পেরেন্টিং টিপ্স

এই ব্যস্ততার দিনকালে মা-বাবা কিংবা বাচ্চারা কারওই সময় নেই দুদণ্ড বসে কোয়ালিটি টাইম শেয়ার করার।সাপ্তাহিক ছুটির অবসরটাকে কাজে লাগান বন্ডিং তৈরিতে। সন্তানের সঙ্গে বাড়তে থাকা দূরত্ব কমিয়ে ফেলার এমন সুযোগ আর হয় না। মনে রাখবেন মা-বাবার সঙ্গ প্রত্যেক বাচ্চার কাম্য। তারা সবচেয়ে বেশি কমফর্টেবল থাকে মা-বাবার সঙ্গে সময় কাটানোর সময়টাতে। তাই বন্ডিং টাইম-টাকে কাজে লাগিয়ে সন্তানের মানসিক নির্ভরতার আধার হয়ে উঠুন। আপনি সমস্ত অ্যাটেনশন দিয়ে বাচ্চাকে আগলে রাখলে, সেও ইমোশনালি এবং ফিজিক্যালি অনেক নিশ্চিন্ত বোধ করবে। এটাই তার মানসিক ভাবে ভালো থাকার রসদ জোগাবে।

কী করবেন?

  • প্রত্যেকদিন একটা নির্দিষ্ট সময় বের করে নিন, যখন সন্তানের সঙ্গে সময় কাটাবেন। এই সময়টায় দুজনে একসঙ্গে গান শুনুন বা দাবা খেলুন। কোনও গল্প পড়েও শোনাতে পারেন বাচ্চাকে
  • একটা ছোট্ট ডায়ারি তৈরি করুন। আপনার সন্তানের ছোটোখাটো কোনও কৃতিত্বের ঘটনা ঘটলে, দু-চার লাইন সেখানে লিখে রাখুন। যদি জীবনের কোনও পর্যায়ে সন্তান ডিমোটিভেটেড হয়ে পড়ে, এই ডায়ারি-টি তাকে মানসিক শক্তি জোগাবে
  • সকাল থেকে রাত— কী ভাবে সময় কাটাবে সে বিষয়ে বাচ্চার সঙ্গে বসেই আলোচনা করে নেওয়া যেতে পারে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই বাচ্চারা বেশ বুদ্ধিমান। তাদের সম্পূর্ণ পরিস্থিতি বুঝিয়ে বললে তারা ঠিকই বুঝতে পারবে।
  • এখনকার বাচ্চাদের মধ্যে বই পড়ার অভ্যাস খুব কমে গিয়েছে।আপনার ছুটির দিনে ওদের বই পড়ার অভ্যেস গড়ে তোলার চেষ্টা করুন। বই পড়ার অভ্যাস না থাকলে কোনও ভালো গল্প পড়ে শোনান, কিন্তু সম্পূর্ণ করার আগেই থেমে যান। সন্তানকে বলুন বাকি অংশ ও যেন আপনাদের পড়ে শোনায়। শিশুসাহিত্যিকদের লেখা একটা করে গল্প পড়ে শোনানোর ফলে মাতৃভাষার প্রতি ধীরে ধীরে আগ্রহও বাড়বে।
  • আপনার ল্যাপটপ বা ডেস্কটপ-এ সন্তানের সঙ্গে সেরা মুহূর্তগুলির ছবির অ্যালবাম সেভ করে রাখুন। খুব মন খারাপের দিনগুলোয় যাতে সে ওগুলো দেখে আনন্দ পায়
  • মা-বাবা কেয়ার করে তার জন্য, এই ভাবনাটুকুই সন্তানকে বাইরের নানা অপ্রীতিকর পরিস্থিতির সঙ্গে মোকাবিলা করতে সাহায্য করে। তাই ওর মনের ইনসিকিয়োরিটি দূর করতে, খারাপ-ভালো পরিস্থিতিতে ওর পাশে থাকুন
  • সন্তানের ছোটো ছোটো সাফল্য সেলিব্রেট করুন
  • প্রতিদিন ডিনারটা একসঙ্গেই করুন, যাতে সারাদিন সে কী করল তা শেয়ার করার সুযোগ পায়
  • অতিরিক্ত শাসন না করে তার সমস্যাগুলো বোঝার চেষ্টা করুন। এতে সমাধানের পথ খুঁজতে পারবেন।

নির্জনতার রাজাভাতখাওয়া-রসিক বিল

রাজাভাতখাওয়া

ডুয়ার্স-এর সবুজের মায়াময় আকর্ষণ আপনাকে ছুটিয়ে নিয়ে যাবে এই ডেস্টিনেশন রাজভাতখাওয়ায়। ভুটানের রাজা ও কোচবিহারের রাজার মধ্যে একসময় সামরিক চুক্তি সাক্ষরিত হয়েছিল। তারপর এই স্থানে দুই রাজাই বসে ভাত খেয়েছিলেন। তারই প্রেক্ষিতে জায়গার নামকরণ। বস্তুত বক্সা অভয়ারণ্যের গেটওয়ে এই জায়গাটি।

অতীতে রাজভাতখাওয়া ও জয়ন্তীর রমরমা ছিল ডলোমাইট ব্যাবসার জন্য। সে সব অবশ্য ইতিহাস। এখন ডুয়ার্স পর্যটনের মানচিত্রে একটি উজ্জ্বল জায়গা হয়ে উঠেছে রাজভাতখাওয়া ও বক্সা। জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে রেলপথ। পাশে ছোট্ট জনপদ। প্রকৃতির কোলে যেন এক শান্তির ঠাঁই।

বক্সা জঙ্গলের বন্যপ্রাণ-কে জানতে ও চিনতে গড়ে তোলা হয়েছে প্রকৃতি পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র। রয়েছে অর্কিডের সংগ্রহশালা। আর জঙ্গলের নিবিড়ে রয়েছে একটি ওয়াচটাওয়ার। জঙ্গল যারা ভালোবাসেন, তারা অনায়াসেই প্রকৃতির সঙ্গে একটা উইকএন্ড ডেট করতে পারেন এই বক্সায়।

কীভাবে যাবেন : কলকাতা থেকে ট্রেনে আলিপুরদুয়ার। এখানে নেমে রাজভাতখাওয়া গাড়িতে বা বাসে ১৮ কিলোমিটার দূরত্বে।

কোথায় থাকবেন : বন দফতরের জঙ্গল লজ রয়েছে রাজাভাতখাওয়ায়। বুকিং করতে হবে সুবোধ মল্লিক স্কোয়ার-এ ফরেস্ট ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশনের অফিসে এসে।

travel Rasik Bill

রসিক বিল

 চারপাশে গ্লোবাল ওয়ার্মিং-এর জন্য যখন হইচই, তখন একটুকরো নির্জন সবুজ গেরস্থালি নিয়ে পর্যটকের অপেক্ষায় এই অপূর্ব জায়গাটি। নাম রসিক বিল। সিনচুলা পাহাড়ের পাদদেশে ১৭৫ হেক্টর জায়গা নিয়ে এখানে পাখিদের ঘরসংসার। যে-সব পরিযাযী পাখিরা হাজার হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে উড়ে আসত একসময়ে গ্লোবাল ওয়ার্মিং বদলে দিয়েছে তাদের উড়ালপথ। তবু কিছু পাখি এখনও আসে রকিক বিলে। বার্ড ওয়াচাররা তাই শীতকালে মিস করেন না এই নিরালা সফর।

অতীতে কোচ রাজাদের মৃগয়াভূমি ছিল এই বিস্তৃত জলা।এখানে নৌকায় চেপে বার্ড ওয়াচিংয়ের মজাই আলাদা। পিনপতন নৈশব্দ, বুক ভরা অক্সিজেন আপনার মন ও শরীরকে নিমেষে রিজুভিনেট করে দেবে।

শীতের আমেজ পুরোপুরি চলে যাওয়ার আগে,ঘুরে যান এই বনস্থলি থেকে৷ সঙ্গে আনবেন বাইনোকুলার৷ আর সেলিম আলির পাখি বিষয়ক বইটি থাকলে তো কথাই নেই। এক এক করে ক্যামেরায় ধরা দেবে নানা চেনা-অচেনা পাখি। নীলডোবা, বোচামারি, রায়চাঙ্গমারি, শাঁখাডাঙা হয়ে রসিক বিলে পেঁছে যাবেন। ভাসতে ভাসতেই চোখে পড়বে খুন্তি বক, বেলে হাঁস, সঙ্গে পরিযাযী পাখিদের ঝাঁক।

পাখি দেখার ফাঁকে, বোচামারির বিলে, প্রকৃতিবীক্ষণকেন্দ্রটিও দেখে নেবেন। এছাড়া ছোটোদের জন্য পার্ক আর অ্যাকোরিয়ামও আছে। পাখি দেখা যায় সকাল ৮-টা থেকে বিকেল ৫-টা অবধি।

কীভাবে যাবেন : শিয়ালদহ থেকে ট্রেনে নামুন আলিপুরদুয়ার। বাসে বা গাড়িতে ২৪ কিলোমিটার পথ পেরোলেই রসিকবিল।

কোথায় থাকবেন : রসিকবিলে থাকার জন্য বন দফতরের কটেজ আছে। বুকিংয়ের জন্য যোগাযোগ করুন ৬-এ, সুবোধ মল্লিক স্কোয়ার-এ। ফোন : ২২৩৭-০০৬০।

 

আলাদা স্বাদের নুডল্স

সাধারণ ভাবে তৈরি করা নুডল্স তো আমরা সকলেই খাই৷ কিন্তু স্বাদবদল করতে কার না ইচ্ছে হয়৷ তাই একটু আলাদা স্বাদের নুডল্স  পরিবেশন করছি আমরা৷ পেটভরা জলখাবারের মজাই এবার আপনার পরিবারের খুশির কারণ হয়ে উঠবে৷

রাইস নুডল্স উইথ কোকোনাট মিল্ক

উপকরণ : ১/২ কাপ কোকোনাট মিল্ক, ১ কাপ রাইস নুডল্স সেদ্ধ করা, ১ কাপ মিক্স ভেজিটেবল্স অর্থাৎ বিন্স, গাজর, ফুলকপি, ক্যাপসিকাম, পেঁয়াজ শাক, টম্যাটো মিহি করে কুচি করা, ১টা কাঁচালংকা কুচোনো, ১ চামচ টম্যাটো পিউরি, ১/৪ ছোটো চামচ পাস্তা মশলা, ২ ছোটো চামচ তেল, নুন স্বাদমতো।

প্রণালী : কড়ায় সাদা তেল গরম করে সবজিগুলি ভেজে নিন। নরম হলে নুন ও লংকাকুচি দিন। তারপর টম্যাটো পিউরি দিয়ে ভালো ভাবে নাড়াচাড়া করুন। এর উপর কোকোনাট মিল্ক ঢেলে দিয়ে তারপর পাস্তা মশলা ছড়িয়ে দিন। ঢিমে আঁচে একটু রান্না হতে দিন। তারপর সেদ্ধ নুডল্স দিয়ে ভালো ভাবে মিক্স করুন। মিশে গেলে নামিয়ে গরম গরম পরিবেশন করুন।

One Pan Noodles recipe

ওয়ান প্যান নুডল্স

উপকরণ : ১ প্যাকেট নুডল্স, ১ বড়ো চামচ লাল, হলুদ ও সবুজ ক্যাপসিকাম কুচোনো, ১টা রাঙাআলু মিহি করে কুচোনো, ২ বড়ো চামচ কড়াইশুঁটি, ৫-৬টা ফ্রেঞ্চ বিন্স, ১টা পেঁয়াজ টুকরো করা, ২-৩টি বাঁধাকপির পাতা কুচি করা, ১টা টম্যাটো, ১ বড়ো চামচ সাদা তেল, ৫০ গ্রাম পনির।

প্রণালী : একটা কড়ায় তেল গরম করে পেঁয়াজ, ক্যাপসিকাম, রাঙাআলু, ফ্রেঞ্চ বিন্স, বাঁধাকপি, কড়াইশুঁটি দিন। অল্প নুন ছড়িয়ে নাড়াচাড়া করে নরম হতে দিন। টম্যাটো ও কাঁচালংকা মিক্সিতে পেস্ট করে নিন। সবজি নরম হয়ে এলে এর উপর টম্যাটোর গ্রেভিটা ঢেলে দিন। প্রয়োজনমতো জল দিয়ে ১-২ মিনিট রান্না করুন। পনিরের টুকরো ঢেলে দিন। এবার সেদ্ধ নুডল্স দিয়ে নাড়াচাড়া করে নামিয়ে নিন। গরম গরম পরিবেশন করুন।

শুধু মহিলারাই কেন?

নিয়ম শৃঙ্খলা বলবৎ করে সরকার চালানো মোটেই সহজসাধ্য নয়। এটা কোনও মন্ত্রবলেই সম্ভব নয় যে একবারে রাতারাতি সব অপরাধ বন্ধ হয়ে যাবে, কিংবা অপরাধের উপর নিয়ন্ত্রণ তৈরি করে ফেলা যাবে। এত বড়ো দেশ আমাদের। সেখানে প্রতিটি জিনিসের প্রতি শ্যেন দৃষ্টি রাখলেও, সবসময় সফল ভাবে পরিচালনা করা যায় না প্রশাসনিক কাজকর্ম।

সরকার সঠিক ভাবে পরিচালনা তখনই করা যাবে যখন অলস সরকারি কর্মচারী, আইন কানুন ও আদালতের গাফিলতির বিষয়গুলি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রিত হবে। যে-কোনও দিন কাগজ খুলুন, ভুরি ভুরি ধর্ষণের মামলার খবর নজরে পড়বে। এগুলি সেই মামলা যাতে কিনা শুধু মহিলাদের উপরেই নয়, কিশোরী ও শিশুকন্যাদের উপর হয়েছে অমানুষিক অত্যাচার। এগুলি সেই মামলা যেখানে অন্যায়ের শিকার হওয়া মেয়েটি কিংবা তার পরিবার, সমাজ সংসারের পরোয়া না করে অন্যায়ের ঘটনাটি পুলিশের খাতায় নথিবদ্ধ করেছিল।

সাধারণ মানুষ এখন জেনে গেছে খোদ আদালতও ন্যায়ের পক্ষে রায় দেয় না। উপর থেকে নীচের মহল অবধি যেখানে টাকা কথা বলে, সেখানে কোন ন্যায়ের আশায় আদালতের দ্বারস্থ হবে মানুষ! মহিলারাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার হন দেশের এই কানুনি ব্যবস্থায়। একদিকে তারা যেমন তাদের উপর ঘটে যাওয়া অন্যায় সহ্য করতে বাধ্য হন, অন্যদিকে বাড়ির কোনও পুরুষকে যদি মিথ্যে মামলায় ফাঁসানো হয় তাহলে তো আদালতে ধর্না দিয়েই তার অর্ধেক জীবন কেটে যায়।

প্রতিদিন কাগজে যদি এত ধর্ষণ, রাহাজানি, খুন, কেপমারি প্রভতি অপরাধের খবর বেরোয়, তাহলে বুঝতে হবে সেই মামলাগুলোরও শুনানির তারিখ পড়ে। তাহলে সাক্ষ্য প্রমাণ পেয়ে রায় দিতে দিতে এত বিলম্ব কেন হয়? তার মানে এটাই বুঝতে হবে প্রভাবশালী আর অর্থবানদের অসাধু কার্যকলাপের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় কোর্ট। যার কাছে অর্থ ও ক্ষমতার জোর, সে-ই আদালতের উপর প্রভাব খাটিয়ে মামলা-মোকদ্দমাকে প্রভাবিত করে।

আজও গ্রামেগঞ্জে মহিলাদের পাশে দাঁড়ানো বা তাদের উপর হওয়া নির্যাতন রুখে দাঁড়ানোর মতো কেউ নেই। নারী স্বশক্তিকরণ বা নারি অধিকারের স্বপক্ষে গালভরা কিছু কথা আলোচনা হয় বটে বিভিন্ন সভা-সমিতিতে কিন্তু কার্যক্ষেত্রে তার প্রয়োগ ঘটতে বড়ো একটা দেখা যায় না।

অনেকটা সময় ল্যাপটপে চলে ক্লাস

ল্যাপটপ-এ দীর্ঘ সময় বসে কাজ করলে ল্যাপটপের থেকে কিছুটা দূরত্ব যেমন বজায় রাখা দরকার তেমনি মাঝে মাঝেই চোখে ঠাণ্ডা জলের ঝাপটা দেওয়াও খুব জরুরি।

 আমার ২২ বছর বয়স। ডিস্ট্যান্স এডুকেশনে পড়াশোনা করি৷ এৰ  জন্য  বাড়ি থেকে অনলাইন ক্লাস করার ব্যবস্থা রয়েছে। এর ফলে আমাকে ল্যাপটপ ব্যবহার করতে হচ্ছে। ক্লাসের পরেও গান বা সিনেমা দেখার জন্য মোবাইল আর ল্যাপটপ ব্যবহার করি। কিছুদিন হল চোখে সমস্যা বোধ করছি। মাঝেমধ্যেই চোখ জ্বালা করে ও ব্যথা অনুভব করি। এরকম কেন হচ্ছে এবং এর কী সমাধান?

