মেচেতার দাগ এবং তিল সমস্যার সমাধান কী?

 প্রশ্নঃ আমি ২২ বছর বয়সি যুবতি। আমার নাকের দুইপাশে এবং ঠোটের উপর মেচেতার দাগ রয়েছে। ছোটো ছোটো তিলও রয়েছে। কীভাবে এগুলির থেকে নিষ্কৃতি পাব? 

উত্তরঃ মেচেতা হওয়ার কারণ সাধারণত সরাসরি রোদের সম্পর্কে আসা, স্বাস্থ্যের সমস্যা অথবা ঘুম পুরো না-হওয়া। মেচেতার দাগ হালকা করতে হলে টম্যাটোর রস লাগিয়ে শুকোতে দিতে হবে এবং পরে ধুয়ে নিতে হবে। এছাড়াও দইয়ের সঙ্গে লেবুর রস মিশিয়েও ত্বকে লাগাতে পারেন। দই, টম্যাটো, লেবুতে ন্যাচারাল ব্লিচিং এজেন্ট থাকে, যা কিনা মেচেতার সঙ্গে সঙ্গে ত্বকের অন্যান্য দাগ- ছোপও হালকা করতে সাহায্য করে। এগুলি ব্যবহার করে দেখুন উপকার পাবেন।

প্রশ্নঃ আমি ৩৩ বছর বয়সি বিবাহিতা। আমার ভুরুর রোম এখনই সাদা হয়ে যাচ্ছে। কী করলে সাদা হওয়া আটকানো যাবে?

উত্তরঃ ভুরুর রোম কালো করার জন্য এবং সাদা হওয়া আটকানোর জন্য, রাত্রে শোওয়ার আগে অলিভ অথবা ক্যাস্টর অয়েল দিয়ে ভুরু মালিশ করুন। চোখের আশেপাশের স্পর্শকাতর ত্বকের জন্য বাদাম তেল খুবই উপকারী। এছাড়াও ভুরুর রোমকে সাদা হওয়া থেকে বাঁচাতে, ডায়েটে প্রোটিনযুক্ত খাদ্যপদার্থ রাখাটা একান্ত জরুরি। যেমন— দুধ, কলা, ডিম, ডাল ইত্যাদি।

প্রশ্নঃ আমি ৪০ বছর বয়সি মহিলা। আমার মুখে ডার্ক স্পট্স ভর্তি। সানবার্ন-এর জন্য ত্বকও খারাপ হয়ে গেছে। কীভাবে ডার্ক- স্পট্স এবং সানবার্নের জন্য খারাপ হয়ে যাওয়া ত্বকের পরিচর্যা করব?

উত্তরঃ ত্বককে সানবার্ন থেকে বাঁচাতে হলে প্রথমে খেয়াল রাখতে হবে যাতে ত্বকে সরাসরি রোদ্দুর না লাগে। বাড়ির বাইরে পা রাখতে হলে স্কার্ফ, সানগ্লাস এবং ছাতা ব্যবহার করুন। বেরোবার আগে সানস্ক্রিন লাগাতে ভুলবেন না। বর্তমানে ডার্ক স্পট্স এবং সানবার্নের প্রভাব দূর করতে ত্বকে দই এবং লেবুর রস মিশিয়ে লাগান। পেস্ট শুকিয়ে গেলে ধুয়ে ফেলুন। এছাড়াও লাল চন্দন পাউডার, কমলালেবুর রস এবং মুলতানি মাটি মিশিয়ে প্যাক তৈরি করে মুখে লাগান। প্যাকে ব্যবহৃত সবকটা উপাদানই, ত্বকের পিগমেনটেশন এবং ডার্ক স্পট্স হালকা করতে সাহায্য করবে।

প্রশ্নঃ আমার চোখের নীচে কালো প্যাচ রয়েছে। কী করলে কালো প্যাচ-টা মুছে যাবে?

উত্তরঃ চোখের চারপাশের ত্বক খুব নরম হয়। সুতরাং ওখানকার কালো প্যাচ দূর করতে হলে আঙুলের সাহায্যে হালকা করে বাদাম তেল চোখের চারপাশে মাসাজ করতে হবে। ভিটামিনে সমৃদ্ধ বাদাম তেল ডার্ক সার্কলস কম করে। এটি ছাড়াও তুলোর সাহায্যে আলুর রস চোখের নীচে লাগাতে পারেন। আলুতে ন্যাচারাল ব্লিচিং উপাদান আছে যা ডার্ক সার্কলস হালকা করতে সাহায্য করে।

মুখরোচক মিক্সচার

মশলাদার কর্নফ্লেক্স, ভেজ কাটলেট ব্যানানা টোস্ট, ম্যাকারনি স্যালাড কিংবা স্পেশাল আলু টিক্কি, যা মন চায় খেতে, বানিয়ে নিন নিজের হাতে। রইল রেসিপিজ।

মশলাদার কর্নফ্লেক্স

উপকরণ: ৩ কাপ কর্নফ্লেক্স, তিন টেবিল চামচ কাজু, ১০-১২টা কিশমিশ, ৮-১০টা বাদাম, তিন টেবিল চামচ চিনাবাদাম গুঁড়ো, এক টেবিল চামচ সাদা তেল, সামান্য কারিপাতা, সামান্য হিং, আধা চা চামচ হলুদগুঁড়ো, এক চা চামচ চাটমশলা, আধা চা চামচ আমচুর, আধা চা চামচ লাল মরিচের গুঁড়ো, দুই চা চামচ চিনি এবং স্বাদ অনুযায়ী নুন।

প্রণালী: একটি নন-স্টিক প্যানে তেল গরম করে কাজু ও বাদাম দিন এবং বাদামি রং হওয়া পর্যন্ত ভাজুন। আস্তে আস্তে ভাজুন এবং তেলে হিং, কারিপাতা, হলুদগুঁড়ো, শুকনো মশলা এবং কর্নফ্লেক্স দিয়ে মেশান। তারপর কাজু-কিশমিশ যোগ করুন। এবার যখন খুশি পরিবেশন করুন।

ভেজ কাটলেট

উপকরণ: মাঝারি আকারের দুটি বিটরুট, ১৫০ গ্রাম আলু সিদ্ধ ম্যাশ করা, স্লাইস ব্রেড দু-পিস, দুই টেবিল চামচ অ্যারারুট পাউডার, সাদা তেল দুই টেবিল চামচ এবং নুন স্বাদ অনুযায়ী।

স্টাফিং উপাদান: ১০-১২টি কাজুবাদাম চূর্ণ, আধা কাপ খোসা ছাড়ানো তিল, দুই টেবিল চামচ চিনাবাদাম গুঁড়ো, ১০- ১২টা কিশমিশ, আধা চা চামচ গোলমরিচ গুঁড়ো, ১০০ গ্রাম পনির, সামান্য ধনেপাতার কুচি।

প্রণালী: বিটরুট সিদ্ধ করে ঠান্ডা করুন, খোসা ছাড়িয়ে নিয়ে চটকে রাখুন। ম্যাশ করা আলু এবং ব্রেড মিশিয়ে নিন। স্টাফিংয়ের জন্য অ্যারারুট পাউডার, নুন, গ্রেট করা পনির, কাজুর গুঁড়ো এবং তিলের বীজ ছাড়া বাকি সব উপকরণ যোগ করুন। মিশ্রণটির মাঝখানে চিজ ফিলিং দিন এবং একটি কাটলেটের আকার দিন। খোসা ছাড়ানো তিলের বীজে মুড়িয়ে মাঝখানে এক টুকরো কাজু দিন। অল্প আঁচে গরম তেলে খাস্তা করে ভাজুন এবং চাটনি এবং সসের সঙ্গে পরিবেশন করুন।

ব্যানানা টোস্ট

উপকরণ: ৪-টে পাকা কলা, সাদা স্লাইস ব্রেড কয়েকটা, এক টেবিল চামচ সুগার ফ্রি পিনাট বাটার, সামান্য চিনি, এক চা চামচ এলাচগুঁড়ো।

প্রণালী: ব্রেড বেক করে তাতে পিনাট বাটার লাগান। এবার এতে সুগার ফ্রি পিনাট বাটার লাগান। এরপর ব্রেড-এর উপর কলার টুকরো রেখে এলাচগুঁড়ো দিয়ে সাজিয়ে পরিবেশন করুন।

ম্যাকারনি স্যালাড

স্যালাড ড্রেসিং জন্য উপকরণ: দুই টেবিল চামচ ভিনিগার, আধা চা চামচ লেবুর রস, এক টেবিল চামচ অলিভ অয়েল, দুই টেবিল চামচ আনারস সিরাপ, এক চামচ রসুন বাটা এবং নুন স্বাদমতো।

স্যালাডের উপাদান: পরিমাণ মতো ম্যাকারনি, একটা শসার কুচি, একটি পেঁয়াজ কুচি, আনারস কাটা, একটি গাজরের টুকরো এবং লাল-হলুদ-সবুজ ক্যাপসিকামের টুকরো।

প্রণালী: একটি প্যানে ম্যাকারনি সিদ্ধ করে ছেঁকে নিন। তারপর এতে সব কাটা সবজি দিন। সবশেষে স্যালাড দিয়ে সাজিয়ে, ফ্রিজে রেখে ঠান্ডা করে পরিবেশন করুন।

স্পেশাল আলু টিক্কি

উপকরণ: ২০০ গ্রাম সিদ্ধ এবং ম্যাশ করা আলু, এক কাপ দই, দুই টেবিল চামচ অ্যারারুট পাউডার, এক টেবিল চামচ চালের আটা। আধা কাপ ব্রেড ক্রাম্বস। পরিমাণমতো সাদা তেল, স্বাদ অনুযায়ী নুন।

