সহমর্মিতা

খোলা হাওয়ায় শ্রীরাধা বুক ভরে নিঃশ্বাস নিল। শহরের শেষপ্রান্তে থাকা ঝিলটায় পৌঁছোতে গেলে এই একটাই রাস্তা ধরতে হয়। এদিকটা বেশ নির্জন। চারিদিকে নিবিড় সবুজ গাছগাছালি তাদের শাখা-প্রশাখা বিস্তার করেছে। পিচ বাঁধানো ঢালাই মসৃণ রাস্তা। একটাই বেশ বড়ো হাসপাতাল রয়েছে এই চত্বরে, ঝিলের থেকে কিছুটা দূরত্বে। আর কোনও লোকবসতি নেই এই দিকটায়।

আজ অনেক দিন পর গৌতমের সঙ্গে বাইকে শ্রীরাধা বাড়ি ছাড়িয়ে এতটা দূরে এসেছে, একান্তে কিছুটা সময় কাটাবে বলে। জায়গাটা বরাবরই তার বড়ো প্রিয়। চারপাশের নিসর্গ দেখতে দেখতেই সময় কাটিয়ে দেওয়া যায়। তাই গৌতম যখন এখানে আসার কথা বলল, দ্বিধা করেনি শ্রীরাধা মুহূর্তে রাজি হয়ে গিয়েছিল।

ঝিলের চারপাশে কিছু কিছু আগাছার ভিড় থাকলেও একটু পরিষ্কার দেখে ওরা দুজনে একটা কাগজ বিছিয়ে ঘাসের উপর বসল। গৌতম একটু কাছে ঘেঁষে আসতে চাইলে, শ্রীরাধা কপট রাগ দেখিয়ে ওকে দূরত্ব রেখে বসতে বলল। দুজনেই পা মেলে বসল ঘাসের উপর। হঠাৎই ঝিলের জলে একটা মৃদু কম্পন আর তার সঙ্গে ঝুপ একটা শব্দ শুনে, শ্রীরাধা একটু সজাগ হয়ে উঠল।

মনে হচ্ছে জলে কেউ পাথর ফেলল। নিশ্চয়ই আশেপাশে কেউ আছে আর আড়াল থেকে আমাদের লক্ষ্য করছে।

এখানে কেউ প্রায় আসে না। অনেক সময় জলের উপরে মাছ লাফিযে ওঠে। তারই আওয়াজ তুমি শুনে থাকবে। গৌতম নিশ্চিন্ত করতে চায় শ্রীরাধাকে।

শ্রীরাধার শরীর থেকে একটা মিষ্টি গন্ধ এসে গৌতমের দেহ-মনে নেশা ধরিয়ে দিয়েে। নিজেকে সংযত রাখতে কষ্ট হচ্ছিল গৌতমের। কিন্তু শ্রীরাধার যা ব্যক্তিত্ব তাতে কোনও ভাবেই ওর মতের বিরুদ্ধে যাওয়া চলে না। তাই ধীরে ধীরে ওর চুলের লম্বা বিনুনিটা হাতে নিয়ে খেলতে খেলতে হালকা করে জিজ্ঞেস করে, তোমার পারফিউম-টার নাম কী?

উত্তর দেয় না শ্রীরাধা। মৃদু হেসে গৌতমের কাঁধে মাথা রাখে সে। সুযোগ বুঝে গৌতমের চোখদুটো শ্রীরাধার রূপ-মাধুর‌্য পান করতে ব্যস্ত হয়ে ওঠে। এভাবেই কাটে কিছুটা সময়।

কী দেখছ এমন করে?

তোমার চোখ।

এতে দেখার কী আছে? তোমার সবেতেই বেশি বেশি।

ওই চোখে কী শুধু আমিই জানি।

থামো তো, বাড়িয়ে বলাটা তোমার স্বভাব। এবার চলো উঠি। আর একটু পরেই সন্ধে নামবে। বলে শ্রীরাধা উঠে পড়ল। শাড়িটা ঠিকঠাক করে গুছিযে নিল। সেই সময় দমকা একটা হাওয়ার বেগ ওর আঁচলটা উড়িয়ে নিয়ে গৌতমের মুখ ঢেকে দিল।

গৌতম আঁচলটা হাত দিয়ে ধরতেই শ্রীরাধা বলে উঠল, আঁচলটা প্লিজ ছেড়ে দাও, কেউ দেখে ফেলবে।

আজকের দিনটাই ভালোবাসার জন্য। আমারও প্রাণভরে তোমাকে ভালোবাসতে ইচ্ছে করছে।

প্লিজ ছাড়ো, দেরি হয়ে যাচ্ছে।

ঠিক আছে ম্যাডাম আজ ছেড়ে দিচ্ছি, বলে শ্রীরাধার কোমরের খোলা অংশ হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে গৌতম গভীর চুম্বনে শ্রীরাধাকে সিক্ত করল।

ওদের এই ভালোবাসার সাক্ষী থাকে ঝিলের জল, আশেপাশের গাছপালা আর এক দম্পতি যুগল। ডক্টর সৌম্য বোস এবং ডক্টর শীলা বোস। ঝিলের অনতিদূরেই তাঁদের হাসপাতালটি। কখনও কখনও দুজনের কাজ একই সমযে শেষ হলে, নিজেদের ক্লান্তি দূর করতে, স্বামী-স্ত্রী এই ঝিলটির ধারে এসে বসে কিছুক্ষণ সময় কাটিযে যান।

গৌতম-শ্রীরাধা ওখান থেকে চলে যাওয়ার পর শীলা তাঁর স্বামীকে বললেন, এই ছেলেটিকে আমি চিনি। আমার বাপেরবাড়ির পাড়ায় থাকে। খুব বাজে ছেলে। এক কথায় বলা যায় ধনী বাপের উচ্ছন্নে যাওয়া ছেলে। পড়াশোনা কতদূর করেছে জানা নেই, তবে নিত্য নতুন মেয়েে ফাঁসাতে ওস্তাদ। একবার তো এই ছেলেটির দুশ্চরিত্র স্বভাবের কারণে, একটি মেয়ে আত্মহত্যা করারও চেষ্টা করেছিল।

ছাড়ো তো ছেলেটার কথা, ওদের সঙ্গে আমাদের তো কোনও লেনদেন নেই, ডা. সৌম্য স্ত্রীকে বলেন।

এই ঘটনার পর ছয়-সাত মাস কেটে গেছে। সৌম্য এবং শীলা দুজনেরই সেদিন নাইট ডিউটি। হঠাৎই একটা ট্যাক্সি এসে থামে হাসপাতালের সামনে। এক দম্পতি একটি মেয়েে নিয়ে ট্যাক্সি থেকে নেমে হাসপাতালে ঢোকেন। দুজনে মেয়েটিকে ধরে, ধীরে ধীরে এমারজেন্সি-তে ডাক্তারের কাছে নিয়ে আসেন। সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে ডাক্তারবাবু দম্পতির দিকে চাইলে, মহিলা এগিয়ে আসেন।

ডাক্তারবাবু, এ আমার মেয়ে আজ দুপুর থেকে ওর পেটে প্রচন্ড যন্ত্রণা হচ্ছে আর সেই সঙ্গে খুব ব্লিডিং-ও হচ্ছে।

ডাক্তার সঙ্গে সঙ্গে মেয়েির ব্লাড প্রেশার চেক করে একটা ফোন করলেন। ডক্টর শীলা, প্লিজ তাড়াতাড়ি একবার এমারজেন্সি-তে আসুন। একটা ক্রিটিক্যাল কেস এসেছে।

দুমিনিটের মধ্যেই স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ শীলা এসে সেখানে পেঁছোলেন। ঝড়ের গতিতে মেয়েিকে বিছানায় শুইযে পর্দা টেনে দিলেন। একটু পরেই বেরিয়ে এসে জানালেন, মাত্রাতিরিক্ত ব্লিডিং হচ্ছে। এখুনি অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যেতে হবে। সার্জারি করতে হবে।

অপারেশনের নাম শুনেই মেয়েটির মা-বাবা ঘাবড়ে গেলেন। ভদ্রলোক জিজ্ঞেস করলেন, ডক্টর, ভয়ে কোনও কারণ আছে নাকি?

এখনই কিছু বলা যাচ্ছে না। আপনারা ফর্মালিটিজগুলো সেরে, ওটি-র সামনে অপেক্ষা করুন।

ওটি-তে সৌম্যও স্ত্রী-কে জয়েন করলেন। একটু পরেই একজন নার্স বাইরে এসে জিজ্ঞেস করলেন, ওটি-তে থাকা অসুস্থ মেয়েটির অভিভাবক কি আপনারা? নার্স একটি কাগজ এগিয়ে দিল ভদ্রলোকটির দিকে, তাড়াতাড়ি করে এটাতে সাইন করে দিন। অপারেশন করতে হবে। এখনই করুন।

কী হয়েে সিস্টার?

এখন কথা বলার সময় নেই। যা প্রশ্ন আছে অপারেশনের পরে ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করে নেবেন। মেয়েিকে ডিসচার্জ করার আগে এক বোতল রক্ত আমাদের ব্লাড ব্যাংক-এ জমা করতে হবে। এখন আমরা আমাদের স্টক থেকে রক্ত দেওয়ার ব্যবস্থা করেছি।

নার্স চলে গেলে একজন অ্যাটেনডেন্ট-এর সঙ্গে গিয়ে ভদ্রলোক এক বোতল নিজের রক্ত জমা দিয়ে আবার এসে স্ত্রীয়ের পাশে, ওটি-র সামনের বেঞ্চটাতে বসলেন।

হঠাৎ করে শ্রীরাধার কী হল? ভালোই তো ছিল। ভিতরের টেনশন কিছুতেই চেপে রাখতে পারছিলেন না শ্রীরাধার বাবা।

অপারেশন টেবিলে শ্রীরাধাকে শুইয়ে দিয়ে শীলা জিজ্ঞেস করলেন, যার সঙ্গে তুমি প্রায়শই ওই ঝিলটায় যাও এটা তারই কীর্তি, তাইতো?

চোখের জল বাধ মানে না শ্রীরাধার। হ্যাঁ ডক্টর, আমার একটা ভুলের জন্য এই পরিণতি হবে আমি ভাবতে পারিনি। আমাকে প্লিজ বাঁচাবার চেষ্টা করবেন না। আমার মরে যাওয়াই উচিত।

আমি তোমার মতো বোকা এবং দাযিত্বজ্ঞানহীন নই। আমার কী কর্তব্য সেটা আমি ভালোই জানি।

কিন্তু এই কলঙ্কের বোঝা নিয়ে আমি কী করে বাঁচব? আপনি আমাকে এখন বাঁচিয়ে দিতে পারেন ঠিকই কিন্তু পরেও তো আবার আমি আত্মহত্যা করতেই পারি। দয়া করে আমাকে মরতে দিন।

ঘাবড়ে যেও না, আমি তোমার বদনাম হতে দেব না। এখান থেকে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে তুমি বাড়ি যাবে। নিজের পড়াশোনার ওপর বেশি ফোকাস রাখো। এখন থেকে মা-বাবার সম্মানের কথাটা মাথায় রেখো দয়া করে। সম্মতিসূচক মাথা হেলায় শ্রীরাধা। আর কথা বোলো না, এখনই অ্যানাস্থেশিযার প্রভাব ধীরে ধীরে শুরু হয়ে যাবে। তার পরেই আমি অপারেশন শুরু করব।

প্রায় দুঘন্টা পর ওটি থেকে শীলা বাইরে বেরোতেই, শ্রীরাধার মা-বাবা দৌড়ে এলেন। জিজ্ঞেস করলেন, এখন আমাদের মেয়ে কেমন আছে?

ভালো আছে। আপনারা ঠিক সময়ে মেয়েটির হাসপাতালে নিয়ে এসেছিলেন, নয়তো বেশি ব্লিডিং হওয়ার ফলে প্রাণটাও যেতে পারত। অপারেশন সাকসেসফুল। এখন আর কোনও ভয় নেই আপনাদের মেয়ে।

কিন্তু ডক্টর, আমার মেয়ের কী হয়েছে ? শ্রীরাধার বাবা জিজ্ঞেস করলেন।

আপনারা আমার কেবিনে আসুন।

শ্রীরাধার মা-বাবা ডা. শীলার সঙ্গে ওনার চেম্বারে গিয়ে বসলেন। শীলা, শ্রীরাধার ফাইলে দেওয়া বিবরণ চোখের সামনে খুলে ধরলেন। পেশেন্টের বাবার দিকে সরাসরি তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন, আপনি ফাইলে মেয়ে বয়স লিখিয়েেন সতেরো অর্থাৎ নাবালিকা। আপনারা কি জানতেন, শ্রীরাধা গর্ভবতী ছিল?

কিন্তু এটা কী করে সম্ভব?

তার উত্তর তো একমাত্র শ্রীরাধাই দিতে পারবে। ওর একটি ফার্টিলাইজড এগ গর্ভাশয় অবধি পৌঁছোতে পারেনি। ফ্যালোপিয়ন টিউবেই আটকে ছিল। গর্ভের আকার বড়ো হতেই নালি ফেটে গিয়ে ব্লিডিং শুরু হয়েছিল। আমরা নালির ওই অংশ কেটে বাদ দিয়ে দিয়েছি। এখন আর ভয় পাওয়ার কোনও কারণ নেই।

ডাক্তারের কথা শুনে শীলার মা-বাবার মুখে আশ্চর্য হওয়ার অভিব্যক্তি ফুটে উঠল। মুহূর্তের মধ্যে ওঁরা লজ্জায় মাথা নীচু করে নিলেন।

সপ্তাহ খানিক পর শ্রীরাধার ডিসচার্জ হওয়ার কথা। শীলার অ্যাসিস্ট্যান্ট এসে জিজ্ঞেস করল, ডিসচার্জ ফাইলে কী লিখব ম্যাডাম? আপনি বলেছিলেন ডিসচার্জ ফাইল তৈরি করার সময় আপনাকে একবার জিজ্ঞেস করতে।

ওকে, পেশেন্টকে যে ডিসচার্জ স্লিপটা দেওয়া হবে, তুমি তাতে সব সত্যিটা লেখো। আর হাসপাতালের ফাইলে লেখো ডান দিকের ফ্যালোপিয়ন টিউব ফেটে যাওয়ার পরে, সেটা আপারেশন করে বার করে দেওয়া হয়েছে। একটা নোট লিখে দিও যে, সার্জারির ডিটেল রিপোর্ট গাইনিকোলজিস্টের ফাইলে রয়েছে। এই ডিটেল পেপার্স-এর ফাইল আমাকে দিয়ে দিও। এই পুরো ব্যাপারটা যেন আমাদের দুজনের মধ্যেই থাকে। তুমি নিজে একজন মেয়ে হয়ে নিশ্চয়ই এটার গুরুত্ব বুঝতে পারছ।

কথোপকথনের মধ্যেই সৌম্য এসে স্ত্রীয়ের কেবিনে ঢুকেছিলেন। চুপচাপ বসে স্ত্রীয়ের কথা শুনছিলেন। অ্যাসিস্ট্যান্ট ঘর থেকে বেরিয়ে যেতেই শীলাকে বললেন, এটা তুমি কী করছ? হাসপাতালের ফাইলেই অপারেশন নোটস থাকতে দাও। এটা তোমার করা উচিত নয়। পেশেন্টের প্রতি সহানুভূতি রয়েছে বলে, তুমি হাসপাতালের নিয়ম ভাঙতে পারো না।

সৌম্য তুমি যা বলছ, তা একদম ঠিক। কিন্তু ভেবে দ্যাখো মেয়েটি নাবালিকা, বাচ্চা মেয়ে বললেও ভুল হবে না। ওর এই অবৈধ প্রেগন্যান্সি যদি একবার ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে মেয়েটির বদনামের শেষ থাকবে না। মেয়েটির ভবিষ্যৎও নষ্ট হয়ে যাবে। আমি ডাক্তার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে একজন নারী। আমি মেয়েটির ব্যথা খুব ভালো বুঝতে পারি।

শীলা, শ্রীরাধার মা-বাবাকে ডেকে পাঠালেন নিজের কেবিনে। হাসপাতালের নিয়মকানুন বুঝিয়ে বললেন, দেখুন আপনাদের ফাইলে আমাকে সত্যিটা লিখতেই হবে। ফাইল আপনাদের সুতরাং ওটা নিয়ে আপনারা যা খুশি করতে পারেন। চাইলে নষ্ট করেও দিতে পারেন। আপনাদের মেয়ে ভালোর জন্য আমার পক্ষে যতখানি সম্ভব আমি সেটা করেছি। এবার ওর ভবিষ্যৎ আপনাদের হাতে।

মা জিজ্ঞেস করলেন, শ্রীরাধা ভবিষ্যতে আদৌ মা হতে পারবে কি?

হ্যাঁ, মা হতে পারবে। ওর একটা ফ্যালোপিয়ন টিউব সম্পূর্ণ ঠিক আছে।

কিন্তু অপারেশনের দাগ তো পেটে থেকেই যাবে। বিয়ের পর যদি ওর স্বামী দেখে কিছু সন্দেহ করে?

আমি ল্যাপ্রোস্কোপিক পদ্ধতিতে সার্জারি করেছি। ছোট্ট একটুখানি জায়গা কাটতে হয়েছে। সুতরাং পেটে কোনও বড়ো দাগ থাকবে না, তাড়াতাড়ি সেরে উঠবে। শ্রীরাধার বিয়ে এখনও অনেক দেরি আছে। আমি ওর সঙ্গে কথা বলেছি, ও এখন পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত থাকতে চায়। মাস্টার্স করে তবেই বিয়ে করবে আপনাদের মেয়ে হাসপাতাল থেকে ডিসচার্জ করে দেওয়ার পর বাড়ি এসে শ্রীরাধা মায়ের কাছে কান্নায় ভেঙে পড়ল। লজ্জা যেন ওকে গ্রাস করে নিচ্ছিল। মা, আমি আর কারও কাছে মুখ দেখাতে পারব না! বেঁচে থেকে আমি কী করব?

খবরদার রাধা এমন বোকার মতো কথা মাথাতেও আনবি না। একটা দুর্ঘটনা ভেবে ভুলে যা। এটা নিয়ে কারও সঙ্গে কোনও আলোচনা করবি না। এমনকী বিয়ে পর স্বামীর সঙ্গেও না। এখন মন দিয়ে পড়াশোনা কর। আমরা খুব ধুমধাম করে তোর বিয়ে দেব, চিন্তা করিস না।

শ্রীরাধার মা স্বামীকেও বললেন, এই ব্যাপার নিয়ে রাধাকে তুমি কিচ্ছু বলবে না। আমি ওর সঙ্গে কথা বলেছি। এই পুরো ঘটনায় ও খুব লজ্জিত। ও এখন পড়াশোনা নিয়ে থাকতে চায়। ভাগ্য ভালো যে, এরকম একজন ভালো লেডি ডক্টর-এর সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ হয়েছিল। যিনি আমাদের সম্মান বাঁচাবার জন্য যতখানি সম্ভব সহযোগিতা করেছেন।

এই ঘটনার পর আট বছর কেটে গেছে। আজ শ্রীরাধা নিজের স্বামীর সঙ্গে আবার ডা. শীলার হাসপাতালে এসে হাজির হয়েে। আড়াই মাসের গর্ভবতী সে। ওর ডাক্তারই শ্রীরাধাকে, ডা. শীলা বোসের কাছে রেফার করেছেন।

শ্রীরাধা আর তার স্বামীর সঙ্গে কথার শেষে, শ্রীরাধার স্বামীকে কেবিনের বাইরে অপেক্ষা করতে বলে ডা. শীলা চেক-আপের জন্য শ্রীরাধাকে বেডে শুইযে দিলেন। পরীক্ষা করে বললেন, পেটের দাগটা তো একেবারেই মিলিয়ে গেছে দেখছি। এখন ক’মাস চলছে?

আড়াই মাস চলছে ম্যাম।

বাচ্চা একদম ঠিক আছে। খাওয়া-দাওয়ার খেযাল রাখতে হবে আর অ্যাক্টিভ থাকবার চেষ্টা করবে সবসময়। এতে নর্মাল ডেলিভারি হতে সুবিধা হবে। কমপ্লিট রেস্টের কোনও দরকার নেই তোমার। তোমার স্বামী বাইরে বসে ছটফট করছেন, তোমাকে খুবই ভালোবাসেন, তাই না?

