মূল্যায়ন

সৌগত তাড়াতাড়ি সব কাজ শেষ করে তৈরি হয়ে বেরোতে যাবে, কেট জিজ্ঞেস করল, এখনই যাচ্ছ? জুতো পায়ে গলাতে গলাতে সৌগত উত্তর দিল, হ্যাঁ, আর কী, দুঘন্টা তো এয়ারপোর্ট পেঁছোতেই লেগে যাবে।

সৌগত কিছুতেই উত্তেজনা চেপে রাখতে পারছে না। সামনেই সোফাতে ওর দুই ছেলে-মেয়ে চুপচাপ বসে বাবাকে লক্ষ্য করেলেমেয়ে কারওকেই বাবার এই উত্তেজনা স্পর্শ করেছে বলে মনে হল না। পাথরের মতো দুজনে বসে রইল।

সৌগত ইশারায় স্ত্রীর কাছে, ছেলে-মেয়ে চুপ করে থাকার কারণ জানতে চাইল। কেটও ইশারাতেই জানাল চিন্তা না করে, এয়ারপোর্টের জন্য রওনা হতে। সৌগত-র মধ্যে দ্বিধার ভাব লক্ষ্য করে আশ্বাসের সুরে বলল, দেরি কোরো না। মা বাবাকে যতক্ষণে নিয়ে বাড়ি ফিরবে, তার মধ্যে আমরা সবাই চানটান করে রেডি হয়ে থাকব।

একুশ বছর হয়ে গেছে, এই প্রথম শোভনবাবু আর গৌরীদেবী একমাত্র সন্তান সৌগতর গোছানো সংসার একবার চোখের দেখা দেখতে লন্ডন আসছেন। কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে সেই যে চাকরি নিয়ে বিদেশ এসেছে, আর ফিরে যায়নি সৌগত।

প্রথম এসেই লন্ডনের রিচমন্ড এলাকায় এক কামরার একটা ঘর ভাড়া নিয়েছিল সে। নীচে বাড়িওয়ালারা থাকতেন আর উপরের একটা ওয়ান রুম কিচেন বাথরুম নিয়ে সৌগত ভাড়াতে থেকে গিয়েছিল। ঘরটা ভারি পছন্দ হয়ে গিয়েছিল তার। ঘরের এক দিকটায় বড়ো বড়ো কাচের জানলা ছিল, যেখানে দাঁড়ালে টেমস নদীটা নজরে পড়ত।

সেসময় ভাড়াও খুব বেশি ছিল না। বাড়িওয়ালার একমাত্র মেয়ে কেট দিব্যি ভাব জমিয়ে ফেলেছিল সৌগতর সঙ্গে। যেদিন অফিস থেকে ফিরতে একটু বেশি দেরি হয়ে যেত সৌগতর, কেট এসে মেন গেট খুলে দিত। গুছিযে রাতের খাবারটা হাতে ধরিযে দিত যাতে, রাত্রে আর সৌগতকে হাত পুড়িয়ে রান্না না করতে হয়।

বিদেশে যেখানে দুটো মনের কথা বলার জন্য মানুষ ব্যাকুল হয়ে ওঠে, সেখানে কেটের মিষ্টি স্বভাব, অপরকে সাহায্য করার মানসিকতা সহজেই সৌগত-র হৃদযে জায়গা করে নেয়। দুজনেই একে অপরের প্রতি দুর্নিবার আকর্ষণ বোধ করতে থাকে। কেট মুখে কিছু না বললেও, তার চোখের ভাষা পড়তে সৌগতর ভুল হয় না।

কেটকে বিয়ে করায় মনস্থ করলে, সব থেকে বড়ো চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়ায় সৌগতর কাছে নিজের মা-বাবা। ব্রাহ্মণ পরিবারের ছেলে হয়ে বিদেশিনি খ্রিস্টান মেয়েে বিয়ে করার অনুমতি বাবা কখনও দেবেন না বলেই সৌগত ভেবে নিয়েছিল। পুরোনো দিনের মানুষ তাঁরা। কেটের মা-বাবা সৌগতর মতো জামাই পাবেন বলে আপত্তি করেননি। কিন্তু নিজের মা-বাবাকে কী বলবে সেটাই ভাবতে তিনদিন সময় নিয়েছিল সৌগত।

শেষে মনে সাহস সঞ্চয় করে কলকাতায় নিজের বাড়িতে ফোন করেছিল সে। সোজাসুজি তখন ফোন করার অসুবিধা ছিল। ট্রাংক কল বুক করতে হয়েছিল। বাবা ফোন ধরতেই বিয়ে প্রসঙ্গ উত্থাপন করেছিল সৌগত। কিছুক্ষণ চুপ করেছিলেন শোভনবাবু। তারপর মাযে সঙ্গে কথা বলে জানাবেন বলে ফোন ছেড়ে দিয়েছিলেন।

তারপরের দশটা দিন সৌগতর কী যে অস্থিরতায় কেটে ছিল, আজ ভাবলে হাসি পায়। কিন্তু ফোন করেননি শোভনবাবু বরং মাযে লেখা চিঠি পেয়েছিল সৌগত। ওনাদের শুধু একটাই শর্ত, মেয়ে এবং মেয়ে বাড়ির লোককে কলকাতায় আসতে হবে। বিয়ে কলকাতাতেই হবে। সৌগত শর্তে রাজি হয়ে গিয়েছিল। কলকাতাতেই ধুমধাম করে কেটের সঙ্গে ছেলের বিয়ে দেন শোভনবাবু আর গৌরীদেবী।

বিয়ে দুবছর পর অন্বেষার জন্ম আর পাঁচ বছরের মাথায় অনির্বাণের। ছেলে সংসারে মন দিয়েছে, বিদেশে ছেলেকে দেখাশোনা করার জন্য লক্ষ্মীসম বউমা রয়েছে ভেবেই গৌরীদেবীর মন আনন্দে ভরে উঠত। এর মধ্যে নাতি-নাতনি হওয়ার সুখবর তাঁদের স্বামী স্ত্রী দুজনকেই নতুন করে খুশির সীমাহীন জগতে নিয়ে গিয়ে ফেলে। নাতি-নাতনীর মুখ দেখার জন্য উৎসুক হয়ে ওঠেন। ছেলের আসার অপেক্ষায় দুজনে দিন গুনতে থাকেন।

এরই মধ্যে চাকরি ছেড়ে সৌগত কেটের বাবার প্রকাশনা ব্যাবসায় ঢুকেছে তাঁরই অনুরোধে। দিনরাত খেটে ব্যাবসাকে এমন পর্যায়ে দাঁড় করিযেছে সৌগত, যেখানে লন্ডনের মান্যগণ্যদের মধ্যে সৌগতকে চেনে না এমন কেউ নেই। বাড়ি আলাদা করে আর কিনতে হয়নি তাকে। একমাত্র মেয়েজামাইকে উইল করে বাড়ি লিখে দিয়েছেন কেটের বাবা। তিনি আর তাঁর স্ত্রী অবসর জীবনযাপন করছেন সারা পৃথিবী ঘুরে বেড়িয়ে। ব্যাবসার দাযিত্ব পুরোটাই সামলাচ্ছে সৌগত।

সময় পেলেই কেট আর বাচ্চাদের নিয়ে কলকাতায় ঘুরে যাওয়াটাও এতদিন দাযিত্ব মনে করেই পালন করেছে সৌগত। কখনও তাঁদের অবহেলা করেনি। লন্ডনে থেকেও নিজে এবং কেট প্রায় প্রতিদিন ফোনে খবরাখবর নিতে ভোলেনি শোভনবাবুর আর গৌরীদেবীর। কিন্তু বাচ্চারা যখন থেকে বড়ো হয়েছে ওদের পড়াশোনা, অন্য কোথাও ছুটি কাটাবার আগ্রহ ইত্যাদি নানা কারণে কলকাতায় যাওয়া-আসাটা অনেকটাই কমিয়ে ফেলতে হয়েছে সৌগতকে।

গতবছর পুজোর আগে কেট কলকাতার খবরাখবর নেওয়ার জন্য ফোন করলে, গৌরীদেবী মনের ইচ্ছেটা প্রকাশই করে ফেলেন কেটের কাছে, কেট অনেকদিন হয়ে গেল তোমরা ইন্ডিয়া আসোনি। এবার শীতে কিছুদিনের জন্য ঘুরে যাও। তোমাদের সকলকে খুব দেখতে ইচ্ছে করছে।

কেট কিছুটা ইতস্তত করে জবাব দেয়, না মা এখন কিছুতেই আসা সম্ভব নয়। বাচ্চাদের ক্লাস এখন একেবারেই মিস করানো যাবে না।

ওপারের স্তব্ধতা কেটকে বিচলিত করে। একটু ভেবে হঠাৎই বলে, মা আপনারা বরং এখানে চলে আসুন। সকলকে দেখা হবে আর একটু ঘোরাও হয়ে যাবে। কলকাতা ছেড়ে আপনারা তো কোথাওই যান না। চলে আসুন। আপনার ছেলেকে বলব সব ব্যবস্থা করে দেবে।

ব্যস তারপর দৌড়োদৌড়ি, ভিসার কাগজপত্র জমা দেওয়া, আরও যা কিছু করণীয়। সবশেষে আজ শোভনবাবু আর গৌরীদেবী সুদূর লন্ডনে পা রাখতে চলেছেন। প্রথম বিলেত সফর সুতরাং উত্তেজনায় দুজনেই প্লেনের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত গহ্বরেও ঘেমে নেয়ে উঠছেন।

 

সৌগত অপেক্ষায় দাঁড়িয়েছিল, প্লেন কখন ল্যান্ড করবে। দূর থেকে বাবাকে আগে দেখতে পেয়ে হাত নাড়ল সৌগত। শোভনবাবু একটু স্বস্তি বোধ করলেন। এই দূর অচেনা মাটিতে তাঁর আসার ইচ্ছে একবিন্দুও ছিল না। কী করবেন, স্ত্রীর জোরাজুরিতে আর ছেলে-বউমার বারবার অনুরোধে তাঁকে সিদ্ধান্ত নিতেই হল।

ভিড় ঠেলে সৌগত এগিয়ে এল। বাবার হাত থেকে ব্যাগেজের ট্রলিটা জোর করে নিজের হাতে নিতেই মা এসে জড়িয়ে ধরলেন ছেলেকে। চোখের জল বাঁধ মানল না। একমাত্র সন্তানকে কাছে পাওয়ার আনন্দ অশ্রু হয়ে গড়িয়ে পড়ল গৌরীদেবীর দুচোখ বেযে সৌগতও চোখের ভেজা ভাবটা অনুভব করল। পরিস্থিতি হালকা করতে মা-কে জড়িয়ে ধরে মুখে হাসি টেনে বলল, মা, তুমি সবে এসেছ। তোমার কান্না দেখে সবাই ভাববে তোমাকে সব কিছু ছেড়ে চলে যেতে হচ্ছে।

বাড়ির পথে অবাক হয়ে তাকিযে রইলেন শোভনবাবু আর গৌরীদেবী গাড়ির কাচে চোখ রেখে। হুহু করে পেরিযে যাচ্ছে রাস্তা। চারিদিক পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন, রাস্তায় কুকুর বেড়াল চোখে পড়ে না। সর্বত্র অনুশাসনের ছাপ স্পষ্ট। রাস্তার ধারে ধারে সবুজের সমারোহ মন কেড়ে নেয়। হর্নের কান ফাটানো আওয়াজ, ট্র‌্যাফিকের ভিড় নেই কোথাও।

অন্যমনষ্কতা ভাঙল সৌগতর কথাতে। হাঁ করে কী দেখছ তোমরা? আজ তোমাদের ভাগ্য ভালো যে রোদ উঠেছে নয়তো বেশিরভাগ সময়ই বৃষ্টির আবহাওয়া থাকে এখানে।

গেটের কাছে দাঁড়িয়ে কেট ওনাদের আসার অপেক্ষা করছিল। গাড়ি এসে দাঁড়াতেই সানন্দে গেট খুলে কেট ওনাদের বাড়ির ভিতরে স্বাগত জানাল। সৌগত গাড়ি থেকে সুটকেস নামিয়ে বাড়ির ভিতর নিয়ে গেল। নীচের তলাতেই একটা বড়ো ঘরে কেট ওনাদের থাকার ব্যবস্থা করে রেখেছিল। সুটকেসগুলো ওই ঘরে দিয়ে ওনাদের ফ্রেশ হতে বলে কেট চা-জলখাবার আনতে কিচেনে চলে গেল।

সৌগত বাথরুমে গরমজলের ব্যবস্থা সব দেখিযে বাইরে এসে বসল। দুজনে হাত-মুখ ধুযে ঘাড়ে মাথায় সামান্য গরমজল বুলিযে নিলেন। তাতে ধকলটা একটু কম মনে হল। বাইরের পোশাক ছেড়ে সুটকেস খুলে পরিষ্কার জামা-কাপড় বার করে পরে বাইরে এলেন।

সৌগত সোফাতেই বসে ছিল। কেট জলখাবারের ট্রে হাতে নিয়ে ঢুকে টেবিলে নামিয়ে ওনাদের সামনে খাবার আর চায়ের কাপটা এগিয়ে দিল।

কী ব্যাপার অন্বেষা আর অনির্বাণকে দেখছি না কেন? ওরা কোথায়? গৌরীদেবী আর শোভনবাবুর চোখ আদরের নাতি-নাতনিকে খুঁজে বেড়াচ্ছিল।

