পিন-পার্বতীর উৎস অভিযানে (পর্ব-০৫)

প্রায় দু-ঘণ্টা হাঁটার পর সামনে দেখা গেল সম্মুখ গ্রাবরেখা খাড়া স্তুপকে। নিন্নু জানাল, এই উঁচু পাথরের স্তূপের পিছনেই রয়েছে পার্বতী নদীর উৎস ‘মানতালাই’ লেক। দক্ষিণ-পশ্চিম দিকের ঝুলন্ত হিমবাহের পাথর গড়িয়ে এসে পার্বতীর গতিপথকে আটকে তৈরি হয়েছে বিশাল এক সরোবর।

বাঁদিক থেকে নেমে আসা কয়েকটি জলধারা অতিক্রম করে খাড়া চড়াই ভেঙে উঠতে শুরু করলাম। সাদা মেঘ দেখতে দেখতেই ঢেকে দিল চরাচর। সঙ্গে সাবু দানার মতো বরফ কুচির উপহার। সবাই পলিথিন শিট ঢেকে নিলেও এতটা ঠান্ডার জন্য প্রস্তুত ছিলাম না। হাড় কাঁপানো ঠান্ডায় থরথর করে কাঁপছি। ঝুরো পাথরের পথ ভয়ংকর পিচ্ছিল হয়ে উঠেছে। পায়ের চাপে খসে যাচ্ছে পায়ের তলার আলগা পাথর। অক্সিজেনের অভাব প্রকট হয়ে উঠেছে। বুক হাপরের মতো উঠানামা করছে। জিভ শুকিয়ে কাঠ। বোতলের ঠান্ডা জলে গলা ভিজিয়ে নিয়ে আস্তে আস্তে চড়াই ভেঙে উপরে উঠে এলাম। পিঠটা ঠেকিয়ে দিলাম পাথরের দেয়ালে, কিছুটা বিশ্রামের তাগিদে।

এখান থেকে সামনে অনেকটা নীচে মানতালাই সরোবরকে দেখা গেল। চড়াই ভাঙা শেষ হলেও বিপদমুক্ত নই আমরা! সরু খাড়া ঢালের পিচ্ছিল উতরাই পথ অনেক বেশি বিপদসংকুল। ধীর পায়ে সাবধানে একে একে নেমে এলাম সরোবরের ধারে। নীচে পাথর সাজিয়ে তিন- চারটি বেদি তৈরি করা হয়েছে। তিনটি সিঁদুর মাখা ত্রিশূল পোঁতা রয়েছে। কাপড়ের টুকরো হাওয়ায় উড়ছে পতপত করে। সবাই পবিত্র সরোবরের জল মাথায় ছিটিয়ে বসে গেলাম উপাসনার কাজে। ধূপ জ্বালিয়ে প্রসাদ অর্পণ করা হল দেবতার পায়ে। কথিত আছে দেবী পার্বতী ও অন্যান্য দেব-দেবীরা বছরে কোনও এক বিশেষ দিনে এখানে স্নান করতে নামেন। ছবি তুলে ও প্রসাদ খেয়ে এগিয়ে চললাম গন্তব্যে। আকাশ এখন অনেকটা পরিষ্কার। আধ ঘণ্টা হেঁটে পৌঁছে গেলাম আমাদের কাঙ্খিত লক্ষ্যে।

(8)

এত কিছু শব্দ কানের মধ্যে ঢুকলেও মাথা পর্যন্ত যাচ্ছিল না। ভালো লাগার রেশে সারা মন প্রাণ ডুবে ছিল। তাঁবুর বাইরে বেরিয়ে মন ভরে গেল। মানতালাই লেকের উপর দাঁড়িয়ে থাকা ত্রিভুজ আকৃতির শৃঙ্গটি সোনালি টোপর পরে ফেলেছে। চারিদিকে সুউচ্চ পর্বতে ঘেরা বিশাল আয়তনের সরোবরটির জল যেন কাকচক্ষুর মতো, দেখে মনে হয় যেন একখণ্ড সুবিশাল নীলকান্তমণি। তুষারাবৃত পর্বত থেকে নেমে আসা বরফ গলা জলে এই হ্রদ সর্বদা পূর্ণ থাকে। পিরামিড শৃঙ্গের প্রতিকৃতি সুস্পষ্ট ভাবে ফুটে থাকে সরোবরের জলে।

তাঁবুর গায়ে জমাট বাঁধা বরফ। কালকের জলতরঙ্গ খেলে যাওয়া লেকটি জমে স্তব্ধ হয়ে গেছে। আজ সারাদিন বিশ্রাম। লেকের চারপাশ ঘুরে ছবি তোলা আর গল্পে কেটে যায়।

পরের দিনের গন্তব্য মানতালাই থেকে উচ্চ পার্বতী বেস ক্যাম্প। আজ আমাদের চড়াই পথে ১৩ কিমি পথ অতিক্রম করতে হবে। অধিক উচ্চতার কারণে বাতাসে অক্সিজেনের অভাব রয়েছে। গতকাল রাতে রাঁধুনি দীপকের জন্মদিন পালন করেছি। পোলাও ছিল অপূর্ব স্বাদের। টিনের বাক্সে থাকা গোলাপ জামুনের সদগতি করেছি সবাই। আজ সকাল সকাল রওনা হওয়ার কথা থাকলেও ভিজে তাঁবু শুকিয়ে বের হতে দেরি হবে। ঠিক হল রাজা আর নিন্ধু আমাদের সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে যাবে। রাঁধুনি দীপক তাঁবু শুকিয়ে, গুছিয়ে আসবে পিছনে।

তাঁবু খুলতে গিয়ে পার্থ আবিষ্কার করল গন্ধের উৎস। আমাদের প্রিয় কুকুর লালুর গা থেকেই আসছে বিটকেল পচা গন্ধ। গতকাল রাতে মাঝে মাঝেই পেয়েছি আর পরস্পর ভুল কথা ভাবছিলাম। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় আমাদের তাঁবুর আউটারের নীচে আশ্রয় নিয়েছিল লালু।

সকাল ৭টা ৩০ মিনিটে রওনা হলাম পিন পার্বতী বেস ক্যাম্পের উদ্দেশ্যে। গতকাল নিম্বু বলছিল, আগে এই পার্বতী হিমবাহ ধরে কয়েক কিমি যাওয়ার পর পার্বতী নদীকে অনুসরণ করে বাঁদিকের গিরিশিরার উপর চড়তে হতো। ১০ কিমি দীর্ঘ পার্বতী হিমবাহ অসংখ্য ক্রিভাস সমৃদ্ধ ও বিপদজনক বলে এই পথে আর কেউ যায় না। পরিবর্তে বাঁদিকের ছোট্ট একটা নদী অতিক্রম করে ৬০-৭০ ডিগ্রি খাড়া চড়াই ভেঙে পৌঁছাতে হবে গিরিশিরার মাথায়।

বাঁদিকের খাড়া পাহাড়ের পাদদেশ দিয়ে হাঁটতে শুরু করলাম। একদিনের বিশ্রামে সবাই তরতাজা হয়ে উঠেছে। গল্প মজা করতে করতেই পৌঁছে গেলাম একটি বড়ো ঝোরার কাছে। পাহাড়ের মাথা থেকে পাথরের খাঁজে খাঁজে উদ্দাম নৃত্য করতে করতে নেমে আসছে জলধারা। দূর থেকে শব্দ শুনেই ধারণা করেছিলাম আকৃতির। পথ অতিক্রমে বাধা হয়ে দাঁড়াল। কোমরে দড়ি আর হাত ধরাধরি করে সবাই পেরিয়ে এলাম। তীব্র ঠান্ডা বরফ গলা জলে নিম্নাঙ্গ অবশ হয়ে গেল। আদুরে হাতে ঘষে ঘষে ওম দেওয়ার চেষ্টা চলল কিছু সময়।

আরও কুড়ি মিনিট হাঁটার পর পৌঁছে গেলাম খাড়া পথের নীচে। নিন্ধু আঙুল দিয়ে দেখাল ওই পথেই যেতে হবে আমাদের। খাড়া পাথরের দেয়ালের গায়ে সংকীর্ণ পথরেখা।

মানসিক ভাবে প্রস্তুত হলাম, এ যাত্রার সব থেকে কঠিন পথ অতিক্রম করার লক্ষ্যে। বলা হল প্রত্যেকের সঙ্গে ১৫ থেকে ২০ ফুট ব্যবধান রেখে ধীরে ধীরে চলতে। পাথর না পড়ে সে ব্যাপারে বিশেষ ভাবে সতর্ক করা হল। ঠিক হল সামনের জন যতক্ষণ চড়াই ভাঙবে নীচের ব্যক্তি অপেক্ষা করবে। ভুলবশত পাথর খসে পড়লে নীচের সবাইকে সাবধান করে দেবে।

শুরুটা হল চমৎকার। সিঁড়ি ভাঙার মতো চড়তে শুরু করলাম। আস্তে আস্তে দেহভার অসহ্য হয়ে উঠল। বুকের ভিতরে থাকা হৃদযন্ত্রটি ফেটে বেরিয়ে আসতে চাইছে। উপর দিকে তাকিয়ে বুঝতে চাইছিলাম চড়াইয়ের ভয়ংকরতা। টানা আকাশমুখী পথ। নাগালের মধ্যেই ফুটে রয়েছে সূর্যমুখীর মতো দেখতে ফুল। খাড়া ঢালে দাঁড়িয়ে ছবি তোলার মতো অবস্থাতেও নেই। দুয়েকবার ছোটো পাথর খসে পড়লেও কারও বিপদ ঘটেনি। প্রায় দু’ঘণ্টার প্রাণান্তকর চড়াই ভেঙে পৌঁছে গেলাম উপরে।

বরফের ঘোমটা টেনে পিরামিড আকৃতির ‘দক্ষিণ পার্বতী’ শিখর লাজুক চোখে তাকিয়ে রয়েছে। নীল আকাশের গায়ে অপরূপা হয়ে দাঁড়িয়ে। আকাশের দিক থেকে চোখ নামিয়ে আনলাম নীচের পৃথিবীতে। U-আকৃতির বিস্তৃত ধূসর হিমউপত্যকা। মাঝে মাঝেই হিমবাহের দেহপটে সবুজাভ জলরাশি (Tarn Lake) দৃশ্যমান। পার্বতী উপত্যকার দুই পাশে খাড়া পর্বত শ্রেণি। অধিকাংশের মাথা বরফের টোপর পরা। এখনও অনেক পথ বাকি! অধিকাংশই বোতলের জল প্রায় শেষ করে ফেলেছে। নিন্ধু জানাল— ‘পানি আভি নেহি মিলেগা। অউর ১ ঘণ্টা চলনেসে মিল জায়েগা।’

তুলনামূলক সহজ পথে এগিয়ে চললাম। পরপর গিরিশিরাগুলি অতিক্রম করে পৌঁছে গেলাম পার্বতী নদীর পার্শ্বে। অনেক নীচ দিয়ে প্রবল গর্জনে বয়ে চলেছে। নদীকে ডানদিকে রেখে এগিয়ে চললাম উৎসমুখের দিকে। স্যাঁতস্যাঁতে জোলো বাতাস বুকভরে টেনে নিয়েও জলের পিপাসা মিটল না। বুকের মধ্যে রুক্ষ মরুভূমির পিপাসা। আরও মিনিট পনেরো হাঁটার পর পৌঁছে গেলাম আদিগন্ত বোল্ডারের সাম্রাজ্যে। পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে তির তির করে বয়ে আসা জল সবার তৃষ্ণা নিবারণ করল।

বারবার চোখ আকাশ ছুঁলেও মন ভাবছিল অন্য কথা। হিমালয়প্রেমী কত মানুষের স্মৃতি বুকে নিয়ে আছে এই পাহাড়, এই পথ। এই ছড়ানো পাথরেরা কত অভিযাত্রীদের দেখেছে। তাদের কত কথা, কত গল্পের এরা সাক্ষী! ভাবতে ভাবতে কখন দু’চোখ জুড়ে এসেছিল মনে নেই, এমন সময় নিম্বুর গলা— ‘চলিয়ে সাব! কাফি দূর জানা হোগা। মৌসম ঠিক নেহি লাগ রাহা হ্যায়।’

নিম্বুর ডাকে ধড়মড় করে দাঁড়িয়ে পড়লাম। চোখ মেলে দেখি পশ্চিম আকাশে রূপসি মৌসমের এ কী রূপ! পিঠ বেয়ে নামা একঢাল এলো চুলের মতো কালো মেঘ পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নামছিল। অবাধ্য পদযুগলকে যত দ্রুত গতিতে সম্ভব এগিয়ে নিয়ে চললাম। নড়বড়ে পাথরের মধ্যে হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়ে গেলাম। খাড়া অনন্ত পাথুরে পথ। টলমল করতে করতে এক সময় পৌঁছে গেলাম প্রশস্ত তুষার খেতের সন্নিকটে। স্থাপিত হল আজকের শিবির পার্বতী বেস ক্যাম্প। উচ্চতা ১৬,২০৭ ফুট অর্থাৎ তিন হাজার ফুট উচ্চতা চড়তে হয়েছে। চড়াই ভেঙে সবাই ক্লান্ত। বাইরে ঝোড়ো হাওয়া ঠান্ডার তীব্রতাকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। সন্ধ্যা হতেই স্লিপিং ব্যাগের উষ্ণতায় আশ্রয় নিলাম। দূর থেকে অনবরত ভেসে আসা ভয়াল বুমবুম বরফ ভাঙার শব্দ শুনতে শুনতেই ঘুমের দেশে হারিয়ে গেলাম।

