সুগন্ধ যখন মৃত্যু পর্ব- ০২

খামটা এক ঝটকায় নিয়ে পিছিয়ে আসে ও। এসবে অপ্রস্তুত লাগে। ফর্মালিটি কোনওদিনই ভালো লাগে না। ওর সরল হাসিটা কস্তুরীর মনের ভয়টা মুছে দেয়। তাই তো এই কদিনে এতটা আপন হয়ে গেছে। নাহলে যার সঙ্গে কোনও রক্তের সম্পর্ক নেই তাকে এভাবে…। নাহ কোনও বাড়াবাড়ি নয়। ও জানে এটুকু ভালো থাকার সলতে হাজার বাধা এলেও ও বাঁচিয়ে রাখবে। যেভাবেই হোক। ও তো কস্তুরীর আপন ভাইও তো হতে পারত?

কস্তুরী তোষকের নীচ থেকে খুব যত্ন করে ভাঁজ করা কাগজের অংশগুলো ছেলেটাকে দেয়।

—করেছ কী। এ তো রচনা পুরো। দেখি কতদিন লাগে পড়তে? একটা চটি বই পড়তে একমাস লাগিয়ে দেয়। মেয়েদের মতো স্নান করতে পাক্কা দুঘন্টা…। যা লেজি আর কী বলব। আমাকে আবার টেকো বলে। আমিও ওর নাম দিয়েছি স্লো ম্যান। নাহলে মে মাসের প্রচণ্ড দুপুরে যখন সবাই তেতে পুড়ে একশা, তখন কেউ ফ্যান বন্ধ করে বসে থাকে? বলে সিলিং ফ্যানের বনবন জোরে ঘোরা ওর মাথার মধ্যে সাঁই সাঁই করে। তুমিই বলো এটা কী রকম? ও যে কী জিনিস হাড়ে হাড়ে টের পাবে। কস্তুরী ডান মুঠিটা উঁচুতে তুলে কিল মারতে যায়। ছেলেটাও একগাল ফিচেল হেসে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে গিয়ে বলে, সোমবার আসব দিদি। রচনাটা লিখিয়ে দিও।

ও জানে বাড়ির অন্যান্যদের শোনানোর জন্য এটুকু বলা। হাসি পায়। নাক টিপলে দুধ বেরোয়। সবে ক্লাস টেন। একেবারে এক্সপার্ট।

বাঁ-হাতে দরজাটা ভেজিয়ে দিয়ে আবার ছিটকিনি দিয়ে দেয়। বলা তো যায় না কেউ যদি এসে পড়ে। বুকের কাছে বালিশটা টেনে উপুড় হয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ে। নাকের কাছে খামটা নিয়ে আসে। কোনও মিষ্টি গন্ধ নেই, তবু আছে। কারুর ওম লেগে আছে যেন। কস্তুরী বুঝতে পারছে। বেশ বুঝতে পারছে সে এসেছে। কথা বলছে। কানের কাছে ফিসফিসিয়ে বলছে, হরিণ।

দুহাতের পাতায় মেলে ধরে একটা রঙিন কার্ড। পুরোটাই হাতে অাঁকা, নিজের হাতে লেখা কথা। খুঁজেপেতেও এতটুকু কৃত্রিমতা পাওয়া যাবে না। নিজের অজান্তেই চোখের পাতা দুটো বুজে আসে ওর। সর্পিল বিন্দুরা ধাপে ধাপে গাল বেয়ে নেমে জড়ো হয় কস্তুরীর ঠোঁটের শেষ প্রান্তে। ভেজা ঠোঁটে নোনতা স্বাদটা নতুন লাগে। হাতে ধরা কার্ডটাকে কাছে এনে ডুবিয়ে রাখে নোনতা জলে। আজ শুধু ভালোবাসার দিন। ভালো থাকার দিন।

( ২ )

সবদিনগুলোতে ভালো থাকা যায় না। সব দিনগুলো ভালোবাসারও হয় না। ঝুপ করে ঘরটা অন্ধকার হয়ে যেতেই ঋজুদার সাঁড়াশির মতো আঙুলগুলো ঘিনঘিনে হয়ে কোমরে আটকে বসবে আগে একটুও বুঝতে পারেনি কস্তুরী।

—কলেজে ভর্তি হলে আর রেহাই নেই। দেখবি কী করে তোকে। কানের কাছে ঠোঁটটা নিয়ে এসে ফিসফিসিয়ে বলে ঋজুদা, যা উঁচু উঁচু বুক তোর। আর গা-টা তো পুরো মাখন। আরও কী কী সব বলেই যাচ্ছিল। বলেই যাচ্ছিল ঋজুদা। কিচ্ছুটি করতে পারছিল না ও। কথা বলার সমস্ত শক্তি হারিয়ে গলাটা শুকিয়ে একটু একটু করে খাদে, অতলে নেমে যাচ্ছিল। নিজেকে ছাড়িয়ে দৌড়ে উঠে যাওয়ার মতো সামযিক নার্ভ সক্রিয়তাও যেন কোনও পঙ্গু মানুষের মতো হয়ে গেছিল মুহূর্তে।

দিদি এমার্জেন্সি টিউব আলোটা আনতে উঠে যেতেই ডানহাতে কস্তুরীর গালটা টিপে ধরে ঠোঁট ডুবিয়ে দিয়েছিল ওর ঠোঁটে।

বাঁ-আঙ্গুলটা তখনও বিলবিলে হয়ে ঘেঁটে যাচ্ছিল ওর প্যান্টের ভেতরে অনেকটা নীচে শরীরের নিম্নাংশে। আরও নীচে…। আরও বেশ খানিকটা নীচে নামতেই শরীরের সব শক্তি ফিরিয়ে আনার চেষ্টায় নিজেকে প্রাণপণ ছাড়িয়ে উঠতে যেতেই,

—বাবু, উঠিস না দাঁড়া। বাপি জেনারেটারটা চালাক। ও ঘরের রংটা কাঁচা আছে। আমরা এখন ওই দিকটায় যেতে পারব না। পায়ে রং লেগে একাকার হয়ে যাবে। বলতে বলতে টেবিলের ওপর একটা সাদা ফ্যাটফ্যাটে আলো এনে রাখে কস্তুরীর দিদি পায়ে।

ঋজুদার আঙুলটাও ওর কোনও নরম অংশে জোর অাঁচড়ে দিয়ে ছিটকে বেরিয়ে আসে শরীর থেকে। কান্নায় বুজে আসে ওর গলা। একতাল বিষ যেন কেউ জমা করে রেখেছে গলার কাছটাতে। ও কাঁদছে। কিন্তু শব্দ করতে পারছে না। একটুও না। গায়ে কুর্তিটা ভয়ে লজ্জায় ঘামে চুপচুপে হয়ে আটকে গেছে পিঠে।

আড় চোখে কস্তুরীর দিকে তাকাতে তাকাতে হাসে ঋজুদা। ভেজা আঙুলের এপিঠ ওপিঠ রুমালে মুছে পায়েলকে বলে, চলি গো। তোমার বাপীর ভরসায় বসে থাকলে তো হবে না। ওদিকে অফিসের একগাদা প্রোজেক্ট পড়ে আছে। সালটে দিতে হবে কালকের মধ্যে। পড়তেও তো আসবে পুচকেগুলো। কটা বাজে বলো তো?

