সুগন্ধ যখন মৃত্যু পর্ব-০৫

—এই রে ওরা এসে গেল মনে হয়। কী গো কোথায় গেলে? দ্যাখো না বেরিয়ে শৈবাল ঠিক করে গাড়িটা গ্যারেজ করতে পারছে কিনা। শাশুড়ি চ্যাঁচাতে চ্যাঁচাতে দরজার দিকে এগিয়ে গেল।

—দিদি তুমি একটু এদিকটা দেখো না। হয়ে গেছে সব। আমি চট করে শাড়িটা চেঞ্জ করে আসি।

শ্রেষ্ঠা তড়তড়িয়ে দোতলায় উঠে গেল। বাড়ির গলি থেকে বাকিদের হাসিঠাট্টার আওয়াজ পাচ্ছে। ওরা এসে গেছে। নিজের দিকে তাকানোর সময় কোথায়? রান্নাঘরে তাড়াহুড়ো করে চলে এসেছিল। দুপুরের শাড়িটাও পালটাতে পারেনি। এখন আর সে সময়টা নেই। নীচে ওর ঘর। লোকজন এলে সোনামুখে যে-অবস্থাতেই থাকুক না কেন রিসিভ করতে হয়। কোনওরকম ওজর আপত্তি চলে না। ও সেটা চায়ও না। কিন্তু রান্নাঘরে যদি একটু সুযোগ পেত তাহলে অন্তত রান্নাটা শিখে নিতে পারত। ওতো শিখতে চায়।

কই বড়ো বউমা গেলে কোথায়? কাকুর গলা।

ড্রযিংরুমে একে একে সবাই এসে বসে। ও থাকলে ভালো হতো কস্তুরী মনে মনে ভাবে। শনিবার, আইটিদের ছুটি থাকলেও ওদের অফিসে নেই।

যাও যাও ওদের ঘরে নিয়ে গিয়ে বসাও। এসিটা চালিয়ে দিও কিন্তু। শাশুড়ি বলেন।

আরে তুমি এত ব্যস্ত হচ্ছ কেন? আমরা তো এই সবে এলাম। বসছি তাড়া কীসের? তা তোমার বড়ো ছেলে কখন আসবে? রূপা কাকিমা, বিমলকাকুর স্ত্রী বলেন।

ছেলের আসতে আসতে একটু রাত হয় গো। শ্রেষ্ঠা তোমাদের জন্য একটা স্পেশাল পকোড়া করেছে। মেয়েটা যা ওস্তাদ রান্নায়। ওর বাবা আর আমি জানোই তো হালকা পাতলা খাই, ঝাল মশলা আমাদের পেটে সহ্য হয় না। লোক আসার অপেক্ষায় থাকে মেয়েটা। যখন থেকে শুনেছে তোমরা আসছ আমাকে পাগল করে মারছে, মা কী রান্না করব। আর মা কী রান্না করব বলেই চলেছে। ওর বাবা তো বলল তোমার যা ইচ্ছে।

সত্যি শেলি তোমার শ্রেষ্ঠা তো একেবারে রূপে লক্ষ্মী গুণে সরস্বতী।

হ্যাঁ গো লক্ষ্মীবারে আমার ঘরে এসেছে। দুধ একেবারে উথলে গেছিল। আর ওর সঙ্গে আলাপ হওয়ার পরই তো আমার ছোটোটার মতিগতি ফিরল। সরকারি চাকরি তো পেল। বড়োটার তো তাও হল না।

মা, কাকিমাদের একটু শরবত দিই? জিজ্ঞেস করে কস্তুরী।

ওমা শুধু শরবত দেবে কেন? পাকোড়াগুলো গরম করতে হবে তো। দাঁড়াও দাঁড়াও শ্রেষ্ঠা নামুক ওই করে দেবে। এসিটা অন করেছ?

করেছি মা। ঘাড় নেড়ে বলে ও।

তুমি বরং এদিকটা একটু পরিষ্কার করো তো। এক্ষুণি লক্ষ্মী কাজে আসবে।

ঘর রান্নাঘর গুছিয়ে শুতে শুতে বারোটা বেজে গেছিল। লোক এলে এমনটাই হয়। রান্নার খুব একটা অনুমতি না থাকলেও রান্নাঘর পরিপাটি করার অধিকারটুকু ওর আছে। বিমলকাকুরা নটা নাগাদ বাড়ি ফিরে যায়। তমালের সঙ্গে ওদের দেখা হয়নি। তমালের বাড়ি ঢুকতে ঢুকতে সাড়ে নটা বাজে। সবাই শ্রেষ্ঠার পকোড়ার প্রশংসা করেছে। ওর নিজের যে-হিংসে হয়েছে কথাটা ঠিক তা নয়। কিন্তু ওকে সবকিছু থেকে এতটা দূরে রাখা হয় কেন বুঝতে পারে না কিছুতেই। যে-জায়গাটা ওর আগে প্রাপ্য, যা ওর ন্যায্য সেটাতেও অদ্ভতভাবে শ্রেষ্ঠাকে যেন অনায়াসেই শ্রেষ্ঠ করিয়ে দিচ্ছে বাড়ির সবাই।

তমাল সব শোনে। মাঝে মাঝে ধমকও দেয় ওকে। বলে, বাইরে তো চাকরি করতে বেরোতে হয় না, বুঝবে কী করে কতটা হ্যাপা পোহাতে হচ্ছে রোজ? চুপ করে যায় কস্তুরী। উলটোদিকে পিঠ ফিরিয়ে শুকনো বালিশে উগরে দেয় নিজের যাবতীয় কষ্ট। মনে মনে পুরোনো দিনগুলোর কথা ভাবে। নিজেকে ভালো রাখবার চেষ্টা করে।

তমাল বিয়ে আগে বলেছিল, দেখবে মা ঠিক তোমায় মাথায় নিয়ে থাকবে। পাড়ায় পাড়ায় বলবে আমার বউ এমএ পাশ। একসঙ্গে বুকের তিতিরপাখিগুলো ডানা ঝাপটিয়ে উঠেছিল আনন্দে। এই পরিবার, এই বাবা-মা নতুন করে সবকিছু গড়ার স্বপ্নে মশগুল ছিল এতদিন। কিন্তু ভুল পুরোটাই।

এ বাড়িতে আসার পর বুঝেছে সরস্বতী নয়, লক্ষ্মীর প্রাযোরিটি আগে। বাড়িশুদ্ধু সবাই লক্ষ্মী চায়। সরস্বতী না হলেও চলবে।

যে-বইগুলো বাপের বাড়ি থেকে বয়ে এনেছে সঙ্গে, মনে হয় ওগুলো বদলে ও যদি তাকভর্তি গয়না আনতে পারত তাহলে ওই রান্নাঘরের নির্দিষ্ট জায়গাটা শ্রেষ্ঠা নয়, ও-ই পেত।

আসলে মানুষ চায় সে নিজে কতটা পেল। জ্ঞান বিদ্যা বুদ্ধি হলে সেটা তো ওর মধ্যেই থাকবে। সেটা আর বাইরের লোককে বলে শান্তি পাওয়া যাবে না। বরং টাকাপয়সার ওজন বলার আরামই আলাদা। শ্রেষ্ঠার ফুলশয্যার পরের দিন শাশুড়ি, স্বামীকে বলেছিলেন, এতদিনে আমাদের ব্যাংকের লকারটা একটু ভারী হল বলো। শ্রেষ্ঠার বাপের বাড়ির গয়নাগুলো কী ভারী।

