চটজলদি কাজ সারুন কিচেনে

যে-কোনও ঘর-গেরস্থালির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হল রান্নাঘর, যেখানে সারাদিনের বেশ কিছুটা সময় রোজই কাটাতে হয়। সুতরাং সময়ের দৌড়ে কমফর্ট-এর সঙ্গে সঙ্গে কিচেনের কাজ চটজলদি সেরে ফেলাটাও খুবই জরুরি হয়ে উঠেছে। তাই কিছুটা রদবদল করে নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী সাজিয়ে তুলুন রান্নাঘর।

রান্নাঘরের অন্দরসজ্জা

রং – রান্নাঘরের জন্য উপযুক্ত রং নির্বাচন করাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ কারণ রান্নার জায়গার সম্পূর্ণ ছবিটা ওটার উপরেই নির্ভর করে। বেগুনি, সবুজ ইত্যাদি গাঢ় রং ব্যবহার না করাই ভালো। বরং চোখের আরামের জন্য হলুদ, কমলা অথবা মাটির রং বেছে নিতে পারেন।

টাইল্স-  ডিজাইনার টাইল্স কিচেনের দেয়ালে লাগালে দাগছোপের হাত থেকে নিষ্কৃতি পাবেন এবং ঘরও বড়ো দেখাবে। মার্কেটে গিয়ে নিজে দেখে টাইল্স বেছে আনতে পারেন তবে সময়ের অভাব থাকলে অনলাইনেও অর্ডার করতে পারেন। পছন্দের ভ্যারাইটি হল মোজেক, সিরামিক, প্রিন্টেড সিরামিক, রাস্টিক, ম্যাট ওয়াল টাইল্স, গ্লাস সিরিজ ডিজিটাল ওয়াল টাইল্স ইত্যাদি। এছাড়াও বিভিন্ন ফল বা ভোজনসামগ্রীর ছবি প্রিন্ট করা টাইল্স-ও পছন্দমতো বেছে নিতে পারেন।

জানলাঃ  রান্নাঘরে জানলা থাকা খুবই প্রয়োজন। তাই রান্নাঘরে জানলার জন্য একটু বেশি অর্থ খরচ করে উত্তম কোয়ালিটিরই জিনিস কিনুন। জানলার মাধ্যমে রান্নাঘরে সূর্যের আলো প্রবেশ করে। আজকাল ঘষা কাচের জানলা ফ্যাশনে ইন। রান্নাঘরকে আকর্ষণীয় করে তুলতে ইন্টিরিয়র ডিজাইনাররা জানলায় এই ধরনের কাচ বেশি ব্যবহার করছেন।

চিমনিঃ  প্রতি বছরই কিচেন চিমনিতে নানারকম পরিবর্তন আসছে এবং দিন দিন এর চাহিদাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। মডিউলার কিচেনের অপরিহার্য অঙ্গ হল কিচেন চিমনি। তিন ধরনের ফিলটার যুক্ত চিমনি সাধারণত পাওয়া যায়– ক্যাসেট ফিলটার, কার্বন ফিলটার ও ব্যাফেল ফিলটার। ভারতীয় কিচেনের জন্য ব্যাফেল ফিলটার সবচেয়ে বেশি কার্যকরী।

কিচেন কাউন্টার টপঃ  উপযুক্ত কিচেন টপ বাছলে যেমন কাজের সুবিধা হয় তেমনি কাজও তাড়াতাড়ি করা যায়। এছাড়া দেখতেও আকর্ষণীয় লাগে। সাধারণত গ্রানাইট কিচেন টপ বা টেবিল বেশি জনপ্রিয়। কিন্তু সাদা বা কালো মার্বল টপ বা চিনেমাটির তৈরি টপ-ও এখন অনেকেই পছন্দ করছেন। কিচেন কাউন্টার টপ-এ কম্প্যাক

কোয়ার্টজ-এর খুব রমরমা এখন এবং নিউ জেনারেশন এই স্টাইলটির খুব ভক্ত।

আলোর ব্যবহারঃ  রান্নাঘরে আলোর পর্যাপ্ত ব্যবস্থা রাখা খুবই দরকার। রান্নাঘরের সম্পূর্ণ সৗন্দর্যায়ন-এর জন্য ভালো কোয়ালিটির ল্যাম্প, বাল্ব ইত্যাদি লাগানো জরুরি। এলইডি এবং হ্যালোজেন কিচেন লাইটস এখন অনেকেরই পছন্দের তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে।

কিচেন ক্যাবিনেটঃ  স্টোরেজের জন্য কিচেন ক্যাবিনেট খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

প্রি-ল্যামিনেটেড পার্টিকল বোর্ডস, হার্ডউড, মেরিন প্লাই, হাইব্রিড উড প্লাস্টিক কম্পোজিট ইত্যাদি কিচেন ক্যাবিনেটস-এর চল সবথেকে বেশি।

রান্নাঘর সাজাবার জন্য এগুলি ছাড়াও কিচেন ক্যারোসেল ব্যবহার করা যায় জায়গা বাঁচিয়ে কিচেনে কাজ করার জন্য অ্যাডজাস্ট করা যায়, এমন টেবিলও কিনে নিতে পারেন।

রান্নাঘরের জিনিসপত্র

আধুনিক সময়ের প্রয়োজনীয়তা এবং সময়ের অপচয় কমতে, রান্নাঘরে কাজের সুবিধার্থে রাখা যেতে পারে বেশ কিছু প্রোডাক্ট, যেগুলি আপনার রান্নাঘরকেও করে তুলবে যথেষ্ট আকর্ষণীয়।

এয়ার ফ্রায়ারঃ  তেলে ফ্রাই করা খাবারের থেকে ৮০ শতাংশ কম তেলে এটিতে ফ্রাই করা ছাড়াও খাবারও বানানো যায়। এতে খাবারের স্বাদেও কোনও ঘাটতি হয় না। এয়ার ফ্রায়ারের সাহায্যে শুধুমাত্র তেল ব্রাশ করে পোটাটো চিপ্স, চিকেন, ফিশ ইত্যাদি ফ্রাই করা যেতে পারে।

জুসারঃ  ফলের বা সবজির টাটকা জুস, প্যাকেটের জুস-এর থেকে অনেক বেশি পুষ্টিকর। জুসারের সাহায্যে বাড়িতেই জুস বানিয়ে নিজেকে সারাদিন এনার্জি-তে ভরপুর রাখতে পারেন।

স্মার্ট কুকি আভেনঃ  ১০ মিনিটেরও কম সময়ের মধ্যে ফ্রেশ বেক করতে স্মার্ট কুকি আভেন-এর জুড়ি মেলা ভার।

সোয়ার্মা গ্রিলারঃ  সোয়ার্মা গ্রিলারের সাহায্যে বাড়িতে বসেই বানিয়ে ফেলতে পারেন শাওয়ারমা। এটি যেমন পুষ্টিকর, তেমনই সুস্বাদু একটি পদ। ভালো ভাবে তৈরি সোয়ার্মা প্রোটিন এবং কার্বোহাইড্রেট-এ ভরপুর হয়। এর মধ্যে থাকে স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী ফ্যাট সুতরাং এটি শরীরের কোনও ক্ষতি করে না।

আপনার মোবাইল ফোনের ব্যাপারে আপনি সতর্ক তো?

আধুনিক সময়ে টেকনোলজি যতই উন্নত হচ্ছে, মোবাইল ফোনের অপব্যবহারে বাড়ছে নানা অপরাধমূলক কার্যকলাপ। সাইবার ক্রাইম বা ভাইরাল ক্রাইম থেকে নিজের ফোনটিকে সুরক্ষিত রাখার জন্য, কিছু বাড়তি সতর্কতা মেনে চলুন। এখানে রইল কিছু পরামর্শ।

  • মোবাইল হ্যান্ডসেট-এর ব্লুটুথ সারাক্ষণ অন করে রাখবেন না
  • লাইসেন্স-যুক্ত অ্যান্টি ভাইরাস ভরুন
  • মাঝে মাঝে মোবাইল হ্যান্ডসেট ফরম্যাট করুন
  • আপনার মোবাইল নম্বরটি বদলাবার প্রয়োজন হলে, নতুন নম্বরটি অবশ্যই পরিচিতদের দিয়ে রাখুন। নম্বর পরিবর্তন করছেন, সেটা জানিয়ে দিন। এর কারণ আপনার পুরোনো নম্বরটি কিছু দিন পরে কোম্পানি অন্য কোনও ব্যক্তিকে দিয়ে দিতে পারে
  • অশ্লীল মেসেজ আদানপ্রদান করাটা এখন একটা কমন ব্যাপার। কিন্তু এসব মেসেজ শেয়ার করার ব্যাপারে সাবধান হোন
  • অচেনা সোইল আইডি বা নম্বর থেকে আসা কোনও লিংক-এ আঙুল ছুঁইয়ে প্রতারণার শিকার হবেন না
  • ভাইরাস-এর কারণে ফোনের ডাটাবেস যে-কোনও সময় আপনার হাতছাড়া হতে পারে। তাই খুব জরুরি ইনফর্মেশন-এর ব্যাক আপ অবশ্যই রাখুন। ব্যাংক বা অফিশিয়াল তথ্যের হার্ডকপি রাখা বাঞ্ছনীয়
  • সাইবার ক্রাইম-এর শিকার হলে, সঙ্গে সঙ্গে নেটওয়ার্ক ব্যবহার করছেন যে-কোম্পানির, তাদের এবং পুলিশকে বিষয়টা জানান
  • বারবার মোবাইল ফোনের নম্বর বদলাবেন না
  • সবাইকে নিজের ব্যক্তিগত ফোন নম্বর দেবেন না। কাজের নম্বরটি আলাদা রাখুন
  • মহিলারা বিশেষ করে, নিজের ব্যক্তিগত নম্বর সার্ভিস সেন্টার, বিউটি পার্লার, দুধ বা কাগজ বিক্রেতা, সবজিওযালা প্রভৃতি লোকজনদের সঙ্গে শেয়ার করবেন না
  • অচেনা কোনও লোকের হাতে মোবাইলটি দেবেন না, খুব প্রয়োজনেও না। কারণ তিনি যে কোনও সন্ত্রাসবাদী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত-নন, সে ব্যাপারে আপনি নিশ্চিত নন
  • মোবাইল ফোন-এ সবসময় লক কোড দিয়ে রাখুন, যাতে সেটা বেহাত হলেও কেউ যেন অপব্যবহার না করতে পারে
  • মোবাইল ফোন চুরি হলে, সঙ্গে সঙ্গে সিম কার্ড বন্ধ করান ও নেটওয়ার্ক কোম্পানি এবং পুলিশকে জানান
  • সেকেন্ড হ্যান্ড মোবাইল ফোন কিনলে, বিক্রেতার নাম, ঠিকানা ও রশিদ অবশ্যই নেবেন
  • অচেনা লোকের থেকে কম দামে হলেও মোবাইল ফোন কিনবেন না।

ইমিউনিটি বাড়ানোর উপায়

যাদের ইমিউনিটি শক্তি বেশি, তাদের অসুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা অনেক কম থাকে। বড়ো কোনও অসুখে পড়লেও তাদের সুস্থ হয়ে উঠতে বেশি সময় লাগে না। অবসাদ দূরে রেখে যোগ-ব্যায়াম এবং মেডিটেশনের মাধ্যমে ইমিউনিটি বাড়ানো সম্ভব। এছাড়াও ইমিউনিটি শক্তি বাড়াতে সুষম এবং পুষ্টিকর আহার অত্যন্ত প্রযোজনীয়। বর্তমান পরিস্থিতিতে একমাত্র বাঁচার উপায় হল শরীরের ইমিউনিটি পাওয়ার বাড়িয়ে নিজেকে মজবুত করে তোলা।

ইমিউনিটি বাড়াবার জন্য কী খাবেন?

