যাবার জায়গা

নির্জন হানাবাড়ির মাঝে দাঁড়ানো বৈশাখীর মুখে ছাদের ফাটল গলে এক চিলতে আলো এসে পড়ে। রণেন্দুর তাকে দেবী বলে মনে হয়। সে ভাবে কথাটা আজ বলেই ফেলবে বৈশাখীকে। কিন্তু তার মুখমন্ডল ঘেমে ওঠে। হঠাৎ কড়িবরগার থেকে দৃষ্টি সরিয়ে বৈশাখী চুপ করে যাওয়া রণেন্দুর মুখের দিকে তাকায়। তার কপালের ঘামে হাতের তালু ঠেকিয়ে বলে, ‘কী রে, তুই কী আমার সাথে সেক্স করতে চাইছিস!’

ঘাবড়ে যায় রণেন্দু। সে কীভাবে প্রোপোজ করবে ঠিক করতে পারছিল না লজ্জায়, তাকে বৈশাখীর হঠাৎ এই প্রশ্ন এফোঁড়-ওফোঁড় করে দেয়। সে তোতলাতে তোতলাতে বলে, ‘ন্না, না তো, কই…’

‘ছেলেরা সেক্স ফিল করলে কপাল ঘেমে যায়’ রিনরিনে হাসি ছড়িয়ে কথাগুলো বলে বৈশাখী। ‘আলটিমেটলি ছেলেরা তো মেয়েদের কাছাকাছি আসতে চায় সেক্স করার জন্যই।’ বৈশাখীর এই কথায় তার মনের ভিতর সাজিয়ে গুছিয়ে রাখা কথাগুলো এলোমেলো হয়ে যায়।

কলেজ পালিয়ে সবাই এদিক ওদিক ঘুরতে চলে যায়। জোড়ায় জোড়ায়। একদিন নদীর ধারে যায় রণেন্দু ও বৈশাখী। জঙ্গলে ঢাকা পোড়ো জমিদার বাড়ি দেখতে। রণেন্দু বৈশাখীর ক্লাসমেট হলেও মনের মধ্যে যত্নলালিত কথাটা তাকে কোনওদিনও বলে উঠতে পারেনি। আসলে বৈশাখীর সমদূরত্ব বজায় রাখা সব ছেলেবন্ধুর মধ্যে তার অবস্থানটা গুলিয়ে ফেলে রণেন্দু। তাই একদিন সুযোগ বুঝে বৈশাখীকে আমন্ত্রণ জানায় অজয়ের তীরে পোড়ো জমিদার বাড়ি দেখতে যাবার।

বাইকের পিছনে বসিয়ে বৈশাখীকে নিয়ে যাবার সময় নিজেকে রণেন্দুর পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী ও সৗভাগ্যবান সম্রাট বলে মনে হচ্ছিল। কোনও ধন-দৗলত ছাড়াই একজন মহিলাকে শুধুমাত্র নিজের করে পাওয়ার জন্য পুরুষরা সত্যিই সব ঐশ্বর্য হেলায় হারিয়ে দিতে পারে। অনেকের নজর থাকলেও বৈশাখীকে নিয়ে আজও কেউ স্বপ্নের মায়াজাল বুনতে পারেনি। স্বপ্ন দানা বাঁধার আগেই সবাই বুঝতে পারে বৈশাখী আদৌ ধরাই দিচ্ছে না স্বপ্নে। বাস্তবে তো নয়ই। সেই বৈশাখী একবার বলায় রাজি হয়ে যাবে, রণেন্দু ভাবেনি।

সাত কিলোমিটার দূরের নদীপাড়ে জমিদার বাড়ির ভগ্নাবশেষ দেখতে যাবার প্রস্তাব দিয়েছিল রণেন্দু। ভেবেছিল সেখানে নদীর তীরে চুনসুরকির ইটের স্তূপে বসে কাশফুলের দিকে তাকিয়ে কথাটা আজ বলেই ফেলবে বৈশাখীকে। তা-ও বাইকে চাপার সময় বৈশাখী বলেছিল, ‘কী রে, শুধু আমি আর তুই? আর কেউ যাবে না?’

মুহূর্তে চুপসে যায় রণেন্দু। এমন বেড়াতে যাবার ক্যাবলা প্রস্তাবের মধ্যে লুকিয়ে থাকা ছেলেদের উদ্দেশ্য মেয়েরা কোথাও পা বাড়ানোর আগেই বোধহয় বুঝে ফেলে, ভাবে রণেন্দু। তবে সে কিছু বলার আগেই বৈশাখী বলে, ‘ঠিক আছে, চল…’

জমিদার বাড়ির ভেঙে পড়া দেয়ালে আবছা হয়ে যাওয়া বংশলতিকা পড়তে গিয়ে যখন ঝুঁকে পড়েছিল বৈশাখী, সত্যি মুহূর্তে উত্তেজিত হয়ে উঠেছিল রণেন্দু বৈশাখীর ক্লিভেজের দিকে তাকিয়ে। কিন্তু ওই প্রশ্ন করার পর কেমন যেন গুটিয়ে গেল রণেন্দু। আর সে প্রস্তাবটা পাড়তেই পারল না। ফিরতে ফিরতে রণেন্দু প্রশ্ন করে, ‘তোর কী মনে হয়, ছেলেরা কি শুধু সেক্স করতে চায় বলেই মেয়েদের কাছে ঘুর ঘুর করে? তাহলে, জীবনে প্রেম ভালোবাসার কি কোনও গুরুত্ব নেই?’

বৈশাখী সে প্রশ্ন শুনে বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। তারপর রণেন্দুর পিঠে তার চিবুক ছোঁয়ায়। মুহূর্তে একটা অদ্ভুত শিহরণ জেগে ওঠে রণেন্দুর শরীরে। সে বাইকের গতি আস্তে করে দেয়। বৈশাখী তার কানের কাছে ফিসফিস করে বলে, ‘তুই না খুব ছেলেমানুষ!’