—উফঃ তোমার খালি কাজ আর কাজ। কতদিন বলেছি কাজটা বাদ দিয়ে তবে আমার কাছে এসো। এরপর এমন করলে কিন্তু তোমার সঙ্গে কাট্টি।

—উঁহু কাট্টি কে করতে দিচ্ছে জানেমন? খুব তাড়াতাড়ি তোমাকে নিতেই আসব..।

কস্তুরী বুঝতে পারছিল দিদি আর ঋজুদা পরস্পরের কাছে কতটা ঘন হয়ে এসেছে। আসে এমনটাই আসে ওরা বরাবর। আজ প্রায় চার বছর হল, এভাবেই। কেউ ওদের বাধা দেয় না। বলেও না কিছু। কস্তুরীদের বাড়িতে দিদির বয়ফ্রেন্ড হওয়ায় ঋজুদার একটা আলাদাই জায়গা। দিদি যে আকাশের তারা। যে কখনও কোনও ভুল করতেই পারে না। ঠিক এই তারা শব্দটার ইঙ্গিত করতে করতেই কস্তুরীর বাবা বাড়িতে ঢুকেছিল দিদির মাধ্যমিক পরীক্ষার রেজাল্টের দিন। ছছটা বিষয়ে লেটারসহ স্টার। ভাবা যায়! প্রতিদিন, প্রতিনিয়ত তারার উজ্জ্বলতা একটু একটু করে পিছনে নিয়ে যাচ্ছিল ওকে। কিন্তু আর নয়…। দিদিকে আজকের কথাটা যেভাবে হোক যে-করে হোক বলবেই।

সোফাসেট থেকে উঠতেই মাথাটা টাল খেয়ে যায়। গা-টা গুলিয়ে ওঠে। বেসিনের কাছে ছুটে যায় ও। পেট মুচড়ে কিছু একটা বেরিয়ে আসতে চাইছে যেন, পারছে না। অনেক চেষ্টা করে। একটুও বমি হয় না। কল খুলে দুহাতে মুঠি ভরে চোখেমুখে জলের ঝাপটা দিতে থাকে। গায়ে ভেতরটা রি রি করে উঠছে। বারান্দা দিয়ে চোখ চলে যায় মোড়ের মাথায়। রাস্তা কুপিয়ে একের পর এক বাঁশ পুঁতে প্যান্ডেলের ভিত করছে কাকুগুলো। পুজো আসতে আর মাত্র দেড় মাস। জোলো হাওয়ার ধাক্কায় গোপন ব্যথাটা চিনচিন করে ওঠে।

এই রিভেঞ্জ ড্রামায় বস্তুত চ্যালেঞ্জ নিয়েছেন নওয়াজ

কিছু কিছু চরিত্র সারা জীবনের মতো দাগ কেটে যায় দর্শকদের মনে৷ নওয়াজউদ্দিন সিদ্দিকির ‘হাড্ডি’ ছবিটির এই চরিত্র একেবারেই সেরকম।Nawazuddin Siddique-র আসন্ন এই রিভেঞ্জ ড্রামা Haddi ছবিতে, নওয়াজের লুক দেখে রীতিমতো হতবাক হয়েছিলেন অনুরাগীরা৷ কেউ কেউ একঝলক দেখে চমকে গিয়েছিলেন! লম্বা চুল এবং কড়া মেকআপ-সহ ধূসর গাউন পরা লুকের এই মহিলা,  নওয়াজ নাকি অর্চনা পূরণ সিং?  দু’জনের মধ্যে যেন এতটুকু পার্থক্য নেই।

মেক-আপের ঠিক কতখানি ক্ষমতা, কী কী করতে পারে মেক-আপ– সেটার আন্দাজ বোধহয় আমাদের সকলেরই কম বেশি আছে। একটা মানুষকে আদ্যোপান্ত বদলে  দিতে পারে আধুনিক সময়ের প্রস্থেটিক মেক-আপ। আর সেটা আমরা দেখেছি সাম্প্রতিক ছবি ‘আয় খুকু আয়’ ছবিতে বা ‘গুমনামি’ ছবিতে প্রসেনজিতের ক্ষেত্রে৷ ঋত্বিক চক্রবর্তী  অভিনীত ছবি ‘ভিঞ্চি দা’, আমাদের চোখ খুলে দিয়েছে৷  অমিতাভ বচ্চন অভিনীত ‘পা’, শাহরুখ খানের ‘ জিরো’ ছবিতেওঅনবদ্য মেক-আপ দেখেছি। দর্শকদের এই মেকওভারগুলো রীতিমতো বাকরুদ্ধ  করে দিয়েছিল। তবে উল্লিখিত এই ছবিগুলোই  শুধু নয়, অতীতে আরও বহু ছবিতে এরকম চোখ ধাঁধানো মেক-আপ দেখা গিয়েছে।নারী হিসেবে লুক বদলে এক সময় পর্দায় আলোড়ন তুলেছিলেন কমল হাসান, ‘চাচি ৪২০’ ছবিতে৷উদাহরণ এমন বহু আছে৷

সুতরাং নওয়াজের লুকস নিয়ে বিতর্ক চললেও– আদতে একজন রূপান্তরকামী মানুষের চরিত্রকে বাস্তবিক করে তোলার লক্ষ্যেই এই চ্যালেঞ্জ নিয়েছিলেন নওয়াজ৷ অভিনেতা হিসেবে কতটা সফল হয়েছেন তিনি নিজেকে এই চরিত্রে ফুটিয়ে তুলতে, তা জানতে হলে নতুন বছরের জন্য অপেক্ষা করতে হবে দর্শকদের৷ ছবিটি আপাতত সেন্সরের ছাড়পত্র পেয়ে গিয়েছে৷

এর আগেও ‘হিরোপন্তি’ সিনেমায় এইধরনের একটি চরিত্রে তাঁকে দেখা গিয়েছিল৷তবে, এবারের বিষয় এক্কেবারে আলাদা। তাই নিজেকে দুমড়ে মুচড়ে তৈরি করেছেন তিনি। নওয়াজ জানান, যেহেতু একজন রূপান্তরকামী হিসেবে অভিনয় করছেন, তাই তাঁর সামাজিক দায়-দায়িত্ব অনেকটা।সমাজের কাছে সঠিক বার্তাটা যেন পৌঁছোয়, কারও ভাবাবেগে আঘাত না লাগে৷

এবারের  রূপান্তরকামী চরিত্রটির জন্য নানান ধরনের প্রস্তুতি নিয়েছেন নওয়াজ। সেইসব কথাই শেয়ার করেছিলেন একটি সাক্ষাৎকারে৷ তাঁর কথায়, ‘হাড্ডি ছবিতে অনেক রূপান্তরকামী মানুষের সঙ্গে কাজ করেছি। তাঁদের সঙ্গে থেকেছি, সময় কাটিয়েছি। ওঁরা যেভাবে পৃথিবীটা দেখেন সেটা শুধু আলাদা নয়, খুব আকর্ষণীয়ও বটে! চরিত্রটাকে কাটাছেঁড়া করেছি৷ সব রূপান্তরকামী মানুষ যেমন হন, হাড়ে মজ্জায় সেটাই ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেছি।এটি আমার কাছে স্পেশাল, কারণ এটি আমাকে একজন অভিনেতা হিসাবে বেড়ে উঠতেও সাহয্য করেছে। ’

এই ছবিটি একটি প্রতিশোধের গল্প বলবে। যেটির পরিচালনা করেছেন অক্ষত অজয় শর্মা। ছবির প্রযোজনা করছে জি স্টুডি ও এবং আনন্দিতা স্টুডিও।আপনি অনুমান করতে পারেন যে নওয়াজউদ্দিন এই চরিত্রের জন্য কতটা পরিশ্রম করেছেন। নিজের চরিত্র সম্পর্কে নওয়াজউদ্দিন বলেন- ‘আমি অনেক ভিন্ন এবং আকর্ষণীয় চরিত্রে অভিনয় করেছি, তবে হাড্ডি সবচেয়ে অন্য রকম৷’ আগামী বছর ছবিটি মুক্তি পাবে।

সুগন্ধ যখন মৃত্যু পর্ব-০১

( ১ )

পার্টিকুলার হরিণ নামটা কবে কে রেখেছিল জানে না ও। তবু মাঝে মাঝেই মনে হয় ঠিক ওই সাদামাটা নামটাই বড্ড বেশি উপযুক্ত ওর। ওই নির্দিষ্ট বুনো প্রাণীটার যা কিছু চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ঈশ্বর যেন খুঁজে পেতে ওর মধ্যেই উপচে দিয়েছেন। পটলচেরা মায়াময় চোখ, পাতলা শরীর, আর ছটফটে দুখানা পাতলা কান,

যে-কানে দুনিয়ার যা কিছু খারাপ কেবল একটা জায়গায় দাঁড়িয়ে থেকেই টের পায়, অনুভব করে। কিন্তু গলা ফেঁড়ে বলতে পারে না। কইতে পারে না কস্তুরী।

হ্যাঁ এটাই হরিণের পোশাকি নাম। বাবা দিয়েছেন। তেমন একটা ভালো লাগে না ওর নামটা। নামটার মধ্যে যেন একটা উগ্রতা মিশে আছে। একটা ধারালো উগ্রতা। জন্মের সময় ওর চোখ, মুখ, টিকালো নাক, এমনকী, মাস্ক ডিয়ারের মতো মাড়ির দু-পাশের গজদাঁত দেখেই মনে হয় পিতৃদেব নামকরণ করে ফেলেছিলেন। সত্যি কথা বলতে কী, কস্তুরী তো হরিণেরই অংশ। তবে…? আবার এটাও সত্যি সব হরিণই কিন্তু কস্তুরী হরিণ নয়। ঠিক পরিষ্কার করে বোঝাবার নয়।

