নিরাপত্তা (শেষ পর্ব)

মেয়ের মাধ্যমিক দেবার সময় হল এখনও পুতুল খেলার শখ গেল না। পুরোনো, নতুন কোনও পুতুলই সে ফেলতে রাজি নয়। ছেলেরও একই অবস্থা ভাঙা ব্যাট, ফাটা বলও যেন মহার্ঘ সম্পত্তি।

বাবার কথা মনে হল অরুণালোকের। বাবা বর্তমানে গ্রামের বাড়িতে প্রায় পঁচাত্তর বছর এক ভিটায়। আজও গ্রামের বাড়িতে গেলে চোরকুঠুরি থেকে এক একটা জিনিস বের করে ছেলেকে দেখায় অরুণালোকের বাবা— দ্যাখ, তোর বাবার খেলার জিনিস। মরচে ধরা নাট বলটু, লোহার হাতুড়ি, টিনের বাক্স। বাবা যে কেন এসব ফেলে দেয় না !

বিধান অ্যাপার্টমেন্টের সবাই একে একে দেখা করে যাচ্ছে। সৃজার চোখে জল। ছোটো ফ্ল্যাট বাড়িতে এই এক সুবিধে, সবাই সবাইকে চেনে। দু’-একজন বাদ দিলে সবাইয়ের সঙ্গেই সম্পর্ক মধুর। মজুমদার মাসিমাকে দেখে সৃজা ডুকরে কেঁদে উঠল। অথচ দু’দিন আগেই গাল ফুলিয়ে বলেছিল, ‘সুইমিং পুল আছে, জিম আছে, বাচ্চাদের জন্য আলাদা পার্ক,

চোর-ডাকাতের ভয় নেই, সাপ-ব্যাঙের ভয় নেই, উটকো লোকের বেল বাজানোর ভয় নেই। একেবারে নিরাপদ। জানলা খুললে দূরে দারুচিনি দ্বীপ!”

বাচ্চাদের ছেড়ে কোথাও কিছুক্ষণ যাওয়ার প্রয়োজন হলে এতদিন মজুমদার মাসিমা ভরসা। তিনি শুনে বললেন, “প্রায় সারা জীবনই তো একতলায় কাটালাম রে। এ এলাকায় দেখ না, কত একতলা নিজস্ব বাড়ি। কাকে ক’টা পুলিশ পাহারা দিয়ে রেখেছে বল, ডাকাতির কথা শুনেছিস এখানে এসে?”

এই কথাগুলো অরুণালোকও সৃজাকে বলত। সন্তোষপুরে একতলা-দোতলা বাড়িই বেশি। ওদের তো নিজস্ব সিকিউরিটিও নেই। আমাদের নেপালি দারোয়ান আছে।

কিন্তু সৃজার কানে এসব কথা ঢুকত না। অরুণালোক হাসপাতালে চাকরি করে, তাই শিফটিং ডিউটি করতে হয়। ইভনিং বা নাইট-ডিউটি থাকলে সৃজার টেনশন বেড়ে যায়। জানলাও খুলতে চায় না। ফ্ল্যাট থেকে অদূরে কয়েকটা ছোটো ঘর আছে। ওখানে মদ খেয়ে নিজেদের মধ্যে প্রায়ই ঝগড়া-মারামারি হয়। একদিন সকালে নাইট ডিউটি করে এলে সৃজা বলল, “জানো কাল সারা রাত ঘুমাইনি। ওদের কী ঝগড়া!”

এবার আর লাগোয়া বস্তি নেই। নেই বিরক্তিকর মশা। নেই প্যাকিং-মুভিং-এর খাটুনি। এক কিমিও দূর নয়। লরি করে নিজে হাত লাগিয়ে একদিন যেমন এ ফ্ল্যাটে এসেছিল, তেমনটা ঘটল না এবার। এবার প্রফেশনাল লোক আনা হয়েছে। তারা মসৃণ ভাবে সবকিছু সামলে নিচ্ছে। শুধু কী কী বাদ দিতে হবে তারা তা জানে না। সৃজা একটা পুরোনো ব্লাউজ হাতে নিয়ে তাকিয়েই রইল। কতদিন পরা হয়নি ব্লাউজটা! ভুলেই গেছিল। নেবে কি সঙ্গে? আর কি কোনওদিন পরবে? না, শুধু বোঝা বাড়াবে না। এসেছিল এক লরিতে, এখন যাবে দু-লরি। এরপর কি তিন লরি, চার লরি? আবার কী নিরাপত্তার অভাব হবে? আরও ভালো কোনও নিরাপদ জায়গায় চলে যেতে হবে! কোথায় আছে সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা? অরুণালোক ভাবে।

তিন

পাকা দু-দিন হল স্বর্ণলতায় আসা। অর্ধেকও গোছানো হয়নি। এরই মধ্যে ঠিক উপরের তলার মিসেস গুপ্ত ও সৃজার মধ্যে বেশ ভাব হয়েছে। প্রবীণার সংসারে শুধু স্বামী। ছেলে সিঙ্গাপুরে থাকে। আগে এ ফ্ল্যাটে যারা থাকত, তাদের সঙ্গে মিসেস গুপ্তের যোগাযোগ ছিল সবচেয়ে বেশি। অরুণালোক ভাবল, অসুস্থ স্বামী ছাড়া আপনজন বলতে তো কেউ নেই, না-হয় করলেনইবা একটু বাচালতা। আমাদেরও তো কথা বলার, মেলামেশার লোক চাই। ফ্লোরে তিনটে করে ফ্ল্যাট। পাশের ফ্ল্যাটে থাকেন মিস্টার বিশ্বাস। তিনি মিসেসকে নিয়ে একবার আলাপ করে গেছেন। তবে ঠিক সামনের ফ্ল্যাট তালা বন্ধ। হয়তো বাইরে কোথাও গেছেন।

আজ অরুণালোক ডিউটি যেত না। কিন্তু এক কলিগের জ্বর হওয়ায় ইভনিং ডিউটি করতে হবে। ইনচার্জ ফোনে জানাল। সৃজা খুশি নয়। ডিউটি করতে রাজি হওয়ায় সে বিরক্ত। তবে বাধা দিতে পারবে না। অরুণালোক রেগে যাবে, উলেটাপালটা কথা বলবে, “চব্বিশ ঘণ্টা বসে বসে তোমাদের পাহারা দিলে চলবে!”

আগের ফ্ল্যাট হলে অরুণালোক সাবধান করত — – কোলাপসিবল গেটে ডবল লক করবে। জানলা বেশি খোলা রাখবে না। কেউ কলিংবেল টিপলে জিজ্ঞেস করে দরজা খুলবে… ইত্যাদি। কিন্তু এই সাততলায় কী বলবে অরুণালোক

চার

অরুণালোককে সাধারণত দু-বার কলিংবেল টিপতে হয় না। আজ ইভনিং ডিউটি শেষে বাড়ি ফিরে এল। সৃজার সাড়া পেল এবার, ‘কে?’

—আমি।

তবু যেন দরজা খুলতে সময় লাগল। বিকেলে দেখে যাওয়া মুখের সঙ্গে এ মুখের বিস্তর ফারাক। গোলাপি মুখ রক্তশূন্য ফ্যাকাসে। ভালো খবর বা খারাপ খবর— যাই থাকুক অরুণালোক বাড়ি আসা মাত্রই সৃজা গড়গড়িয়ে সব বলে দেয়। তবে কী বাপের বাড়ি বা শ্বশুরবাড়ির কোনও খারাপ খবর! তাহলে ও তো চুপ থাকার পাত্রী নয়। এ অভিমানের ইঙ্গিতও নয়। কী হল? কথাটা চোখে চোখেই বলল ক্লান্ত অরুণালোক। এবার সৃজার বাঁধ ভাঙল।

—এ ফ্ল্যাট আমাদের মিথ্যে বলে বিক্রি করে গেছে, জানো। তাই এত কম দাম! আমি আর এ ফ্ল্যাটে থাকব না। তুমি কালই বিক্রির ব্যবস্থা করো।

—ঘটনাটা কী?

—গুপ্ত মাসিমা সন্ধেবেলা এসেছিলেন। জানো কী বললেন? শুনলে তুমি তাজ্জব হয়ে যাবে!

—আঃ জানব কী করে!

—আমাদের সামনের ফ্ল্যাটে গত মাসে এক মহিলাকে নৃশংস ভাবে খুন করেছে কেউ! এখনও তার হদিশ পাওয়া যায়নি। সেই থেকে ওটা তালাবন্ধ। দুপুরবেলা ঘটেছে! আমি বাবা কালকেই চলে যাব। অপ্রত্যাশিত ঝটকা।

—ও কোনও ব্যাপার নয়। এই সহজাত ঢঙে সৃজার ভয় তাড়াতে পারল না অরুণালোক।

—শিফটিং করতে তোমার যা খরচ হয়েছে, আমি গয়না বেচে দেব। ফিরে চলো। ওখানে ফ্ল্যাট আর বিক্রি করব না। বরং এটাই আবার বিক্রি করে দাও। দু’-এক লাখ কমে হলেও ছেড়ে দাও।

সে রাতে কখন ঘুমিয়েছিল খেয়াল নেই। সকালে কলিংবেলের শব্দে ঘুম ভাঙল সৃজার। অরুণালোক অঘোরে ঘুমাচ্ছে। প্রশান্ত মুখ, যেন কোনও দুশ্চিন্তা নেই। কলিংবেল মানে দুধ বা কাগজ বা কাজের মাসি। যেই হোক, দরজা খুললেই সামনে আরেকটা দরজা বন্ধ। কিন্তু বায়; নিথর কিন্তু খতরনাক। সৃজা এই দরজার সামনে দাঁড়াতে পারছে না। আগে যারা ছিল, তারাও দাঁড়াতে পারেনি।

অরুণালোকের অফিস যাওয়া বন্ধ। একদিন, দু’দিন, তিনদিন। সৃজার নাছোড়বান্দা ভাব কমলেও পুরোনো ফ্ল্যাটে ফিরে যাওয়ার ইচ্ছে প্রবল। অরুণালোক বোঝায়, সামনের ফ্ল্যাট চিরদিন এভাবে বন্ধ থাকবে না। রহস্য একদিন উন্মোচিত হবেই। দেখবে, হয়তো ওদের পরিচিত কেউ এর সঙ্গে জড়িত। হয়তো ওর স্বামীই লোক লাগিয়ে, হয়তো ওই মহিলাই ভালো ছিল না। সৃজা এসব শোনে না। বেডরুমের জানলা খুলে সবুজ ‘দারুচিনি দ্বীপ’ ‘-এর দিকে তাকিয়ে থাকে।

অরুণালোক পিছনে দাঁড়িয়ে বলে, ‘ছেড়ে এলে আর ফেরা যায় না সৃজা। এখানে কিছুদিন কাটিয়ে দাও। শুনছি বাইপাসের ধারে আরেকটা আশি তলার প্রোজেক্ট হবে। একেবারে নতুন। নো পাস্ট, নো প্রেজেন্ট। অনলি ফিউচার। বলো, কোন ফ্লোরটা তোমার পছন্দ?’

৪৯তম আন্তর্জাতিক কলকাতা বইমেলার উদবোধন ২২ জানুয়ারি, ২০২৬

যাঁরা লেখালেখি করেন কিংবা যাঁরা বই পড়তে ভালোবাসেন, তাঁদের জন্য বইমেলা বয়ে নিয়ে আসে খুশির হাওয়া। আর তাই শারদোৎসবের পরে এই রাজ্যের সবচেয়ে বড়ো উৎসব— আন্তর্জাতিক কলকাতা বইমেলা। সেই বইমেলার জন্য আর বেশিদিন অপেক্ষা করতে হবে না। কারণ, ৪৯তম আন্তর্জাতিক কলকাতা বইমেলার উদবোধন ২২ জানুয়ারি, ২০২৬ এবং এই বইমেলা চলবে ৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ পর্যন্ত। গতকাল কলকাতা-র এক অভিজাত হোটেলে আয়োজিত সাংবাদিক সম্মেলনে জানানো হয়েছে, এবারও আন্তর্জাতিক কলকাতা বইমেলার উদবোধন করবেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সম্মানীয় অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন দেশ ও বিদেশের বিশিষ্ট কবি, সাহিত্যিক ও অন্যান্য গুণীজন। এবারও আন্তর্জাতিক কলকাতা বইমেলা অনুষ্ঠিত হবে সল্টলেক অঞ্চলের বইমেলা প্রাঙ্গনে।

সাংবাদিক সম্মেলনে, আন্তর্জাতিক কলকাতা বইমেলার আয়োজকদের পক্ষ থেকে গভীর কৃতজ্ঞতা জানানো হয় পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী  মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে। কারণ, আয়োজকরা  জানিয়েছেন, মুখ্যমন্ত্রীর সার্বিক সহযোগিতা ছাড়া এই বিশাল উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব নয়। শুধু তাই নয়, বইমেলা প্রাঙ্গণকে সাজিয়ে তোলার জন্য এবং সুন্দর ভাবে আয়োজন করতে সাহায্য করার জন্য কৃতজ্ঞতা জানানো হয়েছে নগরোন্নয়ন দপ্তর, কে এম ডি এ, তথ্য ও সংস্কৃতি বিভাগ, বিধাননগর পুলিশ, কলকাতা পুলিশ, বিধাননগর পৌরসংস্থা সহ পশ্চিমবঙ্গ সরকারের অন্যান্য দপ্তরকে।