সারা রাস্তা ভেবেও সে কথার মানে উদ্ধার করতে পারে না রণেন্দু। বাইক থেকে নেমে যাবার সময় বৈশাখী বলে যায়, ‘মেয়েরা কিন্তু ছেলেমানুষ বর আদৌ পছন্দ করে না। বড়ো হ তাড়াতাড়ি।’

রণেন্দুর সারা শরীরে যেন বিদ্যুতের ঝিলিক খেলা করে যায়। স্ট্যান্ড করা বাইকের পাশে দাঁড়িয়ে সে নিজের শরীরের কাঁপুনি অনুভব করে।

তারপর থেকেই রাত জেগে রণেন্দু নিজের বদলে বৈশাখীর নোটস তৈরি করতে থাকে। পরীক্ষার আগে পড়াশোনার জন্য বাড়ি থেকে বেরোনো বন্ধ করে দিল বৈশাখী। লাইব্রেরি থেকে ছুটোছুটি করে বই এনে তার কাছে পৌঁছে দিতে লাগল রণেন্দু। আস্তে আস্তে বন্ধুমহলে ‘রণেন্দু-বৈশাখী’ কথাটা আর-পাঁচটা জুটির মতো চাউর হতে থাকে। রণেন্দু তার স্বপ্নের সিঁড়ি বেয়ে একটা করে ধাপ উপরে উঠতে থাকে।

আনন্দমুখর হয়ে থাকে কলেজের দিনগুলো। মাঝে মাঝে রণেন্দুর পথে অবশ্য টুকরো-টাকরা বাধা এসে দাঁড়ায়। তাদেরই সহপাঠী কৃষ্ণেন্দু ওর মাকে বলে, ‘মা. বৈশাখীকে তুমি বউমা করাতে চাও, ওকে বলো না।’ কৃষ্ণেন্দুর মা-ও মনে মনে অমন একটা ইচ্ছা লালন করতেন। একদিন এক বিয়ে বাড়িতে বৈশাখীকে সামনে পেয়ে কষ্ণেন্দুর মা সবার সামনে বলে বসেন, ‘তোকে আমার বউমা করব, মা…’

এই ঘটনায় রণেন্দুর অবশ্য ভালোই হয়। পরদিন কলেজে সবার সামনে কৃষ্ণেন্দুকে যা-তা অপমান করে বৈশাখী। রণেন্দু ভিতরে ভিতরে খুব খুশি হয়। প্রেমিকা বা গার্লফ্রেন্ড সুন্দরী হলে ছেলেরা যে কী নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে তা সে-ই জানে।

কলেজ পেরিয়ে ইউনিভার্সিটি গিয়ে আবার কিছুদিন টেনশন ভোগ করল রণেন্দু। অবিবাহিত ছোকরা প্রফেসর পি কে আর প্রথম দিনেই চেয়ারে বসে বললেন, ‘বছর কয়েক আগেও উলটোদিকের বেঞ্চে বসেছি। সো ইউ ক্যান টেক মি টু বি আ ফ্রেন্ড অ্যান্ড গাইড র্আদার দ্যান টিচার অর প্রিচার…’

কিন্তু রণেন্দুর বুকে কাঁটা ঢুকে গেল একটা। সব সাধারণ পুরুষমানুষের মতো পি কে আর-এর চোখ বারবার আটকে যেতে লাগল বৈশাখীর কাছে গিয়ে। মেয়েদের কে কতটা পড়া বুঝল সেই জিজ্ঞাসাটা বেশি করে বৈশাখী কেন্দ্রিক হয়ে গেল।

তবে ততটা গুরুত্ব দিল না রণেন্দু। কারণ ততদিনে সে বৈশাখীর অনেক কাছে চলে এসেছে। বৈশাখীকে সে আসল কথাটা বলে দিয়েছে অনেকদিন হল। বৈশাখী শুনে নিয়ে বলেছিল, ‘বিনা গোলাপে প্রোপোজ! যা, গোলাপ ফুল নিয়ে আয়। তারপর ভাবব।’

পার্কে বৈশাখীকে বসিয়ে সে সত্যিই ছুটেছিল গোলাপ খুঁজতে। আর কী পোড়া কপাল! কোথাও সে ফুলের দোকানের দেখা পেল না। অনেক ঘুরে ঘুরে যখন মনে হতে লাগল একা পার্কে বসে অধৈর্য হয়ে উঠবে বৈশাখী! উফ কী যে ঘটবে তার কপালে আজকের দিনে, কে জানে! হঠাৎ নজরে পড়ে গেল একটা লোক সাইকেলে করে একগাদা গোলাপের স্টিক নিয়ে যাচ্ছে। তার কাছ থেকে চড়া দামে একটা গোলাপের স্টিক নিয়ে পার্কে গিয়ে কেতাবি স্টাইলে হাঁটু গেড়ে প্রোপোজ করেছিল রণেন্দু।

গোলাপ পেয়ে বাচ্চা মেয়ের মতো খুশি হয়েছিল বৈশাখী। হেসেছিল খুব, ওর কান্ড দেখে। একবার রণেন্দুর মনে উঁকি দিয়েছিল একটা প্রশ্ন, এসব করে কি মেয়েরা আনুগত্য দেখে? নাকি জাস্ট তার প্রেমিক, বর হতে চাওয়া পুরুষ, তার জন্য কতটা পাগলপারা, দেখে একটা সুখ অনুভব করে? যাই করে করুক। রণেন্দুর যে বৈশাখীকে চাই-ই।

তারপর তারা রেস্টুরেন্টে একসাথে খেয়েছে, একসাথে হাত ধরে ময়দানে, চিড়িয়াখানায় ঘুরেছে। সিনেমা হলে সিনেমা দেখেছে। নলবন ভেড়িতে গিয়ে একদিন ওকে জড়িয়ে চুমু খেয়েছে।

‘এই ছাড়, বিয়ের আগে অত প্রেম ভালো নয়’, বলে যে ঠেলা দিয়ে ছাড়াতে চেয়েছিল বৈশাখী তার দুর্বল থেকে দুর্বলতর হতে থাকা দেখে রণেন্দু বুঝেছিল তাতে প্রতিরোধের চেয়ে প্রশ্রয় ছিল বেশি। কিন্তু সব মেয়েরাই এমন সিচুয়েশনে প্রথমে দুর্বল বা কপট বাধা দিয়েই থাকে। এটাই ভারতীয় নারীদের সংস্কার। ফর্মাল প্রোপোজ করার আগে একদিন রেস্টুরেন্টে খেতে বসে ওর হাতটা নিজের হাতে একবার নিয়ে ধরে দেখতে চেয়েছিল রণেন্দু। বৈশাখী ওর প্রাথমিক দ্বিধা কাটিয়ে বলেছিল, ‘একবার ধরতে দিলেই আবদার মিটে যাবে তো?’

ধরার পর রণেন্দু আর ছাড়তে চায়নি বৈশাখীর হাত। ধরে বসেই ছিল। বৈশাখী বলেছিল, ‘এবার হাতটা ছাড়ুন মশাই। নইলে প্রেমে পড়ে যাবেন!’

বৈশাখী কী জানত না, তার কত আগে থেকে সে তার প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে!