স্টাফিং উপাদান: আধা কাপ ধোয়া মুগ ডাল, এক টেবিল চামচ সিদ্ধ মটর ডাল, এক টেবিল চামচ কাজুবাদামের গুঁড়ো, ১০-১২টা কিশমিশ, এক টেবিল চামচ চিনাবাদাম গুঁড়ো, আধা চা চামচ ‘সুমন’ ব্র্যান্ড-এর জিরেগুঁড়ো, এক চা চামচ ধনে ও মরিচগুঁড়ো, এক চা চামচ আদাকুচি, কাঁচালংকার কুচি, এক চা চামচ চাট মশলা, দুই চামচ সাদা তেল, এক টেবিল চামচ বেসন, এক টেবিল চামচ ধনেপাতা কুচি এবং স্বাদ অনুযায়ী নুন।

প্রণালী: ডালে জল যোগ করুন এবং সিদ্ধ করুন। ডাল গলে যাওয়ার আগে নামিয়ে রেখে জল ঝরিয়ে রাখুন। একটি নন-স্টিক প্যানে তেল গরম করে বেসন দিন। তারপর ডাল যোগ করুন এবং কম আঁচে ভালো করে ভাজুন। এতে সব মশলা, মটর, ড্রাই ফ্রুট ইত্যাদি যোগ করুন।

ম্যাশ করা আলুতে অ্যারারুট পাউডার, চালের গুঁড়ো এবং নুন ভালো করে মিশিয়ে নিন। লেবুর রস মেশান। প্রতিটি টিক্কি ব্রেডক্রাম্বে ডুবিয়ে একটি নন-স্টিক প্যানে সোনালি হওয়া পর্যন্ত ভাজুন। চাটনি, আদাকুচি, দই, নুন এবং ঝুরিভাজা দিয়ে পরিবেশন করুন।

ছোটোদের রাগ কিংবা আবেগ সামলাবেন কীভাবে?

গবেষকরা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে, অভিভাবকত্বের ক্ষেত্রে স্বৈরাচারী কৌশলগুলি প্রকৃতপক্ষে সন্তানের মঙ্গল সাধন করে না। তাহলে সন্তানকে লালন-পালন করার সঠিক উপায় কী? একজন অভিভাবক কতটা শৃঙ্খলা এবং সঠিক শিক্ষা দিতে পারেন তার সন্তানকে? সঠিক অভিভাবকত্বের উপায় বা কৌশল কী? উত্তর হল— কোমল অভিভাবকত্ব। এটি হল পেরেন্টিং টেকনিক। আর এই কোমল অভিভাবকত্ব এমন একটি ধারণা, যা মূলত ভালোবাসা এবং সহানুভূতি সমৃদ্ধ। বিশেষকরে সন্তানের রাগ কিংবা আবেগকে সহজে সামলানোর মাধ্যম হতে পারে— স্পর্শ। তাই বলা যায়, শিশুর বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে শারীরিক সংযোগ।

সন্তানের প্রতি ভালোবাসা ও সহানুভূতির আচরণকে কোমল অভিভাবকত্ব আখ্যা দেওয়া যেতে পারে। সন্তান যখন ছোটো থাকে, তখন বাবা-মাকে বুঝতে হয় যে, তাদের সন্তানের মস্তিষ্ক এখনও পরিপক্ক নয়। তাই সন্তানকে পরিবেশের উপর নিয়ন্ত্রণ অর্জন করতে শেখাতে হয়। সন্তানের ব্যক্তিগত চাহিদা, পছন্দ এবং অপছন্দের বিষয়টিকে সহানুভূতির সঙ্গে বিবেচনা করতে হয় বাবা-মাকে। শুধু তাই নয়, ধীরে ধীরে সন্তানকে আত্মবিশ্বাসী করে তুলতে হয়। আর এই প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ করা যেতে পারে স্পর্শকে মাধ্যম করে।

সন্তানের অবাঞ্ছিত আচরণগুলির সংশোধন করার জন্যও যত্ন, মনোযোগ এবং সহানুভূতির প্রয়োজন। ইলেকট্রনিক ডিভাইসের উপর তাদের নির্ভরশীলতা যাতে বৃদ্ধি না পায়, সেই বিষয়ে যথেষ্ট সচেতন থাকতে হবে অবিভাবকদের। এর জন্য ওদের বকাবকি না করে, বরং কোমল অভিভাবকত্বের পথ অবলম্বন করুন। ইলেকট্রনিক ডিভাইসের উপর তাদের নির্ভরশীলতা কমানোর জন্য বই পড়া, গান শোনা, শারীরিক ব্যায়াম, সাঁতার প্রভৃতি ভালো বিষয়গুলির অভ্যাস গড়ে তুলতে সাহায্য করতে হবে।

প্রয়োজনে মা এবং বাবাও সন্তানের সামনে এই ভালো উপায়গুলি অবলম্বন করে সন্তানকেও সুঅভ্যাস গড়ে তুলতে অনুপ্রাণিত করবেন আদর এবং স্পর্শকে মাধ্যম করে। কারণ, শিশুদের সঙ্গে স্পর্শের মাধ্যমে হৃদয়ের সংযোগ বাড়ানো যায়, রাগ কমানো যায় কিংবা বদভ্যাস দূর করানো যায়। তাই শিশুর বেড়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে তাদের নিরাপত্তা এবং আত্মবিশ্বাস গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে স্পর্শ।

স্পর্শ হল এমন এক টেকনিক, যা শিশুকে নিরাপত্তা দেয়, নিশ্চিত করে যে, ‘আমি তোমার পাশেই আছি, তোমার ভয় নেই।’ স্পর্শ হল শারীরিক উপস্থিতি নিশ্চিত করা, স্পর্শ হল ভালোবাসা। স্পর্শ হল মানসিক এবং শারীরিক কষ্ট লাঘব, স্পর্শ হল আরামের অনুভূতি প্রদান।

স্পর্শ মানসিক শক্তি এবং সাহস জোগায়। পাশাপাশি, স্পর্শের পরে অক্সিটোসিন হরমোন নিঃসরণ করে, স্বাস্থ্যকে ভালো রাখে। শুধু তাই নয়, এটি কর্টিসল, স্ট্রেস হরমোনের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে, স্ট্রেস এবং উদ্বেগ হ্রাস করে এবং মানসিক সুস্থতা প্রদান করে। যেসব শিশু স্পর্শ থেকে বঞ্চিত হয়, তাদের কর্টিসলের পরিমাণ বেশি। থাকে, যা মস্তিষ্কের হিপ্পোক্যাম্পাসে টিস্যুর ক্ষতি করতে পারে। তবে প্রতিটি স্পর্শের অভিপ্রায় ভিন্ন। ভালো স্পর্শ এবং খারাপ স্পর্শের মধ্যে পার্থক্যগুলিও কিশোর-কিশোরীদের শেখানো উচিত।

শিশুর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের জন্য তাকে জড়িয়ে ধরা, চুমু খাওয়া ইত্যাদি বিষয়গুলো শিশুর ভালো অনুভূতির হরমোন নিঃসৃত করে, যা শিশুর বিকাশকে প্রভাবিত করে। শিশুরা কোনও ভুল করলে তাদের যেমন বকা হয়, একই ভাবে তাদের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের জন্য দ্রুত আলিঙ্গন করা এবং জড়িয়ে ধরাও প্রয়োজন। সন্তান যদি একই ভুল বারবার করে, সেক্ষেত্রে ভেঙে পড়লে চলবে না। সন্তানের প্রতি বিরূপ মানসিকতা নিয়ে তাকে মারধর করতে যাবেন না। এতে ফল বিপরীত হতে পারে। বরং ওর পাশে থাকুন।

সন্তান যদি অকারণ জেদ বা বায়না বাড়িয়ে দেয়, অনেক পরিবারেই মা কিংবা বাবা তাকে চরম মারধর করে বসেন। তা না করে, আপনি আপনার শিশুর সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করুন। শিশু কী চাইছে সেটা শোনার চেষ্টা করুন। তারপর তার মাথায়, পিঠে হাত রেখে বোঝান, সে যেটার জন্য বায়না করছে সেটা যুক্তিসঙ্গত নয়। পরিবর্তে আপনার সাধ্যের মধ্যে যা আছে, সেটা তাকে দিয়ে প্রাথমিক ভাবে শান্ত করুন।

সন্তানের বয়ঃসন্ধিকালীন আচরণ খেয়াল করুন। ওকে কথায় কথায় দোষারোপ বা বকাবকি করবেন না। ওর সঙ্গে বন্ধুত্বসুলভ আচরণ করুন এবং কী বলতে চায় তা মনোযোগ সহকারে শুনুন। ওকে কথা বলার সুযোগ দিন। আপনার সন্তান যদি কোনও অন্যায় করে থাকে এবং সেটি অন্য কোনও সূত্রে জানতে পেরে থাকেন, তাহলে আগেই ওর উপর খড়্গহস্ত হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়বেন না। বরং তাকে পাশে বসিয়ে, পিঠে হাত রেখে বুঝিয়ে বলুন, দেখবেন সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে সহজে।

বোঝার চেষ্টা করুন, আপনার ছেলে বা মেয়ে, কোনও ঘটনা জানায়নি হয়তো ভয়ে। আপনি ওকে ধমক দিতে পারেন, বকাবকি করতে পারেন, ওর এই ভয় থাকা খুবই স্বাভাবিক। তাই পাশে বসিয়ে আগে ওর মুখ থেকে শুনুন কেন সে অনৈতিক কাজটি করল। এতে অন্য কারও প্ররোচনা ছিল কিনা। হয়তো আপনার সন্তানের দোষ নয়, ঘটনাটি যে ঘটাতে প্ররোচিত করেছে, এটা তারই দোষ।

