একটা ঘরে ফেরার গল্প (৩ পর্ব)

৩ পর্ব

আজ সকালে বেড-রোল গুটিয়ে তেরো নম্বর প্ল্যাটফর্ম সংলগ্ন টয়লেটের বিপরীত দেয়ালে তালাবন্ধ ঢাউস কাঠের বাক্সটা খুলে বিছানাপত্র ঢুকিয়ে, টয়লেটের দিকে তাকাতেই অর্জুন বুঝতে পারল, তখনও পর্যন্ত টয়লেট একরকম ফাঁকাই রয়েছে বলা চলে। তার মানে ঘড়ির কাঁটায় সকাল সাতটা বাজলে কি হবে, এখনও পর্যন্ত কোনও ট্রেন স্টেশনে ঢুকতে পারেনি। প্রাতঃকৃত্য-স্নানাদি সেরে, বাইরে বেরোতেই অর্জুনের চোখে পড়ল — বারো নম্বর প্ল্যাটফর্মে রাঁচি-হাতিয়া এক্সপ্রেস এসে দাঁড়িয়ে আছে। জামা-প্যান্ট-জুতো গলিয়ে, পিঠব্যাগটা কাঁধে নিয়ে, ধীর পায়ে অর্জুন চোদ্দো নম্বর প্ল্যাটফর্ম সংলগ্ন এস্ক্যালেটরের দিকে পা বাড়াল। তার পুষ্যিগুলোকে ঘুম থেকে উঠিয়ে, রোজকার মতন টিফিন হাতে ধরিয়ে দিয়ে, স্কুলমুখো রওনা করিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে।

সারারাত ধরে দুর্যোগ-ক্লিষ্ট, অনিশ্চিত যাত্রার শেষে, ক্লান্ত আচ্ছন্ন শরীরে মালপত্র টানাটানি করে প্যাসেঞ্জাররা সব ট্রেন থেকে নেমে প্ল্যাটফর্ম পার করে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে। তার মধ্যে অর্জুন খেয়াল করল, জিআরপি’র লোকজন ধরাধরি করে কাউকে যেন ওই ট্রেনের সাধারণ কামরা থেকে নামিয়ে প্ল্যাটফর্মের বেঞ্চের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। এই দৃশ্য দেখে, প্যাসেঞ্জারদের মধ্যে অনেকে চলার পথে সেদিকে অগ্রসর হয়ে, উকিঝুঁকিও মারছে। অর্জুনও কৌতূহল দমন করতে না পেরে সেদিকেই পা বাড়াল।

ভিড় ঠেলে কাছাকাছি পৌঁছোতেই, এবার পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে— একটা মেয়ে পাশ ফিরে অচৈতন্য অবস্থায় শুয়ে রয়েছে। তার জামা-প্যান্ট রক্তে ভেজা; যা দেখে ভিড়ের মধ্য থেকে কেউ কেউ মন্তব্য করছে, ‘চল চল, পাগলি-টাগলি হবে’। আবার কেউ বলছে, “না না, রেপ কেস! চল, এখানে দাঁড়িয়ে থাকা মানে ঝামেলা বাড়ানো।’ অর্জুন কাছে গিয়ে, জিআরপি’র একজন এসআই-কে দেখে জানতে চাইল, ‘কী হয়েছে এর?”

—কী যে হয়েছে, সেটাই তো বোঝা যাচ্ছে না। সারারাত সাধারণ কামরার টয়লেটের মধ্যে অচৈতন্য অবস্থায় পড়েছিল। প্যাসেঞ্জাররা নাকি রাত থেকেই ওকে এইরকম অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেছে ওই টয়লেটের মধ্যে। ঝামেলা এড়াতে কেউ আর কোনও সাড়াশব্দ করেনি। অনেকে বলছে, রেপ-কেস হতে পারে। কিন্তু জ্ঞান না ফিরলে, কিছুই জানা যাচ্ছে না— জিআরপি’র এসআই জয়ন্ত ঘোষ মেয়েটির রক্তে ভেজা জামা-প্যান্টের দিকে ইঙ্গিত করে, অর্জুনের প্রশ্নের উত্তর দিলেন।

এই স্টেশন চত্বরে রেল পুলিশের সব লোকজনই অর্জুনকে খুব ভালো করে চেনে। অর্জুন সঙ্গে সঙ্গে তাই এসআই-এর উদ্দেশ্যে বলল, ‘অবস্থা কিন্তু খুব একটা ভালো ঠেকছে না। এক্ষুনি একে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া উচিত।’ ঘাড় ঘুরিয়ে এদিক ওদিক তাকাতেই, পাশেই বিল্টুকে দেখতে পেল অর্জুন। বিল্টুর হাতে ওর দলবলের ব্রেকফাস্টের ব্যবস্থা করার জন্য দু’শো টাকা দিয়ে বলল, “তুই সবার টিফিনের বন্দোবস্ত করে, সকলকে স্কুলে পাঠিয়ে দিবি ঠিকমতো। আমি একে নিয়ে হাসপাতালে যাচ্ছি। তুই চট করে কুলিদের থেকে একটা হ্যান্ড ব্যারো নিয়ে আয়।”

এরপরে এসআই জয়ন্ত ঘোষ আর অর্জুন দু’জনে মিলে মেয়েটাকে হাওড়া জেলা হাসপাতালে নিয়ে এল। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ মেয়েটার অবস্থা দেখে, ওকে সঙ্গে সঙ্গে ভর্তি করে নিয়ে, স্যালাইন, ইঞ্জেকশন প্রভৃতি প্রক্রিয়া চালু করে দিল। মেয়েটার জ্ঞান ফেরার অপেক্ষায় জয়ন্ত ঘোষের সাথে অর্জুন ওয়ার্ডের বাইরে ঠায় দাঁড়িয়ে রইল। দুপুরের পরে, ক্ষণিকের জন্য মেয়েটার জ্ঞান ফিরলে ডাক্তার জানালেন, ‘মেয়েটি শারীরিক ভাবে অসম্ভব রকমের দুর্বল। মনে হয় চার-পাঁচদিন ধরে পেটে কিছু পড়েনি। ক্ষীণ স্বরে কিছু হয়তো বলছে, যদিও তার বিন্দু-বিসর্গ কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। সামান্য সময়ের জন্য জ্ঞান ফিরলেও, আবার জ্ঞান হারাচ্ছে। দেখুন, আবার জ্ঞান ফিরলে, ওর কাছ থেকে যদি কোনও তথ্য সংগ্রহ করতে পারেন! পরীক্ষায় ধর্ষণ সংক্রান্ত কোনও তথ্য-প্রমাণ মেলেনি। তবে মেয়েটি ঋতুকালীন অবস্থার মধ্যে রয়েছে। ভালো করে জ্ঞান না ফিরলে, বেশি জোর জবরদস্তি করে কিছু জানার চেষ্টা করা উচিত নয়।’

ক্রমশ…

 

 

একটা ঘরে ফেরার গল্প (২-পর্ব)

২ পর্ব

পড়শিদের চিৎকার আর আলোচনা শুনে শ্রাবণী জানতে পেরেছিল, ওর জ্ঞাতিরা তার মা-বাবাকে মেরে ওদের জায়গা জমি হাতিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যেই তাদের ঘরে আগুন লাগিয়ে দিয়েছিল। দিন দু’য়েক বাদে গাঁয়েরই এক পিসে ওকে বুঝিয়েছিল, এভাবে পথে পথে কেঁদে বেড়ালে, না আর বাপ-মাকে খুঁজে পাবি; না জোটাতে পারবি পেটের ভাত। তার চেয়ে আমার সাথে চল, কলকাতার একটা অনাথ আশ্রমে ভর্তি করিয়ে দেব’খন। সেখানে মাথা গোঁজার ঠাঁই যেমন একটা পাবি; দু’বেলা দু’মুঠো ভাতের সঙ্গে দু’অক্ষর লেখাপড়াও শিখতে পারবি। পথে পথে ভিক্ষে করে আর বেড়াতে হবে না তোকে।

