বোর্ডিং স্কুলে দেখাশোনার সঙ্গে সঙ্গে পড়াশোনাও করানো হয় এবং সেইসঙ্গে ডিসিপ্লিন-ও শেখানো হয়। খেলাধুলো, গঠনমূলক কাজও তাদের শেখানো হয়। অনেক সময় বোর্ডিং স্কুলে যা-যা শেখানো হয়, স্কুলে ভর্তি হতে গেলে সেগুলি থেকে প্রচুর সাহায্যও পাওয়া যায়। অনেক জায়গায় বড়ো স্কুলগুলোর সঙ্গেই ডে-বোর্ডিং ফেসিলিটি দেওয়া হয়।

স্কুলে পড়াশোনার পর ছুটি হয়ে গেলে বোর্ডিং-এ ব্যবস্থা থাকে খাওয়াদাওয়া, বিশ্রামের। তারপর স্কুলের সমস্ত হোমওয়ার্ক, পড়াশোনা ওখানেই করিয়ে দেওয়া হয়, যাতে বাচ্চাদের বাড়ি এসে আর কিছু পড়াশোনা করতে না হয়। অফিস ছুটি হলে মায়ের সঙ্গেই বাচ্চা বাড়ি চলে আসতে পারে অথবা বোর্ডিং স্কুল থেকেই তাদের নিজস্ব গাড়িতে বাচ্চাদের বাড়ি পাঠাবার ব্যবস্থা থাকে। এক্ষেত্রে বাড়িতে বাচ্চাকে পড়াশোনা করাবার দায়িত্ব থেকেও মা মুক্ত হতে পারেন। তবে ডে-বোর্ডিং-এ রাখতে হলে আর্থিক সঙ্গতি থাকা প্রয়োজন। কারণ অর্থের পরিমাণ ডে-বোর্ডিং-এর ক্ষেত্রে একটু বেশি।

আপনজনের দায়িত্বে বাচ্চাকে রাখা: সময়ের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে, পরিবার পরিজনও এগিয়ে আসছেন একক মায়েদের সমস্যা হ্রাস করার জন্যে। মেয়েদের বাপেরবাড়ির লোকেরা এখন অনেক বেশি সচেতন, যাতে বাড়ির মেয়ে নিশ্চিন্তে কর্মস্থানের কর্তব্য পালন করতে পারে। সন্তান নিয়ে অযথা তাকে দুশ্চিন্তা না করতে হয়। তারা তৎপর থাকেন নাতি-নাতনিকে সঙ্গ দেওয়ার জন্য। স্কুলের সময় হলে স্কুলবাস না এলে স্কুল পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে আসা, নিয়ে আসা, জলখাবার খাইয়ে অল্প বিশ্রামের পর পড়তে বসানো— এসব দায়িত্ব এখন অনেক দাদু-দিদা পালন করছেন। বাপের বাড়ি কাছাকাছি হলে মেয়ের মায়েরা এসে বাচ্চার সারাদিনের দেখাশোনা করছেন। চাকুরিরতা মায়েরাও সম্পূর্ণ নিশ্চিন্ত থেকে বাইরের কাজে মন দিতে পারছেন, কারণ বাপের বাড়ির আপনজনের কাছেই বাচ্চারা সুরক্ষিত রয়েছে।

সুতরাং ক্রেশ, ডে-বোর্ডিং স্কুল এবং নিজের মায়ের বাড়ির সদস্যরা এখন একক মায়েদের সাহায্যে এগিয়ে আসছেন। কিন্তু প্রথম দুটো জায়গায় বাচ্চাকে রাখতে হলে নিজেকে মানসিক ভাবে প্রস্তুত করতে হবে এবং বাচ্চাকেও বোঝাতে হবে যে, নিজেদের থেকে দূরে রাখা মানে তাকে একলা ছেড়ে দেওয়া— এমন নয়। বাচ্চা যদি একবার ভেবে নেয় মা তাকে ভালোবাসে না বলেই ক্রেশ বা বোর্ডিং-এ দিয়েছে, তাহলে সমস্যা কমার বদলে বাচ্চার পক্ষে এই ভাবনা ক্ষতিকারক হয়ে দাঁড়াবে।

সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে:

বাচ্চাকে দেওয়ার আগে ক্রেশের খোঁজখবর নিন। সেখানে গিয়ে বাচ্চা সুস্থ ও সুরক্ষিত থাকবে নিশ্চিত হলে তবেই ক্রেশে দিন। ক্রেশের মালিকের মোবাইল নম্বর নিয়ে রাখুন এবং নিজের নম্বর তাকে দিন। ক্রেশে যে-মহিলা কাজ করেন তিনি কেমন খোঁজখবর নিন।

বাচ্চার কোনও অসুস্থতা থাকলে ক্রেশের সঞ্চালক-কে আগে থেকেই জানিয়ে রাখুন।

ঠিক সময় বাচ্চাকে ক্রেশে ছাড়ুন। চেষ্টা করুন যতটা কম সময় বাচ্চাকে ক্রেশে রাখা যেতে পারে। বাচ্চার পছন্দের খাবার তার সঙ্গে দিয়ে দিন।

সারাদিনে ফোনে অন্তত কয়েকবার বাচ্চার খবরাখবর নিন। বোর্ডিং স্কুলও দেখেশুনে বাছুন।

ক্রেশ-এ বাচ্চাকে রাখতে বাধ্য হলেও, নিজের কাছে বাচ্চাকে যতক্ষণ রাখবে মাতৃস্নেহে ভরিয়ে তুলুন যাতে আপনাকে না-পাওয়ার কষ্ট তার মনে না থাকে।

অসুস্থ অবস্থায় বাচ্চাকে ক্রেশে পাঠাবেন না।

ক্রেশে আপনার বাচ্চার ঠিকমতো দেখাশোনা হচ্ছে কিনা চেক করতে মাঝেমধ্যে ক্রেশে যান।

নিরাধার ভালোবাসা (শেষ পর্ব)

আমার জেদের কাছে আমি অটল ছিলাম। মনে মনে ঠিক করে রেখেছিলাম বাড়ি থেকে বিয়ের অনুমতি না দিলে আমরা মন্দিরে গিয়ে বিয়ে করব। সেইমতো আমরা সবকিছু পরিকল্পনাও করে ফেলেছিলাম। কিন্তু ঠিক তার কয়েকদিন পরেই খবর পেলাম ঠাকুরদার শরীরে ক্যান্সার ধরা পড়েছে। তার শারীরিক অবস্থারও চরম অবণতি ঘটেছে। বাবা তখন আদেশ দিল আমায় এখানে আসার জন্য। সত্যি বলতে কী, ঠাকুরদার জন্য আমার মনটা বড়োই বিষণ্ন হয়ে পড়েছিল। কিন্তু প্রিয়াঙ্কাকে ছেড়ে আমি কিছুতেই আসতে চাইছিলাম না।

আমি জিজ্ঞেস করলাম, “তারপর? ওনার সঙ্গে তোমার আর দেখা হয়েছিল? তাঁর সঙ্গে তো তোমার বিয়েই হয়নি। কারণ তুমি সারাজীবন…’

পুরো কথাটা শেষ হওয়ার আগেই ঠাকুরদা বলল, ‘না। প্রিয়াঙ্কার সঙ্গে সেদিন আমার শেষ দেখা হয়েছিল। এখানে আসার দিন কয়েকের মধ্যে বাবা-মাও এখানে চলে আসে। ভেবেছিলাম কয়েকদিন দাদা এবং তাদের ভরসায় ঠাকুরদাকে রেখে প্রিয়াঙ্কাকে বিয়ে করে তবেই ফিব।’ যাওয়ার সময় বাবা একটি কথাই আমায় বলেছিল, ‘মেয়েটির কাছে যাওয়ার জন্য আমি তোকে কোনওপ্রকার বাধা দেব না। তবে মেয়েটি কি সত্যিই তোকে ভালোবাসে? একটু বিচার করে দেখিস।’

প্রত্যুত্তরে বলেছিলাম, ‘প্রিয়াঙ্কাকে আমি চিনি বাবা। সে কোনদিনও আমায় ঠকাবে না।’

—কলকাতায় ফিরে সোজা চলে যাই ওর বাড়ি। কিন্তু সেখানে গিয়ে আশ্চর্যজনক ভাবে কারওর দেখা পেলাম না। ফটকের বাইরে দেখি তালা ঝুলছে। তখন ভাবলাম ওদের কোনও প্রতিবেশীর কাছে জিজ্ঞেস করি- ওরা কোথায় গিয়েছে। সেইমতো ওদের ঘনিষ্ঠ একজন ভদ্রলোকের কাছ থেকে জানতে পারি ওরা নাকি বাড়ি বিক্রি করে অন্যত্র কোথাও চলে গিয়েছে। কোথায় গিয়েছে, তা শুধু তিনি কেন, পাড়ার কেউই জানেন না। সেদিনের ওকে হারানোর যন্ত্রণা আমি আজও বুকে বয়ে বেড়াচ্ছি। আজও ওকে অত্যন্ত ভালোবাসি। আমি জানি, প্রিয়াঙ্কা আমায় না বলে কোনদিনও কোথাও যেতে পারে না। নিজের ভালোবাসাকে হারানোর যন্ত্রণা প্রবল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে খবর পাই ঠাকুরদা আমাদের ছেড়ে চিরদিনের মতো চলে গিয়েছে। যাদের আমি সবচেয়ে বেশি ভালোবেসেছি, মাত্র কয়েকদিনের ব্যবধানে তাদের হারানোর যন্ত্রণা আমার উপর সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলেছিল। ফলে আমি মানসিক ভাবে ভেঙে পড়েছিলাম।

