জীবন রং-বেরং (পর্ব-০২)

মিহিরের কথা শুনে গাড়ির ব্রেক কষলেন অভিজিৎ। তারপর বললেন, ‘নো প্রবলেম। বরং ভালোই হল। এখানে গাড়িটা ভালো ভাবে, নিশ্চিন্তে পার্ক করা যাবে। শপিং মল-এর পার্কিং খুব বাজে, বেরোতে সময় লেগে যায়। আর এইটুকু তো রাস্তা। আমি আর পৃথা হেঁটে মল-এর দিকে এগোচ্ছি। তুমি গাড়িটা পার্ক করে এসো।”

মিহির গাড়ি পার্ক করতে চলে গেল বস্-এর কথামতো। আর অভিজিৎ এবং পৃথা পাশপাপাশি হাঁটতে শুরু করল। এমন সময় হঠাৎ-ই অভিজিতের মোবাইল ফোন বেজে উঠল। ফোনে কথা যখন শেষ হল, তখন ওরা পৌঁছে গেছে শপিং মল চত্বরে। কথা শেষ করে অভিজিৎ জানালেন পৃথাকে, ‘মুম্বই থেকে আসা আমাদের কলিগরা আর শপিং করতে আসতে পারবে না, কাজে আটকে গেছে। চলো পৃথা, মিহির না আসা পর্যন্ত ওই সামনের বেঞ্চে গিয়ে বসি।’

এক সময় অভিজিৎ ক্রাশ ছিল পৃথার। তবুও আজ এতদিন পর অভিজিতের পাশে বসতে কেমন যেন একটু বাধো বাধো লাগছে তার। কারণ, সে এখন মিহিরের স্ত্রী, সুখের দাম্পত্য। অবশ্য এসব ভাবনার মধ্যেও সে কখন যেন বসে পড়েছে অভিজিতের পাশে। কয়েক সেকেন্ড দু’জনে চুপচাপ বসে থাকার পর মুখ খুললেন অভিজিৎ— ‘পৃথা, দেখা যখন হয়েই গেল এত বছর পর, আমার জীবনের কিছু না-বলা কথা শেয়ার করতে চাই তোমার সঙ্গে। আজ না বললে আর কোনও দিন হয়তো বলাই হবে না।”

অভিজিতের কথা শুনে পৃথা একটু ঘাবড়ে যায়। আজ এতদিন বাদে অভিজিতের মনের কথা শোনার পর সে যদি নতুন করে অভিজিতের প্রতি কোনও টান অনুভব করে, তাহলে তো মিহিরের সঙ্গে তার মনের দূরত্ব বেড়ে যাবে। কিন্তু অভিজিতের কথা না শুনেও তো উপায় নেই, আফটার অল তিনি তো মিহিরের বস্। বস্ রেগে গেলে কর্মক্ষেত্রে মিহিরের ক্ষতি হতে পারে। কিন্তু এরই মধ্যে যদি মিহির এসে পড়ে? এমনই কিছু ভাবনা যখন ঘুরপাক খাচ্ছে পৃথার মনে, ঠিক তখনই আবার অভিজিতের ফোনটা বেজে উঠল।

ফোনে কথা বলার পর অভিজিৎ পৃথাকে জানালেন, ‘মিহিরের ফোন। আমাদের এক ক্লায়েন্ট-এর সঙ্গে দেখা হয়ে গেছে পার্কিং এরিয়ায়, তাই মিহিরের আসতে একটু সময় লাগবে জানাল।’

মিহিরের দূরভাষ বার্তার পর অভিজিৎ এবং পৃথা দু’জনেই হয়তো একটু নিশ্চিন্ত বোধ করল। তারপর অভিজিৎ পৃথা-কে বলতে শুরু করলেন, “জানো পৃথা, চার বছর আগে আমি বিয়ে করেছিলাম। আমার স্ত্রীর নাম ছিল বিদিশা। খুব সুন্দরী ছিল। আমি খুব ভালোবাসতাম তাকে।’

—বিদিশা একা থাকত। বলেছিল, ওর মা-বাবা মারা গেছেন। টিউশন করে নিজের এবং ভাইবোনের লেখাপড়া-সহ সমস্ত দায়িত্ব বহন করত বলেই, শুনেছিলাম ওর থেকে। আমাদের এক ক্লায়েন্ট-এর অফিস-এ কাজ পেয়েছিল পরে। ওখানেই ওর সঙ্গে আলাপ হয়েছিল আমার। ওর দুঃখ-কষ্টের কাহিনি শুনিয়েছিল আলাপ-পরিচয়ের পরে। বিয়ের আগে প্রায়ই আমাকে বলত, ‘অভিজিৎ, আই লাভ ইউ ফ্রম দ্য কোর অফ মাই হার্ট”। শুধু তাই নয়, বিদিশা আমাকে বলেছিল, “এত খেটে, কষ্ট করে আর আমি পারছি না। বিয়ে করে তুমি আমার কষ্ট লাঘব করো প্লিজ।’ ওর এই কথা শোনার পর আমি আর দেরি করিনি। ওকে বিয়ে করে ঘরে এনেছিলাম।”

—বিয়ের আগে বিদিশার সঙ্গে কোর্টশিপ-পর্বে আমার বন্ধুস্থানীয় দু’তিনজন আমাকে বলেছিল, “বিদিশা ভালো মেয়ে নয়, সরে যাও ওর থেকে।’ কিন্তু তখন আমি কারও-র কথা শুনিনি। কারণ, বিদিশাকে খুব বিশ্বাস করেছিলাম। কিন্তু বিয়ের কয়েক মাস পরই ধীরে ধীরে ওর আসল রূপ দেখাতে শুরু করে দিল। প্রায় দিনই নতুন নতুন পুরুষ বন্ধুদের সঙ্গে পার্টি করে গভীর রাতে মাতাল হয়ে ফিরত। বিরক্ত হয়ে যখন আমি প্রতিবাদ করতে শুরু করলাম, তখন বিদিশা জানিয়েছিল, ‘ওটা ওর পার্সোনাল লাইফ, তাই যা- ইচ্ছে করবে।’ অবস্থা এক সময় এতটাই চরমে উঠেছিল যে, প্রায় দিনই হাত তুলত আমার গায়ে।”

পৃথা অবাক হয়ে শুনে চলেছে তার পুরোনো বন্ধু কিংবা বলা যায় এক সময়ের ভালোলাগা মানুষটার দুঃখের কাহিনি৷ আর অভিজিৎ বলে চলেছিল, ‘বিয়ের মাস পাঁচেক পর একদিন হঠাৎ বিদিশা জানাল, সে মুক্তি চায়, উড়তে চায় বাঁধনহারা হয়ে। আমার কোনও অসম্পূর্ণতা কিংবা অন্যায় না থেকেও, শুধু সম্মান বাঁচানোর তাগিদে, চাহিদা মতো আমার থেকে মোটা টাকা নিয়ে ডিভোর্স দিয়েছিল বিদিশা। পরে জেনেছিলাম, আমি একা নই, আমার আগে প্রতারিত হয়েছিল আরও দু’জন। আমি ছিলাম বিদিশার থার্ড হাজব্যান্ড।’

এবার একটু থামলেন অভিজিৎ। তারপর আবার বলতে শুরু করলেন, ‘আমি একা ছিলাম একাই হয়ে গেলাম। নেশায় ডুবিয়ে রাখলাম নিজেকে৷ সিগারেট আর মদ আমার ‘বন্ধু’ হয়ে উঠল। মনটা শূন্যতা আর হাহাকারে ভরে গেল। কখন যেন আমি আমূল বদলে গেলাম। মেয়েরা সুযোগ নিতে শুরু করল। শূন্যতা কাটানোর জন্য আমি মেয়েদের সঙ্গে ক্লাব-এ, বার-এ, পার্টিতে গিয়ে আকণ্ঠ মদ গিলতে শুরু করলাম আর নেশা চড়ে গেলে আমার গাড়ির ড্রাইভার-এর হাত ধরে বাড়ি এসে শুয়ে পড়তাম। মেয়েরা দু’- একজন আমার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হতে চাইত, কিন্তু বিদিশার মুখটা ভেসে উঠলেই আমার রাগ চড়ে যেত। সব মেয়ে সমান নয় জেনেও, কেমন যেন বিদিশার মতো মনে হতো সবাইকে। কাউকে টাচ করার ইচ্ছেও এখন হয় না আমার। শুধু একরাশ ঘৃণা জমে আছে মনের মধ্যে। কিন্তু তোমার মুখোমুখি হতেই আমি কেমন যেন সেই পুরোনো ‘আমি’-কে ফিরে পেলাম। তোমার আর মিহিরের সুখী দাম্পত্য জীবন দেখে ভালো লাগছে। কত বিশ্বাসে ভরা তোমাদের দাম্পত্য! এমনই থেকো তোমরা চিরকাল। আজ তোমাদের দেখে কেন জানি না শুধরে যেতে ইচ্ছে করছে, নতুন করে বাঁচতে ইচ্ছে করছে।”

পৃথার হঠাৎ চোখ পড়ে অভিজিতের চোখে। তার চোখ তখন জলে টইটম্বুর। অভিজিতের ওই অবস্থা দেখে পৃথা কিছুটা আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ে। মনের একটা স্তর বলছে, অভিজিতের মাথাটা ধরে নিজের কাঁধে রাখতে। আবার মনের অন্য স্তর মনে করিয়ে দিচ্ছে, সে মিহিরের বিশ্বাস, মিহিরের ভালোবাসা, মিহিরের স্ত্রী। তাই পৃথা আবেগ কাটিয়ে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, ‘তোমার সঙ্গে যা ঘটেছে তা খুব বেদনাদায়ক। আমার খুব খারাপ লাগছে তোমার জন্য। কিন্তু এখন কী-ই বা করতে পারি আমি? বড়োজোর তোমার ভালো বন্ধু হতে পারি। তোমার যখন মন চাইবে ফোন করবে নির্দ্বিধায়। মিহির আমার হাজব্যান্ড হলেও, খুব ভালো বন্ধু। ওকে আমি সময়মতো সব বুঝিয়ে বলব। আই অ্যাম শিওর, মিহির আমাকে সাপোর্ট করবে। আশা করি, অফিসে তুমি ওর বস্ হলেও, বাইরে মিহির তোমার ভালো বন্ধু হয়ে উঠবে। প্লিজ তুমি অবসর সময়ে আঁকায় মনোনিবেশ করো আবার। তোমার দুঃখ- যন্ত্রণা ফুটিয়ে তোলো ক্যানভাসে, প্লিজ…।’

(ক্রমশ…)

নুব্রা উপত্যকা (পর্ব-০২)

হাঁফাতে হাঁফাতে ১৭৪টা সিঁড়ি গুনে শাক্যমুণির দর্শন পেলাম। আরও ১৪-১৫টা সিঁড়ি ভাঙলে একেবারে চূড়ায় আরেকটা বুদ্ধমূর্তি আছে যার দরজায় সন্ধেবেলা সময় উত্তীর্ণ হওয়ায় তালা পড়ে গেছে। তবে কালীমা ও তারামা এখানেও দেখা দিলেন। ছোটো ছোটো কুঠুরিতে কাচবন্দী তারা। কালী মূর্তিগুলো দেখে কেনা ও ছবি তোলা— দুটো ইচ্ছাই চাগাড় দিয়ে উঠল। ছবি তোলা নিষিদ্ধ। অন্ধকারে সুবিধাও হল না।

গাড়িতে যখন ফিরলাম তখন আকাশে আলো। উট-বিহার যখন সম্ভব নয়, তখন ডিসকিট মঠের নিজস্ব বিপণিতে একটু ঢুঁ মারা যাক। ছোট্ট পিতলের কিন্তু ঝকঝকে সোনালি অপরূপ একটা তারা মূর্তি কিনে ফেললাম একটু দরাদরি করে ৪৫০ টাকা দিয়ে। ওখানে নাকি দরাদরি চলে না।

