পবিত্র মনোরম হরিদ্বার

সন্ধ্যায় হাওড়া থেকে দুন এক্সপ্রেস ধরলাম হরিদ্বার ভ্রমণের জন্য। টাইম-টেবিল মেনে দ্বিতীয় ভোরে আমরা পৌঁছোলাম হরিদ্বারে।

স্টেশন চত্বর থেকেই একটা অটো ভাড়া করে রাস্তাঘাট দেখতে দেখতে আমাদের বুকিং করা নির্দিষ্ট হোটেলের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা হোটেলে পেঁছে রুম-এ ঢুকে ফ্রেশ হয়ে নিলাম। ভারি সুন্দর দৃশ্য দেখা যাচ্ছিল দোতলার ঘর থেকে। সামনেই উন্মুক্ত গঙ্গা। দেখেই মনপ্রাণ জুড়িয়ে যায়। সূর্য  দেখি ঘুম ঘুম চোখে উঁকি দিচ্ছে আকাশের ক্যানভাস জুড়ে।

সিগারেট ধরিয়ে বারান্দায় এসে বেতের চেয়ারে আরাম করে হেলান দিয়ে বসলাম। একটু সময় বসে থাকতেই চারিদিকের সুশোভন প্রকৃতি আমার ক্লান্তি যেন কোথায় উড়িয়ে নিয়ে গেল। পেটের মধ্যে কেমন যেন চোঁ চোঁ শব্দ হতেই বুঝলাম খিদে পেয়েে। আগের রাতে তিনটে রুটি আর একটু ফুলকপির তরকারি, খিদে পাওয়ারই কথা! যথা ভাবা সেইমতো কাজ। ঠিক করলাম একটু এগিয়ে পাঞ্জাবি হোটেল থেকে কিছু হরিদ্বারী খাবার খেয়ে আসব। সকলেই রাজি হল, চললাম খেতে। আমি আগে থেকেই নেট সার্চ করে এখানকার দোকানপাঠ, রাস্তাঘাটের বিবরণ জেনে নিয়েছি, যাতে স্বাচ্ছন্দ্য বজায় থাকে।

ভারতের সকল ভ্রমণ স্থলগুলির মধ্যে হরিদ্বার অন্যতম একটি আকর্ষণীয় স্থান। এখানকার প্রাকৃতিক পটভমি ও মনোরম দৃশ্য আমাদের হৃদয়ে পরম আনন্দের সঞ্চার করে। এখানে প্রবাহিত গঙ্গা সকলের মনপ্রাণ প্রসন্ন করে। গঙ্গার নির্মল পবিত্র রূপ ও ধারা যেন জায়গাটিকে বিশ্বের প্রথম সারির ভ্রমণস্থলে পরিণত করেছে। ঋষি, মুনি, সিদ্ধ পুরুষদের আনাগোনায় এই তপস্যাভমি সবসময় সরগরম থাকে। শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কারণেই নয়, হরিদ্বারে একটি ধর্মীয় পটভূমিও রয়েছে।

প্রাচীন ঐতিহ্য ও মাহাত্ম্যে এই জায়গাটি খুবই সমাদৃত। দেশের এবং বিদেশের ভ্রমণযাত্রী ও পর‌্যটকরা এখানে আসেন বহু দূর থেকে। গঙ্গার ধারে শান্ত সমাহিত পরিবেশে সময় কাটানোর জন্য হরিদ্বার, পর্যটক ও তীর্থযাত্রীদের কাছে খুবই আকর্ষণীয়। যেমন নামেতে ধর্মীয় মাহাত্ম্য জড়িয়ে আছে, তেমনই এখানকার পর্যটন মাহাত্ম্যও কম নয়। এখানে অগণিত মন্দির, আশ্রম, শিবালয়, বন-উপবন, বাটিকা, পাহাড়, পর্বতীয় দেবালয় এবং তীর্থকেন্দ্র অবস্থিত। এখানে গঙ্গা, পর্বত প্রদেশ হতে কলকল শব্দ করতে করতে সর্বপ্রথম সমতলভমিতে প্রবাহিত হয়েে। এজন্যই এ-স্থলের নামকরণ হয় গঙ্গাদ্বার।

এখানে বেড়াতে এসে জানলাম হর-কি-পৌড়ি হরিদ্বারের প্রধান ঘাট। আর আছে বিষ্ণু ঘাট, রাম ঘাট, গো-ঘাট। দুজন সাধুকে দেখলাম ছাইভস্ম মেখে আখড়ায় বসার তোড়জোড় করছেন। স্বচ্ছ ভারত অভিযানে এখানে অনেকগুলি শৌচালয় ও জামা-কাপড় বদলানোর জায়গাও হয়েে সরকারি উদ্যোগে। তাছাড়া ঘাটগুলিও সত্যিই পরিষ্কার।

খুব জানতে ইচ্ছে হল হরিদ্বার নামকরণ হল কেন? স্কন্ধপুরাণে এইস্থল মায়াপুরী নামে বর্ণিত আছে। কালক্রমে হরিদ্বারের এক সামান্য অংশে পরিণত হয়েে। বর্তমানে উক্ত স্থানকে কঙ্খল বলে অভিহিত করা হয়ে থাকে।

শত সহস্র বছরের প্রাচীন গঙ্গার দক্ষিণ তটে অবস্থিত এই ভ্রমণক্ষেত্র বা তীর্থক্ষেত্র। বিশাল পর্বতরাশি কেটেই গঙ্গা এখান থেকে সমতলে অবতীর্ণ হয়েে। হরিদ্বারে গঙ্গা প্রায় এক কিলোমিটার চওড়া। সেজন্যই নানা শাখা-প্রশাখায় বিভক্ত। হাজার হাজার যাত্রী এখানে সকাল সন্ধ্যায় গঙ্গাস্নান এবং গঙ্গা আরতি দর্শনে বিপুল আনন্দ ও পুণ্য লাভ করে থাকেন।

হরিদ্বারে প্রতি বছর কোটি কোটি যাত্রীর আগমন ঘটে চন্দ্রগ্রহণ, সূর্যগ্রহণ, অমাবস্যা, বৈশাখী, মকরসংক্রান্তি ও মাঘীস্নানে। ১২ বছর পরে পরে কুম্ভ ইত্যাদি স্নান উপলক্ষ্যে এখানে অত্যন্ত ভিড় হয়। পূণ্যস্নান ও মেলায় লক্ষ লক্ষ যাত্রী সমাবেশ হওয়ার ফলে হরিদ্বার আলাদা মাহাত্ম্য লাভ করে। দুই মাসব্যাপী কুম্ভপর্ব উপলক্ষ্যে এখানে বয় আনন্দের বন্যা। কোথাও কীর্তনীয়ারা ভজন কীর্তন করছেন, কোথাও চলছে যজ্ঞানুষ্ঠান। আবার কোথাও মহাত্মাগণ সদুপদেশ দান করছেন এবং কোথাও বিরাট দানপুণ্য চলছে।

travel
Haridwar

এবারে জেনে নেওয়া যায় হরিদ্বারের প্রাচীন ইতিহাস পৌড়ির রাজপুতদের পর হরিদ্বার কয়েকবার মুঘলরা আক্রমণ করে। আক্রমণের ক্ষতচিহ্ন হিসাবে ভেখজির প্রতিমা (ভেখ অর্থাত্ আখড়া), নবগ্রহের মূর্তিগুলি (কাংড়া মন্দির) এবং হর কি পৌড়ির ভগবান বিষ্ণুর মন্দির দেখা যেতে পারে।

হরিদ্বারের আবহাওয়া খুবই মনমুগ্ধকর। গ্রীষ্মকালে সূর‌্যদেব এখানে তার নিজ আধিপত্য বিস্তার করতে পারেন না। সন্ধ্যাবেলায় গঙ্গার তীরে বসে থাকলে মন শান্ত ও পুলকিত হয়। কিন্তু শীতকালে আবার প্রচন্ড ঠান্ডা।

আমরা খানিক বিশ্রামের পর শহর দেখতে বেরোলাম। অনেকেই খেয়াল করে থাকবেন, রেলওয়ে স্টেশন থেকে বাইরে বেরিয়ে এলেই সন্মুখে প্রাপ্তি ফোয়ারা। ফোয়ারা থেকে তিনধারে রাস্তা বেরিয়ে গেছে। এক রাস্তা সোজাসুজি হরিদ্বারের উপর দিয়ে হর কি পৌড়ির দিকে, দ্বিতীয়টি কঙ্খলের দিকে, আর তৃতীয়টি স্টেশনের আগে বের হয়ে পেছন দিকে দক্ষিণ দিশার জ্বালাপুরে চলে গেছে। ঋষিকুল, কুরুকুল এবং ভারত হেভি ইলেক্ট্রিক্যালস উক্ত রাস্তায় পড়ে। বাণীপুর মোড় থেকে এই রাস্তা মোড় ঘুরে যুক্ত হয়েে।

হরিদ্বারের অভিমুখী রাস্তায় চলতে চলতে ফুহারেনুমা প্রতিমা দর্শন করবেন। এর নিকটেই হাতের ডানদিকে চিত্রা সিনেমা হল। সিনেমা হলের সোজাসুজি অন্য একটি ছোট্ট রাস্তা গঙ্গার কিনারা পর্যন্ত চলে গিয়েে, যা আজ কালের গর্ভে সমাহিত। ওই রাস্তার দুধারে চোখে পড়ে বড়ো বড়ো আশ্রম ও সুন্দর সুন্দর অট্টালিকা। সন্মুখে চলতে চলতে রাস্তার বাম দিকে স্টেশনের সীমানা পার হয়ে গেলে পঞ্চায়েি মারওয়াড়ি এবং ডানদিকে কলকত্তাওয়ালি মুরলীমল ও বাসন্তীদেবীর ধর্মশালা। এগুলি পার হয়ে এলে কিছু দূরে অবস্থিত লালতারো পাকা পুল।

উক্ত পুল থেকে কিছু দূর এগিয়ে গেলে বামদিকে রাস্তার ধার ঘেঁষে অপর একটি রাস্তা সোজা বিশ্বকেশ্বর মন্দির পর‌্যন্ত চলে গেছে। এই রাস্তার ওপরে শ্রীগুরু সিংহ সভা গুরুদ্বারা নামে একটি বিশাল গুরুদ্বারা আছে। যাত্রীদের অবস্থানের জন্য উক্ত গুরুদ্বারে যথোপযুক্ত সুব্যবস্থা রয়েে।

ভোলাগিরি রোড গঙ্গাতীর ধরে চলে গেলে মোতি বাজার। এটি হর কি পৌড়ি পর‌্যন্ত বিস্তৃত। উক্ত রোডে গীতা ভবন, ভোলাগিরি আশ্রম এবং শেঠ কেশব দেব ধর্মশালা, বিড়লা ভবন, কর্ণাটক ধর্মশালা ইত্যাদি আছে। সবজিমন্ডি থেকে রাস্তা নীচের বাজার পর‌্যন্ত বিস্তৃত। ওই বাজারে প্রচুর দোকানপাঠ আছে। হর কি পৌড়ি থেকে পাহাড়ের নীচ দিয়ে একটা রাস্তা ভীমগোডা, সপ্তধারা, ঋষিকেশ ইত্যাদি অঞ্চলে চলে গেছে।

প্রধান দর্শনীয় স্থলগুলির মধ্যে মনসাদেবী মন্দির, বিল্বকেশ্বর মহাদেব মন্দির (মনসাদেবী মন্দির যাওয়ার উড়ান খোটলা যেখান থেকে শুরু হয়, ঠিক তার নীচে দিয়ে একটি রাস্তা, বাইপাশ রোড হয়ে চলে গেছে এই মন্দিরে), পার্বতী মায়ে মন্দির, শান্তিকুঞ্জ, পতঞ্জলী যোগপীঠ, চণ্ডীদেবী মন্দির, ভীমগোডা মন্দির, বিশ্বকেশ্বর মন্দির, মায়াদেবী মন্দির, স্বামী বিবেকানন্দ পার্ক, গীতা ভবন, পারদ শিবলিঙ্গ, রাঘবেন্দ্র মন্দির, ভপতওয়ালা, ভারতমাতা মন্দির, বৈষ্ণোদেবী মন্দির, সপ্ত সরোবর, ভমা নিকেতন, গৌরীশংকর মহাদেব মন্দির, নীলধারা পক্ষীবিহার, জয়রাম আশ্রম, কুশাবর্ত ঘাট, সুরেশ্বরী দেবী মন্দির, প্রেমনগর আশ্রম, ভারতসেবাশ্রম সংঘ, রামকৃষ্ণ মিশন (হাসপাতাল, কঙ্খল), প্রভতি অনেক কিছু দেখার আছে এখানে।

 

অন্যান্য দর্শনীয় স্থান

২৬ কিলোমিটার দূরত্বে চিল্লা ওয়াইল্ড লাইফ সাংচুয়ারি। হৃষিকেশ, যা হরিদ্বার থেকে ২০ কিলোমিটার দূরে উত্তর-পূর্ব দিকে গঙ্গার কিনারায় অবস্থিত। এখান থেকেই উত্তরাখন্ডের বদ্রিনাথ, কেদারনাথ, গঙ্গোত্রী, যমুনোত্রী আদি পবিত্র তীর্থস্থানগুলির উদ্দেশে বাসযাত্রা আরম্ভ হয়। এখানে শুধুমাত্র একটিই বাজার রয়েে। অধিকাংশ যাত্রীই পাঞ্জাব সিন্ধক্ষেত্র এবং বাবা কালী কমলিওয়ালে ধর্মশালাতে অবস্থান করেন। এছাড়া স্বর্গাশ্রম, গীতাভবন, শিবানন্দ আশ্রম, হেমকুন্ড ও গুরুদ্বারা ট্রাস্ট নির্মিত গুরুদ্বারাতে বহু যাত্রী রাত্রিযাপন করেন। ত্রিবেণী ঘাট, ভরত মন্দির, লছমন ঝুলা, রাম ঝুলা, পরমার্থ নিকেতন, নীলকণ্ঠ মহাদেব, সবই প্রাকৃতিক সৌন্দর‌্য ও মাহাত্ম্যে ষোলোআনা পরিপূর্ণ।

হরিদ্বার থেকে তিন কিলোমিটার দূরে অবস্থিত অতি প্রাচীন এক দর্শনীয় স্থান কঙ্খল। হরিদ্বার স্টেশনে নামার পর রাস্তায় যেতে যেতে মৃতু্যঞ্জয় মহাদেবের মূর্তি নজরে আসে। সেখান থেকে ডানদিকে এক রাস্তা চলে গেছে। ওই রাস্তাই মায়াপুরী হয়ে কঙ্খল পর‌্যন্ত বিস্তৃত। দক্ষমন্দির, সতীকুন্ড, সতীঘাট, অবধূত মন্ডল, আনন্দমযী মা-র আশ্রম, গুরুদ্বারা গুরু অমর দাস, হরিহর আশ্রম, গঙ্গা ইত্যাদি বেশ কিছু দর্শনীয় স্থান রয়েে।

হরিদ্বারে যারা আসেন তারা জানেন যে, এখানে শুদ্ধ নিরামিষ ভোজনই পাওয়া যায়। ভাত, রুটি ছাড়াও দেশি ঘি-এর তৈরি অন্যান্য উপাদেয় খাবারও এখানে পাওয়া যায়। কোনও রকম আমিষ খাবার না থাকার জন্য দুঃখ হবার কথা নয়। কিছু বাঙালি হোটেলও রয়েে। তবে প্রায় সব হোটেলেই থালি সিস্টেম। বাঙালি হোটেলের মেনুতে থাকে দেরাদুন চালের ভাত, ঘি, বেগুনি, ঝুরোঝুরো আলুভাজা, ডাল, পোস্ত, অন্য সবজির দুটো তরকারি, চাটনি, পাঁপড়।

ইচ্ছে করলে লাইন হোটেল থেকে গরম তাজা দুধ কিনে খেতে পারেন। খাঁটি দুধের তৈরি রাবড়িও খুব ভালো। রসনার তপ্তির জন্য একটু পরখ করে দেখতেই পারেন। এখানে বেশকিছু মিষ্টির দোকান রয়েে, যেখানে হরিদ্বারের বিখ্যাত প্যাঁড়া পাওয়া যায়। আসার সময় বাড়ির জন্য কিনে আনতে পারেন। এখানকার লস্যির স্বাদ একেবারেই অন্যরকম। এক গেলাস লস্যি পান করলে সমস্ত ক্লান্তি দূর হয়ে যাবে।

কীভাবে যাবেন : প্রতিদিন হাওড়া থেকে উপাসনা এক্সপ্রেস দুপুরে এবং দুন এক্সপ্রেস রাতে হরিদ্বারের উদ্দেশে রওনা দেয়।

কোথায় থাকবেন : এখানে থাকার জায়গার কোনও অভাব নেই। বিভিন্ন বাজেটের সরকারি, বেসরকারি হোটেলে রয়েে। রয়েে বিলাসবহুল রিসর্ট। এছাড়া অগুনতি ধর্মশালা রয়েে, যেখানে অল্প রেট বা অনুদানের ভিত্তিতে থাকা যায়।

যৌনসম্পর্ক স্থাপনে উদার হলেই কি সমস্যা মিটবে?