কিন্তু হাওড়া স্টেশনে ট্রেন থেকে নামার পরে, সেই পিসেকে আর খুঁজে পায়নি শ্রাবণী। পরে জিআরপি’র এক পুলিশ অফিসার কাকুর কাছ থেকে শ্রাবণী জেনেছিল, ওটা তোর পিসে না ছাই! ওটা শিশু পাচার চক্রের একটা দালাল। তোকে বেচে দেওয়ার উদ্দেশ্যে কলকাতায় নিয়ে যাচ্ছিল। পুলিশ দেখে ভয় পেয়ে গিয়ে, তোকে ফেলে রেখে এখান থেকে পিঠটান দিয়েছে।

হাওড়া স্টেশন থেকে বেরিয়ে, পূর্বপ্রান্তের রাস্তার ওপারে একটা ভাতের হোটেলে নিয়ে গিয়ে, সেইদিন দুপুরে মাছ-ভাত খাইয়ে, রেল-পুলিশের অফিসার শ্রাবণীকে ওই ভাতের হোটেলে রেখে দিয়ে, চলে যাওয়ার আগে বলে গিয়েছিল, আপাতত তুই এখানেই থাক, টুকটাক ফাই-ফরমায়েশ খেটে দিবি। দু’বেলা দু’মুঠো ভাত যেমন পেয়ে যাবি, তেমনই মাথা গোঁজার একটা ঠাঁইও হয়ে গেল তোর। কিন্তু হোটেল মালিক কথায় কথায় যেমন ধমক-ধামক আর তার সাথে চুলের মুঠি ধরে ঝাঁকুনি দিত, তা মোটেও পছন্দ হতো না শ্রাবণীর।

একদিন ভোর হওয়ার আগে হোটেল থেকে পালিয়ে, প্রথম মেদিনীপুর লোকাল ধরে, সোজা খড়গপুর স্টেশনে গিয়ে নেমে পড়েছিল সে। সেখানে কিছুদিন ট্রেনে ট্রেনে ভিক্ষে করে বেশ ভালোই দিন কেটে যাচ্ছিল তার। হঠাৎ করে একদিন রেল পুলিশের তাড়া খেয়ে, বছর দুয়েক বাদে আবার হাওড়া স্টেশনে ফিরে আসে সে। তারপর থেকে রোজ সারাদিন ধরে এ ট্রেন ও ট্রেন ভিক্ষে করে বেড়ানোর শেষে, রাতে ফিরে আসত এই তেইশ নম্বর প্ল্যাটফর্মে। প্ল্যাটফর্মের বেঞ্চে শুয়ে, নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়ত শ্রাবণী।

আর রোজ সন্ধ্যায় অর্জুনের পাশে বসে, কোলে চেপে, সবচেয়ে ছোটো যে মেয়েটা স্লেট-পেন্সিল নিয়ে, সবে অক্ষরজ্ঞান অর্জনে ব্যস্ত; তার নাম শান্তা। শান্তার জন্ম এই তেইশ নম্বর প্ল্যাটফর্মেই। সেও এক প্রচণ্ড ঝড়বৃষ্টির রাতে। জন্ম দেওয়ার পরে, ওকে ফেলে রেখে ওর মা-টা যে কোথায় চলে গিয়েছিল, তা কে জানে! মা-কে ছাড়া অতটুকু শিশু এতটুকু টু-শব্দটি পর্যন্ত করেনি কোনওদিন। ছোটো থেকেই সে এতই শান্ত ছিল যে, অর্জুনই ওর নাম দিয়েছিল— শান্তা!

এদের সঙ্গে অর্জুন দীর্ঘদিন ধরে পরিচিত হলেও, এদেরকে সঙ্ঘবদ্ধ করে, এই তেইশ নম্বর প্ল্যাটফর্মের বাসিন্দা বানাতে সক্ষম হয়েছে সে; তাও প্রায় বছর তিনেক হয়ে গেল। এদের বেশির ভাগই আগে প্ল্যাটফর্মে বসে, ট্রেনে ট্রেনে ঘুরে ভিক্ষে করে বেড়াত। সুযোগ পেলে যাত্রীদের মালপত্র থেকে হাতসাফাই করে, দু’-চার টাকা কামিয়ে নিতেও সিদ্ধহস্ত ছিল এরা।

অর্জুন বুঝেছিল, এদের সকাল থেকে রাত পর্যন্ত পেট চালানোর একটা বন্দোবস্ত করে দিতে পারলে আর নিয়মিত ভাবে পড়াশোনার জগতে ব্যস্ত করে রাখতে পারলে, তবেই এদের এই অসৎ উপার্জনের থেকে বিরত রেখে, একটা সুস্থ জীবনের আলো দেখানো সম্ভব। তাই সকাল হতেই কোনওদিন লুচি-তরকারি, কোনওদিন কেক, কোনওদিন কলা-পাউরুটি ধরিয়ে দিয়ে, সকলকে আজকাল টিকিয়াপাড়ার রেল লাইনের ধারের স্কুলে পাঠিয়ে দেয় অর্জুন। সেখানে প্রাপ্ত মিড-ডে মিলের সুবাদে দুপুরের খাওয়াটাও জুটে যায় রোজ। রাতে তেইশ নম্বর প্ল্যাটফর্ম সংলগ্ন গোডাউনের পাঁচিলের ধারে বসে ঘন্টা দুয়েকের পড়াশোনার পরে, একুশজনের এই দলটা চলে যায় হাওড়া স্টেশনের বাইরে নদীর ধারের ভাতের হোটেলে নৈশভোজ সারতে। তারপর সেখান থেকে ফিরে এসে, ওই গোডাউনের পাঁচিলের ধারেই সবাইকে শুইয়ে দেওয়ার পরে, রাতের এই ক’ঘন্টার জন্য অর্জুনের সারাদিনের সব ব্যস্ততার অবসান।

ক্রমশ…

 

একটা ঘরে ফেরার গল্প (১-পর্ব)

সকালে ঘুম থেকে উঠে টয়লেটে যেতে, আজ বেশ দেরি হয়ে গেছে অর্জুনের। ঘুম থেকে উঠে চোখ মেলে, কবজিতে বাঁধা ঘড়ির দিকে তাকাতেই মেজাজটা খারাপ হয়ে গেল। সকাল সাতটা বাজে। এইসময় টয়লেটে ঢুকতে গেলে, লম্বা লাইনের পিছনে গিয়ে দাঁড়াতে হবে। রোজ সাধারণত ভোর পাঁচটা-সাড়ে পাঁচটার মধ্যে টয়লেটে ঢুকে, একেবারে প্রাতঃকৃত্য-স্নানাদি সেরে নেয় অর্জুন। এর থেকে বেশি দেরি হয়ে গেলেই, হাওড়া স্টেশনের তেরো নম্বর প্ল্যাটফর্ম সংলগ্ন এই টয়লেটে সহজে ঢোকার সুযোগ পাওয়াটা বেশ দুরূহ হয়ে পড়ে।

দূরপাল্লার ট্রেনগুলো ভোরবেলায় ঠিক এই সময় থেকেই একের পর এক ঢুকতে শুরু করে হাওড়া স্টেশনে। যেসব প্যাসেঞ্জারদের ট্রেন থেকে নেমে, ট্রেন পালটাতে হয়, তারা এইসময় টয়লেটে ঢুকে একটু ফ্রেশ হয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে সবাই। এদের পিছনে লাইন দিতে হলে, সেদিনকার মতো সব কাজ যে মাথায় উঠবে, তা খুব ভালো করে জানে অর্জুন।

অর্জুন মনে মনে ভাবে, আজকের এই গণ্ডগোলের মূলে হচ্ছে গতকাল রাতের কালবৈশাখীর ঝড়। গতকাল রাত আটটা নাগাদ শুরু হয়ে, কয়েক দফায় যে ভীষণ বেগে এবছরের প্রথম কালবৈশাখীর ঝড় আছড়ে পড়েছিল, তাতেই তো সমস্ত রেল-যোগাযোগ ব্যবস্থা একেবারে লন্ডভন্ড হয়ে গিয়েছিল। ওই ঝোড়ো হাওয়ার সঙ্গী ছিল অবিশ্রান্ত ধারায় বৃষ্টি। সেই ঝড়বৃষ্টির তাণ্ডব যখন থামল, তখন ঘড়ির কাঁটা রাত বারোটা পার হয়ে গিয়েছে।