বাবা-মা অনেক চেষ্টা করেছিল একাকীত্ব কাটানোর জন্য আমার বিয়ে দেওয়ার। প্রায় নিয়মিত অনেক বড়োলোক ঘরের মেয়ের ছবি তারা আমায় দেখাতো। বারেবারে একটা কথাই পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছি যে, আমি বিয়ে করব না। সারাজীবন একাই থাকব। ব্যস, তারপর থেকে এই বই আর ছবিটিই ছিল আমার নিত্যদিনের সঙ্গী। বইটা প্রিয়াঙ্কা আমায় পড়ার জন্য দিয়েছিল। প্রেমের গল্প পড়তে ও বড়ো ভালোবাসত। যখন আমি বড়ো একাকীত্ব বোধ করতাম, তখন এই বইটি পড়ে আর ওর ছবি দেখে তা দূর করার চেষ্টা করতাম। তারপর ধীরে ধীরে এই একাকীত্বকেই আপন করে ফেললাম। এরপর প্রায় সুদীর্ঘ বছর পার হয়ে যাওয়ার পর একদিন এই দুটো জিনিসকে কলেজের বইপত্তরের সঙ্গে ট্রাঙ্কবন্দি করে রেখে দিলাম।

পুরো ঘটনাটা শুনতে শুনতে আমার দুচোখ বেয়ে অঝোরে অশ্রু ঝরে পড়ছিল। ভালোবাসা এমনও হতে পারে! একজন মানুষ আর একজন মানুষকে ভালোবেসে এভাবে কষ্ট পেতে পারে! না, এমনটা হতে পারে না। ঠাকুরদাকে বলে ছবিটা আমি নিজের কাছে রেখে দিলাম। জানি না তার সেই প্রেয়সী এখন কোথায় থাকেন। নিশ্চয়ই বিয়ে করেছেন। নাতি, নাতনি আছে। দেখি যদি কারও কাছ থেকে তাঁর সম্বন্ধে কিছু জানা যায়। তিনি কোথায় থাকতেন, তা তো আমার জানাই। তবে তা দিয়ে বিশেষ কিছু জানা না গেলে তখন বিকল্প পদ্ধতি অবলম্বন করতে হবে। তাছাড়া এমনও হতে পারে তিনি আর এই পৃথিবীতে…. না থাক, এখন ওসব অমঙ্গলের কথা না ভাবাই উচিত।

সোনালিকে আমি ঠাকুরদার জীবনের গল্পটা বললাম। তারপর ও ছবিটা দেখতে চাইলে ওকে দেখালাম। ছবিটা দেখার পর ও কিছুক্ষণ কী যেন চিন্তা করে বলল, “এই রকমের কোনও একটা ছবি আমি বোধহয় এর আগেও কোথাও দেখেছি। কিন্তু এই মুহূর্তে ঠিক মনে পড়ছে না। আচ্ছা, ওঁর সম্পূর্ণ নাম যেন কী?”

আজ আমাদের পরিবারে আনন্দের জোয়ার। পরিবারের সকলে মিলিত হয়েছি। ছোটো ঠাকুরদার জন্মদিন বলে কথা। সকাল থেকে নিজ দায়িত্বে গোটা বাড়িটা সুন্দর করে সাজিয়েছি। ঠাকুরদা যদিও প্রতিবছরের মতোই আজ বেজায় খুশি, তবুও মনে মনে বুঝতে পারছি ভিতরের কষ্টটা সে কিছুতেই বাইরে প্রকাশ করতে চায় না। সত্যি, মানুষটা এমনই যে কখনও ঘুণাক্ষরেও বুঝতে দেয়নি তার একটা কষ্টকর, জীবন নিংড়ে নেওয়া অতীত আছে।

সন্ধেবেলা যথাসময়ে সুন্দর কারুকার্য করা পাঞ্জাবি পায়জামা পরে ঠাকুরদা আমাদের মাঝে উপস্থিত হল। বড়ো হলঘরের মাঝখানে গোল টেবিলের উপর রাখা আছে একটি বড়ো কেক এবং তার উপর উজ্জ্বল হয়ে জ্বলছে কতগুলো মোমবাতি। আমি ধীর পায়ে এগিয়ে গেলাম ঠাকুরদার কাছে। তারপর বললাম, “কেক কাটার আগে তোমার জন্য একটা সারপ্রাইজ আছে।’ ডান হাতটা তুলে সদর দরজার দিকে নির্দেশ করলাম। সেদিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর তার চোখদুটো ছলছল করে উঠল।

সোনালি যে-বৃদ্ধা মহিলাকে সঙ্গে নিয়ে এসেছে, তিনি যে প্রিয়াঙ্কা দিদা, তাতে বিন্দুমাত্রও সন্দেহ নেই। ঠাকুরদার দু’চোখ তা বলে দিচ্ছে। প্রিয়াঙ্কা দিদার দিকে তার এগিয়ে যাওয়া তা বলে দিচ্ছে। অকস্মাৎ ঠাকুরদা তাঁর কাছে গিয়েই জিজ্ঞেস করল, “তুমি এখানে কীভাবে? তোমায় আমি এত বছর পর আবার দেখতে পাব, তা কখনওই ভাবতে পারিনি। কেমন আছো?”

বৃদ্ধা আবেগরুদ্ধ গলায় উত্তর দিল, ‘ভালো আছি। তুমি কেমন আছো? এখনও ঠিক আগের মতোই চনমনে আছো।’

—আমি বেশ ভালোই আছি। দাদুভাই থাকতে আমি কখনও একাকীত্ব বোধ করি না। বিয়ে করিনি। তোমার পরিবারের কেউ আসেনি?

—তোমায় ছাড়া আর কাউকেই যে কোনওদিন ভালোবাসিনি। অভাবের তাড়নায় আমাদের গ্রামের বাড়িতে চলে যেতে হয়েছিল। তাই তোমার সঙ্গে সব সম্পর্ক ছিন্ন হয়েছিল। আমার এখন দিন কাটে বৃদ্ধাশ্রমে। মা-বাবার মৃত্যুর পর এ শহরে ফিরে আসি। একসময় বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের দেখাশোনার কাজ করতাম। এখন সেখানেই পড়ে থাকি। সোনালি মা সেখানে মাঝে মাঝেই যায়। আমার সঙ্গে অনেক কথাও হয়। একদিন ওকে আমার ছেলেবেলার ছবি দেখাই। তারপর আজ হঠাৎ ও আমায় তোমায় দেওয়া সেই ছবিটা দেখিয়ে জিজ্ঞেস করে সেই মেয়েটি আমি কিনা। সেজন্যই এত বছর পরে হলেও আমি তোমার খোঁজ পেলাম।’

ঠাকুরদা আমার মনের কথাটাই যেন বলল, ‘এখন তো আমাদের বাধা দেওয়ার কেউ নেই। বাকি জীবনটুকু কি আমরা একসঙ্গে কাটাতে পারি না?’

প্রিয়াঙ্কা দিদা ঠাকুরদার হাতদুটো ধরল। সঙ্গে সঙ্গে গোটা ঘর হাততালিতে ফেটে পড়ল। এতো বড়ো পৃথিবীতে দুটি হারিয়ে যাওয়া মানুষের পুনর্মিলন চট করে হয় না। এটা নিছকই সৌভাগ্য। আজ প্রকৃত ভালোবাসার জয় হয়েছে। দুজন নিঃসঙ্গ মানুষের একাকীত্ব আজ সম্পূর্ণ ভাবে কাটল। এখন থেকে বাকিটা জীবন ওরা একসঙ্গেই অতিবাহিত করতে পারবে। শুধু একটাই আপশোশ, এতগুলো বছর ওরা একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার যন্ত্রণা ভোগ করেছে। তবে সত্যি বলতে কী, ওদের প্রেম কাহিনি আমায় অনেক কিছু শিখিয়েছে। সোনালিকে আমি নতুন করে ভালোবাসতে শিখেছি। আজীবন ওর হাত এমনই শক্ত করে ধরে থাকব।

(সমাপ্ত)

কর্মক্ষেত্রে সাফল্য পাবেন কীভাবে?

অনেক সময় দেখা যায়, দীর্ঘদিন চাকরি করার পরেও পদোন্নতি হচ্ছে না। কারণ খুঁজলে হয়তো দেখা যাবে, আপনার কর্মদক্ষতা, বুদ্ধি এবং কৌশলের অভাব রয়েছে। তাই, আপনার কর্মজীবনে প্রবেশের আগে আপনার স্বপ্ন কী ছিল, তা জানা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ পেশাগত দুনিয়ায় আপনি কী করতে চান, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন। সেই স্বপ্ন সফল করার জন্যও আগে থেকে প্রস্তুতি নেওয়ার প্রয়োজন আছে। আর সেই অনুযায়ী কাজ করা প্রয়োজন। রইল গুরুত্বপূর্ণ কিছু পরামর্শ।

আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে তুলুন

আপনার কর্মজীবনের অগ্রগতি নির্ভর করবে আপনার দক্ষতা এবং বুদ্ধি অনুযায়ী। একটি বিশেষ প্রতিষ্ঠানে চাকরি পাওয়ার পর থেকেই আপনার তাৎপর্য এবং অবদান আপনি বুঝতে শুরু করবেন। আপনি যা দক্ষতা অর্জন করেছেন, তাতে বিশ্বাস রাখুন এবং কাজের প্রতি আপনার দৃষ্টি তীক্ষ্ণ রাখুন। এটি আপনার কর্মজীবনের বিকাশ এবং ইতিবাচক কেরিয়ার গ্রাফ তৈরি করতে আপনাকে সহায়তা করবে।

আপনার বসএর পছন্দকে গুরুত্ব দিন

কর্মক্ষেত্রে একটি গণ্ডির মধ্যে থাকা ভালো। প্রোফেশনাল স্কিল্স আপনার কাজের অঙ্গ। আপনার স্ট্রং কোয়ালিটিগুলিই বসের সামনে তুলে ধরুন। কাজ সময়ে শেষ করুন। কোনও কাজে যদি সমস্যা হয়, আপনার সমস্যার ব্যাপারে সরাসরি আপনার বসকেই সে কথা খুলে বলুন। অন্যথায় আপনার কাজ না জানার বিষয়টা সারা অফিসের আলোচনার বিষয় হয়ে উঠবে। এই ধরনের কিছু ঘটার থেকে, নিজের না পারাটা আগেই স্বীকার করুন এবং বস-কে আশ্বাস দিন খুব কম সময়ের মধ্যে আপনি সেটা শিখে ফেলবেন। এরপর নিজের দক্ষতা বাড়াতে আর মোটেই দেরি করবেন না। এটা না করে যদি আপনি আপনার বসকে জানান যে, আপনার প্রজেক্ট জমা দিতে দেরি হবে, তাহলে তো তিনি তা শুনবেন না। কারণ আপনার অদক্ষতা আপনার নিতান্তই ব্যক্তিগত ব্যাপার। এগুলো নিয়ে কখনওই অফিসের বসের সঙ্গে কথা বলা ঠিক নয়। এটার প্রভাব খারাপ হতে পারে।