উল্লেখ্য, বেশ কয়েক বছর ধরে আন্তর্জাতিক কলকাতা বইমেলা পৃথিবীর বৃহত্তম পাঠকধন্য বই উৎসব। ২০২৫ সালের বইমেলায় এসেছিলেন ২৭ লক্ষ বইপ্রেমী মানুষ, বই বিক্রির পরিমাণ ২৩ কোটি টাকা। মেলার এই অভাবনীয় সাফল্যে আয়োজকরা যেমন আনন্দিত, তেমনই  চিন্তান্বিতও। কারণ, আগামী বইমেলায় অংশগ্রহণের জন্য অনেক নতুন প্রকাশক আবেদন করেছেন। অথচ বইমেলা প্রাঙ্গণের পরিসর এতটুকুও বাড়ানো যায়নি। তদসত্ত্বেও গতবার সামান্য কিছু নতুন স্টল দিতে পেরেছেন আয়োজকরা। তাই অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে জানানো হয়েছে, আগামী বইমেলায় স্টলের সংখ্যা আর বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না।

তবে, আনন্দ প্রকাশ করে জানানো হয়েছে যে, আন্তর্জাতিক কলকাতা বইমেলায় এই প্রথম ফোকাল থিম কান্ট্রি হিসেবে অংশগ্রহণ করছে আর্জেন্তিনা – যে দেশের সঙ্গে ভারত তথা বাংলার অতি নিকট সম্পর্ক। এই অংশগ্রহণের মাধ্যমে দুদেশের মধ্যে পারষ্পরিক সম্পর্ক আরও দৃঢ় হবে বলে মনে করেন আয়োজকরা।

সাংবাদিক সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন ভারতে আর্জেন্তিনা দূতাবাসের দুজন প্রতিনিধি। বইমেলায় ফোকাল থিম হিসেবে অংশগ্রহণের বিষয়ে তাঁরা আনন্দ-উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন।

আগামী ২০২৭ আন্তর্জাতিক কলকাতা বইমেলার সুবর্ণজয়ন্তী। এই উপলক্ষ্যে আয়োজকরা চাইছেন,  যেসব আলোকচিত্রী প্রথম ২০ বছর অর্থাৎ ১৯৭৬ থেকে ১৯৯৬ পর্যন্ত ময়দানে আয়োজিত বইমেলার দুর্লভ সব ছবি তুলেছেন, তাঁদের আলোকচিত্রের একটি প্রতিযোগিতা ও প্রদর্শনী করার ইচ্ছে রয়েছে। এইসব দুর্লভ ও স্মৃতিবিজড়িত আলোকচিত্রের মধ্যে সেরা ১০-টিকে যথাযোগ্য মূল্যে পুরস্কৃত করার কথা জানানো হয়েছে এক প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে। ২০২৬ বইমেলার প্রেস কর্ণারে তাঁদের পাঠানো সব ছবিই মনোনয়ন সাপেক্ষে প্রদর্শিত হবে। আয়োজকদের এও  ইচ্ছে, আগামী সুবর্ণজয়ন্তী বর্ষে এই ছবিগুলি বইমেলার স্মরণিকায় প্রকাশ করার। ই-মেলে স্বচ্ছন্দে সংগ্রহে থাকা যে-কোনও বইমেলার ছবি পাঠাতে পারেন আলোকচিত্রীরা। ছবি পাঠাবার শেষ দিন ১০ ডিসেম্বর ২০২৫।

প্রতিবছরের মতো আগামী ২০২৬ বইমেলায় অংশগ্রহণ করতে চলেছেন গ্রেট ব্রিটেন, আমেরিকা, জার্মানি, অষ্ট্রেলিয়া, ফ্রান্স, স্পেন, পেরু, কলম্বিয়া, জাপান, থাইল্যান্ড এবং লাতিন আমেরিকার অন্যান্য দেশ। আলোচনা চলছে আরও কিছু দেশের সঙ্গে। অন্যান্য বছরের তুলনায় ২০২৬ এ আরও বেশি সংখ্যক দেশের উপস্থিতি আশা করছেন আয়োজকরা। এছাড়া থাকছে ভারতের অন্যান্য রাজ্যের প্রকাশনাও, যেমন দিল্লি, উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, হরিয়ানা, পাঞ্জাব, তামিলনাডু, গুজরাট, মহারাষ্ট্র, বিহার, অসম, ঝাড়খন্ড, কর্ণাটক, ওডিশা এবং ত্রিপুরা। যথারীতি থাকবে লিটল ম্যাগাজিন প্যাভিলিয়ন, চিলড্রেনস প্যাভিলিয়ন ও অন্যান্য আকর্ষণও।

আন্তর্জাতিক কলকাতা বইমেলার অন্যতম আকর্ষণ, কলকাতা লিটারেচার ফেস্টিভ্যাল। অনুষ্ঠিত হবে ২৪ এবং ২৫ জানুয়ারি, ২০২৬।

নিরাপত্তা (পর্ব-০১)

আট বছরের মাথায় আবার একটা ফ্ল্যাট। গ্রাউন্ড ফ্লোর থেকে একেবারে সাততলায়। ছোটো প্রমোটারের, বস্তির পাশ থেকে সরকার-মিলিওনেয়ারের জয়েন্ট ভেঞ্চার। ইএম বাইপাসে বেঙ্গল-ডিসুজার ‘স্বর্ণলতা’ আবাসন। বারো বছরের পুরোনো, কিন্তু অরুণালোকের ঠিক চাহিদা মতো।

আট বছর আগে, নতুন ফ্ল্যাট জীবনের প্রারম্ভে, পরেও সৃজা নিজস্ব বাড়ির পক্ষে ওকালতি ছাড়েনি। তখন কুড়ি লাখে একটা বাড়ি কেনা সম্ভব ছিল না। এখনও না। দাম বেড়ে তিনগুন হয়েছে। তাই ফ্ল্যাটের পক্ষে যুক্তিগুলো মেনে নিয়ে বত্রিশ লাখে আটশো স্কোয়ার ফুট, সাততলায়। ঝুটঝামেলা কম। ব্যালকনি থেকে দেখা যাবে— সবুজ দারুচিনি দ্বীপ!

দশ বছর আগে গ্রামের শ্বশুরবাড়ি ছেড়ে পাকাপাকি ভাবে কলকাতা চলে আসে সৃজা। এক মেয়ে এক ছেলে। অরুণালোক এক কামরা ঘরে ভাড়া থাকত। পালটে দু’-কামরা ঘর নিল। শুরু হল জলের সমস্যা। অন্য ভাড়াটিয়াদের সঙ্গেও বনল না। আরও ভালো পরিবেশে, আরও ভালো ঘর ভাড়া নিতে যা খরচ— অরুণালোক বলল, ‘তার চেয়ে হাউসিং লোন নিয়ে ছোটো ফ্ল্যাট কিনে ফেলি। ঘরভাড়ার খরচে ইএমআই হয়ে যাবে।’

ডাবল বেড, ডাইনিং-কাম-ড্রইং, কিচেন সবই ঠিক, কিন্তু বাজেটে না থাকায়, দু’টো ব্যাপারে ওদের আপোশ করতে হয়েছিল— এক- গ্রাউন্ড ফ্লোর; দুই- একটা বাথরুম। বাথরুমের বিষয়টা ব্যক্তিগত থেকে গেলেও গ্রাউন্ড ফ্লোরের নিরাপত্তাহীনতা ছড়িয়ে পড়ল সৃজার বাপের বাড়ি, অরুণালোকের অফিস, অন্যান্য পরিচিত ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের মধ্যে। আরও এক লাখ পারলে একই সাইডে দোতলায় ফ্ল্যাট হতো ওদের। অরুণালোক রাজিও ছিল, ‘হোয়াইট’ মানি হলে ব্যাংক থেকে আরও লোন নিতে পারত, ডেভেলপার চাইল ‘ব্ল্যাক’-এ।

গ্রাউন্ড ফ্লোর শুনে কেউ কেউ বলত, ‘ভালো করেছ। সিঁড়ি ভাঙা নেই, পাম্প খারাপ হলে উপরে জল তোলার সমস্যা নেই। বোরিং লাগলে চট করে বাইরে এসে একটু পায়চারি করতে পারবে।’

অরুণালোক বা সৃজা যুক্তি খণ্ডন করে বলত, ‘হলেও গ্রাউন্ড ফ্লোরে উলটোপালটা অনেক বেল বাজে। একটু কোথাও বেরোলেও জানলা বন্ধ করে যেতে হয়। ল্যাপটপ, জামা-কাপড় চুরির ভয়।’

গ্রাউন্ড ফ্লোর শুনে যারা বলত, ‘কেন উপরে পেলে না? তাদের সমস্যা না শুনিয়ে ওরা সুবিধার কথা বেশি বেশি বলত। যেমন—গ্রাউন্ড ফ্লোর হলেও পনেরো ফুট ছেড়ে প্রাচীর। দুপুর থেকে সন্ধ্যা অবধি রোদ। বাতাস খেলে। বাইরেটা ব্যবহার করতে পারি। পিছনে ব্যালকনি কেটে গেট বানিয়ে নিয়েছি, ইচ্ছে হলে চেয়ার পেতে বসা যায়। সামনেই কেয়ারটেকারের ঘর। এক ডাকে হাজির। তবু হিতাকাঙ্ক্ষীরা সন্তুষ্ট হয় না। বলে, “তাছাড়া কলকাতায় যা সব ঘটনা শুনি, কেয়ারটেকারকেই বা ভরসা কী!’

অরুণালোক তখন গলা চড়িয়ে জয় ঘোষণা করত, ‘সন্তোষপুরের মতো এলাকায় আড়াই হাজার টাকা স্কোয়ার ফিট, ভাবা যায়! আমি তো প্রথমে ওয়ান বেডরুমের ফ্ল্যাটের কথা ব্রোকারকে বলেছিলাম। তবে চারজনে একটা বাথরুম এই যা প্রবলেম।’

বাইরের লোক যে যাই বলুক বা বাইরের লোককে যাই বলা হোক অরুণালোকেরা এই ফ্ল্যাটে খুশি নয়। এই ‘বিধান অ্যাপার্টমেন্ট’-এর সামনের ফ্ল্যাটগুলো বেশ বড়ো। বিশেষকরে ড্রইং-কাম-ডাইনিং বড়ো হওয়ার জন্য যথেষ্ট খোলামেলা হয়েছে।

সবচেয়ে কম দামের ফ্ল্যাট আমরা নিলাম, এই হীনমন্যতাবোধ প্রতিপদে কুরে খেতে লাগল সৃজাকে। অরুণালোক সান্ত্বনা দিয়ে বলেছিল, “থাক না। প্রায় শূন্য হাতে হাউসিং লোন নিয়ে একটা তো কিনলাম। এটাই ভাড়ায় নিলে মাসে আট হাজার টাকা লাগত। পনেরো বছর ভাড়া গুনলে কত টাকা হিসেব করো। তাছাড়া ভাড়া তো আর সবসময় এক থাকত না, বাড়ত। অথচ নিজের কোনও দিনই হতো না। অল্পদিন গ্রাম থেকে কলকাতায় এসে সাধারণ একটা চাকরির উপর নির্ভর করে একটা ফ্ল্যাট কেনা কি সহজ কথা! আমরা কোথায় ছিলাম, কোথায় এসেছি— সেটা তো ভাবতে হবে। আমার বয়সটাও দেখো, এখানে সবার চেয়ে কম।’

কথাগুলো তো ঠিকই, সৃজা ভাবে। তবু ইনফিরিয়রিটি কমপ্লেক্সে নিজেকে গুটিয়ে রাখে। শুধু তো ফ্ল্যাট কেনা নয়, সাজানোরও বিরাট খরচ আছে। ‘বিধান অ্যাপার্টমেন্ট’-এ ছটা কার স্পেস। সৃজার ইচ্ছা ছিল একটা কিনে রাখে। হয়তো একদিন গাড়ি হবে। তিনটে প্রথমেই বিক্রি হয়ে গিয়েছিল। ক্রমে চার নম্বর, পাঁচ নম্বর। সৃজা মনে মনে চাইছিল

ছ’-নম্বরটা যেন অন্য কেউ না কেনে। একদিন সে ওটা কিনবে। যখন সেটাও বিক্রি হয়ে গেল, বেশ কিছুদিন মন খারাপ ছিল সৃজার। অরুণালোককে অপদার্থ মনে হয়েছিল। মেজাজ খিটখিটে হয়েছিল।

