মায়েরাও বজায় রাখুন ত্বকের তারুণ্য

বয়স যাইহোক-না কেন, ত্বকের জৌলুস বজায় রাখা যায় যে-কোনও বয়সে। কিন্তু দুঃশ্চিন্তা, কম ঘুম, শরীরের সঠিক যত্ন না নেওয়া প্রভৃতি কারণে অনেকেরই ত্বকে বার্ধক্যের ছাপ পড়ে অকালে। বিশেষকরে মুখেচোখে বার্ধক্যের রেখাগুলি স্পষ্ট হয় আগে। আর সৌন্দর্য কমতে থাকলে আত্মবিশ্বাসও কমতে থাকে।

একসময় কসমেটিক অ্যান্টি এজিং প্রক্রিয়া বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। সৌন্দর্য ধরে রাখার জন্য এবং সৌন্দর্য বাড়ানোর জন্য অনেকেই এই প্রক্রিয়াকে মাধ্যম করেছেন। আবার কেউ কেউ শুধু ইঞ্জেকশন এবং ডার্মাল ফিলারকে মাধ্যম করেও সৌন্দর্য ধরে রেখেছেন। তবে শুধু এখানেই থেমে নেই বিউটি ট্রিটমেন্ট-এর বিষয়টি। আজকাল অনেক মহিলা ফেসিয়াল রিজুভিনেশন সার্জারি অর্থাৎ ফেসলিফ্ট সার্জারিও মাধ্যম করছেন সৌন্দর্য বর্ধনে।

কারা এই সার্জারি করাতে পারবেন

অকালে যাদের মুখের ত্বক জৌলুস হারিয়েছে কিংবা যারা বয়স বাড়লেও আরও কিছুদিন সৌন্দর্য ধরে রাখতে চান, তারাই সাধারণত এই ধরনের বিউটি ট্রিটমেন্ট করাতে পারেন। ফেসলিফ্ট সার্জারি করাতে হলে যে-দুটি বিষয় মাথায় রাখতে হবে, তা হল—

  • ধূমপান এবং মদ্যপান করা যাবে না।
  • অন্য কোনও বড়ো অসুখ থাকলে এই সার্জারি করা যাবে না।

ফেসলিফ্ট সার্জারির সুফল

  • মুখমণ্ডলের মাংসপেশি টাইট থাকে এবং ত্বকের জৌলুস বাড়াতে সাহায্য করে
  • চোয়াল এবং ঘাড়ের শেপ বজায় রাখে
  • কোনও সার্জারির দাগ থাকলে তা দূর করা যায়
  • স্বাভাবিক সৌন্দর্য ফিরে পাওয়া যায় এবং দীর্ঘদিন সৌন্দর্য বজায় থাকে।

ফেসলিফ্ট সার্জারির সাইড এফেক্ট

বেশিরভাগ সার্জারির যেমন কিছু সাইড এফেক্ট থাকে, ফেসলিফ্ট সার্জারিরও তেমনই কিছু সাইড এফেক্ট আছে।

যেমন—

  • অ্যানেস্থেসিয়া-র কুপ্রভাব পড়তে পারে
  • কিছুটা রক্তক্ষয় হতে পারে
  • সংক্রমণের ভয় থাকে
  • রক্ত জমে যেতে পারে
  • যন্ত্রণা হতে পারে
  • দীর্ঘ সময় ফোলা ভাব থাকতে পারে
  • ঠিক হতে সময় লাগে।

সতর্ক থাকলে এবং সঠিক ভাবে ফেসলিফ্ট সার্জারি করলে, এর কুপ্রভাব অনেকটাই এড়ানো যায়। কিন্তু মনে রাখা দরকার, সার্জারি ঠিকমতো না হলে আরও কিছু স্থায়ী জটিলতা বা সমস্যা তৈরি হতে পারে, যেমন—

  • হেমাটোমা
  • সার্জারি-র দাগ থেকে যাওয়া
  • নার্ভ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে
  • সার্জারি-র জায়গায় (মুখমণ্ডল লাগোয়া অঞ্চলে) চুল না গজানো
  • ত্বকেরও ক্ষতি হতে পারে।

শুধু তাই নয়, ভুল ফেসলিফ্ট সার্জারি নানারকম অসুখ এবং জীবনশৈলীর পরিবর্তনও ঘটাতে পারে। যেমন— যদি কেউ রক্ত পাতলা করার ওষুধ সেবন করেন, তাহলে তার ক্ষেত্রে ঝুঁকি বেশি। কারণ, ফেসলিফ্ট সার্জারির সময় রক্ত পাতলা করার ওষুধ খাওয়া বন্ধ রাখতে হয়। এর ফলে, সার্জারির সময় বা ঠিক পরে ব্লাড ক্লট অর্থাৎ রক্ত জমাট বাঁধতে বিলম্ব হতে পারে।

অন্যান্য সমস্যা বা অসুখ

যিনি ফেসলিফ্ট করাবেন, তার যদি ডায়াবেটিস কিংবা হাই ব্লাড প্রেশার-এর সমস্যা থাকে, তাহলে ফেসলিফ্ট সার্জারির পর ঘা শুকোতে দেরি হবে এবং হেমাটোমা-র সমস্যা দেখা দিতে পারে।

ধূমপানের বিষয়টিও এক্ষেত্রে ভীষণ ক্ষতিকারক। যদি আপনি ধূমপানকারী হয়ে থাকেন, তাহলে ফেসলিফ্ট সার্জারির দুই সপ্তাহ আগে থেকে ধূমপান বন্ধ করতে হবে। শুধু তাই নয়, ফেসলিফ্ট সার্জারির পরও কমপক্ষে তিন সপ্তাহ ধূমপান বন্ধ রাখা বাধ্যতামূলক। আর তা যদি না করেন, তাহলে সার্জারির পর নানারকম সমস্যা দেখা দিতে পারে।

ওজন কমবেশি হওয়া: যদি আপনার ওজন ঘনঘন কমবেশি হওয়ার সমস্যা থাকে, তাহলে ফেসলিফ্ট সার্জারির পর ফেস শেপ-এর সমস্যা দেখা দিতে পারে। এক্ষেত্রে ফেসলিফ্ট-এর উদ্দেশ্য বিফলে যেতে পারে।

সার্জারি আগে পরে: কসমেটিক সার্জন-এর মতে, যদি ফেসলিফ্ট সার্জারি করাতেই হয়, তাহলে তা ভালো কোনও হাসপাতালে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসককে দিয়ে করান। এক্ষেত্রে যেহেতু অ্যানাস্থেসিয়া ব্যবহার করতে হয়, তাই ভালো অ্যানাস্থেটিক-কে নিয়োগ করা উচিত।

সার্জারি: ত্বক টাইট করানোর প্রক্রিয়ার জন্য টিস্যু, পেশী প্রভৃতিতে জমা ফ্যাট রিমুভ করা হয়। এরপর ঝুলে যাওয়া ত্বক বাদ দিয়ে টানটান রূপ দেওয়া হয়। আর সার্জারির পর টেপ-এর সাহায্য নিয়ে কাটা জায়গা ঢেকে দেওয়া হয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এই ধরনের সার্জারির জন্য একদিন, এক রাত্রি হাসপাতালে থাকতে হয় রোগীকে।

ফেসলিফ্ট সার্জারির জন্য সময় লাগে ২-৩ ঘণ্টা। তবে, বিশেষ কিছু ক্ষেত্রে আরও একটু বেশি সময় লাগতে পারে। ফেসলিফ্ট বিষয়টি আসলে কী?

ফেসলিফ্ট হল এক ধরনের কসমেটিক সার্জারি। এই সার্জারির মাধ্যমে শিথিল হয়ে যাওয়া ত্বককে টানটান রূপ দিয়ে তারুণ্য ফিরিয়ে আনা যায়। আগে শুধু মুখের অংশ ঠিক করা যেত এই সার্জারির মাধ্যমে। কিন্তু বর্তমানে গলা এবং ঘাড়ের ত্বকও টানটান করে দেওয়া যায়। অবশ্য শুধু ত্বক-ই নয়, শিথিল হওয়া মাংশপেশিও ঠিক করা যায় এই সার্জারির মাধ্যমে। এমনকী ফ্যাটও সরিয়ে ফেলা যায়।

ফেসলিফ্ট সার্জারি-কে মাধ্যম করে যে-সমস্ত সমস্যার সমাধান করা যেতে পারে, তা হল—

  • মুখ এবং নাকের শিথিল ত্বক টানটান করে দেওয়া যায়
  • গলার ত্বক ঠিক করা যায়
  • ঘাড়ের অংশের ত্বক এবং মাংসপেশির শিথিলতা দূর করা যায়
  • মুখমণ্ডলের যে-কোনও অংশের অতিরিক্ত মেদ কমিয়ে ফেলা যায় এই সার্জারির মাধ্যমে।

এই প্রসঙ্গে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, ফেসিয়াল ইঞ্জেকশন প্রয়োগ করে সৌন্দর্য ধরে রাখা যায় ৮ মাস থেকে ২ বছর কিন্তু ফেসলিফ্ট সার্জারির পর সৌন্দর্য বজায় থাকে প্রায় ১০ বছর।

প্রক্রিয়ার পরে

ফেসলিফ্ট-এর পর যেসব উপসর্গ দেখা দিতে পারে, তা হল-

  • হালকা ব্যথা। এই ব্যথা লাঘব করার জন্য ওষুধ দেওয়া হয়
  • চুলকানির সমস্যা হতে পারে
  • অস্বস্তি হতে পারে
  • সামান্য ফুলে যেতে পারে সার্জারির জায়গা
  • শ্বাসকষ্ট হতে পারে
  • মাথার যন্ত্রণা করতে পারে
  • হার্টবিট বাড়তে-কমতে পারে।

এই সমস্ত সমস্যা দেখা দিলে সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসকের পরামর্শমতো উপযুক্ত ব্যবস্থা নিন।

সার্জারির পর চিকিৎসকরা যে সমস্ত পরামর্শ দিয়ে থাকেন

  • মাথার নীচে উঁচু বালিশ দিতে পরামর্শ
  • ব্যথা কমানোর জন্য ওষুধ খেতে হবে চিকিৎসকের পরামর্শ মতো
  • সার্জারির আশপাশে আইসপ্যাক ব্যবহারের পরামর্শ
  • সার্জারির পর দু’মাস ফলো-আপে থাকার পরামর্শও দেওয়া হয়। সেইসঙ্গে, ব্যান্ডেজ খোলা এবং তারপর ওষুধ প্রয়োগ করাতে হবে ট্রেনড নার্স-কে দিয়ে।

সার্জারির পর আর যা করতে হবে

যত্ন এবং সতর্কতা-ই আপনাকে জটিল সমস্যা থেকে রক্ষা করতে পারে সার্জারির পর। এ ক্ষেত্রে যা যা করণীয়

  • চিকিৎসকের পরামর্শমতো সঠিক ভাবে যত্ন নেওয়া
  • সার্জারির জায়গায় নখ দিয়ে চুলকাবেন না
  • সার্জারির জায়গায় যে আস্তরণ তৈরি হয়, তা তুলে ফেলবেন না
  • এমন পোশাক পরুন যা সামনে থেকে খোলা যায়। কারণ, মাথা দিয়ে খুলতে গেলে সার্জারির স্থানে আঁচড় লাগতে পারে, যা ক্ষতিকারক
  • সার্জারির পর বেশি মুভমেন্ট যেন না হয়
  • সার্জারির পর কিছুদিন মেক-আপ করবেন না।
  • সার্জারির পর যদি মাথার চুলে শ্যাম্পু করতে হয়, তাহলে তা কীভাবে করতে হবে, তা চিকিৎসকের থেকে জেনে নিন সার্জারির পর ভারী ব্যায়াম করবেন না।
  • সার্জারির পর অন্তত ৬ থেকে আট সপ্তাহ সরাসরি রোদ লাগাবেন না মুখে
  • সার্জারির পর অন্তত ৬ সপ্তাহ চুলে ব্লিচ কিংবা কালার করবেন না।