অনেক সময় বয়ঃসন্ধির ছেলেমেয়েরা বন্ধুদের সঙ্গে চ্যালেঞ্জ নিয়েও, ভালো-মন্দ না বুঝেই অনেক ধরনের অন্যায় করে বসে। ও হয়তো বুঝতে পারেনি ব্যাপারটি কী ঘটতে যাচ্ছে, কারণ এর পরিণাম সম্পর্কেও হয়তো কোনও পূর্ব ধারণা ছিল না। তাই যুক্তি বুদ্ধি দিয়ে বিচার করে তারপর সমস্যা সমাধানের পথ তৈরি করুন। প্রয়োজনে সন্তানকে আদরের স্পর্শে খারাপ কাজ থেকে বিরত থাকার শিক্ষা দিন।

বিশেষ পরামর্শ

O শিশু বা কিশোরটি কোনও কারণে খুব বেশি রাগ করলে কিংবা আবেগপ্রবণ হলে তাকে জড়িয়ে ধরুন, তার গালে চুমু খান। এতে তার মন শান্ত হয়ে আসবে

O বড়োদের মতো ছোটোরাও মাঝেমধ্যে অবসাদ অনুভব করে। তাদেরকে এই হতাশা ও অবসাদ থেকে বের করে আনার জন্য জড়িয়ে ধরা ও চুমু খাওয়ার গুরুত্ব অনেক

O স্পর্শ শিশুর মানসিক স্বাস্থ্য ভালো রাখে এবং তারা তাদের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে

O সুখী সন্তানই সুস্থ সন্তান। আপনার সন্তানের সঙ্গে কোয়ালিটি টাইম স্পেন্ড করুন। ভালোবাসা প্রকাশের জন্য কথা বলার সময় তাকে স্পর্শ করুন। এটা কেবল সন্তানকে খুশিই রাখে না, পাশাপাশি তার আত্মবিশ্বাস ও আপনার কাছে তার গুরুত্ব অনুভব করাতেও সাহায্য করে

O অভিভাবক ও সন্তানের মধ্যে সম্পর্ক জোরালো করতে সাহায্য করে শারীরিক স্পর্শ। ফলে শিশু নিজেকে নিরাপদ অনুভব করে

O জড়িয়ে ধরার উষ্ণতা সন্তানের ভয় দূর করতে সহায়তা করে এবং সম্পর্কের প্রতি বিশ্বাস বাড়াতেও সাহায্য করে।

শ্বেতপাথরের স্বর্গ (পর্ব-০১)

আমাদের কল্পনায় মনের ভিতরে স্বর্গের একটা অজানা রূপ গড়া আছে। সেই স্বর্গ যেন শ্বেতপাথর ছেনে তৈরি। তবে আমি কিন্তু শ্বেতপাথরের যে সমারোহ দেখে এলাম, তাকে স্বর্গরাজ্য বলাই যায়। আমাদের কাছে যার পরিচিত নাম মার্বেল-রক। খুব বেশি দূরে নয়। ট্রেনে মাত্র এক রাতের যাত্রাপথ৷ তিন-চার দিনের ছুটি পেলেই দিব্যি ঘুরে আসা যায়। আমিও তেমন-ই এক সপ্তাহান্তে বন্ধুর সঙ্গে বেরিয়ে পড়েছিলাম সেই স্বর্গ দেখার লোভে। বন্ধুকে নেওয়ার আমার একমাত্র উদ্দেশ্য, ওর ক্যামেরা যেন রং তুলি দিয়ে ছবি আঁকে মনের ক্যানভাসে।

জব্বলপুরে যদিও বিমানবন্দর আছে, তবুও আমি কোথাও ঘুরতে গেলে খুব নিরুপায় না হলে সাধারণত বিমানে যাই না। কারণ ট্রেনে বেশি সময় ধরে গেলে কিছুটা সময়ের অপচয় হয় বটে, তবে চারপাশটা অনেক বেশি উপভোগ করা যায়। পাঁচটি রাজ্য পেরিয়ে এক্ষেত্রে ভ্রমণের অনুভূতিটা বেশ চমকপ্রদই হল। ঠিক সেই কারণেই হাওড়া থেকে দুপুর একটা চল্লিশে উঠে পড়লাম, শক্তিপুঞ্জ এক্সপ্রেসে। গন্তব্য একেবারে শেষ স্টেশন, জব্বলপুর।

পরদিন দুপুর প্রায় আড়াইটে নাগাদ জব্বলপুরে নেমে পড়লাম। স্টেশনটি ছবির মতো সুন্দর এবং অত্যাধুনিক। ফাঁকে একটা কথা বলে রাখা জরুরি যে, শক্তিপুঞ্জ এক্সপ্রেসের খাবারের মান কিন্তু বেশ ভালো। আমিষ, নিরামিষ দু’রকমই যথেষ্ট সুস্বাদু। আমাকে আরও বেশি মুগ্ধ করেছিল ট্রেনের পরিচ্ছন্নতা। স্টেশনের কাছাকাছি প্রচুর বিভিন্ন মানের হোটেল আছে। একটি বাঙালি খাওয়ার হোটেলের পাশেই আমরা উঠলাম। উদ্দেশ্য ক’দিন বিভুঁইয়ে বাঙালি খাবারের স্বাদ। ফ্রেশ হয়ে একটু বিশ্রাম নিয়ে নিলাম, যাতে ট্রেন-যাত্রার ধকলটা কাটে। কারণ সন্ধের মুখেই আবার বেরব। আসলে একদম সময় নষ্ট করা নেই।

হোটেলের সামনে থেকেই একটি অটো রিজার্ভ করে নিলাম আড়াইশো টাকায় ‘কাচনার সিটি’ যাতায়াতের জন্য। কী আছে ওখানে! ভারতের সবচেয়ে বড়ো শিব মূর্তি স্থাপিত এক স্বর্গীয় উদ্যানে। ঠিক সন্ধে সাতটায় আরতি হয়। উদ্দেশ্য অনবদ্য সেই দৃশ্য উপভোগ করা। পরদিন আমাদের গন্তব্য আসল আকর্ষণ মার্বেল রক ও ধুঁয়াধার ফলস, সঙ্গে আরও কিছু উপরি দ্রষ্টব্য স্থান।

হোটেলের সামনেই গাড়ির স্ট্যান্ড। আমি মূল দু’টি দ্রষ্টব্য স্থান ছাড়াও আরও দু’টি জায়গা বেছে নিলাম। একটি হল চৌষট্টি যোগিনী মন্দির, অপরটি মদনমহল ফোর্ট ও তৎসংলগ্ন ব্যালেন্সিং রক। যাওয়া আসা চুক্তি হল দেড় হাজার টাকায়। মোটামুটি সব মিলিয়ে পঞ্চাশ কিলোমিটার ভ্রমণ। আমরা প্রাতঃরাশ সেরে বেরোলাম সকাল ন’টা নাগাদ। প্রথম গন্তব্য মার্বেল-রক। জব্বলপুর শহর ছাড়াতেই রাস্তার দু’পাশে জঙ্গল ফুঁড়ে মাথা উঁচু করতে লাগল ছোটো বড়ো টিলা। সময় গড়াতেই সেগুলো পাহাড়ের রূপ নিল। ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই আমরা পৌঁছে গেলাম মার্বেল-রক গাড়ি স্ট্যান্ডে। সেখান থেকে মার্বেল-রক নদীপথে কাছ থেকে উপভোগ করার জন্য বোটিং ঘাট প্রায় পাঁচশো সিঁড়ি নীচে। যাওয়ার পথের দু’ধারে হরেকরকম মার্বেলের দ্রব্যের পসরার দোকান। নিজের সংগ্রহ করার ইচ্ছেকে অতি কষ্টে দমন করে নামতে লাগলাম বোটিং ঘাটের দিকে। ঘাটের পাশেই পাঁচমাথার মন্দির। মাথাপিছু একশো টাকা টিকিট কেটে আমরা উঠে পড়লাম বোটে।

নৌকা ছাড়ল নর্মদা নদীর স্বচ্ছ সবুজাভ জলে। জলের নীচের পাথর, মাছ সব দৃশ্যমান। তবে আসল চমক নদীর দু’পাশে। এই সুন্দর যাত্রাপথে নৌকার যিনি চালক, তিনিই সাধারণত গাইডের কাজ করেন। বুঝিয়ে দিতে লাগলেন কোন স্থানে কোন সিনেমার কী গানের শুটিং হয়েছিল। চারপাশে শ্বেতপাথরের পর্বতমালা। আর তার শ্বেতশুভ্র দেয়ালে সূর্যের রামধনু রঙের নৃত্যনাট্য। নামেই শ্বেতপাথর, তার মধ্যে রয়েছে পীতাভ, নীলাভ, গোলাপি, বাদামি, সবুজের আভাযুক্ত কত রঙের মার্বেল! আরও একটি বিষয় মুগ্ধ করল, মার্বেলের খাঁজে নীল ডানার সোয়ালো পাখির বাসা। কোনও জায়গায় দু’ধারের পাথরের দেয়াল এত সরু হয়ে এসেছে, যেন লাফ দিয়ে চলে যাওয়া যাবে। আবার পরক্ষণেই তার বিপুল ফারাক।