সৌগত ওদের নাম ধরে ডাকতেই দুজনে উপর থেকে নীচে নেমে এল। চোখের ইশারায় ওদের ঠাকুমা-ঠাকুরদাকে প্রণাম করার কথা বলতে, দুজনে প্রণাম করে দাঁড়াতেই ওদের বুকে টেনে নিলেন দাদু-ঠাকুমা।

অন্বেষা আর অনির্বাণ তোমরা কত বড়ো হয়ে গেছ! কলকাতায় শেষ যখন এসেছিলে তখন বেশ ছোটো ছিলে। কতদিন হয়ে গেছে তোমাদের দেখিনি। বলতে বলতে চোখে জল চলে আসে গৌরীদেবীর।

অথচ এই ইমোশন যেন ছুঁতে পারে না বিদেশের মাটিতে বড়ো হওয়া অন্বেষা আর অনির্বাণ-কে। পাথরের মতো দাঁড়িয়ে থাকে দুজনে, মুখে ফুটে ওঠে বিরক্তির ভাব। দুজনের ব্যবহারে মনে মনে বিরক্ত বোধ করে সৌগত। ভিতরে ভিতরে রাগ বাড়তে থাকে তার। কুশল বিনিময়টুকু করতে ভুলে গেছে কী করে তার সন্তানেরা। কেট মুহূর্তে পড়ে ফেলে সৌগতর মন। পরিস্থিতি সামাল দিতে ছেলেমেয়ে দিকে তাকিযে কেট বলে, তোমরা এখন যাও, পড়াশোনা শেষ করো।

ছোটো থেকেই কেট ভারতীয় সংস্কৃতিকে ভালোবেসে এসেছে। বাড়ির আশেপাশে বহু ভারতীয় পরিবারকে খুব কাছের থেকে দেখেছে। সৌগতর সঙ্গে বিয়ের পর সেই ভালোবাসা আরও গাঢ় হয়েছে। ফলে সৌগতর মা-বাবাকে আপন করে নিতে এতটুকু অসুবিধা হয়নি কেটের। শ্বশুর-শাশুড়ির থেকেও পেয়েছে স্নেহের উষ্ণতা। সবাইকে নিয়ে সুন্দর সংসার গড়ে তোলার পরিকল্পনা সবসমযে কেটের মনের মধ্যে লালিত হয়েছে। কিন্তু এই একটা জায়গায় এসে সে হেরে গেছে। দুই সন্তানকে যেমনটা চেযেছে তেমন করে মানুষ করতে পারেনি। সে নিজেও এই বিদেশের মাটিতে জন্মেছে কিন্তু বড়োদের অসম্মান করার মানসিকতা কখনও তার হয়নি।

পাশ্চাত্য দেশের ছেলেমেয়েরা অনেকটাই আলাদা। নিজের শিকড়কে অস্বীকার করে বিদেশের সংস্কৃতিকে আঁকড়ে ধরার মানসিকতা প্রবল তাদের মধ্যে। অন্বেষা এখন আঠারো বছরের আর অনির্বাণ পনেরো। কিন্তু বিদেশের আদব-কায়দা তাদের রক্তের ভিতর ঢুকে গেছে। কেটের ক্ষমতা নেই তাদের সেখান থেকে বার করে নিয়ে আসে।

শোভনবাবু আর গৌরীদেবী কিছুটা পরিবেশের সঙ্গে ধাতস্থ হলে, সৌগত আর কেট ওনাদের নিয়ে উইক-এন্ডে সারা লন্ডন ঘুরিযে ঘুরিযে দেখিযে নিয়ে এল। লন্ডনের মিউজিয়াম দেখে শোভনবাবু একটাই মন্তব্য করলেন, এই ব্রিটিশরা শুধু ভারতবর্ষকে নয়, সমগ্র বিশ্বকে লুঠ করে নিজের দেশকে ধনী বানিয়েছে।

 

শোভনবাবুদের আসার তিন সপ্তাহ পার হয়ে গেছে। সৌগতর সময় না হলেও কেট ওনাদের নানা জায়গায় ঘুরিযে এনেছে। ভারতীয় সংস্কৃতির তুলনায় লন্ডনের সংস্কৃতি যে সম্পূর্ণ ভিন্ন, তা এতদিনে বেশ বুঝতে পেরেছেন শোভনবাবুরা। এখানে সবাই ব্যস্ত। কারও জন্যই কারও কাছে সময় নেই। সন্তানদের নিজেদের জীবন নিয়ে ভাবার স্বাধীনতা দেওয়া আছে। মা-বাবার সেখানে কিছু বলা চলবে না। বিয়ে আগে একসঙ্গে থাকা বা পছন্দ না হলে ছেড়ে চলে যাওয়াটা এখানে কেউ গুরুত্ব দিয়ে দেখেই না। অদ্ভুত এক মিশ্র সংস্কৃতির বাড়-বাড়ন্ত। যা-কিনা গৌরীদেবী বা শোভনবাবু কেউই মন থেকে মেনে নিতে পারছিলেন না কিছুতেই।

প্রথমে এসেই গৌরীদেবী খেযাল করেছিলেন, সৌগত আর কেট কেউই সকালে অফিস যাওয়ার সময় খেযে বেরোয় না। একদিন না থাকতে পেরে বলেই ফেললেন, তোদের সময় না থাকে, আমি সকালে কিছু একটা বানিয়ে দেব। এভাবে না খেযে সারাদিনের জন্য বেরোনো উচিত নয়।

এতে সৌগত হেসে উত্তর দিয়েছিল, মা তুমি মিথ্যা চিন্তা করছ। আমরা রাস্তা থেকে স্যান্ডউইচ আর কফি কিনে খেযে নিই। দুপুরেও অফিসে আর সবার মতো পাশেই একটা রেস্তোরাঁ থেকে খাবার নিয়ে এসে অফিসেই খেযে নিই। কেট-ও তাই করে। বাবা আর তুমি টিভি দ্যাখো, এনজয় করো। আমাদের নিয়ে ভেবো না। এই লাইফে আমরা অভ্যস্ত।

আর কিছু বলেননি গৌরীদেবী। ছেলের সংসার যেমন চলছিল তেমনিই চলতে লাগল। বাচ্চারা স্কুল, কলেজ বেরিযে যেত, সৌগত নিজের ব্যাবসা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল আর কেট বাড়ি আর অফিস একসাথে সামলাতো।

কিছুদিন ধরে গৌরীদেবী দেখছিলেন অন্বেষা যখন কলেজ থেকে ফেরে, একটা কালো মতন ছেলে ওকে ছেড়ে দিয়ে যায়। অন্বেষার থেকে বয়সে অনেকটাই বড়ো মনে হল ছেলেটিকে। একদিন সন্ধেবেলা জানলায় দাঁড়িয়ে বাইরের শোভা দেখছিলেন গৌরীদেবী। হঠাৎ-ই খেযাল হল রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা একটা গাড়ির আড়ালে, অন্বেষা আর ছেলেটি গভীর চুম্বনে ব্যস্ত।

পায়ে তলার মাটি কেঁপে উঠল তাঁর। কী বয়স অন্বেষার আর এখনই এইসব করে বেড়াচ্ছে! তারপরেই মনে হল যে-দেশে বড়ো হচ্ছে বাচ্চারা, সেখানকার সংস্কৃতিকেই ওরা আপন করে নেবে, এতে দোষটা কোথায়? ওরা তো যেমন দেখবে তেমনই শিখবে। অগত্যা চুপ করে গেলেন, কাউকে কিছু বলা উচিত মনে করলেন না।

শুধু নিজের স্বামীকে না জানিয়ে পারলেন না, এই তো একটা বাচ্চা মেয়ে, কোনও ভুল পথে পা দেবে না তো? শোভনবাবু স্ত্রীকে শান্ত করার চেষ্টা করলেন, এত চিন্তা কোরো না, কিছু একটা উপায় বার করতে হবে! আমি দেখছি কী করা যায়।

 

সকাল সকাল চায়ের কাপ হাতে নিয়ে গৌরীদেবী ব্যালকনিতে এসে দাঁড়ালেন। দূর পর‌্যন্ত বিস্তৃত রিচমন্ড হিল এবং টেম্স নদীর সৌন্দর‌্য এক মনে অবলোকন করছিলেন। সেন্ট পিটারস্ চার্চ-টা এখান থেকেই চোখে পড়ে আর তার চারপাশে মনোরম সবুজ ঘাসের গালিচা মুহূর্তে মন উদাস করে দেয়।

কিন্তু প্রকৃতির এই অপরূপ শোভা কিছুতেই গৌরীদেবীর মনকে শান্ত করতে পারছিল না। গত সন্ধের দৃশ্যটা বারবার চোখের সামনে ভেসে উঠছিল। মনে মনে উদ্বিগ্ন বোধ করছিলেন। খানিক পরে কেটও চায়ের কাপ নিয়ে গৌরীদেবীর পাশে এসে দাঁড়াল। কিছুটা সংকোচ কাটিযে সন্ধের ঘটনাটা খুলেই বললেন কেটকে, তোমাকে না বলে পারলাম না তুমি মা। ও আমাদের বাড়ির সন্তান। ঘটনাটা এড়িয়ে তো যেতে পারি না।

তুমি ঠিক বলেছ মা। তোমার চিন্তা করাটাই স্বাভাবিক। অন্বেষা যেটা করেছে অন্যায়, আমি সেটা বুঝি। কিন্তু এখানে আমরা কিছুই বলতে পারব না কারণ এটা ওর জীবন। এখানকার সংস্কৃতি ভারতীয় সংস্কৃতির থেকে অনেক আলাদা। ছোটো থাকতেই এখানে ছেলে-মেয়েদের মধ্যে বন্ধুত্ব হয়ে যায়। অনেক সময় সেটা বিয়ে অবধিও গড়ায়। আবার কখনও সম্পর্ক ভেঙেও যায়। এটা ওদের সম্পূর্ণ নিজস্ব ডিসিশন। এটা আমাদের হাতের বাইরে। খুব অল্প শব্দের মধ্যে কেট ওযে্টার্ন সংস্কৃতির এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ শাশুড়িকে পরিষ্কার করে বুঝিযে দিল ঠিকই কিন্তু গৌরীদেবী কিছুতেই এটা মন থেকে মেনে নিতে পারলেন না।

কলেজের জন্য তৈরি হতে হতে মা আর ঠাকুমার কথাবার্তা সবই অন্বেষার কানে এসেছিল। সঙ্গে সঙ্গে ঠাকুমার এই অনাবশ্যক নাক গলানো ওর কাছে অসহ্য মনে হল। অন্বেষা ব্যালকনিতে এসে কেটকে লক্ষ্য করে বেশ জোর দিয়ে বলল, মম, আজ সন্ধে বেলায় ফিরতে আমার দেরি হবে। আমি আমার বয়ফ্রেন্ডের সঙ্গে একটা পার্টি-তে যাব। আমার ফেরার অপেক্ষা কোরো না, বলে ব্যাগ নিয়ে বেরিযে গেল।

সবাই সবার মতো কাজে বেরিযে গেলে শোভনবাবু খবরের কাগজ নিয়ে বসতেন। খবরের কাগজের নানা ঘটনা নিয়ে স্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করতেন। তাতেই গৌরীদেবী আরও বেশি করে ওখানকার কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে নানা ধরনের মানসিক সমস্যা বাড়তে থাকার ঘটনাগুলো সম্পর্কে জানতে পারতেন। ওখানকার ছেলেমেযো অল্প বয়সেই অবসাদের শিকার, কিশোরাবস্থায় গর্ভধারণ, হিংসাত্মক প্রবৃত্তি, অসামাজিক ব্যবহার, ছোটো থেকেই ড্রাগ ও মাদকদ্রব্যে আসক্তি বাড়া ইত্যাদি নানা খবর গৌরীদেবীকে আরও বেশি করে চিন্তাগ্রস্ত করে তুলতে লাগল।

একদিন যখন শোভনবাবু স্ত্রীর সঙ্গে বসে এগুলো নিয়ে আলোচনা করছেন, সৌগত এসে হাজির হল সেখানে। মন দিয়ে বাবার কথা শুনতে শুনতে বলে উঠল, বাবা, এখানে বাচ্চাদের মুখে বলে বোঝাতে পারো তো খুব ভালো। যদি তোমার কথা মেনে নিল তাহলে তোমার ভাগ্য! তুমি কোনও ভাবেই ওদের উপর জোর ফলাতে পারবে না।

কিন্তু এটা তো ভুল শিক্ষা। মা-বাবা, বাড়ির বড়োরা, শিক্ষকেরা সন্তানের ভালো চান বলেই না তাদের বকাবকি করেন, শাসনে রাখেন। তারা তো ছেলেমানুষ, এটাই তো শেখার বয়স। সঠিক শিক্ষা দিতে হবে, বোঝাতে হবে তবেই না ওরা শিখবে। শোভনবাবু নিজের মতামত জোরের সঙ্গে ব্যক্ত করলেন ছেলের কাছে।

তোমার কথা ঠিক, আমি মানছি বাবা। এখানেও এখন এই পয়েন্টগুলো অনেকেই তুলছেন। তোমার মতোই তাদেরও একই মত। কিন্তু কী করা যাবে, এখানকার আইন তো অন্যরকম। সৌগতর কথা শেষ হওয়ার আগেই অন্বেষা এসে ঘরের মধ্যে দাঁড়াল। ওহ… কাম অন ড্যাড, তুমি কাকে কী বোঝাবার চেষ্টা করছ? এখানে শুধু জেনারেশন গ্যাপ-ই নয় সংস্কৃতিরও একটা বিরাট পার্থক্য আছে।

অন্বেষা যবে থেকে মা আর ঠাকুমার কথাগুলো শুনেছিল, তবে থেকেই ঠাকুরমার প্রতি একটা অসন্তোষ ওর মনের মধ্যে জমা হচ্ছিল। ঠাকুমার সঙ্গে কথা বলা একেবারেই বন্ধ করে দিয়েছিল। চোখের দৃষ্টিতে সুযোগ পেলেই মনের ভাব প্রকাশ করে ফেলতে দ্বিধা করত না অন্বেষা। কথার মাঝে কটুক্তি করে সোজা নিজের ঘরে এসে দরজা বন্ধ করে দিত।

সৌগত আর কেটের মধ্যে কথা হচ্ছিল। সৌগত বলছিল কেটকে, কিছুদিন ধরে লক্ষ্য করছি, অন্বেষা অনেক বদলে গেছে। অনির্বাণও। তুমি কি কিছু জানো?

