তাণ্ডব নিয়ে তুলকালাম

দেশের বিভিন্ন প্রান্তে আবার একটি ওয়েব সিরিজকে ঘিরে জোর বিরোধিতা শুরু হয়েছে। বিজেপি নেতারা অভিযোগ করেছেন যে, তাণ্ডব ওয়েব সিরিজটিতে  হিন্দু দেবদেবীদের অবমাননা করা হয়েছে। ফলে এই সিরিজ বন্ধ করে দেওয়ার ডাক দেন তাঁরা।

সইফ আলি  খান অভিনীত এই ওয়েব সিরিজ-এর বেশ কিছু বিতর্কিত অংশ বাদ না দেওয়া পর্যন্ত, বিজেপি এই সিরিজ বয়কট করবে বলেও জানানো হয়েছে। ওই ঘটনার পরপরই, তাণ্ডবকে নিষিদ্ধ করা হোক বলে দাবি করেন কপিল মিশ্র। এমনকী, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী প্রকাশ জাভড়েকরকে নিজের টুইটে ট্যাগও করেন বিজেপি নেতা কপিল মিশ্র। কপিল মিশ্র প্রকাশ্যেই বলেছেন যে, এই ওয়েব সিরিজের মাধ্যমে ধর্মীয় বিভাজনের চেষ্টা করা হয়েছে। ওয়েব সিরিজটির মাধ্যমে হিন্দু দেবদেবীদের অপমান করা হচ্ছে।

মূল শোরগোলটা বেধেছে খান মহম্মদ আয়ুব জিশান অভিনীত, শিবা শেখরের চরিত্রটি নিয়ে। মহম্মদ আয়ুব-কে দেখা গিয়েছে কলেজ নাটকের একটি দৃশ্যে শিবের চরিত্রে অভিনয় করতে যেখানে, নারদের চরিত্রকে বলতে শোনা যায় যে, রামের ফলোয়ার্স বেড়ে যাচ্ছে, তা নিয়ে শিবের কিছু করা উচিত। ব্যঙ্গাত্মক এই নাটকে শিবের চরিত্র করতে গিয়ে অশালীন ভাষার প্রয়োগও করতে শোনা যায় আয়ুবকে।এই ধরনের চরিত্র সৃষ্টি করে ধর্মীয় ভাবাবেগে আঘাত করার চেষ্টা হয়েছে, এই মর্মে সরব হয়েছে দলীয় সমর্থকরা।

সিরিজের মুখ্য অভিনেতা সইফ আলি খানকে ক্ষমা চাওয়ার দাবি জানিয়েছেন দলের নেতা তথা মহারাষ্ট্রের ঘাটকোপারের বিধায়ক রাম কদম। ঘাটকোপার থানায় অভিযোগ দায়ের করেছেন তিনি। প্রশাসনের কাছে আবেদন জানিয়েছেন রাম, যাতে অভিনেতা, প্রোডিউসার এবং ডিরেক্টরের বিরুদ্ধে কড়া ব্যাবস্থা নেওয়া হয়।

একের পর এক ওয়েব সিরিজ নিয়ে এই ধরনের বিরোধিতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে বিভিন্ন ওটিটি প্ল্যাটফর্ম-কে।মামলা মোকদ্দমাও হচ্ছে।অথচ করোনা আবহে হল বিমুখ দর্শকদের অন্যতম বিনোদনের মাধ্যম হয়েছে ওয়েব সিরিজ।ফলে বিতর্কিত ওয়েব সিরিজের টিআরপি বাড়ছে হু হু করে। স্টার প্যাকড তাণ্ডবে, সইফ আলি খান ছাড়াও অভিনয় করেছেন  ডিম্পল কপাডিয়া, গওহর খান প্রমুখ অসাধারণ অ্যাক্টররা।

চিরসবুজ কোদাইকানাল

গাড়ি চলছে সমতল পথ ধরে– মাদুরাই থেকে কোদাইকানাল রোডের দিকে, দূরত্ব প্রায় ৪৩ কিমি। এরপর অবশ্য শুরু পাহাড়ি পথ, প্রায় ৮০ কিমি কোদাইকানাল শৈলশহর পর্যন্ত। কোদাইকানাল ভারতের জনপ্রিয় শৈলশহরগুলির অন্যতম। মাদুরাই জেলার উত্তর পশ্চিমে পালানী পাহাড়ে প্রায় ৭০০০ ফুট উচ্চতায় ২১৪৬ বর্গ কিমি এলাকা জুড়ে এই মনোরম পাহাড়ি শহর।

কোদাই শব্দটির অর্থ অরণ্যের উপহার। সমতল পথের শেষে এবার আমরা পাহাড়ের পথে উঠছি– একদিকে পাহাড় আর এক দিকে খাদ। দূরে সবুজ পাহাড়ের প্রেক্ষাপট যেন ঢেউ খেলানো সবুজ পাহাড়ের শৃঙ্খল। এই পথে কলা আর ইউক্যালিপটাস গাছের জঙ্গল। পাহাড়ের ঢালে কফির খেত সঙ্গে আঙুরের চাষও হচ্ছে জায়গায় জায়গায়। যতই গাড়ি ওপরে উঠছে একটা ঠান্ডা আবেশ আমাদের স্পর্শ করে যাচ্ছে। পথে পড়ল ম্যাঞ্জেলার ড্যামের জলাধার, গাড়ি থামিয়ে ছবি তুলি। আর কিছুটা এগিয়ে সবুজ পাহাড়ের গা বেয়ে নামছে ফিতের মতো সরু ঝরনাধারা– নামটা অদ্ভুত, দমদম ফল্স। রাস্তার ধারে ভিউপয়েন্ট থেকে দূরের এই প্রপাতের সৌন্দর্য আস্বাদন করার ব্যবস্থা আছে।

যাত্রা শুরুতে আকাশ ছিল পরিষ্কার এখন একেবারে মেঘে ঢাকা। এখন সেপ্টেম্বর মাসের শেষ, বর্ষা পেরিয়ে গেছে তবে বৃষ্টি এদিকে যখন-তখন হয়। তামিলনাড়ুতে বছরে বর্ষা হয় দু’বার। নভেম্বর-ডিসেম্বরে এখানে দ্বিতীয় দফার বর্ষা হয়। গাড়ি আরও ওপরে উঠছে। কোদাইকানালের ৮ কিমি আগে রাস্তার এক বাঁকে সাক্ষাৎ হল এক বিশাল জলপ্রপাতের সঙ্গে। কোদাইকানালের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ সিলভার কাসকেড ফল্স। ধাপে ধাপে পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসছে বিশাল জলধারা। ১৮০ ফুট উঁচু থেকে ঝরে পড়া এই প্রপাত যেন কোদাইকানালে আগত সমস্ত মানুষকে স্বাগত জানাচ্ছে। প্রপাতের তলায় সৃষ্টি এক ছোটো পুল সেখানে স্নানে মগ্ন অনেকেই। নানা ধরনের দোকান গড়ে উঠেছে প্রপাতের ধারে। ছবি তুলে আমরা এগিয়ে চলি। শহরের মুখে প্রচণ্ড যানজট কাটিয়ে আমরা পৌঁছে গেলাম আমাদের নির্ধারিত হোটেলে। এটাই আমাদের আগামী দুদিনের আস্তানা।

ভারতের অন্যান্য অনেক শৈলশহরের মতো কোদাইকানালের আবিষ্কর্তাও ব্রিটিশরা। ১৮২১ সালে লেফটেন্যান্ট ওয়ার্ড প্রথম সরকারি অফিসার হিসাবে পদার্পণ করেন কোদাইকানালে। আমেরিকান মিশনারিরা রাস্তাঘাট নির্মাণে এগিয়ে আসে আর মাদুরাই-এর কালেক্টর স্যার লেভিঞ্জির এই স্থানটিকে এক সুন্দর শৈলশহর হিসাবে গড়ে তোলার প্রথম পদক্ষেপ নেন।

Travelogue Kodaikanal

হোটেলে লাঞ্চ সেরে আমরা লেকের দিকে এগোই। হোটেল থেকে লেকের দূরত্ব মাত্র ৫০০ মিটার। পরপর দুদিন ছুটি তাই আজ শহরে খুব ভিড়। পাহাড়ঘেরা তারকাকৃতি বিশাল লেক এই হিলস্টেশনের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ। লেকের জলে বোটিং-এর ব্যবস্থা আছে। বুকিং-এর জন্য রয়েছে শতাব্দী প্রাচীন বোট হাউস তার সামনে বিশাল লাইন। এখন বৃষ্টি নেই তবে আকাশ মেঘে ঢাকা। বোটিং করছে বহু ট্যুরিস্ট। প্যাডেল বোট আর দাঁড়টানা নৌকারই প্রধান্য মোটর বোট এখানে চলতে দেখলাম না। বোটিং যখন আজকে হল না আমরা সবাই মিলে লেক প্রদক্ষিণ করতে হাঁটা শুরু করলাম। ৬০ একর বিস্তৃত লেকের চারদিক রেলিং দিয়ে ঘেরা বাঁধানো রাস্তা সেখানে ভ্রমণার্থীদের সঙ্গে ফেরিওয়ালাদের ভিড়। নানা ধরনের শীতবস্ত্র, স্ন্যাক্স, আইসক্রিম, কফি বিক্রি হচ্ছে। ঘোড়ার পিঠে চড়ে অনেকেই ঘুরছে, সঙ্গে সাইকেল চালিয়ে ঘোড়াকে নিয়ন্ত্রণ করছে ঘোড়াওয়ালা। অনেকক্ষণ লেকের ধারে বসে প্রকৃতি আর মানুষকে উপভোগ করলাম। সন্ধ্যা হয়ে আসছে এবার হোটেলে ফেরার পালা। দোকান, বাজার, বাড়িঘরের আলো সব জ্বলে উঠেছে। সন্ধ্যায় কোদাইকানাল ঝলমল করছে।

আমাদের কোদাইকানালের মেয়াদ দুদিন। তৃতীয় দিন বিকেল পর্যন্ত আমরা কোদাই উপভোগ করতে পারি কারণ কোদাইকানাল রোড স্টেশন থেকে আমাদের ট্রেন রাত ৯টার পরে। কোদাইকানালে নানা ভ্রমণ সংস্থা বিভিন্ন ধরনের টুর পরিচালনা করে। শহরের মধ্যে অর্ধদিবস করে ভ্যালি ও পার্ক টুর আছে আর শহরের বাইরে দুধরনের পিকনিক টুর একটা ট্রেকিং অন্যটা অরণ্যের। আগামীকাল আমরা যাব জঙ্গলের পিকনিক টুর আর তার পরের দিন ভ্যালি ও পার্ক টুর করে চলে যাব একেবারে কোদাইকানাল রোড স্টেশনে। সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৩টে জঙ্গলের পিকনিক টুরের মেয়াদ। দেখানো হয় সাইলেন্ট ভ্যালি ভিউ, ফায়ার টাওয়ার, বেরিজ্যাম লেক ভিউ, ক্যাপস ফ্লাই ভ্যালি, মাথিকেট্টান ফরেস্ট ভিউ, মাথা পিছু ভাড়া ৩০০ টাকা। সারা দিন ধরে জঙ্গল সফর ভালোই হল শুধু মেঘকুয়াশার দৗরাত্ম্যে মাঝে মাঝে বিঘ্ন ঘটেছে। তবে কোদাইকানালের খ্যাতি যেসব স্পটের জন্য সেগুলি অধিকাংশ ভ্যালি ও পার্ক টুরের অন্তর্গত। অবশ্য কোদাইকানালের প্রধান দুটি আকর্ষণ সিলভার কাসকেড ফল্স ও লেক তো আমাদের আগেই দেখা হয়ে গেছে।

অক্টোবর মাসের প্রথম সপ্তাহে শীত এখনও পড়েনি তবুও কোদাইয়ের হিমেল বাতাস ভোরের দিকে বেশ কাঁপিয়ে দিচ্ছে। স্নান সেরে একেবারে ব্রেকফাস্ট টেবিলে। এই হোটেলে কমপ্লিমেন্টরি ব্রেকফাস্ট বেশ মনের সুখে খাওয়া যায়। টোস্ট অমলেট মাখন জ্যাম কলা যেমন আছে তেমনি রয়েছে দোসা-ইডলি-বড়া-উত্তাপম। এর সঙ্গে ফ্রুটজুস চা কফি তো রয়েছেই। ব্রেকফাস্ট সেরে বেলা ৯টা নাগাদ বেরিয়ে পড়ি। সাইটসিইং শেষ করে সোজা চলে যাব কোডাই রোড স্টেশনে। আজ সাইটসিইং-এ বাস নয় গাড়ি। গাড়ি প্রথমে নিয়ে গেল কোকারস্ ওয়াক। পাশেই একটি সুন্দর চার্চ নাম সম্ভবত ক্রাইস্ট কিং চার্চ। কোকারস্ ওয়াক এক কিমি দীর্ঘ পিচ বাঁধানো রাস্তা অনেকটা মুসৗরির ক্যামেলস্ ব্যাক রোডের মতো। ১৮৭২ সালে মিস্টার কোকার খুঁজে পেয়েছিলেন এই ঢালু পথ। তাঁর স্মৃতিতেই রাস্তার নামকরণ।

কোদাইকানালের দক্ষিণ দিকে এই রাস্তায় চলতে চলতে নীচে উপত্যকার অসাধারণ সৗন্দর্য উপভোগ করা যায়। প্রথমে এক ঝলক শহরের রূপ চোখে পড়ল, খেলনা বাড়ির মতো নানা রঙের বাড়িঘর। এই সব বাড়িঘর কখনও টিলার মাথায়, কখনও ঢালে আবার কখনও টিলার নীচে। ফলে উচ্চতার একটা তারতম্য রয়েছে। এরপর সবুজ পাহাড়ের কয়েকটি চূড়া আর তার পায়ের কাছে সবুজ উপত্যকার অপরূপ রূপ। আকাশে মেঘ তুলোর মতো উড়ে বেড়াচ্ছে। কোকারস্ ওয়াক রাস্তাটির বাইরের দিকে খাদ ঘেঁষে রেলিং দেওয়া রয়েছে আর পাহাড়ের দিকে নানা সম্ভার দিয়ে দোকান সাজাচ্ছে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা। এই দুর্দান্ত ল্যান্ডস্কেপ দেখতে দেখতে হাঁটতে কোনও কষ্টই হয় না। হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে গেলাম কোকারস্ ওয়াকের শেষ প্রান্তে সেখানে টেলিস্কোপ হাউস। দূরবিনে চোখ লাগালে সেই সবুজ উপত্যকা চলে আসে হাতের মুঠোয়, দূরের পাহাড় ঝরনা যেন পাশের বাড়িতেই। নির্গমন পথ দিয়ে বেরিয়ে আসি একদম রাস্তায় যেখানে আমাদের গাড়ি অপেক্ষা করছে।