( 5 )

ভোরে ঘুম ভেঙে গেল। তাঁবুর বাইরে গিয়ে দেখি নীল আকাশের কণ্ঠলগ্ন হয়ে আছে হিমগ্ন শিখর। প্রথম সকালের নরম আলোয় ফুলশয্যার রাতের মতো সোহাগে যেন ভাসছিল। এই দিনটি আমাদের কাছে অতি গুরুত্বপূর্ণ। বহু অক্ষাঙ্খিত পিন-পার্বতী গিরিবর্তে পৌঁছাতে চলেছি। সামনে শেষ পথটুকু, ইতি টানলেই পৌঁছে যাব স্বর্গের ঠিকানায়। শেষবারের মতো তাই তাগিদটাকে উসকে দিলাম।

প্রাতরাশ খেয়েই সারিবদ্ধ উটের মতো এগিয়ে চললাম কচ্ছপের পিঠের মতো আকৃতি এবং কঠিন বরফের ঢাল বেয়ে। শুভ্র বিপুলাকার উত্তাল ময়দানটির শেষ প্রান্তে কালো পাথরের খাঁজ দেখা যাচ্ছে। যত উপরে উঠছি ঢাল অপেক্ষাকৃত সহজ হয়ে আসছে। একে একে সবাই উপরে উঠে এল। উপরের ক্ষেত্রটি প্রায় সমতল তবে নরম বরফে ঢাকা।

১০টি বাংলা গান ও ১টি হিন্দি গান প্রকাশ করা হল আনুষ্ঠানিক ভাবে

অনুভব হাজরা ও সঞ্জয় চক্রবর্তী-র লেখা গানে এবং সঞ্জয় চক্রবর্তী-র সুরে, ১০টি বাংলা গান ও ১টি হিন্দি গান প্রকাশ করা হল কলকাতা-র কালীঘাট অঞ্চলে অবস্থিত যোগেশ মাইম আকাদেমিতে। বর্তমান ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘের প্রধান সম্পাদক স্বামী বিশ্বাত্মানন্দজী মহারাজ এই সংগীত সংকলনের শুভ উদ্বোধন করেন এবং মহতি কর্ম উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি জানিয়েছেন, ‘স্বামী প্রণবানন্দজী মহারাজ তাঁর মহান কর্ম কান্ডের মাধ্যমে সমাজের সর্বস্তরে সমান ভাবে সমাদৃত। আজ এই সংগীত সংকলন সঙ্ঘের ভক্তকুল ও জনমানসে আধ্যাত্মিকতায় ও কর্মক্ষেত্রে বিশেষ প্রভাব ফেলবে।’

ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘের সংস্থাপক যুগাবতার শ্রীমৎ স্বামী প্রণবানন্দজী মহারাজের নররূপে আবির্ভাব ও দিব্যজীবন চর্চাকে সমাজ জীবনে প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্য নিয়ে ‘মন্মথপুর প্রণব মন্দির’  এক অভিনব সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উপহার দিল যোগেশ মাইম আকাদেমিতে। এই উপলক্ষ্যে ‘প্রণবাঞ্জলি অ্যাপ’ এবং ইউটিউব চ্যানেল ‘যুগের প্রণববাণী’ লঞ্চ করা হল আনুষ্ঠানিক ভাবে।

স্বামী প্রণবানন্দজী মহারাজকে নিয়ে ইতিপূর্বে বহু বিদগ্ধ সন্ন্যাসী ও পন্ডিত গান লিখেছেন, সুর দিয়েছেন এবং সংগীতের মাধ্যমে মননে, চিন্তনে কর্মধারায় পরিবর্তন এনেছেন। আজও ভিন্ন সাধের কিছু গান আগামী দিনে স্বামী প্রণবানন্দজী মহারাজের পৃথিবীতে আবির্ভাব ও জনমানসে তাঁর সুচিন্তন ভাবনার প্রতিফলন ঘটাবে বলে মনে করেন ভক্তরা।

এক প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যামে জানানো হয়েছে, এই মহৎ উদ্যোগের দৃঢ় অঙ্গীকার, প্রয়াস ও সংগীত সংকলনে সমস্ত শিল্পীর সাফল্য শ্রীশ্রী গুরুমহারাজের কৃপায় আগামী দিন বিস্তার লাভ করবে। সংগীত সংকলনের সব থেকে আকর্ষনীয় বিষয় হল— সঙ্ঘবাণী, সাধন সিদ্ধবাণী এবং হিন্দু মিলন মন্দির পাঁচালি। এই সংকলনে সংগীত পরিবেশন করেছেন সঞ্জয় চক্রবর্তী, রেশমী চক্রবর্তী, প্রাঞ্জল বিশ্বাস, বিশাখ জ্যোতি, সৌরিক, অয়েন্তিকা ও অন্যান্য শিল্পীরা। পরবর্তী সংকলনে কিঞ্জল চট্টোপাধ্যায়, সৃজন চট্টোপাধ্যায়, অঙ্কন এবং অঙ্কিতা কন্ঠদান করবেন বলে জানানো হয়েছে। আয়োজক মন্ডলীর লক্ষ্য, আগামী দিনে স্বামী প্রণবানন্দজী মহারাজের দিব্যভাবের প্রচার ও প্রসারকে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যে নিয়ে যাওয়া।

সেরা উপহার

উৎসব-অনুষ্ঠান উপলক্ষ্যে বরের কাছ থেকে কী উপহার পাবে, তা আগেই জেনে যায় রিয়া। কারণ, রিয়ার কী চাই তা জেনে নিয়ে সেইমতো উপহার কেনে ওর বর। কিন্তু বরের এইরকম উপহার কেনার ধরন পছন্দ হয় না রিয়ার। উপহার পাওয়ায় চমক থাকলেই ভালো লাগে ওর। তাই উপহার দেওয়ার আগে যাতে জিজ্ঞেস না করে, বরকে সেই অনুরোধ করেছে রিয়া।

তবে, রিয়ার মতো না হলেও, উপহার পাওয়ার ব্যাপারে প্রিয়ারও অন্যরকম সমস্যা রয়েছে। বিয়ের পর প্রথম কয়েকবছর বরের কাছ থেকে উৎসব-অনুষ্ঠান উপলক্ষ্যে ভালো উপহার পেত প্রিয়া। কিন্তু তারপর ব্যস্ততার কারণেই হোক কিংবা যে-কোনও কারণেই হোক, প্রিয়াকে আর উপহার দেয়নি ওর বর। তাই প্রায় পাঁচ বছর উপহার পাওয়া বন্ধ থাকার পর হঠাৎই বরের কাছ থেকে হিরের আংটি উপহার পেয়ে কেঁদে ফেলেছিল প্রিয়া। আর প্রিয়ার কান্নার কারণ বুঝতে পেরে ওর বর জানিয়েছিল, পাঁচবছর কোনও উপহার না দিয়ে, টাকা জমিয়ে হিরের আংটি উপহার দিতে পেরেছে সে।

আসলে, রিয়া এবং প্রিয়া— এই দুই বন্ধুর উপহার পাওয়ার সুখ-দুঃখের বিষয়টিই তুলে ধরা হল মাত্র। কিন্তু উপহার পাওয়া নিয়ে এমন আরও অনেক ঘটনা ঘটে, যা নিয়ে ছোটোগল্পও লেখা যায় অনায়াসে। যেমন— ‘গিফ্‌ট অফ দ্য ম্যাজাই’ গল্পটির বিষয়ই ধরা যাক। স্বামী এবং স্ত্রী পরস্পরকে ভীষণ ভালোবাসে। দু’জনেই চায় একে অন্যকে সেরা উপহার দিতে। কিন্তু হঠাৎ আয় কমে গিয়ে ওরা মনের ইচ্ছেপূরণ করতে পারে না। অবশেষে দু’জনে নিজের মতো ভেবেচিন্তে একটা উপায় বের করে।

স্বামীর সুন্দর হাতঘড়ির ছেঁড়া বেল্টের পরিবর্তে ভালো বেল্ট উপহার দিতে চায় স্ত্রী এবং স্ত্রীর সুন্দর চুলের পরিচর্যার জন্য ভালো একটা চিরুনি উপহার দিতে চায় স্বামী। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয়, এই দুটো ভালোবাসার উপহার দিতে গিয়ে স্ত্রী বিক্রি করে দিয়েছে তার মাথার অমূল্য চুল এবং স্বামী বিক্রি করে দিয়েছে তার দারুণ হাতঘড়িটা। এভাবেই উপহার নিয়ে নানা সুখ-দুঃখের স্মৃতি বহন করে চলেন অনেকেই।

আসলে, একজনের সঙ্গে অন্যজনের সম্পর্কের বাঁধন দৃঢ় করে উপহার। তাই কাকে, কখন, কোন উপহার দেবেন— তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

উপহারের রকমফের

উপহার নানা রকমের হয়। কিন্তু এই নানারকম উপহার দেওয়া-নেওয়ার বিষয়ে অনেকে বেশ চাপে থাকেন। বিশেষ করে, , কখন, কী উপহার দেবেন, সেই সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না অনেকে। কিন্তু উপহার এমন হওয়া চাই, যা সবার নজর কাড়বে এবং উপহার প্রাপকের মন জয় করবে। যেমন, স্ত্রীকে স্বামীর এমন উপহার দেওয়া উচিত, যাতে স্ত্রীর মনে খুশির বন্যা বয়ে যায়। অবশ্য শুধু নিজের ক্ষেত্রেই নয়, আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে অনুষ্ঠানের নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে গেলে কী উপহার দিলে সম্মান রক্ষা হবে এবং সম্পর্ক মজবুত হবে, সেই বিষয়েও অনেকের কপালে ভাঁজ পড়ে।

সবচেয়ে মজার কথা, সবাই চান কম টাকায় ভালো গিফ্‌ট কিনতে। কিন্তু কী কিনবেন তা ঠিক করে উঠতে পারেন না। তবে বিবেচকদের মতে, মোটা টাকার বিনিময়ে উপহার কিনে দিয়ে দম্ভ জাহির না করে, এমন উপহার দিন, যার বিচার মূল্য দিয়ে হবে না, অন্তর ছুঁয়ে যাবে, স্মরণীয় হয়ে থাকবে। সবাই জানেন, উপহারের রকমফের আছে। যেমন— – শো পিস, পেন, ঘড়ি, সানগ্লাস, জামা-প্যান্ট, শাড়ি, সালোয়ার, বেডকভার, ফোটো অ্যালবাম, পুতুল, ফুলদানি, ব্যাগ, ছাতা, ফুলের তোড়া, গিফ্ট ভাউচার প্রভৃতি সাধারণ উপহারের মধ্যে পড়ে। রুচিশীল উপহারের মধ্যে রয়েছে বই, মিউজিক অ্যালবাম, বাদ্যযন্ত্র, কালার টেবিল ল্যাম্প, পেন্টিং, অ্যাকোয়ারিয়াম প্রভৃতি।

আর বহুমূল্য উপহারের মধ্যে রয়েছে টিভি, ফ্রিজ, ওয়াশিং মেশিন, মোবাইল, ট্যাব, ল্যাপটপ, মিউজিক সিস্টেম, জমি, বাড়ি, ফ্ল্যাট, গাড়ি, ফিক্সড ডিপোজিট— এমন আরও অনেক কিছু। এছাড়া রয়েছে আবেগমিশ্রিত উপহার। যেমন— মা, বাবা, ভাই, বোন কিংবা স্ত্রীর আদেশ কিংবা অনুরোধে ধূমপান কিংবা মদ্যপান ছেড়ে দেওয়া।

সেরা উপহার

প্রত্যেক মানুষই ভিন্ন স্বভাব এবং ভাবধারা নিয়ে বেড়ে ওঠেন। তাই, সবাইকে একইরকম উপহার দিয়ে সমান ভাবে খুশি করতে পারবেন না। অতএব, কে কেমন স্বভাবের এবং কী উপলক্ষ্যে উপহার দিচ্ছেন তা জেনে-দেখে নিয়ে তবেই উপহার দিন। নয়তো, সবই বিফলে গিয়ে আপনি মর্মাহত হবেন। যেমন— কেউ চায় ব্যবহার্য সামগ্রী, কেউ চায় শৌখিন জিনিস, কেউ চায় দামি কিছু, কেউবা আবার হয়তো আবেগমিশ্রিত ব্যক্তিগত কিছু ইচ্ছের বাস্তবায়ন চায় উপহারকে উপলক্ষ্য করে।