এরকমই এক সংকীর্ণ জায়গার নাম ‘বান্দনি লাফ’। এখানে সত্যিই বাঁদর এ-মাথা থেকে ও-মাথা লাফালাফি করে। তার মাঝে খরস্রোতা নদী কোথাও সংকীর্ণ আবার কোনওখানে বিস্তৃত। ঘণ্টাখানেকের সফর, তবু মনে দাগ কেটে গেল আজীবনের মতো। এবার আবার নীচে থেকে গাড়ির কাছে উঠে আসার পালা। কিন্তু যাওয়ার সময়ের দু’পাশের লোভনীয় দ্রব্যাদি সংগ্রহের আগ্রহ আর সংবরণ করা গেল না। যথারীতি কেনাকাটা বেশ ভালোই হল। আর দামও তুলনামূলক অনেক সস্তা। আমাদের পরবর্তী গন্তব্য মধ্যপ্রদেশ পর্যটনের বিস্ময় ধুঁয়াধার ফলস। প্রসঙ্গত বলে রাখি এই দ্রষ্টব্যস্থানগুলি সবই ভেড়াঘাট বা তার আশেপাশেই। যদি কেউ গাড়ির অর্থ বাঁচিয়ে বাসে আসতে চান, তাহলে তাকে নামতে হবে ভেড়াঘাট বাস স্টপে।

(ক্রমশ…)

সমৰ্পণ (শেষ পর্ব)

সেদিন মা এবং ভাইয়ের অমন ঝগড়া দেখে আমিও ঘাবড়ে গিয়েছিলাম। ঠিক এমন সময় মাসির ফোন এল। মা তখন রাগের মাথায় মাসিকে জিজ্ঞেস করে বসলেন, ‘যা শুনছি তা কি সত্যি? তুমি কি সম্মান হারিয়েছ?’

মায়ের কথা শুনে মাসি বলেছিলেন, ‘এখন এসব কথার উত্তর খুঁজতে গিয়ে লাভ কী? পরিবারের লোকজন, সমাজ— সবাই মিলে যখন গুরুজির আশ্রমে এই সুদূর বৃন্দাবনে আমাকে জোর করে পাঠিয়ে দিয়েছিল, তখন কি কেউ আমার ভালোমন্দের কথা চিন্তা করেছিল? আমার যে সম্মানহানি হতে পারে, তা কি তখন কেউ ভেবেছিল? সবই কি আমার দোষ? আমার ইচ্ছেতে কি সবকিছু চলেছে? যা ঘটেছে কিংবা ঘটে চলেছে, তার জন্য কি আমি-ই দায়ী?’ মাসির থেকে অমন কথা শুনে মা তো রেগে আগুন। বলেছিলেন, ‘এমন জীবনের কী দাম! এর থেকে তো মরা ভালো।’

মায়ের কথার উত্তরে মাসি বলেছিলেন, ‘মরে যাওয়া কি অতই সোজা! সবার কি অত মনের জোর আছে?’ এভাবেই আরও কিছু কথা কাটাকাটির পর চিরদিনের জন্য বন্ধ হয়ে গিয়েছিল মায়ের সঙ্গে মাসির যোগাযোগ।

এরপর সময়ের স্রোতে বয়ে গেছে সবার জীবনের অনেক ক’টা বছর। আমার মায়ের সঙ্গে মাসির যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্নই ছিল। হঠাৎ দিল্লির এক হাসপাতাল থেকে একটা ফোন এল। জানা গেল, মাসি ক্যান্সারে আক্রান্ত। লাস্ট স্টেজ। চিকিৎসা চলছে। শেষবেলায় মাসি মায়ের সঙ্গে দেখা করার কাতর অনুরোধ জানিয়েছিলেন। সবকিছু জানার পর আমার মা পুরোনো মান-অভিমান ভুলে দিল্লি যাওয়ার প্রস্তুতি নিলেন। ভাইও কী ভেবে যেন সমস্ত রাগ-অভিমান ভুলে মাকে নিয়ে দিল্লি পাড়ি দিল।

মায়ের কাছ থেকে শুনেছিলাম, দিল্লি গিয়ে মা দেখে যে, মাসির সেই সুঠাম চেহারা ভেঙে জীর্ণকায় রূপ নিয়েছে। মুখোমুখি হওয়ার পর দু’জনে গলা জড়িয়ে অনেকক্ষণ কান্নাকাটি করেছিলেন। দুই বোনের অমন ভাব-ভালোবাসা দেখে আমার ভাইও কেমন অবাক হয়ে গিয়েছিল বলে শুনেছিলাম।

কিন্তু কান্নাকাটির পর মাসি হঠাৎ মাকে বলেছিলেন, ‘আর তো ক’টা দিন আছি এই পৃথিবীতে। তাই কোনও কথা আর গোপন রেখে মরতে চাই না। কী জানার আছে বল। আমি সব বলতে চাই আজ।’

এমন অবস্থায় মাসিকে শান্ত হতে বলেছিলেন আমার মা। কিন্তু মাসি থামেননি। প্রশ্ন করার আগেই অতীত তুলে ধরেছিলেন তিনি।

মাসি সেদিন মায়ের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, ‘শোন মিনতি, একা একটা মেয়ের বেঁচে থাকা বড়ো কঠিন রে। এটা আমি হাড়ে হাড়ে টের পাওয়ার আগেই নিজেকে বদলে নিয়েছিলাম। যখন দেখেছিলাম, বাপেরবাড়ির কিংবা শ্বশুরবাড়ির লোকেরা কেউ-ই আমার দায়িত্ব না নিয়ে বৃন্দাবন পাঠিয়ে দিল, তখন আমি মনকে শক্ত করে নিয়েছিলাম। ঠিক করেছিলাম, ঝড়- ঝাপটা যাই আসুক না কেন, সব সামলাব শক্ত হাতে।’

‘অবশ্য এই লড়াই শুরু হয়ে গিয়েছিল আরও আগে থেকেই। স্বামীকে বাঁচানোর জন্য কতগুলি অন্ধ-কুসংস্কারাচ্ছন্ন মানুষ যখন ভণ্ড গুরুজির সেবা করতে বাধ্য করেছিল, সেই তখন থেকেই আমার কপাল পুড়তে শুরু করেছিল। আমার সতীত্ব হরণ হয়েছিল তখনই। তাই বৃন্দাবনে গিয়ে নতুন করে আর খারাপ হতে হয়নি।’

‘অতএব বেঁচে থাকার জন্য গুরুজির দয়া ছাড়া আর দ্বিতীয় কোনও পথ খোলা ছিল না আমার কাছে। আর আমি জানি যে, বিধবা এক মহিলা বাড়ি ছেড়ে বৃন্দাবনের আশ্রমে থাকলে, তাকে সমাজ বেশ্যা-ই তো বলবে। অথচ সেই সমাজই রক্তচক্ষু দেখিয়ে এই বিধবাকে গুরুজির পায়ে সমর্পণ করেছিল। শালীনতা রক্ষা করা কি শুধু নারীর দায়িত্ব, কর্তব্য?’ এক নিশ্বাসে জীবনের গোপন ঝাঁপি খুলে দিয়ে মাসি তার বোনের কোলে এলিয়ে দিলেন শরীরটাকে।

একটু দূরে দাঁড়িয়ে আমার ভাই সব শুনছিল। সব শুনে মাসির প্রতি সমস্ত ঘৃণা যেন মুহূর্তের মধ্যে দূর হয়ে গিয়েছিল তার। কিন্তু সে যখন মাসির পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করতে গেল, তখন মাসি ইহজগৎ ত্যাগ করেছিলেন।

(সমাপ্ত)

সমৰ্পণ (পর্ব-০১)

সাত-সকালে একটা খবর শুনে মাথা গরম হয়ে গেল বিদিতার। সবসময় মহিলাদেরই কাঠগড়ায় তুলে কেন যে দোষী সাব্যস্ত করা হয়, এটা দেখেই রাগ দ্বিগুন হল বিদিতার। তার মাথার মধ্যে ঘুরতে লাগল, আশ্রমের সাধুরা যা ঘটাচ্ছে, তা কি কোনও নতুন ঘটনা? রাতারাতি তো আর আশ্রমও গড়ে ওঠেনি এবং সেখানে সাধুদের দৌরাত্ম্যও নতুন কোনও ঘটনা নয়। যাইহোক এ-সব সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতেই মাথা যখন আরও গরম হয়ে উঠল, তখন টিভির সুইচ অফ করে দিল বিদিতা। তারপর মনকে শান্ত করার জন্য রান্না ঘরে গেল চা বানাতে। কিন্তু চা বানাতে গিয়ে মনকে শান্ত করার চেষ্টা করলেও, মন ডুব দিল স্মৃতির গভীরে। শতকোটি চেষ্টা করেও মন খারাপের সেই স্মৃতিকে তাড়াতে পারল না বিদিতা।

অবশ্য মনকে আয়ত্তে আনতে না পারার ঘটনা নতুন নয়। আগেও বিদিতা বহুবারই পুরোনো দিনের কথা ভেবে মন খারাপের শিকার হয়েছে, কষ্ট পেয়েছে। আজও সেই অবস্থার পুনরাবৃত্তি ঘটল।

আজ আবার মাসির কথা মনে পড়ে গেল। মা আর মাসি যখন কথা বলত, তখন আমাকে সেখান থেকে চলে যেতে হতো। মাসি বলত, বড়োদের কথা শুনতে নেই বাচ্চাদের। বাধ্য হয়ে আমি তখন চলে যেতাম অন্যত্র। কিন্তু তারই মধ্যে যতটুকু যা কথা কানে আসত, তাতে মনে হয়েছিল, মাসি ছিলেন বাল্যবিধবা। তবে তখন ‘বিধবা’ শব্দটা শুনলেও, সঠিক মানে বুঝতাম না। তাই, মা-কে জিজ্ঞেস করে জেনেছিলাম যে, মাসি যখন ছোটো ছিল, তখন মেসো মারা গিয়েছিলেন। অবশ্য পুরো বিষয়টা বুঝেছিলাম আরও বড়ো হয়ে।