ছ’শো স্কোয়ার ফুটের একটা ফ্ল্যাট হল তো মন মতো সাজানো গেল না। অথচ এই ফ্ল্যাট কেনার আগে ভাড়া বাড়িতে থাকতে ঘর সাজানোর কথা বললে অরুণালোক বলত, ‘এ ঘর আর কী সাজাব। ফ্ল্যাট কিনি তারপর দেখো।’ ফ্ল্যাট কেনার পরও নানা বাহানা। ‘এই ধারগুলো আগে শোধ করি।’ ঋণ কমল তো বলল, ‘এবার রেজিস্ট্রিটা করি। তারপর মিউটেশন, বকেয়া ট্যাক্স, ছেলে-মেয়েদের স্কুলের খরচ— সে নানা ফিরিস্তি।’ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আসবাবও ভরে উঠল। আহামরি কিছু নয়। মেগা সিরিয়ালের মতো সাজানো নয়, যেমনটা আরও কয়েকজনের আছে।

মন মতো ফ্ল্যাট হল না, গ্যারেজ হল না, ঘর সাজানোও যেমন তেমন। সৃজার খোঁচা খেয়ে অরুণালোক আবার বলত, ‘দাঁড়াও না এবার দশতলায় ফ্ল্যাট কিনব। নো মশকুইটো, নো ফ্রগ, নো স্নেক, নো থিফ, নো ড্যাকোইট।’

মশার সমস্যা তো জানা কথা, গ্রাউন্ড ফ্লোরে দু’-একটা ব্যাঙ আসাও অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু কলকাতা মহানগরের কেন্দ্রে বাস করে সাপকে ভয় পেতে হবে ভাবা যায়নি। নিকাশি নালা গিয়েছে কাছ দিয়ে। সেখানে ঢোঁড়া জাতীয় সাপ দেখা যায়। কিন্তু ঝোপঝাড় ভর্তি পাশের প্লটে যে সাপ আছে—সেই সাপ একটাই ফ্ল্যাট বেচে দেবার পক্ষে যথেষ্ট। অরুণালোকও বুঝতে পারল আজীবন এ ফ্ল্যাটে থাকা যাবে না। তখনই লাখ সাতেক টাকা বেশি খরচ করতে পারলে এখানেই মন মতো ফ্ল্যাট হতে পারত। কিন্তু তখন সাত লাখ এক্সট্রা বের করার মতো সামর্থ্য ছিল না।

বেতন বাড়ছিল, কমছিল সুদের হার। অরুণালোক আবার শুরু করল যোগ-বিয়োগ-গুণ-ভাগ। একদিন হঠাৎ-ই চোখ আটকে গেল বেঙ্গল-ডিসুজায়। বাড়ি-বাজারের বিজ্ঞাপনের ভিড়েও চকচক করে উঠল— ‘জলের দরে’।

ভদ্রমহিলা বাপের বাড়ির কাছে নিউটাউনে ফ্ল্যাট কিনে শীঘ্র উঠে যাবে। অরুণালোক ব্যাংক-এ কথা বলল। নো প্রবলেম।

প্রথম ফ্ল্যাটে আসার আগে যেমন তুলনা চলত— -দু’-কামরা বনাম তিন-কামরা, ভাড়া বনাম ইএমআই, জলের প্রবলেম বনাম ওভার-ফ্লো…। এবারও তেমনই শুরু হল— একতলা বনাম সাততলা, সিঁড়ি বনাম লিফট, তিন বনাম চার কামরা, সাপ বনাম ঘুড়ি-লাটাই।

দুই

আবার গোছগাছ। আবার যা যা মূল্যবান মনে হয়েছিল তার অনেক কিছুকে মূল্যহীন করে ফেলে যাওয়া। ভাড়াবাড়ি থেকে প্রথম ফ্ল্যাটে আসার সময় বেমানান বলে অনেক কিছু আনা যায়নি। এবারও অরুণালোক বলে, “না না এসব ফেলে দাও। ছড়িয়ে দাও। অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্তের ‘উদ্বাস্তু’ কবিতার মতো।’

সৃজা বলল, ‘থাক, এটা মামণির অন্নপ্রাশনের জামা।’

অরুণালোক মুচকি হাসল।

সৃজা ছেলের জামা হাতে নিয়ে বলল, ‘থাক, এটা মাত্র দু’বার পরেছে। একেবারে নতুনের মতো আছে।’

অরুণালোক আবার হেসে বলল, ‘না না, সাততলার ফ্ল্যাটে ভার বাড়িয়ে লাভ নেই।’

সৃজার মতো অরুণালোকও কোনও বই বা ম্যাগাজিন হাতে থমকে যেত। কোনটা অর্ধেক পড়া হয়েছে পরে পড়বে বলে সময় হয়নি বা খুঁজে পায়নি।

চিলাপাতা-র আরণ্যক গন্তব্য (পর্ব-০১)

চিলাপাতা অরণ্যের রহস্যময় পথের প্রতিটি বাঁকেই রোমাঞ্চ। অত্যন্ত ঘন সবুজের অলিন্দে বাতায়নে অদ্ভুত স্তব্ধতা। অরণ্যের সাহচর্য, মাদকতা আচ্ছন্ন করে রেখেছে।

অরণ্যের নিবিড় সান্নিধ্যে মনে পড়ছে, কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতার লাইন—

‘আমরা অরণ্যের চেয়েও আরো পুরোনো অরণ্যের দিকে

চলেছি ভেসে

অমর পাতার ছাপ যেখানে পাথরের চিবুকে লীন

তেমনই ভুবনছাড়া যোগাযোগের দেশে ভেসে চলেছি

কেবলই— ‘

মুহূর্তরা পড়ে রয়েছে জঙ্গলের ওপারে। কোচ রাজাদের প্রাচীন মৃগয়াক্ষেত্র চিলাপাতা জঙ্গল আদপে জলদাপাড়া অভয়ারণ্যেরই বিস্তৃত পরিসর। তোর্সা, কালচিনি, বুড়িবাসরা, বেনিয়া নদীগুলি চিলাপাতার অন্দর দিয়ে প্রবহমান। তোর্সা নামের মিষ্টি নদীটি জলদাপাড়া ও চিলাপাতাকে ভাগ করেছে দু’ভাগে। তোর্সা জলদাপাড়ার পূর্ব থেকে চিলাপাতার পশ্চিমে বয়ে চলেছে।

সবুজের স্নিগ্ধ বর্ণমালার চিলাপাতার জঙ্গল প্রকৃত অর্থেই অরণ্য। এখানে অন্যান্য জঙ্গলের মতো সীমাহীন ঘাসজমির বিস্তার নেই। সেই জায়গা পূরণ করেছে প্রবীণ অরণ্যগল্পের মতো শিরীষ, মেহগনি, শাল, শিশু, চিলৌনি, সেগুন, চিকরাশি, শিমুল, কাটুস, নাগেশ্বরী ইত্যাদি মহীরুহরা। এই জঙ্গলেই রয়েছে বিখ্যাত রামগুয়া নামের এক বৃক্ষ। যে বৃক্ষে আঘাত করলে রক্তক্ষরণের মতো লাল রস নিঃসৃত হয়। স্থানীয়দের বিশ্বাস, কিছু অনুগত সৈন্য আজও রামগুয়া বৃক্ষের রূপ ধরে এখানকার শতাব্দী প্রাচীন নলরাজার দুর্গটিকে পাহারা দিয়ে যাচ্ছে।

নদীর ওপারে বালুচরের ধূসর বিস্তৃতি জঙ্গল-আবহকে আরও রহস্যময় করে তুলছিল। একটানা ঝিঁঝিডাক অন্যমাত্রা আনে, যেমন উত্তরবঙ্গের প্রতিটি জঙ্গলেরই এটা চেনা শ্রুতস্বর। তার সঙ্গে যোগ্য সঙ্গত করছিল— ময়ূরের কেকাধ্বনি, টিয়াপাখি ঝাঁকের তীক্ষ্মস্বর। পাখিদের খুনসুটির শব্দ ছাড়া বাকি সব নিস্তব্ধ।

চিলাপাতা বনাঞ্চলকে তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। মেন্দাবাড়ি, কোদাল বনবস্তি এবং কুরমাই বনবস্তি। এই তিনটি এলাকাই জঙ্গল লাগোয়া। এইসব অঞ্চলের হোমস্টেগুলির সীমানায় ইলেকট্রিক সংযোগ তার দিয়ে ঘেরা। গাছগাছালি ছাড়াও চিলাপাতা জঙ্গলে রয়েছে হাতি, হরিণ, ময়ূর, গাউর, সম্বর, একশৃঙ্গী গণ্ডার, প্রচুর প্রজাপতি, সাপ, অসংখ্য প্রজাতির পাখপাখালি। এত নিবিড় জঙ্গল যে, এক বনপথ থেকে যত অন্য বনপথে গাড়ি ঢুকছে, আরও ঘন হচ্ছে জঙ্গল। কোনও জায়গায় এতটাই ঘন যে, মনে হচ্ছে সবুজ অন্ধকার নেমে এসেছে। পর্যটকরা চিলাপাতা থেকেই ১৫ কিলোমিটার দূরে জলদাপাড়া অরণ্য অথবা ৩০ কিলোমিটার দূরত্বে বক্সা অরণ্য ঘুরে নেন। আবার উলটোটাও করেন।

এই অরণ্যে কোচ রাজারা প্রায়শই শিকার করতে আসতেন। কোচবিহারের রাজার সেনাধ্যক্ষ চিল্লার-এর নাম অনুসারে এই জঙ্গলের নাম হয়েছিল চিলাপাতা। অন্য মতে, কোচবিহারের রাজা নরনারায়ণের ভাই শুক্লধ্বজ চিলা রায়ের নাম থেকে নামকরণ এই জঙ্গলের। কথিত আছে, কোচ রাজবংশের আদি পুরুষ বিশ্বসিংহের তৃতীয় পুত্র চিলা রায় নাকি চিলপক্ষীর মতো ক্ষিপ্রতায় শত্রুপক্ষকে নাকাল করতেন। চিলা রায় নির্মিত দুর্গটি রাজা নরনারায়ণের নামে পরবর্তীকালে নলরাজার দুর্গ হিসাবে পরিচিতি লাভ করে।

অনেকে মনে করেন, সন্ন্যাসী বিদ্রোহের নেতা ভবানী পাঠকের গুপ্ত ঘাঁটি ছিল চিলাপাতা জঙ্গল। স্বাধীনতা সংগ্রামীরা নাকি এখানেই আত্মগোপন করে থাকতেন। এছাড়া নল-দময়ন্তীর পুরাণগাথা জড়িয়ে রয়েছে এই অরণ্যে। সেদিক থেকে দেখতে গেলে, চিলাপাতার ঐতিহাসিক গুরুত্ব অনেকটাই।

নিবিড় জঙ্গলে অবস্থিত বিখ্যাত নলরাজার গড়টি দেখার মতো। প্রাচীন স্থাপত্য ও পুরাকীর্তির বনেদিয়ানা এর রন্ধ্রে রন্ধ্রে। প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের মতে দুর্গটি গুপ্তযুগে নির্মিত। পরবর্তী পাল যুগেও দুর্গটি কার্যক্ষম ছিল। অন্য মতে, ভুটান রাজাদের আগ্রাসন থেকে রক্ষার নিমিত্ত কোচ রাজার সৈন্যরা এই সুরক্ষিত দুর্গে থাকতেন এবং বানিয়া নদী দিয়ে যাতায়াত করতেন। গাছের গায়ে টাঙানো জলদাপাড়া বন্যপ্রাণ বিভাগের নোটিশ বোর্ডে লেখা, নলরাজার গড়ের কাগুজে নাম ‘মেন্দাবাড়ি গড়’। ইংরেজরা বলতেন ‘চেচাকোটার গড়’। দ্বাদশ ও ত্রয়োদশ শতাব্দীতে এই অঞ্চলের যুদ্ধের তথ্য যথাক্রমে তবক্য-ই-নসিবী ও মার্কোপোলোর বিবরণীতে পাওয়া যায়।

একদা নলরাজার গড়ের চারদিকে চারটি প্রবেশদ্বার ছিল। ইট-নির্মিত তোরণ, সুদৃঢ় প্রাচীর, গবাক্ষ, কার্নিশ, খিলান, কুলুঙ্গি প্রভৃতি বৈশিষ্ট্য সমৃদ্ধ এই গড়। নলরাজার গড়ের পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে বানিয়া নদী। বন্য আদিমতায় গা ছমছমে পরিবেশে নলরাজা গড়ের ধ্বংসাবশেষ পঞ্চম শতকের গুপ্তযুগের মহান স্বর্ণযুগের অতীত ইতিহাসকে উসকে দেয়।

ওজন রাখুন কন্ট্রোলে

যে-কোনও উৎসব-অনুষ্ঠান সকলের জন্যই সমান আনন্দের আবহ তৈরি করে। পোশাক-আশাক থেকে শুরু করে নানাবিধ ব্যঞ্জন উপভোগ করার সুযোগ পাওয়া যায়। রাস্তাঘাটে লোভনীয় খাবার চেখে দেখার তখন কোনও বাধা থাকে না। কিন্তু সেই সব খাবার বেশিরভাগই তৈলাক্ত এবং শর্করা-যুক্ত। এই খাবারগুলি সাধারণত স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকারক হয়ে থাকে।

