প্রফুল্লনগর উদ্বাস্তু কলোনির নাম পালটানোর প্রস্তাব হল মিটিং-এ। একটা কলোনি কমিটি আছে ঠিকই, কিন্তু আজকাল কাজকর্ম কিছু নেই। তবু ঘরটা আছে পুকুরের পাশে। ওখানে কয়েকজন বুড়ো মানুষ জড়ো হয়। পুকুরের পাশে সিমেন্টের চেয়ার আছে কয়েকটা, ওখানে সকালে প্রাতর্ভ্রমণকারীরা, দুপুরে কাক ও কুকুর, সন্ধের সময় চ্যাংড়াগুলো বসে। চ্যাংড়া ছেলেছোকরাদের সঙ্গে আজকাল দু’-একটা মেয়েও এসে আড্ডা মারে। একদিন একটি কিশোরীকে সিগারেট খেতে দেখলেন কালীপদবাবু। কিশোরীটি একটি ছেলের ঠোঁট থেকে সিগারেট ছিনিয়ে নিয়ে টানতে লাগল। কলোনির কমিটি রুম থেকে দেখলেন। কয়েকবছর আগে হলে সঙ্গে সঙ্গে গিয়ে ঠাস করে চড় মারতেন। এখন চোখ সরিয়ে নিলেন। একটা দোকান হয়েছে কলোনিতে ঢুকতেই, নাম মোমো-চোমো। মোমো নাকি সিঙাড়া জাতীয় একটি খাবার, ওটা নাকি ভাপে সেদ্ধ হয়। কিন্তু চোমোটা কী? এইগুলি বদমায়েশি। অশ্লীল ইঙ্গিত যা নামের মধ্যেই প্রচ্ছন্ন। কালীপদ চক্রবর্তী ইস্কুলের মাস্টার ছিলেন। এখন বয়েস আশির কাছাকাছি। কলোনির জন্য লড়েছেন প্রচুর।

প্রাইমারি স্কুল, ব্যায়ামাগার, এইসব ছাড়াও লেখালিখির কাজটা কালীপদবাবুই করতেন। এই যে এখন কলোনিগুলোর হাল ফিরে গেছে, এটা তো পাট্টা পাওয়ার জন্যই হয়েছে। এই পাট্টা পাওয়ার জন্য কম লড়াই করতে হয়েছে নাকি! সেই নেহরু-লিয়াকত চুক্তি। নেহরু পঞ্জাবে জন-বিনিময়ে রাজি হলেন, কিন্তু বাংলার জন্য রাজি হলেন না। সে সময় হেমেন ঘোষ লিখেছিলেন, লিয়াকত-র সঙ্গে দিয়াকত-র চুক্তি হইল। নেহরু তো সবই মেনে নিলেন– দিয়ে দিলেন লিয়াকত যা চেয়েছিল। ওপার থেকে আসা লোকগুলি ভারত সরকারের কাছে অনভিপ্রেত হয়েই রইল। সম্পূর্ণ পুনর্বাসন হল না, ফলে জবরদখল। এটাই জবরদখল কলোনিই ছিল। সবাই ছিল বেআইনি দখলদার। সরকার বলেছিল ওদের দখলদার শব্দটা থেকে মুক্ত করবে। করেও ছিল। কিন্তু আইনের জট খোলা সহজ নাকি? শেষ পর্যন্ত হয়েছিল। এবং এরপরই পালটে গেল কলোনি।

বছর কুড়ি আগেও রাস্তার একপাশে ছিল মাছি ভনভন ড্রেন। টিন আর টালির ঘর। তেলেভাজার দোকান, রাস্তার ছাগলের ভ্যাঁ, কুকুরের ঝগড়া, আর কুকুরের গু। সারমেয় বিষ্ঠা এখনও থাকে, তবে ওসব বিলাতি কুকুরের। বাবুরা কুত্তা হাগাতে নিয়ে আসে সকালে। এখন কতরকমের বাবু। টালির ঘরের মালিকরা প্রোমোটারদের দিয়ে বড়ো বড়ো ফ্ল্যাট করিয়েছে। সব জবরদখলকারী উদ্বাস্তুরা এখন ফ্ল্যাটের মালিক। এমনকী কালীপদ চক্রবর্তী নিজেও। ভেবেছিল কখনও যে জবরদখল করা চার কাঠা জমির বিনিময়ে একটা ফ্ল্যাট-সহ কয়েক লক্ষ টাকা পাবে? এখন ওইসব ফ্ল্যাটে অনেক বাইরের লোকজন থাকে। পুরোনো লোকের তুলনায় নতুন আসা মানুষজনই বেশি। ঠেলায় করে সবজি বিক্রি হয়, সবজিওয়ালারা হাঁকে টমট্টর… লাউকি… পরবল…। বোঝাই যাচ্ছে প্রচুর অবাঙালির বাস। হনুমান মন্দির হয়েছে একটা। হরিপদ চক্রবর্তী আগে এদিকের পুজো-আচ্চা করতেন। ওঁর নাতি সংস্কৃতে অনার্স। সে নাকি হনুমান পুজো করতে পারে। ও কিন্তু কম্পিউটার জানে, বাইক চালায়। জিন্সের প্যান্ট পরে, আবার পুজো-আচ্চাও করে। পাড়ায় তিনটে ভ্রূ ওঠাবার দোকান– বিউটি পার্লার যারে কয়। তেলেভাজার দোকান আর নাই। চাট-রোল এইসব। পুকুরটা এখনও আছে, তবে বক-পানকৌড়ি এইসব আসে না। পুকুরঘাটে বাসন ধুতে আসে না ঘরের বউরা। দুপুরবেলায় পুঁটি মাছ ধরার জন্য ছিপ হাতেও বসে না কেউ। পুকুরপাড়ের এই কলোনি অফিসটুকু আছে, এই অঞ্চলে টিনের চালের ঘর এখন একটাই। সঙ্গে ছিল একটা কুস্তির আখড়া। ওইখানে এখন জঙ্গল। অফিস ঘরের পাশেই ছিল ব্যায়াম স্থান। পরে ওটা হল ক্যারাম স্থান, এখন ব্যারাম স্থান।