একদিক থেকে কস্তুরী নাভির গন্ধই যেমন হিমালয়ে পাদদেশের মাস্ক ডিয়ার নামক পুরুষ হরিণদের সবার থেকে ওদের আলাদা করে, ঠিক তেমনই ওই উগ্র নাভিগন্ধটুকুই তো কখনও কখনও নিরীহ প্রাণীটার প্রাণঘাতী। একথা সবাই জানে, কস্তুরীর সৌন্দর্য‌্য যতই সুন্দর হোক, তার বিনাশের কারণই হল তার অলৌকিক সৌন্দর্য‌্য। চোখের সামনে ভেসে ওঠে কলেজবেলায় পড়া রবি ঠাকুরের লেখা গুটিকতক কথা—

সৃষ্টিকার‌্যের মধ্যে সৌন্দর্য‌্য সর্বাপেক্ষা আশ্চর্য‌্য রহস্যময় কারণ জগত্রক্ষায় তাহার একান্ত উপযোগিতা দেখা যায় না। সৌন্দর্য‌্য অন্ন নহে, বস্ত্র নহে, তাহা কাহারও পক্ষে প্রত্যক্ষরূপে আবশ্যক নহে। তাহা আবশ্যকের অতিরিক্ত দান। তাহা ঈশ্বরের প্রেম। এইজন্য সৌন্দর্য‌্য অতীব আশ্চর্য‌্য রহস্যময়। মানুষ আপন সভ্যতাকে যখন অভ্রভেদী করে তুলতে থাকে তখন জয়ে স্পর্ধায় বস্তুর লোভে তুলতে থাকে যে-সীমার নিয়মের দ্বারা তার অভু্যত্থান পরিমিত। সেই সীমায় সৌন্দর্য‌্য, সেই সীমায় কল্যাণ। সেই যথোচিত সীমার বিরুদ্ধে নিরতিশয় ঔদ্ধত্যকে বিশ্ববিধান কখনওই ক্ষমা করে না। প্রায় সব সভ্যতায় অবশেষে এসে পড়ে এই ঔদ্ধত্য এবং নিয়ে আসে বিনাশ।

অপরকে আকর্ষণ করে নিজেকে মেলে ধরতে চায় না ও। চায় খুব সহজ স্বাভাবিক ভাবে জীবনের ভালোমন্দ খোপগুলো একে একে পেরিয়ে একটা শান্তির ঠিকানা! তাই কস্তুরী নয় উলটে হরিণ বলে বাড়ির কেউ ডাকলে ও মনে মনে খুশি হয়। চোখ বুজে খানিক ভেবে নেয় দিনের ভালোটুকু। কথাগুলো খুব বোকা বোকা তাই না? ও তো বোকাই, নাহলে এভাবে কেউ বারেবারে নিজের মানুষদের কাছে ঠকে…? বুকের ভেতরটা তিরতির করে ওঠে। গুঁড়ি মেরে হৃত্পিণ্ডের কাছে ঘুরঘুর করতে থাকে ভয়টা, সেই ভয়টা যা ওকে সবকিছু থেকে টেনে আনে পিছনের সারিতে।

আজকাল কেড়ে নেবার যুগ, ছিনিয়ে নেবার যুগ। জোর গলায় নিজের অধিকারকে জিইয়ে রাখার যুগ, অন্যের কাছে নিজের প্রযোজনকে জাহির করার যুগ। সেটা যে পারে না, তার কি সত্যি সত্যি এগোনোর স্বপ্ন দেখতে আছে? কিন্তু ভাবনাগুলো কি মনের আগলে বন্ধ করে রাখতে পারবে? যখন ঘরেই এত কিছু ঘটছে। মনটা চঞ্চল হয়ে ওঠে। অস্থির পায়ে জানলার কাছটা দাঁড়ায়।

একতলা থেকে হালকা হাসাহাসি আর শাঁখের ধ্বনি শুনতে পাচ্ছে। বল্টুমামা প্রতিবার এই সময় ঠিক ছুটি নিয়ে সপরিবারে কলকাতা আসেন। সরশুনায় গিয়ে নিজের মা বড়োদাদার সঙ্গে দেখা না করলেও কলকাতা আসেন বোনের বাড়ি, ফোঁটা নিতে। বউ আর ছেলেমেয়েকে ইছাপুর মামির বাপেরবাড়ি রেখে পাতপেড়ে আমোদ করে যান এক সপ্তাহ।

বল্টুমামা রেলের নামজাদা অফিসার। কস্তুরীর মায়ের ছোটো ভাই। পুজোয় ওঠা স্পেশাল শাড়ি আর এককাঁড়ি মিষ্টি নিয়ে হাসিমুখে কস্তুরীদের বাড়ি এসে হাজির হন ঠিক ভাইফোঁটার আগের দিনে। ওর মা-ও সকালের লুচি তরকারি থেকে দুপুরে রাতে রুই মাছের কালিয়া, পাবদার ঝাল, সর্ষে ইলিশ, কষা মাংস, চিকেন রেজালা, দশ টাকা দামের রসগোল্লা, ঘরে পাতা টকদই প্রভতি এলাহি কারবার করে সাজিয়ে দেন ভাইয়ের পাতে।

মা-র কী একবারও বড়োমামার কথা মনে পড়ে না? কতবার জিজ্ঞেস করেছে কস্তুরী। শুনে এসেছে একটাই উত্তর, বড়দার শরীর খারাপ আসতে পারবে না। আমি তাই তো বড়দার জন্য দেয়ালে ফোঁটা দিয়ে দিচ্ছি। তাতেই হবে। এসব তো কথার কথা। ও জানে মনে মনে মা নিজের বড়োদাদাকে চায় না। আসলে বড়োমামা যে অসফল। বড়োমামা যে মুখচোরা। মায়ের জন্য দামি শাড়ির উপহার আনার ক্ষমতা তাঁর নেই।

দাদু রিটায়ার করবার আগে সংসারের বড়ো ছেলেকে রেলের যে-কোনও দফতরে ঢোকাতে চেয়েছিলেন কিন্তু বড়োমামা সেসময় ফুটবল ছাড়া আর কোনও স্বপ্নই দেখতেন না। চাকরি, রোজগার এসবে সিরিয়াস না হওয়ায় একটু একটু করে বড়োমামার বয়সটাও বেড়ে যায়। কিন্তু সময় কি কারও জন্য থেমে থাকে? চাকরি বড়োমামার হাত থেকে পিছলে ছোটোমামার দিকে চলে যায়।

ছোটোমামা রেলের চাকরিতে ঢুকে যান। সেই থেকেই ছোটোমামার টাকায় আর খানিকটা দাদুর পেনশনে দিম্মাকে নিয়ে বড়োমামা নিজের অবিবাহিত জীবন কাটাচ্ছেন। ওর বেশ মনে আছে, শেষবার যখন মামার বাড়ি গেছিল, ফেরার সময় বড়োমামা ওর হাত চেপে ধরে বলেছিল, একদিন তোদের বাড়ি যাব।

ও বুঝতে পেরেছিল মামা এখানে আসতে চায়। কিন্তু পারে না। পারে না তাঁর দুর্বল রোজগারের দিকে চেয়ে পারে না ছোটোবোন ভাইয়ের থেকে পিছিয়ে থাকার লজ্জায়। হোক লজ্জা, হোক পিছিয়ে থাকার ভয় তবু কস্তুরী এইসব মানুষগুলোকে মনে মনে শ্রদ্ধা করে। মনে করে এই পৃথিবীর দূষণে এখনও কিছু মানুষ আছেন, যাঁদের হৃদয়ে আজও দূষণের হদিশ মিলবে না। কোথাও একটা চাপা আনন্দের হদিশ পেয়ে ঝিলমিলিয়ে ওঠে ও। মন বলে, হরিণ তুমি একা নয়, আরও কিছু মানুষ আছেন যাঁরা অনেকটা তোমারই মতো।

আছেই তো…। ইশ অনেকটা সময় নষ্ট করেছে। তৈরি হতে হবে। দরজাটায় ছিটকিনি দিয়ে হলুদ রঙের কুর্তিটা পরে নেয়। কপালের ওপর ঝুঁকে পড়া ছোটো চুলটা ঠিকঠাক করে নেয় আলতো হাতে। এক ফাঁকে অগোছালো ঘরটাকেও গুছিয়ে নেয়। এই সাজটা ওর নিজের জন্য। নিজের ভালোবাসার জন্য। জানে অলক্ষে কেউ তো…। ওর পোশাক, কথা বলার ধরন, থুতনির নীচে ঢেউ খেলে যাওয়া টোলের কথা নাহলে জানবে কী করে ও?

