দুরন্ত ঘোড়া

এই সমাজে ছোটাটাই দস্তুর। কেউ কেউ পরিকল্পনা করেই ছোটে। মিশনটা ভোগ সাগরে ডুব দেওয়া। অনেকে শক্তি হারিয়ে সেই সাগরে অতল গর্ভে বিলীন হয়ে যায়। আবার কেউ সব হারিয়ে সর্বস্বান্ত হয়ে ফিরে আসে। জীবনের মূল্যবোধ, পরম্পরা দায়দায়িত্ব, কর্তব্যবোধ সব খুইয়ে সে রিক্ত। ভোগ সাম্রাজ্যের মাঝে বসে নিরেট ভোগ সামগ্রী তাকে গিলে খেতে চায়। প্রাগৈতিহাসিক ডাইনোসরেরা শিকারিকে নিয়ে প্রথমে খেলা করে, তারপর একটু একটু করে ছিঁড়ে খায়। সেই ছিন্নভিন্ন মনের যন্ত্রণায় প্রলেপ দিতে কেউ আসে না।

সে আজ বড়ো একা। মিঠু যন্ত্রমানবে পরিণত হতে চায় না। ছোটোবেলা থেকে অতি মেধাবী মিঠুর স্বপ্ন ছিল অন্যরকম। জীবনবিমার তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী আজীবন দারিদ্রের সঙ্গে লড়াই করতে করতে পর্যুদস্ত। নিম্নবিত্ত পরিবারে বেড়ে ওঠা মিঠু আলোর দিশারি। মিঠুর হাত ধরে আদিত্য আকাশ ছুঁতে চায়। অফিস কলিগরা ইন্ধন দেয়– আদিত্যবাবু, মিঠুর মতো অসাধারণ মেধাবী মেয়েকে স্টেট লেভেলের ইঞ্জিনিয়ারিং পড়িয়ে পাতি ইঞ্জিনিয়ার বানাবেন? ওর জন্য পড়ে রয়েছে তো গোটা জগৎ। ওকে তো আরও বড়ো জায়গায় পরীক্ষা দেওয়াতে পারতেন? ওর আসল জায়গা আইআইটি।

ভাগ্য খোলে তরুণ কর্মকারের লটারি ব্যাবসায়। ফুটপাথে চেয়ার টেবিল পেতে লটারি বিক্রিতে যা কমিশন হতো, সংসারের হাঁড়িতে তেমন একটা কালি পড়ে না। পড়ার কথাও নয়। মোড় ঘুরল এই কাউন্টার থেকে প্রথম পুরস্কার লেগে যাওয়ায়। প্রথম পুরস্কার পেয়ে ট্যারা গোবিন্দ কত নম্বর বিত্তশালীদের খাতায় নাম লিখিয়েছিল জানা যায়নি। তরুণ ফুলে ফেঁপে ঢোল। খদ্দেরের মন বুঝে মা কালীর ফটোতে প্রতিদিন তাজা জবার মালা, সিঁদুর পরিয়ে, ধুপকাঠি জ্বালিয়ে বসে। সামনে থাকে বড়ো প্লাইবোর্ডে কাগজ লাগানো বিজ্ঞাপন, আনন্দ সংবাদ, আনন্দ সংবাদ, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য লটারি প্রথম পুরস্কার এই কাউন্টার থেকে উঠেছে, ইত্যাদি। আওয়াজটা বহুদূর পেৌঁছে দেওয়ার তাগিদে রাখা আছে একটি সাউন্ড বক্স। চটুল হিন্দি গানের পাশে চলতে থাকে আনন্দ সংবাদ। খদ্দেররাও হঠাৎ বিত্তশালী হওয়ার বাসনায় পিল পিল করে টিকিট সংগ্রহ করে। প্রাচুর্য তরুণকে নিয়ে যায় নরক দর্শনে। অন্ধকার জগতে। সেই জগতে সে এখন মাফিয়া। জীবনের মূল্যবোধ দায়িত্ব কর্তব্যবোধ সব কিছুরই প্রয়োজন ফুরিয়েছে।

বাচ্চা হওয়ার সময়ই রূপাঞ্জনার মা সমস্ত দায়দায়িত্ব সন্তান বাৎসল্য সমস্ত কিছুই তরুণের হাতে সঁপে দিয়ে জগতের মায়া ছেড়ে কেটে পড়ে। এত দায়ভার বহনের ক্ষমতা হয়তো তরুণের ছিল না। ছোট্ট শিশুর মিষ্টি হাসি সন্তান বাৎসল্য উসকে দেয়। বিরক্ত হয় না। ক্লান্তি আসে না। তিল তিল করে হারিয়ে যাওয়া মায়ের সাহচর্য দিয়ে বড়ো করতে থাকে। দাম্পত্য জীবনের আশা আকাঙক্ষা স্বপ্ন সব কিছুরই মূর্ত প্রতীক রূপাঞ্জনা। সে আজ আকাশের বুকে লেপটে থাকা নক্ষত্র। কম্পিটিশনটা ছিল মিঠুর সাথে। মিঠু ফোন করে –– হ্যালো রূপাঞ্জনা পড়তে যাবি তো?

– না রে আজকে শরীরটা ভালো নেই।

– সে কি, আজ যে ফিজিক্সের ক্লাস।

– থাক আজ ভালো লাগছে না। মাথাটা কেমন ঘুরছে।

হঠাৎই মেয়ের এই পড়াশোনার উদাসীনতার উৎস বুঝতে পারে না। টিচাররাও মিঠু, রূপাঞ্জনার অগ্রগতিতে উৎসাহিত। শ্যামলবাবু তো প্রথমেই ডেকে বললেন– তোমরা আমার কাছে ফিজিক্স পড়বে। আর শোনো তোমাদের কোনও ফি দিতে হবে না। কোচিং দেওয়া নিয়ে শিক্ষকদের মধ্যে কম্পিটিশন ওঠে তুঙ্গে। ফোন ছাড়তেই তরুণ উদগ্রীব হয়ে প্রশ্ন করে– কিরে, পড়তে যাবি না কেন? শরীর খারাপ? কি হয়েছে?

– না তেমন কিছু না।

– তবে? শেষ সময়ে এসে এই ফাঁকি কতবড়ো সর্বনাশ ডেকে আনবে বুঝতে পারছিস না। তোকে যে বড়ো ইঞ্জিনিয়ার হতে হবে। তোর মা যে হাঁ করে বসে আছে। তাকে কি কৈফিয়ত দেব?

রূপাঞ্জনা চুপ করে থাকে। বাবার এই উৎকন্ঠা, আবেগ প্রলেপ দেওয়ার রসদ জমা নেই। শরীরের মধ্যে এক অজানা অস্থিরতা যন্ত্রণা। সমস্ত উৎসাহ উদ্দীপনা যেন ক্রমশ নিঃশেষিত হয়ে যাচ্ছে। মাঝে মাঝে তরুণের মনে হয় মেয়েটা কোনও বয়ফ্রেন্ডের পাল্লায় পড়েনি তো? সেক্ষেত্রে এই উদাসীনতা স্বাভাবিক। তরুণ ভিন গ্রহে হ্যারিকেন নিয়ে বয়ফ্রেন্ডের তল্লাশি চালাতে থাকে।

বাড়ির সামনে লোকের ভিড় দেখে তরুণের বুকের ভিতরটা ধড়াস ধড়াস করতে থাকে। পা যেন আর চলতেই চায় না। সামনে এসে অতি কষ্টে জিজ্ঞাসা করে– কি হয়েছে? পুলকের মা একটু বকে বেশি। নাম কিনতে চায়। লোকজন ঠেলে মুখ বাড়িয়ে বলে– আর বলো কেন। তুমি সাত সকালেই বেরিয়ে যাও। মেয়েটা মনে হয়, না খেয়েই পড়তে গিয়েছিল। তাই বোধ হয় মাথা ঘুরে পড়ে গিয়েছে। জ্ঞান ছিল না। এখন এসেছে। তরুণ ঘরে ঢুকতেই বুলটির মাকে ঠেলা দিয়ে বলে– কি জানি বাবা। আজকাল ছেলে-মেয়েদের ব্যাপারে যা শুনি, কোথায় কি করে এসেছে কি জানি। বুলটির মা সায় দিয়ে বলে– মা মরা মেয়ে। শাসন নেই। হতেও পারে। উৎকন্ঠিত তরুণ জিজ্ঞাসা করে– কিরে মা, কি হয়েছে? রূপাঞ্জনা ধীরে ধীরে উত্তর দেয় – শ্বাসকষ্ট হচ্ছে। বুকে একটা যন্ত্রণা।

তবে চল কাছাকাছি কোনও নার্সিং হোমে, বলেই তরুণ উর্দ্ধশ্বাসে বেরিয়ে যায় গাড়ির খোঁজে। অনেক পরীক্ষানিরীক্ষার পর ডাক্তার পাল জানিয়ে দেয়– পেশেন্ট ইজ ভেরি সিরিয়াস। হার্টের দুটো ভালভ্ই প্রায় ব্লক। একটি হান্ড্রেড অপরটি সিক্সটি পারসেন্ট। ইমিডিয়েট অপারেশন করতে হবে। ওয়ার্ড মাস্টারের কাছে যান। সব বলে দেবে।

তরুণ দিশেহারা। উদ্ভ্রান্ত, এসব ব্যাপারে মুরারীপুকুরের ক্লাবের ছেলেরা হাত গুটিয়ে বসে থাকে না। টাকার সংস্থান হল। সেই টাকা নিয়ে ছুটতে ছুটতে নার্সিংহোমে তরুণ যখন পৌঁছোয় সূর্য তখন পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়েছে। অনেক আশা-আকাঙক্ষা স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করার চোখ দুটি স্থির। নিস্পন্দ নিথর দেহখানি। সার্জন জানিয়ে দিলেন– সরি, মেয়েটি কোনও সুযোগই দিল না। ওটি-তে নেওয়ার আগেই সব শেষ।

আদিত্য অফিস থেকে ফিরেই আইআইটি-র ফর্মটা মেয়েকে দিয়ে বলে– নে এটা ফিল আপ কর। মিঠু দেখেই বলে এটা কী?

পড়ে দেখ। ফর্মের পাতা ওলটাতে ওলটাতে মিঠু খানিকটা ভীত হয়ে প্রশ্ন করে– বাবা, এ কি আমি পারব? আদিত্য নিজেই মনোবল উসকে নিয়ে সাহস জোগায়– পারবি মানে, তোর টিউটররা কি তাহলে ভুল মূল্যায়ন করেছে। আর ছিল রূপাঞ্জনা। সে তো আজ অতীত। তোর টিচাররা তো তোদের দুজনের ব্যাপারে হাই অ্যামবিশনের এক্সপেক্ট করছে।

– কিন্তু বাবা আমি চেয়েছিলাম, স্টেট লেভেলে ইঞ্জিনিয়ারিংটা দিতে। লোকালই কোনও একটা চাকরি নিয়ে তোমাদের কাছে থাকতে। আমি তো তোমাদের একমাত্র সন্তান। এটাতে পড়াশোনা করলে চাকরি নিয়ে তোমাদের ছেড়ে চলে যেতে হবে।

– তা হোক। আমাদের কথা তোর ভাবতে হবে না। চোখ উপর দিকে রাখ, তোকে অনেক উঁচুতে উঠতে হবে। তুই আমাদের গর্ব। পাড়ার গর্ব। মিঠু তর্ক বাড়ায় না। চুপ করে যায়। যে কথাটা বলতে পারল না, এই যে বাবা উঁচুতে স্বপ্ন দেখছে, অর্থের প্রাচুর্য হয়তো একদিন গিলে খাবে। দায়িত্ব, কর্তব্য মূল্যবোধ সবই হয়তো একদিন পরিত্যাজ্য হবে।

তরুণ যাচ্ছিল আদিত্য মুখার্জীর বাড়ির পাশ দিয়ে। একটা চিৎকার চ্যাঁচামেচিতে বাড়িতে প্রবেশ করে। তার চাইতেও বড়ো, কারণে অকারণে মিঠুকে দেখার অভিলাষ। সে যে তার রূপাঞ্জনারই প্রতিরূপ। রাঘব আগরওয়ালার কর্মচারী সুজন অধিকারীর কঞ্চির আস্ফালনে আদিত্য কুঁকড়ে ঢোঁড়া সাপ। মুখে ভাষা নেই। প্রতিশ্রুতির বাক্যবাণী নেই। অবনত মস্তকে চেয়ারে মাথা নীচু করে বসে থাকে। সুজনের অশ্রাব্য ভাষায় দরজা নেই। অবিশ্রান্ত আস্ফালন করেই চলেছে– বুড়ো ভাম, ভাড়া চুকোতে অসুবিধা কোথায়? ছিপলিটা দিয়ে দিলেই তো সব চুকে যায়। বাইরে দাঁড়িয়ে তরুণ বেকায়দায় পড়ল। আশা ছিল মেয়েটার সাথে দু-দণ্ড কথা বলে মনটা জুড়োবে। মেজাজটা হিঁচড়ে দিল। পকেট থেকে কানপুরি ছুরিটা বের করে সুজনের পেটের সামনে ঠেকিয়ে বলে– আবে এ কাঞ্চা, কি বললি? আবার বল। একদম পেট কামিয়ে দেব। ভ্যাবাচ্যাকা খাওয়া সুজন ছুরি দেখে নীচের কাপড় আর শুকনো রাখতে পারে না, দুর্বল পরিবারে তড়পানোর শক্তি হারিয়েছে। তরুণের পা দুটি জড়িয়ে ধরে হাউ হাউ করে কেঁদে বলে– দাদা আমার কি দোষ? মালিকের অর্ডার ছিল কড়া ভাষায় থ্রেট করতে।

– নে ওঠ শালা, তাই বলে আমার মাকে বেইজ্জত করবি। কত ভাড়া পাবি? সুজন করুন সুরে বলে– পাঁচশো টাকা করে ছয় মাস তিন হাজার টাকা।

পকেটের থেকে এক গোছা টাকা বের করে ছুড়ে দিয়ে বলে– নে এতে তোর তিনহাজার টাকার বেশি আছে। এর পরে যে টাকা বাকি পড়বে আমার মা চাকরি করে শুধবে। তার আগে যদি এ মহল্লায় পা দিয়েছিস তো, আসার সময় দত্তদের পুকুরটা দেখেছিস, একদম খাল্লাস করে ওখানে চালান করে দেব। চল হট শালা। মিঠুর দিকে তাকিয়ে বলে– মা-রে ও মালটার সাথে এভাবে কথা না বললে হল্লা করেই চলত। বারবার ঝামেলা করত। তোর সামনে লোকটার সঙ্গে এরকম ব্যবহার করায় আমারও সংকোচ হচ্ছে। এছাড়া আমার যে আর কোনও পথও খোলা ছিল না। সংকোচ মিঠু করে না। শ্রদ্ধার পরিমাণটা অন্তরস্থলে আরও একটু জায়গা করে নেয়। আমি উঠি রে, তোর পড়াশোনার অনেকটা ক্ষতি হয়ে গেল। বলে তরুণ দাঁড়ায় না।

পরিণতি তরুণকে নিয়ে যায় নরক দর্শনে। সে জাত বজ্জাত নয়। বেপরোয়া ঔদাসীন্যের সঙ্গে যারা পাপের পথে হাঁটে, কোয়ালিস হাঁকায়, সে ধাতুতে তরুণ গড়া নয়। পাপ তার পেশা নয়, নেশা। দারিদ্র্যকে বড়ো কাছের থেকে দেখেছে। সেই দারিদ্র্য নিয়ে স্ত্রী কন্যার সংসার সামলেছে। সব হারানোর যন্ত্রণা বিষাক্ত ভয়ানক নেশার মতোই তার মতো ইস্পাতে গড়া মানুষটাকে ধবংসের পথে নিয়ে যায়। বিদ্যার কারণেই হোক আর মস্তিষ্কের উর্বরা শক্তির প্রয়োগে বন্ধ কারখানায় মাল সরানোর কাজে সে এলাকার মাফিয়া ডন। তরুণের সমগোত্রীয় কেউ ধৃষ্টতা দেখানোর স্পর্ধা দেখায় না।

শ্রীজীবের আর এক দশা। বাপটা এক মেয়েছেলের খপ্পরে পড়ে তাকে নিয়ে ভেগেছে। দারিদ্র্য অনেক কিছু দেয়। দায়িত্ব কর্তব্য সুস্থ রুচিবোধের রসদ যোগায়। ক্ষিদের তাড়না মেটায় না। সেই তাড়নাতেই বাবুর বাড়িতে কাজ ধরে। শরীরে খাদ্য যোগানের বিনিময়ে পরিশ্রমের মাত্রা বেশি হলে শরীর তা সহ্য করে না। প্রতিদিন জ্বর হয়। বুকে কফের ভাব তৈরি হয়। সবসময় শুধু কাশে। শ্রীজীবটার কোনও কাজ জোটেনি। সব কারখানায় বড়ো বড়ো তালা ঝুলছে। তরুণের ফাইফরমাশ খাটে। তরুণ কিছু দেয়। শ্রীজীবটা কদিন তরুণের কাছে যায় না। মা টার শরীরটা বাড়াবাড়ি হয়েছে।

শ্রীজীব ধূর্ত নয়। সে পরিস্থিতির দাস। সেই দাসত্বের শৃঙ্খল মোচন করার শক্তি তার নেই। অকৃতজ্ঞতা, বিবেকদংশন মনকে কুরে কুরে খায়। যথাসম্ভব সেই যন্ত্রণাকে চাপা দিয়ে কৃত্রিম উত্তেজনা তৈরি করে হাঁপাতে হাঁপাতে তরুণকে গিয়ে বলে– তরুণদা, কোরা শিবুকে পুলিশ কৃষ্ণা রেপ কেসে সকালে তুলে নিয়ে গেছে। তরুণের মালের নেশাটা বেশ চড়েছে। চেয়ারে বসে দেয়ালে হেলান দিয়ে ব্যালেন্স রাখছে। শ্রীজীবের কথা শুনে চমকে ওঠে– কি, কোরা শিবুকে পুলিশ পেল কোথায়? ওকে তো ঘোড়াডাঙায় পাঠিয়েছি। আজ বিকেলে ফেরার কথা। ফোন করেছিল তো কাল রাত্রে।

– তা জানি না, হয়তো সকালেই এসেছিল। পুলিশ বাগে পেয়েই অ্যারেস্ট করেছে।

– ও কেসে শিবুকে ধরবে কেন। ওটা তো কাঁকুরগাছির কেস। ঘাপলা কেস নয়তো?

– কি জানি, একবার গিয়ে দেখলে হতো না?

– চল তবে দেখেই আসি। শীতের পড়ন্ত বেলায় হাঁটতে ভালোই লাগছে। হাঁটতে হাঁটতে মালের ধুনকিটা অনেকটা কেটে এসেছে। প্রশস্ত রাস্তার দুই পাশে অজস্র এঁদো গলি। নদীর শাখা নদী। স্রোত কম থাকায় এসব নদীতে পাঁক প্রজাতির মাছের উৎপাদন ঘটে। এই এঁদো গলিতে সন্ধ্যার আগেই সন্ধ্যার আঁধার ঘনিয়ে আসে। চাঁদ এ গলিতে উঁকি মারে না। এদের দৈন্যদশা খোঁজ নেওয়ার তাগিদ নেই। পাঁচ ফুট রাস্তার দুই পাশে সরু নর্দমার পাঁক চলকে চলকে সমস্ত রাস্তাটা পাঁকময় করে রেখেছে। হাবু ডাবু গলি থেকে বেরিয়েই তরুণের সাথে দেখা।

– আরে তরুণদা কোথায় চললে?

– আর বলিস না, আমাদের কোরা শিবুটাকে রেপ কেসে পুলিশ তুলে নিয়ে গেছে।

– হ্যাঁ তাই তো শুনলাম, তুমি এসেছ ভালোই হয়েছে। চলো তো যাই। কেসটা কি? তরুণ আপত্তি করে না। মনে মনে দু-একজন সঙ্গী তরুণ খুঁজছিল। শ্রীজীব অনেকক্ষণ ধরে কেটে পড়ার ধান্ধা করছিল। তরুণকে বলে– তরুণদা মা টার শরীরের অবস্থা ভালো না। আমি তবে চলে যাব? আয় তবে। প্রশস্ত রাস্তা ছেড়ে এঁদো গলিতে কিছুটা পথ যেতেই তরুণের নেশার ঘোরটা কাটতে স্বাভাবিক ছন্দে ফেরে– ইস, এ নোংরা গলিতে ঢুকলি কেন?

– আরে ইয়ার, এখান থেকে একটু তাড়াতাড়ি হবে।

– কেস দিয়ে দিলে সব লুচ্চা হয়ে যাবে না? মস্তিষ্কের উর্বরা শক্তি তরুণের কম নেই। সেই শক্তিতেই এক মুহূর্তে সিদ্ধান্ত নেয়।

এখান থেকে পালাবার আর কোনও রাস্তা নেই, মৃত্যুর বদ্ধভূমিতে ঢুকে পড়েছে।

– আরে ইয়ার থোড়া রুক, একটু খালাস করে নিই। হাবু ডাবু বাধা দেয় না। একটু এগিয়ে গিয়ে অপেক্ষা করে। পরস্পরের সঙ্গে শলা পর্ব সেরে নেয়। শালা এখান থেকে ভাগবে কোথায়? নে খালাস করে নে। একটু পরে তুই খালাস হবি। মতলবটা নরখাদক বাটপাড়েরা বুঝতে পারেনি। মিশকালো ঘন অন্ধকারে পকেট থেকে মেশিনটা বার করে। অত্যন্ত সন্তর্পণে লক্ষ্য স্থির রেখে পর পর শুট। আওয়াজটা বজ্রগর্ভ নয়। সাইলেন্সার লাগানো ছিল। হাবুটা ছিটকে এঁদো নর্দমায় পড়ে। বিষধর সাপ শেষবারের মতো ফণা তোলার চেষ্টা করে। পারে না। নর্দমার পাঁক মাথা ঠান্ডা করে। পাঁকেই সমস্ত শক্তি নিঃসৃত হতে হতে নিথর হয়ে যায়। ডাবু তলপেটে দানা খেয়ে বজ্রগর্ভে হুংকার দিতে দিতে বড়ো রাস্তায় মুখ থুবড়ে পড়ে। তরুণ পাঁকে দেহটাতে পাড়া দিয়ে বিজয়ের মুকুট চাপিয়ে দাম্ভিক শ্লেষাত্মক ভঙ্গিতে বলে– শালা মারনেওয়ালা মর গই। পথের কাঁটা তরুণ উপড়ে, দ্রুত গতিতে বেরিয়ে আসে। নির্মূল হয় না। পশ্চিম আকাশে লাল দিগন্তে মৃত্যুর বলিরেখা অঙ্কিত হয়ে রইল, তাতে তরুণের পরোয়া নেই। আত্মরক্ষার কোনও দায় নেই। সে আজ পালহীন, উদ্দেশ্যবিহীন উত্তলিত জোয়ারে বয়ে যাওয়া নৌকা। সে নৌকায় সওয়ারী সে নিজেই।

মিঠু প্রথম প্রথম বাবাকে ফোন করত। সুদূর কেনটনে বসে মায়ের যত্ন, বাবার সাহচর্যের অভাবে মনটা শূন্যতায় ভরে উঠত। ট্রেনিং পিরিয়ডে তখনও, বৃহৎ কর্ম জগতে প্রবেশ করেনি। মা-বাবার মায়া মমতার তুচ্ছ মোড়কটার অভাবে জীবনীশক্তি কেমন স্তিমিত হয়ে যায়। মেয়ের সাফল্যের চূড়ার মসনদে আসীন হওয়ার মোহে মেয়ের শূন্যতা আদিত্যকে ভারাক্রান্ত করে না। সেটা ক্ষণিকের মোহজাল। অবসর গ্রহণের পর আদিত্যের একমাত্র ঠিকানা রাধিকারঞ্জনের দাবার ঠেক। দাবার ঘুটিতে চাল দেওয়ায় আদিত্যের অপরূপ কৌশল। সেই কৌশলেই রাধিকারঞ্জন কুপোকাত। একটার পর একটা চালে কখন যে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা, সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত, কখন যে জগৎটাকে ঘন অন্ধকার গ্রাস করেছে আদিত্য বুঝতে পারে না। এবার বাড়ি ফেরার পালা। ফিরতে হয়। সেই যাওয়া আর আসা। এরমধ্যে সবসময় যে সদর্থ ব্যাখ্যা থাকে তা নয়। তবু যেতে হয়।

ঘরে ফিরেই আদিত্য মৃন্ময়ীকে সুধোয়– মেয়েটা ফোন করেছিল? মৃন্ময়ী উত্তর দেয় না। ফুঁসতে থাকে। মৃত আগ্নেয়গিরি বিস্ফোরণের রসদ সঞ্চয় করে। তারপর একসময় বজ্রনিনাদে বিস্ফোরিত হয়। দ্বিতীয়বার জিজ্ঞাসা করতেই অগ্নিস্ফুলিঙ্গের মতো বিচ্ছুরিত হতে থাকে– রোজ রোজ একই কথা বলো কেন। নিজে তো দাবার আড্ডায় সারা দিন কাটিয়ে, গভীর রাতে মেয়ের কথা মনে পড়ে। মা হয়ে আমার মন টেকে কি করে। ভেবে দেখেছ? টাকার লোভে মেয়েটাকে পরবাসী করে ছাড়লে। এখন লোক দেখানো হাপিত্যেস করে লাভ কি? লোভ আদিত্যের ছিল। লোভটা সহজাত নয়। দারিদ্রের অপমান লাঞ্ছনা তাকে লোভাতুর করে তোলে। মিঠুর নাম্বারটা ডায়াল করতেই অল লাইনস আর বিজি। কথাগুলো ফাটা কাঁসির মতো লাগে। আদিত্য ধীরে ধীরে ক্লান্ত হয়ে পড়ে। হতাশা অবসাদে ফোন আর ধরে না। অবসর সময়ে আকাশের দিকে শূন্য দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে।

ভয়, আতঙ্ক, সংকোচ এগুলি অপরাধী মনের সহজাত প্রবৃত্তি। সেই প্রবৃত্তিতে শ্রীজীব নিজেকে আত্মগোপন করে রাখে। তরুণদাকে জল্লাদের হাতে তুলে দিয়েছিল। মরেছে জল্লাদেরা। জল্লাদের হাতে দেবতাদের মৃত্যু হয় না। ইচ্ছা মৃত্যুতেই তাদের পরিণতি ঘটে। তরুণদার প্রতি শ্রদ্ধা ভক্তি শ্রীজীবের মনের দৃঢ়তা আনে। সেই দৃঢ়তায় মনের সমস্ত সংকোচ ঝেড়ে ফেলে তরুণের পায়ে মাথা নীচু করে বসে। তরুণদা আমাকে শাস্তি দাও। আমি মাফ চাই না। যে অপরাধ আমি করেছি তার ক্ষমা হয় না। তরুণের শান্ত স্নিগ্ধ মমতা যেন শ্রীজীবের উপর বর্ষিত হয়, বাইরে কৃত্রিম ক্ষিপ্রতায় ঝাঁঝিয়ে ওঠে– ওঠ শালা মাকড়া, ঘাপলা করে এসে ন্যাকামি মারাচ্ছে। কি এমন দরকার পড়ল, কত টাকা নিয়েছিস? ওদের তুই চিনিস? এবারে তো তোকে সরিয়ে দেওয়ার ছক করছে, সে খবর রাখিস?

– না না বস, টাকা নিইনি। মানে ওরা বলেছিল কাজ হলে টাকা দেবে।

– যাক, খাওয়াদাওয়া করেছিস? শ্রীজীবের মুখে ভাষা নেই। অপরাধীর মতো মাথা নত করে বসে থাকে।

– যা টেবিলের উপর পাউরুটি কলা আছে। খেয়ে নে। শ্রীজীব দুটো থালায় পাউরুটি কলা নিয়ে আসে। একটি তরুণদাকে দেয়, একটি নিজে নেয়।

– তোর মা কেমন আছে?

– ভালো না, সেই জন্যই ওরা বলল, তরুণকে আমাদের হাতে তুলে দে, তোর সব চিকিৎসার খরচ আমাদের।

– গর্ধব, সেটা তো আমাকে বলতে পারতিস।

– তোমার ঋণ আর কত বাড়াব। আমার যে আর মুখ ছিল না।

– তাই বলে আমাকে খরচা করে ঋণ শোধ করবি? এখন তোর বিপদটা ভেবে দেখছিস? তোকে যে ওরা খরচা করে দেবে। শোন, বিলাসপুরে আমার এক বন্ধু আছে। কাল দুপুরের মুম্বই মেলের টিকিট কেটে দিচ্ছি। মাকে নিয়ে ওখানে চলে যা। ওরা সব ব্যবস্থা করে দেবে। আমার সঙ্গে ঋত্বিকের কথা হয়ে আছে। ওখানকার চিরিমিরি কোলিয়ারিতে তোর একটা কাজেরও ব্যবস্থা করে দেবে। আর ড্রয়ারটা খোল, ওখানে লাখ খানেক টাকা আছে। ওই টাকা নিয়ে মায়ের চিকিৎসা করাবি। এটুকু সময় তোর বাড়ির চারদিকে আমার লোক থাকবে। এখানে তোকে রক্ষা করতে পারব না।

শ্রীজীব যে দেবতাকে জল্লাদের হাতে তুলে দিতে গিয়েছিল সেই তাকে মারন বিপদের হাত থেকে রক্ষা করতে এই মহান দায়ভার গ্রহণ করছে। বিপদ যে তার অন্তরস্থলের দেবতাকেও গ্রাস করতে চলেছে। দেবতার নাম সে শুনেছে। চোখে দেখেনি। শুখা নদীতে বান এসেছে। কৃতজ্ঞতার বানে উত্তলিত হয়ে তরুণের পা জড়িয়ে ধরে– তরুণদা, ঠাকুর আমি দেখিনি। তুমিই আমার ঠাকুর। তোমাকে এই বিপদের মধ্যে ফেলে আমি কোথাও যেতে পারব না। যা হবার হোক। আমি তোমার সাথেই থাকব।

– অনেক ভাট বকেছিস। এবার ওঠ। তোর যে সংসারে অনেক কাজ। আমার সংসারে প্রয়োজন ফুরিয়েছে।

– কি বলছ, তরুণদা? আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না।

– বুঝতে হবে না। অনেক মেগাসিরিয়াল হয়েছে। এবার কেটে পড়। বাড়িতে গিয়ে গোছগাছ কর।

কতদিন ধরে মৃন্ময়ীর শরীরটা ভালো যাচ্ছে না। পেটে একটা অব্যক্ত যন্ত্রণা সমস্ত শরীরটা নাড়া দিয়ে উঠেছে। সেই যন্ত্রণা প্রবল হলে আদিত্য কাছাকাছি এক হাসপাতালে মৃন্ময়ীকে নিয়ে যায়। পেশেন্টকে দেখেই ডা. রায়ের সন্দেহ হয়। বায়োপসির রিপোর্ট হাতে আসতেই ডা. রায়ের সন্দেহের অন্ধকার কেটে যায়। রিপোর্ট পজিটিভ। লিভারে ম্যালিগন্যান্ট ক্যান্সার। অন্ধকারটা নেমে আসে আদিত্যর জীবনে।

ব্যাংকে যে ক’টা টাকা ছিল প্রাথমিক চিকিৎসাতেই শেষ। মৃন্ময়ীর আয়ুষ্কাল আর কতদিন, সেটা বলবে ভবিষ্যৎ। চিকিৎসার পরবর্তী ব্যয়ভার মেটাবে কীভাবে। সেটা তো গন্ধমাদন পর্বত।

যাদুকরের কেরামতিতে পুতুল নাচে। অর্থের যাদুকর দুর্বল হলে পেশেন্টও অচল হতে থাকে। মৃন্ময়ী ক্রমশ ঝিমিয়ে পড়ে থাকে। দৃষ্টি আবছা হতে থাকে। গলাতে আওয়াজে আর সেই ঝাঁঝ নেই। থেকে থেকে আদিত্যকে প্রশ্ন করে– মেয়েটা ফোন করেছিল গো? আদিত্যের দীর্ঘনিঃশ্বাসের আঁচ মৃন্ময়ী করতে পারেনি। বাইরে কৃত্রিম স্বাচ্ছ্যন্দে উত্তর দেয়– হ্যাঁ করেছিল তো। নানান ঝামেলায় বলা হয়নি। এই তো রাধিকার বাড়ি থেকে আসার পথে হঠাৎই মিঠুর ফোন। তোমার কথা, আমার কথা। পাড়ার সবার কথা। বলছে অফিসে খুব কাজের চাপ। তবে পুজোর সময় আসবে বলেছে। মৃন্ময়ী বাধা দিয়ে বলে– আমার শরীর খারাপের কথা বলোনি তো?– না না ওসব বলিনি। মেয়েটা ওখানে বসে ছটফট করবে। এতগুলি মিথ্যা কথা বানিয়ে বলতে আদিত্যেরও মনটা হিঁচড়ে যাচ্ছিল। বাস্তবটা যে বড়ো নিষ্ঠুর। মৃত্যু পথযাত্রীর কাছে এই মিথ্যেটাই যে বাঁচার রসদ। কিছুটা হলেও শরীর, মন চাঙ্গা হয়।

বিকেল হলেই রাধিকারঞ্জনের মনটা ছুকছুক করে। চোখ পড়ে দাবার বোর্ডের দিকে। ঘুটি সাজিয়ে বসে থাকে আদিত্যের অপেক্ষায়। আজ কতদিন হল আদিত্য এমুখো হয় না। দাবার নেশা তাকে আদিত্যমুখী করে তোলে। সদর দরজা হাট করা খোলা। মধ্য খাটালে একটা বিড়াল উচ্ছিষ্ঠ যা কিছু ছিল সাবড়ে দিয়ে মৌতাত করছে স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে। ম্যাও করে নবাগত অতিথির আগমনি বার্তা জানান দিয়ে খাটের তলায় নিরাপদ আশ্রয় নিয়েছে। খাটের উপর গোটা তিনেক বালিশে হেলান দিয়ে অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে। যে চাউনিতে আলোর রেখা নেই। অন্ধকারের করাল গ্রাস একটু একটু করে গিলে খাচ্ছে। ভাঙা হাটে প্রেম ভালোবাসা স্নেহের খদ্দেররা এক এক করে সরে যাচ্ছে। এখন আদিত্য শুধুই একা। অকর্মণ্য স্বামী মৃত্যু পথযাত্রী স্ত্রীর শেষ চিকিৎসাটুকু করতে অপারগ। অসহায় মানুষের চিন্তাটাই একমাত্র অবলম্বন।

দরজা খোলা পেয়ে ভিতরে ঢুকে হাঁক পাড়ে রাধিকারঞ্জন – আদিত্য, ও আদিত্য ঘরে আছ নাকি? নিস্তব্ধ নিঃস্পন্দ একটা মাত্র অল্প পাওয়ারের ল্যাম্পের ক্ষীণ আলো জ্বলছে। প্রাণহীন ইটের পাঁজরে চারদেয়ালে আদিত্য যেন বন্দিদশা কাটাচ্ছে। মুখমণ্ডল মনের আরসি। কোটরাগত চোখ, অসংখ্য চিন্তার ভাঁজ জানান দিচ্ছে আদিত্য ভালো নেই। – কি ব্যাপার? কত দিন তোমার দেখা নেই। আদিত্যর সাড়া মেলে না। গায়ে হাত পড়তেই ধড়মড় করে ওঠে। স্বাভাবিক হতে চেষ্টা করে। সবটা পারে না। উদ্বিগ্ন অশান্ত মন স্বাভাবিক হতে দেয় না। বয়সের ভারে রাধিকারঞ্জনেরও চেতনার পরিপক্বতা এসেছে। সেই পরিপক্বতায় তার বুঝতে দেরি হয় না।

– কি ব্যাপার, মনে হচ্ছে কোনও গভীর সমস্যায় পড়েছ?– হ্যাঁ ভাই, ভালো নেই। মিঠুর মা হাসপাতালে ভর্তি। উদ্বিগ্ন রাধিকা প্রশ্ন করে– কেন কী হয়েছে? অকারণ গৌরচন্দ্রিকা বাড়ায় না। আর সে মানসিকতাও নেই। সরাসরি বলে– লিভার ক্যান্সার। রাধিকা হতবাক স্তম্ভিত। সে জানে অশান্ত, উদ্বিগ্ন মনকে শান্ত করা যায় না। রাধিকা সে পথে হাঁটেও না। পরিস্থিতিটা বোঝার চেষ্টা করে। তা চিকিৎসা ঠিকঠাক চলছে তো?

– চলছে, তবে প্রাথমিক পর্বটা মিটেছে। এখন দরকার পরের ধাপ। অপারেশন, কেমো এদিক সেদিক আরও খরচ। এ রাশ তো আমি আর টানতে পারছি না। এখন আমি সর্বশান্ত।

– তা এখনও খরচ কত কিছু জানতে পেরেছ?

– কি জানি, বোধহয় লাখখানেক হবে।

– মিঠুকে খবর দিয়েছ?

এক দীর্ঘনিশ্বাসে বলে– না, আসলে অতদূরে থাকে। তাছাড়া ওখানে ওর কাজের চাপও খুব বেশি। শুধু শুধু ব্যতিব্যস্ত করে লাভ কি বলো ভায়া।

এই দীর্ঘনিশ্বাসই রাধিকাকে জানান দেয় শেষোক্ত মনগড়া মন্তব্য অন্তরস্থলের হতাশার গভীরতা। বড়ো অজান্তে আদিত্যের দগদগে ঘায়ে খোঁচা দিয়ে বসেছে। রাধিকা কথা বাড়ায় না। আজ আসি– বলে রাধিকারঞ্জন রাস্তায় বেরিয়ে আসে।

বৃদ্ধ বয়সের দোসর বড়ো অবলম্বন। বয়েস বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ক্রমশ সঙ্গীহীন হতে থাকে মানুষ। সে হতে থাকে নিঃসঙ্গ, একা। এই দোসর তখন পরস্পর পরস্পরকে আঁকড়ে ধরতে চায়। এতগুলো টাকার দায়ভার সে বইবে কী ভাবে। ক্লাবের ছেলেদের বলবে? মন সায় দেয় না। আদিত্য তো তাকে দায়িত্ব দেয়ওনি। দিশাহীন, উদভ্রান্তের মতো চলতে চলতে হঠাৎই তরুণের সাথে দেখা হয়।

– পাশে এসো। একটা ভয়ংকর সমস্যায় পড়েছি।

সেটা তো দূর থেকে আসতে দেখেই বুঝতে পারছি। কি হয়েছে?

– আদিত্যের স্ত্রীর শরীর খুব খারাপ। হাসপাতালে ভর্তি। এখন ওর যা অবস্থা, তাতে চিকিৎসাটাও করতে পারছে না। ভাবছিলাম ক্লাবকে জানাব কিনা। মেয়েকে খবর দেওয়ার প্রসঙ্গ তুলতেই মনগড়া কতগুলো কথা বলে প্রসঙ্গ এড়িয়ে গেল।

– মিঠুর নাম্বারটা, আচ্ছা দেখি বাড়িতে যাই।

– কি মিঠুর নাম্বার। দাঁড়াও। বলে বুক পকেট থেকে একতাড়া চিরকুট বের করে খুঁজে খুঁজে নাম্বারটা দিয়ে বলে– দ্যাখো, নবাব নন্দিনীর নাগাল পাও কিনা।

নাম্বারটা পকেটে গুঁজেই বলে– আমাকে দুটো দিন সময় দিন। আমি হাসপাতালে যাচ্ছি রাধিকাবাবু, এ চিকিৎসার খরচ আমিই দিতে পারতাম। আপনি তো জানেন আমার রোজগার সবই পাপের টাকা। বউদি বাঁচবেন কিনা জানি না, পাঁক তাঁর গায়ে লাগাতে চাইছি না।

তরুণ সময় নষ্ট করে না। মিঠুকে ফোন লাগায়। সেই ফাটা ক্যাসেট– অল লাইনস আর বিজি। তরুণ নাছোড়। হতাশায় শ্রান্ত হওয়ার ধাতুতে সে গড়া নয়। অবিশ্রান্ত ডায়াল করতেই থাকে। আচমকাই রিং বাজতে থাকে। শুখা নদীতে যেন জলের সঞ্চার ঘটে। প্রাচুর্যের মসনদে আসীন হলে কণ্ঠস্বরে আলাদা গাম্ভীর্য আসে। রুচি, চালচলনে সর্বত্র লেগে থাকে পরিবর্তনের ছোঁয়া।

– হ্যালো, তরুণ ভীত নয়। মনের দৃঢ়তাই শক্তি যোগায়। অথচ স্নেহশীল বাপের মতোই আর্জি জানায়– হ্যালো মিঠু? আমাকে চিনতে পারছিস মা, আমি তোর তরুণ কাকা।

– ও হ্যাঁ, বলো, বাবা-মা কেমন আছে, তুমি কেমন আছ? পাড়ায় সবাই? দাঁড়া দাঁড়া একবারে এত প্রশ্ন করিস না, সব গুলিয়ে যাবে। ফোনটা ছাড়িস না। আমার কথা, পাড়ার কথা ছাড়, তোর বাপ মায়ের খবরটা নিস। তারা কেমন আছে?

– কাকু, এখন আর আপশোশ করে কি হবে বলো? বাবা যে আমায় এই জায়গায় আসতে বাধ্য করেছে। এটা তো আমি চাইনি। প্রচুর টাকার বিনিময়ে কোম্পানি আমার চব্বিশ ঘণ্টাই কিনে নিয়েছে। আমার পার্সোনাল লাইফ বলে যে কিছুই অবশিষ্ট নেই। যাক মা-বাবা এখন কেমন আছে?

– ভালো নেই। তোর মায়ের শরীর খুব খারাপ। লিভার ক্যান্সার। চিকিৎসার সামর্থ্যও তোর বাবার নেই। বলিস তো চাঁদা তুলে তোর মায়ের চিকিৎসা করাই।

– সে কি? বাবা একটু আমাকে জানাতে পারত।

– তোর বাবা ফোন করে করে হতাশ হয়ে অভিমানে ফোন করা ছেড়ে দিয়েছে।

– কাকু বাবার অ্যাকাউন্ট নাম্বার আমার জানা আছে। আজকেই আমি দশ লাখ টাকা ট্রান্সফার করে দিচ্ছি। তুমি একটু দাঁড়িয়ে থেকে চিকিৎসা করাও। লাগলে আরও পাঠাব। আমি যত তাড়াতাড়ি পারি দেশে ফিরব।

টাকা এল। চিকিৎসাও হল। পেল না অন্তরাত্মার পদধ্বনি। সেই অন্তরাত্মার অভাবে শেষ জীবনীশক্তি ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হতে লাগল। এ রোগের শেষ পরিণতি বড়ো মর্মান্তিক। সেই মর্মান্তিকতার চরম মুহূর্তের আগে পর্যন্ত ঝাপসা স্থির দৃষ্টিতে শুধু একটাই প্রলাপ

– মিঠুর ফোন পেলে গো? আমার শরীর খারাপের কথা বলোনি তো। ও যে বড়ো কষ্ট পাবে। মিথ্যে আশ্বাস পাথেয় করে মৃন্ময়ী ভোরবেলা চলে গেল।

আজ সতেরোই শ্রাবণ। ঘন কালো মেঘে আকাশটা নীচে নেমে এসেছে। প্রকৃতির অশ্রুধারা দু’কূল প্লাবিত করছে। সে অশ্রু মোছাবার কেউ নেই। এই কালান্তক দিনটি তরুণের বড়ো একার। একা কাঁদবার দিন। মালা, ফুল, চন্দনে অপরূপ সাজে সেজেছে। আজ যে মা-মেয়ের জন্ম মৃত্যু দিন। ভরপেট্টা মাল টেনেছে এই উৎসবে। বেসামাল তরুণ মা-মেয়ের সামনে দাঁড়িয়ে অবুঝ বালকের মতো প্রশ্ন করে– আমাকে এভাবে ঠকালি কেন বল তো? এখানে ফেলে রেখে তোরা সুখে আছিস তো? এবার তরুণ আর সামলাতে পারে না। দু-চোখ বেয়ে অবিরত ধারা বেয়ে আসে। একটু থেমে বায়না করে– আমাকে তোরা নিবি? এ শরীরের বোঝা আর যে টানতে পারছি না। রূপাঞ্জনার প্রতিকৃতি জীবন্ত মূর্ত প্রতীক হয়ে আর্জি মঞ্জুর করে– চলে এস বাবা। ওখানে যে তুমি পাঁকে তলিয়ে যাচ্ছ। তিনদিন পর বাড়িটার ভেতর থেকে পচা দুর্গন্ধ এলাকা ভারী করে তুলল।

মালতিটা কাজ করে ভালো। বাসন মাজা, রান্না করা, কাপড় কাচা, দাদুর স্নানের জল তোলা। এসব কাজে খুঁত রাখে না। তবে একটু টকেটিভ। চান্স পেলেই ডিভিডি চালাবে। আদিত্যর অসুবিধা হয় না। বোবা ঘরে তবু একটা কথা বলার লোক তো আছে। যতক্ষণ থাকে ঘরটা কথাময় করে রাখে। আদিত্য খাটে শুয়ে খবরের কাগজটা সামনে নিয়ে পুরু লেন্সের চশমাটা নাকের ডগায় রেখে রাজনীতির দুবৃত্তায়ন হজম করছিল। মালতি বাইরে থেকে ছুটতে ছুটতে এসে আদিত্যকে সংবাদটা দেয়– দাদু বাইরে বিশুর চায়ের দোকানে চ্যাঁচামেচি হচ্ছে, শুনতে পাচ্ছ না?

