পরীক্ষা নাকি অগ্নিপরীক্ষা

আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থা অনুযায়ী দ্বাদশ শ্রেণির পরীক্ষাতেই নির্ণয় হয়ে যায় শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ। পরীক্ষার্থী যদি ভালো ভাবে উতরে যায়, তাহলে তার ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল, আর অকৃতকার্য হলে সারাজীবন মুখ লুকিয়ে থাকতে হবে, চাকরি না পেয়ে বেকারত্বের শিকার হয়ে।

ঠিক এই কারণেই মায়েদের কাছে সন্তানের দ্বাদশ শ্রেণির পরীক্ষা যেন অগ্নিপরীক্ষারই মতো। দাঁতে দাঁত চেপে এই দহন সহ্য করেন মায়েরাই। পরীক্ষার ফল বেরোনোর পর যদি দেখা যায় সন্তান বা সন্ততি কম নম্বর পেয়েছে, তখনও মাকেই মাথা হেঁট করে থাকতে হয়, যেন এটা বস্তুত তাঁরই পরাজয়।

আজকাল মায়েরাই বেশি সময় দেন সন্তানের পড়াশোনার জন্য। সন্তানকে সঙ্গে করে কোচিং ক্লাসে নিয়ে যাওয়া, প্রতিযোগিতামূলক নানা পরীক্ষায় বসানো, অনলাইন অ্যাসেসমেন্ট-এর জন্য রাজি করানো থেকে রাত জেগে সন্তানের পড়ার টেবিলের পাশে বসে থাকা– সবই মায়েদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। মায়েদের জগৎটা সন্তানকে ঘিরে এমনই আবর্তিত হতে থাকে যে তিনি আত্মীয়স্বজন ত্যাগ দিয়ে শুধু সন্তানের জন্যই সময় অতিবাহিত করেন। কাকভোরে উঠে সন্তানকে তৈরি করা, তার জন্য খাবার বানানো দিয়ে দিন শুরু হয়ে, মধ্যরাতে সে যতক্ষণ না শুতে যাচ্ছে, ততক্ষণ পাশে থাকাটাই মায়ের রুটিন। এরপরও যদি সন্তান আশানুরূপ ফল না করতে পারে, তাহলে মুখ লুকিয়ে ঘোরা ছাড়া মায়ের আর রাস্তা কী?

এ আমাদের সরকারি নীতির ব্যর্থতা যে, শিক্ষা এখন শুধুই অন্তসারশূন্য এক সিলেবাসের সীমাবদ্ধতায় আটকে গেছে। পরীক্ষাগুলির ধরন যেমন, তাতে ছাত্রছাত্রীর সঠিক মান নির্ণয় হয় না। মধ্য বা নিম্ন-মেধার পড়ুয়া আগেও ছিল, কিন্তু অন্তত তারাও সুযোগ পেত নিজের মান অনুযায়ী রুজি-রোজগার করার মতো কেরিয়ার বেছে নেওয়ার। যবে থেকে দ্বাদশ শ্রেণির পরীক্ষায় ৯৮ বা ৯৯.৫ শতাংশ নম্বর ওঠা শুরু হয়েছে, ৯০-য়ের নীচে নম্বর পাওয়া প্রতিটি শিক্ষার্থীই সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হতে শুরু করেছে, আর অসফল হলে তো কথাই নেই। কিন্তু ৯০-য়ের উপর নম্বর পাওয়া পরীক্ষার্থীর সংখ্যাটাও নেহাত কম নয়। ফলে তাদেরও ইচ্ছেমতো বিভাগে সুযোগ পাওয়ার নিশ্চয়তা থাকছে না। দ্বাদশ শ্রেণির পরীক্ষাতেই তো থেমে থাকলে চলবে না, রয়েছে আইআইটি বা জয়েন্ট এন্ট্রান্স-এর মতো কেরিয়ারমুখী নানা পরীক্ষার প্রতিযোগিতা। মধ্য-মেধা বা নিম্ন-মেধার শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে এসব সুযোগ নেই, ফলে তাদের জন্য পড়ে থাকে অ্যামাজন বা ফ্লিপকার্টের পণ্য পরিবহনের কাজ, বা কল সেন্টারের লাঞ্ছনা সহ্য করার চাকরি। বস্তুত দ্বাদশ শ্রেণির এই পরীক্ষা প্রায় চিনের প্রাচীরের মতোই অলঙঘনীয়। যদি বা টপকানো গেল, তারপর এমবিএ, এমবিবিএস বা ইঞ্জিনিয়ারিং পড়লেই মাসিক লক্ষাধিক টাকার চাকরি মিলবে, তেমন নিশ্চয়তা কোথায়? কিন্তু চাকরি প্রার্থীর সংখ্যাটা যেরূপ ক্রমবর্ধমান, তাতে একটা মোটামুটি মাইনের চাকরি পাওয়াই বিরাট ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ ৯০-এর বেশি বা কম যেটাই পাক না কেন সন্তান, মায়েদের চিন্তা থেকে মুক্তি নেই।

কেবল বেকারত্বকে ইস্যু করে বিপক্ষ দলনেতারা ভোটের বাজার গরম করেছেন এবার। নরেন্দ্র মোদির তো বক্তব্য, বালাকোট-এ হামলা করে পাকিস্তানকে উচিত শিক্ষা দেওয়া হয়ে গেছে, গো-বধ নিষিদ্ধ করা হয়ে গেছে, ভারত মাতা কি জয় বলার মধ্যে দিয়ে দেশভক্তি সঞ্চার করা হয়ে গেছে। ১০০ কোটির দেশে এতেই সব দুঃখ মোচন করা হয়ে গেছে। এদিকে কেবল মায়েরাই জানেন দ্বাদশ শ্রেণির গাঁট না- পেরোনো মেয়ের, বিয়ের বাজারে কদর কমে। ছেলে একটি যুথসই কেরিয়ার গড়ায় অসফল হওয়া মানে ঠিক কি?

বস্তুত আমাদের দেশের পড়ুয়াদের আরও অনেক কেরিয়ার অপশন্স নিয়ে এই মুহূর্তে সরকারের ভাবা উচিত। যাতে শুধু মেধাবীরাই নয়, কম মেধার ছেলেমেয়েরাও কেরিয়ার তৈরি করা থেকে বঞ্চিত না হয়। শিক্ষার মান উন্নয়ন করার মধ্যে দিয়ে শুধু মেধার চাষ করাটাই সরকারের লক্ষ্য হওয়া উচিত নয়, প্রয়োজন সমস্ত পরীক্ষার্থীর রোজগারের পথকে সুগম করা। প্রতিটি ছাত্র-ছাত্রীই যাতে নিজের যোগ্যতা ও মেধা অনুযায়ী কোনও না কোনও পথ খুঁজে পান, জীবন নির্বাহের জন্য। এর দ্বারাই সমাজ এগোবে, শুধু মেধার জয় জয়কার করলেই হবে না।

 

 

 

বন্ধুত্বের নস্টালজিয়া নিয়ে আসছে ‘আবার বছর কুড়ি পরে’

আধুনিক টেকনোলজির যুগে এখন সবাই সবাইকে দেখতে পায়, চ্যাটিংয়ের দৌলতে বন্ধুত্বটুকু বেঁচে থাকে। এভাবেই স্কুলের হারানো বন্ধুত্বগুলো ফিরে পাওয়া যায়।কুড়ি বছর পর সোশ্যাল সাইটের দৌলতেই ফের দেখা হবে অরুণ, বনি, দত্ত আর নীলার।বহুদিন ধরে দেশের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছেন তারা।তাই দেখা হওয়ামাত্র স্কুলের গল্প, শৈশব আর নস্ট্যালজিয়ায় তারা ফিরে যাবেন সেই সব সোনালি দিনে।

বন্ধুত্ব, নস্ট্যালজিয়া, রিইউনিয়ন নিয়ে এর আগেও বাংলাতে ছবি হয়েছে।কিন্তু নতুন এই ছবিটিতে, সেই স্কুল বন্ধুদের রিইউনিয়ন হবে, যারা তাঁদের নিজেদের জীবনের ঘাত -প্রতিঘাতে প্রাণ খুলে হাসতেও ভুলে গিয়েছিলেন। প্রতিযোগিতার ইঁদুর দৌড়ে নিজেজের প্তাঁরতিষ্রাঠিত করতে তারা ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন। তারাই এবার সিদ্ধান্ত নেন, নিজেদের বহমান জীবনের একঘেয়েমি থেকে বেরিয়ে, ২০ বছর আগের সেই সোনালি দিনগুলিতে পুনরায় ফেরত যাওয়ার।

শ্রীমন্ত সেনগুপ্তের  পরিচালনায়, পিএসএস এন্টারটেইনমেন্টস এবং প্রোমোদ ফিল্মসের প্রযোজনায় এই ছবি ‘আবার বছর কুড়ি পরে’ নব্বইয়ের দশকের শেষের দিকের কলকাতার প্রেক্ষাপট, স্কুলের বন্ধুবান্ধব, নস্টালজিয়া এবং কয়েকটি অন্যান্য নানা টুইস্ট নিয়ে তৈরি হয়েছে।

সাড়ে তিন বছর ধরে মোনালি সেন চৌধুরীর সঙ্গে বসে এই গল্পটি লিখেছেন শ্রীমন্ত। সেখানে নিজেদের জীবনের গল্প যেমন রয়েছে, তেমনই পরিচিত বন্ধু-বান্ধবদের জীবনের গল্পও, জানালেন শ্রীমন্ত। এই ছবিতেই প্রথমবার জুটি বাঁধতে চলেছেন অর্পিতা আর আবির। থাকছেন তনুশ্রী চক্রবর্তী এবং অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়।

আদতে কলকাতারই ছেলে শ্রীমন্ত, কিন্তু কর্মসূত্রে গত ১৫ বছর ধরে মুম্বইয়ের বাসিন্দা।এর আগে শর্ট ফিল্ম পরিচালনা করলেও ফিচার এই প্রথম। ছবিতে ফ্ল্যাশব্যাকের মধ্যে দিয়ে নব্বইয়ের দশককে তুলে ধরা হবে। চারজনের স্কুলের চরিত্রে অভিনয় করবেন আর্য দাশগুপ্ত, পূষণ দাশগুপ্ত, দিয়াশা দাস, তনিকা বসু। অন্যান্য চরিত্রে পরাণ বন্দ্যোপাধ্যায়, রবি সাউ, অরিত্র দত্ত বণিক, রাজর্ষি নাগ। সুরকার রণজয় ভট্টাচার্য। উত্তরবঙ্গে শ্যুটিং হয়েছে ছবিটির।

সম্প্রতি ছবিটিতে তাঁর লুক প্রকাশ করতে একটি ছবি পোস্ট করেছেন অভিনেত্রী তনুশ্রী চক্রবর্তী। ছবি মুক্তির সঠিক তারিখ এখনও স্পষ্ট না হলেও, খুব শিঘ্রই যে পরিচালক এ ব্যপারে উদ্যোগী হবেন, অভিনেত্রীর এই পোস্ট থেকে তা আন্দাজ করা যায়।

ছোটোদের চানঘর

সন্তানের হাসিখুশি, প্রাণচঞ্চল চেহারা দেখতে সব বাবা-মা-ই চায়। ওদের ভালো থাকার জন্যই তো বাবা-মা-দের হাড়ভাঙা খাটুনি, এত আয়োজন, মনের মতো করে সাজিয়ে তোলা ওদের ঘর। বাথরুমই বা বাদ যায় কেন? কীভাবে সাজাবেন ওদের স্নানের জায়গা, কেমন হবে দেয়ালের রং? সুরক্ষা আর সৌন্দর্যের মিশেলে আপনার বাচ্চার বাথরুমে দারুণ লুক এনে দিতে, জেনে নিন কয়েকটা টিপ্স।

ওয়াশরুম সাজান ওদের মনের মতো করে

যখন আপনার সন্তানের বয়স খুব কম, তখন স্বাভাবিক ভাবেই আপনার প্রচেষ্টা হবে ওর জীবনকে স্বচ্ছন্দ করে তোলার। এমন একটা জীবন, যাতে ওর কোনও কিছুতেই অসুবিধা না হয়। তাই ওদের টয়লেট সাজিয়ে দিন ওদের কমফর্ট অনুযায়ী। ছোটো গিজার, হাতের নাগালে থাকা সিংক, ছোটো এবং কমপ্যাক্ট কমোড– এই সবই টয়লেটে দেবে শিশুসুলভ সারল্য আর সৌন্দর্যের ছোঁয়া। যদিও এটা মনে রাখা খুবই জরুরি যে, আপনার বাচ্চারা কিন্তু খুব দ্রুত বেড়ে উঠছে। ফলে নতুন করে বাথরুম সাজানোর প্রয়োজন পড়তে পারে খুব শিগগিরি।

আপনার কাছে আর একটি অপশন হল, বাথরুম বা ওয়াশরুম সাজাতে ওদের পছন্দকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া। ডেকরেশনে ব্যবহার করুন বিভিন্ন উজ্জ্বল রং, কার্টুন ক্যারেকটারের ছবি বা শো-পিস। অদ্ভুত ডিজাইন, দেয়ালের এখানে ডট বা ওখানে ছিটিয়ে দেওয়া রঙের বাহার ফাটাফাটি লুক এনে দেবে। আপনার বাচ্চাও থাকবে খুশি।

রং বাছার সময়ে

বাচ্চার বাথরুম সাজিয়ে দিতে সবথেকে তাড়াতাড়ি আপনি যে- উপায়টা অবলম্বন করতে পারেন তা হল, দেয়ালের রং পরিবর্তন। বাচ্চাদের পছন্দ কিন্তু অনেক সময়েই বেশ অন্যরকম হয়। সবসময় যে ওর সাদা বা বিভিন্ন হালকা শেড পছন্দ হবে, এমনটা নয়। বালিগঞ্জের রুমিতার চার বছরের ছোটো ছেলের বাথরুমের জন্য পছন্দের রং হল বাবলগাম পিংক। যদি পেন্টশপ-এ ওর ঠিক পছন্দের রং না পান, তবে পরিবর্তে ওর যে- রং পছন্দ, সেই রং-ই নিন।

কিন্তু একটা কথা খেয়াল রাখবেন যে, ওদের পছন্দ কিন্তু খুব দ্রুত পরিবর্তিত হয়। ফলে রং-এর পেছনে বেশি অর্থ ব্যয় করবেন না। হয়তো দেখলেন, প্রতিবছরেই বাথরুমের দেয়ালের রং পরিবর্তন করতে হচ্ছে। অবশ্য নন-টক্সিক রং কিনবেন যা বাচ্চার স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকারক হবে না।

বাথরুম অ্যাক্সেসরিজ

স্নান করার তোয়ালে, টুথব্রাশ, টুথব্রাশ হোল্ডার, সাবান রাখার ডিসপেনসার, বাকেট, মাগ ইত্যাদি বাচ্চারা নিজেরা পছন্দ করে কিনতে ভালোবাসে। ওদের শপিং করতে সঙ্গে নিয়ে যান, আপনার বাজেটের কথাও ওদের বলুন। ওরা মনের আনন্দে যা কিনতে চাইবে, তাই কিনতে দিন।

While decorating kid's washroom

দেয়ালে নতুনত্ব

সন্তানের বাথরুমের দেয়ালে নতুনত্ব আনতে বিভিন্ন ধরনের স্টিকার লাগানো যেতেই পারে। বাজারে রকমারি স্টিকারের সম্ভার রয়েছে। বাঘ, সিংহ, বাঁদর, জিরাফের কার্টুন-স্টিকার অথবা রং-বেরঙের ফ্লোরাল ডিজাইন দেয়ালে নিমেষে নতুনত্বের ছোঁয়া এনে দেবে।

দেয়াল সাজাতে আপনি নির্দিষ্ট কোনও থিম-ও বেছে নিতে পারেন। সেই থিম অনুযায়ী সাজিয়ে তুলতে পারেন আপনার বাচ্চার বাথরুম-এর দেয়াল। খেয়াল রাখবেন স্টিকারগুলি যাতে এমন হয় যে, দেয়ালে উজ্জ্বলতা আসে। বিক্রেতাদের মধ্যে করা একটি সমীক্ষা থেকে জানা গেছে যে, মেয়েরা সাধারণত ডিজনি প্রিন্সেস, গোলাপি বা ল্যাভেন্ডার রঙের জিনিস, ফুলের মোটিফ পছন্দ করে। বাচ্চা ছেলেরা খেলনা গাড়ি, কার্টুন চরিত্র, পশু-পাখির ছবি ইত্যাদি বেশি পছন্দ করে। যদি আপনার শিশুদের মধ্যে একজন ছেলে এবং অপরজন মেয়ে হয়, তাহলে কিছু কমন থিম বেছে নিতে পারেন। যেমন, জঙ্গল, চিড়িয়াখানা, রাতের আকাশ ইত্যাদি।

