ইন্দো-চিন সীমানায় ছোট্ট গ্রাম গামশালি (পর্ব-০২)

চলার পথে মাঝে মাঝেই ধৌলিগঙ্গা চোখের আড়ালে লুকিয়ে পড়ছিল। কিন্তু তার উচ্ছলতার ধ্বনি ছড়িয়ে পড়ছিল আমাদের কানে, মনে সারা উপত্যকা জুড়ে। এ পথে বেড়াতে গেলে দিনে দিনেই ফিরে আসতে হবে। পরিচয়পত্র জমা রাখতে হবে মালারি গ্রামের আইটিবিপি ক্যাম্পে। সারাদিন ঘুরে বিকেলে সংগ্রহ করে নিলেই হলো! যোশিমঠ থেকে মালারির দুরত্ব ৬২ কিমি। এখান থেকেই পথ দু’ভাগ হয়ে গেছে, আমরা বাঁ-দিকের পথটি ধরে এগিয়ে চললাম গন্তব্যের দিকে। বিবর্ণ মালারি গ্রাম ধূসর পাহাড়ের গায়ে মিশে রয়েছে গিরগিটির মতো।

পথ যত সীমানার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে আর সবুজ ছেড়ে পাহাড়ের রং ধূসর বর্ণ ধারণ করছে। ঘোলাটে নদীর জল বদলে নীলকান্ত বর্ণ ধারণ করেছে। ধূর্ত মুখের রং বদলে যায় নিষ্পাপ সারল্যে। শরীর মনের পুনঃযৌবন ঘটাতে চাইলে থাকতে হবে মেঘেদের চাষবাস করা গামশালির সবুজ মাঠে। এখানে রাতে তারারা চুপি চুপি নেমে এসে শোনাবে মেঘ-পাহাড়ের গল্প। মাঝে মাঝে ভাল্লুক তার ছানাপনা নিয়ে হাজির হতে পারে নদীর পাড়ে। পাখির দলের সাথে পাশ দিয়ে বয়ে চলা অমৃত গঙ্গা, দিনরাত বেটোফেনের মিউজিকের মতো নিরন্তর সঙ্গ দেবে।

শান্ত নির্জন এই স্থানে সেনাবাহিনীর গাড়ির শব্দ কখনও সখনও নিস্তব্ধতা ভঙ্গ করে। সারল্যে ভরা গ্রামীণ মানুষগুলো জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকবে আপনার দিকে! জিজ্ঞেস করলেই বলতে শুরু করে দেবে প্রয়োজনীয়-অপ্রয়োজীয় সব কথা। বিষেণ সিং নেগীর মতো ক্লান্ত কিষাণ, সামান্য একটা সিগারেটের বদলে সদ্য তুলে আনা মটরশুঁটি হাতে তুলে দিয়ে সারল্য ভরা হাসিতে যা ফিরিয়ে দেয় তা অমূল্য! প্রাপ্তির ঝুলি ভরে ওঠে।

রাতে তাঁবুতে থাকতে গেলে ইনার লাইন পারমিট নিতে হবে। তাঁবু ও রেশন সঙ্গে আনতে হবে। নন্দাদেবী বায়ো রিজার্ভ ফরেস্ট এবং তিব্বত সীমানার কাছে অবস্থিত হওয়ায় কারণে পারমিশন প্রয়োজন। গামশালির দেড় কিমি আগের বর্ধিষ্ণু গ্রাম বাষ্পায় চেষ্টা করলে কারও কারও বাড়িতে থাকার ব্যবস্থা হয়ে যেতে পারে। বাম্পায় হোম স্টে ছাড়া বর্তমানে গামশালিতে সরকারি গেস্ট হাউস তৈরি হচ্ছে। ঝঞ্ঝাট পোয়াতে পারলে সুদে-আসলে উশুল হয়ে যাবে।

গামশালি থেকে ৫ কিমি দূরে উত্তরাখণ্ডের চামোলি জেলার ইন্দো-চিন সীমানার শেষ গ্রাম নিতি। প্রাচীনকাল থেকে মানা পাসের সাথে সাড়ে ১৬ হাজার ফুট উচ্চতার নিতি পাস দিয়েও নিয়মিত চিনের সাথে বাণিজ্য চলত। ১৯৬২ সালে ইন্দো-চিন যুদ্ধের পর থেকেই এই পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এই সীমানা রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক দিক থেকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। নিতির উচ্চতা প্রায় সাড়ে ১২ হাজার ফুট। গামশালির উচ্চতা ১২ হাজার ফুট।

গ্রীষ্মকালে রাজমা মটরশুঁটি, অ্যাপ্রিকট ও নানা ওষধি গাছের চাষবাস হয়। আর সেইসঙ্গে কিছু পরিমাণ আপেলও হয়। সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে কুলির কাজেই এদের প্রধান জীবিকা নির্বাহ হয়। ভুটিয়া, মোর্চা সম্প্রদায়ের মূলত বাস। গাড়ওয়ালি ও তিব্বতি সম্প্রদায়ের মিশ্রণে গড়ে ওঠা সমাজের দরিদ্র্য মানুষগুলি সরকারি সুযোগ থেকে প্রায় বঞ্চিত। গরমের কয়েক মাস এখানে কাটিয়ে নীচে নেমে আসে এলাকাবাসী।

নিতির দেড় কিমি আগে রয়েছে একটি গুহা। সরল পথে হেঁটে গুহাতে পৌঁছে গেলে দেখা যাবে বেশ কয়েক ফুট লম্বা শিব লিঙ্গ। উত্তরাখণ্ড সরকার মার্চের শেষে এখানে যাওয়ার তারিখ ঘোষণা করেন। ভবিষ্যতে এই মন্দির সাধারণ পুণ্যার্থীদের কাছে জনপ্রিয় হবে। অনির্বচনীয় সৌন্দর্যে ভরপুর এই পরিবেশ।

(ক্রমশ…)

সুইট Recipes

অনেকেই মনে করেন খাবারের পর মিষ্টি খেলে হজম প্রক্রিয়ার উন্নত হয়। এই কারণেই বেশিরভাগ মানুষ এই জিনিসটি অনুসরণ করেন৷ অন্যদিকে আয়ুর্বেদিক বিশেষজ্ঞদের মতে, মিষ্টি খাওয়ার প্রথম নিয়ম হল খাবারের আগে খাওয়া। কারণ এটি হজম হতে সবচেয়ে বেশি সময় লাগে। যার ফলে অন্যান্য সমস্যা হতে পারে।

হজম ছাড়াও খাবারে প্রথমে মিষ্টি খেলে স্বাদ কোরক বা টেস্ট বার সক্রিয় হয়। এতে স্বাদ আরও ভালো হয়।মিষ্টি খেতে কম বেশি সকলেই ভালোবাসেন। কিন্তু এখন ডায়েটিংয়ের কারণে অনেকে দোনোমনায় ভোগেন বা কম করে খান। কিন্তু তাঁরা বাদে এমন অনেক মানুষ আছেন যাঁরা মিষ্টি ছাড়া থাকতেই পারেন না। দিনে অন্তত একটা মিষ্টি চাই তাঁদের। জন্য রইল কিছু নতুন ধরনের সুইট ডিশ৷

ব্যানানা শটস

উপকরণ : ২ টো কলা টুকরো করা, ১ কাপ ভ্যানিলা কাস্টার্ড, ১৫০ মিলি ফেটানো ক্রিম, সাজানোর জন্য চকো চিপ্‌স।

প্রণালী: কলার টুকরোগুলো পুডিং গ্লাসে রাখুন। উপর থেকে ভ্যানিলা কাস্টার্ড ঢেলে দিন। ক্রিম ফেটিয়ে কাস্টার্ডের উপর আর একটা লেয়ার তৈরি করুন। আবার কলার টুকরো দিয়ে সাজান। ফ্যাটানো ক্রিম ঢেলে দিন। চকো চিপ্‌স ছড়িয়ে সার্ভ করুন।