আর কত শুনতে হবে। আর কতটা সহ্য করতে পারবে ও। দুপুরে যখন যে-যার কাজে ব্যস্ত থাকে, ছুট্টে হরিণের মতো পালিয়ে যেতে মন চায় ওর।

গোঁ গোঁ করে মোবাইলটা ভাইব্রেট হচ্ছিল।

অ্যালার্ম।

নতুন বৈবাহিক সম্পর্ক অক্ষয় করুন

বৈবাহিক সম্পর্কে দু’জন মানুষ একে অপরের সঙ্গে থাকতে চায়। তাই তাদের মধ্যে মানসিক মিলটা খুব জরুরি হয়ে পড়ে। সেই একাত্মতায় যখন অপছন্দের কিছু আসে তখনই সমস্যা দেখা দেয়। আর তা ভেঙে যায়। তাই সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার জন্য এমন মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করা উচিত যার সঙ্গে মনের মিল আছে। যার সঙ্গে পছন্দ-অপছন্দগুলো মেলে। বিয়ের আগে এই বিষয়গুলো মাথায় রাখুন। জেনে নিন secrets of happy marriage।

সঙ্গীকে অতিরিক্ত বদলানোর চেষ্টা করবেন না

আপনি ঠিক যেমনটা চান, আপনার সঙ্গীর প্রকৃতি হুবহু সেটা না-ও হতে পারে।তাই বলে তাকে আপনার মতো ধাঁচে গড়ে তুলতে চেষ্টা করবেন না। মনে রাখুন, প্রতিটি মানুষ প্রকৃতিগত ভাবে স্বতন্ত্র।কোনএ কিছু আপনার চোখে খুব বিশদৃস লাগলে, তার সাথে ব্যাপারটি নিয়ে আলোচনা করুন।বুঝিয়ে বললে সে নিজেকে ঠিকই শুধরোবে। এছাড়া সে যেমন আছে, তেমনই তাকে প্রশংসা করুন। সঙ্গী যদি পাল্টাতে না চায় তাহলে জোর করতে যাবেন না। সেটা হতে পারে পোশাক কিংবা আচরন। কারণ, এটির ফলাফল কখনোই শুভ হবে না আপনার সুন্দর সম্পর্কটির পক্ষে।

একে অন্যকে সমর্থন করুন

আপাত দৃষ্টিতে আপনার চোখে না পড়লেও বাস্তবে আরও অনেকের মতনই সম্পর্কের কিছু খুঁটিনাটি বিষয়কে হয়তো আপনিও এড়িয়ে যাচ্ছেন। ব্যাপারগুলো ঠিক চোখে পড়ার মতন না হলেও, এই একেককটি ছোট্ট ছোট্ট ঘটনাই আপনার সম্পর্ককে করে তুলতে পারে সজীব আর প্রাণবন্ত।তাই ছোটো ছোটো সাফল্যতেও পরস্পরকে প্রশংসা করুন, সমর্থন করুন।

নিজেরও মূল্য বুঝুন

পৃথিবীর আর সবার চাইতে আপনি আপনার সঙ্গীর কাছে আলাদা কেন? কারণ এই যে, সে বিশ্বাস করে যে সবকিছু লন্ডভন্ড হয়ে পৃথিবী অন্যদিকে চলে গেলেও আপনি তাকে ছেড়ে যাবেন না। তার পাশে থাকবেন। তাকে বোঝার চেষ্টা করবেন। আর এই বিশ্বাসটুকুই আপনাকে আপনার সঙ্গীর চোখে আলাদা করে তোলে। করে তোলে অনন্য। তাই সেই বিশ্বাসের মর্যাদা দিয়ে সঙ্গীর পাশে থাকুন সবসময়।

মনে রাখবেন marriage and bonding একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। একে অপরকে বোঝান- আপনারা একসঙ্গে থাকবেন বলেই একই পথে চলছেন, তাই নিজেদের সব সমস্যাগুলোকে নিজেদেরই সামলে উঠতে হবে।

স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ নয়

জীবনে প্রেম-ভালোবাসা থাকবেই। ভালোবাসার সম্পর্ক নারী-পুরুষকে অনেক বেশি চাঙ্গা করে রাখে। বলা হয়, সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে ভালোবাসার চেয়ে ভালো উপাদান আর নেই। কিন্তু শুধুমাত্র ভালোবাসা দিয়ে কোনো সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা যায় না।

নারী-পুরুষ উভয়েরই স্বাধীনতাবোধ রয়েছে। স্বাধীন চিন্তা ও নিজের একটি স্বতন্ত্র জগত রয়েছে প্রতিটি মানুষেরই। ভালোবাসার সম্পর্ক এমনই হওয়া উচিত যা পরস্পরের স্বাধীনতা, মূল্যবোধ ও সম্মানের স্থানগুলোকে অক্ষত ও সুরক্ষিত রাখবে।

নিরস্ত্রদের উপর হামলা ও প্রসঙ্গ কাশ্মীর

বিগত এক দশকের সময়কালে, গত কয়েক বছর ধরে আবার কাশ্মীর, পর্যটকদের কাছে একটি রমণীয় টুরিস্ট স্পট হয়ে উঠেছিল। এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যই এই রাজ্যের সম্পদ। বিশেষ করে শীতে বরফে ঢাকা গুলমার্গ, হয়ে ওঠে স্কি প্রেমীদের আদর্শ ডেস্টিনেশন। গ্রীষ্মে টিউলিপ আর নানা ধরনের ফুলের আকর্ষণে জড়ো হয় আবিশ্বের মানুষ৷ সত্যি বলতে কী কাশ্মীরের সৌন্দর্য কখনও পুরোনো হবার নয়৷ আমাদের বহু হিন্দি ছবির পটভূমিকায় এখনও কাশ্মীরের সৌন্দর্য জাজ্ব্যল্যমান৷ কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে মনে হচ্ছে কাশ্মীর আরও একবার হিন্দু-মুসলিম বিবাদের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠছে। Terrorism problems জর্জরিত এই রাজ্য৷

কেন্দ্রীয় সরকার বেশ ধূমধাম করে কিছুদিন আগে কাশ্মীরকে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল বলে ঘোষণা করে, উপরাজ্যপালের উপর দায়িত্ব ন্যস্ত করে ৩৭০ ধারার সংশোধন আইন প্রয়োগ করেছে। এর ফলে Kashmir এখন সম্পূর্ণ রূপে ভারতেরই অঙ্গ। কিন্তু এবছর মে-জুন মাসে ঘটে যাওয়া সন্ত্রাসবাদী ঘটনা আবার কাশ্মীরকে সেই আতঙ্কের দিনগুলিতে ফিরিয়ে দিল। এমনই পরিস্থিতি যে বেড়ানো তো দূর অস্ত, ব্যাবসার কাজে পর্যন্ত মানুষ এখন ওই রাজ্যে পা রাখতে সন্ত্রস্ত। Jammu & Kashmir – এ  সন্ত্রাসবাদীরা বেছে বেছে বহিরাগতদের উপর হামলা চালাচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে নববিবাহিত ব্যাংক কর্মচারী ও তার শিক্ষিকা স্ত্রীয়ের উপর হামলায় মৃত্যুর ঘটনা এই ভয়ের সঞ্চার করেছিল। এছাড়া দু’দিন ছাড়া ছাড়া বোমা-বন্দুকের সন্ত্রাস তো লেগেই আছে!