যেহেতু দরজা-টরজা চুরি হয়ে গেছে, ওখানে সামাজিক ব্যারাম সংগঠিত হয়। দ্বিপ্রহরে উঠতি যুবা-যত, কখনও সদ্য যুবতিও ওই আড়াল ব্যবহার করে। মোমো-চোমো দোকানে চোমোর মধ্যে যে গুপ্ত অর্থ নিহিত আছে, তার ভাব সম্প্রসারণ করে। আগে ওই একই স্থানে বারবেল, ডাম্বেল, মুগুর ইত্যাদি ছিল। স্বাস্থ্যই সম্পদ এই রচনা যেন কেবল রচনা বইয়ের বাইরে গিয়ে মাংসপেশি অভ্যাসের ভিতর চলে যায়– কালীপদবাবু সেই চেষ্টা করতেন। এই ব্যায়ামাগার তৈরি হয়েছিল সুখবিলাস বিশ্বাসের উদ্যোগে। কুস্তির আখড়াও। ‘বোম ফট্!’ উরু চাপড়ানোর শব্দটা মনে এল। কুস্তির মাস্টার ছিল একজন এলাহাবাদি। কৃষ্ণকুমার হিন্দু আকাদেমির দারোয়ান। বোম ফট্ জয় বজরংবলি কি… বলে উরু চাপড়াত। বাঙালগুলির মুখ দিয়ে কিন্তু কিছুতেই ‘জয় বজরংবলি’ বের হতো না। বাঙাল কখনও হনুমানের পূজা করে না। সেই প্রফুল্লনগর কলোনিতে এখন দুইটা হনুমান মন্দির। পাড়ায় প্রচুর হিন্দুস্থানি। হনুমানের নিত্যপুজো হয়। বাঙালি নব্য গৃহিণীদের অনেকেই টক করে হনুমান প্রণাম করে, ঢক করে চরণামৃত খেয়ে নেয়, ঠক করে প্রণামির বাক্সে একটা কয়েন ফেলে দেয়। নব্য বাঙালি যুবতিগণ আজকাল দেখা যায় হাতে মেহেন্দি ধারণ করে, শাঁখা-পলা ধারণ করে না যদিও, দুর্গাপুজোর দশমীতে মুখমণ্ডলে সিঁদুর লেপন করে। নব্য যুবকের বাম হস্তে রঙিন সুতো বাঁধা থাকে। ওইটা কি ফ্যাশন? কালীপদবাবু একটা নব্য যুবাকে প্রশ্ন করে উত্তর পেয়েছিলেন– সৌরভের হাতে থাকে। ওটা মঙ্গলচণ্ডীর ডোর। কালীপদ চক্রবর্তীর বয়েস হলেও এখনও ন্যুব্জ নয়। ওঁর ধারণা এটা যৌবনের ব্যায়ামের ফল। রোজই পাড়া পরিক্রমায় বের হন। আধুনিক ভাষায় ওটা মর্নিংওয়াক। একদিন তিনি দেখলেন এক নব্যমাতা তার সন্তানকে স্কুলে পৌঁছে দিচ্ছে। শিশু সন্তানের বয়েস চারের বেশি নয়। মায়ের হাতে শিশুর ব্যাগ। মায়ের হাতেই জলের বোতল। শিশু সন্তান মাকে বলল, মা– আতল-বাতলটা দাও।

মা জলের বোতলটা দিল। ওয়াটার বটল শব্দটা এখনও উচ্চারণ করতে পারে না ওই শিশু। ওদের পিছনে মর্নিংওয়াকে কালীপদবাবু। একটি গরু দেখে বাচ্চাটা বলেছিল ওটা হাম্বা। মা বলল– হাম্বা বলে না, কাউ। এরপর একটা কুকুর। বাচ্চাটা বলল ঘেউ ঘেউ। মা বলল, ডগ বলো সোনা। এরপরই হনুমান মন্দির। ছেলেটা বলে মাংকি। মা বলে মাংকি বলে না বাবা, এটা ঠাকুর, নমো করো। ওরা ‘জয় গার্ডেন’-এ যাচ্ছে। এটা একটা ইস্কুল। গার্ডেন মানে কয়েকটা প্লাস্টিকের গাছ আছে বারান্দায়, গ্রিলের লোহায় লাগানো বাঁদর ছানা। ভালুক ছানা। বিজয় সাহার পুত্রবধূ ওর বাসাটা ফ্ল্যাট বানিয়ে একতলার ফ্ল্যাটে গার্ডেন করেছে। ওখানে শ’খানেক শিশু গাদাগাদি করে কাউ-ডগ-আন্টি-আঙ্কেল শেখে।

এখন কলোনি কমিটির চেয়ে বড়ো হল কাউন্সিলারের অফিস। এই ওয়ার্ডের কাউন্সিলার এখন ঘেমো। ওর ছবি দেখা যায় এখানে-ওখানে। হাতজোড় করা। এলাকাবাসীদের নববর্ষের শুভেচ্ছা, বিজয়া দশমীর শুভেচ্ছা… এলাকাবাসীদের প্রতি আবেদন– সুস্থ সংস্কৃতি বজায় রাখুন, রবীন্দ্র-নজরুল জন্মদিন পালন করুন…। তলায় পৌরপিতা ঘেমোর ছবি। পৌরপিতা চাইছেন কলোনি শব্দটা উঠিয়ে দিতে।

কলোনি কমিটির মিটিংয়ে বিজয় সাহা বলল– অরা যা করে করুক গিয়া। আমাগোর কথার কিছু দাম আছে নাকি! বাচুম কয়দিন? কইলকাত্তা লন্ডন হইব, আর প্রফুল্লনগর কলোনি যদি প্রফুল্লকানন হয় হোক, আমাগর কী? কালীপদবাবু বলল– নাম পাল্টামু কইলেই হইল? একি কোর্টে গিয়া এফিডেভিট কইরা উলঙ্গিনী দাসীর নাম পালটাইয়া দিব্যাঙ্গনা দাসী হওয়ন নাকি? এটা হইল একটা জবরদখল কলোনি। সরকারি খাতায় তো কলোনি কথাটা আছেই। নারায়ণ দাস বলল– সরকারি খাতায় যা খুশি থাকুক গা। আমরা নিজেরাও আর কলোনি কমু না। আমরা প্রফুল্লকাননে বাস করলে ক্ষতিটা কী! প্রস্তাব আকারে ঘেমোরে কইয়া দিমু আমরাও একমত। কালীপদ বলে, এবার একখান কথা আছে। আমরা যে প্রস্তাব আকারে সম্মতি দিমু, আমাগোর প্যাডে লিখ্যাই তো? প্যাডে কী আছে? প্রফুল্লনগর কলোনি কমিটি নাই?

বিজয় সাহা বলে– কী দরকার প্রস্তাব আকারে দেওয়ার। চুপ কইরা থাকো। আমার কী বলি, না বলি, তার কিছু দাম আছে নাকি! কিচ্ছু ল্যাখালিখির দরকার নাই। এখানে আমরা বুড়ারা যেমন যাই আসি, তেমন যাব আসব। নারায়ণ দাস বলে– আমরা কি শ্যাষ নাকি? প্রস্তাব আকারেই দিব। আমরা জানাব যে আমরাও আছি। রাস্তার সামনে যদি গেট হয়, সেখানে প্রফুল্ল দাসের নামটা লেখা থাকবে। প্রফুল্ল দাসের কথা কেউ জানে না। একবার ক্লাবে গিয়া জিগাইলাম– এই যে প্রফুল্লনগর, এইটা কার নামে কও দেখি কে জানে? সবাই চুপ। একজন কয় শহিদ প্রফুল্ল চাকীর নামে। ক্লাবের চ্যাংড়াগুলির কথা বাদ দাও। অনেক বয়স্ক লোকও জানে না। কেউ ভাবে এইটা আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের নামে, কেউ প্রফুল্ল সেনের নামেও ভাবতে পারে। আসলে প্রফুল্ল দাসের নামে। কালীপদবাবু এটা জানেন। জবরদখল পর্বে গুণ্ডাদের লাঠির আঘাতে মারা গিয়েছিলেন প্রফুল্লচন্দ্র দাস। এই নারায়ণ দাসের কাকা। প্রফুল্ল দাসের বয়স তখন মাত্র বাইশ। নারায়ণ দাসের বয়স তখন নয়-দশ।

