পিন-পার্বতীর উৎস অভিযানে (পর্ব-০২)

বিকেল তিনটে নাগাদ গাইড রাজা সব সঙ্গীদের নিয়ে হাজির। রান্নার দায়িত্ব সামলাবে দীপক, ছোট্ট চেহারার ছেলেটি নাকি মানালির অনেক হোটেলের হেঁশেল সামলেছে। কুলিদের মাথা নিম্বু, এই পথে বহুবার লটবহরের দায়িত্ব সামলেছে। গাইড রাজা ঠাকুরকে গাইডের থেকে ‘নায়ক’ বেশি লাগছে। গুরুদ্বারায় সবার থাকার বন্দোবস্ত করে বেরিয়ে পড়লাম বাজার করতে। লিস্ট মিলিয়ে বাজার করতে গিয়ে বারংবার ধাক্কা খাচ্ছি। প্রায় প্রতিটি জিনিসের পরিমাণ বাড়িয়ে দিচ্ছে, কারণ হিসেবে বলছে— ‘এ লোগ জ্যাদা খাতে হ্যায়, রাস্তা ভি কাফি লম্বা; খানে মে তকলিফ নেহি হোনা চাহিয়ে।’

কেনাকাটা ও প্রাথমিক গোছগাছ করতেই রাত্রি আটটা বেজে গেল। সকাল সকাল রওনা দেব তাই অহেতুক রাত্রি জাগরণ না করে সবাই শুয়ে পড়লাম।

(2)

পরেরদিনের গন্তব্য – ক্ষীর গঙ্গা, দূরত্ব – ১০ কিমি, উচ্চতা – ৯,১৮০ ফুট। আগেরদিন ঠিক করে রাখা একটা বড়ো টেম্পো ট্রাভেলারে সমস্ত মালপত্র তুলে চেপে বসলাম বারসেনির উদ্দেশ্যে। এ পথের শেষ বড়ো গ্রাম এবং হাঁটাপথের শুরু। গাড়ি মণিকরণ ছেড়ে এগিয়ে যেতেই দু’পাশে দেখা পেলাম সারি সারি আপেল বাগানের। সবুজ, গোলাপি, সোনালি রঙের আপেল ঝুলে রয়েছে সারা গাছ জুড়ে। যেমন মিষ্টি তেমন সুস্বাদু। হিমাচলের কুলু উপত্যকায় সবচেয়ে বেশি আপেলের চাষ হয়।

পার্বতী নদীকে সঙ্গী করে আমাদের গাড়ি দুলতে দুলতে এগিয়ে চলল। গাড়ি থামিয়ে মাঝে মাঝেই চলল ফটো সেশন। সকাল প্রায় ন’টায় পৌঁছে গেলাম বারসেনীতে। সমুখে পার্বতী নদীর উপর ব্রিজ দেখা যাচ্ছে। ওই ব্রিজ পেরিয়ে আমরা যাব আজকের গন্তব্য ক্ষীর গঙ্গায়। এখান থেকে দুটি পথ আছে ক্ষীর গঙ্গা যাওয়ার। একটি পথ অপেক্ষাকৃত খাড়াই ও সুন্দর। জঙ্গল ঘেরা পুলগা ফরেস্ট বাংলোর পাশ দিয়ে চলে গেছে। দ্বিতীয় পথটি হল আমাদের, অপেক্ষাকৃত সহজ পথে নাকথান গ্রাম হয়ে ক্ষীর গঙ্গা।

উত্তর দিক থেকে প্রবল বেগে বয়ে আসা তোশ নালা এখানে পার্বতী নদীতে মিলিত হয়েছে। এই নদীর উজান পথে এগিয়ে গেলে পাওয়া যাবে তোশ গ্রাম। সেখান থেকেই পথ চলে গেছে ‘সারা উপমা লা’-র দিকে। (লা অর্থাৎ গিরিপথ) এই গিরিপথের ওপারে লাহুল উপত্যকা। সেখান থেকে গাড়ি করে কুনজুম গিরিবর্ত্ত পেরিয়ে যাওয়া যায় স্পিতি উপত্যকায়। যাত্রা শেষে আমরা ওই পথ ধরেই ফিরে আসব মানালিতে।

কুলি সর্দার নিম্বুর তত্ত্বাবধানে সমস্ত মালপত্র বণ্টন হচ্ছে মালবাহকদের মধ্যে। চললাম সামনের হোটেলে সবার জন্য প্রাতরাশ কাম দ্বিপ্রাহরিক আহারের বন্দোবস্ত করতে। আলু পরোটা, দই ও ডিমের ওমলেট। চলছিল খাওয়া ও গল্প, শেষ হওয়ার আগেই যা আশা করেছিলাম সেই খবর চলে এল।

গিয়ে দেখি, নিম্বু একটা ওজন যন্ত্র হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মালের ওজন ২০ কেজির বেশি নেবে না! অনেক অনুরোধ সত্ত্বেও রাজি হল না। কী হবে! আমরা নিজেদের ব্যাগ নিজেরাই বইব, সেখানে অতিরিক্ত কিছুই নেওয়া সম্ভব নয়। কোথায় পাব এক্সট্রা মালবাহক? এক বয়স্ক লোক যেতে রাজি হল। কিন্তু শর্ত, পুরো রাস্তাই নিয়ে যেতে হবে। কয়েকদিনের জন্য প্রয়োজন। অবশেষে একজন কুলিকে অতিরিক্ত পারিশ্রমিক দিতে হবে এই শর্তে নিম্বু সবাইকে রাজি করাল।

পার্বতী ব্রিজ পেরিয়ে এলাম, দুই পাশের আপেল বাগানের মধ্য দিয়ে হালকা চড়াই পথ উঠে গেছে। চারিদিকে আপেল ঝুলে থাকলেও ভয়ে পাড়তে পারছি না! হোটেলের লোকজন সাবধান করে দিয়েছে, আপেল না তুলতে। অনুমতি না নিয়ে আপেলে হাত না দিই। কী মুশকিল! জনমানবশূন্য এলাকা… একটা প্রাণীও নেই বললেই হবে! নাকের ডগায় ঝুলে রয়েছে অথচ তুলতে পারব না? না পাওয়ার বেদনায় হাঁটার কষ্ট বেড়ে যাচ্ছে। দেড় ঘণ্টা হাঁটার পর একটা লোককে দেখতে পেলাম। সবাই পটাতে শুরু করল।

—ভাইসাব, চায়ে মিলেগা?

—হ্যাঁ মিলেগা, আপলোগ আইয়ে। নিয়ে গেল ছোট্ট একটা কুঁড়েঘরে। পুরো ঘর জুড়ে আপেলের স্তূপ। যৎসামান্য টাকার বিনিময়ে চা খেলাম। আপেল চাই বলতেই, বলল— ‘জিতনা চাহিয়ে লে লিজিয়ে। পেড়সে মৎ তোড়িয়ে।”

প্রাণের সুখে যে যা পারল নিয়ে নিল। কিন্তু বইতে হবে যে! সঙ্গে সঙ্গেই ১০টার বদলে সংখ্যা ৫ হয়ে গেল। আপেল খেতে খেতেই এসে গেলাম এ পথের শেষ গ্রাম নাকথানে। ছোট্ট গ্রাম, অল্প কয়েকটি বাড়ি রয়েছে। মণিকরণ থেকে উৎসাহীরা এখানে আসতে পারেন। দু-একটি ধাবা রয়েছে খাওয়ার জন্য, থাকার জন্য রয়েছে হোম স্টে।

চা খেতে খেতেই পরিচয় হল বিপিন সিং পারমার সঙ্গে। বয়স্ক লোক, দেশের রাজনীতি ও অর্থনীতির খোঁজখবর রাখেন। লোকজনের জীবন-জীবিকার কথা জিজ্ঞাসা করায় বললেন— ‘এই সময় মহিলা ও পুরুষরা আপেল খেতেই কাজ করে। বছরের বাকি সময় কুলি কিংবা হোটেলের কাজে লেগে যায়।”

ঘরে ঘরে দেখলাম আপেল বাছাইয়ের কাজ করছে মূলত বাড়ির মহিলা ও বাচ্চারা। এক মহিলা সুন্দর দুটো টুকটুকে আপেল উপহার দিল। আমি আর জ্যোতি গল্পগুজব করে নাকথান থেকে একটু দেরিতে হাঁটতে শুরু করলাম।

এখান থেকে রুদ্রনাগের দূরত্ব মাত্র আধ ঘণ্টার। দুই পাশের খাড়া পর্বত দেয়ালের মাঝে এই পার্বতী উপত্যকা। আপেলের বাগান আস্তে আস্তে কমে আসছে। এক বুড়ি নাতিকে নিয়ে আপেল বাগান পাহারা দিচ্ছে। জ্যোতির্ময়-এর ইচ্ছে আপেল গাছে উঠে আপেল পেড়ে খাওয়া। বুড়ি ঠাকুমাকে টুপি পরানোর চেষ্টা করেও পারল না।

অনেক দেরি হয়ে গেছে। সবাই অপেক্ষা করছে গালাগালি দেওয়ার জন্য। প্রায় দৌড়াতে দৌড়াতে পৌঁছে গেলাম।

আহা! কী অপূর্ব স্বৰ্গীয় স্থান। দুরন্ত এক ঝরনা লাফিয়ে নামছে মন্দিরের পিছনে। তাঁবু ফেলার আদর্শ স্থান। বহু লোকের সমাগম হয়েছে আজ। বোধ হয় রুদ্রনাগের আজ বিশেষ পুজোর দিন। বহু পুণ্যার্থী দল বেঁধে আসছে। তাদের জন্য চলছে রান্না।

চা খাওয়ার পর পার্বতী নদীর উপরে নড়বড়ে ব্রিজ পেরিয়ে এগিয়ে চললাম ক্ষীর গঙ্গার দিকে। এখান থেকে পুরো খাড়া পথ উঠে গেছে ঘন অরণ্যানীর মধ্য দিয়ে। দীর্ঘ বনস্পতি ও ঘন ঝোপের আড়ালে চলে গেছে পথ। প্রথম দিনের কষ্ট সামলে পৌঁছে গেলাম বিস্তৃত বুগিয়াল ক্ষীর গঙ্গায়। উচ্চতা ৯,১৮০ ফুট। এখানে রয়েছে বিখ্যাত উষ্ণ প্রস্রবণ। জলের গুণমান নাকি মণিকরণের থেকেও ভালো। প্রথম দিনের ব্যথার উপশমে এই প্রস্রবণের জল মহৌষধি। এখানে থাকা ও খাওয়ার বন্দোবস্ত রয়েছে।

(সাম্প্রতিককালে মাননীয় হাইকোর্ট এখানে তাঁবু ফেলা নিষিদ্ধ করে দিয়েছে দূষণের কারণে। ফরেস্ট ডিপার্টমেন্ট থেকে বিশেষ অনুমতি না নিলে সমূহ বিপদে পড়তে পারেন।)

আমরা কুণ্ড থেকে একটু নীচে তাঁবু ফেললাম। সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়ল মোবাইল ফোনের সিগন্যাল খুঁজতে। নানা বিচিত্র ভঙ্গিতে এদিক ওদিক সবাই ঘুরে বেড়াতে লাগল। এরপর ট্রেক শেষ না হওয়া পর্যন্ত বাড়ির সঙ্গে যোগাযোগ করা যাবে না।

এই স্থান নিয়েও নানা পৌরাণিক গল্প আছে। সিদ্ধিদাতা গণেশ এখানে তপস্যা করতেন। একদিন হর-পার্বতী এসেছেন সন্তানকে দেখতে। পরম মমতায় রান্না করেছেন ক্ষীর ভোগ। এর থেকেই নাকি নাম হয় ক্ষীর গঙ্গা!