এগুলিতে থাকা মাত্রাতিরিক্ত ট্রাইগ্লিসারাইডের স্তর এবং কোলেস্টেরলের বাড়াবাড়ি পরিমাণ, হৃদরোগের কারণ হয়ে উঠতে পারে। পরিবারের সঙ্গে উৎসবের আনন্দ সকলেই উপভোগ করুন কিন্তু বিশেষ কয়েকটি বিষয়ে অবশ্যই খেয়াল রাখা দরকার। কোলেস্টেরল এবং ট্রাইগ্লিসারাইড-এর স্তরের ভারসাম্য বজায় রাখা একান্ত জরুরি।

অধিক শর্করায় শরীরের ক্ষতি

ফ্রুক্টোজ শর্করার একটি বিশেষ রুপ। এতে শরীরে ট্রাইগ্লিসারাইড-এর স্তর বৃদ্ধি পায়। উৎসবের সময় বাইরে বেরিয়ে ভাজাভুজি, ক্যান্ডি, বেকড খাবার, আইসক্রিম এবং অতিরিক্ত চিনি দেওয়া খাবার না খাওয়াই ভালো। সুগার ফ্রি মিষ্টিতে ফ্রুক্টোজ থাকে। এতে ফ্যাট বাড়ার সম্ভাবনাও অনেক বেশি। সবসময় মনে রাখতে হবে অতিরিক্ত শর্করা আমাদের শরীরের জন্য ক্ষতিকারক।

রিফাইন্ড খাদ্যপদার্থ এড়িয়ে চলুন

নর্মাল সাদা পাউরুটি, নুডলস, পাস্তা, ভাত ইত্যাদি যেগুলি খুব সহজেই ফুড কাউন্টারে এবং রাস্তার ধারে গজিয়ে ওঠা ফুড স্টলগুলিতে পাওয়া যায়— সেগুলি খুব সহজেই শর্করায় পরিবর্তিত হয়। এই খাবারগুলি এড়িয়ে যাওয়াই বাঞ্ছনীয়। আনাজ-যুক্ত খাবার জিনিস বাছুন যেগুলি আপনার ট্রাইগ্লিসারাইড-এর স্তরের ভারসাম্য বজায় রাখবে।

ফাইবার-যুক্ত খাবার খান

উৎসবের সময় বাড়িতে ফাইবার-যুক্ত খাবার খান। গবেষণায় প্রমাণিত যে, ফাইবার-যুক্ত খাবারে জটিল কার্বোহাইড্রেট উপাদান থাকে যা শরীরের জন্য লাভজনক। ট্রাইগ্লিসারাইড-এর স্তর যাতে না বাড়ে, সেটিও নিয়ন্ত্রণ করে। কারণ যে-কোনও খাবার খাওয়ার পরেই ট্রাইগ্লিসারাইড বাড়তে থাকে। ডায়েটে স্যালাড এবং শাকসবজি থাকাটা অত্যন্ত আবশ্যক। আনাজ এবং পুষ্টিকর উপাদানে ভরপুর খাদ্যপদার্থ যেমন, ফল এবং সবজিতে ফাইবার সবথেকে বেশি পাওয়া যায়।

সঠিক ফ্যাট-যুক্ত খাবার

ট্রাইগ্লিসারাইড এবং কোলেস্টেরলের মাত্রা স্বাভাবিক রাখতে স্যালমন, অলিভ অয়েল, ডায়েটারি প্রোডাক্ট ইত্যাদির উপর আস্থা রাখুন। এগুলি সাপ্লিমেন্ট-এর মতো যার মধ্যে থাকে ওমেগা থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিড। এছাড়াও স্যাচুরেটেড ফ্যাট যা কিনা মাংস এবং অন্যান্য খাদ্যপদার্থের মধ্যে থাকে যেমন আইসক্রিম, পনির ইত্যাদির মাত্রা সারাদিনে ৫ থেকে ৬ শতাংশ ক্যালোরির বেশি হওয়া উচিত নয়। কোলেস্টেরল-এর দৈনিক মাত্রা হওয়া উচিত ৩০০ মিলিগ্রাম-এর মধ্যে। এর থেকে বেশি হলে তা স্বাস্থ্যের ক্ষতি করতে পারে। এগুলো ছাড়াও একবার যে- তেলে কিছু ভাজা হয়েছে সেই বেঁচে যাওয়া তেল পুনরায় ব্যবহার না করাই ভালো।

নিয়মিত ব্যায়াম করুন

সকলেরই ব্যায়াম করা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়, বিশেষকরে যাদের ট্রাইগ্লিসারাইড ৫-এর মাত্রা খুব বেশি। এতে রক্তে শর্করার পরিমাণ কমার সঙ্গে সঙ্গে শরীরে এনার্জি এবং শক্তি বাড়াতেও সাহায্য করে। এছাড়াও শরীরে থাকা শর্করা যেটি কিনা ট্রাইগ্লিসারাইড-এর মাত্রায় পরিবর্তন আনে, সেটিও কম করতে সহায়তা করে। অ্যারোবিক ব্যায়াম হার্টের রোগীদের জন্য খুবই উপকারী। কারণ এতে ট্রাইগ্লিসারাইড-এর মাত্রা কমানো সম্ভব হয়।

ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন

শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা সকলের জন্য জরুরি। তবে অনেকেই মনে করেন স্থূলতার কারণে যদি শরীরে কোনও অসুবিধা না হয়, তাহলে শুধু শুধু ওজন কমানোর কী দরকার? কম বয়সে হয়তো এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নজরে পড়ে না কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অতিরিক্ত ওজনের কারণে শরীরে শর্করার পরিমাণ বাড়তে আরম্ভ করে। একই সঙ্গে শরীরের মেটাবলিক প্রক্রিয়ার কাজ করার ক্ষমতা হ্রাস পেতে থাকে। এর ফলে ট্রাইগ্লিসারাইড- এর মাত্র বৃদ্ধি পায়।

হেলদি ক্যালোরি ইনটেক করে ওজন কন্ট্রোলে রাখুন এবং ট্রাইগ্লিসারাইড- ৫-এর মাত্রা কমিয়ে আনুন। উৎসবের মরশুমে না খেয়ে থাকার থেকে অল্প সময়ের ব্যবধানে অল্প করে কিছু খান। এতে শরীরের ওজনও আয়ত্তের মধ্যে থাকবে এবং আপনি অনেক সুস্থ অনুভব করবেন।

শুধু প্রতিশ্রুতির বন্যা বইছে

প্রতারকরা কখনও ফোন করে বলছে ‘আপনার নামে আসা পার্সেল-এ মাদকদ্রব্য ছিল, যা ধরা পড়েছে। আপনি কিছু টাকা পাঠালে বেঁচে যাবেন।’ কখনও আবার বলছে ‘ইনশিয়োরেন্স পলিসি ম্যাচিওর করে গেছে এবং ওই টাকা তুলে অ্যাকাউন্ট-এ পাওয়ার জন্য এসএমএস-এ যাওয়া পিন নাম্বার ফরওয়ার্ড করুন’। আসলে অপরাধী মানসিকতার লোকেরা খুব দ্রুত অনেককে তাদের বক্তব্য বিশ্বাস করিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। কারণ প্রতারকরা জানে, এমন কিছু মানুষ আছেন, যারা খুবই ভীতু, লোভী এবং বোকাও।

আসলে এখন অনেককিছুই অনলাইন-এ করতে হচ্ছে এবং যার সুযোগ নিচ্ছে প্রতারকরা। বিষয়টা হল, সহজে এবং কম দামে কিছু কিনতে পারলে তার মধ্যে কোনও বোকামো নেই কিন্তু যে সাইটস থেকে ওই কেনাকাটা করছেন, তা ঠিকমতো যাচাই করে নেন না অনেকে। যে ব্র্যান্ড-এর জিনিস কিনছেন, সেই ব্র্যান্ড-এর কোনও অফিস আছে কিনা কিংবা যে সাইটস থেকে বুকিং করছেন জিনিসপত্র, তা ফেক কিনা কিংবা প্রতারণা চক্রের তৈরি কিনা এসব অনেকে যাচাই না করেই অর্ডার করেন জিনিসপত্র এবং আগাম টাকা পাঠিয়েও দেন।

মুহূর্তের মধ্যে সবকিছু পেয়ে যাব কিংবা ম্যাজিকের মতো সবকিছু হাতে এসে যাবে, এমন ধারণা থেকেই মানুষের মনে অতিরিক্ত লোভ তৈরি হয় এবং যার ফলে প্রতারিত হওয়ার সম্ভাবনাও বেড়ে যায়। এছাড়া আছে অন্ধবিশ্বাস। যুক্তি দিয়ে বিচার-বিবেচনা না করে সবকিছু বিশ্বাস করে নেওয়ার প্রবণতা আছে অনেকের। তাই, সরকারি প্রতিশ্রুতিও অন্ধের মতো বিশ্বাস করে নিয়ে সেই শাসককে ভোটদান করেন অনেকে। আর এখন যেমন অনলাইন প্রতারণা বাড়ছে, ঠিক তেমনই চলছে অন্যান্য প্রতারণা। আজকের সভ্য সমাজে দাঁড়িয়েও গণেশকে দুধ খাইয়ে বোকা ভক্তদের থেকে ভালো পরিমাণ প্রণামীর অর্থ লুটছে ধর্মীয় প্রতারকরা।

আসলে এই অনলাইন-এর যুগে সবকিছুই লাগামছাড়া। কোনও কন্ট্রোল নেই, তাই বাড়ছে অপব্যবহার। এই যেমন অনালাইন পোর্টালগুলোর উপর নিয়ন্ত্রণ আনার চেষ্টা করছে সরকার কিন্তু তা কী কড়া আইন ছাড়া সম্ভব? পার্সোনাল মেইল-এ কিংবা মোবাইল ফোন-এ আপনি না চাইলেও প্রতারণামূলক অফার আসতে থাকে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল এই যে, সরকার সবরকম প্রতারণা আটকানোর প্রতিশ্রুতি দিলেও, আজও তা কার্যকরী হয়নি। এ যেন সেই ব্ল্যাকমানি উদ্ধার করে জনগনের হাতে টাকা তুলে দেওয়ার প্রতিশ্রুতির মতোই ঘটনা! কিন্তু মনে রাখা দরকার, শুধু প্রতিশ্রুতি নয়, সরকার চাইলে টেকনিক্যালি এবং আইন মোতাবেক সবরকম প্রতারণা আটকাতে পারে অনেকটাই।

ফ্যাশনে শাড়ি

শাড়ি ভারতের প্রাচীনতম পরিধান। ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে, বিভিন্ন ভাবে শাড়ি পরার চল আজও বর্তমান। অনেকেরই ধারণা, শাড়ি পরা মানেই ‘বহেনজি’ টাইপ, আউটডেটেড লুক। অথচ ধারণাটা সম্পূর্ণ ভুল। অন্যান্য পোশাকের তুলনায় শাড়িতেই সেক্সি ও আকর্ষণীয়া হয়ে ওঠার সম্ভাবনা সবথেকে বেশি। আধুনিকারা হিন্দি ছবির হিরোইনদের আইডল মেনে তাদেরই ফ্যাশন ফলো করেন। আজকাল বহু হিন্দি ছবিতেই গ্ল্যামারাস হিরোইনরা শাড়ির সৌন্দর্যকে অন স্ক্রিন ফুটিয়ে তুলছেন। ফ্যাশনে শাড়ি আজও তাই স্ব- মহিমায় বিরাজমান। শুধুমাত্র শাড়ি পরার সময় কয়েকটি বিষয় যদি খেয়াল রাখেন, তাহলে আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে যে আপনি থাকবেন-ই, এতে কোনও সন্দেহ নেই।

ভারতীয় ডিজাইনাররা বরাবরই শাড়িতে নিজেদের ডিজাইনের নিজস্বতা প্রমাণ করে সারা বিশ্বের দরবারে তুলে ধরেছেন। শাড়ির খ্যাতি দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে বিদেশের মার্কেটে পৌঁছে দিতে সমর্থ হয়েছেন। প্রয়াত সত্য পল নিজস্ব প্রিন্টেড ফাঙ্কি ডিজাইনের জন্য বিশ্ববন্দিত। মনীষ মালহোত্রা বলিউড এবং ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রিতে সুলতান অফ শাড়ি বলে খ্যাত। সব্যসাচী মুখোপাধ্যায়ের ডিজাইন করা শাড়ির খ্যাতি সারা বিশ্বজোড়া। তরুণ তাহিলিয়ানী তাঁর ব্রাইডাল শাড়ির জন্য বিখ্যাত।

শাড়ি এবং লহঙ্গার ফ্যাব্রিকের উপর হেভি ব্রাইডাল ডিজাইনার রেঞ্জ-এর জন্য ঋতু কুমারের প্রসিদ্ধি। গৌরাঙ্গ শাহ হায়দরাবাদের ডিজাইনার। এনার জামদানি উইভার্স-এর একটি বড়ো ক্রিয়েটিভ টিম রয়েছে। এঁরা সাধারণত হ্যান্ডমেড মাস্টার পিস বানান। এছাড়াও অনিতা ডোগরে, নীতা লুল্লা প্রমুখ ডিজাইনাররাও যথেষ্ট সুনাম অর্জন করেছেন এবং বিশ্বের বাজারে শাড়িকে বিশেষ পরিচিতি দিতে এঁদের অবদানও কিছুমাত্র কম নয়।

