সুখপাখি (পর্ব-০১)

সুমনা বইয়ের দোকানে দরদাম করছে। দরদাম না করে কিছু কিনতে মন সায় দেয় না তার। তা সে যত তুচ্ছই হোক বা জীবনদায়ী ওষুধই হোক না কেন। বাজারে এক আঁটি শাকের দাম দোকানি পাঁচ টাকা চাইলে, সুমনা চার টাকা বলবে। পরে অবশ্য পাঁচ টাকাতেই নেবে।

সুমনা বলল, ‘এই সমস্ত সাবজেক্টের বইতে ত্রিশ থেকে চল্লিশ পার্সেন্ট ছাড় পাওয়া যায়। আপনি দশ পার্সেন্টের বেশি দিতেই চাইছেন না! বেশ তো দাদা আপনি।’

মধ্য ত্রিশের টান টান মেদবর্জিত চেহারার সুমনার মুখে ‘দাদা’ শব্দটি শুনে বৃদ্ধ দোকানির মন বুঝি একটু গলল। আগের চেয়ে চওড়া হাসি হেসে উত্তর দিল, কিছু বইতে ছাড় তো সাবজেক্টের উপরে দেওয়া হয় না, দেওয়া হয় সেলের উপরে। এই বইটির একদম সেল নেই। গত পাঁচ বছরে একটিও কপি বিক্রি হয়নি। দশ কপিই ধরা আছে। নির্ধারিত মূল্যে বিক্রি করলেও হিসেবমতো লস হবে। ঠিক আছে আপনাকে পনেরো পার্সেন্ট ছাড় দিলাম। একশো সত্তর টাকা দিন।

সুমনা এমনটাই আন্দাজ করছিল। দরদামে ওর নিজের সূত্র আছে। সেই সূত্র অনুযায়ী বহুদিনের অভ্যেসে সে বুঝে যায় দোকানি যখন নামতে থাকে তখন ক্রেতাকে ডুব দিতে হয়। অর্থাৎ আগে যা দাম বলেছিল, তার চেয়ে কিছুটা কম বলে চুপ করে জলের তলায় ঘাপটি মেরে থাকার মতো থাকতে হয়। তার সঙ্গে মুখে বিতৃষ্ণার ছবি ফুটিয়ে তুললে কাজ অনেকটাই সহজ হয়ে যায়। সুমনা সূত্র মিলিয়ে তেমনটাই করল। চুপ করে থাকল।

দোকানি অন্য দু’জন খদ্দের সামলে বলল, ‘বুঝতে পেরেছি। যাক না হয় আমারই লস হোক। আপনি আরও কুড়ি টাকা কম দিন। দিন, দেড়শোই দিন। কী এবার নিশ্চয় আপনি খুশি?”

সুমনার খুশি বোঝা গেল না। দরদামের সময় মুখে খুশি খুশি ছবি ফুটিয়ে তুলতে নেই। দোকানি বুঝে গেলেই সমস্যা। খুশি হলেও জোরসে খুশি চেপে রাখতে হয়। নইলে দোকানি পেয়ে বসবে। সে চট করে একশো চল্লিশ টাকা দোকানির হাতে গুঁজে দিয়ে, ব্যাকডেটেড সাবজেক্টের বই, একশো টাকা হলেই ঠিক ছিল….। বলতে বলতে বইটি হাতে নিয়ে হন হন করে হাঁটা দিল বড়ো রাস্তার দিকে। দোকানি ফ্যালফেলিয়ে তাকিয়ে রইল খানিকক্ষণ। একসময় চোখ ফিরিয়ে নিল।

দাপুটে স্বভাবের মেয়ে সুমনা। ছোটোবেলায় গাছে উঠে ফল পেড়ে খাওয়া, সাঁতরে পুকুর পার হওয়ায় ওর জুড়ি মেলা ভার ছিল। সংসার জীবনেও ওর দাপট অব্যাহত। সন্দীপন অবশ্য দাপুটে স্ত্রী পেয়ে বেশ খুশি। সংসার জীবনটা বাইরে থেকে দেখতে এক রকম ভিতর থেকে অন্য রকম। ঠিক নারকেলের উলটোটা যেন। বাইরে থেকে তুলতুলে মনে হলেও ভিতরে বেশ শক্ত। বাইরেটা পুরুষ, ভিতরটা নারী যদি হয় অর্থাৎ সংসারের হাল যদি শক্ত করে ধরে নারী, তবেই সংসার সুখের হয়। সংসার আসলে পরিপাটি সাজানো ঘর-দোর। নারীই পারে সমস্ত ঝুলকালি ঝাঁটাপেটা করে তকতকে করে তুলতে। সন্দীপন-সুমনার সংসারে দুঃখের চোরাস্রোত থাকলেও, সুমনার দাপট থাকলেও, সুখও ছিল।

সুখ বড়ো চঞ্চল। শিশুর চেয়েও চঞ্চল। ধরে রাখা মুশকিল। দাপুটে সুমনার সংসারে সুখের ব্যাঘাত ঘটল৷ কোথা থেকে উড়ে এল একটি পাখি। ওলট পালট করে দিল সবকিছু।

ঘটনার সূত্রপাত তিনদিন আগে। সকালে চা করল সুমনা। সব ঠিকঠাক। ঘণ্টা দুয়েক পরে রান্নার প্রস্তুতি নিতে গিয়ে সুমনার চোখে পড়ল গ্যাসের ওভেনের উপরে উলটে থাকা কলসির মতো কিচেন চিমনিতে এই সামান্য সময়ের মধ্যে কী করে যে একটি পাখি খরকুটো দিয়ে বাসা বানিয়ে ফেলেছে! প্রথম দর্শনে সুমনা ভেবেছিল দু-একবার হুশ হাশ করলেই উড়ে যাবে। সুমনা তাই করল। ওড়া তো দূরের কথা, পাখিটি বিন্দুমাত্র নড়ল না। পাখিটির সাহস দেখে ওর মনে সন্দেহ হল। খুব ভালো করে খুঁটিয়ে দেখল খড়কুটোর বাসায় তিনটে ছোট্ট ছোট্ট ডিম। সেই ডিমের উপর বসে আছে পাখিটি। মুহূর্তে সুমনা বুঝল পাখিটি মা পাখি। সন্তানের জন্ম দিতে সমস্ত ভয়কে অগ্রাহ্য করে ডিমে তা দিচ্ছে। সঙ্গে সঙ্গে এও নিশ্চিত হল যে, ডিম ফুটে বাচ্চা না বের হওয়া পর্যন্ত পাখিটি নড়বে না। কিছু কিছু সিদ্ধান্ত মানুষকে খুব কম সময়ের মধ্যে নিতে হয়। অবশ্যই সে সিদ্ধান্ত সঠিক হওয়া আবশ্যক। সুমনা আর কিছু বলল না। ভয় দেখাতে বা জোর করে পাখিটিকে উড়িয়ে দিতে চেষ্টা করল না।

সন্দীপন বাজার থেকে ফিরলে সুমনা সমস্ত ঘটনা জানাল। সন্দীপনকে রান্নাঘরে টেনে নিয়ে গিয়ে বাসা দেখিয়ে বলল, ‘বাড়িতে দু- একদিন রান্না না হলেও আমরা বাইরের খাবার খেয়ে বেঁচে থাকতে পারব। কিন্তু এই অবস্থায় বাসাটা ভেঙে দিলে মাতৃত্বের সুখ ও স্বপ্ন থেকে বঞ্চিত পাখিটি আর নাও বাঁচতে পারে। তাছাড়া তিনটে প্রাণের পৃথিবীর আলো দেখার আগেই হত্যা করা ঠিক হবে না। তুমি কী বলো?’

সন্দীপনের মুখে বিরক্তির ছাপ। কিন্তু সুমনার মুখের উপর কিছু বলল না। মোবাইল বেজে উঠল। স্ক্রিনে নাম ভেসে উঠেছে মোহিত তালুকদার। অফিসের সহকর্মী। লাল বোতাম প্রেস করে ঘরের বাইরে যেতে যেতে বলল, ‘ডিম ফোটানোর আর জায়গা পেল না! যত্তসব।’

সন্দীপনের বিরক্তি বেশ বুঝতে পারল সুমনা। সে নিজেও ভেবে দেখল সাজানো গোছানো ফ্ল্যাটের বাইরেই পাখি মানায়, ভিতরে নয়। তাছাড়া আজ একটি পাখি বাসা বেঁধেছে, কাল হয়তো দলে দলে আসবে। তখন সামাল দেওয়াই মুশকিল হবে। অতএব শুরুতেই তাড়িয়ে দেওয়া ভালো। কিন্তু পাখিটির মাতৃত্ব সুমনার মনে গভীর ছাপ ফেলল। এই অবস্থায় কি তাড়িয়ে দেওয়া ঠিক হবে? ছোটোবেলায় ঠাকুমা বলত, গৃহস্থের বাড়িতে গর্ভবতী কেউ এলে তাকে না খাইয়ে যেতে দিতে নেই। এমনকী গর্ভবতী আশ্রয় চাইলে, গৃহস্থের উচিত আশ্রয় দেওয়া। সন্তান জন্মের পরে কেউ মা হয় না। মাতৃত্বের আসল অনুভূতি সন্তান জন্মের আগে। গর্ভবতী অবস্থাতেই। পৃথিবীর সব মা একসুতোয় বাঁধা, মাতৃত্ব। তা সে মানুষ হোক বা পাখি।

(ক্রমশ…)

অ্যালার্জি প্রতিরোধের উপায়

এখন আমরা এমন এক আবহাওয়ার মধ্যে আছি, যা খুবই অদ্ভূত। এখন দ্রুত তাপমাত্রা ওঠানামা করছে। ভোরবেলায় গায়ে পাখার হাওয়া লাগালে গা শিরশির করছে, কিন্তু দুপুরে আবার বেশ গরম লাগছে। আর তাপমাত্রার এই দ্রুত ওঠানামার কারণে, সর্দিকাশি, ভাইরাল সংক্রমণ এবং অ্যালার্জি-র সমস্যা বাড়ছে।

আসলে, এই খামখেয়ালি আবহাওয়া যেমন অস্বস্তিকর, ঠিক তেমনই শরীরের জন্যও সুখকর নয়। কারণ, এই সময় অ্যালার্জি থেকে শুরু করে নানারকম স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা দিতে পারে। অতএব, কীভাবে সমস্যা এড়িয়ে চলবেন কিংবা সুস্থ থাকবেন, সেই বিষয়ে তিনজন চিকিৎসকের বক্তব্য এবং পরামর্শ তুলে ধরা হচ্ছে।