দিল্লির সেন্ট্রাল রিজার্ভ পুলিশ ফোর্স-এর এক ৩০ বছর বয়সি মহিলা কনস্টেবল, তাঁর সহকর্মীর বিরুদ্ধে ধর্ষণের লিখিত অভিযোগ জানিয়েছেন।

ওই কনস্টেবল-এর বক্তব্য, সিআরপিএফ-এ সেক্স র‌্যাকেট চলছে। মহিলা কনস্টেবল-এর স্নানের দৃশ্য কিংবা পোশাক বদলানোর দৃশ্য ক্যামেরাবন্দি করে ব্ল্যাকমেল করার চেষ্টা করা হচ্ছে। কিন্তু, অভিযোগকারিণী কুস্তি প্রতিযোগিতায় পদকজয়ী হওয়া সত্ত্বেও, এমন দুর্ভাগ্যজনক ঘটনার শিকার হয়েছেন।

আর এই ঘটনা থেকে প্রমাণিত হয় যে, আমাদের পুলিশ ফোর্স কোনও নিশ্চয়তা দিতে পারে না মহিলাদের সুরক্ষার ক্ষেত্রে। এমনকী তাদের মহিলা সহকর্মীরাও সুরক্ষিত নয়।

একবার প্রকাশ্যে আদালতে সেনা আধিকারিকরা বিরোধীতা করেছিলেন মহিলাদের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করার বিষয়ে৷ বিরোধীদের ভয় ছিল যে, মহিলারা যুদ্ধে গেলে প্রতিপক্ষ ছাড়বে না তাদের। আর মহিলাদের প্রতি এই তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যের মনোভাব এবং তাদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার যারা করছেন, তাদের লজ্জা হওয়া উচিত। আসলে, মহিলাদের কীভাবে গৃহবন্দি করে রাখা যায়, সেই চেষ্টা চলছে সর্বত্র। ধর্মীয় রীতি-নীতিতেও এই একই উদ্দেশ্য বলবত করার নির্দেশ দেওয়া আছে সেই প্রাচীনকাল থেকেই।

রাজা এবং জমিদারের আমলেও মহিলাদের সমানাধিকার এতটা লঙ্ঘিত হতো না। কারণ তাঁরা চাইতেন যেভাবেই হোক উত্পাদন বৃদ্ধি পাক এবং ট্যাক্স বাবদ আরও টাকা আসুক।

সব ধর্মের ইতিহাসে দেখা গেছে যে, যারা মহিলাদের দোষী সাব্যস্ত করেন, তাদেরই গুণগান করা হয়। সীতাকে রাবণের লঙ্কা থেকে উদ্ধার করার পর, রাম সীতার উদ্দেশ্যে যা বলেছিলেন, তা খুবই নিন্দনীয় ছিল। কিন্তু, সেই রামকেই পুজো করা হয়।

বর্তমান সময়ের প্রেক্ষিতে, মহিলাদের এক যুক্তিপূর্ণ বক্তব্য তুলে ধরার মতো। তাদের মতে, পুলিশ-প্রশাসন ঠিক থাকলে ধর্ষণের মতো পৈশাচিক ঘটনা আটকানো যাবে অনেকটাই। আর একটা বিষয় খুবই দুঃখজনক যে, পুলিশ ফোর্স-এর কিছু মহিলা কনস্টেবল কিছু পুরুষ সহকর্মীর লালসা এবং শয়তানির শিকার হয়ে মুখ বুজে থাকেন, মোটা বেতন হাতছাড়া হওয়ার ভয়ে৷

আসলে, নির্মম সত্যিটা বোধ হয় এই যে, যৌনসম্পর্ক স্থাপনকে যদি তুচ্ছ বিষয় ধরে নেওয়া হয়, তাহলে হয়তো ধর্ষণের বিষয়টি এত গুরুত্ব পাবে না। কিন্তু তাই হওয়া উচিত কি? মেয়েরা কি কারও ব্যক্তিগত সম্পত্তি? মেয়েদের ইচ্ছের বিরুদ্ধে যে-কেউ কি তার শরীর ছুঁতে পারে? অন্য কেউ বিনা অনুমতিতে কোনও নারীর সঙ্গে যৌনসম্পর্ক স্থাপন করলে, তার কুপ্রভাব কি মেয়েটির বিবাহিত জীবনে পড়বে না? ধর্ষকরা এখন তো আবার ওই সময়ের ভিডিয়ো রেকর্ডিং করে রাখে এবং ওই ভিডিয়ো পাবলিক করে দেওয়ার ভয় দেখিযে বারবার যৌনসম্পর্ক স্থাপন করে।

অনেকে হয়তো বলবেন, যৌনতার ব্যাপারে মেয়েরা রক্ষণশীলতা ভেঙে বেরিয়ে এলে বা আরও উদার হলে শ্লীলতাহানি কিংবা ধর্ষণের ঘটনা কমবে। তাই কি? তাহলে যেখানে মেয়েরা উদার মনস্ক, সেখানে কেন পতিতালয় আছে এখনও? আসলে, সত্য এটাই যে, আমরা মানসিকতার পরিবর্তন না করলে, মহিলাদের অসম্মান করার প্রবণতা কমবে না।

সম্মান

‘সে কী মশাই আপনি এখনও একটাও সম্মাননা পাননি! ছোটো বড়ো কোনও অ্যাওয়ার্ড? তাও না?’ প্রশান্ত এমন করে কথাগুলো বলল, কিছুতেই যেন তার মুখের রেখাগুলো থেকে, অশ্রদ্ধার ভাবটা লুকোনো গেল না। বর্ষীয়ান মানুষ অমূল্যবাবু। কিছু না হোক বয়োঃজ্যেষ্ঠ হিসেবে তো তাঁর একটা সম্মান প্রাপ্য হয়! অপমানটা কোনও রকমে গিলে ফেলে মুখে একটু হাসির ভাব এনে অমূল্যবাবু বলার চেষ্টা করলেন ‘না’। কিন্তু গলা দিয়ে স্বর বেরোল না। তাই মাথা নেড়ে বোঝানোর চেষ্টা করলেন।

‘অ! তা আমার কিন্তু আপনাদের আশীর্বাদে ২৮টা হল,’ বেশ গদগদ শোনাল প্রশান্তর গলা।

বছর ৪৮ বয়স হবে প্রশান্তর। খুব বেশি দিন লেখালেখি করছে বলেও জানা নেই অমূল্যবাবুর। তিনি বেশ অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন প্রশান্তর মুখের দিকে। কী যেন ছিল সেই তাকানোয়, প্রশান্ত বেশিক্ষণ তাঁর চোখে চোখ রাখতে পারল না। মাথা নীচু করে মুখে একটা অহংকারী ভাব রেখে বলল, ‘সাহিত্যকর্ম তো আর যে-কেউ পারে না দাদা। এটা আপনার মতো পোড় খাওয়া লেখকরাই বুঝবেন। আচ্ছা চলি, ফেরার সময় একবার বাজারটা ঘুরে যাব। পা চালিয়ে এগোই৷’ কথাটা বলে প্রশান্ত ভিড়ে মিশে যায়।

অমূল্যবাবুর বয়স আটষট্টি। একটা স্ট্রোক হয়ে যাওয়ার পর থেকে একটু বেশিই সাবধানী হয়ে পড়েছেন। একমাত্র ছেলে বিদেশে থাকে। স্ত্রীকে নিয়ে বোলপুরের বাড়িতে থাকেন অমূল্যবাবু। সাদামাটা একটা সরকারি চাকরি করতেন। লোন নিয়ে তখন বাড়িটা বানিয়ে ফেলেছিলেন বলে আজ নিশ্চিন্তে অবসর জীবন কাটাতে পারেন। লেখালিখির একটা বাতিক আছে।

‘বাতিক’! এমনটাই বলেন সুরমা,তাঁর স্ত্রী। সেই কারণেই তেমন অ্যাম্বিশাস হতে পারেননি অমূল্যবাবু। কোনও দিন বিরাট লেখক হয়ে দেশের নানা প্রান্তে তাঁর নাম ছড়িয়ে পড়বে, এমনও ভাবেননি। কিন্তু যে-টুকু যা লেখালেখি করছেন, তা এই বোলপুরের সাহিত্য সভা-টভায় বেশ প্রশংসিত হয়েছে। প্রতি শুক্রবার সন্ধেবেলা এখানকার একটি পাঠাগারে সাহিত্যচর্চার আসর বসে। তাঁর মতো যাঁরা লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত, তাঁরা আসেন। সাহিত্য নিয়ে আলোচনা, নতুন লেখা পাঠ এসব নিয়ে দিব্যি সময়টা কেটে যায়। সেখানেই প্রশান্তর সঙ্গে আলাপ। খুব যে আহামরি কিছু লেখে তেমন নয়। কিন্তু ইতিমধ্যেই এতগুলো সম্মানলাভ, ব্যাপারটা আজ একটু হলেও ভাবিয়েছে অমূল্যবাবুকে।

গোলাপ গাছগুলোয় বারবার পোকা লেগে যাচ্ছে। মালিকে সঙ্গে নিয়ে তাই আজ সকাল থেকেই বাগান পরিচর্যায় মেতেছেন সুরমা। সাবানজল গুলে বাড়িতেই তৈরি করেছেন কীটনাশক। ভালো করে সেটা স্প্রে করছেন গাছে। মালি খুপরি নিয়ে মাটি খোঁচাচ্ছে।

অমূল্যবাবুর কাগজ পড়ায় আজ তেমন মন নেই। সকালে দেওয়া চা-টাও পুরোটা খাননি। দুটো মাছি সমানে কাপের গায়ে আটকে থাকা চিনির উপর উড়ে উড়ে বসছে। সেদিকেও তেমন লক্ষ্য নেই অমূল্যবাবুর।বাড়ির গেটের বাইরে খোলা রাস্তা, তারও পরে বটগাছ আর ফণীমনসার ঝোপের ওধারে তাঁর দৃষ্টি প্রসারিত।

ছেলে বছর দুয়েক হল একটা কম্পিউটার কিনে দিয়ে গেছে। ব্যবহারটাও মোটামুটি রপ্ত করে ফেলেছেন অমূল্যবাবু। ওটাতেই টাইপ করেন এখন। কিন্তু তিনি ভাবছেন অন্য কথা। প্রশান্ত কথায় কথায় যা বলছিল, সেই ভাবনাটাই তাঁর মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। এইসব সম্মান জ্ঞাপনের আমন্ত্রণগুলো প্রশান্ত মেইল-এ পায়। এরকম মেইল তো তাঁর কাছেও আসে বটে। কিন্তু ছেলে বলে প্রচুর স্প্যাম মেইল জমে মেইল বক্স-এ। তাই কয়েক মাস ছাড়া ছাড়াই জাংক মেইল খালি করে দেন অমূল্যবাবু।

আজ কী মনে করে চেয়ার থেকে উঠে সোজা কম্পিউটারের ঘরে চলে এলেন। মেইল বক্স খুলে বেশ কিছু পুরোনো মেইল হাতড়াতে শুরু করলেন। হ্যাঁ, এই তো গোটা পাঁচেক এই ধরনের সাহিত্যসভার আমন্ত্রণী মেইল খুঁজেও পেলেন, যেগুলো অনাদরে ফেলে রেখেছিলেন এতদিন। নিজ মুখে স্বীকার না করলেও, অমূল্যবাবু টের পাচ্ছিলেন তাঁর মধ্যে একটা ইচ্ছার সঞ্চার হচ্ছে। একটা সবুজ গিরগিটি যেন মনের মধ্যে পুরস্কার পাওয়ার ইচ্ছা হয়ে প্রবেশ করেছে। রং বদলে এখন কমলা দেখাচ্ছে গিরগিটিটাকে। ইচ্ছাটা প্রবল হতে হতে ক্রমশ লোভ হয়ে উঠছে। সম্মানলাভের লোভ, অ্যাওয়ার্ড পাওয়ার লোভ। পরক্ষণেই গিরগিটিটা বাদামি রং নিচ্ছে। এবার তিনি হিংসা টের পাচ্ছেন মনের ভেতর। তাঁর হাঁটুর বয়সি প্রশান্ত সেও এত কম বয়সে এতগুলো সংস্থা থেকে সম্মান পেয়ে গেল! আর তিনি? কী লাভ এই লেখালেখির, যা তাঁকে জনপরিচিতি দেয় না? চারটে পদক, দুটো মানপত্র এটুকুও যদি এই বয়সে পৌঁছে না থাকে তাঁর, তবে কীসের লেখক তিনি!

একবার ঝট করে টেবিলের একপাশে স্তূপ করে রাখা, তাঁর উপন্যাসের পাণ্ডুলিপিগুলির উপর দৃষ্টি বুলিয়ে নেন অমূল্যবাবু। এই সব সাহিত্যকীর্তি তো একদিনে হয়নি। তাঁর বহু পরিশ্রমলব্ধ এই লেখাগুলি, বহু বছরের ফসল। সমাদর পাওয়ার অধিকার ওই পুঁচকে ছোঁড়ার যদি থাকে, তবে তাঁরও আছে। তিনি দিব্যি মানসচক্ষে দেখতে পাচ্ছেন, সাহিত্য সভায় তাঁকে সম্বর্ধনা দিতে এগিয়ে আসছেন কোনও এক গণ্যমান্য ব্যক্তি। মাইকে অ্যানাউন্স করা হচ্ছে অমূল্যভূষণ চক্রবর্তীর নাম, থালায় ফুল আর মানপত্র নিয়ে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে একটি কমবয়সি মেয়ে৷সলজ্জ অথচ গুণমুগ্ধতার ভাব তরুণীটির চোখেমুখে।

ভেতরে ভেতরে বেশ উত্তেজিত হয়ে ওঠেন অমূল্যবাবু। বিভিন্ন তারিখে আসা ওই পাঁচটি মেইল-এর একটি তিনি ক্লিক করেন। বর্ধমান-এর একটি প্রকাশনীর সহযোগিতায় জনৈক সাহিত্য-অনুরাগী একটি সংস্থা, সম্মান জ্ঞাপনের এই অনুষ্ঠান আয়োজন করবে মাসদুয়েকের মধ্যেই। চিঠিতে লেখা আছে—

‘মাননীয় মহাশয়,

আমাদের বহুল পরিচিত সাহিত্য সংস্থাটি আপনাকে শ্রেষ্ঠ লেখক হিসাবে সম্মানিত করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। আপনি তা গ্রহণ করতে ইচ্ছুক থাকলে, দয়া করে আপনার পাসপোর্ট সাইজ রঙিন ছবি, সম্পূর্ণ পরিচয়পত্র, সাহিত্যক্ষেত্রে উত্তরণের বৃত্তান্ত ও ১৫০০ টাকার মানিঅর্ডার বা নিম্নোক্ত ব্যাংক অ্যাকাউন্ট-এ রেজিস্ট্রেশন হেতু জমা দিন। একটি ফর্ম, এই মেইল-এর সঙ্গে যুক্ত করা হল। দয়া করে সেটি পূরণ করে  পাঠিয়ে দিন আমাদের দফতরে৷’

চিঠিটা বারদুয়েক পড়লেন অমূল্যবাবু। কিন্তু শেষ তারিখ পার হয়ে গেছে দেখে একটু বিমর্ষ হলেন।এরপর এক এক করে বাকি মেইলগুলিও খুলে পড়লেন অমূল্যবাবু। বয়ান প্রায় একইরকম। রেজিস্ট্রেশন ফি-এর অঙ্কটায় যা কিঞ্চিত্ তারতম্য। একটি মেইল-এ দেওয়া ফোন নম্বরে ফোন করার সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি। এই পত্রটিতে অবশ্য গল্প-উপন্যাস নয়, কবি হিসাবে সম্মান জ্ঞাপনের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু পুরস্কারের লোভটা এবার বেশ জাঁকিয়ে বসছে অমূল্যবাবুর মনে।

মালদা ইংলিশবাজারের একটি ঠিকানা দেওয়া রয়েছে এই মেইল-এ। সংশ্লিষ্ট নম্বরে ফোন করতেই ওপাশ থেকে একটি গম্ভীর গলা ফোন ধরল।

‘হ্যাঁ বলুন’

‘বলছিলাম কি এটা কি বাগদেবী সাহিত্য মন্দির?’

‘আজ্ঞে হ্যাঁ৷’

‘না,আপনারা যে মেইল পাঠিয়েছেন, সে ব্যাপারে জানতে চাইছিলাম। ইয়ে মানে আমি পুরস্কৃত হতে ইচ্ছুক, আর কী৷’

‘বেশ তো, ফর্ম ভরে টাকা পাঠিয়ে দিন। সব বলা আছে তো মেইল-এ’।

‘না মানে বলছি, যে-তারিখ দেওয়া আছে, আমার পূরণ করা ফর্ম পৌঁছোতে পৌঁছোতে তো তারিখ পার হয়ে যাবে তাহলে’?

‘আরে ওসব চিন্তা আপনি করবেন না। ফর্মটা মেইল-এ পাঠিয়ে দিন। সই-এর ব্যাপারটা আমরা ম্যানেজ করে নেব। আপনি টাকাটা খালি অ্যাকাউন্ট-এ ফেলে দেওয়ার ব্যবস্থা করুন’।

‘সেকি! আপনারা আমার সাহিত্য একটু পড়ে দেখবেন না, মানে কয়েকটি প্রকাশিত লেখার কপি ইত্যাদি পাঠাব ভাবছিলাম…’

‘ওসব কী হবে! আরে আপনাকে আমাদের কমিটি নির্বাচন করে মেইল পাঠিয়েছে, মানেই তো বোঝা যাচ্ছে আমরা আপনার গুণগ্রাহী’!

এবার বেশ একটু নড়েচড়ে বসলেন অমূল্যবাবু, সত্যিই তো এরা বেশ কদর করেছে তাঁর প্রতিভার। এবার আরও একটু সাহস সঞ্চয় করে বলেন, ‘আচ্ছা ওই সাহিত্য ক্ষেত্রে উত্তরণের বিষয়ে কী লিখব বলুন তো’?

মানে আসলে আমার লেখা কিছু জাযগায় ছাপাও যেমন হয়েছে, বাতিলও হয়েছে এটাও সত্যি। মানে আপনার কাছে আর কী লুকোব। সব লেখককেই এই উত্থান পতনের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়, নয় কী’?