হুন্দরের বালিয়াড়ি

নুব্রা উপত্যকার অন্যতম আকর্ষণ ‘স্যান্ডডিউন’ বা বালিয়াড়ি। আকাশে আলো থাকলেও কমে এসেছে, তার উপর পৌঁছানোর মুখেই বৃষ্টিপাত শুরু হল। একটা সরু নালার উপর একটা ছোট্ট সাঁকো। সাঁকো পেরিয়ে টুকটাক স্টল ছাড়িয়ে বেশ দূরে সাফারির আয়োজন, আর তার জন্য বিরাট লাইন। এদিকে বৃষ্টি টিপটিপ থেকে রিমঝিমের দিকে।

ড্রাইভার ‘দেখ লিজিয়ে’ বললেও আমার মেয়ে গেল বিগড়ে। এক পা-ও এগোবে না, তক্ষুণি হোটেলে যাবে। উটের পিঠে বা পদব্ৰজে— সবই ‘না’। আমার হোটেলে ঢোকার একটুও ইচ্ছা ছিল না। তাই আমি বোঝানোর চেষ্টা অব্যাহত রাখায় উত্তর পেলাম, —তুমি অক্সিজেন নিয়েছ, তাই এত এনার্জি। আমি নিইনি, আমি কিচ্ছু করব না।’

অষ্টাদশী কন্যা পাঁচ বছরের শিশুর মতো মাটিতে পা দাপিয়ে যা শুরু করল, বৃষ্টি ধরে এলেও ওর বাবা বাধ্য হয়ে ‘আঙুর ফল টক’ জ্ঞানে উট সাফারি বাতিল করে আমাকে স্থানীয় পোশাকে নাচার প্রস্তাব দিল। পর্যটন কেন্দ্র মার্কামারা বৈশিষ্ট্য। ফোটোশুটে আমি সম্মতি জানানোর আগেই আমাকে সং সাজানোর বরাত দেওয়া হয়ে গেল।

অগত্যা ‘হো-হো-হো-হো লা-লা-লা-লা…’র সঙ্গে বেশ হেলেনের কায়দায় চাতালরূপী মঞ্চ থেকে মাটিতে অবতীর্ণ হয়ে নাচতে নাচতে দেখি আমার বর ইঙ্গিতে আর মেয়ে তেড়ে মেরে সরে যেতে বলছে। আবিষ্কার করলাম অন্য এক ক্যামেরাম্যানের নৃত্যরতা আত্মীয়া বাহিনীর নুব্রা ধন্য করা নাচের ভিডিয়ো-র মাঝে আমি সাক্ষাৎ ফোটো-বম্বার থুড়ি ভিডিয়ো-বম্বার হয়ে অঙ্গ দোলাচ্ছি। ওদিকটায় গিয়েছি পোশাকওয়ালি বুড়ির নির্দেশেই। সে আমাকে স্টেজে সোলো পারফরমেন্সের বদলে মাটিতে গ্রুপডান্সই করাবে। ঘনঘন গান বদলানোয় এমনিতেই জুত পাচ্ছিলাম না, তার উপর এমন অপমান!

পরের আপত্তি, বরের ঈশারা, আত্মজার ভর্ৎসনা— মেয়ের সঙ্গে মায়েরও মুড আমসি! কিছুতেই মেজাজ ঠিক হচ্ছে না দেখে তিনি এবার মোক্ষম চালটা দিলেন, আমার দেড়শো টাকা তাহলে জলে গেল। তাহলে হোটেলেই যাই চলো…..

আমি প্লাস্টিকের ফুল ঝাঁকিয়ে, ঘুষি বাগিয়ে, দু’হাতের আঙুল দিয়ে দেড়শো দেখিয়ে বিচিত্র অঙ্গভঙ্গীতে রেগেমেগে নেচে যখন থামলাম, ততক্ষণে বৃষ্টিও থেমে গেছে। তাতে টাকা উসুল হল কিনা জানি না, তবে আমার মেয়ে আঙুল তুলে ‘আর্চারি’ বলায় বুঝলাম, ওর মেজাজ নরম হয়েছে।

সাফারির সময় তো অতিক্রান্ত। আমরা জানলাম, ১০০ টাকায় ৫ বার তির ছোড়া যায়। জীবনে প্রথমবার ভারী ধনুক তুলে প্রায় ২৫-৩০ মিটার দূরবর্তী বোর্ডে তিনবার গেঁথে দিলাম।

‘ক্যামেল রাইড’-এও ‘হ্যাঁ’ শুনেই ছুট ছুট ছুট। সন্ধে সাড়ে ছটাতেও আকাশে বেশ আলো কিন্তু বিশাল লাইন। আমাদের হোটেল থেকে বার দুই-তিন ফোনে তলব এসেছে। বিস্তর দোনোমনোর পর টিকিট কাটা হল এই প্রতিশ্রুতি পেয়ে, যদি তখন আর উট না মেলে, পরের দিন এই টিকিট দেখিয়ে মরুজাহাজে চড়া যাবে। ৮-১০টা উট একসঙ্গে ছাড়ছে, আবার তেমন এক ঝাঁক আসছে। এরকম তিন-চারটে দল সমতলবাসীর বায়না মেটাচ্ছিল। মাথাপিছু ৩৫০ টাকা করে দিয়ে ‘আজ না কাল’ ভাবতে ভাবতে দেখি অপ্রত্যাশিত ভাবে আমাদের ডাক এল। একটা বড়ো দল একসাথে যাবে বলে তখনই রওনা হতে চলা সাফারির শেষ তিনটে নম্বর ছেড়ে দিয়েছে। কী ভাগ্য!

অপেক্ষা করার সময় আলাপ হয়েছিল একদল মহিলা পর্যটকের সঙ্গে। ছবি তুলে দেওয়ার জন্য এক ভদ্রমহিলার হাতে মোবাইল দিলাম। চলভাষ ফেরত পাওয়ার আগেই আমার উট তার পশ্চাদ্দেশ উত্থিত করে ফেলেছে। আমি নাগাল পেলাম না। যা কী হবে! পিছনের উঁট থেকে জবাব এল, ‘আমাকে দিয়েছ তোমার মোবাইল। ঘাড় ঘুরিও না, ভালো করে ধরে বোসো।”

—তুমি শিওর, ওটা আমারই মোবাইল?

অত ঝুঁকি নেওয়ার দরকার ছিল না। কিছু দূর গিয়ে উটওয়ালারা নিজেরাই ছবি টবি তুলে দিল, যদিও যাচ্ছেতাই।

যাক, আকাশে ম্লান আলো থাকতে থাকতে এখানকার স্থানীয় কর্মসূচি মোটামুটি শেষ। তবে ঘুটঘুটে অন্ধকার পেলাম আমাদের ‘হ্যাপি ডে গেস্টহাউস’-এ। লাদাখে এই প্রথম বাসস্থানে অব্যবস্থা। ১৫০০ টাকা ভাড়া। ঘর বড়োসড়ো ও পরিষ্কার হলেও আলো নেই, আয়না নেই, স্নানঘরে কাপড় রাখার ব্র্যাকেট পর্যন্ত নেই; আবার সব জানানোর পর গ্রাহ্যও নেই। খানিক রাগারাগি করতে হল। যাইহোক, একটা রাতের তো ব্যাপার।

হুন্দর থেকে তুরতুকের পথে

২৬ জুলাই সকাল সকাল তুরতুকের উদ্দেশ্যে রওনা হব বলে প্রাতরাশের টেবিলে হাত ধুয়ে বসে আছি। একটা ছোট্ট কুকুরছানা এসে হঠাৎ আমাদের সঙ্গে খেলা জুড়ল। প্রিয় খেলা হল আমার পায়ের পাতা কামড়ানো। জুতো থাকায় সুবিধা করতে না পারলেও বেশ টের পাচ্ছিলাম, ধারালো দাঁত জুতো ভেদ করলে ব্যাপারটা আর খেলা থাকবে না। ও ব্যাটার জন্যই টেবিল ছেড়ে ছুটোছুটি করতে হল খানিক। কিন্তু আমাদের আলু পরোটার দেখা নেই।

উর্বী বলল, ‘কীভাবে হাত ধুলো দেখলে? সাবান দিয়ে প্রায় কনুই পর্যন্ত ধুয়ে আটা মাখল ছেলেটা।’ পাহাড়ি রাজ্যে জলাভাব খুব সাধারণ সমস্যা। স্থানীয়রা দিনের পর দিন স্নান না করে থাকাই অভ্যাস করে ফেলে। কিন্তু লাদাখিদের নোংরা থাকতে দেখিনি, অন্তত আমরা যেটুকু দেখেছি। গত রাতে এরই মুখে অব্যবস্থার জন্য দুঃখপ্রকাশের বদলে চ্যাটাং চ্যাটাং কথা শুনে বেশ রাগ হয়েছিল। সকালে কন্যার মুখনিঃসৃত ওর হাত ধোয়ার ধারাবিবরণী ও পরোটার স্বাদ সেসব ভুলিয়ে দিল।

(ক্রমশ…)

ক্যান্সার সারভাইভারশিপ

জুন মাসকে জাতীয় ক্যান্সার সারভাইভার্স মাস হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়, যা ক্যান্সার সারভাইভার-দের মানসিক শক্তি জোগায়। অবশ্য, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) জুন মাসকে ‘ক্যান্সার সারভাইভার্স মাস’ হিসেবে নির্দিষ্ট করেনি, তবে এটি বিভিন্ন সংস্থা দ্বারা সমর্থিত একটি বিশ্বব্যাপী উদযাপন।

এখন প্রশ্ন হল–ক্যান্সার সারভাইভারশিপ বিষয়টি আসলে কী? এই বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এবং পরামর্শ দিয়েছেন মেডেলা কার্কিনোস অঙ্কোলজি ইনস্টিটিউট-এর কনসালটেন্ট ক্লিনিক্যাল অঙ্কোলজিস্ট ডা. কাজী সাজ্জাদ মুনীর।

আসলে, ক্যান্সার সারভাইভারশিপ হল ক্যান্সার নির্ণয়ের সময় থেকে জীবনের বাকি সময় পর্যন্ত ব্যক্তিদের একটি শারীরিক, মানসিক, সামাজিক এবং আর্থিক সফর, যার মধ্যে ক্যান্সারে আক্রান্ত এবং ক্যান্সারমুক্ত উভয়ই অন্তর্ভুক্ত। বেঁচে থাকার প্রাথমিক লক্ষ্য হল—শারীরিক এবং মানসিক ভাবে যতটা সম্ভব সুস্থ থাকা। আর এই সারভাইভারশিপ কেয়ার জটিল ও বহুমুখী।এর মধ্যে রয়েছে পুনরাবৃত্তি এবং নতুন ক্যান্সার প্রতিরোধ, সনাক্তকরণ, ক্যান্সার সম্পর্কিত লক্ষণগুলির পর্যবেক্ষণ,  নিরাময় এবং ক্যান্সার চিকিৎসার পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া (স্বল্প এবং দীর্ঘমেয়াদী) আটকানো।

Dr. Kazi Sazzad Munir
Dr. Kazi Sazzad Munir

ক্যান্সারের চিকিৎসা এবং জীবনকাল উন্নত হওয়ার কারণে গত ২০-৩০ বছরে ক্যান্সার থেকে বেঁচে যাওয়া রোগীর সংখ্যা ৩ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। পুরুষ ও মহিলাদের মধ্যে সর্বাধিক সাধারণ ক্যান্সার থেকে বেঁচে যাওয়া রোগী হলেন যথাক্রমে প্রস্টেট এবং ব্রেস্ট ক্যান্সার। ২০২২ সালে প্রকাশিত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুসারে, বর্তমানে বিশ্বব্যাপী প্রায় ৫৩.৫ মিলিয়ন মানুষ ক্যান্সার নির্ণয়ের ৫ বছরের মধ্যে সেরে উঠেছেন।