ডা. এম এস পুরকাইত-এর পরামর্শ  

এই সময় বাতাসে পরাগরেণু এবং অন্যান্য অ্যালার্জেন ভাসতে থাকে, যা আমাদের নাক-মুখ দিয়ে ফুসফুসে গিয়ে অ্যালার্জিক কাশি এবং শ্বাসকষ্টের সমস্যা তৈরি করতে পারে। তাই এই সময় আমাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা আরও বাড়াতে হবে এবং দুপুরের প্রখর রোদ এড়িয়ে চলতে হবে। শুধু তাই নয়, শরীরকে একটা নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় রাখতে হবে। নয়তো স্বাস্থ্যহানি ঘটতে পারে এবং চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে।

অদ্ভুত এই আবহে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য আরও বেশি সময় হাঁটাচলা এবং ব্যায়াম করতে হবে। প্রচুর পরিমাণে খেতে হবে তাজা শাকসবজি। আর কোনওরকম অ্যালার্জির সমস্যা দেখা দিলে, দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ মতো দ্রুত চিকিৎসা করাতে হবে।

ডা. কেতকী সুবেদার ঘোষ-এর পরামর্শ 

বর্তমান আবহে চোখের যত্ন নিতে হবে বিশেষ ভাবে। কারণ, এই সময় চোখে অ্যালার্জির সমস্যা হতে পারে এবং সংক্রমণের সমস্যাও দেখা দিতে পারে। তাই, কীভাবে চোখের যত্ন নেবেন, সেই বিষয়ে জেনে নিন বিশদে।

  • পরাগ এবং ধুলো থেকে আপনার চোখকে রক্ষা করুন। পরাগ এবং ধুলো চোখের অ্যালার্জিকে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে। যার ফলে চোখে চুলকানি, লাল ভাব এবং চোখ দিয়ে জল পড়ার সমস্যা হতে পারে। অতএব, বাড়ির বাইরে থাকাকালীন চোখে সানগ্লাস ব্যবহার করুন। সেইসঙ্গে, বাইরে থেকে আসার পর নিজের মুখ এবং হাত ধুয়ে নিন সাবান দিয়ে।
  • চোখ স্পর্শ করা বা রগড়ানো বন্ধ করুন। কারণ, যদি আপনার অ্যালার্জি থাকে, তাহলে চোখে আঙুল দিয়ে রগড়ালে চোখ আরও জ্বালাপোড়া করতে পারে। তাই, সংক্রমণ প্রতিরোধ করতে নিয়মিত আপনার চোখ এবং চোখের পাতা পরিষ্কার করুন। অন্যের মেক-আপ ভাগ করে নেওয়া এড়িয়ে চলুন এবং পরিষ্কার ব্রাশ ব্যবহার করুন।
  • বাগানে গাছের পরিচর্যা করর সময় চোখে চশমা কিংবা সানগ্লাস পরুন। সেইসঙ্গে, মাঠে খেলা চলাকালীন কিংবা খেলা শেষ করে হাত না ধুয়ে চোখে হাত দেবেন না। আর কোনও রাসায়নিক পদার্থ যাতে চোখের ভিতর না যায়, সেই বিষয়ে সতর্ক থাকুন।
  • কৃত্রিম টিয়ার ড্রপ ব্যবহার করুন— দীর্ঘক্ষণ রোদে থাকলে চোখ শুষ্ক, চুলকানির সমস্যা এবং কখনও কখনও লাল এবং জল পড়ার সমস্যা দেখা দিতে পারে। এমন সমস্যা হলে, চক্ষু বিশেষজ্ঞের সঙ্গে দেখা করুন এবং তাঁর পরামর্শ মতো চোখের ড্রপ ব্যবহার করুন, এতে উপশম হবে।
  • ঘরের বাতাস বিশুদ্ধ রাখুন — ঘরের পরিবেশ বিশুদ্ধ এবং স্বাস্থ্যকর রাখা একটি কর্তব্য। এতে চোখের সংক্রমণের সম্ভাবনা কমে।
  • সুষম খাবার খান এবং হাইড্রেটেড থাকুন। কারণ, দৃষ্টিশক্তি ঠিক রাখতে সাহায্য করে সুষম খাবার এবং জল। মনে রাখবেন, ভিটামিন এ, সি এবং ই সমৃদ্ধ খাবার, সবুজ শাকসবজি, শুকনো ফল এবং দুধ, চোখের স্বাস্থ্য ভালো রাখে। এই জাতীয় ডায়েট চার্ট চোখের অ্যালার্জি কমাতেও সাহায্য করে। আর পর্যাপ্ত পরিমাণে জল পান করা উচিত চোখের আর্দ্রতার মাত্রা বজায় রাখার জন্য।
  • ন্যূনতম শান্তিপূর্ণ ঘুম অপরিহার্য। চোখ এবং শরীরকে আরাম দেওয়ার জন্য ৬ থেকে ৮ ঘণ্টা ঘুম আবশ্যক। আর ঘুমানোর সময় ইলেকট্রনিক গ্যাজেটগুলি দূরে রাখুন। কারণ, স্ক্রিন-এর উজ্জ্বল আলো চোখের উপর চাপ সৃষ্টি করে।
  • ঘুমের সময়কালের ধারাবাহিকতা বজায় রাখুন। শোওয়ার ঘরে গাঢ় রঙের পর্দা ব্যবহার করুন। এড়িয়ে চলুন প্রখর রোদ। কারণ, সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি চোখের চরম ক্ষতি করে দিতে পারে।
  • এই সময় নিয়মিত চক্ষু পরীক্ষা করান।

ডা. ঈশা বন্দ্যোপাধ্যায়-এর পরামর্শ

এই সময় অ্যালার্জি, শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণ এবং মশাবাহিত রোগের শিকার হতে পারেন যে-কেউ। এক্ষেত্রে মনে রাখবেন, হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা এবং ওষুধ প্রাকৃতিক এবং কার্যকর সমাধানে খুব ভালো ভূমিকা নিয়ে থাকে। কখন কী করবেন এই সময়, তা জেনে নিন বিশদে

হালকা লক্ষণ: অ্যালার্জি এবং এই সময়ের অন্যান্য রোগের লক্ষণগুলি হালকা থাকা অবস্থায় হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা শুরু করুন।

গুরুতর লক্ষণ: অ্যালার্জি-র কারণে যদি আপনার উচ্চ জ্বর (১০২ ডিগ্রি ফারেনহাইটের উপরে), শ্বাসকষ্ট, শরীরে তীব্র ব্যথা কিংবা গলা শুকিয়ে যাওয়ার সমস্যা অনুভব করেন, তাহলে তখনই চিকিৎসকের পরামর্শ মতো চিকিৎসা শুরু করুন। নিজে থেকে সিদ্ধান্ত নিয়ে কিংবা ওষুধের দোকানে অনুরোধ করে অ্যান্টিবায়োটিক নিয়ে খাবেন না। কারণ, কোন অ্যান্টিবায়োটিক খেলে আপনার রোগ সারবে এবং শরীরের ক্ষতি হবে না, তা নিয়ে একমাত্র বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরাই সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।

উচ্চঝুঁকিপূর্ণ সমস্যা: যদি আপনার আগে থেকে হাঁপানি, ডায়াবেটিস প্রভৃতি সমস্যা থাকে কিংবা আপনি প্রবীণ ব্যক্তি হন, তাহলে জটিলতা প্রতিরোধ করার জন্য তাড়াতাড়ি হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা করানোই ভালো।

অ্যালার্জিক রাইনাইটিস

গাছ এবং ফুলের পরাগরেণু থেকে হাঁচি, পিচুটিতে চোখ আটকে যাওয়া এবং চুলকানির সমস্যা হতে পারে। যদি লক্ষণগুলির মধ্যে মুখের ফোলাভাব, তীব্র সাইনাসের চাপ কিংবা ক্রমাগত শ্বাসকষ্ট হতে থাকে, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ মতো চিকিৎসা করান দ্রুত।

ইনফ্লুয়েঞ্জা (ফু)

ভাইরাল মিউটেশনের কারণে এই সময় ইনফ্লুয়েঞ্জার (ফ্লু) শিকার হতে পারেন। তাই, এই সময় অসুস্থ ব্যক্তিদের থেকে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ এড়িয়ে চলুন এবং ঘন ঘন হাত ধুয়ে নিন ভালো সাবান দিয়ে৷ সেইসঙ্গে, এই সময় মশারি ব্যবহার করুন এবং কোথাও জল জমতে দেবেন না।

বিশেষ সতর্কতা

  • বাইরের খাবার খাদ্য বিষক্রিয়ার ঝুঁকি বাড়ায়। অতএব, এই সময় বাইরের খাবার যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলুন
  • প্রখর রোদ এড়িয়ে চলুন। কারণ, বেশি রোদে পোড়ার ফলে ফুসকুড়ি এবং ডার্মাটাইটিস হতে পারে
  • প্রতিরক্ষামূলক পোশাক এবং সানস্ক্রিন ব্যবহার করুন

• যদি ত্বকে ফোসকা, লালচে ভাব অথবা জ্বলে যাওয়ার মতো যন্ত্রণা অনুভব করেন ক্রমাগত, তাহলে বরফ কাপড়ে জড়িয়ে যন্ত্রণার জায়গায় চেপে ধরুন।

মোক্ষলাভ (শেষ পর্ব)

ঘর থেকে বেরিয়ে বাবার পাশে বসে সুনীল জিজ্ঞাসা করল, ‘তুমি কেমন আছো বাবা?’

—যেমন দেখছিস। খুব অবাক হয়েছিস তাই না? ভাবছিস যার মরার ব্যবস্থা পাকা করে পালিয়ে এলাম, সে এভাবে বেঁচে ফিরল কী করে ?

—না বাবা, আসলে…।

—চুপ কর, আমাকে আর আসলে বোঝাতে হবে না। ম্যানেজারকে মিথ্যা কথা বলে বাড়ি এসে আর ফিরে গেলি না। এসে সবাইকে বলে দিলি বাবা মরে গেছে, ঘটা করে শ্রাদ্ধশান্তিও করে ফেললি।

সুনীল আমতা আমতা করে বলল, ‘আসলে আমি আসার দু’দিন পরে আশ্রমের একজন ফোন করে তোমার মৃত্যু সংবাদ দিল। তাই আর যাইনি।’

—চুপ কর, মিথ্যা কথা বলিস না।

–কিন্তু তুমি শ্রাদ্ধের কথা জানলে কী করে?

—গয়ায় পিণ্ডদান করতে আসা তোর মামাবাড়ির একজনের মুখে।

—গয়ায় কেন গিয়েছিলে তুমি?

—ওখানেই তো বিদ্যাদের বাড়ি, ওই নিয়ে গিয়েছিল ওর বাড়িতে, সেখানেই ছিলাম এতদিন। ওর সেবাতেই তো বেঁচে ফিরলাম আমি।

অবাক হল সুনীল, ‘কী বলছ তুমি? কীভাবে ঠিক হলে তুমি?”