সাবধান থাকুন

তামিল ছবির বিখ্যাত অভিনেত্রী রাইজা উইলসন এক ভিডিয়ো পোস্ট করেছিলেন সোশ্যাল মিডিয়াতে, যেখানে তিনি তাঁর শরীরের ক্ষতিগ্রস্ত ত্বক প্রদর্শন করেন। আসলে ওই ভিডিয়োটির মাধ্যমে তিনি এই বার্তা দিতে চেয়েছেন যে, ফেসলিফ্ট সার্জারির কারণেই তাঁর ত্বক নষ্ট হয়ে গেছে। আর এই ক্ষতির জন্য তিনি কসমেটিক সার্জনকে দায়ী করেছেন। তাই, সৌন্দর্য ধরে রাখা কিংবা সৌন্দর্য বাড়ানোর ইচ্ছে থাকলেও, অনেকেই এখন সার্জারির উপর ভরসা করতে পারছেন না৷

কিন্তু সত্যিই যদি বিউটি ট্রিটমেন্ট কিংবা কোনও সার্জারি করাতে চান, তাহলে প্রথমে খোঁজখবর নিয়ে ভালো কোনও কসমেটিক সার্জন-এর কাছে যান। শুধু তাই নয়, ফেসলিফ্ট করানোর আগে সবরকম ফিজিক্যাল চেক-আপ করে চিকিৎসকের থেকে জেনে নিন যে, সার্জারি করাতে পারবেন কিনা। অর্থাৎ সার্জারির পর কোনও জটিলতা তৈরি হতে পারে কিনা। কারণ, অন্য কোনও শারীরিক সমস্যা কিংবা অসুখ থাকলে ফেসলিফ্ট সার্জারি করানো অনুচিত।

বাঁচতে হলে সতর্কতা জরুরি

যে দল ক্ষমতায় থাকে, সেই দলের লোকেরা কোনও সমস্যা কিংবা অপরাধ দেখতে পান না। হয় তারা চোখ বন্ধ করে রাখেন অথবা দেখেও না দেখার ভান করেন। তাই বড়ো কোনও অপরাধের ঘটনা ঘটলেও তাদের বলতে শোনা যায়— কোনও সমস্যা তো নেই, সবকিছু ঠিকঠাক চলছে। কারণ তারা রাম, শিব, বিষ্ণু, ব্রহ্মা এবং অন্যান্য শত শত দেব-দেবীর আশীর্বাদপ্রাপ্ত। কিন্তু বাস্তবে, এই ‘পূজারী’-দের যুগে যে পরিমাণ অপরাধ, ধর্ষণ ও খুন হচ্ছে, তা তাদের মর্যাদা বৃদ্ধি করছে না ববং তাদের এখন শিক্ষিত লোকেরা ঘৃণার চোখে দেখছে। তবু আজও কারও বিরুদ্ধে কোনও অপরাধ সংঘটিত হলে, তা তার এই জন্মে বা পূর্বজন্মের কৃতকর্মের ফল বলে তুলে ধরছে ভণ্ড ধার্মিকরা।

কয়েক মাস আগে মধ্যপ্রদেশে একটি মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে। দুই সেনা কর্মকর্তার সামনে, তাদেরই সঙ্গে আসা দুই তরুণীকে রাতে গণধর্ষণ করা হয়। আবার ৪ অক্টোবর পুণেতে তিনজন পুরুষ মিলে এক তরুণীকে ধর্ষণ করে তারই পুরুষ বন্ধুর সামনে। একদিকে যেমন এই ধরনের নারকীয় ধর্ষণের ঘটনা ঘটে চলেছে, অন্যদিকে আবার ধর্ষণ নিয়ে চলছে রাজনীতি। এই যেমন কলকাতার চিকিৎসক তরুণীর ধর্ষণ এবং খুনকে রাজনৈতিক ইস্যু বানিয়ে ফায়দা নেওয়ারও চেষ্টা হচ্ছে। মধ্যপ্রদেশের মহু, কলকাতার আরজিকর এবং পুণেতে হওয়া ধর্ষণের ঘটনাকে ‘বিচ্ছিন্ন ঘটনা’ আখ্যা দিয়েছেন কেউ কেউ।

আবার ধর্ষণ নিয়ে ধর্মীয় রাজনীতিও হয়। ধর্মের দোকানদাররা বোঝাতে চান যে, ‘কেউ যদি কোনও ভুল করে থাকে, তাহলে সরকার তাকে শাস্তি দেবে, নয়তো সে এই জীবনে অথবা মৃত্যুর পর শাস্তি পাবেই ভগবানের কাছে।’

যুবতিরাও অনেকে এই মিথ্যাচারে গভীর ভাবে বিশ্বাস করে চলেছেন এবং তারা সংবিধান দ্বারা প্রণীত আইনি শাসনের চেয়ে ধর্মের বিধি-বিধানে বেশি বিশ্বাস করছেন। অনেকে মনে করছেন যে, তাদের সঙ্গে খারাপ কিছু ঘটলে, স্বয়ং ভগবান অপরাধীকে শাস্তি দেবেন। আর এই বিশ্বাসের ফলেই তারা জরুরী পরিস্থিতিতেও, নিজে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার পরিবর্তে, সুরক্ষার জন্য পূজাপাঠ করে তার সঙ্গে হওয়া অন্যায়ের বিচার চাইছেন।

আসলে, প্রতিটি ধর্মের সাহিত্যও এমন সব ঘটনা দ্বারা পরিপূর্ণ, যেখানে মহিলাদের সঙ্গে খারাপ ঘটনা ঘটেছে অথচ আইনি শাস্তির পরিবর্তে, তার বিচার করছেন ভগবান।

পুনের কাছে বোপদেব ঘাটে যখন তিনজন লোক ২২ বছরের মেয়েটির শার্ট এবং স্কার্ফ খুলে নিয়ে, তারই প্রেমিককে বেঁধে রেখে, প্রেমিকেরই সামনে ধর্ষণ করে পালিয়ে গিয়েছিল ধর্ষকরা, ধর্ষিতা মেয়েটি হয়তো তখনও ভেবেছিল, ভগবান এর বিচার করবেন!

কোজাগরি (পর্ব-০২)

সূর্যটা এখন পশ্চিমের আকাশে ঢলে পড়েছে। শেষ বিকেলের আলো ছড়িয়ে পড়েছে কার্জন পার্কের মেহগনি আর ইউক্যালিপটাস গাছের মাথায়। পড়ন্ত বিকেলের আভায় কোজাগরি যেন আরও সুন্দর হয়ে উঠেছে। ঝিকমিক করছে তার কালো চোখের তারা দুটো। চোখ তো নয় যেন উটির স্বচ্ছ সরোবর। শঙ্খশুভ্রর হঠাৎ অজন্তার কথা মনে পড়ল। সে হয়তো তার জন্য প্যারাডাইস সিনেমার সামনে অপেক্ষা করে এতক্ষণে বাড়ি চলে গেছে। সে তাকে ফালতু ছেলে ভেবেছে কিনা কে জানে। কাল তার সামনে কোন মুখে গিয়ে দাঁড়াবে শঙ্খশুভ্র ভেবে পেল না।অজন্তার কথা ভাবতে ভাবতেই আবার কোজাগরির দিকে চোখটা পড়তেই সে বলল, “আচ্ছা আমাকে তোমার কী প্রয়োজন বললে না তো?”

—সেটা বলব বলেই তো তোমাকে এখন এক জায়গায় নিয়ে যাব।

—কোথায়?

—গেলেই দেখতে পাবে। চলো, বাস দাঁড়িয়ে আছে।

—দাঁড়াও, আগে ফুচকার পয়সা মিটিয়ে দিই। শঙ্খশুভ্র ফুচকার পয়সা মিটিয়ে দিয়ে কোজাগরির নির্দেশে একটা মিনি বাসে উঠে পাশাপাশি বসল। এরই মধ্যে ব্যাকপকেটের মোবাইল ফোনটা বেজে উঠল মাইকেল জ্যাকসনের গানের সুরে— ‘ট্রিজ আর আওয়ার লাংস। দ্য এয়ার ইজ আওয়ার ব্রিদ’। শঙ্খশুভ্র মোবাইলটা হাতে নিয়ে নম্বরটা দেখেই বুঝতে পারল অজন্তার ফোন। সে সুইচ অন করে সাফাই গাইল, ‘হ্যালো অজন্তা একটা বিশেষ কাজে আটকে গেছি। কাল দেখা হলে সব বলব। প্লিজ কিছু মনে কোরো না।”

অজন্তা লাইন কেটে দিল কোনও কথা না বলে। বোঝা গেল সে রেগে আছে। কথা ছিল ওরা আজ একসঙ্গে সিনেমা দেখবে। রেস্তোরাঁয় চাউমিন খাবে। মানুষ পরিস্থিতির দাস। কখন কোন পরিস্থিতি মানুষকে কোথায় নিয়ে যায় কেউ বলতে পারে না। শঙ্খশুভ্র কি ভাবতে পেরেছিল অজানা অচেনা একটা মেয়ের সঙ্গে তাকে এখন কাটাতে হবে। মানুষ ভাবে এক আর হয় আর এক। একটু পরে কোজাগরি তাকে কনুইয়ের ধাক্কা মেরে বলল, ‘এই নেমে এসো।’

শঙ্খশুভ্র বাস থেকে নেমে কনডাক্টরকে দুটো টিকিটের টাকা দিল। আর ঠিক তখনই বাসটা হাড় বজ্জাতের মতো তার চোখের সামনে এক রাশ কালো পেট্রোলের ধোঁয়া উড়িয়ে চলে গেল। শঙ্খশুভ্র নাকে রুমাল চেপে ধরল। পেট্রলের গন্ধ সে সহ্য করতে পারে না। বাসটা অনেকটা দূর চলে যেতেই শঙ্খশুভ্র নাক থেকে রুমালটা সরিয়ে দেখল কোজাগরি রাসমণি বাজারের রাস্তার ওপারে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। শঙ্খশুভ্র রাস্তা  পার হতেই কোজাগরি হাতের ইশারায় ওকে অনুসরণ করার ইঙ্গিত দিয়ে দ্রুত এগিয়ে গেল৷ মনে হয় কোজাগরি ইচ্ছা করেই শঙ্খশুভ্রর সঙ্গে এখানে কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখে চলছে। সন্ধে হতেই রাস্তার বিজলিবাতিগুলো জ্বলে উঠল, কিন্তু আলোগুলোর দেহে যেন প্রাণ নেই। কেমন নিষ্প্রভ। আবছা আলোয় দেখা গেল রাস্তার দুপাশে ভূতের মতো মানুষগুলো কাঁচা সবজি বিক্রি করছে। অফিস ফেরতা বাবুদের বেজায় ভিড় লেগে গেছে এরই মধ্যে।

এক জায়গায় কিছু মানুষের জটলা দেখে শঙ্খশুভ্র দাঁড়িয়ে পড়ল। ভিড় ঠেলে ভিতরে যায় কার সাধ্যি। শঙ্খশুভ্র শুনতে পেল কে যেন আর্তস্বরে প্রাণভয়ে চিৎকার করছে – ‘কে আছো বাঁচাও। আমায় মেরে ফেলল।’

—চুপ শালা, ভেবেছিস হিস্সা না দিয়ে পালাবি। আজ তোর কোন বাপ বাঁচায় দেখি। অন্য আর একজনের ক্রুদ্ধ স্পর্ধিত কণ্ঠস্বর গর্জে উঠল৷

শঙ্খশুভ্র অতি কষ্টে ভিড় ঠেলে সামনে গিয়ে দেখল আধবুড়ো কঙ্কালসার মানুষের বুকের উপর পা তুলে দিয়েছে একটি যুবক। মাটিতে থাকা লোকটিকে দেখে বোঝা গেল তার উপর যথেষ্ট কিল চড় লাথি ঘুষি পড়েছে। একজন অসহায় লোককে এমন নিষ্ঠুর ভাবে মারা হচ্ছে অথচ প্রতিবাদ করার কেউ নেই। সকলেই মুখে কুলুপ এঁটে আছে। প্রতিবাদ করার সাহস কারওর নেই। শঙ্খশুভ্র ওদের একজনকে জিজ্ঞেস করল, “আচ্ছা কী হয়েছে বলতে পারেন?’

একজন সাহস করে বলল, ‘আর বলেন কেন বাবু। ওই ছেলেটি এখানকার উঠতি মস্তান।আমরা এখানে কাঁচাআনাজ বেচতে আসি। আমাদের বিক্রি হোক না হোক এই মস্তানকে রোজ একশো টাকা দিতে হবে। না দিলে বাজারে বসতে দেয় না। ওই ইদ্রিস চাচা তিনদিন টাকা দেয়নি বলে ওকে মারছে।’

শঙ্খশুভ্র বলল, “আপনারা থানায় জানিয়েছেন?”