স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীর উচিত, রোগী এবং স্টেকহোল্ডারদের নিয়মিত চেক-আপ, লক্ষণ সনাক্তকরণ, জীবনযাত্রার পরিবর্তন, টিকাকরণ এবং দীর্ঘমেয়াদী পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সম্পর্কে সচেতন করার দিকে মনোনিবেশ করা। নিয়োগকর্তা, আইনজীবি, পৃষ্ঠপোষক, সরকারী এবং এনজিও সংস্থাগুলির উচিত, ক্যান্সার থেকে বেঁচে যাওয়া কর্মীদের বৈষম্য দূর করার দিকে গুরুত্ব আরোপ করা এবং চিকিৎসা ও পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া পর্যায়ে তাকে সহায়তা করা। নীতি-নির্ধারকদের উচিত, জীবিতদের জন্য সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী মূল্যের স্বাস্থ্যসেবা সুবিধা এবং স্বাস্থ্য বীমা কভারেজ নিশ্চিত করার উপর জোর দেওয়া এবং তা নিশ্চিত করা।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২০৫০ সালের মধ্যে নতুন ক্যান্সার আক্রান্তের সংখ্যা ৭৭% বৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছে, যা আগামী দিনে ক্যান্সার থেকে বেঁচে থাকাকে একটি বড়ো চ্যালেঞ্জ করে তুলবে। ভারত সহ বিশ্বের বেশিরভাগ অংশে বর্তমান সারভাইভারশিপ কেয়ার অনুকূল নয়, যার ফলে সারভাইভারদের ক্রমাগত লক্ষণ, চাহিদা পূরণ না হওয়া এবং ব্যাপক সারভাইভারশিপ কেয়ারের অভাব দেখা দেয়। তাই, ক্যান্সার সারভাইভারশিপ কেয়ারের উপর সবার এগিয়ে আসার এবং মনোযোগ দেওয়ার এখনই উপযুক্ত সময়।

বর্ষাকালে শিশুর ত্বকের যত্ন

গ্রীষ্মের তীব্র দাবদাহের পর বর্ষা এলে সমগ্র প্রাণীজগত যেন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। বর্ষাকাল খুবই মনোরম। তবে এই ঋতুতে শিশু থেকে বৃদ্ধ সকলেরই স্বাস্থ্যের প্রতি বিশেষ যত্ন নেওয়া প্রয়োজন। আসলে বৃষ্টিতে মশার উপদ্রব যেমন বাড়ে, তেমনই নোংরা বা জমা জলের কারণে রোগ সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়ে যায়। এমনিতে শিশুরা বর্ষাকাল খুব ভালো ভাবে উপভোগ করে। কিন্তু বর্ষাকালে ওদের ত্বকের বিশেষ যত্ন নেওয়ার প্রয়োজন। কারণ ওদের ত্বক খুবই কোমল ও নরম প্রকৃতির।

সামান্য অসাবধানতায় অনেক সমস্যা হতে পারে। বর্ষা ঋতুতে অনেক সময় শিশুরা বৃষ্টিতে ভিজে যায়। যার ফলে ত্বকে চুলকানি, ফুসকুড়ির মতো সমস্যা হতে পারে। সেজন্য শিশুর ত্বকের বিশেষ যত্ন নেওয়া প্রয়োজন।

ময়েশ্চারাইজিং লোশন ব্যবহার করুন

শিশুদের ত্বক খুব নরম এবং সংবেদনশীল। বর্ষা ঋতুতে আর্দ্রতা বাড়লে শিশুর চুলকানি ও ফুসকুড়ির সমস্যা দেখা দিতে পারে। এজন্য ভালো মানের ময়েশ্চারাইজিং লোশন ব্যবহার করতে পারেন, যা আপনার শিশুর ত্বককে ফুসকুড়ি এবং শুষ্কতা থেকে রক্ষা করতে পারে।

ডায়াপার ভেজা রাখবেন না

আপনার শিশুকে ডায়াপার পরাতে পারেন। তবে মাঝে মাঝে পরীক্ষা করে দেখবেন যে, সেটি অতিরিক্ত মাত্রায় ভিজে গেছে কিনা। ওরা যদি দীর্ঘসময় ভিজে ডায়াপারে শুয়ে থাকে, তাহলে ওদের ত্বকে র‍্যাশ বেরোনোর ঝুঁকি থাকে। তাই নিয়মিত ব্যবধানে শিশুর ডায়াপার পরিবর্তন করুন। এছাড়া কিছু সময়ের জন্য তাকে ডায়াপার-মুক্ত রাখুন এবং সুতির ডায়াপার ব্যবহার করুন। এতে বায়ু সঞ্চালন ভালো মাত্রায় হয়।

ব্যবহার্য পণ্যগুলি পরীক্ষা করুন

বাচ্চাদের জন্য বাজার থেকে কোনও পণ্য সাবধানে কিনুন। পণ্য কেনার আগে সেগুলো ভালোভাবে পরীক্ষা করে দেখে নিন। সাধারণত শিশুর প্রসাধনীজাতীয় পণ্যগুলিতে ফেনোক্সিথেনল থাকে, যা শিশুর ত্বকে অ্যালার্জির কারণ হতে পারে। সেজন্য কোনও পণ্য কেনার আগে প্যাকেটের গায়ে সংশ্লিষ্ট পণ্যটির উপাদানগুলি পড়ুন এবং শুধুমাত্র নিরাপদ পণ্যই কিনুন। প্যারাবেন, অ্যালকোহল, কৃত্রিম রং, সুগন্ধি এবং রঞ্জকযুক্ত পণ্যগুলি এড়িয়ে চলুন।

মশার কামড় থেকে রক্ষা করুন

সাধারণত বর্ষাকালে মশার উপদ্রব বেড়ে যায়। তাই বর্ষাকালে মশার কামড় থেকে শিশুদের রক্ষা করুন। নরম ত্বকে মশা কামড়ালে ওরা প্রচণ্ড ব্যথা অনুভব করে। ত্বকে লাল দাগ হতে পারে বা ফুলেও যেতে পারে।

এই সময়ে ডেঙ্গু ও ম্যালেরিয়ার মতো মশাবাহিত রোগ ছড়ায়। এগুলো থেকে রক্ষা পেতে হলে আপনার বাচ্চাকে মশা থেকে দূরে রাখতে হবে। যখনই শিশুকে ঘুম পাড়াবেন মশারি টাঙাতে ভুলবেন না।

বর্তমানে বাজারে শিশুদের ত্বকে লাগানোর উপযোগী কিছু সূক্ষ্ম বিষমুক্ত এবং ডিইইটি-মুক্ত মশা প্রতিরোধী ওষুধ পাওয়া যাচ্ছে। চিকিৎসকের অনুমতি নিয়ে আপনার শিশুর ত্বকে তা লাগাতে পারেন। এছাড়া ঘরদোর সবসময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখবেন, যাতে মশারা বংশবৃদ্ধি না করতে পারে। সন্ধের পরে বাচ্চাকে বাড়ির বাইরে বের না করাই ভালো। আর যদি বাইরে বের করতেই হয়, তাহলে আপাদমস্তক পোশাক পরিয়ে নিয়ে যাবেন, যাতে ওরা মশার কামড় থেকে রক্ষা পেতে পারে।

শরীরে মালিশ-এর প্রয়োজন

বর্ষাকালে শিশুকে স্নানের আগে ভালো ভাবে মালিশ করুন। অলিভ অয়েল বা বাদাম তেল দিয়ে মালিশ ত্বকের জন্য খুবই উপকারী। বিশেষকরে অলিভ অয়েল একটি ভালো ময়েশ্চারাইজার হিসেবে কাজ করে।

এছাড়াও ভার্জিন নারকেল তেলের মতো ভালো মানের প্রাকৃতিক তেল দিয়ে শিশুর ত্বক মালিশ করতে পারেন। এতে অনেক উপাদান আছে, যা আপনার শিশুর ত্বকে প্রয়োজনীয় পুষ্টি প্রদান করে।

হাত পরিষ্কার রাখাও গুরুত্বপূর্ণ

আপনার শিশুর নখ সবসময় ছোটো রাখুন। হাতের ময়লা শিশুদের স্বাস্থ্যের উপরও প্রভাব ফেলতে পারে। অভিভাবকদেরও উচিত ভালো হ্যান্ডওয়াশ দিয়ে নিজেদের হাত ধোয়া। সন্তানদেরও একই শিক্ষা দিন। বিশেষ করে খাওয়ার আগে তাদের হাত অবশ্যই ধুতে বলুন।

ত্বক শুষ্ক রাখুন

বর্ষাকালে আবহাওয়ায় বেশি আর্দ্রতা থাকে। যার ফলে প্রচণ্ড ঘাম হয়। কখনও কখনও বৃষ্টিতে ত্বকও ভিজে যায়। এমন পরিস্থিতিতে প্রথমে পরিষ্কার জল দিয়ে শিশুর ত্বক ধুয়ে নিন। তারপর শুকনো তোয়ালে দিয়ে ত্বক পরিষ্কার করুন। সবসময় চেষ্টা করবেন ওদের ত্বক শুষ্ক রাখার।

শিশুকে সুতির পোশাক পরান

বর্ষাকালে শিশুকে শুধুমাত্র সুতির কাপড় পরানো উচিত। কারণ এই ধরনের কাপড় সহজেই ঘাম শুষে নেয় এবং ত্বকও শ্বাস নিতে সক্ষম হয়। এই সময়ে শিশুদের আঁটোসাঁটো পোশাক পরানো থেকে বিরত থাকুন। কারণ আঁটোসাঁটো পোশাক পরলে ত্বকে ফুসকুড়ি হতে পারে।

শিশুর জিনিসপত্র শেয়ার করবেন না

এই আবহাওয়ায় একটু অসাবধানতার কারণে শিশুর ত্বকে নানা ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে। শিশুকে পরিষ্কার রাখার পাশাপাশি তার ব্যক্তিগত জিনিসপত্রও নিয়মিত পরিষ্কার করুন। শিশুর তোয়ালে, জামাকাপড় এবং চিরুনি কাউকে দেবেন না ।

অ্যান্টি-ফাংগাল পাউডার ব্যবহার করুন

শিশুদের ত্বকের যত্ন নিতে অ্যান্টি-ফাংগাল পাউডার ব্যবহার করা যেতে পারে। এই পাউডার লাগালে ত্বকে ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি রোধ হবে। এছাড়া স্নানের সময় জলে অ্যান্টিসেপটিক লিকুইড ব্যবহার করতে পারেন। এতে শিশুর ত্বক ব্যাকটেরিয়া-মুক্ত থাকবে।

ক্লিনজার ব্যবহার করুন

আর্দ্রতার কারণে শিশুদের ত্বক শুষ্ক হয়ে যেতে পারে। এমন অবস্থায় ত্বকে সাবান ব্যবহার করবেন না। কারণ এতে ত্বক আরও শুষ্ক হয়ে যেতে পারে। শিশুদের ত্বকের পিএইচ ব্যালান্স বজায় রাখতে তেল-মুক্ত ক্লিনজার ব্যবহার করুন।

কাপড় শুকনো রাখুন

বর্ষাকালে যদি বাচ্চার জামাকাপড় ভিজে যায় বা ধোয়ার পরও তা ঠিকমতো না শুকোয়, তাহলে ওই অবস্থায় আলমারিতে রাখবেন না। বাচ্চাদের জামাকাপড় ভালো করে শুকিয়ে নিন। যদি সূর্যের আলোয় না শুকোয় তাহলে ইস্ত্রি করে তা শুকোতে হবে। কিন্তু কোনওভাবেই বাচ্চাকে সামান্যতম ভিজে জামাকাপড়ও পরানো চলবে না। কারণ ভেজা পোশাক পরলে ওদের শরীরে চুলকানি, ফুসকুড়ি ইত্যাদি সমস্যা দেখা দিতে পারে।

স্বাস্থ্যকর খাবার

বর্ষাকালে শিশুদের স্বাস্থ্যকর ও সুষম খাবার দেওয়া খুবই জরুরি। এই ঋতুতে সর্দি-কাশি ও জ্বর হতে পারে। তাই এই সময় শিশুদের ভিটামিন সি-যুক্ত খাবার ও ব্যাকটেরিয়ারোধক খাবার যেমন— পেয়ারা, আমলা, কমলালেবু, পেঁপে প্রভৃতি খাওয়ানো উচিত। এছাড়া গরম স্যুপ-ও দিতে পারেন। এই সময় জল ফুটিয়ে বাচ্চাকে খাওয়াবেন। জল ফোটালে জলের মধ্যে থাকা জীবাণুগুলো মরে যায়।