—সে অনেক কথা।

সুমতি দুধ-মুড়ি নিয়ে এসেছিল। বলল, “খেতে খেতে বলো বাবা।”

তারপর বাবার মুখে মুক্তি ভবনের শেষ চারদিনের কাহিনি শুনে সুনীল তো হতবাক।

—তুই চলে আসার পর প্রথমটা আমি খুব মুষড়ে পড়েছিলাম। কিন্তু বিদ্যার সেবাযত্নে আমি যেন প্রাণ ফিরে পেলাম। জরাগ্রস্ত বৃদ্ধ বাবার সঙ্গে, সে আমারও খুব খেয়াল রাখত, যত্ন করে খাইয়ে দিত। দু’দিন পরে যখন ওর বাবা মারা গেল, আর তুইও এলি না, তখন আমার মতো বিদ্যাও পড়ল চিন্তায়। এই ক’দিনে আমার উপরে মেয়েটার এমন মায়া পড়ে গিয়েছিল যে, আমাকে অসহায় অবস্থায় ফেলে যেতে পারল না। বলল, তোমার ছেলে মিথ্যা কথা বলে পালিয়েছে, ও আর আসবে না। মুক্তি ভবন থেকে বের করে দিলে এবার তোমাকে রাস্তায় পড়ে থাকতে হবে। তার থেকে আমার সঙ্গে চলো। বাবা তো চলে গেল, এবার আমি একা, তোমার কোনও অসুবিধা হবে না। গয়ায় আমাদের বাড়ির কাছে একজন বৈদ্য আছে হাঁপানির ভালো ওষুধ দেয়, তার কাছে কিছুদিন চিকিৎসা করিয়ে তারপর তোমাকে বাড়ি রেখে আসব। বিদ্যার কথায় আমি তো হাতে চাঁদ পেলাম। পরদিন চলে গেলাম ওর বাড়িতে। তারপর সেই বৈদ্যর ওষুধ খেয়ে আর বিদ্যার সেবাযত্নে আমার হাঁপানির কষ্ট অনেকটা কমে গেল। তোদের জন্যে মনটা খুব খারাপ করছিল, বাড়ি আসতে চাইছিলাম, কিন্তু বিদ্যা ছাড়ল না। বলল, আরও কিছুদিন থাকো, পুরোপুরি সুস্থ হয়ে যেও। তারপর এই বছর খানেক ওষুধ খেয়ে সুস্থ হতে চলে এলাম।

বাবার কথা শুনে সুনীল তো অবাক! বাবা যে এভাবে বেঁচে উঠবে, সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে আসতে পারবে কল্পনাও করেনি সে। সর্বেশ্বর মুচকি হেসে বলল, ‘একটা জিনিস ঠিক করেছি আমরা। এখন কেবল তোর সম্মতির অপেক্ষা।”

—কী ঠিক করেছ? সুনীল উদ্বিগ্ন হয়ে উঠল।

—বিদ্যার তো কেউ নেই, আর এই এক বছর ও যেভাবে সেবা করে আমাকে মৃত্যুমুখ থেকে ফিরিয়ে এনেছে নিজের স্ত্রীও করবে না। তাই ঠিক করেছি ওকে এখানেই নিয়ে আসব, ওর সেবাশুশ্রূষাতেই কাটিয়ে দেব বাকি জীবনটা।

হাঁ হাঁ করে উঠল সুনীল, ‘তোমার ভীমরতি হয়েছে নাকি? লোকে বলবে কী?”

—কেন, এতে লোকের বলার কী আছে?

—এই বয়সে এইসব কথা বলতে আটকাচ্ছে না তোমার ?

বয়স হয়েছে তো কী হয়েছে? বিদ্যারও তো বয়স হয়েছে, ওকেই বা একলা ছাড়ি কী করে? আমারও তো একটা কর্তব্য আছে। তুই না করিস না।

—না বাবা, আমার ঘরে আমি এসব করতে দেব না।

—তোর ঘর? এ তো আমার ঘর, আমার সম্পত্তি, তোর কবে থেকে হল?

—তুমিই তো আমাকে সব লিখে দিয়েছ। এসব এখন আমার।

—তাতে কী হয়েছে? তেমন হলে আমার সম্পত্তি আবার ফিরিয়ে নেব আমি।

—না, তোমরা এখানে থাকতে পারবে না। এইসব অনাচার আমি তোমাকে করতে দেব না, এই স্পষ্ট বলে দিলাম। বলে সুনীল উঠে পড়ল।

সারাটা দিন সুনীল বাবার সঙ্গে কথা বলল না। সুমতিও দু’জনকে খেতে তো দিল কিন্তু ভালো করে কথা বলল না। সর্বেশ্বরের কিন্তু কোনও হেলদোল নেই, নির্বিকার ভাবে খেল-দেল, ঘুমাল, নাতিনাতনির সঙ্গে হেসে হেসে কথা বলল। পাড়ার দু’একজনের সঙ্গে দেখা হতে বলল— বাবা বিশ্বনাথের কৃপায় মরে গিয়েও বেঁচে উঠেছি।

পরদিন ভোরে হঠাৎ বাবার ডাকে সুনীলের ঘুম ভেঙে গেল। উঠে এসে দেখে বাবা কাপড়চোপড় পরে বেরিয়ে পড়েছে। অবাক হল। জিজ্ঞাসা করল, “কী ব্যাপার! এই সকালে কোথায় যাচ্ছ?’

—গয়া ফিরে যাচ্ছি।

—গয়া! এই তো বলছিলে…।

—দেখছিলাম বিদ্যার কথাটা সত্যি কিনা।

—কী কথা? সুনীলের বিস্ময় বাড়ল।

—বিদ্যা আগেই বলেছিল, আমরা ওখানে গেলে তোমার ছেলে কিছুতেই মেনে নেবে না, দূর দূর করে তাড়াবে। আমি মানিনি, বলেছিলাম, আমার সুনীল আমাকে খুব ভালোবাসে, সে কখনও বাবার সুখের অন্তরায় হবে না। কিন্তু এসে দেখলাম ওর কথাই ঠিক। বাবার থেকেও সম্পত্তির দাম তোর কাছে অনেক বেশি।

সুনীলের মুখে কথা নেই।

—চিন্তা করিস না, গয়াতে আমি ভালোই থাকব। বিদ্যার যা ঘরবাড়ি সম্পত্তি আছে তাতে বাপবেটির ভালোই চলে যাবে।

—বাপবেটি মানে? সুনীল অবাক।

—হ্যাঁ বাপবেটি। তুই কী ভেবেছিলি? এই বয়সে আমি আবার বিয়ে করব?

—মানে তুমি তো…।

—তোকে আর মানে বোঝাতে হবে না। তুই নিশ্চিন্তে থাক, আমার সম্পত্তির দরকার নেই, আর আমি এখানে থাকবও না। তবে বোনটাকে ভুলিস না, তাকে বাবার আদর দিস।

তারপর ব্যাগটা উঠিয়ে ‘যাই বাবা, দেরি হয়ে যাচ্ছে’ বলে সর্বেশ্বর বেরিয়ে পড়ল।

সুনীল বিস্ময় বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে রইল কুয়াশার অন্তরালে ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাওয়া ছায়ামূর্তিটার দিকে। তার মাথা কাজ করছিল না, বুঝতে পারছিল না কাল থেকে যা ঘটে গেল সেটা স্বপ্ন না বাস্তব। বাবা সত্যিই জীবিত না মোক্ষলাভের পর তার প্রেতাত্মা এসেছিল ঘরের টানে!

‘কার সঙ্গে কথা বলছ গো?” প্রশ্ন করে সুমতি। কিন্তু ঘরের ভিতর থেকে ভেসে আসা সুমতি-র কথাগুলো কানেই ঢুকল না সুনীলের!

নুব্রা উপত্যকা (পর্ব-০৪)

যতটুকু দেখলাম, সৌন্দর্যের ছিঁটেফোটা চোখে পড়ল না। মেয়েদের মধ্যে কিছুটা আবাহন থাকলেও পুরুষদের নজর বহিরাগতদের কাছ থেকে শুধু ব্যাবসা করায়। পাহাড়ের গায়ে বিপজ্জনক ভাঙা সিঁড়ির ফাঁকে একটু চাতাল মতো পেরলেই বালটি কুইজিন-এর রেস্তোঁরা। পরিচিত উত্তর ভারতীয়, চিনা ও তিব্বতি খাবারও ‘বালটি কুইজিন’ বলে হুড়িয়ে বিকোচ্ছে। আমাদের প্রবৃত্তি হল না। নেমে একটা বাগানঘেরা পরিচ্ছন্ন স্নিগ্ধ মনোরম রেস্তোঁরায় খেলাম। তুরতুক থেকে থং পর্যন্ত বেশ কয়েকটা রেস্তোরাঁ আছে সবুজের মধ্যে।

পাশেই সেনা চেক পোস্ট। শুকনো ফল কিনলাম সেনার একটি স্টল থেকে। তারপর এগিয়ে গেলাম নিয়ন্ত্রণরেখা বা Line of Control (LOC) দেখার জন্য। এখানেও LOC!

নিয়ন্ত্রণ রেখা বা Line of Control (LOC)

১৯৭১-র যুদ্ধে শুধু তুরতুক নয়, আরও তিনটি গ্রাম ভারতভুক্ত হয়েছিল — চালুংখা (Chalunkha), থং (Thang) ও তাকশি (Takshi)। এরই সৌজন্যে তারা ভারত সরকার প্রদত্ত ভর্তুকি, পর্যটন, স্কুল, অঙ্গনবাড়িসহ গ্রামীণ উন্নয়ন— সব সুবিধাই পায় নিয়ন্ত্রণরেখা থং গ্রামে।

কাঁটাতারের সামনে দাঁড়িয়ে দূরের পাহাড়ে অস্পষ্ট চেকপোস্ট, বাঙ্কার ইত্যাদি দেখে অবাক লাগছিল এই ভয়ানক দুর্গম, প্রায় অগম্য স্থানে মানুষ কীভাবে ডিউটি করতে পারে। চারপাশে পাকিস্তান কবলিত পাহাড়চূড়া। যে-কোনও মুহূর্তে উপর থেকে গোলাগুলি আসতে পারে। তাই ছোটো ছোটো বাঙ্কারে ভারতীয় সেনা নজরদারি করছে। এমন বিপদসংকুল জায়গায় সরকার পর্যটকদের যেতে অনুমতি দিচ্ছে কেন? Indo-Pak Border View Point-এ সেলফি তুলিয়ে দেশাত্মবোধ সঞ্চারিত করতে?