রণেন্দু হাতটা নিয়ে তার নাকের কাছে তুলছিল আস্তে আস্তে। উদ্দেশ্য ছিল ঘ্রাণ নেওয়া। আর একটা চুমু। মাঝপথে হাত থামিয়ে দিয়েছিল বৈশাখী, ‘বলেছিল এটা কিন্তু কথা ছিল না রণো…’

তবু থামেনি রণেন্দু। জোর করে হাতটার ঘ্রাণ নিয়ে একটা দীর্ঘ চুমু খেয়ে ছেড়েছিল। সাথে সাথে চোখ বুজে ফেলেছিল বৈশাখী। দ্রুত শ্বাস ফেলছিল। হাঁফানোর মতো করে ওর দু’বুক ওঠানামা করছিল। দু’মিনিট চোখ বন্ধ করে রেখেছিল। নাকের পাটা ফোলা। গাল লাল। তার বুকের দ্রুত ওঠানামা লক্ষ্য করতে করতে রণেন্দু ভাবল, ভুল করে বসল নাকি! তাতে আবার তার প্রেমটাই না কেঁচে যায়। সবাই জানে বৈশাখী চরম জেদি আর অভিমানী। না, সেদিন খারাপ কিছু ঘটেনি। শ্বাস-প্রশ্বাস স্বাভাবিক হয়ে গেলে চোখ খুলেছিল বৈশাখী। স্বাভাবিক ভাবেই কফি খেতে খেতে গল্প করেছিল। উঠে আসার সময় রণেন্দুর হাতটা একবার নিজের মুঠোর মধ্যে নিয়েছিল, নিজে থেকেই।

তাই কৃষ্ণেন্দুর পাগলামি বা পি কে আর স্যারের তাকিয়ে থাকা নিয়ে আর সে মাথা ঘামাত না। বৈশাখী নিজে থেকে তাকে নিয়ে কারও পাগলামির কথা রণেন্দুর কাছে গল্প করলে রণেন্দু বলত, ‘যাক, আমি সেফ তো?’

কটমট করে তাকাত বৈশাখী। কপট রাগ দেখিয়ে বলত, না, ‘সেফ নোস। আমি ওকে দেখে গলে গেছি…’

সেটা যে নিন্তাতই খুনসুটি বুঝত রণেন্দু। এমএ পড়ার সময়ই একদিন বাবা বলল, ‘হ্যাঁরে রণো, তোর মা বলছিল, কমলবাবুর মেয়ে নাকি আমাদের বউমা হবে…’

রণেন্দু মায়ের দিকে তাকিয়ে দেখল, মা তখন মিটিমিটি হাসছে। রণেন্দু কী আর বলবে বাবা-মা’র কাছে। বলল, ‘তোমরা কোথা থেকে এইসব আজগুবি খবর যে পাও না, একসাথে পড়ি…’

আবার কিছুদিন পরে মা বলল, ‘হ্যাঁ রে, বৈশাখী কিছু বলে?’

‘কী বলবে মা!’

‘না, আমার ওকে বউ হিসাবে খুব পছন্দ। তোর বাবারও। তুই ওকে আমাদের বউ করে এনে দে…’

‘হ্যাঁ চাকরি বাকরি পেলাম না, এখনই তোমাদের বউ খুঁজতে বেরোই আমি…’

শেষে বাবা মা’র জোরাজুরিতে বৈশাখীকে একদিন নিয়ে আসতে হয়েছিল ওদের কাছে। সেদিন লাজুক লাজুক মুখ করে বৈশাখী ওদের বাড়ি এসেছিল। এই লজ্জাটা এসেই যায় বোধহয়। বন্ধু হিসাবে কারও বাড়ি গেলে তো এই লজ্জা থাকে না মেযেদের মধ্যে।

বাড়িতে বৈশাখী আসার পর রণেন্দুর কাজ আরও বেড়ে গেল। বিশেষ কিছু হলেই মা জোর করে বৈশাখীর জন্য দিয়ে পাঠাত। সে কোথাও পুজো দিয়ে আনা মন্দিরের প্রসাদ হোক, বা পৌষের পিঠে পুলি হোক। ছেলের হবু বউকে খাওয়ানো চাই-ই।

পরীক্ষার রেজাল্ট দুজনেরই ভালো হল। তবে বৈশাখী ছাপান্ন পারসেন্ট পেলেও রণেন্দু সাড়ে চুয়ান্নতে আটকে গেল। বৈশাখী নেট-স্লেটের জন্য প্রিপারেশন নিতে লাগল। কিন্তু ইচ্ছা থাকলেও রণেন্দুকে তার স্বপ্ন কাটছাঁট করতে হল। ততদিনে বাবাও রিটায়ার করে গেছে। সংসারের আর্থিক দায় মেটাবার জন্য সে এসএসসি পরীক্ষা দিল। আর একটা স্কুলে পড়ানোর চাকরিও পেয়ে গেল।

অল্প বয়সেই নেট ক্র্যাক করা পি কে আর আবার স্পেশাল কোচিং শুরু করলেন নেট-স্লেট অ্যাস্পির্যান্টদের জন্য। সেখানে বীরেন আর ঝুমুরের সাথে বৈশাখীও যেতে লাগল। সারাদিন লাইব্রেরি টিউশন এইসব করে ফিরতে রাত হয়ে যেত বৈশাখীর। রণেন্দুরও স্কুল থেকে ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা নেমে যেত। প্রায় দিনই সে রাত আটটা সাড়ে আটটার দিকে একবার করে যেত বৈশাখীর কাছে। ওকে সামান্য স্পর্শ করলেই কেমন যেন কেঁপে উঠত বৈশাখী। লজ্জা পেয়ে বুকে মুখ গুঁজে দিত। শুধু ওইটুকু সুখের জন্য রোজ রাত ন’টা থেকে পরের দিন সন্ধ্যা আটটা বাজার অপেক্ষা করত রণেন্দু। দু-তিন মিনিটের একবারের স্পর্শ একজন মানুষকে সারাদিন এভাবে উন্মুখ রাখতে পারে, প্রেমে না পড়লে রণেন্দুর জানা হতো না।