কোনও প্রদেশ, কোনও জাতি বা কোনও বিশেষ ধর্মের প্রতি বিদ্বেষ-কে ইন্ধন করে রাষ্ট্র চালানো একটি রিস্কি গেম। এদেশের প্রতিটি পাড়ায়, গলিতে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ বসবাস করেন। তাদের পরস্পরের মধ্যে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান হলে, সে আপনি নাগাল্যান্ডেই থাকুন বা কাশ্মীরে– নিরবিচ্ছিন্ন শান্তি বিরাজ করবে। কিন্তু পরস্পরকে বিভাজিত করার নীতি নিলে, তার মাশুল তো দিতেই হবে। কেউ সংরক্ষণ চাইবেন, আর শক্তিশালী চাইবেন আরও ক্ষমতা। যেখানে আমরা খোদ দিল্লির মধ্যেই জাকিরনগর আর শাহিনবাগ অঞ্চলকে পৃথক ভাবতে শুরু করি, সেখানে কাশ্মীরকে এক ও অভিন্ন ভাবব কী করে?

পর্যটন হল বিভিন্নতার মধ্যে সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্ববোধ তৈরির একটি পদক্ষেপ। রাজ্যটির অর্থনীতির একটি আধারও বটে৷ কাশ্মীরের সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠীরা ঠিক সেই কারণেই এই পর্যটনকে শেষ করে দেওয়ার ষড়যন্ত্র করেছে। তাই তাদের নিশানা এবার নিরস্ত্র পর্যটকরা। এখন এটাই দেখার, সরকার আমজনতাকে শান্তি ফিরিয়ে দেওয়ার যে-প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, কার্যত তা কতটা কায়েম করতে পারে।

কবিতীর্থ চুরুলিয়া (দ্বিতীয় পর্ব)

প্রমীলা মঞ্চে প্রদীপ প্রজ্বলনের মধ্যে শুরু হল নজরুল মেলার উদ্বোধন। নজরুল আকাদেমি অতিথি আপ্যায়নের কোনও ত্রুটি করেনি। বিকালে টিফিন, রাতে ডিমের ঝোল ভাত। আর সকালে কোলিয়ারি এলাকার ঘুগনি-মুড়ির একটা ভিন্ন স্বাদ আছে বই-কি!

চুরুলিয়া জুড়ে নজরুলের জন্মদিন থেকে শুরু উৎসব। বাঙালি জাতি সৌভাগ্যবান যে নজরুলের মতো উদার, অসাম্প্রদায়িক, মুক্তমনা ব্যক্তি ও লেখক আমাদের এই রাঢ় বাংলায় জন্মেছিলেন। সাতদিন ধরে চলে নজরুল মেলা। আইসক্রিম থেকে আয়না গ্রামীণ মেলায় যা যা থাকে আর কী। নাগরদোলা থেকে মনিহারি জিনিস, জিলিপি পাঁপড়ভাজা, চপ-তেলেভাজা, ঘুগনি সব কিছু।

নজরুল আকাদেমি লাগোয়া মুজাফ্ফর আহমেদ ভবনে আমাদের ঢালাও রাত্রিবাসের ব্যবস্থা। রাতের খাবার খেয়ে কিছুক্ষণের বিরতি। তারপর আর ঘুম আসেনি। রাতের ঘুম ভুলে রাতভর কবির পৌত্র সুবর্ণ কাজির সঙ্গে জমে গেল গল্প। তার গানে গল্পে দিন আর রাত যেন একাকার হয়ে গিয়েছে।

নজরুলের বংশধর সুবর্ণ কাজীর খোলামেলা আলোচনা। আপনভোলা এই মানুষটির সঙ্গে সারা রাত গল্পে-গানে কেটেছে। সারা রাতের সঙ্গ অনেক অজানাকে খুঁজে পেলাম। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে লালন ফকিরের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন সুবর্ণ কাজী।

কবিতীর্থ চুরুলিয়া আজ সাম্প্রদাযিক সম্প্রীতির এক আদর্শ পীঠস্থান। ভালোবাসার নতুন তীর্থভূমি চুরুলিয়া। চুরুলিয়া গ্রাম তখন গভীর ঘুমে মগ্ন। তবুও আমাদের সঙ্গে রাত জাগবে চুরুলিয়া। আড্ডা দিতে দিতে রাত পোহাল। আকাশ চিরে ভোরের আলো চোখেমুখে। ভোরের পাখির ডাক আর আজানের সুরে তখন ঘুম ভাঙছে চুরুলিয়ার। বেলা দশটা থেকে শুরু দুই বাংলার কবি সম্মেলন।

বাংলাদেশসহ বিভিন্ন জেলার কবিদের কবিতা পাঠ। আমিও প্রমীলা মঞ্চে কবিতা পাঠে অংশগ্রহণ করলাম। আমাদের দেওয়া হল স্মারক সম্মান। এবার ফেরার পালা। চুরুলিয়া অজয়ঘাট থেকে আসানসোলগামী বাসে চড়ে ফিরলাম মন খারাপ-করা বিকালে।

এমন বিদ্রোহী কবির স্মৃতিবিজড়িত স্থান সরকারি উদ্যোগে পর্যটন কেন্দ্র হিসাবে প্রসিদ্ধি লাভ করতে পারে। এখানে রয়েছে নজরুল ইসলামের জন্মভিটা, নজরুল সংগ্রহশালা বা মিউজিয়াম ও ঐতিহাসিক নজরুল স্মৃতিসৌধ। নজরুল সংগ্রহশালায় কবির ব্যবহৃত বিভিন্ন সামগ্রি রয়েছে। রয়েছে খাট, আলমারি, এইচএমভি কোম্পানির দেওয়া নজরুলের গ্রামোফোন, বিভিন্ন পদক ইত্যাদি। তার পাশেই প্রমীলা নজরুল পরিবারের সমাধিক্ষেত্রে ফুলবাগিচা ঘেরা দেয়ালের গায়ে গায়ে কবির বিভিন্ন ছবি আঁকা রয়েছে। স্মৃতিসৌধের সঙ্গে লাগানো হয়েছে প্রতীকী অগ্নিবীণা।

উল্লেখ্য, কবিপুত্র কাজী সব্যসাচী ১৯৭৬ সালে কবির কবরের কিছু মাটি এনে কবিপত্নী প্রমীলা সমাধির পাশে রাখেন। এখন সেখানেই রয়েছে কবির প্রতীকী সমাধি। শ্বেতপাথরের বেদির ওপর কালোপাথর দিয়ে তৈরি। এর উচ্চতা ৩০ ফুট। এই স্মৃতিসৌধের গায়ে উৎকীর্ণ আছে কবির নানা কাব্যের নাম। এই ফুলবাগিচার উদ্যানে রয়েছে নজরুলের বিশাল ব্রোঞ্জের মূর্তি। শিল্পী কাজী হুমাযুন কবির এই মূর্তি তৈরি করেছেন। রাতের আলোয় ঝলমল করে নজরুল সৌধ।

মেলা উপলক্ষ্যে নতুন সাজে সেজেছে সব কিছু। গাঁ উজাড় করে আসছে মানুষজন। নজরুলের লাগানো কবির স্মৃতি বিজড়িত পীর পুকুরের পাড়ের, মারুত আর হারুত নামক গাছ দুটি এখন আর নেই। এটেসেই গাছ যে-গাছে কিশোর কবি চড়তেন। পুকুরটি আজও স্মৃতি উসকে দেয় যেখানে কবি সাঁতার কাটতেন। নজরুল প্রমীলা তোরণ দিয়ে প্রবেশ করলেই বিস্তীর্ণ মেলার মাঠ, কবির স্মৃতি বিজড়িত মক্তব যেখানে কবির প্রথম শিক্ষাজীবন শুরু। যার নাম বর্তমান চুরুলিয়া নজরুল বিদ্যাপীঠ।