আপনার Personal Skills বাড়ান

যদি আপনার কিছু পার্সোনাল স্কিল থাকে, তবে আপনার সহকর্মীদের পক্ষেও এটি লক্ষ্য করা সহজ হবে। এই দক্ষতাগুলি আপনার জুনিয়রদের মনের উপরও দীর্ঘ প্রভাব ফেলবে, যা আপনার কেরিয়ারের জন্য নতুন সুযোগও আনতে পারে।

মানুষ যা আপনাকে বলবে, আপনি তা শুধু মনোযোগ দিয়েই শুনবেন না, বরং আপনাকে একজন দক্ষ কমিউনিকেটর-ও হতে হবে। টিম পরিচালনার ক্ষেত্রে এটা বিশেষ একটি গুণ। শক্তিশালী কমিউনিকেশন-এর দক্ষতা সুষ্ঠুভাবে আপনার কর্মজীবন গড়ে তুলবে এবং আপনার উন্নতির ক্ষেত্রে কার্যকর হবে। আপনি যদি এগুলি বাস্তবে পরিণত করেন, তবেই আপনি নিশ্চিত থাকতে পারবেন সুফল লাভের বিষয়ে।

জীবনে সাফল্য চান প্রত্যেকেই। আবার এই সাফল্যকামী লোকেরাই, সমস্যায় পড়লে ভয় পেয়ে পিছু হঠেন। কিন্তু নিজের উপর ভরসা থাকলে, জীবনে কোনও প্রতিকূলতাই চাপে ফেলতে পারবে না, সাফল্য আসবেই। অবশ্য এর জন্য সততা, নিষ্ঠা এবং কর্মকুশলতার প্রয়োজন আছে। জীবনের প্রতিটি কাজে কীভাবে সাফল্য আসবে, সেই বিষয়েই রইল কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ।

  • আজকের কাজ এখনই করুন। কারণ, ‘কাল করব’ ভেবে ফেলে রাখলে সমস্যা তৈরি হতে পারে
  • সময়ের মধ্যেই হাতের কাজ সম্পূর্ণ করলে নিশ্চিন্ত থাকা যায় এবং সাফল্যের পথে এগিয়ে যাওয়া যায়
  • কাজ যাইহোক না কেন, প্রত্যেক কাজই নিষ্ঠা সহকারে করা উচিত
  • সবাই আপনার কাজের প্রশংসা করবে এটা ভাববেন না। কারণ, প্রত্যেকেরই দৃষ্টিকোণ আলাদা। তাছাড়া অন্যের কাজের প্রশংসা করার মতো উচ্চ মানসিকতা সবার থাকে না। তাই কাজ করুন ফলের আশা না করে। দেখবেন সাফল্য পাবেন অনায়াসে
  • সমস্যা এলে ভেঙে পড়বেন না, মোকাবিলা করুন। প্রয়োজনে শুভাকাঙ্ক্ষীর পরামর্শ এবং সাহায্য নিন
  • বিপদে রক্ষা করার জন্য অনেক বন্ধু থাকতে হবে এমন নয়, কিন্তু দু-তিনজন এমন বন্ধু থাকা উচিত, যারা আন্তরিক ভাবে আপনার সুখ-দুঃখে শামিল হবে
  • সাফল্যলাভের জন্য কঠিন বাস্তববাদী হওয়ার প্রয়োজন নেই, কিন্তু আবেগকেও আয়ত্তে রাখতে হবে
  • সৎ এবং বিশ্বাসী মানুষ হিসাবে নিজের পরিচিতি গড়তে হবে। তাই কোনও কাজ না পারলে আগেই ‘না’ করুন কিন্তু কাজ কিংবা দায়িত্ব হাতে নিয়ে কারও বিশ্বাসভঙ্গ করবেন না
  • সমস্ত কাজেই কঠিন পরিশ্রম করতে হবে। কারণ, অলস থাকলে কিংবা পরিশ্রম না করলে সৌভাগ্যও বিমুখ হতে পারে কাজ করার সময় সতর্ক থাকতে হবে, যাতে দোষ, ত্রুটি এড়ানো যায়
  • সুশাসক হোন ক্ষতি নেই, কিন্তু অযথা অন্যের ক্ষতি করবেন না কিংবা অন্যদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করবেন না। কর্মক্ষেত্রে সদ্ব্যবহার বজায় রাখুন
  • সবরকম ক্ষতিকারক নেশা থেকে নিজেকে দূরে রাখুন
  • অযথা লোভ করবেন না এবং লোভের শিকার হবেন না
  • নিজের উপর ভরসা রাখুন। কখনও যদি কাজে অসফল হন, তাহলে ভেঙে পড়বেন না। অসাফল্যকে সংশোধনের প্রাথমিক ধাপ ধরে নিয়ে এগোতে হবে
  • সাফল্য পেতে শুরু করলেও, অহমিকা প্রকাশ করবেন না। মনে রাখবেন, সাফল্যের শুরুতে অহমিকা প্রকাশ কিন্তু পতনের সূত্রপাত হতে পারে
  • সহজে অন্যের কথা বিশ্বাস করে কোনও বড়ো ধরনের সিদ্ধান্ত নেবেন না। সবার মতামত এবং বক্তব্য শুনুন কিন্তু সিদ্ধান্ত নিন বিচারবিবেচনা করে
  • কর্মক্ষেত্রে পরনিন্দা-পরচর্চা করবেন না এবং কারওর গোপন কথা শুনে তা অন্যের কাছে বলে বিশ্বাসভঙ্গ করবেন না। এতে অযথা সমস্যায় পড়তে পারেন
  • শিক্ষার শেষ নেই। তাই প্রতি মুহূর্তে নতুন ভাবে জ্ঞান অর্জন করুন। সেইসঙ্গে, ছোটো-বড়ো সবার কাছ থেকেই ‘ভালোটা’ নেওয়ার চেষ্টা করুন
  • কর্মক্ষেত্রে সর্বদা পরিষ্কার জামাকাপড় পরে যাবেন এবং মনকে পরিচ্ছন্ন রাখবেন।
  • ব্যক্তিগত সমস্যা কিংবা কোনও চারিত্রিক দুর্বলতাকে প্রশ্রয় দেবেন না এবং প্রকাশ করবেন না কর্মক্ষেত্রে। ব্যক্তিত্ব বজায় রাখুন।

শরতের আবহে কলকাতা-য় চলছে অভিনব উৎসব ‘শেফালী’

এসে গেছে আমাদের প্রিয় শরৎ কাল। এখন প্রায় প্রতিদিন ছড়িয়ে পড়ছে ঝলমলে মিঠে রোদ। মাঠভরা কাশ ফুল দুলছে হাওয়ায়। পেঁজা তুলোর মতো মেঘেদের সারি ভেসে বেড়াচ্ছে আকাশে। ফুলে-ফলে ভরে উঠছে বাগান। বাতাসে আগমনী সুর। উৎসবের আবহের সূচনা। আসলে শরৎ তো উৎসবেরই ঋতু এবং উৎসব মানেই তো আনন্দের উদযাপন। আর এই শরৎ কালকেই আলিঙ্গন করতে সাতদিনব্যাপী  অভিনব শরৎ-উৎসব ‘শেফালী’ অনুষ্ঠিত হচ্ছে জি ডি বিড়লা সভাঘরে। ১৪ থেকে ২০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলবে এই শরৎ-আরতি। এমন অভিনব শরৎ উদযাপনের আয়োজক ‘ইনফোসিস ফাউন্ডেশন’ এবং ‘ভারতীয় বিদ্যাভবন’।

বাংলা সাহিত্য এবং সংস্কৃতির আঙিনায় শরতের রূপ-রস-গন্ধের প্রভাব সুদূরপ্রসারী। সেই কথা মাথায় রেখেই ‘শেফালী’ প্রতি সন্ধ্যায় নানা আঙ্গিকে সেজে উঠেছে শরৎ-স্তুতিতে। সাত দিনে যেন সাত রঙ-বাহারি। গানে-কবিতায়-নৃত্যের তালে-চিত্রকলায় শরৎকে বরণ করে নিতে শুরু করেছে ‘শেফালী’।

প্রথম দিন উদ্বোধনের পর ছিল পিয়াল ভট্টাচার্য পরিচালিত নাটক ‘শরচ্চারু চক্রম’। শরৎ কালকে মাথায় রেখে সংগীত-নৃত্য-নাটকের সমারোহে ‘চিদাকাশ কলালয়া সেন্টার’ এই অভিনব নাটক পরিবেশন করেছে। একেক দিন একেক রকমের আয়োজন। একদিন থাকছে ‘সোনা রঙের শরৎ’। এই বিভাগটি সংগীত-নৃত্য-কবিতা-অঙ্কনের সমবেত ঝংকার। নৃত্যের তালে তালে রবীন্দ্রনাথের গান থেকে কিটসের কবিতা, সঙ্গে লাইভ পেইন্টিং–এক অন্যরকম শরৎ-বন্দনার সাক্ষী হতে চলেছে কলকাতা। গানে সপ্তক সানাই, কবিতায় তন্ময় চক্রবর্তী, নৃত্যে সায়নী এবং অঙ্কনে রিঙ্কু ভদ্র– একঝাঁক নতুন শিল্পীর সমবেত উদযাপন।

