ফ্যাটি লিভার এবং সঠিক চিকিৎসা

লিভার-এর যে-সমস্যায় এখন ভীষণ ভাবে ভুগছেন অসংখ্য মানুষ, তা হল— ফ্যাটি লিভার। ফ্যাটি লিভার-এর সমস্যা আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারি আমাদের খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাত্রাকে নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে। কিন্তু যদি আমরা ফ্যাটি লিভার-কে প্রাথমিক স্টেজ-এ নিয়ন্ত্রণ করতে না পারি, তাহলে লিভার-এর বিভিন্ন সমস্যা দেখা যায়। যেমন— লিভার ফাইব্রোসিস, লিভার সিরোসিস, এমনকী ক্যান্সার পর্যন্ত হতে পারে। এই বিষয়ে তুলে ধরা হচ্ছে কনসালটেন্ট জিআই সার্জন ডা. সঞ্জয় মণ্ডল-এর বক্তব্য এবং পরামর্শ।

ফ্যাটি লিভার-এর প্রাথমিক স্টেজ সাধারণ ভাবে উপসর্গহীন। তাই আমাদের সচেতন থাকতে হবে। ফ্যাটি লিভার-এর দ্বিতীয় কিংবা তৃতীয় স্টেজ থেকে যে- উপসর্গগুলি বোঝা যায়, তা হল— পেট বেশি বেড়ে যায় শরীরের অন্যান্য অংশ থেকে, অতিরিক্ত ওজন বেড়ে যাওয়া, হাঁপিয়ে যাওয়া, পেটে ব্যথা, বমি, হালকা জন্ডিস, ঘনঘন সর্দি কাশি। দ্বিতীয় স্টেজ থেকে ওষুধের প্রয়োজন হয়। সেইসঙ্গে, নিয়ন্ত্রণ করতে হয় খাওয়া-দাওয়া এবং নিয়মিত হাঁটাচলা ও ব্যায়ামের মাধ্যমে ফ্যাটি লিভারকে সুস্থ রাখতে হয়।

ফ্যাটি লিভার অধিকাংশ সময়েই ধরা পড়ে না, কারণ এই অসুখের প্রাথমিক স্তরে কোনও ব্যথা বা অস্বস্তি দেখা দেয় না। তাই, এই অসুখ সম্পর্কে আরও সচেতনতা তৈরি করতে হবে বলে মনে করেন চিকিৎসকরা। যেহেতু এই অসুখ নীরবে কোনও লক্ষণ ছাড়াই বাড়তে থাকে, তাই, যথাযথ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা জরুরি।

লিভারকে ফ্যাটি বলে ধরা হয় যখন লিভারে ফ্যাট ৫ শতাংশর বেশি হয়ে যায়। ডায়াবেটিস, কোলেস্টেরল, উচ্চ রক্তচাপ এবং মেদবহুলতায় ভোগা মানুষের ফ্যাটি লিভার হওয়ার সম্ভাবনা ৫০-৬০ শতাংশ। মোটামুটি ভাবে ফ্যাটি লিভারের তিনটে স্তর আছে। নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার (NAFL)- স্টেয়াটোসিস, নন-অ্যালকোহলিক স্টেয়াটো হেপাটাইটিস (NASH) এবং লিভার সিরোসিস। নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার ডিজিজ (NAFLD) রোগীদের ২০-২৫ শতাংশ নন-অ্যালকোহলিক স্টেয়াটো হেপাটাইটিস স্তরে পৌঁছে যান এবং ১০-১৫ শতাংশ সিরোসিস অফ লিভার হয়, যা সারা পৃথিবীতে লিভার প্রতিস্থাপনের সবচেয়ে বেশি ঘটনার কারণ।

সাম্প্রতিক সমীক্ষাগুলোতে দেখা গেছে, স্রেফ সচেতনতার অভাবে রোগনির্ণয় অনেক পরে হয়। গত দুই দশকে ভারতে আরও একটা প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, যার নাম লিন ফ্যাটি লিভার। এটা দেখা যায় মেদবহুলতার কোনও চিহ্ন না থাকা মানুষের মধ্যে। এই রোগীরাও অসুখের প্রাথমিক স্তরে নজরে পড়েন না, যদি না স্বতঃপ্রণোদিত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়। দ্রুত রোগনির্ণয় হলে এবং জীবনযাত্রার পরিবর্তন করলে ফ্যাটি লিভার সারিয়ে তোলা সম্ভব। কিন্তু সিরোসিস যদি দেরি করে ধরা পড়ে, তাহলে তার বৃদ্ধি আটকানো শক্ত।

ফ্যাটি লিভার এখন তরুণদের মধ্যেই বেশি দেখা যায় এবং ডায়াবেটিস অথবা মেদবহুলতায় ভোগা শিশুদের মধ্যেও এটা পাওয়া যায়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ওষুধ একমাত্র চিকিৎসা নয়। নিয়মিত পরীক্ষা করিয়ে তার ফলাফল দেখে মূল্যায়ন করতে হয়। এর মধ্যে আছে চিকিৎসকের পরামর্শ, জীবনযাত্রার পরিবর্তন সম্পর্কে কাউন্সেলিং এবং প্রাথমিক পরিচর্যা।

অভিনেতা অমিতাভ বচ্চনের যখন লিভার সিরোসিস ধরা পড়েছিল, তখন প্রত্যেক ভারতীয় ওই তথ্য জেনে গিয়েছিলেন। কিন্তু লিভার সিরোসিস হল এমন একটা অসুখের চূড়ান্ত স্তর, যা বেশিরভাগ মানুষের ক্ষেত্রে শুরু হয় ফ্যাটি লিভার হিসাবে। আর প্রচলিত ধারণার বিপরীতে, যারা অ্যালকোহলিক নন, তাদেরও ফ্যাটি লিভার হতে পারে। বিশেষকরে যদি ডায়াবেটিস, মেদবহুলতা এবং রক্তে কোলেস্টেরল অস্বাভাবিক মাত্রায় থাকে।

কনসালটেন্ট জিআই সার্জন (ল্যাপারোস্কোপি এবং অঙ্কোসার্জারি) ডা. সঞ্জয় মণ্ডল প্রসঙ্গত আরও জানিয়েছেন, ফ্যাটি লিভারের সমস্যা আজকাল খুবই সাধারণ এবং এটি মূলত লিভারে চর্বি জমে হয়। বর্তমান অস্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রা, সঠিক খাদ্যাভ্যাসের অভাব এবং অ্যালকোহল গ্রহণের ফলে সারা শরীরে এবং লিভারেও চর্বি জমা হচ্ছে। এর ফলে লিভারের কার্যকারিতা খারাপ হয় এবং সামগ্রিক ভাবে স্বাস্থ্যহানি হয়। বেশিরভাগ রোগীই উপসর্গহীন। তবে পেটের ডানদিকে ব্যথা, জন্ডিস, দুর্বলতা অনুভব, খিদে কমে যাওয়া, কিছু ক্ষেত্রে জন্ডিস এবং ত্বকের চুলকানি হতে পারে।

রোগীর ফ্যাটি লিভার মূল্যায়নের জন্য প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্যে রয়েছে পেটের আল্ট্রাসাউন্ড, ফাইব্রোস্ক্যান, লিভার ফাংশন টেস্ট, লিপিড প্রোফাইল এবং রক্তে শর্করার অবস্থা। মেডিক্যালি ফ্যাটি লিভারকে মৃদু থেকে গুরুতর অবস্থা পর্যন্ত চারটি গ্রেডে ভাগ করা হয়।

বর্তমান লাগামছাড়া জীবনশৈলীর কারণে বেশিরভাগ মানুষের হালকা গ্ৰেড অর্থাৎ গ্রেড ওয়ান ফ্যাটি লিভার-এর সমস্যা দেখা দিতে পারে। যদি রোগীর অন্য কোনও নির্দিষ্ট সমস্যা না থাকে, তাহলে বিষয়টি নিয়ে দুশ্চিন্তার কিছু নেই। কিন্তু রোগটি যদি আরও গুরুতর হয়ে উঠে, অর্থাৎ শারীরিক অন্যান্য অস্বস্তি হয়, তখন যত দ্রুত সম্ভব চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। যদি রোগীর ফ্যাটি লিভারের আরও গুরুতর গ্রেড থাকে, তাহলে একজন গ্যাস্ট্রোএন্টেরোলজিস্ট বা লিভার বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত এবং যথাযথ চিকিৎসা করা উচিত। আর চিকিৎসার পাশাপাশি জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আনতে হবে, যার মধ্যে ওজন কমানো, নিয়মিত ব্যায়াম ইত্যাদি করা প্রয়োজন।

খাদ্যতালিকাগত পরিবর্তনের মধ্যে জাংক ফুড এড়ানো, ব্যালেন্স ডায়েট, অ্যালকোহল থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকা প্রয়োজন। এছাড়া, রোগীর কিছু ওষুধের প্রয়োজন হবে, যা ফ্যাটি লিভার কমাতে এবং সামগ্রিক লিভারের স্বাস্থ্যের উন্নতিতে সাহায্য করবে। যদি রোগীর অস্বাভাবিক লিপিড প্রোফাইল থাকে, তাহলে রোগীকে ওষুধ খাওয়া শুরু করতে হবে এবং রোগীর যদি ডায়াবেটিস থাকে তবে রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণ করা আবশ্যক। ধাপে ধাপে ফ্যাটি লিভার গ্রেড নামিয়ে আনা যায়।

ফ্যাটি লিভারের চিকিৎসা করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ফ্যাটি লিভারের সমস্যা দীর্ঘায়িত হলে সিরোসিস হতে পারে, যা মারাত্মক এবং যার একমাত্র চিকিৎসা হল লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্ট। তাই যকৃতের রোগ প্রতিরোধের জন্য ফ্যাটি লিভারের চিকিৎসা প্রয়োজন এবং এরজন্য অবশ্যই স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন করতে হবে। সেইসঙ্গে প্রয়োজনীয় ওষুধ খেতে হবে।

পুরিতে পরি (শেষ পর্ব)

তেমন কিছু নেই, সেই মিষ্টি আর ছানাপোড়া। একটা দোকানে ছানা আছে। জগন্নাথ মন্দিরে আমরা যে দামে কিনেছিলাম, এখানে একেবারে ডবল। কী আর করা যায়, তাই-ই খাওয়া হল। বাস ছাড়ল প্রায় তিরিশ মিনিট পর। বামদিকে সমুদ্রকে রেখে আমাদের বাস চলল। প্রায় নির্জন রাস্তা। আমরা যাচ্ছি, আর আমাদের সঙ্গে সঙ্গে যাচ্ছে সমুদ্রের গর্জন। একটা অদ্ভূত অনুভূতি। বেশ কিছুটা এভাবে চলার পর, হঠাৎ একসময় দেখি সমুদ্র হারিয়ে গেছে পথের কোন বাঁকে। আমরা তখন প্রায় পুরীর কাছাকাছি।

( ছয় )

চিল্কা হ্রদ। নিবেদন যাবে না। সুনামীর আগে দেখেছে। শুনেছে সেই হ্রদ আর নেই। পূর্বের সেই মধুর স্মৃতিকে সে ধ্বংস করতে চায় না। ডাক্তারবাবু মানে সমর্পণ ওকে কিছু কাজ দিয়েছে, আমরা যখন হ্রদের জলে ভাসব নিবেদন তখন সেই কাজগুলো করবে। গোপালপুরের কাছে বারকুলি আর রম্ভা, চিল্কার অন্যদিক, অন্যরকম সৌন্দর্য। আমরা ওই রাস্তায় যাব না। পুরী থেকে সবচেয়ে কাছে সাতকুরা, সেখানেই চিক্কা। খুব বেশি হলে ৬০ কিমি।

চা-বিস্কুট খেয়ে সকাল সকাল বেরিয়ে পড়লাম। পথে কোথাও জলযোগ করা হবে। বেশ কিছুক্ষণ যাওয়ার পর, একটা গঞ্জের মতো জায়গাতে আমাদের চালক তার রথ থামাল। একটা দোকান দেখিয়ে বলল, এই পথে সবচেয়ে ভালো খাবারের দোকান। দোকানটির খাবার সত্যিই ভালো। পাওয়া যায় মশলাধোসা, ডালের বড়া, কচুরি, সঙ্গে নানারকমের মিষ্টি, খাজা আর ছানাপোড়া। এটা এখানকার যে-কোনও মিষ্টির দোকানের কমন আইটেম। দোকানি জানাল, তাদের রসগোল্লাও খুব ভালো। খাওয়া হল। সত্যিই ভালো টেস্ট।