শাড়ির ফ্যাশন আবহমানকাল ধরে চলে এলেও, এর আকর্ষণ ফুরোবার নয়। কর্মব্যস্ততার কারণে ড্রেস পরার চলটা এখন বেড়েছে, কিন্তু ভারতীয় সংস্কৃতির ছাপ রয়েছে মানুষের মনে। তাই উৎসবে, অনুষ্ঠানে আজও মেয়েদের পছন্দ শাড়ি। তবে অনভ্যাস এবং ব্যস্ততার কথা মাথায় রেখে ছয় গজের শাড়ি পরা এবং ম্যানেজ করা অনেকের জন্যই দুঃসাধ্য হয়ে ওঠে। এই কথা মাথায় রেখেই ডিজাইনাররাও পোশাক নিয়ে নানা এক্সপেরিমেন্ট করতে থাকেন এবং শাড়ি নিয়েও নানা পরীক্ষা, জল্পনা-কল্পনাও চলছে আধুনিক সময়ে।

শাড়ির ফ্যাব্রিক

নিজেকে হট ও গ্ল্যামারাস করে তুলতে প্রথাগত সিল্ক শাড়ি বা অন্য ফ্যাব্রিক না বেছে শিফন, জর্জেট বা ক্রেপ বাছুন। শিয়ার শাড়ির ফ্যাশন এখন খুব চলছে। লাইট ফ্যাব্রিক ক্যারি করা খুব সুবিধা। শাড়ির প্রিন্ট এবং প্যাটার্নও খেয়াল রাখা উচিত। প্রিন্টেড শাড়ির থেকেও প্লেন শাড়িতে গ্ল্যামারাস হয়ে ওঠার সুযোগ অনেক বেশি। আজকাল হাফ শাড়ির প্যাটার্নও খুব জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এই প্যাটার্নে শাড়ির অর্ধেক প্রিন্টেড হয়, বাকি অর্ধেক প্লেন।

এখন মার্কেটে হট্‌ ফেভারিট, ‘শাড়ি গাউন’ অথবা এটাকে অনেকে লেহেঙ্গা শাড়িও বলতে পছন্দ করছেন। শাড়ি এবং গাউনের কম্বিনেশনে তৈরি শাড়ি গাউন দেখতে খুবই স্টাইলিশ এবং ম্যানেজ করাটাও খুব সোজা। যে-কোনও অনুষ্ঠানের রাত আরও রঙিন করে তুলতে বেছে নিতে পারেন এই শাড়ি গাউন, তবে বাছার আগে কয়েকটা বিষয়ে খেয়াল রাখা খুব দরকার।

শাড়ি গাউন কেন বাছবেন

এভারগ্রিন এবং সবসময় ফ্যাশনে ইন এই শাড়ি গাউন, পরা এবং পরে ম্যানেজ করাটা খুবই সোজা। শাড়ির মধ্যে প্লিটস-এর সঙ্গেই ব্লাউজ এবং আঁচল অ্যাটাচ করা থাকে। তাই ড্রেস পরার মতোই খুব সহজে মিনিটের মধ্যে এটা পরা যায়। সবকিছু অ্যাটাচ থাকার ফলে, কুঁচি বা আঁচল খুলে যাওয়ারও ভয় থাকে না এবং ফিটিংস-টাও খুব ভালো হয়।

কীভাবে বাছবেন শাড়ি গাউন

বাজারে শাড়ি গাউনের বিভিন্ন প্যাটার্ন, স্টাইল এবং ফ্যাব্রিক চোখে পড়বে। নিজের জন্য পারফেক্ট শাড়ি গাউন বাছতে হলে খেয়াল রাখতে হবে—

প্যাটার্ন: মার্কেটে শাড়ি গাউনের অনেকরকম ভ্যারাইটি পাওয়া যায়। ধুতি, প্যান্ট স্টাইল, ফিশ কাট, লেহেঙ্গা থেকে শুরু করে স্ট্রেট কাট সব ধরনের প্যাটার্ন-ই এখন ফ্যাশনে ইন। নিজের পার্সোনালিটি কীরকম, সেটা মাথায় রেখে প্যাটার্ন বাছাটা জরুরি। এমন প্যাটার্ন বাছা উচিত, যেটা নিজের বডি শেপের সঙ্গে মানাবে। যেমন, যাদের হাইট কম তাদের উচিত স্ট্রেট অথবা ফিশ কাট শাড়ি গাউন বাছা। কারণ এতে আপনাকে লম্বা দেখাবে। যাদের উচ্চতা বেশি তাদের ফ্লেয়ার্ড শাড়ি গাউন দারুণ মানাবে।

শাড়ি গাউনের ব্লাউজ: শাড়ি গাউনের ব্লাউজের নানা প্যাটার্ন হয়। যেমন— ভন শোল্ডার, অফ শোল্ডার, স্লিভলেস, হাফস্লিভ, ফুলস্লিভ, থ্রি কোয়ার্টার স্লিভ ব্লাউজ ইত্যাদি। এরই সঙ্গে নেকলাইনেও ডিফারেন্ট ভ্যারাইটি দেখতে পাওয়া যায়। যেমন রাউন্ড, স্কোয়্যার, ওভাল, বোটনেক। ব্লাউজের ক্ষেত্রেও, পার্সোনালিটির উপরই নির্ভর করবে, কী ধরনের ব্লাউজের সঙ্গে শাড়ি গাউন বাছাটা বাঞ্ছনীয়।

ডিজাইন: সিম্পল এবং সোবার থেকে শুরু করে সিকোয়েন্স, জরির কাজ, এমব্রয়ডারি কাজের শাড়ি গাউন, মার্কেটে সহজেই পেয়ে যাবেন। কী অনুষ্ঠানের জন্য শাড়ি গাউন বাছবেন সেটা খেয়াল রাখাটাও খুব জরুরি। যেমন বিয়ের অনুষ্ঠানের জন্য বেছে নিতে পারেন হেভি ওয়ার্কের গর্জিয়াস লুকিং শাড়ি গাউন। কিন্তু ডে-পার্টি, গেট-টুগেদার-এর জন্য সিম্পল, সোবার ডিজাইনই মানাবে ভালো।

কালার্স: হালকা রং থেকে শুরু করে ডার্ক, ব্রাইট কালার্স অথবা ম্যাট কালার্স, সব রকমের অপশন-ই মার্কেটে অ্যাভেলেবেল। স্কিনটোন দেখে কালার বাছা উচিত। রং ফরসা হলে রেড, পিংক, গোল্ড, সিলভার শেড-এর শাড়ি গাউন কেনা যেতে পারে। কিন্তু রং যদি শ্যামলা হয়, লাইট বা প্যাস্টেল শেডের শাড়ি ট্রাই করা উচিত। কোনও কোনও শাড়ি গাউন ডুয়েল শেড, কনট্রাস্ট কালারস অথবা মাল্টি শেডেও বানানো হয়, যেগুলোও ট্রাই করে দেখা যেতে পারে মানানসই লাগছে কিনা৷

ফ্যাব্রিক: নেট, ব্রোকেড, জর্জেট থেকে শুরু করে সিল্কের ফ্যাব্রিকেও শাড়ি গাউন পাওয়া যায়। আলাদা আলাদা ফ্যাব্রিকে, শাড়ির লুক এবং ফল-ও ডিফারেন্ট হয়। কোন মরশুমে শাড়িটা পরবেন সেটা মাথায় রেখে ফ্যাব্রিক পছন্দ করা উচিত। শাড়ির লুক- টাও দেখে নেওয়া খুব জরুরি। লাইট ফ্লোয়িং ফ্যাব্রিকের শাড়ি গাউন দেখতে সবথেকে সুন্দর লাগে। এর সঙ্গে ব্লাউজের ফ্যাব্রিক যদি নেট-এর বাছা যায়, তাহলে শাড়ি গাউনের লুক আরও সেক্সি হয়ে উঠবে নিঃসন্দেহে। আর আপনার আনন্দ-উৎসবের রাতও হয়ে উঠবে স্মরণীয়।

স্মার্ট আইডিয়া

শাড়ি গাউনে কমপ্লিট লুক পেতে হলে কী করবেন তার কিছু আইডিয়া শেয়ার করা হল।

জুয়েলারি সিলেকশন: শাড়ি গাউনের সঙ্গে হেভি জুয়েলারি পরার ভুল করবেন না। কানের দুল, আংটি ব্রেসলেট পরলেই যথেষ্ট। হেয়ারস্টাইল: পারফেক্ট লুকের জন্য চুলে হাই অথবা লো ‘বান’ বাঁধতে পারেন। আবার চাইলে স্ট্রেটনিং করিয়ে চুল খোলাও রাখতে পারেন।

মেকআপ লুক: ডার্ক শেড-এর লিপস্টিক লাগান অথবা স্মোকি আই মেক-আপ। দুটোর কোনওটাকেই হাইলাইট করবেন না। ট্রেন্ডি ফুটওয়্যার: স্লিম লুকের জন্য শাড়ি গাউনের সঙ্গে হাইহিল পেনসিল ফুটওয়্যার পরুন। সিম্পল গাউনের সঙ্গে সোবার এবং হেভি গাউনের সঙ্গে স্টোন স্টাডেড ফুটওয়্যার ভালো মানাবে।

ক্লাচ ব্যাগ: শাড়ি গাউনের কালারের সঙ্গে ম্যাচ করে ক্লাচ ব্যাগ ক্যারি করতে পারলে আপনার সাজ সম্পূর্ণ হবে।

শাড়ি পরার নিয়ম

সঠিক উপায়ে শাড়ি পরাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। নাভির উপর থেকে শাড়িটা গোঁজা আরম্ভ করতে হয়। এতে আপনার ফিগার বা শরীরের শেপ স্পষ্ট হবে। কোমরের অংশ খোলা রাখতে চাইলে আঁচল প্লিট করা অবস্থায় স্লিক ড্রেপ করুন। আর যদি কোমর ঢাকা রাখতে চান তাহলে আঁচলে গ্লিট্স না করে হাতের উপর দিয়ে ছড়িয়ে দিন।

ব্লাউজ

শাড়িকে আকর্ষণীয় করে তুলতে ব্লাউজ অনেকটাই সাহায্য করে। আজকাল মিক্স এবং ম্যাচ ফ্যাশনের প্রচণ্ড ডিমান্ড। প্লেন শাড়ির সঙ্গে প্রিন্টেড ব্লাউজ এখন ট্রেন্ডিং। ব্লাউজ, শাড়ির স্টাইলকে অনেক বেশি ফুটিয়ে তোলে। নানা প্যাটার্নের আকর্ষণীয় ব্লাউজ বাজারে পাওয়া যায়।

O হল্টার নেক ব্লাউজ

O স্প্যাগেটি স্ট্র্যাপ ব্লাউজ

O ফুলস্লিভ বা থ্রি কোয়ার্টার স্লিভ-এর ব্যাকলেস ব্লাউজ

O ওয়াইড নেক ব্লাউজ

O স্টাইলিশ র‍্যাপআপ শাড়ি ব্লাউজ

O এমবস্ড এমব্রয়ডারি ব্লাউজ

O মডার্ন চোলি ব্লাউজ

O শিয়ার ব্যাক শাড়ি ব্লাউজ।

শাড়ির সঙ্গে অ্যাক্সেসরিজ

খুব সামান্য অ্যাক্সেসরিজ পরেই আপনি হয়ে উঠতে পারেন হট এবং গ্ল্যামারাস। শাড়ির সঙ্গে ম্যাচ করে স্টেটমেন্ট ইয়াররিংস পরলেই যথেষ্ট। স্টেটমেন্ট ক্লাচ ব্যাগটা ভুললে কিন্তু চলবে না। পেন্সিল হিল আপনার সাজ সম্পূর্ণ করবে।

হেয়ার স্টাইল

হাই বান হেয়ারস্টাইল: যদি ব্লাউজের নেকলাইন খুব ছড়ানো এবং বড়ো হয় অথবা স্ট্র্যাপলেস ব্লাউজ হয়, তাহলে এই হেয়ারস্টাইল খুব ভালো মানাবে।

স্ট্রেট হেয়ারস্টাইল: খুব তাড়াতাড়ি সাজ কমপ্লিট করতে চাইলে এই হেয়ারস্টাইল বেছে নিতে পারেন। এটি সিম্পল এবং এলিগ্যান্ট-ও বটে।

ব্যাস হেয়ারস্টাইল: যাদের চুল লম্বা তাদের জন্য এই স্টাইল এখন ফ্যাশনে ইন। ওয়েস্টার্ন ড্রেসেজ এবং শাড়ি উভয়ক্ষেত্রেই এই স্টাইল খুব মানানসই।

সিম্পল শর্ট কাট হেয়ারস্টাইল: হিন্দি ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি-তে মন্দিরা বেদী খুব সুন্দর ভাবে এই হেয়ারস্টাইল ক্যারি করেন এবং তাঁর দৌলতেই এই স্টাইলটি ইয়ং জেনারেশনের মধ্যে এতটা পপুলার হয়ে উঠেছে। এই স্টাইলের সঙ্গে বড়ো ইয়াররিংস এবং নেকপিস খুব ভালো মানাবে।

