রাগ সামলানোর নিয়মকানুন

আমাদের অন্যান্য ইমোশনগুলির মধ্যে রাগ একটি স্বাভাবিক ইমোশন। সময় নির্বিশেষে কোনও না কোনও কারণে আমাদের রাগের মতো ইমোশন-এর মুখোমুখি হতেই হয়। যারা প্রচণ্ড বদরাগী তাদের অনেক সময় নানা শারীরিক সমস্যারও সম্মুখীন হতে হয়। যেমন প্রচণ্ড উদ্বেগ, হাই ব্লাড প্রেশার, মাথাব্যথা এমনকী হার্ট-এর সমস্যাও হয়ে থাকে।

অথচ সময় সুযোগ বুঝে যদি ঠিক ভাবে রাগ এক্সপ্রেস করা যায়, তাহলে এটা কিন্তু পজিটিভ এবং প্রয়োজনীয় ইমোশন হয়ে উঠতে পারে। রাগ যাতে আয়ত্তে রাখা যায় তার জন্য লং-টার্ম স্ট্রাটেজি হল, রেগুলার এক্সারসাইজ করা, রিল্যাক্সিং টেকনিকগুলো শিখে রাখা এবং সর্বোপরি কাউন্সেলিং করানো।

শরীরে রাগের প্রভাব

রাগের সঙ্গে সঙ্গে ভয়, এক্সসাইটমেন্ট এবং উদ্বেগ-এর সমস্যাও একইসঙ্গে হয়ে থাকে। ফলে শরীরের অ্যাড্রোনাল গ্ল্যান্ডস থেকে স্ট্রেস হরমোন নিঃসৃত হয়ে সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। হার্ট রেট, ব্লাড প্রেশার এবং রেসপিরেশন-এর মাত্রা বেড়ে যায়। বডি টেম্পারেচার বেড়ে যায় এবং ঘাম হতে থাকে

রাগের থেকে কী কী শারীরিক সমস্যা হয়ে থাকে?

রাগের প্রভাবে তাৎক্ষণিক এবং দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক সমস্যা দেখা দিতে পারে। যেমন, মাথাব্যথা, হজমের সমস্যা, তল পেটে ব্যথা, ঘুম না আসা (insomnia), মাত্রাতিরিক্ত উদ্বেগ, অবসাদ, উচ্চ রক্তচাপ, ত্বকের নানা সমস্যা যেমন একজিমা, হার্ট-এর সমস্যা, স্ট্রোক ইত্যাদি।

স্বাস্থ্যকর উপায়ে কী ভাবে রাগ হয়েছে বোঝাবেন?

  • আপনি যদি বোঝেন রাগ কন্ট্রোল করতে পারছেন না তাহলে সেই মুহূর্তে ওই পরিবেশ ছেড়ে চলে যান, যতক্ষণ না আপনার রাগ কমছে
  • নিজের রাগ হয়েছে মেনে নিন এবং স্বাভাবিক জীবনের অঙ্গ বলে স্বীকার করে নিন
  • চেষ্টা করুন রাগের কারণটা পিনপয়েন্ট করতে
  • একবার সমস্যাটা যদি বুঝতে পেরে যান, তাহলে চেষ্টা করুন অন্য কী ভাবে সিচুয়েশনটা হ্যান্ডেল করা যায়। অর্থাৎ কাজটা হাসিল করতে রাগ না দেখিয়ে বিকল্প রাস্তা বার করুন
  • খুব রাগ হলে ফিজিক্যাল কিছু করার চেষ্টা করুন। যেমন কিছুটা দৌড়ে আসুন অথবা ফুটবল, ক্রিকেট যাতে ইন্টারেস্ট আছে সেটা খেলতে চলে যান, যদি সঙ্গী পান
  • যাকে বিশ্বাস করেন তার কাছে আপনার মনের কথা এবং অবস্থাটা খুলে বলুন, শেয়ার করার চেষ্টা করুন

রাগ চেপে রাখাটাও শরীরের জন্য খারাপ

রাগের মাথায় অতিরিক্ত চ্যাঁচামেচি করা : মানুষ বেশিরভাগই এমন করে রাগ প্রকাশ করে থাকে, যাতে উপকারের বদলে অপকারই বেশি হয়। অনেকে রাগ কন্ট্রোল করতে না পেরে চ্যাঁচামেচি শুরু করে এমনকী ফিজিক্যাল ভাইওলেনস-এও জড়িয়ে পড়ে। এতে পরিবার, বন্ধুবান্ধব, প্রতিবেশী সকলের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ হয়ে যাওয়ার সম্ভবনা বৃদ্ধি পায়। অনেকে নিজের দুর্বলতাগুলো ঢাকার জন্যেও রাগ প্রকাশ করে। এমনটা করে কারণ নিজেকে সে অনেকের থেকে সুপিরিয়র প্রমাণ করতে চায়।

রাগ নিজের মধ্যেই চেপে রাখা : অনেকে রাগ দেখানোটাকে অশোভন আচরণ বলে ভেবে নিজের মনেই পুষে রাখে। এটা থেকে হামেশাই অবসাদ এবং উদ্বেগের সৃষ্টি হয়। অনেকের আবার রাগ কারও ওপর হল আর ইনোসেন্ট কারও ওপর সেই রাগটা সে প্রকাশ করে। যেমন বাড়িতে স্বামী-স্ত্রীর ঝগড়া হল আর রাগ গিয়ে পড়ল বাড়িতে থাকা শিশুটির উপর।

দীর্ঘ সময়ে অ্যাংগার ম্যানেজমেন্ট অভ্যাস করুন

  • যে যে ঘটনায় রাগ সামলাতে পারেননি, সেগুলো একটি ডায়ারিতে লিখে রাখুন। অবসর সময়ে সেটা পড়ে ভাবুন, কেন এবং কীভাবে আপনি অতটা রেগে উঠলেন
  • রিল্যাক্স থাকার টেকনিকগুলো রপ্ত করার চেষ্টা করুন। মেডিটেশন বা যোগ ব্যায়াম অভ্যাস করুন
  • অতীতে কী ঘটেছে সেই নিয়ে বর্তমানেও যদি আপনার রাগ কমতে না চায়, তাহলে অবশ্যই কাউন্সেলর বা সাইকোলজিস্ট-এর পরামর্শ নিন।

 

প্রত্যাখান কীভাবে সামলাবেন

সফল হতে না পারাকে জীবনের শেষ ভেবে নেওয়ার আগে, নিজেকে কিছু প্রশ্ন অবশ্যই করুন। জীবনে সকলকেই কখনও না কখনও প্রত্যাখ্যানের মুখোমুখি হতে হয়। কারণ অনেক কিছুই হতে পারে। ভালো স্কুল কলেজে ভর্তি হতে পারলেন না, পরীক্ষার রেজাল্ট খারাপ হল, কর্মক্ষেত্রে সফল হতে না পারা, প্রেমে আঘাত ইত্যাদি নানা কারণে নিজেকে প্রত্যাখ্যাত মনে করতে পারেন। কিন্তু ভেঙে পড়ে অবস্থার কাছে নতি স্বীকার করে নেওয়া মানে হেরে যাওয়া। সুতরাং মনকে বোঝান, সাহস আনুন মনে।

প্রথমে নিজেকে প্রশ্ন করুন : সবথেকে আগে নিজেকে প্রশ্ন করুন, কেন আপনি ওই জিনিসটা পেতে চান? যেমন ভালো নম্বর, চাকরি, সম্পর্ক, ভালোবাসা ইত্যাদি। সাধারণত এগুলি মানুষ চায় সমাজে প্রতিষ্ঠা পেতে, নিজে কিছু করে দেখাবার আশায়। অথবা জীবনের পথ চলার জন্য একজন সঙ্গী পেতে। জবাব পেয়ে গেলে ভাবুন, নিজেকে উত্তম প্রমাণিত না করতে পেরে, শেষ করে ফেলাটা কি আপনার উচিত হবে? অবসাদে ডুবে না গিয়ে পরের বার আরও ভালো করার জন্য নিজেকে তৈরি করুন।

নিজেকে কষ্ট দেবেন না : হার-জিত জীবনে লেগেই থাকবে। জীবনের কোনও একটা পর্যায়ে প্রত্যাখ্যান এলে মনকে বোঝান, ওটা আপনার জন্য নয়। নিজেকে ছোটো ভাববেন না, নেতিবাচক ভাবনা স্থান দেবেন না মনে, অবসাদ দূরে রাখবেন।

নিয়ন্ত্রণে থাকুন : সাধারণত যেটা আমরা চাই সেটা না পেলে বিকল্প হিসেবে ভুল রাস্তা বেছে ফেলি। যে-কোনও উপায়ে জিনিসটা হাসিল করার চেষ্টা করি। এটা অন্যায়, নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখা উচিত।

পরিস্থিতি নতুন করে পর্যালোচনা করা উচিত : কোনও কাজ আপনাকে দেওয়া না হলে ভেঙে পড়বেন না বা কেউ সম্পর্ক ভেঙে দিতে চাইলে আঘাত পাবেন না। অন্য ভাবে জিনিসটাকে নেওয়ার চেষ্টা করুন। হয়তো কাজটা বা সঙ্গীটি আপনার মতো লোকের জন্য নয়। এর থেকে অনেক ভালো কিছু পাওয়ার যোগ্য আপনি অথবা ওই সম্পর্ককে টিকিয়ে রাখলে ক্ষতি আপনারই বেশি হতো।

ব্যর্থতাও প্রেরণা দেয় : সাফল্যের সঙ্গে সঙ্গে ব্যর্থতাও জীবনের একটা গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। জীবনে যখনই খারাপ কিছু ঘটে, আমরা ভেবে নিই এটা সবসময় আমার সঙ্গে হয়। কিন্তু এটা সত্যি নয়। আশেপাশে যারা আছে সবাইকেই জিজ্ঞেস করুন, প্রত্যেককেই জীবনের কোনও একটা পর্যায়ে প্রত্যাখ্যান স্বীকার করতে হয়েছে।

প্রত্যাখ্যান মানুষকে নতুন উদ্যমে কাজ করতে প্রেরণা জোগায় এবং বড়ো ক্যানভাসে কাজ করতে প্রেরণা দেয়। সুতরাং সব সময় ইতিবাচক চিন্তা রাখুন।

 

 

Studio Apartment-এর অন্দরসাজ

আমাদের সকলের একটা ধারণা আছে, ইন্টিরিয়র ডিজাইনিং কেবলমাত্র উচ্চবিত্তদের জন্য। ধারণাটা অংশত ঠিক, সবটা নয়। কারণ, একটা সময় ছিল যখন ইন্টিরিয়র ডিজাইনিং ছিল বিলাসিতা। সময় পালটেছে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের চিন্তাভাবনা, রুচিবোধও পালটেছে। সাজানো – গোছানো বাড়িতে থাকতে সবাই ভালোবাসে। সঙ্গতি না থাকায় বড়ো বাড়ির কনসেপ্ট বদলে এখন কেবল দুই বা তিন কামরার ফ্ল্যাটেই স্বর্গ গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেন মধ্যবিত্ত। ইন্টিরিয়র ডিজাইনারদের ভূমিকা হল আপনার স্বপ্নে দেখা একটি ছোট্ট সুন্দর, সাজানো ফ্ল্যাটকে বাস্তবে রূপায়িত করা।

কেউ কেউ তো শিফ্ট করেছেন স্টুডিয়ো অ্যাপার্টমেন্ট-এও। সামাজিক তথা অর্থনৈতিক চালচিত্রটা বদলে যাওয়াই এর মূল কারণ৷ এ যুগের তরুণ প্রজন্মের একা থাকার বা বড়োজোর সঙ্গীর সঙ্গে লিভ ইন করার প্রবণতা বাড়ছে৷ আবার দু-তিনজন বন্ধু মিলে একত্রে থাকার সিদ্ধান্তও নিচ্ছেন অনেকে৷ এসব ক্ষেত্রে একটা দু বা তিন কামরার  ফ্ল্যাটের পরিবর্তে চাহিদা বাড়ছে স্টুডিয়ো অ্যাপার্টমেন্ট-এর৷

এবার প্রশ্ন হল এই ধরনের অ্যাপার্টমেন্ট-এর অন্দরসাজ কেমন হবে?ধরে নেওয়া যাক এক নববিবাহিত দম্পতির দক্ষিণ কলকাতায় একটা ছোটো স্টুডিয়ো অ্যাপার্টমেন্ট আছে। ফ্ল্যাটের ফ্লোর প্ল্যানটা এইরকম– স্পেস-এর একদিকে লিভিং কাম ডাইনিং-এর ব্যাবস্থা, সঙ্গে লাগোয়া বারান্দা, একটি কিচেন, টয়লেট ও একটি বেড এরিয়া। বাজেট আশি হাজার থেকে এক লাখের মধ্যে।

এন্ট্রান্স

কথায় আছে ‘ফার্স্ট ইমপ্রেশন ইজ দ্য লাস্ট ইমপ্রেশন’ তাই এন্ট্রান্সটিকে সুন্দরভাবে সাজানো দরকার। ভালো একটা নেমপ্লেট ,সঙ্গে সেরামিকের সুন্দর কিছু টবে প্লান্টস্, একটা ওয়াল হ্যাঙ্গিং আপনার এন্ট্রান্সের গেট্আপ পালটে দেবে।

Studio apartment Decoration tips

লিভিং এরিয়া

ঢুকেই লিভিং এরিয়া। আলাদা ঘর না হলেও স্পেস-টা ওভাবেই প্ল্যান করা। আমাদের নব-দম্পতির পছন্দ লো সিটিং অ্যারেজমেন্ট। প্রথাগত সোফাসেট না রেখে আমরা যদি কম বাজেটে একটু অন্যরকম ভাবনাচিন্তা করি। কাঠের চৌকির সঙ্গে সবাই পরিচিত। সহজে পাওয়া যায়। দামেও কম। একটি সিঙ্গল চৌকি কিনে তার চারটে পায়া কেটে উচ্চতা কমিয়ে নিন। যে-কোনও লোকাল কাঠের মিস্ত্রি করে দেবে। এরপর উড্ প্রাইমারে একটু টারমাইট মিশিয়ে ভালো করে পেইন্ট করান। এতে যদি কাঠে পোকা থাকে তাহলে মরে যাবে অথবা আগামী দিনে পোকা লাগবে না। এরপর সাদা, কালো অথবা গাঢ় বাদামি পেইন্ট করে দিন, চমৎকার একটি ডিজাইন তৈরি। ডিভানে চার ইঞ্চি ফোম-এর ম্যাটরেস্ রেখে, তাতে সুন্দর বেডকভার ও রং ম্যাচ করে কিছু লুজ কুশন রাখুন, আপনার ডিভান হয়ে উঠবে আকর্ষণীয়।

ডিভানটা একটা দেয়াল ঘেঁষে রাখলে ভালো হয়। আরও একটি দেয়ালে কিছু ফ্লোর কুশন রেখে, সঙ্গে ব্যাক রেস্ট হিসাবে কিছু লুজ কুশন দিলে, আপনার কমপ্লিট একটা সেট তৈরি হয়ে যাবে। কুশন ও ডিভানের মাঝখানে যে- ছোটো জায়গাটা থাকবে, সেখানে একটা জলচৌকির উপর বাহারি ল্যাম্প শেড্, কিছু টুকিটাকি সাজানোর জিনিস রাখা যেতে পারে. তবে জলচৌকিটি অবশ্যই রং করে নেবেন।