সীমা সুরক্ষার কারণেই লাদাখ পুরোপুরি ভারতীয় সেনা নিয়ন্ত্রিত। যদিও লাদাখিদের তরফে কোনও অশান্তি নেই, ক্ষোভও নেই। ৩টি দেশের সঙ্গে প্রায় ২২১৭ কিলোমিটার আন্তর্জাতিক সীমান্তরেখা থাকলেও পশ্চিমবঙ্গ ভাগ্যিস সীমান্তবর্তী রাজ্য নয়।

সুমুর থেকে সিয়াচেন

ভাগ্যিস ২৫ তারিখেই নুব্রা উপত্যকায় মোটামুটি যা কিছু করণীয় বলে জানতাম, সেগুলো সেরে নিয়েছিলাম। কারণ ২৬ তারিখে পাকিস্তান সীমান্ত থেকে ফিরে এসে বালিয়াড়িতে সময় কাটানো কোনওভাবেই সম্ভব ছিল না। তুরতুক থেকে নুব্রা ফিরে যে অফিসার্স মেসে উঠলাম, তা বর্ডার রোডস নয়, খাস আর্মির তত্ত্বাবধানে।

পরতাপুর

জায়গাটার নাম যে পরতাপুর এবং সামরিক অভিযানে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ, ঐতিহাসিক ভূমিকাও আছে, সেসব নিয়ে ক্লান্ত শরীরে আর মাথা ঘামাইনি। শুধু ছবির মতো পটচিত্রে সাজানো গোছানো কটেজ দেখে মুগ্ধ। মন খারাপ হয়ে গেল, আগামীকাল ভোরেই এটা ছেড়ে যেতে হবে। এমন জায়গা পেলেই রাতবিরেত না মেনে আমি কষে কাচাকুচি, শ্যাম্পু, ত্বক পরিচর্যা, মিরর সেলফি ইত্যাদি সেরে ফেলি। ঝাঁ চকচকে ঘরের ভিতরেও বৃষ্টির টুপটাপ। ছবি তুলে কোয়ার্টার মাস্টারকে জানানোর পর সমস্যার কিছুটা সমাধান হল। কিন্তু অমন সুন্দর কক্ষে মিলিটারি কেতায় সুখাদ্য সহযোগে প্রকৃতির স্পর্শ মন্দ লাগল না। তেমন ঠান্ডা তো নেই। প্রসঙ্গত লে-র দিকে বৃষ্টিপাত প্রায় শূন্য, সব পাথুরে। কিন্তু নুব্রা উপত্যকার বালিয়াড়ি উট ইত্যাদি সহকারে মরুসদৃশ্য পরিবেশেও কিছুটা সবুজের স্নিগ্ধতা আছে।

বৃষ্টির সঙ্গে সহাবস্থান করেই আরেকটা দিন পরতাপুরের স্বপ্নালু আর্মির ফিল্ড ওয়ার্কশপ-এর এই অফিসার্স মেস-এ কাটাতে পারলে সিয়াচেন দেখার জন্যও ঠাঁইনাড়া হতে হয় না। বস্তুত নুব্রায় থাকার জন্য পরপর তিনদিনই চেয়েছিলাম; পাইনি। অগত্যা ২৭ জুলাই সকাল সকাল প্রাতরাশ সেরে গাড়িতে সব মালপত্র তুলেই সিয়াচেনের উদ্দেশে রওনা হতে হল। পথে নুব্রা উপত্যকারই সুমুর নামে একটা ছোটো শহরে ছিমছাম একটি অতিথি নিবাসে নিজেদের মালপত্র রেখে দিলাম।

সিয়াচেন বেস ক্যাম্প

সেই কাদায় ঘোলাটে নদী আর বাদামি ন্যাড়া পাহাড়ের মাঝখানে আঁকাবাঁকা পথ বেয়ে যাত্রা। পাহাড়ের গায়ে মাঝে মাঝে গুহা চোখে পড়ছিল। সুযোগ পেলেই ফেসবুকে সচিত্র দিনলিপি লিখে প্রাইভেসি সেটিং ‘ওনলি মি’ করে রাখি। আসলে ভ্রমণকাহিনির খসড়া তুলে রাখছি। সেই আবশ্যিক কাজ করার জন্য গাড়িতে উঠে মোবাইল দেখতে গিয়ে আমার প্রচণ্ড গা গুলিয়ে উঠল। যাঃ! ওষুধের ভাঁড়ার তো হোটেলে ঢুকিয়ে এসেছি। জলখাবার পুরোটাই উগরে ধাতস্থ হলাম। মিলিটারি খাতির হজম হয়নি। রাস্তায় সিয়াচেনের জন্য চেকপোস্টে দাঁড়িয়ে আবার আপশোশ।

ইস্! গতকাল গোটা ইউনিটের কম্যান্ডিং অফিসার কর্নেল নিজে এক ঝলক এসে আমাদের খোঁজ খবর নিয়ে গেছেন, পরেরদিন বুকিং হয়নি বলে মেসের দায়িত্বে থাকা ক্যাপ্টেন চারবার ফোন করে দুঃখপ্রকাশ করেছেন। কিন্তু চেকপোস্টে এসে আমার যে-প্রশ্ন জাগল, সেটা আগের দিন মাথাতেই এল না? আসলে কার্গিল যুদ্ধে পরতাপুরের ভূমিকা তো ভুলেই গিয়েছিলাম। যাঁর সবকিছু নখদর্পণে, সেই মহাশয় তো কিছু চাইতে জানেন না। ‘কুছ ভি চাহিয়ে তো বতা দিজিয়ে গা ম্যাডাম’-এর উত্তর দিতে ভুলটা আমারই হয়েছে। আসলে বেস ক্যাম্পের অধিক এগোনো যায়, ভাবিইনি। ধরেই নিয়েছি, সেখানেই হিমবাহ ও যুদ্ধক্ষেত্রের আরম্ভ।

যাইহোক, সিয়াচেন বেসক্যাম্পে গিয়ে সুদূরে তুষারাচ্ছাদিত পর্বতচূড়া দেখতে দেখতে কিটকিটে মিষ্টি চা ও মোমো খেলাম। ক্যাম্পের সুবেদার বেশ গপ্পোবাজ মানুষ। জানালেন, সিকিমে নাথুলায় যেমন বাবা মন্দির’ আছে এক সৈনিকের স্মৃতিতে, এখানেও তেমনই আছে আরেক বাবা মন্দির আরেক মৃত সৈনিকের স্মৃতিতে। ‘ওপি বাবা”। নাথুলার হরভজন সিং কিংবা সিয়াচেনের ওম প্রকাশ— এঁরা কেউ বীরচক্র পাওয়া যোদ্ধা নন। কিন্তু তাঁদের বিদেহী আত্মা সেনা ও সাধারণ মানুষকে বিপদ থেকে রক্ষা করে, এই বিশ্বাস আমাদের কাছে আষাঢ়ে গল্প শোনালেও সুকঠিন পরিস্থিতিতে জীবন-মরণের মাঝখানে দাঁড়ানো উর্দিপরা মানুষগুলোর মনোবলের একটা করে উৎস।

(ক্রমশ…)

মোক্ষলাভ (পর্ব-০১)

ভুজুং ভাজুং দিয়ে বৃদ্ধ বাবার থেকে জমি জায়গা সব নিজের নামে লিখিয়ে নিয়েও সুনীলের মনে শান্তি নেই। বোন যেভাবে ঘনঘন এসে বাবার কানে ফুসমন্ত্র দিতে শুরু করেছে, তাতে কোনও দিন না বাবা আগেকার দলিল বদলে মেয়েকেও অর্ধেক সম্পত্তি লিখে দেয়। তবে একটাই বাঁচোয়া, বাবার হাঁপের টান যেভাবে বাড়ছে, মনে হচ্ছে আর বেশিদিনের মেহমান নয়— এই শীতেই হয়তো একটা এসপার ওসপার হয়ে যাবে। ততদিন একটু ঠেকিয়ে রাখতে হবে বোনকে

শীত পড়তে শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কষ্টও বাড়ল সর্বেশ্বরের। সকাল সন্ধেয় তো হয়ই, গ্রন্থপাঠ করতে করতেও কাশতে থাকে নাগাড়ে। সঙ্গে আসে হাঁফের টান, একেক দিন রাতে ঠিকমতো ঘুমও হয় না। কিন্তু তবু কারও কথা শুনবে না, দুপুরে চান করে ঠাকুর দিয়ে আর সন্ধ্যায় আহ্নিক করার পর গীতাপাঠ চাই-ই। মানা করলে বলে গোটা জীবন করে এসেছি, এখন হুট করে কী করে ছাড়ি বল তো? গীতায় একটু তুলসী দিয়ে দু’ছত্র না পড়লে আমি যে মহাপাতকের ভাগী হব। এখন অবস্থা এমন হয়েছে যে, ডাক্তারের ওষুধেও তেমন কাজ হয় না। ক’দিন ধরে একদম শয্যাশায়ী হয়ে পড়েছে। সুনীল নিয়মরক্ষার্থে ওষুধ এনে দিলেও মনে মনে ঈশ্বরকে জানায়— তাড়াতাড়ি বাবাকে তুলে নাও ভগবান। তাহলে বাবাও বাঁচে আর আমিও বাঁচি।

দিনকয়েক পরে পাড়ার ঝন্টুর পিসিমা এল বিহারের গিরিডি থেকে বাপের বাড়িতে। বৃদ্ধের অবস্থা খারাপ শুনে দেখতে এল। কথায় কথায় বলল তার খুড়শ্বশুরের কথা। তারও হাঁপানির অসুখ ছিল। অবস্থা খারাপ হতে বাড়ির লোক তাকে বারাণসির মুক্তি ভবনে রেখে আসে। সেখানেই বারো দিনের মাথায় মারা যায়।

বাড়ি ছেড়ে কেন শেষ অবস্থায় বারাণসি নিয়ে গেল— জিজ্ঞেস করতে বলল, বারণসিতে দেহ রাখলে মোক্ষলাভ হয়, আর পুনর্জন্ম হয় না। তাদের ওদিকে অনেকে নাকি ওখানে গিয়েই শেষ নিঃশ্বাস ফেলে। শুনে ধর্মপ্রাণ মুমূর্ষু সর্বেশ্বর ছেলের কাছে বায়না ধরল সেও বারাণসিতে গিয়ে দেহ রাখবে। স্ত্রী থাকলে তবুও একটা কথা ছিল। কিন্তু সেও তো বছর বারো আগে অকালে ফাঁকি দিয়ে পালিয়েছে, এখন কার টানে ঘরে পড়ে থাকবে সে?