নারায়ণ দাস ছিলেন এই অঞ্চলের সবচেয়ে ধনী। এই অঞ্চলের প্রথম তিনতলা বাড়িটা ওরই। ওর বাবার শ্রাদ্ধে এক হাজার লোককে খাইয়ে ছিলেন। ছাদে হরিনাম বসিয়েছিলেন। ওর কথার একটা ওজন আছে। তিনি কিছু বললে সেটাকে অগ্রাহ্য করা যায় না। বহুদিন ধরে তিনিই এই প্রফুল্লনগর কলোনির কমিটির প্রেসিডেন্ট। একটা গামছার দোকান করেছিলেন নারায়ণবাবুর বাবা। নারায়ণবাবু সেই ব্যাবসাকে বড়ো করেন। বড়ো রাস্তার শাড়ি প্যালেস ছাড়াও তিনটে দোকান। ছেলেরা দেখাশোনা করে। ব্যাবসা ছাড়াও কলোনির জন্যও অনেক করেছেন নারায়ণ দাস। কলোনির দুর্গাপুজোয় অনেক চাঁদা দিতেন। এখন তো দুর্গাপুজোটা চলে গেছে জ্বলন্ত সংঘের কাছে। ওরাই সব করে।

প্রস্তাব চলে গেল ঘেমোর কাছে। ঘেমো মানে মলয় মল্লিক। ওকে দু’একটি আধুনিকা মম্দা বলে ডাকে। যদিও ঘেমোদা সম্ভাষণে ওর কোনও নীতিগত আপত্তি নেই। ছেলেটি উদার প্রকৃতির।

মলয় মল্লিক জ্বলন্ত সংঘের ছোঁড়াগুলিকে ডাকল। বলল– তোদের হেল্প ছাড়া তো এটা হবে না। আমরা কলোনিতে ঢুকবার মুখে তোরণ বানাব। তোরণে লেখা থাকবে প্রফুল্লকানন। তোরা আর কলোনিতে ঢুকবি না, কাননে ঢুকবি। মন্ত্রী-টন্ত্রী ডাকব। সেইসঙ্গে একটা গুণীজন সংবর্ধনা করে দেব। পাড়ার গুণীজনগুলোর একটা লিস্ট করে দিস তো আমাকে…।

জ্বলন্ত সংঘ প্রায় সবসময় নিভন্তই। জ্বলন্ত হয় দুর্গাপুজোর আগে। ক্লাবঘরে তাস-টাস চলে, টুকটাক জুয়াও। ক্লাবে যারা আসে তাদের মধ্যে দু’চারজন বেকার, দু’চারজন ইট-বালি সাপ্লায়ার, দু’একজন ছোটো চাকুরে…। আইটি পড়া ভাইটিরা আসে পরে, পুজো প্যান্ডেলে বসে থাকে। ক্লাবের সেক্রেটারি বিশু, মানে বিশ্বনাথ ঘোষ প্রস্তাব করল গেট উদ্বোধনের দিন একটা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও করা হোক।

সংস্কৃতির কথা শুনে সবাই বলল হোক-হোক। বিশু একজন তরুণ সাপ্লায়ার। প্রোমোটারদের লোহা-বালি-পাথর সাপ্লাই করে। সব খালাসির যেমন লক্ষ্য থাকে ড্রাইভার হওয়ার, ফেনা ভাত চায় বিরিয়ানি হতে, পাউরুটি চায় কেক, পেস্ট্রি হতে, সাপ্লায়ারও প্রোমোটার হতে চায়। প্রোমোটার হলেই সমাজসেবী হওয়া যায়। সমাজসেবী হলে কাউন্সিলার হওয়া যায়। বিশু জগদীশকে বলল, গুণীজনের সন্ধান করতে। জগদীশ যেহেতু ফ্ল্যাটের দালালি করে, পাড়ার সব খবরও রাখে। কোন্ ফ্ল্যাটে কে থাকে, কোন্ বাড়িতে ভাইয়ে-ভাইয়ে ঝগড়াটা বেশ পেকেছে, কোন্ ফ্ল্যাটে দুপুরবেলা বাইরের পুরুষমানুষ আসে, এসব তথ্য ওর মন-কম্পিউটারে মজুত।

মলয় মল্লিক, নারায়ণ দাসের কাছে তোরণের নকশা ফেলে দিল। বলল– দেখুন জ্যাঠাবাবু, পছন্দ হয় কিনা। দু’পাশে গোল মার্বেলের পিলার। উপরে গ্র্যানাইট। স্টিলের হরফে লেখা থাকবে প্রফুল্লকানন। তার তলায় লেখা থাকবে মান্যবর নারায়ণ দাসের অর্থানুকুল্যে প্রতিষ্ঠিত।

নারায়ণবাবু বললেন– তা কেন? তা কেন? আমার নাম কেন?

বিশু বলল– এটা কোনও দোষের নয় জ্যাঠামশাই, দেখেননি নতুন বাস স্টপেজের শেড? ভিতরে রবীন্দ্রনাথের একটা ছবি, তার উপর এক বিঘত বড়ো অক্ষরে কী লেখা– দেখেন নাই? কী লেখা?

আমাদের এমপি-র নাম। তা থাকুক গিয়া। আমার লিখার দরকার নাই। শাজাহান কি তাজমহলের গায়ে নিজের নাম লিখ্যা রাখছে? আমি চাই আমার কাকার নামটা থাউক। কলোনির শহিদ প্রফুল্ল দাসের নামটা থাউক।

মলয় মল্লিক বলল– আবার কলোনি কেন? কলোনি শব্দটা উঠিয়ে দেওয়ার জন্যই তো ‘কানন’।

নারায়ণবাবু বললেন– কিন্তু প্রফুল্ল দাসের নামটা রাখতে চাই।

মলয় মল্লিক বলল– তাহলে পুকুরপাড়ে নয় একটা বেদি বানিয়ে দেব অমর শহিদ প্রফুল্ল দাস, তোমায় আমরা ভুলছি না ভুলব না।