‘হ্যাঁ হ্যাঁ সে তো বটেই, সে তো বটেই’। ওপারের কণ্ঠস্বরে একটু যেন তাড়াহুড়ো লক্ষ্য করলেন অমূল্যবাবু। যেন ফোনটা রাখতে পারলেই বাঁচে। কিন্তু বয়স বাড়া বোধহয় একেই বলে। অল্প কথায় আজকাল আর সারতে পারেন না অমূল্যবাবু। অনেক অনেক কথা কোথা থেকে যেন এসে পড়ে গলার কাছে, আর আসা মাত্র মুখ দিয়ে বেরোতেও চায়। সুরমাও মাঝে মাঝে বিরক্ত হয়ে ওঠেন, বলেন, ‘যা বলবে একটু সংক্ষেপে বলো না বাপু, আমার ঢের কাজ পড়ে আছে’।

ফোনটা সহজে ছাড়তে চান না অমূল্যবাবু। সব খোঁজখবর নেওয়া দরকার ভালো করে। যতই হোক প্রথমবার অ্যাপ্লাই করছেন পুরস্কারের জন্য। বললেন, ‘না আসলে আমি সারাজীবন সত্ ভাবেই লেখালেখি করেছি আর কী! লিটল ম্যাগাজিনে লেখা ছাপলে ওরা সদস্য হওয়ার চাঁদার বিল ধরিযে দেয়। বইটাও কিনতে হয়। আর কাগজে বেরোলেও সেটা পত্রিকা অফিস ফ্রি-তে দেয় না আজকাল। লেখা বেরোল কিনা চেক করার জন্য, পাড়ার খবরের কাগজওলাকে কাগজটা দেখতে দিতে বললে সেও খিঁচিয়ে ওঠে, পাঁচ টাকা দিয়ে একটা কাগজ কিনতে পারেন না? রোজ এসে জ্বালান। কিন্তু আপনি বলুন দাদা, রোজ রোজ কত কাগজ আর পত্র-পত্রিকা কিনব, আমি তো একটা রিটায়ার্ড মানুষ,’ বলেই খ্যা খ্যা করে একটু জোরেই হাসলেন অমূল্যবাবু।

ওপারের কণ্ঠস্বর এবার বেশ বিরক্ত। বলে, ‘আর কী জানতে চান একটু তাড়াতাড়ি বলুন। আর টাকাটা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব অ্যাকাউন্ট-এ..’

‘হ্যাঁ হ্যাঁ নিশ্চয়ই নিশ্চয়ই। না আসলে প্রথমবার তো, তাই একটু নার্ভাস লাগছে আর কী! আর বলবেন না, পত্র-পত্রিকার সম্পাদকরাও আজকাল লেখা সম্পর্কে প্রশ্ন করলে বিরক্ত হন। বলে লেখা অমনোনীত হলে ফেরত পাঠানো সম্ভব নয়। প্রতিলিপি রেখে লেখা পাঠান। বারবার ফোন করে লেখার ব্যাপারে খোঁজ নেবেন না। পত্রিকার গ্রাহক হয়েছেন? ও গ্রাহক হননি? তাহলে আর লেখা পাঠাবেন না…। বুঝলেন তো! এইসব চললে কী সাহিত্যচর্চার মতো জিনিস চালিয়ে যাওয়া যায়? তবে আমি কিন্তু হাল ছাড়িনি। এত বছর ধরে নিষ্ঠার সঙ্গে চালিয়ে গেছি আমার সাহিত্যকর্ম। আমার গল্পের সংখ্যা ২০০-র বেশি, আর উপন্যাসের সংখ্যা ৩১। তবে সত্যি বলতে কী, কবিতা তেমন একটা লিখিনি’।

‘সে আমরা ম্যানেজ করে নেব। আপনি আসুন না,’ বলে ফোনটা কেটে দিলেন। ওপারের ব্যক্তি।

একটু যেন মনক্ষুণ্ণ হলেন অমূল্যবাবু। তাছাড়া কবি হিসাবে সম্মান গ্রহণ করায় একটা মিথ্যাচার থাকবে তাঁর ক্ষেত্রে। সে অর্থে তো কবি তিনি নন, সাহিত্যিক বটে! তাই অন্য একটি মেইল খুলে ফেললেন।

এটা খোদ কলকাতার একটি ঠিকানা থেকে এসেছে। ‘চারণিক’ নামক এই সংস্থাটির রেজিস্ট্রেশন ফিজ একটু বেশি, ২০০০ টাকা। ফোন নম্বর দেওয়া আছে দেখে, কিন্তু কিন্তু করে ডায়াল করেই ফেললেন অমূল্যবাবু।

কলকাতার বিজয়গড়ের নিরঞ্জন সদনে আগামী মাসেই হবে এই সংবর্ধনা ও সম্মান জ্ঞাপন অনুষ্ঠান। স্পনসরশিপও নাকি রয়েছে এই সংস্থার। খুবই প্রেস্টিজিযাস সম্মান, এমনটাই বললেন চারণিক-এর পক্ষ থেকে জনৈক ব্যক্তি। ফোনে আরও যা যা জানবার একে একে প্রশ্ন করে ফেললেন অমূল্যবাবু। সব শেষে আমতা আমতা করে একটু অপ্রিয়-কথন করে ফেললেন।

‘আচ্ছা ইয়ে বলছিলাম যে, আপনাদের ওই রেজিস্ট্রেশন ফিজটা একটু বেশি নয় কী! মানে, আসলে অনেকগুলো টাকা তো…’

‘অনেক টাকা! কী বলছেন। ওটুকু তো লাগবেই। খোদ কলকাতার নামি সংস্থা থেকে পুরস্কার গ্রহণ করবেন, প্রচার হবে, আর ওটুকু খরচ করবেন না? সম্মানপত্র বানানো, সংস্থার তরফে ব্যানার পোস্টার, হলভাড়া, সংস্থার স্মৃতিস্মারক, পুষ্পস্তবক এসবের খরচা নেই? কী বলছেন মশাই?’

ফোনের ওপারের ব্যক্তি প্রায় ধমকের মতো করে কথাগুলো বলে থামলেন। সত্যি বলতে কী, একটু যেন ঘাবড়েই গেলেন অমূল্যবাবু। তারপর পরিস্থিতিটা ম্যানেজ করার জন্য সুর আরও মোলায়েম করে বললেন, ‘তাও তো বটে! আচ্ছা বেশ বেশ। আমি কালই টাকাটা আপনাদের অ্যাকাউন্ট-এ ফেলার ব্যবস্থা করছি’।

‘বেশ, আর আগামী ১৬ আগস্ট সোজা চলে আসবেন আমাদের নিরঞ্জন সদনে। সকাল ১১-টার ভেতর পেঁছে যাবেন কিন্তু’।

ব্যাপারটা নিয়ে বেশ একটা শিহরণ হচ্ছে ভেতরে ভেতরে। কম্পিউটারে ফর্ম পূরণ করে মেইল বন্ধ করলেন অমূল্যবাবু। কম্পিউটার শাট ডাউন করতে করতে দু’কলি গানও গুনগুনিয়ে উঠলেন।

সুরমা ঘরে ঢুকে স্বামীর খোশমেজাজ দেখে একটু অবাকই হলেন।

‘কী ব্যাপার বলো তো? চান করার কথা মনেই নেই তোমার। বলি আজ কি চান খাওয়া হবে না?’

‘আরে দাঁড়াও দাঁড়াও গিন্নি। এত দিনে তোমার স্বামীর প্রতিভাকে কুর্নিশ করার একটা সুযোগ পেতে চলেছ তুমি’।

‘সে আবার কী? মাথাটা কি বিগড়োল তোমার?’

‘আরে না গো না। কলকাতার একটি নামি সংস্থা আমায় সম্মানিত করবে আগামী ১৬ আগস্ট। ওদের অনুষ্ঠানে আমাকে নিমন্ত্রণ করেছে’।

খুশিতে চোখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে সুরমার। বরাবরই স্বামীর এই সাহিত্যগুণকে তিনি আপদ হিসাবেই জ্ঞান করে এসেছেন। কী হবে এসব ছাইপাঁশ লিখে, এমন বিস্ময়ও প্রকাশ করেছেন। স্বামী গরবে গরবিনী হয়ে আজ তিনি বেশ ডগমগ হয়ে উঠলেন। বললেন, ‘এ তো দারুণ খবর গো! দাঁড়াও আজ রাতেই খোকা ফোন করলে দিতে হবে খবরটা। হ্যাঁ গো তোমায কি তাহলে কলকাতা যেতে হবে নাকি?’

‘নিশ্চয়ই হবে। অত বড়ো সভায দাঁড়িয়ে সম্মান গ্রহণ করব, সেকি মুখের কথা! ওরা আমার লেখাগুলো নিশ্চয়ই সব খুঁটিয়ে পড়েছে, বুঝলে গিন্নি। আজ আমার সাহিত্যচর্চা সত্যিই সফল হল মনে হচ্ছে’। উত্তেজিত শোনায় সুরমার কণ্ঠও। বলেন,

‘হ্যাঁ গো তোমার জন্য তবে কালই বেরিয়ে একটা ভালো পাঞ্জাবি কিনে আনব। আর সঙ্গে ছেলের দেওয়া ওই ফরাসডাঙার ধুতিটাই পোরো না হয় ওইদিন’।

‘উফঃ, এখন থেকে এত উত্তেজিত হোয়ো না। একগাদা খরচ করে বোসো না’।

‘না না, ওসব শুনব না। অত বড়ো সাহিত্য সম্মান নিতে যাচ্ছো, তা কি একটা এলেবেলে পোশাক পরে গেলে ভালো দেখায়!’

সেই কাক ভোরে আজ বাড়ি থেকে বেরিযেছেন অমূল্যবাবু। দু’বার লোকাল বদলে হাওড়ায় এসে নেমেছেন। সুরমা শোনেননি। সুন্দর একটা চিকন কাজ করা সাদা পাঞ্জাবি কিনে দিয়েছেন। পাঞ্জাবি, ধুতি আর পাম্প শু পরে বেশ দেখাচ্ছে অমূল্যবাবুকে। সেই বিয়ের দিনটির মতো। উত্তেজনা একটা ভেতরে ভেতরে বেশ টের পাচ্ছেন তিনি। দেরি হয়ে যাবে ভেবে, স্টেশনে একটু চা-বিস্কুট খেয়ে চড়ে বসেছেন বিজয়গড়ের মিনিতে। না হোক বার তিনেক কন্ডাক্টরকে বলেছেন ঠিক জায়গায় নামিয়ে দেওয়ার কথা। পাশে বসা তরুণীকে দু’বার জিজ্ঞেস করেছেন ক’টা বাজে।

বাস থেকে নামার সময় অল্প একটু মাথাটা ঘুরে গেল। আসলে এত ধকল অভ্যাস নেই তো। সামলে নিয়ে একটু জিজ্ঞাসাবাদ করে হাঁটা দিলেন নিরঞ্জন সদনের দিকে। গিয়ে বুঝলেন সময়ের একটু আগেই পৌঁছে গেছেন তিনি।

মূল অনুষ্ঠান শুরু বেলা ১টা থেকে। ঘড়িতে সবে পৌনে এগারোটা। উনি অত দূর থেকে আসবেন জেনেই হয়তো উদ্যোক্তাদের তরফে ওই ভদ্রলোক, ফোনে তাঁকে ১১টায় আসতে বলেছিলেন। হলের বাইরে ডেকরেটরের লোকজন ইলেক্ট্রিশিয়ান আর উদ্যোক্তাদের কয়েকজন ঘোরাফেরা করছে। জোর তোড়জোড় চলছে ভেতরে।

অমূল্যবাবু এগিয়ে গিয়ে একজনকে নিজের পরিচয় দিলেন। চারণিক গোষ্ঠীরই কেউ হবেন হয়তো। তিনি তেমন উত্সাহ না দেখিয়ে একটা চেয়ারের দিকে আঙুল দেখিয়ে বসতে বলে, আবার অন্য কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। ডেকরেটরের একজন এগিয়ে এসে তাঁকে চেয়ারে বেফালতু বসে থাকতে দেখে বললেন, ‘দাদা ধরুন তো ব্যানারটা, টাঙিয়ে দিই গেটে’।

আরও কিছুক্ষণ এটা সেটা টুকটাক ফাইফরমাশে সময় কেটে গেল অমূল্যবাবুর। তিনি অবিশ্যি কিছু মনে করেননি। এরা এত বড়ো একটা উদ্যোগ নিয়েছে, এটুকু সাহায্য না হয় তিনি করলেনই!

এক এক করে লোক আসতে শুরু করল এরপর। একটু কান পেতে গল্পগাছা শুনে অমূল্যবাবু বুঝতে পারলেন, তাঁরই মতো আরও অনেকে এসেছে সম্মান গ্রহণ করতে। জায়গাটা লোকের হাঁকডাক আর গালগল্পে বেশ জমজমাট হয়ে উঠতে লাগল। এদিকে অনেকগুলো ফুলের তোড়া নিয়ে একটি সাগরেদকে সঙ্গে করে একজন লম্বা চেহারার লোক প্রবেশ করল। সাগরেদটিকে ফুলগুলো যথাস্থানে রাখতে বলে, সে এবার এগিয়ে এল অমূল্যবাবুর দিকে।

‘আপনি অমূল্যভষণ চক্রবর্তী তো?’

‘আজ্ঞে হ্যাঁ’।

‘বুঝেছি, আপনার সঙ্গেই ফোনে কথা হয়েছিল আমার। ছবি পাঠিয়ে ছিলেন তো, তাই চিনতে অসুবিধা হল না। চলুন ভিতরে বসবেন আসুন’। এই প্রথম অমূল্যবাবুর বেশ ভালো লাগল, কেউ অন্তত তাঁকে আলাদা ভাবে স্বাগত জানাল।

হলের ভিতরে তখন অনেকেই দর্শকাসনে জায়গা দখল করতে ব্যস্ত। ভদ্রলোকের থেকে অমূল্যবাবু জানতে পারলেন, তাঁরই মতো মোট ৫০ জন লেখককে সম্মান জ্ঞাপন করা হবে আজ। তিনি ওই পঞ্চাশজনের তালিকায় রয়েছেন সেটা শুনে খুশি হবেন নাকি হবেন না, বুঝতে গিয়ে সব কেমন গুলিয়ে গেল অমূল্যবাবুর। কিন্তু ওসব ভাবার তখন সময় নেই। সবাই জায়গা দখল করছে। তিনি এই বেলা একটা সিটে বসে না পড়লে, পুরো অনুষ্ঠানটা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখতে হবে। হল বেশ ভরে উঠেছে ইতিমধ্যেই। এত সাহিত্য গুণমুগ্ধ রয়েছে এ শহরে, ভেবে বেশ ভালো লাগতে শুরু করল অমূল্যবাবুর।

উদ্যোক্তারা সবাইকে চা পরিবেশন করল। কিন্তু এবার বেশ খিদে পেয়েছে। একবার ভাবলেন বেরিয়ে কিছু খেয়ে আসবেন। কিন্তু জায়গা যদি দখল হয়ে যায়, এই ভয়ে বেরোলেন না তিনি। চা দিয়ে খিদেটা মেরে দেওয়ার চেষ্টা করলেন অমূল্যবাবু। স্টেজ সাজানো হয়ে গেছে। লম্বা একটা টেবিলের ওপারে দশটা চেয়ার। সাদা ঝালর লাগানো টেবিল ক্লথ আর টেবিলের উপর ফুল ও জলের বোতল সাজানো।

ঘোষক উঠে এবার একে একে সংস্থার সভাপতি-সহ অন্যান্য সম্মানীয় অতিথিদের স্টেজে ডেকে নিলেন। প্রধান অতিথি এই অঞ্চলের কাউন্সিলর। তাঁর জন্যই অপেক্ষা। তিনি এসে পড়লেই সভার কাজ শুরু হবে, এও বললেন ঘোষক। সেইমতো শুরু হল উদ্বোধনী সংগীত। দু’তিনটি বাচ্চা মেয়ে মিলে ‘ধন-ধান্যে-পুষ্পে ভরা’ গাইল। অমূল্যবাবু মাথা নেড়ে নেড়ে শুনলেন ওই গান। ছেলেবেলায় ইস্কুলে এই গান তাঁর প্রার্থনা সংগীত ছিল।

সভা শুরু হয়ে গেছে প্রায় আধঘন্টা হল। অতিথিদের পুষ্পস্তবক দিয়ে অ্যাপায়নের পর, প্রত্যেকের বক্তব্য রাখা শুরু হল। আশপাশের সবাই এবার উশখুশ করা শুরু করল। কতক্ষণে এই বক্তব্য রাখা শেষ হবে কে জানে! এতজন বসে আছেন মঞ্চে! এসব মিটলে তবে ৫০ জনের সংবর্ধনা। শেষ হতে হতে তো বিকেল গড়িয়ে যাবে মনে হয়। এর মধ্যেই প্রধান অতিথির আগমন! তিনিও আপ্যায়িত হলেন পুষ্প ও উত্তরীয় দিয়ে৷ চারণিক প্রসঙ্গে তাঁর দীর্ঘ বক্তব্যও রাখলেন।

মাথাটা বেশ টিপটিপ করছে অমূল্যবাবুর। একটু যেন দমটা বন্ধ বন্ধ লাগছে। তিনি অস্বস্তি অনুভব করছেন, এটা বোধহয় পাশের লোকটি বুঝতে পেরেছিল। একটি জলের বোতল এগিয়ে দিয়ে বললেন, ‘জল খাবেন?’