 

নাটি বাটার স্কচ

Nutty Butter Scotch recipe

উপকরণ: ১ কাপ বাটার স্কচ নাটস, ১ কাপ দুধ, ১/২ ছোটো চামচ ভ্যানিলা এসেন্স, ২ বড়ো চামচ চকো চিপ্‌স অল্প ওরিয়ো বিস্কুটের গুঁড়ো, ১ কাপ ভ্যানিলা আইসক্রিম, সাজানোর জন্য ফেটানো ক্রিম আর বাটার স্কচ আইসক্রিম।

প্রণালী: বাটার স্কচ নাটস দুধে দিয়ে ফুটতে দিন। এতে ভ্যানিলা এসেন্স দিয়ে সস তৈরি করুন। একটা পুডিং ডিশে এক লেয়ার বিস্কুটের গুঁড়ো দিন। তারপর দিন ভ্যানিলা আইসক্রিম। এরপর সসের লেয়ার উপর থেকে ক্রিম আর বাটার স্কচ নাটস দিয়ে সাজিয়ে পরিবেশন করুন।

ক্যারামেল ডিলাইট

Caramel Delight recipe

উপকরণ:  ৫০ গ্রাম চিনি, ১০০ মিলি দুধ, ১ ছোটো চামচ মাখন, ১ কাপ ভ্যানিলা আইসক্রিম, সাজানোর জন্য বাটার স্কচ ক্রাঞ্চ।

প্রণালী: চিনি প্যানে দিয়ে ক্যারামেলাইজ করে নিন। এতে দুধ ও মাখন দিয়ে ফুটতে দিন এবং সস তৈরি হতে দিন। একটা পুডিং গ্লাসে অল্প সস ঢালুন, তারপর দিন ভ্যানিলা আইসক্রিম। উপর থেকে আরও একটা লেয়ার তৈরি করুন সস ঢেলে। তারপর বাটার স্কচ ক্রাঞ্চ ছড়িয়ে সার্ভ করুন।

দ্বিতীয় পুরুষ (শেষ পর্ব)

কেউ বলছে ডাক্তার ডাকতে, কেউ বা হাসপাতালের কথা। অঙ্গিরা জোর করে উঠে বসে বারণ করল সবাইকে। জানাল সে সম্পূর্ণ ঠিক আছে। কিন্তু নিজের দিকে তাকিয়ে নিজেই অবাক হয়ে গেল। সে কী স্বপ্ন দেখছে! সে মৃত না জীবিত। এতগুলো ঘুমের ওষুধ খেয়েও কোনও বিরূপ প্রতিক্রিয়া নেই শরীরে! তার তো এতক্ষণে এই চরাচর ছেড়ে দেওয়ার কথা। তাহলে কী! ওষুধের মধ্যেই কোনও কারসাজি! রঙ্গন তার প্রখর বুদ্ধি দিয়ে হারিয়ে দিল অঙ্গিরার অবধারিত মৃত্যুকে। কিন্তু রঙ্গনের কী হল! এবার সেই ভেবে উতলা হয়ে উঠল অঙ্গিরার মন। সে তো আর মোবাইলের যুগ নয়, দৌড়ে গেল ল্যান্ড লাইনের দিকে। হাত কাঁপছে, ডায়াল করতে পারছে না, আঙুল জড়িয়ে যাচ্ছে। অবশেষে লাগল রঙ্গনদের বাড়ির নম্বর। জানা গেল বেশ কিছুক্ষণ আগেই রঙ্গন নাকি হিমাচল ঘুরতে যাচ্ছে বলে কয়েকদিনের জন্য বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেছে। মাথায় বাজ ভেঙে পড়ল অঙ্গিরার। কিছুদিন পর ওষুধের শিশির ভেতর সাদা গুঁড়ো পরীক্ষা করে জানা গেল, সেগুলো অতি সাধারণ ক্যালশিয়ামের বড়ি ছিল। ভালোবাসা আরও গভীরে নোঙর ফেলল অঙ্গিরার ডুবোপাহাড়ের ভেতরে।

এরপর রঙ্গনদের পরিবার আরও বছর দুই ছিল ওই পাড়ায়। ততদিন পর্যন্ত এক দিনের জন্যেও ফেরেনি নিখোঁজ রঙ্গন। রঙ্গনদের পরিবার এই পাড়া ছেড়ে চলে যাবার আগে এক অদ্ভুত খবর এল তাদের বাড়ি। দেরাদুনের কাছে এক ভয়াবহ ট্রেন দুর্ঘটনায় একটি দলা পাকানো দেহ পাওয়া গেছে। চেনার কোনও উপায় নেই। পাশের পড়ে থাকা টিকিটের সূত্র ধরে আন্দাজ করা হচ্ছে এটা নাকি রঙ্গন মিত্র। রেলওয়ে জিআরপি এরকমই খবর দিল। পাড়ার দু’একজনকে নিয়ে ঘটনাস্থলে ছুটল রঙ্গনের পরিবার। শোনা যায় ওখানেই নাকি দাহ করে এসেছিল সেই অশনাক্ত রঙ্গনকে। তারপর বাড়ি ফিরে রঙ্গনের শ্রাদ্ধ শান্তি-ও হল। চিরকালের মতো অঙ্গিরার জীবনের একটা রঙিন অধ্যায় সাদা হয়ে গেল।

নিয়মভঙ্গের দিন অঙ্গিরা শেষবারের মতো গিয়েছিল ওদের বাড়ি। যে রঙ্গনের গলায় মালা দেওয়ার কথা ছিল ওর, তার কাচের ফ্রেমেবন্দি হাসিভরা মুখচ্ছবিতে মালা দিয়ে এল। আজ ওটাতো একটা জড় পদার্থ। তার আর কোনও হেলদোল নেই। হা ঈশ্বর! অঙ্গিরা মনে মনে ভাবল, যখন যাত্রীভরা নৌকাডুবি হয়, তখন যারা বেঁচে যায়, তারা ভাবে ঈশ্বর অপার করুণাময়, অথচ যারা ডুবে মরছে তারা ঠিক তখনই বুঝতে পারে ঈশ্বর আসলে কত নির্মম।

তারপর ওর বাবা-মায়েরাও চলে গেল এই পাড়া ছেড়ে। বলেও যায়নি কাউকে। আসলে একমাত্র ছেলে চলে যাওয়ায়, পুরোনো স্মৃতিকে আর টেনে নিয়ে যেতে চাইল না তারা। পুরোনো যোগাযোগ থাকা মানেই সেইসব ফেলে আসা দিনের অপ্রিয় স্মৃতির রোমন্থন। যেটা তারা একেবারেই চাইল না। তাই পাড়ায় আর কেউ জানেও না ওদের খবর।

এদিকে একবার আত্মহত্যার হাত থেকে বরাতজোরে বেঁচে যাওয়ায় ভীষণ চোখে চোখে রাখা শুরু হল অঙ্গিরাকে। বিশেষ করে ওর মা এক মুহূর্তের জন্যও চোখের আড়াল করতেন না অঙ্গিরাকে। শুরু হল ওর মানসিক স্বাস্থ্যের চিকিৎসা। কিছুদিনের মধ্যেই রাজি করিয়ে মোটামুটি মনের ইচ্ছের বিরুদ্ধেই বসিয়ে দেওয়া হল বিয়ের পিঁড়িতে। চার হাত এক হয়ে গেল পুলকের সাথে। সংসারের সুখের অভ্যাসে অনেক তলানিতে চলে গেল ফেলে আসা স্মৃতি। বিয়ের দু’বছরের মাথায় কোলে এল মেয়ে। সংসার ভরে উঠল অপত্য স্নেহে। দায়িত্ব কর্তব্যের পুরু ধুলো পড়ে গেল কিশোরীবেলার সেই অবিচ্ছেদ্য সম্পর্কের ওপর। অঙ্গিরার মন থেকে অনেকটাই বিস্মৃত হয়ে গেল রঙ্গনের গল্প।

তারপর হঠাৎ এই আজকের সকাল। মনের মধ্যে একটাই প্রশ্ন শুধু ঘুরপাক খাচ্ছে, এই রঙ্গন মিত্র কি সেই রঙ্গন? নাকি একই নামের কোনও আলাদা মানুষ। মনের গভীরে আবার একটা নিস্তব্ধ আলোড়ন হচ্ছে। যার ঢেউ’র কোনও বহিঃপ্রকাশ বাইরের চেহারায় নেই। কিন্তু এখন উপায়! কীভাবে যোগাযোগ করা যায় রঙ্গনের সাথে? একবার পত্রিকা অফিসে কি ফোন করা উচিত হবে? দোটানায় অঙ্গিরা। তবু মন মানছে না। শেষমেশ নিজেকে আর দমন করে রাখতে পারল না। ফোন করেই ফেলল পত্রিকা অফিসে।

—হ্যালো…?