অন্যদিন থাকছেন দুই প্রতিভাবান গুণী শিল্পী সরোদ বাদক ইন্দ্রায়ুধ মজুমদার এবং কণ্ঠশিল্পী সৌনক চট্টোপাধ্যায়ের যুগলবন্দী ‘শরতের ছায়ানট’। ভাষ্যে থাকছেন আরও এক গুণী শিল্পী সৌম্য কারফা। একদিন থাকছে প্রীতি প্যাটেলের ‘অসিত আওয়ান্থা শরৎ’। শরতের নানা রূপ এই পরিবেশনায় ফুটে উঠবে। থাকবে ‘বীরভূম সংস্কৃতি বাহিনী’ নিবেদিত  এবং উজ্জ্বল মুখোপাধ্যায় পরিচালিত নাটক ‘বোগলেয় বায়েন’। এই অভিনব শরৎ-বন্দনা শেষ হবে সুশান্ত মাহাতো গ্রুপ-এর ছৌনাচ দিয়ে।

সাতদিনব্যাপী এই শরৎ-উৎসব শুরু হচ্ছে প্রতিদিন সন্ধে সাড়ে ছয়টা থেকে। কোনও প্রবেশমূল্য নেই। এমন অভিনব শরৎ-বন্দনার জন্য সাধুবাদ প্রাপ্য ‘ভারতীয় বিদ্যা ভবন’ এবং ‘ইনফোসিস ফাউন্ডেশন’-এর। শারদোৎসবের আর বেশি দেরি নেই, তাই শরতের আগমনী সুরে গা ভাসাতে আপনিও সামিল হন ‘শেফালী’ উৎসবে।

নিরাধার ভালোবাসা (পর্ব-০২)

যেভাবেই হোক, নিরাপদ জায়গায় একবার পৌঁছে যেতে পারলেই এই ভয়ানক নির্মমতার হাত থেকে আমরা রক্ষা পাব। ঠিক সেই সময় হঠাৎই আমার কানের খুব কাছে পুনরায় গুলির শব্দ পেলাম এবং সঙ্গে সঙ্গে প্রিয়াঙ্কার তীব্র আর্তনাদ আমার কানে এল। এক মুহূর্তও সময় নষ্ট না করে পিছন ফিরেই আমি ছুটে গেলাম সেদিকে। দেখলাম প্রিয়াঙ্কা ওর ডানহাত চেপে ফুটপাতের উপর বসে পড়েছে। কোনওরকমে এলোমেলো ভাবে ছুটতে থাকা ভয়ার্ত শিক্ষার্থী এবং পথচারীদের সামলে ওকে নিয়ে এলাম সুরক্ষিত স্থানে। গুলিটা ওর কনুই ঘেঁষে বেরিয়ে গেছে। গলগল করে রক্ত পড়ছে। দ্রুত হসপিটালে নিয়ে গিয়ে ওর প্রাথমিক চিকিৎসা করাতে হবে। আমি অজিতেশদের বললাম, তোরা বাড়ি যা। আমি ওকে হসপিটালে নিয়ে যাচ্ছি।

অজিতেশ জবাব দিল, “আমরা তোর বন্ধু। এই সময় আমাদের তোর পাশে থাকা প্রয়োজন। আমরা একসঙ্গে হসপিটালে যাব। তারপর ওর চিকিৎসা হয়ে গেলে একসঙ্গেই বাড়ি ফিরব। এখন আর সময় বিলম্ব না করে তাড়াতাড়ি চল।”

—সেদিন ওর প্রাথমিক চিকিৎসার পর যখন ও সম্পূর্ণ ভাবে বিপদমুক্ত, তখন ওকে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে তারপর আমরা যে-যার বাড়ি ফিরেছিলাম। সেদিন ওর বাড়ি প্রথমবার দূর থেকে দেখেছিলাম। ছোট্ট বাড়ি। তবে বেশ প্রাচীন, জরাজীর্ণ। ঘরের সামনে আগাছায় ভরা পথ। সেদিনই বুঝেছিলাম ও কত গরিব ঘরের মেয়ে এবং ওর বাবা কতটা কষ্ট করে মেয়ের লেখাপড়া চালাচ্ছেন। যাই হোক, সেদিনের সেই দুর্ঘটনার জন্যই প্রিয়াঙ্কা আর আমার সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল। ওকে আর একা ছাড়তে আমার মন চাইছিল না।

আমার বন্ধুরাও বলেছিল সবসময় ওকে সঙ্গ দিতে। সত্যিই আমি ওদের কাছে ক্রমশই ঋণী হয়ে পড়ছিলাম এবং প্রিয়াঙ্কার মতো সুশীলা মেয়েকে জীবনসঙ্গী করতে পেরে আমি নিজেকে ধন্য মনে করেছিলাম। ওর হাতে হাত রেখে সেই কথাও আমি জানিয়েছিলাম আর প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়েছিলাম ওকে ছাড়া আর কোনও মেয়েকে কখনওই ভালোবাসব না। বিয়ে আমি একমাত্র ওকেই করব।

এর কয়েকদিনের মধ্যে অজিতেশও মন্দাকিনী নামের একটি মেয়ের প্রেমে পড়ল। এভাবেই যে-যার জীবন নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল। আমিও প্রিয়াঙ্কাকে নিয়ে বেশ ভালোই ছিলাম। কলেজ ফাঁকি দিয়ে ঘুরতে যাওয়া, সিনেমা দেখা, খাবার কিনে তা ভাগ করে খাওয়া— আমাদের মধ্যে সবই চলত। সরস্বতী পুজোর দিন ও একটা হলুদ রঙের শাড়ি পরে কলেজে এসেছিল। খোঁপায় জুঁই ফুলের মালা, কপালে টিপ— সবমিলিয়ে ওকে বড়োই সুন্দর দেখাচ্ছিল। যেন স্বপ্নের নায়িকা।

আমি সেদিন পাঞ্জাবি পরে এসেছিলাম। ও আমার কাছে এসে আলতো হাতে যখন আমার হাত ধরে বলল, তোমায় আজ দারুণ লাগছে। এমন বেশে এই প্রথমবার তোমায় দেখে বেশ অন্যরকম অনুভূতি হচ্ছে। তখন আমার মনে বসন্তের আগমনী হাওয়া বয়ে গিয়েছিল। সেদিন ও আমার হাত ধরে ফাঁকা ক্লাসঘরে টেনে নিয়ে গিয়ে প্রথমবার ঠোঁটে ঠোঁট রেখেছিল। বড়োই অদ্ভুত এবং সুখকর ছিল সেই অনুভূতি।

আমরা পরস্পরকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরেছিলাম। ওকে সেদিন ভালোবাসতে প্রবল ইচ্ছে করছিল। কিন্তু কেউ দেখে ফেলার ভয়ে নিজেকে সংযত করে রেখেছিলাম। ভাগ্যিস করেছিলাম। নইলে প্রিয়াঙ্কার জীবন নষ্ট করার জন্য আজীবন নিজের কাছে চূড়ান্ত অপরাধী হয়ে থাকতাম। ঠাকুরদার দিকে তাকিয়ে দেখলাম তার চোখদুটো ছলছল করছে। জিজ্ঞেস করলাম, ‘তারপর কী হয়েছিল বলো? নিজেকে তুমি কীসের দোষে অপরাধী মনে করছ?’

—কারণ তার দিন কয়েকের মধ্যেই প্রিয়াঙ্কার সম্মতিতে ওর বাবা-মায়ের কাছে যাই আমাদের ভালোবাসার কথা জানাতে। এককথায় তাঁরা আমাকে জামাই হিসেবে মেনে নিয়েছিলেন। তাঁদের কোনও শর্ত ছিল না যে আমায় ভালো চাকরি করতে হবে এবং আমি যে বড়োলোক ঘরের ছেলে— সেটাও না জেনেই তাঁরা রাজি হয়ে গিয়েছিলেন। আমি তখন যেন স্বর্গসুখ পেয়েছি! মনে মনে সেই বিশ্বাস ক্রমশই প্রবল হয়ে উঠছিল যে, ভগবান প্রিয়াঙ্কাকে একমাত্র আমার জন্যই এই পৃথিবীতে পাঠিয়েছে।

এরপর থেকে আমরা খোলাখুলিই মেলামেশা করতে শুরু করেছিলাম। মনে মনে ঠিক করে রেখেছিলাম কয়েকদিন পর আমার বাবা-মাকে আমাদের সম্পর্কের কথা জানাব। কারণ আমার সম্পূর্ণ বিশ্বাস ছিল, আমার খুশিতেই তারা খুশি হবে। কিন্তু কীভাবে জানি আমাদের ব্যাপারটা তাদের কানে আমি বলার আগেই পৌঁছে গিয়েছিল।

সেদিন বাবা আমায় ডেকে জিজ্ঞেস করল, ‘মেয়েটি কে?”

—আমি জানালাম সব কথা। এমনকী এও বললাম ও খুব গরিব ঘরের মেয়ে। আমার বউ হয়ে এলে ও দারুণ সুখী হবে। আমি ওকে কোনওদিন কষ্ট দেব না। বাবা তখন আমায় যা বলল, তার জন্য আগে থেকে বিন্দুমাত্রও প্রস্তুত ছিলাম না।

—ওই মেয়েকে আমি কোনওদিনও আমার পুত্রবধূ করতে পারব না। তোর জন্য আমি একটা ধনী পরিবারের মেয়ে দেখে রেখেছি। তার সঙ্গেই আমি তোর বিয়ে দেব। তুই ওকে ভুলে যা।

—আমার মনেও তখন জেদ চেপে গিয়েছে। বললাম, তুমি যতই বাধা দেওয়ার চেষ্টা করো, আমি কোনও কথাই শুনব না। বিয়ে করলে একমাত্র আমি প্রিয়াঙ্কাকেই করব।

(ক্রমশ…)

নিরাধার ভালোবাসা (পর্ব-০১)

ছোটো ঠাকুরদা। আমাদের পরিবারের ছোটো ছেলে। বিবাহ করেনি। ছোটো ঠাকুরদার ঘরের কিছু বাড়তি মরচে ধরা লোহার জিনিসপত্র তাঁর নির্দেশে বিক্রি করছিলাম। আদতে আগামীকাল ঠাকুরদার জন্মদিন। তাঁর ঘরে ইতিমধ্যেই নতুন জিনিসপত্র রাখার অভাব হয়ে পড়েছে। তাই ব্যবহারজীর্ণ জিনিসপত্রগুলি বিক্রির দায়িত্ব আমার উপরেই এসে বর্তেছে। সেগুলোর মধ্যে ছিল একটা মরচে ধরা ট্রাঙ্ক। সেটি খুলে তার মধ্যে থেকে ডায়ারি, খাতা, পেন এবং একটি প্রেমের গল্পের বই খুঁজে পাই।