আপনি যে যে সমস্যার কথা জানিয়েেন তাতে মনে হচ্ছে, আপনার ড্রাই আই সিন্ড্রোমের সমস্যা হচ্ছে। ল্যাপটপের স্ক্রিনের দিকে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকলে ড্রাই আই অর্থাৎ চোখে শুকনো ভাব অনুভত হয়।

এর ফলেই চোখ চুলকানো, ব্যথা, জ্বালা ইত্যাদি সমস্যার সূত্রপাত ঘটে। এই অবস্থায় চোখের চুলকানি দূর করতে আমরা জোরে জোরে চোখ রগড়াতে থাকি। এর জন্য সমস্যা আরও বেড়ে যায়। সত্যিই যদি সমস্যা থেকে মুক্ত হতে চান তাহলে মোবাইল এবং ল্যাপটপের ব্যবহার কম করুন, প্রয়োজন ছাড়া ব্যবহার করবেন না। ল্যাপটপে যখন কাজ করবেন তখন মাঝেমধ্যেই চোখ খোলা বন্ধ করবেন, মাঝে মাঝেই ব্রেক নিয়ে ল্যাপটপের সামনে থেকে উঠে যাবেন এবং অন্তত ২ ফুট দূরত্বে ল্যাপটপ রেখে কাজ করবেন।

ল্যাপটপের ব্রাইটনেস কম রাখবেন। কাজ শেষ হওয়ার পর চোখে ঠান্ডা জলের ঝাপটা দিন এবং খানিকক্ষণ চোখ বন্ধ করে রাখুন। এতে চোখে আরাম পাবেন। খাওয়াদাওয়ার খেয়াল রাখুন এবং বেশি করে জল খান।

 

 

ত্বকের সুরক্ষায় সানস্ক্রিন

সানস্ক্রিন সানব্লক ক্রিম, সানট্যান লোশন, সানবার্ন ক্রিম, সানক্রিম ইত্যাদিও বলা হয়। লোশন, স্প্রে অথবা জেল– এই তিন ধরনের হয় সানস্ক্রিন। সানস্ক্রিনের প্রধান কাজ হচ্ছে সূর্যের ক্ষতিকারক রশ্মি ‘আল্ট্রাভায়োলেট রে’ থেকে এটি ত্বককে সুরক্ষা প্রদান করে। আজকাল দেখা যাচ্ছে যেসব মহিলা সানস্ক্রিন ব্যবহার করেন না, তাদের ত্বকের ক্যানসার হওয়ার ভয় বেশি থাকে। নিয়মিত ভাবে সানস্ক্রিন লাগালে সহজে বলিরেখা পড়ে না এবং ত্বকে বলিরেখা পড়ে থাকলেও তা ধীরে ধীরে হ্রাস পেতে থাকে। যাদের ত্বক সূর্যের রশ্মির প্রতি বেশি স্পর্শকাতর, তাদের সানস্ক্রিন লাগানো  অত্যন্ত জরুরি।

এসপিএফ কী

এসপিএফ হল, আল্ট্রাভায়োলেট রশ্মি থেকে সানস্ক্রিনের মাধ্যমে ত্বককে যে সুরক্ষা দেওয়া হয় তারই মাপদণ্ড। ত্বকের যারা বিশেষজ্ঞ তারা এসপিএফ ১৫ অথবা এসপিএফ ৩০ লাগানোর পরামর্শ দেন। তাই বলে অতিরিক্ত এসপিএফ যে অতিরিক্ত সুরক্ষা দেবে, এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল।

সানস্ক্রিন না লাগালে কী ক্ষতি হতে পারে

যে-কোনও মরশুমেই সানস্ক্রিন লাগানো উচিত। বিশেষ করে গরমে লাগানোটা খুবই জরুরি। গরম মানেই ত্বকের যম, কারণ এই সময় ত্বকে নানা ধরনের রোগ হয়ে থাকে। এই মরশুমে, বেশিরভাগ মহিলা ত্বকে র‍্যাশ, ফোটো ডার্মাটাইটিস, অধিক ঘাম হওয়া, ফাংগাস এবং ব্যাক্টেরিয়ার সংক্রমণের সমস্যায় ভোগেন। গরমে খানিকক্ষণ রোদে থাকলেও সানট্যান এবং সানবার্নের মতো সমস্যা দেখা দেয়। এই মরশুমে ত্বকে ট্যানিং-এর সমস্যা খুবই স্বাভাবিক একটা সমস্যা। সুতরাং বাড়ি থেকে বাইরে বেরোতে হলে অবশ্যই সানস্ক্রিন লাগিয়ে বেরোনো উচিত।

যারা সানস্ক্রিন ব্যবহার করতে চান না তাদের ত্বক, সূর্যের রোদে সরাসরি এক্সপোজ হবার ফলে, খুব তাড়াতাড়ি কুঁচকে যায় ফলে অকালেই বলিরেখার শিকার হয়ে পড়ে ত্বক। আল্ট্রাভায়োলেট রে ত্বকের ক্যানসারের অন্যতম কারণও বটে।

কীভাবে বাছবেন সানস্ক্রিন

ত্বকের জন্য সঠিক সানস্ক্রিন বেছে নেওয়াটা খুব জরুরি। বেশিরভাগ মহিলাদের ক্ষেত্রে এসপিএফ ১৫-যুক্ত সানস্ক্রিন সবথেকে কার্যকরী। কিন্তু যাদের ত্বকের রং ফরসা, ফ্যামিলি হিসট্রি আছে স্কিন ক্যানসারের অথবা লুপুস-এর মতো অসুস্থতার কারণে সূর্যের রোদে ত্বক অত্যন্ত বেশি স্পর্শকাতর, তাদের এসপিএফ ৩০ অথবা তার থেকে বেশি এসপিএফ যুক্ত সানস্ক্রিন ব্যবহার করা উচিত। কেউ যদি ভাবে এসপিএফ ৩০-যুক্ত সানস্ক্রিন, এসপিএফ ১৫-র থেকে বেশি ভালো, তাহলে বলতে হবে তার ভাবনা ভুল। এসপিএফ ১৫, ৯৩ শতাংশ আল্ট্রাভায়োলেট রশ্মিকে ফিলটার করে আর এসপিএফ ৩০ সেই জায়গায় সামান্য বেশি অর্থাৎ ৯৭ শতাংশ ইউভিবি-কে ফিলটার করে।

স্কিন স্পেশালিস্টদের মতে দরকার না হলে এসপিএফ ৩০-যুক্ত সানস্ক্রিন লাগানো উচিত নয়। অনেকে এসপিএফ ৫০-যুক্ত সানস্ক্রিনও ব্যবহার করেন। কিন্তু বাজারে এমন কোনও সানস্ক্রিন পাওয়া যায় না যেটা ১০০ শতাংশ, ত্বককে ইউভি রশ্মি থেকে সুরক্ষা দেবে। সবসময় ভালো ব্র্যান্ডের সানস্ক্রিন ব্যবহার করা উচিত। যাদের বেশি ঘাম হয় তাদের ওয়াটারপ্রুফ্ সানস্ক্রিন ব্যবহার করা উচিত।

কীভাবে এবং কতটা লাগানো উচিত

সঠিক সানস্ক্রিন লাগিয়েও মনের মতো ফল পাওয়া যায় না যদি না রোজ সঠিক পদ্ধতি মেনে সানস্ক্রিন লাগানো হয়। লাগানোর কয়েকটি নিয়ম –

১)   রোদে বেরোবার ১৫ থেকে ৩০ মিনিট আগে সানস্ক্রিন লাগানো উচিত।

২)   মেক-আপ করার দরকার থাকলে, মেক-আপ করার আগে সানস্ক্রিন লাগাতে হবে।

৩)   খুব কম পরিমাণে সানস্ক্রিন লাগানো উচিত নয়।

৪)   শুধু মুখেই নয়, শরীরের যে অংশ পোশাকে ঢাকা থাকে না ত্বকের সেই অংশেও সানস্ক্রিন লাগানো উচিত।

৫)   দু’ঘণ্টা পরপর সানস্ক্রিন লাগানো উচিত।

৬)   এক্সপায়ারি ডেট ওভার হয়ে যাওয়া সানস্ক্রিন লাগানো উচিত নয় কারণ এর কার্যকরিতা নষ্ট হয়ে যায়।

সানস্ক্রিন সম্পর্কে ভুল ও সঠিক তথ্য

ভুল – সানস্ক্রিন লাগালে সানট্যান হয় না।

সঠিক – এসপিএফ ৩০ যুক্ত সানস্ক্রিন লাগালে সানবার্ন থেকে সুরক্ষা পাওয়া যায়। ভালো সানস্ক্রিন ইউভিএ এবং ইউভিবি রশ্মি থেকে ত্বককে বাঁচাতে পারে। কিন্তু দীর্ঘক্ষণ রোদে থাকতে হলে সানট্যানের সমস্যা হতে পারে।

ভুল – জলে সানবার্ন হয় না।

সঠিক – প্রচণ্ড গরমে জল শরীরকে ঠান্ডা করে। জলে ডুবে থাকা শরীর, সূর্যের আলো থেকে সুরক্ষিত থাকে, এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। বাস্তবে জল, সূর্যের রশ্মিকে প্রতিফলিত করে। এর ফলে জলে ডুবে থাকা শরীর বেশি এক্সপোজ হয়ে পড়ে সূর্যের রশ্মিতে।

ভুল – গাড়ি অথবা বাসের জানলা দিয়ে সূর্যের ইউভি রশ্মি, ত্বকের কোনও ক্ষতি করতে পারে না।

সঠিক – এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। সূর্যের ক্ষতিকারক ‘আল্ট্রাভায়োলেট রে’ জানলার কাচ পেনিট্রেট করে ভিতরে চলে আসে। যদি জানলার ধারে কেউ বসা পছন্দ করেন অথবা কাজের জন্য লম্বা ড্রাইভ করতে হয় কাউকে, তাহলে অন্য সময় সাধারণত যতটা পরিমাণ সানস্ক্রিন লাগাতে হয়, তার থেকে বেশি পরিমাণে লাগানো উচিত।

 

বাড়িতে রাখুন ডিশওয়াশার

আধুনিক জীবনশৈলীতে ব্যস্ততার কারণে মানুষের ইলেকট্রনিক গ্যাজেট-এর উপর নির্ভরতা বাড়ছে। পরিবারের ব্যাপ্তি এখন ছোট্ট গন্ডিতে সীমাবদ্ধ। ফলে কাজের চাপ ভাগ করার মতো পরিবারের সদস্য তেমন আর কাউকে পাওয়া যায় না। এর উপর আছে কর্মস্থলের চাপ ও ব্যস্ততা। পরিচারিকার উপস্থিতিও এখন দূরঅস্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে মেশিন-ই ভরসা। বাড়িতে অতিথি অভ্যাগতদের অভ্যর্থনা জানাতে হলেও, ছোটোখাটো খাওয়াদাওয়ার আয়োজন করতেই হয়। হই-হুল্লোড়ে সময়টা বেশ কেটে গেলেও আসল কাজ পড়ে থাকে অতিথিরা বিদায় নিলে। শো-কেসে সাজানো বাসনগুলো ব্যবহারের সুযোগ হয়তো এভাবেই আসে। কিন্তু সেগুলো আবার ধুয়ে মুছে তুলে রাখাটাও মস্ত বড়ো দাযিত্ব। আর যেখানে আপনার হাতে হাতে সাহায্য করার কেউ নেই, সেখানে বাসন ধোওয়ার সহজ উপায় হল ডিশওয়াশার-এর ব্যবহার। সুতরাং দেরি কেন? জেনে নেওয়া যাক ডিশওয়াশার সম্পর্কে কিছু জরুরি তথ্য।

কত রকমের হয়

সাধারণত দুই ধরনের ডিশওয়াশার পাওয়া যায়। প্রথমটি ফ্রি স্ট্যান্ডিং অর্থাৎ আলাদা করে কোথাও আপনি লাগাতে পারেন। দ্বিতীয়টি, বিল্ট ইন অর্থাৎ কিচেন কাউন্টারের নীচে স্থায়ী ভাবে লাগাবার ব্যবস্থা করতে পারেন।

সাধারণত ডিশওয়াশার ১২ থেকে ১৬ প্লেস-সেটিং-এর হয়ে থাকে। আমাদের দেশে বেশি ১২ প্লেস-সেটিং-যুক্ত মেশিন পাওয়া যায়। ১ প্লেস-সেটিং মানে ১-১ ডিনার প্লেট এবং জলখাবারের প্লেট, বাটি, গেলাস, চা কিংবা কফির কাপ-প্লেট, ছুরি, ফর্ক এবং আরও ২টি করে চামচ এবং স্যালাড ফর্ক ওতে লোড করতে পারবেন। এছাড়াও কিছুটা খালি জায়গাও থাকে, যেখানে রান্না করার বাসনও রাখতে পারবেন।

ভারতীয় বাজার ছেয়ে গেছে ডিশওয়াশার-এ। বস, সিমেন্স, হোয়ার্লপুল, আইএফবি এবং এলজি কোম্পানির ডিশওয়াশার ভারতবর্ষে পাওয়া যায়। এগুলোর দাম মোটামুটি ২৬ হাজার থেকে ৪০ হাজার টাকার মধ্যে।

ডিশওয়াশার লাগাবার আগে

ডিশওয়াশার লাগাবার আগে অবশ্যই চারটে জিনিসের খেয়াল রাখতে হবে। কোথায় রাখা হবে, সেখানে ইলেকট্রিক কানেকশন আছে কিনা, জলের কানেকশন আছে কিনা এবং জল নিকাশির ব্যবস্থা আছে কিনা। সাধারণত ডিশওয়াশার ২৪ ইঞ্চি / ২৪ ইঞ্চি হয়ে থাকে এবং এর উচ্চতা হয় ৩৫ ইঞ্চি। এতে অ্যাডজ্যাস্টেবল স্ট্যান্ড দেওয়া থাকে।

মডিউলার কিচেনের সঙ্গে খুব সহজেই বিল্ট ইন ডিশওয়াশার লাগিয়ে নেওয়া যায়। নিজের বাড়ি হলে বিল্ট ইন ডিশওয়াশারই সবথেকে ভালো। যাদের বাড়ি বদল করার দরকার পড়ে, তাদের জন্য ফ্রি স্ট্যান্ডিং মডেল কেনাই যুক্তিসঙ্গত। পুরোনো বাড়ির কিচেনে ডিশওয়াশার লাগাতে হলে কিছুটা রিমডেলিং করার দরকার পড়বে। কিছু ভাঙচুর করে কাউন্টারের নীচে পর্যাপ্ত জায়গা বানিয়ে ওই পর্যন্ত জলের সাপ্লাই এবং জল নিকাশির ব্যবস্থা করতে হবে।