অনেক বড়ো ঘরে বিয়ে হয়েছিল মাসির। বিষয়-সম্পত্তিও ছিল অনেক। কিন্তু মেসোর স্বাস্থ্য ভালো ছিল না। মা-বাবার একমাত্র সন্তান ছিলেন মেসো। খুব আদরে মানুষ হয়েছিলেন। মাসির থেকে মেসো বয়সে অনেকটাই বড়ো ছিলেন। মেসোকে সুস্থ করে তোলার জন্য তাদের বাড়িতে পুজোপাঠ চলত। বৃন্দাবন থেকে এক গুরুজি আসতেন বাড়িতে। তাঁর আদেশ মানতে হতো পরিবারের সব সদস্যকে। গুরুজিকে ‘ভগবান’-এর মতো মনে করা হতো।

মাসি সব রকম নিয়মনিষ্ঠা পালন করতেন মেসোকে সুস্থ করে তোলার জন্য। শুনেছি একবার এক শীতের রাতেও নাকি স্নান করে রাতভর কীসব নির্দেশ পালন করেছিলেন মাসি। সব তিনি মুখ বুজে করতেন। কিন্তু কোনও সেবাযত্ন, নিয়মনিষ্ঠা, পুজোপাঠ করেও মেসোর প্রাণরক্ষা হয়নি।

মাসির বৈধব্যের পর অনেকেই অনেক জ্ঞান, উপদেশ প্রভৃতি দিতে শুরু করেছিলেন। কেউ বলেছিলেন, ‘বাকি জীবন নিষ্ঠার সঙ্গে বৈধব্য পালন করে পুণ্য অর্জন করো।’ কেউ আবার সহানুভূতি দেখিয়েছিল এই বলে যে, ‘এত কচি বয়েস, আবার বিয়ে করে আনন্দ করো।’ কিন্তু গুরুজি বলেছিলেন, “একে ভগবানের সেবায় নিয়োজিত করো, ভালো থাকবে’ এবং তাঁর নির্দেশই পালন করতে শুরু করেছিলেন মাসি।

বেশি দিন অপেক্ষা করতে হয়নি, বৃন্দাবন থেকে গুরুজি ডেকে পাঠালেন মাসিকে। তখন পরিবারের লোকজন আর প্রতিবেশীরা অনেকেই গুরুজির ডাকে সাড়া দেওয়ার পরামর্শ দিল মাসিকে এবং মাসিও সেই আজ্ঞা পালন করলেন মাথা নত করে।

এরপর শুরু হয়েছিল মাসির বৃন্দাবন-কাহিনি। শ্বশুরবাড়িতে তো টাকার অভাব ছিল না, তাই বৃন্দাবনে ‘ভগবান’ সেবা করতে গিয়ে অন্য বিধবাদের মতো ভিক্ষেবৃত্তি করতে হয়নি। বরং মাসির দেওয়া টাকায় গুরুজি বৃন্দাবনের আশ্রমকে সাজিয়ে-গুছিয়ে নিয়েছিলেন। তাই, থাকার জন্য ভালো জায়গাও পেয়েছিলেন মাসি। প্রথম দিকে দু’একবার শ্বশুরবাড়িতে এলেও পরের দিকে আর বৃন্দাবন ছাড়েননি মাসি। তবে আমার মায়ের সঙ্গে মাসির কথা হতো মাঝেমধ্যে ফোনে। কিন্তু, দু’একবার দেখেছি, মাসির সঙ্গে কথা বলার পর মা কেমন যেন দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়তেন। একবার তো এমনই হল যে, মা বৃন্দাবন যাওয়ার প্রস্তুতি নিলেন। কিন্তু আমার ভাই ছাড়ল না মা-কে একা। মায়ের সঙ্গে ভাইও বৃন্দাবন গেল মাসির আশ্রমে।

মা আর ভাইকে দেখে মাসি খুশি হলেও, সবকিছু দেখেশুনে আমার ভাই গেল বিগড়ে। মাসিকে সম্মান প্রদর্শন তো দূরের কথা, ঘৃণা করতে শুরু করল। মা যখন ভাইকে বলেছিলেন মাসিকে প্রণাম করতে, ভাই তখন রেগে আশ্রমের বাইরে চলে গিয়েছিল। শুধু তাই নয়, সেই ঘটনার রেশ গড়িয়েছিল বাড়ি পর্যন্ত।

আসলে আমার মা তার বোনকে এতটাই ভালোবাসতেন যে, মাসির বিরুদ্ধে কোনও অভিযোগ শুনতে চাইতেন না। তাই আমার ভাই যখন বাড়ি এসে রাগের মাথায় মাসিকে ‘বৃন্দাবনের বেশ্যা” বলে গালি দিয়েছিল, মা তখন ভাইয়ের গালে সপাটে একটা চড় বসিয়ে বলেছিলেন, ‘গুরুজনদের সম্মান করতে শেখো।’ কিন্তু আমার ভাই তাতে এতটুকুও বিচলিত না হয়ে বলেছিল, ‘আমি যা দেখে-শুনে এলাম তা কি সব মিথ্যে?” তবে আমার মা-ও ছিলেন বক্তব্যে অবিচল। তিনি ভাইকে বলেছিলেন, “তুই যা জেনেছিস, সব ভুল, মিথ্যে। আর কোনওদিন যদি আমার বোনের সম্পর্কে অপমানজনক কথা বলিস তো আমার অন্য রূপ দেখবি।”

(ক্রমশ…)

সন্তানকে সহবত শেখাবেন কীভাবে?

শিশুরা কাঁচা বাঁশ কিংবা নরম মাটির মতো। তাই নরম থাকা অবস্থায় তাকে ইচ্ছেমতো সুন্দর রূপ দেওয়া যায়। জানেন তো, ইংরেজিতে একটা প্রবাদ আছে, ‘ওয়েল বিগান ইজ হাফ ডান’। অতএব, শুরুটা ভালো হওয়া চাই। ভিত সুন্দর এবং মজবুত হলে তবেই ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল হবে। আর শিশুকে সুন্দর ভাবে গড়ে তোলার শিল্পী বা কারিগর কিন্তু শিশুর মা-বাবা। শুধু ভালো স্কুল-এ ভর্তি, ভালো লেখাপড়া কিংবা পুষ্টিকর খাবার খাওয়ালেই শিশুর ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল করে তোলা সম্ভব নয়।

শিশুকে সহবতও শেখাতে হবে। যাতে তার ব্যবহারে ভদ্রতা, নম্রতা এসব বজায় থাকে। যেন সে মিশুকে এবং দয়ালু হয়, স্বার্থপর না হয়, অন্যকে সাহায্য করে, সহানুভূতি দেখায়। কারণ, শিশুরাই সমাজ এবং দেশের ভবিষ্যৎ। মনে রাখবেন, সহবত শেখানো এবং দেখানো, দুটি বিশেষ গুণ। এই গুণ-কে ছোটো থেকে লালন করতে পারলে নিজের এবং অন্যের সবার-ই মঙ্গল। মা-বাবা যদি তাদের সন্তানকে ছোটো থেকে সহবত না শেখান, তাহলে যে কী কী হতে পারে, তেমন-ই কিছু ঘটনার উল্লেখ করছি এখানে।

বিয়ের পাকা দেখা চলছে। মেয়ের বাড়ির লোকেরা উপস্থিত ছেলের বাড়িতে। টেবিলে জল, মিষ্টি, চা প্রভৃতি দেওয়া হয়েছে অতিথিদের। এমন সময় ওই বাড়ির একটি বাচ্চা ছেলে নিজের ছোট্টো সাইকেলে চড়ে এ-ঘর, ও-ঘর দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। ওকে বাড়ির কেউ থামাচ্ছেও না। অতএব, বিপর্যয় ঘটার-ই ছিল! বাচ্চাটি জোরে সাইকেল চড়ে এসে ধাক্কা মারল টেবিলে। মুহূর্তের মধ্যেই চা, মিষ্টি, জল সমস্ত ছড়িয়ে ছিটিয়ে, কাচের বাসনপত্র ভেঙে একাকার। অনেকের গায়ে গরম চা পড়ে সে এক করুণ পরিস্থিতি।

‘বাচ্চা ছেলে কী আর করা যাবে’ বলে হাসিমুখে তাৎক্ষণিক ভালো প্রতিক্রিয়া দিলেও, পরে মেয়ের বাড়ির লোকেরা সিদ্ধান্ত বদলে ফেলেন। অতিথিদের সামনে কী সহবত দেখাবে বাচ্চা, তা যে বাড়িতে শেখানো হয় না, সেই বাড়িতে মেয়ের বিয়ে দিলে মেয়ে সুখী হবে না— এমনটাই ধরে নিয়েছিলেন মেয়ের বাড়ির লোকেরা। কার্যত, বিয়ের সম্বন্ধটা ভেঙে যায়।