সুরক্ষায় নজর দিন

ওয়াশরুম-এর দেয়াল যত সুন্দর করেই সাজান না কেন, সুরক্ষার সঙ্গে কিন্তু কখনও কমপ্রোমাইজ করবেন না। লক্ষ্য রাখুন, বাথরুম-এর মেঝে যেন পিছল না হয়। ইলেকট্রিক ওয়্যারিং, শকপ্রুফ হওয়া বাঞ্ছনীয়। দরজার লক যেন কখনও জ্যাম না হয় সেদিকেও খেয়াল রাখুন। এমন সব আসবাবপত্রই ওয়াশরুম-এর ভিতরে রাখুন, যাদের কোণ খুব ধারালো বা শার্প না হয়।

বেঁচে থাকার স্বাদ

সবুজ ধানখেতের বুকে চরে বেড়াচ্ছিল দামাল হাওয়া। পাকা রাস্তা ছেড়ে মোরাম রাস্তা ধরতেই জুড়িযে গেল দুচোখ। সরু ফিতের মতো লালমাটির রাস্তার দুধারে ঘন সবুজের লুটোপুটি। রাজা বাইক চালাতে চালাতে গুনিনের গুণকীর্তন করতে করতে যাচ্ছিল। আর আমি হাঁ-হুঁ করে যাচ্ছিলাম। আসলে আমি অর্ধেক কথা শুনতে পাচ্ছিলাম না। বাকি যা কানে আসছিল তা অন্য কান দিয়ে বের করে দিচ্ছিলাম। সত্যি বলতে কী আমি মণির কথা ভাবছিলাম। ভাবছিলাম তাড়াতাড়ি মুক্তির কথা।

আমার তুকতাকে কোনও দিনই বিশ্বাস ছিল না। কিন্তু মানুষ যখন সমস্যার

অকূল-পাথারে ভাসে, তখন খড়কুটোও আঁকড়ে ধরতে চায়। আমিও ধরেছিলাম।

সুরভি আমার জীবনে আসার পর ঝগড়া-ঝাঁটি, অশান্তি কম হল না, বিগত দুবছরে। কিন্তু মণিদীপা ছেড়ে যাবার কথা উচ্চারণ করে না একটি বারও। বিয়ে প্রথম কয়েক বছরে, যখন মণির সাথে আঠা আঠা ভাব, রোজ বার-দুতিনেক দুটো শরীরের গভীর সংযোগ–তখন ওকে বলতে শুনতাম, আমার জিনিসে কেউ যেন কোনও দিন ভাগ না বসায়… যদি দেখেছি কারও সাথে কিছু করেছ, সটান বাপের বাড়ি।

বিয়ের নবছর পর মণিদীপা আর বাপের বাড়ি যাবার নাম উচ্চারণ করে না। বলে, কত অত্যাচার করতে পারবে করো। সব সহ্য করেও পড়ে থাকব। সময় সময় অসহ্য লাগে ওর এই সতীপনা। দুএকবার চড় থাপ্পড়ও মেরেছি। আর একবার মাটিতে ফেলে বুকে… যাক, সেবার ওর দোষ ছিল খুব!

অত্যাচার অত্যাচার কথাটা ফলাও করে বলার মতো কী আছে? পাবলিকে খুব খায় বলে? আমি ওকে কী অত্যাচার করেছি? খাওয়া দিই, পরা দিই, দামি মোবাইল, মান্থলি নেট প্যাক, বিউটি পার্লার খরচা… আর কী চাই ওর মতো একটা গড়পড়তা মেয়ের? বলে নাকি অবহেলা করছি, আর সেটাই অত্যাচার! নাও বোঝো! মেয়েরা কবে আর বুঝবে, পুরুষমানুষ মাত্রই জিনগত ভাবে বহুগামী।

অফিসের শৈবাল প্রতি সপ্তাহে মেয়ে চেঞ্জ করে। কই ওর বউ তো অশান্তি করে না। মনোরমের মতো ক্যাসানোভাও দিব্যি বউ নিয়ে সংসার করছে। সেদিন ব্যালকনিতে বসে মণি কাকে যেন ফোনে শোনাচ্ছিল অবহেলা নামক অত্যাচারের কথা। ঘুম ভেঙে ওঠার পর সেই শুনে আমার মটকা একটু গরম হয়ে গেছিল। টুসি ছুটে এসেছিল পাশের ঘর থেকে।

বাবা, বাবা, বাবা গো… কাঁদছিল টুসি। ততক্ষণে টেবিলে রাখা কাচের গেলাস মেঝেয় পড়ে ভেঙে গেছে। আর তার উপর মণির কপাল লেগে কেটে গিয়ে রক্ত পড়ছে। ও ছুটে ডেকে এনেছিল একতলার ডক্টর আংকলকে। বসার ঘরের সোফায় বসে মণিকে দেখছিল ডক্টর দাশগুপ্ত। মণি বলল, বাথরুমে পা স্লিপ করে পড়ে দেয়ালের পেরেকে ঘষা খেয়েছে কপালে। সত্তরোর্ধ ডাক্তারবাবু কী বুঝেছিল কে জানে!

আমি অবশ্য সেই হঠাত্ মাথা গরমের জন্য পরে সরি বলেছি। তবু মনটা বেশ কদিন খুঁত খুঁত করেছে। মনে পড়ত বাইকের স্পিড ঝাঁ করে সত্তরে তুলে দিয়ে ঝাড়খন্ডের ফাঁকা রাস্তায় ঘুরতাম। মণি ভয় পেয়ে সিঁটিয়ে যেত। এমন ভাবে জড়িয়ে ধরত মনে হতো ওর শরীরটা বুঝি আমার শরীরে মিশে গেছে। সেদিনের অপরাধবোধ থেকে ওদের উইক এন্ডে দিঘা নিয়ে গেছিলাম। বিকেলের বিচে টুসি ছোটাছুটি করছিল। আমরা যেখানে বসেছিলাম, জল বাড়তে বাড়তে এসে পা ছুঁয়ে যাচ্ছিল। মণি হাতের মুঠোয় তুলে নিয়েছিল এক আঁজলা জল। আমাকেও তুলতে বলল। আমিও তুলেছিলাম।

বলো, সমুদ্রের এই জল ছুঁয়ে বলছি তোমাকে আবার আগের মতো ভালোবাসব। আমার দিকে করুণ ভাবে তাকিয়েছিল মণি। ওর হাতের জল আস্তে আস্তে মুঠো গলে পড়ে গেছিল। আর আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলেছিলাম।

এইসব পুরোনো স্মৃতি আমাকে গিলে খেতে আসত রোজ। কী এক বাধো বাধো ঠেকায় বিগত ছ’মাস ধরে ওকে বলতে পারিনি কথাটা। রোজ অফিস থেকে ফেরার সময় ভাবি আজ কায়দা করে কথাটা বলেই ফেলব ওকে। কিন্তু পারি না। সন্ধেবেলায় ও বসে সিরিয়াল দেখে দোতলার ঘরে। আমি অফিস থেকে ফিরি। গাড়ির শব্দ শুনে ও চায়ের জল বসিয়ে দেয় ইন্ডাকশন কুকারে। আমার যখন তখন চা তেষ্টা পায়। আর ওর থাইরয়েডের হাঁটু ব্যথা। রান্নাঘর একতলায়। বারবার ওঠানামা। তাই শুধু চায়ের ব্যবস্থাটুকু মণি উপরেই করেছে। বাইরের পোশাক, বাইরের জুতো এসব একতলায় খুলি। কলঘরে ঢুকে ফ্রেশ হই। তারপর দোতলায় উঠে আমি আমার কম্পিউটার ঘর কাম ইদানীং শোবার ঘরে ঢোকামাত্র চা হাতে এসে হাজির হয় মণি। কাপটা ধরতে গিয়ে হাতখানা যেন ঈষত্ কেঁপে যায়। সেদিন আর কথাটা বলা হয়ে ওঠে না।

আমার সমস্যার কথা একমাত্র রাজাকেই বলেছিলাম। রাজা শুনে গম্ভীর হয়ে গেল। হুম, ডিভোর্স চাস? মুখে বলতে পারছিস না। তাই তো?

হ্যাঁ, তাই। বিয়ের পর যে বলত এই করলে ছেড়ে চলে যাব ওই করলে বাপের বাড়ি চলে যাব… কই এখন তো আর সেসব বলে না।

সেসব কথার মানে এখন তুই আর বুঝবি না, প্রতীক…। রাজা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে।

বরং ঝামেলা ঝগড়া যাই হোক, বলে তুমি কী ভাবছ অত্যাচার করলে আমি বাড়ি ছেড়ে চলে যাব? আর তুমি সুরভিকে নিয়ে নতুন সংসার পাতবে?

তোদের জুটিটা তো ভালোই ছিল রে…

উফ্, রাজাও সেই এক সেন্টু পাবলিকের দলে। ডিভোর্সের কথা ভাবলেই বুকের খাঁচা থেকে বাতাস উড়ে যায়। বাঙালি বস্তাপচা সম্পর্ক নিয়ে পড়ে থাকবে, তবু ডিভোর্সের কথা শুনলে আঁতকে উঠবে। অসহ্য, এই ফোর জি-র যুগে। কোথায় ফরসা, তন্বী, পতৌদির রানির মতো গালে টোল পড়া এমএসসি, ফিজিক্স। আর কোথায় শ্যামলা,বীরভূম-ঝাড়খন্ড সীমানার সামান্য এইচএস। বিয়ে পর এত মুটিয়ে গেছে মণি যে, আর ওর শরীর ঘেঁটে দেখতে কোনও ইচ্ছাই জাগে না। পঁয়তিরিশ পেরোলাম না, এখন থেকেই এই সন্ন্যাস আমার পক্ষে অসহ্য। সেখানে সুরভি বিছানায় আমাকে পাগল করে রাখে। ওকে দেখলেই পৌরুষ জেগে ওঠে। এমনকী জলের স্রোতের মতো ওর হাসির উচ্ছ্বাস ফোনে যখন আছড়ে পড়ে, আমি টের পাই ঘুমন্ত সাপের ফণা তোলা। আমি এখনও অনেকদিন বেঁচে থাকার স্বাদটা পেতে চাই। আমি একথা কাকে কী করে বোঝাব!

রাজা একবার মণিদীপার জন্য দুঃখপ্রকাশ করল। তারপর অবশ্য বন্ধুত্বের খাতিরে আমার সাহায্যের জন্যই এগিয়ে এসেছিল। ওর কথাতেই প্রথম গিয়েছিলাম গুনিনের কাছে। সাঁইথিয়া শহরের কাছেই। তার কথামতো কাজ শুরু করে দিলাম। মণির হার্টের লেফট ভেন্ট্রিকুলার ডায়াস্টলিক কমপ্লায়েন্স স্লো। আমার কথাতেই একসময় ও অর্জুন গাছের ছাল খাওয়া শুরু করেছিল। রোজ রাতে শোবার সময় জলে ভিজিয়ে রাখত, ফ্রিজের উপরে। আমি টুক করে তাতে গুনিনের দেওয়া জড়ি-বুটি অল্প করে ফেলে দিতাম। কথা ছিল, একমাসের মধ্যে এই ঘর ওর কাছে অসহ্য হয়ে উঠবে। আমায় কিছু বলতে হবে না, ও নিজেই আমাকে ছেড়ে পালাবে।

কিন্তু কোথায় কী! সেই ওষুধে দেড়মাস কেটে গেল। ঝগড়াঝাঁটি বাড়ার বদলে ও তো আরও শান্ত হয়ে গেল। আগে চায়ের কাপ দেবার সময় বাড়ি ফিরতে দেরি হবার জন্য নানান প্রশ্ন করত। ইদানীং তাও বন্ধ করে দিয়েছে।

সবই মণি হজম করে নিচ্ছিল। ছেড়ে যাবার কথা মুখেও আনছিল না। অফিসের পর টুর, আউটডোর সার্ভে এসবের নাম করে সুরোর ফরসা নরম বুকের ঘ্রাণ নিয়ে যখন ফিরতাম, তখন রাত বারোটা পেরিয়ে যেত প্রায়দিনই। এসে দেখতাম মণি টুসিকে বুকে জড়িয়ে ধরে অঘোরে ঘুমোচ্ছে। রোজই এক প্রস্থ মনখারাপ আর দুর্বলতা কোথা থেকে যেন চলে আসত। কাজটা আদৌ ঠিক হচ্ছে কিনা এই ভেবে মনটা বড়ো খচখচ করত।

একদিকে মণিদীপা। চাকরির প্রথম পোস্টিং-এ ভালো লেগে যাওয়া রাজগ্রামের সামান্য দর্জির মেয়ে আমার বিয়ে করা বউ। রাস্তা পারাপারের সময় টুসির হাত ধরলেও মনে হয় যেন মণিকে ছুঁয়ে আছি। আর একদিকে সুরভি, আমার বেঁচে থাকার নতুন ঠিকানা। যাকে ছেড়ে বেঁচে থাকা আমার পক্ষে এখন খুব কঠিন।

এদিকে ওষুধে কাজ হল না। ওদিকে আমিও বেশি নিষ্ঠুর হতে পারছি না। টুসির দিকে তাকালে আরও দুর্বল হয়ে পড়ছি। সেই দুর্বলতা আঁচ করে একদিন সুরভি বলে দিল, ওদেরকে যখন ছাড়তে পারছ না, আমাকেই ছেড়ে দাও, বুঝলে? বাড়ি থেকে চাপ দিচ্ছে, বিয়ের জন্য। কতদিন আর ঝুলিয়ে রাখব, বলো? ডিভোর্সি পাত্রর ব্যাপারটা বাড়িতে বুঝিয়ে বলার দায়িত্ব তাও আমি নিয়েছি। না হলে আমি বেরিয়ে আসব, তোমাকে তাও বলেছি। আর কত করব বলো?

ঝরনার জলের মতো হাসির শব্দ নিয়ে সুরো আমার জীবন ছেড়ে অন্য কারও জীবনে চলে যাবে! ভাবতেই মাথা খারাপ হয়ে গেল। অফিস থেকে ফিরেই রাজার উপর চড়াও হলাম। নিরুদ্বিগ্ন রাজা সিগারেটে টান দিতে লাগল। ওর বাড়ির ছাদে বসে।

যেমন চলছে তাই চালা না…

তুই কী ভাবছিস সুরোর মতো একটা এলিজিবল, অফিসের হার্টথ্রব মেয়ে সারাজীবন আমার রক্ষিতা হয়ে রয়ে যাবে?

তাহলে ডিভোর্সের চিঠি দে তোর বউকে। অন্ধকার আকাশে ধোঁয়া ছেড়ে বলল রাজা।

আরে ক্যালাস! তাহলে এসব কেন করছি? আমি বললেও ডিভোর্সে তো রাজি হবে না। কনটেস্ট করবে। দশ বছর ধরে মামলা চলবে। সুরো বুড়ি হবার জন্য অপেক্ষা করবে না!

আমার চাপে রাজা রাজি হল। ও আমার শৈশব-কৈশোর-বযঃসন্ধিক্ষণের সব গোপন কথার বন্ধু। রবিবার আরও বড়ো এক গুনিনের কাছে নিয়ে যাবে বলে কথা দিল। আমি খড়-কুটোর মতো এক গুনিনকে ছেড়ে অন্য গুনিনকে আঁকড়ে ধরলাম।

বাইকে যেতে যেতে রাজা সেই বড়ো গুনিন বাবাজির মাহাত্ম্য শোনাচ্ছিল আমাকে। দুপাশে ধানের খেতের উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া হাওয়ায উড়ে যাচ্ছিল সেসব কথা।

থাম রাজা, বাইক থামা…

আমার কথা শুনে রাজা স্পিড স্লো করে, থামায় না। জিজ্ঞেস করে, কেন? মাইনাস…

না, চল। ফিরে চল। আর যাব না গুনিনের কাছে।

রাজা একটা কালভার্টের উপর গাড়ি দাঁড় করিয়ে দেয়। আমার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে বলে, কী ভাবলি আবার?