এবার গন্তব্য ক্ষীর গঙ্গা থেকে তুণ্ডাভজে। উচ্চতা ১২,০০০ ফুট। দূরত্ব ১২ কিমি। রোদ ঝলমলে সকাল আমাদের স্বাগত জানাল। লম্বা পথ হাঁটতে হবে। সকালে ভারী প্রাতরাশ সেরে বেরিয়ে পড়লাম। নিম্বু ও দীপকরা তাঁবু গুটিয়ে পরে আসবে। সংকীর্ণ পথে ঝোপঝাড় ভেঙে কিছুটা উতরাই পথে নেমে এলাম পার্বতী নদীর কোলে। গভীর বনভূমির সবুজ-শ্যামলিমা আমাদের ঘিরে রয়েছে।

পিন-পার্বতীর উৎস অভিযানে (পর্ব-০১)

দুই উচ্ছলা সুন্দরী রমণীর জন্ম একই স্থানে। নাগাধিরাজের গোপন অন্তঃপুরের এক সু-উচ্চ গিরিপ্রাচীরের গাত্রে। জন্মাবধি ছুটে চলেছে পরস্পরের বিপরীতে।

হিমাচলের উত্তর-পশ্চিমে পার্বত্য গিরিশিরায় জমে থাকা বিপুল আকৃতির চলমান বরফরাশি পর্বতের খাড়া ঢাল বেয়ে নেমে এসেছে। বয়ে আনা উপল স্তূপ আর ভেঙে পড়া বরফ দিয়ে তৈরি হয়েছে বিশাল আকৃতির সরোবর ‘মানতালাই”। ঢালে অবরুদ্ধ জল লক্ষ লক্ষ পাথরের বেষ্টনী ভেদ করে ছুটে চলেছে নিম্নমুখে ‘পার্বতী নদী’ রূপে। চলার পথে আসা অসংখ্য স্রোতস্বিনী তাকে আরও পুষ্ট করে তুলেছে। এই প্রবাহ সুগভীর গিরিখাত আর নিবিড় বনানীর মধ্য দিয়ে মণিকরণ, কাসোল জনপদকে ক্লেদমুক্ত করে কুলু উপত্যকায় ভুন্টারের কাছে নিজেকে সমর্পণ করেছে বিপাশার গর্ভে।

রুক্ষ, উগ্র স্বভাবের চঞ্চলা পিন নদীর জন্ম গিরিশিরার উত্তর-পূর্ব দিকে। রুক্ষ, ধূসর অঞ্চল দিয়ে প্রবাহিত পিন উপত্যকায় সবুজের দেখা মেলে কদাচিৎ। পিন সুন্দরীর মাথায় মেঘ জমার সাহস পায় না। পবনদেব তাঁর আজ্ঞাবহ ভৃত্য। দিনরাত বয়ে চলে হু হু করে আর পরম মমতায়, অনুপম দক্ষতায় উপত্যকার গিরিরাজকে নব নব রূপে সাজিয়ে তুলেছে। গিরিশ্রেণির প্রতিটি ভাস্কর্যই নিপুণ ভাস্করের অনুপম শিল্পকর্ম। সূর্যদেবের অকৃপণ আলোকবর্ষণে সেগুলি ক্ষণে ক্ষণেই রং বদলায়। পিন নদীর গতিধারা বিলীন হয়েছে স্পিতি উপত্যকার স্পিতি নদীতে।

‘পিন পার্বতী পাস’– এমনই এক দুর্গম গিরিবা। যে সুউচ্চ গিরিপ্রাচীর জলবিভাজিকা রূপে ‘পিন আর পার্বতীর’ নদী উপত্যকাকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে। তারই একটি অংশে ১৭৫৫৭ ফিট উচ্চতায় ‘পিন-পার্বতী গিরিবরে অবস্থান।

হিমাচলে যেমন অসংখ্য নদী উপত্যকা আছে তেমনই আছে অসংখ্য সুউচ্চ গিরিব। এক উপত্যকা থেকে অন্য উপত্যকায় যাওয়ার পথ সংক্ষিপ্ত করতে স্থানীয় মানুষেরা দীর্ঘকাল যাবৎ এই গিরিপথগুলিকে বেছে নিতেন। বর্তমানের উন্নত পরিবহণ ব্যবস্থার কল্যাণে বহু দুর্গম গিরিপথ আজ পরিত্যক্ত কিংবা কদাচিৎ ব্যবহৃৎ হয় দেশের সুরক্ষার কাজে।

১৯৮৪ সালের তৎকালীন ব্রিটিশ ফরেন সেক্রেটারি স্যার লুইস ডেন রুক্ষ স্পিতি উপত্যকার দিক থেকে দ্রুত আসার উপায় খুঁজতে গিয়ে পার্বতী গিরিপথের সন্ধান পান। স্পিতির দিক থেকে প্রথম পিন-পার্বতী পাস অতিক্রম করেন। কিন্তু সবুজ কুলু উপত্যকা থেকে প্রথম অভিযান করেন তৎকালীন সহকারী কমিশনার উব্লিউ লি শাটলওয়ারথ (W Lee Shuttleworth) ১৯২১ সালে। এরপর দীর্ঘদিন এই গিরিপথ কেউ অতিক্রম করেনি। ১৯৮১ সালে স্যার এডমন্ড হিলারির পুত্র পিটার হিলারি ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা থেকে কারাকোরাম’ অভিযান পর্বে এই গিরিপথ অতিক্রম করেন। খ্যাতনামা বাঙালি পর্বতারোহী প্রভাত কুমার গঙ্গোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে ১৯৮৩ সালে প্রথম ভারতীয় পার্বতী উপত্যকা থেকে স্পিতি উপত্যকায় সফল ভাবে অভিযান করেন। ওনার চিহ্নিত পথই বর্তমানে প্রচলিত। ১৯৯৩ সাল থেকে হিমাচল প্রদেশ সরকার সাধারণ অভিযাত্রীদের জন্য এই পথ খুলে দেয়।

কুলু ও স্পিতি উপত্যকার সীমারেখায় অবস্থানকারী সুউচ্চ জলবিভাজিকায় ‘পিন পার্বতী গিরিপথ’-কে অতিক্রম করার লক্ষ্যে, ৮ সদস্যের দল বিপুল উৎসাহ ও উদ্দীপনায় চেপে বসলাম কালকা মেলে। চণ্ডিগড় পৌঁছে গেলাম ভোরবেলায়। কুয়াশাচ্ছন্ন ভোরে মালপত্র নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছি। ড্রাইভার পাঠকের দেখা নেই, বারবার ফোনে চেষ্টা করেও পাওয়া গেল না। অবশেষে প্রায় ৫ টার সময় আমাদের সারথি পাঠক গাড়ি নিয়ে হাজির হলেন। লটবহর চাপিয়ে ২৯০ কিমি মণিকরণের উদ্দেশ্যে পাড়ি দিলাম। ভুন্টার পৌঁছাতে পৌঁছাতেই প্রায় বিকেল হয়ে গেল। এখানেই পার্বতী নদী বিপাশায় মিলিত হয়েছে।

হিমাচলের অপরূপ প্রকৃতি, বিপাশার কলকাকলি, উচ্ছলতা চোখ জুড়ানো উপত্যকা ছেড়ে এগিয়ে চললাম। তুলনামূলক সরু রাস্তা ধরে এগিয়ে চলেছি ৪০ কিমি দূরে মণিকরণের উদ্দেশ্যে। দৃশ্যপটের পরিবর্তন ঘটে গেছে। জনবহুল রাস্তা ছেড়ে নির্জন, নিভৃত পার্বতী উপত্যকার কোল ধরে এগিয়ে চলেছি। কুলু সদর থেকে মণিকরণের দূরত্ব মাত্র ৪৫ কিমি। লোকাল বাসে কুলু বা মানালি থেকে আসা যায়।

রাস্তার পাশের লোভনীয় আপেল বাগান দেখে নিজেদের আর সামলানো গেল না। ড্রাইভার-এর ভয়ার্ত সাবধান বাণী উপেক্ষা করেই আপেল পাড়ার চেষ্টা চলতে লাগল। গাছগুলো হয় দূরে কিংবা উঁচুতে। গাড়ির ছাদে উঠলে সহজেই পাড়া যেতে পারে, কিন্তু তা করা যাবে না! এইভাবে আপেল তোলা অন্যায়ের; চোখের সামনে ঝুলতে থাকা টুকটুকে লাল, গোলাপি, সোনালি বর্ণের ফলগুলির হাতছানি থেকে নিজেদের বিরত রাখা মুশকিল হয়ে উঠল।

—আরে দাদা! ইয়ে তো কুচ ভি নেহি, আপ লোগ জিস রাস্তা পে যায়েঙ্গে। শিরফ শেওই হ্যাঁয়। শেও কা পুরা জঙ্গল।

আমরা পৌঁছে গেলাম অপূর্ব পাহাড়ি জনপদ কাসোলে। বিদেশিরা এখানে বিপুল সংখ্যায় আসে। মূলত ইজরায়েলের লোকজন। চারিদিকে আপেলের বাগান দেখতে দেখতে এখন উত্তেজনা কিছুটা প্রশমিত। পার্বতী নদীকে সঙ্গী করে আরও কয়েকটি বাঁক অতিক্রম করতেই পৌঁছে গেলাম আমাদের গন্তব্য মণিকরণে।

মণিকরণ হিমাচল প্রদেশের একটি বিখ্যাত দর্শনীয় স্থান। ভ্রমণার্থী, পুণ্যার্থী সবার কাছেই আকর্ষণীয়। শান্ত, সৌম্য, মনোমুগ্ধকর পরিবেশ। কুলকুল করে বয়ে চলেছে পার্বতী নদী। তাকালেই চোখে পড়বে বিশাল গুরুদ্বারা। লোহার ব্রিজ রয়েছে পারাপারের জন্য। বাষ্পীয় ধোঁয়ার জটাজাল তৈরি হচ্ছে উষ্ণপ্রস্রবণগুলি থেকে। কাছেই রয়েছে রাম মন্দির ও শিব মন্দির।

মণিকরণ নিয়ে অনেক পৌরাণিক কাহিনি প্রচলিত রয়েছে। শিব-পার্বতী নাকি এখানে তিন হাজার বছর ছিলেন। সুখী সাংসারিক জীবন চলছিল নিরুপদ্রবেই। একদিন নদীতে অবগাহনকালে পার্বতীর প্রিয় রত্নখচিত ‘মণি’ কুণ্ডল হারিয়ে যায়। ভগ্নহৃদয়ে তা জানায় স্বামী ভূতনাথকে। দেবাদিদেব তার অনুচরদের নির্দেশ দেন খুঁজে আনতে। অনুচরদের সমস্ত চেষ্টা বৃথা যায়। রুষ্ট মহেশ্বর-এর তৃতীয় চক্ষু জ্বলে ওঠে। স্বর্গ মর্ত্য পাতাল কেঁপে ওঠে, দানব মানব দেবতারা বিচলিত, বিভ্রান্ত, ভয়ার্ত। নিকটে থাকতেন নাগরাজ শেষনাগ। পাতাল ফুঁড়ে বেরিয়ে এসে কুণ্ডল ফেরত দেন। সেই সঙ্গে বেরিয়ে আসে উষ্ণ জলের স্রোত। তৈরি হয় কুণ্ড। মণিকরণ পরিণত হয় মহাতীর্থে। শিখ গুরু নানক-ও এখানে এই কুণ্ডের ধারে বসেই দীর্ঘকাল তপস্যা করেছেন; তাই এটি শিখ তীর্থও বটে।

গুরুদ্বারার লঙ্গরখানায় উদর পূরণ করে একটা বড়ো ঘরে থাকার বন্দোবস্ত হল। কিন্তু আগামীকালের ট্রেকিং-এর পুরো রেশন কিনতে হবে। গুরুদ্বারা থেকে বাজার বেশ দূরে, সমস্ত রেশন বয়ে আনা মুশকিল! এসব চিন্তাভাবনা করে বাজারের কাছে সস্তা ও সুন্দর একটি হোটেলে আশ্রয় নিলাম। এখানকার প্রতিটি হোটেল উষ্ণ প্রস্রবণের জল সরবরাহ করে। হোটেলে ঢুকে সবাই হট বাথ নিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। সকালের দিকে কাজ না থাকায় বেরিয়ে পড়লাম মণিকরণ দর্শনে। ছোট্ট জনপদ, এখানকার উষ্ণপ্রস্রবণ প্রায় ১.৫ কিমি জায়গা জুড়ে অবস্থান করছে। শিব মন্দিরে অনেককেই দেখলাম কাপড়ের পুঁটলিতে চাল বেঁধে উষ্ণ কুণ্ডে ছুঁড়ে দিচ্ছে। জলের খনিজ গুণের কারণে মহাপ্রসাদরূপে ভক্তগণ গ্রহণ করছে। হাঁটতে হাঁটতে ১.৫ কিমি দূরের হিপিদের স্বর্গরাজ্য কাসোলেও ঘুরে এলাম।

