মনকাড়া কাবিনি

খোঁজটা পেয়েছিলাম বেঙ্গালুরু বেড়াতে গিয়ে। অপূর্ব এক বনভূমির, যার নাম কাবিনি। বেঙ্গালুরু থেকে স্টেট হাইওয়ে ধরে গাড়ি ছুটিয়ে, মাইসোর শহর ঢোকার আগে পথ বদলে এইচডি কোটে রোড অনুসরণ করতে হবে। এইচডি কোটে ঢোকার কিলোমিটার দুয়েক আগে, রাস্তা বদলে আরও ১২ কিলোমিটার গেলেই পৌঁছে যাওয়া যায় কাবিনি রিভার লজ-এ।

কাবিনি বা কপিলা যে-নামেই ডাকুন না কেন, এ নদীর উৎসমুখ কেরলে। বান্দিপুর আর নাগরহোল জঙ্গল-মহলের মধ্যে দিয়ে বয়ে, মিশেছে কাবেরীর সঙ্গে। এর স্রোতেই তৈরি হয়েছে বিশাল জলাধার কাবিনি ড্যাম। কাবিনি ফরেস্ট রিজার্ভ পর্যটকদের বরাবরের পছন্দের জায়গা। আর আপনি সেলিম আলির ভক্ত হলে তো কথাই নেই!

Kabini Dam

আমরা ভোর ছ’টায় বেঙ্গালুরু থেকে রওনা দিয়ে, সকাল সাড়ে দশটায় এসে পৌঁছোলাম রিভার লজের দোরগোড়ায়। যদিও চেক-ইন-টাইম-এর কিছু আগেই পৗঁছে গেছি, তবু ম্যানেজারের আতিথেয়তায় আমাদের তাঁবুতে ঢুকে পড়া গেল আধঘন্টার মধ্যেই।

দক্ষিণ ভারতীয় থালি ছিল দ্বিপ্রাহরিক আহারে। ঠিক দুপুর সাড়ে তিনটেয় ডাকা হল আমাদের, জিপ সাফারির জন্য। নাগরহোল বনাঞ্চলের রোমাঞ্চকর অরণ্যযাত্রায়, এক নজরেই প্রেমে পড়ে গেলাম জঙ্গলটার। কিছু বন্য বরাহ, হরিণের ঝাঁক, ময়ূর, প্রচুর বাঁদর, বুনো কাঠবেড়ালি এবং কপালজোরে গাছের উপর একটি চিতাও নজরে পড়ল। কাছাকাছি একটি এলিফ্যান্ট ক্যাম্প-এ কিছু কুনকি হাতি দেখে ফিরে এলাম। গাইড বলল এই বনে প্রায় ১৯০০ হাতির বাস, আর আছে প্রায় ২০০টি বাঘ ও চিতা।

Travel Kabini

সাফারি-তে ঘন্টা তিনেক সময় লেগেছে। সন্ধেবেলায় প্রায় কৌতূহল মেটাতেই আয়ুর্বেদ বডি মাসাজ-এর অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করলাম, কিন্তু সেটা খুব সুখকর অভিজ্ঞতা নয়। রাতের খাবার খাওয়া হলে একদল পর্যটক ক্যাম্প ফায়ারের হইহই-তে মেতে উঠল, বাকিরা গেলাম কাবিনি নদীর ধারে। চাঁদের আলোয় সেই নদী দেখার অভিজ্ঞতা, ভাষায় বর্ণনা করা যায় না।

কাবিনি একসময় মাইসোরের রাজাদের এবং পরবর্তী সময়ে ব্রিটিশ জেনারেলদের প্রিয় মৃগয়াক্ষেত্র ছিল। বর্তমানে ২টি ৭ বেডরুমের ব্লক, ৮টি কটেজ ও ৫টি তাঁবু নিয়ে গড়ে উঠেছে এই লজ, যেটির রক্ষণাবেক্ষণ করে কর্ণাটক সরকার। কাবিনি নদীর স্নিগ্ধ গতি আর এই শান্ত বনাঞ্চল, পর্যটকদের কাছে অত্যন্ত প্রিয় এক ছুটির ঠিকানা। কাবিনি ড্যাম লাগোয়া এই বনাঞ্চল পশুদের বিচরণ ক্ষেত্র হয়ে ওঠে গ্রীষ্মকালে। নদীর জল কমে গিয়ে যখন সবুজ শ্যামল তৃণভূমি জেগে ওঠে।

পরদিন ভোরে আমাদের বোট-রাইড-এ নিয়ে যাওয়া হল। মোটর চালিত বোট-এ ৪ জনের বসার ব্যবস্থা। কাবিনি নদীর বুক চিরে যেতে যেতে পাড়জোড়া বনস্থলিতে বন্য জন্তু দেখার সুযোগ মেলে। কূল ছুঁয়ে যাওয়া সেই জঙ্গলেই চোখে পড়ল প্রায় ২০টি হাতির একটি দঙ্গল। বাচ্চা-বুড়ো মিলে তাদের জলকেলি দীর্ঘক্ষণ আচ্ছন্ন করে রাখল আমাদের। আরও কিছুটা এগিয়ে চোখে পড়ল গাছে এক বৃহৎ পাইথন। বাইনোকুলারে চোখ রেখে দেখলাম অজস্র পাখি। মালাবার পায়েড ঈগল, ফ্লাওয়ার পেকার, জাকানা, হোয়াইট নেকড্ স্টর্ক, পাহাড়ি ময়না, বুলবুল, বারবেট প্রভৃতি। নদীর চরায় পাথরের উপর দেখা গেল এক বিশালাকার কুমির রোদ পোহাচ্ছে।

travel

 

শেষদিন ভোরে আমাদের একটি ওয়াচটাওয়ারে নিয়ে যাওয়া হল। প্রচুর চিতল হরিণ, গউর, কচ্ছপ ও একদল বন্যকুকুরের দেখা পেলাম। এদিন আমাদের প্রাতরাশ সেরেই কাবিনি ছেড়ে চলে যাওয়ার কথা। ফেরার পথে কাবিনি জলাধার দেখে নিলাম। নরম রোদে জলে সাঁতার কাটা একঝাঁক রাজহাঁস চোখে পড়ল। বাতাসে শীতের ছোঁয়া। কাবিনিকে বিদায় জানাতে মন চায় না। অরণ্যের দিকে চোখ রেখে অনুচ্চারিত বিদায়সম্ভাষণটা রেখে এলাম সবার অগোচরে।

সারমেয়পুরাণ

ছোটো বোন বিদিশার হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ার খবর, বিস্ময়বিমূঢ় করে দিল নন্দাকে। তা-ও যেমন-তেমন রোগ নয়, ক্যানসার। দেশটার নাম আমেরিকা, এই যা এক বাঁচোয়া! আধুনিক চিকিৎসার যাবতীয় সুযোগ সেখানে হয়তো পাওয়া যাবে! কিন্তু, বিদিশার অসহায়ত্ব নন্দাকে কষ্ট দিল। অথচ, ফোন করে দু’বেলা খবর নেওয়া ছাড়া তো অন্য কোনও উপায়ও নেই! ভারত থেকে আমেরিকা যেতে হ্যাপা কত! কত ধরনের প্রমাণপত্র লাগে! যাতায়াত-খরচ না হয় বাদই রইল। তবু সে-ও তো বিপুল।

এই দুঃসময়ে বিদেশবিভুঁইয়ে বোনের পাশে থাকতে না পারার কষ্টটা ভিতরে ভিতরে অস্থির করে তুলল নন্দাকে। বিদিশার স্বামী দেব, প্রায়ই ফোন করে বিদিশার খবরাখবর জানায়। কিন্তু কেবল মুখের কথায় কি কোনও মানসিক উদ্বেগ দূর হওয়ার? নন্দার থেকে মাত্র একবছরের ছোটো বিদিশা। দুজনে পিঠোপিঠি বেড়ে উঠেছে। ছোটোবেলার দিনগুলি একে অন্যের বান্ধবী হয়ে কেটেছে। বিদিশার যখন বিয়ের সম্বন্ধ আসে এবং জানা যায় বিয়ের পর স্বামীর সঙ্গে ওকেও বিদেশে চলে যেতে হবে, কত রাত যে ঘুমোতে পারেনি সে! চোখের জল ফেলেছে। বিদিশার বিয়ের সময়ও, সকলে যখন আনন্দ করছে, সে কিছুতেই নিজেকে স্বান্তনা দিতে পারেনি। আত্মীয়স্বজনরা বলেছেন, ‘কী মেয়ে রে তুই? এখন যদি কেঁদে ভাসাস, বিদিশার মনের অবস্থাটা কি হবে, ভাবতে পারছিস? তার প্রাণের এত কাছাকাছি থাকা বিদিশা আজ ক্যানসারে ভুগে অসহায়। এ কথা জেনেও কীভাবে শান্ত থাকে নন্দা?

সে দেশের নিয়ম অনুযায়ী, যে-কেউ গিয়ে আমেরিকায় পা রাখতে পারে না। অনুমতি লাগে। কারণ দেখাতে হয়। দু-দেশেরই নানারকম আইনি বাধানিষেধ থাকে। নন্দার আমেরিকা যাত্রা বিদিশা ‘স্পনসর’ করায় শেষপর্যন্ত সমস্যার জট খুলল।

নন্দা আমেরিকায় পৌঁছোনোর আগেই বিদিশা হাসপাতালে দীর্ঘ চিকিৎসার পর বাড়ি ফিরে এসেছে। নন্দা দেখে চমকে উঠল। এ কী চেহারা হয়েছে বিদিশার! ভীষণ রোগা হয়ে গিয়েছে এক লপ্তে। চোখের তলায় কালি পড়েছে। মাথায় কালো চুলের ঢল নেই মোটে। তাতে তার রুগ্নতা স্পষ্ট হয়েছে আরও। শরীর অত্যন্ত দুর্বল। হাসপাতালের ডাক্তার কড়া গলায় বলে দিয়েছেন, এখন বেশ কয়েকমাস শরীরকে কোনওরকম স্ট্রেস দেওয়া চলবে না। আসলে, বিদিশা রয়েছে হাসপাতালের ডাক্তারবাবুদের কড়া নেকনজরে। পনেরো দিন অন্তর ওকে বেশ কয়েকবার পরীক্ষা করে তবে ওঁরা বুঝবেন, ইমপ্রুভমেন্ট সত্যিই কিছু হচ্ছে কিনা। তবে ফের স্বাভাবিক জীবনে ফেরার প্রশ্ন!

নন্দা দেখল, দেব কোথাও কোনও খামতি রাখেনি। বিদিশার জন্য চব্বিশ ঘণ্টার  অ্যাটেন্ড্যান্ট রয়েছে। মাঝারি উচ্চতার কমবয়সি কালো মেয়ে, ধবধবে পোশাক পরে সর্বক্ষণ বিদিশার ঘরে বসে থাকে। রান্নার লোক আগে থেকেই ছিল। পরিবার বলতে তো বিদিশা, দেব আর তাদের পোষা একটি কুকুর। যাকে বলে ঝাড়া হাত-পা সংসার।

ইতিমধ্যেই দেব অবশ্য অসাধ্যসাধন করেছে। আমেরিকান রাঁধুনিকে সে আলুপোস্ত, উচ্ছে ভাজা, মাছের ঝোল করা শিখিয়েছে বেশ যত্ন করে। হেসে বলল, ‘আমার বন্ধুরা বলে, এই মেয়েটিকে আর বেশিদিন আমাদের রান্নাঘরে আটকে রাখা যাবে না। যা রান্না করছে ইদানীং, তাতে ছোটোখাটো বাঙালি রেস্তোরাঁ এখনই খুলে বসতে পারেঃ!’