সিম্পল পনিটেল: পনিটেলের সঙ্গে ডিজাইনার ব্লাউজ ম্যাচ করিয়ে নিজেকে আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু করে তুলতে পারেন। এই হেয়ারস্টাইল আপনাকে দেবে ক্লাসিক লুক। শাড়ির সঙ্গে এই স্টাইলটি খুবই ভালো লাগে এবং ইয়ং জেনারেশনের কাছে এই স্টাইলটি খুবই পছন্দের।

ভয়েউরিস্টিক ডিসঅর্ডার

হিউম্যান সাইকোলজি ইজ ভাস্ট। অর্থাৎ, মানব মনস্তত্ত্বের পরিধি বিশাল, প্রায় সীমাহীন এবং গোলকধাঁধার মতো। আসলে আমাদের মস্তিষ্ক কিংবা মনের মধ্যে থাকে অনেকরকম জটিলতর স্তর। তাই, কোনও মানুষের মস্তিষ্ক কখন কোন পথে চালিত হবে, তা সম্পূর্ণ বুঝে ওঠা সম্ভব নয়। বাইরের রূপের সঙ্গে ভিতরের রূপের বিস্তর অমিল থাকতেই পারে।

অতএব, একবার কোনও মানুষকে দেখে কিংবা কথা বলে, তার সম্পর্কে সঠিক ধারণা করা যায় না কিংবা তার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে কোনও সিদ্ধান্তে আসা যায় না। যদি সত্যিই কারও-র চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য বুঝতে হয়, তাহলে তাকে দীর্ঘ পর্যবেক্ষণে রাখতেই হবে। লুকস, বডি ল্যাঙ্গুয়েজ, চলন-বলন সবটা নিখুঁত ভাবে নিরীক্ষণ করে এবং তার সঙ্গে যারা বসবাস করেন, তাদের থেকে তথ্য নিয়ে তবেই কাউকে বিচার করা যায়।

তবে, এই ধরনের বিচার থেকে সাধারণ চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে ধারণা করা যায়। কিন্তু কোনও মানুষের যৌন-ভাবনা কিংবা যৌন-চরিত্র বাইরে থেকে একশো শতাংশ বুঝে ওঠা প্রায় অসম্ভব। এমনও কিছু মানুষ আছেন, যারা ভুগছেন ভয়েউরিস্টিক ডিসঅর্ডার-এ। কিন্তু কী এই ভয়েউরিস্টিক ডিসঅর্ডার? মনোশিজ-এর কাউন্সেলিং সাইকোলজিস্ট শ্রীতমা ঘোষ এই বিষয়ে জানিয়েছেন বিস্তারিত।

ভয়েউরিস্টিক ডিসঅর্ডার (Voyeuristic Disorder) এমন এক মানসিক রোগ, যেখানে একজন ব্যক্তি অন্য কারও ব্যক্তিগত বা যৌন কার্যকলাপ, যেমন— পোশাক খোলা বা যৌন-সঙ্গম গোপনে দেখে যৌন-উত্তেজনা অনুভব করেন। এই ধরনের কার্যকলাপ তাদের জন্য একটি প্রধান যৌন-আকর্ষণ বা ফ্যান্টাসি হয়ে দাঁড়ায়। যখন এই ধরনের লুকিয়ে দেখার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ওই ব্যক্তি কিংবা অন্য কারওর সামাজিক সম্মানহানি ঘটায় কিংবা কর্মজীবনে সমস্যা সৃষ্টি করে, তখনই এটিকে ওই লুকিয়ে দেখা ব্যাক্তির ডিসঅর্ডার বা রোগ হিসেবে ধরা হয়।

এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা সাধারণত এমন লোকদের দেখে যৌন উত্তেজনা অনুভব করেন, যারা ওই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিটিকে দেখতে পান না। এক্ষেত্রে ভয়েউরিস্টিক ডিসঅর্ডার-এ আক্রান্ত ব্যক্তিটি অন্যদের যৌন কার্যকলাপে অতিরিক্ত কৌতূহলী হয়ে ওঠেন। এবং নিজে চরম মাত্রায় যৌন আকর্ষণ অনুভব করেন। কিন্তু, ভয়েউরিস্টিক ডিসঅর্ডার-এ আক্রান্ত ব্যক্তিরা প্রায়শই তাদের এই ধরনের আচরণের কারণে মানসিক কষ্ট অনুভব করেন। উদ্বেগ, অস্বস্তি কিংবা অপরাধবোধে ভোগেন।

ভয়েউরিস্টিক ডিসঅর্ডার-এ আক্রান্ত ব্যক্তিরা তাদের যৌন ফ্যান্টাসি বা কার্যকলাপের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন এবং এটি তাদের জীবনযাত্রায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে। যদি কেউ ভয়েউরিস্টিক ডিসঅর্ডার-এ আক্রান্ত হন, তাহলে তাকে মনোবিদ কিংবা মনোরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, অন্য ব্যক্তির যৌন কার্যকলাপ দেখে কেউ যদি উত্তেজিত হয়, তাহলে তা কি অসুস্থতা হিসাবে ধরে নেওয়া হবে? না। কিন্তু নিয়মিত যদি অন্য কারওর ব্যক্তিগত জীবনে গোপনে উঁকি দেওয়ার অভ্যাস তৈরি হয়ে যায় এবং কাউকে বিবস্ত্র হতে দেখে কিংবা সঙ্গমে লিপ্ত হতে দেখে নিজে যৌনাচার করেন কিংবা উদ্বেগ, অস্বস্তিতে থেকে কাজকর্মে ব্যাঘাত ঘটে, তাহলে তখন তা রোগে পরিণত হয়। অর্থাৎ, এই অবস্থাটিকে বলা হয়— ভয়েউরিস্টিক ডিসঅর্ডার।

এই লুকিয়ে দেখার বিষয়টি সাধারণ ভাবেও ব্যক্তিত্বহীনতার দিকে নিয়ে যায়। অতিরিক্ত যৌনতা কিংবা ফ্যান্টাসি-র ফলে লুকিয়ে দেখা কুঅভ্যাসে পরিণত হয় এবং সামাজিক স্তরেও বিড়ম্বনায় ফেলে। দেখা যায়, লুকিয়ে কারওর শরীর দেখা কিংবা সঙ্গমে লিপ্ত হতে দেখার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য-যুক্ত ব্যক্তিটি যখন কারওর সঙ্গে চোখে চোখ রেখে কথা বলতেও চান, তখন তিনি তা পারেন না। তার চোখ চলে যায় অন্যের গোপনাঙ্গের দিকে। এক্ষেত্রে সামনে বসে কথা বলতে থাকা নারী কিংবা পুরুষটিও অস্বস্তিবোধ, এমনকী বিরক্তবোধও করেন বেশিরভাগ ক্ষেত্রে।

যদি কোনও ব্যক্তি অতিরিক্ত কামাসক্ত হয়ে গোপনে অন্যের শরীর কিংবা সঙ্গম দেখার কুঅভ্যাস তৈরি করে নেন, তাহলে দেখা যায়, সেই ব্যক্তিটির মেজাজ থাকে খিটখিটে, কর্মক্ষেত্রে সঠিক ভাবে কাজ করতে পারেন না এবং কিছুটা মানসিক অবসাদে ভুগতে থাকেন। আর এই ভয়েউরিস্টিক ডিসঅর্ডার-কে অনেক মনস্তত্ত্ববিদ প্যারাফিলিক ডিসঅর্ডার-ও বলে থাকেন। এটি তীব্র এবং অবিরাম যৌন আগ্রহ, আকাঙ্ক্ষা এবং আচরণ দ্বারা চিহ্নিত হয়, যা ফ্যান্টাসি হিসাবেও বিবেচিত হয়। আর এই ভয়েউরিস্টিক ফ্যান্টাসি সাধারণত বয়ঃসন্ধিকালে কিংবা প্রৌঢ়ত্বেও শুরু হতে পারে। তবে, মহিলাদের তুলনায় পুরুষদের মধ্যে ভয়েউরিস্টিক ডিসঅর্ডার বেশি দেখা যায়। প্রায় বারো শতাংশ পুরুষ এবং চার শতাংশ মহিলা ভয়েউরিস্টিক ডিসঅর্ডারে ভোগেন।

যৌনব্যাধিতে আক্রান্ত ব্যক্তিরা অন্যদের যৌন কার্যকলাপে লিপ্ত হতে দেখে নিজের উপর অস্বাভাবিক যৌনক্রিয়া সম্পাদন করতে পারে কিংবা পার্টনার-এর সঙ্গে যৌনমিলনের সময়ও বন্য আচরণ করতে পারে। ভয়েউরিস্টিক ডিসঅর্ডার-এ আক্রান্ত ব্যক্তিদের অন্যান্য মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যাও হতে পারে। যেমন বিষণ্নতা, অতি-উদ্বেগ এবং মাদকাসক্তি।

আসলে, ভয়েউরিস্টিক ডিসঅর্ডার-এর কোনও একক কারণ নেই। পারিবারিক, সামাজিক সমস্যা ছাড়াও, একান্ত ব্যক্তিগত চাহিদাও এক্ষেত্রে রোগের আকার ধারণ করতে পারে। ভয়েউরিস্টিক ডিসঅর্ডার নির্ণয় করা হয় যখন কারওর যৌন আচরণ এতটাই তীব্র হয় যে, তা ওই ব্যক্তি কিংবা অন্যদের ক্ষতি বা কষ্টের কারণ হয়ে ওঠে। ভয়েউরিস্টিক ডিসঅর্ডার নির্ণয় করতে পারেন একজন সাইকোলজিস্ট, সাইকিয়াট্রিস্ট এবং লাইসেন্সপ্রাপ্ত থেরাপিস্ট। তাঁরা আপনার চিকিৎসার ইতিহাস সম্পর্কে আপনার সঙ্গে কথা বলে এবং আপনার বর্তমান চিন্তাভাবনা এবং অনুভূতি সম্পর্কে প্রশ্ন করে, চূড়ান্ত রোগ নির্ণয় করতে পারেন।

ভয়েউরিস্টিক ডিসঅর্ডার-এ আক্রান্ত ব্যক্তিরা স্বীকার করতে পারেন কিংবা নাও করতে পারেন যে, তাদের আচরণে কোনও সমস্যা আছে। তারা সাধারণত এই বিষয়ে কারওর সঙ্গে কথা বলতে আগ্রহী থাকেন না। ফলস্বরূপ, ভয়েউরিস্টিক ডিসঅর্ডার-এ আক্রান্ত ব্যক্তিরা অনেক ক্ষেত্রে যৌন অপরাধ করার সময় ধরা পড়ার পরেই রোগ নির্ণয়ে তৎপর হন। কিন্তু যদি প্রাথমিক অবস্থায় ভয়েউরিস্টিক ডিসঅর্ডার-এ আক্রান্ত ব্যক্তির চিকিৎসা করা যায়, তাহলে নিজের বা অন্যদের ক্ষতির হাত থেকে বাঁচানো সম্ভব।

ভয়েউরিস্টিক ডিসঅর্ডার সাইকোথেরাপি, ওষুধ অথবা উভয়ের মাধ্যমেই চিকিৎসা করা যেতে পারে। তবে মনে রাখবেন, ভয়েউরিস্টিক ডিসঅর্ডার-এর প্রভাব ব্যক্তিভেদে ভিন্ন। ভয়েউরিস্টিক ডিসঅর্ডার-এর ফলে সৃষ্ট মানসিক চাপ এবং ব্যক্তিত্ব বিকাশের প্রতিবন্ধকতার বিষয়টি ওই ব্যক্তির মেজাজ এবং পরিবেশগত অবস্থার উপর নির্ভর করে।

ভয়েউরিস্টিক ডিসঅর্ডার-এ আক্রান্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসার বিকল্পগুলির মধ্যে রয়েছে সাইকোথেরাপি, ম্যারিটাল থেরাপি, গ্রুপ থেরাপি, ফ্যামিলি থেরাপি, কগনিটিভ থেরাপি প্রভৃতি। এছাড়াও, রোগীদের নির্দিষ্ট ওষুধ দিয়েও চিকিৎসা করা হয়, যার মধ্যে রয়েছে তাদের যৌন হরমোনের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখার ওষুধ।

কখন যৌনাচার ব্যাধিতে পরিণত হয়? মানসিক স্বাস্থ্যের উপর এর প্রভাব কী?