নারায়ণবাবু বললেন, তাই হোক তবে।

এবার চলল গুণীজন হান্টিং। একটা ফ্ল্যাটের সামনে প্রায়ই একটা প্রেসের গাড়ি আসে। জানা গেল, বিখ্যাত এক কাগজের কোনও সাংবাদিক ফ্ল্যাটটা কিনেছেন। একজোড়া সিরিয়াল অভিনেত্রীও এ পাড়ায় ফ্ল্যাট নিয়েছে। একজন জোজো-কণ্ঠীও আছে। এছাড়া পুরোনো বাসিন্দাদের মধ্যে একজন বুড়ো ম্যাজিশিয়ান আছেন, বহুদিন খেলা দেখাতে পারেন না। তিনি কি গুণীজন? তিন-চারজন ইস্কুল মাস্টার, আর একজন প্রফেসর আছেন। প্রফেসরটা গুণীজন হলেও হতে পারেন। এক পিস কবিও আছে। কবি নিশ্চই গুণীজন! এদের অনেক সময় বিদ্বজ্জনও বলা হয়। ছবি আঁকলে বিদ্বজ্জন হয়। এ পাড়ায় তেমন ছবি-আঁকিয়ের সন্ধান নেই। দুটো হোমিওপ্যাথ আছে, এখনও পুরিয়া চালিয়ে যাচ্ছে। পঞ্চাশ টাকা করে নেয়। ওরা গুণীজনের মধ্যে পড়ে কিনা কে জানে? বিশুর ইচ্ছে ওদের গুণীজনের মধ্যে ফেলার। দেখা যাক শুডঢারা কি বলে। ও! হারুদার মেয়েটা তো গুণীজন। ওকে

সংবর্ধনা দিতেই হবে। নাচো পাগলি নাচো রিয়ালিটি শোয়ে ও অনেক রাউন্ড পর্যন্ত নেচেছিল। প্রচুর গিফ্ট হ্যাম্পার পেয়েছিল। একবার ছিটকে গিয়েও দর্শকের এসএমএস-এর জোরে ফিরে এসেছিল।

দেখা গেল গুণীজনের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। অনেকেই নতুন নতুন গুণীজন সাজেস্ট করছে। গুণীজন সংবর্ধনায় রসগোল্লার হাঁড়ি স্পনসর করছে ‘আবার খাব সুইটস্’ এবং উত্তরীয় স্পনসর করছে ‘লজ্জা নিবারণ বস্ত্রালয়’। ওরাও একডজন করে গুণীজন পুশ করার চেষ্টা করছে। সাংস্কৃতিক উৎসবে বাংলা ব্যান্ড ‘ধুমধাড়াকা’-র পুরো টাকাটা স্পনসর করছে এ পাড়ার নতুন ফাস্ট ফুডের দোকান মোমো-চোমো।

কালীপদবাবু এখন কিছুটা গুটিয়ে নিয়েছেন। নারায়ণবাবু, বিজয়বাবুদের সঙ্গে বসল ওরা। মতভেদ হতে লাগল। নারায়ণবাবু বলছে ওইসব সিরিয়ালে নামা চ্যাংড়া-চেংড়িরা মোটেই গুণীজন নয়। গানবাজনার লাইনে যদি কাউকে সংবর্ধনা দিতেই হয় তবে অক্ষয় সরখেলকে দাও। এখনও বেঁচে আছে। কী অপূর্ব শ্যামাসংগীত গাইতেন এককালে। কতজন ওর কাছে গান শিখতে যেত। অক্ষয়বাবুর কল্যাণে কলোনির বহু মাইয়ার বিয়া হয়েছে। পাত্রপক্ষ কনে দেখতে এলে দুই-চাইর খান গান তো গাইতেই হতো। বিবাহযোগ্যা কন্যাদের মায়েরা অক্ষয়বাবুর কাছে নিয়ে যেত। দুই-একখান রবীন্দ্রসংগীত, একখান নজরুলের গান– ভরিয়া পরাণ শুনিতেছি গান আসিবে আজি বন্ধু মোর, একখান শ্যামাসংগীত… অক্ষয়দা সবরকম গান জানত। কি গলা। জিন্দাবাদের গানও কম গাইছে নাকি? তোমাদের জনম হয় নাই। মনোরঞ্জন গুহ একটা গানের দল করেছিল। হেই সামালো ধান, আলোর পথযাত্রী, মানব না বন্ধনে এইসব কমুনিস্টি গান গাইত। অক্ষয়দা ওই দলেও গাইত। সবরকম, সবরকম গানের ওস্তাদ…। মনোরঞ্জনদা তো নাই, অক্ষয়দা আছে।

সিপিএমের গান গাইত? আর ওকেই সংবর্ধনা দিতে বলছেন? বিশু কেমন রে রে করে উঠল।

নারায়ণবাবু বললেন– তখন সিপিএম আছিল নাকি! ওইসব গান তো তোরাও খামচাইয়া নিয়া নিছস। জগদীশ বলে ওইসব লোককে ঘেমোদা হয়তো অ্যাপ্রুভ করবে না। আমরা তো খালি গুণীজনের লিস্ট দেব, টিক মারবে তো ঘেমোদা… নারায়ণবাবুর দুঃখ হয়। উনি ছিলেন প্রেসিডেন্ট। কত কিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। আজ ওর প্রস্তাব অ্যাপ্রুভ করে সেদিনের ছোঁড়া ঘেমো। আগে কাউন্সিলার ছিল সুবীর। বললে কথা শুনত। এখন ওরা গর্তে। কোনও সাড়াশব্দ নাই। ছ্যামড়ারা অপরাধবোধে ভোগে আর কি! বিশু বলল– সাংবাদিকটাকে আমাদের হাতে রাখতেই হবে। ওকে সংবর্ধনাটা দিতেই হবে। সাংবাদিক হাতে থাকলে কত সুবিধে।

– থামো দেখি। সাংবাদিক চিনাও আমারে! রেগে গেলে বাঙাল কথাটাই বলেন নারায়ণবাবু। বিবেকানন্দ মুখার্জিরে দেখছি আমি। হেমেন ঘোষের নাম শুনছ! দেবজ্যোতি বর্মন? কাপড়ের ব্যাবসা করতে পারি, কিন্তু হেইসব খবর রাখতাম। হঃ, সাংবাদিক! খবর কাগজের বড়ো খবর হয় সিনেমার হিরোর বিয়ায় কি কি পদ খাওয়াইছে। সাংবাদিক দরকার নাই। আমার কথা না শুনলে তোরণের দরকার নাই, টাকাও দিমু না। তোমরা যা পারো করো।

– রাগ করছেন কেন জ্যাঠামশাই। বলুন, আপনি সাজেশান তো দিতেই পারেন। বয়োজ্যেষ্ঠ লোক।

নারায়ণ বলেন, সুখবিলাস বিশ্বাসরে ভুইল্যা গেলা? এই ব্যায়ামাগার কে করছিল? কে করছিল কুস্তির আখড়া? মনোহর আইচরে নিয়া আসছিল সে। লাঠিখেলা হইত। বারবেল-ডাম্বেল-মুগুর– সব কিছু আছিল। আমিও ছোটোবেলায় মুগুর ভাঁজতাম। এখন সুখবিলাস অথর্ব। এখন তো সব জিম হইছে, জিম। জিম না ঘোড়ার ডিম! উনি ছিলেন জিমের বাপ। আমার ইচ্ছা অক্ষয়দাদা আর সুখবিলাসদাদারে সংবর্ধনা দাও।

নামগুলো লিখল। বোধহয় ওদের সংক্ষিপ্ত পরিচয়। বোধহয় ওদের ঘেমোদার সঙ্গে পরামর্শ করবে।