‘আর, তখন আমাদের জন্য ফ্রি খাওয়া, তার উপর হোম ডেলিভারি, কী তাই না অ্যানি?’ গৃহকর্তার রসিকতায় অ্যানি নামের কৃষ্ণকলি মেয়েটি সাজানো সাদা দাঁত দেখিয়ে হাসল।

বিদিশার পরিবারে মানুষ কেবল দুজন। সে আর দেব। আর একজন আছে অবশ্য, সে মানুষ না হলেও যত্নআত্তির দিক দিয়ে মানুষের থেকে ঢের এগিয়ে। সেটি একটি কুকুর। বাদামি রঙের লোমওলা সরল চোখের কুকুরটির নাম বিদিশাই সাধ করে রেখেছে, কায়া। নন্দাকে কায়ার বোধহয় বেশ পছন্দই হল। কেন-না থেকে থেকেই সে নন্দার চারপাশে লোমশ লেজ দুলিয়ে তার আনন্দ প্রকাশ করে গেল। আমেরিকান কুকুর হলেও আনন্দ প্রকাশের ধরনটা আদিম ও অকৃত্রিম।

কেবল কায়ার পরিচর্যাতেই একজন দক্ষ লোকের দরকার! বিদিশা নিজের হাতে এসব করত। সে অসুস্থ থাকায় অতঃপর নন্দাতেই বর্তালো কায়ার ভার। আমেরিকায় পৌঁছোনোর পর চতুর্থ দিনই সন্ধ্যায় কায়াকে নিয়ে ঘুরতে বের হল নন্দা। এ দেশে কুকুর নিয়ে রাস্তা চলারও বেশ কিছু নিয়মকানুন আছে। সেদিন বিদিশা, গোটা দুপুর ধরে নন্দাকে পাশে বসিয়ে রীতিমতো ক্লাসই নিয়ে ফেলল একটা।

বলল, ‘সবসময় লক্ষ্য রাখবি কায়ার উপর। কাউকে দেখে যেন ঘেউ ঘেউ না করে। কায়ার গলার চেনটা সবসময় শক্ত করে হাতে ধরে থাকবি। ছাড়বি না। কায়া যেন রাস্তা নোংরা না করে। নোংরা করা মানে, কী বলতে চাইছি, বুঝতে পারছিস তো? আর-একটা ব্যাপার খেয়াল রাখবি। কায়ার গলার নম্বর প্লেটটা যেন লাগানো থাকে। দস্তানা আর শক্ত একটা কার্ড সঙ্গে রাখতে ভুলিস না।’

বিদিশার শেষ কথাটায় অবাক হল নন্দা। বলল, ‘বাকি সবই তো বুঝলাম। কিন্তু, দস্তানা আর কার্ড কীসের জন্য লাগবে, সেটা তো বুঝলাম না!’

‘সেটা তোকে বলিনি বোধহয়, তাই না?’ বিদিশা ম্লান হেসে বলল, ‘কুকুর যদি রাস্তা নোংরা করে ফেলে তাহলে এ দেশের নিয়ম অনুযায়ী কুকুরের মালিককেই সেই নোংরা পরিষ্কার করে দিতে হয়, তা-ও নিজের হাতে। ওই শক্ত কাগজে তুলে কাছাকাছি কোনও ভ্যাটে ফেলে আসতে হয়। এটা না করলে কী হবে জানিস? মোটা টাকা ফাইন!’

ভাবতেই গুলিয়ে উঠল নন্দার গোটা শরীরটা। বলল, ‘আরে থাম! থাম দিকিনি! আমাদের দেশে কুকুর তো কোন ছার, মানুষ পর্যন্ত যেখানে-সেখানে… কই সেখানে তো ফাইন দিতে হয় না! বেশি উপদেশ দিস নাঃ!’

‘উপদেশ দিচ্ছি না রে, এখানকার আইনের কথা বলছি,’ বিদিশা শান্ত গলায় বলে, ‘এখানকার আইন মানুষের পাশাপাশি পোষা জন্তুজানোয়ারদেরও সমানাধিকার দিয়েছে। এখানে তো লোকে নিজেদের সন্তানদের মতোই এদের ভালোবাসে। অন্য কারু পোষা কুকুরের গায়ে তুই এখানে হাত পর্যন্ত দিতে পারবি না। কত কোর্টকাছারি পর্যন্ত হয়ে যায় এই সামান্য ঘটনা নিয়ে! ফাইন তো আছেই!’

অসহিষ্ণু গলায় নন্দা বলে ওঠে, ‘বুঝেছি, বুঝেছি। আচ্ছা, তাহলে বেরোচ্ছি এখন। যবে থেকে এসেছি, ঘরেই বন্ধ হয়ে আছি।’ আজ একটু মুক্ত হাওয়ায় ঘুরে আসি। দেখে আসি দেশটা কেমন!’

কায়ার গলার চেনের প্রান্ত শক্ত করে ধরে রাস্তায় নেমে এল নন্দা।

এ দেশে এখন বসন্তকাল। গাছে গাছে রঙিন ফুল ফুটে আছে। বাচ্চারা পার্কে ছুটোছুটি করে খেলাধূলা করছে। বেশ কয়েকজন বৃদ্ধ মানুষও, কেউ হাতের লাঠিতে ভর দিয়ে, কেউ-বা এমনিই, সান্ধ্যভ্রমণে বেরিয়েছেন। মনে মনে খুব খুশি হয়ে উঠল নন্দা। কায়ার গলার চেন হাতের মুঠিতে নিয়ে হেঁটে গেল বেশ খানিকটা দূর। কায়াও ছুটছিল মনের আনন্দে। চেনে টান পড়ছিল জোরে। পরে বোঝা গেল তার এত উৎসাহের কারণটা।

উলটোদিক থেকে এক বৃদ্ধ ভদ্রলোক আসছিলেন। তার হাতে ধরা চেনে একটি সাদা বেড়াল। সেটিকে দেখতে পেয়েই রাগে লাফালাফি করতে শুরু করল কায়া। এক ঝটকায় নন্দার হাত ছাড়িয়ে নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল বেড়ালটির উপর। নন্দার মনে পড়ে গেল বিদিশার কথা। কায়ার ঘেউ-ঘেউ শুনে ভয়ে বুক কেঁপে উঠল তার সাদা বেড়ালটির গায়ে উদ্যত থাবার আঁচড় কাটতে লাগল কায়া। বেড়ালটি আকারেও ছোটো। সে কায়ার শক্তিশালী মুষ্টিযোগের সামনে কি দাঁড়াতে পারে? অচিরেই সেটিকে মাটিতে ফেলে তার উপর এক-পা রেখে বিজয়ীর ভঙ্গিমায় দাঁড়াল কায়া।

কায়ার কাণ্ড দেখে বৃদ্ধ ভদ্রলোক রাগে গজরাতে লাগলেন। একেই এদেশের মানুষজন ফরসা। তার উপর ক্রোধে তার মুখ আরও থমথমে আর লাল দেখাতে থাকল। বিরস মুখে ভদ্রলোক প্রায় চিৎকার করে উঠলেন, ‘আপনার কুকুরটাকে বাঁধুন। এখানকার আইন জানা নেই আপনার?’

কায়া তখনও ফুঁসছে। নন্দা কোনওরকমে তার গলার চেন ধরে টেনে তাকে সামলায়। তারপর কাঁচুমাঁচু মুখে বলে ওঠে, ‘আমাকে মাপ করবেন। আমি খুব দুঃখিত!’

ভদ্রলোক সে কথায় কোনও আমল না দিয়ে, পকেট থেকে এক টুকরো কাগজ আর পেন বের করে বলে উঠলেন, ‘আপনার ঠিকানা আর ফোন নম্বরটা আমায় দিন। পুলিশকে তো বিষয়টা জানাতে হবে!’

ভদ্রলোক বলতে গেলে বাধ্যই করলেন ঠিকানা ও ফোন নম্বর দিতে। আর বেশি দূর হাঁটার মানসিকতাটাই রইল না। বাড়ির পথ ধরল নন্দা। বেশ বুঝতে পারছিল, কায়ার এমন কাণ্ডের জন্য বিদিশা আর দেবকে অযাচিতভাবে সমস্যায় পড়তে হবে! নিজেকে অপরাধীও মনে হল, কেন-না এই ঘটনা ঘটার জন্য সে নিজেও অনেকটাই দায়ী।

বিদিশা সব শুনে ম্লান হেসে বলল, ‘কায়াটা খুব অসভ্য হয়ে গেছে ইদানীং। কী আর করা যাবে! এখন এই নিয়ে একটা কেস হবে, ফাইন দিতে হবেঃ!’

আধঘণ্টাও হয়নি, তারই মধ্যে কলিংবেল বেজে উঠেছে। দরজা খুলে নন্দা দেখে সেই বৃদ্ধ ভদ্রলোক, সঙ্গে দুজন গোমড়ামুখো পুলিশ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। পুলিশ দুজন কায়ার লাইসেন্স দেখতে চাইল। এখানে পোষ্যপ্রাণী রাখতে গেলেও লাইসেন্সে লাগে। লাইসেন্সে অনৈতিক কিছু বেরোয় না। ফলে তারা কায়ার কেস হিস্ট্রির ফাইলটা নিয়ে আসতে বলে। কেস হিস্ট্রির ফাইলে কায়ার যাবতীয় প্রেসক্রিপশন, খাবারদাবারের বিবরণ ইত্যাদি রয়েছে। ফাইলটা উলটেপালটে দেখে ফিরে গেল তারা।

নন্দা হাঁফ ছেড়ে ভাবল, এখানেই ঘটনাটার পরিসমাপ্তি ঘটে গেল! যদিও মোটেই সেরকম কিছু হল না। পরের দিন যথারীতি কোর্ট থেকে নোটিশ পৌঁছোল বাড়িতে। সঙ্গে বৃদ্ধ ভদ্রলোকের পোষা বেড়ালটির ডাক্তার-খরচ, ওষুধপত্রের বিল। পাঁচশো ডলার জরিমানার সঙ্গে এই দুশো ডলারও গুনাগার দিয়ে, তবে ছুট মিলল। জরিমানার কারণ, পোষা কুকুর অন্যের বেড়ালকে আক্রমণ করেছে এবং আক্রমণকারী কুকুরের মালিকও তার দায়বদ্ধতা সঠিকভাবে পালন করেননি।

কায়াকে একদিন বাইরে বেড়াতে নিয়ে যাওয়ার জন্য এত টাকা অনাবশ্যক গচ্চা দিতে হবে, এ কথা স্বপ্নেও ভাবেনি নন্দা। হতাশ গলায় সে বিদিশাকে বলল, ‘তোদের আমেরিকা সত্যি এক আজব দেশ! কুকুর তো ঘেউ-ঘেউ করবেই। না তো কি সে ম্যাও-ম্যাও করবে? কাউকে কামড়ায়নি কিছু না, কেবল একটা বেড়ালের গায়ে থাবা তুলেছে। তাতেই এতবড়ো ডাক্তারি-বিল? মোট কত দিতে হল বল তো?’

‘সাতশো ডলার, মানে মোটামুটি ২৮ হাজার টাকা’, বিদিশা অল্প হেসে বল ওঠে।

‘বলিস কী?  ২৮ হাজার?  হার্ট অ্যাটাক হওয়ার জোগাড় দেখছি!’

‘এখানে এরকমই হয়। তুই এসব নিয়ে বৃথা চিন্তা করিস না তো!’

বিদিশা বলে ওঠে, ‘এরপর থেকে কেবল মনে রাখবি, কায়াকে চেনে বেঁধে রাখতে হবে শক্ত করে, ছাড়া চলবে না।’

নন্দা মাথা নেড়ে চিন্তিত মুখে বলল, ‘হ্যাঁ, এরপর থেকে আরও সতর্ক থাকতে হবে এ ব্যাপারে। আর এমন ভুল হবে না!’

‘তবে, এবার আমরা অল্পেই ছাড়া পেয়েছি, বুঝলি? বাঁচোয়া এটাই যে, কায়া ওই বেড়ালটিকেই কেবল আক্রমণ করেছে। যদি এর ফলে কোনওভাবে বৃদ্ধ ভদ্রলোকের চোট লেগে যেত, তাহলে কয়েক হাজার ডলারের জরিমানা হওয়াও কোনও আশ্চর্যের বিষয় হতো না।’– বিদিশা ম্লান হেসে জানায়।

হেসে ফেলে নন্দাও, বলে, ‘বাঃ রে আমেরিকা, ধন্য তুমি। ধন্য তোমার দেশের কুকুরেরা।’

কায়াকে নিয়ে বেড়াতে বেরোনো নন্দার রোজকার কাজ হয়ে পড়ল। তবে এখন আগের চেয়ে সে অনেক সতর্ক থাকে। কোনও অবস্থাতেই কায়ার গলার চেন ধরা মুঠি আলগা হতে দেয় না। অন্য দিকে মন যেতে চাইলেও দৃষ্টি কেবল কায়ার উপরই নিবদ্ধ থাকে।

আজকাল নন্দার মনে হয়, কায়াকে নিয়ে বেড়াতে বেরোনোও একটা সাধনার মতো। যেহেতু, সমস্ত চেতনা, ধ্যান, ভাবনা কেবল কায়ার উপরেই নিবন্ধ থাকে। নন্দার সামান্য ভুলচুকে, কায়া কী কাণ্ড ঘটিয়ে বসবে তা কে জানে!

দিন কয়েক আর কোনও ঘটনা ঘটল না। কায়াও শান্তশিষ্টের মতো রাস্তা চলে। নন্দারও কোনও সমস্যা হয় না। কিন্তু একদিন আবার একটা অপ্রীতিকর বিষয়ের মুখোমুখি হতে হল নন্দাকে।

কায়ার শরীরটা সেদিন সকাল থেকেই খারাপ যাচ্ছিল। দেব ওকে ডাক্তারের কাছেও নিয়ে গেল। বিকেলে অবশ্য ওকে দেখে ততটা খারাপ মনে হচ্ছিল না! বিদিশা বলল, ‘কায়াকে নিয়ে একটু ঘুরে আয়। ওর শরীরটা তো এখন ভালো বলেই মনে হচ্ছে!’