অনেক মানুষের আচরণ, বিশেষকরে যৌনতার সঙ্গে সম্পর্কিত আচরণ, সবসময় পরিষ্কার ভাবে ‘স্বাভাবিক’ এবং ‘অস্বাভাবিক’-এ ভাগ করা যায় না। দৈনন্দিন জীবনে যৌনতা সম্পর্কে কৌতূহল ক্ষণস্থায়ীও হতে পারে। সবসময়-ই যে সমস্যার ইঙ্গিত দেয়, এমনটা নয়। তবে, যখন এই কৌতূহল অবিরাম যৌন উত্তেজনায় পরিণত হয়, তখন এটি একটি সীমা অতিক্রম করতে শুরু করে। এই সময় ভয়েরিজম (voyeurism) একটি মানসিক স্বাস্থ্যব্যাধির রূপ নিতে পারে। ক্লিনিক্যালি, এই অবস্থাকে ভয়েউরিস্টিক(voyeuristic) ব্যাধি হিসাবে উল্লেখ করা হয়, যা DSM-5 (Diagnostic and Statistical Manual of Mental Disorders-5th Edition) এবং ICD-10 ( International Classification of Diseases, 10th Revision) উভয় শ্রেণিবিন্যাস ব্যবস্থা দ্বারা স্বীকৃত। এই রোগ নির্ণয়ের মূল বৈশিষ্ট্যগুলির মধ্যে রয়েছে চলমান এবং তীব্র যৌন আকাঙ্ক্ষা বা আচরণ, যা অ-সম্মতিমূলক পর্যবেক্ষণকে ধরা হয়। কিন্তু রোগ নির্ণয় খুব সহজ নয়। কারণ, এক্ষেত্রে সন্দেহভাজন রোগীর আবেগগত জগৎ, আচরণ, যন্ত্রণা কিংবা অন্যের ক্ষতি করছে কিনা, সেই বিষয়টিও দেখতে হয়।

কোন কোন বৈশিষ্ট্য থেকে বোঝা যায় যে, কেউ ভয়েউরিস্টিক ডিসঅর্ডার-এ ভুগছেন?

ভয়েউরিস্টিক ডিসঅর্ডার গোপনে কাজ করে, যার ফলে তার আশেপাশের লোকেদের পক্ষে এটি প্রাথমিক ভাবে শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। এই ডিসঅর্ডার-এ আক্রান্ত ব্যক্তি লুকিয়ে অন্যদের শরীর দেখে কিংবা সঙ্গমক্রিয়া দেখে অতি-উত্তেজিত হয়ে নিজে অস্বাভাবিক ভাবে যৌনাচার করে। শুধু তাই নয়, এই কার্যকলাপ কুঅভ্যাসে পরিণত হয় এবং নিজে ব্যক্তিত্বহীন হয়ে পড়ে। এর ফলে অপরাধবোধ, লজ্জা এবং উদ্বেগও দেখা দিতে পারে। বিশেষকরে যখন সে তার আচরণের অনৈতিক প্রকৃতি বুঝতে পারে। কিন্তু তবুও নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে না। তখন তাকে ভয়েউরিস্টিক ডিসঅর্ডার-এ আক্রান্ত হয়েছে ধরে নেওয়া হয়। সে তখন ধীরে-ধীরে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হতে থাকে, বিভ্রান্তির শিকার হয় এবং মানসিক অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়তে পারে।

বয়ঃসন্ধিকালের কিশোর-কিশোরীরা কেন ভয়েউরিস্টিক ডিসঅর্ডার-এর বেশি শিকার হন? ভার্চুয়াল জগতে লাগামহীন যৌনদৃশ্য দেখার সুবিধা কি পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করে তুলছে?

কিশোর-কিশোরীরা যখন বয়ঃসন্ধিকালে পৌঁছায়, তখন তাদের তীব্র মানসিক এবং যৌন-চাহিদা তৈরি হয়। কিন্তু ওই সময় তাদের যদি সঠিক ভাবে যৌনশিক্ষা না দেওয়া হয়, তাহলে তারা বিপথে চালিত হতে পারে এবং এই রোগের শিকার হতে পারে। প্রৌঢ় ব্যক্তিরা আবার গোপনে তরুণীদের শরীর দেখতে কিংবা ছুঁতে চান অতিরিক্ত কাম-প্রবণতার কারণে। এই ক্ষেত্রেও নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে না পারলেই হতে পারেন রোগের শিকার। ভার্চুয়াল জগৎ এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে অবশ্যই। অশ্লীল কনটেন্ট, লুকানো ক্যামেরা দ্বারা ক্যাপচার করা অশ্লীল ভিডিও এবং যৌন আচরণকে আকর্ষণীয় করে তোলার মাধ্যমের অফুরন্ত অ্যাক্সেসের কারণে, অনেক তরুণ-তরুণীর মন আবেগগত বা নীতিগত ভাবে এর কুপ্রভাব বুঝতে পারার আগেই রোগের শিকার হতে পারে।

তরুণদের মধ্যে যৌন-প্রেমিক আচরণ বেশি দেখা যায়। এই ক্ষেত্রে গবেষণার অভাবের কারণে ভারতীয় সমাজে এর প্রকোপ এখনও অজানা। আমাদের মতো সমাজে, যৌনতা সম্পর্কে খোলামেলা আলোচনা এখনও সীমাবদ্ধ। তাই, চাই আরও যৌন- সচেতনতা। নয়তো, ভয়েউরিস্টিক ডিসঅর্ডার-এ আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।

পিন-পার্বতীর উৎস অভিযানে (শেষ পর্ব)

খাড়া বরফের দেয়ালের মাঝখানের সরু গলির কাছ থেকে ডানদিকে বাঁক নিলাম। সামনেই বিস্তৃত তুষারের অনন্ত শয্যা। আশেপাশে বরফের ফাটল আছে। কিছু দেখা যাচ্ছে, বাকিটা বরফের অন্তরালে সন্তর্পণে ক্ষুধার্থ শ্বাপদের মতো অপেক্ষা করে আছে। মূর্খ লোকেদের কিছু সুবিধা আছে। কিছুই জানি না, তাই ভয় পাওয়ার কিছু নেই। সামনে থাকা নিম্বুর পদচিহ্নতে পা মিলিয়ে এগিয়ে যাও।

গত কয়েকদিন থেকেই মৃন্ময় পিছিয়ে পড়েছিল। আজ আরও বেশি। একঘেয়ে বরফে চলার ক্লান্তি, অক্সিজেনের অভাব, বারবার গলা শুকিয়ে আসছিল। হাঁ করে থাকা বরফের ফাটল এড়িয়ে এগিয়ে চলেছি। স্বরূপ, আজ বেশ কিছুটা এগিয়ে রয়েছে। সঙ্গী কুকুর লালু। ইয়েতির মতো বিশাল দেহটা চলতে চলতে হঠাৎ হারিয়ে গেল বরফের মধ্যে। অজানা আশঙ্কায় বুক কেঁপে গেল! বরফের ঢাল বেয়ে দৌড়ে চলেছে রাজা আর নিম্বু। আমরা বেশ কিছুটা দূরে। পায়ের তলা শিরশির করছে, বুকের মধ্যে দামামা।

বারবার বলি এগিয়ে যাস না! একসাথে যাব। এই বিপদজনক পথ একাকী যাওয়া অনুচিত। হঠাৎ দেখি, স্বরূপের মাথা দেখা যাচ্ছে। আস্তে আস্তে পুরো দেহ। দূর থেকে হাত নেড়ে জানাল, সব ঠিক আছে। সবার স্বস্তির নিঃশ্বাস পড়ল। একে একে সবাই পৌঁছে গেলাম ক্রিভাসের ধারে। প্রায় ৫ ফুট চওড়া ও ৫ ফুট গভীর। অনেকক্ষণ অপেক্ষার পর স্বরূপ সাহস করে নেমে পার হতে গিয়ে বরফে গেঁথে গেছে। ফাটল-এর নীচে পায়ের ছাপ দেখে এই দুঃসাহসিক কাজটি করে ফেলেছে। রোপ ও আইস এক্সের সাহায্য নিয়ে আমরা একে একে পেরিয়ে এলাম। আমায় যেন অন্যরকম ভালোলাগায় পেয়ে বসেছিল। চলতে চলতে বারবার থামছিলাম। অসম্ভব চড়াই বেয়ে মনে মনে পৌঁছে যাচ্ছিলাম পাহাড়ের শীর্ষে, যেখানে আকাশ পৃথিবীর শরীর ছুঁয়ে আছে পরম মমতায়, ভালোবাসায়। থামার সময়টুকু পেরোতেই আবার এগিয়ে চলা নিঃশব্দে। শুভ্র বরফের উপর চলার শব্দ। পথ ধীরে ধীরে উঠেছিল মাথার উপর দিগন্তহীন নীল আকাশের দিকে।

বরফের দেয়ালের প্রান্তদেশে কালো সীমারেখা। ওখানেই পৌঁছাতে হবে। গিরিশিরাটি অর্ধচন্দ্রাকারে বেষ্টন করে আছে। বাঁদিকের একটা অংশ কিছুটা চাপা। কিন্তু ওখান দিয়ে অতিক্রম করতে হবে! সাবধানে সেগুলি পেরিয়ে, বাঁদিকের পাহাড়ের ঢাল বেয়ে এক টানা উঠতে থাকলাম। ক্র্যাম্পন না থাকায় বারবার পিছলে যাচ্ছিলাম। শরীরের শেষ শক্তিটুকু উজাড় করে ওই বরফের মসৃণ দেয়াল বেয়েই উঠে এলাম চির কাঙ্ক্ষিত পিন পার্বতী পাসের শীর্ষে।

চোখের সামনে তুষার মৌলি হিমালয়ের গিরিরাজরা। দক্ষিণ পার্বতী, স্নো পিক, কাঙলা টাবো, রিজ পিক, পিরামিড পিক, কুলু মাকালু, বড়া শিগ্রি, ওয়েস্ট হর্ন প্রভৃতি। এছাড়াও কত নাম না-জানা শৃঙ্গ উজ্জ্বল আলোকে উদ্ভাসিত। পায়ের নীচে সাদা মেঘ অঞ্জলি দেওয়া ফুলের মতো ছড়িয়ে রয়েছে। বিমুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখছিলাম চূড়ায় চূড়ায় আলোর খেলা। চির তুষারাচ্ছন্ন হিমালয়ের অপরূপ সৌন্দর্যের মধ্যে যেন হারিয়ে ফেলেছিলাম নিজেকে!

সবার চোখ-মুখ চুঁইয়ে পড়ছিল বিজয়ের আনন্দ। ভালোলাগা আর ভালোবাসায় বারবার জড়িয়ে ধরেছিলাম পরস্পরকে। আনন্দের এই মুহূর্তগুলোকে সবাই ক্যামেরাবন্দী করতে ভুলল না। পূজা পাঠ, খাওয়া-দাওয়া করতেই এক ঘণ্টা কেটে গেছে। দাঁড়িয়ে আছি ১৭,৩৮৮ ফুট উচ্চতায়। সংকীর্ণ পরিসরের এই বিভাজিকাটির দুই দিকে খাড়া ঢাল অতলে নেমে গেছে। সামান্য এদিক ওদিক হলেই অস্তিত্ব রসাতলে!

দ্রুত গতিতে সবাই নামতে শুরু করল। এক ঘণ্টার মধ্যে এসে পৌঁছে গেলাম পাথরের রাজ্যে। এখান থেকে অনেকটা নীচে বাঁদিকে দেখা গেল একটি হিমবাহ। তার দু-দিক থেকে দুটি ধারা এসে মিলিত হয়ে সৃষ্টি করেছে পিন নদী। কিছুটা যাওয়ার পর একটা ক্যাম্পিং গ্রাউন্ড দেখতে পেলাম। সম্ভবত পিন উপত্যকার দিক থেকে অভিযাত্রীদের বেস ক্যাম্প। এখান থেকে ক্রমাগত নেমে চলা। হাঁটু বিদ্রোহ করতে শুরু করেছে। অনেক নীচ দিয়ে বয়ে চলেছে পিন নদী। বাঁদিকের হিমবাহটি আধ কিমির বেশি চওড়া নয়। গল্প করতে করতেই নেমে এলাম নদী উপত্যকায়। এখানে জল অসংখ্য ধারায় বিভক্ত।

উচ্ছল, উত্তাল স্রোতস্বিনী পাগলা ঝোরা উদ্দাম গতিতে এগিয়ে চলেছে। সবাই জুতো খুলে, প্যান্ট গুটিয়ে প্রস্তুত। ছোটোখাটো চেহারার সুনীত তখনও ভ্যাবলাকান্ত হয়ে পাথরের উপর বসে। যে কুলিরা পেরিয়ে গেল তাদের হাঁটুর উপর জল। সুনীতের তো বিপদসীমা ছুঁয়ে যাবে! অনিচ্ছা সত্ত্বেও সবাই নেমে পড়ল জলে। মালবাহকেরা ধরে রয়েছে। জলে ডুবে থাকা পাথরগুলি পদতলে অসহনীয় ভাবে বিধছে। নদী পেরিয়ে সমতল পথ ধরে ৪৫ মিনিট হাঁটার পর পাথর ঘেরা একটা সুন্দর জায়গা পাওয়া গেল। নিম্বু বলল জায়গাটার নাম “থিয়া থাচ”। পাশ দিয়েই নাচতে নাচতে বয়ে চলেছে পিন নদী। এখান থেকে দেখা যায় বরফাবৃত শৃঙ্গগুলিকে। কুলু উপত্যকায় মেঘের বসন পিন উপত্যকার শিখরগুলি ত্যাগ করে একসাথে অনাবৃত হয়ে রয়েছে, চোখ ফেরানো দায়।