হ্যাঁ ম্যাম। আমার অতীতের ঘটনা ওনাকে কিছুই জানাইনি। আমি তো আত্মহত্যা করব বলেই ঠিক করে ফেলেছিলাম, আপনিই আমাকে মরার হাত থেকে বাঁচিয়েছেন। আপনার জন্যই এত সুন্দর জীবন পেয়েছি। এই ঋণ কোনও দিন আমি শোধ করতে পারব না। শ্রীরাধার চোখ জলে ভরে আসে।

আচ্ছা ঠিক আছে। এখন শিগগির স্বামীর কাছে যাও। ও বেচারা উত্কণ্ঠায় ছটফট করে মরছে। হাসতে হাসতে শীলা বললেন।

চোখে জল নিয়ে শ্রীরাধা কেবিন থেকে বাইরে এল। ওকে দেখে স্বামী রথীন দৌড়ে এল, কী হল শ্রীরাধা, সব ঠিক আছে তো? তোমার চোখে জল কেন?

রথীন এটা হচ্ছে আনন্দের অশ্রু। শ্রীরাধার শরীর আর বাচ্চা দু-ই একদম ঠিক আছে। পরের বার মিষ্টি নিয়ে আসতে ভুলো না শ্রীরাধা। ওরা দুজনের কেউই খেয়াল করেনি, কখন ডা. শীলাও শ্রীরাধার পিছনে এসে দাঁড়িয়েছেন। ওনার কথাতে দুজনের চমক ভাঙে। রথীন আর শ্রীরাধা হাসিমুখে শীলাকে ধন্যবাদ জানিয়ে হাসপাতালের বাইরে বেরিয়ে আসে। নবজাতকের আগমনের স্বপ্নে দুজনেই বিভোর হয়ে ওঠে।

ইলেক্ট্রনিক অ্যাপ্লায়ান্সেস

আধুনিক জীবনশৈলীতে সময়ের বড়ো অভাব। শুধু তাই নয়, কম পরিশ্রমে সহজে কীভাবে রান্নাকাজ সারা যাবে, সেই বিষয়টিও খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আর সেইজন্যই চাই ইলেক্ট্রনিক কিচেন অ্যাপ্লায়ান্সেস। কিন্তু মনে রাখবেন, ইলেক্ট্রনিক অ্যাপ্লায়ান্সেস-এর সঠিক যত্ন না নিলে, তা খারাপ হয়ে যেতে পারে এবং দুর্ঘটনাও ঘটতে পারে। ভালো ভাবে খোঁজ খবর নিয়ে কিনতে হবে ব্র‌্যান্ডেড জিনিস। কেনার সময় অবশ্যই সংগ্রহ করবেন ওয়ারেন্টি কার্ড।  মিক্সি, আভেন, চিমনি, টোস্টার, কফিমেকার, ফ্রিজ প্রভৃতি রান্নাঘরে ব্যবহারযোগ্য সামগ্রীর ব্যবহার-বিধি ও সঠিক যত্নের বিষয়ে জ্ঞান এবং সচেতনতা না থাকলে বিপদে পড়ার সম্ভাবনা থাকবে।

  • ইলেক্ট্রনিক অ্যাপ্লায়ান্সেস-এর ব্যবহার করার পর বন্ধ করতে ভুলবেন না
  • ফ্রিজ বারবার খুলবেন না, এতে বিদু্যতের খরচ বাড়বে এবং ফ্রিজে রাখা জিনিসপত্রে জীবাণু আক্রান্ত হতে পারে
  • খাবার গরম করার জন্য মাইক্রো আভেন ব্যবহার করুন। এতে সময় বাঁচবে। কারণ, খাবার গরম করতে সময় লাগে মাত্র এক থেকে দেড় মিনিট। কিন্তু মনে রাখবেন, মাইক্রো আভেনে ব্যবহারের উপযোগী পাত্র ছাড়া অন্য কোনও পাত্র ব্যবহার করবেন না। সাধারণ প্লাস্টিকের পাত্র এবং কোনও স্টিল-এর পাত্র ব্যবহার করলে দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে। ভালো মানের কাচের পাত্র এবং ফাইবার-এর পাত্র ব্যবহার করা নিরাপদ। আর পাউরুটি গরম করবেন না এবং ডিমের পোচ তৈরি করবেন না মাইক্রো আভেনে, এতে মাইক্রো আভেন ক্ষতিগ্রস্থ হতে পারে
  • কোম্পানির দেওয়া গাইডলাইন মেনে পরিষ্কার করুন কিচেন অ্যাপ্লায়ান্সেস। শুকনো সূতির কাপড়, বেকিং পাউডার এবং লেবুর জল দিয়ে পরিষ্কার করতে পারেন কিন্তু অবশ্যই নিয়ম মেনে। আর অ্যাপ্লায়ান্সেস পরিষ্কার করার সময় অবশ্যই বিচ্ছিন্ন করবেন বিদু্যত্ সংযোগ। মাইক্রো আভেন, টোস্টার প্রভৃতি তাপবাহী অ্যাপ্লায়ান্সেস ঠান্ডা না হলে পরিষ্কার করতে যাবেন না, এতে হাত পুড়ে যেতে পারে
  • রান্নাঘরে যেন পর্যাপ্ত আলো থাকে। কারণ, পর্যাপ্ত আলো না থাকলে রান্নার সামগ্রীতে চুল কিংবা অন্যান্য ময়লা পড়তে পারে এবং সবজি কাটার সময় হাত কেটে যেতে পারে। অতএব, রান্নাঘরে অবশ্যই একটা বা দুটো টিউবলাইট লাগাবেন এবং তা যেন ভালো ব্র‌্যান্ড-এর হয়

রান্না শুরু হলেই এগজস্ট ফ্যান অথবা চিমনি ব্যবহার করবেন অবশ্যই। আর অ্যাপ্লায়ান্সেস ক্লিনিং-এর জন্য ট্রেন্ড সার্ভিস পার্সন-এর সাহায্য নেবেন অবশ্যই।

সঠিক আচরণের অভ্যাস করান সন্তানকে

চলন্ত ট্রেনে ঠিক আমার সামনে একটি পরিবারের চারজন জার্নি করছিল। বাবা, মা এবং তাদের দুটি সন্তান। মেয়েটির বয়স ৮-১০ বছরের মধ্যে হবে এবং ছেলেটি ৬-৭ বছরের। তাদের জামাকাপড় দেখে মনে হচ্ছিল সম্ভ্রান্ত এবং শিক্ষিত পরিবার। বেশ কিছুটা সময় অতিক্রম করে যাওয়ার পর বাচ্চা দুটির মধ্যে মোবাইল নিয়ে ঝগড়া শুরু হয়ে গেল। ট্রেনের ওই কম্পার্টমেন্টে বাচ্চা দুটি ছাড়া সকলেই প্রায় গুরুজন ব্যক্তি বসেছিলেন। স্বাভাবিক ভাবেই অনেকেরই চোখ পড়ল দুটি বাচ্চার ঝগড়ায়।

ঝগড়া গিয়ে দাঁড়াল মারামারিতে। বোন, ভাইয়ের গালে জোরে থাপ্পড় মারলে ভাইও বোনের চুলের মুঠি ধরে টান দিল। ওদের মা বা বাবা কেউই শাসন করার চেষ্টা করলেন না। শুধু মা নরম সুরে ছেলেকে বকলেন, ‘সোনা এরকম করে না, তুমি তো গুড বয়।’

ছেলে মায়ের মুখের উপরেই উত্তর দিল, ‘নো মম, আই অ্যাম আ ব্যাড বয়।’

‘ছিঃ, এরকম বলে না, তুমি কনভেন্ট স্কুলে পড়ো। ইউ আর সাচ আ গুড বয় আই নো’, শাসনের বদলে মায়ের গলায়  প্রশংসারই সুর বাজল।

বাচ্চা মেয়েটি খেয়াল করলাম মায়ের মোবাইলটা নিয়ে নাড়াচাড়া করছে। ‘মা-মা প্লিজ এবার আমার নিজের মোবাইল চাই নয়তো এটাও আমি ভেঙে দেব, তাহলে তুমিও ইউজ করতে পারবে না।’

মা-কে দেখলাম হাসিমুখে মেয়েকে বলছেন, ‘ছিঃ এরকম কথা বলতে নেই। তুমি এখন বড়ো হয়েছ।’

‘টিচারের মতো জ্ঞান দিও না প্লিজ, মেয়ের উত্তর।

এতক্ষণে বাচ্চাদুটির বাবা মুখ খুললেন, ‘এভাবে মায়ের সঙ্গে কথা বলে কেউ?’ মেয়েটি চুপ করলে, ভদ্রলোক নিজের স্ত্রী-কে বললেন, ‘এই সব তোমারই শিক্ষার ফল।’

‘কেন, শুধু শুধু মিথ্যা বলছ? তুমিই তো বাচ্চাদের আদর দিয়ে মাথায় তুলেছ।’

পরিবারটির চারজনের কথোপকথনে এবং আচরণে ততক্ষণে ট্রেনের ওই কামরায় সকলের কাছেই পরিষ্কার হয়ে গেছে, বাচ্চাদের ওইরকম অভদ্র ব্যবহারের আসল কারণটা কী। বাড়িতে অতিরিক্ত তোষামোদ পাওয়া এবং সঙ্গে শাসনের অভাব।

আমরা বড়োরা কোনও রকম ভাবনা-চিন্তা না করেই সাধারণত বাচ্চাদের সামনেই যে-কোনও বিষয় নিয়ে আলোচনা শুরু করে দিই। এটা ভুলে যাই যে বাচ্চারা খেলতে খেলতেও আমাদের সব আলোচনা শুনছে এবং মাথায় রাখছে। আমরা বড়ো, তাই বাইরের লোকের সামনে ইচ্ছেমতো মুখোশ ব্যবহার করি কিন্তু ওরা বাচ্চা। তাই ভিতরের কথা ওরা লুকোতে পারে না। চট্ করে বাইরের লোকের সামনে নিজের আচরণ বদলে ফেলতে ওরা জানে না। ফলে এমন কথাও ওরা বলে ফেলে যেটা মাঝেমধ্যে বড়োদের লজ্জার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

আজকের এই ব্যস্ততার যুগে বাচ্চাদের আচরণ নিয়ে এই ধরনের সমস্যা প্রায়শই দেখতে পাওয়া যায়। বাচ্চাদের মধ্যে কথা না শোনা, রাগ, জেদ, বদমায়েশি খুব বেশি চোখে পড়ে এখন। অনেক অভিভাবকেরাই বুঝতে পারেন না, কী করে বাচ্চাদের স্বাভাবিক ব্যবহারে অভ্যস্ত করাবেন যাতে অপরের সামনে লজ্জায় না পড়তে হয়। বাচ্চারা খারাপ আচরণ করলে মা বা বাবা বেশিরভাগই ব্যাপারটা এড়িয়ে যান এই কথা বলে যে, তাদের সন্তানের মুড এখন ভালো নেই। অথচ সাইকোলজিস্ট এবং সাইকোথেরাপিস্টদের মতে এটা শুধু বাচ্চার মুড নয়, বাচ্চা নিজের মনোযোগ নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারছে না বলেই এমন আচরণ করছে।

তাদের মতে ছোটো থেকেই বাচ্চাকে সঠিক আচরণে অভ্যস্ত করাতে হবে অভিভাবকদেরই, যাতে খারাপ-ভালোর সঙ্গে পরিচিত হতে পারে বাচ্চারা। দুটোর মধ্যে পার্থক্য করতে শেখে তারা। এছাড়াও বড়োদের ইচ্ছে বা যুক্তি ছোট্ট শিশুর উপর চাপিয়ে দেওয়াটাও বাচ্চাদের উপর নির্যাতন করারই সমান। এটাও বাচ্চাদের মানসিক উদ্বেগেরই কারণ।

কী করা উচিত

 ১) বাচ্চাদের সামনে বড়োদের নিজেদের মধ্যে ঝগড়া করা উচিত নয়। যে-কোনও বিষয়ে কথাবার্তা বলার সময় খুব সাবধান থাকা উচিত কারণ, বাচ্চারা খুব তাড়াতাড়ি বড়োদের বলা প্রতিটা শব্দ অনুকরণ করে।

২) ক্রিয়েটিভ কাজে বাচ্চাদের ব্যস্ত রাখুন যাতে বাচ্চা বোর না হয় এবং মনের মধ্যে জানার একটা ইচ্ছা তৈরি হতে পারে।

৩) বাচ্চাকে ভালোবাসুন, আদর দিন কিন্তু জীবনের মূল্যবোধগুলির সঙ্গেও ওকে পরিচয় করান। খেলার মাধ্যমে, ছোটো ছোটো গল্পের মধ্যে দিয়ে মূল্যবোধের শিক্ষা দিন। শিক্ষামূলক গল্পের বই কিনে দিন পড়ার জন্য।

৪) শিক্ষার মানে এবং গুরুত্ব বাচ্চাকে শেখানো উচিত। বাচ্চাকে গড়ে তোলার জন্য এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

৫) বাচ্চাকে সময় দিন, মন খুলে বাচ্চার সঙ্গে মিশুন তাতে বাচ্চার মনে কী চলছে সেটা বুঝতে আপনার অসুবিধা হবে না। বাচ্চা যদি কোনও অন্যায় করে সেটা সঙ্গে সঙ্গে শুধরে দিতে পারবেন।

৬) বাচ্চা কথা না শুনলে, তাকে মারধর না করে তার পছন্দের অ্যাকটিভিটি থেকে তাকে সরিয়ে দিন। যেমন গল্প বলা বন্ধ করে দিন বা কথা না শুনলে বাইরে গিয়ে খেলা কয়েকদিন বন্ধ করে দিন। বেশি জেদ করলে বলতে পারেন, পছন্দের খেলনা তাকে দেওয়া হবে না যদি সে জেদ করতেই থাকে।

কী করবেন না

 ১) বাচ্চাকেও গুরুত্ব দিতে হবে, বাচ্চা ভেবে ভুল করলে চলবে না। বড়োরা যখন নিজেদের কথায় ব্যস্ত থাকবে তখন বাচ্চা হয়তো খেলছে বা পড়াশোনা করছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও সে বড়োদের কথা মন দিয়ে শুনে থাকতে পারে। বাচ্চার মস্তিষ্ক বড়োদের থেকে অনেক বেশি শক্তিশালী হয়।

২) নিজের ইচ্ছে বাচ্চার উপর চাপাবেন না, তাতে ভালো কথাও বাচ্চার উপর চাপ সৃষ্টি করবে। বাচ্চা নিরাশ হয়ে পড়তে পারে।

৩) সব কাজের ভালো এবং খারাপ দিকটা বাচ্চাকে বোঝাতে হবে। বাচ্চার সব কথা সময় বার করে ধৈর্য নিয়ে শুনতে হবে। ওদের এড়িয়ে যাওয়া বা ইগনোর করা উচিত হবে না।

৪) বাড়ির বা বাইরের কোনও ব্যক্তির সঙ্গে বাচ্চার তুলনা একেবারেই করবেন না এতে সেই ব্যক্তির প্রতি রাগ এবং ঘৃণা বাড়বে আপনার বাচ্চার। সব বাচ্চার মধ্যেই নিজস্ব অনেক গুণ থাকে যেগুলো খেয়াল না করার ভুল করবেন না।

৫) সব অভিভাবকরাই নিজেদের সন্তানকে স্মার্ট এবং ইনটেলিজেন্ট দেখতে চান। কিন্তু স্মার্ট বানাতে গিয়ে বাচ্চাকে বয়সের তুলনায় ম্যাচিওর করে তুলবেন না।

৬) নিজের স্বপ্ন, বাচ্চার মাধ্যমে সাকার করার চেষ্টা করবেন না। বাচ্চাকে নিজের স্বপ্নের উড়ান ওড়াতে, সাহায্য করুন। আপনি জীবনে কী করতে চেয়েছিলেন, কী করতে পারেননি এগুলির প্রভাব বাচ্চার উপর কোনওভাবেই পড়তে দেবেন না।

৭) ভয় দেখিয়ে বাচ্চাকে দিয়ে কাজ করাবেন না। এর ফলে বাচ্চা কাল্পনিক পরিস্থিতি থেকেও ভয় পেতে শুরু করবে। বাচ্চার  মানসিক বিকাশও ঠিকমতো হবে না। বাচ্চার ইচ্ছে না থাকলেও বাচ্চা ভুল করবেই।

 

আলোয় ফেরা

‘মিত্রা, তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নাও। এখুনি বেরোতে হবে। একটা ফ্ল্যাটের সন্ধান দিল এজেন্ট। এখন না গেলে যার ফ্ল্যাট সে চলে যাবে’, শংকর তাড়া লাগাল বউকে।

আজ এক সপ্তাহ হল শংকর আর মিত্রা বেঙ্গালুরু থেকে দিল্লি এসে হোটেলে উঠেছে। শংকর বেঙ্গালুরুর চাকরি ছেড়ে আরও ভালো প্যাকেজ পেয়ে দিল্লি এসেছে। বরের সঙ্গে থাকবে বলে মিত্রা ওখানকার চাকরিটা ছেড়ে দিয়েছে। ও জানে এখানে সেটল করে ঠিক একটা চাকরি ও জোগাড় করে নেবে। বেঙ্গালুরুর ফার্নিশড ফ্ল্যাটটাও ওরা আসার সময় ছেড়ে দিয়ে এসেছে। ওরা ঠিকই করে রেখেছে নিজস্ব ফ্ল্যাট না হওয়া পর্যন্ত ফার্নিশড ফ্ল্যাট-ই ভাড়া নিয়ে থাকবে। এতে সুবিধা হচ্ছে, গুচ্ছের জিনিসপত্র কিনে টানা-হ্যাঁচড়ার কোনও প্রশ্ন নেই। শুধু নিজেদের ব্যবহার্য জামাকাপড় এবং দৈনন্দিন কিছু জিনিস ছাড়া শিফটিংয়ের সময় গুচ্ছের জিনিস বইতে হয় না। সুতরাং দিল্লিতে আসা থেকে ওরা নতুন ফ্ল্যাটের সন্ধানে রয়েছে। কয়েকটা দেখেওছে কিন্তু কোনওটাই ফার্নিশড ছিল না। হোটেলে থাকতেও ওদের আর ভালো লাগছিল না।

নতুন ফ্ল্যাটটা দেখেই দুজনেরই পছন্দ হয়ে গেল। নতুন ফার্নিচারে সাজানো দুটো বেডরুম, ড্রয়িং কাম ডাইনিং, ঝকঝকে মডার্ন কিচেন, বাথরুম– সবই প্রশংসার যোগ্য কিন্তু মিত্রার সবথেকে পছন্দ হল ফ্ল্যাটের সঙ্গে লাগোয়া সার্ভেন্ট কোয়ার্টারটা দেখে। বাড়িওয়ালা জানালেন, ওই সোসাইটিতে প্রত্যেকটি ফ্ল্যাটের সঙ্গে একটি করে সার্ভেন্ট কোয়ার্টার আছে। তাতে একটি রুম সঙ্গে লাগোয়া বাথরুম এবং রান্নাঘর। কোয়ার্টারে ঢোকার রাস্তাও আলাদা।

ফ্ল্যাটে যে কাজ করবে সে পরিবারের সঙ্গে ওখানে থাকতে পারবে পরিবর্তে কম টাকায় তাকে ওই ফ্ল্যাটের সব কাজ করতে হবে। এটাই নাকী ওই সোসাইটির নিয়ম। যারা এই শর্তে কাজ করতে ইচ্ছুক তারা সিকিউরিটি গার্ডের কাছে নিজেদের মোবাইল নম্বর দিয়ে রেখেছে সুতরাং যোগাযোগ করতে হলে সিকিউরিটি গার্ডের সঙ্গে কথা বলতে হবে।

সব দেখেশুনে সঙ্গে সঙ্গে হ্যাঁ করে দিল শংকর। মিত্রার মুখ দেখে বুঝতে পারছিল ওরও খুব পছন্দ হয়েছে পুরো ব্যবস্থা। টাকা দিতে যাওয়ার একটা দিন ধার্য করে ওরা স্বামী-স্ত্রী বেরিয়ে এল সোসাইটি থেকে। মিত্রা আনন্দ চেপে রাখতে পারল না। বাইরে পা দিয়েই বলল, ‘আমার দারুণ পছন্দ হয়েছে ফ্ল্যাটটা, বিশেষ করে সার্ভেন্ট কোয়ার্টার থাকায় চাকরি করাটা খুব সুবিধা হবে তাই না?’