নন্দা বের হল কায়াকে সঙ্গে নিয়ে। অল্প কিছু দূর হেঁটেই বোঝা গেল কায়ার শরীরটা এখনও সম্পূর্ণ সারেনি। রাস্তার একপাশে গিয়ে বমি করল কায়া। তারপর অসহায় চোখে ধুঁকতে থাকল। নন্দা নিজেও অসহায়বোধ করতে লাগল। একে তো রাস্তাটা নোংরা করে ফেলেছে কায়া, তার উপর ওর শরীরের অবস্থাটাও মোটেই সুবিধার বলে মনে হচ্ছে না। তার মনে পড়ল বিদিশার সাবধানবাণী। কায়ার বর্জ্য তাকেই সাফ করে দিতে হবে। একে তো সেটা মোটেই কোনও সুখকর অভিজ্ঞতা হবে না, তার উপর কায়ার চেনটি হাতে ধরে রেখে রাস্তা সাফ করা একরকম অসম্ভব। কায়াকেও কিছুতেই ছেড়ে রাখা চলবে না। বড়োই সমস্যার মধ্যে পড়ে গেল নন্দা। ত্রস্ত চোখে চারপাশটা একবার দেখল। শুনশান রাস্তা। জনমনিষ্যি চোখে পড়ে না। এখন, মানে মানে সরে পড়লেও কেউ হয়তো দেখবে না। যেমন ভাবনা, তেমন-ই কাজ। কায়ার গলার চেন শক্ত মুঠিতে নিয়ে নন্দা বাড়ির দিকে ফিরল। সে খানিকটা নিশ্চিন্ত, কেন-না রাস্তাটা নোংরা হতে সম্ভবত দেখেনি কেউ। সাতপাঁচ ভেবে পা বাড়াতে গিয়ে আটকে গেল নন্দা। সে স্পষ্ট দেখল, জনশূন্য রাস্তাকে পিছনে রেখে বিরাট চেহারার উর্দিধারী এক পুলিশ তারই দিকে এগিয়ে আসছে। তার ভারী বুটের শব্দ ক্রমশ জোরালো হয়ে এল। জড়ানো ইংরেজিতে গম্ভীর গলায় লোকটি বলল, ‘আপনার কুকুর রাস্তাটা নোংরা করল দেখেও আপনি সেটা সাফ না করে চলে যাচ্ছেন? এ দেশের আইন অনুযায়ী এটা অপরাধ। আপনাকে এজন্য জরিমমানা করা হবে। আগে নোংরাটা সাফ করুন তারপর ফাইন দিন।’

নন্দা কাতর চোখে তাকাল লোকটির দিকে। তারপর কায়াকে দেখিয়ে বলল, ‘ওকে একটু ধরুন। আমি পরিষ্কার করে দিচ্ছি। আসলে আমি বাইরে থেকে এ দেশে এসেছি। এখানকার সব আইনকানুন আমার জানা নেই।’

এবার লোকটির পাথুরে মুখে মৃদু হাসির আভাস দেখা গেল। সে বলল, ‘আপনি ইন্ডিয়া থেকে এসেছেন, তাই না? সেই জন্যেই…!’ বলে সে বিজ্ঞের মতো মাথা নাড়ে।

‘সেই জন্যেই… কী?’ অবাক হয়ে প্রশ্ন করে নন্দা।

‘সেই জন্যেই পরিচ্ছন্নতার কোনও ধারণাই নেই।’

নন্দার আঁতে লাগল। রুখে দাঁড়িয়ে বলল, ‘কতটুকু জানেন আপনি ইন্ডিয়া সম্পর্কে? পরিচ্ছন্নতা আমরাও ভালোবাসি!’

‘অনেকটাই জানি,’ লোকটি বলে ওঠে, ‘আপনার দেশে মানুষজন রাস্তায় দাঁড়িয়ে প্রকাশ্যে নোংরা করে। সরকারও কিছু বলে না।’

লোকটির কথা অনেকাংশেই সত্যি। নন্দা তাই চুপ করে গেল। তাড়া দিল পুলিশটি, ‘তাড়াতাড়ি করুন। নোংরা পরিষ্কার করে কার্ডটা ভ্যাটে ফেলে দিয়ে আসুন।’

নন্দা যন্ত্রচালিতের মতো সেটাই করে। কাজ হয়ে গেলে পুলিশকর্মীটি ফোন নম্বর আর বাড়়ির ঠিকানা জেনে নিল।

বাড়িতে ফিরে বিদিশাকে গোড়া থেকে সব ঘটনা জানিয়ে নন্দা কাঁদোকাঁদো গলায় জিজ্ঞেস করলছ ‘এবার কী হবে রে বিদিশা?’

‘কী আবার হবে,’ বিদিশা প্রবোধ দেয়, ‘কোর্ট থেকে নোটিশ আসবে। আবার ফাইন দিতে হবে!’

‘উফ্,  এ দেশের লোকগুলোকে কি সুখে থাকতে ভূতে কিলোয়, যে, কুকুর পুষতে যায়? তোরাই বা কী? বিচ্ছু কুকুর পুষেছিস একটা,’ কায়ার দিকে তাকিয়ে অগ্নিবর্ষণ করে নন্দা, ‘এটার নাম কায়া পালটে জরিমানা করে দে–!’

সোফার একপাশে আধশোয়া হয়ে, নির্লিপ্ত মুখে কায়া জুলজুল করে নন্দাকে দেখতে থাকে।

পরের দিনই কোর্ট থেকে নোটিশ এল দেবের নামে। একশো ডলার জরিমানা, সেইসঙ্গে শ্লেষ দু-চার লাইন ‘এটি আপনার প্রথম অপরাধ। তাই কেবল জরিমানা আদায় করেই আপনাকে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে। যদি দ্বিতীয়বার এমন অপরাধ করা হয়, তাহলে আপনার কুকুর-পালকের লাইসেন্স কেড়ে নেওয়া হবে।’

দেখতে দেখতে সপ্তাহ ফুরিয়ে এল। এ দেশে উইক এন্ড-টা বড়োই হাস্যে-লাস্যে কাটায় সকলে। কায়ার শরীরটাও এ’কদিনে বেশ সেরে উঠেছে। রবিবার সকালে ওকে ডগ পার্লারে নিয়ে যাওয়া ঠিক হল। বিদিশা বলল, ‘দেব তো যাচ্ছেই। তুই-ও যা। গিয়ে দেখে আয়, কুকুরদের গা-হাত-পা কী করে সাফসুতরো করে ওরা।’

বিদিশা হেসে বলল, ‘অবশ্যই যাব। আমেরিকার কুকুরদেরও বড়ো হিংসে হচ্ছে রে–!’

ডগ পার্লার দশ কিলোমিটার দূরে। কায়া বোধহয় বুঝতে পারছিল ওর যত্নআত্তির ব্যবস্থা হচ্ছে। গাড়িতে যেতে যেতে আনন্দে লেজ নাড়তে থাকল প্রবল বেগে।

পার্লারে প্রথমে কায়ার পেডিকিয়োর আর ম্যানিকিয়োর করা হল। থাবার নীচে থাকা নখগুলি কেটে এবড়োখেবড়ো ভাব ঘুচিয়ে দেওয়া হল। এবার কায়া গেল শ্যাম্পু-বাথ নিতে। ড্রায়ার দিয়ে গায়ের জল শুকোনো হল। ব্রাশ দিয়ে ঝেড়ে দেওয়া হল রোম। সবশেষে গলায় বেঁধে দেওয়া হল সুন্দর লাল রঙের একটি বো। পরিচর্যার পর দিব্যি ফুরফুরে মেজাজে বাইরে এল কায়া। দেব আর নন্দা কাউন্টারে গেল পরিচর্যার খরচ জমা দিতে। সুন্দরী রিসেপশনিস্ট চাঁপার কলির মতো মার্জিত আঙুলে পাঁচশো ডলার গুনে নিয়ে কম্পিউটারে বিল বানিয়ে দিলেন।

বিলটা হাতে নিয়ে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ল নন্দা। পাঁচশো ডলার মানে কুড়ি হাজার টাকা। ভাবা যায়?

এবার কায়া খাওয়াদাওয়া করবে। ডগ পার্লার থেকে বেরিয়েই ডগ মল। সেখানে কায়ার জন্য দামি খাবার কেনা হল। চোখ ঘুরিয়ে মলটাকে দেখে হতবাকই হয়ে গেল নন্দা। কেবল কুকুরদের জন্য এমন এলাহি বন্দোবস্ত? কী নেই সেখানে? কুকুরদের খাবারদাবার থেকে শুরু করে রূপচর্চার জিনিস পর্যন্ত থরে থরে সাজানো আছে। মহা স্ফূর্তিতে নিজেদের ভাষায় সেখানে গল্পগুজব করছে উইক এন্ডের কুকুররা। কায়াও সেই পার্টিতে যোগ দিল সোৎসাহে।
সত্য সেনুকাস, কা বিচিত্র এই দেশ !

Single Mother যখন সন্তানের দায়িত্বে

একাকী একজন মায়ের পক্ষে সঠিক ভাবে সন্তানের ভরণ-পোষণের জন্য নিজেকে মানসিক ও শারীরিক ভাবে সুস্থ রাখা এবং নিজের সামাজিক সীমা বাড়ানো খুবই জরুরি। একা সবসময় থাকার বদলে যত বেশি সামাজিক স্তরে মেলামেশা বাড়াবেন, ততই মানসিক ভাবে সুস্থ থাকতে পারবেন এবং সন্তানকেও সুন্দর সুস্থ পরিবেশে বড়ো হওয়ার সুযোগ দিতে পারবেন।

মনে রাখবেন, সিংগল মাদার হওয়ার সিদ্ধান্তটা আপনার নিজস্ব। সুতরাং এই সিদ্ধান্ত নিয়ে কারও কিছু বলার নেই। নিজের ব্যক্তিত্ব বজায় রাখুন যাতে কেউ আপনার পরিস্থিতির সুযোগ না নিতে পারে। তা সত্ত্বেও কোনও সমস্যায় পড়লে আইনি ব্যবস্থা নিন। আপনি সিংগল মাদার হলেও অসহায় নন এটা ভেবে জীবনটাকে নতুন করে গুছিয়ে নিন। সামাজিক মেলামেশা বজায় রাখুন এবং সন্তানের সঙ্গে একে অপরের নৈকট্য এনজয় করুন।

 

সোশ্যাল লিমিট বা সামাজিক সীমা কতটা হওয়া বাঞ্ছনীয়?

  • সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সামাজিক স্তরে ব্যক্তিকে বহু মানুষের সাথে একসঙ্গে যোগাযোগ রাখতে সাহায্য করে। একে অপরের সুখ-দুঃখে শামিল হোন। প্রযোজনে উপদেশ বা সাহায্য নিন। সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং-এর মাধ্যমে বাড়ি বসেই সকলের সান্নিধ্য উপভোগ করার সুযোগ পাবেন
  • পুরোনো বন্ধুদের সঙ্গে টাচে না থাকলেও চেষ্টা করুন তাদের কনট্যাক্ট নাম্বার জোগাড় করতে। পরিচিতদের সঙ্গে ফোনে হলেও কিছুটা সময় কথা বলুন। এতে আশেপাশের খবর যেমন আপনার কাছে থাকবে, তেমনি বিপদে আপনি তাদেরও সাহায্য পাবেন। নিজের ইমোশনাল আউটলেটের জন্য বন্ধু, প্রতিবেশী সকলের সঙ্গে কথা বলা দরকার। নতুন বন্ধু বানাবারও চেষ্টা করতে পারেন
  • নিজের পরিবারের গণ্ডি ছাড়িযে অপরিচিতদের সঙ্গে মিশতে দ্বিধা করবেন না। যেমন পরিবারে বোন, জা, ননদ এরা ছাড়াও এদের পরিচিত বন্ধু-বান্ধব বা এঁদের পরিবারের অন্য লোকেদের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখার চেষ্টা করুন। প্রযোজনে এঁদের বাড়িতে আমন্ত্রণ জানান
  • অফিসের কাজকর্ম-কে সোশ্যাল লাইফ থেকে আলাদা করে রাখবেন না। উইক এন্ড-এ পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো-টাও এক ধরনের সামাজিকতা। অফিসেও সকলের সঙ্গে মেলামেশা করুন, হাসিমুখে মন খুলে কথা বলুন। আপনার ব্যবহার এমন হওয়া উচিত যাতে অফিসে একদিন আপনি না আসতে পারলে সবাই যেন আপনাকে মিস করে
  • নিজের পার্সোনালিটি এমন রাখুন যাতে সকলে আপনার সঙ্গে মিশতে চায়। কাজের সময় কোনও ফাঁকি নয় কিন্তু অবসর সমযে কথা বলতে দ্বিধা করবেন না
  • সামাজিক অনুষ্ঠানগুলোতে যোগদান করুন, নয়তো আন-সোশ্যাল হিসেবে কুখ্যাতি অর্জন করবেন। অফিসের যে-কোনও অনুষ্ঠানে নিজে থেকে এগিযে এসে পার্টিসিপেট করুন এবং অনুষ্ঠান পুরোপুরি এনজয় করুন
  • সকলের কাছেই এখন সমযের অভাব। কিন্তু যারা বন্ধু, আত্মীয়স্বজনদের জন্য সময় দিতে চায় না, একটা সময় তারা নিজেরাই একাকিত্বের শিকার হযে পড়ে। সুতরাং সকলের সঙ্গে কথা বলুন, পরিচিতদের খবরাখবর রাখুন। এতে তাদেরও মনে হবে, আপনার কাছে তাদের গুরুত্ব আছে
  • সামাজিক স্তরে সক্রিয়তা বজায় রাখলে মানসিক ভাবে সুস্থ থাকতে অসুবিধা হয় না। নানা পরীক্ষায় এটা বারবার প্রমাণিত হযেছে যে, সুস্থ সামাজিক সম্পর্ক আপনাকে ভালো স্বাস্থ্য এবং দীর্ঘ আযু দিতে সক্ষম। সকলের সাথে মেলামেশা করলে নিজের ও অপরের সুখ-দুঃখ ভাগ করে নিলে, মানসিক শান্তি পাওয়া যায়
  • আমাদের ফাস্ট লাইফ মেইনটেন করতে গিযে আমরা সামাজিক সীমা সংকুচিত করে ফেলছি। আপনজনের সঙ্গে কথা বলার সময় পাই না। দুঃখ, সমস্যা অন্যের সঙ্গে ভাগ করে নিতে পারি না। ফলে অবসাদ, ব্লাডপ্রেশার, দুশ্চিন্তাগ্রস্ত এই সমস্যাগুলোর শিকার হযে পড়ি।