এমন একটি স্মৃতি বিজড়িত ঐতিহাসিক স্থান শিক্ষা-সাহিত্য সংস্কৃতির পীঠস্থান পর্যটনের মানচিত্রে সহজে স্থান করে নিতে পারে। যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত করলে ভ্রমণ পিপাসু বাঙালি-সহ দেশ-বিদেশের পর্যটকরা ছুটে আসবে কবিতীর্থ চুরুলিয়া। পাশেই রয়েছে পশ্চিমের ছোটোনাগপুর মালভমি অঞ্চলের প্রাকৃতিক মনোলোভা সৌন্দর্য। সহজে যাওয়া যেতে পারে মাইথন কল্যাণেশ্বরী। বহু বছর ধরে পড়ে রয়েছে আধুনিক যুব আবাস। এখানে পর্যটকদের থাকার ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু দেখে মনে হল নজরুল মেলা ছাড়া বাকি সময় যুব আবাস অব্যবহৃত হয়ে পড়ে থাকে।

কলকাতা-শিয়ালদহ থেকে প্রচুর ট্রেন যায় আসানসোল স্টেশন। স্টেশন থেকে মিলবে অটো কিংবা বাজার বাসস্ট্যান্ড থেকে দোমোহনী চুরুলিয়া বাস রয়েছে। থাকবার জন্য পশ্চিমবঙ্গ সরকারের যুব আবাস। এছাড়া আসানসোলে রয়েছে প্রচুর হোটেল। ঘুরে আসতে পারেন মাইথন ড্যাম, কাল্যাণেশ্বরী মন্দির, ঘাঘরবুড়ি মন্দির।

পশ্চিম বর্ধমানের জেলাশহর ও কোলিয়ারি এলাকার প্রাণকেন্দ্র আসানসোলকে কেন্দ্র করে প্রাকৃতিক সৌন্দর‌্যে ভরপুর নদী-পাহাড় ছুঁয়ে মাইথন, ম্যাসেঞ্জোর ড্যাম আর কবিতীর্থ চুরুলিয়া ঘুরে আসুন। ভ্রমণপিপাসু জীবন-রসিকরা বাংলায় আর একটা শান্তি-নিকেতনের সন্ধান পাবেন নিশ্চিত করে বলা যায়।

 

সুগন্ধ যখন মৃত্যু পর্ব-০৪

( ২ )

চোখ বুজে থাকলেও বাপির চলে যাওয়া টের পেয়েছিল। ওনাকে কী বলবে? একটা প্রাপ্তবয়স্ক মেয়ে হয়ে বাবাকে কোন লজ্জায় বলবে?

ও জানে সেই ছবছর বয়সে যখন সবকিছু বুঝে ওঠার ক্ষমতাই হয়নি। বাপি ঠিক বারোটায় নিজের ট্যাক্সি গ্যারেজ করে রোজ চোখে মুখে জল দিয়ে কস্তুরীকে জাগাত, পড়তে বসাত। মায়ের কাছে কখনও পড়তে বসত না ও। মা যে বরাবর বলত, ওর আদপেই কিছু হবার নেই।

কোনওদিন ভুলতে পারবে না দিনগুলোর কথা। শাখাওয়াত মেমোরিয়ালের ভর্তির মৌখিক পরীক্ষায় যখন ও দুবারের চেষ্টায় বিফল হয়, বাপিই শক্ত হাতে হাল ধরেছিল। অন্য স্কুলে ফর্ম তুলেছিল। রাতে কোনও কোনওদিন বলতেও শুনেছে বাপিকে, দেখো আমি ঠিক পাশ করাব মেয়েটাকে। বড়োটাকে পেরেছি ছোটোটাকে পারব না?

মায়ের আশা ছিল না। তবু বাপি দিনরাত এক করে এমনকী আগের দিন ফুটে শুয়ে ভোরে উঠে লড়াই করে মাল্টিপারপাস স্কুলের ফর্ম তুলে, ৩০০ নম্বরের লেখা পরীক্ষায় পাশ করিয়েছিল ওকে। কিন্তু তারপর…। তারপর কেন সব এলোমেলো হয়ে গেল একে একে? কেন একের পর এক পরীক্ষা, পড়াশোনার বিফলতা কস্তুরীকে পায়ে বেড়ি পরিয়ে পরিবার থেকে শত শত দূরে নিয়ে গেল?

রাত বাড়ছিল। জানলার পাশের কদম গাছটায় কোনও একটা নিশাচর রাত-চেরা ডাক ডেকে যাচ্ছিল। কী পাখি ওটা? মাঝে মাঝে খসখস খটখট করে একটা শব্দ হচ্ছিল, বড়ো ভয় হচ্ছিল কস্তুরীর। তলপেটের কাছটা ফাঁকা ফাঁকা হয়ে রক্তশূন্য মনে হচ্ছিল। দিদি পাশে শুল। ও যে জেগে আছে এটা যেন দিদি কিছুতেই বুঝতে না পারে। নিঃসাড় কাঠ হয়ে থাকে কস্তুরী। মনে জোর আনার চেষ্টা করে, দিদিকে একদিন ঠিক বলবে ও। কিন্তু আজ নয়।

( ৩ )

—আজ তোমাকে রান্নাঘরে ঢুকতে হবে না। শ্রেষ্ঠা সব সামলে নেবে।

—আমি আলুটা একটু কুটে দিই মা? ওর হাতে হাতে একটু হেল্প তো হবে।

—শ্রেষ্ঠা বলে দাও তো কেমন করে কাটবে আলুটা।

—উফঃ দিদি তুমি একটু আলুও কাটতে পারবে না? সত্যি! বেঁকা হেসে কস্তুরীর দিকে তাকায় শ্রেষ্ঠা। সমস্ত উত্সাহ যেন হাতুড়ি মেরে পেছন হাঁটতে থাকে। এগোতে পারে না।

কত ছোটো শ্রেষ্ঠা ওর থেকে, বছর ছয় সাতের তো হবেই। কস্তুরী ওর বড়ো জা। ওকে কথাগুলো বলার সময় মেয়েটার এতটুকু দ্বিধাবোধ নেই! শ্রেষ্ঠা এই বাড়িতে এসে থেকেই কতটা সহজ ভাবে দোষটাকেও ঠিক বলে চালিয়েছে। চালাচ্ছে। কিন্তু ও? সবসময় মনে হয় ভুল করে ফেলবে না তো? এটা করলে কেউ যদি কিছু মনে করে, ওটা করলে কেউ যদি কিছু ভাবে…। দোষ হলে সব কিছুর দায়ভার চিরকালের মতো ওকেই নিতে হবে যে।

আজ বিমলকাকুরা আসবে। মানে পারিবারিক বন্ধু ও তার পরিবার। পুরোনো কলকাতার ও-দিকটায় থাকে। ওরা প্রায়ই আসে। বিমলকাকুর ছেলে ওর হাজব্যান্ডের সমবয়সি। তাই ওদের আলাদা করে একটা বন্ধুত্ব আছে। মাঝে মাঝে এর-ওর বাড়ি আসা যাওয়াও হয়। বিশেষ করে কস্তুরীর বিয়ে হবার পর থেকে নতুন বউকে দেখতে ওরা প্রায়ই আসে।