সুনীল দেখল এই সুযোগ, একবার বাবাকে বারাণসিতে সরিয়ে দিতে পারলে সব চিন্তা থেকে মুক্তি। তাই প্ৰথমে গেল মদন ডাক্তারের কাছে। জিজ্ঞেস করতে ডাক্তার বলল বৃদ্ধ আর কয়েকদিনের মেহমান, শরীরের যা অবস্থা আর যেভাবে শীত বাড়ছে তাতে তার আগেও যে কোনও দিন কিছু একটা হয়ে যেতে পারে। তারপর বউ-ছেলেমেয়ের অনিচ্ছা সত্ত্বেও সুনীল বোনকে না জানিয়ে বাবাকে নিয়ে বেরিয়ে পড়ল বারাণসির পথে।

ঝন্টুর পিসির নির্দেশ মতো দু’জনে গিয়ে হাজির হল বারাণসির মুক্তি ভবনে। ম্যানেজার ভৈরবনাথ শুক্লার সঙ্গে কথা বলে বাবার থাকার ব্যবস্থা করে ফেলল। তাকেও রয়ে যেতে হল শেষ ক’টাদিন বাবার দেখাশোনা করার জন্যে। ম্যানেজার কিন্তু জানিয়ে দিল চোদ্দ দিনের মধ্যে যদি মৃত্যু না হয় তাহলে বাবাকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে হবে। আত্মবিশ্বাসী সুনীল তাতেই রাজি হয়ে রয়ে গেল বাবার কাছে।

মুক্তি ভবনে টাকাকড়ি না লাগলেও খাওয়া থাকার অবস্থা তেমন ভালো নয়। ঘরগুলো জরাজীর্ণ, আসবাবপত্রের বালাই নেই, তক্তপোশের শক্ত বিছানায় শুয়ে মৃত্যুর অপেক্ষায় দিন গোনা। নিজের একটু কষ্ট হলেও সুনীল মনে মনে খুশিই হল— এই ভাবে থাকলে বাবার যাওয়া ত্বরান্বিত হবে।

ধীরে ধীরে দিন দশেক কেটে গেল সুনীলদের। কিন্তু বাবার অবস্থা একই রকম আর মৃত্যুর কোনও লক্ষণ না দেখে সুনীল তো প্রমাদ গুণল। আর চারদিনের মধ্যে বাবার যদি কিছু না হয়, তাহলে তো বাড়িতে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে হবে। তখন কী হবে? তার সব মেহনত বেকার তো হবেই, এত টাকা খরচ সব জলে যাবে। ভেবে ভেবে শেষে একটা উপায় বের করল। বিকেলবেলা ম্যানেজারের কাছে গিয়ে কেঁদে কেঁদে বলল— বাড়িতে বড়ো বিপদ, মায়ের শরীর খুব খারাপ, আজই তাকে একটু বাড়ি যেতে হবে, দু’দিন পরে চলে আসবে আবার। এদিকে কোনও অসুবিধা হবে না। পাশের রুমের বিদ্যামাসি এই দুটো দিন বাবাকে দেখবে বলেছে। এই বলে সুনীল সন্ধ্যায় ট্রেনে উঠে বসল। বাবাকে বুঝিয়ে বলে এল— ঘরে খুব বিপদ, দু’দিন পরেই ফিরে চলে আসব।

পরদিন সুনীল বাড়িতে ঢুকল কাঁদতে কাঁদতে। সবাইকে বলল গতকাল সকালে বাবা দেহ রেখেছে। দাহকাজ মিটিয়ে এখানে এসেছে। তারপর দিন দশেক পরে যথারীতি বাবার শ্রাদ্ধশান্তিও করল ঘটা করে। সবাই সুনীলের খুব প্রশংসা করল বাবাকে শেষ সময়ে মোক্ষধাম বারাণসিতে নিয়ে যাওয়ার জন্যে। বলল সর্বেশ্বর সত্যিই ভাগ্যবান, খোদ বিশ্বনাথের চরণে এমন মোক্ষলাভ ক’জনার ভাগ্যে জোটে?

এরপর কেটে গেছে প্রায় বছর খানেক। অজন্তা বাবার অবর্তমানে তেমন একটা আসে না বাপের বাড়ি। সুনীলও নিশ্চিন্তমনে নিজের সংসার গুছিয়ে বসেছে। বাবার বা বোনের নাম মুখেও আনে না।

একদিন সকালে সুনীল ঘুম থেকে উঠে মুখহাত ধুয়ে এসে দুয়ারে বসে সবে চায়ের কাপে একটা চুমুক দিয়েছে কী হঠাৎ কানে এল কারও ডাক— সুনীল কোথায় রে?

চেনা স্বর শুনে অবাক হল সুনীল। উঠে এসে বাইরে তাকিয়েই ভূত দেখার মতো চমকে উঠল— উঠোনে দাঁড়িয়ে বাবা। চেহারা আগের মতো থাকলেও শরীরে বেশ তরতাজা ভাব। সুনীল হাঁ করে তাকিয়ে রইল বাবার দিকে, অস্ফুটে মুখ থেকে বেরিয়ে এল, ‘তুমি বেঁচে আছো?”

—হ্যাঁ বেঁচে আছি। তুই কী ভেবেছিলি ? মরে গেছি, তাই না?” সুনীলের মুখে কথা নেই।

সুনীলের বউ সুমতিও বেরিয়ে এসেছিল। অবাক হয়ে বলে উঠল, ‘বাবা, তুমি বেঁচে আছো? তবে যে তোমার ছেলে…।’

—চুপ করো তো। আগে বাবাকে ভিতরে নিয়ে গিয়ে খেতে দাও, বলে তার মুখ বন্ধ করে বাবাকে নিয়ে চট করে ভিতরে ঢুকে গেল সুনীল। বুকটা ধকধক করছিল। উঠোনে মুখ বাড়িয়ে দেখল পাড়ার কেউ দেখেছে কিনা। কাউকে দেখতে না পেয়ে নিশ্চিন্ত হল। সুমতি বাবাকে মাদুর পেতে বসতে দিচ্ছিল।

—চলো, আগে বাবার জন্যে খাবার ব্যবস্থা করো বলে তাকে টেনে ভিতরে নিয়ে গিয়ে ফিসফিসিয়ে সাবধান করে দিয়ে বলল, বাবার শ্রাদ্ধশান্তির কথা একদম বলবে না। পরে বাবাকে সব বুঝিয়ে বলব।

(ক্রমশ…)

মর্যাদা হারাচ্ছে পর্যটন কেন্দ্রগুলো

আমাদের দেশের উত্তর হিমালয়ের পর্যটন স্পটগুলি কেবল যানজট এবং নতুন হোটেল তৈরির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে না, স্থানীয় মানুষের জন্যও সমস্যা তৈরি করছে। শান্তিতে অবসর যাপনের জন্য যারা ১০-২০ বছর আগে জমি-বাড়ি কিনেছিলেন প্রকৃতির কোলে, তারাও এখন চিন্তিত পর্যটন কেন্দ্রের নানারকম সমস্যার কারণে। অথচ নানারকম সমস্যার পরও পর্যটন কেন্দ্রের জমির দাম বাড়ছে ক্রমশ। কিন্তু মনে রাখতে হবে, প্রতিটি পর্যটন কেন্দ্র দেশের জন্য অর্থ উপার্জনের অন্যতম ক্ষেত্র, এটা অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু সেই পর্যটন ক্ষেত্র যদি মর্যাদা হারায়, তাহলে উদ্বেগ তো বাড়বেই।

পর্যটন ক্ষেত্রে হয়তো উপার্জন বাড়ছে কিন্তু যানবাহন থেকে নির্গত ধোঁয়া, গাছ কেটে হোটেল বানানো, নিয়ম না মেনে যত্রতত্র খাবারের দোকান বানানো, চারিদিকে আবর্জনার স্তূপ প্রভৃতির কারণে অনেক পর্যটন কেন্দ্র মর্যাদা হারাচ্ছে প্রতিদিন। গোয়া, কেরালা, গোটা কন্যাকুমারী, বলা যায় ভারতের সর্বত্র, যেখানে থেকে মানুষ আগে শান্তি পেত, বাণিজ্যিকরণের জন্য সেইসব পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে এখন দূষণ বাড়ছে। কিছু ছোটো গ্রামেও এখন ঘরে ঘরে নতুন হোটেল খোলা হচ্ছে কিংবা বহিরাগতরা গিয়ে ন্যাচারাল বিউটি নষ্ট করে বহুতল হোটেল তৈরি করছে।

গোয়াতে পুরোনো বাড়ির সামনে ঝোলানো বোর্ডে লেখা হয়েছে যে, ‘বাড়ির ছবি তুলে গোপনীয়তা নষ্ট করবেন না। ফোটোগ্রাফি নিষিদ্ধ।’ অথচ আগে পর্যটকদের খোলাখুলি স্বাগত জানানো হতো এই গোয়াতে। পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে হয়তো জমির দাম বেড়েছে, ছোটো গ্রামগুলিও আকর্ষণের কেন্দ্রে রয়েছে, কিন্তু পর্যটকরা এখন আর ততটা খুশি নন, যতটা আগে কোথাও বেড়াতে গিয়ে খুশি হতেন।

পর্যটকদের যেভাবে বোকা বানানো হচ্ছে, তা হয়তো আর বেশিদিন চলবে না। কারণ, পর্যটকরা একসময় জেনে যাবেন, কোন-কোন পর্যটন কেন্দ্র মর্যাদা হারিয়েছে। অনেক পর্যটন কেন্দ্রে মদ এবং মাদকের ব্যাবসাকে এতটাই বাড়িয়ে তোলা হয়েছে যে, সেইসব জায়গায় ২৪ ঘন্টা বেআইনি ভাবে এইসব ‘বিষ’ বিক্রি হচ্ছে।

আগে তীর্থস্থান ছিল চালকলা, ফুল-বেলপাতা আর দেবীদেবতার কেন্দ্র, আর এখন অনেক তীর্থস্থানে মদ, মাংস এবং দেহব্যাবসা চলে। আসলে, সব ক্ষেত্রেই চলছে বাড়াবাড়ি। আর এই বাড়াবাড়ির অবসান কোনওদিন সম্ভব কিনা, তা আমরা কেউ জানি না।

জীবন রং-বেরং (শেষ পর্ব)

অসহ্য গরমের পর ঝেপে বৃষ্টি নামলে শরীরে এবং মনে যে-শান্তি আসে, পৃথার কথা শুনে অভিজিতেরও সেই অনুভূতি হল হঠাৎ। এমন সময় আবার মিহিরের ফোন। ফোনটা রিসিভ করে মিহিরের কথা শোনার পর অভিজিৎ জানালেন, ‘না, আমরা শপিং করিনি। মুম্বইয়ের কলিগরা কাজে আটকে গেছে, শপিং-এ আসতে পারবে না জানিয়েছে। আমরা তোমার জন্য মল-এর বাইরে বেঞ্চ-এ অপেক্ষা করছি। তুমি গাড়ি নিয়ে এসো।’

এক সন্ধেবেলা মিহির বাড়ি ঢুকল হাসি মুখে। একটা প্রিন্টেড পেপার পৃথা-র হাতে দিয়ে বলল, ‘দ্যাখো এটা, আমার প্রোমোশন লেটার।’