 

কীভাবে বাড়াবেন সোশ্যাল লিমিট

  • জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে অভিযোগ করা বন্ধ করুন এতে সোশ্যাল ইন্ট্যারঅ্যাকশন বাড়বে। বন্ধু দুঃখ শেযার করতে সাহায্য করে ঠিকই কিন্তু সবসময় সব অবস্থাতেই যদি অভিযোগ তুলে কাঁদতে শুরু করেন, তাহলে নিতান্ত চেনা-পরিচিতরাও আপনাকে এড়িযে যেতে শুরু করবে
  • কেউ আপনাকে নিমন্ত্রণ করলে সেটা রক্ষা করার চেষ্টা করুন। মুখের উপর না বলবেন না বা না-যাওয়ার বাহানা বানাবেন না। এটাও মনের মধ্যে আনবেন না যে, নিমন্ত্রণকারী ব্যক্তিটি আপনার অপছন্দের সুতরাং ওখানে না গেলেও চলবে। একবার গিযে দেখুন, পরিবেশ দেখে হয়তো বারবার যাওয়ার ইচ্ছে হবে। অনেক পরিচিতি বাড়বে। এছাড়াও নিমন্ত্রণ বারবার অস্বীকার করতে থাকলে অন্যদের মনেও আপনার প্রতি নেতিবাচক মনোভাব সৃষ্টি হবে
  • আপনার যদি কোনও হবি থাকে বা কোনও বিশেষ জিনিসের প্রতি ভালোবাসা থাকে তাহলে আপনার এলাকার আশেপাশে এ ধরনের কোনও প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে পারেন, যেখানে আপনার মতো একই রুচির মানুষদের সান্নিধ্য আপনি পাবেন। স্পোর্টস ক্লাব, বুক ক্লাব, লাইব্রেরি, হাইকিং গ্রুপের মেম্বার হতে পারেন। এগুলো কোনওটাই যদি ভালো না লাগে তাহলে নতুন হবি খুঁজুন। কিন্তু মনে রাখবেন গ্রুপের মধ্যে থেকেই যেন সেই হবি পূরণ করতে পারেন
  • যেসব সংস্থা সমাজসেবার কাজে ব্রতী, তেমন কোনও সংস্থাতে যোগ দিতে পারেন। সপ্তাহে একটা দিন আপনার মহামূল্য সময় সেখানে ব্যয় করতে পারেন। গরিব বাচ্চাদের বিনা পারিশ্রমিকে পড়াবার দায়িত্ব নিজের উপর তুলে নিন, এতে মনে শান্তি বোধ করবেন। প্রযোজনে অপরকে সাহায্য করুন। এতে লোক আপনাকে জানবে এবং তারাও আপনাকে সাহায্য করার জন্য সর্বদা প্রস্তুত থাকবে।

 

সন্তানের প্রতি আপনার দৃষ্টিভঙ্গী

সিংগল মাদার হিসেবে স্বভাবতই একক ভাবে আপনার দাযিত্ব অনেকটা বেড়ে যায়। সন্তানকে তার বাবার অভাববোধ অনুভব করতে দেওয়া চলে না। তাই কিছু জিনিস অবশ্যই মাথায় রাখুন।

সন্তানকে অবজ্ঞা করবেন না : সোশ্যাল সার্কল বাড়ান কিন্তু একটা লিমিট অবশ্যই রাখুন। বাচ্চাকে বাড়িতে একা, অভুক্ত রেখে সামাজিক মেলামেশায় ব্যস্ত হযে পড়াটা বাঞ্ছনীয় নয়। বাচ্চার পড়াশোনা থেকে শুরু করে তাকে আরামে রাখা, তার প্রযোজন মেটানো আপনার দাযিত্ব। সুতরাং বাড়ি সামলে তবে অন্যকিছুতে সময় দিন।

সমস্যায় সঙ্গে থাকুন : সময় কাটাবার জন্য শুধুমাত্র কোনও অ্যাক্টিভিটির সঙ্গে জুড়ে থাকাটা সঠিক পন্থা নয়। সকলের সুখ-দুঃখও শেযার করার চেষ্টা করুন। কেউ সমস্যায় পড়লে তাকে সাহায্য করতে পিছপা হবেন না। একই ভাবে নিজের সন্তানের কোনও সমস্যা হলে অন্যের সাহায্য নিন।

অপরকে অনুসরণ করবেন না : আপনার আশেপাশের অন্যান্য মহিলাদের সঙ্গে নিজেকে তুলনা করে কিছু করার প্রচেষ্টা করবেন না। তাদের মতো ব্র‌্যান্ডেড পোশাক কেন আপনার কাছে নেই বা আপনার স্ট্যাটাস কেন তাদের মতো নয়, এরকম অযথা চিন্তায় নিজেকে জড়িযে ফেলবেন না। নিজের সীমার মধ্যে থাকবার চেষ্টা করবেন। নিজের সন্তানকেও সেই শিক্ষাই দেবেন।

কু-অভ্যাস ত্যাগ করুন : হাই স্ট্যাটাস মহিলাদের অনুকরণ করতে গিযে ধূমপান, মদ্যপানে আসক্ত হযে পড়বেন না। আপনি যতই এসবের থেকে নিজেকে বাঁচাবার চেষ্টা করুন না কেন, জানতেও পারবেন না, এই ধরনের নেশা কখন আপনাকে গ্রাস করতে উদ্যত হচ্ছে। সুতরাং এই ধরনের সঙ্গ পরিত্যাগ করাই বুদ্ধিমানের কাজ। মনে রাখবেন আপনার দেখানো পথই, আপনার সন্তান অনুসরণ করবে।

 

কর্মক্ষেত্রে সবার প্রিয় হয়ে উঠুন

অনেকেই আছেন যারা মুখ গুঁজে কাজ করে যান, অথচ তারা বাহবা পান না। তাদের কাজের মূল্যায়ন বা সমাদর কোনওটাই হয় না। আবার কেউ কেউ ওয়ার্কপ্লেসে খুব সহজেই প্রশংসিত হন, জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন।

বাড়তি সময় অফিসে থাকা, কম্পিউটার বা ফাইলে মুখ গুঁজে কাজ করা, ব্যাগের ভিতরে রাখা মোবাইল চেঁচিয়ে গলা ফাটিয়ে ফেললেও তাকে স্রেফ উপেক্ষা করা— এই সবই নিশ্তিত ভাবে একজন সুদক্ষ কর্মীর লক্ষণ। কিম্তু শুধু ভালো কর্মী হলেই যে সহকর্মীদের সঙ্গে আপনার সুসম্পর্ক গড়ে উঠবে তেমন নয়৷ দিনের একটা বড়ো অংশ আপনাকে হয়তো অফিসেই কাটাতে হয়৷ ফলে অফিসই এক সময় হয়ে ওঠে আপনার বৃহত্তর পরিবার৷ তাই সেখানে সহকর্মীদের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তোলার পাশাপাশি আপনাকে হয়ে উঠতে হবে জনপ্রিয়৷

কী করবেন ভেবে যখন আপনি দিশাহারা, তখন আমরা এগিয়ে দিচ্ছি সাহায্যের হাত৷নতুন সংস্থায় চাকরিতে ঢুকে সকলেই ‘গুডবয়’ ইমেজ তৈরি করতে ব্যস্ত থাকেন। সেটাই স্বাভাবিক। খোলস ছে়ড়ে বেরনোর পর্ব শুরু হয় লাঞ্চটাইম দিয়ে।  নতুন অফিসে কলিগদের সঙ্গে বন্ধুত্ব পাতানোর সুযোগ মেলে লাঞ্চ টাইমেই। সকলের সঙ্গে মেশার ও আলাপ করার পক্ষে কিন্তু মধ্যাহ্নভোজের সময়টাই উপযুক্ত।

আপনি যদি কোনও সংস্থায় টিমলিডার হয়ে জয়েন করেন, তাহলে টিম পরিচালনা করার কারণেও আপনাকে সহকর্মীদের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে৷ অনেক সময় টিম লিডারের খারাপ আচরণের কারণে কোম্পানি বড়োসড়ো ক্ষতির শিকার হয়৷গবেষণায় দেখা গেছে, সংস্থা বা সংস্থার সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষ নন, টিম-লিডার বা বসের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়েই অধিকাংশ কর্মী চাকরি ছাড়েন। একজন কর্মী তাঁর পেশায় উন্নতির লক্ষ্যেই চাকরি করেন। যখনই তাঁর বস বা টিম-লিডার তাঁর উন্নতির পথে বাঁধা হয়ে দাঁড়ান, তখন বাধ্য হয়েই চাকরি ছেড়ে নিজের উন্নতি বজায় রাখতে চান কর্মীরা। তাই আপনার জনপ্রিয়তার একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হল, অধস্তনদের প্রতি আপনার ব্যবহার ও মনোভাব৷

আপনার কাজের দক্ষতার পাশাপাশি কিছু বিশেষ গুণাবলি থাকা আজকের দুনিয়ার ক্ষেত্রে ‌বিশেষ ভাবে জরুরি৷সেটা হল আপনি কীভাবে নিজেকে প্রোজেক্ট করছেন, সেই ভাবমূর্তি৷ সময়মতো কাজ সুষ্ঠু ভাবে সম্পাদন করার পাশাপাশি, বিনয়ী, মিশুকে এবং ঠান্ডা মাথার মানুষদের সবাই পছন্দ করে৷ আপনিও কী ভাবে সকলের পছন্দের তালিকায় নিজের নামটি রাখতে পারবেন, জেনে নিন৷

  • রোজ সকালে সেদিনের কাজ কতটা শেষ করবেন, তার একটা ব্যক্তিগত টার্গেট সেট করুন
  • ডেডলাইনের আগে প্রোজেক্ট শেষ করলে বা বিশেষ কিছু অ্যাচিভ করলে, সেদিন নিজেকে একটা ট্রিট বা গিফ্ট দিন
  • ওয়ার্ক-লাইফ ব্যালেন্স বজায় রাখার চ্যালেঞ্জটা সফল ভাবে মেনটেন করুন। অর্থাত্ অফিসের কাজ বাড়ি বয়ে আনবেন না। বাড়িতে রিফ্রেশড থাকলে তবেই অফিসের আউটপুট ভালো হবে
  • অফিসেও শুধু কাজ আপনাকে বোরডম-এর দিকে ঠেলে দেবে। কাজের ফাঁকে উঠে একটু হেঁটে আসুন বা ফ্রি হ্যান্ড এক্সারসাইজ করুন বা দশ মিনিট ব্রেক নিয়ে গান শুনুন
  • নিজের মূল্যায়ন নিজে করুন। আপনি বাকিদের থেকে কোথায় এগিয়ে বা পিছিয়ে আছেন, সেটা বুঝলে, আপনার পারফর্মেন্স উন্নত হবে
  • সহকর্মীদের সঙ্গে বন্ধুত্ব রাখুন, কাজের পরে কিছুটা সময় আড্ডা দিন। ওদের কাজেও সাহায্য করুন। অতিরিক্ত দাম্ভিক হয়ে উঠবেন না।

মাথাব্যথা-য় অবহেলা নয়

মাথা থাকলেই কি মাথাব্যথা হওয়াটা স্বাভাবিক? সমীক্ষায় দেখা গেছে, মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক প্রাপ্তবয়স্ক লোকই মাঝেমধ্যে মাথাব্যথায় ভোগেন। এর মধ্যে টেনশন-টাইপ মাথাব্যথাও যেমন থাকে, তেমনই, মাইগ্রেন, চোখের সমস্যা, গ্যাস প্রভৃতির সমস্যার কারণও থাকে। কিন্তু শুধু এসব কারণেই মাথাব্যথা হয় না, অনেক সময় এই মাথাব্যথা বড়ো কোনও রোগের উপসর্গ হতে পারে। তাই, অসুখ বেড়ে যাওয়ার আগে সতর্কতা জরুরি। এ ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিয়েছেন ডা. কৗশিক সেন।

মাথাব্যথার প্রাথমিক কারণগুলি কী কী?