পরিচ্ছন্ন পথ বেয়ে গাড়ি চলছে শহরের বুক চিরে। রাস্তার দুপাশে পাইন, বার্চ, কমলা, কলা, ইউক্যালিপটাস গাছ। আকাশ এখনও মোটামুটি পরিষ্কার। সূর্যের তেজ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শীত অনেকটা কম লাগছে। গাড়ি এবার থামল আপার লেক ভিউ পয়েন্টে। অনেকটা উচ্চতা থেকে কোদাই লেক দর্শন। ভিউপয়েন্টের আশেপাশে অনেক দোকানপাট। ভিউপয়েন্ট থেকে কোদাই লেককে মনে হয় যেন এক ত্রিমাত্রিক মানচিত্র। মনে আর ক্যামেরায় গেঁথে নিই সেই ছবি।

গাড়ি এবার গোঁ গোঁ করে ওপরে উঠছে তার সঙ্গে বাড়ছে ঠান্ডা হাওয়া আর কুয়াশার প্রকোপ। গাড়ি থামল মোয়ের পয়েন্টে। এখান থেকে উপত্যকার দৃশ্য আজ দেখা গেল না সেই কুয়াশা আর মেঘের কারণে। তবে যাতায়াতের পথটি বড়োই সুন্দর। রাস্তার দুপাশেই আকাশ ঢাকা জঙ্গল। গাড়ি আবার নীচে নামছে, আমাদের পরবর্তী গন্তব্য পাইনের জঙ্গল। গাড়ি থেকে নেমে দেখি রাস্তা সংলগ্ন একটি উপত্যকায় পাইন গাছের জঙ্গল। সামনে একটু ফাঁকা ফাঁকা তবে উপত্যকা খাড়া হয়ে টিলার রূপ নিয়েছে। সেখানেও পাইন গাছের সমান্তরাল রেখা। এই স্পটে অনেক সিনেমার শুটিং হয়েছে তাই স্থানীয়রা এটিকে শুটিং স্পট হিসেবেই জানে। পর্যটকদের মধ্যে ছবি তোলার ধুম পড়ে গেছে, আমরাও বাদ গেলাম না। শুধু ছবি তোলা নয় পাইনের জঙ্গলে আলো ছায়ায় শুধু ঘুরে বেড়াতেও দারুণ লাগে।

আবার একটু এগিয়েই গাড়ি থামল। ড্রাইভার জায়গাটির নাম বলল গুনা কেভস অ্যান্ড ডেভিলস্ কিচেন। রাস্তা থেকে কয়েকটা সিঁড়ি বেয়ে উঠে তারপর জঙ্গলময় সমতল পথ তারপর হালকা ঢালু জমি। গাছের ডালে ডালে বানর কাঁধের ব্যাগ বা হাতে কোনও খাদ্যবস্তু থাকলে খুব সতর্ক থাকতে হবে। গন্তব্যে পৌঁছে দেখলাম বেশ মোটা মোটা গাছ তাদের শিকড় জমিতে বিছিয়ে সৃষ্টি করেছে এক অনন্য আলপনা। এই প্রাকৃতিক আলপনার মাঝে অনেকেই ছবি তুলতে ব্যস্ত, গাছের ডালে চড়ে কয়েকটি অল্পবয়সি ছেলে বানরদের নকল করে চিৎকার করছে। এটাকেই কি বাঁদরামি বলে? গাছ আর শিকড়ের আলপনাই আমার চোখে এই স্পটের সবচেয়ে দর্শনীয় বলে মনে হল। পাহাড়ের পাদদেশে পরিত্যক্ত এক গুহা। এই স্থানে গুনা নামে এক তামিল ছবির শুটিং হবার পরেই মুখে মুখে নাম হয়ে গেছে গুনা কেভস্। পাহাড়ি রাস্তার শেষে সরু পথ গ্রিল দিয়ে ঘেরা, তার ফাঁক দিয়ে দৃষ্টি চলে যায় এক অতলস্পর্শী খাদে। ঢালহীন এই খাদ সোজা চলে গেছে অতলে। তবে শয়তানের রান্নাঘর তথা ডেভিলস্ কিচেনের সন্ধান পেলাম না।

আবার পথ চলা শুরু। রাস্তার একটা বাঁক থেকে দেখতে পেলাম ‘পিলার রকস্’। তিনটি উঁচু বিশাল পাথরের স্তম্ভ গায়ে গায়ে লেগে পিলারের আকারে দাঁড়িয়ে আছে উচ্চতা ৪ঙ্ম০ ফুট। কিন্তু ছবি তুলতে হলে কাছে যেতে হবে, ভিউপয়েন্টের টিকিট কাটতে হবে, ক্যামেরার চার্জ দিতে হবে। এইসব করতে গিয়ে মিনিট পাঁচেক সময় লাগল। ১০ টাকা প্রবেশ মূল্য আর ক্যামেরার চার্জ ২০ টাকা। ‘পিলার রকস্’ নামাঙ্কিত গেট পেরিয়ে একটা ঘাসে মোড়া ঝুলন্ত বারান্দায় প্রবেশ করলাম। কিন্তু এ কি ম্যাজিক, পিলার রকস্ উধাও! এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখি কোনও দিকেই দেখতে পাচ্ছি না। সামনে সবুজ ঘাসে মোড়া একটা পাথুরে পথের ওপর ছোটো ঝরনা কুলকুলিয়ে বয়ে যাচ্ছে। আশপাশের ভ্রমণার্থীদের জিজ্ঞাসা করায় জানাল, কয়েক মিনিট আগেই কুয়াশা এসে ঢেকে দিয়ে গেছে পিলার রকস্। এলাকা জুড়ে বেশ কয়েকটা গাছে হলদে রঙের কলকে ফুলের মতো ফুল ফুটে রয়েছে বরং বলা যায় ঝুলে রয়েছে। কুয়াশা পরিষ্কার হওয়ার জন্য কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে বেরিয়ে পড়ি পিলার

রকস্-এর বারান্দা থেকে।

কোদাইকানাল অঞ্চলে ছোটো বড়ো ঝরনা আছে বেশ কয়েকটা। পাম্বারপুরম এলাকায় একটা ছোটো বাজারের ধারে গাড়ি থামল। তার পাশ দিয়ে ঢালু কাঁচা পথ নেমে গেছে। সামনেই একটা ঝরনা সিঁড়ির মতো পর পর নেমে আসছে। এ ঝরনার উচ্ছ্বাস নেই, উচ্চতাও খুব বেশি নয়। অনেকটা নদীর মতো, ধাপ কাটা পথে নেমে নদীর মতো বয়ে যাচ্ছে। ড্রাইভার জানাল, এই ছোট্ট ঝরনার নাম পাম্বারপুরম ফল্স।

আকাশে মেঘ-কুয়াশা ঘনিয়ে আসছে। যখন গাড়ি ব্রায়ান্ট পার্কের সামনে থামল তখন ৫০ ফুট দূরেও কিছু দেখা যাচ্ছে না। মনে হল পার্কে ঢুকে কী হবে, যখন কিছুই দেখা যাবে না? তার ওপর প্রবেশমূল্য মাথা পিছু ৩০ টাকা আর ক্যামেরা চার্জ ২০ টাকা। তবুও প্রবেশমূল্য চুকিয়ে আমরা ভিতরে ঢুকলাম। ২০ একর এলাকা জুড়ে এই পার্কের বিস্তৃতি। ৭৫০ ধরনের গোলাপ, নানা ধরনের দুষ্প্রাপ্য অর্কিড, ফুলের গাছ এখানে প্রধান আকর্ষণ। ব্রায়ান্ট পার্ককে বলা হয় ফুলের বাগান। পাহাড়ের ঢালে নির্মিত এই পার্কের যেদিকে তাকানো যায় শুধু সবুজ আর সবুজ। বাৎসরিক ফুলের মেলা অনুষ্ঠিত হয় মে মাসে তখন ফুলের উৎসবে এলাকাটি হয়ে ওঠে নানা রঙে রঙিন।

প্রথমেই চোখে পড়ল গাছপালা ফুল দিয়ে তৈরি এক ট্রেনের মডেল। কম্পার্টমেন্ট, হেডলাইট, চাকা, ইঞ্জিন সবই নানান ফুল, পাতা, গাছের ডাল দিয়ে তৈরি। পাশেই বাগানের মধ্যে গান্ধি মূর্তি। নানা ধরনের ফুল গাছ সব ফুলের নাম তো জানি না, কিন্তু সৗন্দর্যের খাতিরে ছবি তুলি। গোলাপকে তো বিলক্ষণ চিনি। এখন সিজন নয় তবু বর্ণে গন্ধে মনকে ভরিয়ে দেয়। রয়েছে এক বিশাল পদ্মপুকুর, বেশি না হলেও কয়েকটি ফুল প্রস্ফুটিত। নানা রঙের বাঁধাকপির মতো দেখতে রঙিন ফুল ফুটে আছে, চেনা ফুল ডালিয়া, ক্রিসেনথিমাম, জিনিয়া তো আছেই। কাঁটা দেওয়া কান্ড মাথাটা পাম গাছের মতো, নাম লেখা রয়েছে ইউকা । লতানে গাছ ছেঁটে নানা ধরনের মডেল তৈরি হয়েছে। একটি রাক্ষসের মুখ তার মধ্যে আকর্ষণীয়।

বাগানের এক ধারে রয়েছে গ্রিন হাউস সেখানে রয়েছে সব দুষ্প্রাপ্য গাছ ও অর্কিড। বাগানের মধ্যেই একটা বোর্ডে ব্রায়ান্ট পার্ক সম্পর্কে নানা তথ্য দেওয়া আছে।  হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে গেলাম একটা বেশ বড়ো লনের মধ্যে। চারদিক গাছ দিয়ে ঘেরা। মাঝে একটা উঁচু স্তম্ভের শীর্ষে অশোকস্তম্ভ। সামনে বেঞ্চ পাতা। লনে বাচ্চারা ছোটাছুটি করে খেলে বেড়াচ্ছে এই নির্মল পরিবেশে। পার্কের ভ্রমণের সময় সীমা পেরিয়ে গেছে, ফিরে আসি গাড়ির কাছে। ড্রাইভার চাইছে এখনই লাঞ্চ ব্রেক নিতে, আমরা চাইছি আরও একটু ঘুরে নিতে– কখন যে মেঘকুয়াশার দল আবার সব ঘিরে দেবে কে জানে!

travel kodaikanal

গ্রিন ভ্যালি ভিউ নামই বলে দিচ্ছে এখান থেকে কী দেখা যাবে। লেক থেকে দূরত্ব প্রায় ৫ কিমি। এই শহরে সমস্ত দূরত্বই লেক থেকে মাপা হয়। সামনেই এক বাজার। বাজারের মধ্যে দিয়ে সরু সিঁড়ি চলে গেছে গ্রিন ভ্যালি ভিউ পয়েন্টে। জায়গাটি রেলিং দিয়ে ঘেরা, দেখা গেল তবু কুয়াশা আর মেঘের কুণ্ডলী। এই স্পটের আগের নাম ছিল সুইসাইড পয়েন্ট এখন গ্রিন ভ্যালি ভিউ। তা হলে বোধহয় মেনে নিতে হবে এই অঞ্চলে সুইসাইড করার প্রবণতা কমে গেছে। পাশেই গল্ফ ক্লাব ৬০০০ ফুট উচ্চতায়। ১০০ একরের বেশি জায়গা জুড়ে ঢেউ খেলানো সবুজ প্রান্তরে ১৮ হোলের গল্ফ কোর্স।

এবার আমরা মন্দির দেখতে যাব– কুরুঞ্জি আন্দাভার মন্দির। মাঝারি আকারের মন্দির বিশেষ ভিড় নেই এই দুপুরে। এই মন্দিরে মুরুগান মূর্তি পূজিত হয় অর্থাৎ এটি কার্তিক মন্দির। মন্দিরে গোপুরম আছে তবে উচ্চতা বেশি নয়। তামিল ভাষায় কুরুঞ্জি মানে পার্বত্য এলাকা আর আন্দাভার মানে দেবতা। তাই মুরুগানকে এখানে পর্বতের দেবতা বলা হয়। কোদাইকানালের অন্যতম আকর্ষণ এখানকার একটি গাছ কুরুঞ্জি। এই গাছে প্রতি ১২ বছর অন্তর ফুল ফোটে। আর তখন সারা কোদাই বেগুনি রঙে রঙিন হয়ে ওঠে। এই দশকের শেষ ফুল ফোটে ২০১৬ সালে। মন্দিরের বাইরে অনেক দোকান, পূজার উপকরণ ছাড়াও নানা ধরনের উপহার দ্রব্য হস্তশিল্প পাওয়া যাচ্ছে। এখানে হাতির আর রাক্ষসের মুখোশ বিক্রি হচ্ছে তার সঙ্গে চা, মশলা, হোম মেড চকোলেট, ওষধি তেলও পাওয়া যাচ্ছে।

মন্দিরের পাশেই একটি রেলিং দেওয়া বারান্দা– এটি পালানি ভিউপয়েন্ট। পরিষ্কার দিনে এখান থেকে পালানি মন্দির ও ভাইগাই ড্যাম দেখা যায়। কিন্তু আজকে এই মেঘ-কুয়াশার সাম্রাজ্যে এই দৃশ্য দেখা সম্ভব ছিল না।