আদিত্য ভাবলেশহীন কৌতুক প্রকাশ করে বলে– কই না তো।

– সে কি, কত লোক জড়ো হয়েছে, তুমি শুনতে পাচ্ছ না?

– তাহলে চ্যাঁচামেচিটা বোধহয় আস্তে আস্তে হচ্ছে। একরকম জোর করে মালতি আদিত্যকে বাইরে টেনে আনে।

দিশেহারা ভীত সন্ত্রস্ত চান্দ্রেয়ী কোলের ছেলেটাকে বিশুর চায়ের দোকানে বসায়। বাচ্চাটা ক্ষিদের ক্লান্তিতে কেমন নেতিয়ে পড়ে। চান্দ্রেয়ী এ ব্যাগ সে ব্যাগ থেকে এক প্যাকেট দলা পাকানো বিস্কুট বের করে। বিশুর দিকে তাকিয়ে করুণ ভাবে বলে– দাদা এক গেলাস দুধ দেবেন? বিশু না করে না। দুধ বিস্কুট খেয়ে শক্তি ফিরে পায়। স্বভাবসিদ্ধ চরিত্রে এদিক ওদিক ছুটোছুটি করতে থাকে। উদ্দেশ্যবিহীন চান্দ্রেয়ীকে বাঁশের খুটিতে হেলান দিয়ে বসে থাকতে দেখে বিশুর কৌতুহলী মন জিজ্ঞাসা করে– এই মেয়ে তোমার নাম কি? চান্দ্রেয়ী নির্বাক। তুমি কোথায় থাকো? মনের বিভ্রান্তি তাকে আড়ষ্ট করে রাখে।

– আরে এ মেয়ে তো কোনও কথার উত্তর দেয় না। তোমার স্বামীর নাম কি? কোনও উত্তর না পেয়ে বিশুর মেজাজ এবার সপ্তমে।

– দুধ চাইবার বেলা তো বেশ কথা ফুটছিল। দাও তো বাপু, পয়সাটা দাও। লেডিস ব্যাগটা খুলে এদিক ওদিক ঝাঁকিয়ে করুণভাবে চান্দ্রেয়ী বলে,

– দাদা পয়সা যে নেই।

– সেটা তো আগে বলতে হয়। আগে বললে বাচ্চাটার জন্য বিশু দুধ দিত কি আদৌ দিত না সে প্রসঙ্গ অপ্রাসঙ্গিক। কিন্তু পাড়ার চায়ের দোকানে তার বচনে লোক সমাগমের সূত্রপাত এখানেই। আদিত্য কাছে এসে সবাইকে উদ্দেশ্য করে বলে– বাপু তোমরা একটু সরো তো। মেয়েটা আসলে ঘাবড়ে গেছে। আদিত্যকে এ পাড়ার লোকজন কতকটা বয়সের কারণে কতকটা সজ্জন ব্যক্তিত্বের কারণে মান্য করে। তারা একে একে সরে যায়। বেশি দূর যায় না। দাঁড়িয়ে থাকে।

– এ-ই মেয়ে তোমার নাম কী? স্নেহমাখা এই প্রশ্নে পিতৃমাতৃহীন মেয়েটা বাপের অজস্র স্নেহ ধারা বইতে থাকে। মেয়েটার মুখে কথা ফোটে– চান্দ্রেয়ী মিত্র।

– বাড়ি কোথায়?

– রায়গঞ্জ, বকুলপুর।

– থানা পোস্টঅফিস জানা আছে?

– না তা তো জানি না।

– তোমার স্বামীর নাম কি?

রজতশুভ্র মিত্র।

– মোবাইল নাম্বার আছে

– না, আমার মোবাইলটাও তো ফেলে এসেছি।

– তাহলে এভাবে তো কারও হোয়্যার এবাউটস জানা যাবে না। তুমি চাইলে আমার বাড়িতে গিয়ে থাকতে পারো। আমার ঘরে আমি ছাড়া আর কেউ নেই। মেয়েমানুষ এখন কোথায় যাবে? তারপর দেখছি কী করা যায়। স্বামীর সাথে মান-অভিমানের পালা চলছে? পাগলি মেয়ে, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মান-অভিমান মনোমালিন্য এসব হয়ই। তাই বলে এভাবে নিরুদ্দেশের পথে কেউ পা বাড়ায়? আর দেরি কোরো না, চলে এস। পালহীন নৌকো তীর খুঁজে পেয়েছে। দেবদূতের মতো সন্তানস্নেহে যে মানুষটা তাকে আশ্রয় দিতে চাইছে, সে যে তার বাবারই সমগোত্রীয়।

আদিত্য বুড়োর একাকিত্ব ঘুচেছে। চান্দ্রেয়ী, মালতির সেবাযত্নে নিভে যাওয়া প্রদীপের সলতে আবার তিরতির করে জ্বলে উঠেছে। আর ছোট্ট শিশুটির আধো আধো বুলিতে গোটা বাড়িটা বর্ণময় করে তুলছে। তাকে জিজ্ঞাসা করে

– দাদুভাই তোমার নাম কি?

– ছিচন মিত্ত।

চান্দ্রেয়ী শুধরে দেয়– বলো দাদুভাইকে সিঞ্চন মিত্র। ছোট্ট কথাকলির দস্যিপনায় বুড়ার হাড়গোড়ের মরচেগুলো ছাড়তে শুরু করেছে। কখন যে সকাল গড়িয়ে রাতের আঁধার নেমে আসছে, সে হিসেবের খাতা খোলার বুড়োর সময় নেই। হঠাৎই কাগজে নিরুদ্দেশের প্রতি, এক বিজ্ঞাপনে আদিতের নজর পড়ে। আদিত্যের বুঝতে অসুবিধা হয় না। পোস্টআফিসে চিঠিখানা ড্রপ করে দিন গুনতে থাকে। প্রদীপের তেল একটু একটু করে নিঃশেষিত হচ্ছে। জেগে ওঠা দীপ্তিময় জীবনে রাতের আঁধার নেমে আসছে।

সিঞ্চন বাইরের বারান্দায় খেলা করছিল। বলে ওঠে– বাবা বাবা। বাসন মাজতে মাজতে মালতি ঘরে ঢুকে বলে– দাদু, বাইরে কে একজন তোমার কাছে এসেছে।

– ও এসে গেছে। ঘরে আসতে বল। রজত ঘরে ঢুকেই আদিত্যকে প্রণাম করে। আদিত্যর অনুমতিতে বসে। এদিক-ওদিক তাকায়।

– তাহলে তুমিই রজতশুভ্র মিত্র।

– আজ্ঞে হ্যাঁ

– বেশ। মালতিকে উদ্দেশ্য করে বলে। – মালতি, চান্দ্রেয়ীকে ডেকে দে তো মা। রজতকে দেখে তার দুচোখ বেয়ে ঝর ঝর করে জল পড়তে থাকে। এ অশ্রুবর্ষণের গভীরতা বহুদূর বিস্তৃত। স্বামী দর্শনের ভিতর থেকে নির্দিষ্ট হয়ে যায়, যে সংসারের প্রদীপ সে তুচ্ছ অভিমানে নিভিয়ে এসেছিল, সেই প্রদীপ আবার জ্বেলে সংসারকে সে আলোকিত করবে। এক চোখে বইছে অনাবিল আনন্দের অশ্রুধারা, আর ওই যে অসহায় বৃদ্ধ মানুষটা সন্তান বাৎসল্যে, সস্নেহে এই কটাদিন লালিত করেছে, নাতিকে পেয়ে জীবনের দীপশিখা প্রজ্জ্বলিত হচ্ছিল, রজতের হাত ধরে বেরিয়ে যেতেই তার প্রদীপের শিখা যে ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হবে। সে চোখের জল সম্বরণ করা যায় না। আবেগ মানুষের চিরন্তন ধর্ম। সেই আবেগ হাসায়। সেই আবেগ চোখের জলে বুক ভাসায়। আবেগে ছেদ পড়ে আদিত্যের ডাকে– মা রজতকে খেতে দেওয়ার বন্দোবস্ত করো। ছেলেটা কতদূর থেকে এসেছে। রজতের দিকে তাকিয়ে বলে– তা বাবা আজ রাতটা থেকে কালকে না হয় সকালেই যেও, অতদূরের পথ। সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। রজত বাধা দেয় না।

সেই রাতে আদিত্য বুড়োর প্রবল জ্বর আসে। প্রলাপ বকতে থাকে– দাদু ভাই, আমার ঘোড়াটা দিয়ে যা। আমি যে হেরে যাচ্ছি। খবরটা মালতিই রাধিকারঞ্জনকে দেয়। রাধিকারঞ্জন দেরি করে না। হাসপাতালে ভর্তি করে বাইরে বেরিয়েই মিঠুকে ফোন লাগায়। রিং বাজতেই মিঠু ফোনটা ধরে– হ্যাঁ জেঠু বলো, বাবা, তোমরা কেমন আছ?

– হ্যাঁ মা, এখনও তোর আসার সময় হল না– এবার যে তোর বাবাও চলেছে রে। এক ভয়ংকর অজানা জ্বরে সঙ্গাহীন। জেঠু ফোনটা রাখ, আমি আসছি।

এয়ারপোর্ট থেকে ট্যাক্সি নিয়ে হাসপাতালে পৌঁছোয়। উদভ্রান্ত উন্মাদের মতো ছুটতে ছুটতে বাবাকে জড়িয়ে ধরে– বাবা আমি এসেছি। এই দেখো তোমার মিঠু। আর তোমাকে ফেলে যাব না। আদিত্য আবছা প্রলেপে তখনও প্রলাপ বকেই চলেছে– দাদুভাই এলি? ঘোড়াটা দিয়ে যা। আমি যে মাত হয়ে যাচ্ছি। আমাকে যে জিততেই হবে।

দুরন্ত ঘোড়া একসময় শান্ত হয়। প্রাচুর্যের ঢক্বানিনাদে বসে দায়িত্ব, কর্তব্য, মূল্যবোধ, জীবনের সার্থকতার তাৎপর্য সে বুঝতে পারে না। সে তখন ফিরতে চায়। অবহেলায় ফেলে যাওয়া সেই রত্নভাণ্ডারকে সংসারের ধ্বংসস্তূপের ভিতর খুঁজতে থাকে। পায় না। কোনওদিন পাবে কিনা, কে জানে।

কয়েদি

আজকাল শব্দটা সারা দিনরাত মাথার ভিতর বাজতে থাকে। ধুপ ধুপ ধুপ… আওয়াজটা ঘুমের মধ্যেও শুনতে পায় সরতাজ। রাত যত গভীর হয়, চারপাশের ক্রমবর্ধমান নৈঃশব্দের সাথে সাথে শব্দটার তীব্রতাও বাড়তে থাকে। মাথার ভিতরকার স্নায়ুগুলি যেন সব জট পাকিয়ে গেছে, মুক্তির আশায় প্রাণপণ টানছে, ছিঁড়ে বেরিয়ে যেতে চাইছে মাথার খুলি ভেদ করে। একটা বিস্ফোরণের অপেক্ষায় আছে সরতাজ। একটা ঘোরতর বিস্ফোরণ প্রয়োজন, যেটা তার নামের জায়গায় সেঁটে থাকা নম্বরটাকে ধ্বংস করে দেবে।

সরতাজ সিং, গাঁও সুলহানি, জেলা ফিরোজপুর, পঞ্জাব প্রদেশ। শব্দবন্ধগুলো মনে হয় যেন গত জন্মের কোনও বিস্মৃতপ্রায় অতীতের ছায়া। এখন সরতাজ শুধুই কয়েদি নম্বর একশো সাইত্রিশ। দিনের বেলা ঘন্টার পর ঘন্টা জেলের কমিউনিটি কিচেনের রাবণের চিতার মতো দাউদাউ করে জ্বলতে থাকা আগুনের সামনে দাঁড়িয়ে পাহাড়প্রমাণ ডেকচিতে ডাল সবজির জাউ রাঁধে সরতাজ। গনগনে ধোঁয়ায় চোখ জ্বালা করে। দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসে সরতাজ সিং-এর। সেই ধোঁয়ার ভিতরে কখনও কখনও একটা চেনা মুখ ভেসে উঠেই মিলিয়ে যায়।

বড়ো আবছা সে মুখ, এখন আর মনে পড়ে না স্পষ্ট। শুধু সেই ধোঁয়ার ভিতর থেকে ঝিকিয়ে ওঠা নাকছাবিটা স্পষ্ট দেখতে পায় সরতাজ। লম্বা ভারী হাতাটা ডালের ভিতর চালাতে চালাতে মাথার ভিতরটা প্রাণপণে হাতড়াতে থাকে সে। দরদর করে লবণাক্ত ঘাম গড়ায় তার মাথা, গলা, বুক, পিঠ বেয়ে জিভে ঠেকে নোনতা স্বাদ। সরতাজ এলোমেলো হয়ে জড়িয়ে যাওয়া স্মৃতির তন্ত্রী ঘেঁটে চলে। কবে কোথায় পথের কোন বাঁকে দেখা হয়েছিল সেই চেনা মুখের সাথে, কিছুতেই মনে পড়ে না।

এগারো বছর কম সময় নয়। সরতাজ সিং এগারোটা বছর এই জেলের উঁচু দেয়ালের ও-প্রান্তের পৃথিবীকে দেখেনি। আজকাল আর মনে পড়ে না বাইরের পৃথিবীর কথা। মাথার ভিতরে সব যেন ধোঁয়াটে লাগে। বেশি ভাবতে গেলে মাথায় খুব যন্ত্রণা হয়। দীর্ঘদিন ধরে জেলের ভেতরে অমানুষিক শারীরিক নির্যাতন চলেছে তার উপরে।

জেলের ডাক্তারসাহেব বলেছেন, সরতাজ সিং-এর মস্তিষ্কের স্নায়ুগুলো শুকিয়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। স্মৃতিশক্তির উপর ঢেকে যাচ্ছে কুয়াশার অস্বচ্ছ আবরণ। আজকাল মাঝে মাঝে বুকের বাঁ দিকে অসহ্য যন্ত্রণা হয়। নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে তখন। বয়স বাড়ছে সরতাজ সিং-এর। তার পাহাড়ের মতো বিশাল দেহটা দেখে নতুন কয়েদিরা সম্ভ্রমের দৃষ্টিতে তাকায়, পুরোনোরা মুখ দিয়ে চুক চুক শব্দ করে মাথা নাড়ে। আহা, এই সরতাজ সিং-এর নামে একদিন গোটা ফিরোজপুর জেলা কাঁপত। কত যে খুন জখম তোলাবাজির কেস ছিল তার নামে, সে হিসাব বোধ করি সে নিজেও রাখত না। ক্ষমতাসীন দল, বিরোধী দল সকলেই সমীহ করে চলত এই সরতাজ সিংকে।

সরতাজ সিং-এর কোনও দলের দরকার হতো না, দলেদের দরকার হতো তাকে। সে নিজেই ছিল একটা প্রতিষ্ঠান। সেসবও দিন ছিল, যখন সরতাজ সিং ছিল ফিরোজপুরের মুকুটহীন সম্রাট।

আজ আর সেই রামও নেই, সেই অযোধ্যাও নেই। সরতাজ সিং-এর সিংহের কেশরের মতো দাড়িতে পাক ধরেছে। কালোর মাঝে মাঝে রূপোলি রেখা ভেসে উঠেছে। তার সেই আগেকার রুক্ষ কঠোর দৃষ্টি আজকাল কেমন যেন ক্লান্ত, করুণ দেখায়। কখনও কোনও অলস বিকেলে জেলের হেঁশেলের বারান্দায় বসে আকাশের দিকে তাকিয়ে আপন মনেই বিড়বিড় করে চলে সরতাজ। কী যে বলে, কাকে দোষারোপ করে কে জানে!

নিজের হাতের তালু উলটেপালটে দেখে। কী যেন খুঁজে চলে খাঁজে কড়া পড়া দুই হাতের রেখায়। কখনও আবার গলা ছেড়ে গান ধরে পঞ্জাবের মাটির সুরে। অন্য কয়েদিরা আসা যাওয়ার পথে থমকে দাঁড়ায় কিছু মুহূর্তের জন্য। অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে তার দিকে। সেই গান কান পেতে শোনেন আরেকজন, তিনি জেলর গগনজিত কপূর। মাথার ভিতরে সেই সুর গুমরে মরে তাঁরও। সরতাজ সিং-এর গান শুনে তিনিও ফিরে যান তাঁর ফেলে আসা অতীতে।

ভাতিন্ডা থেকে ফিরোজপুরে বদলি হয়ে এসে সরতাজ সিং-এর নাম কানে আসতে দেরি হয়নি গগনজিত কপূরের। তাঁকে এটাও বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছিল, জলে বাস করে কুমীরের সাথে শত্রুতা চলে না। সরতাজ সিংকে ভয় পায় না, এমন লোক ফিরোজপুরে নেই। সুতরাং নবাগত অফিসারকে যে সরতাজকে ভয় হোক বা সমীহ, কিছু একটা করতেই হবে তা তো বলে দেওয়ার অপেক্ষা রাখে না।

গগনজিত কপূরও শুরু শুরুতে সরতাজ সিংকে সমঝে চলার চেষ্টাই করেছিলেন। দেশি কাট্টা, ম্যাগাজিনের অবৈধ চোরাচালানের বিশাল রমরমা ব্যাবসা ছিল সরতাজ সিং-এর। পুলিশ, প্রশাসন সবাই ছিল তার হাতের মুঠোয়। ভোটের আগে ক্ষমতাসীন ও বিরোধী, দুই দলের ফান্ডেই সরতাজ সিং-এর অনুদান জমা হতো। সাথে তাদের হাতে হাতে ঘুরত সরতাজ সিং-এর কারখানায় তৈরি দেশি অস্ত্র। দুই হাতে জলের মতো টাকা ছড়াত সরতাজ। নেতা মন্ত্রীরাও ছিল তার কৃপাধন্য। সরতাজ সিং-এর হাত যার মাথার উপর, গদিও তারই খাতে বরাদ্দ হতো।

কিন্তু দিন কারও একরকম যায় না। কোন ছিদ্রপথে সরতাজ সিং-এর ইস্পাত-দৃঢ় হৃদয়ে ভিতর এক চিলতে তুলতুলে নরম দুর্বলতা গোপনে ঘাঁটি গাড়তে শুরু করেছিল, তা সে বোধ করি নিজেও জানতে পারেনি। নইলে সরতাজ সিং-এর কি নারীর অভাব? এতদিন যারা তার বিছানা গরম করেছে, তারা তো সরতাজ সিং-এর সামান্য ইশারার জন্য উন্মুখ হয়ে থাকত। প্রেম ভালোবাসার মতো দুর্বলতা তার ছিল না কোনও দিন। আর ঠিক সেই কারণেই সে ছিল অপ্রতিরোধ্য। কিন্তু তারপর একদিন সব ওলোট পালট হয়ে গেল হঠাৎই। সরতাজ সিং প্রেমে পড়ল।

গগনজিত কপূর উঠে গিয়ে খোলা জানলার সামনে দাঁড়ালেন। বাইরে আকাশে ঘন কালো মেঘ করেছে। বৃষ্টির ছাঁট সূচের মতন এসে বিঁধছে তাঁর চোখেমুখে। তবু জানলাটা বন্ধ করতে ইচ্ছে করছে না। সরতাজ সিং আজ আবার গাইছে। বুকের ভিতরকার কোন চোরা কুঠুরিতে লুকিয়ে রাখা তীব্র যন্ত্রণা গলে গলে মিশছে সেই সুরে। জেলখানার উঁচু প্রাচীরের গায়ে ধাক্কা খেয়ে ফিরছে সেই সুর, অনুরণিত হচ্ছে এক সুতীব্র হাহাকার। গগনজিত বেশ শব্দ করে জানলাটা বন্ধ করে দিলেন। ঠিক যতটা জোরে শব্দ হলে সংগীতের শব্দ ভেঙে চুরে যায়, তার চেয়ে বেশি শক্তি প্রয়োগ করলেন তিনি। বুকের ভিতরটা তোলপাড় করছে। চেয়ারে বসে দুই হাতে মাথার চুল খামচে ধরলেন জেলরসাহেব।

চাঁদনি মেয়েটা চাঁদের মতোই সুন্দর ছিল। সহজ সরল পঞ্জাবি মেয়ের মদ-মাতাল হাড়বজ্জাত বাপটা মেয়েকে পাত্রস্থ করার জন্য উঠে পড়ে লেগেছিল। মেয়ের বিয়ে দিয়ে কিছু আদায় উশুল করে নেবার ধান্দায় ছিল বুড়ো। অন্তত এমন চটকদার মেয়ের পরিবর্তে কয়েক মাসের মতো পাঁইটের ব্যবস্থা তো হয়ে যেত।

বস্তিতে লুকোনো চোরাই মালের রেড করতে গিয়ে চাঁদনির দেখা পেয়েছিলেন গগনজিত কপূর। কয়েক মুহূর্তের জন্য দৃষ্টি স্থির হয়েছিল মেয়েটার মুখে। অভিজ্ঞ দৃষ্টি বুলিয়ে বুঝে নিয়েছিলেন, একে দিয়ে তাঁর কাজ হবে। এই মেয়ে হবে তাঁর টোপ। সরতাজ সিংকে বঁড়শিতে গাঁথতে পারলে প্রোমোশন তাঁর পাকা, কেউ আটকাতে পারবে না। শুধু প্রোমোশনের লোভ নয়, সরতাজ সিং-এর মতন সাক্ষাৎ শয়তানকে শিক্ষা দেওয়ার একটা সুতীব্র ইচ্ছে পেয়ে বসেছিল তাঁকে।

পুলিশের উর্দি গায়ে চাপিয়ে শয়তানটাকে সেলাম ঠোকার অসহায়তা আর সহ্য হচ্ছিল না। চাঁদনির বাপটাকে টোপ গেলাতে অসুবিধে হয়নি। টাকা আর মদের বোতল পেয়ে বুড়ো খুশি মনে কন্যেকে জবাই হতে পাঠিয়েছিল। চাঁদনি বুড়ো বাপের হাতে পায়ে ধরেছিল, বুড়োটা দুবার হ্যাট হ্যাট করে লাথি মেরে টলতে টলতে গুনগুন করে গান ধরে, ঘর থেকে বেরিয়ে গেছিল সেদিন। একবারের জন্যও ফিরে তাকায়নি মেয়ের দিকে।

সরতাজ সিং-এর মতো পাক্কা খেলুড়েও চাল চিনতে ভুল করেছিল। চাঁদনিকে নিজে হাতে করে ট্রেনিং দিয়েছিলেন গগনজিত কপূর। একটা সোজা সরল বস্তির মেয়েকে ঘষে মেজে পুলিশের চর হিসেবে গড়ে তোলার কাজটা সহজ ছিল না। কিন্তু কপূরসাহেব সেই অসাধ্যই সাধন করেছিলেন। সরতাজ সিংকে প্রেমের জালে জড়িয়ে তার সব গোপন খবর তুলে দিতে হবে পুলিশের হাতে। খুব অল্প সময়ে সব শিখে নিয়েছিল চাঁদনি, হয়ে উঠেছিল পুলিশের শিক্ষিত চর। সে তখনও জানত না, কোন কাজের জন্য তৈরি করা হচ্ছে তাকে। নির্মোহ, বীতস্পৃহ মন নিয়ে খুব অল্প সময়ে মধ্যে সব শিখে নিয়েছিল চাঁদনি।

সময় থেমে থাকে না। সরতাজ সিং-এর দিকে চাঁদনিকে এগিয়ে দেওয়ার জন্য ছোট্ট একটা নাটকের দরকার ছিল, সেটাও মসৃণ ভাবে উতরে গেছিল। মাঝরাত্তিরে কোনও অনাথিনী যদি দুর্বৃত্তদের হাত থেকে পালিয়ে সরতাজ সিং-এর আশ্রয় ভিক্ষা করে, সর্বশক্তিমান সরতাজ কি তাকে ফিরিয়ে দিতে পারে? সরতাজ সেই মুহূর্তে কল্পনাও করতে পারেনি, ত্রস্ত চড়ুই পাখির মতো তিরতির করে প্রাণভয়ে কাঁপতে থাকা মেযেটা শুধুই অভিনয় করছে। কিংবা হয়তো সত্যিই সে অভিনয় করছিল না। সরতাজ সিং-এর মতো ভয়ংকর মানুষের হাতে নিজেকে তুলে দেওয়ার মুহূর্তে নরম মেযেটা হয়তো সত্যিই শঙ্কা, লজ্জায় কেঁপে উঠেছিল।

হায় মোহ! মোহের কারাগার থেকে নিজেকে রক্ষা করা কি আর এতই সহজ? ইতিহাস সাক্ষী, এই রিপুর কারণে বারবার রক্তক্ষয় হয়েছে, বদলে গেছে পৃথিবীর মানচিত্র। দুটি মানুষের বুকেও মোহের প্লাবন উত্তাল হয়ে উঠছিল সেই দিনগুলোয়। ভযংকর সরতাজ, কুখ্যাত সমাজবিরোধী সরতাজ, যার ভয়ে সারা ফিরোজপুর কাঁপে, শিশুর মতো হৃদয়ে আশ্রয় খুঁজে চলেছিল আরেকটি হৃদয়ে একটা সাধারণ মেয়ের প্রতি অন্ধ মোহ ধীরে ধীরে বদলে দিচ্ছিল তাকে। আর আরেকজন, যিনি নিজের হাতে চাঁদনিকে তুলে দিয়েছিলেন শয়তানের হাতে, তাঁরও বুকের ভিতর যে কী ভীষণ ঝড় চলছিল, তা সেদিন আর কেউ জানতে পারেনি।

একদিকে চাঁদনির প্রতি তাঁর অদম্য আকর্ষণ, অপরদিকে তাঁর কর্তব্য, প্রতিদিন একটু একটু করে ক্ষয় করছিল তাঁকে। কখনও মনে হতো, থাক আর দরকার নেই, ফিরিয়ে নিয়ে আসি তাকে। আবার মনে হতো আর তো মাত্র কটা দিন। চাঁদনি তার দায়িত্ব সুচারুরূপেই পালন করে চলেছে। গত দুই মাসে সরতাজের একখানা বড়ো কনসাইনমেন্ট ধরা পড়েছে। আরও কিছু মালপত্র উদ্ধার হয়েছে সীমান্তের গ্রামগুলি থেকে। সরতাজ সিং-এর ব্যাবসায় একটা বড়োসড়ো ধাক্কা দেওয়া গেছে। এইখান থেকে ফিরে আসা যায় না।

হায়, যদি সেদিন তিনি ফিরিয়ে আনতেন চাঁদনিকে। গত এগারো বছর ধরে এই প্রশ্নটাই নিজেকে বারবার করেছেন গগনজিত কপূর। কেন? কীসের পেছনে ছুটছিলেন তিনি? কী পেতে চেয়েছিলেন? সরতাজ সিং-এর মতন পাষণ্ডের দিকে সব জেনেশুনে কেন ঠেলে দিয়েছিলেন চাঁদনিকে? আর চাঁদনি? তাকে তো তিনি নিজের হাতে দক্ষ চর হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন। নিজের হাতে যত্ন করে শিখিয়েছিলেন চরবৃত্তির প্রথম আবশ্যিক পাঠ, একজন সুদক্ষ চরের হৃদয় থাকতে নেই। প্রেম, দয়া-মায়ার মতন হৃদয়াবেগের কোনও জায়গা নেই সেই কাজে। সে কী করে এত বড়ো ভুল করল? বোকা মেয়েটা কী করে সরতাজ সিং-এর মতো একটা পাষণ্ডের জালে নিজেকে জড়িয়ে ফেলল?

এরকমই ভাবেন গগনজিত কপূর, ভাবতে ও বিশ্বাস করতে প্রাণপণ চেষ্টা করেন। হয়তো নিজেকে সান্ত্বনা দেওয়ার এই চেষ্টাটাই তিনি চালিয়ে যাচ্ছেন গত এগারোটা বছর ধরে। ভেবে শান্তি পান যে, চাঁদনি সত্যিই ভালোবাসেনি সরতাজকে। শুধু ক্ষণিকের জন্য আত্মবিস্মৃত হয়েছিল। সরতাজ ওকে মিথ্যে প্রেমের স্বপ্ন দেখিয়ে প্রলুব্ধ করেছিল, বোকা মেয়েটা একটা ভুল করেছিল। নইলে সরতাজের প্রেমে পড়তে পারে না সে। চাঁদনি শুধু তাঁর, গগনজিত কপূরের। নিষ্ফল আক্রোশে অন্ধ হয়ে গিয়েছিলেন গগনজিত।

চাঁদনির তরফ থেকে সবরকম খবরের সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছিল। নরম কোমল মেযেটা নাগিনির মতো ফোঁস করে মাথা তুলেছিল। তেজোদৃপ্ত স্বরে গগনজিত কপূরের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে জানিয়েছিল, আর কোনও ভাবেই সরতাজের বিরুদ্ধে তাকে ব্যবহার করা যাবে না। সরতাজকে সে ভালোবাসে।

ভালোবাসে! এত বড়ো কথা? চাঁদনি সরতাজ সিংকে ভালোবাসে? একটা সমাজবিরোধী, দাগি অপরাধী, সাক্ষাৎ শয়তানের দূত, চাঁদনি নাকি ভালোবাসে তাকে! সারা শরীরের রক্ত প্রবল বেগে মস্তিষ্কের দিকে ছুটতে থাকে গগনজিত কপূরের। প্রচণ্ড ক্রোধে উন্মাদ হয়ে ওঠেন তিনি। চাঁদনিকে যে-নরক থেকে তুলে এনেছিলেন তিনি, সেখানকারই যোগ্য সে। নইলে স্বেচ্ছায় কেউ সরতাজ সিং-এর কণ্ঠলগ্না হতে চায়?

ছি ছি, একটা নরকের কীট, সে কি না দংশন করবে গগনজিত সিং-এর বাগানের ফুলকে! সেই মুহূর্তে তিনি ভুলে যান, তিনি নিজেই তো সেই উদ্দেশ্যে চাঁদনিকে পাঠিয়েছিলেন সরতাজ সিং-এর কাছে। ভুলে যান, তখন চাঁদনি তাঁর কাছে ছিল শুধু তাঁর উদ্দেশ্যপূরণের, উপরে ওঠার সিঁড়ি। নিস্ফল আক্রোশে নিজের হাত কামড়াতে থাকেন গগনজিত কপূর।

সরতাজ সিং তার জীবনে মেয়েমানুষ কম দেখেনি। তবে এতদিন নারীদেহ তার কাছে শুধুই ছিল ভোগের উপকরণ, রাত শেষ হলে উচ্ছিষ্টের মতন যাকে আস্তাকুঁড়ে ছুড়ে ফেলা যায়। কিন্তু চাঁদনি মেযেটা অন্যরকম। আজকাল সরতাজের একটা সুস্থ জীবন পেতে খুব ইচ্ছে করে। একটা সুখী গৃহকোণ, চাঁদনিকে নিয়ে নিশ্চিন্ত জীবনের প্রতি বড়ো লোভ হয় সরতাজের। প্রথমবার কোনও নারীকে তার শুধু শরীর নয়, আস্ত একটা মানুষ বলে মনে হয়। যার নরম চোখে চোখ রেখে কাটিয়ে দেওয়া যায় একটা গোটা জীবন।

চাঁদনিকে নিয়ে এই ফিরোজপুর, এই অপরাধের জগৎ ছেড়ে দূরে কোথাও চলে যাবে সরতাজ। এখানে থাকলে তার অপরাধ, তার কলঙ্কিত অতীত, তার পিছু ছাড়বে না। চাঁদনিও তাই চায়। অর্থের অভাব নেই তার। দুজনে মিলে নতুন কোনও জায়গায় তাদের সুখের নীড় গড়ে তুলবে। ভাবতে ভাবতে তৃপ্তিতে সরতাজ সিং-এর ঠোঁটের কোণে হাসি খেলে যায়। বক্ষলগ্না প্রেয়সীর কপালে চুমু খায় স্নেহভরে।

 

বাইরে বৃষ্টি থেমে গেছে। দীর্ঘ জ্যৈষ্ঠদিনের শেষের এই বৈকালিক বর্ষণ শীতলতার পরশ বুলিয়ে গেছে তাপদগ্ধ মৃত্তিকার বুকে। কিন্তু দীর্ঘ এগারো বছর ধরে যে-প্রচণ্ড দাহ চলছে গগনজিত কপূরের বুকের ভিতর, তা নিভবে কোন শান্তিজলে?

সন্ধ্যা নেমেছে। সরতাজ সিং-এর গান থেমে গেছে কখন। কয়েদিদের নম্বর মিলিয়ে একে একে সেল-এ ঢোকানো হচ্ছে। সেদিনও এমনই এক গ্রীষ্মের সন্ধ্যা ছিল। দিন শেষে আজকের মতোই বৃষ্টি হয়েছিল সেদিনও। গোটা ফিরোজপুর শহরটা সেদিন সেজেছে আলোর মালায়। সরতাজ সিং-এর বিয়ে বলে কথা, উত্সবই হবে বই কি।

পুলিশ চৌকির নিঃসঙ্গ কেবিনে বসে একটার পর একটা সিগারেট শেষ করে চলেছিলেন গগনজিত কপূর। আহ্, অপেক্ষার প্রহর কী দীর্ঘ! আজ চাঁদনি ফিরে আসবে, বিয়েবাড়ির আলো নিভে যাবে, বাজনা থেমে যাবে। সরতাজ সিং-এর মোহজাল ছিন্ন করে চাঁদনি ছুটে আসবে গগনজিতের কাছে, তাঁর বাহুডোরে ধরা দেবে তাঁর প্রেয়সী।

এতক্ষণে তো সরতাজ সিং-এর কাছে খবর পৌঁছে যাওয়ার কথা। যাকে ভালোবেসে সরতাজ সিং জীবনসঙ্গী বানাতে চলেছে, সে শুধুমাত্র একজন পুলিশের চর। আগাগোড়াই মিথ্যে দিয়ে সাজানো, পুরোটাই তার অভিনয়। নিজের মনেই একা বসে মিটিমিটি হাসতে থাকেন কপূরসাহেব।

জলদি চলুন স্যার, সরতাজ সিং তার হবু স্ত্রীকে বিয়ে মণ্ডপ থেকে তুলে টানতে টানতে জিপে বসিয়ে কোথায় নিয়ে গেছে। মেয়েটাকে কিছু করে না ফেলে।

খবরটা পেয়ে পায়ের নীচ থেকে মাটি সরে গেছিল গগনজিত কপূরের। প্রাণপণ দ্রুতগতিতে গাড়ি ছুটিয়েছিলেন তিনি। তবু দেরি হয়ে গেছিল, খুব দেরি হয়ে গেছিল সেদিন। গিয়ে কী দেখেছিলেন তিনি? চাঁদনির রক্তাক্ত নিথর দেহটা মাটিতে পড়ে আছে। সরতাজ সিং একটা ভারী কাঠের বাটাম দিয়ে তার গায়ে আঘাতের পর আঘাত করে চলেছে, ভোঁতা শব্দ হচ্ছে, ধুপ ধুপ ধুপ…।

রক্তে ভেসে যাচ্ছে চারিদিক। সরতাজ সিং-এর চোখে উন্মাদের দৃষ্টি। আট দশজন সেপাই মিলেও ধরে রাখতে পারছিল না তাকে। পাগলের মতো চিত্কার করে চলেছিল সরতাজ সিং, কেন? কেন? কেন? সেই চিত্কার কপূরসাহেবের কানে সেদিন হাহাকারের মতো শোনাচ্ছিল। দুই হাতে নিজের কান চেপে ধরে মাটিতে বসে পড়েছিলেন তিনি।

এগারো বছর কেটে গেছে। ফিরোজপুর ছেড়ে আর যাওয়া হয়নি গগনজিত সিং-এর। ওপরতলায় সমস্ত যোগাযোগকে কাজে লাগিয়ে এই জেলেই রয়ে গেছেন তিনি। পদটা হয়তো জেলার কিন্তু তিনি নিজে জানেন, সরতাজের মতন তিনিও কয়েদি এখানে! চাঁদনি এক অদৃশ্য সম্পর্কে বেঁধে দিয়ে গেছে তাঁদের দুজনকে। এই তাঁদের শাস্তি। সরতাজকে ঘৃণা করেন তিনি, প্রবল ঘৃণা। আর সেই ঘৃণাই এগারো বছর ধরে চাঁদনিকে বাঁচিয়ে রেখেছে গগনজিত কপূরের বুকের ভিতর।

স্যারজি, জলদি আসুন, জেলের নিরাপত্তারক্ষীর ডাকে সম্বিত ফিরে পেলেন জেলরসাহেব। ভ্রু কুঁচকে তাকালেন তার দিকে।

কী হয়েছে?

স্যার, কয়েদি নম্বর একশো সাইত্রিশ…, বলে থেমে যায় নিরাপত্তারক্ষী।

কয়েদি নম্বর একশো সাইত্রিশ, সরতাজ সিং, গাঁও সুলহানি, জেলা ফিরোজপুর, পঞ্জাব, দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে আছে জেলের হেঁশেলের বারান্দায়। ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি। যেন অনেকদিন পরে স্মৃতির আস্তর সরিয়ে দেখা মিলেছে সেই নাকছাবি ঝিকিয়ে ওঠা নরম মুখের। সরতাজ সিং-এর চোখের দৃষ্টি আজ স্থির, শান্ত। সব কষ্ট, সব যন্ত্রণা থেকে তার মুক্তি মিলেছে এতদিনে।

মাথার টুপিটা খুলে হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন জেলর গগনজিত কপূর, নিস্পন্দ নিশ্চল। জেলের দেয়ালগুলো যেন কাছে এগিয়ে আসছে তাঁর দিকে, ঘিরে ধরছে তাঁকে। আকাশের দিকে মুখ তুলে তাকালেন গগনজিত। নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে। একটু বাতাস চাই তাঁর, একটু বাতাস…

নিজভূমে পরবাসী

ঊর্মিলা হন্তদন্ত হয়ে ক্যাব-এ উঠে পড়ল। তার কপালে, চিবুকে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে। হাজারও বিরক্তি মুখে মেখে প্রাণেলও উঠে পড়ল একই গাড়িতে। মে মাসের সূর্যের প্রখর তেজে চারিদিক ঝলসে যাচ্ছে। প্রাণেল সিটে বসেই রুক্ষ্ম ঝলসানো গলায় ঊর্মিলাকে বলল, কি যে করো সারাদিন! ছেলেটার দিকে নজর দিতে পারো না। ও দিন দিন উচ্ছৃঙ্খল হয়ে যাচ্ছে। ভালো স্কুলে প্রচুর টাকা দিয়ে অ্যাডমিশন করা নয়, ছেলে গোল্লায় গেলে গার্জিয়ান মিটিং-এ অপমান হজম করা।

ঊর্মিলা নিরুত্তাপ দৃষ্টিতে জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিল। প্রাণেলের কথার প্রত্যুত্তর দেবার প্রয়োজন সে বোধ করল না। ঊর্মিলার কাছ থেকে কোনও প্রত্যুত্তর না পেয়ে প্রাণেল গলার স্বর চড়িয়ে বলল, কী হল! কথা বলছ না কেন! নিজের ত্রুটিগুলো চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছি বলে ঠিক মানতে পারছ না।

ঊর্মিলা আর চুপ করে থাকতে পারল না। প্রাণেলের চোখে চোখ রেখে বেশ ভারী গলায় সে বলল, আমি সারাদিন বাড়িতে বসে থাকি বুঝি চাকরি ফেলে! আমার না হয় মা হিসাবে অনেক ত্রুটি আছে, একথা আমি মেনেই নিলাম। তুমি বাবা হয়ে কোন কর্তব্যটি পালন করো শুনি? একটা কম্পিউটার সেন্টারে পাঁচ ঘন্টার পার্ট টাইম জব করে বাড়িতে বসে আয় করো। যে-টাকা ইনকাম করো তাতে ডাল-ভাতের খরচা হয় না। আজ আমি প্রাইভেট ব্যাংক-এ জব করছি বলে সংসারের চাকা গড়গড়িয়ে চলছে।

প্রাণেল বলল, ও তুমিই যেন পৃথিবীতে একা মহিলা যে ইনকাম করে সংসার চালাচ্ছ! এখন সব মহিলাই রোজগার করে স্বামীদের হেল্প করার জন্য, তাতে হয়েছে কি!

ঊর্মিলা বলল, বাহ্ চমৎকার! দুহাতে রোজগার করে সংসারের জন্য উপার্জন করব আবার কথাও শুনব! প্রাণেল বলল, কথা শুধু শুনছ কি! সে হতাশ গলায় বলল, আমি সংসারের জন্য খুব বেশি টাকা আনতে পারি না বলে, প্রায় রোজই খোঁটা শুনতে হয়। ক্যাব এসে পড়ল তাদের নির্দিষ্ট গন্তব্যে। ঊর্মিলা আর প্রাণেল দুজনেই গাড়ি থেকে নেমে বাড়ির ভিতরে ঢুকল।

ঊর্মিলা বলল, প্রাণেল, তোমাকে যখন ভালোবেসে বিয়ে করেছিলাম, তখন সকলের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হয়েছিল। বিয়ের পর সতেরো বছর সংসারের জন্য ঘরে বাইরে লড়াই করছি। এতদিন পর তোমার সঙ্গে লড়াই করতে ভালো লাগে না। ভালোবাসার মানুষের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আমি আগেই হেরে বসে আছি। বড্ড ক্লান্ত লাগে আজকাল। আর আমি পারছি না।

প্রাণেল নিশ্চুপ থেকে একটু হালকা নিঃশ্বাস ছাড়ল। ঊর্মিলা বলল, সামনের বছর ছেলে মাধ্যমিক দেবে। তার যদি নিজে থেকে পড়াশোনার কোনও আগ্রহ না থাকে তাহলে আমার বা তোমার কী দোষ! সারাক্ষণ ওই কম্পিউটার অথবা মোবাইলে মুখ গুঁজে বসে থাকে ঋক। দ্যাখো ওই করে চোখটা খারাপ হবে। আর বাদবাকি অঙ্গে জং ধরে যাবে অল্প বয়সে। কত বলি একটু খেলাধুলা কর বাইরে বেরিয়ে কিন্তু কে কার কথা শোনে! কী যে মোহ লাগিয়ে দেয় আধুনিক যন্ত্রগুলো, কে জানে! যন্ত্রগুলো দিনরাত ছেলেমেয়েদের শৈশব-কৈশোরকে অযথা নির্দয় ভাবে নিষ্পেষণ করতে থাকে। ভাগ্যিস আমাদের সময়ে এসব ছিল না। এত মন-মগজ ঘুরিয়ে দেওয়ার জিনিস থাকলে পরীক্ষায় পাশটুকু হতো না। আজকাল বাচ্চারা এত অল্প বয়সে হাতের নাগালে সবকিছু পেয়ে যায় যে, তাদের ভালোমন্দ বোধটুকু তৈরি হওয়ার সময় পায় না।

প্রাণেল ঊর্মিলার কথা ভ্রূক্ষেপ না করে ঘরে জামা ছাড়তে ছাড়তে বিরক্তিভরে বলল, যা গরম পড়েছে আর পারা যাচ্ছে না। যতদিন যাচ্ছে গরম বাড়ছে। কথা বলতে বলতে ফ্রিজে রাখা ঠান্ডা জলের বোতল বার করে ঢকঢক করে খেল। স্বস্তির নিঃশ্বাস নিয়ে বলল, আহ! কী যে তেষ্টা পেয়েছিল!

ঊর্মিলা প্রাণেলের উপর স্বাভাবিক অধিকারবশত উগ্র গলায় বলল, রোদ থেকে ফিরে ওই বরফ ঠান্ডা জল খাওয়ার মজা বুঝবে। একে তো আরামপ্রিয় শরীর। দিনের পর দিন শরীর অতিরিক্ত আরাম পেয়ে সহ্য ক্ষমতা হারিয়ে ফেলছে। কথায় বলে না, যত্নের ধানে পোকা লাগে তোমারও হয়েছে তাই।

প্রাণেল হাওয়ায় ওড়া হাসি হেসে বলল, তোমার এই চোখ মুখ লাল করা শাসনটা আমার খুব ভালো লাগে, তাই শরীরের উপর নির্বিচারে নির্যাতন করি। তুমি কি এখন বেরোবে?