বাঙলির বিয়ের বাজারে আর পাঁচজন স্কুল মাস্টার চাকুরের মতো রণেন্দুর গ্রহণযোগ্যতাও বেড়ে গেছে ততদিনে। বেড়ে গেছে বৈশাখীর বাবা-মার কাছেও। তাঁরা আকারে ইঙ্গিতে বিয়েটা সেরে ফেলার কথা বলেছেন কয়েকবার। বাড়িতে বাবার তো যেন ধৈর্য ধরছে না। কিন্তু বৈশাখী নেট-স্লেট দিয়ে চাকরি পেয়ে তবেই বিয়ে করতে চায়। আর ও এত ইন্টেলিজেন্ট রেজাল্ট নিয়ে ঘরে বসে থাকুক, সেটা রণেন্দুও চায় না। সুতরাং অপেক্ষাই ভবিতব্য।

চলে আসার সময় বৈশাখী বলত, ‘আমার কাছে আর একটু বোস না।’ শাড়ি পড়া বৈশাখীকে দেখলে তার কেমন বউ বউ লাগত।

এক রবিবারের দুপুরে স্নান সেরে বেরিরে বৈশাখী রণেন্দুর দুহাত ধরে একজায়গায় দাঁড় করিয়ে দিল। মাথায় ঘোমটা দিয়ে তার পায়ের কাছের মাটিতে মাথা ঠেকিয়ে প্রণাম করল। এই দৃশ্যে কিছুটা যেন স্তম্ভিত হয়ে গেছিল রণেন্দু। সহপাঠী, বয়সে এক, তাছাড়া শুধু বউ হবার কারণে স্বামীকে প্রণাম, এটা কোনওদিন সমর্থন করেনি সে।

অবাক রণেন্দু বলেছিল, ‘আরে হঠাৎ প্রণাম করছিস কেন?’

‘স্বামীদের প্রণাম করতে হয়, হাঁদারাম!’

‘তুই কি বউ হয়ে গেছিস?’

‘ষোলো পেরোলেই মেয়েরা মনে মনে বউ হয়ে যায়। কার বউ হবে সেটা পরে ঠিক হয়। আমার তো তাও ঠিক হয়ে গেছে।’

এক আকাশ সুখ, এক সমুদ্র সুখ রণেন্দুর বুকের ভিতর তিরতির করে ফল্গু ধারার মতো বইতে শুরু করে।

রণেন্দু চোখ বুজলে তার বাড়ির রান্নাঘরে ব্যস্ত বৈশাখীকে দেখতে পায়। দেখতে পায় বাবা ও মায়ের মুখ থেকে সুন্দরী বউমা পাবার সুখ ও গর্ব সারাদিন চুঁইয়ে চুঁইয়ে পড়ছে। শুনতে পায় রান্নাঘর থেকে ভেসে আসা চুড়ির রিনরিন আওয়াজ।

হঠাৎ চমক ভাঙে বৈশাখীর কথায়। ওর হাতে ধরা খোলা সিঁদুরের একটা কৗটো। ‘আমাকে একবার সিঁদুর পরিয়ে দিবি?’

চমকে ওঠে রণেন্দু। ‘আরে! এখন..বাড়িতে সিঁদুর পরে ঘুরবি নাকি!’

‘দাও না, তুমি চলে যাবার পর আমি মুছে নেব।’

বৈশাখীর দু চোখে কেমন যেন এক আকুল আর্তি। নিরাশ করতে পারে না রণেন্দু ওকে। এক চিমটে সিঁদুর দু আঙুলে তুলে নেয় কৌটো থেকে। বৈশাখীর সিঁথিতে সেই সিঁদুর লেপে দেবার সময় হাত কেঁপে যায় রণেন্দুর। ভিতরে ভিতরে একটা মিশ্র আনন্দের অনুভুতি লাভ করে তার সারা শরীর, দেহ, মন। বৈশাখী ওকে দু’বাহু দিয়ে জড়িয়ে ধরে।

হঠাৎ শীর্ষেন্দুর লেখা ‘বাঘ’ গল্পটার কথা মনে পড়ে যায় রণেন্দুর। তার খুব প্রিয় গল্প। গল্পের নায়ক জোনাকি কুমারের কোথাও যাবার যায়গা ছিল না। ছিল, দু বছর আগে পর্যন্ত। প্রেমিকা তিতিরের বিয়ের আগে অবধি। তার সুন্দরী প্রেমিকা তিতির। যার নানা ভঙ্গির মধ্যে লুকিয়ে থাকত কত সুন্দর দৃশ্য। জড়িয়ে থাকা অবস্থায় রণেন্দু ফিসফিস করে বলে, ‘তুমিও আমার একমাত্র ‘যাবার জায়গা’, বৈশাখী। শুধু হারিয়ে যেও না…’

মুখ তুলতে রণেন্দু দেখে বৈশাখীর চোখে জল। শাড়ির আঁচল দিয়ে সেই জল মুছে স্বাভাবিক হয়ে নেয় বৈশাখী। তারপর বলে, ‘আজ থেকে আমি তোর বউ, অ্যাঁ? নো প্রেমিকা, নো গার্লফ্রেন্ড, অনলি বউ। আর আজ থেকে আমাকে ‘তুই’ বলবি না। শুধু ‘তুমি’ বলবি।’

সেদিন এক অপূর্ব সুখানুভূতি নিয়ে ঘরে ফেরে রণেন্দু। সারারাত তার ঘুম হয় না ভালো করে। বারবার আসে আর ভেঙে যায়। যতটুকু সময় ঘুম হয় শুধু বৈশাখীকে স্বপ্নে দেখে, মনে হয় আর সে বৈশাখীকে ছেড়ে থাকতে পারবে না। মনে হয় এখনই ফের চলে যায় তার কাছে, হাত ধরে নিয়ে নিজের ঘরে চলে আসে।

সন্ধ্যার গল্পের মাঝে মাঝে হঠাৎ হঠাৎ কথা থামিয়ে প্রশ্ন করত বৈশাখী, ‘আমি তোমার বউ তো?’

মিটিমিটি হাসত রণেন্দু।

বৈশাখী বলত, ‘না, উত্তর দাও।’

‘হ্যাঁ, বউ। নে, হয়েছে?’

হেসে বিছানায় একপাক গড়াগড়ি দিত বৈশাখী। বালিশে চিবুক ছুঁইয়ে বিছানায় শুয়ে তার দিকে তাকিয়ে থাকত।

বৈশাখীর সারাদিন প্রাণপাত পরিশ্রম, লাইব্রেরি, টিউশন শেষ হয় অবেশেষে। তার নেট পরীক্ষা হয়ে যায়। যখন রণেন্দু ভাবছিল এবার নিজেদের মতো করে একটু সময় কাটানো যাবে, তখনই তার বিএড ট্রেনিং-এর চিঠি চলে আসে।

সেদিন সন্ধ্যায় মুখ ভার করে থাকে বৈশাখী। বলে, ‘না, তুমি আমাকে ছেড়ে কোথাও যাবে না…’

‘আরে কোথায় যাব পাগলি!’