—আমি অঙ্গিরা বসু বলছি, আচ্ছা গত রবিবার আপনাদের কাগজে যে-গল্পটি প্রকাশিত হয়েছে, তাঁর লেখক রঙ্গন মিত্রের ফোন নম্বরটা কি পাওয়া যাবে?

—না, মাপ করবেন। লেখকের অনুমতি ছাড়া তো তার ফোন নম্বর কাউকে দেওয়া তো সম্ভব নয়।

—তাহলে কি কোনওভাবেই ওনার সাথে যোগাযোগ করা যাবে না?

—আপনি একটা কাজ করতে পারেন, আপনার ফোন নম্বরটা আমাকে দিন, আমি রঙ্গনবাবুকে পৌঁছে দেবার চেষ্টা করব। এইটুকু করতে পারি বড়োজোর।

—অসংখ্য ধন্যবাদ।

এরপর প্রায় দিন সাতেক কেটে গেল। অঙ্গিরা হতাশ হয়ে পড়ল। ধরেই নিল যে, রঙ্গন সত্যি সত্যিই আর এই দুনিয়াতে নেই। তার মানে ওটা আসলে রঙ্গনেরই মৃতদেহ ছিল। মনের কোণে যেটুকু দোলাচলের নিষ্পাপ কুঁড়ি টিকেছিল, সেটাও ঝরে গেল। ধরেই নিল, এই রঙ্গন মিত্র আলাদা এক মানুষ। দোল এসে গেল। পুলকের সেদিন ছুটি। অঙ্গিরাদের ফ্ল্যাটে হই হই করে রং খেলা হচ্ছে। কাউকে চেনা যাচ্ছে না। সবাই রং মেখে অন্য চেহারা। হঠাৎ ফোন বেজে উঠল অঙ্গিরার। মেয়ে চিৎকার করে উঠল, ‘মা তোমার ফোন।’ দৌড়ে গেল অঙ্গিরা।

—হ্যালো…?

ওপার থেকে এক গুরুগম্ভীর পুরুষ কন্ঠস্বর ভেসে এল। অবিকল সেই বহু বছর আগে শোনা বড়ো চেনা অঙ্গিরার এই কন্ঠস্বর। ঝলমলিয়ে উঠল অঙ্গিরা, গলা কেঁপে উঠল, এক নিঃশ্বাসে বলে গেল, ‘কেমন আছো? এতদিন কোথায় ছিলে? আমি অঙ্গিরা!”

—পত্রিকা অফিস থেকে আপনার নম্বরটা দিল। আপনি নাকি আমার সঙ্গে যোগাযোগ করতে চাইছেন, তাই ফোন করলাম! আমি তো ঠিক আপনাকে চিনতে পারলাম না! কে আপনি?

চুপ করে গেল অঙ্গিরা। ভেজা গলায় বলে উঠল, ‘মাপ করবেন। আমার বোধহয় কিছু একটা ভুল হয়েছিল। নমস্কার।”

ফোন কেটে গেল। এতদিন অঙ্গিরা মরিয়া ডুবেছিল, এবার ডুবিয়া মরিল রঙ্গনের স্মৃতিতে।

ওজনের কারণে আর্থরাইটিস-এর সমস্যা হচ্ছে

আর্থরাইটিস মূলত হল বাতের ব্যথা। দুটো হাড়ের জয়েন্টে ব্যথা শুরু হলে বুঝতে হবে আর্থরাইটিস-এর প্রাথমিক লক্ষণ। পায়ের পাতা, হিপ জয়েন্ট, হাত, কোমরের জয়েন্টে ব্যথা হলে তা মূলত Arthritis-এর কারণেই হয়ে থাকে। আর্থরাইটিস নানা রকমের হয়ে থাকে। রিউমাটয়েড আর্থরাইটিস, সোরিয়াটিক আর্থরাইটিস, জুভেনাইল আর্থরাইটিস, গাউট।

প্রশ্ন: ৩৪ বছর বয়সে একটি দুর্ঘটনায় আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে আমার লিগামেন্ট ছিঁড়ে যায়। কিন্তু তখন আমি সার্জারি করাইনি। ১৪-১৫ বছর বাদে আমার নি-Arthritis হয়। লিগামেন্ট টিয়ার সার্জারি করালে কি আমার এই সমস্যা ঠিক হয়ে যাবে?

উত্তর: লিগামেন্ট ছিঁড়ে গেলে অনেকের হাঁটুতে প্রচণ্ড ব্যথা হয় এবং পায়ের মুভমেন্টে সমস্যা দেখা দেয়। হাঁটুর মুভমেন্টও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ১০- ১৫ বছর ধরে লাগাতার সমস্যার ফলে আর্থরাইটিস দেখা দেয়। আর্থরাইটিস একবার দেখা দিলে লিগামেন্ট-এর চিকিৎসা করালেও কোনও লাভ হবে না। কেউ যদি এটা এড়িয়ে চলতে চান তাহলে দুর্ঘটনা বা খেলাধুলার কারণে লিগামেন্ট ক্ষতিগ্রস্ত হলে সঙ্গে সঙ্গে সার্জারি করিয়ে নেওয়া উচিত। এর জন্য অর্থোস্কোপিক সার্জারি করা হয়। এই সার্জারিতে সেরে উঠতেও বেশি সময় লাগে না। মানুষের ধারণা যে-ফ্র্যাকচার না হলে সার্জারির কোনও প্রয়োজন নেই। ওটা নিজে থেকেই ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল।

প্রশ:  আমার উচ্চতা ৫ ফুট ১ ইঞ্চি এবং ওজন ৯৮ কিলো। আমার দুটো হাঁটুতেই Arthritis আছে। আমাকে অনেকেই বেরিয়াট্রিক সার্জারি করানোর পরামর্শ দিয়েছে। সকলেই বলে ওজন কমাতে পারলে আমার আর্থরাইটিসও ঠিক হয়ে যাবে! এটা কি ঠিক?

উত্তর: এটা খুবই সত্যি যে শরীরের ওজন বেশি হলে হাঁটুতে বেশি প্রেসার পড়ে। ওজন কম করলে ব্যথা এবং ফোলা ভাব অনেকটাই কমবে। হাঁটুর মুভমেন্টও উন্নত হবে। আর্লি আর্থরাইটিস-এর ক্ষেত্রে ওষুধ, এক্সারসাইজের সঙ্গে ওজন কমানোরও পরামর্শ দেওয়া হয়। সার্জারির আগেও রোগীকে ওজন কম করার পরামর্শ দেওয়া হয় কারণ ওজন বেশি থাকলে কৃত্রিম জোড়ের উপরেও চাপ সৃষ্টি হয়। কিন্তু ওজন কম হলে আর্থরাইটিস ঠিক হয়ে যাবে, আপনার এই ধারণা ভুল। আর্থরাইটিস-এর কারণে জোড় যতটা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার হয়েই যায়, সেটা ঠিক হয় না। কিন্তু ওজন কমিয়ে, জোড়ের আরও বেশি ক্ষতি হওয়া থেকে বাঁচানো সম্ভব হয়।

প্রশ্ন:  আমার বয়স ৪৬ বছর। বেশ কিছুদিন ধরে দুটো হাঁটুতেই খুব ব্যথা হচ্ছে। বাড়ির মধ্যে হাঁটাচলাতেও সমস্যা ফেস করছি। সিড়ি-তে ওঠানামা তো একেবারেই অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। কী করব?