বইয়ে তাক থেকে বার করে আনে চিঠিটা। সাদা পাতায় লেখা চারপাতার একটা লম্বা চিঠি। বাবাঃ লিখতে লিখতে মনেই হয়নি চিঠিটা এতটা বড়ো হয়ে যাবে। এভাবে লিখতে না বসলে কস্তুরী নিজে জানতেই পারত না ওর বুকের ধাপে এত কিছু আটকে রয়েছে। সেই অনেকটা পাঁককাদায় আটকে পড়া মাছগুলো যেভাবে খাবি খায়, বাঁচার জন্য আকুলিবিকুলি করে। তেমনই কথাগুলোও মাথা নীচু করে বসে হাপরের মতো দম নেবার চেষ্টা করছিল। কলমে ভর করে সরসরিয়ে বেরিয়ে এসেছে অক্সিজেনের আশায়।

ও পড়বে তো? নিশ্চয়ই পড়বে। পড়বে বলেই তো…

—দিদি।

ভাবনায় ব্যাগড়া দিয়ে একটা কিশোর গলা ডেকে ওঠে দরজার ওপারে। ঠুকঠাক আঙুলের আঘাত শুনতে পায়।

—আয় আয়।

একটা ছোট্ট সাড়া দিয়ে তাড়াহুড়োয় দরজার দিকে যেতে গিয়ে চটির স্ট্র‌্যাপটা পায়ে আঙুলের ফাঁকে জড়িয়ে যায়। উফঃ। কোনও মতে চটিটাকে সোজা করে দরজা খুলে পর্দা সরায়।

—এহে তুমি দেখছি অনেকক্ষণ অপেক্ষা করছিলে।

—যাহ কী যে বলিস। মুখ নামিয়ে নেয় কস্তুরী। বুঝতে পারে ওর গালদুটো লাল হয়ে উঠছে। ছেলেটা সাংঘাতিক ডেপো। হবে না? নিজেকে সামলে ছেলেটার হাত ধরে টেনে এনে বলে, থাক আর পাকামো করতে হবে না। চুপচাপ পাঁচ মিনিট বসবি। নো বকবক। বুঝলি?

—বুঝলাম। ও দিদি খুব দেরি হবে নাকি? ওদিকে যে-পায়চারি করেই চলেছে, করেই চলেছে একবার বারান্দা একবার ঘর একবার ছাদ আবার একতলা আবার ছাদ কত আর বলব তোমায়? আমি যাওয়া না পর্যন্ত। মুখে দেখায় কিছুই জানতে চায় না। কিন্তু পেটের খিদেটা কি মুখের হাবভাবে ঢেকে রাখতে পারে? আলগা একটা চাঁটি মারে কস্তুরী।

—উফঃ লাগছে।

—বেশ হয়েছে। বলছি না চুপচাপ থাক। আমার সবকিছু ভন্ডুল করে দিবি দেখছি।

টেবিলের ওপর থেকে একটা ১০০টাকার ডেয়ারি মিল্ক, একটা খয়েরি ডায়ারি, পেন আর প্লেটে করে কিছু দূর্বা ধান, মোমবাতি জ্বালিয়ে নিয়ে ছেলেটার সামনে এসে দাঁড়ায়।

ছেলেটা মেঝের দিকে নীচু হয়ে বসতে যেতেই কস্তুরী বলে, খালি মেঝেতে বসতে নেই। আসন নেই এই ঘরে। তুই বরং বিছানাতেই বস। এই যাঃ চন্দনটাই ভুলে গেছি। এখন মায়ের কাছে চাইতে গেলেই যে কী হবে?

—কেলো করেছে। আসল জিনিসটাই ভুলে গেলে? ছাড়ো ছাড়ো। জেঠির কাছে চাইতে হবে না। যা এনেছ তাতেই হবে।

—হবে বলছিস? আমি তো এমন করে কোনওদিন কাউকে ফোঁটা দিইনি চন্দন ছাড়া?

—হ্যাঁ হবে একশোবার হবে। হাজারবার হবে। তুমি শুরু তো করো।

কস্তুরী দুঃখী দুঃখী মুখে প্লেট সমেত মোমবাতিটা ঘুরিয়ে ধান দূর্বা মাথায় দিতে দিতে গেলাসের জলে আঙ্গুল ভিজিয়ে ছেলেটার কপালে দিয়ে বলে ভাইয়ের কপালে দিলাম ফোঁটা যমের দুয়ারে পড়ল কাঁটা। যমুনা দেয় যমকে ফোঁটা, আমি দিই আমার ভাইকে ফোঁটা।

—ও দিদি হল তোমার? দাও দাও কী গিফট দেবে শিগগিরই দিয়ে দাও। আমাকে আবার বেরোতে হবে যে।

—বুঝেছি আমার কাছে এসেই তোর যত তাড়া নিজের দিদি নই তো তাই।

ক্যাডবেরির প্যাকেটটা ছিঁড়ে ছেলেটার মুখে দেয় কস্তুরী। ছেলেটাও নিজের ক্যাডবেরি থেকে খানিকটা কস্তুরীর মুখে পুরে দেয়।

—তুমি আমার নিজের দিদির চাইতেও আপন। হল? অমনি মেয়ে অভিমান। রাগ দেখালে হবে? আমি নিজে কিছু কিনতে পারিনি বটে কিন্তু একখানা যা হেব্বি গিফট এনেছি তোমার জন্য। পুরো চমকে যাবে। বোমকে যাবে। নাও নাও ধরো। একগাল হেসে ছেলেটা ওর হাতে একটা গোলাপি চারকোনা খাম ধরিয়ে দিয়ে ঢিপ করে পেন্নাম ঠোকে।

কন্যাসন্তান হোক আপনার অহংকার – দ্বিতীয় পর্ব

মানুষের আধুনিক হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সমাজকেও হতে হবে আধুনিক। এখনও আমাদের সমাজে কন্যা সন্তানরা উপেক্ষিত, গ্রামে গঞ্জে ছাড়াও বড় বড় শহরেও আজও মানুষ শিক্ষিত হয়েও কন্যা ভ্রূণ নষ্ট করতে উদ্যোগী ভূমিকা পালন করে থাকে। অথচ কেন এই বৈষম্য? আজ আধুনিকতার বুলি আউড়েও মনসিকতায় কিন্তু আধুনিক হতে পারিনি। আধুনিক হয়েছি শুধু ভাষায়, আদব কায়দায়, পোশাকে। পুত্র সন্তান কে নিয়ে যেমন মা বাবার মনে আশার শেষ নেই কারণ সেই কিনা হতে পারে বুড়ো মা বাবার মাথার ছাতা! অথচ এমন ভাবনা মেয়ের জন্যেও ভাবা যায় নাকী? নতুন করে ভাবার সময় এসে গেছে। কন্যা সন্তানই হতে পারে মা বাবার গর্বের কারণ।

লক্ষ্য নির্ধারণ করুন

বিশ্বের দরবারে চোখ রাখলেই বহু আদর্শ ছবি চোখে পড়বে ঠিক যার মতো আপনি মেয়েকে তৈরি করতে চান। লক্ষ্য নির্ধারণ করা মানে শুধু কোনও প্রফেশনই নয়, বরং মানুষ, ব্যক্তিত্ব, মানসিকতা সবকিছুরই বিকাশ ঘটা। এর ফলে একটি শিশু আত্মনির্ভর হয়ে ভবিষ্যতের জন্য নিজেকে তৈরি করতে পারবে।

ছেলের মতো মানুষ করার অভিলাষে অমিত নিজের মেয়ে জীবন নষ্ট করে দিয়েছে, এমন ঘটনাও কিন্তু ঘটছে। আমি ছেলে-মেয়েতে ভেদাভেদ করি না এই মানসিকতায় বড়ো হয়ে ওঠা অমিতের মেয়ে রোশনি আধুনিকতার মুখোশের পিছনে নিজের জীবনটা ছারখার করে দিয়েছে। না কোনও কাজে তার আগ্রহ আছে আর না তো উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হতে পেরেছে সে। ফলে আজ বাবার অবর্তমানে আর্থিক ভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার ক্ষমতাই তার তৈরি হয়নি।