‘না, আমি দু বছর তোমাকে ছেড়ে থাকব কী করে!’

‘আরে দু বছর তো আর একটানা থেকে যাচ্ছি না। প্রত্যেক মাসেই তো আসব।’

সেদিন হঠাৎ বৈশাখী বলে, ‘এক মাস না দেখলে যত চুমু ডিউ হবার কথা সব আমাকে আগাম দিয়ে যাও।’

একই শহরে বৈশাখীর দুই মাসি আর মামার বাড়ি। প্রায় দিনই কারও না কারও বাড়িতে তাদের পারিবারিক আড্ডা জমে। বৈশাখীর বাবা-মা নির্দ্বিধায় তাদের এমএ পাস মেয়ে আর স্কুলমাস্টার হবু জামাইকে রেখে চলে যান সে সবে যোগ দিতে। স্কুল কলেজের অল্প বয়সী ছেলেমেয়েদের মতো তার সুযোগ নেবার চিন্তা কোনওদিনও রণেন্দু-বৈশাখীর মনে আসেনি।

তবে সেদিন বৈশাখীর কপালে পাঁচটা চুমু খাবার পর ও তর্জনী দিয়ে ক্লিভেজের মাঝখানটা দেখায়। দিয়ে চোখ বুজে ফেলে। রণেন্দু কী করবে ভেবে থমকে যায়। বৈশাখীর তখন দ্রুত শ্বাস পড়ছে। মনে হয় সে যেন কিছুর জন্য অপেক্ষা করছে।

বৈশাখীর বুকের উপর মুখ নামিয়ে এনেছিল রণেন্দু। তারপর দুজনে কোথায় ভেসে গিয়েছিল মনে নেই।

দেখতে দেখতে বছর ঘুরে যায়। নেট-এর রেজাল্ট বের হয়। বৈশাখী পাস করে যায়। ইন্টারভিউ দিয়ে অ্যাপয়েন্টমেন্ট পেতে প্রায় বছর খানেক লেগে যায়। তাই ততদিনের জন্য পার্ট টাইম লেকচারারের পোস্টে ঢুকে যায় ও। নর্থ বেঙ্গল ইউনিভার্সিটি থেকে শিলিগুড়ির একটা কলেজে যোগ দেবার ডাক আসে। সেই সময় রণেন্দু পরীক্ষার জন্য বেশ কিছুদিন বাড়ি আসতে পারে না। অথচ আসার জন্য মনটা ছটফট করে।

বৈশাখীর যাবার আগে রণেন্দু দুদিনের ছুটি ম্যানেজ করে। বৈশাখী টেনশনে ছিল। তার টিকিট ছিল ওয়েটিং লিস্টে। কনফার্ম হল কিনা দেখতে যাবার নাম করে রণেন্দু চলে গেল টিকিট নিয়ে। সেটা ক্যানসেল করে প্লেনের টিকিট নিয়ে এল।

কিন্তু যতটা খুশি হবে ভেবেছিল বৈশাখী ততটা যেন হল না। বলল, ‘অত টাকা খরচ করতে গেলে কেন… আমি ট্রেনেই চলে যেতাম তৎকাল করে। গোছগাছে ব্যস্ত থাকায় দুজনের একাকী আলাপ সেদিন ততটা জমল না। আসার সময় বৈশাখী বলল, ‘তোমার কত টাকা লাগল টিকিট কাটতে? ওর হাতে তখন কয়েকটা পাঁচশো টাকার নোট।’

‘কেন? তুই আমাকে টাকা দিবি নাকি!’

বৈশাখীর মুখটা কেমন যেন ফ্যাকাশে হয়ে যায়।

‘দাঁড়া, তোকে সামনের মাসেই পিঁড়িতে বসাচ্ছি। তার পর সব বউ যা করে, তুই ও তো তাই করবি? হাত খরচটা ধরিয়ে দিয়ে গোটা মাইনের টাকাটাই তো নিয়ে নিবি…’

শরীরের স্বাদ একবার পাবার পর রণেন্দুর দিনরাত কেমন যেন পাল্টে যায়। সেই আস্বাদন পাবার জন্য শরীর বারবার জেগে উঠতে থাকে। রণেন্দুর খুব ইচ্ছা ছিল শিলিগুড়ি যাবার আগে বৈশাখীকে একবার কাছে পেতে…

সেটা আর হয়ে ওঠে না। বৈশাখীকে সে এয়ারপোর্টে বিদায় জানিয়ে বাড়ি ফিরে আসে। বাবা মা পুরুতের সাথে কথা বলে শুভ লগ্নের দিন ঠিক করতে বসে যায়।

ফ্লাইটের সময় হিসেব করে ফোন করে রণেন্দু। বিজি টোন পায়। ভাবে বাবা মা র সাথে কথা বলছে হয়তো। ফ্লাইট ল্যান্ড করার খবর দিচ্ছে। দশ মিনিট পরে ফোন করে ফের। আবার এনগেজড টোন পায়। এমন হলে বৈশাখী কল হোল্ড করে রণেন্দুকে ধরে নেয়। যদি বা জরুরি ফোন হয়, কথা শেষ করেই রিং ব্যাক করে। ফোনের প্রত্যাশায় থাকতে থাকতে দুপুর বেলায় ঘুমিয়ে পড়ে রণেন্দু। ঘুম থেকে উঠে তড়িঘড়ি সে ফোন চেক করে। না, কোনও কল আসেনি। মোবাইল হাতে নিয়ে সে চটজলদি রিং ব্যাক করে। খবর নেবার আগেই ঘুমিয়ে পড়ার জন্য মনে মনে লজ্জিত হয়। কিন্তু আবার এনগেজড টোন পাওয়া যায়।

ভিতরে ভিতরে অস্থির হয়ে ওঠে রণেন্দু। আবার কল করে। ঘোষিকার গলা বলে ওঠে ফোনে ‘অন্য কল পর হ্যায়’। হোয়াট্‌স অ্যাপ অন করে রণেন্দু। মেসেজ করে সে তড়িঘড়ি। একের পর এক। অনলাইন থাকতে থাকতে হঠাৎ অফলাইন হয়ে যায় বৈশাখী।