উকিল চটজলদি সমাধানের যেসব সম্ভাবনার কথা বলেছিল, সব বলি রাজাকে, এক এক করে। শেষে বলি আমার মাথায় ঝট করে খেলে যাওয়া আইডিয়াটার কথা। কোথায় লাগে গুনিন বাবাজি!

বেশ কিছু টাকা খরচ করতে হল। অবশ্য খরচ করতে তো আমি প্রথম থেকেই রাজি ছিলাম। আমি তো ওদের দুজনকে এমনি ছেড়ে দিতে চাইনি। খোরপোশ, অর্থাত্ মা-মেয়ে ভরণ-পোষণ, টুসির পড়াশোনার খরচ আমি তো দিতে রাজিই ছিলাম। তাই পিওনের পিছনে সামান্য খরচ গায়ে লাগল না।

কোর্টের পরপর তিনটে চিঠিই গেল মণির ভোটার কার্ডে থাকা বাপের বাড়ির ঠিকানায়। ওর হাফ-ঝাড়খন্ডি দর্জি বাবা রিসিভ করে নিল। বদলে পেল সাদা কাগজ ভর্তি বাদামি খাম। হয়তো ভাবল কেউ ইয়ার্কি করেছে…

কিন্তু আমার আর ইযার্কি করার মতো সময় ছিল না। চিঠি পেয়ে বিবাদী হাজির না হওয়ায় যে-কোনও একটা সংবাদপত্রে বিজ্ঞপ্তি। আদালতের নির্দেশ, দিয়ে দিলাম। অজস্র খবরের পেটের ভিতর, খুদে হরফে, কোথায় সবার অলক্ষ্যে পড়ে রইল, বিবাদী শ্রীমতী মণিদীপা মন্ডল, আপনি এই বিজ্ঞপ্তি জারির তিরিশ দিনের মধ্যে… নতুবা আদালত একতরফা…

তিন মাস পর বেশ নির্বিঘ্নেই হয়ে গেল রায়। এত তাড়াতাড়ি হবে, ভাবিইনি। আজ আমি মুক্ত। এই কয়েক মাসের মধ্যে কিস্তিতে একটা রেডি ফ্ল্যাট কিনে নিয়েছি আমরা। আমাদের ঘর তৈরি। সাজানো ঘরে আমরা আজই উঠে যাব। সাত বছরের সন্তান থাকা ডিভোর্সি ছেলের সাথে বিয়েতে মত দেয়নি বাবা-মা। তাই আজই বেরিয়ে আসবে সুরভি। তারপর শুভ দিনক্ষণ দেখে রেজিস্ট্রি।

এবারের ফ্ল্যাটটা বেশ নির্জন। যে-গেস্টহাউসটায় আমরা এতদিন যেতাম, তার দরজার কাছের ব্যালকনিতে বসে পুট পুট করে মোবাইল ঘাঁটত বয়গুলো। খাটটা ছিল সেকেলে, ক্যাঁচকেঁচে, আওয়াজ হতো খুব, বিশেষ করে চরম মুহূর্তে। সুরো তো সেসময় মোটেই দামাল হতে দিত না। আর পুরুষমাত্রে সবাই জানে ওই সময়ে সুখটুকুই সব। ধীর লয়ে মানে পুরো আনন্দই মাটি। আজ থেকে আর ওর বাধা মানব না…

আমি কোর্ট থেকে নতুন ঘরে চলে এসেছি। সুরো অফিস করে কিছু রান্নার জিনিস কিনে নিয়ে ঢুকবে। নির্জন ফ্ল্যাটের ঘরে আজ সুরোর শরীরের প্রতিটি তারে নতুন তান বাজাব আমি। গ্যারান্টি ও আজ পাগল হয়ে যাবে। আজ আর উদ্দামতায় কোনও বাধা নয়।

কলিং বেল এর শব্দ যেন একরাশ আনন্দ নিয়ে বেজে উঠল আমার শরীরের প্রতিটা কণায়। কোশে কোশে। খুব উত্তেজিত বোধ করলাম আমি। দরজা খুলে দিতেই সুরো ঢুকে এল ঘরের ভিতর। চুমুতে চুমুতে আমি বন্যা বইয়ে দিলাম। সোফার উপর আমার কোলেই শুযে পড়ল ও।

গাড়িটা কবে দেবে খোঁজ নিলে?

নতুন মডেল তো, বম্বে থেকে আনাবে। পাঁচ দিনের মধ্যে ডেলিভারি। ইনস্টলমেন্ট এর ডিউরেশনটা বাড়িযে নিয়েছি।

ক’দিন মেট্রোয় অফিস যেতে হবে। কারণ গাড়িটা আমারই টাকায় কেনা যদিও, তবু মণির নামে ছিল বলে সুরো ও গাড়ি রাখতে রাজি হল না। আট বছরের পুরোনো হয়ে গেছে, শরীরের কয়েক জায়গায় সুরোর ড্রাইভিং শেখার চিহ্ন। সারাতেও প্রতিমাসে ভালোই খরচ হচ্ছিল। দোনামোনা করে গাড়িটা ছেড়েই দিলাম, মণিই চাপুক।

কোর্ট থেকে আজ বেশ দূরে গাড়ি রেখেছিলাম। সেখান থেকে বেরিয়ে রেল স্টেশনে নিয়ে গিয়ে ড্রাইভারকে ছেড়ে দিয়েছি। অফিস টুর থাকলে যেমন করি। সেরকম কিছু বুঝে বাপ্পা চলে গেল। আমি একটা এসি ট্যাক্সি নিয়ে সোজা নতুন ঘরে।

কোলে শোওয়া সুরভিকে দেখে আমার আর তর সইছিল না। নিজের ঘরে ওকে জড়িয়ে ধরে পিষে দেবার ইচ্ছা, সারারাত নগ্ন হয়ে জড়িযে থাকার রোমাঞ্চ শরীরকে অস্থির করে দিতে লাগল।

আই এম অলরেডি ইন দ্য মুড অব মিসচিফ। ওর ক্লিভেজে নাক ঠেকিয়ে বললাম আমি।

নো-ও-প। নট নাউ… কপট অনাগ্রহে সুরো ঠেলে সরিয়ে দিল আমাকে, ফ্রেশ হই। চা খাই। তারপর যা খুশি কোরো…

আমাকে অপেক্ষায় রেখে বাথরুমে চলে গেল সুরো। জল পড়তে লাগল, যেন অনন্তকাল ধরে। শেষে সুরভি হাত মুখ মুছতে মুছতে বেরিয়ে এল। তারপর ঢুকে গেল রান্নাঘরে। আমাকে অপেক্ষায় রেখে গ্যাসের উপর চায়ের জল ফুটতে লাগল, যেন অনন্তকাল ধরে।

হঠাত্ আমার রোমাঞ্চ কোথায় যেন উড়ে গেল। একটা প্রশ্ন একরাশ ভয় নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল আমার মনের ভিতরে। আমি ঠেকাতে পারলাম না। কিছুতেই না।

এই বাপ্পার পৌঁছাবার সময় হল ঘরে। গ্যারেজের গেট খুলে ওর গাড়ি ঢোকাবার শব্দ হচ্ছে নিশ্চয়। আর সিরিয়ালের শাস-বহুর ঝগড়া ভেদ করে মণি আজও শুনে ফেলেছে সে আওয়াজ, নিশ্চিত। আজও কি মণি চায়ের জল বসাচ্ছে গাড়ির শব্দ শুনেই…? আমাকে না দেখেই কি চায়ের কাপ হাতে ঢুকে আসছে আমার বেডরুমে…??

জানি না।

আমি কিচ্ছু জানি না, সত্যি জানি না…৷

শীতের ফ্যাশন

শাড়ির সঙ্গে জ্যাকেটের ফ্যাশন এখন ভীষণ ভাবে ইন। তাই শাড়ি পরলেই যে আপনি আউটডেটেড, তা একদমই ভাববেন না। শাড়ির আবেদন চিরন্তন, ফ্যাশনে সবসময়ই ট্রেন্ডিং। শুধু স্টাইলাইজেশনের গুণে শাড়ি হয়ে উঠতে পারে আপনার ফ্যাশন স্টেটমেন্ট।

সুতির শাড়ির ফ্যাশন এখন শীর্ষে। সরু জরি পাড় একরঙা শাড়ির সঙ্গে পরুন একই রঙের লম্বা ঝুলওয়ালা শ্রাগ বা জ্যাকেট। দারুণ স্টাইলিশ দেখাবে। আপনি চাইলে সিল্কের প্রিন্টেড শাড়ির সঙ্গে পরতে পারেন আপনার পছন্দের খাদি সিল্কের শার্ট। সুতির শাড়ির সঙ্গে সুতির টপও অনায়াসে পরা যায়।

হ্যান্ডলুমের শাড়ি গত দুবছর ধরে খুবই ফ্যাশনেবল হয়ে উঠেছে। শীতে এই শাড়ির সঙ্গে পরতে পারেন ফ্লোরাল প্রিন্টেড সুতির জ্যাকেট। কলমকারি কাজ বা কাথিয়াওয়াড়ি কাজের জ্যাকেটেও বেশ ট্র‌্যাডিশনাল লুক আসবে।

আর আপনি যদি আপাদমস্তক ফ্যাশন আইকন হয়ে উঠতে চান তবে আপনার পরিধানের ক্রেপ বা লিনেন শাড়ির সঙ্গে, দুর্দান্ত পেয়ারিং করতে পারেন ডেনিম জ্যাকেট-এর। ডেনিমের ওভারসাইজড শার্ট-ও বিকল্প হতে পারে, শাড়ির উপরে ক্যাজুয়ালি পরার জন্য। পছন্দ আপনার। ক্যারি করুন কনফিডেন্টলি।

এমন শীত পোশাক বাছুন যা সহজেই ব্যাগে নিয়ে যাওয়া সম্ভব। স্টোল ব্যবহার করলে দোপাট্টার মতো করে নিতে পারেন দিনে। রাতে সেটাই চাদরের মতো করে জড়িয়ে নেবেন। চেরা উল, সুতি, বেছে নিন পছন্দ মতো। টুকটাক অনুষ্ঠান আবার শুরু হয়েছে। সে রকম কোথাও যাওয়ার থাকলে কাঁথা, গুজরাটি বা কাশ্মীরী কাজ করা স্টোল বেছে নিতে পারেন।

বেশি শীতে কিন্তু সোয়েটারের মতো আরামদায়ক আর কিছু নেই। এখন একটু ওভারসাইজড মোটা উলের সোয়াটার ফ্যাশনে ‘ইন’। সেরকম কিছু বেছে নিতে পারেন বেশি শীতের জন্য। শালের আবেদন কিন্তু চিরন্তন। আর শাল বললে পশমিনার কথাই সবার আগে মনে আসে। কিন্তু আসল পশমিনা কেনা মুখের কথা নয়। বেছে নিতে পারেন পশমিনার মতো কোনও ফ্যাব্রিক।

শাড়ির সঙ্গে হাইনেক, ফুলস্লিভড ব্লাউজ বা সুতির জ্যাকেট ঠান্ডাও যেমন আটকাবে, তেমনি দেখতেও বেশ সুন্দর লাগবে।  জ্যাকেট পছন্দ করলে, অল্প শীতের জন্য কিন্তু সুতি বা ডেনিমের জ্যাকেটই ভালো। একটু ইন্ডো-ওয়েস্টার্ন স্টাইল পছন্দ হলে এমব্রয়ডারি করা বা কাচ বসানো জ্যাকেটও বাছতে পারেন।

স্টাইলিশ স্লিভলেস জ্যাকেট সহজেই পেয়ে যাবেন বিভিন্ন অনলাইন সাইটে। নিউ মার্কেট আর গড়িয়াহাটও দেখে নিতে পারেন। সাধ্যের মধ্যে স্টাইলিশ শীত পোশাক মিলবে। আর মলের বিদেশি দোকানগুলো তো থাকলই। নানা অকেশনে বিশেষ ছাড়ও দেয় মলের দোকানগুলি৷ একটু বেছে কিনতে পারলেই, এই শীতেও পেতে পারেন স্টাইলিশ ওয়ার্ডরোব৷

হার-জিত

রাত প্রায় বারোটা বাজে। রোজকার মতো প্রিয়া বইখাতা খুলে পড়াশোনায় ব্যস্ত। প্রিয়ার বাবা, সোমনাথ দরজায় এসে দাঁড়ালেন। ঘরে উঁকি মেরে জিজ্ঞেস করলেন, এখনও পড়ছিস?

প্রিয়া না তাকিয়ে জবাব দিল, যা বলতে এসেছ বলে চলে যাও।

প্রিয়া জানত এত রাতে বাবা শুধু এখনও পড়ছিস, জিজ্ঞেস করতে ওর ঘরে আসেননি। অন্য কোনও কারণ আছে। কথা বলার আগে একটা ভূমিকা করা, প্রিয়ার একেবারে অপছন্দের। ভিতরে ভিতরে বিরক্ত হল সে।

সোমনাথ দরজা থেকে মুখ বাড়িয়ে মেয়ের উদ্দেশ্যে বললেন, এবার ওকে ক্ষমা করে দে প্রিয়া…এমনিতেই ও আমাদের ছেড়ে চলে যাবে।

ক্ষমা, কখনও না, আমি ওকে কোনও দিন ক্ষমা করতে পারব না, অনেক কষ্টে প্রিয়া নিজের রাগ সংযত করে।

কিন্তু প্রিয়া ও তোর মা…

সোমনাথের কথাগুলো প্রিয়ার ভিতরে ঢুকে সজোরে ওকে ধাক্কা মারে, চেঁচিয়ে ওঠে সে। বাবা ওই মহিলা তোমার বউ হতে পারে কিন্তু আমার মা নয়। আর তাছাড়া মায়ের জায়গায় ওকে আমি কোনও দিনই বসাতে পারব না। কোনও শক্তিই আমাকে দিয়ে এ কাজ করিয়ে নিতে পারবে না।

কিন্তু প্রিয়া…

কথা শেষ হবার আগেই প্রিয়া হাতের বইটা মাটিতে ছুড়ে ফেলে দিল, প্লিজ যাবে এখান থেকে? আমাকে একা ছেড়ে দাও।

মেয়ের রাগ দেখে সোমনাথ চলে গেলেন। প্রিয়া ভিতরে ভিতরে ফুঁসতে লাগল। পনেরোয় পড়েছে প্রিয়া কিন্তু পরিস্থিতি ওকে বয়সের তুলনায় অনেকটাই বড়ো করে তুলেছে। রাগেতে চোখে জল চলে এল তার। হঠাৎই বাবার কথাগুলো তার মনে হল… ও আমাদের ছেড়ে চলেই যাবে। সঙ্গে সঙ্গে মনটা খুশিতে ভরে উঠল তার।

বাবার কথার সহজ মানেটা করে ফেলল প্রিয়া। তার মানে বাবার সঙ্গে ওই মহিলার ডিভোর্স হয়ে যাচ্ছে। সেই জন্যই কি বাবার এত মন খারাপ? বাবার থেকে মনটা সরিয়ে নিজের মনের মধ্যে ডুব দিল প্রিয়া। এতটা খুশি সে অনেকদিন বোধ করেনি।

পরের দিন স্কুলে গিয়ে বন্ধুদের ক্যান্টিনে নিয়ে গেল প্রিয়া। আজ ট্রিট আমার তরফ থেকে।

কেন রে, হঠাৎ এত খুশির কী হল? বন্ধুদের মধ্যে একজন জিজ্ঞেস করল।

ফাইনালি… ফাইনালি অ্যান্ড ফাইনালি আমার বাবার আর মণিকার ডিভোর্স হচ্ছে। মণিকা আমাদের বাড়ি ছেড়ে কিছুদিনের মধ্যেই চলে যাবে, উৎফুল্ল দেখাচ্ছিল প্রিয়াকে।

সত্যি করেই মণিকাকে কখনও-ই প্রিয়া নিজের মায়ের আসনে বসাতে পারেনি। তাই মা বলা দূরে থাক বরাবরই নাম ধরেই ডেকে এসেছে। সোমনাথ মেয়েকে অনেক বোঝাবার চেষ্টা করেছেন কিন্তু বাবার একটা কথাও কানে তোলেনি প্রিয়া।

চিন্তা ভঙ্গ হল রিয়ার ডাকে, এই কী ভাবছিস বল তো? আচ্ছা, তোর বাবা আর সৎমায়ের মধ্যে খুব ঝগড়া হয়?

না তো!