অবশেষে আমরা চিল্কার দুয়ারে। পথে কুহুর টুপি হাওয়ায় উড়ে গেল, গাড়ি থামল। টুপি উদ্ধার করতে গিয়ে একজন স্থানীয় মানুষের সঙ্গে কথা হল। সে জানাল, চিল্কাতে ঝিনুক ভেঙে মুক্তো বার করে বিক্রি করে। সেই মুক্তো না কেনাই উচিৎ, কেন না সেগুলো আসল মুক্তো নয়, সব ঝুটো।

বেশ ভালো লাগছিল চিল্কায় ডলফিনের লাফালাফি। যে জায়গাতে অনেক বেশি ডলফিন, সেখানে যখন আমাদের নৌকা দাঁড়িয়ে গেল, মনে হচ্ছিল না, নৌকা আর কোথাও যাক। ডলফিনগুলো অনেকক্ষেত্রেই জোড়ায় জোড়ায় লাফাচ্ছিল। আরও এগিয়ে গেলে সি- মাউথ। সমুদ্রের মুখ, যেখানে সমুদ্র মিশেছে চিল্কায়। বিশাল বালিয়াড়ি। প্রচুর ট্যুরিস্ট, মনের আনন্দে ঘোরাফেরা করছে। আর খুব সস্তায় বিক্রি হচ্ছে গরম গরম চিংড়িমাছ ভাজা, কাঁকড়া, ডাব। আমরাও সেপথেই গমন করলাম। যার যা পছন্দ ইচ্ছেমতোন খেলাম।

দিগন্ত বিস্তৃত বালিয়াড়ি। অজস্র ছোটো ছোটো লাল কাঁকড়া, জেলিফিশ, মহানন্দে ঘুরে বেড়াচ্ছে, যেমন আমরা ঘুরছি। কোনও চাপ নেই, হাট-বাজার নেই, স্কুল, অফিস নেই— যেন কোনও নতুন স্বর্গে আমরা এসে পড়েছি! এই জন্যই তো বেড়াতে আসা। দু’দিনের জন্য একটা স্বর্গ রচনা। ভালোলাগা সবকিছু ফ্রেমে বন্দি করছিলাম।

আমরা নৌকাতে ওঠার আগে, একটা হোটেলে খাবার অর্ডার দিয়ে গিয়েছিলাম। মাঝারি মাপের চিংড়ির মালাইকারি, সঙ্গে সরু চালের ভাত, ডাল আর সবজি। পুরীর হোটেলের তুলনায় দাম বেশ চড়া। যে-হোটেলে কিংবা খাবার দোকানে বেশি ভিড়, সেখানে খাওয়া বুদ্ধিমানের কাজ। কারণ সেখানে আর যাই হোক বাসি পচা খাবার থাকবে না।

নৌকাবিহার করে যখন আমরা চিল্কার ঘাটে পৌঁছোলাম, তখন প্রায় ২.৩০ বেজে গেছে। রম্ভা, বারকুলিতে এখানকার তুলনায় খাবারের মান অনেক ভালো। দামও অনেক সস্তা। এ যাত্রায় রম্ভা বারকুলি যাওয়া হল না। ফেরার সময় আর এক বিভ্রাট। গাড়িতে ওঠার সময় মেহুলী দেখে তার টাকার ব্যাগ, তার কাছেই থাকার কথা ছিল কিন্তু নেই।

এবার শুরু থেকেই মেহুলীদের বিভ্রাট। ট্রেনে ওঠার সময়ে মেহুলীর চটি ট্রেনের নীচে পড়ে যাওয়া, জগন্নাথ মন্দিরে শান্তবাবুর পকেটমারি। যাইহোক শেষপর্যন্ত পাওয়া গেল। গাড়িতেই পড়েছিল। এবার আমি আর সমর্পণ ড্রাইভারের পাশে, চনমন আর অরিত্র পিছনে। ফেরার পথে একটা জৈনমন্দির দর্শন করলাম, নাম অলারনাথ। সবাই মন্দিরের ভিতরে গেল, আমি বাইরে দাঁড়িয়ে দেখছিলাম, আরও অন্য সৌন্দর্য। সন্ধের কোলে ফিরে এলাম আমাদের হোটেলে। সেদিন অনেক রাত পর্যন্ত আমরা সি-বিচে কাটালাম।

( সাত )

পরদিন আমাদের ফেরার ট্রেন রাত ১০.২০ মিনিটে। খুব সকালে আমরা আবার সি-বিচে। সারি সারি চেয়ার পাতা, এক কাপ চা নিলেই ওই চেয়ারের মালিকানা কিছুক্ষণের জন্য আমাদের। দু’কাপ করে চা নিয়ে প্রায় দু’ঘণ্টা কাটিয়ে দিলাম। সমুদ্রকে ফ্রেমবন্দি করতে করতে যখন ঘুরছিলাম, তখন দেখা হল পৃথাদির সঙ্গে। পৃথাদি বার্ণপুরের একটা গার্লস স্কুলের হেডমিস্ট্রেস। নাতিকে নিয়ে এসেছেন। কিছুক্ষণ কথা বলে ফিরে এলাম আমাদের দলবল যেখানে বসেছিল সেখানে। সামান্য তফাতে চোখ ফেরাতেই আমি বাকরুদ্ধ হয়ে গেলাম। একটা টি-স্টলের পাশে চেয়ারে বসে আছে মৌটুসি— আমার পরি।

পুরী আসার পর থেকে, পরি এসেছে অনেকবার। কিন্তু এত কাছে এই প্রথম। এ যদি পরি না হয়, তাহলে অবশ্যই পরির কোনও যমজ বোন আছে। এক অমোঘ টানে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলাম। স্বাভাবিক গতিতে হাঁটলে পাঁচ মিনিটের বেশি লাগার কথা নয়। কিন্তু আমার মনে হচ্ছিল পরির কাছে যাওয়ার জন্য আমি অনন্তকাল ধরে হাঁটছি, হেঁটেই যাচ্ছি। শেষপর্যন্ত পরির কাছে পৌঁছতে পারব তো? হ্যাঁ পারলাম, অবশেষে পরির কাছে। অনেকটা সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। পরি নির্বিষ্ট হয়ে দেখছিল সমুদ্রকে। সমুদ্রের ঢেউ ভাঙার ছন্দকে যেন মুখস্থ করছে মনে হল। খুব ধীরে আমার দিকে মুখ ফেরাল। চোখে জিজ্ঞাসা, সে শুধু এক নিমেষের জন্য। তারপরেই পরির মুখে যে অপার্থিব আলো জ্বলে উঠল, তার বর্ণনা দেবার মতো ভাষা আমার স্টকে নেই, স্বীকার করে নেওয়াই ভালো।

—যাক তাহলে চিনতে পেরেছ। আমি তো ভাবলাম… আমাকে কথাটা শেষ করতে না দিয়েই পরি বলে উঠল— তোমাকে চিনব না?

যেভাবে, যে-ভঙ্গিতে বলল, আমি যেন শুনলাম— অনন্তকাল পরে দেখা হলেও, এমনকী এ পৃথিবীতে না হয়ে, অন্য কোনও পৃথিবীতে দেখা হলেও তোমাকে যে চিনতেই হবে গো!

টুয়েলভের ফাইনাল পরীক্ষার পরেই পরি হারিয়ে গিয়েছিল। সেই যে শুরু হয়েছিল আমাদের মেলামেশা, তারপর স্বাভাবিকভাবেই কলেজে আমরা আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছিলাম। ক্লাসের বোর্ডে, কলেজের দেয়ালে লেখা হতে লাগল আমাদের নাম। এমনকী শহরের রাস্তায় আমাকে ধরে থ্রেট করা হল। ভাবখানা এমন— কে হে তুমি হরিদাস পাল! পাড়া গাঁয়ের ক্যাবলা! আমাদের মতো হিরোরা থাকতে, কলেজের সেরা সুন্দরীর সঙ্গে প্রেম করবে? তখন আমি কলেজের হোস্টেলে থাকি। ঘটনাটা হোস্টেলে জানাতেই সবাই খেপে লাল, পরদিন হাতের কাছে যে যা পেল হকিস্টিক, উইকেট, ব্যাট নিয়ে হইহই করে কলেজে যাওয়া হল। যারা আমাকে থ্রেট করেছিল, তাদেরকে উপযুক্ত শিক্ষা দিতে হবে।

সমুদ্রতটের হাওয়া এলোমেলো করে দিচ্ছিল পরির খোলা চুল। ঢেউ এসে ভিজিয়ে দিচ্ছিল পরির পায়ের পাতা। মনে হচ্ছিল পরি নয়, পরির সুষমা আমার সামনে। সেদিন দেখেছিলাম সাহস, যেদিন আমরা দলবল মিলে কলেজে ঢুকেছিলাম, তার পরের দিন থেকে। এমন শান্ত, সুন্দরের মধ্যে কোথায় এত সাহস লুকিয়ে ছিল? পরের দিন কলেজ ক্যাম্পাসে আমার হাত ধরে ঘুরেছিল। সিনেমা দেখতে গিয়েছিলাম।

—কবে এলে পরি?

যেদিনের কথা পরি বলল, সেদিনটা আমাদেরও আসার দিন ছিল। একই ট্রেনে এসেছিল। আমি স্টেশনে যাকে দেখেছিলাম, সে-ই পরি ছিল।

—কবে ফিরবে?

পরি জানাল, আর দু’দিন তারা থাকবে। ওর কলেজের মেয়েদের নিয়ে এসেছে, শিক্ষামূলক ভ্রমণে।

ইস, আমরা যে আজ রাতেই…। ভাবলাম যদি থেকে যাই আর দু’দিন। না, না, সেটা ঠিক হবে না। লোকে কী ভাববে? এত সাহস আমার নেই। পরির মতো সাহস আমার কোনওদিনই ছিল না। ও হোস্টেলে এসে অসুস্থ আমাকে দেখে যেতে পারে। ওদের বাড়ি বেড়াতে নিয়ে যেতে পারে। আমি এসব কিছু পারি না। আমাদের সম্পর্কটা কী ছিল, এতদিনেও তো বুঝতেই পারলাম না। পরি আমার কে ছিল? শুধুই বন্ধু নাকি অন্য কিছু? তবে এটুকু জানি, পরিকে আমি কোনওদিন ভুলতে পারব না। কোনওদিন না। চলে তো যেতেই হবে।

জিজ্ঞেস করি আবার কবে, কবে দেখা হবে পরি?

পরি একটু হেসে বলে, হবে হয়তো, এমনি করেই কোনও একদিন। আর দেখা যদি আর কোনওদিন না হয়, তাতেই বা কী রাজা।

হ্যাঁ, বলা হয়নি পরি আমাকে রাজা বলত। ততক্ষণে ডাকাডাকি শুরু হয়েছে। ফিরে যেতে হবে হোটেলে। আমি শেষবারের মতো পরির দিকে তাকালাম! না ভুল বললাম, পরির দিকে নয়, পরির চোখের দিকে। যেতে হবে পরি, জানি না আর কোনওদিন দেখা হবে কিনা! কিন্তু না থাক, সব কথা তো উচ্চারণ করে বলা যায় না। সে কথা অন্য কারওর শোনার দরকারও নেই।

অকারণেই ডেকে উঠি পরি। পিছু ফিরলাম। জানি না, পরির চোখটা ভিজে গিয়েছিল কিনা! তবে আমার চোখটা শুকনো ছিল না।

কতবার তো কত কত জায়গাতে বেড়াতে গেছি, কোনওদিন দেখা হয়নি। পুরীতে এসে কেন পরির সঙ্গে দেখা হল? না দেখাই তো ভালো ছিল। ছিল কি? না সেটাও জানি না। আমি হাঁটতে থাকলাম। হাঁটতে হাঁটতে হয়তো কোথাও, কোনও একদিন আবার দেখা হয়ে যাবে।

(সমাপ্ত)

ওদের সাফল্য প্রেরণাদায়ক

জীবন কাকে, কখন, কোন পথে চালিত করে কেউ বলতে পারে না। তাই, মানুষকেও নদীর মতো হঠাৎ-ই গতিপথ পরিবর্তন করতে হয় অনেক সময়। কিন্তু সেই পথ বাধাহীন হয় না সবার জন্য। তবুও যারা সমস্ত প্রতিকূলতা কাটিয়ে সাহস নিয়ে এগিয়ে যান গন্তব্যের দিকে, তারা-ই একসময় বিজয়-পতাকা ওড়াতে পারেন। আর তারা-ই অন্যকে প্রেরণা জোগান, সমাজকে আলোকিত করেন। তানিয়া, টুম্পা, দেবযানী এবং প্রতিমাও তাই আমাদের গর্ব। ওদের সাফল্য প্রেরণাদায়ক। ওদের ‘অন্যতমা’ সম্মানলাভ তাই যথার্থ স্বীকৃতি।