‘তুমি কোথায়?’ ‘ফোন ধরছ না কেন?’ ‘সেফলি ল্যান্ড করেছ?’ প্রশ্নগুলো আনসিন, আন আনসারড রয়ে যায়। বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে র‍্যান্ডম টাইপ শুরু করে রণেন্দু! একটানা একশো সাতাশটা মেসেজ পাঠিয়ে থামে সে। ডবল টিক হয়। তবু সবুজ হয় না তার মেসেজ। অথচ মাঝে মাঝে বৈশাখীকে অনলাইন দেখায়। রণেন্দু বুঝতে পারে হোয়াট্‌স অ্যাপ খুলছে বৈশাখী। অথচ তার মেসেজ হেড খুলে দেখছে না। সে হোয়াট্‌স অ্যাপে ভয়েস কল করে। স্ক্রিনে ভেসে ওঠে ‘মাই জান ইন অন অ্যানাদার কল, মাই জান ইজ অন অ্যানাদার কল।

সন্ধ্যা হয়ে যায়। পাগল পাগল লাগে রণেন্দুর। ফোন করার বদলে ছুটে যায় বৈশাখীদের বাড়ি। উদ্বেগ যথাসম্ভব গোপন রেখে জেনে নেয় সেফ ল্যান্ডিং এর খবর। লজ্জায় বলতে পারে না, ফোন তুলছে না বৈশাখী। পাগলের মতো রাস্তায় হাঁটতে থাকে রণেন্দু। আর রিং করতে থাকে, মেসেজ করতে থাকে। কত খারাপ কিছু মনে উদয় হয়।

একবার ওর গলাটা শুনতে খুব ইচ্ছা করে। কোথায় গিয়ে উঠল, কেমন আছে, কিছু অসুবিধা হচ্ছে কিনা, সব জানতে ইচ্ছা করে। সব জানার অধিকার তো তারই, তার একার। তাহলে কার সাথে এত কথা বলছে বৈশাখী। ওর কি কিছু ঘটল? ওর কি ফোন হারিয়ে গেল? ওর ফোন কি অন্য কেউ ব্যবহার করছে?

রাত হয়, উদ্ভ্রান্তের মতো বাড়ি ফিরে আসে রণেন্দু। মা বাবা অনেক প্রশ্ন করে। সব হুঁ-হাঁ করে উত্তর দিয়ে নিজের শোবার ঘরে গিয়ে খিল দেয় সে। তার দু’চোখে তখন টলটলে জল। দশটা থেকে সাড়ে এগারোটা, ফোন হোয়াট্‌স অ্যাপ সব বন্ধ রাখে বৈশাখী। রণেন্দু ফেসবুক খোলে, মেসেঞ্জার খোলে, কোথাও অনলাইন নেই বৈশাখী।

রাত সাড়ে এগারোটায় হোয়াট্‌স অ্যাপ অনলাইন দেখায়। রণেন্দু কাঁপা কাঁপা হাতে ভিডিও কল করে। কল রিসিভ করে না বৈশাখী। পরের মুহূর্তেই রিং ব্যাক করে রণেন্দু। স্ক্রিনে ভেসে ওঠে ‘মাই জান ইজ অন অ্যানাদার কল’। সাড়ে এগারোটা, বারোটা, সাড়ে বারোটা, একটা… ‘মাই জান ইজ অন অ্যানাদার কল’, ‘মাই জান ইজ অন অ্যানাদার কল…’

দেড়টা, দুটো, আড়াইটা… ‘মাই জান ইজ অন অ্যানাদার কল’… ‘মাই জান ইজ অন অ্যানাদার কল…’

ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকে রণেন্দু।

চারটে, সাড়ে চারটে… ‘মাই জান ইন অন অ্যানাদার কল’, ‘মাই জান অন অ্যানাদার কল…’

পাঁচটায় গিয়ে অফলাইন হয়ে যায় বৈশাখী। কাঁদতে কাঁদতে ক্লান্ত রণেন্দু ঘুমিয়ে পড়ে। ঘুমের দেশে গিয়ে সে স্বপ্নে দেখে বৈশাখীকে।

একসময় ঘুম ভেঙে যায়। স্বপ্ন স্বপ্নই থাকে মানুষের। কদাচ তা পূরণ হয়। ফোন খুলে হোয়াট্‌স অ্যাপে একটা মেসেজ দেখতে পায় রণেন্দু।

‘সরি রণো, আমি বুঝতেই পারিনি কবে পরিমলকে এত ভালোবেসে ফেলেছি। বুঝলাম তখন, যখন শিলিগুড়ি যাবার ডাক এল। বুঝতে পারলাম ওকে ছেড়ে থাকতে হলে আমি মরে যাব। ও আমার জন্য প্রাণপাত করেছে বলেই আজ আমি নেটে সফল হতে পেরেছি। তার সবটুকু তোমাকে আমি বলতে পারিনি। ও চাইছে শিগগিরিই বিয়েটা হয়ে যাক আমাদের। কাকা-কাকিমা শুনলাম শুভলগ্ন দেখে রেখেছেন। আমার মতো মেয়ে পেয়েই যাবে। একজনকে খুঁজে নিও! ভালো থেকো।

ফোনটা হাত থেকে পড়ে যায় রণেন্দুর। সাধের স্মার্ট ফোনের টাচ স্ক্রিন ভেঙে চৌচির হয়ে যায়। চৌচির হয়ে যায় তার হূদয়। শিশুর মতো ডুকরে কেঁদে ওঠে সে। বুঝতে পারে তার একমাত্র ‘যাবার জায়গাটা’ হারিয়ে গেল, চিরতরে…

ঠেলা

সামনের রোববার বিকেলে যেন কোনও কাজ রেখো না।

শ্রীদীপ্তা ড্রেসিং টেবিলের টুলটায় বসে মুখে ময়েশ্চারাইজার ঘষছিল। বাড়তি যত্ন চল্লিশ-এর দিকে ছুটে যাওয়া শরীর চায়। শ্রীদীপ্তা সে চাওয়া সারাদিনে না পারলেও রাতে মেটায়। কমপিউটার সি্্ক্রন থেকে মুখ তুলল না জয়। রীতিমতো উপেক্ষা মনে হয় শ্রীদীপ্তা’র। বেশ কিছু বছর ধরেই চলে আসছে এই ঘটনা। শুধু ছোট্ট একটা জবাব বুঝিয়ে দিল শোবার ঘরটায় শ্রীদীপ্তা একা নেই।