ঊর্মিলা বলল, আর ভালো লেগে কাজ নেই। ভালো লাগতে লাগতে ভালোলাগা একসময় তলানিতে দাঁড়াবে, তখন মন্দলাগার ভিড়ে ভালোলাগাকে আলাদা করতে পারবে না। ঋকের স্কুলে গার্জিয়ান মিটিংয়ে জন্য ছুটি নিয়েছি তো আজ। কথা শেষ করেই সে রান্না ঘরের কাজে ব্যস্ত হয়ে গেল।

প্রাণেল দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখল চারটে বেজে গেছে। সময়গুলো কেমন ঝড়ের বেগে বয়ে গেল। পার হয়ে গেল ঊর্মিলার সঙ্গে তার দীর্ঘ সতেরো বছর। ঋকও হু হু করে বড়ো হয়ে গেল। ঊর্মিলার সঙ্গে সঙ্গে তার নিজের বয়সও বাড়ল। চব্বিশ বছরের সেই ঊর্মিলাই আজ বয়সের হাত ধরে চল্লিশের দোরগোড়ায় এসে উপনীত হয়েছে। প্রাণেলকে ভালোবেসে চব্বিশ বছরে বাবার ঘর ছেড়ে বেরিয়ে আসে ঊর্মিলা।

সবে সে তখন এমবিএ করে ব্যাংক-এ চাকরি পেয়েছে। তারপর দু-একটা ব্যাংক পরিবর্তন করেছে সে, জব লাইফে আত্মতুষ্টির জন্য। সে যাই হোক সংসারের বোঝার ভার প্রাণেলের চেয়ে তার ঘাড়েই পড়েছে বেশি। সেই চাপেই বোধ হয় চব্বিশ বছরের ছেলেমানুষি আবেগ সব বিদায় নিতে শুরু করেছে নীরবে। ঊর্মিলা তা নিজেও বুঝতে পারেনি হয়তো। ঘরে বাইরে একা হাতে সবটুকু সামলাতে গিয়ে নিজের দিকে তাকাবার সময় পর্যন্ত নেই।

ঊর্মিলার যখন বিয়ে হয় সত্যিই সে তখন সুন্দরী। সাদা কাগজের মতো গায়ে রং। মেদহীন ছিপছিপে চেহারা। মাঝারি উচ্চতা। দেবী প্রতিমার মতো একঢাল ঘন ঢেউখেলানো চুল পিঠ পর‌্যন্ত বিস্তৃত। মুখশ্রীটি পানপাতার মতো। ঝিনুকের খোলের মতো চোখে বাদামি তারা। সে রূপের ঝলকানি কমে এসেছে। গায়ের রং আর উচ্চতা ছাড়া সবকিছুরই পরিবর্তন হয়েছে।

মেদহীন চেহারা কিছু অপ্রয়োজনীয় চর্বি এসে দখল করেছে। মুখের মধ্যে হাজার ক্লান্তি দিনের শেষে জমা হয়েছে। বাদামি তারার চোখ দুটো উজ্জ্বলতা হারিয়ে নিস্তেজ হয়ে গেছে। ঢেউখেলানো চুলে ঢেউয়ে গতি কমে আসায় বব ছাঁট হয়েছে। প্রাণেলের অবশ্য ঢেউয়ে গতি কমা পিঠ পর্যন্ত চুলই পছন্দের ছিল।

ঊর্মিলা প্রথমদিকে প্রাণেলের পছন্দের গুরুত্ব দিয়েছিল। পরে চাকরির উন্নতিতে সে কর্পোরেট দেখনদারিকেই গুরুত্ব দিয়েছে। সে নিয়ে প্রাণেলও খুব বিরোধিতা করেনি। সে শুধু হাসতে হাসতে বলেছিল, চুলের উপর এভাবে রাগ দেখাতে পারলে! একটুও কষ্ট হল না তোমার! আমার সারা জীবনের শান্তির ঘুম গেল। যে-ঘ্রাণে আমি ঘুমোই, আবার নতুন সকালে জেগে উঠি সেটার উপর এতটা জুলুম না করলেও পারতে।

ঊর্মিলা সেদিন খুব হেসে বলেছিল, তুমি আমার রাগ তো পছন্দ করো। তোমার মনে হয় রাগটা মেয়েদের অলংকারের মতো। তোমার উপরে তো সবসময় রাগ করতে পারি না। আর রাগ করলেও স্থায়ীত্ব কম। তাই চুলের উপর চিরস্থায়ী রাগ বর্তালাম।

ঊর্মিলার পায়ের শব্দে অতীত সরে গিয়ে বর্তমান এসে পড়ল প্রাণেলের সামনে। প্রাণেল বলল, কী করছিলে এতক্ষণ রান্নাঘরে! আমি কখন থেকে সোফায় বসে আছি চায়ের প্রতীক্ষায়। ঋক এখনও বাড়ি ফেরেনি? ঊর্মিলা ম্যাক্সিতে ঘাম মুছতে মুছতে বলল, তোমার ছেলের খাবার ব্যবস্থা করলাম। ঋক এখুনি ফিরবে। সাড়ে চারটে বাজছে। চাউমিন রেডি করে ক্যাসারোলে ভরে রাখলাম। একটু সরে বসো, ফ্যানের তলায় এমন বসেছ হাওয়া পাই না আমি। প্রাণেল একটু নড়েচড়ে বসল ঊর্মিলার কথায়।

ঋক হন্তদন্ত হয়ে স্কুলের ব্যাগ কাঁধে নিয়ে এমন ভাবে ঘরে ঢুকল যে, দেখে মনে হল সে রাজ্য জয় করে ফিরেছে। প্রাণেলের নিজের ছেলেকে আজ বড়ো অচেনা লাগে। ঋকও আজকাল প্রাণেলের সঙ্গে দূরত্ব বজায় রেখেই কথা বলে। প্রাণেল ভাবে মাঝেমাঝে বাবা-মার সঙ্গেও এত মেপে কথা বলা যায়! তবু এ যুগের ছেলেমেযো বোধ হয় প্রয়োজন ব্যতীত কথা বলতে চায় না।

ঋক আগে অবশ্য এরকম ছিল না। সে বরাবর হাসিখুশি প্রাণচঞ্চল স্বভাবের ছিল। মা হলেও ঊর্মিলার সঙ্গে তার যথেষ্ট সখ্যতা ছিল। প্রাণেল শাসন করলেও সে শাসন ভালোবাসা মিশ্রিত ছিল বলে, তা ঋকের মনে কখনও অপমান বোধ তৈরি করতে পারেনি। তার সুকুমার মুখটা দেখলে প্রাণেলের পুত্রস্নেহ বিগলিত হতো। ঊর্মিলার মতো দেখতে হওয়ায় সকলেই বলাবলি করত, ঋক জন্ম থেকেই মায়ের রূপ পেয়েছে। মাতৃমুখী পুত্র নাকি খুব সুখী হয় ইত্যাদি। এখন সেই ঊর্মিলাই হয়তো ছেলেকে ঠিক বুঝে উঠতে পারে না। ঊর্মিলার সঙ্গেও কথাবার্তা যে খুব বেশি হয়, তা নয়।

ঋক যেন গত চার বছরে নিজেকে কেঁচোর মতো বাবা-মার থেকে গুটিয়ে নিল। ঊর্মিলার খুব কষ্ট হয় ছেলের এই স্বভাবে। প্রিয়জনের পরিবর্তনকে সে কখনও-ই মানতে পারে না। সে প্রাণেলের হোক বা ঋকের। মুখ ফুটে কিছু না বললেও আড়ালে চোখের জল ফেলে। কতবার প্রাণেল তা লক্ষ্য করেছে। প্রাণেলের কোনও পরিবর্তিত আচরণে খারাপ লাগলে এক আধবার নীচু গলায় বলত, সকলেই পরিস্থিতির সঙ্গে পালটাচ্ছে। আমি নিজের লোকদের কাছে অপরিচিত হয়ে উঠতে পারছি না বলে এত কষ্ট। আমিও যেদিন তোমাদের কাছে অচেনা হয়ে যাব, সেদিন তোমাদেরও আমাকে মেলাতে অসুবিধে হবে।

পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে ঊর্মিলা একটু হলেও আজ শিখেছে। বাধ্য হয়ে আবেগের কিছু অংশ তাকে কাটছাঁট করতে হয়েছে। তাই প্রাণেল সংসারের খুব বেশি দাযিত্ব না নিলেও সে নিশ্চুপ থাকে। ঋকের খারাপ ব্যবহারের কোনও জবাব সে দেবার প্রয়োজন মনে করে না। ঊর্মিলা নির্দ্বিধায় নিজের কাজ করে যাওয়াটাকেই লক্ষ্য মনে করে। সব ভুলে প্রতিদিনের মতো ছেলের জন্য সে যত্ন সহকারে খাবার বানিয়ে রেখেছে।

ঋক বেশ বিরক্তি ভরা গলায় বলল, আমার চাউমিন করেছ?

ঊর্মিলা শান্ত গলায় বলল, হ্যাঁ করেছি। তুই যেদিন যা খেতে চেয়েছিস কোনদিন তোকে দেওয়া হয়নি! আমি আমার সাধ্যমতো তা করে দিয়েছি।

ঋক ঝাঁঝালো গলায় বলল, থামো কত দাও আমার জানা আছে! ছোটোলোকের মতো আগের সপ্তাহে টানা মুড়ি খেয়েছি। ডিসগাস্টিং।

ঊর্মিলা এবার একটু চড়া সুরে বলল, আগের সপ্তাহে আমার অফিসে কাজের চাপ ছিল তুই জানতিস। আর মুড়ি বুঝি ছোটোলোকের খাবার!

ঋক বলল, একদম তাই। মা, তুমি শুধু দুহাতে রোজগার করেই গেলে, স্ট্যাটাস মেনটেন করতে শিখলে না। তোমরা বাবা সত্যিই পারো।

ঊর্মিলা ছেলের এ কথার প্রত্যুত্তর দেবার প্রয়োজন না মনে করে বলল, হাত মুখ ধুয়ে খেতে বস। ডাইনিং টেবিলে খাবার দিচ্ছি। তোকে খাবার দিয়ে বাবাকে চা করে দেব।

ঋক বাথরুম যেতে যেতে বলল, মা, তুমি না অতিরিক্ত কথা বলো। আমি কি জানতে চেয়েছি বাবার জন্য তুমি কী করবে! আমার খাবার টেবিলে রেখে দাও। আমি খেয়ে নেব। আমি কি বাচ্চা ছেলে নাকি! ঋক বাথরুমে চলে গেল।

ঊর্মিলা ঋকের জন্য খাবার ঠিক করে চায়ে জল বসাল। সে ভাবল সত্যিই ঋক বাচ্চা ছেলে নয়, অনেক বড়ো হয়েছে। তার ইচ্ছে ছিল ছুটির দিনে ঋককে খাবার টেবিলে সঙ্গ দেবে। কিন্তু তার সব ইচ্ছা হাওয়ায় বুদবুদের মতো নিমেষে মিলিয়ে গেল।

চা হয়ে গেছে। ঊর্মিলা চায়ে কাপ হাতে নিয়ে প্রাণেলের কাছে গিয়ে বলল, ধরো। প্রাণেল বলল, তুমি খাবে না! ঊর্মিলা বলল, খাব। রান্নাঘর থেকে কাপটা নিয়ে আসি। প্রাণেল শশব্যস্ত হয়ে বলল, তুমি বসো। আমি এনে দিচ্ছি। ঘেমে নেয়ে গেছ পুরো।

প্রাণেলের প্রায়ই ইচ্ছে করে ভালো রোজগার করে ঊর্মিলাকে বিশ্রাম দিতে। ঊর্মিলাকে দেখে তার বুকটা চিনচিন করে ওঠে। বড়োলোক বাবার খোলস ছেড়ে কতদিন আগে ঊর্মিলা তার কাছে চলে এসেছে। তার কাছে আসার পর থেকেই সংসারের হাড়িকাঠে ঊর্মিলা নিজেকে বলি দিয়েছে। ভালোবেসে কী পেয়েছে ঊর্মিলা তা কোনওদিন হিসাব করেনি প্রাণেল। সে হিসাব করেনি বলেই মাঝেমধ্যে কারণে-অকারণে নিজের মেজাজকে জাহির করতে গিয়ে নিদারুণ আঘাত দিয়ে ফেলেছে ঊর্মিলাকে। তার কাজের জন্য পরে সে অনুতপ্তও হয়েছে।

ঊর্মিলার হাতে চা তুলে দিয়ে প্রাণেল বলল, ঋক খেয়েছে?

ঊর্মিলা কী যেন চিন্তা করছিল। সে হকচকিয়ে বলে উঠল, খেয়ে নেবে হাত মুখ ধুয়ে আমি রেডি করে রেখেছি।

প্রাণেল একটু তিক্ততার সঙ্গে বলল, কখন বাথরুম ঢুকেছে। এখনও বেরোবার নাম নেই। কী যে করে ঘন্টার পর ঘন্টা বাথরুমে, আমার মাথায় ঢোকে না। প্রাণেলের কথা শেষ হতেই বাইরে প্লেটের শব্দ হল। ঋক খেতে বসেছে।

চা শেষ হয়ে আসা প্রায় শূন্য কাপ হাতে নিয়ে ঊর্মিলা জানলার কাছে এল। বাড়ির বাইরে বড়ো রাস্তায় গাড়িগুলো সাঁ সাঁ করে ছুটে চলেছে। ল্যাম্পপোস্টের আলো অনিচ্ছা সত্ত্বেও জ্বলে উঠল। ঊর্মিলার বুকের ভিতর একরাশ অপরিমেয় শূন্যতা। প্রাণেল তার সঙ্গে যেমন ব্যবহার করুক না কেন, তা ক্ষণস্থায়ী। ঊর্মিলা এটা ভালো ভাবে জানে দিনের শেষে প্রাণেলের শেষ আশ্রয় সে-ই। প্রাণেল সেই নিরাপদ আশ্রয় হারাতে চায় না। ঋক তো ঊর্মিলার নিজের রক্ত। রক্ত কি শরীর ছাড়া আশ্রয় পায়! যদি না পায় তাহলে ঋক কেন ঊর্মিলার কাছে দিন দিন অপরিচিত হয়ে উঠছে! ঊর্মিলা নিজের সন্তানকে আশ্রয় দেবার পরিবর্তে কি তার কাছে আশ্রয় খুঁজছে! নিজের সন্তান ঋক স্ট্যাটাস মেনটেন শেখায় তাকে।

ঊর্মিলা স্ট্যাটাস মানে যতটুকু বোঝে তা হল তার সামাজিক পদমর‌্যাদা। সে সেটা অনেক বছর আগে তার শিক্ষক-বাবার কাছ থেকে অজান্তেই শিখে ফেলেছে। সৎ পথে মাথা উঁচু করে সম্মানের সঙ্গে সমাজে বেঁচে থাকাকেই বরাবর গুরুত্ব দিয়েছে ঊর্মিলা। আজকালকার ছেলেমেয়ে হয়তো একেই মিডল ক্লাস মেন্টালিটি বলে বিদ্রুপ করে। ঋক যে-স্ট্যাটসের কথা বলে, সেটা কী বস্তু ঊর্মিলার জানা নেই।

বাবা-মার কাছ থেকে সন্তানকে বোধ হয় অনায়াসে পৃথক করতে পারে এই স্ট্যাটাস। বহু কষ্টে উপার্জিত বাবা-মার অর্থ, বিলাসবহুল রেস্তোরাঁ, হোটেল, সিনেমা হল অথবা শপিংমলে নির্দ্বিধায় বন্ধুদের সঙ্গে নিয়ে খরচা করাকে স্ট্যাটাস বলে। তাই খাবারের বিভাজনও ঋকের কাছে ছোটোলোক-বড়োলোক দিয়ে হয়। বড়োলোকি ছাঁচে নিজেকে ফেলে ঋক। সেই ছাঁচে ঊর্মিলাকে ফেলতে পারছে না বলেই কি এত দূরত্ব!

ঊর্মিলা ভাবে ঋকের মতো ছেলেরা কি কোনও দিন ঘাম ঝরিয়ে সংসারের সবার জন্য পরিশ্রম করতে পারবে! শেষ জীবনে ঋকের মধ্যে কি আশ্রয় খুঁজে নিতে পারবে সে! আশ্রয়হীন হয়ে যাবার ভয় কি তাকে প্রতিনিয়ত সাপের মতো তাড়া করে বেড়াচ্ছে! বুঝতে পারে না সে। হয়তো বুঝতেও চায় না। শুধু মাতৃত্বের দাবি নিয়ে বারবার সে করাঘাত করে ঋকের দরজায়। তার উদ্ভ্রান্ত মন ছুটে চলে সন্তান পিপাসায়। নিজের রক্তের মায়া যে কী, তা ঋক কবে বুঝবে! এই চার বছরে কি একবারও তার মনে হয়েছে মা ঊর্মিলার কথা? দূরের নিস্তেজ আলোর মতো নিস্তেজ হয়ে যাচ্ছে না তো সম্পর্কগুলো? এসব ভাবতে ভাবতে ঊর্মিলা শূন্যতার বুকে একটা নিরাশার দীর্ঘশ্বাস ফেলে।

প্রাণেল ঊর্মিলার কাঁধে আলতো হাত রেখে বলল, কী হয়েছে ঊর্মি! কখন থেকে খালি চায়ে কাপ হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছো এক ভাবে। বলো কী হয়েছে। ঋক কিছু বলেছে তোমায়?

ঊর্মিলার ভালো লাগল অনেকদিন পর প্রাণেলের মুখ থেকে ঊর্মি ডাকটা শুনে। বিয়ে প্রথম তিন বছর এই নামটা যেন অজ্ঞাত শৃঙ্খলে তাকে আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে ফেলেছিল। যাইহোক সময়ে সঙ্গে সঙ্গে সে শৃঙ্খল ক্রমশ শিথিল হয়েছে।

ঊর্মিলা সব গোপন করে, হাসির মতো হাসি না এনে ঠোঁট একটু চওড়া করে বলল, কিছু হয়নি। আর ঋক কী বলবে আমাকে।

প্রাণেল যেমনই মানুষ হোক না কেন, কেউ ঊর্মিলার মুখের উপর কথা বলেছে শুনলে মাথা ঠিক রাখতে পারে না। ভীষণরকম প্রতিক্রিয়া হয়। সব শুনলে সে ঋককে বকবে। হয়তো ঋকের গায়ে হাত তুলতেও দ্বিধা করবে না। ঋকের ইদানীং অপমানবোধটাও সাংঘাতিক তৈরি হয়েছে।

প্রাণেল ব্যঙ্গের হাসি হেসে বলল, তোমায় কিছু না বললেই ভালো। গুণী ছেলে বোধ হয় এখন নিজের ঘরে ঢুকেছেন। তাকে বলো গিয়ে আজ গার্জিয়ান মিটিং-এ কী কী শুনতে হয়েছে আমাদের।

ঊর্মিলা বলল, ঋককে বলব বইকি! তুমি মাথা গরম করছ কেন! আমি যাচ্ছি। ঊর্মিলা ঘর থেকে বিরক্তির সঙ্গে বেরিয়ে গেল।

ঋকের ঘরে গিয়ে ঊর্মিলা দেখল ঋক মোবাইলে গেম খেলছে। ঊর্মিলা ঘরে পা দিতেই সে তিক্ততার সঙ্গে বলল, তুমি এ সময়ে আমার ঘরে! কিছু দরকার আছে?

ঊর্মিলার মুখটা কেমন ম্লান হয়ে গেল ঋকের কথায়। দাঁতে দাঁত চেপে মুখটা কঠিন করে ঊর্মিলা বলল, আমি তোর ঘরে আসতে পারি না নাকি! দরকার আছে বলেই আরও তোর কাছে আসার প্রয়োজন হয়েছে।

ঋক গেমটায় হেরে গেছে এমন মুখ করে বলল, অফ কোর্স আসতে পারো। কিন্তু ডিসিপ্লিন মেনে নক করা উচিত ছিল। কী দরকার সেটা সরাসরি বলো ভমিকা না করে। ঊর্মিলার রুচিতে আঘাত লাগছিল ঋকের সঙ্গে কথা বলতে। তার মনে হচ্ছিল মা হিসাবে ঠাস করে গালে একটা থাপ্পড় কষাতে। নিজের মেজাজ সামলে নিয়ে সে বলল, তোর স্কুলে আজ গার্জিয়ান মিটিং ছিল। সেখানে কী হল তুই একবারও জানার প্রয়োজন মনে করলি না বলে আমি আগ বাড়িয়ে জানানোর কথা ভাবলাম।

ঋক একটু থতমত খেয়ে বলল, আমি ওসব শুনে কী করব! স্কুলে গার্জিয়ান মিটিং ছিল যেতে বলেছিলাম তোমাদের। গেছ তোমরা আর-পাঁচটা গার্জিয়ানের মতো। ব্যস মিটে গেছে। স্কুলের সমস্যা বাড়িতে আনছ কেন!

ঊর্মিলা উঁচু গলায় বলল, শুনতে হবে ঋক। তুই অন্যায় করলে হাজারবার শুনতে হবে। তুই কী মেটার কথা বলছিস! তোদের স্কুলের হেডমাস্টার তমালবাবু বলেছেন যে, তুই তোদের জুনিয়ার ব্যাচের মীনা নামে একটি মেয়েকে প্রায়ই টিজ করিস। গত সপ্তাহে তোর ব্যাগ থেকে তোর বন্ধু রণিতের টাকা পাওয়া গেছে। তমালবাবু বললেন যে, তুই চোরের খাতায় নাম লিখিয়েছিস। আর উনি যা তোর পড়াশোনার নমুনা বললেন, তা শুনে আমার নিজের লজ্জা লাগছিল। তুই প্রায় দিনই ক্লাস অফ করে বাইরে কোথাও ঘুরতে বেরিয়ে যাস কয়েকজন বন্ধুর সঙ্গে। এগুলো কি সত্যি ঋক, আমি জানতে চাই। তোর বাবা ভীষণ আপসেট।

ঋক পুলিশের হাতে ধরা পড়া চোরের মতো ভয় পেয়ে বলল, মা, তুমি নিজের ছেলেকে কি বিশ্বাস করো না! ওই শালা হারামি তমালবাবু কী বলল তার কথা শুনে নাচছ!

ঊর্মিলা আর সহ্য করতে পারল না। ঋকের গালে গায়ে জোরে ঘৃণার সঙ্গে থাপ্পড় মেরে বলল, চুপ। একদম চুপ। ছি ছি, কী মুখের ভাষা শিক্ষক সম্পর্কে! আমাকে তুই শিক্ষা দিস স্ট্যাটাসের। তোকে ছেলে বলে পরিচয় দিতে কষ্ট হয় আমার। পড়াশোনা বাদই দিলাম। তাই বলে মেয়েদের টিজ করবি, চুরি করবি! পড়াশোনা সবার দ্বারা হয় না ভদ্র স্বভাব-আচরণটা তো তৈরি করতে হয়।

ঊর্মিলা আর ঋকের চিতকার তিরের ফলার মতো প্রাণেলের কানে বিঁধছিল। সে থাকতে না পেরে ঋকের ঘরে ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড়ে গেল। অনেকদিন পর ঊর্মিলার চোখ মুখ লাল করা রাগি চেহারাটা সে দেখতে পেল। ঋক তখন বিড়বিড় করে রাগে গজরাচ্ছে।

ক্ষুব্ধ গলায় ঋক বলল, ছেলে বলে পরিচয় দিতে ইচ্ছে না করে দিও না। একদম অপমান করবে না আমাকে। সারাদিন তো চাকরির নাম করে উড়ে উড়ে বেড়াও। নিজের ছেলের সঙ্গে এরকম আচরণ কোন ভদ্রতায় পড়ে? দুপয়সা কামাচ্ছ বলে তোমার খুব দেমাক। আমি তোমার ওই পয়সায় ইয়ে করি বুঝলে। আমার কাছে কৈফিয়ত চাইছ কোন সাহসে!

ঊর্মিলা তীব্র কঠিন গলায় বলল, সন্তান বেপথে গেলে তাকে শাসন করতে মায়ের সাহস লাগে না, মাতৃত্বের অধিকার থাকলেই চলে। সারাদিন অক্লান্ত পরিশ্রম করে সংসারের জন্য টাকা আনাটা তোর উড়ে বেড়ানো মনে হতে পারে। এত ফুটানি করিস মা দুপয়সা ইনকাম করে তাই। তুই পাঁচটাকা ইনকাম করে তবে আমার টাকায় ইয়ে করিস। আমার টাকার দেমাক যদি হয়ে থাকে সেটা রক্ত, ঘাম ঝরিয়ে উপার্জিত। তোর মতো চুরি চামারির পয়সা বা হাত পেতে অন্যের কাছ থেকে নেওয়া নয়।

প্রাণেল এই প্রথমবার ঊর্মিলার চেহারার ও মনের ভাঁজে ভাঁজে ঋকের জন্য ঘৃণা, অভিমান দেখল। ঋকের এই চার বছরের পরিবর্তিত পর্বে সে বহু অন্যায় করেছে। অকথা-কুকথা ঊর্মিলাকে বলেছে। ঊর্মিলা বোবার মতো নিশ্চুপ থেকেছে। সে বিনা প্রতিবাদে সব মেনে নিয়েছে। তার মনের ভিতরের জমাটবাঁধা দুঃখ-কষ্ট মাঝেমধ্যে উগরেছে প্রাণেলের কাছে। কিন্তু সে ঋকের সঙ্গে কোনও তর্ক-বিতর্ক করেনি। এতদিনের জমাটবাঁধা দুঃখ-কষ্ট আগ্নেয়গিরির লাভার মতো স্ফুরিত হতে লাগল।

ঋকের ঊর্মিলাকে অপমান করাটা প্রাণেল ভালো চোখে নিল না। প্রাণেল ঊর্মিলার পক্ষ নিয়ে প্রতিবাদে গর্জে উঠে ঋককে বলল, তোর মাথার ঠিক আছে তো! কী যা তা কথা বলছিস মাকে। ছোটোলোকের বাড়ির মতো ঝগড়া করছিস।

ঋক প্রাণেলকে তাচ্ছিল্যের সুরে বলল, এই তুমি তোমার ঘরে যাও তো। তুমি প্রথম থেকে ছিলে না তাই জানো না কিছু। মা সামান্য একটা স্কুলের গার্জিয়ান মিটিং নিয়ে তিলকে তাল করছে।

প্রাণেল শান্ত গলায় ঋককে বলল, তুই তোর মায়ের সঙ্গে হাজার খারাপ ব্যবহার করলেও আজও তোকে নিয়ে কেউ কোনও খারাপ কথা বললে তোর মায়ের খারাপ লাগে। আফটার অল তোরই মা তো।

ঊর্মিলা তখনও খাটের হাতল ধরে রাগে গজর গজর করছিল। বিমর্ষ মুখে সে যেন নিজেকেই দোষারোপ করছিল। হঠাৎ ক্ষিপ্ত গলায় সে প্রাণেলের উদ্দেশ্যে বলল, তুমি কিছু বোলো না ছেলেকে। ওর আর কিছু হবার নেই। শুধু শুধু তুমি ছেলের কাছে অপমানিত হও আমি স্ত্রী হিসাবে তা মেনে নেব না। যে নিজের ভালোমন্দ নিজে বুঝতে চায় না তাকে বোঝাবার কোনও দরকার নেই।

ঋক ঊর্মিলার কথায় খ্যাপা কুকুরের মতো ক্ষেপে উঠল। তার দুটো চোখ আগুনের মতো দপ করে জ্বলে উঠল। সে রুক্ষ্ম স্বরে ঊর্মিলাকে বলল, বাবার আবার মান-অপমান বোধ! তোমার টাকায় খেয়েপরে আমাকে জ্ঞান দিতে আসে। আমি তো সবাইকে অপমান করি। আমি বিন্দুমাত্র ব্যবহার জানি না। আর বাবা যখন কথায় কথায় তোমাকে অপমান করে, তোমার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করে, তখন তোমার কিছু লাগে না বলো! অ্যাকচুয়ালি বাবা একটা মেরুদণ্ডহীন লোক। আত্মসম্মান বলে কোনও কিছু আছে নাকি বাবার?

ঋকের কথা শুনে প্রাণেল ভিতর থেকে খোলা ছাতা বন্ধ হওয়ার মতো দমে গেল এই ভেবে যে, ঊর্মিলার মতো স্ত্রীকেও সে অপমান করে। ঋকের মতোই সেও তো ঊর্মিলাকে প্রতিপদে আঘাত করে। সে ভাবল ঋকের কথাগুলো তো খুব ভুল নয়।

প্রাণেলের অপমানটা ঊর্মিলা হজম করতে পারল না। সে ঋকের গালে সপাটে চড় মেরে বলল, তোর এত অধঃপতন হয়েছে ঋক! তুই তোর বাবাকে অপমান করছিস। ছোটো করছিস। নিজেও ছোটো হচ্ছিস। বাবা না হয় মেরুদণ্ডহীন। আমার রোজগারের টাকায় খায়-পরে। তার কোনও মুরোদ নেই। তোর তো মেরুদণ্ড আছে। তোর মুরোদটা দ্যাখা। আমি মা হয়ে সেটা দেখি।

প্রাণেলের বুকের ভিতরটা কেমন ছ্যাঁৎ করে উঠল সন্তানের মুখ থেকে অযোগ্যতার কথা শুনে। এখুনি বুঝি সাপের খোলস ছাড়ার মতো তার বাইরের আবরণ খসে গিয়ে ভিতরের দুর্বলতাগুলো উন্মুক্ত হয়ে পড়বে। ঋকের মুখ থেকে বেফাঁস কথা বেরিয়ে পড়বে এই দুর্ভাবনা, এই শঙ্কার তাড়া খেয়ে সে ঊর্মিলাকে বলল, চলো ও ঘরে। মাথা ঠান্ডা করো। গায়ে হাত তুললে সমস্যার সমাধান হবে না। আর তুমিও ঊর্মি, ঋকের মতো বাচ্চা হয়ে গেলে নাকি। চলো, বেরিয়ে এসো ঘর থেকে। প্রাণেল ঊর্মিলার হাত ধরে ঋকের ঘরের বাইরে নিয়ে চলে এল।

ঋকও যুদ্ধের ময়দান ছেড়ে পালিয়ে যাবার পাত্র নয়। সে মায়ের সঙ্গে দ্বন্দ্ব যুদ্ধে নেমেছে। যুদ্ধে জয়ীর মতো গলা হাঁকিয়ে সে বলল, আরে যাও যাও। বউয়ে প্রতি দরদ উথলে উঠছে একেবারে। আমার কী মুরোদ আছে না আছে দেখাব তোমাদের। আমাকে চড় মারলে তো তার ফল ভালো হবে না, বলে দিলাম।

ঋকের ঘরের মধ্যে চিৎকার করে বলা কথাগুলো প্রাণেল আর ঊর্মিলার কানে গেল। ঊর্মিলা হতাশ ভাবে বলল, ঋক এতটা বেপরোয়া, এতটা নির্দয় হয়ে গেল! প্রাণেল নীরব হয়ে রইল। নীরবতা ভেঙে তার মতামতের অপেক্ষা ঊর্মিলা করে না।

ঊর্মিলা জোর করায় প্রাণেল রাতের খাবার খেল। ঊর্মিলার খাওয়ায় রুচি ছিল না। মায়ের সঙ্গে কথা কাটাকাটির পর ঋক সেই যে দরজা বন্ধ করেছে, আর খোলেনি। মা তাকে ডাকতে গেলে ঘরের ভিতর থেকেই সে জানিয়েছে খিদে নেই। রাতের বিছানায় শুতে গিয়ে নানা রকম দুর্ভাবনা ঊর্মিলাকে অক্টোপাসের মতো জড়িয়ে ধরে। ঘুম আসে না সহজে। প্রাণেলকেও মাঝেমাঝেই অচেনা লাগে তার। প্রাণেল নিরলস ভঙ্গিতে জানলার কাছে দাঁড়িয়ে অকারণ ঘন ঘন সিগারেট খায়।

ঊর্মিলা একবার দুহাত বাড়িয়ে ডাকে প্রাণেলকে, কী হল! রাতদুপুরে এত সিগারেট খাচ্ছ কেন! শোবে এসো।

প্রাণেল হতাশার সুরে বলল, আচ্ছা ঊর্মি, আমি মেরুদন্ডহীন লোক বলো! এই যে সিগারেট টানছি সেটার খরচাও তোমাকে জোগাতে হয়। এমন লোককে ভালোবেসে আপশোশ হয় না তোমার?

ঊর্মিলার মন মেজাজ একদম ভালো ছিল না। তাই প্রাণেলের কথাগুলো এড়িয়ে বলল, শুতে এসো। তোমাকে ছাড়া আমার ঘুম আসে না জানো। তবু দূরে দাঁড়িয়ে আছ। কাছে এসো আমার। প্রাণেল বলল, তুমি শোও। আমি বাথরুম থেকে আসছি হাত মুখ ধুয়ে

ঊর্মিলা কথা বাড়াল না। সারা পৃথিবী নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে। ঊর্মিলার মনে হল কেবল সেই জেগে আছে একাকী। সে নিজেও জানে প্রাণেল ঘুম পাড়ালেও আজ তার ঘুম আসবে না। পরক্ষণেই ঋকের চিন্তা মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। কী করছে ঋক এখন! ছেলেটা কি ঘুমিয়ে পড়ল! সারারাত কি না খেয়ে থাকবে ছেলেটা! আগে একদম খিদে সহ্য করতে পারত না ঋক। বড়ো হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুরোনো অভ্যাসের চরিত্র বদলাল। ঊর্মিলার বুকটা কোনও এক অজ্ঞাত ব্যথায় মোচড় দিয়ে উঠল। ঋকের গায়ে এই প্রথমবার হাত তুলল সে। তবু তার মনে হল সন্তানকে আঘাত করা মানে নিজেকে আঘাত করা। ঋক কি আদৌ বুঝবে সেকথা!

নানা দুর্ভাবনাকে প্রশ্রয় আশ্রয় দিয়ে ঊর্মিলা শোবার ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এল। তার কপালে চিবুকে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে। ঘুম তার আজ হবে না। বাইরে বেরিয়ে ডাইনিং টেবিলে রাখা জলের গেলাস থেকে কয়েক ঢোক জল খেয়ে একটা হালকা নিঃশ্বাস ছাড়ল। তারপর অনেক সংশয় নিয়ে ঊর্মিলা ঋকের ঘরের দিকে পা বাড়াল। দরজাটা বোধ হয় শোওয়ার আগে ভেজিয়ে রেখেছিল ঋক। ঊর্মিলা হাত দিয়ে ঠেলতেই ক্যাঁচ করে একটা মৃদু শব্দ করে দরজাটা খুলে গেল। ঘরটার দখল নিয়েছে একটা থমথমে অন্ধকার।

ঊর্মিলা আপন মনেই বলল, নাইট বাল্বটাও জ্বালেনি ঋক। কী যে করে না ছেলেটা। একদম এই দিকটা বাবার মতো হয়েছে। নাইট বাল্ব জ্বালতেই অন্ধকার সরে গিয়ে স্নিগ্ধ আলোয় ভরে উঠল ঘর। বাল্বের পরিমিত আলোয় দেখল, এলোমেলো বিছানায় ঋক অচৈতন্য অবস্থায় ঘুমাচ্ছে। ঋকের ম্লান মুখের দিকে তাকিয়ে সে কিছু একটা ভেবে স্মিত হাসল। তারপর তার স্নেহের হাতটা বেশ কিছুক্ষণ ছেলের মাথায় বুলিয়ে দিল। ঋকও ঘুমের ঘোরে স্নেহের স্পর্শ পেয়ে নড়েচড়ে উঠল। ঊর্মিলা তার কপালে একটা স্নেহচুম্বন করে ঘরের দরজা ভেজিয়ে বাইরে বেরিয়ে এল।

ঊর্মিলা বাইরে এসে দেখল প্রচণ্ড ঝড় উঠেছে। মিশমিশে কালো আকাশ ভেদ করে মেঘ তীব্র ভাবে গর্জন করছে। ঊর্মিলা বাইরের দরজা জানালা বন্ধ করতে করতে হাঁক পাড়ল, প্রাণেল, একবার বাইরে এসো। প্রচণ্ড মেঘ করেছে। ঝড় উঠেছে। ঊর্মিলা তার নিজের ডাকের কোনও প্রত্যুত্তর না পেয়ে বিরক্তিভরে বলল, আমার পোড়া কপাল! লোকটা বোধ হয় কুম্ভকর্ণের মতো ঘুমোচ্ছে। দরজা জানালা বন্ধ করতে গিয়ে ছাঁটের জলে কিছুটা ভিজে গেল ঊর্মিলা। ভিজে জামাকাপড় বদলে ফেলে শোবার ঘরে ঢুকল সে।

ঊর্মিলা ঘরে ঢুকে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে যাবে এমন সময় দেখল, প্রাণেল বিছানায় নেই। শোবার ঘরে প্রাণেল আসেনি। ঝড় বৃষ্টির রাতে ঊর্মিলা উচ্চস্বরে প্রাণেলের নাম ধরে চিৎকার করল। কিন্তু কোনও লাভ হল না। সারা বাড়ির দমবন্ধ করা নীরবতা তাকে হাঙরের মতো গিলতে চাইল। সে ঊর্ধশ্বাসে বাথরুমে গেল। সেখানেও গিয়ে সে দেখল প্রাণেল নেই। রান্নাঘরের দরজা, ছাদের দরজা সব বন্ধ। সংশয়পূর্ণ গলায় ঊর্মিলা নিজেই বলে উঠল, কোথায় গেল প্রাণেল! ঋকের ঘরে তো যাবার কথা নয়। আমি তো ঋকের ঘরে এতক্ষণ ছিলাম।

ঊর্মিলার এবার নজরে পড়ল উত্তরে রান্নাঘরের পাশে গেস্ট রুমে। গেস্ট রুমের মৃদু আলোর রেখা ভেজানো দরজা ভেদ করে বাইরে আসছে। ঊর্মিলা হাঁপ ছেড়ে বলল, শোবার ঘরে আমি বিরক্ত করব ভেবে গেস্টরুমে লোকটা ঘুমানো বাদ দিয়ে সিগারেট খাচ্ছে। কী লোক বাবা। দেখাচ্ছি মজা।

ঊর্মিলা একরাশ অভিযোগ মাথায় নিয়ে গেস্টরুমের ভেজানো দরজা সজোরে ঠেলে বলল, কী ব্যাপার এত রাতে এ ঘরে! কথা শেষ করেই ঘরের চারদিকে তাকিয়ে ঊর্মিলার কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে এল। নাইট বাল্বের মৃদু আলোয় যা দেখল তাতে তার নিজের চোখকেই বিশ্বাস হল না। সে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে বলল, ঋক, কোথায় তুই! আমার এ কি সর্বনাশ হল! কান্নায় জড়িয়ে এল ঊর্মিলার গলা। সেই সময় ঋক বোধ হয় বাথরুম গিয়েছিল। সে ঘুম চোখে বাথরুম থেকে বেরিয়ে এল।

মায়ের তীব্র আর্তনাদ শুনে ছুটে এসে বলল, রাত দুটো বেজে গেছে। এত রাতে চিৎকার করছ কেন! ঊর্মিলা গেস্টরুমের সামনে বসেছিল। অশ্রুভেজা দু’চোখে ধরা গলায় প্রাণেলের দিকে আঙুল তুলে সে বলল, দ্যাখ ওদিকে তাকিয়ে ঋকের ঘুমের ঘোর কেটে গিয়েছিল। সে ঊর্মিলাকে জড়িয়ে ধরে অস্ফুট কণ্ঠে ডাকল, বাবা! প্রাণেলের নিথর দেহটা সিলিং ফ্যানের তলায় ঝুলছে। প্রাণেলের গলায় প্যাঁচানো রয়েছে ঊর্মিলার একটা শাড়ি। গত বছর পুজোর সময় প্রাণেল নিজের হাতে গড়িয়াহাট মার্কেট থেকে ঊর্মিলার জন্য কিনে এনেছিল।

ঋক ঊর্মিলাকে বলার মতো ভাষা খুঁজে পাচ্ছিল না। মনে মনে ঋক ভাবল, সন্ধ্যায় বাবাকে খুব অপমান করেছে। এই সবকিছুর জন্য ঋক যেন নিজেকে দায়ী করল। তারপর সে গলা ছেড়ে অঝোরে কাঁদতে লাগল। ঋক ঘরের টিউব লাইট জ্বেলে মাকে ছেড়ে ঘরের খাটের কাছে গিয়ে দাঁড়াল। খাটের কাছে যেতেই বাবার হাতে লেখা বালিশের উপর একটি খোলা চিঠি ঋকের নজরে পড়ল। ঋক চিঠিটা হাতে তুলে বলল, মা, এই দ্যাখো বাবা চিঠি লিখে রেখেছে এখানে।

ঊর্মিলা কাঁদতে কাঁদতে বলল, কী লিখেছে লোকটা! নিশ্চয়ই অনেক অভিযোগ করে গেছে আমার বিরুদ্ধে। ঊর্মিলার কথা বলতে কষ্ট হচ্ছিল। প্রাণবাযু কে যেন ভিতর থেকে শুষে নিচ্ছে। ঋক চিঠিটা পড়তে শুরু করল। চিঠিতে লেখা কথাগুলো ছিল—

প্রিয় ঊর্মি,

তোমার বিরুদ্ধে কোনও রাগ অভিমান অভিযোগ আমার কোনও দিনই ছিল না। আজও নেই। আমার মেরুদণ্ডহীনতা আমার অপদার্থতার জন্য আমি নিজেই দায়ী। তোমার উপর সব ভার চাপিয়ে আমি বোঝা বাড়িয়ে চলেছিলাম। তুমি এ জীবনে যা দিয়ে আমাকে, তা হয়তো আমার কোনও জন্মের পুণ্যের ফল। তোমার মতো স্ত্রী পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। তবু কারণে-অকারণে কত আঘাত কত কষ্ট দিয়েছি তোমায়। সেকথা সব ভাবলে আমার নিজের উপর ঘৃণা হয়। ঋকের উপর তুমি এত অভিমান কোরো না। ছেলেটা হাজার হলেও এই মেরুদণ্ডহীন অপদার্থ বাপটার ছেলে বলে, তোমাকে না বুঝে আঘাত দেয়। যেদিন ছেলেটা বুঝবে হয়তো আমারই মতো অনুশোচনার আগুনে দগ্ধ হবে। আমার ঋক যখন একদিন বাবা হবে তখন হয়তো বুঝবে বাবার মর্ম। ওকে তুমি আমার মতো নয়, তোমার মতো তৈরি কোরো, যাতে ওর ছেলেমেয়ে কোনও দিন ওর মেরুদণ্ডহীনতা অপদার্থতা চোখে আঙুল দিয়ে দেখাতে না পারে। আমি তো সে ভাবে ভালো স্বামী, ভালো বাবা হয়ে উঠতে পারলাম না। আমায় ক্ষমা কোরো। তোমাকে মুক্তি দিলাম ঊর্মি। আর একটা কথা তোমাকে বলা হয়নি। চন্দ্রকোণায় আমার ভাগের পৈতৃক সম্পত্তি বিক্রির কুড়ি লাখ টাকায় তোমার আর ঋকের নামে একটা এলআইসি করে ছিলাম। ঋকের জন্য আমার অনেক আশীর্বাদ রইল। ওকে তুমি মানুষ কোরো। তোমরা ভালো থেকো।

চিঠি পড়া শেষ করে ঋক ঊর্মিলার কাছে বসে পড়ল। কাঁদতে কাঁদতে সে বলল, মা, বাবার মৃত্যুর জন্য আমি দায়ী। বাবা আমার কাছ থেকে পাওয়া অপমান সহ্য করতে পারেনি। আমাকে তুমি শাস্তি দাও।

ঊর্মিলা কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, শাস্তি আমি দেবার কে! ওই লোকটা দেখছিস না আমাদের শাস্তি দিয়ে চলে গেল। সব ব্যথা বুকে নিয়ে আমার ভার কমিয়ে আমাকে মুক্তি দিয়ে গেছে। যাবার আগে তোকে প্রাণভরে আশীর্বাদ করে গেছে। নিজেকে অপরাধী ভাবিস না। আমার কাছে শাস্তি ভিক্ষে করার চেয়ে তোর বাবার শেষ ইচ্ছে পূরণ কর। তুই মানুষের মতো মানুষ হলে তোর বাবার আত্মা শান্তি পাবে। কথা বলতে বলতে ঊর্মিলার গলা থমকে গেল। মনে হল একটা বোবা কান্না মণ্ড পাকিয়ে গলাকে আড়ষ্ট করে দিল।

ভোর হয়ে এসেছে প্রায়। দেয়াল ঘড়িতে সাড়ে চারটে বেজে গেছে। ঝড় বৃষ্টি থেমে গিয়েছে। নীল আকাশ থেকে স্নিগ্ধ নরম আলো ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে। ভোরের দুচারটে দূরপাল্লার ট্রেন অজানা পথে হুইসেল বাজিয়ে দুর্বার গতিতে ছুটে চলেছে। পাড়ার অলিতেগলিতে কিছু কুকুর তারস্বরে ডেকে উঠল।

স্বামী প্রাণেলকে ছাড়া নতুন একটা সকাল আসছে ঊর্মিলার জীবনে। বাবা ছাড়া ঋকের নতুন অধ্যায়ে সূচনা হবে। এ যেন ঋকের পুনর্জন্ম। ঊর্মিলা ছেলেকে বুকে আঁকড়ে জলভরা দুচোখে অস্পষ্ট ভাবে হয়তো উপলব্ধি করল দূরের অনাগত দিনগুলি।

শেষবারের মতো

সকাল সকাল উঠে পড়া গীতার বরাবরের অভ্যাস। আজকের দিনটাও তার ব্যতিক্রম নয়। কিন্তু ঘুম ভাঙার পরেও বিছানা ছাড়তে আজকে কিছুতেই ইচ্ছে করছে না গীতার। কীরকম যেন আলসেমি লাগছে। এপাশ ওপাশ করতে করতে অজয়ের দিকে পাশ ফিরল।

অঘোরে ঘুমোচ্ছে অজয়। গীতার স্বামী। অজয়ের উপর চোখ পড়তেই গীতার মনটা আশ্চর্য রকমের দ্রব হয়ে উঠল।

অজয়ের কপালে তপ্ত ঠোঁটের চুম্বন এঁকে দিয়ে বিছানা থেকে নামবার জন্য পা বাড়াতেই অজয়ের বলিষ্ঠ বাহু এক ঝটকায় গীতাকে নিজের শরীরের উপরে এনে ফেলল। অজয়ের শরীরের উষ্ণতা গীতার স্বাভাবিক বোধবুদ্ধিকে গ্রাস করে নেওয়ার উপক্রম করল। তাও নিজেকে সংযত করার চেষ্টা করল গীতা। অজয়ের বলিষ্ঠ বাহুর বন্ধন থেকে গীতা নিজেকে আপ্রাণ ছাড়াবার চেষ্টা চালাতে চালাতে কপট রাগ দেখাল।

‘আঃ কী করছ কী? সকাল হয়ে গেছে খেয়াল নেই?’

