ঘরে-বাইরে সমান তালে

বন্যার বিয়ে হয়েছে চারমাস আগে। সে ব্যাংক কর্মী। আগে সে যৌথ পরিবারে ছিল। এই সুবাদে বন্যার কাজের চাপ ছিল কম। কিন্তু বিয়ের দু’মাস পর ট্রান্সফার হয়ে অন্য শহরে চলে যেতে হয় বন্যার স্বামীকে। নিরুপায় হয়ে বন্যাও বদলি নিয়ে চলে যায় স্বামীর সঙ্গে।

এখন দু’জনে (স্বামী-স্ত্রী) একসঙ্গে থাকলেও, পরিবারের অন্যদের থেকে অনেক দূরে। তাই বাড়ির কাজে সাহায্য করার কেউ নেই। বন্যার একার উপর এখন দ্বিগুণ চাপ। অফিস করার পরও বাড়ির সমস্ত কাজ করতে হচ্ছে। অভ্যাস নেই, তাই বিপর্যস্ত অবস্থা। টাইম ম্যানেজমেন্ট-ও রপ্ত নেই, অতএব করুণ পরিণতির শিকার।

একদিন অফিসেই বেহুঁশ হয়ে পড়ে বন্যা। হাসপাতালে ভর্তি করাতে হয়। চিকিৎসক জানান, অতিরিক্ত কাজের চাপেই এই অবস্থা। অতএব, বিশ্রাম চাই।

বাড়িতে এক সপ্তাহ বিশ্রাম নিল বন্যা। এই সময় অনেক আত্মীয়স্বজন এসে হইহুল্লোড় করে গেলেন। একদিন বন্যার এক বন্ধু এল। ওই বন্ধু এক মাল্টি-ন্যাশনাল কোম্পানিতে কর্মরত। সে জানাল, ‘ওয়ার্কিং উয়োম্যানদের টাইম ম্যানেজমেন্ট জরুরি। যদি সুস্থ থাকতে চাও, তাহলে অফিস এবং বাড়ির কাজের মধ্যে ভারসাম্য রাখো।’

শুধু বন্যা নয়, আসলে কর্মরতা মাত্রেই, প্রায় দ্বিগুন কাজের দায়িত্ব নিতে হয়। আর যদি অফিস এবং বাড়ির কাজ সিস্টেম্যাটিক না করা হয়, তাহলে শরীরের উপর চাপ পড়বে এবং অসুস্থ হয়ে পড়ার সম্ভাবনা থাকবে।

আসলে অনেকেই আছেন যারা সবাইকে খুশি করতে চান। তাই যে কাজ না করলেও চলে, যে কাজ অন্যরা করে নিতে পারে, তাও নিজে করতে গিয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়েন। জীবনে একঘেয়েমি চলে আসে। মন খারাপ হয়। স্বামী-সন্তানকে কোয়ালিটি টাইম দিতে পারেন না। রক্ষা করতে পারেন না সামাজিকতা। অফিসে গিয়ে বাড়ির চিন্তা আর বাড়িতে ফিরে অফিসের চিন্তা করেন। ‘সুপার উয়োম্যান’ হতে গিয়ে সবকিছু এলোমেলো করে ফেলেন। এভাবেই সুস্থ-শান্ত জীবনে ‘অতি ব্যস্ততা’ ঢুকে গিয়ে বাঁচার আনন্দটাই চলে যায়। তাই, সবকিছু ম্যানেজ করার কৌশল রপ্ত করা চাই।

ভারসাম্য বজায় রাখার কৌশল

সময়টা ‘বিউটি উইদ ব্রেন’-এর। অতএব, সৌন্দর্যের পাশাপাশি বুদ্ধিমত্তারও প্রয়োজন। তাই সবসময় পজিটিভ থিঙ্কিং রাখতে হবে। নেগেটিভ থিঙ্কিং  মনে যেন জায়গা না পায়। এমন ভাবেই কাজের তালিকা তৈরি করুন, যা আপনার ব্যক্তিগত এবং পেশাগত জীবনকে আরও মসৃণ করবে।

প্রথমে নিজের ব্যক্তিত্বের বিষয়ে সচেতন হোন। ঘাটতিগুলো দূর করুন। কারণ, নেগেটিভ পয়েন্টস ব্যক্তিত্ব বিকাশের অন্যতম অন্তরায় হতে পারে। তাই, আত্মবিশ্লেষণ জরুরি। বন্ধু এবং শুভাকাঙক্ষীদের পরামর্শও নেওয়া আবশ্যক। সেইসঙ্গে প্রয়োজন টাইম ম্যানেজমেন্ট-এর। অফিসে কিংবা বাড়িতে অহেতুক সময় নষ্ট না করে, ভালো কাজে সময় ব্যয় করুন। কোন কাজ কখন করতে হবে, কতটা সময় লাগবে তা মাথায় ছকে নিন অথবা কাজের তালিকা তৈরি করে রাখুন। বাড়ির ছোটো-বড়ো সব সদস্যের থেকে কাজের সাহায্য নিন যতটা সম্ভব। যদি কোনও সমস্যা কিংবা মানসিক চাপে থাকেন, তাহলে বাড়ির সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা করে চাপমুক্ত থাকার চেষ্টা করুন।

অফিসে যদি আপনাকে নিয়ে অকারণে নিন্দুকরা কু-কথা বলে কিংবা আপনার নেগেটিভ সমালোচনা করে, তাহলে বিষয়টাকে সিরিয়াসলি নেবেন না। বরং নিজের কাজ মনযোগ দিয়ে করুন এবং সততা, আদর্শ বজায় রাখুন– দেখবেন নিন্দুকদের মুখ একদিন বন্ধ হবেই। তবে অফিসে প্রয়োজনের অতিরিক্ত বোঝা কাঁধে তুলে নেবেন না।

উইক এন্ড-এ পরিবারের জন্য নিজেকে ফ্রি রাখুন। সবাইকে নিয়ে হইহুল্লোড় করুন, আনন্দে থাকুন। ছুটির দিনে মোবাইল ফোন থেকে যতটা সম্ভব দূরে রাখুন নিজেকে। মনে রাখবেন, ছুটির দিনগুলিতে নিজেকে যতটা চাপমুক্ত রাখবেন, আনন্দে থাকবেন, কাজের দিনগুলিতে ততটাই ফ্রেশ থাকবেন এবং কাজে উৎসাহ বাড়বে।

অফিসে বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখুন। এর সুফল পাবেন। সহকর্মীদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখলে সহকর্মীরাও ভালো ব্যবহার করবে। আর অফিস-এর সমস্যা অফিসেই মেটানোর চেষ্টা করুন যতটা সম্ভব। কারণ অফিসের সমস্যা বাড়ি বয়ে নিয়ে গেলে আপনার ব্যক্তিজীবনের সুখশান্তি বিঘ্নিত হতে পারে।

টিভি কিংবা মোবাইল ফোন-এ অপ্রয়োজনে বেশি সময় নষ্ট না করে, পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে বাড়তি সময় কাটান। এতে সম্পর্কের বাঁধন দৃঢ় হবে এবং আপনিও খুশি থাকবেন।

বাড়ির সমস্ত কাজ করতে গিয়ে যদি ক্লান্তি কিংবা বিরক্তি আসে, তাহলে অন্য সদস্যদের সাহায্য চান অথবা কাজ করার লোক ঠিক করুন।নিজের জন্য কিছুটা সময় বাঁচিয়ে রাখুন। ওই একান্ত সময়টুকুতে নিজের মতো করে রিল্যাক্স করুন। রূপচর্চা, বইপড়া, গান শোনা, সমাজসেবা প্রভৃতি যা আপনার মন চায়, তাই করুন।

সুস্থ থাকুক সন্তান

সময়ের দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে। একটা সময় ছিল যখন বাড়িতে একাধিক বাচ্চা থাকত। একসঙ্গে এতগুলো ভাই-বোন কীভাবে যে মানুষ হতো, সেটা সঠিক ভাবে কেউ-ই হয়তো বলতে পারবেন না। বিশেষ একজনকে নিয়ে মাতামাতি করতেও দেখা যেত না। বাড়ি ভর্তি লোকজন থাকত। সকলেরই শাসন এবং আদরে বাচ্চারা সবার অলক্ষ্যে কখন যেন বড়ো হয়ে উঠত।

বাড়িতে অনেক লোকজন, সংযুক্ত পরিবার এসবের কনসেপ্টটাই এখন পুরোপুরি বদলে গেছে। এখন ছোট্ট পরিবার– বাবা, মা এবং একটি, বড়োজোর দুটি সন্তান। তারপর প্রতিটি ক্ষেত্রেই আছে বিজ্ঞাপনের রমরমা। রাস্তায় টাঙানো হচ্ছে হোর্ডিং, সিনেমা, টিভিতে বিজ্ঞাপনে দেখা যাচ্ছে সুন্দর, ফুটফুটে বাচ্চাদের দিয়ে করানো কিছু ফুটেজ। আর এই বিজ্ঞাপন দেখে মা-বাবার স্বপ্ন, যদি তাদের সন্তানটিও বাস্তবে এরকম গোলগাল, সুন্দর হয়। কিন্তু স্বপ্ন অনেক সময়ই বাস্তবায়িত হয়ে ওঠে না।

সমবয়সি বাচ্চাদের মতো যদি নিজের সন্তান অ্যাকটিভ না-হয়, তাহলে প্রথমেই বাচ্চাকে অতিমাত্রায় শান্ত ধরে নেওয়া ঠিক নয়। এটা অসুস্থতাও হতে পারে। তাই ভালো হবে যদি সন্তানকে ডাক্তার দেখিয়ে সঠিক পরামর্শ নেওয়া হয়।

সুস্থ হওয়ার মানে

শিশু বিশেষজ্ঞের মতে বাচ্চা যদি বিকলাঙ্গ না হয় এবং মানসিক ভাবে সুস্থ হয়েও সবসময় চুপচাপ, শান্ত থাকে–তাহলে তার কিছু লক্ষণের উপর নজর রাখা উচিত।

  • যদি ৪-৫ মাসের বাচ্চা আলোর দিকে না তাকায়, ঝুমঝুমির আওয়াজ শুনেও সেটা ধরার চেষ্টা না করে,মা-কে চিনছে অথচ গলা থেকে নানারকম আওয়াজ বের না করে তাহলে সেটা নিয়ে ভাবা দরকার
  • যখন দেখবেন ১০ মাসের বাচ্চা, দাদা-বাবা বলছে না অথবা চলবার চেষ্টা করছে না, সেটা অস্বাভাবিক
  • ৪-৫ বছরের বাচ্চার খেলাধুলোয় কোনও মন নেই, সমবয়সি কোনও বন্ধুবান্ধব নেই অথবা তাদের সঙ্গে কথা বলে না, সবসময় সবকিছুতে বিরক্তি– এইসব অস্বাভাবিকতা যদি লক্ষ্য করা যায় বাচ্চার মধ্যে, তা হলে তাকে নিয়ে চিন্তার দরকার আছে। ডাক্তারের সঙ্গে পরামর্শ করে জানতে হবে বাচ্চার কী অসুবিধা রয়েছে।

শিশুর শারীরিক দুর্বলতার কারণ

অনেক কারণেই শিশু শারীরিক ভাবে দুর্বল থাকতে পারে তবে বিশেষ কয়েকটি কারণ রয়েছে যেমন,

  • গর্ভধারণ করার সময় মা যদি পুষ্টিকর আহার না-খেয়ে থাকেন এবং মায়ের স্বাস্থ্য যদি খারাপ থাকে
  • প্রসবের সময় যদি কোনওরকম সমস্যা হয়ে থাকে অথবা প্রসবক্রিয়ার সময় কোনও বাধার কারণে যদি শিশুর মস্তিকে ঠিকমতো অক্সিজেন পৌঁছোতে না-পারে, তাহলেও শিশু জন্ম থেকেই দুর্বল হয়
  • জন্মগত কোনও অসুখের শিকার হলেও শিশু দুর্বল হয়, যেমন হার্টের অসুখ, নিঃশ্বাসের অসুবিধা, হাঁপানি ইত্যাদি।
  • গর্ভাবস্থায় এবং জন্মাবার পর শিশু যদি পুষ্টিকর খাবার না-পায় তাহলে শিশুর প্রতিরোধক ক্ষমতা ঠিকমতো গড়ে ওঠে না। এর ফলে পেটের রোগ, বারবার জ্বর আসা, রক্তের অভাব ইত্যাদি অসুবিধা দেখা দেয়।
  • গর্ভাবস্থায় প্রথম ৪ মাসের মধ্যে যদি মায়ের হাম, বসন্ত ইত্যাদি ছোঁয়াচে রোগ হয়ে থাকে, তাহলে জন্মের পর শিশুর মধ্যেও এই ইনফেকশনের জীবাণু চলে আসে। এর ফলে শিশুর মস্তিষ্কের ক্ষতি হতে পারে।
  • উপরোক্ত কারণগুলি ছাড়াও, অনেক সময় শিশুকে দেখেই বোঝা যায় সে সম্পূর্ণ সুস্থ কিনা। অনেক সময় বাচ্চার ওজন স্বাভাবিকের থেকে কম হয় আবার অনেক শিশুর ওজন অস্বাভাবিক বেশি হয়। ‘অ্যাসেসমেন্ট অফ গ্রোথ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট’ সংস্থার সাহায্যে জানা যায়, শিশু সুস্থ কিনা এবং তার সঠিক গ্রোথ হচ্ছে কিনা।

মানসিক অসুস্থতা ছাড়া শিশুর মধ্যে যদি শারীরিক কোনও দুর্বলতা থেকে থাকে, যেটা ঠিক হওয়া সম্ভব, তাহলে ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া উচিত এবং সঠিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করা উচিত। পুষ্টির অভাব যদি শিশুর হয়ে থাকে তাহলে ডায়াটিশিয়ানের সঙ্গে আলোচনা করে তার খাদ্য-তালিকা বানিয়ে, তাকে সঠিক পুষ্টি দেওয়া প্রয়োজন। এছাড়াও বাড়ির সঠিক পরিবেশও বাচ্চাকে সুস্থ রাখতে সাহায্য করে।

টিলাবাড়ির সান্নিধ্যে

‘এই তো একটু আগেই এখানে হাতি ঢুকেছিল। গার্ডরা পটকা ফাটিয়ে তাড়াল দাঁতালটিকে৷’ কথাটা যখন বলছিলেন ম্যানেজার ম্যাডাম বিস্ময়ে আমাদের চোখ বিস্ফারিত। অন্ধকারের মধ্যে যতদূর চোখ যায়, ঠাওর করার চেষ্টা করছি কোথাও এক ঝলক যদি দেখা যায় গণপতির কানটুকু। আসলে এই ঘটনা হাল-হামেশাই ঘটে টিলাবাড়িতে। জঙ্গল থেকে হাতির পাল কখনও কখনও এদিক ওদিক হানা দেয় খাদ্যের সন্ধানে। পথ ভুলে ঢুকে পড়ে পাইথন আর কদাচিত্ লেপার্ডও।

চা-বাগানের সবুজে যেখানে গুচ্ছ মেঘের ছায়া, আর সেই সবুজ-কে আগলে রাখে গরুমারা বনাঞ্চল, তারই কোল ঘেঁষে তিলে তিলে গড়ে উঠেছে এই তিলোত্তমা৷

জায়গাটার নাম টিলাবাড়ি। আর এই নামানুসারেই ওয়েস্ট বেঙ্গল টুরিজম প্রপার্টির নিজস্ব পর্যটকাবাস, এই তিলোত্তমা।

ডুয়ার্স এমনই একটি জায়গা, যেখানে সারা বছরই লেগে থাকে পর্যটকদের আনাগোনা। গরুমারা, চাপড়ামারি, জলদাপাড়া থেকে বক্সা– সর্বত্রই দুয়ার খুলে ডুয়ার্স আহ্বান করে পর্যটকদের। এই ভাবনা থেকেই টিলাবাড়ির এই নির্জন বনবাসর গড়ে ওঠে।

ব্রিটিশরা কলকাতার গরমের সঙ্গে মোকাবিলা না করতে পারায়, দার্জিলিং-কে সাজিয়ে তোলে গ্রীষ্ম আবাস হিসাবে। আর পাহাড়ের পায়ের নীচে একটু একটু করে জনপ্রিয় হতে থাকে এই ডুয়ার্স অঞ্চল। ছোটো ছোটো বাড়ি, ব্যাকড্রপে পাহাড়, ঝকঝকে নীল আকাশ আর নির্মল অক্সিজেনের এই সাম্রাজ্যে কটা দিন কাটিয়ে গেলে সত্যিই মন ভালো হয়ে যায়। আকাশ পরিষ্কার থাকলে অক্টোবর-নভেম্বর মাসে টিলাবাড়ির হাতায় বসে মুগ্ধ চোখে দেখতে পাবেন কাঞ্চনজঙ্ঘা।

কালিম্পং, দার্জিলিংয়ে ভিড়ভাট্টা এড়িয়ে যারা নির্জনবাস পছন্দ করেন, এ জায়গাটা তাদের জন্য আদর্শ। আধুনিক ব্যবস্থায় ১০টি কটেজ ও বেশ কয়েকটি ঘর রয়েছে তিলোত্তমায়। যদি কোনও কিছু না-ও করেন, ভোরবেলা ল্যান্ডস্কেপ গার্ডেনে হাঁটুন আর বুক ভরে নিন বাঁচার আনন্দ। পাইন, বার্চ, জারুল, শিমূল, অজস্র গাছগাছালি আর অর্কিডে সাজানো এই জায়গাটায়, একদা মনে পড়ে যেতে পারে অমিত আর লাবণ্যকে।

বাচ্চাদের বিনোদনের জন্য নানা খেলার সরঞ্জাম রাখা হয়েছে বিস্তৃত লন-এ। আর আছে বাড়তি আকর্ষণ একটি ইকো মিউজিয়াম। গাছগাছালি, পাখপাখালি, এক কথায় বন্যজগতের এক আস্ত ছবি আঁকা হয়ে যাবে ছোটোদের মনজগতে। মিউজিয়ামে রয়েছে নানা ধরনের খেলা, কু্ইজ ও বিনোদনী ব্যবস্থা। প্রকৃতিপাঠের এক অনন্য সুযোগ। সকাল থেকেই টিলাবাড়ির গাছগুলিতে চলে নানা পাখির আনাগোনা। ফলে চোখ বুজে শুধু পাখির ডাক শুনেই সময় কেটে যায়।

Rhino in Gorumara Forest

অনতিদূরেই গরুমারা জাতীয় উদ্যান। প্রায় ৮০ স্কোয়ার কিলোমিটার জুড়ে এর বিস্তার। পার্কটি দেশের সংরক্ষিত বনাঞ্চল হিসাবে সেরার শিরোপা লাভ করেছে। তরাই বনভূমির অসংখ্য গাছগাছালি, নানা প্রজাতির পাখি, হাতি, গন্ডার, বাইসন, হরিণ, মযূর প্রভৃতিতে ভরা এই বনস্থলি। ওয়াচটাওয়ার থেকে জঙ্গলটি দেখা যেন রোমাঞ্চে ভরপুর।

বেড়াতে গিয়ে রসনা তৃপ্তির কথা যারা ভাবছেন, তাদেরও মন ভরে যাবে এখানকার কিচেনে তৈরি হওয়া সুস্বাদু ভুরিভোজে। ডাইনিং এরিয়া বা রুম সার্ভিস পরিবেশনে নিখুঁত। কটেজের ডেকরেও অসম্ভব সুন্দর, পরিপাটি ছাপ। দেয়ালে টাঙানো ছবি থেকে পেয়ালা-পিরিচ সবেতেই যার আদর আপ্যায়ন লেগে, তাঁর নামটি বাদ দিলে চলবে না। তিনি এখানকার ম্যানেজার গৌরী ঘোষ। শুধু টিলাবাড়িই নয়, মূর্তি বাংলোর দায়িত্বও তাঁর তরুণ কাঁধে ন্যস্ত। ‘সত্যি বলতে কী এত কম বয়সি এবং সর্বোপরি মহিলা ম্যানেজার হয়ে পরিচালনার কাজটি করা শুরুতে সহজ ছিল না’, সলজ্জ হাসি গৌরীর। কিন্তু বর্তমান ব্যবস্থাটি দেখলে বোঝা যায় তাঁর নিরলস পরিশ্রমে কীভাবে নিখুঁত হয়ে উঠেছে তিলোত্তমা।Teagardens near Tilabari , Dooars

কোভিডের এই দমচাপ কষ্ট কাটিয়ে একটু মন ভালো করতে যদি বেরিয়ে পড়েন, মন্দ লাগবে না। জঙ্গল সাফারির ব্যবস্থা করে দেবেন ম্যানেজার ম্যাডাম। সব মিলিয়ে এক অপূর্ব স্মৃতি খুঁটে বেঁধে ফিরতে পারবেন শহুরে রোজনামচায়।

কীভাবে যাবেন : এনজেপি বা নিউ মাল জংশন, দু’জায়গাতেই নামতে পারেন টিলাবাড়ি আসার জন্য। এনজেপি থেকে ঘন্টা দুয়েকের পথ। করোনেশন ব্রিজ পেরিয়ে ডানহাতে বেঁকে মেটেলি চা-বাগানের পাশ দিয়ে পথ গেছে তিলোত্তমায়। সবুজের হাতছানি এড়াতে পারবেন কী?