আর একজন এগিয়ে এসে বলল, “জানিয়েছি। কোনও ফল হয়নি। আমাদের কথা কে শোনে বলুন।”

শঙ্খশুভ্র বুঝতে পারল, যে রক্ষক সেই ভক্ষক। মস্তান ছেলেটি সবজি বিক্রেতা ইদ্রিস চাচার চুলের মুঠি ধরে সপাটে চড় মারতেই সে ককিয়ে উঠল, “তোমার পায়ে পড়ি আমাকে মেরো না। আমি কালই তোমার টাকা মিটিয়ে দেব।”

দৃশ্যটা দেখে শঙ্খশুভ্রর রক্তে আগুন ধরে গেল। তার ভিতর থেকে কে যেন বেরিয়ে এসে বলে উঠল, ‘ওকে ছেড়ে দিন। আমি ওর টাকা মিটিয়ে দিচ্ছি। বলুন কত দিতে হবে’। মস্তান যুবকটি লাল চোখে শঙ্খশুভ্রকে আপাদমস্তক দেখে নিয়ে বলল, “মাত্র তিনশো টাকা।’

শঙ্খশুভ্র টাকা মিটিয়ে দিতেই মস্তান যুবকটি চলে গেল। আশপাশের সমস্ত মানুষগুলো শঙ্খশুভ্রর দিকে অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে রইল। যেন তারা সাক্ষাৎ শ্রীহরি দর্শন করছে। যে লোকটি মার খেয়ে মাটিতে পড়েছিল সে ঠোঁটের কষের রক্ত হাতের চেটোয় মুছে হামাগুড়ি দিয়ে এসে শঙ্খশুভ্রর পা জড়িয়ে ধরে কেঁদে উঠল। আধা হিন্দি আধা উর্দু ভাষায় কী যেন বলল, বোঝা গেল না। লাথ খাওয়া অসহায় মানুষটিকে দেখে শঙ্খশুভ্রর চোখদুটো ছলছল করে উঠল।

কোজাগরি ভিড় ঠেলে সামনে এসে ওর হাত ধরে বলে উঠল, ‘চলে এসো।’

পচাখালের কাছে আসতেই দূর থেকে কারা যেন শিস দিয়ে উঠল। জায়গাটা অন্ধকার। যেন নরকগুলজার। খালের দু-পাশের বস্তিতে আলো জ্বলছে। কিন্তু রাস্তায় আলো নেই। কাঠের পুল পার হয়ে আসতেই দেখা গেল কাছের চায়ের দোকানে কিছু ছোকরা গুলতানি করছে। ঝুলন্ত এমার্জেন্সি লাইটের আলোয় তাদের স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না। শুধু আবছা আলোয় ছায়ামূর্তিগুলোর মুখের বিড়ির আগুন জোনাকির মতো জ্বলছে নিভছে। কে যেন বলে উঠল, ‘গুরু তোমার ঐশ্বর্য রাই আসছে।’

–এই চুপ, সঙ্গে চিড়িয়া আছে। আর একজন প্রেতের কণ্ঠস্বর ভেসে এল কানে। হঠাৎ কোজাগরি একটা সিগারেটের দোকানের সামনে এসে শঙ্খশুভ্রর দিকে ঘাড় ফিরিয়ে বলল, ‘এই পাঁচশো টাকা দাও তো।’

(ক্রমশ…)

ত্বক এবং চুল ভালো রাখার উপায়

এমন অনেক মহিলা আছেন, যারা ত্বক এবং চুলের সমস্যার জন্য শুধু খারাপ জীবনধারা কিংবা জেনেটিক ফ্যাক্টর-কে দায়ী করেন। আবার অনেকে আছেন যারা ত্বক এবং চুলের সমস্যাকে অবহেলা করেন কিংবা বলতে থাকেন ‘যত্ন নেওয়ার জন্য সময় দিতে পারছি না’। কিন্তু অনেকে এটা জানেন না যে, শরীরে নিউট্রিশন লেভেল-এর উপর নির্ভর করে ত্বক এবং চুলের স্বাস্থ্য। আসলে নিউট্রিশন ও সঠিক ভিটামিন ত্বককে কোমল, মোলায়েম করে তোলে এবং চুলকে ঘন, কালো এবং মজবুত রাখতে সাহায্য করে।

মনে রাখা দরকার, উপযুক্ত আহার এবং সঠিক ভাবে হজম না হলে, তার কুপ্রভাব পড়ে ত্বক এবং চুলে। তাই কী খাচ্ছেন এবং তা সঠিক ভাবে হজম হচ্ছে কিনা সে বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। বিশেষকরে যাদের ফুড সেন্সিটিভিটি বা অ্যালার্জির সমস্যা আছে, তাদের এই বিষয়ে বিশেষ ভাবে যত্ন নেওয়া দরকার। বিশেষজ্ঞদের মতে, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট-এর ফোটো প্রোটেক্টিভ ক্ষমতা ত্বককে সুরক্ষা দেয়। তাই, এবার জেনে নিন আর কী কী কারণে ত্বক এবং চুলের স্বাস্থ্য নির্ভর করে।

ত্বকের স্বাস্থ্যরক্ষার উপায়

ভিটামিন-এ, বি-৩ এবং বি-১২-এর কার্যকারিতা: মানব শরীরে, বিশেষকরে ত্বকের সু-স্বাস্থ্য বজায় রাখার জন্য ভিটামিন ‘এ’-র ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভিটামিন এ ত্বক-ফার্মিং, কোলাজেন এবং ইলাস্টিনের উৎপাদন বাড়ায়, যা সূক্ষ্ম রেখা এবং বলিরেখা কমাতে সাহায্য করে। UV রশ্মির সংস্পর্শে হাইপারপিগমেন্টেশন এবং দাগ হতে পারে। ভিটামিন এ-এর অনেক সুবিধার মধ্যে একটি হল— – এটি এই ক্ষতির হাত থেকে বাঁচায়। ভিটামিন এ কোলাজেন উৎপাদনকে উদ্দীপিত করে সূক্ষ্ম রেখা এবং বলিরেখার উপস্থিতি কমাতে কাজ করে। রেটিনলের মতো রেটিনোয়েডগুলি ক্ষতিগ্রস্ত ইলাস্টিন ফাইবারগুলি অপসারণ করতে এবং অ্যাঞ্জিওজেনেসিস বা নতুন রক্তনালী গঠনে সহায়তা করে ত্বকের স্থিতিস্থাপকতা এবং ঝুলে পড়া রোধ করে।

ক্যারোটিনয়েড সমৃদ্ধ একটি খাদ্য, যেমন বিটা ক্যারোটিন, কোষের ক্ষতি, ত্বকের বার্ধক্য এবং চর্মরোগ প্রতিরোধ করতে সাহায্য করতে পারে। ক্যারোটিনয়েডগুলি ত্বককে দূষণ এবং ইউভি বিকিরণ থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করতে পারে, যা ত্বকের স্বাস্থ্য এবং চেহারাকেও প্রভাবিত করতে পারে। হাইপারপিগমেন্টেশন, বয়সের দাগ এবং সানস্পটগুলিকে উন্নত করতে সাহায্য করতে পারে এবং সামগ্রিক ভাবে ত্বকের টোন আরও সমান করতে পারে। রেটিনোয়েডগুলি ত্বককে এক্সফোলিয়েট করতে সাহায্য করতে পারে, ছিদ্র থেকে ময়লা, তেল এবং মৃত ত্বকের কোষগুলিকে বের করে, পিম্পল প্রতিরোধ করতে সাহায্য করতে পারে। এগুলি কোলাজেন এবং ইলাস্টিন উৎপাদনকে উদ্দীপিত করতে ত্বকে প্রবেশ করে, যা ছিদ্র এবং ব্রণের দাগ কমাতে সাহায্য করে।

ভিটামিন বিথ্রি আপনার ত্বকের জন্য কী করে?

এটি ত্বকের আর্দ্রতা ধরে রাখতে কাজ করে। এটি কেরাটিন বাড়াতেও সাহায্য করে। যখন এটি বার্ধক্যযুক্ত ত্বকের ক্ষেত্রে আসে, তখন ত্বকের গঠনকে মসৃণ করতে এবং বলিরেখা কমাতে সাহায্য করে। তাই, স্ক্রাবিং করে ত্বকের মৃত কোষ থেকে মুক্তি পান। এছাড়া, ত্বকের উজ্জ্বলতা বাড়াতে ভিটামিন-সি সিরাম ব্যবহার করুন।

সারাদিন আপনার ত্বককে সুস্থ রাখতে ময়েশ্চারাইজার প্রয়োগ করে ত্বককে হাইড্রেট রাখুন। দিনেরবেলা হালকা সিরাম ক্রিম এবং রাতে নাইট ক্রিম প্রয়োগ করুন। আপনার ত্বককে সূর্যের ক্ষতিকারক প্রভাব থেকে বাঁচান। এর জন্য ব্রড স্পেকট্রাম ক্রিম ব্যবহার করে ত্বকের ট্যানিং, কালো দাগ এবং রোদে পোড়ার হাত থেকে রক্ষা করুন।

আপনার ত্বকের কোষের স্বাস্থ্যরক্ষার জন্য বি-১২ প্রয়োজন। এটি ত্বকের কোষের প্রদাহ এবং শুষ্কতা কমায় এবং ব্রণ, সোরিয়াসিস, একজিমা প্রভৃতি প্রতিরোধ করে।

ত্বকের জন্য ভিটামিনসি

কয়েকটি ক্লিনিকাল গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, ভিটামিন সি বলিরেখার সমস্যা দূর করে। অন্তত তিন মাস ধরে ভিটামিন সি ফর্মুলেশন ব্যবহার করলে মুখ এবং ঘাড়ের সূক্ষ্ম এবং মোটা বলিরেখা দূর হয়। সেইসঙ্গে, সামগ্রিক ত্বকের গঠনও উন্নত করে। ভিটামিন সি একটি ব্রড-স্পেকট্রাম সানস্ক্রিনের সংমিশ্রণে ব্যবহার করা হলে ক্ষতিকারক অতিবেগুনি রশ্মি থেকে ত্বককে রক্ষা করতেও সাহায্য করতে পারে।

ক্লিনিকাল গবেষণায় দেখা গেছে যে, ভিটামিন সি অন্যান্য সাময়িক উপাদানগুলির সঙ্গে মিশ্রিত করা— যেমন ফেরুলিক অ্যাসিড এবং ভিটামিন ই, লালভাব হ্রাস করতে পারে এবং ক্ষতিকারক সূর্যের রশ্মির কারণে ত্বককে দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি থেকে রক্ষা করতে সহায়তা করে। এছাড়া, ভিটামিন সি আমাদের ত্বকে রঞ্জক উৎপাদনে বাধা দিয়ে কালো দাগ কমাতে পারে। ভিটামিন সি-র অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি বৈশিষ্ট্যগুলি ব্রণ কমাতে সাহায্য করে। ভিটামিন সি সিরাম অল্প সময়ের মধ্যে নিস্তেজ ত্বক, পিগমেন্টেশন এবং কালো দাগ দূর করতে সাহায্য করে।

ত্বকের স্বাস্থ্যরক্ষায় জিঙ্কএর কার্যকারিতা

জিঙ্ক পরোক্ষ ভাবে আমাদের ত্বককে হাইড্রেটেড রাখতে সাহায্য করে। শক্তিশালী অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি এবং অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল গুণাবলীর কারণে, জিঙ্ক ব্রণ প্রতিরোধে সহায়তা করে। জিঙ্ক ত্বকের স্বাস্থ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এটি প্রোটিন সংশ্লেষণ এবং ক্ষত নিরাময়ের জন্য প্রয়োজন এবং এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। এটি লিভার থেকে ভিটামিন এ পরিবহণ করে এবং ওমেগা থ্রি বিপাক প্রক্রিয়ায় সাহায্য করে। এমনকী জিঙ্কের হালকা ঘাটতি কোলাজেন উৎপাদন, ফ্যাটি অ্যাসিড বিপাক এবং ক্ষত নিরাময়কে ব্যাহত করতে পারে। ত্বকে তুলনামূলক ভাবে উচ্চ জিঙ্ক কন্টেন্ট (৫ শতাংশ), প্রাথমিক ভাবে এপিডার্মিসের মধ্যে পাওয়া যায়।