মাথার যন্ত্রণা বা মাথাব্যথা সব মরশুমের সঙ্গী। বর্তমানে মোট জনসংখ্যার তিনের দুই ভাগ এই সমস্যায় জর্জরিত। সাধারণ মাথাব্যথা কখনও দৈনিক সমস্যায় পরিণত হতে পারে। তবে মাথার যন্ত্রণা উপেক্ষা করা কখনওই বুদ্ধিমানের নয়। অনেকের ক্ষেত্রেই দেখা যায় যে, যারা অল্পতেই টেনশন করেন বা মানসিক দুশ্চিন্তা হয়, তাদের হালকা মাথাব্যথা করে। সাধারণত দেখা যায় যে, এই ব্যথাগুলো খুব জোরালো না হলেও তা আধ ঘণ্টার বেশি চলতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায় এগুলো প্রায় কয়েক মাস ধরে চলতে পারে। বলাই বাহুল্য, এই ব্যথার উৎপত্তি টেনশন থেকে হয়। তাই বলা যেতে পারে, মাথাব্যথা কোনও রোগ নয়, রোগের উপসর্গ মাত্র।

টেনশন থেকে মাথাব্যথা সাধারণত কত ধরনের হতে পারে?

টেনশন থেকে হওয়া মাথাব্যথা দুই ধরনের হয়। একদিকে রয়েছে এপিসডিক ধাঁচের টেনশন থেকে হওয়া মাথাব্যথা যা মাসে এক বা একাধিক বার হয়ে থাকে। ক্রনিক টেনশন থেকে হওয়া মাথাব্যথা মাসে ১৫ বার শুধু নয়, তিন চারমাস ধরে হতে পারে। এছাড়া মাইগ্রেন বা কিছু ক্ষেত্রে ব্রেন টিউমারের ইঙ্গিতও হতে পারে মাথাব্যথা।

সাধারণ মাথাব্যথার থেকে টেনশনের মাথাব্যথা কী ভাবে আলাদা করা যাবে?

এই ক্ষেত্রে অনেক সময়েই সাধারণ মানুষের পক্ষে বোঝা খুব কঠিন। তবে কতক্ষণ ধরে বা কতদিন ধরে ব্যথা হচ্ছে, সেটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

মাথাব্যথা কি ভারী অসুখেরও ইঙ্গিত হতে পারে?

কোনও মাথাব্যথাই হেলাফেলা করা উচিত নয়। এক্ষেত্রে নজর রাখতে হবে যে, মাথার ব্যথা একটা সময়ের পর কমে কিনা। যদি দেখা যায় যে ব্যথা কমছে না এবং ঘুমও অনেকটা কমে গেছে, তাহলে অবিলম্বে নিউরোলজিস্টের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে।

ওয়্যাক্সিং-এ NO টেনশন

আপনার ত্বক-কে মসৃণ কোমল ও রোমমুক্ত করতে হলে সেরা পদ্ধতি ওয়্যাক্সিং। এই পদ্ধতিতে শুধু রোম নিমূর্লই হয় না, ত্বকের ট্যানও ফিকে লাগে দেখতে। ওয়্যাক্সিং করানোর পর অন্তত দু-সপ্তাহ ত্বক পরিচ্ছন্ন ও দাগহীন দেখতে লাগে। আবার নতুন রোম গজালেও তা আগের চেয়ে সংখ্যায় কম এবং মিহি হয়। নিয়মিত ওয়্যাক্সিং করালে ৩-৪ সপ্তাহ পর্যন্ত হেয়ার গ্রোথ থামিয়ে রাখা যায়। ওয়্যাক্সিং-এর নানা ধরন এখানে আলোচনা করা হল।

সফ্ট ওয়্যাক্সিং বা রেগুলার ওয়্যাক্স

এটাই সবচেয়ে কমন ওয়্যাক্সিং-এর পদ্ধতি। এতে মধু ও চিনির মিশ্রণ গরম করে ত্বকের উপর লাগানো হয়। হেয়ার রিমুভ করার পাশাপাশি এটা ট্যানও রিমুভ করে। স্কিন সফট ও গ্লসি হয়।

চকোলেট ওয়্যাক্স

এই ওয়্যাক্সিং-এ স্কিন পোরস্ ওপেন হয়। এর ফলে রোম সহজেই ত্বক থেকে নির্মূল হয়। বেশি যন্ত্রণাদায়কও নয় এই পদ্ধতি। চকোলেটে মজুদ স্কিন স্মুদিং এলিমেন্ট, ত্বককে রিল্যাক্স করতেও সহায়ক। কোকো পাউডার বেসড ওয়্যাক্স-এর সাহায্যে রোম পুরোপুরি উঠে আসে। এই ওয়্যাক্সিং-এ রেড প্যাচ পড়ে না ত্বকে। চকোলেটের গন্ধটাও এক আনন্দের অনুভূতি এনে দেয় মনে।

অ্যালোভেরা ওয়্যাক্স

অ্যালোভেরা পাল্প দিয়ে তৈরি এই ওয়্যাক্স স্কিন নারিশ করার সাথে সাথে রিজুভিনেটও করে। শরীরের সেন্সিটিভ এরিয়া, যেমন আন্ডার আর্মস এবং বিকিনি পার্ট-এর জন্য এটা উপযুক্ত।

ব্রাজিলিয়ন ওয়্যাক্স

এটা এক ধরনের হার্ড ওয়্যাক্স যা বিকিনি এরিয়ার জন্য আইডিয়াল। ওয়্যাক্সিং-এর যন্ত্রণা কম করতে হলে, দ্রুত এই ওয়্যাক্স করা প্রয়োজন।

লাইপোসলিউবল ওয়্যাক্স

এই ওয়্যাক্স অয়েল বেসড। রোমের গোড়ায় এটা ভালো ভাবে আটকে ধরে। ফলে রোম তুলতে সুবিধে হয়। ত্বকের উপরও এটা অত্যন্ত কোমল। তবে এই ওয়্যাক্স ব্যবহার করতে হলে আগে স্কিনের ওপর তেল বুলিয়ে নেওয়া জরুরি। এই ওয়্যাক্স খুব গরম অবস্থায় লাগানো হলেও, ত্বক ক্ষতিগ্রস্ত হয় না।

খেয়াল রাখুন

ওয়্যাক্সিং করানোর সময়, ত্বকে প্রদাহ হতে পারে, যন্ত্রণাদায়ক বোধ হতে পারে, লাল হওয়া বা সংক্রমণ হওয়াও স্বাভাবিক। ত্বক অনেক সময় চুলকায় বা ত্বকের টেক্সচারেও পরিবর্তন আসতে পারে। মুখের ত্বক খুব সেন্সিটিভ। ওয়্যাক্সিং করানোর ফলে অকালে মুখে বলিরেখা পড়তে পারে। তাই বারবার ওয়্যাক্সিং করার বিকল্প হতে পারে লেজার হেয়ার রিমুভাল।

ওয়্যাক্সিং করার আগে

ক)  সংক্রমণ এড়াতে হাত পরিষ্কার রাখুন

খ)  যে-অংশে ওয়্যাক্সিং হবে সেটাও পরিচ্ছন্ন রাখুন

গ)  ওয়্যাক্সিং ভালো পার্লারেই করুন

ঘ)  ওয়্যাক্স ও স্ট্রিপস্ ভালো ব্র্যান্ডের হওয়াটা জরুরি

ঙ)  ওয়্যাক্সিং করার একদিন আগে ত্বক স্ক্রাব করে নিন। এর ফলে মৃত কোশ ঝরে যাবে

ওয়্যাক্সিং-এর পর

ক)  ওয়্যাক্সিং করার ২৪ ঘন্টার মধ্যে রোদে না বেরোনোই ভালো

খ)  ১২ ঘন্টা অবধি সওনাবাথ না নেওয়া উচিত

গ)  ২৪ ঘন্টার মধ্যে ক্লোরিনযুক্ত সুইমিং পুল-এ নামবেন না

ঘ)  স্পা করাবেন না ২৪ ঘন্টার মধ্যে

ঙ)  ক্রিম লাগাবেন না

চ)  যদি ত্বকে কোনও প্রদাহ হয় ওয়্যাক্সিং-এর পর, তাহলে ত্বকে সর লাগান তারপর ঠান্ডা জলে ধুয়ে নিন

ছ)  ওয়্যাক্সিং করার পরই বরফ লাগান ত্বকে

জ)  ওয়্যাক্সিং-এর পর ত্বক জ্বালা করলে, ত্বকে অ্যালোভেরা-যুক্ত ক্রিম মাসাজ করুন

ঝ)  ওয়্যাক্সিং করার পর খুব টাইট পোশাক পরবেন না

 

মাটন নল্লি নিহারি

নিহারির অর্থ হল ঢিমে আঁচে রান্না করা মাংস৷আর্বি শব্দ নাহার থেকে গৃহীত৷নাহার মানে দিন৷ এক সময় নবাবদের সকালের আয়াতের পর অর্থাত প্রার্থনা পর্বের পরই পরিবেশন করা হতো এই মাংস৷এখনও  শীতের কয়েকটা মাস, কলকাতার কিছু রেস্তোঁরায় ভোরবেলা মেলে, আর নিঃশেষ হয়ে যায় সকাল ৮-টার ভিতর৷

নল্লি নিহারির কী যে মহিমা, তা যারা খেয়েছেন তারাই জানেন৷ কলকাতার ভোজনরসিকদের খুবই প্রিয় এই ডিশ৷  ভোরবেলায় লাইন দিয়েও অনেকে কিনে নিয়ে যান এই মাটন-এর পদটি৷তুলতুলে মাংসের মশলাদার ঝোল–এই হল নেহারির স্বাদের সাতকাহন।

নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি, কলকাতার নাখোদা মসজিদের কাছে সুফিয়া, বেকবাগানের জাইকা পার্ক সার্কাসের নাফিল এবং জানবাজারের নবাব ইটিং হাউস –এ মেলে এই নেহারি।এটা শীতের রিচুয়াল রান্নাও বলতে পারেন৷যে- মশলা ব্যবহার হয় এতে তার গুণেই সারা রাত রান্না করা মাংস, এমন সুস্বাদু হয়ে ওঠে৷নরম তুলতুলে এই মাংস মুখে দিলেই গলে যায়।আসুন জেনে নেওয়া যাক এটি রান্না করার পদ্ধতি৷

 উপকরণ -২৫০ গ্রাম মাটন, ১ ছোটো চামচ টমেটো পিউরি, ১টা তেজপাতা, ২টো ছোটোএলাচ, ১ ছোটো চামচ লবঙ্গ,১টা বড়োএলাচ, ২ ছোটো চামচ রসুনবাটা, ১ ছোটো চামচ আদাবাটা, ১ ছোটো চামচ গরমমশলা, ১ বড়ো চামচ ধনেগুঁড়ো,১ ছোটো চামচ হলুদগুঁড়ো, ১ ছোটো চামচ জিরেগুঁড়ো, ১ বড়ো চামচ ভাজা পেঁয়াজের পেস্ট, ১/২ কাপ দই, ১ বড়ো চামচ ঘি,১ কাপ মাটন স্টক, ১ ছোটো চামচ বেসন, ১ চামচ কেওড়ার জল,১ ছোটো চামচ গোলাপ জল।

প্রণালী – একটা গভীর কড়াইতে, মাটনটা সেদ্ধ করে নিন। এবার প্যানে তেল গরম করে এতে গোটা গরমমশলা, আদা-রসুন পেস্ট দিয়ে রান্না করুন। এতে ভাজা পেঁয়াজের পেস্ট, হলুদগুঁড়ো, জিরে, ধনে দিয়ে ভালো ভাবে কষুন। এতে সেদ্ধ মাটন দিয়ে ভালো ভাবে রান্না করুন। এবার দইয়ের সঙ্গে অল্প জল, বেসন ও নুন দিয়ে গুলে একটা মিশ্রণ বানান। এটা মটনের উপর ঢেলে রান্না করুন। খুব ভালে হয় যদি ঢিমে আঁচে সারারাত রান্না হতে দেন৷