উত্তর: এটি আর্থরাইটিস-এর প্রথম স্তর। সাধারণত ৫৫-৫৬ বছর বয়স থেকে Arthritis শুরু হয়। আপনার একটু কম বয়সেই দেখা দিয়েছে। বংশগত কারণে, আঘাত লাগলে বা পুষ্টির অভাবে জোড় দুর্বল হয়ে পড়ে তাড়াতাড়ি। আপনি ডায়েটে প্রোটিনের মাত্রা বাড়িয়ে দিন। ক্যালসিয়াম এবং ভিটামিন ‘ডি’-এর সাপ্লিমেন্টস নিতে শুরু করুন। নিয়মিত এক্সারসাইজ করুন। এতে হাঁটুর জোড় সুস্থ থাকবে ও ব্যথায় আরাম পাবেন। এতেও যদি সুফল না হয়, তাহলে ডাক্তার দেখান।

ডা. শেখর শ্রীবাস্তব, সিনিয়র কনসালটেন্ট এবং এইচওডি অর্থোপেডিক ডিপার্টমেন্ট
সন্ত পরমানন্দ হাসপাতাল, দিল্লি।

 

দ্বিতীয় পুরুষ (পর্ব ২)

তারপর আর কিছু মনে নেই অঙ্গিরার। তবে বেশ কিছুক্ষণ অঙ্গিরাকে পাওয়া যায়নি। চারদিকে সবাই খোঁজাখুঁজি শুরু করেছিল। শেষে নির্জন দুপুরে রেশন দোকানের পাশে একটা কানা গলিতে অঙ্গিরার শরীরটা পাওয়া গিয়েছিল। অচৈতন্য। কষের ওপর গড়িয়ে পড়া শুকনো রক্তের দাগ। সারা গায়ে শেয়াল শকুনের ছিঁড়ে খাওয়ার চিহ্ন। খবর দিয়েছিল, ওদেরই পরিচিত এক দুধাওয়ালা। দেখে চিনতে পেরেছিল অঙ্গিরাকে। বহুকষ্টে রঙ্গনের জন্য সযত্নে তুলে রাখা তার অরক্ষিত যমুনা এক লহমার ভুলে তছনছ হয়ে গেল। মাসখানেক লেগে গেল প্রায় অঙ্গিরার সুস্থ হতে। কিন্তু সমস্যা দেখা দিল অন্য জায়গায়। শরীরের ক্ষত মেরামত হলেও, মনের ভেতরের গভীর দাগ কেউ মুছে দিতে পারল না। মনস্তত্ববিদের সহায়তা নিতে হল।

মানসিক স্বাস্থ্য কিছুটা ঠিক হবার পর একটা অদ্ভুত সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল অঙ্গিরা। সেটা কতটা যুক্তিসঙ্গত সেটা সে নিজেই জানে। কিন্তু বাকিদের কাছে, বিশেষ করে বড়ো অবাক ঠেকল রঙ্গনের কাছে। ক্রমশ সে নিজেকে দূরে সরিয়ে নিতে চাইল রঙ্গনের কাছ থেকে। কথার জালে রঙ্গন অনেক বোঝাতে চাইত কিন্তু ফল খুব একটা কিছু হল না। অঙ্গিরা তার জীবন থেকে মুছে ফেলতে চাইল রঙ্গনের নাম। তার জীবনের সেইসব স্বপ্নের দিনগুলোর গভীর দাগ আবছা করে দিল তার জীবন থেকে। নিজেকে মনে করতে লাগল অপবিত্র। তার নিজের শরীরটাই মনে হতে লাগল, তার কাছে পাপের বোঝা। সেই পাপী শরীর মনকে অনেক দূরে সরিয়ে নিল এতদিনের লালিত পবিত্র সম্পর্ক থেকে। এদিকে রঙ্গন তো নাছোড়বান্দা। সে প্রাণের বিনিময়ে হলেও, যে করেই হোক পেতে চায় তার প্রাণাধিক অঙ্গিরাকে।

তবে অঙ্গিরার বাড়ির পরিস্থিতি বেশ ঘোরালো হয়ে উঠল। বিনা দোষে অঙ্গিরার শরীরে এক গাঢ় কলঙ্কের দাগ এঁকে দিয়েছিল সমাজ। তাই বাড়ি থেকে চাইছিল যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিয়ে দিয়ে সামাজিক লজ্জার হাত থেকে মুক্তি পেতে। সবাই তো আর খারাপ হয় না। এগিয়ে এল এক সহৃদয় পরিবার। ছেলেটিও বেশ ভালো। ব্যাংকের উচ্চপদস্থ কর্মী। বড়ো অমায়িক ব্যবহার। পুলক সব জেনেও রাজি হয়ে গেল অঙ্গিরাকে বিয়ে করতে। অঙ্গিরার বাড়ি থেকে ক্রমশ চাপ বাড়তে লাগল বিয়ের। বেঁকে বসল অঙ্গিরা। অবশ্য রঙ্গনকে বিয়ে করতে চাইলে, অঙ্গিরার বাড়ির লোকের কোনও আপত্তি নেই।

রঙ্গনের-ও অমতের কোনও প্রশ্নই ওঠে না। রঙ্গন প্রাণপণ চেষ্টা করতে লাগল বোঝানোর। কিন্তু অঙ্গিরা কোনওমতেই রঙ্গন বা অন্য কাউকেই বিয়ে করতে রাজি হল না। কিছুতেই না। তবু ওর বাড়ির লোক এক প্রকার বাধ্য হয়েই শুরু করল বিয়ের তোড়জোড়। অঙ্গিরা হাপুস নয়নে আত্মসমর্পণ করল রঙ্গনের বুকে। যেভাবেই হোক এই উভয়সঙ্কট থেকে উদ্ধার করে দিতেই হবে তাকে।

বহুরকম আলোচনাতেও কোনও সমাধান সূত্র বেরোল না। অগত্যা আত্মহত্যা ছাড়া আর কোনও পথই খোলা থাকল না তাদের। অঙ্গিরা নিজের জীবন শেষ করে দিতে রাজি হলেও রঙ্গনকে সে কিছুতেই মরতে দিতে চায় না। এদিকে অঙ্গিরা নিজেকে শেষ করে দিলে, রঙ্গনের পক্ষে এই পৃথিবীতে বেঁচে থাকা অর্থহীন।

অবশেষে আলোচনার ঝড় থেমে যাওয়ার পর দু’জনেই এক নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে উপনীত হল যে, আত্মহত্যা ছাড়া আর কোনও পথ ওদের জীবনে খোলা নেই। পরিকল্পনা শুরু হল। যেদিন স্থির হল তার মোটামুটি এক সপ্তাহ পরেই অঙ্গিরার বিয়ে। রঙ্গন অঙ্গিরাকে সবচেয়ে কষ্টহীন মৃত্যুর পথ দেখাল। ঘুমের ওষুধ খেয়ে চিরঘুমে চলে যাওয়াটাই সবচেয়ে সহজ।

উতলা হয়ে উঠল অঙ্গিরা। অস্থির হয়ে প্রশ্ন করে উঠল, “আর তুমি?”