স্কুলের প্রধান শিক্ষকের ছেলে হওয়া সত্ত্বেও, তাকে যে ঠিক মতো সহবত শেখানো হয়নি, তারই প্রমাণ পাওয়া গেল একটি ঘটনায়। প্রধান শিক্ষকের বাড়িতে তাঁর ছেলে রিন্টু ছাড়াও কয়েকজনকে পড়াতেন এক শিক্ষক। একবার পড়ুয়া এবং শিক্ষককে পায়েস খেতে দিয়েছেন রিন্টুর মা। আর রিন্টুকে বলেছেন পড়া শেষ হলে খেতে দেবেন। এ কথা শুনে রিন্টু হঠাৎ উঠে চলে গেল। খানিক বাদে আবার পড়ার ঘরে ঢুকল হাসতে হাসতে। এর ঠিক এক মিনিট বাদে রিন্টুর মা ভেজা কাকের মতো হয়ে ঢুকলেন পড়ার ঘরে এবং রুটি গড়ার বেলনা দিয়ে রিন্টুকে পেটাতে থাকলেন শিক্ষকের সামনেই। কী হয়েছে শিক্ষক জানতে চাইলে রিন্টুর মা জানালেন, পড়া শেষ হলে খেতে দেব বলায়, গায়ে এক বোতল জল ঢেলে দিয়ে এসেছে। গড়া রুটি, পায়েস সব নষ্ট হয়ে গেছে। শুধু তাই নয়, শীতকালে ফ্রিজে রাখা কনকনে ঠান্ডা জল মাথায় ঢাললে কী কষ্ট হতে পারে, তা বেশ টের পেয়েছিলেন রিন্টুর মা।

বাড়িতে আসা অতিথিদের মুখোমুখি বসে খাচ্ছিল পিঙ্কু। হঠাৎ সজোরে হাঁচি দিল নাকের সামনে হাত না রেখে। ব্যস! নাকের সর্দি গিয়ে পড়ল অতিথিদের গায়ে এবং খাবারে। খাওয়া পণ্ড হল অতিথিদের।

এমন আরও অনেক অপ্রিয় ঘটনার খবর আসতে থাকে কানে। কেউ হয়তো হাত দিয়ে মুখ না ঢেকে জোরে জোরে হাই তুলছে। কেউ শব্দ করে খাবার চিবোচ্ছে। বড়োরা যখন কথা বলছে তখন হঠাৎ-ই তাদের মাঝে লাফ দিয়ে পড়ছে। কেউ এলোপাথাড়ি ঢিল ছুঁড়ছে। কেউ অন্য কোনও বাচ্চার খেলনাপত্র কেড়ে নিচ্ছে। কেউ ধারালো কিছু দিয়ে অন্যকে খুঁচিয়ে দিচ্ছে। অন্যের চুল ধরে টানছে, মারছে। জামা-প্যান্ট-এ কালির দাগ কেটে দিচ্ছে। যে-কোনও ডে-কেয়ার বা ক্রেশ-এর এটি পরিচিত দৃশ্য। অর্থাৎ শিশুরা হাজারো অন্যায় করছে সঠিক গাইড-এর অভাবে। অবশ্য এর ঠিক উলটো ছবিও দেখা যায় অনেক ক্ষেত্রে।

জরুরি বিষয়

নিয়ম-নীতি, উচিত-অনুচিত এসব জেনে-বুঝে কাজ করে অনেকে। হাত না ধুয়ে খাবার খেলে যে অসুখ হতে পারে, এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টা ছোটো থেকেই শেখাতে হবে। খাবার টেবিল-এ কী সহবত দেখাতে হবে, তাও অত্যন্ত জরুরি বিষয়। হাঁচি, কাশির পর কিংবা বড়োদের গায়ে পা লাগলে যে ‘সরি’ বলতে হবে, এটা বাচ্চাদের অবশ্যই শেখাতে হবে। আস্তে কথা বলা, অন্যের কথার মাঝে কথা না বলা ইত্যাদি শেখানোও আবশ্যক। কেউ কিছু দিলে মা-বাবার অনুমতি নিয়ে খাওয়া, অনুমতি নিয়ে কোথাও কিংবা কারওর সঙ্গে যাওয়ার অভ্যাসও গড়ে তোলাতে হবে। যত্রতত্র ময়লা না ফেলে ওয়েস্টবিন-এ ময়লা ফেলা, যেখানে খুশি মলমূত্র ত্যাগ না করে শৌচালয়ে ত্যাগ করাও শেখাতে হবে ছোটো থেকেই। অনুমতি না নিয়ে কারও ঘরে ঢোকা যে উচিত নয়, তাও যেন শৈশবেই শিখে রাখে বাচ্চারা। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, ছেলে বাচ্চাদের ছোটো থেকেই শেখাতে হবে মেয়েদের সম্মান করতে।

নিজের বাড়ির পাশাপাশি রাস্তায়, উৎসব-অনুষ্ঠানে, অন্যের বাড়িতে, শিক্ষাক্ষেত্রেও কী কী সহবত দেখানো উচিত, তাও ছোটো থেকেই শেখাতে হবে। বামদিকের ফুটপাথ ধরে হাঁটা, রেড সিগন্যাল দেখে জেব্রা ক্রসিং দিয়ে রাস্তা পার হওয়া, অন্যকে ধাক্কা না দিয়ে চলা প্রভৃতি শেখানোও যেমন জরুরি, তেমনই উৎসব অনুষ্ঠানে খাওয়ার জন্য হ্যাংলামো না করে সবার সঙ্গে বসে ঠিকঠাক ভাবে খাওয়া, ভিড়ের মধ্যে লাফালাফি না করে বড়োদের হাত ধরে থাকা, ফুলের গাছে কিংবা সাজানো কোনও কিছুতে অযথা হাত না দেওয়া প্রভৃতি নিয়ম-নীতিগুলি বুঝিয়ে দিতে হবে বাচ্চাদের।

শিক্ষাক্ষেত্রে সহপাঠীদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ ব্যবহার করা, অকারণে অন্যের বিরুদ্ধে শিক্ষক-শিক্ষিকার কাছে মিথ্যে নালিশ না করা, অন্যের ব্যাগ থেকে কোনও জিনিস তুলে না নেওয়া, অন্যের খাবার জোর করে না খাওয়া, ঝগড়া না করা, লেখাপড়ায় মনোযোগ দেওয়া প্রভৃতি শেখানো অত্যন্ত জরুরি। শিক্ষক-শিক্ষিকার কথা ঠিকমতো শোনা, পরীক্ষার সময় অন্যের খাতা দেখে কিংবা বই দেখে যাতে না লেখে, লিখলে কী শাস্তি হতে পারে— তা বন্ধুর মতো বুঝিয়ে দিতে হবে ছোটো থেকেই।

বাচ্চাদের সামনে ঝগড়া-মারামারি-গালমন্দ না করা, অন্যদের এসব করতে না দেওয়ার সহবত দেখাতে হবে মা- বাবাকে। আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, বাচ্চাদের সামনে ধূমপান, মদ্যপান করা, স্বামী-স্ত্রী-র শারীরিক ভাবে ঘনিষ্ঠ হওয়া প্রভৃতি থেকেও স্ট্রিক্টলি বিরত থাকতে হবে। আর যদি দেখেন বাচ্চা কোনও ভাবে সহবত শিখছে না, কথা না শুনে চিৎকার চ্যাঁচামেচি করে একরোখা স্বভাবের হয়ে উঠছে, তাহলে ভাববেন সমস্যার শিকড় লুকিয়ে আছে গভীরে। আর নিজেরা যদি সমস্যার সমাধানে অসফল হন বারংবার, তাহলে আর দেরি না করে কোনও ভালো মনোবিদ কিংবা মনোরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে বাচ্চাকে নিয়ে গিয়ে কাউন্সেলিং করাবেন অবশ্যই। নয়তো এর ফল ভুগতে হবে আপনাদের এবং দেশ-বিদেশের সুস্থ নাগরিক সমাজকে।

উচ্চবিত্ত পিতামাতা-র জন্য এটা সতর্কতা

লাগামছাড়া হলে তার শাস্তি তো পেতেই হবে। পুনে নিবাসী এক বিল্ডারের ছেলে হাতে মোটা টাকা আর ক্ষমতা পেয়ে কী করেছিল, তা একটি বড়ো দুর্ঘটনা-র পর সামনে আসে। পানশালায় আকণ্ঠ মদ্যপানের পর, দেড়-দু কোটি টাকার গাড়িতে চেপে, ঘন্টায় ২০০ কিলোমিটার-এর বেশি স্পিড তুলে, দুই বাইক আরোহীর সঙ্গে টক্কর দিতে গিয়ে, জেদের বশে ওই দুই বাইক আরোহীকে মেরে ফেলে বিল্ডারের ‘সুপুত্র’।

সবচেয়ে মজার বিষয় হল এই যে, বিল্ডারের বিগড়ে যাওয়া ওই নাবালক ‘সুপুত্র’-কে যখন জুভেনাইল জাস্টিস বোর্ড-এ বিচারকের সামনে উপস্থিত করা হল, বিচারক তখন ৩০০ শব্দের নোট দিয়ে ওই নাবালক ‘অপরাধী’-কে শর্তসাপেক্ষে মুক্তি দিয়ে দেন। তবে ছেলেটি মুক্তি পেলেও, সংবিধানের ক্ষমতা প্রয়োগ করে, বিচারক ছেলেটির বাবা, মা এবং পানশালার মালিককে গ্রেপ্তার করার নির্দেশ দেন পুলিশকে।

কিন্তু ভেবে দেখুন, সংবিধানে যদি এই সুযোগ না থাকত কিংবা বিচারক ব্যাতিক্রমী ভূমিকা না নিতেন, তাহলে হয়তো ধনী বাবা-র অর্থ কিংবা ক্ষমতাবলে পুরো বিষয়টি ধামাচাপা পড়ে যেত। আর প্রাণ হারানো বাইক-আরোহীর পরিবার হয়তো অসহায় ভাবে নিজেদের দুর্ভাগ্যকে দায়ী করত। কিন্তু সংবিধান অনুযায়ী বিচারক যে ব্যতিক্রমী রায় দিয়েছেন, তা নিয়ে ব্যাপক হইচই পড়ে গিয়েছে। নৈতিকতার আদর্শ এই উদাহরণকে সামনে রেখে, সোশ্যাল মিডিয়া থেকে শুরু করে সংবাদমাধ্যম— সর্বত্র আলোচিত হয়েছে বিষয়টি। এখনও এই ঘটনা বিচারাধীন, তবে আশা করা যায়, দোষীরা উপযুক্ত শাস্তি এবং উচিত শিক্ষা পাবে।

অবশ্য এক্ষেত্রে প্রশ্ন থেকে গেল একটি বিষয় নিয়ে— এই ঘটনায় ‘মূল অপরাধী’ নাবালকের বিল্ডার পিতার কোনও রাজনৈতিক যোগ ছিল না বলেই হয়তো আমজনতা আওয়াজ তুলতে পেরেছে এবং দোষীরা গ্রেপ্তার হয়েছে। কিন্তু যদি কোনও রাজনৈতিক প্রভাবশালীর ‘সুপুত্র’ এমন অপরাধ করে, তাহলে সেই সময়ও পাবলিক এভাবেই আওয়াজ তুলতে পারবে তো?