Living room Decoration

লিভিং এরিয়াটা আলাদা করতে একটা ছোটো কার্পেট অথবা দরি (সুন্দর শতরঞ্চি) রাখা যেতে পারে। বাড়িতে পিতল অথবা কাঁসার হাড়ি (সাইজে বড়ো) থাকলে সেটা চকচকে করে মেজে নিয়ে, টেবিল বেস্ হিসাবে ব্যবহার করা যায়। যদি তা না থাকে তাহলে টেরাকোটার হাঁড়ি নিন, তাতে পেইন্ট করে,তার উপর কাচের টপ রাখতে পারেন। ভালো মলাটওয়ালা কিছু বই দু’ভাগে ভাগ করে কাচের টপের উপর রাখুন। তবে মনে রাখবেন কাচের টপটা যেন বেসের কানায় কানায় না বসে। বেসের থেকে যেন কিছুটা বেরিয়ে থাকে, তাহলে দেখতে ভালো লাগবে। ছোটো টবে কিছু প্লান্টস্, বা জন্মদিনে পাওয়া ব্রাসের ও ডোকরার কিছু টুকিটাকি অবশ্যই সেন্টার টেবিলকে সুন্দর করে তুলবে। একটা সেরামিকের পটে কিঠু রঙিন পাথর রাখলেও বা জলে ফুল ও ফ্লোটিং মোমবাতি দিলেও দারুণ দেখতে লাগবে৷

ঘরের রং হিসাবে নিউট্রাল কালার বেছে নেওয়াই ভালো। যেমন আইভরি, বেইজ ইত্যাদি। নিউট্রাল কালারের সঙ্গে সবরকম আসবাব মানিয়ে যায়। যদি গাঢ় রং পছন্দ থাকে তাহলে সেটা একটা দেয়ালে সীমিত রাখাই ভালো। না হলে ছোটো ঘর আরও ছোটো লাগবে। বাজারে দেড়শো-দু’শো টাকায় ভালো পর্দার কাপড় পাওয়া যায়। ঘরের রঙের সঙ্গে মিলিয়ে কিনে নিন। লিভিংরুমে জানালার দু’ধারে গাঢ় রঙের পর্দা দিয়ে মাঝখানে নেটের পর্দা দিন। তাতে আলো-বাতাস আসবে এবং দেখতেও ভালো লাগবে।

Dining area decoration

ডাইনিং স্পেস

ডাইনিং স্পেস প্রধান ফার্নিচার হল ডাইনিং টেবিল ও চেয়ার। আজকাল রট আয়রন, পিভিসি ও স্টিলের নানান ধরনের ডাইনিং সেট পাওয়া যায়। আপনার জায়গা অনুযায়ী  গোল সেট কিনে নিতে পারেন। লক্ষ্য রাখবেন ডাইনিং সেট রাখার পর চেয়ারের সামনে এবং পেছনে অন্ততপক্ষে এক ফুট জায়গা যেন থাকে। ডাইনিং এরিয়ার সাইডে একটি টেবিল, ফোল্ডিং তাক অথবা কিচেন ট্রলি থাকলে ভালো হয়। টেবিলে বাড়তি জিনিস রাখা যেতে পারে অথবা রান্নাঘর থেকে খাবার এনে ওই টেবিলের উপর রাখা যায়।

ডাইনিং এরিয়ার উপরে একটি ঝুলন্ত লাইট (পেনডেন্ট লাইট) জায়গাটিকে আলো-আঁধারে আরও আকর্ষণীয় করে তুলবে। দেয়ালে কিছু ছবি, ফল অথবা সবজির গ্রুপ করে লাগাতে পারেন। ছবি স্কোয়ার,রেক্ট্যাংগ্ল যা-ই হোক, তা সরল রেখা বরাবর দেয়ালে টাঙান। একই থিমের একই সাইজের ছবি লাগানো যেতে পারে কিন্তু ছবির ভিতরের রং যেন আলাদা হয়।

কিচেন এরিয়া

ছোটো কিচেন সবসময় পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকলে দেখতে ভালো লাগে। কিচেনে স্টোরেজ বেশি থাকা উচিত। কাজ হয়ে গেলে বাসনপত্র যাবতীয় জিনিস সহজেই যাতে স্টোরেজ-এর মধ্যে চলে যায়, এর ব্যবস্থা প্রথম থেকেই করে নেওয়া ভালো। বাজারে কম দামে সুন্দর সুন্দর পিভিসির স্টোরেজ পাওয়া যায়। যদি ওপেন স্টোরেজ হয় অর্থাৎ তাক, তাহলে রান্নার শেষে সবকিছু পরিষ্কার করে গুছিয়ে নিলেই হল। ওপেন শেলফ্-এ খরচ অনেক কম। তাকগুলি একটু ছোটো, বড়ো, মাঝারি সাইজের করে সাজালে ভালো লাগবে। লম্বা তাকের একঘেয়েমি কাটবে।

Decorating Bedroom

বেড স্পেস

বসবাস শুরু করার আগে যদি দু’জনে পরামর্শ করে ফার্নিচার কেনার সুবিধে থাকে, তাহলে কেবিন বেড অবশ্যই লিস্টে রাখবেন। এই বেডটিতে অনেক স্টোরেজ আছে এবং এটি ছোটো ফ্ল্যাটের একান্ত উপযোগী।  বেড স্পেস নানা ধরনের হয়, এটা সম্পূর্ণ নির্ভর করছে আপনি কীভাবে আপনার এটাকে দেখতে চান। সকালে আপনার বেডটিকে সুন্দরভাবে কুশন দিয়ে সাজিয়ে  রাখলে একটি অতিরিক্ত সিটিং এরিয়া হিসেবে ব্যবহার করা যায়। একটি ভালো দেয়াল  ঘড়ি কিছু থিম বেস্ড্ পেইন্টিং দিয়ে এই জায়গাটা সাজাতে পারেন।

বিশেষ টিপ্স

  • বাড়িতে পর্দা একটা খরচ। ছোটো-বড়ো সব মিলিয়ে অনেক পর্দা লাগে। সবটাই যে একমাসে করতে হবে তা নয়
  • বাড়ির গৃহসজ্জার জন্য আলাদা ভাবে বাজেট করলে সুবিধা হবে
  • বিভিন্ন দামের ড্রেপারি, রড্‌স্ ও ফিনিয়াল্স্ (রডের শেষে সুদৃশ্য মুখ) পাওয়া যায়। পছন্দসই কিনে নিলেই হল
  • কাচ, কাঁসা, পিতল ইত্যাদি জিনিস ঝকঝকে অবস্থায় দেখতে ভালো লাগে
  •  ইন্টিরিয়র ডিজাইনিং-এ প্রধান বৈচিত্র্য আনে রং।  সঠিক রঙের ব্যবহার আপনার অন্দরসজ্জায় এক নতুন মাত্রা এনে দেবে
  • বাড়ি সাজানোর পর বাড়ি মেনটেন করা খুবই প্রয়োজন। রুটিন করে রোজ কিছুটা সময় বাড়ি পরিষ্কার করলে ধুলো-বালি থাকবে না এবং বাড়ি সুন্দর দেখাবে

ঝটপট রান্নার চটপট রেসিপি

সবসময় যে তন্দুর আইটেম করতে হলে মাছ মাংস লাগবে, তেমন কিন্তু নয়৷ নিরামিষ উপকরণ দিয়েও অসম্ভব সুস্বাদু রান্না প্রস্তুত করা যায়, টেকনিক জানা থাকলে৷ আজ রইল তেমন তিনটি ডিশ, নিরামিষাশীদের জন্য৷

তন্দুরি বাগিচা

উপকরণ : ১৫ গ্রাম পনিরের টুকরো, ১২ গ্রাম আলু ২ টুকরো করা, ১৫ গ্রাম আনারসের টুকরো, ৩০ গ্রাম মাশরুম, ২৫ গ্রাম ফুলকপির টুকরো, ১০ গ্রাম টম্যাটো কিউব করা, ১০ গ্রাম পেঁয়াজ কিউব করে কাটা, ১০ গ্রাম ক্যাপসিকাম, ৬০ গ্রাম জল ঝরানো দই, ১ বড়ো চামচ খোলায় নাড়াচাড়া করা বেসন, ১/২ ছোটো চামচ দেগি মির্চ, ১/২ ছোটো চামচ গরমমশলাগুঁড়ো, ১/২ ছোটো চামচ জিরেগুঁড়ো, ১/২ চামচ চিনি, ১/২ ছোটো চামচ তন্দুরি চিকেন মশলা, নুন স্বাদমতো।

প্রণালী : একটা পাত্রে শুধু মশলাগুলো মাখিয়ে নিন। এই মিশ্রণ সবজি ও ফলের টুকরোয় মাখিয়ে আধঘন্টা রেখে দিন। এবার পরপর পনির, সবজি ও ফল শিকে গেঁথে ১০ মিনিট গ্রিল করুন। চাটমশলা ছড়িয়ে পরিবেশন করুন।

Mushroom Tikka Recipe

মাশরুম টিক্কা

উপকরণ : ২৫০ গ্রাম মাশরুম, ৪০ গ্রাম জল ঝরানো দই, ১/২ বড়ো চামচ খোলায় নাড়াচাড়া করা বেসন, ৫ গ্রাম সরষের তেল, ১/২ ছোটো চামচ রসুনবাটা, ১/২ ছোটো চামচ আদাবাটা, ৫ মিলিগ্রাম লেবুর রস, ১/২ ছোটো চামচ দেগি মির্চ, ১/২ ছোটো চামচ গরমমশলাগুঁড়ো, ১/২ ছোটো চামচ জিরেগুঁড়ো, ১/২ ছোটো চামচ জোয়ান, ১/২ ছোটো চামচ গোলমরিচগুঁড়ো, ১/২ ছোটো চামচ কসৌরি মেথি, নুন স্বাদমতো।

প্রণালী : একটা পাত্রে মাশরুম ছাড়া অন্য সব উপকরণ একসঙ্গে মিশিয়ে নিন। মাশরুম পরিষ্কার করে কেটে এই মিশ্রণ ভালো ভাবে মাখিয়ে ৪৫ মিনিট ম্যারিনেট করুন। এরপর প্রত্যেকটি মাশরুম শিকে গেঁথে ১০ মিনিট আভেনে গ্রিল করুন। ধনেপাতা ছড়িয়ে সার্ভ করুন।

Paneer tikka recipe

পনির টিক্কা

উপকরণ : ২৫০ গ্রাম পনির ছোটো টুকরোয় কাটা, ৪০ গ্রাম জল ঝরানো দই, ১/২ বড়ো চামচ খোলায় নাড়াচাড়া করা বেসন, ৫ গ্রাম সরষের তেল, ১/২ ছোটো চামচ রসুনবাটা, ১/২ ছোটো চামচ আদাবাদা, ৫ মিলিগ্রাম লেবুর রস, ১/২ ছোটো চামচ দেগি মির্চ, ১/২ ছোটো চামচ জোয়ান, ১/২ ছোটো চামচ জিরেগুঁড়ো, ১/২ ছোটো চামচ গোলমরিচের গুঁড়ো, ১/২ চামচ কসৌরি মেথি, নুন স্বাদমতো।

প্রণালী : একটা পাত্রে পনির বাদ দিয়ে আর সব সামগ্রী ভালো ভাবে মিশিয়ে নিন। পনিরের টুকরোয় মিশ্রণ মাখিয়ে ৪৫ মিনিট ম্যারিনেট করুন। এবার শিকে গেঁথে ৭-১০ মিনিট গ্রিল করুন। ধনেপাতা ছড়িয়ে প্লেটে সাজান।

বাড়ছে সিলভার সেপারেশন

‘বেলাশেষে’ ছবিটা যারা দেখেছেন, তারা অবাক হয়ে ভেবেছেন প্রৌঢ়ত্বে পৌঁছোনো ওই দম্পতি, বিবাহ বিচ্ছেদের কথা কীভাবে ভাবলেন! কিন্তু বাস্তবে আমাদের সমাজে ভাঙন বাড়ছে। বিশেষ করে দাম্পত্যে। শুধু সদ্য বিয়ে হওয়া যুগলদের মধ্যেই না, এ ঘটনা এখন ২৫ বছর পার করে দেওয়া দম্পতিদের ক্ষেত্রেও একইরকম সত্যি।

এক সত্য ঘটনায় দেখেছি, মধ্য চল্লিশের এক গৃহবধূকে এমন সিদ্ধান্ত নিতে। ঘটনাটা অত্যন্ত চমকপ্রদ। খুব কম বয়সে বিয়ে হয়ে স্বামীর ঘরে আসা এই মহিলা, প্রথম থেকেই তাঁর মদ্যপ স্বামীর নির্যাতনের শিকার। তাঁর পরিবারের অর্থাৎ বাপের বাড়ির অবস্থা এমন ছিল না যে, তারা মেয়েকে ফিরিয়ে নিয়ে যাবেন। ফলে স্বল্প শিক্ষিত এই মহিলা দিনের পর দিন মুখ বুজে এই নির্যাতন সহ্য করতে থাকেন। স্বামীর কামনার ফলস্বরূপ তিনি দুই সন্তানের জননীও হন। এরপর হঠাৎই এক দুঃসাহসী পদক্ষেপ নেন এই নারী, বিয়ের দশ বছরের মাথায়। তিনি নিজে গিয়ে বন্ধ্যাত্বকরণ করিয়ে আসেন। স্বামী জানতে পারলে তার উপর অত্যাচার করেন। স্বামী ক্রমশ ধর্ষক হয়ে ওঠেন, তাঁর পৌরুষত্বে ঘা লাগায়। কিন্তু সত্যিই নারীটির কিছু করার ছিল না। দুটি ছোটো ছোটো সন্তানকে মানুষ করাই তাঁর ব্রত হয়ে দাঁড়াল। সন্তানদের অস্বচ্ছলতার ও অনিশ্চয়তার জীবনে একেবারেই ঠেলতে চাননি ওই মহিলা।

দিন অতিবাহিত হল। সন্তান-সন্ততি বড়ো হল। তারা নিজের পায়ে দাঁড়ানোর পর, এবার ঘুরে দাঁড়ালেন মহিলা। দীর্ঘ ২৫ বছরের এই নির্যাতনের দাম্পত্য থেকে নিজেকে অব্যাহতি দেওয়ার সিদ্ধান্তে, বিবাহবিচ্ছেদের মামলা করলেন তিনি। এও এক জীবন– এও এক দাম্পত্য।

এমন ঘটনা নতুন নয়। তবে সবক্ষেত্রেই যে মেয়েরা যন্ত্রণার শিকার, তা নয়। পুরুষদের ক্ষেত্রেও এমন ঘটনা ঘটতে পারে। দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে স্ত্রী-র সন্দেহবাতিক সহ্য করার পর, আর পেরে না উঠে ডিভোর্স দিলেন, এমনই একজন পুরুষের কথাও জেনেছি।

দাম্পত্যের শুরুতে বোঝা যায়নি যে তাঁর স্ত্রী মানসিক বিকারগ্রস্ত। প্রথম প্রথম উনি ভাবতেন এটা নিছক পজেসিভনেস। স্বামী বাড়ি থেকে দফতরে রওনা হওয়া মাত্রই, স্ত্রী ফোন করে খোঁজ নেওয়া শুরু করতেন, স্বামী কোথায়, সঙ্গে কে আছে ইত্যাদি। প্রায় প্রতিদিনই বায়না ধরতেন কিছু কিনে আনার জন্য। স্বামী সেটা কিনে এনে দিলেও স্ত্রীর সন্দেহ, সঙ্গে কে ছিল এটা কেনার সময়? স্বামীর সমস্ত বন্ধুর স্ত্রী, স্বামীর মহিলা সহকর্মী, প্রতেককেই তিনি সন্দেহের চোখে দেখা শুরু করলেন। স্বামীর বোঝানোতে প্রথম প্রথম বুঝতেন, কান্নাকাটি করতেন, সাময়িক শুধরোতেন। কিন্তু আবার কিছুদিন পর থেকেই তার সন্দেহের উপসর্গ শুরু হতো।