একই রাস্তায় ফেরা। রাস্তার ধারেই চেত্তিয়ার পার্ক। ব্রায়ান্ট পার্ক দেখার সময় মেঘ-কুয়াশা জমাট বেঁধে ছিল, এখন অনেকটা পরিষ্কার। শহরের উত্তর-পূর্বে চেত্তিয়ার রোডের ওপর এর অবস্থান। গেট থেকে সিঁড়ি দিয়ে নেমে পার্কের মধ্যে প্রবেশ করি। পথের দুপাশে লতানে গাছ ছেঁটে পাঁচিলের আকার দেওয়া হয়েছে, মাঝে মাঝে রয়েছে আর্চ। বাগানের বিভিন্ন ধাপে নানা বর্ণের ফুল গাছ। লাল হলুদ বেগুনি গোলাপি সব রং মিলে যেন ফুলের এক রামধনু সৃষ্টি হয়েছে। চিনতে পারলাম ডালিয়া, ক্রিসেনথিমাম, জিনিয়া, মোরগঝুঁটি, ক্যানা প্রভৃতি গাছ– এছাড়া আরও অনেক ফুল। লতানে গাছ ছেঁটে বাগানের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে ছাতা, ভল্লুক, ময়ূর তাও বেশ দৃষ্টিনন্দন। পার্কের মধ্যে বসার ব্যবস্থাও আছে। টিপ টিপ করে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। মেঘও ঘনিয়ে আসছে। আমরা পার্ক থেকে বেরোনোর উদ্যোগ নিলাম। চেত্তিয়ার রোড ধরে ফেরার পথে দেখা হল এক জৈন মন্দির– শ্রীবর্ধমান মহাবীর ভগবান মন্দির। শ্বেত পাথরের মন্দিরে মহাবীরের মূর্তি শোভা পাচ্ছে। ছোটো হলেও শ্বেত পাথরের সুন্দর কারুকার্য চোখে পড়ে। মনে হয় মন্দিরটি হাল আমলের। এবার সোজা লেকের কাছে আমাদের হোটেলের ডাইনিং হলে। আজ আমরা চাইনিজ খানা খাব, চাউমিন আর চিলি চিকেন। একটু বিশ্রাম তারপর শেষপর্বের ভ্রমণ।

আমাদের হোটেলের কাছেই মাউন্ট জিয়ন লুথেরান চার্চ এক ঝলক দেখে বেরিয়ে পড়লাম ৫ কিমি দূরে বেয়ার শোলা ফল্স দেখতে। এই প্রপাতটাতে ভল্লুক জল খেতে আসত বলে হয়তো এই নামকরণ। গাড়ি যেখানে থামল সেটা শহরের এক প্রান্তে। নতুন নতুন বাড়িঘরে এলাকাটি ঝলমল করছে। এখানে কোথায় জলপ্রপাত? ড্রাইভার অবশ্য দেখিয়ে দিল একটি সরু অরণ্যময় পথ। সেই পথে কয়েকজন স্ত্রী-পুরুষ বাচ্চা এগিয়ে চলেছে। কিছুটা তাই দেখে আশ্বস্ত হলাম। কিন্তু একটু পরেই দেখি সেই পরিবার মুখ ঘুরিয়ে ফেরার পথ ধরেছে। জিজ্ঞাসা করলাম ফল্স কত দূর?

–জানি না। সামনে জঙ্গল এগোতে ভরসা পাচ্ছি না, তাই ফিরে যাচ্ছি।

এ তো ভয়ের কথা। প্রথমে ইউক্যালিপটাস গাছের বেশ বড়ো জঙ্গল। তারপর পথ সরু হয়ে গেছে। দুপাশেই ঝোপজঙ্গল। লোহার জাল দিয়ে পথটি জঙ্গল থেকে আলাদা করা ছিল তাও ভেঙেচুরে একাকার। একটা যেন রহস্যময় পরিবেশ এলাকা জুড়ে। এছাড়া কোনও মানুষজনের এখনও দেখা পাইনি। আমরা এগিয়ে চলি সেই সরু পথ ধরে। শুকনো পাতার মচমচ শব্দ ছাড়া আর কোনও শব্দ নেই। একটা নালার ওপর ছোটো ব্রিজ পেরিয়ে এবার পথ গেছে ডান দিকে। মিনিট দশেক হাঁটার পর জলের একটা শব্দ পাওয়া গেল। মনে হচ্ছে আমরা প্রপাতের কাছাকাছি চলে এসেছি। আরও মিনিট দুয়েক হাঁটার পর চোখের সামনে প্রতিভাত হল জঙ্গলের মধ্যে পাথরের গা বেয়ে নামছে প্রপাতের জলধারা। তবে ধারাটি খুব চওড়া নয়। সামনে বিরাট একটা পাথরের চাতাল, তার পাশ দিয়ে জল প্রবাহিত হচ্ছে। তখনই দুজন ভ্রমণার্থীর দেখা মিলল– একজন পুরুষ অন্যজন মহিলা, তারা নানা ভঙ্গিমায় ছবি তোলায় ব্যস্ত। প্রপাতটি আহামরি নয়, জলের ধারাটিও সরু কিন্তু এই পরিবেশ, পথ অনেকদিন মনে থাকবে আমার। এবার ফেরার পথ ধরি।

গাড়ি এবার কোদাই শহর ছেড়ে নীচের দিকে নামতে শুরু করল। থামল প্রায় ৬ কিমি পরে সেক্রেড হার্ট কলেজের সামনে, বড়ো রাস্তা থেকে ঢুকে একটা গলির মধ্যে। ১৮৯৫ সালে স্থাপিত এই কলেজটি বিশাল এলাকা জুড়ে আর দোতলার বারান্দাতে জিশুর মূর্তি। এই কলেজের মাধ্যমে নানাধরনের সামাজিক কল্যাণমূলক কাজ করা হয়ে থাকে। এর মধ্যে আছে পরিবেশ, আধ্যাত্মিক, সামাজিক ও শিক্ষা বিষয়ক নানা কাজকর্ম। স্লঁদের পরিচালনায় স্থাপিত হয়েছে শেন বাগানুর মিউজিয়াম ও অর্কিডোরিয়াম। সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৬টা পর্যন্ত খোলা থাকে, প্রবেশমূল্য ২০ টাকা। এই মিউজিয়ামে দেখলাম বিভিন্ন পাহাড়ি উদ্ভিদের সংগ্রহ, রয়েছে ৩০০ ধরনের অর্কিড। এখানে আছে স্টাফ করা নানা ধরনের পাখি ও জন্তু-জানোয়ারের দেহ। রয়েছে ফরেস্ট ঈগল, পেঁচা, হরিণ, পাইথন, নীলগিরি উড পিজন, প্যারাকিট, টিট, কোয়েল, চিল প্রভৃতির স্টাফ করা দেহ। এর সঙ্গে রয়েছে প্রজাপতি ও প্রাচীন মুদ্রার সংগ্রহ। এই পাহাড়ের জীবজন্তু, পরিবেশের চিত্র এবং মডেলও উপস্থাপিত হয়েছে।

ফেরার পথে আবার সিলভার কাসকেড ফলসে একটু বিরতি আর ছবি তোলা। কোদাইকানালের দ্বাররক্ষী এই প্রপাত যেন বলছে আবার এসো।

কীভাবে যাবেন -হাওড়া থেকে সাপ্তাহিক কন্যাকুমারী এক্সপ্রেসে কোদাইকানাল রোড স্টেশনে নেমে সড়কপথে ৮০ কিমি দূরে কোদাইকানাল। অথবা হাওড়া থেকে ট্রেনে চেন্নাই পৌঁছে, ট্রেন বদলে কেদাইকানাল রোড বা মাদুরাই হয়েও যাওয়া যায়। মাদুরাই থেকে সড়কপথে দূরত্ব ১২০ কিমি। কোদাইকানাল ঘোরার জন্য বিভিন্ন প্রাইভেট সংস্থা নানা ধরনের কনডাকটেড টুরের ব্যবস্থা করে। হোটেল থেকেই তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেবে।

কোথায় থাকবেন – কোদাইকানালে হোটেলের অভাব নেই। তামিলনাড়ু পর্যটন দফতরের হোটেল ছাড়াও অনেক প্রাইভেট হোটেল রয়েছে। এখানে এপ্রিল থেকে জুন মাস হল সিজন টাইম। অন্য সময়ে হোটেল ভাড়ায় কিছুটা ছাড় থাকে। তামিলনাড়ু পর্যটন দপ্তরের হোটেল বুকিং ও ভ্রমণ সংক্রান্ত তথ্য জানতে যোগাযোগ করুন– জি-২৬ দক্ষিণাপন শপিং কমপ্লেকস। ২ গড়িয়াহাট রোড কলকাতা-৭০০০৬৮, ফোন ৮৯৬১৩৯৪০১৭।

বসুন্ধরা অ্যাপার্টমেন্ট

মধ্যমগ্রামের এই পাড়াটা বেশ নিঝুম। পাড়াজুড়ে ছোটো ছোটো বাড়ি, খান দুয়েক পুকুর। মধ্যবিত্ত বসতি বললেও ভুল হয় না। কিন্তু সব জায়গাতেই এখন প্রোমোটারের চোখ। তারা গৃহস্থকে বসতবাড়ি বেচে, ফ্ল্যাট আর নগদ টাকার লোভ দেখাচ্ছে অ্যাপার্টমেন্ট তৈরি করার অভিপ্রায়ে। সেই লোভেই মধুসূদনবাবু তাঁর পৈতৃক ভিটে আর সংলগ্ন বেশ কিছুটা বাগান বেচে দিয়েছেন দুলাল প্রোমোটারকে। সেখানেই গড়ে উঠেছে এই বসুন্ধরা অ্যাপার্টমেন্ট আধুনিক জি প্লাস ফোর ফর্মুলায়।

এ পাড়ায় এত বড়ো বাড়ি এই মুহূর্তে ওই একটিই। অ্যাপার্টমেন্ট-এ বাকি বাসিন্দারা সকলেই এসেছেন অন্যান্য জায়গা থেকে। একতলাটা পুরোটাই মধুসূদনবাবু ও তাঁর পুত্রের পরিবারের দখলে। দুতলার দুটি ফ্ল্যাটের একটিতে প্রভাতিদেবী একাই থাকেন। একসময় রবীন্দ্রসংগীতের শিল্পী ছিলেন। বিয়ে করেননি। অন্য ফ্ল্যাটটি আগাগোড়াই তালাবন্ধ। কোণার দিকের দুটি ফ্ল্যাটের মাঝের দেয়াল ভেঙে একটাই করে নিয়েছেন মেরিন ইঞ্জিনিয়ার শোভন সোম। বছরে ছমাস জলে, ছমাস স্থলে থাকেন তিনি। বিরাট ফ্ল্যাটে বেশির ভাগ সময়টাই তাঁর বউ কেয়া, একাই থাকে।

তিনতলায় একটি ফ্ল্যাট সদ্য বিক্রি হয়েছে। কিন্তু বাসিন্দারা এখনও আসেননি। বাকি তিনটিতে থাকেন, মানস ও রূপা সান্যাল ও তাদের দুটি ছেলেমেয়ে চক্রবর্তী পরিবারের মোট ছজন। আর কোণার ফ্ল্যাটটায় সোনালি ও শুভম নামের এক নবদম্পতি।

চারতলায় ফ্ল্যাটে থাকে সাহা পরিবার। এক ছেলে, বউ, নাতিকে নিয়ে স্বপন সাহাবাবু। স্ত্রী বিয়োগের পর ছেলে এখানেই নিয়ে এসেছে তাঁকে। অন্য তিনটিতে যথাক্রমে প্রবীর জানা, মহেশ জালান, হাবিবুর রহমান ও তাঁদের পরিবার৷

বস্তুত বসুন্ধরা অ্যাপার্টমেন্ট যেন এক মিনি ভারতবর্ষ। বিবিধের মাঝে মিলন মহান। অর্থাৎ ফ্ল্যাটের সকলে সকলের পরমাত্মীয়। হোলি, দীপাবলি, ইদ, সরস্বতী পুজো, সবই ছাদে হয় ধুমধাম করে। আর মাঝে মাঝে ছাদের উপর ছোটোখাটো পিকনিক বা ফিস্ট তো লেগে থাকেই।সারাদিন ছাদে হুটোপাটি করে বেড়ায় জানা, জালান ও সান্যালদের ছেলেমেয়েরা। বিকেলে ছাদে চুল বাঁধতে ওঠে বাড়ির গিন্নিরা। এ ওর চুলের পরিচর্যা করে দেয়। বিনুনির গিঁটে বাঁধা থাকে কত সুখ-দুঃখের সখ্যতার গল্প। সকলে সকলের পাশে থাকে বিপদে আপদে। চক্রবর্তী গিন্নীর পায়ে বাতের তেল মালিশ করে দিচ্ছিল রূপা। আয়েশে চোখ বুজে সদ্য বিবাহিতা সোনালিকে বলেন চক্রবর্তী গিন্নি,

-হ্যাঁ লা সোনালি কবে বাচ্চাকাচ্চা আনবি তুই। যেভাবে বাতে ধরেছে আমায়, আর কবে মানুষ করব তোর ছেলে!