বলতে বলতেই প্রিয়া আবার অতীতের দরজায় এসে দাঁড়াল। মনে পড়ে যখন ছোটো ছিল, মা আর বাবার মধ্যে খুব ঝগড়া হতো। ওদের ঝগড়া দেখে প্রিয়া কাঁদতে থাকত। প্রিয়াকে কাঁদতে দেখে ঝগড়া ক্ষণকালের জন্য থেমে গেলেও, আবার শুরু হতো। ওদের ঝগড়ায বারবার প্রিয়ার নামটাও উঠে আসত। দুজনের একই অভিযোগ, অপরজনের জন্য নাকি প্রিয়ার জীবনটা নষ্ট হতে চলেছে। প্রিয়া চুপ করে থাকত কারণ মা-বাবার মধ্যে কাউকেই আলাদা করে বেছে নেওয়া তার পক্ষে সম্ভব ছিল না।

কখনও ঘুম ভেঙে গেলেও মৃতের মতো বিছানায় পড়ে থাকত। সে খুব ভালো ভাবে জানত, তাকে কাঁদতে দেখলে মা আর বাবা একে অপরকে দোষারোপ শুরু করবে। ক্রমশ পরিস্থিতি এতটাই খারাপ হতে আরম্ভ করল যে, মা-বাবা প্রিয়াকে আলাদা ঘরে শোওয়ার ব্যবস্থা করে দিল।

দুর্ভাগ্যের বিষয, সেখানেও প্রিয়া স্বস্তি পেত না। ওদের ঝগড়ার আওয়াজ প্রিয়ার ঘর পর্যন্ত চলে আসত। বালিশ দিয়ে কান চেপে ধরলেও লাভ হতো না। মনে মনে কামনা করত, সব যেন ঠিক হয়ে যায়। কিন্তু তার মনের আশা কখনও পূরণ হয়নি।

আজও ওই দিনটা প্রিয়া ভুলতে পারে না। ছয় বছর বয়স হবে তখন তার। মা তাকে একটা গোলাপি রঙের ফ্রক পরিয়ে খুব আদর করছিলেন। চোখের জলে ভেসে যাচ্ছিল তাঁর চোখ-মুখ। কাঁদতে কাঁদতেই প্রিয়াকে কোলে বসিযে বললেন, প্রিয়া আমি কেস হেরে গেছি। তোমার বাবা তোমার কাস্টডি পেয়েছেন। আমাকে চলে যেতে হবে। বড়ো হও, আমি তখন যেমন করে হোক, আমার কাছে তোমাকে নিয়ে যাব।

ব্যস, ওর মা বাড়ি ছেড়ে চলে গেলেন। প্রিয়া বাবার সঙ্গে রয়ে গেল। প্রথম দুবছর বাবা মাসে একবার করে হলেও মায়ের সঙ্গে দেখা করাতে নিয়ে যেতেন। কিন্তু ধীরে ধীরে সেটাও বন্ধ হয়ে গেল। মা, অবশ্য মাঝেমধ্যে প্রিয়ার সঙ্গে ফোনে কথা বলতেন আর কাঁদতেন। মায়ের কান্না প্রিয়ার কোমল মনটাকে ভেঙে চুরমার করে দিত। ফলে ইমোশনাল সাপোর্ট পেতে প্রিয়া নিজের বাবার উপর বেশি করে নির্ভরশীল হয়ে পড়ল।

 

সেবার প্রিয়ার চতুর্থতম জন্মদিন পালিত হচ্ছিল। বাড়িতেই সোমনাথ সব ব্যবস্থা করেছিলেন ক্যাটেরার দিয়ে। অতিথিরা সকলেই প্রায় উপস্থিত ছিল। মণিকাকে প্রিয়া সেই প্রথম দ্যাখে। লক্ষ্য করে, বাবা একটু বেশিই হেসে হেসে কথা বলছেন মহিলাটির সঙ্গে। মহিলাটির সঙ্গে বাবাকে এতটা কথা বলতে দেখে, প্রথম দিনেই মণিকার প্রতি মনটা বিতৃষ্ণায় ভরে যায় প্রিয়ার। অথচ মণিকার ছেলে অয়নের সঙ্গে ভালো বন্ধুত্ব হয়ে যায় তার।

এর পর থেকে প্রায়দিনই মণিকা চলে আসত ওদের বাড়ি। যে সময়টা সোমনাথ মেয়ের সঙ্গে কাটাতেন, সেই সময়টার দখল নিল মণিকা। বাবাকে ওই মহিলার সঙ্গে দেখে প্রিয়ার মনের ভিতর আগুন জ্বলে উঠত। ওর খালি মনে হতো, বাবার পাশে বসার অধিকার শুধু তার আর মায়ের আছে। সেই অধিকার আর কেউ পেতে পারে না।

নানারকম ফন্দি আঁটত সে, কী করে মণিকাকে বাবার থেকে দূরে রাখা যায়। কিন্তু ওদের প্রেমের গভীরতা প্রিয়ার মতো ওইটুকু মেয়ে ফন্দিকে কোথায় ভাসিয়ে নিয়ে চলে যেত। কথাতেই আছে প্রেম অন্ধ। প্রিয়ার আজও মনে হয়, মণিকাকে বিয়ে করার সময় একবারের জন্যও বাবা তার কথা ভাবেননি।

বিয়ের পর মণিকার সঙ্গে ওর ছেলে অয়নও প্রিয়াদের বাড়িতেই থাকতে আরম্ভ করল। অয়নকে ছোটো ভাই হিসেবে স্বীকার করে নিলেও মণিকাকে সে মন থেকে ক্ষমা করতে পারল না। আর না তো মা হিসেবে মেনে নিল।

প্রিয়ার মনে পড়ল বিয়ের পর মণিকা যখন প্রথমবার ওদের বাড়িতে পা রাখল, প্রিয়া ঘরের এক কোণে চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিল, দুচোখে শুধু ঘৃণা নিয়ে ।মণিকা কিন্তু আদর করে ওকে কাছে টেনে নিয়েছিল। মাথায় হাত বুলোতে বুলোতে বলেছিল, প্রিয়া আমাদের জীবনটা একটা নদীর মতো। নদীর স্রোত কখনও পাথর ভেঙে নিজের রাস্তা তৈরি করে নেয় কখনও বা পাহাড় কেটে। আবার কখনও কাউকে আঘাত না করেই চুপচাপ নিজের গতিপথ বদলে নেয়। এর জন্য আমরা নদীকে দোষ দিতে পারি না। আমিও অনেকটা ওই নদীর মতোই। হঠাৎ তোমার জীবনে ঢুকে পড়েছি। আমি জানি তুমি আমাকে অপছন্দ করো। পারলে আমাকে ক্ষমা করে দিও। আমরা এখন একটাই পরিবার। আমি চেষ্টা করব পরিবারটাকে যেন ভালো রাখতে পারি।

 

প্রিয়া, এই প্রিয়া কী অতশত ভাবছিস? রিয়ার ডাকে সংবিৎ ফিরল প্রিয়ার। বন্ধুদের সঙ্গে গল্পে আবার মেতে উঠল সে।

পরের চার-পাঁচদিন খুব আনন্দে কাটল প্রিয়ার। গান শোনা, আড্ডা মারা, বন্ধুদের সঙ্গে হইহই করে কাটিয়ে দিল দিনগুলো। এই চার-পাঁচ দিনই মণিকা বা অয়ন কারওরই মুখোমুখি হতে হল না তাকে।

সপ্তাহ শেষে স্কুল ছুটি থাকায় বাড়িতে ছিল প্রিয়া। ঘুম থেকে উঠতে দেরিই হয়েছিল  উঠে বাইরের ঘরে আসতেই দেখল অয়ন তৈরি হয়ে বেরোচ্ছে। অয়নের কাছেই প্রিয়া জানতে পারল, মণিকা হাসপাতালে ভর্তি। জানার ইচ্ছা না থাকলেও সৌজন্য বজায় রাখতে জিজ্ঞেস করল, কী হয়েছে?

মায়ের লাং ক্যান্সার। টার্মিনাল স্টেজ।

হোয়াট? চেঁচিয়ে উঠল প্রিয়া। এখনই ধরা পড়ল আর এর মধ্যেই টার্মিনাল স্টেজ! কী করে সম্ভব?

প্রিয়ার চোখেমুখে অবিশ্বাসের ছাপ স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠল। তাই দেখে অয়ন বলল, শুরুতে লাং-এই ক্যান্সার ধরা পড়েছিল কিন্তু এখন ব্রেনেও ছড়িয়ে পড়েছে।

একটা শক খেল প্রিয়া। ঘটনার গতিপথ যে এরকম একটা মোড় নিতে পারে, স্বপ্নেও ভাবেনি সে। একটা ছোট্ট অপরাধবোধ গুঁড়ি মেরে যেন তার মনে জায়গা করে নিতে চাইছে। অয়নের একটা হাত নিজের হাতে তুলে নিয়ে প্রিয়া বলল, অয়ন চিন্তা কোরো না, সব ঠিক হয়ে যাবে। বলে নিজের ঘরে ফিরে এল প্রিয়া।

আজ বুঝতে পারছিল, কেন বাবা সেদিন বলেছিলেন মণিকার চলে যাওয়ার কথা। মণিকাকে দেখার জন্য অধীর হয়ে উঠল প্রিয়া। মনে পড়ল এক একদিন এমনও গেছে, মণিকা তার কাছে এসে কত অনুনয়বিনয় করেছে, ওকে ক্ষমা করে দেওয়ার জন্য। কিন্তু প্রিয়াই পাষাণ হয়ে থেকেছে। অবশ্য তাতেও মণিকার দিক থেকে তার যত্নের কোনও কমতি কোনও দিনই হয়নি। মায়ের কর্তব্য মণিকা একনিষ্ঠ ভাবে পালন করে গেছে।

 

আজ মনের সঙ্গে অনেক যুদ্ধ করে প্রিয়া বাবার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। বলল, আমি আজ তোমার সঙ্গে হাসপাতালে যাব মণিকাকে দেখতে। সন্ধেবেলায় হাসপাতালে গিয়ে মণিকার সঙ্গে দেখা হল না। মণিকাকে কাচের ঘরে রাখা হয়েছিল। সেখানে ভিজিটর যাওয়ার অনুমতি ছিল না।

মণিকাকে এভাবে কেন রাখা হয়েছে? প্রিয়া বাবাকে জিজ্ঞেস করল।

কেমো নেওয়ার পর মণিকার শরীর দুর্বল হয়ে পড়ায়, বুকে শুরুতেই সংক্রমণ হয়েছিল। তাই, ওকে আলাদা রাখা হয়েছে। কারণ যাতে আর কোনও রকম সংক্রমণ না হয়।

কাচের ওপারে দাঁড়িয়ে মণিকার শরীরের সঙ্গে লাগানো বিভিন্ন যন্ত্র ও নলগুলোর দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে দেখছিল প্রিয়া। মণিকা বাবার থেকে দূরে চলে যাবে এই স্বপ্নই দেখছিল এতদিন। কিন্তু এভাবে সেটা হোক, তা কখনওই চায়নি প্রিয়া। মণিকাকে মনে মনে সে ঘৃণা করত ঠিকই কিন্তু এতটাও ঘৃণা কখনও করেনি যে, মণিকাকে এই অবস্থায দেখে আনন্দে লাফিয়ে উঠবে।

আজ এইখানে মণিকার ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে থেকে প্রথমবার প্রিয়ার মনে হল একবার যদি সে মণিকার সামনে গিয়ে দাঁড়াবার সুযোগ পেত, তাহলে ওর হাতদুটো নিজের হাতে নিয়ে ওর চোখে চোখ রেখে বলত, মণিকা আমি তোমাকে ক্ষমা করে দিয়েছি। প্রিয়ার চোখের জল বাঁধ মানে না।

বারবার প্রিয়ার মনে হতে থাকে, আজ এত বছর জিতে আসার পর মণিকার কাছে আজ সে সম্পূর্ণ হেরে গেছে। মণিকাকে এত কষ্ট দেওয়ার জন্য অপরাধবোধে ডুবে যায় প্রিয়া। হঠাৎ করে বয়সের থেকে অনেকটাই বড়ো গেছে বলে মন হয় নিজেকে। উপলব্ধি করে, কোনও সম্পর্ক শেষ হওয়ার মূলে সবসময় যে অন্য কোনও নারীর হাত থাকে এই ধারণা ওর সম্পূর্ণ ভুল। ওর মা-বাবার মধ্যে সম্পর্কটা ভাঙারই ছিল। তাহলে কেন ওর সবসময় মনে হয়েছে মণিকাই দোষী? প্রিয়ার নিজের কাছেও এর উত্তর অজানাই।

মণিকাও তো জানত সে প্রিয়ার নিজের মা নয়। তবুও সুখী পরিবার তৈরি করার স্বপ্নে বিভোর হয়ে ছিল। সেই স্বপ্ন সত্যি করার লক্ষ্যে মণিকার দিক থেকে কোনও কমতি কোনও দিনও হয়নি। অথচ ওর সমস্ত চেষ্টা চালানোটাকে ষড়যন্ত্র বলেই মনে হয়েছে প্রিয়ার। আর সে ষড়যন্ত্রকে বানচাল করে দেওয়াকেই নিজের জয় বলে ধরে এসেছে প্রিয়া।

প্রতি বছরই একটু একটু করে বয়স বেড়েছে প্রিয়ার কিন্তু কেন জানি না এই সহজ সত্যটাকে দেখেও না দেখার ভান করে এসেছে। এখন মনে হচ্ছে আর একটু সময় যদি ও হাতে পায়, তাহলে অতীতের ভুলগুলো শুধরে নিতে পারে। কিন্তু জীবন কী তাকে সেই সুযোগ দেবে? মনে মনে অস্থির হয় প্রিয়া।

এক সপ্তাহ কেমো আর রেডিয়েশন চলার জন্য মণিকাকে কাচের ঘরেই রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। শুধু প্রিয়া কেন, কারুরই ওর সঙ্গে দেখা করার অনুমতি ছিল না।

এদিকে মণিকার অবস্থা শুধরোনোর বদলে আরও খারাপ হওয়া শুরু হল। ট্রিটমেন্ট কোনও কাজই করছিল না। রেডিয়েশনের জন্য সারা শরীরে জ্বলুনি অনুভব করছিল মণিকা। বাড়ির সকলে মণিকার জন্য উদ্বেগে দিন কাটাচ্ছিল। শুধু অপেক্ষা, কবে মণিকাকে দেখতে যাওয়ার অনুমতি পাওয়া যাবে। এছাড়া আর কোনও পথও খোলা ছিল না তাদের কাছে।

তাদের আশা অনুযায়ী মণিকাকে ওয়ার্ডে শিফ্ট করা হল না। অবস্থার অবণতি হওয়াতে এবং সোমনাথের বিশেষ চেনাশোনা থাকার কারণে হাসপাতালেই বিশেষ একটা কেবিনে আলাদা করে মণিকাকে রাখার ব্যবস্থা করা হল। চব্বিশ ঘন্টা ডাক্তার আর নার্সেরও ব্যবস্থা হল। সোমনাথ আর অয়ন হাসপাতালেই শিফট করে গেলেন যাতে পালা করে মণিকার দেখাশোনা করতে পারেন।

প্রিয়া কিছুতেই মণিকার সামনাসামনি হওয়ার সাহস জোটাতে পারল না। সে বাড়িতেই থেকে গেল। বাবার কাছ থেকে জানল, আর কিছু দিনের অতিথি মণিকা।

অনেক কষ্ট করে ভয় কাটিয়ে নিজের মনকে তৈরি করল প্রিয়া। হাসপাতালে পৌঁছে দেখল মণিকার দুর্বল শরীরটা বিছানার সঙ্গে মিশে গেছে। চোখ জলে ভরে এল। তার দিকে মণিকার চোখ পড়তেই হাত তুলে কোনও রকমে ওকে কাছে ডাকল মণিকা। মেয়ে আর স্ত্রীকে রেখে সোমনাথ আর অয়ন কেবিনের বাইরে বেরিয়ে এলেন। মণিকা প্রিয়াকে ইশারা করল, তাকে খাটে বসিয়ে দিতে।

প্রিয়া ধীরে ধীরে বেডের হাতল ঘুরিয়ে বসানোর অবস্থায় নিয়ে এল। হাত দিয়ে ধরে থাকল মণিকাকে। মণিকা তাকে জড়িয়ে ধরল। প্রিয়া আর নিজেকে সামলাতে পারল না। কান্নায় ভেঙে পড়ল।

মনের ভিতর চলতে থাকা প্রতিটা সংঘর্ষ প্রিয়া চাইছিল মণিকার সঙ্গে শেযার করতে। কিন্তু হঠাৎ-ই ওর মনে হল মণিকা ওকে খুব জোরে ধরে রয়েছে। একটু চেষ্টা করে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে প্রিয়ার খেযাল হল, মণিকা একদৃষ্টে তার দিকে তাকিয়ে আছে।

মৃত্যু জিনিসটা যে কী, তা এর আগে কোনও দিন প্রিয়া দেখেনি। কিন্তু খারাপ কিছু আশঙ্কা করে প্রিয়া চেঁচিয়ে উঠল, ডক্টর… ডক্টর! ততক্ষণে মণিকা সকলের থেকে বিদায় নিয়েছে।

মণিকার মৃত্যুর পর সারা বাড়িটা যেন প্রিয়াকে গিলতে আসত। মা চলে যাওয়ার পরেও, এতটা একাকিত্ব কখনও বোধ করেনি প্রিয়া। ধীরে ধীরে বুঝতে পারল, শুধু বাড়িটাই নয়, ওর নিজের মনের অনেকটা জুড়েও মণিকা জায়গা দখল করে নিয়েছিল।

আত্মগ্লানিতে পুড়তে লাগল প্রিয়া। ইশ যদি সুযোগ পেত তাহলে মনের কথাটা মণিকাকে বলতে পারত! যেটা শোনার জন্য মণিকা এতটা অধীর হয়ে ছিল। আদৌ কি সে শুনতে পেত? মৃত্যুপথযাত্রীর কাছে সত্যিই কি তার কথাটা কোনও গুরুত্ব পেত? প্রিয়া সবসময় শুনে এসেছে, সময় থেমে থাকে না। তাহলে কেন সে সময় থাকতে থাকতে নিজের মনের কথাটা খুলে বলতে পারল না?