দলবেঁধে কোথাও বেড়াতে গিয়েও স্বামীর শান্তি নেই। দলের কোনও না কোনও মহিলাকে নিয়ে টুর-এর মধ্যপথেই তার স্ত্রী প্রকাশ্যেই ঝামেলা অশান্তি শুরু করতেন।

এভাবেই ধৈর্য ধরে ভদ্রলোক ২৫-টি বছর কাটিয়ে, অবশেষে নিজের চাকরি থেকে ইস্তফা দিলেন এবং ঘোষণা করলেন তিনি বিবাহবিচ্ছেদ চান।

দুটি নর-নারীর সম্পর্ক একটি সরু সুতোয় বাঁধা থাকে। সে বন্ধন দৃঢ় হওয়া ভালো কিন্তু দমবদ্ধ করা নয়। এই ভারসাম্যটাই রক্ষা করতে পারেন না বহু দম্পতি। কেউ কেউ শিশুদের প্রতি অবিচার করে আগেই বিবাহ বিচ্ছিন্ন হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। কেউ আবার যন্ত্রণা সহ্য করেন বাচ্চারা বড়ো হওয়ার অপেক্ষায়। অনেক সময় বাচ্চাকেই সিদ্ধান্ত নিতে হয়– সে কার সঙ্গে থাকবে, বাবা নাকি মা।

কী কারণ এরকম বিচ্ছেদের, এমন একটা প্রশ্ন সবার মনেই আসা স্বাভাবিক। কখনও অতিরিক্ত পজেসিভনেস, কখনও সন্দেহ, কখনও স্বেচ্ছাচার বা দাম্পত্যে তৃতীয় ব্যক্তির উপস্থিতি– কারণ যাই হোক, সম্পর্কটা যখন কলুষিত হয়ে যায়, তখন আর সেটাকে টেনে হিঁচড়ে বহন করার কোনও যৌক্তিকতা নেই। বস্তুত একটি মানুষ যখন তার পার্টনারকে ভালোবাসে, তার মধ্যে এই বিশ্বাস জন্মায় যে, প্রতিদানে সে একইরকমের ভালোবাসা ফেরত পাবে। এর অন্যথা হলেই সেটা সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। পরিস্থিতি ক্রমশ অসহনীয় হয়ে ওঠে। একজন চায় তার চাহিদাপূরণ হোক, পরিস্থিতি তার ইচ্ছানুগ হোক, আর অন্য জন চায় এই পরিস্থিতি থেকে নিষ্ক্রমণের পথ। দাম্পত্যের দৈর্ঘ্য কোনও রেখাপাতই করে না কারও মনে।

সিলভার লাইন সেপারেশন-এর প্রবণতা বাড়ছে

লেখক পাউলো কোয়েলহোর মতে, যদি বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নিয়েই থাকেন, তাহলে পুরনো-কে মন থেকে বিদায় জানানো উচিত। না হলে এই ব্যথা সারাজীবন আপনাকে আনন্দের হদিশ পেতে দেবে না।

একটি রিপোর্টে দেখা গেছে ভারতে, এই ধরনের দীর্ঘ সময়ের দাম্পত্য কাটানো যুগলদের বিবাহবিচ্ছেদের হার গত ১২ বছরে দ্বিগুন হয়ে গেছে। সত্যি কথা বলতে কী, বিবাহবিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নেওয়া কোনও অপরাধ নয়।

যে-দাম্পত্য রোজকার অশান্তিতে অসহনীয় হয়ে উঠেছে, নিত্য তাতে দগ্ধানোর চেয়ে, বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া ভালো।

 Spending quality time even afterSeparation

সমাজ সিলভার সেপারেশন

দাম্পত্যের সিলভার জুবিলি পালন করার বদলে যখন সিলভার সেপারেশন-এর মুখোমুখি হতে হয়, তখন স্বাভাবিক ভাবেই জীবনের উপর একটা বড়োসড়ো ধাক্বা লাগে। সমাজ স্বাভাবিক ভাবে এটা গ্রহণ করে না। অন্যদিকে ছেলেমেয়েরা ততদিনে নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছে অথবা নিজেদের সামাজিক পরিচয় গড়ে নিয়েছে। তাদেরও সামাজিক জীবনে প্রভাব ফেলবে এই সিদ্ধান্ত। কিন্তু এসব সত্ত্বেও যদি আপনি মানসিক ভাবে প্রস্তুত থাকেন এই সিদ্ধান্ত নিতে, তাহলে দেরি করবেন না।

অনেক পরিবারেই এই ঘটনা ঘটছে। সব ক্ষেত্রেই যে সন্তানদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠছে এই সিদ্ধান্তে –এমন নয়। তাই নিজেকে যন্ত্রণা মুক্ত করতে যদি এই সিদ্ধান্ত নিতেই হয়, তাহলে সমাজের ভয় না পেয়ে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে নতুন করে বাঁচার কথা ভাবুন। আর বিচ্ছেদ মানেই যে মুখ দেখাদেখি বন্ধ করবেন দীর্ঘ দিনের সঙ্গীর সঙ্গে, তা-ই বা কেন হবে? সুস্থ একটা বন্ধুত্ব না হয় বজায় থাক৷ এতে সম্পর্কে একটা সমীহ বজায় থাকবে৷বিবাহ বিচ্ছেদের পরেও মাঝে মাঝে গোটা পরিবার মিলিত হোন৷ খানিকটা ভালো সময় কাটান তিক্ততা ভুলে৷ এতে আপনার সন্তান সন্ততিরাও ভালো থাকবে৷ দূরে থাকলেও পারস্পরিক সম্পর্ক সুস্থ ও সুন্দর হবে৷

উচ্ছিষ্ট

বর্ধমানে পৌঁছে রমেনের বাড়ি খুঁজে পেতে সীমার বিশেষ অসুবিধা হল না। গাড়ি থেকে নেমে বাড়ির দরজার দিকে পা বাড়াল ও। বাইরে থেকে ওকে ধীরস্থির, শান্ত মনে হলেও ভিতরে ভিতরে ওর মন অধীর হয়ে উঠছিল।

দরজা খুলে যে-মহিলা এগিয়ে এলেন, তাকে কোনওমতে একটা নমস্কার জানিয়ে সীমা জিজ্ঞেস করল, ‘রমেন কি বাড়িতে আছে?’

‘আপনি সীমা না?’ ভদ্রমহিলার মুখ-চোখ দেখে মনে হচ্ছিল সীমা যেন ওনার বহু দিনের পরিচিত।

‘হ্যাঁ, কিন্তু আপনি আমাকে চিনলেন কী করে?’

‘একবার উনি, মানে রমেন অফিসের কোনও ফাংশনের ছবি আমাকে দেখিয়েছিলেন, তাই মনে থেকে গেছে। চলুন ভিতরে চলুন।’ সীমার হাত ধরে মহিলা ওকে বাড়ির ভিতরে নিয়ে গেল।

‘আমি কে, আপনি নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন। আমি রমেনের স্ত্রী…।’

‘বন্দনা, তাই না?’ সীমা ওর কথার মাঝেই বলে উঠল, ‘আমিও আপনাকে চিনি। রমেনের ফ্ল্যাটে যে-ফ্যামিলি ফোটোগ্রাফটা লাগানো আছে, সেটাতে আপনাকে দেখেছি। ছবিটা এতবার দেখেছি যে মনের মধ্যে গেঁথে গেছে।’

সীমার কথায় কোনও প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে বন্দনা খুব সহজ ভাবে জিজ্ঞেস করল, ‘ওনার অসুস্থতার সম্পর্কে কী করে জানতে পারলেন?’

‘রমেন অফিসে আমার সিনিয়র। ওনার সঙ্গে ফোনে রোজ আমাকে কন্ট্যাক্ট রাখতে হয়। এখন ওনার শরীর কেমন আছে?’ সীমার উত্তরে কোনওরকম আড়ষ্টতা ছিল না।

‘আপনার এই প্রশ্নের উত্তর উনি নিজেই দেবেন। আমি ওনাকে ডেকে দিচ্ছি। আপনাকে কী দেব, চা না কফি? ঠান্ডাও খেতে পারেন।’

‘না-না। কফি হলেই চলবে।’

‘আপনি আমার সম্মানীয় অতিথি। ওনার অফিসের কারও সঙ্গে আমার কোনওদিন পরিচয় হওয়ার সুযোগ হয়নি, আপনিই প্রথম। সুতরাং অতিথি আপ্যায়নে আমি কোনও ত্রুটি রাখতে চাই না। আপনি বসুন, আমি ওনাকে পাঠিয়ে দিচ্ছি’, বলে বন্দনা হাসিমুখে ভিতরে চলে গেল।

সীমা এবার নিজের চারপাশে চোখ বুলোবার সুযোগ পেল। পরিপাটি ভাবে সজ্জিত ড্রয়িংরুম। চারপাশ গোছানো পরিষ্কার ঝকঝক করছে। ঘরের ডেকরেশনে গৃহিণীর সুরুচির ছাপ সর্বত্র।

বন্দনার ব্যক্তিত্বেরও তারিফ না করে পারল না সীমা। গায়ের রং শ্যামলা হলেও, যথেষ্ট সুন্দরী বলা চলে। দুই সন্তানের মা হয়ে যাওয়াতে চেহারাটা সামান্য ভারী হয়ে গেলেও, আকর্ষণ বিন্দুমাত্র কমেনি।

সীমা জানত, বন্দনার শিক্ষগত যোগ্যতা ক্লাস টেন পর্যন্ত। ও ধারণা করে নিয়েছিল স্বল্পশিক্ষিত অন্যান্য মহিলাদের মতোই বন্দনাও হয়তো ক্লান্ত শরীর নিয়ে সংসার সামলে গেঁয়োভূত হয়ে উঠেছে। অথচ সকাল সকাল বন্দনাকে যথেষ্ট আধুনিক সাজসজ্জায় এবং আত্মবিশ্বাসে ভরপুর দেখে সীমার মনে অনেক প্রশ্ন উঁকিঝুঁকি মারতে শুরু করল।

একটু পরেই রমেন এসে ঘরে ঢুকল। সীমাকে দেখে মুখে হাসি ফুটে উঠল তার। সীমার কাছে সরে এসে বলল, ‘তোমাকে আমার বাড়িতে দেখতে পাব কোনওদিন ভাবিনি। কালকে ফোনে কথা হল, বললে না কেন আজ এখানে আসবে তুমি?’

‘আমি বললে, তুমি আমাকে আসতে দিতে? কপট রাগ দেখিয়ে সীমা রমেনের হাতের উপর নিজের হাত রাখে।’

‘হয়তো না।’

‘সেই জন্যেই তো আগে থেকে তোমাকে কিছু জানাইনি, জাস্ট চলে এসেছি। এখন তোমার শরীর কেমন আছে?

‘গত দু’দিন জ্বরটা আর আসেনি, তবে অসম্ভব দুর্বল বোধ করছি।’

‘দেখতেও খুব দুর্বল লাগছে। আরও কদিন বরং ছুটি নিয়ে বিশ্রাম করো।’

‘না-না, আর নয়। সাতদিন হয়ে গেল কামাই করেছি, পরশু সোমবার জয়েন করব ঠিক করেছি। তোমার থেকেও দূরে আর থাকতে পারছি না।’

‘একটু আস্তে বলো’, রমেনের ঠোঁটে হাত রাখে সীমা, ‘তোমার বউ শুনতে পাবে। আচ্ছা একটা কথা জিজ্ঞেস করব?’

‘করো।’

‘আচ্ছা, বন্দনা কি আমাদের সম্পর্কের কথাটা জানে?’

‘জানে হয়তো তবে নিজের মুখে কখনও জিজ্ঞেস করেনি।’ কাঁধ ঝাঁকিয়ে অবহেলার ভঙ্গিতে বলে রমেন।

‘আমার সঙ্গে তো খুবই ভালো ব্যবহার করল। মনে তো হল না, আমার উপর ওর কোনও রাগ বা বিদ্বেষ আছে বলে। কী জানি হয়তো…’, চুপ করে গেল সীমা।

‘সীমা, তুমি আমার কলিগ এবং পরিচিত, আর সেই জন্যই ও তোমার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করবে না এবং করার সাহাসও ওর নেই। তুমি এখানে আমার বাড়িতে পুরো সেফ। বন্দনাকে নিয়ে কোনওরকম টেনশন করার দরকার নেই’, সীমার গালে আলতো করে একটা টোকা মেরে রমেন সামনের সোফাতে গিয়ে বসল।

অফিসের কাজকর্ম সম্পর্কে কথাবার্তা হতে হতে বন্দনা ট্রে নিয়ে ঘরে ঢুকল। কফি আর জলখাবারের ডিশ ট্রে থেকে তুলে টেবিলে রেখে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে উদ্যত হল।

‘আপনিও আমাদের সঙ্গে বসে কফি খান’, সীমা বন্দনাকে ওদের সঙ্গে বসতে অনুরোধ জানাল কিন্তু বন্দনা সামান্য হেসে রান্নাঘরে কাজ আছে বলে ঘরের বাইরে চলে গেল।

কথা বলতে বলতে সীমা একপ্রকার বন্দনার কথা ভুলেই গেল। ভালোবাসার মানুষটাকে এতদিন পর সামনে পেয়ে সীমার মনের অপরাধবোধটাও এক মুহূর্তে মন থেকে মুছে গেল। বন্দনাও খালি কাপ প্লেটগুলো একবার এসে তুলে নিয়ে গেল কিন্তু তারপর ওই ঘরে ও আর পা মাড়াল না।

বছরখানেক আগে নতুন অফিসে জয়েন করার পর রমেনের সঙ্গে সীমার প্রথম পরিচয় হয়। রমেনের চেহারা এবং ব্যক্তিত্বের আকর্ষণে সীমা নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখতে পারে না। রমেন বিবাহিত জেনেও শরীর মন রমেনের কাছে সমর্পণ করে। সীমার এই সম্পর্কের কথা ওর মা-বাবার কানেও পৌঁছোয়। ওর বাবাই একদিন ওকে আলাদা করে ডেকে জিজ্ঞেস করেন, ‘রমেনের সঙ্গে তোমার সম্পর্কটা ঠিক কীরকম একটু জানতে পারি?’

‘বাবা আমার এখন ৩৫ বছর বয়স। রমেনকে আমি ভালোবাসি। ঠিক সময়ে তোমরা যখন আমার বিয়ে দিতে পারোনি তখন আমার চিন্তা করা ছেড়ে দাও। তোমরা যদি রমেনের সঙ্গে সম্পর্ক ত্যাগ দেওয়ার জন্য জোর করতে থাকো, আমি বাইরে কোথাও নিজের থাকার ব্যবস্থা করে নেব।’ সীমার পরিষ্কার জবাবের পর ওর মা-বাবাও বিষয়টি নিয়ে মেয়ের সঙ্গে আলোচনা করাই ছেড়ে দেন।

বহুদিন অবিবাহিত থাকার পর সীমাও ঠিক করে নিয়েছিল ও আর বিয়ে করবে না। কিন্তু একা জীবন অতিবাহিত করা অতটাও সহজ নয়। এদিকে রমেনও নিজের পরিবারের থেকে দূরে একলা শহরে থাকতে থাকতে নিজেকে নিঃসঙ্গ মনে করতে থাকে। ফলে উভয়ের প্রথম পরিচয় হতেই একে অপরের প্রতি আকর্ষিত হয়ে পড়ে।

রমেনের প্রতি তীব্র আকর্ষণ সীমার নীরস জীবনটাকেই পুরো বদলে দেয়। প্রেমটা অবৈধ জেনেও অজানা এক আকর্ষণে সীমা বাঁধা পড়তে থাকে। ধীরে ধীরে সীমার মনে আরও কিছু পাওয়ার স্বপ্ন জোরালো হতে শুরু করে।

একদিন অফিস শেষে দুজনে রমেনের ফ্ল্যাটে চলে আসে। সীমাকে চুপচাপ দেখে রমেনই জানতে চায়, ‘কী ব্যাপার, আজ এত চুপচাপ কেন?’