শান্ত গলায় উত্তর দিল রঙ্গন, ‘তুমি যেদিন মৃত্যুকে আলিঙ্গন করবে, দেখবে আমি তোমার পাশেই আছি। মৃত্যুর পরে তুমি যেখানেই যাও, দেখবে আমি তার আগেই সেখানে গিয়ে তোমার জায়গা করে রেখেছি আমার পাশেই। তুমি নিশ্চিন্তে মৃত্যুবরণ করতে পারো। আমি নিজে তোমায় ওষুধ এনে দেব।”

নিশ্চুপ হয়ে গেল অঙ্গিরা। অর্থহীন শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল রঙ্গনের দিকে। সুখের দিন পার হয় দৌড়ে, দুঃখের দিন খুঁড়িয়ে। চোখের পলকে যেন কেটে গেল মাঝের ক’টা দিন। এসে গেল সেই মহা অশুভ সময়। রঙ্গন গোপনে এসে অঙ্গিরাকে দিয়ে গেল সেই শিশিভরা মৃত্যুবাণ। হাত থেকে ওষুধটা নেবার সময় হাতে হাত লাগল দু’জনের। শেষ স্পর্শ। দু’জনের অপলক দৃষ্টি। আঙুলে আঙুল ছাড়তে চাইছে না। প্রবাহিত হচ্ছে এক অনাদি অনন্ত ভালোবাসার স্রোত। চোখ ভিজে উঠছে দু’জনের। মনের বিরুদ্ধে জোর করেই বিদায় নিল রঙ্গন। ওষুধের শিশি নিয়ে ঘরের দরজায় খিল দিল অঙ্গিরা।

এরপরেই ঘটনা মোড় নিল এক অপ্রত্যাশিত বাঁকে। পুরো ওষুধের শিশি গলায় ঢেলে দিল অঙ্গিরা। চোখের সামনে ঝাপসা হয়ে আসছে যেন ওষুধের শিশির লেবেলটা। টেবিলে রেখে দিল শিশিটা। ঘুমে চোখ জড়িয়ে আসছে অঙ্গিরার। জোর করে জেগে থাকার চেষ্টা ব্যর্থ করে ঢলে পড়ল গভীর ঘুমে। কতক্ষণ ঘুমিয়ে ছিল খেয়াল নেই অঙ্গিরার। হঠাৎ ভীষণ চিৎকারে ঘুম ভাঙল। দরজায় সজোরে ধাক্কার আওয়াজ। ভেঙে পড়ার জোগাড়। ধড়মড়িয়ে উঠল অঙ্গিরা। বাধ্য হয়ে দরজা খুলে বেরিয়ে এল বাইরে। সবাই দৌড়ে ঘরে ঢুকল। ঢুকেই দেখে টেবিলের ওপর ঘুমের ওষুধের শিশি। পুরোটাই ফাঁকা। ধরাধরি করে বাকিরা শুইয়ে দিল অঙ্গিরাকে।

(চলবে)

মানবিক মূল্যবোধের ছবি ‘বিজয়ার পরে’

২০২৪-এর শারদোৎসবের জন্য এখনও আরও অনেকদিন অপেক্ষা করতে হবে। কিন্তু এই ইংরেজি বছরের শুরুতে শারদোৎসবের আবহ উপলব্ধি করতে পারবেন সিনেমাপ্রেমীরা। কারণ, ১২ জানুয়ারি মুক্তি পাবে শারদোৎসবের পটভূমিতে তৈরি বাংলা ছবি ‘বিজয়ার পরে’।

পরিচালক অভিজিৎ শ্রীদাস তাঁর ‘বিজয়ার পরে’ ছবিটি সম্পর্কে জানিয়েছেন, এই ছবিটি দেখতে বসে দর্শকরা উপলব্ধি করবেন গভীর প্রেম, পারিবারিক বন্ধন এবং মানবিক চেতনা। এক প্রজন্মের সঙ্গে অন্য প্রজন্মের ক্রমবর্ধমান যে বিভাজন, তা কীভাবে ছবির শেষে অন্য রূপ নেবে, তাও প্রত্যক্ষ করবেন দর্শকরা। শুধু তাই নয়, প্রেম কতটা শক্তিশালী হলে জীবন-মৃত্যুর সীমানা অতিক্রম করতে পারে, তাও প্রতিফলিত হবে ‘বিজয়ার পরে’ ছবিতে।

পরিচালকের আরও দাবি, মানবিক মূল্যবোধের বিষয় নির্ভর এই ছবিটি দেখতে বসে দর্শকরা মুগ্ধ হবেন এবং তাদের হৃদয় ছুঁয়ে যাবেই। ছবিটির সিনেম্যাটোগ্রাফি, সংগীত এবং অভিনয়ও দর্শকদের মন জয় করে নেবে বলে দাবি করেছেন ছবির প্রযোজক সুজিত রাহা।

কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব ছাড়াও, ইতিমধ্যেই বিভিন্ন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত এবং প্রশংসিত হয়েছে ‘বিজয়ার পরে’। তাই ছবিটির বাণিজ্যিক সাফল্যের ব্যাপারেও ভীষণ আশাবাদী ছবির পরিচালক, প্রযোজক এবং অভিনেতা-অভিনেত্রীরা।  এই ছবিটিতে অভিনয় করেছেন স্বস্তিকা মুখোপাধ্যায়, মমতা শঙ্কর, দীপঙ্কর দে, মীর আফসার আলী, ঋতব্রত মুখোপাধ্যায়, পদ্মনাভ দাশগুপ্ত, বিদীপ্তা চক্রবর্তী, অনিমেষ ভাদুড়ী, মিসকা হালিম, খেয়া চট্টোপাধ্যায়, তনিকা বসু, বিমল গিরি এবং সম্প্রীতি ঘটক।

পরিচালক অভিজিত শ্রীদাস-এর এটি প্রথম ছবি। ১৪৬ মিনিটের এই ছবিটির কাহিনি, চিত্রনাট্য এবং সংলাপ লিখেছেন পরিচালক স্বয়ং। এসআর জুপিটার মোশন পিকচার্স-এর ব্যানারে নির্মিত ‘বিজয়ার পরে’ ছবিটির চিত্রগ্রহণের দায়িত্বে ছিলেন সুপ্রিয় দত্ত। ছবিটির সংগীত পরিচালনা করেছেন রণজয় ভট্টাচার্য। তিনি নিজেই লিখেছেন এই ছবির গান। কন্ঠদান করেছেন লগ্নজিতা চক্রবর্তী, ইশান মিত্র, রণজয় ভট্টাচার্য এবং শাওনী মজুমদার। ছবিটির সম্পাদনায় ছিলেন অনির্বাণ মাইতি। শিল্প নির্দেশক রণজিৎ ঘোড়াই। কার্যনির্বাহী প্রযোজক প্রসেনজিৎ সিকদার এবং অগ্নিশ্বর বসু। সাউন্ড ডিজাইনার অয়ন ভট্টাচার্য এবং অভীক চট্টোপাধ্যায়। পোশাক সরবরাহ করেছেন সন্দীপ জয়সওয়াল ও অভিষেক রায়। মেক আপ-এ ছিলেন প্রসেনজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়। এই ছবিতে ব্যবহৃৎ ‘যত্নে রাখা’ শীর্ষক গানটি মুক্তি পেয়েছে সম্প্রতি। প্রযোজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, গানটি ইতিমধ্যেই অনেকের ভালো লেগেছে বলে প্রতিক্রিয়া পাচ্ছেন তারা।

দ্বিতীয় পুরুষ (পর্ব ১)

সূর্যাস্তের পরেও যেরকম আলো অনেকক্ষণ থাকে, শীতটা এখন সেরকম। চলে গেছে, অথচ কোথায় যেন লেগে আছে একটু! পুলকের এই এক দোষ! রোজ শোওয়ার সময় চাদর নেবে না, স্বামীত্ব আর পৌরুষ দেখাবে, অথচ ভোররাতেই শিশুর মতো এসে ঢুকবে অঙ্গিরার চাদরে। আচ্ছা! বিরক্তি আর মায়া মিলে কোনও শব্দ আছে! হয়তো সেটারই নাম সংসার। বিশেষ করে রবিবার বিছানা ছেড়ে নামতে চাইলেও আটকাবেই, ‘আর একটু… অঙ্গিরা।’