টম্যাটো ফ্ৰাই, ব্রেড চপ এবং লাউ-পালং পকোড়া

হোম-মেড খাবারের স্বাদ-ই আলাদা। শুধু তাই নয়, হোম-মেড খাবার স্বাস্থ্যকরও। আর এইসব মুখরোচক পদগুলি বানিয়ে নেওয়া যায় রান্নাঘরে থাকা সাধারণ উপকরণ দিয়েই। অতএব, আজ শিখে নিন টম্যাটো ফ্ৰাই, ব্রেড চপ এবং লাউ-পালং পকোড়া বানানোর পদ্ধতি।

মুচমুচে টম্যাটো ফ্ৰাই

উপকরণ: ৪টে পাকা টম্যাটো, ধনে পাতার চাটনি হাফ কাপ, ১ কাপ বেসন, ১ বড়ো চামচ চালের গুঁড়ো, গোলমরিচের গুঁড়ো হাফ চামচ, হাফ চামচ আজোয়ান, ১ ছোটো চামচ ‘সুমন’ ব্র্যান্ড-এর জিরে গুঁড়ো, সামান্য হিং, ১ চামচ চাটমশালা, পরিমাণ মতো তেল এবং নুন স্বাদ অনুসারে।

প্রণালী: টম্যাটো পাতলা করে কেটে নিন। প্রতিটা টম্যাটোকে চারটি করে স্লাইস করবেন। কাটা টম্যাটোতে ধনেপাতার চাটনি মাখিয়ে রেখে দিন। একটা পাত্রে বেসন এবং চালের গুঁড়ো নিয়ে, ওর সঙ্গে চাটমশালা, স্বাদ বাড়ানোর জন্য ‘সুমন’ ব্র্যান্ড-এর জিরেগুঁড়ো, গোলমরিচের গুঁড়ো, আজোয়ান এবং স্বাদমতো নুন মিশিয়ে নিয়ে অল্প জল দিয়ে মেখে রাখুন। ওই মিশ্রণ অন্তত ১০ মিনিট ঢাকা দিয়ে রেখে দিন। এরপর কড়াইতে তেল দিয়ে গরম করুন। তেল গরম হয়ে গেলে, ধনেপাতা মাখানো টম্যাটোর পিসগুলো এক এক করে বেসন ও চালের গুঁড়োর গ্রেভিতে চুবিয়ে তেলে ভাজুন মধ্যম আঁচে। লালচে রং এসে গেলে টম্যাটো ভুজিয়া তৈরি। টম্যাটো সস-এর সঙ্গে গরম গরম পরিবেশন করুন।

ব্রেড চপ

উপকরণ: স্লাইস ব্রেড ৬ পিস, ২ টো বড়োমাপের আলু সেদ্ধ, ১ কাপ বেসন, ১ ছোটো চামচ কাঁচালংকাকুচো, ১ ছোটো চামচ আদাকুচি, বিটনুন হাফ চামচ, হাফ চামচ গোলমরিচের গুঁড়ো, হাফ চামচ লাললংকাগুঁড়ো, হাফ চামচ জিরেগুঁড়ো, ১ ছোটো চামচ চাটমশালা, ২ বড়ো চামচ ধনেপাতার চাটনি, ২ বড়ো চামচ তেঁতুলের লেই, ১টা বড়োমাপের পেঁয়াজ কুচো, ১টা বড়োমাপের টম্যাটো কুচো, ১ বড়ো চামচ ধনেপাতা কুচি, ২ বড়ো চামচ তেল এবং নুন স্বাদমতো।

প্রণালী: স্লাইস ব্রেডগুলো জলে চুবিয়ে নিয়ে তুলে রাখুন ২ মিনিট। ব্রেড-এর গা থেকে জল ঝরে গেলে, ওর সঙ্গে সেদ্ধ আলু, কাঁচালংকাকুচো, জিরেগুঁড়ো, গোলমরিচের গুঁড়ো, আদাকুচি, চাটমশালা এবং বেসন ভালো ভাবে চটকে মিশিয়ে নিন। এবার ওই মিশ্রণকে ছোটো ছোটো চ্যাপ্টা আকার দিয়ে রাখুন। এরপর ফ্রাইং প্যান-এ তেল গরম করে হালকা আঁচে ভাজুন এবং বাদামি বর্ণ ধারণ করলে নামিয়ে নিন। ওর উপর বিটনুন, পেঁয়াজকুচি, টম্যাটোকুচি ছড়িয়ে দিয়ে, ধনেপাতার চাটনি এবং তেঁতুলের লেই সহযোগে গরম গরম পরিবেশন করুন।

লাউ-পালং পকোড়া

উপকরণ: কুচো করা তিন কাপ লাউ, পালং শাক কুচো করা দু’কাপ, ২টো কাঁচালংকার কুচো, হাফ কাপ বেসন, ১ ছোটো চামচ জিরেগুঁড়ো, হাফ চামচ আমচুর, সামান্য হিং, হাফ কাপ পেঁয়াজপাতা কুচো, ভাজার জন্য পরিমাণ মতো তেল এবং স্বাদমতো নুন।

প্রণালী: লাউয়ের কুচো এবং পালং শাকের কুচো ভালো ভাবে ধুয়ে জল ঝরিয়ে রাখুন। এর সঙ্গে কাঁচালাংকার কুচো, গোলমরিচের গুঁড়ো, জিরেগুঁড়ো, আমচুর, হিং, পেঁয়াজপাতা এবং বেসন মিশিয়ে নিয়ে ছোটো ছোটো বল তৈরি করুন। এবার কড়াইতে তেল গরম করে হালকা আঁচে ভাজুন এবং বাদামি রং এসে গেলে নামিয়ে নিয়ে ধনেপাতার চাটনি কিংবা টম্যাটো সস সহযোগে গরম গরম পরিবেশন করুন।

একলা চলার লড়াই

আজও অনেকেরই মনে প্রশ্ন জাগে, যে-মহিলারা একলা থাকা বেছে নেন, তারা কি পারিবারিক দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার জন্য এই জীবন বেছে নেন?

মা-দিদিমাদের সময়েই হোক অথবা বর্তমান সমাজ ব্যবস্থায় হোক— এই দীর্ঘ সময়ের সফরে এমন বহু মহিলা আছেন, যারা লড়াই জারি রেখেছেন এবং সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন। সেইসঙ্গে পরের প্রজন্মকেও সব দিক দিয়ে পুরোপুরি তৈরি করে দিয়েছেন।

“যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলো রে’, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই শব্দ চয়ন মনে করায় একাকী নারীর সংগ্রামকেও। দেশভক্তির পরিচয়স্বরূপ প্রতিবাদমূলক (স্বদেশ পর্যায়ের) এই গানটি কবি রচনা করলেও, গানের কথাগুলো যেন একাকী নারীর সংঘর্ষের প্রতি কবির এক শ্ৰদ্ধাৰ্য্য।

আত্মবিশ্বাস

এক শিক্ষিকার বিয়ের ১১ বছর পরে ডিভোর্স হয়ে যায় এবং সন্তানের দেখাশোনা করার জন্য তিনি চাকরি করা শুরু করেন। তার কাছে তখন বর্তমানটাই সব। রোজ তিনি নতুন করে বাঁচার চেষ্টা করেন। ডিভোর্স-এর পুরো প্রক্রিয়া আজও তার কাছে অত্যন্ত বেদনাদায়ক। কিন্তু আজ তিনি বিশ্বাস করেন, চাইলেও সবকিছু দীর্ঘদিন স্থায়ী হয় না।

ডিভোর্সের পর তিনি গ্র্যাজুয়েশন কমপ্লিট করেন। টিচিং-এর সঙ্গে সঙ্গে ‘ল’ পড়েন। আত্মবিশ্বাস না হারিয়ে তিনি নিজের সিদ্ধান্তে দৃঢ় থেকেছেন। লোকের সমালোচনা গায়ে মাখেননি। বাচ্চার জন্য নিজের মা-বাবা এমনকী সন্তানের পিতার কাছ থেকেও এতটুকু সাহায্য দাবি করেননি। ওই শিক্ষিকার সব সময় মনে হয়েছে, ওর থেকেও দুঃখী আরও অনেক মানুষ আছেন। নিজের জন্য তো সকলেই বাঁচে, কিন্তু তিনি অপরের জন্য বাঁচতে শিখে গিয়েছেন।

তাই, নিজেকে দুর্বল ভাবা উচিত নয়। আত্মবিশ্বাস থাকলে জীবনে অগ্রসর হওয়ার পথ কেউ আটকাতে পারবে না। কারও কাছে কিছু আশা করা উচিত নয়, কারণ আশাপূরণ না হলে ব্যথা পাওয়া স্বাভাবিক। কঠিন সময়ে সান্ত্বনা বাক্য দিতে লোকের অভাব হবে না। কিন্তু নিজের প্রতি বিশ্বাস রেখে এগিয়ে চলাটাই মঙ্গলদায়ক।

অভিভাবকত্ব

আমাদের চারপাশে এমন অনেক মহিলা আছেন, যারা স্বামী ছাড়াই সন্তানকে বড়ো করেছেন গর্ব করার মতোই। সিনেমা জগতের মানুষদের মধ্যে এমন দৃষ্টান্ত ভুরি ভুরি আমাদের চোখে পড়ে।

আজকাল ঘরে ঘরে ডিভোর্স-এর ঘটনা ঘটতে দেখা যায়। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মহিলারাই সন্তানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন, সসম্মানে এইরকম সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে এসে সন্তান-সহ সংসারের হাল ধরছেন। বহু ক্ষেত্রে এমনও দেখা যায়— স্বামীর অনাদরেপীড়িত শ্বশুর-শাশুড়ির দায়িত্বও একা পুত্রবধূ বহন করতে বদ্ধপরিকর।

নারীর এই দায়িত্ববোধ ও আত্মবিশ্বাস রামায়ণের সময় থেকেই চর্চিত হয়ে আসছে। শ্রীরাম কর্তৃক সীতার বনবাসকালেও স্বাভিমানের বিন্দুমাত্র অভাব সীতার মধ্যে দেখা যায়নি। দুই সন্তান-সহ বনবাসে একলা থেকেছেন এবং শ্রীরামের সাহায্য ছাড়াই সন্তানদের উপযুক্ত করে গড়ে তুলেছেন।

বিশেষত্ব

এক বিজ্ঞাপন এজেন্সির প্রোডাকশন ডিজাইনার মহিলা জানিয়েছেন, ‘আমি অবিবাহিত এবং এখন বয়স ৪৬। বিয়ে না কারাটা সম্পূর্ণ আমার ইচ্ছে এবং ব্যক্তিগত ব্যাপার। সেই পুরোনো সময় থেকে চলে আসা, জোর করে মেয়েদের উপর চাপিয়ে দেওয়া সমাজব্যবস্থায় আমার কোনওরকম ভরসা নেই। আমি এই যুগের মহিলা এবং নিজের ইচ্ছেমতোন বিকল্প আমি খুঁজে নিই। নিজের স্বতন্ত্র জীবন বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা আমার আছে বলে মনে করি। আমি আনন্দে আছি। আর দশটা লোক আমার সম্পর্কে কী বলল, তার আমি পরোয়া করি না।’

এরকম মানসিকতা যাদের আছে, তারা নিজেদের একাকী মনে করে চোখের জল ফেলে সময় কাটান না। বরং, সমাজের ভালোমন্দের প্রতি তারা যথেষ্ট সচেতন। সমাজ থেকে নিজেকে বহির্ভূত না রেখেও, তারা নিজের পছন্দের বিকল্প জীবনশৈলীর আনন্দ গ্রহণ করেন। এরা কিন্তু সকলেই শিক্ষিত, যথেষ্ট বুদ্ধিমতি এবং সংবেদনশীল। একা থাকতে এরা ভালোবাসেন। আগেকার দিনের অবিবাহিত মাসি, পিসিদের থেকে এরা অনেক আলাদা। এই মানুষদের বন্ধুর সংখ্যা প্রচুর। এরা সম্পর্কেও আছেন, কিন্তু অনেকের থেকেই তা আলাদা। এদের কাছে জীবনের অর্থ-ই হল আত্মসম্মান, বিশ্বাস এবং সৃজনশীলতা।