সবুজ শাকসবজি : পালংশাক, মেথিশাক, সরষেশাক ইত্যাদি সবুজ পাতা-যুক্ত সবজি রাখুন খাদ্য-তালিকায়। এগুলি আয়রন, অ্যান্টি অক্সিড্যান্টস, ফলিক অ্যাসিড, ম্যাগ্নেশিয়াম, কপার, ফসফেট ইত্যাদি তত্ত্বে ভরপুর।

ভিটামিন সি : কমলালেবু, আমলকী, পাতিলেবু, কিউযি, পেয়ারা, ব্রোকোলি, পালংশাক ইত্যাদি ফল ও সবজি ভিটামিন সি-তে ভরপুর। শরীর সুস্থ রাখতে ভিটামিন সি খাওয়া খুবই জরুরি। এগুলো ইমিউনিটি শক্তি বাড়ায় এবং অসুখের সঙ্গে লড়াই করার ক্ষমতা প্রদান করে।

ভিটামিন এ : কমলা বা লাল রঙের ফল আর সবজি যেমন পেঁপে, গাজর, রাঙাআলু, তরমুজ, লাল আঙুর, আম ইত্যাদিতে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন এ থাকে। এটা আমাদের ইমিউনিটি পাওয়ার বাড়াতে সাহায্য করে।

ক্যালসিয়াম : হাড় শক্ত করতেই যে শুধু দরকার ক্যালসিয়ামের এমন নয়, শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতেও সাহায্য করে। দুধ, দই, ঘি, ছানা, চিজ, ছাছ, ভিন্ডি, পালং, ব্রোকোলি, বিনস এবং ফলের মধ্যে কমলালেবু, কিউইয়ি, ব্ল্যাকবেরি, পেঁপে ইত্যাদিতে প্রচুর পরিমাণে ক্যালসিয়াম থাকে।

ফাইবার : ফাইবার-যুক্ত আহার আমাদের হজম প্রক্রিয়া মজবুত করতে সাহায্য করে। ফাইবার-যুক্ত সবজি, ফল, ব্রাউন ব্রেড, ডাল, গমের আটা, ড্রাইফ্রুটস, ওটস, কড়াইশুঁটি, ভুট্টা ইত্যাদি ইমিউনিটি শক্তি বাড়াতে খুবই কার‌্যকরী। এগুলি নানা ভাইরাস ও ব্যাক্টেরিয়ার সংক্রমণ আটকাতে সাহায্য করে মানুষের শরীরে।

তুলসী : তুলসী অ্যান্টিবাযোটিকের কাজ করে। রোগপ্রতিরোধক হিসেবেও কাজ করে, সঙ্গে শরীরের ইমিউনিটি শক্তি বাড়াতেও সাহায্য করে। রোজ সকালে খালি পেটে ৪-৫টি তুলসীর পাতা চিবিয়ে খেতে পারেন। এছাড়াও মধুর সঙ্গে তুলসীপাতা সেবন করলে সর্দি, কাশির হাত থেকে মুক্তি পাওয়া যায়।

হলুদ : মশলার মধ্যে সবথেকে উপকারী বলা হয় হলুদকে। ইমিউনিটি বাড়াবার সঙ্গে সঙ্গে, হলুদ অ্যান্টিবাযোটিক হিসেবেও কাজ করে। এছাড়াও এতে রয়েছে অ্যান্টি ফাংগাল এবং অ্যান্টি ইনফ্লেমেটারি গুণ, যা শরীরকে বিভিন্ন সংক্রমণ থেকে বাঁচাতে সহায়তা করে। খাবার তৈরির সময় হলুদের ব্যবহার করা এবং দুধের মধ্যে হলুদ দিয়ে খাওয়া এই সময় খুবই প্রযোজন।

মাল্টি ভিটামিন ক্যাপসুল : যদি উপরে দেওয়া খাবারগুলি কোনও কারণে খাওয়ার অসুবিধা থাকে, তাহলে মাল্টি ভিটামিন ট্যাবলেট খাওয়া যেতে পারে। ইমিউনিটি বাড়াবার জন্য ক্যালসিয়াম, মাইক্রো নিউট্রিযে্টস যেমন জিংক, কপার, ম্যাঙ্গানিজ এবং ভিটামিন ডি থ্রি বেশি মাত্রায় খাওয়া বাঞ্ছনীয়।

প্রচুর পরিমাণে পানীয় : জল শুধু তেষ্টা মেটায় না, শরীরে ওষুধের মতো কাজ করে। শরীরের বর্জনীয় বিষাক্ত তত্ত্ব বাইরে বার করে দিতেও সাহায্য করে। এতে শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে। সারাদিনে অন্ততপক্ষে তিন লিটার জল খাওয়া অত্যন্ত জরুরি।

রঙিন প্রজাপতি

অনিতার চোখ বেয়ে নেমে এল জলের ধারা। সকালটা এভাবে শুরু হোক একেবারেই সে এটা চায়নি। তবু অনিমেষের কথাগুলো তাকে শুনতে হল।

নিতা, তুমি খুব ভালো করেই জানো কোম্পানিতে আমি একটা বড়ো দায়িত্বে আছি। ছোটো ছোটো কাজের জন্য বসের কাছে সবসময় ছুটির কথা বলাটা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। তোমার সঙ্গে সব জায়গায় যাওয়ার আমার কি খুব দরকার আছে? তুমি তো একলাও যেতে পারো। তোমাকে গাড়ি, ড্রাইভার সবই তো দিয়ে রেখেছি। আর কী চাও আমার থেকে?

কী চাই? তোমার ব্যস্ত শেডিউল থেকে খুব সামান্য একটু সময় এবং মনের কোণায় খুব অল্প একটু জায়গা পেলেই আমি খুশি।

ব্যস, শুরু হয়ে গেল তোমার দর্শনশাস্ত্র! সত্যি নিতা, তুমি একটা কথাকে কোথা থেকে কোথায় নিয়ে যাও।

অনিমেষ, অন্য সকলের জন্য তোমার কাছে অফুরন্ত সময় অথচ আমার বাপের বাড়ি যেতে বললেই তোমার কাছে সময় থাকে না, অনিতার চোখে জল চলে এল।

তুমি কি ভাবছ আমি মিথ্যা বলছি? কোম্পানির দোহাই দিচ্ছি? তোমার বাপের বাড়ির কোন অনুষ্ঠানটায় আমি যাইনি বলতে পারো? আমাকে দোষ দেওয়াটা তোমার স্বভাবে দাঁড়িয়ে গেছে।

অনিতা ঝাঁঝিয়ে ওঠে, তুমি যাওয়াতে আমার মা-বাবা উদ্ধার হয়ে গেছে। তোমার এই অবদান আমি ভুলতে পারি?

অনিতার এই কটাক্ষ অনিমেষকে আরও রাগিয়ে দেয়, তোমার মতো ইডিয়েটের সঙ্গে কথা বলারই কোনও মানে হয় না।

মা-বাবার নিত্যদিনের এই ঝগড়ায় তিন্নিও বিরক্ত হয়ে উঠেছিল। আজ আর ও নিজেকে কিছুতেই সামলাতে পারল না। মায়ের সামনে এসে একটু চেঁচিয়ে বলল, হোয়াট দ্য হেল ইজ দিস মাম্মা? সকাল-সন্ধে কিছুই তোমরা দ্যাখো না। ব্যস ঝগড়া করা চাই-ই?

হ্যাঁ, তুইও আমাকেই দোষ দে। আমি নরম মাটি কিনা! আবার জল গড়িয়ে পড়ে অনিতার চোখ দিয়ে৷

বাবা ততক্ষণে ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিয়েছে। তাই মা-কে সামনে পেয়ে নিজের অসন্তোষ প্রকাশ করতে বাধ্য হয় তিন্নি।

মুড ঠিক করতে রান্নাঘরে ঢুকে তিন্নি নিজের জন্য কফি বানায়। কফির মাগ হাতে নিয়ে নিজের ঘরের জানলার সামনে দাঁড়ায়। সামনেই রাস্তা। রাস্তার দুই ধারে সারিবদ্ধ গাছের মিতালি। রাতে বোধহয় কয়েক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে। গাছের পাতাগুলো থেকে তখনও টুপটাপ জল ঝরে পড়ছে। মাটি ভিজে। রাস্তার গর্তগুলো জলে ভরা। সামনের গাছটায় একটা পাখির বাসা নজরে পড়ে তিন্নির। হয়তো কাক বাসা বেঁধেছে ওখানে। গাছের শাখাপ্রশাখা ভেদ করে মিঠে রোদ্দুর ছড়িয়ে পড়েছে প্রকৃতির কোলে। বড়ো ভালো লাগছিল তিন্নির বাইরের প্রকৃতির রূপ দেখতে। ভুলেই গিয়েছিল ওর মতো, সময় এক জায়গায় আটকে নেই। দেয়ালে ঘড়ির দিকে তাকাল। ৭টা বেজে গেছে। আর দাঁড়ালে চলবে না। কফির মাগ রান্নাঘরে রেখে এসে তাড়াতাড়ি করে স্নান সেরে স্কুলের জন্য তৈরি হয়ে নিল। ব্যাগ গুছিয়ে কাঁধে তুলে নিল। ঘরের বাইরে বেরোতেই বসার ঘরে বাবার সঙ্গে মুখোমুখি হল তিন্নি।

খবরের কাগজ থেকে চোখ তুলে অনিমেষ তাকাল তিন্নির দিকে, ওঃ তুমি রেডি হয়ে গেছ, গুড!

তিন্নি ঠান্ডা স্বরে গুড মর্নিং বলে বেরিয়ে যাচ্ছিল, মা পিছন থেকে ডাক দিল।

কী রে, বেরিয়ে যাচ্ছিস, জলখাবারটা তো খেয়ে যা।

না মাম্মা। তোমার আর বাবার ঝগড়াতেই আমার পেট ভরে গেছে। তাছাড়া আমার স্কুলেরও দেরি হয়ে যাচ্ছে। বাই, বলে তিন্নি বেরিয়ে গেল।

অনিতা তাকিয়ে রইল দরজার দিকে। মেয়ের রাগ হয়েছে বুঝতে পেরে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

রাস্তায় স্কুলের পথে যেতে যেতে তিন্নির বারবার মা-বাবার কথাই মনে হচ্ছিল। ও খুব ভালো করেই জানে, এখন বাড়িতে ওর অনুপস্থিতিতে ওদের মধ্যে আবার তর্কাতর্কি শুরু হয়ে গেছে। এবারের বিষয়টা সকালের ঝগড়াটার জন্য দায়ী কে, সেটা নিয়ে৷ এ বিষযে তিন্নি একেবারে শিয়োর।

সন্ধেবেলায় তিন্নি একটু দেরিতেই বাড়ি ফিরল। বাড়ি যাওয়ার থেকে লাইব্রেরিতে বসে পড়াশোনা করতে তিন্নির বেশি ভালো লাগে। এমনিতেও বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ও খুবই ইন্ট্রোভার্ট হয়ে পড়ছে। একা থাকতেই বেশি পছন্দ করে। খুব সহজে কারও সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে পারে না।

কতবার মাকে বলেছে তিন্নি, আমার কেন কোনও ছোটো ভাই বা বোন নেই? আমার সব বন্ধুদের ভাই-বোন আছে। আর ওরা কত মজা করে। আর, আমাকে দ্যাখো সবসময় একা একা।

আমি তো তোর বেস্ট ফ্রেন্ড, হেসে প্রতিবারই উত্তর দিয়েছে মেয়ে প্রশ্নের। তখনকার মতো চুপ করে থেকেছে তিন্নি। নিজের ভিতরেই শূন্যতা আর চোখের জল লুকোতে ঘরের প্রিয় জানলাটা দিয়ে বাইরে চেয়ে থেকেছে। সময়ের খেয়ালই করেনি।

স্কুল থেকে সন্ধেবেলায় বাড়ি ঢুকতেই মা জিজ্ঞেস করল, কী রে আজ এত দেরি? বাবাও কখন বাড়ি এসে গেছে। ফোন করছিলাম, ধরিসনি কেন? প্রচণ্ড টেনশন হচ্ছিল, বলে অনিতা তিন্নির কাঁধ থেকে স্কুলের ব্যাগটা নিয়ে টেবিলে নামিয়ে রেখে, ওর জন্য জল আনতে রান্নাঘরের দিকে চলে গেল।

অনিমেষ এতক্ষণ চুপ করে ছিল। অনিতাকে রান্নাঘরের দিকে যেতে দেখে মেয়েকে জিজ্ঞেস করল, কী রে উত্তর নেই কেন? দ্যাখ আমার আর তোর মা-র ঝগড়ার জন্য তুই কেন নিজেকে কষ্ট দিচ্ছিস? উঠে এসে মেয়ের মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে বলল, এমন একটা বাড়ি দেখা তিন্নি, যেখানে মা-বাবার মধ্যে ঝগড়া হয় না।

কিন্তু বাবা, তোমার আর মায়েরর ঝগড়া আর সব বাড়ির সাধারণ ঝগড়ার মতো নয়। মাঝে মাঝে তো আমার মনে হয় তোমরা খুব কষ্ট করে এই সম্পর্কটাকে বয়ে বেড়াচ্ছ। সম্পর্কটাই তোমাদের কাছে এখন বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আরও তো সবাই আছে দাদুরা,কাকু-কাকিমা, পিসিরা… কই কাউকে তো তোমাদের মতো ঝগড়া করতে দেখি না।

তিন্নির চোখের দিকে তাকিয়ে অনিমেষ একটা কথাও আর বলতে পারল না।

এর মধ্যে অনিতা এসে তিন্নির হাতে এক গেলাস শরবত ধরিয়ে দিয়ে আবার ভেতরে চলে গেল।

অনিমেষ এবার মুখ খুলল, এমনও তো হতে পারে তিন্নি, তুই আমাদের রিলেশনটা নিয়ে একটু বেশিই সংবেদনশীল হয়ে পড়ছিস।

তিন্নি উত্তরটা এড়িয়ে গেল, আচ্ছা বাবা দাদু-দিদা কি তোমাকে জোর করেছিল মা-কে বিয়ে করার জন্য?