বিশেষজ্ঞের পরামর্শ

বিশিষ্ট শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মনজিন্দর সিং রান্ধাওয়া জানিয়েছেন, বর্ষাকালে শিশুদের ত্বকের যত্ন নিতে বিশেষ মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন। কারণ পরিবেশে আর্দ্রতা বৃদ্ধির কারণে ওদের ত্বককে নানাবিধ সমস্যার সঙ্গে লড়াই করতে হয়। বর্ষাকালে সাধারণত ছত্রাকের সংক্রমণ দেখা যায়। তা থেকে রক্ষা পেতে শিশুর ত্বক পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার পাশাপাশি, শুকনো রাখারও প্রয়োজন। পিএইচ-যুক্ত সাবান দিয়ে নিয়মিত স্নান করাবেন। এরফলে শিশু ঘাম ও ঘামের দুর্গন্ধ থেকে মুক্তি পেতে পারে।

এই সময় অতিরিক্ত স্নান না করানোই উচিত। এরফলে ত্বকের প্রাকৃতিক তেল দূর হবে না। ত্বকও রুক্ষ হয়ে উঠবে না। শিশুদের ত্বক প্রচণ্ড সংবেদনশীল। স্নানের পর হালকা ময়েশ্চারাইজার লাগালে ত্বকের কোমলতা বজায় থাকে।

জীবন রং-বেরং (পর্ব-০১)

পৃথা দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকাল। রাত ১২টা বাজে। মিহির এখনও এসে পৌঁছোল না দেখে চিন্তায় পড়ে গেল পৃথা। কিছুক্ষণ আগে পৃথা যখন মিহিরকে ফোন করেছিল, তখন উত্তর পেয়েছিল, ‘দিস নাম্বার ইজ নট রিচেবল’।

—এত দেরি তো করে না মিহির! আজ যে কী হল! কোনও দুর্ঘটনায় পড়েনি তো? নট রিচেবল কেন বলছে? চিন্তায় পড়ে যায় পৃথা।

শুধু খারাপ চিন্তা মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে পৃথার। খুব ঘাবড়ে যায় সে। কারণ, এই শহরটা তার কাছে নতুন। সে প্রায় কাউকেই চেনে না। কার সাহায্য নেবে ভেবে ঠিক করতে পারছে না। বাপের বাড়ির শহর কলকাতা হলে, সে এতক্ষণে দু’চারজনকে ডেকে নিয়ে সাহায্য চাইত।

আসলে, মিহিরের সঙ্গে বিয়ে হওয়ার পর দিল্লি চলে আসে পৃথা। একটি মাল্টি ন্যাশনাল কোম্পানিতে সেলস এগজিকিউটিভ হিসাবে কাজ করে মিহির। তা প্রায় বছর পাঁচেক হয়ে গেল মিহির এবং পৃথা দিল্লিতে ঘর ভাড়া নিয়ে থাকে। ওরা এখনও মা-বাবা হয়নি। বিয়ের পর ওরা এখনও গোল্ডেন টাইম পাস করছে। এবার হয়তো দুই থেকে তিনজন হওয়ার প্ল্যান করবে।

—অফিস কলিগ ছাড়াও মিহিরের অনেক বন্ধু আছে দিল্লিতে। তাদের সঙ্গে সন্ধেবেলা আড্ডাও মারে মিহির। কিন্তু দেরি হলে ফোন করে জানিয়ে দেয়। আজ যে কী হল… ভাবতে থাকে পৃথা।

—অনেক সময় অবশ্য অফিস-এ বস্-এর সঙ্গে মিটিং করতে গিয়েও দেরি হয়। আর দেরি হলেই এসে নানা অজুহাত দেবে। কখনও বলবে, ‘বস্ আমাকে একটা জরুরি কাজ করতে দিলেন অফিস ছুটির সময়।’ কোনও দিন হয়তো বলবে, ‘আজ বস্-এর সঙ্গে কফি শপ-এ গিয়ে কফি খেতে গিয়ে দেরি হয়ে গেল।”

মিহিরের হার্ড ওয়ার্ক এবং অনেস্টির জন্য যে মিহিরকে কিছুটা বেশি গুরুত্ব দেন ওর বস্, এটা জানে পৃথা। শুধু এটুকুই নয়, মিহিরের বস্-এর সম্পর্কে পৃথা জেনে গেছে আরও অনেক কিছু। মেয়েদের নিয়ে শপিং-এ যাওয়া, ককটেল পার্টিতে যাওয়া, এসবও যে বেশ পছন্দ করেন মিহিরের বস্, তা পৃথা জেনেছে মিহিরের মাধ্যমে। আসলে পৃথা এবং মিহির স্বামী-স্ত্রী হলেও বন্ধুর মতো। তাই মিহির মজা করে পৃথাকে অনেকবারই বলেছে, ‘পৃথা, তুমি তো একদিন শপিং-এ যেতে পারো আমার স্যার-এর সঙ্গে, তাহলে আমার ভালো প্রোমোশন হতো৷’ এমনই সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে মোটরবাইকের শব্দ শুনতে পেল পৃথা। ছুটে গেল দরজার দিকে। দরজার আইহোল-এ চোখ রাখতেই পৃথা দেখতে পেল, মিহির এসে গেছে। এবার নিশ্চিন্ত হল সে এবং দরজা খুলে দাঁড়াল।

মোটরবাইক রেখে মিহির ঘরে ঢুকতে ঢুকতে পৃথা-র উদ্দেশ্যে বলল, “খুব কাজের চাপ ছিল, ফোন করতে পারিনি, সরি। খুব খিদে পেয়েছে, খাবার রেডি করো, ফ্রেশ হয়ে আসছি।’

ডিনার-এর সময় মিহির পৃথাকে জানাল, ‘কাল আমাদের মুম্বই অফিস থেকে কয়েকজন স্টাফ আসবে। বস্-কে নিয়ে সবাই শপিং-এ যাবে। বাড়ির বউদের জন্য শাড়ি কিনবে সবাই। আমরা কেউ শাড়ি চিনি না। প্লিজ, তুমি একটু আমাদের সঙ্গে যাবে শপিং-এ?’

মিহিরের কথা শুনে পৃথা খুব চিন্তায় পড়ে গেল। এতগুলো পুরুষ মানুষের সঙ্গে একা যেতে ওর মন চাইছে না। আবার ভাবল যে, মিহির অবশ্য সঙ্গে থাকবে। তাই, কিছুক্ষণ ভেবেচিন্তে ‘হ্যাঁ” বলে দিল পৃথা৷

পরের দিন বিকেল পাঁচটার সময় ফোন এল মিহিরের। ‘পৃথা তুমি তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে নাও। ঠিক তিরিশ মিনিট বাদে আমরা তোমাকে গাড়িতে তুলব।’

পৃথা রেডি হয়ে ব্যাগটা নেবে, এমন সময় ডোরবেল বাজল।

দরজা খুলল পৃথা।

‘আসুন স্যার ভিতরে’– বলেই মিহির ওর বস্-কে ড্রইং-রুম-এ এনে বসাল।

পৃথা একটু দূরেই দাঁড়িয়েছিল। মিহির ওর দিকে ঘুরে বলল, ‘কাম হিয়ার পৃথা, আলাপ করিয়ে দিই— আমার বস্ মিস্টার চ্যাটার্জী। আর স্যার, ও পৃথা, আমার স্ত্রী।’

পৃথা এবং মিস্টার চ্যাটার্জী দু’জনেই নমস্কার বিনিময় করলেন। হঠাৎ পৃথা-র কেমন যেন চেনা মনে হল ভদ্রলোককে। মিস্টার চ্যাটার্জীও পৃথাকে দেখে কেমন যেন চমকে গেলেন। তাঁর যেন খুব চেনা মনে হল পৃথাকে। এভাবেই কেটে গেল কয়েক সেকেন্ড। তারপর মিস্টার চ্যাটার্জীই পৃথাকে প্রশ্ন করলেন, “আরে তুমি সেই পৃথা না…? হাসপাতালে আলাপ হয়েছিল। মনে আছে, তোমার বাবা আর আমার বাবা একই হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন? হাসপাতালের ওয়েটিং রুম-এ আলাপ হয়েছিল আমাদের। একইদিনে আমাদের দু’জনেরই বাবা মারা গিয়েছিলেন!”

পৃথা-র সব মনে পড়ে যায়। কিন্তু সেও তো প্রায় দশ বছর আগের কথা। পৃথা এবার মিস্টার চ্যাটার্জীর উদ্দেশ্যে বলে, ‘হ্যাঁ, মনে পড়েছে। আপনি তো অভিজিৎ…?’

—এগজ্যাক্টলি। তোমার স্মৃতিশক্তি বেশ ভালো দেখছি, এখনও আমার নামটা মনে রেখেছ?

পৃথা এবং মিস্টার চ্যাটার্জী পরস্পরের চেনা দেখে বেশ খুশি হল মিহির। এবার সে সত্যিই ভাবতে শুরু করল, বস্ তার প্রতি এবার আরও সদয় হবেন এবং ওর প্রোমোশনও হবে।

আরও দু’-চারটে বাক্য বিনিময়ের পর, ওরা তিনজনে গাড়িতে উঠল। ড্রাইভিং সিটে ছিলেন মিস্টার চ্যাটার্জী। তাঁর পাশে বসেছিল মিহির এবং পৃথা বসেছিল পিছনের সিটে। তারা তিনজনই তিনরকম ভাবনায় ডুবেছিল। মিহির ভাবছিল, পৃথা এবং তার বস্-এর মধ্যে যোগাযোগ এবং সম্পর্ক ঠিক কতটা এগিয়েছিল? আর পৃথা ভাবছিল সেই ফেলে আসা দিনগুলির কথা।

অভিজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে হাসপাতালে যখন আলাপ হয়েছিল, তখন পৃথা সবে কলেজে ভর্তি হয়েছিল। লেখাপড়ার পাশাপাশি, ভালো ছবি আঁকত সে। একটা বড়ো আঁকার স্কুলে ভর্তিও হয়েছিল। ওখানে আবার দেখা হয়ে গিয়েছিল অভিজিতের সঙ্গে। অভিজিৎ যেমন ভালো ছবি আঁকত, তেমনই ভদ্র এবং বিনয়ী ছিল। তাই, অভিজিতের প্রতি একটা বাড়তি আকর্ষণ ছিল পৃথার, কিন্তু তা প্রকাশ করতে পারেনি। হয়তো অভিজিৎও পছন্দ করত পৃথাকে, কিন্তু সেও মুখ ফুটে কখনও বলতে পারেনি। তাই আজ দশ বছর পর আবার দেখা হয়ে যেতেই পৃথা একটু চঞ্চল হয়ে ওঠে। আবার পরক্ষণেই ভাবতে থাকে, তার দুর্বল হওয়া উচিত নয়। কারণ, তার বিবাহিত জীবন সুখের। মিহির ভালো ছেলে। বন্ধুর মতো। তাই সে পুরোনো দিনের সব কথা মিহিরকে সময় মতো বলবে ঠিক করে।

আবার অভিজিৎ চট্টোপাধ্যায় ভাবতে থাকেন, আঁকার স্কুলেও যে পৃথার সঙ্গে অনেকগুলি দিন পাশাপাশি কাটিয়েছে, তা তো মিহিরের সামনে বলা গেল না। যাইহোক, এর মধ্যে পৃথা আবার ভাবতে থাকে, মিহির তার বস্ অভিজিতের সম্পর্কে যেমনটা বলেছে অর্থাৎ, অভিজিৎ ভালো কিন্তু মহিলাদের সঙ্গে শপিং করতে ভালোবাসেন, ককটেল পার্টি-তে যান, এসব যেন মেলাতে পারছে না পৃথা। কারণ সে জানে অভিজিৎ অত্যন্ত নম্র ভদ্র একজন মানুষ, যে মেয়েদের চোখের দিকে সরাসরি তাকাতও না। গাড়িতে বসে এসব সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতেই হঠাৎ পৃথা মৌনতা ভেঙে প্রশ্ন করে অভিজিতকে,

—ছবি আঁকা এখনও জারি আছে তো?