হাজার হাজার প্যাসেঞ্জার অসহায় ভাবে এদিক ওদিক ছোটাছুটি করছে। তারা কেউ লোকাল ট্রেন ধরে বাড়ি ফিরবে, কেউ আবার বাক্সপ্যাঁটরা নিয়ে দূরপাল্লার ট্রেন ধরবে বলে হাজির হয়েছে হাওড়া স্টেশনে। বাচ্চা, বুড়ো, মহিলা, সবার সে এক নিদারুণ অসহায় অবস্থা! সেই ঝড়-বৃষ্টির পর থেকে সারারাত, না আর কোনও ট্রেন হাওড়া স্টেশনে ঢুকেছে; না কোনও ট্রেন হাওড়া স্টেশন থেকে ছেড়ে বেরোতে পেরেছে।

গতকাল রাতে ঝড় যখন উঠল, অর্জুন তখন ওর দলবল নিয়ে হাওড়া স্টেশনের তেইশ নম্বর প্ল্যাটফর্ম সংলগ্ন গোডাউনের পাঁচিলের কোল ঘেঁষে বসেছিল। ওর দলবল বলতে এক পাঁচ বছর বয়সি থেকে শুরু করে, আঠারো-ঊনিশ বছর বয়স পর্যন্ত কয়েক জন কিশোর-কিশোরী মিলিয়ে জনা বিশেকের একটা দল। এদের সবাইকে এককথায় ‘অনাথ’ বলা চলে। কিন্তু অর্জুন তা মানতে রাজি নয়। অর্জুন বলে, ‘এরা সবাই আমার পরিবারের!” রোজ সন্ধ্যায়, মাঝখানে একটা হ্যাজাক জ্বেলে বসে অর্জুন। তাকে ঘিরে গোল করে বসে থাকে বাকি সকলে। অর্জুন ওদের গুরু। গুরুর কাছে পাঠ নিতে, সন্ধ্যা সাতটা বাজতে না বাজতেই যে যেখানে থাকুক না কেন, সকলেই এসে হাজির হয় হাওড়া স্টেশনের তেইশ নম্বর প্ল্যাটফর্মের এই গোডাউন লাগোয়া পাঁচিলের গোড়ায়।

ওদের প্রত্যেককে একটা করে পিঠব্যাগ কিনে দিয়েছে অর্জুন। সঙ্গে দিয়েছে বই, খাতা, কলম, পোশাক; যার যেমন প্রয়োজন। পড়াশোনার স্তরও একেক জনের একেকরকম। সবচেয়ে বড়ো যে ছেলেটি, তার নাম বিল্টু; বয়স সতেরো আঠারো হবে। ওর ব্যাগে রয়েছে ক্লাস সিক্সের বইপত্র। বিল্টু কীভাবে এই হাওড়া স্টেশনে এসে পৌঁছোল, তা অর্জুন অনেকবার বিল্টুর কাছে জানতে চেয়েছে। কিন্তু বিল্টু কিছুতেই তার জবাব দিতে পারে না। শুধু ওর কথাবার্তা থেকে অর্জুন বুঝতে পারে— ও কোনও সাঁওতাল মা-বাবার সন্তান। বিল্টুর পড়াশোনায় আগ্রহ থাকলেও, ভিতটা খুব দুর্বল হওয়ায়, অর্জুন ওকে গত দু’বছর আগে ক্লাস ফোরের স্তর থেকে সব বইপত্র কিনে দিয়ে, তালিম দিতে শুরু করেছিল। বয়স অনুপাতে অনেকটা পিছন থেকে শুরু করলেও, বিল্টুর অধ্যাবসায় যথার্থভাবেই ওকে ক্লাস সিক্স স্তর পর্যন্ত টেনে নিয়ে এসেছে।

আর বিল্টুর সমবয়সি যে-মেয়েটি, সে হল শ্রাবণী। আগামী বছর মাধ্যমিক পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে ও। শ্রাবণীর মা-বাবা যখন বেঁচে ছিল, তখন ও ক্লাস ফাইভে পড়ত। ওর কতই বা আর বয়স হবে তখন; বছর এগারো হবে। মেদিনীপুর জেলার শ্যামচকে ওদের বাড়ি ছিল। একরাতে ঘুমের মধ্যেই শ্রাবণী টের পায়, ওদের গ্রামের সেই খড়ের চালের ঘরটা দাউদাউ করে জ্বলছে। ভয়ে আতঙ্কে কাঁদতে কাঁদতে শ্রাবণী একরাশ ধোঁয়া আর অন্ধকারের মধ্যে ঘর থেকে বাইরে বেরিয়ে এসেছিল। মালপত্র বের করতে গিয়ে, চালচাপা পড়ে ঘরের মধ্যেই অগ্নিদগ্ধ হয়ে ওর মা-বাবা মারা গিয়েছিল সেদিন।

ক্রমশ…

 

ত্বক নিখুঁত করে তোলা কঠিন নয়

মহিলারা কর্মরতাই হোন বা হোমমেকার— অনেক সময় নিজের দিকে মনোযোগ দেওয়ার অবকাশ পান না। ত্বক অবহেলিত হলে, খুব সহজে তার ফল প্রকট হয়। তাই ত্বকের ড্যামেজ নিয়ন্ত্রণ করার এটাই সঠিক সময়। এই পদ্ধতিগুলি ট্রাই করুন, অবশ্যই আপনার ত্বক ঝলমলে হয়ে উঠবে।

ময়েশ্চারাইজিং: ত্বক ময়েশ্চারাইজ করা ভীষণ জরুরি। ত্বক যাতে স্বাস্থ্যোজ্জ্বল দেখায়, তাই দিনে দু’বার অবশ্যই ময়েশ্চারাইজার লাগান।

এক্সফলিয়েশন: মাইল্ড স্ক্রাব-এর সাহায্যে সপ্তাহে অন্তত দু’বার স্কিন এক্সফলিয়েট করুন। এর ফলে ত্বকের উপরের লেয়ার থেকে মৃত কোশ নির্মূল হবে। ত্বকে জমে থাকা ময়লাও একই সঙ্গে বেরিয়ে যাবে। ত্বকের হারানো ঔজ্জ্বল্য ফিরে আসবে। পরিচ্ছন্ন ত্বকে এরপর যে-স্কিন প্রোডাক্ট ব্যবহার করবেন, তার গুণাগুণ ত্বকের গভীরে প্রবেশ করতে পারবে।

ক্লিনজিং: ত্বকের ধরন বুঝে সঠিক ক্লিনজার ব্যবহার করুন। এটি ত্বককে পরিষ্কার রাখতে সহায়তা করবে। তবে ক্লিনজার লাগানোর আগে, মুখে থাকা মেক-আপ, মাইসেলর ওয়াটার দিয়ে ধুয়ে পরিষ্কার করে নেওয়া আবশ্যক।