‘অন্যতমা’ এই চারজন নারী অর্থাৎ তানিয়া সান্যাল, টুম্পা দাস, দেবযানী মুখোপাধ্যায় এবং প্রতিমা পোদ্দার-এর সঙ্গে আলাপ করাল ‘আভা সার্জি সেন্টার’। কলকাতা-র অন্যতম এই আইভিএফ এবং গাইনিকোলজি সেন্টার সম্প্রতি দক্ষিণ কলকাতা-র এক অভিজাত হোটেলে এঁদেরকে সম্মান জানাল আনুষ্ঠানিক ভাবে। সম্মান জানালেন ‘আভা সার্জি সেন্টার’-এর  ফাউন্ডার ও চিফ কনসালটেন্ট ডা. বাণী কুমার মিত্র এবং ডিরেক্টর ও চিফ এমব্রায়োলজিস্ট ডা.  কঙ্কণ দাস মিত্র।

যাঁরা সেদিন সম্মানজ্ঞাপন অনুষ্ঠানের মঞ্চে আলো ছড়ালেন, সেই চারজন নজির গড়েছেন বিভিন্ন ক্ষেত্রে। ২০১৮ সালে অ্যাভিয়েশন ফিমেল ফায়ার ফাইটার হিসাবে AAI-তে যোগদান করে, তানিয়া সান্যাল ইতিহাস তৈরি করেন এবং পরে কলকাতার ফায়ার সার্ভিস ট্রেনিং সেন্টারে AAI-এর প্রথম মহিলা প্রশিক্ষক হন। দিল্লি ফায়ার ট্রেনিং সেন্টারের ১০০+ পুরুষের মধ্যে তিনিই একমাত্র মহিলা, যিনি পাঁচ মাসের কষ্টকর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছেন এবং প্রশিক্ষক ও সহকর্মীদের কাছ থেকে সম্মান পেয়ে তিনি অভিভূত।

টুম্পা দাস এমন একজন পেশাদার, যিনি শ্মশানে শবদাহের কাজ করে নজির গড়েছেন। টুম্পা প্রথমে হতে চেয়েছিলেন নার্স এবং সেই অনুযায়ী কেরিয়ার গড়তে চেয়েছিলেন। কিন্তু স্বল্প বেতন ও পরবর্তীকালে তাঁর বাবার মৃত্যুর কারণে তিনি ১৯ বছর বয়সে শ্মশানে শবদাহ থেকে শুরু করে যাবতীয় নথির কাজ শুরু করেন। দশ বছরের মধ্যে তিনি ৫০০০-এরও বেশি মানুষের শবদাহ করেছেন।

দেবযানী মুখোপাধ্যায় আবার এমন একজন সামাজিক উদ্যোক্তা, যিনি গৃহিণীদের সফল উদ্যোক্তা এবং আর্থিক ভাবে স্বাধীন হওয়ার দীর্ঘকালীন স্বপ্ন পূরণে সহায়তা করেছেন। তাঁর উদ্যোগে গড়ে ওঠা ‘নানিঘর’-এর মাধ্যমে ৫০০+ মহিলা ক্ষমতায়িত হয়েছেন। দেবযানী বিশ্বাস করেন যে, প্রতিটি মহিলার উন্নতির সুযোগ প্রাপ্য।

বাংলার প্রথম মহিলা বাস চালক প্রতিমা পোদ্দারও নজর কাড়েন মঞ্চে। তিনি জানিয়েছেন, প্রথমে বাস কন্ডাক্টর হিসেবে কাজ করতেন তিনি। তারপর এক দুর্ঘটনায় স্বামীর মৃত্যুর পর, সংসারের পুরো দায়ভার নিতে হয় তাঁকে। তাই উপার্জন বাড়িয়ে, সন্তানদের মুখে অন্ন জোগানোর তাগিদে গাড়ি চালানো শুরু করেন প্রতিমা। ঐতিহ্যগত ভাবে পুরুষ শাসিত পেশায় তিনি প্রকৃতপক্ষে নারীদের জন্য একজন আদর্শ হয়ে উঠেছেন। কলকাতার গণপরিবহন ক্ষেত্রে তাঁর ধারণা পরিবর্তন এবং নারীর ক্ষমতায়নে তাঁর সাহস, ব্যতিক্রমী  অবদান রেখেছে সমাজে।

সাহস এবং প্রগতিশীল চেতনার এক স্মরণীয় উদযাপনে, চারজন ব্যতিক্রমী নারীকে তাঁদের নিজ নিজ ক্ষেত্রে যুগান্তকারী অবদানের জন্য সম্মানিত করা হয়েছে। ‘অন্যতমা – অন্য নারীর গল্প’ শিরোনামে আয়োজিত এই পুরস্কার প্রদান মঞ্চে, ‘আভা সার্জি সেন্টার’-এর পক্ষ থেকে ‘অন্যতমা’-দের হাতে মেমেন্টো তুলে দেন পশ্চিমবঙ্গ সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ, ভূমি ও ভূমি সংস্কার, শরণার্থী ও পুনর্বাসন প্রতিমন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য এবং গায়িকা ঊষা উত্থুপ। অনুষ্ঠান সঞ্চালনায় ছিলেন সুরভি মিত্র এবং অভিনেত্রী গার্গী রায় চৌধুরি।

পুরিতে পরি (পর্ব-০৩)

যাইহোক, বেলা বাড়ছে। এই সবে শুরু, এরপর ভুবনেশ্বর মন্দির। কিছুদূর যাওয়ার পর বাস থেমে গেল। এখান থেকে পায়ে হেঁটে যেতে হবে মন্দির দেখতে। পুরীতে এতটা গরম লাগছিল না, এখানে দরদর করে ঘাম হচ্ছে। প্রখর রোদ, পিচ রাস্তা গরমে প্রায় গলে গেছে। সবাই চলে গেল। মাথায় থাক দর্শন, একমাত্র আমি থেকে গেলাম বাসে। বাসের ড্রাইভার, হেলপার একনাগাড়ে চেষ্টা করে যাচ্ছে যাতে উদয়গিরি আর খন্ডগিরি না যাই। বক্তব্য, ওখানে এমন কিছু দেখার নেই। শুধু শুধু যাওয়া হবে, আর গেলে অনেক দেরি হয়ে যাবে। রাস্তার দুধারে দু’টি পাহাড়, আর কিছু দেখার নেই। আমরা নাছোড়, তা বললে তো হবে না, আমরা যে ওই দু’টি জায়গার অনেক নাম শুনেছি। আর এসেছি যখন, না দেখে যাবই বা কেন? সে সাপ ব্যাঙ যাই হোক না কেন!

উদয়গিরি, খণ্ডগিরি এলাকা রীতিমতো জমজমাট। দোকান-পশরা নিয়ে বসেছে অনেকেই। এছাড়াও বেশ কিছু লোক কাঁচা বাদামের ঠোঙা নিয়ে ফেরি করছে। কেন না এখানে প্রচুর বাঁদর, তাদের ভেট না চড়িয়ে মন্দিরে যেতে পারবেন না। বাদাম না পেলে জিনিসপত্র নিয়ে টানাটানি করবে। সুতরাং কেনা হল বেশ কয়েক প্যাকেট বাদাম। প্রথমে উদয়গিরি, টিকিট কেটে ঢোকা। ভিডিও করা যাবে না। তা হলে কি স্টিল ছবি তোলা যাবে? ঠিক বোঝা গেল না। এখন তো সব ফোনেই ভিডিও ক্যামেরা আছে। নয়নাভিরাম দৃশ্য, ছোটো ছোটো ধাপে উঠে গেছে পাহাড়ি রাস্তা। রাস্তার দু’ধারে রং-বেরঙের ফুলের সমারোহ।

উদয়গিরিতে পৌঁছে দেখি, ছোটো ছোটো অনেক গুহা। একটা বড়ো চাতাল। এদিক-ওদিক ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎ দেখি একটা বড়ো গুহার ভেতর দু’জন মাতাজি বসে আছেন। কৌতূহলে কাছে গিয়ে দেখি, ওমা! মাতাজি কোথায়? এ তো আমাদের মিষ্টি আর মেহুলী। কী সুন্দর ভঙ্গিতে জোড় হাতে দু’জনে বসে ছিল। সেই গুহাটার মুখে বাঘের মুখ আঁকা ছিল। কেন, কে জানে। মনের আনন্দে কিছুটা ভিডিও, কিছুটা স্টিল ছবি তুললাম। এখানে দেখার কেউ নেই। খণ্ডগিরি ওঠার ধকল আর কেউ নিতে চাইল না, সুতরাং খণ্ডগিরি এবারের মতো বাদ। বাসের ড্রাইভার বেশ খুশি কিছুটা হলেও সময় বাঁচানো গেছে। বাস ছাড়ল নন্দনকাননের উদ্দেশে।

মুড়ি যখন নেওয়া হয়, তখন মনে হয় বাহুল্যমাত্র কিন্তু খিদের মুখে যেন অমৃত। কোথাও কোনও কিছু পাওয়া যাচ্ছে না অথবা যা পাওয়া যাচ্ছে সেটা আর খেতে ভালো লাগছে না, তখন মুড়ি। যে বছর গ্যাংটক গিয়েছিলাম, তখন মুড়ি যে কী জিনিস বুঝেছিলাম। এখানেও বাস ছাড়ার একটু পরেই মুড়ি এল সঙ্গে চানাচুর, বাদাম। আহা, যেন স্বর্গীয় আস্বাদ! এদিকে বাস চলছে তো চলছেই। অনেকক্ষণ চলার পর, নন্দনকাননের কিছুটা আগে একটি রেস্টুরেন্টের কাছে আমাদের বাস থামল। প্রচুর ভিড়, বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে হল। আমরা এখানে লাঞ্চ সারলাম।

সারাদিন বৃষ্টির পর যদি বিকেলে হঠাৎ ঝকঝকে রোদ উঠে পড়ে, দিনের পর দিন কাজ করতে করতে হঠাৎ যদি একটা ছুটি পাওয়া যায়, মেঘ না চাইতেই যদি জল হাতের নাগালে চলে আসে— আমার অবস্থাও তখন ঠিক সেরকম। ধাঁ করে উড়ে গেলাম, উড়ছি, মেঘের ঝুঁটি চেপে ধরে মেঘের সঙ্গে নীল আকাশে উড়ে চলেছি। সেই শুরু, তারপর মৌটুসি কখন যেন, আমার পরি হয়ে গেল। অফ পিরিয়ডের করিডোর কখন যেন আমাদের আগডুম বাগডুম গল্প করার পার্ক হয়ে গেল জানতেই পারিনি। হঠাৎ বাসটা ব্রেক কষায় এক ধাক্কায় কলেজের রঙিন দিন থেকে ধাঁ করে এসে পড়লাম নন্দনকাননের এবড়ো-খেবড়ো পথে! আগামীকাল আমদের ডেস্টিনেশন চিল্কা হ্রদ।

( পাঁচ )

অবশেষে নন্দনকানন। প্রতীক্ষার অবসান। চত্বরে বাস পৌঁছোতেই গাইডদের হামলা। বিশাল এরিয়া। তাড়াতাড়ি দেখে ফিরে আসতে গেলে গাইডের সাহায্য নেওয়াই ভালো, না হলে হয়তো বেশ কিছু জায়গা না দেখাই থেকে যাবে। অযথা অনেক সময় নষ্ট করে ফিরে আসতে হবে। এরকম একটা আবহাওয়া বাসচালক আগেই তৈরি করে রেখেছিল। ভিতরে যাওয়ার আগেই শুনলাম, জঙ্গল সাফারি এখন বন্ধ হয়ে গেছে। সুতরাং তারের বেড়ার এপার থেকেই দেখতে হবে বন্যপ্রাণীদের। কাচঢাকা বাসে বসে, উন্মুক্ত প্রান্তরে বন্যপ্রাণীদের স্বাধীন বিচরণ দেখার সৌভাগ্য এ যাত্রায় হল না।

এখানেও বাঁদরের উৎপাত। এবারে বাঁদরের টার্গেট লহরী। দেখা যাচ্ছে সদ্য যুবতী লহরীকেই ওদের খুব পছন্দ। বার বার ওর দিকেই ধেয়ে যাচ্ছে। আমাদের গাইড ছেলেটি বাঁদর তাড়ানোয় মুখ্য ভূমিকা পালন করায়, আমরা বেশ নিশ্চিন্ত। ফেরার সময় ট্রয় ট্রেন। জঙ্গলের ভিতর দিয়ে খেলনার গাড়িতে যেতে বেশ ভালো লাগছিল। যখন নন্দনকানন থেকে বেরিয়ে এলাম, তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। এখান থেকে যেতে হবে কোনারক।