ডিশওয়াশার সম্পর্কে ভুল ধারণা

ডিশওয়াশার সম্পর্কে মানুষের সচেতনতা এখনও সেভাবে বৃদ্ধি পায়নি। মানুষের ধারণা এতে ইলেকট্রিসিটি এবং জলের খরচ অনেক বেশি হয়। এই ধারণা ভ্রান্ত। ইনস্টলেশন-এর সময় কিছুটা খরচ হয়তো বেশি করতে হতে পারে, তবে এখনকার অ্যাপার্টমেন্টগুলোতে বেশির ভাগই মডিউলার কিচেন থাকে, যেখানে ডিশওয়াশার বসানো খুব সহজ। এর জন্য আলাদা কোনও প্ল্যানিং করতে হয় না।

সেটিংস : ডিশওয়াশার সাধারণত অটোমেটিক হয়। ওর মধ্যে বাসন সাজিয়ে সাইকেল বেছে অন করে দিন। বাসন পরিষ্কার করে মেশিন নিজেই বন্ধ হয়ে যাবে। সাধারণত এতে ৪ ওয়াশ প্রোগ্রাম করা থাকে। এতে ডিলেড স্টার্ট-এরও সুবিধা দেওয়া থাকে। অর্থাৎ, সুবিধামতো ২-৪ ঘন্টা বা তার পরেও মেশিন চালু করার প্রোগ্রাম বেছে নেওয়া যায়। এতে চাইল্ড সেফটি লক-এরও সুবিধা দেওয়া আছে।

কিছু কিছু মডেলে অ্যাকুয়া এবং লোড সেনসার্স-ও দেওয়া থাকে, যা কিনা জল এবং ইলেকট্রিক সেভ করে। বাসনে নোংরা যদি বেশি লেগে থাকে তাহলে অ্যাকুয়া সেনসর বাসন পরিষ্কার করতে ঠিক যতটা জলের প্রয়োজন, ঠিক ততটাই জল নেবে। লোড সেনসর মেশিনের লোড অনুসারে জলের তাপমাত্রা এবং ওয়াশিং টাইম বেছে নেয়।

সুবিধা

ইউজার ফ্রেন্ডলি : ডিশওয়াশার ব্যবহার করতে পারলে খুবই সুবিধা হয়, সময়ও বাঁচে। বাসন পরিষ্কার করার জন্য সিংক-এর সামনে দাঁড়িয়ে থাকার দরকার হয় না। কাজের লোকের উপরেও নির্ভর করতে হয় না। রান্নাঘর দেখতেও পরিষ্কার লাগে।

জল ও বিদ্যুৎ : ডিশওয়াশার-এর নতুন মডেলগুলি বিদ্যুৎ এবং জলের খরচের ব্যাপারে খুবই ইকোনমিক্যাল। সাধারণত একটি ইকোনমিক ওয়াশ সাইকেলে প্রায় ১ ইউনিট বিদ্যুৎ খরচ হয়। বাসন যদি হিটার চালিয়ে তাড়াতাড়ি শুকোতে চান, তাহলে প্রতি ওয়াশে ২ ইউনিট মতো কারেন্ট পোড়ে। ৮ থেকে ১০ লিটার জল খরচ হয় প্রতি ওয়াশ সাইকেলে, যা কিনা বাসন হাতে ধোওয়া হলে এর থেকে অনেক বেশি খরচ সাপেক্ষ।

ডিশ ছাড়া অন্যান্য বাসনও ধোয়া যায় : রান্নাঘরের যাবতীয় বাসন ডিশওয়াশার-এ ধুতে পারেন। প্লাস্টিক, কাচের বাসন আর চিনামাটির বাসন ডিশওয়াশার-এ সেফ থাকে। সাধারণত বাসন প্রস্তুতকারক কোম্পানিগুলি বাসনের গায়ে একথা লিখে দেন।

লোডিং : ডিশওয়াশার নির্মাতা, মেশিনের সঙ্গে দেওয়া ব্যবহারবিধি বইটিতে ওয়াশার লোড করার সঠিক উপায় ছবি-সহ বুঝিয়ে দেয়। সেই নির্দেশ অনুযায়ী বাসন লোড করলে সময় যেমন বাঁচবে, তেমনি লোডিং ও আনলোডিং-এর ক্ষেত্রেও সুবিধা হবে। ডিশ এবং অন্য বাসন উলটে রাখুন, যাতে জলের তীব্র বেগ প্লেটের নোংরা দিকটার উপর পড়ে এবং বাসন ভালো করে পরিষ্কার হয়।

গরমজলের ব্যবহার : গরমজলের ব্যবহার করে বাসন ধুলে বাসন বেশি পরিষ্কার হবে। ভারতীয় রান্নায় তেল, মশলা একটু বেশি ব্যবহার হয়, তার ফলে গরমজলে বাসন ধোয়াটা অনেক বেশি কার্যকরী।

প্রি-ওয়াশ জরুরি নয় : ডিশওয়াশার নির্মাতারা বাসন প্রি-ওয়াশের পরামর্শ দেন ঠিকই কিন্তু এটা জরুরি নয়। এতে সময়, জল এবং বিদ্যুৎ-এর অপচয় হয়। ওয়াশার লোড করে রিনজ ওনলি অপশন বাছতে পারেন।

পরিষ্কার করা : মাঝেমধ্যেই ডিশওয়াশার পরিষ্কার করা উচিত। উপরের র‌্যাকের মধ্যে কাপে আধকাপ ভিনিগার ঢেলে মেশিন চালালে, মেশিন পরিষ্কার হয়ে যাবে এবং গন্ধও দূর হবে। এছাড়াও ওয়াশারের ফিলটার পরিষ্কার করা উচিত, যাতে ড্রেন লাইন বন্ধ হয়ে না যায়।

ফুল ইন্টিগ্রেটেড ডিশওয়াশার লাগান : এটি আপনার রান্নাঘরের স্ল্যাবের নীচে একই লেভেলে ফিট হয়ে যাবে। মেশিনের অপারেটিং প্যানেল আপনার সামনে থাকবে। ওয়াশার-এর ড্রেন রান্নাঘরের ড্রেনের সঙ্গে মিশে যাবে।

 

লাভার্স মিট

একাকী দাঁড়িয়ে থাকে তন্বী। বারান্দার রংচটা গ্রিলটা ধরে। বারান্দার গ্রিলটা যেন তন্বীর প্রাণের বন্ধু হয়ে গিয়েছে। বর্ষার দিনে মুঠোতে শক্ত করে ধরে, এক দৃষ্টিতে দ্যাখে কীভাবে বৃষ্টির ফোঁটা আকাশ থেকে ঝরে মাটিতে পড়ে ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে। আর বৃষ্টির ফোঁটা ফোঁটা জল ভূমির ঢাল ধরে ছোটো ড্রেন, হাইড্রেন হয়ে হু হু করে বইছে। হয়তো নদী হবে বলে।

সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে অভ্যাসমতো বারান্দায় গিয়ে এক মনে কী যে ভাবে তন্বী কে জানে? পাখির কিচিরমিচির শব্দে প্রতিদিন ভোরে ঘুম ভাঙে তন্বীর। ঘরের ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে আকাশকুসুম ভাবে। উঠোনের কাঁঠাল আর পেয়ারা গাছটা সকাল-সন্ধে পাখির কলকাকলিতে মুখর। পাখিদের সংসার যেন তন্বীর খুব চেনা হয়ে গিয়েছে। কাঁঠাল গাছটাকে বর্ষার আগাছা আর বিভিন্ন লতাগুল্ম আঁকড়ে ধরে থাকে। বৃষ্টিস্নাত সবুজ গাছের পাতায় জল গড়িয়ে পড়ে। গাছ-গাছালি বেশ ঝাঁকড়া হয়ে যায় এই সময়টায়। বিভিন্ন ঋতুতে গাছগুলোর বিভিন্ন রুপ দেখেছে। আর সকাল-সন্ধে পাখিদের সংসার, আনাগোনা সব এখন নখদর্পণে তন্বীর।

সকালের পাখির ডাকে ঘুম ভাঙে। ঘুম ভাঙানিয়া পাখপাখালি সারাদিন কী ব্যস্ত থাকে। আবার কোথায় উড়ে চলে যায় দূর আকাশে। মন দিয়ে পাখিদের খুনসুটি দেখে। কখনও পাখি হতে ইচ্ছা করে তন্বীর। আবার সন্ধ্যায় আকাশ-পথ চিনে কীভাবে যে ওরা ফেরত আসে বাসায়, তার কূলকিনারা খোঁজার চেষ্টা করে। এই পাখিগুলোর ব্যস্ত আনাগোনা দেখতে দেখতে কখনও হিংসা হয়। ভাবতে থাকে এরা তো কেউ বেকার নয়।

বৃষ্টিভেজা কচি সবুজ পাতা তন্বীর খুব প্রিয়। রাতের খাবার সেরে প্রতিদিন ব্যালকনিতে দাঁড়ানো যেন নিয়ম হয়ে গিয়েছে। দৈত্যের মতো আবাসানগুলো শহরের আকাশ, মেঘ, সব যেন গিলে খাচ্ছে। তবুও একফালি আকাশ এখনও দেখা যায়। আর শীতের বেলায় ধবল কাঞ্চনজঙ্ঘার রূপ। আগে তো হিমালয়ে আকাশ ছুঁই ছুঁই চড়াগুলো বারান্দা থেকে দেখা যেত স্পষ্ট। কয়েকটা বছরে কেমন যেন বদলে গেল শহরটা। জ্যোত্স্না রাতে চাঁদটা বেশ কিছুক্ষণ দেখা যায় এক টুকরো মেঘের ফাঁকে। রাত বাড়লে হারিয়ে যায়। শহরের নিয়ন আলোয় আকাশের তারাগুলো আত্মগোপন করে। আজ রোহনের কথা মনে পড়ছে খুব। চাঁদের মায়াবি আলো এসে পড়ে তন্বীর চোখেমুখে। সন্ধ্যার দিকে বেশ কিছু ছাত্রছাত্রী টিউশন পড়তে আসত।

বেশ কিছু দিন আগে স্থানীয় একটি নার্সারি স্কুলে শিক্ষিকার পদে কাজ করত সে। কিন্তু বেসরকারি স্কুলের ফাইফরমাশ খাটতে খাটতে জেরবার হয়ে যায়। এক সময় সেই কাজটা ছেড়ে দেয়। ভোরবেলায় ঘুম ঘুম চোখের ঘোর কাটাতে বাইরের আলোতে কিছুক্ষণ কাটিয়ে নেয়। আবার রাতের খাবার সেরে বেশ কিছুক্ষণ একাগ্র চিত্তে দাঁড়িয়ে থাকে গ্রিলটা ধরে। শিলিগুড়ি শহরের ব্যস্ততম রাস্তার ধারে অপূর্ব কাঠের দ্বিতল ঘরে তন্বীদের বাস। এই শহরে কিছুদিন আগেও ছবির মতো কাঠের কারুকাজ করা সুন্দর ঘরগুলো শহরের অহংকার ছিল। তন্বীদের পুরোনো কাঠের ঘরটা এখনও প্রমোটারদের থাবা থেকে বেঁচে আছে।

বাবা বলাই চৌধুরী-রা তিন ভাই। তাদের মধ্যে বড়ো তন্বীর বাবা। আর দুই ভাইয়ে একজন থাকে বিদেশে। আর একজন দিল্লিতে কর্মরত। বহুদিন শিলিগুড়িতেই আসেনি কেউ। তন্বী কাকুদের চিনতেই পারবে না। তবে অ্যালবামে ছবি দেখেছে সবার।

বার্মা টিকের কাঠের দ্বিতল বাড়িটার অধিকাংশ রুম জরাজীর্ণ। নীচের ঘরগুলোর মধ্যে একটায় বইয়ের দোকানের গোডাউন। কিছু ভাড়া পাওয়া যায়। সেই টাকা দিয়ে মাঝেমধ্যে ঘর মেরামত করা হয়। শহরের ব্যস্ততম রাস্তার পাশে এক সময় এই কাঠের ঘরটা ছিল দেখবার মতো। পঁক পঁক রিকশার হর্নের শব্দ শুনতে কান অভ্যস্ত হয়ে গিয়েে তন্বীর। শিলিগুড়ি রিকশার শহর নামে খ্যাত।

উঠোন থেকে লোহার প্যাঁচানো সিঁড়িটা বেয়ে উপরের কাঠের বারন্দায় উঠতে হয়। তারপর সার-সার দুটি ঘর। বন বাংলোর মতো একটা অনুভূতি হয় রুমে ঢুকলে। এই দুটো ঘরেই তন্বীদের সংসার। বাকি ঘরগুলো ভাম, বিড়ালদের বাস, ব্যবহার হয় না। ফুল বাগিচায় সাজানো গোছানো উঠোন। লাল টুকটুকে জবা ফুল ফুটে থাকে উঠোনময়। নয়নতারা, টগর, বেলি আর রাতে রজনীগন্ধার সুবাসে মনটা ভরে ওঠে।

তন্বীর মা পুজো অর্চনা নিয়ে থাকেন। প্রতিবেশীরা ফুল তুলতে আসেন। খুব সখের বাগান তাঁদের। একটা বাংলা শর্ট ফিল্মের শুটিংও হয়েছিল।

তন্বীর বাবা বলাই চৌধুরী যজমানি করে রোজগার করেন। তাঁর একমাত্র কন্যাসন্তানকে মানুষ করেছেন বহু কষ্টে। বড়ো সাধ ছিল মেয়ে একটা সরকারি চাকরি করবে। রোজ সকালে ফুলের সাজি আর সিঁদুরগোলা পাত্র নিয়ে পুজো করতে বার হয়ে যান তিনি। তন্বীর মা রুমা ফুলের সাজি আর একটা ছোটো বাটিতে সিঁদুর গুলে রাখেন পরিপাটি করে।

রেল লাইন পার হলেই লোকাল বাসস্ট্যান্ড। সকালের দিকে স্ট্যান্ডে থাকা বাসগুলোতে ফুল, ধূপ দিয়ে পুজো করেন বলাইবাবু। এছাড়াও বেশ কিছু বাঁধা দোকান, সেলুনে পুজো সেরে দুপুরে ঘরে ফেরেন। হাটবারে ওঁদের বাড়ির দেযাল লাগোয়া জায়গায় শাকসবজির পসরা নিয়ে বসে সবজি বিক্রেতারা। এক পা বাড়ালেই হাটবাজার, সবই হাতের মুঠোয়।

বৃষ্টির দিনে আজ মনটা কেমন করে উঠল তন্বীর। খুব রোহনের কথা মনে পড়ছে। হঠাৎ ভোর রাতে ঘুম ভেঙে গেছে। রোহনের স্বপ্ন দেখেছে সে। বহুদিন রোহনের সঙ্গে দেখা হয় না। ছোটোবেলার প্রিয বন্ধু যেন স্বপ্নে ধরা দিল ভোর রাতে। বেশ কয়েক বছর হল রোহন আর এ শহরে আসেনি।

অঝোরে বৃষ্টি পড়ছে। কখনও মেঘের বুক চিরে বিদ্যুৎ ঝিলিক। গাছের শাখায় শাখায় কচিপাতা গজিযে উঠছে। বৃষ্টি ভেজা সবুজ গাছের পাতায় টলটলে বৃষ্টির ফোঁটা, দেখতে ভীষণ ভালো লাগে তার। মনে পড়ে যাচ্ছে সেদিনটার কথা। কলেজ পথে একদিন রোহনের চারচাকা গাড়িতে ফুলবাড়ি ক্যানাল ধরে গাজলডোবা গিয়েছিল।

টুকটুকে পুতুল পুতুল চেহারার তন্বী খুব আকর্ষণীয় ছিল। তাদের অজান্তে ভালোবাসার একটা অজানা স্রোত প্রবাহিত ছিল। দুটো পরিবার আসতে পেয়েছিল। তিস্তা ক্যানাল বর্ষার অতি বৃষ্টিতে টইটুম্বুর। দুপাশে ঘন লকলকে সবুজ ছুঁয়ে গাজোলডোবায় পৌঁছে গিয়েছিল সেদিন। ওদের মনের ভেতর বইত ভালোবাসার অন্তঃসলিলা। কলেজ লাইফ বেশ কেটেছে। কলেজ জীবনের স্মৃতি ফিল্মের রোলের মতো ভেসে আসছে। কিছুটা নিজেকে সামলে নিয়ে রোজকার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে তন্বী।