‘তো কী হয়েছে? আমি নিজের বউয়ের সঙ্গে প্রেম করছি সেটাও দোষের?’ অজয়ের চোখে দুষ্টুমির হাসি চিকচিক করে ওঠে।

‘না, ছাড়ো আমাকে। আজকে থেকে আমাকে মর্নিং ওয়াকে যেতেই হবে। বুঝতে পারছি অসম্ভব ওয়েট পুট অন করছি।’

‘তাই জন্যই তো তোমার শরীরের এ টু জেড আমাকে মেপে রাখতে হবে নয়তো বুঝব কী করে যে সত্যি সত্যি হাঁটতে যাচ্ছ নাকি বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা মেরে বাড়ি ফিরে চলে আসছ।’

‘তাহলে সঙ্গে যাচ্ছ না কেন আমার উপর নজর রাখতে?’

‘এক বছর আগে যখন এই বাড়িতে তুমি নতুন বউ হয়ে এসেছিলে, তখনই কোনওদিন তোমাকে সন্দেহ করিনি তাহলে আজকে নতুন করে কেন শুরু করব?’

‘হ্যাপি ম্যারেজ অ্যানিভার্সারি’, গীতা নিজের আনন্দ চেপে রাখতে না পেরে অজয়ের বুকে মুখ লুকোয়।

‘গীতা, আমি প্রমিস করছি আমাদের বিবাহিত জীবনের সুখ, আনন্দ আমি কোনওদিন এতটুকুও ফিকে হয়ে যেতে দেব না। সারাজীবন আমি তোমাকে সুখে রাখবার চেষ্টা করে যাব।’

আনন্দে গীতার চোখে জল চলে আসে। পাছে অজয় এই আনন্দাশ্রু দেখে ফেলে, লজ্জায় গীতা অজয়ের বুকে মুখ গুঁজে রাখে।

গীতা হাতের ঘড়ির দিকে তাকায়। একঘণ্টা কেটে গেছে। ঘামে শরীর চপচপ করছে। বাড়ি থেকে যখন বেরিয়েছিল তখন আকাশ সবে ফরসা হতে শুরু করেছে। এখন ভালো রোদ উঠে গেছে। গীতা বাড়ির দিকে পা বাড়ায়।

বাড়ি পেৌঁছোতেই অজয় লেবু মধুর জল এগিয়ে দেয় গীতার দিকে। অজয়ের এই ছোটো ছোটো জিনিসের খেয়াল রাখার স্বভাবটা গীতার বড়ো ভালো লাগে। গীতা চেয়ারে বসে লেবু মধুর জলের গেলাসে ঠোঁট লাগায়।

অজয় চোখ দিয়ে গীতাকে খানিকটা মেপে নেয়, ‘বাঃ, একদিনেই তো তোমাকে বেশ খানিকটা রোগা লাগছে।’

‘মিথ্যা কথা বোলো না তো। একদিনে কেউ আবার রোগা হয় নাকি?’

‘কথাটা আজকে তোমার মিথ্যা মনে হলেও, এক মাস বাদে কিন্তু আমার কথা যে সত্যি হবেই এটা আমি এখনই বুঝতে পারছি।’

‘না গো, তোমার চোখে নিজেকে সুন্দর রাখার জন্য তো বটেই, নিজের শরীর স্বাস্থ্যের কথা ভেবেও আমাকে যেমন করে হোক রোগা হতেই হবে।’

‘গুড। আচ্ছা এখন বলুন তো ম্যাডাম, তৈরি হয়ে বেরোতে আপনার কতটা সময় লাগবে?’

‘তার মানে তুমি বলতে চাও, আজকের এই বিশেষ দিনে আমার সাজতে-গুজতে কতটা সময় লাগবে?’

‘ঠিক ধরেছ, বিশেষ দিনের বিশেষ সাজ তো।’

‘তুমি সবসময় অভিযোগ করো সাজতে আমি একটু বেশি সময় নিই। দেখো আজ তুমি অভিযোগ করার সুযোগই পাবে না।’

তৈরি হয়ে দুজনে দোতলা থেকে একতলায় নেমে আসে। সত্যি ওদের দুজনের দিক থেকে চোখ ঘোরানো যাচ্ছিল না। ভগবান যেন দুজনকে বানিয়েছেন একে অপরের জন্যে। একতলায় গীতার শ্বশুর শাশুড়ি, ভাসুর-জা আর এক ননদ থাকে।

প্রথমেই গীতার জা অলকা দুজনকে ‘হ্যাপি ম্যারেজ অ্যানিভার্সারি’ উইশ করে। গীতা নিজের পার্স থেকে জা-য়ের পছন্দের একটা চকোলেট বার করে ওর হাতে ধরিয়ে দেয়।

কয়েক সপ্তাহ ধরেই গীতার ননদ শিখা ওদের সঙ্গে কথাবার্তা বলছিল না। সামান্য কারণে ও, অজয় আর গীতার উপর রেগেছিল। কারণ কী ঘটেছিল গীতার জানা নেই কিন্তু এক-দুবার চেষ্টা করেছিল দিদির রাগ ভাঙানোর, কিন্তু শিখা যেন প্রতিজ্ঞা করে নিয়েছিল কথা না বলার।

আজ যখন ওরা দুজন একসাথে বসার ঘরে এসে ঢুকল দেখল শিখা সোফায় বসে টিভি-তে খবর দেখছে। ওদেরকে দেখে শিখা সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে দরজার দিকে পা বাড়াতেই, গীতা এসে শিখার পথ আগলে দাঁড়াল।

ঘটনার আকস্মিকতায় শিখা খানিকটা হকচকিয়ে গিয়েছিল। গীতার দিকে দৃষ্টি দিতেই গীতা বলল, ‘দিদি, তুমি আজ আমাদের আশীর্বাদ করবে না? আজ আমাদের বিয়ের একবছর পূর্ণ হল।’ এই বলে গীতা শিখার পা ছুঁয়ে প্রণাম করল। অজয়ও এগিয়ে এসে দিদির পা ছুঁয়ে প্রণাম করল।

গীতা দিদির হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে বলল, ‘দিদি, আমরা যা অন্যায় করেছি সেটা ভুলে গিয়ে আমাদের ক্ষমা করে দাও প্লিজ। আজকের দিনে মুখ ঘুরিয়ে থেকো না।’ হঠাৎ-ই কান্নায় গলা রুদ্ধ হয়ে আসার ফলে গীতার গলা দিয়ে আর একটা শব্দও বেরোয় না।

গীতার হঠাৎ করে ক্ষমা চাওয়ায় দুজনের মধ্যে গড়ে ওঠা দেয়ালটা এক ঝটকায় ভেঙে যায়। শিখা একটা কথাও মুখ ফুটে বলতে পারে না। শুধু নিজের ভাইয়ের বউকে দুই হাত বাড়িয়ে কাছে টেনে নেয়। দুজনের মনের যত অভিমান সব চোখের জলে ধুয়ে মুছে পরিষ্কার হয়ে যায়। শিখা দুজনকে বিবাহবার্ষিকীর শুভেচ্ছা জানিয়ে বাথরুমের দিকে পা বাড়ায়।

শিখা বেরিয়ে যেতেই অজয়ের মা-বাবা ঘরে এসে ঢোকেন। গীতার কান্নাভেজা চোখ দেখে ভুল ধারণা করে বসেন। অজয়ের মা নির্মলা বউমার দিকে তীক্ষ্ন দৃষ্টি নিক্ষেপ করেন, ‘কী বউমা, আজকের দিনেও তোমরা ঝগড়াঝাঁটি করছ? একটা দিন তো অন্তত আমার ছেলেটাকে শান্তিতে থাকতে দাও। কী পাও বলো তো এইসব করে?’

গীতার চোখে অগ্নিস্ফুলিঙ্গ মুহূর্তের জন্য দেখা দিয়ে আবার মিলিয়ে যায়। অজয়ের মুখে হাসি দেখে নিজেকে সামলে নেয় গীতা।

‘আমাদের মধ্যে তো কোনও ঝগড়া হয়নি, মা। তুমি ভুল বুঝেছ,’ অজয় ঝুঁকে মা আর বাবার পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে।

অজয়ের দেখাদেখি গীতাও শ্বশুর-শাশুড়িকে প্রণাম করে। ওর শ্বশুরমশাই প্রকাশবাবু চুপ করে থাকেন। শাশুড়ি নির্মলা আশীর্বাদ করেন ঠিকই কিন্তু মেশিনের মতো হাতটা বাড়িয়ে শুধু গীতার মাথাটা একবার ছুঁয়ে নেন। এর পরেও উনি নিজের বিরক্তি চাপতে পারেন না, ‘আজ সকাল সকাল দুজনে সেজেগুজে কোথায় চললে? একটা দিনও কি বাড়িতে থাকা যায় না? তোমাদের জন্য লুচি, তরকারি আর পায়েসের ব্যবস্থা করছিলাম। এখন ওগুলো কে খাবে বলো তো?’ নির্মলার প্রশ্নবান যে গীতাকে উদ্দেশ্য করেই নিক্ষেপ করা সেটা কারও বুঝতে অসুবিধা হয় না।

‘আঃ নির্মলা, বলতে শুরু করলে তুমি যে আর থামতেই চাও না। কী হবে এসব বলে? এরপর দেখবে বউমা রাগ করে দুই-তিন মাসের জন্য বাপের বাড়ি চলে গেছে।’ প্রকাশবাবুর কথার তীর্যক ভঙ্গী গীতাকে আঘাত করে।

অজয়ের মৃদ্যু হাতের স্পর্শ নিজের কাঁধে অনুভব করে গীতা মনে খানিকটা বল পায়। ধীর মৃদু স্বরে উত্তর করে, ‘না বাবা, ভবিষ্যতে এরকম ভুল আর কখনও করব না।’

‘আমিও আজ একটা প্রতিজ্ঞা করেছি বাবা।’ অজয়ের গলা শুনে সকলের চোখ গিয়ে পড়ে অজয়ের উপর।

প্রকাশবাবু জিজ্ঞেস করেন, ‘কী প্রতিজ্ঞা করেছ তুমি?

‘এই যে তুমি সবসময় আমাদের বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতে বলো, আমি আর গীতা ঠিক করেছি সিরিয়াসলি ব্যাপারটা নিয়ে নিজেদের মুড আর খারাপ করব না।’

‘অজয়, এই বাড়িতে থাকতে হলে এখানকার নিয়মকানুন তো তোমাকে মেনে চলতেই হবে।’

‘বাবা প্লিজ, আজকের দিনে এইসব কথা কি তোমার না বললেই নয়? আজ এসব ভালো লাগছে না,’ এই বলে অজয় বাবাকে জড়িয়ে ধরে। ‘আজ আমরা ঠিক করেছি বাইরে কোথাও ঘুরেফিরে একটা ফিল্ম দেখব, তারপর বাইরেই কোথাও খেয়ে নেব। সন্ধেবেলায় সিদ্ধার্থর ওখানে পার্টি রয়েছে। বন্ধুরা সবাই মিলে আমাদের পার্টি দিচ্ছে। ওরা তোমাদেরও নেমন্তন্ন করতে আসবে। প্লিজ তোমরা ঠিক সময় পেৌঁছে যেও আর আমাদের গিফট্-টা আনতে ভুলো না কিন্তু।’

এইবলে অজয় গীতার হাতটা চেপে ধরে সদর দরজার দিকে পা বাড়ায়।

‘সকাল সকাল ছেলেটা কোনও নেশা-টেশা করেছে নাকি? দেখলে ছেলের ব্যবহারটা?’ নির্মলার কথার মধ্যেই ফুটে উঠল অজয়ের প্রতি বিরিক্তির মনোভাব।

পনেরো কুড়ি মিনিট বাদে অজয়ের মোটরবাইকটা যেখানে এসে দাঁড়াল সেটা একটা দশতলা ফ্ল্যাটবাড়ি। অজয়ের সঙ্গে গীতাও বাইক থেকে নেমে লিফটের দিকে এগোল। ‘তুমি দশ মিনিট বাদে উপরে এসো। আমি আগে গিয়ে পরিস্থিতিটা সামলাই নয়তো শুধুশুধু তোমাকে আবার অপমানিত হতে হবে,’ এই বলে গীতার গালে একটা আলতো টোকা মেরে অজয় লিফটের ভিতরে ঢুকে গেল।

আটতলায় উঠে যে-ফ্ল্যাটটার সামনে গিয়ে অজয় কলিংবেল বাজাল, তার দরজাটা একটু পরেই খুলে সামনে এসে দাঁড়াল অর্চনা। অর্চনা অজয়ের অফিসেই কাজ করে। সকলেই জানে টানা তিনবছর অজয়ের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক ছিল অর্চনার। অনেক বছর আগেই স্বামীর সঙ্গে অর্চনার ডিভোর্স হয়ে গেছে। অজয়ের থেকে বয়সেও দুবছরের বড়ো অর্চনা।

‘আরে তুমি। আজ তোমাকে এখানে দেখব আশা করিনি। যাক তোমাকে দেখে অসম্ভব আনন্দ হচ্ছে’, এই বলে অজয়ের হাত ধরে টেনে নিয়ে গিয়ে সোফাতে বসিয়ে দিল অর্চনা।

অর্চনার হাত ছাড়িয়ে নিয়ে অজয় সোফাতে গুছিয়ে বসল, ‘কী করছিলে?’

‘এই ঘরদোর পরিষ্কার করছিলাম। কেন কোথাও বেড়াতে যাবার কথা ভাবছ? তাহলে বলো তৈরি হয়ে আসি।’

‘আগে এক কাপ কফি তো খাওয়াও, তারপর দেখছি।’ অজয়কে দেখে মনে হচ্ছিল আজ ওর কাছে অফুরন্ত সময় রয়েছে।

‘গীতা কি এখনও বাপের বাড়িতেই রয়েছে?’

‘না, গতকাল সকালেই বাড়ি ফিরে এসেছে।’

‘বাবা, শেষমেশ মাথা নীচু করতে রাজী হয়েছে?’

‘সময়, অনেক মানুষকেই বদলে দেয় অর্চনা।’

‘গীতার পক্ষে বদলানো অসম্ভব। তোমাদের দুজনের এতদিনে ডিভোর্স নিয়ে নেওয়া উচিত ছিল। না তোমরা একে অপরকে ভালোবাসো আর না তোমাদের চরিত্রগত কোনও মিল রয়েছে। স্বভাবেও তোমরা একদম আলাদা।’

‘ধরো ডিভোর্স হয়েও গেল, কিন্তু আমার একাকিত্ব কীভাবে কাটবে?’

‘কেন আমি তো আছি।’ অর্চনা সোফায় বসে অজয়ের গলাটা জড়িয়ে ধরে নিজের দিকে ওকে টানার চেষ্টা করে।

‘কিন্তু তুমি তো দ্বিতীয়বার বিয়ের রাস্তা মাড়াবে না বলে প্রতিজ্ঞা করেছ।’

‘প্রথম বিয়ের পরে যা বাজে অভিজ্ঞতা হয়েছে, এখন বিয়ের নাম শুনলেই ভয় লাগে। তাই বলে তুমি চিন্তা কোরো না। প্রেমিকার ভূমিকা যে আমি ভালো ভাবেই পালন করতে পারব সে বিশ্বাস আমার নিজের ওপর আছে। কী বলো অজয়?’

‘উত্তরটা কফি খাওয়ার পরেই দেব।’

অজয়ের গাছাড়া ভাবটা ইচ্ছে করেই উপেক্ষা করে অর্চনা রান্নাঘরের দিকে প্রস্থান করে।

কফি বানিয়ে আনতে আনতে ফ্ল্যাটের কলিংবেলটা আর একবার বেজে ওঠে। কফির কাপটা অজয়ের সামনে নামিয়ে রেখে অর্চনা সদর দরজাটা খুলে দেয়।

সামনে গীতাকে দেখেই অর্চনার মেজাজটা চড়াক করে গরম হয়ে ওঠে। কিছু বলার জন্য মুখ খোলার আগেই পিছন থেকে অজয়ের গলা ভেসে আসে, ‘ওঃ তুমি এসে গেছো। ভেতরে চলে এসো।’

অর্চনা সামান্য সরে দাঁড়িয়ে গীতাকে ফ্ল্যাটের ভিতরে ঢুকতে দেয়। ফ্ল্যাটে ঢেকার দরজাটা বন্ধ করে অর্চনা অজয়ের শরীর ঘেঁসে সোফার উপর বসে পড়ে।

‘অজয়, ওকে বলে দাও লাস্ট টাইমের মতো অশান্তি করে একটা সিন না ক্রিয়েট করে। সেদিন ওরকম চ্যাঁচামেচির পর প্রতিবেশীদের সামনে চোখ তুলে দাঁড়াতে পর্যন্ত লজ্জা করছিল।’ অর্চনার কথায় শুধু রাগ নয় একটা ভীতিও ফুটে উঠছিল।

‘আমি অশান্তি করতে এখানে আসিনি। কিন্তু সেদিনও আমার যা প্রশ্ন ছিল আজও সেই প্রশ্নই আমি তোমাকে করতে চাই। অজয় বিবাহিত জেনেও কেন তুমি ওকে পেতে চাইছ?’ গীতা নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ না হারিয়েই অর্চনাকে প্রশ্নটা করে।

‘তোমাকে তো সেদিনই অজয় এর পরিষ্কার উত্তর দিয়েছিল। আমরা দুজন পরস্পরকে ভালোবাসি। তোমাদের দুজনের সম্পর্কটা যে ক্রমশ খারাপের দিকে যাচ্ছে, তার জন্য আমি নই, তুমিই পুরোপুরি দায়ী।’

অজয় এতক্ষণ চুপচাপ ওদের কথা শুনছিল, এবার মুখ খোলে, ‘অর্চনা সত্যিটা গীতার কাছে লুকোবার চেষ্টা কোরো না। স্বীকার করো যে গত তিনবছর ধরে আমাদের মধ্যে গভীর সম্পর্ক গড়ে উঠেছে।’

অর্চনা চমকে অজয়ের দিকে তাকায়। চোখে মুখে ওর স্পষ্ট ফুটে ওঠে রাগ।

‘অর্চনা, বিবাহিত পুরুষের সঙ্গে সম্পর্ক রাখাটা অনুচিত। সমাজের নিয়মের বাইরে এটা। এছাড়াও তোমার এই জেদের জন্য আমাদেরও বিবাহিত জীবনের সুখশান্তি নষ্ট হতে বসেছে। তুমি প্লিজ অজয়ের জীবন থেকে সরে দাঁড়াও।’ গীতার ধীর কণ্ঠস্বরে শুধু অর্চনা নয়, অজয়ও বেশ আশ্চর্য হয়। ভোররাত্রে বাহুবন্ধনে আবদ্ধ গীতার সঙ্গে এখন সামনে দাঁড়িয়ে থাকা গীতার কোনও মিল খুঁজে পায় না অজয়।

‘আমাকে অজয় ভালোবাসে। ওর জীবনে আমার প্রয়োজন আছে। সেই জন্যই আজও আমাদের সম্পর্ক অটুট রয়েছে। তোমাদের অসফল বিয়ের জন্য আমাকে দোষী ঠাওর করার কোনও অর্থ হয় না।’ রুক্ষভাবে অর্চনা উত্তর করে।

‘তাহলে তো অজয়কেই ঠিক করে নিতে হবে আমাদের দু’জনের মধ্যে থেকে ও কাকে জীবনসঙ্গী হিসেবে বেছে নিতে চায়। ও যদি তোমাকে বেছে নেয়, তাহলে আমি কথা দিচ্ছি চিরজীবনের মতো তোমাদের দু’জনের জীবন থেকে আমি সরে দাঁড়াব।’

‘আগের বারও অজয় নিজের ইচ্ছে তোমাকে জানিয়ে দিয়েছিল। তুমিই জেদ করে একলাই এখান থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল। আজকের দিনটা অজয়ের আমার কাছে আসা এটাই প্রমাণ করে যে, ও আমাকে ছাড়া থাকতে পারবে না।’

‘ঠিক আছে। আমি না হয় এখনই অজয়ের কাছ থেকে জেনে নিই এখন ও কী চায়।’

‘জিজ্ঞেস করো।’

‘আর ও যদি জীবনসঙ্গী হিসেবে আমাকে বাছে তাহলে তোমাকে কথা দিতে হবে তুমি ওর জীবন থেকে সরে দাঁড়াবে।’

‘এটা কখনওই হবে না।’ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে অর্চনা উত্তর দেয়।’

‘আর যদি এরকমই হয়, তাহলে?’

সম্মুখ সমরে আহ্বান করার গীতার এই ভঙ্গিমা অর্চনা-কে মনে মনে দুর্বল করে তোলে।

দু’জনেই অজয়ের দিকে ঘোরে। অজয়ের মুখে লেগে থাকা হাসি কাউকেই বুঝতে দেয় না কাকে ও জীবনসঙ্গী হিসেবে বেছে নিয়েছে।

খানিকক্ষণ চুপ থেকে অজয় অর্চনার পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। সঙ্গে সঙ্গে অর্চনার চোখেমুখে ফুটে ওঠে বিজয়ীর অভিব্যক্তি।

‘গতবার তোমাদের দু’জনের ঝগড়ায় আমি তোমাকে সাপোর্ট করেছিলাম কিন্তু আজ আর সেটা সম্ভব নয় অর্চনা। আমি যদি দ্বিতীয়বার আবার এই একই ভুল করি তাহলে সারা জীবনের জন্য গীতাকে হারিয়ে ফেলব। তোমার সঙ্গে আমার পথ চলা এতদূর পর্যন্তই ছিল। গীতার সঙ্গে নতুন জীবন শুরু করতে হলে তোমার থেকে তো আমাকে দূরে যেতেই হবে।’ অর্চনার হাতে সামান্য চাপ দিয়ে অজয় নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে গীতার দিকে ফেরে।

‘আমার মনে হয় তোমার জীবন থেকে অজয়ের সরে যাওয়াই ভালো। আর সেটা তোমার মঙ্গলের জন্যই। অর্চনা, অতীতের সঙ্গে সম্পর্ক ত্যাগ করতে না পারলে নতুনকে কীভাবে আমন্ত্রণ জানানো যাবে?  মনে রেখো, এটাই ভালো হল তোমাদের জন্য’, এই বলে গীতা অজয়ের হাত ধরে অর্চনার ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে আসে। অজয়কে আটকাবার সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয় অর্চনার।

দোকানে বসে দু’জনেরই পছন্দের ঢাকাই পরোটা, আলুর তরকারি আর মিষ্টি খেয়ে বেরিয়ে এসে সোজা ওরা পা বাড়ায় গীতার বাপের বাড়ির দিকে। বাপের বাড়ির সামনে বাইক থেকে নেমে দাঁড়াতেই গীতা যেন আবেগে ভেসে যেতে থাকে।

‘কী হল, দাঁড়িয়ে পড়লে যে। ভেতরে যাবে না?’

‘এই এক সপ্তাহ আগে যখন মায়ের কাছে এসেছিলাম তখন কেমন একটা নিঃসঙ্গ একাকিত্বে ভুগছিলাম। সবসময় মনে হচ্ছিল সবাই যেন আমার মনের ভিতরটা স্পষ্ট পড়তে পারছে। আমার ব্যথার জায়গাটা সকলের যেন জানা হয়ে গেছে। আজ মনটা খুব ভালো লাগছে জানো। আমি এই আনন্দের মুহূর্তগুলো আর হারাতে চাই না।’

‘আমরা আবার নতুন করে জীবন শুরু করতে চলেছি গীতা। কথা দিচ্ছি, আনন্দ খুশিতে তোমার জীবন ভরিয়ে দেব।’ অজয় গীতার কাঁধটা জড়িয়ে ধরে শ্বশুরবাড়ির দরজায় গিয়ে দাঁড়ায়।

গীতার মা-বাবা, দাদা-বউদি এসে ওদের দু’জনকে প্রথম বিবাহবার্ষিকীর শুভেচ্ছা জানিয়ে বাড়ির ভিতরে নিয়ে যায়। এতদিন পরে জামাই বাড়ি এসেছে অথচ কীভাবে ওদের দু’জনকে স্বাগত জানাবে, গীতার বাড়ির লোকেরা বুঝে পায় না। এক সপ্তাহ আগে পর্যন্ত ওদের জানা ছিল জামাই আর মেয়ের মধ্যে সম্পর্কের টানাপোড়েন চলছে। এর মধ্যে যে সব ঠিক হয়ে গেছে তা ওদের ধারণাও ছিল না।

সবাই একসঙ্গে বসবার ঘরে বসে গল্পগুজব করতে করতে গীতার মা বন্দনা মেয়েকে নিয়ে ভিতরের ঘরে চলে যান। গীতার বউদিও রান্নাঘরের দিকে পা বাড়ায়। অজয় শ্বশুর এবং শ্যালকের সঙ্গে বসেই গল্প করতে থাকে।

প্রায় কুড়ি মিনিট পর গীতা মায়ের সঙ্গে বসবার ঘরে এসে ঢোকে। গীতা মাকে চেয়ারে বসিয়ে অজয়ের পাশে এসে বসে।

‘শুনছ, মা না আমায় নিয়ে খুব চিন্তায় রয়েছে। আমি কীরকম আছি, সুখে আছি কিনা এই নিয়ে নানা দুশ্চিন্তা আর কী! আমি তো বুঝিয়েছি, এখন তুমিই পারো মায়ের চিন্তা দূর করতে।’ বন্দনা মেয়ের কথা শুনে জামাইয়ের সামনে লজ্জায় পড়ে যান।

‘মা, গীতাকে নিয়ে কী এত চিন্তা করছেন?’ অজয় খুব সিরিয়াস হয়েই শাশুড়িকে প্রশ্নটা করে।

‘না-না বাবা, সেরকম কিছু নয়। একটাই মেয়ে। চিন্তা তো হয়ই।’

এরই মধ্যে গীতা বলে ওঠে, ‘মা, শুধু তো চিন্তা নয়, আমি কীভাবে ভালো থাকতে পারি সেই পরামর্শগুলোও আমার সঙ্গে সঙ্গে অজয়কেও দাও। দ্যাখো না ও কী বলে।’

মেয়ের কথা শুনে বন্দনা যেন একটু অপ্রস্তুত হয়ে পড়েন। মেয়েকে থামাবার প্রয়াস বিফল হলে মুখের হাসি বজায় রেখেই অজয়কে বলেন, ‘গীতা বরাবরই একটু বোকা, মনের কথা গুছিয়ে বলতে পারে না। তোমাদের দু’জনেরই জীবনে যাতে খুশি বজায় থাকে তাই আমি গীতাকে বলেছিলাম, সংযুক্ত পরিবারে থেকে যখন তোমাদের দুজনের মধ্যে ব্যবধান বাড়ছে তখন উচিত হচ্ছে ওই বাড়ি ছেড়ে অন্য কোথাও দু’জনের আলাদা করে সংসার পাতা উচিত। এক বছর ধরে তোমাদের সম্পর্কের টানাপোড়েনের ঘটনা তো সকলেরই জানা। মা হয়ে এটুকু চাওয়াটা কি অন্যায়?’

‘না মা, অন্যায়টা আসলে আমার,’ গম্ভীর ভাবে অজয় শাশুড়ির কথার উত্তর দেয়। ‘তবে বিবাহিত জীবনের দ্বিতীয় ধাপের শুরুতে আমরা দুজনেই অতীতকে ভুলে নতুন করে জীবন শুরু করার প্রতিজ্ঞা করেছি। আপনাদের আশীর্বাদটুকুই এখন শুধু দরকার।’

‘মা তোমাকেও একটা প্রমিস করতে হবে। এবার থেকে কিছু বোঝাবার হলে আমাকে একলা নয়, অজয় সঙ্গে থাকলে তবেই বলবে।’ গীতাও কিছুটা সিরিয়াস হয় কারণ মায়ের স্বভাব তার অজানা নয়।

‘আর একটা কথা’, অজয় বলে, ‘এটাও আমরা ঠিক করেছি সকলের কথাই আমরা শুনব। কিন্তু আমরা দু’জন মিলে যা ডিসিশন নেব সেটাই মেনে চলব। এটাতে কেউ ব্যথা পেলেও আমাদের কিছু করার নেই।’

‘আমি তো গীতাকে যা বলেছি, সবই ওর ভালোর জন্যই। ও যদি সেটা না মানে তাহলে সেখানে আমার কিছু বলার নেই।’

‘মা প্লিজ। এখন থেকে আমার জন্য নয়, আমাদের ভালো কীসে হবে ভাবতে শুরু করো।’

বন্দনা কথা না বাড়িয়ে, মেয়ের দিকে তীর্যক দৃষ্টি নিক্ষেপ করে রান্নাঘরের দিকে পা বাড়ান।

এতক্ষণ গীতার বাবা সুব্রতবাবু এবং দাদা সৌম্য দু’জনেই মুখ বন্ধ করে বসে সব শুনছিলেন। বাড়ির গৃহিনী ভিতরে যেতেই দুজনে উঠে এসে অজয়কে জড়িয়ে ধরেন। দুজনের চোখেই আনন্দ যেন উপচে পড়ছিল।

‘অজয়, আমার মনের বোঝা আজ তোমরা দুজনে মিলে হালকা করে দিলে। আশীর্বাদ করি তোমাদের এই সদ্বুদ্ধি আজীবন বজায় থাকুক।’ সুব্রতবাবুর গলা রুদ্ধ হয়ে আসে।

হাসিঠাট্টার মধ্যে দিয়ে ওদের চারজনের আড্ডা জমে ওঠে। দুপুরে সকলে একসঙ্গে খেতে বসলে গল্পগুজবের মধ্যে দিয়ে সকালের টেনশন অনেকটা সহজ হয়ে আসে। বিশ্রামের পর অজয়, বন্ধু সিদ্ধার্থর বাড়ির পার্টিতে সকলকে নিমন্ত্রণ জানিয়ে গীতাকে নিয়ে শ্বশুরবাড়ি থেকে বেরিয়ে আসে।

অজয়ের চারজন বন্ধু মিলে সিদ্ধার্থর বাড়িতে গীতা আর অজয়ের বিবাহবার্ষিকীর পার্টিটার আয়োজন করেছিল। সিদ্ধার্থর বউ সুচেতা গীতাকে সাজানোর দায়িত্ব নিয়েছিল। গীতাকে সাজিয়েগুজিয়ে যখন বার করল সত্যিই ওর দিক থেকে চোখ ফেরানো যাচ্ছিল না।

অজয় আর গীতারই পার্টিটা দেওয়া উচিত ছিল কিন্তু প্রায় ভেঙে যাওয়া দু’জনের বিবাহিত জীবন নতুন করে জোড়া লাগার আনন্দে বন্ধুরাই পার্টিটার আয়োজন করেছিল। নিমন্ত্রিত সকলেই প্রায় উপস্থিত ছিল পার্টিতে। হাসি, আড্ডা আর সকলের শুভেচ্ছায় পার্টি জমে ওঠে। হইচই মিটতে মিটতে রাত প্রায় বারোটা। অতিথিরা সকলেই তখন চলে গেছেন। শুধু পাঁচ বন্ধু আর তাদের ফ্যামিলি তখনও গল্পে মশগুল।

হাতঘড়ির দিকে চোখ পড়তেই অজয় উঠে দাঁড়ায়, ‘আর না, এইবার বাড়ি যাওয়া দরকার। অনেক রাত্তির হল। তোদের সকলকে অনেক ধন্যবাদ এত ভালো একটা পার্টি আয়োজন করার জন্য। চলো গীতা, এর পরে গেলে বাড়িতেও আর ঢুকতে পারব না।’

সকলকে শুভরাত্রি জানিয়ে অজয় আর গীতা যখন বাড়ি ঢুকল তখন রটা বেজে গিয়েছে। শোবার ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করতেই গীতা অজয়ের কাছে নিজেকে সঁপে দেয়। হাতের বেষ্টনী এতটুকুও আলগা না করে অজয় জিজ্ঞেস করে, ‘কেমন কাটল আজকের দিনটা?’

‘অসম্ভব ভালো। এই দিনটার কথা কোনওদিনও ভুলতে পারব না।’

‘আমিও না। আমি প্রমিস করছি কোনওদিন তোমাকে আর দুঃখ দেব না। অতীতটা আজ আমার কাছে স্বপ্ন। আমার বাস্তব এখন তুমি। ভুল করেছি আর ভুল ভেঙেও গেছে। আমি ধীরে ধীরে বুঝতে পারছিলাম, অর্চনা আর আমার সম্পর্ক আসলে কোনও পরিণতিতে পেৌঁছোবে না। কারণ ও কখনও চায় না আমার বউ হয়ে সংসার করতে। ক্ষণিক সুখের চাহিদা মিটে গেলেই ও খুশি। দাম্পত্য মানে যে আগলে রাখা, আঁকড়ে থাকা, এই আবেগটা ওর মধ্যে দেখিনি। দেখেছি শুধু তোমার কাছ থেকে কেড়ে নেওয়ার, যেন কোনও বাজি জেতার আনন্দ। আমার ভুল আমি বুঝতে পেরেছি। আমি শুধু প্রায়শ্চিত্ত-ই করতে চাই না গীতা, তোমার জীবনটাও ভালোবাসায় ভরিয়ে তুলতে চাই। আমাকে সেই সুযোগটুকু দেবে তো গীতা?’

উত্তর না দিয়ে গীতা অজয়ের বুকের কাছে আরও ঘন হয়ে আসে। টের পায় অজয়ের উষ্ণ নিঃশ্বাস নিজের ঠোঁটে এসে লাগছে। ঘরের আলোটা কখন নেভানো হয়েছে গীতা টের পায় না। শুধু ওদের উষ্ণ ভালোবাসার সাক্ষী হয়ে থাকে ঘরের নাইট বাল্বটা।

চেতন-অচেতন

দোতলার ঝুল বারান্দা থেকে দৃশ্যটা দেখে মামির চক্ষু ছানাবড়া!

– এই হাঁদারাম, কী করছিস, কী করছিস– বলতে বলতে দ্রুত সিঁড়ি দিয়ে নীচে নেমে আসেন। তারপর কান ধরে হিড়হিড় করে টানতে টানতে ঋজুকে ড্রয়িংরুমে মামার কাছে নিয়ে গিয়ে ঝাঁঝের সঙ্গে বলেন– এই শুনছ, দ্যাখো, একে নিয়ে তো আর পারা যায় না।

– কী, করেছে কী গর্দভটা?

– আর করেছে! শোনো, পুজোর নতুন শার্ট প্যান্টটা একটা ভিখিরি ছেলেকে… সঙ্গে আবার ফ্রিজ খুলে মিষ্টির প্যাকেটটাও!

মামা গর্জে ওঠেন– সে কী! এভাবে দানছত্র করতে কে বলেছে?

ঋজুর কাঁদো কাঁদো স্বর– ও যে চাইল মামা!

গালে এক চড় বসিয়ে চিৎকার করে বলেন– চাইলেই দিতে হবে, অপদার্থ কোথাকার! ক্ষমতা কতটুকু বুঝতে হবে না! এখন যদি কেউ কেঁদে কেটে আমার কাছে বাড়িটা চায়, আমি কি দিতে পারব?

তোতলাতে তোতলাতে ঋজু বলে– না মানে… আমার তো পুরোনো দুটো আছে কিন্তু ওর তো একটাও নেই!

চোখ পাকিয়ে মামা বলেন– খবরদার! আর যেন এরকম না শুনি! ওর কাছে নেই, তুই কি দেখে এসেছিস? এক্বেবারে রাম বোকা! ছোটো ভাইটাকে দেখেও শেখে না! ভাগ এখান থেকে। মনে রাখবি নিজে যখন উপার্জন করবি, তখন যতখুশি দানছত্র করবি। কিন্তু এখন নয়।

আপনমনে গজগজ করেন মামা– হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে, মাথার ঘাম পায়ে ফেলে সংসার ঠেলতে হচ্ছে। তার ওপর আবার দানছত্র করে পুণ্য অর্জন করা! যত্তসব…!

মামি পিঠে দুটো কিল দিয়ে বলেন– আর যদি কোনওদিন এরকম কিছু দেখি, তবে ওদের সঙ্গে তোকেও বাইরে পাঠিয়ে দেব। ঋজু দু’হাতে চোখ মুছতে মুছতে নিজের ঘরের দিকে চলে যায়।

জন্মলগ্নে মাকে হারিয়েছে ঋজু। তার বছর খানেক ঘুরতে না ঘুরতে এক দুর্ঘটনায় বাবাকেও। এই মামা ছাড়া সাতকুলে আর কেউ নেই। মামা নিজে এক ছোটো কারখানায় ছোটো কর্মী মাত্র। বাড়িটা পৈত্রিক সূত্রে। তিনজনের সংসার মামা মামি আর তাদের একমাত্র সন্তান সানু। ভালো নাম সান্নিধ্য। ঋজুর চেয়ে বছর দুইয়ের ছোটো। সব্বার স্নেহ ভালোবাসার সান্নিধ্যে তিলতিল করে বড়ো হয়ে ওঠা বুদ্ধিমান মেধাবী সান্নিধ্য। ঋজু এ’বাড়িতে পরগাছা। পান থেকে চুন খসলে কপালে জোটে কিল চড় ঘুসি। পোশাকি নাম সমৃদ্ধ। অনেক শখ করে বাবা তাঁদের ছোট্ট সংসারের নতুন অতিথির নাম রেখেছিলেন সমৃদ্ধ। আজ কপালগুণে সেই সমৃদ্ধ সব খুইয়ে এ বাড়ির একটা বাড়তি বোঝা।

কালের নিয়মে একসময় বড়ো হয়ে ওঠে সমৃদ্ধ। তবুও খুব সাদাসিধে। আলাভোলা। পরীক্ষার রেজাল্ট বরাবর-ই কোনওক্রমে, টেনেটুনে। এদিকে প্রায় প্রতি ক্লাসে প্রথম দ্বিতীয় স্থান অধিকার করে সান্নিধ্য এখন ভালো নামজাদা কলেজে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছে। আর দু’বেলা সানুর সঙ্গে তুলনার খোঁচা খেতে খেতে একসময় নিজের পায়ে দাঁড়াবার চেষ্টায় ব্যস্ত ঋজু। যদিও মামা-মামি একটা ব্যাপারে একমত যে, এই ছেলে কোনওদিন ভালো কিছু করতে পারবে না। এত ভুলো মনের, হাবাগোবা ছেলের দ্বারা বড়ো কিছু অসম্ভব। এব্যাপারে হয়তো শত্রু মিত্র সব্বাই একমত। মামা মাঝে মাঝে দুঃখ করে বলেন– হঠাৎ যদি আমার মৃত্যু হয়, ঋজুটাকে কে দেখবে?

মামি সায় দেন– আমিও তাই ভাবি, ভবিষ্যতে এই ছেলের কী হবে? আমাদের মৃত্যুর পর এটা সানুর বোঝা হয়ে থাকবে না তো?

মামার গম্ভীর স্বর– মস্তিষ্কের বিশেষ কোনও কোশ বা অনুকোশ অকেজো হয়ে পড়লে, এরকম হয় হয়তো। মামি বলে ওঠেন– কাজ তো করে একটা প্লাস্টিক কারখানায় কিন্তু সেখানেও ক’দিন করতে পারবে কে জানে! মাধ্যমিকের যা রেজাল্ট! উচ্চমাধ্যমিকে পি ডিভিশন ছিল বলে রক্ষে, নইলে…। পাস কোর্সে বি.এ। তা-ও কোনওক্রমে। মামা একটা ছোট্ট স্বস্তির নিশ্বাস ছেড়ে বলেন– যাক তবু তো গ্র্যাজুয়েট।

মামি আবার গজগজ করে ওঠেন– জানো আজও কারখানায় বেরোবার মুখে টিফিন কৌটো নিতে ভুলে গেল! সব গুছিয়ে এলাম, তবুও…! কী যে হবে এর!

মামাও সুর মিলিয়ে বলে ওঠেন– হ্যাঁ, আমিও লক্ষ্য করেছি, দিন দিন যেন এটা বেড়ে যাচ্ছে। এই তো রোববার সকালে দোকানে পাঠালাম একটা ব্লেড আনতে, আর ছেলে কিনা একটা পাউরুটি নিয়ে হাজির। সত্যি ভাবনার বিষয়! মামি আবার বলেন– আর বলো কেন, গত পরশু সানুটার জন্মদিন ছিল, তাই ঋজুকে বললাম, একটু তাড়াতাড়ি কারখানা থেকে ফিরতে, বলেও গেল তাড়াতাড়ি ফিরবে অথচ বেমালুম ভুলে ফিরল সেই রাত দশটায়। এমন ছেলে দেখিনি বাবা! না লাগে হোমে, না লাগে যজ্ঞে।

কারখানায় ক’দিন ধরেই ঝামেলা চলছে। একটা জরুরি ফাইল খুঁজে পাচ্ছে না ঋজু। অথচ গত তিনদিন আগেই দত্ত সাহেব ফাইলটা ওর হাতে দিয়ে বলেছিল– এটা খুব জরুরি। নেক্সট ফ্রাইডে ফ্যাক্টরির বোর্ড মিটিং। অর্ডারটা বড়ো সাহেবকে দিয়ে তখন স্যাংশন করিয়ে নিতে হবে। এটা রাখুন। কাল আমাকে দিয়ে দেবেন। এর আগেও দত্ত সাহেব অনেক জরুরি ফাইল ঋজুর হাতে তুলে দিয়েছেন। ঋজুও সততার সঙ্গে দায়িত্ব নিয়ে, সেই দায়িত্ব যথাযথ পালন করেছে। কোথাও কোনওরকম ভুল হয়নি। বরং ওর সততা আর দায়িত্ববোধকে সব্বাই বেশ তারিফ করেছেন।

অথচ পরশু দিনের ফাইলটা ওর কাছ থেকে বেমালুম লোপাট হয়ে গেল! এটা কী ওর মনের ভুল না কাজের গাফিলতি? নিজেকে নিজে সান্ত্বনা দেয়– নাহ্, এটা মোটেই ওর গাফিলতি নয়। কারখানায় এসে কাজে কখনও ফাঁকি দেয় না সে। ফাইলটা নিয়ে, সেটা যত্ন করেই রেখেছিল, তবুও…! চারদিক তন্নতন্ন করে খোঁজা হ’ল। কোথাও নেই…! সেই থেকে কারখানার দত্তসাহেবের কাছে দু’চক্ষের বিষ হয়ে উঠল। এদিকে ওর এক সহকর্মী কমল, নিজের দুঃখ দুর্দশার কথা ওর কাছে সাতকাহন করে ফেনিয়ে ফেনিয়ে বলে ওর মাইনের পুরো টাকাটা নিয়ে কারখানা ছেড়ে কেটে পড়ল। বাড়িতে মামা মামির কাছে কী কৈফিয়ত দেবে ভেবে পায় না ঋজু। মামির বাক্যবাণে প্রাণ ওষ্ঠাগত। ঘরে বাইরে কেমন যেন কোণঠাসা অবস্থা। আপন মনে বিড়বিড় করে ঋজু– ধ্যুস, কিচ্ছু ভাল্লাগে না। কী যে করি! কোথায় যে যাই!