হিন্দি ছবিতে অভিনয়ে ফিরলেন ঋতুপর্ণা

অনেকদিন পর আবার বলিউডের হিন্দি ছবিতে অভিনয়ে ফিরলেন ঋতুপর্ণা।কলকাতায় শুরু হয়েছে নতুন ছবি ‘সল্ট’-এর শুটিং। ঋতুপর্ণার বিপরীতে এবার চন্দন রায় সান্যাল। এই সিনেমা দিয়েই পরিচালক হিসেবে হাতেখড়ি হতে চলেছে সানি রায়ের। একেবারে ভিন্ন স্বাদের একটি ছবি দর্শকদের উপহার দিতে চান সানি। দু’জন সম্পূর্ণ বিপরীতধর্মী মানুষের  নিটোল প্রেমের গল্প ‘সল্ট’। কাহিনিতে ছ’টি পর্যায় রয়েছে। ছবি শুরু হচ্ছে দু’জনের শেষ দেখা হওয়ার জায়গা থেকে, আর শেষ হচ্ছে প্রথম সাক্ষাতের জায়গায়।অর্থাত ছবির চলনে অনেকটা পথ পিছন দিকে হেঁটে যায় ছবিটির গল্প। আর এই ভিন্ন স্বাদের প্রেমের গল্পের জন্য পরিচালক বেছে নিয়েছেন ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত ও চন্দন রায় সান্যালকে। তাদের রয়াসন গল্পে অন্য মাত্রা আনবে বলেই বিশ্বাস পরিচালকের। এক অর্থে আনকোরা নয় এই জুটি- এর আগে সুমন মুখোপাধ্যায় পরিচালিত ‘মহানগর অ্যাট কলকাতা’তে একসঙ্গে কাজ করছেন দুজনে।

অতিমারির কারণে সিঙ্গাপুরে সপরিবারের সংকটময় দিনগুলো কাটানোর দীর্ঘ দশ মাস পর শুটিং ফ্লোরে ফিরলেন অভিনেত্রী। আর শুরুটাই করলেন হিন্দি সিনেমার কাজ দিয়ে৷ ফলে বরাবরের মতো বেশ এনার্জেটিক ঋতুপর্ণা৷এপ্রসঙ্গে অভিনেত্রী ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত জানিয়েছেন, “গল্পটা ভালো লাগল। নারী চরিত্রটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ এই ছবিতে৷ একটি মেয়ের জীবনের নানা পর্ব নিয়েই ছবি। ফলে মহিলাদের সাইকোলজি ঠিক কীভাবে কাজ করে, সেটা দারুণ ভাবে ধরা পড়বে এই ছবিতে। আমি ভীষণই এক্সাইটেড।”

হিন্দি ছবি ‘কমিনে’-খ্যাত অভিনেতা চন্দন রায় সান্যালকে সাম্প্রতিক সময়ে নেগেটিভ চরিত্রে দেখা গেছে ওয়েব সিরিজ আশ্রম-এ৷ সেখানে ববি দেওলের সঙ্গে প্রায় সমানে সমানে টক্কর দিয়েছেন এই বাঙালি অভিনেতা৷ভোপা স্বামী চরিত্রে রীতিমতো নজর কেড়েছেন চন্দন রায় সান্যাল। এবারে সল্ট ছবিতে একেবারে স্বাদ বদলে দিতে ভিন্নধর্মী একটি চরিত্র করবেন চন্দন৷

চন্দনকে ছবিতে দেখা যাবে শঙ্কর নামে এক ব্যক্তির ভূমিকায়, যে ভীষনই অন্তর্মুখী স্বভাবের। সে প্রেমে পড়ে বান্ধবী মায়ার। অন্যদিকে মায়া বেশ প্রানোচ্ছল ও প্রাণবন্ত। দুজনের যেদিন আলাপ সেদিন শঙ্কর একটি মিথ্যে বলে মায়াকে। সেই মিথ্যে কেমনভাবে যেন বদলে দেয় তাদের জীবন৷ সেই ঘাত প্রতিঘাতকে ঘিরেই গল্প এগোয়। কিন্তু ঠিক কেন সেই মিথ্যে শোনার পরে শঙ্করের প্রতি আরও আকর্ষণ বেড়ে যায় মায়ার, সেটা জানার জন্য অপেক্ষা করতে হবে ছবি মুক্তি পাওয়া অবধি।

‘সল্ট’-এর শুটিং হবে কলকাতা ও দার্জিলিংয়ে। ঋতুপর্ণা-চন্দন ছাড়াও ছবিতে রয়েছেন সুদীপ মুখোপাধ্যায়, ঈশান মজুমদার, শুভম প্রমুখ। পরিচালক-সহ গোটা টিম কলকাতার হলেও, ছবিটি হিন্দিতেই হবে। একটা সময়ে বলিউডের ছবিতে দেখা গিয়েছিল ঋতুপর্ণাকে৷ বেশ কয়েকটি ছবিতে কাজ করলেও, পাকাপাকি ভাবে হিন্দি ছবিতে কাজ করতে মুম্বইতে থেকে যেতে চাননি তিনি৷ কিন্তু অনেকদিন পর আবার একটি হিন্দি ছবিতে তাঁকে দেখার আগ্রহ দর্শকদের মধ্যে তৈরি হয়েছে বেশ বোঝা যাচ্ছে৷তবে ভাষাটি হিন্দি হলেও  পরিচালক, অভিনেতা ও শুটিংয়ের লোকেশন– সবেতেই রয়েছে বাঙালিয়ানা। তাই বাঙালিদের এই ছবিটি খুব ভালো লাগবে বলে আশাবাদী ছবির পরিচালক। সানির কথায়,”এত ভালো কলাকুশলীদের নিয়ে কাজ করতে পারব বলে আমি খুব উৎসাহী। আপনাদের সকলের জন্যে একটা খুব মিষ্টি প্রেমের গল্প উপহার দেওয়ার অপেক্ষায় রয়েছি।”

শুধু একটু ভালোবাসা

বড়দার কাছে মাকে পৌঁছে দিয়ে কিছুটা স্বস্তি বোধ করল শিউলি। এখানে কাজের লোকের সমস্যায় জেরবার হয়ে উঠেছিল। অথচ সে কথাটা কিছুতেই বোঝানো যাচ্ছিল না ওদের, বিশেষ করে বড়োবউদিকে। বড়োবউদির ধারণা এটা শিউলির একটা চাল। কথাটা এরমধ্যেই কানেও এসেছে শিউলির। অদ্ভুত! শিউলি অবাক হয়ে ভাবে, যখনই ও কোনও অসুবিধার কথা বলেছে তখনই এই ধরনের প্রতিক্রিয়া দিয়েছে বড়োবউদি। একা থাকে বলে মাকে দেখার দায়িত্বটা নিতে হয় শিউলিকেই। অথচ এটা তো ওদেরই করার কথা। তবুও করে শিউলি। কারণ মা ওর কাছে এলে একটু প্রাণ খুলে বাঁচতে পারে, দুটো মনের কথা বলতে পারে। মা ওদের কাছে এখন উচ্ছিষ্ট বস্তু, নেহাত ফেলে দিতে পারে না তাই রেখেছে।

মায়ের অবদান ওরা মানে না। বড়দার ডাক্তারি পড়া প্রায় বন্ধ হতে বসেছিল। মা নিজের গয়না বন্ধক রেখে বাবার হাতে টাকা তুলে দিয়ে বলেছিল, আমরা আধপেটা খেয়ে থাকব, কিন্তু ওর পড়া বন্ধ করতে দেব না। বড়দা ডাক্তারি পাশ করল। ধীরে ধীরে যত ওর পসার বাড়তে লাগল, একটা চমকপ্রদ বিলাসবহুল জীবন নাগালের মধ্যে ধরা দিল, বড়দা তত বেশি করে অতীতটাকে ঝেড়ে ফেলতে চাইল। অতীত যেন একটা সিঁড়ি, শুধু ওপরে ওঠার কাজে লাগে। এ কেমন ওপরে ওঠা! ভেবে পায়নি শিউলি।

বখাটে, বাউন্ডুলে মেজদা যখন বন্ধু-বান্ধব আর রাজনীতির চক্বরে পড়ে উচ্ছন্নে যেতে বসেছিল, বাবা হাল ছেড়ে দিলেও মা কিন্তু বুক চিতিয়ে লড়েছিল। একটু একটু করে তুলে এনেছিল ডুবন্ত ছেলেকে। পায়ের তলায় মাটি দিয়ে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল শক্ত ভূমিতে। মেজদা এখন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী। দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে রয়েছে ওর কারবার। সুযোগ পেলেই উপদেশ দেয়, মানুষ নিজেই নিজের ভাগ্যের নির্মাতা। অর্থাৎ ওর ভাগ্যের বাড়বাড়ন্তের মাঝখানে কেউ নেই, কেউ কোনও দিন ছিল না। কত বড়ো বেইমান! ওদের জীবন কাহিনি তো শিউলির জানা। কী করে পারে এত বড়ো মিথ্যে বলতে?

শিউলির ডিভোর্স নিয়েও কম কথা বলেনি ওরা। বড়দা তো সুযোগ পেলে এখনও শোনায়– ডিসিশনটা একটু বেশি তাড়াতাড়ি নিয়ে ফেললি বুড়ি… আর একটু ভাবতে পারতিস।

বড়দার সাথে সমান ভাবে তাল মিলিয়ে গেছে বড়োবউদি, মেজদা, মেজবউদি। আত্মীয়স্বজন, পাড়া প্রতিবেশী সবাইকে বলে বেড়িয়েছে, দোষটা আসলে শিউলির-ই। সুযোগ বুঝে দেবদাস নিজেকে দেবদূত প্রতিপন্ন করার সব চেষ্টাই করে যাচ্ছে। ওদের সাথে দেবদাসের এখনও যোগাযোগ আছে, জানে শিউলি। পর হয়ে গেছে শিউলিই। বড়দা, মেজদা কেউই দরকার ছাড়া কথা বলে না শিউলির সাথে। দরকার বলতে অবশ্য একটাই, সেটা হল মা। মায়ের জন্য ওদের ফরেন টুর আটকে যায়, ছেলে-মেয়েদের পড়াশোনার ভীষণ ক্ষতি হয়। স্বাভাবিক আনন্দ উৎসবে একটা বিষাদের ছায়া হয়ে সব আনন্দটাকে শুষে নেয় মা। সেই বিষাদমূর্তিকে শিউলির ঘাড়ে চাপিয়ে ওরা মাঝেমধ্যে একটু আনন্দ উপভোগের অবকাশ পায়। মায়ের মৃত্যুর সাথে সাথে শিউলির এই কদর এক লহমায় ধূলিসাৎ হবে জানে শিউলি।

বলার কিছুই নেই, তবুও বড়ো বউদি খোঁটা দিতে ছাড়ল না– ‘মা ছেলের কাছে আসবে, থাকবে, এ তো ভালো কথা। এই কর্তব্য তো করতেই হবে। তোমার দাদাও সে কথা বলে। কিন্তু বলতে বাধ্য হচ্ছি শিউলি, তোমার মায়েরও কিছু দোষ আছে গো। সব ব্যাপারে নাক না গলিয়ে উনি থাকতে পারেন না। সংসারটা আমাকে সামলাতে হয়। হঠাৎ করে উনি মাঝখানে না বুঝেশুনে মন্তব্য করে বসলে কেমন লাগে বলো তো?’

শিউলি জবাব দিতে গিয়েও থেমে গেল। মাকে ভালো করেই চেনে শিউলি। একসময় স্কুলের দিদিমণি ছিল। যথেষ্ট ব্যক্তিত্বময়ী মহিলা। সেই তুলনায় বিদ্যে ও ব্যক্তিত্বের দৗড়ে অনেক পিছিয়ে বড়োবউদি ও মেজবউদি দুজনেই। আর এখানেই বউদি-দের সমস্যা। মায়ের ব্যক্তিত্বের মোকাবিলা করতে না পেরে এভাবে বদনাম করে বেড়ায়।

বড়োবউদির পক্ষ নিয়ে বড়দা বলল– ‘কথাটা সত্যি রে। মা আজকাল কেমন জানি হয়ে গেছে। সব কিছুতেই বড্ড বেশি রিআ্যক্ট করে। আরে বাবা, তোমার বয়স হয়েছে, খাও দাও, রেস্ট করো। সব কথার মাঝখানে যাওয়ার কী দরকার? যাইহোক যাওয়ার আগে সেই কথাটা মাকে একটু ভালো করে বুঝিয়ে দিয়ে যাস।’

এসব কথা মাকে বলার প্রয়়োজন বোধ করেনি শিউলি। বলা মানে ওদের মিথ্যেটাকে প্রশ্রয় দেওয়া। কেন বলবে এসব?