—ও তো আমার প্রাণ। একদিন মিহিরকে নিয়ে আমার বাড়িতে এসো, সব দেখতে পারবে। তবে আগের মতো রেগুলার আর আঁকা হয় না।

এসবের মধ্যে মিহির হঠাৎ বলে উঠল, ‘স্যার, আমরা তো শপিং মল পিছনে ফেলে এসেছি।”

(ক্রমশ…)

মাছের ৪ পদ

কথায় বলে— মাছে-ভাতে বাঙালি। খাবারের থালায় মাছ না থাকলে যেন বাঙালির মন ভরে না। তাই, প্রতিদিন মধ্যাহ্নভোজ সম্পূর্ণ হোক মাছ সহযোগে। কখনও সামুদ্রিক মাছ, আবার কখনও মিষ্টি জলের মাছ এনে বাড়িতেই বানিয়ে নিন মাছের নানারকম সুস্বাদু পদ। খুব বেশি ঝামেলাও হবে না, আবার বেশি সময়ও ব্যয় হবে না, এমনই কিছু মাছের রেসিপি এবার আমরা শেয়ার করছি মাছ-প্রেমীদের জন্য।

পুর ভরা পমফ্রেট

উপকরণ: ১টি বড়ো সাইজের পমফ্রেট মাছ, ১ কাপ কোরানো নারকেল, ১ টেবিল চামচ কুচোনো ধনেপাতা, ১/২ চা চামচ রসুনবাটা, ১ চা চামচ আদাবাটা, ১ টেবিল চামচ তেঁতুলের কাই, ২টি কুচোনো কাঁচালংকা, ১ চা চামচ চিনি, ১/২ চা চামচ গোলমরিচগুঁড়ো, নুন ও তেল আন্দাজমতো।

প্রণালী: আস্ত পমফ্রেট মাছ মাঝখান থেকে এমন ভাবে চিরে দিতে হবে যাতে মাথার দিক ও ল্যাজা জোড়া থাকে। এবার পুরের জন্য মিশ্রণ তৈরি করুন। নারকেলকোরা, রসুনবাটা, আদাবাটা, কাঁচালংকা, গোলমরিচগুঁড়ো, তেঁতুলের কাই, ধনেপাতা, চিনি— সব মিশিয়ে পিষে নিয়ে নুন মেশাবেন।

মাছের ভিতরে পুর সমান ভাবে চারিয়ে দিয়ে সুতো বেঁধে দিন টাইট করে, যাতে ভাজতে গেলে পুর বেরিয়ে না যায়। এবার ফ্লাইং প্যান-এ তেল গরম করে দু’পিঠ ভালো করে ভেজে নিন। লেবু, ধনেপাতা দিয়ে সাজিয়ে গরম গরম পরিবেশন করুন।

মশলা পমফ্রেট

উপকরণ: ৪টি ছোটো সাইজের আস্ত পমফ্রেট, (দুটো পিঠ অল্প চিরে নেওয়া), ১টি পেঁয়াজ, ৪ কোয়া রসুন ও ২টি কাঁচালংকা একসঙ্গে বেটে নিন, স্বাদমতো লংকাগুঁড়ো, ২টি কাঁচালংকা ও ২ চা-চামচ সরষে একসঙ্গে বেটে নেওয়া, নুন, হলুদ এবং সরষের তেল আন্দাজমতো, ২টি কুচোনো টম্যাটো, ২টি পেঁয়াজ কুচো করা, নুন স্বাদমতো।

প্রণালী: মাছে পেঁয়াজ, রসুন ও লংকাবাটা মাখিয়ে বেশ কিছুক্ষণ রেখে দিন। কড়াইতে তেল দিয়ে মশলা মাখা মাছ ভেজে রাখুন। কড়াইতে আরও একটু তেল দিয়ে কুচোনো পেঁয়াজ একটু ভেজে লংকার গুঁড়ো, নুন, হলুদ ও ১টি কুচোনো টম্যাটো দিন। কম আঁচে মশলা কষে নিন। রসুন-পেঁয়াজের বাটা মশলা এবং সরষে-লংকার বাটা মশলা একসঙ্গে কড়াইতে দিয়ে কষে নিন এবং মাছগুলি ওতে ছাড়ুন। মশলা ভালো করে গা-মাখা হয়ে গেলে ও ফুটতে থাকলে নামিয়ে নিয়ে উপরে কুচোনো টম্যাটো ও ধনেপাতা ছড়িয়ে পরিবেশন করুন।

রুইপোস্ত

উপকরণ: ৪ টুকরো রুইমাছ, ৪ টেবিল চামচ পোস্তবাটা, ২টি টম্যাটো (পাতলা করে কাটা), ৫ টেবিল চামচ সরষের তেল, ১ চা-চামচ কালোজিরে, ১ চা-চামচ হলুদগুঁড়ো, ২-৩টি কাঁচালংকা, নুন স্বাদমতো, ১ কাপ জল।

প্রণালী: রুইমাছ ভালো করে ধুয়ে নিয়ে নুন এবং হলুদগুঁড়ো দিয়ে এবং সামান্য সরষের তেল মাখিয়ে ১৫-২০ মিনিট ম্যারিনেট করুন। প্যানে তেল গরম করে মাছগুলি হালকা ভেজে নিন। মাছ ভাজার তেল সরিয়ে রেখে প্যানে ফ্রেশ তেল ঢালুন। তেল গরম হলে কালোজিরে এবং ২টি কাঁচালংকা তেলে দিন। একটু বাদে টম্যাটো-টা তেলে দিয়ে দিন। টম্যাটো নরম হয়ে গেলে, পোস্তবাটা ওতে দিয়ে দিন এবং ভালো করে নাড়াচাড়া করে নিন। হলুদ, নুন মিশিয়ে, জল দিন। গ্রেভি ফুটে উঠলে ভাজা মাছগুলি ঝোলে দিয়ে দিন। আন্দাজমতো গ্রেভির ঘনত্ব বুঝে রান্না হতে দিন এবং আঁচ বন্ধ করুন। উপর থেকে কাঁচা সরষের তেল ও কাঁচালংকা দিয়ে পাত্রের মুখ ঢেকে দিন। গরম গরম পরিবেশন করুন।

চিংড়ির মালাইকারি

উপকরণ: ৫০০ গ্রাম বাগদা বা গলদা চিংড়ি পিঠের কালো সুতো ছাড়িয়ে পরিষ্কার করা, ১/২ কাপ কুচোনো পেঁয়াজ, ১/৪ টেবিল চামচ পেঁয়াজবাটা, ১/২ চা-চামচ রসুনবাটা, ১ চা-চামচ আদাবাটা, ১ চা-চামচ জিরেগুঁড়ো, ১ চা-চামচ চিনি, ২টি তেজপাতা, ১চা-চামচ লংকাগুঁড়ো, ১/২ চা-চামচ গরমমশলার গুঁড়ো, ২ কাপ কোরানো নারকেল (ওর মধ্যে গরমজল ঢেলে ঢেকে রাখুন ও একটু পরে চিপে দুধ বার করে নিন), ২টি করে লবঙ্গ ও ছোটো এলাচ, বাদাম তেল, নুন, মিষ্টি আন্দাজমতো।

প্রণালী: কড়াইতে তেল গরম করে চিংড়িমাছ ভেজে তুলে রাখুন। সেই তেলে তেজপাতা, লবঙ্গ ও ছোটো এলাচ অল্প থেঁতো করে ফোড়ন দিন। চিনি দিয়ে লাল করে ভাজা হলে কুচোনো পেঁয়াজ দিন। পেঁয়াজ লালচে হয়ে এলে বাটামশলা, নুন, হলুদ, জিরে ও লংকাগুঁড়ো দিয়ে কম আঁচে পুরো মশলা কষতে হবে। কষা হয়ে গেলে ভাজা চিংড়ি এবং নারকেলের দুধ দিতে হবে। ফুটে উঠলে এবং মাছ সেদ্ধ হয়ে গেলে গাওয়া ঘি ও গরমমশলার গুঁড়ো ছড়িয়ে আঁচ থেকে নামিয়ে নিতে হবে। রান্নার সময় পাত্রের মুখে ঢাকা দেবেন না, নারকেল তেলের গন্ধ হয়ে যাবে।

মোনালিসার বিয়ে (শেষ পর্ব)

মোনা শোওয়ার ঘরে খাটের উপর পা ছড়িয়ে বসেছিল। কাপড় চোপড় ঈষৎ অবিন্যস্ত। শরীরে তার যৌবনের ঢেউ। তাকে দেখে সুখেনের শরীরে উত্তেজনা খেলা করে উঠল। কিন্তু তার দুঃখের পারদ সমস্ত সীমা ছাপিয়ে গেল, যখন ঘরে ঢোকার সাথে সাথেই মোনা তাকে জিজ্ঞেস করল, ‘কিরে টাকলু কোথায় গেছিলি?’

মোনার কথায় সে কোনও উত্তর দিতে পারল না। ধীরে ধীরে ঘর থেকে বেরিয়ে চলে এল ছাদে। সময়ে অসময়ে আর কেউ তার পাশে না থাকলেও এই ছাদ সবসময় তার পাশে থেকেছে। এই ছাদে দাঁড়িয়েই সে আকাশ চিনেছে। জীবনের প্রথম প্রেম ভেঙে যাওয়ার কষ্ট ভুলেছে। দেবিকা যেদিন তাকে ছেড়ে, সৌম্যকে বিয়ে করে মুম্বই নিবাসী হয়েছিল, সেদিনও সুখেন এই ছাদে এসে কেঁদেছিল। এই ছাদ তাকে সেদিনও ফেরায়নি। এর বুকে বসেই ধীরে ধীরে সুখেন জীবনের লড়াইয়ে ফিরেছে। সরকারি চাকরি জোগাড় করেছে। মোনাকে দেখে সে আবার ভালোবাসতে শুরু করেছে। কিন্তু তার ভালোবাসার পথে যে তার টাক আর নাম বাধা হয়ে দাঁড়াবে তা সে স্বপ্নেও ভাবেনি।

সেদিন অনেক রাতে সুখেন ছাদ থেকে নামল এবং বাড়িতে জানিয়ে দিল এখন ক’টা দিন সে মোনার সঙ্গে এক ঘরে থাকবে না। পাশের ঘরে থাকবে। সুখেনের মা একটু আপত্তি করেছিলেন। তবে মোনার আচরণের কথা চিন্তা করে নিজেই চুপ করে গেলেন।

কয়েকদিনের মধ্যেই সুখেনের বাড়িশুদ্ধ সকলে মোনার পাগলামিতে অতিষ্ঠ হয়ে পড়ল। অষ্টমঙ্গলায় যাওয়া আর হল না। দিনকে দিন মোনালিসার দৌরাত্ম্য বেড়েই চলল। সে কখনও বাড়ির পেয়ারা গাছে উঠে বসে থাকে, কখনও রান্নাঘরে ঢুকে জিনিসপত্র বাসনকোসন ছুঁড়ে ফেলে, কখনও বা যাকে তাকে যা তা বলে। যুবতী মেয়ে, তার গায়ে হাত দিতে ছেলেরা ভয় পায়। আর বাড়ির মেয়েরা তার সঙ্গে গায়ের জোরে পারে না। থাকার মধ্যে সুখেন। কিন্তু সে বেচারা এমন ভালো মানুষ যে, সে বউকে কিছুই বলতে পারে না। ফলে মোনালিসাকে থামানো অসম্ভব হয়ে পড়ল।

শেষে একদিন বাড়িতে মোনালিসাকে দেখতে সাইকিয়াট্রিস্ট এলেন। মোনাকে অনেকক্ষণ পরীক্ষা করে খসখস করে গোটা তিনেক ওষুধ লিখে দিলেন। যাওয়ার সময় বলে গেলেন, “ও কিছু নয়। ক’দিন ওষুধ খেলেই সব ঠিক হয়ে যাবে।”