না, তবে ওদের এখন পিউবার্টি-র সময় যাচ্ছে। চারিত্রিক একটু পরিবর্তন তো হবেই। তোমাকে বলা হয়ে ওঠেনি সৌগত, অনির্বাণ একটা স্কলারশিপ পেয়েছে। ঠিক কলেজে বলব না, অন্য ইউনিভার্সিটিতে যাওয়ার জন্য কোনও প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা দিয়েছিল। সেরকম একটা কলেজ থেকে ডাক এসেছে, যারা কমপ্লিট স্কলারশিপ দেবে বলেছে। দুই বছরের কোর্স আর কলেজটা পাকিস্তানের লাহোরে।

চমকে ওঠে সৌগত, পাকিস্তান? পাকিস্তান কেন, লন্ডন ছেড়ে কেউ পাকিস্তান যায়?

অনির্বাণ পাকিস্তানে গিয়ে পড়তে চায়। অনেক বুঝিযেছি কিন্তু মনে হচ্ছে ব্রেনওয়াশ করেছে কেউ। কেটের মনের সন্দেহ কণ্ঠে ফুটে ওঠে।

এই সময় শোভনবাবুও ঘরে এসে ঢোকেন। ছেলে-বউমার কথাবার্তা কিছুটা ওনার কানে গিয়ে পৌঁছোয়। নিজেই এগিয়ে এসে বলেন, কিন্তু কেট তোমাদের ওকে এতদূরে পাকিস্তানে পাঠানো ঠিক হবে বলে মনে হয় না। বাচ্চা ছেলে এত দূরের শহর বাছার কী দরকার ছিল। তার ওপর তোমরা ওখানে কাউকে চেনো না। বিপদ-আপদ ঘটলে কী করবে?

বাবা, জানোই তো আমরা বললেও কিছুতেই শুনবে না অনির্বাণ। ও মনস্থির করে ফেলেছে, হতাশ শোনায় কেটের স্বর।

সৌগত আর কেটের মত আছে শুনে আর কথা বাড়ালেন না শোভনবাবু। কিন্তু মনটা অনির্বাণের জন্য খচখচ করতে লাগল। লন্ডনে জন্ম, বড়ো হওয়াও এখানে। এসব ছেড়ে লাহোর গিয়ে কেন ও পড়াশোনা করতে চাইছে? আসতে হলে ভারতে আসতে ক্ষতি কী ছিল? এখানে ওর আপনজনেরা রয়েছে, নিজের দেশ সেটা। এইসব ঘটনাচক্র ধীরে ধীরে শোভনবাবু আর গৌরীদেবীর মন ভারাক্রান্ত করতে লাগল।

একদিন সবাই বাইরে কাজে বেরিযে যাওয়ার পর, গৌরীদেবী কযেদিন ধরে বহন করা মনের কথাটা স্বামীর কাছে তুলে ধরলেন, অনেক তো হল, চলো এবার আমরা দেশে ফিরে যাই। ছেলে কেমন সংসার করছে নিজের চোখে একবার দেখার ইচ্ছে ছিল, দেখা হয়ে গেছে। এক মাসের ওপর আমরা এখানে রয়েছি। আর ভালো লাগছে না।

কলকাতার জন্য খুব মন কেমন করছিল গৌরীদেবীর। অনেক পুরোনো বাসিন্দা ওনারা। আশেপাশের বহু প্রতিবেশী খোঁজখবর নিতে আসে শোভনবাবুর কাছে। বিজয়ার সময় সকলে এসে পায়ে হাত দিয়ে দুজনকে প্রণাম করে যায়। তাদের ভালোমন্দের খবরটুকু তারাই কেউ না কেউ এসে নিয়ে যায় প্রায়দিনই। বিশেষ প্রযোজনে তারাই সবসময় এগিয়ে আসে। কতদিন হয়ে গেছে, তাদের কাউকে দেখতে পাচ্ছেন না। ভিতরে ভিতরে অস্থির হয়ে পড়েন গৌরীদেবী।

শোভনবাবু স্ত্রীকে ভালোমতোই জানেন, তাঁর বুঝতে অসুবিধা হয় না এতটুকুও। তাঁর নিজেরও আর ভালো লাগছে না। অগত্যা উঠে শোভনবাবু সৌগতর ঘরের দিকে চললেন ছেলেকে ইন্ডিযা ফেরার টিকিট কেটে দেওয়ার জন্য বলতে। অনির্বাণের ঘরের সামনে দিয়ে যেতে গিয়ে হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়ে পড়লেন। অনির্বাণের ঘর থেকে ভেসে আসছে ওরই গলা। ও নিজেকে কারও কাছে খালিদ হাসান বলে দাবি করছে।

দরজায় কান পাতলেন শোভনবাবু। অনির্বাণ এটা কী বলছে? সে নিজেকে কেন খালিদ হাসান বলছে? ওর স্বর ভেসে এল বন্ধ দরজার বাইরে, হ্যাঁ, ওমর শরিফের কথা আমিও শুনেছি। তিনিও এখানকার কিংস কলেজ থেকে পড়াশোনা করেছেন। তিনজন ব্রিটিশ এবং একজন আমেরিকানকে কিডন্যাপ করার জন্য ভারতে ধরা পড়েন। এর পর

যাত্রী-সহ এয়ার ইন্ডিয়ার প্লেন হাইজ্যাক করেন, আমেরিকান সাংস্কৃতিক কেন্দ্র বোমা মেরে উড়িয়ে দেন এবং ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের ড্যানিয়ে পার্লকেও কিডন্যাপ করে হত্যা করেন। আমার ওনার জন্য গর্ব হয়। জানি অনেকগুলো বছর আমরা পেরিযে এসেছি তবুও। হ্যাঁ আমি জানি, সিরিযাতে হাজারের বেশি ব্রিটিশ ছেলে-মেয়ে জিহাদের জন্য লড়াই করছে। আমি ওদের জন্য গর্ব অনুভব করি।

এরপর সব চুপচাপ। শোভনবাবু বুঝলেন ফোনের ওপার থেকে অনির্বাণ কারও কথা শুনছে। খানিক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলেন। আবার অনির্বাণের গলা শুনতে পেলেন। ও বলছে, আপনি চিন্তা করবেন না। অন্বেষা আগে যাবে, কযেদিনের মধ্যে আমি আসছি। নেটওয়ার্কিং সাইটে দেখে নিয়েছি পুরো ব্যবস্থা করা হবে। যখন আপনারা আমাদের সব সুবিধার খেযাল রাখছেন তখন আমরাও পিছু হটব না।

যে-লক্ষ্য নিয়ে যাব সেটা সম্পূর্ণ করেই আসব। কথা দিচ্ছি শেষ নিশ্বাস পর‌্যন্ত জিহাদের জন্য লড়ব। কেউ বাধা দিতে চাইলে পৃথিবী থেকে তাকে সরিযে দেব।

শোভনবাবুর হাত-পা কাঁপছিল। দাঁড়িয়ে থাকতে পারছিলেন না। পনেরো বছরের ছোট্ট ছেলেটা এসব কী বলছে? কোনওমতে শরীরটাকে টেনে এনে বিছানায় শুয়ে পড়লেন। চিন্তা করার ক্ষমতাও লোপ পেয়েছে। ভিতর থেকে একটা শূন্যতা যেন পাক দিয়ে দিয়ে উঠে শোভনবাবুর গলা চেপে ধরেছে।

খানিক্ষণ সেভাবেই পড়ে রইলেন। ভাবলেশহীন শুধু একটা শরীর। অনেক কষ্টে নিজেকে টেনে তুললেন। এই জন্যই কি অন্বেষা আর অনির্বাণ লন্ডন ছেড়ে পাকিস্তান যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে? ওরা কি কোনও সন্ত্রাসবাদী সংস্থার সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েছে? ওরা কি ধর্মান্তরিত হয়েছে? তাঁর নিজের পরিবার শেষে এভাবে ভাঙতে চলেছে? এসব নানা প্রশ্নের কোনও উত্তর খুঁজে পাচ্ছিলেন না শোভনবাবু। একটা নিঃশব্দ বেদনা, অস্থিরতা, তাঁকে কুরে কুরে খাচ্ছিল। কী করবেন তিনি? বাচ্চাদের শাসন করবেন? ভালোবেসে লজিক দিয়ে বোঝাবার চেষ্টা করবেন? চিন্তায় চিন্তায় মাথা ফেটে যাচ্ছিল শোভনবাবুর।

এতদিন খবরের কাগজেই পড়ছিলেন, লন্ডনের রাস্তায় জিহাদের কালো ঝান্ডা তুলে বুক ফুলিযে সব ঘুরে বেড়াচ্ছে। অক্সফোর্ড স্ট্রিট, আরও অনেক জায়গায় আইএস-এর মতো সন্ত্রাসবাদী গ্রুপের সমর্থনকারীদের দেখা গেছে। কিন্তু কে জানত তাঁর নিজের পরিবারেও সন্ত্রাস তার শাখা-প্রশাখা বিস্তার করছে? কে ভাবতে পারে একটা শিক্ষিত, সম্পন্ন, সাংস্কৃতিক পরিবারের ছেলেমেয়ে সোনালি ভবিষ্যতের স্বপ্ন ছেড়ে এভাবে জীবন নষ্ট করতে গর্ব অনুভব করবে!

কিন্তু হেরে গেলে চলবে না। মন শক্ত করেন শোভনবাবু। একসময় দেশের জন্য লড়েছেন। দুচোখ ভরে দেশকে স্বাধীন করার স্বপ্ন দেখেছেন। আর এ তো নিজের পরিবার বলে কথা। মন শক্ত করে উঠে দাঁড়ান। পরিস্থিতি কীভাবে সামলাবেন একটা ছক কষেন মনে মনে।

 

সেদিন সকালে একটু তাড়াতাড়ি ঘুম ভেঙে যাওয়াতে গৌরীদেবী চোখে-মুখে জল দিয়ে বারান্দায় এসে দাঁড়ালেন। বড়ো প্রিয় এই জায়গাটা ওনার। সবে আলো ফুটতে আরম্ভ করেছে। খেযাল করলেন এক পাশে চুপ করে কেট দাঁড়িয়ে আছে, দৃষ্টি সুদূর প্রসারী। এত তাড়াতাড়ি উঠে কী করছে মেযো চিন্তিত হলেন! ডাকলেন, কেট।

ওঃ তুমি উঠে পড়েছ, চমকে ফিরে তাকাল কেট। কেটের চোখ-মুখের বিধ্বস্ত অবস্থা দেখে গৌরীদেবী কাছে এসে দাঁড়ালেন, এ কী অবস্থা, সারা রাত ঘুমোওনি? কী হয়েছে?

কেটের মুখ থেকেই জানলেন, অন্বেষা গর্ভবতী। কালো ছেলেটি ওর সঙ্গেই কলেজে পড়ত। হঠাৎই কলেজ ছেড়ে কোথাও চলে গেছে। ফোন করেও কোনও লাভ হচ্ছে না। সুইচ অফ। অগত্যা নিরুপায় হয়ে গত রাতে মা-র কাছে সবকিছু খুলে বলেছে অন্বেষা।

নিজের মেয়ে হলে হয়তো গাযে হাত তুলে দিতেন গৌরীদেবী কিন্তু একটা মাত্র নাতনি, বড়ো মায়া ওর উপর। রাগ দমন করে কেট-কে শান্ত করলেন। বেলা বাড়লে কেট এবং অন্বেষার সঙ্গে ডাক্তারের কাছে গেলেন। সেখান থেকে গর্ভপাত করাবার জন্য ওনাদের হাসপাতালে পাঠানো হল। এক সেকেন্ড-ও অন্বেষার বিছানার পাশ থেকে উঠলেন না গৌরীদেবী। শক্ত করে অন্বেষার হাত ধরে রইলেন। বাড়ি ফেরা না অবধি সেই হাত আর ছাড়লেন না।

অ্যানি বলে কোনওদিনই গৌরীদেবী নাতনিকে ডাকেননি। অন্বেষাই বলে এসেছেন বরাবর। অন্বেষার এটা একেবারেই পছন্দ ছিল না। কিন্তু ঠাকুমার এই ডাকে এখন আর তার বিরক্ত লাগে না। ওর মধ্যে এই পরিবর্তনটা দেখে আর কেউ না হোক, কেট সবথেকে খুশি হয়েছিল। গৌরীদেবী কত গল্প বলেছেন কেট-কে। যে-গ্রামে গৌরীদেবী জন্মেছেন, বড়ো হয়েছেন সেখানকার গল্প। কলকাতায় বিয়ে হয়ে এসে শহুরে পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা। শ্বশুরবাড়ির একান্নবর্তী পরিবারে সকলের মন জিতে নেওয়া সব শুনিয়েছেন কেট-কে। কেটও নিজের দেশ ছেড়ে ভারতীয় সংস্কৃতির উপর অসম্ভব একটা টান অনুভব করে।