অনিমেষের মনে পড়ে গেল ২০ বছর আগেকার কথা। যৌথ পরিবার ছিল তাদের। দাদু, ঠাকুমা, পিসি, জেঠু, কাকু– সকলকে নিয়ে অনিমেষদের বেশ বড়ো পরিবার। দাদু আর জেঠু দুজনেই গিয়ে অনিতাকে পছন্দ করে এসেছিলেন। বনেদি বাড়ির মেয়ে পড়াশোনা জানা, বাড়ির সকলেরই সম্মতি পেতে দেরি লাগেনি। কিন্তু অনিমেষ প্রথমটায় বিয়ের জন্য পরিষ্কারই না বলে দিয়েছিল। দাদুই বকলমে অনিমেষকে শেষ পর্যন্ত রাজি করিয়ে ছেড়েছিলেন।

আজ এত বছর পর মেয়ের প্রশ্নে সামান্য থতমত খেলেও, অনিমেষ নিজেকে সামলে নিল। সামান্য হেসে উত্তর দিল, না রে মা, এরকম কিছুই ঘটেনি। অনেকগুলো বছর তো পার করলাম। কী বা বয়স ছিল আমাদের, আমার কুড়ি আর তোর মায়ের ঊনিশ।

কিন্তু তুমি যেরকম হাবভাব করো তাতে মনে হয় তুমি ছোটো আর মা তোমার থেকে বড়ো, বলে তিন্নি হেসে ফেলে।

অনিমেষ আলতো করে মেয়ের গালটা টিপে দেয়, হ্যাঁ, তুই তো বলবিই। মায়ের এক নম্বরের চামচা।

সেদিন তিন্নির জন্মদিনের পার্টিতে বাড়ি ভর্তি লোকজন। অনিতা অতিথিদের জন্য প্রচুর রান্নাবান্না করেছিল, আর সবই তিন্নির পছন্দের। বাবাও অফিস থেকে ফেরার সময় বড়ো একটা কেক কিনে এনেছিল তিন্নির নাম লেখা। সারাটা দিন হইহই করে কাটিয়ে বেশ ভালো মুড ছিল তিন্নির। রাতে সব অতিথিরা চলে যেতেই তিন্নি বায়না ধরল, মাম্মা, আজ আমি তোমার আর বাবার কাছে শোব। নিজের ঘর থেকে বালিশ আর চাদর তুলে এনে তিন্নি মায়ের খাটে উঠে এল। আজ সত্যিই মনটা খুব ভালো ছিল। এরকম করেই দিনগুলো কাটুক সেটাই তিন্নি চাইত। এগারো ক্লাসের ছাত্রী তিন্নির সমবয়সিরা যেখানে মোবাইল, বয়ফ্রেন্ড, স্টইলিশ জামাকাপড় নিয়ে বেশি মাথা ঘামাত, সেখানে তিন্নি হেসে খেলে পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর-ই স্বপ্ন দেখত। মনে মনে সবসময় চাইত মা-বাবার মধ্যে ঝগড়া বন্ধ হোক।

অনিমেষ হাতে রিমোট নিয়ে আধশোয়া অবস্থায় টিভিতে নিউজ দেখছিল, তিন্নি এসে ঘরে ঢুকল। মা রান্নাঘরে তিনজনের জন্য কফি বানাতে ব্যস্ত, এমন সময় অনিমেষের মোবাইলটা বেজে উঠল।

অনিমেষ তাকিয়ে দেখল, আমেরিকা থেকে প্রতিমার ফোন। নিশ্চয়ই প্রিয় ভাইজির জন্মদিনে উইশ করতেই ফোন করেছে। ওদের ওখানে এখন সকাল। নিজে না ধরে তিন্নিকেই ফোনটা ধরিয়ে দিল পিসির কলটা রিসিভ করতে।

হ্যালো, পিপি…, তিন্নির গলায় আনন্দ ঝরে পড়ল।

হ্যালো মাই ডার্লিং, মেনি মেনি হ্যাপি রিটার্নস অফ দ্য ডে।

তিন্নি আর অনিমেষের সঙ্গে ভিডিও কলের মাধ্যমে কথা হতে হতেই অনিতা কফি নিয়ে ঘরে ঢুকল। তিন্নি মা-কে ফোনটা ধরিয়ে দিল। অনিতা আর প্রতিমা কিছুক্ষণ কথা বলে ফোন রেখে দিল।

দিদির কানের হিরের দুলটা দেখেছ অনিমেষ? কী সুন্দর! বেস মজাতেই আছে দিদি ওখানে।

দিদি উচ্চশিক্ষিত, আধুনিকা। বড়ো মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে উঁচু পদে রয়েছে। নিজে রোজগার করে আর খরচও সেরকম করে।

প্রতিমার কথা উঠলেই অনিমেষ একটু বেশিই দিদির হয়ে কথা বলে। দিদিকে নিয়ে অনিমেষের গর্বের শেষ নেই।

তুমি আমাকে কথা শোনাচ্ছ অনিমেষ? প্রতিবাদ করে ওঠে অনিতা।

নিতা, এটা কথা শোনানো নয়, যা ফ্যাক্ট তাই বলছি।

কিন্তু তোমার বলাটাই ওইরকম। আমিও তো তিন্নি আর তোমার জন্য চাকরি ছেড়ে দিয়েছি, কেরিয়ার নিয়ে ভাবিনি।

তুমি তোমার চাকরির সঙ্গে দিদির চাকরির তুলনা করছ? দিদি সিইও-র পদে রয়েছে আর তুমি স্কুলে পড়াতে। দুটোর তুলনা কোনওভাবেই করা যায় না।

অনিমেষের ব্যঙ্গ-মাখানো কথাগুলো শুনে অনিতা রাগ সামলাতে পারল না।

তোমার নিজেকে নিয়ে আর দিদিকে নিয়ে খুব গর্ব, তাই না? আমার বাপের বাড়ি কোনও কিছু লুকিয়েচুরিয়ে আমার বিয়ে দেয়নি। ইতিহাস নিয়ে পোস্ট
গ্র্যাজুয়েশন করেছি, বাবা স্পষ্ট তোমাদের জানিয়েছিলেন। আমরা তোমাদের পায়ে পড়িনি বিয়ে দেবার জন্য, বরং তোমার দাদু আর জেঠুই আমাদের বনেদি পরিবার দেখে বিয়ে দেবার জন্য উঠে পড়ে লেগেছিলেন৷তখন তো বুঝিনি এ আসলে ছোটোলোকের পরিবার…! এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে অনিতা হাঁপাতে থাকে।

অনিতা মুখ সামলে কথা বলো নয়তো…

প্রথমবার তিন্নি বাবাকে মায়ের গায়ে হাত তুলতে দেখে স্তম্ভিত হয়ে গেল। এর আগে বাবা কখনও মায়ের গায়ে হাত তোলেনি।

বাবা, তুমি মায়ের গায়ে হাত তুলতে পারো না। তুমিও অদ্ভুত,মা-কে কষ্ট দেওয়াটা কি খুব দরকার ছিল?

তুই এখনও মায়ের হয়েই কথা বলবি?যে আমার পরিবারকে অপমান করে!তোর মা বাংলা মিডিয়ামের মেয়ে৷ ইংলিশে দুটো শব্দও ঠিকমতো বলতে পারে না, অনিমেষের গলার তিক্ততা তিন্নিকে ভিতর থেকে নাড়িয়ে দিয়ে গেল।

তিন্নিও চুপ করে থাকতে পারল না, বাবা, তুমি মায়ের ইংরেজি না বলতে পারাটাকে সবসময় এত কেন গুরুত্ব দাও? মায়ের মধ্যে এমন অনেক গুণ আছে যা, আমার কোনও বন্ধুর মায়ের মধ্যে নেই।

মুহূর্তের মধ্যে তিন্নির সব আনন্দ মাটি হয়ে গেল। জল ভরা চোখে তিন্নি বালিশ, চাদর নিয়ে আবার নিজের ঘরে ফিরে গেল।

অনিমেষ অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি থেকে এমবিএ করেছিল আর অনিতা বর্ধমান ইউনিভার্সিটি থেকে ইতিহাসে এমএ। হয়তো এই শিক্ষাগত যোগ্যতার তফাতই তাদের দুজনের মধ্যে প্রাচীর হয়ে উঠেছিল।

তিন্নি খেয়াল করত, বাবা রেগে গেলে মা-কে অন্য নামে ডাকে। এমনিতে অনিমেষ নিতা বলেই সম্বোধন করত। কিন্তু অতিরিক্ত রেগে গেলে অনিতা-ই মুখ থেকে বেরিয়ে আসে। এছাড়াও ইডিয়েট, গবেট, গাঁইয়া, এগুলোর ব্যবহারও বেড়ে যায়। ছোটোবেলায় বাবার মা-কে ডাকা থেকেই, তিন্নি বুঝে যেত বাবার মুড আজ কীরকম।

মার্চ মাসেই প্রচণ্ড গরম, সকলের জন্য অস্বস্তির কারণ হয়ে উঠছিল। পরীক্ষার টেনশন গরমের অস্বস্তি দ্বিগুন করে তুলেছিল। বারো ক্লাসের বোর্ডের পরীক্ষার জন্য তিন্নি সারা দিনরাত পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত থাকত। সকালে কোচিং ক্লাস শেষ করে, টিউশন নিয়ে বিকেল হয়ে যেত বাড়ি ফিরতে। জলখাবার খেয়ে আবার বই মুখে পড়তে বসা। মা-বাবার সঙ্গেও সময় কাটাতে পারত না তিন্নি।

রবিবার দিন একটু সকাল সকাল ঘুম ভাঙতে তিন্নি উঠে সোজা ডাইনিং হলে চলে এল। লক্ষ্য করল ডাইনিং টেবিলের উপর থার্মোমিটারটা রাখা।

মাম্মা, থার্মোমিটার কীসের জন্য? কার আবার কী হল? চিন্তিত স্বরে মাকে প্রশ্ন করল তিন্নি।

তোর বাবার কাল রাত থেকে প্রচণ্ড জ্বর। সারারাত প্রচণ্ড কাশি। রাত্রে এক ফোঁটাও কেউ আমরা ঘুমোতে পারিনি।

সে-কী এত কাশি কীভাবে বেড়ে গেল? ডাক্তারকাকুকে ফোন করেছ? চলো একবার, আমরাই পাড়ার ডাক্তারখানায় নিয়ে যাই।

তোর বাবা কী বাচ্চা, যে-কোলে করে নিয়ে গেলে তবে যাবে? অনেকবার বলেছি যাওয়ার কথা, কানে তুললে তো, অনিতা মেয়ের কাছে অভিযোগ করে।

মা তুমিও! এই সময় বাবার এত জ্বর আর তুমি… মানছি সারা রাত তোমার টেনশনে কেটেছে। তাও সব কথার একটা সময় থাকে। এখন এসব ছাড়ো, বাবাকে আগে ডাক্তার দেখানো দরকার৷ কথা শেষ করে তিন্নি বাবাকে দেখতে শোবার ঘরে চলে যায়।

তিন্নির অবস্থাটা অনেকটা পেন্ডুলামের মতো। কখনও মাকে সাপোর্ট করতে হয় তো কখনও বাবার হয়ে মায়ের সঙ্গে ঝগড়া করতে হয়। ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে প্রকৃতি বদলালেও, তিন্নির মনে হতো ওর বাড়ির পরিবেশ সেই একই। ঝগড়া আর ডিপ্রেশনে ভরা। ও বেশ বুঝতে পারত ওর জন্যই মা-বাবার সম্পর্কটা আজও জোড়াতালি দিয়ে চলছে।

সেদিন তিন্নির বোর্ডের লাস্ট পেপার। খুব হালকা লাগছিল নিজেকে। প্রায় চার মাস পরে একটু স্বস্তি। রেজাল্ট নিয়ে এতটুকুও টেনশন ছিল না ওর। অনেকদিন পর মা-বাবার সঙ্গে ডিনার টেবিলে মুখোমুখি হল তিন্নি। অনিতাও মেয়ের পছন্দের প্রতিটি রান্না নিজের হাতে করেছিল।

বাবার দিকে তাকাল তিন্নি, বাবা, আমি তোমাদের কিছু বলতে চাই, তিন্নির গম্ভীর মুখ দেখে অনিতা এবং অনিমেষ দুজনেই একটু শঙ্কাবোধ করল।

হ্যাঁ, কী বলবি মা বল, অনিমেষ ধীর কণ্ঠে মেয়েকে জিজ্ঞাসা করে, কিন্তু নিজে কী ভাবছে তা মেয়েকে বুঝতে দেয় না।

তিন্নি নিজেকে কিছুটা গুছিয়ে নেয়। অনেক দিন ধরেই এটা নিয়ে অনেক ভাবনা-চিন্তা করেছে ও। আজ সামনাসামনি বলার সময় হয়েছে। খুব আস্তে গলায় তিন্নি বলল, বাবা, আমি কলকাতার বাইরে গিয়ে পড়াশোনা করতে চাই। হায়ার স্টাডিজ-এর জন্য দিল্লি কিংবা মুম্বই যেতে চাই।

কিন্তু এখানেও তো ভালো ভালো কলেজ আছে। তুই যদি চাস ইঞ্জিনিয়ারিং আর ডাক্তারির পরীক্ষাগুলোতেও বসতে পারিস, অনিমেষ মেয়েকে বোঝাবার চেষ্টা করে।

হ্যাঁ তুমি ঠিকই বলেছ বাবা। কিন্তু দিল্লি, মুম্বইয়ে কলেজগুলোর মান আরও ভালো।

কিন্তু তুই-ই তো বলেছিলি গ্র্যাজুয়েশন এখান থেকে পাশ করে পরে বিদেশে গিয়ে পোস্ট গ্র্যাজুয়েশন করবি। হঠাত্ মাইন্ড চেঞ্জ করার কারণটা জানতে পারি?