অনেক মহিলাই চান না একাকী সন্তানের পুরো দায়িত্ব বহন করতে। কিন্তু যখন পরিস্থিতি কোনও নারীকে এই দায়িত্ব বহন করতে বাধ্য করে, তখন শত সংঘর্ষের মুখোমুখি হয়েও সর্বশক্তি এবং সাহসিকতার সঙ্গে সন্তানকে মানুষ করতে কোনও দ্বিধা করেন না। তারা।

চ্যালেঞ্জ

আজও অনেকেরই মনে প্রশ্ন জাগে যে, একলা থাকা যারা বেছে নেন, তারা কি পারিবারিক দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার জন্য এই জীবন বেছে নেন? কিন্তু এই জীবনের রাস্তা সহজ নয়। একাকী থাকেন এমন কোনও মহিলাকে জিজ্ঞেস করলেই জানা যাবে, লোকে শুধু দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ারই দোষ দেয় না। পথভ্রষ্ট, জেদি, রহস্যময়ী ইত্যাদি নানা উপাধিতে ভূষিত করতেও পিছপা হয় না। পুরুষকেন্দ্রিক সমাজে একক মহিলাদের নৈতিক ব্যক্তিত্বর উপরেও কলঙ্কের দাগ লাগানো সকলেই সহজ বলেই ধরে নেয়।

৪৯ বছর বয়সি এক মহিলা সাইকোলজিস্ট কথায় কথায় জানিয়েছেন, “একাকী যুবতির জন্য নতুন শহরে গিয়ে বাড়ি খোঁজাটা খুব মুশকিল হয়ে দাঁড়ায় অনেক সময়। নিজের বয়স থেকে শুরু করে খাওয়াদাওয়ার অভ্যাস, চেনাপরিচিত বন্ধুবান্ধবের ঠিকুজি- কোষ্ঠী— সবকিছু তথ্য বাড়ির মালিককে জানাতে হয়। তা সত্ত্বেও অবিশ্বাসের স্ক্রুটিনির মধ্য দিয়ে তাকে যেতে হয়। একাকী যুবতির আচার-আচরণ, তার জীবনশৈলী, বন্ধুবান্ধব, এমনকী দৃষ্টিভঙ্গির উপরেও আঙুল তোলাটা লোকে নিজের অধিকার ভেবে নেয়।”

এটাই মেনে নেওয়া সব থেকে সহজ যে, একক মহিলা মানেই সে বিশৃঙ্খল জীবনযাপন করে। সারাদিন বাইরে বাইরে ঘুরে বেড়ায়, বাজে ছেলেমেয়েদের সঙ্গে মেশে, বাড়িতে রান্না না করে রেস্তোরাঁ থেকে রোজ খাবার আনায়, ইত্যাদি কতরকম লোকে ধরে নেয়। যে-কোনও সামাজিক অনুষ্ঠানে অবিবাহিত যুবতিকে ‘বেচারা’ সম্বোধন করা হয়, তার সংসার হয়নি বলে।

এই শহরের একটি পিআর এজেন্সিতে কর্মরত এক তরুণী জানিয়েছেন, ‘আমি সকলের থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখার জন্য একা থাকি না। কিন্তু এক এক সময় আমার আশপাশে কারোর উপস্থিতি আমি একেবারেই চাই না। বিবাহিত লোকেদের জীবনেও নিশ্চয়ই এরকম পরিস্থিতি কখনও না কখনও আসেই!”

এনজিও-তে কর্মরত এক তরুণী জানিয়েছেন, ‘প্রায়শই আমাকে বিদেশে যেতে হয়। দেশে থাকলে সময় পেলেই মা-বাবার সঙ্গে সময় কাটাই। তবে আমি বেড়াতে ভালোবাসি, আমার পেশা আমাকে সে সুযোগ করে দিয়েছে। এক জায়গায় থেমে থাকা জীবনে আমি বাঁচতে পারব না। তাই, শুধুমাত্র সামাজিক নিয়ম রক্ষার জন্য বিয়ে করার কথা কখনও আমার মাথাতেই আসেনি।’

মার্কেটিং কনসালটেন্ট এক তরুণী জানিয়েছেন, ‘আমি একাকী একটি ফ্ল্যাট নিয়ে থাকি এবং এইরকম জীবনযাপনে আমি খুশি। আমি বিয়ে করিনি, কিন্তু বিবাহিত জীবনের সবরকম সুবিধা এবং অসুবিধা ভালো করে বিবেচনা করে, তবেই আমি একা থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। জীবন থেকে আমার চাহিদা অন্যদের থেকে আলাদা। বিয়ে হয়ে গেলে কেরিয়ার নিয়ে হয়তো মনোযোগী হতে পারতাম না। তবে যেসব মেয়েরা সফল বিবাহিত জীবন কাটাবার আকাঙ্ক্ষা রাখে, আমি কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে নই।’

“বিয়ে না করা মানে সমাজ থেকে সরে যাওয়া নয় কিংবা সমস্ত সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসা নয়। এখন মাতৃত্ব পেতে পুরুষেরও প্রয়োজন নেই’, এমনটাই মানেন ৩৯ বছরের এক মহিলা। যিনি ৮ মাস আগে দেড় বছর বয়সি এক কন্যা সন্তানকে দত্তক নিয়েছেন। মা এবং মেয়ে দু’জনের এই সংসারে যথেষ্ট আনন্দে রয়েছেন। রুপোলি পর্দার সুস্মিতা সেন এই ধরনের মানসিকতার খুবই পরিচিত একটি মুখ।

পরিবর্তন

ধীরে ধীরে সমাজের মানসিকতায় পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এর প্রধান কারণ হল স্ত্রী শিক্ষা এবং সমাজে মেয়েরা যে-জায়গায় নিজেদের পরিচিতি বানাতে সক্ষম হয়েছে। অন্তত বড়ো বড়ো শহরে মেয়েদের একা থাকাটা ‘বাধ্য হয়ে থাকতে হচ্ছে’ বলে ধরে নেওয়া হয় না। এটা সম্পূর্ণ তাদের নিজস্ব ইচ্ছা। এখন অফিস এবং সংসার একসঙ্গে সামলানো সম্ভব নয় ভেবে মেয়েরা বিয়ে করতে অস্বীকার করলে, তাদের অসুবিধাটা সাধারণ মানুষ বুঝতে পারছে। তাদের নিজেদের জীবন নিজের মতো করে কাটাবার সুযোগ দিচ্ছে।

আক্ষেপ নয়

একা যদি কেউ জীবন কাটাতে চান, তার অন্যতম কারণ হল— তিনি নিজের পরিচিতি হারাতে চান না। যেসব মহিলা একা জীবন কাটাবার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তার সংখ্যা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাওয়ার অন্যতম কারণ হল— পরিবার, বন্ধুবান্ধব এবং আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে পুরোপুরি সম্মান, সহযোগিতা এবং ভালোবাসা পাওয়া। তাদের কোনও আক্ষেপ নেই। কখনও তাদের মনেই হয় না তারা একা জীবন কাটাচ্ছেন। তাদের বন্ধু, পরিবারের সদস্যরা সবসময় সাপোর্ট করছেন। এমনকী কোনও উৎসব, অনুষ্ঠানেও সবাই একসঙ্গে এনজয় করছেন।

উপসংহার

একাকী মহিলাদের বর্তমান মানসিকতাই হল, “আমি একা আছি তো কী হয়েছে। আমার এতে কোনও দুঃখ নেই। বিয়ে করাটাই শুধু পরিচয়পত্র হতে পারে না। আমার ইচ্ছা, রুচি, স্বাধীনতা আমার কাছে অনেক বেশি প্রিয় এবং জরুরি।’

শহুরে আবহাওয়া, ফার্স্ট লাইফস্টাইল, পুরোনো ধ্যানধারণায় পরিবর্তন— এসব কিছুই সিংগল উয়োম্যান কনসেপ্ট-কে আরও এগিয়ে নিয়ে এসেছে। মানুষের জীবনশৈলীতে প্রচুর পরিবর্তন হয়েছে। এখন একাকী কোনও নারী বা পুরুষ বাস্তবে একাকী নয়। তারা নিজেদের মধ্যে মেলামেশা করেন, ঘুরতে যান, একে অপরের বাড়িতেও যান নির্দ্বিধায়। এই কারণেও বিয়ে করার বা সংসারধর্ম পালন করার কোনও প্রয়োজন তারা উপলব্ধি করতে পারেন না।

মেজাজ হারাবেন না

বিশ্ব উষ্ণায়ন কোনও নতুন খবর নয় এবং এখন এই সমস্যা প্রায় অনিবার্য। আর এই উষ্ণতার কুপ্রভাব প্রতিদিন আমরা টের পাচ্ছি। বাড়ছে রক্তচাপ, তাই অস্থিরতাও বাড়ছে গভীর ভাবে। বিরক্তি এবং ক্লান্তির পাশাপাশি, অনেকে মানসিক অবসাদেরও শিকার হচ্ছেন। এই জলবায়ুগত বিষণ্ণতা যেন চিরসঙ্গী হয়ে উঠছে। কিন্তু পরিস্থিতি যাইহোক, মেজাজ হারালে চলবে না। সমস্যার সমাধানের পথ খুঁজে বের করে বাঁচার চেষ্টা করতে হবে স্বাভাবিক ভাবে।

এখন প্রশ্ন উঠতেই পারে, এই অস্থিরতা দূর করা কি সহজ? মানসিক চাপ বেড়ে গেলে মেজাজ ধরে রাখা কি সম্ভব? সম্ভব। কারণ, বাঁচার জন্য সমস্যার সমাধানের পথ নিজেকেই বের করতে হবে। খারাপ পরিস্থিতির দ্বারা নিজেকে প্রভাবিত হতে দেওয়া চলবে না। কিন্তু কখন বুঝবেন যে, আবহাওয়া কিংবা জলবায়ু পরিবর্তনের কুপ্রভাব আপনার স্বাস্থ্য-সমস্যা তৈরি করেছে? এর জন্য আপনাকে প্রথমে বুঝতে হবে ‘জলবায়ু বিষণ্ণতা’-র বিষয়টি। এই বিষয়ে বিস্তারিত জানিয়ে, সুপরামর্শ দিয়েছেন ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট দেবদীপ রায় চৌধুরী।

আসলে, ‘জলবায়ু বিষণ্ণতা’ হল বিশ্রী আবহাওয়ার কারণে উদ্ভূত মানসিক চাপ। যেমন— ভারী বৃষ্টিপাত রাস্তাঘাট জলাবদ্ধ করে, যার ফলে ওই জমা জলে তৈরি হয় পোকামাকড় এবং জীবাণু। ঠিক তেমনই বন্যা, গুমোট গরম প্রভৃতি আমাদের মনে একপ্রকার হতাশা অথবা বিষণ্ণতা তৈরি করে। অর্থাৎ,

O নির্দিষ্ট কোনও কারণ ছাড়াই হতাশা বোধ করা

O ভবিষ্যৎ আরও খারাপ হবে ভেবে ক্রমাগত উদ্বেগ

O আত্মবিশ্বাস কমে যাওয়া

O বিশ্রাম নেওয়ার পরেও ক্লান্তিবোধ করা

O একসময় উপভোগ করা বিষয়গুলিতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলা, ইত্যাদি।

জলবায়ু এবং স্বাস্থ্যের মধ্যে লুকানো যোগসূত্র

অনেকেই হয়তো জানেন যে, জলবায়ু পরিবর্তন আমাদের জল এবং খাদ্যের গুণমানের উপর কুপ্রভাব ফেলে এবং সেই কারণে আমাদের স্বাস্থ্যহানি ঘটে। আর স্বাস্থ্যহানি ঘটলেই আমাদের মন-মস্তিষ্কও দূষিত হয়। যার ফলে, আমাদের চিন্তাভাবনা ঘেঁটে যায়, সংবেদনশীলতা কমে যায় এবং পরিশেষে আমরা মেজাজ হারাতে থাকি।

বিষণ্ণতা বিভিন্ন কারণ এবং কুফল

গুমোট গরম: গ্রীষ্মকালে দীর্ঘস্থায়ী উচ্চ তাপমাত্রা-র কারণে স্বাভাবিক বিদ্যুৎ সরবরাহে সমস্যা হয় এবং এই বিদ্যুৎ-বিভ্রাটের কারণে ঘুম কম হয়। আর ঘুম কম হলেই মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায় এবং উদ্বেগ অস্থিরতাও বেড়ে যায়।