নিজের উপরই ঘৃণা হল প্রিয়ার। অস্থির বোধ করল। নিঃশব্দে বারান্দায় এসে দাঁড়াল। নীল আকাশে সাদা মেঘগুলো ভেলার মতো ভেসে বেড়াচ্ছে। মাথাটা ঘুরছে মনে হল প্রিয়ার। ভিতর থেকে একটাই শব্দ ঠেলে বেরোতে চাইছে, মণিকা… মণিকা। চীৎকার করতে ইচ্ছে করছে কিন্তু কেউ যেন গলাটা চেপে ধরেছে। স্বর বেরোচ্ছে না কিছুতেই প্রিয়ার গলা দিয়ে।আকাশে মেঘের ঘূর্ণায়মান গতিপথের দিকে চেয়ে সমস্ত শক্তি একত্র করে চ্যাঁচাল প্রিয়া, মণিকা প্লিজ… প্লিজ আমাকে ক্ষমা করে দাও।

কিন্তু খুব ভালো করেই জানে প্রিয়া, আজ মণিকা আর কোনও কথাই শুনবে না। আজ যে মণিকারই জয় হয়েছে।

লক্ষ্যহীন যুব সমাজ

বেশ কয়েকমাস আগের ঘনা হলেও, স্মৃতিটা এখনও টাটকা আছে। খবরে প্রকাশিত একটি ঘটনায় জানা গিয়েছিল, ২৫ বছরের এক যুবককে এলোপাতাড়ি ছুরির আঘাতে হত্যা করে পাড়ার দু-তিনটি যুবক। তার অপরাধ সে নাকি মানা করা সত্ত্বেও রোজ বাইক-এ স্টার্ট দিয়ে, ওই যুবকদের শান্তি ভঙ্গ করে।

লকডাউনের আগের অন্য একটি ঘটনায়, একটি মেয়ে তার স্কুলের হস্টেলে আত্মহত্যা করেছিল সহপাঠীদের মানসিক অত্যাচারের শিকার হয়ে।

দুটি ঘটনাই একটা প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়, কোন অন্ধকারে ডুবে যাচ্ছে আমাদের যুব সমাজ?

এদের সামনে না আছে কোনও উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ, না কোনও ভালো চাকরির প্রতিশ্রুতি। অনিশ্চয়তাই কি তাদের ভেতরে এই পশুত্ব তৈরি করছে? অবশ্য পশুরাও কেউ ক্ষতি না করলে প্রত্যাঘাত করে না। কিন্তু এদের লাগামছাড়া ঔদ্ধত্য সমাজের ক্ষতি করছে।

এরাই রাজনৈতিক মদতে একসময় সমাজবিরোধী হয়ে ওঠে। তখন তোলাবাজি থেকে বন্দুকের গুলিতে কাউকে হত্যা করা তাদের কাছে আর কোনও বড়ো ব্যাপার নয়। কারণ হিংস্রতার বীজ বহু আগেই বপন হয়ে গেছে এদের কোমল মনে। উদ্দেশ্যহীন জীবনযাপন, আদর্শহীন ছাত্র রাজনীতি সবই আসলে গুন্ডামি-মাস্তানির পথ প্রশস্ত করে।

এই প্রজন্মের হাতে মোবাইল ছাড়া কিছুই নেই। শিক্ষা বা জ্ঞানের আলোয় উজ্জ্বল হবার জন্য বই দিতে পারিনি আমরা তাদের হাতে। ফলে টিকটক বা সমতুল্য অ্যাপের চটকদারিত্বে ডুবে গেছে এদের জীবনযাপন, চিন্তাশক্তি। যে-সমাজে যুবকরা পিছিয়ে পড়ে, সেই সমাজ আর উন্নতি করতে পারে না এটাই সবচেয়ে দুঃখজনক।

অভাবনীয়

স্বর্ণযুগের জনপ্রিয় বাংলা ছবিগুলি দেখতে খুব পছন্দ করেন কাকলি। তার সেই ভালোলাগা এখন সংক্রামিত হয়েছে বউমা পল্লবীর মধ্যে। সে-ও এখন শাশুড়ির সঙ্গে বসে পুরোনো ছবিগুলি দেখে ল্যাপটপ-এ, ইউটিউব-কে মাধ্যম করে।

গতকাল শাশুড়ি-বউমা মিলে অনেক রাত পর্যন্ত পলাতক দেখেছে। তাই আজ ঘুম ভাঙতে দেরি হয়ে গেছে পল্লবীর। ফলে, দ্রুত স্নান সেরে, মুখে অল্প খাবার তুলে নিয়ে অফিস যাওয়ার জন্য রেডি হয়ে নিয়েছে সে।

অফিসের ব্যাগটা কাঁধে তুলে নিয়ে দরজার দিকে পা বাড়াতে বাড়াতে পল্লবী কাকলির উদ্দেশ্যে বলে, বাই মা, আমি বেরোচ্ছি। দুপুরে খাবার খাওয়ার আগে ঠিক মতো ওষুধ খেয়ে নিও কিন্তু।

পল্লবীর কথা শেষ হওয়ার আগেই টিফিন বক্স নিয়ে ছুটে এসে কাকলি বললেন, এক মিনিট দাঁড়িয়ে যা পল্লবী। এই নে ধর, আজও টিফিন নিতে ভুলে যাচ্ছিলি। বলেই খাবারের ব্যাগটা পল্লবীর হাতে দিলেন।

তাড়াহুড়োয় আজও ভুলে গিয়েছিলাম মা। যাক ক্যান্টিনের ওই অখাদ্য খাবার খাওয়ার হাত থেকে বাঁচলাম। লভ ইউ মা।

অফিসে পৌঁছে ফোন করিস কিন্তু। মনে করিয়ে দেন কাকলি। আর পল্লবী এগোতে গিয়ে আবার পিছন ফিরে জানায়, মা, মনে আছে তো? পাঁচটার সময় রেডি থেকো। আমি চলে আসব। বাই।

কাকলির সম্মতিসূচক মাথা নাড়ানো দেখে নিয়ে দ্রুত অফিসের পথে পা বাড়ায় পল্লবী।

কী ব্যাপার মা, তোমার বউমার সঙ্গে ইশারায় কী কথা হচ্ছিল? মুচকি হেসে বিপুল প্রশ্ন করে কাকলিকে।

মেয়েদের সব ব্যাপারে এত নাক গলাতে নেই ছেলেদের। যা, তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে নিয়ে কাজে বেরিয়ে পড়। উত্তর দেন কাকলি।

মায়ের কথা শুনে বাবার দিকে তাকিয়ে বিপুল হেসে বলল, দেখো বাবা,শাশুড়ি-বউমার গোপন আঁতাত চলছে।

ছেলের কথা শুনে অজিতেশও হেসে ফেললেন। বেচারা বিপুল বউ আর মায়ের মধ্যে ইশারায় হওয়া কথার রহস্য উদ্ঘাটন করতে না পেরে, বিফল মনে রওনা দিল অফিসের পথে।

দুকাপ চা এনে কাকলি বসলেন অজিতেশের পাশে। তখনও অজিতেশের মুখে হাসি দেখে কাকলি জিজ্ঞেস করলেন, কী ব্যাপার, এত হাসছ কেন?

তোমরাও পারো বটে। শাশুড়ি-বউমা মিলে কী প্ল্যান করছ, ছেলেকে বলে দিলেই পারতে। বেচারা কৌতুহল নিয়ে অফিসে গেল। বলেই জোরে জোরে হাসতে শুরু করলেন অজিতেশ। তারপর একটু থেমে তিনি আবার বললেন, তবে তোমাদের বন্ডিং দেখে আমার খুব ভালো লাগে, খুব আনন্দ হয়। আমার মা তো তোমাকে শুধু শাসন করেছে। শয্যাশায়ী হওয়ার আগে কোনও দিন বুঝতে চায়নি তার প্রতি তোমার অবদানের কথা। যাক, তবু মারা যাওয়ার আগে তোমাকে ভালোবেসে বুকে টেনে নিয়েছিল ভাগ্যিস, নয়তো শুধু দুঃখ-স্মৃতি নিয়ে থাকতে হতো তোমাকে।

আসলে কী জানো, আজকাল খুব ভয় হয় আমার। এই প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা একটু বেশি ইমোশনাল। দিনকয়েক আগে খবরের কাগজে পড়লাম, শাশুড়ির অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে, কোলের শিশুসমেত এক তরুণী বহুতল থেকে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেছে। পুলিশ গ্রেফতার করেছে শাশুড়ি, শ্বশুর, স্বামী সবাইকে।

অজিতেশের কথা শুনে কাকলি বলেন, মেয়েটির শাশুড়ির অপরাধে বিনা কারণে হয়তো আইনি ঝামেলায় পড়বে ওর স্বামী, শ্বশুর। এতদিন হয়তো মা আর বউয়ের ঝগড়ার মাঝে অসহায় বোধ করত ছেলেটি। সত্যিই এসব মর্মান্তিক ঘটনা।

তুমি ঠিকই বলেছ কাকলি। এক পরিবেশে বড়ো হয়ে বিয়ে পর যখন অন্য পরিবেশে এসে এতগুলো লোককে মানিয়ে চলতে হয় একজন মেয়েকে, তা যে কত কঠিন কাজ সেটাই বুঝতে চান না অনেকে। সবার মন জুগিয়ে চলতে পারবে কিনা, খুশি করতে পারবে কিনা, ভালোবাসা পাবে কিনা, এসব ভয় কাজ করে মেয়েটির মধ্যে।

সেই ভয় কাটানোর দাযিত্ব নেয় কজন? অথচ, ভালোবাসা পেলে পরের বাড়ির মেয়েটিও সম্মান করতে শিখবে শ্বশুরবাড়ির লোকজনকে। তা ছাড়া তাকেও তো বিবাহিত জীবনের স্বাদ নেওয়ার সুযোগ দিতে হবে, হেসেখেলে বেড়াতে দিতে হবে। তা না করে অনেকে বিয়ে পরের দিন থেকেই মেয়েটির সঙ্গে দুর্ব্যবহার করতে শুরু করে দেয়। এমন ভাবে ফাই ফরমাশ খাটাতে শুরু করে দেয় যে, মেয়েটি আর শ্বশুরবাড়ির সদস্যদের আপন ভাবতে পারে না, প্রথম থেকেই ওর মনে দূরত্ব তৈরি হয়ে যায়। এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে একটু থামলেন অজিতেশ।

আর অজিতেশের কথার রেশ ধরে কাকলি বলতে শুরু করলেন, শুধু কি তাই? অনেক ছেলের মা ভাবতে শুরু করে দেন যে, বিয়ের পর ছেলে ওদের ভুলে যাবে, বউয়ের কথায় উঠবে-বসবে, ছেলে পর হয়ে যাবে। তা ভাবনা যদি এমনই হয়, তাহলে ছেলের বিয়ে দেওয়া কেন বাপু! রাখো না নিজের আঁচলে বেঁধে। সত্যি, কারও কারও কী বিচিত্র মানসিকতা! মা যদি ভুল করে, ছেলে যদি তখন মাকে শাসন করে, তখন মা ভাবতে থাকেন, সব বউমা শিখিযে দিয়েছে। ফলে, যা হওয়ার তাই হয়। এসব অযৌক্তিক মিথ্যে দোষারোপ সহ্য করতে করতে ধৈ্যের বাঁধ ভাঙে তারও, সেও আর সম্মান দেখাতে পারে না গুরুজনদের।

অথচ, শাশুড়ি যদি মুর্খের মতো এসব চিন্তা না করে বউমাকে নিজের মেয়ের মতো ভাবে, তাকেও যদি সংসারের কিছু বিষযে আলোচনা, সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়, তাহলে সেও আর নিজেকে পর ভাববে না, ভালোবাসায ভরিয়ে দেবে।

কাকলির কথা শুনে অজিতেশ বেশ বুঝতে পারছিলেন যে, আজ আবার সেই অসহাযতার মুহূর্তগুলি কাকলির মনকে ভারাক্রান্ত করে তুলেছে। তাই তাঁরও মনে পড়ে গেল, মায়ের দ্বারা কাকলির নিপীড়িত হওয়ার দিনগুলি। প্রায়ই তাঁর মা দুর্ব্যবহার করতেন কাকলির সঙ্গে। পান থেকে চুন খসলেই ধমকানো, গালিগালাজ, এমনকী কাকলির গালে থাপ্পড় মারতেও ছাড়েননি তিনি। সব মুখ বুঝে সহ্য করত কাকলি।

কিন্তু যখন তার মা-বাবা তুলে গালিগালাজ দিতেন, কাকলি আর নিজেকে সামলাতে পারত না, জবাব দিত। অনেকবার মাকে বুঝিযে কোনও লাভ হয়নি। শুধু তিনি যখন চলতে অক্ষম হয়ে পড়েন, বউমার সেবা নেওয়া ছাড়া আর অন্য কোনও পথ খোলা ছিল না, তখন একপ্রকার নিরুপায় ভাবেই কদর করতেন কাকলির।

এসব ভাবতে ভাবতেই কাকলির মনের অবস্থা বুঝতে পেরেছিলেন অজিতেশ। তাই কাকলির মাথায় হাত বুলিয়ে তিনি প্রসঙ্গ পরিবর্তন করতে চাইলেন। বললেন, তোমার বউমা কিন্তু লাকি। ভালো শাশুড়ি পেয়েছে।

আমি তো আগেই ঠিক করে নিয়েছিলাম যে, আমার ছেলের বউকে আমি নিজের মেয়ে মতো আদর-ভালোবাসা দেব। তাই শুধু দায়িত্ব, কতর্ব্য-ই নয়, পল্লবীকে আমি স্বাধীনতাও দিয়েছি, অধিকারও দিয়েছি মেয়ের মতোই।

এই দ্যাখো, কথায় কথায় বড্ড দেরি হয়ে গেল। কত কাজ পড়ে আছে। আমি যাই।

হ্যাঁ, সে যাও কাজ করতে, কিন্তু শাশুড়ি-বউমার প্রোগ্রাম-টা কী, তা অন্তত আমাকে তো বলো… হাসতে হাসতে কৌতুহল নিবারণের চেষ্টা করলেন অজিতেশ।

ধরে নাও আজ শাশুড়ি-বউমা মিলে সিনেমা দেখতে যাব।আর রাতের রান্নার দায়িত্ব তোমাদের বাপ ছেলের। বলেই মুচকি হাসলেন কাকলি।

কোন ছবি?

আরে, ওই তো, বিদ্যা বালনের কী একটা সিনেমা এসেছে না… তুমহারি সুলু না কী যেন নাম…

ও বুঝলাম। তাই রাতের খাবার বাপ-ছেলেকেই বানাতে বলছ তাই তো?