‘রমেন আমি তোমার সঙ্গে লিভ ইন করতেও রাজি আছি, যদি তুমি সেটাই চাও। কিন্তু বিয়ে করে জীবন কাটাবার আলাদা একটা আনন্দ যেমন আছে তেমনি সম্পর্কটাতে একটা সম্মানও আছে।’

‘তুমি রাজি থাকলে আজই আমি তোমাকে বিয়ে করে নিতে চাই’, সামান্য কৗতুকমিশ্রিত কণ্ঠে রমেন উত্তর দেয়। সীমা একটু গম্ভীর হয়, ‘এটা করা মানে তো নিজেকেই ঠকানো।’

‘তাহলে বিয়ের কথা তুলছ কেন?’

‘আমার মনের ইচ্ছা তোমার কাছে বলব না তো কাকে বলব?’ সীমা রমেনকে বোঝাবার চেষ্টা করে।

রমেনও একটু সিরিয়াস হয়, ‘সবই তো বুঝলাম কিন্তু আমাদের বিয়ে করাটা সম্ভব নয়, সেটাও তো তুমি ভালো করেই জানো।’

‘তুমি সত্যিই আমাকে মন থেকে ভালোবাসো তো?’ সন্দেহ উঁকিঝুঁকি দেয় সীমার মনে।

‘অবশ্যই’, সীমার মন থেকে সন্দেহ দূর করতে রমেন সীমার ঠোঁটে  চুম্বন এঁকে দেয়।

‘তুমিই সবসময় বলো, বন্দনা তোমার স্ত্রী হলেও, আমাকেই তুমি মন থেকে চাও। এটা তো সত্যি, তাই না?’

‘হ্যাঁ। বন্দনা আমার দুই সন্তানের মা। ও খুব সরল মনের মেয়ে কিন্তু নিজের স্ত্রী-র মধ্যে যে-ধরনের ব্যক্তিত্ব আমি দেখতে চাই, বন্দনার মধ্যে সেটার অভাব রয়েছে। মা-বাবার পছন্দ মতন আমার বিয়ে করা কখনওই উচিত হয়নি। কিন্তু বন্দনার দেখাশোনা করাটা এখন আমার একটা কর্তব্য ছাড়া আর কিছুই নয়’। মনের কথা খুলে বলতে পেরে রমেন অনেকটা সহজবোধ করে। অনেকদিন ধরেই সীমা চাইছিল ও যেন বন্দনাকে ডিভোর্স দিয়ে দেয়।

‘কিন্তু তাহলে আমার কী হবে? আমাদের খুশির জন্যেও তুমি বন্দনা-কে ডিভোর্স দেবে না?’ আহত বাঘিনির মতো সীমা রমেনের মুখোমুখি হয়।

‘না, দেব না। এই কথা নিয়ে তুমি এরপর আর কোনওদিন আমাকে প্রেশার দিও না। বন্দনা আমাকে ছেড়ে যেতে চাইলে আলাদা কথা, কিন্তু ওকে ডিভোর্সের প্রস্তাব দেওয়া মানে আমি নিজের চোখে নিজেই ছোটো হয়ে যাব। কারণ ও আমাকে ছাড়া আর কিছুই জানে না। ওর পৃথিবীটা আমাকে ঘিরেই ও তো তোমার মতো সাবলম্বি নয়। বিনা দোষে ওকে আমি এই শাস্তি কিছুতেই দিতে পারব না। সেটা অন্যায় হবে’।

রমেনের কঠোর স্পষ্ট উত্তর দেওয়ার ভঙ্গিতে সীমা আর কথা বাড়াবার সাহস পেল না। কিন্তু মনে মনে সীমা সেদিনই ঠিক করে নিয়েছিল, বন্দনার সঙ্গে তাকে একবার দেখা করতেই হবে। কারণটা অবশ্য সীমারও ঠিকমতো জানা ছিল না কিন্তু যাকে সে চোখে দেখেনি তার চরিত্র এবং ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে জানার এক অদম্য কৗতহূল সীমাকে সেদিন গ্রাস করেছিল। হয়তো মনে মনে সীমা চেয়েছিল বন্দনা নিজে থেকেই রমেনকে ছেড়ে চলে যাক এবং এই ইচ্ছাটাকে কার্যকরী করার লক্ষ্যেই রাস্তা খুঁজে বার করতে সীমা, রমেনের খোঁজ নেওয়ার বাহানা করে ওদের বর্ধমানের বাড়িতে গিয়ে উপস্থিত হয়েছিল।

বন্দনা-কে দেখে সীমারও মনে হল ও খুব সরল, শান্ত স্বভাবের মেয়ে। সীমার প্রতি কোনও রাগ বা বিদ্বেষ বন্দনার ব্যবহারে প্রকাশ না পাওয়ার ফলে, সীমাও মনে মনে ওর প্রতি বিরূপ মনোভাব কিছুতেই পোষণ করতে পারল না। বরং মেয়েটা-র প্রতি একটা মায়া অনুভব করল সীমা।

রমেনকে সীমা ভালোবাসে ঠিকই কিন্তু নিজের স্ত্রী-র সঙ্গে ওর ব্যবহার কেমন যেন অদ্ভুত মনে হল সীমার। সীমার জায়গায় অন্য কেউ হলে এই অদ্ভুত ব্যবহারের জন্য শুধুমাত্র রমেনকেই দোষারোপ করত, এটা সীমাও অস্বীকার করতে পারল না।

নিজের বাড়িতে রমেন খোলাখুলি ভাবেই সীমার সঙ্গে গল্পে মেতে উঠল। ওর ব্যবহারে কোনও আড়ষ্টতা প্রকাশ পেল না। বন্দনা বাড়িতে থাকা সত্ত্বেও রমেন সীমার হাতটা নিয়ে নিজের হাতে চেপে ধরে ওর সঙ্গে গল্পে মেতে উঠল।

বন্দনা হঠাৎ যদি এই অবস্থায় ওদের দেখে ফেলে, এই ভয় বোধহয় সীমারই খালি ছিল, রমেনের নয় কারণ রমেনের ব্যবহারে সেটাই বারবর প্রকট হয়ে উঠছিল। গল্পের মাঝে হঠাৎই রমেন, সীমাকে নিজের কাছে টেনে নিয়ে ওর ঠোঁটে নিজের ঠোঁট চেপে ধরতেই সীমা ঘাবড়ে গেল!

‘কী করছ রমেন? বন্দনা যদি এই অবস্থায় আমাদের দেখে ফেলে তাহলে অ্যাটলিস্ট আমি খুব লজ্জা পাব’, সীমাকে সত্যিই খুব নার্ভাস মনে হচ্ছিল।

‘রিল্যাক্স, সীমা’, রমেনকে খুব স্বাভাবিক মনে হল। ওকে এই ব্যাপারটা নিয়ে এতটুকু চিন্তা করতে সীমা দেখল না। ‘আমি তোমাকে মন থেকে ভালোবাসি সীমা। তুমি ভেবো না যে তোমাকে মাধ্যম করে আমি আমার কামনা-বাসনা মেটাচ্ছি। তোমার কাছ থেকে এতদিন যা পেয়েছি, বন্দনার কাছ থেকে সেটা কোনও দিন পাইনি, সেই আনন্দ একমাত্র তুমিই আমাকে দিয়েছ সীমা।’

‘কিন্তু তাও… এখানে, বন্দনার উপস্থিতিতে… ওর বাড়িতে আমাকে আদর করছ– এটা আমার কাছে অত্যন্ত অস্বস্তিকর। রমেন… প্লিজ ছারো’, আকুতি জানায় সীমা।

‘ঠিক আছে, আমি হাত সরিয়ে নিচ্ছি। কিন্তু একটা ব্যাপার তুমিও খেয়াল রেখো…।’

‘কী ব্যাপার রমেন?’

‘বন্দনাকে ভয় পাওয়ার কোনও কারণ নেই। ও যদি কোনওদিন আমাকে প্রেশার দেওয়ার চেষ্টা করে তাহলে আমি ওকে ছেড়ে তোমাকে বেছে নেব’। রমেনের কথার মধ্যেই ওর মনোভাব স্পষ্ট ভাবে সীমার কাছে ধরা দেয় যেটা সীমা অ্যাপ্রিশিয়েট করে ঠিকই কিন্তু মনের একটা কোণায় অস্বস্তির অনুভূতি সীমাকে মানসিক ভাবে চঞ্চল করে তোলে।

হঠাৎ-ই সীমার মনে হয় বন্দনার সঙ্গে কথা বলাটা খুব দরকার। বন্দনার ব্যক্তিত্ব, ওর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যগুলো জানার অদম্য ইচ্ছা সীমাকে পেয়ে বসে। বন্দনার সঙ্গে কথা না বলা পর্যন্ত রমেনকে ওর থেকে দূর করার কোনও রাস্তা সীমার খুঁজে পাওয়া সম্ভব নয়।

বন্দনাও আর একবারের জন্যেও বসার ঘরে ওদের সামনে আসেনি। রমেন-ই বলল রান্নাঘরে দুপুরের খাবার বানাতে ও ব্যস্ত রয়েছে। অথচ সীমার কেন জানি না মনে হল, বন্দনা ইচ্ছে করেই ওদের থেকে নিজের দূরত্ব বজায় রাখছে। ব্যস্ততার ব্যাপারটা শুধু একটা বাহানা মাত্র।

বন্দনা ওদের সঙ্গে একসঙ্গে খেতেও বসল না। সীমা ওকে অনেক জোর করল একসঙ্গে খাওয়ার জন্য কিন্তু ও কিছুতেই খেল না।

‘বন্দনা সব সময় আমার খাওয়া শেষ হলে তবেই খেতে বসে। তুমি শুরু করো, ও পরে খেয়ে নেবে’, বন্দনার তোয়াক্বা না করেই রমেন সীমার প্লেটে খাবার তুলে দিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।

সীমা খেয়াল করল, প্রত্যেকটা খাবার রমেনের পছন্দের বানিয়েছে বন্দনা এবং প্রত্যেকটি পদই অত্যন্ত সুস্বাদু।

‘রান্না কেমন হয়েছে সীমা?’ বন্দনার উপস্থিতিতেই রমেন সীমাকে প্রশ্ন করল।

‘দারুণ হয়েছে’, সীমার উত্তরে পরিষ্কার বোঝা গেল খাবার খেয়ে সীমা অত্যন্ত তৃপ্ত।

‘বন্দনা সত্যিই দারুণ রান্না করে। সেইজন্যই তো ওজন কিছুতেই কম করতে পারছি না।’

সীমা খেয়াল করল, রমেনের মুখে নিজের প্রশংসা শুনে বন্দনার মুখ রাঙা হয়ে উঠল। ওর দু’চোখে রমেনের জন্য অন্ধ ভালোবাসা ঝরে পড়ার সাক্ষী হয়ে থাকল সীমা।

বন্দনা যে রমেনকে প্রচন্ড ভালোবাসে এবং হয়তো রমেনকে ডিভোর্স দিতে ও কখনও রাজি হবে না, এই ভয়টা হঠাৎ-ই সীমাকে কেন জানি পেয়ে বসল। তার মন অশান্ত হয়ে উঠল।

খাওয়া-দাওয়া শেষ করে রমেন এসে ড্রয়িংরুমের ডিভানে লম্বা হয়ে শুয়ে পড়ল। খানিকক্ষণ পরেই ওর নাক ডাকার শব্দে সীমা মনে মনে না হেসে পারল না। কিছুক্ষণ অপলকে ওর মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে সীমা সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। ওর গন্তব্য রান্নাঘর।

বন্দনা-কে দুটো প্লেটে খাবার বাড়তে দেখে সীমা কৗতূহল চাপতে পারল না, ‘আপনি ছাড়াও আরও কেউ খাবার খেতে বাকি আছে নাকি?’

‘হ্যাঁ, এই অন্য প্লেট-টা আমার বান্ধবী রুনার’, বন্দনা জানলা দিয়ে পাশের বাড়ির দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করল, ‘ও পাশেই থাকে।’

‘আপনার বান্ধবী এখানে এসে খাবে না?’ আশ্চর্য হয়ে সীমা জিজ্ঞেস করল।

‘না, আমার বড়ো ছেলে বাবলু প্লেট-টা ওর বাড়ি দিয়ে আসবে।’

‘আপনার দুই ছেলেকে তো দেখলাম না, ওরা বুঝি বাড়িতে নেই?’ সীমা প্রশ্ন করে।

‘ছোটোটার জ্বর হয়েছে, ঘরে শুয়ে আছে। বাবলু-কে আমি ডাকছি। সকাল থেকে ও রুনার বাড়িতেই রয়েছে, একবারও বাড়ি আসেনি।’

পিছনের দরজা খুলে বন্দনা ছেলের নাম ধরে ডাকতেই, বাবলু ছুট্টে রুনার বাড়ি থেকে বেরিয়ে এল।

মায়ের আদেশ মতো সীমাকে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করল। খুব সাবধানে বন্দনা, রুনার জন্য বাড়া থালাটা বাবলুর হাতে ধরাতেই, ও সঙ্গে সঙ্গে আবার রুনার বাড়ির দিকে পা বাড়াল।

‘আপনার ছেলেটি তো খুব মিষ্টি এবং খুবই কাজের’, সীমাকে

প্রশংসা করতেই হল।

‘রুনা-ও ওকে প্রচণ্ড ভালোবাসে… মায়ের মতো। বাবলুই লাভবান, কারণ দু’জন মায়ের ভালোবাসা একসঙ্গে পাচ্ছে ও’, শান্তস্বরে সীমার চোখের দিকে তাকিয়ে বন্দনা কথাগুলো বলল।

খাবার ঘরের পাশেই, বারান্দায় তিন-চারটে চেয়ার পাতা ছিল, বন্দনা প্লেট নিয়ে ওখানেই বসল। সীমাকেও ইশারায় পাশে বসতে অনুরোধ করল। একটা নিঃস্তব্ধতা ওদের ঘিরে ধরল, কারও মুখেই কথা নেই। সীমাই প্রথম নিঃস্তব্ধতা ভঙ্গ করল।

‘রুনার বুঝি কোনও সন্তান নেই?’