ইতিহাসে মাস্টার ডিগ্রি কমপ্লিট করে ঘরে বসে আছে তন্বী। কোনও চাকরি জোটেনি। সংবাদপত্রের বিজ্ঞাপনে নজর রাখে। দরখাস্তও করে। সাফল্য আসেনি এখনও। আসলে শিক্ষকতার পেশায বিএড খুব জরুরি। কিন্তু দরিদ্র ব্রাহ্মণ পরিবারের মেয়ে তন্বী, লাখ লাখ টাকা দিয়ে ভর্তি হওয়া আকাশকুসুম কল্পনা।

এদিকে সরকারি, বেসরকারি বিভিন্ন দফতরে অ্যাপ্লাই করেই চলেছে। কিন্তু সুযোগ আসেনি একটাও। কিছুদিন আগে একটা নার্সারি স্কুলে শিক্ষকতার চাকরি জুটিযেছিল। কিন্তু বেসরকারি স্কুলের সঙ্গে তাল মেলাতে পারেনি।

সামনের বড়ো রাস্তাটা পার হলেই রোহনদের বিশাল বাড়ি। প্রশস্ত উঠোন। যখন ছোটো ছিল ওরা একসঙ্গে খেলাধূলা করত। প্রাইমারি থেকে কলেজে পড়া পর‌্যন্ত ওরা দুজন দারুণ জুটি। রোহন পড়াশোনায খুব ভালো। উচ্চমাধ্যামিকে স্কুলের টপার হয়েছিল। তন্বীও মনযোগী ছাত্রী ছিল। ছোটোবেলার খেলার সাথি ওরা। কলেজেও একসঙ্গে পড়েছে। রোহনদের বাড়ির সহযোগিতা দারুণ ভাবে পেযেছে তন্বী। আসলে তন্বীর বাবা রোহনদের পরিবারের কূল-পুরোহিত। রোহনের বাবার বিয়েও পুরোহিত ছিলেন বলাইবাবু।

বেশিরভাগ সময় রোহনদের বাড়িতে কাটাত তন্বী। রোহনের মা মিতার খুব পছন্দের মেয়ে ছিল সে। রোজ স্কুল শেষে যখন রোহনদের বাড়িতে খেলতে আসত, মাথার ঘন কালো কোঁকড়া চুলে কৃষ্ণচড়ার ঝুঁটি বেঁধে দিতেন রোহনের মা। আত্মীয-কুটুমদের মধ্যে কানাঘুষো হত, তন্বীকে বউ করে নিয়ে আসবে ঘোষ পরিবার। কিন্তু তন্বীর মা আবার খুব গোঁড়া। ধর্মকর্ম পুজো নিয়ে থাকেন। বলবার সাহস হয় না মিতার।

রোহনের বাবা বাদল ঘোষ শহরের নামজাদা ব্যবসাযী। কযেটা গোডাউন রযেে। বাদল ঘোষ ধনেমানে বড়ো হলে কী হবে, লেখাপড়া ছিটেফোঁটাও জানেন না। স্কুলছুট হয়ছিলেন। সে আর এক গল্প। পণ্ডিত স্যারের কানমলা খেযে নাকি আর স্কুলমুখো হননি। কিন্তু এখন এই শহরের বেশ ধনী ব্যবসায়ী। বাদল ঘোষের বাবাও ব্যবসায়ী ছিলেন। ব্যাবসাটা ওদের পরিবারের মজ্জাগত। এখন বাদলবাবু ফুলে-ফেঁপে কলাগাছ। এদিকে রাজনীতির সঙ্গেও যুক্ত।

রোহন কলেজে অনার্সে ভালো ফল করেছে। রোহনের বাবা খুব খুশি। এই আনন্দে ঠিক করেছেন রোহনকে কলকাতায হোস্টেলে রেখে পড়াবেন। ব্যাবসার সুত্রে পরিচিত এক বন্ধুর বাড়িতে কিছুদিন ছিল রোহন। কিন্তু মন বসেনি। মাঝপথে সব ছেড়ে চলে আসে। সুযোগ পেলেই তন্বীকে নিয়ে শুকনার জঙ্গল দেখতে বেরিয়ে পড়ে। রংটঙের টযট্রেনের নির্জন ষ্টেশনে বসে চলে ওদের প্রেমালাপ। কখনও দিনের শেষে ধূমাযিত কফি কাপে চুমুক দিতে দিতে, ভালোবাসায বুঁদ হয়ে যায দুজনে। কিছুক্ষণ কাটিয়ে আবার মোমো শপে গরম মোমো খেযে বাড়ি ফেরে।

এদিকে তন্বী ইতিহাসে এমএ করছে বিশ্ববিদ্যালয থেকে। মাঝপথে রোহন সব ছেড়ে চলে আসায, রোহনের বাবা-মায়ের মন খুব খারাপ। তন্বীদের সঙ্গে রোহনদের একটা ঘরোযা সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। পাড়াপড়শি, আত্মীযমহলে আলোচনা করে অনেকে। তন্বীও ফের ভর্তি হতে বলে রোহনকে। যাইহোক রোহন নেক্সট ইয়ার বেঙ্গালুরুতে বিজনেস ম্যনেজমেন্টে ভর্তি হয়। এখন ওখানেই থাকে। বেশ মন বসে গিয়েছে। চিরবসন্তের শহরে এক অন্য জগতের পড়াশোনা নিয়ে মজে গেছে। শিলিগুড়ি আর আসতেই চায় না রোহন। টাকা পযসার তো আর অভাব নেই। বাবা টাকা পাঠান।

এখন অফিসের কাজে ব্যস্ত হয়ে গিয়েছে। বিজনেস ম্যনেজমেন্ট পাশ করে নামকরা বেসরকারি কোম্পানির ম্যানেজিং ডিরেক্টরের পদে আসীন। বেকার বসে থাকতে হল না আর। প্রথম দিকে তন্বীর খোঁজ খবর নিত। ফোন করত নিয়ম করে। কিছুদিন হল সেসব পাট যেন চুকে গেছে।

রোহনের বাবা বাদল ঘোষের বাড়িতে ঘটে গিয়েছে অঘটন। পুলিশ রেড হয়েছে। রেশন দুর্নীতিতে আপাদমস্তক ডুবে গিয়েছেন বাদলবাবু। রাজনীতির কেউকেটা হয়ে নাকি পার পাওয়া যাচ্ছে না।

কোনও অভিযোগের ভিত্তিতে গুদামে, বাড়িতে পুলিশ প্রশাসন রেড করে বেআইনি শস্য উদ্ধার করেছে। দুর্নীতির শিকড় নাকি বহুদূর। মন্ত্রী-আমলারাও যুক্ত। আসলে এদেশে শস্য নিয়ে দুর্নীতি মারাত্মক। আর এরাই আবার রাজনীতির হর্তা-কর্তা-বিধাতা। কিন্তু পাপ তো বাপকেও ছাড়ে না। কাজেই বলাই ঘোষ গ্রেফতার হয়েছেন। তদন্তে কী হবে কেউ জানে না!

বিভিন্ন সংবাদপত্রে রেশন দুর্নীতি নিয়ে কযেকদিন ধারাবাহিক লেখাও বার হয়েছে। রোহনের কানে সব খবর গিয়েে। লজ্জায় ঘৃণায় রোহনের মাথা হেঁট হয়ে গিয়েছে। তারপর থেকে আর শিলিগুড়ির বাড়ি আসা যাওয়া ছেড়ে দিয়েছে। কীভাবে বন্ধু আত্মীয়দের মুখ দেখাবে রোহন! চায়ের দোকান থেকে ঘরে-বাইরে আড্ডায় এখন মুখরোচক খবর, বলাই ঘোষের দুর্নীতি।

এরকম বিপর্যয়ের মুখে একদিন রোহনের ফোন আসে। তন্বীর মুখে সে ঘটনার সত্যাসত্য জানতে চায়। তন্বী রোহনকে সান্ত্বনা দেয়। তারপর বহুদিন আর ফোন করা হয়নি। মনে হয় রোহন এড়িয়ে যাচ্ছে। তন্বী খুব বাস্তববাদী। মনে মনে ঘরের বারন্দার গ্রিলটা ধরে ভাবে কতো কী। আবার এগিয়ে যেতে হবে। জীবনের আর এক নাম লড়াই। ছোটো থেকে দেখেছে বাবাকে, কী ভাবে জীবনসংগ্রাম করে তাকে মানুষ করেছেন।

সব কিছু মানিয়ে নেওয়ার অভ্যাস ধীরে ধীরে গড়ে উঠেছে তন্বীর। জীবন যন্ত্রণার বহু করুণ-কাহিনির সাক্ষী সে নিজে। হয়তো আরও পথ যেতে হবে তাকে। জীবনটাকে চ্যালেঞ্জ হিসাবেই নিতে চায় তন্বী। তাই হতাশার কোনও ঠাঁই নেই তন্বীর অভিধানে। সম্পর্কে এইভাবেই দূরত্ব তৈরি হয়। রোহন তন্বীর সঙ্গে যোগাযোগ না রাখলেও সে রোহনকে মন থেকে ঝেড়ে ফেলতে পারেনি।

এদিকে বলাই ঘোষের জামিন হয়েে কিন্তু কেস চলছে। বলাই ঘোষ বিচারাধীন। তাঁর অনুগামীরা জামিনের দিন ফুলের মালা দিয়ে সংবর্ধিত করেছেন। সংবাদে সচিত্র এমন সংবাদ পড়ে অনেক কিছু ভাবতে থাকে তন্বী। ওদের বাড়ির বারান্দা থেকে দেখা যায় মহকুমা শাসকের দফতরের জাতীয পতকাটা পতপত করে উড়ছে। আর ওইখানেই আদালত। তন্বী এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে হাঁ করে পতাকাটার দিকে। আনমনা হয়ে যায়।

তন্বীর বাবার বয়স হচ্ছে। সেদিন পুজো করতে গিয়ে মাথা ঘুরে পড়ে গিয়েছিলেন। মুখ দিয়ে ফেনা বার হচ্ছিল। পাতলা ছিপছিপে চেহারার মানুষ। লো-প্রেশারের রোগী। অনেকবার তন্বীর মা বলেছেন মেযোর জন্য পাত্র খুঁজতে। কিন্তু তন্বী নারাজ। মা যতবার বলেছেন, তন্বী তুই সব খুলে বল। তন্বী ততবার বলেছে, আমি নিজের পায়ে দাঁড়াব, কিছু একটা করব।

এমন সময় একটা কলিং বেলের শব্দে তন্বী দরজা খুলে দেখে পিয়ন কাকু। বহুদিন পর দেখা। আসলে আজকাল চিঠিপত্তর তেমন আর আসে না। একটা বাদামি খাম তার হাতে ধরিয়ে দিল লোকটি। খামের মুখ খুলে দেখে ইন্টারভিউ লেটার। গ্যাংটকে ভেনু। সময় তারিখ সব দেওয়া আছে। মনটা বেশ চনমনে হয়ে উঠল। মাকে সব বলল। বাবাও ফিরেছেন পুজোর কাজ সেরে।

সপ্তাহে নিয়ম করে একটা খবরের কাগজ রাখে তারা। সাপ্তাহিক কাগজে দেশবিদেশের খবর থাকে। বেশ কিছুদিন আগে একটা ভালো মাইনের চাকরির বেসরকারি কোম্পানির বিজ্ঞাপন দেখে অবেদন করেছিল। পদটি অফিস সহকারীর। এক নামকরা ওয়াটার পাম্প কোম্পানির অফিস অ্যাসিস্ট্যান্ট। সারা দেশ জুড়ে বিভিন্ন শহরে এই কোম্পানির মূল অফিস। হিল এরিযায নতুন অফিস খুলবে। তরাই-ডুযার্স, অসম, সিকিম এলাকার চা-বাগিচায় ওয়াটার পাম্পের ডিমান্ড রযেছে।

বাবাকে সঙ্গে নিয়ে ইন্টারভিউ-এর জন্য প্রস্তুতি নিয়ে সেভক রোডের কাছে একটা টাটা সুমোতে চেপে বসে তন্বী। বেলা দশটার মধ্যে গ্যাংটকে পৌঁছে ইন্টারভিউ বোর্ডের মুখোমুখি হতে হবে। সাক্ষাত্ প্রার্থীরা একটা হোটেলের করিডরে অপেক্ষা করছে। এই হোটেলটা থেকে দূর পাহাড়ের উপত্যকার মাঝে তিস্তা নদী দেখা যায়। হোটেলের পিছনের দিকে কনফারেন্স রুমে বসবার ব্যবস্থা। কাগজপত্র ভেরিফিকেশন হবার পর ইন্টারভিউ-এর সময় হল। কযেজনের পর ডাক পড়ল তন্বীর।

শীতশীত আবহাওয়া। আজ যদিও আকাশে সূর‌্যের দেখা মিলেছে। ফাইল নিয়ে বোর্ডের সামনে চেযারে বসতেই, সারা শরীরে কেমন শিহরণ অনুভব করল সে। খুব চেনা মানুষ ইন্টারভিউ বোর্ডের হেড। ফ্রেঞ্চকাট দাড়ি, গোলাপি হাফ সোয়েটার। চশমার ফাঁকে বুদ্ধিদীপ্ত চোখদুটো ঘুরছে। চোখ আর জোড়াভুরু দুটো খুব চেনা। পাশে বসে এক আধুনিকা। কাগজপত্র মিলিয়ে বেশ কিছুক্ষণ আলাপের ছলে ভদ্রমহিলা অনেক কিছু প্রশ্ন করলেন। কিন্তু সেই চেনা মানুষটির যখন প্রশ্নের পালা এল কোনও প্রশ্ন না করে, ওকে বলে শেষ করলেন।

রুম থেকে বেরিয়ে আসতেই বাবা জিজ্ঞেস করলেন, ইন্টারভিউ কেমন হল তন্বী? তন্বী বাবার কথা এড়িয়ে বলল, হয়েছে চলো, দেরি হয়ে যাবে। লাস্ট বাসটা ধরতে হবে।

কিছু একটা গড়বড় হয়েছে, বাবা সহজেই বুঝলেন। খানিকটা হেঁটে বাজারের বাসস্ট্যান্ডে কিছু শুকনো খাবার কিনে, বাসের জানলার দিকে সিট নিয়ে বসল তন্বী। মেঘমুক্ত আকাশে স্পষ্ট দেখা যায তিস্তার মূল স্রোতে কত অনামি জলধারা এসে মিশছে। সাদা পেঁজা তুলোর মতো মেঘ, সবুজ উপত্যকায ঘুরে বেড়াচ্ছে।

গ্যাংটক ছাড়িয়ে বাসটা পাহাড়ের পাকদণ্ডি পথে ছুটছে। জানলার দিকে তাকিয়ে রোহনের স্মৃতি রোমন্থন করতে করতে, এক সমযে সিটে হেলান দিয়ে ঘুমিযে পড়েছে তন্বী। হঠাত্ বাসটা বাঁক নিয়ে ব্রেক কষলে এক ঝটকায় ঘুমটা ভেঙে যায তন্বীর।

এখন রাস্তাটা তিস্তা নদী ঘেঁষে চলেছে। সামনেই তিস্তা বাজার জনবসতি। বাসের জানলা থেকেই দেখা যাচ্ছে প্রধান নদী তিস্তায়, রঙ্গিত নদী মিশছে। সিকিম থেকে রঙ্গিত, তিস্তা বাজারে তিস্তার মূল প্রবাহে মেশে।

তিস্তা-রঙ্গিতের সঙ্গমস্থল লাভার্স মিট দেখতে দেখতে কেমন নস্টালজিক হয়ে যায তন্বী।

রোহনের আজকে না চেনার ভান নাকি কোম্পানির প্রোটোকল কোনটা সঠিক ভাবতে থাকে তন্বী। কখনও নিজেকে সান্ত্বনাও দেয়। ভাবতে থাকে এমনটাই কাঙ্খিত ছিল। অভিমানে গাল বেয়ে দুফোঁটা মুক্তো দানা ঝরে পড়ে। রোহনের সাথে হঠাত্ দেখা হওয়া যেন স্মৃতির দরজা ধরে এক ঝলক ফিরে দেখার অপেক্ষা। কে জানে যদি আবার সেই দিনগুলো ফিরে আসে!