অনিমেষের জিজ্ঞাসায় দুশ্চিন্তা স্পষ্ট ভাবে ফুটে উঠল। শত চেষ্টাতেও সে সেটা লুকোতে পারল না।

হঠাত্ সবাই চুপ করে খাওয়ায় মন দিল। সারা ঘরে নিস্তব্ধতা ছেয়ে গেল। তিন্নির মনে হল মা-বাবার ঝগড়ার পরেও, বাড়ি এরকমই নিঃঝুম হয়ে পড়ে, কিন্তু আজ রাতের এই স্তব্ধতা একেবারেই যেন অন্যরকম। শুধু দেয়াল ঘড়ির টিকটিক শব্দটাই কানে আসছিল তিন্নির।

মা-বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে কিছুতেই গলা দিয়ে খাবার নামাতে পারল না তিন্নি। পৃথিবীতে এই দুজন ছাড়া আর কেই বা আছে ওর। টেবিল থেকে উঠে থালা নামিয়ে রাখল। ওয়াশবেসিনে হাত ধোয়ার বাহানায় চোখের জলও মুছে নিল তিন্নি। আয়নায় চোখ রেখে দেখল মা-বাবা ওর দিকেই তাকিয়ে রয়েছে। চোখে গভীর অনুনয়,আকুতি।

আজ বুঝতে পারছি, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পৃথিবী কোথায় এগিয়ে গেছে। এমনকী আমাদের একমাত্র মেয়ে এই স্রোতে গা ভাসানো থেকে নিজেকে বাঁচাতে পারল না, অনিমেষের গলা ধরে এল।

অনিমেষ, এই সবই হয়েছে মেয়েকে অতিরিক্ত মাথায় তোলার জন্য। আরও ওর সঙ্গে বসে তোমার হস্টেল লাইফের গল্প শেয়ার করো। তুমি তো এটাই চেয়েছিলে, তোমার মেয়ে তোমার মতো স্মার্ট হোক। ভালোই হল তিন্নি সময়ের সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে নিজের স্বাধীনতাকেই গুরুত্ব দিল, আমাদের কথা একবার ভেবেও দেখল না, অনিতা নিজেকে আর সামলাতে পারল না। চোখের জল গড়িয়ে পড়ল তার দুই গাল বেয়ে৷

অনিতা আর অনিমেষের কিছু কথা তিন্নি-রও কানে ঢুকেছিল। অনিতার দুটো চোখ ফুলে উঠেছিল কাঁদতে কাঁদতে। কিন্তু কিছুই করার ছিল না ওদের। তিন্নির পুরো ভবিষ্যত্ এটার উপরেই নির্ভর করছিল।

তিন্নি সেদিন বেরিয়েছিল বাড়ি থেকে ক্লাস টেন আর টুয়েলভ-এর রেজাল্ট, মার্কশিট সব ফটোকপি করার জন্য। দোকানে গিয়ে খেয়াল করল ক্লাস টেনের মার্কশিট-টা আনা হয়নি। সঙ্গে সঙ্গে বাড়িতে ফোন করতেই অনিতা ফোন ধরল, মা, আমার আলমারির থার্ড তাকে দ্যাখো একটা ব্রাউন রঙের ফাইল রয়েছে। ওটাতে আমার ক্লাস টেনের মার্কশিট-টা রাখা আছে। ওটার ছবি তুলে এক্ষুনি পাঠাও।

ছবি তুলে মেয়েকে পাঠিয়ে দিয়ে অনিতা খেয়াল করল, সযত্নে একটি গোলাপি রঙের ডায়ারি রাখা আছে কাগজপত্রের সঙ্গে। হাতে নিয়ে পাতা ওলটাতেই তিন্নির মুক্তোর মতো হাতের লেখা তার দৃষ্টি আকর্ষণ করল।

অনেক চেষ্টা করলাম সুন্দর স্বপ্নটাকে বাস্তব রূপ দিতে কিন্তু মুহূর্তের মধ্যেই স্বপ্নটা ভেঙে চুরমার হয়ে চোখের সামনে গুঁড়িয়ে গেল হয়তো আমি এখান থেকে চলে গেলেই মাবাবার একাকিত্বই ওদের দুজনকে একে অপরের কাছে নিয়ে আসবে শত কষ্ট হলেও আমি এই ডিসিশন নিতে বাধ্য হয়েছি আমি জানি মাবাবা কষ্ট পাবে, তবুও আমাকে শক্ত থাকতেই হবে এছাড়া আমার কাছে আর অন্য কোনও রাস্তা খোলা নেই

লেখার শেষে তিন্নি নিজের নাম লিখে রেখেছে আর তারিখটা হল ১৫ জুন অর্থাত্ তিন্নির জন্মদিনের তারিখ।

সঙ্গে সঙ্গে অনিতার মনে পড়ে গেল সে রাতের কথা। সত্যি নিজেকে বড়ো নির্দয় মনে হল অনিতার। মা হয়ে সন্তানের কষ্টটা বুঝল না সে। নিজের ইগো-র জন্য স্বামীর সঙ্গে সবসময় তর্ক চালিয়ে গেছে অথচ একবারও ভাবেনি মেয়ের উপর এর কী এফেক্ট হচ্ছে।

অন্য আর একটি পাতায় তার নজর আটকাল। সেখানে তিন্নি লিখেছে, আজ কাঁদতে কাঁদতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছি জানি না। ঘুমোবার আগে টয়লেট যেতেও ভুলে গিয়েছিলাম। সকালে ঘুম ভাঙতে দেখি বিছানা ভিজে। এবার মা-কে কী উত্তর দেবো?

পড়ে অনিতা অবাক হয়ে গেল। তিন্নির কষ্ট, চোখের জল ডায়ারির প্রত্যেকটা পাতায় ফুটে উঠেছে। যে-বয়সে মেয়েদের রোমান্টিক কবিতা, নভেল ইত্যাদি পড়ার কথা, সেই বয়সে তিন্নির প্রতিটা লেখায় গভীর দুঃখ। আজ যদি ডায়ারিটা তার হাতে না পড়ত, তাহলে কোনও দিন অনিতা জানতেও পারত না, মেয়ে বাইরে ভিন্ন শহরে পড়তে যাওয়ার আসল কারণটা।

অনিতা তিন্নির জিনিস আলমারিতে তুলে রেখে সঙ্গে সঙ্গে অনিমেষকে ফোন করে, শুনছ, আজ একটু তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরো। তিন্নি ফিরবে পাঁচটা নাগাদ, তুমি তার আগে এসে যেও। দরকারি কথা আছে, বলে ফোন কেটে দেয়।

চারটের আগেই অনিমেষ ফিরে এল। কেন এত জরুরি তলব? অনিতার মুখোমুখি হতেই অনিমেষ বলল, আমি জানি অনিতা, তুমি নতুন একটা ফ্রিজ কিনতে চাও। কিন্তু এই মুহূর্তে, সবথেকে জরুরি হল তিন্নির কলেজে অ্যাডমিশন।

ফ্রিজ পরে হবে, চলো ধীরে সুস্থে বসে কথা বলি। আমিও তিন্নিকে নিয়েই কিছু বলতে চাই, ধীর কণ্ঠে অনিতা বলে।

অনিমেষ একটু অবাক হয়। জীবনে এই প্রথমবার অনিতার সঙ্গে তার মতের মিল হল। অনিমেষ এসে চেয়ারে বসতেই, অনিতা তিন্নির ডায়ারিটা অনিমেষের হাতে দেয়। দ্যাখো পড়ে, এটা তিন্নির ডায়ারি।

অনিমেষ একটার পর একটা পাতা ওলটাতে শুরু করে। তিন্নির মনটা খোলা পাতা হয়ে অনিমেষের চোখের সামনে উঠে আসে। কবে মেয়ে এত বড়ো হয়ে গেল! অনিমেষ ভাবতে থাকে। তার মুখের ভাব পরিবর্তন অনিতারও চোখ এড়াল না।

আমরা তিন্নি সম্পর্কে কতটা ভুল ভাবছিলাম। এরকম দুঃখ নিয়ে আমরা কখনওই ওকে বাইরে যেতে দিতে পারব না। অনিমেষ নিজের মোবাইল বার করে তিন্নিকে মেসেজ পাঠায়, তাড়াতাড়ি বাড়ি ফেরার জন্য।

কী ব্যাপার বাবা, তুমি আজ এত তাড়িাতাড়ি বাড়ি ফিরে এলে। আমাকেও দেখলাম মেসেজ করেছ, তিন্নি উত্তেজিত স্বরে বলে বাড়ি ঢুকতে ঢুকতে।

হ্যাঁ রে, দ্যাখ এই কবিতাটা তোকে নিয়ে লিখেছি। নাম দিয়েছি রঙিন প্রজাপতি। কেমন হয়েছে একটু দেখ তো। তোর মা-তো বলল, আমার লেখার হাত বেশ ভালোই।

তুমি আবার কবে থেকে কবিতা লেখা শুরু করলে বাবা? আগে কখনও তো তোমাকে কবিতার বইও খুলে পড়তে দেখিনি, লেখা তো অনেক দূরের ব্যাপার। হাসতে হাসতে বাবাকে জড়িয়ে ধরে তিন্নি। অনিতাও পিছন থেকে এসে মেয়েকে জড়িয়ে ধরে। তিন্নি উই আর ভেরি সরি,আজ আমাদের কারণেই তুই বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিস৷ কথাটা বলতে গিয়ে অনিতার গলা ধরে আসে।

তিন্নি এক মুহূর্ত চুপ করে থাকে৷ তারপর চোখে দুষটুমির হাসি নিয়ে বলে,এ মা না না, ক্ষমা তো আমার চাওয়া উচিত। আমিই বোকা বানিয়েছি তোমাদের।

তার মানে? অনিতা আর অনিমেষ একসঙ্গে বলে ওঠে।

মানে সোজা রাস্তায় কাজ না হলে, বাঁকা রাস্তা ধরতে বাধ্য হতে হয়। এত সহজে তোমরা আমার থেকে মুক্তি পাচ্ছ না। হ্যাঁ একটাই আফশোস যে, আমার পার্সোনাল ডায়ারি তোমাদের সঙ্গে শেয়ার করতে হল। তবে কিছু পেতে গেলে হারাতেও তো হয় কিছু, তাই না মা?

ওঃ! তাহলে তোর বাইরে গিয়ে পড়ার ব্যাপারটা পুরোটাই নাটক ছিল? অনিমেষ জিজ্ঞাসা করে।

সরি বাবা, তোমাকে আর মা-কে কাছাকাছি আনার জন্য এই একটাই রাস্তা আছে বলে আামার মনে হয়েছিল, নিজের কান ধরে বলে তিন্নি।

অনিমেষ বোধহয় এই প্রথমবার নিজের ভুল বুঝতে পারেন৷ বলেন, না-রে মা, দোষ তোর নয়। আমরাই অন্যায় করেছি, তাই কান আমাদেরই ধরা উচিত, অনিমেষ হেসে বলে।

চলো তাহলে এই ঐতিহাসিক মুহূর্তের স্মৃতি ক্যামেরাবন্দি করা যাক, বলে তিন্নি নিজের মোবাইলে মা-বাবার সঙ্গে সেলফি তুলতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। আজ এই ছবিটা সে বন্ধুদের সঙ্গে ইনস্টাগ্রাম-এ শেয়ার করবে আর ক্যাপশন দেবে ‘রঙিন প্রজাপতি’।

গুণে ভরা পনির

কেউ কেউ দুধ বা দই একেবারেই খাওয়া পছন্দ করেন না। কিন্তু শরীরকে নানা রোগ অসুখ থেকে সুরক্ষা দিতে দুগ্ধজাত খাবার খাওয়া খুবই দরকার। দুধ বা দই না খেলেও, চেষ্টা করুন পনির দিয়ে শরীরের এই চাহিদা পূরণ করতে৷ রোজ ডায়েটে রাখতে পারেন পনির মাখনি, মটর পনির, শাহি পনির অথবা পালক পনিরের মতো  কোনও একটি পদ৷

পনিরে রয়েছে কম করে ১৮.৩ গ্রাম প্রোটিন, ২০.৮ উপকারি ফ্যাট, ২.৬ গ্রাম মিনারেল, ১.২ গ্রাম কার্বোহাইড্রেট, ২৬৫ কেসিএল এনার্জি, ২০৮ এমজিএস ক্যালসিয়াম, ১৩৮ এমজি ফসফরাস এবং আরও বহু উপাদান৷ প্রসঙ্গত, এই সবকটি উপাদানই নানাভাবে শরীরের উপকারে লেগে থাকে। বিশেষত একাধিক রোগকে দূরে রাখতে পনিরের কোনও বিকল্প হয় না বললেই চলে।