বইটা বেশ জব্বর লাগল। প্রেমের ক্ষেত্রে হয়তো কাজেও লাগতে পারে। তাহলে সোনালির সঙ্গে আমার প্রেমটা আরও মজবুত হয়ে উঠবে। কাজেই বইটি এবং বাকি জিনিসগুলো নিজের কাছে রেখে ট্রাঙ্কটা বিক্রি করে দিলাম। সবমিলিয়ে যা টাকা-পয়সা পেলাম, সবটাই ঠাকুরদার হাতে ধরিয়ে দিলাম। ঠাকুরদা বলল— টাকাগুলো নিজের কাছে রাখতে। জন্মদিনের সরঞ্জাম কিনতে কাজে লাগবে। তখন বললাম, “আমি থাকতে তোমার এসব নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করার কোনও দরকার নেই। তুমি একলা মানুষ। টাকাগুলো তোমার বেশি দরকারে লাগবে।’ তবুও ঠাকুরদা আমার হাতে পঞ্চাশ টাকার একটি নোট ধরিয়ে দিয়ে বলল, “নিজের জন্য না লাগুক, অন্তত সোনালিকে একটা চকলেট কিনে দিস। ও বড়ো ভালো মেয়ে। কখনও ওকে কষ্ট দিবি না।’

আমি মাথা চুলকে একটু মুচকি হেসে ঠাকুরদার ঘর থেকে বেরিয়ে আসি। তারপর ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে প্রেমের গল্পের বইটা হাতে নিয়ে বসে যাই। প্রথম যে গল্পটি পড়লাম, তা খানিকটা এই রকম— গল্পের নায়ক, নায়িকাকে বড়ো ভালোবাসত কিন্তু মেয়েটি তাকে ভালোবাসত না। সে আবার অত্যন্ত সুন্দরী বলে মনে মনে বেশ অহংকার বোধ করত। একটি ছেলেকে সে ভালোবেসেও ফেলেছিল। তারপর যখন সে জানতে পারে ছেলেটি বহু মেয়ের সঙ্গে প্রেমলীলা চালিয়েছে এবং বর্তমানে একজনের সঙ্গে শারীরিক সম্পর্কে যুক্ত, তখন তার ভুল ভাঙে। এদিকে গল্পের নায়ক সেই মেয়েটিকে ছাড়া অন্য কোনও মেয়েকে তেমন পাত্তা দিত না। কাজেই শেষপর্যন্ত তাদের মিল হয়েছিল।

গল্পটি পড়ার পর মনে মনে ভাবলাম, বাব্বা, ভাগ্যিস সোনালিকে পেতে আমায় এত কাঠখড় পোড়াতে হয়নি। এর পরের গল্পটা পড়তে গিয়ে হঠাৎ সাদা-কালো পোস্টকার্ড সাইজের একটি মেয়ের ছবি খুঁজে পাই। ছবিটি দেখেই তৎক্ষণাৎ মনের মধ্যে একটা কৌতূহল জন্মাল। এই ছবি এমনি এমনি কখনওই বইটির মধ্যে থাকতে পারে না। সঙ্গে সঙ্গে ছুটে যাই ঠাকুরদার ঘরে। তারপর মেয়েটির ছবি তাকে দেখিয়ে বললাম, “এই মেয়েটি কে ঠাকুরদা? তুমি কি এনাকে চেনো?”

ছবিটি হাতে নিয়ে কয়েক মুহূর্ত সেটি দেখে ঠাকুরদা বলল, ‘এই ছবি তুই কোথায় পেলি?”

ঠাকুরদাকে বললাম সমস্ত কথা। তা শুনে সে চোখ থেকে চশমা খুলে কিছুক্ষণ চোখ বুজে রইল। তারপর বলতে শুরু করল— সে বহুকাল আগের কথা। আমি তখন প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়তাম। কলকাতার বাড়িতেই থাকতাম বাবা-মায়ের সঙ্গে। প্রায় নিয়মিত কলেজ যেতাম। তবে যে শুধুই পড়াশোনার জন্য, তা নয়। আমরা চার বন্ধু মিলে আড্ডা মারতাম। আমি, অজিতেশ, বিপিন আর সঞ্জয়। ছুটির পর আমরা একসঙ্গে ট্রামে চেপে বাড়ি ফিরতাম। আমরা একসঙ্গে অনেক নাটকও দেখেছি। তবে এরই মাঝে হঠাৎ একদিন আমাদের কলেজে একটি মেয়ের লেট অ্যাডমিশন হয়। ওর নাম ছিল প্রিয়াঙ্কা। মেয়েটি খুব নম্র, শান্তশিষ্ট গোছের। প্রথম দিনই ও আমার পাশে এসে বসেছিল, সেদিনই ওর সঙ্গে আমার আলাপ হয়। আমরা চার বন্ধু তখন কী বিষয় নিয়ে ইয়ার্কি ঠাট্টা করছিলাম, তা মনে নেই। কিন্তু ও পাশে এসে বসতেই আমরা চুপ করে গিয়েছিলাম। একটা সময় ও যখন আমার সঙ্গে আলাপ-পরিচয় করল, তখন পাশ থেকে সঞ্জয় আমার কানের খুব কাছে চাপা কণ্ঠে বলল, দেখেছিস, মেয়েটা আজ প্রথমবার ক্লাসে এসেই তোর সঙ্গে কেমন ভাব জমিয়ে নিল। এটাই প্রেমের প্রথম লক্ষণ।

সঞ্জয় এমনিতেই মজা করতে খুব ভালোবাসত। তাই ওর কথায় তেমন আমল দিইনি। কিন্তু ধীরে ধীরে ওর কথাই যে বাস্তবের রূপ নেবে, তা পূর্বে আন্দাজই করতে পারিনি। আসলে প্রেম, ভালোবাসার প্রতি আমার কোনওদিনই উৎসাহ ছিল না। ক্লাসের লাস্ট বেঞ্চে বসে আড্ডা মারা, ছুটির সময় বন্ধুরা মিলে একসঙ্গে বাড়ি ফেরা, এগুলোই আমার জীবন ছিল। কিন্তু তারই মাঝে প্রিয়াঙ্কা যে কীভাবে একটু একটু করে আমার মনে বাসা বেঁধে ফেলেছিল, তা কোনওভাবেই বুঝতে পারিনি। সে সর্বক্ষণ আমার সঙ্গে সঙ্গে থাকত। ছুটির পরেও আমার সঙ্গে বাড়ি ফিরতে চাইত। কিন্তু আমি মানা করতাম। বলতাম আমার বন্ধুদের সঙ্গে বাড়ি ফিরতেই আমি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি। এমনিতেই সেই সময়ে কলকাতার রাস্তায় এমন দাঙ্গা-হাঙ্গামা লেগে থাকত যে, ওকে একা ছাড়তেও কুণ্ঠাবোধ হতো। তবুও আমি মন থেকে ওকে এড়িয়েই যেতে চেয়েছিলাম।

কিন্তু একদিন কলেজ ছুটির পর সামনের ফুটপাতে রীতিমতো প্রবল সংঘর্ষ শুরু হয়ে হল। সেইসঙ্গে গুলি বর্ষণ। আমাদের চোখের সামনে একটি জলজ্যান্ত যুবককে খুন হয়ে যেতে দেখেছিলাম। আমাদের সকলের মনে তখন চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।

খেলনা যখন শেখার মাধ্যম

আপনারা জানলে অবাক হবেন যে, শিশুদের সঠিক মানসিক বিকাশে ওদের প্রিয় খেলনাগুলিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এক্ষেত্রে যেটা প্রয়োজন তা হল, শিশুদের সঠিক বয়সে সঠিক খেলনা দিতে হবে। খেলনাগুলি এমন হওয়া উচিত যাতে ওগুলো নিয়ে খেলার সময় শিশুরা সম্পূর্ণরূপে খেলার সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকতে পারে এবং খেলতে খেলতে শিশুদের ব্যক্তিত্বের বিকাশও ঘটবে।

রিমোট এবং ব্যাটারি-সহ যে খেলনাগুলি পাওয়া যায় সেগুলো নিয়ে খেলার পরিবর্তে, শিশুরা যদি নিজেরা শারীরিক সক্ষমতার সঙ্গে খেলতে পারে সেটা ওদের শেখার ক্ষেত্রে বেশি সহায়তা করে। এমন অনেক খেলনা আছে যেগুলো দামে সস্তা হওয়া সত্ত্বেও শিশুদের জন্য খুবই উপযোগী। এ ব্যাপারে অভিভাবকদেরও মনে রাখতে হবে যে, শিশুকে কত বেশি দামের খেলনা কিনে দিলেন সেটা গুরুত্বপূর্ণ নয়, খেয়াল রাখুন ওগুলো বাচ্চাদের জন্য কতটা উপযোগী এবং ওরা তা কতটা পছন্দ করে।

আমরা যখনই বাচ্চাদের মনস্তত্ত্ব বোঝার চেষ্টা করি, আমাদের প্রচেষ্টা থাকে ওদের না-বলা কথাগুলোকে বোঝার। আমরা চেষ্টা করি কোনও না কোনও ভাবে ওদের ‘দুনিয়া’-তে পৌঁছানোর। ওদের দুনিয়ায় একটি দেশলাই বাক্সকে উড়োজাহাজ বলে মনে হয়। যেখানে সামান্য ছোটো ছোটো খেলনার মাধ্যমেও অনেক বড়ো বড়ো স্বপ্ন সাজানো যায়। যে দুনিয়ায় কখনও যানবাহনের চাকা দিয়ে আবার কখনও দেশলাই বাক্সগুলোকে পরপর সাজিয়ে প্রাসাদ নির্মাণ করা যায়। কোনও খেলনা ভেঙে গেলে বাচ্চারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা চোখের জল ফেলে। আবার নতুন কোনও খেলনা হাতে পেলে এমন ভাবে আনন্দ প্রকাশ করে, যেন যক্ষের ধন খুঁজে পেয়েছে।