প্রতি বাঁকে ‘তুমি’

 

হাতছানি

তখন তেড়ে বর্ষা, জুনের শেষের দিক… বেড়াবার জায়গা খুঁজছি নেটে। আলগোছে এটা-সেটা দেখতে দেখতে চোখে পড়ল বরফঢাকা পাহাড়ের কোলে পান্না সবুজ শেষনাগ। পাহাড়ি ঢালে ভেড়া চরছে আর রুক্ষ প্রকৃতির মাঝখান দিয়ে সুতোর মতো এক চিলতে পথের পরতে-পরতে এঁকেবেঁকে মানুষের সারি। লোভ উসকে দেবার একশো আয়োজন নিয়ে কভার পিকচার হাতছানিতে রেডি। পেজটি আসলে অমরনাথ যাত্রার ও যাত্রার ফর্ম এখান থেকেই জমা নিচ্ছে। ব্যস, নেটসার্ফিং-এর ক্যাজুয়াল ভাব গোল্লায় গিয়ে লাফিয়ে উঠল মন ‘যাব’ বলে। কিন্তু কীভাবে? বাকি প্রয়োজন মিটলে তবে না! মিডিল অফ জুনে যাত্রা শুরু হয়েছে যা বন্ধ হতে জুলাইয়ের শেষ। তার মানে হাতে পাচ্ছি বিশ-বাইশটা দিন। এর মধ্যেই ফর্ম ফিলআপ, রিজার্ভেশন, পোশাক-আশাক, ফিট সার্টিফিকেট… কঠিন জায়গার কঠিন প্রস্তুতি।

খ্যাপামি

জানি, ঝাঁকায় করে টিকিট নিয়ে রেল দফতর বসে নেই যে চাইলেই দু’খিলি পান খাইয়ে হাত বাড়াবেন ‘নিন গো দিদি’ বলে। তবু… চোখের ওপর উড়ছে অমরাবতীর আকাশ- বরফঠান্ডা বাতাস। পিছু হটার ভাবনা আমলই পাচ্ছে না। এ পথ মোটে দেড়-দু’মাসের জন্য খুলেই ফের তুষার গ্রাসের কবলে চলে যায়। সুতরাং মিস মানে সেই পরের বছর। সঙ্গে-সঙ্গে নেট-এ যেতে হল ট্রেন টিকিটের সাইটে। কিন্তু সবাই যে খেয়ালি নন তার ছাপ ছড়িয়ে আছে অ্যাভেলেবিলিটির পাতায়। ‘নো রুম’ পড়তে-পড়তে চোখে চালশে। ওরই মধ্যে হিমগিরি এক্সপ্রেসে ক’টা বাঁচাখোঁচা তখনও। এবার সঙ্গী হিসেবে যাদের পেতে চাই, জিজ্ঞাসা না করেই টিকিট কাটলাম তাদেরও।

বেড়ানোর ইচ্ছে একটা খ্যাপামির মতো। আমি ফড়িং হয়ে ছোট্ট পাখায় উড়ি তো মন দৌড়োয় ফিঙের ডানায়। অথচ ক-ত-কি-ছু। আছে ফর্ম ফিলআপ, সঙ্গীদের অনুমোদন… তবু ডেফিনিট পা ফেলেছি যেই, মন ‘পিসুটপ’-এর চড়াই ভাঙছে। ‘পেতে চাই’-টা জোরদার ছিল বলে এগোনো যাচ্ছে আর ইচ্ছেকে মান দিতে গেলে যেতেও হয়। আগ্রাসী আমি আদ্যান্ত এগিয়েও ঝকমারি চলছেই। বাকিদের যে বলাই হয়নি। কিন্তু কে জানত ঘাপটি মেরে আছে বিপুল বিস্ময়। ‘অমরনাথ’ শোনামাত্র তাদের উৎসাহের বাঁধ ভাঙল, বুঝিয়ে দিল ভুল।

‘দহ’ থেকে দয়া-য়

এবার নড়ে চড়ে বসতে হল। টিকিটের খোঁজে ঘোরাঘুরি শুরু হতেই দিল্লি অবধি ‘দুরন্ত এক্সপ্রেস’ ও ‘রাজধানী-জম্মু’র ই-টিকিট হয়ে গেল। পরের পর্যায়ে শুধু পহেলগাঁ অবধি পৌঁছোনো চাই। পড়লাম এবার হেলিকপ্টার নিয়ে। অমরনাথ শ্রাইন বোর্ডের যে সাইট দেখে অ্যাদ্দুর এগোলাম, এবার সেখান থেকে চাই রেজিস্ট্রেশন। ফর্মের সাধাসিধে প্রশ্নাবলী নিয়ে দিব্যি চলেছি, আটকালাম ‘হেল্থ’এ এসে। ডক্টরের নো অবজেকশন সার্টিফিকেট চাই। আরও চাই বললেই তো পাই না। ব্লাডগ্রুপ টেস্ট করানো, দুরারোগ্য রোগী নই জানিয়ে ডা.-এর মুচলেকা দেওয়া… অবশেষে দিন পাঁচেকে সব জুটিয়ে নিয়ে বসা গেল। কিন্তু সাইট এবার দাঁত ছরকুটে চেত্তা খাওয়া ঘুড়ি। ‘যাব’-‘যাব’ পাগলামি আর ঘাঁটাঘাঁটিতে তিনি একজস্টেড, খুললই না। প্রায় কাঁচা ঘুঁটি পাকা করে ফেলে শেষে কিনা দহ? ভাবা ছিল পহেলগাঁও থেকে চন্দনবাড়ি হয়ে ঘোড়ায় যাব ও ফিরব বালতাল দিয়ে হেলিকপ্টারে। হেঁটে হবে না, কেন না রাস্তা বিপদসংকুল। ঘনঘন ল্যান্ডস্লাইড, স্টিফ চড়াই-উতরাই ও খাদ পাহাড়ের মাঝখান দিয়ে কখনও ফুট দু-একের রাস্তা। এ সবও পরে, আগে রেজিস্ট্রেশন দরকার।

অতঃপর মেল-এ হেলিকপ্টার সার্ভিসেস-এর টেক্সট- ‘উড়ান অ্যাভেল করতে চাইলে টিকিট কাটুন- না হলে প্রেফারেন্স ডেটে পাবেন না।’ ফের সাইটে গিয়ে রেজিস্ট্রেশন করলাম এবং পঞ্চতরণী-বালতাল হেলিকপ্টর-এর টিকিট কেটে ফেললাম।

যাত্রা হল শুরু

যেই সব মিটে গেল, শুরু হল হাজারো প্রস্তুতি। ব্যাপারটা ইউজ্যুয়াল বেড়ানোর মতন যে নয় তা বুঝে গেছি। এরই মধ্যে দূরের এক যাত্রা-সাথির ফোন, কি কিনবে, কতটা প্রিপারেশন, স্লিপিংব্যাগ, সোয়েটার, জ্যাকেট… উত্তর দিতে-দিতে ও সবটার সঙ্গে জুড়তে জুড়তে ফের ছন্দে ফিরলাম। জুলাইয়ের তৃতীয় সপ্তাহ। ভোর সবে প্ল্যাটফর্মের কারশেড ছুঁয়ে নামছে, আমরা পৗঁছে গেলাম জম্মু। জানতাম যে জম্মু থেকে পহেলগাঁও শেয়ার জিপে যাওয়াই শ্রেয়। ওদিকে ট্যাক্সির পর ট্যাক্সি ছাড়লেও সবাই ‘শ্রীনগর শ্রীনগর’ চ্যাঁচায়। ক্রমশ যাত্রীশূন্য স্ট্যান্ডে ‘পহেলগাঁও’ শোনার অপেক্ষায় শুধু আমরাই দাঁড়িয়ে। অমরনাথের যাত্রী প্রায় নেই বললেই হয়। যদিও এই শেষ দিকে যাওয়ায় অসুবিধের চেয়ে সুবিধে পেয়েছি বেশি। আসছি তা’তে পরে। আগে বেসক্যাম্পে পৌঁছোই।

উড়াল

প্রায় ঘন্টাখানেক বাদে এক ড্রাইভার এল বোলেরো চালিয়ে। বাড়ি তার পহেলগাঁও, পথে পাবলিক পেলে রথ দেখা কলা বেচা সেরে নেবে। ভাগ্যিস! মুক্তচিত্তে এবার সুস্থির হয়ে বসা গেল। গাড়ি ছাড়তেই মনে ফূর্তির রোদ। একে অজানাকে জানার ইচ্ছেয় ভিতরটা লাফাচ্ছে তায় কাছে দূরের পাহাড়ে অফুরন্ত সবুজ। সময়টা ঠিকঠাক। জুলাই, মানে কাশ্মীরের গ্রীষ্মকাল। পরিপাটি রাস্তা, ভোরবেলাকার পবিত্রতা দিয়ে ধুয়ে যাচ্ছে সকাল। গাড়ি ছেড়েছে তখন আটটা। বেলা বাড়তে রেস্টুরেন্টে লাঞ্চ সেরে ফের উঠলাম ড্রাইভারের পাশের সিটে। সারাদিনে কখনও নদী, কখনও আপেল খেত, কখনও ড্রাইভারের বাড়ির উঠোন পেরিয়ে একসময় পৌঁছে গেলাম পহেলগাঁও। তখন সন্ধ্যার মুখ, কোথাও উঠতে হবে। তিনটে দেখাদেখির পরে সটান উঠলাম সেই হোটেলটায় যেটা বাসআড্ডা থেকে দেখা যাচ্ছিল দূরে– জঙ্গলের কপালে টিপের মতো। একেবারেই নতুন, সবুজ বনানীর ফাঁকে জ্বলজ্বল করছিল লাল-হলুদ বাহার নিয়ে একলা। খানিকটা উঁচুতে। এখন ‘নেব-নেব না’-র দোনামনা দেখে মালিক আশ্বস্ত করল, ‘নেচারমে রহনে কে লিয়ে আয়ে হো, রহে যাও। আনে যানে কা দিক্বত নেহি, মেন চৗকমে হোটেল কা গাড়ি ছোড় দেগা।’ আর কি চাই, চোখের সামনে লিডার নদী, নদীর পাশে ঘোড়ার সারি আর সাতশো কিসিমের ফুলের বিছানা বিছিয়ে পহেলগাঁও আনমনে শুয়ে। তার সবুজ এলোচুলের মাঝখানে কুয়াশার সাতকাহন। যেন সম্ভাবনার স্বপ্নে মজে টুকরো-টুকরো সুখের মুখ।

পূর্তি দিয়ে পূণ্যি

আমাদের যাত্রা পরদিনই, সুতরাং সরেজমিন তদারকিতে বেরোতে হল। শ্রাইন বোর্ড অফিসের খোঁজ, কিছু জানা, নিজেদেরটা জানানো, সেই বুঝে ব্যবস্থা নেওয়া, কাজ অঢেল। খোঁজখবর নিতে, গিয়ে পড়লাম এক বিস্তৃত প্রাঙ্গণে। সাজগোজ করা অফিস, নানা ধর্মের পতাকা ওড়ানো ভক্তবৃন্দ, মোবাইল রিচার্জ ও সিম বদলের দোকান, তাগাড় দেওয়া সোয়েটার-কম্বল, তাঁবু, ফুডস্টল। ঠিক মনঃপূত  হল না পরিবেশ। কেমন যেন খাবি খাওয়া বিধবস্ত দশা। অফিস আছে, লোক নেই। তাঁবু অনেক, মানুষ নেই। শুধু ফুডস্টলগুলো মুখর। অমরনাথ শ্রাইন বোর্ড এখান থেকেই যাত্রা শুরুর ব্যবস্থা রেখেছে। এটাই বেসক্যাম্প, কিন্তু প্রকৃতিগত ভাবে ভাঙা হাট। ইতিমধ্যে অফিসে লোক এল, কাজকর্ম মিটিয়ে গুটি গুটি এগোলাম স্টলের দিকে।

এই একটা ব্যাপার সারা অমরনাথের মুখ্য জায়গাগুলো জুড়ে। কী খাবার এখানে আছে আর কী যে নেই তা গবেষণার বিষয়। ভারতের সমস্ত রাজ্যের সেরা খাবারের দেদার আয়োজন। সবটা এ-ক্লাস শুধু নয়, পরিষেবাও বিনামূল্যে। চা থেকে চানা-বাটোরা থেকে সবজি, পায়েস, রোস্টেড পেস্তা-আখরোট-কাজু, ফল, ফুচকা, লাড্ডু, লো-ফ্যাট কার্ড, ব্রেড-রোটি, উপমা, জিরা রাইস, পোলাও মায় ফ্রুট জুস, হার্বাল টি, জোয়ান, বলে শেষ হবে না মেনু। বিভিন্ন ভাণ্ডারায় ২০ থেকে শুরু করে প্রায় ৫৬ রকম আইটেম। সেবা কার্যে নিয়োজিত কত যে মানুষ, আর সমস্ত কাজটা ভাণ্ডারা অর্গানাইজেশন করে চলেছে অমরনাথ সাইনবোর্ডের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে। সেবকদল কোনও কোনও ভাণ্ডারায় পরিচয়জ্ঞাপক ড্রেসে আছে তো কেউ-কেউ ক্যাজুয়াল ড্রেসে। লক্ষ্য সেই এক– সেবাদান। পূর্ণার্থীকে তৃিঀ৫ দিয়ে পূণ্যির দান জমানো। ওই উচ্চতা, এত মানুষ, আবহাওয়ার বৈপরিত্য সামলে যে কি করে তা অর্গানাইজড ওয়েতে চলেছে, না দেখলে বোঝা যাবে না। কোথাও জমে থাকা জঞ্জাল নেই, খাবারের প্রতিটি ট্রে বার্নারের ওপর তীব্র ঠান্ডাতেও ছ্যাঁকা লাগা উত্তাপে উষ্ণ। গ্যাস সিলিন্ডার, কাঁচা বাজার, চাল-চিনি-মশলাপাতি, কত যে স্টক, বিপুল যজ্ঞ। নিজেরাই হেঁটে উঠতে পারছি না ওদিকে এতসব মজুত প্রতি পাঁচ-সাত কিলোমিটার অন্তর। বরফে বরফ চারিধার, পিসুটপের চড়াই, তারপরেও, বিস্ময় অতল।

জয় জওয়ান

চন্দনবাড়ি থেকে মোট ৩২ কিলোমিটার পথে যতই উত্তর দিতে দিতে যাই না কেন, শেষ হয় না প্রশ্ন। ১৬ কিমি পর্যন্ত শেষনাগের রাস্তা ঝিম ধরানো সৌন্দর্যের খনি যেমন, তেমনি কঠিনতম। যদিও এ পথের সর্বোচ্চ পয়েন্ট মহাগুনাস পাস, যে পাস শেষনাগ ও পঞ্চতরণীর পিককে দোলনার মতো ধরে আছে। শেষনাগ থেকে ১৪ কিমি দূরে পঞ্চতরণী, রূপ ও মহিমায় সেরার সেরা। কী নেই সেখানে, জল, জঙ্গল, বরফিলা চূড়া, ঝরণা, সাঁকো, সোঁতা, মৗনতা। মাধুরী অশেষ। এরপর ৩ কিমি এগোতেই সংগম পয়েন্টে বালতালের রাস্তার সঙ্গে দেখা। বাকি ৩ কিমি উতরাই ও গ্লেসিয়ার। পেরোতে পারলেই বিপুল বিস্তার নিয়ে অমরনাথ গুহা।