ক’দিন পরে ওরা এল। সেদিন কালীপদবাবু, সাধনবাবু, বিজয় সাহা এরাও ছিল।

বিশু বলল– জ্যাঠামশাই, আপনার কথাই রইল, কিন্তু টফি আর কফি এই দুই বোনকে আমরা চাই। মৌবনের ভোমরা, সতীসাবিত্রী, তোমায় আমি ছাড়ব না– এইসব সিরিয়ালে ওরা দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। স্পনসররা ওদের চাইছে।

কালীপদ চক্রবর্তী বললেন, ওদের ছাড়ো তো, ওরা ক’দিনের? কোত্থেকে উড়ে এসে জুড়ে বসেছে। পুরোনো লোকদের দিকে দেখো।

বিশু বলল– এভাবে আমরা-ওরা করবেন না জেঠু। ওরা নতুন এসেছে তো কী হয়েছে? সবাইকে নিয়েই তো এই পাড়া। বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য।

জগদীশ বলল– নানা ভাষা নানা মত নানা পরিধান।

কালীপদবাবু বললেন– বাবা। তোমরাও দেখি কথায় কথায় কোটেশন ছাড়ো।

– শুনে শুনে হয়ে গেছে। সলাজ হাসি হাসে।

– পুরোনো লোকের কথা যদি বলেন– ভানু জ্যাঠা তো পুরোনো লোক। ভানু জ্যাঠার নাতনিই তো নাচো পাগলি নাচোতে মাতিয়ে দিয়েছে। মেয়েটাকে উৎসাহ দিতে হবে না। স্পনসরদের বুঝিয়ে পটিয়ে-পাটিয়ে ছ’জন করার চেষ্টা করব।

– ছ’জন কে!

– ওই তো, আপনার কোটার দু’জন, আর কফি-টফি, সাংবাদিক আর ভানুদার নাতনি বা হারুদার মেয়ে বুলবুলি।

নারায়ণবাবু বললেন– যা খুশি করগা।

মলয় মল্লিক একটু ভ্রূ কুঁচকে সুখবিলাস বিশ্বাস আর অক্ষয় সরখেলে টিক মারল। আর অন্যদেরও।

অক্ষয় সরখেল এখন চোখে দেখেন না একদম। গ্লুকোমা হয়েছিল। বয়েস আশি ছাড়িয়েছে। ওঁর স্ত্রীর বয়েসও সত্তরের বেশি। গানবাজনা ছেড়ে দিতে হয়েছে বহুদিন। একটাই গান এখনও আপন মনে করেন– গান কে নিল আমার কণ্ঠ হতে।

বিশু ওদের বাড়িতে গেল। দেখল একজন বুড়ো বিছানায় শুয়ে রেডিয়ো শুনছে। রেডিয়োয় ঘড়ঘড় শুনছে। গান-টান কিছু তো হচ্ছে না। ঘরের কোণায় ধূলিধূসরিত বাঁয়া-তবলা। তবলার আচ্ছাদন ফেটে গেছে। টেবিলের উপরে একটা হারমোনিয়াম। হারমোনিয়ামের উপরের কাঠের আচ্ছাদনের উপর কয়েকটা শিশি। একটা শিশির গায়ে লেখা জাদুমালিশ। ঘরে একটা বোঁটকা গন্ধ। তাঁর স্ত্রী বললেন, তোমার সঙ্গে দ্যাখা করতে আইছে।

অক্ষয় সরখেল বলল– ক্যাডা?

বিশু বলল– আমি বিশ্বনাথ।

– বাপের নাম?

– হারাধন রায়।

– তার বাপ?

– জনার্দন।

মাথা চুলকে বললেন, হ। বুজছি। তোমার বাপটা সেই কবে চইল্যা গেল গিয়া। হারু। হারু আমারে খুড়া ডাকত। কও। কিসের কারণে আইছ?

বিশু বলে– আমরা ঠিক করেছি আমাদের পাড়ায় ঢোকার মুখে একটা তোরণদ্বার তৈরি করব। উদ্বোধন করবেন গৌতম রায়।

– সে কেডা?

– মাননীয় সাংসদ।

– জোরে কও।

– সাংসদ। সাংসদ। মাননীয় এমপি।

– তাতে আমার কী।

– সেই সঙ্গে আপনাকে আমরা সংবর্ধনা দেব।

– কী দিবা?

– সংবর্ধনা। সন্মান, সন্মান।

– ক্যান?

– আপনি কতজনকে গান শিখিয়েছেন। কত বড়ো সংগীতশিল্পী আপনি।

– কে কইল?

– বলেছে অনেকে। নারায়ণ জেঠু, বিজয় জেঠু…

– নারায়ণ তো বিরাট ধনী। মনে রাখছে আমারে?

– ওঁরাই তো আপনার কথা বললেন।

– ভালো কথা শুনাইলা! এখন কণ্ঠে আর গান নাই। ওই দ্যাখো ম্যাডেল। ঝুলতাছে। যুব উৎসবে ফার্স্ট হইছিলাম।

উনি চোখে দেখতে পাচ্ছেন না, কিন্তু আঙুলের নির্দেশ খাপে খাপ। মেডেলটা দেয়ালে টাঙানো চৈতন্যদেবের ক্যালেন্ডারের উপর ঝুলছে।

একখান রেডিও দিও, বুঝলা, চক্ষে তো দেখি না, রেডিও শুনি। এইটা বড়ো ঘড়ঘড় করে। সারানোর লোক নাই। যারা টিভি সারায়, তারা রেডিও পারে না। রেডিও তে বোঝলা, আগের মতো গান নাই। কি সব হইহল্লা হয়, বুঝি না। কইলকাতা ক কেন্দ্রে তবু কিছু পুরানো গান হয়। কিন্তু রেডিওটা বড়ো ঘড়ঘড়াইয়া কিচ্ছু শুনা যায় না।

বিশু বলে– ঠিক আছে। ও হিসেব করে নিয়েছে শালের চেয়ে রেডিওর দাম কমই পড়বে।

– আমারে কি বক্তৃতাও দিতে হইব?

– তা তো নিশ্চই।

– কিন্তু স্টেজে উঠুম কি কইরা! ভালো কইরা দেখতেও পাই না…। আহারে… কত স্টেজে উঠছি, স্টেজে উইঠ্যা…

– সে ভাবতে হবে না। আমরা উঠিয়ে দেব।

– আইচ্ছা। আইসো মাঝে-মইধ্যে। কেউ তো আসে না…।

সুখবিলাস বিশ্বাসের বাড়িটাও ছোটোই। তবে অক্ষয় সরখেলের মতো এতটা দীর্ণ নয়। ওঁর এক ছেলে মিলিটারিতে কাজ করত। চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে হয়তো বারবেল-ডাম্বেলের কিছুটা ভূমিকা থাকতে পারে। সেই ছেলেটা নাকি হায়দরাবাদ না সেকেন্দ্রাবাদ কোথায় থাকে। আর এক ছেলে অ্যাক্সিডেন্টে মারা গেছে। এখানেও দু’জন। এদের ডিটেলস্ বিশুরা রাখে না। এরা এখন পুরোনো। ভালো মনে এল, ফাংশনে পুরানো সেই দিনের কথা ভুলবি কিরে হায় গানটা চালাতে হবে যখন ওদের সংবর্ধনা দেওয়া হবে।

– আপনার ছেলে, কী করছে এখন!