ছোট্ট একটা ‘হ্যাঁ’ বলেই শংকর চুপ করল।

‘এখানে শিফট করেই একজন কাজের লোক রেখে নেব। তাহলে অফিস জয়েন যখন করব কোনও চিন্তা থাকবে না আর অফিস থেকে ফিরেও রান্না করার ঝামেলায় পড়তে হবে না’, মিত্রা আনন্দ কিছুতেই চাপতে পারে না।

তিন দিনের মাথায় শংকর আর মিত্রা নতুন ফ্ল্যাটে শিফট করল। মিত্রা এসেই সিকিউরিটি গার্ডের সঙ্গে কথা বলে চার-পাঁচজন পরিচারিকার নম্বর নিজের মোবাইলে সেভ করে রাখল, সময় করে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করবে বলে।

একটু গুছিয়ে বসতেই মিত্রা কাজের লোক খুঁজতে লেগে পড়ল। দুটো তিনটে ফোন করার পর একজনকে পছন্দ হল কিন্তু তার এক মাসের বাচ্চা আছে শুনে পিছিয়ে গেল আবার। অতটুকু বাচ্চা নিয়ে পুরো বাড়ি কীভাবে মেয়েটি সামাল দেবে ভেবে পেল না মিত্রা। অগত্যা তাকেও না করতে হল।

শংকর অফিসের জন্য তৈরি হচ্ছে দেখে মিত্রা রান্নাঘরে ঢুকল। মনটা পড়ে রইল কাজের লোকের চিন্তায়। কী জানি কটা দিন আর অপেক্ষা করতে হবে? আনমনা হয়েই দরজা অবধি এগিয়ে গেল মিত্রা, শংকরকে সিঅফ করতে। দরজা বন্ধ করে সোফায় এসে বসল। এখনও ঘরদোর পরিষ্কার করা হয়নি। মনে মনে কাজের একটা লিস্ট ছকে নেয় ও। সিকিউরিটি গার্ডের কাছ থেকে আরও কটা নম্বর জোগাড় করে নিয়ে আসতে হবে। সুতরাং দেরি না করে সোফা ছেড়ে উঠে পড়ে। তক্ষুনি ডোর বেলটা বেজে ওঠে। মিত্রা দরজার দিকে এগোয়। দরজা খুলতেই দ্যাখে সামনে দাঁড়িয়ে মাঝবয়সি একটি মহিলা। বেশ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। সুতির ছাপা একটি শাড়ি পরনে। গায়ের রং শ্যামলা এবং ছিপছিপে শরীর।

মিত্রাকে দেখে মহিলাটি হাত তুলে নমস্কার জানাল। কিছু জিজ্ঞাসা করার আগেই মিত্রার জিজ্ঞাসু এবং উৎসুক মুখ দেখে মহিলাটি বলল, ‘ম্যাডাম, আমার নাম শ্যামা। থাকার জন্য আমার ঘরের খুব দরকার। আপনি লোক খুঁজছেন কাজের জন্য। আমি এখানে কাজ করতে রাজি আছি। আমার স্বামী তিনবছর আগে মারা গেছে, দুটো মেয়ে আছে। মেয়েদের বিয়ে হয়ে গেছে। পাশেই বস্তিতে একটা ঘর ভাড়া নিয়ে থাকি। আগে অনেক বাড়িতে ঘুরে ঘুরে কাজ করতাম কিন্তু এখন আর পারি না। এখন একটা বাড়িতে থেকে সেখানেই রাত-দিনের কাজ করতে চাই। এটুকু বলতে পারি আমাকে নিয়ে বা আমার কাজ নিয়ে আপনাকে নালিশ করতে হবে না। সারাদিন পরিশ্রম করতে আমার কোনও অসুবিধা নেই।’

মহিলাটির কথাবার্তা শুনে, মিত্রার মহিলাটিকে ভালোই মনে হল, তবে কয়েকটা প্রশ্ন আগে থেকে জিজ্ঞেস করে নেওয়াটা উচিত মনে হল মিত্রার। জিজ্ঞেস করল, ‘তুমি কি জানো, এখানে সার্ভেন্ট কোয়ার্টারে থাকতে হলে, তোমাকে কম টাকায় বাড়ির কাজ করতে হবে? তাহলে তোমার মাসে চলবে কী করে?’

‘সে চিন্তা নেই ম্যাডাম। ছয় মাস বাদে বাদে গ্রাম থেকে আমার চাল, ডাল গম সব আসে। গ্রামে আমাদের জমিজমা কিছু আছে। এছাড়া আমার দুই জামাইও খুব ভালো। টাকাপয়সা দিয়ে ওরা সবসময় আমাকে সাহায্য করে। আমার শুধু থাকার জন্য ঘরের খুব দরকার।’

‘ঠিক আছে, তুমি কবে থেকে আসতে পারবে? মিত্রা জিজ্ঞেস করল।’

‘ম্যাডাম, কাল বাদে পরশু সকালেই আমি জিনিসপত্র নিয়ে চলে আসব’, বলে শ্যামা চলে গেল। মিত্রাও দরজা বন্ধ করে ভিতরে আসতে আসতে অনেকটা হালকা বোধ করল। মহিলাটি একাই থাকবে সুতরাং ওর নিজের ঝামেলা খুব একটা থাকবে না, ফলে মিত্রার সংসারে ও ভালোমতোই সময় দিতে পারবে। শংকরকে ফোন করে সুখবরটা দিতে হবে ভেবে মিত্রা মুঠোফোনটা হাতে তুলে নিল।

একদিন পরই শ্যামা নিজের জিনিসপত্র নিয়ে মিত্রার কাছে হাজির হল। মিত্রা সার্ভেন্ট কোয়ার্টারের চাবি খুলে দিয়ে শ্যামার হাতে চাবিটা ধরিয়ে দিল। হাতমুখ ধুয়ে জিনিসপত্র রেখে শ্যামা মিত্রার ফ্ল্যাটে চলে এল এবং বাড়ির সব কাজ বুঝে নিল। শ্যামার গোছালো কাজ দেখে মিত্রা নিশ্চিন্ত বোধ করল এবং নিজের চাকরির জন্য খোঁজখবর নিতে শুরু করে দিল। দেখতে দেখতে একটা মাসের মধ্যে তিনটে ইন্টারভিউ দেওয়া হয়ে গেল মিত্রার। মাস কাটতেই হঠাৎই শ্যামার ব্যবহারে কিছু অসংগতি মিত্রার চোখে ধরা পড়তে আরম্ভ করল।

গ্রামের থেকে চাল, ডাল, গম আসে, শ্যামার কাছে এই গল্প প্রথমে বিশ্বাসই করেছিল মিত্রা। কিন্তু রোজ রোজ যখন জিনিস চাওয়া আরম্ভ করল শ্যামা তখনই মিত্রার সন্দেহ হওয়া শুরু হয়। ধীরে ধীরে সাহস বাড়তে থাকে শ্যামার। মিত্রাকে কিছু না জানিয়েই রান্নাঘর থেকে চাল, আটা, ডাল, ফ্রিজ থেকে দুধ, সবজি নিয়ে যেতে আরম্ভ করল ও।

একদিন মিত্রা এই নিয়ে একটু চ্যাঁচামেচি করতেই শ্যামাও গলার জোর বাড়াল, ‘আমি কি চুরি করেছি নাকি? আপনার সামনেই তো বার করেছি। এখানে কাজ করছি আর গ্রাম থেকেও এখনও কেউ চাল, ডাল দিতে আসেনি। এই অবস্থায় আপনার থেকে নেব না তো আর কোথায় যাব?’

মিত্রা রাগের মাথায় আর কিছু না বলে চুপ করে গেল।

কিন্তু ধীরে ধীরে শ্যামার চাহিদা বাড়তে আরম্ভ করল। কখনও বিছানায় পাতার জন্য চাদর চেয়ে বসে আবার কখনও কোথাও যাওয়ার দরকার হলে মিত্রার থেকে শাড়ি চেয়ে বসে। শুধু চাওয়া নয়, প্রতিটা কথায় মিত্রার আচার আচরণ নিয়ে টিটকিরি দেওয়া শুরু করে দিল। কখনও মিত্রা সিঁদুর পরে না বলে কথা শোনাত তো কখনও বাড়িতে পুজোপাঠ করে না বলে তাচ্ছিল্য করা শুরু করে দিল। অথচ কাজের কথা মিত্রা কিছু বললে, না-শোনার ভান করত। টাকাপয়সাও মাঝেমধ্যেই চাওয়া শুরু করল। মিত্রা দিতে না চাইলে মেজাজ দেখিয়ে ফ্ল্যাট ছেড়ে চলে যেত শ্যামা। মিত্রার কাছে সব শুনে শংকর ওকে ছাড়িয়ে দেওয়ার কথা বললেও মিত্রা কিছুতেই মনস্থির করতে পারছিল না শ্যামাকে নিয়ে ও কী করবে।

একদিন ফোনে যখন ব্যস্ত মিত্রা, ডোরবেল বেজে ওঠে। শ্যামাকে ডেকে দরজাটা খুলে কে এসেছে দেখতে বলে মিত্রা। ঝনঝন করে রান্নাঘর থেকে বাসন পড়ার শব্দ পায়। মিত্রা বুঝতে পারে দরজা খুলতে বলায় শ্যামা রেগে বেসিনে বাসন ছুঁড়ে দিয়ে দরজা খুলতে গেছে। বিরক্ত বোধ করে মিত্রা। সঙ্গে সঙ্গেই একটা প্যাকেট হাতে করে নিয়ে উপস্থিত হয় শ্যামা। ‘নিন, ধরুন, দরজাটা আপনিও তো খুলে দিতে পারতেন… এই ভাবে কাজই তো শেষ করতে পারব না… সারাদিনটা কি এখানেই কাটাব আমি?’

রাগ সামলে প্যাকেট খোলায় মন দেয় মিত্রা। অনলাইনে বুক করা নতুন জুতোটা পাঠিয়েছে। প্যাকেট খুলতেই নতুন জুতো দেখে শ্যামা চুপ থাকতে পারে না, ‘বাবাঃ, শু-র‍্যাক-টা তো আগে থেকেই উপচে পড়ছে, আবার একটা জুতো কিনলেন? একেবারে বাজে খরচা। এর জন্য আপনাদের কাছে টাকা রয়েছে আর আমরা গরিব মানুষরা একটা জিনিস নিলেই আপনাদের মাথা খারাপ হয়ে যায়।’

শ্যামার স্পর্ধা দেখে মিত্রা অবাক হয়ে গেল। কয়েক মাসের মধ্যে শ্যামার চরিত্রের এই পরিবর্তন মিত্রার মাথায় আগুন ধরিয়ে দিল। মুহূর্তের মধ্যে মিত্রা, শ্যামাকে কাজ থেকে বরখাস্ত করে দিল আর চার ঘণ্টা সময় দিল কোয়ার্টার ছেড়ে দেবার জন্য।

শ্যামাও রাগ দেখাতে ছাড়ল না, ‘দরকার নেই আমার এরকম কাজের। আমি মেয়ে জামাইয়ের কাছে আরামে থাকব… লোক রেখে দেখুনই না… বুঝতে পারবেন’, বলে দুড়দাড় করে কোয়ার্টারে ঢুকে গেল। খানিক্ষণ পরেই মেয়ে, জামাই এসে শ্যামাকে নিয়ে গেল। যাওয়ার সময় মিত্রা, কোয়ার্টারের চাবিটা ওদের কাছ থেকে চেয়ে নিল।

রাগের মাথায় শ্যামাকে ছাড়িয়ে দিয়ে আর এতগুলো কথা বলে বড়ো ক্লান্ত অনুভব করছিল মিত্রা। বাড়ির পড়ে থাকা সমস্ত কাজ সেরে মিত্রা একটু গড়িয়ে নিতে বিছানায় এসে বসে। ক্লান্ত শরীরে কখন যে চোখ বুজে এসেছিল ও নিজেও বুঝতে পারেনি। দরজায় ধাক্বা শুনে ঘুমটা ভাঙে ওর। বাইরেটা বেশ অন্ধকার হয়ে এসেছে। শংকরের ফেরার সময় তো এখনও হয়নি। তবে কে এল এই অসময়ে? উঠতে ইচ্ছে করছিল না, জোর করে উঠল।

দরজা খুলে দেখল তেইশ-চব্বিশ বছরের একজন যুবতি মেয়ে। দেখে মনে হচ্ছিল নতুন বিয়ে হয়েছে বেশ হাসি মুখ। পাশেই দাঁড়িয়ে একটি যুবক। মিত্রার মনে হল মেয়েটির স্বামী নিশ্চয়ই।

‘দিদি, আমার নাম সীমা, এ হল রানা… আমার… আমি কাজের জন্য এসেছি।’

ছেলেটি হাতজোড় করে মিত্রাকে নমস্কার জানাল। দুজনের মুখের উপর একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে মিত্রা জিজ্ঞেস করল, ‘তুমি কী করে জানলে আমি কাজের জন্য লোক খুঁজছি? আমার লোক তো আজ সকালেই ছেড়ে গেছে। আমি তো এখনও কাউকে কিছু জানাইনি পর্যন্ত’, কথা শেষ করে মিত্রা দুজনকে ভিতরে এসে কথা বলার জন্য ইশারা করল। দুজনে ভিতরে এসে দরজার গা ঘেঁষে দাঁড়াল।

‘দিদি, আপনার কাছে আমার পিসি এতদিন কাজ করছিল। আজকে রেগে গিয়ে আপনাকে কী বলেছে জানি না কিন্তু বাড়ি গিয়ে নিজেকেই দোষারোপ করছিল। পিসি খুব ভালো করেই জানে ওকে আপনি আর কাজে নেবেন না তাই আমাকে এখানে কাজের কথা বলল’ সীমা মিত্রার উত্তরের অপেক্ষা করতে লাগল।

‘ও… তাই বলো! তোমাকে তাহলে শ্যামা আমার কাছে পাঠিয়েছে? তুমি পারবে সব কাজকর্ম ঠিক করে করতে?’ মেয়েটির ব্যবহার মিত্রার ঠিকই মনে হল অগত্যা মেয়েটিকে কাজে বহাল করার কথা ঠিক করে নিল মিত্রা।

‘দিদি, আমি এই হাউজিং-এ আমার ভাসুর-জায়ের সঙ্গে সার্ভেন্টস কোয়ার্টারে থাকি, বাইরের একটা কাজও করি… কিন্তু দিদি থাকার খুব অসুবিধে হচ্ছে। আমার জায়ের দুটো বাচ্চা সঙ্গে আবার আমরা দুজন। একটা ঘরে গাদাগাদি করে কোনওমতে থাকা। এখানে আপনার কাছে কাজ করলে থাকার অসুবিধে থাকবে না। এবার যদি আপনি আমাকে রাখেন।’

সীমাকে রাখার সিদ্ধান্ত আগেই মনে মনে নিয়ে নিয়েছিল মিত্রা। সুতরাং মুখে বলল ‘ঠিক আছে, তোমরা তাহলে চলে এসো। যখন আসবে চাবিটা আমার কাছ থেকে চেয়ে নিও।’

রাত্তিরেই একটা খাট আর কিছু জামাকাপড় নিয়ে সীমা, রানার সঙ্গে মিত্রার সার্ভেন্টস কোয়ার্টারে চলে এল।

পরের দিন সকালেই রানা নিজের কাজে চলে গেলে সীমা মিত্রাদের ফ্ল্যাটে চলে এল। মিত্রার কাছ থেকে সব কাজ বুঝে নিয়ে মিত্রাকে জোর করে বসিয়ে দিল, ‘দিদি, আপনি বসে থাকুন, আমি সব কাজ করে দেব। যদি মনে হয় কাজটা ঠিকমতো হয়নি তাহলে আমাকে ডেকে শুধু বলে দেবেন।’

রবিবার সাধারণত সীমা, অর্ধেক দিনের ছুটি চেয়ে নিত মিত্রার কাছে। দুপুরে কাজ সেরে বরের সঙ্গে কোথাও না কোথাও বেড়াতে যেত ও। কখনও সিনেমা দেখতে, কখনও এমনি ঘুরতে অথবা আত্মীয়স্বজনদের বাড়িও যেত ওরা। কখনও কখনও বেরোত যখন, মিত্রার চোখেও পড়ত। সীমার সাজগোজ দেখে মিত্রার একটু অবাকই লাগত কারণ ইমিটেশন গয়না থেকে মেক-আপ, পোশাক-আশাক কিছুতেই কোনও খামতি ওর চোখে পড়ত না। এত সব করার টাকা কোথা থেকে আসে বুঝতে পারত না মিত্রা।

মিত্রা যখনই এ বিষয়ে সীমার সঙ্গে কথা বলত, একই উত্তর শুনত, ‘দিদি, আমাদের নতুন বিয়ে হয়েছে… ও সেজেগুজে থাকা খুব পছন্দ করে। সাজগোজের বেশিরভাগ জিনিসই তো ওই কিনে আনে।’

বেশি মাথা ঘামায়নি মিত্রা এই নিয়ে। এটা ওদের ব্যক্তিগত জীবন, যতক্ষণ বাড়ির কাজ ঠিকমতো হয়ে যাচ্ছে এইসব ব্যাপারে মাথা ঘামাবার কোনও কারণ নেই মিত্রার। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব চাকরি খুঁজে জয়েন করাটাই মিত্রার লক্ষ্য। এই নিয়েই আপাতত ও ব্যস্ত থাকতে চায়।

ল্যাপটপ-টা খুলে মেলগুলো চেক করতে বসে মিত্রা। হতাশ হয়, কোনও মেল ঢোকেনি দেখে। কী করবে ভেবে না পেয়ে অনলাইন শপিং সাইটগুলো একটার পর একটা দেখতে শুরু করে। অবসাদ কাটাবার একমাত্র উপায় শপিং, সুতরাং তাতেই মনোযোগ দেওয়ার চেষ্টা করে সে। হঠাৎ চোখ আটকায় একটা কুর্তা দেখে। কিনলে বেশ খানিকটা রিবেট পাওয়া যাবে দেখে প্লাস্টিক কার্ডটা নেওয়ার জন্য উঠে দাঁড়ায়। মনে করার চেষ্টা করে পার্সটা কোথায় রেখেছে। খেয়াল হয় কাল থেকে ড্রয়িংরুমের টিভির পাশেই পড়ে রয়েছে পার্সটা। তাড়াতাড়ি ড্রয়িংরুমের দিকে পা বাড়ায়। কিন্তু ঘরে ঢুকেই যে দৃশ্য চোখে পড়ে, তা দেখে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে মিত্রা। সীমা সোফায় গা এলিয়ে বসে মিত্রার পার্সটা নিয়েই ঘাঁটাঘাঁটি করছে। সীমার পিঠ মিত্রার দিকে থাকায় ও মিত্রাকে দেখতে পায়নি। মিত্রা সোফা অবধি পৌঁছোতে পৌঁছোতে সীমা পার্স থেকে টাকা বার করে ব্লাউজের ভিতর ঢুকিয়ে নেয়। মিত্রাও বিন্দুমাত্র শব্দ না করে পিছন থেকে সীমার হাতটা ধরে ফেলে। চুরি করতে গিয়ে হাতেনাতে ধরা পড়াতে সীমা ঘাবড়ে যায়।

‘দিদি, তুমি!’ মিত্রার মুখ-চোখ দেখে সীমা তোতলাতে থাকে, ‘আমা…কে ক্ষমা করে দাও। আমি কখনও চুরি করি না… আজ শরীরটা ঠিক নেই তাই ডাক্তার দেখাতে যাব… টাকার দরকার ছিল, তাই এই টাকাটা… আর কখনও হবে না দিদি’। ব্লাউজের ভিতর থেকে পাঁচশোর নোটটা বার করতে করতে সীমা বলে।