ত্বকের জন্য আয়রনএর স্বাস্থ্য উপকারিতা

সাম্প্রতিক গবেষণা অনুসারে, আয়রন একাধিক উপায়ে ত্বকের উপকার করে। কালো দাগ এবং চোখের নীচের ভাঁজ দূর করতেও সাহায্য করে আয়রন। তাই, প্রতিদিন আয়রন-যুক্ত খাবার খান। কিছু লোকের ত্বকে যে উজ্জ্বল গোলাপি আভা থাকে, তা স্বাস্থ্যকর লোহিত রক্তকণিকা-র (RBCs) কারণে হয়। যদি আপনার ত্বকের টোন অস্বাভাবিক ভাবে ফ্যাকাসে হয়, তাহলে সম্ভবত আপনার রক্তে RBC- র সংখ্যা কম। এই ক্ষেত্রে, আপনার খাদ্যতালিকায় ভালো পরিমাণে মাংস এবং সবুজ শাকসবজি যোগ করা উচিত। এটি আপনার ত্বককে উজ্জ্বল করবে।

সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে যে, আয়রন ত্বকের ক্ষত নিরাময়ে অত্যন্ত কার্যকরী একটি পুষ্টি উপাদান। যেহেতু আয়রন লোহিত রক্তকণিকা (RBCs) তৈরি করে, তাই এটি ক্ষত নিরাময়ের জন্য অতিরিক্ত উপকারী। তাছাড়া, আয়রন সাপ্লিমেন্টের কিছু উল্লেখযোগ্য সুবিধা রয়েছে।

চুলের স্বাস্থ্যরক্ষার উপায়

ভিটামিন বি-১২ চুল মজবুত করে। ভিটামিন বি-১২ কোবালামিন নামেও পরিচিত। বি কমপ্লেক্স গ্রুপের অংশ, প্রাথমিক ভাবে দুগ্ধজাত পণ্য এবং ডিম ও মাংসে পাওয়া যায়। বি-১২ শিশুর বিকাশ, কোষ বিভাজনের সময় স্নায়ুতন্ত্র এবং ডিএনএ-র জন্য প্রয়োজন। ভিটামিন বি ১২-এর ঘাটতির ফলে রক্তাল্পতা হতে পারে।

চুলের স্বাস্থ্যে আয়রন এর ভূমিকা

আয়রন আপনার শরীরকে হিমোগ্লোবিন তৈরি করতে সাহায্য করে। এটি আপনার লোহিত রক্তকণিকার প্রোটিন। শরীরের কোষগুলিতে অক্সিজেনও বহন করে আয়রন। যদি আপনার যথেষ্ট আয়রন না থাকে, তাহলে আপনার রক্তে হিমোগ্লোবিন তৈরি করতে পারে না। হিমোগ্লোবিন আপনার শরীরের কোষগুলির বৃদ্ধি এবং মেরামতের জন্য অক্সিজেন বহন করে এবং সেই কোষগুলি চুলের বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা নেয়।

আপনি যদি মনে করেন যে, আপনার চুল পড়া আয়রনের ঘাটতির সঙ্গে সম্পর্কিত, তাহলে আপনার আয়রনের মাত্রা পরিমাপ করার জন্য একজন চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করুন। আপনার চিকিৎসক সম্ভবত একটি ফেরিটিন স্তরের রক্ত পরীক্ষার আদেশ দেবেন, যা ফেরিটিন নামক প্রোটিনের মাত্রা পরিমাপ করবে এবং সমস্যা নির্ণয় করবে। যদি আপনার আয়রনের মাত্রা কম দেখায়, তাহলে আপনি আয়রন সাপ্লিমেন্ট দিয়ে এর চিকিৎসা করতে পারেন।

চুলের স্বাস্থ্যের জন্য জিঙ্ক

চুলের স্বাস্থ্যের জন্য জিঙ্ক সাপ্লিমেন্ট গ্রহণের ক্ষেত্রে বেশ কিছু গবেষণায় ইতিবাচক ফলাফল পাওয়া গেছে। জিঙ্ক চুলের বৃদ্ধিতে সাহায্য করে, চুলের ফলিকলকে শক্তিশালী করে এবং ঘনত্ব বাড়ায়। জিঙ্কের ঘাটতি যেমন চুল পড়ার কারণ হতে পারে, তেমনই জিঙ্কের অতিরিক্ত মাত্রায়ও চুল পড়ে যেতে পারে। তাই জিঙ্ক থাকা চাই সঠিক মাত্রায়।

জিঙ্ক চুলের টিস্যু বৃদ্ধি, মেরামত এবং রক্ষণাবেক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়ে থাকে। গবেষণায় দেখা গেছে যে, জিঙ্কের ঘাটতির কারণে চুল ভঙ্গুর হতে পারে এবং চুল পাতলা হতে পারে। জিঙ্ক-এর ঘাটতির কারণে চুলের বৃদ্ধিতে ব্যাঘাত ঘটলে চুল ভেঙে যেতে পারে এবং চুলের বৃদ্ধি ও বিকাশ ধীর হয়ে যেতে পারে। আসলে, দুর্বল চুলের স্বাস্থ্য জিঙ্কের অভাবের একটি সাধারণ লক্ষণ।

চুলের স্বাস্থ্যে ভিটামিনসি‘- ভূমিকা

ভিটামিন ‘সি’ চুলের স্বাস্থ্যের উন্নতি করে, চুল পড়া কমায় এবং চুলের বৃদ্ধি ঘটায়। ভিটামিন “সি”-র অভাবে চুল শুষ্ক ও ফেটে যেতে পারে। একটি শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এবং প্রাকৃতিক কোলাজেন বুস্টার হল ভিটামিন “সি”। এটি চুল এবং মাথার ত্বকের পাশাপাশি মুখের জন্যও উপকারী।

বৈষম্যের পরিবর্তন আবশ্যক

নারী-পুরুষের মধ্যে বৈষম্য আজও অব্যাহত। স্বার্থান্বেষীরা চায় নারীরা মানসিক ভাবে দুর্বল থাকুক। আর এই কারণেই তারা বিশ্বাস করে এবং বোঝাতে চায় যে, মহিলারা ধর্মীয় রীতিনীতি পালন করলেই সংসারে সুখশান্তি আসবে, পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতা বজায় থাকবে, মেয়েরা ভালো বর পাবে এবং রোগীরা রোগমুক্ত হবে।

স্বার্থান্বেষীরা এও মনে করে, যে-কোনও কাজ করতে নাকি পুরুষরা কম সময় ব্যয় করে, নারীরা বেশি সময় ব্যয় করে। এই মানসিকতা কি সমর্থনযোগ্য? এটা কি কর্মরত নারীদের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র নয়? অথচ যাদের বিরুদ্ধে এই ষড়যন্ত্র, সেই নারীরা কি আদৌ বুঝতে পারেন যে, এটা একটা বৈষম্য তৈরির বিশেষ কৌশল। স্বার্থান্বেষীরা আরও মনে করেন যে, নারীদের জন্য বাইরের জগত নয়, তাদের উচিত সংসারধর্ম পালন করা এবং পুজোপাঠে ব্যস্ত থাকা।

অবশ্য আজকের যুগের কিছুসংখ্যক নারী অনেক বেশি আধুনিকমনস্ক। তারা সংসার সামলিয়েও চাকরি করছেন দক্ষতার সঙ্গে। গৃহপরিচারিকা এবং বেবি সিটারদের সহায়তায়, বাড়ি এবং বাইরের কাজ উভয়ই ভালোভাবে পরিচালনা করেন তারা। চাকরি এবং সেইসঙ্গে সংসার ও সন্তানের যত্ন নেওয়া সহজ কাজ নয়, তবুও মহিলারা এটি ভালোভাবেই করে দেখিয়েছেন। মহিলাদের উচিত তাদের সঙ্গীকে বলা যে, সন্তান উভয়েরই, তাই দায়িত্বও উভয়ের।

ভারতের অনেক রাজ্য ও শহরে এমন অনেক মহিলা রয়েছেন, যারা খাবারের স্টল দিয়ে নিজেকে স্বাবলম্বী করেছেন। তারা কেবল তাদের নিজের ব্যয়ভার বহন করেন না, বরং সংসারের আর্থিক চাহিদাও পূরণ করেন।

আমরা আমাদের চারপাশে এমন অনেক মহিলাকেই দেখি, যারা লেবুরজল, জুস, লস্যি এবং চা ইত্যাদির স্টল চালাচ্ছেন। এই নারীরাই আমাদের অনুপ্রাণিত করেন। আসলে এরা সবাই দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। কারণ, বিয়ের পরেও এরা আর্থিক ভাবে সাবলম্বী। অনেকে বাড়িতে বসেও আয় করেন নানারকম কাজ করে। যেমন গল্প-কবিতা লেখা, অনুবাদ, প্রুফ রিডিং, এডিটিং, টাইপিং ইত্যাদি। তবুও তারা কেন পান না তাদের কৃতিত্বের সঠিক স্বীকৃতি ?

আসলে, সমাজে স্বার্থান্বেষীরা নারী-পুরুষের মধ্যে ভেদাভেদ রেখা টেনে রাখলেও, আধুনিকমনস্ক নারীরা সেইসবের তোয়াক্কা করেন না এবং এটাই হওয়া উচিত। নারীর কর্মমুখী, দৃঢ়চেতা স্বভাব-ই হয়তো স্বার্থান্বেষী শয়তানদের জন্য যোগ্য জবাব। আগামী দিনে নারীরা আরও যত বিচক্ষণ হবেন, আর্থিক ভাবে স্বনির্ভর হবেন, স্বার্থান্বেষীদের মুখোশ ততটাই খুলে যাবে। তারা ভবিষ্যতে কোণঠাসা হয়ে যাবে। তাই এখন সর্বস্তরের মহিলাদের উচিত, কর্মকে প্রাধান্য দেওয়া। কারণ, কর্মরত নারীরা যেমন আর্থিকভাবে সক্ষম, তেমনই চাকুরিজীবী হওয়ার অনেক উপকারিতাও রয়েছে। এর ফলে মহিলারা আরও অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠেন। কারণ, তারা সমাজের অন্ধবিশ্বাস থেকে নিজেদের দূরে রাখতে পারেন। তাই তাদের চেহারায় এক উজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব ফুটে ওঠে। কর্মরত মহিলারা আনন্দে থাকেন এবং একই সঙ্গে জীবনকে নতুন ভাবে দেখার সুযোগ পান।

এছাড়া, অর্থনৈতিক ভাবে সক্ষম কর্মজীবী নারীরা নিজস্ব আর্থিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, যা খুশি তাই কিনতেও পারেন। এর জন্য তাদের স্বামীর উপর নির্ভর করতেও হয় না। বিয়ের পর নারীরা চাকরি না করলে, ছোটোখাটো প্রয়োজনেও স্বামীর উপর নির্ভরশীল থাকতে হয়, তার কাছে হাত পাততে হয়। এই বিষয়টি চরম অস্বস্তিকর। এই অস্বস্তি থেকে নিজেকে বের করে আনতে, বিয়ের পরও প্রত্যেক নারীর আর্থিক ভাবে স্বনির্ভর হওয়া উচিত। তবেই সমাজ তাদের আলাদা মর্যাদা দিতে বাধ্য থাকবে।

মেয়েদের মাথায় রাখতে হবে, সমাজের ধান্দাবাজরা মহিলাদের জন্য অনেক নিয়মের বেড়াজাল তৈরি করে রেখেছেন। এর মধ্যে একটি হল— পোশাক। মেয়েরা একটু খোলামেলা পোশাক পরলেই হইচই করে কুৎসা ছড়িয়ে দেন সংকীর্ণ মানসিকতার লোকেরা। শুধু তাই নয়, যদি কোনও মেয়ে তার পা প্রসারিত করে বসে থাকে, তাহলে তাও যৌনতার প্রতীক হিসাবে বিবেচিত হয়। যারা মেয়েদের পা ছড়িয়ে বসে থাকাকে অশোভন বলে অভিহিত করেন, তারা বিশ্বাস করেন যে, এই ধরনের মেয়েরা ভালো বাড়ির মেয়ে নয়। তাদের মধ্যে সংস্কার ও মূল্যবোধের অভাব রয়েছে। তাদের ধারণা, মেয়েরা এ ধরনের আচরণ করে ছেলেদের আকৃষ্ট করার জন্য।