– সিকিউরিটি অফিসার। গর্বের সঙ্গে বললেন সুখবিলাস।

এই ঘরেও বোঁটকা গন্ধ। বারান্দায় পাতা বেঞ্চি। বারান্দার গ্রিলে একটা লেটারবক্স দড়ি দিয়ে বাঁধা। বোঝাই যায় বহুদিন ওখানে কোনও চিঠিপত্র পড়ে না। লেটারবক্সের গায়ে লেখা সুখবিলাস বিশ্বাস, দেহশ্রী। দেহশ্রীর স্ত্রী কফ থুথু ফেলার কৌটোটা ঘর থেকে নিয়ে বারান্দায় রাখলেন। দেহশ্রী এখন হতশ্রী। বোঝাই যায় কাঁধটা খুব চওড়া ছিল। এখন হ্যাঙার থেকে জামা ঝোলার মতো ওর শরীরে চামড়া ঝুলছে।

বিছানায় বসে একটা স্টিলের থালায় কড়াইশুঁটি ছুলছিলেন দেহশ্রী।

– কড়াইশুঁটি ছুলছেন?

– হু। ডাইবিটিস ধরেছে। কড়াইশুঁটি খাইতে কইল ডাক্তার। ভাত ঠিক এই দুইটা। আঙুলে আয়তন দেখায় দেহশ্রী। কড়াইশুঁটির বড়ো দাম। তবুও কিনতে বাধ্য। নিজেই ছুলতাছি। আঙুলের এক্সারসাইজ হয়। তুমি কে? ট্যাক্স নিবা?

– না। পাড়ার ছেলে।

– চাঁদা-টাদা নিবা বুঝি কিছু।

– না, চাঁদা নয়। আপনাকে সংবর্ধনা দেব।

– ক্যান? কি দোষ করছি?

– ছিঃ, দোষ কেন করবেন। পাড়ায় এত সুন্দর একটা ব্যায়ামাগার তৈরি করেছিলেন… বিশু বিরক্ত হয়। জগদীশ, তারু, অনিল কেউ এল না। ওকেই সব সামলাতে হচ্ছে। লোকটার কথায় একটা ব্যাঁকা-ট্যারা স্পিন বল।

– হ। ব্যায়ামাগার তো করছিলাম। তোমরা যাও? ব্যায়াম-ট্যায়াম করো?

– না, সময় পাই না…।

– ব্যায়ামের সময় নাই, যত কুকর্মের সময় পাও।

দেহশ্রীর স্ত্রী বাধা দেয়। কি অকথা কুকথা কও। ওরা আইসে, বইতে কও…।

বিশু পিতৃপরিচয় দেয়। এরপর সংবর্ধনার কথাটা পাড়ে।

সুখবিলাস বলে– আমি সুখী হইতাম যদি তোমরা আবার ব্যায়ামাগারটা চালু করতে পারো। যদি আবার একটু কুস্তি-টুস্তি করো। মুগুর-টুগুর ভাঁজো।

– এখন আর কুস্তিতে কাউকে পটকানো যায় না। কুংফু-ক্যারাটে এসে গেছে। আর মুগুর দিয়ে আত্মরক্ষা করা যায় না। পিস্তল এসে গেছে।

সুখবিলাস বলে– বেকুবের মতো কথা কও ক্যান? মুগুর ঘুরাইলে মাএ মজবুত হয়। এই হাত, কাঁধ আর বুকে দুইশো মাএ আছে। ডাইবিটিসটা না থাকলে দেখাইয়া দিতাম। ডাইবিটিস সব শ্যাষ করছে। ওই দ্যাখো আমার জুয়ান বয়েসের ছবি। ওই দ্যাখো মনোহর আইচের লগে। ওই যে ব্যাঙ্গল বডি বিল্ডিং চ্যাম্পিয়ন কাপ। পিয়োর সিলভার, ওনারও আঙুল যেন কম্পাস। ওই সিলভার কাপটায় কতটা সিলভার আছে জানো? পাক্বা ফাইভ হানড্রেড গ্রাম। আমার এত অভাব সত্ত্বেও ওইটা বেচি নাই। ক্যান জানো। আমার নাতি-নাতনি আইস্যা দেখুক। এইগুলার মর্ম বুঝুক। আসে না, বুঝলা, আসে না…। কণ্ঠস্বর হঠাৎ আইসক্রিম হয়ে যায় দেহশ্রীর। ওরা সেকেন্দ্রাবাদে নিজেরা নিজেরা থাকে। নাতি-নাতনিরা পড়াশুনা করে। আসে না। তিন বছর দেখি নাই। ফুটবলই খেল আর ডান্ডাগুলিই খেল, বডি ফিট না থাকলে কিচ্ছু হয় না। এক আনা দুই আনা কইরা জমাইয়া একে একে ডাম্বেল, বারবেল খরিদ কইর্যা আনছি।

– এসব জানি তো… জন্যই তো একটু ঋণ স্বীকার।

স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে সুখবিলাস বললেন, দেখলা তো, কিছু বৃথা যায় না। আর এই দুনিয়াটা এখনও খারাপ হইয়া যায় নাই।

অক্ষয় সরখেল ‘গান কে নিল আমার কণ্ঠ হতে’ ছাড়াও অন্য দু’একটা গানেরও সুর ভাঁজেন। অন্য কেউ বুঝতে পারবে না হয়তো, কিন্তু ওর স্ত্রী ঠিক বুঝতে পারেন– এ মণিহার আমায় নাহি সাজে। অক্ষয় বলেন– গরদের পাঞ্জাবিখানা ঠিক আছে তো? ধুতি?

– হেইসব তোমার চিন্তার কথা না। আমি ঠিকই বাইর কইরা রাখমু অনে।

তারপর বলে– একখান ভাষণ লিখতে হইব তো, লিখ্যা দিব্যা?

– কইয়া দিও, লিখ্যা দিমু। পড়ব কে?

– তুমি পইড়া দিও– তবে আগে পইড়া শুনাইও। ঠিক আছে, তুমি কয়েকবার পইড়া শুনাইয়া দিলেই আমি পারুম। পয়েন্টে পয়েন্টে কইয়া দিমু।

বিশুর একটা বাড়তি ঝামেলার কাজ মানপত্র তৈরি করানো। এই সুযোগে টফি-কফিদের বাড়িতে কয়েকবার গিয়েছে। ওদের গুণাবলী লিখে নিয়েছে, চা-কেক খেয়েছে। বাংলার স্যার বিভাসবাবুকে দিয়ে ভালো করে মানপত্রগুলির বয়ান লিখিয়ে ডিটিপি করিয়ে নিতে হবে।

প্রচুর ঝামেলা। সাংবাদিকটা অবশ্য নিজের মানপত্রটা নিজেই লিখে নিয়েছে। একটা ঝামেলা কমল।

বিভাসবাবু বললেন– মানপত্র? কোনও সমস্যাই নয়। লিখে দেব। গানের মাস্টার! – হে সুরসাধক আপনার সুরমুর্ছনা ছড়িয়ে পড়েছিল এ অঞ্চলের ঘর থেকে ঘরে… আর ব্যায়ামবিদ? হে চির সবুজ, চির নবীন, স্বাস্থ্যই সম্পদ এই মন্ত্র গ্রহণ করে আপনার তত্ত্বাবধানে কত যুবা হাতে তুলে নিয়েছিল বারবেল… আজকের এই জিম যুগেও আপনার কীর্তিকে কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করি…।

অক্ষয় সরখেলের তর সয় না। মহামায়াকে দিয়ে ভাষণ লেখায়। মহামায়ার লেখার অভ্যেস নেই। হাতও অল্প অল্প কাঁপে। অক্ষয়বাবু বলে যাচ্ছেন– আজকের এই সংবর্ধনায় আমি বড়োই আনন্দিত। কিন্তু আমি কি এই সংবর্ধনার যোগ্য?