 

এখন অন্বেষাও বাড়ি এলেই ঠাকুমার সঙ্গে সঙ্গে ঘোরে। কলকাতার গল্প শুনতে চায়। অবাক হয়ে শোনে। এত গুরুত্ব দেওয়া হয় মানুষের সম্পর্ককে যে, ও নিজের জন্মস্থানকে তুলনা করে ভারতের সঙ্গে। সম্পর্ক শব্দটা যে এত দামি, ধীরে ধীরে এখন বুঝতে শিখেছে অন্বেষা।

অন্বেষাকে নিয়ে আর কোনও চিন্তা ছিল না শোভনবাবুদের কিন্তু অনির্বাণকে নিয়ে কী করা যাবে তা ভেবে কূল পাচ্ছিলেন না।

সন্ধেবেলায় অন্বেষা আর গৌরীদেবী বারান্দায় বসে কেটের দেওয়া গরম গরম সু্প খেতে খেতে গল্পে মেতেছিলেন। সৌগত তখনও বাড়ি ফেরেনি। অনির্বাণ-কে, বাড়ি ফিরে নিজের ঘরে ঢুকতে দেখে শোভনবাবু এগিয়ে এলেন, অ্যান, আজকের খবরটা শুনেছ? ফ্রান্সের নিস শহরে সন্ত্রাসবাদী হামলার? এরা এত অমানুষ যে, ওখানকার সাধারণ নাগরিকদের মেরে ফলতে ওদের হাত কাঁপে না। আর এরাই মুখে শান্তির কথা বলে বাচ্চা বাচ্চা ছেলেমেয়েছের নিজেদের জালে ফাঁসায়। ভগবান এদের ঠিক শাস্তি দেবেনই।

শোভনবাবু যেটা চাইছিলেন, সেটাই হল। তির লক্ষ্যভেদ করল। সন্ত্রাসবাদীদের সাপোর্ট করে অনির্বাণ মুখ খুলল, তুমি কি জানো ওদের বিষযে ওদের উদ্দেশ্য আর আইডিযালিজম আমাদের থেকে অনেক বেশি উন্নত। আমরা শুধু নিজেদের কথা ভাবি আর ওরা দেশ, ধর্ম সবকিছুকে বাঁচাবার লক্ষ্যে লড়ছে। এটা সন্ত্রাস নয়, জেহাদ। জেহাদের বিষযে কখনও শুনেছ তুমি?

অ্যান, আমার জন্ম ভারতে। সেখানকার মাটি আজ কত বছর ধরে সন্ত্রাসের শিকার। তুমি যে-জেহাদের কথা বলছ, সেটা আমি মন থেকে মানি না। জেহাদের মাধ্যমে যদি স্বর্গের রাস্তা খুলে যায়, তাহলে বড়ো বড়ো পলিটিশিযান, ধনী ব্যক্তিদের ছেলেমেযো দূর বিদেশে গিয়ে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে আরামদায়ক জীবন যাপন করছে কেন? কেন তারাও আর-চারটে সাধারণ ছেলেমেয়ে মতোই, জেহাদের জন্য নিজেদের হাতে বন্দুক তুলে নিচ্ছে না? আর যারা সন্ত্রাসের বাণী দিচ্ছে, তারা সামনে না এসে সোশ্যাল মিডিয়ার পর্দার আড়ালে লুকিযে অপরকে নির্দেশ দিচ্ছে আর মরবার জন্য অন্যের বাড়ির ছেলে-মেয়েদের বোকা বানাচ্ছে!

তোমরা এখনকার প্রজন্ম, ইন্টারনেট গুলে খেয়েছ। নেটে গিয়ে দ্যাখো যাদের বাড়ির জোয়ান ছেলে সন্ত্রাসে নাম লিখিযে মারা গেছে, তাদের কী হাল? এরা গরিবকে অর্থের লোভ দেখিযে সন্ত্রাসবাদী বানায় আর অর্থের প্রযোজন নেই যাদের, তাদের ব্রেনওয়াশ করে। বাড়ির এক ছেলে মারা গেলে অন্য ছেলেদেরও এরা দলে টানার চেষ্টা করে। এভাবে একটা প্রজন্ম থেকে আরেকটা প্রজন্মের ছেলেমেয়ে জীবনও নষ্ট করে, বাধ্য করে সন্ত্রাসে নাম লেখাতে।

শোভনবাবু, সরাসরি অনির্বাণকে কথায় আক্রমণ না করে আশেপাশের পরিস্থিতির উদাহরণ দিয়ে ওকে বোঝাতে সফল হচ্ছেন, সেটা অনির্বাণের মুখ দেখেই বুঝতে পারছিলেন। ভযে ওর মুখ শুকিয়ে এসেছিল। লন্ডনের ঠান্ডাতেও বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে উঠেছিল অনির্বাণের কপালে। শোভনবাবুর কথাগুলো যে কতটা সত্যি, সেটা মনে মনে অস্বীকার করার জায়গা ছিল না অনির্বাণের।

পরের তিনদিন ঘর থেকে কোথাও বেরোল না অনির্বাণ। ভেতরে ফোনে মাঝেমধ্যেই কথা বলার আওয়াজ খালি কানে আসত বন্ধ ঘরের দরজা ভেদ করে। শোভনবাবু ছাড়া কেউই এর নেপথ্যের ঘটনা কিছু জানত না, তাই কেউই অনির্বাণের এই ব্যবহারে চিন্তিত হল না।

একমাত্র শোভনবাবুই মাঝে মাঝে নাতির ঘরের সামনে এসে দাঁড়াতেন। ঘরের ভিতর ঢোকার প্রবল ইচ্ছেটাকে দমন করে আবার ফিরে আসতেন। নিজের উপর এবং নিজের রক্তের উপর একবারের জন্যও বিশ্বাস হারাতে দেননি।

তিনদিনের দিন দরজা খুলে অনির্বাণ যখন বাইরে এল, শোভনবাবু দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে। অনির্বাণের দুচোখে শুধু হাজারো প্রশ্নের ভিড়। শোভনবাবু ওর হাত ধরে বাইরের ঘরে এসে বসলেন। সামনে কেট-কে দেখে অনির্বাণ শোভনবাবুর দিকে তাকিযে সামান্য হেসে বলল, মা, আমি পাকিস্তান যাচ্ছি না। আমি খোঁজ নিয়েছি কোর্সটা এমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ নয়।

 

সপ্তাহের শেষে ছুটির দিন দেখে সৌগত, মা-বাবার ইন্ডিযা ফেরত যাওয়ার টিকিট বুক করার জন্য, ইন্টারনেটে বসে তারিখ জিজ্ঞেস করছিল শোভনবাবুকে। সে সময় অন্বেষা ঘরে ঢোকে, দাদা, আমি তোমাদের সঙ্গে ভারতে যেতে পারি? শোভনবাবুকে জিজ্ঞেস করে অন্বেষা।

ওটা তোমার নিজের বাড়ি। অবশ্যই তুমি আমাদের সঙ্গে যেতে পারো, আর যতদিন ইচ্ছে থাকতে পারো।

আর দিদি চলে গেলে আমি বুঝি এখানে একা থাকব? অনির্বাণও ঘরে এসে ঢোকে।

প্লেনের জানলা দিয়ে টুকরো টুকরো মেঘগুলোর ইতিউতি ভেসে বেড়ানো দেখছিলেন শোভনবাবু আর গৌরীদেবী। ওই একই সময় অন্বেষা আর অনির্বাণ মোবাইলে মা-বাবার সঙ্গে নানা পোজে সেলফি তুলতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।

আচার খাওয়ার সুফল-কুফল

ভারতীয় খাওয়া-দাওয়ার একটি অঙ্গ হল আচার। আম, লেবু, লংকা, রসুন ছাড়াও নানা সবজি যেমন গাজর, বেগুন, বাঁধাকপি, ফুলকপি, এমন নানা উপকরণ দিয়ে তৈরি হয় জিভে জল আনা আচার। নুন, সরষের তেল ও ভিনিগার আচারে এই তিনটি উপাদান থাকবেই। ঘরে তৈরি হোক কিংবা দোকানে, আচার স্বাদে অতুলনীয় হওয়ার জন্য, মুখ বদলাতে সহায়তা করে। আচারের সুন্দর গন্ধ ও স্বাদ দীর্ঘ সময় ধরে জিভে লেগে থাকে।

আচার খাওয়ার সময় খেয়াল রাখুন সেটা যেন পরিমিত হয়। অধিক পরিমাণে বা রোজ রোজ আচার খাওয়া স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকারক। কিন্তু আমরা রসনার তৃপ্তির জন্য এই অভ্যাস সহজে ছাড়তেও পারি না।

আচার হজমের সহায়ক কিন্তু সেটা তখনই সম্ভব, যদি তা বাড়িতে বানানো হয়।আসুন জেনে নেওয়া যাক আচারের নানা ভালো দিকগুলি।

  • আচারে ভিটামিন ও খনিজ পদার্থ থাকে। সেই কারণেই আচার কৌটোয় ভরে রোদে রেখে দেওয়া হয়
  • আচারে ব্যবহার করা ভিনিগারে প্রচুর পরিমাণে অ্যাসেটিক অ্যাসিড থাকে, যা হিমোগ্লোবিন বাড়াতে ও মধুমেহ নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হয়। ডায়াবেটিস রোগীদের সপ্তাহে একবার আমলকীর আচার খাওয়া বিশেষ উপকারী
  • প্রেগন্যান্সির সময় লেবু বা আমের আচার খেলে মর্নিং সিকনেস-এর সমস্যা মিটে যাবে, এটা মা-ঠাকুমাদের টোটকা
  • আচার খেলে ওজন কমে। এর কারণ এতে ক্যালোরি অত্যন্ত কম। এছাড়া আচারের উপকরণে থাকে শরীরের ফ্যাট ভেঙে দেওয়ার গুণাগুণ
  • আচারে থাকে প্রচুর আ্যন্টি অক্সিড্যান্টস্, যা আমাদের শরীরের ফ্রি রাডিক্যালস থেকে সুরক্ষিত রাখে
  • দৈনিক আচার খেলে মানসিক স্বাস্থ্য ভালো থাকে
  • আচারে ভিটামিন কে-ও থাকে। যা রক্ততঞ্চনে সাহায্য করে। কোথাও কেটে গেলে রক্ত জমাট বাঁধতে এটি সাহায্য করে
  • আচার পেট পরিষ্কার করতে সক্ষম। কারণ এতে ব্যবহৃত সবজিতে থাকে ফাইবার, যা কনস্টিপেশন-এর সমস্যা থেকে পরিত্রাণ দেয়।

এবার আসি ক্ষতির বিষয়টিতে। একটি সমীক্ষায় সম্প্রতি জানতে পারা গিয়েছে যে, বেশি সবজি দিয়ে তৈরি আচার খাওয়ার কারণে গ্যাস্ট্রিক ক্যান্সারের সম্ভাবনা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাই মূল খাবারের স্বাদ বাড়াতে আচার খাওয়ার সময় রসনায় রাশ টানাও দরকার।

আচারে প্রচুর পরিমাণে সোডিয়াম থাকে যা হাইপার টেনশন ও উচ্চ রক্তচাপের রোগীদের পক্ষে ক্ষতিকারক। দোকানে যে-সব আচার পাওয়া যায়, তাতে তেল অত্যধিক পরিমাণে থাকে। এতে ব্যবহৃত তেল ও মশলাগুলি অনেকটাই কাঁচা অবস্থায় থাকে। এর ফলে কোলস্টেরল বৃদ্ধির সম্ভাবনা বাড়ে। আচার তাজা রাখার জন্য যে-প্রিজারভেটিভ ব্যবহার করা হয়, সেগুলিও শরীরের পক্ষে ক্ষতিকারক। এটি অ্যাসিডিটি ও শরীরের স্ফীতির জন্যও দায়ী।

করোনা কাবু করতে পারেনি কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবকে

করোনা প্রভাবিত এই বদলে যাওয়া সময়ে ইতিহাস সাক্ষী রইল নয়া মোড়কের কলকাতা আন্তর্জাতিক ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের৷ গত কাল অফিশিয়ালি উদ্বোধন হল এবারে ২৬তম ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের৷ প্রত্যেকবারের মতো সশরীরে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে পারেননি শাহ রুখ খান৷ কিন্তু ‘দিদি’ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের  আমন্ত্রণ ফেলতেও পারেননি, তাই ভার্চুয়াল অনুষ্ঠানে হাজির হয়েছিলেন কিং খান ৷

তাঁকে বাংলাতে স্বাগত জানিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর প্রশ্ন ছিল, ‘কেমন আছো শাহরুখ, ভালো আছো তো?’  দিদির প্রশ্নের উত্তরটাও বাংলাতেই দেন শাহ রুখ। কোভিড আবহে চলচ্চিত্র উৎসবে সশরীরে উপস্থিত না থাকতে পারার জন্য আফসোস করেন বাংলার ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডর। কিং খান বলেন, ‘মহামারী শিখিয়েছে, পরিবার অনেক দামী। কলকাতা আমার পরিবার, পশ্চিমবঙ্গ আমার পরিবার। শীঘ্রই কলকাতায় যাব, সকলের সঙ্গে দেখা করব।’  মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁকে বলেন, ‘রাখিতে কিন্তু আসতেই হবে।’  দিদির অনুরোধে সায় জানান শাহ রুখও।