‘তোমার শরীর খারাপ? কিন্তু সকাল থেকে তো দেখে কিছু মনে হয়নি, বরং আনন্দেই আছ বলে মনে হচ্ছিল। এখন বুঝতে পারছি বাথরুম থেকে শ্যাম্পু, কন্ডিশনার কীভাবে এত তাড়াতাড়ি শেষ হচ্ছে? কয়েকটা লিপস্টিকও আমি খুঁজে পাচ্ছি না। তারপর তো আরও আছে, মাঝেমধ্যেই কাজ করতে করতে কোয়ার্টারে চলে যাও… এখন বুঝতে পারছি যাওয়ার কারণ। আমি আর কিছু জানতে চাই না। তোমাকে আর কাজ করতে হবে না। যত তাড়াতাড়ি পারো কোয়ার্টার খালি করে দাও’, রাগে আর কথা বলতে পারে না মিত্রা। ইচ্ছে হয় এখুনি পুলিশ ডেকে সীমাকে ওদের হাতে তুলে দিতে।

সন্ধেবেলায় শংকর বাড়ি ফেরার পরেই সীমা এসে কোয়ার্টারের চাবি মিত্রাকে ধরিয়ে গেল। চুপচাপ স্বামী-স্ত্রী জিনিসপত্র নিয়ে বেরিয়ে যায়।

আবার সেই কাজের লোকের সমস্যা। মিত্রা মুষড়ে পড়ল তবুও প্রতিজ্ঞা করল এবার আর কোনওরকম তাড়াহুড়ো করবে না। দেখেশুনে তবেই বাড়িতে কাজের লোক ঢোকাবে। সিকিউরিটি গার্ডকেও ফোন করে একটু চেনাশোনা লোকের খোঁজ করতে অনুরোধ করল।

রবিবার শংকরের অফিস ছুটি, ফলে উঠতে একটু দেরিই হয়েছে। মুখ ধুয়ে চা বানিয়ে মিত্রা শোবার ঘরে ঢোকে। শংকর তখনও বিছানা ছাড়েনি। বেডসাইড টেবিলে চায়ের ট্রে টা নামিয়ে বিছানায় গুছিয়ে বসে মিত্রা। কাপটা এগিয়ে দেয় শংকরের দিকে। এই একটা দিনই শংকরের সঙ্গে বেশ কিছুটা সময় কাটাতে পারে মিত্রা। নয়তো রোজই তো সকালে উঠেই অফিস যাওয়ার তাড়া। আর প্রাইভেট চাকরিতে ফেরার কোনও ঠিক নেই।

সবে গল্প করতে করতে চায়ের কাপটা শেষ করেছে, এমন সময় কলিং বেলটা কারও আসার বার্তা জানায়। এই সময় কে রে বাবা! অজান্তেই ঘড়ির দিকে চোখটা চলে যায় মিত্রার। সবে আটটা বাজছে।

বিরক্ত হয়েই বিছানা ছেড়ে দরজার দিকে পা বাড়ায় ও। হয়তো সিকিউরিটি গার্ড কাউকে পাঠিয়েছে সকাল সকাল, ভেবে খানিকটা স্বস্তি অনুভব করে মিত্রা।

দরজা খুলতেই দ্যাখে সামনে দাঁড়িয়ে পঁয়ষট্টি-সত্তর বছর বয়সি বৃদ্ধ দম্পতি। সঙ্গে রয়েছে ছোটোখাটো চেহারার কুড়ি-একুশ বছরের একটি যুবতি।

মিত্রাকে দেখতেই বৃদ্ধটি হাতজোড় করে বলে, ‘ম্যাডাম, আমি রিটায়ার্ড সরকারি চাপরাশি। বহুদিন ধরে কৈলাশ কলোনিতে একটি ফ্যামিলির সঙ্গে রয়েছি। আমার বউ আগে ওখানে কাজ করত এখন বয়স হয়ে যাওয়াতে আমার এই নাতনি ওদের সব কাজ করে।’

‘আচ্ছা এটি আপনার নাতনি?’ মিত্রা প্রশ্ন করে।

‘হ্যাঁ ম্যাডাম। আমরা ওই সাহেবের বাড়ির সার্ভেন্টস কোয়ার্টারে এতদিন ধরে রয়েছি। এই মাসে ওই সাহেব দিল্লির বাইরে বদলি হয়ে যাচ্ছেন। সুতরাং আমাদেরও কোয়ার্টার ছাড়তে হবে। শহরে বাড়িভাড়া নিয়ে থাকার ক্ষমতা নেই আমাদের। আমার পেনশনে সংসারটা চলে কোনওরকমে। তাই এখানে কোয়ার্টার পাওয়া যাবে শুনেই আমি এসেছি।’

‘আপনাদের ছেলে, ছেলের বউ কোথায় থাকে? নাতনি তো দেখছি আপনাদের সঙ্গেই থাকে।’

‘ম্যাডাম, আমাদের ভাগ্যের কথা আর বলবেন না। মেয়েটির জন্মের সময়ই ওর মা মারা যায়। কয়েক বছর বাদেই মাত্র কয়েকদিনের জ্বরে আমার ছেলে…’ বলতে বলতে বৃদ্ধের গলা

ধরে আসে।

‘আপনাদের নাম কী’, মিত্রা জানতে চায়।

‘আমার নাম রতন আর আমার স্ত্রী সারদা। নাতনির নাম ওর বাবাই রেখেছিল রেশমি।’

‘একটু দাঁড়ান, আমি আসছি’, বলে মিত্রা শোবার ঘরে এসে ঢোকে। শংকর ততক্ষণে বিছানা ছেড়ে উঠে পড়েছে। শংকরকে রতনের সম্পর্কে সব বলে মিত্রা। দুজনেরই মনে হয় ওদের সার্ভেন্ট কোয়ার্টারে রাখলে কোনওরকম অসুবিধায় পড়তে হবে না। বৃদ্ধের কথায় মিত্রা বুঝে গিয়েছিল রেশমিই ওর কাছে কাজ করবে। সুতরাং বাইরে এসে মিত্রা ওদের জানিয়ে দেয়, ওদের কাজে বহাল করতে ও রাজি।

সন্ধের আগেই রতন, স্ত্রী এবং নাতনিকে নিয়ে মিত্রার কাছে হাজির হল। মিত্রা কোয়ার্টারের দরজা খুলে দিয়ে ওদের সবকিছু বুঝিয়ে দিল। মিত্রার মনেও সামান্য আশার সঞ্চার হল, ওর মনে হল এবারটা শ্চিয়ই ওর কাজের লোকের ভাগ্য সুপ্রসন্ন হবে।

পরের দিন দরজা খুলতেই সকালে, মিত্রা দেখে রতন আর সারদা দরজায় দাঁড়িয়ে। কী ব্যাপার জিজ্ঞেস করতেই রতন জানায়, ‘ম্যাডাম, রেশমির জ্বর এসেছে। ওর বদলে আমরা দুজন মিলে কয়েকদিন আপনার কাজ করে দেব।’

বয়স্ক মানুষকে দিয়ে কাজ করাতে মিত্রার খুবই খারাপ লাগছিল কিন্তু ওর কাছে কোনও উপায়ও ছিল না। ওদের কাজটাও ঠিক পছন্দ হচ্ছিল না মিত্রার।

দু সপ্তাহ কেটে যাওয়ার পরেও যখন রেশমি কাজ করতে এল না, মিত্রার সন্দেহ হতে লাগল, ওরা মিথ্যা কথা বলে কোয়ার্টার পাওয়ার লোভে এখানে ঢোকেনি তো? মেয়েটা হয়তো অন্য কোনও বাড়ির কাজ ধরেছে।

এইভাবে তো চলতে পারে না, এই ভেবে মিত্রা ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে কোয়ার্টারের দরজায় কড়া নাড়ল। রতন আর সারদা তখন মিত্রার ফ্ল্যাটে কাজ করছিল। দরজার কড়া নাড়তেই রেশমি এসে দরজা খুলে দিল। মিত্রার ওকে দেখে এতটুকুও অসুস্থ বলে মনে হল না।

‘তুমি তো দেখছি দিব্যি সুস্থ আছ, তাহলে কাজে আসছ না কেন?’ মিত্রা জানতে চাইল।

‘না… মানে… আমার…. আমি একটু….’ রেশমি তোতলাতে থাকে।

মিত্রা কথা না বাড়িয়ে নিজের ফ্ল্যাটে এসে দরজা বন্ধ করতে যাবে, চোখে পড়ল তিরিশ-পঁয়ত্রিশ বছরের একটি লোক রতনদের কোয়ার্টার থেকে বেরিয়ে লিফটের দিকে যাচ্ছে। আশ্চর্য হয়ে গেল মিত্রা। ওদের কাছে কোনও আত্মীয়স্বজনের কথা মিত্রা তো কিছু শোনেনি। তাহলে পুরুষটি কে হতে পারে? চোরের মতন লুকিয়ে পড়ারই বা কী দরকার বুঝে পেল না মিত্রা। কিন্তু মিত্রা মনে মনে স্থির করে নিল, এই রহস্যের অনুসন্ধান ওকে করতেই হবে।

লক্ষ্য রাখা শুরু করল মিত্রা। রতন আর সারদা কাজ করতে সকালেই এসে যেত। ওরা কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লেই মিত্রা খেয়াল করত, প্রত্যেকদিনই আলাদা আলাদা পুরুষমানুষ কোয়ার্টারে আসছে। মিত্রা, কয়েকদিন পর পর নতুন নতুন পুরুষকে কোয়ার্টারে আসতে দেখে ভয় পেয়ে গেল, ওখানে এরা দেহব্যাবসা ফেঁদে বসেনি তো? শংকরকে জানানোটা সবথেকে আগে দরকার।

একদিন বাড়ি ফিরে আসার পর মিত্রা শংকরকে সবকিছু খুলে বলল। শংকর সব শুনে প্রচণ্ড রেগে গেল, ‘প্রথম দিনই তোমার আমাকে সব খুলে বলা উচিত ছিল। এতগুলো দিন হয়ে গেল। কিন্তু দোষ চাপালেই তো হবে না! হাতেনাতে ওদের ধরতে হবে। তুমি একটু চোখ কান খোলা রেখো। হতে পারে এটা একটা র‍্যাকেট।’

পরের দিন অফিস থেকে ছুটি নিয়ে শংকর বাড়িতেই থেকে গেল। রোজের মতোই রতন আর সারদা এসে কাজে লেগে পড়ল। মিত্রা আগেই নিজেকে তৈরি রেখেছিল, ওদের কাজের মাঝেই মিত্রা জিজ্ঞেস করল, ‘কী ব্যাপার রতনদা? আপনার নাতনির অসুখ এতদিনেও ঠিক হল না? আপনারা আমাকে গাধা ভেবেছেন? আজ আমি সত্যিটা না জেনে ছাড়ছি না।’

কথার মাঝেই শংকরও এসে দাঁড়াল মিত্রার পাশে, ‘হ্যাঁ, রতনদা আজকে উত্তর তো তোমাকে দিতেই হবে। আর একবার আমার সঙ্গে তোমাদের কোয়ার্টারে চলো। আমি একটা ছোটো আলমারি ওখানে রাখব। জায়গাটা তাই আমি আগে একটু দেখে নিতে চাই।’

‘কিন্তু সাহেব… এখুনি…’, রতনের কিন্তু কিন্তু ভাব দেখে শংকর ধমক দিয়ে উঠল জোরে।

শান্ত স্বভাবের শংকরের অগ্নিমূর্তি দেখে রতন ভয় পেয়ে গেল। সারদা ভয়ে রতনের হাত জড়িয়ে ধরল, ‘তুমি এনাদের সব কথা বলে দাও… এভাবে আমি আর সহ্য করতে পারছি না।’

ততক্ষণে রতন নিজেকে কিছুটা সামলে নিয়েছে। ও বলতে শুরু করে, ‘সাহেব, আমরা মিথ্যা বলেছিলাম, রেশমির বিয়ে হয়ে গেছে। আমাদের জামাই খুব বাজে লোক। সবসময় মদ খেয়ে থাকে। যখন বিয়ে হয় জামাইয়ের একটা ছোটো চায়ের দোকান ছিল। বিয়ের পর আমাদের মেয়ের যে-কটা গয়না ছিল সব বিক্রি করে দিল। যখন দোকানটাও বিক্রি করে দিল তখন রেশমিকে দিয়ে খারাপ খারাপ কাজ করাত। আমরা মেয়েটাকে নিজেদের বাড়ি নিয়ে আসি কিন্তু সেখানেও সে আমাদের পিছু ছাড়ল না। ওখানেও লোক পাঠাত জামাই। আপনাদের এখানে কোয়ার্টার পেতেই একরকম লুকিয়েই এখানে পালিয়ে আসি… কিন্তু এখানকার ঠিকানাও ও কী করে জোগাড় করল জানি না, এখানেও লোক পাঠানো…’, চোখের জল আর ধরে রাখতে পারে না রতন।

‘পুলিশে জানাওনি কেন’, শংকর প্রশ্ন করে।

‘ও শাসিয়ে গিয়েছিল, পুলিশে জানালে আমাদের মেয়েটাকে মেরে দেবে’, ভীত রতন স্বীকার করে।

‘ভাবা যায়, মাত্র একটা লোক এতগুলো মানুষকে ভয় দেখিয়ে খারাপ কাজ করাতে বাধ্য করছে?’ শংকরের উক্তিটা মিত্রার উদ্দেশ্যে হলেও অনেকটা স্বগতোক্তির মতোই শোনাল।

‘সাহেব, রেশমি ছাড়া আমাদের আর কেউ নেই। আমরা ওকে প্রচণ্ড ভালোবাসি। ওই জানোয়ারটা আমাদের জীবন নরক করে তুলেছে’, করুণ শোনায় রতনের স্বর।

মুহূর্ত দেরি না করে সারদা আর রতনকে সঙ্গে নিয়ে শংকর পুলিশের কাছে রিপোর্ট লিখিয়ে আসে। পরের দিনই রেশমির স্বামীর পুলিশের হাতে ধরা পড়ার খবর আসে। খবরটা শুনেই রতনের পরিবারের মুখে হাসি ফোটে। শংকর আর মিত্রা দুজনেই অনুভব করে, লজ্জা গ্লানির জীবন পিছনে ফেলে আজ এই গরিব পরিবারটি রৌদ্রজ্জ্বল ভবিষ্যতের স্বপ্ন নিয়ে বাঁচার প্রতীক্ষায় উন্মুখ হয়ে রয়েছে।

 

জীবন বাঁচাবে সিপিআর

বোহেমিয়ান জীবনযাপনকেই হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার প্রধান কারণ হিসাবে চিহ্নিত করছেন চিকিৎসকরা। এছাড়া, সতর্কতা স্লবং চিকিৎসা পদ্ধতি সম্পর্কে অজ্ঞানতার কারণেও রোগীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন এমনই ফল প্রকাশিত হয়েছে সমীক্ষায়। ধূমপান, মদ্যপান, হরমোন থেরাপির কুফল ছাড়াও, হৃদযন্ত্র  বিকল হতে পারে বেশিদিন জন্মনিরোধক ওষুধ সেবন করলেও। হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়া এবং আরও নানারকম সতর্কতামূলক বিষয়ে সম্প্রতি গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিলেন ডা. সৌম্য পাত্র।

হঠাৎ বুকে ব্যথা অনুভব করলে কী করা উচিত?

অনেকেই এ বিষয়ে সচেতন থাকেন না যে, বুকে ব্যথা হৃদরোগের একটি পূর্বাভাষ। বুকে ব্যথা হওয়াটা হৃদরোগের একটি সাধারণ লক্ষণ হওয়া সত্ত্বেও, অনেক সময়ই বুকে ব্যথার সঙ্গে হৃদরোগের সম্পর্কের কথা ভাবেন না অনেকেই। এক্ষেত্রে অন্যান্য লক্ষণ-এর দিকে নজর দিতে হয়। এছাড়া, হঠাৎ বুকে ব্যথা হলে, পাশে থাকা কাউকে জানানো জরুরি।

মহিলাদের ক্ষেত্রে হৃদরোগের লক্ষণ কী?

মহিলাদের ক্ষেত্রে হৃদরোগের সাধারণ ছয়টি লক্ষণ হল–

  • বুকে ব্যথা এবং অস্বস্তি বোধ হওয়া। বুকে ব্যথা হওয়াটা হৃদরোগের একটি সাধারণ লক্ষণ। তা হলেও কিছু কিছু মহিলাদের ক্ষেত্রে এই বিষয়ে পুরুষদের থেকে পৃথক অভিজ্ঞতা হয়ে থাকে।
  • হাতে, পিঠে, ঘাড়ে অথবা চোয়ালে ব্যথা অনুভব হয়। পাকস্থলিতে ব্যথা হয়।
  • শ্বাসকষ্ট দেখা দিতে পারে। নাক দিয়ে রক্ত বের হয়, মাথা ঘোরার লক্ষণ দেখা দেয়।
  • ঘাম বের হতে থাকে।
  • শরীরে ক্লান্তি বা অবসাদ আসে।

আপনার স্বাভাবিক দৈনন্দিন কাজ করতে করতে যদি হঠাৎ করে ক্লান্তি বোধ করেন, তখন আপনাকে এই বিষয়ে অবহেলা না করে নজর দিতে হবে।

ক্লান্তি ভাব এবং সেই সঙ্গে বুকে প্রবল ব্যথা অনুভব করলে অবশ্যই সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নিন।

সাধারণ ও হালকা কাজ, যেমন বিছানা করা, বাথরুমের দিকে যাওয়া অথবা দোকান-বাজারে যাওয়া, ইত্যাদি কাজেও যদি আপনার অস্বাভাবিক বেশি ক্লান্তি অনুভব হয়, তখন সেদিকে নজর দেওয়াটা জরুরি।

যদি ঘুমে বিঘ্ন ঘটে বা ঠিকমতো ঘুম না হয়, তখন সেটাও লক্ষ্য রাখতে হবে।

ঘাম হওয়া অথবা স্বাভাবিক শ্বাসকার্যের যদি বিঘ্ন ঘটে, তাহলে সতর্ক থাকতে হবে।

মহিলাদের ক্ষেত্রে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কম ব্যায়াম ও পরিশ্রমের কারণে এবং দেহের ওজন বেড়ে যাবার কারণে শ্বাসকার্যের বিঘ্ন ঘটতে পারে। অনেক মহিলাদের ক্ষেত্রে মেনোপজ-এর সময় সাধারণ লক্ষণ হল– শরীর গরম হয়ে যাওয়া এবং জ্বালা-জ্বালা ভাব।

কী কী কারণে হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে?

বেশি রাত জাগা, মানসিক চাপ, ডায়াবেটিস, ফাস্ট ফুড, ধূমপান, মদ্যপান, হরমোন থেরাপি ছাড়াও, বেশিদিন জন্ম-নিরোধক সেবন করলেও হূদরোগ হতে পারে। ওবেসিটিও হৃদযন্ত্র বিকল করতে পারে। রক্তে ব্যাড কোলেস্ট্রলের মাত্রা বেড়ে গেলেও হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে। এছাড়া করোনারি হার্ট ডিজিজ থাকলেও হৃদরোগ জটিল রূপ নেয়।

কোন বিষয়গুলির দিকে নজর দিতে হবে?

চিকিৎসককে যে-সমস্ত বিষয়গুলি খুলে বলতে হবে–

  •  দিন দিন দেহের ওজন লক্ষ্যণীয়ভাবে বেড়ে গেলে
  • পায়ের তলা, গোড়ালি অথবা দেহের অন্য অংশ ঘেমে যেতে থাকলে
  • স্বাভাবিক ভাবে শ্বাসকার্য করার পক্ষে কষ্টকর হতে থাকলে
  • দৈনন্দিন কাজকর্মের সময় অস্বাভাবিক ক্লান্তি অনুভব করলে
  • ঘনঘন জ্বর হতে থাকলে

প্রায় সময় বুকে ব্যথা অনুভব করলে

হৃদযন্ত্রটি ঠিকমতো কাজ করছে কিনা তা সাধারণ ভাবে বুঝবার উপায় কী?

  •  কফের রং লালাভ হয়ে গেলে। কফের সঙ্গে রক্ত মেশা মিউকাস বের হলে
  • মনের মধ্যে বিভ্রান্তি দেখা দিচ্ছে, ঠিকমতো চিন্তা-ভাবনা করতে পারছেন না। মাথা ঘোরা ভাব অথবা হালকা মাথাব্যথা অনুভব হলে
  •  খাবার অভ্যাসের বদল ঘটছে অথবা খাবার খেতে অনিচ্ছা দেখা দিলে

এই অবস্থায় কী করা উচিত?