সারাদিন পার্টি, হই-হুল্লোড়, ফূর্তি এবং পরনির্ভরশীল একটা মানুষ রোশনি। নির্ভর করতে নয় বাবাকে দরকার বা স্বামী। এর ফলস্বরূপ আজ শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে ধাক্কা খেতে হচ্ছে রোশনিকে। মেয়েকে অমানুষ তৈরি করার সব দায় শ্বশুরবাড়ি, অমিতের ঘাড়েই চাপিয়ে দিয়েছে।

এখন সকলেরই প্রায় ১টি কি ২টি সন্তান। ছেলেরা বেশি পড়াশোনা করে বাড়ি থেকে দূরে কোথাও চাকরি নিয়ে চলে যাচ্ছে। মানুষ মেয়েদের উপর নির্ভর করছে, আশা করছে মেয়েরাই তাদের বার্ধক্যে সেবাযত্ন করবে। তারা মেয়েদের সংবেদনশীলতা এবং সেবার মনোভাবের পরিপূর্ণ সুযোগ নিচ্ছে। অথচ এই মা-বাবারাই নিজেদের যৌবনে মেয়েকে অন্য পরিবারে বিয়ে দিয়ে পাঠাবেন, এই মানসিকতা নিয়ে বড়ো করেন।

যে-মেয়ে নিজেই অন্যের উপর নির্ভরশীল আর্থিক ভাবে, সে কতদূর পর্যন্ত নিজের মা-বাবাকে সাহায্য করতে পারবে? তবে ধীরে ধীরে সমাজ বদলাচ্ছে সঙ্গে মানুষের চিন্তাভাবনাও।

কিছুদিন আগে পর্যন্ত মেয়েদের হাতের কলম কেড়ে নিয়ে ঘরকন্নায় তাকে ঢুকিয়ে দেওয়া হতো। শিক্ষার আলোর বদলে টেনে নামানো হতো সংসার নামক অন্ধকারের জাঁতাকলে। সেটাই তাদের জীবন, বারবার মনে করানো হতো। তবে আশীর্বাদ এটাই, মানুষ বদলাচ্ছে সচেতনতা বাড়ছে। কন্যাসন্তানের প্রতি মা-বাবা, সমাজেরও ধারণায় প্রভূত পরিবর্তন এসেছে।

এইভাবে করে তুলুন আত্মনির্ভর

  • কন্যাসন্তান হলে তার যেন এটা মনে না হয় মা-বাবা বাধ্য হচ্ছে তার দেখাশোনা করতে। আপনাদের কাছে সে কতটা গুরুত্বপূর্ণ সেটা তাকে বলা এবং বোঝানোটা জরুরি
  • সবসময় ভরসা দিন আপনার বাড়িই ওরও বাড়ি। সেটা আপনার মেয়ে বিবাহিতাই হোক কিংবা নিজে কয়েকটা বাড়ির মালকিনই হোক
  • আত্মীয়স্বজনের মধ্যে বা চেনা পরিচিতির মধ্যে যে-সাফল্য অর্জন করেছে তার কথা, নানা গল্প মেয়েকে বারবার শোনান। কার মতো নিজেকে সে তৈরি করতে পারে সেই পরামর্শও আপনি তাকে দিতে পারেন। মনে রাখবেন আপনার কর্তব্য হচ্ছে তার রাস্তা প্রশস্ত করা, নিজের ইচ্ছা তার উপর চাপিয়ে দেওয়া নয়
  • মানসিক এবং শারীরিক ভাবে মেয়েকে শক্ত করে গড়ে তুলুন সহজে যাতে সে ভেঙে না পড়তে পারে। তাকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা দিন। বিশ্বাস রাখুন আপনি যেটা পছন্দ করেন সেইমতোই সে সিদ্ধান্ত নেবে। যদি সে কোনও ভুলও করে বসে নিরুত্সাহিত করবেন না। বেশি বাধা দিলে বাচ্চা হীনম্মন্যতার শিকার হয়
  • মেয়ে যেটা বলছে মন দিয়ে গুরুত্ব দিয়ে শুনুন। প্রথম থেকেই যদি ওর কথা শোনেন তাহলে মেয়েও আপনার কাছে খুলে বলার অভ্যাস তৈরি হবে। আপনার কথাও সে শুনবে। কথোপকথনের মাধ্যমে ঠিক বেঠিকটাও আপনি তাকে বলতে পারবেন
  • মেয়েকে এমন ভাবে শিক্ষা দিন যাতে সে বুঝতে পারে একটা বয়সের পর তাকে আর্থিক ভাবে পুরোপুরি আত্মনির্ভর হতে হবে। আর্থিক আত্মনির্ভরতা তার মনোবল দৃঢ় করতে সাহায্য করবে। ফলে নিজের জীবনে যে-কোনও সিদ্ধান্ত নিতে নিজে সক্ষম হবে এবং মা-বাবার বার্ধ্যক্যের লাঠিও হয়ে উঠতে পারবে।

সুতরাং কন্যাসন্তানকে মনে করুন অহংকারের বস্তু, তাকে সুশিক্ষা দিন এবং সংবেদনশীল হতে শেখান।

 

কন্যাসন্তান হোক আপনার অহংকার – প্রথম পর্ব

পিয়ালি আজও ভুলতে পারে না কুড়ি একুশ বছর আগের সময়টা। প্রথম সন্তান দীপ্তার পর যখন দ্বিতীয় সন্তানও মেয়ে কোলে এল, তখন শাশুড়িমায়ের কথাগুলো আজও দুঃখ দেয় ওকে, ‘এতে এত আনন্দের কী আছে বউমা। জেনে রাখো ছেলেই হচ্ছে বংশের প্রদীপ, মেয়েরা তো মা-বাবার বোঝা ছাড়া কিছু নয়।’

অথচ আজ যদি শাশুড়ি বেঁচে থাকতেন, দেখতে পেতেন এই দুই মেয়ে মা-বাবাকে কত যত্নে আরামে রেখেছে। পিয়ালি এবং ওর স্বামী দেবাংশুর মনে কিন্তু কন্যাসন্তান নিয়ে এতটুকুও কোনও কালিমা কোনওদিনও ছিল না। বরং বলা যায় দুটি কন্যার মা-বাবা হিসেবে ওরা যথেষ্ট গর্ববোধ করেছে সারাটা জীবন।

২০-২১ বছর পরেও কিন্তু মানুষের মন থেকে কন্যাসন্তানের প্রতি বিতৃষ্ণার মনোভাব সম্পূর্ণ ভাবে মুছে যায়নি।

পরমার মাসিশাশুড়ি বাড়িরই একটি অনুষ্ঠানে সকলের সামনে পরমাকে উদাহরণস্বরূপ তুলে ধরেছিলেন, নিজের ছেলের বউয়ের দ্বিতীয় কন্যাসন্তান জন্মাবার দুঃখ সকলের সঙ্গে ভাগ করে নিতে। পরমা আধুনিকমনস্কা মেয়ে, দুটি মেয়ে একটি কোলে এবং অপরটি সবে ক্লাস ওয়ানে। অনুষ্ঠান বাড়িতে সকলের সামনে হঠাত্ই মাসিশাশুড়ি পরমাকে দেখিয়ে সকলকে বলে বসলেন, ‘আমার ছেলের বউটাও হয়েছে এরই মতো। ঘরে কোথায় নাতি আসবে তা না, আবার দ্বিতীয়টাও মেয়ে। কপাল খারাপ হলে যা হয়।’

সেদিনই পরমা মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেছিল একদিন এই মেয়েদের দেখিয়ে ওনাকে গর্ব করতে বাধ্য করবে সে। বর্তমান সময়ে উপযুক্ত করে মেয়েদের মানুষ করবে যাতে আজ যাদের মনে ওকে নিয়ে আপশোশ রয়েছে, কিছু বছর পর তারাই সেরার মুকুট তুলে ধরতে বাধ্য হবে তার দুই মেয়ের মাথায়। এইভাবেই সে মানুষ করবে তার নিজের রক্তমাংস দিয়ে গড়া দুই মেয়েকে।

পরমা নিজে অত্যন্ত মজবুত এবং পরিণতমনস্ক। সুতরাং তার মেয়েরাও তার মতো হবে এতে অবিশ্বাসের কোনও জায়গা নেই। কথায় আছে, এতটাই নিজেকে শক্ত করে গড়ে তোলো যে, তোমার ছেলে সেই মেয়েদের প্রতিই আকৃষ্ট হবে যারা কিনা তোমার মতো চিন্তাধারায় বিশ্বাসী।