অতি বৃষ্টি: অপ্রত্যাশিত দীর্ঘস্থায়ী ভারী বর্ষণের ফলে ক্ষেতের ফসলের যেমন ক্ষতি হয়, ঠিক তেমনই ওই ফসলে জন্মানো ব্যাক্টেরিয়া খাদ্যের মাধ্যমে আমাদের শরীরে গিয়ে স্বাস্থ্যহানি ঘটায়।

বায়ু দূষণ: বায়ুর মান খারাপ হওয়ার কারণে স্বাভাবিক ভাবে শ্বাস নিতে কষ্ট হয় এবং দীর্ঘদিন এই সমস্যা হলে শরীরে নানারকম অস্বস্তি হতে পারে এবং রোগ বাসা বাঁধতে পারে।

দুর্যোগের প্রভাব: গত কয়েক বছরে ভারতের বেশ কয়েকটি শহর ভয়াবহ বন্যা এবং ঘূর্ণিঝড়ের সম্মুখীন হয়েছে। ওড়িশা, কেরল এবং মুম্বইয়ের কথা সহজেই মনে পড়ে। আর বন্যা, ঘূর্ণিঝড় কিংবা খরা-র কারণে যেমন আমাদের সম্পদ নষ্ট হয়, আর্থিক ক্ষতি হয়, ঠিক তেমনই প্রাণহানি ঘটে। বন্যার কারণে পুকুর এবং নদীর জল দূষিত হলে মাছের শরীরেও জীবাণু বাসা বাঁধে এবং ওই মাছ খেয়ে আমাদের শরীরও অসুস্থ হতে পারে। এমন আরও নানারকম কারণে আমাদের স্বাভাবিক ছন্দে বেঁচে থাকা ব্যহত হয়। আর এর কুপ্রভাব পড়ে আমাদের শরীর ও মনে।

আসলে প্রাকৃতিক বিপর্যয় ছাড়াও, সবুজ ধ্বংস হওয়া, কংক্রিটের জঙ্গল প্রভৃতির কুপ্রভাবে আমাদের মন-মানসিকতারও পরিবর্তন ঘটছে। যার ফলেও তৈরি হচ্ছে একরকম বিষণ্ণতা।

সমস্যামুক্ত হওয়ার উপায়

আমরা হয়তো আবহাওয়া নিয়ন্ত্রণ করতে পারব না। কিন্তু সমস্যা সমাধানের পথ খুঁজতে পারি। নিতে পারি শরীর ও মনের যত্ন। রাখতে পারি ইতিবাচক মানসিকতা। মনে রাখতে হবে, দুঃখ, ভয়, রাগ— এইসব খুব সাধারণ আবেগগত বিষয়। আবহাওয়ার খারাপ পরিস্থিতি-র কারণে এইসব সমস্যা তৈরি হতে পারে। কিন্তু এগুলিকে নিয়ন্ত্রণে রাখার কৌশল রপ্ত করতেই হবে।

কিছুটা সময় বের করে সকাল- -বিকেল পার্ক কিংবা যানবাহন-মুক্ত শাখা-রাস্তায় হাঁটুন। হালকা ব্যায়াম করুন। নিজেকে ব্যস্ত রাখুন নানারকম কাজে। আপনজনের সঙ্গে সমস্যা এবং দুঃখ-অনুভূতিগুলো ভাগ করে নিন প্রয়োজনে। মাঝেমধ্যে বেড়াতে যান কোথাও। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে হৃদয়ের নিবিড় সংযোগ স্থাপন করার চেষ্টা করুন। মোবাইল এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় বেশি সময় ব্যয় না করে, আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে আড্ডা দিন যতটা সম্ভব। আর স্বাস্থ্যকর খাবার খান এবং ইতিবাচক মানসিকতা রাখুন।

মন খারাপ লাগলে যেভাবেই হোক ব্যস্ত রাখুন নিজেকে। ওই সময় কোনও শুভাকাঙ্খীর সঙ্গে মন খুলে কথা বলুন দূরভাষে কিংবা মুখোমুখি হয়ে। আর কোনও কাজ না থাকলে বাগান পরিচর্যা করুন কিংবা রান্না করুন। লেখার অভ্যাস থাকলে আপনার আবেগ-অনুভূতিগুলো লিখে রাখুন খাতায় কিংবা কম্পিউটার- এ। আর যখন অন্য কিছু কাজ করার ইচ্ছে করবে না, তখন ধ্যান করে নিজের অস্থিরতা কাটান এবং ব্যক্তিত্বে বদল আনার চেষ্টা করুন।

ভেবে নিন, সমস্যা জোয়ারের মতো আসে, আবার কিছু সময় পর ভাঁটার মতো ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। তাই, খারাপ সময় কাটানোর জন্য অপেক্ষা করতেই হবে দৃঢ় ভাবে। কিছু ভালো শখ-আহ্লাদ থাকলে তা পূরণ করার চেষ্টা করুন অস্থির সময় থেকে বেরিয়ে আসার জন্য। কিন্তু বিষণ্ণতা কাটানোর জন্য কোনও ভাবেই ধূমপান কিংবা মদ্যপানকে মাধ্যম করবেন না।

নবজাতকের যত্ন নেবেন কীভাবে?

সন্তান আপনার। তাই, তাকে সুস্থ রাখার দায়িত্বও নিতে হবে আপনাকেই। নবজাতকের স্বাস্থ্য-সুরক্ষার জন্য উপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে হবে শুরু থেকেই। মেনে চলতে হবে স্বাস্থ্যবিধি। কারণ, খালি চোখে দেখা যায় না এমন রোগজীবাণু ছড়িয়ে রয়েছে চারিদিকে। একটু অসতর্ক থাকলে যা বাসা বাঁধতে পারে ছোট্ট শিশুর শরীরে। অতএব, আপনার ছোট্ট শিশুটি যাতে সর্বদা জীবাণুমুক্ত থাকে, তার জন্য আপনাকে উপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে হবে।

হাত ধুয়ে বাচ্চাকে কোলে নিন

নবজাতকদের ইমিউন সিস্টেম খুব স্ট্রং হয় না, তাই সংক্রমণের ভয় থাকে সব সময়। সুতরাং বাচ্চাকে স্পর্শ করার আগে ভালো করে হাত ধুয়ে নিন অথবা হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহার করুন। সেইসঙ্গে, অপরিষ্কার হাতে বাচ্চাকে ধরতে কাউকেই অনুমতি দেবেন না।

মাথা এবং ঘাড়ে সাপোর্ট দিন

যখনই বাচ্চাকে কোলে নেবেন, ঘাড়ে এবং মাথার নীচে হাত রাখুন যাতে ঘাড় এবং মাথার পিছনে সাপোর্ট থাকে। বাচ্চাকে শোয়াবার সময়ও একই নিয়ম মেনে চলুন। বাচ্চাকে নিয়ে বাড়ির বাইরে ট্রাভেল করলে খেয়াল রাখতে হবে, যাতে যাত্রাপথ খুব রাফ বা বাউন্সি না হয়।

বেশি নাড়াচাড়া নয়

অনেক সময় বাচ্চা কাঁদতে থাকলে, বাচ্চাকে হাসাবার জন্য কিংবা নিছকই খেলার ছলে বাচ্চাকে শূন্যে ছুঁড়ে আবার ধরে নেন অনেকে। কিন্তু বাচ্চাকে অতিরিক্ত ঝাঁকানো একেবারেই অনুচিত। এতে শিশুর মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে। বাচ্চাকে ঘুম থেকে তুলতে তাকে ঝাঁকাবার দরকার নেই বরং পায়ের তলায় সুড়সুড়ি দিন বা গালে আঙুল দিয়ে আলতো করে টোকা দিন।

পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখুন

বাচ্চাকে নিয়ে বাড়ি ফিরে সিদ্ধান্ত নেওয়া দরকার যে, ডায়াপার ব্যবহার করবেন নাকি কাপড়ের ন্যাপি। যাই ব্যবহার করুন না কেন, দিনে অন্তত দশবার ন্যাপি বদলাবার দরকার পড়ে। সুতরাং মজুত রাখা দরকার পরিষ্কার ডায়াপার। কাপড় ব্যবহার করলে ডায়াপার পিনস, ডায়াপার ক্রিম এবং একটি পাত্রে হালকা গরমজল এবং মোছার নরম সুতির পরিষ্কার কাপড় এবং তুলো রাখা দরকার।

বাচ্চাদের প্রায়ই ডায়াপার র‍্যাশ হতে দেখা যায়। সেই ক্ষেত্রে হালকা গরমজলে বাচ্চাকে পরিষ্কার করে ভালো করে সেখানে ক্রিম লাগিয়ে রাখতে হবে এবং ডায়াপার ছাড়া বাচ্চাকে কিছুটা সময় রাখতে হবে।

৩ দিনের মধ্যে র‍্যাশ না সারলে, চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে, কারণ ফাংগাল সংক্রমণের কারণেও এমনটা হতে পারে।

স্নানের নিয়ম

নবজাতককে স্পঞ্জ বাথ দেওয়া বাঞ্ছনীয়, যতদিন না আমবিলিকাল কর্ডটা পড়ে যায় এবং নাভি সম্পূর্ণ শুকিয়ে যায়। সপ্তাহে ৩ থেকে ৪ বার বাচ্চাকে স্নান করালেই যথেষ্ট, কারণ বাবাবার স্নান করালে বাচ্চার ত্বক ড্রাই হয়ে যায়। বাকি দিনে স্পঞ্জ বাথ দিন বাচ্চাকে।

খাওয়ানো এবং ঢেঁকুর তোলানো

সাধারণত খিদে পেলে তবেই খাওয়ানো উচিত বাচ্চাকে। খিদে পেলে বাচ্চা নয় কাঁদবে কিংবা মুখে হাত ঢুকিয়ে আঙুল চুষতে থাকবে। বাচ্চাকে ফিডিং করাবার সময় অনেকবার হাওয়া গিলে নেয় বাচ্চা, ফলে পেটে ব্যথা হয় এবং বাচ্চা কাঁদতে থাকে। এই সমস্যা যাতে না হয়, তার জন্য মাঝেমধ্যেই খাওয়াবার মাঝে বাচ্চাকে পিঠের উপর ফেলে ঢেঁকুর তোলানো খুব জরুরি।

ঘুমের অভ্যাস

নবজাতক সাধারণত ১৬ ঘণ্টা বা তার বেশি ঘুমোয়। কিন্তু টানা এক ভাবে নয়। ২ থেকে ৪ ঘণ্টা টানা ঘুমোয় বাচ্চা। ৪ ঘণ্টার মধ্যে বাচ্চা ঘুম থেকে না উঠলে, বাচ্চাকে ঘুম থেকে তুলে ফিড করানো দরকার। বাচ্চারা নিজেরাই একটা ঘুমের প্যাটার্ন তৈরি করে নেয়। সাধারণত ৩ মাস বয়স থেকে বাচ্চা ৬ থেকে ৮ ঘণ্টা টানা ঘুমোয়। যদি সেটা নাও হয়, ভয় পাওয়ার কোনও দরকার নেই। যদি দেখেন বাচ্চার ওজন বাড়ছে এবং দেখে মনে হয় সুস্থ, তাহলে ৩ মাস বয়সে পুরো রাত না ঘুমোলেও চিন্তার কোনও কারণ নেই।

সব মিলিয়ে নবজাতকের দেখাশোনার জন্য মা-বাবা এবং বিশেষ করে মা-কে সবসময় সজাগ থাকতে হয়। ধীরে ধীরে স্বাভাবিক নিয়মেই শিশু বড়ো হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পারিপার্শ্বিক পরিবেশের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে শিখতে থাকে এবং তার জীবনযাত্রা ছন্দে ফিরতে আরম্ভ করে। কিন্তু তার আগে পর্যন্ত শিশুকে সাবধানে রাখা মা-বাবার কর্তব্য।