  নিয়মিত পনির খেলে যা যা উপকার পাবেন

  • এনার্জির ঘাটতি দূর হবে
  • আর্থ্রাইটিসের মতো রোগের কষ্ট কমবে
  • হজম ক্ষমতার উন্নতি হবে
  • হার্টের স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটবে
  • ফলেটের ঘাটতি মিটবে
  • হাড় শক্তপোক্ত হবে
  • মস্তিষ্কের ক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে
  • প্রোটিনের চাহিদা পূরণ হবে
  • ক্যান্সারের মতো রোগকে দূরে থাকবে
  • ওজন নিয়ন্ত্রণে আসবে
  • ডায়াবেটিসের মতো রোগ দূরে থাকবে
  • দাঁত শক্তপোক্ত হয়ে উঠবে

আপনার স্বাদবদলের জন্য আমরা দিচ্ছি একটি পনিরের রেসিপি,এটি যেমন সুস্বাদু, তেমনি হেলদি৷ ট্রাই করে দেখতে পারেন৷

 টেস্টি পনির

উপকরণ – ৫০০ গ্রাম পনির, ১/৪   কাপ দই, ১/২  কাপ টম্যাটো পিউরি, ৩/৪  ছোটো চামচ নুন, ১/৪  ছোটো চামচ লংকাগুঁড়ো, ১/৪  ছোটো চামচ রসুনবাটা, ১/২  ছোটো চামচ অলিভ অয়েল।

প্রণালী – দই, টম্যাটো পিউরি, নুন, লংকাগুঁড়ো, রসুন আর তেল একসঙ্গে মিশিয়ে নিন৷ পনিরগুলি চৌকো টুকরোয় কেটে নিন। টুকরোগুলির উপর দই ছড়িয়ে হালকা হাতে মাখিয়ে নিন। ৩-৪ ঘণ্টা ঢেকে রাখুন। গ্রিল গরম করে নিন। জালের উপর মাখন মাখান। পনিরের টুকরোগুলো এর উপর রেখে অল্প অলিভ অয়েল ছড়িয়ে দিন। সস, চাটনি ডিপ, স্যালাড সহযোগে পরিবেশন করুন৷

মানসিক ভাবে সুস্থ থাকতে

সারা পৃথিবীতে যেখানে কোভিড ১৯-এর দাপট অব্যাহত, বহু মানুষের রুজি-রোজগারের পথ বন্ধ সেই অবস্থায় সবথেকে বেশি দরকার নিজেদের মেন্টাল ও ইমোশনাল হেল্থ সুস্থ রাখা। এর জন্য নিজের জীবনশৈলীতে সামান্য কিছু হেরফের করলেই সুফল পাবেন।

শরীর ও স্বাস্থ্যের বিশেষ খেয়াল রাখুন। ব্যালেন্সড খাবার খান, এক্সারসাইজ করুন, বিশ্রাম নিন। ভিটামিন বি-১২, ওমেগা ও ফ্যাটি অ্যাসিড সমৃদ্ধ টাটকা খাবার খান।পর্যাপ্ত ঘুমোন নয়তো ক্লান্ত এবং স্ট্রেস্ড বোধ করবেন।

  • ফ্রেশ বাতাস এবং সূর্যের আলো শরীরে লাগান। সূর্যের রশ্মি সেরোটোনিন-এর মাত্রা বাড়ায়। এই রাসায়নিক পদার্থটি মস্তিষ্কে মুড নিয়ন্ত্রণ করে
  • নিজের প্রতি যত্নশীল হোন
  • যার সান্নিধ্য ভালো লাগে, তার সঙ্গে বেশি করে সময় কাটান
  • কোনও হবি অথবা নতুন অ্যাক্টিভিটি নিয়ে ব্যস্ত থাকার চেষ্টা করুন। এতে আত্মবিশ্বাস ও মনোযোগ, দুই-ই বাড়বে। নতুন কিছু শিখছেন ভেবে নিজেরই ভালো লাগবে
  • স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট করা প্রযোজন। স্ট্রেসফুল সিচুয়েশন অ্যাভয়েড করতে পারেন একটু চেষ্টা করলেই। আপনাকে পার্থক্যটা বুঝতে হবে কখন আপনি এই ধরনের পরিস্থিতি অ্যাভয়েড করতে পারবেন, আর কখন পারবেন না। স্ট্রেস কমাতে বন্ধুর সঙ্গে কথা বলুন, বাইরে হাঁটতে যান, নিজের উপর বিশ্বাস রাখুন, যে-কোনও পরিস্থিতিতে বারবার বিশ্লেষণ করুন, মেডিটেশন করুন, গান শুনুন, এক্সারসাইজ করুন
  • নিজের ক্ষমতা, দুর্বলতা এবং সীমা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল হন
  • কৃতজ্ঞতা স্বীকার করতে শিখুন। আপনি কী, আপনার কাছে কী রয়েছে সেটাতে সন্তুষ্ট থাকুন, কৃতজ্ঞ থাকুন। কী নেই তার জন্যে হা-পিত্যেশ করবেন না
  • মনে যা ভাবছেন সেটা অপরকে বলুন। সেটার খারাপ প্রভাব পড়বে ভেবে চুপ করে থাকবেন না। ইমোশন, এক্সপ্রেস করাও দরকার
  • নিজে আবেগ কন্ট্রোল করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেললে কোনও মনোবিদের সাহায্য নিন।

 

ইউরিক অ্যাসিডের সমস্যা থেকে বাঁচুন

বেশি মাত্রায় পুষ্টিকর খাবার খেলেই শরীর সুস্থ রাখা যায় না। অবিলম্বে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি মাত্রায় পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ খাবার  খাওয়া বন্ধ করুন। অতিরিক্ত পুষ্টি শরীর সঞ্চয় করে রাখতে পারে না। সে ক্ষেত্রে, এই পুষ্টিগুলো এক হয় মেদে পরিণত হয়, অন্যথায় শরীর থেকে বিভিন্ন উপায়ে বেরিয়ে যায়।ইউরিক অ্যাসিড বাড়লে দেখা দিতে পারে নানান শারীরিক সমস্যা। তাই জেনে নিন কেন বাড়ে ইউরিক অ্যাসিড এবং কীভাবে বাঁচবেন ইউরিক অ্যাসিডের সমস্যা থেকে।

ইউরিক অ্যাসিড বেড়ে যাওয়ার কারণ

  • প্রোটিনযুক্ত খাবারে পিউরিন থাকার কারণে ইউরিক অ্যাসিড তৈরি হয় শরীরে। তাই, কেউ যদি নিয়মিত মাংস, বাঁধাকপি, কড়াইশুঁটি প্রভৃতি বেশি পরিমাণে খান, তাহলে তার ইউরিক অ্যাসিড বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল
  • দীর্ঘ সময় পেট খালি থাকলেও ইউরিক অ্যাসিড বেড়ে যেতে পারে শরীরে
  • যারা ডায়াবেটিস-এ ভুগছেন তাদের শরীরেও বেড়ে যেতে পারে ইউরিক অ্যাসিডের মাত্রা
  • মূত্রের মাধ্যমে শরীর থেকে ইউরিক অ্যাসিড বের করতে সাহায্য করে কিডনি। তাই, কিডনি যদি ত্রুটিযুক্ত হয়, তাহলে শরীরে ইউরিক অ্যাসিড সমস্যা তৈরি করতে পারে
  • জেনেটিক কারণেও শরীরে বেড়ে যেতে পারে ইউরিক অ্যাসিডের পরিমাণ
  • স্থূলতার কারণেও ইউরিক অ্যাসিড বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে শরীরে।

আয়ত্তে রাখার কৌশল

আপনার খাদ্য-তালিকায় পেঁয়াজ রাখুন। কারণ পেঁয়াজে থাকা অ্যান্টি অক্সিড্যান্টস উপাদান পরিপাকে সাহায্য করে এবং শরীরে ইউরিক অ্যাসিডের মাত্রা আয়ত্তে রাখে। এছাড়া, প্রোটিন-যুক্ত খাবার খাওয়া কমিয়ে বেশি খান ফাইবার-যুক্ত খাবার। প্রতিদিন তিন থেকে চার লিটার জল পান করুন। বন্ধ করুন ধূমপান এবং মদ্যপান। আর, শরীরচর্চা করুন নিয়মিত।

ইউরিক অ্যাসিড কমাতে সাহায্য করে ভিটামিন ই । মেটে, মুরগির মাংস, বাদাম, আপেল, বিট, রাঙালু ও ব্রকোলিতে ভিটামিন-ই পাওয়া যায়।

ভিটামিন সি-ও একই কাজ করে থাকে। পেয়ারা, কমলা লেবু, বেল পেপার, পাতিলেবুতে ভিটামিন সি থাকে। ম্যাগনেসিয়ামও গাউট সমস্যা মুক্তির জন্য খুব উপকারী।

 

নতুন রাস্তা

অনেকদিন পরে সেদিন বাজারে হঠাৎই রেণুর সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। দুহাতে দুটো ভারী থলে। খুবই বিধবস্ত মুখচোখ। বাজার করার পরিশ্রম আর অফিসে যাওয়ার তাড়া– এই দুটো মিলেজুলেই নিশ্চয় মুখে অমন ঘর্মাক্ত ও পর্যুদস্ত ছাপটা পড়েছে।

রেণু আমাদেরই প্রতিবেশী। একই পাড়ায় আমাদের দীর্ঘকালের বসবাস। আমাদের উত্তর কলকাতার এই পাড়াগুলোয় পারস্পরিক সম্পর্কগুলো এখনও যান্ত্রিক হয়ে পড়েনি। দেখা হলে কেবল সৌজন্যের হাসি হেসে আমরা সরে পড়ি না, বরং দু-দণ্ড দাঁড়িয়ে কথা বলে মনের ভার হালকা করি।

রেণুর সঙ্গে আমার চেনাজানা, এ পাড়ার বিয়ে হয়ে আসার পর থেকেই। আমরা প্রায় সমবয়সি। তবে আমারও বছর দুই আগে ওর বিয়ে হয়। মফস্সলের মেয়ে। আমার মতোই। তবে খাস কলকাতায় এসেও দিব্যি মানিয়েগুছিয়ে নিয়েছে। মনে আছে, আমার বিয়ের সময় স্বেচ্ছাসেবা দেওয়ার জন্য পাড়ার যে ব্যাটেলিয়ান তৈরি ছিল, তার পুরোভাগে ছিল রেণু। হালকা পাখির মতো পায়ে কতবার তাকে একতলা-দোতলা করতে দেখেছি। খলবল করে গোটা অনুষ্ঠানবাড়িটা যেন মাতিয়ে রেখেছিল।

অতএব, প্রাণোচ্ছ্বল রেণুকে যথেষ্ট বিষণ্ণ দেখে আমি কৌতূহল চাপতে পারলাম না। জিজ্ঞেস করলাম, ‘কী হয়েছে গো?’

আমার প্রশ্নটাও শেষ হতে পায়নি, রেণু যেন উছলে পড়ল, ‘আর বোলো না কল্পনা। আমি খুব ঝামেলার মধ্যে আছি।’

‘কী ঝামেলা?’ আমি এবার সত্যি অবাক হই।

‘কী ঝামেলা, কী বলব! আমার শাশুড়ি একেবারে নাকে দড়ি দিয়ে ঘোরাচ্ছেন ভাই। হাড়মাস কয়লা হয়ে গেল। এখন অফিস করব, নাকি এইসব ঝামেলা সামলাব, তাই বুঝতে পারছি না!’

রেণুর শাশুড়ির ছবিটা তক্ষুণি চোখের সামনে ভেসে উঠল। ভদ্রমহিলা বিধবা। কিন্তু ষাটের কোঠা পেরিয়ে গিয়েও বেশ সুস্থ, সুঠাম। আর ভদ্রমহিলার ব্যাপারে সেটাই প্রথমে নজর কাড়ে।

বছরপাঁচেক আগে রেণুর স্বামী রজতদা হঠাৎ-ই তার মাকে বর্ধমানে দেশের বাড়ি থেকে শহরে নিয়ে আসেন। তখন একসঙ্গে অনেকগুলো ঘটনা ঘটেছিল আসলে। তার কিছুদিন আগেই রজতদার পিতৃবিয়োগ হয়েছে। ফলে দেশের বাড়িতে তার মা একেবারেই একা হয়ে পড়েছেন। আবার এদিকেও দুই ছেলে সামান্য বড়ো হয়ে যেতে রেণু চাকরি করার তাল ঠুকছে। অর্থাৎ উভয়েরই তখন পরস্পরকে প্রয়োজন।

সেই থেকে রজতদার মা এই পাড়ার স্থায়ী বাসিন্দা হয়ে গেলেন। বর্ধমানে সকলে ওকে বড়োমা বলে ডাকত। আগেকার যৌথ পরিবারে এ ধরনের প্রথা ছিল। পাড়াতেও সেই নামটাই স্থায়ী হয়ে গেল। অন্তত দুটো ভিন্ন প্রজন্ম এখন রজতদার মাকে ওই নামেই ডাকে।

আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘বড়ো-মার কথা বলছ? বড়ো-মা কী করেছে?’