সবাই হাসিতে ফেটে পড়ে, সোনালি লাল হয়ে যায় লজ্জায়।

-আহ্ জেঠি, তোমার যত তাড়া। একটু হাসতে খেলতে দাও মেয়েটাকে। সদ্য বিয়ে হয়েছে, আগে কটা দিন একটু সোহাগ করুক, বলে রূপা। আবার হাসিতে ফেটে পড়ে সকলে। এভাবেই নানা সুখ-দুঃখ-আনন্দ নিয়ে রোজ বিকেলে ছাদের এই মজলিশ বসে বসুন্ধরা অ্যাপার্টমেন্ট-এর বাসিন্দাদের।

মাস খানেক পর দুপুরে তিনতলার মেরিন ইঞ্জিনিয়ারের বউ কেয়া খেয়ে উঠে স্নান করে কলঘরে রাখা ভিজে জামাকাপড় বারান্দায় মেলতে এল। নীচে তাকাতেই খেয়াল করল একটা বড়ো ম্যাটাডর থেকে কাদের যেন প্রচুর আসবাব, জিনিসপত্র নামানো হচ্ছে। একটা ইনোভা গাড়ি থেকে নামলেন এক দম্পতি। দুজনেই পঞ্চাশোর্ধ। তারাই তদারক করে তাদের অ্যাপার্টমেন্ট-এ মালগুলো তোলাতে শুরু করলেন। কেয়া বুঝল, তার ফ্লোরের বিক্রি হওয়া ফ্ল্যাটটির বাসিন্দারা এসে গেছে।

আইপিস দিয়ে দেখল, যা ভেবেছে তাই। একটা নেমপ্লেট লাগানোর কাজ চলছে, তাতে লেখা, নির্মল চ্যাটার্জী-সোমা চ্যাটার্জি। কেয়া একটু নিশ্চিন্ত হল, যাক একই ফ্লোরে কথা বলার দুটো লোক পাওয়া যাবে। এমনিতে তো তার একা একাই কাটে বছরের ছটা মাস। ফোনে বাকি ফ্ল্যাটের বাসিন্দাদের সুখবরটা জানিয়ে দেয় কেয়া।

সবাই হইহই করে নেমে আসে অতিথিদের অভ্যর্থনা জানাতে, আলাপ জমাতে। মিসেস জানা, পার্বতী জালান, সফিউন্নিসা সবাই খুব আন্তরিক ভাবেই এগিয়ে যায়, জিনিসপত্র ঘরে ঢোকাতে সাহায্য করে।

কেয়া এগিয়ে এসে বলেন কাকিমা আজ রাতে আর রান্না করতে হবে না। আমার কাছেই খাবেন।

রূপা বলে আপনারা একটু জিরিয়ে নিন, আমি এখুনি চা নিয়ে আসছি।

সাহাবাবুর বউমা স্বরলিপি বলে, কাকিমা আপনার গ্যাসের কানেকশন যতদিন না হচ্ছে, আমি আমার এক্সট্রা সিলিন্ডারটা দিয়ে যাব। আপনার অসুবিধে হবে না।

এরকম প্রতিবেশী পাওয়া বিরল। কিন্তু এক্ষেত্রে ঘটল ঠিক উলটো। সোমা চ্যাটার্জী প্রায় তিরিক্ষি মেজাজে সবার উদ্দেশ্যে বলে উঠলেন আপনাদের কারও থেকে কোনও সাহায্য লাগবে না। এখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মজা না দেখে যে-যার ঘরে ঢুকে যান। আমরা সব সামলে নেব। অযথা গায়ে পড়া আমার পছন্দ নয়।

ওনার স্বামী নির্মলবাবু বাধা দিয়ে বলতে যান

-আহ্ সোমা…

-তুমি থামো তো! সাহায্যের নামে সব কৌতুহল মেটাতে এসেছে। বুঝি না আমি! বললেন সোমা।

এরপর আর দাঁড়িয়ে থাকা যায় না। যে যার ঘরে ঢুকে গেল। এরকম অপ্রীতিকর একটা পরিস্থিতি কখনও হয়নি বসুন্ধরা অ্যাপার্টমেন্ট-এ। পুরো বাড়িটা কেমন থম মেরে গেল। বাচ্চারা অন্যান্য দিনের মতো আজ সিঁড়ি দিয়ে দৌড়োদৌড়ি করল না বড়োদের নিষেধ মেনে।

দিন দুয়েক পর বাকিরা কিছুটা স্বাভাবিক হলে, সেদিন প্রায় সারারাত অবধি তারস্বরে ঝগড়া চলল সদ্য আগত চ্যাটার্জী দম্পতির মধ্যে। এমনই সেই ঝগড়া আর বাসন ছোড়ার শব্দ যে, বাসিন্দারা হতবাক।

পরদিন বিকেলে ছাদের মজলিশে নিচুস্বরে ওই একটিই প্রসঙ্গ আলোচিত হল। চক্রবর্তী গিন্নি সব শুনে বললেন,

– নিশ্চয়ই ওদের মধ্যে কিছু নিয়ে অভাব বোধ আছে, বুঝলি। পয়সাই কী সব নাকি!

সত্যি বলতে কী সবার কৌতুহল বাড়ল। এই বয়সি দম্পতি এভাবে ঝগড়া করে কেন!

সপ্তাহ খানেক পর বাচ্চারা সিঁড়িতে হইচই করছিল। সোমা চ্যাটার্জী দরজা খুলে ঠাস করে একটি বাচ্চার গালে এক চড় লাগিয়ে দিলেন।

-পুজোয় বসেছি, আর তোরা চিত্কার করছিস, আপদের দল!

বাচ্চারা খেলা থামিয়ে মুখ চুন করে যে যার বাড়ি চলে গেল। এই দম্পতি তাদের কাছেও ত্রাস হয়ে উঠল।

দিন যায়, চ্যাটার্জী দম্পতির ঝগড়ার মাত্রাও বাড়ে। ওষ্ঠাগত হয়ে ওঠে বাকিদের প্রাণ। অ্যাপার্টমেন্ট-এর মিটিং-এ ডাক পড়ে চ্যাটার্জীদের। ওঁরা কেউ আসার প্রয়োজনই মনে করেন না।

চক্রবর্তী মশাই বলেন, ওদের নিয়ে ভেবে লাভ নেই। মাথায় গণ্ডগোল আছে মনে হয় মহিলার। প্রসঙ্গটা তখনকার মতো চাপা পড়ে গেল। ঠিক হল, সামনেই হোলি। প্রতি বছরের মতো এবছরও বিকেলে ছাদে বসন্ত উত্সব হবে। তারপর খাওয়া দাওয়া। ওঁদেরও নিমন্ত্রণ করা হবে। এলে ভালো, না এলে আর কোনও কিছুতেই ওদের আমন্ত্রণ জানানো হবে না।

হোলি হ্যায়… আজ আর বাচ্চাগুলোকে আটকায় কার সাধ্যি। সবার ফ্ল্যাটে ঢুকে ঢুকে রং মাখাচ্ছে তারা। আনন্দ জিনিসটা খুব ছোঁয়াচে। বড়োরাও তাদের সঙ্গে সামিল হয়ে যাচ্ছে আবির খেলায়। কমবয়সি বউ-রা মিলে একটা থালায় আবির নিয়ে ফ্ল্যাটে ফ্ল্যাটে গিয়ে বড়োদের পায়ে আবির দিচ্ছে। এই উত্সবের দিনে সোমা চ্যাটার্জীকেও বাদ দিতে ইচ্ছে হল না তাদের। সাহস করে কলিংবেল বাজিয়ে ফেলল কেয়া। অপমানিত হবে ভেবেও তারা ঠিক করেছে, আজ কাকিমা খারাপ কিছু বললেও, তাঁকে টেনে নিয়ে আসবে রঙের খেলায়। রাতের খাওয়াদাওয়ার তো জোগাড় করতে হবে সবাই  মিলে। জানাবাবু, রহমানসাহেব বাজারে গেছেন সব কিনেকেটে আনতে।

বেল বাজিয়ে কেয়ারা অপেক্ষা করতে থাকে। কিন্তু দরজা খুলে যিনি বেরিয়ে এলেন, তিনি যেন তাদের চেনা ওই রণচণ্ডী সোমা কাকিমা নয়। যেন সদ্য তার উপর দিয়ে ঝড় বয়ে গেছে, এরকম অসহায় উদ্বিগ্ন একটা চেহারা নিয়ে সোমা কাকিমা দাঁড়িয়ে৷

-কী হয়েছে কাকিমা? স্বরলিপি প্রশ্ন করে। কিছু বলতে পারেন না সোমা, হাউহাউ করে কেঁদে ওঠেন। বাথরুমের দিকে আঙুল দেখান। সকলে সেদিকেই ছুটে গিয়ে দেখে মেঝেতে চিৎ হয়ে পড়ে আছেন নির্মলবাবু অচেতন অবস্থায়, রক্তে ভেসে যাচ্ছে মেঝে। সোফায় সোমাকে বসিয়ে কেয়া জানতে চায়,

– কী করে এসব হল কাকিমা!

-সকালে একটু আগে বাথরুম গেল। শরীরটা ভালো নেই কাল রাত থেকে। আমি বললাম, দরজাটা ভেতর থেকে লক কোরো না বাথরুমের। আমি রান্নাঘরে ছিলাম। হঠাৎ খুব জোরে একটা শব্দ হয়। ছুটে এসে দেখি এই দৃশ্য!

এরপর ছোটাছুটি, অ্যাম্বুল্যান্স। বাইপাসের একটা বড়ো নার্সিংহোমে নিয়ে যাওয়া হয় নির্মলবাবুকে। স্ট্রোক হওয়ায় এই বিপত্তি। মাথার পেছনের একটা অংশ ফেটেও গেছে, পড়ার সময় কোমোডে ধাক্কা লেগে। বেশ কটা দিন ভর্তি থাকতে হবে নির্মলবাবুকে।

রোজ পালা করে কেউ না কেউ সোমা চ্যাটার্জীর সঙ্গে নার্সিংহোমে গেল বসুন্ধরা অ্যাপার্টমেন্ট থেকে। সোমা স্বীকার করেছেন, তাঁর এই রূঢ়ভাষণের জন্য সব আত্মীয়রা সম্পর্কচ্ছেদ করেছে তাঁদের সঙ্গে। আসলে সন্তানহীনতায় পারস্পরিক দোষারোপ, তাদের দাম্পত্য সম্পর্কটা তিলে তিলে শেষ করে দিয়েছিল। এই ঘটনা না ঘটলে হয়তো সোমা অনুভব করতেন না, ফল্গুর স্রোতের মতো কোথাও একটা অব্যক্ত অদেখা ভালোবাসার স্রোত তার ভেতর এখনও বয়ে চলে। শুধু নির্মলের জন্যই নয়, আশপাশের মানুষগুলোর প্রতি ব্যবহারেও একটা পরিবর্তন আনার জন্য, হয়তো খুব দরকার ছিল এই ঘটনাটার।

দিন পনেরো সময় লাগল বটে কিন্তু আস্তে আস্তে নার্সিংহোমে সুস্থ হতে শুরু করলেন নির্মল। প্রতিদিনই সোমা গিয়ে তাঁর সঙ্গে বেশ খানিকটা সময় কাটায়। একদিন খুব খুশি হয়ে সোমা জানালেন, ডাক্তারবাবু অনুমতি দিয়েছে, নির্মলকে এবার বাড়ি নিয়ে যাওয়া যাবে।

যথা সময়ে দিনকুড়ি পর বাড়ি ফিরলেন নির্মল। সবাই দেখতে এল। বসুন্ধরা অ্যাপার্টমেন্ট-এ আজ আবার খুশির জোয়ার। হোলির দিনের সেই আনন্দানুষ্ঠান পণ্ড হয়েছিল। সোমা তাই ঘোষণা করলেন এবার একদিন পিকনিক-এর আয়োজন করো তোমরা, সব খরচা দেব আমি আর তোমাদের কাকু। সফিউন্নিসা তুমি বিরিয়ানি রাঁধবে। হইহই করে ওঠে সকলে। এ যেন এক নতুন মানুষকে ফিরে পেল তারা। শুধু নির্মলবাবুরই যে নবজন্ম হল তা নয়, সোমাও যেন এক নতুন অধ্যায় শুরু করলেন তাঁর জীবনের।

এরপর আরও প্রায় তিনমাস কেটে গেছে। চ্যাটার্জী দম্পতি ঠিক করলেন কদিনের জন্য বৃন্দাবন ঘুরে আসবেন। যা ঝড় গেল জীবনের উপর। মন শান্ত করতে একটু তীর্থ করলে ভালোই লাগবে। শেষ অবধি বাক্স গুছিয়ে একদিন রওনা হলেন নির্মল ও সোমা।

বৃন্দাবনের মন্দিরের ঘন্টাধ্বনি, কর্পূরের গন্ধ, সবমিলে মনটা ভারি শান্ত হয়ে এল সোমার। চাতালের এক কোণে বসে সেই শান্তিই অনুভব করছিলেন তিনি। আশপাশ দিয়ে বহু পর‌্যটক ও ভক্তদের আনাগোনা দেখছিলেন সোমা। অসংখ্য বিধবার জীবন কেটে যায় মন্দিরের চাতালে বসে, ভোগ প্রসাদ খেয়ে৷ এ এক দুঃখের অধ্যায়, যার সঙ্গে জীবনে এই প্রথমবার পরিচিত হচ্ছিলেন সোমা।

হঠাৎই চোখ গেল মন্দিরের এক কোণায় এক প্রৌঢ় ভদ্রলোকের পা ধরে একটি বছর কুড়ির বউ কান্নাকাটি করছে আর জড়ানো গলায় কী যেন বলছে। প্রৌঢ়টি অন্য দিকে মুখ ফিরিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। কিছুটা বিহ্বল হয়ে যেন কী করবেন ভেবে পাচ্ছেন না। কৌতূহল চাপতে না পেরে সোমা এগিয়ে গেলেন সেদিকে। শুনলেন মেয়েটি কাতর স্বরে বলছে,

-মুঝে ছোড়কে না জাইয়ে ঠাকুরজি, ম্যায় এক কোণে মে পড়ি রহুঙ্গি। ঘর মে রহনে দিজিয়ে ঠাকুরজি।

মেয়েটি এবার অঝোরে কাঁদতে শুরু করে। পাশে একটা পুঁটলি রাখা। সাদা থান পরা এত অল্পবয়সি বিধবা দেখে মায়া হল সোমার। মেয়েটির সঙ্গের ওই প্রৌঢ়র এবার চোখ যায় সোমার দিকে। সোমা অস্বস্তি কাটিয়ে প্রশ্ন করেন,

– কী হয়েছে ওর!