আরও একটি বিষয় ভাবিয়ে তুলেছে যে, একটি আনরেজিস্টার্ড দামী গাড়ি এক নাবালকের হাতে মা- বাবা কী করে তুলে দিলেন? আবার এই প্রশ্নও মনে জাগে যে, এক নাবালককে পানশালায় মদ্যপানের অনুমতি কীভাবে দেওয়া হল? এক্ষেত্রে গাড়িটি যেমন দুটি প্রাণ ছিনিয়ে নিয়েছে, অর্থাৎ গাড়িটি এক্ষেত্রে খুনের অস্ত্র আর এই অপরাধ সংগঠিত হতে দিয়েছেন যারা, ছেলেটির মা-বাবা এবং পানশালার মালিক প্রত্যক্ষ অপরাধ না করেও, বড়ো অপরাধী। অতএব, ভালো অভিভাবক হতে গেলে যেমন নৈতিক দায়িত্ব পালন করতে হবে, ঠিক তেমনই সুশাসনও জারি রাখতে হবে।

অসামাজিক (শেষ পর্ব)

দেখুন, আমি কলকাতায় থাকি। উনি আমার বড়ো বউদি হন। ওনার ছেলেকে আজ পর্যন্ত আমরা দেখিনি। তাই যোগাযোগও নেই। আমেরিকায় থাকে শুনেছি। এমনকী আমার বাবার মৃত্যুর সময় পর্যন্ত আমার দাদাকে এই বউদি আসতে দেননি। এমনকী এখানে আমাদের অনেক পৈত্রিক জমি-জমা আছে, কিন্তু এই বউদির অসহযোগিতার জন্য সেই জমি-জমা বিক্রিও করা যাচ্ছে না। পড়ে পড়ে অযত্নে নষ্ট হচ্ছে। চিরকালই ওনার টাকা পয়সার অহংকারের জন্য উনি আমাদের কারও সঙ্গে যোগাযোগই রাখতেন না।

—দেখুন, এখন ওসব ভাবার সময় নয়। ভদ্রমহিলা এখন মৃত্যুশয্যায়, তাই যদি কিছু সাহায্য করতে পারেন তাহলে খুব ভালো হয়। মানবিকতার কথা ভেবে অন্তত…! ওহো আপনার নামটাই জিজ্ঞাসা করা হয়নি।

—শম্পা মণ্ডল। ঠিক আছে আপনি যখন মানবিকতার কথা বলছেন তখন আমি চেষ্টা করব যতটুকু করা সম্ভব তা করার। তবে আমি দিল্লি গিয়ে ওনাকে দেখাশোনা করতে পারব না। আমিও এখানে একা থাকি। আমার স্বামী গত হয়েছেন দু’বছর হল। আমার দুই মেয়ে আছে তারা বিবাহিত এবং বিদেশে সেটেলড। তাই আমাকেও এখানে দেখার কেউ নেই।

—দেখুন ওনার দেখাশোনার জন্য এজেন্সির মাধ্যমে একজন পরিচারিকাকে ২৪ ঘণ্টার জন্য রেখেছি। তাকে মাসে ২৫ হাজার টাকা করে দিতে হবে।

—আমি আপনার কথা বুঝতে পারছি। ঠিক আছে আমি এই খরচটা দিয়ে দেব। ওনার বিলটা আমাকে পাঠিয়ে দেবেন।

—টাকাটা আমাদের দিতে হবে না। যে এজেন্সি লোক দিয়েছে তাদের দিয়ে দিলেই হবে।

এরপর আরও দেড় মাস কেটে গেছে। অনিতাদেবীর শারীরিক অবস্থার ক্রমশ অবনতি হয়েছে। মিস্টার আহুজা আমেরিকাতে ওনার ছেলের নম্বরে হোয়াটসঅ্যাপ করেছিলেন। তাতে রিপ্লাই এসেছে, অনিতা সরকারের ছেলের বউ লিখেছে— আমি একজন আমেরিকান লেডি। আমার স্বামী অনিন্দ্য সরকার এখন জেলে আছে। সামনের মাসে কোর্টের তারিখ আছে। তখন জানতে পারব উনি ছাড়া পাবেন কিনা! নয়তো দশ বছরের জেল হবে। আর বিস্তারিত কিছু লেখা ছিল না। সদুত্তর না মেলায় সমস্যা আরও বেড়ে গেল।

ডাক্তার দেখতে এসে বললেন— ইমিডিয়েট রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে। না হলে বাঁচানো যাবে না। তাই সবাই খুব ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। শম্পা মণ্ডলের থেকে হাসপাতালে ভর্তি করার জন্য অনুমতি চাওয়া হল। কিন্তু উনি রাজি হলেন না।

শম্পা বললেন— দেখুন, আমি অনুমতি দিলেও ওনার ছেলে পরে আমাদের বলতে পারে যে, কোন অধিকারে আমরা ওনাকে হাসপাতালে পাঠিয়েছি। দ্বিতীয়ত, নার্সিং হোম বা হাসপাতালের এত খরচা আমরা দিতে পারব না। আপনারা যা ভালো মনে হয় করুন।

অনিতা সরকারের অবস্থা আরও খারাপ হওয়াতে আরডব্লিউএ পুলিশের সহায়তা নিয়ে সরকারি হাসপাতালে ভর্তি করল। কিন্তু তিনদিনের মধ্যে উনি ইহলোকের মায়া ত্যাগ করলেন।

বিনোদ বললেন— ওনার ছেলেকে ফোন করেছিলাম। ওনার আমেরিকান বউমা জানিয়েছেন ওদের ছেলেকে পাঠাবেন। তবে যতক্ষণ ছেলে এসে না পৌঁছোচ্ছে ততক্ষণ আমাদের দায়িত্ব যে, ফ্ল্যাটটা যেন কেউ বেদখল করতে না পারে।

সৌমিত্রবাবু বললেন— সে কী! এ কীভাবে সম্ভব?

পাশ থেকে মিস্টার নায়ার বলে উঠলেন— আমাদের পাড়াতেই এমন হয়েছে। মিস্টার মুখার্জীর ফ্ল্যাটও একজন পরিচারিকা জোর করে লিখিয়ে নিয়েছিল। ওনার ছেলে-মেয়ে কেউ ছিল না। বউদি আগেই মারা গিয়েছিলেন। এক পালিতপুত্র ছিল কিন্তু সেও শেষ সময়ে আলাদা থাকত বলে একজন পরিচারিকা রেখেছিলেন। সেই পরিচারিকা এবং তার স্বামী জোর করে তাকে সম্পত্তি সই করিয়ে নিয়েছিল।

সৌমিত্র— আরে মশাই, সেখানে তো ওনার নিজের সই ছিল বলে সবাইকে মেনে নিতে হয়েছিল। কিন্তু এখানে তো অবস্থাটা অন্যরকম।

মিস্টার আহুজা বললেন— সৌমিত্রবাবু আপনি হয়তো জানেন না আমাদের এই পাড়াতে মা ও মেয়ে থাকতেন। ভদ্রমহিলা মারা যাওয়ার কয়েকদিনের মধ্যে ওনার মেয়েও মারা যান। তখন আমাদের আরডব্লিউএ থেকে তার কিছু আত্মীয়স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছিল। তাঁরা জানান যেহেতু মা এবং মেয়ে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন না তাই তাদের সম্পত্তি নিয়ে কারও কোনও উৎসাহ নেই। তখন আরডব্লিউএ থেকে ওই ফ্ল্যাটে তালা লাগিয়ে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু কয়েকদিন পর এই পাড়ারই এক ঝগড়াটে মহিলা একথা জানতে পেরে তালা ভেঙে ফ্ল্যাটে ঢুকে ফ্ল্যাট দখল করে নেয়। প্রতিবাদ করলে বলে যে, কোনও তালা লাগানো ছিল না। তাই সে ফ্ল্যাটটির কব্জা নিয়েছে।

—এও কি সম্ভব?

—সব সম্ভব দাদা। কোর্টে গেলেও ওরা বলবে তদেরকেই ফ্ল্যাটটা দিয়ে গেছে। কোনও প্রমাণ নেই আমাদের কাছে। এখনও তারা ওই ফ্ল্যাট দখল করেই আছে। তাই আমরা চাই না এর পুনরাবৃত্তি হোক। আগামীকাল আমেরিকা থেকে অনিতাদেবীর নাতি এলে ফ্ল্যাট ওনার হাতে তুলে দিয়ে আমারা নিশ্চিন্ত হব!