  •  দেরি না করে চিকিৎসকের কাছে গিয়ে এই বিষয়ে তার পরামর্শ গ্রহণ করুন
  • খাবারের লেবেলগুলি ভালোভাবে দেখুন এবং উচ্চ মাত্রায় সোডিয়াম (লবণ) রয়েছে, সেই ধরনের খাবার এড়িয়ে চলুন
  • নিজের স্বাস্থ্যের প্রতি যত্নশীল হোন এবং সেই বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিন।

যদি কারওর শ্বাসকার্য বন্ধ হয়ে যায়, তখন কী করতে হবে?

সিপিআর তখন জীবনকে রক্ষা করতে পারে। কার্ডিও পালমোনারি রিসাসিটেশন (সিপিআর) হল প্রকৃত অর্থেই একটি জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা পদ্ধতি, যার সাহায্যে হৃদরোগে আক্রান্ত কোনও মানুষের জীবনকে রক্ষা করা যায়। যখন মানুষের হৃদযন্ত্রটি কাজ করতে পারে না, তখন এই পদ্ধতির সাহায্যে রক্তকে পাম্প করে সারা দেহে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। এক্ষেত্রে রোগীর মুখে মুখ দিয়ে অক্সিজেন সরবরাহ করতে হবে এবং দু’হাত দিয়ে বুকে পাম্প করতে হবে।

সিপিআর ব্যবস্থা চালু করার পর শরীরের মধ্যে কী ধরনের উন্নতির লক্ষণ দেখা দিতে পারে?

  •  কাশি হওয়া
  • চোখ খুলে তাকানো
  • কথা বলতে পারা এবং উদ্দেশ্যপূর্ণভাবে অঙ্গ সঞ্চালন করা
  • স্বাভাবিক ভাবে শ্বাসকার্য করতে পারা
  • আর যখন অসুস্থ ব্যক্তি তার চেতনা ফিরে পাবে এবং ধীরে ধীরে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে শুরু করবে, তখন সিপিআর বন্ধ করে দিতে হবে। যদি দেখা যায় যে, রোগী স্বাভাবিকভাবে শ্বাসকার্য করছে কিন্তু অচেতন রয়ে গিয়েছে, তখন তার জ্ঞান ফিরে না পাওয়া পর্যন্ত তার দিকে নজর রাখুন। দেখা গিয়েছে যে ভারতীয়দের মধ্যে ৯৮ শতাংশই সিপিআর সম্পর্কে কিছু জানেন না।

সিপিআর কেবলমাত্র জলে ডুবে যাওয়া মানুষকে বাঁচিয়ে তোলার পক্ষে কার্যকরই নয়, এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক চিকিৎসা। এর সাহায্যে অজ্ঞান হয়ে যাওয়া কিংবা হৃদরোগে  আক্রান্ত মানুষকে বাঁচিয়ে তোলা যায়। যারা সিপিআর-এর সাহায্য পেয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে জীবন রক্ষা দুই বা তিনগুণ বেড়ে গিয়েছে। ভারতে প্রকৃত তথ্যের অভাবে এই বিষয়গুলি পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়ে। তাহলেও ভারতকেই কিন্তু বলা হয় হূদরোগ, ডায়াবেটিস এবং ওবেসিটি-র দেশ। আসল বিষয় হল– হৃদরোগ হবার মতো কারণগুলি আমাদের দেশেই বেশি মাত্রায় প্রকাশ পায়। সেই কারণে হৃদরোগে মৃত্যুর হার আমাদের দেশেই সবচেয়ে বেশি।।

মহিলাদের সিপিআর গ্রহণ করার ক্ষেত্রে বিভিন্ন বিষয়গুলি কী কী?

সমীক্ষা করে দেখা গিয়েছে যে, মহিলারা পুরুষদের তুলনায় সিপিআর-কে কম পছন্দ করেন। সমাজে লিঙ্গ বিচারের বিষয়টিই এখানে প্রধান কারণ হিসেবে দেখা দেয়। মহিলাদের ক্ষেত্রে এ বিষয়ে নানাবিধ ভয় বেশি করে কাজ করে। এর মধ্যে রয়েছে ভুল বোঝার ভয়। তাছাড়া সিপিআর-এর সময় মহিলাদের বুকে বেশি করে চাপ দেবার বিষয়টি অনেকে পছন্দ করে না। সেই কারণে তারা সিপিআর নিতে দ্বিধা করে। তাছাড়া আমাদের সমাজ পশ্চিমি সমাজ ব্যবস্থার চেয়ে অনেক আলাদা। তাই বেশি করে শারীরিক ঘনিষ্ঠতাকে আমাদের সমাজ মেনে নিতে পারে না। তাই প্রত্যেককে সিপিআর সম্পর্কে ট্রেনিং দেওয়াটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই বিষয়টি সেই সমস্ত মানুষের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যারা সাধারণ মানুষের মধ্যে কাজ করে। যেমন– ট্রাফিক পুলিশ কিংবা জরুরি পরিষেবায় কর্মরত মানুষ। তথ্য পরিসংখ্যান বলছে, ভারতে হূদরোগীর সংখ্যা ক্রমশ বেড়েই চলেছে। এই অবস্থায় মনে করা যেতে পারে যে, সিপিআর চিকিৎসা পদ্ধতি শিখে নিয়ে এর হাত থেকে রোগীদের রক্ষা করার চেষ্টা করা উচিত প্রত্যেকের।

হৃদযন্ত্র বিকল হওয়ার হাত থেকে আমরা কীভাবে বাঁচতে পারি?

হৃদযন্ত্র বিকল হওয়ার চিকিৎসা পদ্ধতির সার্থক প্রয়োগ আমাদের জীবনকে দীর্ঘস্থায়ী করতে পারে। আমাদের জীবনযাপনের মানকেও বাড়াতে সাহায্য করে। হূদযন্ত্র বিকল হওয়ার চিকিৎসা ওষুধ প্রয়োগের সাহায্যে করা যেতে পারে। যেমন ক্লান্তি, শ্বাসকষ্ট, ঘেমে যাওয়া ইত্যাদি নিয়ন্ত্রণ করার জন্য যথাযথ ওষুধ প্রয়োগ করতে হবে। এর মাধ্যমে দেহে শক্তির মাত্রা বাড়ানো সম্ভব হয়। পাশাপাশি মানুষকেও শারীরিক ভাবে সক্ষম হয়ে ওঠার চেষ্টা করে যেতে হবে। সৗভাগ্যক্রমে হূদযন্ত্র বিকল হওয়ার চিকিৎসা পদ্ধতি আমাদের সামনে রয়েছে। ভালো ভাবে চিকিৎসা এবং পরিচর্যা পেলে এবং চিকিৎসকের পরামর্শ ঠিক মতো মেনে চললে, হূদরোগের বিষয়ে সচেতন হলে নিশ্চিন্তে জীবনযাপন করা সম্ভব।

চিকিৎসক আপনার শারীরিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে যে ওষুধ আপনাকে গ্রহণ করতে বলবেন, আপনি চিকিৎসকের সেই পরামর্শ মেনে চলবেন। তাঁর নির্দেশমতো খাবার গ্রহণ এবং নির্দিষ্ট কিছু ব্যায়াম করে যেতে হবে আপনাকে। তাহলেই হৃদরোগের হাত থেকে আপনি রক্ষা পেতে পারেন।

ল্যান্ডরোভারে সান্দাকফু

কিছু  কিছু মানুষের মতো কিছু কিছু জায়গাও প্রিয় হয়ে ওঠে কারও কারও কাছে। বার বার ছুটে যায় প্রিয় সান্নিধ্যে। কেবল স্বপ্ন কিংবা কল্পনায় নয়, বাস্তবেও। কয়েকটা দিন কাটিয়ে আসতে পারলে শরীর-মন দুটোই উজ্জীবিত হয়। বাঙালির ভ্রমণ মানচিত্রে এমনই তিনটে জায়গা দীঘা-পুরী-দার্জিলিং। রসিক বাঙালি এ জন্যেই বোধহয় নিজেদের নাম রেখেছে ‘দীপুদা’। তবে আমি ঠিক এই গোত্রে পড়ি না। আমার পছন্দের জায়গা দার্জিলিং-এর খুব কাছে, সাধারণ পর্যটকদের হিসাবের বাইরে, পশ্চিমবঙ্গের সর্বোচ্চ স্থান সান্দাকফু। সাধারণ মানুষের ভ্রমণ তালিকায় সান্দাকফু না আসার কারণ অবশ্যই যাতায়াতের দুর্গমতা। তবে সে সমস্যাও কেটে যেতে বসেছে। মানেভঞ্জন থেকে সান্দাকফু পর্যন্ত দ্রুত গতিতে চলছে রাস্তা তৈরির কাজ। কংক্রিটের ঢালাই রাস্তা। আগামী কয়েক বছরের মধ্যে যে মধ্যবিত্ত বাঙালির পর্যটন মানচিত্রে সান্দাকফু একটা বিশেষ জায়গা করে নেবে, সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই। অন্তত এবারের সান্দাকফু ভ্রমণ অভিঞ্জতা সে রকমই ইঙ্গিত দিচ্ছে। কাচ্চা-বাচ্চা নিয়ে সপরিবারে সান্দাকফু যেতে এর আগে কখনও দেখেছি বলে মনে পড়ছে না।

এই নিয়ে তৃতীয়বার সান্দাকফু-তে। প্রথম দুবার ট্রেকিং করে গেলেও, এবার হাতে সময় কম থাকায় ল্যান্ডরোভারে যাওয়া মনস্থির করেছিলাম। পরিকল্পনা মতো পাঁচ জনের ছোটো দলটা কলকাতা থেকে শিলিগুড়ি হয়ে আড়াই হাজার টাকার রিজার্ভ গাড়িতে দুপুরের মধ্যেই মানেভঞ্জন পৌঁছোলাম। পথে উপরি পাওনা ঘণ্টা খানিকের চা বিরতিতে মিরিক। মে মাসের শেষ সপ্তাহে মিরিক লেকের ধারে সবুজ ঘাসের গালিচা পাতা। লেকের জল স্বচ্ছ। মাত্র মাস খানেক আগেই এখানে ভরা বসন্ত অর্থাৎ ফুলের মরশুম ছিল। এখনও ছিটেফোঁটা যেটুকু আছে তাতেও চোখ জুড়িয়ে যায়। বুড়ি ছোঁয়ার মতো মিরিকে সময় কাটিয়ে মানেভঞ্জনের পথে রওনা দিলাম।

মানেভঞ্জন সান্দাকফুর গেটওয়ে। নেপালি ভাষায় মানেভঞ্জন শব্দের অর্থ দুই গিরিশিরার মিলনস্থল। টংলু আর জোড়পোখরি পাহাড়ের মাঝখানে বাটির মতো উপত্যকা। যার দক্ষিণ-পশ্চিম ঢালে নেপাল আর উত্তর-পূর্ব ঢালে ভারত, মাঝখানে সীমারেখা বলতে ছোটো একটা নালা। নালা পেরিয়ে অবলীলায় ভারত-নেপাল করছে মানুষ। সীমান্তরক্ষীর কোনও চোখরাঙানি নেই। দোকানপাট-বাড়িঘর-হোটেল-রেস্তোরাঁ-চোর্তেন আর মন্দির নিয়ে মানেভঞ্জন এখন ঘিঞ্জি শহর। বিকালটা এলোমেলো এদিক ওদিক ঘুরে, মন্দির ও গুম্ফা দর্শন করে হোটেলে ফিরতে রাত ন’টা বাজল। সেই সঙ্গে সান্দাকফু যাওয়ার ব্যবস্থা, অর্থাৎ ল্যান্ডরোভারের ব্যবস্থাও পাকা করে রাখলাম।

সান্দাকফু যাওয়ার একমাত্র গাড়ি ল্যান্ডরোভার। তৈরি ইংল্যান্ডে। ইংরেজদের হাত ধরে এদেশে এসেছে। সর্বকনিষ্ঠ গাড়িটির বয়সও সত্তরের বেশি। এখনও চুয়াল্লিশটির মতো ল্যান্ডরোভার আছে এ অঞ্চলে। গাড়ি বুক করতে হল ওদের নির্দিষ্ট ইউনিয়ন অফিস থেকে। মানেভঞ্জন থেকে সান্দাকফুর দূরত্ব ৩১ কিমি। সময় লাগে ঘণ্টা তিনেক। ভাড়া চার হাজার তিনশো টাকা যাতায়াত। আর নাইট হল্ট করলে অতিরিক্ত পাঁচশো টাকা। পরদিন সকালে সান্দাকফু যাওয়ার গাড়ি ঠিক কখন পাওয়া যাবে অফিস থেকে বলতে পারল না। প্রায় সবগুলি ল্যান্ডরোভার আজ সান্দাকফুতে নাইট হল্ট করছে। কাল ফেরার পর সিরিয়াল অনুযায়ী পাওয়া যাবে। যত তাড়াতাড়িই হোক সকাল দশটার আগে পাওয়ার কোনও সম্ভাবনা নেই।

সত্যিই পরদিন সকাল দশটার পর গাড়িগুলি একে একে ফিরতে লাগল। আমরা স্নান খাওয়া করে তৈরি হয়ে ছিলাম। এগারোটা নাগাদ আমাদের ডাক এল। গাড়িতে উঠেই ড্রাইভারকে বললাম, তাড়াহুড়োর কিছু নেই। ধীরে ধীরে চলুন, দেখতে দেখতে যাব। সম্ভব হলে সবকটা গ্রামে কিছুক্ষণের জন্যে দাঁড়াবেন। ইতিপূর্বে দু’বার এসেছি সান্দাকফু, এ রাস্তা আমাদের হাতের তালুর মতো চেনা। পূর্ব অভিজ্ঞতা থেকে জানি প্রতিটি গ্রামই সৌন্দর্যে স্বতন্ত্র, ছবির মতো।

গাড়ি ছাড়তেই চমক। পিচ ঢালা পাকা রাস্তা, রাবার সোলিং। ড্রাইভারের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে বলল, পাকা রাস্তা চিত্রে অবধি। তারপর ঢালাই। কাজ চলছে। সান্দাকফু অবধি হবে। ভদ্রলোকের আক্ষেপ, এরপর মানুষ দলে দলে আসবে। সান্দাকফু ভার্জিনিটি হারাবে। মানুষ আর ট্রেকিং করবে না। সবচেয়ে দুশ্চিন্তার কথা, ল্যান্ডরোভারও নাকি তুলে দেওয়া হবে।

বললাম, অসুবিধা কোথায়। এ তো আনন্দের খবর। আপনাদের ইনকাম বাড়বে।

ড্রাইভার পসন উত্তর দিল না।

মসৃণ পথে কিছুক্ষণের মধ্যে পৌঁছে গেলাম চিত্রে। গ্রামের সামনে অনেকটা ফাঁকা জায়গা, ভ্যালির মতো। কারা যেন সেখানে তাঁবু ফেলেছে। অন্তত পঞ্চাশজন এক সঙ্গে থাকতে পারবে। এখানে নেপাল সরকারের উদ্যোগে তৈরি হচ্ছে বিশাল একটা মনাস্ট্রি, নির্মাণ কাজ প্রায় শেষের দিকে। মানেভঞ্জন থেকে চিত্রের দূরত্ব মাত্র দু কিলোমিটার। অল্প কিছু বাড়িঘর, চোর্তেন, মনাস্ট্রি নিয়ে ছবির মতো সাজানো গ্রাম চিত্রে। চারপাশে পতপত করে উড়ছে নানা রঙের ধর্মীয় পতাকা। লামারা তাদের দৈনন্দিন কাজে ব্যস্ত। বাচ্চারা ভ্যালিতে ক্রিকেট খেলছে। এখানে কিছুক্ষণ কাটিয়ে আমরা এগিয়ে চলি। সাড়ে তিন কিলোমিটারের ব্যবধানে দ্বিতীয় গ্রাম লামেডুরা। খুব ছোটো গ্রাম, বৈশিষ্ট্যহীন। সব মিলিয়ে আট-দশ ঘর বাসিন্দা হবে বড়োজোর। লামেডুরা পার করে আমরা পৌঁছই পরের গ্রাম মেঘমা। এখানে চা পানের ছোট্ট একটা বিরতি।

যেমন গ্রামের নাম তেমন তার চরিত্র। সবসময় মেঘ কুয়াশার ওড়নায় ঢাকা মুখ। অস্পষ্ট জলছবির মতো। এই নিয়ে তিনবার আসছি। তিনবারই একই দৃশ্য। মেঘমায় ঢোকার মুখেই পড়ে একটা সেনা চৌকি। চেকপোস্টে নিজেদের ট্যুরিস্ট পরিচয় দিতেই ছাড়পত্র মিলে গেল। গ্রামের শেষ প্রান্তে শেষ বাড়িটার সামনে আমরা চা খেতে দাঁড়ালাম। দোকানি মেয়েটি তার অতুলনীয় ফিগারে যে-কোনও বাঙালি নায়িকাকে হার মানাবে, একথা হলফ করে বলা যায়। আপ্যায়ন করে সে আমাদের ঘরে নিয়ে গিয়ে বসায়। এটা কিচেন কাম ডাইনিং। বড়ো একটা কাঠের উনুন, উনুনের সাথে চিমনি লাগানো। বড়ো একটা ড্রাম বসানো উনুনে, ড্রামের মাথায় একটা হাঁড়ি। উনুন জ্বলছে। জিজ্ঞাসা করে জানতে পারলাম, ছাং তৈরি হচ্ছে। ছাং হচ্ছে দেশিয় পদ্ধতিতে তৈরি এক ধরনের মদ। আমরা অবশ্য চায়েই সন্তুষ্ট থাকলাম।

মেঘমা থেকে পথ দুভাগ হয়েছে। একটি গেছে সিঙ্গালিলা গিরিশিরার উচ্চতম শৃঙ্গ টংলুর দিকে। অন্য পথটি বাঁহাতি, গেছে তুমলিং। আমরা মেঘমার মায়া কাটিয়ে তুমলিং-এর পথ ধরি।

তুমলিং নেপালের মধ্যে। এপথে চড়াই উতরাই অপেক্ষাকৃত কম। একটা বাঁক ঘুরতেই সামনের পাহাড়ে ছবির মতো সাজানো গ্রাম। রাস্তাটিও বেশ মসৃণ। তুমলিং-এ আবার বিরতি। ফটো সেশন। মনে আছে প্রথমবার ট্রেকিং-এ এসে প্রথম রাতটা এখানেই কাটিয়েছিলাম। ওয়েদার ভালো থাকলে কাঞ্চনজঙঘা-সহ অসংখ্য শৃঙ্গ এখান থেকে স্পষ্ট দেখা যায়। সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্তে অপূর্ব ক্যানভাস হয়ে ওঠে তুমলিং-এর আকাশ। আজ সকাল থেকেই আকাশের মুখ গোমড়া। তেনাদের দর্শন পাওয়ার কোনও সম্ভাবনা নেই। অযথা সময় নষ্ট না করে আমরা আবার গাড়িতে উঠে বসি।

এরপর গৗরীবাস। সিঙ্গালিলা অভয়ারণ্যের প্রবেশদ্বার। টিকিট দেখিয়ে ভেতরে ঢোকার অনুমতি মিলল। টিকিট এখানেও পাওয়া যায়, আবার মানেভঞ্জনের বনদফতরের অফিসেও পাওয়া যায়। ক্যামেরার চার্জ আলাদা। আমরা মানেভঞ্জন থেকেই টিকিট সংগ্রহ করে এনেছিলাম।

পরের গ্রাম কালাপোখরি। সিঙ্গালিলা অভয়ারণ্যের মধ্যে দিয়ে পথ। দূরত্ব মাত্র চার কিমি। চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যে এ পথের অন্য গ্রামগুলোর থেকে কালাপোখরি সম্পূর্ণ আলাদা। এখানে মূলত তিববতি উদ্বাস্তুদের বসবাস, অন্য গ্রামগুলো নেপালিদের। মেঘমার মতো এখানেও সবসময় মেঘ কুয়াশায় ঢাকা। অদ্ভুত এক মায়াময় আলো-আধারি পরিবেশ। শীতে এখানে বরফ পড়ে। মনে আছে, দ্বিতীয়বার সান্দাকফু এসেছিলাম ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে, কালাপোখরি তখন বরফের চাদরে মোড়া ছিল। সে এক অন্য সৌন্দর্য।