মামি মুখ ঝামটা দিয়ে বলেন– এত বোকা, পৃথিবীতে দু’টো নেই। মামা শুধরে দিয়ে বলেন– না না বোকা নয় ঋজু। তবে খুব নরম মনের ছেলে। কারও দুঃখ কষ্ট সহ্য করতে পারে না। মামি আবার চড়া গলায় বলেন– ওই একই হ’ল। নির্বোধ যারা তাদেরই মন নরম হয়, ওসব নরম-ই বলো আর সরল-ই বলো সব এক-ই। নইলে এই তো দু’দিন আগে, পল্টু নামে কারখানার এক ছেলেকে নিজের টিফিন খাইয়ে নিজে সারাদিন ঢোক ঢোক করে জল গিলে রাতে বাড়ি ফিরল। সে নাকি টিফিন আনেনি, খিদেতে ছটফট করছিল তাই…। এমন বোকা কেউ দেখেছে!

মনে মনে ভাবে ঋজু– আর আজ? আজও ভুল হয়ে গেল আবার। মুহূর্তের অন্যমনস্কতায় ফেরার পথে, চেনা ট্রেন ছেড়ে অচেনা ট্রেনে উঠে পড়ল। প্রায় প্রতি রোববার-ই এদিক-ওদিক বেরোয় সমৃদ্ধ। বাড়িতে মন বসে না। মামা-মামির তির্যক কথার চোটে এদিক-ওদিক ছুটে বেড়ায়। তাছাড়া সান্নিধ্যটাও হয়েছে সে’রকম। কেবল পড়ার বই-এ মুখ গুঁজে বসে থাকা, আর কেরিয়ার তৈরি করা– এর বাইরে দুনিয়াটা যেন নিরস গদ্যময়।

ধ্যুস কিস্যু ভাল্লাগে না। যেদিকে চোখ যায়, চলে যেতে ইচ্ছে করে সমৃদ্ধের। তাই ফেরার তেমন তাগিদও ছিল না। যাবে শিয়ালদা চলে গেল সোদপুর। ভিড় ঠেলে স্টেশনে নামতেই টনক নড়ল। কোথা থেকে এক সুন্দরী মেয়ে সামনে এসে, একমুখ হাসি নিয়ে বলল– এই তো শান্তনু কোথায় ছিলে এতদিন! চলো চলো আমার সঙ্গে এসো, যেতে যেতে সব শুনব।

ঋজুকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে হাত ধরে টানতে টানতে সামনের দিকে নিয়ে চলে। ঋজু যখন দিশেহারা, আমতা আমতা করে কিছু বলতে যাচ্ছে, মেয়েটি তখন হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে, ওকে দু’হাতে জড়িয়ে ধরে, ঠেলে নিয়ে চলল। কিছুটা গিয়ে একটু থেমে মেয়েটা বলে– হাঁদারামের মতো অমন করে কী দেখছ? আমাকে চিনতে পারছ না, মনে হচ্ছে? আর অভিনয় কোরো না। ধরা পড়ে গেছ। এবার লক্ষ্মী ছেলের মতো চলো তো।

দিশেহারা মন নিয়েও, স্মৃতি হাতড়াবার চেষ্টা করল সমৃদ্ধ। কিন্তু না। চিনতে পারল না। ফলে মনে উঠল দ্বিধা আর সংশয়ের দোলাচল। আপনমনেই প্রশ্নের ঝড় উঠল একসময়– খারাপ মেয়ে নয়তো? রাত তো বেশ হয়েছে। শীতের রাত। চারদিক সুনশান। ঋজু ক্রমশ মেয়েটিকে এড়িয়ে যাবার চেষ্টা করল। কিন্তু ততক্ষণে মেয়েটি রিকশা ডেকে, নিজে আগে উঠে, হাত ধরে সমৃদ্ধকেও রিকশায় ওঠার জন্য টানাটানি শুরু করে। আশেপাশের কয়েকজন রিকশাওয়ালা, অটোওয়ালা এসে ভিড় জমায়। অগত্যা একসময় সিন-ক্রিয়েটের ভয়ে রিকশায় উঠে বসে ঋজু। কিন্তু মেয়েটিকে সত্যি সত্যি চিনতে পারে না। অথচ আসতে বাধ্য হল। মেয়েটি যেভাবে জড়িয়ে ধরেছে, হাত ধরে টানছে, তাতে গভীর অন্তরঙ্গতা ফুটে ওঠে। প্রতিবাদের ভাষা থাকে না। তাছাড়া প্রতিবাদ করতে গেলে হয়তো মেয়েটি তর্কাতর্কি শুরু করবে, পরে হয়তো কান্নাকাটিও জুড়ে দেবে। লোক জড়ো হবে– এই ভয়েও ঋজু শেষ পর্যন্ত বেশি কথা বলে না।

সমৃদ্ধ তবুও একসময় প্রতিবাদের গলায় মিনমিনিয়ে বলে– দেখুন আপনি বোধহয় কোথাও ভুল করছেন।

– ভুল! না না আমি কোনও ভুল করছি না। তবে মাত্র সাত বছরে তুমি আমাকে ভুলে গেলে? এ-ও কি সম্ভব? আমাদের এত বছরের সম্পর্ক! তবে চিরদিন-ই তুমি ভুলো মনের, হাঁদারাম। এখন-ও সেরকম-ই আছো। কোনও পরিবর্তন নেই। কথা না বলে, মুখ বুজে চলো তো!

এই মুহূর্তে সমৃদ্ধের মনে হল কে যেন তাকে মাদক খাইয়ে বেহুঁশ করে দিয়েছে। হাত পা কেমন যেন আলগা আলগা লাগছে। শরীরটা অবশ। মামা-মামি, ঘরবাড়ি, সব যেন ক্রমশ ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। শরীরে শরীর ছুঁয়ে ওরা যখন রিকশায় পাশাপাশি বসল, সমৃদ্ধের মন তখন আরও বেশি অসাড়। এই প্রথম একজন অল্পবয়সি মেয়ের ছোঁয়া। মনে ওঠে সাত সমুদ্রের ঢেউ। অনেকটা পথ যাবার পর আমতা আমতা করে বলে সমৃদ্ধ– আচ্ছা আমরা কোথায় চলেছি…?

মেয়েটি হেসে ওঠে ওর প্রশ্ন শুনে। এই হাসির মধ্যে আর যাই হোক, কিন্তু ছলনা নেই। এ যেন বিশ্বজয়ের আনন্দে গর্বিত হাসি। হাসতে হাসতেই বলল– আর পারি না। সত্যি সত্যি তুমি একটা ক্যাবলাকান্ত। কোথায় আর যাব এত রাতে? বাড়ি যাচ্ছি। তুমি আমাদের বাড়ি চেন না? তুমি না আমার বাবার প্রিয় ছাত্র ছিলে? সব ভুলে গেলে? সত্যি তোমার হলটা কী বলো তো? মগজ ধোলাই হয়েছে নাকি? গঙ্গার ধারে আমাদের বাড়ি। তুমি রোজ সে বাড়িতে যেতে, সব ভুলে গেছ? পরীক্ষার পরও নানান ছুতো করে আমাদের বাড়ি আসতে, শুধু একবার আমাকে দেখার জন্য। তবে এতটাই হাঁদা ছিলে বাড়ির সবার সঙ্গে কত কথা, শুধু আমার সঙ্গে কথা বলতে গেলেই তোতলাতে, মনে আছে?

সমৃদ্ধের মুখে কোনও ভাষা নেই। ভাষা যেন কোথায় হারিয়ে গেছে। তেরছা চোখে বারবার মেয়েটিকে দেখার চেষ্টা করছে। আর মনের অতল গহ্বরে, স্মৃতির ঘেরাটোপ থেকে ওর মুখটা তুলে আনার চেষ্টা করছে। কিন্তু যতবার চেষ্টা করছে, ততবার-ই ব্যর্থ হচ্ছে। অগত্যা অসহায় ভাবে ভ্যাবলার মতো চারদিকে তাকাচ্ছে। স্মৃতিকে উস্কে দেবার জন্য প্রকৃতি যদি সামান্যতম সাহায্য করে, এই আশায়। কিন্তু শীতের রাত। বেশিরভাগ বাড়ির দরজা জানালা বন্ধ। অন্ধকার যেন অন্ধকারকে ছুঁয়ে ঘন হয়ে আছে। কিছু ঠাহর করা অসম্ভব। মনে মনে ভাবে সমৃদ্ধ, মেয়েটি ভালো-ই নাটক জানে। এমনকী ওর বাচনভঙ্গিতে কোনও জড়তা নেই। অভিনয়ে এতটুকু আড়ষ্টতা নেই। কখন কী বলতে হবে, সব মুখস্ত। মুহূর্তে আবার মনে ঝড় ওঠে, সবটাই কি অভিনয়? এই যে শীতের রাতে গঙ্গার ধার দিয়ে রিকশায় যাচ্ছে, তাতে ওর একটু আগে শীত করছিল। মেয়েটি যেহেতু ওর গা ঘেঁষে বসেছিল তাই ওর ঠক ঠক করে কাঁপা বুঝতে পেরে, তক্ষুনি নিজের গায়ের শালটা খুলে, ওর গায়ে জড়িয়ে দিল। বারণ করেও সে আটকাতে পারল না। এটাও কি অভিনয়! ওর চোখ দুটো ছলছল করে উঠেছিল। ভাগ্যিস অন্ধকার ছিল!

সমৃদ্ধ স্মৃতি হাতড়ে সমানে মেয়েটিকে খোঁজার চেষ্টা করে। কিন্তু স্মৃতির ঘরে শুধুই ধোঁয়াশা। গাঢ় অন্ধকার। মেয়েটিকে কখনও দেখেছে কিনা সন্দেহ। প্রেম তো বহু দূরের কথা! মেয়েটি কিন্তু তার সবরকমের সুযোগ-সুবিধার প্রতি খেয়াল রাখছে। ব্যাগের চেন খুলে দুটো লজেন্স ওর হাতে দিল। গায়ের শালটা দিল! বারবার জল তেষ্টা পেয়েছে কিনা জানতে চাইছে। এই মুহূর্তে সমৃদ্ধের নরম মনটা একটু একটু করে নিজের বশ হারিয়ে দুর্বল হয়ে পড়ছে। ওর এত বয়সের জীবনে এভাবে কেউ কোনওদিন ওর প্রতি নজর দেয়নি। মামা-মামির সংসারে, জ্ঞান বয়স থেকেই ও একটা পরগাছা, আপদ বিশেষ। সেও যে কারও প্রিয় পাত্র হতে পারে, এটা এই প্রথম সমৃদ্ধ অনুভব করল। তবে কী ইদানীং ওর সব স্মৃতি ক্রমশ বিস্মৃতির গহ্বরে চলে যাচ্ছে! হলটা কি তার! একজন মানসিক ডাক্তারের সঙ্গে পরামর্শ করা প্রয়োজন।

এসব সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতেই তারা গঙ্গার ধারে একটা পুরোনো বাড়ির সামনে দাঁড়াল। সমৃদ্ধ তাড়াতাড়ি রিকশাভাড়া মিটিয়ে দিল। রিকশাওয়ালা তক্ষুনি উলটোদিকে চলা শুরু করল। মেয়েটি দ্রুত পায়ে এগিয়ে সদরের কড়া নাড়ে। মুহূর্তের মধ্যে বেরিয়ে এলেন বনেদি চেহারার এক প্রৌঢ়া। মুখে চোখে উৎকণ্ঠা। মেয়েটির দিকে এক ঝলক তাকিয়েই বলে ওঠেন– কোথায় গিয়েছিলি সুমি? এত দেরি হ’ল যে!

তারপর পাশে দাঁড়ানো সমৃদ্ধকে দেখে উদ্বেগে দিশাহারা ভাবে ব্যাকুল স্বরে বলে ওঠেন– আবার একজনকে…! সুমি মাথা ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে বলে– এবার ভুল করিনি মা। দ্যাখো ভালো করে দ্যাখো ও শান্তনু। পরক্ষণে একটু চড়া সুরে ডাকে, এই শান্তনু এদিকে এসো। আলোর দিকে মুখ করে দাঁড়াও। এবার দেখে বলো তো মা, আমি ভুল করেছি কি না?

মা জোরে জোরে ঘাড় নেড়ে কান্নায় ভেঙে পড়তে পড়তে প্রতিবাদের গলায় বললেন– ওরে সুমি ও শান্তনু নয়। তোকে কতবার বলেছি শান্তনু মারা গেছে। তবুও তুই বিশ্বাস করবি না! তবু এই বার বার ভুল করে…!

ভয়ংকর ক্ষেপে ওঠে সুমি। যে-মেয়েকে কিছুক্ষণ আগেও হাসি খুশি দেখাচ্ছিল, উচ্ছল উজ্জ্বল লাগছিল, মুহূর্তে কে যেন তার মুখে কালি লেপে দিল! মাথা ঝাঁকিয়ে কড়া চোখে মায়ের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে ওঠে– বিশ্বাস করো মা এবার আমি ভুল করিনি। ভুল করিনি মা। ও শান্তনু… শান্তনু।

এই সময় ভেতর ঘর থেকে এক যুবক বেরিয়ে এল। সমৃদ্ধের-ই সমবয়সি। বেশ ভালো চেহারা। কাছে এসে উৎকণ্ঠা নিয়ে বলল– আবারও এক-ই ভুল করলি সুমি?

– না রে দাদা আমি তো কোনও ভুল করিনি। তারপর সমৃদ্ধের দিকে ঘুরে বলে ওঠে, তুমি ওকে চিনবে না শান্তনু। ও আমার মাসতুতো দাদা সুব্রত।

মা বলে ওঠেন– ওকে ঘরে নিয়ে যা সুব্রত।

– না না আমি শান্তনুকে না নিয়ে ঘরে ঢুকবই না। সমৃদ্ধ-র হাতটা শক্ত করে ধরে রেখেছে সুমি। কেমন যেন বেপরোয়া ভঙ্গি, উন্মত্ত ক্ষিপ্ত চেহারা। মেয়ের হাত মা কিছুতেই ছাড়াতে পারছেন না। অগত্যা সুব্রত ওর পেশিবহুল শরীরের সব শক্তি প্রয়োগ করে। গর্জে উঠে বলে– শোন সুমি ও সত্যিই শান্তনুর মতো দেখতে, কিন্তু ও শান্তনু নয়। বোঝার চেষ্টা কর। শান্তনু আর নেই।

কিন্তু কে কার কথা শোনে! সুমি তখন-ও চ্যাঁচাচ্ছে– আমি যাব না। শান্তনুকে ছেড়ে আমি কিছুতেই যাব না। নাছোড়বান্দা সুমিকে একসময় জোর করেই টানতে টানতে ভেতরের ঘরে ঢুকিয়ে বাইরে থেকে দরজা বন্ধ করে দেয় সুব্রত। ভেতরে তখন প্রলয় কাণ্ড চলছে। হাতের কাছে যা যা ছিল সব ছুড়ে ছুড়ে ভাঙছে সুমি। কোনও কাণ্ডজ্ঞান নেই। বৃদ্ধ বাবা-মা, দাদা, কত বোঝাবার চেষ্টা করছে বাইরে থেকে। যত শান্ত করার চেষ্টা চলছে তত-ই হিংস্র নেকড়ের মতো জিনিসপত্রগুলো তছনছ করছে। ভেতরের ঝড়ের তাণ্ডবে বাইরের সবাই চমকে উঠছে। বেকুবের মতো এককোণে দাঁড়িয়ে আছে সমৃদ্ধ। যেন কিংকর্তব্যবিমূঢ় এক জড়পিণ্ড।

মা একটু এগিয়ে ওর কাছে এসে ফিস ফিস করে বলেন– এভাবেই চলছে বাবা। এরপরই ও জ্ঞান হারাবে। দেখা ছাড়া কিচ্ছু করার নেই আমাদের। ওরা দু’জনে দু’জনকে খুব ভালোবাসত। বিয়ের দিন-ও ঠিক হয়ে গিয়েছিল। অনেক চিকিৎসা করেছি। কিন্তু…! মনোরোগ! তেমন কোনও তাৎক্ষণিক মেডিসিন নেই। অনেক ধৈর্য ধরে দীর্ঘদিন চিকিৎসা করাতে হবে। কিন্তু আমাদের বয়স হয়েছে। দুজনেই অসুস্থ। সুব্রত চলে যাবে। তখন আমাদের পক্ষে…! কী জানি কী হবে! ডাক্তারের মতে এভাবে চলতে থাকলে একসময় ও সম্পূর্ণ উন্মাদ হয়ে যাবে, বলেই কান্নায় ভেঙে পড়লেন মা। ভেতরে তখন হুলুস্থুলু কাণ্ড! দরজার খিল দিয়ে বাড়ি দিচ্ছে আলমারি, ড্রেসিং টেবিলের উপর। ঝনঝন করে কাচ ভাঙ্গার আওয়াজ। সুব্রত তাড়াতাড়ি দরজাটা খুলতেই দরজার ডাসাটা ছুড়ে মারল ওকে লক্ষ্য করে। তারপর দাঁত কিড়মিড় করে ছুটে এল ওর দিকে। চোখ দিয়ে যেন আগুন বেরোচ্ছে।

সমৃদ্ধ যাবার জন্য পেছন ঘুরেছে। হঠাৎ শুনতে পায় গোঁ গোঁ আওয়াজ। মুখ দিয়ে গ্যাঁজলা বেরোচ্ছে। চোখ উলটে ধড়াস করে মেঝেতে অজ্ঞান হয়ে পড়ে যায় মেয়েটি। ছুটে আসে সব্বাই। সমৃদ্ধও দ্রুত ঘরে এসে ওর মুখে চোখে জল ছেটায়। পাখার হাওয়া করে জ্ঞান ফেরায়। প্রথমে সুমি কারোকে চিনতে পারে না। চারদিকে চোখ বোলায়। হঠাৎ একসময় সমৃদ্ধের দিকে দৃষ্টি স্থির হয়। শার্টটা দুহাতে চেপে ধরে, টেনে টেনে বলে– আর পালাতে পারবে না। এইতো আমি ধরে রেখেছি। সুমির মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে শান্ত স্বরে সমৃদ্ধ বলে– না সুমি আর ভয় নেই। আমি আর কোথাও যাব না। মামা-মামি সান্নিধ্য-র মুখটা এক ঝলক ভেবে নিয়ে ধীরে ধীরে আবার বলে– উঠে পড়ো, তোমার শান্তনু তোমার কাছেই ফিরে এসেছে। সব্বাই একসঙ্গে অপলক দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকায়। সুমি ফ্যাল ফ্যাল করে অসহায় দৃষ্টি মেলে ওর দিকে তাকিয়ে থাকে।

ঘূর্ণাবর্ত

ভালো ছাত্রছাত্রীরা গোলাপবাগ আর তারাবাগের মায়া কাটাতে না পেরে একটার পর একটা কোর্সের জন্য পরীক্ষায় বসে, আর কোনওটা না কোনওটা উৎরে গিয়ে ফের অ্যাডমিশন পেয়ে যায়, আর সবান্ধবে হোস্টেল জীবন দীর্ঘায়িত করে চলে। তাছাড়া ছাত্র সংসদের নেতা হওয়ার একাধিক সুবিধার মধ্যে একটি হল বছরের পর বছর সাংগাঠনিক কাজের উদ্দেশ্যে ছাত্রাবাস দখল করে থাকা যায়।

কৃষাণু রায়ের দুটো খুঁটিই মজবুত। এমকম করার পর এমবিএ-তে ভর্তি হয়েছে। এমবিএ-তে সুযোগ পাওয়াটা কঠিন, কিন্তু পেলে প্রথম শ্রেণিতে পাস না করাটাই বিরলতমের মধ্যে বিরলতম ঘটনা– এই আপ্তবাক্য স্মরণে রেখে ক্যাম্পাস কাঁপিয়ে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে আছে। দ্বিতীয় প্রাপ্তি হোস্টেলের প্রাথমিক লিস্ট বেরোনোতেও সংসদের দাদা-দিদিদের ভূমিকা অগ্রণী। মেয়েদের ছাত্রীনিবাস ছাত্রী সংখ্যার অনুপাতে নিতান্ত অপ্রতুল। তাই নতুন ভর্তির সঙ্গে সঙ্গে কৃষাণুদের পেছনে নতুন নতুন মেয়েরা ঘুরে বেড়ায় যাতে আবাসন তাড়াতাড়ি জোটে।

সুতরাং প্রথমটায় সিক্তাই কৃষাণুর সাক্ষাত ও সহযোগিতা প্রার্থী ছিল। পরবর্তীকালে দেখা গেল নিজের বিভাগের নতুন ছাত্রীটির আবাসনিক সুবন্দোবস্তের জন্য কৃষাণুর তৎপরতাই বেশি। কারণ প্রতিদান প্রাপ্তির ব্যাপারে তার আত্মবিশ্বাস চিড় খায়নি। কৃষাণুর টানেই সিক্তা ইংরেজির ছাত্রী হয়েও সাহস করে ফাইনান্সে স্পেশালাইজেশন নেবে স্থির করে, কাছাকাছি এক জায়গায় ম্যানেজারিয়াল অ্যাকাউন্টেন্সির টিউশনি নিচ্ছে। টিউশনি ছাড়াও তারাবাগের গাছের তলায়, ঝিলের পাড়ে, কৃষ্ণসায়র পার্কে ও মাঝেমধ্যে কৃষাণুর হোস্টেলেও ডেবিট, ক্রেডিট, ফান্ড ফ্লো, ব্রেক ইভেনের কোচিং চলে। ছাত্রীর গাফিলতি থাকলেও শিক্ষক শিক্ষাদানে ও গুরুদক্ষিণা আদায়ে যথেষ্ট দায়িত্বশীল।

‘জানিস নাইনটি এইটের পর আমাদের ডিপার্টমেন্ট আর একাঙ্ক নাটক প্রতিযোগিতায় পার্টিসিপেট করেনি। যতসব ডেঁপোর দল। আমাদের বিরাট পড়াশোনো, প্রজেক্ট, সেমিনার, ক্যাম্পাসের চাপ– তাই নাকি নাটকের সময় নেই। আমরা এবার এই প্রোডাকশনটা নামাবই। এই নিয়ে এসকে স্যারের সঙ্গে হেডুর লেগে গিয়েছিল। এসকে হেড থাকার সময় নাটক হয়েছিল তো।’

‘কিন্তু নাটকের ক’দিন পরেই ফার্স্ট সেমেস্টার। তোর কাছে সাবজেক্টগুলো খুব অপরিচিত না হলেও আমার কাছে একেবারে নতুন। অ্যাকাউন্টেন্সির এ জানি না। ম্যানেজারিয়াল ইকোনোমিক্সে এত অঙ্ক জানলে আমি অ্যাডমিশন টেস্টই দিতাম না।’

‘আরে সবাই পাস করবে। তুই ঘাবড়াচ্ছিস কেন? নাটকটা যেন না ধ্যাড়ায়, এমজি আর তার চামচাদের উচিত জবাব দিতে হবে।’

নাটকের মহড়া চলে তারাবাগেই, বিশ্ববিদ্যালয়ের অতিথিনিবাসে। শনি রবিবার স্বর্গ দর্শনের লোভ দেখালেও সিক্তা হোস্টেলে থাকতে চায় না। সপ্তাহের শেষে বাড়ি না ফিরলে তারাবাগের বৃন্দাবনকে আন্দামানের দ্বীপান্তর মনে হয়। কৃষাণুর মাসে একবার বাড়ি গেলেই চলে। আগে একজনের সঙ্গে ব্যান্ডেল পর্যন্ত একসাথে যেত বলে গন্তব্য হাওড়া হলেও মেইন লাইনের লোকাল বা মেইল ধরত। এখন সে মুখপুস্তিকার বন্ধুতালিকায় কোনওক্রমে টিকে আছে। বড্ড কেঁদেছিল মেয়েটা সেদিন। ভাবতেই পারছিল না এত কিছুর পর এত সহজে কেউ সব শেষ করে দিতে পারে। ভগবান মেয়েদের চোখে কত জল ভরে পাঠান কে জানে? সিক্তাও তো– দুদিন দেখা না হলে কি ফোন না ধরলেই চোখ ছলছল, আবার একটু বেশি দেখতে চাইলেও প্রবল বাধা, জোর করে কেঁদে ফেলে যেন কী না কী অনাসৃষ্টি হয়ে গেল!

‘আজ হোস্টেলে রাতের মিল অফ রাখিস। অতনুদার বাড়িতে রাত জেগে রিহার্সাল হবে।’

‘কালকেই তো স্টেজ রিহার্সাল, তাহলে আজ আবার… ওকে, গেটপাস করিয়ে রাখি।’

‘ধুর! কাল ওই মশার আড়তে কখন আমাদের পালা আসবে বসে থাকতে হবে। আজ একেবারে ফুল এনার্জি দিয়ে, বুঝলি? গেটপাসের কী দরকার? তুই তো এমনিতেই শনি রবি থাকিস না। বোধহয় এই প্রথম শনিবার বাড়ি ছুটছিস না। চল না। সবাই মিলে জমিয়ে আড্ডা দেব।’

পরিচালক অতনু সান্যালের বাড়িতে সন্ধে ছটা নাগাদ বাণিজ্য প্রশাসন বিভাগের নাট্যশিল্পীর দল পেৌঁছে গেল। মহড়া চলল রাত সাড়ে দশটা পর্যন্ত। অতনুদার মা বেশ সমারোহ করে সবাইকে সান্ধ্য জলখাবার থেকে রাতের মাংস ভাত খাওয়ালেন। সোমা, দিলীপ, সমরেন্দ্রর বাড়ি বর্ধমান শহরেই। ওরা খেয়েদেয়ে চলে গেল। সিক্তা একটু অবাক হল শুনে ওদের কারোরই নাকি অতনুর বাড়ি থেকে যাওয়ার কথা হয়নি। কারণ বিশাল সিলেবাস, টার্ম পেপার, সামনে পরীক্ষা। বাকিরা বিদায় নিতে সিক্তার মুখখানা আরও ভাবিত হয়ে উঠল।

‘কী ভাবছ? এখন নাটকে কনসেনট্রেট করো সিক্তা। আরে কৃষাণু রায়ের বান্ধবীর চিন্তা কীসের? এই তোরা বেশি রাত করিস না। সিক্তা, রেবতীর ঘরে একা শুতে ভয় করবে না তো? বোনটা আজই মাসির বাড়ি গেল।’ কথাগুলো বলে অতনু স্নানঘরে ঢুকে গেল ব্রাশ মুখে।

কৃষাণু কী চমৎকার বিন্দাস থাকতে পারে! পাশের ঘরে অতনুদার সঙ্গে তার হাসিমশকরার শব্দ একটু পরেই স্তিমিত হয়ে এল। অতনুদার নাক ডাকছে। সিক্তার ঘুম আসছিল না। বান্ধবের কথায় নেচে এসব নাটক ফাটক নিয়ে মাতা কি উচিত হল? বাড়ি না গেলে কিছুতেই হোস্টেলে পড়াশুনো করতে পারে না সিক্তা। অনেককেই দেখেছে নিরুপদ্রবে দল বেঁধে পড়বে বলে টানা ছুটির দিনগুলোতেও হোস্টেলে থেকে যায়। এপাশ ওপাশ করতে করতে চোখে তন্দ্রা লেগে গিয়েছিল কখন– গায়ে একটা স্পর্শে চমকে জেগে উঠল।

‘ঘুমোসনি?’ কৃষাণুর মৃদু গলার প্রশ্ন।

‘আসছে না। নিজের জায়গা ছাড়া অস্বস্তি হয়। তুই মশারি খুলে মাথা অর্ধেকটা ঢুকিয়েছিস? মশা কামড়াবে যে আমায়। কী করছিস? ওই ঘরে যা, কেউ দেখে ফেললে উলটোপালটা ভাববে।’

‘কে দেখবে? শুনছিস না, অতনুদার নাসিকা গর্জন। ওই আওয়াজে কারও ঘুম হয়? তাই তো এ ঘরে এলাম দেখতে ম্যাডাম নিদ্রিত না জাগ্রত।’

‘আমার অনেক পড়া বাকি। নাটকটা মঞ্চস্থ হওয়ার আগে সেদিকে মন দিতে পারব না। জিএম স্যার এমনিতেই আমাদের ওপর খচা। তার ওপর রেজাল্ট খারাপ হলে…। এসকে-র সঙ্গে টাএ, আর তার রিপার্কেশন পড়বে আমাদের ওপর। এই মশা ঢুকবে কিন্তু। ও ঘরে যা না।’

‘বাবা! এমন করে তাড়িয়ে দিচ্ছিস? এবার মশা ঢোকার রাস্তা বন্ধ।’ কৃষাণু পুরোপুরি খাটে উঠে মশারি গুঁজে দিল।

‘ও কী?’ সিক্তা আঁতকে উঠল। ‘এই বিছানায় ঢুকলি কেন? প্লিজ…। এ ঘরে কেউ দেখে ফেললে খুব খারাপ হবে। আমারও তো ঘুম আসছে না। আমি কি অন্য ঘরে হানা দিয়েছি?’

‘অতনুদার মা বাবা দোতলায়। অতনুদার ঘুম বিউগল বাজালেও ভাঙবে না। এক কাজ করি চ। দালানের সিঁড়িতে বসি। উঠোনে চমৎকার জোছনা।’

অগত্যা। সিঁড়িতে বসে সিক্তার হাত ধরে ইকিড়মিকিড় খেলছে কৃষাণু। হাতের আঙুল কখনও কখনও ম্যাও মারতে গেলাম ভঙ্গিতে ওপর নীচ করছে। অস্বস্তি আর ভালোলাগা নিয়ে একটু আড়ষ্ট হয়েও নিজেকে ছেড়ে রেখেছে সিক্তা। বাধ সাধল মশা। ‘বাপরে! এখানে বসা যায় নাকি? ম্যালেরিয়া ডেঙ্গু চিকুনগুনিয়া সব একসাথে ধরবে। আমি ঘরে যাচ্ছি।’

হাত ধরে টেনে নিজের কাছে বসাতে গেল কৃষাণু। সিক্তা প্রায় হুমড়ি খেয়ে ওর কোলের ওপর পড়ল। গালে মুখ চেপে কৃষাণু বলল, ‘বাড়িতে জানিয়েছিস?’

‘কী জানাব?’ কথাটায় একটু নাড়া খেল সিক্তা। সঙ্গে শিরশিরানি।

‘যার জন্য কিছুদিন মেলামেশার পরেই মেয়েরা প্যানপ্যান করতে থাকে। সারাজীবন কি এভাবে খোলা বারান্দায় মশার কামড় খাব নাকি? মশারিতে ঢোকার পারমিশনটা চাই তো? লিগাল পারমিশন।’

কৃষাণুর মধ্যে বামপন্থী রাজনৈতিক বিশ্বাসের পাশাপাশি একটা প্রতিষ্ঠান বিরোধী প্রবণতাও ফুটে ওঠে প্রায়ই। যেন প্রচলিত সব কিছু বোগাস, প্রথা ভাঙাই বীরত্ব। সংস্কারকে গুঁড়িয়ে ফেলার নামই প্রগতি। সংস্কারটা ভালো না মন্দ জানার দরকার নেই। আধুনিক এক মহিলা কবির একটা কবিতা প্রায়ই শোনায়– ‘বেশ করি নিশিক্লাবে যাই বেশ করি আমি মাল খাই বেশ করি রাত করে ফিরি এসব ছাড়পত্র বুঝি তোর? মনে ক্লেদ পেশি ভরা জোর যখন তখন পশুগিরি? পাঁচ বছরের কচি মেয়ে কাঁদে মাকে দেখতে না পেয়ে বিক্ষত কেন তার শ্রোণী? সেও কি পেশায় মেতে আছে? ইশারায় ডেকেছিল কাছে? অস্ত্রে শান পড়ল যখনই?’ শেষ অনুচ্ছেদের প্রশ্নটার চাইতে প্রথম লাইনকটার দৃপ্ত ঘোষণা কৃষাণুকে বেশি আকর্ষণ করে বোঝা যায়। ওই সোচ্চার ঘোষণার মধ্যে যে ক্ষোভ লুকিয়ে আছে বিনা প্ররোচনাতেও লালসার শিকার হওয়ার প্রতি, সেটা কি বোঝে না? যেন সিক্তার মদে প্রবল বিরাগ, সিগারেটের গন্ধে এলার্জি– মানে সে যথেষ্ট সাহসি নয়।

এক সময় এই দলের দাদা-দিদিরাই ছাত্রীদের জন্য শালীনতার নানা সীমানা বেঁধে দিয়েছিল। ক্যাম্পাসের বক্তৃতায় প্রায়ই শোনা যেত ‘অপসংস্কৃতি’ শব্দটা। তখন ‘চোলিকে পিছে’ও ছিল অপসংস্কৃতি, ‘দূরদর্শনের পাঁচটি নতুন চ্যানেল যেন চেতনার বুকে ছুরিকাঘাত’। আজ তো ‘ছত্রাক’ ও সংস্কৃতির অঙ্গ কারণ কেবল আর ইন্টারনেটে ব্যাক্টিরিয়া, ভাইরাস, প্রোটোজোয়া’দের অবাধ বিস্তার। যে-ছেলেটা বান্ধবীকে কথায় কথায় শোনায়, ‘তুই যথেষ্ট বোহেমিয়ান নোস। আমার সাথে তাল মেলাতে গেলে কিন্তু প্রথা ভেঙে ছুটতে হবে। টিভি সিরিয়ালের ঘোমটা টানা বহুরানি, শাঁখা নোয়া চুড়ির জবরজং আমার পোষাবে না। বুক ফুলিয়ে বলতে পারা চাই আমি একে ভালোবাসি, এর সঙ্গে থাকব, কার বাপের কী?’– তার সাথে সম্পর্ক চাইলেও, মুখ ফুটে সমাজ স্বীকৃত চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের কথা তাই কোনওদিন বলতে পারেনি সিক্তা, পাছে বন্ধুত্বটাও হাতছাড়া হয়। আড়ালে আবডালে কৃষাণুর খাইখাই আদরটায় উত্যক্ত হয়েছে যত, উত্তপ্ত হয়েছে তার চেয়ে ঢের বেশি। কিন্তু সীমা ছাড়ানোটার ব্যাপারটা যেন বৈধতার শর্তেই আটকে থেকেছে। যার ফলে শুনেছে ‘তুই টিপিক্যাল মিডলক্লাস গাঁইয়া, এই, ওই, সেই’। সেই ছেলের মুখে আজ এ কী কথা? ভেতরটা অদ্ভুত ভালোলাগায় কেঁপে উঠল।

আর একটু নিশ্চিত হওয়ার জন্য প্রশ্ন করল, ‘লিগাল পারমিশন মানে? কাগজে কলমে সাক্ষী রেখে পরস্পরকে পার্টনার হিসাবে গ্রহণ?’

‘শুধু কাগজ কলম কেন, তোর আমার বাড়িতে চাইলে প্যাঁপ্যাঁপ্যাঁপ্যাঁ– প্যাঁপ্যাঁপ্যাঁ– প্যাঁ– ’

এই চিরকালীন বহু ঘটিত ব্যাপারটা, পৃথিবীর কত স্ত্রী পুরুষই তো করেছে, কেউ নিজের পছন্দে কেউ অন্যের কথায়। কেউ স্বেচ্ছায়, কেউ বাধ্য হয়ে। কিন্তু কৃষাণুর সঙ্গে মিশে সিক্তাও দায়বন্ধনহীন সহবাস কিংবা বিচ্ছেদকে নিজের প্রেমের নিয়তি হিসাবে ধরে নিয়ে অহরহ একটা অস্বস্তিতেই থাকে। বাড়িতে কী বলবে? মা, ‘আমি একজনের সঙ্গে লিভ টুগেদার করতে চাই!’ কীভাবে বলবে? আর বাবাকে? সেই প্রতিষ্ঠান বিরোধী মানুষের মুখে এই সেকেলে ব্যপারটার উল্লেখই এক অদ্ভুত শিহরণ সৃষ্টি করছে।

‘কী বললে? আবার বলো?’

কৃষাণু সিক্তাকে গাঢ়ভাবে আলিঙ্গন করে ঠোঁটদুটোকে যেন শুষে নিতে লাগল। আধ মিনিট পর বাঁধন আলগা করে বলল, ‘মশার কামড়ে আপাতত এই টুকুই। বাকিটা লাইসেন্স পেলে উসুল করে নেব। ভেবে দেখলাম, তোকে ছাড়া থাকা সম্ভব নয়। পুরোপুরি এবং পাকাপাকি ভাবে পেতে যদি রেজিস্ট্রারের সামনে শপথ নিতে হয় নেব, যদি মাথায় টোপরও পরতে হয় তো তাই সই। কিন্তু তোকেই চাই। এবার যা, বর কনের কারও ডেঙ্গু হলে সব ফুটুস। আপাতত নাটকটাও নামানো দরকার। আমি অতনুদার নাকডাকা শুনি। তুই একটু ঘুমোনোর চেষ্টা কর।’

আর ঘুম? দু চোখে অত স্বপ্ন জড়ো হলে কি ঘুম আসে? নিজের কানকে বিশ্বাস হচ্ছিল না। অথচ অবিশ্বাসের কিছু নেই। পৃথিবীতে ওরাই প্রথম ভালোবেসে বিয়ে করতে চলছে না। লাইসেন্স পেলে উসুল করার কথাটা মনে পড়লে শিরদাঁড়া দিয়ে একটা শিরশিরে স্রোত বয়ে যাচ্ছে। গালে ঘাড়ে ঠোঁটে কৃষাণুর আদর, শরীরের আনাচ-কানাচ অভিমুখী হাতের স্পর্শ হঠাৎ একটা অনুচ্চারিত শব্দে অমৃত হয়ে গেল– বিয়ে। কারণ কৃষাণু ওকেই চায়। কিন্তু সত্যিই শেষ রক্ষা হবে তো?

নাটক পর্ব অতিক্রান্ত। কুশীলবদের অভিনয় সহ গোটা প্রযোজনাটাই বেশ প্রশংসিত হল। কদিন কিছু ক্লাস কামাই হলেও অনুমতিক্রমে উপস্থিতির খাতায় ওদের হাজিরার রেকর্ড আছে। কিন্তু অনেকদিন না পড়ায় অনেক কিছু বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে। বাণিজ্য অর্থনীতির ছদ্মবেশে গাদা গাদা ক্যালকুলাস খাঁড়ার মতো ডিফারেন্সিয়েশন, ইন্টিগ্রেশন, লিমিট, ডট ডট ইত্যাদি বাগিয়ে ঘাপটি মেরে আছে কে জানত? এইসব আঙ্কিক দংশন থেকে মুক্তি পেতেই তো বিজ্ঞান নিয়ে উচ্চমাধ্যমিক পাস করার পর ইংরিজিতে অনার্স নিয়েছিল সিক্তা। আবার ওই কিম্ভূত চিহ্নগুলোর খপ্পরে পড়তে হল? পড়ায় ক্ষতিপূরণের জন্য এখন এর তার শরণাপন্ন হতে হচ্ছে। কৃষাণুর কাছে কাজের চেয়ে অকাজ হয় বেশি, যার জেরে রাত জেগে পড়া আর রাতের ঘুম দুটোই ভোগে যায়।

এরই মধ্যে কেন্দ্রীয় সরকারের সন্ত্রাস দমন নীতির বিরুদ্ধে ভারতের কোণে কোণে ছাত্রদের বিক্ষোভ। কৃষাণু ব্যস্ত হয়ে পড়ল মিটিং মিছিল পরিচালনায়। সিক্তাকেও যখন তখন ক্লাস কামাই করিয়ে নিয়ে যায়। উত্তপ্ত বক্তৃতা পড়ে মতামত চায়। সিক্তা বলল, ‘আর সময় নেই। সামনেই শীতের ছুটি, মোটে সাত দিনের। এখনই বন্ধুদের কাছ থেকে যা কালেক্ট করার করে নিতে হবে। ছুটিতে কাউকে পাব না। ছুটির পরেই পরীক্ষা। আমি অত ব্রেইনি নই। অলরেডি নাটকের জন্য পিছিয়ে গেছি। আর মিছিলে পথনাটিকায় পার্টিসিপেট করতে পারব না।’

‘এত সেলফিশ কেন তুই? শুধু নিজের কথা ভাবছিস? যাদের দেশদ্রোহী স্ট্যাম্প দিয়ে অ্যারেস্ট করা হল, যারা নিজভূমে পরবাসী হয়ে ইন্ডিয়ান আর্মির হাতে শহিদ হচ্ছে তাদের কথা ভাববি না?’

‘একটা কথা বলে রাখি। তোর সঙ্গে সারা জীবন কাটাতে চাই বলে তোর বিচিত্র রাজনৈতিক স্ট্যান্ডকেও অ্যাকসেপ্ট করে নেব ভাবিস না। ইডিওলজিকালি আমি এই আজাদির আন্দোলন, অ্যান্টি ইন্ডিয়ান স্লোগান শাউটিং কোনওটাই সমর্থন করছি না। আমাদের দেশের সরকার যারা চালায় তাদের হয়তো অনেক দোষ আছে, অনেক ভুল নীতিও আছে আমাদের সংবিধানে। নর্থ-ইস্টে সেনা যা করে তার নিশ্চই প্রতিকার হওয়া দরকার। কিন্তু সেগুলো রেকটিফাই করার পদ্ধতি শত্রু দেশগুলোর ষড়যন্ত্রে কি সন্ত্রাসে মদত দেওয়া নয়? দ্যাখ বলতে গেলে অনেক তর্ক হবে। আমি শুধু বলতে চাই, যে মিশনটা আমি সাপোর্টই করি না, তার জন্য নিজের শ্রম, সময়, পড়াশোনা নষ্ট করব কেন? তুই এই নিয়ে স্টুডেন্টদের খ্যাপাচ্ছিস খ্যাপা, আমার পছন্দ না হলেও তোকে তো বাধা দিচ্ছি না। আমাকেও জোর করিস না।’

‘পথনাটিকায় অভিনয় না করিস, অ্যাটলিস্ট প্রসেশনে চল।’

‘কেন ভিড় বাড়াতে? স্যরি।’

‘ভুলে যাস না, তুই কিন্তু এখনও ফিফ্থ ইয়ার। আমি এখন তোর ক্লাসমেট হলেও তোর চেয়ে সিনিয়র, তিন বছর গোলাপবাগে আছি। তোকে সারদা হোস্টেলে পার্মানেন্ট বোর্ডার করেছি কিন্তু আমিই।’

‘ভয় দেখাচ্ছিস? তোদের জুলুমবাজিতে এসে অবধি প্রায় দিন মিটিং, মিছিলে হাজির থাকতে হয়েছে। আমাদের হোস্টেলের মেস কমিটি কিন্তু বলেছে যাদের ছুটির পরেই পরীক্ষা তাদের মিছিলে যাওয়া বাধ্যতামূলক নয়।’

‘শেষবারের মতো জানতে চাইছি। যাবি কিনা?’

‘আমায় ছেড়ে দে কৃষাণু। আমি পারব না। শরীরটাও ভালো নেই। গলায় কষ্ট হচ্ছে। গা ম্যাজম্যাজ করছে।’

‘গা ম্যাজম্যাজানির টনিক আমি জানি। একটু ফিজিওথেরাপিতে ফ্রেশ হয়ে যাবি।’

‘প্লিজ আমায় জোর করিস না।’

‘তোর ওপর আমার এটুকু জোর নেই? তাহলে আজ এখানেই বাইবাই বলি?’