দিবসান্ত

অয়নের আজ প্রথম দুটো ক্লাস অফ। সে যখন কলেজের স্টপে বাস থেকে নামল, ঘড়িতে এগারোটা। অর্থাৎ সবে ফার্স্ট ক্লাস শেষ হয়েছে। হাতে এখনও চল্লিশ মিনিট। কয়েক পা কলেজের দিকে এগিয়ে তাকে দাঁড়িয়ে পড়তে হল। অসীমা কলেজ থেকে বেরিয়ে আসছে। তার আজ পরপর ক্লাস। ফার্স্ট হাফে কোনও অফ নেই। অয়নের কপালে ছোট্ট ভাঁজ পড়ল। অসীমা ক্লাস অফ পচ্ছন্দ করে না। কলেজে এলে সে প্রত্যেকটা ক্লাস অ্যাটেন্ড করবেই। তাদের গ্রুপটা যত অ্যাট্রাক্টিভ প্রোগ্রামই অ্যারেঞ্জ করুক না কেন, সে একটা ক্লাসও মিস করতে চায় না। তার খুব সহজ কথা, কলেজে এলে ক্লাস করবই। প্রোগ্রাম করতে হলে কলেজ শেষের পর। নইলে পুরো দিন অফ করে।

গত দুটো বছর ধরে অয়ন লক্ষ্য করছে, আধা খ্যাঁচড়া ভাবে কোনও কাজ করা অসীমা পচ্ছন্দ করে না। যা করে, খুব গুছিয়ে করে।

সেই অসীমা কলেজ কেটে হাওয়া হয়ে যাচ্ছে। এটা আজ প্রথম নয়। গত তিন মাস ধরে চলছে। শুধু কলেজ কেটে নয়, প্রোগ্রাম কেটেও দু’বার হাওয়া হয়েছে। অয়ন লক্ষ্য করেছে অসীমার মোবাইলে ফোন আসে। ফোনটা রিসিভ করার পর তার মুখের চেহারা সম্পূর্ণ পালটে যায়। দুঃখে না আনন্দে, বিষণ্ণতায় না আতঙ্কে, কিছুই বোঝা যায় না। মুখটাকে অন্য হাতের চেটো দিয়ে আড়াল করে মিনিট খানেক কথা বলে। তারপর কাউকে কিছু বলার জন্য সামান্যতম সময় নষ্ট না করে হনহন করে কিছুটা উদ্ভ্রান্তের মতো বেরিয়ে যায়।

কয়েকবার ব্যর্থ চেষ্টার পর অসীমার মোবাইল বেজে ওঠার সময় অয়ন একদিন এক মুহূর্তের জন্য তার মোবাইলের স্ক্রিনটা দেখার চান্স পেয়েছিল। সেখানে ফুটে ওঠা নম্বরটা ছিল ল্যান্ড লাইনের। এত অল্প সময়ের জন্য সে নম্বরটা দেখতে পেয়েছিল যে তার মেমারি সেটা ক্যাচ করতে পারেনি।

কেন অসীমা এমন ভাবে চলে যায়, প্রশ্নটা বেশ কয়েকবার অনেক রকম ভাবে অনেকে অসীমাকে করেছে। উত্তর একই, আছে বস, আছে। সব কিছু কি আর শেয়ার করা যায়। ওটা বড্ড বেশি সিক্রেট চ্যাপ্টার। প্যানডোরার বক্সের মতো ওপেন হলেই অজানা ব্যথায় পৃথিবী ভরে যেতে পারে। কথাগুলো শেষ করে মিনিট খানেক ধরে সে হাসে। সেই হাসির পর নীল আকাশ জুড়ে রোদ আসে। তারপর সকলের মন থেকে প্রশ্নটা হারিয়ে যায়।

নিজস্ব মুহূর্তেও কয়েকবার অয়ন প্রশ্নটা করেছে। কোনও উত্তর না দিয়ে প্রতিবারই অসীমা মিষ্টি হাসিতে নিজেকে আরও সুন্দর করে তুলেছে। প্রশ্নটাও প্রাসঙ্গিকতা হারিয়েছে। অসীমার অনুপস্থিতিতে মাঝেমধ্যেই অয়নকে বন্ধুদের কাছে প্যাঁক খেতে হয়। নীরবে সে সব হজম করা ছাড়া তার কিছু করার থাকে না। তখন অসীমার উপর মনে মনে তার খুব রাগ হয়। কেন এই ব্যাপারটা নিয়ে সে এমন লুকোচুরি খেলে? কী এমন রহস্যজনক বিষয়? তবে অসীমা সামনে এলে তার আর কিছু মনে থাকে না।

মুশকিল হচ্ছে তাদের সম্পর্কটা সকলে জেনে গেছে। জানাজানিটা ঘটিয়েছে অসীমাই। সেদিন প্যারাডাইস সিনেমা হলে আমির খানের একটা ছবি দেখতে যাওয়ার কথা ছিল। আমির খান অসীমার সবচেয়ে ফেভারিট হিরো। প্রোগ্রামটা অসীমাই ঠিক করেছিল। কথা ছিল, শো শুরুর এক ঘণ্টা আগে সকলে হলের সামনে চলে আসবে। টিকিট সহ সব খরচ অসীমার।

নির্দিষ্ট সময়ের কিছুটা আগে অয়ন পৌঁছে গিয়েছিল। তারও আগে এসে টিকিট কাউন্টারের সামনের ফুটপাথে অসীমা দাঁড়িয়েছিল।

যে-কোনও প্রোগ্রামে সে-ই সকলের শেষে আসে। অয়ন তাই জিজ্ঞাসা করেছিল, সূর্য আজ কোন দিকে উঠেছে রে? ঠিক দেখছি তো? আমার কোথাও ভুল হয়নি তো?

মিষ্টি হাসিতে মুখ ভরিয়ে অসীমা বলেছিল, ঠিক দেখছিস। কোথাও কোনও ভুল হচ্ছে না। তবে আজ এখনও সূর্য ওঠেনি। কিছুক্ষণ পর উঠবে। তখন টের পাবি।

অসীমার হেঁয়ালি অয়ন ধরতে পারেনি। বোকার মতো বলেছিল, উঠবে মানে?

অসীমা আরও মিষ্টি হেসে বলেছিল, তুই একটা হাঁদারাম। সবাইকে আসতে দে। দেখবি সূর্য ওঠা কাকে বলে।

একে একে সঞ্চিতা, রাহুল, আশা এসে পড়লে সবাইকে অবাক করে দিয়ে অসীমা বলেছিল, ‘আজ সিনেমা দেখতে ইচ্ছে করছে না। চল, ভিক্টোরিয়ার মাঠে বসে আড্ডা মারি।’

সঞ্চিতা অসীমার কথা বিশ্বাস করেনি। বলেছিল, তোর আমির খান–

অসীমা সঞ্চিতাকে কথা শেষ করতে দেয়নি। বলেছিল, আমির খান পর্দায় সেঁটে থাক। এখন চল একটা ট্যাক্সি নিয়ে ভিক্টোরিয়া যাই। জমিয়ে আড্ডা দেওয়া যাবে।

রাহুল ফুট কেটেছিল, বস, কাউন্টারে টিকিটের প্রাইস লিস্ট দেখে হিরোকে পর্দায় সাঁটিয়ে দিলে?

অসীমা বলেছিল, না গুরু, প্রাইস লিস্ট আমি দেখিনি। ফেরার পথে রেস্টুরেন্টের খরচা আমার।

সকলে হই হই করে রাহুলকে প্যাঁক দিয়েছিল। দলে অয়নও ছিল।

ভিক্টোরিয়ার মাঠে বসে কোনওরকম ভনিতা না করে অসীমা বলেছিল, তোদেরকে একটা খুব জরুরি কথা জানানোর জন্য সিনেমা দেখা বাদ দিয়ে এখানে এসেছি।

এমন আচমকা নাটুকেপনায় সকলেই বেশ একটু ঘাবড়ে গিয়েছিল, সে তো তুই প্যারাডাইসের সামনে বলতে পারতিস। হাতে তো অনেকটা সময় ছিল। শুধু শুধু সিনেমাটা মিস করালি।

সঞ্চিতার কথার কোনও উত্তর না দিয়ে অসীমা অয়নের দিকে তাকিয়ে বলেছিল, এই যে হাঁদারাম, আমার কথাটা তোর খুব মন দিয়ে শোনা দরকার। সূর্য ওঠার ব্যাপারটা আছে।

এটুকু বলে অসীমা থেমে গেলেও কেউ কিছু আর জানতে চায়নি। একটু দম নিয়ে, নাকি মনে মনে নিজেকে গুছিয়ে নিয়ে অসীমা বলেছিল, অনেক আগেই অয়ন নামে একটা ভীতু চোর আমার কাছে ধরা পড়েছে। অবশ্য চোরটা সে কথা জানে না। তবে চোরটার চুরি করার সাধ থাকলেও সাহস একেবারেই নেই।

প্রায় সকলেই আকাশ থেকে পড়েছিল। অয়ন কোন দিকে তাকাবে বুঝতে পারছিল না।

– চান্স পেলেই আমার চোখের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে থাকে আর নিজের মনে কথা বলে। এমন হাঁদারাম, এটুকু জানে না যে, কারও চোখের দিকে তাকিয়ে মনে মনে কথা বললে, অন্য জন সে কথা সহজেই জেনে যায়।

এমন একটা পরিস্থিতির মধ্যে পড়তে হবে, অয়ন স্বপ্নেও ভাবেনি! কলেজে ডাকাবুকো ছেলে বলে পরিচিতি থাকলে কী হবে, সেই মুহূর্তে তার নিজেকে সত্যিই একটা হাঁদারাম বলে মনে হচ্ছিল।

– অয়নের যে-কোনও দিন মুখ ফুটবে না, সে আমি বুঝে গেছি। তাই আমিই তোদের জানিয়ে দিচ্ছি ,অয়নের জন্য আমারও মনে কুছ কুছ হোতা হ্যায়। সকলে সেদিন মন প্রাণ ঢেলে সেলিব্রেট করেছিল। রাত প্রায় ন’টা নাগাদ তারা বাড়িমুখো হয়েছিল। সেদিন কীভাবে বাড়ি ফিরেছিল অয়নের কিছু মনে নেই। সূর্যের প্রখর আলোয় তার দৃষ্টি মন সম্পূর্ণ আচ্ছন্ন ছিল।

অসীমা অয়নের পাশ দিয়ে চলে গেল। তাকে দেখতেই পেল না। অয়ন নিশ্চিত, আজ সেই ফোনটাই আবার এসেছে। অসীমা এখন একটা মিসাইলের মতন। আশপাশের সবকিছু তুচ্ছ করে রহস্যে ঘেরা লক্ষ্যের দিকে উড়ে যাবে। লক্ষ্যে পৗঁছে তার বিস্ফোরণ কেমন হয়, সে জানে না। আজ ঠিক করল, অসীমাকে অনুসরণ করবে। রহস্যটা আজই সে ভেদ করে ফেলবে।

ভাবতে ভাবতেই পিছন ফিরে দেখল, অসীমা অনেকটা এগিয়ে গেছে। এক দিক দিয়ে ভালোই হয়েছে। রাস্তায় এখন মানুষজনের সংখ্যাও অনেক। অসীমা তার উপস্থিতি টের পাবে না।

নাক বরাবর অসীমা হেঁটে চলেছে। গতি যথেষ্ট বেশি। ডান দিকের ফুটপাথ দিয়ে হাঁটার জন্য অয়নের একটু অসুবিধা হচ্ছে। বেশ কিছুটা দূরের অসীমাকে নজরে রেখে উলটো দিক থেকে হেঁটে আসা অসংখ্য মানুষকে সামলাতে হচ্ছে। অবশ্য ডান ফুটপাথ ব্যবহার করায় একটা বিষয়ে নিশ্চিত, অসীমা কোনও বাসে উঠবে না। যেখানে যাওয়ার হেঁটেই যাবে।

অসীমা হঠাৎ ফুটপাথ বদল করে বাঁ দিকে বাঁক নিল। পড়িমরি করে অয়ন রাস্তা পার হয়ে বাঁ দিকে বেঁকে যাওয়া রাস্তাটার মুখে এসে হাঁপ ছাড়ল। এটা কোনও পাড়ার গলি নয়। রাস্তাটা বাস-ট্রাম রুটের আওতায় নয়। তবে সেখানে অন্যান্য গাড়ির যথেষ্ট ভিড়। রাস্তার দু’পাশের প্রায় সব বাড়ির গ্রাউন্ড ফ্লোরে একাধিক দোকান। জায়গাটা একটা মার্কেটের মতন। তবে এখন ফুটপাথে ক্রেতাদের তেমন যাতায়াত নেই। একটা কফি শপের সামনে অসীমা দাঁড়িয়ে। একা। বেশ কিছুটা দূর থেকে হলেও অয়ন তার বডি ল্যাঙ্গুয়েজ পড়ে ফেলল। খুবই উদ্বিগ্ন, কাউকে খুঁজছে।

সে একটা সিগারেট ধরাল। একা একা রাস্তার মোড়ে দাঁড়িযে দূরের কোনও মেয়ের শরীরী ভাষা পরখ করা যথেষ্ট সন্দেহজনক ব্যাপার। পাবলিকের নজর পড়ে গেলে বিপদ হতে পারে। হঠাৎ অসীমার সামনে একটি ছেলে এসে দাঁড়াল। অয়ন একটু চমকে উঠল। ছেলেটি যেন মাটি ফুঁড়ে উদয় হল। কোথা দিয়ে এল সে টের পেল না। নিজেকে সামলে নিয়ে সে ভালো ভাবে নজর করল। ছেলেটি তাদের চেয়ে বয়সে অনেকটাই বড়ো। সে চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে। অসীমা হাত নেড়ে কথা বলেই চলেছে। একটু পরে ওরা কফি শপে ঢুকে গেল। পা চালিয়ে অয়ন কফি শপের কাছে চলে এল। নিজেকে আড়ালে রেখে সে কাচের দরজা দিয়ে দেখল পাশাপাশি দুটো চেয়ারে ওরা বসেছে। দরজার দিকে পিছন ফেরা। অসীমার মাথা নীচু। ছেলেটি তার পিঠে হাত রেখে কিছু বলছে।

অয়নের মনটা তেতো হয়ে গেল। সে ফুটপাথ পালটে এলোমেলো পায়ে কলেজে ফিরে এল। সেকেন্ড অফটা প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। কিন্তু তার ক্লাসে যেতে ইচ্ছে করল না। কমন রুমের দিকে এগোল। সেখানে রাহুলের মুখোমুখি হয়ে পড়ল। তাকে দেখে রাহুল হই হই করে উঠল, এ কী রে, তোর মুখের কী অবস্থা। কেস কী?

নীচু স্বরে অয়ন বলল, কথা আছে। এই ক্লাসটা অফ করতে পারবি? খুব জরুরি।

রাহুল একটু ঘাবড়ে গেল। –কেস জন্ডিস নাকি রে? গুলি মার তোর ক্লাসের। প্রবলেম কী?

– এখানে নয়। বাইরে চল।

ওরা একটা চা-টিফিনের দোকানে মুখোমুখি বসল। দোকানে তেমন একটা ভিড় নেই। ছড়িয়ে ছিটিয়ে তিনজন কাস্টমার। শুধু দু কাপ চায়ের অর্ডার দিয়ে রাহুল বলল, এবার ঝেড়ে কাশ তো বাবা। কেসটা কী?

অয়ন পুরো ঘটনাটা বলল। রাহুলের চোখ জোড়া ছানাবড়া হয়ে গেল।

–সে কী রে, তার মানে অসীমা তোর সাথে গেম খেলছে!

সাংঘাতিক মেয়ে তো! একেবারেই বোঝা যায় না। টাইম পাস করার জন্য তোকে বাছল!

– কিছুই তো বুঝতে পারছি না।

–ঠিকঠাক দেখেছিস তো? নাকি ভগবান দেখতে গিয়ে ভূত দেখে লাফাচ্ছিস?

–বাজে কথা বলিস না। এখন এসব ভালো লাগছে না।

–মালটা কেমন?

–সুন্দর চেহারার একটা ডেফিনেশন আছে না– টল, ডার্ক অ্যান্ড হ্যান্ডসাম? তবে চেহারাটা বেশ রাফ টাইপের। বয়সটাও আমাদের চেয়ে অনেকটাই বেশি।

এবারে রাহুলের কপালে ভাঁজ পড়ল।

-অসীমা এমন লুকোছাপা করে কারও সাথে রিলেশন করবে, ভাবতে গেলেই গা গুলিয়ে উঠছে। কী ক্যারেক্টার রে ভাই! বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়।

–কিন্তু ঘটনাটা ঘটেছে। আমারই চোখের সামনে।

–দাঁড়া, এমন হা-হুতাশ করিস না। ভাবতে দে। কনফার্মড হতে হবে। আরও ইনফরমেশন জোগাড় করতে হবে। নইলে দেখবি হাতে হ্যারিকেন নিয়ে ফ্যা-ফ্যা করছিস।

অয়ন বুঝতে পারল, তার মাথাটা পুরোপুরি ঘেঁটে গেছে। অসহায় ভাবে সে রাহুলের দিকে তাকাল।

–এমন গাধার মতন তাকিয়ে থাকিস না। কেসটা বেশ জন্ডিস! ভেবেচিন্তে এগোতে হবে।

–গাধা, গরু যা খুশি বল, আমি তাই। এখন একটু তাড়াতাড়ি কিছু একটা ভাব।

–আচ্ছা, ছেলেটা অসীমা-র দাদা-টাদা হবে না তো?

–না, হবে না। অয়ন বেশ জোর দিয়ে বলল। তোরা জানিস না, অসীমা বেশ কয়েকবার আমায় ওদের বাড়ি নিয়ে গেছে। ওর

বাবা-মায়ের সাথে পরিচয় হয়েছে। অনেক কথা হয়েছে। কোনও দাদা থাকলে নিশ্চয়ই কথাবার্তায় তার কথা আসত। এক-আধ বার দেখা হওয়ারও চান্স মিলত।

–কোনও তুতো দাদা নয়তো?

–এবার তুই গাধার মতো কথা বললি। তুতো দাদার ফোন পেয়ে কেউ অমন বিশ্ব ভুলে দৌড় লাগায় না। তাও এক-আধ বার নয়, বারবার।

রাহুল ঘাড় নাড়ল। –তোর কথায় দম আছে। তবে একটা কথা শোন, এখনই কাউকে কিছু বলিস না। আমার মাথায় একটা প্ল্যান এসেছে। আগে সেটা অ্যাপ্লাই করতে হবে।

–কী প্ল্যান? অসীমার পিছনে স্পাই লাগাতে হবে।

–মানে?

–ঘাবড়াস না। আমার বাবার জানাশোনা এজেন্সি আছে। তারা এসব কাজ করে। সাবজেক্ট কিচ্ছুটি টের পাবে না। একেবারে নাড়ির খবর টেনে বের করবে। বেশি সময়ও নেবে না।

অয়ন সত্যিই ঘাবড়ে গেল। বলল, উলটো-পালটা কিছু হবে না তো রে?

–ফালতু কথা বলিস না। প্রফেশনাল লোকজন কাজ করবে। মাখনের মধ্যে ছুরি চলবে। কেউ কিছু বুঝবে না।

দিন কুড়ি বাদে রাহুল হ য ব র ল মার্কা একটা খবর আনল। এর মধ্যে ফোন কলে সাড়া দিয়ে বার দুয়েক অসীমা কলেজ কেটেছে। সে অয়নকে উপদেশ দিয়েছিল, ঘটনাটার কথা কাউকে না বলতে। কিন্তু মাথামুণ্ডহীন খবরটা এনে সে হাটের মাঝেই ঝাঁপি খুলে বসল। একটু আগেই ফোন পেয়ে অসীমা কলেজ কেটেছে। সোমবার পর পর চারটে অনার্সের ক্লাস থাকে। সেসবের তোয়াক্বা করেনি। তাতেই হয়তো রাহুল উৎসাহিত হয়ে গোপন তথ্য ফাঁস করে ফেলল। এটা তার বরাবরের দোষ। উৎসাহিত হয়ে পড়লে তার পেটে আর কোনও কথা থাকে না।

ঘনিষ্ঠ পাঁচ জনের মধ্যে একজনের পিছনে গোয়েন্দা লাগানো হচ্ছে। অয়ন ভাবল, বাকিরা ব্যাপারটা সমর্থন করবে না।

যে-কোনও বিষয়ে আগ বাড়িয়ে উলটো পালটা কিছু একটা করে ফেলার বদনাম রাহুলের আছে। কিন্তু এই গোয়েন্দা লাগানোর ব্যাপারটা রাহুলের মস্তিষ্ক প্রসূত হলেও, অয়নের ভয় হল বাকিরা তাকেই দূষবে।

কিন্তু তার দিকে কেউ ফিরেও তাকাল না। দু’জনই রাহুলের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল, কোথায় যায় বলতো? জিজ্ঞাসা করলে কিছু বলতে চায় না। একি রাধিকা প্রেম?

–বাব্বা, একেবারে কলির রাধা।

তিনজনই বিশ্রী ভাবে হেসে উঠল। অয়নের খুব খারাপ লাগল। হতে পারে অসীমার এমন কোনও ব্যক্তিগত বিষয় আছে যেটা সে কারও সাথে শেয়ার করতে চায় না। এই মুহূর্তে হয়তো তাকেও নয়। তাই বলে তার অনুপস্থিতিতে তাকে নিয়ে হাসিঠাট্টা ঠিক নয়। সে সকলের মুখের দিকে তাকাল। তার উপস্থিতি নিয়ে কারও কোনও মাথাব্যথা নেই। তার আরও খারাপ লাগল, বন্ধুদের প্রতি বিশ্বাসে চিড় ধরে গেল। তার কোনও বিষয় নিয়ে এরা হয়তো ভবিষ্যতে এমনি মজা করবে।

–অয়নটাও কিছু জানে না। একেবারে ভ্যাদা।

–ঠিক বলেছিস। ওর উচিত অসীমাকে আচ্ছা করে চেপে ধরা।

কথাটা ঠক করে অয়নের কানে লাগল। প্রেমিক বা প্রেমিকার কোনও গোপন ব্যাক্তিগত বিষয় থাকতেই পারে। একজনের জীবনের সবকিছু অন্যজনের কাছে পরিচিত নাও হতে পারে। শেষের মন্তব্যটা রাহুলের করা। তার মনে হল, সেদিন তার রাহুলের সামনে অতটা রিঅ্যাক্ট করা ঠিক হয়নি। রাহুলকে থামানোর জন্য সে বলল, কী তখন থেকে আজেবাজে বকছিস। কাজের কাজ কিছু হল?

এমন হঠাৎ আক্রমণে রাহুল একটু থতমত খেয়ে গেল। বাকিরাও মুহূর্তের মধ্যে নিজেদের মুড পালটে ফেলল।

–ঠিকই তো। তোর সিক্রেট এজেন্সির প্রোগ্রেস কী?