অনুষ্ঠানের শুরুতেই  কিছু সিনেমার ভিডিয়ো কোলাজে প্রয়াত অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে শ্রদ্ধা জানানো হয়। আকারে ছোটো হলেও ছবি প্রদর্শন নিয়ে কোনওরকম কার্পণ্য করা হয়নি এবারও। তবে এবারের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান নেতাজি ইন্ডোর স্টেডিয়ামের পরিবর্তে অনুষ্ঠিত হয়েছে নবান্নর সভাঘরে।

৫০ শতাংশ নয়, ১০০ শতাংশ দর্শক নিয়ে সিনেমা দেখানো হবে, তবে সুরক্ষা হিসাবে বারবার স্যানিটাইজ করা হবে আসন গুলি—কলকাতা চলচ্চিত্র উৎসবের উদ্বোধনে জানিয়ে দিলেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর নির্দেশ— একটা সিনেমা শেষ হওয়ার সঙ্গেসঙ্গেই স্প্রে করতে হবে। তাতে সকলে নিরাপদ বোধ করবেন। তবে সিনেমা দেখতে আসতে হবে মাস্ক পরেই।

কোভিড পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখে এবার চলচ্চিত্র উৎসবে ই-টিকিটের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী কমিটিতে থাকা শিল্পীদের অনুরোধ করেন, যাঁরা ই-টিকিট কাটতে পারেন না, তাঁদের যেন সহায়তা করা হয়। পরমব্রত চট্টোপাধ্যায় জানিয়েছেন, সকলকে সাহায্য করার জন্য এবার বিশেষ সহায়তা কেন্দ্র থাকছে। এদিন পরিচালক অনুভব সিনহা সহ চলচ্চিত্র উৎসবে উপস্থিত সকলকে ধন্যবাদ জানাতে ভুললেন না মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। প্রতিশ্রুতিমতো ভার্চুয়ালি উপস্থিত থাকার জন্য শাহ রুখ খানের প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন মমতা। মুখ্যমন্ত্রীর কথায়, যাঁরা সিনেমায় কাজ করেন, তাঁদের জীবন কিন্তু সহজ নয়। তাঁদের কাজটিও প্রচুর পরিশ্রমসাপেক্ষ। অনেককিছু ত্যাগ করতে হয়। এদিন আত্মবিশ্বাসের সুরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, টলিউড একদিন বলিউড কেন হলিউডকেও পাল্লা দেবে। তাঁর মতে, বাংলায় প্রচুর প্রতিভা আছে।

এ বারের এই উৎসবের বিশেষ আকর্ষণ ‘স্পেশাল স্ক্রিনিং’ বিভাগের তিনটে বিশেষ ছবি। তিনটি ছবি হল—‘সুইমিং আউট টিল দ্য সি টার্নস ব্লু’, ‘মি রাকসাম’ আর ‘লালি’।

শিশুর বিকাশে বাধা মা-বাবার বিবাদ

রাজর্ষির বয়স মাত্র ৮ বছর। কিন্তু ও, ওর বয়সের বাচ্চাদের থেকে স্বভাবে একেবারেই আলাদা। খেলাধুলা করার সময় বেশিরভাগ দিন অন্যান্য খেলার সঙ্গীদের মেরে ধরে ভয় দেখিয়ে নিজের জয় নিশ্চিত করে নেয়। ওর মা-বাবাও ওকে কখনও ভালো ভাবে, কখনও বকে অনেক বুঝিয়েছেন কিন্তু অবাধ্যতা করা ওর স্বভাব হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমনকী মা-বাবার মুখে মুখে তর্ক করা, বাড়ির জিনিসপত্র ছুড়ে ভেঙে দেওয়াও ওর এই বয়সেই অভ্যাস হয়ে দাঁড়িয়েছে।

রাজর্ষির মা-বাবা দুজনেই কর্মরত। কর্মজীবনে প্রচুর স্ট্রেস থাকার ফলে বাড়িতে মাঝেমধ্যেই নিজেদের মধ্যে তর্ক-বিতর্ক হয় এমনকী চিৎকার-চ্যাঁচামেচিও কখনও-সখনও হয়েই থাকে। এমনও হয়েছে রাজর্ষির সামনেই বাবা রাগের মাথায় ওর মায়ের উপর হাত তুলেছেন। প্রথম প্রথম ও চমকে উঠত কিন্তু ধীরে ধীরে এটাই ওর মনে বসে গেল যে এই ধরনের ব্যবহারই সঠিক। প্রথমে শুরু করল মা-বাবার সঙ্গে চেঁচিয়ে কথা বলা, বাড়ির জিনিসপত্র ভাঙা। ধীরে ধীরে স্কুল এবং পাড়ার বন্ধুদের সঙ্গেও একই ব্যবহার করা শুরু করল।

রাজর্ষির এই ব্যবহারের জন্য ওর মা-বাবা অনেকটাই দায়ী। প্রথমদিকে কান্নাকাটি করে অথবা একদম চুপ হয়ে গিয়ে নিজের প্রতিক্রিয়া জানাবার চেষ্টা করত কিন্তু ওর মা-বাবা কখনওই ওর কথা বোঝার চেষ্টা করেননি। নিজেদের মধ্যে লড়াইতে ব্যস্ত থেকেছেন। ফল দাঁড়িয়েছে রাজর্ষির অসম্ভব জেদি এবং রাগি হয়ে ওঠা।

প্রত্যেক শিশুর কাছে তার মা-বাবাই হল রোল মডেল। মা-বাবার থেকে ভালো সে আর কাউকেই মনে করে না। সুতরাং যখন বাচ্চার সামনেই তার অভিভাবকদের মধ্যে ঝগড়া-বিবাদের সৃষ্টি হয়, কদর্য ভাষার ব্যবহার চলে– তখন বাচ্চার মানসপটে আঁকা মা-বাবার ছবি কলুষিত হয়ে পড়ে। মা-বাবার আচরণে নিজেকে ঢেলে সাজাবার চেষ্টা করে।

সাইকোলজি-তে রয়েছে ইমিটেশন থিওরি। যার দ্বারা প্রমাণ হয় যে, বাচ্চা মা-বাবার কাছ থেকেই সামাজিক ব্যবহার শিখে বড়ো হয়। যদিও সব অভিভাবকেরাই চান বাচ্চাকে সুশিক্ষা দিতে তবুও কখনও কখনও বাচ্চার সামনেই এমন কিছু ভুল করে বসেন যাতে বাচ্চার উপর খু ব খারাপ প্রভাব পড়ে।

এমনও ঘটনা অনেক সময় ঘটে থাকে যেখানে অভিভাবকেরা নিজেদের মধ্যে ঝগড়া করার পর নিজেকে বাচ্চার কাছে সঠিক প্রমাণিত করতে একে অপরের বিরুদ্ধে দোষারোপ করতে থাকে বাচ্চার সরল মনকে অপরের প্রতি বিষিয়ে তুলতে। এর ফলে বাচ্চা আরও বেশি বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে।

মা-বাবার ঝগড়ার প্রভাব বাচ্চার মনে নিয়ে আসে অবসাদ অর্থাৎ ডিপ্রেশন – যে-বাচ্চারা সবসময় মা-বাবার মধ্যে ঝগড়া মারামারি দেখে বড়ো হয় তাদের মধ্যে ডিপ্রেশনের সমস্যা হতে পারে। এর কারণ তারা হাসিখুশি পরিবেশ পায় না এবং একটা নেতিবাচক পরিস্থিতির মধ্যে তার মানসিক বিকাশ ঘটে।

ভয়ে ভয়ে থাকা – বাচ্চার সামনে লড়াই ঝগড়া, বাজে শব্দ ব্যবহার করা বা মারধর করার সময় মা-বাবা ভুলে যান তাদের এই ব্যবহার বাচ্চার উপর কী প্রভাব ফেলতে পারে। বেশিরভাগ সময়েই মা-বাবাকে লড়াই করতে দেখলে বাচ্চার মনে ভয় চেপে বসে।

মানসিক সমস্যা – ঝগড়া-বিবাদের পরিবেশে বাচ্চা বড়ো হতে থাকলে, বাচ্চার মানসিক সমস্যা দেখা দিতে পারে। বাচ্চার ইনোসেন্স হারিয়ে যায়, বাচ্চা জেদি এবং খিটখিটে মেজাজের হয়ে ওঠে। মা-বাবাও এই ক্ষেত্রে বাচ্চা এই ধরনের আচরণের কারণ খুঁজে পান না। তারা বোঝার চেষ্টাই করেন না যে, তাদের কারণেই বাচ্চার মধ্যে এতটা পরিবর্তন হচ্ছে।

জীবনে বড়ো ক্ষতির সম্মুখীন হওয়া – বাড়ির অশান্তি, ঝগড়ার পরিবেশে বাচ্চার মানসিক বিকাশ ঠিক মতো হয় না ফলে অন্য বাচ্চাদের তুলনায় খেলধুলো, পড়াশোনায় সে পিছিয়ে পড়তে থাকে।

নিজেকেই দোষী ভাবতে শুরু করে – বাড়িতে রোজ বড়োদের ঝগড়া দেখতে দেখতে বাচ্চার মনে হতে থাকে সে-ই এই ঝগড়ার মূল কারণ। এরপর বাচ্চা নিজেকে গুটিয়ে নেয় এবং চুপচাপ থাকতে শুরু করে। অনেক বাচ্চা আবার আত্মহননের পথও বেছে নেয়।

ভরসা করা ছেড়ে দেয় – বড়োদের মধ্যে ঝগড়ায় বাচ্চার শিশুমন নিরাশায় ডুবে যায়। কোনও কিছুতে ভালো লাগা তার জীবন থেকে হারিয়ে যায়। কাউকে ভরসা করতে পারে না। কেউ ভালোবাসলেও সেটা তার কাছে মিথ্যা বলে মনে হয়।

অল্প বয়সি বাচ্চাদের উপর লড়াই ঝগড়ার প্রভাব – ছোটো বাচ্চারা মা-বাবার কথোপকথন খুব একটা বুঝতে না পারলেও ওদের ইমোশন, মুড খুব সহজে বুঝতে পারে। লক্ষ্য করা গেছে যেসব পরিবারে দম্পতির মধ্যে সবসময় ঝগড়া লেগে থাকে সেখানে বাচ্চা খুব ভয়ে ভয়ে থাকে। তাদের মনে হয়, এই বুঝি মা-বাবা আলাদা হয়ে যাবে আর ওর সঙ্গে কেউ থাকবে না। নিজেকে অসুরক্ষিত মনে করতে আরম্ভ করে। এমনকী বাইরে মেলামেশা করা বা কোথাও যাওয়া আসাও বন্ধ করে দেয়।

একটু বেশি বয়সি বাচ্চার উপর লড়াইয়ের প্রভাব – বাচ্চা একটু বড়ো হয়ে গেলে মা-বাবা আশা করেন নিজেদের ঝগড়ায় বাচ্চা কারও একটা পক্ষ নেবে। কিন্তু বাচ্চার সাইকোলজি এই ক্ষেত্রে একটু অন্যরকম, সে বরং মনে করে জবরদস্তি সে এই সিচুয়েশনে আটকে পড়েছে। গ্লানি অনুভব করে। এই সিচুয়েশনের জন্য নিজেকেই দায়ী করে।

আমেরিকায় একটি রিসার্চ-এর ফলাফল অনুসারে মা-বাবার ঝগড়ার প্রভাব বাচ্চার শরীরের ইমিউন সিস্টেমের উপরেও গভীর ভাবে পড়ে। এর ফলে বাচ্চার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ে। ছোটো থেকেই লড়াই ঝগড়ার পরিবেশে বড়ো হতে থাকলে অথবা মা-বাবার মধ্যে কথাবর্তা বন্ধ থাকলে বা ডিভোর্স কেস দীর্ঘ সময় ধরে চলতে থাকলে বাচ্চার মনের উপর খুব গভীর প্রভাব পড়ে। শুধু শৈশবেই নয় বড়ো হয়েও বাচ্চা এর নেতিবাচক প্রভাব থেকে বেরোতে পারে না। পড়াশোনাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ঝগড়া হওয়া খুবই স্বাভাবিক। কারণ দুটো মানুষ দুটো ভিন্ন ভিন্ন পরিবেশ থেকে আসে ফলে তাদের চিন্তা-ভাবনা আলাদা হতেই পারে। কিন্তু সামান্য তর্ক-বিতর্ক, মারপিটে পৌঁছে গেলে অথবা কেস ডিভোর্স অবধি পৌঁছোলে, তার মারাত্মক প্রভাব পড়তে পারে সন্তানের উপর।

বাচ্চার মানসিক বিকাশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। নানারকম মানসিক বিকার উৎপন্ন হতে পারে। নয় সে ভীতু স্বভাবের হয়ে ওঠে আর নয়তো সঠিক পথ থেকে সরে দাঁড়ায়। তাই নিজেদের মধ্যে ঝগড়া হলেও, বাচ্চাকে নিজেদের ঝগড়া থেকে দূরে রাখাটাই সকলের জন্য বাঞ্ছনীয়। তাহলেই বাচ্চার পালন-পোষণ সঠিক ভাবে হতে পারবে।

মা-বাবার জন্য টিপস     

ক) নিজের অহংকার বজায় রাখার বদলে সন্তানের কথা ভাবুন

খ) দম্পতির মধ্যে ঝগড়া হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু যখন একজন রেগে রয়েছে অন্যজনের উচিত চুপ করে যাওয়া, যাতে ঝগড়া আরও না বাড়ে

গ) নিজেদের ঝগড়ায় বাচ্চাদের শামিল করা উচিত নয়

ঘ) কোনও ব্যাপারে বড়োদের সম্মতি একসঙ্গে না হলেও বাচ্চার সামনে একে অপরকে অসম্মান করা ঠিক নয়

ঙ) বাচ্চার সামনে খারাপ ভাষা ব্যবহার করা উচিত নয়। চিৎকার-চ্যাঁচামেচি বা গালিগালাজ দিয়ে কথা কখনওই বলা শোভনীয় নয়

চ)  যদি স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ঝগড়া কিছুতেই না থামে তাহলে কাউন্সিলার-এর পরামর্শ নিন

 

 

বাচ্চার জেদ কমাবেন কীভাবে?