–আচ্ছা।

জয় এ রকমই। সবেতেই হ্যাঁ। অথচ থেকেও যেন নেই। সবার মতের বিপক্ষে বেরিয়ে আসা। ঘুপচি একটা ঘরে ভাড়া থেকে জীবন শুরু। তখন কিন্তু জয়ের মধ্যে তাপ পেয়েছে। দাঁতে-দাঁত চিপে দু’জনের লড়াই চালানো। জীবনের সিঁড়ি দিয়ে পাঁচজনের চেয়ে একটু দ্রুতই উঠেছে। রোজগার বেড়েছে। বেড়ে গেছে দু’জনের দূরত্ব। আগে রাগ হয়ে যেত। এখন সয়ে গেছে। এই ফ্ল্যাট, তার গোছগাছ, অর্পর স্কুলে ভর্তি হওয়া–সব ব্যাপারগুলোতেই যেন জয় নিজেকে কীভাবে আলগা করে নিয়েছে। শ্রীদীপ্তা মানে, একজন মাল্টিন্যাশনাল এক্সিকিউটিভ-এর হাতে আজকাল খুব বেশি সময় থাকে না তার পরিবারের জন্য। তবুও যেখানটায় ন্যূনতম দায়িত্ব পালন বা সিদ্ধান্ত নিতে মতামত দেবার দরকার, তাও পাওয়া যায় না আজকাল ।

–শুনলে?

ল্যাপটপ বন্ধ হয়েছে এতক্ষণে।

–হ্যাঁ, শুনেছি। তুমি শনিবার সকালে একবার মনে করিয়ে দিও। সোমবার হেড অফিস রিপোর্টিং থাকলে, ক্যানসেল করাতে হবে ফ্লাইটের টিকিট।

চুপ আবার জয়। অসহ্য! ছেলেও ঠিক একই স্বভাবের হয়েছে। যত কম কথা বলা যায়! বাধ্য হয়ে শ্রীদীপ্তা বলে ওঠে, –জানতে চাইলে না, কেন?

–কেন?

বিছানায় শরীর এলিয়ে দিয়েছে জয়। বুঝতে পারল না শ্রীদীপ্তা, চুপ করে যাবে না কথাবার্তা আরও এগিয়ে নিয়ে যাবে। বলেই ফেলে শেষমেশ।

–তোমার ছেলে এবার চেস-এ ডিসট্রিক্ট চ্যাম্পিয়ন হয়েছে জুনিয়র লেভেলে। রোববার রবীন্দ্রভবনে ওরা প্রাইজ ডিস্ট্রিবিউশন সেরিমনিটা রেখেছে। কে একজন গ্রান্ড-মাস্টার আসছে। চিঠি দিয়ে ওরা ইনভাইট করেছে পেরেন্ট-দের।

আয়নায় নিজের ক্রিম ঘষা মুখটা ভালো করে দেখল শেষবার শ্রীদীপ্তা। এবার আলো নেভাবে। গর্ব না ক্রিম কীসে মুখ এত জ্বলজ্বল করছে, হদিস পেল না। কোনও কথা ভেসে এল না দেখে বিছানার দিকে ফিরে তাকায় শ্রীদীপ্তা।

অঘোরে ঘুমিয়ে পড়েছে মাল্টিন্যাশনালের এক্সিকিউটিভ।

দুই

বাইরে হর্ন-এর আওয়াজ। মানে, সাড়ে তিনটে। ফিরল ছেলে। ম্যাগাজিনটা কোল থেকে সরিয়ে সেন্টার টেবিলের উপর রেখে সোফা ছাড়ে শ্রীদীপ্তা।

দরজা খুলতেই হুড়মুড় করে ফ্ল্যাটে ঢুকল ছেলে। স্কুল ইউনিফর্মে যুদ্ধের চিহ্ন। একটা জুতোর ফিতে কখন খুলে গেছে। প্রায় নিজের ওজনের থেকেও ভারী একটা ব্যাগ পিঠে। খালি হয়ে যাওয়া ওয়াটার বটলটা বেসিনের নীচে প্রায় ছুড়ে ফেলে দিয়েই সোফায় বই-এর ব্যাগটাকে নামায় অর্প। সারাটাদিন স্কুলের ধকল সামলেও ছেলে যে এখনও কিছুটা তরতাজা, এতেই শান্তি পায় শ্রীদীপ্তা।

কতকগুলো বাঁধা প্রশ্ন থাকে ছেলের জন্য রোজ। আজকেও

একটা-একটা করে ছুড়ে দেবার জন্য তৈরি হল। অর্প এখন কিছু খুঁজছে সোফায়। টিভির রিমোটটা পেয়ে যেতেই সুইচ টিপে অন করে। চ্যানেল সার্ফ করতেই চোখের সামনে সব কিম্ভূতকিমাকার কার্টুন। বিস্ময় আর আনন্দ অর্পর মুখে। কিছু বলার নেই শ্রীদীপ্তার। ক্লাস সিক্সে পড়া তার ছেলে এখনই আওয়াল নাম্বার প্রায় সবেতেই। সেন্ট নিকোলাস-এর মতো স্কুলে ফার্স্ট বয়। কমপিউটার জিনিয়াস। ড্রয়িং-এ অন্তত ছ’টা জায়গার চ্যাম্পিয়ন। উপরি পাওনা, জেলা দাবা প্রতিযোগিতায় প্রথম হয়েছে কিছুদিন হল। স্কুল থেকে ফিরে এই আধঘন্টা তাই ছেলে কার্টুন নেটওয়ার্কে সময় ব্যয় করলেও খুব একটা আপত্তি থাকার কথা নয়।

ছেলের পাশে এসে বসে শ্রীদীপ্তা। চ্যানেলের আলো ছেলের চোখের মণি আর মুখটায় মেখে গেছে। বেশ মায়াবী। এলোমেলো চুলে সিঁথিটা সারাদিনের ধকলে কোথাও হারিয়েছে। মমতা মাখিয়ে প্রশ্ন ছোড়ে শ্রীদীপ্তা –টিফিন শেষ করেছ আজ?

–হুঁ।

ছেলের মনের বেশিরভাগ জায়গা জুড়েই এখন কার্টুনের দাপাদাপি। অবশ্য প্রশ্নটা না করলেও চলত। টিফিনে আজ মিক্সড চাউমিন করে দিয়েছিল। টিফিন ফেরত আসার কথা নয়। ভীষণ পছন্দ করে চাইনিজ অর্প।

–হোমওয়ার্ক কপি সব ঠিক আছে?