( 6 )

এবার ঝকঝকে সকাল এল অজস্র রোদ্দুরকে সঙ্গে নিয়ে। অকলংকিত গিরিশীর্ষগুলি ঝলমল করছিল নীল আকাশের পেক্ষাপটে। সামনে জরাগ্রস্ত নারীর বুকের মতো সজীবতাহীন উপত্যকা। ঠান্ডা হাওয়া রুক্ষ উপত্যকার বুক ছুঁয়ে আলতো করে বইছে। আজ আমাদের দীর্ঘ পথ অতিক্রম করতে হবে। তিয়া থেকে মুদ গ্রামের দূরত্ব ২৫ কিমির বেশি। সহজ পথ হলেও সংকীর্ণ, অসমান পাথুরে। সবার মধ্যেই খুশির ঝলক। দীর্ঘদিন পরে জনজীবনে ফিরে যেতে পারবে! পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগও রয়েছে। প্রাতরাশ খেয়ে বেরোতে বেরোতেই বেশ দেরি হয়ে গেল। পিন উপত্যকার বুকে দাঁড়িয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে শেষবারের মতো দেখে নিলাম পিন পার্বতী পাসকে।

উপত্যকার মাঝ দিয়ে বয়ে চলেছে চঞ্চলা পিন নদী। নদীপাশের বিভিন্ন আকৃতির পাহাড়গুলিতে যেন টেরাকোটার সূক্ষ্ম কাজ। সকালের নরম রোদ্দুর পড়ে নানা রঙের বদল ঘটছে। লাদাখের পাহাড় ও ধূসর কিন্তু এত রঙের বাহার পাহাড় দেখা যায় না। স্পিতির এই নিভৃত অঞ্চল কত সুন্দর না দেখলে বিশ্বাস হয় না। মুগ্ধ বিস্ময়ে দেখতে দেখতে এগিয়ে চলেছি। প্রায় ৪ ঘন্টা হাঁটার পর পৌঁছে গেলাম বাঁধানো রাস্তায়।

এখানে পিন নদীতে মিলিত হয়েছে আরেকটি নদী। বহুক্ষণ চলল আড্ডা। এখনও অনেক পথ। বাকি রাস্তাটুকুর জন্য গাড়ি পাওয়া দুরাশা। পিন নদীকে সঙ্গে নিয়ে চলছি তো চলছি। অনন্ত পথ শেষ আর হয় না! শক্ত পাথরে পথে চলতে গিয়ে পায়ে বেশ ক’টি ফোস্কা পড়েছে। পোড়া পা আর সঙ্গ দিচ্ছে না! দূরে দুর্গের মতো দেখতে পাহাড়ের কোলে একখানি ছোট্ট গ্রাম দেখা যাচ্ছে! পিন নদী এখান থেকে ডানদিকে বাঁক নিয়েছে। হাতের কাছেই লাল, সবুজ, হলুদ ধূসর পাহাড় সারি সারি দাঁড়িয়ে রয়েছে। মাঝে মাঝেই তাদের বুক চিরে নেমে আসা জলধারা ধুইয়ে দিয়ে যাচ্ছে পথ। ভেড়-বকরির দল চরে বেড়াচ্ছে পাহাড়ের গায়ে। ঘাসের বোঝা নিয়ে ঘরমুখো গ্রামের মেয়েরা। পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় গোলাপি ঠোঁটের নরম হাসির ঢেউ তোলে। হলদে হয়ে আসা বিকেলের আলো, পাহাড়ি মেয়েগুলির মতোই রূপসি। স্বর্গ থেকে বিদায় নেওয়ার দুঃখে মন ভাঙছিল। আবার নতুন করে অপেক্ষা!

এক সময় ক্লান্ত চরণ এসে যায় মুদ গ্রামের প্রাঙ্গণে। পিন উপত্যকার পটভূমিতে দিগন্ত জুড়ে দাঁড়িয়ে থাকা অসংখ্য পাহাড়গুলির শরীর থেকে ধীরে ধীরে মুছে যাচ্ছিল অস্তরবির আলো। শুকিয়ে আসা বিবর্ণ কড়াইশুঁটির গাছের উপর দিয়ে হিমেল হাওয়া বয়ে যাচ্ছিল হু হু করে, বুক ফাটা দীর্ঘশ্বাসের মতো। আমার আত্মা, সত্তা, অস্তিত্ব জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে এক শুদ্ধ অনাবিল অনুভূতি।

৩১তম কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে থাকছে চমক

৬ নভেম্বর থেকে কলকাতার সিনেমাপ্রেমীরা মেতে উঠবেন চলচ্চিত্র উৎসবে। ২৮ অক্টোবর রবীন্দ্র সদনে আয়োজিত সাংবাদিক সম্মেলনে, আনুষ্ঠানিক ভাবে দেওয়া হয়েছে এবারের  কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য। সাংবাদিক সম্মেলনে উপস্থিত থেকে এই তথ্য পরিবেশন করেছেন মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস, মন্ত্রী ইন্দ্রনীল সেন, কেআইএফএফ-এর ডিজি এবং আই অ্যান্ড সিএ-র প্রিন্সিপাল সেক্রেটারি সান্তনু বসু, অভিনেতা প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়, অভিনেত্রী জুন মালিয়া, কোয়েল মল্লিক, চলচ্চিত্র পরিচালক হরনাথ চক্রবর্তী প্রমুখ। এবারের ফেস্টিভ্যাল-এর চেয়ারম্যান গৌতম ঘোষ উপস্থিত থাকতে পারেননি ওই দিনের সাংবাদিক সম্মেলনে।

জানানো হয়েছে, ৩১তম কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব শুরু হবে ৬ নভেম্বর এবং উৎসব শেষ হবে ১৩ নভেম্বর (২০২৫)। উদবোধনী অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে ধনধান্য অডিটোরিয়াম-এ। ৬ নভেম্বর বিকেল চারটের সময় এই উৎসবের সূচনা করা হবে। উপস্থিত থাকবেন পশ্চিমবঙ্গের মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তবে সূচনা পর্বে আর কারা থাকবেন তা স্পষ্ট করে কিছু জানানো না হলেও, শোনা যাচ্ছে অভিনেতা শত্রুঘ্ন সিনহা, ‘শোলে’ ছবির পরিচালক রমেশ সিপ্পি, অভিনেত্রী শর্মিলা ঠাকুর প্রমুখ উপস্থিত থাকতে পারেন। সূচনা লগ্নে নৃত্য পরিবেশন করবেন ডোনা গঙ্গোপাধ্যায়।

এবার উদবোধনী ছবি হিসাবে থাকছে ১৯৬১ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘সপ্তপদী’। অজয় কর পরিচালিত এই ছবিতে অভিনয় করেছেন উত্তম কুমার, সুচিত্রা সেন, ছায়া দেবী এবং ছবি বিশ্বাস। ২০২৫ সালে নির্মিত স্পোর্টস সিনেমাও থাকছে এবারের উৎসবে এবং থাকছে পরিবেশ বিষয়ক চারটি ছবি। ৩৫এমএম সেলুলয়েড ফিলম রাজা গুপ্ত-র ‘নয়নতারা’ দেখানো হবে শিশির মঞ্চে। ১৮৫টি ফিচার ফিলম ছাড়াও, স্বল্পদৈর্ঘ্য এবং তথ্যচিত্র মিলে থাকছে ৩০টি, অর্থাৎ ৩৭টি বিভাগে মোট ২১৫টি সিনেমা দেখানো হবে ৩১তম কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে। মোট ১৮২৭টি ছবির মধ্যে থেকে বেছে নেওয়া হয়েছে এই ছবিগুলি।

৩৯টি দেশের ১৮টি ভারতীয় ভাষার ছবি এবং ৩০টি বিদেশি ভাষার ছবির স্ক্রিনিং হবে এবারের উৎসবে। ফিচার ফিলম ১৩২টি, এরমধ্যে কম্পিটিশন বিভাগে থাকবে ৪৩টি ছবি এবং নন-কম্পিটিশন বিভাগে থাকবে ৮৯টি ছবি। এবারের ট্যাগলাইন ‘চলচ্চিত্র মেলায় বিশ্ব’। এবারের কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব প্রসঙ্গে সাংবাদিক সম্মেলনে বক্তব্য রাখতে গিয়ে কিছুটা আবেগের সুরে  ‘সুপার সাকসেস’-এর আশ্বাস দিলেন মন্ত্রী এবং সংগীতশিল্পী ইন্দ্রনীল সেন।

এবার জুরি মেম্বার হিসাবে থাকছেন কাজাকস্তান, কোরিয়া এবং ভারতীয় বিশিষ্ট পরিচালকরা। এবারের উৎসবের ফোকাস কান্ট্রি পোলান্ড। তাই, দেখানো হবে মোট ১৯টি পোলিস ফিলম।

ইনোভেশন ইন মুভিং ইমেজেস-এ ১৪টি ছবি, কম্পিটিশন ইন ইন্ডিয়ান ল্যাঙ্গুয়েজেস ফিলম ১৪টি, এশিয়ান সিলেক্ট নেট প্যাক অ্যাওয়ার্ড ৯টি, কম্পিটিশন ইন শর্ট ফিলমস ১৯টি, কম্পিটিশন ইন ডকুমেন্টরি ফিলম ১০টি, বেঙ্গলি প্যানোরমা বিভাগে থাকবে ৭টি ফিলম। ইনোভেশন ইন মুভিং ইমেজেস ক্যাটাগরিতে থাকছে অ্যাওয়ার্ড, বেস্ট ফিলম ইন ইন্টারন্যাশনাল কম্পিটিশন প্রেস্টিজিয়াস রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার গোল্ড ট্রফি এবং ক্যাশ প্রাইজ, বেস্ট ডিরেক্টর ইন ইন্টারন্যাশনাল কম্পিটিশন প্রেস্টিজিয়াস রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার গোল্ডেন ট্রফি এবং ক্যাশ প্রাইজ, কম্পিটিশন ইন ইন্ডিয়ান ল্যাঙ্গুয়েজেস ফিলম হীরালাল সেন মেমোরিয়াল ট্রফি এবং ক্যাশ প্রাইজ, বেস্ট ডিরেক্টর ইন ইন্ডিয়ান ল্যাঙ্গুয়েজেস ফিলম হীরালাল সেন মেমোরিয়াল ট্রফি এবং ক্যাশ প্রাইজ, সেইসঙ্গে বেস্ট শর্ট ফিলম এবং বেস্ট ডকুমেন্টরি ফিলম-এর জন্য বরাদ্দ রয়্যাল বেঙ্গল গোল্ডেন টাইগার ট্রফি এবং ক্যাশ প্রাইজ। রেয়ার ল্যাঙ্গুয়েজেস ফিলমস স্ক্রিনিংও হবে এবারের উৎসবে।

মুখ্যমন্ত্রীর ইচ্ছেকে প্রাধান্য দিয়ে এবার থাকছে ‘গানে গানে সিনেমা’ অর্থাৎ বিভিন্ন সিনেমার গান এবং আড্ডা চলবে মুক্ত মঞ্চে। লোকগান, রোমান্টিক গান, রাগাশ্রয়ী গান সহ বিভিন্ন আঙ্গিকের বিষয়ভিত্তিক গান গাইবেন বাংলার সংগীতশিল্পীরা। শিল্পীদের তালিকায় আছেন শিবাজী চট্টোপাধ্যায়, অরুন্ধতি রায়চৌধুরী(চট্টোপাধ্যায়), অরিন্দম গঙ্গোপাধ্যায়, ইমন চক্রবর্তী, কবীর সুমন, ইন্দনীল সেন, অরিত্র দাশগুপ্ত, শুভঙ্কর ভাস্কর, নচিকেতা চক্রবর্তী, রূপংকর বাগচী প্রমুখ। সেইসঙ্গে রোমান্টিক গান গেয়ে শোনাবেন অভিনেতা প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়।

মোট ২০টি ভেন্যুতে (উদবোধনী ছবি নিয়ে ২১টি ভেন্যু) দেখানো হবে উৎসবের সিনেমাগুলি। নন্দন ওয়ান, নন্দন টু, নন্দন থ্রি, রবীন্দ্র সদন, শিশির মঞ্চ, নজরুল তীর্থ ওয়ান, নজরুল তীর্থ টু, রাধা স্টুডিও, রবীন্দ্র ওকাকুরা ভবন সল্টলেক, স্টার(বিনোদিনী থিয়েটার), এসএসআর গ্লোব সিনেমা, নিউ এম্পায়ার, নবীনা, এসএসআর অজন্তা সিনেমা, মেনকা, প্রাচী, আইনক্স সাউথ সিটি, আইনক্স কোয়েস্ট মল, মানি স্কোয়ার, এবং আইনক্স মেট্রো সিনেমা-য় সিনেমাগুলি দেখতে পারবেন দর্শকরা। আর প্রতি বছরের মতো এবারও থাকছে সিনে আড্ডা এবং প্রদর্শনী।

পড়ার জন্য সীমাহীন গল্প-নিবন্ধসাবস্ক্রাইব