অমূল্যবাবু বোতলটা নিয়ে বেশ খানিকটা জল খেয়ে স্বস্তি অনুভব করলেন। এই ভদ্রলোক তাঁর চেয়ে বয়সে বছর পাঁচেকের ছোটোই হবেন। তিনিও এসেছেন সম্মান গ্রহণ করতে।

সব কিছুরই যেমন শেষ আছে, স্টেজের অভ্যাগতরাও একসময় মঞ্চ থেকে নেমে এলেন। এবার পুরষ্কার প্রদানের পালা। একটি করে মেমেন্টো, সংস্থার ব্যাজ ও একটি গোলাপ ফুল– প্রতিটি লেখককে এভাবেই বরণ করে নেওয়া হবে ও সম্মান জানানো হবে, বললেন ঘোষক। ঘড়িতে তখন প্রায় সাড়ে তিনটে।

দীর্ঘ নামের তালিকা নিয়ে এবার নাম ডাকা শুরু করলেন ঘোষক। দর্শকাসনে যেন হইচই পড়ে গেল। তারপর রীতিমতো হুড়োহুড়ি। লেখকপ্রতি দেড় মিনিট সময় বরাদ্দ হল। একজনের নাম ডাকতে না ডাকতে অন্যজন মঞ্চে উঠে পড়ছে, একজনের স্মারক অন্যজনের হাতে চলে যাচ্ছে। ধাক্কাধাক্কি, হইচই, একজন তো ডায়াস-এ ওঠার সময় পড়েই গেলেন।

এত কম সময়ের মধ্যে যে সম্মানজ্ঞাপন হয়ে যাবে, ভাবেননি অমূল্যবাবু। কোনও রকমে নিজের স্মারকটা বুকে চেপে বসে পড়লেন একটি চেয়ারে। সুরমা আসার আগে বলে দিয়েছিলেন, একটা ছবি তুলে এনো মোবাইলে কিন্তু সে সবের অবকাশ কোথায়!জানা গেল বিকেল চারটে অবধি হল বুকিং আছে। নিমেষের মধ্যে ৫০জনকে সম্মান জ্ঞাপন করা হয়ে গেল উদ্যোক্তাদের।

ঘোষক এবার স্পনসর-এর গুণকীর্তন ও ধন্যবাদ জ্ঞাপন সারছেন। তাঁর শেষ কথাগুলো আর কানে ঢুকছিল না অমূল্যবাবুর। বুকের বাঁ দিকটায় প্রচণ্ড ব্যথা শুরু হয়েছে। এতটাই তীব্র ব্যথাটা যে, জোরে কাউকে ডাকতেই পারছেন না তিনি। চারপাশের কলরোল আর মাইকের শব্দে চাপা পড়ে গেল তাঁর ক্ষীণকণ্ঠ।

আর সামলাতে পারলেন না, চেয়ার থেকে হুড়মুড় করে মাটিতে পড়ে গেলেন অমূল্যবাবু। পড়ার সঙ্গে সঙ্গে একটা হইহই শুরু হল তাঁকে ঘিরে। সবাই এগিয়ে এসেছে, কী হল, কী হল করে। কথাগুলো অস্পষ্ট ভাবে শুনতে পেলেন অমূল্যবাবু। চোখ বন্ধ। কে একটা পাশ থেকে বলে উঠল, ‘গ্যাস থেকে হয়েছে মনে হয়, চোখে জলের ঝাপটা দে’। কেউ একজন বলল, ‘স্ট্রোক নয়তো? মুখের একটা দিক কেমন বেঁকে যাচ্ছে মনে হচ্ছে!’ আর-একজন কেউ আতঙ্কের গলায় বলল, ‘ওরে ডাক্তার ডাক। একটা স্ট্রেচারের ব্যবস্থা কর’।

চৈতন্য ক্রমশ লোপ পাচ্ছে অমূল্যবাবুর। খুব আবছা ভাবে চোখের সামনে ভেসে উঠছে সুরমা আর খোকার মুখ। তিনি যেন তলিয়ে যাচ্ছেন জলের নীচে। মাইকে কারা যেন বারবার ঘোষণা করছে তাঁর নাম। করতালি, আর জলের শব্দের ভেতর থেকে আবারও কানে এল, ‘উফঃ কতবার বলেছি এইসব বুড়োগুলোকে ডেকে আনবে না সম্মান দেওয়ার লোভ দেখিয়ে, নাও এবার ভোগো!’

কে একটা রাগত স্বরে বলল, ‘এসব চিটিংবাজির ব্যাবসা। পুরস্কার দেওয়ার লোভে টাকা নিয়েছে প্রত্যেকের থেকে’। এবার শুরু হয়ে গেল জোর বচসা। ‘আরে টাকা দিয়েছেন বলেই তো সম্মান পেলেন, আবার অত কথা কীসের?’ দুপক্ষই লড়ে যাচ্ছে। কে একজন চেঁচিয়ে বলল, ‘অ্যাম্বুল্যান্স এসে গেছে, বুড়োটাকে শিগগির তোল’।

সবাই ধরাধরি করে এবার স্ট্রেচারে তুলল অমূল্যবাবুকে। চোখ খুলে শেষবারের মতো তাকানোর চেষ্টা করলেন অমূল্যবাবু। পারলেন না। ক্রমশ তলিয়ে যাচ্ছেন জলের অতলে, গভীরে, আরও আরও গভীরে। হাতে ধরা স্মারকটা মুঠো আলগা হয়ে মাটিতে পড়ে গেল। গোলাপটা তখনও সতেজ। শেষ সম্মানটা জানাতে সেটা রয়ে গেল তাঁর বুকের উপর।

বাপের বাড়ির লোক আসা পছন্দ নয় শাশুড়ির

আমি ৩০ বছর বয়সি বিবাহিতা। আমার বাপের বাড়ি শ্বশুরবাড়ির খুবই কাছে। এর ফলে আমার মা এবং বাপের বাড়ির অন্যান্য আত্মীয়-স্বজনদের আসা-যাওয়া লেগেই থাকে আমার শ্বশুরবাড়িতে। এতে আমার স্বামীর কোনও আপত্তি নেই ঠিকই কিন্তু শাশুড়িমায়ের এটা পছন্দ নয়। উনি আমাকে বলেছেন মায়ের সঙ্গে কথা বলতে, যাতে আমার মা আসা কম করেন। অথচ এরকমও নয় যে, শ্বশুরবাড়িতে বাপের বাড়ির লোকজনকে অপমান করা হয়। বরং যত্নের কোনও ত্রুটি হয় না। তাঁরা যথেষ্ট একে অপরকে সম্মান করেন। আমার শাশুড়ি মনে করেন, সম্পর্কের দূরত্ব রাখলে বিশেষ করে বেয়ানবাড়ির সঙ্গে দূরত্ব থাকলে সম্পর্কের মিষ্টতা বজায় থাকে। এই নিয়ে শাশুড়ির সঙ্গে আমার একটু মনোমালিন্যও চলছে। মা-কে শাশুড়ির কথা কীভাবে বলব বুঝতে পারছি না। একমাত্র সন্তান হওয়ার কারণে মায়ের মনে কষ্ট দিতে ইচ্ছে করছে না। এই পরিস্থিতিতে আমার কী করা উচিত?

 

আপনার শাশুড়ি-মা যেটা বলেছেন সেটা একদম ঠিক কথা। মন থেকে সম্পর্ক গড়ে ওঠে ঠিকই কিন্তু কিছুটা দূরত্ব বজায় রাখাটাও এই ক্ষেত্রে জরুরি। এতে সম্পর্ক টিকে থাকে অনেক দিন এবং ভালোবাসাও অক্ষুণ্ণ থাকে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায় মেয়ের শ্বশুরবাড়ি কাছাকাছি হলেই বাপের বাড়ির লোকজন মেয়ের শ্বশুরবাড়িতে একটু বেশি যাতাযাত আরম্ভ করে দেয়। আর এর ফলে তাদের পারিবারিক সবকিছুতে অবাঞ্ছিত ভাবে মাথা গলানো শুরু করে দেয়। যে-কারণে অনেক সময় মেয়ের বিবাহিত জীবনে এর প্রতিকূল প্রভাব পড়ে। এমনকী মেয়ের সংসারও ভেঙে যায়। একে অপরের সুখ-দুঃখে অবশ্যই থাকা বাঞ্ছনীয় কিন্তু সম্পর্ক টেকাবার জন্য দূরত্ব অবশ্যই রাখা জরুরি। এতে সম্পর্কের প্রেম, মিষ্টতা বজায় থাকবে, সম্পর্ক তিক্ত হয়ে উঠবে না।

আপনার মায়ের সঙ্গে খোলাখুলি পরিষ্কার করে কথা বলুন। তিনি মা, সুতরাং কিছুতেই এটা চাইবেন না, তাঁর জন্য নিজের মেয়ে, শ্বশুরবাড়িতে কারও সঙ্গে মনোমালিন্য হোক। তবে এক মেয়ে হওয়ার কারণে সন্তানের দায়িত্ব আপনাকে পালন করতে হবে। একটা দিন ঠিক করে বা অবকাশ দেখে শাশুড়ির মত নিয়ে নিজের মায়ের কাছে গিয়ে তাঁর ভালো-মন্দের খবরাখবর নিতে পারেন। এছাড়া ফোনেও মায়ের সঙ্গে সবসময় যোগাযোগ রাখুন। বাপের বাড়ির সুখ-দুঃখে তাদের পাশে থাকুন। এগুলো মেনে চললেই দেখবেন শ্বশুরবাড়িতে অশান্তি থাকবে না আর সম্পর্কের মিষ্টতাও নষ্ট হবে না।

 

রোজদিনের রাস্তা

মানস বোস, কেউ বলে মানসা, কেউ বা আরও ভালোবেসে মা মনসা। পাঁচ ফুট দুই ইঞ্চির রোগা চেহারার লোকটি জেলা অফিসের একটি দফতরের বড়োবাবু।

বছর ছাপ্পান্নর ভদ্রলোকটি ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি মাস বাদ দিলে, বাকি সময় হাফশার্ট আর চটি পায়ে অফিসে আসেন। বাকি মাসে পাম শু, ফুল শার্ট আর হাফ সোয়েটার। মাথার বাঁ দিকে সিঁথে, চুল এক্কেবারে পেতে ছড়ানো।

আটটা একত্রিশের লোকাল ট্রেনের নির্দিষ্ট কামরাতে উঠলেই, সবাই যে-যার খুশিমতো ডেকে ঠাট্টা ইযার্কি আরম্ভ করে। মানস বোস রাগেন না, বা রাগলেও প্রকাশ করেন না। বেশির ভাগ দিনেই ট্রেনে বসার জায়গাটা রাখা থাকে, না পেলে দাঁড়িয়ে চলে যান। কারও-র সাথে কোনও রকম বিরোধে সচরাচর যান না। কম কথা বলেন, হাসেন কম, আসা-যাওয়ার মাঝে এই টুকটাক যা কথাবার্তা এই নিয়ে চলে মানস বোসের নিত্যযাত্রা।

শনি, রবি বা অন্যান্য ছুটির দিন বাদে মানসবাবুর প্রতিদিনের কাজকর্মও এক্কেবারে নিয়মমাফিক। ঘুম থেকে ওঠেন সাড়ে চারটে থেকে পৌনে পাঁচটার মধ্যে। নিজের হাতের তৈরি এক কাপ চা পান করে একটু হেঁটে যোগব্যায়াম করে বাড়ি ফেরা। তারপর ভাতের জল চাপিয়ে স্নান সেরে রান্নার কাজ আরম্ভ করেন।

মানসবাবু সকাল সাড়ে সাতটায় ভাত খেয়ে পৌনে আটটার বাস ধরেন। বাস থেকে নেমে ট্রেন, ট্রেন থেকে নেমে হেঁটে বা কোনও দিন অফিসের গাড়িতে অফিস পৌঁছন।

সকালে বউয়ের সাথে কথা বলা মানে আলু পটলের নাম গোত্র অথবা একমাত্র মেয়ে কলেজ বা টিউশন বা হাত খরচের টাকা নেওয়া সম্পর্কিত। কোনও দিন বউয়ের মনটা বাগান বাগান থাকলে বা সকালে ভালো ভাবে পেট পরিষ্কার হয়ে গেলে, আরও দু-একটা কথা বলেন তার মধ্যে বেশির ভাগটাই নিজের বাপের বাড়ি নিয়ে।

মানসবাবুর মেয়ে কলেজে পড়ে, গড়ন রোগা হলেও মায়ের মতো গায়ে রং-টা ফরসা। এখনকার চালচলন সম্পর্কে খুব বেশি সচেতন। নিয়মিত বিউটি পার্লার যায়, বন্ধু বান্ধবদের সাথে সিনেমা-টিনেমা তো আছেই। এখনও পর্যন্ত কোনও বিশেষ বন্ধু হয়েছে কিনা সে ব্যাপারে জানা না গেলেও, মায়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাবার গায়ে হুল ফোটাতে বেশ পটু হয়ে গেছে। মায়ের আশীর্বাদে এই দক্ষতা দিন দিন বেড়েই চলেছে। মাধ্যমিক পাশ করেই মোবাইলের জন্য তীব্র অসহযোগ আন্দোলনের মাধ্যমে মানসবাবুকে হারিয়ে নিজেকে মায়ের যোগ্য কন্যা হিসাবে প্রমাণও করে দিয়েছে।

মানসবাবুও কোনও আঠারো ইঞ্চির কপাল নিয়ে জন্মাননি। তাঁর বউও পৃথিবীর সেই একমাত্র ব্যতিক্রমী ভদ্রমহিলা হবেন, যিনি সব কিছু ছেড়ে শ্বশুরবাড়িতে এসে একমাত্র নিজের স্বামীর স্বার্থটাই দেখবেন। অন্তত মানসবাবু কোনও দিন স্বপ্নেও একথা ভাবেননি! বউএর পাশে দাঁড়ালে তাঁকে আরও নিরীহ অসহায় লাগে।

সন্ধে সাড়ে সাতটা থেকে আটটার মধ্যে মানসবাবু যখন বাড়ি ফেরেন, বউ তখন টিভির সাথে মধুর সহবাসে ব্যস্ত থাকেন। পেমেন্টের দিন বা অন্য কিছু বিশেষ দরকারের দিনে এক কাপ চায়ের সাথে কিছু খাবার মানসবাবুর মুখের সামনে পৌঁছে দেন। আর না হলে বলেন, চা করা আছে, গরম করে নাও, অথবা গিলে নাও।

এই বিশ বছরের বৈবাহিক জাঁতাযন্ত্রে বউএর রাগ, মন খারাপের রূপ, রং, গন্ধ, স্পর্শগুলো খুব ভালো ভাবে বুঝে গেছেন। যেমন যেদিন নিজে দরজা খুলে হাত থেকে বাজারের ব্যাগটা টেনে নেন, তার মানে আবহাওয়াটা বাগান বাগান। তা না হলে মেঘ জমেছে। সেদিন কোনও কথা না বলে চুপচাপ জামাকাপড় ছেড়ে, হাত পা ধুয়ে নিজের চা গরম করে নেন। মুড়ির কৌটো থেকে মুড়ি বের করে চায়ে চুমুকের সাথে মুড়ি চিবোতে চিবোতে ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করেন, রুটি হয়ে গেছে? উত্তরটাও সেদিনের আবহাওয়ার মতোই আসে।

সন্ধের থেকে রাতটা আরও ভয়ানক হয়ে ওঠে। একটা শীতল জড়বস্তুর পাশে শুয়ে নিজের অঙ্গ প্রত্যঙ্গ সব নিস্তেজ হয়ে পড়ে। অন্তত মানসবাবুর নিজের সেই রকমই মনে হয়। তবুও কোনও কোনও দিন শরীর হালুম হালুম করে ওঠে। পাশে শুয়ে থাকা শীতল যন্ত্রটাকে নিজের দিকে টেনে নিতে গেলে স্পিকার বেজে ওঠে, সেই কয়েকটা বুলি, লজ্জা লাগে না, মেয়ে বড়ো হয়ে গেছে। বা মরণ! কখনও আদিখ্যেতা!