–আমার কোনও সিক্রেট এজেন্সি নেই। যারা কাজটা করছে তারা প্রফেশনাল।

–প্রোগ্রেসটা বল। প্রায় গনগনে স্বরে অয়ন বলল।

সামান্য একটু কেশে গলাটা পরিষ্কার করে নিয়ে রাহুল বলল, ‘ছেলেটিকে এখনও আইডেন্টিফাই করা যায়নি। তবে তার সাথে অসীমার সম্পর্ক বেশ গভীর। দু’বার রেস্টুরেন্টের কেবিনে সে ছেলেটির সামনে কান্নাকাটি করে। ছেলেটিকে সে বাড়ি নিয়ে যেতে চায়। তবে এখনও হয়তো পারেনি। ছেলেটি খুব ধুরন্ধর।’

–কান্নাকাটি করেছে। বাড়ি নিয়ে যেতে চায়। এসব কথার মানে কী? অয়ন ঝাঁঝিয়ে উঠল।

–খুব বেশি ডিটেল এখনও জানা যায়নি। তবে সবই জানা যাবে। আর একটু সময় লাগবে।

হঠাৎই অয়নের মাথাটা ঝিমঝিম করে উঠল। কমন রুমে একটা

টি টি টেবিলে হেলান দিয়ে সে দাঁড়িয়েছিল। সেখান থেকে সরে গিয়ে একটা চেয়ার টেনে নিয়ে বসল।

–ডিটেলে আর নতুন কী জানবি। এতো সোজাসাপটা টাইম পাসের খেলা।

–অসীমাকে দেখে কিন্তু কিছু বোঝা যায় না।

–আমাদের কথা বাদ দে। অয়নও কিছু বুঝতে পারেনি।

–এটা কিন্তু মেনে নেওয়া যায় না। অসীমাকে এবার সোজাসুজি চার্জ করতে হবে। ওকে বুঝিয়ে দেওয়া দরকার, এমন নোংরা গেম আমরা কেউ পছন্দ করি না। এনজয় করি না।

হঠাৎ রাহুলের মোবাইল ফোন বেজে উঠল। সকলে এক সাথে চমকে উঠল। পকেট থেকে মোবাইল সেট বের করে রাহুল আরও চমকে উঠল– অসীমা ফোন করেছে।

কলটা রিসিভ না করে রাহুল সকলের উদ্দেশ্যে বলল, অসীমা ফোন করেছে।

সকলে এতটা চমকে উঠল যে কেউ কোনও কথা বলতে পারল না। মোবাইলটা চুপ করে গেল।

প্রায় আর্তনাদের স্বরে অয়ন বলল, রিং ব্যাক কর। রিং ব্যাক কর।

রাহুল রিং ব্যাক করল। আশা বলল, লাউডস্পিকার অন করে দে।

ও প্রান্তে অসীমা কলটা রিসিভ করতেই রাহুল নিজের মোবাইলের লাউডস্পিকার অন করে দিল।

রাহুল ‘হ্যালো’বলার আগেই অসীমার স্বর ভেসে এল, একটা রিকোয়েস্ট করছি। প্লিজ রাখিস। আমার হয়ে একটু সকলকে বলিস, রিকোয়েস্টটা যেন রাখে। খুব জরুরি একটা কারণ আছে।

–রিকোয়েস্টটা বল। না রাখার কিছু নেই।

–কাল তোরা কলেজ ড্রপ কর। এগারোটা নাগাদ ভিক্টোরিয়ার মাঠে চলে আয়। ওখানেই কথা হবে। অসীমা লাইনটা কেটে দিল।

কয়েকটা মুহূর্ত নির্বাক অবস্থায় কাটার পর সঞ্চিতা বলল, আবার কী নাটক হবে ভগবান জানে। আমি বাবা কাল কলেজে আসব।

আশা বলল, এসব গেম-টেমের মধ্যে আমি নেই। কাল আমিও কলেজে আসব।

রাহুল দু’জনকেই বোঝানোর চেষ্টা করল, এমন করিস না। দেখা যাক না ও কী বলতে চায়। সিরিয়াস কিছুও তো হতে পারে। হয়তো আমাদের কোনও হেল্প ওর প্রয়োজন।

সকলের ঘড়িতে অনেকক্ষণ এগারোটা বেজে গেছে। এক রাউন্ড বাদাম, তারপর চা শেষ হয়েছে। সকলেই একটু একটু রেগে উঠল। সবচেয়ে বেশি বিরক্ত হয়ে উঠল অয়ন। সকালের দিকে সে একবার ভেবেছিল কলেজে চলে যাবে। অসীমা ফোনে তাকে একটু হিন্টস দিতে পারত। গত রাতে সে দুটো পর্যন্ত জেগে ছিল। অসীমা ফোন করেনি। সে-ও করতে পারত। কিন্তু তার ইগোতে লেগেছিল। অসীমা তাকে সকলের দলে ফেলে দিয়েছে! মনটা একেবারে তিতকুটে মেরে গেছে। খুব অনিচ্ছাতেই সে এখানে এসেছে।

–অসীমার সেন্স অফ টাইমিং-ও তো খারাপ নয়।

–নিজে প্রোগ্রাম করে নিজে এত লেট?

–আমাদের এখানে ভাগিয়ে এনে নিজে আবার কলেজে চলে যায়নি তো?

–হতে পারে। যা খেল দেখাচ্ছে।

–এটাও যদি অসীমার একটা গেম হয়, মেয়ে বলে কিন্তু কোনও ছাড় পাবে না। স্রেফ কেলিয়ে দেব। তখন কেউ জ্ঞান মারতে আসবি না– কথাগুলো রাহুল বলল।

তারা নিজেদের মধ্যে এমন কথা বলে না। কিন্তু আজ বলছে। অয়নের মনে হল তার মাথার ভিতরটা আস্তে আস্তে অবশ হয়ে যাচ্ছে। আগে কখনও এমন হয়নি।

অসীমা গেট দিয়ে বাগানে ঢুকছে। সকলের সাথে অয়নও দেখল। অসীমা নিশ্চয়ই তাদের দেখেছে। তার ঠোঁটের এক কোণে একটা ছোট্ট খুশির ছোঁয়া। অয়ন অনুভব করল, তার মনের তিতকুটে ভাবটা একটু কেটে গেল। মাথাটাও একটু ঝরঝরে হয়ে গেল। সবই অসীমার ওইটুকু হাসির জন্য।

অসীমা এসে রাহুলের পাশে বসল। অয়নকে যেন দেখতেই পেল না।

–একটা খুব জরুরি বিষয় তোদের সামনে শুরু করেছিলাম। আজ সেটা তোদের সামনেই শেষ করতে চাই। কথা দিচ্ছি আর কোনও দিন তোদের কাউকে কলেজ কাটার রিকোয়েস্ট করব না।

হেঁয়ালি করে কথা বলা অসীমা একেবারে পচ্ছন্দ করে না। অথচ এখন নিজেই সেটা করছে। খুব তাড়াতাড়ি অয়ন এদিক-ওদিক একটু ভেবে দেখল। হেঁয়ালির কোনও অর্থ মিলল না।

–অয়নের প্রেমিক হওয়ার কোনও যোগ্যতাই নেই। তোদেরও বন্ধু হিসেবে মানতে একটুও ইচ্ছে করছে না।

চারজনই বিস্ময়ে হাঁ হয়ে গেল। অসীমা কী বলছে! অয়ন নিজের কান দুটোকে বিশ্বাস করতে পারল না।

–তোরা আমার পিছনে প্রফেশনাল স্পাই লাগিয়েছিস?

অয়ন ভীষণ ভাবে চমকে উঠল। রাহুলের দিকে তাকাল। তারও চক্ষু ছানাবড়া।

–বিশেষ একটা ফোন পেয়ে আমি কোথায় যাই, সেটা জানার জন্য তোরা এমন একটা কাজ করলি! একটু ধৈর্য ধরলে সত্যিটা আমি যে-কোনও দিন তোদের বলে দিতাম।

অসীমার চোখের তারায়, ঠোঁটের কোণে কোথাও কোনও হাসির ছোঁয়া নেই। সে খুব রেগে গেলেও এমনটা হয় না।

–আমায় ফোন করে আমার দাদা। একমাত্র দাদা।

চারজনই আকাশ থেকে পড়ল।

–আমার আর কিছু বলার নেই। তোদের আর কিছু জানার অধিকারও নেই। অসীমা উঠে দাঁড়াল।

–আসি রে। ইচ্ছে করলে তোরা এখন কলেজে চলে যেতে পারিস। সে গেটের দিকে পা বাড়াল।

অনেক কথাই অসীমা তার বন্ধুদের বলতে পারল না। তার দাদা অসীম খুব ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্ট ছিল। কিন্তু পড়াশোনা শেষ না করে দেশ উদ্ধারের কাজে নেমেছিল। এমন একটা রাজনৈতিক দলের সদস্য হয়েছিল, যে দলটাকে দেশের, রাজ্যের সরকার ভয় পায়। সাধারণ মানুষও ভয় পায়। অথচ অসীমের বিশ্বাস একমাত্র তারাই দেশের প্রান্তিক মানুষদের কথা ভাবে। তাদের জন্য কিছু করার চেষ্টা করে। তাদের অবস্থার কথা দেশের বাকি মানুষদের জানাতে চায়।

পুলিশ কোনও দিন অসীমকে ধরতে পারেনি। সেজন্য প্রথম দিকে তাদের পরিবারের উপর অনেক অত্যাচার হয়েছে। শুধু পুলিশের দিক থেকে নয়। আগে অসীমারা যেখানে থাকত সেখানকার মানুষজনও তাদেরকে পাড়া ছাড়া করানোর জন্য উঠে পড়ে লেগেছিল। অশান্তি এড়ানোর জন্য অসীমা-র বাবা ও-পাড়ার ফ্ল্যাট বিক্রি করে দিয়েছিলেন। ক’টা বছর সম্পূর্ণ অপরিচিত একটা জায়গায় ওরা ভাড়া বাড়িতে ছিল। সেই সময় থেকে অসীম ওদের পরিবারে অস্তিত্বহীন। শেষে অসীমার বাবা কলকাতায় ফ্ল্যাট কেনেন। ওরা এখানকার ভিড়ে মিশে যায়। সকলেই জানে ওদের তিনজনের সংসার। নির্ঝঞ্ঝাট, সুখী একটা পরিবার। ভেতরের দগদগে ক্ষতের কথা কেউ জানে না।

অসীম তার বোনকে অত্যন্ত ভালোবাসত। নিজে দূরে হারিয়ে গিয়েও সে বোনের খোঁজ করেছে। এক সময় খোঁজ পেয়েছে। কলকাতায় কাজে এলে সুবিধা মতন বোনকে ডেকে নেয়। কয়েকটা মুহূর্ত বোনের সাথে কাটায়।

একথা অসীমার মা বাবা জানেন না।

চারজন পলকহীন দৃষ্টিতে দেখল অসীমা গেট পার হয়ে দূরে মিলিয়ে গেল। চারজনের কেউ কারও মুখের দিকে তাকাতে পারল না। প্রত্যেকের লক্ষ্যহীন দৃষ্টি দূরে দূরে ঘুরতে লাগল। বেলা বাড়তে থাকল। গাছের ছায়ারা সরে সরে যেতে লাগল।

শো করতে গিয়ে বিপাকে যশ-নুসরত

বেশ ধূমধাম করে ২০১৯ এ বিয়েটা সেরেছিলেন নিখিল জৈন ও নুসরত জাহান৷ তুরস্কের এক বন্দর শহরের পাঁচতারা হোটেলে হয়েছিল আয়োজন৷ অথচ দেড়বছরের মাথায় সেই বিয়েই ভাঙনের মুখে৷ নিখিল জৈন ও নুসরত জাহানের সম্পর্ক নিয়ে রীতিমতো টানাপোড়েন শুরু হয়েছে। অনেকেই বলা শুরু করেছেন এর মূলে নাকি অভিনেতা যশ৷ নিখিলের সঙ্গে দূরত্বের কারণ যশের সঙ্গে নুসরতের সম্পর্ক৷

এ বিষয়ে যশ-নুসরত জুটি কোনও রকম মন্তব্য করতে না চাইলেও, টলিউডের দুই তারকা তাঁদের অন্তরঙ্গতা চেপে রাখতে বিফল হয়েছেন৷ অল্পদিন আগে যশ-নুসরত এক সঙ্গে রাজস্থান ঘুরে এসেছেন বলেও খবর। সম্প্রতি একটি ভিডিও, সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়ে গিয়েছিল, যাতে দেখা গেছে নুসরত জাহান, যশ দাশগুপ্তের সঙ্গে দক্ষিণেশ্বরের কালী মন্দিরে গিয়েছেন।নুসরত গোলাপি সবুজ সিল্কের শাড়ি পরে, হাতে শাঁখা পলা, কপালে সিঁদুর, পাশে যশ। সঙ্গে রয়েছেন মদন মিত্র৷ ফেসবুক, ইনস্টাগ্রামে বেশ কয়েকটি ফ্যান ক্লাব শেয়ার করেছে এই ভিডিওটি। যশ অবশ্য এই ঘনিষ্ঠতার কথা অস্বীকার করেছেন, দাবি করেছেন পুরোনো এই ভিডিওটি নিয়ে অযথা জলঘোলা করা হচ্ছে। তাঁর আর নুসরতের সম্পর্ক নিয়ে লোকে অতিরঞ্জিত করছে। এতে তাঁর আর নতুন করে কিছু যোগ করার নেই।

এদিকে যশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়াতেই, নুসরতের সঙ্গে নিখিলের সম্পর্ক প্রায় তলানিতে এসে ঠেকেছে বলে খবর। প্রথম সিনেমার পর একসঙ্গে শো করাও শুরু করেছেন যশ- নুসরত৷ কিন্তু প্রথম শোয়ের আগেই বিপাকে পড়েছেন দুজনেই৷ কুলগাছিয়াতে শো করতে যাওয়ার পথে  চা খেতে দাঁড়ালে, আচমকাই তাঁদের গাড়ির কাঁচ ভেঙে যায়। কীভাবে ওই ঘটনা ঘটল, তা নিয়ে এখনও সংশয় কাটেনি যশের৷ যশ এবং নুসরতের গাড়ির সঙ্গে অন্য যে-গাড়িগুলি ছিল, সেগুলির কয়েকটিরও অল্পবিস্তর ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে৷ কে বা কারা,এই অপকর্মের সঙ্গে যুক্ত তা এখনও জানা যায়নি।

‘এসওএস কলকাতা’ নামের ছবিতে একসঙ্গে কাজ করেছেন যশ এ নুসরত৷ আন্দাজ করা যায় এই ছবির সূত্র ধরেই তাঁদের অন্তরঙ্গতা গভীর হয়৷ তবে এই সম্পর্কের বিষয়ে দুজনেই মুখ খুলতে নারাজ ৷যশ তো স্পষ্টই জানিয়ে দিয়েছেন, নুসরতের ব্যক্তিগত জীবনে প্রসঙ্গে যেন তাঁকে কোনও প্রশ্ন করা না হয়। অন্যদিকে তৃণমূল কংগ্রেসের সাংসদ অভিনেত্রীও তাঁর ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে একেবারেই কথা বলতে চান না৷ ।স্পষ্টই বলেছেন, মানুষ তাঁর কাজের বিষয়ে প্রশ্ন তুললে সাংসদ হিসাবে তিনি উত্তর দিতে বাধ্য, কিন্তু ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে নয়৷

স্বামী নিখিল জৈনের সঙ্গে সম্পর্কের এই ভাঙনকে ঘিরে বেশ কিছুদিন ধরেই খবরের শিরোনামে রয়েছেন নুসরত। এই বিষয়ে আবার সম্পূর্ণ মুখে কুলুপ এঁটেছেন নিখিল৷ বছরের শেষ দিনের একটি পোস্ট-এর পর একদম চুপচাপ তিনি৷ সম্প্রতি একটি ছবি যদিও বা দিয়েছেন ইনস্টাগ্রাম-এ, সেটা নুসরতের সঙ্গে নয়, তাঁর এক বন্ধুর সঙ্গে তোলা৷ শুরুর দিকে যখন নুসরতকে ঘিরে বিরূপ মন্তব্যের ঝড় ওঠে সোশ্যাল মিডিয়ায়, তখনও নিখিল, স্ত্রীর পক্ষ নিয়েই সেইসব মন্তব্যের জবাব দেন৷ এখন এই সম্পর্কের পরিণতি ঠিক কী,তা সময়ই জানান দেবে৷

গলস্টোন

জীবনশৈলীর বদল ঘটলে, খাদ্যাভ্যাসও বদলায়। কেউ হয়তো ঠিক সময়ে সঠিক খাবার খাওয়ার সময় পান না, কেউ আবার মশলাদার মুখরোচক খাবার খেতে অভ্যস্ত। এরফলে শুরু হয় হজমের গণ্ডগোল। আর দীর্ঘদিন যদি হজমের গণ্ডগোল হতে থাকে, তাহলে তার পরিণতিতে হতে পারে গলস্টোন– যা কিনা বিপদবহুল। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানাচ্ছেন ডা. মহেশ গোয়েঙ্কা।

গলব্লাডার এবং গলস্টোন বিষয়টি ঠিক কী?

মানুষের শরীরের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ হল গলব্লাডার। মাত্র ৩ ইঞ্চি লম্বা এক অরগান যা আপনার লিভারের ঠিক নীচে থাকে আর লিভারে তৈরি হওয়া পিত্তকে স্টোর করে। ‘বাইল’কে ‘গল’ও বলা হয় যার থেকে এই অরগানের নামকরণ হয়েছে। পিত্তের কাজ হল চর্বিকে হজম (ইমস্লিফিকেশন) করা। তাই আপনি যখনই মুখরোচক খাবার খান, তখন তৈলাক্ত পদার্থ (ফ্যাট) হজম করে উপযোগী জ্বালানির রূপ দেওয়ার কাজ গল ব্লাডার করে থাকে। আপনার পেটে আর আপনার অন্ত্রে যখনই হজম প্রক্রিয়া শুরু হয়, তখন গল ব্লাডার ‘বাইল ডাক্ট’ নামের একটি নল থেকে আপনার ছোটো অন্ত্রে বাইল পাঠায়, যাতে ফ্যাটের ইমস্লিফিকেশন হতে পারে।

কিন্তু গল ব্লাডার বা বাইল ডাক্টে ‘পাথর’ থাকলে, বাইল ডাক্টে বাইলের প্রবাহ বন্ধ হয়ে যায় যা এই প্রক্রিয়ায় বাধার সৃষ্টি করে। বাইল ডাক্টের পাথরকে ‘কোলেডোকোলাইথিয়াসিস’ বলা হয়। গলস্টোন (পাথর) হওয়ার কারণে বাইলের কিছু পদার্থ শক্ত হয়ে যায়। কিছু সমীক্ষায় দেখা গেছে, গল ব্লাডারে পাথরের পনেরো শতাংশ রোগীর, বাইল ডাক্টেও পাথর হয়। কিছু রোগীর ক্ষেত্রে কেবল একটি পাথর হয়, আবার অনেক রোগীর ক্ষেত্রে একাধিক পাথর হতে পারে। পাথর বালুর দানার মতো খুব ছোটো বা লেবু বা গলফ বলের মতো বড়ো হতে পারে।

কী কারণে হয় গলস্টোন?

বেশির ভাগ গল স্টোন কোলেস্টেরল থেকে হয়ে থাকে। সেই কারণে ডাক্তার মনে করে স্থূলতা, মধুমেহ, খাবারে বেশি ফ্যাট আর ফাইবার কম থাকা এবং শরীর কম সক্রিয় থাকলে তা গল ব্লাডারের সমস্যাকে আমন্ত্রণ জানায়। অন্য এক ধরনের গলস্টোন বিলুরুবিন থেকে তৈরি হয়, যা বস্তুত লিভার  দ্বারা ব্লাড সেল নষ্ট হওয়ার সময় তৈরি হওয়া পিগমেন্ট। লিভার সিরোসিসের রোগীর যদি রক্তের কোনও অসুখ বা বিলিয়রি ট্র্যাকে সংক্রমণ হয়, তাহলে লিভারে বিলুরুবিন অনেক বেশি তৈরি হওয়ার আর গল ব্লাডারে এর পরিমাণ অনেক বেড়ে যাওয়ার কারণে পাথর তৈরি হওয়া শুরু হয়।

পাথর হওয়ার বিপদ মহিলাদের মধ্যে বেশি থাকে। যদি পরিবারে আগে থেকেই কারও পাথর থাকে, তার ওজন দ্রুত কমতে থাকে। এস্ট্রোজেন যুক্ত (কেবল মহিলাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য) ওষুধ বা ট্যাবলেট যদি নেন আর তার বয়স ৪০ এর বেশি যদি হয়, তবে পাথর হওয়ার বিপদ বেড়ে যায়।

পাথর হওয়ার সাধারণ লক্ষণগুলি কী কী?

  •  পেটের ওপরে ডানদিকে হঠাৎ ব্যথা
  •  স্তনের হাড় (ব্রেস্টবোন)-এর নীচে পেটের মাঝখানে হঠাৎ ব্যাথা
  • কোমরের ব্যথা, ঘাড়ের (শোল্ডার ব্লেড) মাঝের অংশে ব্যথা
  •  ডান কাঁধে ব্যথা, এই ব্যথা কয়েক মিনিটের জন্য হতে পারে বা কয়েক ঘন্টা ধরে সমস্যায় ফেলতে পারে।

অন্য লক্ষণগুলি হল–

  •  বমি
  •  মাথা ঘোরা
  •  ধূসর রঙের মল

গলস্টোন হলে কী কী সমস্যা দেখা দেয়?

পাথর হয়ে থাকলেও সবক্ষেত্রে স্পষ্ট লক্ষণ দেখা দেয় না। কিন্তু এই সব সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে যেমন–

  •  কোলেসিস্টাইটিস ছ এটি গল ব্লাডার ফুলে যাওয়ার সমস্যা, যা গল ব্লাডারের গলায় পাথর আটকে গেলে হয়। এর ফলে রোগীর খুব ব্যথা বা জ্বর হতে পারে।
  •  বাইল ডাক্টে ব্লকেজ ছ যদি পাথরের ফলে বাইলকে লিভার হয়ে অন্ত্রে নিয়ে যাওয়ার ডাক্ট ব্লক হয়ে যায়, তবে সংক্রমণ এবং জন্ডিস (চোখ এবং ত্বক হলদে হয়ে যাওয়া কারণ বিলুরুবিন জমতে থাকে) হতে পারে।
  •  প্যানক্রিয়াটাইটিস ছ যদি পাথর প্যানক্রিয়াটিক ডাক্ট (প্যানক্রিয়াসকে কমন বাইল ডাক্ট-এর সঙ্গে যুক্ত করার নল)-কে ব্লক করে দেয়, তবে এ থেকে পাথরের সবচেয়ে বিপজ্জনক অসুখের মধ্যে অন্যতম, প্যানক্রিয়াটাইটিস হতে পারে। এর ফলে প্যানক্রিয়াস ফুলে যায় এবং খুব ব্যথা হয় আর প্রায়ই রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করার দরকার হয়। প্যানক্রিয়াটাইটিস কিছু কিছু ক্ষেত্রে প্রাণঘাতী হতে পারে।
  •  গল ব্লাডারের ক্যান্সার ছ যদিও এই ক্যন্সারের বেশি প্রকোপ নেই কিন্তু যদি কারও পাথরের সমস্যা থেকে থাকে, তবে তার গল ব্লাডারের ক্যান্সার হওয়ার বিপদ থাকে

এই রোগের নিরাময় কীভাবে সম্ভব?