কোনারকের সূর্য মন্দির, সেই ছোটোবেলা থেকে যার কথা শুনে আসছি। পাঠ্যবইয়ে, গল্পে, নানা ভাবে সূর্যমন্দির এসেছে। আর আমি ভেবেছি কবে যাব, কবে সেই বিস্ময়কে দু’ চোখ ভরে দেখব। আজ সেই দিন, আজ সেই বহু আকাঙ্খিত দিন, আজ সূর্যমন্দিরে সশরীরে। সমুদ্র থেকে খুব বেশি দূরে নয়। বিশাল এলাকা জুড়ে সূর্যের মন্দির। মন্দিরের গায়ে অপূর্ব কারুকাজ, তৎকালীন সমাজ, অর্থনৈতিক অবস্থার বিবরণ যার ছত্রে ছত্রে। সূর্যের রথের চাকা, নাটমন্দির পার হয়ে মূল গর্ভগৃহ। এখানেও গাইড, যার কাজ দাঁড়ি, কমা বাদ দিয়ে নাগাড়ে মুখস্থ বলা— তুমি শুনছ কিনা সেটা জানা তার কাজ নয়।

মন্দির অভ্যন্তরে সূর্যের মূর্তি। শূন্যে ঝুলছে। সামনে পিছনে, ঊর্ধ্বে নীচে, কোথাও কোনও অবলম্বন নেই। কোনও শক্তিশালী চুম্বক দিয়ে মূর্তিটিকে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিল। সে সময় নিকটবর্তী সমুদ্র দিয়ে কোনও জাহাজ গেলেই চুম্বকের আকর্ষণে থেমে যেত। ব্রিটিশ রাজত্বে সেই চুম্বক খুলে নেওয়া হয়। শোনা গেল, মন্দিরগৃহ বন্ধ সেও আজ ১০০ বছর হয়ে গেল। খোলার কোনও উদ্যোগ আজও কেন নেওয়া হল না এটাও একটা বিস্ময়! সমুদ্রের নোনা হাওয়ায় একটা একটা করে চিত্রিত পাথরগুলো ক্ষয়ে যাচ্ছিল, এখন সে সব মেরামত করার একটা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

আমরা যখন কোনারক পৌঁছেছিলাম, তখন সূর্য অস্তগামী, প্রায় সন্ধে। যার জন্য সেইভাবে সূর্যমন্দির দেখা হল না। এখানে মুক্তোর মালার পশরা নিয়ে অনেকেই বসে আছে। এক একটার দাম বলছে ৩৫০ টাকা, কিন্তু বিক্রি করছে শেষ পর্যন্ত মাত্র ২৫ টাকায়। মুক্তো না প্লাস্টিক, প্রশ্নটা লাখ টাকার। এখানে কাজু সস্তা, সত্যিই খুব সস্তা। সুন্দর প্যাকেটে মোড়া। খুব সুন্দর দানা। বাড়ি ফিরে বোঝা গিয়েছিল, সস্তার কতরকম অবস্থা হতে পারে। বাইরে কিছু ভালো দানা দিয়ে ভিতরে অপুষ্ট দানা ভরে দিয়েছে। সোজা বাংলায় আমাদের ঠকিয়েছে, যাচ্ছেতাই ভাবে ঠকিয়েছে। সুতরাং ভবিষ্যতের কাজু ক্রেতারা সাবধান। ভালো করে পরখ করে কিনবেন। ফেরার সময় রাত হয়ে গেল। টিফিন করতে হবে। বাসের চালক জানাল, সামনেই চন্দ্রভাগা সি বিচ, সেখানে কিছু দোকান আছে। তথাস্তু, ওঠো সবাই বাসে। মিনিট দশেক চলার পর পেলাম চন্দ্রভাগা।

(ক্রমশ…)

স্মরণীয় হয়ে থাক বিয়ের অনুষ্ঠান পর্ব

বিবাহ বলতে যেমন বোঝায় দু’জনের সম্পর্কের স্থায়ী সামাজিক এবং আইনি স্বীকৃতি, ঠিক তেমনই ‘বিবাহ’ শব্দের আক্ষরিক অর্থ হল— বিশেষ রূপে বহন করা। সুতরাং, বিয়ের অনুষ্ঠানকে সফল এবং স্মরণীয় করে তোলার জন্যও কিছু দায়দায়িত্ব বহন করতেই হবে। আসলে, জীবনসঙ্গী খুঁজে কিংবা বুঝে নেওয়ার মতোই সমান গুরুত্বপূর্ণ হল বিয়ে সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র অথবা সাজ- সরঞ্জাম সময়মতো সংগ্রহে রাখা। শুধু তাই নয়, বিয়েতে নিমন্ত্রিত অতিথিদের খুশি করারও চেষ্টা করতে হবে। মনে রাখবেন, বিয়ের অনুষ্ঠান আয়োজনের পরিকল্পনা সঠিক এবং নিখুঁত হলেই বিয়ের অনুষ্ঠানকে সর্বাঙ্গীন সফল এবং স্মরণীয় করে তোলা সম্ভব।

আগে থেকে পড়াশোনা না করে পরীক্ষা দিলে যেমন ফল ভালো হয় না, রেসের আগে ব্যাপক প্রশিক্ষণ ছাড়া আপনি যেমন ম্যারাথন-এ সফল হতে পারবেন না, ঠিক তেমনই বিয়ের অনুষ্ঠান আয়োজনের ক্ষেত্রেও এটি একই ভাবে প্রযোজ্য। কারণ, ভারতীয় বিয়ে কোনও বড়ো উৎসবের থেকে কম নয়। যে-কোনও উৎসব শুরু হওয়ার আগে আমরা যেমন প্রস্তুতি নিই, তেমনই বিয়েও একটা বড়ো উৎসবের মতো।

বিয়ের আগে অনেক কিছু করার আছে। ভেবেচিন্তে সবকিছু পরিকল্পনা করলে আত্মীয়স্বজনকে যেমন খুশি করতে পারবেন, ঠিক তেমনই নিজেরাও তৃপ্তি পাবেন। তাই হবু জীবনসঙ্গীর সঙ্গে আলোচনা করে বিয়ের প্রস্তুতি নিন। আর এই প্রস্তুতি যাতে নিখুঁত হয়, তার জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মাথায় রাখা দরকার।

প্রেম কিংবা দেখেশুনে, যে-বিয়েই করুন-না কেন, বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর, হবু স্বামী-স্ত্রী দু’জনে মিলে বিয়ের অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি নিতে একান্তে আলোচনায় বসার জন্য সময় বের করুন। যেদিন আলোচনায় বসবেন, কাগজ-কলম নিয়ে বসুন। কাজকর্ম থেকে অন্তত দু’সপ্তাহের জন্য দু’জনে বিরতি নিতে পারবেন, এমন একটা সময়কে বেছে নিন বিয়ের জন্য। কারণ, বিয়ের ঠিক পরেই হনিমুনও সেরে নিতে পারবেন এবং তা খুব সুখকরও হবে।

যাইহোক, হবু স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কেউ যদি শুভ-অশুভ সময়ের বিষয়টি মানেন, তাহলে পুরোহিতের সঙ্গে কথা বলে বিয়ের দিন ঠিক করুন। এরপর আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নিন যে, বিয়ের অনুষ্ঠান কোথায় করবেন বাড়িতে নাকি অনুষ্ঠান বাড়ি ভাড়া নিয়ে? এক্ষত্রে ভাবতে পারেন ডেস্টিনেশন

ম্যারেজ-এর বিষয়টিও, অবশ্য যদি বাজেট বেশি থাকে। কারণ ডেস্টিনেশন ম্যারেজ মানেই তো দূর-দূরান্তে গিয়ে বিয়ে এবং তা যথেষ্ট খরচসাপেক্ষ। তবে খরচ করতে পারলে, ডেস্টিনেশন ম্যারেজ-এর মজাই আলাদা।

বিয়ের অনুষ্ঠান আয়োজন করার আগে মাথায় রাখুন বাজেটের বিষয়টি। অর্থ সাশ্রয় করতে চাইলে, বরপক্ষ এবং কনেপক্ষ মিলে এক জায়গায় বিয়ের অনুষ্ঠানের আয়োজন করতে পারেন। যদি বাড়ি ভাড়া নিয়ে বিয়ের অনুষ্ঠান করেন, তাহলে জেনে নিন কত টাকা ভাড়া এবং কী কী সুবিধা পাওয়া যাবে। আর যদি ডেস্টিনেশন ম্যারেজ-এর কথা ভাবেন, তাহলে যে লোকেশন-এ বিয়ের অনুষ্ঠান করবেন, সেখানে যাতায়াতের জন্য এবং অনুষ্ঠান করার জন্য কত টাকা খরচ হবে, তার হিসেব করুন খোঁজখবর নিয়ে।

বরযাত্রী, কনেযাত্রী এবং বউভাতে আমন্ত্রিত অতিথিদের তালিকা তৈরি করে রাখুন আগেভাগে। কারণ, আমন্ত্রিত অতিথির সংখ্যার উপর অনেকটাই নির্ভর করবে বিয়ের অনুষ্ঠানের খরচ। প্রি-ওয়েডিং এবং ওয়েডিং টাইম-এ স্টিল এবং ভিডিয়ো শ্যুট-এর ইচ্ছে থাকলে, সেই বিষয়টিও রাখতে হবে বাজেটে।

যদি নিজেরা অনুষ্ঠান অয়োজনের দায়িত্ব না নিতে চান, তাহলে কোনও ওয়েডিং প্ল্যানার এজেন্সি-কে দিয়ে সবকিছু করিয়ে নিতে পারেন, তবে তা ব্যয়সাপেক্ষ। আর যদি নিজেরা সবকিছু করতে চান, তাহলে বাড়ির লোকজনদের বিয়ের অনুষ্ঠানের দায়িত্ব ভাগ করে দিন। কে অনুষ্ঠান বাড়ি সাজানোর দায়িত্ব নেবে, কে বিয়ের কার্ড পৌঁছে দেবে আমন্ত্রিত অতিথিদের বাড়িতে, কে কেটারিংয়ের দায়িত্ব নেবে, কে আপ্যায়নের ভার নেবে, কে ছোটোখাটো প্রয়োজন মেটাবে, কে সবকিছু তদারকি করবে— এই সবকিছুর দায়িত্ব আগেই ভাগ করে দিন। তবে এক্ষেত্রে যে-ব্যক্তি, যেই বিষয়টিতে পারদর্শী বলে জানেন, তাকে সেই কাজটাই দিন বুঝেশুনে।

নিমন্ত্রণ পত্র

বিয়ের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হওয়ার পর, প্রথমে নিমন্ত্রণযোগ্য অতিথিদের তালিকা তৈরি করুন। তবে বাজেট ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকলে প্রয়োজনে তালিকা ছোটো করতেও দ্বিধা করবেন না। এরপর বাজারে গিয়ে রুচিসম্মত নিমন্ত্রণ পত্র কিনে আনুন এবং অল্প কথায় ইংরেজি অথবা বাংলায় ম্যাটার (ইনভিটেশন স্ক্রিপ্ট) লিখে নিমন্ত্রণ পত্র ছাপতে দিন। বিয়ের কার্ড অর্থাৎ নিমন্ত্রণ পত্রের ডিজাইন কেমন হবে, তা ঠিক করুন দু’জনে মিলে। এর জন্য সাহায্য নিতে পারেন গুগল-এরও কিংবা শিয়ালদা বৈঠকখানা বাজারে গিয়ে বেছে নিতে পারেন কার্ড। কোনও আর্টিস্ট বন্ধু থাকলে তারও সাহায্য নিতে পারেন এই বিষয়ে।

উল্লেখ্য, এখন ই-কার্ড-এরও প্রচলন হয়েছে। তাই যদি নিমন্ত্রণ পত্র হাতে হাতে পৌঁছে দিতে না পারেন কিংবা যদি দূর-দূরান্তে থাকা কোনও আত্মীয়স্বজনকে নিমন্ত্রণ করতে হয়, তাহলে তা মেইল বা হোয়াটস অ্যাপ কিংবা ম্যাসেঞ্জারে পাঠিয়ে একবার ফোন করে দেবেন নিমন্ত্রিত অতিথিদের। বিয়ের অন্তত পনেরো দিন আগে নিমন্ত্রণ পত্র আত্মীয়-স্বজনদের হাতে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করুন। বন্ধুদের হাতে নিজেই দিয়ে আসুন নিমন্ত্রণ পত্র।