‘ও-তো বিয়েই করেনি… আপনার মতোই বিয়ে করবে না বলে মনস্থির করেছে। প্রত্যেকটি মেয়েরই মনে মমতা ভরা থাকে এবং স্বাভাবিক ভাবেই মাতৃহূদয়ও থাকে। রুনা তো বাবলুকেই নিজের ছেলে মনে করে, ওর প্রতি রুনার ভালোবাসার অন্ত নেই’, হাসিমুখে জানায় বন্দনা।

কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থাকে সীমা। কী বলবে ভেবে পায় না। মনে মনে কিছুট সাহস সঞ্চয় করার চেষ্টা করে। হঠাৎ-ই নিঃস্তব্ধতা ভঙ্গ করে ও, ‘সত্যিই আমিও ভেবেছিলাম কোনওদিন আর বিয়ে করব না কিন্তু এখন আমি এমন মানুষকে খুঁজে পেয়েছি যার সঙ্গে আমি সারাটা জীবন কাটাতে চাই। এই ব্যাপারে আমি আপনার সঙ্গে কথা বলতে চাই।’

বন্দনার কানে সীমার কথাগুলো ঢুকেছে কিনা সীমা ঠিক বুঝতে পারে না কারণ বন্দনার পরের কথাগুলো ঠিক সীমাকে কেন্দ্র করে নয় বরং বাবলু আর রুনার সম্পর্কটা নিয়ে। আনমনা হয়েই বন্দনা বলতে থাকে, ‘রুনা-কে কতবার বলেছি একটা বিয়ে করতে কিন্তু ও কিছুতেই কথা শুনতে চায় না। সবসময় বলে, বিয়ে না করেই বাবলুর মতন একটা মিষ্টি ছেলেকে যখন সন্তান হিসেবে পেয়েছি, তখন মিছিমিছি একটা অজানা লোককে বিয়ে করে নিজের স্বাধীনতা কেন নষ্ট করব। আমার বাবলু যে ওর বার্ধক্যের অবলম্বন হতে চলেছে এই বিশ্বাস ওর মনে একেবারে গেঁথে গেছে।’

‘বন্দনা, রমেনের সঙ্গে এক বছরেরও বেশি আমার পরিচয়। ওর সঙ্গে দেখা হওয়ার পরেই আমার জীবনে খুশি ফিরে এসেছে, নয়তো এই একাকীত্ব আমায় আত্মহত্যাপ্রবণ করে তুলত। সীমা বন্দনার বলা কথাগুলোকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করেই যেন বলতে থাকে।

‘রুনার জীবনে আমার বাবলুই খুশির আলো নিয়ে এসেছে। রোজই প্রায় রুনা ওর জন্য গিফ্ট নিয়ে আসে।’

সীমাও নাছোড়বান্দা। ও গলার স্বর সামান্য বাড়িয়ে বলে, ‘রমেন আর আমার সম্পর্কটা বন্ধুত্ব দিয়ে শুরু হয়েছিল ঠিকই কিন্তু এখন অনেক গভীরে পৌঁছে গেছে এই সম্পর্ক। এখন আমরা একে অপরকে ভালোবাসি’। যেন কিছুটা অগ্রাহ্য করার ভঙ্গিতেই।

বন্দনা উদাস হয়ে যায়। দূর দিগন্তে নিজের দৃষ্টি প্রসারিত করে বলে, ‘জানেন, আমার ছেলের মন জেতার জন্য রুনা ওকে প্রচুর লোভ দেখায়। প্রচুর টাকা খরচ করে প্রায়শই রেস্তোরাঁর খাবার নিয়ে আসে বাবলুর জন্য। ছেলেটার বাইরের খাবারে এতটাই অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে যে বাড়ির খাবার এখন আর ওর মুখে রোচে না।’

‘বাবলুর কথা ছেড়ে রমেন সম্পর্কে কেন আপনি আমার সঙ্গে কথা বলছেন না?’ সীমা বিরক্ত হয়ে ওঠে।

আশ্চর্য, বন্দনা সীমার ব্যবহারে এতটুকু বিচলিত হয় না বরং সীমার কাঁধে হাত রাখে যেন সীমা ওর খুব ভরসার পাত্রী, ‘রুনা একদম রান্না করতে পারে না। ওর রান্নাঘর খালিই পড়ে থাকে। অথচ বাবলু যদি ওর নিজের ছেলে হতো তাহলে কি ও এই দায়িত্ব এড়িয়ে যেতে পারত? নিজের হাতে নিজের ছেলেকে রান্না করে খাওয়ানো-টা কি তখন ওর বোঝা মনে হতো?’

‘নিজের সন্তানের ইচ্ছে পূরণ করাটা কোনও মায়ের কাছেই বোঝা হতে পারে না।’

‘যাকে আমরা ভালোবাসি, তার খুশির জন্য কিছু করা কখনওই বোঝা হতে পারে না। রুনা-তো প্রায় রোজই আমাকে প্রেশার দিতে থাকে যে ও বাবলুকে অ্যাডপ্ট করতে চায়।’

‘এই বিষয়ে আপনার কি মতামত, বন্দনা?’ বন্দনা মুখে সামান্য হাসি টেনে এনে বলতে লাগল, ‘প্রসবযন্ত্রণা সহ্য না করেই কি কেউ যথার্থ অর্থে মা হতে পারে। সংসার সামলানোর ঝক্বি থেকে শুরু করে যে-কোনও পরীক্ষার সম্মুখীন হওয়ার শক্তি, নিজে কষ্ট সহ্য করে সন্তানের সুখ-সুবিধার খেয়াল রাখার ইচ্ছে একমাত্র মায়েরই থাকে –কোনও মাসিপিসি বা জেঠি, কাকিমার থাকে না এত কষ্ট করার ইচ্ছে।’

‘হ্যাঁ, আপনি ঠিকই বলেছেন। আমিও এখন নিজের একটা সংসার পাতার…’

বন্দনা সীমা-কে কথার মাঝেই থামিয়ে দিয়ে কিছুটা গম্ভীর হয়ে যায়। বলে, ‘আমার বাবলুকে রুনা যতই ভালোবাসুক, বাবলু কিন্তু আমার সন্তানই থাকবে… বিশ্ব-সংসার ওকে আমার ছেলে বলেই জানবে। রুনার, বাবলুর পিছনে এত টাকা খরচ করা, বাবলুর ওর বাড়িতে এত যাতায়াত করা ইত্যাদি কিন্তু একটা ‘সত্যি’ কখনও বদলাতে পারবে না যে, বাবলু আমার সন্তান। একটা কথা আপনাকে জিজ্ঞেস করতে পারি?’

‘হ্যাঁ, নিশ্চয়ই’, সীমা নিজেও একটু গম্ভীর হয়ে যায় কারণ প্রথমবার ওর মনে হয় বন্দনা, বাবলু আর রুনার সম্পর্কটার ব্যাপারে ওর কাছে কিছু জানতে চাইবে।

‘আমি যদি কোনও উপায় না পেয়ে আমার বাবলুকে রুনার হাতে তুলে দিই, তাহলেও কি সত্যি সত্যি রুনা ওর মা হয়ে যাবে? সন্তানকে জন্ম দেওয়ার আনন্দ ও কি করে বুঝবে? আমাকে কাঁদিয়ে ও কি জীবনে সুখী হতে পারবে?’ বন্দনার দুই চোখ হঠাৎই জলে ভরে ওঠে।

সীমা একটা গভীর নিঃশ্বাস ফেলে, ‘আপনাকে কষ্ট না দিয়ে কি রুনা আপনার বাবলুকে পেতে পারবে আর আপনার বান্ধবী হিসেবে রুনার বাবলুকে দত্তক নেওয়ার ইচ্ছে মন থেকে ত্যাগ করা উচিত। আমারও এখানে আসাটা উচিত হয়নি। আপনার ব্যক্তিত্বর সঙ্গে পরিচিত হওয়ার পর আমার মন আরও অশান্ত হয়ে উঠেছে।’

বন্দনা সীমার হাত নিজের হাতে তুলে নেয়। ভারী গলায় বলে, ‘সীমা, আপনি আমার ছোটো বোনের মতো তাই নিজের মনের কথা আপনার কাছে খুলে বলছি। আমার কাছে আমার সন্তান, স্বামী এবং

সংসার ছাড়া ভালোবাসার আর কেউ নেই। রমেনকে ছাড়ার কল্পনা করাটাও আমার কাছে অসহনীয়।

আমি জানি আমার থেকে আপনাকে বেশি চায় রমেন। এটা আমার জন্য ঠিক নয়। রমেনের সুখ-সুবিধা সবকিছুর খেয়াল অথচ আমিই রাখি। ও নিজের ছেলেদের প্রাণের থেকে বেশি ভালোবাসে। ওদের জন্যই বাড়ির সঙ্গে ওর যোগাযোগ রয়েছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। আর এই সত্যিটা আমার মনকে গভীর নিরাপত্তা এবং একইসঙ্গে গভীর আনন্দও দেয়।’

‘আপনাকে দেখে যতটা সরল এবং সাদাসিধে মনে হয় আপনি মোটেও ততটা নন। আপনার সঙ্গে এক মিনিটও আর থাকা আমার পক্ষে সম্ভব নয়’, হঠাৎই চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ায় সীমা।

বন্দনা নির্লিপ্ত ভাবে জবাব দেয়, ‘আপনি যদি আমার মনের ভিতরে ঢুকতে পারতেন তাহলে আমার উপর রেগে না গিয়ে আমাকে সহানুভূতি দেখাতেন। আমার উপর দয়া হতো। স্বামীকে ভালোবেসেও, ভালোবাসা না পাওয়ার দুঃখ, হাজার চেষ্টা করেও আমি ভুলতে পারি না।

রমেন আর বাবলুর মধ্যে একটা মিল খেয়াল করেছেন কি? নিজেদের চাহিদা পূরণ করার জন্য আমার স্বামী আপনার সঙ্গে আর ছেলে রুনার সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করে নিয়েছে। কিন্তু এই বাড়ির সঙ্গে সম্পর্ক ত্যাগ করার জন্য কেউ ইচ্ছে প্রকাশ কখনও করেনি।

দোকানের খাবার বাবলুর স্বাস্থ্যের জন্য খারাপ জেনেও ছেলের খুশির জন্য আমি চুপ করে থাকি। রমেনের আপনাকে ভালো লাগে, এই নিয়ে আমিও কোনওদিন রমেনের কাছে নালিশ জানাতে যাব না। আমার মৃত্যু খালি পারবে ওদের সঙ্গে আমার সম্পর্ক ছিন্ন করতে।

যে-কোনও পরিস্থিতিতেই আমি রমেনের সঙ্গে ভালো ভাবে মনে আনন্দ বজায় রেখে থাকতে পারব কিন্তু রুনা বা আপনি এই সম্পর্কটা-কে টিকিয়ে রেখে কী আদৗ লাভবান হতে পারবেন? ওর সন্তান বা আপনার যদি একজন সঙ্গীর প্রয়োজন তাহলে আপনারা নতুন করে কেন শুরু করছেন না? অপরের উচ্ছিষ্ট যতই সুস্বাদু হোক না কেন, সেটা খাওয়ার কী খুব দরকার আছে?’

নিরুত্তর সীমা দাঁড়িয়ে বন্দনার অশ্রুসজল মুখের দিকে খানিকক্ষণ তাকিয়ে থাকে। ঠিক এই মুহূর্তে তার মনে হতে থাকে বন্দনার ওই ব্যক্তিত্বের জোরের কাছে, তার সমস্ত আধুনিকতা, বেপরোয়া ভাব, সবই কেমন যেন ফিকে হয়ে গেছে। বন্দনা একটা বিশেষ তারে ঘা দিয়েছে, যা তার মাথার কোশগুলোকে নাড়িয়ে দিয়েছে। সত্যি কি সে কোনওদিন সম্পূর্ণ ভাবে পাবে রমেনকে? উত্তরটা এই মুহূর্তে তার মতো করে কেউ জানে না। সীমা দরজার দিকে পা বাড়ায়। রমেন তখনও নিশ্চিন্তে সোফায় ঘুমোচ্ছে দেখে, ওকে না জাগিয়েই সীমা নিজের পার্সটা সোফা থেকে তুলে দরজা দিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসে।

মনে মনে, রমেনের সঙ্গে অবৈধ সম্পর্কটা থেকে বেরিয়ে আসার সিদ্ধান্তটা আরও দৃঢ় হতে থাকে সীমার মধ্যে।

দেশভক্ত

স্কুল থেকে এসে ব্যাগটা খাটে ছুড়ে দিয়ে এনসিসি-র ড্রেসটা খুলতে থাকে উপল। মা পেছন থেকে এসে বলে, ওই ঘেমো জামাকাপড়গুলো বিছানায় তুলবি না, যত রাজ্যের নোংরা লেগে আছে।

উপল ঘেমো শরীরেই মাকে জড়িয়ে ধরে, জানে মা এতে আরও বেশি রেগে যায়। মা-র এই রাগটুকু উপল উপভোগ করে, পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হয়ে নিলেই মা খুশি। গরিবের সংসারে পঞ্চব্যাঞ্জন না হোক, শাকপাতা দিয়ে মা যা রান্না করে, তাই উপলের অমৃত লাগে।

দেরি না করে কলপাড়ে হুড়োহুড়ি করে স্নানটা সেরে নেয় উপল। দুষ্টুমি করে চাতালে বসে থাকা কাকটাকে ভিজিয়ে দেয়। কা কা করে উড়ে কাকটা প্রতিবাদ করে যায়।

মা রান্নাঘরের দাওয়ায় বসে উপলের সুন্দর, সুঠাম চেহারা দেখে! ছেলেটা দেখতে দেখতে বড়ো হয়ে গেল। শরীরচর্চায় খুব উত্সাহ, পুলিশ বা মিলিটারিতে যাওয়ার ইচ্ছে আছে। সবসময় বলে, দেশের জন্য কিছু করর, লড়াইয়ে ময়দানে সামনের সারিতে থাকব। ছেলের এরকম ইচ্ছেতে মায়ের মন সায় দেয় না। তবে বড়ো হচ্ছে, ওর মতকেও তো গুরুত্ব দিতে হবে।

গত বছর, পাড়ার ক্লাবের পাশের ঝিলে একটা ছেলে ডুবে যাচ্ছে শুনে, এক ডাকে বেরিয়ে গেছিল, গিয়ে দ্যাখে আশেপাশের লোকেরা ঘিরে মজা দেখছে, কারুর নামার সাহস হচ্ছে না। উপল এক লাফে জলে নেমে, খাবি খেতে খেতেও ওকে উদ্ধার করে এনেছিল।

স্কুলের শারীরশিক্ষার শিক্ষক দীপেনবাবু উপলকে বিশেষ স্নেহ করেন। উপলের সততা, সুন্দর ব্যবহার আর টিম স্পিরিট সকলের নজর কাড়ে। বিবেকানন্দ মিশন স্কুলের দশম শ্রেণির ছাত্র উপল, স্যারদের ডান হাত। কোনও কাজেই পিছপা হয় না। কারও বিপদ শুনলে ওইটুকু ছেলে ঝাঁপিয়ে পড়ে।

চন্দনা ওদের ক্লাসের ফার্স্ট গার্ল। উপল যা যা পারে, চন্দনা তা পারে না বলে উপলের ওপর ওর বাড়তি আগ্রহ। উপলের বোন আইরিন একই স্কুলে ক্লাস ফাইভে পড়ে। দাদা যে সকলের প্রিয়, এতে ওর প্রচ্ছন্ন গর্ব আছে। চন্দনা ক্লাসের অন্য ছেলেদের কাছে ঘেঁষতে দেয় না। কিন্তু উপল কিছু বলুক, একবার বললেই করে দেবে।

মাধ্যমিকে উপল টায়-টায় ফার্স্ট ডিভিশন পেল, চন্দনার সবেতেই লেটার মার্কস। আরও ভালো স্কুলে একাদশে ভর্তি হতে পারত। বেচারি, উপলের জন্য একই স্কুলে রয়ে গেল।

কৈশোর অতিক্রম করে উপলের ব্যাপারে চন্দনার আগ্রহ এখন নিখাদ ভালোবাসায় পরিণত হয়েে। কীসে উপলের ভালো হয়, পড়াশোনায় ওকে কতটা সাহায্য করা যায় এসবই চন্দনার ধ্যানজ্ঞান। উপল স্কুলের ফুটবল, ক্রিকেট দলের সদস্য, পাড়ার ক্লাবে জিমও করে, লক্ষ্য এখনও পর‌্যন্ত স্থির। চন্দনা চায় উপল পড়াশোনা করে শিক্ষকতা বা ব্যাংক-এ চাকরি করুক। তবু উপলের পছন্দের উপর প্রভাব খাটাতে পারে না। যাহোক দুটো বছর একসঙ্গে পড়াশোনা করবে, চন্দনার কাছে এই-ই অনেক।

চন্দনা বিজ্ঞান নিয়েে, উপল কমার্স। টিউশনির ব্যস্ততা চন্দনার অনেক বেশি, তাও নিয়ম করে উপলের খোঁজ নেয়। বাংলা, ইংরেজি তো ওদের দুজনেরই আছে। যত প্রশ্নোত্তর চন্দনা তৈরি করে, নোটস সব উপলকে দেয়। মনের আশা, ওগুলো পড়ে যদি উপল একটু ভালো রেজাল্ট করে।

এদিকে পাড়ায় ব্লাড ডোনেশন ক্যাম্প হোক কিংবা কোথাও রিলিফ দেওয়ার ব্যাপার সবার আগে হাজির উপল। মা মনে মনে ভাবে, তাদের মতো ছাপোষা সংসারে ছেলেটা যেন কেমন অন্যরকম। সারাদিনের খাটাখাটনির পর, ক্লান্ত শরীরে উপলের বাবার আর কিছু ভাবার ক্ষমতা থাকে না। এভাবেই দিন গড়িয়ে চলে।

উপলদের পাড়ায় এক বৃদ্ধ দম্পতি আছেন, উপল তাঁদের দাদু-ঠাকুমা বলে ডাকে। কদিন আগে ঠাকুমা পড়ে গিয়ে আর উঠতে পারেন না। কে তুলবে? কে নিয়ে যাবে? উপল হাজির ঠাকুমার সেবায়। প্লাস্টার করিয়ে আনা, রোজকার নিত্যকর্মে সাহায্য করা, এমনকী রান্না করে খাওয়ানো অবধি, উপল একাই করেছে।

মা-র মনে মনে শংকা হয়, এত উদার, এত ভালো ছেলে। কোনও স্বার্থপরতা ওকে স্পর্শ করেনি। যেন দেবতা, মানুষ নয়!