ল্যাব টেস্ট আর ইমেজিং টেস্ট থেকে পাথর সম্পর্কে জানা হয়। ইমেজিং টেস্ট থেকে ডাক্তারদের পক্ষে গল ব্লাডার, বাইল ডাক্ট আর এসবের সঙ্গে যুক্ত অন্য অঙ্গ প্রত্যঙ্গের পরীক্ষা প্রক্রিয়া সহজ হয়, যাতে পাথর সম্পর্কে জানা যায়। আজ ডাক্তারদের কাছে ইমেজিং-এর অনেক বিকল্প আছে যেমন–

  •  আল্ট্রা সাউন্ডঃ  এটি পাথর সম্পর্কে জানার অন্যতম ভালো পদ্ধতি। আল্ট্রা সাউন্ড মেশিন সাউন্ড ওয়েভের সহায়তায় অঙ্গের ইমেজ তৈরি করে আর এটাও দেখায় যে সেই অংশে পাথর আছে কি না। এতে রোগীর কোনও কষ্ট হয় না। এটি গর্ভবতী মহিলা সহ সকলের জন্য সুরক্ষিত।
  •  কম্পিউটেড টোমাগ্রাফি (সিটি) স্ক্যানঃ  এতে এক্সরে আর কম্পিউটার টেকনোলজির সামঞ্জস্যে গল ব্লাডার, বাইল ডাক্ট আর প্যানক্রিয়াসের ইমেজ তৈরি করা হয়। কিন্তু দুঃখের বিষয় এই প্রযুক্তি খুব কার্যকর নয় আর কিছু কিছু পাথর এতে ধরা পড়ে না।
  •  ম্যাগনেটিক রেসোন্যান্স ইমেজিং (এমআরআই)ঃ  এই মেশিন এক্সরে-এর পরিবর্তে রেডিও ওয়েভস আর শক্তিশালী চুম্বকের সহায়তায় অঙ্গের সুক্ষ্ম ছবি তৈরি করে আর সমস্ত স্থানে পাথরের বিষয়ে জানার কার্যকরী পরীক্ষা।
  •  এইচআইডিএ স্ক্যানঃ  একে কোলেসাইন্টিগ্রাফিও বলা হয়। এই পদ্ধতিতে রোগীর শরীরের ভেতরে খুব অল্পমাত্রায় সুরক্ষিত রেডিও অ্যাক্টিভ মেটিরিয়াল ইঞ্জেক্ট করা হয় আর একটি বিশেষ ক্যামেরার সহায়তায় এর ওপর দৃষ্টি রাখা হয়, যাতে গল ব্লাডারে যদি কিছু অস্বাভাবিক থাকে বা বাইল ডাক্ট ব্লক হয়, তার ছবি সামনে দেখা যায়।
  •  এন্ডোস্কোইক রেট্রোগ্রেড কোলেজিয়োপ্যাংক্রিয়েটোগ্রাফি (ইআরসিপি)ঃ  এই পরীক্ষা উররোক্ত অন্যান্য পরীক্ষার চেয়ে বেশি ইনভেসিভ হয়ে থাকে। এতে রোগীর মুখে একটি লম্বা নমনীয় টিউব প্রবেশ করান হয়, যা গলা হয়ে পেট এবং অন্ত্র পর্যন্ত যায়। এই প্রক্রিয়ায় পাথর দেখা এবং বের করাও যায়।

গলস্টোন-এর কোনও নতুন চিকিৎসা পদ্ধতি রয়েছে কি?

‘কোলেজিয়োস্কোপি’র জন্য উপলব্ধ নতুন প্রযুক্তিতে একটি ইআরসিপি (ওপরে তথ্য দেওয়া হয়েছে) থেকে ডাক্ট-এর ভেতর পাথর দেখা এবং নষ্ট করা সম্ভব হয়েছে। আগে বাইল ডাক্ট দেখার জন্য এন্ডোস্কোপি টুলস ব্যবহার করা হতো, যা তাদের রোগীর মুখের ভেতরে প্রবেশ করাতে হতো, সেইসঙ্গে এক্সরে-র ব্যবহার করতে হতো, যাতে পাথর কোথায় আছে তা সঠিক ভাবে জানা যায়। আজকের আধুনিক টুলসের ফলে এক্সরে-র প্রয়োজন নেই আর ডাক্তার আধুনিক ইন্সট্রুমেন্ট এবং ছোটো ক্যামেরার সহায়তায় গল ব্লাডারের পাথর সোজা দেখতে পারেন। এতে ডাক্তাররা পাথরের সঠিক অবস্থান জানতে পারেন আর সঠিক চিকিৎসার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। এটি পাথরের সেই সব ঘটনায় সাহায্য করে, যেখানে চিকিৎসা কঠিন।

পাথর অন্য অঙ্গে, যেমন কিডনিতে হলে ডাক্তার শরীরের বাইরে থেকে শক ওয়েভ দিয়ে পাথর ভেঙ্গে ফেলতে পারেন। কিন্তু এই পদ্ধতি গল ব্লাডারের পাথরের কঠিন জায়গায় হওয়ার দরুন খুব কার্যকর নয়। তবে এই সমস্যারও সমাধান এসে গেছে। আজ ডাক্তার লেজারের সহায়তায় পাথর সনাক্ত করে, সঙ্গে সঙ্গে বের করতেও পারেন। এই সার্জারি বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মধ্যে ন্যূনতম সার্জারির প্রক্রিয়া। রোগীর কষ্ট কম হয়, কয়েকদিন হাসপাতালে থাকতে হয়, তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক জীবনের আনন্দ নিতে পারেন।

——-

সং অফ দ্য সিগাল

‘আমি ক্লান্ত প্রাণ এক, চারিদিকে জীবনের সমুদ্র সফেন,আমারে দুদণ্ড শান্তি দিয়েছিল…’

সময়টা এখন ডিসেম্বরের শেষ। সাড়ে দশটার নরম হলুদ সকাল। ব্রেকফাস্ট সেরে হোটেলের সামনে থাকা সুন্দর করে সাজানো লনে এসে বসেছি। সামনে আদিগন্ত নীল, শুধু নীল জল। গোপালপুর অন সি-তে আসার ইচ্ছা আমার অনেক দিনের।

‘বাবাই, ফুল ছেঁড়ে না’, চেঁচিয়ে ওঠে সুমি, ‘ওঃ, এই এক ছেলে হয়েছে, এত অসভ্য! আমি আর পারি না। রাকেশ, এই রাকেশ, দ্যাখো তোমার ছেলে একটুও কথা শোনে না।’

টঙ্কাস ততক্ষণে টবের গাছ থেকে বেশ কয়েকটি ফুল ছিঁড়ে, মুঠোয় ভরে হাসছে। ওর চোখে-মুখে দিব্যতা, দুষ্টুমি ঝরে পড়ছে।

ভায়রা রাকেশ সকলের সঙ্গে সেলফি তুলে বেড়াচ্ছিল। ছুটে এসে ছেলের মাথায় সাঁটিয়ে কষাল এক উড়ন-চাঁটি। তাতে বছর ছয়েকের টঙ্কাস একটু থতমত খেয়ে অদ্ভুত দৃষ্টিতে বাবার দিকে তাকাল, তবে কাঁদল না। মাথার পিছনে হাত বুলিয়ে বুলিয়ে ঘটনার গুরুত্ব বোঝার চেষ্টা করতে লাগল সম্ভবত। ও মোটেও ছিঁচকাঁদুনে নয়। তবে খুব দুরন্ত।

রাকেশ চোখ পাকিয়ে বলে উঠল, ‘তোমাকে কতবার বারণ করা হয়েছে অসভ্যতা না করতে।’

পরিস্থিতি সামাল দিতে আমি এগিয়ে গেলাম।

ওদিকে মেয়েরা হোটেলের লনে বিভিন্ন পোজে বিভিন্ন পজিশনে কখনও একক, কখনও বা যৌথ ভাবে ফটো তুলতে ব্যস্ত। খেয়াল নেই, সকলেই প্রায় ঘরোয়া পোশাকে রয়েছে।

হোটেলের নাম ‘সং অফ দ্য সিগাল’।

নামটি শুনলেই সমুদ্রের ফেনার মতন হালকা হয়ে যায় মন। নীল জল যেখানে বালির সীমানা ছুঁয়েছে তার ওপর উড়তে থাকা শঙ্খচিলগুলোর ডাক বুঝি শোনা যায় বুকের গভীরে।

অসীম আর হরলালদা এগিয়ে আসে আমার দিকে। ওরা আমাদের খানিক পর ব্রেকফাস্ট সেরে বেরোল। হরলালদা কাছে এসে বলল, ‘আরে শালাবাবু, একটু ধূমপান চলবে নাকি?’

‘চলো, ওদিকটায় গিয়ে বসি’, বলে আমি ওদের হোটেলের গাড়িবারান্দার কাছাকাছি নিয়ে গেলাম। কয়েকটি চেয়ার টেনে বসলাম তিনজন। তারপর সিগারেট ধরালাম।

বললাম, ‘গতকাল ইস্টকোস্ট এক্সপ্রেস লেটে চলছে জেনে দুশ্চিন্তায় পড়েছিলাম। সঙ্গে বাচ্চা-কাচ্চা, মেয়েরা। কারণ, শুনেছিলাম গোপালপুর জায়গাটা পুরীর মতন অত জমজমাট নয়, বেশ ফাঁকা ফাঁকা।’

অসীম বলল, ‘কী আর এমন লেট করল ট্রেন? শেডিউলড টাইম ছিল দশটা পঞ্চাশ। তার জায়গায় ট্রেন ব্রহ্মপুর স্টেশনে ঢুকল সাড়ে এগারোটায়। এতেই লেট বলছ?’

‘মালপত্তর নিয়ে স্টেশন ছেড়ে বেরোতে বেরোতে আরও আধ ঘন্টা’ বলল হরলালদা, ‘আরে তুমি তো রেল কোম্পানির লোক, কোম্পানির দোষ কি আর চোখে দেখতে পাবে? কী বলো, গৌতম?’ আমার সাপোর্ট চায়।

হরলালদা সম্পর্কে অসীমের বড়ো ভায়রা হয়। ফলে সুযোগ পেলে লেগপুল করতে ছাড়ে না।

‘হ্যাঁ, সে আর বলতে’, বললাম আমি তারপর জিজ্ঞাসা করলাম, ‘আবির কোথায় গেল? ওদের কি এখনও ব্রেকফাস্ট শেষ হয়নি?’

‘তোমার হ্যান্ডসাম ফ্রেন্ডকে দেখলাম এই হোটেলের মালকিনের সঙ্গে কী একটা বিষয় নিয়ে গভীর আলোচনায় মগ্ন’, হরলালদা জবাব দিল।

আমি হরলালদার চোখের দিকে তাকালাম সরাসরি। ওর কথার শেষ দিকে কীসের যেন ইঙ্গিত কানে বাজল। আর মুহূর্তেই বিশালজির মিসেসের ছবিটা মাথার মধ্যে ঝিলিক দিয়ে উঠল।

গতকাল রাতে ব্রহ্মপুর স্টেশন থেকে হোটেলে পৌঁছোতে খুব বেশি যে সময় লেগেছিল তা নয়। ট্রাভেল এজেন্ট শুভজিৎ চৌধুরি স্টেশনে দুটি গাড়ির ব্যবস্থা করে রেখেছিলেন। রাত দশটা থেকেই ড্রাইভাররা আমাদের সঙ্গে কনট্যাক্ট রাখছিল। ফলে ব্রহ্মপুর পৌঁছে গাড়ি পেতে অসুবিধা হয়নি আমাদের। সতেরো কিলোমিটার দূরত্ব। গভীর রাতের ফাঁকা রাস্তায় আসতে বড়ো জোর আধ ঘন্টাটাক। তবে এখানে তখন রাত নিশুতি।

হোটেলে পৌঁছে মেন গেটে নক করতে বিশালজি দুটি রুম-বয়কে নিয়ে এগিয়ে এলেন। হোটেলে পা রাখতেই দেখলাম বাঘের মতন বিশালকায় কালো কুকুর একবারে চেন বাঁধা অবস্থায় আমাদের স্বাগত জানাতে প্রস্তুত। আমরা পাঁচটি পরিবার নির্দিষ্ট পাঁচটি রুমে প্রবেশ করলাম। ছেলে দুটি আমাদের লাগেজ পৌঁছে দিল প্রত্যেকের রুমে। খাওয়া-দাওয়া ট্রেনেই সেরে এসেছিলাম। ফলে শীতের রাতে বেশি দেরি না করে যে যার মতন শুয়ে পড়লাম।

চিরকালের লেট রাইজার আমি। সাড়ে আটটা নাগাদ দরজায় ঠকঠক করে নক। অনিতাকে বললাম, ‘দ্যাখো তো, কে।’

দরজা খুলে ও দ্যাখে আমার পিসতুতো বোন বুলা। ওরা ব্রেকফাস্ট করতে ডাইনিং রুমে যাচ্ছে তা জানাতে এসেছে। ওদের এগোতে বলে অনিতা ঘুম থেকে ডেকে তুলল ফুলকে।

কিছুক্ষণের মধ্যে তৈরি হয়ে আমরা ডাইনিংয়-এ গেলাম। দেখলাম সেখানে কল্পনাদি, ওর হাজব্যান্ড হরলালদা, বুলা, ওর হাজব্যান্ড অসীম, ওদের কন্যা মাম, আমার বন্ধু আবির, ওর স্ত্রী ইরা, রাকেশ, ওর স্ত্রী সুমি ওদের ছেলে-মেয়ে নিয়ে সকলেই উপস্থিত এবং পাশাপাশি তিনটি টেবিল ভরে একদম হইচই জুড়ে দিয়েছে।

আমরা যেতে আর এক প্রস্থ শোরগোল উঠল।

ব্রেকফাস্ট সেরে আমিই প্রথম বেরিয়ে এসে লনে বসেছিলাম। একে একে সবাই আসতে লাগল।

ফটো তোলা শেষ করে রাকেশ এসে বলল, ‘যাই বলো গৌতমদা, হোটেলটা কিন্তু একঘর। প্রত্যেকেই সি-ফেসিং রুম পেয়েছে।’

বললাম, ‘চৌধুরি-কে সেরকম ব্যবস্থা করতেই বলেছিলাম।’

হরলালদা বলে উঠল, ‘দেখলে তো, তোমরা হোটেল বুক করলে ট্রাভেল এজেন্ট ধরে। আমি করলাম নিজে। তাও আবার তোমাদের থেকে পাঁচশো টাকা কম রেটে।’

‘তুমি যদি আগে থেকে জানাতে এখানে বেড়াতে আসবে তা হলে তোমার জন্যও ঘর বুকিং করতে বলতাম’, বললাম আমি।

‘আমি কী করে বলব? অসীম তো সব ব্যবস্থা পাকা করে তারপর আমাকে জানাল যে তোমরা গোপালপুর যাচ্ছ।’

‘এই লালদা, একদম বাজে কথা বলবেন না কিন্তু। আমি আপনাকে আগেই বলেছিলাম যে আমাদের গোপালপুর যাওয়া একদম ফাইনাল। গৌতম আর রাকেশ সব ব্যবস্থা করছে। আপনি তখন কী বললেন?’

‘কী বললাম?’

‘বললেন, আরে তোমাদের ব্যবস্থা আগে করো তো দেখি। ওরকম যাবার প্ল্যান-প্রোগ্রাম অনেক হয়। তারপর সব কেঁচিয়ে যায়।’

‘যাকগে ওসব, ট্রেনের টিকিট থেকে শুরু করে হোটেল বুকিং, তাও আবার একই হোটেলে পাশাপাশি রুমে থাকার ব্যবস্থা করলাম। তোমাদের থেকে কম রেটে। এবার তো তোমরা আমাকেই গুরু বলে মানবে!’

হরলালদার মুখে সাফল্যের হাসি।

রাকেশ বলে, ‘আচ্ছা গৌতমদা, এটা কীভাবে হয়? আমরা যে রুম দু-হাজার টাকা করে পার ডে-তে থাকছি, লালদারা সেই এক রুম দেড় হাজারে থাকছে কী করে?’

‘তোরা কি চৌধুরি-কে ব্যবসা-ট্যাবসা করতে দিবি না?’ বলতে বলতে আবির এসে একটা চেয়ার টেনে বসে পড়ল। পরনে একটি গেরুয়া রঙের পাঞ্জাবি, আর আকাশি জিন্স।

ওর পিছন পিছন স্ত্রী ইরা। ইরা মহিলাদের দিকে এগিয়ে গেল।

রাকেশ বলল, ‘ব্যবসা বলে ব্যবসা? আমাদের চার-চারটি ফ্যামিলি চারদিন থাকবে পাঁচশো টাকা করে বেশি রুম রেন্ট দিয়ে?’

হরলালদা হাসতে হাসতে বলল, ‘বাকিটা শুনবে? তোমাকে এমন একটা খবর দেব যে গায়ে এক্ষুনি ফোসকা পড়ে যাবে।’

সবাই হরলালদার দিকে তাকাল।

একটু থেমে ও বলল, ‘আমার এক বন্ধু ফ্যামিলি নিয়ে আজ সন্ধ্যায় আসছে। ওরাও এই হোটেলেই উঠবে। ওদের জন্যও ঘর বুক করেছি আমি। একই রেটে, দেড় হাজার।’

চোখ-মুখ দেখে মনে হল, এবার বেশ রেগে গেল রাকেশ। বলল, ‘আমি যাচ্ছি, এক্ষুনি এর একটা হেস্তনেস্ত করা দরকার।’

অসীমও বলল, ‘ঠিকই তো, এটা ঘোরতর অন্যায়।’

আবির বলল, ‘বাহ্, বেশ জমেছে তো ব্যাপারটা। তবে কী জানেন অসীম, হোটেল মালিক বলবে, আপনারা আপনাদের ট্রাভেল এজেন্টের সঙ্গে বোঝাপড়া করে নিন।’

অসীম বলল, ‘গৌতম, চৌধুরি-কে একবার ফোন লাগাও তো। দেখি ও ব্যাটা কী বলে। আমাদের এত পয়সা চোট যাবে?’

বললাম, ‘শোনো, চুপচাপ মাথা ঠান্ডা করে বোসো সবাই। একটিবার ভাবো তো, চৌধুরি যদি ট্রেনের টিকিট বুক করে না দিত এই গোপালপুর ট্যুর তোমাদের হতো? তোমার ট্রাভেল এজেন্টকে তুমি বললে, সে বলল, বড়ো জোর তিনটে টিকিট ম্যানেজ করতে পারবে। রাকেশের এজেন্ট বলল, চারটে কনফার্মড, দুটো আরএসি। তার বেশি সম্ভব নয়। আবির বলল, ও এ সবের মধ্যে নেই, সব দায়িত্ব আমাদের। তোমাদের এক এজেন্ট বলল, ট্রেনের টিকিটে পার হেড আড়াইশো করে নেবে, আর একজন বলল, দুশো করে। অপরদিকে চৌধুরি কী করল? সক্বলের টিকিট কনফার্মড, যাওয়া এবং আসা। পার হেড নয়, পার টিকিটে ও দেড়শো টাকা করে নিল। পরিবর্তে রুম রেন্ট থেকে কিছুটা কমিশন ম্যানেজ করল। চার দিনে পার ফ্যামিলি দু’হাজার টাকা। সেটা কি খুবই বেশি? ও তো ব্যবসা করতে বসেছে। আমাদের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের ব্যবস্থা ঠিকঠাক করে দিয়ে ও যদি দুটো টাকা রোজগার করে এতে অভিযোগের তো আমি কিছু দেখি না।’

আমার কথায় সকলে কিছুটা শান্ত হল বলে মনে হল। বললাম, বেড়াতে বেরিয়ে অত লাভ-লোকসানের কথা ভাবলে চলে? সুবিধা-অসুবিধার কথাগুলি একবার ভাবো।’

‘থাক গে ওসব, ছাড়ো’, বলে হরলালদা, ‘একটু পর বসবে তো?’

অসীম বলল, ‘সে আর বলতে? গলাটা কেমন শুকিয়ে আসছে। আবির?

আবির বলল, ‘ভাবছি স্নানে যাব।’

‘আরে স্নানে তো আমরাও যাব’, চেঁচিয়ে উঠল রাকেশ।

বললাম, ‘গোপালপুর সি-বিচ সম্বন্ধে কিন্তু যথেষ্ট বদনাম আছে। বেশ কয়েকটা দুর্ঘটনা ঘটেছে বলে শুনেছি।’

হরলালদা বলল, ‘আরে আমরা বেশি দূরে যাবই না। দু-পেগ করে মেরে জলে নামব।’

বললাম, ‘যা ভালো বোঝো করো।’

অসীম বলল, ‘তুমি নেবে না ড্রিংকস?’

‘নাহ্, দিনের বেলা ড্রিংকস নিতে ভালো লাগে না আমার। রাতে দ্যাখা যাবে।’

আমি চেয়ার ঠেলে উঠে দাঁড়ালাম।

আবির বলল, ‘আমি নেব, দু পেগ। ওনলি টু।’ আঙুল তুলে দ্যাখাল।

আমি আবিরের দিকে তাকালাম।

ও উঠে আমার কাছে এসে কানে কানে বলল, ‘তুই তো জানিস, মদ এবং মহিলা– পৃথিবীর কেবল মাত্র এই দুটি বিষয়ে আমার ভীষণ আগ্রহ।’

ওর স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে একবার চোখ মেরে রহস্যময় হাসি হেসে ও চলে গেল।

রাকেশ বলল, ‘এই শোনো না, বিয়ার খেলে কেমন হয়? দুপুরবেলা বিয়ারই ভালো। না না, আমি বিয়ারই খাব।’

অসীম বলল, ‘যার যা খুশি খাও না, কে বারণ করেছে! আগে চলো, রেশনটা তো তুলে আনি।’

দুপুরে খাওয়া-দাওয়ার খানিক পর বিশালজির সঙ্গে ঘুরে ঘুরে আমি হোটেলের চারপাশটা দেখছিলাম। প্রায় দু’বিঘা জমির ওপর দোতলা এই হোটেল। হোটেলের সামনের লন সবুজ ঘাসের নরম গালিচায় ঢাকা। সামান্য উঁচু পাঁচিল যাতে লনে বসে সমুদ্র দেখার কোনও অন্তরায় না হয়। অসংখ্য টবে নানা ধরনের ফুল গাছ। বেশ কিছু নারকেল গাছও আছে এক পাশে। লনে একটি হলুদ, একটি সবুজ ও একটি আকাশি কাঠের হেলান দেওয়া চেয়ার আছে যাতে রীতিমতন শুয়ে শীতের নরম রোদ উপভোগ করা যায়, আছে বেতের কিছু চেয়ারও।

বিশালজি বললেন, ‘ইয়ে হোটেল ম্যায়নে এক বাঙ্গালিসাব-সে খরিদা থা। আজ সে লগভগ বাইশ সাল পহলে। উস টাইম এক হি ফ্লোর থা। দুসরা ম্যায়নে বানায়া।’

বললাম, ‘পহলেসেই আপ হোটেল বিজনেস মে থে?’