আগেই ঠিক ছিল দুপুরের আহারপর্বটা কালাপোখরিতে সারব। খুব ভালো খিচুড়ি বানায় এরা। গ্রামে ঢোকার মুখেই প্রথম বাড়িটায় খিচুড়ি খেয়েছিলাম দ্বিতীয়বার, এবারও সেই বাড়ির সামনে গাড়ি থামালাম। ভেতরে ঢুকে চেনা মুখ না পেয়ে হতাশ হলাম প্রথমে। জানতে পারলাম বাড়ির মালিকানা বদল হয়েছে। কী আর করা যাবে, এখানেই খিচুড়ির অর্ডার দিয়ে গ্রাম ঘুরতে বেরোলাম।

কালাপোখরি ঢোকার মুখে পড়বে একটা পুকুর বা হ্রদ। হ্রদের জল কালো। নাম কালাপোখরি। হ্রদের নামেই জায়গার নাম। হ্রদের চারপাশে ধর্মীয় পতাকা। স্থানীয় মানুষের বিশ্বাস, এই হ্রদ কালনাগের বাসস্থান। অতি পবিত্র স্থান। পাশে ছোটো একটা চোর্তেন। হ্রদের উপর জমাট বাঁধা কুয়াশা। কুয়াশা অবশ্য গ্রাম জুড়েই। যেন বড়ো একটা ক্যানভাসে আঁকা জলরঙের ছবি।

গ্রাম ঘোরা শেষ করে ঘণ্টা খানিক পরে ফিরে আসি পেটের টানে। বাড়িতেই হোটেল, পাহাড়ি গ্রামগুলোতে যেমন হয়। মা আর মেয়ে মিলে সামলাচ্ছে। বাড়ির পুরুষরা দূর শহরে কাজে গেছে। শহর বলতে দার্জিলিং, জলপাইগুড়ি নয়তো কলকাতা। মেয়েটির বয়স বাইশ তেইশ বছর হবে বড়োজোর। বেশ বলিয়ে কইয়ে, স্মার্ট। নাম পসন। পসন এখানে ছেলে মেয়ে উভয়ের নাম হয় দেখছি। পসন কেরালায় থাকে, হোটেল ম্যানেজমেন্ট পড়ছে। পড়াশোনা শেষে কালাপোখরিতেই ফিরবে, এখানেই কিছু করতে চায়। কলেজে এখন ছুটি চলছে তাই এখানে। সে-ই আমাদের রান্না করে খাওয়াল। বেশ ভালো রান্নার হাতটি।

ছোটো দুটো অতিথিনিবাস আছে এদের। একটায় আটটা বেড, অন্যটায় চারটে। অসাধারণ সাজানো গোছানো দুটি ঘর। ভেতরে ঢুকলে মন ভালো হয়ে যায়। ভাড়া মাথাপিছু দুশো টাকা। অর্থাৎ বড়ো ঘরটার জন্যে ১৬০০ টাকা, ছোটোটার জন্যে ৮০০ টাকা। অফ সিজনে আরও কম। হাতে সময় থাকলে অন্তত একটা দিন এখানে কাটিয়ে যেতাম।

খাওয়াদাওয়ার পর্ব শেষ হলে আমরা আবার বেরিয়ে পড়ি। ওয়েদার খারাপ, অযথা দেরি করা ঠিক হচ্ছে না। পথে আর কোথাও থামব না, এবার সোজা সান্দাকফু। কালাপোখরি থেকে সান্দাকফুর দূরত্ব মাত্র সাত কিমি। শেষ চার কিমি অসম্ভব চড়াই। চড়াই ভেঙে যখন পশ্চিমবঙ্গের টঙে এসে পৌঁছলাম, চরাচর তখন কুয়াশায় ঢাকা। সঙ্গে মেঘ। একটু পরেই ঝিরঝির করে বৃষ্টি শুরু হল। ইচ্ছা থাকলেও বিকালটা আর বাইরে বেরোতে পারলাম না। হাড় কাঁপানো ঠাণ্ডায় গৃহবন্দি হতে হল। তাছাড়া সারাদিনের ধকলে গায়ে-হাত-পায়ে বেশ ব্যথা। তাড়াতাড়ি রাতের খাওয়াদাওয়া সেরে কম্বলের তলায় সেঁধিয়ে গেলাম।

মুষলধারায় বৃষ্টি নামল। বৃষ্টির শব্দ শুনতে শুনতে ঘুম নেমে এল দু’চোখে। ভোর চারটেয় ঘুম ভাঙল। মোবাইলে অ্যালার্ম দেওয়া ছিল। আরও কিছুক্ষণ গড়িমসি করে পাঁচটা নাগাদ বাইরে বেরোলাম। শরীরে পর্যাপ্ত গরম পোশাক। সঙ্গে ক্যামেরা। রাতে বৃষ্টি হওয়ায় মেঘ কেটে গেছে, আকাশ পরিষ্কার। বুঝতে পারি ভালো একটা সকাল আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। আমরা সানরাইজ পয়েন্টে অপেক্ষা করি। যথাসময়ে পুব আকাশে তার আগমনবার্তা সূচিত হল। লাল হয়ে উঠল আকাশ। উলটো দিকে, কাঞ্চনজঙঘার মাথায় তাঁর আশীর্বাদি। আস্তে আস্তে সে আশীর্বাদ ছড়িয়ে পড়ল কাঞ্চনজঙঘা-সহ কুম্ভকর্ণ, কাব্রু সাউথ, কাব্রু নর্থ, পাণ্ডিম, নরসিংহ এবং হিমালয়ের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ এভারেস্টের শরীরে। মাত্র আধ ঘণ্টার এই রঙের উৎসব কেবল যে এই টুরটাকে পূর্ণতা দিল এমন নয়, সারা জীবনের এক অবিস্মরণীয় প্রাপ্তি হয়ে থাকল। এই জন্যেই তো ছুটে আসা সান্দাকফুর মাথায়। আর কিছু চাইবার নেই আমাদের।

সারাদিন সান্দাকফুর ছোট্ট পরিসরে এলোমেলো ঘুরে বেড়ালাম, ছবি তুললাম। ফালুটের পথে হাঁটতে হাঁটতে বেশ কয়েক কিলোমিটার এগিয়ে গিয়েছিলাম, প্রাপ্তি হিসাবে মিলল রডোডেনড্রনের জঙ্গল। এখন আর সেভাবে ফুল না থাকলেও, যেটুকু অবশিষ্ট আছে সেটাও অনেক। মাস দুই আগে আসতে পারলে প্রকৃতি আমাদের কীভাবে বরণ করত বেশ অনুমান করতে পারছি।

দুপুরের পর আবার মেঘ করে এল। সূর্যাস্ত অধরাই থাকল এ যাত্রায়। তাতে অবশ্য দুঃখ নেই। এর আগে দু’বারই অসাধারণ সূর্যাস্ত দেখার সৌভাগ্য হয়েছে। সন্ধেটা সেই স্মৃতিচারণেই কাটল। যেটুকু পেয়েছি এটুকুই বা কজনের ভাগ্যে জোটে! আমরা খুশি।

কাল ফিরব। সঙ্গে নিয়ে যাব এই অপার্থিব অভিজ্ঞতা আর অসংখ্য ছবি। অবসরের মানস ভ্রমণে এই ছবিগুলিই হবে আমাদের পাথেয়।

কীভাবে যাবেন?

শিলিগুড়ি বা নিউ জলপাইগুড়ি থেকে শেয়ার জিপ বা গাড়ি রিজার্ভ করে সরাসরি মানেভঞ্জন। মানেভঞ্জন থেকেই মিলবে সান্দাকফু যাওয়ার ল্যান্ডরোভার। আগের দিনই গাড়ি বুক করে রাখুন। পারমিশন করিয়ে নিন মানেভঞ্জনের বন দফতরের অফিস থেকে। সঙ্গে পরিচয় পত্র নিতে ভুলবেন না। পারমিশন করাতে লাগবে। মানেভঞ্জন থেকেই আগামী দুদিনের প্রয়োজনীয় রেশন সংগ্রহ করে নিন। পথে দোকান মিললেও মূল্য লাগবে দেড়-দু’গুণ।

কোথায় থাকবেন?

মানেভঞ্জনে অসংখ্য থাকার জায়গা। আগে থেকে বুক করে আসার প্রয়োজন নেই। এখনও এখানে সে ভাবে সাধারণ টুরিস্টদের চাপ তৈরি হয়নি। ইদানীং সান্দাকফুতেও প্রচুর থাকার জায়গা। এখানেও স্পট বুকিং করলে চলবে। প্রয়োজনে মানেভঞ্জন থেকেও বুক করে আসতে পারেন অথবা আপনার গাড়ির ড্রাইভারকে বলুন, সে-ই ব্যবস্থা করে দেবে।

সাবধানতা

পর্যাপ্ত গরম পোশাক, টর্চ, প্রয়োজনীয় ওষুধ, আর জোঁকের হাত থেকে বাঁচতে সঙ্গে লবণ নিন। শরীর গরম রাখার জন্য মধু বা ব্র্যান্ডি জাতীয় পানীয় সঙ্গে রাখতে পারেন। যাদের উচ্চতাজনিত শ্বাসকষ্ট আছে, তারা সঙ্গে কর্পূর বা ‘কোকা-৬’ জাতীয় ওষুধ সঙ্গে রাখুন। আর অবশ্যই সঙ্গে রাখবেন কোনও সচিত্র পরিচয়পত্র।

কেনাকাটা

ফেরার পথে নেপালের পশুপতি মার্কেট হয়ে ফিরতে পারেন। এখানে দেশিবিদেশি হরেকরকম প্রসাধনী দ্রব্য এবং ইলেক্ট্রনিক্স গুডস পাবেন। দরদাম করে কিনতে পারলে ঠকবেন না।

 

 

ওয়ার্ক ফ্রম হোম

ওয়ার্ক ফ্রম হোম– অর্থাৎ, বাড়িতে বসেই কাজ। হ্যাঁ, এমন কিছু কাজ আছে, যা বাড়ি বসে করা যায় অনায়াসে। ইন্টারনেট এবং ওয়াইফাই-কে মাধ্যম করে পৃথিবীর যে-কোনও প্রান্তে বসে কিছু কাজ করা যায় সহজে। এক্ষেত্রে যিনি কাজ করাবেন এবং যিনি কাজ করবেন, দু’জনেরই লাভ। একটা সময় ছিল, যখন শুধু পশ্চিমি দেশগুলিতে এই সুবিধে পাওয়া যেত কিন্তু এখন আমাদের দেশেও ইন্টারনেট-এর প্রসারের জন্য ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’-এর সুবিধা পাওয়া যাচ্ছে সর্বত্র।

যে সব কাজ বাড়ি বসে করা যায়

এক নয়, একাধিক কাজ করা যায় বাড়ি বসে। শুধু একটু মাথা খাটিয়ে পরিকল্পনা করার প্রয়োজন। কাজের খোঁজ খবর রাখলে প্রায় দশ থেকে বারো রকম কাজ করা যায় বাড়ি বসে। যেমন–

ভার্চুয়াল অ্যাসিস্ট্যান্ট

নিজের কোম্পানি খুলে ভার্চুয়াল অ্যাসিস্ট্যান্ট হওয়া যায় বাড়ি বসে। ছোটো কোম্পানির হয়ে কিংবা সেলিব্রিটিদের হয়ে ভার্চুয়াল মাধ্যমে প্রচারের কাজ করার বিষয়টি জনপ্রিয়তা পাচ্ছে ধীরে ধীরে। এইরকম কাজে আয়ও বেশ ভালো।

মেডিকেল ট্রান্সস্ক্রিপ্ট

ব্যস্ত চিকিৎসকরা নিজের সময় বাঁচাতে এই রকম মেডিকেল ট্রান্সস্ক্রিপ্ট-এর কাজ করান। এক্ষেত্রে চিকিৎসকের থেকে চিকিৎসা সংক্রান্ত কথা শুনে কম্পিউটার-এ এন্ট্রি করতে হয়। ডক্টর অন্য কোনও দেশে বসেও এই কাজ করাতে পারেন। সে ক্ষেত্রে, মাধ্যম থাকে টেলিফোন।

অনুবাদক

মাতৃভাষা ছাড়াও যদি আপনি একাধিক ভাষা জানেন, তাহলে অনুবাদকের কাজ করতে পারবেন বাড়ি বসে। ভয়েস রেকর্ড বাজিয়ে কিংবা নথি দেখে এক ভাষা থেকে অন্য ভাষায় অনুবাদ করে বাড়ি বসেই ইনকাম করা যায় অনেক টাকা।

ওয়েব ডিজাইনার

এখন ওয়েব সাইট-এর রমরমা বাজার। ওয়েবসাইট খুলে

সংবাদ পরিবেশন কিংবা ব্যাক্তিগত কোনও লেখা, তথ্য ইত্যাদি পরিবেশন করেন অনেকেই। তাই এইসব ওয়েব সাইটগুলির জন্য ওয়েব ডিজাইনার লাগে। আর এই ওয়েব ডিজাইনিং বাড়ি বসেই করা যায় এবং ভালো আয়ও করা যায়।

কল সেন্টার প্রতিনিধি

ছোটো, বড়ো অনেক সংস্থা বড়ো কোনও কল সেন্টার-কে দায়িত্ব না দিয়ে, কল সেন্টার প্রতিনিধি নিয়োগ করে। এতে কোম্পানির আর্থিক সাশ্রয় হয়। এক্ষেত্রে সংস্থার ক্রেতাদের থেকে অর্ডার নেওয়া এবং অভাব-অভিযোগের সমাধান করা-ই কল সেন্টার প্রতিনিধির কাজ। এই কাজ বাড়ি বসেই করা যায়।

সহায়ক টেকনিক বিশেষজ্ঞ

কল সেন্টার-এর কম্পিউটার, ইন্টারনেট, মোডেম, ওয়াইফাই প্রভৃতির সমস্যা দেখা দিলে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ দরকার হয় সমস্যার সমাধান করার জন্য। তাই কেউ যদি এইসব বিষয়ে জ্ঞান আহরণ করতে পারেন, তাহলে বাড়ি বসে সহায়ক টেকনিক বিশেষজ্ঞের কাজ করতে পারবেন।

ট্রাভেল এজেন্ট

দেশ-বিদেশের দর্শনীয় জায়গাগুলি সম্পর্কে যদি জ্ঞান থাকে এবং পর্যটকদের যাতায়াত, থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করার ক্ষমতা থাকে, তাহলে ট্র্যাভেল এজেন্ট হওয়া যায় অনায়াসে। এই কাজ বাাড়িতে বসেই করা যায়।

প্রাইভেট টিউশন

আজকাল ডিসট্যান্স এডুকেশন কিংবা করেসপন্ডেন্স কোর্স-এর জনপ্রিয়তা রয়েছে। তাই বাড়ি বসে শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনমতো শিক্ষাদান করা যায় অর্থের বিনিময়ে।

লেখক এবং সম্পাদক

লেখা অর্থাৎ কন্টেন্ট রাইটিং, প্রুফরিডিং এবং সম্পাদনার কাজ বাড়ি বসেই করা যায় ওয়েব পোর্টাল-এর জন্য। আর এখন এই ওয়েব পোর্টাল-এর কাজ এবং চাহিদা বাড়ছে। শুধু তাই নয়, এই কাজ করে অনেকে ভালো টাকাও উপার্জন করছেন।

ফ্রাঞ্চাইজি

যদি বাজারে ব্যাবসা সংক্রান্ত বিষয়ে ঠিকমতো খোঁজ খবর রাখা যায়, তাহলে ফ্রাঞ্চাইজি নিয়ে বাড়ি বসে কাজ করা যায়। ফুড, এডুকেশন, মেডিসিন প্রভৃতি কাজ এই তালিকায় পড়ে।

দাবার কোচিং

দাবা খেলায় আগ্রহ বাড়ছে অনেকের। কিন্তু না জানলে দাবা খেলা যায় না। তাই কেউ যদি ভালো ভাবে দাবা খেলা শিখে নেন, তাহলে বাড়ি বসে দাবার কোচ হয়ে অর্থ উপার্জন করা যায়।

বাড়ি বসে কাজের নানান সুবিধে

  • বাড়ি বসে কাজ করলে পরিবারের সদস্যদের বেশি সময় দেওয়া যায়
  • অবসরপ্রাপ্তদের জন্য অতিরিক্ত আয়ের সুবিধে
  • যে সমস্ত মহিলার স্বামীর বদলির চাকরি, তাদের ক্ষেত্রে বাড়ি বসে কিছু কাজ করা সুবিধেজনক
  • শারীরিক প্রতিবন্ধীরাও তাদের সামর্থ অনুযায়ী কিছু কাজ বাড়ি বসে করতে পারেন
  • খুব সকালে উঠে, বাস কিংবা ট্রেনে ভিড়ের মধ্যে কষ্ট করে যাওয়ার প্রয়োজন নেই
  • বাড়ি বসে কাজ করলে নিজের সুবিধেমতো বিশ্রাম নেওয়া যায়
  • বাড়িতে থাকলে ওয়েল-ড্রেসড হওয়ার প্রয়োজন নেই,মেক-আপ করারও প্রয়োজন নেই
  •  বাইরের খাবার খেয়ে শরীর খারাপ করার ঝামেলা নেই। সঠিক সময়ে নিজের ইচ্ছেমতো বাড়ির খাবার খেয়ে কাজ করা যায়
  • যাতায়াত করতে হয় না, তাই কোনও খরচাও নেই
  • অন্যের অধীনে কাজ করে অযথা সমস্যা কিংবা চাকরি হারানোর ভয়ও নেই

অবশ্য বাড়ি বসে কাজের সুবিধের দিক বেশি থাকলেও, কিছু অসুবিধেও আছে। যেমন– বর্হিজগতের সঙ্গে যোগাযোগ কমে যায়, কাজের আবহ না থাকায় মন বসে না, কিছু সমস্যা হলে অন্যদের সাহায্য পাওয়া যায় না ইত্যাদি। তবে যদি মনযোগ এবং নিষ্ঠা সহকারে কাজ করা যায় এবং সমস্যার সমাধান করা যায়, তাহলে বাড়ি বসে কাজ করতে ক্ষতি কী?