কেনাকাটা

দল বেঁধে কেনাকাটা করতে যাবেন। কারণ, সবাই মিলে দেখেশুনে কেনাকাটা করলে ঠকে যাওয়ার সম্ভাবনা কম থাকবে। বিয়ের রীতিনীতি থেকে শুরু করে হনিমুন পর্যন্ত যা কিছু প্রয়োজন, সেগুলির তালিকা তৈরি করে কেনাকাটা করতে যাওয়া উচিত। জীবনসঙ্গীর জন্য কোনও কিছু কিনতে হলে, আগেই তার পছন্দের ব্যাপারে জেনে নিন। প্রয়োজনে তাকে সঙ্গে নিয়েও কেনাকাটা করতে যেতে পারেন। খুব পুরোনো গয়না বাড়িতে থাকলে তা বদলে নতুন ডিজাইনের গয়না গড়ে নিতে পারেন। তবে তা বিশ্বস্ত গয়নার দোকান থেকেই কেনা উচিত।

বিয়ের অনুষ্ঠানের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল — পোশাক। গায়েহলুদ, বিয়ের দিন, বউভাতের দিন ভিন্ন পোশাকের প্রচলন আছে আমাদের ভারতীয় বিয়েতে। তাই পোশাক কেনার ব্যাপারেও আগাম পরিকল্পনা দরকার। দু’জনের রুচি, পছন্দ এবং বাজেট অনুযায়ী কিনে রাখুন এইসব প্রয়োজনীয় পোশাকগুলি। এক্ষেত্রে পরস্পরের পছন্দকে গুরুত্ব দিন।

শপিংমল কিংবা ফ্যাশন ডিজাইনার-এর থেকেও সংগ্রহ করতে পারেন বিয়ের পোশাক। আর আত্মীয়স্বজনদের জন্য অপরিহার্য পোশাকগুলি কেনার আগে গুরুজন এবং পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা করে নেওয়া ভালো। শুধু তাই নয়, যাকে পোশাক উপহার দেবেন, প্রয়োজন মনে করলে তার সঙ্গে কথাপ্রসঙ্গে আলোচনা করে নিয়েও কিনতে পারেন পোশাক। যদি অনেক শাড়ি কিনতে হয়, তাহলে নদিয়া জেলার ফুলিয়া থেকেও কিনতে পারেন শাড়ি। কারণ ওখানে কম দামে ভালো শাড়ি পাওয়া যায়।

মণ্ডপসজ্জা

পেশাদার ডেকরেটর দিয়েই মণ্ডপ সাজানো উচিত। ফুল, পাতা, পাটকাঠি, ওড়না, থার্মোকল প্রভৃতি দিয়ে আজকাল সুন্দর ভাবে মণ্ডপ সাজানো হয়। আপনার পছন্দের বিষয়টি আগেই জানিয়ে দিন। বন্ধু-বান্ধবদের বিয়ের মণ্ডপসজ্জা দেখে আইডিয়া নিন এবং সেইসঙ্গে ইন্টারনেটে সার্চ করে মণ্ডপ তৈরির আইডিয়া নিতে পারেন।

ফোটোগ্রাফি

বিয়ের অনুষ্ঠানের স্টিল এবং ভিডিয়ো ফোটোগ্রাফি করান প্যাকেজে। পেশাদার আলোকচিত্রীদের দিয়েই বিয়ের ছবি তোলানো উচিত। কারণ ছবিগুলিকে প্রেজেন্টেবল করার জন্য ভালো ফ্লেমিংও হওয়া চাই। স্টিল ছবিগুলিকে ভালো অ্যালবামে সাজিয়ে রাখবেন এবং ভিডিয়োগ্রাফি এডিট করে পেন-ড্রাইভে সংরক্ষণ করুন।

রেজিস্ট্রেশন

সিঁদুরদান, মালাবদল যা-ই করুন না কেন, ম্যারেজ রেজিস্ট্রেশন করা অত্যন্ত জরুরি। এই আইনসিদ্ধ বিয়ে ভবিষ্যতের রক্ষাকবচই শুধু নয়, নানা সরকারি কাজকর্মেও তা একান্ত ভাবে আবশ্যক। একমাস আগে নোটিশ করেও রেজিস্ট্রেশন করা যায়, আবার বিয়ের পরও রেজিস্ট্রেশন করানো যায়। তবে বিয়ের পরে রেজিস্ট্রেশনে খরচ বেশি। অন্তত পাঁচ হাজার টাকা রেজিস্ট্রেশন বাবদ বিয়ের বাজেটে রাখবেন।

রেজিস্ট্রেশনের পরে পেমেন্ট রিসিট মনে করে নিয়ে সযত্নে রাখবেন। কারণ রেজিস্ট্রেশনের সপ্তাহখানেক বাদে যখন সার্টিফিকেট তুলতে যাবেন কোর্ট থেকে, তখন পেমেন্ট রিসিট দেখাতে হবে। পাত্রপাত্রী দু’জনেরই চার কপি করে পাসপোর্ট সাইজ ছবি, অ্যাড্রেস প্রুফ ইত্যাদি লাগে রেজিস্ট্রেশনের জন্য। উভয়পক্ষের দু’জন সাক্ষীও থাকতে হবে ম্যারেজ রেজিস্ট্রেশন-এর সময়।

আপ্যায়ন

দূরের নিমন্ত্রিত অতিথিদের থাকার ব্যবস্থা রাখবেন। আপ্যায়নের জন্য মিষ্টভাষী এবং মিশুকে কাউকে দায়িত্বে রাখা জরুরি। নিমন্ত্রিত অতিথিদের আসা-যাওয়া, থাকা-খাওয়ার যাতে কোনও অসুবিধা না হয়, সেই ব্যাপারে যত্নশীল হওয়া প্রয়োজন। অতিথিদের মনোরঞ্জনের জন্য গান-বাজনার আয়োজনও রাখতে পারেন।

প্রীতিভোজ

নিমন্ত্রিতদের খাওয়ানোর দায়িত্ব নিজেরা না নিয়ে, কোনও কেটারার দিয়ে করালে নিশ্চিন্ত থাকা যায়। ভেজ এবং ননভেজ দু- রকম খাবারই রাখার চেষ্টা করুন মেনুতে। তবে খুব বেশি পদ না রেখে, পছন্দসই অল্পসংখ্যক পদের ভালো খাবার রাখুন। বন্ধু- বান্ধবদের সঙ্গে আলোচনা করে এবং বাজেট মাথায় রেখে খাদ্য তালিকা তৈরি করুন। মূল খাবারের সঙ্গে দই, মিষ্টি এবং পান রাখা জরুরি। আর বিয়ের অনুষ্ঠান শীতকালে না হলে, দইয়ের পরিবর্তে আইসক্রিম রাখতে পারেন। আজকাল বুফে সিস্টেমে খাওয়ানোর রীতি চালু হয়েছে। আপনিও এই পদ্ধতিতে খাইয়ে সবাইকে খুশি করার চেষ্টা করুন।

হনিমুন পর্ব

জীবনসঙ্গীর সঙ্গে আলোচনা করে আগে থেকে ঠিক করে ফেলুন হনিমুন স্পট। মধুচন্দ্রিমায় যাওয়ার আগে, গন্তব্য স্থানের বিষয়ে বিশদে খোঁজখবর নিয়ে রাখুন। সেইসঙ্গে, গন্তব্যস্থানে যাওয়া-আসা, থাকা-খাওয়ার সমস্ত ব্যবস্থা পাকা করে রাখুন। প্রয়োজনে কোনও ট্রাভেল এজেন্সির সাহায্য নিন।

চাকুরিজীবীরা হনিমুনে যাওয়ার জন্য আগেভাগে কর্মস্থলে ছুটির আবেদন করতে ভুলবেন না। বিদেশে হনিমুন করার ইচ্ছে থাকলে, সুনাম আছে এমন কোনও ট্রাভেল এজেন্সিকে দিয়ে ভিসা-র আবেদন করুন এবং ওই এজেন্সিকে টাকা দিয়ে পুরো ট্যুর-এর প্যাকেজ নিন। তবে এক্ষেত্রে মনে রাখবেন, কমপক্ষে দু-মাস আগে ভিসা-র আবেদন করা উচিত।

বিয়ের পোশাক

বাঙালি মাত্রেই পরম্পরায় অভ্যস্ত। আজও তাই বাঙালি চোখ বিয়ের আসরে নববধূকে দেখতে চায় পারস্পরিক পোশাকে। নববধূ নিজে যদি খুব আধুনিক মনস্কও হন, তাহলেও তিনি বিয়ের আসরে পরম্পরার বাইরে বেরোতে চান না। কারণ, তিনিও জানেন, বাঙালি বিয়ে বেনারসি বাদ দিয়ে ভাবাই যায় না। অবশ্য পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুবাদে এখন ‘হাফ অ্যান্ড হাফ’ বেনারসি বাজারে এসেছে। এক্ষেত্রে কাতান বেনারসির বেস টা রেখে, কখনও করা হচ্ছে ঘিচা ও চান্দেরির কম্বিনেশন, কখনও ঘিচার সঙ্গে পশমিনার মিক্স অ্যান্ড ম্যাচ। মেরুন, লাল, ম্যাজেন্টা প্রভৃতি রঙের সঙ্গে হালকা রঙের ঘিচার কন্ট্রাস্টে, শাড়িটি দেখতে হচ্ছে মেখলার মতো।

এছাড়া কাতানে আনা হচ্ছে লেহেঙ্গার অনুকরণে কাজ, জরদৌসির ভারী নকশা, সঙ্গে নকশাদার ব্লাউজ। কখনও সাধারণ ট্র্যাডিশনাল বেনারসির ডিজাইনে আনা হচ্ছে বৈচিত্র্য। আঁচলের নকশায় লতা-পাতা-গুল্ম থাকলেও, বড়িতে থাকছে জ্যামিতিক নকশা। তবে, ‘হাফ অ্যান্ড হাফ’ বেনারসি বাজারে এলেও, পিওর বেনারসির চাহিদা এতটুকুও কমেনি।

বর্ণাঢ্য এই বেনারসি শাড়ির জন্মস্থান ‘বেনারস’। ইতিহাসের পাতায় পাতায় মুদ্রিত আছে বেনারসির ঐতিহ্য। মসৃণ রেশমের শাড়ির গায়ে সোনালি বা রুপোলি জরির বর্ণময় সাবেক শৈলীটি বেনারসের নিজস্ব সম্পদ। গঙ্গার ধারের এই ‘বেনারস’ শহরটির খ্যাতি শুধু বাবা বিশ্বনাথের জন্যই নয়, বিয়ের বর্ণাঢ্য বেনারসি শাড়ি তৈরির জন্যও।

১৭ শতকে বেনারসি শাড়ি তৈরি হওয়া শুরু হলেও, তা উৎকর্ষতার শীর্ষে পৌঁছায় ১৯ শতকে। মোগল আমলে কলকা আর লতাগুল্মের ঠাস বুননে এক একটা শাড়ি নান্দনিকতা এবং শিল্পকর্মের চূড়ান্ত দৃষ্টান্ত হয়ে ওঠে। তিনজন কারিগরের মিলিত প্রচেষ্টায় ১৪ দিন থেকে ৬ মাস লেগে যায় এক একটি শাড়ি তৈরি করতে। শাড়ির নকশার উপর নির্ভর করে, কতটা সময় লাগবে তৈরি করতে।

শুধুমাত্র কনের সাজই নয়, বিয়ের আসরে সম্ভ্রান্ত রুচির গৃহিণী তথা কমবয়সি আধুনিকাদের অঙ্গেও শোভা পায় চিরকালীন বেনারসি। এককথায় বলা যেতে পারে, বাঙালি বিয়ের ঐতিহ্যকে আজও অক্ষুণ্ণ রেখেছে বেনারসি শাড়ি।

সলাজ নববধূর চেলি ঢাকা আনত মুখ আর অঙ্গের বেনারসি শাড়ি, সার্থক করে তোলে বিয়ের আবহ। প্রত্যেকটি বেনারসি শাড়ি যেন শিল্পকর্মের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। জামদানি, তাঞ্চই, জংলা বা কাতান— যে- বেনারসিই হোক, বিয়ের আসরে তা নজর কেড়ে নেবেই। এই বেনারসির ঐতিহ্য উদ্ভাসিত হয়ে উঠবে ইতিহাস খুঁড়লেই। মসৃণ রেশমের শাড়ির গায়ে সোনালি বা রুপোলি জরির বর্ণময় নকশার সাবেক শৈলীটি গড়ে ওঠে বেনারসে।