নানারকম কারণে জেদ করে বাচ্চারা। খিদে পেলে, ঘুম পেলে কিংবা শরীরে কোনও কষ্ট হলে যেমন জেদ করে, ঠিক তেমনই ভলোবাসার অভাববোধ করলেও জেদ করে। অনেক সময আবার নিজের প্রতি অতিরিক্ত দৃষ্টি আকর্ষণ করানোর জন্যও জেদ ধরে বাচ্চারা। কিন্তু অতিরিক্ত জেদ বাচ্চার শরীর ও মনে কুপ্রভাব ফেলতে পারে। শুধু তাই নয়, জেদের কারণে ভবিষ্যতে অন্যের চোখে অপ্রিয় হয়ে উঠতে পারে। অতএব, বাচ্চার জেদ কমাতেই হবে। এর জন্য প্রধান দায়িত্ব নিতে হবে বাবা-মাকে। কিন্তু কীভাবে?

  • বাচ্চা যদি একাকিত্ব অনুভব করে কিংবা বিরক্তবোধ করে, তাহলে তার কান্নাকাটি বা চ্যাঁচামেচি বন্ধ করানোর জন্য কোনও কাজে তাকে ব্যস্ত রাখুন। যেমন খেলনা, আঁকা অথবা বড়োদের কাজে সাহায্য করতে বলুন। শাকসবজি বাছাবাছি, গুছিয়ে রাখা ইত্যাদিতেও ব্যস্ত রাখতে পারেন। প্রযোজন হলে বাসনপত্র এলোমেলো করে দিয়ে বাচ্চাকে গোছাতে বলুন
  • খিদে পাওয়ার কারণে যদি জেদ করছে মনে হয়, তাহলে তখন পছন্দের খাবার খাওয়ান বাচ্চাকে
  • সঠিক সময়ে ঘুম পাড়ান বাচ্চাকে এবং বাচ্চাকে অন্তত আট ঘন্টা ঘুমোনোর ব্যবস্থা করুন। কারণ, ঘুম ভালো হলে বাচ্চার মুড ভালো থাকবে এবং জেদ কমবে
  • বাচ্চা যখন জেদ করবে, তখন তাকে মারধর কিংবা অন্য কোনও ভাবে শাস্তি দেবেন না, এতে জেদ আরও বেড়ে যাবে। বরং উলটোটাই করুন, ওকে আদর দিয়ে অন্য কোনও ভাবে ব্যস্ত রাখুন, হাসাবার চেষ্টা করুন
  • বাচ্চাকে নিজের ভালোবাসা প্রকাশ করুন। যেন কোনও ভাবেই বাচ্চা অসহায়তা অনুভব না করে
  • বাচ্চার সামনে বড়োরা যেন ঝগড়া না করে। কারণ, ঝগড়া দেখলে ভয় পেয়ে বিরক্তি কিংবা জেদ দেখাতে পারে।

শিশুদের বডি হাইজিন বজায় রাখুন

শিশুদের বোধশক্তি যেহেতু কম, তাই তাদের যত্নে রাখার দাযিত্ব মা-বাবার উপর বর্তায়। আর এই যত্নে রাখার মধ্যে অন্যতম বিষয় হল বডি হাইজিন বজায় রাখা। অতএব, জেনে নিন শিশুদের বডি হাইজিন মেনটেইন করবেন কী করে।

  • বাচ্চাকে প্রতিদিন সম্পূর্ণ স্নান করার অভ্যাস করান
  • স্নানের সময় বাচ্চারা যেন শরীরের বিভিন্ন অংশ, যেমন হাত, পা, বগল, কোমর, নাভি, হাত ও পাযে জযে্টস, আঙুলের খাঁজ, কুঁচকি, নিতম্ব প্রভতি ভালো ভাবে ধোয়, সেই অভ্যাস তৈরি করান
  • স্নানের পর বাচ্চাকে পরিষ্কার জামাকাপড় পরাবার অভ্যাস করান এবং ইনার গারমেন্টসও চেঞ্জ করতে শেখান
  • সপ্তাহে দুবার বাচ্চার চুল শ্যাম্পু দিযে পরিষ্কার রাখার অভ্যাস করান। এতে বাচ্চার স্কাল্পে তেল, ধুলোময়লা ইত্যাদি জমবে না এবং জীবাণু বাসা বাঁধবে না।
  • বাচ্চার হাত ও পাযে নখ সপ্তাহে একবার করে কেটে দিন
  • মাথার চুল বেড়ে গেলেই কাটানোর ব্যবস্থা করুন
  • বাচ্চার পার্সোনাল হাইজিন-এর জিনিসপত্র নিয়মিত পরিষ্কার রাখুন।

অত্যাচারিত হলে, স্বামীর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান

গার্হস্থ্য হিংসার জেরে ভারতে বাড়ছে স্বামীকে খুন করার মতো ঘটনা। এই ধরনের খবর প্রকাশিত হলে, প্রাথমিক ভাবে একটু আশ্চর্য লাগে ঠিকই কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা বিবাদের জেরে এখন এমন ঘটনাই মুহূর্মুহূ ঘটছে। সমীক্ষা বলছে লকডাউনের সময়টাতে এবং করোনা পরবর্তী এই অর্থনৈতিক মন্দার সময়ে ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স কয়েক গুনে বেড়ে গিয়েছে। একদিকে এটাও যেমন সত্যি, তেমনি আশঙ্কিত হওয়ার বিষয়টি হল, মেয়েরা নির্যাতন সহ্য করার বদলে এখন অনেক বেশি খুনের মতো মারাত্মক অপরাধ  করে ফেলছে এর জেরে।

সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহ নাগাদ, হায়দরাবাদের ডক্টর লেফটেন্যান্ট জেনারেল-এর মৃত্যুও এমনই একটি দুর্ভাগ্যজনক ঘটনার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া। দাম্পত্য বিবাদের জেরে রান্নাঘরের ছুরি দিয়ে তাঁকে হত্যা করেন তাঁর স্ত্রী। এই খুন কিন্তু সহজসাধ্য ছিল না। রান্নাঘরের ছুরির মতো একটি হাতিয়ার দিয়ে এমন ঘটনা ঘটাতে যে বিপুল শক্তি লাগে তাতে কোনও সন্দেহ নেই। মৃত্যু নিশ্চিত করতে নিশচয়ই তাকে একাধিক বার ছুরিকাঘাত করতে স্বামীর শরীরে। পরে পুলিশের কাছে খুনের খবরটি পৌঁছে দেন তাঁদের ২৩ বছরের মেয়ে।

স্ত্রীয়ের অভিযোগ ছিল স্বামী তাঁর উপর দীর্ঘদিন ধরে অকথ্য শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালিয়ে গেছেন। শেষে ধৈর্য্যের বাঁধ ভেঙে যাওয়ায় এই নারকীয় ঘটনাটি ঘটে যায়।সাধারণত পুরুষরা মহিলাদের গায়ে হাত তোলেন না, এই ভেবে যে এর ফলে বাচ্চাদের উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। প্রাকৃতিক ভাবেই মায়েরা বাচ্চাদের খেয়াল অনেক বেশি রাখেন বাবাদের তুলনায়। মা সন্তান কে ছেড়ে থাকতে পারবেন না, এই দুর্বলতার সুযোগ নিয়েই, বহু নারীকে যুগের পর যুগ নির্যাতন করে এসেছেন পুরুষরা।

সবচেয়ে দুর্ভাগ্যের বিষয়টি হল, নারীর উপর বাইরে হওয়া অত্যাচারের তুলনায়, গার্হস্থ্য হিংসার ঘটনার কথা লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয় না বলেই, ঘটনাগুলো প্রকাশ্যেই আসে না। অচেনা পুরুষ দ্বারা ধর্ষিত হওয়ার ঘটনা যত না ঘটে, দাম্পত্যে তার চেয়ে বহুগুন বেশি ধর্ষনের শিকার হয় মেয়েরা। আর সন্তানের মুখ চেয়ে তারা সরব হতেও পারে না।প্রতিবাদে লাভও হয় না, কারণ একদিকে যেমন কন্যার বিবাহ দিয়ে পিতা তাঁর দায় এড়িয়েছেন, অন্যদিকে মেয়েটির মা একইরকম ভাবে বিনা প্রতিবাদে যুগের পর যুগ জুলুম সইতে বাধ্য থেকেছেন।

স্বামি হত্যার ঘটনায় সমাজ মেয়েটির পাশে দাঁড়াবে না। জেলে যাওয়ার নিয়তিকে যেমন স্বীকার করে নিতে দবে মেয়েটিকে। চরম লাঞ্ছনা আর অপমানের জীবন বহন করতে হবে তাঁর সন্তানকেও, যে- সন্তান কখনোই মেনে নিতে পারবে না এই হত্যার যৌক্তিকতা, সে যতই কেন না সে মায়ের উপর হওয়া অত্যাচারের সাক্ষী হোক। এরপরও মেয়েটির হেনস্থার শেষ নেই কারণ সে কোর্ট- এ তার পক্ষ নেওয়ার মতো ভাল উকিল পাবে না।তবু ভালো দিক একটিই, প্রতিবাদের একটি দৃষ্টান্ত অন্তত তৈরি হবে এই রকম ঘটনায়।

আলো আঁধারির গপ্পো

সাউথ ফেসিং অ্যাপার্টমেন্ট। জি-প্লাস ফোর ফ্ল্যাট। সুনন্দের ফ্লাটটা ঠিক মাঝখানে। ব্যালকনিটাও সাউথ ফেসিং। সামনে ছোটো একটা মাঠ। তারপরে সবুজ বনানী। আগাছা জঙ্গল ভরা নয়। নানা রকম বাহারি ফুল, বাহারি জঙ্গল। বনানি দেখভালের জন্য একজন মালিও নিয়োজিত। তারও ওপারে একটা দিঘি। কাচের মতো স্বচ্ছ তার জল। সুইমিং, বোটিং। গোটা কতক দশাসই আমগাছ তুলে এনে ‘ইনস্টল’ করা হয়েছে। নতুন নাম ‘মাঝের গাঁ’। এ সবই খদ্দের পটানোর বন্দোবস্ত।

একটা লম্বা হাই তুলে সুনন্দ ব্যালকনির ইজি চেয়ারটাতে বসেছে। দুপুরের ভাত ঘুম। পাতলা ঘুম। পাতলা ঘুম অতল স্পর্শ করে না। অগভীর ঘুমে মনের সুখ বাসনাগুলি ছেঁড়া ছেঁড়া পেঁজা তুলার মতো ভাসতে থাকে। বাসনার বিপরীত মুখী হয়ে অবচেতন মনের সামনে বিরক্তি ঘটায়। না পাওয়ার অস্বস্তিতে হতাশা আসে। বাইরে প্রকৃতির অনাবিল রূপের ডালি! সুনন্দর নজর সেদিকে নেই। আকাশে মেঘ নেই। সুনন্দর মুখে আছে। এক রাশ ঘনীভূত আষাঢ়ের মেঘ। ঝরব ঝরব করছে। ঝরেনি। বাইরে অসহায়ের মতো ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে।

পড়ন্ত বিকেল। সূর্য এক অত্যাচারী শাসক। সারাদিন রক্তচক্ষু দিয়ে জগৎ শাসন করেছে। বসুন্ধরার রক্তরস ছিবড়ে করে নিজেই ক্লান্ত। বিশ্রামের জন্য পশ্চিমে রওনা হয়েছে।

হাতে এক কাপ চা। মধুছন্দা দেবী ব্যালকনির দরজায় দাঁড়িয়ে। টের পায়নি। –কী দেখছিস ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে? ব্যাবসার কথা ভাবছিস? ভাবিস না। সব ঠিক হয়ে যাবে।

একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে বলে –নাঃ তেমন কিছু না। মাথা তুলতেই মায়ের দৃষ্টি এড়ায় না।

–ও মা এ কি! চোখ দুটো অমন লাল কেন? মুখ খানাও কেমন গোমড়া। ব্যাবসায় আরও কিছু ক্ষতি হ’ল নাকি?

–না সেসব কিছু না। একটা আজেবাজে স্বপ্ন দেখে মনটা খারাপ হয়ে গেল। মায়ের মন অস্থির হয়ে ওঠে।

–ও মা সে কি? কী বাজে স্বপ্ন? কু-স্বপ্ন মনে চেপে রাখতে নেই। বলে দে। মায়ের পীড়াপীড়ি এড়াতে পারে না।

মেঘমুক্ত আকাশ। পশম মেঘ। বুনো মেঘ। গোটা আকাশে কিছু নেই। হঠাৎ কোথা থেকে কচিকাঁচা মেঘেরা মুক্ত আকাশে খেলতে নেমেছে। আমাকে হাত ধরে টানাটানি। আমি বললাম– আরে আমি কি তোদের সাথে খেলতে পারব?