বাপেরবাড়িতে মাধবী বলে একটি মেয়ে মোনার দেখাশোনা করত। তাকে ডেকে আনা হল। তার উপর ভার পড়ল মোনাকে ওষুধ খাওয়ানোর। এভাবে আরও কয়েকদিন কেটে গেল। কিন্তু মোনালিসার উপদ্রব কিছুমাত্র কমল না। তার শোওয়ার ঘরের পিছনের আগাছা ভরা মাঠ না-খাওয়া ওষুধের মোড়কে ভরে গেল। সমস্যা কমা দূরে থাক আরও বেড়ে চলল। কয়েকদিন পর সুখেনের মা তাকে নিজের ঘরে ডেকে পাঠাল। ‘বাবা আর তো পারি না। ওই মেয়ে কাল আমাকে এমন ধাক্কা দিয়েছে যে, আরেকটু হলেই আমি পড়ে যাচ্ছিলাম। এই বয়সে পড়ে গেলে কি আর আমার শরীর থাকবে? তুই বাবা এবার কিছু কর।’

অবশেষে একদিন মোনালিসা মাধবীকে নিয়ে বাপেরবাড়ি চলে গেল। বুকে পাথর রেখে, সুখেন বাধ্য হল তার পছন্দ করে বিয়ে করা সুন্দরী বউকে বাপেরবাড়ি রেখে আসতে।

প্রথম প্রেমের পর তার দ্বিতীয় প্রেমও আকাশের গায়ে বিলীয়মান হতে চলল। সুখেনের ভালোবাসা মোনালিসার পাগলামির নীচে চাপা পড়ল।

মোনা যেদিন বাপেরবাড়ি ফিরে এল তার বাবা সেদিন মুখে ভাত তুললেন না। বউদি দেখে ঠোঁট বেঁকাল। মা দু-একবার ফুঁপিয়ে চুপ করে গেলেন। কিন্তু মোনালিসা যেন এই সবকিছুর থেকে বহুদূরে। কোনওদিকেই তার ভ্রূক্ষেপ নেই। সে জানলা দিয়ে গাছের পাতার নাচ দেখে। পাখির ডাক শোনে। পূর্ণিমার রাতে আকাশের গোল থালার মতো চাঁদ দেখে ফিকফিক করে হাসে। কেউ তাকে কিছু বলতে গেলে তেড়ে মারতে যায়। ননদের রকমসকম দ্যাখে তার বউদি। তারপর রাতে বর বাড়ি এলে বরের কাছে ফিসফিস করে অনুযোগ করে।

—তোমার বোন তো পুরো পাগল হয়ে গেছে গো। এই পাগলামি তোমাদের বংশগত নয় তো? তুমি আবার কোনওদিন এমন হয়ে যাবে না তো? ও মাগো! তখন আমি কোথায় যাব?

তার কথায় তার স্বামী চিন্তিত হয়। তবে মুখে হো হো করে হেসে উঠে, বউকে জোর করে কাছে টেনে নেয়। দিন গড়িয়ে চলে।

ওদিকে হীরক এতদিন সবকিছু থেকে মুখ লুকিয়ে ছিল। তার শুধু ভয় এই বুঝি সুখেন এসে ঘটকালির টাকা ফেরত চায়। কয়েকদিন বাদে তার কানে দুটো খবর এল। এক, মোনালিসা বাপের বাড়ি ফিরে এসেছে। দুই, সুখেন ডিভোর্সের নোটিশ পাঠিয়েছে। খবরটা তাকে দিল তার এক বন্ধু তোতন। তোতন হীরকের বহুদিনের সাথী। সে হীরককে আশ্বস্ত করল, সুখেনকে সে যেটুকু চিনেছে তাতে তার মনে হয়েছে যে, সুখেন ঘটকালির টাকা আর ফেরত চাইবে না।

এর কয়েকদিন পর হীরক মনে একটু সাহস সঞ্চয় করল। মোনাকে একটু দেখে আসা দরকার। সে পায়ে পায়ে মোনালিসার বাড়িতে হাজির হল। গোটা বাড়ি থমথম করছে। হীরককে দেখে কেউ কথা বলল না। তাদের ভাব এমন যে, মোনার পাগলামির জন্য যেন হীরক দায়ী। বেগতিক বুঝে হীরক চলে আসছিল। ঠিক তখনই মোনালিসার মুখোমুখি। মোনালিসা যেন সেই একই আছে। হীরককে দেখেই সে একটা চ্যালাকাঠ হাতে তাড়া করে এল।

—এই শয়তানটাই আমাকে ওই টাকলু সুখেনের সঙ্গে ভিড়িয়েছিল।

তাকে আটকায় কার সাধ্যি।

তার তাড়া খেয়ে হীরক আর দাঁড়াল না। সোজা পিছন ঘুরে দৌড়ল। দৌড়তে দৌড়তে দু’বার আছাড় খেল। উঠল আবার দৌড়ল৷ মোনালিসা তখন সমানে পিছনে তাড়া করে আসছে।

দৌড়তে দৌড়তে হীরক একটা মজে যাওয়া পুকুরের সামনে এসে পড়ল। এরপর যাওয়ার রাস্তা নেই। যেতে গেলে পুকুর পার হতে হবে। হীরক সাঁতার জানে না। অতএব তার সে ক্ষমতা নেই। সে পুকুর পাড়ে দাঁড়িয়ে হাঁপাতে লাগল। মোনালিসা ততক্ষণে কাছে এসে পড়েছে। এই পুকুরের পাড়ে তাদের অনেক স্মৃতি। সে হীরকের কলার চেপে ধরল।

—তোমার জন্য পাগল সেজে বিয়ে ভাঙতে গিয়ে কী কাণ্ডটা করতে হল। এবার কবে বিয়ে করবে বলো?

—পরিস্থিতি একটু ঠান্ডা হোক তারপর।

হীরক আলতো করে ছোটোবেলার প্রেমিকার হাত থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিল।

(সমাপ্ত)

নুব্রা উপত্যকা (পর্ব-০১)

সপরিবারে আমরা তিনজন ২২ জুলাই, ২০২২ রাত ৯টা ৩৫ মিনিটের উড়ান ধরেছিলাম দিল্লি হয়ে লে-র উদ্দেশ্যে। মোবাইলের একটা করে সিমকার্ডকে পোস্টপেইড করানো ছিল যাত্রারম্ভের কিছুদিন আগে থাকতেই। আমাদের ‘ইনারলাইন পারমিট’ও ছিল, যা লে পৌঁছে হাতে পেয়ে গিয়েছিলাম। আর এই পারমিট-এর জন্য দিতে হয়েছিল (২০২২ সাল-এ) ১৬৮০ টাকা।

রাত পৌনে বারোটায় দিল্লি বিমানবন্দরের টার্মিনাল দুই থেকে লে-র উড়ান ধরতে যেতে হল ৮.৫ কিলোমিটার দূরে টার্মিনাল-এ এবং যেতে গিয়ে মালপত্রের জন্য দুশ্চিন্তাটা বেশ ভোগাচ্ছিল। সকাল ৬:৩০ নাগাদ লে বিমানবন্দরের পুঁচকি কনভেয়ার বেল্টে মাল উদ্ধার করে আর দুটি গাড়ি হাজির দেখে হাঁফ ছাড়লাম। কিন্তু অতখানি উচ্চতায় সকাল ৬:৩০ নাগাদ তেমন শীত নেই, গায়ে মামুলি গরম জামা-ই যথেষ্ট দেখে বিস্মিত হলেও ঠিক প্রসন্ন হতে পারিনি। চেনা ভূগোল-বিজ্ঞান না মেলার অস্বস্তি। যাইহোক, লে-তে আমরা গেস্টহাউসে ছিলাম।

সচরাচর সমতল থেকে একলাফে ১১,৪৮০ ফুট উচ্চতায় উঠে এলে সমতলবাসীর শরীর বিদ্রোহ করে। প্রায় সব ভ্রমণসূচি ও সরকারি নির্দেশিকাতেই অন্তত ২৪ ঘণ্টা বিশ্রামের পরামর্শ দেওয়া আছে। কিন্তু মাসখানেক ধরে বিস্তর গবেষণা করে ৮ দিনের মধ্যে নিজেদের শখ-সামর্থ্য-স্বাস্থ্যে কুলোনোর মতো যে-ভ্রমণসূচি বানিয়েছি, সেটা প্রথম দুই দিনে মানে ২৩ ও ২৪ জুলাই তারিখেই পরিবেশের সঙ্গে খাপ-খাওয়ানোর বিধি কিছুটা ভঙ্গ করেই লে শহরের বেশকিছু গন্তব্য ঘুরে নিয়েছি।

২৫ জুলাই ২০২২ আমাদের যাত্রা খারদুংলা পাস হয়ে নুব্রা উপত্যকার পথে। উচ্চতার কারণে ও অক্সিজেনের অভাবে শরীর কাহিল হলে আর রক্ষা থাকে না। তাই নুব্রার দিকে যাত্রা করার আগে পর্যটকদের অক্সিজেন সিলিন্ডার রাখতে বলা হয়। চালকের নাম রিগজিন। তিব্বতী ভাষায় Rigzin শব্দের অর্থ জ্ঞানী। কিঞ্চিত দরাদরির পর ৪৫ হাজার টাকায় ২৫-৩০ জুলাই আমাদের গন্তব্যগুলো ঘুরিয়ে ৩১-এ লে ফিরিয়ে আনবে চুক্তি হয়েছে। ৬ জন বসার মাহিন্দ্রা বোলেরো গাড়িতে তিনজন যাচ্ছি। আরেকটি পরিবার সঙ্গে থাকলে টাকাটা ভাগাভাগি হয়ে যেত। খাতির যত্নেরও ভাগ পেত বলা বাহুল্য।

প্রথমে বাজারে গিয়ে অক্সিজেন সিলিন্ডার ভাড়া নিলাম ২৫০০ টাকা দিয়ে। তারপর ‘এই পথ যদি না শেষ হয়…’। সুনীল আকাশ ছাড়া চতুর্দিকে সব পাথুরে মেটেরঙা, বর্ণচ্ছটা নেই। কিন্তু সেই প্রাকৃতিক ভাস্কর্য ও কারুকার্য দেখেও মোহিত হতে হয়। পথে মাঝেমাঝেই বাইক বাহিনী চোখে পড়ে। অবশ্য যারা এমন উচ্চতায় টানা মোটরবাইক চালিয়ে যেতে পারে, তাদের রক্ত এমনিতেই অক্সিজেনের গোডাউন। অধিকাংশ বাইকে দুজন করে আরোহী; হয়তো পালা করে চালাবে। কিন্তু অনেকেই একা। কয়েকটি মেয়েও আছে।

খারদুংলা পাসে গাড়ি দাঁড়াল। ১৭,৫৮২ ফুটের মান রেখে খানিকটা ঠান্ডা ছিল। একটা টিলার মাথায়, সম্ভবত ‘খারদুংলা টপ’-এ চড়ে সবাই ছবি তুলছে দেখে আমরাও উঠেছিলাম। আমার মাথা টলে পড়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল, সঙ্গে হাঁফ। নতুন কিছু নয়। ভার্টিগো ও স্পন্ডেলিসিসের জন্য মাথা ঘোরা আমার সঙ্গী, আর সিঁড়ি চড়লে সমতলেও হাঁপাই। কিন্তু বিশ্বের দ্বিতীয় উচ্চতম মোটরযোগ্য সড়কপাসের উচ্চতাকে সম্মান জানিয়ে একটা টিলায় সিঁড়ি বেয়ে ওঠা-নামা করে আমি বাস্তবিকই খানিকটা টলমলে আর খিটখিটে হয়ে গেলাম।

যতটা না কাবু হয়েছিলাম, তার চেয়ে বেশি অভিনয় করতে হল অক্সিজেন সিলিন্ডারের ভাড়া উসুল করার জন্য। নতুবা ড্রাইভারের অভিজ্ঞ চোখ বুঝতে পেরেছিল, বিশ্রাম ও খানিকটা নীচে অবতরণের পর নিজে থেকে ঠিক হয়ে যাবে আমার কষ্ট। সত্যিই মোমো ও কফি খাওয়ার পর খারদুংলাতেই চাঙ্গা হয়ে গেলাম। গাড়ি ছাড়ার আগে একটা ফলক থেকে টুকে নিলাম — খারদুংলা (টপ) ১৭,৭৬০ ফুট, খারদুংলা গ্রাম ১৪,৭৬৩ ফুট। এটাই বিশ্বাসযোগ্য লাগল। খারদুংলা টপের বিজ্ঞাপিত উচ্চতা ১৮,৩৮০ ফুট ও তার বিশ্বের উচ্চতম বা দ্বিতীয় উচ্চতম হওয়ার দাবিটি যথার্থ নয়। উচ্চতম সড়কপথগুলোর মধ্যে এর অবস্থান ১১তম।