সন্তান পালনের প্রথম শর্ত

ছেলে হোক কিংবা মেয়ে তার পালন-পোষণের প্রথম শর্তই হল সেই মানসিকতা থাকা দরকার যাতে সন্তানকে এতটাই উপযুক্ত করে গড়ে তোলা যায়, যাতে ভবিষ্যতে তাকে যেন কারও উপর বা কোনও জিনিসের উপর নির্ভর করতে না হয়, সেটা আর্থিক হোক কিংবা সামাজিক। অনেক সময় মা-বাবা ভাবেন মেয়েকে যখন বিয়ে দিয়ে অন্য বাড়িতে পাঠাতেই হবে তখন তাকে বেশি পড়াশোনা করিয়ে আর্থিক ভাবে সামর্থ্য করে তোলার কী প্রযোজন? অথচ পুত্রসন্তানকে আর্থিকভাবে যোগ্য করে তুলতে বাড়ির অন্য কোনও কাজ তাকে শেখানোই হয় না, যার ফলে এই কাজের জন্য তাকে অন্যের উপর নির্ভর করতেই হয়। সন্তানের পালন-পোষণ লিঙ্গ নির্ভর না হয়ে বরং আত্মনির্ভর কীভাবে করা যাবে তার উপর জোর দেওয়া উচিত।

অধিকাংশ মা-বাবারাই বলে থাকেন, আমি আমার মেয়েকে ছেলের মতো মানুষ করেছি। আমি ওকে কোনও অংশে ছেলের থেকে কম মনে করি না। তার মানে ছেলেকেই তো বেশি গুরুত্ব দেওয়া হল। ছেলে কি সত্যিই সম্পূর্ণ গুণসম্পন্ন যে মৌখিক কথোপকথনে তাকে বিশেষণ হিসেবে ব্যবহার করা চলে? কত ছেলেই তো বদগুণের অধিকারী হয়, তাহলে কীভাবে আমরা তাকে দৃষ্টান্ত ভাবি?

ঘরের সাদা রঙে শান্তির পরশ

আপনার ঘর, যেখানে আপনি কাটান দিনের একটা দীর্ঘ সময়- তার রং আপনাকে প্রভাবিত করবে না, তাই কি হয়? কোনও রং আমাদের মনকে ফুরফুরে করে তোলে, আবার কোনও রং যেন মুডটাই অফ করে দেয়। মনের ওপর রঙের এই প্রভাব শুধু প্রকৃতিতে বা পোশাকে নয়, সব ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।

দিনের ব্যস্ততা শেষে ক্লান্তি দূর করতে যে-ঘরে আমরা নিজেকে এলিয়ে দিই, সেটা আমাদের শোবার ঘর।Bedroom colour তাই খুবই গুরুত্বপূর্ণ৷ শোবার ঘরের রং হওয়া উচিত হালকা, শান্ত, স্নিগ্ধ ও শীতল। যেন ঘরে ঢুকলেই মন–মেজাজ সতেজ হয়ে যায়। সাদা রং শুদ্ধতা, পবিত্রতা, পরিচ্ছন্নতা, সারল্য ও শান্তির প্রতীক। আপনি যদি খুব স্ট্রেসফুল চাকরি বা কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকেন, তাহলে আপনার বেডরুমে সাদা রংকে প্রাধান্য দিয়ে দেখুন। কিছুক্ষণ পর আর চাপ অনুভব করবেন না।একজন গর্ভবতী মায়ের জন্য সাদা রঙের ঘর একটি আদর্শ ঘর হতে পারে।এছাড়া শোবার ঘরের রং  নীল, সবুজ বা ল্যাভেন্ডারও হতে পারে। এই রংগুলো মনে প্রশান্তির প্রভাব ফেলে বলে মনে করা হয়।তাই Home paints ব্যবহারের আগে ভালো ভাবে ভাবনাচিন্তা করে নিন৷

ঘরের শান্ত সতেজ পরিবেশ বজায় রাখতে উজ্জ্বল সাদা রঙের কোনও জুড়ি নেই। তাই বসার ঘরের ক্ষেত্রেও, সাদা, চাপা সাদা (অফ হোয়াইট), হালকা বেগুনি, সবুজ, লেবু–হলুদ, ফ্রেঞ্চ গ্রে, ক্রিমের মতো ‘শীতল রং’ দেওয়া যেতে পারে। যদি সাদা রংটিকেই বেছে থাকেন, তাহলে ঘরের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারে একটু বেশি নজর দিতে হবে।

বাড়িতে অতিথিদের জন্য যে-ঘরটি থাকবে, তা যেন আপনার রুচির পরিচয় দেয়। হালকা রং এ ঘরের জন্য আদর্শ। ক্যারামেল, কফি বা ক্রিম রং করতে পারেন এ ঘরে।

এছাড়া কোনও স্পেসকে বড়ো দেখাতে হলে, সাদা রঙের জুড়ি নেই। তাই আপনার কোনও ঘর যদি একটু ছোটো হয় তার দেয়ালে দিতে পারেন সাদা রং। ঘরটিকে আবদ্ধ মনে হবে না তাহলে।

মনে রাখবেন, আপনি যখন আপনার ঘরের জন্য কোনও রং পছন্দ করছেন তখন যে-কোনও  একটি রং বেছে নেওয়ার বদলে বেছে নিন ৩ -টি রং। দেয়াল বা ফ্লোরের জন্য বেছে নিন প্রকৃতির কাছাকাছি কোনও রং। আসবাবগুলোকে দিন শীতল রং, আর ঘর সাজানোর বাকি জিনিসগুলো হোক উজ্জ্বল কোনও একটি রঙের। রঙের বৈচিত্র্য যত মানানসই হবে, সে ঘরে শান্তিও তেমনি বজায় থাকবে।

কম্পিউটারে কাজ করলেই চোখে এবং মাথায় ব্যথা শুরু হয়

আমার বয়স ৪০ বছর। রেলে চাকরি করি। কলেজে পড়ার সময় থেকেই চশমা পরতে শুরু করি। কিছু বছর ধরে কনট্যাক্ট লেন্স পরছি। ডান চোখের পাওয়ার ২.৫ আর বাঁ চোখে ৩.৫। অফিসে দেড়-দুঘন্টা কম্পিউটারে কাজ করলেই চোখে এবং মাথায় ব্যথা শুরু হয়ে যায়। খালি মনে হয় বমি পাচ্ছে। এখন আমার কী করা উচিত?

অধিকাংশ মানুষই এখন কম্পিউটারে কাজ করেন। মনিটারের সামনে বসে দীর্ঘসময় কাজ করার অনেক ঝুঁকি রয়েছে। অনেকেই কম্পিউটার ভিশন সিনড্রোম-এ আক্রান্ত হন। চোখের আর্দ্রতা কমে যায় ফলে চোখ লাল হয়ে ওঠে, চুলকোয়। দৃষ্টি আচ্ছন্ন ও ঘোলা হয়ে আসে। একটি বস্তুকে দুটি দেখায় (Double Vision)। এছাড়াও টানা মনিটার-এর দিকে তাকিয়ে কাজ করলে মাথাব্যথা, ঘাড় ও পিঠেও ব্যথা হয়।

আপনার চোখের সমস্যার জন্য উচিত সকাল-সন্ধ্যা রোজ চোখের ব্যায়াম করা। হাতে পেনসিল নিয়ে নাকের সামনে ধরুন। নাক বরাবর পেনসিল রেখে চোখের দৃষ্টি পেনসিলের উপর রাখুন। প্রথমে পেনসিল কাছ থেকে দূরে নিয়ে যান। চোখের দৃষ্টি পেনসিলের উপরেই নিবদ্ধ রাখুন। এরপর পেনসিল আবার কাছে নিয়ে আসুন। এই সোজা ব্যায়ামটি আপনার চোখের পেশিতে শক্তি জোগাবে। এছাড়াও কম্পিউটারে কাজ করতে করতে মাঝেমধ্যেই ব্রেক নেওয়াটা খুবই জরুরি।