পরেরদিন আমেরিকা থেকে নাতি এসে উপস্থিত হলে, মি. আহুজা অনিতাদেবীর অস্থি নিয়ে ওনার নাতিকে নিয়ে হরিদ্বার গিয়ে পারলৌকিক কার্য সম্পন্ন করে ফিরে আসেন।

ছেলেটি পুরোপুরি আমেরিকান। বাংলা বা হিন্দি বলতে পারে না। ভাষা সমস্যা থাকায় কষ্ট করে কোনওরকমে কাজটা সম্পন্ন করা হয়। সে ফেরার টিকিট নিয়েই এসেছিল, তাই ফ্ল্যাট এবং ব্যাংক-এর কাগজপত্র ইত্যাদি নিয়ে আমেরিকায় রওনা দেয়।

এখানেই হয়তো গল্পটার সমাপ্তি হয়ে যেত। কিন্তু কথায় আছে— ম্যান প্রোপোজেস অ্যান্ড গড ডিসপোজেস।

পরেরদিন মিস্টার আহুজা ফোন করে সৌমিত্রবাবুকে জানালেন— দাদা সব গড়বড় হো গ্যায়া। আজ আমরিকা সে উনকা নাতি কা ফোন আয়া থা, উনহো নে বোলা কী কাল ও আ রাহা হ্যায়। অভি সওয়াল এ হ্যায় কী— কাল যো সব লেকে গায়া, ওহ ফির কউন থা!

অসামাজিক (পর্ব-০১)

সৌমিত্র ভট্টাচার্য দীর্ঘদিন ধরে দিল্লিতে আছেন। তাই পরিচিতিও হয়েছে। এক রবিবার সৌমিত্র-র মোবাইলটা সকাল সকাল বেজে ওঠাতে সে একটু অবাকও হল। এত সকালে কে ফোন করল। কারণ দিল্লিতে রবিবার প্রায় অনেকেই একটু দেরিতে বিছানা ছাড়েন! এমনকী কেউ সকাল এগারোটার আগে কাউকে ফোনও করেন না।

সবাই জানেন, শনিবার হয়তো কোনও না কোনও কাজে লোকেরা শুতে দেরি করেছেন। তাই রবিবার এত সকালে ঘুমের ব্যাঘাত করাটা ঠিক নয়। এই অলিখিত নিয়মটা চলে আসছে অনেকদিন থেকেই। তাই বিরক্তি সহকারে ফোনটা তুলতেই দেখতে পেল তাতে নাম লেখা আসছে বিনোদ আহুজা, রেসিডেন্ট ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন (আরডব্লিউএ)। ভাবল এত সকাল সকাল কী এমন দরকার পড়ল।

ফোনটা তুলে হ্যালো বলতেই, অন্যদিক থেকে বিনোদ আহুজার কণ্ঠস্বর ভেসে এল— দাদা, একটু তাড়াতাড়ি চলে আসুন। আমাদের আবাসনের ১০৭ নম্বর ফ্ল্যাটের একজন বাঙালি মহিলা অসুস্থ হয়ে পড়েছেন বলে মনে হচ্ছে। দরজা খুলছেন না। পাশের ফ্ল্যাটের ভদ্রমহিলা জানিয়েছেন। একটু তাড়াতাড়ি আসুন দাদা। দেখুন তো আপনি চিনতে পারেন কিনা। আমি পুলিশে খবর দিয়েছি। দরজা ভাঙতে হতে পারে বা অন্য কোনও উপায়ে ওনাকে উদ্ধার করতে হবে।

একথা শুনেই সৌমিত্র যেন কেমন হয়ে গেল। মনে মনে ভেবে দেখল ওখানে বাঙালি কেউ থাকেন বলে তো তার জানা ছিল না। হতে পারে এমন কেউ যাকে দেখলে চিনতে পারবে। ভাবল এই অসময়ে অবশ্যই তার যাওয়া দরকার। তড়িঘড়ি করে মোবাইলটা হাতে নিয়ে বেরিয়ে গেল। আজকাল মোবাইল ছাড়া কোনও কাজই হয় না।

গন্তব্যে পৌঁছে গিয়ে শুনল, পাশের বাড়ির প্রতিবেশীরা বলছেন— গতকাল থেকে ১০৭ নম্বরের বয়স্কা মহিলা অনিতা সরকার দরজা খুলছেন না। উনি কয়েকদিন ধরেই অসুস্থ ছিলেন। ওনার স্বামী ভারত সরকারের জয়েন্ট সেক্রেটারি পদে ছিলেন এবং গত হয়েছেন অনেক বছর হল। এক ছেলে, সেও চাকরির খাতিরে আমেরিকাতে থাকেন। এর বেশি ওনারা কিছুই জানেন না। ভদ্রমহিলা খুবই অসামাজিক মানে যাকে বলে আনসোশ্যাল ছিলেন! কারও সঙ্গে মিশতেন না। এমনকী তাদের সঙ্গেও না।

সৌমিত্রবাবু বললেন আর দেরি না করে দরজা ভাঙা হোক। তবে অবশ্যই পুলিশকে ডেকে। বিনোদ বললেন— দাদা আমি আমাদের বিট কনেস্টবলকে ফোন করে দিয়েছি। এলেন বলে। ইতিমধ্যেই পুলিশও এসে হাজির হল। পিছনের ব্যালকনির দিকের দরজা ভেঙে দেখা গেল, অনিতা সরকার খাট থেকে মেঝেতে মুখ থুবড়ে পড়ে আছেন। তবে তখনও প্রাণবায়ু বেরোয়নি। পালস চলছে। সঙ্গে সঙ্গে তাকে অ্যাম্বুলেন্সে করে হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হল। ঘরে তালা লাগিয়ে দেওয়া হল। সৌমিত্র ভদ্রমহিলাকে চেনেন না। তবে কয়েকবার বাজারে ও দোকানে দেখেছেন জিনিসপত্র কিনতে। কাঁধে একটি সাইডব্যাগ থাকত। দেখলে মনে হবে যেন লেখক-কবি-সাহিত্যিক।

এরপর পাঁচদিন বাদে অনিতা সরকারকে হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেওয়া হল। তাকে অ্যাম্বুলেন্সে করে তার ফ্ল্যাটে ফিরিয়ে নিয়ে আসা হল। ইতিমধ্যেই সৌমিত্রবাবু এই অনিতা সরকারের সম্পর্কে খোঁজ খবর নিতে শুরু করেছিলেন। পাড়াতে পুজো কমিটিকে জানানো হল। তারা এই নামে কাউকে চেনেন না বলে দায়সারা গোছের উত্তর দিয়ে এড়িয়ে গেলেন। আসলে কেউ এর মধ্যে ঢুকতে চাইছেন না এটা বুঝতে সৌমিত্রবাবুর আর বাকি রইল না।

সৌমিত্রবাবু পাড়ার আরডব্লিউএ-কে অনুরোধ করলেন যে, চব্বিশ ঘণ্টা থাকা ও ওনাকে দেখাশোনা করার জন্য যেন একজন নার্স-কাম পরিচারিকা রাখা হয়।

আরডব্লিউএ-এর সেক্রেটারি বললেন— দাদা, নার্স তো রেখে দেব কিন্তু এর খরচা কে দেবে? কারণ প্রতিমাসে চব্বিশ ঘণ্টা থাকার জন্য এজেন্সিগুলো ২৫ হাজার টাকা নেয়। টাকা কে দেবে বলুন? আমাদের ফান্ডেও অত টাকা নেই। আপনি বরং অন্য কিছু ভাবুন।

—আমি দেখছি কী করা যায়। কিন্তু এখন প্রথম কাজ হল ওনার দেখাশোনা করার জন্য কাউকে সবসময়ের জন্য রাখা।

—ঠিক আছে আমি ব্যবস্থা করছি। তবে আপনি টাকার কথা ভাবুন। নয়তো পুরো টাকাটা আপনার পকেট থেকে দিতে হবে। বলল বিনোদ আহুজা।

সৌমিত্রবাবুর কথায় একজন নার্স-কাম পরিচারিকার ব্যবস্থা করা হল। অনিতা সরকারের ছোটো একটা ফোন আছে দেখে সেই ফোন ঘেঁটে আমেরিকার একটি ফোন নম্বর পাওয়া গেল। সৌমিত্রবাবু ভাবলেন প্রথম কর্তব্য হল ওনার ছেলেকে জানানো। কিন্তু দুর্ভাগ্য তাকে ফোনে পাওয়া গেল না !

এরপর অন্য একটি ফোন নম্বর পাওয়া গেল যেটি এসেছিল অন্য কোথাও থেকে। সেই নম্বরে ডায়াল করতেই অন্যপ্রান্ত থেকে এক মহিলার কণ্ঠ ভেসে এল। সৌমিত্রবাবু বললেন –আপনি কি অনিতা সরকারকে চেনেন?

—হ্যাঁ চিনি। উনি আমার বড়ো বউদি হন। কিন্তু আপনি কে? আর কেনই বা আমাকে ফোন করছেন?

—দেখুন আমি অনিতাদেবীর প্রতিবেশী। উনি খুবই অসুস্থ। আপনারা একবার ওনার ছেলেকে ফোন করে খবরটা জানালে খুব ভালো হয়। ফোন করে বলুন যে, মা খুব অসুস্থ, তাই এ সময় তার আসাটা খুব জরুরি। আর হ্যাঁ, আপনি কোথায় থাকেন? আপনারা কেউ এসে ওনার দ্বায়িত্ব নিলে খুব ভালো হয়, কারণ ওনাকে দেখার জন্য এখানে কেউ নেই। এই অসময়ে ওনার কাছে কারও থাকা খুবই জরুরি।

(ক্রমশ…)

পড়ার জন্য সীমাহীন গল্প-নিবন্ধসাবস্ক্রাইব