মূলত চার ধরনের বেনারসি শাড়ি প্রস্তুত হয় এই অঞ্চলে। পিওর সিল্কের উপর কাতান বেনারসি, অর্গ্যাঞ্জা বা কোরা বেনারসি, তাঞ্চই এবং টিসু বেনারসি। বর্তমানে রেশমের পরিবর্তে আরও সস্তায় সিন্থেটিক ফ্যাব্রিকে বেনারসির নকশা তোলা শাড়ি প্রস্তুত হচ্ছে সুরাতে। ফলে বেনারসির বাজারে কিছুটা হলেও মন্দা দেখা দিয়েছে।

বাঙালি বিয়েতে বেনারসির বিকল্প প্রায় নেই বললেই চলে। বর্তমানে ট্র্যাডিশনাল নকশার বেনারসির পাশাপাশি, ডিজাইনে নানা হেরফের আনা হচ্ছে বেনারসিতে। চিরকালীন কলকা, বুটি ও ফ্লোরাল প্যাটার্নের নানা বৈচিত্র্যে ভরপুর এখন বেনারসি শাড়ি। জর্জেট এবং শান্তির এই দুটো ফ্যাব্রিকও এখন বেনারসিতে ব্যবহার করা হচ্ছে, যা নকশা ফুটিয়ে তোলার জন্য অনন্য। মোগল জমানায় মুসলিম কারিগরদের নকশার ধারাবাহিকতা বজায় থাকলেও, পরীক্ষা-নিরীক্ষার স্বার্থে কাটওয়ার্ক ও বুটিদার নকশার সৃজন করছেন হাল সময়ের তন্তুবায়রা।

মূলত চার ধরনের বেনারসি শাড়ি প্রস্তুত হয়। পিওর সিল্ক কাতান বেনারসি, অর্গাঞ্জা বা কোরা বেনারসি, তাঞ্চই বেনারসি এবং টিস্যু বেনারসি। বর্তমানে ট্র্যাডিশনাল নকশার পাশাপাশি কলকা, বুটি, জংলা, ভাসকাট, কাটওয়ার্ক ডিজাইনের চাহিদা বহুল পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে। মোগল জমানায় মুসলিম কারিগরদের নকশার ধারাবাহিকতা আজও অক্ষুণ্ণ। তবে, নকশায় হেরফের আনতে এই সময়ের তাঁতিরাও বেনারসি নিয়ে বহু পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাচ্ছেন।

পিওর সিল্ক কাতান বেনারসি

কাতান খুব সাধারণ একটি ফ্যাব্রিক, যা পিওর সিল্ক সুতোর সঙ্গে বুননের ফলে রূপ পায় বেনারসির। একসময় হ্যান্ডলুমে তৈরি হতো এই শাড়ি। পরবর্তীকালে পাওয়ারলুম এসে পড়ায় এই শাড়ির প্রোডাকশন বিপুল পরিমাণে হচ্ছে।

অর্গ্যাঞ্জা বা কোরা বেনারসি

ব্রোকেডের অপরূপ নকশা তোলা এই শাড়ির বর্ণাঢ্যতা বিবাহ অনুষ্ঠানের জন্য আদর্শ হয়ে উঠেছিল। সোনা বা রুপোর জল করা এই সমস্ত শাড়ি পৌঁছেছিল উৎকর্ষতার শীর্ষে। এখনও তা বাঙালিদের অতি প্রিয় পরিধেয়।

তাঞ্চই বেনারসি

জামেওয়ার নকশার সাবেক বর্ণাঢ্যতাই এই শাড়ির বৈশিষ্ট্য। জরির অপরূপ নকশায় নববধূর সাজকে সম্পূর্ণতা দেয় এই শাড়ি। হালফিল নকশায় আঁচলের কাজ আর বর্ডারে তারতম্য রাখা হচ্ছে। অনেকসময়ই আঁচলটিতে বড়ো কলকা আর পাড় আধুনিক জ্যামিতিক প্যাটার্নে সাজানো হচ্ছে।

টিস্যু বেনারসি

সোনালি জরির ঠাসবুনোটে তৈরি এই শাড়ি আক্ষরিক অর্থেই বিয়ের সন্ধেটিকে ঝলমলে করে তোলে। এই শাড়ির নকশার মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় হল জলে ভাসা পদ্ম। জলের বিন্দুগুলি বোঝাতে জামদানি নকশার আশ্রয়ও নেওয়া হয়ে থাকে। আঁচল আর কুচিতে সামঞ্জস্য রেখে তৈরি হয় এই শাড়ির নকশা। তবে, ডিজাইনের উপর ভিত্তি করে বেনারসি শাড়িগুলিকে আরও কিছু বিভাগে ভাগ করা যায়। এর মধ্যে রয়েছে জংলা, কাটওয়ার্ক এবং বুটিদার।

জংলা

নকশার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই এই শাড়িটিকে জংলা বেনারসি বলা হয়। গোটা শাড়ি জুড়ে লতাপাতার নকশাই হল এই শাড়ির বৈশিষ্ট্য। এই জংলা মোটিফ-ই বেনারসের প্রাচীন মোটিফের ঐতিহ্য বহন করে চলেছে আজও। বিবাহ অনুষ্ঠানের জন্য বরাবরই আদর্শ এই জংলা নকশার শাড়ি।

কাটওয়ার্ক

এই শাড়িগুলি সস্তার জামদানি হিসাবেই পরিচিত। করাতকাজ নকশার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা হয় এই শাড়িতে। চিরকালীন নকশার মধ্যে জুঁই ফুল, গাঁদা ফুল, লতাপাতার মোটিফ খুব বেশিমাত্রায় প্রয়োগ করা হয়।

বুটিদার

সোনা-রুপোর জল করা, সুতোর কাজে ঋদ্ধ এই বুটিদার নকশার বেনারসিগুলি। ব্রোকেডের উজ্জ্বলতায় কনের সাজকে উজ্জ্বলতর করে তোলে এই শাড়ি। আঙুরগুচ্ছ, আশরফি বুটি, লতিফা বুটি, রেখা বুটি, ঝুমুর বুটি, জরি বুটি, লতাপাতা বুটি, বালুচরি বুটি প্রভৃতি নকশার আলংকারিক মেলবন্ধন ঘটে এইসব শাড়িতে। বুটিদার বেনারসি বা আদি অকৃত্রিম লতা-পাতার ডিজাইনে মিক্স অ্যান্ড ম্যাচ করেই ভ্যারাইটি তৈরি হচ্ছে। এক্ষেত্রে আঁচল, কোল আঁচল আর কুঁচিতে মোটিফের হেরফের করে তা ব্যবহার করা হচ্ছে, যাতে তিনটি অংশই আলাদা দেখতে লাগে।

আর আছে থ্রি-ডি কাতান বেনারসি। এক রঙা কোল আঁচল আর কুচি, সেইসঙ্গে আঁচলে সুতো আর জরির নকশাই এর অনন্যতা। এছাড়া স্টোন বসানো জারদৌসি কাজের বেনারসি এখনও বেশ জনপ্রিয়। রিসেপশনের দিন পরার জন্য চলছে ডাবল শেডের (হাফ অ্যান্ড হাফ) জামেওয়ার বা তাঞ্চই। রঙের ব্যাপারে চিরাচরিত লালের শেড ও ম্যাজেন্টা রঙের বেনারসি রয়েছে পছন্দের শীর্ষে।

পুরিতে পরি (পর্ব-০২)

পরের গন্তব্য লক্ষ্মীজলা, যেখানে সারা বছর ধানচাষ হয়। আর সেই সুগন্ধি ধানের চাল দিয়ে জগন্নাথদেবের প্রতিদিনের ভোগ রান্না হয়। এরপর জগন্নাথদেবের মাসির বাড়ি। বিশাল এলাকা। জগন্নাথদেবের রথ এখানে আসে। সেই সময় লক্ষ লক্ষ মানুষের ঢল নামে পুরীতে।

মাসির বাড়ি ঢুকতেই দেখলাম একটা গাছে প্রচুর সুতো জড়ানো। ঢোকার সময় ওই বৃক্ষকে স্পর্শ করে, একজন ধর্মের ধ্বজাধারি বসে আছেন, তাঁকে প্রণামি দিয়ে ভিতরে যেতে হবে। আমি বৃক্ষকে স্পর্শ না করে এবং কোনও প্রণামি না দিয়ে ভিতরে ঢোকার জন্য উনি খুব রেগে গেলেন। আমাকে মহাপাপী, নরকেও ঠাঁই হবে না, বলে গালাগালি দিলেন। আমি মহানন্দে এগিয়ে গেলাম! উনি প্রতিদিন, প্রতি মুহূর্তে যত পাপ করছেন, আমি সারাজীবনে সে পাপ করতে পারব না— এ ব্যাপারে একশো ভাগ নিশ্চিত।

সব জায়গাতেই বড়ো বড়ো হাঁ করে বসে আছে। তাদের হাঁ-মুখে টাকা ফেললেই মহাপুণ্য। এরই নাম তীর্থ ধর্ম। আমি তো তীর্থ করতে, ধর্ম করতে আসিনি। এসেছি কত না-দেখা স্বপ্ন, পথের পরতে পরতে, নিজেদের সাজিয়ে গুছিয়ে বসে আছে— আমি সেসব বিস্ময়ের রূপ-রস-গন্ধ সব সবকিছু আকণ্ঠ পান করতে চাই। সুতরাং আমার ওই দায় নেই, ওদের হাঁ-গর্তে আমার পকেট হালকা করার কোনওরকম বাজে ইচ্ছে নেই। যত্রতত্র ব্যারিকেড করে, যতরকম ভাবে টাকা আদায় করা যায় তার চেষ্টা!

এরপর সোনার গৌরাঙ্গ। কীর্তন চলছে। প্রণামি বাক্স আছে কিন্তু কোনও জোরজবরদস্তি নেই। ভালো লাগল। শান্ত স্নিগ্ধ পরিবেশ, নানান মূর্তি সুন্দর ভাবে সাজানো দেখে চোখ জুড়িয়ে যাচ্ছে। শুনলাম একটা মিউজিয়াম আছে। কিন্তু তার দরজা বন্ধ। সুতরাং বাইরে থেকেই যেটুকু দেখার। এবারে হোটেলে ফেরা। সি-বিচে একটু ঘোরাঘুরি করে, খাজা কিনে সন্ধেকালীন জলযোগ সারা হল।

আজ বহু প্রতীক্ষিত, বহু চর্চিত শ্রীশ্রী জগন্নাথ দেবের মন্দিরদর্শন। প্রায় সকলেই সকাল থেকে না খেয়ে আছে। উপোস করে পুজো দিলে পুণ্য নাকি অনেক বেশি! বলাবাহুল্য আমি ওই দলে নেই, কোনওদিনই ছিলাম না। যথারীতি পেটপুরে ব্রেকফাস্ট করে রওনা দিলাম। মোবাইল সঙ্গে নিলাম না। শুনলাম, জুতো, মোবাইল, চামড়ার বেল্ট সব বাইরে জমা রেখে মন্দিরের ভিতরে যেতে হবে। হাত, পা, মুখ ধুয়ে নিজেকে পবিত্র করে মূল ফটকে যাওয়া। সেখানে সশস্ত্র প্রহরা। প্রয়োজনে পরীক্ষা করে ঢুকতে দিচ্ছে। আমাদের পান্ডাঠাকুর এক জায়গাতে সবাইকে দাঁড় করিয়ে অনর্গল বকে গেল। বলাবাহুল্য সবটাই ঠাকুরের মহিমাকীর্তন। ভেবেছিলাম খুব সহজেই জগন্নাথ দর্শন হয়ে যাবে !

মাথার উপর গনগনে রোদ। মূল গর্ভগৃহে ঢোকার আগে লাইনে দাঁড়ালাম। সামনে অগণিত পুণ্যলোভী মানুষের আকাঙ্খা, ধীরে ধীরে পিছনেও বিশাল লাইন পড়ে গেল। দীর্ঘক্ষণ দাঁড়ানোর পর, হুড়মুড় করে সামনের মানুষজন কিছুটা এগিয়ে গেল, পিছনের ধাক্কা আমাদেরও এগিয়ে নিয়ে গেল। আবার ঠায় দাঁড়িয়ে থাকা, যাকে বলে ন যযৌ ন তস্থৌ। এরমধ্যেই একটা লোক স্প্রে করে মাঝে মাঝে ঠান্ডা জল ছেটাচ্ছে, তাতে একটু আরাম হচ্ছে। এরকম দু-তিনটে ঢল এল আর গেল। এখন কিন্তু আমাদের দলের কাউকে সামনে, পিছনে কোথাও দেখা যাচ্ছে না। কে যে কোথায় ছিটকে গেছে কে জানে? আমাদের সঙ্গে তিনটে বাচ্চা। যদি হারিয়ে যায়!