হেলদি ফুড হ্যাবিট

  • নুন ও চিনির পরিমাণ ন্যূনতম রাখুন আপনার ডায়েট-এ। এর ফলে রেডিয়ান্ট স্কিন যেমন পাবেন, তেমনি সারাদিন এনার্জেটিক থাকতে পারবেন।
  • রিচ অ্যান্টি অক্সিড্যান্টস-যুক্ত ফল, যেমন সিট্রাস ফ্রুটস, বেরি, অ্যাভোকাডো প্রভৃতি ডায়েট-এ রাখুন।
  • ত্বক উজ্জ্বল রাখতে ভিটামিন সি ১০০০ মিলিগ্রাম, রোজ গ্রহণ করুন। গ্লুটেথিওন ট্যাবলেট যদি এর সঙ্গে সেবন করেন, খুব ভালো ফল পাওয়া সম্ভব।
  • স্বাস্থ্যোজ্জ্বল আর হাইড্রেটেড স্কিন পেতে হলে, প্রচুর জল পান করুন। এছাড়া হ্যালুরনিক অ্যাসিড- যুক্ত সিরাম ব্যবহার করলে ত্বক হাইড্রেটেড ও মসৃণ থাকে। বস্তুত হ্যালুরনিক অ্যাসিড একটি সুগার মলিকিউল, যা ত্বকে প্রাকৃতিক ভাবেই থাকে। এটি যদি আলাদা করে প্রয়োগ করেন তাহলে উপকৃত হবেন। এটি ময়েশ্চারকে বাইরে থেকে গ্রহণ করে ত্বকের কোলোজন-এর সঙ্গে সংযুক্ত করে। হ্যালুরনিক অ্যাসিড ত্বকের হাইড্রেশন ব্যালেন্স বজায় রাখতেও সহায়ক। যাদের ত্বক অতিরিক্ত ড্রাই, তারা ফেস অয়েল ব্যবহার করলে উপকার পাবেন।
  • প্যাক বা শিট মাস্ক, সপ্তাহে একবার করে অবশ্যই ত্বকে প্রয়োগ করুন। এর ফলে ত্বক রিল্যাক্সড হবে। সারা সপ্তাহের ধকলে ত্বকের উপর যে প্রভাব পড়ে, তা থেকে মুক্ত হবেন।

বিবাহের আগে নিজের এটুকু পরিচর্যা অবশ্যই করুন। এর ফলে আপনার ত্বক মেরামত তো হবেই, সেইসঙ্গে গ্লো-ও ফিরে পাবেন।

হোম কেয়ার টিপ্‌স

রোজ ওয়াটার: সাধারণ গোলাপ জল তুলোয় নিয়ে, শোয়ার আগে ১০-১৫ মিনিট ধরে ভালো ভাবে ত্বক মুছে নিন। এর ফলে ত্বকের হারানো আর্দ্রতা ফিরে আসবে। রোজ ওয়াটার স্প্রে, ইন্সট্যান্ট ক্লান্তি সারাতে অব্যর্থ।

অ্যালোভেরা: অ্যালোভেরা পাল্প সপ্তাহে ১-২ দিন লাগালে, ত্বকের আর্দ্রভাব বজায় থাকবে।

কাঁচা আলু: কাঁচা আলু মিহি করে গ্রেট করে, সপ্তাহে ১ বার লাগান। ১০-১৫ মিনিট মাসাজ করুন ত্বকে। তারপর ধুয়ে ফেলুন। আন-ইভন স্কিন টোন মেরামত করতে এটা দারুণ সহায়তা করে।

হলুদ ও মধু: হলুদ আর মধুর মিশ্রণ ব্রণ-যুক্ত ত্বকের জন্য দারুণ উপকারী। হলুদের অ্যান্টিসেপটিক গুণ অ্যাকনে সারাতে সাহায্য করে। এক চামচ কাঁচা হলুদ পেস্ট, বেসন ও চালগুঁড়োর সঙ্গে মিশিয়ে স্ক্রাব তৈরি করে নিন। পনেরো দিনে একবার করে এই মিশ্রণের সাহায্যে স্ক্রাবিং করুন। ত্বকের তৈলাক্তভাব কমবে। ফলে ব্রণর সমস্যা থেকেও মুক্ত হবেন।

মানবদেহ (শেষ পর্ব)

স্যার চার্লি চ্যাপলিন সেজেছিল সেই সন্ধ্যায় প্রবাল। নকল বাটার ফ্লাই গোঁফ। ঢোলা শার্ট, ঢোলা প্যান্ট, থ্যাবড়া জুতো। হাতে বাঁকা মজবুত স্টিক একটা। চারিদিকে সুস্থ, সবল মানুষেরা কেউ কিছু বলছে না। আজ প্রমাণ করবে সে, সারা শরীর মানুষের অবজ্ঞা মাখা কত শক্তি এই বামন শরীরে। স্বাভাবিক, ভয়হীন মস্তিষ্ক। সবাইকে হতভম্ব করে, বিশেষত ওই মাতাল যুবকটিকে কোনও প্রস্তুতির সুযোগ না দিয়েই শরীরের সমস্ত শক্তি প্রয়োগ করে ওই বাঁকা লাঠিটি সজোরে দু’বার পায়ে এবং পিঠে ঘুরিয়ে মারে। ওড়নাটা মুঠো থেকে খসে হাওয়ায় উড়ে যায় গাড়ি পার্কিং জোনের দিকে। বেসামাল হয়ে যুবকটি মাটিতে গড়িয়ে পড়ে। সবাই ছুটে এসে তাকে মাটি থেকে তুলে ধরে। বিপদের গন্ধ পেয়ে সঙ্গের অন্য যুবকটি ততক্ষণে মোটর সাইকেলে উঠে স্টার্ট দিয়ে দিয়েছে। টানতে টানতে আহত সঙ্গীটিকে পেছনে বসিয়ে অশ্রাব্য গালাগাল এবং বদলা নেওয়ার কথা বলতে বলতে ওরা চলে যেতেই মাটি থেকে ওড়নাটা কুড়িয়ে ঝিমলির দিকে তা বাড়িয়ে ধরেছিল প্রবাল।

—দাঁড়াবেন না, চলে যান বাড়ি। তার সেই সম্ভ্রম বাঁচানোর জন্যই ঝিমলি কি তাকে বকশিশ দিতে চায় আজ?

ঘড়িতে ন’টা বাজতেই রোজকার মতো অর্কেস্ট্রার শব্দ থেমে যায়। চল্লিশ মিনিট বাদেই ঝিমলি বাইরে বেরিয়ে আসবে। প্রবাল সরে যেতে চায় দরজার পাশ থেকে। কিন্তু একে একে সব সম্মানীয় খদ্দেররা বেরিয়ে আসবে। সাথে ছোটো মালিকও হয়তো বেরিয়ে আসবে। দম বন্ধ করে তাই একে একে সবাইকে ‘বাও’ করতে থাকে ‘মহারাজ’ ওরফে প্রবাল।

সব খদ্দের প্রায় চলে গেছে, এমন সময় সুইংডোর ঠেলে বেরিয়ে আসে ঝিমলি। প্রবাল গেটের কাছ থেকে সরে মালিক পক্ষের নিজস্ব গাড়ি রাখার শেডে গিয়ে দাঁড়ায়। ঝিমলিও এগিয়ে যায় সেদিকে।

—প্রবালদা! আজ দোল পূর্ণিমা— বলেই নীচু হয়ে একমুঠো আবির প্রবালের পায়ে দিয়েই টিপ করে প্রণামটা সেরে ফেলে। সাইড ব্যাগের মধ্যে থেকে একটানে বেরিয়ে আসা ঝুরঝুরি নীল রঙের রাংতায় মোড়া ভারি সুন্দর একটা প্যাকেট প্রবালের হাতে দেয়। একই সাথে কথা বলে সে, আমাকে দেখে সরে যাচ্ছিলেন কেন? আমি খারাপ মেয়ে। হোটেলে নাচি, তাই? আমার জন্য আপনাকে সেদিন থানায় মেরেছে, আটকে রেখেছিল। কিন্তু এই খারাপ মেয়েটা কোনওদিন আপনাকে ভুলবে না, দাদা! কবে থেকে আমি অপেক্ষা করে আছি এই দিনটার জন্য, জানেন? কণ্ঠস্বর ভিজে আসে ঝিমলির।

এইবার মাথা নীচু করে প্রবালের সামনে চুপ করে দাঁড়ায়। এখন কী করতে হয় প্রবাল জানে না। তাকে কোনওদিন কেউ আবির দেয়নি। এ দুর্লভ মূহুর্তে কি মাথায় হাত রেখে আশীর্বাদ করতে হয় বোনকে!