প্রণাম করে বেরিয়ে আসার সময় মায়ের সজল চোখের দিকে তাকিয়ে বুকের ভেতর কেমন জানি করে উঠল। কোনওরকমে বলল– ‘লেখাটা থামিও না মা। আমি পৌঁছে ফোন করব।’

শিউলির স্কুলটা কলকাতা থেকে ঘণ্টা তিনেকের পথ। এমন একটা দূরত্ব, না ডেইলি প্যাসেঞ্জারি করা যায়, না ওখানকার গ্রাম্য পরিবেশে থাকা যায়। শেষপর্যন্ত স্কুলের কাছাকাছি একটা গঞ্জ এলাকায় বাড়ি ভাড়া নিয়েছে দুজনে মিলে। ইচ্ছে করলেই ছুটির দিনগুলোতে কলকাতায় আসতে পারে। কিন্তু আসে না। উঠবে কোথায়? ডিভোর্সের পর নিজের ঘর বলতে তো আর কিছু নেই। বড়দা বা মেজদার বাড়িতে থাকার প্রশ্নই ওঠে না। ওরাও সেটা বোধহয় চাইবে না। সব মিলিয়ে শিউলি এখন কলকাতা থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন বলা যায়।

সুধাদেবী ব্যালকনিতে দাঁড়িয়েই রইলেন যতক্ষণ না শিউলির গাড়ি গলি পেরিয়ে বড়ো রাস্তায় অদৃশ্য হল। মেয়েটা চলে গেল। বেশ কিছুক্ষণ একটা অসীম শূন্যতা গ্রাস করে রাখল সুধাদেবী-কে। মেয়েটা তার অন্য রকম। ছেলে দুটোর মতো স্বার্থপর, বিবেকহীন নয়। তবু মেয়ে তো ! ওর কাছে থাকতে মন চাইলেও উপায় থাকে না। ওর দিকটাও দেখতে হয়। ওর অসুবিধাগুলো নিজের চোখে দেখে এসেছেন সুধাদেবী। স্থায়ী কোনও কাজের লোক নেই। ঠিকে কাজের মেয়েটা অসম্ভব কামাই করে। এই অবস্থায় শিউলি চাকরি সামাল দেবে, না মায়ের সেবা করবে? তবুও ওর মধ্যেই যথাসাধ্য করে যাচ্ছিল। কিন্তু সুধাদেবীরই ভালো লাগছিল না। জেদটা তিনিই ধরেছিলেন। নিজের সুখের জন্য ওকে কষ্টে রাখতে মোটেও ভালো লাগছিল না।

একসময় অলস পায়ে ঘরে এসে ঢুকলেন। কিছুই ভালো লাগছিল না। বারবার শিউলি আর মণিদীপার কথা মনে পড়ছিল। ওর স্কুলের আর এক দিদিমণি। ওরা দুজনে মিলেই একটা বাড়ির দুটো পার্টে ভাড়া নিয়েছে। মণিদীপা শিউলির চেয়ে বছর তিন চারেকের বড়ো। ভারি আন্তরিক স্বভাবের মেয়ে। ওর বাড়ি ঘর, স্বামী, সন্তান সবই আছে। কিন্তু দূরত্বের কারণে ভাড়া নিতে হয়েছে। ছুটির দিনগুলো বাড়িতে কাটিয়ে আসে। ওই মেয়েটা-কেও ভালোবেসে ফেলেছেন সুধাদেবী। আসার সময় কান্না চেপে রাখতে পারেননি। মণিদীপাও কাঁদছিল।

এখন আর বেশি কথা বলেন না সুধাদেবী। অবসর সময় লেখালেখি করেন। একটা সময় লেখার অভ্যাস ছিল। মাঝখানে ছেদ পড়ে গিয়েছিল। শিউলির তাগিদেই আবার শুরু। সেসব সত্যিকারের সাহিত্য হয়ে ওঠে কিনা বুঝতে পারেন না। তবে লিখতে ভালো লাগে। মনের জমে থাকা কথাগুলো একটা পথ খুঁজে পায় যেন। শিউলি পড়ে। পড়ে বলে, দারুণ লিখেছ মা, আরও লিখে যাও। হয়তো মন জোগানোর জন্য বলে। তবুও সুধাদেবী খুশি হন।

সুধাদেবীর এই পরিবর্তন দেখে তার বড়োবউমা তো হেসেই অস্থির! ছেলেরাও…

–খাতা ভর্তি করে এসব হিজিবিজি কী লিখছেন মা?

সুধাদেবী হাসেন– ওসব তুমি বুঝবে না মা। আমিও কী সব বুঝি? মন বলে, আমি লিখে যাই। সব সময় বকবক করার চেয়ে তো ভালো। এই জগতের মধ্যেই এ এক আলাদা জগৎ যেন। চাইলে তুমিও পড়তে পারো।

–দূর… ওসব পড়ার সময় কোথায় আমার?  ওতে আপনি কী লিখবেন সেটা তো বুঝতেই পারছি। নিশ্চয়ই আমাদের নিন্দা দিয়ে ভরিয়ে রেখেছেন। আমরা আপনাকে কতভাবে কষ্ট দিই এই সবই তো?

–তোমাদের নিন্দা গাথা লিখে আবার তোমাদেরকে সেটা পড়তে দেব… এটুকু বোধও তোমার কাজ করল না? না পড়েই তুমি অদ্ভুত একটা মন্তব্য করে দিলে। ওসব কথা আমি লিখিনি। কেন লিখব? তোমাদের নিন্দে করা মানে তো আমার নিজেকেই নিন্দে করা। এই বয়সে এসে আর জীবনটাকে নীচে নামাতে ইচ্ছে করে না। যদি কোনওদিন মনে হয়, একটু পড়ে দেখো। আসলে আমার লেখার মধ্যে দিয়ে আবার একবার নিজেকে দেখার চেষ্টা করে যাচ্ছি। পুরোনো আমিটাকে দেখতে গিয়ে দেখছি, সারা জীবনে কত না ভুল করেছি!

–বাববা… এইটুকু লিখেই তো দেখছি আপনার মাথা ঘুরে গেছে। এসব পোকা কী শিউলি আপনার মাথায় ঢুকিয়েছে?

–যদি ঢুকিয়েই থাকে অন্যায় তো কিছু করেনি। সবদিক থেকেই ভালো হয়েছে। মাঝখানে আমি কেমন জানি হয়ে গেছিলাম! তোমাদের অহেতুক বিরক্ত করতাম। তখন বুঝতাম না, এখন একটু একটু করে তফাতটা বুঝতে পারছি। ভালো করে বেঁচে থাকতে হলে নিজস্ব একটা জগৎ তৈরি করে নিতে হয়। শিউলি সেটাই শিখিয়েছে আমাকে। শিউলির জায়গায় তুমিও হতে পারতে সেটা। সব সময় মা-ই যে শেখাবে এমন তো কোনও কথা নেই। কখনও কখনও মেয়েরাও মাকে অনেক কিছু শিখিয়ে দিতে পারে।

–আপনারা দুজনেই স্কুলের দিদিমণি, কত কিছু জানেন। আমরা তো আবার ওসব হতে পারিনি। ঘরদোর, সংসার, ছেলে-পুলে এসব নিয়েই কাটিয়ে দিলাম। শিউলি একদিক থেকে ভালোই করেছে। একটা মুক্ত, স্বাধীন জীবনযাপন করতে পারছে। নিজের মতো যেমন খুশি চলতে পারছে। বাধা দেওয়ার কেউ নেই।

ইঙ্গিতটা ধরতে অসুবিধা হল না সুধাদেবীর। নোংরা ঘেঁটে যার আনন্দ, তার মন সব কিছুতেই নোংরা দেখে। সুধাদেবী কোনও কথা বললেন না। এসব কথার কোনও প্রতিবাদ হয় না। প্রতিবাদ করতে গেলে সেটার অন্য ব্যাখ্যা করে এক্ষুনি কাদার মধ্যে নামিয়ে আনা হবে, জানেন সুধাদেবী। হয়তো সেটাই চাইছে তার বড়োবউমা। কিন্তু সতর্ক সুধাদেবী আজ সেই সুযোগটা দিলেন না।

দেবদাস এখন এ বাড়িতে নিয়মিত আসা যাওয়া করছে।

খাওয়া-দাওয়া, হই-হুল্লোড়, সবকিছুতেই ওর ডাক পড়ে। সুধাদেবীর কয়েক মাস অনুপস্থিতির সুযোগে ওরা এটা নিয়ম বানিয়ে ফেলেছে। সুধাদেবী অবাক হন। কেমন ভাই তোরা? যে-ছেলেটা তোদের বোনকে অপমান করে ডিভোর্স দিল, তার সাথেই তোরা এভাবে মেলামেশা করছিস? বোনের মনে কতটা কষ্ট হবে একবারও ভেবে দেখলি না? বউমাদের আদিখ্যেতা দেখলে মনে হয় ওরা ইচ্ছে করেই আরও বেশি করে এসব করছে।

সুধাদেবী ওদের পাতা ফাঁদে পা দিলেন না। এখন কিছু বলতে যাওয়া মানেই ওদের হাতে ঝগড়ার উপাদান তুলে দেওয়া এবং সবশেষে সবার কাছে ‘দজ্জাল বুড়ি’ হিসেবে নিজেকে প্রতিপন্ন করার সুযোগ করে দেওয়া। হঠাৎ সুধার মনে হল, শিউলি কী এসব জানে? আজ না জানলেও একদিন তো ঠিক জানতে পারবে। তখন? সেদিন অসম্ভব কষ্ট পাবে মেয়েটা। বউদিরা না হয় পরের মেয়ে, কিন্তু নিজের দাদারা কী করে এতটা নিষ্ঠুর হতে পারে? এমন ছেলেদের পেটে ধরেছিলেন তিনি? কেমন জানি অসহায় লাগে সুধাদেবীর।

কিন্তু সহ্যের তো একটা সীমা থাকে। সেটারই বাঁধ ভেঙে গেল একদিন। শিউলিকে নিয়ে ওরা সেদিন ওনার সামনেই যা নয় তাই শুরু করে দিল। নিজেকে আর ধরে রাখতে পারলেন না সুধাদেবী। নিজের ছেলে বউমাদের না ধরে সরাসরি দেবদাসকেই ধরলেন। –তুমি কেমন ধরনের ছেলে বাবা! লজ্জা শরম বলে কী কিছুই নেই তোমার শরীরে? এভাবে এই বাড়িতে তোমার আসাটা কি ঠিক বলে মনে করো তুমি? কোন সম্পর্কের ভিত্তিতে তুমি এখানে আসো? একসময় তুমি আমাদের জামাই ছিলে, এখন তো নেই তাই না?

দেবদাস রাগ দেখাল না। খুব শান্ত ভাবে মাথাটাকে হেলিয়ে ঠোঁটের কোণে একটা দুষ্টু হাসি খেলিয়ে বলল– ‘এসব কথা আমাকে না বলে ওনাদের-কে বলুন না। বড়দাই তো আমাকে ডেকে আনেন। আমি যে ইচ্ছে করে আসি তা কিন্তু নয়।’

সুধাদেবী বড়োছেলে তথাগতের দিকে তাকালেন।

তথাগত ভীষণ অপ্রস্তুত। বড়োবউমা সুতপা অবস্থা বেগতিক দেখে ড্যামেজ কন্ট্রোলে নেমে পড়ল। –আপনি বোধহয় ভুলে গেছেন মা, দেবদাস একজন মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভ। ডাক্তারদের সাথে মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভ-দের একটা সম্পর্ক থাকে। বিজনেস ফিল্ডে দেবদাসের খুব নাম। আপনার মেয়ে ওর সাথে সম্পর্ক রাখতে পারেনি। তার দায় আপনি সবার ওপর চাপিয়ে দিতে পারেন না। দেবদাস তবুও নানা ভাবে আপনার ছেলেকে হেল্প করে। নেহাত ওর বড়ো মন তাই।

সুধাদেবী ভীষণ অবাক হন। বিজনেসের সম্পর্ক আর পারিবারিক সম্পর্ক এক হল! কথাগুলো শিউলিকে আর না জানিয়ে পারলেন না। অন্য লোকের মুখে শোনার চেয়ে নিজের মায়ের মুখেই শুনুক নির্মম সত্যটা। ফোনে সবটাই খুলে বললেন।

সব শুনে শিউলি হেসে বলল– ‘আমি সব জানি মা। তুমি এসব নিয়ে মন খারাপ কোরো না। কাউকে কিছু বলতেও যেও না।’

সুধাদেবী অবাক হয়ে বলেন– ‘কার মুখে শুনলি তুই এসব? কে বলল?’

–বড়োবউদিই বলেছে। বলে অনেক আনন্দও পেয়েছে। আসলে দেবদাস ওদের কোম্পানি থেকে বড়দাকে একটা ইউরোপ টুরের বন্দোবস্ত করে দিচ্ছে। পুরো ফ্যামিলি সমেত। সমস্ত খরচা ওরাই দেবে। তার জন্যেই এত খাতির যত্ন। হয়তো মেজদাও কিছু সুযোগ পাবে। শুধু তাই নয়, ওরা সবাই মিলে দেবদাসের জন্য একটা পাত্রীরও সন্ধান করেছে। বড়োবউদি যে-পাত্রীর খবর দিয়েছে, ঘটনাক্রমে মেয়েটি আমার চেনা। ওরা অবশ্য সেটা জানে না। ওই মেয়েটাই ফোনে আমার সাথে যোগাযোগ করেছিল। গল্পের ছলে জানতে চাইছিল, ডিভোর্সটা কেন হয়েছিল।

–তুই কী বললি? সত্যিটাই বলে দিয়েছিলি তো…?