‘নাহি সাব, ভুবনেশ্বর মে মেরা দো বড়িয়া দুকান থা। এক ডোমেস্টিক স্টিল অ্যাপ্লায়েন্স কা, দুসরা গারমেন্টস কা। এক মে ম্যায় বৈঠতা থা, দুসরা মে মেরি বিবি বৈঠতি থি। শুরু শুরু মে ইয়ে হোটেল ম্যায়নে লিজ মে লিয়া থা। চার সাল বাদ খরিদ লিয়া।’

‘আউর উও দো দুকান?’

‘উও দোনো আভিভি হ্যায়। লেকিন কিরায়ে পে দে দিয়া। অ্যাকচুয়ালি ইয়ে জগহ মুঝে ইতনা আচ্ছা লগা। ইতনা কাম অ্যান্ড কোয়ায়েট, পলিউশন ফ্রি। সোচা কি এহি পে রহে জাউ।’ উনি মৃদু হাসলেন।

দেখলাম, হোটেলের বাউন্ডারি ওয়ালের সঙ্গে গোপালপুরের বিখ্যাত লাইটহাউস এরিয়া একদম অ্যাডজাসেন্ট। পাঁচিলের ওপারটাই সরকারি এলাকা। লাল-সাদা রঙের সুউচ্চ লাইটহাউসটি বেশ সুদৃশ্য। তবে জানতে পারলাম, লাইটহাউস ঘিরে থাকা কয়েক বিঘা জমিতে সরকারি লোকজন থাকলেও জনসাধারণের জন্য প্রবেশ একেবারেই নিষিদ্ধ।

এই ফ্যামিলি পরিচালিত হোটেলটি আদ্যন্তই বিশালজি, তার স্ত্রী এবং জনাদশেক আঞ্চলিক ছেলে নিয়ে চালান। বেশ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। খাবার-দাবার, রুম সার্ভিস, কোনও বিষয়েই অভিযোগ করার মতন কিছু নেই। ডিসেম্বর মাস, তাই হোটেলে বোর্ডার যথেষ্ট। দু’জন ফরেনারও দেখতে পেলাম।

হোটেল দেখে রুমে ফিরে এলাম। রুম থেকে পর্দা সরিয়ে কাচে ঢাকা সমুদ্রের দিকে তাকালে কেমন মায়াবী জগৎ বলে মনে হয়। অনিতা আর ফুল নীচে সুমিদের রুমে গেছে বোধ হয়।

আমি দরজা ঠেলে ব্যালকনিতে এসে বসলাম। হাত দশেকের মধ্যে একটি নারকেল গাছ। তারপর আরও একটি। লাইটহাউসের বাউন্ডারি ওয়াল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে ওরা।

ব্যালকনি থেকে কুড়ি-বাইশ ফুট দূরে হোটেলের সামনের সীমানা পাঁচিল। সেখানে হাত দশেকের চওড়া রাস্তা। তারপর ঢাল নেমে গেছে প্রায় আড়াই-তিন তলা বাড়ির সমান। ঢালের শেষপ্রান্ত থেকে শুরু হয়েছে সি-বিচ। সি-বিচ চওড়ায় প্রায় দু-আড়াইশো ফুট, সংকোচনশীল। মোট কথা, সমুদ্র চোখের একদম নাগালে। তার জলদগম্ভীর অপূর্ব কণ্ঠস্বর বেশ স্পষ্ট এবং জোরালো ভাবেই জানান দিচ্ছে তার অস্তিত্ব।

বালির ওপর চারটি বাঁশ গেঁথে নীল পলিথিন টাঙিয়ে ডাব বিক্রি করা হচ্ছে কিছুটা দূর অন্তর অন্তর। এখন বিচে লোকজন কম। বিকেলের দিকে বোধহয় বাড়বে।

দূরে ভেসে যাচ্ছে জেলে ডিঙিগুলি।

রোদে চকচক করছে দূরের জল। তীরে ক্রমাগত আছড়ে পড়ছে ঢেউ। বেশ কয়েকটি শঙ্খচিল মন্থর ডানায় ভেসে বেড়াচ্ছে, যাকে বলে গ্লাইডিং।

সমুদ্রের দিকে দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে থাকতে একটুও বোর লাগে না আমার। ঘন্টার পর ঘন্টা সমুদ্র দেখতে পারি আমি।

সামনের নারকেল গাছে একটি কাক উড়ে এসে বসল। বেশ কয়েকবার গলা ছেড়ে ডাকল। তারপর উড়ে গেল।

লাইটহাউসের শীর্ষে বিশালাকার ব্লেডটি ঘুরে চলেছে ক্রমাগত।

আমাদের ঠিক নীচের রুমটাই রাকেশদের। ওর ছেলে ছোটো, দুরন্ত। তাই গ্রাউন্ড ফ্লোরে রুমের ব্যবস্থা করা হয়েছে। সুমি ওর ছ-মাসের মেয়েকে সামলাতে ব্যস্ত। মেয়েতো নয়, যেন একটি ফর্সা গোলগাল পুতুল। যে-দেখে সে-ই অবাক হয়ে যায়, বলে, ‘কি মিষ্টি দ্যাখো বেবিটা।’

ওদের কিছু কিছু কথাবার্তা লাফিয়ে উঠে আসছে দোতলায়। দেখলাম টঙ্কাস একাই একটি বলে লাথি মেরে চলেছে ক্রমাগত। রাকেশের চিৎকার শোনা গেল, ‘বাবাই, পাঁচিলের বাইরে যাবি না।’

হরলালদা, অসীম, আবির সবাই বোধহয় বিশ্রাম নিচ্ছে।

হঠাৎ কলিংবেল বাজলে আমি উঠে গিয়ে দরজা খুলে দিলাম। ফুল বলল, ‘বাবা, কাল নাকি আমাদের ফার্স্ট ইয়ারের রেজাল্ট আউট হচ্ছে।’

‘তো, তাতে কী হল?’

‘উফ্, আমার কপালটাই খারাপ। একটু শান্তি নেই। এতদিন ধরে কোথাও কিছু নেই, যেই দুদিনের জন্য বেড়াতে এসেছি অমনি উৎপাত। যাচ্ছেতাই একেবারে।’

দড়াম করে টয়লেটের দরজা বন্ধ করে দিল। একটু পর পা মুছে খাটে এসে বসল। একের পর এক বন্ধুকে শুরু হল ফোন করা।

বললাম, ‘চাপ নিস না, পাশ করে যাবি। তোর ওপর তো ফার্স্ট হবার কোনও দায় নেই। তোর মা কিংবা আমি কি কখনও দাবি করেছি যে তুই ফার্স্ট হয়ে দ্যাখা?’

‘তুমি কি একটু চুপ করবে? খুব মজা লাগছে তাই না?’

যা বাব্বা, কী কথার কী উত্তর। অনিতা মুচকি মুচকি হাসছিল। হাওয়া খারাপ দেখে খাটের ধার ঘেঁষে শুয়ে পড়লাম।

বিকেলে হোটেল থেকে বেরিয়ে খানিক এগিয়ে গেলাম আমরা দল বেঁধে। ভ্রমণার্থীদের জন্য গোপালপুরে বসার একমাত্র পার্কটি চোখে পড়ল। পার্কের এক পাশে পিচের রাস্তা। অপর পাশে ধাপে ধাপে সিঁড়ি নেমে গেছে সি-বিচে।

আমরা ছোটো ছোটো গ্রুপে ছড়িয়ে ছিটিয়ে গেলাম।

হরলালদা আর অসীম চা পান শেষে ধূমপানে মনোযোগ দিল।

রাকেশ ওর বাচ্চার বায়না মেটাতে কী যেন খেলনা কিনে দিচ্ছে। আমার মেয়ে আর মাম নিজেদের মধ্যে আড্ডায় মত্ত।

বাকিরা পার্কের মধ্যে থাকা উঁচু বেদিতে বালি-সিমেন্টে তৈরি মৎস্যকন্যার সঙ্গে ফটো তুলতে ব্যস্ত। অনেক উঁচুতে স্ট্রিট লাইট। মনে হল ফটো তোলার জন্য আলো যথেষ্ট নয়।

আবিরকে সে কথা বলাতে ও বলে উঠল, ‘ফ্ল্যাশ অন করে ফটো তোল।’

একটু পরে রাকেশ, আবির আর আমি সিঁড়িতে বসে সমুদ্রের হাওয়া খেতে খেতে চা-ওয়ালাকে ডাকলাম। বলল, লিকার চা, বিট নুন আর লেবু দেওয়া। বললাম, ‘ঠিক আছে তাই চলবে।’

চা খেতে খেতে গল্পগুজব চলছিল।

অসীম আর হরলালদা কাছাকাছি কোথাও গেছে। বোধহয় রাতের প্ল্যান-প্রোগ্রাম করছে।

রাকেশ বলল, ‘গৌতমদা, কাল আমি সুমিদের নিয়ে পুরী যাচ্ছি। তুমি তো জানো ছেলের নামে একটা পুজো দিতে হবে।’

আবির বলল, ‘সে কী, এই তো এলে গোপালপুর। এখনই পালাতে চাইছ?’

‘না-না, পালাতে চাইছি না, পুজো দেবার প্রোগ্রাম আমার আগেই ছিল। গৌতমদা জানে। কী গো তোমাকে বলিনি?’

‘হ্যাঁ, তা কাল কখন বেরোবে তোমরা?’

‘লাঞ্চ করে। রাত্রে পুরীতে থাকব। পরশু পুজো দেব। আশা করছি পরশু রাতেই ফিরে আসতে পারব।’

‘দু-দুটো বাচ্চা নিয়ে চাপ হয়ে যাবে না?’

‘আরে তুমি ভেব না। পুজো তো আমাদের সকালেই দেওয়া হয়ে যাবে। দুপুরে একটু তাড়াতাড়ি খাওয়া-দাওয়া সেরে বেরিয়ে পড়ব। তোমরা চিন্তা কোরো না। পরশু রাতের পার্টিতে অবশ্যই থাকছি।’

একটু দূর থেকে সুমি হঠাৎ ওকে ডেকে উঠল, ‘রাকেশ, এদিকে একটু এসো না।’

ও উঠে গেল।

দেখলাম রাকেশের ছেলে প্যাঁ প্যাঁ শব্দে বিচ্ছিরি এক বাঁশি ক্রমাগত বাজিয়েই চলেছে। ওর বয়সি দু-তিনটে ছেলেও জুটে গেছে। বাঁশি বাজানোর ফাঁকে ফাঁকে কী সব বকে চলেছে ওদের সঙ্গে।

আবিরকে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘বল, তোর কী প্রোগ্রাম?’

‘ভাই তোকে সত্যি বলছি, গোপালপুর জায়গাটা মোটেও জমজমাট নয়। অন্তত তিন-চার দিন কাটানোর মতন নয়। নেহাত বিশালজির ওয়াইফ না থাকলে রাকেশের মতন আমিও পুরী কেটে পড়তাম।’

‘তুই আর পালটালি না’, বললাম আমি, ‘সেই কলেজ জীবন থেকে তো দেখছি। চল্লিশ ক্রস করেছিস, এবার তো সন্ন্যাস নেবার কথা ভাব।’

‘কী যে বলিস বন্ধু, সবে তো কলির সন্ধে। জানিস না, আফটার ফর্টি বয়েজ গেট নটি?’

‘একটা কথা বলি তোকে…’

‘হ্যাঁ বল না। তোর কথা শুনতে খারাপ লাগে না।’

‘নারী মধু নারী বিষ, বুঝেশুনে পা ফেলিস।’

সিগারেটে জোরে একটা টান মেরে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে জবাব দিল, ‘নাহ্, এ প্রবাদটা আগে কোথাও পড়েছি বা শুনেছি বলে মনে পড়ছে না। আয়াম শিওর, ইউ হ্যাভ কয়েনড ইট।’

মৃদু হাসলাম, কিছু বললাম না। একবার ওকে আপাদমস্তক জরিপ করলাম। প্রায় ছ’ফুট উচ্চতার সুন্দর সুঠাম চেহারা। শ্যামলা রং, চোয়ালের কাঠিন্যে প্রকট পুরুষালি দৃঢ়তা বয়সের সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে। চোখেমুখে অদ্ভুত এক কনফিডেন্স। দেখেছি, এসব ছাড়াও কী এক অনির্বচনীয় ব্যক্তিত্ব ওর মধ্যে আছে যা কিছু কিছু নারীর হৃদয়ে ওর আকর্ষণ অমোঘ করে তোলে।

খেয়াল করেছি, নারীদের চোখে আমিও নেহাত ফেলনা নই। তবে আমার সঙ্গে তারা মেশে, কথা বলে কেমন যেন সমীহ করে। তাদের আচার-আচরণে একটা সম্ভ্রম, শ্রদ্ধার ভাব ফুটে ওঠে। কখনওই তা মাত্রা ছাড়ায় না।

নারীদের মধ্যে যাদের সবাই আল্ট্রা মডার্ন বা ড্যাম স্মার্ট বলে জানে, শরীর নিয়ে যাদের নেকু নেকু বা পরপুরুষ ছুঁলে জাত যাবে –এমন মনোভাব নেই, সে ধরনের মহিলারাও দেখেছি আমার তেমন কাছে ঘেঁষার চেষ্টা করে না। বরং ‘তুমি রবে নীরবে, হৃদয়ে মম…’ গোছের কিংবদন্তি স্লোগানের দূরত্বে রাখতেই ভালোবাসে আমাকে।

অথচ আবিরের বেলায় ঘটনাটা ঘটে সম্পূর্ণ বিপরীত। কত দ্রুত কত কাছাকাছি আসা যায় বুঝি সেরকমই একটি প্রতিযোগিতা চলে ওর আর সদ্য পরিচিতা নারীটির মধ্যে।

সিগারেট শেষ করে বাট ছুড়ে ফেলে বললাম, ‘ইরা অশান্তি শুরু করবে। সাবধান কিন্তু।’

‘করুক গে, চল যাওয়া যাক।’

রাতে ছাদে বসার ব্যবস্থা হল। টেবিল, চেয়ার, জল, খাবার-দাবার সব কিছু হোটেলের ছেলেরা তুলে দিয়ে গেল।

ছাদটা ভারি সুন্দর। বেশ ছড়ানো ছিটোনো, অনেকটা স্পেস। সামনের দিকে অনতিদূরে সুবিশাল উঁচু লাইটপোস্টে হ্যালোজেন জ্বলছে। দেখেছি দিনের বেলা ওর মাথায় একটি চিল বসে থাকে। হ্যালোজেনের আলোতে হোটেলের গেটের অংশটি স্পষ্ট ভাবে আলোকিত। সেই আলো ছাদে এসে পড়েছে আংশিক। ফলে পরিবেশটা হয়ে উঠেছে চমৎকার।

হোটেলের পিছন দিকটাতে নাগরিক আলো অল্পবিস্তর। সামনে সমুদ্রের হা হা অন্ধকার। এক পাশে লাইটহাউসের শিখরে জ্বলতে থাকা অসম্ভব জোরালো আলো দূর দিগন্তের কোনও নাবিককে দিশা দেখাতে ব্যস্ত। ক্রমশ চারপাশের কোলাহল কমে আসছে।

হোটেলের নিয়ম অনুযায়ী রাত দশটার মধ্যে খাওয়া-দাওয়ার পাট শেষ করতে হবে। ঠিক হল, মহিলারা যারা ড্রিংকস নেবে না তারা বাচ্চাদের সঙ্গে ডিনার সেরে ফেলবে নির্দিষ্ট সময়ে। বাকিদের খাবার কন্টেনারে, ফয়েলে ভরে রুমে পাঠানো হবে। রুমে ফিরে যে যার মতন খেয়ে নেবে।

ছাদে আসর বসতে না বসতেই হরলালদার বন্ধু জগন্নাথবাবু এবং ওনার স্ত্রী সুইটি উঠে এলেন আলাপ করতে। প্রাথমিক পরিচয় পর্ব শেষ হতে আরও দুটি চেয়ারের ব্যবস্থা করল অসীম।

সুমি, ইরা, আমার স্ত্রী কেউই এল না আসরে। তবে কথাবার্তা হাসি-ঠাট্টা, আবৃত্তি, লোকসংগীত, রবীন্দ্রসংগীত ইত্যাদিতে কিছুক্ষণের মধ্যেই জমে উঠল পরিবেশ।

সকলে মিলে পরিকল্পনা করতে লাগল দারিংবাড়ি বেড়াতে যাবার। বিশেষত হরলালদার বন্ধু এবং ওনার স্ত্রী-র উৎসাহই বেশি বলে মনে হল।

আমি দারিংবাড়ি যাবার পক্ষে ছিলাম না। যতদূর শুনেছিলাম ওখানে দেখার মতন তেমন কিছু নেই। সে কথা বললাম ওদের।

অসীম বলল, ‘জানো, ওখানে বরফ পড়ে?’

রাকেশ বলল, ‘পড়ে, না কোন কালে একবার পড়েছিল?’

বললাম, ‘তোমরা কি আশা করছ এখন ওখানে গেলে বরফ দেখতে পাবে?’

‘বুলা, কল্পনাদি বলল, ‘গিয়েই দেখা যাক না। এসেছি তো ঘুরতে।’

রাকেশ আবিরকে বলল, ‘তুমি যাচ্ছ নাকি দারিংবাড়ি?’

‘আমি? নাহ্, তবে ইরা যাবে।’

বললাম, ‘ইরা জানে দারিংবাড়ির প্রোগ্রাম?’

‘জানে না, জেনে যাবে।’

‘না-ও তো যেতে পারে।’

‘যাবে না মানে? আলবৎ যাবে। একশো বার যাবে। বেড়াতে এসে আনন্দ করবে না? আমি বলব আর ও যাবে না, এত হিম্মত?’ আবিরের গলা সকলকে ছাপিয়ে গেল।

বুলা, কল্পনাদি, সুইটি– সকলে নিজেদের মধ্যেকার কথা থামিয়ে চমকে ওর দিকে তাকাল। বুঝলাম ওর নেশা চড়েছে ভালোরকম।

হঠাৎ হরলালদা গলা ছেড়ে গেয়ে উঠল, ‘এমন মানুষ পেলাম না রে যে আমায় ব্যথা দিল না। নয়নজলে বুক ভাসাইলাম…’

পরিস্থিতি লঘু করতে আবিরকে টেনে তুললাম চেয়ার থেকে, ‘চল ওদিকে। একটু ধোঁয়া টানা যাক।’

সকলে ফের গল্পে মশগুল হয়ে পড়ল।

খুব দ্রুত ড্রিংকস নেয় আবির। ঘন্টাখানেকের মধ্যেই বোধহয় চার-পাঁচ পেগ নিয়েছে। ছাদের আধো অন্ধকারে পেগের মাপও নিশ্চয়ই কেউ নিক্তি মেপে ঢালছে না।

যেদিকে সমুদ্র সেদিকে গিয়ে দাঁড়ালাম। উড়ে আসছে আর্দ্র বাতাস। বাতাসে জোর যথেষ্ট। অনেক চেষ্টা ও তৎপরতায় বাতাস আড়াল করে সিগারেট ধরানো হল।

সকলে আশা করেছিল সমুদ্রের কাছে নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়া হবে। কিন্তু দেখা গেল জাঁকিয়ে শীত পড়েছে। ডিসেম্বর মাস, মনে করিয়ে দিচ্ছে ভালোরকম। মহিলারা মাথায় স্কার্ফ, দোপাট্টা জড়িয়েছে, পুরুষরা টুপি, মাফলার। নাহলে কুয়াশা মাথায় চাপলে আর দেখতে হবে না, বেড়ানো মাটি। দেখলাম আবির মাথায় কিছু দেয়নি।

বললাম, ‘একটা টুপি চাপাতে পারতিস মাথায়।’

‘নাহ্, ঠান্ডা লাগবে না। আমার গরম বেশি। তুই তো জানিস।’

বস্তুত ওর জীবনে নারীঘটিত প্রায় সকল কাহিনিই আমি শুনেছি বা জানি। এক অদ্ভুত বিজয়ীর ভঙ্গিতে ও আমার কাছে সব ঘটনার বর্ণনা করে কী এক আত্মপ্রসাদ লাভ করে কে জানে।

বললাম, ‘যা মন চায় কর, কিন্তু এভাবে সিন ক্রিয়েট করা ঠিক নয়। আই এক্সপেক্ট আ বিট ম্যাচিয়োরিটি ফ্রম ইউ।’ একটু দৃঢ়তার সঙ্গে কথাগুলি উচ্চারণ করলাম।

ছাদের রেলিং ধরে সমুদ্রের কালো অন্ধকারের দিকে চেয়ে থাকল, কোনও জবাব দিল না। সিগারেটে ঘন ঘন টান দিচ্ছিল। আগুনটা জোরে জ্বলে উঠছে মাঝে মাঝে। আমার দিকে একবার অস্থির দৃষ্টিতে তাকাল। তারপর বলল, ‘নিরুপমাকে কেমন দেখলি?’

‘হু ইজ সি?’

‘ওয়াইফ অফ মিস্টার বিশাল শর্মা।’

বললাম, ‘হুম। কিছু মহিলাকে ঈশ্বর নারীসুলভ আশীর্বাদ উজাড় করে দেন। নিরুপমাও সেরকম একজন মহিলা।’

‘ভাই তুই তো লেখক মানুষ, তোর কাছ থেকে আরও ভালো বর্ণনা আশা করেছিলাম। শালা, কালিদাস পড়িসনি নাকি! গুরুস্তনী, গুরুনিতম্বিনী, রম্ভোরূ, আর কামনা মদির পুরু মোটা ঠোঁটকে এক কথায় কী যেন বলে?’