প্রথমে কথাটা বুঝতে পারেনি সিক্তা। বোঝার পরও ভাবল রাগের মাথায় বলছে। পালটা রাগ দেখিয়ে বলল, ‘তোর খুশি’। কিন্তু মনে খচখচানি নিয়ে হোস্টেলে ফিরল।

পরেরদিন শনিবার। সিক্তা ব্যাগপত্তর নিয়ে ক্লাসে। শেষ ক্লাসটা শেষ হতেই স্টেশন ছুটবে। কতদিন পরে বাড়ি যাচ্ছে! সাত দিনের ছুটি, আর বিরাট পাঠ্যসূচি। গতকালের খচখচানি নিয়ে কৃষাণুকে খুঁজল। রিডিং রুমে অয়নদের সঙ্গে হেসে হেসে গল্প করছে। একবার চোখাচোখি হল। আবার তাকিয়ে দেখে কৃষাণু নেই। ক্লাসে ঢুকেও কথা নেই। সিক্তার কথার জবাব দিল না। ছুটির আমেজে বেশিরভাগ ক্লাস হল না। কৃষাণুও বিকেলে ছুটি পর্যন্ত সিক্তাকে যেন দেখতেই পেল না।

গোলাপবাগ থেকে যখন স্টেশনগামী বাসে চড়ল, তখন চোখ ছাপিয়ে জল আসছে। মাত্র দু’দিন আগে যে পাকাপাকি গাঁটছড়ার কথা বাড়িতে জানানোর প্রস্তাব দেয়, প্রেয়সীকে পাওয়ার জন্য ছটফট করে, এতটাই ছটফটানি যে এখনও সিক্তার শরীরে কৃষাণুর নিশ্বাসের উত্তাপ লেগে আছে, আজ সেই মানুষটার চাওনি মরা মাছের মতো অভিব্যক্তিহীন হয়ে গেল? ব্যক্তিগত সম্পর্কের চেয়ে রাজনৈতিক অবস্থানটাই বড়ো হয়ে গেল? বিয়ে সংসার বন্ধন সবই সাময়িক আবেগ, আজাদিটাই সত্যি?

পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য যেখানে মনে হচ্ছিল সাত দিনের বদলে মাস খানেক ছুটি পেলে ভালো হতো, সেখানে বই হাতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অন্যমনস্ক কেটে যাচ্ছে, রাত জেগে যত না পড়া হচ্ছে বালিশ ভিজছে তার দশগুন। কৃষাণু ফোন করা তো দূর, ধরেওনি, মিস্ড কল দেখে ফিরতি কল করেনি। এমনকী ফেসবুক কি হোয়াটস্অ্যাপে জাগ্রত থাকলেও নীরব থেকেছে। সিক্তার সেই প্রথম মনে হল কবে ছুটি শেষ হবে। একবার মনে হয়, এই যে মান খুইয়ে একতরফা যোগাযোগের চেষ্টা করে প্রত্যাখ্যাত হল, মুখোমুখি হলে পালটা উপেক্ষা দেখিয়ে প্রতিশোধ তো নিতে হবে। আবার কখনও সেই অসম্পূর্ণ উষ্ণ মুহূর্তগুলো হ্যাংলার মতো আবার ফিরে পেতে ইচ্ছে করে। হে ঈশ্বর! কী ভাবে সময় নষ্ট করছে মেয়েটা? প্রথম সেমেস্টার উৎরোবে তো?

পরীক্ষার পর সবাই হইহই করে সিনেমা দেখতে গেল। সঙঘমিত্রা, ভাস্বতী, মৃণালরা বলল সঙ্গে যেতে। কিন্তু সিক্তা যার সঙ্গের অপেক্ষায়, সে অন্য বন্ধুদের সাথে সিনেমা দেখে এসেছে শুনে পা থেকে মাথা টলে গেল। শরীর ভালো লাগছে না বলে হোস্টেলে ফিরে বিছানায় শুয়ে রইল। রুমমেট রাষ্ট্রবিজ্ঞানের মৃন্ময়ী সন্ধে থেকে লক্ষ্য করে রাতে মাথায় হাত বুলিয়ে গালে গাল রেখে বলল, ‘জানি ভুলে যা বললেই ভোলা সম্ভব নয়, তবু মনে হয় তোর সেটাই করা উচিত। কৃষাণুদার জীবনে তুই প্রথম নোস, দ্বিতীয়ও নোস। ওই মারকাটারি চেহারা আর পারসোনালিটি নিয়ে গত তিন বছরে এ রকম অনেককেই কাঁদিয়েছে। কলেজে পড়তেও। আমিও তো সিটি কলেজেই পড়তাম না।’

‘আগে বলিসনি কেন?’

‘বললেই কি তুই শুনতিস? তাছাড়া ওকে যারা চেনে আমাদের সিনিয়রদের কেউ কেউ বলছিল, কৃষাণুর নৌকা তাহলে এই ঘাটে পাকাপাকি নোঙর করল। ওদের মনে হয়েছিল তুইই শেষতম। আমারও তাই মনে হতো, আর তোকেও বেশ খুশি খুশি দেখাত।’

‘একটু আধটু আমিও শুনেছিলাম। ও তো দুঃখ করত ওর কোনও রিলেশন টেকেনি। তাই আমাকে ভীষণ ভাবে আঁকড়ে ধরেছিল। এমনকী বিয়েতে বিশ্বাস না করলেও নাটকের ঠিক আগেটায় আমায় বিয়ের প্রস্তাবও দেয়। দু দিনের মধ্যে একটা তুচ্ছ ব্যাপারকে অজুহাত করে…। নিজে না ঠকলে, মনের ভেতর থেকে চাড় না এলে অন্যের কাউন্সেলিং-এ মোহ থেকে সরে আসা মুশকিল রে!’ আবার গলা ধরে এল। ‘আই স্টিল বিলিভ ও জেদের বশে নিজেকেও শাস্তি দিচ্ছে। ইফ নট মি, ইটস্ নান।’

‘কেঁদে নে, কেঁদে হালকা হ।’

মাস ছয়েক ধরে তারা রুমমেট। কিন্তু আজ প্রথম মৃন্ময়ীকে ভীষণ ভালো বন্ধু মনে হল। একটা বিছানা খালি পড়ে রইল। শীতের রাতে একই কম্বলের তলায় পরস্পরের শরীরের ওম্ ভাগাভাগি করে দুই বন্ধু ঘুমিয়ে পড়ল।

ফেব্রুয়ারির গোড়ায় সেমিনার। বিজ্ঞাপন যোগাড়, ডেলিগেট আহ্বান, অতিথি আমন্ত্রণের প্রস্তুতি পুজোর পর থেকেই শুরু হয়ে গিয়েছিল। সিক্তাও কোনও একটি কমিটির সদস্য, তবে তার বিশেষ কাজ নেই। থাকলে এই একঘেয়ে ছিঁচকাদুনে জ্বালা ভুলে থাকা যেত। বদলে, বিভাগের অনেক ছাত্র, সহপাঠী থেকে সিনিয়র তার হাফ-সোল খাওয়া নিয়ে টিটকিরি দিচ্ছে, ‘বিরহিণী রাধার কোনও কাজে মন নেই।’ কৃষাণু দারুণ ব্যস্ত, সদা হাস্যময়। সম্পর্ক ব্যাপারটাই ছেলেদের কাছে ছেলেখেলা। গভীর ভাবে জড়িয়ে পড়া, তাই নিয়ে কষ্ট পাওয়া এইসব মেয়েলি ন্যাকামি। ‘স্টে কু-ল’ হল এই যুগের মন্ত্র, জীবন যেভাবে আসবে তাকে সেইভাবে নাও। যতদিন ভালো লাগবে ততদিন থাকো, তারপর গা ঝাড়া দাও। আবার কিছু প্রত্যাখ্যাত প্রার্থী আনন্দে ফুটছে ভেতর ভেতর। বস কেটে গেছে এবার বুঝি তাদের পালা। কার কপালে সিকে ছেঁড়ে, সেটাই দেখার। এসএমএস থেকে ফেসবুক, হোয়াটস্অ্যাপে বার্তার ছড়াছড়ি। কেউ বা নতুন বান্ধবী জুটিয়ে হিংস্র আনন্দে– বেশ হয়েছে!

সেমিনারের দ্বিতীয় দিন রাতের খাওয়ার পর সিক্তা একা একা খোলা আকাশের নীচে দাঁড়িয়েছিল। ভেতরের হইচই আর মশকরা ভালো লাগছিল না। হঠাৎ পেছন থেকে একটা গরম কোট কে চাপিয়ে দিল। চমকে ফিরে তাকাতেই দেখে কৃষাণু! ‘তোর না ঠান্ডা লাগার ধাত। শিশির পড়ছে, এভাবে বাইরে দাঁড়িয়ে আছিস যে? ভাস্বতীদের হলে হোস্টেলে চলে যাস। ততক্ষণ ভেতরে বোস।’

বিহ্বলতা কাটিয়ে বলতে গেল, ‘তাতে তোর কী?’– কিন্তু গলা বুঁজে এল। নাটকের মহড়ার সময় সিক্তা গলা আর নাক নিয়ে বেশ নাকাল থাকত। মশার ধূপ, ঠান্ডা, সিগারেটের ধোঁয়া সবেতেই অ্যালার্জি। বেশি কথা বললেও কষ্ট। তাই নিয়ে কৃষাণু পেছনে লাগত, আর উপদেশ দিত, ‘সব তোর ম্যানিয়া, মুক্ত হয়ে বাঁচ, দেখবি সব রোগ পালিয়েছে।’ ওর মনে আছে? মানে মনে রেখেছে? তার আর মনে হচ্ছে না ঠান্ডার ভয়টা সিক্তার বাতিক? উলটে নিজের ব্লেজার সিক্তার গায়ে চালিয়ে দিল! আর সবার মধ্যে থেকেও লক্ষ্য করেছে সিক্তা ম্যারাপ বা ডিপার্টমেন্ট কোথাও নেই, বাইরে অন্ধকারে একা?

এই চোখের জল মস্ত বিড়ম্বনার বস্তু। এই অবস্থায় সবার মাঝে গিয়ে বসে কী করে? চুপচাপ কৃষাণুকে অনুসরণ করে ভেতরে ঢুকেও নির্জনতার খোঁজ। কৃষাণু ওকে রেখে আবার হইহুল্লোড়ের মধ্যে ফিরে গেল। একান্তে পেয়েও সিক্তার কাছে থাকল না, কথাও বলল না আর। ও শুধু দয়া দেখাতে এসেছিল? ব্লেজারটা খুলে তনয়ের হাতে দিয়ে বলল, ‘কৃষাণুকে দিয়ে দিস।’ তারপর সোজা জ্যোৎস্নার আলোয় গাছগাছালির আলো-আঁধারির ভেতর দিয়ে, দু বছর আগে যেখানে এক ছাত্রীর অচৈতন্য ক্ষত-বিক্ষত দেহ পাওয়া গিয়েছিল, তারাবাগ গোলাপবাগের মধ্যেকার সেই কাঠের সেতু পেরিয়ে একাই হোস্টেলে পৌঁছে গেল।

গেটপাস ভাস্বতীদের কাছে। দারোয়ান ভূত দেখার মতো অবাক হলেও সিক্তার উদ্ভ্রান্ত রূপ দেখে দরজা খুলে দিল। সিক্তা তিনতলায় ওর ঘরে ছুটল। ওর এখন অনেক অনেক কান্না বাকি আছে। আজ মৃন্ময়ী নেই। ভালোই হয়েছে। যে যন্ত্রণার সান্ত্বনা হয় না, সে একাকিত্বই খোঁজে।

পরের দিন রাজবাটী থেকে হেঁটে ফেরার পথে একটা রিক্শার দিকে চোখ পড়তে থমকে যেতে হল। বুকে ছুরি মারলেও বুঝি কম যন্ত্রণা হতো। কৃষাণুর পাশে মৃন্ময়ী। দুজনের তন্ময়তা একটাই সম্পর্ক সূচিত করে। আগুন সর্বভুক, আর পিঁপড়ের পাখা গজানোই নিয়তি।

সোনা মামিমার গল্প

স্বর্ণলতা সোনা মামিমার ভালো নাম। ডাকনাম সোনা। উনি আমার মামার প্রথম পক্ষের স্ত্রী। কেউ বলে, স্বর্ণলতা থেকে ছোটো করে সোনা হয়েছে। আবার কেউ বলে, কাঁচা সোনার মতো গায়ের রঙের জন্য এই নাম শ্বশুরবাড়ির লোকেরা দিয়েছে। মামিমা মানুষ হিসেবে খুব ভালো। আমাদের খুব ভালোবাসতেন। বছরে অন্তত একবার আমাদের বাড়ি আসতেনই। আর সেই দিনগুলো ছিল, বিশেষ করে আমার কাছে খুব মজার– মহা আনন্দের।

মামিমার বাপের বাড়ি কলকাতার শোভাবাজারে। আমার মায়ের বাড়ি কিন্তু অজপাড়াগাঁ। বাস থেকে নেমে হয় গরুর গাড়ি, নয়তো পালকিতে চেপে যেতে হতো প্রায় পাঁচ মাইল। মাঝে পড়ে নদী। নদীর ওপারে বনের প্রান্ত ঘেঁষা গ্রাম। নাম মধুবন। বন-প্রকৃতির কোলে আদরের দুলালির মতো গ্রামটি। মনকাড়া এখানের প্রাকৃতিক শোভা।

তবে প্রকৃতিপ্রেমিক বা কবি-সাহিত্যিকদের মন কেড়ে নিলেও, কলকাতার মানুষের পক্ষে এই বিভুঁইয়ে এসে মানিয়ে নেওয়া প্রায় অসম্ভব। আমারই মাঝে মাঝে ভালো লাগত না। মায়ের সাথে গেলেও বাড়ি ফেরার জন্য মন কাঁদত। মায়ের তো বাপের বাড়ি, জন্মভূমি। তার ভালো লাগলেও আমার কেমন যেন ফাঁকা ফাঁকা লাগত। থাকতে মন চাইত না।

সোনা মামিমার ক্ষেত্রে ঘটে ছিল তাই। মামিমা কলকাতার মানুষ। শৈশব-কৈশোর কাটিয়ে ষোলোয় পা দিয়েই এসে পড়েন মামা বাড়ির কুলবধূ রূপে মধুবনে। সে এক ইতিহাস। মায়ের মুখে শোনা ওই চমকপ্রদ ঘটনা।

গ্রামের মধ্যে সবচেয়ে ধনীর বাড়ি। ছেলে শিক্ষিত। চাকুরে। এসব দেখেই মামিমার বাবা গণ্ডগ্রাম হওয়া সত্ত্বেও এখানে মেয়ের বিয়ে দিয়েছিলেন। প্রথমবার যখন বধূবেশে মামিমা এবাড়িতে পা দেন তখন তো হইচই, লোকজনে ভরা শ্বশুরবাড়ি তাঁর মন্দ লাগেনি। কিন্তু অষ্টমঙ্গলার পর বিপরীত ছবি। সব ফাঁকা ফাঁকা লাগে তাঁর। মন বসে না কোনওকিছুতেই। বাড়ির একমাত্র বউ মামিমা। শ্বশুর, শাশুড়ি আর স্বামী নিয়ে তাঁর ছোট্ট সংসার। তার উপর স্বামী সারাদিন থাকে বাইরে। মধুবন থেকে অনেকখানি দূরে তার চাকরিস্থল। ফিরতে ফিরতে হয় সন্ধে।

পাড়াপড়শির বাড়িতে বেড়াতে যাবার চল তেমন ছিল না। সিনেমা দেখতে গেলেও অনেক কাঠ খড় পোড়াতে হতো। সারা দিন শাশুড়ি আর বউ। এছাড়া জনা কতক মুনিশ-মানদার। আর বাড়ির পুরোনো ঝি মানদা। তবে আমার মা যখন বাপের বাড়ি যেত, সে সব দিনগুলো মামিমার খুব আনন্দে কাটত। কিন্তু তা তো বছরে মাত্র একবার কি দু’বার।

দিনের বেলা যদিও বা হইচই হাসি আনন্দে কেটে যেত, সন্ধের পর থেকে মামিমার একা একা খুব কষ্ট হতো। বাড়ির পিছনের পুকুর পাড়ের বাঁশ-ঝাড় থেকে মাঝে মাঝে শিয়াল ডেকে উঠত। তার সঙ্গে প্যাঁচা আর ঝিঁঝির ডাক। ফলে মামিমার শ্বশুরবাড়িতে মন টিকত না। বাপের বাড়ি গেলে আর আসতে চাইতেন না।

মেয়ের শ্বশুরবাড়িতে তেমন মন নেই তার একটাই কারণ, মেয়ে ভয় পায়। এমন অজপাড়াগাঁয়ে থাকা তার পক্ষে দুরূহ। মামা আনতে গেলে, এবার থাক না, আর ক’টা দিন যাক তারপরে যাবে বলে মামিমার বাবা মামাকে দু’একবার ঘুরিয়েও দেন। দাদুর রাগ হয়। কড়া ভাষায় বেয়াইকে পত্র দেন।

– যদি আপনার মেয়েকে না পাঠান তাহলে আবার ছেলের বিয়ে দেবার কথা ভাবব।

পত্র পেয়েই মামিমার বাবা তখন নিজে এসে দাদুকে অনেক বুঝিয়ে সুঝিয়ে অনুরোধ করেন– আপনি যদি মাসে একবার অন্তত মেয়েকে দিন দুয়ের জন্যও বাপের বাড়ি যাবার অনুমতি দেন তাহলে আমাদের পাঠাতে কোনও বাধা নেই। আসলে শহরে মানুষ তো, তাই একটু অসুবিধে হচ্ছে। বিশেষ করে সন্ধ্যার দিকে ভয় পায়। পরে পরে অবশ্য সব ঠিক হয়ে যাবে।

– ঠিক আছে। আমি বউমার কাছে দিন-রাতের জন্য একজন কাজের মেয়ে রাখার ব্যবস্থা করে দেব। আপনারা মেয়ে পাঠিয়ে দিন। নচেৎ ছেলের বিয়ে দিতে বাধ্য হব।

কতকটা মনমরা হয়েই মামিমা আসেন শ্বশুরবাড়িতে। দাদু কিন্তু তার কথার খেলাপ করেননি। একজন দাসীর বন্দোবস্ত করে দিয়েছিলেন। তবে সেই মেয়ের সঙ্গে কি গল্পই বা করবে মামিমা? গ্রামের মানুষের গল্প বলতে তো চোর-ডাকাত, নয়তো ভূত-পেত্নি। এতে মামিমার ভয় আরও বেড়ে যেতে থাকে।

সেবার দু’দুটি ঘটনা মামিমার শ্বশুরবাড়িতে থাকার বাধা হয়ে দাঁড়ায়। বলতে দ্বিধা নেই, মামিমার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।

দিদিমা, মামিমাকে খুব ভালোবাসতেন। তবে বেশিক্ষণ সময় দিতে পারতেন না। মাঝে মাঝে সন্ধ্যার পর মামিমাকে নিয়ে ছাদে উঠে হাঁটতেন। কখনও কখনও মাদুর পেতে বসে গল্প করতেন। পাশের বাড়ির রাঙা দিদিমাও এই আসরে কোনও কোনওদিন যোগ দিত। এতে মামিমারও খুব ভালো লাগত।

এরকম একদিন মামার আসতে দেরি দেখে দিদিমা মামিমাকে নিয়ে ছাদ থেকে মামা আসছেন কিনা দেখছিলেন। কিন্তু নীচের থেকে কারও ডাকে দিদিমা নেমে গেলে মামিমা দূরে বয়ে যাওয়া নদীর দিকে উৎসুক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলেন। কারণ ওই পথেই তো মামা বাড়ি ফিরবেন।

নদীর ওই পাড়ে দিগন্তবিস্তৃত ধানখেত। আর এপারে মামাদের বিশাল আম বাগান। মামিমা জীবনে এত বড়ো আম বাগান দেখেননি। যখন আম ঝরানো হতো তখন ঝাঁকা ঝাঁকা আম আসত মামাদের বাড়িতে।

নদীর থেকে হঠাৎ সোনা মামিমার দৃষ্টি পড়ে আম বাগানে। পাশে দাঁড়িয়ে কাজের মেয়ে নন্দা। শুক্লপক্ষ চলছিল। তাই ছাদ থেকেও বাগানটিকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। সেই আলোতে মামিমা হঠাৎ দেখতে পান, একটি মেয়ে সাদা কাপড়ে সারা গা ঢেকে বাগানের ভিতরের দিকে দৌড়োচ্ছে। ওই দৃশ্য নন্দাকে দেখালে সে ভূত ভূত বলে চিৎকার করে মূর্ছা যায়। মামিমাও চোখ ঢেকে বসে পড়েন। কিন্তু দিদিমা এসে কোনও কিছুই দেখতে পাননি।

ঠিক এর দিন দুই পরে আরও একটি ঘটনা ঘটে মামিমার চোখের সামনে। এক বিরাট ডাকাতি হয় মামাদের পাশের বাড়িতে। দলটি নাকি চল্লিশ জনের। হাতে মশাল নিয়ে রণপা চেপে এসেছিল। প্রায় দু’ঘন্টা ধরে ডাকাতি করে সেই সাথে গৃহস্থকে মারধোর দিয়ে সর্বস্বান্ত করে দলটি চলে যায়।

এসব দেখে মামিমা কান্নাকাটি শুরু করেন। ফলে কয়েক দিনের জন্য মামিমাকে বাপের বাড়িতে রেখে আসতে হয়। তারপর থেকে মামিমা আর মধুবনে আসেননি। বাপের বাড়ির লোকেরাও আর পাঠাতে চায়নি। বিশেষ করে মামিমার বাবা তো মেয়ের নামে বেশ কিছু টাকা ও বসতবাড়ি সংলগ্ন একটি বাড়িও কিনে দিয়েছিলেন। তাই মামা আনতে গেলে উনি বলেন– মেয়ে যখন ওখানে থাকতেই পারবে না তখন আর জোর করে ওখানে পাঠাই কি করে বাবা? এখানেই থাক। নইলে কবে দেখব মেয়েটা ভয়ে মারাই গেছে।

সব জানার পর দাদু প্রায় জেদ নিয়ে সেই মাসেই মামার বিয়ে দেন। এ বিয়েতে নাকি মামার মত ছিল না। কিন্তু বাপের মুখের ওপর কথা বলার সাহস তখনকার ছেলেদের ছিল না। তাই বিয়েটিও হয়ে যায়। এরপর থেকে মামাবাড়ির সাথে যোগাযোগ উঠে যায় সোনা মামিমার। তবে দিদিমা যতদিন বেঁচে ছিলেন ততদিন নাকি সোনা বউয়ের জন্য কাঁদতেন। সে বউ এখনকার বউয়ের চেয়ে রূপেগুণে সব দিকেই সেরা ছিল তাঁর কাছে। মামাও বোধ হয় মামিমাকে একেবারে ভুলতে পারেননি।

নতুন মামিমার তিন ছেলের পর, একমাত্র মেয়ে পুষ্পদি। বড়ো ছেলে যে-বছর এম.এ. পড়ার জন্য কলকাতার কলেজে ভর্তি হয় সেবছরই মামা মারা যান। এরপর ওই ছেলেই সোনা মামিমার সাথে যোগাযোগ করে মামিমাকে জোর করে মাঝে মধ্যে বাড়িতে নিয়েও আসে। এখন বয়সের জন্যই হোক আর নিঃসন্তান বলেই হোক ছেলেদের কাছে থেকেও যেতেন কিছুদিন করে। সৎ ছেলেমেয়েদের ভালোবাসতেন খুব। ছেলেমেয়েরাও সোনামা বলতে অজ্ঞান। মা তো কাজ-যোগের বাড়ি হলে মামিমাকে আমাদের বাড়ি আনতে পাঠাতেন। উনি নিজেও বছরে একবার অন্তত আসতেন।

আমরা ছোটোরা যখন মামিমাকে দেখলাম তখন তিনি বিগত যৌবনা একজন বিধবা। তবে দুধে আলতা গায়ের রং তখনও মামিমাকে অন্যের থেকে আলাদা করে রেখেছে। পিঠ ভর্তি কালো চুল। মুখে একটা কমনীয় মাধুর্য।

শ্বশুরবাড়ি মামিমার এখন ভালো লাগে। তাছাড়া মধুবনের এখন অনেক উন্নতি হয়েছে।  গ্রামের পাশ দিয়ে পাকা রাস্তা। দিনে তিন চারটি বাস যাতায়াত করে। ঘরে ঘরে বিজলি বাতি। ল্যান্ড ফোনও এসেছে চার-পাঁচটি ঘরে।

মামার বড়ো ছেলের বিয়ে। কিছুদিন আগে একমাত্র মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে ধুমধাম করে, বড়ো ঘরে। সেবারও মামিমা এসেছিলেন। বেশ কয়েকভরি গয়না দিয়ে মেয়েকে আশীর্বাদ করেছিলেন। এবার এসেছেন মামার ছোটো ছেলের সাথে। বিয়েটা বেশ জাঁকজমক করেই হচ্ছে। আত্মীয় কুটুম্ব এসেছে প্রচুর। কেউ বাদ যায়নি। মায়ের বয়স হলেও মাকে নিয়ে আমরা গিয়েছি।

বিয়ের দিন বরযাত্রী সহ দাদা যখন যাত্রা করল রাত তখন প্রায় আটটা। বরযাত্রীরা বাসে আর দাদা ট্যাক্সিতে। পুষ্পদি-সহ আমরা মেয়েরা যাওয়ার জন্য বায়না ধরলেও, বড়োরা তা বাতিল করে দেয়। কারণ মেয়ের বাড়ি যাওয়ার পথে ভীষণ জয়পুরের জঙ্গল। অতএব রিস্ক নেওয়া উচিত নয়। বিফল মনোরথ হয়ে আমরা রয়ে গেলাম।

খাওয়াদাওয়ার পর রাতে পুষ্পদি সহ আমরা কয়েকজন সোনা মামিমার সাথে বৈঠকখানায় শুয়েছি। বাড়িতে পুরুষ বলতে কয়েকজন বুড়ো। মা-মামিরা সব ওপর ঘরে শুয়েছে। পুরুষের চেয়ে মেয়েরা সংখ্যায় বেশি। সারাদিন খাটাখাটনির জন্য অনেকেই ঘুমিয়ে পড়েছে। আমরা দু’চারজন তখনও জেগে। মামিমার মুখে গল্প শুনছি। আসলে মামিমা খুব জমিয়ে গল্প বলতে পারতেন। রাত বাড়ার সাথে সাথে গল্পও বেশ জমে উঠেছে। গল্প শোনার মাঝেই আমার একটু তন্দ্রা মতো এসেছিল, সেই সময়ই কানে এল ত্রাহি ত্রাহি চিৎকার।

– বাবা গো, মেরে ফেললে গো। কে আছো বাঁচাও।

জেগে উঠে বিছানায় বসলাম। বুঝতে অসুবিধা হল না যে আমাদের বাড়িতেই ডাকাত পড়েছে। ভয়ে কাঁপতে থাকি। কি হবে এবার? দেখি পুষ্পদি ভয়ে সোনা মামিমার কোলে মাথা গুঁজে বসে। বিয়ে বাড়ি বলে কথা। মেয়েদের সবারই গায়ে কিছু না কিছু গয়নাগাটি রয়েছে। বিশেষ করে পুষ্পদির গায়ে। ওর তো আবার নতুন বিয়ে হয়েছে। মামিমা মুহূর্তের মধ্যে সকলের গয়নাপত্তর খুলিয়ে নিয়ে কাপড়ে জড়িয়ে বৈঠকখানার দরজা একটু ফাঁক করে চারদিকে দেখেই ছুটে বেরিয়ে গেলেন। পুষ্পদি সাথে সাথে মামিমার নির্দেশমতো দরজা বন্ধ করে দিল। আসলে বৈঠকখানাটা ছিল বাড়ির একেবারে বাইরের দিকে। তাই হয়তো এই দুঃসাহসিক কাজটা করতে পারলেন মামিমা।

আমাদের তারস্বরে চিৎকার চ্যাঁচামেচির ফলে ডাকাত দলটি আর বৈঠকখানার দিকে এল না। তার উপর সারা পাড়া জেগে উঠেছে। ধরা পড়ার ভয়ে দলটি চম্পট দিল। কিন্তু যাবার সময় আশা মতো গয়নাগাটি আর টাকাকড়ি না পেয়ে অনেক আসবাবপত্র ভাঙচুর করে গেল। তবু নগদ টাকা, গয়নাপত্তর খুব কমও তো পায়নি। কেবল সোনা মামিমার সাহসিকতা আর বুদ্ধিমত্তার জন্য আমাদের, বিশেষ করে পুষ্পদির গায়ের বহুমূল্য অলংকারগুলি রক্ষা পেল।

পরের দিন সকালে সব ঘটনা জানাজানি হলে শুধু মামাবাড়িতে নয়, গোটা পাড়ায় আলোড়ন পড়ে গেল। ওই অন্ধকার রাতে পুকুর পাড়ে বাঁশবনের ঝোপে সোনা মামিমা একাকী রাত কাটালেন কী করে? ভাবতে আমারও দেহে শিহরণ জাগে। অথচ ওই বাঁশবনের পুকুরের ভয়ে মামিমা একদিন সংসার ছেড়ে ছিলেন। কেমন যেন রহস্যময়। তাইতো অনেকে প্রশংসা করলেও নিন্দুকেরা কটূক্তি করতে ছাড়ল না।

– এই সাহসের সিকিভাগ যদি দেখাত সেদিন, তাহলে তো আর এ বাড়ি ছাড়তে হতো না। মেয়ে কিনা ভয় পায়। নাকি বাপির বাড়িতে অন্য কিছু ছিল?

নিন্দুকেরা যাই বলুক, সেদিন আর এদিন যে অনেক তফাত, অনেকটা সময়, তা তারা বোঝে না।

তবে মামিমা এই নিন্দা বা প্রশংসার কোনওটিতেই কর্ণপাত করেননি। তিনি যা করেছেন ওই মুহূর্তে তাঁর যা মনে হয়েছে। ভালো মন্দ বিবেচনার সময় কোথায়?

– এ সব কথা তোমরা আর আমায় জিজ্ঞাসা কোরো না। ভগবানই আমাকে বুদ্ধি ও সাহস জুগিয়েছেন। নইলে কি পারতাম। সবই তাঁর ইচ্ছা।

এরপর আর কেউ কোনও কথা বলার সাহস পায়নি।

অষ্টমঙ্গলা শেষ। আমরা বাড়ি ফেরার জন্য তৈরি হচ্ছি। মামিমাও পরের দিন কলকাতায় বাপের বাড়ি ফিরে যাবেন। কিন্তু দুই মামিমা, পুষ্পদি আর নতুন বউদি সেদিনটা থেকে যাবার জন্য এমন ভাবে অনুরোধ করতে থাকলেন যে, মা সিদ্ধান্ত বদলাতে বাধ্য হলেন। বিশেষ করে আবার কবে একসাথে দেখা হবে কে জানে? আমারও ভালো লাগল এই সিদ্ধান্ত।

সন্ধ্যাবেলা আমরা ছোটদার ঘরে নতুন বউদির গান শুনছি। মা আর দু’মামিমা ছাদে গল্প করছেন। হঠাৎ কাকতালীয় ভাবে সোনা মামিমার চোখে পড়ে পঁয়ত্রিশ বছর আগেকার সেই একই রকম ঘটনা। শাড়ি পরা একটি মেয়ে আম বাগানের ভিতর দিয়ে একাকী দৌড়োচ্ছে। তবে এর শাড়িটা রঙিন। এটা দেখেই তিনি, মা ও ছোটো মামিমাকে দেখালেন। এবার আর সোনা মামিমা ভয় পেলেন না। বরং বিয়েবাড়ির অন্যান্যদের জানালেন। তখনও বাড়িতে লোক কম ছিল না। ঘটনা শুনে সবাই ছুটল বাগানের দিকে। পাড়ার লোকেরাও ওদের সঙ্গ নিল।

প্রায় আধ ঘন্টা পরে সকলে ফিরল, সঙ্গে নিয়ে একটি রঙিন শাড়ি পরা অল্পবয়সি মেয়েকে। মেয়েটি পাড়ারই সম্ভ্রান্ত বোসবাবুর ছোটো মেয়ে। সে তার প্রেমিকের সাথে ঘর বাঁধার উদ্দেশ্যে এই রাত্রিতে একাকী বেরিয়েছিল বাড়ি ছেড়ে। ভালোবাসে তাকে সে। অথচ বাবা-মায়ের ইচ্ছে তার বিপরীত। তাই তার এই সিদ্ধান্ত।

এরপর যা হয় তাই। মেয়েটিকে সকলে মিলে বুঝিয়ে সুঝিয়ে বাবা-মায়ের কাছে রেখে আসে। ঘটনাটা যাই হোক, সোনা মামিমার ভাবনা কিন্তু দানা বাঁধল পঁয়ত্রিশ বছর আগের ঘটনায়। সেই মেয়েটিও নিশ্চয় ভূত বা পেত্নি ছিল না। হয়তো এরকমই একটি সাধারণ মেয়ে। নিজের ভালোবাসার জনকে পেতে রাতের বেলা বেরিয়েছিল অভিসারে। আর সেটিকে অন্যভাবে ভেবেই তার জীবন আজ রিক্ত, শূন্য। ভাবতে ভাবতেই তার চোখে জল এসে যায়।

এই ঘটনার পর সোনা মামিকে আর শত অনুরোধেও এখানে রাখা যায়নি। অনুতাপে দগ্ধ মামিমার হয়তো মনে হয়েছিল একটি ভুল সিদ্ধান্ত কীভাবে তার জীবনের সব কিছু কেড়ে নিয়েছে। ওই ভুলের জন্যই তার এত ভালো স্বামীর ঘর করা হয়নি। সব কিছু পেয়েও সে আজ নিঃস্ব। এই ভাবনার মাঝেই বাঁধভাঙা কান্নায় ভেঙে পড়েন সোনা মামিমা।

ভালো বাসা

সক্রোধে তখনও চেঁচিয়ে চলেছেন মৃণালিনী। ‘না আর এক মহূর্তও এই বাড়িতে থাকব না আমি। এ বাড়ির জলও আমার জন্য বিষ। আমার কি মান-সম্মান বলে কিচ্ছু নেই! সামান্য একটা কাজের লোক কিনা আমার মুখের উপর জবাব দেবে। এতবড়ো দুঃসাহস। এ অনাচার মেনে নেওয়া যায় না। আজই আমরা এ-বাড়ি ছেড়ে গ্রামের বাড়িতে চলে যাব।’

উৎপলেন্দুবাবু সামনের চেয়ারে বসে চায়ে চুমুক দিতে দিতে খবরের কাগজের পাতা উলটে-পালটে দেখছিলেন। আর মাঝে মাঝে আড়চোখে চশমার ফাঁক দিয়ে গিন্নির পারদ মাপবার চেষ্টা করছিলেন। প্রথম প্রথম পাত্তা দেননি, কিন্তু বেগতিক দেখে বলে বসলেন, ‘বনমালি তোমাকে কী এমন বলেছে যে, সক্বাল সক্বাল বাড়ি একেবারে মাথায় তুলে ফেললে। বলার মধ্যে এই তো বলেছে, বাগান থেকে ফুল না তুলতে। ও তো দ্যাখে ওই গাছগুলোর পিছনে ওর বউদিমণি কতটা সময় ব্যয় করে। বরাবর বউমার তো একটাই স্বপ্ন, বাড়ির সামনে একটা ছোট্ট সুন্দর ফুলবাগান থাকবে। সেখানে তুমি যদি ওর সাজানো বাগান নষ্ট করতে যাও, তাহলে কথা তো উঠবেই। আজ ও বলছে, কাল কেয়া, বউমা কিংবা রক্তিম বলবে।’

স্বামীর কথা শুনে ঝাঁঝিয়ে ওঠেন মৃণালিনী, ‘তুমি তো কখনওই অন্য কারওর দোষ দেখতে পাও না। ঘরে সাজিয়ে রাখব বলে সামান্য কয়েকটা গোলাপের কুঁড়ি-ই তো তুলেছিলাম! অমনি ওই বউদি-সোহাগি এসে বলে কিনা ফুল তুলবে না। বউদিমণি রাগ করবেন। কোথায় তোর বউদিমণি ডাক, আমিও দেখছি।’ কাকে ডাকবে সে, তার বউদিমণি, দাদাবাবু তো ততক্ষণে অফিসে পৌঁছে গেছে।

বনমালি এবাড়িতে বাগান দেখাশোনার কাজ করে। শুধুমাত্র বাগানের শখ মেটাবার জন্য বাড়ির-ই নীচের তলায় একটা ঘরে থাকতে দিয়েছে কেয়া আর রক্তিম। দু-বেলা খাওয়াদাওয়া, থাকা আর মাস গেলে কিছু টাকা পায় সে। তাতেই সে খুশি। চারকূলে তার যে আর কেউ নেই। কেয়ার বাগানের শখ দেখে এক প্রতিবেশী কাকিমাই বিশ্বস্ত এই বনমালিকে ঠিক করে দিয়েছেন। গাছ দেখাশোনা ছাড়াও ঘরের দোকান-বাজার করে দেয় ওই বনমালি-ই। কেয়ারটেকার বললেও খুব একটা ভুল বলা হয় না। খুব সাধাসিধে মানুষ। সংসারের এত মারপ্যাঁচ সে বোঝে না। আগে চাকদা গ্রামে থাকত। মাটির পাত্র বানাত। তাতে দুবেলা ঠিক করে খেতেও পেত না। এই কাজ পেয়ে সে খুব খুশি।

অন্যদিন ছেলে-বউমার সাথেই বেরিয়ে যান উৎপলেন্দুবাবু। আজ হাঁটুর ব্যথায় কাবু হয়ে পড়েছেন, তাই আর বেরোতে পারেননি। একটু বেলা করে উঠে সামনে পার্কে কিছুক্ষণের জন্য পা-টা ছাড়াতে গিয়েছিলেন। তখনই খানিক আভাস পেয়েছিলেন। কিন্তু সেটা যে এতদূর গড়াবে বুঝতে পারেননি।

বাড়ি ফিরে দেখেন তখনও তর্জা চলছে। গিন্নি অনর্গল অকথা-কুকথা বলেই চলেছেন, আর সামনে দাঁড়িয়ে বনমালি মালি থরথর করে কাঁপছে। বারবার বোঝানোর চেষ্টা করছে ওভাবে সে বলতে চায়নি, কিন্তু কে-কার কথা শোনে। ভেবেছিলেন আশ মিটিয়ে বলার পর গিন্নি খানিক শান্ত হবে, তাই কিছু না দেখার ভান করে লক্ষ্মীকে চা দিতে বলে খবরের কাগজটা নিয়ে বসে পড়েছিলেন। মাঝে লক্ষ্মী এসে চুপিসাড়ে চা-ও দিয়ে গেছে। একটুও দাঁড়ায়নি সে-ও কী কম ডরায় গিন্নিমাকে। সব ওই মুখে মুখে চোপার কারণে।

বনমালির অনুনয়-বিনয় কাজে আসছে না দেখে নিজেই মাঠে নেমে পড়লেন উৎপলেন্দুবাবু। পরিবেশ হালকা করতে চেষ্টা চালালেন বটে, কিন্তু কাজে দিল না। ‘মাথা ঠান্ডা করো, মাথা ঠান্ডা করো। রক্তের চাপ বেড়ে যাবে।’ বলেই হাঁক দিলেন, ‘লক্ষ্মী তোর গিন্নিমাকে ফ্রিজ থেকে এক বোতল জল দিয়ে যাতো। মাথায় ঢালুক।’ আর সঙ্গে সঙ্গে বনমালিকেও ইশারা করলেন ওখান থেকে সরে পড়ার জন্য। বড়োবাবুর কথামতো সেও সুড়সুড় করে সরে পড়ল।

স্বামীর রসিকতা আর ইশারার বহর দেখে মেজাজ আরও সপ্তমে চড়ে যায় মৃণালিনীর। ‘তোলো তোলো, আরও মাথায় তোলো। তোমাদের সংসার তোমরা যা খুশি করো। মৃণালিনী কারওর গলগ্রহ হয়ে বেঁচে থাকবে না। কালই চলে যাব এখান থেকে। মৃণালিনী শেষ হয়ে যাবে তবু কথার নড়চড় করবে না।’

মৃণালিনীর কথায় কথায় হুমকি দেওয়াটা নতুন কিছু নয়। বাড়ির সকলেই কমবেশি ওনার এই অভ্যাস সম্পর্কে অবগত। কথায় কথায় শপথ নেওয়া, দিব্যি দেওয়া, তিলকে তাল করা, সুযোগ পেলেই সকলকে নীচু দেখানো এটা ওনার বরাবরের অভ্যাস। আগে নিজের সংসারে হুকুম চালাতেন এখন ছেলে-বউয়ের সংসারে। তফাতটা এই যা!