‘সেসব নিজের চোখে না দেখলে তুমি বিশ্বাস করবে না কল্পনা,’ রেণু বলল, ‘বরং নিজেই এসে একদিন দেখে যাও। সমীরদাকেও সঙ্গে এনো। আমি চলি, আমার আবার ওদিকে অফিসের দেরি হয়ে যাচ্ছে। সব দিকেই তো বিপদ–!’

নিজের মনে গজগজ করতে করতে লম্বা পা ফেলে বাজারের বাইরে চলে গেল রেণু। আমি ওর থলে হাতে কিঞ্চিৎ ঝুঁকে পড়া শরীরের চলে যাওয়ার দিকে চেয়ে রইলাম।

সংসার থাকলে তার নিজস্ব এক ব্যস্ততা থাকবেই। সেই জীবনে আমিও ব্যস্ত। ব্যস্ততা শুরু হয় ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই। মাথার পাশের বেডসাইড টেবিলের উপর মোবাইল ফোনে অ্যালার্ম দেওয়া থাকে। কেবল আমারটাতেই নয়, সমীরেরটাতেও। পাছে একবারের অ্যালার্মে পাকা ঘুম না ভাঙে, তাই এই ব্যবস্থা।

অ্যালার্ম বেজে উঠলে আমিও ধড়ফড় করে উঠে বসি। সমীর অবশ্য তারপরও আধঘণ্টা বিছানা ছাড়ে না। ওর চাই জ্যান্ত এবং প্রহারকারী অ্যালার্ম। অর্থাৎ আমি। কিচেনে সকালের ভাতটা চাপিয়ে, আঁচলে মুখের ঘাম মুছতে মুছতে আমি যতক্ষণ না মশারি তুলে গলা ঝাঁঝিয়ে দুহাতে ঠেলা দিয়ে তাকে জাগাব, ততক্ষণ ওঠার নামও নেবে না সে। আমাদের ছেলেকে তামিলনাড়ুর এক আবাসিক স্কুলে দিয়েছি। ফলে কাউকে স্কুলের বাসে উঠিয়ে দেওয়ার ঝঞ্ছাট থেকে আমরা মুক্ত। কিন্তু দুজনেই অফিস যাই। ফলে সেজন্য প্রস্তুতিও নিতে সময় লাগে। শুধু সকালের খাবার তৈরি করলেই তো কাজ ফুরিয়ে যায় না। দুজনের লাঞ্চ তৈরি করে টিফিন বক্সে ভরার ব্যাপার আছে। তারই মধ্যে সবজিওলা এসে দরজায় হাঁকডাক করবে। ছুটির দিন ছাড়া বাজারে যাওয়া হয় না, ফলে এরাই ভরসা। প্রায় একই সময়ে চলে আসবে টুনির মা। সে প্রায় দশহাতে গোটা বাড়িতে দাপিয়ে বেড়ায় পরবর্তী পৌনে একঘণ্টা। একটা সাইক্লোন যেন ফোঁসফোঁস করে তোলপাড় তুলে দরজা খুলে অন্য কোনও বাড়ির দিকে উড়ে যায়। সকালটা যেন অগ্নিগর্ভ হয়ে থাকে।

এতকিছু সামলে বড়ো-মার কথাটা মন থেকে বেমালুম যেন উবে গেছিল। কোনও কোনও ছুটির দিনে বা সন্ধের অবসরে, টেলিভিশনে কোনও একঘেয়ে অনুষ্ঠান দেখতে দেখতে হঠাৎ করে মনে পড়ে গেলেও শরীর জোড়া ক্লান্তি দূরতিক্রম্য হয়ে দাঁড়াত।

রেণুদের বাড়ি আমাদের গলিটার ঠিক মুখে। খুব বেশি হলে হেঁটে আমাদের বাড়ি থেকে দু-মিনিটের রাস্তা। তবু আলস্য যেন দু-পা চেপে ধরত, অফিস থেকে বাড়ি ফেরার পর। রেণুকেও তারপর অনেকদিন বাজারে দেখিনি। আগে মাঝেমধ্যে সকালে অফিসযাত্রীদের বাসে ওকে দেখতে পেতাম। এখন বোধহয় রেণু অন্য কোনও ব্রাঞ্চে ট্রান্সফার হয়ে গেছে। কাজেই রুট বদল হয়ে গেছে তার।

পাকেচক্রে রেণুর কথাগুলো আমি হয়তো ভুলেই যেতাম। কিন্তু এক সন্ধ্যাবেলার একটা ঘটনা আমাকে আবার রেণু ও বড়ো-মার প্রসঙ্গ মনে পড়িয়ে দিল।

আমাদের বাড়ির কাছেই থাকে সোহিনীরা। পাশের পাড়ার মেয়ে। বিয়ে হয়ে আমাদের পাড়ার বাসিন্দা হয়। ছোটো ছোটো দুটি বাচ্চা আছে। ইংরেজিতে এমএ করার পর বাড়িতেই কিছু ছাত্রছাত্রীকে টিউশন দিত। কিন্তু দেখা হলেই বলত, ‘আমার চাকরি করার কী ভীষণ ইচ্ছা, জানো কল্পনাদি! কত অফার পাচ্ছি, ভাবতে পারবে না। কিন্তু নিতে সাহস হচ্ছে না। বাচ্চাদুটো তো ছোটো! কী করি বলো তো?’

ওর আগ্রহ আর হতাশার কথা শুনে চুপ করে থাকা ছাড়া আমার আর কিছু করার থাকত না। মেয়েদের জীবনটাই যে একছাঁচে গড়া। যেখানে আমার জীবন, সোহিনীর জীবন, আর-একটা মেয়ের জীবন মিলেমিশে একাকার।

শেষে সোহিনী নিজেই বলত, ‘ভাবছি কত তাড়াতাড়ি ছেলেদুটো একটু বড়ো হয়ে যাবে। কষ্ট করে লেখাপড়া শিখলাম, সে কি শুধু

সংসারের হেঁসেল ঠেলা আর বাচ্চাদের মানুষ করার জন্য? তুমিই বলো কল্পনাদি!’

আমি ম্লান হেসে ওকে স্ত্বান্না দিতাম, ‘সব ঠিক হয়ে যাবে, দেখিস!’

তারপর অনেকদিন কেটে গেছে। বাচ্চাদুটি এতদিনে নিশ্চয় একটু বড়ো হয়েছে। যদিও এখনও স্কুলে যাওয়ার বয়স হয়নি ওদের। এইসময় হঠাৎ একদিন দুপুরে সোহিনী আমাদের বাড়িতে এল।

বেশ খুশি-খুশি দেখাচ্ছে ওকে। হাতের বড়ো ঝোলায় একটা কিছু আছে বলে মনে হচ্ছে। সম্ভবত কোনও বাক্স। আমাকে ধরে, ‘কল্পনাদি, ও কল্পনাদি, সুখবর আছে’ বলে একপাক নেচে নিল সোহিনী। তারপর ঝোলা থেকে বেশ বড়োসড়ো একটা মিষ্টির প্যাকেট বের করে ঢাকনা খুলে আমার সামনে ধরে বলল, ‘নাও মিষ্টি খাও–!’

আমি নিচ্ছি না দেখে ও ফের বলল, ‘কী হল কী, নাও–!

ইতস্তত করে একটা হাতে নিই, কিন্তু আমার ভুরুর ভাঁজ মেলায় না। চোখ সরু করে জিজ্ঞেস করি, ‘ব্যাপারটা কী’ আমায় খুলে বল তো! তোরা কত্তা-গিন্নিতে মিলে আবার কোনও তৃতীয় জনকে পৃথিবীতে আনার মতলব কষেছিস নাকি? পরিবার পরিকল্পনার এ যুগেও? তোদের তো সাহস খুব!’

সেইসঙ্গে আমার মেয়েলি সন্ধানী চোখ সোহিনীর শরীরে হেঁটে বেড়ায়। এখনও গর্ভধারণের কোনও চিহ্ন ওর শরীরে দৃশ্যমান নয়।

ডাইনিং টেবিলের উপর মিষ্টির প্যাকেটটা সযত্নে রেখে দিয়ে সোহিনী ঘুরে দাঁড়াল। তারপর বিচিত্র এক মুখভঙ্গি করে বলল, ‘দেখেছ? এই হচ্ছে তোমাদের মতো নিপাট হাউসওয়াইফের দোষ। ওইটা ছাড়া আর অন্য কিছু ভাবতে পারো না। হরাইজনটা আসলে ছোটো হয়ে আসে।’

বিরক্ত মুখে বললাম, ‘যা, যা, মেলা বকিসনি। কী খবর, সেটাই খোলসা করে বল ঢং না করে–!’

আমার দু-কাঁধে চাপ দিয়ে সোফায় বসিয়ে সোহিনী আদুরে গলায় বলল, ‘বলছি, বলছি দাঁড়াও।’

তারপর আমার পাশে বসে পড়ে বলল, ‘তুমি তো জানো, আমার একটাই স্বপ্ন ছিল। চাকরি করব।’

‘ও, চাকরি পেয়েছিস বুঝি?’

‘আলবত। হেঁজিপেঁজি চাকরি নয় গো। মালটিন্যাশনাল কোম্পানিতে চাকরি। ভালো মাইনে দেবে। এবার আমিও সকালবেলা নাকেমুখে কোনওরকমে গুঁজে বড়োরাস্তার দিকে ছুটব। ঠিক নটায় বাসস্ট্যান্ডে কোম্পানির বাস এসে দাঁড়াবে। এসি বাস। আমায় তুলে নিয়ে হুস করে…!’

হাতের মুদ্রায় সোহিনী ‘হুস’ করে চলে যাওয়াটা কেমন, সেটা দেখায়। নতুন প্রাণস্ফূর্তিতে ও যেন মত্ত হয়ে আছে। দু-চোখ জুড়ে স্বপ্নপূরণের আনন্দ ঝিলিক দিচ্ছে।

হঠাৎ-ই বলল, ‘জানো কল্পনাদি, চাকরিটা হয়ে যাবে বলে কনফার্মেশনটা যে-মুহূর্তে পেয়েছি, অমনি শপিং মলে গিয়ে এক্বেবারে নতুন ডিজাইনের পাঁচটা চুড়িদার-কামিজ কিনে এনেছি। শাড়ি পরে তো আর এত দৌড়ঝাঁপ করা যায় না। মাঝেমধ্যে শাড়ি পরব। অফিসের কোনও অনুষ্ঠানে। কিংবা ধরো চুড়িদার পরতে পরতে একঘেয়ে লাগলে তখন। স্বাদবদলের জন্য।’

আমি কী বলি তা শোনার জন্য একগাল হিরের টুকরো ছড়ানো হাসি নিয়ে সোহিনী আমার দিকে চেয়ে রইল।

আমি গম্ভীর স্বরে বললাম, ‘সবই তো ঠিক আছে। কিন্তু বাচ্চারা? ওদের কি প্রেপ স্কুলে ভর্তি করে দিলি, নাকি কোনও ক্রেশ?’

সোহিনী হাসি ধরে রেখে বলল, ‘ক্রেশ কেন? বড়ো-মা আছে তো!’

নামটা শুনে আমি চমকে উঠলাম। ‘বড়ো-মা? বড়ো-মা এর মধ্যে আসছে কী করে?’

সোহিনীর মুখ থেকে হাসি মুছে গেল এইবার। অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘ওমা, তুমি জানো না?’

আমি অবাক হওয়া মুখ দুপাশে নেড়ে জবাব দিলাম, ‘না!’

সোহিনী বোধহয় আমার চেয়েও বেশি অবাক হল।

অবিশ্বাসীর হাসি হেসে জিজ্ঞেস করল, ‘সত্যিই জানো না? তুমি কী গো? তুমি কি এ পাড়ায় থাকো?’

আমার মাথাটা কেমন যেন ঝিমঝিম করছিল। অনেকদিন আগে বাজারে দেখা রেণুর উদভ্রান্ত মুখটা মনে পড়ে গেল। মনে পড়ে গেল, প্রতিশ্রুতি দিয়েও শেষ পর্যন্ত রেণুদের বাড়িতে যাওয়া হয়নি ব্যস্ততার জন্য। আমি কৌতূহল দমন করে বললাম, ‘হ্যাঁ, বাজারে একদিন রেণুর সঙ্গে দেখা হয়েছিল। ও তাড়ায় ছিল। সবটা খুলে বলতে পারল না। আমিও আর পরে জানতে চাইনি। মনে হল, বড়ো-মাকে নিয়ে ওরা খুবই ব্যতিব্যস্ত।’

‘দূর! রেণুদির কথা ছাড়ো তো! ওদের বড্ড বাড়াবাড়ি! আরে বড়ো-মা যা করছেন তাতে, আমাদের মতো মেয়েরা ওর কাছে সারাজীবন কৃতজ্ঞ থাকবে। রেণুদি এত কথা বলছে তো! রেণুদির নিজের কত সুবিধা হয়েছে বড়ো-মা এখানে থাকায়, সে-কথা কি একবারও রেণুদি স্বীকার করে?’