পৃথা প্রোমোশনাল লেটারটি খুলে এক ঝলক দেখে বলল, ‘বাহ্, দারুণ ব্যাপার, কনগ্র্যাচুলেশনস।’

—‘স্যালারিও বেড়েছে অনেকটাই”, বলেই পৃথাকে জড়িয়ে ধরে চুমু খেল মিহির।

পৃথা বলল, ‘রেস্তেরাঁয় খাওয়াতে হবে কিন্তু।’

—চলো, আজই যাব। রেডি হয়ে নাও।’ জানাল মিহির।

সত্যিই সেদিন পৃথাকে নিয়ে গিয়ে একটা বড়ো রেস্তোরাঁয় ডিনার করিয়েছিল মিহির। আর সেদিনের শপিং মল-এর বাইরের বেঞ্চে বসে যে-জীবনকাহিনি শুনেছিল অভিজিতের থেকে, রাতে মিহিরের পাশে শুয়ে সবটাই জানিয়েছিল পৃথা। সব শুনে মিহির বলল, ‘স্যার-এর জীবনে যা ঘটেছে তা সত্যিই বেদনাদায়ক। কিন্তু কী আশ্চর্য, স্যার-এর জীবনে যে, এত বড়ো ঝড় বয়ে গেছে, তা আমরা অফিসে এতটুকুও টের পাইনি। তাই, সব শুনে যেন অবিশ্বাস্য লাগছে।”

—এটাই সত্যি। তাই, তোমাদের বস্ মহিলাদের সঙ্গে ককটেল পার্টিতে গেলেও, একটা চাপা ঘৃণার ভাব রয়েছে মহিলাদের প্রতি। কারণ, সব মেয়েকে দেখে এখন তাঁর স্ত্রী বিদিশার মতো প্রতারক মনে হয়। আমি পুরোনো বন্ধু বলেই হয়তো তাঁর ধারণা কিছুটা হলেও বদলাতে পেরেছি।’ কথাগুলো মিহিরকে জানাল পৃথা।

একটু থামার পর পৃথা মিহিরকে বলল, ‘একটা কথা বলব?”

—’হ্যাঁ বলো…’

—যদি তুমি অনুমতি দাও তো আমি তোমার বস্-এর সঙ্গে ফোনে মাঝেমধ্যে কিছু কথা বলব, মানুষটা বড়ো দুঃখী। আমি কথা বললে তোমার খারাপ লাগবে না তো?’

পৃথার কথার উত্তরে মিহির জানাল, ‘দ্যাখো, তুমি আমার স্ত্রী। আমরা ভালো বন্ধুও পরস্পরের। আমাদের সম্পর্কে বিশ্বাস এবং ভালোবাসা রয়েছে। তোমার উদ্যোগে যদি আমার বস্-এর জীবনে কোনও পরিবর্তন আসে, তাহলে আমার ভালো লাগবে। বন্ধু হিসাবে তোমাকে ভরসা করে তিনি যখন সবকিছু জানিয়েছেন। তাই তুমি যদি দশটা কথা বলে কাউন্সেলিং করো, তাহলে আমি কেন মন খারাপ করব? এতে আমার পূর্ণ সম্মতি রইল।’

মিহির তার প্রতি বিশ্বাস এবং আস্থা রাখার জন্য খুব ভালো লাগল পৃথার এবং আবার নতুন করে বুঝতে পারল, তাদের দাম্পত্য সত্যিই সুখের।

এক ছুটির দিনে সকালে মিহির এবং পৃথা দু’জনে পরিকল্পনামাফিক পৌঁছে যায় অভিজিতের ফ্ল্যাটে। দরজা খুলে অভিজিৎ প্রথমে একটু ঘাবড়ে যায় ওদের দেখে…!

—তোমরা হঠাৎ!”

—সারপ্রাইজ ভিজিট। ভিতরে আসতে বলবে না?’ হাসতে হাসতে জানাল পৃথা।

উত্তরে অভিজিৎ জানালেন, “তোমরা এসেছ দেখে খুবই ভালো লাগছে। আসলে ঘরে সব অগোছালো তো…। আচ্ছা, এসো তোমরা ভিতরে।”

ঘরে ঢুকে পৃথা দেখল, বসার ঘরের সোফার উপর মদের বোতল, গেলাস, ছাইদানি সব ছড়ানো রয়েছে। অভিজিৎ কিছুটা লজ্জা পেয়ে গিয়ে সবকিছু অন্য ঘরে সরাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন এবং ওদের সোফায় বসার ব্যবস্থা করে দেন।

—স্যার, আমি একটু আসছি। গাড়িটা লক করতে ভুলে গেছি বলে ছুতো করে সরে যায় মিহির। আসলে পৃথার সঙ্গে এই পরিকল্পনা করে রেখেছিল মিহির। যাতে ওর বস্ নিরিবিলিতে পৃথার সঙ্গে দুটো মনের কথা বলে হালকা হতে পারেন নির্দ্বিধায়।

—কী খাবে, চা নাকি কফি?’ প্রশ্ন করল অভিজিৎ।

—একটু আগেই আমরা চা খেয়ে বেরিয়েছি। বরং ব্যস্ত না হয়ে তুমি বোসো, একটু কথা বলি। জানাল পৃথা।

অভিজিৎ একটা চেয়ার টেনে বসল পৃথার সামনে। তারপর পৃথা বলতে শুরু করল, ‘তোমার আঁকার নেশাটাকে বাড়াও অভিজিৎ। আমি খুব খুশি হব যদি তুমি আগের মতো রং তুলি নিয়ে ব্যস্ত থাকো।”

খুব বিষাদমাখা কণ্ঠে অভিজিৎ জানাল, ‘এখন আর ধৈর্য রাখতে পারি না আঁকতে গিয়ে।”

—কিন্তু জীবনটা তো আর সাদা-কালো করে রাখতে পারো না তুমি। ভুলে যাও কী ঘটেছে। যে তোমায় ঠকিয়েছে, তাকে জিততে দিও না। তুমি এভাবে দিন কাটালে আদতে বিদিশা-ই জিতে যাবে। জীবনের রং ছড়িয়ে দাও তোমার ক্যানভাসে।” —এমন আরও অনেক প্রেরণামূলক কথা বলে অভিজিতের আরও ভালো বন্ধু হয়ে উঠেছিল পৃথা।

এরপর মাঝেমধ্যে পৃথা ফোনে কথা বলত অভিজিতের সঙ্গে। একদিন মিহির এবং পৃথা একটা পেইন্টিং এগজিবিশন-এ নিয়ে যায় অভিজিৎ-কে। আর ওই প্রদর্শনীতে গিয়ে মন ভালো হয়ে যায় অভিজিতের এবং তিনি যেন নতুন ভাবে মানসিক শক্তি সঞ্চয় করেন। এরপর অবসর সময়ে রং-তুলি নিয়ে ব্যস্ত থাকতে শুরু করেন অভিজিৎ।

সময় বয়ে চলে। এভাবেই মিহির এবং পৃথার সঙ্গে অভিজিতের বন্ধুত্ব আরও গাঢ় হয়। কিন্তু হঠাৎই মুম্বই ট্রান্সফার হয়ে যান অভিজিৎ। স্বাভাবিক ভাবে যোগাযোগ কিছুটা কমে যায় তাদের মধ্যে। এরই মধ্যে একদিন হঠাৎ একটা চিঠি এল ক্যুরিয়ার-এ। খামের উপর মিহির এবং পৃথা-র নাম লেখা।

চিঠি খুলে ওরা দেখল, অভিজিতের চিঠি। তাতে লেখা—

প্রিয় মিহির ও পৃথা,

দূরভাষে এই খুশির খবরটা দিতে ইচ্ছে হল না, তাই চিঠিতে জানাচ্ছি। এটা রেখে দিও যত্নে। তোমাদের প্রতি এ আমার কৃতজ্ঞতা স্বীকার। তোমাদের প্রেরণায় আমি নতুন জীবন পেয়েছি। সবাই যে বিদিশা নয়, তার প্রমাণ পেয়েছি আমি। তোমাদের প্রেরণায় আমি জীবনে নতুন করে পেয়েছি সাগরিকাকে। ও ছবি আঁকে আমার মতো। আমরা বিয়ে করব আগামী সপ্তাহে। আর ওই বিয়ের রিসেপশন-এ আমাদের একটা যৌথ চিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন থাকবে। উদ্বোধক হিসাবে চাই তোমাদের দু’জনকে। আমি ফ্লাইট -এর টিকিট পাঠিয়ে দেব। তোমাদের দু’জনকেই আসতে হবে।

—অভিজিৎ ও সাগরিকা।

চিঠিটা পড়ার পর মিহির এবং পৃথা দু’জনে আনন্দে জড়িয়ে ধরল পরস্পরকে। তারপর মিহিল বলল, ‘পৃথা তুমি জিতে গেছ। তোমার উদ্যোগ সফল। সত্যিই গর্ব হচ্ছে তোমার জন্য।”

সেদিন আনন্দে আবার ওরা ডিনার করেছিল একটা বড়ো রেস্তোরাঁয়।

(সমাপ্ত)

মনসুন-এ মুখরোচক স্ন্যাকস (শেষ পর্ব)

মশালা-রাইস বড়া, ক্যাপসিকাম ললিপপ, কাঁচকলার কাবাব এবং সুজি শসার চপ-এর  রেসিপি পরিবেশন করছি আমরা।

মশালা-রাইস বড়া

উপকরণ: ২ কাপ ভেজানো চাল, ২ বড়ো চামচ কর্নফ্লাওয়ার, ৩টে আলু সেদ্ধ, ১টা বড়ো পেঁয়াজের কুচো, ২টো কাঁচালংকার কুচো, ১ ছোটো চামচ আদাকুচো, হাফ চামচ আমচুর, হাফ চামচ লাললংকার গুঁড়ো, হাফ ছোটো চামচ চাটমশালা, হাফ ছোটো চামচ গরমমশালা, ২ বড়ো চামচ সেদ্ধ ছোলা, পরিমাণ মতো তেল এবং নুন স্বাদমতো।

প্রণালী: সেদ্ধ আলুর খোসা ছাড়িয়ে নিয়ে রাখুন। ১টা সেদ্ধ আলু কেটে ছোটো ছোটো টুকরো করে নিন এবং বাকি ২টো আলু চটকে নিন ভালো ভাবে। ভেজা চাল মিক্সিতে পেস্ট বানিয়ে নিন। এরপর চটকানো আলুর সঙ্গে চালের পেস্ট এবং কর্নফ্লাওয়ার মেশান। ওর সঙ্গে পেঁয়াজকুচো, আদাকুচো, লংকাকুচো, আমচুর, চাটমশালা, গরমমশালা মিশিয়ে নিয়ে ছোটো ছোটো রিং তৈরি করে রাখুন। এরপর কড়াইতে তেল গরম করে, আলু-চালের রিংগুলো ভাজুন হালকা আঁচে। বাদামি রং ধারণ করলে নামিয়ে নিন রিং এবং আলু-ছোলার টুকরোয় গোলমরিচ ছড়িয়ে দিয়ে, চাটনির সঙ্গে মশালা-রাইস বড়া গরম গরম পরিবেশন করুন।