আসলে, এই নিয়ম নির্ধারণ করা হয়েছে কোনও ভাবে মেয়েদের নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য। এর জন্য পর্যায়ক্রমে তাদের স্বাভাবিক জীবনযাপনেও নানা ভাবে বাধা দেওয়া হয়, তাদের উপর নানা ধরনের বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়, তাদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করা হয় এবং অপমান করা হয়। আর যে-মেয়েরা এইসব অন্যায়, অত্যাচারের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠে, তাদেরকে নানারকম ভাবে কোণঠাসা করে রাখার চেষ্টা জারি রাখে সমাজের ধান্দাবাজ লোকেরা।

মেয়েদের অপমান করার ক্ষেত্রে সমাজের ভদ্রবেশী কিছু মানুষেরও একটা বড়ো ভূমিকা রয়েছে। তারা মেয়েদের হাতের পুতুল ভাবেন এবং সেই ভাবেই তাদের সঙ্গে দুর্ব্যাবহার করেন। পুতুলনাচের মঞ্চে যেভাবে পুতুলগুলোকে নিয়ন্ত্রিত করা হয় সুতো দিয়ে, ঠিক সেই ভাবেই স্বার্থান্বেষীরা মেয়েদের স্বাধীনতার লাগাম রাখতে চান তাদের হাতে। এমনকী, মেয়েরা কী ভাবে হাসবেন, কোথায় যাবেন, কখন যাবেন, কখন বাড়ি ফিরবেন, সে সম্পর্কেও ধান্দাবাজরা কঠোর নিয়ম বলবৎ করার চেষ্টা করেন।

ভাবতে অবাক লাগে যে, আজকের উন্নত প্রযুক্তি এবং আধুনিক যুগে বাস করেও, প্রতিটি মেয়েকে তার জীবনের কোনও না কোনও সময়ে পরিবারের শাসন মেনে চলতে হয়। এইসব নিয়ম এই জন্যই মেয়েদের উপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে, যাতে সহজেই তাদের গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ করা যায়।

অনেক সময় নিজের বাড়িতেই মেয়েদের অসম্মান এতটাই বেড়ে যায় যে, পরিবারের সদস্যরাই মেয়েটির চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেন। এটি প্রায়শই কম শিক্ষিত এবং অর্থনৈতিক ভাবে দুর্বল লোকদের বাড়িতে বেশি ঘটতে দেখা যায়। কিন্তু কোনও মেয়েকে ‘খারাপ স্বভাবের’ ধরে নেওয়া কিংবা সন্দেহ করা মানেই হল, সেই মেয়েটির চরিত্র সম্পর্কে মিথ্যা অপবাদ দেওয়ার সমান। কিন্তু প্রশ্ন জাগে, বর্তমান সমাজ ‘আধুনিক’ তকমা পাওয়া সত্ত্বেও, নারীদের জন্য অপমানজনক শব্দ আজও কেন ব্যবহার করা হয়? কেন তাদের অহেতুক সন্দেহ করা হয়? কেন সরলীকরণ নীতিতে সব মেয়েদেরই ‘খারাপ মানসিকতা’-র ভাবা হয়? কেন তাদের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করা হয় ?

প্রকৃতপক্ষে যারা খারাপ, তারা কিন্তু অপরাধ করেও শাস্তি পান না বেশিরভাগ ক্ষেত্রে। অথচ, কোমল হৃদয়ের সংবেদনশীল মেয়েরা স্বার্থান্বেষী লোকেদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ঝড় তুলতে পারেন না বলেই হয়তো বৈষম্য কিংবা অত্যাচারের শিকার হয়ে চলেছেন আজও।

আসলে, যারা তাদের বাড়িতে মেয়ে এবং মহিলাদের অপমান করেন, তারা বুঝতে পারেন না যে, এর ফলে তারা নিজের জন্যই বিপদ ডেকে আনছেন। কারণ, যে মেয়েরা বাড়িতে অপমান ভোগ করেন, তারা আর সেই বাড়িতে পা রাখতে চান না। এমনকী তাদের মনের কোমল প্রবৃত্তিগুলি হারিয়ে যায়। তাদের মন বিষিয়ে ওঠে। তারা আর কাউকে ভালোবাসতে পারেন না, বিশ্বাস করতে পারেন না। কিন্তু ভেবে দেখুন তো, বৈষম্যের শিকার হওয়া মেয়েদের এই করুণ পরিণতির কুফল কি সমাজে প্রতিফলিত হবে না?

কোজাগরি (পর্ব-০১)

ম্যাটিনি শো শুরু হওয়ার প্রথম বেল বেজে উঠল। শো দেখার জন্য যারা এসেছিল তারা হলের মধ্যে ঢুকে পড়েছে। তবু এখনও কিছু মানুষ ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে বিক্ষিপ্ত ভাবে। হাউস ফুল। অনেকেই এক্সট্রা টিকিটের জন্য উন্মুখ হয়ে আছে। শো শুরু হওয়ার মুখে অথচ অজন্তার পাত্তা নেই। ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলার প্রতিবাদে বুদ্ধিজীবীদের একটা ধিক্কার মিছিল গড়িয়াহাট থেকে বেরোবার কথা। অজন্তা কি সেই মিছিলের জ্যামে আটকে গেছে?

শঙ্খশুভ্র অভ্যাসবশত হজমোলা ক্যান্ডির শেষ অংশটা চিবিয়ে রসাস্বাদন করতেই আবার সেই মেয়েটির সঙ্গে তার দৃষ্টি বিনিময় হয়ে গেল। মনে হল মেয়েটি ওর দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছে। শঙ্খশুভ্র এবার সত্যি নার্ভাস ফিল করছে। বুকের ভিতর মাদলের বাজনার মতো দ্রিম দ্রিম শব্দ হচ্ছে।

—আপনি কি কাউকে খুঁজছেন? মেয়েটি সরাসরি এগিয়ে এসে জলতরঙ্গের মতো বেজে উঠল।

—কেন বলুন তো? শঙ্খশুভ্রর কণ্ঠে অবাক জিজ্ঞাসা।

—আপনি যদি চান তাহলে আমি আপনাকে সঙ্গ দিতে পারি। মেয়েটি এমন ভাবে ফিস ফিস করে কথাটা বলল যে, শঙ্খশুভ্র ছাড়া আশপাশের অন্য কেউ শুনতেই পেল না। মনের মানুষ যেভাবে কথা বলে অনেকটা সেইরকম।

শঙ্খশুভ্র ছবি আঁকার সরঞ্জামে ভরা কাঁধের শান্তিনিকেতনি ব্যাগটা বাঁ কাঁধ থেকে ডান কাঁধে ঝুলিয়ে মৃদু হেসে বলল, ‘ধন্যবাদ। আমার একজন বান্ধবীর আসার কথা। তার জন্য অপেক্ষা করছি।’

—কিন্তু আপনাকে যে আমার ভীষণ প্রয়োজন। জানেন আমার ভীষণ বিপদ।

—বলুন আপনার জন্য আমি কী করতে পারি।

—তাহলে আপনাকে আমার সঙ্গে কষ্ট করে এক জায়গায় যেতে হবে!

শঙ্খশুভ্র-র চরিত্রের একটা বড়ো গুণ কেউ বিপদে পড়ে সাহায্য চাইলে সে না করতে পারে না।

— বেশ তো চলুন। বলে শঙ্খশুভ্র মন্ত্রমুগ্ধের মতো মেয়েটিকে অনুসরণ করল। এই মুহূর্তে সে যেন নিজের প্রতি সমস্ত নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছে। তার নিজস্ব শক্তি বলতে এখন কিছুই নেই। কোনও এক অজানা নারীশক্তি যেন কপালকুণ্ডলার মতো তাকে টেনে নিয়ে চলেছে৷ কোন গন্তব্যে সে চলেছে জানে না। জাহান্নামে নিয়ে গেলেও এখন তার কিছুই করার নেই। শঙ্খশুভ্রর নিষ্কলঙ্ক চরিত্রের হয়তো আজই হল প্রথম পদস্খলন। তেইশ বছর বয়সটা বড়ো সাংঘাতিক। কোনও বিপদের তোয়াক্কা করে না।

—এই চাপা পড়ে যাবেন যে। বলে মেয়েটি একান্ত আপনজনের মতো শঙ্খশুভ্রর হাত ধরে দাঁড়িয়ে পড়ল চৌরঙ্গীর জেব্রা ক্রসিংয়ের উপর। একটা মিনিবাস দ্রুত গতিতে বুনো জানোয়ারের মতো গর্জন করে লেনিন সরণির দিকে ছুটে গেল।

শঙ্খশুভ্র একটু অন্যমনস্ক হয়ে গিয়েছিল। সম্বিত ফিরে আসতে বুঝতে পারল সে এক অচেনা মেয়ের পথের সঙ্গী হয়েছে। শুধু তাই নয়, সে অবাক বিস্ময়ে দেখল তার একটা হাত মেয়েটির গোলাপি নেলপালিস-রঞ্জিত নরম উষ্ণ হাতে সমর্পিত। বাইরের লোক ওদের এই অবস্থায় দেখলে ভাববে বুঝি প্রেমিক-প্রেমিকা। নিজেকে প্রেমিক ভাবতেই শঙ্খশুভ্রর হাসি পেল। এখন প্রেম করার তার সময় নেই। এইচএস পাস করতেই ঘোড়দৌড়ের মতো তার জীবন শুরু হয়েছে। ঘুম থেকে উঠে বেলা বাড়তে না বাড়তেই নাকে মুখে গুঁজে দমদমের গরুহাটা থেকে অটো করে ট্রেন ধরার জন্য ছুটতে হয় দমদম স্টেশনে। শিয়ালদায় নেমেই বাসে বাদুড় ঝোলা হয়ে গভর্নমেন্ট আর্ট কলেজ। সেখান থেকে সন্ধেবেলা বাড়ি ফিরেই ছুটতে হয় ‘অংকিতা আর্ট একাডেমি’-তে ছাত্রছাত্রীদের অংকন শেখাতে। তার পর আছে প্রাইভেট টিউশন।

রবিবার একটা দিন আর্ট কলেজ ছুটি থাকলেও তার রেহাই নেই। সেদিনও বাড়িতে প্রায় দুশো ছেলেমেয়ে আসে আঁকা শিখতে। কাজেই প্রেম করার তার ফুরসত কোথায়। অজন্তার সঙ্গে আর্ট কলেজে এক বছর মিশছে। একদিনও সময় করে নিভৃতে কোথাও বসা হয়নি। অজন্তার কথাতেই সে আজ প্যারাডাইসে ‘লোহা’ দেখবে বলে এসেছিল। তাও দেখা কপালে জুটল না। কোথাকার কোন এক কপালকুণ্ডলার ডাকে তাকে ছুটতে হচ্ছে প্রয়োজনের তাগিদে।

— এই আমার দারুণ খিদে পেয়েছে, ফুচকা খাওয়াবেন? মেয়েটি তার হাতে ঝাঁকুনি দিয়ে ছেলেমানুষের মতো বলে উঠল। কথাটা শুনে শঙ্খশুভ্র তার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। মনে হল মেয়েটি যেন তার পুরুষাকারকে গ্রাস করেছে। একবার ভাবল মেয়েটি কি খারাপ? যদি তাকে ব্ল্যাকমেল করে। এক মিনিটের আলাপে সে যেভাবে শঙ্খশুভ্রর সঙ্গে অন্তরঙ্গ হতে চাইছে সন্দেহটা স্বাভাবিক। কথায় বলে পথে নারী বিবর্জিতা। তবু মেয়েটির কাজল কালো টানা চোখের দিকে তাকালে নিষ্পাপ বলে মনে হয়। মনে হয় এই পৃথিবীর কোনও পাপই যেন তাকে স্পর্শ করেনি। এটা কি শঙ্খশুভ্রর ঘোর লাগা চোখের দোষ না মনের ভুল? বাঘে ছুঁলে আঠারো ঘা, অচেনা মেয়েমানুষ ছুঁলে যে কত ঘা খেতে হবে তা কে জানে। তাছাড়া যার বিপদ তার ফুচকা খাওয়ার কথা মনে আসে কী করে।

—ভয় নেই, আপনার বেশি পয়সা খসাব না। আমি জানি আপনি বড়োলোক নন। বলে মেয়েটি তার চোখের দিকে তাকাল।

—কী করে বুঝলেন?