সিনেমায় দেখেছে নায়ক দাদা বোনের হাতে একগোছা টাকা তুলে দেয়। কিন্তু তার পকেট তো একদম ফাঁকা। কোনও টিপসও আজ পায়নি সে। কিছু একটা ভেবে ওঠার আগেই আবারও রুমালে চোখ মুছে ঠোঁট টিপে হেসে ঘুরে দাঁড়ায় ঝিমলি— ‘চলি, আবার কালকে’।

সামনের বাঁক পেরিয়ে ওদের মোবাইক চলে যেতেই আকাশের দিকে মুখ তুলে তাকায় প্রবাল। মাথার ওপরে থালার মতো মস্ত পূর্ণিমার চাঁদ। না আজ সে গাঁটুল নয়। দৈত্যের মতো বিশাল এক শরীর আজ তার। মাথার ওপর দীর্ঘ দু’বাহু তুলে ওই আকাশের দিকে টানটান মেলে ধরে প্রবাল গুহ। পরনে মহারাজ-এর ঝলমলে রাজকীয় পোশাক। ডান হাতের তালুতে জীবনের সব গ্লানি ছাপিয়ে সূর্যের মতো জ্বলজ্বল করছে একটা নীল প্যাকেট।

(সমাপ্ত)

মানবদেহ (পর্ব-০৪)

আবারও নকল গোঁফ থেকে উঠে আসা পাটের সেই ফেঁসোটা নাকের ভেতর হাওয়ায় উড়ে এসে অভব্যের মতো বেদম সুড়সুড়ি দিয়ে ওঠে গাঁটুলের। প্রাণপণ শক্তিতে মস্ত হাঁচিটা গিলতে গিয়ে দু’চোখে জল ভরে ওঠে আবারও। না, ওই জলও রুমালে মোছার কোনও উপায় নেই। মেক-আপ মুছে যাবে সব। চুপচাপ দাঁড়িয়ে দু’চোখে জল নিয়ে পায়ে হেঁটে আসা কাস্টমারদের মাথা ঝুঁকিয়ে ‘বাও’ করে।

দূরে অশ্বত্থ গাছটার নীচে মোবাইক থেকে ঝিমলিকে তার দাদা এসে নামিয়ে দিচ্ছে। রেস্তোরাঁর বাইরে ওর নাম ঝিমলি দত্ত। একটু বাদেই ওই সুইং ডোরটা ঠেলে ভেতরে ঢুকলেই ওর নাম পালটে হবে ‘মিস লিলি’। কিছু বাদেই ছোটো জামাকাপড় পরে নাচবে। বাজার চলতি হিন্দি ফিলমি গানের সুরে অর্কেস্ট্রা বাজবে। সিন্থেসাইজারে সেই বাবরি চুল ‘রোমিও’ মার্কা ছেলেটা মাথা দোলাচ্ছে। রাত ন’টা অবধি নাচবে ঝিমলি। তারপর মিস লিলি পোশাক পালটে রেস্তোরাঁর বাইরে বেরিয়ে ঝিমলি দত্ত হয়ে যাবে। রোজ ঠিক পৌনে দশটায় ঘড়ি ধরে মোবাইকে এসে তার দাদা তুলে নিয়ে যায়। পেটের দায়ে জামাকাপড় খুলতে হয়, ছোট্ট কাঁচুলি আর ঘাগরা পরে নাচতে হয় ঝিমলিকে। ধনমদে মত্ত পুরুষেরা কুপ্রস্তাব দেয় সুযোগ পেলেই।

আজ রেস্তোরাঁর ভেতরে ঢোকার আগে ঝিমলি এক লহমার জন্য প্রবালের সামনে এসে দাঁড়িয়েছিল। প্রথমত সুন্দরী তরুণী বলেই হোক বা নিজের শারীরিক খর্বতার কারণেই হোক প্রবাল একটু দূরে দূরেই সব সময় থাকে ঝিমলির থেকে। তার অপমান মাখা জীবন, ঘর ছেড়ে আসা, দৈনিক অনটন— সব খবরই ওই মেয়ে রাখে। কাছে এসে ঝিমলি তার হাতের বটুয়া খুলে কী একটা খুঁজে না পেয়ে ভেতরে চলে যাওয়ার আগে ঠোঁট উলটে মুচকি একটু হেসেছিল তার উদ্দেশ্যে। সেদিনের সেই ঘটনার পর থেকে রোজই তাকে উদ্দেশ্য করে যাওয়া আসার সময় এই মুচকি হাসিটি উপহার দেয় ঝিমলি। খুব ভেতরের হাসি এটা। চোখদুটো চকচক করে তখন তার। সে বোঝে এটা কৃতজ্ঞতার হাসি। এর জন্য পুলিশি ঝামেলায়ও পড়তে হয়েছিল প্রবালকে। কিন্তু বটুয়া খুলে তার সামনে আজ কী খুঁজছিল সে? টাকা নয় তো? তাকে বকশিশ দেবে! যেভাবে কখনও সখনও নেশাতুর চোখে টাকার কুমিরেরা তার ভাঁড়ামো দেখে দেয়। সত্যি যদি তা হয়, তবে এবার সত্যি সত্যি তার জীবন শেষ করে দেবে। ঈশ্বর, ওই নিষ্পাপ সরল মেয়েটার হাত দিয়ে তুমি এ পাপ কাজ করিও না।

দিন পনেরো আগে, রবিবারের রাত ছিল সেটা। ঘড়ির কাঁটা দশটা ছুঁই ছুঁই। গাছটার নীচে মোবাইকে ঝিমলির দাদা অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে। ঝড়ের বেগে সুইংডোর ঠেলে হঠাৎ ঝিমলি বেরিয়ে আসতেই চমকে ওঠে প্রবাল। কই, এভাবে তো কখনও সে বেরিয়ে আসে না। তারই সাথে সাথেই বেরিয়ে আসে দু’টি যুবক। আকণ্ঠ পান করেছে তারা। তাদের একজন খপ করে ধরতে চায় ঝিমলির হাত। তার হাতের টানে ঝিমলির শরীরের ওপর থেকে সালোয়ার কুর্তার সঙ্গের ওড়নাটি খুলে মুঠোর ভেতর থেকে যায় যুবকটির। প্রতিদিন পেটের দায়ে তাকে পোশাক পালটাতে হয়। কিন্তু প্রকাশ্য রাস্তায় সম্ভ্রম হারিয়ে লজ্জায় সে কুঁকড়ে যায়। হো হো শব্দে রেস্তোরাঁর দরজায় দাঁড়িয়ে হাসতে থাকে দু’টি মাতাল। একই সাথে যারা এসেছে ভেতর থেকে ভরপেটে, তারা আর রাস্তায় জমে যাওয়া কিছু সুস্থ, সবল পূর্ণাঙ্গ মানুষও পকেটে হাত দিয়ে তখন মজা দেখছে। সিকিউরিটি রামাচন্দ্রন আর মোবাইকে বসে থাকা দাদাও “হাঁ” করে তাকিয়ে। কোথাও কোনও প্রতিবাদ নেই।

—ভালো হবে না বলছি, ওড়নাটা দিন আমাকে। কান্না মেশানো ঝিমলির গলা। ধনীর দুলাল দু’টি সম্ভবত রেস্তোরাঁর ভেতর থেকেই তাকে কুপ্রস্তাব দিচ্ছে বারবার। তখনও সরব তারা।

—যদি না দিই?

—অসভ্য! চোখ ছলছল করে ওঠে ঝিমলির।

মদমত্ত সামনের যুবকটি, যার হাতের মুঠোয় ধরা গোলাপি ওড়নাটা। সে কিছুটা কাছে এগিয়ে আসে ঝিমলির, ভয়ানক টলছে। জিভে কথা জড়িয়ে যাচ্ছে।

—ইয়া! অসভ্য! তুমি সতী-সাবিত্রী, তাই না?