মানসবাবুর জেগে ওঠা রঙে আলকাতরা মিশে যায়। জেগে যাওয়া শরীর নুয়ে পড়ে, জোর করে ঘুম পাড়িয়ে দেন। কোনও কোনও দিন শরীর বাগ মানে না। জেগে উঠে, বিছানা নড়ে। পাশের শীতল যন্ত্রের স্পিকারে শোনা যায, বাথরুমে যাও। তার পরেই ফুলস্টপ।

মানসবাবুর মেয়ে খুব ব্যস্ত। সকালে অফিস বেরিয়ে যাওয়ার পরেই ঘুম থেকে ওঠে। ফেরার সময় বেশির ভাগ দিনেই ব্যস্ত থাকে নিজের কাজে। কী কাজ, মানসবাবু জিজ্ঞেস করেন না। করলেও উত্তর আসে, তোমাকে বলে কী করব? কিছু বুঝবে কি? সেই তো সেকেলেই রয়ে গেলে। মায়ের সাথে পাল্লা দিয়ে হুল ফোটায়। মানসবাবুর ব্যথা লাগলেও কিছু বলা যায় না। বউ মেয়ে সাঁড়াশি আক্রমণে বেচারা বোসবাবুর যা অবস্থা, তা বর্ণনা করতে গেলে দক্ষতার প্রয়োজন হয় না।

মানসবাবুর অফিসটাও খুব অদ্ভুত। সকাল থেকে দুপুর হয়ে বিকাল শুধু কিছু ফাইল আর লেখা। না হয় পেপার পড়া। ডিপার্টমেন্টের না আছে কোনও ঘুসের ব্যবস্থা, না আছে কোনও মহিলা কর্মচারী। আগে দুএকজন যা ছিল ফাঁক-তোল, ভাঁজ-খাঁজ দেখা যেত। কিন্তু কয়েক বছর আগে অন্য জায়গায় বদলির পরে শুধু ফাঁকা মরুভূমি।

তবে খুব ভালো লাগার জায়গা হল ট্রেনের কামরা। যদিও তিনি খুব একটা সক্রিয় যাত্রী নন। এমনকী তাঁকে নিয়ে ইয়ার্কিতে ফাজলামিও বেশি হয়। তাও অন্য কেউ কিছু বললে শোনেন, অন্যের ইয়ার্কিতে মন পুলকিত হয়ে ওঠে। তাঁদের নজনের নিত্যযাত্রীর দলে কোনও মহিলা সঙ্গী নেই। বোসবাবু ছাড়া বাকি সবাই কম-বেশি নেশা করেন, খিস্তিখাস্তাও চলে। মহিলা নিত্যযাত্রী থাকলে অসুবিধা হয়।

এমনি যাত্রীদের সেরকম পাত্তা দেওয়া না হলেও, মহিলা যাত্রীদের আড় চোখে দেখে নেওয়া হয়। বোসবাবুও এই রস নেওয়া থেকে বাদ যান না। বিশুদা এলে খুব ভালো লাগে, তিনদিন আসেন বিশুদা। ওষুধ সাপ্লাই করেন, জামার বাঁ দিকের পকেট থেকে প্যাড বের করে ফোনে জিজ্ঞেস করেন, কপাতা? সঙ্গে একটা দামি মোবাইল থাকে। নিজের কাজ হয়ে যাওয়ার পরে মোবাইলটা বেশির ভাগ দিনেই বোসবাবুকে দিয়ে দিলে, তিনি ওটাকে আড়ালে নিয়ে চলে যান। একমনে দেখেন, আর শরীরের ঘুম ভাঙান। অনেকেই এই ব্যাপারটা দেখে টিপ্পনি কাটে, তবে তাতে বোসবাবুর কোনও কিছু এসে যায় না, হেসে উড়িয়ে দেন।

নজনের নিত্যযাত্রীদের প্রায় সবাই বযস্কদের জায়গা ছেড়ে বসতে দেন। আর জায়গা ছাড়েন ছেলে কোলে দাঁড়িয়ে থাকা মহিলা যাত্রীদের। শুধু কম বয়সী মহিলা, কলেজ পড়ুয়াদের বসতে জায়গা ছাড়েন না। তবে সেদিন এর ব্যতিক্রম ঘটল এবং ঘটালেন সেই মানস বোস।

লোকাল ট্রেনে সেদিন অস্বাভাবিক রকমের ভিড়। দেওঘরের কোনও এক আশ্রমের উৎসবের জন্য ট্রেনের সব কামরা তাদের দখলে। ট্রেনে ওঠার আগে এই খবরটা পেলেও কোনও এক্সপ্রেস ট্রেন না থাকার কারণে সবাইকে লোকালেই উঠতে হয়। উঠতেই পিছনের থেকে কেউ একজন বলে উঠল, কাকা, আজ মাছিও গলবে না। বোসবাবু তাকে কোনও উত্তর না দিয়ে আস্তে আস্তে ভিতরের দিকে এগিয়ে যান।

অন্যদিনে যে-সিটে তিনজন বসে থাকে আজ সেখানেই পাঁচজন। বোসবাবু কোনও রকমে একটা জায়গায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে চেনাজানা কাউকে দেখতে পাওয়া যায় কিনা দেখতে লাগলেন। মাথা নাড়িয়ে নিজের উপস্থিতি জানালেন। কেউ আবার তাঁকে দেখে বলে উঠল, বোসদা আমাদের এদিকে আসুন, গল্প করা যাবে।

না ভাই, আজ যে এখানে দাঁড়াবার জায়গা পেয়েছি এটাই অনেক।

কেউ আবার বলে উঠল, কি রে মানসা, কোনও এক্সপ্রেস পেলি না? ভিড়ে মরতে এলি, না মারাতে?

বোসবাবু এবারেও হেসে উত্তর দেন, উৎসব চলছে তো তাই এত ভিড়।

নিত্যযাত্রীদের অনেকেই সেদিন পেপার বা পলিথিন পেতে দরজার সামনে বসেছিল। বোসবাবুর একবার এভাবে বসতে গিয়ে প্যান্ট ফেটে গেছিল! সে এক যাচ্ছেতাই অবস্থা। সারাটা দিন ভগবানকে গালাগালের সাথে, জামা দিয়ে ফাটা জায়গা ঢাকতে হয়েছিল। তবে এইদিন মানসবাবুর ভাগ্যটা হয়তো একটু প্রসন্ন ছিল। পরের স্টেশনে একটা জায়গা পেয়ে গেলেন। গোটা সিট না হলেও এই বাজারে সেই সিটের যে কী মহিমা, তা আর বোঝাতে হবে না। অবশ্য সঙ্গে সঙ্গে শুনলেন, বোসদা আজ একটা লটারি কেটে নিন।

বোসবাবু কিছু না বলে হালকা হাসলেন। বুঝতে পারলেন নজর লেগে গেল, হলও তাই। এক স্টপেজ যেতে না যেতেই একটা মেয়ের গলা কানে এল, কাকু কাইন্ডলি আমাকে একটু বসতে দেবেন, পায়ে খুব ব্যথা করছে, আজ আমার পরীক্ষা আছে। বোসবাবু ঘাড় ঘুরিয়ে মেয়েটিকে দেখলেন। তাঁর মেয়ের মতোই বয়স, একটু বড়োও হতে পারে। জিন্স-এর প্যান্ট আর কুর্তি পরে আছে। গায়ে রং-টা চাপা হলেও মুখটা বেশ ভালো। কোনও ছেলে হলে এতক্ষণ জবাব না দিয়ে উলটো দিকে মুখ ঘুরিয়ে বসে থাকতেন। সেই জায়গায় উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, বোসো, তবে জায়গাটা খুব কম। মেয়েটি বোসবাবুর দিকে তাকিয়ে হালকা হেসে, থ্যাংক ইউ বলে বসেই হাতে থাকা একটা খাতাতে চোখ ডুবিয়ে দিল।

বোসবাবু আবার আগের জায়গায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে মাঝে মাঝে আড়চোখে মেয়েটিকে দেখতে লাগলেন। দুএকজন চেনা নিত্যযাত্রী দাঁড়ানোর কারণ জিজ্ঞেস করলে, তিনি চোখের ইশারাতে বোঝানোর চেষ্টা করলেন। কিছুক্ষণ পরেই মেয়েটি বলে উঠল, কাকু তোমার ব্যাগটা দাও, আমি ধরছি। বোসবাবু, না, ঠিক আছে বললেও মেয়েটি মানসবাবুর হাত থেকে ব্যাগটা প্রায় কেড়ে নিজের কোলে নিয়ে তার ওপর খাতা রেখে পড়তে আরম্ভ করল।

হাতের ভার কমলেও বোসবাবু আর মেয়েটির কুর্তির কোনও ভাঁজ দেখতে পেলেন না। তবে সারাদিন মনটা বেশ বাগান বাগান হয়ে থাকল। অলিগলি থেকে ট্রেনের মেয়েটার ভেসে ওঠা মুখটা শরীরটাকেও নাড়িয়ে দিচ্ছিল। কাজ করবার সময় গুনগুন গান আঙুলগুলোর মধ্যে একটা অনুঘটকের কাজ করছিল। এমনকী বাড়ি গিয়ে বউয়ের মুখ ঝামটা শুনেও সেরকম কোনও প্রতিক্রিযা হয়নি।

বাড়ি ফিরে বারান্দার অন্ধকারে দাঁড়িয়ে এক ভাবে আকাশের দিকে তাকিয়ে থেকে অথবা হাওয়ার সাথে মিশিয়ে নিজের গাওয়া দু-এক কলি গান গাওয়ার মধ্যেও মেয়েটি চলে আসে। রাতে শুয়ে ঘুম আসেনি। বন্ধ চোখের সামনে সেই মুখ মনে শরীরে এক অদ্ভুত তৃপ্তি এনে দিয়েছে। কিছুক্ষণ পরেই অবশ্য বউয়ের ভয়ে বাথরুম চলে যেতে হল।

তার পরের দিনও সেই একই রকমের ভিড় ঠেলে কিছুটা ট্রেনের ভিতরে গিয়ে ঘাড় ঘোরাতেই, আগের দিনের মেয়েটিকে বসে থাকতে দেখে একটু রাগই হল। নিশ্চয়ই আবার কারওর পি… মেরে জায়গা করে নিয়েছে। কিছু না বলে একটু ইতস্তত করে আরও ভেতরের দিকে যাওয়ার পরেই পিছনের দিক থেকে শুনলেন, ও কাকু, আমি এখানে, দেখতে পাওনি?

বোসবাবু আর না এগিয়ে মেয়েটির দিকে তাকিয়ে বললেন, না, মানে দেখতে পাইনি।

বুঝেছি, আর বলতে হবে না। না দেখার ভান করে চলে যাচ্ছিলে।

মানসবাবুর মাথাতে আর কোনও জলজ্যান্ত মিথ্যা কথা এল না। আমতা আমতা করে বললেন, তুমি পড়ছিলে তো তাই।

কই আজ তো আমি পড়িনি।

পরীক্ষা শেষ?

কাল একটা ডিপার্টমেন্টের পরীক্ষা ছিল।

তারপরে সিট ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, কাকু, আজ তুমি বোসো।

না না ঠিক আছে। আমরা তো প্রতিদিন জায়গা পাই না। দাঁড়িয়ে যাওয়ার অভ্যাস আছে।

পাশে বসে থাকা আর একজন যাত্রী বললেন, আপনি বসুন, আমি পরেরটাতেই নেমে যাব।

মেয়েটির পাশে কুঁকড়ে বসতেই মেয়েটি বলে উঠল, ও কাকু, তুমি ওরকম জড়ভূতের মতো বসে আছো কেন? বি কমফর্টেবল।

না না, আমি ঠিক আছি।

দূর কিছু ঠিক নেই।

মানসবাবু মেয়েটির দিকে আরও একটু সরে বসলেন।

আজও আগের দিনের মতোই জিন্স আর টপ পরেই এসেছে। ডান কাঁধের সাথে বোসবাবুর বাঁ কাঁধ লেগে আছে, কনুইটা বুকের কাছাকাছি।

পিছন থেকে নিত্যযাত্রী ভোম্বল বলে উঠল, বোসদা লটারি কিনেছিলেন? আজ মিলিয়ে নেবেন, ফার্স্ট প্রাইজ পেয়ে গেছেন। শুধু বউদিকে একটু সাইজে আনতে হবে।

ওষুধের বিশুদা বলে উঠল, নতুন ডাউনলোড করেছি দেখবেন নাকি? দেব ওখানে। বোসবাবু কিছু সময় মেয়েটির কাছে বসে উঠে দাঁড়িয়ে বলে উঠলেন, তুমি এখানে বোসো, আমি একটু বন্ধুদের কাছে যাই, ওরা আবার কী ভাববে।

ওরা তোমার লেগপুল করছে?

না না। আসলে প্রতিদিন একসাথে যাই তো, তাই একটু মজা করছে।

কথাগুলো শেষ করেই জায়গাটা ছেড়ে পিছনের দিকে চলে গেলেন। কিন্তু নিত্যযাত্রীদের কাছে রীতিমতো টোন টিটকিরি সহ্য করতে হল। সেটা অবশ্য প্রতিদিনই হয়। তবে সেদিন এতটাই মাত্রা ছাড়াল যে, বোসবাবু তাদের থেকে পাশে সরে দরজার সামনে একাই দাঁড়িয়ে থাকলেন। হাওয়া আসছিল, মনটাও ভেসে ভেসে যাচ্ছিল। কিন্তু সব কিছু কেমন যেন অস্থির। সব সময় ইয়ার্কিও ভালো লাগে না।

কাকু বসবে না তুমি? কথাটা শুনে ঘাড়টা ঘোরাতেই দেখলেন আবার সেই মেয়েটি, এক্কেবারে কাছে দাঁড়িয়ে আছে। বোসবাবু একটু কঠিন ভাবে বললেন, কী ব্যাপার তুমি উঠে এলে?

তুমি বসবে না?

তুমি বোসো।

মেয়েটি আর কথা না বাড়িয়ে আস্তে আস্তে নিজের জায়গাতে ফিরে গেল। কিছুক্ষণ পর মানসবাবুর মনটা হু হু করে উঠল। মেয়েটিকে এরকম ভাবে না বললেই হতো। বেচারি শুধুমাত্র বসতে বলবার জন্য এসেছিল।

মেয়েটির কাছে গিয়ে ওকে সরিয়ে নিজের বসবার ব্যবস্থা করলেন। কিছু সময় পরে মেয়েটি, বোসবাবু কোথায় কাজ করতে যান থেকে আরম্ভ করে, বাড়িতে কে কে আছে, সব জেনে নিল।

মানসবাবুও জানলেন ওর নাম অনুশ্রী। এবার নিত্যযাত্রীরা কেউ কিছু বললেও, বোসবাবু কাউকে কোনও পাত্তা দিলেন না। সারাটা রাস্তা অনুশ্রীর সাথে গল্প করে যেতে লাগলেন।

ট্রেন থেকে নেমেই অনুশ্রী বলে, কাকু তোমার অফিস তো কাছেই, পরের ট্রেনে তো আসতে পারো। দশটার মধ্যে ঢুকে যাবে।

ট্রেনের কামরাতে থাকবার সময় অনুশ্রীর কথাটা সেরকম ভাবে না শুনলেও, অফিসের রাস্তায় হাঁটবার সময় কথাগুলো কানের কাছে গুন গুন করতে আরম্ভ করল। সত্যিই তো পরের ট্রেনটাতেও আসা যায়! বাড়িতে আরও আধ ঘন্টা বেশি সময় পাওয়া যাবে। আর একটু বেশি সময় ঘুমানো যাবে। ট্রেনেও শুধুমাত্র অনুশ্রী। তাছাড়া অফিসে তাড়াতাড়ি এসেই বা কী করবেন, সেই তো বসে বসে পেপার পড়া। না হয়, এর ওর সাথে গল্প করা। মাঝে মাঝে বিরক্ত লাগে।

অনুশ্রীর মোবাইলে ফোন করতেই সঙ্গে সঙ্গে ওপার থেকে উত্তর আসে,

বলো কাকু…

ক্লাসে?

না, এই তো নামলাম।

শোনো কাল থেকে পরের ট্রেনেই আসব।

বেশ কাকু তাই হবে। পিছনের থেকে তিন নম্বর কামরাতে উঠবে, আমি জায়গা রাখব।

পরের দিন থেকেই মানসবাবু সব কিছু আধঘন্টা পরে করতে আরম্ভ করলেন। সেই ঘুম থেকে ওঠা থেকে আরম্ভ করে বাস ধরা পর্যন্ত সব কিছু আধ ঘন্টা পিছিয়ে গেল। বাকি সব কিছু একই ভাবে চললেও আরেকটা বড়ো পরিবর্তন বউয়ের চোখে পড়ল। অফিসে যাওয়ার সময় এই প্রথম জামা ইন করে পরতে আরম্ভ করলেন, সঙ্গে জুতো। এমনকী মেয়ের বডি স্প্রে-র গন্ধও জামার ঘামের গন্ধ থেকে বেরিয়ে আসতে লাগল। বউ সব কিছু দেখেও কিছু বললেন না। কিন্তু মাস দেড় পরে স্বামীর সাজ বেড়ে উঠতে দেখে, একদিন মানসবাবু বেরিয়ে গেলে, মেয়ের সাথে আলোচনা করলেন, হ্যাঁ রে তোর বাবার হল কী? এত চকচকে পোশাক, উড়ো উড়ো ভাব, বুড়ো বয়সে প্রেমে পড়ল নাকি?

মেয়ে সব কিছু দেখে শুনে, মাকে চিন্তা করতে বারণ করলেও নিজের কাছে অস্বস্তি গোপন থাকল না। ট্রেনে কিন্তু বোসবাবুর যাতাযাতের মজা আরও দ্বিগুন বেড়ে গেল। পরের ট্রেনটা তুলনামূলক ফাঁকা আসে। অনুশ্রীও প্রতিদিন বোসবাবুর জন্য জায়গা রেখে দেয়। সারাটা রাস্তা দুজনে গল্প করতে করতে চলে যান। শনি, রবি বা অন্যান্য ছুটির দিনে মন খারাপ লাগে। অনুশ্রীকে ফোন করেন।

বিশুদা কথা প্রসঙ্গে মোবাইলে আরও নতুন কিছু আনার খবর দেয়। মানসবাবু উত্তরে শুধু হাসেন। কিন্তু ট্রেন বা কার সঙ্গে কোন কামরাতে উঠলেন, সে সম্পর্কে কোনও কথাই বলেন না। রাতে ফিরে একা বসে প্রায়ই গুনগুন করে গান করেন। শুয়ে ঘুমিয়ে পড়েন তাড়াতাড়ি। বউ ঘুমিয়ে থাকা বোসবাবুকে দেখে বোঝার চেষ্টা করেন। কিছু বুঝতে না পেরে পরের দিন বোসবাবু বেরিয়ে যাওয়ার পরে, আবার মেয়ের সাথে আলোচনা করতে বসেন।

 

সেদিন অফিস থেকে ফিরে মানসবাবু অবাক হয়ে যান। বেল বাজাতেই বউ তাড়াতাড়ি এসে হাত থেকে ব্যাগ নিয়ে চেযার টেনে বসতে দেন। হাত মুখ ধোওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হাতের কাছে চা তৈরি করে দেন। মেয়ে ডিম পাঁউরুটি তৈরি করে দাঁড়িয়ে থাকে। মানসবাবুর খাওয়ার আগে অবাক হয়ে সবার মুখের দিকে তাকাতে থাকেন।

বিবাহবার্ষিকী, দু-একটা পূজাপার্বণ আর মেয়ের জন্মদিন ছাড়া, অফিস থেকে ফিরে এরকম জলখাবার আর কোনও দিন হয় কিনা মনে করতে পারলেন না। তাই অত খাবার দেখে জিজ্ঞেস করলেন, আজ কি কোনও অনুষ্ঠান আছে? কোনও পুজো-টুজো!