শিশুর সঙ্গে বন্ডিং

নবজাতকের যত্নে, মা-বাবার সঙ্গে বন্ডিং হওয়াটা খুব জরুরি। বাচ্চার সঙ্গে ফিজিক্যাল ক্লোজনেস, ইমোশনাল কানেকশন বাড়ায়। বাবা-মায়ের সঙ্গে অ্যাটাচমেন্ট, বাচ্চার ইমোশনাল গ্রোথ হতে সাহায্য করে এবং শারীরিক ডেভেলপমেন্ট হতেও সাহায্য করে। বন্ডিং-এর শুরু হয় বাচ্চাকে যেই নিজের কোলে নিচ্ছেন এবং ধীরে ধীরে তার সারা গায়ে হাত বুলোচ্ছেন। ব্রেস্ট ফিড করাবার সময়ও মা ও সন্তানের ত্বকের সংস্পর্শে বাচ্চা এবং মা উভয়ের মনেই আনকন্ডিশনাল ভালোবাসার বন্ধন তৈরি হয়। বাচ্চারা গলার স্বর শুনতে ভালোবাসে, সুতরাং বাচ্চার সঙ্গে মাঝেমধ্যে কথা বলুন, গান শোনান।

সামগ্রিক যত্ন

মানব শরীরের অঙ্গগুলির মধ্যে সবথেকে বেশি ব্যবহৃত হয় হাত। এই হাত প্রতি মুহূর্তে অন্যান্য উপাদানের সংস্পর্শে আসে এবং ওইসব উপাদানে থাকা জীবাণু আশ্রয় নেয় হাতে। তাই, নবজাতককে কোলে নেওয়ার আগে কিংবা খাওয়ানোর আগে, নিজের হাত সাবান দিয়ে ভালো ভাবে ধুয়ে নেওয়া প্রয়োজন। বাইরে থাকলে স্যানিটাইজার হাতে নিয়ে তারপর বাচ্চাকে খাওয়ান।

শিশুর হাইজিন মেনটেইন করতে হলে বাড়ির অন্যান্য সদস্যদেরও জীবাণুমুক্ত থাকতে হবে। অর্থাৎ, বাইরে থেকে ঘেমো গায়ে বাড়িতে ঢুকেই শিশুকে কোলে তুলে নেবেন না। এতে আপনার দ্বারা বাহিত জীবাণু শিশুর শরীরেও সংক্রমিত হতে পারে। তাই বাইরে থেকে বাড়ি ঢুকে, প্রথম নিজে মেডিকেটেড লিকুইড সোপ দিয়ে হাত ধুয়ে এবং সম্ভব হলে সম্পূর্ণ স্নান সেরে তবেই সন্তানকে কোলে তুলুন। এই অভ্যাস আপনার এবং আপনার সন্তান উভয়ের পক্ষেই লাভজনক হবে।

এছাড়া, মাঝেমধ্যে ছোট্ট শিশুকেও বেবি সোপ দিয়ে সম্পূর্ণ স্নান করিয়ে দিন। ব্র্যান্ডেড বেবি সোপ শিশুর চোখে গেলেও, জ্বালা কিংবা ক্ষতি করবে না। অবশ্য শিশুকে শুধু হ্যান্ডওয়াশ কিংবা বডিওয়াশ-ই নয়, শিশু যাতে ময়লা কিংবা ক্ষতিকারক কোনও উপাদান হাত দিয়ে না ধরে কিংবা মুখে না তুলে নেয়, এ বিষয়েও মা-বাবাকেই সতর্ক থাকতে হবে। কারণ, শিশুর সুস্থতার জন্য এই সতর্কতা ভীষণ জরুরি।

এছাড়া, বাচ্চারা মল-মূত্র ত্যাগ করার পর, জলে সামান্য জীবাণুনাশক তরল ফেলে বাচ্চার রেচনাঙ্গ ধুয়ে দেওয়া উচিত। এ প্রসঙ্গে আরও একটি বিষয় মনে রাখতে হবে যে, শুধু বাহ্যিক নয়, শিশু যেন সম্পূর্ণ (অভ্যন্তরীণ) সুস্থ থাকে। আর এই সম্পূর্ণ সুস্থতার জন্য শিশুকে উপযুক্ত পরিমাণে শুদ্ধ জলও খাওয়াতে হবে। কারণ, মূত্রের মাধ্যমে শরীরের অনেক বর্জ্য এবং রোগজীবাণু বাইরে বেরিয়ে যায়।

শিশুদের স্নান করানোর জন্য ব্যবহৃত জলে সামান্য গরমজল মিশিয়ে নিলেও ভালো। এতে চট করে যেমন ঠান্ডা লাগবে না, ঠিক তেমনই স্নানের জন্য ব্যবহৃত জলকেও জীবাণুমুক্ত রাখা যাবে। কখনও যদি শিশু বৃষ্টিতে ভিজে যায়, তাহলে সঙ্গে সঙ্গে হালকা গরমজলে তোয়ালে ভিজিয়ে শিশুর গা মুছে দিন। এতে বৃষ্টির জলের সঙ্গে মিশে থাকা জীবাণু সংক্রমিত হবে না শিশুর শরীরে।

রাতে যদি বাচ্চাদের ন্যাপি পরিয়ে রাখেন, তাহলে মল-মূত্র ত্যাগ না করলেও ন্যাপি বদলে ফেলুন। কারণ, দীর্ঘ সময় হাওয়া না ঢুকলে ন্যাপিতে জীবাণু সংক্রমণ হতে পারে। বাচ্চার জন্য ব্যবহৃত বিছানা এবং জামাকাপড় সাবান দিয়ে ভালো ভাবে কেচে ধুয়ে কড়া রোদে শুকিয়ে নিন। এতে বিছানা এবং জামাকাপড়ে জীবাণু বাসা বাঁধতে পারবে না। যে-বোতলে বাচ্চাকে দুধ খাওয়ান, সেই বোতল প্রতিদিন অন্তত কুড়ি মিনিট গরমজলে ফুটিয়ে নিন। কারণ, ঠান্ডা জলে দুধের বোতল ধুলে, তা পুরোপুরি জীবাণুমুক্ত হয় না। এভাবেই হাইজিন মেনে চললে আপনার বাচ্চা শারীরিক ভাবে সুস্থ থাকবে এবং দীর্ঘজীবন লাভ করবে।

স্থানীয় সংবাদ (শেষ পর্ব)

যোগীর প্রতি মালিকের হৃদয়হীন মন্তব্যে সোনা আহত হয়। মনে মনে ভাবে একগাল বাসি থুতু মালিকের মুখে ছিটিয়ে দিতে পারলে বোধহয় প্রতিশোধ নেওয়ার আকাঙ্ক্ষা কিছুটা মিটত। ইচ্ছেটা চরিতার্থ করতে না পেরে সে গুমরে মরে। সতীর্থ হওয়ার কারণে যোগীর মৃত্যুর খবরটা মালিকের কানে পৌঁছে দেওয়াটাই ছিল তার জীবনের অন্যতম নৈতিক কর্তব্য। সোনা তৎক্ষণাৎ স্থান ত্যাগ করতে উদ্যত হয়।

মালিক সেই মুহূর্তে সুবর্ণ গোলকের ন্যায় একটি আশাতীত প্রস্তাব ছুঁড়ে দেয়— বোল তু কাম করেগা?

বলাবাহুল্য সোনার কাছে চির আকাঙ্ক্ষিত এবং লোভনীয় এক সুযোগ। সোনার কাছে তখন উভয় সংকট। মালিকের মুখ নিঃসৃত কথাটা শোনামাত্র অন্তরটা চকিতে দ্বিখণ্ডিত হয়ে গিয়েছিল। সোনা ভাবে যোগীর পরিত্যক্ত স্থানে আসীন হলে যোগীর বিদেহী আত্মা যদি কোনও ভাবে দুঃখ পায়? আবার ভাবে মাসান্তে ওই পাঁচশো টাকাই বা কম কীসের? যোগীকে সে এই কারণেই এককালে হিংসে করত। আজ মালিকের অযাচিত প্রস্তাবে সম্মতি জানানোই হবে সবদিক থেকে বুদ্ধিমানের পরিচয়। কিন্তু বিবেক সায় দিচ্ছিল না।

মালিকের প্রস্তাবে স্বীকৃতি জানালে যোগীর প্রতি তার যে অন্যায় অবিচার করা হবে। সোনা মাথা হেঁট করে দাঁড়িয়ে থাকে কিছুক্ষণ। অবশেষে অনেক ভেবেচিন্তে চোখে চোখ রেখে দৃঢ় আত্মপ্রত্যয়ের সঙ্গে জবাবদিহি করে— নেহি বাবুজী। মেরে সে ইয়ে কাম নেহি হো পায়গা।

সোনার এই অস্বাভাবিক আচরণে মালিক অতিশয় ক্ষুব্ধ হয়। তুচ্ছজ্ঞানে অস্বীকার করায় মালিক অতিশয় কুপিত হয়ে ওঠে। অবাধ্যতার কারণে মুহূর্তে তার চুলের মুঠি ঝাঁকিয়ে নিতম্বে সজোরে এক লাথি মেরে বলে— শালা শূয়ার কা বাচ্চা, ভাগ ইঁহাসে।

এত লাঞ্ছনা ও অপমান সত্ত্বেও সোনার চোখে জল আসে না। শোকে-দুঃখে চোখের জল যেন সব জমাট বেঁধে গিয়েছিল। অসহায় সোনা লাথি খেয়ে দোকানের বারান্দা ছেড়ে এক সময় রাস্তায় এসে দাঁড়ায়।

প্রতিদিনের মতো সেদিন বিকেলেও সোনা কাগজ বিক্রি করতে আসে। আসে বাধ্য হয়ে, বাড়িতে থাকতে ভালো লাগে না বলে। কিন্তু চৌরাস্তায় এসে সব ফাঁকা মনে হয়। প্রতিদ্বন্দ্বীহীন প্রতিযোগীহীন নিষ্কণ্টক কর্মভূমি, তবু নিজেকে বড়ো একাকী এবং অসহায় মনে হয়। দৃষ্টির সীমারেখায় যাবতীয় সবকিছুই আগের মতো বর্তমান, নেই শুধু তার প্রাণসখা যোগী। সোনার সমস্ত সত্তা জুড়ে তখন কেবল যোগীর উপস্থিতি। অন্যদিনের মতো ছোটাছুটি করে কাগজ বিক্রি করতে সেদিন তার মোটেও ভালো লাগছিল না। সব কীরকম অন্তঃসারশূন্য বলে মনে হচ্ছিল।

খোলা রাস্তা কাগজ বিক্রি করার অফুরন্ত অবকাশ। তবু দু’পায়ে উঠে দাঁড়ানোর শক্তিটুকু পর্যন্ত তার আয়ত্তে ছিল না। জীবনযুদ্ধে হার-জিত, জয়-পরাজয় সব যেন তুচ্ছ মনে হচ্ছিল। যোগীর কথা মনে পড়লে নিজের অজান্তে চোখ দুটো নিমেষে ঝাপসা হয়ে যাচ্ছিল। দু’চোখের কোণ বেয়ে অবিরাম ধারায় নেমে আসছিল অশ্রুধারা। মনে পড়ছিল যোগীর বলা সকরুণ আকুতি — আমি মরলে তুই কাঁদবি তো? সোনা ভাবে ও কি আমাকে কাঁদাবে বলেই এত শীঘ্র মৃত্যুবরণ করল? সত্যি-মিথ্যা যাচাই করবে বলে? ওর মৃত্যু সম্পর্কে ও কি আগাম কিছু জানতে পেরেছিল?