এই সারা পথ জুড়ে ভারতীয় সেনাবাহিনীর অবদান বিবরণের বাইরে। কে কোথায় হাঁটতে পারছে না, দেবদূতের মতো হাজির জওয়ান। কেউ অন্ধকারে হা-ক্লান্ত হয়ে আসছে, তাঁকে টর্চের আলো দেখিয়ে এনে গরম পানীয়ে চাঙ্গা করছে জওয়ান, কারুর শারীরিক অসুবিধেয় কোলে করে এনে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা, সব কিছু সামলাচ্ছে হাসিমুখে। স্লঁরা মনপ্রাণ সঁপে নিয়োজিত বলেই যাত্রা নিরুদ্বিগ্ন। যদি কর্তব্য ও মহানুভবতার দিক এটা হয় তো বাকি খাটনি অন্যত্র। সেখানে দেশের দায়, দশের দায়। যেমন কথায় কথায় রাস্তায় ল্যান্ডস্লাইড, সে সমস্ত পরিষ্কার করে পূর্বাবস্থায় ফেরানো, যাত্রা পরিচালনা করা… একদম তুখোড় কুশলতা।

আজকের দিনে অমরনাথ যাত্রা আর হানাদারীর বার্তা একটা সমাপাতনের মতো। একের উচ্চারণে অন্যটি আপনি এসে দাঁড়ায়। এ জায়গার এফিসিয়েন্সি প্রশ্নাতীত। এক হাতে রিলিফ অন্য হাতে আর্মস নিয়ে সেনাদল কর্তব্যকর্মে নিবিড়। ছেয়ে আছে সর্বত্র… ভর্তি যাত্রীসহ বাস আসছে সেখানে, অস্থায়ী টেন্টে, ভাণ্ডারায়। যদিও সিকিউরিটি ফোর্সের কাছে নাইট ভিশন ক্যাপাবিলিটির সহযোগ ভরপুর, আছে বুলেট প্রুফ বাঙ্কার, তবু চ্যালেঞ্জ বইকি। সজাগ, সতর্ক, নিবেদিত প্রাণ জওয়ান-মনোযোগ পথের প্রতি ইঞ্চিতে।

প্রস্তুতি

ঘোড়া ঠিক করতে গিয়ে পড়েছি বিপুল সমস্যায়। এখন প্রায় ফাঁকা মাঠ, গোল দিলেই বল জড়াবে জালে। মানে ওপরে ওঠার যাত্রী নেই অথচ ঘোড়াওয়ালা ঢের। শেষের দিকে আসার ফল ফলতে শুরু করেছে। যতদূর দৃষ্টি যায়, দেদার ফাঁকা। সবুজ পাহাড়, গায়ে তার ঘাস চিবুনি একটি-দুটি ভেড়া আর মাঝে মধ্যেই তিরতিরিয়ে নেমে আসা সোঁতা। পা ভিজিয়ে গা ভিজিয়ে গান শুনিয়ে চলল। ছবিতে যেমন অহরহ দেখে থাকি, তেমন সারি সারি পিলপিলানো মানুষ নেই। শুরুতেই তাই দারুণ ভালো লাগা।

কিন্তু বেশিক্ষণ মুগ্ধতায় থাকা গেল না, ঘোড়া চড়াই ভাঙছে। সাংঘাতিক খাড়াই রাস্তায় টালমাটাল শরীর ক্লান্ত হচ্ছে ঘোড়ায় বসেও। যে সে নয়, এ পিসুটপের চড়াই, যাত্রা শুরু হল শক্ত প্রশ্ন দিয়ে। এন্তার এলোপাতাড়ি আপ-ডাউন, কাদা আর ঘোড়ার পটিতে থকথকে পথে ঘোড়াবাবাজির চার ঠ্যাং-এর কোনও এক ঠ্যাং ছেতরে চলেছে। গেল গেল ভাব সারাক্ষণ। বুঝতে পারছি, বরফ গলছে। খাতা বন্ধ করতে চলেছে পাহাড়, মাটি-জলে পথ বিপৎসংকুল। হেঁটে না উঠেও দম পুরো ফুস।

বাঁচাখোঁচা দমটুকু হাতড়ে নিয়ে চলেছি। মহাগুনাস পাস পেরোলাম, পেরোলাম পোষপাতরী। এখানে পাহাড়ের চূড়া যেন কেকের ওপরের আইসিং। ভারি যত্ন দিয়ে সাজানো। কুয়াশার চাদর সরিয়ে সূর্য কখনও দ্যুতি ছড়াচ্ছে, কখনও মুখ ঢাকছে। যেতে-যেতে বারবার মনের মধ্যে প্রণিপাত, তিনি চেয়েছেন বলেই আসতে পেরেছি, তিনি চাইলে তবেই ফিরতে পারব। এ এমন এক বন্যতা, যা চেতনাকে কিনারায় নিয়ে রাখে। যে-কোনও মুহূর্তে যা কিছু ঘটতে পারে। বেঁচে থাকতে পারি নাও পারি, এ’কথা রিংরিং করে মনের মধ্যে অনর্গল। এই রূপশালী প্রকৃতির কী ছেড়ে কী দেখি, কাকে যে দেখি। দুরূহ রাস্তা পেরোবার কিছু কানুন আছে, যা জানা ছিল না, অবস্থার ফেরে পড়ে বুঝলাম। যেমন এতটাই বেয়াড়া বাঁক কোথাও, যে সওয়ারিসমেত ঘোড়া নিয়ে এগোনোর প্রশ্ন ওঠে না, নামতেই হয়। তারপর সহিস ঘোড়া সামলে এগিয়ে যায়, গিয়ে দাঁড়ায় অপেক্ষাকৃত সুবিধেজনক জায়গায় আর মোক্ষম চ্যালেঞ্জে পড়ে যাত্রী। আসলে সরু যে পথে হেঁটে এগোচ্ছি, উলটোদিক থেকে সে পথেই আসছে ঘোড়া। হাজারো হাজারো ঘোড়ার বর্জ্য, বরফ গলা জল, ঝিরঝিরে ঝরনার উড়তি কণা, খাদ, কখনও পায়ের গোছ অবধি ডুবে যাওয়া তুষারপথ সামলে এগোনো। এই মাপের দুরূহ অবস্থা ভাবতে পারিনি বলেই ফেলে মারার শাস্তি জুটেছে মনে হয়। ছাড়ান নেই। পেরোতে হবে মানে হবেই।

স্বপ্নের নানারূপ

কেঁদে ককিয়ে, আধো বেঁচে আধো মরে একসময় পৌঁছে গেলাম শেষনাগ। ওটুকু অপারগতা বাদ দিলে সহিসকে পাই যে-কোনও অবস্থানে, যে-কোনও অবস্থায়। এখানে জীবন-মৃত্যুর চুল পরিমাণ ফাঁকের মধ্যে ঘোড়াওয়ালার ছড়ি-লাগামই ভরসা। ঘোড়া নিশ্চিন্তে পিছলোচ্ছে আর সওয়ারি সহিস-ভরসায় বিন্দাস। সে দায় তার, সওয়ার ও সওয়ারি দু’জনের। কীভাবে সে পারছে জানি না তবে অমরনাথের পথে এ আর এক দর্শন ‘অমরাথের’। নিজেকে শতধায় তিনি ছড়িয়ে রেখেছেন সর্বত্র!

এগিয়ে যাচ্ছি এগোতে হবে বলেই। ভাণ্ডারায় ঢোকার অবকাশ নেই, থাকব পঞ্চতরণীতে। উষ্ণ খাবার সেধে সেধে দিচ্ছে তারা সারাক্ষণ। এমনকী ঘোড়ায় চড়ে যখন এগোচ্ছি, দৗড়ে এসে কেউ ফ্রুটজুস ধরিয়ে গেল তো পাশের ভাণ্ডারার মানুষ দিয়ে গেল লাঠি, কেউ রুদ্রাক্ষ। পূণ্যের এই সেবাদানী ব্যাখ্যায় ও পার্থিব প্রাপ্তিবিহীন উদ্যোগে আপ্লুত মন আর্দ্র হয়েছে শতবার।

রূপের খনি

বেলা গেছে, বিকেলও ফুরোতে চলল। এসে গেছি শুদ্ধি-লোভে সবুজ জলের কোলে। এ কোল পাতা আছে অমরনাথ গুহার ৬ কিমি আগে। তুষারলিঙ্গের কাছে পৌঁছোনো যদি একটা লক্ষ্য হয়, তবে পৌঁছোতে যতগুলি উপলক্ষ্য, অমরনাথ তার সবটা জুড়ে আছেন নিজেকে একশো ভাগে ভেঙে। এমনই এক ছোট্ট ভাগের নাম- পঞ্চতরণী। সৌন্দর্যে, বন্যতায়, আবহাওয়ার আনপ্রেডিক্টেবল ধাঁচধরণ নিয়ে তার উপস্থিতি তীব্র, স্বনিয়ন্ত্রিত।  গা থেকে বচ্ছরকার বরফ খসিয়ে ফেলে এই ফুটে ওঠার মাঝে দেড়মাস কেটে গেছে, তবু আদিম ভাব তার এখনও সোচ্চার। এখানে রাত কাটাতে হবে ভেবেই ভিতরে ধুকুরপুকুর ভয়। চারিদিকে প্রচুর তাঁবু, তবু মাথায় ছাউনি তাদের কোনওটা নীল, কোনওটা সবুজ, কমলা, লাল। পাহাড় জুড়ে বরফ, পাদদেশে তার সবে জন্মানো কাঁচাসবুজ গুল্ম, তিরতিরে সোঁতার ওপর কাঠের সাঁকো আর রাজকীয় গরিমায় পঞ্চতরণীর শ্রেষ্ঠ মহিমা হয়ে টলটলাচ্ছে স্বপ্নসবুজ জল। এই ঐশ্বরিক সৌন্দর্য শুধু উপলব্ধির। কীসের টানে আমি এখানে তার উত্তর প্রতি পরতে সাজিয়ে বসে আছে চরাচর। না এলে অপূর্ণ জীবন।

বেছেবুছে তাঁবুতে

পৌঁছে গেছি। এবার বেছেবুছে একটা তাঁবুতে উঠলাম। হ্যাঁ, ঠিকই, বেছেবুছে। এই যে বললাম, শেষের দিকে আসার সুফল ফলতেঞ্জশুরু করেছে।ঞ্জএক-একটা তাঁবুতে কম করে বারো থেকে ষোলোটি শোবার জায়গা, অথচ কোথাওই দু’তিন জনের বেশি নেই। আমরা খুঁজেপেতে পুরো খালি একটাই চাইলাম, হয়েও গেল ব্যবস্থা। আহা, তারপর থেকে শুধু শীতে জবুথুবু কাঁপা, আর প্রকৃতিতে তাকিয়ে তাকিয়ে আনমনা হওয়া। ব্যস। এরই মধ্যে শরীরে ঠান্ডা আর অন্তরে রূপময় প্রকৃতির দাপট সইয়ে নিয়ে অন্দরে ফিরে চাইলাম। এক কোণায় একটা ব্যাটারি-হারিকেন আর পায়ের তলায় বিছানো খড়ের ওপর সারসার খাটিয়া। তবু যাহোক ঠিকঠাক এখানটা। কিন্তু পঞ্চতরণী থেকে অমরনাথ যেতে যেসব তাঁবু, তা সোজাসুজি বরফের ওপর পাতা। ভাবতেই পারলাম না মানুষ থাকল কী করে- তা সে যতই খড় বিছানো ঘর আর স্লিপিং ব্যাগের ওম হোক।

ভেতরে এসেও মন বসছে না। সূর্য ঢলছে, দিন পালাচ্ছে। মোটে একটা রাতের থাকায় কী জানি কী মিস করছি, অপার্থিব কিছু কি হারাচ্ছি? বাইরে বেরোলাম। সরু, পাথুরে পথে পাহাড়ি ঝরনা খেলছে, পা ফেলছি সতর্ক হয়ে। আচমকা কোনও বাঁকে সবুজরঙা জল দেখা দিয়েই মেলাচ্ছে, তারপর হঠাৎই একসময় টন টন বরফের মাঝে পান্নারঙা আলো, পৗঁছে গেছি স্বপ্ননদীর কাছে। হূদকোরকে কাঁপন, বুঝতে পারছি- ফুল ফুটছে। পাহাড় পাহাড় বেয়ে ধারা। স্রোতস্বিনী নামতে নামতে তুষার সোঁতায় বদলে গিয়ে মিশছে জলে, চুড়োর খাঁজে-ভাঁজে আটকে যাচ্ছে চারু মেঘের দল। জল আয়নায় পাহাড়ের প্রতিচ্ছবি আর বাস্তব চোখের আঙিনায় সিধেসাদা পরমেশ। কাকে দেখি! ছায়ামায়ার মুখ না বাউলিনি বিউটি এই ভাবতেই বেলা গেল। হু-হু ঠান্ডা হাওয়া যে কোথা থেকে আসছে ধেয়ে কে জানে।

আকাশ-পাহাড়-লেক ছাপিয়ে নজর গেল নীচের সাঁকোয়, সে একলা ভিজছে, ওপর দিয়ে ছোটো ছোটো ঢেউয়ের তিরতিরে জল অনর্গল।

দেখব ভিতরপুরে

ঘোড়াওলা ভোর পাঁচটায় আসবে বলে গেল, তাড়াতাড়ি বেরোতে চায়। অমরনাথ ঘুরে পঞ্চতরণীতে আমাদের রেখে ওরা সেদিনই ফিরবে। ফিরব আমরাও। হেলিকপ্টারে বালতালের পথে। এবার ঘুমোবার আপ্রাণ চেষ্টায় কাটল সারারাত। কী যে অস্বস্তি, কেন যে চারটে কম্বলের নীচেও কাঁপছি কে জানে। ‘চলো বহেনজি’ শুনে ধড়মড়িয়ে বাইরে এলাম। ঝকঝকে আকাশে তখনও তকতকে তারার মেলা। জমে যাচ্ছি ঠান্ডায়। টর্চের আলোয় দেখি কাঁধের কাছ থেকে ছিঁড়ে পরা লতপতানো সোয়াটারের তরুণ সহিসটি হাস্যমুখের আহ্বানে। প্রসন্ন হয়ে উঠল মন। বেরোলাম গায়ে শীত-তাড়ুনি একশো জগঝম্প চাপিয়ে।

এখন সবাই ফিরতি পথের যাত্রী- দর্শন শেষে নামছে আর আমি যাচ্ছি উজানে, ফাঁকার মজা নেব বলে। অনেকে বলেছিল এত দেরিতে গিয়ে কী পাবে? তুষারলিঙ্গ গলে যাবে, মিথ্যে কষ্ট করা। কিন্তু কেন? লেক-পাহাড়ের কিনারায় গজিয়েছে সবুজ ঘাস, একই ছাঁটে বেড়েছে তার মাপসই রেখা। বছরভরের বরফ-ঢাকা পাহাড় মোটে দেড় মাসের রোদ-সোহাগে যে সবুজের জন্ম দিল, সে দৃশ্য কিছু না? সাঁকোর জলখেলার দিকে চেয়ে-চেয়ে আমার যে চোখ ঝাপসা হচ্ছে, এটা কিছু না? দোকান-বিক্রেতার থেকে ফুল-নৈবিদ্য কিনে পুজো দিচ্ছে অমরনাথের। এটা উদ্দীপনার না? কেন ছোটো করে নেব আমার পাওনা-গণ্ডার হিসেব? হয়তো তুষারলিঙ্গের কাছে এমনই কোনও বৈভব লুকিয়ে আছে অপেক্ষায়, সেটাই দেখব… যা সবার নজরে এল না। এই ছড়িয়ে থাকা একশো ‘অমরনাথ’-এর টানই আমায় অমরনাথ-এ এনেছে।

ধন্যবাদ

ঘড়িটাতে প্রায় নিভে যাওয়া টর্চের আলো ফেলতেই সুনন্দর একটা ঝটকা লাগল। অন্ধকারে এগারোটা বেজে গেছে। বাজবে না-ই বা কেন, সেই কতক্ষণ আগে সাড়ে দশটা দেখে গুটিগুটি পায়ে শেষ মোমবাতিখণ্ডটা জ্বালিয়ে, খাওয়া শেষ করেই নিভিয়ে দিয়েছে। কিছুটা গাফিলতি থেকেই ঘরে আর মোমবাতি কিনে রাখেনি। সেরকম দরকারও পড়েনি। কোনওদিন এই তিন বছরে দু পাঁচ মিনিটের জন্য কারেন্ট গেলেও সেটা ধরা ছোঁয়ার মধ্যে নয়। কিন্তু গত রাতে ঝড়ে সব লন্ডভন্ড হয়ে যাওয়ার পর, কত যে ইলেকট্রিকের পোল উপড়ে পড়েছে তার কোনও হিসেব নেই। সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কোথাও তার ছিঁড়েছে তো কোথাও গাছের ডাল বা আস্ত একটা গাছই পড়ে গেছে পোলে ।