হেসে বললাম, ‘এবার তুইও লেখালেখি শুরু কর। যতদূর মনে হয় ভদ্রমহিলার বয়স হয়েছে।’

‘কত হতে পারে বলে মনে হয় তোর?’

‘অ্যারাউন্ড ফর্টি ফাইভ।’

‘বাহ্, তোর নারীজ্ঞান তো বেশ টনটনে দেখছি। আমারও সেরকমই ধারণা। তবে জেনে রাখ, মাঝ-সমুদ্র ওপর থেকে আপাত শান্ত দেখালেও অনেক চোরা-স্রোত বয় তার গহিন গোপনে। সেরকম ঝড় উঠলে সেও বলগাহীন হয়ে উঠতে দেরি হয় না। ডুবিয়ে দিতে পারে যে-কোনও জাহাজ।’

হেসে বললাম, ‘অনেক দূর এগিয়েছিস মনে হচ্ছে।’

ও টেবিলের দিকে এগিয়ে গেল। ইতিমধ্যে কেউ ওর গেলাসটি ভরে দিয়েছিল। সেটা থেকে প্রায় অর্ধেক গলায় ঢালল। তারপর গেলাস হাতে ফের এগিয়ে এল আমার দিকে। বলল, ‘শিকারি তার শিকার ঠিক চিনে নেয়। কথাটা নারী-পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। বাদ দে জ্ঞানের কথা, তোকে একটা সুখবর দিই, সম্ভবত বিশালজি পরশুদিন ভুবনেশ্বর যাচ্ছেন।’

বেশ অর্থপূর্ণ দৃষ্টি ছুড়ে দিল আমার দিকে।

হঠাৎ কল্পনাদি চেঁচিয়ে ডাকল আমাদের, ‘ভাই, তোরা কি নিজেদের মধ্যেই আড্ডা দিবি দুজন? আমরা বাদ?’

ওকে বললাম, ‘চল টেবিলে।’

আচমকা ছাদে নিরুপমাজি উঠে এলেন। আমাদের দিকে এগিয়ে এসে বললেন, ‘আরে আপলোগ ইতনি দের তক পার্টি মানা রহে হো, সোনে নেহি যায়েঙ্গে?’

সকলে এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। কী জবাব দেওয়া উচিত তৎক্ষণাৎ ভেবে পেল না কেউ। এটা কি মামুলি প্রশ্ন, নাকি হোটেলের নিয়মনীতি অনুযায়ী অভিযোগ?

আবির মুহূর্তে চটুল গানের সুরে বলে উঠল, ‘আরে অভি তো পার্টি শুরু হুয়ি হ্যায়…’

সকলে হইহই করে সাপোর্ট করে উঠল।

দেখলাম নিরুপমাজীও বেশ রসিক মহিলা। রাগ তো করলেনই না বরং হেসে বললেন, ‘জরুর, জরুর। আপলোগ এনজয় করনে কে লিয়েই তো ইতনি দূর সে আয়ে হ্যায়। হম বস দেখনে আয়ে থে, সব কুছ ঠিক-ঠাক চল রহা, কি নেহি?’

হরলালদা জমিয়ে দিল, ‘ব্যস ম্যাডাম, সির্ফ আপহি কি কমি হমলোগ মেহসুস কর রহে থে।’

হাসির ফোয়ারা জেগে উঠল ফের।

সবাই বলল, ‘বৈঠ জাইয়ে ম্যাম, হামারা সাথ দো পেগ পি লিজিয়ে।’

‘না বাবা না। অভি অভি ম্যায়নে খানা খায়া। আপলোগ এনজয় করো। গুডনাইট এভরি বডি, বাই’, বলে উনি পালিয়ে বাঁচলেন।

রাকেশ প্রশ্ন করল, ‘ভদ্রমহিলা হঠাৎ ছাদে উঠে এলেন?’

বললাম, ‘খুবই স্বাভাবিক, হোটেল ওনার। শুতে যাবার আগে চারপাশটা একবার চোখ বুলিয়ে যাবেন না, আবাসিকরা কোথায় কী অবস্থায় আছে!’

কল্পনাদির বন্ধু সুইটি ছাদের অপর দিকটি ঘুরে দেখে এসে জানালেন যে, ওদিকে ফার্স্ট ফ্লোরে একটি বড়ো ব্যালকনিতে আমাদের মতন এত বড়ো না হলেও জনা চারেক নারী-পুরুষের একটি ছোটোখাটো পার্টি বসেছে।

আমাদের কেউ কেউ উঁকি মেরে এল।

আরও কিছু সময় আড্ডা মেরে পরস্পরকে শুভরাত্রি জানিয়ে যে যার রুমে ফিরে গেলাম আমরা।

***

‘অতিদূর সমুদ্রের ’পর

হাল ভেঙে যে নাবিক হারায়েছে দিশা

সবুজ ঘাসের দেশ যখন সে চোখে দেখে দারুচিনি…’

***

পরদিন ব্রেকফাস্ট টেবিলে অসীম বলল, ‘তোমরা যে কী করো, খালি পড়ে পড়ে ঘুমোচ্ছো। সমুদ্রের কাছে এসে সূর্যোদয় না দেখলে আসাটাই বৃথা।’

‘অত রাতে শুয়ে সকালে ওঠা যায়?’ বলল কল্পনাদি।

‘আমি তো উঠলাম। উঠে সি-বীচে…’

ওর কথা সম্পূর্ণ করতে না দিয়ে হরলালদা বলে উঠল, ‘তুমি তো তাড়াতাড়ি উঠবেই। বুড়ো হলে ঘুম কমে যায়।’

সকলে হেসে উঠল। অসীম বাকরুদ্ধ দৃষ্টিতে হরলালদার দিকে তাকাল।

বললাম, ‘সি-বিচে হাঁটলে?’

‘হাঁটলাম। জেলেরা মাছ ধরে এনেছে দেখে ওদের থেকে মাছ কিনলাম।’ সকলে অবাক।

আবির বলল, ‘ওগুলো সব তেচোখো মাছ, যে খাবে সেই মরবে।’

সবাই হেসে উঠল ফের। অসীমকে রাগাতে কেউ কসুর করছে না।

অসীম রেগে বলল, ‘মোটেও না। ওদের থেকে আমি আমার চেনা মাছগুলোই কিনেছি।’

হরলালদা সিগারেটে টান মেরে বলল, ‘হুঁ, গড়িয়া বাজারে ও যে মাছগুলোকে চিনে এসেছিল ওদের এখানে কিনল। যাও, সব পচা মাছ।’

‘এই লালদা, না জেনেশুনে একদম কথা বলবেন না বলে দিচ্ছি। পচা মাছ? আপনি দেখেছেন?’

মেয়েকে কোলে সামলাতে সামলাতে সুমি প্রশ্ন করে, ‘মাছগুলো কিনে কী করলেন অসীমদা?

‘এখানে একজনকে দিয়ে মাছগুলো কাটালাম, ধুয়ে ভালো করে পরিষ্কার করালাম। তারপর মাছভাজার একটা দোকানের ফ্রিজে রেখে এলাম। পরে সময় মতন ভেজে নিয়ে আসব।’

হরলালদা বলল, ‘ওই বাজে তেলে ভাজা মাছ তুমিই খেও। ওসব খেয়ে সবাই পেট ছেড়ে মরুক আর কী। আরে এ বদমায়েশটা তো মনে হচ্ছে আমাদের সকলের দারিংবাড়ি যাবার প্রোগ্রামটা নষ্ট করার তালে আছে।’

ওর বলার ভঙ্গিতে হাসির রোল উঠল ফের।

অসীম বলল, ‘ঠিক আছে, ড্রিংকসের সঙ্গে মাছভাজা চাইলে কপালে দুঃখ আছে, মনে থাকে যেন।’

বেলা বারোটা নাগাদ রাকেশরা বেরিয়ে গেল। আর বাকিরা ব্যস্ত হয়ে পড়ল সমুদ্র-স্নানে। তারপর দুপুরের খাওয়া সেরে রেস্ট নিতে গেল সকলে।

রুমে ফিরে মেয়েকে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘তোর রেজাল্টের খবর কী?’

‘কাল বেরোবে বলেছে’, বলেই মোবাইলে মনোযোগ দিল।

বিকালের দিকে বললাম, ‘চল, সি-বিচে একটু হেঁটে আসি। যাবি? মনটা ভালো লাগবে।’

‘তুমি যাও। আমি ওদের সঙ্গে একটু পর বেরোব।’

আবিরকে ফোন করলাম, ভাবলাম ওকে বলি আমার সঙ্গে যেতে। ফোন বেজে গেল, ও ধরল না। বোধহয় ঘুমোচ্ছে।

প্যান্টের ওপর পাঞ্জাবি, তার ওপর একটি জ্যাকেট চাপিয়ে সি-বিচে বেড়াতে গেলাম।

একটু পর সূর্য পশ্চিম দিকে ঢলে পড়বে। সূর্যোদয় তো দেখা হল না সূর্যাস্তই দেখা যাক ভেবে পশ্চিম দিকে রওনা হলাম।

দু’পা হাঁটলে ডান দিকে নজরে আসে লাইটহাউসের পাঁচিল থেকে নেমে আসা কংক্রিটের বাঁধানো ঢাল। তার গায়ে বিশালাকৃতি এক তিমির ছবি। বুঝি সেটি রাতের অন্ধকারে বাম দিকের সমুদ্র থেকে সুযোগ বুঝে লাফিয়ে উঠে পড়েছে ঢালে। আর ওখান থেকে পর্যবেক্ষণ করছে বিচের মানুষজন তথা আদিগন্ত সমুদ্র। সময় হলেই লাফিয়ে ফিরে যাবে তার অফুরান নীলে।

সি-বিচের কিছুটা সমতল কিছুটা মালভূমি সদৃশ মাঝারি উঁচু। তারপর ঠেলে উঠে গেছে অনেকটা। মানুষ যা কিছু গড়েছে বা গড়ার চেষ্টা করেছে এখানে, তা সবই হোটেলের সম-উচ্চতায়।

পুরোনো কোনও বিশালাকৃতি বাড়ি ভাঙা বিবর্ণ অবস্থায় চোখে পড়ল। বেশ কিছুটা অঞ্চল মাঝারি মাপের ঝোপেঝাড়ে ভরা। কিছুটা ঊষর।

মাঝেমধ্যে দু-একজন ময়লা মানুষ আমার বিপরীত দিক থেকে হেঁটে আসছে একা একা।

পায়ের শব্দে ছোটো ছোটো গর্ত থেকে উঠে আসা বালিমাখা স্বচ্ছ খুদে খুদে কাঁকড়া প্রাণভয়ে ছুটে যাচ্ছে আশ্রয়ের খোঁজে।

অনবরত ঢেউ ভাঙছে বিকেলের সমুদ্রে। গড়িয়ে যাচ্ছে ফেনা।

দূরে দূরে ভেসে যাচ্ছে জেলে ডিঙি।

নির্জনতা এখানে স্তব্ধতার সমাহারে অবিরত নিজেকে সাজিয়ে তুলছে অনন্ত আয়োজনে।

একটু এগোতে দেখলাম একটি দাড়িওয়ালা যুবক গিটার হাতে নেমে আসছে সি-বিচের পাশে থাকা কোনও রিসর্ট থেকে। সঙ্গে পরির মতন এক কিশোরী।

ক্রমশ আমি তাদের কাছাকাছি পৌঁছোলাম। অপূর্ব রূপসী মেয়েটি ছোট্ট একটি কালো ফ্রক পরেছে, তাতে যেন আরও ছোটো দেখাচ্ছে তাকে।

ছেলেটি প্রায় হাঁটুজলে নেমে গিটার বাজিয়ে কোনও সুর তুলল। কিশোরীটি গোড়ালি ভিজিয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে একবার ডানদিক একবার বামদিকে নেচে বেড়াতে লাগল অদ্ভুত ছন্দে।

ছোটো-বড়ো-মাঝারি ঢেউ এসে আছড়ে পড়ছিল ক্রমাগত। পড়ন্ত সূর্যের আলোয় সামুদ্রিক পটভূমিতে এ দৃশ্যে আমি এত আচ্ছন্ন হয়ে পড়লাম যে, কিছু সময়ের জন্য স্থানটি ছেড়ে এগোতে ভুলে গেলাম। মনে হল আমি বুঝি কোনও ফিল্মের খণ্ড অংশ দেখছি যা যে-কোনও মুহূর্তে অদৃশ্য হয়ে যাবে আমার দৃষ্টি থেকে।

সামনে এগোতে যাব হঠাৎ নজরে এল, এক বয়স্ক প্রবীণ ব্যক্তি, মধ্যপ্রদেশ যথেষ্ট স্ফীত, হাফপ্যান্ট পরা, গলায় তোয়ালে জড়িয়ে সমুদ্রের দিকে নেমে আসছেন। তার সঙ্গে সুইমস্যুটে তিন যুবতি।

যুবতি তিনজন নিজেদের মধ্যে দুর্বোধ্য ভাষায় কথা বলতে বলতে হাসিতে ফেটে পড়ছিল। প্রবীণ ব্যক্তিটি তাদের সঙ্গে নিয়ে স্নানে নামলেন গিটারিস্টের থেকে অনেকটা দূরত্ব রেখে।

এ দৃশ্য দাঁড়িয়ে দেখার মতন নয়। এগোলাম সামনের দিকে। অনেকটা দূর যাবার পর দেখলাম, একটি নৌকো দাঁড় সমেত ডান দিকের অপেক্ষাকৃত উঁচু বালিতে রাখা। নৌকোর তলার অংশ কালো, তার ওপর সাদা, তারও ওপরে লাল এবং নীল আড়াআড়ি ভাবে নির্দিষ্ট দূরত্ব রেখে রং করা।

খেয়াল করলাম, নৌকোটির আড়ালে একটি কালো যুবক নিজের মনে ধূমপান করে চলেছে সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে। তার পাশে বৃত্তাকারে পাকে পাকে রাখা মোটা কাছি। যুবকটি আমাকে ভ্রূক্ষেপ করল না।

আরও হাফ মাইল এগিয়ে যাবার পর মনে হল বুঝি পৃথিবীর একদম কিনারে এসে পৌঁছেছি। এই নির্জন সমুদ্র সৈকতে আমি ছাড়া আর কেউ নেই। সমুদ্রের দিকে দৃষ্টির ঝাপসায় কালো অস্পষ্টতা। সূর্য অস্তাচলে। হু হু বাতাসে প্রকৃতির অস্ফুট কলরব। বালিতে আছড়ে পড়া ফেনাজল ফিরে যাচ্ছে তার চেনা বুকে।

পৃথিবীর আদিম প্রশান্তি আমাকে অভিভূত, আপ্লুত করে তুলল। কী এক অনন্ত ঐশ্বর্যে ভরে উঠল আমার হৃদয়। কতক্ষণ সেখানে আচ্ছন্ন অবস্থায় কাটালাম কে জানে!

হঠাৎ শীত শীত বোধ হল। ভাবলাম এবার ফেরা দরকার। যেদিক থেকে এসেছিলাম সেদিকে রওনা হলাম। ভাঙা ঢেউয়ের মতন মানুষকে বার বার ফিরে আসতে হয় তার চেনা ঘরে।

নীল আকাশ ফুঁড়ে ক্রমাগত উঁচুতে উড়ে যাচ্ছে কোনও এক রকেট। পড়ন্ত সূর্যের মহান আলোয় রুপোর মতন ঝকঝক করছে সেটি। পিছনে ফেলে যাচ্ছে গ্রামের আলপথের মতন বিধবার সাদা সিঁথি যা ক্রমশ বিলীয়মান।

খানিক এগোতে দেখলাম মাথার ওপর একটি চিল। ভারি আশ্চর্য! আমাকে লক্ষ্য করে কিছুটা পথ সেটি পাকে পাকে উড়ে চলল। আমার মুঠোফোনে বন্দি করলাম তাকে। ল্যাপটপে হিমায়িত করে রাখতে হবে এই ক্ষণিকের সখ্যতা।

ফেরার পথে নজরে পড়ল তিনটি জলকন্যার সঙ্গে সেই প্রবীণ ব্যক্তিটি তখনও সামুদ্রিক বিলাসে মেতে আছেন। ভাগ্যবান সফল পুরুষ!

সেই গিটারিস্ট যুবক ও পরিটি নজরে এল না।

আরও খানিক এগোতে দেখলাম আমার কন্যা এবং স্ত্রী অনেকের সঙ্গে এগিয়ে আসছে। ওরা বেশি দূর যেতে রাজি হল না। ফলে সদলবলে ফিরে চললাম।

একটি জেলে-ডিঙি মাছ ধরে সমুদ্র থেকে ফিরে এসেছে। বেশ কিছু মেয়ে-মদ্দ জালবদ্ধ মাছ বেছে ঝুলিতে ভরছে। আর বেশ কিছু সবুজ মাথাওয়ালা বেঁটে বেঁটে মাছ জেলেরা জাল থেকে খুলে ছুড়ে ফেলে দিচ্ছিল। ওগুলি মানুষে খায় না। কাক-চিলের খাদ্য হয় বোধ হয়। দেখলাম, বালির ওপর কুয়াশা মাখা ভোর-রঙা গোলাকার থকথকে জেলিফিশ পড়ে রয়েছে। আমরা সকলে আগ্রহ ভরা দৃষ্টিতে ঝুঁকে পড়লাম। সকলের হাতে মোবাইল থাকায় ফটো তোলার বিরাম নেই।

সূর্য অস্ত গেছে কিছুক্ষণ হল। ফেরার পথে হাঁটতে হাঁটতে আমার মোবাইল থেকে পাবলো নেরুদার একটি কবিতা ইংরেজি অনুবাদে আমি পড়ে শোনালাম। কবিবন্ধু পীযূষ বাগচী দুপুরে ওটি আমাকে পাঠিয়ে ছিল। কবিতাটি শুনে মেয়ের মুখ থেকে উৎকণ্ঠার মেঘ কিছু সময়ের জন্য দূর হল বলে মনে হল।

আমরা ফিরে চললাম গোপালপুরের পার্ক সংলগ্ন অঞ্চলে। ওখানে বালির ওপর বেশ কিছু দোকান। ঝিনুক-শামুক প্রভৃতিতে তৈরি নানা উপহার সামগ্রী বিক্রি হচ্ছে।

আমাদের দলের মহিলারা কেউ কেউ কেনাকাটি করল।

অসীম বলল, ‘চলো, চা খাওয়া যাক।’

নরম বালির ওপর হাঁটা বেশ কঠিন।

অবশেষে আমরা সিঁড়ি বেয়ে উঠলাম। পার্ক সংলগ্ন চায়ের দোকানে চা অর্ডার করা হল।

কিছুক্ষণের মধ্যে হরলালদা, আবির এবং বাকিরা এসে হাজির। জানাল, গাড়ি বুুক করা হয়ে গেছে। আগামীকাল সকাল সাতটায় ওরা রওনা হবে দারিংবাড়ি।

বুলা, ইরা, মাম, ফুল সবাই এসে জানাল যে, ওখানে ফুচকা খেতে গিয়ে যা অভিজ্ঞতা হয়েছে তাতে কলকাতার ফুচকার টেস্ট ভুলে যাবার জোগাড়।

কে যেন বলল, ‘এখানে ঘুগনি যা বানায় না, অপূর্ব। একবার খেলে জীবনে ভুলবি না।’

সাড়ে আটটা অবধি আড্ডা মেরে আমরা হোটেলে ফিরে গেলাম।

পরদিন খুব ভোর নাগাদ ঘুম ভাঙলে ফুল, অনিতা আর আমি বেরোলাম সূর্যোদয় দেখার উদ্দেশ্যে। ঠান্ডা ছিল বেশ। তাই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হল একটু বেশি রকম। ফুলের ঠান্ডা লাগার ধাত। তাছাড়া অসুস্থতার পর ওর মায়েরও চট করে ঠান্ডা লেগে যাবার প্রবণতা।

সি-বিচে ভোরবেলা লোকজন কমই দেখা গেল। হয়তো শীতকাল বলেই! টুরিস্টদের মধ্যেও উন্মাদনা যেন তত প্রবল নয়। খানিকক্ষণ হেঁটে বেড়াবার পর কুয়াশার চাদর সরিয়ে সূর্য যখন মুখ তুলল তখন তা আকাশের অনেকটা ওপরে।

জেলেদের মেছো নৌকোগুলি ফিরেছে। মাছ সংগ্রহের আগ্রহ আমাদের বিন্দুমাত্র নেই। তবে নৌকোগুলি ঘিরে কিছু মানুষের জটলা, ব্যস্ততা, কোলাহল ভালোই লাগল।

বাইরে এক প্রস্থ চা পান করে হোটেলে ফিরলাম। তখন অসীম, হরলালদা-রা দারিংবাড়ি রওনা হয়ে গেছে।

ব্রেকফাস্ট টেবিলে আবিরকে বললাম, ‘ইরাকে ওদের সঙ্গে পাঠিয়ে দিলি। তোর মতলব ভালো ঠেকছে না আমার।’

ও চোখ মেরে বলল, ‘আজ একদম আমার খোঁজ করবি না তুই।’

সামান্য গল্পগুজব করে হোটেল ছেড়ে বেরিয়ে পড়ল। কোথায় গেল কে জানে।

আমরা রুমে ফিরে এলাম।

ফোন নিয়ে ব্যালকনিতে গিয়ে বসলাম।

মেয়ে ওর বন্ধুদের সঙ্গে ক্রমাগত কথা বলে যাচ্ছে। খুবই টেনস্ড শোনাচ্ছিল ওর কণ্ঠস্বর। রেজাল্ট সংক্রান্ত আলোচনা চলছে।

আধ ঘন্টা পর চেঁচিয়ে উঠল আনন্দে। ব্যালকনিতে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরল। বলল, ‘থার্ড পেপার, আর প্র্যাক্টিক্যালটা  নিয়ে খুব চিন্তা ছিল। ভেবেছিলাম অনার্স বোধহয় কেটেই যাবে। জোর বাঁচা বেঁচে গেছি এবারের মতন।’

বললাম, ‘এরকম রেজাল্ট করলে ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তার কিছু নেই। মাস্টার্সে চান্স পাক্বা।’

‘আহা, তুমি একদম চাপ নিও না, বুঝলে? দেখবে এবার সেকেন্ড ইয়ারে কেমন পড়াশোনা করি।’

অনিতা বলে, ‘রাত দেড়টা-দুটো অবধি ফেসবুক, হোয়াটস অ্যাপ করলে পড়াশোনা হবে কী করে। সব গোল্লায় যাবে।’

‘ওঃ মা, তুমি না…’ ওর ফোন বেজে উঠল, ‘হ্যাঁ বনিতা, বল…’

বন্ধুর সঙ্গে কথায় ডুবে গেল।

মনে মনে আমারও চাপা উদ্বেগ ছিল। মেয়েটা এ বছর এত ফাঁকি মেরেছে যে বলার নয়। পরীক্ষার আগের রাতে কান্নাকাটি করছিল, সব ভুলে যাচ্ছে। থ্যাংক্ গড, এ যাত্রায় বেঁচে গেল। মাঝারি মানের স্টুডেন্টদের যে ফাঁকি মারা উচিত নয়, সেটাই বোঝে না মেয়েটা।

সারাটি দিন শুয়ে-বসে আলসেমি আর মাঝেমধ্যে একে তাকে ফোন করেই কেটে গেল।

***

‘সব পাখি ঘরে আসে– সব নদী– ফুরায় এ জীবনের সব লেনদেন, থাকে শুধু অন্ধকার, মুখোমুখি বসিবার…’

***

গোপলপুরে শেষ রাত্রি

কাল অনেক রাতে দারিংবাড়ি টিম ফিরেছিল। রাকেশদের ট্রেন লেট করায় ওরা যখন ফিরল তখন তো রাত সাড়ে এগারোটা। হোটেলে বলা ছিল, তাই রাতের খাবার জুটেছিল। টঙ্কাস তখন গভীর ঘুমে।

ব্রেকফাস্ট টেবিলে সকলে একটু বেলা করেই ঢুকল।

সুমি সকলকে পুরীর প্রসাদ দিচ্ছিল।

জিজ্ঞাসা করলাম, ‘কেমন কাটল পুরী?’