কস্তুরীদের বাপের বাড়ি এদেশীয়। ছোটোবেলা থেকেই বিশেষ উত্সব অনুষ্ঠান ছাড়া আত্মীয়-স্বজনের তেমন একটা চল ছিল না। কিন্তু তমালদের বাড়ি উলটোটাই। ওরা ওপার বাংলার লোক। কথায় কথায় লতায়পাতায় জড়ানো সম্পর্কগুলোও কাছাকাছি হতে দেখেছে এই কয়েকটা বছরেই। রোজ সন্ধেবেলাতেই কোথা থেকে না কোথা থেকে ঠিক কেউ না কেউ চলে আসে

শ্বশুর-শাশুড়ির সঙ্গে গল্প করতে, চা-মুড়ি খেতে।

মন্দ লাগে না ওর। ছোটোবেলায় মামারবাড়িতে সবার সঙ্গে মিশে মিশে ওর মনটা অমন করেই তৈরি হয়েছিল। বাপি মা কাছে এলেই মনে হতো, এ যেন এক কয়েকঘর। নিজে কম কথা বললেও হাসি কথা গল্প শুনতে ওর ভালো লাগে। ঘরে বেশ একটা জমজমাট ভাব থাকবে, তবেই না। নাহলে যে ঘরে মানুষ আছে বোঝাই যায় না।

নতুন মানুষগুলোর জন্য একটা কিছু অন্তত রান্না করতে ইচ্ছে করছিল। কস্তুরী একটু একটু করে কাচের গেলাসের দিকে এগিয়ে গিয়ে বলে, শরবতটা করি?

—হ্যাঁ করো। আমাদের এখন হাতে একদম সময় নেই। তোমাকে দেখাতে পারব না। দেখো কোনও ভুলচুক করে ফেলো না কিন্তু।

কোথা থেকে জলগুলো ভিড় করে আসছিল চোখে। ঝাপসা চোখে রান্নাঘরের এক পাশে দাঁড়িয়ে আমপান্নার স্কোয়াশ গেলাসে ঢালতে শুরু করে।

৪০-এর পর Breast Cancer-এর ঝুঁকি

সাধারণত ৪০ থেকে ৫০ বছর বয়সি মহিলাদের মধ্যে স্তন ক্যানসারের প্রবণতা বেশি দেখা যায়, এমনই বলছেন বিশেষজ্ঞরা। ৪০ পেরোলেই মহিলাদের শরীরে Breast cancer দেখা দেওয়ার ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক থাকা উচিত।

বয়স্ক মহিলাদের কী কারণে স্তন ক্যানসার হতে পারে, কী ধরনের রিস্ক ফ্যাক্টর কাজ করে, সে সম্পর্কে বেশ কিছু তথ্য জানা গিয়েছে। এই রিস্ক ফ্যাক্টরগুলির জন্যই স্তন ক্যানসারের সম্ভাবনা বাড়ে।Awareness about breast cancer প্রয়োজন৷

সাধারণত একজন মহিলা কোন বয়সে রজঃস্বলা হচ্ছেন এবং কোন বয়সে তাঁর মেনোপজ হচ্ছে, তার ওপর নির্ভর করে তাঁর স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা কতখানি। যেসব মহিলা ১২ বছর বয়স হওয়ার আগেই রজঃস্বলা হন এবং ৫৫ বছর বয়স হওয়ার পর যাঁদের মেনোপজ হ্য়, তাঁদের স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা সামান্য বেশি। কারণ, নারী হরমোন ইস্ট্রোজেন এবং প্রোজেস্টেরনের উপস্থিতি, ঋতুচক্র চলার ফলে শরীরে বেশিদিন থেকে যায়, যা স্তন ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। এছাড়াও, বয়সজনিত অন্যান্য শারীরিক পরিবর্তনও স্তন ক্যানসারের সম্ভাবনা বাড়াতে পারে। বয়স বাড়ার সঙ্গে মহিলাদের স্তনের কোশ ও মাসলের গঠন পরিবর্তিত হয়। এই পরিবর্তনের ফলেও স্তন ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ে।

এবার  care and treatment for breast cancer, জেনে নেওয়া যাক৷ বয়স্ক মহিলাদের ক্ষেত্রে স্তন ক্যানসারের চিকিৎসায় থেরাপি কম্বিনেশেন সংখ্যায় কম হ্য়। ফলে চিকিৎসা পদ্ধতি সহজ হ্য়ে যায়। কিন্তু এক্ষেত্রে যেসব সাইড এফেক্ট হয়, অনেক সময় তা সামলানো কঠিন হয়ে পড়ে।  যদি কারও স্তন ক্যানসার অ্যাডভান্সড স্টেজে বা প্রাথমিক চিকিৎসার সময় পেরিয়ে যাওয়ার পর ধরা পড়ে, সেক্ষেত্রে কেমোথেরাপিই যথাযোগ্য চিকিৎসা পদ্ধতি।

অল্পবয়সিদের তুলনায় অবশ্য বয়স্কদের শরীরে কেমোর পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া বেশি হয়। রোগীর শরীর এই পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া কতখানি গ্রহণ করতে পারছে এবং তাঁর দৈনন্দিন জীবনে তার কী ধরনের প্রভাব পড়বে, তার ওপর ভিত্তি করেই ডাক্তাররা চিকিৎসা পদ্ধতি ঠিক করেন।

স্তন ক্যানসারের সম্ভাবনা রয়েছে কিনা তা জানার জন্য শারীরিক পরীক্ষা দু’ভাবে হতে পারে। বাড়িতেই যে-কোনও মহিলা নিজের স্তন পরীক্ষা করতে পারেন। একে ‘হোম স্ক্রিনিং’ বলে। আবার চিকিৎসক ও নার্সরা হাসপাতাল বা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পরীক্ষা করতে পারেন। একে বলে ‘ক্লিনিক্যাল স্ক্রিনিং’। পারিবারিক ইতিহাস ও ঝুঁকির বিষয়টি খতিয়ে দেখে চিকিৎসকরা ৪০ বছরের বেশি বয়সি মহিলাদের প্রতি দুই থেকে তিন বছর অন্তর ম্যামোগ্রাফি করানোর পরামর্শ দিতে পারেন।

কবিতীর্থ চুরুলিয়া (প্রথম পর্ব)

বিদ্রোহী কবি নজরুল ইসলামের জন্মোত্সব উপলক্ষ্যে সেবার নজরুল মেলায় চুরুলিয়া যাওয়া। আকাশে তখন গনগনে সূর্যের আঁচ। সময় এখানে থমকে যায়। দোমোহনী পার হয়ে বারাবনি রেলগেটে কিছুক্ষণ থমকে যাওয়া। কোলিয়ারি এলাকা। সীমান্ত ছুঁয়ে ঝাড়খণ্ড রাজ্য। কয়লাখাদানের খননের পাথর মাটি প্রায় দিগন্ত ছুঁয়ে কৃত্রিম পাহাড় গড়ে তুলেছে।

পশ্চিম বর্ধমান জেলার জামুড়িয়া ব্লকের অন্তর্গত শান্ত নিরিবিলি পরিবেশে অবস্থিত কাজী নজরুল ইসলামের জন্মভূমি। ঘর্মাক্ত শরীরে অটোতে উঠি। নজরুল আকাদেমি ও নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোগে আযোজিত নজরুল মেলায় আমরা আমন্ত্রিত। এমন সুবর্ণসুযোগ কে ছাড়ে? সবে আমার স্কুলে গ্রীষ্মের ছুটি হয়েছে। ছুটি হলে আজও গ্রামের বাড়ি রাঢ় বাঁকুড়ার দধিমুখায় হাজির হই।