ঠাকুমা তো সুস্থ হয়ে সে কথা জনে জনে বলেন, আমার নিজের ছেলে-বউ,

নাতি-নাতনিরা খোঁজ নিল না। এই প্রাণটুকু কে বাঁচালে? ওই তো উপল।

দেখতে দেখতে দুবছর অতিক্রান্ত হল উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা সামনে। চন্দনার অভিভাবকরা চান ও ডাক্তারি পড়ুক, তাই এসময় তার চাপটা একটু বেশি। উপল যথা পূর্বং তথা পরং। সবকিছুর সঙ্গে মানিয়ে ওর পড়াশোনা।

পরীক্ষার রেজাল্ট বেরোনোর পর দেখা গেল, উপল টেনেটুনে ফার্স্ট ডিভিশন আর চন্দনা সবেতে লেটার পেয়েছে। উপল জানে চন্দনা ডাক্তারিতেও চান্স পাবে। ওর দিক থেকে চন্দনাকে দখল করে রাখার কোনও চেষ্টা নেই। সময় গড়িয়ে যা হবার হবে, আগে ওর লক্ষ্যপূরণ।

দেশের-দশের কাজ করার সুযোগ আছে, এমন একটা চাকরি পাওয়া খুব জরুরি। পুলিশ, মিলিটারি দুইয়েই প্র‌্যাক্টিক্যাল পরীক্ষা খুব কঠিন হয়, উপল জানে। শরীরকে তৈরি রাখতে হয়, কতজন দৌড়ানোর ট্র‌্যাকে অজ্ঞান হয়ে যায়। তবে, স্নাতক হয়ে পরীক্ষাগুলো দেবে, তাহলে সুযোগও বাড়বে।

চন্দনা এখন কলকাতা মেডিকেল কলেজের স্টুডেন্ট, মাঝে মাঝে উপল ওকে কলেজেও পেঁছে দেয়। চন্দনার বাবা-মা-ও উপলকে মেনে নিয়েেন, ওর সততা, সুন্দর ব্যবহারের জন্য। উপলের মায়ের অবশ্য আশংকা, অমন মেধাবী মেয়ে তার সাধারণ ছেলেকে শেষ অবধি বিয়ে করবে তো? মায়ের চিন্তা ছেলে যেন কোনও ভাবে দুঃখ না পায়। তবে সাদাসিধে চন্দনাকে ভালোও লাগে। মেযোর সরলতা সবাইকে মুগ্ধ করে। সবচেয়ে বড়ো কথা, এই পরিবারের ওপর ওর টান, যেন এটা ওর নিজেরই পরিবার।

উপল সিটি কলেজে যায়, কলেজ টিমের হয়ে ইন্টারকলেজ কম্পিটিশনে খেলে।

লং-জাম্প-এ ডিস্ট্রিক্ট চ্যাম্পিয়ন। কলেজ মিটে কলকাতা কমিশনিয়ারেট-এর কর্তাব্যক্তিরা উপলের শারীরিক সক্ষমতার প্রশংসা করে, ওকে চাকরির প্রস্তাবও দেয়।

উপল মেঘ না চাইতে জল পায়, খুশি হয়ে আইরিনের জন্য ফ্রক আর বাড়ির জন্য মিষ্টির প্যাকেট নিয়ে ঘরে ঢোকে। মা মিষ্টি হাতে নিয়ে চোখের জলে ভাসেন। খুশি হবেন নাকি দুঃখ পাবেন, বুঝে উঠতে পারেন না। আইরিন নতুন ফ্রক পেয়ে তিড়িংবিড়িং করে লাফাতে থাকে। মায়ের পীড়াপীড়িতে চন্দনাকে কলেজ ফেরত আসতে বলে, একসঙ্গে খাওয়াদাওয়া করে সেলিব্রেট করবে বলে।

 

পার্ট-টু পরীক্ষার রেজাল্ট বেরোতে উপল কলকাতা পুলিশের ট্র‌্যাফিক গার্ডে সার্জেন্ট হিসেবে জয়ে করে। নিয়মমাফিক সব শারীরিক পরীক্ষা উপলকেও দিতে হয়। চন্দনা অবশ্য তেমন খুশি নয়। তারা যখন ঘরে আরাম করবে, উপলকে তখন রোদে গরমে ডিউটি করতে হবে। মনে মনে ভাবে আরও পড়তে পারত। মুখে কিছু বলে না। ওর আনন্দের সঙ্গে তার নিজের আনন্দকে মিলিয়ে নিতে হবে, এতেই তার সুখ।

চাকরিসূত্রে উপলকে কলকাতা চষে বেড়াতে হয়। শুধু ইন্টার অফিস মিট থাকলে খেলার জন্য ছাড় পায়। কখনও গার্ডেনরিচ তো কখনও বেহালার রাস্তায় ট্র‌্যাফিক সামলাতে দেখা যায় তাকে। বেনিয়ম করে গাড়ি দাঁড় করানো, কি ঘুস নেওয়া, এসবে দেখা যায় না উপলকে। চাকরি জগতেও তার বিরল স্বভাবের নিদর্শন চলতে থাকে। চন্দনা এমবিবিএস ফাইনাল দেবে এ বছর, হাজার ব্যস্ততাতেও উপলের খবর রাখে। ওর ক্ষমতায় যতটুকু কুলায় পরামর্শ দেয়।

সেদিন হেদুয়ার সামনে ডিউটি করছিল উপল। উলটো দিকে বেথুন থেকে কলেজ ফেরত মেযো বেরোচ্ছিল। রাস্তায় দাঁড়িয়ে তিন রোমিও ওদের দিকে বিশ্রী অঙ্গভঙ্গি করছিল। উপলের ব্যাপারটা নজরে আসে। ডিউটির পোশাকে সরাসরি মারধর তো করতে পারে না। গিয়ে ধমক দিয়ে এলাকা ছাড়া করেছিল ছেলেগুলোকে। তখনকার মতো চলে গেলেও,ওরা উপলকে পরে দেখে নেবে বলে শাসিয়ে ছিল।

উপলের কষ্ট হয় এই ভেবে, যে আইরিনও তো দুদিন পরেই কলেজ যাতায়াত করবে আর এইসব ইভটিজারদের খপ্পরে পড়বে। এরা মেয়েের নূ্যনতম সম্মানটুকু করে না, এরা কি আমাদের দেশের পরম্পরা, ঐতিহ্য জানে? কোন ধাতু দিয়ে গড়া, নরকের কীট সব!

চন্দনাকে ফোনে ওইদিনের অভিজ্ঞতা শেয়ার করায়, ওর ভয় দ্বিগুন হল। এমনিতেই উপলকে নিয়ে সবসময় ভয়ে ভয়ে থাকে। উপল চন্দনার মধ্যে ওর মায়ের ছায়া দ্যাখে। সকলের স্বাভাবিক চলাফেরা নিশ্চিন্ত করার জন্য, পুলিশের যে বিশেষ ভূমিকা আছে, ওকথা অস্বীকার করার উপায় নেই। চোখের সামনে অপরাধ দেখে যে চুপ করে বসে থাকা যায় না, তা চন্দনাকে বোঝাতে পেরেছিল।

উপল জোর করে বাবাকে ভিআরএস নেওয়া করিয়েছে। সংসারের পুরো দাযিত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েে। আইরিনকে অনেক দূর পড়ানোর স্বপ্ন দ্যাখে। পরদিন পুলিশ মিট উপলক্ষ্যে ধানবাদ যেতে হবে। আজকে নাইট ডিউটি কলেজ স্ট্রিটে। পরদিন রাতে ধানবাদ যাওয়ার ট্রেন। বিকেলে চন্দনার সঙ্গে দেখা করে নিতে হবে। দু-তিন দিনের জন্য বাইরে গেলে এটা উপলের আবশ্যিক কর্তব্যের মধ্যে পড়ে।

চন্দনাকে বাড়িতেই ডেকে নিল উপল। চন্দনার এ বাড়িতে যাতায়াত এখন স্বাভাবিক ব্যাপার। চন্দনা এল। একটা গোলাপি রঙের সালোয়ার কামিজ পরেছে। আজ কেন যেন উপলের দুচোখ ভরে চন্দনাকে দেখতে ইচ্ছে করছে। চন্দনা অবাক হয় উপলের এই আবেগ দেখে।

মায়ের বানানো লুচি তরকারি দিয়ে দুজনে বিকেলের জলখাবার সারে। দুজনেই হাক্লান্ত, ক্ষিদেও পেয়েছিল বেশ। খেয়ে নিযে উপলের চুলের গোছা নেড়ে দিয়ে চন্দনা বেরোল। বারবার পেছন ফিরে দেখছিল। বেরোনর আগে, ধানবাদ পৌঁছে খবর দেওয়ার কথা বলেছিল। চন্দনা চলে যেতে, আইরিনকে কটা অঙ্ক বুঝিয়ে রাতের ডিউটিতে যাওয়ার জন্য তৈরি হয়ে নিল উপল।

 

মা আজ পাড়ায় কীর্তন শুনতে যাবেন। তাও ছেলের কাচা পোশাক, সবকিছু গুছিয়ে দিলেন। কী মনে হতে উপল ঢিপ করে মাকে একটা প্রণাম করে নিল। সংসার চালানোয় মায়ের নিপুণতা উপলকে মুগ্ধ করে। চন্দনাকে ঘিরেও স্বপ্নের বীজ বোনে। বড়ো শ্রীমযী চন্দনা, অফুরন্ত ভালোবাসা দেয় তাকে।

আজ ডিউটিতে উপল ছাড়াও আরও দুজন সার্জেন্ট আছে। রাতের রাস্তা আস্তে আস্তে ফাঁকা হচ্ছে, ভারী গাড়ির আনাগোনা এসময় বেশি। দুজন সঙ্গী কাছের দোকানে চা খেতে গেল। উপল সতর্ক চোখে তাকিয়ে আছে। হঠাত্, ওকি!

বাইকের পেছনে একজন তরুণী, চালাচ্ছে এক যুবক। পাশে একটা গাড়ি থেকে বাইকটাকে ডিসটার্ব করা হচ্ছে। তরুণীর ওড়নাটাকেও টেনে ধরেছে।

গাড়িটাকে দাঁড় করাল উপল। ভেতর থেকে মদ্যপদের খিস্তি, খেউড় ভেসে আসছে। ওরা নেমে এসে উপলের ওপর চড়াও হল। চারজনে মিলে লাগাতার মেরে চলেছে ওকে। একা অভিমনু্য় যেন জগতের সব লাঞ্ছনা মুছে দিতে চাইছে। নাক দিয়ে রক্ত ঝরছে, পা ভেঙে গিয়েে, কেউ সাহায্য করতে এগিয়ে আসছে না। এমনকী, যে-বাইকআরোহীদের বাঁচাতে সে এগিয়েিল, তারাও না। উপলের দৃষ্টি ক্রমশ ঝাপসা হচ্ছে। চোখের সামনে ভাসছে চন্দনার মুখ, কানে বাজছে আইরিনের দাদা ডাক, মায়ের কাতরতা। কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের অভিমনু্যর মতোই ক্ষতবিক্ষত, রক্তস্নাত হয়ে পথেই পড়ে রইল সে।

সঙ্গী দুজন ফিরে আসার আগেই শয়তানগুলো পালিয়েে। পুলিশের গাড়িতে চলেছে ভারতমাতার সাহসী সন্তান। নারী লাঞ্ছনার প্রতিবাদে যে নিজের প্রাণটাই বাজি রেখেছে। কাছাকাছি কলকাতা মেডিকেল কলেজে নিয়ে যাওয়া হল উপলকে। ডিউটি নার্স ওকে দেখেই চমকে উঠলেন। কারণ চন্দনার সঙ্গে উপলকে আগে দেখেছেন আর ও যে পুলিশে আছে সে কথাও জানেন।

ওয়ার্ডবয়ে সাহায্যে দ্রুত ট্রমা কেয়ারের আইসিইউতে নিয়ে চললেন। এক ফাঁকে ফোনে চন্দনাকে সব জানালেন। ডাক্তারি শপথ কি আর প্রিয়জনদের ক্ষেত্রে খাটে? আবেগ কি প্রশমিত করা যায়? চন্দনাও পারল না, শোকে মূর্ছিতাপ্রায় হয়ে বান্ধবীদের সঙ্গে এসে পৌঁছোল। ওর স্যারেরাও জান-প্রাণ লড়িয়ে দিলেন। প্রশাসনিক মহল থেকেও বিশেষ তত্পরতা দেখা গেল। ঘটনাস্থলে প্রচুর ব্লিডিং হয়েিল। তাই অরগ্যানস-এ, বিশেষ করে মাথায় অক্সিজেনের ঘাটতি এমন পর‌্যায় পৌঁছেছে যে, কোনও ওষুধই ঠিকমতো কাজ করছে না। উপল গভীর কোমায় চলে যাচ্ছে। উপলের আত্মীয়পরিজনেরাও এসেছেন ওর মাকে সামলানোর জন্য।

দৈনন্দিন জীবনে যে-যার সমস্যায় ব্যস্ত থাকে কিন্তু বিপদ এলে রক্তের সম্পর্ককে উপেক্ষা করা যায় না। ডাক্তারির অভিজ্ঞতায় চন্দনাও বুঝতে পারছে, শেষের সে ক্ষণ আসন্ন। আগামী চিরবিচ্ছেদের আশঙ্কার মধ্যেও ওর চোয়াল শক্ত হয়, রাস্তার গুন্ডাগুলোর কথা ভেবে। আইসিইউ-এর কাচের বাইরে উপলের দিকে স্থির চোখে তাকিয়ে আছে চন্দনা।

চোখের সামনে অদৃশ্য পর্দায় ভেসে উঠছে তাদের ছোটোবেলা, কৈশোর ও যৌবনে একসঙ্গে কাটানো মুহূর্তগুলো। ভেতরে নদীর পাড় ভাঙা টের পাচ্ছে, কেমন জীবন হবে তার উপলকে ছাড়া? মাসিমা, আইরিনকেই বা কীভাবে সামলাবে? ভাবনার ছন্দপতন হল বোস স্যার কাঁধে হাত রাখলেন, হি ইজ নো মোর মাই চাইল্ড, বলে মাথা নীচু করলেন।