প্রৌঢ় বলেন, কা বলু বহনজি। এ হামার কপাল। এ আমার সব সে ছোটা ভাইয়ের বউ আছে। শাদি হল কি এক মাস পরেই ভাই মরে গেলো। ঘর মে সব একে ডাইন বলল। সবাই চাইল কি এই বেওয়াকে আমি এই মন্দিরেই ছোড়ে যাই।

সোমা প্রায় আঁতকে উঠলেন ঘটনাটা শুনে। মন্দির প্রদক্ষিণ সেরে নির্মলও তখন এগিয়ে এসেছেন এদের দিকে। সব শুনে তিনিও হতবাক। বললেন,

– এই যুগে কোথায় পড়ে আছেন আপনারা! এমন আবার হয় নাকি। কম বয়সি একটা মেয়ে৷ ওতো অন্ধকারে হারিয়ে যাবে, এখানে ফেলে রেখে গেলে।

-সে আমি কুছু জানি না বাবু। আমরা বিহারের আরা জিলার লোক। আমাদের গ্রামে অনেক ঝামেলা হোবে যদি একে আমি লিয়ে যাই।

সোমা ও নির্মল পরস্পরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করলেন। কী যেন ভাবলেন দুজনেই। তারপর সোমা মেয়েটিকে বললেন,

– তুম হমারে সাথ কলকত্তা যাওগি? মেয়েটি অসহায়ের মতো একবার তাদের দিকে একবার ওই প্রৌঢ়ের দিকে তাকাচ্ছে। প্রৌঢ়ও খানিক অবাক হয়ে বললেন,

-আপনারা ওকে লিয়ে যাবেন, সত্যি? বলে পা দুটো ধরে ফেললেন নির্মলের।

নিয়ে যান বাবু, পিংকি খুব ভালো মেয়ে খুব সেবা করবে আপনাদের। ঘরের সব কামকাজ করে নিবে।

পিংকি নামের মেয়েটি বাংলা বলতে না পারলেও, কথোপকথনটা বুঝতে পেরে, চোখের জল মুছে একটু ধাতস্থ হল। হয়তো বুঝল ভাগ্যকে মেনে নিতেই হবে তাকে। এখানে এই বৃন্দবনের মন্দিরে তার বৈধব্যকাল কাটাতে পারবে না সে। অচিরেই কারও কুদৃষ্টি পড়বে। শেয়াল-কুকুরে ছিঁড়ে খাবে তাকে।

বসুন্ধরা অ্যাপার্টমেন্ট-এ আজ আবার নতুন অতিথির আগমন। পিংকির কাহিনি শুনে সকলে বেশ অবাক। দশদিনের বৃন্দাবন সফর সেরে চ্যাটার্জী দম্পতি একা ফেরেননি, একটি ফুটফুটে যুবতিকে উদ্ধার করে এনেছেন এই কাহিনি এখন সবার মুখে মুখে।

দিন যায়, পিংকিও এখন অনেকটাই অভ্যস্ত হওয়ার চেষ্টা করছে কলকাতার আদবকায়দার সঙ্গে। চ্যাটার্জী দম্পতি মোটেই কাজের লোকের মতো আচরণ করেননি তার সঙ্গে। বরং সে এ বাড়িতে রয়েছে তাদের মেয়ের মতোই। উলটোদিকের ফ্ল্যাটের কেয়ার কাছে রোজ দুপুরে বাংলা লেখা-পড়া শিখতে যায় পিংকি। যে-কোনও জিনিস চট করে শিখে নেওয়ার ক্ষমতা তার আছে। ফলে বিহারের প্রত্যন্ত গ্রামের মেয়ের ছাপটা, সে মাস দুয়েকের মধ্যে বেশ কাটিয়ে ফেলেছে।

পিংকি ক্রমশ বসুন্ধরা অ্যাপার্টমেন্ট-এর হৃদস্পন্দন হয়ে উঠল। আজ এ ডাকে পিংকি আয় ফুচকা বানিয়েছি খেয়ে যা, তো কাল অন্য ফ্ল্যাটে ডাক পড়ে পিংকি শপিং-এ যাচ্ছি, যাবি? ফ্ল্যাটের বাচ্চাদেরও প্রাণ পিংকি দিদি৷ ছাদে ক্রিকেট খেলা থেকে ব্যাডমিন্টন, সবেতেই তাদের পিংকিকে চাই। এভাবেই প্রায় একটা বছর কেটে গেল। পিংকিকে এখন দেখলে কেউ বলবে না যে, সে অবাঙালি। সোমারও একটা মনের মতো সঙ্গী হয়েছে পিংকি।

এক দুপুরে সোমার আলমারি গুছিয়ে দিতে দিতে পিংকি বলল,

– মা একটা কথা কদিন ধরেই তোমায় বলব বলব করছি। রাগ করবে না বলো, তাহলে বলতে পারি।

-আরে বল না পাগলি, অত দ্বিধা না করে।

-বলছি যে মা, আমি বিউটি পার্লারের কাজ শিখতে চাই।

-কেন রে, তোর কী অভাব আছে এখানে?

-না মা, অভাব নয়। যে-সম্মান তোমরা আমায় দিয়ে, তা আমি স্বপ্নেও ভাবিনি আমি পাব।

চোখে জল এসে যায় পিংকির। সে সোমার কাছে এগিয়ে গিয়ে বলে,

-মা আমি সম্মানের সঙ্গে নিজের পায়ে দাঁড়াতে চাই।

পিংকির মুখের দিকে তাকিয়ে সোমা বোঝেন এই মেয়ের আত্মবিশ্বাস আর আত্মসম্মান দুই-ই প্রচুর। সোমা আর বাধা দেন না। পিংকির বিউটিশিয়ান কোর্স শুরু হয় পরের মাস থেকেই।

পিংকি কোর্স শেষ করে একটি পার্লারে কাজ পেয়ে যায়। তার আরও কদর বাড়ে বসুন্ধরা অ্যাপার্টমেন্ট-এ। কারও ফেসিয়াল, কারও আইব্রো, রোজ কারও না কারও ফ্ল্যাটে ডাক পড়ে পিংকির। পিংকির স্বপ্ন এবার সে ব্যাংক লোন নিয়ে একটা বিউটি পার্লার খুলবে বসুন্ধরার গ্যারাজে।

কিন্তু জীবন হয়তো পিংকির জন্য আরও কিছু সুখবর জমিয়ে রেখেছিল। এক শীতের দুপুরে চক্রবর্তী গিন্নি বাতের ব্যথা সামলে এলেন সোমার ফ্ল্যাটে। সোমা তখন একটা সোয়েটারের জন্য সবে ঘর তোলা শুরু করেছেন। পিংকি গেছে পার্লারে আর নির্মলবাবু দিবানিদ্রায় মগ্ন।

একটু আমতা আমতা করে কথাটা পেড়েই ফেললেন চক্রবর্তী গিন্নি। বললেন,

– শোনো সোমা, পিংকি মেয়েটি বেশ ভালো। এতদিন তো ওকে দেখছি। কিন্তু তুমিই বা সারাজীবন ওর কী করে দায়িত্ব নেবে। কিছু কি ভেবেছ ওর ভবিষ্যৎ নিয়ে

সত্যিই কিছু ভাবেননি সোমা। কথাটা শুনে একটু যেন থতমত খেলেন। চক্রবর্তী গিন্নি তার পানের ডিব্বা খুলে এক খিলি পান সোমার দিকে এগিয়ে দিয়ে অন্যটি নিজে গালে পুরলেন। তারপর একটু মিঠে রস চোখ বুজে গলধঃকরণ করে বললেন,

– ভেবো না অত। আমি পিংকির জন্য এক সুপাত্রের খোঁজ এনেছি।

এবার সোমার সত্যিই অবাক হওয়ার পালা। বললেন,

– মানে? কোথাকার পাত্র! কী ভাবে খোঁজ পেলেন দিদি?

-আরে তোমার চক্রবর্তীদাকে যাঁর কাছে দেখাই, ডক্টর ঝা, ওই মোড়ের মাথায় যাঁর চেম্বার, ওঁর ছেলেও এখন ডাক্তার হয়েছে। বাবার চেম্বারেই বসছে, প্রতি বুধ আর শুক্কুরবার। সেদিন তোমাদের দাদাকে নিয়ে দেখাতে গেছিলাম ডাক্তারখানায়। পিংকিও সঙ্গে গেল না?

-হ্যাঁ সে তো বললেন আপনার রিক্সা থেকে নামা-ওঠা কষ্ট, পিংকি গেলে একটু সুবিধা হয়।

-হ্যাঁ, ঠিক তাই। ওখানেই ডাক্তারের ছেলে দেখেছে পিংকিকে। দেখতে শুনতে ভালো, চটপটে এমন মেয়ে– কচি ডাক্তার তো ভারি পছন্দ করে ফেলেছে গো তোমাদের পিংকিকে!

-তাই নাকি! কী নাম ছেলেটির?

-ওর নাম পবন। ডক্টর ঝা-এর স্ত্রী আমার অনেকদিনের চেনা। মল্লিকা। সে-তো আমায় তার দিনদুয়েক পরেই ফোন করেছে। কে এসেছিল তোমার সঙ্গে। পবনের খুব পছন্দ তাকে। শিগগিরি বলো। তা আমি বাপু সবই বলেছি। ওর ব্যাপারে কিছু লুকোইনি।

-ঠিকই করেছেন দিদি। লুকোনোর প্রয়োজনই বা কী। সব শুনে যদি ওকে কেউ বিয়ে করতে চায়, আমাদের আপত্তি নেই।

-তুমি ভেবো না সোমা। পিংকি আমাদের ভালোই থাকবে। মল্লিকা আমার ছোটোবেলার বন্ধু। ও আমার বাপের বাড়ি ধানবাদেরই মেয়ে৷ডা. ঝা-দের পরিবার খুব দরাজ মনের। উনিও বিহারের একটা ছোটো গ্রাম থেকে উঠে এসে আজ ডাক্তার হিসেবে নাম করেছেন। ছেলেটিও প্রতিষ্ঠা পেতে শুরু করেছে।

এরপর আর দ্বিধার কোনও অবকাশই থাকে না। এর পরের কয়েকটা মাস কারও দম ফেলার ফুরসত থাকে না বসুন্ধরা অ্যাপার্টমেন্ট-এ। বিয়ে বলে কথা। সবাই একটিই পরিবার হয়ে লেগে পড়ে বিয়ের তোড়জোড়ে। পিংকি প্রথমে কিঞ্চিৎ আপত্তি তুলেছিল, মা-বাবাকে ছেড়ে সে যেতে চায় না বলে। কিন্তু পাড়াতেই তার শ্বশুরবাড়ি, সুতরাং বসুন্ধরা অ্যাপার্টমেন্ট থেকে খুব দূরে তাকে যেতে হচ্ছে না শুনে রাজি হয়েছে।

শীত পেরিয়ে বৈশাখের এক শুভদিনে পিংকি আর পবনের বিয়ের দিন স্থির হয়েছে। গোধূলি লগ্নে বিয়ে যে-বিউটি পার্লারে কাজ করত পিংকি, আজ সেখান থেকেই তাকে সাজানোর জন্য এসেছে। কনের সাজে চেনাই যাচ্ছে না পিংকিকে। সে সোমার সামনে এসে দাঁড়াতে, সোমার চোখের পলক পড়া বন্ধ হয়ে যাওয়ার জোগাড়। পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করতেই হু হু করে জল এসে গেল দুজনের চোখেই। নিজের সন্তান তার হয়নি বটে, কিন্তু আজ পিংকিকে বিদায় দেওয়ার সময় তিনি অনুভব করলেন এ আসলে নাড়ির টানের চেয়ে কম নয়।

কে যেন বলল ওরে সানাইটা বাজা। বিকেলের রাগে শানাই ধরলেন বিসমিল্লা খাঁ। গোধূলির আকাশটা যেন নববধূর মুখের মতোই রাঙা হয়ে উঠল।

মর্মস্পর্শী অভিজ্ঞতা মলাটবন্দি করলেন নাসরিন নাজমা

করোনা-র প্রভাবে সারা পৃথিবীর মানুষের জীবনের সংজ্ঞাটাই বদলে গেছে। কত মানুষকে আমরা হারিয়েছি,আবার করোনামুক্ত হয়েও অনেকে এখনও নানা শারীরিক সমস্যায় ভুগছেন। আবার সংক্রমণের ভয়ে এখনও আমরা স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারছি না। কর্মহীনতা আর আর্থিক মন্দা কুরে কুরে খাচ্ছে অসংখ্য মানুষকে। স্বাভাবিক স্বাস্থ্য পরিষেবা থেকে এখনও আমরা বঞ্চিত। কিন্তু করোনা মোকাবিলার উপযুক্ত স্বাস্থ্য পরিকাঠামো না থাকার সত্ত্বেও, যাঁরা নিজের জীবন বাজি রেখে মানুষকে বাঁচানোর প্রয়াস জারি রেখেছেন, সেইসব যোদ্ধাদের মধ্যে নাসরিন নাজমা অন্যতম। তাঁকে কুর্নিশ জানাতেই হচ্ছে। কারণ, নাসরিন নাজমা-ও  এক কোভিড-যোদ্ধা। পেশায় তিনি নার্স। অবশ্য শুধু এইটুকুতে তাঁকে আলাদা ভাবে তুলে ধরা যাবে না। এই অতিমারীর সংকটপূর্ণ আবহে, নানা ভাবে এমন কর্তব্য পালনে হয়তো এখনও অনেকেই যুক্ত আছেন। কিন্তু নাসরিন নাজমা কিছুটা ব্যতিক্রমী। কারণ, কর্তব্য পালনকালীন তাঁর সংবেদনশীল মনের অনুভব,অনুযোগ এসব তিনি আমাদের মধ্যে ভাগ করে নেওয়ার সাহস দেখিয়েছেন ‘কথা হারানোর জার্নাল’ বইটির মাধ্যমে। রাজারহাট কোয়ারেন্টিন সেন্টার-এ কর্মরত থাকাকালীন যে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছিলেন, তা তিনি লিপিবদ্ধ করেছেন এই বইটিতে। আরও বিশদে বললে— প্রিয়জনকে ছেড়ে দিনরাত রোগীর সেবা করতে গিয়ে তিনি কী মানসিক পরিস্থিতির সম্মুখিন হয়েছিলেন, আবার রুগিদের শারীরিক-মানসিক পরিস্থিতি কেমন ছিল, সেইসব মর্মস্পর্শী মুহূর্ত তাঁর লেখার প্রতিটি শব্দে বর্ণিত হয়েছে। মাঝেমধ্যে তিনি তুলে ধরেছেন সমাজ,কবিতা,গান,এমনকি রবীন্দ্রনাথকেও। অনেক মনছোঁয়া স্মৃতি আজও তাঁকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে বলেও জানিয়েছেন তিনি।

Touching experience of Nasrin Najma
Moment of book launch
In presence of writer Nasrin Najma and others

বইটি সম্প্রতি প্রকাশিত হল কলকাতা প্রেস ক্লাব-এ। লেখিকা ছাড়াও,বইটির আনুষ্ঠানিক মোড়ক উন্মোচন করেন কবি ও শিল্পকলা বিশেষজ্ঞ দেবাশীষ চন্দ, কবি ও বাংলাদেশ উপ দূতাবাসের প্রধান প্রেস সচিব মোফাক খারুল ইকবাল প্রমুখ।আর এই বইটির মোড়ক উন্মোচন উপলক্ষ্যে নাসরিন নাজমা জানিয়েছেন,তাঁর জন্ম এবং বেড়ে ওঠা মুর্শিদাবাদ জেলার লালগোলা-র বালুটুঙ্গি গ্রামে। পেশার বাইরে ভালোবাসেন গান গাইতে,লিখতে এবং  আবৃত্তি করতে। বইটি তিনি উৎসর্গ করেছেন সেইসব সহযোদ্ধাদের,যাঁরা সংকটপূর্ণ পরিস্থিতিতে তাঁর-ই মতো মানবিকতার পরিচয় দিয়ে চলেছেন প্রতি মুহূর্তে। নাসরিন নাজমা-র লেখা, ‘কথা হারানোর জার্নাল’ শীর্ষক এই  বইটির প্রকাশক ‘বইতরণী ট্রাস্ট’।

ঘুমের ঘাটতি বিপজ্জনক

কাজের চাপ, মানসিক চাপ কিংবা নানারকম অস্থিরতার কারণে রাতে ঘুম কমছে অনেকের। আর এই ‘ঘুম-বঞ্চনা’ বিপজ্জনক! যদি দিনেরবেলায় ঘুম-ঘুম ভাব, অবসন্নতা, দেহের ওজন বেড়ে যাওয়া, মস্তিষ্ক ও নার্ভতন্ত্রের স্বাভাবিক কাজে বিঘ্ন ঘটা প্রভৃতি উপসর্গ দেখা দেয়, তাহলে সাবধান! কারণ, হৃদরোগ, কিডনি বিকল, উচ্চ রক্তচাপ, মধুমেহ প্রভৃতি অসুখের কবলে পড়তে পারেন আপনি। তাই, এর থেকে কীভাবে পরিত্রাণ পাবেন, সেই বিষয়ে আলোকপাত করছেন ডা. সৌজাত্য চক্রবর্তী।

পর্যাপ্ত পরিমাণে ঘুমের সময় কতটা?