ভবিষ্যতের উন্নয়ন কৌশল

আমাদের প্রত্যেকেরই শৈশবের কোনও না কোনও খেলনার কথা আজও মনে আছে। কিন্তু আপনি কি জানেন যে, খেলনা দিয়ে খেলা শুধুমাত্র একটি কার্যকলাপ নয়, এটি একটি উজ্জ্বল ভবিষ্যতের বিকাশের ভিত্তি তৈরি করে? খেলনা দিয়ে খেলতে খেলতে বাচ্চারা আত্ম-সচেতনতা, অন্যের সঙ্গে মেলামেশা, আত্মবিকাশের মতো বিষয়গুলো শিখতে পারে। যা সঠিক ব্যক্তিত্ব বিকাশের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

মনোবিদ সোনাল গুপ্তা জানিয়েছেন, ‘অনেক সময় শিশুরা কিছু কিছু কথা তাদের বাবা-মাকে বলতে পারে না। কিন্তু সেটাই ওরা খেলনার মাধ্যমে বলতে পারে। তাই, শিশুর সঙ্গে খেলাধুলোর মাধ্যমে কিছুটা সময় কাটানো উচিত বড়োদের। এতে করে শিশুদের মনো-জগতের সঙ্গে পরিচিত হতে পারবেন।’ মনোবিদরা এই ভাবে ‘প্লে থেরাপি’-র প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই শিশুদের মনের জগতে প্রবেশ করেন এবং তাদের অনেক সমস্যার সমাধানে সহায়তা করেন।

দামি খেলনার প্রয়োজন হয় না

সাধারণত অভিভাবকরা মনে করেন শিশুরা দামি খেলনা বেশি পছন্দ করে। এই ধারণা সঠিক নয়। অনেক সময় দেখা যায় শিশুরা সস্তার কোনও খেলনা দেখে বেশি আকৃষ্ট হচ্ছে। খেলনা কেনার সময় ওদের পছন্দের ব্যাপারে নজর দিন। বয়স অনুযায়ী বাচ্চাকে কী শেখানো যেতে পারে, তা মাথায় রেখে ওদের খেলনা কিনে দিন।

খেলনা শিশুদের জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান জিনিস। তবে খেলনাটি যে ব্যয়বহুল হতে হবে এরকম মোটেই নয়। খেয়াল রাখুন যে, মনের বিকাশের পরিবর্তে খেলনাগুলি শিশুর জেদ এবং অহংবোধের দরজা যেন না খুলে দেয়। মনে রাখবেন, খেলনাগুলি হল বাচ্চাদের কল্পনার প্রতীক মাত্র। কাগজের নৌকা হোক বা শুকনো কাঠের তৈরি উড়োজাহাজ, কল্পনার এই জগতেই যেন ওরা বিচরণ করে।

খেলনার মাধ্যমেই শিশুর রুচি প্রকাশ পায়

সাইকোথেরাপিস্ট ডা. নেহা আনন্দ জানিয়েছেন, ‘একটি শিশু যখন খেলনা নিয়ে খেলে, তখন আমরা তার স্বভাব সম্পর্কে ধারণা করতে পারি। এই সময়েই স্পষ্ট হয়ে যায় যে, শিশুটির কোন বিষয়ে আগ্রহ আছে। যে বাচ্চা ছোটো থেকেই ক্রিকেট খেলার প্রতি আকর্ষণ বোধ করে, স্বভাবতই বড়ো হয়ে তার ক্রিকেটার হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।’

খেলার মধ্যে দিয়েই বাচ্চাদের স্বভাব ও আচরণ সম্পর্কে একটা ধারণা পাওয়া যায়। অনেক বাচ্চা খেলতে খেলতে প্রচণ্ড রেগে যায়। বুঝতে হবে এরা রাগী স্বভাবের। অভিভাবকদের চেষ্টা করতে হবে কীভাবে এদের রাগের স্বভাব দূর করা যায়। নিশ্চয়ই লক্ষ্য করেছেন বাচ্চারা মাঝেমাঝে বল নিয়ে লোফালুফি করে। এটি ওদের কাছে নিতান্তই একটি খেলা। কিন্তু একটু গভীর ভাবে দেখলে বুঝতে পারবেন, বলকে তালুবন্দি করার এই খেলার মাধ্যমে ওদের শুধু শারীরিক এক্সারসাইজ নয়, মানসিক এক্সারসাইজও হয়। বৃদ্ধি পায় একাগ্রতা। এর সঙ্গে ওরা বলের গতির অনুমান করতেও শেখে। এছাড়া কাগজ ছেঁড়া, পেন্সিল দিয়ে দেয়ালে আঁকিবুকি কাটা ওদের একপ্রকার খেলা। যদিও কোনও কোনও অভিভাবক এটা সন্তানদের খারাপ আচরণ মনে করেন। মনে রাখবেন, বাবা-মায়েরাও যদি ছোটো বাচ্চাদের সঙ্গে খেলার জন্য সময় দেন, তা ওদের সঠিক বিকাশে দারুণ কাজে আসে।

খেলনা শুধুমাত্র মন ভোলানোর জন্য নয়

বেশিরভাগ অভিভাবক মনে করেন যে, খেলনাগুলি তাদের বাচ্চাদের মন ভোলানোর একটি মাধ্যম। তাই তারা বাচ্চাদের জন্য সবচেয়ে দামি এবং সেরা খেলনা কিনে দেন। কিন্তু এগুলো তাদের বিকাশে মোটেই সাহায্য করে না। বরং বাবা-মায়ের এই আচরণের ফলে বাচ্চা জেদি হয়ে ওঠে। সে তখন নিজের জন্য দামি দামি খেলনা কেনার জন্য জেদ করে।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, একটি শিশু যদি রিমোট-নিয়ন্ত্রিত এরোপ্লেন নিয়ে খেলে, তবে সে শিখবে বোতাম টিপলেই এরোপ্লেনটি উড়ে যায়। কিন্তু কোনও শিশু যদি সাধারণ এরোপ্লেন নিয়ে খেলে, তাহলে সে জানবে যে, এরোপ্লেন ওড়ার জন্য চাকা এবং ডানারও প্রয়োজন হয়। এমনকী ওড়ার আগে সমতল রাস্তারও প্রয়োজন হয়। তাই রিমোট-নিয়ন্ত্রিত খেলনার তুলনায় সাধারণ খেলনা নিয়ে খেললে শিশুরা বেশি শিখতে পারে।

বর্তমান সময়ে বাচ্চা যখনই কাঁদে তখন মা তাকে নিজের বা বাড়ির অন্য কারও মোবাইল দিয়ে দেন। বাচ্চাও সঙ্গে সঙ্গে মোবাইল নিয়ে খেলা শুরু করে দেয়। ধীরে ধীরে এটাই বাচ্চার অভ্যাসে পরিণত হয়।

সাইকোথেরাপিস্ট ডা. নেহা আনন্দ জানিয়েছেন, ‘ব্লু স্ক্রিনের আসক্তি শিশুদের মনে কুপ্রভাব ফেলে। এটি শরীরে আসক্তিতে পরিণত হয়। এক্ষেত্রে মনে রাখবেন, স্ক্রিন বড়ো হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এর কুপ্রভাবও বাড়তে থাকে। খেলনার পরিবর্তে শিশুদের মোবাইল ফোন কখনওই দেওয়া উচিত নয়। এর প্রভাব শিশুদের মনে দীর্ঘ সময় পর্যন্ত থেকে যায়।

মেয়েদের জন্য আলাদা কোনও খেলনার যুগ নেই

কয়েক বছর আগেও খেলনা কেনার সময় মাথায় রাখা হতো সেটি ছেলের না মেয়ের। আমরা যখন ছেলে এবং মেয়েদের মধ্যে সমতার কথা বলছি, খেলনাগুলিতেও কোনও বৈষম্য করা উচিত নয়।

ডাক্তার নেহা আনন্দ বলেন, ‘স্কুলে কাউন্সেলিং করার সময় আমরা দেখি মেয়েদের লালন-পালনে কী ধরনের পার্থক্য রয়েছে। যেসব মেয়েরা ‘ছেলে-মেয়ে’-র ভেদাভেদের পরিবেশে বড়ো হয়, তাদের মনের মধ্যে হীনমন্যতা বাসা বাঁধে। আবার যাদের লালন-পালনে এই বৈষম্য থাকে না, তারা অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী হয়।’

খেলার জন্য বাচ্চাদের সব ধরনের খেলনা দিতে হবে। আরও ভালো হয়, যদি বাচ্চারা কাগজ বা অন্যান্য জিনিস থেকে নিজেরাই খেলার জন্য কিছু প্রস্তুত করে। এতে করে ওদের শেখার ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। এই কারণেই বিভিন্ন স্কুলে কাগজের তৈরি খেলনা তৈরি করা শেখানো হয়।

শিশুদের বিকাশে বেশি সাহায্য করে সেইসব খেলা যেগুলো ওরা বাড়ির বাইরে মাঠে গিয়ে খেলে। ইনডোর হোক বা আউটডোর— খেলাধুলোর মাধ্যমে শিশুদের শুধু শারীরিক বিকাশই হয় না, মানসিক বিকাশও হয়। একইসঙ্গে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং একাগ্রতাও বৃদ্ধি পায়। এরফলে বাচ্চারা কখনওই মানসিক রোগের শিকার হয় না।

কিন্তু দুঃখের বিষয়, বর্তমানে মাঠে গিয়ে খেলার প্রবণতা কমে যাচ্ছে। বিদ্যালয় হোক বা অভিভাবক— কেউই এ ব্যাপারে মনোযোগ দিচ্ছেন না। মাঠে খেলাধুলো করলে শিশুরা শারীরিক দিক থেকে বেশি শক্তপোক্ত হয়, যা তাদের ভবিষ্যৎ জীবনে কাজে লাগে। এর ফলে শিশু সামাজিক হয়ে ওঠে। পাশাপাশি মোবাইল গেমস বাচ্চার মধ্যে একা থাকার অভ্যাস তৈরি করে, যা তাকে অন্যদের থেকে দূরে সরিয়ে রাখে।