ওরা উপলকে ঢেকে দিচ্ছে, এক ছুটে ঢুকল চন্দনা। শেষবারের মতো উপলের চুলে বিলি কেটে দিতে হবে না! ও তো সব দুঃখ, কষ্ট, যন্ত্রণা, অপমান থেকে বহুদূরে আরামে ঘুমোতে যাচ্ছে।

স্কুল জীবনের বন্ধুবান্ধবরাও অনেকে খবর পেয়ে এসেছে, চন্দনার সঙ্গে সঙ্গে থাকছে। শোকেরও তো সুযোগ নেই! পোস্টমর্টেম না হলে তো বডি দেবে না। চন্দনার বাবা-মাও আছেন, সবারই বাড়ি ফেরা স্থির হল। পরদিন আসতে হবে।

চোখের জলে ভেসে, বাবা-মার কাঁধে ভর দিয়ে চন্দনা বেরিয়ে আসে তার রোজকার ফেরার করিডর দিয়ে যে-করিডরে উপলও অনেক দিন তাকে সঙ্গ দিয়েে। মাসিমাকে দূর থেকে দেখতে পায়, উপলের মামাদের সঙ্গে। ওদের দাযিত্ব তো উপল তার ওপরে ছেড়েই অকালে বিদায় নিল।

পরদিন কাচের গাড়িতে উপল চলল সেইসব রাস্তা দিয়ে যে-রাস্তায় একনিষ্ঠতার সঙ্গে ডিউটি করেছে সে। পেরিয়ে যায় ওর কলেজ, থানায় গার্ড অফ অনার নিয়ে চলল পঞ্চভূতে লীন হতে।

চন্দনা মাসিমার সঙ্গে সেঁটে আছে, আইরিনই দাদার মুখাগ্নি করল। ইলেকট্রিক চুল্লির অন্ধকারে মিলিয়ে গেল, আলোকিত এক প্রাণ তার সমস্ত জাগতিক সম্ভাবনা নিয়ে চন্দনা চোখের জল মুছে শক্ত হল। তার এখন অনেক কাজ। প্রথম কাজ হল উপলের ওপর ঘটে যাওয়া জঘন্য অপরাধের প্রতিবিধান করা। প্রশাসন কী কী পদক্ষেপ করছে, তার ওপর কড়া নজর রাখবে সে। সঙ্গে উপলের চাকরির জায়গার পাওনা-গন্ডা পরিবার ঠিকমতো পাচ্ছে কিনা দেখা। ডিউটিরত অবস্থায় যখন ঘটনা ঘটেছে, তখন বিশেষ ক্ষতিপূরণও মাসিমা পাবেন।

খবর এল অপরাধী চারজন ধরা পড়েছে, তবে জেল-আদালতে চক্কর কাটা ছাড়া তো কোন সুরাহা হবে না। চন্দনা ওর এক বান্ধবীকে আইরিনকে পড়াবার দাযিত্ব দিয়েে। সবকিছুর মাঝে উপলের তার বোনকে ঘিরে দেখা স্বপ্নটা নষ্ট না হয়ে যায়। আদালতে সাক্ষ্য দেওয়ার লোকই তো পাওয়া যাচ্ছে না! এক চলমান শহরে, ছুটে চলে যাওয়া সাক্ষীদের কোথায় পাওয়া যাবে?

ওদিকে অপরাধী পক্ষ, সমাজে প্রভাবশালী হওয়ায়, টাকা ছড়িয়ে মিথ্যে সাক্ষী ধরে ধরে নিয়ে আসছে। চন্দনা ওর নেটওয়ার্ককে কাজে লাগিয়েে, ওই বাইকআরোহী আর মেযোকে খুঁজে বার করার জন্য। প্রাইভেট ডিটেক্টিভও লাগিয়েে। পুলিশ চেষ্টা করছে কিন্তু চন্দনা ভরসা রাখতে পারছে না। প্রভাবশালীদের হস্তক্ষেপে যদি খোঁজার আন্তরিকতা না থাকে। আদালতে সরকারি উকিল ছাড়াও ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় ভালো উকিল ঠিক করে রেখেছে।

নিজস্ব নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ওই বাইকআরোহী আর মেযোর খোঁজ পেয়েে। একদিন লুকিয়ে দেখা করতে গেল। বুঝিয়ে বলল, উপলের মা, বোনের কথা। তার নিজের দুঃখের কথা। মেযো লজ্জা, অপমান, অনাগত আশংকায় কিছুতে রাজি হচ্ছে না সাক্ষ্য দিতে। চন্দনা অনেক চেষ্টা করল, ওর বিবেককে জাগ্রত করার। শেষে সব পরিস্থিতি চন্দনা সামলাবে, পুলিশও পাশে থাকবে এসব বলে যখন ফিরছে দূর থেকে দেখল ওই বাড়িতে কারা যেন ঢুকছে।

পরদিন অপরাধীদের সনাক্তকরণ প্যারেডে আনা হল, ম্যাজিস্ট্রেটের কক্ষে। গোপন জবানবন্দিতে মেযো জানাল, অপরাধী বলে যাদের আনা হয়েে তাদের সে চেনে না। কোনও দিন দেখেনি আর ঘটনার সময় ঘটনাস্থলে ভালো আলো ছিল না বলে, পরিষ্কার ভাবে সে কিছু বোঝেনি। তাকে যেন ভবিষ্যতে আর বিরক্ত করা না হয়।

শেষ আশাও বিফলে যাওয়ায় চন্দনা মাথা নীচু করে বসে আছে। এ সময় ওর কাঁধে কে হাত রাখল। আরে আইরিন! নিঃশব্দে কাঁদছে আইরিন। শক্ত করে ধরেছে চন্দনার হাত। সব আশ্বাস যেন ওই হাতেই আছে। আইরিনের মধ্যেই যেন উপলকে দেখতে পেল চন্দনা।

স্টাইলিংয়ের পর চুলের বিশেষ যত্ন

শুধু উৎসব কেন, সারাবছরই মহিলারা তাদের সৌন্দর্যের ব্যাপারে অতি সচেতন। উৎসব, অনুষ্ঠান, পার্টি, অফিস কিংবা কলেজ– যেখানেই যান না কেন, নিজেকে প্রেজেন্টেবল করে তুলতে হবে। সেই দৌড়ে ত্বক আর চুলের চাকচিক্য একটা বড়ো ভূমিকা গ্রহণ করে। তবে মহিলারা বরাবরই তাদের চুলের ব্যাপারে একটু বেশিই যত্নশীল। একরাশ ঘন কালো চুলের কনসেপ্ট বদলালেও, বদলায়নি চুলকে নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা এবং নানান হেয়ারস্টাইল করার হিড়িক। আর সময়ের সঙ্গে পা মেলাতে রকমফের স্টাইলিং করতে গিয়েই যত বিপত্তি।

চুলকে মানানসই শেপ দিতে ব্যবহার করা হচ্ছে নানা প্রকারের ক্ষতিকারক রাসায়নিক উপকরণ, স্ট্রেটনার, ড্রায়ার, ব্লোয়ার এবং অ্যালকোহল জাত স্প্রে। তাছাড়া বায়ুদূষণ, ধুলো, ময়লা এবং রোদের আলট্রাভায়োলেট রে-র প্রকোপ তো রয়েইছে। ফলস্বরূপ চুল হয়ে উঠছে নিষ্প্রাণ, জেল্লাহীন। শুধু তাই নয় অতিরিক্ত জেল বা বারবার চুল কালার করার ফলে চুল সাদা হয়ে যাচ্ছে। এছাড়া অ্যালোপেসিয়া-রও শিকার হচ্ছেন কিছু কিছু মহিলা। এমনকী টাক পড়ার প্রবণতাও দেখা যাচ্ছে। যদি স্ট্রেটনার, ড্রায়ার, ব্লোয়ার বা রাসায়নিক জাতীয় উপকরণ ব্যবহার করতেই হয়, সেক্ষেত্রে কিছু বাড়তি সাবধানতা অবলম্বন আবশ্যক।

১) চুল ভালো রাখার প্রথম শর্তই হল পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা। যদি আপনি নিয়মিত চুল না পরিষ্কার করেন সেক্ষেত্রে চুলের গোড়া দুর্বল হয়ে পড়বে এবং অতিমাত্রায় হেয়ারস্টাইলিং উপকরণের ব্যবহার সেই সমস্যা আরও বাড়িয়ে দেবে। তাই চুল সুস্থ রাখতে হলে ডিপ কন্ডিশনিং অত্যন্ত প্রয়োজনীয় তত্ত্ব। এতে নিষ্প্রাণ, শুষ্ক চুলও সুরক্ষিত থাকবে এবং জৌলুষ ফিরে পাবে।

২) ভিটামিন এ, ফলিক অ্যাসিড, ভিটামিন বি-কমপ্লেক্স, প্রোটিন এবং ক্যালশিয়ামের মতো সাপ্লিমেন্টস্, চুলের জন্য দারুণ উপযোগী। যদি আপনার চুল পাতলা হতে শুরু করে, তাহলে অবিলম্বে ভালো কোনও ডার্মাটোলজিস্ট-এর পরামর্শ নিন।

৩) ড্রায়ার যত কম ব্যবহার করা যায়, ততই ভালো। বরং প্রথমে ভিজে চুলে তোয়ালে জড়িয়ে জল টানিয়ে নিন। বাকিটা পাখার হাওয়ায় শুকোন। সময়ের অভাবে যদি ড্রায়ার ব্যবহার করতেই হয়, তাহলে ড্রায়ার দিয়ে চুল শুকানোর আগে অ্যালোভেরা জেল অবশ্যই লাগান। যে-কোনও অন্য জেল যেখানে স্টাইল বদলানোর জন্য আদর্শ, সেখানে অ্যালোভেরা জেল স্টাইলিং-এর পাশাপাশি সুরক্ষাও প্রদান করে।

৪) ব্লোয়ার ব্যবহারের ফলে স্ক্যাল্পের রোমছিদ্র খুলে যায়। যার কারণে ধুলো-ময়লা অনায়াসেই প্রবেশ করে চুলের গোড়া দুর্বল করে তোলে।

৫) অ্যালকোহল অথবা অন্যান্য হানিকারক রাসায়নিক স্টাইলিং প্রোডাক্টস্-ও চুলের ক্ষতিসাধন করে। সম্ভব হলে এসব এড়িয়ে প্রাকৃতিক উপকরণেই ভরসা রাখুন।

৬) হেয়ার কালারের ব্যাপারে কমবেশি সকলেরই দুর্বলতা রয়েছে। কিন্তু মনে রাখবেন অ্যামোনিয়া কিংবা সিলিকন যুক্ত কালার আর অ্যালকোহল যুক্ত কালার চুলের জন্য মোটেই যথোপযুক্ত নয়। কারণ এর ব্যবহারে খুশকি, চুলকুনি এমনকী চুল পড়ার মতো সমস্যার কবলেও পড়তে হয়।

৭) চুলের পুষ্টির কথা খেয়াল রাখুন। এর জন্য নিয়মিত স্ক্যাল্প এবং চুলে ঈষদুষ্ণ অলিভ অয়েল, নয়তো নারকেল তেল দিয়ে মাসাজ করুন। এতে চুলের আর্দ্রতা বজায় থাকবে। কিন্তু একটা কথা মাথায় রাখবেন, অতিরিক্ত তেলও চুলের ক্ষতিসাধন করতে পারে। সেক্ষেত্রে সপ্তাহে একদিনই তেলের ব্যবহার যথোপযুক্ত। সারারাত মাথায় তেল লাগিয়ে রাখার দরকার পড়ে না, ২-৩ ঘন্টাই যথেষ্ট। সঙ্গে মিনিট দশেক হালকা মাসাজ করতে পারলেই বাজিমাত।

৮) চুলের গ্রোথের জন্য স্টেম সেল থেরাপি, পেপ্টাইড থেরাপি, এলইডি থেরাপি এবং রিজুভিনেশন অরেঞ্জ লাইট থেরাপি দারুণ কার্যকর। এগুলি চুলে পুষ্টির যোগান দেওয়ার পাশাপাশি, খুশকি তথা অন্যান্য সমস্যার থেকে চুলকে সুরক্ষিত রাখে।

৯) ডিমের সাদা অংশ, দই, হেনা প্রভৃতি প্রাকৃতিক উপাদান চুল-কে কন্ডিশনিং করতে সাহায্য করে। এর ব্যবহারে নিষ্প্রাণ, শুষ্ক চুলও হয়ে ওঠে প্রাণবন্ত।

১০) পুষ্টিকর খাবার খান। কারণ এই খাবারের উপর অনেকাংশে নির্ভর করে আপনার চুলের স্বাস্থ্য। ডিম, চিকেন, ওমেগা থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিডের মতো প্রোটিন-যুক্ত আহার, আর মাছ, বাদাম, আখরোটের মতো আয়রন-যুক্ত খাবার এবং গাজর আর ডাল খান প্রচুর পরিমাণে। যার মধ্যে অধিক মাত্রায় রয়েছে ভিটামিন এবং ফলিক অ্যাসিড। এগুলি মেনে চললেই আপনার চুল সুস্থ এবং স্বাস্থ্যোজ্জ্বল থাকবে।

 

 

 

গড়ে তুলুন সন্তানের ভবিষ্যৎ

অভিভাবকেরা সকলেই চান একটা ধরাবাঁধা রুট ম্যাপ, যেটা ফলো করতে পারলেই সন্তান ভবিষ্যতে সাফল্যের চূড়ায় বসে রাজত্ব চালাতে পারবে। সৎ এবং ভদ্র হিসেবেও সন্তানকে প্রতিষ্ঠিত হতে দেখতে চান অভিভাবকেরা। এই সব কিছু ইচ্ছা সফল করে তোলার ডেফিনিট ফর্মুলা হয়তো কিছুই নেই কিন্তু বিজ্ঞানভিত্তিক বহু প্রমাণ আছে যার উপর ভিত্তি করে বলা চলে যে অভিভাবকেরা কীভাবে সন্তানকে বড়ো করছেন তার উপরে সন্তানের সাফল্য অনেকটাই নির্ভর করে।

বেশিরভাগ মা-বাবাই বিশ্বাস করেন তাদের সন্তানের ভবিষ্যৎ সাফল্য, নির্ভর করে তাদের অ্যাকাডেমিক এক্সিলেন্স-এর উপর। আজকের কমপিটিটিভ ওয়ার্ল্ডে ভালো রেজাল্ট-ই একমাত্র বাচ্চাকে অন্যান্যদের তুলনায় এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে এই ধারণা অনেকেরই আছে। কিন্তু এটা জেনে আশ্চর্য হবেন, পড়াশোনা ছাড়াও আরও অনেক বিষয় আছে যেগুলোর উপর বাচ্চার সাফল্য নির্ভর করছে। বহু রিসার্চ এবং পরীক্ষা চালাবার পর একটাই সিদ্ধান্তে পৌঁছোনো গেছে যে, সব বিষয়ে জোর খাটিয়ে বাচ্চাকে কিছুতেই সঠিক রাস্তায় আনা যায় না উলটে তার প্রতি অবিচারই করা হয়। সুতরাং জানতে হবে অভিভাবক হিসেবে সন্তানের জন্য কী করা উচিত এবং কী নয়।

গৃহকর্মে সহযোগিতা

সেদিন আর নেই যখন বাচ্চারাও বাড়ির কাজে মা-বাবাকে সাহায্য করত যেমন, ময়লা ফেলা, বাগানে জল দেওয়া, এক ছুট্টে দোকান থেকে প্রয়োজনীয় কোনও জিনিস এনে দেওয়া ইত্যাদি। বাচ্চাদের উপর অলরেডি অ্যাকাডেমিক প্রেশার ছাড়াও, টিউশন, এক্সট্রা কারিকুলার অ্যাকটিভিটি ইত্যাদির চাপ তো আছেই সুতরাং বাড়ির কাজে মা-বাবাকে সাহায্য করাটা তার সময়ের অপচয় বলেই ধরে নেওয়া হয়।