যোগীর কথা ভাবতে ভাবতে সে বিভোর হয়ে গিয়েছিল, অনুতাপের আগুনে পুড়ে মরছিল। যোগী বেঁচে থাকতে তার উপর সে অনেক অন্যায় অপরাধ করেছিল। কিন্তু এখন শুধুই স্মৃতিচারণ। যোগীর কাছে সে ক্ষমাপ্রার্থী। বিষাদগ্রস্ত মনে সে সিমেন্ট বাঁধানো ফুটপাথের উপর বসেছিল এক মনে। হাতে রাখা ছিল পুরোনো একটি খবরের কাগজ। সেটা বিক্রির জন্যে নয়। ছবি সহ যোগীর শেষ স্মৃতিচিহ্ন। রাস্তার পান দোকানওয়ালা ওর হাতে ধরিয়ে দিয়েছিল কাগজখানা।

অফিস থেকে বাড়ি ফেরার পথে তাম্বুল রসে কণ্ঠনালি সিক্ত করার অছিলায় উক্ত পান দোকানের সামনে দাঁড়াতেই ছেলেটির সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় হয়। বাঙালি মাত্রই ভাবুক হয় তা অস্বীকার করার উপায় নেই। সোনা নামের সেই হতভাগ্য ছেলেটিই সেদিন আমাকে ওর ব্যাপারে গল্প লিখতে উদ্বুদ্ধ করেছিল। পড়ন্ত বিকেলে ফুটপাথে পড়ে থাকা ছেলেটিকে কী মনে করে আমার দিকে এগিয়ে আসতে দেখে প্রথমে ভেবেছিলাম হয়তো ভিক্ষে চাইতে আসছে। পরে অবশ্য আমার সেই ভুল ভেঙেছিল, বুঝেছিলাম সেইসব কিছু নয়। ওর হাতে ধরা সেদিনের কাগজখানা আমার চোখের সামনে মেলে সকরুণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে কম্পিত স্বরে অনুরোধ করেছিল এই বলে— বাবু, এতে কী লেখা আছে আমারে একবার পইড়া শুনাবেন?

পরের দুঃখে ব্যথা পাওয়ার মতো সংবেদনশীল হৃদয় ঈশ্বর যে আমাকে দেননি তা বলাই বাহুল্য। কিন্তু সেদিন বন্ধুর বিরহে বিরহী সোনার স্বমুখে ওর দুঃখের কথা শুনে আমি যারপরনাই কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েছিলাম। উপেক্ষা করতে পারিনি। ভীষণ অবাক হয়ে গিয়েছিলাম ওর কথা শুনে। দাঁত দিয়ে চুন কেটে ওর দিকে অবাক বিস্ময়ভরা দৃষ্টিতে তাকিয়েছিলাম কিছুক্ষণ। সুদূর দিল্লি শহরে একটি পান দোকানের সামনে ঢিলে-ঢালা জামা-প্যান্ট পরিহিত অজ্ঞাত কুলশীল একটি নাবালক ছেলের মুখে বাংলা মিশ্রিত হিন্দি কথা শুনে ওকে উপেক্ষা করি সেই সাধ্য আমার ছিল না। আদ্যোপান্ত খবরটা পড়ে ওকে বাংলায় বুঝিয়ে দিয়েছিলাম।

আমাকে বাঙালি জেনে ও তারপর ভাবাবেগে হাউ হাউ করে কেঁদে ফেলেছিল। ওকে কীভাবে সান্ত্বনা দেব ভেবে পাচ্ছিলাম না। ছেলেটি সেদিন কাগজ বিক্রি করতে পারেনি বলে মনে ভীষণ দুঃখ পেয়েছিলাম। পকেট থেকে বের করে কয়েকটা টাকা ওর হাতের মুঠোয় গুঁজে দিয়ে শুধু বলেছিলাম— একটা কথা মনে রেখো, যার যত শীঘ্র মৃত্যু হয় জানবে ঈশ্বরের সে ততই প্রিয়! তুমি কেঁদো না বা দুঃখ কোরো না। ও মুক্তি পেয়ে গিয়েছে! ও যেখানে গিয়েছে একদিন আমাদের সকলকেই যেতে হবে। সবাই যাওয়ার জন্যই আসে। কেউ আগে কেউ পরে, এই যা তফাৎ। তুমি এখন বাড়ি যাও।

একমুখ পানের পিক রাস্তার উপর ফেলে শেষে আমিই একসময় রওনা হয়েছিলাম নিজ গন্তব্যের দিকে। ওকে দেখলাম নিঃসাড় নিস্তেজ হতবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ও আগের মতোই অশ্রু বিসর্জন করে চলেছে। দুই গাল বেয়ে নেমে আসছিল সরু একটি জলের ধারা। দূরত্বের সঙ্গে সঙ্গে আলো-আঁধারের গোলকধাঁধায় ছেলেটি একসময় সত্যি সত্যি অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল।

আমি ছিলাম ওই পান দোকানের স্থায়ী ক্রেতা। আইটিও-তে আমার অফিস। ওই পথে আমার রোজ যাতায়াত। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় সেদিনের পরে ছেলেটিকে আর কখনও কোথাও দেখা যায়নি। এই বিশাল বিপুল মায়াঘেরা পৃথিবীর রঙ্গমঞ্চে সে যে কোথায় অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল কে জানে!

স্থানীয় সংবাদ (পর্ব-০৩)

সারা রাত জেগে মশার কামড় খেয়ে যোগী একটি দোকান পাহারা দেয়। কিছুদিন আগে পর্যন্ত এই দায়িত্ব ছিল ওর বাবার উপর। পরস্ত্রী আসক্ত যোগীর বাবা সংসার ধর্ম ত্যাগ করে বস্তির এক মহিলাকে সঙ্গে নিয়ে নিরুদ্দেশ হওয়ায় অধুনা সেই কাজের গুরুভার এখন যোগীর উপর ন্যস্ত। কাজটা সহজলভ্য ছিল না মোটেই। যোগী বয়সে ছোটো বলে কাজটা প্রায় হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। সেই কারণে অনেক কাঠ খড় পোড়াতে হয়েছে কাজটা হাতে পাওয়ার জন্যে। মায়ের কান্নায় শেষ পর্যন্ত মালিককে রাজি হতে হয়েছিল। ওদের সংসারে যোগীই একমাত্র কর্ণধার সংসারটা বাঁচিয়ে রাখার পক্ষে। সুতরাং যোগীর দায়িত্ব তূলনামূলক ভাবে ছিল অন্যান্যদের চেয়ে অনেক বেশি। যোগী ঘুমালে ওদের সংসার চলবে কী করে?

মালিকের দোকান বস্তিপাড়ার অদূরে। তিনি থাকেন অন্যত্র। এই তল্লাটে সবগুলো দোকানের তুলনায় তাঁর দোকানটাই সবচেয়ে জনপ্রিয়। সেই কারণে একটি পাহারাদার তাঁর বিশেষ প্রয়োজন। কম খরচে বিশ্বস্ত একটি লোক। অন্তত কেউ চুরি করতে এলে সে না পারুক চিৎকার চেঁচামেচি করে আশেপাশের লোকজনদের যেন সচকিত করে তুলতে পারে।

রাতের অন্ধকারে কাঁথামুড়ি দিয়ে শুয়ে থাকলেও সহজে ঘুম আসতে চায় না। সোনা মনে মনে তীব্র আক্রোশে মরমে জ্বলে মরে। কেবলই ভাবে যোগীর কাজটা যদি তার কপালে লাগত তাহলে মনে কোনও ক্ষোভ থাকত না। দিব্বি রসে-বশে সে দিনাতিপাত করতে পারত! মাসের শেষে পাঁচশো টাকাই বা কম কীসের? যত তুচ্ছই হোক, তবু বুক চিতিয়ে বলা যেত সে রোজগার করে বা চাকরি করে। ওই একটা ব্যাপারেই সোনার যত হিংসে যোগীর উপরে।

অন্যদিকে রাতের অন্ধকারে যোগী পাহারায় বসে নিজের দুর্ভাগ্যের কথা ভাবতে থাকে। মনে মনে ভাবে সত্যি বাপটা কী স্বার্থপর ও অপদার্থ! কারও কথা একবারও চিন্তা করল না? তার অবর্তমানে কীভাবে সংসারটা চলবে, কীভাবে দিন কাটবে কোনও কিছুর তোয়াক্কা পর্যন্ত করল না। অথচ সোনার বাপটা সংসারের জন্যে কী পরিমাণ প্রাণপাত করে! সংসারটা চালানোর জন্যে সে নিজের কথা বোধহয় কখনও ভাবেও না।

সারাদিন নিরলস পরিশ্রম করে ঠোঙা তৈরি করে। তারপর যায় পায়ে হেঁটে বাজারে বিক্রি করতে। তারই ফাঁকে সোনার মায়ের সাথে বসে বড়ি, পাপড় আর আচার তৈরি করে। খাটিয়া বাঁধতে জানে। দিন মজুরির সন্ধানে এদিক-সেদিক ঘুরে বেড়ায়। দিনের শেষে ক্লান্ত শরীরে যখন বাড়ি ফেরে, তখনও মুখে থাকে একরাশ নির্মল হাসি।

নিজের হাতে আনাজ কিনে আনে। তারপরে একসাথে বসে সকলে মিলে নৈশভোজন করে। যোগীর মতো সোনাকে রাতের পর রাত জাগতে হয় না। মশার কামড় খেয়ে দোকান পাহারা দিতে হয় না। নিশ্চিন্ত মনে ঘুমাতে পারে আগামীদিনের নতুন স্বপ্ন নিয়ে। গরিবের ঘরেও যে সুখ বিরাজ করে এটা তারই প্রকৃষ্ট উদাহরণ।

যদিও এক অখ্যাত দিনে সমস্ত চিন্তা ভাবনার অবসান ঘটে। তখনও আর মাত্র কয়েকটা কাগজ বিক্রি করার বাকি ছিল। সেদিন কাগজ বিক্রির ব্যস্ততায় কখন যে লাল বাতির পরিবর্তে সবুজ বাতি জ্বলে উঠেছিল যোগী তা খেয়াল করতে পারেনি। সেদিন কেন যেন সকলেই কাগজ কেনার জন্যে হাত বাড়িয়ে দিচ্ছিল। সেদিনের সান্ধ্য কাগজে হয়তো বিশেষ কোনও উত্তেজনাপূর্ণ বা রোমাঞ্চকর খবর ছাপা হয়েছিল, যার দরুন ছিল মানুষের অপ্রত্যাশিত চাহিদা৷ সেদিন এক মুহূর্তের জন্যেও সময় নষ্ট করার অবকাশ ছিল না। হাতে কাগজ দিয়ে পয়সা গুনে অন্য গাড়ির দিকে ছুটে যেতে হচ্ছিল।

যোগী সেইসময় সিগন্যালের দিকে পিঠ দিয়ে কাগজ বিক্রি করতে ব্যস্ত ছিল। টের পায়নি কখন সবুজ বাতি জ্বলে উঠেছিল। দূর থেকে সবুজ বাতির সংকেতে দ্রুতগতিতে গাড়ি ছুটে আসছিল। নিমেষে তীরবেগে ছুটে আসা একটি গাড়ির বাঁদিকের সামনের চাকায় যোগী মুহূর্তের মধ্যে হঠাৎ পিষে গিয়েছিল। সোনা ভয়ে ও আতঙ্কে সহসা চিৎকার করে উঠেছিল গাড়ির কর্কশ আওয়াজে। অবশ্য যোগী সেই মুহূর্তে সোনার সাবধানিসূচক চিৎকার শুনতে পেয়েছিল কিনা বলা কঠিন। লোকজনের ভিড়ে যোগী একেবারে আড়াল হয়ে গিয়েছিল।

অতঃপর যোগী একসময় সাদা কাপড়ে ঢাকা পড়ে গিয়েছিল। আর দেখা যায়নি তাকে। চিরতরে অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল। জীবিতাবস্থায় যে গাড়ি চাপা পড়ল, মৃত্যুর পরে সেই আবার গাড়ির অন্যতম যাত্রী। কথাটা ভাবতেই কেমন যেন অসহায় লাগছিল সোনার।

সাথীহারা সোনা, যোগীর অনুপস্থিতির কারণে সেদিন অসহায় ভাবে কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি ফিরে তার মৃত্যুসংবাদ দিয়েছিল। সেদিন নিদারুণ শোকে দুঃখে সোনার আহার নিদ্রা পর্যন্ত ঘুচে গিয়েছিল। যোগীর শেষ মুহূর্তের করুণ দৃশ্যটা বারংবার তার মানসপটে ভেসে উঠছিল। সেই রাত্রে সোনা যোগীর কথা ভাবা ছাড়া অন্য কিছু ভাবতে পাচ্ছিল না। তারপর কী মনে করে সোনা একসময় শয্যা ত্যাগ করে উঠে পড়ে। সবার অলক্ষ্যে সে চলে যায় যোগীর অবর্তমানে দোকান পাহারা দিতে। ক্লান্ত শরীরে ভারাক্রান্ত মনে ভোরের দিকে চোখের পাতা জড়িয়ে আসায় আর জেগে থাকা সম্ভব হয়নি। কুকুরকুণ্ডলী অবস্থায় সে দোকানের দোরগোড়ায় শুয়েছিল।

পুব আকাশে তখন সবেমাত্র সূর্য উকি দিতে শুরু করেছিল। পাখিদের ভোরের কূজনও প্রায় থেমে গিয়েছিল। তার অনেক পরে বেলা আটটা নাগাদ দোকান খুলতে এসে স্বয়ং মালিক সোনার ঘুম ভাঙায়। ধাক্কা দিতেই সোনা নিদ্রাজড়িত চোখ মেলে তাকায়। মালিক সন্দিগ্ধ কণ্ঠে ভ্রুযুগল কুচকে অবাক বিস্ময়ে প্রশ্ন করে— – তুই কে? তুই এখানে শুয়ে আছিস কেন?