সোহিনী রীতিমতো ফোঁস করে ওঠে। মনে হল যেন, বড়ো-মার বিরুদ্ধে রেণুর অভিযোগ, সরাসরি সোহিনীর গায়ে গিয়েই লেগেছে। ফলে বেরিয়ে পড়েছে পাড়াতুতো রাজনীতির দাঁত-নখ। আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘বড়ো-মার কথাটাই বল। উনি তোকে কীভাবে…!’

সোহিনী আমার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বলল, ‘রেণুদিদের বাড়িটা তো ফাঁকাই পড়ে থাকে সারাদিন। ওরা তো কত্তাগিন্নি দুজনেই অফিসে যায়। বড়ো-মা পাড়ার বাচ্চাদের সে সময়টা সামলান। সকলেই এ-পাড়ার বা পাশের পাড়ার চাকরি করা মহিলাদের সন্তান। শুনেছি, বাচ্চাদের পাল্সটা উনি খুব ভালো বোঝেন। প্রচুর যত্নআত্যি করেন। এখন তো সকলেই বাচ্চাদের রাখার জন্য ওঁর কাছে দৌড়োচ্ছে।’

বড়ো-মার কীর্তিকলাপের কথা শুনে আমার তো চোখ কপালে উঠেছে। রেণুর অভিযোগটা তাহলে নিতান্ত অন্যায্য নয়।

সোহিনীর কথা তখনও শেষ হয়নি। সে খুব রুষ্ট মুখে বলল, ‘বড়ো-মা আর নতুন কাউকে নিচ্ছে না জানো! ডিমান্ড তো খুব! আমি নেহাত পাড়ার বউ। তাই না করতে পারল না।’

সোহিনী বেশ খানিকক্ষণ গল্প করে চলে গেল। কিন্তু আমার ভাবনায় বড়ো-মা ঢুকে পড়লেন। রেণু এবং ওর স্বামী রজত– দুজনেই ভালো চাকরি করে। বড়ো-মাকেও যে তারা অবহেলা করে, এমন নয়। তাহলে বড়ো-মার কী উদ্দেশ্য সাধিত হচ্ছে এহেন কার্যকলাপের মাধ্যমে? কী প্রমাণ করতে চান উনি? ছেলে আর বউমাকে সকলের চোখে এমন খাটো করে দেখানোর ভাবনাই বা তার মাথায় চেপে বসল কেন হঠাৎ?

সন্ধেয় সমীর বাড়ি ফিরতে ওকে প্রথমেই সোহিনীর জানানো কথাগুলো বলেছি। শুনে প্রথমে সে অবাক হল। তারপর মুখটা বিকৃত করল একটু। শেষে ভুরুতে সেই যে ভাঁজ পড়ল, সে ভাঁজ আর সিধে হল না।

খানিকক্ষণ গুম মেরে বসে থেকে সমীর বলল, ‘আমায় তুমি তো খুব চিন্তায় ফেলে দিলে কল্পনা। ছোটোবেলায় আমি আর রজত হরিহর আত্মা ছিলাম। এখনও আমাদের মধ্যে যথেষ্ট বন্ধুত্ব। তাই ওর ব্যথাটা আমার বুকে বড়ো লাগছে!’

আমি চুপ করে আছি দেখে, সমীর আমাকেই পালটা প্রশ্ন করল, ‘কী দরকার ছিল বলো তো বড়ো-মার এমন সব পাগলামো করার? এতে সমাজের সমালোচনার আঙুল যে ওরই ছেলে-বউমার দিকে উঠবে, একথা কি একবারও উনি ভাবলেন না?’

‘আমার কী মনে হয় জানো?’ আমি বলি, ‘আমাদের দুজনের একবার ওদের বাড়িতে যাওয়া উচিত। বড়ো-মাকে বোঝানো উচিত। উনি যেটা করছেন, সেটা ঠিক করছেন না। তুমি বোঝালে হয়তো উনি তার মূল্য দেবেন!’

সমীর মাথা নেড়ে সম্মতি জানিয়ে বলল, ‘দেখা যাক।’

সেই সপ্তাহেই একদিন অফিস থেকে ছুটি নিয়েছে সমীর অন্য কোনও কারণে। সম্ভবত শরীরটা তার ভালো ছিল না সেদিন। দুপুরবেলা খাওয়াদাওয়ার পর বলল, ‘চলো বড়ো-মার কাছ থেকে ঘুরে আসি।’

দুপুর দুটো বাজে। সদর দরজা খোলাই ছিল। আমরা দোতলায় উঠতেই বাচ্চাদের নানারকম গলার আওয়াজ শুনতে পেলাম। রেণুদের ড্রয়িংরুমের সামনে এসে দাঁড়তেই একঝলকে গোটা ছবিটা পরিষ্কার হয়ে গেল। ঘর জুড়ে দশটি প্রায় একই বয়সি বাচ্চা। কেউ ঘুমোচ্ছে। কেউ বা দুষ্টুমি করছে। খেলনা নিয়ে খেলছে কেউ। খোদ বড়ো-মা একটি বাচ্চাকে কোলে নিয়ে, দুধের বোতল থেকে দুধ পান করাচ্ছেন। আর-এক মধ্যবয়সিনি অন্য বাচ্চাদের নিয়ে ব্যস্ত।

বড়ো-মাকে দেখতে অদ্ভুত লাগছে। মুখ থেকে যেন একটা জ্যোতি বের হচ্ছে। স্নেহের বিভা। আমরা থতোমতো খেয়ে দরজার গোড়ায় দাঁড়িয়ে রইলাম। হঠাৎ মুখ তুলে আমাদের দেখতে পেয়েই বড়ো-মা উদার আমন্ত্রণ জানালেন।

‘আরে, সমীর? বউমা? এসো, এসো ভিতরে এসো। বাইরে দাঁড়িয়ে আছো কেন? মালতী একে ধর। দেখিস দুধটা যেন পুরোটা খায়।’

মালতীর হাতে কোলের বাচ্চাটিকে তুলে দিয়ে বড়ো-মা উঠে দাঁড়ালেন।

‘ও হল মালতী। সাতকুলে কেউ নেই ওর। তাই জুটে গেল। একা একা এতগুলো বাচ্চাকে সামলানোর বয়স কি আর আছে?’

বড়ো-মা আমাদের ভিতরের ঘরে নিয়ে গেলেন। সমীর সোফায় বসে বলল, ‘আপনি তো রীতিমতো ক্রেশ চালু করে দিয়েছেন দেখছি বড়ো-মা!’

বড়ো-মা তৃপ্তির হাসি হাসলেন। মালতীকে ডেকে বললেন, ‘তোমার হাত খালি হলে ফ্রিজ থেকে মিষ্টি নিয়ে এসো তো মালতী!’ তারপরই আমাদের দিকে ফিরলেন, ‘খুব ভালো লাগে জানো। মনটা পবিত্র হয়ে যায়। বয়স তো হল। পরমার্থের সন্ধান করার এখনই তো প্রকৃষ্ট সময়।’

আমি জানতে চাইলাম, ‘আপনি হাঁফিয়ে পড়েন না? এতগুলো বাচ্চাকে সামলানো তো মুখের কথা নয়। তাই না?’

‘দ্যাখো, নিজের নাতি-নাতনিদের জন্যও কি কম দৗড়ঝাঁপ করেছি? এক-একটার আবদার শুনলে মাথা খারাপ হয়ে যায়। এখন তবু মালতী আছে। তখন তো আমি একা। ওরা দুজন চলে যেত অফিসে, সারাদিনের মতো। এখন নিজের নাতি-নাতনি বড়ো হয়ে গেছে। তাই ‘বসুধৈব কুটুম্বকম’ করছি আর কী! এদেরকেই নাতি-নাতনি বানিয়ে ফেলেছি। জানো, ওদের মায়েরা বলে, বাচ্চাদের অনেকে নাকি রাতেও বায়না ধরে, বড়ো-মার কাছে শোবো। বোঝো অবস্থা!’

বড়ো-মার মুখটা একথা বলতে গিয়ে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।

সমীর জিজ্ঞেস করল, ‘বাবা-মায়েরা এদের নিয়ে যায় কখন?’

‘সন্ধে ছটার মধ্যে গোটা তল্লাট ফাঁকা হয়ে যায়। মালতী সব গুছিয়ে নীচে ওর ঘরে চলে যায় বিশ্রাম করতে। রেণু আর রজতও ফিরে আসে আধঘণ্টার মধ্যে। বাচ্চারা অবশ্য তার অনেক আগেই স্কুল থেকে ফেরে।’

আমি ক্রমশ অধৈর্য হয়ে পড়ছিলাম এরকম অপ্রাসঙ্গিক কথাবার্তা শুনে। ভাবছিলাম, কেন এতক্ষণেও আসল বক্তব্যে আসতে পারছে না সমীর। অফিসে সে সপ্তাহে দশটা মিটিং করে। তার তো মূল বক্তব্যে আসতে এত সময় লাগারই কথা নয়।

আমিই শেষে অসহিষ্ণুতাটা প্রকাশ করলাম। বললাম, ‘কিন্তু বড়ো-মা… আপনার তো এখন বিশ্রাম নেওয়ার বয়স। কী দরকার ছিল বলুন তো এসব ঝামেলা নেওয়ার? পৃথিবীতে আপনার বয়সি অনেক দুর্ভাগা নারী আছেন। যাদের ছেলেমেয়ে, বউমারা তাদের দেখে না। তারা যদি এরকম ক্রেশ খোলেন, তবু মানা যায়। তাই বলে আপনি?’

আমি একটানা ক্ষোভ উগরে দিয়ে হতাশায় মাথা নাড়ি।

তাকিয়ে দেখি, বড়ো-মার মুখ থেকে তখনও হাসি লোপ পায়নি। হ্যাঁ, ভুুরুদুটো একটু বেঁকেছে। কিন্তু ওটুকুই।

শেষে বললেন, ‘এবার তাহলে তোমায় একটা প্রশ্ন করি মা?’

আমি বিরক্ত মুখে বললাম, ‘করুন।’

‘তোমার বাবা-মা তো তোমার দাদা-বউদির সঙ্গে থাকেন। ওঁরা সুখী?’

একটা ধাক্বা লাগল ওর প্রশ্নে। মনটা নিমেষে বিষণ্ণ হয়ে গেল। আমার বৃদ্ধ বাবা ও মায়ের মুখটা ভেসে উঠল চোখের পর্দায়। ‘মা কেমন আছো’, জিজ্ঞেস করলে মা করুণ মুখটা তুলে যেভাবে বলে ‘ভালো আছি’, সেই স্তোক দেওয়ার ছবিটা মনে পড়ল। আমি জানি, মা-বাবা ভালো নেই দাদা-বউদির সংসারে। দুজনেই প্রাণপণে চেষ্টা করে চলেছেন বাস্তবের সঙ্গে আপস করার। আমি বুঝতে পারি ওরা ভালো নেই। আমরা কখনও গেলে বউদি ওদের সঙ্গে খুব ভালো ব্যবহার করার চেষ্টা করে। কিন্তু সেটা চেষ্টাই। কোনও কোনও প্রসঙ্গে, ছিটকে বের হয় বাবা-মায়ের প্রতি বউদির অশ্রদ্ধা আর নৈরাশ্য। আমরা সামনে আছি বলে বউদি দ্রুত সামলে নেয় নিজেকে, কিন্তু বাবা ও মায়ের বেদনাটা তাতে চাপা পড়ে না। বিয়ের পর সব মেয়েই বাপের বাড়ির অতিথি। অসহায় হয়ে হাত কামড়ানো ছাড়া আর কোনও উপায় থাকে না তখন আমার।

বাপের বাড়িতে মেয়েরা আনন্দ করতে যায়। আমি ফিরে এসে বিছানায় উপুড় হয়ে কাঁদি।

এই মুহূর্তে বিষণ্ণতায় আমার মনটা দ্রব হয়ে যায়। চোখদুটিও নত হয়ে আসে। মনের গভীরে কোনওমতে কান্না সামলাই।

বড়ো-মা হয়তো বোঝেন। মৃদু হেসে মাথায় হাত রাখেন। চমকে উঠে তাকাই বড়ো-মার দিকে।

শান্ত গলায় বড়ো-মা বললেন, ‘যতই লুকোনোর চেষ্টা করো, চোখের জলকে লুকোবে কী করে? বয়স্ক মানুষদের অবস্থাটা এখন এরকমই। একটা কথা বলি। তোমার নিজের উপরে যখন এরকম বৃদ্ধবৃদ্ধাদের দায় পড়বে, তখন এই চোখের জলের কথা মনে রেখো মা!’

সমীর কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু বড়ো-মা তখনই তার দিকে ফিরে বললেন, ‘আসলে কী জানো বাবা, স্বামীর উপার্জন কিংবা তার মনের উপর স্ত্রীর যতটা অধিকার, ততটা অধিকার মায়ের আর থাকে না। সেইজন্যেই আমার মনে হয়, তাদের আত্মনির্ভর হওয়াটা খুব জরুরি। আর, পরিশ্রমের কথাই যদি বলো, সেটাও অতটা গায়ে লাগে না। বাড়িতে বসে বাচ্চাদের সঙ্গে সময় কাটানো– এই তো কাজ! অথচ দ্যাখো, আমার বউমা কত খাটাখাটনি করে–!’