ডিসকিট মঠ

খারদুংলার পর নামার পালা। মাঝে মাঝে সমতল রাস্তা। স্থানে স্থানে ছোটোবড়ো স্তূপ দেখতে এই দু’দিনে অভ্যস্থ হয়ে গেছি। দুপুরে নুব্রা উপত্যকার খালসারে একটা ছোটো রেস্তোরাঁয় খেলাম। জায়গাটা বেশ সুন্দর। রেস্তোরাঁর উলটোদিকে এক সারি সাদা ঝকঝকে অলংকৃত স্তূপ। আমাদের দিনশেষের গন্তব্য হুন্দর।

পথে চোখে পড়ল প্রকাণ্ড দুটি অট্টালিকা— একটি পাহাড়ের মাথায় আর অন্যটি তার পাদদেশে। দ্বিতীয়টিই বেশি সুন্দর লাগল। গাড়ি থামতে জনপ্রতি ৩০ টাকার টিকিট কেটে সেটাই ঘুরেফিরে দেখে নিলাম। প্রকাণ্ড বুদ্ধমূর্তির নীচে বসে, বৃত্তাকার দেওয়ালে “ওঁ মণিপদ্ম হুং’ লেখা চোঙাকৃতি অসংখ্য ঘণ্টার বেষ্টনীর বেশ কয়েকটা ঘুরিয়ে, লম্বা বারান্দা বেয়ে মন্দির প্রদক্ষিণ করে বেশ খানিকক্ষণ কাটালাম। এককথায় অপূর্ব নিসর্গ ।

গাড়িতে ফিরতে রিগজিন বলল, ‘ওয়াহা জানা হ্যায়?’

—ও কেয়া হ্যায়?

—ডিসকিট মনেস্ট্রি।

—তো ইয়ে কেয়া থা?

—ইয়ে ভি ডিসকিট মনেস্ট্রি। নয়া বনা।

আমরা নতুন অংশটি দেখেছি, পুরোনো মূল মনেস্ট্রি হল চূড়ায় অবস্থানকারী অট্টালিকাটি। ঘড়ি অনুযায়ী বিকেল গড়াতে চলেছে। হুন্দর পৌঁছানো নিয়ে চিন্তা নেই কিন্তু তক্ষুণি যাত্রারম্ভ না করলে বালিয়াড়িতে উটের সাফারি ওইদিন আর সম্ভব নয়। পরেরদিন তুরতুক থেকে ফিরে কি সাফারির সময় থাকবে? দোনোমনো করতে করতে গাড়ি কিছুটা গড়িয়ে গেছে। রিগজিন হঠাৎ গাড়ি ঘোরাল, ‘ক্যামেল সাফারি আজ নহী হো পায়েগা। আপ মনেস্ট্রি দেখ লো। সাফারি কল তুরতুক সে ওয়াপস আকে কর লেনা।’

(ক্রমশ…)

স্পেশাল বিউটি ট্রিটমেন্ট

দুশ্চিন্তা, কম ঘুম, শরীরের সঠিক যত্ন না নেওয়া প্রভৃতি কারণে অনেকেরই ত্বকে বার্ধক্যের ছাপ পড়ে অকালে। বিশেষ করে মুখেচোখে বার্ধক্যের রেখাগুলি স্পষ্ট হয় আগে৷ তাই বলা যায়, শুধু বয়স বেড়ে যাওয়ার কারণেই নয়, অকালেও ত্বকের জৌলুস হারিয়ে ফেলেন অনেকেই।

একসময় কসমেটিক অ্যান্টি এজিং প্রক্রিয়া বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। সৌন্দর্য ধরে রাখার জন্য এবং সৌন্দর্য বাড়ানোর জন্য অনেকেই এই প্রক্রিয়াকে মাধ্যম করেছেন। আবার কেউ কেউ শুধু ইঞ্জেকশন এবং ডার্মাল ফিলারকে মাধ্যম করেও সৌন্দর্য ধরে রেখেছেন। তবে শুধু এখানেই থেমে নেই বিউটি ট্রিটমেন্ট-এর বিষয়টি। আজকাল অনেক মহিলা ফেসিয়াল রিজ্যুভিনেশন সার্জারি, অর্থাৎ ফেসলিফ্‌ট সার্জারি-কেও মাধ্যম করছেন সৌন্দর্য বর্ধনে।

ফেসলিফ্ বিষয়টি আসলে কী?

ফেসলিফ্ট হল এক ধরনের কসমেটিক সার্জারি। এই সার্জারির মাধ্যমে শিথিল হয়ে যাওয়া ত্বককে টানটান রূপ দিয়ে, ত্বকের তারুণ্য ফিরিয়ে আনা যায়। আগে শুধু মুখের অংশ ঠিক করা যেত এই সার্জারির মাধ্যমে। কিন্তু বর্তমানে গলা এবং ঘাড়ের ত্বকও টানটান করে দেওয়া যায়। অবশ্য শুধু ত্বক-ই নয়, শিথিল হওয়া মাংসপেশিও ঠিক করা যায় এই সার্জারির মাধ্যমে। এমনকী ফ্যাটও সরিয়ে ফেলা যায়।

ফেসলিফ্ট সার্জারি-কে মাধ্যম করে যে সমস্ত সমস্যার সমাধান করা যেতে পারে, তা হল—

O মুখ এবং নাকের শিথিল ত্বক টানটান করে দেওয়া যায়

O গলার ত্বক ঠিক করা যায়

O ঘাড়ের অংশের ত্বক এবং মাংসপেশির শিথিলতা দূর করা যায়

O মুখমণ্ডলের যে-কোনও অংশের অতিরিক্ত মেদ কমিয়ে ফেলা যায় এই সার্জারির মাধ্যমে।

এই প্রসঙ্গে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, ফেসিয়াল ইঞ্জেকশন প্রয়োগ করে সৌন্দর্য ধরে রাখা যায় ৮ মাস থেকে ২ বছর পর্যন্ত। কিন্তু ফেসলিফ্‌ট সার্জারির পর সৌন্দর্য বজায় থাকে প্রায় ১০ বছর।

কারা এই সার্জারি করাতে পারবেন

অকালে যাদের মুখের ত্বক জৌলুস হারিয়েছে কিংবা যারা বয়স বাড়লেও আরও কিছুদিন সৌন্দর্য ধরে রাখতে চান, তারাই সাধারণত এই ধরনের বিউটি ট্রিটমেন্ট করাতে পারেন। ফেসলিফ্ট সার্জারি করাতে হলে যে-দুটি বিষয় মাথায় রাখতে হবে, তা হল—

O ধূমপান এবং মদ্যপান করা যাবে না।

O অন্য কোনও বড়ো অসুখ থাকলে এই সার্জারি করা যাবে না।

ফেসলিফ্ সার্জারির সুফল

O মুখমণ্ডলের মাংসপেশি টাইট থাকে এবং ত্বকের জৌলুস বাড়াতে সাহায্য করে

O চোয়াল এবং ঘাড়ের শেপ বজায় রাখে

O কোনও সার্জারির দাগ থাকলে তা দূর করা যায়

O স্বাভাবিক সৌন্দর্য ফিরে পাওয়া যায় এবং দীর্ঘদিন সৌন্দর্য বজায় থাকে।

ফেসলিফ্ সার্জারির সাইড এফেক্ট

বেশিরভাগ সার্জারির যেমন কিছু সাইড এফেক্ট থাকে, ফেসলিফ্ট সার্জারিরও তেমনই কিছু সাইড এফেক্ট আছে। যেমন—

O অ্যানেস্থেসিয়া-র কুপ্রভাব পড়তে পারে

O কিছুটা রক্তক্ষয় হতে পারে

O সংক্রমণের ভয় থাকে

O রক্ত জমে যেতে পারে

O যন্ত্রণা হতে পারে

O দীর্ঘ সময় ফোলা ভাব থাকতে পারে

O ঠিক হতে সময় লাগে।

সতর্ক থাকলে এবং সঠিক ভাবে ফেস লিফ্ট সার্জারি করলে, এর কুপ্রভাব অনেকটাই এড়ানো যায়। কিন্তু মনে রাখা দরকার, সার্জারি ঠিকমতো না হলে আরও কিছু স্থায়ী জটিলতা বা সমস্যা তৈরি হতে পারে, যেমন—

O হেমাটোমা

O সার্জারির দাগ থেকে যাওয়া

O নার্ভ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে কাটা জায়গায় চুল না থাকা

O ত্বকেরও ক্ষতি হতে পারে।

শুধু তাই নয়, ভুল ফেসলিফ্ট সার্জারি নানারকম অসুখ এবং জীবনশৈলীর পরিবর্তনও ঘটাতে পারে। যেমন যদি কেউ রক্ত পাতলা করার ওষুধ সেবন করেন, তাহলে তার ক্ষেত্রে ঝুঁকি বেশি। কারণ, ফেসলিফ্ট সার্জারির সময় রক্ত পাতলা করার ওষুধ খাওয়া বন্ধ রাখতে হয়। এর ফলে, সার্জারির সময় বা ঠিক পরে ব্লাড ক্লট অর্থাৎ রক্ত জমাট বাঁধতে বিলম্ব হতে পারে।

অন্যান্য সমস্যা

যিনি ফেসলিফ্ট করাবেন, তার যদি ডায়াবেটিস কিংবা হাই ব্লাড প্রেসার-এর সমস্যা থাকে, তাহলে ফেসলিফ্‌ট সার্জারির পর ঘা শুকোতে দেরি হবে এবং হেমাটোমা-র সমস্যা দেখা দিতে পারে।

ধূমপানের বিষয়টিও এক্ষেত্রে ভীষণ ক্ষতিকারক। যদি আপনি ধূমপায়ী হয়ে থাকেন, তাহলে ফেসলিফ্ট সার্জারির দুই সপ্তাহ আগে থেকে ধূমপান বন্ধ করতে হবে। শুধু তাই নয়, ফেসলিফ্ট সার্জারির পরও কমপক্ষে তিন সপ্তাহ ধূমপান বন্ধ রাখা বাধ্যতামূলক। আর তা যদি না করেন, তাহলে সার্জারির পর নানারকম সমস্যা দেখা দিতে পারে।

ওজন কমবেশি হওয়া: যদি আপনার ওজন ঘনঘন কম-বেশি হওয়ার সমস্যা থাকে, তাহলে ফেসলিফ্ট সার্জারির পর ফেস শেপ-এর সমস্যা দেখা দিতে পারে। এক্ষেত্রে ফেসলিফ্ট-এর উদ্দেশ্য বিফলে যেতে পারে।

সার্জারি আগে পরে: কসমেটিক সার্জন-এর মতে, যদি ফেসলিফ্‌ট সার্জারি করাতেই হয়, তাহলে তা ভালো কোনও হাসপাতালে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসককে দিয়ে করান। এক্ষেত্রে যেহেতু অ্যানাস্থেসিয়া ব্যবহার করতে হয়, তাই ভালো অ্যানাস্থেটিক-কে নিয়োগ করা উচিত।

সার্জারি: ত্বক টাইট করানোর প্রক্রিয়ার জন্য টিস্যু, মাসলস প্রভৃতিতে জমা ফ্যাট রিমুভ করা হয়। এরপর ঝুলে যাওয়া ত্বক বাদ দিয়ে টানটান রূপ দেওয়া হয়। আর সার্জারির পর টেপ-এর সাহায্য নিয়ে কাটা জায়গা ঢেকে দেওয়া হয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এই ধরনের সার্জারির জন্য একদিন, এক রাত্রি হাসপাতালে থাকতে হয় রোগীকে।

ফেসলিফ্‌ট সার্জারির জন্য সময় লাগে ২-৩ ঘণ্টা। তবে, বিশেষ কিছু ক্ষেত্রে আরও একটু বেশি সময় লাগতে পারে।