আর এই আবেগমিশ্রিত উপহারগুলির মধ্যে হয়তো মনের মানুষের দেশ-দেশান্তরে বেড়ানোর ইচ্ছেপূরণ করতে হতে পারে, তাড়াতাড়ি সন্তান চাইলে তাও দেওয়ার চেষ্টা করতে হবে কিংবা ভাড়াবাড়ি ছেড়ে স্থায়ী ঠিকানার বন্দোবস্তও করতে হতে পারে। শুধু তাই নয়, ধূমপান, মদ্যপান-এর মতো ‘কুঅভ্যাস’ ত্যাগ করানোকেও অনেকে সেরা উপহার মনে করেন।

যা করা অনুচিত

O ছোটো বাচ্চাকে দামি মোবাইল কিংবা খেলনা আগ্নেয়াস্ত্র উপহার দেবেন না

O সাধ থাকলেও, যদি সাধ্য না থাকে, তাহলে টাকা ধার করে উপহার কিনে দেবেন না

O নগদ অর্থ উপহার দিতে চাইলে, খামে না ভরে দেবেন না

O বাড়িতে একাধিক বাচ্চা থাকলে বিভিন্নরকম উপহার দেবেন না

O নরম মনের মানুষকে উপহার দেওয়া নিয়ে রঙ্গ-রসিকতা করবেন না কিংবা মিথ্যে প্রতিশ্রুতি দেবেন না

O উপহার পছন্দ না হলেও, মনে আঘাত দিয়ে কোনও কথা উপহার দাতাকে বলবেন না

O উপহার দেওয়া-নেওয়ার ক্ষেত্রে আর্থিক বিচার করবেন না।

পিন-পার্বতীর উৎস অভিযানে (পর্ব-০৪)

ঘন জঙ্গল শেষ হয়ে গেলেও রডোডেনড্রন, ফার, সিলভার বার্চ গাছের বিচ্ছিন্ন জঙ্গল এখনও দেখা যাচ্ছে। ক্রমে ক্রমে বৃক্ষরাজি শেষ হয়ে দেখা যেতে শুরু করল জুনিপারের ঝোপ। পার্বতী উপত্যকা ধীরে ধীরে প্রশস্ত হয়ে এল। বৃষ্টি থেমে গেছে। আমাদের আনন্দ উচ্ছ্বাস, কলধ্বনি পার্বতী নদীর জলশব্দের সঙ্গে একাকার হয়ে যাচ্ছে। এ পথের খুঁটিনাটি সর্দার নিষ্ঠুর নখদর্পণে। এই পথের আমাদের প্রকৃত গাইড। পার্বতীর বাম তীর ধরে এতক্ষণ হাঁটছিলাম আমরা। নিম্বু বলল কিছু সময় পরে ডান তীরে চলে যাব। সামনেই একটা কাঠের ব্রিজ রয়েছে।

কিছু সময় পর দূর থেকে কাঠের ব্রিজটি দৃশ্যমান হল। ব্রিজের কাছে যত যাচ্ছি মাথার চুল খাড়া হয়ে যাচ্ছে! লোহার তারে বাঁধা কাঠের সেতু একদিকে হেলে বিপজ্জনক ভাবে ঝুলছে। এখান দিয়ে নাকি পেরোতে হবে! আরে, এখানে উঠলেই তো ভেঙে পড়বে! যাব কেমন করে?

নিম্বুর অভয় বাণী— ‘কুছ নেহি হোগা, আপলোগ চলিয়ে।’

সবাই বসে রইলাম হতভম্ব হয়ে। এই নদীর স্রোত পেরিয়ে অপর পাড়ে যাওয়া অসম্ভব! অল্প সময় পরে হঠাৎ দেখি, এক মেষপালক হাজির ভেড়ার পাল নিয়ে। দলবেঁধে ভেড়া গুলি চলে এল, চলে এল মেষপালক।

—দাদা আপলোগ আরামসে যাইয়ে, এ ব্রিজ টুটেগি নেহি। মেষপালকের অভয় বাণী।

সমস্ত পোর্টার আরামসে পেরিয়ে গেল। নিন্ধু পেরিয়ে গেল তড়িৎ গতিতে। পিছনে এক এক করে আমরা বিপজ্জনক সেতু পেরিয়ে এলাম। আমাদের সঙ্গে আরও এক পথপ্রদর্শক রয়েছে গত দু’দিন ধরে। সবসময় আগে আগে চলছে, তাই পথ চিনতে কোনও অসুবিধা হচ্ছে না। লাল রঙের একটি কুকুর অর্থাৎ লালু।

ব্রিজ পেরিয়ে পাড়ের খাড়া ঢাল বেয়ে উপরে উঠে এলাম। সামনেই বিস্তৃত প্রায় সমতল প্রান্তর। তার মধ্যে এঁকেবেঁকে বয়ে চলেছে পার্বতী নদী। ফুটবল মাঠের মতো এই থাচগুলিতে (বুগিয়াল) মনের আনন্দে গান গাইতে গাইতে পেরিয়ে চলেছি। মাড়িয়ে চলেছি নানা অজানা ফুলের ডালি। ফুল গাছের জঙ্গল ভেদ করে পৌঁছে গেলাম পুলি ব্রিজের ধারে।

একটা লোহার খাঁচা ঝোলানো আছে মোটা তারের সঙ্গে। খাঁচার দুই পাশে লাগানো দড়ির সাহায্যে একে একে সবাই পেরিয়ে এলাম। লালু চিৎকার জুড়ে দিল, অসহায় ভাবে এদিক ওদিক দৌড়াতে শুরু করল নদী পেরিয়ে আসার অভিপ্রায়ে। এক মালবাহক অনুমতি নিয়ে লালুকে আনতে গেল। পুলি ব্রিজ পেরিয়ে অল্পসময়ে পৌঁছে গেলাম আজকের গন্তব্য ঠাকুরকুঁয়া। সময় দুপুর আড়াইটে। এখানে নাকি একটা গুহা আছে, প্রয়োজনে বেশ কয়েকজন আরামে রাত্রিবাস করতে পারে। বৃষ্টি না হলেও সাদা মেঘ এখনও আকাশ ঢেকে রেখেছে।

পরেরদিন চললাম ঠাকুরকুয়া থেকে ওডিথাচ। উচ্চতা ১২,৫১৭ ফিট, দূরত্ব ১২ কিমি। সকাল থেকেই দেখলাম বন্ধুরা হাসিখুশি, উচ্ছল। সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত। দীপকের তৈরি রুটি-সবজি খেয়ে বেরিয়ে পড়লাম। পার্বতী নদীকে বাঁদিকে রেখে দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলেছি, সামান্য উতরাই সহজতম পথ। আজ আকাশে ছেঁড়া ছেঁড়া মেঘ রয়েছে, সূর্যদেব লুকোচুরি খেলছে মেঘবালিকাদের সাথে। অদূরেই বাঁদিক থেকে আসা ডিবি বকরি নালাকে দেখা গেল। উত্তর-পূর্বদিক থেকে এসে দুটো বিশাল পাথরের মাঝখান দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে পার্বতীর বুকে। দেখলে রোমাঞ্চ লাগে।

ডিবি বকরি নালার সঙ্গমকে বাঁদিকে রেখে আমরা এগিয়ে চললাম। সোজা সরল পথ, সামনের দিকে দৃষ্টি আর বাধা পেয়ে ফিরে আসছে না। দিগন্ত রেখায় কয়েকটি ঝুলন্ত হিমবাহ দেখা যাচ্ছে। ডানদিকে একটা বরফের শৃঙ্গ উঁকি মারছে। বিস্তৃত সবুজের ময়দান। নিম্বু বলল, জায়গাটার নাম গদ্দি থাচ। সকাল দশটার মধ্যেই পৌঁছে গেলাম পান্ডুপুলের ধারে। ডানদিক থেকে একটা নালা এসে পার্বতীতে মিশেছে। একটা বড়ো গোলাকার পাথর রয়েছে পারাপারের জন্য। অনভিজ্ঞদের এই পাথর, সাহায্য ছাড়া অতিক্রম করা বিপদজনক।

দ্বিতীয়দিন সত্যিই আমরা একসাথে চলতে পারিনি। গোল পাথরের সামনে সবাই দাঁড়িয়ে পড়ল। পাথরের মাথার উপর উঠে দেখলাম, পার হওয়া রিস্কি। গোল বিপুল আকৃতির পাথরটির গায়ে হালকা খাঁজ। ঠিকমতো একটা পা রাখাও মুশকিল। নীচ দিয়ে ভয়ংকর গতিতে বয়ে চলেছে এক নালা। প্রথমে পার্বতী নদীর দিকে পাথরের গায়ে নেমে ডানদিকে পাথরের খাঁজে পা রেখে পেরিয়ে যেতে হবে। পাথরটিতে ধরার মতো কিছুই নেই।

পাথরের গা ঘেঁষে দড়ি ধরে পাথরের খাঁজে নেমে এলাম। কিন্তু পা এগোনোর মতো জায়গা পাচ্ছি না। নীচে মৃত্যুর পদধ্বনি শুনতে পাচ্ছি। পাথরের গায়ে শুয়ে পড়ে ধীরে ধীরে পেরিয়ে এলাম। সবারই একই অবস্থা। পাথরের গায়ে নামতেই দেখি পা কাঁপছে, দড়ি ছেড়ে পাথর ধরে এগিয়ে আসছে। সবাই চিৎকার করে উৎসাহ দিতে লাগল আর আমি দড়ি ধরে থাকতে বললাম।

গোলাকার গণ্ডশিলা পেরিয়ে নেমে এলাম পার্বতী নদীর কূলে। সামনে আবার বিপুল আকৃতির পাথর। তার নীচ দিয়ে পার্বতী নদী বয়ে চলেছে। আকৃতির কারণে মধ্যম পাণ্ডবের নামে নামকরণ ‘পাণ্ডুপুল’। বিশাল আকৃতির পাথরের গায়ে নুড়িপাথর সাজিয়ে সিঁড়ি করে দেওয়া আছে। নড়বড়ে সিঁড়ি বেয়ে দড়ি ধরে অতিক্রম করলাম পাণ্ডুপুল। সদস্যরা সবাই এপারে চলে এলে মালবাহকদের সাহায্য করলাম বোঝাগুলি এপারে নিয়ে আসতে।

এখন পার্বতী নদীকে ডান দিকে রেখে এগিয়ে গেলাম। আমাদের বাঁদিকের গিরিশিরা থেকে একের পর এক জলধারা নেমে এসেছে। সেগুলি অতিক্রম করে এগিয়ে চলেছি। পাণ্ডুপুল থেকে প্রায় এক ঘণ্টা পরে বিশাল এক সবুজ ময়দানে নেমে এলাম। দক্ষিণ-পশ্চিম (আমাদের ডানদিক) দিক থেকে একটি খরস্রোতা নালা এসে মিশেছে পার্বতী নদীর অপর পাশে। সেদিকে তাকালে চোখে পড়বে কুলু আইগার কে শৃঙ্গ (১৮,৫০০ ফিট )। এখানে পার্বতী নদী অসংখ্য ধারায় বিভক্ত হয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। স্বর্গীয় স্থান। ভেলভেটের মতো নরম প্রান্তরে গড়াগড়ি খেল সবাই। লম্বা বিশ্রাম নিলাম। গন্তব্য খুব সামনেই। মালবাহকদের নিয়ে রাজা, নিম্বু সবাই চলে গেল। কারও তেমন হেলদোল নেই সামনে এগিয়ে যাওয়ার। আমাদের গন্তব্যস্থলের কাছেই রয়েছে একটা বড়ো গুহা। অভিযাত্রী দল চাইলে সেখানে রাত্রিবাস করতে পারে, কিন্তু জল বেশ কিছুটা দূরে!