কম্পিউটারে কাজ করতে করতে আমরা আশেপাশে সবকিছু ভুলে কম্পিউটারের মধ্যে নিজেদের হারিয়ে ফেলি। ফলে চোখ খোলা-বন্ধ করতেও ভুলে যাই। এর ফলে চোখে জমে থাকা জল চোখের সামনে একটা হালকা পর্দা তৈরি করে, যার জন্য দৃষ্টির পথে বাধা সৃষ্টি হয়। চোখের আর্দ্রতা কম হয়ে যায় এবং চোখ ড্রাই হয়ে যায়। এই Dry eye syndrome থেকে চোখকে বাঁচিয়ে রাখাটা খুব জরুরি। এটার জন্য কাজের মাঝেমাঝে চোখ খোলা-বন্ধ করা খুব দরকার।

দ্বিতীয়ত চোখের পাওয়ার মাঝেমাঝেই চেক করানো উচিত। চেক করানোর আগে অন্তত ৫দিন কনট্যাক্ট লেন্স না ব্যবহার করে চশমা পরে থাকুন। তারপর চোখ পরীক্ষা করান। পাওয়ার চেঞ্জ হলে লেন্স বদলে নিন। হিমোগ্লোবিনও চেক করিয়ে নেবেন। কখনও কখনও অ্যানিমিয়া হয়ে থাকলেও এই লক্ষণগুলি প্রকট হতে দেখা যায়।

 

পারিবারিক বন্ধনেই প্রকৃত সুখ

সুখের খোঁজেই আমরা সবাই ছুটে চলছি। কখনো ভেবে দেখেছেন এটা আসলে কী? এটা কি একটি আবেগ? জীবনের চাহিদা? মনের সাময়িক অবস্থা? নাকি প্রবৃত্তি? আমরা কীসে সুখী হই? আসলেই সুখ বলে কিছু আছে? প্রশ্নগুলোর উত্তর পাওয়া যায় একটু গভীরভাবে আত্মসমালোচনা করলে।

আমরা আমাদের জীবনকালে সাময়িক সুখের জন্য অর্থ-সম্পত্তি অর্জনের পিছনে ছুটে চলি। সাংসারিক জীবনে সুখের কথা বললে সংসার, আত্মীয়, স্বামী-স্ত্রী, বাবা-মা, বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে সুখ খুঁজে বেড়াই। পরিবারে Secrets of happiness তাহলে কী ?

বর্তমান সমাজের মানুষ বিত্ত-সম্পত্তিতে সন্তুষ্ট। আবার অন্যরা তা নয়। অন্য কেউ হয়তো সীমিত আয়ের জীবনযাপনে সন্তুষ্ট। কেউবা আবার দারিদ্র্যেও সন্তুষ্ট। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে অর্থ কি সুখ দিতে পারে?

তা বোধহয় নয়৷ তাহলে অতি দরিদ্র পরিবারেও সুখের ঘাটতি থাকত না৷ আবার অর্থের অভাব নেই কিন্তু সাংসারিক জীবনে সুখ খুঁজে পাচ্ছে না- এমন মানুষও প্রচুর। বর্তমানে সারা বিশ্বে সাংসারিক জীবনে অশান্তি লেগে থাকে পরকীয়া কিংবা স্বামী-স্ত্রীর মনের মিল না থাকলে। Family bonding নেই বললেই চলে৷

আমাদের সমাজে ছেলে-মেয়ের সম্বন্ধ করে বিয়ের আগে, ছেলের অর্থবিত্ত দেখে মেয়ের বিয়ের ব্যবস্থা করা হয়। না হলে বিয়ে হওয়ার পর এই অর্থই সাংসারিক জীবনে দুর্ঘটনার কারণ হয়। সুখ নষ্ট হয় সংসারে অর্থাভাব থাকলে৷ ঘটে বিচ্ছেদ।

অতিরিক্ত বিত্তশালী হলেও আবার আরেক সমস্যা৷ আপনি ভাবতে থাকেন আপনার হাতের মুঠোয় পুরো পৃথিবী। টাকা দিয়ে আপনি জাগতিক সুখ কিনতে চাইবেন। আপনার স্ত্রী অথবা আত্মীয়স্বজন এই টাকার জন্যই আপনাকে ভালোবাসবে। যখন টাকা থাকবে না তখন দূরে সরিয়ে দেবে। কারণ টাকা রোজগারের মোহে পড়ে কোনও আত্মিক বন্ধনই আপনি গড়ে তুলতে বিফল হবেন পরিবারের সঙ্গে৷

অথচ দেখা গেছে একজন মধ্যবিত্ত উপার্জনকারী, স্বল্প রোজগারেও সুখে সংসার করছে।কারণ পরিবারে স্ত্রী-সন্তান, বাবা-মা সকলের সঙ্গেই তার মনের বন্ধন খুব দৃঢ্৷ অর্থ এবং টাকার সুখ সাময়িক। একজন মধ্যবিত্ত ঘরের স্বামী-স্ত্রীর চাহিদা থাকে অল্প। কোনও লোভ-লালসা থাকে না সংসারে। শুধু ভালোবাসার খাতিরে গোটা পরিবারের সঙ্গে সারাজীবন আবদ্ধ থাকে সকলে। সুখের ভিত্তি বিশ্বাস, আস্থা, ভরসা, কৃতজ্ঞতা,  সন্তুষ্টি, তৃপ্তি ও ইতিবাচকতা। দেখা গেছে ছোটোখাটো মনোমালিন্য থাকলেও সেটা খুব  সাময়িক৷ আদতে যৌথ পরিবারেই সুখের গোপন চাবিকাঠি লুকিয়ে আছে৷

জীবনে যা পাওয়া গেছে তা নিয়ে ইতিবাচক ভাবনা, যা পাওয়া যায়নি তা নিয়ে না ভাবা-এটাই হওয়া  উচিত দৃষ্টিভঙ্গী । সব সময় নিজের চেয়ে কম সুবিধাপ্রাপ্ত শ্রেণিকে দেখুন, বেশি সুবিধাপ্রাপ্ত ব্যক্তি, পরিবার ও শ্রেণির সঙ্গে তুলনা করলে, অসন্তষ্টি বাড়বে। আপনার পায়ে জুতো নেই তাই আপনি অসুখী ভাবেন নিজেকে, কিন্তু যার একটি পা নেই তার দিকে তাকালে আপনার অবস্থানটি বুঝতে পারবেন।

আসলে প্রকৃতপক্ষে সুখ হচ্ছে মনের প্রশান্তি। যা চিরসত্য তাই সুন্দর, সেই সত্যের সন্ধানেই থাকুন। সকলের ভালো থাকাতেই সুখ৷ শুধু নিজেরটুকু নিয়ে ভাববেন না৷ কিছু আত্মত্যাগেরও প্রয়োজন আছে৷ গোটা পরিবারটাকে এখসাথে বেঁধে রাখুন৷ সেটাতেই আনন্দ৷ একমাত্র এভাবেই সেই চরম সুখের কাছাকাছি আপনি পৌঁছোতে পারবেন, যা আসলে আপনার মনের ভিতরেই রয়েছে।

শরীরের ফিটনেস হোক লক্ষ্য

শরীরটাকে ফিট রাখতে দরকার Fitness exercise। সুস্থভাবে বাঁচার ও Healthy lifestyle-এর জন্য নিয়মিত শরীরচর্চা জরুরি বলে পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা। সকালে ঘুম থেকে উঠেই ব্যায়াম সেরে ফেলতে পারলে সারাদিন ভাবনা থাকে না৷ একটা নিয়ম তৈরি হয়ে যায়৷ ভোরের মনোরম পরিবেশে হাঁটলে বা ব্যায়াম করলে, শরীর ও মন দুটোই ভালো থাকে। শরীরের নানা অংশে ব্যথা থাকলে সেটাও কমে যায়। পাশাপাশি ওজনকেও নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।

যতই ব্যস্ততা থাক, রুটিন করে নিলে সহজেই প্রয়োজনীয় Daily workout সেরে নেওয়া যায়৷ সুস্থ জীবনযাপন করার জন্য এটা খুব জরুরি।ঘুম থেকে ওঠার আধা ঘণ্টা পর হালকা জগিং বা মর্নিং ওয়াক করুন। তবে অবশ্যই হাঁটার সময় আপনাকে সঠিক গতি বজায় রাখতে হবে। কারণ সঠিক ভাবে না হাঁটলে কোনও উপকারই পাওয়া যাবে না শরীরে।

হাঁটার আছে অনেক উপকারিতা- এর ফলে পেশী সুগঠিত হয়, শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সুরক্ষিত থাকে ও মেরামত হয়, হজমে সাহায্য করে, এবং মস্তিষ্ককেও সতেজ রেখে বার্ধক্য প্রতিরোধ করে।