—কী আর একটু? আমার একগাদা কাজ পড়ে আছে। পাশের ঘরে মেয়ে উঠে পড়েছে। এখন ছাড়ো।

—উঁহু… প্লিজ।

পুলকের হাত সরিয়ে আলতো হেসে বিছানা থেকে নেমে ঠোঁটের ওপর আঙুল চেপে বলে, ‘চু…প, মেয়ে উঠে পড়েছে পাশের ঘরে। এখন যথেষ্ট বড়ো হয়ে গেছে। সব বোঝে। আবার রাত্তিরে।

এই কথা শেষ হতে না হতেই বারান্দায় ঠক করে একটা শব্দ। বোধহয় কাগজ দিয়ে গেল। গতকাল ভোট গেছে, আজ কাগজ বেশ মোটা। খবরে ঠাসা। অঙ্গিরা ভাবে, ছুটির দিন, চায়ের সাথে গুছিয়ে এলিয়ে পড়া যাবে। বারান্দায় কাগজটা আনতে গেল। উলটে পড়ে আছে কাগজটা। গল্পের পাতাটা ওপরে। নীচু হয়ে যেই না কাগজটা তুলতে যাবে, অঙ্গিরার শিরায়, ধমনীতে, শরীরের আনাচে কানাচের প্রতিটি রন্ধ্রে একটা শিহরণ খেলে গেল। গল্পটার নীচে এক লেখকের নাম দেখে। রঙ্গন মিত্র।

সাধারণত অঙ্গিরা রবিবারের পাতায় মাঝেমধ্যে গল্প পড়লেও লেখকের নাম কোনওদিনই খেয়াল করে না। গল্পটা খুব ভালো লাগলে তখন একবার চোখ বুলিয়ে দেখে। কিন্তু আজকের নামটা দেখে সারা শরীরে যে-বিদ্যুৎ খেলে গেল, ঠিক এরকম হয়েছিল প্রায় বছর কুড়ি আগে, যেদিন প্রথম দু’জনে একসাথে অন্ধকারে সুইচ বোর্ডে কারেন্ট খেয়েছিল। আসলে সুইচে হাত দিয়েছিল শুধু অঙ্গিরাই, কিন্তু তার আগেই অঙ্গিরাকে তড়িতাহত করে রেখেছিল অপর মানুষটি। ফলত একসাথেই বিদ্যুৎস্পৃষ্ট। তবে সে যাত্রায় দু’জনেই বেঁচে গিয়েছিল।

কে ছিল সেই অপর মানুষটি ? সে কথা আজ আর বলে লাভ কী! যে আজ সারা দুনিয়াতে হয়তো আর কোত্থাও নেই। তবু ওই কাগজের নামটা অত ভাবাচ্ছে কেন অঙ্গিরাকে? সে তো নিজের কানে শুনেছিল তার মৃত্যুসংবাদ। এক নামে তো কত মানুষই হয় ! যাক তবু তো জানা গেল এই পৃথিবীতে আরও ‘রঙ্গন মিত্র’ আছে। গল্পটা পড়ে দেখল, এক স্মৃতিভ্রষ্ট মানুষের গল্প। এক সুস্থ স্বাভাবিক মানুষ। অথচ এক আকস্মিক দুর্ঘটনায় অতীতের সব কথা তার বিস্মৃত।

তবু চা খাওয়ার সময় অনেক স্মৃতি আজ অঙ্গিরার মনের ফুটোয় ফিনকি দিয়ে বেরিয়ে এল। সংসারের নরম বালাপোশের নীচে বহুকাল সেসব চাপা পড়ে গিয়েছিল। প্রায় কুড়ি বছর আগের কথা। তখন অঙ্গিরা সতেরো কী বড়ো জোর আঠারো। উচ্চ মাধ্যমিক। বাংলায় একটু পিছিয়ে পড়া। বাকি সবেতে অনেকটাই এগিয়ে। সেই খাদ মেরামতির জন্য এল এক নতুন কারিগর, শিক্ষক বেশে। নাম এই রঙ্গন মিত্র। তখন সে কলেজের পাঠ সদ্য শেষ করে পা রেখেছে বিশ্ববিদ্যালয়ে। তার বিষয় বাংলা। তাই এই বাংলা দিয়েই প্রথম পরিচয় ওদের। সাহিত্যের ভেতর একটা প্রেমের ফল্গুধারা আছে, যার প্রবাহ নিত্য, আবহমান। নিজেদের অজান্তেই সাহিত্যের হাত ধরে কাছাকাছি আসতে লাগল অঙ্গিরা আর রঙ্গন।

বেশ কিছুদিন পর রঙ্গন খেয়াল করল, ও যখন খুব মন দিয়ে পড়ায় ব্যস্ত, তখন অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে অঙ্গিরা। পরক্ষণেই যখন রঙ্গন পড়ানো বিষয়ের ওপর একটা প্রশ্ন করে, “তখন অঙ্গিরা ভারী চোখের পাতা ফেলে একগাল হেসে শিশুর মতো বলে ওঠে, “কী যেন বলছিলেন?’

এরপরেও রঙ্গনের কেন রাগ হয় না, রঙ্গন বুঝে উঠতে পারে না। তবু রঙ্গন আবার শুরু করে প্রথম থেকে। বছর চারেক এরকম চলার ফাঁকে বেশ ঘনীভূত হতে থাকল ওদের ভালোবাসার মিশ্রণ।

বিপদটা ঘটল দোলের দিন। অঙ্গিরা একটু রাস্তায় বেরিয়েছিল মনের ভেতর অন্য আশা পুষে রেখে। বাড়িতে বলেছিল, ওইদিনই ওর যেন কী একটা ওষুধ লাগবে। আসলে হাতের মুঠোয় আবির ছিল অন্য উদ্দেশ্যে। মোড় ঘুরলেই দু’টো বাড়ি পরেই হলুদ বাড়িটাই তো রঙ্গনদাদের বাড়ি। মনের ইচ্ছে, যদি রঙ্গনদার সাথে দেখা করে গালে একটু আবির ছুইয়ে দেওয়া যায়। তারপর মনের কথা বুঝে রঙ্গনদা যদি একটু আবির ছুঁইয়ে দেয় সিঁথির ফাঁকে। তাহলে ছুটে এসে ঘরে খিল দিয়ে মাথায় ঘোমটা টেনে আয়নায় দেখবে নিজের মুখখানি। ভেবেই যেন আয়না থেকে বার করে নিজেকে আদর করতে ইচ্ছে করছে অঙ্গিরার।

কিন্তু বিধিবাম। রঙ্গনদের বাড়ি আসার আগেই উঁচু বস্তির এক দঙ্গল ছেলে বাঁদুরে রং মেখে সামনে এসে হঠাৎ হাজির হল। একটু আগেও কেউ কোত্থাও ছিল না। যেন আকাশ থেকে পড়ল অকস্মাৎ। দলটা ছিল চার পাঁচজনের। অঙ্গিরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই একটা ছেলে আবির ছিটিয়ে দিল চোখে। মুহূর্তের মধ্যে অঙ্গিরার চোখ অন্ধকার। যন্ত্রণায় ফেটে যাচ্ছে চোখ দু’টো। ঝাপসা হয়ে আসছে দৃষ্টি। এর মধ্যেই পিছনের একটা ষন্ডামার্কা ছেলে পাঁজাকোলা করে তুলে নিল অঙ্গিরাকে। এবার সাংঘাতিক ভয় পেল অঙ্গিরা। জোর খাটাতে গেল পারল না। বস্তির ফাঁক দিয়ে পুকুর পাড়ে যাওয়ার একটা সরু গলি আছে। সবকটা ছেলের গা থেকেই একটা কটু গন্ধ বেরোচ্ছে। দেশি মদের। গলির ভেতর অঙ্গিরাকে নিয়ে যাওয়ার পর, একটা ছেলে খুব কটু গন্ধের একটা পানীয় জোর করে অঙ্গিরার গলায় ঢেলে দিল।