আরও কিছুক্ষণ হাঁটার পরই পৌঁছে গেলাম গন্তব্য ওডি থাচে। দূর থেকেই দেখলাম কয়েকজন ক্রিকেট খেলছে। কয়েকটি রঙিন তাঁবু লাগানো রয়েছে নদীর ধারে। দেখলাম আমার পূর্ব পরিচিত বেহালার কয়েকজন অভিযাত্রী। আমাদের একদিন আগেই যাত্রা শুরু করেছিল। আজ ওনাদের বিশ্রামের দিন। লেগে পড়লাম ক্রিকেট খেলায়। কাপড়-কাগজে তৈরি বল এবং ভাঙা গাছের ডাল দিয়ে তৈরি ব্যাট। সাড়ে ১২ হাজার ফুট উচ্চতায় ক্রিকেট খেলছি ভাবা যায়! চারিদিকে কালো পাথর দিয়ে ঘেরা উঁচু স্টেডিয়াম। নাহ, বেশিক্ষণ খেলতে পারলাম না, হাঁপিয়ে উঠছি। চলে এলাম নিজেদের তাঁবু টাঙাতে। নদীর ধারে বাতাস প্রচণ্ড জোরে বইছে। একটু পিছিয়ে এমন ভাবে তাঁবু লাগানো হল, যাতে হাওয়ার দাপট কিছুটা কম লাগে। এরই মধ্যে ম্যানেজার প্রণব ও স্বরূপ “বিখ্যাত’ মশলা মুড়ি তৈরি করে ফেলেছে। সবাই বেশ জমিয়ে খেলাম।

দেখতে চললাম মানতালাই লেক। উচ্চতা ১৩,৩৬৭ ফিট, দূরত্ব ১০ কিমি। সকালে খেয়ে বেরোতে বেরোতেই আটটা বেজে গেল। সবাই মোটামুটি ধীরে সুস্থে এগিয়ে চলেছি। উচ্চতাও বাড়ছে ধীরে ধীরে। পার্বতী নদী উপত্যকার কাদাজল, নুড়িপাথর মাড়িয়ে এগিয়ে চললাম। দুই পাশের গিরিশিরাগুলি থেকে অগণিত ছোটো ছোটো জলধারা এসে মিশেছে পার্বতী নদীর সঙ্গে। আজও আকাশের মুখ ভার হয়ে রয়েছে। সবুজ বিস্তৃত প্রান্তরের মাঝে মাঝেই বিপুল আকৃতির পাথর স্তুপ বেমানান ভাবে দাঁড়িয়ে রয়েছে একাকী। যেন গৃহচ্যুত উপল রাজ।

পিন-পার্বতীর উৎস অভিযানে (পর্ব-০৩)

ধীরে ধীরে কখন যে অন্যদের থেকে দূরে চলে এসেছি, বুঝতে পারিনি। যদিও পথ হারানোর ভয় নেই। সরু পথরেখা হারিয়ে গেছে পথের বাঁকে, ঝোপের আড়ালে। সহজ পথে দ্রুত গতিতে আপন মনে এগিয়ে চলেছি, পথ খোঁজার নেশায়। পিছনে কারও কণ্ঠস্বর শুনতে পাচ্ছি না! কেবল পার্বতী নদীর গর্জন আর পাখির কূজন। ক্রমশ বেড়ে চলল অজানা বন কুসুমের সুঘ্রাণ। বনস্পতির ছায়ায় গন্ধটা যেন আরও সুমিষ্ট হয়ে উঠেছে। কী নিভৃত শান্তি! কী অদ্ভুত নির্জনতা! কতক্ষণ হেটে চলেছি? দেড় ঘণ্টার কম নয়! বন্য পাখির কাকলি জলস্রোত-এর গর্জন ছাড়া অন্য শব্দ শুনিনি। পায়ের চাপে পথে পড়ে থাকা শুকনো পাতায় নূপুরের শব্দ। মানুষের চিহ্ন নেই কোনওদিকে।

ওপারে পাহাড় চূড়ায় মেঘের দল কালো গাভীর মতো চরে বেড়াচ্ছে। পরস্পরের সঙ্গে মিলিত হয়ে যে-কোনও সময় ধেয়ে আসতে পারে! শৈলমালার শীর্ষ দেশ থেকে পাদদেশ পর্যন্ত প্রসারিত আকাশের গায়ে অসংখ্য জলধারা লাফিয়ে লাফিয়ে নামছে। রুক্ষ পর্বতের দেয়াল ধুয়ে নেমে আসছে অসংখ্য রুপোলি রেখা।

হঠাৎ বুকের মধ্যে ভয় ধরিয়ে দিল আগুয়ান তীব্র শব্দে। মনে হল বনভূমি ভেঙে ধেয়ে আসছে কোনও যমদূত! অজানা আশঙ্কায় বুক কেঁপে গেল৷ হাঁটা থামিয়ে পাথরের আড়ালে অপেক্ষা করতে লাগলাম অনাহূত আগন্তুকের। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই তীব্র গতিতে ছুটে চলে গেল কালো দূত। বুনো শুয়োর, হাড়ে কাঁপন ধরিয়ে চলে গেল।

আর একাকী এগিয়ে যেতে মন চাইল না। অপেক্ষা করতে লাগলাম বাকিদের। নির্বাক, নিস্পন্দ হয়ে বেশ কিছু সময় কেটে গেল। সবাই মিলে আরও কিছু সময় বিশ্রাম নিলাম। ক্রমশ ধূসর থেকে আকাশ কালো বর্ণ ধারণ করল। যে-কোনও মুহূর্তেই শুরু হয়ে যাবে বৃষ্টি। সবাই পলিথিন শিট বার করে নিল। কয়েক পা এগোতে না এগোতেই শুরু হয়ে গেল মুশলধারায়। হাঁটার গতি শ্লথ হয়ে গেল।

অনেকক্ষণ ধরে হাঁটছি। ঢালু রাস্তায় গাছের পাতা আর ছোটো পাথর মিলেমিশে ভয়াবহ পিচ্ছিল হয়ে উঠেছে। তখন সময় প্রায় বারোটা, ঢালের নীচে একটা কুঁড়েঘর দেখতে পেলাম। ধোঁয়া উড়ছে, তার মানে মানুষ আছে! পায়ের গতি বেড়ে গেল।

—চায়ে মিলেগা?

—কিউ নেহি! বইঠিয়ে।

দেখলাম তিন-চারজন লোক আগুনের পাশে বসে গল্প করছে। কিছু বাসনপত্র, কুঁড়েঘরের চাল থেকে ঝুলে থাকা শুকনো মাংস। কাছেই কোনও জলবিদ্যুৎ প্রকল্প হচ্ছে, সেখানকার কুলি-কামিন ও অফিসারদের জন্য লোকটি দোকান দিয়েছে। আলাপচারিতায় আরও জানা গেল ৫৫ বছরের গোবিন্দ সিং, স্ত্রী-পুত্র সবাই থাকা সত্ত্বেও কেউ খেতে দেয় না। মাত্রাতিরিক্ত নেশা তার এই দশার কারণ। এই এলাকা চরসের স্বর্গরাজ্য। হিপিরা দলে দলে আসে এই এলাকায় নেশার টানে। আসার পথে কিছু বিদেশিদের দেখেছি গাছের তলায় বসে ছিলিমে টান দিতে। চরস, মদের নেশায় ঘরছাড়া করেছে গোবিন্দ সিংকে।

চায়ের পরিবর্তে জুটে গেল ভাত ও রাজমার ঝোল। বাইরে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি পড়ছে। এখনও যেতে হবে অনেক পথ। বৃষ্টি মাথায় নিয়েই বেরিয়ে পড়লাম। পিছল পথে আছাড় খেতে খেতে এগিয়ে চলেছি। কাদা অংশ ছেড়ে জ্যোতি রাস্তার ধার দিয়ে যেতে গিয়ে এমন আছাড় খেল যে, গড়িয়ে নেমে গেল বেশ কিছুটা। জল-কাদায় মাখামাখি হয়ে হাঁচড়-প্যাঁচোড় করে উঠে এল। যদিও ভয়ের কিছু নেই, বড়ো বড়ো বনস্পতির ঠাস বুননে আটকে যাবে শরীর। এর আগে অবশ্য জ্যোতির পায়ে পা মিলিয়ে চলতে গিয়ে ছোট্ট ডোবার মধ্যে হাবু-ডুবু খেয়েছি। চলতে চলতে হঠাৎ থমকে দাঁড়ানোতেই এই বিপত্তি। কাদামাটি, পাতা ধুয়ে আবার এগিয়ে চলা।

আছাড় খেতে কারও বাকি নেই, একাধিকবার। একটাই ভয় পড়ে গিয়ে কারও আঘাত না লাগে। বৃষ্টি কাদার পিছল পথ হাঁটতে হাঁটতে সবাই ক্লান্ত, অবসন্ন। সঙ্গে থাকা রাজাকে কতটা পথ বাকি প্রশ্ন করে উত্তর পাওয়া যাচ্ছে না। নিম্বুর কাছে জানতে পারলাম এই পথে প্রথমবার আসছে আমাদের গাইড বাবাজি। বার বার মনে হচ্ছে খাড়া ঢালের এই বাঁক পার হলেই এসে যাবে আমাদের গন্তব্য তুণ্ডাভুজ।

খাড়া ঢালের পিচ্ছিল কাদার মধ্যে পা চলছে না। বেশিরভাগ সময় দাঁড়িয়ে থাকছি, ভাবছি কোন দিক দিয়ে উঠব? কয়েকজন কুলি ধপ ধপ করে আমাদের ছেড়ে এগিয়ে গেল। জিজ্ঞাসা করলাম আমার বন্ধুরা কতটা পিছনে।

—বহুৎ পিছে সাব! আনেমে কাফি টাইম লাগে গা।

—অউর কিতনা দূর হাম লোগো কো জানা হোগা?

—নজদিক আ চুকে আপ লোগ। অউর ১০ মিনিট।

ধড়ে প্রাণ এল। বাকিদের জন্য দুশ্চিন্তা বেড়ে গেল, ওরা কত দূরে! ঠিক কত সময় লাগবে? আসতে পারবে তো?

বাঁক ঘুরতেই দেখতে পেলাম নদীর পাড়ে কুলি ও গাইড বসে আছে। বসে থাকতে দেখেই মেজাজ বিগড়ে গেল। একে তো গাইড রাস্তার কিছুই জানে না, তার উপর তাঁবু না খাটিয়েই বসে আছে। কোথায় কিচেন টেন্ট লাগিয়ে গরম চা বা স্যুপ করার চেষ্টা করবে..!

নীচে গিয়েই চেঁচামেচি করে ফেললাম। গাইড রাজাকে বললাম, দু’জন কুলি নিয়ে একদম পিছনে যারা আছে নিয়ে আসতে। বাকিরা আমাদের সাহায্য করুক তাঁবুগুলো লাগাতে। বৃষ্টির মধ্যে সবাই ক্লান্ত। তাঁবু লাগাতে গিয়ে বুঝলাম শরীরে কিছু অবশিষ্ট নেই। অনেক কষ্টে দুটো তাঁবু দাঁড় করালাম। ব্যাগ ও মালপত্রগুলো তাঁবুর মধ্যে ঢুকিয়ে দিলাম। দীপক এসে গেল, জানা গেল মৃন্ময় ও জ্যোতি ক্লান্তিতে হাঁটতে পারছে না। আসতে অন্তত ১ ঘণ্টা লাগবে। আনতে যাওয়া মালবাহকরা ব্যাগ নিয়ে নিলে আশা করা যায় নির্বিঘ্নে চলে আসবে। প্রায় চারটের সময় বন্ধুরা হাজির হল। ক্লান্ত অবসন্ন বন্ধুদের গরম স্যুপ ও স্লিপিং ব্যাগের উষ্ণতায় চাঙ্গা করার চেষ্টা চলল।

( 3 )

পরের দিনের গন্তব্য- তুণ্ডাভুজ থেকে ঠাকুরকুঁয়া। দূরত্ব প্রায় ১২ কিমি, উচ্চতা ১১,১৫৫ ফিট।

কাল মধ্যরাত পর্যন্ত বৃষ্টি পড়েছে। গতকালের অমানবিক ক্লান্তিতে সবাই বেরোতে দেরি করে ফেললাম। জামাকাপড় জুতো সবই ভিজে। জামাকাপড় বদলানোর সুযোগ থাকলেও ভিজে জুতো পরতে হল। এখনও টিপ টিপ করে বৃষ্টি পড়ছে, থামার অপেক্ষা না করে বৃষ্টি মাথায় নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম পথে।

বাঁদিকে পার্বতী নদী গভীর খাতের মধ্য দিয়ে বয়ে চলেছে। নদীর ওপারে খাড়া পাথরের দেয়াল। চারিদিক সাদা মেঘে ঢাকা। পরপর তিনটি ঝরনা অন্তত ৫০০ ফিট নীচে পার্বতী নদীতে গিয়ে পড়ছে। আজকের পথ অপেক্ষাকৃত সহজ৷ সমস্ত পথই সামান্য চড়াই-উতরাই। কিছুটা চড়াই ভাঙার পর দেখলাম দক্ষিণ দিক থেকে প্রবল বেগে বয়ে আসছে এক নালা। সে দিকে তাকালেই দেখা যায় একটা রকি পিক। সম্ভবত এটাই বাসুকী পিক এবং নালাটি বাসুকী নালা। মেষপালকদের তৈরি সেতুর উপর দিয়ে পেরিয়ে এলাম।

সুস্থ এবং নিরাপদে থাকুন আলোর উৎসবে

দীপাবলি একটি জনপ্রিয় উৎসব, যা সারা বিশ্বে উদযাপিত হয়। আলোক উৎসব নামেও পরিচিত এই উৎসব কার্তিক মাসের অমাবস্যার রাতে উদযাপিত হয়। এই উৎসবে শহর ও গ্রামগুলি প্রদীপের আলোয় আলোকিত হয় এবং আকাশ জুড়ে আতশবাজি ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু সমস্ত উৎসাহ এবং আনন্দের মধ্যেও, এই সময় এমন সতর্ক থাকা উচিত, যাতে আপনার এবং অন্য কারওর কোনও ক্ষতি না হয়।