–আমি শুধু বলেছি, এসব প্রশ্ন আমাকে কোরো না, কারণ আমার উত্তর তোমার কাছে একতরফা লাগবে। ওর সাথে কথা বলে যেটুকু বুঝলাম তাতে বড়দা, বড়োবউদি ডিভোর্সের সমস্ত দায় আমার ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে ভালো রকমের ব্রেন ওয়াশ করে দিয়েছে। তারপরে অবশ্য আর কোনও প্রশ্ন করেনি। তবুও বিয়েটা যদি কোনও ভাবে ভেঙে যায়, দোষটা ঘুরেফিরে আমার ঘাড়েই এসে পড়বে জানি। আমার কপালটাই বোধহয় এমন!

কিছুক্ষণ কোনও কথা বলতে পারলেন না সুধাদেবী। ফোনের ওপার থেকে ক্লিষ্ট হাসি হেসে শিউলি বলল– ‘বুঝতে পারছি এসব দেখেশুনে তুমি খুব কষ্ট পাচ্ছ। কিন্তু এটাই তো সত্যি মা। সত্যি নির্মম হলেও তাকে মেনে নিতেই হয়। তোমার মেয়ের ভাগ্যটাই যে এমন! তবে বেশি ভাবার কিছু নেই। আমি তো একেবারে জলে পড়ে নেই। দু-মুঠো অন্ন সংস্থানের ব্যবস্থা তো আছে। কেউ তোমার মেয়েকে মাটিতে ফেলে পিষে অন্তত মারতে পারবে না। লতানো গাছেরাও পৃথিবীতে বেঁচে থাকে মা।’

সুধাদেবী অসহায় ভাবে বললেন– ‘কিন্তু একটা অবলম্বন লাগে তাদের… বাড়তে, ফুল দিতে, ফল দিতে। আমি বলি কি, তুই একটা বিয়ে করে নে মা। দেবদাস যদি করতে পারে, তবে তুই কেন পারবি না?’

শিউলি হেসে বলল– ‘তুমি কী আমাকে প্রতিযোগিতায় নামাতে চাইছ?’

তারপরেই অন্যমনস্ক ভাবে বলল– ‘বিয়ে মানে তো দেবদাসের মতো পুরুষের সাথে একটা বন্দোবস্ত। যে-বন্দোবস্তে একতরফা ভাবে কতকগুলি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। পরাজিত পক্ষের মতো মেয়েদের-কেই সব সময় চুক্তির সমস্ত শর্ত মেনে নিতে হয়। না মানলেই শর্ত লঙঘনের দায় চাপিয়ে চলে পেষণ। তবে এটাও মানি, সহমর্মী পুরষেরাও এই পৃথিবীতেই থাকে। যদি কখনও তেমন কারও সাথে দেখা হয়ে যায়… অবশ্যই বিয়ে করব।’

সুধাদেবী আর কোনও কথা বললেন না। অদ্ভুত একটা অনুভূতি খেলে গেল তার মস্তিষ্কে। তার মনে হল, আর একটা সুধা যেন তার মধ্যে থেকে বেরিয়ে নিঃশব্দে চলে গেল বহু দূরে শিউলির ঘরে। শিউলির মাথায় হাত রেখে সে পরম মমতায় বলল, ‘অন্তরের টান থাকলে মানুষ সব পায়। অন্তরের শক্তিই তাকে সব এনে দেয়। টাকা, গাড়ি, বাড়ি নয়… তুই শুধু একটু ভালোবাসা চেয়েছিস। ঠিক পাবি মা! এ আমার আশীর্বাদ। মায়ের আশীর্বাদ কখনও বিফলে যায় না।’

অ্যালজাইমার্স এবং রিস্ক ফ্যাক্টর

জার্মান মনোচিকিৎসক অ্যালয়েস অ্যালজাইমার এই রোগটি সম্পর্কে প্রথম বিস্তারিত জানান। তাই তাঁরই নামানুসারে এই রোগটির নামকরণ হয় ‘অ্যালজাইমার্স’।

এটি স্মৃতিভ্রংশের প্রাথমিক রূপ। সাধারণত ষাটোর্ধ্ব নারী-পুরুষ বেশি আক্রান্ত হন এই অসুখে। তবে বর্তমানে এই রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন কম বয়সিরাও। সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে, ক্রমশ বাড়ছে এই রোগের প্রকোপ এবং চিকিৎসকরা মনে করছেন, আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে প্রতি ৮৫ জন ষাটোর্ধ্ব মানুষের মধ্যে অন্তত ১জন আক্রান্ত হতে পারেন এই রোগে। তাই, রোগটি সম্পর্কে সচেতনতা জরুরি। ডা. দেবাশিস চক্রবর্তী রোগটির কারণ, ফলাফল এবং চিকিৎসা পদ্ধতি সম্পর্কে বিস্তারিত জানালেন সম্প্রতি।

অ্যালজাইমার্স কী?

অ্যালজাইমার্স ডিজিজ হল একটি নিউরোলজিক্যাল ডিসঅর্ডার। এটি ডিমেনশিয়া বা স্মৃতিভ্রংশের প্রথম ধাপ। শুধু ষাটোর্ধ্ব নারী-পুরুষই নয়, কম বয়সিরাও আক্রান্ত হতে পারেন এই অসুখে।

অ্যালজাইমার্স-এর কারণ কী?

কী কারণে এই রোগ হয়, তা সঠিক ভাবে উদ্ঘাটন করা সম্ভব হয়নি এখনও। তবে বিভিন্ন গবেষণার মাধ্যমে জানা গেছে, এটি মস্তিষ্কের প্লাক ও টেঙ্গুল অর্থাৎ, হাইড্রোফসফোরাইলেটেড টাউ প্রোটিনের সমষ্টির কারণে ঘটে। ফলে, অ্যালামাইড প্লাক, নিউরোফাইব্রিলারি টেঙ্গুল এবং অ্যাসিটাইলকোলিন উপাদানের অস্বাভাবিক উপস্থিতি পরিলক্ষিত হয় আক্রন্তের মস্তিষ্কে। অনেকের মতে, এই রোগের সূত্রপাত হয় অ্যামাইলয়েড বিটা নামের এক ধরনের প্রোটিন উৎপাদনের মাধ্যমে, যা পরবর্তী সময়ে মস্তিষ্কের রক্তকণিকার ভিতরে দলা পাকিয়ে অ্যামাইলয়েড প্লাক তৈরি করে। আর এই অ্যামাইলয়েড প্লাক-ই নিউরন বা মস্তিষ্ককোশের মৃত্যুর জন্য দায়ী। সাধারণত অ্যামাইলয়েড প্লাক দুটি ঘটনার মাধ্যমে মস্তিষ্ককোশের মৃত্যু ঘটায়। এক, প্রদাহ ও জারণক্রিয়ায় স্নায়ুর ক্ষতি করে। দুই, নিউরোফাইব্রিলারি টেঙ্গুল গঠনের মাধ্যমে। মস্তিষ্কের কর্টেক্সে ও সম্মুখভাগে পিরামিড আকৃতির অ্যাসিটাইলকোলিন নিউরন থাকে, যা অ্যাসিটাইলকোলিন ক্ষরণের মাধ্যমে বুদ্ধিমত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই রোগে টাউ প্রোটিনের গাঠনিক পরিবর্তনের কারণে এই অ্যাসিটাইলকোলিন নিউরনের কর্মক্ষমতা হ্রাস পায়। ফলে স্মৃতি হ্রাস পেতে থাকে।

কী কী লক্ষণ বা উপসর্গ দেখা যায় এই রোগের ক্ষেত্রে?

তাৎক্ষণিক কিছু ভুলে যাওয়া এই রোগের প্রাথমিক লক্ষণ। তবে এই প্রাথমিক উপসর্গকে অনেকেই ভুল করে বার্ধক্যজনিত সমস্যা কিংবা মানসিক চাপের বহিঃপ্রকাশ মনে করেন। কিন্তু উপসর্গ দেখে অসুখ ধরতে না পারলে কিংবা চিকিৎসা না করিয়ে অবহেলা করলে কী কুফল ভোগ করতে হয়, তা রোগী টের পান কিছুদিন পরে। কারণ, রোগ বাড়লে দ্বিধাগ্রস্থতা, অস্থিরতা, রাগ বেড়ে যাওয়া, ভাষা ব্যবহারে অসুবিধা, দীর্ঘ সময় কিছু মনে না পড়া প্রভৃতি সমস্যা প্রকট হতে থাকবে।

শোনা যায় অ্যালজাইমার্স-এর কিছু রিস্ক-ফ্যাক্টর আছে, সত্যিই কি তাই?

হ্যাঁ, অ্যালজাইমার্স ডিজিজ হওয়ার সঙ্গে কিছু রিস্ক-ফ্যাক্টর যুক্ত থাকে। এগুলি এই রোগ তৈরিতে এবং তীব্রতায় প্রভাব ফেলে। যেমন–

  •  নিম্ন সামাজিক-অর্থনৈতিক শ্রেণি
  •  বিচ্ছিন্ন জীবনযাপন
  •  দুর্বল সামাজিকতা
  •  অলস মস্তিষ্ক বা মস্তিষ্কের যথোপযুক্ত ব্যবহার না করা
  •  প্রবল পারিবারিক চাপজনিত বিষণ্ণতা
  •  হাইপারটেনশন ও ব্লাড সুগারের মতো ভাস্কুলার রিস্ক ফ্যাক্টরসমূহ, যা মস্তিষ্কে রক্ত প্রবাহ হ্রাস করে, যার ফলে ডিমেনশিয়া বৃদ্ধি পায়। যদিও, এরফলে সরাসরি অ্যালজাইমার্স ডিজিজ তীব্রতর হয় না

কাদের সর্বাধিক আশঙ্কা রয়েছে অ্যালজাইমার্স ডিজিজ হওয়ার?

নিম্ন সামাজিক-অর্থনৈতিক অবস্থা সম্পন্ন, একাকী থাকা, সারাদিন করার মতো কিছু না থাকা ও এভাবে কোনও সক্রিয়তার সঙ্গে নিজের মস্তিষ্কের ব্যবহার না করা এবং প্রবল পারিবারিক চাপের জন্য বিষণ্ণতায় আচ্ছন্ন যে-কোনও ব্যক্তির ভবিষ্যতে আলজাইমার্স ডিজিজে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বয়স্ক মানুষজনের মধ্যে অ্যালজাইমার্স বেড়ে যাচ্ছে কেন?

পরিবর্তিত সামাজিক কাঠামোয় জয়েন্ট ফ্যামিলির তুলনায় নিউক্লিয়ার ফ্যামিলির সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। আরও উন্নত জীবিকার সন্ধানে তরুণ প্রজন্ম শহর ছেড়ে বা দেশ ছেড়ে যাচ্ছে বলে পরিবারের পুরোনো প্রজন্ম হয় একা থাকছে নয়তো কারও সহায়তা নিয়ে বাস করছে। এর ফলে মস্তিষ্কের কোশে ‘স্লো ডিগ্রেডেশন’ হতে থাকে পর্যাপ্ত ‘স্টিমুলেশন’-এর অভাবে। এটিই রোগ বৃদ্ধির সম্ভাব্য অন্যতম কারণ।

অ্যালজাইমার্স ডিজিজে আক্রান্ত হওয়ার হাত থেকে রক্ষা পেতে জীবনযাত্রায় কী ধরনের সহজ পরিবর্তন আনা যেতে পারে?

যেসব ব্যক্তির কোনও সক্রিয় জীবন নেই, তারা ক্রসওয়ার্ড পাজল সমাধান করতে পারেন, নিয়মিত সামাজিক কর্মকাণ্ডে যোগ দিতে পারেন এবং গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও সামাজিক বিষয়ভিত্তিক বিতর্কে অংশ নিতে পারেন। এর ফলে মস্তিষ্ক সর্বদা সক্রিয় থাকবে। আর মস্তিষ্ক সক্রিয় রাখতে পারলে, অ্যালজাইমার্স ডিজিজকেও দূরে রাখা সম্ভব।

অ্যালজাইমার্স কি সম্পূর্ণ নিরাময় সম্ভব?

না। এই রোগের কোনও স্থায়ী প্রতিকার নেই। এর চিকিৎসা, রোগের লক্ষণ এবং উপসর্গ দেখে কিছু ওষুধ এবং কাউসেলিং-এর মাধ্যমে করা হয়। এক কথায়, এই রোগের চিকিৎসা প্রতিরোধের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। তাই, আগাম সতর্কতার যেমন প্রয়োজন, ঠিক তেমনই এই রোগে আক্রান্তদের সুস্থ রাখার জন্য এগিয়ে আসতে হবে প্রতিটি শুভবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষকে। আন্তরিক যোগাযোগ এবং সামাজিক মেলামেশার মাধ্যমেই সুস্থ রাখতে হবে রোগীকে।

পড়ার জন্য সীমাহীন গল্প-নিবন্ধসাবস্ক্রাইব