এর পাশাপাশি হাঁটার ফলে মানুষের চিন্তার সৃজনশীলতা বৃদ্ধি পায়, মেজাজ বা মুড ভালো রাখে এবং স্ট্রেস বা মানসিক চাপ কমাতেও সাহায্য করে।

 

নিয়মিত হাঁটার সুফল

  • হাঁটার ফলে হাড় মজবুত হয়। জয়েন্ট ও মাসল্স টোনড হয়, শরীরে এনার্জি উৎপন্ন
    হয়
  • রক্ত চলাচল মসৃণ হয়, ফলে হৃদযন্ত্র ভালো ভাবে কাজ করতে পারে
  • পাচনতন্ত্র মজবুত হয়
  • রক্তে শর্করার পরিমাণ যাতে যথাযথ থাকে, তার জন্যও হাঁটা জরুরি
  • মেদ ঝরে গিয়ে শারীরিক সৌন্দর্য‌্য বৃদ্ধি পায়, আপনার আত্মবিশ্বাস বাড়বে এর ফলে
  • মগজ ক্রিয়াশীল থাকে, সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়
  • চারপাশের স্নিগ্ধ সবুজ দৃষ্টিশক্তি ভালো রাখে, মনে প্রশান্তি আনে।
  • প্রাতর্ভ্রমণের সামাজিক সুফল
  • হাঁটতে বেরোলে আপনি নিজেও যেমন নিজের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে পারবেন, তেমনই হয়ে উঠতে পারবেন অন্যের আদর্শ
  • প্রকৃতির সংস্পর্শে আসার সুযোগ বাড়বে, মন কলুষতাহীন হয়ে মানুষের জন্য ভালো কিছু করার তাগিদ বাড়বে
  • বহু নতুন বন্ধু পাবেন, যারা আপনার মতো স্বাস্থ্যসচেতন। আপনার সামাজিক পরিমণ্ডল বৃদ্ধি পাবে এবং একটা স্বেচ্ছাসেবার মনোভাব তৈরি হবে
  • আপনি আপডেটেড থাকতে পারবেন নানা বিষয়ে এই মেলামেশার ফলে
  • মতামতের আদানপ্রদান হবার ফলে আপনার দৃষ্টিকোণে স্বচ্ছতা আসবে, সংগঠিত হয়ে কিছু করার ইচ্ছে জাগবে
  • আপনার নানা সমস্যার সমাধানে এগিয়ে আসবেন বহু মানুষ, মনের কথা বলার ও শোনার সঙ্গী হবেন অনেকে
  • জানাশোনার পরিধি বাড়বে, ছোটো ছোটো কূটকচালি বা অশান্তির ঊর্ধ্বে উঠে আধ্যাত্মিক চেতনা ও অন্যান্য বিষয় নিয়ে আলোচনা করার সুযোগ পাবেন
  • আপনি নিয়মিত হাঁটলে আপনার মস্তিষ্ক দীর্ঘদিন সক্রিয় থাকবে। নানা আইডিয়া আপনি হাঁটার সঙ্গীদের সঙ্গে শেয়ার করতে পারবেন এবং মিলিত ভাবে কোনও উদ্যোগে সামিল হতে পারবেন৷

তবে ফিটনেস এক্সারসাইজ করারও একটা নির্দিষ্ট নিয়ম আছে৷ ঘুম থেকে ওঠার পর শরীরটাকে অ্যাকটিভ হওয়ার জন্য অন্তত তিন ঘণ্টা সময় দিন। শরীরের এনার্জি লেভেল স্বাভাবিক অবস্থায় পৌঁছলে তবেই ব্যায়াম করা শুরু করবেন।

জম্মু-কাশ্মীর এবং হিমাচল শেষ পর্ব

সাড়ে নয় ঘন্টা জার্নি করে প্রায় সন্ধে হয়ে গেল ডালহৌসির হোটেলে পেঁছোতে আমাদের। সেই রাতটা খাবার খেয়ে সবাই বিশ্রাম নিলাম। ডালহৌসিতে আমরা তিনরাত দুইদিন ছিলাম। পরদিন সকালে জলখাবার খেয়ে প্রথমে আমরা গেলাম খাজিয়ার। ভারতের মিনি সুইজারল্যান্ড হিসেবে পরিচিত খাজিয়ারের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য‌ মনোমুগ্ধকর। একটি বেশ সুদৃশ্য লেক রয়েছে খাজিয়ারে এছাড়া রয়েছে বিশালাকার নয়টি গলফ কোর্স। খজিয়ারের পর আমরা সাতধারা জলপ্রপাত ও পঞ্চপুলা দেখতে যাই।

সাতধারা জলপ্রপাত স্থানীয় ভাবে গান্ডাক নামে পরিচিত। সাতধারা ঝরনায় সাতটি ঝরনার জল সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১,০৩৬ মিটার উঁচু স্থানে মিলিত হয়ে নীচে নেমে আসে। বলা হয় এর জলে মাইকা বা অভ্র নামক এক পদার্থ রয়েছে, যার ফলে ত্বকের বিভিন্ন রোগের নিরাময় ঘটে।

পাঁচটি ঝরনা ধারার মিলনে পঞ্চপুলা এক অন্যতম পর‌্যটনকেন্দ্র। স্থানীয়দের কাছে পঞ্চপুলা জলের অন্যতম উত্সও বটে।

ডালহৌসির দুটো প্রধান কেন্দ্র, সুভাষচক এবং গান্ধিচক। আমাদের হোটেল ছিল সুভাষচকের কাছে। শেষদিনে আমরা চামেরা লেক দেখে হিমাচলি পোশাক পরে ফটো তুললাম তারপর আমরা সবাই মিলে গান্ধি চকে কেনাকাটার জন্য গেলাম। কেনাকাটা হয়ে গেলে হোটেলে ফিরে গিয়ে রাতের খাবার খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ি। পরদিন সকালে জলখাবার খেয়ে আমরা অমৃতসরের উদ্দেশ্যে যাত্রা করি। দুপুরবেলা অমৃতসরের হোটেলে পৌঁছে গেলাম।

পঞ্জাবের কেন্দ্রস্থলে অমৃতসর একটি বড়ো বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। শহরটিতে শিখ ধর্মের আধ্যাত্মিক গুরু, হরমান্দির সাহেবের বাড়ি, এটি স্বর্ণমন্দির নামেও পরিচিত। আমরা হোটেলে পৌঁছে স্নান খাওয়া সেরে বাসে করে ওয়াগা সীমান্তে যাই। ওয়াগা সীমান্তের অনুষ্ঠানটি সূর‌্যাস্তের দুই ঘন্টা পূর্বে প্রতিদিন সীমান্ত গেটে অনুষ্ঠিত হয়। পতাকা অনুষ্ঠানটি ভারতীয় বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স (বিএসএফ) ও পাকিস্তানের রেঞ্জার্স (পিআর) দ্বারা পরিচালিত হয়। অপূর্ব সুন্দর অনুষ্ঠান দেখে ফিরে এলাম হোটেলে।

পরদিন আমরা সকালে স্নান করে স্বর্ণমন্দির দেখতে গেলাম। অপূর্ব পরিবেশ। মন্দিরের ভিতর ঢুকলে আর বেরোতে ইচ্ছা করে না। স্বর্ণমন্দিরের অন্যতম আকর্ষণ এর প্রসাদ। আসল ঘি দিয়ে তৈরি প্রসাদের গন্ধ মাতোয়ারা করে দেয়। এখানে জাত, ধর্ম, বর্ণ বিশেষে মানুষে মানুষে ভেদাভেদ করা হয় না। স্বর্ণমন্দিরের থেকে খুব কাছেই জালিয়ানওয়ালাবাগ।

১৯১৯সালে ১৩ই এপ্রিল রাওলাট আইনের প্রতিবাদে শান্তিপূর্ণ মিছিলে গুলি চালনার অর্ডার দেন জেনারেল ডায়ার। নির্বিচারে গুলি চালনায় প্রাণ দেন প্রচুর মানুষ। জালিয়ানওয়ালাবাগ এসে মনটা একটু খারাপ হয়ে গেল।

বেড়ানো প্রায় শেষ, পরদিন দশটায় বাড়ি ফেরার ট্রেন। মনের মণিকোঠায় সঞ্চয় করে নিয়ে গেলাম পাহাড়ি রাজ্যের ও অমৃতসরের কিছু অবিস্মরণীয় স্মৃতি।

পড়ার জন্য সীমাহীন গল্প-নিবন্ধসাবস্ক্রাইব