সকালে স্কুলে যে যার খুশি মতো কারেন্টের কথা বলতে আরম্ভ করেছিল। তবে ইতিহাসের তাজমুল সাহেব একটু আশার কথা শোনাল, ‘ম্যাক্সিমাম কালকের দিন, কারেন্ট চলে আসবে, জোর কাজ হচ্ছে।’ সবাই শুনে বলে উঠল, ‘আপনার মুখে ফুল চন্দন পডুক।’ সুনন্দ কিছু মন্তব্য করেনি, যে বিষয় জানে না, সে বিষয়ে কোনও রকমের মন্তব্য করা থেকে সবসময় নিজেকে সরিয়ে রাখে। তাছাড়া মাত্র তিনবছর হল এখানে এসেছে। এখনও এখানকার ইতিহাস ভূগোল সম্পর্কে কোনও জ্ঞান হয়নি বলে নিজে মনে করে। কারেন্ট না থাকলেও অর্থদফতরের একটা বিশেষ বিজ্ঞপ্তির জন্য স্কুলের সবাই বারবার মোবাইলের নেট খুলেছে। সেখানে সুনন্দের মোবাইলটাও বাদ পড়েনি। বাড়িতেও মা, ঝুমা এমনকী বিটকুর সাথে কথাও বলেছে, সকালে সন্ধেবেলাতেও। ঝুমা কারেন্টের কথাও জিজ্ঞেস করেছে। আসেনি, শুনে বলেছে, ‘তাহলে তাড়াতাড়ি খেয়ে শুয়ে পড়ো।’

‘সেটা এমনিতেই করতে হবে। যা দু-এক টুকরো মোমবাতি আছে তা দিয়ে কোনও রকমে খাওয়াটুকু হবে।’ সুনন্দ বলে।

ঝুমা প্রতিবারের মতো সেই একই রেকর্ড করা কিছু বুলি আউড়ে ফোন বন্ধ করে। সুনন্দ ফোনটা কাটবার সময় লক্ষ্য করে চার্জ শেষ। ইন্ডিকেটরটাও ব্রিম করছে। উপায় না দেখে ফোনটা পুরোপুরি বন্ধ করে চেয়ারে চোখ বন্ধ করে বসে থাকে। মাঝে একবার উঠে মোম জ্বেলেই খান চার রুটি তৈরি করে দুধ গরম করে নেয়। তরকারি করতে আর ইচ্ছে করে না। আধপো দুধ, একটা মিষ্টি, তিনটে রুটি খাওয়া হয়ে যাবে। একটা বাড়তি করা থাকল। কোনদিন কীরকম খিদে থাকে। না হলে সকালে ভুলো তো আছেই। প্রতি সকালে গোপালদা দুধ দিতে আসার সময় ওটাও চলে আসে, লেজ নাড়ে। সুনন্দ রুটি, বিস্কুট কিছু একটা দিলে খেয়ে পালিয়ে যায়, পরের দিনের আগে আর ওর পাত্তা পাওয়া যায় না। এই বাড়িতে ভাড়া আসার মাস কয়েক পর থেকেই ভুলোর রুটিন মোটামুটি এই রকম। অবশ্য মাঝে কোনওসময় আর ঘুরতে আসে কিনা সুনন্দ জানে না। সারাদিন স্কুল, ফিরে সামনের লাইব্রেরিতে ছোটোখাটো একটা আড্ডা দিয়ে, রুটি তৈরি করে খেয়ে ঘুমিয়ে পড়া। বেশির ভাগ শুক্রবার বাড়ি চলে যায়, ফেরে হয় রবিবার রাতে না হয় সোমবার সকালে। এই প্রোগ্রাম বদল বলতে মাঝে মাঝে স্কুলের কোনও স্যার বা দিদিমণিদের বাড়িতে গেট টুগেদার, তাও সব সময় যায় না।

প্রথম প্রথম ভাড়ার এক কামরার এই ঘরটাও গিলে খেতে আসত। কোনওদিন বাবা-মাকে ছেড়ে একা থাকেনি। ভালো কাজ পেয়েও ভিন রাজ্যে যায়নি। তবে সব সময় তো সবকিছু নিজের মর্জি মতো হয় না। বাবা মারা গেল। সেই বছরই আবার স্কুলে চাকরি পেল। প্রথম বছরটা প্রতিদিন আড়াইশো কিলোমিটার আপ ডাউন যাতায়াত করে শরীরের কলকব্জা সব ঢিলে হতে আরম্ভ করল। তারপরেই স্কুলের কয়েকজন স্যার দিদিমণির পরামর্শে বাড়ি ভাড়া করে মাকে এনে রাখলেও, মায়ের শরীর মন কোনওটাই জায়গাটার সাথে খাপ খাওয়াতে পারল না। অগত্যা আবার ডেলি-প্যাসেঞ্জারি। তারপরেই ঝুমা এল, এক বছরের মাথায় বিটকু। বিটকু জন্মাবার পরেও কয়েকটা মাস

ডেলি-প্যাসেঞ্জারি করে বাধ্য হয়ে স্কুলের কাছাকাছি ঘর ভাড়া নিল, একটাই ঘর সঙ্গে বাথরুম। বাড়ি মালিকের সাথে দেখা হওয়ার কোনও উপায় নেই। তবে ভাড়া দেওয়ার সময় প্রায় কান কামড়ে বলে দিয়েছিল, ‘সামনের স্কুলের মাস্টার তাই ঘরটা দিলাম, না হলে একা পুরুষ মানুষকে কোনওমতেই ঘর ভাড়া নয়।’ সুনন্দ কথাগুলো ঝুমাকে বলতেই সে কি হাসি। মজা করে বলে উঠল, ‘তাহলে আমি সব থেকে নিশ্চিন্ত, কিছু হলে ঠিক খবর পেয়ে যাব, ফোন নম্বরটা দিয়ে আসতে হবে।’

আবার বৃষ্টি নামল। সন্ধে থেকে একভাবে হয়ে কিছু সময়ের জন্য বিরতি নিয়ে আবার। মাঝে কয়েকটা ঘন্টা হুডুম হাডুম থাকলেও বৃষ্টিটা পড়েনি। সুনন্দ ঘরে চেয়ারে বসে বসে পাশে গোয়ালঘরের ছাদে বৃষ্টির ফোঁটা পড়বার শব্দ শুনতে পেল। জানলার পর্দা টেনে মশারি খাটিয়ে শুতে যাবে, এমন সময় দরজার কড়া নাড়াবার শব্দ পেল। সুনন্দ প্রথমবার কোনও আমল না দিয়ে আগের মতোই শোওয়ার ব্যাবস্থা করতে লাগল। কিন্তু আবার শব্দটা পেতে চেয়ার ছেড়ে দরজার কাছে দাঁড়াল। ঠিক বিপদে পড়লে কেউ কড়া নাড়লে যেমন শব্দ করে, তেমনি শব্দ।

চেষ্টা করেও মনের ভুল এটা নিজেকে বোঝাতে পারল না। দরজাটাও খুলতে সাহস হল না। কানের বা মনের কোনও ভুল নয় তো? তাও দরজার কাছে দাঁড়িয়ে রইল কিছু সময়। আবার সব চুপচাপ। অন্ধকার এখন আরও প্রকট। ঘরের ভিতরটা আরেকবার দেখে নিল। একটু গিয়ে দরজার উলটো দিকের জানলার পর্দা সরিয়ে বাইরেটা দেখবার চেষ্টা করল। সেই অন্ধকার, আর মাঝে মাঝে বিদ্যুৎ ঝলকানি। দরজার কড়াটা আবার নড়ে উঠল। সুনন্দ আস্তে আস্তে দরজার কাছে গিয়ে কাঁপা গলায় ‘কে…?’ জিজ্ঞেস করতে ওপাশ থেকে একটা মেয়েলি গলা শুনল, ‘একটু দরজাটা খুলবেন, খুব বিপদে পড়ে গেছি।’

মেয়ের গলা পেয়ে রীতিমতো ঘাবড়ে গেল। মেয়েটিরও গলাতে শব্দগুলো জড়িয়ে যাচ্ছিল। পাশের বাড়ির কাকুর কি কোনও বিপদ হল? বউদি এসেছে নাকি না, বউদি হলে তো নাম ধরে ডাকত। কিছুসময় দরজার কাছে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল, বাইরের কড়া নড়ে উঠল আবার।

আস্তে আস্তে দরজাটা একটু ফাঁক করে বাইরেটা দেখার চেষ্টা করল, কিন্তু মেঘে ঢাকা। অন্ধকার রাত্রি চোখ দুটো আটকে দিল। কিছু বুঝতে পারল না। কিছু সময় পরেই একটা গলা শুনতে পেল, ‘ভিতরে আসব, বাইরে খুব বৃষ্টি পড়ছে , দরজাটা ভালো ভাবে খুলুন।’

–আপনি কে, হঠাৎ আমার এ ঘরে তাও রাত্রিবেলা?

–সব পরে বলছি আপনি আগে দরজাটা খুলুন।

সুনন্দ দরজাটা ভালো ভাবে খুলে কিছু বলবার আগেই আগন্তুক ঘরের ভিতর সুনন্দকে পাশ কাটিয়ে তাড়াতাড়ি ঢুকে দরজার কাছে, সুনন্দের বিপরীতে বাঁদিক থেকে হাত পাঁচ দূরে দাঁড়িয়ে, বলে উঠল, ‘একটা গামছা টামছা কিছু দিতে পারবেন?’

সুনন্দের ঘোর তখনও কাটেনি। অন্ধকার হলেও চোখের সামনে দিয়ে একজন ভিতরে ঢুকল। রোগা নয় বোঝা গেল, সুনন্দের শরীরের সঙ্গে  হালকা ধাক্বা লাগল। চুড়িদার বা পাঞ্জাবি কিছু একটা পরে আছে।

আগন্তুকের পোশাকের জল গায়ে লাগার পরে দরজার ছিটকিনিটা তখনও না লাগিয়ে মেয়েটির দিকে তাকিয়ে বলল ,‘আপনি এভাবে ঘরে ঢুকে গেলেন?’

–দেখছেন না বাইরে কি অবস্থা!

–বাইরে এমন অবস্থা তো আমার বাড়িতে এলেন কেন? আর বাড়ি ছিল না?

–আসলে রাস্তার থেকে এই বাড়িটাই সামনে পেলাম, আলোও জ্বলছিল একটু আগে।

–আমি এ বাড়িতে একা থাকি।

–সেটা আমি বাইরে থেকে কীভাবে জানব?

–এবার তো জানলেন, তাহলে আসুন এবার। আমি আপনাকে পাশের বাড়ির বউদির কাছে দিয়ে আসছি।

–ভয় পাচ্ছেন? আপনার অতো ভয় কীসের?

–দিনকাল তো ভালো নয়।

–সে ভয় তো আমারও থাকবার কথা।

বাইরের বৃষ্টির ঝাপটা খোলা দরজা দিয়ে ঘরের ভিতর আসছে দেখে মেয়েটি বলে উঠল, ‘দরজাটা লাগিয়ে দিন, জল আসছে।’ সুনন্দ বুঝল মেয়েটির কথাগুলো একটু স্বাভাবিক হয়েছে। একটু আগেই হাঁপাচ্ছিল।

ঘরের ভিতরটা অন্ধকার। সুনন্দ মেয়েটিকে ভালো করে দেখতে না পাবার জন্য মেয়েটির বয়স, কালো না ফরসা, মুখ শরীর কিছুই বুঝল না।

–আপনি এত রাতে আমার দরজায় কড়া নাড়লেন, ঘরে ঢুকলেন, কি অসম্ভব আতান্তরে পড়লাম বলুন তো।

–সব বলছি, তার আগে কিছু একটা দিন মাথাটা মুছতে হবে। একটু খাবার জল পাওয়া যাবে?

একটু কষ্ট করে হেঁটে আগন্তুককে একটা বোতল ধরিয়ে বললাম, ‘জলটা নিন, গামছা দিচ্ছি।’ পিছনের দিকে ফিরতেই মেয়েটির জল পানের শব্দ শুনতে পেল। তার পরে একটা তৃপ্তির শব্দ এল, ‘আঃ।’

সুনন্দর হাত থেকে গামছা নিয়ে মাথাটা মুছে বলে উঠল, ‘আমি নন্দিতা। যাত্রাাদলে কাজ করি, কুশপুর গ্রামে যাচ্ছিলাম, কমলপুর চেনেন? এখান থেকে এক কিলোমিটার হবে নাকি?

–আরও বেশি। আমাদের স্কুলে ছাত্র-ছাত্রী আসে।

–ও আপনি স্যার? কোন স্কুলে পড়ান?

–এই গ্রামের হাইস্কুলে।

–যাই হোক। কমলপুরে আমার মাসি থাকে। ওখানে দেখা করে ভেবেছিলাম হেঁটে বা ভ্যানে কুশপুরে চলে যাব। বেরিয়েও ছিলাম। মাঝরাস্তায় এই বৃষ্টি।

–আপনি কি পাগল, রাত্রিবেলা এই গ্রামে ভ্যান কোথায় পাবেন?

–না না, রাত্রিবেলা নয়। আমি সন্ধের আগেই বেরিয়ে ছিলাম।

–তাহলেও এই গ্রামে-ঘরে এমনি ভাবে সন্ধেবেলাতে একা বের হতে নেই।

–আসলে আমি তো এদিককার কিছু জানি না। মাসিও একা থাকে। বাসে চেপেছিলাম। ঠিক চললে তাড়াতাড়ি পৌঁছে যেতাম। কিন্তু মাঝরাস্তায় বাস খারাপ। বাসেই বলল, ‘ভ্যান পেয়ে যাবেন।’ ভ্যানের আশায় হাঁটতে হাঁটতে অনেক দূর চলে এলাম। মোবাইলে চার্জ নেই, তার উপর জল ঢুকে গেছে, দলের কারোর সাথে কথাও বলতে পারলাম না। মাঝরাস্তায় বৃষ্টি নামতে একটা মন্দিরে দাঁড়ালাম।

–কোন দিকে

এই বাড়ির পূর্ব দিকে মনে হয়।

–পূর্ব দিকে কোনও মন্দির নেই, উত্তরে আছে, ধর্মরাজের মন্দির।

–যাই হোক, সেই মন্দিরের চাতালে বসেছিলাম।

–আপনি তো অদ্ভুত, একে অন্ধকার, তার উপর এই বৃষ্টি, আর আপনি একা মন্দিরে বসেছিলেন! যে-কোনও রকম বিপদ হতে পারত।

–প্রথমে একাই ছিলাম, তাতে অসুবিধা হয়নি, কিছুক্ষণ পরে কোথা থেকে তিন-চারজন ছেলে এসে বিরক্ত করতে আরম্ভ করল, তাই পালিয়ে এদিকে চলে এলাম। আপনাদের গ্রামে তো সন্ধেবেলাতেই রাত্রি নেমে আসে দেখছি।

–আপনি এখানে কখন এসেছেন?

–আধঘণ্টা হবে।

–এখন এগারোটার বেশি বাজে, এই বৃষ্টিতে কি সবাই বাইরে নাচবে? কারেন্ট নেই, খেয়ে শুয়ে পড়েছে। আপনি কটার সময় মাসির বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলেন?

–ক’টা হবে, সাড়ে ছটা, সাতটা।

–তখন তো বৃষ্টি পড়ছিল।

–সেই রকম জোরে পড়েনি।

–আপনার কথাবার্তাতে কীরকম সন্দেহ হচ্ছে। গ্রামে রাতেরবেলা কেউ বের হয় না, তারপর ওই মন্দিরেও সন্ধেবেলা কেউ যায় না।

–স্যার পৃথিবীর সব কিছু কি অঙ্কের নিয়মে হয়?