সেদিনের নিদারুণ দুঃসংবাদটা জানানোর উদ্দেশ্যেই বোধহয় রাতের অন্ধকারে ঘর ছেড়ে সোনার বাইরে বেরিয়ে আসা। সোনা উদাস চোখে তাকিয়ে অস্ফুট স্বরে জবাব দেয়— – বাবুজী, যোগী গাড়ি সে টকরা কর মর গ্যায়া পিছলি রাত। ও জীবিত নেহি হ্যায়।

অভিব্যক্তিতে বিশেষ কোনও পরিবর্তন দেখা যায় না। ব্যবসায়ী মন নিজের আর্থিক লাভ-লোকসানে যতটা আগ্রহী পরের জাগতিক লাভ-লোকসানে তাঁর ততটাই অরুচি।

সে নির্বিকার চিত্তে বলে ওঠে— গাড়ি সে টকরা কর মর গ্যায়া? কোই বাত নেহি। একদিন তো মর না হী থা!

স্বাদে-আহ্লাদে

বৃষ্টিদিনে মাঝেমধ্যে মনটা যখন খাই-খাই করে ওঠে, তখন মুখরোচক কিছু চাই-ই চাই। অতএব, সামান্য কিছু উপকরণ নিন আর সহজেই বানিয়ে ফেলুন সুস্বাদু নানারকম খাবার। রইল রেসিপিজ।

স্পেশাল আলুপনির পরোটা

উপকরণ: ৩/৪ কাপ বাজরার আটা, ১/৪ কাপ আলু সেদ্ধ করে চটকানো, ২ ছোটো চামচ আদা-কাঁচালংকার পেস্ট, অল্প গরমজল আটা মাখার জন্য, নুন-লংকা স্বাদমতো।

পুরের জন্য: ১/৪ কাপ পনির চটকানো, ১ বড়ো চামচ লাল-সবুজ-হলুদ ক্যাপসিকামকুচি, ১ বড়ো চামচ ‘সুমন’ ব্র্যান্ড-এর সরষের তেল, নুন ও গোলমরিচের গুঁড়ো প্রয়োজনমতো।

প্রণালী: বাজরার আটার সঙ্গে আলু সেদ্ধ, নুন, আদা-কাঁচালংকার পেস্ট মিশিয়ে অল্প গরমজল দিয়ে চটকে মেখে নিন। দেখবেন আটা মাখাটা যেন বেশি নরম না হয়ে যায়। ৫ মিনিট আটার মণ্ডটা ঢেকে রেখে দিন।

এবার পনিরের সঙ্গে বাকি উপকরণগুলো মিশিয়ে নিন। আলাদা রাখুন। আটা মাখা থেকে লেচি তৈরি করে ছোটো ছোটো পরোটা বেলে নিন। একটা পরোটার উপর পনিরের মিশ্রণ চারিয়ে দিন। তারপর অন্য পরোটা দিয়ে ঢেকে কোণাগুলো ভালো ভাবে আটকে দিন। তাওয়ায় তেল গরম করে পরোটাগুলো একে একে ভেজে নিন। ভাজার সময় মিডিয়াম আঁচে ভাজলে পরোটা নরম থাকবে। সস বা ধনেপাতা-পুদিনার চাটনির সঙ্গে খান।

চিলিওনিয়ন পট্যাটো ফ্ৰাইজ

উপকরণ: ৩-৪টি চন্দ্রমুখী আলু, ২ বড়ো চামচ কুচোনো পেঁয়াজ, ১ বড়ো চামচ টম্যাটো কুচোনো, ২ বড়ো চামচ ধনেপাতাকুচি, ১ চিমটে চাটমশলা, ১ চিমটে বিটনুন, ১ ছোটো চামচ তেঁতুলের চাটনি, ১ ছোটো চামচ পুদিনার চাটনি, ১ চিমটে লংকাগুঁড়ো, ১ ছোটো চামচ লেবুর রস, স্বাদমতো লংকাকুচি।

প্রণালী: আলু সেদ্ধ করে খোসা ছাড়িয়ে চটকে নিন এবং সামান্য তেল দিয়ে হালকা ফ্লাই করে রাখুন। এবার একটি বোল-এ বাকি সমস্ত উপকরণ একসঙ্গে মেশান। এর মধ্যে হালকা ফ্রাই করে রাখা পট্যাটো মিশিয়ে, ছোটো- ছোটো বলের আকার দিয়ে অল্প পরিমাণ তেলে ভেজে নিন। এবার ধনেপাতাকুচি ও লংকাকুচি ছড়িয়ে সার্ভ করুন।

স্পেশাল ফ্রেঞ্চ ফ্রাইজ

উপকরণ: ১/৪ কাপ মিহি করে কাটা গাজর, ১/৪ কাপ ক্যাপসিকামকুচি, ১২ বড়ো চামচ মিহি করে কাটা রসুন, ১/৪ বড়ো চামচ রিফাইন্ড তেল, ১/৪ কাপ হট গার্লিক সস ১/৪ ছোটো চামচ নুন, ১৮ কাপ পেঁয়াজকলি কুচি করা, ৩০০ গ্রাম স্লাইস পট্যাটো, ১ বড়ো চামচ কর্নফ্লাওয়ার, ৩ ছোটো চামচ জল।

প্রণালী: স্লাইস পট্যাটোয় কর্নফ্লাওয়ার মাখিয়ে নিয়ে, ১৭৫ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রায় ৪ মিনিট ফ্রাই করে নিন। একটা ফ্রাইংপ্যান-এ এবার তেল গরম করে, কুচোনো রসুন ভেজে নিন। এতে দিন গাজর ও ক্যাপসিকামকুচি এবং ৩০ সেকেন্ড ভাজুন। সবজি নরম হয়েছে বুঝলেই, এতে দিন হট গার্লিক সস ও নুন। এরপর, পেঁয়াজ সঁতে করে স্লাইস পট্যাটো ফ্রাই-এর উপর ছড়িয়ে দিয়ে, গরম গরম সার্ভ করুন।

ওদের অস্তিত্ব বিপন্ন

পৃথিবীর কয়েকটি দেশে আমরা ভিসা ছাড়াই পর্যটক হিসাবে ঘুরে বেড়াতে পারি পাহাড়, জঙ্গল, সমুদ্র সৈকতে কিংবা অন্যত্র। কিন্তু যে দেশে ভিসা ছাড়া প্রবেশ নিষিদ্ধ, সেই দেশের নিয়ম তো মানতেই হবে। মানসিক ভাবে সুস্থ নাগরিকদের থেকে এটাই কাম্য। কিন্তু তবুও কেন অনুপ্রবেশ ঘটে চলে, তার কারণ আমরা কমবেশি প্রত্যেকেই জানি।

মূল বিষয়টি হল— এক দেশ থেকে অন্য দেশে বৈধ ভাবে যেতে হলে লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ করতে হয়। তবে পর্যটক হিসাবে বৈধ ভিসা নিয়ে প্রবেশ এক বিষয়, আবার ‘ওয়ার্কিং ভিসা’ নিয়ে ভিন দেশে থাকা অন্য বিষয়। যখন থেকে আমেরিকা ‘ওয়ার্কিং ভিসা’ প্রদানে কড়াকড়ি করেছে, তবে থেকে ওখানে ‘অবৈধ’ নাগরিকের সংখ্যা হয়তো বেড়েছে। আর দেশের অভ্যন্তরিণ নিরাপত্তা অক্ষুন্ন রাখতে গিয়ে হয়তো ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরকার হঠাৎ নির্মমতা শুরু করেছে। অনুপ্রবেশকারীদের সনাক্ত করে বের করে দিচ্ছে দেশের বাইরে। সে যাইহোক, দেশের নিরাপত্তা রক্ষার বিষয়ে প্রত্যেকটি দেশের পূর্ণ স্বাধীনতা রয়েছে। আমেরিকাও সেই স্বাধীনতা রক্ষা করবে, এই বিষয়টির মধ্যে খারাপ কিছু নেই। কিন্তু, আমেরিকার সামরিক বিমানে ভারতীয় অনুপ্রবেশকারীদের টেক্সাস থেকে অমৃতসরে পাঠানোর বিষয়ে ভারত সরকারের নীরবতা অবাক করেছে!

এই প্রসঙ্গে উল্লেখ্য, যারা বৈধ উপায়ে ভিন দেশে যাচ্ছেন শিক্ষা কিংবা কর্মের তাগিদে, তারা তাদের জমানো টাকা খরচ করে যেমন নিঃস্ব হয়ে যায়, ঠিক তেমনই পরিবারের সদস্যদের থেকেও প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। তাই, বৈধ নাগরিকদের দুঃখ দূর করার বিষয়ে কেউ ভাবে না। যারা বাধ্য হয়ে নিজের দেশ আর পরিবার ছেড়ে অন্য দেশে যায়, তাদের পরিবারের লোকেদের এর জন্য মন খারাপ হলেও, বিদেশে গেলে আপনজন জীবনে আর্থিক প্রতিষ্ঠা পাবে, এই আশায় সমস্ত মন খারাপ ভুলে থাকেন।

আসলে, নিজের দেশ ছেড়ে ভিন দেশে যারা যান, দেশের সৈনিকদের মতো তাদেরও প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করতে হয়। হয়তো এই যুদ্ধ দেশের জন্য নয়, লড়তে হয় নিজের জন্য, পরিবারের জন্য এবং এই লড়াই যেমন প্রতিকুল পরিস্থিতির সঙ্গে লড়তে হয়, ঠিক তেমনই নিজের মনের সঙ্গেও লড়তে হয় অনেক সময়।

অবশ্য অনুপ্রবেশ যে দেশেই হোক না কেন, তা মোটেই ভালো নয়। কারণ, অনুপ্রবেশকারীরা বৈধ উপায়ে কোনও কাজ যেমন পাবে না, ঠিক তেমনই তারা যে-কোনও রকম ঘৃণ্য কাজও করতে পারে। আমেরিকায় যারা অবৈধ ভাবে বসবাস করছে, তারাও হয়তো তার নিজের দেশে কোনও কাজ না পেয়ে কিংবা বেশি টাকা উপার্জনের লোভে রয়েছে। তাই, অনুপ্রবেশকারীদের জন্য সরকার হয়তো কিছুটা চিন্তিত, কিন্তু সাধারণ নাগরিকরা আছেন আতঙ্কে। কারণ, সারা পৃথিবীতে আতঙ্কবাদীদের দৌরাত্ম বাড়ছে।

আমেরিকা থেকে অনুপ্রবেশকারীদের নিজের দেশে ফেরানোর ব্যবস্থা করতে গেলে, ট্রাম্প সরকারের অনেক টাকা খরচ হয়তো হবে কিন্তু অবৈধ নাগরিকদের চিহ্নিত করে নিজের দেশ থেকে উচ্ছেদ করতে পারলে, অনেকটাই চিন্তামুক্ত হতে পারবে ট্রাম্প সরকার।

কিন্তু আমেরিকা থেকে বিতাড়িত হয়ে যারা ভারত কিংবা অন্যান্য দেশে ফিরবেন, তারা তো সেইসব দেশকে ভারাক্রান্ত করে তুলবেন। কারণ, ভিন দেশে তারা সাফ-সাফাইয়ের যে-সব কাজ করতেন, নিজের দেশে ফিরে তারা সেই কাজ করতে কুণ্ঠিত হবেন চক্ষুলজ্জার কারণে। তাই, আমেরিকা ফেরৎ লোকেরা যে এবার নিজের দেশে বোঝা হয়ে বসবাস করবেন, এই বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই।

পড়ার জন্য সীমাহীন গল্প-নিবন্ধসাবস্ক্রাইব