একটা দিন তো অন্তত রান্না থেকে আমাদের বিশ্রাম দাও।

চলো, তাই হোক। কিন্তু আর এক কাপ চা এখন খাওয়াতে হবে। বলেই হাসতে লাগলেন অজিতেশ।

এভাবেই হাসিতে, খুশিতে চলতে থাকে ভট্টাচার্য দম্পতির প্রৌঢ়-দাম্পত্য। হবে না-ই বা কেন? এত ভালো বউমা পেয়েছেন ওঁরা। পল্লবী, ভট্টাচার্য পরিবারের চার বছরের সদস্য। এই চার বছরে শাশুড়ি-বউমার চিৎকার চ্যাঁচামেচি কিংবা ঝগড়া কেউ শোনেনি। আত্মীয-স্বজন,পাড়া-প্রতিবেশীর লোকেরা ওদের শাশুড়ি-বউমার এমন মিলমিশ দেখে আশ্চর্য হন।

বিপুলের সঙ্গে পল্লবীর আলাপ হয়েছিল কর্মসূত্রে। দুজনে ভিন্ন সংস্থায কাজ করলেও, দুই সংস্থার প্রযোজনায় হওয়া এক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে আলাপ হয়েছিল ওদের। আসলে, বিপুল খুব ভালো গান গায় আর পল্লবী খুব ভালো অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করে। এসব ওদের বাড়তি গুণ। অফিসের যে-কোনও অনুষ্ঠানে তাই ওদের অংশগ্রহণ করা আবশ্যক হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিয়ের আগে পল্লবী একটা বিষয় নিয়ে খুব ভয়ে ভয়ে থাকত। শাশুড়ি শব্দটাতেই আতঙ্ক ছিল। পল্লবীর বদ্ধমূল ধারণা ছিল যে,

শাশুড়ি-বউমা মানেই সাপে-নেউলে সম্পর্ক। আসলে, মা এবং ঠাকুমার মধ্যে দিনরাত ঝগড়া দেখতে দেখতেই বড়ো হয়েছে পল্লবী। ওর বয়স যত বেড়েছে, মা-ঠাকুমার লড়াই ততই জোরদার হয়েছে। কারও অন্যায় দেখে অন্য পক্ষের সমর্থনে যতবারই কিছু বলতে গেছেন পল্লবীর বাবা, ততবারই তিনি লাঞ্ছিত হয়েছেন। কখনও এমনও হয়েছে যে, পল্লবীর মা-ঠাকুমার অত্যাচারে, ওর বাবা বাড়ি ছেড়ে দূরে কোথাও একা একা বেড়াতে চলে যেতেন, মন ভালো করার জন্য।

অবশ্য শুধু নিজের মা-ঠাকুমার ঝগড়াই নয়, প্রতিবেশী শাশুড়ি-বউমার ঝগড়ার কথাও কানে আসত পল্লবীর। এখনও তার স্পষ্ট মনে আছে, এক রাতের সেই ঘটনা! প্রতিবেশী এক বউ, শাশুড়ির অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে, গায়ে আগুন দিয়ে আত্মহত্যা করেছিল। পাড়ার অনেকে বলেছিল, শাশুড়িই নাকি কেরোসিন দিয়ে পুড়িয়ে মেরেছিল বউটাকে। তারপর তো থানা, পুলিশ, হাঙ্গামা… উফ্ কী ভয়ানক ছিল সেই ঘটনা! বউটির বাপের বাড়ির লোক প্রচুর ঝামেলা করেছিল কিন্তু আদালতে শাশুড়ির অপরাধ প্রমাণ করতে পারেনি। আসলে এসব দেখে শুনেই বড়ো হয়েছে পল্লবী। তাই তার মনে শাশুড়ি-ভীতি ছিল প্রবল।

তাই বিয়ের আগে এই শাশুড়ি-ভীতির কথা সে বিশদে জানিয়েছিল বিপুলকে। আর সব শুনে হাসতে হাসতে বিপুল বলেছিল, এখনও সময় আছে, ভেবে নাও, বিয়ে পর্যন্ত আর এগোবে কিনা সম্পর্কটাকে।

কিন্তু পল্লবী তখন বিপুলের প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছিল। তাই মজা করে বলেছিল, তেমন হলে শাশুড়িকে ছেড়ে দেব কিন্তু তোমাকে নয়।

বিপুল অবশ্য পরে পল্লবীকে আশ্বস্ত করেছিল এই বলে যে, দেখবে আমার বাড়ি গেলে তোমার শাশুড়ি-ভীতি কেটে যাবে। কারণ, আমার মা চান না, আমার ঠাকুরমার মতো ঝগড়ুটে শাশুড়ি হতে।

এভাবেই পল্লবীর মন থেকে শাশুড়ি-ভীতি কাটানোর চেষ্টা করেছিল বিপুল। কিন্তু বিয়ের পরের দিন নিজের বাড়ি ছাড়ার আগে, বিদায়ী মুহূর্তে নতুন করে দুশ্চিন্তায় পড়েছিল পল্লবী। কারণ, ওর মা চুপিচুপি বলেছিলেন, শাশুড়ির থেকে সাবধানে থাকিস। টাকাপয়সা সব নিজের হাতে রাখবি, হাতছাড়া করবি না। বরকে বেশি মা মা করার সুযোগ দিবি না। আর মনে রাখবি, শাশুড়ি কখনও নিজের মায়ের মতো হয় না।

পল্লবী যখন শ্বশুরবাড়িতে পা রেখেছিল, তখন ঘাবড়ে গিয়েছিল শাশুড়িকে দেখে। স্বাস্থ্যবতী, ভারী গলা, চলন-বলন প্রভৃতি দেখে পল্লবীর মনে হয়েছিল, ওর আশঙ্কাই ঠিক হবে। আর-দশজন অত্যাচারিত বউয়ের থেকে আলাদা কিছু ঘটবে না তার ক্ষেত্রে। কিন্তু বিয়ের দিন দশেক পর পল্লবী বুঝেছিল,

অন্যদের মতো শাশুড়ি নয় বিপুলের মা। বিচক্ষণ, বুদ্ধিমতি, মিশুকে এবং এক আদর্শ মাতৃগুণের অধিকারী। মনটা আনন্দে ভরে গিয়েছিল পল্লবীর। আবেগে যখন তার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়েছিল, কাকলি তখন পরম স্নেহে বুকে জড়িযে ধরে বলেছিলেন, কাঁদিস না, তোকে আমি পেটে না ধরলেও, মেয়ের থেকে কম কিছু আদর পাবি না।

এভাবেই ভালো শাশুড়ি হওয়ার প্রয়াস জারি রেখেছিলেন কাকলি। পল্লবী যদি কোনও ভুলও করে ফেলত, কাকলি মায়ের মতো পরম স্নেহে শিখিযে দিতেন। ভাত, ম্যাগি, ওমলেট ছাড়া আর কিছুই বানাতে পারত না পল্লবী। কিন্তু এখন সে অনেক রান্না জানে। এই অবদানও কাকলির। ছেলে বিপুল যদি কোনও কারণে পল্লবীর উপর চোটপাট করে, তাহলে কাকলি পল্লবীর পক্ষ নিয়ে বিপুলকেই বকাঝকা করেন। এর ফলে কাকলির প্রতি আরও সম্মান বেড়ে যায় পল্লবীর। তার হৃদয়ে নিজের মায়ের থেকেও বড়ো জায়গায় বসায় শাশুড়িকে।

তারা দুজনে শপিং করে, সিনেমা দেখে, বেড়াতে যায়, রেস্তোরাঁয় খায়, বাড়িতে পার্টিও করে। শাশুড়ির প্রসাধন সামগ্রী থেকে পোশাক সবই কিনে দেয় পল্লবী। আর বউমার পছন্দের জিনিস কিনে এনে তাকে উপহার দিতে ছাড়েন না কাকলি।

যে-প্রকাশনা সংস্থায সম্পাদনার কাজ করে পল্লবী, সেই সংস্থার সহকর্মীদের অনেকেই এখন জেনে গেছেন, তার শাশুড়ির অভাবনীয় গুণের কথা। অবশ্য শুধু সহকর্মীরাই নয়, সংস্থার এমডি-র কানেও পেঁছে গিয়েছিল পল্লবীর শাশুড়ির মহানুভবতার কাহিনি।

 

একবার ওড়িশার এক অঞ্চলে স্বামী, শ্বশুর এবং শাশুড়ির সঙ্গে বেড়াতে গিয়েছিল পল্লবী। জঙ্গলে ঘুরে-বেড়িযে আনন্দ করার পর, সন্ধে নাগাদ যখন তারা হোটেলে ফেরার উদ্যোগ নিচ্ছিল, তখন আচমকাই পল্লবীর পায়ে ছোবল মারে এক বিষধর সাপ। অনেক চেষ্টা করেও তাড়াতাড়ি অ্যান্টিভেনাম জোগাড় করতে পারেনি তারা। অবশেষে যখন অ্যান্টিভেনাম দিয়ে কোনও রকমে পল্লবীর প্রাণ বাঁচানো সম্ভব হয়েছিল, ততক্ষণে ওর দুটি কিডনিই প্রায় ড্যামেজ হয়ে গেছে। পল্লবীর মা-বাবা কিডনি দিতে চাইলেও, নানারকম সমস্যার কারণে তা দেওয়া সম্ভব হয়নি।

শেষ পর্যন্ত এগিয়ে আসেন কাকলি। পল্লবীর বি-পজিটিভ ব্লাড-গ্রুপ-এর সঙ্গে কাকলির ব্লাড গ্রুপ অদ্ভুত ভাবে মিলেও যায়। তাই, একটা কিডনি ডোনেট করে পল্লবীর প্রাণ বাঁচান ওর শাশুড়িই।

শাশুড়ি-বউমার এই অভাবনীয় ভালোবাসার কাহিনি পল্লবী নিজে মলাটবন্দি করেছে তার সংস্থার এমডি-র নির্দেশে। ‘দৃষ্টান্ত’ শিরোনামের সেই বইয়ের আনুষ্ঠানিক মোড়ক উন্মোচন আজ সন্ধ্যায়।

যে-হাসপাতালে পল্লবীর কিডনি প্রতিস্থাপন করা হয়েছিল, সেই হাসপাতালই বইপ্রকাশ অনুষ্ঠানটির মুখ্য স্পনসর। শাশুড়ি ছাড়া আর কাউকে আগে থেকে খবরটা জানায়নি পল্লবী। বর এবং শ্বশুরকে সন্ধেটা ফাঁকা রাখার কথা শুধু ফোন করে জানিয়ে দিয়েছিল সে।

কথামতো অফিস থেকে ফিরে স্বামী, শ্বশুর এবং শাশুড়িকে সঙ্গে নিয়ে বাইপাস অঞ্চলে অবস্থিত এক পাঁচতারা হোটেলে পৌঁছে গিয়েছিল পল্লবী।

হোটেলের অনুষ্ঠান কক্ষে ঢুকেই চমকে যায় বিপুল। এত বড়ো একটা ব্যাপার কেন পল্লবী আগে জানায়নি, ভেবে একটু রাগ হয় তার। কিন্তু তার মায়ের প্রতি পল্লবীর এই সম্মান প্রদর্শনের অভিনব উদ্যোগ দেখে গর্বে বুক ভরে যায়। বিপুলের বাবা অজিতেশেরও একই অবস্থা। লোক সমাগম না থাকলে তিনি হয়তো তখনই পল্লবীর মাথায় হাত রেখে বাহবা দিতেন।

অনুষ্ঠানটি নিজের নামে উৎসর্গ হতে দেখে কাকলিও বেশ লজ্জা পেয়ে যান। আবার, তাঁর প্রতি পল্লবীর কৃতজ্ঞতা স্বীকারের উদ্যোগ দেখে, তাঁর মনটাও ভরে যায় আনন্দে।

সবাই মিলে রাতের খাওয়া সেরে যখন গাড়ি করে বাড়ি ফিরছিল, পল্লবী তখন তার ক্লান্ত শরীরটা এলিয়ে দিয়েছে শাশুড়ির কোলে। আর পরম স্নেহে পল্লবীর মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিলেন কাকলি। বাইপাসের বড়ো রাস্তা ধরে গড়িয়ামুখী গাড়িটা ছুটে চলেছে আপন গতিতে। আর সেই গাড়িতে থাকা পল্লবী, বিপুল, অজিতেশ এবং কাকলির কানে তখন শুধু প্রতিধ্বনিত হচ্ছে অনুষ্ঠানে উপস্থিত দর্শকদের উচ্ছ্বসিত করতালি।

ডেকোরেটিং আইডিয়াজ

এবার নতুনত্বের ছোঁয়া আপনার ইন্টিরিয়র ডিজাইন-এও নিয়ে আসুন। বদলে ফেলুন পর্দা থেকে কুশন কভার। কীভাবে ঘরে কয়েকটা বদল আনলে  ঝলমলিয়ে উঠবে আপনার ঘর, এখানে তারই টিপ্স দেওয়া হল।

পর্দা

  • পর্দা যতটা সম্ভব সিলিংয়ের থেকে স্বল্প দূরত্বে রাখুন
  • ইচ্ছে করলে ব্লাইন্ড এবং পর্দা দুই-ই লাগাতে পারেন
  • জানলা বড়ো হলেও ক্ষতি নেই। বেশি কুঁচিওয়ালা পর্দা ঝোলান
  • পর্দা বাছার সময় এমন রং-ই বাছুন যা আপনার ঘরের রঙের সঙ্গে মানানসই হবে
  • আসবাবের সঙ্গেও যেন পর্দার একটা সামঞ্জস্য থাকে। বস্তুত একটা ঘরে চারটি জিনিসের ব্যাপারে খেয়াল রাখুন। মেঝে, সিলিং, দেয়াল ও আসবাব। এর মধ্যে যে-কোনও একটাকে বেছে নিন হাইলাইট করার জন্য। বাকিগুলো শুধু সাপোর্টিং রোল প্লে করবে
  • ঘরে কাঠ-কে গুরুত্ব দেবেন না ব্লাইন্ডস-কে, সেই সিদ্ধান্ত আপনাকেই নিতে হবে– কতটা প্রাইভেসি চান, সেটার ওপর ভিত্তি করে
  • পর্দার দৈর্ঘ্য নির্ভর করছে আপনার পছন্দের ওপর। কেউ ফ্লোর লেংথ পছন্দ করে, কেউ মেঝে থেকে অনেক উপরে
  • বেডরুম-এর জন্য ব্ল্যাক আউট ব্লাইন্ডস্-ই ভালো
  • পর্দার রড আন্তত ১ ইঞ্চি মোটা হওয়া উচিত
  • পর্দার কুঁচি অন্ততপক্ষে জানলার মাপের দ্বিগুন হওয়া বাঞ্ছনীয়

Kitchen Rugs for Decor

  • কিচেন রাগ্স
  • আপনার কিচেন-এর লুক বদলানোর জন্য কিচেন রাগ্স-এর জুড়ি নেই।
  • এই রাগ্স ব্যবহার করলে পায়ের নীচে ঠান্ডা অনুভূতিটাও থাকবে না এবং কিচেনের সৌন্দর্যও বাড়বে।
  • কিচেনের দেয়ালে ডেকোরেশন করার কোনও অপশন না থাকলে, এই রাগ্স ব্যবহার করলে কিচেনের
  • লুক-এ একটা চেঞ্জ আসবে
  • কিচেন ওয়াল হালকা রঙের হলে কালারফুল রাগ বাছুন
  • আপনার অ্যান্টিক রাগ্স পছন্দ হলে হ্যান্ডলুম-এর উলেন রাগ্স ব্যবহার করুন। এই ভিনটেজ প্যাটার্ন আপনার কিচেন-কে একটা ডিজাইনার ক্যারেক্টার দেবে।
  • রেক্ট্যাঙ্গুলার (আয়তাকার) শেপ-এর কিচেন রাগ্স-এর বদলে গোল বা ডিম্বাকৃতি রাগ্সও ব্যবহার করতে পারেন