ব্যানানা মিশন (শেষ পর্ব)

কেস যখন প্রায় জন্ডিস, বাড়িতে অনিতা প্রায় হাঙ্গার স্ট্রাইকের মতন শুরু করেছেন। কোনও কথা শুনছেন না, রাগ দেখাচ্ছেন, জিনিসপত্র ছুড়ছেন। শাস্তি চাই, শাস্তি চাই রব তুলেছেন। তখন অজিত অনেক বোঝানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হলেন। তিনি প্রমাদ গুনলেন। কাদায় পড়া হাতির মতো ঝুম্পাকে স্মরণ করলেন। দ্বিধাগ্রস্ত অজিতবাবু। ঝুম্পা এখনকার রাজনৈতিক দলের মতো শিবির বদল করে যদি অনিতা দেবীর ঝান্ডা নিয়ে প্রচারে বেরোয় তখন কী হবে? ঝুম্পা অবশ্য বাবাকে নিরাশ করল না। একটা বেশ শাঁসালো মতলব দিল।

টেকো অভয়চরণ অজিতবাবুর কলেজবন্ধু। এ বাড়িতে তাঁর অবাধ যাতায়াত। আগে একটা চার্টার্ড ফার্মে কাজ করতেন। সাইড ব্যাবসা হিসাবে ঝোলায় রাখতেন হোমিওপ্যাথির নানাবিধ শিশি। তবে মনে হয়, এটা নিতান্তই তাঁর শখ। এর থেকে তিনি যা আয় করতেন, মাথার টাক পালিশ করার এক শিশি তেলের দামও পাওয়া মুশকিল ছিল। অবশ্য এই হোমিওপ্যাথির দৌলতে ঠাকুরপো আর বউঠানের মধুর সম্পর্ক ছিল। মাঝেমধ্যে জ্বরজারি হলে তাঁর দেওয়া পুরিয়াতেই কাজ হতো অনিতার।

এই তো সেদিন কইমাছের কাঁটা গলায় আটকে বিপত্তি। অভয়চরণবাবুর এক পুরিয়াতেই কাজ হল। বন্ধুর এই কেরামতিতে খুব খুশি হলেন অজিত। সারাদিন নিজের স্ত্রী খুব কষ্ট পাচ্ছিল। রাতে অভয়চরণকে ভূষণের দোকান থেকে মাছের কচুরি খাওয়ালেন। গিন্নি, বন্ধু দুজনেই খুব খুশি।

পরের দিন রাতের দিকে অভয়চরণ মিত্র বাড়িতে এলেন। সেই কালপ্রিট খাটের উপরেই বাবু হয়ে বসেছেন তিনি। একেবারে বিচারকের আসনে। বিপরীতে বিবাদী অজিতবাবু। একটা চেয়ারে বাদী পক্ষের অনিতা। এখানে কোনও সাক্ষীসাবুদ নেই। বেডরুমের ঘটনা!

অনিতা গতকাল রাতের ঘটে যাওয়া ঘটনার আদ্যোপান্ত বিবরণ টেকো জজ অভয়চরণের কাছে পেশ করলেন আর মাঝে মাঝেই স্বামীর দিকে আড়চোখে তাকিয়ে হুংকার দিলেন। অজিতবাবু শরৎচন্দ্রের একটা নভেল পড়ছিলেন, অন্তত পড়ার ভান করছিলেন তিনি। কোনও প্রতিবাদ করলেন। না। কিন্তু লক্ষ্য করলেন অনিতা মামলা মজবুত করার জন্য তার বক্তব্যে খানিকটা জল মেশাচ্ছেন। তিনি যারপরনাই দুঃখিত হলেন কিন্তু আত্মপক্ষ সমর্থনের কোনও চেষ্টা করলেন না।

বিচারক অভয়চরণ রায় ঘোষণা করলেন, ‘কাল একজন ছুতোর মিস্ত্রি পাঠিয়ে দেব।’ দুজনেই মুখ চাওয়া-চাওয়ি করলেন। অদ্ভুত রায় ! অনিতার কণ্ঠে কৌতূহল, ‘ছুতোর কী করবে?” অজিত বাবুও মাথা নেড়ে সায় দিলেন।

—আরে বাবা, এতদিন তো একসঙ্গে ছিলে, না হয় কিছুদিন আলাদা থাকো। হাসতে হাসতে রায়ের ওরাল কপি পেশ করলেন অভয়চরণ।

—সে তো পরের কথা কিন্তু ছুতোরের কাজ কী? এতক্ষণে মুখ খুলেছেন বিবাদী অজিত। খানিকটা যেন স্বামীর পক্ষ নিয়ে মাথা নাড়লেন অনিতা।

অভয়চরণ দুজনের মুখের দিকে তাকিয়ে সদর্পে বললেন, “খাট কেটে দু—ভাগ করা হবে।”

—কী? না, না। তা কী করে হবে! আমার বাবার নিজের হাতে বানানো খাট। প্রতিবাদের ঝড় তুললেন অনিতা।

বিবাদী-বাদী দুজনেরই রায় পছন্দ হল না। বিরস মুখে আদালত ছাড়লেন অভয়চরণ।

সেদিন রাতে অবশ্য সামান্য ডিনার করলেন অনিতা। তবে রাতে বিছানায় সেই “বিতর্কিত’ খাটে প্রায় যোজন দূরত্ব রেখে শুয়ে পড়লেন তিনি।

অজিতবাবু মুচকি হেসে ভাব জমাবার চেষ্টা করলেন, ‘পড়ে যাবে যে!” স্বামীর দিকে চোখে আইড্রপ দেওয়ার মতো করে তাকিয়ে মুখ ফিরিয়ে ঘুমানোর ভান করলেন তিনি।

আজ বাজার থেকে ঝুম্পার কথামতো প্রায় এক ডজন কলা কিনেছেন অজিত। ঝুম্পা অবশ্য তিন—চারটে কিনতে বলেছিল। কিন্তু অজিত কোনও রিস্ক নিতে রাজি নন। তাই হাতের কাছে একটু বেশি কলা মজুত করেছেন। কলাগুলো বেশি পাকা এবং খারাপ দেখে নিতে বলেছিল ঝুম্পা। তাই করেছেন। বেছে বেছে রসালো কলা এনেছেন। মজা কলাগুলো বিক্রি করে দোকানিও খুশি। এখন ব্রেকফাস্ট টেবিলে শুধু অভিনয়টা করতে হবে। কাজের মেয়েটা আসার আগেই কাজ সারতে হবে। সে যদি আবার দাদাবাবুকে তুলতে আসে!

সকালের ব্রেকফাস্ট অজিতবাবুর দায়িত্বর মধ্যে পড়ে। সব ভেবেচিন্তেই ফন্দি এঁটেছে ঝুম্পা। ছোটো মেয়ের বুদ্ধির তারিফ করলেন তিনি। ব্রেড টোস্ট, ডিম সেদ্ধ,আর নিজের জন্য খারাপ দুটো কলা নিলেন। অপেক্ষাকৃত ভালো দুটো স্ত্রী অনিতার প্লেটের পাশে রাখলেন। অনিতা একটা টোস্টে কামড় দিয়ে খবরের কাগজটা টেনে নিলেন।

অজিতবাবু মঞ্চে নামলেন চার্লি চ্যাপলিন-কে স্মরণ করে। সুক্ষ অভিনয় করতে হবে। ধরা পড়লে প্রেস্টিজ পাংচার। ছোটো মেয়ের কাছেও ফেস লস হবে। তিনিও একটা টোস্ট কামড়ে কলার খোসাটা ছাড়িয়ে অতি সন্তর্পণে পায়ের নীচে ফেললেন। একটু সময় নিলেন। অভিনয়টা নিখুঁত করা চাই। কলায় একটু কামড় দিলেন। ডিমে কামড় দিয়ে কেলেঙ্কারি বাঁধল। গলায় আটকালো। বিষম লাগায় কাশি হতে লাগল। জল চাই। অনিতা বোতল থেকে গেলাসে জল ঢেলে এগিয়ে দিলেন। এই মরেছে! প্ল্যান না ভেস্তে যায়! জল খেতে খেতে আড়চোখে দেখলেন স্ত্রীকে। আবার খবরের কাগজে মন দিয়েছে সে।

কলার খোসার উপর আস্তে আস্তে ডান পা—টা দিয়ে সহসা পড়ে গিয়ে চিৎকার জুড়লেন তিনি। অনিতা হই হই করে এগিয়ে এলেন। নাটক জমেছে। কাজের মেয়েটাও চিৎকার শুনে এগিয়ে এসেছে। গিন্নিমা হুংকার দিলেন, “জলঘটের মতো দাঁড়িয়ে আছিস কেন? দাদাবাবুকে ধর।’ দুজনে মিলে টেনে তুলল অজিতবাবুকে।

অভিনয়টা খুব ভালো হয়নি! পা-টা বেকায়দায় পড়েছে, উঠতে বেশ ব্যথা লাগছে। যাই হোক বিছানায় শুয়ে পড়লেন অজিতবাবু। এরপর থেকে স্ত্রী অনিতার কেয়ারে আছেন অজিত। একবার স্ত্রীর হাত ধরে টয়লেটে গেলেন। রাতে বিছানায় হট ওয়াটার ব্যাগ দিয়ে কোমরে সেঁক দিলেন অনিতা। সেই সময় বড়ো মেয়ে ফোন করেছিল। ফোন কেটে স্বামীর সেবায় ব্যস্ত হয়ে পড়লেন তিনি। রাতে মাথার বালিশটা অজিতবাবুর কাছাকাছি রেখে শুলেন তিনি। দূরত্বটা ঘুচিয়ে ফেলা দরকার!