না না, অনুষ্ঠান কেন থাকবে? রোজ ওই এক মুড়ি। তাই মাম্পি বলল, ডিম পাঁউরুটি করবে। এই টিফিনটা শুধুমাত্র একদিনের জন্যেই নয়। এরপর অফিস থেকে ফিরলেই বিভিন্ন রকমের টিফিন নিয়ে মা, মেয়ে হাজির থাকত।

এখন রাতে শুয়ে বউ নিজের থেকে নিজের দিকে টেনে, বিয়ের প্রথম কয়েক বছরের সেই সব দিনের কথা আলোচনা করে। তারপর মাঝে মাঝেই জানলাতে মুখ রেখে মাম্পি ঘুমিয়ে গেছে কিনা দেখে নিয়ে নিজেদের ঘরের দরজার ছিটকিনিটা তুলে দেয়। বোসবাবুর এখন ঘুম থেকে উঠতে একটু বেশি দেরি হয়। তবে অসুবিধা হয় না, হেঁটে এলেই হাতে রেডি চা পেয়ে যান।

এখন আর আনাজ কাটতে বসতে হয় না, ভাতের জলও চাপাতে হয় না। সব কাজ মা আর মেয়ে মিলেই সামলে দেয়। বোসবাবু ট্রেনে যাওয়ার সময় অনুশ্রীর সাথে সব কিছুর আলোচনা করেন, তবে পরিবর্তনের কারণ বুঝতে পারেন না। অনুশ্রীও কিছু বলে না।

একদিন প্ল্যাটফর্মের ওভারব্রিজে উঠতে উঠতে পুরোনো নিত্যযাত্রীদের দলের তপন ফোন করে, কী ব্যাপার বোসদা, আমাদের ছেড়ে নতুন বান্ধবী পাতিয়েছেন শুনলাম! বউদি সব জানে তো? গা পিত্তি জ্বলে উঠল। কাছে থাকলে টেনে দুথাপ্পড় কষাতেন।

বেশ জোর গলাতেই উত্তর দিলেন, সে খবরে তোমার কী দরকার? বলেই ফোনটা কেটে দিলেন।

ট্রেন আসতে মিনিট দশ দেরি হল। পিছনের দিক থেকে তিন নম্বর কামরাতে উঠলেন। অনুশ্রী বাঁ দিকটাতে বসে। বোসবাবু বাঁ দিক দেখলেন, ডান দিক দেখলেন, কই নেই তো! সামনে উঠল নাকি? চলন্ত ট্রেনের ভিতর হেঁটে সেই কামরার সামনের দিকে এলেন। না নেই। ভালো লাগছে না। মোবাইলের কন্ট্যাক্ট-এ গিয়ে অনুশ্রীকে ডায়াল করলেন। কী আশ্চর্য! ফোন বন্ধ! তাহলে? একটা জায়গাতে বসলেন বোসবাবু, কিন্তু অনুশ্রী কই? আসেনি, নাকি সামনের দিকে উঠল? এরপর কি পুরো ট্রেনটা দেখতে হবে? শরীরে একটা অস্বস্তি আরম্ভ হল। না আর বসা যাবে না।

অফিসেও সেদিন কোনও কাজ করা তো দূর, ভালো করে বসে থাকতেই পারলেন না। একটা চাপা কষ্ট তাড়িয়ে বেড়াচ্ছিল। বাড়িতে সেই এক অবস্থা। পরের দিন একটু আগে আগে বাড়ি থেকে বেরিয়ে আগের ট্রেনে অনুশ্রীর কলেজে পৌঁছলেন। বহু কষ্ট করে ভিতরে গিয়ে ডিপার্টমেন্টও পৌঁছোলেন। কিন্তু নাম বলতে কেউই বুঝতে পারল না। একজন তো বলেই দিলেন, অনুশ্রী নামে এই ডিপার্টমেন্ট-এ কেউ নেই।

কলেজের রাস্তা ধরে অফিসের রাস্তায় আর যেতে ইচ্ছে করল না। কী রকম একটা লাগছে! তার মানে আগামীকাল থেকে সেই জীবন! সেই ট্রেন? সেই বউ মেয়ে?

কলেজের রাস্তার পাশে থাকা বেঞ্চে বসলেন। কত হাজার হাজার কমবয়সী ছেলে-মেয়ে কলেজে ঢুকছে। বোসবাবু তাদের দিকে এক ভাবে তাকিয়ে থাকলেন।

হঠাৎ দুকানে ও কাকু… ডাক শুনে একটু চমকে উঠলেন। ঘাড় ঘুরিয়ে এদিক ওদিক দেখতে আরম্ভ করলেন। না মানুষটা ধারে কাছে নেই!

 

 

‘ম’-এ মুরগি-মাটন

কাবাব মূলত পারস্য এবং তুরস্কের মধ্যযুগীয় রান্নাঘরে তৈরি মাংসের বিভিন্ন খাবারগুলির সাথে সম্পর্কিত।মুসলিম প্রভাবের সাথে সমান্তরাল ভাবে এই খাবারটি বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। ভ্রামণিক ইবন বতুতার মতে, দিল্লি সুলতানির সময়কালে (১২০৬-১৫২৬) রাজবাড়িতে কাবাব পরিবেশিত হত, এমনকী সাধারণ মানুষেরাও প্রাতঃরাশে নান রুটির সাথে এটি উপভোগ করতন৷ রেস্তরাঁয় গেলেই যে-খাবারগুলি আপনার মুখে জল এনে দিতে পারে, তার মধ্যে কাবাব হল অন্যতম। কাবাবের কয়েকটি দুর্দান্ত পদ, এবার বাড়িতেই ঝটপট বানিয়ে ফেলে, আপনার বন্ধুদের চমকে দিন৷

চিকেন টিক্কা

উপকরণ : ২৫০ গ্রাম হাড়ছাড়া মুরগির মাংস ছোটো টুকরোয় কাটা, ৮০ গ্রাম জল ঝরানো দই, ১/২ বড়ো চামচ বেসন শুকনো খোলায় নাড়াচাড়া করা, ৫ গ্রাম সরষের তেল, ১/২ ছোটো চামচ রসুনবাটা, ১/২ ছোটো চামচ আদাবাটা, ৫ মিলিগ্রাম লেবুর রস, ১/২ ছোটো চামচ দেগি মির্চ, ১/২ ছোটো চামচ গরমমশলাগুঁড়ো, ১/২ ছোটো চামচ জিরেগুঁড়ো, ১/২ ছোটো চামচ গোলমরিচগুঁড়ো, ১/২ ছোটো চামচ কসৌরি মেথি, নুন স্বাদমতো।

প্রণালী : একটা পাত্রে, চিকেন বাদ দিয়ে অন্য সমস্ত উপকরণ ভালো ভাবে মেশান। এবার এই মিশ্রণ চিকেনের গায়ে ভালো ভাবে মাখিয়ে অন্তত ৪৫ মিনিট ম্যারিনেট করুন। এরপর চিকেনের টুকরোগুলো শিকে গেঁথে ৭-৮ মিনিট আভেন-এ গ্রিল করুন। ধনেপাতা-পুদিনাপাতার চাটনি সহযোগে সার্ভ করুন।

Mutton Sheek Kebab Cuisine

মাটন শিক কাবাব

উপকরণ : ২৫০ গ্রাম মাটন কিমা, ১ ইঞ্চি আদার টুকরো মিহি করে কাটা, ১টা কাঁচালংকা কুচি করা, ১/২ চামচ ধনেপাতাকুচি, ২ গ্রাম দারচিনি, ১টা বড়ো এলাচ, ১/২ ছোটো চামচ লংকাগুঁড়ো, ১/২ ছোটো চামচ গরমমশলা, ১/২ ছোটো চামচ জিরেগুঁড়ো, ১/২ ছোটো চামচ গোলমরিচগুঁড়ো, ৫ মিলিগ্রাম নারকেলের দুধ, নুন স্বাদমতো।

প্রণালী : একটা পাত্রে সমস্ত উপকরণের সঙ্গে, মাংসের টুকরোগুলো মাখিয়ে ঘন্টা দুয়ে রেখে দিন। এবার শিকে গেঁথে, ১০ মিনিট গ্রিল করুন। দুপিঠ ভালো ভাবে সেঁকা হলে, ধনেপাতার চাটনির সঙ্গে পরিবেশন করুন।

Murg Elichi Tikka Recipe

মুর্গ ইলাইচি টিক্কা

উপকরণ : ২৫০ গ্রাম হাড়ছাড়া চিকেন (ছোটো টুকরো করা), ৫ বড়ো চামচ কাজুপেস্ট, ২৫ গ্রাম চিজ, ৩০ গ্রাম জল ঝরানো দই, ১টা ডিম, ৫০ গ্রাম ক্রিম, ১ বড়ো চামচ শাহমরিচ, ১ বড়ো চামচ এলাচগুঁড়ো, ১/২ বড়ো চামচ কুচোনো পুদিনাপাতা, নুন স্বাদমতো।

প্রণালী : একটা বোল-এ চিকেনের টুকরোগুলো ধুয়ে রাখুন। এবার অন্য পাত্রে সমস্ত সামগ্রী একসঙ্গে মেখে নিন। চিকেনের গায়ে ভালো ভাবে এই মিশ্রণ মাখিয়ে ৪৫ মিনিট ম্যারিনেট হতে দিন। শিকে গেঁথে ১০ মিনিট গ্রিল করুন। ধনেপাতার চাটনির সঙ্গে পরিবেশন করুন।

বজায় রাখুন চুলের ঔজ্জ্বল্য

এখন রঙিন চুলের ট্রেন্ড চলছে। মহিলারা অনেকেই তাই চুলে রং করছেন। তবে পুরো চুলে নয়, বোল্ড কালার ব্যবহার করে চুল হাইলাইটও করছেন অনেকে।

কালার্ড হেয়ার আমাদের লুক্স চেঞ্জ করে দেয়। তাই ইমেজ চেঞ্জ করার জন্য এখন অনেকেই চুলে রং করছেন। তবে চুল রং করার সামগ্রী যাতে অ্যামেনিয়া ফ্রি হয়, সে ব্যাপারেও এখন সতর্ক না থাকলে, রোদের তাপ চুলে কুপ্রভাব ফেলবেই। অতএব, জানতে হবে চুলের সুস্বাস্থ্য বজায় রাখার উপায়।

রোদের কুপ্রভাব থেকে বাঁচার উপায়

শুধু চোখে কিংবা ত্বকে নয়, সূর্যের আল্ট্রাভায়োলেট রশ্মি চুলেও খারাপ প্রভাব ফেলে। ফলে, কড়া রোদে চুলের স্বাস্থ্য এবং সৗন্দর্য দুই-ই নষ্ট হয়। আর যদি সবকিছু না জেনে চুলে রং করিয়ে নেন, তাহলে চুলের আরও সর্বনাশ হবে। তবে এর থেকে বাঁচার একটা উপায় আছে। চুল কালার করার আগে ব্লিচ করবেন না। কারণ, ব্লিচ করিয়ে চুল কালার করলে রোদে বেরোলে সূর্যের আল্ট্রাভায়োলেট রশ্মি আরও ক্ষতি করবে। চুল তখন রুক্ষ হয়ে উঠবে এবং ভেঙে ঝরে যাবে। এ বিষয়ে আরও কিছু সতর্কতা জরুরি। যেমন–

হট্ অয়েল ট্রিটমেন্টঃ নর্মাল চুলের তুলনায় কালার্ড চুলে বেশি প্রয়োজন আদ্রভাব ধরে রাখা। আর এরজন্য চাই হট্ অয়েল ট্রিটমেন্ট। হেয়ার অয়েল রোদে কিছুক্ষণ বসিয়ে রেখে চুলে মেখে নিন। তারপর গরম জলে তোয়ালে ডুবিয়ে, জল নিংড়ে নিয়ে মাথায় জড়িয়ে রাখুন। ২-৩ বার রিপিট করুন। সপ্তাহে অন্তত তিন থেকে চারদিন এইভাবে হট্ অয়েল ট্রিটমেন্ট করলে চুল ভালো থাকবে।

অ্যালকোহল ফ্রি প্রোডাক্টঃ আজকাল এমন কিছু প্রোডাক্ট বাজারে এসেছে, যা ব্যবহার করলে সূর্যের ক্ষতিকারক রশ্মিও চুলের ক্ষতি করতে পারবে না। তবে এইসব প্রোডাক্ট কেনার সময় ভালো ভাবে দেখে এবং জেনে নেবেন, প্রোডাক্ট অ্যামোনিয়া এবং অ্যালকোহল ফ্রি কিনা। কারণ, প্রোডাক্ট যদি অ্যামোনিয়া এবং অ্যালকোহল যুক্ত হয়, তাহলে হিতে বিপরীত হবে। অর্থাৎ, চুলের স্বাস্থ্য নষ্ট হবে।

স্কার্ফ-এর প্রয়োগঃ রোদে বেরনোর আগে মাথায় টুপি অথবা স্কার্ফ ব্যবহার করুন। কারণ, চুল ঢাকা থাকলে সূর্যের তাপ সরাসরি চুলে লাগবে না এবং চুলের ক্ষতির সম্ভাবনা কমবে। তবে টুপি অথবা স্কার্ফ ব্যবহার করলেও, চুল খোলা রাখবেন না। কারণ, টুপি অথবা স্কার্ফ-এর বাইরে থাকা চুল রোদের তাপে ক্ষতি হতে পারে।

সুইমিং-এ সতর্কতাঃ গরমকালে সুইমিং পুলের জল যেমন গরম থাকে, ঠিক তেমনই হেয়ার প্রোটেকশন ছাড়া সাঁতার কাটার সময়, সূর্যের আল্ট্রা ভায়োলেট রশ্মির কুপ্রভাবও পড়তে পারে। তাই সাঁতার কাটার আগে চুলে লাগান হেয়ার প্রোটেকশন সিরাম।

বিউটি উইথ পারফেকশন

গত এক দশকে পারফেক্ট ফিগার ও পারফেক্ট সৌন্দর্যের প্রতি মেয়েদের ক্রেজ অনেকগুনে বেড়ে গেছে। বিয়ন্ড বিউটি নতুন করে নিজেকে উপস্থাপিত করার জন্য আধুনিকতম সৌন্দর্যচর্চার সাহায্য নিচ্ছেন তারা। শুধু মুখের সৌন্দর্য বজায় রাখাই এখন আর একমাত্র লক্ষ্য নয়, বডি শেপ-এ পারফেকশন এখন সৌন্দর্যের অঙ্গ। একসময় এই ধরনের সৌন্দর্যচর্চার সাহায্য নিতেন শুধু রুপোলি পর্দার নায়িকারা, বা হাই-এন্ড মডেলস্ ও সোশ্যালাইটসরা। এখন কিন্তু চিত্রটা সম্পূর্ণ বদলে গেছে। সুন্দর হয়ে ওঠার অধিকার সবার আছে। তাই নতুন টেকনোলজির সাহায্যে বিউটি ট্রিটমেন্টস্ করাচ্ছেন সাধারণ পরিবারের মেয়েরাও।

সর্বাধিক প্রচলিত টেকনিক

হালফিল সময়ে লুকস্ ডিজাইন করার জন্য অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে কয়েকটি এসথেটিক ট্রিটমেন্টস্। লাইপোসাকশন বা বডি কন্ট্যুরিং, বোটোক্স, ফিলার্স এবং লেজার –এর মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয়।

লাইপোসাকশন

লাইপোসাকশন বস্তুত বডি কন্ট্যুরিং সার্জারি। এটা এক ধরনের কসমেটিক সার্জারি। অতিরিক্ত মেদ থেকে মুক্তি পাওয়ার এ-এক অব্যর্থ পন্থা। মেদ কমিয়ে শরীরের গঠনকে পারফেক্ট করাই এই সার্জারির উদ্দেশ্য। যে -অবাঞ্ছিত ফ্যাট, এক্সারসাইজ বা ডায়েটেও নির্মূল হয় না, তা থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার জন্য করা হয় সার্জারি। নিতম্ব, পেট, জঙঘা প্রভৃতি অংশে জমা এই ফ্যাট শরীর থেকে বের করে দেওয়া হয় এই সার্জারির মাধ্যমে। শরীরের এই ফ্যাট তরলীকরণ করার পর তা শরীর থেকে বাদ দেওয়া হয় লাইপোসাকশনের দ্বারা।

এই সার্জারি অ্যানাস্থেসিয়া করার পর করা হয়ে থাকে। অল্প একটু অংশ কেটে সাকশন পাম্প বা একটা বড়ো সিরিঞ্জ-এর সাহায্যে ওই বাড়তি ফ্যাট বের করে নেওয়া হয়। এই সার্জারিতে ঠিক কতটা সময় লাগবে, সেটা নির্ভর করে কতটা ফ্যাট বের করা হবে, তার উপর। এই সার্জারিতে যন্ত্রণার অনুভব হয় না।লাইপোসাকশনের জন্য কোনও বয়সের সীমা নেই। ৬০ বছর বয়সের মহিলাদের উপর এটা প্রয়োগ করে সুফল পাওয়া গেছে। এর জন্য শুধু ফিজিক্যাল ফিটনেসের প্রয়োজন। লাইপোসাকশন-এর পর অবশ্য আপনার নতুন ওজনটা মেনটেন করে যাওয়া জরুরি। এর জন্য উপযুক্ত ডায়েট ও এক্সারসাইজ প্রয়োজন।

 

কাদের জন্য প্রয়োজন

  • গর্ভাবস্থার পর শরীরকে স্বাভাবিক শেপ-এ ফেরানো দরকার
  • শরীরের সেইসব অংশ যেমন ঘাড়, চিবুক, গাল, নিতম্ব প্রভৃতি –যেখান থেকে মেদ কমানো কঠিন, এসব ক্ষেত্রে জরুরি
  • আর্মপিট যাদের অতিরিক্ত ঘামে তাদের জন্য প্রয়োজন
  • তলপেটের বাড়তি মেদ বা হাতের উপরের অংশে জমা মেদের জন্য