Mirror for Decor

আয়না

  • আয়না শুধু মুখ দেখার জন্যই ব্যবহার হয় না, ঘরের ডেকর বদলানোর জন্যও এটা গুরুত্বপূর্ণ। ঘরকে স্পেসাস দেখাতেও সাহায্য করে আয়না। আয়না ব্যবহার করে ঘরের ডেকর-এ আলাদা মাত্রা যোগ করতে পারেন।
  • গোল্ডেন বিট লাগানো আয়না একটা এথনিক টাচ নিয়ে আসে আপনার ইন্টিরিয়র লুক্স-এ। এটা ক্যাবিনেটের উপরের দেয়ালে লাগান। ক্যাবিনেটের উপর কিছু ডেকোরেটিভ পিস বা অ্যান্টিক্স রাখুন। লুকটাই বদলে যাবে ঘরের।
  • বেডরুম-এ রাখার জন্য অবশ্য একটা চৌকো আয়নাই ভালো। আপনি চাইলে লিভিং ও ডাইনিং এরিয়ার মাঝখানে সেপারেটর হিসাবে একটা বড়ো আয়না লাগাতে পারেন। এতে ঘরটা বড়ো দেখাবে।
  • অনেকে দরজার পেছনে আয়না লাগাচ্ছেন আজকাল। এই কনসেপ্টটা অবশ্য বেডরুমের জন্যই উপযুক্ত।
  • বড়ো লিভিং রুম হলে ফ্লোর টু সিলিং মিরর লাগাতে পারেন। এটা বেশ একটা স্টাইল স্টেটমেন্ট তৈরি করবে।
  • বাথরুমে একটু অ্যান্টিক লুক আয়না লাগাতে পারেন, বাথরুম ক্যাবিনেট বা বাথরুম ফিটিংস-এর উপরের দেয়ালে। এতে বাথরুম-এ বেশ একটা আভিজাত্য আসবে।

 

 

 

কুশন

  • আপনার লিভিং রুমটা কি খুব একঘেয়ে দেখতে লাগছে? চট করে এর লুক বদল করতে পারবেন কুশন কভার বদলে। পেইন্ট করানো বা আসবাব বদলানোর মতো খরচ সাপেক্ষ পথে না গিয়েও এর লুক্স-এ পরিবর্তন আনতে পারেন কালারফুল কুশন।
  • সোফার রঙের সঙ্গে হুবহু একই রঙের কুশন কভার কেনার ভুল করবেন না। এতে ঘরটা খুব বিসদৃশ দেখাব
  • সাধারণত লিভিং রুম-এ অনেক রং ও প্যাটার্ন থাকেই। দেয়ালের রং, পর্দার ডিজাইন, দেয়ালে টাঙানো ছবির রং –সেগুলোর মধ্যে থেকে রং বেছে নিয়ে কুশনের রঙের সঙ্গে কালার ব্যালান্সিং করুন। খেয়াল রাখুন রংটা যেন অন্যান্য জিনিসের রংকে কমপ্লিমেন্ট করে, বিরোধিতা না করে
  • ঘরে ট্র্যাডিশনাল লুক রাখতে চাইলে, কুশনের সংখ্যা যেন জোড় সংখ্যায় থাকে। যদি গৃহসজ্জা খুব হাল ফ্যাশনের হয়, তাহলে কুশনের সংখ্যা বিজোড় সংখ্যায় রাখুন।
  • কুশন কভারের ডিজাইন একইরকম না রেখে মিক্স অ্যান্ড ম্যাচ করে রাখুন। কোনওটায় থাক সলিড কালার, কোনওটা হোক প্যাটার্নধর্মী।

কে দেখেছে

শেষ পর্যন্ত সোনাগাছিতেই যাবে অলকানন্দা। তার তাড়না এখন বিপদসীমা ছাপিয়ে ফুঁসে ওঠা নদীর মতো ভয়ংকর। সেই জলের তোড় এখন অলকানন্দাকে ভাসিয়ে নিয়ে গিয়ে আছড়ে ফেলতে চাইছে সোনাগাছিতে। তারপর অলকানন্দা সেরে নেবে তার আসল কাজ। চকার সঙ্গে হবে তার শেষ বোঝাপড়া। একটা তুমুল হেস্তনেস্ত করে ছাড়বে সে। জামার কলার ধরে হিড়হিড় করে টানতে টানতে নিয়ে যাবে থানায়। সবাই দেখুক গোবরডাঙার চ্যাটার্জিপাড়ার, লালবাড়ির ছোটোবউয়ের আসল মূর্তি।

অফিসে গিয়ে কদিনই সুস্থির মতো কাজে মন দিতে পারছে না অলকানন্দা। ভেতরে ভেতরে একটা ছটফটানি ভাব লেগেই আছে। সেটা খেয়াল করেছে কস্তুরী। কস্তুরীর পাশের টেবিল অলকানন্দার।

কী হল তোর?

কাল সারারাত দুচোখের পাতা এক করতে পারিনি।

ঘুমোতে পারিসনি? কীসের অস্বস্তি? কী ব্যাপার রে তোর? কদিন ধরে লক্ষ্য করছি, কী হয়েছে?

অলকানন্দা এড়িয়ে যেতে গিয়ে, গেল না। বলল, তোকে বলে তো কোনও সুরাহা হবে না। খুবই বিশ্রী একটা কাণ্ড ঘটে গেছে। আমি কিছুতেই ব্যাপারটা বরদাস্ত করতে পারছি না। আবার মন থেকে ঝেড়েও ফেলতে পারছি না।

সব শুনে কস্তুরী একটা বড়ো করে নিঃশ্বাস ছাড়ল। জলের গেলাস হাতে তুলে বলল, তোর মাথাটা সত্যিই গেছে। এসব তো খুবই বস্তাপচা ঘটনা। তুই এতে ফালতু মাথা গলাচ্ছিস। চিরকালই তো এসব হচ্ছে। তুই ভেবেও বা করবিটা কী?

আমি সোনাগাছিতে যাব।

জলের গেলাসে সবে ঠোঁট ছুঁইয়েছিল কস্তুরী। বেমক্কা বিষম খেয়ে কাশতে লাগল। ধরা গলায় বলল, তুই কোনও সাইকায়াট্রিস্ট-কে দেখা অলোকা। আমার ধারণা, তোর মাথাটা হ্যাং মোডে চলে গেছে। ডোন্ট বি সিলি অলোকা। মাটিতে পা রেখে চল। বাস্তবটা বোঝার চেষ্টা কর। ডোন্ট টেক এনি হুইমজিক্যাল ডিসিশন লাইক দিস। এই ধরনের ছেলেমানুষি জেদের কথা তোর মুখে মানায় না। কোনও ভদ্রঘরের মেয়ে ও-পাড়ায় পা দেয় নাকি? তোর বাড়িতে ক’বছর রান্না করেছে, তো কী হয়েছে? এসব কথা কেউ স্বীকার করে নাকি? লজ্জায় চেপে গেছে।

সেই লজ্জাটাই তো ওকে দিতে চাই আমি। আবার ঠাটের কথার বহর কী! চাকরি পেয়েছি।

তোকে কি এই যুদ্ধে জিততেই হবে? একটা নোংরা ব্যাপার ঘাঁটতে গিয়ে তোকেও যে নর্দমায় নামতে হবে, তা ভেবে দেখেছিস?

ওসব আমি বুঝি না। আমি সোনাগাছিতে যাবই আর তুইও আমার সঙ্গে যাবি।

আমি যাব! তুই আমাকে নিয়ে যাওয়ার আর জায়গা পেলি না? শেষ পর্যন্ত ওই নরকে? কোনও লোচ্ছা তোর বা আমার হাত ধরে টান দিলে, আই মিন টু সে দ্যাট, তুই বা আমি ফিজিক্যালি হ্যরাসড হলে মুখ দেখাতে পারব?

ওসব ভয়  দেখিয়ে আমাকে দমিয়ে রাখতে পারবি না। আমি যাবই। আর তুইও আমার সঙ্গে যাবি। আমাকে যেতেই হবে।

সে নয় গেলি। আমিও সঙ্গে গেলাম। কিন্তু তুই তোর হাবিকে বলতে পারবি? সাহসে কুলোবে তোর?

ও জানে কেসটা। ও-ই বলেছে আমাকে।

কী বলেছে? বলেছে, ওহ, শিয়োর। ইউ মাস্ট গো টু সোনাগাছি? তাই বলেছে?

না, তা নয়। সোমা যে সোনাগাছিতে ঘর নিয়েছে, খবরটা সুজয়ই আমাকে দিয়েছে। কে নাকি সোমাকে সোনাগাছিতে দেখেছে, এই তো গত বৃহস্পতিবারেই।

রাতে অলকানন্দা শুতে যাওয়ার তোড়জোড় করছিল। সুজয় ওর স্টাডিরুমে ল্যাপটপে ঘাড় গুঁজে বসেছিল। সুজয়ের জন্য জলের গেলাস নিয়ে গজগজ করতে করতে ঢুকল অলকানন্দা। বলল, বেশি রাত কোরো না। আমাকে সাতসকালে উঠতে হবে। সোমা আমার সব সুখ কেড়ে নিয়েছে। কথা নেই বার্তা নেই দুম করে কাজ ছেড়ে দিল।

সুজয় তখনই বলল কথাটা। প্রথমটা তেমন খেয়াল করেনি অলকানন্দা। বলল, কী বললে?

সুজয় ল্যাপটপেই ঘাড় গুঁজে রেখে ফের বলল, তোমার সোমার প্রামোশন হয়েছে। সে সোনাগাছিতে ঘর নিয়েছে।

কী বলছ তুমি?

ঠিকই বলছি। ইটস ট্রু অ্যাজ ডে লাইট। নাও সোমা ইজ আ পার্মানেন্ট রেসিডেন্ট অফ সোনাগাছি।

সোমা সোনাগাছিতে…!

ইয়েস, ঘর নিয়েছে। নাও সি ইজ আ কনফার্মড হোর। ওহ, আই অ্যাম সরি। দিজ ভোকাবুলারিজ আর আনকনস্টিটিউশনাল নাউ-এ-ডেজ। আজকাল ওদের ডেজিগনেশন হয়েছে। দে আর কলড সেক্স ওয়ার্কার্স। আই মিন যৌনকর্মী। ডোন্ট সে হোর, প্রস্টিটিউট অ্যান্ড সো অন…

কী নিষ্ঠুরের মতো বলছ এসব? একটুও মুখে বাধছে না তোমার?

লিসন মাই ডিয়ার, ইন দিস কেস, আম সিম্পলি হেল্পলেস। আই ডোন্ট ওয়ান্ট টু বি আ পেটি সিমপ্যাথাইজার লাইক ইউ, ইউ নো। আই হেট অল দিস ডার্টি থিংগস। যাও, শুতে যাও। আমাকে কাজ করতে দাও।

অলকানন্দা আর দাঁড়ায়নি। সুজযের স্টাডিরুম থেকে বেরিয়ে নিজের ঘরে এসে সোফার ওপর গা ছেড়ে দিয়ে বসে পড়ে। অলকানন্দা মনে মনে দুয়ে দুয়ে চার করে নেয়। নিজের সঙ্গেই কথা বলে ওঠে সে, ও তাই সোমা আমার রান্নার কাজটা ছেড়ে দিল!

দোলের পরের দিনই সোমা এসেছিল। বলল, বউদি, খুব খারাপ খবর। তোমার বাড়ির কাজ আমি আর করতে পারব না গো। শুনে অলকানন্দার মাথাটা বাঁই করে ঘুরে গেল। বলল, ইযার্কি করিস না সোমা। তুই ছাড়া আমি অচল, তুই জানিস। আমার অফিস মাথায় উঠবে, তুই না এলে।

সে তো জানি বউদি। কিন্তু, কলকাতায় আমি একটা বড়ো কাজ পেয়েছি। অনেক টাকা মাইনে!

তুই কি আমাকে মাইনে বাড়াতে বলছিস? তা অত ঘুরিয়ে নাক ধরার কী আছে? সোজা কথা বল না। দেব বাড়িয়ে জানি তোর বরের চিকিত্সার খরচ অনেক। আমি তো সবাইকে বলি, সোমা ওর বরকে নিয়ে কী লড়াইটাই না লড়ছে! এমনিতেই তোকে আমি অনেক বেশিই টাকা দিই। আরও বাড়িয়ে দেব। তবু তোকে ছাড়া আমার চলবে না সোমা।

না বউদি, চাকরিটা আমি হাতছাড়া করতে চাই না। ওর ওষুধের পেছনে কত খরচ, তা তো জানো। তিনবাড়ির রান্নার কাজে যা পাই ফুটকড়াই হয়ে যায়। সংসার চলে না। এবার মনে হয় একটু সুখের মুখ দেখব।

কী চাকরি তোর?

উঁ

উঁ না টুঁ। বলছি কাজটা কী?

ওই একটা কাজ। সে বলার মতো কিছু নয়। লেখাপড়া জানি না। অফিসের কাজ আর কে দেবে আমায়?

তবে কী? টিভি সিরিয়ালে অ্যাকটিং করবি? ওই চকা তোর মাথায় এসব ভূত চাপিয়েেছে না? আমি তোকে বলেছি না, ওসব লাইন তোর মতো মেয়ের জন্য নয়। তোর রূপের চটক আছে। কিন্তু, খুঁটির জোর আছে কি? চিল-শকুনে ছিঁড়ে খাবে তোকে, তখন কেঁদে কূল পাবি না। ওই চকার পাল্লায পড়িস না। ওটা একটা আস্ত ক্রিমিনাল। মওকা পেলে ও তোকে আরব-এ চালান করে দেবে।

সোমা বলল, না বউদি, চকাকে ওপর থেকে দেখে আম্মো তাই ভাবতাম। ও আমাকে দিদি ডেকেছে।

অলকানন্দার আন্দাজে ঢিল ছোড়াটা তাহলে লাগসই হয়েছে। রিভলভিং স্টেজ-ড্রামার মতো বাঁই করে এক চক্করে ঘুরে গেল যেন মঞ্চটা। একটা ঘাগু উকিল আর ঝানু গোয়েন্দার মতো দ্বৈত চরিত্রে ঢুকে পড়ে অলকানন্দা। অদ্ভুত ভঙ্গিতে মাথাটা দোলাতে দোলাতে বলে, তাহলে চকাই তোর মাথাটা খেয়েছে। দ্যাখ সোমা, দুনিয়াটার কিছুই দেখিসনি তুই। জানিসও না কিছুই। চকার মতো ক্রিমিনালদের কাছে মা-বোন বলে কিছু নেই রে। ওটা একটা আস্ত তোলাবাজ। ওরা শুধু চেনে টাকা আর চেনে মদ আর মেয়েমানুষ। তোকে দিদি বলল, আর তুই অমনি গলে গেলি?

চকা আজ পোজ্জন্ত আমার সঙ্গে কোনও খারাপ ব্যাভার করেনি।

করেনি তোকে বাগে পায়নি, তাই করেনি। এবার পাবে।

কেন? এবার পাবে কেন?

ওই যে কৃতজ্ঞতা। তুই তো আর অকৃতজ্ঞ হতে পারবি না। তোকে অনেক টাকার কাজ জোগাড় করে দিল। তার প্রতিদান যখন চাইবে, তখন বুঝবি। যাই হোক, চাকরিটা কী? মানে কী কাজ?