(চলবে)

নি-রিপ্লেসমেন্ট প্রসঙ্গে পরামর্শ দিন

নি-রিপ্লেসমেন্ট বা হাঁটু প্রতিস্থাপন একটি অস্ত্রপ্রচার পদ্ধতি যেখানে হাঁটুর হাড়ের ক্ষতিগ্রস্ত অংশ অপসারণ করা হয় এবং একটি প্রস্থেসিস দিয়ে পুনরুত্থিত করা হয়। সার্জন তখনই হাঁটু প্রতিস্থাপনের অস্ত্রপ্রচারের পরামর্শ দেন যখন ওষুধ এবং ফিজিওথেরাপি হাঁটুর ব্যথার উপশম ঘটাতে ব্যর্থ হয়।

প্রশ্ন: আমার শাশুড়ির বয়স ৬৩ বছর। ডাক্তার ওনাকে নি-রিপ্লেসমেন্ট-এর পরামর্শ দিয়েছে। আমি রোবোটিক নি-রিপ্লেসমেন্ট সম্পর্কে শুনেছি। আমি জানতে চাই যে, নর্মাল প্রসিডিওর থেকে এই পদ্ধতি কি বেশি সুবিধাজনক?

উত্তর: নর্মাল সার্জারির তুলনায় রোবোটিক সার্জারি অনেক বেশি অ্যাকুয়ারেট এবং সঠিক। সার্জারির ফলাফলও খুব উন্নতমানের এবং সেরে উঠতেও বেশি সময় লাগে না। হাঁটু প্রতিস্থাপন করার নর্মাল পদ্ধতিতে ইমপ্লান্ট ঠিকমতো সেট করার জন্য হাঁটুকে ম্যানুয়ালি ঘষা হয়। কিন্তু রোবোটিক-এর ক্ষেত্রে সিটি স্ক্যান এবং আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স-এর সহায়তায় অসুস্থ ব্যক্তির হাঁটুর থ্রি-ডি স্ক্যান করা হয়। প্রথম থেকেই ইমপ্লান্ট ঠিকমতো যাতে ফিট করা হয় তার একটা পরিকল্পনা করা হয়, যাতে অ্যালাইনমেন্ট পারফেক্ট হয়। এতে সুস্থ হাড়গুলি কম ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং পেশিও খুব বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় না। অ্যালাইনমেন্ট-ও খুব ভালো হয়। সেজন্য রোবোটিক সার্জারি পারম্পরিক হাঁটু প্রতিস্থাপনের থেকে অনেক বেশি ভালো মনে করা হয়।

প্রশ্ন: আমার মা এবং দিদা, দু’জনেরই নি-রিপ্লেসমেন্ট সার্জারি করাতে হয়েছিল বাতের জন্য। আমারও দুটো হাঁটুতেই আর্থরাইটিস রয়েছে। আমার বয়স ৪৮ বছর। আমাকেও কি নি-রিপ্লেসমেন্ট করাতে হতে পারে?

উত্তর: আর্থরাইটিস রোগটা বংশগত। বংশে কারও থাকলে এই রোগ হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি থাকে। প্রাথমিক স্তরে এই রোগে ওষুধ আর এক্সারসাইজ দিয়ে কাজ চলে, ইনজেকশনও প্রয়োগ করা হয়ে থাকে। এতেই অনেকটা আরাম পাওয়া যায়। কিন্তু এসব করার পরেও আরাম না হলে, বিকল্প হিসেবে সার্জারি বেছে নেওয়া হয়। অর্থোপেডিক সার্জেন ৪৮ বছর বয়স্কদের সাধারণত নি-রিপ্লেসমেন্ট করার পরামর্শ দেন না। এর বদলে অ্যালাইনমেন্ট সঠিক করার সার্জারি করা হয়।

সাধারণত হাঁটুর জোড় একদিক খারাপ হয়, অন্যদিকটা ঠিক থাকে। অ্যালাইনমেন্ট ঠিক করা হলে হাঁটুর স্বাভাবিক জোড় বজায় থাকে এবং ব্যথারও উপশম ঘটে। এছাড়াও অল্প বয়সিদের জন্য আংশিক হাঁটু প্রতিস্থাপন-এর বিকল্পও বাছা হয়। এতে পুরো জোড়-এর বদলে কেবল ক্ষতিগ্রস্ত অংশই বদলানো হয়ে থাকে। এর ফলে অনেক তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে ওঠা যায়।

ডা. শেখর শ্রীবাস্তব, সিনিয়র কনসালটেন্ট এবং এইচওডি অর্থোপেডিক ডিপার্টমেন্ট
সন্ত পরমানন্দ হাসপাতাল, দিল্লি

 

ইন্দো-চিন সীমানায় ছোট্ট গ্রাম গামশালি (পর্ব-০১)

বাঙালিদের কাছে উত্তরাখণ্ডের আকর্ষণ চিরন্তন। পুণ্যকামী তীর্থযাত্রীরা যেমন পুরাণকাল থেকেই কেদারনাথ, বদ্রিনাথ, গঙ্গোত্রী, যমুনোত্রী দর্শনে যান, তেমনই পর্বতারোহী প্রকৃতি প্রেমিকদের কাছে এই অঞ্চলের উত্তুঙ্গ গিরিশিখরের আকর্ষণ অমোঘ। পাহাড়ের বাঁকে বাঁকে এখানে নানা স্বপ্ন, মায়া ও কুহকের ওঠা-পড়া। তারই আকর্ষণে বারে বারে হিমালয়ে ছুটে আসা!

অফবিট পথের সন্ধানে ছয় বন্ধু বেরিয়ে পড়লাম সেপ্টেম্বর মাসের ভোরে। কলকাতা থেকে উড়ান পথে পৌঁছে গেলাম দেরাদুন জলি গ্র্যান্ট এয়ারপোর্টে। অপেক্ষারত পূর্ব পরিচিত ড্রাইভার রাজেশ নিয়ে চলল ২৭২ কিমি দূরে যোশিমঠের উদ্দেশ্যে। একে একে আমরা সুদৃশ্য তেহেরি ড্যাম, দেবপ্রয়াগ, রুদ্রপ্রয়াগ, কর্ণপ্রয়াগ পেরিয়ে সন্ধ্যা সাতটায় পৌঁছে গেলাম যোশিমঠে। হোটেল ঠিক করেই ছুটলাম জিপ স্ট্যান্ডে পরের দিন ভোরের গাড়ি বুক করতে। সারাদিনের ক্লান্তিময় দিনের কথা ভাবতে ভাবতেই ঘুমের দেশে পাড়ি দিলাম।

ভোরে ঘুম ভাঙতেই জানলার দিকে চোখ গেল। কাচের জানলার ওপারে সারি সারি পাহাড় চুপটি করে অপেক্ষায় রয়েছে। মেঘের ঘুম না ভেঙে যায়! পাহাড়ের কোলে মেঘের ঘুম দেখতে বড়োই সুন্দর লাগে। চঞ্চল মেঘ সমস্ত দিন ধরে ছোটাছুটি করে। তাই কি সন্ধ্যাবেলায় তাদের ঘুম পায়? তারা কেমন শান্ত হয়ে পাহাড়ের গায়ে শুয়ে আছে। সমস্ত রাত্রি তারা ওই ভাবেই কাটায়। সকালবেলা সূর্যের আলো তাদের গায়ে পড়লেই ঘুম ভেঙে যায়।