Stay healthy and safe during the Festival of Lights
Dr. Anchal Mitra

দিশা আই হসপিটাল-এর কনসালট্যান্ট পেডিয়াট্রিক এবং কমপ্রিহেনসিভ অপথালমোলজি সার্ভিসেস-এর ডা. আঁচল মিত্র-র পরামর্শ—

সতর্কতা

  • যদি কোনও স্প্লিন্টার (অথবা গরম এবং জ্বলন্ত কিছু) চোখে পড়ে, তাহলে দ্রুত (কয়েক সেকেন্ড-এর মধ্যে) পরিষ্কার জল দিয়ে ধুয়ে ফেলুন। কলের জল, পানীয় জল— যে কোনও পরিষ্কার জল  চলবে। সম্ভব হলে আপনি বরফ বা ঠান্ডা কম্প্রেসও লাগাতে পারেন। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব চিকিৎসকের পরামর্শ মতো উপযুক্ত চিকিৎসা করাও দরকার।
  • আলোর উৎসবের এই সময় সাধারণ চশমা (পাওয়ার ছাড়া) পরা উচিত, যা আপনার চোখকে সুরক্ষিত রাখতে সাহায্য করবে। যখন বিপজ্জনক উপায়ে পটকা ফাটানোর চেষ্টা করে কেউ, তখনই দুর্ঘটনা ঘটে। এটি অত্যন্ত বোকামি। অনেক সময় দেখা যায়, কোনও পটকা প্রথমে ফাটে না এবং তারপরে কেউ আবার এটি জ্বালানোর চেষ্টা করে, তখন অনেক সময় এটি হঠাৎ মুখে কিংবা হাতে ফেটে যায়। বছরের পর বছর ধরে দীপাবলির সময় এগুলি শত শত গুরুতর আঘাতের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং এগুলি নিষিদ্ধ করা উচিত।
  • শব্দের প্রভাব কিংবা অতিরিক্ত শব্দের জন্য কাচের বোতল, টিন, বাক্স, অথবা মাটির পাত্র দিয়ে বাজি ঢেকে রাখবেন না। এগুলো ফেটে ছোটো ছোটো টুকরো হয়ে যেতে পারে এবং আশেপাশে উড়ে যাওয়ার সময় আপনার চোখকে চিরতরে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। আকাশের নীচে খোলা জায়গায় এগুলো ফাটান।
  • যেসব বাজি ফাটেনি, তার কাছে যাবেন না। দূর থেকে দেখলে দ্রুত নিভিয়ে ফেলার চেষ্টা করুন।
  • যদি আপনি কন্টাক্ট লেন্স পরে থাকেন, তাহলে বাজি ফাটাতে যাবেন না, কারণ দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ তাপে রাখলে কন্টাক্ট লেন্সযুক্ত চোখ দুটিকে, চোখে জ্বালা হতে পারে এবং বড়ো ক্ষতি হয়ে যেতে পারে।
  • চোখে আঘাত লাগলে চোখ ঘষবেন না কিংবা চোখে এবং চোখের আশেপাশের অংশে হলুদ গুঁড়ো, নারকেল তেল ইত্যাদির মতো ঘরোয়া প্রতিকার ব্যবহার করবেন না। চোখের ভিতরে যদি কোনও ক্ষুদ্র কণা থাকে, তাহলে ঘষলে আরও খারাপ হতে পারে। পরিবর্তে, প্রায় ১০ মিনিট ধরে পরিষ্কার জল দিয়ে চোখ ধুয়ে ফেলুন এবং তারপরে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব একজন চক্ষু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।
  • রঙ্গোলি তৈরির পর বা আতশবাজি ধরার পর চোখ স্পর্শ করার আগে সবসময় হাত ধোয়া বা সাবান দিয়ে ভালো করে ধুয়ে নিতে ভুলবেন না। রং, চক পাউডার, পটকায় থাকা বারুদ এবং রাসায়নিক পদার্থ চোখে জ্বালা, চুলকানি এবং কিছু ক্ষেত্রে অপূরণীয় ক্ষতি করতে পারে।
  • আতশবাজি দেখতে আকর্ষণীয় এবং উজ্জ্বল হলেও, এগুলি থেকে দূরে থাকাই ভালো। ছোটো বাচ্চাদের পটকা জ্বালাতে দেবেন না। যদি তারা পটকা ফাটায়, তাহলে বড়োদের উপস্থিতি এবং সতর্কতা আবশ্যক।
Stay healthy and safe during the Festival of Lights
Dr. M S Purkait

টেকনো ইন্ডিয়া ডামা হাসপাতাল-এর মেডিকেল সুপারিনটেনডেন্ট ডা. এমএস পুরকায়েত-এর পরামর্শ—

দীপাবলি হল আলোর উৎসব। কিন্তু এখন এটি বায়ু দূষণ এবং শব্দ দূষণের একটি বিশাল উৎসে পরিণত হয়েছে। কিছু মানুষের বোকামোর কারণে, ব্রঙ্কিয়াল অ্যাজমা, ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজ(সিওপিডি), হৃদরোগীদের জন্য অনেক সময় সমস্যা সৃষ্টি করে এই উৎসব।

সতর্কতা

  • দীপাবলির সময় আমরা যে সবচেয়ে সাধারণ স্বাস্থ্য সমস্যাগুলি দেখতে পাই, তা হল—পুড়ে যাওয়া। এই বিপদ এড়ানোর জন্য উচিত খাঁটি সুতির পোশাক পরা। কারণ সিন্থেটিক কাপড়ে সহজেই আগুন ধরে যায়। পায়ে পোড়া আঘাত এড়াতে পা সম্পূর্ণ ঢেকে রাখা (শু-জাতীয়) জুতো পরা উচিত।
  • দীপাবলির সময় মোমবাতি বা প্রদীপ জ্বালালে বায়ু দূষণ অনেকাংশে রোধ করা যায়। অথবা রঙিন LED আলো ব্যবহার করতে পারেন। বায়ু দূষণের ফলে চোখ, নাক, গলা, ত্বকে জ্বালাপোড়া হতে পারে, যার ফলে চোখে জল আসে, হাঁচি, শুষ্ক কাশি হয়। এটি ব্রঙ্কিয়াল অ্যাজমা বা সিওপিডির লক্ষণগুলিকে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে, যার ফলে শ্বাসকষ্ট হতে পারে। রোগীরা ফেস মাস্ক ব্যবহার করতে পারেন। নাকের স্প্রে এবং অ্যালার্জির মতো ওষুধ মজুত রাখাও বাঞ্ছনীয়।
  • ইকো-ফ্রেন্ডলি পটকা ফাটানো, সাধারণ পটকার চেয়ে ভালো। কারণ এটি কম দূষণ সৃষ্টি করে এবং ১২৫ ডেসিবেলের কম শব্দ উৎপন্ন করে। বেশি শব্দ উৎপন্নকারী পটকা শ্রবণশক্তি হ্রাস, মাথাব্যথা, উদ্বেগ, উচ্চ রক্তচাপ বা হৃদরোগের অবনতি ইত্যাদির কারণ হতে পারে।
  • শ্বাসনালী হাঁপানি, সিওপিডি বা হৃদরোগে আক্রান্ত রোগীদের জন্য সন্ধ্যার সময় ঘরে থাকা ভালো। কারণ বাজি থেকে নির্গত গ্যাস গ্রহণ করলে লক্ষণগুলি আরও বেড়ে যেতে পারে। রোগীদের ইনহেলারের মতো প্রয়োজনীয় সমস্ত ওষুধও মজুত রাখা উচিত।
  • এই সময়কালে বাইরের ব্যায়াম করা এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়, কারণ দূষণের মাত্রা বেশি থাকে এই সময়।
  • এই সময়ে শিশুদের বাইরের কার্যকলাপ সীমিত করারও পরামর্শ দেওয়া হয়।
  • প্রত্যেকেরই নিজেদের সঠিক ভাবে হাইড্রেটেড থাকা উচিত। ডিসলিপিডেমিয়া বা ইস্কেমিক হৃদরোগে আক্রান্ত রোগীদের ভাজা খাবার এবং ঘি জাতীয় খাবার এড়িয়ে চলা উচিত। ডায়াবেটিস মেলিটাসে আক্রান্ত রোগীদের দীপাবলির সময় আমরা যে মিষ্টি বিনিময় করি, সেইসব মিষ্টি এড়িয়ে চলা উচিত।
Stay healthy and safe during the Festival of Lights
Dr. Payel K Roy

টেকনো ইন্ডিয়া ডামা মাল্টিস্পেশালিটি হাসপাতালের ডায়েটিক্স বিভাগ এবং ক্রিটিক্যাল কেয়ার-এর পুষ্টিবিদ (HOD) ডা. পায়েল কৃষ্ণ রায়-এর পরামর্শ —

  • বাংলায় ভূত চতুর্দশী এবং চোদ্দো শাক খাওয়ার রীতি বাংলার সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের একটি অপরিহার্য অংশ। বাংলায় আলোর উৎসবের আগে ভূত চতুর্দশী পালন করা হয় এবং ১৪টি প্রদীপ জ্বালিয়ে এবং চোদ্দো শাক খাওয়ার মাধ্যমে এই রীতি পালন করা হয়, যা ১৪টি শাক দিয়ে তৈরি একটি খাবার। এগুলি সুস্বাস্থ্য বজায় রাখতে সাহায্য করে।
  • আসলে, ১৪টি শাক খাওয়া হয়, কারণ এটি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে এবং শীতকালে  শরীরকে সুস্থ রাখে। পালং শাক থেকে শুরু করে কুমড়োর পাতা পর্যন্ত শাক ভিটামিন এবং খনিজ সমৃদ্ধ, যা পুষ্টিকর খাবারের মধ্যে পড়ে।
  • ১৪ শাক খাওয়ার ঐতিহ্য শীতকালে ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। কারণ, এই সময়কালে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা প্রায়ই দুর্বল হয়ে পড়ে, যা মানুষকে অসুস্থ করে তোলে। ১৪ শাকে ব্যবহৃত পাতা শারীরিক সুস্থতা নিশ্চিত করে। এই খাবারটি পুষ্টিতে সমৃদ্ধ এবং এটি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় বলে বিশ্বাস করা হয়, যা আবহাওয়ার পরিবর্তনের সময় শরীরকে মৌসুমী অসুস্থতার বিরুদ্ধে লড়াই করতে সাহায্য করে। অনেক সবুজ শাক শরীরের জন্য প্রাকৃতিক বিষমুক্তি মাধ্যম হিসেবে কাজ করে।
  • বিভিন্ন ধরণের সবুজ শাক একত্রিত করে তৈরি খাবার হিসেবে, ১৪ শাক ভিটামিন এবং খনিজ পদার্থের একটি চমৎকার উৎস, যার মধ্যে রয়েছে ফলিক অ্যাসিড, ভিটামিন সি, ভিটামিন কে, আয়রন, ক্যালসিয়াম এবং পটাসিয়াম।
  • শাকসবজিতে দ্রবণীয় এবং অদ্রবণীয় উভয় ধরণের ফাইবার থাকে, যা হজমে সহায়তা করে, কোষ্ঠকাঠিন্য প্রতিরোধ করে এবং অন্ত্রের স্বাস্থ্য উন্নত করে।
  • শাকসবজিতে উচ্চ মাত্রার অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এবং যৌগ থাকে, যা প্রদাহ-বিরোধী এবং অ্যান্টিহিস্টামিন প্রভাব প্রদান করে।
  • শাকসবজি রক্তচাপ কমাতে, রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতে এবং কোলেস্টেরল কমাতে সাহায্য করতে পারে, যা হৃদপিণ্ড এবং বিপাকীয় স্বাস্থ্যের উন্নতি নিশ্চিত করে।
  • সবুজ শাকসবজিতে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন থাকে, যা ত্বকের জন্য উপকারী, ফুসকুড়ি এবং ব্রণ প্রতিরোধে সাহায্য করে। ক্যারোটিনয়েড এবং অন্যান্য পুষ্টি উপাদান চোখের স্বাস্থ্য রক্ষা করতেও সাহায্য করে।

দীপাবলি স্পেশাল হোম-ডেকর

কীরকম অন্দরসজ্জা চান আপনি, তা ঠিক করে নিন প্রথমে। গুরুত্ব দিন আপনার পরিবারের বাকি সদস্যদের পছন্দকেও। এবার ঠিক করুন, সবাই ট্র্যাডিশনাল লুক চান নাকি ফিউশন। এরপর গুরুত্ব দিন আলোর বিকল্প, আসবাব, ফ্লোরিং, বাড়ির বাইরের এবং ভিতরের রং অথবা ওয়ালপেপার। এই সবকিছুরই দাম জেনে নিয়ে কিছুটা দরদাম করে, বাজেটের মধ্যে যেটা নিতে পারবেন, সেই পছন্দের জিনিস দিয়ে সাজিয়ে তুলুন নিজের একান্ত আপন বাড়িটিকে। অবশ্য বাড়ি সাজাবার আগে, যারা ওই বাড়িতে থাকবেন, তাদের রুচি এবং প্রয়োজন প্রাধান্য পাওয়া উচিত এক্ষেত্রে।