কয়েকদিন আগেই স্কুলে মেয়েকে আনতে গিয়ে কয়েকজন অভিভাবকের মধ্যে কিছু কথাবার্তা কানে এল। একজন মা, অপর আর একজনকে বলছিলেন, ‘আমি মেয়েকে বাড়ির কোনও কাজ করতে দিই না। জল ভরা বা আমাদের বাড়ির কুুকুরটাকে একটু বাইরে ঘুরিয়ে নিয়ে আসা মানে সময় নষ্ট করা আর পড়াশোনার ক্ষতি।’

ওনাদের মধ্যে আর এক মহিলার উত্তর কানে এল, ‘ঠিকই বলেছেন, আর মাত্র একমাসই বাকি পরীক্ষার। ছেলে যখন চাকরির জন্য ইন্টারভিউ দিতে যাবে তখন  রান্না করতে পারে কিনা বা বিছানা ঠিকমতো করতে পারে কিনা এই নিয়ে কেউ কি মাথা ঘামাবে? আমি তো পড়াশোনার সময় ছেলেকে এক গেলাস জলও নিজেকে নিতে দিই না। আমিই সবকিছু এগিয়ে দিই।’

আজকের দিনে মা-বাবা, সন্তানকে বাড়ির কাজ করতে দেন না এই ভেবে যে, সে পুরো সময়টা পড়াশোনায় দেবে যেটা একমাত্র পারে তাকে সাফল্য এনে দিতে। অথচ বহু প্রমাণ আছে, যেখানে বাড়িতে করা কাজেরও একটা অবদান রয়েছে, ভবিষ্যতে সাক্সেসফুল হয়ে ওঠার পিছনে। মনে রাখতে হবে বাড়ির দৈনন্দিন কর্মসূচি বাচ্চার মধ্যে দায়িত্ববোধের বিকাশ ঘটায় এবং এই শিক্ষাও দেয় যে বাড়ির কাজটাও অন্যান্য প্রয়োজনের মতোই আমাদের জীবনের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গী ভাবে যুক্ত।

সামাজিক যোগ্যতা

অভিভাবক হিসেবে অনেক সময়েই আমরা বাচ্চার সামাজিক এবং মানসিক দক্ষতার বিকাশ ঘটাবার প্রয়োজনীয়তাকে গুরুত্ব দিই না।

যে-কোনও সংবেদনশীল বাচ্চা, যে অন্যান্য বাচ্চাদের সঙ্গে মানিয়ে চলতে পারে, নিজের সমস্যা সমাধান করার ক্ষমতা রাখে– তাদেরকেই মনে করা হয় সামাজিক যোগ্যতার অধিকারী। এই সব বাচ্চার অভিভাবকেরা চেষ্টা করেন এই গুণগুলিকেই আরও বিকশিত করার এবং বহু অধ্যয়ন করে প্রমাণিত হয়েছে ভবিষ্যতে সাফল্য অর্জন করতে হলে এই গুণগুলিও মস্ত সহায়ক। যে বাচ্চার মধ্যে এই গুণগুলির অভাব থাকে তারা বেশিরভাগই বদ অভ্যাসের শিকার হয়ে পড়ে এবং সময় ও সুযোগের অপব্যবহার করে ফেলে। সুতরাং এক্ষেত্রে অভিভাবকের দায়িত্ব হয়ে দাঁড়ায়, সন্তানকে সঠিক পথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার। এছাড়াও বাচ্চা নিজে থেকে অগ্রসর হয়ে কোনও সোশ্যাল কাজ করতে চাইলে অথবা কোনও দলগত অ্যাকটিভিটি-তে অংশগ্রহণ করতে চাইলে তাকে বাধা দেওয়া যুক্তিসঙ্গত নয়।

ঘুমের প্রয়োজনীয়তা

রাত্রে দেরি অবধি জোর করে বাচ্চাকে পড়ানো অথবা ভোরবেলায় ঘুমন্ত বাচ্চাকে জোর করে ঘুম ভাঙিয়ে পড়তে বসানো কখনওই উচিত কাজ নয়। ঘুম পর্যাপ্ত না হলে বাচ্চারা অমনোযোগী হয়ে পড়ে, কোনও কিছু শিখতে দেরি করে এবং লক্ষ্য স্থির করতে পারে না। ঘুমটাকে সময়ের অপচয় ভাবা ঠিক নয়। বরং টাইম ম্যানেজমেন্ট ঠিক মতো করতে পারলে, বাচ্চা নিজে থেকে যতটা সময় জেগে থাকবে তার পুরোপুরি সদ্ব্যবহার করতে তাকে সাহায্য করুন। বাচ্চার ব্রেন এবং শরীর যতটা আরাম চায় তাকে ততটা দেওয়া একান্ত দরকার।

অত্যধিক প্রেশার দেওয়ার অভ্যাস

অভিভাবকেরা অনেক সময় ভয়ে থাকেন, স্কুলে সহপাঠীদের কতটা চাপ তাদের সন্তানকে সহ্য করতে হচ্ছে এবং এটার কোনও খারাপ প্রভাব তাদের সন্তানের ভবিষ্যতের উপর পড়বে না তো, এই চিন্তাও ক্রমাগত তাদের মনের শান্তি ব্যহত করে। এটা জানেন কি, অভিভাবক হিসেবে আপনার প্রভাবও নেগেটিভ ইমপ্যাক্ট ফেলতে পারে আপনার সন্তানের ভবিষ্যতের উপর। যেমন সন্তানকে ছোটোখাটো সিদ্ধান্ত নিতে বাধা দেওয়া, কী করলে তাদের জীবন আরামদায়ক হবে সেটা সব সময় পয়েন্ট আউট করা ইত্যাদি।

যে-মুহূর্তে সন্তানকে স্ট্রাগল করতে দেখেন মা-বাবা, তাকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসেন তারা। এর ফলে বাচ্চা নিজে সিদ্ধান্ত নেওয়া শিখতে পারে না এবং বড়ো হয়ে সর্বগুণসম্পন্ন হয়ে উঠতে পারে না।

স্বাভাবিক ভাবেই মা-বাবা চাইবেন, সন্তানকে অসাফল্যের বিপদ থেকে সবসময় গার্ড করতে। কিন্তু মা-বাবার আসল দায়িত্ব হল সন্তানকে ডানা মেলে উড়তে সাহায্য করা, তাদের ডানা দুটো কেটে দেওয়া নয়। নিজেদের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করার শিক্ষা দিতে হবে যেমন, ছোটোদের তেমনি তাদের স্বাধীনতাও দিতে হবে নিজে নিজে সিদ্ধান্ত নেওয়ার। ওভারবিয়ারিং পেরেন্টদের বাচ্চার উপর প্রতিনিয়ত নিয়ন্ত্রণ, বাচ্চার জীবনভরের জন্য মানসিক ক্ষতি করে দিতে পারে। ফলে বাচ্চার মধ্যে আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি থেকে যায় এবং বড়ো হয়েও তার মধ্যে এই অভাব রয়েই যায়। পেরেন্ট হিসেবে বাচ্চাকে শুধুমাত্র গাইড করা উচিত। কীসে বিপদ হতে পারে তার একটা পরিষ্কার ছবি বাচ্চার সামনে তুলে ধরা দরকার এবং  সে যেটা করবে তার কী কী পরিণতি এবং প্রভাব পড়বে সেটাও বুঝিয়ে বলা উচিত।

অভিভাবকদের অত্যধিক চাপ

মাঝেমধ্যেই বড়োদের বলতে শোনা যায় ‘আমি চাই আমার সন্তান এই করবে’। কিন্তু তারা যেটা চান তাদের সন্তানও কি ওই একই জিনিস করতে আগ্রহী? মা-বাবা চান, তাদের সন্তানের মাধ্যমে নিজেদের স্বপ্ন সাকার করতে। নিজেরা জীবনে যেটা করতে পারেননি, সেটাকেই সাকার করে তোলার ইচ্ছেটা তারা বাচ্চার ঘাড়ে তুলে দিতে চেষ্টা করেন। এতেই বোঝা যায় কেন অনেক সময় বাচ্চারা, মা-বাবার বেছে দেওয়া রাস্তায় চলতে বাধ্য হয়, নিজেদের আগ্রহ না থাকা সত্ত্বেও।

সেল্ফ ডিসিপ্লিন

সুশৃঙ্খল জীবনযাত্রা নানাভাবে সাহায্য করে মানুষের জীবনে সাফল্য এনে দিতে। সেল্ফ ডিসিপ্লিনড বাচ্চা জীবনে একটা লক্ষ্য স্থির করে নেয় এবং সেটাকেই সাকার করার চেষ্টা করতে থাকে। এরা নিজেদের রাগ কন্ট্রোল করার ক্ষমতা রাখে, পথের দিশা সঠিক রাখে, ভুল ধরিয়ে দিলে নিজেকে ঠিক করে নিতে লজ্জা বোধ করে না। এই ধরনের মানুষ নিজের পরিবারের সংস্কারও মেনে চলে। এদের এই মানসিকতার জন্য এদের মা-বাবাও জীবনের কিছু মূল্যবান শিক্ষা এদের প্রথমেই শিখিয়ে রাখেন সুতরাং এরাই যখন প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে ওঠে তখন জীবনের যে-কোনও চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে এরা ভয় পায় না।

অভিভাবকদের নিজেদের মধ্যে সম্পর্ক

আমরা সকলেই ভালো করে জানি মা-বাবার মধ্যে সম্পর্ক অনেকটাই বাচ্চাকে প্রভাবিত করে। মা-বাবার সুখী দাম্পত্য ইমোশনালি সাউন্ড রাখে বাচ্চাকে। মা-বাবার মধ্যে ভালো সম্পর্ক এবং তাদের নিজস্ব শৈশবের স্মৃতি বাচ্চাকে যেমন সুস্থ ভবিষ্যৎ প্রদান করে তেমনি ইমোশনালি, অ্যাকাডেমিকালি ও সোশ্যালি তাকে হেলদি এবং স্ট্রং হতেও সাহায্য করে। বাড়ির পরিবেশে বাচ্চার প্রথম শিক্ষার হাতেখড়ি সুতরাং সেটাই সবথেকে হেলদি হওয়া আগে প্রয়োজন যাতে বাচ্চা সম্পর্কের গুরুত্ব বুঝতে শেখে। ভবিষ্যতে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পরেও যাতে বিভিন্ন সম্পর্কের আনাগোনার মধ্যেও সে সম্পর্ককে সম্মান দিতে পারে।

অভিভাবক হিসেবে বাচ্চাদের রোল মডেল মা-বাবাকেই হতে হবে। কারণ, অনুপ্রেরণার প্রয়োজন পড়লে বাচ্চা, মা-বাবার দিকেই প্রথম দৃষ্টিপাত করবে, সাপোর্টের প্রয়োজন হলে তাদের পাশে পাবে এবং সাফল্যে খুশি হলে মা-বাবার সঙ্গেই আগে শেয়ার করবে।

 

রোদে ঝলসানো ত্বক সারান

শীতের কড়া রোদ যতই আরামদায়ক হোক, বেশিক্ষণ এই রোদ ত্বকে লাগলে, ত্বক ঝলসে যাবে। যারা অতিরিক্ত খোলা জায়গায় কাজ করেন, তাদের ত্বকের পক্ষে এই রোদ ক্ষতিকারক। ক্ষতিগ্রস্ত ত্বককে কীভাবে হারানো উজ্জ্বলতা ফিরিয়ে দেবেন, রইল তারই কিছু পরামর্শ।

বরফে বাজিমাত

প্রথমে রোদে ঝলসানো ত্বকে একটা আইস কিউব নিয়ে ঘষুন। এতে ত্বকের পোড়া ও জ্বালা ভাব হ্রাস পাবে। আইস-এর কুলিং প্রপার্টিজ, ত্বকের অতিরিক্ত তাপ শুষে নেবে, যার ফলে আপনি ত্বকের ঝলসে যাওয়া অনুভতি থেকে আরাম পাবেন।

Ice cubes foe Sun burnt skin

দইয়ের প্যাক

রোদে ক্ষতিগ্রস্ত ত্বককে বাঁচাতে, দই হল অব্যর্থ। দইয়ের প্রোবায়োটিক্স এবং এনজাইম, স্কিন পরিষ্কার করে। ছোটোখাটো স্কিন ইনফেকশন রোধ করে। মুখে ১০-১৫ মিনিট দইয়ের প্রলেপ দিয়ে রেখে দিন স্নানের আগে। এরপর ধুয়ে নিলেই দেখবেন মুখের হারানো উজ্জ্বলতা ফিরে এসেছে। রোমছিদ্র খুলে ত্বক পরিষ্কারের কাজটাও করে দই। দইয়ের অ্যান্টি ইনফ্লেমেটরি গুণ ত্বকের প্রদাহ থেকে মুক্তি দেয়। সপ্তাহে অন্তত ৪ বার এই প্যাক লাগান।

Sun burn curd pack

মধুদুধে সমাধান

রোদে পোড়া ত্বকের হাল ফেরাতে, সঙ্গী করতে পারেন মধু ও দুধকে। একটি বাটিতে ১ বড়ো চামচ মধু, কয়েক ফোঁটা লেবুর রস আর ১ চামচ দুধ মিশিয়ে প্যাক তৈরি করুন। মুখের উপর সমান ভাবে লাগিয়ে অন্তত ২০ মিনিট অপেক্ষা করুন। লাগানোর সময় হালকা হাতে মাসাজও করতে পারেন। শুকিয়ে গেলে জলের ঝাপটায় মুখ ধুয়ে নিন। এটা নিয়মিত ভাবে করলে, ত্বকের ঔজ্জ্বল্য বজায় থাকবে।

মধু অ্যান্টি  ট্যান এজেন্ট হিসাবে অত্যন্ত সক্রিয়। অন্য দিকে দুধে রয়েছে ত্বক ময়েশ্চারাইজ করার গুণ। ফলে ত্বকের সমস্যা নির্মূল করতে এই প্যাক দারুণ কার্যকরী।

রাইস ওয়াটার প্যাক

শীতের ঝলসানো ত্বকে রাইস ওয়াটার প্যাক প্রয়োগ করতে পারেন। ভাতের পাতলা মাড় ফ্রিজে রেখে দিন। এর মধ্যে এসেন্সিয়াল অয়েল কয়েক ফোঁটা মিশিয়ে দিন। এবার টিশু পেপারের সাহায্যে মুখে লাগিয়ে ২০ মিনিট রেখে দিন। এটা সানবার্ন সারাতেও অব্যর্থ।

ন্যাচারাল বাথ থেরাপি 

  • স্নানের জলে ১/২ কাপ অ্যাপেল সিডার ভিনিগার মিশিয়ে স্নান করুন। রোদে ঝলসানো ত্বকের পক্ষে খুবই উপকারী
  • স্নানের সময় জলে এসেন্সিয়াল অয়েল, রোজ ওয়াটার, ল্যাভেন্ডার প্রভৃতি ব্যবহার করতে পারেন
  • অল্প বেকিং সোডা স্নানের জলে মিশিয়ে নিলে, ত্বকের ছোটোখাটো ইনফেকশন কমে যাবে
  • এক কাপ ওটস জলে ভিজিয়ে রাখুন। তারপর জলটা ছেঁকে নিয়ে স্নানের জলে মিশিয়ে নিন। এটা ত্বকের হারানো ময়েশ্চার ফেরাতে দারুণ সহায়ক।
পড়ার জন্য সীমাহীন গল্প-নিবন্ধসাবস্ক্রাইব