(ক্রমশ…)

***

মানবদেহ (পর্ব-০৩)

গালে, ঠোঁটে রং-চং মেখে ঝিমলি নামের ওই মেয়েটা নাচছে ভেতরে। রেশমি ফিতে আর জরি জড়ানো ঝলমলে পোশাকের ফাঁক ফোঁকর দিয়ে একটি নারী শরীর বাজনার ছন্দে ধনী পুরুষদের প্রলোভিত করছে। ওয়েটার মারফত পানীয়র অর্ডার যাচ্ছে বার কাউন্টারে। আরও রঙিন হোক আজকের সন্ধ্যা। ব্যাবসা মানবদেহের। ঝিমলির মতোই বোধহয় একদিন ছোটো মালিক, রাজেশ বাজাজের হঠাৎ তার কথা মাথায় এসেছিল। স্বাভাবিক গড়নের মানুষের চেয়ে অনেক ইন্টারেস্টিং একজন বাঁটকুল মানুষ। বিকৃত অপরিপূর্ণ শরীরে যে প্রতিবাদী হতে সাহস পায় না।

পূর্ণবয়স্ক পাকস্থলী আরও একমুঠো টাকার বিনিময়ে তাকে বহু আপস করতে শিখিয়েছে। আরও একটু বেঁচে থাকার প্রলোভন দিয়ে, রসদ জুগিয়ে, খোলা আকাশের নীচে সং সাজিয়ে সভ্য ধনীসমাজ তাকে নাচায়। রোজ সন্ধে থেকে রেস্তোরাঁ বন্ধ হওয়া অবধি কখনও সে চার্লি চ্যাপলিন, কখনও এয়ার ইন্ডিয়ার মহারাজা, কখনও-বা সার্কাসের ক্লাউন। রেস্তোরাঁর ছোটো মালিকের শখ এটা। তার পৈতৃক ব্যাবসার প্রধান ফটকে নানান চরিত্রের সাজে আগত সবাইকে বিরামহীন কুর্নিস করবে এই বণ্ঠ। যা দেখে ধনকুবের খদ্দেরের দল ঢুকতে বেরোতে মজা পাবে। তার বিনিময়ে অসহায় বামন মানুষটা তিনশো টাকা অতিরিক্ত মাসোহারা পাবে। ভাবলে অবাক হয়, সুন্দরী নারী শরীরের মতো তার এই বামন শরীরও মানুষকে উদ্ভাসিত, পুলকিত করে।

প্রতিদিনই নতুন সাজে এই মস্ত বড়ো বার-কাম রেস্তোঁরার বাইরে ক্রেতা মনোরঞ্জনের জন্য তাকে দাঁড়াতে হয়। রেস্তোরাঁর প্রধান ফটকের পাশে দাঁড়িয়ে ফ্লুরোসেন্ট আলোয় মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে এখন সে সাঁ-পিচ্ছিল গাড়ি চালিয়ে আসা কাস্টমারদের অনবরত ‘বাও’ করছে। ঝলমল পোশাকে কেউ কেউ তার দিকে প্রতিদানে মুচকি হাসি উপহার দিয়ে ভেতরের ঠান্ডা ঘরে ঢুকে যাচ্ছে। অবশ্য সবাই যে গাড়ি চালিয়ে আসছে, তা নয়। ট্যাক্সি চেপে কিংবা পায়ে হেঁটেও সুরালোভী, স্বাদু খাদ্যলোভী ধনী মানুষেরা আসছে। সিকিউরিটি রামাচন্দ্রন দম দেওয়া পুতুলের মতো বারবার সুইংডোর খুলে দিয়ে তাদের ভেতরে যাওয়ার পথ প্রশস্ত করছে।

নাকের নীচে আঠা দিয়ে লাগানো পেল্লায় গোঁফটা সুড়সুড় করছে গাঁটুলের। পার্ট দিয়ে বানানো ওই গোঁফের একটা আঁশ উঠে এসে বারবার হিমেল হাওয়ায় তার নাকের ভেতর ঢুকে পড়ছে। সশব্দ একটা হাঁচিকে বারবার ফিরিয়ে দিতে হচ্ছে তাকে প্রাণপণ শক্তিতে। ফলে একটা দমবন্ধ অবস্থা এবং দুচোখের কোলে জল। ওই হাঁচির সাথেই পুরো গোঁফটা যদি খুলে মাটিতে পড়ে যায়। একবার বাথরুম করার অছিলায় ভেতরে যায় সে। ভাবে, দেখতে পেলে আঙুল দিয়ে বসিয়ে দেবে তা। টয়লেটের মিরারগুলি এতটাই উপরে যে মুখ দেখার কোনও উপায়ই নেই তার। তিনফুট সাত ইঞ্চি উচ্চতায় মুখ দেখার একমাত্র উপায় তার নিজের ঘুপচি কামরার ভেতর রাখা হাত আয়নাই। কিন্তু সেখানে যাওয়া এখন বারণ।

—আরে, ইয়ার! এ ঘোঞ্চু কীধার গিয়া?

রেস্তোরাঁর মালিকের ছেলে প্রতাপ বাজাজ সাদা কন্টেসা থেকে নামতে নামতে খোঁজ করে গাঁটুলের। আসলে গাঁটুল নামটা তারই দেওয়া। আসল নাম প্রবাল গুহ কবেই হারিয়ে গেছে তার শারীরিক খর্বতার আড়ালে। নিজের ঘরে ঢোকার চেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে রেস্তোরাঁর ভেতর থেকে সুইং ডোর ঠেলে বাইরে বেরিয়েই চোখাচোখি হয় ছোটো মালিকের সাথে।

—এ ডোয়ার্ফ মাস্টার, হারামসে পয়সা মিলতা হ্যায়, ক্যাঁ?

—নো বস! নেচারস কল। গাঁটুল তার বাঁ হাতের থ্যাবড়া পুঁচকে কড়ে আঙুলটা ওপরে তুলে ধরে।

—ইসটাইম পানি মৎ পিয়া করো, শাআআলে!

(ক্রমশ…)

মানবদেহ (পর্ব-০২)

আকাশে চতুর্দশীর চাঁদ। অন্ধকারে উঠোনের প্যাসেজের বাঁকে ঘুম চোখে খাড়া খাড়া চুল, ঘাড়ে মাথায় কাপড় জড়ানো আচমকা তাকে দেখে চিৎকার করে জ্ঞান হারায় দিদি। তারপর বাড়িময় আলো জ্বলে ওঠে। দাদা এসে কাঁধে হাত রেখে, জোরে জোরে ঝাঁকায় প্রবালকে।

—ভূতের মতো চেহারা নিয়ে রাতবিরেতে না উঠলেই তো হয়। কাল থেকে শোয়ার আগে জল খেয়ে, বাথরুম করে, বিছানায় ঢুকবি, মনে থাকে যেন।

সেদিন বাকি রাতটা শুধু ভোর হওয়ার অপেক্ষায় বিছানায় বসে ছিল। ‘আনপড়’ বামন মানুষেরা কী করে তাদের পেটের ভাত জোগাড় করে? এই রূঢ় প্রশ্নটার মুখোমুখি মাত্র ষোলো বছর বয়সেই এসে তাকে দাঁড়াতে হল। সে বোঝে, বহু দৈহিক কাজ তার নাগালের বাইরে। অথচ শরীরে দৈত্যের শক্তি। আর মগজ? প্রবাল জানে, সবকিছুর বৃদ্ধি তার শরীরে থেমে গেলেও সুযোগ পেলে বহু বুদ্ধিজীবীকে আজও টপকে দিতে পারে। মগজ আজও প্রখর। শিক্ষার সুযোগ পেলে সেও অনায়াসে একজন ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়র কিংবা কম্পিউটার এক্সপার্ট হতে পারত। কিন্তু সে সুযোগ তাকে দেওয়া হল না। ভোর হতেই মার বিছানার পাশে গিয়ে বসেছিল প্রবাল।

—ভয় নেই মা, মরতে যাচ্ছি না। কাজের খোঁজে যাচ্ছি। আশীর্বাদ করো আমাকে। মা প্রভাবতী শুনে নিঃশব্দে কাঁদছিলেন। আর কাউকেই বলেনি সেদিন।