অন্দরসজ্জায় পরিবর্তন আনতে হবে আর্থিক সামর্থ্য অনুযায়ী। সবরকম আর্থিক সামর্থ্যের ক্রেতাদের কথা মাথায় রেখে, বিপণিগুলি নিত্যনতুন পণ্যসম্ভারে বাজার ভরিয়ে তুলেছে। বাজেট অনুযায়ী, পছন্দসই ফার্নিশিংস আর আসবাবের কোনও অভাব নেই বাজারে। শুধু বাছাই করে নিতে পারলেই উদ্দেশ্য পূরণ হবে। নতুনরূপে সহজে সাজাবার কিছু পরামর্শ দেওয়া হল এখানে, যা আপনাকে সাহায্য করবে।

কাস্টমাইজড ইন্টিরিয়র ডিজাইনিং

প্রত্যেকটি শোয়ার ঘর, রান্নাঘর, বাথরুম, বারান্দা প্রভৃতি কতটা স্পেস রয়েছে, তা দেখে নিয়ে সাজে বদল আনার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এই পদ্ধতিকে বলা হয় কাস্টমাইজড ইন্টিরিয়র ডিজাইনিং। এতে ব্যক্তির প্রয়োজন, ঘরের রং, আসবাবের শেপ, ফ্যাব্রিক, মেটিরিয়াল, ডিজাইনিং প্রভৃতি একের সঙ্গে অপরের সামঞ্জস্য বজায় রেখে সোফা, কুশন, দেয়াল, সিলিং, পর্দা সবকিছুরই বিশেষ খেয়াল রাখা হয়।

বাজারে গিয়ে কিছু পছন্দসই জিনিস কিনলেন অথচ বাড়িতে নিয়ে এসে দেখলেন ঘরের আকার অনুযায়ী ঠিকমতো আঁটানো যাচ্ছে না, এমন ঝামেলায় পড়তে হয় অনেক সময়। যেটাই বাড়িতে নতুন তৈরি করা হবে, তা যেন বাড়ির পুরো ডেকরের সঙ্গে সামঞ্জস্য বজায় রেখে করানো হয় এবং বাজেটও আয়ত্বে থাকে। লিভিং রুমটি হয়তো আকারে ছোটো অথচ দোকানে গিয়ে পছন্দ হল বড়োসড়ো একটি সোফা। কখনওই সেটা মানানসই হবে না, উপরন্তু জায়গাতেও কম পড়বে। তার চেয়ে ভালো, ঘরের আকার অনুযায়ী কাস্টমাইজড সোফা বানিয়ে নেওয়া এবং সেইসঙ্গে, ঘরের অন্যান্য আসবাবও।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কাস্টমাইজড ইন্টিরিয়র হল বিভিন্নরকমের ডিজাইন নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষার মাধ্যম। গ্রাহকের চাহিদা অনুযায়ী বাড়ির অভ্যন্তরীণ পরিবেশ, জায়গা ইত্যাদি দেখে বানানো হয়। এতে গ্রাহকের নিজস্ব পছন্দের বিষয়টিও ঠিক থাকে। সারা বাড়ির ডেকর বদলে ফেলা সম্ভব এই পদ্ধতিতে। লেদারের সঙ্গে সলিড কাঠের আসবাব মানানসই হলেও একটু বেশি গরমের অনুভূতি হয়। কিন্তু যদি কাঠ এবং মোটা তারের জাল ব্যবহার করে সোফা কিংবা খাট তৈরি করা হয়, তাহলে হাওয়া চলাচল সঠিক থাকবে এবং গরম হবে না। এরকম ডিজাইনার ফার্নিচারের প্রচুর বিকল্পও রয়েছে আজকাল। এগুলিকে মডার্ন লুকও দেওয়া যায়, আবার ক্রেতা চাইলে ট্র্যাডিশনাল লুক দিয়ে তৈরি করে দেন ফার্নিচার বিপণির কর্মীরা।

পছন্দসই ডেকর

আমরা যে-রঙের পর্দা ব্যবহার করি, সেই রঙের কুশন কভার, বেড কভার ইত্যাদি দিয়ে ঘর সাজাবার চেষ্টা করি, যাতে রং ও স্টাইল-এ একটা মিলমিশ থাকে। পর্দায় ঝালর লাগাতে চাইলে, দেয়ালের রঙের সঙ্গে মিলিয়ে লাগানো যেতে পারে। ঘর আকারে ছোটো হলে, বড়ো যাতে লাগে, সেইজন্য দেয়ালে ওয়ালপেপার লাগানো যেতে পারে অথবা ওয়ালপেপারে পেইন্ট করানো যেতে পারে। ওয়ালপেপার পছন্দ করার প্রথম কারণ হচ্ছে, ঘর দেখতে সুন্দর লাগে। তারপর রং করাবার হলে, ভালো রঙের মিস্ত্রি খুঁজে বার করা এবং হাতে সময় থাকাটাও জরুরি। সময় বাঁচাতে চটজলদি ওয়ালপেপার লাগিয়ে ঘরের অন্দরসজ্জা সেরে ফেলতে ক্ষতি কী? বাড়ির সকলের আলাদা আলাদা পছন্দে এবং ওয়ালপেপারের বৈচিত্র্যে প্রত্যেকের ঘর সেজে উঠতে পারে সম্পূর্ণ ডিফারেন্ট লুক নিয়ে।

অনেকের মনেই এই ধারণা রয়েছে যে, নিজের পছন্দমতো বাড়ি সাজাতে গেলেই অর্থব্যয় অনেক বেশি হবে। কিছুদিন আগে পর্যন্ত হয়তো এই ধারণাটা সত্যি ছিল কিন্তু এখন সময় বদলেছে। কারণ আর কিছুই নয়, এখন বাজারে ভ্যারাইটি এবং বিভিন্ন রকমের মেটিরিয়ালের প্রাচুর্য রয়েছে। কাঠের আসবাব কিনতে গেলে, কাঠের মধ্যেই নানা ভ্যারাইটি পাবেন। তাছাড়া, দামি, কমদামি সবই পেয়ে যাবেন একই ছাদের তলায়। এরকমই ফ্র্যাব্রিক, কিচেন অ্যাকসেসরিজ, ডেকোরেশনের জিনিস, সবই ফ্ল্যাট অথবা অ্যাপার্টমেন্ট অনুযায়ী এবং বাজেটের মধ্যেই পেয়ে যাবেন। প্রয়োজন শুধু সঠিক খোঁজখবর নেওয়ার। সুতরাং অন্যের কথায় কান না দিয়ে, নিজের প্রয়োজন জানুন এবং বাড়িতে বসবাসের দিনগুলিকে আনন্দময় করে তুলুন।

পর্দায় বাড়ান আকর্ষণ

ঘরের পর্দা আমরা চট করে বদলাই না। টাঙানো থাকতে থাকতে পর্দায় একটা ম্যাড়মেড়ে ভাব চলে আসে, যা ভীষণ ভাবে ঘরের মেজাজে একটা প্রভাব ফেলে। তাই পর্দা মাঝেমধ্যেই বদলান। পর্দায় উজ্জ্বল ফ্লাওয়ার প্রিন্ট বা একরঙা উজ্জ্বল যে-কোনও রং-ই এই বসন্ত ঋতুর পক্ষে আদর্শ সাজ। আপনার ঘরের দেয়ালে যদি ডিজাইন পেইন্ট করা থাকে, চেষ্টা করুন পর্দার ক্ষেত্রে একই ধরনের ডিজাইন প্যাটার্ন ফলো করতে। ফ্লোরাল প্রিন্ট পছন্দ না হলে মডার্ন কার্টন ডিজাইনগুলি দেখুন। মার্কেটে বোল্ড প্যাটার্ন-এর প্রচুর পর্দা পাবেন। কিন্তু যেটাই ব্যবহার করুন, সেটার যেন ঘরের রঙের সঙ্গে সামঞ্জস্য থাকে।

দেয়ালের রূপ খোলে পেইন্টিং

আপনি যদি ক্রিয়েটিভ হন, নিজের সৃষ্টি করা কোনও পেইন্টিং সুন্দর করে বাঁধিয়ে দেয়ালে ঝোলাতে পারেন। চাইলে অ্যামব্রোস পেইন্টিং কিনে নিতে পারেন থ্রিডি এফেক্ট-এর জন্য। এছাড়া নিজেও এমবস করে বানাতে পারেন। এমবস করার জন্য রং ও ছাপ কিনতে পাওয়া যায়। যদি ফোটোগ্রাফির শখ থাকে, তাহলে ছবি তুলে ওয়াশ করে বাঁধিয়ে নিতে পারেন। দেয়ালের রূপ নিমেষে খুলে যাবে।

কুশন কভারে পরিবর্তন

আপনার কুশন কভারগুলো কি বহু ব্যবহারে মলিন হয়ে গেছে? তাহলে এখনই ওগুলো বদলাবার সময় এসেছে। আপনি পুরোনো কভারগুলির উপর ব্লক প্রিন্ট বা অ্যাপ্লিক করে অন্য লুক নিয়ে আসতে পারেন। পুরোনো সিল্কের শাড়ি থেকে নিজেই প্যাচওয়ার্ক করে কুশন বানাতে পারেন। প্লেন একরঙা কুশন হলে এতে ফেব্রিক পেইন্ট করতে পারেন। সব মিলিয়ে আপনার চিরচেনা ঘরটা নতুনত্বের ছোঁয়া পাবে।

ইন্ডোর প্ল্যান্টসএর সবুজ সংসার

গাছপালা শুধু বাড়ির বাইরেটাকেই নয়, অন্দরমহলকেও নিমেষে সতেজ সুন্দর করে তুলতে পারে। তাই ঘরটাকে শ্যামলিমায় ভরে দিতে ইন্ডোর প্ল্যান্টস লাগান। মানি প্ল্যান্ট, এয়ার পিউরিফায়ার, অ্যালোভেরা, ব্যাম্বু প্রভৃতি ঘরের সৌন্দর্য বাড়ায়। গাছ থাকার ফলে আপনার ঘরের পরিবেশটাও বিশুদ্ধ হাওয়ায় ভরে উঠবে। যে-কোনও অতিথি আপনার রুচির প্রশংসা করবেন।

ওয়ালপেপার রূপ বদল

আজকাল নানারকম ওয়ালপেপার পাওয়া যায় মার্কেটে। পেইন্ট করা ব্যয়সাপেক্ষ, সেই সঙ্গে একটু ঝামেলাও। তারই সুবিধাজনক বিকল্প ওয়ালপেপার আটকানো। এটুকু বদল করলেই আপনার চেনা ঘরটা একেবারে ঝকমকে নতুন হয়ে উঠবে। তাই স্টিকার বা ওয়ালপেপার এখন বিপুল ভাবে জনপ্রিয়।

ফার্নিচার সেটিং

আপনি হয়তো ঘরের যাবতীয় আসবাব বহুদিন ধরে একই পজিশনে দেখছেন। সেটাও একঘেয়েমির একটা কারণ হতে পারে। একটু জায়গা অদলবদল করে দেখুন, চেনা ঘরটাই নতুন লাগবে। আলমারি, খাট, চেয়ার সবই একটু স্থান পরিবর্তন করলে ঘরের ধুলোও ঝাড়া হবে, আর আলো হাওয়াতেও পরিবর্তন হবে।

লাইটিং আনে উজ্জ্বলতা

দীর্ঘদিন একই ধরনের লাইট সেটিং ঘরটাকে ম্লান করে তোলে। পুরোনো টিউব বদলে এলইডি নিয়ে আসুন। ঘরের আলো উজ্জ্বল করলে ঘরটা দেখতেও ভালো লাগবে। সুন্দর ল্যাম্পশেড, দেয়ালে লাগানোর ল্যাম্প শেড সবই সৌন্দর্যে আলাদা মাত্রা আনে। ঘর এবং বারান্দা— দুই-ই সুন্দর আলো দিয়ে সাজাতে পারেন।

ঘর সাজাতে ফুলের ব্যবহার

আজকাল বহু রকমের আর্টিফিশিয়াল ফ্লাওয়ার কিনতে পাওয়া যায়। ঘরের কোনায় বড়ো ফ্লাওয়ার ভাস-এ সাজান কিংবা টেবিলের উপর, ফুল কিন্তু ঘরের সৌন্দর্যে দারুণ পরিবর্তন আনতে পারে। যদি ফ্রেশ ফ্লাওয়ার পছন্দ হয় আপনার, তাহলে জারবেরা বা ডালিয়া, চন্দ্রমল্লিকা, গোলাপ— এসব তো আছেই। সেন্টেড, ফ্লোটিং ক্যান্ডল্স আর ফুল, নিমেষে একটা সুন্দর পরিবেশ তৈরি করবে আপনার ঘরে।