—জানি মশাই। তোমাকে দেখেই বোঝা যায়। ইস্ তুমি বলে ফেললাম, মাইরি ভুল হয়ে গেছে।

—বেশ তো, শুনতে ভালো লাগছে।

—সত্যি? তা হলে তুমিও আমাকে তুমি বলবে কেমন। এসপ্ল্যানেডের ট্রাম টার্মিনাসের কাছে একজন ফুচকা বিক্রি করছে দেখে দুজনে তার কাছে এসে দাঁড়াল। ফুচকা খেতে খেতেই শঙ্খশুভ্র তার নামও জেনে ফেলেছে। মেয়েটির নাম কোজাগরি। শঙ্খশুভ্রর খাওয়া হয়ে যাওয়ার পর কোজাগরি তখনও ফুচকা খেয়ে চলেছে। কোনওদিকে তাকাবার তার ফুরসত নেই। দেখে মনে হয় যেন কতকাল সে খায়নি। ওর খাওয়া দেখে শঙ্খশুভ্রর বড়ো মায়া হল। বুকের মধ্যে একটা কষ্টের ঢেউ গুমরে গুমরে উঠল। বাবার ব্রেথওয়েট কারখানাটা বন্ধ হয়ে গেলে তাদের একটা বছর ভীষণ কষ্ট হয়েছিল। চারটে প্রাণীর মুখে বাবা একবেলা ভাত জোটাতে গিয়ে হিমসিম খেয়ে যেত। তখন আধখানা ডিম পাতে পড়লে শঙ্খশুভ্র যেন আকাশের চাঁদ হাতে পেয়ে যেত। আঁকার হাতটা ছিল বলে সে ড্রয়িং-এর টিউশনি করে শক্ত হাতে সংসারের হাল ধরতে পেরেছিল। তা না হলে অভাবের তাড়নায় সে দিশেহারা হয়ে পড়ত।

কোজাগরির খাওয়া হলে শঙ্খশুভ্র বলল, ‘আর কিছু খাবে?’

—না বাবা আর না। আমার পেট ভরে গেছে। বলে কোজাগরি তার গোলাপি রুমালে মুখ পুঁছল।

(ক্রমশ…)

মোবাইল ফোনের তথ্যের গোপনীয়তার সুরক্ষা জরুরি

তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষা করা জরুরি। কিন্তু বিদেশি ব্র্যান্ড-এর যে সমস্ত মোবাইল ফোন ব্যবহার করে চলেছি আমরা, সেইসব মোবাইল ফোনগুলিতে ব্যক্তিগত তথ্য কতটা সুরক্ষিত থাকে, সেই বিষয়ে নিশ্চিত ভাবে কিছু বলা যায় না এবং সন্দেহ থেকেই যায়। তাই, তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষার জন্য এক যুগান্তকারী পরিবর্তন জরুরি ছিল।

এআই+ স্মার্টফোন এই পরিবর্তন আনতে পেরেছে বলে দাবি করা হচ্ছে। ভারতে তৈরি এই স্মার্টফোন, ডেটা গোপনীয়তার সঙ্গে বিশ্বমানের কোয়ালিটি প্রদানের লক্ষ্যে ডিজাইন করা হয়েছে বলেও জানানো হয়েছে। ভারতের প্রথম মোবাইল অপারেটিং সিস্টেম নেক্সট কোয়ান্টাম ওএস দ্বারা চালিত, এই এআই+ স্মার্টফোন উচ্চমানের এবং গোপনীয়তার সমন্বয় ঘটিয়েছে বলেও জানানো হয়েছে এক প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে। এআই+ স্মার্টফোনের মাধ্যমে, ভারত এখন আর শুধু স্মার্টফোনের সংগ্রহ নয়, ডিজিটাল ভিত্তি তৈরি করছে বলা হচ্ছে।

এই প্রসঙ্গে এআই+ স্মার্টফোনের সিইও এবং নেক্সট কোয়ান্টাম-এর শিফট টেকনোলজিস-এর প্রতিষ্ঠাতা মাধব শেঠ জানিয়েছেন, ‘আসলে, এআই+ স্মার্টফোন হল ভারতীয় ব্যবহারকারীদের হাতে নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে আনার এক অনন্য সুযোগ। অথচ, বছরের পর বছর ধরে, আমরা এমন ফোন এবং প্ল্যাটফর্মের উপর নির্ভর করে আসছি, যেগুলি কখনওই ভারতীয় নাগরিকদের তথ্য-সুরক্ষার কথা মাথায় রেখে নির্মিত হয়নি। অথচ, ভারতে তৈরি এই এআই+ স্মার্টফোনগুলি পরিস্থিতিকে আমূল বদলে দিয়েছে। এই ফোনগুলি দ্রুত কাজ করে, সুন্দর ভাবে ডিজাইন করা হয়েছে এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, এগুলি আপনার ডেটা অত্যন্ত সুরক্ষিত রাখে।’

দীর্ঘ ব্যাটারি লাইফ এবং উচ্চমানের ডিসপ্লে থেকে শুরু করে, ডুয়েল সিম ইন্টারচেঞ্জেবিলিটি এবং উন্নত ক্যামেরা পারফরম্যান্স প্রভৃতি সুবিধের বিষয় মাথায় রেখে তৈরি করা হয়েছে এই এআই+ স্মার্টফোন। যেমন- মানুষ কীভাবে জীবনযাপন করে, কাজ করে, শেখে এবং সামাজিক ভাবে মেলামেশা করে, তা মাথায় রেখে এখন ডিজাইন করা হচ্ছে মোবাইল ফোন। মোবাইল ডিভাইসগুলি স্থানীয় ভাষা, স্থানীয় বিষয়বস্তু এবং নেক্সট কোয়ান্টাম-এর থিম ডিজাইনার টুলস সমৃদ্ধ। অর্থাৎ, এই এআই+ স্মার্টফোন কাস্টমাইজড অভিজ্ঞতা প্রদান করে বলেও দাবি করা হচ্ছে।

ভারত হল বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম স্মার্টফোন বাজার, যেখানে ৮০ কোটিরও বেশি স্মার্টফোন ব্যবহারকারী রয়েছেন। তা স্বত্বেও, আজও বেশিরভাগ স্মার্টফোন বিদেশি সফটওয়্যার দ্বারা চলে এবং দেশের বাইরে থার্ড পার্টির সিস্টেমের মাধ্যমে ব্যবহারকারীর তথ্য পাঠায়। আর এই সমস্যা সমাধানের জন্য এখন তাই এআই+  স্মার্টফোন বাজারে এসে গেল। প্রতিটি এআই+ স্মার্টফোন নেক্সট কোয়ান্টাম ওএস -এ চলে, যা সম্পূর্ণ ভাবে ভারতে তৈরী অপারেটিং সিস্টেম এবং তথ্য-সুরক্ষা জোরদার করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। সমস্ত ব্যক্তিগত ডেটা, অ্যাপের পছন্দ থেকে ব্যাক-আপ পর্যন্ত, নিরাপদে সংরক্ষণ করা হয়। এখন ফ্লিপকার্টেও পাওয়া যাচ্ছে এই এআই+ স্মার্টফোন। দামেও সস্তা। উজ্জ্বল রং-যুক্ত এবং অত্যাধুনিক টেকনোলজিতে তৈরি এই স্মার্টফোন পাওয়া যাচ্ছে মাত্র পাঁচ হাজার টাকায়।

নুব্রা উপত্যকা (শেষ পর্ব)

অনেকটা হেঁটে বাবা মন্দির ও স্মৃতিসৌধ পর্যন্ত গিয়ে হাঁফিয়ে গেলাম। সিয়াচেন শুনলেই মানসচক্ষে তুষারাবৃত পাহাড়ে বরফে পা ডুবিয়ে হাঁটার দৃশ্য ভেসে ওঠে। কিন্তু চড়া রোদে এত গরম যে, কিছুই মেলাতে পারছিলাম না। হয়তো আরেকটু হেঁটে সেতুর ওপারে সুদূরে মিলিয়ে যাওয়া পিচ রাস্তাটা ধরে কিছুদূর এগোলে দেখা মিলত আসল সিয়াচেনের; মানে গ্লেসিয়ার বলতে যা বুঝি তার। সুবেদার ভদ্রলোক নিজে এসেছিলেন সঙ্গে। আমার হাহুতাশ বাড়িয়ে বললেন, ‘পরতাপুর মে স্যারকো একবার সির্ফ বোলনা থা না। একদম ব্যাটেল ফিল্ড তক দিখা দেতে।’ সেতুর ওপাশে তৃষিত দৃষ্টি নিক্ষেপ করে দেখে ফেরার পথ ধরতে হল।

সেই পথেই আরেকটি সুন্দর সংগ্রহশালা। রাষ্ট্রীয় প্রতীক অশোকচক্রের ঠিক নীচে বসে ছবি তোলার বলে সিঁড়ির ধারিতে ঘষটে ঘষটে এমন জায়গায় উঠে গেছি, সে সিঁড়িতে পা দিয়ে নামার চেষ্টা করলে হাড়গোড় ভাঙার গ্যারান্টি ছিল। এক সৈনিক সিয়াচেনে সংঘটিত ইন্দো-পাক যুদ্ধের বর্ণনা দিতে গিয়ে একটা দামি কথা বলল, “অ্যায়সে তো দোনো তরফ কী সিপাহী রোজ মিলতে, জরুরত পড়নে পর হম এক দুসরে সে রেশন ভি মাঙ্গাকর খা লেতে হ্যায়। জংগ তো তব হোতা জব উপর সে অর্ডার আতি হ্যায়।’

‘ব্যাটেল ফিল্ড সেলফি পয়েন্ট’ দেখে হাসি পেল, দীর্ঘশ্বাসও পড়ল। যুদ্ধও ‘পর্যটন পণ্য’ হয়ে গেল তাহলে! একটা আর্মি জিপসিতে কয়েকজন বয়স্ক মানুষের সঙ্গে আমাদেরও বসিয়ে ছাউনিতে ফিরিয়ে আনা হল। ওই পেটমোটা সুবেদার ভদ্রলোকই ব্যবস্থা করে নিজে পদব্রজে এলেন। শামিয়ানার নীচে বসে তাঁকে দেখে ভূত দেখার মতো অবাক হয়ে গেলাম। অক্সিজেনের স্বল্পতা ও ঝলসানো গরমে যেখানে আমার অষ্টাদশী কন্যাও হাঁটতে গিয়ে কেঁদে-রেগে একাকার, সেখানে গায়ে গরম ও ভারী ইউনিফর্ম পরে এই প্রৌঢ় সৈনিক কি উড়ে এলেন? কী দিয়ে তৈরি এরা?

উর্বীর খেপচুরিয়াস মেজাজ অক্সিজেন দিয়ে শমিত করতে হল। গপ্পুড়ে সুবেদার আমার আহ্লাদি আওবাতালে মেয়েকে অনেক বোঝালেন, ‘বেটি, ফৌজ মে আ যাও। পাপাকা ইজ্জত দেখ রহে হো না। কোই ভি প্রাইভেট কোম্পানি মে জাওগি তো ইয়ে নহী মিলনেওয়ালা।’ ভদ্রলোক শেষে বললেন, ‘স্যার মেমোরিয়াল শপ সে কুছ লেকর যাইয়ে।’

আমি ততক্ষণে বেশ গদগদ। আমাকে ‘ম্যাডামজি’-র বদলে ‘দিদি’ বলেছেন। কলকাতা গিয়ে আমার হাতে ঠিকঠাক চা খেতে চেয়েছেন (আমার চায়ে খুব মিষ্টি, কথাটা কী করে জানি কানে গিয়েছিল)। সর্বোপরি আমার মেয়েকে ভালো ভালো কথা বলে কাউন্সেলিং করেছেন। স্যারের সদ্য অক্সিজেন দিয়ে দাঁড় করানো মেয়েকে নিয়ে ফেরার তাড়া থাকলেও, শপিং-এর গন্ধে ভাইয়ের কথা রেখে সিয়াচেন শপে ঢুকে পড়লেন। মেয়ের সেনায় যাওয়ার ক্ষীণতম সম্ভাবনা নেই। ওর জন্য একটা টি-শার্ট কিনে দুধের স্বাদ ঘোলে মেটালাম।

পানামিক উষ্ণ প্রস্রবণ

সুমুর ফেরার পথে এক স্থানে উষ্ণ প্রস্রবণ পড়ে। কিন্তু স্নানের ঘর বন্ধ। লে-তে দালাই লামা এসে যজ্ঞ করবেন বলে স্নানঘরের মালিক সেখানে গেছে। কোনও কর্মীও নেই। কুকুরের কৃত্য পড়ে আছে। পাহাড়ের গা বেয়ে কিছুটা চড়ে দেখলাম, জলের উৎসমুখে স্রোত নেই, আছে শ্যাওলা আর হলদেটে অধক্ষেপ। গরম জলে গা ডোবানো হল না বলে এতটুকু আক্ষেপ হল না। বরং আমার দ্রষ্টব্যসূচির বাইরে অতিরিক্ত কিছু লেখার সুযোগ পেলাম।