সোমা বলতে গিয়ে থেমে গেল। কে যেন ওর গলা টিপে ধরল। তার চোখ, চিবুক শক্ত দেখাল। বলল, ওই একটা ছোটোখাটো কাজ আর কী। বলার মতো তেমন কিছু না। চলি। আর দাঁড়ায়নি সোমা।

 

বাড়ি ফিরে ঘরে ঢুকেই অলকানন্দা হাতব্যাগটাকে ছুঁড়ে দিল সোফায়। বাথরুমে ঢুকে গেল সোজা। অনেকক্ষণ ধরে শাওয়ারের নীচে দাঁড়িয়ে শরীর ও মনকে স্থির করার অনুশীলন চালাল। সোমার এই পরিণতির কথা ভাবতে ভাবতে গা গুলিয়ে ওঠে তার। বেসিনের কাছে ছুটে গিয়ে ওয়াক তুলতে থাকে। খানিক ধাতস্থ হওয়ার পর চোখে মুখে জলের ঝাপটা দেয়। ঘাড়ে ও পিঠে জল দেয়। হ্যাঙার থেকে তোয়ালেটাকে একটানে নামিয়ে এনে, বিছানায় শরীর গড়িয়ে দিয়ে চোখ বুঁজে পড়ে থাকে। যেন চোখ খুলতেও ভয়। ছেলেবেলায় রাক্ষস-খোক্ষসের স্বপ্ন দেখার পর ভয়ে আতঙ্কে যেমন চোখ খুলতে পারত না ঠিক তেমন। ঠিক সেই আতঙ্ক গিলে রেখেছে অলকানন্দাকে। যেন জেগে শুয়ে চোখ বুজে থাকলে মনে হবে, সে সোমাকে নিয়ে দুঃস্বপ্ন দেখছিল। গোটাটাই স্বপ্ন। চোখ খুলে বাস্তবে ফিরতে চায় না সে।

ওভাবে শুয়ে থাকতে থাকতে অলকানন্দা টের পায়, ওর ভেতরে স্মৃতির জলভরা বোতলটা কখন কাত হয়ে শুয়ে পড়েছে। তাই নীচের অচেতন স্তরের খড়িমাটির গুঁড়োর মতো থিতিয়ে পড়া স্মৃতিগুলো গড়িয়ে অবচেতন স্তর টপকে এল। এল একেবারে অলকানন্দার চেতন স্তরে। নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করতে থাকে সে। তার মন বলে ওঠে, ও, তাই! তাই সোনাগাছির প্রতি তার এমন দুর্বার আকর্ষণ? এই সেই সোনাগাছি। ওহ! এ তো সেই প্রত্যভিজ্ঞা! সেই প্রত্যভিজ্ঞাই এতকাল পরে ঘুরে ফিরে অলকানন্দার সামনে এসে হাজির।

অলকানন্দা কলেজে সাইকোলজি পড়েছে। জেনেছে প্রত্যভিজ্ঞার কথা। আগের দেখা ও শোনার সঙ্গে মিল খুঁজে পাওয়া। এই যে-সোনাগাছি তাকে মাতিয়ে তুলেছে, তার মূলে তো শুধু সোমা নয়! রয়েছে আরও একজন। সে অলকানন্দার মাসতুতো দিদি মান্তুদি। অনেক বছর আগে মান্তুদি গেছিল সোনাগাছিতে। মান্তুদির বর প্রায় রাতেই বাড়ি ফিরত না। পাড়ার অভিজিত্দাই গোয়েন্দাগিরি করে, সুমনদার সুলুক সন্ধান এনে দিল মান্তুদিকে। অভিজিত্দার সঙ্গে সোনাগাছিতে গিয়ে হানা দিল মান্তুদি। এক রূপসী মহিলার ঘর থেকে মান্তুদি ওর বরকে, জামার কলার ধরে হিড় হিড় করে টেনে রাস্তায় এনে, মুখে থুতু ছিটিয়ে দিয়ে চলে এসেছিল। আর ফেরেনি।

সে আজ থেকে বছর কুড়ি আগের কথা। তখন অলকানন্দার বয়স বড়োজোর বারো-তোরো হবে। তাই বাড়ির বড়োরা ছোটোদের কানকে আড়াল করে ফিসফাস, কানাঘুষো চালাত। তখনই সোনাগাছি শব্দটা ছিটকে এসেছিল অলকানন্দার কানে। পরে সব ঘটনাই শুনেছে, জেনেছে। প্রায় এক যুগ আগের সেই পারিবারিক বিপর্যয়, মান্তুদির সেই সোনাগাছি অভিযানের কথা স্রেফ কর্পূরের মতো উবে গিয়েছিল। আজ এতকাল পরে সোমার কদর্য পরিণতিতে অলকানন্দার অন্তরিন্দ্রিয়ে অচেতন স্তরে, মজে যাওয়া সেই স্মৃতি উঠে এল চেতনায়। আখেরে মান্তুদিই হল তার অ্যাকচুয়াল ইন্সপিরেশন। এই মুহূর্তে মান্তুদিই তার মনের জোর একশোগুন বাড়িয়ে দিল যেন।

রাতে ভালো করে ঘুমোতে পারল না অলকানন্দা। যত রাত বেড়েছে, ততই রোখ বেড়েছে তার। কেবলই মনে হতে থাকে, ওই লোচ্ছা চকা যেন ওকে হারিয়ে দিল শেষটায়। চকাকে উচিত শিক্ষা না দিতে পারলে স্বস্তি নেই। এত দূর স্পর্ধা! একটা মেয়ে দারিদ্রের সুযোগ নিয়ে তাকে ওই নরকে টেনে নিয়ে যায় কী করে? আগে সোমার গালে চড় কষিয়ে ওর দেমাক ভেঙে গুঁড়িয়ে দিতে হবে। তারপর সে একটা হেস্তনেস্ত করে তবেই ছাড়বে।

পার্টি-পলিটিক্স যতদূর যেতে হয় যাবে অলকানন্দা।

 

পরের দিন অফিস থেকে ফেরার পথে অলকানন্দা গেল চকাদের ঠেকে। একদল ছেলেছোকরা বসে গুলতানি করছিল একটা চা দোকানে। চকা এসে দাঁড়াল অলকানন্দার সামনে। মোবাইল ফোনে তর্জনী চালাতে চালাতেই বলল, আপনি এখানে? কী ব্যাপার বলুন তো?

অলকানন্দা বলল, সোমাকে তুমি এই পথে নামালে কেন?

কে সোমা?

তুমি ভালোই জানো কোন সোমা। ও আমাদের বাড়িতে রান্নার কাজ করত।

অ… সোমাদি। তাকে সোনাগাছিতে নিয়ে গেছি কেন? তাই তো? তা সে কি কারও কোলের মেয়ে আমি কি তাকে কারও কোল থেকে কেড়ে নিয়ে গেছি? এমন গিলাবিলা বলেন না, শুনলে শালা সাত পেগের নেশা ছুটে যায়। নিজের পায়ে হেঁটে হেঁটে হাটে গেল ঘোষ, সবাই বলে, হাই রোডেরই দোষ। সোমা তো নিজের ইচ্ছেতেই গেছে। সব জেনে তাপ্পর কথা বলুন। মাস খানেক ধরে সোমা আমার পেছনে এঁটুলির মতো লেগে পড়েছিল। শুধু বলেছে, ছেলেকে ইশকুলে ভত্তি করাবে। ওর অনেক টাকা দরকার। বলল, ও কারও দয়া নেবে না। বলল, চকা আমি রোজগার করতে চাই। যেমন করেই হোক, নিজের রোজগার। ওর স্বামীর তো প্যারলিসিস। শুনে আমার মায়া হল। তাই আমি ওকে…

চকার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে অলকানন্দা বলল, তাই তুমি ওকে সোনাগাছিতে নিয়ে গেলে? বাঃ চমত্কার সোমা যে-ছেলেকে স্কুলে ভর্তি করাবে, দুদিন বাদে ছেলে বড়ো হয়ে যখন মায়ের আসল পরিচয়টা জানবে, তখন?

চকা আঙুলের টোকায় সিগারেটটাকে ঘরের এক কোণে ছুড়ে দিয়ে বলল, দেখুন বউদি, ছোটোমুখে একটা বড়ো কথা বলি, মায়ের পরিচয় শুধুই মা। আপনারা পিথিবির কটা মাকে দেখেছেন?

তোমার কাছে জ্ঞানের কথা শুনতে চাই না। তুমি আমাকে সোমার সোনাগাছির ঠিকানাটা একটু বলবে?

কেন? আপনি যাবেন নাকি সেখানে?

নিশ্চয়ই যাব।

বিন্দাস বলেছেন মাইরি। আপনার কলিজায় কুলোবে?

আমি ভয় পাই না।

তাওলে যান, আপনি গেলে সিনটা জমে যাবে। অবোসসো আপনি একা গেলে ওর ঠেক খুঁজে পাবেন না। সে অনেক গোলমেলে গলতা। কিন্তু, আপনি কেন যাবেন সেখানে সেটা বলবেন? মানে আপনার আসলি কাহানি?

কাহিনি আবার কী? ও আমায় বলেছে চাকরি পেয়েছে নাকি। আমি গিয়ে ওই মিথ্যেবাদীর গালে একটা ঠাস করে চড় মারব। তারপর তোমার সঙ্গে হবে আমার আসল বোঝাপড়া।

চমকাচ্ছেন? আমাকে? আপনি মেয়েছেলে, তাই চেপে গেলাম। ঠিক আছে, কবে যেতে চান, চলুন আমি নিয়ে যাব।

আমি কালই যেতে চাই। কিন্তু তুমি আগে থেকে সোমাকে কিছু জানাতে পারবে না।

সে ঠিক আছে। একটা সবুজ পাত্তি ছাড়তে হবে। মাগনা হবে না।

মানে! কত পাঁচশো?

চকা মাথা ঝাঁকিয়ে তার সম্মতি বুঝিয়ে দেয়।

অলকানন্দা বলে, ঠিক আছে দেব।

 

রাতে তুলকালাম ঝড় উঠল। অলকানন্দার প্রস্তাব শুনে সুজয়, সিংহের গর্জন তুলে গোটা বাড়ি কাঁপিয়ে দিল। এমন বিশ্রী একগুঁয়েমি, জেদের কথা শুনে সুজয় ঝাঁঝিয়ে উঠে ঠাস করে একটা চড় কষিয়ে দিল অলকানন্দার গালে। ব্যস, আর কোনও পরোয়া নেই। কোনও বাধা নেই আর। সুজয়ের চড় অলকানন্দার সোনাগাছির পাসপোর্ট পাকা করে দিল। তার সোনাগাছি অভিযানের আসন্ন সাফল্যের রোমাঞ্চ, সুজয়ের চড়ের গ্লানি মুহূর্তে মুছে দিল। আর কথা বাড়তে দেয়নি অলকানন্দা। বালিশে মুখ গুঁজে পড়ে থাকে। সুজয় বারবার অনুতাপ, অনুকম্পা জানাতে এলেও, মুখ তোলেনি সে।

সারারাত এক ভাবে বিছানায় পড়ে থাকে অলকানন্দা। অনেক রাত পর‌্যন্ত সুজয় আত্মপক্ষ সমর্থনে গজগজ করতে থাকে। একসময় অলকানন্দা টের পায়, তার সিংহমার্কা স্বামী নাকের গর্জন তুলছে। অলকানন্দা টুঁ শব্দেরও টুঁটি টিপে নেমে আসে বিছানা থেকে। ওদের তিনতলার ঝুলবারান্দায় একটু একটু করে রাতের আয়ু ফুরিয়ে আসতে থাকে।

খুব ভোরে আচমকা ঘুম থেকে জেগে উঠে সুজয় দেখল অলকানন্দা নেই। ওর বালিশের এক কোণে একটা ভাঁজ করা এ ফোর পেপার। তাতে লেখা, আজ অফিস ছুটির পর সোনাগাছি যাচ্ছি। তার পরের গন্তব্য আমার জানা নেই।

 

অফিস ছুটির পর অলকানন্দা ভূত দেখে চমকে ওঠে। অফিসের গেটের মুখে সুজয় দাঁড়িয়ে অলকানন্দাকে দেখে এগিয়ে এল। বলল, চলো আমিও যাব। পেছন থেকে কস্তুরী বলল, অলকা, তাহলে আমি আর যাচ্ছি না। অলকানন্দা মাথা নেড়ে হাত তুলে গুডবাই বোঝাল।

ভিক্টোরিয়া হাউসের সামনে চকার দাঁড়ানোর কথা। দূর থেকে চকাকে দেখা গেল। ফর্সা লম্বা মেয়ে পটানো চেহারা। নীল জিন্স-এর ওপর একটা ডার্ক টি-শার্ট। বলিউডের হিরোর স্টাইলে কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

অলকানন্দা বলল, ওই যে ওই ছেলেটা। চকার গা ঘেঁষেই ট্যাক্সি দাঁড়াল। অলকানন্দা মুখ বাড়িয়ে বলল, উঠে এসো চকা, সামনে বসো। ট্যাক্সি ছুটছে সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউ ধরে। চকা ড্রাইভারের কপালের কাছে ঝোলানো আয়নায় কেঁপে কেঁপে যাওয়া লোকটাকে দেখার চেষ্টা করছিল।

ট্যাক্সি থেকে নেমে চকা বলল, আপনারা আসুন আমার সঙ্গে। চকাকে অনুসরণ করে চলল অলকানন্দা আর সুজয়। বুক কাঁপছিল অলকানন্দার। এটাই তাহলে সোনাগাছি! আসলে পৃথিবীর এই আদিম পেশার ওপর অনেকদিনের চাপা কৌতূহল তার। সোমাই যেন হাত ধরে নিয়ে এল অলকানন্দাকে। তার অজানা ও অদেখাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল সোমাই। রাস্তার দুধারের বাড়ির সামনে সব অসভ্য সাজগোজ করা রোজগেরে মেয়ে। এরাই বেশ্যা, বারবনিতা, বারাঙ্গনা আরও কত নাম এদের। এখন শুধুই যৌনকর্মী।

একটা বাড়ির সামনে এসে দাঁড়িয়ে পেছন ফেরে চকা। বলে, এই বাড়িটাই, চলে আসুন। বাড়িটার একবারে গর্ভস্থলে ঢুকে পড়ল ওরা তিনজন।

অলকানন্দা বলল, বাব্বা, কত ভেতরে গো চকা।

চকা বলল, আসুন না। আরও একটু ভেতরে। সুজয় নাকে-মুখে সাদা রুমাল চেপে হাঁটছিল। অলকানন্দার বুকে ভূমিকম্পের ধকল। গলা শুকিয়ে আসছিল। অনেক কষ্টে বলল, চকা তুমি সোমাকে কিছু জানাওনি তো।

না কিছু বলিনি। আপনাদের দেখে ও বমকে যাবে।

অলকানন্দা চাপা গলায় বলল, লজ্জাও পাবে। অবশ্য এখনও যদি ওর লজ্জা বলে কিছু অবশিষ্ট থাকে।

চকা বলল, এখানে ওসব লজ্জাফজ্জা চলে না। বলতে বলতে একটা ঘরে ঢুকে গেল চকা। পেছন ফিরে বলল, আসুন ভেতরে চলে আসুন। ঘরের ভেতরে ঝলমল করছে আলো। ঘরে ঢুকেই একেবারে সোমার মুখোমুখি অলকানন্দা।

সোমা ছুটে এসে অলকানন্দার হাত চেপে ধরল। বলল, দাদা-বউদি, তোমরা এখানে! চকা নিয়ে এল বুঝি? খুব ভালো করেছ এসেছ। আমি যেন স্বপ্ন দেখছি।

অলকানন্দার কথা বলার শক্তি নেই। চকা বলল, এটা এই বাড়ির কিচেন। দুবেলা পনেরো-পনেরো তিরিশটার মতো পাত পড়ে এখানে। দুজন জোগাড়েকে নিয়ে সোমা একাই সামলায় এই কিচেন। মাস মাইনে পনেরো হাজার।

সোমা বলল, তোমরা বসো বউদি, আমি তোমাদের চা করে দিই।

 

অলকানন্দার পায়ের নীচ থেকে মাটি সরে যাচ্ছিল। কিচেন থেকে বেরিয়ে বাইরের ছোট্ট প্যাসেজে একটা চেয়ারে স্থবিরের মতো বসে পড়ল অলকানন্দা। সুজয় পাশে নাকে রুমাল চাপা দিয়ে দাঁড়াল।

চকা এসে বলল, এবার বলুন বউদি, আমার সঙ্গে কী বোঝাপড়া করবেন।

অলকানন্দার চোখ ঝাপসা হয়ে এল। হাতের রুমাল দিয়ে চোখের কোণা মুছে নিয়ে বলল, আমাকে আর লজ্জা দিও না।

ঠিক তখনই চকার মধ্যে জেগে উঠল মাস্তান চকা। মাস্তানির ঢঙেই সে বলল, বউদি, সোমাকে এই সোনাগাছিতে কে দেখেছে বলুন তো? মানে সেই ডবল ভদ্দলোকটি কে?

সুজয় এবার তাড়া লাগাল। বলল, ওসব কথা পরে হবে। আমরা এখন ফিরব।

অলকানন্দার বুকের ভেতরে ভূমিকম্পে ধস নামছিল। সুজয় বলল, চলো, একটু হেঁটে এসো। ওই মোড় থেকে ট্যাক্সি নেব।

অলকানন্দা হাঁটছিল সুজয়ের পেছন পেছন। দূরত্ব সামান্য হলেও ব্যবধান ছিল। একটা লোক সুজয়কে দেখে সালাম সাব বলল। প্রায় মাঝবয়সি লোকটার পরনে চেক লুঙ্গি, কালো স্যান্ডো গেঞ্জি, গলায় চৌকো তাবিজ। অলকানন্দাকে পাশ কাটিয়ে চলে গেল লোকটা।

অলকানন্দা এবার পা চালিয়ে সুজয়ের পাশে পাশে হাঁটতে লাগল। বলল, লোকটাকে তুমি চেনো নাকি?

কথাটা সুজয়ের কানে গেল কিনা বোঝা গেল না। অদূরে দাঁড়ানো একটা ট্যাক্সি দেখে সুজয়, ট্যাক্সি বলে চেঁচিয়ে উঠল।

পড়ার জন্য সীমাহীন গল্প-নিবন্ধসাবস্ক্রাইব