–এসো না। খুব পারবে।

ওদের সঙ্গে লুকোচুরি খেলতে লাগলাম। তারপর যা হওয়ার তাই। অল্প সময়েই হাঁপিয়ে পড়লাম। ওরা বলল– এসো তবে কিছু জলযোগ করে নিই। বলে আমাকেও চাট্টি মুড়ি দিল। আমি পরমানন্দে খেতে লাগলাম। তারপরই হঠাৎ ঘুমটা ভেঙে গেল।

–ওহ, এটা আবার দুঃস্বপ্ন কীসের?মুড়ি তো ভালো জিনিস। এতে মুখ গোমড়া করে বসে থাকার কি হয়েছে?

–না আমি ভাবছি অন্য কথা। তারপরই মাকে প্রশ্ন করে –আচ্ছা মা, মেঘেদের খাবার কিনতে শুধু খাবার কেন কোনও কিছুই জোগাড় করতে তো পয়সা লাগে না। এত ভালো ভালো খাবার থাকতে শুধু মুড়ি। তাই ভাবছি বাকি জীবনটা কি তাহলে আমাকে মুড়ি…।

–ছিঃ বাবা অমন কথা বলতে নেই। ঘুমটা ভালো হয়নি তো! পাতলা ঘুমে ওরকম হিজিবিজি স্বপ্ন দেখে মানুষ। ওসব কথা মনে করে কষ্ট পেতে নেই।

ড. ডি কে বাসু! এটা কেতাবি নাম! বাপ-মায়ের দেওয়া নাম দিলীপ কুমার বোস। বিদেশে গিয়ে সাহেবি নাম হয়েছে। প্রথম নামটি। বার্কিংহাম ইউনিভার্সিটিতে অর্থনীতির প্রফেসরের পাশাপাশি গোটা ইউরোপ ঘুরে জ্ঞানের ঝুলিটা ফুলে ফেঁপে লাউ। জ্ঞানের ঝুলিটা যত ভারী, দাম্ভিকতার তবলা সমপরিমাণে টিউনিং। মুখে লেগে থাকে নেটিভ ইন্ডিয়ান। ইন্ডিয়ান কালচারটা একেবারে বস্তাপচা। জ্ঞানের ভান্ডার দিয়ে ইউরোপকে সমৃদ্ধ করেছে, মাতৃভূমিকে ছড়িয়েছে বিষাক্ত নিঃশ্বাস।

কৌতুকবশত সুনন্দ বলেছিল– মামা, তুমি গেঞ্জিটা উলটো পরেছ।

ড. বাসু একগাল তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বলে– আসলে কি জানিস, ইন্ডিয়ানরা কমফর্ট ব্যাপারটা ঠিক বোঝে না। সেলাইয়ের দিকটা ভেতরে থাকলে কমফর্ট ব্যাপারটা ডিসটার্ব হয়। এ গল্পে ড. বাসুর প্রবল আত্মকেন্দ্রিকতা, মাতৃভূমির উপর ঘৃণা, ইউরোপিয়ান আদব-কায়দা ইত্যাদি বিশ্লেষণ করা। এসব একান্তই অনাবশ্যক ছিল! যদি না দীর্ঘ পঞ্চাশ বছর পর দেশের মাটিতে পদার্পণ ঘটিয়ে, বোনের বাড়িতে সটান এসে স্বঘোষিত অভিভাবক হয়ে না উঠত।

সুনন্দের হাতে এখন অঢেল সময়। ডিমনিটাইজেশনের জেরে ট্রাভেলিং-এর ব্যাবসা যত তলানিতে ঠেকছে বিশ্রামের সময় ততই বাড়ছে। ব্যাবসা এখন চড়ায় আটকে যাওয়া নৗকার মতো। পরিশ্রম কম হলে ঘুম আসে না। পায়চারি করে।

ব্যালকনির কর্নারে একটা টব। গোলাপ গাছ। বেচারা। অনাদরে অবহেলায় শুকিয়ে কঙ্কাল। সময় আছে যথেষ্ট। উৎসাহে গলগ্রহ। সেই গলগ্রহে গাছটার অকাল প্রয়াণ। পাশ দিয়ে আরও এক অবহেলিত অনাহুত গাছ মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে। পথ শিশুদের আদর যত্নের প্রয়োজন হয় না।

জাত ধর্ম সবারই আছে। গাছেরও আছে। শুধু অনাহুত গাছটা শনাক্ত কেউ করতে পারল না। কৗতুহলটা ঘরের চৗকাঠ পেরিয়ে দোতলা তিনতলা। গোটা অ্যাপার্টমেন্টময় ছড়িয়ে পড়ে।

অবশেষে এলেন পরান হালদার। উড়িষ্যার জঙ্গল। আদিবাসীপাড়া। ঝাড়ফুক। তুকতাক। ঘরবন্ধন। ভূত ছাড়ানো। এসবে হাত যশ আছে। সব ছাড়িয়ে পয়সার ঝোলাটা আরও ভারী।

পরান হালদার গাছটা দেখেই অাঁতকে ওঠে। কি সর্বনাশ! এ-তো এক ভয়ংকর বিপদের ইঙ্গিত। গাছটা তোমরা চিনতে পারলে না? –সুনন্দের কৗতুহল বাড়তে থাকে।

–কেন কি গাছ?

–আরে, এ-তো ভূতের বাসস্থান।

–সেটাই তো জানতে চাইছি। এটা কি গাছ? ভূতেরা আবার আলাদা গাছে থাকে না কি?

–থাকে বাবা থাকে। তোমরা শিক্ষিত। এ যুগের ছেলে। ওসব বুঝবে না।

–না, বলছি গাছটার একটা নাম তো আছে?

–আছে বাবা আছে। এটা শ্যাওড়া গাছ। বলে দাঁড়ায় না। পাঞ্জাবির পকেট থেকে রুমাল বের করে মুখে চাপা দিয়ে হন্ হন্ করতে করতে বের হয়ে যায়। পরানবাবু ভয় পেয়েছে। নাক মুখ দিয়ে সুরুৎ করে ভুতের বাচ্চা শরীরে ঢুকে গেলে আর রক্ষে নেই।।

সুনন্দ ভাবছে। নোট জেলে বন্দি। কবে ছাড়া পাবে কে জানে। ট্যুরিস্টেরের পকেটে নেই টাকা। তাই গাড়ির ঘোরেও না চাকা। নোট বন্দি। না বাক্বন্দি। বাক্বন্দি না জীবনবন্দি। ধ্যাৎ! যত্তসব! ঘরের ভিতরটা কেমন গুমোট হয়ে আসছে। মাথার পেছনটা কেমন ভারী ভারী লাগছে। কোন আগন্তুকের পদশব্দ! সুনন্দ চমকে ওঠে।

একটা কিশোর। বয়স বছর বারো তেরো। খালি গা। পরনে ছেঁড়া হাফ প্যান্ট। গায়ে খড়ি উঠে গেছে। তেল সাবান বহুদিন পড়েনি বোধ হয়। মাথায় শেষ কবে চিরুনি পড়েছিল কে জানে! চোখ দুটো অস্বাভাবিক রকম জ্বল জ্বল করছে। তবু কেমন নিরীহ নিরীহ লাগে।

সুনন্দ ধড়মড় করে উঠে বসে। –আরে রে রে। তুই কোথা থেকে এলি? দরজা তো বন্ধ।

–ওই তো দরজা খুলে।

সুনন্দ ভাবছে বাঁ দিকে ব্যালকনির দরজাটা খোলা। কিন্তু সেদিক থেকে দোতলা উঠবে কি করে! আরও এক ঝলক ভাবে– ডানদিকের দরজা এখনও বন্ধ। লক করা ছিল না হ্যান্ডেল লকটা খুলল। ঢুকল। আবার বন্ধ করল। আমি কিছুই টের পেলাম না। সে যাক্।

–এখানে এসেছিস কেন?

–একটু থাকতে দেবে দাদাভাই?

–তোর বাড়ি কোথায়? নামটাই বা কি?

–জন্ম উড়িষ্যায়। এখন থাকি ফুটপাথে। আর নাম লালু! লালু নায়েক ছিল। এখন যে যা বলে তাই।

–কী করে চলে? মানে খাস কি?

–ভিক্ষা করে। তা-ও ঠিক হচ্ছে না।

তারপরেই লালু পা-দু’টো ধরে বলে– দাও না দাদাভাই একটু থাকতে। আমি তোমাদের সব কাজ করে দেব। এই ধরো হাট বাজার। ঘরের কাজ সব কিছু পারি। ছেলেটার কথায় একটা মাদকতা আছে। সুনন্দ নরম হয়। তারপরই বলে– সবই তো বুঝলাম। কিন্তু তুই এখন যা বাপু! আমার এখন কাজের লোক রাখার সামর্থ্য নেই। আর তা ছাড়া থাকবিই বা কোথায়? আমাদের তো মাত্র তিনটে বেডরুম। লালু মনের ভাব বুঝতে পারে। বলে, –দাদাভাই তোমাদের এঁটো কাঁটা যা দেবে তাতেই আমার হবে। আর থাকার কথা বলছ, সে তোমাদের স্টোররুমেই চলে যাবে। থাকতাম তো ফুটপাথে।

সুনন্দ বিরক্ত হয়। ভাবছে, আচ্ছা মুশকিলে ফেলল তো ছেলেটা। ওকে বোঝাই কি করে। ছড়িয়ে ছিটিয়ে খাওয়ার মতো অবস্থাতেও আমি নেই।

কথার শব্দে মধুছন্দার ভাত ঘুমটা ভাঙে। হাঁটুর আড়ষ্ঠতা কাটিয়ে সুনন্দর ঘরে ঢুকে বলে, ‘ও মা এ ছেলেটা কে? কী চায়?’

লালু মধুছন্দার পা জড়িয়ে বলে, – মা, ওমা, একটু থাকতে দাও। দাদাভাইকে একটু বলো না। মায়ের মন। ‘মা’ সম্বোধনে গলে জল!

সুনন্দ বিরক্ত হয়ে বলে– আচ্ছা ঝামেলায় পড়া গেল তো। কোথা থেকে এসে কাঙালিপনা করছে। একে কীভাবে বিদায় করি বলো তো?

–থাক। থাক। মা বলে ডেকেছে। ও আমি সামলে নেব। দু’মুঠো কম খেলে আমার কিছু হবে না। তাছাড়া ঘরের কাজ সামলে বাজার হাট করা। এখন শরীর দেয় না। হাঁটুর ব্যথাটাও ইদানীং বড্ড বেড়েছে।

মধুছন্দা আঁচলের খুট থেকে পঞ্চাশ টাকার নোটটা দিয়ে লালুকে বলে– যা তো বাবা এক কেজি চাল আর এই শিশিতে একটু সরষের তেল নিয়ে আয়। লালু কাগজের ঠোঙায় চাল আর তেলের শিশিটা ধরিয়ে দিয়ে কোথায় ফুড়ুত করে হাওয়া। আপতত আর দেখা গেল না।

কাজ কম তাই হিজিবিজি ভাবনাটা বেশি। সুনন্দ ভাবছে। ঘরটা কেমন নির্জন নীরব মনে হচ্ছে কেন? তিন জনের সংসারে এখন চারজন। মামা থেকেও নেই। দুপুরে বেরোয়। গভীর রাতে দুলে দুলে ঘরে ফেরে। অশীতিপর বৃদ্ধ। চলাফেরায় এখন আর বলিষ্ঠতা নেই। লালুটা কখন যে কোথায় থাকে বোঝা ভার। অথচ ডাকলেই হাজির। গোটা ঘরটা এক অদ্ভূত রকমের রহস্যময় লাগছে।

জ্যৈষ্ঠের দুপুর। দূরে একটা তৃষ্ণার্ত কাকের ‘কা’ ‘কা’ শব্দে সুনন্দের গলা শুকিয়ে আসছে। টেবিলের উপর বোতলগুলো সার সার খালি। মাকে বিরক্ত করতে মন সায় দেয় না। ডাকে– লালু একটু আয় তো। সাড়া নেই। এবার তৃতীয় স্বরে– লালু। নিস্তব্ধ। এবার সপ্তমে চড়িয়ে ডাকে– লালু। নাঃ ছেলেটা গেল কোথায় এই ভরদুপুরে। ছেলেটা মনে হয় ঘুমোচ্ছে। স্টোর রুমের দরজাটা খুলতেই আঁতকে ওঠে। উফ্। এ-কি দেখলাম। ক্যাম্প খাটে যেটা শুয়ে আছে সেটা কি? একটা কঙ্কাল! গোটা শরীরটা হিম হয়ে আসছে। পা দুটো অসাড়। কোনওরকমে মাতালের মতো টলতে টলতে নিজের ঘরে ঢুকতেই লালু বলে– দাদাভাই ডাকছিলে? একটু বাইরে গেছিলাম।

সুনন্দের ঠোট দুটো তখনও কাঁপছে। অনেক কষ্টে স্বর বেরোয় –তোর ঘরের খাটে ওটা কী?

–কী?

–একটা কঙ্কাল। ওটা কোথা থেকে এল?

তুই এনেছিস?