কিছু সময় দুজনেই চুপ থাকল। বাইরে তখনও সমানে বৃষ্টি পড়ছে, কমবার কোনও লক্ষণই নেই। মাঝে মাঝে বিদ্যুতের ঝলক ঘরের ভিতরের অন্ধকারকে কাঁপিয়ে আরও অন্ধকার করে, অদৃশ্য হয়ে নিজে সেই আগন্তুককে আরও রহস্যের চাদরে ঢেকে দিচ্ছে।

–আমি আজকের রাতটা আপনার ঘরে থাকব।

নিঃশব্দ অন্ধকার ঠেলে কথাটা কানে যেতেই সুনন্দের গলাতেও বজ্রপাত হল– মানে?

–মানে, যেটা বললাম।

–ক্ষ্যাপা পেয়েছেন নাকি আমাকে?

–কাল সকালেই চলে যাব।

–শুনুন একা থাকি, তাতে আবার স্কুলটিচার, কেউ জানতে পারলে আমাকে পিটিয়ে পায়েস বানিয়ে দেবে, সঙ্গে উপরি পাওনা বদনাম। বাড়ি থেকেও বের করে দেবে।

–এই যে বললেন আপনি এখানে একা থাকেন, তাতে আপনাকে কে বের করবে?

– বাড়ির লোক জানতে কতক্ষণ।

–কে আছে বাড়িতে?

–মা, বউ, ছেলে।

–তার মানে আপনি বউকে ভয় পান।

– আপনি খুব বাজে বকছেন।

–কেউ কিছু জানতে পারবে না, আমি খুব ভোরেই বেরিয়ে যাব।

–যত ভোরেই বের হন, এটা হতে পারে না। এমনি ভাবে রাতে আপনাকে আমি থাকতে দিতে পারি না।

–আপনি এক কাজ করুন, বউয়ের ফোন নম্বরটা দিন। আমি সব জানিয়ে দিচ্ছি।

–আপনি তো আমাকে আচ্ছা ঝামেলাতে ফেললেন, এটা সম্ভব নয়। আপনি প্লিজ বোঝবার চেষ্টা করুন। দরজা খুলে দিচ্ছি আপনি বাইরে চলে যান। সুনন্দর গলার উষ্মা বাড়তে লাগল।

–আপনি আস্তে আস্তে কথা বলুন, সবাই চলে আসবে।

সুনন্দ একপা এগিয়ে দরজার ছিটকিনিটা খুলতে গিয়ে ডান হাতে আরেকটা নরম হাতের ছোঁয়া পেল, সেই সঙ্গে ডান কানে একটা ফিসফিস হাওয়া, ‘আমাকে বের করে দেবেন না প্লিজ।’

সুনন্দর সারা শরীর ঝন্ঝন্ করে উঠল। ছিটকিনি থেকে হাতটা সরিয়ে দরজার ডানদিকে পিঠ দিয়ে দাঁড়াতেই সামনের জন বলে উঠল, ‘এই মুহূর্তে আমি যদি বাইরে বাঁচাও বাঁচাও বলে চিৎকার করি, কী হবে বলুন তো?’

–মানে! কথাটা বলবার সময় সুনন্দ ঢোঁক গিলল।

–মানে কাল সকালের আগেই আপনার স্কুল, বাড়ি, সবাই জানতে পারবে আপনি…

–কিন্তু আমি তো আপনাকে কিছু করিনি।

–রাতটা থাকি। কাল আলো ফোটার আগে বেরিয়ে যাব, কেউ কিছু জানতে পারবে না, কথা দিলাম।

সুনন্দ একটা শ্বাস ফেললেও বৃষ্টির শব্দে নিজের জায়গায় ঢাকা পড়ে গেল। কিছু সময় চুপ থেকে বলল, ‘আপনি কিন্তু ভোর তিনটে সাড়ে তিনটের সময় বেরিয়ে যাবেন, এখানে চারটে সাড়ে চারটে নাগাদ সবাই উঠে পড়ে। কেউ দেখতে পেলে আমাকে সুইসাইড করতে হবে।

–আপনি নিশ্চিন্তে থাকুন। আপনি আমার এত উপকার করলেন আর আমি এইটুকু করব না?

সুনন্দ সামনের দিকে এগোতেই মেয়েটি বলে উঠল, ‘আপনার ঘরে শাড়িটাড়ি তো নেই। আমার সালায়োরটা ভিজে জবজব করছে। এখানটাও ভিজে গেছে। এটা পড়ে থাকলে তো সমস্যা।

– লুঙ্গি চলবে ?

–লুঙ্গি! দারুণ। যাত্রাতে অনেকবার পরেছি। তাছাড়া র‍্যাপার তো পরি।

–তাহলে লুঙ্গি আর একটা শার্ট দিয়ে দিচ্ছি। তবে আর একটা সমস্যা হবে। আপনি এই ভিজে জামা কাপড়গুলো নিয়ে কী করবেন, এখানে তো রাখা যাবে না।

–না না এখানে রাখব কেন? চার পাঁচ ঘন্টাতে জল ঝরে যাবে, তারপর আমি পরে চলে যাব। সুনন্দ অন্ধকার হাতড়ে দেয়ালে ঝোলানো দড়ি থেকে লুঙ্গি আর শার্ট নিয়ে আগের মতোই অন্ধকার হাতড়ে এসে মেয়েটির হাতে দিয়ে বলল, ‘এই যে, সোজা আস্তে আস্তে হেঁটে বাথরুমে গিয়ে পোশাকটা ছেড়ে নিন।’

–অত দূর যাওয়া যাবে না। আপনার ঘরটা পুরো ভিজে যাবে। আমি এখানে চেঞ্জ করে নিচ্ছি, আপনি একটু দূরে দাঁড়ান।

–বাথরুমে গেলে ভালো হতো না?

–এখানেও খারাপ হবে না।

সুনন্দ সেই ছায়ানারীর কথামতো চেয়ারে বসল। অন্ধকারে ছায়ানারীর পোশাক বদলানো না- দেখতে পেলেও, বুঝতে পেরে চোখদুটো বন্ধ করে নিল। বন্ধ চোখেও মাঝে মাঝে ভালো দেখা যায়।

কিছু সময় পরে কানে এল, ‘ঘরে কিছু খাবার হবে?

কথাটা শুনে সুনন্দ চোখ খুললে সামনেটা আরও অন্ধকার হয়ে গেল।

কিছু বললেন?

–ঘুমিয়ে গেছিলেন?

না না, চোখ বন্ধ করে বসেছিলাম।

–ও! কিছু খাবার হবে?

–একটা রুটি আছে। মুড়ি হতে পারে। আর তো কিছু নেই।

–চিনি গুড় কিছু?

–চিনি আছে।

–ব্যস ব্যস। একটা রুটি চিনি মুড়ে দিয়ে দিন। প্লেট-ফেট দিতে হবে না।

–তা কি করে হয়, আমি প্লেটেই দিচ্ছি, আপনি ততক্ষণ ভিজে জামাটামাগুলো বাথরুমে মেলে দিয়ে আসুন। সোজা, আস্তে আস্তে হাঁটুন অসুবিধা হবে না। আমার টর্চটারও ব্যাটারি শেষ হয়ে গেছে।

–ভালোই হয়েছে, মাঝে মাঝে অন্ধকার ভালো।

কিছুসময় পর একটা জোরে শব্দ আর তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে উফ্ কথাটা শুনেই সুনন্দ ঘাড় ঘুরিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘কি হল, কোথায় ধাক্বা লাগল?’

–এই যে শক্ত মতন কিছুতে।

–বিছানা, একটু আস্তে আস্তে চলুন।

আগন্তুক বাথরুমে গেলে সুনন্দ একটা প্লেটে চারটে বিস্কুট, রুটি, চিনি নিয়ে বিছানাতে রেখে বলল, ‘এই বিছানাতে রাখলাম, খেয়ে নেবেন।’

আবার চেয়ারের জায়গায় ফিরে বসতেই বাথরুম থেকে ছায়ানারীর গলার আওয়াজ পেল, ‘বাথরুমে মেলব কোথায়?’

–একটা দড়ি আছে, দেয়ালের দিকে, সাবধানে দেয়াল ধরে ধরে যাবেন। চেয়ারে বসে থাকবার কিছুসময় পরেই কাঠের আলমারির উপর কিছু একটা পড়বার আওয়াজ পেয়ে চমকে উঠে বলল ‘কিছু ফেললেন নাকি?’

– এখানে ধাক্বা লাগল।

–আপনি ওদিকে গেছেন কেন, সোজা যেভাবে গেছিলেন সেভাবেই চলে আসুন। আস্তে আস্তে আসুন, বিছানাতে খাবার দেওয়া আছে।

চেয়ারে বসেই সুনন্দ পায়ের আওয়াজ এবং কিছুপরে বিছানার ক্যাঁচ ক্যাঁচ আওয়াজ পেল। কিছু সময় পরে মেয়েটি বলে উঠল, ‘আপনি বিস্কুটও দিয়েছেন, ভালো।’

সুনন্দের কানে চেবানোর আওয়াজ এল।

–আপনার বাড়িতে বউ মা আর ছেলে, বাঃ বেশ ছোটো পরিবার।

প্রথমবার কথাটার কোনও জবাব না পেয়ে আগন্তুক খেতে খেতেই বলে উঠল, ‘ঘুমিয়ে গেলেন?’

–আপনি তো ঘুমের বারোটা বাজিয়ে দিয়েছেন।

–আপনি রেগে গেছেন?

–কী হবে আপনার এই সব জেনে?

–মাত্র তো কয়েক ঘন্টা, চাপ নেবেন না।

–আপনার খাওয়া হয়ে গেছে?

–হ্যাঁ।

–শুয়ে পডু়ন। আমি মশারি টাঙিয়ে দিচ্ছি।

–আপনি?

–আমার কথা অনেক ভেবেছেন, ঘুমোন।

–ছিঃ ছিঃ। তা কি করে হয়। তার থেকে আপনি ঘুমোন আমি বসে থাকি। আমার রাত জাগা অভ্যাস আছে।

–বিছানাতে শুলে আমি আর উঠতে পারব না। ভোরে আপনাকে ডাকতেও পারব না। ।

–বাঃ বাঃ আপনি সেই একই কথা ভাবছেন। আমি তো আপনাকে কথা দিয়েছি।

–ঠিক আছে আপনি শুয়ে পড়ুন।

–আমি কি এই বিছানাতে শোবো?

–তাছাড়া, মাটিতে শুতে পারবেন না, জায়গাও নেই।

কিছুসময় দুজনেই চুপচাপ। বাইরে বৃষ্টির সাথে ঝড় উঠেছে। মাঝে মাঝে বিদ্যুতের আলো। ঘরের ভিতর দুজন অচেনা অল্প জানা মানুষদের একে অপরের কাছে কিছুসময়ের জন্য দৃশ্যমান করেই আবার নিজেকে লুকিয়ে দিচ্ছে।

–শুনুন না, আমার খুব খারাপ লাগছে, আপনি এইভাবে সারারাত বসে থাকবেন, আর আমি শুয়ে থাকব। তার থেকে আপনি শুয়ে পড়ুন।

–অনেক জ্বালিয়েছেন এবার একটু ক্ষ্যামা দিয়ে শান্তিতে বসতে দিন। রাতে ঘরে ঢুকেছেন, খেতে পেয়েছেন, শুতে পেয়েছেন, এবার ঘুমোন। আমাকে শুধু চাদরটা বের করে দিন। বালিশের নীচে পাবেন।

চাদর ঢাকা নিয়ে পাদুটো সোজা করে বসতে সুনন্দ স্পষ্ট বুঝতে পারল আগন্তুক শুয়ে পড়েছে।

সুনন্দ চোখ দুটো বন্ধ করে নিল। এই অন্ধকার বৃষ্টির রাতে ঝুমা থাকলে অন্যরকম সমীকরণ তৈরি হতো। সুনন্দ চারদিকটা আরেকবার দেখে নিল। ছায়ানারী শুয়ে আছে। সুনন্দের শরীরের অনেক অঙ্ক, অসমীকরণ ঝাঁপাঝাঁপি আরম্ভ করলেও উত্তর নেই, পাতা উলটে সমাধান করবার উপায় নেই। এক একটা দিনের উচ্চতা, দূরত্ব বাকি সব দিন বা রাতের সূচক ছাড়িয়ে যায়। উত্তর মেলে না, শুধু পাতার পর পাতা ব্যর্থ কষা। সমীকরণ, অসমীকরণের গ্রাফ, লগ, বা পাটিগণিতে শরীর নষ্ট হয়, পায়জামা, লুঙ্গি ভিজে দাগ হলেও শুধু জয় জগন্নাথ বলে রণে ভঙ্গ দেওয়ার অঙ্ক শিখে নেওয়ার মধ্যেই তো সব গ্রাফ, সব জটিল বিষয়ের মিল!

–মাস্টারদা, ও মাস্টারদা।

বাইরের আওয়াজে থতমত খেয়ে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল সুনন্দ। ঘরের ভিতরে সব আলো জ্বলছে। মশারিটা এখনও খাটানো রয়েছে। তার মানে গতরাতের মেয়েটা এখনও শুয়ে আছে। মাথার ভিতরটা দপ্দপ্ করতে লাগল। জীবন, জীবিকা সবের বারাটো বেজে যাবে। তাড়াতাড়ি রান্নাঘর থেকে দুধের বাটি নিয়ে দরজার কাছে আসতেই জলে হালকা পিছলে গেলেও সামলে নিয়ে, ছিটকিনি খুলে ডান হাতটা বের করে দুধ নিল।

–কি ব্যাপার মাস্টারদা, আজ এত ঘুম, কখন থেকে ডাকছি।

–কাল সারারাত কারেন্ট ছিল না, ঘুম হয়নি, ভোরে ঘুমিয়ে গেছি।

বেশি কথা আর না বাড়িয়ে দরজায় ছিটকিনিটা লাগিয়ে দিল। মেয়েটা কথা রাখল না। বলেছিল ভোরে চলে যাবে। এবার কী হবে? সুনন্দ মশারির কাছে আসতেই দেখল বিছানা ফাঁকা। মেয়েটা? বাথরুমে!

সুনন্দ বাথরুমের কাছে এসে দরজায় টোকা দেওয়ার জন্য হাত বাড়াল। কিন্তু টোকা দিতেই দরজা খুলে গেল। তাহলে মেয়েটা!

চোখ পড়ল বাথরুমের দেয়ালের টাঙানো দড়িটাতে, ওই তো, লুঙ্গি, শার্ট।

তাহলে মেয়েটা! চলে গেল? না, তাহলে তো দরজার ছিটকিনিটা ভিতর থেকে দেওয়া থাকত না। কেমন পাগল পাগল লাগছে নিজেকে। মেয়েটা তো গতকাল রাতে ঘরে এসেছিল, অন্ধকার হলেও সুনন্দ এতটা ভুল দেখেনি।

সুনন্দ রুটির জায়গাটা খুলল, কী আশ্চর্য এই তো রুটিটা আছে। কিন্তু কাল রাতে নিজে একটা প্লেটে মেয়েটাকে রুটিটা দিয়েছিল, তাহলে!

মশারিটা তাড়াতাড়িতে খুলতে গিয়ে দুটো দড়ি ছিঁড়ে ফেলল। দলা পাকিয়ে একপাশে সরিয়ে রেখে বিছানাতে হাত দিল। এই তো পায়ের দিকটা ভিজে। বালিশটাও সাঁতস্যাত করছে। চাদরটা কুঁচকে আছে পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে কেউ শুয়ে ছিল।

সুনন্দর শরীরে একটা অসমীকরণের স্রোত বইতে আরম্ভ করলেও, এবারেও কোনও সমাধান বা উত্তর মেলাতে পারল না। বালিশটা সরাতে একটা ভাঁজ করা ছোটো কাগজ দেখতে পেল। হাতে নিয়ে খুলতেই বুঝল বাসের টিকিট। ভাড়ার টাকা কিছু না লেখা থাকলেও টিকিটের নীচের দিকে ধন্যবাদ লেখাটাতে চোখদুটো আটকে গেল।

 

পড়ার জন্য সীমাহীন গল্প-নিবন্ধসাবস্ক্রাইব