মহামায়া বলে– এই কথাটা কও ক্যান?

অক্ষয় বলে– এইটা কইতে লাগে। সরস্বতী বন্দনার মতন।

– লিখ– যাহা হউক, উদ্যোক্তাগণকে ধন্যবাদ। কলোনি পত্তনের দিনে দেখিলাম জীবন সংগ্রাম চলিতেছে। আমার অগ্রজ মনোরঞ্জন গুহ মহাশয় সেই সংগ্রামের মধ্যে সংগীত দিলেন। নেতাজির জন্মদিনে, স্বাধীনতা দিবসে আমরা গান গাহিতাম। পরে এখানে সংগীত প্রতিষ্ঠান তৈয়ারি হইল। আমার কাঁচাঘরেই মহড়া চলিত। সেইসব কথা মনে পড়ে।

বেশি কথা হইয়া যায়। অক্ষয় নিজেই বলে।

লিখ। আমি সামান্য চাকুরি করিতাম। সেখানে ওভারটাইমের ব্যবস্থা ছিল। কিন্তু আমি সংগীতের টানে সন্ধ্যার পরই ঘরে ফিরিতাম। পল্লির পোলাপান আমার কাছে গান শিখিতে আসিত।

– বক্তৃতার মধ্যে কেউ পোলাপান কয় নাকি? ছেলে-মেয়ে কও।

তিনদিন ধরে অনেক কাটাকুটির পর একটা ভাষণ তৈরি হল। মহামায়া পড়ে শোনাল। অক্ষয় বলে– তোমার হাতখান দাও। অক্ষয় ওর হাতে হাত বুলোল। অনেক– অনেকদিন পর। বলে বড়ো কষ্ট করো না তুমি গো…।

মহামায়া বলে– ঢং।

তিন চারদিন আগে থেকেই মাইকে ঘোষণা হতে লাগল– বিরাট বিচিত্রানুষ্ঠান। তোরণ উদ্বোধন করবেন মাননীয় সাংসদ গৌতম রায়, উপস্থিত থাকবেন অমুক-অমুক। সংগীত পরিবেশন করবেন বিখ্যাত ব্যান্ড ধুমধাড়াক্বা। সংগীত পরিবেশন করবেন জোজোকণ্ঠী পিংকি। জনপ্রিয় সিরিয়ালের সংলাপ পরিবেশন করবেন এলাকার গর্ব, অভিনেত্রী কফি ও টফি। নৃত্য পরিবেশনায় নাচো পাগলি নাচো খ্যাত বুলবুলি। সমগ্র অনুষ্ঠানটি নিবেদন করবেন মোমো-চোমো।

মহামায়া বলে– তোমার নাম তো কইল না…

অক্ষয় বলে, না কউক গা।

অনুষ্ঠানের দু’দিন আগে থেকেই অক্ষয়ের বেশ শরীর খারাপ। বমি হল। ডাক্তার ডেকে আনে মহামায়া। প্রেশার বেশ হাই। ডাক্তার বললেন, শুয়ে থাকুন। অক্ষয়ের খুব মাথা ভোঁ ভোঁ করে।

মহামায়া জানে উত্তেজনা হলে প্রেশার বাড়ে।

অক্ষয় বলে– তাহলে উপায়?

মহামায়া বলে– ম্যাডেল বেশি না জীবন বেশি! তোমার ম্যাডেল আমি গিয়া নিয়া আসুম।

– কিন্তু আমার ভাষণ?

– ভাষণের দরকার নাই।

– কী পাগলের মতন কথা কও। অরা সংবর্ধনা দিব। তার উত্তরে আমি একখান ভাষণ দিমু না?

– ক্যামনে দিবা। মাথাখান উঠাইতে পার না। আইচ্ছা, তোমার এই ভাষণ কাউরে দিয়া পড়াইয়া দিমু।

– কাউরে ক্যান? আমার স্ত্রী হিসাবে তুমি নিজে পড়তে পারবা না?

– আমি ইস্টেজে উইঠ্যা! আমার ভয় করে।

– ভয়? কী কথা কও। আমি ভয় করব না ভাই ভয় করব না। ভয় কী? একটু স্মার্ট হইবার পারবা না!

– উঁহু!

– উঁহু না, হুঁ কও– সোনা আমার।

মহামায়া বলে, ঢং।

বেছে বেছে একটা ভালো শাড়ি পরেছে মহামায়া। সিল্কের, লালপাড়, ভিতরে কলকা। মেয়ের বিয়েতে প্রণামি পাওয়া। ভাষণটা বেশ কয়েকবার পড়ে নিয়েছে, সিঁদুরের একটা বেশ বড়ো টিপও পরে নিয়েছে।

প্যান্ডেলে তখনও খুব একটা লোকজন হয়নি। সবুজ সবুজ চেয়ার। ওকে সামনের সারিতে বসানো হল। এরেই কয় খাতির। চেনা লোকজন খুব কম। বিশু এসে এক্বেবারে সামনের দিকের চেয়ারে বসিয়ে দিল। কে একজন এসে হাতজোড় করল। ভালো আছেন বউদি? ও। নারায়ণবাবু। মোটাসোটা হয়েছে এখন। আরও কেউ কেউ এসে তত্ত্বতালাশ নিচ্ছে। কতদিন পর একটা অন্যরকম সন্ধ্যা। যে সন্ধ্যাবেলাটা মনে হয় আমি আছি। বাঁইচ্যা আছি।

একটু পরে ঘোষণা হল মাননীয় সাংসদ রওনা হয়েছেন, এক্ষুণি এসে পড়বেন।

আবার দেশপ্রেম। আওয়াজটা বড়ো বেশি। ওরা পাশাপাশি বসেও নিজেদের কথা শুনতে পারছে না।

আবার মাইকে ঘোষণা হল আসার পথে মাননীয় সাংসদ একটা নবনির্মিত জিম উদ্বোধন করেই সোজা এখানে চলে আসছেন। চারিদিকে উন্নয়নের কাজ চলছে। যে কারণে সামান্য দেরি। আর কিছুক্ষণ ধৈর্য ধরুন। কিন্তু পাবলিক ধৈর্য ধরছে না। চ্যাঁচামেচি শুরু করে দিয়েছে। তখন বিশ্বনাথ মঞ্চে উঠে বলল– আমরা এখনই অনুষ্ঠান শুরু করে দিচ্ছি। তোরণ উদ্ঘাটন-পর্ব সাংসদ এলেই হবে।