মা-বাবার ঝগড়ায় বিপর্যস্ত শিশু

সব শিশুর কাছেই মা-বাবা হল রোল মডেল। বাচ্চার কাছে নিজের মা-বাবার থেকে ভালো কেউ হতে পারে না। সুতরাং মা-বাবাকেই অনুসরণ করার চেষ্টা করে বাচ্চা। কিন্তু পরিস্থিতি যখন অনুকূল থাকে না, মা-বাবার ঝগড়ার মুখোমুখি হতে হয় বাচ্চাকে প্রতিনিয়ত। ঠিক তখনই শিশুর মনের মধ্যে আঁকা পারফেক্ট মা-বাবার ছবিটা গুঁড়িয়ে যেতে আরম্ভ করে। সে হয় হিংস্র মনোভাবের হয়ে ওঠে, নয়তো অবসাদে ডুবে যায়। আবার কখনও মা-বাবার দেখানো পথই অনুসরণ করে ঝগড়ুটে বা মারকুটে হয়ে ওঠে।

সামাজিক ব্যবহার কী হওয়া উচিত তার পাঠ বাচ্চারা সাধারণত মা-বাবার কাছ থেকেই পায়। যদিও অভিভাবকেরা সবসময়ই চেষ্টা করেন, নিজেরা ভুল কিছু না করতে, যাতে তার খারাপ প্রভাব বাচ্চার উপর না পড়ে। কিন্তু ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে হয়তো তারা শিশুটির সামনেই এমন ভুল করে বসেন, যার প্রভাব শিশুমনে পড়তে বাধ্য।

চাইল্ড সাইকোলজিস্টদের মতে, তাদের কাছে এমন অনেক কেস আসে, যেখানে বাচ্চার মা-বাবা নিজেদের ঝগড়া শেষ হলে, নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করার দায় থেকে একে অপরের নামে বাচ্চার কাছে দোষ চাপাবার চেষ্টা করে। ফলে বাচ্চা আরও কনফিউজড হয়ে যায়।

বাচ্চার উপর বড়োদের ঝগড়ার প্রভাব

  • আবসাদ : যে-বাচ্চা বাড়িতে মা-বাবাকে সবসময় ঝগড়া করতে দেখে বড়ো হতে থাকে, তার অবসাদগ্রস্ত হওয়াটা খুব স্বাভাবিক। বাচ্চা ভালোবাসার অভাব বোধ করে, যার ফলে বাচ্চা ডিপ্রেশনে চলে যায়।
  • সবসময় ভয়ে ভয়ে থাকে : শিশুটির সামনে ঝগড়া বিবাদ, মারামারি, গালিগালাজ করা, বাচ্চাকে কতটা প্রভাবিত করতে পারে, সেটা অনেক মা-বাবাই ঝগড়া করার সময় ভুলে যান। মা-বাবাকে ঝগড়া করতে দেখলে বাচ্চা ভয় পেয়ে যায়।
  • মানসিক অশান্তিতে ভোগে শিশু : বাড়িতে বড়োদের মধ্যে, বিশেষ করে মা-বাবার মধ্যে অশান্তি দেখলে, শিশুটির মধ্যেও মানসিক সমস্যা তৈরি হয়। তার ইনোসেন্স নষ্ট হয়ে যায়। জেদি এবং খিটখিটে মেজাজের হয়ে উঠতে থাকে। তার এই সমস্যার কারণ উপলব্ধি করতে করতে, বেশিরভাগ সময়ে মা-বাবা অনেক দেরি করে ফেলেন।
  • জীবনে অনেক কিছু হারিয়ে ফেলে : যে-বাচ্চার বাড়িতে সবসময় ঝগড়া, অশান্তির পরিবেশ থাকে, সেই বাচ্চার মানসিক বিকাশ বাধাপ্রাপ্ত হয়। অন্য শিশুদের তুলনায় খেলাধুলো, পড়াশোনায় পিছিয়ে পড়তে থাকে।
  • নিজেকেই দাযী করে : মা-বাবার মধ্যে রোজ দ্বৈরথ দেখতে দেখতে শিশুর মনে হতে থাকে সে এর জন্য দাযী। শিশুটি ডিপ্রেশনে চলে যায়, চুপচাপ হয়ে পড়ে। অনেক সময় আত্মহননের পথও বেছে নেয়।
  • ভরসা করা ছেড়ে দেয় : ঝগড়ার পরিবেশ বাচ্চাকে হতাশ করে তোলে। কিছুই তার মন ভালো করতে পারে না। কাউকে সে চট করে বিশ্বাস করতে পারে না এবং কেউ ভালোবাসলেও সেটা তার কাছে কৃত্রিম বলে মনে হয়।

খুব ছোটো বয়সের বাচ্চার উপর মা-বাবার বিবাদের প্রভাব একটু অন্য ভাবে পড়ে। শিশুটির, মা-বাবার মধ্যে হওয়া কথোপকথন ঠিক বুঝতে না পারলেও, তাদের মুড পরিষ্কার ধরা পড়ে বাচ্চার কাছে। দেখা যায় যে-পরিবারে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে অশান্তি লেগেই থাকে, সেই বাড়ির শিশুটি নিজের মধ্যে গুটিয়ে যায়। তার মনে হয়, এবার মা-বাবা আলাদা হয়ে যাবে। তার সঙ্গে কেউ আর থাকবে না। নিজেকে অসুরক্ষিত মনে করে এবং কারও সঙ্গে মেলামেশা করতে আর কোথাও যেতে আসতেও দ্বিধাবোধ করে।

সন্তান বড়ো হয়ে গেলে মা-বাবা ভেবে নেন, নিজেদের ঝগড়ায় সে কারও একটা পক্ষ অবশ্যই নেবে। কিন্তু এই পরিস্থিতিতে বাচ্চার দমবন্ধ হয়ে আসার উপক্রম হয়। তার মনে হয়, এখানে সে না চাইতেই জড়িয়ে পড়ছে। কখনও কখনও সে গ্লানির শিকার হয়ে পড়ে এবং বাড়ির ওই পরিবেশের জন্য নিজেকে দোষী ভেবে নেয়।

শুধু মানসিক নয়, ঝগড়াঝাঁটির প্রভাব শরীরের ইমিউন সিস্টেমের উপরেও পড়ে। ফলে যে-কোনও অসুস্থতার সঙ্গে লড়ার শক্তি শরীর হারিয়ে ফেলে। বাড়িতে মা-বাবার মধ্যে অসন্তোষ বা দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা ডিভোর্স কেস-এর প্রভাব, সন্তানের কোমল মনের উপর এসে পড়ে। সে শুধু শৈশবেই নয়, এর নেতিবাচক প্রভাবের সঙ্গে সারা জীবন ধরে যুঝতে থাকে।

পড়াশোনায় পর্যন্ত এর প্রভাব এসে পড়ে। এর ফলে শিক্ষার ক্ষেত্রে ভালো রেজাল্ট করতে পারে না বাচ্চা। এই নিয়ে অনেক সমীক্ষা করা হয়েছে। মা-বাবার সম্পর্ক নিয়ে বাচ্চার মনে অনিশ্চয়তা থাকলে, স্বাভাবিক ভাবেই তার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে শিশুটির উপর।

এছাড়াও স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে অপ্রীতিকর সম্পর্ক বাচ্চার শরীরের উপর যেমন খারাপ প্রভাব ফেলে, তেমনি তার মানসিক বিকাশেও বাধা দেয়। নানা ধরনের মানসিক বিকার উৎপন্ন হতে পারে। হয় শিশুটি নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে আর নয়তো ভুল পথে পা বাড়ায়। সুতরাং বড়োদেরই খেয়াল রাখতে হবে, তাদের ঝগড়ার প্রভাব কোনও ভাবেই যেন সন্তানের উপর না পড়ে। খুব স্বাভাবিক ভাবেই অন্যান্য আর-দশটা অভিভাবকদের মতোই, বাচ্চাকে মানুষ করার দাযিত্ব পালন করতে হবে।

 

অভিভাবকদের কী করা উচিত

  • নিজেকে গুরুত্ব না দিয়ে সন্তানের কথা আগে ভাবুন
  • সব স্বামী-স্ত্রীর মধ্যেই ঝগড়া হয়। কিন্তু যখন একজন রেগে রয়েছে তখন আর একজনের চুপ করে যাওয়াই বাঞ্ছনীয়। এতে পরিবেশ নিয়ন্ত্রণে থাকে
  • নিজেদের ঝগড়ায় বাচ্চাকে শামিল করবেন না
  • কোনও কথায় স্বামী-স্ত্রীর মনোমালিন্য হলেও শিশুটির সামনে একে অপরকে অপমান করবেন না
  • বাচ্চার সামনে খারাপ ভাষা প্রযোগ করবেন না
  • শিশুটির সামনে একে অপরকে গালিগালাজ করবেন না
  • খেয়াল রাখবেন যে-কথা আপনার মনে কষ্ট দিতে পারে, সেটা বাচ্চার কোমল হৃদয়কে কতটা আঘাত করতে পারে
  • স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ঝগড়া বন্ধ না হলে অবশ্যই কাউন্সেলর-এর কাছে যান এবং পরামর্শ নিন।

গান্ডিকোটা ও বেলাম

যারা আপশোশ করছেন আরিজোনার গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন যেতে পারছেন না বলে– তাদের দুঃখ ঘোচাবে, ভারতেরই একটি অপূর্ব জায়গা, যা সৌন্দর্যে পাল্লা দিতে পারে গ্র্যান্ড ক্যানিয়নের সঙ্গে। অন্ধ্রপ্রদেশের কাডাপা জেলার অন্তর্গত গান্ডিকোটা, প্রকৃতির এক অপরূপ সৃষ্টি।

তবে শুরুতেই বলে নেওয়া ভালো যে, গান্ডিকোটা পৌঁছোনো একটু কঠিন, কারণ এর যোগাযোগ ব্যবস্থা একেবারেই অনুন্নত। একমাত্র বেঙ্গালুরু, চেন্নাই বা হায়দরাবাদ থেকে গাড়িতে পৌঁছোনো যাবে গান্ডিকোটা। এই সফরের অন্যতম পাওনা, বেলাম গুহা, গান্ডিকোটা ফোর্ট ও গুটি ফোর্ট দর্শন।

যারা ট্রেনে আসতে চান তারা তাডিপাট্রি, গুটি বা গুনটাকাল-এ নামতে পারেন। তবে তাডিপাট্রি বা

গুনটাকাল-এ কোনও হোটেল নেই। সেক্ষেত্রে গুটি নামাটাই বুদ্ধিমানের। গুটি থেকে গাড়িতে গান্ডিকোটা ফোর্টের সামনে অন্ধ্রপ্রদেশ ট্যুরিজম ‘হারিথা’-এ থাকার ব্যবস্থা করতে পারেন।

আমরা গুটি থেকে সকাল সকাল রওনা হলাম গাড়িতে। মোট তিনটি জেলা ছুঁয়ে শুরু হল যাত্রা। গুটি অনন্তপুরের অন্তর্গত, বেলাম, কুর্নুলের মধ্যে আর গান্ডিকোটা কাডাপা জেলায়। এটি অন্ধ্রপ্রদেশের শুষ্কতম অঞ্চল।

গান্ডিকোটার নদীখাতের অদূরেই গান্ডিকোটা ফোর্ট, এই জেলাকে সুরক্ষিত করতেই এমন কূটনৈতিক ভাবে এটি নদীখাতের পাশে তৈরি করা হয়েছিল। ত্রয়োদশ শতাব্দীতে তৈরি এই কেল্লার বেশিরভাগটা ধবংশের কবলে। ভেতরে একটি মসজিদ ও ভিউপয়েন্ট রয়েছে।

‘গান্ডি’ অর্থাৎ নদীখাত এবং ‘কোটা’ মানে দুর্গ। চাণক্যদের রাজত্বকালে এর নির্মাণ। গান্ডিকোটাকে হাম্পির সঙ্গে তুলনা করা হয়ে থাকে। এর কারণ এর মধ্যে পাথরে নির্মিত মন্দির ভাস্কর্যগুলির সঙ্গে হাম্পির মিল পাওয়া যায়। একটি প্রবেশদ্বারে অবশ্য ইসলামিক শৈলীর সুস্পষ্ট ইঙ্গিত রয়েছে। গেটের দুধারে লোহার শলাকা, যাতে বহিরাগত শত্রুর হাতি না প্রবেশ করতে পারে। কেল্লার চারপাশে একাধিক ওয়াচ টাওয়ার।

ভিতরে এখনও অটুট রয়েছে একটি চারমিনার। পায়রা রাখার জন্য ব্যবহূত হতো এই ধরনের স্থাপত্যগুলি। এখন এখানে বহু পায়রার ভরাভর্তি সংসার। আর রয়েছে একটি বন্দিশালা। এর উঁচু প্রাচীর ও ছোটো ছোটো ভেন্টিলেটর দেখেই বোঝা যায়, সমস্ত রাজ্যের বন্দিদের এখানেই রাখা হতো। চৌহদ্দির ভিতরে স্থিত মাধবরায় স্বামী মন্দিরের অদূরেই বিশাল জলাধার। এখন এখানেই গ্রামবাসীরা পাম্প বসিয়ে সেচকার্য চালায়। বহু গ্রামবাসীর বসবাস এই কেল্লার মধ্যে। তাদের জলও যোগান দেয় এই জলাধার।

দুর্গের মধ্যে সবচেয়ে বর্ণাঢ্যপূর্ণ মাধবরায় স্বামী মন্দির। গোপুরম সমৃদ্ধ চারতলা বিশিষ্ট মন্দির। পিলারে ও সিলিঙে খোদাই করা কারুকাজ। ১৫ -১৬ শতকে রাজা কৃষ্ণদেব রায়ের সৃষ্টি। আরও আগে তৈরি জুমা মসজিদ। তিনটি আর্চ ও দুটি মিনার বিশিষ্ট কেল্লার অন্তর্গত এই মসজিদে, এখনও কিছু নকশা করা দেয়াল রয়ে গেছে। একটি শস্য ভাণ্ডার রয়েছে। কালের কবল থেকে কীভাবে এগুলি অক্ষত রয়ে গেল কে জানে, তবে কেল্লার অভ্যন্তর দেখে বোঝাই যায় এগুলি কতটা প্ল্যানিং করে করা হয়েছিল। রঘুনাথ মন্দিরেরও কিছু দেয়াল-ভাস্কর্য এখনও অটুট।

এসব দেখে ভিউপয়েন্টে যাবার জন্য পিচ্ছিল পাথরে পা রেখে যেতে হবে। বেশ কিছুটা ক্লাইম্ব করে ভিউ পয়েন্টে পৌঁছোলে নদীখাতের নিসর্গ চোখে ভেসে উঠবে। পাথুরে ল্যান্ডস্কেপের মাঝখানে এক অপরূপ পিকচার পোস্টকার্ড। যেন, নীচে পেন্না নদী। যারা গনগনি দেখেছেন, তারাও মানবেন গনগনি এর তুলনায় কিছুই নয়। একমাত্র গ্র্যান্ড ক্যানিয়নের সঙ্গেই এর তুলনা চলে। চারপাশের সৌন্দর্য যেন জায়গাটাকে আরও রহস্যময় করে তুলেছে।

পরের দিন গাড়িভাড়া করে আমরা পৌঁছোলাম বেলাম গুহা। ভারতের দ্বিতীয় বৃহত্তম এই গুহা প্রায় ৩চ্চ্৯ মিটার দৈর্ঘ্যের। দেড় ঘন্টা লাগে ঘুরে দেখতে। গুহার প্রথম অংশে একটি বড়ো হল, সেখানে একসময় বৌদ্ধ ভিক্ষুরা প্রার্থনা করতেন। তারপর একটি প্রবেশদ্বার। স্ট্যাল্যাকটাইট পাথরে যেন তিনটি সিংহের মুখ তৈরি হয়েছে। আরও ভেতরে শিবলিঙ্গের মতো কিছু আকৃতি। এরপর একটি অংশে পৌঁছোলে স্ট্যালাকটাইট পাথরের কিছু স্ট্রাকচার যার দ্বারা সৃষ্টি হয়েছে সপ্তসুর। কাঠ দিয়ে বাজালে শোনা যায়। এ এক প্রাকৃতিক বিস্ময়।

কিছু কিছু অংশে হামাগুড়ি দিয়ে ঢুকতে হয়। পাথুরে সিলিং-এর একটি অংশে যেন সহস্র ফণাবিশিষ্ট একটি গোখরো সাপ। কোথাও আবার অজস্র ঝুরি সমেত একটি পাথুরে বটবৃক্ষ। প্রাকৃতিক ভাবে তৈরি এসব ভাস্কর্য সত্যি অবাক করে। গুহার গভীরতম স্থানে একটি জলস্রোত, যার নাম পাতালগঙ্গা। এই অপূর্ব ভ্রমণ মুখে বর্ণনা করার নয়, দেখে বিস্ময়ে মুগ্ধ হবার।

শেষযাত্রা

তিনি একমনে ছবি আঁকছিলেন। ক্যানভাস জুড়ে শুধু নীল আর নীল। আকাশ আর সমুদ্র মিশে গেছে। তার মধ্যে দিয়ে একটা নৌকো চলছে। নৌকো না বলে কলার ভেলা বলাই ভালো। এই বিরাট সমুদ্রে তার কখন তলিয়ে যাবার কথা। তবু চলছে। তিনি নৌকোটার গায়ে বাদামি রঙের পোঁচ দিতে লাগলেন জোরে জোরে। না, না, নৗকোটাকে কিছুতেই ডুবতে দেওয়া যাবে না।

ক্যানভাসে যেমন, জানলার বাইরেও তেমন সমুদ্র, ঢেউয়ের পরে ঢেউ আছড়ে পড়ছে সৈকতে। দূরে দূরে নৌকো, জাহাজও দেখা যাচ্ছে। সমুদ্রের ধারে মেলার মতো ভিড়। বড়া পাও, পাপড়ি চাট, কুলফির পসরা। ঘোড়া নিয়ে দর কষাকষি। বেলুন কিনে দেবার জন্যে বাচ্চাদের মার হাত ধরে ঝুলোঝুলি। জানলা দিয়ে দৃশ্যটা দেখে তাঁর হাত ক্যানভাসের ওপর থমকে গেল। ছোটোবেলায়, খুব ছোটোবেলায়, মা তাঁর হাত ধরে জুহু বিচে নিয়ে আসত। কিন্তু সেটা বিকেলে বা সন্ধেবেলা নয়, খুব ভোররাতে। কার কাছ থেকে শুনেছিল নামিদামি ফিল্ম স্টার আর প্রডিউসাররা একটু নির্জনতার জন্যে নাকি এই সময়টা হাঁটতে আসে বিচে। মা আসত তাদের এক ঝলক দেখার জন্য নয়, ফিলমে একটা ব্রেক পাওয়ার জন্য। মা তখনও ভাবত, আগের মতোই সুন্দরী আছে, একটা, জাস্ট একটা ব্রেক পেলেই মাকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হবে না। তখন জুহুতেই তাদের বিরাট বাংলো, বিদেশি গাড়ি, সুববু বিদেশে পড়াশোনা করবে। মা তাকে সুববু বলে ডাকত। বাবা-ই সুববু ডাকতে শুরু করেছিল প্রথম থেকে, বাবার দেখাদেখি মা। শুভলক্ষ্মী থেকে সুববু। শুভলক্ষ্মী নামটা অবশ্য সিনেমায় চলেনি। মেহেরা সাবের কথাটা এখনও কানে বাজে ‘ম্যায় কেয়া মইথোলজিকাল ফিল্ম বানাউঙ্গা যাঁহা হিরোইন কা নাম শুভলক্ষ্মী হোগা। আরে মেরে ফিল্ম মে তো তুমকো বিকিনি ভি পেহননা হোগা। বিকিনি অউর শুভলক্ষ্মী –নেহি চলেগা। তুমহারা নাম রাখা হু কায়রা, ভেরি সেক্সি নেম, তুমহারি তরহা’

এইভাবে শুভলক্ষ্মী নামটা হারিয়ে গেলেও সুববু রয়ে গেল সারাজীবন। বাবার ওই একটাই জিনিস মা ফেলে দেয়নি কখনও। শুধু সুববু নামটা নয়, সুববুও তো বাবারই দান। বাবা বলে যে লোকটাকে জানেন তিনি, ফর্ম ভরার সময় কতবার লিখতে হয়েছে, শিবদাস আয়েঙ্গার। সেই শিবদাস একটা নয়, দু দুটো সন্তান দিয়েছিল ললিতাকে। জন্মের কয়েক মাসের মধ্যে চলে গিয়েছিল প্রথম সন্তান, সুববুর দাদা। তার নাম রাখা হয়েছিল শিবললিত, শিবদাসের শিব আর ললিতার ললিত মিশিয়ে তৈরি সে নাম। শিবললিতকে সুববু দেখেনি, সে আসার আগেই চলে গিয়েছিল সেই ছেলে, আর সুববু হবার বছর খানেকের মধ্যে বাবা চলে গেল। মারা যায়নি, অন্য একটা মেয়ের সঙ্গে ভেগে গেল। মা বলত মরে গেলেই ভালো হতো এর চেয়ে। বাবা কিন্তু মরেনি। সেই শীলা বলে মেয়েটাকে ছেড়ে একটা কোংকনী মেয়ের সঙ্গে থিতু হয়েছিল শেষমেশ। লুকিয়ে লুকিয়ে দেখা করতে আসত সুববুর সঙ্গে স্টুডিওয়। টাকা চাইত না, কিচ্ছু না। শুধু সুববু বলে ডেকে মাথায় হাত রাখত আর বলত নিজের টাকা পয়সার খেয়াল রাখতে, ললিতার ওপর সব ছেড়ে না দিতে।

সমুদ্রে আরও একটু নীল রং দিতে দিতে তাঁর আজ হঠাৎ মনে হল, বাবার বদলে মা যদি তাকে ছেড়ে চলে যেত, তাঁর জীবনটা একদম অন্যরকম হতো। পালিয়ে যাবার মতো আশিক তো কম ছিল না মা-র জীবনে। কিন্তু মা তাদের কাউকে চাইত কি আদৌ? ফিল্ম ছাড়া মার মাথায় কোনওদিন কিছু ছিল না। তাই অন্ধকার বিচে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকত একটা ব্রেকের আশায়। সুববুকে একা রেখে যেতে হবে বলে সঙ্গে নিত। আর তাই অতো ছোটোবেলাতেও সুববু বুঝে গেছিল, সাধারণ চোখে যা সুন্দর লাগে, ফিল্ম লাইনে তার কোনও দাম নেই। শরীরের ধকটাই আসল এখানে আর কচ্চি কলি হলে তো কোনও কথাই নেই।  সুন্দরী হলেও তখন মা-র শরীরে এসব কোনওটাই ছিল না। দু দুটো বাচ্চার জন্ম, অভাব, নিত্য অশান্তি মা-র সব গ্ল্যামার কখন যে শুষে নিয়েছিল, মা বুঝতে পারেনি। অথচ সুববু, তখন মাত্র তিন-চার বছরের মেয়ে হলেও বুঝতে পেরেছিল মা কোনওদিন সিনেমায় চান্স পাবে না, বুঝে গিয়েছিল মার মুখের দিকে ছুড়ে দেওয়া লোকজনের উপেক্ষিত দৃষ্টি দেখে। ওইসময় কাঁচা ঘুম ভাঙ্গিয়ে নিয়ে যেত বলে এমনিই তার ভালো লাগত না। আরও খারাপ লাগত তখন কোনও বেলুনওলা থাকত না বলে। সে মনে মনে চাইত মা তাকে বিকেলে বা সন্ধের সময় বেড়াতে নিয়ে যাক, আর পাঁচটা বাচ্চার মতো সে যখন বেলুনের জন্য বায়না করতে পারে। বেলুন পায়নি সত্যি, কিন্তু সিনেমায় রোল পেয়েছিল। মার কোলে থাকা তার গাল টিপে একজন প্রডিউসার বলেছিল তার পরের ফিল্মে এইরকম একটা বাচ্চার রোল আছে, ললিতা কি দেবে তার বাচ্চাকে?