নতুন সূর্যের আলো মাড়িয়ে একা একা রেল বাজারের ভেতর রাজ্য প্রতিবন্ধী পুনর্বাসন দফতরের শাখা অফিসের বন্ধ দরজার সিঁড়িতে গুটিগুটি এসে বসেছিল। অপেক্ষা, শুধু দরজা খোলার। নানান প্রশিক্ষণের ভেতর মেশিনারিজ ট্রেড, কার্পেন্টারি এমনকী টেলারিং ট্রেডও ছোটো ছোটো হাতে পায়ে অসম্ভব মনে হল। অবিরাম দু’চোখের কোল ফেটে জল বেরিয়ে আসতে চায়। বাড়িতে মা বাদে সবার চোখেই তখন সে একজন ভৃত্যের বেশি নয়। কবে আসবে মুক্তি? অবশেষে, বিচিত্র এক কাজের প্রশিক্ষণে নিজের দিশা খুঁজে পায়। আর মেধাবি বলেই হয়তো দামি রেস্তোরাঁর কন্টিনেন্টাল-মোগলাই খানার রসুইঘরে শেফের সহায়কের ওই প্রশিক্ষণে অল্পদিনেই তুখোড় পারফরম্যান্স দেখাল প্রবাল। প্রতিবন্ধী পুনর্বাসন শাখা অফিসের সেক্রেটারি পৃথিবী সাতকড়ি পার্সোনাল ইনফ্লুয়েন্সে প্রৌঢ় মালিক গণেশ বাজাজের ‘ডিভাইন চয়েজ’ বার কাম রেস্তোরাঁতে তাকে ভিড়িয়ে দিল।

বছর চারেক দুর্বিষহ অনুশীলন বৃত্তি এবং বাড়ির প্রতিটি মানুষের অনুকম্পায় বেঁচে থাকতে থাকতে একদিন খালাস দিল তাদের। রেস্তোরাঁ মালিক প্রৌঢ় গণেশ বাজাজ দীর্ঘ পর্যবেক্ষণে খুশি হয়ে প্রবালের দীর্ঘদিনের একটা প্রার্থনা শেষে মেনে নিলেন। একচিলতে একটা প্রায় অন্ধকার খুপরি ঘর থাকার জন্য দেওয়া হল। রেস্তোরাঁ চালু হওয়ার প্রথম দিকে এটা ছিল স্টোররুম। অতটুকু স্টোরে কাজ হয় না বলে পুরোনো পরিত্যক্ত সামগ্রীর ‘জাংক রুম’ হিসেবে ব্যবহৃত হতো। এখন দু’বেলা খাওয়ারও ব্যবস্থা হয়েছে। তিনজন স্টাফ শুধু এই সুবিধাটা পায় এখানে। সিকিউরিটি রামাচন্দ্রন, জমাদার পরিতোষ পান্ডা, আর সে। মাত্র এক খামচা টাকা তাই মাস ফুরোলে হাতে আসত প্রবালের। যাতে নিজের তেল সাবানের খরচ তুলতেই হিমসিম খেতে হতো।

ঈশ্বরের করুণাই একদিন তার ওপর আবার বর্ষিত হল। সত্যি জীবনে তার এই বিকৃত শরীর, তার মতো একটি অশিক্ষিত যুবকের কাছে অভিশাপ না আশীর্বাদ তা এখনও বুঝতে পারে না প্রবাল। কিন্তু মানুষ যে অসহায় মানুষকে ‘পণ্য’ করে, এটা সে পরিষ্কার বোঝে। আর এই পণ্যের বাজারে সবচেয়ে চাহিদা হল এই মানবদেহের।

(ক্রমশ…)

২০২৩ সালের অন্যতম সফল সিনেমা টুয়েলভথ ফেল 

সকলেই জানেন ইতিমধ্যেই সিনেপ্রেমীদের মধ্যে বীভৎস সাড়া ফেলেছে বিধু বিনোদ চোপড়ার ‘টুয়েলভথ ফেইল’।সিনেমাটি প্রেক্ষাগৃহে মুক্তির পর তার ১২তম সপ্তাহ অতিক্রম করে এসেছে ওটিটি প্ল্যাটফর্মে। এর পরই ঘটেছে মিরাকল৷ ওটিটি রিলিজের পর হঠাৎ করেই চাহিদা বেড়ে গিয়েছে সিনেমাটির। শো বাড়াতে একপ্রকার বাধ্য হয়েছেন হল মালিকরা।

টুয়েলভথ ফেল সিনেমাটি তার ১২তম সপ্তাহান্ত ও ১১তম সপ্তাহে ৫৫ লাখ আয় করেছে। এদিকে ১০তম সপ্তাহে ছবির আয় ছিল ৩০ লাখ। এখনও পর্যন্ত সিনেমার আয় ৫৫.৩০ কোটি। কত বাজেটে তৈরি আর কত আয় হল এই অনুপাতে হিসেব করলে দেখা যাচ্ছে, ২০২৩ সালের অন্যতম সফল সিনেমা টুয়েলভথ ফেল।

একই সঙ্গে ওই সিনেমা ওটিটি-র দর্শকদেরও গভীর ভাবে প্রভাবিত করেছে। চারদিকে প্রশংসার ঝড়। বিক্রান্ত ম্যাসি অভিনীত এই সিনেমাটি কেবল দর্শকদেরই উৎসাহিত করেনি, সঙ্গে ইন্ডাস্ট্রির বহু তারকাকে অনুপ্রাণিত করেছে। ফিল্ম ক্রিটিকদের থেকেও প্রশংসা কুড়িয়েছে। সম্প্রতি অভিনেতা হৃতিক রোশন নিজের এক্স হ্যান্ডেল-এ লিখেছেন, ‘অবশেষে টুয়েলভথ ফেল দেখার সুযোগ পেলাম। ফিল্ম মেকিংয়ের ক্ষেত্রে এটি মাস্টারপিস। ছবির  সাউন্ড এফেক্ট আমাকে মুগ্ধ করেছে, মুহূর্তগুলিকে এক কথায় অনবদ্য করে তুলেছে। দুর্দান্ত পারফরমেন্স সকলের। মিস্টার চোপড়া, কী একটা সিনেমা বানিয়েছেন! আমি সত্যিকারের অনুপ্রাণিত এই সিনেমা থেকে।’

ইতিমধ্যেই বিক্রান্তকে নিয়ে প্রশংসার সুর শোনা গিয়েছে কঙ্গনা রানাওয়াতের মুখেও। কঙ্গনাকে বলতে শোনা গেছে, ‘বিধু স্যার আমার মন জয় করলেন আবারও। বিক্রান্ত তো অনবদ্য। আগামী দিনে তিনি হয়তো ইরফান খানের শূন্যতা পূরণ করতে পারবেন। ওঁর প্রতিভাকে আমার কুর্নিশ।’

লেখক অনুরাগ পাঠকের জনপ্রিয় উপন্যাস ‘টুয়েলভথ ফেল’-এর গল্প অবলম্বনে তৈরি এই ছবিটি IPS অফিসার মনোজ কুমারের জীবনকাহিনি থেকে অনুপ্রাণিত। কী এই গল্প?

দ্বাদশ শ্রেণির পরীক্ষায় পাশ করতে পারেননি রিয়েল লাইফ মনোজ শর্মা। বাড়ি ছাড়ার পর রাত কাটিয়েছিলেন ফুটপাথে। এক ধনীর বাড়িতে পোষ্য সারমেয়র দেখভাল থেকে শুরু করে অটো চালক হিসেবেও দিন গুজরান করেন এই IPS অফিসার। তাঁর জীবনে ছিল লড়াইয়ের ময়দান না ছাড়া এক নাছোড় জেদ। কী ভাবে পাশ করেন ভারতের অন্যতম কঠিন চাকরির পরীক্ষা UPSC?