বড়ো করে শ্বাস নিলেন বড়ো-মা।

জিজ্ঞেস করলাম, ‘আর কেউ ভর্তি করতে চাইছে না বাচ্চাদের?’ ‘চাইছে তো! রোজই কত মানুষ আসে। অনেককে তো চিনিই না। এসে বলে, বড়ো-মা আমাদের বাচ্চাকেও রাখুন। মোড়ের রিকশাস্ট্যান্ডে বড়ো-মার ক্রেশে যাব বললেই, রিকশাওলা নাকি পৗঁছে দেয় এ বাড়িতে। কিন্তু আমি আর অন্য কাউকে নিতে পারব না কল্পনা। আমার তো অর্থের খুব চাহিদা নেই!’

আমরা দুজনেই প্লেট থেকে একটা করে সন্দেশ তুলে মুখে ফেলেছিলাম। মালতী দু-গ্লাস ঠান্ডা জল এনে দিল।

বড়ো-মা বললেন, ‘এবার শীতের ছুটিতে আমরা ক’জন বেড়াতে যাচ্ছি। একটা টুরিস্ট কোম্পানির সঙ্গে। তোমার বাবা-মাকেও বলো না কল্পনা। যদি ওরা আমাদের সঙ্গে যান, খুব ভালো লাগবে।’

আমি বিব্রত হওয়ার মতো চোখ করে সমীরের দিকে তাকাই। দাদা-বউদি যে মা-বাবাকে ছাড়তে রাজি হবেন না, সেকথা আমি যেমন জানি, সমীরও জানে।

তবু ও হঠাৎ বলে উঠল, ‘আমি কথা দিচ্ছি। ওরা যাবেন। আমি শিগগিরি ওদের সঙ্গে কথা বলব বড়ো-মা। আপনি পুরোনো যুগের মানুষ। কিন্তু আজ আমার চোখ খুলে দিয়েছেন।’

সমীর আবেগে আমার হাত চেপে ধরল।

——-

করোনার প্রভাবে ফ্যাশন

বিশ্বব্যাপী কোভিড ১৯-এর কারণে বড়ো বড়ো ফ্যাশন শো গুলো এখন বন্ধ। সাধারণত এগুলোর মাধ্যমেই ফ্যাশন ডিজাইনার-রা নতুন ফ্যাশন ট্রেন্ডস সারা বিশ্বের মানুষের সম্মুখে নিয়ে আসেন।

সম্প্রতি প্যান্ডেমিকের আবহে ভারতেও ফ্যাশনের উপর একটা বড়ো প্রভাব পড়েছে। যা এতদিন কর্মক্ষেত্রে, অফিসে পরে যাওয়া হতো, তাতেও অনেকটা পরিবর্তন চোখে পড়ছে। অফিসে না গিয়ে বহু মানুষ এখনও ওয়ার্ক ফ্রম হোম-এই কাজ চালাচ্ছেন। ফলে ফর্মাল পোশাকের থেকে কমফর্টেবল পোশাকের ফ্যাশন এখন বেশি সম্ভাবনার মুখ দেখছে। এছাড়াও এই মুহূর্তে পোশাকে ইনডোর ফ্যাশন ট্রেন্ড-এর উপরেই ডিজাইনার-রা বেশি প্রাধান্য দিচ্ছেন।

বাইরের অনুষ্ঠান উৎসব বেশ কিছু কিছু পালিত হলেও সোশ্যাল গ্যাদারিং-এর উপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। কোভিড-এর vaccine এসে গেলেও মানুষ বাইরে বেরোতে এখনও কমফর্টেবল হতে পারছে না।

অনলাইন শপিং-এর মাধ্যমেই এখন বেশির ভাগ মানুষ নতুন এই স্টাইল স্টেটমেন্ট-এর সঙ্গে নিজেদের খাপ খাওয়াচ্ছেন। ফ্যাশন ট্রেন্ড এখন কী চলছে আসুন দেখে নেওয়া যাক –

আরামদায়ক পোশাকের চাহিদা বেশি : প্যান্ডেমিক-এর শুরু থেকেই প্রপার ড্রেস-আপ নিয়ে কেউই আর বেশি মাথা ঘামাচ্ছে না। আরামদায়ক পোশাক-ই এখন লিস্ট-এর একেবারে উপরে।

সোয়েট শার্ট, টাইটস, কমফর্টেবল ক্রপ টপস এখন ইযং জেনারেশনের পছন্দের তালিকায়। ক্যাজুয়াল, কমফর্টেবল পোশাক যা কিনা ডিজাইন করা হয়েছে এক্সারসাইজ এবং ডেলি উইয্যার হিসেবে, তাই এখন সকলের পছন্দের শীর্ষে। সারাদিন বাড়িতেও এই ধরনের পোশাকে কাটানো যায় আবার বাইরে বেরিয়ে দৌড়ঝাঁপ করতেও, এই পোশাকে কোনও অসুবিধা হয় না। আবার ওয়ার্ক আউট করে ঘাম ঝরাতে চান, তাও অসুবিধা নেই।

এছাড়াও এই ধরনের হাইব্রিড ক্লোদিং ট্রেন্ড চলাকালীন অনেক মেযেরাই বিভিন্ন স্টাইল এবং প্রিন্ট নিয়ে বাড়িতেই এক্সপেরিমেন্ট করা পছন্দ করছেন।

ফেস মাস্ক : এটি পোশাকের অপরিহার্য অঙ্গ হয়ে উঠেছে। ফেস পিল অফ অথবা চারকোল ফেস মাস্ক নিয়ে চর্চা করার দিন শেষ। সৌন্দর্যের দম্ভ এখন সুরক্ষার আঁচলে ঢাকা পড়ে গেছে। প্রোটেকটিভ ফেস মাস্ক এখন জরুরি প্রযোজন হয়ে দাঁড়িয়েছে। সুতরাং মাস্ক তৈরিতে নানা রকম ক্রিয়েটিভিটি নিয়ে ডিজাইনার-রা এখন উঠেপড়ে লেগেছেন।

বিভিন্ন ধরনের ফ্যাব্রিক, বিভিন্ন শেপ, জিওমেট্রিক্যাল প্যাটার্ন, ফ্লোরাল এমব্রয়ডারি, প্রিন্ট, কালার ইত্যাদি ২০২১ সালের ফ্যাশন অ্যাকসেসারি-তে নতুন সংযোজন।

হিলস নয়, স্লাইডার্স, ক্রক্স, ফ্লিপ ফ্লপ্স : কোথাও যাওয়া আসার সুযোগ যখন বন্ধ, তখন হাই হিলস পরে পা-কে কষ্ট দেওয়া কেন? বরং স্লাইডার্স, ক্রক্স, ফ্লিপ ফ্লপ্স এখন আকর্ষণের কেন্দ্রে রয়েছে। এগুলি অনেক বেশি আরামদায়ক এবং বর্তমানে এগুলোই সকলে পরতে পছন্দ করছেন।

বাড়ির ভিতরে চলাফেরা, রিল্যাক্স করার জন্য এগুলো খুবই ভালো এবং এর কুল ও স্টাইলিশ ভ্যারাইটিও মার্কেটে রয়েছে।

মেক-আপ : মেক-আপ ছাড়া যাদের চলত না তারাও এখন মেক-আপ ব্যবহার না করে মুখ পরিষ্কার রাখতেই বেশি পছন্দ করছেন। সেফটি প্রাযোরিটি এখন সবকিছুর আগে। একমাত্র ওয়ার্ক ফ্রম হমে, ভিডিও কলস-এর সময় এবং যখন একটু আধটু বাইরে বেরোবার প্রযোজন হচ্ছে, তখনই মেক-আপ করার প্রযোজন বোধ করছেন কিছু মানুষ। তাও খুব হালকা মেক-আপ।

মাস্ক এখন যখন আবশ্যিক পোশাকের অঙ্গ হয়ে উঠেছে, সেক্ষেত্রে লিপস্টিক লাগানোর প্রয়োজন ফুরিয়েছে। বরং চোখের মেক-আপে ক্রিয়েটিভিটি এখন লক্ষণীয়। কারণ মাস্কে মুখ অর্ধেক ঢেকে থাকার ফলে চোখই এখন কথা বলছে। তাই, মার্কেটে আই প্রোডাক্টস-এর বিক্রি এখন সবথেকে বেশি।

 

 

জীবনসঙ্গী হিসেবে পুরুষের মধ্যে কী দেখতে পছন্দ করে মেয়েরা?

স্বাভাবিক ভাবেই নারী পুরুষ একে অপরের প্রতি আকৃষ্ট হয়। তবুও কিছু কিছু ক্ষেত্রে মেয়েরা পুরুষদের মধ্যে বিশেষ কিছু গুণের সন্ধান করে যেটার পরিপ্রেক্ষিতে মেয়েরা নিজেদের সুরক্ষিত বলে মনে করতে পারে।

১) লম্বা পুরুষ মেয়েদের বেশি পছন্দ। স্বাভাবিক পুরুষদের যা হাইট হয়, তার থেকে কিছুটা বেশি লম্বা হলে মেয়ে্দের দৃষ্টি সহজেই আকর্ষিত হয়।

২) পুরুষদের বডি ল্যাঙ্গুয়েজের উপর বরাবর মেয়েদের দৃষ্টি থাকে। তার চলাফেরা কেমন, গলার স্বর কেমন, কথাবার্তার ধরন কেমন, কাঁধ সোজা করে কনফিডেন্টলি হাঁটাচলা করেন কিনা সে বিষয় মেযেরা বিশেষ খেয়াল রাখে। মেয়েলি পুরুষ, কোনও মেয়ে সে ভাবে পছন্দ করে না।

৩) পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা মেয়েদের আকর্ষণ বেশি করে। ছেলেদের শরীর থেকে কোনও রকম দুর্গন্ধ বেরোলে মেযেরা বরদাস্ত করতে পারে না। চুল, দাড়ি মেইনটেন করাটা খুব প্রযোজন। হাত ও পায়ের নখ পরিষ্কার রাখা এবং সময়ে সময়ে নখ কাটার ব্যাপারেও খেয়াল রাখা বাঞ্ছনীয়। এছাড়াও পরিষ্কার, ইস্তিরি করা পোশাকে পুরুষদের দেখতে চায় মেযেরা।

৪) দাযিত্ববান এবং ম্যাচিওরিটি আছে এমন পুরুষকেই পছন্দ মেয়েদের। বেশি কথা বললে বা না ভেবেচিন্তে কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়ার মানসিকতা মেয়েদের খুবই অপছন্দের। ছোটো ছোটো কথায় য়ে-সব পুরুষ ধৈর্য হারিয়ে ফেলে, মেযেরা তাদের থেকে দূরত্ব রাখতেই পছন্দ করে।

৫) য়ে-পুরুষ মেয়েদের পিছনে পিছনে ঘোরে নিজের সম্মানের পরোয়া না করে, তেমন পুরুষ মেয়েদের কাছে বিশেষ অপছন্দের। রিজার্ভ কিন্তু কম অ্যাটিটিউড-যুক্ত ছেলেদেরকেই বেশি পছন্দ করে মেযেরা।

৬) ছেলেদের মধ্যে সেন্স অফ হিউমার থাকাটা মেয়েদের চোখে অন্য মাত্রা এনে দেয়। বোরিং পার্সোনালিটি একেবারেই পছন্দ নয় মেয়েদের। সিরিয়াস আবহাওয়াকে মুহূর্তে হালকা করে দিতে পারে, এমন গুণের প্রতি মেযেরা বেশি আকর্ষণ বোধ করে।

৭) যাদের পার্সোনালিটি কম, নিজের ব্যাপারে সব কিছু বাড়িয়ে বলতে ভালোবাসে মেয়েদের ইমপ্রেস করার জন্য, তাদের থেকে মেযো শত হাত দূরে থাকতে পছন্দ করে। পুরুষের মধ্যে তার নিজস্ব গুণটাকেই মেযেরা দেখতে চায়, কোনও রকম নকল ব্যবহার মেযেরা অত্যন্ত অপছন্দ করে।

৮) মেযেরা চায় য়ে-ছেলেটি তার জীবনসঙ্গী হবে, সে য়েন তাকে সম্মান করে। মেয়েটির বাড়ির লোকেদের প্রতিও সম্মান রাখাটা জরুরি।

৯) শারীরিক ভাবে ফিট এবং স্মার্ট পুরুষদের মেযেরা পছন্দ করে। শরীরে কোথাও মেদ অথবা স্থলতা মেযেরা দেখতে চায় না। স্থল শরীরে মেয়েটির সামনে গেলে সঙ্গে সঙ্গে আপনি তার রিজেকশন লিস্টে চলে য়েতে পারেন।

১০) অহংকারী পুরুষ মেযেরা পছন্দ করে না। তারা চায় পছন্দের মানুষটির সঙ্গে কমফোর্টেবল ফিল করতে। সম্পর্কে সংকোচ যদি থাকে সেই সম্পর্ক বেশি দূর গড়াতে পারে না।

 

পড়ার জন্য সীমাহীন গল্প-নিবন্ধসাবস্ক্রাইব