রাতে খুব ভালো ঘুমের জন্য সারাদিনে আপনাকে পরিশ্রম অবশ্যই করতে হবে। ঘুমের প্রয়োজনীয়তা কিছুটা ব্যক্তি বিশেষের ওপর নির্ভর করে। তাহলেও একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষের ক্ষেত্রে সারাদিনে তাদের কাজকে ভালো ভাবে করতে হলে, প্রতি রাত্রে অন্তত ৭ থেকে ৯ ঘন্টা ঘুমাতে হবে। শিশুদের ও টিনএজারদের ক্ষেত্রে এর চেয়েও বেশি পরিমাণে ঘুমের প্রয়োজন। মানুষের শারীরিক, মানসিক ও দৈহিক বিকাশের জন্য প্রয়োজন পর্যাপ্ত পরিমাণে ঘুম।

পর্যাপ্ত পরিমাণে ঘুম কেন প্রয়োজন হয়?

শারীরিক স্বাস্থ্য গঠনের জন্য ঘুম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে, আপনার দেহের হৃৎপিণ্ড  ও রক্তবাহের মেরামতি ও নিরাময় করার কাজে ঘুম সাহায্য করে থাকে। নিয়মিত ঘুমের অভাবের কারণে হৃদরোগ, কিডনির রোগ, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস এবং স্ট্রোক-এর মতো অসুখের ঝুঁকিকে বাড়িয়ে তোলে।

‘ঘুম বঞ্চনা’ কাকে বলে?

যখন পর্যাপ্ত পরিমাণ ঘুমের ঘাটতি হয়, তখন ওই অবস্থাকে বলে ‘ঘুম বঞ্চনা’। এটা ক্রনিক অথবা তীব্র মাত্রায় হতে পারে। ক্রনিক ‘ঘুম বঞ্চনা’ অবস্থায় দিনের বেলায় ক্লান্তি বোধ হয়, তখন ঘুম ঘুম ভাব দেখা দেয়, অবসন্নতা এবং দেহের ওজন বৃদ্ধির ঘটনাও ঘটে। এই অবস্থা দেহের মস্তিষ্ক ও নার্ভতন্ত্রের স্বাভাবিক কাজে বিঘ্ন ঘটায়। কম পরিমাণে ঘুমের কারণে দেহে ইনসুলিনের প্রতিরোধ বাড়িয়ে তোলে। এর ফলে টাইপ-২ ডায়াবেটিস-এর সম্ভাবনা বেড়ে যায়। কম পরিমাণে ঘুমের কারণে সিআরপি বেড়ে যায় অথবা সি-রিঅ্যাক্টিভ প্রোটিন বাড়ে, যা স্ট্রেস এবং প্রদাহকে বাড়িয়ে তোলে। যদি দেহে সিআরপি উচ্চ মাত্রায় দেখা দেয়, তখন কার্ডিওভাস্কুলার রোগ কিংবা হৃদরোগের সম্ভাবনা বেড়ে যায়।

কীভাবে পর্যাপ্ত পরিমাণে ঘুম হৃৎপিণ্ডের স্বাস্থ্য বজায় রাখতে সাহায্য করে?

হৃদরোগীদের ক্ষেত্রে ঘুমই রোগ নিয়ন্ত্রণের পথ। পর্যাপ্ত পরিমাণে ঘুম না হলে বা দীর্ঘ সময় ধরে না ঘুমালে হৃদস্পন্দনের গতি বেড়ে যায়, দেহের রক্তচাপ বেড়ে যায় এবং প্রদাহের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট রাসায়নিক পদার্থের মাত্রা বেড়ে যায়, যা হৃদপিণ্ডের ওপর অতিরিক্ত মাত্রায় চাপ তৈরি করে। ঘুমের সময় হৃদ-ঘাত এবং রক্তচাপের পরিমাণ কমে যায়। সেকারণেই ঘুম চাপ কমানোর সহায়ক হিসেবে কাজ করে।

ঘুম কম হলে কি কারওর হৃদপিণ্ডের প্যালপিটেশনের হার বেড়ে যায়?

অনেক সময় অনেকের মধ্যে কোনও কারণ ছাড়াই হৃদপিণ্ডের প্যালপিটেশন দেখা দিতে পারে। তা হলেও দেখা গিয়েছে, ক্লান্তি, মানসিক চাপ এবং পর্যাপ্ত পরিমাণে ঘুমের অভাবের কারণে মানুষের মধ্যে প্যালপিটেশনের মাত্রা বেড়ে যায়। অনেক সময় এটাকে চরম অবস্থায় পৗছে যেতেও দেখা যায়। হৃদপিণ্ডের প্যালপিটেশন প্রত্যক্ষ ভাবে শ্বাসকার্যের ঘাটতির সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। এর ফলে দেখা যায়, দেহে কোনও গুরুতর সমস্যা না থাকা সত্ত্বেও, শুধুমাত্র কম ঘুমের কারণে শারীরিক অসুস্থতার লক্ষণ প্রকাশ পেয়েছে।

ঘুমের অভাবের কারণে কি বুকে ব্যথার লক্ষণ দেখা যায়?

ঘুমের অভাবের কারণে দেহের মধ্যে অনেকগুলি খারাপ লক্ষণ প্রকাশ পায়, তবে সাধারণ ভাবে এই কারণে বুকের ব্যথা দেখা দেয় না। বুকের মধ্যে একটা চাপ বোধ-এর লক্ষণ দেখা যায় সেই সময়, যখন হৃদপিণ্ডের পেশিতে পর্যাপ্ত পরিমাণে রক্ত সঞ্চালন না হয়। বুকের মধ্যে ব্যথা হওয়াটা এমন একটা লক্ষণ, যেটাকে কখনওই উপেক্ষা করা যায় না। অনেক সময় এটাকে হৃদরোগের লক্ষণ বলেও মনে করা যেতে পারে। এবিষয়ে কয়েকটি বিভিন্ন সম্ভাব্য কারণ রয়েছে। এই লক্ষণ তখনই দেখা যায়, যখন হৃদপিণ্ডের পেশিতে পর্যাপ্ত পরিমাণে রক্ত সঞ্চালন হয় না। এটা ঘটে যখন করোনারি ধমনিতে ব্লকেজ দেখা দেয়।

যদি আপনি কম বয়সি হয়ে থাকেন এবং আপনার পরিবারে কম বয়সে হূদ্রোগের মতো কোনও সমস্যা না থাকে– তখন এই ঘটনাকে অস্বাভাবিক ঘটনা বলেই মনে করা যেতে পারে। এটা অনেক ক্ষেত্রেই দেখা গিয়েছে যে, হার্ট অ্যাটাক, ব্রেন স্ট্রোক এবং হঠাৎ করে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর ঘটনা সকালে ঘুম থেকে ওঠার এক ঘণ্টার মধ্যেই ঘটেছে। এই ধরনের ঘটনা ঘটার সম্ভাব্য কারণের মধ্যে রয়েছে, সকালবেলায় ধমনী বা মস্তিষ্কে রক্ত জমাট বাঁধার প্রবণতা বেড়ে যাওয়া।

বুকের মধ্যে চাপ বোধ হতে পারে ফুসফুসের সমস্যার কারণেও। যেমন নিউমোনিয়া হলে এই লক্ষণ প্রকাশ পায়। সেই অবস্থায় এই লক্ষণের সঙ্গে দেখা যায় দেহে জ্বর ও শ্বাসকষ্ট। হাঁপানি হল এমন একটি শারীরিক অবস্থা, যখন শ্বাসনালির মাধ্যমে ফুসফুসে বাতাসের প্রবেশ পথে বাধা তৈরি হয়। এই অবস্থায় ফুসফুসে বাতাস প্রবেশ ও নির্গমনের কাজটা কঠিন হয়ে পড়ে। এর ফলে বুকের মধ্যে একটা চাপ বোধ হতে পারে। পাশাপাশি সেই অবস্থায় শ্বাসকষ্টও দেখা দেয়। আর যদি বুকে ব্যথা বোধ হয়, তখন সেই অবস্থায় দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

লেট নাইট শিফট-এ কাজ করার ঘটনা কি দেহের হৃদযন্ত্রের ওপর প্রভাব ফেলে?

লেট নাইট শিফট-এ কাজ করা এবং যথেষ্ট পরিমাণে না ঘুমানো হৃদরোগের ঝুঁকিকে বাড়িয়ে দেয়। সাম্প্রতিক এক সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, ঘুমের প্যাটার্ন এবং হৃদপিণ্ডের কাজের প্রতিবন্ধকতার মধ্যে একটি প্রত্যক্ষ সম্পর্ক রয়েছে।

ঘুমের অভাব হৃদপিণ্ডের স্বাস্থ্যের ওপর একটা নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। আমাদের দেহে যথেষ্ট পরিমাণে ঘুমের অভাব এবং বিঘ্ন সমন্বিত ঘুমের প্যাটার্নের নেতিবাচক প্রভাব স্বয়ংক্রিয় ভাবে কাজ করে চলে। লেট নাইট শিফ্ট-এর কর্মীদের মধ্যে এই ঘটনা দেখা যায়, কারণ, তারা তাদের পরিবর্তনশীল কাজের শেডিউল-এর কারণে ঘুমের প্যাটার্ন-এ যে-পরিবর্তন ঘটাতে হচ্ছে, তার ফলে দেহের উপর পড়া এর নেতিবাচক প্রভাব থেকে দ্রুত পুনরুদ্ধার করতে পারে না।

এই কারণেই বলা হয়েছে, স্বাস্থ্যকে ভালো রাখার জন্য প্রত্যেক রাতে অন্ততপক্ষে ৭ থেকে ৯ ঘণ্টা ঘুমানো উচিত। এর পাশাপাশি হৃদযন্ত্রকে সুস্থ ও সবল রাখার জন্য নিয়মিত ব্যায়াম করা এবং প্রাত্যহিক খাদ্য তালিকায় স্বাস্থ্যসম্মত খাবার রাখা প্রয়োজন। এটা করা প্রয়োজন বিশেষ ভাবে তাদের, যারা নাইট শিফট-এ কাজ করে এবং যাদের ঘুমের ক্ষেত্রে বিঘ্ন ঘটে থাকে। স্বাস্থ্যসম্মত ভাবে ঘুমের অভ্যাসের মাধ্যমে এবং স্বাস্থ্যসম্মত জীবনযাপনের মাধ্যমে হূদ্রোগের ঝুঁকি এড়িয়ে এবং সুস্থ ভাবে বাঁচা সম্ভব।

স্লিপ অ্যাপনিয়া কী?

স্লিপ ডিসঅর্ডার ব্রিদিং (এসডিবি) হল ঘুমের সময় বিশেষ করে বিঘ্নিত ঘুমের সময় একটি প্রতিবন্ধকতাযুক্ত শ্বাসকার্যের প্যাটার্ন। এটা ঘটে থাকে, যখন কয়েক সেকেন্ডের জন্য শ্বাসকার্য একেবারে বন্ধ হয়ে যায়। এই ঘটনাকেই বলে স্লিপ অ্যাপনিয়া। এর লক্ষণ হল– খুব জোরে জোরে নাক ডাকা, ঘুম খুব পাতলা হওয়া, ঘুমে প্রশান্তি’র অভাব এবং দিনের বেলা ঘুমের ইচ্ছা ইত্যাদি। ঘুমানোর সময় শ্বাসকার্যের ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের নিয়ন্ত্রণে বাধার কারণে অথবা উপরের বায়ুপথে বাধা (অবস্ট্রাকশন)-র জন্য এই ঘটনা ঘটে থাকে।

স্লিপ অ্যাপনিয়া ও হৃদরোগের মধ্যে কোনও সম্পর্ক রয়েছে কি?

বেশ কয়েক বছর ধরে স্লিপ অ্যাপনিয়া ও হৃদরোগের মধ্যে সম্পর্কের বিষয়ে নানান সমীক্ষা চালানো হয়েছে। দেখা গিয়েছে, দীর্ঘদিন স্থায়ী স্লিপ অ্যাপনিয়া হৃদ্ঘাতের মাত্রাকে বাড়িয়ে দেয়। এটি প্রদাহ, ব্লাড ক্লটিং ইত্যাদির মাত্রাও বৃদ্ধি করে। এই সমস্ত কারণগুলির যোগফলে উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ এবং ব্রেন স্ট্রোকের মতো ঘটনা ঘটে।

স্লিপ অ্যাপনিয়া কীভাবে হূদ্স্পন্দনের ওপর প্রভাব ফেলে?