‘ভালোই, তবে তোমাদের খুব মিস করছিলাম।’

অনিতা বলল, ‘আমরাও। আমরা তো সারাদিন একা একাই কাটালাম।

কল্পনাদিকে রাকেশ জিজ্ঞাসা করল, ‘তোমরা কেমন বেড়ালে দিদি?’

‘ধুর, আর বলিস না, রাস্তার যা অবস্থা! যাওয়াটা তবু একরকম, ফেরার সময় খুব কষ্ট হয়েছে।’

বুলা বলল, ‘দেখলাম ঠিকই। তবে মন ভরল না।’

বললাম, ‘তোমার কেমন লাগল ইরাবতী?’

‘কী বলুন তো দাদা, ওখানে একটা দিন স্টে করলে হয়তো ভালো লাগত। এত জার্নি করে পোষায় না।’

দিদি বলল, ‘নারে, সত্যি কথা বলতে কী, ওখানে দর্শনীয় তেমন কিছু নেই। ওসব ছোটোখাটো ফল্স, পাহাড় দেখার জন্য অতদূর যাবার মানেই হয় না।’

হরলালদা বলল, ‘এই অসীমটাই হল যত নষ্টের গোড়া, খালি বরফ দেখব বরফ দেখব বলে লাফাচ্ছিল।’

‘দেখলে বরফ’, আমি প্রশ্ন করলাম।

‘হ্যাঁ দেখেছি। নিয়েও এসেছি পকেটে করে। রাতে তোমার গেলাসে ঢেলে দেব কিছুটা। বাকিটা অসীমের মাথায়।’

রাকেশ বলল, ‘বাদ দাও ওসব। আজ গোপালপুরে শেষ দিন। আজ রাতে গ্র্যান্ড মস্তি।’

ঠিক সে সময় আবির ডাইনিং রুমে ঢুকে বলল, ‘আজ ড্রিংক্সের টোটাল খরচ আমার।’

সকলে হইহই করে ওকে স্বাগত জানাল।

হরলালদা জিজ্ঞাসা করল, ‘কী ব্র্যান্ড খাওয়াচ্ছ?’

‘কী খাবেন বলুন?’

‘স্কচ, ভালো স্কচ চাই।’

‘দ্যাখা যাক, এখানে কী পাওয়া যায়।’

অসীম বলল, ‘তাহলে স্কচের সঙ্গে খাবার মতন কিছু ব্যবস্থা করি?’

‘তোমার ওই পচা তেচোখো মাছ?’ হরলালদা বলে।

সবাই হাসিতে ফেটে পড়ে।

‘আচ্ছা, পচা মাছ? সেদিন তো বেশ ভালোই সাঁটালেন। পমফ্রেট, পার্শে, ভেটকি, বেলে। আজ সব তেচোখো হয়ে গেল?’

‘শোনো, ভালো শিক কাবারের ব্যবস্থা করো দেখি। আর হোটেলে কী পাওয়া যায় দ্যাখো, স্পেশাল কিছু।’

সুমির বাচ্চা মেয়েটির টানে সব মহিলার ভিড় ওর ঘরেই। একবার এ কোলে নেয় তো একবার ও। সবার কোলেই যায়, একটুও কান্নাকাটি নেই। সকলেই খুশি!

তবে বাচ্চাটির ঠান্ডা লেগে গেছে। সামান্য জ্বরও হয়েছে। বেচারির নাকটি বোধ হয় বন্ধ, সারাক্ষণ মুখ খোলা।

সুমি ওর ছেলেকে ভালো করে গরম জামাকাপড় পরিয়ে দিয়েছে। যাতে ওর আবার ঠান্ডা-টান্ডা না লেগে যায়। রাকেশ কিচেনে গেল মেয়ের জন্য জল গরম করে আনতে। যাবার সময় আমাকে বলে গেল, ‘গৌতমদা, আজ আয়োজন একদম জমজমাট।’

হরলালদার ঘরে নক করতে কল্পনাদি দরজা খুলে দিল। জিজ্ঞাসা করলাম, ‘কী রে, লালদা কই?’

‘ওই দ্যাখ না এখনও শুয়ে রয়েছে।’

বললাম, ‘কী লালদা, ভর সন্ধেবেলা শুয়ে রয়েছো। ওঠো, ওঠো, ছাদে যাবে তো।’

‘আর বোলো না, দুপুরে অনেকক্ষণ স্নান করেছি। তার ওপর পেটে দু-চার পেগ ছিল। খুব টায়ার্ড লাগছিল। লাঞ্চ করে এসে একদম নাক ডাকিয়ে ঘুম।

অসীম ঘরে ঢুকে বলল, ‘যা স্নান করলেন সে তো দেখলাম। গোপালপুরের সমুদ্র আপনাকে মনে রাখবে। হাঁটুজলে ডুবকি মেরে খাবি খেয়ে অস্থির।’

‘এই তুমি আর বোলো না। পেট ভরে, নুনজল গিলে এলে।’

‘আমি!’

‘নয়তো কে? তুমিই তো বললে, জলে খুব নুন। না খেলে, জানলে কীভাবে? থাক গে, একটা সিগারেট দাও তো। আর কিচেনে বলে দাও চা দিতে।’

দরজা খোলাই ছিল। ইরা হঠাৎ ঘরে ঢুকে বলল, ‘দিদি, তোমার কাছে মাথা ধরার কোনও ট্যাবলেট আছে?’

কল্পনাদি বলল, ‘কেন, কার আবার মাথা ধরল?’

‘সকাল থেকেই মাথাটা টিপটিপ করছিল। এখন ব্যথাটা বাড়ছে। তার ওপর আবার জেদ ধরেছে আমাকে ছাদে যেতে হবে, তোমাদের সঙ্গে বসতে।’

দিদি বলল, ‘গ্যাসের ব্যথা নয় তো? অনেক সময় গ্যাস-অম্বল থেকেও মাথার যন্ত্রণা হয়। এক কাজ কর, এই দুটো ট্যাবলেট নিয়ে যা। গরম জল দিয়ে খাবি। একটু রেস্ট নে। দেখবি আধ ঘন্টার মধে ফিট হয়ে গেছিস।’

ও ইরার হাতে দুটি ট্যাবলেট দেয়।

ট্যাবলেট নিয়ে ইরা চলে গেল।

বললাম, ‘এই ইরা কী ছিল, কী রকম দেখতে হয়ে গেল!’

ওরা আমার দিকে কৌতূহলী দৃষ্টি মেলে চাইল।

বললাম, ‘বছর দশেক আগে আবিরের সঙ্গে ইরাবতীকে যখন দেখতে যাই তখন ওর বয়স বছর বাইশ। ডানাকাটা পরি বললে হয়তো কম বলা হবে। যেমন রূপ, তেমনই যৌবন! আবিরের তো দ্যাখা মাত্র পছন্দ হয়ে গেল। আমারও বন্ধু-পত্নী হিসেবে নির্বাচনে দ্বিধা ছিল না। তবে একটা সমস্যা ছিল। ইরার মা-বাবা কেউই ছিল না। এক কার-অ্যাক্সিডেন্টে দুজনই মারা যান। তখন ওর বয়স দশ-কী এগারো। সেই থেকে ও মামার বাড়িতে মানুষ। ভাগ্নীর বিয়েতে মামার মোটা টাকা খরচ করার ইচ্ছা থাকলেও মামীর ভয়ে তা করার উপায় ছিল না। দেনা-পাওনার কোনও গল্প ছিল না। আর তা নিয়ে আবির কিংবা ওর বাড়ির কারও কোনও অভিযোগও ছিল বলে শুনিনি। নমো নমো করে বিয়ে হল।

একটি হোটেল বয় এসে আমাদের চা দিয়ে গেল। চায়ের কাপ তুলে সিপ করছিলাম।

কল্পনাদি বলল, ‘তারপর?’

‘বিয়ের পর বছর চারেক সব ঠিকঠাকই ছিল। কিন্তু ক্রমশই আবির আর ইরার মধ্যে মানসিক ব্যবধান বাড়তে লাগল। আচমকা ইরা অসুস্থ হয়ে পড়লে ওকে নার্সিংহোমে ভর্তি করা হল। মাস তিনেক কাটিয়ে ও বাড়ি ফিরল ঠিকই কিন্তু কেমন যেন পালটে গেল। আমাদের বাড়ি ওরা মাঝেমধ্যে আসত। আমরাও যেতাম। কখনও ও খুব বেশি রকম কথা বলত আবার কখনও খুব চুপচাপ, সংযত। প্রয়োজনের অতিরিক্ত একটি শব্দও খরচ করত না! তবে মনে হতো, ওর মধ্যে কোনও গভীর কষ্ট বা অসহায়তা আছে যা ও কখনও আমাদের বলেনি।’

‘তোকে না বলুক, অনিতাকেও বলেনি?’ দিদি প্রশ্ন করে।

‘সম্ভবত না। বললে জানতে পারতাম।’

‘তারপর?’

তারপর খুব দ্রুত ওর শরীর শুকিয়ে যেতে লাগল। আবিরকে বলতাম ওকে ভালো ডাক্তার দেখাতে। ও বলত, ‘কত ডাক্তার তো দেখালাম। কিছুই হল না। তোর জানাশোনা ভালো কোনও ডাক্তার থাকলে বল।’ কোনও ডাক্তারই ওর রোগ ধরতে পারল না। দিনে দিনে ইরা শুকনো বিবর্ণ পাতার মতন হয়ে গেল। ওকে দেখলে আমার খুব কষ্ট হয়। আবিরের পাশে একদিন ও কিন্তু মোটেও বেমানান ছিল না। পরে মনে হয়েছে, হয়তো ওদের কোনও ইস্যু না থাকাই ওর অসুস্থতার মূল কারণ।

‘ডাক্তার কী বলছে, প্রবলেমটা কার?’ অসীম জিজ্ঞাসা করে।

‘বড্ড টাচি ব্যাপার। ও নিয়ে আমি ওদের কাউকে কখনও প্রশ্ন করিনি। নিজে থেকে যে যতটুকু বলে ততটুকুই শুনি।’

হঠাৎ খোলা দরজাতেই নক। দ্যাখা গেল, দরজার সামনে হরলালদার বন্ধু এবং তার ওয়াইফ। বললেন, ‘সবাই এখানে? আমাদের বাদ দিয়ে জমিয়ে গপ্প হচ্ছে? ভাবলাম ছাদে যাবার আগে একবার নক করে যাই।’

‘আসুন, আসুন ভিতরে আসুন’, অসীম বলে।

ওরা ঘরে ঢুকে চেয়ারে বসলেন। অসীম আর আমি ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলাম।

আটটা নাগাদ বুলা ফোন করে জানাল ছাদে যেতে। সবাই ওখানে যাচ্ছে। ভাবলাম রাকেশকে একবার ডেকে যাই। ওর রুমে গিয়ে শুনলাম কী যেন আনতে রাকেশ দোকানে গেছে। ওকে ফোনে ধরতে জানাল মিনিট কয়েকের মধ্যেই ফিরে আসছে। আমি যেন ওয়েট করি।

হঠাৎ রাকেশের যে-ফোনটি সুমির কাছে থাকে, সেটা বেজে উঠল। দৌড়ে গিয়ে সেটি তুলে নিল টঙ্কাস। বলতে লাগল, ‘হ্যালো, কে?’

ওদিক থেকে সম্ভবত কেউ প্রশ্ন করল, তুমি কে। যার উত্তরে ও বলল, ‘আমি রাকেশের ছেলে। তুমি কে বলছ?’

ফোনের অপর প্রান্তের ব্যক্তিটি কণ্ঠস্বরে মজা পেয়ে নিজের নাম বলছে না। ওর কথা শোনার জন্য অন্য প্রসঙ্গে চলে যাচ্ছে।

‘আগে বলো তুমি কে? তুমি কি কোনও চোর? সত্যি করে বলো তুমি চোর কি না?’ টঙ্কাস প্রশ্ন করে চলে।

অপর প্রান্ত কী জবাব দিচ্ছে কে জানে!

‘আমি জানি তুমি একটা চোর। বাবা আসলে বলব, তোমাকে একটা চোর ফোন করেছিল।’

সুমি এসে এক থাবা দিয়ে ফোনটি ওর হাত থেকে কেড়ে বাম হাতে সেটি কানে ধরল। প্রায় একই সঙ্গে ডান হাতে টঙ্কাসের চুলের মুঠি ধরে বার দুয়েক আচ্ছা করে ঝাঁকানি দিল। তারপর ফোনে কথা বলতে শুরু করল, ‘হ্যাঁ, কে বলছেন? ও আচ্ছা। রাকেশ আসুক, আমি ওকে বলছি ফোন করতে। আপনি কিছু মনে করবেন না দাদা। বাচ্চা, বোঝে না, কী বলতে কী বলে ফেলেছে। ও হ্যাঁ ধরুন, রাকেশ এসে গেছে, দিচ্ছি ওকে।’

‘কে গো?’ হাতের জিনিসগুলি সুমিকে দিয়ে ওর হাত থেকে ফোন নিয়ে জানতে চায় রাকেশ।

‘গিরিনদা, তোমার দোকানের ম্যানেজার’, ধরো ফোনটা।

রাকেশ ফোন নিয়ে কথা বলতে বলতে রুমের বাইরে চলে যায়।

টঙ্কাস তখন এক মনে রুমের নাইট বাল্বের সুইচটি একবার অন একবার অফ করায় মনোযোগ দিয়েছে।

সুমি চেঁচিয়ে ওঠে, ‘কীরে ও…ই। কী করছিস শয়তান? ওহ্ আমি যে কী করি এই ছেলেকে নিয়ে?’

‘খেলা করছি তো’, নিষ্পাপ হাসি টঙ্কাসের মুখে।

বললাম, ‘ওরকম করে না বাবা। লাইটটা নষ্ট হয়ে যাবে। সবাই বলে, টঙ্কাস ভালো ছেলে। খুব কথা শোনে। তুমি এদিকে এসো, আমি একটা গল্প বলব।’

দেখলাম বাধ্য ছেলের মতন আমার কাছে চলে এলো, ‘বলো কী বলবে আমায়!’

‘সে কথা পরে বলছি। তুমি আগে বলো স্কুলে তোমার বেস্ট ফ্রেন্ড কে?’

‘জুনি।’

‘সে আবার কে?’

‘একটা ভালো মেয়ে।’

‘কেমন দেখতে ওকে?’

‘খুব সুন্দর। ও তো আমাদের বাড়ি এসেছিল।

‘কবে এসেছিল?’

‘আমার বার্থ-ডে তে। সুরাইয়া, সেজুঁতি, নীল, জুনি –অনেক বন্ধু এসেছিল। খুব মজা হয়েছিল। ওরা কততো গিফ্ট দিয়েছে আমাকে! আমিও ওদের রিটার্ন গিফ্ট দিয়েছি।’

‘কেক কেটেছিলে?’

‘হ্যাঁ, সব্বাইকে দিয়েছিলাম।’

রাকেশ রুমে ফিরে এসে আমাকে বলল, ‘চলো গৌতমদা। সুমি, তোমার জিনিসপত্র দেখে নিয়েছ? আর কিছু লাগবে না তো? আমি ওপরে গেলে কিন্তু ডাকবে না বলে দিচ্ছি। একদম ডিসটার্ব করবে না আমাকে।’

সুমি নালিশ করে, ‘তোমার ছেলে গিরিনদাকে বলেছে চোর।’

‘অ্যাঁ!’ রাকেশ টঙ্কাসের মাথায় এক চাঁটি মেরে বলে, ‘কীরে, গিরিনদাকে কী বলেছিস?’

মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে বলে, ‘আমি বলেছি, তুমি কে? তুমি কি একটা চোর?’

‘তুই হঠাৎ ওকে চোর বলতে গেলি কেন?’

‘তোমরা সবাই যে বললে!’

‘আমরা সবাই!’ রাকেশ ভ্যাবাচাকা খেয়ে বলে, ‘আমরা বললাম গিরিনদা চোর? কখন বললাম?’

‘ওই যে কালকে, রাত্তির বেলা। আমি তখন ঘুমোচ্ছিলাম।’

হঠাৎ ওরা স্বামী-স্ত্রী চমকে দু’জনে দুজনার দিকে তাকায় অর্থপূর্ণ দৃষ্টিতে।

এমন সময় অসীমের ফোন। আসছি বলে ফোন কেটে দিলাম।

রাকেশকে বললাম, ‘ছাড় ওসব। বাচ্চা মানুষের কথা ধরতে নেই। চল এখন, ওরা অপেক্ষা করছে।’

ওকে টেনে নিয়ে চললাম, সিঁড়ি বেয়ে উঠতে উঠতে বললাম, ‘খুব সাবধান রাকেশ। তোমার ছেলে কিন্তু ডেঞ্জারাস। ও সব বোঝে।’

‘আরে গৌতমদা, কাল রাতে ওকে শুইয়ে দিয়ে সুমি আর আমি নিজেদের মধ্যে কথা বলছিলাম, গিরিনদা একা দোকানে আছে কী করছে কে জানে।’

সুমি বলল, ‘দ্যাখো মালপত্তর আবার সরাচ্ছে কি না।’ ছেলে এর থেকে বুঝে নিল ম্যানেজার চুরি করছে।’

এবার থেকে মুখ সামলে কথা বলবে ওর সামনে’, আমি বললাম।

‘ঠিক বলেছ, তাই বলতে হবে দেখছি।’

ছাদে উঠে দেখি, পার্টি শুরু হব হব করছে! আমরা দুজন যেতেই সকলে চেঁচিয়ে উঠল, ‘আরে কোথায় গেছিলে তোমরা? আমরা তো শুরু করতে পারছি না তোমাদের ছাড়া।’

দেখলাম ভারি অবাক ব্যাপার, আজকের পার্টিতে ইরাও এসেছে। বললাম, ‘তুমি!’

‘ও জোর করল’, আবিরকে দেখিয়ে বলল।

‘আরে বেড়াতে আসা মানে তো আনন্দ-ফূর্তি করতে আসা। একটু-আধটু খেলে কোনও দোষ নেই। আমি বলছি তো ওকে খেতে’, বলে আবির।

‘বছর খানেক হল আপনার বন্ধু আমাকে ড্রিংক্স নেওয়া শেখাচ্ছে।’

‘শেখাতে চাইলে আর শিখছ কই? এক পেগ, খুব জোর দু-পেগ। গেলাস নিয়েই বসে থাকে পার্টিতে। নিয়ম রক্ষা করে আর কী!’

‘কই আমাদের বাড়িতে তো মাস চারেক আগেও এলি তোরা, দেখিনি তো ওকে ড্রিংক্স নিতে?’ বললাম আমি।

‘তোর বউ খায় না, তাই ওকেও জোর করিনি। যেখানে মহল আছে সেখানে খাওয়া যেতেই পারে। তাই না হরলালদা?’

‘ঠিক ঠিক, একদম ঠিক কথা’, জোর সমর্থন জানায় লালদা।

সকলে ‘চিয়ার্স’ জানিয়ে শুরু হল পার্টি। কল্পনাদি ওর বন্ধু সুইটিকে বলল, ‘তুই একটা রবীন্দ্রসংগীত গা।’

আমরা সমস্বরে ওর অনুরোধকে স্বাগত জানালাম। ভদ্রমহিলার গলা ভারি মিষ্টি।

আমাদের অনুরোধে উনি পরপর বেশ কয়েকটি গান গাইলেন।

পারস্পরিক কর্থাবার্তার মধ্যেই চলছিল গান।

আবির বলল, ‘তোমাদের গান-টান শেষ হলে আমি কিন্তু আমার পছন্দের গান শোনাব।’

আমি একটু অবাক হলাম, ‘তুই গান গাইবি?’

ওর দ্বিতীয় পেগ শেষ। বলল, ‘বলেছি যখন গান শোনাব, তো শোনাব। তুই চাপ নিস না।’

হরলালদা হঠাৎ আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে গেয়ে উঠল, ‘ওরে আমি চাইলাম যারে পাইলাম নারে … বাস করে অন্যের ঘরে।’

সকলে হই হই করে উঠল। দেখলাম, বুলা আর কল্পনাদি জমিয়ে গল্প শুরু করেছে ইরার সঙ্গে। রাকেশ আর আবির নিজেদের মধ্যে কথাবার্তায় ব্যস্ত। আমি ছাদের কিনারে সমুদ্রের দিকে উঠে গেলাম।

সুইটি এগিয়ে এসে আমাকে বললেন, ‘আপনার সম্পর্কে অনেক কথা শুনলাম।’

‘ভালো, না মন্দ?’

‘ভালো! যা শুনেছি সবই ভালো।’

‘কী শুনেছেন যদি বলেন’, বলে আগ্রহসূচক ভঙ্গিতে চাইলাম।

‘শুনলাম আপনি লেখালেখি করেন, অনেক বইপত্র আছে।’

‘চেষ্টা করি একটু-আধটু। আপনি ড্রিংক্স নেন না?’