আমার সামনে ছিল লহরি আর চনমন, তাদেরও দেখতে পাচ্ছি না। কুহু এতটুকু মেয়ে, এই ভিড় কী করে সহ্য করছে? এ তো মরে যাওয়ার মতো অবস্থা! মাথায় থাক জগন্নাথ দর্শন, আমি ভাবছি কীভাবে, কখন এই অবস্থা থেকে বেরোতে পারব? আবার এরমধ্যে এক একটা ব্যারিকেড পার হওয়ার সময় পয়সার দাবি নিয়ে, বসে অথবা দাঁড়িয়ে থাকা যমদূত। প্রত্যেকের মাথায় একটা লাঠির ঘা মারছে আর হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে— দাও, দাও দাও…।

মন্দিরের ভিতরে অন্ধকার, ভালো করে প্রায় কিছুই দেখা যাচ্ছে না। সিংহাসনে জগন্নাথদেব, বলরাম আর সুভদ্রার মূর্তি। আবছা আলোতে যেটুকু দেখা যায়। এই অবস্থায় দমবন্ধ হয়ে যে-কারওর মৃত্যু পর্যন্ত ঘটতে পারে। কোনওরকমে গর্ভগৃহের বাইরে এসে বাঁচলাম। মুক্ত হাওয়ায় যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে পেলাম। ভাবছি, আবার পুরী আসব কিন্তু সেইসময়ে আর জগন্নাথ মন্দিরে আসব না। আসলে ধীরেসুস্থে ঠাকুর দেখার সময় এবং পদ্ধতি আছে। আমাদের মূর্খ পান্ডা সেটা না জেনে, কিংবা জেনেশুনে এই ভিড়ের সময়ে নিয়ে এসেছে। পরে জানা গেল, সন্ধের দিকে টিকিট কেটে ধীরেসুস্থে জগন্নাথদেব দর্শন করা যায় এবং যথারীতি পরেরদিন সন্ধের সময় জগন্নাথ মন্দিরে আবার আমাদের পদার্পণ ঘটল। তবে এবার দক্ষিণ গেটে নয়, উত্তর গেটে।

জগন্নাথদেবের দর্শন ছাড়াও এসময় আর একটা শিহরিত হওয়ার মতো দৃশ্য দেখা যায়। বিশাল উঁচু মন্দির শীর্ষের ধ্বজা (পতাকা) প্রতিদিন পালটানো হয় এবং সেটা এই সন্ধের সময়। এর জন্য পেশাদার লোক আছে। অত্যন্ত দ্রুত গতিতে যখন ওরা মন্দির শীর্ষে উঠছিল আমি অবাক হয়ে দেখছিলাম, আমার গায়ের লোমগুলো খাড়া হয়ে যাচ্ছিল। যখন ওরা শীর্ষে পৌঁছে গেল, তখন ওদের অবয়ব হাতের মুঠোয় ধরে রাখার মতো। পুরোনো পতাকার খণ্ডাংশ নিলাম হয়। সেখান থেকেও জগন্নাথদেবের আয় মন্দ হয় না।

এদিন আমি আর ভিতরে গেলাম না। দলের বাকি সদস্যরা যখন মন্দির অভ্যন্তরে আমি তখন বাইরের মন্দির সংলগ্ন বাজারে ঘোরাঘুরি করছিলাম। শুনেছিলাম উত্তর গেটে খুব সস্তায় ছানা পাওয়া যায়। শান্তকে সঙ্গে নিয়ে আমি গেলাম ছানার সন্ধানে। খুঁজতে খুঁজতে একজন ছানা বিক্রেতাকে পেলাম। দু’কেজি ছানা কিনলাম। সামনেই একটা মিষ্টির দোকান, বেশ ভিড়। সুতরাং মিষ্টি ভালো হওয়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা আছে। বেশ কিছুটা ছানা-সহ মিষ্টি খেলাম। পুরীর সমস্ত মিষ্টির দোকানে ছানাপোড়া আর খাজা থাকবেই।

পরেরদিন সকালে আমাদের হোটেলের সামনে একটা পুলকার এসে দাঁড়াল। শুনলাম ওটাই আজ আমাদের বাহন। স্নান সেরে, ভারী ব্রেকফাস্ট করে বাসের পেটে ঢুকে গেলাম। আমি সোজা পিছনের সিটে। পিছনটা পুরো ফাঁকা ছিল। বাস চলল সি-বিচ ধরে। বেশ কিছুটা যাওয়ার পর মূল রাস্তায়। পুরী ছেড়ে যাওয়ার মুখে, একজন পুলিস বাসটা দাঁড় করিয়ে উঠে এল, সঙ্গে একটি ছেলে। বাসের ভিতরে এদিক- ওদিক তাকিয়ে দু’টো ফাঁকা সিট দেখে বসেও গেল। বুঝলাম আমাদের সহযাত্রী হয়ে কিছুদূর যেতে চায়।

( চার )

আজ অনেক জায়গায় ঘুরতে হবে। হোটেল থেকে বার হতে এমনিতেই বেশ দেরি হয়ে গেছিল। আজকের প্রথম দ্রষ্টব্য ধবলগিরি। ছোট্টপাহাড়ের উপর মন্দির। আমাদের বাস পাহাড়ের অর্ধেকটা উঠে এল, বাকিটা হেঁটে এবং খালি পায়ে। সামনেই ধ্যানমগ্ন মহাদেবের বিশাল মূর্তি। পিছনে বুদ্ধদেবের ধ্যানগম্ভীর মূর্তি। থরে থরে সাজানো নানা স্বাদের নাড়ু। চেখে দেখার সুযোগ আছে। ইচ্ছে হলে কেনাও যায়। স্বাদ ভালোই, কাজু বাদামও প্রচুর। কেজিপ্রতি ২০০ থেকে ৩০০ টাকা। শান্ত বলল, কোনারকে আরও সস্তা। সুতরাং ওখানেই কিনতে হবে। সে আরেক কাহিনি। যে-কাজুকাহিনি শুরু হয়েছিল কোনারকে, সে কাহিনি কোনারকে শেষ হয়নি, শেষ কথাটি লেখা হয়েছিল বাড়িতে এসে।

(ক্রমশ…)

গলা এবং ঘাড় পরিষ্কার রাখার উপায় কী?

আমার গলা এবং ঘাড়ের অংশ খুব কালো। গলা এবং ঘাড় পরিষ্কার রাখার উপায় কী?

আমরা বেশিরভাগই মুখের সৌন্দর্যের উপর জোর দিই। ঘাড় এবং গলা এড়িয়ে যাই। এর ফলে গলা এবং ঘাড় কালো থেকে যায়। গলা এবং ঘাড় পরিষ্কার করার জন্য ২ বড়ো চামচ মধুর সঙ্গে ১ বড়ো চামচ লেবুর রস মিশিয়ে মিশ্রণ তৈরি করে নিন। এটি গলায় এবং ঘাড়ে কিছুক্ষণ লাগিয়ে রাখুন। পরে একটি পরিষ্কার কাপড় দিয়ে পুরোটা মুছে নিন।

শুধুমাত্র লেবুর সাহায্যেও গলা পরিষ্কার রাখতে পারেন। লেবু স্ক্রাবার হিসেবে খুব ভালো কাজ দেয়। কেটে রাখা লেবু স্নানের সময় গলায় এবং ঘাড়ে ভালো করে রগড়ে নিন এবং তারপর ভালো করে ধুয়ে ফেলুন। সপ্তাহে ২-৩ দিন এরকম করতে পারলে গলা এবং ঘাড় পরিষ্কার হয়ে যাবে।

আমি ১৮ বছর বয়সি যুবতি। আমার সমস্যা এই যে, আমার ত্বক অসম্ভব স্পর্শকাতর। যে-কোনও বিউটি প্রোডাক্ট ব্যবহার করলেই ত্বক রিঅ্যাক্ট করে। মুখে ব্রণ হওয়া শুরু হয়ে যায়। স্পর্শকাতর ত্বক এবং ব্রণর জন্য কোনও ফেস প্যাক জানা থাকলে দয়া করে জানান।

আপনার ত্বক যেহেতু স্পর্শকাতর তাই কোনও বিউটি প্রোডাক্ট আগে টেস্ট না করে ব্যবহার করবেন না এবং যেটা আপনার ত্বকে স্যুট করে, সেই প্রোডাক্টই খালি ব্যবহার করুন। ফেস প্যাক-এর জন্য তুলসী ও নিম পাউডার, কমলালেবুর রস এবং কাঁচা দুধ মিশিয়ে মিশ্রণ তৈরি করুন। সেটাই ত্বকে লাগান। তুলসী এবং নিম পাউডারে অ্যান্টিব্যাকটিরিয়াল প্রপার্টিজ রয়েছে যেটা ত্বকের কোনও ক্ষতি না করেই রং উন্নত করতে সাহায্য করে এবং ব্রণ কম করতেও সাহায্য করে।

আমি ২০ বছর বয়সি যুবতি। আমার বর্ণ শ্যামলা। শ্যামলা রঙের জন্য আমি আত্মবিশ্বাসের অভাব বোধ করি। আমার রং কীভাবে ফরসা হতে পারে দয়া করে জানান।

ত্বকের রং ফরসা করতে চাইলে কাঁচা দুধ ত্বকে লাগান। এছাড়াও লাল চন্দন, কেসর, মুলতানি মাটি এবং কমলালেবুর রস মিশিয়ে একটি ফেস প্যাক তৈরি করুন এবং ত্বকে লাগান। প্যাক শুকিয়ে গেলে ঠান্ডা জল দিয়ে ধুয়ে ফেলুন। এই প্যাকের নিয়মিত ব্যবহারে আপনার ত্বকের রং অবশ্যই উন্নত হবে।

সন্তানকে সুশিক্ষা দিন

প্রত্যেকটি শিশু তার মা-বাবার সঙ্গে হেসেখেলে কিছুটা সময় কাটাবে, এটাই কাম্য। কারণ, বাবা-মায়ের মতো প্রকৃত বন্ধু আর কেউ হতে পারে না। তাই সারাদিনের কর্মব্যস্ততার মধ্যে যতটা সম্ভব বন্ধুর মতো যেমন মেলামেশা করা উচিত সন্তানের সঙ্গে, ঠিক তেমনই সময় সুযোগ বুঝে সুশিক্ষা দেওয়া উচিত সন্তানকে। কারণ, তারা সবচেয়ে বেশি কমফর্টেবল থাকে মা-বাবার সঙ্গে থাকার সময়টাতে। তাই বন্ডিং টাইম-টাকে কাজে লাগিয়ে, সন্তানের মানসিক নির্ভরতার আধার হয়ে উঠুন। আপনি সমস্ত অ্যাটেনশন দিয়ে বাচ্চাকে আগলে রাখলে, সেও ইমোশনালি এবং ফিজিক্যালি অনেক নিশ্চিন্তবোধ করবে। এটাই তাকে মানসিক ভাবে ভালো থাকার রসদ জোগাবে এবং সন্তান সুশিক্ষিত কিংবা বলা যায় প্রকৃত শিক্ষা পাবে।

কখন, কী করবেন:

  • সকাল থেকে রাত— কীভাবে সময় কাটাবেন সন্তানের সঙ্গে, সে বিষয়ে সন্তানের সঙ্গে আলোচনা করে নিন। বেশিরভাগ বাচ্চারা বেশ বুদ্ধিমান। তাদের সম্পূর্ণ পরিস্থিতি বুঝিয়ে বললে তারা ঠিকই বুঝতে পারবে।
  • প্রত্যেকদিন একটা নির্দিষ্ট সময় বের করে নিন, যখন সন্তানের সঙ্গে সময় কাটাবেন। এই সময়টায় দু’জনে একসঙ্গে গান শুনুন কিংবা দাবা খেলুন। কোনও গল্প পড়েও শোনাতে পারেন বাচ্চাকে।
  • এখনকার বাচ্চাদের মধ্যে বই পড়ার অভ্যাস খুব কমে গিয়েছে। আপনার ছুটির দিনে ওদের বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলার চেষ্টা করুন। বই পড়ার অভ্যাস না থাকলে কোনও ভালো গল্প পড়ে শোনান, কিন্তু সম্পূর্ণ করার আগেই থেমে যান। সন্তানকে বলুন বাকি অংশ ও যেন আপনাদের পড়ে শোনায়। শিশু-সাহিত্যিকদের লেখা একটা করে গল্প পড়ে শোনানোর ফলে মাতৃভাষার প্রতি ধীরে ধীরে আগ্রহও বাড়বে।
  • আপনার ল্যাপটপ বা ডেস্কটপ-এ সন্তানের সঙ্গে সেরা মুহূর্তগুলির ছবি অ্যালবাম-এ সেভ করে রাখুন। খুব মন খারাপের দিনগুলোয় যাতে সে ওগুলো দেখে আনন্দ পায়৷
  • সন্তান মা-বাবার কেয়ার করে, এই ভাবনাটুকুই সন্তানকে বাইরের নানা অপ্রীতিকর পরিস্থিতির সঙ্গে মোকাবিলা করতে সাহায্য করে। তাই ওর মনের ইনসিকিয়োরিটি দূর করতে, খারাপ-ভালো পরিস্থিতিতে ওর পাশে থাকুন।
  • সন্তানের ছোটো ছোটো সাফল্য সেলিব্রেট করুন।
  • ডিনার করুন একসঙ্গে। এর ফলে সারাদিন সে কী করল, তা শেয়ার করার সুযোগ পাবে।
  • অতিরিক্ত শাসন না করে তার সমস্যাগুলো বোঝার চেষ্টা করুন। এতে সমাধানের পথ খুঁজে পাবেন
  • একটা ছোট্ট ডায়ারি তৈরি করুন। আপনার সন্তানের ছোটোখাটো কোনও কৃতিত্বের ঘটনা ঘটলে, দু- চার লাইন সেখানে লিখে রাখুন। যদি জীবনের কোনও পর্যায়ে সন্তান ডিমোটিভেটেড হয়ে পড়ে, এই ডায়ারি-টি তাকে মানসিক শক্তি জোগাবে।

ইতিহাসের শহর জাকার্তা (শেষ পর্ব)

হিস্ট্রি মিউজিয়ামের ঠিক উলটো দিকে রয়েছে বাটাভিয়া ক্যাফে। ১৮৩০ সালে তৈরি একটা আইকনিক বিল্ডিং-এ তৈরি হয়েছে এই ক্যাফে। বিকেল থেকেই শুরু হল ব্যান্ড পারফরমেন্স। দেখতে দেখতে ক্যাফে ভরে উঠল। আমরা উপরতলায় জানলার ধারে বসে বাইরের লোকজনের যাওয়া আসা দেখতে দেখতে ডিনার করলাম। ওল্ড জাকার্তার এই দিকটা ঘুরে আজ মনের মধ্যে কোথায় যেন একটা খটকা লেগে রইল। ডাচ শাসকরা এখান থেকে চলে গিয়েও যেন রেশটুকু রেখে গেছে। আমাদের যে দিন চলে যায়, সত্যিই কি একেবারে চলে যায়? নাকি আমরাই তাকে না দেখে থাকার ভান করি মাত্র? সারাদিন ওল্ড বাটাভিয়ার ইতিহাসে ডুবে থেকে সময় যে কোথা দিয়ে কেটে গেল বোঝার আগেই চারদিকে আলোর রোশনাই ফুটে উঠল। দিনের শেষে হোটেলে ফিরে মনে হল ইতিহাস আমাদের কত শিক্ষা দেয়। আমরাই হয়তো এর যথার্থ মূল্যায়ন করে উঠতে পারি না।

ইন্দোনেশিয়াতে আজই আমাদের শেষ দিন। রাতের ফ্লাইটে অস্ট্রেলিয়া ফিরতে হবে। সারাটা দিন হাতে রয়েছে। গাড়ির ড্রাইভারের সঙ্গে কথা বলে ঠিক করলাম ও আজ সারাদিন আমাদের ঘুরিয়ে বিকেলে এয়ারপোর্টে নামিয়ে দেবে। বাইরের প্রকৃতি যেন সকাল থেকেই তেতে আছে। আর সেই সঙ্গে রয়েছে আর্দ্রতা। জলবায়ু খুব একটা আরামদায়ক নয়।

ইন্দোনেশিয়ার সাধারণ মানুষ যেখানে সারা জীবনের সঞ্চয় দিয়ে মাথার উপর একটা ছাদ তৈরি করতেই হিমশিম খাচ্ছে, সেখানে ইন্দোনেশিয়ায় ছয়টি প্রেসিডেন্সিয়াল প্যালেস রয়েছে। ইন্দোনেশিয়ার রাজধানী জাকার্তাতে রয়েছে মারদেকা প্যালেস। মারদেকা স্কোয়ারের পাশেই এই প্যালেস। এটি জাকার্তার প্রেসিডেন্টের সরকারি বাসস্থান। বিশাল উঁচু প্রাচীরে ঘেরা এই প্যালেস। সাধারণ মানুষের এখানে প্রবেশাধিকার নেই।

ডাচ গভর্নররা সারা জীবন নেদারল্যান্ডস-এর ঠান্ডা জলবায়ুতে থেকে বাটাভিয়ার উষ্ণ ও আর্দ্র জলবায়ুতে মানিয়ে নিতে পারছিলেন না। তাই ১৭৪৭ সালে তৈরি হয় ডাচ গভর্নরের গ্রীষ্মকালীন বাস ভবন, এখন যার নাম ‘বোগোর প্যালেস’। ইন্দোনেশিয়ান ভাষায় যাকে বলা হয় “ইস্তানা বোগোর’। ওয়ার্ল্ড নিউ-এর দৌলতে অনেকেই হয়তো বোগোর প্যালেস দেখে থাকবে। কারণ এখানেই এখন বিভিন্ন দেশের রাজনৈতিক নেতারা মিটিং করতে আসে। জাভা দ্বীপের পশ্চিমে জাকার্তা থেকে ৬০ কিলোমিটার দূরে বোগোর শহরে তৈরি হয়েছে এই প্যালেস। জাকার্তা থেকে এত কাছে হওয়া সত্ত্বেও এখানকার জলবায়ু অনেকটাই মনোরম। চারদিকে ঘন জঙ্গল বলে এখানে তাপমাত্রা অনেকটাই কম। আর সমুদ্র উপকূল থেকে দূরে বলে বায়ুর আর্দ্রতাও কম। সব মিলিয়ে বিদেশি শাসকদের আদর্শ বাসস্থান ছিল এটি। ইউরোপীয় এবং ইন্দোনেশিয়ান স্থাপত্য শৈলীর মিশ্রণে প্রায় ২৮ হেক্টর জমি নিয়ে তৈরি এই প্রাসাদ। প্রাসাদের চারপাশে রয়েছে বাগান। ১৮০৮ সালে গভর্নর জেনারেল হারম্যান উইলিয়াম ডেনডেলস ইন্ডিয়া আর নেপাল থেকে কিছু হরিণ নিয়ে এসেছিলেন। আজও বোগোর প্যালেসের বাগানে সেই হরিণের বংশধর ঘুরে বেড়ায়, পর্যটকদের মনোরঞ্জন করে।

আমাদের ড্রাইভারের কাছে জানতে পারলাম দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানিজ সৈনিকরা এই প্যালেসে এসেছিল। তারপর যুদ্ধে হেরে ইন্দোনেশিয়া থেকে যাওয়ার আগে এই প্যালেসের সব জিনিসপত্র লুট করে নিয়ে গেছে। তাতেও রক্ষা হয়নি, যাওয়ার আগে প্যালেসের একটা বড়ো অংশ আগুন লাগিয়ে পুড়িয়ে দিয়ে গেছে। তারপর প্রেসিডেন্ট সুকর্ণ আবার এই প্যালেসের মেরামত করেন। ১৯৬৮ সাল থেকে বোগোর প্যালেস জনসাধারণের ঘুরে দেখার জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে। তবে আগে থেকে অনুমতি নিয়ে যেতে হয়। দুর্ভাগ্যবশতঃ আমার এসব কিছুই জানা ছিল না। প্যালেসের সামনে দাঁড়ানো গার্ডদের অনেক অনুনয় বিনয় করেও কোনও কাজ হল না। শেষ পর্যন্ত বোগোর প্যালেসকে বাইরে থেকে দেখেই ফিরে আসতে হল।

তিনশো বছরের ইতিহাস জড়িয়ে আছে এই প্রাসাদের আনাচে কানাচে। এতদূর এসে প্যালেসের ভিতরে ঢুকতে পারলাম না বলে মনটা একটু খারাপ হল। প্যালেসের ভিতরের বিপুল আর্ট কালেকশন দেখতে না পারার দুঃখ নিয়ে যখন গাড়িতে এসে বসলাম তখন আমাদের ড্রাইভার বলল, ‘মন খারাপ না করে চলুন আপনাকে আরেকটা ভালো জায়গায় নিয়ে যাই।’

মনে মনে রাগ হল, ভাবলাম, ‘এর থেকে ভালো জায়গা বোগোর-এ আর কী থাকতে পারে?”

মুখে শুধু বললাম, “কোথায়?”

ড্রাইভার বলল, ‘বোগোর বোটানিকাল গার্ডেন।’

আগে থেকে প্ল্যান করে আসিনি বলে সব কিছুই অজানা। আমাদের আজ সারাদিন আর তেমন কিছু করার নেই, তাই ড্রাইভারের কথায় রাজি হয়ে গেলাম। পার্কিং লটে গাড়ি পার্ক করে ড্রাইভারকে সঙ্গে নিয়ে টিকিট কেটে বোটানিকাল গার্ডেনে ঢুকলাম। এখানকার শান্ত পরিবেশ বোগোর প্যালেসে ঢুকতে না পারার দুঃখটা সঙ্গে সঙ্গেই ভুলিয়ে দিল।

১৮১৭ সালে ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ৮৭ হেক্টর জায়গা জুড়ে বোগোর বোটানিকাল গার্ডেন তৈরি করেছিল। এই বোটানিকাল গার্ডেনকে বিষয়ভিত্তিক ভাবে বিভিন্ন অংশে ভাগ করা হয়েছে। এখানে ইন্দোনেশিয়া-সহ সারা পৃথিবী থেকে সংগ্রহ করা বিরল প্রজাতির গাছপালা রয়েছে। ট্যুরিস্টদের জন্য এখানে হাঁটাপথ ও বিশেষ গাড়ির ব্যবস্থা আছে। বেশ কয়েকটি পিকনিক স্পট চোখে পড়ল। মনে হল স্থানীয় লোকেদের কাছে এটা বেশ জনপ্রিয়। ফটোগ্রাফির জন্যও বেশ সুন্দর জায়গা।

বোটানিকাল গার্ডেন আসলে বোগোর প্যালেসকে ঘিরে তৈরি করা হয়েছিল। এর পিছনে হয়তো দুটো কারণ ছিল। বোটানিকাল গার্ডেনের গাছপালা একদিকে যেমন এখানকার জলবায়ুকে ঠান্ডা রাখত, তেমনই আবার গভর্নর ও তার পরিবারের লোকেদের জন্য নিরাপত্তা আর কিছুটা একান্ত পরিবেশ তৈরি করত। বছরের পর বছর ধরে এখানে নতুন গাছ লাগানো হচ্ছে। বোগোর বোটানিকাল গার্ডেন শুধুমাত্র ট্যুরিস্টদের জন্য নয়, এটি এখন একটি বিখ্যাত গবেষণা ও শিক্ষাকেন্দ্র। এখানে অনেক এনডেঞ্জারড বা বিপন্ন প্রজাতির গাছপালা সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে, তাই দেশ-বিদেশ থেকে অনেকেই এখানে আসে রিসার্চ করার জন্য।

সারাদিন ধরে ঘুরে দেখলেও হয়তো মন ভরবে না। কিন্তু আমাদের তাড়াতাড়ি ফিরতে হবে। তাই বোগোর বোটানিকাল গার্ডেন থেকে বেরিয়ে কাছেই একটা রেস্তরাঁতে লাঞ্চ করা হল। ড্রাইভার জানাল এখান থেকে প্রায় তিন ঘণ্টা লাগবে এয়ারপোর্ট পৌঁছোতে। তাই আর দেরি না করে রওনা দিলাম এয়ারপোর্টের পথে। গাড়িতে বসে বার বার মনে হল, আজকাল মিডিয়া শুধু জাকার্তার বায়ুদূষণ নিয়ে কথা বলতে ব্যস্ত। গত তিনশো বছরের যে ইতিহাস এর জন্য অনেকটাই দায়ী, সে ব্যাপারে কথা বলার সময় বা উৎসাহ কোনওটাই আজকের মিডিয়ার নেই। কিন্তু ইতিহাস না জানলে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এর পুনরাবৃত্তি ঠেকাবে কী করে?

পড়ার জন্য সীমাহীন গল্প-নিবন্ধসাবস্ক্রাইব