একবারে পারেননি। ইউনিয়ন পাবলিক সার্ভিস পরীক্ষায় বারবার হোঁচট খেয়েছেন মনোজ শর্মা। কিন্তু, কখনও হাল ছাড়েননি তিনি। তাঁর জীবনের অন্যতম মন্ত্র ছিল, ‘জিততে গেলে লড়তে হবে। হারা ওহি জো লড়া নহি।’ এই আপ্তবাক্যকে সহায় করেই সরকারি চাকরির পরীক্ষায় বসেন তিনি।

আসলে  UPSC পরীক্ষায় বসার স্বপ্ন চেপে বসে মধ্য প্রদেশের এই দ্বাদশ ফেল ছেলেটির মাথায়।সেই জন্যই পাড়ি দেন গোয়ালিয়র। এরপর গোয়ালিয়র থেকে সোজা চলে যান দিল্লিতে।প্রথমটায় টেম্পো চালিয়ে, ছোটো-খাটো কাজ করে লড়াই শুরু করেন তিনি। সে সময় তাঁর মাথার উপর ছাদটুকুও ছিল না। ফুটপাথে ভিখারিদের সঙ্গে শুতে হয়েছে মনোজকে।

একবার এক পুলিশ আধিকারিক মনোজ শর্মার অটোটিকে আটক করেন। মহকুমা শাসকের অফিস থেকে অটোটিকে ছাড়িয়ে আনতে পৌঁছোন তিনি। এই একটি সাক্ষাৎ বদলে দেয় তাঁর জীবন। অটো চালানোর সময়, কথা বলতে বলতেই শুরু হয় জীবনের নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা। কী ভাবে UPSC পরীক্ষায় বসা যায়, কী ভাবে তার প্রস্তুতি নিতে হয় সবটাই ওই আলোচনায় উঠে আসে। মহকুমা শাসক যেন রাতারাতি তাঁর জীবনের গতিপথ বদেল দিয়েছিলেন সেদিন।

একটা সময় লাইব্রেরিতে পিয়োনের কাজ পান তিনি। কাজের সূত্রে বই পড়ার সুযোগ পেয়ে যান তিনি। সেটাই তাঁকে নয়া দিশা দেখায়। ধীরে ধীরে UPSC-র জন্য প্রস্তুতি শুরু করেন।এরপর UPSC পরীক্ষায় তিনবার ব্যর্থ হন মনোজ শর্মা। শেষ পর্যন্ত চতুর্থ অ্যাটেম্পট-এ ১২১ ব়্যাংক করেন তিনি। IPS হয়ে মহারাষ্ট্রে কাজে যোগ দেন।

IPS মনোজ কুমার শর্মার বন্ধু অনুরাগ পাঠক তাঁর বই ‘টুয়েলফথ ফেইল, হারা ওহি জো লড়া নেহি’-তে এই লড়াইয়ের কাহিনি বর্ণনা করেছেন। সেটি থেকেই টুয়েলফথ ফেইল ছবিটি অনুপ্রাণিত।বাণিজ্যিক ধারার ছবি না হওয়া সত্ত্বেও হলে সাড়া ফেলেছে ছবিখানা। আসলে মানুষ ব্যর্থতা থেকে সাফল্য পাওয়ার গল্পই শুনতে চায়৷ সেটার সঙ্গেই সে একাত্ম বোধ করে৷ সেটাই এই ছবির সাফল্যের রহস্য৷

মানবদেহ (পর্ব-০১)

‘মানবদেহ রইল পতিত

আবাদ করলে ফলত সোনা…’

কিন্তু! হায় রে পেট! আর এই পেটের জন্যেই আজ এয়ার ইন্ডিয়ার মহারাজা, কাল ‘স্যার চার্লি চ্যাপলিন’, পরশু সার্কাসের ‘ক্লাউনের’ সাজে ভাঁড়ামো করতে হয় প্রবালকে। মা বেচারি একসময় খুব কাঁদত, কিন্তু কী করা যাবে! বাগানে অনেক চারাগাছ-ই তো এমনি এমনি জন্মায়, ঠিকঠাক বাড়ে না— অথচ ফলফুল হয়। তাতে লোক বাহবাই দেয়। ‘দ্যাখ দ্যাখ কতটুকু গাছে কেমন ফুল ফুটেছে। ফল ধরেছে দ্যাখো— এই ছোট্টো গাছটায়।’

কেউ ওদের ‘বামন’ বলে না। ছোটো ছোটো বাচ্চারা ঢিল ছুড়ে মারে না। দুধের শিশুদের ভয় দেখাতে মায়েরা আঙুল তুলে দেখায় না, ওই দ্যাখ কে দাঁড়িয়ে ওখানে। ধরে নিয়ে যাবে কিন্তু। ভ্যাঁ করে ভয়ে কেঁদে ওঠে না কোনও শিশু তাদের দেখে।

তিন ভাই বোনের ভেতর হঠাৎ যেই না প্রবালের বাড় বন্ধ হয়ে গেল, সে হয়ে গেল সবার করুণার পাত্র। বাড়িতে সেই ছিল একদিন সবার সেরা। ও তো নিজে থেকে ওর বাড়বৃদ্ধি বন্ধ করেনি। প্রকৃতিরই মাটিতে টান পড়ল একদিন তাকে গড়ে তুলতে। তৈরি হল এক বামন।

ক্লাস ফোরে প্রাইমারি স্কুল শেষ হতেই ডে সেশন হাইস্কুল। ক্লাস সেভেন তখন তার, ক্লাসে ছোটোবেলার প্রিয় সহপাঠীদের ছোটোখাটো খাতার পাতা ছেঁড়া হাতে পাকানো কাগজের গোলা এসে পড়তে লাগল গায়ে। বয়ঃসন্ধির ওই শুরুতেই আস্তে আস্তে ফুটে উঠতে থাকল এক এক করে খর্বতার লক্ষণ। গিঁট বেঁধে যেতে লাগল হাতের পাঞ্জা আর পায়ের গুলিতে। মুখমণ্ডলে বিকৃতি। খাঁদা, থ্যাবড়া।

ক্লাস এইট-এ ওঠার পর স্কুল যাওয়া দুষ্কর হয়ে উঠল। ওকে দেখে প্রিয়বন্ধুদের মায়েরাও নিজেদের ভেতর গা টেপাটেপি করে। অথচ একদিন ওইসব কাকিমারাই তার ইংরেজি নোটস-এর জন্য কাড়াকাড়ি করত। মেধা তালিকায় প্রথম পাঁচজনের মধ্যে তার স্থান থাকত। আর ওটাই যেন আরও বৈরী করে তুলল সবাইকে। নবম শ্রেণিতেই পড়াশোনায় ইস্তফা দিতে হল। প্রিয় সব বইখাতাগুলিকে আঁকড়ে ধরে হাউ হাউ করে সেদিন কেঁদেছিল। দাদা প্রত্যয় তখন বিএসসি ফাইনাল দিচ্ছে। দিদি সুধা বিকম প্রথম বছর। বাবা চাকরি থেকে সবে রিটায়ার করেছেন। দিদির একটা বিয়ের সম্বন্ধ পাকা হতে হতে শেষ অবধি ভেঙে গেল। সেই প্রথম জন্মদাতা বাবার মুখে তার শরীরের বিকৃতি নিয়ে ক্ষোভ শুনল…

—এই নাটাটার জন্য সুধার অত ভালো সম্বন্ধটা ভেঙে গেল, বুঝলে সুধার মা! ছেলের বড়োমামা বলছে, এ নাকি জিনের গোলমাল। বংশে ফিরে ফিরে আসে। ও মানবক। সুধার ছেলেমেয়েদেরও যে তা হবে না কে বলতে পারে? বলো, তুমি কী জবাব দেবে এর?

প্রবাল মাথা নীচু করে অন্ধকার বারান্দার কোণে চুপচাপ বসেছিল। একবারও মরে যাবার কথা ভাবেনি সেদিন!

ছোটোবেলায় প্রতি বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় মায়ের গা ঘেঁষে বসে লক্ষ্মীর পাঁচালীতে শুনেছে, আত্মহত্যা মহাপাপ, নরকে গমন। ফুটপাতে পার্কের রেলিং-এর গায়ে টাঙানো নরকের একটা ভয়াবহ ছবিও দেখেছে। সে সময় জানত না, একদিন রাতের অন্ধকারে তাকে দেখেই অতি প্রিয়জনেরও গা ছমছম করে উঠবে। স্কুল বন্ধ হওয়ার বছর দেড়েক বাদে সেদিন মাঝরাতে নানান এলোমেলো ভাবনায় কিছুতেই ঘুম আসছিল না। তাই চুপিচুপি বাথরুম থেকে চোখেমুখে জলের ঝাপটা দিয়ে ঘাড়ে মাথায় ভিজে গামছা জড়িয়ে নিজের বিছানায় ফিরছিল প্রবাল। দিদিও বাথরুমে যাবে বলে তখন উঠেছিল।

(ক্রমশ…)

পড়ার জন্য সীমাহীন গল্প-নিবন্ধসাবস্ক্রাইব