ক্যাপসিকাম ললিপপ

উপকরণ: হলুদ এবং লাল রঙের ক্যাপসিকাম ২টো, ১ কাপ সুজি, হাফ কাপ সেদ্ধ আলু, ২ বড়ো চামচ অ্যারারুট, ১ ছোটো চামচ কাঁচালংকার গুঁড়ো, হাফ চামচ লাললংকার গুঁড়ো, ১টা পেঁয়াজকুচো, হাফ কাপ শসা টুকরো, হাফ কাপ ধনেপাতাকুচো, আদাকুচো ১ চামচ, ১ চামচ চাটমশালা, শুকনো লংকার কুচি ২ চামচ, ১ ছোটো চামচ চাট মশালা, হাফ কাপ ধনেপাতার চাটনি, পরিমাণ মতো তেল, আইসক্রিম-স্টিকস এবং নুন স্বাদমতো।

প্রণালী: ক্যাপসিকাম কেটে টুকরো করে রাখুন। এরপর সুজি, সেদ্ধ আলু চটকে ভালো ভাবে মিশিয়ে নিন। এর সঙ্গে অ্যারারুট এবং সমস্ত মশালা মিশিয়ে নিয়ে ১০ মিনিট ঢাকা দিয়ে রেখে দিন। দশ মিনিট বাদে ওই মিশ্রণ থেকে ছোটো ছোটো বল বানিয়ে চ্যাপ্টা আকার দিন। কড়াইতে তেল গরম করুন এবং হালকা আঁচে ভাজুন। বাদামি বর্ণ নিলে নামিয়ে নিন এবং প্রত্যেকটিতে আইসক্রিম স্টিকস গেঁথে, ললিপপ-এর আকার দিয়ে, ধনেপাতার চাটনি এবং টম্যাটো সস দিয়ে গরম গরম পরিবেশন করুন।

 

কাঁচকলার কাবাব

উপকরণ: ৬টা কাঁচকলা, ২ টো বড়ো আলু সেদ্ধ, ২ বড়ো চামচ ময়দা, ৪টে স্লাইস ব্রেড, ১ ছোটো চামচ লাললংকার গুঁড়ো, ১ ছোটো চামচ চাটমশালা, ২টো কাঁচালংকার কুচো, ২ বড়ো চামচ সুজি, পরিমাণমতো তেল এবং নুন স্বাদমতো।

প্রণালী: কাঁচকলা সেদ্ধ করে নিন। ব্রেডগুলো জলে চুবিয়ে নিয়ে জল ঝরিয়ে রাখুন। এরপর কাঁচকলা চটকে নিয়ে ওর সঙ্গে ময়দা, সুজি, কাঁচালংকার কুচো, লাললংকার গুঁড়ো, চাটমশালা, জিরেগুঁড়ো এবং নুন মেশান স্বাদমতো। প্রয়োজন হলে সামান্য জল মিশিয়ে মাখুন। এবার ওই মিশ্রণ দিয়ে ছোটো ছোটো বল তৈরি করে রাখুন। কড়াইতে সামান্য তেল গরম করে হালকা আঁচে উলটে-পালটে ভাজুন। বাদামি বর্ণ ধারণ করলে কাসুন্দি, চিলি সস কিংবা ধনেপাতার চাটনির সঙ্গে গরম গরম পরিবেশন করুন।

সুজি শসার চপ

উপকরণ: ২ টো বড়ো শসা, ১ কাপ সুজি, ১ কাপ দই, ১টা বড়ো পেঁয়াজ, ২ কাপ ধনেপাতা কুচো, ২ টো কাঁচালংকা কুচো, ১ ছোটো চামচ আদাকুচো, ১ ছোটো চামচ চাটমশালা, ১ ছোটো চামচ লাললংকার গুঁড়ো, হাফ ছোটো চামচ বেকিং সোডা, পরিমাণ মতো তেল এবং নুন স্বাদ অনুসারে।

প্রণালী: শসা কুরে নিয়ে, ওর সঙ্গে সুজি এবং দই মেশান। এরসঙ্গে কাঁচালংকা, আদাকুচো, চাটমশালা, লাললংকার গুঁড়ো এবং ধনেপাতা কুচি ভালো ভাবে মিশিয়ে ১৫ মিনিট ঢাকা দিয়ে রেখে দিন। পনেরো মিনিট পর ওই মিশ্রণ ছোটো ছোটো লেচির আকার দিয়ে রাখুন। ফ্লাইং প্যান-এ সামান্য তেল গরম করে শসা-সুজির লেচি হালকা আঁচে ভাজুন উলটে-পালটে। বাদামি রং নিলে নামিয়ে নিন এবং স্লাইস পেঁয়াজ ও টম্যাটো সস দিয়ে গরম গরম পরিবেশন করুন।

মনসুন-এ মুখরোচক স্ন্যাকস (পর্ব-০১)

বৃষ্টিদিনে মুখরোচক কিছু খেতে ইচ্ছে করে সবারই। তাই, মুচমুচে টম্যাটো ফ্ৰাই, ব্রেড চপ, লাউ-পালং পকোড়া এবং আলু-পনির পকোড়া-র রেসিপি পরিবেশন করছি আমরা।

মুচমুচে টম্যাটো ফ্ৰাই

উপকরণ: ৪টে পাকা টম্যাটো, ধনে পাতার চাটনি হাফ কাপ, ১ কাপ বেসন, ১ বড়ো চামচ চালের গুঁড়ো, গোলমরিচের গুঁড়ো হাফ চামচ, হাফ চামচ আজোয়ান, ১ ছোটো চামচ ‘সুমন’ ব্র্যান্ড জিরে গুঁড়ো, সামান্য হিং, ১ চামচ চাটমশালা, পরিমাণ মতো তেল এবং নুন স্বাদ অনুসারে।

প্রণালী: টম্যাটো পাতলা করে কেটে নিন। প্রতিটা টম্যাটোকে চারটি করে স্লাইস করবেন। কাটা টম্যাটোতে ধনে পাতার চাটনি মাখিয়ে রেখে দিন। একটা পাত্রে বেসন এবং চালের গুঁড়ো নিয়ে, ওর সঙ্গে চাটমশালা, স্বাদ বাড়ানোর জন্য ‘সুমন’ ব্র্যান্ড জিরেগুঁড়ো, গোলমরিচের গুঁড়ো, আজোয়ান এবং স্বাদমতো নুন মিশিয়ে নিয়ে অল্প জল দিয়ে মেখে রাখুন। ওই মিশ্রণ অন্তত ১০ মিনিট ঢাকা দিয়ে রেখে দিন। এরপর কড়াইতে তেল দিয়ে গরম করুন। তেল গরম হয়ে গেলে, ধনেপাতা মাখানো টম্যাটোর পিসগুলো এক এক করে বেসন ও চালের গুঁড়োর গ্রেভিতে চুবিয়ে তেলে ভাজুন মধ্যম আঁচে। লালচে রং এসে গেলে টম্যাটো ভুজিয়া তৈরি। টম্যাটো সস-এর সঙ্গে গরম গরম পরিবেশন করুন।

ব্রেড চপ

উপকরণ: স্লাইস ব্রেড ৬ পিস, ২ টো বড়োমাপের আলু সেদ্ধ, ১ কাপ বেসন, ১ ছোটো চামচ কাঁচালংকাকুচো, ১ ছোটো চামচ আদাকুচি, বিটনুন হাফ চামচ, হাফ চামচ গোলমরিচের গুঁড়ো, হাফ চামচ লাললংকাগুঁড়ো, হাফ চামচ জিরেগুঁড়ো, ১ ছোটো চামচ চাটমশালা, ২ বড়ো চামচ ধনেপাতার চাটনি, ২ বড়ো চামচ তেঁতুলের লেই, ১টা বড়োমাপের পেঁয়াজ কুচো, ১টা বড়োমাপের টম্যাটো কুচো, ১ বড়ো চামচ ধনেপাতা কুচি, ২ বড়ো চামচ তেল এবং নুন স্বাদমতো।

প্রণালী: স্লাইস ব্রেডগুলো জলে চুবিয়ে নিয়ে তুলে রাখুন ২ মিনিট। ব্রেড-এর গা থেকে জল ঝরে গেলে, ওর সঙ্গে সেদ্ধ আলু, কাঁচালংকাকুচো, জিরেগুঁড়ো, গোলমরিচের গুঁড়ো, আদাকুচি, চাটমশালা এবং বেসন ভালো ভাবে চটকে মিশিয়ে নিন। এবার ওই মিশ্রণকে ছোটো ছোটো চ্যাপ্টা আকার দিয়ে রাখুন। এরপর ফ্রাইং প্যান-এ তেল গরম করে হালকা আঁচে ভাজুন এবং বাদামি বর্ণ ধারণ করলে নামিয়ে নিন। ওর উপর বিটনুন, পেঁয়াজকুচি, টম্যাটোকুচি ছড়িয়ে দিয়ে, ধনেপাতার চাটনি এবং তেঁতুলের লেই সহযোগে গরম গরম পরিবেশন করুন।

লাউ-পালং পকোড়া

উপকরণ: কুচো করা তিন কাপ লাউ, পালং শাক কুচো করা দু’কাপ, ২টো কাঁচালংকার কুচো, হাফ কাপ বেসন, ১ ছোটো চামচ জিরেগুঁড়ো, হাফ চামচ আমচুর, সামান্য হিং, হাফ কাপ পেঁয়াজপাতা কুচো, ভাজার জন্য পরিমাণ মতো তেল এবং স্বাদমতো নুন।

প্রণালী: লাউয়ের কুচো এবং পালং শাকের কুচো ভালো ভাবে ধুয়ে জল ঝরিয়ে রাখুন। এর সঙ্গে কাঁচালাংকার কুচো, গোলমরিচের গুঁড়ো, জিরেগুঁড়ো, আমচুর, হিং, পেঁয়াজপাতা এবং বেসন মিশিয়ে নিয়ে ছোটো ছোটো বল তৈরি করুন। এবার কড়াইতে তেল গরম করে হালকা আঁচে ভাজুন এবং বাদামি রং এসে গেলে নামিয়ে নিয়ে ধনেপাতার চাটনি কিংবা টম্যাটো সস সহযোগে গরম গরম পরিবেশন করুন।