টুকিটাকি রদবদল

কাস্টমাইজড ইন্টিরিয়র ডিজাইনিং-এর সঙ্গে সঙ্গে বাড়িতে হাতের কাছে থাকা বিভিন্ন জিনিসের সামান্য রদবদলেও, আপনার ফ্ল্যাটটি উৎসবের রঙে সেজে উঠতে পারে। হাতে সময় কম থাকলে অর্ডার প্লেস করা, জিনিস তৈরি হওয়ার সময় দেওয়া, কোনওটাই সম্ভব নয়। তাই বলে কি অন্দরসজ্জায় পরিবর্তন আনবেন না মাঝেমধ্যে? মন খারাপের কিছু নেই।

আসবাবপত্রের অবস্থান পরিবর্তন করেও ঘরের সাজ বদলে দেওয়া যায়। বারান্দায় অবহেলায় পড়ে থাকা ফুলের টবগুলিকে রঙিন করে ঘরের প্রতিটি কোনায় রাখুন ফুলের গাছ সহযোগে। ঘরের দেয়ালের রং এবং পর্দার রঙের সঙ্গে মিলিয়ে কুশন কভার, বেড কভার, বালিশ এবং পাশবালিশের কভার বদলে ফেলুন। আজকাল মেঝেতে পাতার জন্য খুব সুন্দর ডিজাইনের হালকা, সিন্থেটিক কার্পেট কিনতে পাওয়া যায়। বসার ঘরে যদি একটা কার্পেট বিছিয়ে নেন, তাহলে ঘরের সৌন্দর্যও বাড়বে এবং শীতকালে মেঝে থেকে ওঠা ঠান্ডাও আপনার পায়ে লেগে সমস্যায় পড়তে হবে না। আর বাড়িতে থাকা ফুলদানিতে টাটকা ফুল রেখেও ঘরের সৌন্দর্য বাড়ানো যেতে পারে এবং ঘরকে সুগন্ধময় করে রাখা যেতে পারে।

আলোকিত করুন জীবনকে

এসে গেল আলোর উৎসব দীপাবলি। ভিতর-বাইরের সমস্ত অন্ধকার দূর করে আলোর বন্যা বইয়ে দেওয়ার এ-ও এক সুবর্ণ সুযোগ। তবে এই সুযোগকে হাতের মুঠোয় পেতে হলে, ভাবতে হবে একটু অন্য ভাবে। কেনাকাটা, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, উপহার আদান- প্রদান, বাজি পোড়ানো, ভুরিভোজ প্রভৃতি গতানুগতিকতার পাশাপাশি, একটু অন্যরকম ভাবে উৎসব উদ্যাপন করতে পারলে, পাওয়া যাবে নির্ভেজাল আনন্দ, চরম মানসিক তৃপ্তি। আর এই পজিটিভ ভাইস আপনার নিজের থেকে ছড়িয়ে যাবে পারিবারিক জীবনে।

আসলে আত্মকেন্দ্রিক না হয়ে অন্যের কথা ভাবা, অন্যের জন্য কিছু করার মাধ্যমেই পাওয়া যায় অসীম আনন্দ। মোটকথা আরও উদার, আরও দয়ালু হতে হবে। কারণ আপনজনের মুখে হাসি ফোটাতে পারলে তবেই নিজের অন্তরকে আলোকিত করা যায় প্রকৃতপক্ষে। তাই একার আনন্দে নয়, সমবেত আনন্দেই পরিবারে বজায় থাকবে পজিটিভ ভাইস বা খুশির আবহ। মনে রাখবেন, যে-যার মতো আনন্দে থাকতে চায়। তবে ভালোলাগার বিষয় যাই হোক, উপলক্ষ্য কিন্তু একটাই— আনন্দলাভ। কারণ আমরা মনে মনেই বাঁচি বেশি। অতএব জীবনের সমস্ত প্রতিকূল পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠে, মানসিক শাস্তি এবং আনন্দলাভের সংকল্প করতে হবে। আর সংকল্পের সঠিক সময় হোক আলোর উৎসব দীপাবলি।

আত্মবিশ্লেষণ

আয়নার সামনে দাঁড়ান। দেখুন নিজেকে। কী কী দোষগুণ আছে তা বিশ্লেষণ করুন। দোষগুলিকে কাটানোর চেষ্টা করুন এবং গুণগুলির কথা ভেবে আত্মবিশ্বাস বাড়ান। প্রয়োজনে অন্যদের (শুভাকাঙ্ক্ষী) থেকে জেনে নেওয়ার চেষ্টা করুন আপনার কী কী দোষগুণ আছে। কারণ, নেগেটিভ পয়েন্টস না কাটালে, পজিটিভ ভাইস আসবে না। অতএব নিজেই নিজের সমালোচনা করুন এবং অন্যের থেকে সমালোচনা শুনে নিজেকে শুধরে নিন।

সামাজিকতা

টেলিভিশন কিংবা কম্পিউটারের সামনে অহেতুক দীর্ঘ সময় ব্যয় না করে, মানুষের সঙ্গে মেলামেশা করুন। যত মানুষের সঙ্গে মিশবেন, ততই আপনি জ্ঞানবুদ্ধিতে সমৃদ্ধ হবেন, উপকার পাবেন। শুধু তাই নয়, অন্যের গুণগুলি নিতে পারলে আপনি আরও গুণী এবং স্মার্ট হয়ে উঠবেন। মনে রাখবেন, কূপমণ্ডুকরা কল্পনার জগতে বাস করে, কিন্তু সামাজিকতা বাস্তবের মুখোমুখি করে। আর এই সামাজিকতা বজায় রাখার জন্য ভালোবাসার মানুষের হাতে তুলে দিতে পারেন উপহার সামগ্রী। তবে এক্ষেত্রে মনে রাখবেন, প্রত্যেক মানুষই ভিন্ন স্বভাব এবং ভাবধারা নিয়ে বেড়ে ওঠেন। তাই সবাইকে একইরকম উপহার দিয়ে সমান ভাবে খুশি করতে পারবেন না। অতএব কে কেমন স্বভাবের এবং কী উপলক্ষ্যে উপহার দিচ্ছেন তা জেনেবুঝে নিয়ে তবেই উপহার দিন। নয়তো উপহার দেওয়ার পর অন্যের মুখে হাসি না ফুটলে আপনি মর্মাহত হতে পারেন।

যেমন কেউ চায় ব্যবহার্য সামগ্রী, কেউ চায় শৌখিন জিনিস, কেউ চায় দামি কিছু, কেউ-বা আবার হয়তো আবেগমিশ্রিত ব্যক্তিগত কিছু ইচ্ছের বাস্তবায়ন চায় উৎসবকে উপলক্ষ্য করে। আর এই আবেগমিশ্রিত উপহারগুলির মধ্যে হয়তো মনের মানুষের দেশ-দেশান্তরে বেড়ানোর ইচ্ছেপূরণ করতে হতে পারে। তাড়াতাড়ি সন্তান চাইলে তাও দেওয়ার চেষ্টা করতে হবে কিংবা ভাড়াবাড়ি ছেড়ে স্থায়ী ঠিকানার বন্দোবস্তও করতে হতে পারে। শুধু তাই নয়, ধূমপান, মদ্যপানের মতো কুঅভ্যাস ত্যাগ করানোকেও অনেকে সেরা উপহার মনে করেন।

অবশ্য শুধু উপহার আদানপ্রদানের মধ্যেই আনন্দ সীমাবদ্ধ থাকে না। আত্মীয়, বন্ধু এবং শুভাকাঙ্ক্ষীদের সঙ্গে হইহুল্লোড়ে মেতে থাকার মধ্যেও আনন্দলাভ ঘটে, হৃদয় আলোকিত হয়। কিংবা পরিবারে পজিটিভ ভাইস বা খুশির আবহকে তীব্র রূপ দিতে হলে, পরিবারের সবাইকে সঙ্গে নিয়ে সমাজসেবার মাধ্যমে আরও বৃহত্তর অর্থে পজিটিভ ভাইস আনা যায়। যেমন ধরুন, কারওর জন্য সময়দান কিংবা শিক্ষাদান। এই দুটি বিষয় ছাড়াও রয়েছে অন্নদান, বস্ত্রদান এবং আর্থিক সাহায্যের বিষয়টি।

অর্থাৎ অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে নিজেকে খুশি রাখার উদ্যোগ। আপনার সামর্থ্য মতো কিছু নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস তুলে দিতে পারেন গরিব মানুষের হাতে। কিংবা অসুস্থ মানুষের চিকিৎসার ব্যবস্থা করে দেওয়া অথবা নিঃসঙ্গ বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের সঙ্গে গল্প- আড্ডা, খাওয়াদাওয়ার মাধ্যমেও খুশির আবহ তৈরি করা যায়। অর্থাৎ আত্মকেন্দ্রিক হয়ে না থেকে, সর্বজনীন সামাজিক দায়িত্ব পালন করে নিজের পরিবারে পজিটিভ ভাইস নিয়ে আসুন।

গুরুত্বের বিচার

গুরুত্ব অনুযায়ী কাজের তালিকা তৈরি করুন। কারণ, সঠিক গুরুত্ব মানেই সঠিক সাফল্য। এতে বাজে কাজে সময় নষ্ট হবে না। আপনার জীবনের উপযোগী এবং লাভজনক কাজগুলিকে তালিকার শীর্ষে রাখুন। ঠান্ডা মাথায় নিজের কাজের গুরুত্ব নিজেই বিচার করুন। এর ফলে সাফল্য এবং আনন্দ দুই-ই বজায় থাকবে। আর আনন্দ বজায় থাকলেই পজিটিভ ভাইসও থাকবে পরিবারে। স্বাস্থ্য সচেতনতা

মনে রাখবেন, স্বাস্থ্যই সম্পদ। শরীর স্বাস্থ্যের যত্ন না নিলে, একসময় সব আনন্দ এবং ধনসম্পদ নষ্ট হবে। তাই প্রতিদিন নিয়ম করে পরিবারের প্রত্যেকে শরীরচর্চা করুন। খাদ্যতালিকায় রাখুন শাকসবজি এবং ফল। পান করুন পর্যাপ্ত জল। আর উৎসবে কিংবা অন্য সময় যতটা সম্ভব ফাস্ট ফুড থেকে সরিয়ে রাখুন নিজেকে।

কর্ম প্রাধান্য

ভাগ্য নয়, কর্ম পাক প্রাধান্য। মনে রাখবেন, আত্মবিশ্বাসী ব্যক্তি ভাগ্যে বিশ্বাস করেন না, কর্মময় জীবনযাপন করেন। তাই, কোনও কাজে সাময়িক বাধা কিংবা প্রতিকূলতা এলে, ভাগ্যকে দোষারোপ করে বসে থাকবেন না। প্রতিকূল পরিস্থিতি কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করুন। কারণ, মনের জোর-ই পারে অসাধ্য সাধন করতে। অতএব সাময়িক বাধা এলে নিরাশ না হয়ে বুদ্ধি এবং পরিশ্রম দিয়ে বাধা কাটিয়ে উঠুন।

মনে রাখবেন, ঝড় ওঠে, আবার থেমেও যায়। সমস্যা থাকলে তার সমাধানও আছে। আর যে-সমস্যার সমাধান নেই, সেটা কোনও সমস্যাই নয়। তাই, বীর সৈনিকের মতো যুদ্ধ করুন সমস্ত অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে এবং খুশির আবহ ফিরিয়ে আনুন পরিবারে। বাহ্যিক সৌন্দর্য

পরিবারের সবার অন্তর আলোকিত হলে যেমন পরিবারে পজিটিভ ভাইস বজায় থাকে, ঠিক তেমনই অন্তরকে আলোকিত করতে হলে বাহ্যিক সৌন্দর্যও বজায় রাখতে হবে। কারণ পরিচ্ছন্নতা এবং সৌন্দর্য দর্শনেও সুখ আছে। অতএব দীপাবলি উপলক্ষ্যে ঘরবাড়ি পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন এবং আলোকিত রাখুন। কোথাও যেমন অন্ধকার রাখবেন না, ঠিক তেমনই কোথাও অগোছালো কিংবা নোংরা রাখবেন না৷

একটা কথা মনে রাখবেন, আপনার চারপাশের সৌন্দর্য যেমন আপনার এবং আপনার পরিবারের সবার মন ভালো রাখবে, ঠিক তেমনই অন্যকেও আকর্ষণ করবে। এর ফলে আপনার সুস্থ রুচির পরিচয় বহন করবে এবং খুশির পরিবেশ বজায় থাকবে।