মৃণালিনী বরাবরই বদমেজাজি। সংসারে চ্যাঁচামেচি, টুকটাক ঝামেলা তো হয়ই, তবে বাড়ি ছেড়ে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি এর আগে কোনওদিন তৈরি হয়নি। রাগ করেছেন আবার নিজে নিজেই শান্ত হয়ে গেছেন। তার মালকিন হওয়ার অহংবোধ তাকে কোনওদিন একথা ভাবায়নি।

কিন্তু আজ ছবিটা একটু আলাদা। এটা তার ছেলে বউয়ের বাড়ি। ছেলে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক-এর ম্যানেজার। বউমা একটা কর্পোরেট অফিসে আছে। শহরের সম্ভ্রান্ত এলাকায় দেখার মতো একটা বাংলো। ছেলেও মায়ের ব্যাপারে বেশ যত্নশীল। তৎসত্ত্বেও কিছু কিছু মহিলা এমন থাকেন, যারা ছেলের বিয়ে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভাবতে শুরু করেন ছেলে পর হয়ে গেছে।

অথচ বিয়ের আগে এই ছেলেকেই চোখে হারাতেন মৃণালিনী। ছেলের সাথে মন-কষাকষি শুরু হয় কেয়ার সাথে বিয়ের অনুমতি চাওয়ার সময় থেকেই। এক তো নিজেদের পছন্দের মেয়ে নয় তার উপর জাত আলাদা। কিছুতেই মন থেকে মানতে পারছিলেন না মৃণালিনী। এই নিয়ে কম কথাকাটাকাটি হয়নি। শেষে উৎপলেন্দুবাবুর মধ্যস্থতায় মৃণালিনীর অমতেই রক্তিম আর কেয়ার বিয়েটা সম্পন্ন হয়েছিল। ছেলের খুশির কথা মাথায় রেখে মত দিয়েছিলেন উৎপলেন্দুবাবু। সঙ্গে মৃণালিনীকেও বুঝিয়েছিলেন, ‘অসুবিধেটা কোথায়? কেয়া যথেষ্ট সুন্দরী। শিক্ষিত। ভালো পরিবারের মেয়ে। তাছাড়া যেখানে রক্তিম নিজে থেকে পছন্দ করেছে, সেখানে আমাদের রাজি হওয়া না হওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। ভালো বলতে হবে রক্তিমকে যে ও তোমাকে সম্মান দিতে তোমার মতামত জানতে চেয়েছে।’

কিন্তু মৃণালিনী নিজের সিদ্ধান্তে অনড়। না-জানি কেন ওনার বারবার মনে হয়েছে ওনার সাধাসিধে ছেলের মাথাটা এমবিএ করা কেয়া একেবারে চিবিয়ে খেয়েছে। আসলে উনি ব্যাংক ম্যানেজার ছেলের জন্য কোনও উচ্চশিক্ষিত মেয়ে চাননি বরং এমন মেয়ে আনতে চেয়েছিলেন, যে দিবারাত তার সেবা করবে, তার কথা মতোই চলবে।

উৎপলেন্দুবাবু কম বোঝাননি, যে সংসারটা শেষমেশ তাদেরকেই করতে হবে, মৃণালিনীকে নয়, তার থেকেও বড়ো কথা ওরা একে-অপরকে ভালোবাসে, জানে বোঝে, সুতরাং ওরা একে-অপরের সঙ্গে ভালো থাকবে। কিন্তু ছেলের পছন্দ করার কাঁটাটা মৃণালিনী কোনওদিন তুলে ফেলতে পারেননি। তবুও একরকম চলে যাচ্ছিল।

উৎপলেন্দুবাবুর বদলির চাকরি। মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার। ভালো পোস্টে আছেন। কর্মসূত্রে বিভিন্ন জায়গাতেই থাকতে হয়েছে। শেষে চাকরির আর বছর তিনেক বাকি থাকতে কলকাতায় ট্রান্সফার হয়ে এসেছেন। প্রথমে ভেবেছিলেন গ্রামের বাড়ি থেকেই যাতায়াত করবেন। কিন্তু এই বয়সে তিন-তিন ছয় ঘন্টা জার্নি করা খুব কষ্টের। শরীর দেবে কেন! তাই ঠিক করে ছিলেন ছেলের বাড়িতেই থাকবেন। কিন্তু মৃণালিনী আপত্তি জানিয়েছিলেন। তাই গিন্নির কথামতো ঠিক করেছিলেন অফিসের কাছাকাছি বাড়ি ভাড়া নিয়ে থাকবেন। সেইমতো ব্যবস্থাও পাকা করে ফেলেছিলেন, কিন্তু ছেলে রাজি হয়নি। একপ্রকার জোর করেই মা-বাবাকে বাড়িতে নিয়ে এসেছিল। ‘এই বয়সে তোমাদের একা থাকাটাও তো ঠিক নয়। শরীরের কথা তো বলা যায় না। কখন কি হয়। সবসময় কি এতটা পথ ঠেঙিয়ে আসাটা সম্ভব। তাছাড়া অদ্রিজা বড়ো হচ্ছে, সব কিছু সামলে সম্ভব হলে তো? তাছাড়া তোমরা ভাড়া থাকতেই বা যাবে কেন।’

একপ্রকার বাধ্য হয়ে মৃণালিনী এবাড়িতে আসতে রাজি হয়েছিলেন। কিন্তু কিছুতেই নতুন পরিবেশে মানিয়ে নিতে পারছিলেন না। ছেলে-বউমা ওনার সবরকম সুবিধা-অসুবিধার খেয়াল রাখত। অভিযোগ করার কোনওরকম সুযোগ দিত না। তবু সুযোগ পেলেই উৎপলেন্দুবাবুকে বলতে ছাড়তেন না, ‘নিজেদের বাড়ির আলাদা একটা ব্যাপার। সেখানে স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে সব কিছু করা যায়, কোনও কিছুতে কিন্তু কিন্তু করতে লাগে না। কত করে বললাম– একটা বাড়ির ব্যবস্থা করতে, তা নয় অন্যের সংসারে জোয়াল টেনে মরছি।’

‘জোয়াল টানার কথা কেন বলছ মৃণাল, কেয়া তো কোনওদিন তোমাকে এক গ্লাস জলও গড়িয়ে খেতে বলেনি। তুমি নিজের ইচ্ছেয় করো। লক্ষ্মীকেও রান্নায় হাত লাগাতে দিতে চাও না। তাহলে কেন শুধু শুধু…। তাছাড়া অন্যের তো নয়, করছ তো নিজের সংসারেই। ছেলে-বউ-নাতনি তো আর পর নয়।’ মিষ্টি হেসে জবাব দেন উৎপলেন্দুবাবু।

কথাগুলো মৃণালিনীর মনোমতো হয় না, ‘এসব তোমরা ছেলেরা বুঝতে পারবে না। আর নাতনির কথা বলছ তাকেও তো প্রশ্রয় দিয়ে দিয়ে একেবারে মাথায় তুলে রেখেছে তোমার বউমা। এখন থেকেই মুখে মুখে জবাব দিতে শিখে গেছে। কেউ বলবে ক্লাস সিক্স-এ পড়ে। পোশাক-আশাক দেখেছ। ওই ছোটো ছোটো স্কার্টগুলো– সব মায়ের দোষ। নিজেও যেমন ছেলেদের জামাকাপড় পড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে, তেমনি মেয়েটাকেও উচ্ছন্নে পাঠাচ্ছে। সারাদিন তো বাইরে পড়ে রয়েছে। মেয়ে, মানুষ হবে কী করে। চাকরি করছে চাকরি! বলি চাকরি করে হবেটা কী? এমন তো নয় যে ও উপায় করে আনলে তবে হাঁড়ি চড়বে। রক্তিমের আয় তো কম নয়। আসলে তা নয় ঘরে মন টেকে না।’

বিরক্ত হয়ে উঠে দাঁড়িয়ে পড়েন উৎপলেন্দুবাবু। একটু কর্কশ ভাবেই বলেন, ‘পড়াশোনা শিখেছে কি ঘরে বসে থাকবে বলে। এখন আর কেউ বাড়িতে বসে থাকে না। তোমার এই খিটখিটে মেজাজের জন্য অদ্রিজাটা পর্যন্ত তোমার কাছে ঘেঁষতে চায় না। সব সময় টিক-টিক, এই করিস না ওই করিস না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সবকিছু বদলায়। তোমার কালে একরকম ছিল এখন আর এক রকম। এতবছর বাইরে থেকেও একটু বদলালে না তুমি। সেই পুরোনো চিন্তাভাবনা নিয়ে বসে আছ। কিছু বলার থাকলে ভালোবেসে বোঝাও। কেয়াকে দ্যাখো তো সারাদিন অক্লান্ত পরিশ্রমের পরেও মেয়েটা কীভাবে হাসি মুখে বাড়ির প্রতি তার দায়িত্ব-কর্তব্য পালন করে। মেয়েকে পড়ানো, তোমাদের সকলের ফরমায়েশ পূরণ করা।’ স্বামীর কথা শুনে মুখ বাঁকায় মৃণালিনী। স্ত্রীর আচরণে একটুও অবাক হন না উৎপলেন্দুবাবু। এই বদ্ধ পরিবেশ থেকে বাঁচতে দরজা খুলে বেরিয়ে যান তিনি।

এদিক থেকে উৎপলেন্দুবাবু অনেক উদার মনের মানুষ। খুব সহজেই সকলের সাথে মিশে যেতে পারেন। সকলকে আপন করে নিতে পারেন। তাই এত কম সময়ের মধ্যেই সকলের কাছে খুব প্রিয় হয়ে উঠেছিলেন। নাতনি তো একেবারে দাদুঅন্ত প্রাণ। কার্টুন দেখতে বসলেও দাদু। অঙ্ক করতে বসে কোনও সমস্যা হলেও দাদু আবার কোনও বায়না মেটাতে হলেও দাদু।

বউমা কেয়ার সাথেও উৎপলেন্দুবাবুর বেশ ভালো সম্পর্ক। পাকাপাকিভাবে উনি আসাতে কেয়াও অনেকটা নিশ্চিন্ত হতে পেরেছে। নাতনির পড়াশোনার পুরো দায়ভারটাই উনি নিজের ইচ্ছেয় কাঁধে তুলে নিয়েছেন। কেয়াকে সেভাবে আর দায়িত্বও নিতে হয় না। এমনকী প্রোজেক্ট ওয়ার্ক-টা পর্যন্ত উনি নিজের হাতে করেন। লক্ষ্মী-র ভরসায় তো আর পড়াশোনাটা ছাড়লে চলে না। সারাদিনের দেখভালের জন্য ও ঠিক আছে। বন্ধুদের জোরাজুরিতে বেড়াতে গিয়েছিল রক্তিম আর কেয়া। অদ্রিজার ক্লাস টেস্টের কারণে ওকে নিয়ে যেতে পারেনি। প্রথমে না-ই করে দিয়েছিল কেয়া, উৎপলেন্দুবাবুই জোর করে পাঠিয়েছিলেন তাদের। সেই নিয়েও মুখ ভার করতে ছাড়েননি মৃণালিনী।

‘কই আমার বেলায় তো এসব ভাবেনি কেউ। সব মনে আছে আমার, গ্রামের বাড়ি থেকে যখন মা আসতেন তখন আমরা দুজনে বেড়ানো তো দূর ঠিক করে কথা বলতে পর্যন্ত পারতাম না। মাথা থেকে ঘোমটা সরে যাওয়া নিয়ে কম গঞ্জনা শুনতে হয়নি আমাকে। মানুষ তো সবাই সমান তাহলে এত ভেদাভেদ কেন?’

‘ভুল করছ কোনও ভেদাভেদ নয়। নিজেরা যে দিনগুলো পেরিয়ে এসেছি, যাতে ওরা এই সমস্ত কষ্টের মুখোমুখি না হয়, তার জন্যই এই ব্যবস্থা। তাছাড়া এখন যাবে না তো কবে যাবে। ওরা তো আমাদের সমস্ত রকম ব্যবস্থা পাকা করে তবেই যায় বলো। অসুবিধা করে তো কোথাও যাচ্ছে না।’

‘সমস্যাটা তো তোমার নয় আমার। তুমি তো অফিসে চলে যাবে। এই বুড়ো বয়সে সংসারের সমস্ত ঝক্বি সামলাতে হবে আমাকে।’

‘একটু ভেবে দেখো তো ও তোমাকে বিশ্বাস করে বলেই না তোমার উপর সংসারের দায়িত্ব দিয়ে নিশিন্তে থাকতে পারে।’ কোনও জবাব দিতে পারে না মৃণালিনী।

মৃণালিনী যে খুব খারাপ মনের মানুষ, তা কিন্তু নয়। তবে সংসারে তিনিই যে সর্বেসর্বা একথা প্রমাণ করতে নিরন্তর লড়াই চালাতে চালাতে কেমন যেন গাম্ভীর্যের খোলসে মুড়ে ফেলেছেন নিজেকে। এতদিন যেখানে ওনার ইচ্ছের বিরুদ্ধে বাড়ির একটা পর্দা পর্যন্ত বদলানো হয়নি, সেখানে এই বাড়িতে যে-যার দুনিয়ায় মগ্ন, শত ব্যস্ততা। এখানে যেন তার কোনও অস্তিত্ব-ই নেই। এতদিনে তার বানানো ভিতটা যেন নড়বড়ে মনে হতে থাকে তার, সবসময় একটা ইনসিক্যুরিটি  কাজ করতে থাকে। নতুন এই পরিবেশে হাঁপিয়ে উঠছিলেন মৃণালিনী। কোনও মতেই নিজেকে এই আলো-আঁধারি থেকে টেনে বার করতে পারছিলেন না। ক্রমশ ঘনান্ধকারে ডুবে যাচ্ছিলেন তিনি।

তার উপর গত সপ্তাহে অদ্রিজার ব্যাগ থেকে পাওয়া প্রেমপত্র নিয়ে তিনি বেশ চিন্তিত ছিলেন। চিঠি আবিষ্কারের পর সকলের উপস্থিতিতে নাতনিকে জিজ্ঞেস করাতে নাতনি চিঠিটা ওনার হাত থেকে কেড়ে নিয়ে ঝাঁঝিয়ে ওঠে, ‘না বলে কারওর জিনিসে হাত দেওয়া উচিত নয়। কৃষাণু দাদা ওটা বিপাশা দিদিকে দিতে দিয়েছিল। আর তুমি না বলে পড়ে ফেললে। জানো না কারওর জিনিসে হাত দেওয়া উচিত নয়।’

নাতনির কথাতে একেবারে আকাশ থেকে মাটিতে নেমে এসেছিলেন মৃণালিনী। সব থেকে বেশি রাগ হয়েছিল ছেলে-বউয়ের উপর। এসব দেখেও তারা দু-ঠোঁট এক করল না। শাসন করার বদলে মেয়ের মুখে পাকাপাকা কথা শুনে হাসছিল তারা। তার উপর আজ বনমালির ফুল তুলতে মানা করার ঘটনাটা একেবারে আগুনের মধ্যে ঘি ঢালার কাজ করে দিয়েছে। সবমিলিয়েই আজকের ওনার এই বাড়ি ছেড়ে যাওয়ার ঘোষণা।

বনমালি আজ আর এমুখো হয়নি। লক্ষ্মীকে দিয়ে ঘরেই খাবার আনিয়ে নিয়েছেন মৃণালিনী। বনমালির ক’টা মাথা যে আবার গিন্নিমার সামনে এসে দাঁড়ায়।

দুপুরে উৎপলেন্দুবাবুই বুঝিয়েসুঝিয়ে গিন্নিকে খাওয়াতে রাজি করিয়েছিলেন। খাওয়াদাওয়ার যখন প্রায় একেবারে শেষ ঠিক তখনই কলিংবেলের আওয়াজ। লক্ষ্মী দরজা খুলতেই কেয়া-কে দেখে উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠে। ‘আরে বউদি আজ তাড়াতাড়ি ছুটি হয়ে গেল? ভালোই হয়েছে, সবার এখন খাওয়া শেষ হয়নি, হাত-পা ধুয়ে এসে বসে পড়ো। আমি খাবার বাড়ছি।’ বউমাকে দেখে উৎপলেন্দুবাবুও একগাল হেসে বলে ওঠেন, ‘যা-মা যা, ফ্রেশ হয়ে এসে বসে পড়।’ সামনের টেবিলে ব্যাগটা রেখে ফ্যানের নীচে বসে পড়ে কেয়া।

‘না বাবা, এখন আর কিছু খাব না।’ বলে লক্ষ্মীর দিকে তাকিয়ে, ‘তুই বরং আমাকে একটু লেবুর শরবত বানিয়ে দে, তাহলেই হবে।’

‘কিছু খাবে না?’

‘না রে, এই গরমে আর ভালো লাগছে না।’

‘হ্যাঁরে বনমালিদা, কই রে? ফেরার পথে নার্সারি থেকে এই চারাগুলো আনলাম। বসাতে হবে তো। খেতে আসেনি?’

‘হ্যাঁ খেয়েছে। তুমি রাখো, তোমাকে শরবতটা করে দিয়ে তারপর চারাগুলো দিয়ে আসছি।’ কিন্তু কিন্তু করে জবাব দেয় লক্ষ্মী। বনমালির প্রসঙ্গ ওঠাতে উৎপলেন্দুবাবুও চুপ করে যান। শাশুড়ির মুখটাও কেমন যেন ভার ভার লাগে কেয়ার।

লক্ষ্মীর কথাবার্তাতেই কেয়া খানিক আঁচ করতে পারে যে কিছু একটা ঘটেছে। সন্দেহ আরও বাড়িয়ে দেয়, খাবার সময়ে বনমালিদার অনুপস্থিতিটা। কেয়াও আর খুঁচিয়ে ঘা করতে চায়নি, পরে তো সব জানতেই পারবে।

‘ওহ্ বাবা ভাবছি বিকেলে একটু মার্কেটে যাব। তোমাদের কিছু লাগলে বোলো। ফেরার পথে নিয়ে আসব।’

মৃণালিনী যেন মুখিয়েই ছিলেন, উৎপলেন্দুবাবু কিছু বলার আগেই তাচ্ছিল্যের সুরে বলতে শুরু করলেন, ‘হ্যাঁ, এবাড়িতে শুধু উনিই আছেন। ওনার খিদমত খাটতে সবাই হাজির। শুধু আমিই সংসারের অতিরিক্ত বোঝা। আমার প্রয়োজনের কথা আর কে মাথায় রাখে। করার মধ্যে তো ওই রক্তিম-ই একটু…’ কথা শেষ করতে পারে না মৃণালিনী। তার আগেই কেয়া রাগত স্বরে বলে ওঠে, ‘আপনি হয়তো ঠিক করে শোনেননি, আমি আপনাদের দুজনের কথাই বলেছিলাম। আপনার প্রয়োজনের যথেষ্ট খেয়াল রাখি আমরা। ওইভাবে না বলে সোজাভাবেই বলতে তো পারেন কী লাগবে না লাগবে। এই সামান্য কথাতে রক্তিমকে টানার তো দরকার নেই।’ কথাগুলো বলে আর এক মুহূর্ত দাঁড়ায় না কেয়া। পায়ের শব্দ করতে করতে সিঁড়ি বেয়ে নিজের ঘরের দিকে চলে যায় সে।

উৎপলেন্দুবাবু সহজে রাগেন না। তবে সকাল থেকে বাড়ির পরিবেশে মেজাজটা এমনিতেই বিগড়ে ছিল। ‘এবার শান্তি হয়েছে। এটাই তো চাইছিলে। কতবার বলেছি মানিয়ে নিতে শেখো। গতবার যখন মুম্বইতে গিয়েছিলে তখনও তোমার জন্য মেয়ে জামাইয়ের মধ্যে অশান্তি লেগে গিয়েছিল। তোমার আর জামাইয়ের মাঝে পিষে মেয়েটা শেষ হতে বসেছিল। যেখানেই যাবে সেখানেই কিছু না কিছু ঘটাবে তুমি। বয়স তো হল। এবার তো শোধরাও।’ রাগ সামলাতে না পেরে খাবার থালা ঠেলে উঠে যান তিনি।

মেয়ে জামাইয়ের কথা বলতে বোধকরি খানিক অনুশোচনায় ভুগছিলেন মৃণালিনী। মনে মনে ভাবছিলেন সত্যিই তো তার জন্য মেয়ের সংসারটাই ভাঙতে বসেছিল। কিন্তু সেটা তো সম্পূর্ণ ভিন্ন ঘটনা। আজ অন্তত কেয়ার ওইভাবে বলা উচিত হয়নি। তাকে সঙ্গে করে নিয়ে গিয়ে তার প্রয়োজনীয় কিছু জিনিস কিনে দিতেই পারত সে।

উৎপলেন্দু তো সে সবের ধার দিয়েও হাঁটে না। আজ পর্যন্ত কোনওদিন একটা শাড়িও হাতে করে আনেনি তার জন্য। শুধু টাকা দিয়েই খালাস। কেয়া তো তো তবু মাঝে মধ্যেই এটা-ওটা-সেটা নিয়ে আসে তার জন্য। কী যে ভীমরতি ধরেছিল আজ, কেন যে কেয়াকে ওভাবে বলতে গেল। আর কেনই বা ঘর ছাড়ার কথাটা তুলতে গেল। এই বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাবেটা কোথায়? গ্রামের বাড়িতে! আজ পর্যন্ত গ্রামের বাড়িতে এক সপ্তাহের বেশি থেকেছে কখনও! সারাজীবন তো বরের সাথে এপ্রান্ত-ওপ্রান্ত করে বেড়িয়েছ। আর এই বুড়ো বয়সে গ্রামের বাড়িতে কাটাবে কীভাবে? শরীরেও তো নিত্যদিন কিছু না কিছু লেগেই রয়েছে। আগাগোড়াই চাকর-বাকর দিয়ে

সংসারের কাজ করিয়ে এসেছে। আর ছেলে-বউয়ের বাড়িতে এসে কাজ না করে করে তো বোধহয় হাত-পায়ে জং ধরে গেছে।

খেতে খেতে টিভি দেখাটা এবাড়ির সকলের বরাবরের অভ্যাস। ডাইনিং টেবিলে বসে সকলের চোখ আটকে থাকে টিভির পর্দায়। অবশ্য সকলে বলতে উৎপলেন্দুবাবু আর অদ্রিজার। রক্তিম তো আজ কয়েকদিন যাবৎ তাড়াতাড়িই ডিনার সেরে শুয়ে পড়ছে। ইয়ারএন্ডিং চলছে। কাজের প্রচণ্ড প্রেশার। সেই কাকভোরে বেরিয়ে যাচ্ছে আর ফিরতে ফিরতে রাত ন-টা দশটা। কেয়া আর লক্ষ্মী রান্নাঘরে সম্ভবত পরোটা ভাজছিল। ঠিক সেই সময়ে উৎপলেন্দুবাবুর চেয়ারের সামনে এসে দাঁড়ায় মৃণালিনী।

‘খাওয়া হয়ে গেলে তাড়াতাড়ি উপরে এসে ব্যাগ গুছিয়ে নিও।’

‘শুধু শুধু ব্যাগ গোছাতে যাব কেন?’ খুব সহজ ভাবে মৃণালিনীর দিকে না তাকিয়েই উত্তর দেন উৎপলেন্দুবাবু।

‘কেন আবার, কাল সকালের ট্রেনেই আমরা বেরিয়ে যাব।’

এইবার টিভির দিক থেকে চোখ সরিয়ে মৃণালিনীর দিকে তাকায় উৎপলেন্দুবাবু। বলেন, ‘যাচ্ছ তো তুমি, আমি ব্যাগ প্যাক করব কেন?’

কথাটা শুনে আঁতকে ওঠেন মৃণালিনী। কোনওমতে নিজেকে সামলে নেন। ‘মানে। মানে তুমি যাবে না তাই তো?’

‘ঠিক তাই।’ উৎপলেন্দুবাবুর সোজাসাপটা জবাব শুনে চমকে ওঠেন মৃণালিনী। স্বামীর কাছ থেকে কখনও এরকম উত্তর পাবেন আশা করেননি। প্রকাশ না করলেও একধাক্বায় মনের জোর কমে যায় মৃণালিনীর। এতদিনের বন্ধ ঘর খোলা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা, জ্বালানির ব্যবস্থা করা, দোকানপাট সমস্ত একহাতে করার কথা ভেবেই যেন অসুস্থ বোধ করতে থাকেন তিনি। মনে হতে থাকে এভারেস্ট-এ ওঠার থেকেও এগুলো বোধকরি অনেক কঠিন কাজ। কিন্তু আর করারও তো কিছু নেই, মুখ ফসকে বাড়ি ছাড়ার কথাটা তো বলে বসেছেন। যদি উৎপলেন্দুর হূদয় পরিবর্তনের একটুও আভাস পেতেন তাহলে ভুল করেও এমন শপথ বাক্য পাঠ করতেন না।

অগত্যা মনোবল বাড়িয়ে জিনিসপত্র গোছাতে শুরু করেছিলেন মৃণালিনী। কথামতো পরদিন সকালবেলা রক্তিম বেরিয়ে যাওয়ার পর ড্রাইভারকে গাড়ি বার করতে বলে ব্যাগ নিয়ে নীচে নেমে আসেন মৃণালিনী। গাড়িতে বসে দেখেন চালকের আসনে তার একমাত্র ছেলের বউ কেয়া। বেশ আশ্চর্য লেগেছিল মৃণালিনীর। কিন্তু পালটা কোনও প্রশ্ন করেননি। কোথায় ভেবেছিলেন যাবার সময় উৎপলেন্দু কিংবা বউমা আটকাবে। তা নয় এ যে একেবারে উলটো স্রোত। শাশুড়িকে বাড়ি থেকে তাড়াতে পারলে যেন হাড়ে বাতাস লাগবে। তাই এই ঔদ্ধত্য। ছেলে বাড়িতে থাকলে ব্যাপারটা হয়তো উলটো হতো। হয়তো…!

কেয়াদের বাড়ি থেকে স্টেশন চার কিলোমিটার। এতখানি পথ একটিও বাক্য ব্যয় করেনি কেউই। সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে কখন যে স্টেশনে পৌঁছে গেছেন বুঝতেই পারেননি মৃণালিনী। সম্বিৎ ফেরে এক কুলির কথাতে। ‘সামান দিয়ে আসব মাইজি?’ কুলির কথায় কর্ণপাত করেন না মৃণালিনী, ব্যাগটা নিজের হাতে নিয়েই পড়িমরি করে দরজাটা খুলে রাস্তাটা পার করতে যাবেন অমনি আচমকা সামনে একটা গাড়ি… তারপরে কিছুক্ষণের জন্য সব অন্ধকার। মাঝে একবার মনে হয়েছে, কে যেন তার হাতটা ধরে জোরে টান মেরেছে। তারপর আর কিছু মনে নেই।

সম্বিৎ যখন ফেরে তখন হাসপাতালের বেডে। মাথার সামনে বসে আছেন উৎপলেন্দুবাবু। আর কেয়া পুলিশের সামনেই সাতাশ-আঠাশ বছর বয়সি এক যুবককে ধমক দিয়েই চলেছে।

‘এইভাবে কেউ গাড়ি চালায়। যে-কোনও মুহূর্তে একটা বড়োসড়ো বিপদ ঘটে যেতে পারত। আজ আমি না থাকলে মানুষটা মারা পর্যন্ত যেতে পারত। কিছু হয়ে গেলে ফিরিয়ে দিতে পারতে। এই তোমাদের মতো বেপরোয়া ছেলেদের সাজা পাওয়াই উচিত। নইলে তোমরা শোধরাবে না। ইন্সপেক্টর সাহেব একদম ছাড়বেন না। কয়েকদিন জেলের হাওয়া খেলেই মজা টের পাবে।’

বিছানায় শুয়ে থাকা মৃণালিনীর আর বুঝতে বাকি থাকে না যে, অন্য কেউ নয়, তার বউমা কেয়াই তাকে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরিয়ে এনেছে। বউমার জন্যই যে প্রাণ ফিরে পেয়েছেন। এখন তার চোখের সামনে তার জন্যই লড়াই করছে কেয়া। যাকে তিনি চিরকাল তার প্রতিদ্বন্ধী ভেবে এসেছেন, সে-ই আজ তার পরিত্রাতা হয়ে সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।

মৃণালিনীর শরীরে কিছু কাটা-ছড়া ছাড়াও বড়ো ক্ষতি বলতে, ডান পা-টা ভেঙেছিল। প্লাস্টার করার পর তাই বাড়ি ফেরার অনুমতি দিয়েছিলেন ডাক্তার। ততক্ষণে খবর পেয়ে রক্তিম হাসপাতালে পৌঁছে ছুটে যায় মায়ের কাছে। মায়ের সাথে কথা বলার পর খানিক স্বস্তি পায় সে। তারপর বাড়ি ফেরার ব্যবস্থা করে।

বাড়ি ফেরার পরেই কেয়া লেগে পড়ে শাশুড়ির যত্নে। রক্তিমকে ইয়ারএন্ডিং-এর কারণে ফিরে যেতে হয় ব্যাংকে।

শাশুড়ির পায়ের উপর যাতে কোনওরকম চাপ না পড়ে সেজন্য সমরকম ব্যবস্থা করেছিল কেয়া। অ্যাটাচ বাথরুম থাকার জন্য নিজেদের বেডরুমটা পর্যন্ত ছেড়ে দিয়েছিল ওনাকে। সামনের টি-টেবিলে ওষুধ, জল, বিস্কুট থেকে শুরু করে প্রয়োজনীয় সমস্তরকম জিনিস রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। এমনকী ইলেকট্রিশিয়ানকে ডেকে বেডের নীচে একটা সুইচেরও বন্দোবস্ত করা হয়েছিল, যাতে বেলের আওয়াজে কেউ না কেউ ওনার সেবায় নিয়োজিত হতে পারে। মৃণালিনী সবিস্ময়ে তাকিয়ে থাকেন বউমার দিকে। লজ্জায় পাতাল প্রবেশ করার মতো অবস্থা হয় তার।

নিজের অজান্তেই চোখে জল চলে আসে মৃণালিনীর। লুকোবার আপ্রাণ চেষ্টা করে কিন্তু কেয়ার চোখকে ফাঁকি দিতে পারে না। শাশুড়ির চোখে জল দেখে খানিক মুচকি হেসে শাশুড়িমায়ের উদ্দেশ্যে বলে, ‘কাঁদছেন যে বড়ো। কাঁদলে চলবে। মনকে শক্ত করুন। তাড়াতাড়ি সুস্থ হতে হবে তো। নাহলে গ্রামের বাড়ি যাবেন কী করে।’ চোখ মুছে বউমার দিকে বিস্ময়ভরা নজরে তাকিয়ে থাকে মৃণালিনী। মনে মনে ভাবতে থাকে তাহলে কী…

ভাবনায় বাধ সাধে কেয়া, ‘গ্রামের বাড়ি যাবেন, তবে একা নয় আমরা সকলে দু-দিনের জন্য বেড়িয়ে আসব বুঝেছেন। এবার সবকিছু ভুলে গিয়ে সংসার, নাতনি সামলান তো। শুধু পালাই পালাই। আপনি থাকতে আমি সংসার সামলাতে যাব কেন।’ বলেই চাবির গোছাটা শাশুড়ির হাতে ধরিয়ে দেয় কেয়া।

বউমার হাত ধরে কিছু বলার চেষ্টা করছিলেন মৃণালিনী। ‘থাক আর কিছু বলতে হবে না। বাসন একসাথে থাকলে একটু ঠোকাঠুকি লাগবেই। তাছাড়া বুড়ো মা-বাবারা একটু খিটখিটেই হয়। কী বলো মা?’ এর মাঝে কখন যে উৎপলেন্দুবাবু ঘরে ঢুকে দাঁড়িয়েছিল কেউ-ই খেয়াল করেনি। কেয়ার কথায় হঠাৎ করে তাদের সাথে সাথে উৎপলেন্দুবাবুও হেসে ওঠেন। আর মৃণালিনী কাঁদতে কাঁদতে বউমাকে জড়িয়ে ধরেন।

মৃণালিনীর, উৎপলেন্দুবাবুর কথাগুলো মনে পড়ে যায়। ‘সম্পর্কগুলোকে এভাবে জটিল করে ফেলো না মৃণাল। এটা কেন হল না, ও-কেন ওটা করল এটা বিচার করতে না বসে বরং মিলেমিশে থাকো। দেখবে শান্তি পাবে।’

সত্যিই আজ শান্তি বিরাজ করছে মৃণালিনীর মনে।

বাঘবনে বেড়াতে

তাহলে মিরিক? নাকি কালিঝোরা? আরও দূরে যেতে চাইলে বলে ফেলুন। দেখুন অয়নদা, এখনই ডিসিশন নিন। আর কোনও জায়গা মনে হলে বলে ফেলুন। কলি কফির কাপ এগিয়ে দিল।

অয়ন চিন্তিতভাবে কলির দিকে তাকিয়ে আছে। চোখ এখানে, মন দৃষ্টিটুকু নিয়ে অনেক দূরে। যেন মংপং, কালিঝোরা ছাড়িয়ে অন্যান্য পিকনিক স্পটগুলো দেখতে বেরিয়ে পড়েছে।

– এ কি? তুই যে ব্যোম মেরে রইলি! বলে ফেল বাবা। নাহলে কলি আমাকে পঞ্চাশবার পাঠাবে তোর কাছে। যশ হাসে।

– সত্যি? আহা, সে যে আমার পরম আকাঙিক্ষত। কলি আমাকে বার বার স্মরণ করছে, একথা ভাবতেই আমার হার্ট বিট বেড়ে গেছে।

– ইয়ার্কি নয়, ঠিকঠাক বলুন তো। কলি বুকের ওপর ওড়না ছড়িয়ে দিল– কী ভাবছেন? মিরিক?

– ভাবছি, বাঘবনে আজ ভিড় করেছে দত্যিদানো, বাক বন্দি বর্গিরা সব পালিয়ে কেন? বাঘবনে যাব। অনেক হল মংপং কালিঝোরা। এবার স্বাদ পালটাই চলো। বেতলার জঙ্গলে যাবে?

– বেতলা আমার দেখা। যশ মুচকি হাসে– বিয়ের আগে অবশ্য। তারপর আর বাঘ হওয়া হয়নি, মানে বাঘ দেখা হয়নি। কুছ পরোয়া নেই, পেঞ্চ-এ চল। পেঞ্চ রে বাবা! মধ্যপ্রদেশে। মুখ দেখে মনে হচ্ছে জায়গাটার নাম শোননি? পড়াশোনার ব্যাকগ্রাউন্ড সবার ভালো হবে তার মানে নেই!

কলি অবাক– তুমি কোথায় পেলে নামটা?

অয়ন হাসি চেপে যশের চোখে চোখ রাখে– তুই কোথায় শুনলি?

যশ হেসে ফেলে– এটা কিন্তু বউয়ের সামনে আমাকে আন্ডার এস্টিমেট করা হচ্ছে। কলির মাথায় গ্রে ম্যাটার কম, সেটা মানবি? ও বুঝবে না, তুই একজন ওয়াইল্ড লাইফ ফোটোগ্রাফার, আমাদের সামনে আছিস, স্বাভাবিক ভাবে তোর কাছেই শুনব নামটা? গণ্ডারের গায়ে সুড়সুড়ি দেওয়া, আর কি! একদিন বুঝবে ঠিক।

কলি রেগে যাচ্ছে বুঝে হাত তুলে দাঁড়ায় যশ– ক্ষম দেবী এ দাসের অপরাধ যত! ভাবো, পিকনিক করতে নিয়ে যাচ্ছি বাঘের সামনে ঘোঘ কে। তোমার পাঁচ কোটি বার দেখা মংপং, কালিঝোরা নয়। মধ্যপ্রদেশে! বুইলে গিন্নি?

কলি অবাক হতে হতে খুশির চটক লাগাল চোখে মুখে– সত্যি অয়ন? কবে যাচ্ছি? মঞ্জিরা যাবে তো?

যশ থমকে গেল– কেন? কেন যাবে না? তোমার যত ডিপ্রেসড চিন্তা। বোগাস।

কলি থতমত খেয়ে গেল– আসলে লাস্ট ইয়ারে যাবে বলেও গেল না।

– সেটা তো লাস্ট মোমেন্টে কী একটা প্রবে ফেঁসে গেল বলে, না রে অয়ন?

যশ সিগারেটে আগুন ছোঁয়াতে চেষ্টা করছিল, থেমে হাসল– অয়ন যাচ্ছে, মঞ্জিরা যাবে না? তাহলে অয়ন, ডেট ঠিক করে ফেল।

অয়ন আড় চোখে কলিকে দেখল– ডেট ঠিক করব, কিন্তু দুজন সুন্দরী সঙ্গে থাকছে, বিউটি কনটেস্ট করলে কেমন হয়? তবে শিরোপা কে পাবে?

– যে যার বউকে দেবে। গৃহশান্তি বলে একটা কথা আছে। গুরুর নিষেধ, সেটা নষ্ট না করতে। হাওয়ার হাত থেকে বাঁচিয়ে অবশেষে আগুন ধরাতে পেরেছে যশ।

কলি অল্প হাসে, – বউ কেন? বান্ধবীকে দেবে বলো।

– বান্ধবী? সে আবার কে?

– আসবে! নো টেনশন। ফুশিয়া বর্ডারের লাইট পিংক শাড়ির ময়ূরগুলো দোল খেতে খেতে হাসে। অয়নের চোখের দৃষ্টি দেখে কলি বাধ্য হল চোখ পাকাতে। নিবিষ্ট চোখে খোলা জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে ছিল যশ। কলি সেদিকে তাকিয়ে বুঝল সন্ধে হয়ে এসেছে। ঠান্ডা বাতাস আসছে। জানালা বন্ধ করে না দিলে পন পন করে মশা ঢুকে যাবে। জানালা বন্ধ করতে গিয়ে দেখতে পেল বুবলিকে। এদিকেই আসছে। কলি ঘাড় ঘুরিয়ে যশের দিকে তাকাল– এই, যাও না, দরজাটা খুলে দাও না! বুবলি আসছে। যশও দেখেছিল। উঠে যেতে যেতে বলল– সন্ধে হয়ে যায়। এখন ক’দিন বাইরে যেতে দিও না। ঠান্ডা পড়ছে।

কলি সম্মতিসূচক মাথা নাড়ে– আমিও তাই ভেবেছিলাম।

ওদের কথাবার্তার মধ্যে ঢুকে পড়ে অয়ন– আরে, এদিকে দ্যাখো। জিন্দা লাশ হয়ে বসে আছি। আমি তাহলে ব্যবস্থা করে ফেলছি? মধ্যপ্রদেশের পেঞ্চ রিজার্ভ ফরেস্টে যাচ্ছি?

নেক্সট উইকে ডেট ঠিক হয়েছে। তুমুল গোছগাছ চলছে। অয়নের বউ মঞ্জিরা প্রায় রোজই আসছে। আলোচনা চলছে। সাংঘাতিক এক্সাইটেড কলি আর যশ। বাইরে যাওয়া হয় না ওদের অনেকদিন। দিনক্ষণ ঠিক হওয়া মাত্র অয়ন টিকিট কেটে ফেলেছে।

রাতে নেট সার্ফিং করে যশ। তখনই কলি পেছনে এসে দাঁড়াল। যশ মনিটরে চোখ রেখে বলল– কী? কিছু বলবে? কলি কথা বলছে না দেখে যশ তাকাল– কলি? কী হল? বলেই কলির হাতের দিকে চোখ পড়ল। বুবলির পুতুলের বাক্স। এলোমেলো ছোটো ছোটো পুতুল, রঙিন কাপড়ের টুকরো, ছোটো ছোটো সোফাসেট খাট…। রান্নাবাড়ির ক্ষুদ্র সংস্করণগুলোর নীচে মঞ্জিরার পারফিউমের শিশিটা! এটা সেদিন খুঁজে পাচ্ছিল না মঞ্জিরা।

তুলে হাতে নেওয়ার কথাটা মনে ছিল না। দুজনে স্থির হয়ে থাকে। কলির শাড়ির কুচিগুলো একবারও কেঁপে উঠল না কলির বুকের মতো। লজ্জা করছিল। কেউ কারও দিকে তাকাল না। চকচকে সুন্দর শিশি ভরা তরল পদার্থ। গতকালই মঞ্জিরা এটা বের করে সুগন্ধ ছড়িয়ে দিয়েছিল বাতাসে। কলির ঘাড়ে এসে পড়েছিল সুগন্ধি। অয়ন চোখ বুজে সজোরে শ্বাস নিয়েছিল– এত সুগন্ধি তুমি! অয়নের শ্বাস কলির ঘাড়ে, কানে… আবিষ্ট হয়ে যাচ্ছিল কলি। যশ মঞ্জিরাকে ওর বাগান দেখাতে নিয়ে গেছিল বাড়ির পেছনে। তখন বুবলি…! বুক জুড়ে উথাল পাথাল কান্নাকে গিলে ফেলতে ফেলতে উঠে দাঁড়ায় কলি। যশ অন্ধকার বারান্দায় চলে গেছে নিজেকে লুকোতে। কলি দেখতে পেল ছায়াশরীরকে।

– কী হল? ফিসফিস করে কলি।

– খুব ভুল হয়েছে আমাদের। সাবধান হওয়া উচিত ছিল। অথচ কোনও অভাব তো রাখিনি! কোথা থেকে এই জঘন্য স্বভাব পেল মেয়েটা। এর আগেও এই ধরনের ঘটনা ঘটেছে। ঠিক বলেছে যশ। সহেলির পেনসিল দিয়ে শুরু। মাসতুতো বোন দিয়ার নেইলপালিশ, রুপুদির মেয়ের ক্লিপ, দোতলার ভানুবাবুর গোঁফ কাটার কাঁচি, প্রাঞ্জলের স্কেচ পেন…!

– তোমার রাঙা পিসির সোনার চিরুনি? মনে আছে? জোরে কথা বলতে ভয় পাচ্ছে কলি। কথার শব্দে সভ্যতার মুখোশ ভেঙে চুরমার হয়ে যাবে যেন।

যশ কলির হাত ধরে– এখনও সময় আছে। বকাবকি কোরো না। শুধরে নেওয়া যাবে।

– কিছু বলব না? মেরে ফেলব। কলি হাঁপায়।

এনজেপি থেকে শিয়ালদা। তারপর বিকেলের ফ্লাইটে কলকাতা থেকে নাগপুরের বিআর আম্বেদকর এয়ারপোর্ট পৌঁছোতে সন্ধে হয়ে গেল। গাড়ির ব্যবস্থা করে রেখেছিল অয়ন। বিরানব্বই কিমি পথ পাড়ি দিয়ে মধ্যপ্রদেশের চেকপোস্টে পৌঁছে হাঁফ ছাড়ে ওরা। কলি অয়নের দিকে তাকায়– আর কদ্দূর অয়নদা?

অয়ন হাসে– আর একটু। এসেই গিয়েছি ধরে নাও। লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে প্রচুর গাড়ি। এখান থেকেই গাড়ির পারমিট নিতে হবে। অয়ন আগেই মধ্যপ্রদেশ ট্যুরিজমের একটি রিসর্টে থাকার ব্যবস্থা করে রেখেছিল। সুন্দর প্রাকৃতিক পরিবেশ। মন ভালো হয়ে গেল সবারই। অয়ন হেঁকে বলল– কি? কারও মুখে কথা নেই কেন? কলি সমুদ্রনীল ও লালের কম্বিনেশনের সালোয়ার কামিজে মোড়া শরীরটা দুলিয়ে হেসে উঠল– ওই অয়নদা, দারুণ সারপ্রাইজ দিলেন কিন্তু!

যশ মুগ্ধ গলায় বলে– তুমি জান না কলি, ওয়াইল্ড লাইফ ফোটোগ্রাফাররা খুবই অরগ্যানাইজড হয়। চোখ বুজে বিশ্বাস করা যায়।

পাশাপাশি দুটো কটেজ। পেছন দিকে এক্সট্রা ব্যালকনি। রাতে নাকি বাঘের গর্জন শোনা যায়। ঘরে ঢুকে অয়ন-মঞ্জিরা বাদে বাকি দুজনে থ মেরে গেল। বেডকভারে, ব্লাঙ্কেটে সব জায়গায় বাঘের গায়ের ছাপ বা পাগ মার্কের প্রিন্ট। যশ সোফায় বসে পড়ল– এতক্ষণে মনে হচ্ছে বাঘবনে এসেছি। নিজেকে বাঘ বাঘ মনে হচ্ছে, বলেই শব্দ করে মুখে– হালুম। কলি স্নানের তোড়জোড় করছে। একঘন্টা পরে ডিনার। এখন চা, কফি, স্ন্যাক্স এসেছে। ব্যালকনিতে বসে অয়ন কফির কাপে চুমুক দিয়ে কলিকে দেখল এক পলক– কি কলি? কেমন লাগছে? পালাজোর সঙ্গে লং কামিজ, জিওমেট্রিক শেপের কানের দুল, চুল গুছিয়ে তুলে ট্রেন্ডি ক্লিপে আটকে রাখা কলির চেহারায় ক্লাসি লুক এসেছে। পেছনের ব্যালকনিতে যশ মঞ্জিরার ঠোঁট চুষে চুষে ফুলিয়ে দিল। মঞ্জিরা হাঁপিয়ে উঠে নিজেকে ছাড়াতে চেষ্টা করে– ছাড়ো বাঘ। যশ মত্ত হয়ে উঠেছে। মঞ্জিরার বুকে মুখ ঘষছে। মঞ্জিরা কেঁপে উঠল– এখন না। পরে, পরে…। কলি অয়নের কানে আলতো কামড় দেয়– আজ তোমার কাছে থাকব সারারাত। এখানে। বাঘের ডাক শুনব, বাঘ ঝাঁপিয়ে পড়বে আমার শরীরের ওপর… কামড়ে খাবে আমাকে, খামচে খাবে…। অয়ন কলির কানে মুখ নিয়ে আসে– আজ রাতে এখানে… ঠিক?

পাঁচটায় বেড টি দিয়েছে। হুডখোলা গাড়িতে ছটা নাগাদ বেরিয়ে পড়ল ওরা। সঙ্গে ড্রাইভার ও একজন গাইড। চারপাশে জঙ্গল। জঙ্গলের রং শুকনো শুকনো। কিছুটা যাওয়ার পর বাঘের মল দেখা গেল। গাইড বলল কাছাকাছি বাঘ আছে। একটু পরেই পাগ মার্ক দেখা গেল। মঞ্জিরা চাপা গলায় বলল এবারে ফেরা যাক। লাঞ্চ সেরে ফের আসা যাবে। অয়ন হাসল– তুমি বাঘের অস্তিত্ব টের পেয়ে ভয় পেয়েছ। তোমাকে শেয়াল দেখাব। যশ কোনও কথা না বলে মন দিয়ে দেখে যাচ্ছে। কলি উশখুশ করে– মঞ্জিরা ঠিকই বলেছে। বুবলি ঘুমিয়ে পড়েছে। পরে আসা যাবে অয়নদা।

লাঞ্চ সেরে ব্যালকনি থেকে ক্যামেরা বের করে দাঁড়িয়েছে অয়ন। ভিউফাইন্ডারে চোখ রেখে কী তাক করছে কে জানে। যশকে দেখেছে কলি পেছন ব্যালকনি থেকে আসতে। ও ডাকল– রেডি? যশ আড়মোড়া ভাঙল– এত খেয়েছি। ঘুম পাচ্ছে। অয়ন ঘাড় ঘুরিয়ে যশের চোখে লেন্স তাক করল। চারদিকে পাখিদের কিচিরমিচিরের মধ্যে শাটারের শব্দ হল। অয়ন বলল– যশের চোখ দুটো শ্বাপদের মতো। পেছনের ব্যালকনি থেকে নিজেকে গুছিয়ে নিতে নিতে মঞ্জিরা অয়নের কথা শুনেছে। অলস গলায় ও বলল– কে গো? বাঘের মতো কে? কলি হেসে উঠেছে– শ্বাপদের মতো। মঞ্জিরা আরাম করে বসেছে– আমি একটু ঘুমোব। কোন ভোরে উঠেছি! তোমরা যাও। আমি কাল যাব, সিওর।

শেষে যশ আর মঞ্জিরা রয়ে গেল। কলি অয়নের সঙ্গে বেরিয়ে পড়ল। বুবলি ঘুমিয়েছে। যশের পাশে আছে ও।

– আজ সূর্যাস্ত পর্যন্ত জঙ্গলে ঘুরে বেড়াব। আপত্তি? অয়ন কলির হাতে অল্প চাপ দেয়। কলি গহিন চোখে তাকাল– ফিরতেই হবে?