একটু বেশি রাতে ছোটো মেয়ের মুঠোফোনে বাবার মেসেজ ঢুকল — ‘ব্যানানা মিশন সাকসেসফুল।”

ঝুম্পা প্রত্যুত্তরে বুড়ো আঙুলের ইমোজি পাঠাল। নিশ্চিন্তে ঘুম লাগালেন অজিতবাবু।

(সমাপ্ত)

 

ব্যানানা মিশন (পর্ব-০১)

ধপাস করে একটা শব্দ। আর তারপরেই ঘুমটা ভেঙে গেল অনিতা দেবীর। তিনি চোখ মেলে দেখলেন মাটিতে শুয়ে আছেন। ওঠার চেষ্টা করলেন। পারলেন না। কোমরে কেমন যেন একটু ব্যথা লাগছে। এসবের কিছু কারণ খুঁজে পেলেন না তিনি। শুধু স্মরণে এল ঘুমের মধ্যে কে যেন তার চুলের বিনুনি ধরে টানছিল। হয়তো মনের ভ্রম ভেবে পাত্তা দিলেন না অনিতা।

ঘরের দেয়াল ঘড়িটা টিক টিক আওয়াজ করে সময় জানান দিচ্ছে। কিন্তু অন্ধকার ঘরে কিছু ঠাওর করতে পারলেন না তিনি। একটা নাইট ল্যাম্প নিদেনপক্ষে ফুট ল্যাম্প কতবার লাগাতে বলেছেন কর্তাকে কিন্তু ওনার ঘুমের ব্যাঘাত হবে বলে তা আর হয়নি। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ। তাই বাধ্য হয়ে মেনে নিয়েছেন। কষ্ট করে খাটে ভর করে বিছানায় উঠে বসলেন তিনি। আর তখনই ব্যাপারটা ঘটল।

অজিতবাবু গোঙাতে গোঙাতে ‘সাপ, সাপ… বলে চিৎকার করতে লাগলেন। ব্যাপারটা কী হল! অনিতাও খানিকটা ভয় পেয়ে ঘরের আলোটা জ্বালাতে উঠতে যাবেন, সেই সময় অজিতবাবু এক কাণ্ড করে বসলেন। চিৎকার করে বিছানায় ছটফট করতে করতে অনিতা দেবীর বিনুনি ধরে এমন টান মারলেন যে, তিনি এক্কেবারে স্বামীর বুকের উপর। এমত অবস্থার জন্য প্রস্তুত ছিলেন না অনিতা দেবী। তাড়াতাড়ি করে চুলের বিনুনি বাঁচিয়ে কোমরের ব্যথা সামলে এই বেআক্কেলে লোকটার জন্য গজগজ করতে করতে ঘরের আলোটা জ্বাললেন।

চোখে আলো পড়তে খানিকটা যেন প্রকৃতিস্থ হলেন অজিতবাবু। মনের ভয়টা এখনও যায়নি। খাটের তলায় ঝাঁকি দিয়ে দেখতে লাগলেন। খাটের নীচে কী খুঁজছ? একেবারে হুংকার ছাড়লেন অনিতা। রাগে ফুঁসছেন তিনি। স্ত্রীর দিকে ভীত দৃষ্টিতে তাকালেন অজিতবাবু, ‘না, মানে…’ !

—কী? মাঝ রাত্তিরে কী নাটক শুরু করেছ! খুব বাড়াবাড়ি হচ্ছে। আমার চুল ধরে টানছিলে কেন?

—একটা সাপ। কেমন যেন ভয়ে ভয়ে বললেন অজিতবাবু।

—কী? সাপ? শরীরের কলকব্জাগুলো তো গেছে। মাথাটাও খারাপ হল? একেবারে তেলে বেগুনে জ্বলে উঠেছেন গিন্নি। অনিতার এই রাগের একটা প্রচ্ছন্ন কারণ আছে। বেশ কয়েকদিন ধরে রাতে বিছানায় এই লোকটা একেবারে নির্লিপ্ত আচরণ করে। যেন এসব করা অন্যায়! গা জ্বলে যায় একেবারে তাই এই তির্যক মন্তব্য তার।

অজিতবাবু গিন্নির প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে দরজা খুলে টয়লেটে গেলেন। এখন খানিকটা ধাতস্থ হয়েছেন তিনি। অনিতা আরও রেগে গিয়ে কোমরের বাতের ব্যথা উপেক্ষা করে ধপাস করে বিছানায় শুয়ে পড়লেন। কাল সকালে এর একটা বিহিত করতে হবে!

সকাল হওয়ার আগে একবার অজিতবাবুর পারিবারিক খবরটা নেওয়া যাক। তাঁদের দুই কন্যা সন্তান। বড়ো মেয়ে রুম্পা। সর্বসময় মনে অশান্তির মেঘ। কপাল কুঁচকে থাকা জীবন। ভুরুতে ভাঁজ পড়ে। বিয়ে থা করে বর্তমানে চেন্নাইতে থাকে। বছর চারেকের একটি ফুটফুটে ছেলে আছে। স্বামী ডিফেন্সে চাকরি করেন। তবে ফৌজের নিয়ম মেনে তিন বছর অন্তর নিজে অন্যত্র গেলেও রুম্পাদের সঙ্গী করেন না। রুম্পার শ্বশুর গত হয়েছেন। শাশুড়ি বউমাকে একেবারে হাতের তালুর মধ্যে রাখার চেষ্টা করে। একটু বেচাল হওয়ার উপায় নেই। সেটা অনিতার দুঃখের অন্যতম কারণ।

সকাল থেকে রাত অবধি বড়ো মেয়ের চিন্তায় তিনি আশেপাশের সব মন্দিরে নমস্কার ঠোকেন। মেয়ের জন্য মাঝে মাঝে চেন্নাইতে উড়ে যান। দুই বেয়ানে সৌজন্য সাক্ষাৎ, কথোপকথন হয় কিন্তু তা প্রায় অন্তঃসারশূন্য। বড়ো মেয়ের নামে নালিশ শুনেই দিন কেটে যায়। অনিতার ছোটো মেয়ে ঝুম্পা একেবারে দিদির বিপরীত। সর্বসময় কাউকে না কাউকে জব্দ করার ফন্দি। প্রণোচ্ছল লাগামহীন জীবন।

প্রভিডেন্ট ফান্ড থেকে টাকা তুলে রিটায়ারমেন্টের প্রায় দু’বছর আগে ছোটো মেয়ের খুব ঘটা করে বিয়ে দিয়েছেন অজিতবাবু। এই মেয়ে বরাবরই একটু বাবা ঘেঁষা। ঝুম্পার শ্বশুর হায়দ্রাবাদ শহরের একজন নামজাদা উকিল। তাঁর নামে বাঘে গোরুতে একঘাটে জল খায়। কিন্তু নিজের ছেলের বউকে তিনি জব্দ করতে অপারগ। তাঁর যত হম্বিতম্বি বাড়ির একতলার চেম্বারে। উপরে এলেই অন্য চিত্র। তখন তিনি ঝুম্পার ভয়ে জড়োসড়ো।

সম্প্রতি উকিলবাবু তাঁর দাঁত বাঁধিয়ে নিয়েছেন। খেতে খুব ভালোবাসেন। কিন্তু শরীরে রোগ বাসা বেঁধেছে তাই পাঁঠার মাংস খাওয়া একদম বারণ। বাড়ির লোকের চোখ এড়িয়ে চেম্বারের ছেলেটাকে দিয়ে মাঝে মাঝে দোকান থেকে মাংস আনিয়ে চেম্বারেই ভোজন করেন। সেদিন মাংস এল কিন্তু দাঁতের পাটি হাপিশ। মাংস খাওয়ার যন্ত্র না পেয়ে রেগে আগুন, তেলে বেগুন উকিলবাবু আঙুল দিয়ে একটু চেটে মাংসের ভাঁড় উপরে পাঠিয়ে দিলেন। পরে তিনি জানতে পারলেন ঝুম্পা—ই আসল কালপ্রিট। সেই ওটা লুকিয়েছিল। সেই থেকে উনি নকল দাঁতে মামলার থেকেও বেশি সতর্ক।

সকালটা খুব একটা সুখকর হল না অজিতের। অনিতা সাতসকালেই গত রাতের ঘটে যাওয়া ঘটনা একেবারে পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে বড়ো মেয়ে রুম্পাকে জানেলেন। সে বেচারা তার শাশুড়ির ড্রিবলিং সামলাতেই কুপোকাত। বারংবার তাকে বাঁশি বাজিয়ে ফাউল করে মাঠের বাইরে পাঠিয়ে দেন। রুম্পা তাই এই মুহূর্তে অন্য মাঠে খেলার সাহস পেল না। মায়ের পীড়াপীড়িতে দুদিন সময় চাইল সে।

অনিতা বেগতিক দেখে তাঁর ছোটোমেয়ে ঝুম্পার শরণাপন্ন হলেন। ঝুম্পা তার গর্ভধারিণী মায়ের এহেন নালিশকে খুব একটা আমল দিল না। সে বরাবরই বাবার পক্ষ নিয়ে কথা বলে। কিন্তু বাবা কর্তৃক মায়ের চুলের বিনুনি টানার ঘটনাটা তার ভালো লাগল না।

অজিতবাবু সব খবরই জানতে পারলেন। খানিকটা যেন ভয়ও পেলেন! গিন্নি নাওয়া—খাওয়া বন্ধ করে যেমন খেপে গেছে, তার নামে মানহানির মামলা না করে বসে! দুদিন বাদে অজিতের আশঙ্কাই সত্যি হল। বড়ো মেয়ে নিজের শাশুড়ির কাছে গুঁতো খেয়ে তার নিজের বাপকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে চাইল। বাবার জন্যই তার এই হেনস্থা। এইরকম একটা জাঁদরেল সন্দেহ বাতিক শাশুড়ি। বাবা কেন দেখেশুনে তাকে এই বাড়িতে গছিয়েছে? তাই সে ফলস্বরূপ মাকে নিরপত্তাহীনতার মামলা দায়ের করার পরামর্শ দিল।

(ক্রমশ…)

পড়ার জন্য সীমাহীন গল্প-নিবন্ধসাবস্ক্রাইব