আলু-পনির পকোড়া

উপকরণ: ২৫০ গ্রাম পনির, চারটে বড়ো আলু সেদ্ধ, ২ বড়ো চামচ ময়দা, ২ বড়ো চামচ কর্নফ্লাওয়ার, ১ ছোটো চামচ কাঁচালংকার পেস্ট, ১ ছোটো চামচ আদাপেস্ট, হাফ চামচ গরমমশালা, হাফ ছোটো চামচ হলুদগুঁড়ো, ১ ছোটো চামচ লেবুর রস, হাফ কাপ ধনেপাতা কুচো, হাফ চামচ গোলমরিচের গুঁড়ো, হাফ ছোটো চামচ লাললংকার গুঁড়ো, পরিমাণ মতো তেল এবং নুন স্বাদমতো।

প্রণালী: পনিরকে হালকা ভেজে নিয়ে চটকে রাখুন। ওর সঙ্গে সেদ্ধ আলু, ময়দা, কর্নফ্লাওয়ার পাউডার, কাঁচালংকার পেস্ট, আদার পেস্ট, হলুদগুঁড়ো, গোলমরিচের গুঁড়ো, ধনেপাতার কুচো, লেবুর রস, গরমমশালা এবং স্বাদমতো নুন মিশিয়ে নিয়ে রেখে দিন কিছুক্ষণ। এরপর হাতের তালুতে সামান্য তেল লাগিয়ে, ভালো ভাবে মেশানো ওই উপকরণকে ছোটো ছোটো আকার দিয়ে রাখুন। কড়াইতে তেল গরম করুন। ভালো ভাবে তেল গরম হয়ে গেলে, সমস্ত উপকরণ দিয়ে তৈরি ওই ছোটো ছোটো বলগুলোকে হালকা আঁচে ভাজুন। বাদামি রং ধারণ করলে কড়াই থেকে তুলে নিন। এরপর ধনেপাতার চাটনি কিংবা টম্যাটোর চাটনি দিয়ে গরম গরম পরিবেশন করুন।

(ক্রমশ…)

নুব্রা উপত্যকা (পর্ব-০৩)

পাকিস্তান সীমান্ত ঘেঁষা নৈসর্গিক গ্রাম বলে শুধু নয়, ‘বালটি’ সংস্কৃতির অঙ্গ বলে তুরতুকের একটা ভৌগোলিক ও নৃতাত্ত্বিক গুরুত্বও আছে। বিল মিটিয়ে মালপত্রসহ গাড়িতে উঠলাম। পরবর্তী রাত্রিবাস নুব্রা উপত্যকায় হলেও, হুন্দর অঞ্চলে নয়। শেয়োক অ্যাক্সিস ওয়ার মেমোরিয়াল।

রাস্তায় পড়ল ‘সিয়াচেন যুদ্ধ স্মারক’ (Siachen War Memorial) ফলকিত একটা ফটক। যুদ্ধসাজে দণ্ডায়মান ৫ সেনা জওয়ানের মূর্তি সাজানো। ৫০ টাকা করে টিকিট কেটে সেখান থেকে খানিক দূরে সামান্য চড়াই ধরে গিয়ে শেয়োক অ্যাক্সিস ওয়ার মেমোরিয়াল (Sheyok Axis War Memorial) হল দ্রষ্টব্য।

কয়েকজন সাইকেল চালাচ্ছিল। ফেরার ঢালু পথে আমার চোখের জিজ্ঞাসা পড়ে একজন আরোহী ‘চালাইয়ে চালাইয়ে’ বলে সাগ্রহে নিজের সাইকেল ধরিয়ে দিল। তার ভদ্রতায় আমি অভিভূত। অনভ্যাস নিয়ে পাহাড়ি রাস্তায় চালাতে নিজে সাহস পেলাম না। সেটা চালিয়ে টিকিট কাউন্টারের কাছে ফিরে এসে ৫০ টাকা সাইকেল ভাড়া মেটালাম! ছেলেটাকে ধারে কাছে দেখা গেল না। যাইহোক, আমাদের গন্তব্য ছিল তুরতুক গ্রাম।

শেওক নদীকে পাশে নিয়ে ছুটে চলেছি। ভয়ানক রাস্তা। কোথাও ধস নেমেছে। এক কিলোমিটার দীর্ঘ যানযটে দুই ঘণ্টার বেশি আটকে গেলাম। উঁচু নিচু খোঁচা খোঁচা পাথুরে রাস্তায় চলতে চলতে রিগজিনকে শুধোলাম, ‘স্টেপনি হ্যায় না সাথমে?’ ও হোহো করে হেসে বলল, ‘আজ তক কিসিনে পুছা নহী। চলিয়ে আপনে সোচ তো লিয়া।”

তুরতুক গ্রাম

কিছুদূর পরেই পিচরাস্তা পড়ল। কিন্তু গাড়ি যেখানে থামল সেখানে কোথায় গ্রাম, আর কোথায় নিসর্গ? পথশ্রমে ক্লান্ত শরীর জুড়োব ভেবেছিলাম। কিন্তু সিঁড়ি বেয়ে নদী, নদীর উপর সেতু, তার ওদিকে সিঁড়ি, আর সেই সিঁড়ি ভেঙে নাকি গ্রাম, যার নমুনাস্বরূপ ভাঙাচোরা ঘরবাড়ি আর বিশেষ ধরনের পোশাক, গোঁফদাড়ি ও অভিব্যক্তির মানুষজন ছাড়া দর্শনীয় কিছু চোখে পড়ল না। এসেছি যখন গাড়ি থেকে নামতেই হল। সাঁকোও পেরোতে হল। তারপর দুইদিকে দুই সারি সিঁড়ি দেখে কোন দিকে যাই ভাবতেও হল। শেষে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেওয়ার উপায় যেখানে কাছাকাছি, সেইদিকেই বাঁক নিলাম। তবে ব্যবস্থা দেখে বিয়োগবাসনায় ব্যাকুল জল ব্লাডার ছেড়ে মাথার দিকে ধাওয়া করল। শুভঙ্কর কাজ সারতে পারলেও আমরা মা-মেয়ে নাকমুখ মাস্কে ঢেকে ফিরে এলাম।

জায়গাটা আসলে বালটিস্তানের অঙ্গ, যা পাকিস্তানের দখলে ছিল। ভারতের বিস্তৃতি একদা আফগানিস্তান (গান্ধার) পর্যন্ত ছিল। ১৮৭৬ সাল ব্রিটিশ ভারত থেকে আফগানিস্তান বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় সেই ইতিহাস বর্তমানে প্রাগৈতিহাসিক। একটি ভাঙাচোরা বাড়ি নাকি সংগ্রহশালা বা মিউজিয়াম। তার বাইরে তিনজন মহিলা মজাদার বাচ্চা কোলে। কী মজাদার দেখতে বাচ্চাগুলোকে! ছবি তুলতে যেতেই মেয়েরা বাচ্চা দিয়ে নিজেদের মুখ আড়াল করে ফেলছিল। এই ভগ্নকুটিরে প্রবেশের মূল্য ৫০ টাকা শুনে ফিরে আসব কিনা ভাবছিলাম। কিন্তু বাইরে বসা এক মিষ্টিমুখো মেয়ের মুখে নারী পরিচালিত সংগ্রহশালা শুনে টিকিট কেটে ঢুকেই পড়লাম।

নানা ধাতব গয়না, তৈজসপত্র, পোশাক থেকে ঘরসংসারের নানা জিনিস বেশ আগ্রহভরে দেখাল টিকিট বিক্রেতা তথা গাইড। একটা প্রাচীন বাড়িকেই মিউজিয়াম বানানো হয়েছে। বাচ্চা রাখার স্থান দেখলে আঁতকে উঠতে হয়। ওর মুখের কথাই হল ‘উন দিনো’ এমন হতো বা এমন ছিল না। কিন্তু সেইসব দিন বলতে কোনসব দিন, সেসব কিছু জানে না। পুরুষদের অমতে তুরতুকের মেয়েরা নিজেদের সংগ্রহে যার যা ছিল, তাই দিয়ে এই তথাকথিত মিউজিয়াম তৈরি করেছে। সম্ভবত সেইজন্য কোন ‘উন দিলোঁ’ হাজার খ্রিস্টাব্দের আর কোন “উন দিনোঁ’ নিজের শাশুড়ির আমলের, সেই বিষয়ে ধারণা নেই। বাড়ির যাবতীয় কাজের বর্ণনায় ‘শাশুমা’ হলেন কেন্দ্রীয় চরিত্র। পিতৃতন্ত্রে ‘শাশুমা’দের প্রায়ই খলনায়িকার ভূমিকায় দেখা গেলেও, ওই মেয়েটির বর্ণনায় শাশুড়িরা হলেন পরিবারের কেন্দ্রবিন্দু।

ওই ভাঙাচোরা পথে আরেকটু এগিয়ে ‘রাগবো প্যালেস’। সেখানেও ৫০ টাকার টিকিট। ঈগলের কাষ্ঠ-মূর্তি বসানো দরজা দেখে কৌতূহল হলেও ঝরঝরে কাদার ‘রাজপ্রাসাদ’-কে আর সময় দেওয়া গেল না। প্রমিলা পরিচালিত সংগ্রহশালায় অনেকটা সময় গেছে, তলপেটে জলের চাপও প্রবল। কিছুটা ফিরে এবার উলটোদিকের সিঁড়ি ধরলাম। সিঁড়ির ধাপে ধাপে তথাকথিত ‘বালটি কুইজিন’-এর দোকান। ভেতো বাঙালিসহ বেশকিছু দেশি পর্যটক গোগ্রাসে গিলছে। আমরা বেশ দুর্গম স্থানে হলেও তুলনায় চলনসই শৌচালয় পেয়ে কাজ সেরে নিলাম। জল ত্যাগ করে দেহে বল পেয়ে আমি সিঁড়ি বেয়ে ওইদিকে আরও উঠে গ্রাম দেখতে ইচ্ছুক হলেও এবং কন্যারও আপত্তি না থাকলেও, আমার বর ক্লান্ত ক্ষুধার্ত দেহে আর এক পাও এগোতে রাজি হল না। দুটো বেজে গেছে।

উপর থেকে ফিরতি পর্যটকদের জনে জনে জিজ্ঞাসা করেও উপরে দর্শনীয় কী, জানা গেল না। কয়েকজন বাঙালিকে ভাগ্যক্রমে পেয়ে জানলাম, সেখানেও নাকি ‘মিউজিয়াম’। গাড়িতে ফেরার পর রিগজিন-এর কাছে জানলাম, আরও কয়েকশো সিঁড়ি চড়লে নাকি পোলো গ্রাউন্ড ও কিছু নিসর্গ ছিল। তাই তো! পোলো খেলার উৎপত্তিই তো এই অঞ্চলে। কিন্তু এমন ঘিঞ্জি দুর্গম দুর্গন্ধময় পথে এগোতেই ইচ্ছা করছিল না। পোলো ময়দান দেখতে হলে হেলিকপ্টারে আসতে হয়।

(ক্র্মশ……)

পড়ার জন্য সীমাহীন গল্প-নিবন্ধসাবস্ক্রাইব