ঋতু পরিবর্তনে যখন চরম গরমে মানুষ মে-জুন মাসে হাঁসফাঁস করছে, তখন পশ্চিমবঙ্গের পশ্চিমি অঞ্চল জুড়ে মাটিফাটা রোদ। তবুও গ্রীষ্মেরও একটা আলাদা অনুভতি আছে বইকি। তাই আজও গ্রীষ্মের রোদ মেখে নিতে গ্রীষ্মাবকাশে গ্রামের বাড়ি ছুটি।

ইচ্ছা ছিল বহুবার, Churulia যাবার। সাধ ছিল কিন্তু সুযোগ হয়নি। সুযোগ তো আসে না সহজে। সুযোগ আসলেই ওত পেতে থাকি।

কবির জন্মভিটা চুরুলিয়ার অভিমুখে আমাদের দুটো অটো ছুটছে। ভরদুপুরে খাঁ খাঁ কোলিয়ারি এলাকার পথ পেরিয়ে আমরা চুরুলিয়ার চৌধুরী পুকুরের কাছে হাজির হলাম। বিদ্রোহী কবির আবক্ষ মূর্তি আর নজরুল মেলার তোরণ আমাদের স্বাগত জানাছে।

দুপুর গড়িয়ে তখন বিকালের লাল মেঘ। শরীর-মনের যেন অহরহ রং বদলে যায়। চুরুলিয়ায় উপস্থিত হলাম আমরা। কবির আঁতুড়ঘর জন্মভিটাতে এখন নজরুল আকাদেমি তৈরি হয়েছে। নজরুল সাংস্কৃতিক সমিতি নজরুলের বসতবাড়ি ভেঙে এখানে ভবন তৈরি করে। ১৯৫৮ সালে গঠিত হয় নজরুল আকাদেমি। রয়েছে কমরেড মুজফ্ফর আহমেদ স্মৃতি ভবন, নজরুল গ্রন্থাগার, সংগ্রহশালা ও মিউজিয়াম।

আমরা যখন কবির স্মৃতিধন্য জন্মভমির মাটিতে পা রাখলাম মাটির ছোঁয়ায় শরীরজুড়ে তখন আনন্দের শিহরণ। চুরুলিয়ার আকাশে-বাতাসে-মাটিতে যেন কবির স্পর্শ খুঁজছি। গাঁয়ের দেয়ালে দেয়ালে কবি কথা, আর উৎকীর্ণ বিভিন্ন স্মৃতিবিজড়িত ছবি ভাস্কর্য, আমাকে যেন অন্য জগতে পৌঁছে দেয় নিমেষে। কার না ভালো লাগে এমন নীরবে নির্জনে পড়ে থাকা ধুলোমাটির দেশে বাউল হতে।

২৬ মে সকাল থেকেই প্রভাতফেরির মধ্য দিয়ে নজরুল মেলার শুভ সূচনা হয়েছে। ওপার বাংলা থেকেও তাদের জাতীয় কবির জন্ম উৎসবে যোগ দিতে হাজির হয়েছেন বহু মানুষ। রয়েছেন শিল্পী, কবি, কলাকুশলীরা। চুরুলিয়ার কাজীপাড়ায় সাজ সাজ রব। সন্ধ্যায় উদ্বোধন হল সাতদিনব্যাপী নজরুল মেলার। বিভিন্ন গুণীজনের উপস্থিতিতে প্রমীলা মঞ্চে সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা।

মুজফ্ফর আহম্মদ ভবনজুড়ে আদিবাসী নৃত্যশিল্পীরা খোঁপায় নানা রঙের ফুল গুঁজে ধামসা-মাদলের তালে তাল দিতে তখন প্রস্তুতি নিচ্ছে। সাঁওতালি নৃত্য আর সঙ্গীতে কবির জন্মভিটা চুরুলিয়া মাদলের তালে তালে কোমর দুলিয়ে আনন্দে মাতোয়ারা। দুই-বঙ্গের এ যেন এক মহামিলন ক্ষেত্র। বিভিন্ন এলাকা থেকে আগত অতিথিরাও নাচ-গানের সুর-তালে কোমর দোলাচ্ছে। আর সেই চলচ্চিত্র মোবাইল-বন্দি করছেন অগুনিত মানুষজন।

 

 

 

শীতে উপাদেয়

এসে গেল শাল-সোয়েটারের দিন৷ শীতের রোদে পিঠ দিয়ে কমলার খোসা ছাড়ানোর দিন৷  আমাদের দেশে শীতকাল মানেই প্রচুর খাওয়া দাওয়া আর ঘোরাঘুরি। যারা রাঁধতে ভালোবাসেন, তারা এই সময় নানা রান্নার এক্সপেরিমেন্ট করতে পারেন৷ বাড়ির কচিকাঁচাদের বড়োদিনের ছুটি পড়ার আগেই একবার এই Winter recipes ট্রাই করেও দেখে নিতে পারেন, যাতে পরের বার রাঁধলে, এর স্বাদটা বেশ যুথসই হয়৷

শীতকালীন সবজি সবারই পছন্দের তালিকায় থাকে। তরতাজা সবজি কৃষকের বাগান থেকে বাজারে আসে। যারা সবজি পছন্দ করে তাদের জন্য এই সময়টা খুবই প্রিয়। হেমন্তের শীতল বাতাসের সঙ্গে সঙ্গে বাজারে শীতের সতেজ শাক-সবজি আসতে শুরু করে। শীতের শাক-সবজি পুষ্টিগুণে ভরপুর। আমাদের শরীরে কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন কিংবা ফ্যাট এর পাশাপাশি মিনারেলস ও ভিটামিনের ভূমিকা অন্যতম।এই প্রয়োজন মেটায় সবজি৷

আজ আমরা এমনই দুটি experimental recipes দিচ্ছি, যা ছোটো বড়ো সবারই পছন্দের Tasty dish হয়ে উঠবে৷

তিলপনির

উপকরণ : ৩০০ গ্রাম পনিরের টুকরো, ২ বড়ো চামচ টম্যাটো সস, ১ বড়ো চামচ রেড চিলি সস, ২ বড়ো চামচ সাদা তিল, ২ বড়ো চামচ আদা-রসুন পেস্ট, স্বাদমতো গোলমরিচগুঁড়ো, স্বাদমতো তেল, নুন প্রয়োজন মাফিক।

প্রণালী : একটা প্যানে তেল গরম করে আদা-রসুন পেস্ট ভালো ভাবে কষে নিন। এবার একটা পাত্রে পনিরের টুকরোর সঙ্গে টম্যাটো ও চিলি সস, নুন ও গোলমরিচগুঁড়ো দিয়ে ভালো ভাবে মেখে নিন। এটা রসুন-পেঁয়াজ ভাজা হলে ঢেলে দিন প্যানে। নাড়াচাড়া করুন ও তিল ছড়িয়ে দিন। গা-মাখা হলে নামিয়ে সার্ভ করুন।

 