স্লিপ অ্যাপনিয়া’র অন্যান্য কিছু শরীরবৃত্তীয় প্রভাব রয়েছে। ওএসএ মানুষদের ক্ষেত্রে অক্সিজেনের মাত্রা কমে যাবার কারণে, বিভিন্ন ধরনের শরীরবৃত্তীয় পরিবর্তন ঘটে যায়। এই সমস্ত পরিবর্তনগুলি হৃদযন্ত্র ও রক্তবাহের উপর প্রভাব ফেলে। এই সমস্ত পর্যায়ে হৃদযন্ত্রের মধ্যে চাপ বেড়ে যায়। এর কারণে রক্তচাপ ও হৃদযন্ত্রের গতি বেড়ে যায়।

স্লিপ অ্যাপনিয়ার সঙ্গে ওবেসিটির কোনও সম্পর্ক আছে কি?

অবস্ট্রাক্টিভ স্লিপ অ্যাপনিয়া (ওএসএ)-র সঙ্গে ওবেসিটি’র সম্পর্ক রয়েছে, যেটিকে হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ক্ষেত্রে অন্যতম একটি ঝুঁকির কারণ হিসেবেও গণ্য করা হয়। স্লিপ অ্যাপনিয়া ওবেসিটিকে সাহায্য করার পাশাপাশি এটি বিঘ্নিত ঘুমেরও একটি বড়ো কারণ। এর ফলে অস্বাস্থ্যকর জীবনচক্র তৈরি হয় এবং দেহের মধ্যে নতুন করে ওবেসিটি’র প্রবণতা তৈরি করে।

ঘুম-সম্পর্কিত শ্বাসকার্য ঘটিত রোগগুলির মধ্যে রয়েছে অবস্ট্রাক্টিভ স্লিপ অ্যাপনিয়া (ওএসএ) এবং সেন্ট্রাল স্লিপ অ্যাপনিয়া সহ

চেইনি-স্ট্রোক্স রেসপিরেশন (সিএসআর-সিএসএ)। এগুলি সাধারণ ভাবে দেখা যায় কনজেস্টিভ হার্ট ফেলিওর (সিএইচএফ) রোগীদের মধ্যে।

অবস্ট্রাক্টিভ স্লিপ অ্যাপনিয়া-র কারণে অবশ্যই হৃদস্পন্দনের গতি অনিয়মিত হয়ে পড়ে। গবেষকরা তাঁদের গবেষণার মাধ্যমে দেখিয়েছেন যে, এফ বা অ্যাট্রিয়াল ফিব্রিলেশনের ঝুঁকিকে বাড়িয়ে তোলে ওএসএ। এএফ হল এমন একটি অবস্থা, যাতে অনিয়মিত ভাবে এবং প্রায় সময় দ্রুত হৃদস্পন্দনের ঘটনা ঘটে চলে। এর ফলে স্ট্রোক, হার্ট ফেলিওর এবং অন্যান্য শারীরিক জটিলতার ঝুঁকি বেড়ে যায়।

স্লিপ অ্যাপনিয়া কি উচ্চ রক্তচাপের কারণ?

উচ্চ রক্তচাপ অথবা হৃৎপিণ্ডের সমস্যাবলী ছাড়াও, রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা কমে যাওয়ার ঘটনাও ঘটে থাকে স্লিপ অ্যাপনিয়ার কারণে। স্লিপ অ্যাপনিয়া রক্তচাপ বাড়িয়ে দেয় এবং কার্ডিওভাস্কুলার সিস্টেমের ওপরেও চাপ বাড়িয়ে তোলে। যদি আপনার অবস্ট্রাক্টিভ স্লিপ অ্যাপনিয়া থাকে তবে আপনার দেহে উচ্চ রক্তচাপের সম্ভাবনার মাত্রা অনেকটাই বেড়ে যাবে।

নিয়মিত ব্যায়াম করলে স্লিপ অ্যাপনিয়া কি নিরাময় হতে পারে?

দেহের ওজন কমে গেলে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে স্লিপ অ্যাপনিয়া’-র মাত্রা কমে যায়।। আবার ব্যায়াম করার মাধ্যমে হৃদযন্ত্রের অন্যান্য উপকার পাওয়া ছাড়াও ব্যায়াম করে দেহের ওজনকে কমানো সম্ভব এবং হৃদস্পন্দনের গতি ও রক্তচাপের মাত্রাও কমিয়ে ফেলা যায়। ২০ শতাংশ অবস্ট্রাক্টিভ স্লিপ অ্যাপনিয়ার রোগীরা ওবেসিটিতে আক্রান্ত নয়। তাদের ক্ষেত্রে শ্বাসযন্ত্রে বাতাস প্রবেশপথের অস্বাভাবিকতা বিশেষ চিকিৎসার মাধ্যমে করা যেতে পারে।

——–

আমার বারবার ইউটিআই হয়, কী করব?

আমি ৫৪ বছর বয়সী মহিলা। আমার বারবার ইউটিআই (ইউরিনারি ট্র্যাক্ট ইনফেকশন)-এর সমস্যা হয়। অনেক বার চিকিৎসা করিয়েছি কিন্তু এই সমস্যা স্থায়ী ভাবে কিছুতেই দূর হচ্ছে না। কী করব?

মেনোপজ হয়ে যাওয়ার পর প্রায়শই মহিলাদের এই সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। ব্লাডারে ইউরিন থেকে যায়, ভালো ভাবে পাস হয় না। ফলে সংক্রমণ হওয়ার ভয় বেড়ে যায়। অনেক মহিলাদের আবার মেনোপজ হয়ে যাওয়ার পর ইউরিন পাস করার রাস্তা ড্রাই হয়ে যায়। এর চিকিৎসা হল হরমোন থেরাপি। অপারেশন করেও ইউরিন পাস করার ট্র্যাক্ট চওড়া করা হয়। মেনোপজের পর সাধারণত এস্ট্রোজেন হরমোনের ঘাটতির কারণে ভ্যাজাইনা, ইউরেথ্রা এবং ব্লাডারের নীচের অংশের টিস্যু অনেক পাতলা হয়ে যায় এবং সহজে ছিঁড়ে যায়, ফলে সংক্রমণ হওয়ার ভয় অনেকাংশে বেড়ে যায়। আপনাকে সব সময় পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকতে হবে। শারীরিক হাইজিন মেনে চলতে হবে।

 

আরও পড়ুন

 

আমার বয়স ২৫ বছর এবং সন্তানসম্ভবা। আমার কিডনি স্টোন ধরা পড়েছে। এতে গর্ভাশয়ের ওপর কি কোনও প্রভাব পড়বে?

 বাচ্চা, গর্ভাশয়ের স্থান দখল করলে কিডনির উপর অবশ্যই প্রভাব পড়বে। যেহেতু আপনার কিডনিতে স্টোন রয়েছে, তাই সমস্যা আরও খারাপের দিকে যেতে পারে। গর্ভাবস্থায় কিডনির উপর বেশি প্রেশার পড়ে। এতে সংক্রমণ হওয়ার ভয় আরও বেড়ে যায় এবং সেটা বাচ্চার জন্য আরও ক্ষতিকারক হতে পরে। তাই প্রেগন্যান্সি প্ল্যান করার আগে স্টোনের ওয়ার্কআপ করানো খুব জরুরি, যাতে স্টোনের পরিস্থিতি জানতে পারা যায়।

 

 

 

স্বাস্থ্যগুণে ভরপুর তেঁতুল

এমনিতে তেঁতুলের গন্ধ নাকে এলেই জিভে জল এসে যায়। কিন্তু, সুস্বাদু এই তেঁতুলের কত যে স্বাস্থ্যগুণ রয়েছে, জানলে অবাক হবেন। শরীর থেকে প্রায় ১০ রকম সমস্যা অথবা রোগ দূর করে তেঁতুল। তাই, সপ্তাহে অন্তত তিনদিন পান করুন তেঁতুলের শরবত। তেঁতুলের শরবত খেলে চনমনে থাকার পাশাপাশি আর কী কী রোগ থেকে মুক্তি পাবেন, সেই বিষয়ে জেনে নিন বিশদে।

তেঁতুলের শরবত

প্রণালী : অল্প পরিমাণ পাকা তেঁতুল গরম জলে ভিজিয়ে রাখুন পাঁচ মিনিট। এরপর চটকে ছেঁকে নিন। হালকা করার জন্য এক গেলাস ঠান্ডা জলে মিশিয়ে নিন তেঁতুলের ক্বাথ। পরিমাণ মতো নুন (সাদা বা বিট নুন) এবং গোলমরিচের গুঁড়ো মেশান। এবার এক টুকরো গন্ধরাজ লেবু অথবা পুদিনাপাতা তেঁতুলের মিশ্রণে ফেলে, ফ্রিজে দুমিনিট রেখে বের করে নিয়ে পান করুন।

তেঁতুলের স্বাস্থ্যগুণ

  • আমাদের শরীর থেকে নির্গত ক্ষতিকারক কোলেস্টেরল কমায় তেঁতুল
  • তেঁতুল ভিটামিন সি সমৃদ্ধ, তাই সর্দি-কাশি দূর করতে সাহায্য করে
  • তেঁতুল খাবার হজম করতে সাহায্য করে এবং লিভার ঠিক রাখে
  • তেঁতুল যেমন রক্তে লোহিত কণিকা গঠন করে, ঠিক তেমনই রক্তকে পাতলা রেখে রক্ত সঞ্চালন স্বাভাবিক রাখে
  • অতিরিক্ত গরম কিংবা ঝালজাতীয় উপাদানের কারণে মুখ গহ্বরে যখন আলসার হওযার সম্ভাবনা থাকে, তেঁতুল তখন ত্বক এবং রক্তকোশকে ঠান্ডা রেখে আলসার আটকায়
  • তেঁতুলে যেহেতু প্রচুর পরিমাণে ফাইবার থাকে, তাই কোষ্ঠকাঠিন্যর সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে সাহায্য করে
  • রক্তে শর্করার মাত্রা কমিয়ে ডাযাবেটিস আটকায় কিংবা নিয়ন্ত্রণে রাখে। কালোজামের সঙ্গে মিশিয়ে খেলে আরও ভালো ফল পাওযা যায়
  • তেঁতুলে যেহেতু টারটারিক অ্যাসিড থাকে, তাই গলা ধরলে কিংবা অ্যালকোহলিক হ্যাংওভার থাকলে তা কাটিয়ে তোলে দ্রুত
  • তেঁতুলে ভিটামিন সি যেমন আছে, তেমনই বি কমপ্লেক্সও আছে। আর এই ভিটামিন বি কমপ্লেক্স স্নাযুর চাপ কমিয়ে স্নাযুরোগ দূর করে
  • তেঁতুল অ্যান্টি অক্সিড্যান্ট সমৃদ্ধ। তাই, ক্যানসার প্রতিরোধেও বড়ো ভূমিকা নিতে পারে তেঁতুল।

মডিউলার কিচেন

মডার্ন স্ট্যান্ডার্ড অফ লিভিং-এর সঙ্গে পাল্লা দিতে সবাই চাইছে ইন্টিরিয়র চিক্, এবং স্টাইলিশ ডিজাইনের করে তুলতে। বাড়ির সম্পূর্ণ মেক-ওভার চেঞ্জ করা হচ্ছে। সবথেকে বেশি যেখানে হাত পড়ছে সেটা হল রান্নাঘর আর বাথরুম। রান্নাঘর বলতে এখন শুধু আর রান্না করার জায়গা বোঝায় না বরং চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে সেখানে এখন পুরো পরিবার আড্ডা আলোচনার ঝড় তোলে।

মডিউলার কিচেনের কনসেপ্ট ঘর সাজাবার সংজ্ঞাটাকে পুরো বদলে দিয়েছে। নানা রঙে কিচেন-কে সাজানো হচ্ছে, যেমন– লাল, কমলা, নীল, সবুজ এমনকী ন্যাচারাল শেড্ও ব্যবহার করা হচ্ছে যেমন সেডার এবং বার্চ।

রান্নাঘর সাজাবার সময় ইন্ডিয়ান টেস্ট, লাইফস্টাইল এবং ডিউরেবিলিটি যেমন মাথায় রাখা হয়– তেমনি ইউরোপিয়ান কিচেনের এলিগেন্স-কেও অবহেলা করা হয় না। ট্র্যাডিশনাল সলিড উড্ ফিনিশ থেকে নিয়ে ল্যামিনেট করা কনটেম্পোরারি ফিনিশি যেটা সহজে মেনটেন করা যায় সেগুলো সবই মডিউলার কিচেন-এর জন্য ব্যবহার করা হয়।

প্রধানত নামি কিছু ব্র্যান্ড, মডিউলার কিচেনের অ্যাক্সেসরি বানায়। এর মধ্যে কয়েকটি ব্র্যান্ড হল হেটিক, হ্যাফল, হ্যাকার, প্লাম ইত্যাদি। ব্যক্তিগত প্রয়োজন অনুসারে অ্যাকসেসরি ডিজাইন করা হয় এবং এফেক্টিভ স্পেস প্ল্যানিং করার ফলে দৈনন্দিন কাজ করতে কোনও অসুবিধা হয় না।

চেয়ার, টেবিল, র‍্যাক, ক্যাবিনেট ইত্যাদি আসবাবপত্র দিয়ে কিচেনের ইন্টিরিয়র তৈরি হয়। কিচেনকে কনটেম্পোরারি লুক দিতে সাহায্য করে কিচেন কেবিন, চিমনি, র‍্যাক বা তাক, ক্যাবিনেট শাটার্স, ফিটিংস, ড্রয়ারস, প্রশস্ত খোলামেলা জায়গা এবং ডিশ ওয়াশার। সুতরাং নিজের বাড়ি এবং রান্নাঘরকে ক্লাসি লুক যদি দিতে চান তাহলে নানা রকমের ডিজাইন থেকে পছন্দমতো একটি ডিজাইন বেছে নিতে পারেন।

নানা ধরনের আকার

ইউ-শেপের কিচেন – এই শেপের ডিজাইন তৈরি করতে অনেকটা জায়গা দরকার হয়। এই ডিজাইনের জন্য দরকার অনেক রকমের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র এবং এতে অনেকটা স্টোরেজের জায়গাও পাওয়া যায়। দক্ষতার সঙ্গে রান্নাঘরে কাজ করতে ইচ্ছুক থাকলে এই ডিজাইন বেছে নিতে পারেন।