প্রক্রিয়ার পরে

ফেসলিফ্ট-এর পর যেসব উপসর্গ দেখা দিতে পারে, তা হল—

O হালকা ব্যথা। এই ব্যথা লাঘব করার জন্য ওষুধ দেওয়া হয়

O চুলকানির সমস্যা হতে পারে

O অস্বস্তি হতে পারে।

O সামান্য ফুলে যেতে পারে সার্জারির জায়গা

O শ্বাসকষ্ট হতে পারে

O মাথার যন্ত্রণা হতে পারে

O হার্টবিট বাড়তে-কমতে পারে

এই সমস্ত সমস্যা দেখা দিলে সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসকের পরামর্শ মতো উপযুক্ত ব্যবস্থা নিন।

সার্জারির পর চিকিৎসকরা যেসমস্ত পরামর্শ দিয়ে থাকেন

O মাথার নীচে উঁচু বালিশ দিতে পরামর্শ

O ব্যথা কমানোর জন্য ওষুধ খেতে হবে চিকিৎসকের পরামর্শ মতো

O সার্জারির আশপাশে আইসপ্যাক ব্যবহারের পরামর্শ

O সার্জারির পর দু’মাস ফলো-আপে থাকার পরামর্শও দেওয়া হয়৷ সেইসঙ্গে, ব্যান্ডেজ খোলা এবং তারপর ওষুধ প্রয়োগ করাতে হবে ট্রেনড নার্স-কে দিয়ে

সার্জারির পর আর যাযা করতে হবে

যত্ন এবং সতর্কতা-ই আপনাকে জটিল সমস্যা থেকে রক্ষা করতে পারে সার্জারির পর। এ ক্ষেত্রে যা যা করণীয়-

O চিকিৎসকের পরামর্শমতো সঠিক ভাবে যত্ন নেওয়া

O সার্জারির জায়গায় নখ দিয়ে চুলকাবেন না।

O সার্জারির জায়গায় যে-আস্তরণ তৈরি হয়, তা তুলে ফেলবেন না

O এমন পোশাক পরুন যা সামনে থেকে খোলা যায়। কারণ, মাথা দিয়ে খুলতে গেলে সার্জারির স্থানে আঁচড় লাগতে পারে, যা ক্ষতিকারক

O সার্জারির পর বেশি মুভমেন্ট যেন না হয়

O সার্জারির পর কিছুদিন মেক-আপ করবেন না।

O সার্জারির পর যদি মাথার চুলে শ্যাম্পু করতে হয়, তাহলে তা কীভাবে করতে হবে, তা চিকিৎসকের থেকে জেনে নিন

O সার্জারির পর ভারী ব্যায়াম করবেন না

O সার্জারির পর অন্তত ৬ থেকে আট সপ্তাহ সরাসরি রোদ লাগাবেন না মুখে

O সার্জারির পর অন্তত ৬ সপ্তাহ চুলে ব্লিচ কিংবা কালার করবেন না।

সতর্কতা

সত্যিই যদি বিউটি ট্রিটমেন্ট কিংবা কোনও সার্জারি করাতে চান, তাহলে প্রথমে খোঁজখবর নিয়ে ভালো কোনও কসমেটিক সার্জন-এর কাছে যান। শুধু তাই নয়, ফেসলিফ্‌ট করানোর আগে সবরকম ফিজিক্যাল চেক-আপ করে চিকিৎসকের থেকে জেনে নিন যে, সার্জারি করাতে পারবেন কিনা। অর্থাৎ সার্জারির পর কোনও জটিলতা তৈরি হতে পারে কিনা। কারণ, অন্য কোনও শারীরিক সমস্যা কিংবা অসুখ থাকলে ফেসলিফ্‌ট সার্জারি করানো অনুচিত।

মোনালিসার বিয়ে (পর্ব-০১)

এমন কি ওর আগে কখনও হয়েছিল? চিন্তিত মুখে হীরককে জিজ্ঞেস করল সুখেন।

—কখনও শুনিনি। হলে আমি জানতাম। হীরক চিন্তিত মুখেই উত্তর দিল।

—তাহলে?

—সেটাই তো ভাবছি। কী এমন হল হঠাৎ।

—দেখুন কেউ কি হঠাৎ করে এমন পাগলামি শুরু করে? বউভাতের পর সবে তিনদিন হয়েছে। এখনও অষ্টমঙ্গলাতেও যাওয়া হয়নি।

—ঠিক কী হয়েছিল বলুন তো?

—দেখুন আপনি তো নিজেই জানেন ফুলশয্যার রাত পর্যন্ত সব ঠিকই ছিল। সেদিন রাতে একটা মেয়েলি অসুবিধার কথা বলে আমাকে কাছে ঘেঁষতে দেয়নি। একথা আমি অবশ্য কাউকে বলিনি। কিন্তু পরদিন সকাল থেকেই শুরু করেছে গোলমাল।

—কেমন গোলমাল ?

—প্রথমে বিনা কারণে হি হি করে হাসছিল মাঝেমাঝে। তারপর শুরু করল আমাকে তুই তোকারি। তখনও আমি ভেবেছি ও মজা করছে। কিন্তু তারপর যা করল তা আর…।

—কী করল?

—দেখুন দাদা অত বলতে পারব না। তবে শুনে রাখুন, আজকে ও আমার বউদির চুলের মুঠি ধরে নেড়ে দিয়েছে।

—সর্বনাশ। সুখেনের শেষ কথাটা শুনে হীরকের চোখ গোল হয়ে গেল।

—এখন এই ঘটনার পর বউদি বলছে আলাদা হয়ে যাবে। ওর এই পাগলামির জন্য বাড়িতে একি অশান্তি শুরু হল বলুন তো৷

—বুঝতে পারছি।

—দেখুন দাদা, বিয়ে ঠিক করে দিয়েছেন আপনারা। এখন শুধু আহা উহু করলে তো চলবে না।

দু’জনের কথা হচ্ছিল হীরকের বাবা বোধনবাবুর চেম্বারে বসে। ব্যাপারটা একটু খুলেই বলা যাক। হীরকের বাবা বোধনবাবু ঘটকগিরি করেন। তবে তিনি কিন্তু যে-সে ঘটক নন। তার বিপুল পসার। রুরাল বেঙ্গলি মেট্রিমনি ডট কম নামে একটা ঘটকালি ওয়েবসাইট আছে তার। বর্ধমান পাতালবাজারের কাছে বিরাট অফিস। বর্ধমান, বীরভূম, বাঁকুড়া থেকে শুরু হয়ে পুরুলিয়া আর মেদিনীপুরের কত ছেলেমেয়ের বিয়ে যে তিনি দিয়েছেন তার ঠিক নেই। মোনালিসা বলতে গেলে বোধনবাবুর পাড়ার মেয়ে। মোনালিসা আর সুখেনের বিয়েটা তিনিই ঠিক করেছেন। কিন্তু বিয়ের পর মোনালিসা শ্বশুরবাড়ি গিয়ে যে পাগলামি শুরু করেছে, তাতে বোধনবাবুকে জেল খাটতে না হয়। অবশ্য ছেলে হীরকও যে ছাড় পাবে তার কোনও নিশ্চয়তা নেই। অথচ এই বিয়েটার ঘটকালি করতে হীরক রাজি ছিল না। সে অনেকবার তার বাবাকে বারণ করেছে। কিন্তু বোধনবাবু শোনেননি। মোটা টাকা ঘটক বিদায় পাওয়ার লোভে এই বিয়েটা ঠিক করে দিয়েছিলেন। আজকে তার ফল ভুগতে হচ্ছে। এখন বোধনবাবুকে বললে তিনি কিছুতেই নিজের দোষ মানবেন না।

কিন্তু দায়িত্ব এড়ানো সোজা কথা নয়। সুখেন আজ মরিয়া হয়ে এসেছে। নতুন বিয়ে। কোথায় সুখে দাম্পত্য ভোগ করবে, তা নয় যত্তসব ঝামেলা। তাই সে আজ নিজেদের বাড়িতে হীরককে নিয়ে যাবেই। আজ এসপার নয় ওসপার। ঘটকালির টাকা তার ফেরত চাই। ওদিকে মোনালিসাকে ছাড়তেও তার মন চাইছে না। সুন্দরী যুবতী বউ। তার উপর লোভ সুখেনের ষোলো আনা।

বিপদে পড়ে মোনালিসার জামাইবাবু অরূপকে ফোন করল হীরক। বস্তুত অরূপের উদ্যোগেই এই বিয়ে। তার বাড়ি পাতালবাজার থেকে বেশি দূরে নয়। সে একটু পরেই এসে পড়ল। কিন্তু সে যা বলল তাতে সুখেনের বুক ভেঙে যাওয়ার জোগাড়।

—আসলে বুঝলে হীরক, মোনা টাক একদম পছন্দ করে না। সুখেনের ওই টাক নিয়ে ওর একটা আপত্তি ছিল। আমাকে বলেছিল যে, সব জেনেও আমি কেন একটা টাকলুর সঙ্গে ওকে ভেড়ালাম।

মাথার মধ্যে নিজের গোল টাক-কে একবার হাত বোলালো সুখেন। চোখ তার ছলছল করছে।

—শুধু টাকের জন্য কেউ ওরকম পাগলামি করে না। তাছাড়া এমন তো নয় যে, আমি পরচুলা পরে বিয়ে করেছি। টাক তো আমি কারওর কাছে লুকোইনি। নাকি এই পাগলামি রোগটা মোনার পুরোনো। আপনারা যেটা চেপে গিয়েছেন আমাদের কাছ থেকে।

একবার হতাশ ভঙ্গিতে ঘাড় নাড়ল অরূপ।

—আরে না না। এমন কোনও পাগলামি মোনার কোনও দিন ছিল না। আপনারা তো বিয়ের আগে সব জায়গাতেই খোঁজ নিয়ে দেখেছেন। হীরকও তো মোনাকে ভালোভাবে চেনে। তাছাড়া শুধু যে টাক তা তো নয়। তোমার নামটাও একটা ফ্যাক্টর। আচ্ছা বলো তো এই যুগে ওই নাম চলে? তোমরা আর নাম পেলে না? শেষে সু-খে-ন।

—আমি কিন্তু আমার নাম লুকিয়ে বিয়ে করিনি। আপনারা আমার এই নাম জেনেই এগিয়েছিলেন। তেমন হলে তখনই আপনাদের উচিত ছিল বিয়ে ভেঙে দেওয়া। হীরকের ধৈর্যচ্যুতি ঘটছিল। সে চাপা স্বরে গর্জে উঠল।

—তাহলে এগুলো আপনারা চেপে গিয়েছিলেন কেন অরূপদা ? আপনার জন্য যে আমি বিপদে পড়েছি তার কী হবে? ও কাউকে ভালোবাসত কিনা ওকে জিজ্ঞাসা করেছেন কখনও? হয়তো সেটাই কারণ।

অরূপ অবশ্য এই কথার কোনও সদুত্তর দিল না। আমতা আমতা করে কাজের ছুতো দেখিয়ে কেটে পড়ল। হীরক বুঝতে পারল সুখেন যতই বলুক এই পরিস্থিতিতে সুখেনের বাড়িতে যাওয়া তার চলবে না। বলা যায় না কী ঘটতে কী ঘটে যায়। সে সুখেনকে পরামর্শ দিল বউকে কিছুদিন বাপের বাড়ি রেখে যাওয়ার।

—নতুন বিয়ে তো। অনেক সময় মেয়েদের নতুন বিয়ের পর এইরকম হয় বুঝলেন। চিন্তা করবেন না। সব ঠিক হয়ে যাবে। অষ্টমঙ্গলায় এসে ওকে ক’টা দিন বাপের বাড়িতে রেখে যান।

একদিকে রূপসি মোনালিসার সঙ্গলাভের লোভ, আরেকদিকে তার পাগলামি। এই দুইয়ের টানাপোড়েনে ক্ষতবিক্ষত সুখেন হীরকের সঙ্গে সহমত হতে পারল না। কিন্তু সে বড়ো ভালোমানুষ। জোর করে হীরককে বাড়িতে ধরে নিয়ে যেতে সে পারল না। মনের দুঃখ মনে চেপে সে বাড়ি ফিরে গেল।

(ক্রমশ…)

পড়ার জন্য সীমাহীন গল্প-নিবন্ধসাবস্ক্রাইব