‘না, আমি ঠিক স্ট্যান্ড করতে পারি না। তবে এ ধরনের আসর যদি পরিচ্ছন্ন মানুষদের মধ্যে হয় তা খারাপ লাগে না।’

‘কী খারাপ লাগে আপনার?’

‘মানুষের নীচতা, পরশ্রীকাতরতা, ঈর্ষা– মানুষের দোষের কি আর শেষ আছে?’

‘আর কী ভালো লাগে?’

‘রবীন্দ্রনাথ, আর নাচ। আমার একটা নাচের স্কুল আছে।’

‘নাচ শেখান আপনি?’

‘ওই আপনারই মতন। চেষ্টা করি একটু-আধটু। যাকগে ওসব, কোথায় পাব?’

‘কী পাবেন?’

‘আপনার বইপত্র?’

‘খুঁজবেন! পেয়ে যাবেন।’

‘কোথায় খুঁজব? কলেজ স্ট্রিটে যাওয়া সম্ভব নয়।’

‘যেখানে সবাই খোঁজে। গুগুলে, ফেসবুকে। ফেসটা তো চিনে রাখলেন, একই নামের হলেও আইডেন্টিফাই করতে অসুবিধা হবে না। একান্তই না হলে বলবেন, ওয়েবসাইটটা বলে দেব।’

‘আপনার হোয়াটসঅ্যাপ নাম্বারটা যদি দেন, প্লিজ! অবশ্য যদি আপত্তি না থাকে।’

‘না না, আপত্তির কী আছে।’

ভদ্রমহিলা আমার নাম্বার নিলেন। বললাম, ‘একটা মিসকল দিয়ে দিন।’

সিগারেট হাতে আবির এগিয়ে এসে বলল, ‘মিস নয়, মিসেস কল।’ আমাকে প্যাকেটটা এগিয়ে দিল।

ভদ্রমহিলা মৃদু হেসে টেবিলে ফিরে গেলেন।

উনি চলে গেলে আবিরকে ইঙ্গিত করে বললাম, ‘ইন্টারেস্টেড?’

ও হেসে বলল, ‘উঁহু জমবে না আমার সঙ্গে।’

‘কী করে বুঝলি?’

‘ঠিক যেভাবে বুঝতে পেরেছিলাম নিরুপমার সঙ্গে জমবে।’

‘ক’ পেগ নিলি?’

‘বোধ হয় চার, পাঁচও হতে পারে। তোর তো দেখলাম গেলাসটা পড়ে আছে টেবিলে।’

বললাম, ‘নিলাম তো একটা।’ ‘আজ পার্টি থ্রো করার কারণ আমি আন্দাজ করতে পারছি।’

ও ডান হাত মুঠো করে বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ তুলে ইঙ্গিতে জানাল মিশন সাকসেসফুল।

‘কাল কোথায় গেছিলি? সারা দিন দেখলাম না। কয়েকবার ফোন করলাম, বেজে গেল, ধরলি না।’

‘কোথাও যাবার দরকার কী? হোটেলে এত ঘর।’

‘বিশালাজি এখনও ফেরেননি শুনলাম’, আমি বললাম।

‘রিয়েলি গড ইস সো গুড, আজ রাতেও ফিরছেন না।’

রাকেশ হঠাৎ ফোন পেয়ে নীচে ছুটল।

অসীম এগিয়ে এসে আমাকে বলল, ‘তোমার মতলব কী? চলো চলো, টেবিলে চলো।’

টেবিলে যেতেই শুনলাম টেবিল বাজিয়ে সুইটির হাজবেন্ড জগন্নাথবাবু গান শুরু করেছেন, ‘মনে পড়ে রুবি রায়…’

হঠাৎ আবির চেঁচিয়ে বলে ওঠে, ‘ধ্যাৎ, সব বাজে গান। এবার আমি গান শোনাব।’

বললাম, ‘শোনা, তোর গান তো কখনও শুনিনি।’

সকলে আগ্রহ ভরা দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকাল। ভাবলাম গান গাইবে। ও মোবাইলে সম্ভবত প্রস্তুতি নিয়েই রেখেছিল। বিশেষ কোনও বাটন টিপতেই গান বেজে উঠল, ‘দো বুঁদ মুঝে ভী পিলা দে শরাবি দেখ ফির হোতা হ্যায় ক্যা…’। সঙ্গে কোমর দুলিয়ে নাচ। ওর সঙ্গে যোগ দিল হরলালদা।

অসীম একটু লাজুক প্রকৃতির। ওদের উৎসাহ দিলেও নিজে নাচে যোগ দিল না। মহিলাবৃন্দ নিজেদের মধ্যে কথাবার্তায় ব্যস্ত।

আমি আবার একটু সরে গেলাম সিগারেট নিয়ে। সমুদ্রের দিকে ফিরলাম। খেয়াল করলাম, পিছনে কেউ এসে দাঁড়িয়েছে, পাশ ফিরতেই দেখলাম, ইরা।

‘কিছু বলবে ইরাবতী?’

ইরাবতীর হাতে গেলাস। একটু ড্রাংক মনে হল। বলল, ‘অনেক কিছুই তো বলার ছিল দাদা।’

‘হ্যাঁ হ্যাঁ বলো না, নির্দ্বিধায় বলো।’

‘দাদা, আপনার বন্ধু সম্বন্ধে আপনি অনেক কিছুই জানেন, আমাকে কিছু জানতে দেন না কেন?’

আমি চুপ করে রইলাম।

সত্যি করে বলুন, ওর চরিত্রের ব্যাপারে আপনি কিছু জানতেন না? আপনার মৌনতা প্রমাণ করছে আপনি সব জানতেন। কোনও দিন আমাকে সে কথা বলেননি কেন?’

‘বলতে পারিনি। আমি কিছু বললে ওর কি পরিবর্তন হতো বলে তোমার মনে হয়? শুধু শুধু তোমার যন্ত্রণা বাড়ত।’

একটু চুপ থেকে ইরা বলল, ‘তা হয়তো ঠিক।’

‘আমার জায়গায় তুমি থাকলে তুমিও কি বলতে পারতে এসব কথা? ভেবে দ্যাখো একবার। বন্ধু হিসাবে যতটুকু বলার অনেক বার বলেছি।’

ইরা বলল, ‘মহিলাদের প্রতি ওর দুর্বলতার কথা বিয়ের বছর খানেকের মধ্যেই জানতে পেরেছিলাম। তবে আমল দিতে চাইনি। আমার তো পাশে দাঁড়াবার মতন কেউ নেই। মা-বাবা-অর্থ-সম্পত্তি-কোনও সাপোর্টই নেই। থাকার মধ্যে ছিল কিছুটা রূপ। ঈশ্বরের অভিশাপে সেটুকুও গেছে। নারীর শেষ এবং একমাত্র সম্বল স্বামীর ভালোবাসা, সেটুুকুও…।’

ইরা চোখ ফিরিয়ে নিল, বুঝলাম ওর চোখের কোল ভিজে উঠেছে।

‘দাদা, যন্ত্রণার কথা কোথায় জানেন, আজ আমাদের সন্তান না হবার জন্যও সর্বদা ও আমাকেই দায়ী করে। বলে, আমি নাকি একটা বাঁজা। অথচ তিন-তিনবার আমি মেডিকেল চেক-আপ করিয়েছি তিনটি আলাদা ক্লিনিকে। প্রত্যেকটি রিপোর্ট আমার ফেভারে।’

আমি ওর চোখের দিকে তাকাই। যে-জ্বলন্ত দৃষ্টি মেলে আমার দিকে চেয়ে ইরাবতী কথাগুলি বলছে তা একমাত্র চরম সত্য থেকেই উঠে আসতে পারে। অবিশ্বাস জাগার প্রশ্নই ওঠে না।

‘দাদা, আমার খুব লজ্জা করছে আপনাকে এসব কথা বলতে, খুব কষ্ট হচ্ছে। তবু বলছি, ওর গালাগাল, সময়ে-অসময়ে গায়ে হাত তোলা, দুর্ব্যবহার, লোকের সামনে আমাকে অপদস্থ করা– সব, সব আমি সহ্য করি মুখ বুজে। ওর মহিলাপ্রীতি, আকণ্ঠ মদ্যপান, সব মেনে নিই কেবল একটি কথা ভেবে…।’

ও চুপ করে যায়।

‘কী কথা?’

‘যদি ওকে জানাই, মেডিকেল রিপোর্ট অনুযায়ী আমি সেন্ট পার্সেন্ট ফিট, দোষ যদি কিছু থাকে তবে তা ওরই –এ কথায় মানুষটা হয়তো বড়ো কষ্ট পাবে, আঘাত পাবে মনে। ওর মধ্যে পৌরুষের অহং যে খুব খুব বেশি। ওকে কষ্ট দিতে যে আমি পারব না দাদা… কথাটা জানলে মানুষটার যে বুক ভেঙে যাবে!’

চুড়িদারের ওড়নায় মুখ চেপে ধরে কান্না চাপার চেষ্টা করে ইরাবতী। সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে দমকে দমকে কাঁদতে থাকে।

ওকে সান্ত্বনা দেবার মতন ভাষা আমার নেই। এই জীর্ণ-শীর্ণ কংকালসার নারীটির অসীম শক্তির কাছে কত সামান্য আমি। কী অপার ভালোবাসা বুকে থাকলে একজন মানুষ এতটা যন্ত্রণা নীরবে মুখ বুজে দিনের পর দিন সহ্য করে চলতে পারে। শ্রদ্ধায় অবনত হয়ে আসে হৃদয়। ওপরে তাকাই, মাথার ওপর কৃষ্ণপক্ষের আকাশ। সামনে সমুদ্রের সীমাহীন অন্ধকার। গোপালপুর লাইটহাউসের বিশাল ঘূর্ণায়মান ব্লেড মাথায় আলো নিয়ে অবিরাম ঘুরে চলেছে। মোবাইলের সংগীতের সুরে তখনও মেতে আছে একজনই, আবির… হাতে বোতল নিয়ে ক্রমাগত নেচে-গেয়ে চলেছে, ‘আজ কি পার্টি মেরি তরফ সে…, আজ কি পার্টি….।’

———

ভেষজ উপায়ে ওজন কমান

শরীর স্লিম ও ট্রিম রাখতে কে না পছন্দ করেন? একই সঙ্গে ফিটনেস মন্ত্রটাও যদি কাজ করে তাহলে তো হাতে প্রায় চাঁদ পাওযার মতো অবস্থা। কিন্তু সবার ভাগ্য এতটা সুপ্রসন্ন হয় না। সামান্য খাওযাদাওযার এদিক-ওদিক হলেই শরীরে মেদ জমতে আরম্ভ করে। রোজ ব্যায়াম বা জিম করতে আলসেমি লাগে অথবা সকাল বিকেল ব্রিস্ক হাঁটাটাও নিয়ম মেনে কিছুতেই হয়ে ওঠে না। সেইক্ষেত্রে ভারতীয় ভেষজ উপাদানেই আছে চটজলদি ওজন কমাবার উপায়। সকালে উঠে গরমজলে মধু ও লেবুর রস মিশিয়ে খান অথবা ১ কাপ জলে জিরা সারারাত ভিজিয়ে রেখে সকালে উঠে জলটা খেয়ে নিন, ওজন কমবে। মেথিদানা ব্যবহার করেও দেখতে পারেন, উপকার পাবেনই। একই সঙ্গে সাইড এফেক্টসও নেই।

১) মেথি ভেজানো জল খান, যা খুব দ্রুত ওজন কমাতে সাহায্য করবে। মেথি ভেজানো জল খিদে কমায়। অল্প খেলে শরীরের ওজন কমবে। এছাড়াও জলের মধ্যে মেথি ভিজিয়ে রেখে সকালে যদি চিবিয়ে মেথিদানা খেতে পারেন তাহলেও শরীরের মেদ কমবে।

২) মেথিদানা ফোটানো জল ওজন কমানোর সঙ্গে সঙ্গে ডাযাবেটিজ ও রক্তচাপের সমস্যা নিয়ন্ত্রণে রেখে হজম শক্তি বাড়ায়। জলের সঙ্গে মেথিদানা পিষে, সেই পেস্ট বেশ খানিকটা জলে (২ গেলাস) ফুটিয়ে নিন। এতে আদা, দারচিনিও মেশাতে পারেন। পুরো মিশ্রণটা পাঁচ মিনিট ফুটিয়ে সেই জল রোজ সকালে খালি পেটে খান।

৩) মেথিদানায় রয়েছে প্রচুর ভিটামিন, ক্যারোটিনয়ে। এছাড়াও নানা খনিজ পদার্থে সমৃদ্ধ এটি। একটি পাত্রে মেথিদানা রেখে সেটি ভিজে কাপড় দিয়ে ৩-৪ দিন ঢেকে রেখে দিন। মেথিদানাগুলি অঙ্কুরিত হলে সেগুলি রোজ খান। ওজন কমবে।

৪) মধুর সঙ্গে মেথিদানা ভেজানো জল মিশিয়ে খেলে ওজন কমবে। মেথি গুঁড়ো করে জলে ফুটিয়ে ঠান্ডা করে নিতে হবে এবং অন্তত তিন ঘন্টা পর সেটি ছেঁকে লেবু ও মধু মিশিয়ে পান করতে হবে।

৫) মেথি শুকনো খোলায় ভেজে গুঁড়ো করে নিন। ঈষদুষ্ণ জলের সঙ্গে মিশিয়ে রোজ সকালে খালি পেটে খান। দ্রুত ওজন কমাতে সাহায্য করবে।

এছাড়াও আরও অনেক উপকারিতা রয়েছে মেথিদানার। ডাযাবেটিজ নিয়ন্ত্রণ করে, যারা নতুন মা হয়েছেন তাদের, ব্রেস্ট মিল্ক বাড়াতে সাহায্য করে, পিরিয়ড চলাকালীন ক্র‌্যাম্প এবং পেটের ব্যথা কমাতে সাহায্য করে। কোলেস্টেরল কমিয়ে হার্ট অ্যাটাক রোধ করে, লিভারকে সুরক্ষিত রাখে এবং হজমের সমস্যাও দূর করে।

মাস্ক হোক ফ্যাশনেবল কিন্তু কার্যকরী

ভাইরাস থেকেও সুরক্ষা দেবে আবার ত্বকের ক্ষতিও করবে না- কেন্দ্রীয় সরকারের বায়োটেকনোলজি বিভাগের উদ্যোগে এক আধুনিক ফ্যাশনেবল মাস্ক আনল আদিত্য বিড়লা গ্রুপের ফ্যাশন ব্র্যান্ড ভ্যান হিউসেন। বিশেষ ভাবে সতর্ক থাকতে এখনও মাস্ক পরে থাকা জরুরি। বিশেষ করে পাবলিক গ্যাদারিং-এ, মাস্ক-কে করোনা সংক্রমণ ঠেকাতে অন্যতম হাতিযার করেছে মানুষ। কিন্তু মাস্ক-এরও রয়েছে কিছু সুবিধা-অসুবিধা। তাই কিছু সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি। মাস্কের চাহিদা বেশি।

আজকাল বিয়ের অনুষ্ঠানকে মাথায় রেখে, বাটিক, কটকি থেকে শুরু করে চান্দেরি, কলামকারি, ডেনিম, এমব্রয়ডারি– সব রকম কাপড়ের মাস্ক তৈরি করাচ্ছেন ক্রেতারা। তাই সেইমতো কাপড়ও মজুত রাখতে হচ্ছে টেলরদের। অনলাইন বিক্রেতারাও নানা ডিজাইনের মাস্ক-এ ভরে তুলেছেন বাজার।বিভিন্ন মাস্কের স্টক রাখতে না রাখতেই তা বিক্রি হয়ে যাচ্ছে। কোনও মাস্কই পড়ে থাকছে না।

তবে কোভিড সংক্রমণের মধ্যে যে কোনও মাস্ক পরলে হিতে বিপরীত হতে পারে বলে সাবধান করছেন চিকিৎসকেরা।বিয়ে বা অনুষ্ঠানে গেলেও মেনে চলতে হবে মাস্ক ব্যবহারের সঠিক নিয়ম।কয়েকটি জিনিস মেনে চলা জরুরি।

  • কায়িক পরিশ্রম করার সময় আমাদের শরীরে বিপুল পরিমাণে অক্সিজেন-এর প্রয়োজন হয়। পরিশ্রম সাপেক্ষ কাজগুলো করার সময় মাস্ক পরা চলবে না। এতে শ্বাসপ্রশ্বাস ব্যাহত হবে
  • হাঁপানি, ব্রংকাইটিস প্রভৃতি সমস্যা রয়েছে যাদের, মাস্ক তাদের শ্বাস নেওয়া ও প্রশ্বাস ছাড়াকে আরও কঠিন করে তোলে। হার্টে অক্সিজেন-এর মাত্রা কম প্রবেশ করলে, বিপত্তি বাড়বে
  • যে-সমস্ত সস্তার মাস্ক বাজারে বিক্রি হচ্ছে, সেগুলি এমন উপাদানে তৈরি যা থেকে ত্বকে সংক্রমণ বা অ্যালার্জি হওয়া আশ্চর্যের নয়
  • মাস্ক পরা অবস্থায় প্রশ্বাস ছাড়ার সময় চশমার কাচ ঝাপসা হযে যায়। রাস্তায় বাসে-ট্রামে ওঠার সময় আপনার দৃষ্টিশক্তি ব্যাহত হলে, দুর্ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা প্রবল
  • যারা দিনের অনেকটা সময় মাস্ক পরে কাজ করেন, তাদের শরীরে অক্সিজেনের সঙ্গে শরীর থেকে নির্গত কার্বন ডাইঅক্সাইড পুনরায় শরীরে ব্যাক করে। ফলে শরীরে ল্যাকটিক অ্যাসিডের মাত্রা বেড়ে যায়। নসিয়া, গা-হাত-পায়ে যন্ত্রণা, তিরিক্ষে মেজাজ প্রভৃতি উপসর্গ শুরু হয়
  • মাস্ক পরা অবস্থায় জল খাওয়া কম হয়, ফলে পেশিতে টান ধরে।

কী করবেন

  • একই মাস্ক দীর্ঘক্ষণ পরে থাকবেন না, কারণ মাস্ক পরার পরও হাঁচি-কাশি চলতে থাকে
  • দীর্ঘদিন একই মাস্ক ব্যবহার করবেন না
  • বাতিল মাস্ক সাবধানে ও সতর্কতার সঙ্গে নষ্ট করুন
  • মাস্ক পরার পর, মাস্ক-এ যখন তখন হাত দেবেন না, এতে সংক্রমণের চান্স বাড়ে
  • বাড়িতে মাস্ক ব্যবহার করবেন না
  • এসি চালিয়ে গাড়ির ভেতর মাস্ক পরবেন না
  • বাড়ির সদস্যদের আলাদা আলাদা মাস্ক থাকা বাঞ্ছনীয়
  • দীর্ঘক্ষণ বদ্ধ পরিবেশে কাজের পর, মাস্ক খুলুন এবং খোলা জায়গায় অন্তত আধঘন্টা বড়ো বড়ো শ্বাস নেওয়া শ্বাস ছাড়া করুন। প্রতি ১ ঘন্টা অন্তর আধ গেলাস করে জল পান করুন ও ইউরিন আউটপুট বাড়ান।

একটি ছেলে আমাকে খুব ভালোবাসে কিন্তু আমি ওকে ভালোবাসি না

আমার বয়স ১৭ বছর। আমি এখন ক্লাস টুয়েলভ-এ পড়ি। একটি ছেলে আমাকে খুব ভালোবাসে এবং আমাকে বিয়ে করতে ইচ্ছুক। ভালোবাসাটা শুধুমাত্র ওর দিক থেকেই। কিন্তু আমি ওকে কিছুতেই মুখের উপর বলতে পারছি না যে আমি ওকে ভালোবাসি না। কারণ ও এতে মনে দুঃখ পাবে। অথচ আমি ওকে অন্ধকারে রাখতেও চাইছি না। এই অবস্থায় কী করা উচিত?

আপনার বয়স এখন খুবই কম। এখন পড়াশোনা এবং কেরিয়ার গঠনে মন দিন। যে ছেলেটির কথা জানিয়েছেন তাকে ভদ্র এবং স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিন ওকে আপনি ভালোবাসেন না। সে শুধুই আপনার বন্ধু। এখন প্রেম অথবা বিয়ের বয়স আপনার নয়, এমনকী উদ্দেশ্যহীন ভাবে ঘুরে বেড়াবারও কোনও যুক্তি নেই। সুতরাং আপনার উপর কোনওরকম আশা রাখতে ছেলেটিকে বারণ করুন আর না মানলে এড়িয়ে চলুন।

আরও পড়ুন 

আমি ২৩ বছরের যুবক, এমএ পড়ছি। কলেজেরই একটি মেয়েকে ভালোবাসতাম। আমি জানতাম মেয়েটিও আমাদের সম্পর্কটা নিয়ে যথেষ্ট সিরিয়াস। কিন্তু হঠাৎই মেয়েটি তার বাড়ি থেকে পছন্দ করে দেওয়া একটি ছেলেকে বিয়ে করে নিয়েছে। মেয়েটির এই ব্যবহারে মানসিক ভাবে আমি বিপর্যস্ত। মেয়েটিকে ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করলেও কিছুতেই ভুলতে পারছি না। ওর কথা মনে পড়লে আমি কোনও কাজেও মন দিতে পারি না। আমি এখন কী করব?

 মন থেকে কাউকে ভালোবাসলে তাকে মুছে ফেলা এত সহজ হয় না। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে স্মৃতির চাদরেও ধুলো জমতে শুরু করে। কাউকে ভোলা অবশ্যই কঠিন কিন্তু অসম্ভব নয়, তারপর যেখানে সেই ব্যক্তিটি অবিশ্বাসের কাজ করেছে।

নিজেকে পড়াশোনা, কেরিয়ার নিয়ে ব্যস্ত রাখলে ভোলাটা সহজ হবে। তাছাড়া দু’দিন পর আপনারও বিয়ে হবে, তখন পুরো ঘটনার স্মৃতিই ধীরে ধীরে আবছা হয়ে যাবে। তবে মনের দরজা বন্ধ রাখবেন না, খুবই কম বয়স আপনার। অচিরেই নতুন কোনও সম্পর্ক এসে পুরোনোকে ভাসিয়ে নিয়ে যাবে।

 

পড়ার জন্য সীমাহীন গল্প-নিবন্ধসাবস্ক্রাইব