শহরের দিকে ফেরার রাস্তায় একটু এগিয়েই গাড়ি থামাতে হল। আমার কন্যা বমি করে একটু সুস্থ হল। এতক্ষণ অক্সিজেন নিয়েও খিটখিটে ছিল। কিছুটা এগিয়ে আবার গাড়ি থামাল চালক। সরু নালা লাফিয়ে পার করে একটা সবুজ বাগানে আমাদেরও ডাকল। দু’জন মহিলার খাবার দোকান। মিনিয়েচার একখণ্ড অপুর্ব নিসর্গ-খুদে বাগান, খুদে নালা।

রিগজিন গিয়েই গল্প জুড়ল। এই গ্রামে ওর শ্বশুরবাড়ি। ক্ষেত থেকে ব্রোকোলি আর টমেটো তুলে এনে ম্যাগি করে খাওয়াল ওরা। তিনজনের মাত্র ১০০ টাকা, আর অসামান্য স্বাদ! ড্রাইভারের ফেরার তাড়া নেই। অবশ্য ফিরবে কোথায়? আমাদের সঙ্গেই তো ঘুরছে। একটা স্কুলবাস একটি বাচ্চা মেয়েকে নামিয়ে দিয়ে যেতেই সে ছুটে এসে রিগজিন-এর গলা জাপটে ধরল।

রিগজিনের বউ সরকারি চাকরি করে। মেয়ে ওই দোকানের মালকিনদের কাছেই থাকে স্কুল থেকে ফিরে। ২০ দিন পর বাবাকে দেখে আর ছাড়ল না; আমাদের সঙ্গে সুমুর পর্যন্ত এল। গাছের আপেল আর এপ্রিকট পেড়ে দিতে বললাম হোটেলের ছেলেটাকে। হাসিমুখে কচি কচি দু-হাত নাড়িয়ে মেয়ে মায়ের বাড়ি চলল বাবার গলা জড়িয়ে।

সুমুর

যদিও সরকারি নয় কিন্তু কর্মসূত্রে ডিফেন্স অ্যাকাউন্টস বিভাগের আধিকারিকদের নিয়মিত আনাগোনার সৌজন্যে পান্থনিবাসটির নামই হয়ে গেছে অ্যাকাউন্টস অফিসারদের নামে। দোকান-বাজার, ব্যাংক অদূরে, নুব্রার অন্যত্র যা চোখে পড়েনি। আমাদের ঘরখানা দোতলায়। সামনেই বড়োসড়ো ছাদ। সেখানে বিকেলে বসে অপরূপ দৃশ্য চোখে পড়ল।

দু’টো দিন লেখার সময় পাইনি। ২৭-এর সন্ধেবেলা চলভাষের বদলে রাইটিং প্যাডেই হুন্দর বালিয়াড়ির গল্প লিখে ফেলেছি। সঙ্গে ফেসবুকে আমার আসন্ন ভ্রমণকাহিনির প্রতি ঔৎসুক্য জাগিয়ে তুলতে এক চিমটি শেয়ার করতেও ভুলিনি। সবই আবার পরে হিংসুটির মতো লুকিয়েও ফেলেছি আজকের লেখাটার স্বার্থে।

রাতে খাওয়ার ডাক পেতে ডাইনিং হলে গিয়ে বেশ অভিনব অভিজ্ঞতা হল। অন্দরসজ্জা অনেকটা ভুটানের মতো, হয়তো তিব্বতী আঙ্গিকে বলে। ডাইনিং টেবিল-চেয়ার যেমন আছে, তেমনই মেঝেতে বাহারি জাজিমে বসে অনুচ্চ জলচৌকিতেও থালা রেখে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয় শৈলীতে খাওয়ার আয়োজনও আছে। আমরা দ্বিতীয়টাই বেছে নিলাম। ব্যবস্থাপনা যেমন পরিচ্ছন্ন, খাবারের স্বাদও তেমনই অসামান্য। পরেরদিন সকালে জলখাবার পর্যন্ত পড়ল ৩০০০ টাকা।

পরের দিন সকাল সকাল আমাদের যাত্রা শুরু হল প্যাংগং হ্রদ দেখব বলে। তবে শুধু প্যাংগং নয়, পথে পড়ে আরও অনেক অবিস্মরণীয় দৃশ্য। সেসবের কথা না হয় পরে হবে।

(সমাপ্ত)

সুখপাখি (শেষ পর্ব)

সুমনা বিকল্প ভাবল। সে নিজে কিছু করবে না কিন্তু অন্য কেউ যদি করে তাহলে সুমনার সংসারে শ্যাম এবং রায় দু’জনেরই মান রক্ষা হয়। চিমনি এখনও ওয়ারেন্টি পিরিয়ডের মধ্যে আছে। সুমনা চিমনি কোম্পানির টোল ফ্রি নম্বরে ফোন করল। আশা ছিল ওরা এসে তাড়িয়ে দিলে সুমনার ভাগে দোষ পড়বে না। কিন্তু ওদের কথায় মন ভরল না। চিমনি কেনার সময় যত কিছু টার্মস এবং কন্ডিশন থাকে তার মধ্যে কোথাও উল্লেখ নেই যে, পাখি বাসা বাঁধলে কোম্পানির লোক এসে তাড়িয়ে দিয়ে যাবে। বাড়িটিও নিজের। ভাড়া বাড়ি হলে হয়তো বাড়ির মালিককে কাজে লাগানো যেত। সে আশাও নেই। সুমনা অনেক ভেবে নিরাশ হল। কিন্তু হাল ছাড়ল না। কেবল ভাবনা আর ভাবনা। সমস্ত ভাবনাই পাখিটিকে নিয়ে। ওর মাতৃত্ব নিয়ে। ভাবতে ভাবতে একসময় ওর নিজের অজান্তেই উৎখাতের বদলে কখন যেন পাখির মায়ায় পড়ে গেল।

চারদিন হতে চলল রান্না বন্ধ। সকালের চা থেকে শুরু করে জলখাবার, দুপুর রাতের খাবার পর্যন্ত একটি হোম ডেলিভারি সংস্থাকে অর্ডার করা হয়েছে। রান্না ঘরের মেঝেতে চুপচাপ ঝাড় দিচ্ছে কাজের মেয়ে সন্ধ্যা। প্রয়োজনীয় বাসন কোসন এত সাবধানে নিতে হচ্ছে যেন টু শব্দটি না হয়। সন্দীপনের মতো বিরক্ত হলেও প্রকাশ করতে পারছে না সন্ধ্যাও। সুমনার কড়া নির্দেশ। যতদিন পর্যন্ত না ডিম ফুটে ঠিকঠাক বাচ্চা বের হচ্ছে ততদিন পাখিটিকে কোনওমতেই বুঝতে দেওয়া চলবে না বাড়িটি আমাদের। এমন সন্তর্পণে চলাফেরা, কথাবার্তা বলতে হবে যেন পাখিটির কানে না যায়। এ সময়টা মানুষ-পাখি দু’জন ভাবি মায়েরই খুব টেনশনের সময়। টেনশনের উপর আর টেনশন দেওয়া যাবে না।

বেড়েছে সুমনার ব্যস্ততাও। এই কয়েকটি দিনেই সে যেন পালটে গেছে। দাপুটে স্বভাবটাতে এক অদেখা কোমলতার ছাপ পড়েছে। যেমন স্যাঁকা ব্রেডের উপর মাখন। ছোটোখাটো ভুলত্রুটি চোখে পড়লে কিছু বলছে না। না দেখার ভান করে চোখ সরিয়ে নিচ্ছে। রান্না-বান্নার পাট নেই। সে ব্যস্ত। যথেষ্ট ব্যস্ত। বার বার পা টিপে টিপে যাচ্ছে চিমনির কাছে। পাখিটিকে দেখছে। প্রথম প্রথম সুমনাকে দেখলে পাখিটি ডানা মেলে মিথ্যে ওড়ার ভান করে ফুড়ুৎ ফুড়ুৎ শব্দ করত। এখন করছে না। চিনে গেছে নিশ্চিত। পশুপাখিরা উপকারীদের খুব সহজে চেনে। সুমনাও বাজার ঘুরে ঘুরে সন্ধ্যাকে দিয়ে কিনে এনেছে পাকা পেঁপে, পাকা ডুমুর, লাল টকটকে স্বাস্থ্যবান লংকা। চিমনির উপর থেকে সাবধানে বাসার ভেতরে দিয়েছে। পাখি পেঁপে, ডুমুর খেয়েছে। কিন্তু লংকা খায়নি। লাল লংকা কেন খেল না পাখি! ও কি তবে টিয়া পাখি নয়? সবুজ রঙের পাখি টিয়া পাখি ছাড়া আর কী পাখি হতে পারে? সমস্যায় পড়ল সুমনা। গুগল সার্চ করলেই সমস্যার সমাধান হবে। অনেক সমস্যার সমাধান হয়েছেও। সুমনা গুগল সার্চ করতে শুরু করল। পাখির নাম খুঁজে পাবার আগেই পেল সঠিক পদ্ধতিতে পাখি তাড়াবার বইয়ের নাম। আশার আলো পুনরায় যেন ফুটল। বেশকিছু বইয়ের মধ্যে একটি বই বেছে নিল। প্রাপ্তিস্থানটাও কাছাকাছি। আগে বই পড়ার অভ্যেস ছিল সুমনার। বহুদিন পর পুরোনো অভ্যেস ফিরে আসবে জীবনে। বই-ই তো শ্রেষ্ঠ বন্ধু। এক কাজে দুটো কাজ হবে। সুমনা ছুটল বইয়ের দোকানে।

সুমনা বই পড়ছে। চোখ বুলিয়ে মনে মনে পড়া নয়, রীতিমতো পড়শির সঙ্গে আগবাড়িয়ে ঝগড়ার মতো চিৎকার করে পড়া। এখানেও সুমনার সূত্র। চিৎকারে শব্দের অনুরণন হয়৷ একই শব্দ এখানে ওখানে হোঁচট খেয়ে নিজের কানেই ফিরে আসে। দীর্ঘ সময় সে শব্দের রেশ বজায় থাকে৷ মন এবং মননে গেঁথে যায় শব্দ।

সন্ধে হলেই সুমনা একের পর এক চ্যানেল ঘুরিয়ে সিরিয়াল দেখে। সেসব দেখা বন্ধ। ঘরে খিল এঁটে সুমনা পড়ছে। অনেকদিন পরে পড়ছে। ঘরের চার দেয়ালে আছড়ে পড়ে একই শব্দ ঘুরে ফিরে কানে ফিরে এলেও কোনওমতেই সুমনা সঠিক কারণে পৌঁছোতে পারছে না। পৃথিবীতে সবচেয়ে বিচিত্র পাখির জীবনী। সুমনা পড়ছে বিশিষ্ট লেখক হুশ-এর ‘পক্ষী সম্মাননা’ প্রাপ্ত বই ‘পাখির জীবন চরিত’। ‘হুশ’ নামটি যে ছদ্মনাম, ভূমিকাতেই লিখেছেন লেখক। পাখি বড়ো ছটফটে স্বভাবের। এই গাছের গোড়ায় খাবার খুঁটছে তো মুহূর্তেই হুশ করে মগডালে। দীর্ঘদিন পাখির পিছন পিছন ব্যাধের মতো কলম হাতে ঘুরে ঘুরে লেখক নিজের ছদ্মনাম ‘হুশ’ রেখেছেন। কিন্তু কোথাও নিজের আসল নামের উল্লেখ করেননি। দু-তিনবার রিভাইস দিতে দু-তিনদিন কেটে গেল। সুমনা বুঝতে পারল লেখক কেন ছদ্মনাম ব্যবহার করেছেন! সাধারণ বিষয়ের একটি বই। নামের সঙ্গে সাবজেক্টের মিল প্রায় নেই বললেই চলে। পাখির থেকে বেশি লেখক নিজের জীবন কাহিনি লিখেছেন। এই বই কোন জাদুমন্ত্রে সম্মাননা পায় বুঝল না সুমনা! বইটা ছুঁড়ে ফেলল।

অস্বাভাবিকতা একসময় স্বাভাবিক হয়ে যায়। পাখিটি পরিবারেরই একজন হয়ে উঠেছে। বাইরের খাবার খেতে খেতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে সন্দীপনও। বিরক্তি কমেছে, বেড়েছে পাখির সম্পর্কে আগ্রহ। ডিম ফুটে তিনটে বাচ্চার জন্ম দিয়েছে পাখি। সারাদিন কিচির মিচির শব্দ তাদের। বেশ যেন একটা সুর ফিরেছে সংসারে।

সুখের মতো সুরও ক্ষণস্থায়ী। এক সকালে তেমনটাই প্রমাণিত হল। বাসা ফাঁকা। পাখি নেই! বাচ্চা নেই! সুর নেই। প্রথমে চোখে পড়ে সন্দীপনের। পরে সুমনার। সন্দীপন নিজেকে সামলে নিয়েছে। সামলাতে পারেনি দাপুটে মেয়েটি। কাঁদছে শূন্য বাসার সামনে দাঁড়িয়ে। এমন কান্না কোনওদিন কাঁদেনি। কিছু শূন্যতা চোখের জলও শূন্য করে দেয়। তেমনই কান্না।

মাস ছয়েক হল সুমনা সামলে উঠেছে। চিমনিটা আগের মতোই পরিষ্কার করা হয়েছে। চিমনির উপর দেয়ালের ফোঁকরটাতে নেট দেওয়া হয়েছে যেন আর নতুন করে কোনও পাখির জন্য কাঁদতে না হয়।

এমন সময় একদিন অফিস থেকে ফিরে সন্দীপন আবার সুমনার চোখে জল দেখতে পেল। সে খুব অবাক হল। ধমকের সুরে বলল, “এখনও তোমার চোখে জল? এতদিন পরেও!”