তুলি থামিয়ে তিনি বাইরের দিকে তাকালেন। মুম্বাইতে আটটার আগে সন্ধে নামে না। আকাশে এখনও অনেক আলো, সমুদ্র কি তীব্র নীল, হাওয়ায় একগোছা বেলুন উড়ছে। সব, সব আগের মতো আছে। শুধু তাঁর জীবনটাই এমন ঘেঁটে গেল কেন?

ফোনটা বাজছে। ঠিক বাজছে না, কাঁপছে। ভাইব্রেশনে দেওয়া আছে।  আওয়াজটা শুনবেন না বলে ভাইব্রেশনে দিয়ে রেখেছেন। খুব মৃদু সরোদ বাজছে সাউন্ড সিস্টেমে। এ রাগটা তিনি চেনেন, মারুবেহাগ। ভালোবাসার রাগ। আগে চিনতেন না কোনটা মারুবেহাগ, কোনটা দেশ, কোনটা কেদার। অবিনাশ চিনিয়েছে। ভালোবাসার রাগ থেকে ভালবাসা –সব। ওই শিখিয়েছে কাজের সময় ক্লাসিকাল ইন্সট্রুমেন্টাল চালিয়ে রাখতে, এতে নার্ভ ঠান্ডা থাকে, কাজে মন বসে, স্ট্রেস কমে। স্ট্রেসের কারণগুলো জীবন থেকে ছেঁটে ফেলবেন বলেই তো এই স্টুডিও অ্যাপার্টমেন্টে এসে উঠেছেন, রং তুলি গান আর খুব দরকারি জিনিসগুলো নিয়ে। এখন অনেকটা পথ পেরিয়ে এসে বুঝতে পারছেন, জীবনে কোন কোন জিনিসগুলো সত্যি দরকারি। সারাজীবন তো মা চালিয়েছে, মা ঠিক করে দিয়েছে সব। নিজের সত্যি কী দরকার, কাকে দরকার, বুঝতেই পারেননি।

মা যখন আর পারল না, প্যারালিসিসে শরীরের ডান দিকটা, এমনকী কথা বলার ক্ষমতাও নষ্ট হয়ে গেল, ততদিনে তো ভিকি মালহোত্রা তাঁর জীবনে এসে গেছে। মার বদলে ভিকি ঠিক করত সব তাঁর জন্য। ছবি সাইন করা থেকে পার্টির পোশাক, ডায়েট চার্ট থেকে জিম রেজিম– সব। ওর ওপর নির্ভর করতে শুরু করেছিলেন তিনি কিন্তু তার থেকেও বড়ো কথা, ভিকির জীবনটাই তাঁকে ঘিরে আবর্তিত হতে শুরু করেছিল। সেটা এতটাই যে ও নিজের ১৪ বছরের বিবাহিত বউ, ফুটফুটে দুই ছেলেমেয়ে সবাইকে ছেড়ে তাঁর সাথে লিভ ইন করতে শুরু করল।

মা তখন উঠতে পারে না, কথা বলতে পারে না কিন্তু বুঝতে তো পারে সব কিছু। নিজের মেয়ে এভাবে হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে, সেটা সে একেবারেই মেনে নিতে পারছিল না। ওষুধ না খেয়ে, খাবার না খেয়ে, নানাভাবে জেদ অশান্তি করে সে প্রতিবাদ জারি রেখেছিল। বাধ্য হয়ে মাকে ছেড়ে অন্য একটা ফ্ল্যাটে, মার চোখের আড়ালে থাকতে শুরু করলেন ভিকির সঙ্গে। সমাজ, তারকাদেরও সমাজ থাকে একটা, সেখান থেকে চাপ আসছিল। সবাই ভাবছিল কায়রার মাথা খারাপ হয়ে গেছে, নইলে কেউ ভিকি মালহোত্রার মতো ফ্লপ প্রডিউসারের সঙ্গে জড়ায়। ভিকি তো স্রেফ চেনে টাকা, আগের বউটাও তো রাইজিং স্টার ছিল, সনিয়া কপূর। ওর টাকা, শরীর, কেরিয়ার, সব ছিবড়ে করে এখন ভিকি কায়রার দিকে ঝুঁকেছে। এটাই ওর আসল ব্যাবসা, সুন্দরী নায়িকাদের সিঁড়ির মতো ব্যবহার করা। এমনিতে তো একটা সিনেমাও চলে না।

এসব বিষে মুম্বাইয়ের বাতাস ভারি হচ্ছিল যখন, ঠিক তখনই তিনি ভিকিকে বিয়ে করলেন। আর বিয়ের দিন রাতে, মা চলে গেল। সেটাও নিঃশব্দে নয়, মেয়ের উপেক্ষার প্রতিশোধ মা নিল সুইসাইড করে। একজন প্যরালিসিস মহিলা কীভাবে এত স্লিপিং পিল জোগাড় করতে পারে– সেটা নিয়ে গুজগুজ ফুসফুস চলতে চলতে পুলিশ পর্যন্ত পৗঁছোল। বলা হল পথের কাঁটা সরিয়ে দেওয়ার জন্য মাকে ঠান্ডা মাথায় খুন করেছে কায়রা আর ভিকি। খুন করার হলে মাকে তো অনেক আগেই খুন করা উচিত ছিল তাঁর। করতে পারলে জীবনটা অনেক সুন্দর করে বাঁচা যেত। তাঁর জীবনের প্রথম, হয়তো একমাত্র প্রেমকে ওভাবে গলা টিপে মারতে হতো না। শাওন কুমার, আসল নাম শ্রাবণ মুখার্জি, বাংলার ছেলে, তীব্র ভাবে চেয়েছিল তাঁকে। পুণের এক মন্দিরে গোপনে বিয়েও হয়ে গিয়েছিল তাঁদের মালা বদল করে, মা ঠিক জেনে গেল। গুন্ডা বাহিনী নিয়ে হাজির হল মন্দিরে, শাওনকে খুনই করত, কায়রা মা-র হাতে পায়ে ধরে, বিয়ে ভাঙার প্রমিস করে শাওনকে বাঁচান। শাওন সেই নবলব্ধ জীবন নিয়ে আর তাঁর দিকে ফিরেও তাকায়নি, তিনি নানাভাবে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেছেন। শাওন ফোন ধরেনি, দেখা হলে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে।

এক, সব পুরুষ এক। মেয়েদের মন ওরা বোঝে না। ওরা জানে শুধু মেয়ে-শরীর আর নিজেদের ইগো। মার মৃত্যু নিয়ে অনেক জল ঘোলা হয়েছিল। নীচ থেকে ওপর সবার মুখ বন্ধ করতে অনেক টাকা খসল, অনেক টেনশন ছুটোছুটি। বিয়ের প্রথম বছরটা এইভাবেই কেটে গেল। যেই ভাবতে শুরু করলেন এবার একটু থিতু হয়েছেন, ভিকির ভালোবাসায় বাকি জীবনটা শান্তিতে কেটে যাবে, তখনই ভিকি স্বমূর্তি ধরল। মদ, উঠতি নায়িকাদের কাজের টোপ দিয়ে ফস্টিনস্টি, সবই তাঁর টাকায়। বাধা দিলে অকথ্য গালাগাল, এমনকী মারধোর।

কিন্তু এত ঝড়ঝাপটার কোনও প্রভাব কায়রার কাজে পড়েনি। মা তার চারপাশে কেমন একটা বায়ুনিরোধক বর্ম তৈরি করে গেছিল, সেটা খুব কাজে লেগেছে সারাজীবন। এই যে এখন কোলাবার বাড়ি থেকে বেরিয়ে একা রয়েছেন, এখান থেকেই শুটিং-এ যাচ্ছেন। এখন তো বেছে বেছে ছবি করা। খুব পাওয়ারফুল চরিত্র পেলে তবেই করেন। সেসব নিজেই সামলে নিচ্ছেন। কিন্তু ভিকির সঙ্গে আর নয়।  এনাফ ইজ এনাফ। শুধু মেয়েটার জন্যে বুকের মধ্যে চিন চিনে ব্যথা। এই মেয়েকে আঁকড়েই তো ভিকির সঙ্গে কাটালেন এতগুলো বছর। কিন্তু আর নয়।

ফোনটা আবার কাঁপছে, চিংকি, তাঁর মেয়ে ফোন করছে। ওর ভালো নাম তিনিও রেখেছেন শুভলক্ষ্মী, তাঁর সেই হারিয়ে যাওয়া নামটা। নামটা যেন তাঁর উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া কোনও দামি গহনার মতো, যা কেবল একজনের হাত থেকে আরেকজনের হাতে চলে যাবে, কিন্তু ব্যবহার হবে না। কারণ তিনি  জানেন এই নামটাও বদলে যাবে, চিংকিও সিনেমায় নামছে যে। ওর বাবারই বিশেষ আগ্রহ। এতদিন কায়রার পয়সায় খেয়েছে, এবার কায়রার মেয়ের পয়সায় খাবে।

চিংকিকে অনেক বুঝিয়েছেন তিনি, বলেছেন তাঁর সঙ্গে বেরিয়ে আসতে। মেয়ে আসেনি। এখন কেন ফোন করছে? মাকে কীসের দরকার?

অবিনাশ বলেছিল আসবে দেখা করতে। তিনি বারণ করেছেন। অবিনাশকে দেখলে তিনি নিজেকে ধরে রাখতে পারবেন না। আর এই বয়সে সে ধাক্বা সামলাতে পারবেন? কিন্তু এখন মনে হচ্ছে অবিনাশকে ডেকে পাঠাবেন। ফোনটা তাঁকে খুব অস্থির করে দিয়েছে। অবিনাশকে সব বলা দরকার।

চিংকির ডেবিউ এ বছর শেষের দিকে, ওর অপোজিটে আছে শাওনকুমারের ছেলে অঙ্কিত। তাঁর আদৗ ইচ্ছে ছিল না চিংকি সিনেমায় নামুক। তিনি চেয়েছিলেন ও আগে পড়াশোনাটা শেষ করুক। সেই ৪ বছর বয়স থেকে তিনি লাইট ক্যামেরা অ্যাকশন শুনে আসছেন, এই ইন্ডাস্ট্রির হাড়ে হদ্দ জানেন। তাঁর কাছে খিদে একটা মোটিভেশন ছিল, কাজ না পেলে না খেয়ে মরতে হবে। চিংকির সামনে তো তা নেই, ওর মতো নরম আদুরে মেয়ে এই লাইনের ওঠাপড়া নিতে পারবে না। এই নিয়েই ভিকির সঙ্গে খিটিমিটি শুরু তাঁর। তাও হয়তো মেনে নিতেন, যদি না অঙ্কিতের অপোজিটে কাস্ট করা হতো চিংকিকে। নিউ কামার পেয়ারদের নিয়ে ইন্ডাস্ট্রি নানা গসিপ বাজারে ছাড়ে ছবি হিট করাবার জন্যে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সেটা সত্যি হয়ে যায়। রোমান্টিক সিন করতে করতে সত্যিকারের রোমান্সে জড়িয়ে পড়ে নতুন হিরো হিরোইন। হায় ভগবান! সেরকম যদি হয়! ওরা যে ভাইবোন!

মন্দিরে বিয়ের আগেই শাওনের সন্তান এসেছিল তাঁর গর্ভে। মা যখন সব শেষ করে দিল, তখন জেদ করে শাওনের সন্তানকে অ্যাবর্ট করেননি কায়রা, আর সেই খবরটা শাওনের  নিঃসন্তান স্ত্রী রিতার কানে পৌঁছোয়। এক দুপুরে রিতা এসে তাঁর কাছে প্রায় ভিক্ষে চায় অনাগত সন্তানকে। তাঁকে বোঝায় একে বড়ো করে তুলতে গেলে সমাজ তাঁর বিরুদ্ধে থাকবে চিরকাল, তার থেকে শাওন আর রিতার বৈধ সন্তান হিসেবে বড়ো হোক সে। তিনি রাজি হয়ে যান, এর থেকে ভালো লালন তিনি কি দিতে পারতেন? সমস্ত পৃথিবী জানে অঙ্কিত শাওন আর রিতার ছেলে। শুধু তাঁরা তিনজন ছাড়া। আর মা জানত। ভিকিও না। জানলে হয়তো ওকে বোঝানো যেত।

চিংকি ফোন করে বলল ‘মা, আজ পার্টিতে কী পরে যাব?’ সেই আদুরে গলা। এমনভাবে বলছে যেন কিছুই ঘটেনি, তিনি চলে আসেননি বাড়ি ছেড়ে। শুনে গলে যাচ্ছিলেন, হঠাৎ মন কু গাইল ‘কীসের পার্টি রে সপ্তার মাঝে?’

‘অঙ্কিত থ্রো করছে মা, প্রাইভেট পার্টি’

‘না’

‘কি না?’

‘ওখানে যেও না সোনা, আগে ছবি রিলিজ করুক, প্লিজ মার কথা শোনো, প্লিজ চিংকি’

‘কিন্তু মা’

‘কোনও কিন্তু না মা’।

‘আচ্ছা মা তুমি বারণ করলে যাব না কিন্তু একটা ফোন বারবার আসছে দুবাই থেকে, একটা ওয়েডিং রিসেপশনে এক নাইট অ্যাপিয়ারেন্স। হিউজ পে করবে’। থরথর করে কেঁপে উঠল শরীর। দুবাই, ওয়েডিং রিসেপশন, এক নাইট অ্যাপিয়ারেন্স– এই শব্দগুলো ভীষণ চেনা। সারাজীবন কতভাবে মোকাবিলা করতে হয়েছে এগুলোকে। ভীষণ মা-র অভাব বোধ করলেন এই মুহূর্তে। মা বাঘিনীর মতো আগলে রাখত তাঁকে। আর তিনি এই সময় কেন যে চলে এলেন মেয়েটার পাশ থেকে? আসলে ভিকিকে আর সহ্য করা যাচ্ছিল না। ও মেয়েটাকে শেষ করে দেবে। কে জানে ওই হয়তো ডিল করছে। পিম্প!

তিনি শক্ত গলায় বললেন ‘সোনা, যা বলছি মাথা ঠান্ডা করে শোনো। এখন কোনও পার্টিতে যেও না, যেই ডাকুক। আর ওই নম্বরটা দাও। লিখে নিচ্ছি’ নম্বরটা লিখে অবিনাশকে ফোন করলেন কায়রা।

সাদা ফুলে ঢাকা গাড়িটা জনসমুদ্রের মধ্যে দিয়ে এগিয়ে চলেছে। পেছনের গাড়িতে কালো চশমায় চোখ ঢাকা চিংকি ভাবছিল মাকে এত লোক ভালোবাসত? মা তো সে হওয়ার পর দীর্ঘদিন কোনও ছবি সাইন করেনি, কিন্তু বারো বছর পরে যখন করল, সে ছবি সুপার ডুপার হিট। কী একটা যেন ছিল মার মধ্যে। যেমন অভিনয়, তেমনি সৌন্দর্য। সেই মা মাত্র পঞ্চান্ন বছরে চলে গেল! মেনে নিতে পারেনি ফ্যানেরা। একজন নাকি সুইসাইড করেছে। আচ্ছা, মা কি কিছু দেখতে পাচ্ছে? তাকে ঘিরে এই উন্মাদনা? এত লোকের ভালোবাসা? যাকে এত লোক ভালোবাসত, সে ভালোবাসত তাকে, শুধু তাকে?

কেমন অবিশ্বাস্য লাগে, অথচ কথাটা সত্যি। তাকে বাঁচাতেই তো চলে গেল মা। ওই অদৃশ্য হাতের বিরুদ্ধে আঙুল যেই তুলবে, তাকেই সরিয়ে দেওয়া হবে। অবিনাশ আংকল বলেছে সব তাকে। বাথটবে পড়ে থাকা নিস্পন্দ শরীর কাটাছেঁড়া করে কী পাওয়া গেছে, সেই তথ্য আর কখনও সামনে আসতে দেওয়া হবে না, চিংকি জানে। আর শুধু দুবাই কানেকশন নয়, তার বাবা লোকটা, মানে ভিকি মালহোত্রা এর মধ্যে আছে। নইলে এত তাড়াতাড়ি ওরা মা-কে মেরে ফেলতে পারত না। অবিনাশ আংকল তাকে বলেছে ‘তোমার মার শেষ ইচ্ছে শুধু সাদা ফুল নয়। তুমি জানো কায়রা চায়নি তুমি সিনেমায় নামো। কিন্তু সে জানত একবার ঢুকলে এখান থেকে বেরনো অসম্ভব, অনেকটা বাঘের পিঠে চড়ার মতো। তাই সে বারবার বলেছে চিংকি যেন নিজের জীবনের সিদ্ধান্ত নিজে নেয়, কারও হাতের পুতুল হয়ে না থাকে।’

চিংকি চোখের জল মুছে মোবাইলে একটা ফোন করে। যাকে ফোন করছে, সে ঠিক তার পেছনের গাড়িতে সাদা পাঞ্জাবি পাজামায় আপাদমস্তক শোকের প্রতিমূর্তি হয়ে বসে আছে। সমস্ত মিডিয়ায় বিবৃতি দিয়ে চলেছে সে কতটা শোকার্ত কায়রাকে হারিয়ে। চিংকি ওর শোকের বুদবুদ এক লহমায় ফুটো করে দেয় একটা কথা বলে।

‘আপ মম কি ফিউনারেল মে না জায়ে তো আপকো  লিয়ে আচ্ছা হোগা। সবাই জেনে গেছে মম কীভাবে মারা গেছে। পাবলিক খুব ফিউরিয়াস হয়ে আছে। তোমাকে  ওরা ছাড়বে না।’

সেদিন চ্যানেলে চ্যানেলে চর্চার বিষয় ছিল কায়রার শেষযাত্রায় ভিকির অনুপস্থিতি। মুখাগ্নির সময় চিংকির সঙ্গে অঙ্কিতও কেন এগিয়ে এসেছিল, সেটা নিয়েও জল্পনা কল্পনা চলছে। এটাও কি নতুন ছবির প্রমোশানের মধ্যে পড়ে? খানিকটা দূরে বসে থাকা অবিনাশের মনে হচ্ছিল, কায়রাকে কি এতদিনে একটু শান্তি দিতে পারল? আর ওই জনসমুদ্র, কলরব থেকে অনেক অনেক দূরে সমুদ্রের ধারে এক বৃদ্ধ, একা একা, একটার পর একটা রঙিন বেলুন আকাশে উড়িয়ে চলেছিলেন, আর বিড়বিড় করে কীসব বলছিলেন। কেউ যদি কান পাতত, তবে শুনতে পেত ‘সুববু, শুভলক্ষ্মী, মা আমার, তুই ছোটোবেলায় যে বেলুনগুলো ওড়াতে চেয়েছিলি– নীল লাল, হলুদ, ববি প্রিন্ট– সমস্ত বেলুন তোর সঙ্গে দিয়ে দিলাম। এদের সঙ্গে তুই  মনের আনন্দে  উড়ে যা।’

পড়ার জন্য সীমাহীন গল্প-নিবন্ধসাবস্ক্রাইব