রায়চকে এবার রাজকীয় সফর

সারা সপ্তাহ বিরামহীন কর্মব্যস্ততার পর, উইক এন্ড-এ কোথাও অবসর যাপনের ইচ্ছে হয় অনেকের। কিন্তু কোথায় যাবেন, এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না অনেকে। কারণ, অবসর যাপন মানে তো আর শুধু হোটেলে গিয়ে বিশ্রাম নেওয়া নয়। দু চোখ দিয়ে প্রকৃতিকে উপভোগ করার ইচ্ছেই প্রাধান্য পায় ভ্রমণে। অনেকে আবার সুন্দর প্রকৃতির পাশাপাশি, বিলাসবহুল আরাম-আয়াসও চান। কিন্তু ছোট্ট ছুটিতে সব ইচ্ছে পূরণ করা যাবে কোথায়, সেই চিন্তায় থাকেন অনেকে এবং এরফলে ট্যুর-টাই হয়ে ওঠে না অনেক সময়। কিন্তু এবার সফরের সম্পূর্ণ আনন্দ নেওয়ার সুযোগ পাওয়া যাবে রায়চকে। কারণ, এই রায়চকে খোলা হল ‘তাজ গঙ্গা কুটির রিসর্ট অ্যান্ড স্পা’।

গঙ্গার পাড়ে ১০০ একর জায়গা জুড়ে এই রিসর্ট-টির অবস্থান। গঙ্গা-স্নান থেকে শুরু করে নৌকা ভ্রমণ, নদীর মাছের স্বাদ নেওয়া সবই সম্ভব এখানে। দিনে-রাতে মনোরম হাওয়া গায়ে মেখে, রিসর্ট-এর বিলাসবহুল ঘরে বসবাস করার মজা-ই আলাদা। রিসর্ট-এর একাধিক রেঁস্তোরায় আমিষ, নিরামিষ সবরকম খাবারের স্বাদ নিয়ে, রিসর্ট চত্বরেই লোকগান শোনার দারুণ সুবিধে রয়েছে এখানে। শুধু কী তাই? যারা নদীতে স্নান না করে সুইমিং পুল-এ স্নান করতে চান, তাদের জন্য রয়েছে একাধিক সুইমিং পুল-এ স্নান করার ব্যবস্থা। রয়েছে ছোটো-বড়ো সবার জন্য বিস্তৃত খেলার জায়গা এবং শরীরচর্চার জায়গা। নীচে ঘাসের সবুজ চাদর, চারিদিকে সবুজ গাছ-গাছালি, সামনে বহমান গঙ্গা আর উপরে নীল আকাশের চোখ জুড়ানো শোভা, আহা, নয়নাভিরাম! আর রিসর্ট-এ থাকা স্পা সেন্টার দেবে অতিরিক্ত আরাম।

একদিকে বিলাসবহুল জীবনযাপনের সুযোগ, অন্যদিকে প্রকৃতিকে উপভোগ, সফরের পরিপূর্ণ আনন্দলাভ। এখানে আছে ১৫৫টি রুম, আছে প্রায় ৭০ হাজার স্কোয়ার ফুটের ব্যাঙ্কোয়েট হল। যেখানে দেশ-বিদেশের যে কোনও বড়ো কনফারেন্সের আয়োজন করা যেতে পারে। গঙ্গার পাড়েই বিশাল লনও আছে। খাবারেরও (পদ) এলাহি আয়োজন রয়েছে। বাঙালি খাবার তো বটেই, অন্যান্য রাজ্যের কিংবা দেশের সেরা  খাবারও পাওয়া যায় এই রিসর্ট-এ। আর অম্বুজা নেওটিয়া গ্রুপের সঙ্গে হাত মেলানোর বিষয়ে ইন্ডিয়ান হোটেলস কোম্পানি লিমিটেড-এর ম্যানেজিং ডিরেক্টর অ্যান্ড চিফ এক্সিকিউটিভ অফিসার পুনীত ছতওয়ল জানিয়েছেন, ‘এই রিসর্ট চালু করার কারণে, দুই সংস্থার সম্পর্ক আরও মজবুত হল।’  রায়চকের এই রিসর্ট নিয়ে চুক্তির পর, ‘অম্বুজা নেওটিয়া গ্রুপ’-এর চেয়ারম্যান হর্ষবর্ধন নেওটিয়া জানিয়েছেন, ‘আইকনিক তাজ ব্র্যান্ডের সঙ্গে হাত মেলানোর ফলে এই এলাকার পর্যটনের উপরও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।’

এখানে ঐতিহ্য এবং আধুনিকতার মেলবন্ধন ঘটেছে। গ্রাম্য আবহ যেমন রয়েছে, ঠিক তেমনই বিলাসবহুল সুযোগ-সুবিধাও রয়েছে এখানে। গঙ্গার মনোরম দৃশ্য সফরকে করে তুলবে সার্থক। এছাড়া, অতিথিরা কিউরেট করা খাবার উপভোগ করতে পারবেন এই রিসর্টের সিগনেচার রেস্তোরাঁ মাচান আর হাউজ অফ মিং-এ। এই দুই রেস্তোরাঁর অনুপ্রেরণা হিসাবে কাজ করেছে গঙ্গার জলের মৃদু ছন্দ। রিভার ভিউ লাউঞ্জ আর বারান্দা বিশ্রাম নেওয়ার জন্য আদর্শ।  খোলামেলা পরিবেশ, ইনফিনিটি-এজ পুল, আউটডোর পুল আর অত্যাধুনিক ফিটনেস সেন্টার-এ তাজা হয়ে ওঠার এবং অবসর বিনোদনের সুবর্ণ সুযোগ দিয়েছে এই রিসর্ট। সঙ্গে আছে ইনডোর ও আউটডোর খেলাধুলোর সুযোগ। এই রিসর্টে তাজের সিগনেচার স্পা – জে ওয়েলনেস সার্কল-ও আছে, যা সামগ্রিক সুস্থতার অভিজ্ঞতা দেবে। বিশাল ব্যাংকোয়েটিংয়টি উৎসব উদযাপন, ডেস্টিনেশন ওয়েডিং এবং কর্পোরেট রিট্রিট হিসাবেও আদর্শ।

গঙ্গার ধারে এই লোকেশন-এ আছে দুর্গের মতো সব স্থাপত্য আর নদীতীতের সৌন্দর্য। অতিথিরা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উপভোগ করতে পারেন, গ্রামে ঘুরে বেড়াতে পারেন আর বাংলার বিখ্যাত চায়ের ব্লেন্ডগুলো উপভোগ করতে পারেন এমন এক পরিবেশে, যা এই অঞ্চলের চিরকালীন মেজাজের উদযাপন।

সমাজসেবা এবং উন্নয়নে নজির গড়ার জন্য দেওয়া হবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি

অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষার ব্যবস্থা প্রভৃতি বিষয়ে যাঁরা বিশেষ ভূমিকা নিয়ে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন, তাঁদের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়াকে অন্যতম কর্তব্য মনে করেন রোটারি ক্লাব (পূর্বাঞ্চল) কর্তৃপক্ষ। তাই তাঁরা পূর্ব ভারত জুড়ে ‘সিএসআর পুরষ্কার’ প্রদানের মাধ্যমে কর্পোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতার ক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠত্ব এবং অনুপ্রেরণার একটি মানদণ্ড হয়ে ওঠার লক্ষ্যে কাজ করার উদ্যোগ নিয়েছেন। আর তাই, রোটারি ক্লাবের পূর্বাঞ্চল প্রথমবার মর্যাদাপূর্ণ ‘রোটারি সিএসআর অ্যাওয়ার্ড’ প্রদান করতে চলেছে, যা সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং উন্নয়নের জন্য ব্যতিক্রমী প্রতিশ্রুতি প্রদর্শনকারী কর্পোরেটদের সম্মান জানাতে একটি মহৎ উদ্যোগ।

চলতি বছরের ৮ অক্টোবর কলকাতা-র এক অভিজাত ক্লাবে জুরি সভার আয়োজন করা হয়েছিল। এই মনোনয়ন পর্বে সরকার, শিক্ষা এবং সামাজিক উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত বিশেষজ্ঞরা আলোচনায় অংশ নিয়েছিলেন এবং সমান স্বীকৃতি নিশ্চিত করার জন্য প্রতিটি আবেদন স্বচ্ছভাবে এবং যোগ্যতার ভিত্তিতে মূল্যায়ন করেছেন বলেও জানানো হয়েছে এক প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে।

এই পুরষ্কার বিতরণী অনুষ্ঠানটি ২৩শে অক্টোবর ২০২৫ কলকাতার হায়াত রিজেন্সিতে অনুষ্ঠিত হবে, যেখানে কর্পোরেট লিডারস, সিএসআর পেশাদার, উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ এবং রোটারির সিনিয়র সদস্যরা এক প্ল্যাটফর্মে একত্রিত হবেন। এই অনুষ্ঠানের লক্ষ্য— সহযোগিতা বৃদ্ধি, উদ্ভাবনকে অনুপ্রাণিত করা এবং সামাজিক চেতনা উদযাপন করা।

বিশিষ্ট জুরি সদস্যদের মধ্যে আছেন গায়িকা ঊষা উথুপ। এই উদ্যোগের জন্য তাঁর প্রশংসা প্রকাশ করে জানিয়েছেন, ‘আমাকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করে যে, কর্পোরেটরা এগিয়ে আসছেন এবং সিএসআর কার্যক্রমে আরও আন্তরিক ভাবে যুক্ত হচ্ছেন। ইতিবাচক কাজ করা এবং এর ফলে যে অর্থবহ পরিবর্তন আসছে, তা দেখে আনন্দিত হচ্ছি।’

পুরস্কার প্রদানের উদ্দেশ্য এবং প্রক্রিয়া তুলে ধরে, ২০২৫-২০২৬ সালের রোটারি-র জেলা গভর্নর ড. রামানেন্দু হোমচৌধুরী উল্লেখ করেন, ‘এই উদ্যোগ কর্পোরেট হাউস এবং রোটারি ক্লাবকে কার্যকর ভাবে যোগাযোগ করতে সক্ষম করেছে এবং আশা জাগিয়ে তুলেছে যে, এটি ভবিষ্যতে আরও বৃহত্তর সামাজিক প্রভাবের দিকে পরিচালিত করবে।’

কাঠামোগত সামাজিক দায়বদ্ধতার প্রচেষ্টাকে স্বীকৃতি দেওয়ার তাৎপর্যকে আরও জোরদার করে ডা. কুণাল সরকার জানিয়েছেন, ‘এমন অনেক পুরষ্কার আছে, যার সঙ্গে আমরা পরিচিত, কিন্তু খুব কম সংখ্যক পুরষ্কারই সিএসআর কার্যক্রমকে এত সুশৃঙ্খল এবং গুরুত্বের সঙ্গে স্বীকৃতি দেয়। স্বাস্থ্যসেবা, উদ্ভাবন, শিক্ষা এবং পরিবেশ— এইগুলি হল গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র,  যেখানে পরিবর্তন প্রকৃত অর্থে শুরু হয়।’

রোটারি সিএসআর অ্যাওয়ার্ডস ২০২৫-এর চেয়ারম্যান রবি সেহগাল এই উদ্যোগ পরিচালনায় ক্ষুদ্র ও মাঝারি আকারের উদ্যোগের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা তুলে ধরেন। তিনি উল্লেখ করেছেন যে,  ‘এই ব্যবসাগুলি ছোটো পরিসরে কার্যকর প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে, তবে সুবিধাভোগীদের বিস্তৃত পরিসরে পৌঁছাচ্ছে, বিশেষকরে উপজাতি সম্প্রদায়, গ্রামীণ জনগোষ্ঠী এবং সমাজের সুবিধাবঞ্চিত অংশের মধ্যে। মূল ফোকাস ক্ষেত্রগুলির মধ্যে রয়েছে জল এবং স্যানিটেশন, শিক্ষা, সাক্ষরতা এবং স্বাস্থ্যসেবা, যা দেখায় যে, কীভাবে ছোটো সংস্থাগুলিও অর্থপূর্ণ, সুদূরপ্রসারী সামাজিক প্রভাব তৈরি করতে পারে।

জুরির চেয়ারম্যান দেবাশীষ সেন ইংরেজি শেখানোর জন্য প্রধান কোম্পানিগুলির দ্বারা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অগ্রণী ব্যবহারের প্রশংসা করেন এবং এটিকে বাস্তব-বিশ্বের শিক্ষার সুযোগ তৈরিতে প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য প্রচেষ্টা হিসাবে বর্ণনা করেন। ইমামি পেপার মিলস, ইমামি লিমিটেড, জিন্দাল স্টিল, আইটিসি লিমিটেড, বেদান্ত লিমিটেড, টাটা এআইএ এবং গ্রাফাইট ইন্ডিয়া লিমিটেডের মতো সংস্থা সহ প্রায় ১০০টি এন্ট্রি জমা পড়েছে, যার মধ্যে ২৪টিরও বেশি কোম্পানিকে পুরস্কৃত করা হবে।

পড়ার জন্য সীমাহীন গল্প-নিবন্ধসাবস্ক্রাইব