প্যারালাল অথবা স্ট্রেট কিচেন – ছোটো অ্যাপার্টমেন্টের জন্য এই ডিজাইনের কিচেন খুবই উপযুক্ত যেখানে রান্নাঘরটি লম্বাটে হয় অথচ চওড়ায় খুব বেশি হয় না। এখন প্রচুর ফ্ল্যাটে এই ডিজাইনের কিচেন দেখতে পাওয়া যায়।

এল শেপড কিচেন – কিচেন বড়ো হোক অথবা ছোটো, এই ডিজাইন দুই ধরনের কিচেনের জন্যই উপযুক্ত। ডিজাইনটি হয় এল শেপের। এই ডিজাইন-টির সবথেকে ভালো দিক হল, খাওয়ার জায়গাটাও এরই মধ্যে ইনক্লুড থাকে ফলে জায়গার অপচয় একেবারেই হয় না।

আইল্যান্ড কিচেন – এই ধরনের কিচেনকে ওপেন কিচেনও বলা হয়। যাদের কিচেনে অনেকটা সময় কাটাতে হয় এবং বেশি স্টোরেজ স্পেস-এর দরকার হয় তাদের জন্য এই ডিজাইন-টি খুবই উপযুক্ত।

মডিউলার কিচেন কাউন্টার – আপনার মডিউলার কিচেন-এর স্টাইল এবং ডিজাইন একবার ঠিক করে নেওয়ার পর, সেকেন্ড ইমপর্টেন্ট হল কিচেন কাউন্টারের ডিজাইন নির্দিষ্ট করা। ইন্ডিয়ান কুকিং-এর জন্য বেস্ট অপশন হল গ্র্যানাইট-এর ব্যবহার যেটি কিচেন কাউন্টার-কে এলিগেন্ট টাচ্ দিতেও সাহায্য করে। মডিউলার কিচেনে দরকার, প্রয়োজনীয়তা অনুযায়ী চিমনি লাগিয়ে নেওয়া যেটি কাজের সুবিধা করে দেওয়ার সঙ্গে রিপেয়ার করাতেও সুবিধা হবে।

কিচেন ক্যাবিনেটস – রেডিমেড কিচেন ক্যাবিনেট কেনার সময় মাথায় রাখতে হবে ক্যাবিনেটের মেটেরিয়াল যেন ওয়াটার রেসিসট্যান্ট হয়। ক্যাবিনেটগুলি সাধারণত বিভিন্ন ধরনের মেটেরিয়াল দিয়ে তৈরি করা হয় যেমন ন্যাচারাল উড্ থেকে ল্যাকুয়ার্ড উড্, ল্যামিনেট এবং উড্-এর কম্বিনেশন, অথবা গ্র্যানাইট এবং ল্যামিনেটের সমন্বয়। ক্যাবিনেট-এর জন্য সবথেকে উপযুক্ত মেটেরিয়াল হল মেরিন প্লাই কারণ এটি হাইলি ওয়াটার রেসিসট্যান্ট বলে। ক্যাবিনেটের কোয়ালিটি ভালো হওয়া জরুরি যাতে বর্ষার মরশুমে সেগুলি খারাপ না হয়ে যায়।

মডিউলার কিচেন ড্রয়ারস – ইন্টিরিয়র ডিজাইনারের সঙ্গে পরামর্শ করে তবেই রেডিমেড ড্রয়ারস কিনবেন। আপনার কিচেনের সাইজ এবং চওড়া কতটা মেপে, তারা রেডিমেড ড্রয়ারস বাছতে আপনাকে সাহায্য করবেন। ভালো মানের কাঠ এবং হাইড্রলিক হিঞ্জ বাছাটা খুব দরকার, যাতে ড্রয়ারস মুভমেন্ট মসৃণ হয়।

চিমনি – রান্নাঘরে চিমনি খুব গুরুত্বপূর্ণ। রান্নাঘরকে তেল, ধোঁয়া, বাষ্পমুক্ত রাখতে সাহায্য করে। দুই ধরনের চিমনি পাওয়া যায়। ট্র্যাডিশনাল এবং ডিজাইনার। ডিজাইনার চিমনি দেখতে খুব সুন্দর আর এলিগেন্ট এবং ট্র্যাডিশনাল চিমনির সাক্শন পাওয়ার অনেক বেশি।

ডিশওয়াশার – নানা সাইজ এবং শেপ-এ ডিশওয়াশার মার্কেটে পাওয়া যায়। রান্নাঘরে যেখানে জলের কল এবং জল বেরোবার জায়গা রয়েছে সেরকম উপযুক্ত জায়গা দেখে তবেই ডিশওয়াশার কিনুন।

কিচেনের জন্য প্রয়োজনীয় অন্যান্য জিনিস – মডিউলার কিচেনের সৌন্দর্য বর্ধন করতে গ্লাস শাটার এবং গ্লাস শেলভ অনেকটা সাহায্য করে। ক্রকারির যত্নও সহজে করা যায়।

কিচেনের শেপ, কাউন্টার, ক্যাবিনেট ইত্যাদি ঠিক করে নেওয়ার পর, কিচেনে কী রং করাবেন সেটা ডিসাইড করতে হবে। কেউ স্নিগ্ধ রং পছন্দ করেন তো কেউ ভাইব্র্যান্ট রং বাছেন কিচেনের জন্য।

সিনারি বেজ – নিউট্রাল এই রংটি যে-কোনও রঙের সঙ্গে মিক্স অ্যান্ড ম্যাচ করা যাবে।

ডুয়াল কালার – অনেকেই এই থিম বাছেন। দুটো রং ব্যবহার করা হয় এই থিমে। তিন দিকের দেয়াল যদি ডার্ক হয় তাহলে চতুর্থ দেয়ালে হালকা রং বা সাদা ব্যবহার করা হয়। এই ক্ষেত্রে সিলিং-এর দেয়ালও সাদা রাখা হয়।

গ্রে, ক্লাসি লুক দেয় – কিচেন-কে মডার্ন অথচ সফেস্টিকেটেড লুক দিতে হলে গ্রে কালার বাছতে পারেন।

ব্লু, কুল লুকের জন্য – ব্লু এবং হোয়াইটের কম্বিনেশন, কিচেনকে দেবে কুল লুক।

সবুজ রং – রান্নাঘরের জন্য সবথেকে ভালো কালার হল সবুজ। আমাদের চোখকে রিল্যাক্স রাখে সবুজ রং। এছাড়াও স্ট্রেস দূরে রাখতে সাহায্য করে।

মডিউলার কিচেন বাজেট – কিচেনের সাইজ এবং কী মেটেরিয়াল ব্যবহার করছেন তার উপর ডিপেন্ড করে রেনোভেশন কস্ট। সুতরাং আগে বাজেট তৈরি করুন এবং প্রত্যেকটা জিনিস প্ল্যান করে মার্কেট সার্ভে করুন। তারপর ঠিক করুন ইন্টিরিয়র ডিজাইনার-কে দিয়ে করাবেন নাকী নিজেই ডিজাইন করবেন নিজের রান্নাঘর।

 

ওয়েট ট্রেনিং

শুধুমাত্র অতিমারীর আবহে-ই নয়, শরীরকে সর্বদা সুস্থ, স্বাভাবিক এবং প্রাণচঞ্চল রাখার জন্য ইনার ফিটনেস জরুরি। আর এই ইনার ফিটনেস-এর জন্য ওয়েট ট্রেনিং খুবই কার্যকরি  মাধ্যম। এতে দ্রুত ওজনও কমানো যায়। পুরুষদের তুলনায় মহিলাদের শরীরে যেহেতু ফ্যাট জমার প্রবণতা বেশি থাকে, তাই মহিলাদের ওয়েট ট্রেনিং করা আবশ্যক। তবে এ প্রসঙ্গে একটা ভুল ধারণা আছে অনেক মহিলার যে, ওয়েট ট্রেনিং-এ শরীরে পেশিগুলি নারীসুলভ নমনীয়তা হারিয়ে পুরুষালি হয়ে যায়। কিন্তু এ ধারণা ঠিক নয়। কারণ, যে-হরমোনের কারণে শরীর পেশিবহুল হয়ে ওঠে, সেই টেস্টোস্টেরন হরমোন খুবই কম মাত্রায় থাকে নারী-শরীরে। বরং বেশি থাকে ইস্ট্রোজেন হরমোন। তাই, যদি টেস্টোস্টেরন হরমোন শরীরে ইনজেক্ট না করেন মহিলারা, তাহলে তাদের শরীর পুরুষদের মতো পেশিবহুল হওয়ার সম্ভাবনা কম। অতএব, নির্দ্বিধায় ওয়েট ট্রেনিং-কে মাধ্যম করতে পারেন মহিলারা। এ ক্ষেত্রে মনে রাখবেন, ওয়েট ট্রেনিং-এর ৭২ ঘন্টা পরও ক্যালোরি বার্ন হতে থাকে।

এখন কারও মনে প্রশ্ন জাগতে পারে যে, ওয়েট ট্রেনিং কী? ওজন তোলা এবং নামানোকেই বলা হয় ওয়েট ট্রেনিং। শুধু হাত দিয়ে নয়, হামাগুড়ির ভঙ্গিতেও পিঠ দিয়ে ওজন তোলা-নামানোর সুফল পাওয়া যায়। এরজন্য আপনাকে বাড়িতে রাখতে হবে এক থেকে তিন কিলোগ্রাম ডাম্বেল। আর যারা ডাম্বেল কিনতে পারবেন না, তারা দুটি এক লিটারের অথবা দুটি দুলিটারের জলের বোতল দিয়ে ওয়ার্ক আউট করতে পারেন। তবে এরজন্য কিছু নিয়ম পালন এবং সতর্কতা জরুরি।

  • ওয়েট ট্রেনিং শুরু করার আগে পেশাদার ট্রেনারের পরামর্শ নেওয়া জরুরি
  • শরীরে কোনও বড়ো সার্জারি হয়ে থাকলে ওয়েট ট্রেনিং না করাই ভালো। এক্ষেত্রে আপনার চিকিত্সকের উপদেশ পালন করা আবশ্যক
  • ওয়েট ট্রেনিং শুরু করার আগে, অন্তত দশ মিনিট হেঁটে কিংবা ফ্রি-হ্যান্ড এক্সারসাইজ করে নিতে হবে
  • ওজন তোলা এবং নামানো যেমন ধীর গতিতে করতে হবে, ঠিক তেমনই ওজনের পরিমাণও বাড়াতে হবে ধীরে ধীরে
  • সপ্তাহে অন্তত চারদিন ওয়েট ট্রেনিং-এর ওয়ার্ক আউট করুন এবং ওয়ার্ক আউট-এর সময জোরে জোরে শ্বাস নিন এবং শ্বাস বর্জন করুন
  • ওয়েট ট্রেনিং করতে হলে প্রোটিন এবং সামান্য কার্বোহাইড্রেট-যুক্ত খাবার খাওয়া আবশ্যক। এছাড়া রাতে পর‌্যাপ্ত ঘুমেরও প্রযোজন।

ছোটোদের মজাদার ব্রেকফাস্ট

বাচ্চাদের বায়নাক্কা সামলাতে যখন আপনি নাজেহাল, ঠিক তখনই আমরা নিয়ে এলাম কয়েকটি মজাদার রেসিপি।

নুডল্স কাটলেট

উপকরণ – ১ প্যাকেট নুডল্স, ১ কাপ বাঁধাকপি গ্রেট করা, ১/২ কাপ চিজ, ১টা পেঁয়াজ কাটা, ১-২টো কাঁচালংকা, ৩ বড়ো চামচ কর্নফ্লাওয়ার, ভাজার জন্য তেল, নুন স্বাদমতো।

 প্রণালী– ১ প্যাকেট নুডল্স মশলা বাদ দিয়ে সেদ্ধ করুন। এর সঙ্গে কপি, চিজ, পেঁয়াজ,  লংকা, নুন একসঙ্গে মিশিয়ে কর্নফ্লাওয়ার ছড়িয়ে চটকে নিন। ছোটো ছোটো কাটলেট গড়ে নিন। শ্যালো ফ্রাই করে সসের সঙ্গে পরিবেশন করুন।

dahi sandwich recipe

 

দই স্যান্ডউইচ

উপকরণ– ১ কাপ হাং কার্ড, ১/২ কাপ নারকেলকোরা, ১-২টো কাঁচালংকা, ১ টুকরো আদা, ৪টে ব্রেড স্লাইস, ২ বড়ো চামচ মাখন, নুন স্বদমতো।

প্রণালী – নারকেলকোরা, কাঁচালংকা, আদা, নুন ও দই একসঙ্গে মিশিয়ে বেটে নিন। এই চাটনি ব্রেড স্লাইসের উপর মাখিয়ে অন্য ব্রেড দিয়ে চাপা দিন। গরম তাওয়ায় মাখন দিয়ে ভেজে নিন। গরম গরম পরিবেশন করুন।

Potato Pancake recipe

 

পট্যাটো প্যানকেক

উপকরণ – ২টো কাঁচা আলু, ১টা সেদ্ধ আলু, ১টা পেঁয়াজকুচি, ১-২টো কাঁচালংকাকুচি, ১/২ কাপ ময়দা, ১/২ ছোটো চামচ বেকিং পাউডার, ২-৩ বড়ো চামচ তেল, নুন স্বাদানুসার।

 প্রণালী -কাঁচা আলু খোসা ছাড়িয়ে গ্রেট করে নিন। সেদ্ধ আলু খোসা ছাড়িয়ে চটকে নিন। একটা বোল-এ গ্রেট করা আলু, ময়দা, লংকা, পেঁয়াজ ও জল দিয়ে মিশ্রণ বানান। নুন ও বেকিং পাউডার দিয়ে ফেটিয়ে নিন। গরম তাওয়ায় এই মিশ্রণ থেকে প্যানকেক ভেজে নিন। অল্প করে আলু সেদ্ধর পুর চারিয়ে দিন। উলটো পিঠও সেঁকে নিন। গরম গরম পরিবেশন করুন।

 

পড়ার জন্য সীমাহীন গল্প-নিবন্ধসাবস্ক্রাইব