সকাল সকাল যোশিমঠ ছেড়ে ঘন বার্চের আড়াল পেরোতেই মন ডানা মেলে উড়ে গেল আকাশপানে। সবুজ পাহাড়ের মাথায় সাদা মেঘের খেলা। সেপ্টেম্বর মাসের শুরুতে বর্ষণ ক্লান্ত মেঘেরা মেতে উঠেছে দৌড় প্রতিযোগিতায়। গাঢ় নীল আকাশের বুকে ছুটন্ত মেঘের এই ভেসে বেড়ানোর খেলায় পাহাড়ের গায়ে, উপত্যকার বুকে আলো-আঁধারির ম্যাজিক চলছে। কয়েকদিন ধরেই পাহাড়গুলো বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে সিক্ত, ক্লান্ত হয়ে উষ্ণতার অপেক্ষায়। তাদের মাথা থেকে গা বেয়ে দুধ সাদা পুরুষ্টু জলের ধারা নেমে এসেছে ধৌলিগঙ্গার বুকে।

ধৌলিগঙ্গাকে বাঁ-দিকে রেখে এগিয়ে চলেছি উত্তরের ইন্দো-চিন সীমানার কাছে ছোট্ট গ্রাম গামশালির উদ্দেশে। দূরত্ব ৮৪ কিমি। লতা, কাগা, দ্রোনাগিরি, তপোবন, মালারি, বাম্পা, তারপর গামশালি। প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টার পথ। হাজার হাজার পুণ্যার্থী বদ্রিনাথ দর্শনে গেলেও অতি উৎসাহী ভ্রমণার্থী ছাড়া এখানে কেউ আসে না। অথচ অপরূপ, নৈস্বর্গিক, নিষ্কলুষ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর এই গ্রাম, এই পথ। এই পথের শেষ বর্ধিষ্ণু গ্রাম তপোবন। গাড়ি হোক বা মানুষ এখানেই ভরে নিতে হবে জ্বালানি। দূরত্ব ৪০কিমি। এখানে রয়েছে একটি উষ্ণ প্রস্রবণ। ভবিষ্য বিষ্ণুর মন্দির। ধৌলিগঙ্গার কোলে এই মন্দিরের অবস্থান নৈঃস্বর্গিক সৌন্দর্যে ভরপুর।

(ক্রমশ…)

টিনএজার মেয়েকে নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি

প্রঃ আমার টিনএজার মেয়েকে নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি৷ সে অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী৷ বয়ঃসন্ধিকালীন পরিবর্তনগুলো ওর মধ্যে বেশ স্পষ্ট ভাবে দেখতে পাচ্ছি৷ আমার সঙ্গে আপাত ভাবে বন্ধুত্বসুলভ আচরণ করলেও, বুঝতে পারি যে অনেক কথাই ও আমায় গোপন করা শুরু করেছে৷মনে হচ্ছে ওর কোনও একজন সহপাঠীর সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক তৈরি হয়েছে৷ ছেলেটিকে আমি চিনি৷ কী করা উচিত বুঝতে পারছি না৷ এত অল্প বয়সে প্রেম করলে পড়াশোনা শিকেয় উঠবে, সেটা ভেবে আমি শঙ্কিত৷ কী করি বলে দিন৷

উঃ দিনবদলের সঙ্গে বদলে গেছে টিন-এজারদের চরিত্রও। এখন লোকজন কী বলবে তা নিয়ে খুব বেশি মাথা ঘামায় না তারা। প্রায় সবার হাতে আছে মোবাইল ফোন, ইন্টারনেটে অবাধ প্রবেশ। এসবের হাত ধরে পাল্টেছে টিন-এজ প্রেম। এখনকার টিন-এজারদের মধ্যে সব সময় একটি অন্যরকম অনুভূতি কাজ করে; যা অনেক সময়  মা-বাবাদের চিন্তায় ফেলে দেয়৷ এসব বিষয়ের সাবধানে মোকাবিলা করতে হবে।

আপনার মেয়ে কোনও সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছে এটা আন্দাজ করছেন আপনি কিন্তু এখনও হাতে নাতে কোনও প্রমাণ পাননি৷ তাই প্রথমেই রেগে যাবেন না। বয়ঃসন্ধির সময় ছেলেমেয়েদের শরীর ও মনের নানা পরিবর্তন আসে, সে জন্য বিপরীত লিঙ্গের প্রতি আকর্ষণ বোধ করা খুবই স্বাভাবিক। এতে বিস্মিত হওয়া বা হতাশ হওয়ার কিছু নেই। মেয়ের কাছে গল্পচ্ছলে তার ওই বিশেষ বন্ধুর প্রতি ঠিক কী ফিলিংস, সেটা জানার চেষ্টা করুন৷যতটা সম্ভব স্বাভাবিক ভাবে জেনে নিন তার ওর প্রতি বিশেষ টান বা আগ্রহ আছে কি না৷আপনার কথাবার্তায় যেন সে বুঝতে না পারে আপনি তাকে চাপ দিচ্ছেন বা সে অন্যায় কিছু করছে।

এরপর একদিন সময় মতো আপনি মেয়ের সেই বন্ধুটি-সহ অন্য বন্ধু-বান্ধবদের আপনার বাড়িতে নিমন্ত্রণ করুন। সবার সঙ্গে অবশ্যই স্বাভাবিক এবং স্নেহসুলভ ব্যবহার করবেন। তবে  এই ছেলেটির সঙ্গে আলাদা ভাবে কথা বলুন। জেনে নেন তার পড়াশোনা, পরিবার সম্পর্কে। তাহলে আপনি খুব সহজেই বুঝতে পারবেন মানুষ হিসেবে সে কেমন।মেয়েকে সেই বুঝে ছেলেটির সঙ্গে মিশতে দেবেন কিনা, এবার আপনার সিদ্ধান্ত নিতে সুবিধে হবে৷

ভুলবেন না, আপনার মেয়ে ও তার বিশেষ বন্ধু কিন্তু অপ্রাপ্তবয়স্ক। তাই এখনই তাদের কাছ থেকে ভবিষ্যৎ জীবনের কোনও কমিটমেন্ট আশা করবেন না। তাদের বন্ধুর মতোই থাকতে দিন। বড়ো হওয়ার পরেও যদি এই সম্পর্ক থেকে যায়, তার থেকে ভালো কিছুই আর হতে পারে না। তাই এখন থেকেই ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে ওদের স্বাভাবিক বন্ধুত্বে কোনও ভাবেই বাধা হয়ে দাঁড়াবেন না।

বাড়ির বেসিক ডিসিপ্লিনের ব্যাপারে কমপ্রোমাইজ করবেন না। নির্দিষ্ট সময়ে মেয়ের বাড়ি ফেরা, দেরি হলে ফোন করে জানিয়ে দেওয়া, না জানিয়ে কোথাও চলে যাওয়া, ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফোনে কথা বলা বা কম্পিউটারে চ্যাট করা এসব পরোক্ষ ভাবে আপনার মেয়ের ক্ষতি করতে পারে। তাই চেষ্টা করুন নিজের হাতে এসব নিয়ন্ত্রণ করতে।

যদি দেখেন আপনার মেয়ে তার সম্পর্কটা ঠিকমতো হ্যান্ডেল করতে পারছে না বা ওর ব্যক্তিগত জীবন এতে প্রভাবিত হচ্ছে, পড়াশোনার ক্ষতি হচ্ছে, তাহলে প্রথমেই তাকে বকাঝকা করবেন না। ওকে বন্ধুর মতো করে বোঝানোর চেষ্টা করুন। আপনার সন্তানকে সময় দিন। নিজের যতই ব্যস্ততা থাকুক না কেন, নিয়মিত ওর স্কুল, টিউশন সবকিছু সম্পর্কে খোঁজখবর রাখুন। চেষ্টা করুন ওর বন্ধু হয়ে ভরসার মানুষ হয়ে ওঠার, যাতে ও আপনার কাছে কিছু লুকিয়ে না রাখে।

পড়ার জন্য সীমাহীন গল্প-নিবন্ধসাবস্ক্রাইব