কলিফ্লাওয়ার স্প্রেড

Cauliflower Spreadi recipe

উপকরণ : ১০০ গ্রাম ফুলকপি, ২টো কাঁচালংকা, ১ ছোটো চামচ আদাবাটা, ১ ছোটো চামচ তিল, ১ বড়ো চামচ ধনেপাতাকুচি, ১ বড়ো চামচ লেবুর রস, ১ বড়ো চামচ ভাজা তিল, ২ বড়ো চামচ তেল, নুন স্বাদমতো।

প্রণালী : কড়ায় তেল গরম করে আদা, লংকাকুচি, ফুলকপি, তিল ও অল্প নুন দিয়ে রান্না করুন। ফুলকপি নরম করার জন্য সামান্য জল দিতে পারেন। ঢেকে রান্না করুন। এবার সমস্তটাই মিক্সিতে ঢেলে, ধনেপাতা, নুন ও লেবুর রস মিশিয়ে পেস্ট তৈরি করুন। প্যানে অল্প তেল গরম করে এই পেস্ট একটু নাড়াচাড়া করুন, উপর থেকে ভাজা তিল ছড়িয়ে দিন। এবার ব্রেডের সঙ্গে সার্ভ করুন।

সুগন্ধ যখন মৃত্যু পর্ব-০৩

—কী রে এখানে কী করছিস? কাঁধে হাত রাখে দিদি।

আর নিজেকে আটকে রাখতে পারে না। দিদির বুকের ওপরেই আছড়ে পড়ে। ঝুপঝুপিয়ে চোখ ছাপিয়ে নেমে আসে কান্না।

—কী হল বলবি তো? তোর এই কথায় কথায় কান্না ভালো লাগে না আমার। উফ এত ছিঁচকাঁদুনে।

—দিদি…।

—আরে এই তো বসে ছিলিস? বুঝতেই তো পারছি না আমি। পরীক্ষার কোনও খাতা বেরিয়েছে? আবার গাড্ডা খেয়েছিস? আমার নয় তোর বিযোই আগে দিতে হবে। আর উপায় নেই। বাপিকে তাই বলব। তোর যা হাল দেখছি। বেকার টাকাপয়সা খরচা হচ্ছে। ওকে সোজা করে দাঁড় করিয়ে একনাগাড়ে কথাগুলো বলে যায় পায়ে।

—বাবু কী হল রে? দুইবোনে এখানে গল্প করছিস? কত সাধ্য সাধনা করে জেনারেটার চালাল মানুষটা। যা যা পড়তে বস। ঘরের সুইচগুলো ঠিকঠাক জ্বলছে কিনা দেখতে দেখতে বলেন কস্তুরীর মা।

—আর বোলো না। তোমার ছোটো মেয়ে কীর্তি। আবার নিশ্চয়ই কিছু ঘটিয়েছেন। বারান্দায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কাঁদছিল।

—সে আবার কী?

—হ্যাঁ নাহলে আর বলছি কী?

—কতবার তোর বাবা বলে দিদির কাছে পড়তে ইচ্ছে না হয়, ছেলেটার কাছে তো পড়তে পারিস। দাদার মতো ভালোবাসে তোকে। ইংলিশটাও দারুণ শিখবি। যখন বাড়িতে আসছেই সে। একবার যেগুলো বুঝতে পারছিস না, দেখে নিতে কী হয়?

—কী আবার? সেই সময়টায় টিভিতে হিন্দিগান দেখে কাটাবে। ও পড়বে ঋজুর কাছে? তাহলেই হয়েছে? জানো মা। এই তো আমার সাথে দেখা করে গিয়ে একহাতে অফিসের কাজ, আবার ছাত্রদের পড়ানো। ও যা সাংঘাতিক খাটে চিন্তা করতে পারবে না।

—জানি রে। ওর কথাতেই বোঝা যায়। ও কতটা পরিশ্রমী।

আর কী বোঝা যায় কস্তুরী জানে না। হঠাত্ করেই খুব শীত করছিল ওর। চারপাশটা আনকোরা ঠেকছিল। মা, দিদির কথা শুনতে শুনতে বুকের মধ্যেটা দুমড়ে মুচড়ে যাচ্ছিল।

—অ্যাই তুই খুঁড়িয়ে হাঁটছিস কেন রে…? ওর মা চেঁচিয়ে বলে ওঠে।

গলা ঠেলে ভয় উঠে আসে। ও সত্যি খুঁড়িয়ে হাঁটছে? নিজেও বুঝতে পারেনি তো? তাহলে কী সবাই বুঝতে পারছে? বাইরে থেকে সবটা বোঝা যাচ্ছে? ব্যথাটাও বারবার কাঁটা ফোটাচ্ছে গোপন রোমকূপে রোমকূপে।

—কী হল পড়েটড়ে গেছিস কোথাও? হাঁ করে মুখের দিকে কী দেখছিস? আবার বলে কস্তুরীর মা।

—না এমনি…। এতক্ষণ ধরে জড়ো করে রাখা কথাগুলো যেন হঠাত্ পথ হারিয়ে এলোমেলো ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। থই খুঁজে পায় না কস্তুরী। হাঁটুদুটোও কামড়ে ধরছিল। ও আর একটুও না দাঁড়িয়ে পা টেনে টেনে

বাপি-মার ঘর ছাড়িয়ে নিজের ঘরের দিকে এগোয়।

ঘরে এসে কাত হয়ে শুয়েছিল অনেকক্ষণ। খেতে না ওঠায় সবাই সন্দেহ করছিল নিশ্চয়ই ওর স্কুলে কিছু একটা ঘটেছে। হয়তো মা, বাবা, দিদি স্কুলে কীভাবে পাশ করানো যায় তার কিছু জবরদস্ত প্ল্যান খুঁজছিল। সেটা কী? একটুও জানতে ইচ্ছে করছিল না। কী হবে জেনে? ওর কথা নতুন করে বুঝবে কে? শুনবে কে?

এর মাঝেই বাপি এসে একবার মাথায় হাত বুলিয়ে বলেছিল, কী হয়েছে স্কুলে পরিষ্কার বলে দিলেই হয়। নাহলে তো আমাকেই বড়ো দিদিমণি গার্জেন কল করবে। দেখছিস তো কত কষ্ট করে তোদের দুজনকে লেখাপড়াটা শেখাচ্ছি! সারাদিন একটু শোয়া বসার সময় পাই না।

আঠারো বছর হতে চলল। ক্লাস টুয়েলভ। এটুকু বোধবুদ্ধি আছে ওর। নিজের বাবার আর্থিক সমস্যাটা ও জানে।

কিন্তু এটা কিছুতেই জানে না কেন একটা মানুষ ভুরিভুরি নম্বর আনলেই তার সাত খুন মাফ হয়ে যায়? সে কী কোনওভাবেই জীবনে কখনও ভুল সিদ্ধান্ত নেয় না? ভুল কাজ করে না? কথায় কথায় বাপি মা-র মুখের ওপর কথা বলে দিদি, প্রযোজনে অপ্রযোজনে বন্ধু-বান্ধব ঘরে আনে। বছর বছর কলেজের টু্যরে যায়। বাপির হাজার টাকার অসুবিধা হলেও সব জোগাড় হয়ে যায় ওর জন্য। এই তো সেদিন হাজরার একটা কলেজে কত টাকা খরচা করে ভর্তি হল, যেই পার্ক সার্কাসের নামি কলেজটায় নাম উঠল সব টাকা জলাঞ্জলি দিয়ে বড়ো কলেজেই অ্যাডমিশন নিল।