সুমনা এগিয়ে এসে সন্দীপনকে জড়িয়ে ধরে বলল, ‘পাখিটার নাম কী ছিল গো?’

ছাড়ানোর চেষ্টা করে সন্দীপন বলল, ‘কতবার না বলেছি ওর নাম আমার সামনে বলবে না!”

—বলো না, বলো না, বলো না…।

সন্দীপন কিছু বুঝতে না পেরে চুপ করে রইল। অনেকটা সময় কেটে গেল। সুমনা ওকে ছাড়েনি। জড়িয়েই রয়েছে। বুঝি ঘুমিয়েই পড়েছে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে! সন্দীপন ওকে জাগাবার চেষ্টা করল। সুমনা জাগল না, ও জেগেই ছিল। অস্ফুটে বলল, ‘সুখপাখি।’

—কী বললে?

—সুখপাখি।

—কী করে বুঝলে?

—আমি যে মা হতে চলেছি।

কোনও চোরাস্রোতই স্থায়ী নয় জীবনে। দুঃখের হোক বা সুখের। বিবাহিত জীবনের একযুগ পরে সন্দীপন অনুভব করল দুঃখের চোরাস্রোত ডুবে যাচ্ছে সুখের সাগরে। সেও সুমনাকে জড়িয়ে ধরল।

(সমাপ্ত)

সুখপাখি (পর্ব-০১)

সুমনা বইয়ের দোকানে দরদাম করছে। দরদাম না করে কিছু কিনতে মন সায় দেয় না তার। তা সে যত তুচ্ছই হোক বা জীবনদায়ী ওষুধই হোক না কেন। বাজারে এক আঁটি শাকের দাম দোকানি পাঁচ টাকা চাইলে, সুমনা চার টাকা বলবে। পরে অবশ্য পাঁচ টাকাতেই নেবে।

সুমনা বলল, ‘এই সমস্ত সাবজেক্টের বইতে ত্রিশ থেকে চল্লিশ পার্সেন্ট ছাড় পাওয়া যায়। আপনি দশ পার্সেন্টের বেশি দিতেই চাইছেন না! বেশ তো দাদা আপনি।’

মধ্য ত্রিশের টান টান মেদবর্জিত চেহারার সুমনার মুখে ‘দাদা’ শব্দটি শুনে বৃদ্ধ দোকানির মন বুঝি একটু গলল। আগের চেয়ে চওড়া হাসি হেসে উত্তর দিল, কিছু বইতে ছাড় তো সাবজেক্টের উপরে দেওয়া হয় না, দেওয়া হয় সেলের উপরে। এই বইটির একদম সেল নেই। গত পাঁচ বছরে একটিও কপি বিক্রি হয়নি। দশ কপিই ধরা আছে। নির্ধারিত মূল্যে বিক্রি করলেও হিসেবমতো লস হবে। ঠিক আছে আপনাকে পনেরো পার্সেন্ট ছাড় দিলাম। একশো সত্তর টাকা দিন।

সুমনা এমনটাই আন্দাজ করছিল। দরদামে ওর নিজের সূত্র আছে। সেই সূত্র অনুযায়ী বহুদিনের অভ্যেসে সে বুঝে যায় দোকানি যখন নামতে থাকে তখন ক্রেতাকে ডুব দিতে হয়। অর্থাৎ আগে যা দাম বলেছিল, তার চেয়ে কিছুটা কম বলে চুপ করে জলের তলায় ঘাপটি মেরে থাকার মতো থাকতে হয়। তার সঙ্গে মুখে বিতৃষ্ণার ছবি ফুটিয়ে তুললে কাজ অনেকটাই সহজ হয়ে যায়। সুমনা সূত্র মিলিয়ে তেমনটাই করল। চুপ করে থাকল।

দোকানি অন্য দু’জন খদ্দের সামলে বলল, ‘বুঝতে পেরেছি। যাক না হয় আমারই লস হোক। আপনি আরও কুড়ি টাকা কম দিন। দিন, দেড়শোই দিন। কী এবার নিশ্চয় আপনি খুশি?”

সুমনার খুশি বোঝা গেল না। দরদামের সময় মুখে খুশি খুশি ছবি ফুটিয়ে তুলতে নেই। দোকানি বুঝে গেলেই সমস্যা। খুশি হলেও জোরসে খুশি চেপে রাখতে হয়। নইলে দোকানি পেয়ে বসবে। সে চট করে একশো চল্লিশ টাকা দোকানির হাতে গুঁজে দিয়ে, ব্যাকডেটেড সাবজেক্টের বই, একশো টাকা হলেই ঠিক ছিল….। বলতে বলতে বইটি হাতে নিয়ে হন হন করে হাঁটা দিল বড়ো রাস্তার দিকে। দোকানি ফ্যালফেলিয়ে তাকিয়ে রইল খানিকক্ষণ। একসময় চোখ ফিরিয়ে নিল।

দাপুটে স্বভাবের মেয়ে সুমনা। ছোটোবেলায় গাছে উঠে ফল পেড়ে খাওয়া, সাঁতরে পুকুর পার হওয়ায় ওর জুড়ি মেলা ভার ছিল। সংসার জীবনেও ওর দাপট অব্যাহত। সন্দীপন অবশ্য দাপুটে স্ত্রী পেয়ে বেশ খুশি। সংসার জীবনটা বাইরে থেকে দেখতে এক রকম ভিতর থেকে অন্য রকম। ঠিক নারকেলের উলটোটা যেন। বাইরে থেকে তুলতুলে মনে হলেও ভিতরে বেশ শক্ত। বাইরেটা পুরুষ, ভিতরটা নারী যদি হয় অর্থাৎ সংসারের হাল যদি শক্ত করে ধরে নারী, তবেই সংসার সুখের হয়। সংসার আসলে পরিপাটি সাজানো ঘর-দোর। নারীই পারে সমস্ত ঝুলকালি ঝাঁটাপেটা করে তকতকে করে তুলতে। সন্দীপন-সুমনার সংসারে দুঃখের চোরাস্রোত থাকলেও, সুমনার দাপট থাকলেও, সুখও ছিল।

সুখ বড়ো চঞ্চল। শিশুর চেয়েও চঞ্চল। ধরে রাখা মুশকিল। দাপুটে সুমনার সংসারে সুখের ব্যাঘাত ঘটল৷ কোথা থেকে উড়ে এল একটি পাখি। ওলট পালট করে দিল সবকিছু।

ঘটনার সূত্রপাত তিনদিন আগে। সকালে চা করল সুমনা। সব ঠিকঠাক। ঘণ্টা দুয়েক পরে রান্নার প্রস্তুতি নিতে গিয়ে সুমনার চোখে পড়ল গ্যাসের ওভেনের উপরে উলটে থাকা কলসির মতো কিচেন চিমনিতে এই সামান্য সময়ের মধ্যে কী করে যে একটি পাখি খরকুটো দিয়ে বাসা বানিয়ে ফেলেছে! প্রথম দর্শনে সুমনা ভেবেছিল দু-একবার হুশ হাশ করলেই উড়ে যাবে। সুমনা তাই করল। ওড়া তো দূরের কথা, পাখিটি বিন্দুমাত্র নড়ল না। পাখিটির সাহস দেখে ওর মনে সন্দেহ হল। খুব ভালো করে খুঁটিয়ে দেখল খড়কুটোর বাসায় তিনটে ছোট্ট ছোট্ট ডিম। সেই ডিমের উপর বসে আছে পাখিটি। মুহূর্তে সুমনা বুঝল পাখিটি মা পাখি। সন্তানের জন্ম দিতে সমস্ত ভয়কে অগ্রাহ্য করে ডিমে তা দিচ্ছে। সঙ্গে সঙ্গে এও নিশ্চিত হল যে, ডিম ফুটে বাচ্চা না বের হওয়া পর্যন্ত পাখিটি নড়বে না। কিছু কিছু সিদ্ধান্ত মানুষকে খুব কম সময়ের মধ্যে নিতে হয়। অবশ্যই সে সিদ্ধান্ত সঠিক হওয়া আবশ্যক। সুমনা আর কিছু বলল না। ভয় দেখাতে বা জোর করে পাখিটিকে উড়িয়ে দিতে চেষ্টা করল না।

সন্দীপন বাজার থেকে ফিরলে সুমনা সমস্ত ঘটনা জানাল। সন্দীপনকে রান্নাঘরে টেনে নিয়ে গিয়ে বাসা দেখিয়ে বলল, ‘বাড়িতে দু- একদিন রান্না না হলেও আমরা বাইরের খাবার খেয়ে বেঁচে থাকতে পারব। কিন্তু এই অবস্থায় বাসাটা ভেঙে দিলে মাতৃত্বের সুখ ও স্বপ্ন থেকে বঞ্চিত পাখিটি আর নাও বাঁচতে পারে। তাছাড়া তিনটে প্রাণের পৃথিবীর আলো দেখার আগেই হত্যা করা ঠিক হবে না। তুমি কী বলো?’

সন্দীপনের মুখে বিরক্তির ছাপ। কিন্তু সুমনার মুখের উপর কিছু বলল না। মোবাইল বেজে উঠল। স্ক্রিনে নাম ভেসে উঠেছে মোহিত তালুকদার। অফিসের সহকর্মী। লাল বোতাম প্রেস করে ঘরের বাইরে যেতে যেতে বলল, ‘ডিম ফোটানোর আর জায়গা পেল না! যত্তসব।’

সন্দীপনের বিরক্তি বেশ বুঝতে পারল সুমনা। সে নিজেও ভেবে দেখল সাজানো গোছানো ফ্ল্যাটের বাইরেই পাখি মানায়, ভিতরে নয়। তাছাড়া আজ একটি পাখি বাসা বেঁধেছে, কাল হয়তো দলে দলে আসবে। তখন সামাল দেওয়াই মুশকিল হবে। অতএব শুরুতেই তাড়িয়ে দেওয়া ভালো। কিন্তু পাখিটির মাতৃত্ব সুমনার মনে গভীর ছাপ ফেলল। এই অবস্থায় কি তাড়িয়ে দেওয়া ঠিক হবে? ছোটোবেলায় ঠাকুমা বলত, গৃহস্থের বাড়িতে গর্ভবতী কেউ এলে তাকে না খাইয়ে যেতে দিতে নেই। এমনকী গর্ভবতী আশ্রয় চাইলে, গৃহস্থের উচিত আশ্রয় দেওয়া। সন্তান জন্মের পরে কেউ মা হয় না। মাতৃত্বের আসল অনুভূতি সন্তান জন্মের আগে। গর্ভবতী অবস্থাতেই। পৃথিবীর সব মা একসুতোয় বাঁধা, মাতৃত্ব। তা সে মানুষ হোক বা পাখি।

(ক্রমশ…)

পড়ার জন্য সীমাহীন গল্প-নিবন্ধসাবস্ক্রাইব