যে-পুরুষদের স্তনের আকার বড়ো, তাদের জন্য

আইব্রো লিফ্ট

বোটোক্স-এর সাহায্যে বয়সের কারণে ঝুলে পড়া আইব্রো-কে কিছুটা লিফ্ট করা যায়। এর ফলে মুখটা আর ততটা বয়স্ক দেখায় না।

বোটোক্স

বোটোক্স এক ধরনের নিউরোটক্সিন। এটি শুধু রোগের উপশমেই নয়, সৌন্দর্য বাড়ানোর কাজেও ব্যবহৃত হয়। দামি ক্রিম ত্বককে কোমল করে, টানটান করে ঠিকই কিন্তু রিংকল্স সারাতে কাজে লাগে না। এসব ক্ষেত্রে বোটোক্স অব্যর্থ। ব্যবহার করার মাত্র ৪ দিন পর থেকেই, এর সুফল চোখে পড়ে। শরীরের যে-অংশে ইনজেক্ট করা হয় সেখানকার মাংসপেশি প্যারালাইজ হয়ে যায়। এর ফলে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যে নতুন নতুন বলিরেখার ছাপ দেখা দেওয়ার কথা, তা আর হয় না।

বোটোক্স মুখের উপরই বেশি প্রয়োগ করা হয়ে থাকে। প্রথম বোটোক্স ট্রিটমেন্টের প্রভাব ৪ থেকে ৬ মাস পর্যন্ত অক্ষুণ্ণ থাকে। পরের বারের ট্রিটমেন্টের প্রভাব থাকে ৯ থেকে ১২ মাস অবধি। এই ট্রিটমেন্টের খরচা, প্রতি ইউনিট বোটোক্স অনুযায়ী ধার্য হয়।

ফোরহেড ট্রিটমেন্ট

কপালে ফাইন লাইনস্, চোখের পাশে গর্ত হয়ে চোখ ঢুকে যাওয়া এগুলিই আধুনিক ট্রিটমেন্টের দ্বারা রোধ করা সম্ভব। এটাকে টেম্পোলার হিলিয়স ট্রিটমেন্ট বলা হয়। ডার্মাল ফিলার্স ইনজেক্ট করেও এই ট্রিটমেন্ট করা হয়।

ক্রোজ ফিট

চোখের চারপাশের ফাইন লাইন্সগুলি আপনার সৌন্দর্যকে অনেকটাই খর্ব করে। বয়স বাড়া ছাড়াও রোদের প্রকোপ এবং অতিরিক্ত ধূমপানের কারণে এই ক্রোজ ফিট দেখা যায় চোখের আশপাশে। বোটোক্সে এই মাংশপেশিকেও রিল্যাক্স করতে সাহায্য করে।

স্মাইল কারেকশন

কিছু মানুষের ক্ষেত্রে হাসলে উপরের মাড়ির খানিকটা অংশ দেখা যায়। এই বিসদৃশ পরিস্থিতি থেকে বোটোক্স মুক্তি দিতে পারে। এই ইঞ্জেকশন ঠোঁটের উপরের কিছু অংশে ফিলার দেওয়ার ফলে, পার্শিয়াল প্যারালিসিস-এর জন্য হাসলেও ঠোঁট আর আগের মতো অতটা প্রসারিত হতে পারে না। ফলে মাড়ি দেখা যায় না।

ঘাম থেকে মুক্তি

আর্মপিট ও হাতের উপরের অংশ ঘামার সমস্যা অনেকেরই থাকে। এর ফলে শরীর থেকে দুর্গন্ধও নির্গত হয়। হাত ও বগলে অল্প মাত্রায় বোটোক্স ইনজেক্ট করলে ঘাম নির্গমন কিছুটা রোধ করা যায়। এর প্রভাব ১০ মাস পর্যন্ত থাকে।

লেজার থেরাপি

লেজার বা হিলিয়স-এর উদ্দেশ্যই হল ত্বকের টান ভাব ফিরিয়ে আনা, পিগমেন্টেশন ও ব্রণ ও অ্যাক্নে, বা মেলাজমা প্রভৃতি দাগ ছোপ নির্মূল করা। ত্বক উজ্জ্বল করতে ও স্থায়ী ভাবে ত্বকের অবাঞ্ছিত রোম দূর করতে এই ট্রিটমেন্ট অব্যর্থ। চোখের সংবেদনশীল ত্বক বাদ দিয়ে শরীরের যে-কোনও অংশের অবাঞ্ছিত রোম দূর করতে লেজারের জুড়ি নেই। এর দ্বারা হেয়ার ফলিকলগুলোকে নষ্ট করে দেওয়া হয় ফলে পুনরায় অবাঞ্ছিত রোম দেখা দেয় না।

আজকাল নারী-পুরুষ নির্বিশেষে অনেকেই লেজার থেরাপি করান।

সকলেই চাইছেন নিজেকে আকর্ষণীয় করে তুলতে। ফলে হাত-পায়ের অতিরিক্ত রোম নির্মূল করতে-ও এর সাহায্য নেওয়া হচ্ছে। কোমর, বগল, ছাতি, ঠোঁটের উপরের অংশ প্রভৃতি সমস্ত জায়গার রোম নির্মূল করতে এটি অত্যন্ত কার্যকর ও সুরক্ষিত একটি উপায়। এর দ্বারা ৮০-৯০ শতাংশ রোম নির্মূল হয়ে যায়।

এই ট্রিটমেন্ট যদি পিগমেন্টেশন বা ব্রণর জন্য করে থাকেন, তাহলে আফটার ট্রিটমেন্ট কেয়ার অবশ্যই নেবেন। বেশি করে সানস্ক্রিন ব্যবহার করুন ও রোদে বেরোনোর সময় শরীর ঢেকে বেরোনো আবশ্যক।

ঠোঁট

পুরু ঠোঁট দেখতে খুব আকর্ষক লাগে। ঠোঁট পাতলা হলে ফিলারের সাহায্যে তা পুরন্ত করা সম্ভব। আবার ঠোঁট বিসদৃশ রকমের মোটা হলেও, তা কারেকশন করা যায়। এই ট্রিটমেন্টের পর যদি আপনি ঠোঁটের নতুন আকারে সন্তুষ্ট না হন, তাহলে পুনরায় আগের অবস্থায় তা ফেরানো সম্ভব।

ফিলার্স

হ্যালুরনিক অ্যাসিড আমাদের শরীরে জলীয় আকারে চোখে ও অস্থিসন্ধিতে থাকে। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে এর পরিমাণে ঘাটতি হয়। এর ফলে ত্বকের ইলাস্টিসিটি কমে যায়। ত্বকে রিংকল্স দেখা দেয়। তাই ডার্মাল ফিলার্স-এর সাহায্যে যদি এই হ্যালুরনিক অ্যাসিড পুনরায় শরীরে প্রতিস্থাপন করা যায়, তাহলে ত্বকে বয়সের ছাপ পড়তে পারে না।

টিয়ার ট্রফ

বসা চোখ, ডার্ক সার্কল্স বা চোখের নীচে ব্যাগস হলে খুব অসুস্থ দেখতে লাগে। শুধু বয়স বাড়াই এর কারণ নয় –পর্যাপ্ত ঘুম না হওয়া, ত্বকের শুদ্ধতাও এর অন্যতম কারণ। চোখের চারপাশের সংবেদনশীল ত্বকে এই ট্রিটমেন্টকে টিয়ার ট্রফ বলা হয়। সফট্ ফিলার্স-এর সাহায্যে এই জায়গাগুলোকে ভরে দেওয়া হয়। এর ফলে চোখ পুনরায় ভাসা ভাসা দেখতে লাগে। আপনাকে ইয়ং দেখতে লাগে।

অ্যাপলস অফ চিক

আমাদের গালের উপরেও বয়সের ছাপ পড়ে। যদি মুখের তৈল গ্রন্থিগুলোকে পুনরায় রিজুভিনেট করা যায়, ত্বকে যৌবনের ছোঁয়া লাগে। বেশি ঘনত্ব-য্ক্তু ফিলার-এর সাহায্যে চিক ইমপ্লান্ট আপনার গালে হারানো লাবণ্য ফিরিয়ে দেবে। হাসার ফলে যে-লাইনস্ পড়ে গালে, এই ট্রিটমেন্টের পর আর তা অতটা প্রকট হয় না।

কিডস আই কেয়ার

শিশুদের শারীরিক এবং মানসিক বিকাশ ঘটতে থাকে প্রতিদিন। তাই এই সময় তার প্রতি বিশেষ নজর রাখা এবং যত্ন নেওয়া জরুরি। বিশেষ করে, বেড়ে ওঠার সময় শিশুর চোখের কেয়ার নেওয়া মা-বাবার প্রাথমিক দায়িত্ব। কারণ, চোখ অমূল্য সম্পদ। অবহেলার কারণে শৈশবেই যদি চোখ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে তার মূল্য দিতে হবে জীবনভর। তাই, আপনার সন্তানের দৃষ্টিশক্তি ঠিক আছে কিনা কিংবা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কিনা তা আই চেক-আপ-এর মাধ্যমে জেনে নিয়ে চিকিৎসা করা জরুরি। এ বিষয়ে সম্প্রতি বিশদে জানালেন কন্সালট্যান্ট অপটোমেট্রিস্ট সুমন অঞ্জয়।

কীভাবে শিশুদের চোখ ক্ষতিগ্রস্ত হয় বলে আপনার মনে হয়?

নানারকম ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে শিশুদের চোখ। কখনও ওদের শিশুসুলভ লাগামছাড়া দুষ্টুমি এবং অজ্ঞতার কারণে, আবার কখনও অভিভাবকদের অযত্ন এবং অসতর্কতার কারণে ক্ষতি হতে পারে শিশুদের চোখ। এ প্রসঙ্গে একটি ঘটনার উল্লেখ করছি– দুপুরে খেলতে-খেলতে রাস্তার গর্তে থাকা পিচগলা গরম জল এক শিশুর চোখে ছিটিয়ে দেয় অন্য শিশু। এরপর ওই শিশুর চোখে জ্বালা-যন্ত্রণা করলেও, আই স্পেশালিস্ট-এর কাছে না গিয়ে শুধু চোখে জলের ঝাপটা দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়। কিন্তু পরে যখন শিশুটি পিচের জল পড়া চোখটিতে ঝাপসা দেখে এবং চোখ ফুলে ওঠে, তখন আই স্পেশালিস্ট-এর কাছে নিয়ে যান অভিভাবকরা। ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। শিশুটি সারাজীবনের মতো ওই চোখটির দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছে।

অসতর্কতার কারণে এমন অনেক ঘটনাই ঘটে যায়। তবে এইরকম বড়ো বিপর্যয় ছাড়াও, অযত্ন এবং অসতর্কতায় শিশুদের চোখ কমবেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। চোখে চশমা ওঠে। যেমন– খুব কাছ থেকে টিভির অনুষ্ঠান দেখলে, দীর্ঘসময় মোবাইলে কিছু দেখলে, ল্যাপটপ কিংবা কম্পিউটারে একটানা বেশিক্ষণ কাজ করলে চোখে চাপ পড়তে পারে এবং দৃষ্টিশক্তি ক্ষীণ হতে পারে। প্রতিদিন অনেক রাত পর্যন্ত জেগে থাকলে কিংবা দীর্ঘ সময় প্রোটেকশন ছাড়া রোদে ঘুরলেও ক্ষতি হবে চোখের। শুধু তাই নয়, ছোটোবেলায় অপুষ্টিতে ভুগলেও হতে পারে চোখের সমস্যা।

সাধারণ ভাবে দৈনন্দিন জীবনে চোখের যত্ন নেওয়ার সঠিক উপায় কী?

  • গরমে ঘেমে গেলে অপরিচ্ছন্ন হাত কিংবা রুমাল দিয়ে চোখ-মুখ না মুছে, পরিষ্কার রুমাল কিংবা টিস্যুপেপার ব্যবহার করার ব্যবস্থা করে দিন শিশুকে
  • বৃষ্টির জলে ভিজে এলে, পরিষ্কার জল দিয়ে ধুয়ে দিন শিশুর চোখ। এরপর পরিষ্কার শুকনো তোয়ালে দিয়ে চোখ মুছে দিন
  • সুইমিং পুল-এ সাঁতার কেটে এলে, শিশুকে পরিষ্কার জলে আবার স্নান করিয়ে মুছে দিন। কারণ, সুইমিং পুলের জল জীবাণুমুক্ত না-ও থাকতে পারে, তাই চোখের ক্ষতি হতে পারে
  • রোদে বেরোলে মাথায় টুপি এবং চোখে সানগ্লাস দিয়ে শিশুর চোখকে প্রোটেক্ট করুন
  • নামি ব্র্যান্ড-এর বেবি শ্যাম্পু ব্যবহার করুন। কারণ, বাজে শ্যাম্পু ছোটোদের চোখের ক্ষতি করতে পারে

কখন আই চেক-আপ করা জরুরি মনে করেন আপনি?

চোখের কোনও সমস্যা কিংবা রোগের উপসর্গ দেখা দিলে, দেরি না করে তখনই আই স্পেশালিস্ট-এর পরামর্শ নিন এবং প্রয়োজনে আই চেক-আপ করান। আর যদি ছোটোদের চোখের কোনও সমস্যা আপাত দৃষ্টিতে বোঝা না-ও যায়, তাহলেও বাচ্চার যখন ১৩ বছর বয়স হবে, তখন অবশ্যই একবার আই চেক-আপ করাবেন। কারণ, বয়ঃসন্ধির সময় নানা কারণে অপুষ্টির সমস্যা হতে পারে এবং ওই সময় আই চেক-আপ জরুরি।

ছোটোদের চশমা নির্বাচনে কী কী বিষয় মাথায় রাখতে হবে?

ছোটোরা সাধারণত চশমা পরতে চায় না। কিন্তু চোখ ঠিক রাখার জন্য যদি সত্যিই চশমা পরাতে হয় কোনও বাচ্চাকে, তাহলে টেকসই সুন্দর ফ্রেম এবং আল্ট্রা ভায়োলেট রে প্রোটেকটেড আই গ্লাস সিলেক্ট করা প্রয়োজন। প্লাস্টিক ফ্রেম-এ অনেকসময় অ্যালার্জি হয় বাচ্চাদের, তাই ব্যবহার করুন মেটাল ফ্রেম। হালকা এবং ভাঙবে না এমন মেটাল ফ্রেম এখন বাজারে এসে গেছে। লেন্স-এর ক্ষেত্রে পলি কার্বোনেটেড মেটিরিয়াল লেন্স ব্যবহার করা উচিত। এই লেন্স সহজে ভাঙবে না এবং দাগ পড়বে না। তাছাড়া, এই মেটিরিয়াল লেন্স সূর্যের ক্ষতিকর আল্ট্রাভায়োলেট রশ্মির হাত থেকে রক্ষা করবে। সহজে পরিষ্কারও করা যাবে এই লেন্স। আর এই প্রসঙ্গে উল্লেখ্য, যে-সব বাচ্চারা চশমা পরতে চায় না, তাদের নির্দ্বিধায় ভালো মানের কনট্যাক্ট লেন্স পরাতে পারেন। তবে, প্রেসক্রাইব করা পাওয়ার যেন সঠিক থাকে চশমার গ্লাস-এ অথবা কনট্যাক্ট লেন্স-এ। এরজন্য ভালো অপ্টোমেট্রিস্ট-এর সাহায্য নিন।

মেঘের শহর চেরাপুঞ্জি

মেঘালয়ের রাজধানী শিলং এসেছি গতকাল। মেঘমুলুকে এসে মেঘ-বৃষ্টির লুকোচুরি খেলা নতুন কথা নয়। বৃষ্টির অনুষঙ্গ পেয়ে মনও বিন্দাস। কাল রাত-ভোর শুনেছি বৃষ্টির আওয়াজ। সকালে অবশ্য ধারাবাহিক ধারাপাতের বিন্দুবিসর্গ নেই। তবে মেঘের গতিবিধি দেখে, মেঘালয়ের জলহাওয়ার চটজলদি ভবিষ্যদ্বাণী করা খুবই কঠিন। গতকাল শিলং সাইটটা সারাদিন দেখে, আজ চলেছি বৃষ্টিভেজা চিরসবুজের দেশে। এক কথায় বললে, চেরাপুঞ্জি সাইট সিয়িং।

চেরাপুঞ্জি খাসিয়া পাহাড়ের দক্ষিণ প্রান্তে একটা ছোট্ট পাহাড়ি গ্রাম। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে এর উচ্চতা ১,৪৮৪ মিটার। চেরাপুঞ্জির স্থানীয় নাম ‘সোহরা’ বা সোরা। স্থানীয় খাসিয়া ভাষায় যার অর্থ কয়লা। ব্রিটিশদের উচ্চারণে সোরা হয়ে যায় চেরা। ছেলেবেলায় পড়া চেরাপুঞ্জির নাম আজও মনের কোণে অনুরণন তোলে। এখন আমরা সেই মেঘপুঞ্জের দেশে। সোহরা বাজার ও সংলগ্ন জনপদ বেশ বড়োসড়োই মনে হল। এখানকার কমলালেবু, দারুচিনি, চেরি, ব্রান্ডি আর কমলালেবুর ফুলের মধু বিখ্যাত। ছুটে চলা গাড়ি জানলা দিয়ে সোহরা বাজারের দিকে তাকালাম। কর্মচঞ্চল মানুষজন, স্কুল ফেরত কচিকাঁচা, পথিক– সব মিলিয়ে মেঘালয়ের জন জাতিগোষ্ঠীর একখন্ড চিত্র।