মাথার মধ্যে একটা চাপ চাপ ব্যথা হচ্ছিল। এটা বেশ কয়েকদিন থেকেই লক্ষ করছে। যখনই খুব বেশি করে কিছু ভাবতে চায়, মাথার দুপাশের শিরাগুলো দপদপিয়ে ওঠে। মাথা নীচু করে শুয়ে থাকতে ইচ্ছে হয়। সেদিন স্কুলে ব্যথাটা চাগাড় দেওয়ায় একটা বান্ধবী বলেছিল, তোর মনে হয় মাইগ্রেন হয়েছে, ডাক্তার দেখাস।

পড়াশোনার খরচা করতেই বাড়ির হিমশিম অবস্থা। স্কুলের বাইরে একটা মাত্র অঙ্কের স্যার। তার ওপর নিজের কোনও কিছুর জন্য নতুন করে বলতে ইচ্ছে করে না। শরীর খারাপ শুনলেই বলবে, পড়াশোনার ফাঁকির জন্য কস্তুরী এসব বাহানা করছে। ভালো লাগছে না কিছুই।

ঘরে ঢুকে চাদর টেনে আরও খানিকটা ঢেকে নিয়েছিল নিজেকে। রাস্তার দিকের জানলাটা দিয়ে তখনও অল্প অল্প ঠান্ডা হাওয়া ঢুকছিল ওদের দুইবোনের ঘরে। প্যান্ডেলের আশেপাশে ঘোরাফেরা করা কয়েকটা বাচ্চার গলা ভেসে আসছিল। ওরা বাঙাল বস্তির বাচ্চা। এইসময়ে প্রতি বছরেই ওরা বাঁশ বাঁধা হলে তাতে নারকেল দড়ি ঝুলিয়ে দোলনা করে। দোল খায়। নির্বিঘ্নে, নির্দ্বিধায়। হাত পায়ের পাতা ঠান্ডা হয়ে আসছে চাদর ভেদ করে। এবারে কি শীত এগিয়ে এল? ঠাকুর জলে পড়লে তবেই তো এমনটা হয় শহর কলকাতায়। এত ঠান্ডা লাগছে কেন ওর?

ক্রমশ…

মানুষ জাগবে তবেই কাটবে অন্ধকার

সম্প্রতিক সময়ে মহারাষ্ট্রে  শিবসেনার মহাআগাড়ি বিকাশ জোট থেকে উদ্ভব ঠাকরে-কে ডিফ্যাকশনের দ্বারা ক্ষমতচ্যুত করার ঘটনাটি রাজনৈতিক মহলে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সময়ে আমেরিকার সুপ্রিম কোর্ট গর্ভপাতের সিদ্ধান্তকে অসংবিধানিক বলে রায় দিয়ে এক যুগান্তকারী ফয়সালা শুনিয়েছিল। কিন্তু সত্যি বলতে কি, এ দুটি ঘটনার কোনওটাই কি আমাদের ভারতীয় পরিবারের মা-বোনেদের উপর আক্ষরিক অর্থে কোনও প্রভাব ফেলেছে?

এই ঘটনাগুলি এতটাই রাজনৈতিক অভিসন্ধির নামান্তর যে, সাধারণ জনজীবনে এবং সংসারে এর কোনও প্রভাবই পড়ার কথা নয়।

মহারাষ্ট্রের এই রাজনৈতিক পালাবদলে একটা কথাই প্রমাণিত হয় যে, আপনি এই ক্ষেত্রটাতে কারও উপরেই ভরসা করতে পারবেন না। এখানে যে-কোনও বেতনভুক কর্মচারী, নেতা, মালিক, মন্ত্রী প্রয়োজনে পিছন থেকে ছুরিকাঘাত করতেও উদ্যত হয়। ঘরের শত্রু বিভীষণ কথাটা বারবার প্রমাণিত হয়েছে রাজনীতির পটভূমিকায়। এমন অনেক নেতা ছিলেন এই জোটে, যারা একসময় উদ্ভব ঠাকরের সমস্ত পদক্ষেপে বাহবা দিতেন- আজ তাঁরাই নাম লিখিয়েছেন শত্রু শিবিরে।

যদি দলপতির বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করার মধ্যে অন্যায় না থাকে, তাহলে সংসারে, ননদের তার বউদির ব্যাপারে কূটকচালি করাতেও অন্যায় নেই। ছোটো ভাই, বড়ো ভাইকে ঠকিয়ে সম্পত্তি তছরুপ করাই বা অন্যায্য কেন হবে! উদ্দেশ্য তো একটাই, নিজের ফায়দার জন্য অপরকে বিপাকে ফেলা। একনাথ শিন্ডেও তার ব্যতিক্রম নন।

যথা রাজা, তথা প্রজার মতাদর্শ এদেশে কায়েম হয়। সেই কারণেই একই নাটক মঞ্চস্থ হয় কর্ণাটক, মধ্যপ্রদেশ, গোয়া, অরুণাচলের মতো রাজ্যে। রাজার পদাঙ্কই যদি সংসারে প্রজারা অবলম্বন করেন, তাহলে তা দোষের কোথায়?

আমেরিকার গর্ভপাত বিরোধী রায় প্রসঙ্গে এবার আসা যাক৷ এই রায় প্রমাণ করল যে, মহিলাদের নিজের শরীরের উপরেই কোনও দাবি নেই ।মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে  মহিলারা সন্তান নষ্ট করার সিদ্ধান্তও নিতে পারবে না কারণ সেটা অসংবিধানিক। কাল মহিলাদের উপর যদি পারিবারিক হিংসার ঘটনা ঘটে, তখন হয়তো এটাকেও সমর্থন করা হবে এই বলে যে, সংবিধানে এর বিরুদ্ধে কোনও কথা বলা নেই। কে বলতে পারে একই ভাবে হয়তো ধর্ষণকেও কাল অন্যায় বলে মনে করা হবে না, একই অজুহাত দেখিয়ে!

সত্যি বলতে কী যে-কোনও রাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট যখন এরকম কোনও রায় দেয়,  Social awareness দিয়ে তখন বুঝতে হবে সত্যিই তা সমাজের উপকারে লাগল নাকি অপকারে। আইনি কথার মারপ্যাঁচে একদিকে বলা হল বাবরি মসজিদ ভাঙাটা অপরাধমূলক কাজ হয়েছে, অন্যদিকে রায় দেওয়া হল অযোধ্যার ওই জমিতে রামমন্দির গড়ে তোলার বৈধতা রয়েছে।

ফলে আইনের ফসকা গেরোয় কোনটা বৈধ আর কোনটা অবৈধ বলে বিবেচিত হবে, তা কেউ জানে না। এদেশে স্বাধীনতার পর ৩০ বছর পর্যন্ত গর্ভপাত নিষিদ্ধই ছিল। এখন মহিলারা এই সিদ্ধান্ত নিতে পারেন ঠিকই কিন্তু কাল এই নিয়ে নতুন কোনও রায় দেবে কিনা সুপ্রিম কোর্ট, তা নিশ্চিত করে বলা যায় না।

আসলে মানুষ যদি না জাগে, সচেতন না হয় তার সামাজিক ভালোমন্দের বিষয়ে– তাহলে তাদের মহারাষ্ট্রের পালাবদল আর আমেরিকার ঐতিহাসিক রায় দেখেই সন্তুষ্ট থাকতে হবে। ব্যক্তিগত জীবনের সমস্যাগুলি অধরাই থেকে যাবে।

পড়ার জন্য সীমাহীন গল্প-নিবন্ধসাবস্ক্রাইব