এখন উদ্বোধনী সংগীত।

এবারে গুণীজন সংবর্ধনা।

কাজ-করা পাঞ্জাবি পরা ঘোষক হাতে মাইক ধরে বললেন– আমরা কিছুতেই আমাদের অতীতকে ভুলতে পারি না। সেই অতীত সোনালি রুপালি যাইহোক না কেন। সংগ্রামময়। কণ্টকাকীর্ণ পথ বেয়ে আজ আমরা এখানে পৌঁছেছি। এক-পা এক-পা করে এগিয়েছি…। এসব কিছুক্ষণ বকে বলল, এই এলাকার প্রবীণ মানুষ নারায়ণ দাস মহাশয়কে আমরা মঞ্চে ডেকে নিচ্ছি। উনিই সংবর্ধিত করবেন দুই প্রবীণ গুণী মানুষকে। প্রথমে ডাক পড়ল সুখবিলাস বিশ্বাসের। নারায়ণবাবুর হাতে একটা ট্রে ধরল একটা রংচং-করা মেয়ে। নারায়ণবাবু সেই ট্রে-সমেত উত্তরীয়, মানপত্র, মিষ্টির বাক্স তুলে দিল সুখবিলাসের হাতে। সুখবিলাসের মেডেল পাওয়া, কাপ পাওয়া অভ্যাস ছিল। একটা হাত উপরে তুলল, ট্রফি জিতলে যা করে। কিন্তু একটা হাত চোখে। চোখ মুছল।

কিছু বলতে বলা হলে শুধু বললেন– ভাইরে, স্বাস্থ্য, নিয়ম। ডিসিপ্লিন। সৎ হও। আর কিছু না। মরার আগে যেন…

সব গুলিয়ে যাচ্ছে সুখবিলাসের। কী বলতে চাইছেন নিজেই বুঝতে পারছেন না। নেমে গেলেন।

মহামায়ার এরকম হবে না। ওর তো সব লেখা আছে।

এবার অক্ষয় সরখেলের ডাক। বলা হ’ল ওর পক্ষ থেকে সংবর্ধনা গ্রহণ করবেন ওঁর স্ত্রী মহামায়াদেবী।

এইসব শব্দ– যেমন সংবর্ধনা, এইগুলি মহামায়া নামের সঙ্গে যুক্ত হবে, মহামায়া কি কোনওদিন ভেবেছিল?

মহামায়া ট্রে-টা গ্রহণ করছে, এ সময় সাইরেনের হইহই শোনা গেল। সবাই চঞ্চল হয়ে উঠল।

মহামায়া নারায়ণবাবুকে জিজ্ঞাসা করে ভাষণটা। উনি কইয়া দিছিলেন, আমি লিখ্যা আনছি।

মলয় মল্লিক ঘোষকের কানে কিছু বলল।

ঘোষক বলল– সু-সংবাদ। অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি আমাদের মাননীয় সাংসদ এসে গেছেন। আমরা এবার তোরণের দিকে যাব। প্রথমে উনি ফিতে কেটে তোরণদ্বার উদ্বোধন করবেন…

মহামায়া নারায়ণবাবুকে আবার বলল– ভাষণটার কি হইব?

নারায়ণবাবু বলল– অহন নাইব্যা যান ঠাইরেন।

সাংসদ এলেন। মানে এমপি। ওকেই ভোট দিয়েছিল মহামায়া। ওর ছবি দেখেছে দেয়ালে। এই প্রথম সামনাসামনি দেখল। সামনাসামনি কোথায়। দূর থেকে। ওর সঙ্গে আরও ছ’সাত জন নামল। ফুলের তোড়া। মালা। এবার উনি মঞ্চে। সঙ্গে অনেক লোক। পৌরমাতা-পিতা কতজন। এলাকার কত উন্নয়নের কথা জানালেন। চেয়ারম্যান তোরণের অনুদানের জন্য নারায়ণবাবুকে ধন্যবাদ দিলেন। গুণীজনদের নামও বললেন। শুধু অক্ষয় নামটাই ভুল হয়ে গেল।

সাংসদ জানালেন বিপদে-আপদে উনি আছেন। এই এলাকাকে বড়ো ভালোবেসে ফেলেছেন। ছেড়ে যেতে মন চাইছে না, তাই তিনি সহজে মাইক ছাড়বেন না। কত কী হবে বললেন হাজার হাজার চাকরির কথা বললেন, আর বললেন– এই তোরণটা হল অগ্রগতি আর উন্নয়নের দ্বার।

উনি চলে যেতেই মোমো-চোমোর ম্যানেজার স্টেজে উঠে কফি-টফিকে ডেকে নিলেন। তুমুল তালি।

বাড়ি ফিরে আসে মহামায়া। রিকশায়। ভাষণ হ’ল না।

– আইসা গেছ?

– হ।

– কিছু অসুবিধা হয় নাই তো! পড়তে পারছিলা তো ভাষণখান!

– পারছি।

– হাততালি দিছে?

– খুব।

চোখের জল মুছল মহামায়া। ভাগ্যিস উনি দেখতে পেলেন না।

কী দিছে অরা, দেখি?

ট্রে-টা অক্ষয়ের কোলে বসিয়ে হাতটা টেনে ট্রে-র উপর রেখে দেয়। অক্ষয়ের হাতটা স্পর্শ করতে থাকে মাটি খুঁড়ে নিয়ে আসা সব গুপ্তধন। এইটা বুঝি মিষ্টির বাক্স? বাক্সটা তো বেশ বড়োই গো…। এইটা বুঝি রেডিও। দেখছ, কথা রেখেছে কেমন। আর কি হইল? আমি যাইতে পারলাম না বইলা দুঃখ করল না অরা।

– কত দুঃখ করল।

– আরও কও। বর্ণনা কইর‍্যা যাও। রেডিও-র মাইয়াগো মতন কও।

– কী কমু। তোমার কত সুখ্যাতি, কত প্রশংসা, কইল তুমি পাড়ার গৌরব! কইল তুমি কত বড়ো মানুষ।

– কেডা কইল?

– নেতায়।

আইচ্ছা মানপত্রটা দেহি।

মানপত্রটা হাতে তুলে দেয়। একটা রোল করা কাগজ।

কাগজটার গায়ে হাত বুলোলেন অক্ষয়।

– বাধাইয়া রাইখ্যো। নাতনি আইলে দেখামু।

পড় দেহি কি লেখছে।

মহামায়া পড়তে থাকে– হে চির সবুজ, চির নবীন। স্বাস্থ্যই সম্পদ এই মন্ত্রে বিশ্বাসী আপনি। এই অঞ্চলের তরুণদের শরীরচর্চার জন্য আপনি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন একটি ব্যায়ামাগার।

হে বীর…

থেমে যায় মহামায়া।

 

Tags:
COMMENT