শিলং থেকে চেরাপুঞ্জি ৫৬ কিমির মতো পথ। ব্রেকফাস্টের পর গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়ি। কাল রাতের বৃষ্টিতে  ভিজে পথপার্শ্বস্থ গাছপালাগুলো হয়ে উঠেছে আরও সজীব, সবুজ, প্রাণবন্ত। শিলং-সোহারা হাইওয়ে ধরে ছুটে চলেছে গাড়ি। বায়ুসেনা ব্যারাকের পরই কংক্রিটের জঙ্গল থেকে সবুজের সাম্রাজ্যে প্রবেশ করি। পথ যথেষ্ট প্রশস্ত ও মসৃণ। পাকদণ্ডি হলেও, গাড়োয়ালের মতো তেমন দুর্গম বলা চলে না। পথ ছবিতে মাঝে-মাঝেই চোখ আটকায়। বিশেষত ঢেউ খেলানো পাহাড়ি ল্যান্ডস্কেপ আর মাখামাখি সবুজের বৈচিত্র্যে।

পাইন জঙ্গলের উৎরাই ছেড়ে গাড়ি এখন উপত্যকার মাঝে। দেখি চেরি, পিচ, আর নাসপাতির বাগানে কাজ করছে খাসি নারী-পুরুষরা। জানা ছিল, পৃথিবীর সর্বাধিক বৃষ্টিপাত অঞ্চলের শিরোপো আর চেরাপুঞ্জির দখলে নেই। তার গড় বৃষ্টিপাত কমে হয়েছে ১২,০২৯ মিলিমিটার। কিন্তু ছোটোবেলার ভূগোল বই-এর স্মৃতি কি অত সহজে ভোলা যায়! মূলত গাছপালার অপ্রতুলতায় কম বৃষ্টির একটা বড়ো-সড়ো কারণ। এই পাহাড়ি পথে তাই এখন আর তেমন বড়ো-সড়ো গাছপালার অস্তিত্ব মেলে না। ফলে সামনে শুধুই সবুজ গাছের ঘোমটা পড়া নাতিদীর্ঘ পাহাড় সারি। এই পাহাড়ের উপরে সামান্য মাটির আস্তরণ থাকলেও, পাহাড়ের নীচে সবটাই পাথুরে জমি।

সরকারি তরফে এই সমস্ত জমিতে নিবিড় বনসৃজনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। কিন্তু এখনও সে ভাবে সাফল্য আসেনি। অনুকূল আবহাওয়া থাকলে দিব্যি হতে পারত দিগন্ত বিস্তৃত চা-বাগান অথবা বৃষ্টিকে ধরে রেখে ধানের মতো প্রধান ফসল। কিন্তু যে পাহাড়ের নীচে খনিজ সম্পদ অঢেল, সেখানে কোনওটাই উৎপাদন করা সম্ভব নয়। কেবল উপত্যকা জুড়ে মানুষজনের অক্লান্ত চেষ্টায় গড়ে উঠেছে নিবিড় সবজি চাষ।

চলতি পথে চোখে পড়ল, বেশ কয়েকটা পাথরকুচির কারখানা। চোখ এড়ালো না পরিত্যক্ত কয়েকটা কয়লা খাদানও। শুনলাম মেঘালয় সরকার কয়লা তোলার উপর বর্তমানে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। খাদানের কাজ বন্ধ হওয়ায় স্থানীয় মানুষজনের রুজি-রুটিতে টান পড়েছে।

সবুজ উপত্যকা ছুঁয়ে ছুটে চলেছে গাড়ি। ‘আমার পথ চলাতেই আনন্দ’ গানের মতো পথের সৌন্দর্যই যেন বিমোহিত করে তোলে। চেরা বাজারের আগেই গাড়ি দাঁড়ায় এক ভিউ পয়েন্টে। নাম দুয়ান-সিং-সিয়েম। রাস্তার ধারে গাড়ি থেকে নামতেই অবাক হয়ে গেলাম। এই সাত সকালেই পর্যটক ও স্থানীয় মানুষজনে ভর্তি জায়গাটা। সামনের ল্যান্ডস্কেপ জুড়ে পাহাড়ের প্যানরামিক ভিউ।

দুরে পাহাড়ি খাদ থেকে উঠে আসা ঘন সবুজ পাহাড় পরিবারদের দেখে মনে হচ্ছিল সাজানো পাপড়ি মেলা বড়োসড়ো এক পদ্মফুল, ধূপছায়ার কারসাজিতে হয়ে উঠেছে অসাধারণ। পাথুরে ধাপ সিঁড়ি ধরে গেলাম অনেকটা নীচে। সিড়ির বাঁকে উঁকি দিল এক তন্বী ঝরনা। ঝোপ জঙ্গলের মাঝে সে নিজেকে রেখেছে অবগুণ্ঠিত। ভিউ পয়েন্টে দাঁড়িয়ে বিন্যস্ত গিরিবর্গের ছবি তুললাম বেশ কয়েকটা। উপরে উঠে দেখি পথপার্শে চা, ম্যাগি, চিপস-এর অস্থায়ী সব দোকান। আছে চাদর, টুপি, স্কার্ফ, জ্যাকেটের মতো প্রয়োজনীয় সামগ্রীও।

Falls enroute Cheerapunji

একটা ঝোরার টানে ছুটে চলার পর এক উপত্যকার মাঝে হঠাৎ গাড়ি দাঁড়ায়। কিন্তু মজার ব্যাপার, গাড়ি থেকে নেমে কোনও ঝরনার অস্থিত্বই মেলে না। শুধু খাড়াই পাহাড়ি এক ঢাল নেমে গেছে অনেকটা নীচে। সামনের দিগন্তরেখা জুড়ে শুধু ছোটো-বড়ো কয়েকটা পাহারের সমন্বয়। ড্রাইভার বলল, ‘পাথুরে উৎরাই পথে নীচে নেমে যান। পাবেন তিন-তিনটে সুন্দরী ঝরনা। তাদের দেখে ফিরে আসুন। আমি অপেক্ষায় থাকছি।’

শব্দ সন্ধান করে গড়ানে বেপথে নামতে থাকি। এলোমেলো পাথুরে পথ। কিছুটা নামার পরেই চক্ষুস্থির। সামনে রাস্তা শেষ। আর তারপরই অতলস্পর্শী খাদের শুরু। আর খাদের ও প্রান্তে পলকহীন সবুজ পাহাড়শ্রেণির রূপমাধুর্য। যেন প্রকৃতির ক্যানভাসে জলরং তুলির সার্থক রূপটান। হঠাৎ উড়ে আসা জলকণাকে বৃষ্টি ভেবে ছাতাই বার করে ফেললাম। পরে বুঝলাম, উড়ে আসা জলকণা আসলে এক ঝরণা। যার মাথাতেই দাঁড়িয়ে আছি। তাই উপলব্ধি হচ্ছে না কিছুই। উলটো দিকের পাহাড়ি বাঁক থেকে সেই ঝরনার পূর্ণাবয়ব রূপ দেখলাম। শুনলাম এর নাম ডানথিয়েন ফলস্। ছোটো হলেও এই ফলস্ সেভেন সিস্টার ফলস্ দেখার আগে পর্যটকদের অনেকটাই মুগ্ধ করবে।

গাড়ি এবার ছুটে চলেছে নাহোকালিকাই ফলসের দিকে। এই পথেই পড়ল রামকৃষ্ণ মিশন। নির্জন পাহাড়ের কোলে অনেকটা জায়গা জুড়ে এই মিশন। মিশনের শান্ত পরিবেশ মনে এনে দিল এক প্রশান্তি। শুনলাম ১৯৫২ সালে ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু এই মিশনের উদ্বোধন করেন। নাহোকালিকাই ফলস্ অবশ্য বিনি পয়সায় দেখা গেল না। ব্যক্তি প্রতি টিকিট এখানে দশ টাকা। এছাড়াও ক্যামেরা ও গাড়ি পার্কিং এর জন্য গুনতে হল বাড়তি আরও কিছু অর্থ। বিশ্বের চতুর্থ ও এশিয়ার দ্বিতীয় উচ্চতম জলপ্রপাত এই নাহোকোলিকাই ফলস্ । ফলসের সম্মুখের রেলিং দিয়ে ঘেরা পাহাড়ি খাদের প্রান্তে এখন আমি দাঁড়িয়ে। আমার পায়ের নীচে অতলস্পর্শী খাদ। যার অপর পাড়ের পাহাড়ি শীর্ষদেশ থেকে ঝরে পড়ছে একটি শীর্ণকায় জলধারা। ঘন জঙ্গলের ফাঁকফোকড় গলে, কঠিন পাথুরে পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসছে সশব্দে।

প্রায় ২০০০ ফুট উচ্চতা থেকে এই দুধসাদা জলধারার ঝরে পড়া অসাধারণ লাগছে। সূর্যের আলো বিচ্ছুরিত হয়ে এখানে রামধনুর সৃষ্টি হয়েছে। তার পতনস্থলে সৃষ্টি হয়েছে এক কুন্ড। বিচ্ছুরিত জলকণায় সে কুন্ড এখন কুহকিনী। লোকপ্রবাদ অনুসারে বলা হয় দ্বিতীয় স্বামীর হাতে প্রথম পক্ষের কন্যার মৃত্যুর পর দুঃখে-শোকে মা লিকাই ঝাঁপ দেন এই পাহড়ি খাদে। বিশ্বাসী মানুষজন মনে করে, তারই রূপান্তরিত রূপ এই জলপ্রপাত।

একে সুইসাইডাল ফলস্ও বলা হয়। ফলস্কে ছুঁয়ে দেখতে হলে নামতে হবে নীচে, কুন্ডের কাছে। আছে পাথুরে ধাপসিড়ি। দূরে প্রতিবেশী বাংলাদেশের জলমগ্ন ল্যান্ডস্কেপের অমোঘ হাতছানি। ফলস-কে কেন্দ্র করে এখানে গড়ে উঠেছে জমজমাট বাজার। আছে টয়লেটের সুব্যবস্থাও। রাস্তার ধারেও পসরা সাজিয়ে বসেছে স্থানীয় মানুষজন। বিক্রি হচ্ছে দারুচিনি, মধু, গোলমরিচ ইত্যাদি। ওদের কাছ থেকে বেশ খানিকটা মধু কিনলাম। দাম তুলনামূলক অনেক কম।

গাড়ি এবার চলে আসে সীমান্তবর্তী এলাকায় এক ইকো পার্কে। সামনেই সাজানো-গোছানো এক শিশুউদ্যান। আছে বাচ্চাদের একাধিক রাইড। এর বাইরে এটাকে অ্যাকোয়াটিকার কাছাকাছি পার্ক বললে হয়তো ভুল বলা হবে না। কারণ ঝরনার জলকে ঘুরপথে পাহাড়ের গা বেয়ে যেভাবে একাধিক ওয়াটার রাইড তৈরি করা হয়েছে তা বেশ অভিনব। অনেকেই এই কৃত্রিম ফলসে স্নান করছেন। কেউ কেউ আবার স্রেফ পা ডুবিয়ে বসে আছেন। এই স্থানের আর এক বৈশিষ্ট্য বাংলাদেশের ঝলক দর্শন। এই সব সীমান্তে অবশ্য কাঁটা তারের বেড়া নেই। দুর্গম পাহাড়ি খাদই এখানে আন্তর্জাতিক সীমানা। ঘুর পথে আসা কৃত্রিম জলধারার জলই পাহাড়ি খাদে পড়ে এক অপরূপ ঝরনার রূপ নিয়েছে। সীমান্ত পেরিয়ে এই জলই পৌঁছোচ্ছে বাংলাদেশের নাবাল জমিতে।

Cheerapunji

এবার চলেছি সেভেন সিস্টার ফলস্ দেখতে। মেইন রাস্তা ছেড়ে শাখাপথে সামান্য এগোতেই সামনাসামনি দেখা সেভেন সিস্টারের সঙ্গে। গাড়ি থেকে নামতেই দেখি সারিবদ্ধ বৃত্তাকার পাহাড়ের মাঝে অতলস্পর্শী এক গিরিখাদ। তার বামদিকের পাহাড়েই ঝোলানো ওড়নার মতো সাত সাতটি ছোটো-বড়ো ঝরনা, যা সেভেন সিস্টার ফলস্ নামে পরিচিত। সাতবোনের মধ্যে এ বলে আমায় দেখ, তো ও বলে আমায়। গুনতে গিয়ে মনে হলো সংখ্যাটা যেন আরও বেশি। তাই নামটা ইলেভেন সিস্টার ফলস্ হলেও মন্দ হতো না। মোসমাই গ্রামের সন্নিকটে বলে অনেকে একে মোসমাই ফলস্ও বলে থাকেন। সবুজের প্রেক্ষাপটে ঝরে পড়া শ্বেতশুভ্র একাধিক জলধারার মিলিত ঐক্যতান অনবদ্য। আশ মিটিয়ে দেখেও যেন আবার দেখার খিদেটা রয়ে যায়। এখানে বাইনোকুলারের সাহায্যে ফলস্ দেখানোর ব্যবস্থা আছে। এক মিনিটের জন্য দশ টাকা। ভালো লাগার আবেশ নিয়ে বেশ কিছুক্ষণ বসেই রইলাম। একসাথে সাত সাতটা সুন্দরীকে ছেড়ে আসতে ইচ্ছা করছিল না একটুও। কিন্তু না ফিরে তো উপায়ও নেই।

আজকের শেষ দ্রষ্টব্য মোসমাই কেভস্। সেভেন সিস্টার ফলস্ থেকে সামান্য দূরেই মোসমাই গুহা। পার্কিং জোন থেকে এগিয়ে যেতেই গুহা প্রবেশের টিকিট কাউন্টার। টিকিট সংগ্রহ করে পর্যটকরা অতি আগ্রহসহ এগিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু গুহামুখ থেকে সাহস হারিয়ে অনেকে ফিরে আসছেন। প্রবেশ ও প্রস্থানপথে রয়েছে চমৎকার পাথর বাঁধানো প্রশস্ত পথ। প্যান্ট গুটিয়ে খালি পায়ে বুকে সাহস নিয়ে এগিয়ে যাই। গুহা অভ্যন্তরে আলোর ব্যবস্থা আছে। কিন্তু অন্ধকারের মধ্যে এ আলো নিতান্তই টিমটিমে। গুহার দেয়াল জুড়ে দেখছি অজস্র বাদুড় ঝুলছে। চলার পথে তাই দু’একটা ঝাপটাও মারছে মুখে। মনে পড়ে যাচ্ছে অন্ধ্রপ্রদেশের বোরাকেভ, ছত্তিশগড়ের কুটুমসোর অথবা কুমায়ুনের পাতাল ভুবনেশ্বর গুহার কথা।

ক্রমান্বয়ে পড়তে থাকা টুপটাপ জলে অসমান পাথুরে পথ হয়েছে পিচ্ছিল। স্যাঁতসেতে পরিবেশের মধ্যে পা টিপে টিপে এগিয়ে যাই। মাথার উপর কিম্ভূত আকারের সব স্ট্যালাকটাইট পাথরের অবয়ব। একটু এগিয়ে যেতেই পায়ের নীচে এসে যায় শীতল জলধারা। গা-টা শিরশির করে ওঠে। ভাবছি কোনও সাপ-খোপ এসে পা-টা জড়িয়ে ধরবে না তো! আলো আঁধারি পথে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে এগিয়ে চলেছি। কোথাও ভাঙতে হচ্ছে হাঁটুজল। অবস্থা বিশেষে কোথাও বা হামাগুড়ি দিতে হচ্ছে। চুঁইয়ে পড়া জলধারায় গা-মাথা ভিজে একসা। সব মিলিয়ে এই ১৫০ মিটার গুহাট্রেকের যে অসাধারণ অনুভূতি তা বোধ হয় ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়।

বাইরে বেরিয়ে ধাতস্থ হতে বেশ কিছুটা সময় লাগল। মোসমাই গুহাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে এক ছোট্ট বাজার। হাতে গোনা কয়েকটা ভাতের হোটেল চোখে পড়ল। মধ্যাহ্ন ভোজনের জন্য এর মধ্যে একটি হোটেলে ঢুকলাম। ফেরার পথে শুরু হল অবিশ্রান্ত বৃষ্টি। সেই মেঘ কুয়াশাকে উপেক্ষা করেই ছুটে চলে গাড়ি শিলং শহরের দিকে৷

কীভাবে যাবেন – কলকাতা থেকে প্রথমে পৌঁছোতে হবে গুয়াহাটি। বিমান অথবা ট্রেন পথে চলুন। ট্রেন পাবেন   সরাইঘাট এক্সপ্রেস,  কামরূপ এক্সপ্রেস, কাঞ্চনজঙঘা এক্সপ্রেস অথবা দ্বি-সাপ্তাহিক কলকাতা-গুয়াহাটি গরিবরথ এক্সপ্রেস। গুয়াহাটি স্টেশনের বিপরীত দিকেই পল্টন বাজার। এখান থেকে মিলবে শেয়ার সুমো। নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় গাড়ি ভাড়া করেও ১৫০ কিমি দূরের শিলং শহরে পৌঁছোতে পারেন। চেরাপুঞ্জি ঘোরার জন্য মেঘালয় টুরিজমের তত্বাবধানে চেরাপুঞ্জি টুরের টিকিট কাটুন। ভাড়া জন প্রতি ২৫০ টাকা। সকাল ৮ টায় শুরু হয়ে শেষ হয় বিকাল ৫ টায়। শিলং-এর মেঘালয় ট্রান্সপোর্ট কর্পোরেশনের বিপরীতে অবস্থিত এদের অফিস। নিজেদের উদ্যোগে গাড়ি বুকিং করে চেরাপুঞ্জি ঘুরতে চাইলে, খরচ পড়বে ১৫০০ থেকে ২০০০ টাকা।

কোথায় থাকবেন – শিলং থেকে দিনে-দিনেই ঘুরে আসা যায় চেরাপুঞ্জি। শিলং শহরে থাকার জন্য আছে অসংখ্য হোটেল। এখানে সিংহভাগ হোটেলের অবস্থানই পুলিশ বাজার ও জি এস রোডের আশেপাশে। হোটেল ভাড়া এখানে যথেষ্ট বেশি।

পড়ার জন্য সীমাহীন গল্প-নিবন্ধসাবস্ক্রাইব