–কই না-তো।

চল তো দেখি! পা দুটো তখনও কাঁপছে। সাহসের ভাঁড়ার শূন্য। লালু হাতটা ধরে জোর করেই নিয়ে গেল। দরজা খোলাই ছিল। ক্যাম্প খাটের দিকে তাকাতেই তাজ্জব।

–একি! বিছানা শূন্য। ছাপা বেডশিট পরিপাটি করে সাইড মোড়া। এ বিছানায় আজ কেন, দু’চার দিনেও কেউ গা দিয়েছে বলে মনে হয় না। তাহলে তখন…। বার বার চোখ কচলে নেয় সুনন্দ। অদ্ভুত! সুনন্দ স্তম্ভিত। সমস্ত জমাট বাঁধা রক্ত যেন ঝরঝর করে নীচে নেমে যাচ্ছে। লালু হাতটা ধরে ঝাঁকুনি দিয়ে বলে– হি হি, হি হি। দাদাভাই তুমি ভুল দেখেছিলে। কাল রাতে মনে হয় ভূতের স্বপ্ন দেখেছ।

মধুছন্দার বয়স বেড়েছে। নানা কাজে ভুল হচ্ছে। রান্না ঘরে ঢুকে অাঁচলের খুট খুলতে গিয়ে কী মনে হয়, চালের টিন খুলেই তাজ্জব! টিন প্রায় ভর্তি চাল। ষোলো কিলোর টিন। তিন দিন খেয়েও টিন প্রায় ভর্তি। তেলের শিশির দিকে তাকিয়ে দেখে সামান্য খালি। কি হচ্ছে এসব! মাথাটা আমার গেছে! এত দিন সংসার করছি…।

লালুকে ডেকে বলে– তোকে কবে চাল আনতে বলেছি, আর ক’কেজি?

–কেন পরশু। এক কেজি চাল এনে দিলাম। দুশো সরষের তেল। মনে নেই মা? কেন?

–তা-তো ঠিক। কিন্তু টিন ভর্তি চাল। তেলের শিশি ভর্তি…।

–তাহলে চাল, তেল সব আগে থেকেই ছিল। তুমি ভুল করেই আবার আনতে দিয়েছ।

–হবেও হয়তো। মধুছন্দা ভাবে। নাই ঘরে চাহিদা বেশি। শুধু নাই নাই মন।

আওয়াজটা প্রথমে মধুছন্দাই পেয়েছে। দাদার ঘর থেকে একটা গোঙানির শব্দ। দৗড়ে গিয়ে দেখে গলা দিয়ে কেমন ঘড় ঘড় আওয়াজ। মুখ দিয়ে কালো রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। উদভ্রান্ত মধুছন্দা সুনন্দকে ফোন করে। সুনন্দ শিগগির ঘরে আয়। তোর মামার শরীর খুব খারাপ।

সুনন্দ বিভ্রান্ত। তর তর করে সিঁড়ি দিয়ে নীচে নেমে ছুটোছুটি করতে থাকে। যাকে দেখছে বলছে– দাদা একটা অ্যাম্বুল্যান্স জোগাড় করে দিতে পারেন? আচমকাই সুনন্দের নজরে পড়ে গলি দিয়ে এমার্জেন্সি হর্ন বাজিয়ে একটা অ্যাম্বুলেন্স তীব্র গতিতে এগিয়ে আসছে। বাঁদিকের জানালা দিয়ে একটা কচি হাত বার করে ইশারা করছে। সুনন্দ বুঝতে পারছে না। সামনে আসতেই গাড়ি থেকে বেরিয়ে এল লালু। বলে– দাদাভাই আমি রাস্তাতেই খবর পেয়েছি। তাই অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে এলাম।

নার্সিংহোমে যখন পৗঁছোল রাত দশটা। ডাক্তার এস দত্ত বললেন– পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে। রেডি থাকুন।

ভোর রাতে সুনন্দকে ডাক্তার বলে– কে হন ইনি?

– আমার মামা।

– সরি। উই আর কমপ্লিটলি হেল্পলেস।

অনেকদিন পর আজ সুনন্দ ঘুমিয়েছে। যাকে বলে একেবারে সাউন্ডস্লিপ। সেই ঘুমে সুনন্দের সামনে এক ছায়ামূর্তি। ছায়ামূর্তি বলছে – দাদাভাই আমি চলে যাচ্ছি। আমার কাজ শেষ। তবে বিশ্বাস করো। মামাবাবুকে আমি মারিনি। শুধু আমার স্বরূপ দেখিয়েছি। বোধহয় তাতেই…। সেটা তুমি স্টোররুমেই সেদিন দেখেছ। আমি তোমাকে হ্যালুসিনেশনের লেবেল সেঁটে দিয়েছিলাম। এছাড়া আমার কোনও গতি ছিল না। তোমার মামাবাবুর অঢেল টাকা। কলকাতায় দু’টো ফ্ল্যাট, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নিয়ে আনুমানিক প্রায় দশ কোটি। তোমরা হয়তো জানো না। মামাবাবু দুপুরে বেরিয়ে কোথায় যেতেন! রেসের মাঠে। অঢেল টাকা ওড়াতেন। আরও অনেক বাজে অভ্যেস ছিল। অথচ তোমাদের এই সংকটে পাশে দাঁড়াননি। আমি জানি তোমার ব্যাবসা এখন ডুবন্ত নৗকা। অবশ্য একটা মহৎ কাজ তিনি করেছেন। সেটা পরে বুঝবে। আর একটা কথা। টবের গাছেই আমি থাকতাম। টবটা এখুনি ফেলে দাও। গাছটা আমি নিয়ে গেলাম। ভালো থেকো।

সুনন্দ খাটে শুয়ে আছে। ভাবছে। বিষয়- লালুর আগমন নিঃস্্ক্রমণের হেতু। কলিং বেলটা ডিং ডং আওয়াজ। সুনন্দ দরজা খুলতেই কালো কোট প্যান্ট পরা এক অপরিচিত মানুষ। হাঁ করে তাকিয়ে থাকে। নীরবতা নব আগন্তুকই ভাঙে।

–নমস্কার। আমি অ্যাডভোকেট পার্থ সান্যাল। বারাসাত কোর্টে প্র্যাকটিস করি। এসেছি মধুছন্দা দেবীর কাছে। যদি ভুল না করি আপনি…।

– একমাত্র ছেলে সুনন্দ ঘোষ।

–একটু বসতে পারি?

– ওহ, নিশ্চই।

তাহলে মাকে একটু ডেকে দিন।

অ্যাডভোকেট বলছে– ড. ডি কে বাসু আমার ক্লায়েন্ট। উনি একটা উইল করে গেছেন। ওর সমস্ত সম্পত্তি দান করেছেন। সম্পত্তির আনুমানিক মূল্য প্রায় দশ কোটি। অবশ্য কিছু শর্ত সাপেক্ষে। ওর শেষ জীবনে যে বা যারা দেখভাল করবে সে সম্পত্তি তারই প্রাপ্য। এ-ও উল্লেখ করেছেন বর্তমানে তার বোন শ্রীমতী মধুছন্দা ঘোষ-এর বাড়িতেই বসবাস করছেন। ডিটেলসটা পরে নেবেন। সম্মতি থাকলে প্রসিডিংস-টা স্টার্ট করি?

সুনন্দ ধড়মড় করে উঠে পড়ে। ছুটে যায় ব্যালকনিতে। আশ্চর্য! কালকেও দক্ষিণা হাওয়ায় গাছটার পাতাগুলো পত পত করে দোল খাচ্ছিল। এখন গাছটা শুকিয়ে দড়ি হয়ে আছে। সুনন্দের চোখ দিয়ে ঝর ঝর করে জল পড়ে গাছের গোড়াটা সিক্ত করে দিল।

শুরু হতে চলেছে ‘বেহালা ক্ল্যাসিক্যাল ফেস্টিভ্যাল’

প্রতি বছরের মতো এবারও  বেহালা ব্লাইন্ড স্কুলের মাঠে, আগামী ৯ জানুয়ারি থেকে ১২ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে চলেছে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের উৎসব। ‘বেহালা ক্ল্যাসিক্যাল ফেস্টিভ্যাল’ শীর্ষক এই অনুষ্ঠানের আয়োজনে রয়েছে বেহালা সাংস্কৃতিক সম্মিলনী। অনুষ্ঠানটির নিবেদক  একটি জনপ্রিয় অলংকার প্রস্তুতকারী সংস্থা।

classical festival
Koushiki Chakraborty

এবার এই অনুষ্ঠান পা রাখল নবম বর্ষে। প্রতিদিন সন্ধে ৫টা ৩০মিনিট থেকে শুরু হবে এই অনুষ্ঠান এবং চলবে চারদিন।

‘বেহালা ক্ল্যাসিক্যাল ফেস্টিভ্যাল’-এর পথ চলা শুরু হয়েছিল ২০১৩ সালের  মার্চ মাসে এবং  পন্ডিত রবি শঙ্কর-কে স্মরণ করে। এবারের নবম বছরের উদযাপনে, সুরের ছটায় মঞ্চ আলোকময় করবেন পন্ডিত অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায়, পন্ডিত বিক্রম ঘোষ, পন্ডিত শুভেন চ্যাটার্জি, ভেঙ্কটেশ কুমার, পন্ডিত কুমার বোস, পন্ডিত শুভঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, পন্ডিত কুশল দাস, সরওয়ার হুসেন, রাকেশ চৌরাসিয়া, রাহুল শর্মা, কৌশিকি চক্রবর্তী, জ্যোতি গোহো, সংযুক্তা দাস সহ মোট ছাব্বিশ জন শিল্পী।

classical music
Bikram Ghosh

এই উৎসবের উদবোধনের দিন অর্থাৎ ৯ ই জানুয়ারী, নিবেদক সংস্থার পক্ষ থেকে  পন্ডিত অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায়কে প্রদান করা হবে ‘শ্যাম সুন্দর সর্বোত্তম সম্মান’। বিগত বছরগুলিতে  জীবনকৃতি  সম্মানে সম্মানিত হয়ে এসেছেন সমাজের নানা পেশার গুণীরা। উস্তাদ আমজাদ আলী খান, পন্ডিত বিরজু মহারাজ, আনন্দজি বিরজি শাহ, পি কে.ব্যানার্জি, পন্ডিত বিশ্বমোহন ভাট, কবিতা  কৃষ্ণমূর্তি, হরিহরণ প্রমুখ পেয়েছেন এই সম্মান।

musical evening
Behala Classical Festival

একটা সময় ছিল, যখন বেহালায় কোনও শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের  অনুষ্ঠান হতো না। সেই থেকেই এই অনুষ্ঠানের ভাবনা বলে জানিয়েছেন আয়োজকরা। অতএব, শীতের মরসুমে শহর কলকাতার এই অনুষ্ঠান, শাস্ত্রীয় সঙ্গীতপ্রেমীদের কাছে সত্যিই এক পরম প্রাপ্তি ঘটতে চলেছে বলেই মনে হয়।

musical evening
Behala Classical Festival

——

 

উত্তর ও দক্ষিণ ভারতীয় দুটি ডিশ

এই বহুগুণ সম্পন্ন সবজিটি কাঁচা, সেদ্ধ বা রান্না করে—যেভাবেই খান এর উপকার অশেষ৷এতে গুরুত্বপূর্ণ ভিটামিন, মিনারেল, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এবং অন্য ফাইটোকেমিক্যালও থাকে। এতে ক্যালোরির পরিমাণ খুবই কম।ফলে ওজন বেড়ে যাওয়া নিয়ে যাদের চিন্তা, তারাও নিশ্চিন্তে কপি খেতে পারেন৷ আজ কপির দুটি রেসিপি শেয়ার করছি আমরা৷ একটি উত্তর ভারতীয়, আরেকটি দক্ষিণ ভারতীয়৷

স্পাইসি গোবি ইন গ্রিন কারি

উপকরণ- ২টো ফুলকপির টুকরো, ১/৪ ছোটো চামচ হলুদগুঁড়ো, ১কাপ ধনেপাতা, ১০-১২টা পালংপাতা, ২টো কাঁচালংকা, ১ ইঞ্চি আদার টুকরো, ১/২ ছোটো চামচ কালোজিরে, ৪ কোয়া রসুন, ৩ বড়ো চামচ রিফাইন্ড অয়েল, নুন স্বাদমতো।

প্রণালী-ফুলকপির টুকরো ফুটন্ত জলে ৫ মিনিট ভিজিয়ে রাখুন। এবার জল থেকে তুলে নিন। ননস্টিক প্যানে তেল গরম করুন। হলুদগুঁড়ো দিয়ে নাড়াচাড়া করুন। ধনেপাতা, পালংশাক, কাঁচালংকা, রসুন একসঙ্গে মিক্সিতে পেস্ট করুন। তেলে এই পেস্ট কষতে থাকুন। ফুলকপির টুকরো দিয়ে নাড়াচাড়া করুন যতক্ষণ না মশলা কপির গায়ে ভালো ভাবে লেপটে যায়। গা মাখা হলে নামিয়ে নিন।

 Gobhi appum

গোবি অপ্পম

উপকরণ – ১/৪ কাপ ফুলকপি কুচি করা, ১/২ কাপ পেঁয়াজ মিহি করে কাটা, ২টো কাঁচালংকা কুচি করা, ১/৪ কাপ লাল, হলুদ ও সবুজ ক্যাপসিকাম কুচি করা, ১ বড়ো চামচ ধনেপাতাকুচি, ১ কাপ রেডিমেড ধোসাগুঁড়ো, ১ বড়ো চামচ রিফাইন্ড তেল, নুন স্বাদমতো।

প্রণালী – ধোসা মিক্স পাউডার জল দিয়ে গুলে নিন। এর মধ্যে সমস্ত সবজি ও নুন দিন। অপ্পম বানানোর পাত্রে তেল বুলিয়ে প্রতিটা ছাঁচে এই মিশ্রণটা দিন। অল্প অল্প তেল দিয়ে এপিঠ ওপিঠ সেঁকে নিন। গোবি অপ্পম তৈরি।

পড়ার জন্য সীমাহীন গল্প-নিবন্ধসাবস্ক্রাইব