সাদা বোগেনভিলিয়ার পাশ কাটিয়ে গাড়িতে উঠতে উঠতে অয়ন একটু দাঁড়াতে বলে কলির পরপর কয়েকটা স্ন্যাপ নিল। জিন্সের উপর ফেব্রিকের কাজ করা টপ। খোলা চুলে, ম্যাট টেক্সচারে ব্রাইট শেডের ঠোঁটে সিমপ্লি গ্ল্যামারাস হয়ে উঠেছে কলি। গাড়িতে উঠে বসেও ক্যামেরা কলির দিকে তাক করে রেখেছে অয়ন– এখন ড্রাইভার আর গাইড ছাড়া কেউ নেই। প্লিজ, টপের বোতাম খুলে দাও। নর্মাল থাকো…।

– স্যার, দেখুন, গাইড আঙুল তুলে দেখাচ্ছে। একপাল হরিণ ছুটে পালাচ্ছে। অয়ন লেন্সে চোখ রেখে উঠে দাঁড়াল। কিছু দূরে কয়েকটা ওয়াইল্ড ডগ চুপ করে দাঁড়িয়ে। ওদের দেখে দৌড় লাগাল। একটা ধবধবে সাদা গাছ দেখিয়ে গাইড জানাল এর নাম ঘোস্ট ট্রি। তাড়াতাড়ি করে বোতাম আটকে নিচ্ছিল কলি। লোকগুলো আবার পেছনে না তাকায়। কি ঝামেলা রে বাবা। গাড়ি চলতে চলতে একটা বাঁক নিতেই মুখোমুখি হয়ে গেল ওরা বাঘের। কি বিশাল চেহারা। মাত্র বিশ ফুট মতো তফাতে দাঁড়িয়ে তিনি। সোজা গাড়ির দিকে এগিয়ে আসছেন। ড্রাইভার ব্যাক গিয়ার দিয়ে পিছোতে শুরু করেছে। বাঘ এগিয়ে আসতে আসতে এখন প্রায় দশ ফিটের মধ্যে বনেটের সামনে। কলি শ্বাস বন্ধ করে গোঙাতে শুরু করেছে– তুমি আমাকে মেরে ফেললে অয়ন। আমি ফিরে যাব। আমাকে ফিরিয়ে নিয়ে চলো। তোমার জন্য হল এসব। এখানে আমরা আসতে চাইনি। তুমি! তুমি দায়ী।

বাঘটা হুংকার দিল। অয়নের চোখ ফিউফাইন্ডারে। শাটারে আঙুল রেখে অপেক্ষা করছে ও। কলি চেঁচিয়ে উঠল– আমি বাঁচতে চাই… বাঁচাও…। আর তখনই শাটার পড়ল। চমকে গেল ফ্ল্যাশ। বাঘ থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। শরীরটা গুটিয়ে নিল। ধীরে এগোতে লাগল একটা হরিণের দিকে। হরিণ সম্মোহিত হয়ে গেছে। গাইড বলল– আজ কিলিং ডে। কিছু মারবেই আজ।

গাড়ি ফিরিয়ে নিতে বলেছে অয়ন। ওদের দেখে মঞ্জিরা ব্যালকনি থেকে চেঁচাল– কি? কিছু দেখতে পেলে? অয়ন হেসে জলের বোতল বের করে অনেকটা জল খেল। কলির দিকে এগিয়ে দিল বোতল– জল খাও। কলি মুখ চুন করে দাঁড়িয়ে। হাত বাড়িয়ে বোতল নিল– সরি।

ওদের আওয়াজ পেয়ে যশ দ্রুত মঞ্জিরার ঘর থেকে ওর ঘড়িটা নিয়ে এল। এত তাড়াতাড়ি ফিরে এল ওরা! মঞ্জিরা ইচ্ছে করে জোরে কথা বলছে, যাতে যশ সামলে নিতে পারে। বুঝে মনে মনে হাসে যশ। একটু সুখ চুরি করাকে কি ক্লেপ্টোম্যানিয়া বলা যায়? অয়ন কি কলিকে সঙ্গী করে কীর্তন গেয়ে এল?

গুছিয়ে বসে বাঘ দেখার গল্প করছিল অয়ন। কলির ভয়ে কেঁদে ফেলাটাও বাদ দেয়নি। সব ফের স্বাভাবিক।

ডিনার সেরে ব্যালকনিতে বসেছে সবাই। কলির আসতে দেরি দেখে যশ উঠে গেল। নিশ্চয়ই সাজুগুজু করছে কলি। সবসময়ে মঞ্জিরার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলার অভ্যাসটা যে কবে ত্যাগ করবে ও! ঘরে ঢুকে অবশ্য থ হয়ে গেল। কলি শুয়ে আছে ঘুমন্ত বুবলির পাশে। সারাদিন ধকল গেছে। ঘুমুচ্ছে। যশ শব্দ না করে ফিরে গেল। তখন অয়নের কাছ ঘেঁষে বাঘের গল্প শুনছে মঞ্জিরা।

– আমাকে বাদ দিয়ে সব বলা হয়ে গেল নাকি? যশ হাসতে হাসতে বসে পড়ে– বাঘ কমে যাচ্ছে? সত্যি?

অয়ন ঘাড় নাড়ে– ঠিক। কাস্পিয়ান বাঘ, বালি বাঘ, জাভান বাঘ লুপ্ত। এখন যা আছে, সবই লুপ্তের দিকে। সাড়ে চারশো গ্রাম বাঘের হাড় পাঁচশো ডলারে পাওয়া যায় ভিয়েতনামে। বাঘের হাড়, মাংস দিয়ে বানানো মদের খুব চাহিদা। শুনেছি এক বাটি ব্যাঘ্র লিঙ্গের সুপ তাইওয়ানের কোনও এক রেস্তোরাঁয় মেলে। প্রচুর দাম। তাহলে বাঘ থাকবে কী করে?

মঞ্জিরা সুন্দর মুখটা তুলে বলে– বাঘ বাঁচাও প্রকল্প হচ্ছে শুনেছি!

– হচ্ছে। হাই তোলে অয়ন– কলি আজ ভয় কাকে বলে বুঝেছে। আর কখনও বাঘবনে আসবে বলে মনে হয় না। বাঘের ছবি না তুলে কলির ছবি তোলা উচিত ছিল। তাহলে বুঝতে তোমরা ঘোঘরা আসলে ছুঁচো। হেসে ওঠে অয়ন– বাঘ বাঁচাও প্রকল্প! আগে মানুষ বাঁচাও প্রকল্প হোক।

যশ অবাক প্রায়– মানে, মানুষের গড় আয়ু বেড়ে গেছে জানিস?

অয়ন অদ্ভুত ভাবে তাকায়– তাই? মানুষ আছে বলছিস? ও-ও তো লুপ্তের পথে! দিন এলে মানুষ বনে বেড়াতে যাব।

মঞ্জিরা জোরে হেসে ওঠে– এইরে, তুমি আজ বাঘ দেখে নিজেকেই বাঘ ভাবতে শুরু করেছ নাকি? জবাব না দিয়ে চলে গেল অয়ন। যশকে ইশারা করে মঞ্জিরাও চলে গেল। সবাই টায়ার্ড। কেউ বাঘ দেখে, কেউ না দেখে, কেউ বাঘ হয়ে, কেউ বাঘ হতে না পেরে। পেছনের ব্যালকনিতে অয়নকে জড়িয়ে গুটিসুটি কলি। বন ছমছম করছে। জঙ্গল, জীবজন্তুর মধ্যে থেকে রাতটাকে উপভোগ করছিল ওরা। অয়নের ভেতরে আজ বাঘ দেখে আপ্লুত কলি। নাক ভরে বাঘের গন্ধ নিতে নিতে কলি ভাবে, ডাক্তার বলেছে বুবলির ক্লেপ্টোম্যানিয়া আছে। পরের জিনিসের দিকে আকর্ষণ। তবে সেরে যাবে একটু যত্ন নিলে…। বুবলি সেরে যাবে। কিন্তু ক্লেপ্টোম্যানিয়া কি সবসময় সারে? সেরে যাওয়াটা কি সুখের হয়?

প্রায়শ্চিত্ত

ক্রিং ক্রিং…। ফোনটা অনবরত বেজে চলেছে। ঘড়িটার দিকে তাকালাম। বিরক্তি চেপে রেখে ফোনটা তুললাম। ওপাশ থেকে গলা ভেসে এল। প্রথমটা বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। অজয়ের গলা। এক যুগ কেটে গেছে। কবে শেষবারের মতো ওর সঙ্গে কথা হয়েছিল মনে পড়ল না। সেই কবেই ওর সঙ্গে সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে গেছে আর তার প্রধান কারণ ছিল ওর অহংকার। অহংকারে এতটাই ও অন্ধ হয়ে গিয়েছিল যে বিবেক বলে ওর আর কিছুই ছিল না। ওর ব্যবহারে আমি এতটাই ব্যথা পেয়েছিলাম, যে ওর সঙ্গে সমস্ত সম্পর্ক ত্যাগ করে দিয়েছিলাম। ও-ও যোগাযোগ রাখার কোনও চেষ্টা করেনি। বন্ধুত্ব আছে বলেই যে ওর হ্যাঁ তে হ্যাঁ মেলাব এমন কোনও মানে নেই। যেটা অন্যায় সেটা স্পষ্ট করে বলে দেওয়াটাই আমার অভ্যাস। অজয়েরও সেটা খারাপ লাগতেই পারে তাই বলে এতটাও নয় যে ও খুব খারাপ ভাষায় আমাকে ওর বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতে বলবে। এত বছরের বন্ধুত্ব, একজন মহিলার জন্যে এভাবে যে ওর কাছে মূল্যহীন হয়ে যেতে পারে, সেটা দেখে আমি প্রচন্ড ব্যথা পেয়েছিলাম। সেদিনই ঠিক করে নিয়েছিলাম অজয়ের সঙ্গে কোনওরকম সম্পর্কই আর রাখব না।

আমি আর অজয় একই পাড়ায় থাকতাম। স্কুল, কলেজ সব একসঙ্গে। তারপর আলাদা চাকরির জগৎ। সুখ-দুঃখ আমরা সবসময় একসঙ্গে ভাগ করে নিয়েছি। অজয় প্রথম বিয়ে করে নিজে দেখে। স্বাতিকে। স্বাতি যথেষ্ট সুন্দরী, বুদ্ধিমতী এবং ধনী পরিবারের মেয়ে। মা-বাবার একমাত্র সন্তান ও সম্পত্তির একমাত্র উত্তরাধিকারী। অজয়ের মা-বাবাও স্বাতিকে খুবই ভালোবাসতেন। ওর স্বভাবটাই এতটা মিষ্টি ছিল যে সকলেই ওকে পছন্দ করত। ওর সঙ্গে দাদা-বোনের সম্পর্ক পাতিয়েছিলাম। আমি ওর বাড়িতে গেলেই খাতিরদারীর কোনও সুযোগ ও হাতছাড়া করত না। আমিও ওকে নিজের বোন ছাড়া বন্ধুর স্ত্রী হিসেবে কোনওদিন ভাবতে পারিনি।

এরই মধ্যে স্বাতি দুই সন্তানের মা হল। অজয় সরকারি চাকরি করত। প্রোমোশন পেয়ে পেয়ে এমন জায়গায় পেৌঁছে গিয়েছিল যেখানে উপরি-কামাইয়ের কোনও অন্ত ছিল না। মধ্যবিত্ত একটা পরিবারকে কালো টাকার আবর্তে ধীরে ধীরে ঠেলে দিচ্ছিল। কিন্তু ভগবান বাধ সাধলেন। অজয়ের কপালে সুখ সহ্য হল না। স্বাতি আক্রান্ত হল ক্যানসারে। তিন বছর ধরে জলের মতো টাকা খরচ করেও স্বাতিকে বাঁচানো গেল না। স্বাতির মৃত্যুতে অজয় প্রচন্ড ভাবে ভেঙে পড়ল। বাচ্চা দুটো অসময়ে তাদের মা-কে হারাল।

কথায় আছে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সব আঘাতের চিহ্নই ধীরে ধীরে মুছে যায় তা সে যত বড়ো আঘাতই হোক না কেন। কয়েকমাস পার হয়ে যাওয়ার পর অজয়ের ডিভোর্সি ছোটো বোন কানপুর থেকে চাকরি নিয়ে কলকাতায় দাদার কাছে এসে উঠল। পৈতৃক বাড়ি, আজয়ও বোনকে মানা করল না। অন্বেষার নিজের কোনও সন্তান না থাকায় দাদার বাচ্চাদের দেখাশোনা করার দায়িত্ব নিজের কাঁধে নিয়ে নিল। অজয়ও স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বাঁচল।

স্বাতির মৃত্যুর দুই বছর তখনও হয়নি। অন্বেষা এবং অন্যান্য আত্মীয়স্বজনেরা অজয়কে দ্বিতীয়বার বিয়ে করার জন্যে চাপ দিতে আরম্ভ করল। অজয়ের বয়স তখন বিয়াল্লিশ ছুঁই ছুঁই। বাচ্চারা মায়ের আদর ফিরে পাবে এই ভেবে আমিও অজয়কে বিয়ে করার পরামর্শ দিই। অজয়ের মনে সংশয় ছিল যে সৎমা আসলে বাচ্চাদের সঙ্গে কীরকম ব্যবহার করবে? অনেক বোঝাবার পরে অজয় রাজি হল কিন্তু চোখের জল ধরে রাখতে পারল না। লুকোবার চেষ্টা করলেও আমার কাছে ধরা পড়ে গেল। আমার কাঁধে হাত রেখে বলে, ‘কী দোষে বল তো আমাকে মাঝ সমুদ্রে ফেলে রেখে দিয়ে স্বাতি আমাদের সকলকে ছেড়ে চলে গেল? আমি কি কখনও বাচ্চাদের মায়ের জায়গা নিতে পারি? রাত্তিরে আমি ওদের নিয়ে শুই। মাঝরাতে মায়ের জন্যে কেঁদে উঠলে আমি ওদের চুপ করাতে পারি না। অফিসে গেলে বাড়ি ফেরার জন্যে উতলা হয়ে উঠি, কত বেশি বাচ্চাদের সঙ্গে থাকতে পারব এই ভেবে। আমি সবসময় চাই যাতে ওরা মায়ের অভাব বুঝতে না পারে।’

অজয়ের কথায় আমিও ভাষা হারিয়ে ফেলি। মুহূর্তের মধ্যে নিজেকে সংযত করে বেশ জোরের সঙ্গে বলি, ‘যা হবার ছিল হয়েছে। অতীতে পড়ে না থেকে বর্তমান ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাব।’

‘কী ভাবব? বাচ্চারা বড়ো হচ্ছে কিন্তু মায়ের স্মৃতি আজও ওরা অাঁকড়ে ধরে রেখেছে। আজও চোখে ওদের জল আসে মায়ের কথা উঠলেই। ওদের জন্যেই আমার বেশি চিন্তা হয়।’

‘দ্যাখ, স্বাতির অভাব আমরা সকলেই ফিল করি আর বাচ্চারা তো করবেই। তুই দ্বিতীয় বিয়ে করলে হয়তো মায়ের এই অভাব কিছুটা হলেও দূর হবে।’

‘হতে পারে কিন্তু এর গ্যারান্টি কোথায়? যদি আমার বিয়ে করার বিচার ভুল প্রতিপন্ন হয়, তাহলে আমি নিজেকে কোনওদিন ক্ষমা করতে পারব না। বাচ্চাদের চোখেও আমি সারা জীবনের মতো অপরাধী হয়ে থাকব।’

অজয়ের ভয় অমূলক নয় জানি কিন্তু আশঙ্কার উপর নির্ভর করে পথচলা তো আর বন্ধ করা যায় না। ভবিষ্যতে কী হবে আর কী হবে না, সেটা কে জানে? এমনও তো হতে পারে অজয়-ই পুরোপুরি বদলে গেল?

অজয়ের জন্যে বহু পাত্রীর সম্বন্ধ এল। অন্বেষা অনেক সম্বন্ধ প্রথমেই নাকচ করে দিল সুন্দরী মেয়ে চাই বলে। নিন্দুকেরা এই নিয়ে মশকরা করতে ছাড়ল না যে এই বয়সেও সুন্দরী ভার্যার প্রয়োজন পড়ল। শেষে একটা সম্বন্ধ অজয়ের মনে ধরল। ফরসা, সুন্দরী, ডিভোর্সি, এক সন্তানের মা। নাম সুনন্দা। কানে এসেছিল মহিলার স্বামী কোনও কোম্পানিতে মার্কেটিং বিভাগে কাজ করতেন এবং পথ দুর্ঘটনায় তার একটা পা চলে যায়।

অজয় আর অন্বেষা দুজনেই যে সুনন্দাকে পছন্দ করেছিল তার প্রধান কারণ ছিল সুনন্দা সুন্দরী। ওর একটি মেয়ে, বয়স আট বছর। কেন জানি না সুনন্দার সঙ্গে অজয়ের বিয়েটা আমি মন থেকে মেনে নিতে পারিনি।

আমার সুনন্দাকে দেখে মনে হয়েছিল, অজয়ের জন্যে সুনন্দা উপযুক্ত নয়। অজয়ের দরকার ছিল ঘরোয়া একজন সাধারণ মেয়ের। কিন্তু সুনন্দা খুবই ব্যক্তিত্বময়ী এবং অজয়ের সঙ্গে ওর ব্যক্তিত্বের জমিন-আসমান ফারাক।

অজয় আমার বন্ধু ঠিকই কিন্তু মানবিকতার দৃষ্টি দিয়ে দেখলে মনে হয় ভগবান বোধহয় অন্যায়ই করেছেন সুনন্দার সঙ্গে। সুনন্দার মেয়ে শ্রেয়াও যথেষ্ট স্মার্ট এবং সুন্দরী সেই তুলনায় অজয়ের ছেলেমেয়ে অতটা অসাধারণ নয়। একলা কোনও নারীর পক্ষে একাকী সারাজীবন কাটানো সহজ নয় এবং সেই কারণেই হয়তো সুনন্দার মা-বাবা সামাজিক সুরক্ষার কথা মাথায় রেখে অজয়ের সঙ্গে বিয়ে দিয়ে দেওয়াই উচিত মনে করেছেন।

সুনন্দার সঙ্গে বিয়ের পর থেকেই অজয় প্রচণ্ড বদলে যেতে থাকে। স্ত্রীয়ের সৌন্দর্য ওকে কীরকম যেন একটা পাগল করে তুলতে থাকে। আত্মীয়স্বজন, বন্ধু এমনকী বাচ্চারাও ওর কাছে গুরুত্ব হারিয়ে ফেলতে শুরু করে। চোখের সামনে থেকে সরে গেলেই সুনন্দা অপর কারও হয়ে যেতে পারে এই ভয় অজয়কে কুরে কুরে খেতে আরম্ভ করে ফলে অফিস না যাওয়ারও নানা বাহানা ধীরে ধীরে অজয় তৈরি করা আরম্ভ করে।

আমার আসা-যাওয়াও অজয়ের বাড়িতে অনেক কমে গেল। অজয় আমাকেও সুনন্দার সঙ্গে সময় কাটাতে দিতে পছন্দ করত না। সর্বক্ষণ সুনন্দার সঙ্গে ছায়ার মতো লেগে থাকত। সুনন্দাও স্বামীর দুর্বলতা বুঝতে পেরে নিজের মতো অজয়কে চালাবার চেষ্টা করতে লাগল। নিজে যেটা ভালো বুঝত, অজয়কে দিয়ে সেটাই করাত। অজয়ের চারিত্রিক পরিবর্তন ওর দুই সন্তানকে ভীষণ ভাবে প্রভাবিত করল। ওরা বাবার থেকে ক্রমশ দূরে সরে যেতে থাকল। অফিস থেকে ফিরে বাচ্চাদের ঘরে না ঢুকে অজয় সোজা সুনন্দার ঘরে চলে যেত।

সেদিন সুনন্দার কোনও আত্মীয়ের বিয়ে ছিল। অজয়, সুনন্দা মেয়েকে নিয়ে বিয়েতে যাবার জন্যে তৈরি হচ্ছিল। অজয়ের ছেলে অয়নও যাওয়ার জন্যে বাবার কাছে আগ্রহ প্রকাশ করে। কিন্তু অজয় ওকে বকা দিয়ে চুপ করিয়ে দেয়, ‘গিয়ে পড়াশোনা করো, কোথাও যাওয়ার দরকার নেই।’

বাবার কথা শুনে ছেলে ঘরে এসে মায়ের ছবির সামনে দাঁড়ায়, চোখে জল ভর্তি। অন্বেষা ভাইপোর মনের অবস্থা বুঝতে পেরে ঘরে এসে ঢোকে। অয়নকে ছোট্ট থেকে দেখছে অন্বেষা, খুবই মুখচোরা ছেলে। বাপের মুখের উপর কথা বলবে এমন অভ্যাস ওদের দুই ভাই-বোনের কারওরই নেই। অজয় আজকাল সুনন্দার কথায় ওঠে বসে। সুনন্দার মেয়ের খেয়াল রাখাটা অজয়ের কাছে বেশি জরুরি। অন্বেষা প্রতিবাদ করাতে অজয় জানিয়েছিল, পিতৃহীন মেয়েকে সময় দেওয়াটা অনেক বেশি দরকার। অথচ অজয়ের একবারও মনে হয়নি মা-মরা তার নিজের দুটি সন্তানের কষ্ট। বাচ্চাদের স্কুলের মাইনে, জরুরি কিছু জিনিসপত্র কিনে দেওয়াকেই অজয় ভেবে নিত বাচ্চাদের প্রতি তার কর্তব্য শেষ। অয়ন আর রিয়া বুঝে গিয়েছিল তারা বাবার স্নেহ থেকে বঞ্চিত হতে চলেছে। বাড়িতে যেটুকু ভালোবাসা পাচ্ছে সেটা পিসির কাছ থেকেই। বাড়ির পরিবেশে নিজেদের মানিয়ে নিতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল দুই ভাই-বোন।

হঠাৎই অজয় একদিন নিজের বাড়ি ছেড়ে সুনন্দা আর তিন ছেলেমেয়েকে নিয়ে স্বাতির পৈতৃক বাড়িতে এসে ওঠে। স্বাতির মা মৃত্যুর আগে নাতির নামে বাড়িটা লিখে দিয়ে গিয়েছিলেন। অজয়ের নিজের বাস্তুভিটে ত্যাগ করার প্রধান কারণ ছিল ওখানে বাড়ির অন্যান্যদের মধ্যে ওর স্বাধীনতা খর্ব হচ্ছিল। অন্বেষাই একমাত্র মাঝেমধ্যে বাচ্চাদের দেখতে অজয়ের নতুন আস্তানায় যেত।

আমি অয়নের থেকেই অজয়ের খবরাখবর পেতাম। অজয়ের ব্যবহারে আমিও খুশি ছিলাম না। অনেকবার মনে হয়েছে ওকে বোঝাই কিন্তু অপমানিত হওয়ার ভয়ে সবসময় পিছিয়ে এসেছি। এরই মধ্যে অয়নের কাছ থেকে জানতে পারলাম সুনন্দা মা হতে চলেছে। অজয়ের যা বয়স সেটা ভেবে অবাক হলাম। পঁয়তাল্লিশ ছুঁই ছুঁই, নিজের দুটি সন্তান প্রথম স্ত্রী থেকে। তাছাড়াও সুনন্দারও মেয়ে তখন এগারোয় পড়বে। সন্তানের সত্যিই কি কোনও দরকার ছিল ওদের জীবনে? হঠাৎই অজয় আর সুনন্দাকে প্রচন্ড স্বার্থপর বলে মনে হল আমার।

দ্বিতীয়বার অজয় যখন বিয়ে করতে সম্মতি দিয়েছিল তখনই ওর সঙ্গে কথা হয়েছিল। ও বলেছিল একে অপরের সঙ্গী হতে পারবে বলেই এই বিয়ে করা। আর সন্তানরাও নতুন করে মা-বাবার স্নেহ ভালোবাসা পাবে। তাহলে হঠাৎ কী ভেবে সুনন্দা মা হবার জন্যে রাজি হয়ে গেল?

অজয়, সুনন্দার ছেলে হল। শহরের বড়ো হোটেলে পার্টিও দিল ওরা। আমন্ত্রিতদের লিস্টে আমারও নাম ছিল। অতিথিরা প্রায় সকলেই উপস্থিত ছিলেন ঠিকই কিন্তু আড়ালে আবডালে তাদের মুখে অজয়দের সম্পর্কে খারাপ মন্তব্য ছাড়া কিছু শুনলাম না। অবশ্য অজয়কে দেখলাম এব্যাপারে বেশ নির্লিপ্ত। ওর জগতে সুনন্দা এবং ওদের ছোট্ট শিশুসন্তান ছাড়া আর কেউই নজরে পড়ল না।

পার্টিতেই দেখা হয়ে গেল অয়ন আর রিয়ার সঙ্গে। এতটা উদাস ওদের আগে কখনও দেখিনি। জানি কারণটা অজয়। ওদের প্রতি অজয়ের উদাসীনতাই এর জন্যে দায়ী। টাকা-পয়সা দিয়ে বাচ্চাদের মন হয়তো ভোলানো যায় কিন্তু মন জয় করা সম্ভব নয়। অয়ন আর রিয়ার দরকার ছিল মায়ের স্নেহ মমতার কিন্তু মা না থাকায় কর্তব্যটা বর্তায় বাবার উপর। অথচ দ্বিতীয়বার বিয়ে করবার সময় বাচ্চারাই বাবাকে সবথেকে বেশি জোর দিয়েছিল নিজের জীবনসঙ্গিনী খুঁজে নেওয়ার জন্যে। সেই বাবাই যদি সন্তানদেরথেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় তাহলে সন্তানদের মনের অবস্থা কী হতে পারে এটা কারওরই অজানা নয়।

একটা ব্যাপার আমাকে কুরে কুরে খাচ্ছিল যে এই বয়সে অজয়ের কী দরকার ছিল তৃতীয় সন্তানের। তৃতীয় বলাও ভুল কারণ সুনন্দার মেয়েকে ধরলে অজয়ের মোট চারটি সন্তান। অয়নের সঙ্গে রাস্তায় একদিন দেখা হয়ে গেল। জোর করে বাড়িতে ধরে নিয়ে এলাম। স্বাভাবিক ভাবেই অজয়ের কথা উঠে এল। ‘আচ্ছা কাকু বলোতো, এই বয়সে বাবার আবার কেন ‘বাবা’ হওয়ার সাধ জাগল? বাড়ির বাইরে গেলেই বন্ধুরা, আত্মীয়স্বজনেরা এই নিয়ে হাসি তামাশা করতে ছাড়ে না। কোথাও মুখ দেখাতে পারি না। মনে হয় চুরির দায়ে আমিই চোর সাব্যস্ত হয়েছি। এইসব কারও ভালো লাগে বলো?’ অয়নের কথাগুলো এসে বুকে বিঁধল। কী উত্তর দেব বুঝে পেলাম না। অজয়কে নিয়ে আলোচনা করতে ইচ্ছে হল না। স্বাতির মুখটা মনে পড়ল। ও থাকলে কি অজয় পারত সন্তানদের এভাবে অবহেলা করতে, নিজের স্নেহ থেকে ওদের দূরে রাখতে? স্বাতিকে তো অজয় ভালোবেসে বিয়ে করেছিল। তাহলে তার আমানতকে কী করে অজয় দূরে সরিয়ে রাখতে পারল শুধুমাত্র সুনন্দার জন্যে? অয়নের মুখেই শুনলাম সুনন্দার মা-বাবা ওদের বাড়িতে এসেছিল। ও সুনন্দার মা-কে, অজয়ের কাছে বলতে শুনেছে, ‘যাক বাবা এখন তোমার আর সুনন্দার পরিবার সম্পূর্ণ হল। এক ছেলে এক মেয়ের বাবা-মা তোমরা।’

আশ্চর্য হয়ে গেলাম, রাগও হল। তার মানে অয়ন আর রিয়া অজয়ের পরিবারের সদস্যদের মধ্যে আর পড়ে না? সুনন্দাই তাহলে চতুর্থ সন্তানের জন্যে অজয়ের ব্রেন ওয়াশ করেছিল! হয়তো সুনন্দার মনে হয়েছিল অজয়ের সন্তান যদি সুনন্দা ধারণ না করে তাহলে সম্পত্তির পুরো অধিকার চলে যাবে অয়ন আর রিয়ার হাতে। মনে মনে সুনন্দাকেই দোষী ঠিক করে নিলাম।

কথা বলার জন্যে একদিন অজয়কে ফোন করে ওর বাড়ি গেলাম। অয়ন আর রিয়ার পক্ষ টেনে অজয়কে বোঝাবারও চেষ্টা করলাম, ‘দ্যাখ অজয় তুই অয়ন এবং রিয়ার সঙ্গে অন্যায় করছিস। ওদের মা মারা যাওয়ার পর তোর উপরেই ওদের ভরসা ছিল। কিন্তু সুনন্দাকে বিয়ে করার পর ওদের উপর থেকে স্নেহের হাতটা কেন তুলে নিলি তুই?’

‘কে বলেছে? জানিস অয়নের ইঞ্জিনিয়ারিং কোর্সের জন্য দশ লাখ টাকা খরচ করেছি। রিয়াকে প্রচুর টাকা দিয়ে এমবিএ কোর্সে ভর্তি করিয়েছি। আর তুই বলছিস আমি ওদের জন্য কিচ্ছু করিনি।’

‘টাকা দিয়ে স্নেহের অভাব পূরণ করা যায় না। তুই শুধু বাবার কর্তব্যটুকুই করেছিস।’

‘তোকে কি অয়ন আর রিয়া আমার কাছে পাঠিয়েছে? ওদের বলে দিস আমার পক্ষে যেটুকু করা সম্ভব ছিল আমি করেছি। এর বেশি কিছু আমার পক্ষে করা সম্ভব নয়। আর তুই-ও আসতে পারিস এবার কারণ আমি চাই না এধরনের কথাবার্তা সুনন্দার কানে পৌঁছোক।’

এখানেই আমার আর অজয়ের সম্পর্কের ইতি। অপমানিত হয়ে বাড়ি ফিরে এসেছিলাম সেদিন। অয়ন বিটেক পাশ করে চাকরি নিয়েছে খবর পেয়েছি। একদিন এল আমার কাছে বিয়ে করছে জানাতে।

‘বাবাকে জানিয়েছিস?’

‘না। আমাদের নিয়ে বাবা যখন কিছু ভাবে না তখন আমরা কী করছি না করছি জানাতে যাব কেন? কোনওদিন ভালোবেসে আমাদের সঙ্গে দুটো কথা বলে?’

‘তোদের পড়াশোনা তো করিয়েছে?’

‘পড়িয়েছে ঠিকই, কিন্তু সেটা শুধুই দায়িত্ব মনে করে। আমাদের সঙ্গে বাবার মনের সংযোগ সেই কবেই কেটে গেছে। টাকাপয়সা নিয়ে আমার বা বোনের কোনও চিন্তা নেই কারণ দিদা, মায়ের নামে যা টাকা রেখে গিয়েছিলেন তা এখন আমাদের দুই ভাইবোনের নামেই। তাছাড়া বাবারা এখন যে বাড়িতে রয়েছে সেটাও আমার নামেই।’

‘তোরা আজকালকার ছেলে, যা ভালো বুঝিস।’

অয়নের বিয়েতে আমি গিয়ে দাঁড়িয়েছিলাম। শুনেছি অজয় রিয়ার বিয়ে দিয়ে দিয়েছে কিন্তু আমাকে জানায়নি। তবে এটুকু জানতাম অয়নের সঙ্গে অজয় কোনওরকম সম্পর্ক রাখেনি।

সময় কারও জন্যে থেমে থাকে না। সম্পর্ক না থাকলেও অজয়ের সব খরবই আমার কানে আসত। সুনন্দার নামে একটা ফ্ল্যাট কিনে অজয়রা সেখানেই উঠে গিয়েছিল। অয়নও এসে বাবার হাত থেকে দিদার ফ্ল্যাটের চাবি হস্তগত করে। চাবি দেওয়ার সময় অজয়ও অয়নকে জানিয়ে দেয় পৈতৃক সম্পত্তি থেকে কানাকড়িও অয়ন পাবে না।

সুনন্দার মেয়েও ধীরে ধীরে বিবাহযোগ্য বয়সে এসে পৌঁছোয়। সুনন্দা পাত্রও পছন্দ করে কিন্তু পণের বড়োসড়ো টাকার অঙ্ক দিতে অজয় অস্বীকার করে। সুনন্দা আর অজয়ের মধ্যে সেই প্রথম ঝগড়ার সূত্রপাত। সুনন্দাই প্রথম অশান্তি শুরু করে অজয় পণের টাকা দিতে না চাইলে।

‘অয়নকে দশ লাখ টাকা খরচ করে পড়াতে পারো আর আমার মেয়ের বিয়ের জন্যে তোমার কাছে টাকা নেই?’

‘এভাবে কেন ভাবছ? ফ্ল্যাট কেনার পর আমার হাতে আর বেশি টাকা নেই। আর পণ দিয়ে মেয়ের বিয়ে দেওয়াটা কি একান্ত দরকার? আর একটু দ্যাখো, ভালো ছেলে নিশ্চই পাবে যারা কিনা পণ চাইবে না।’

‘অয়নের থেকে কিছু টাকা চাও না। ওর তো উচিত বাবাকে কিছু টাকা দেওয়া।’

‘তোমার জন্যে ওর সঙ্গে কোনও সম্পর্ক রাখিনি। আজ কোন মুখে ওর কাছে টাকা চাইব?’

‘আমার জন্যে? বরং বলো ইঞ্জিনিয়ার হয়ে দুটো পয়সা কামাচ্ছে বলে ও চালবাজ হয়ে গেছে।’

‘যাই বলো আমি ওর কাছে টাকা চাইতে পারব না।’

‘তাহলে এক কাজ করো। পৈতৃক বাড়িটা বিক্রি করে দাও।’ সুনন্দার এই প্রস্তাবটা অজয়ের খারাপ লাগল না কারণ ওই বাড়িতে শুধু অন্বেষাই থাকত। সেও প্রায় তিন বছর আগে নিজে ফ্ল্যাট কিনে চলে গেছে। বাড়ি বিক্রির খবরটা চারিদিকে চাউর হয়ে গেল। অয়নের কানেও খবরটা পৌঁছোল। সঙ্গে সঙ্গে সে অজয়ের কাছে গেল।

‘বাড়ি বিক্রি করলে সকলকে সমান ভাগ দিতে হবে,’ অয়ন বলল আজয়কে।

‘সকলকে মানে?’

‘রিয়াকেও ভাগ দিতে হবে।’

‘রিয়ার বিয়েতে আমি যা খরচ করেছি, তাতেই সব বরাবর হয়ে গেছে।’

‘তোমার লজ্জা করে না বাবা? বোনের বিয়ের হিসেব করছ?’

‘তোমাদের কাছে ফ্ল্যাট রয়েছে।’

‘সেটা দিদার ফ্ল্যাট। এটা আমার ঠাকুরদার বাড়ি। আইনত এটার উপর আমাদেরও অধিকার রয়েছে। সুতরাং বিক্রির সময়ই হোক অথবা টাকা ভাগ করার সময়, আমি সামনে থাকব।’ অয়নের সামনে সুনন্দা মুখ না খুললেও পরে অজয়কে একলা পেয়ে সুনন্দা এক মুহূর্তও দেরি করে না নিজের রাগ প্রকাশ করতে।

‘খুব তো ছেলে ছেলে করতে, এখন কীরকম মুখে ঝামাটা ঘষল। আমার ছেলে-মেয়েকে বঞ্চিত করে ওকে কেউকেটা বানিয়েছ। আজ তার ভালো প্রতিদান পেলে।’

‘আমি কারও অধিকার ছিনিয়ে নিইনি। তাছাড়া অয়নও আমারই সন্তান।’

‘সেটাই তো বলতে চাইছি। ছেলে হয়ে তাই এরকম দায়িত্বের কাজ করেছে।’

‘শ্রেয়া তোমার মেয়ে, আমার মেয়ে নয়’, অজয়ের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গিয়েছিল।

অজয়ের কথায় সুনন্দাও আর রাগ সামলাতে পারে না, ‘তোমার মতো নির্লজ্জ আমি জীবনে দেখিনি। বিয়ের সময় তুমিই বলেছিলে আমার মেয়েকে বাবার পরিচয় দেবে। তোমার পরিচয়েই ও বড়ো হবে। এত সহজে আমি তোমাকে ছাড়ছি না।’

‘তোমারও আসল রূপ বেরিয়ে পড়েছে।’ ঘৃণা ঝরে পড়ে অজয়ের গলায়। ‘তোমার মেয়ের জন্যে আমার কাছে এক টাকাও নেই। ওকে ওর নিজের বাবার কাছে পাঠিয়ে দাও। আমি ওর বাবা নই।’

অজয়ের কথায় সুনন্দার আত্মসম্মানে আঘাত লাগে। চোখে জল এনে সুনন্দা বলে, ‘তাহলে এই ছেলেও তোমার নয়? একেও কি তুমি অস্বীকার করবে?’ ইশারাটা নিজের ছেলের দিকে।

ছেলেকে দেখে অজয় কিছুটা শান্ত হয়। সুনন্দারও ঠোঁটে ছুঁয়ে যায় আত্মতৃপ্তির তীর্যক হাসি।

শেষমেশ অয়নের শর্ত অনুযায়ীই অজয়ের পৈতৃক সম্পত্তির বিক্রি স্থির হল এবং বিক্রি করে যে টাকা পাওয়া গেল তা সমান ভাবে সকলের মধ্যে অজয়কে ভাগ করে দিতে হল। অবশ্য এই ঘটনার পর অজয় ছেলের মুখ না দেখার প্রতিজ্ঞা করল।

রিটায়ার করার পর অজয় ভীষণ একলা হয়ে গেল। অয়ন, রিয়ার সঙ্গে তো আগেই সম্পর্ক শেষ হয়ে গিয়েছিল। সুনন্দার মেয়ের বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর বাড়িতে সুনন্দা আর ছোটো ছেলে। সেও দেখতে দেখতে কৈশোরে পা দিয়েছে। বাবার থেকে মায়ের সঙ্গেই তার বেশি ওঠাবসা। নামেই শুধু বাবা হয়ে থেকে গেছে অজয়, সুনন্দার ছেলে মেয়ের কাছে। সেই শুরু অজয়ের আত্মদহনের। অয়ন, রিয়ার কাছে সে প্রতিজ্ঞা করেছিল, সেই বাবার দায়িত্বটাও সে পুরোপুরি পালন করতে পারেনি। মনে মনে নিজেকেই ঘৃণা করতে শুরু করে অজয়। মানসিক এই পরিস্থিতির মধ্যেই পুরোনো সম্পর্কগুলো ঝালিয়ে নিতেই অজয় আমাকে ফোন করে।

এত বছর পর ওর গলা শুনে সত্যিই আশ্চর্য হয়েছিলাম কিন্তু বন্ধুত্বের টানে না গিয়েও পারলাম না। দেখলাম অনেক বদলে গেছে অজয়। নিজের ভুল শোধরাতে চায়। অয়ন, রিয়ার সঙ্গে দেখা করতে চায় আমার সাহায্য নিয়ে। কথা দিতে পারলাম না শুধু আশ্বাস দিলাম যে চেষ্টা নিশ্চই করব। কয়েকদিন পরই সুনন্দা ফোন করে জানাল অজয় হাসপাতালে ভর্তি। দুদিন আগে রাতে শরীর খারাপ হওয়াতে পাড়ার সকলে মিলে ওকে হাসপাতালে ভর্তি করেছে। সমস্যা হার্ট স্ট্রোক।

দৌড়োলাম হাসপাতালে। আরও চব্বিশ ঘণ্টা না কাটলে নাকি ডাক্তাররা আশ্বাস দিতে পারছেন না। অয়ন, রিয়াকেও জানালাম। খবর পেয়েই পরের দিন রিয়া বাবাকে দেখতে এল। আশা করেছিলাম সঙ্গে অয়নও আসবে। ও এল না। অয়নের বাড়ি গেলাম। অজয়ের সঙ্গে আমার যা কথা হয়েছে সবই ওকে জানালাম। সব শুনে ও বলল, ‘কাকু, কোনও সন্তানই চায় না তার মায়ের জায়গা সৎমা নিক। কিন্তু বাবার মুখ চেয়ে বাবার বিয়েতে বাধা দিইনি। বাবাও কথা দিয়েছিলেন ভালোবাসার কোনও অভাব আমাদের হবে না। কিন্তু নতুন মা আসার পর থেকে বাড়ির পরিবেশটাই বদলে গেল। মাকে আমি দোষ দেব না। আমার অভিযোগ বাবার বিরুদ্ধে যিনি আমাদের নিজের স্নেহ থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছেন। বোনের বিয়ে বাবা যেমন তেমন করে সেরেছেন অথচ নতুন মায়ের মেয়ের জন্যে পৈতৃক বাড়ি পর্যন্ত বিক্রি করেছেন। আমার টাকার উপর কোনও মোহ নেই কিন্তু নতুন মা-কে বাবা ফ্ল্যাট কিনে দিয়েছেন, তাহলে আমরা পৈতৃক সম্পত্তির ভাগ কেন পাব না? বাবার পিএফ, বিমা, পেনশন সবকিছুর ওপর অধিকার রয়েছে নতুন মায়ের তাহলে আমরা আমাদের অধিকার ছাড়ব কেন?’

‘কিন্তু টাকার কি দরকার আছে তোর?’

‘আমাদের শুধু দরকার ছিল মা-বাবার ভালোবাসার যা ওঁরা আমাদের দেননি। মায়ের জায়গা হয়তো নেওয়া সম্ভব নয় কিন্তু রাত্রে ঘুমন্ত সন্তানের মাথায় হাত বুলিয়ে আদর তো করতে পারতেন।’

‘তোদের বাবা আজ অনুশোচনার আগুনে জ্বলছেন।’

‘অনুশোচনা তো করতেই হবে। নতুন মায়ের প্রতি মোহ, আকর্ষণ কমেছে বয়সের সঙ্গে তাই ছেলে মেয়ের কথা এখন মনে পড়েছে।’

‘তোদের বাবা যে ভুল করেছেন, তুইও কি একই ভুল করতে চাস? প্রতিশোধ নিতে চাস?’

‘আমি আর কী করব? যা অন্যায় করেছেন তার ফল আজ উনি ভোগ করছেন।’

‘তাও উনি তোর বাবা। উনি তোর কাছে কিছু চাইছেন না শুধু নিজের কৃতকর্মের জন্যে লজ্জিত। তার প্রায়শ্চিত্ত করতে চান। একবার ওনার কাছে যা। তোর কাছে ক্ষমা চাইতে পারলে ওনার মনের বোঝা খানিকটা হালকা হবে।’

অয়ন আমার কথা শুনল। পরের দিন আমার সঙ্গে হাসপাতালে বাবাকে দেখতে এল। ওকে দেখে অজয়ের চোখের জল বাঁধ মানল না। অয়নের হাত চেপে ধরে রাখল, মুখ থেকে একটা কথাও বেরোল না। সুনন্দাও স্বামীর স্বাস্থ্যের কথা ভেবে অভদ্রতা না করে অয়নের কুশল জিজ্ঞেস করে চুপ করে থাকল।

অজয় যতদিন হাসপাতালে থাকল অয়ন নিয়ম করে বাবাকে দেখে যেত। হাসপাতাল থেকে ছাড়ার দিন অয়ন এসে সব বিল মিটিয়ে বাবাকে বাড়ি পেৌঁছে দিল। অজয় ছাড়ল না অয়নকে, ‘তোদের কাছে আমি অপরাধী। নিজের প্রতিজ্ঞা আমি রাখতে পারিনি। এতটাই স্বার্থপর হয়ে উঠেছিলাম যে ভুল করেও ভুলটাকে স্বীকার করিনি। আমাকে ক্ষমা করিস।’

‘মানুষের এতটা স্বার্থপর হওয়া উচিত নয় বাবা।’ অয়ন উত্তর করলে সুনন্দা কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল। অজয় ওকে থামিয়ে দিল। আমিও পুরোনো রাগ পুষে রেখেছিলাম। উপযুক্ত সময় দেখে মুখ থেকে বেরিয়েই গেল, ‘বউদি, তোমাদের দুজনের উচিত ছিল সংসারটাকে ধরে রাখার। ছেলে মেয়েদের মধ্যে ভেদাভেদ করা কখনওই উচিত হয়নি। সৎ বোন, সৎ ভাই এই চিন্তাটাই বাচ্চাদের মনে কেন আসবে যদি মা-বাবা সঠিক শিক্ষায় বাচ্চাদের মানুষ করে? তুমি আসতেই কেন অজয়ের ছেলে মেয়েকে নিজের সন্তান ভেবে মাতৃস্নেহে ভরিয়ে তুলতে পারোনি? অজয়কে বিয়ে করে তুমি যে সামাজিক সুরক্ষা পেয়েছ সেটা কীভাবে অস্বীকার করবে? অজয় তো তোমার সঙ্গে এমনটা করেনি। ও তোমার মেয়েকে বাবার পরিচয়ে বড়ো করেছে। ওর বিয়েতে, পৈতৃক বাড়ি বিক্রি করতেও ও পিছপা হয়নি।’ বহুদিনের জমে থাকা কথাগুলো বলতে পেরে অনেক হালকা মনে হচ্ছিল নিজেকে। ফুরফুরে মেজাজ নিয়ে আমি আর অয়ন অজয়ের বাড়ি থেকে বেরিয়ে নিজেদের গন্তব্যে রওনা হলাম।

খবর পেলাম অয়নের দিল্লিতে বদলি হয়েছে। বউকে নিয়ে একদিন দেখা করতে এল। জানাল পরের মাসে অজয়, সুনন্দাও ওর সঙ্গে দিল্লি যাচ্ছে। দুই তিন মাস ওখানে থেকে অয়নের সংসারটা গুছিয়ে দিয়ে কলকাতা ফিরবে। খুশি হলাম। দেরি করে হলেও সুনন্দা বউদি যে নিজেকে বদলাতে পেরেছে সেটা ভেবে আনন্দ পেলাম।

পড়ার জন্য সীমাহীন গল্প-নিবন্ধসাবস্ক্রাইব