– হ্যাঁ।

এ প্রশ্নটাও না করলে চলত। শেষ কবে অর্প-র হোমওয়ার্ক কপিতে কারেকশান হয়েছে, মনে পড়ে না শ্রীদীপ্তার। ঘামের গন্ধ ভেসে আসছে ছেলের গা থেকে। স্কুলের ইউনিফর্মটাও বেশ নোংরা লাগছে। এবার বিরক্তি জন্মাচ্ছে শ্রীদীপ্তার ভেতর। প্যান্টের দু’পাশটা তো রীতিমতো কালো। কীসের যেন ছোপ লেগে রয়েছে। কালকেই ফ্রেশ ইউনিফর্ম দিয়েছে। অথচ আজকের মধ্যেই ড্রেসটার এই অবস্থা! কী করে অর্পটা স্কুলে! মারপিট না কি ধুলোয় গড়াগড়ি খায়! এতক্ষণে জুতসই প্রশ্ন খুঁজে পেয়েছে ছেলেকে করার মতো!

–কালকেই তো নতুন ড্রেস দিলাম। এর মধ্যেই এই অবস্থা! করোটা কী স্কুলে!

–স্কুলে নয়।

ছেলে পাত্তাই দিল না প্রশ্নটায় যেন। রাগে ভিজছে শ্রীদীপ্তা।

–তবে?

ফিরল ছেলে ওর দিকে। চোখে মুখে হাসি ছড়িয়ে পড়েছে। নরম হচ্ছে শ্রীদীপ্তার রাগ।

–মাঝ রাস্তায় আজ পুলকার স্টপ হয়ে গিয়েছিল। ঠেলতে হল।

–মানে! কারা ঠেলল!

শ্রীদীপ্তা অবাক। মুখ দিয়ে বিরক্তিকর শব্দ বেরিয়ে আসে ছেলের। তারপর বলে– কারা? মনীষ, অঙ্কুর, জিৎ আর আমি।

কঠোর হতে চেষ্টা করে শ্রীদীপ্তা এবার।

–যা করেছ, করেছ। তুমি গাড়ি থেকে নামবে না। বলবে ড্রাইভার আঙ্কলকে– মা বারণ করেছে।

–কেন! ওরা একা-একা লেবার দেবে! নাঃ, স্কুলে ফাদার ব্রুজ সবসময় আমাদের টিম এফোর্ট দিতে বলেন।

শ্রীদীপ্তা চোখ পাকাতেই চুপ করে যায় ছেলে। অর্প আবার ওই একই কাজ করবে! কথা শুনবে না! শ্রীদীপ্তা জানে, তার ছেলে এরকম নয়!

তিন

বেস ফোনটা বেজে উঠতেই বিরক্ত হল শ্রীদীপ্তা। বাথরুমে চানে মগ্ন ছিল। ভেজা শরীর নিয়ে ড্রয়িং-এ আসতে ভালো লাগে না। মেঝেটা জলে জলময় হয়ে যায়। অথচ আসতেই হবে। অর্প স্কুলে, জয় অফিসে। জয়-এর ফোন করার হ্যাবিট বিয়ের বছরখানেক পরই চলে গেছে। দাদা কি! হতেও পারে। চুলে একটা তোয়ালে জড়িয়ে ভেজা শরীরেও একটা তোয়ালে জড়াল শ্রীদীপ্তা। বাথরুম থেকে বেরিয়ে এল। ফোনটা তুলে হ্যালো বলতেই অপর প্রান্তে একটা গম্ভীর গলা সরব হয়।

– হ্যাঁ, এটা কি ৩ছছ…..?

– হ্যাঁ, বলুন।

শ্রীদীপ্তা সহজ হচ্ছিল। আবার প্রশ্ন। এবার শ্রীদীপ্তা সচকিত হয়ে ওঠে। –আসলে… একটা পুলকার অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে। একটু চুঁচুড়া হাসপাতালে আসুন।

মাথাটা বোঁ করে ঘুরে গেল। নীচের তোয়ালেটা খুলে পড়ে গেল। গা-এর জল কখন শুকিয়ে গেছে শ্রীদীপ্তার।

–অ্যাঁ!

আশ্বস্ত করার চেষ্টা করে গলাটা ওকে।

–না, দেখুন সবাইকেই হসপিটালাইজড করা হয়েছে। প্রত্যেকেই স্থিতিশীল। আমরা গাড়ির মধ্যে স্কুলের ব্যাগ সার্চ করে যাদের যাদের স্কুল ডায়ারি পেয়েছি, খবর দিচ্ছি।

হাত থেকে রিসিভার পড়ে যাচ্ছিল। তবুও সব শক্তিকে একত্রিত করল শ্রীদীপ্তা।

–আপনি কে বলছেন?

–আমি সন্দীপ নন্দী, ইনভেস্টিগেটিং অফিসার, লোকাল থানা।

আর কিছু বলার আগেই ফোন কেটে যায়।

চোখ জ্বালা করছে। কান-মাথা ঝাঁ ঝাঁ করছে। দেয়ালে ঠেস দিয়ে হাঁটু গেড়ে বসে পড়েছে শ্রীদীপ্তা। কী করবে এখন! কেউ ইয়ার্কি মারল না তো!

হঠাৎ করে খেয়াল পড়ল ড্রাইভারের ঠিকানা আর ফোন নাম্বার। নোট করা আছে ডায়ারিতে। কোনওক্রমে একটা ম্যাক্সি গলিয়ে নিজেকে ঢাকল। তারপর ডায়ারি বের করে ফোন করল। নাঃ, সুইচ অফ। তাহলে কি সত্যি সত্যিই–? চোখ দিয়ে আপনা থেকেই জলের ধারা নোনতা স্বাদ নিয়ে মুখের গোড়ায় চলে আসছে। দু’বছর চেষ্টা করেও কনসিভ হয়নি অর্প। তারপর হঠাৎই একদিন ওর আসার অস্তিত্ব ধরা পড়া! কী আনন্দ, কী খুশি! এগারোটা বছর ধরে তিলে তিলে বেড়ে ওঠা…।

চোখের জল মুছে আবার কাঁপা-কাঁপা হাতে ডায়াল করল জয়-এর মোবাইলে। অফিস থেকে আসতেও ওর সময় লাগবে। রিং হচ্ছে। তুলল জয়।।

–হ্যালো-তুমি? শোনো, এই… এইমাত্র একটা ফোন এল থানা থেকে। বলছে, অর্পদের পুলকারটা নাকি অ্যাক্সি…।

কথা শেষ করতে পারল না শ্রীদীপ্তা। গলা ভিজে গেল। দম আটকে এল। জয়-এর গলা আশ্চর্য রকম শান্ত!

–কেউ ইয়ার্কি-ফিয়ার্কি–।

–না গো না। গলাটা ভীষণ সিরিয়াস লাগল। আর তাছাড়া অমিত-এর মোবাইলেও ট্রাই করলাম। সুইচ অফ। আমি কী করব! তুমি এখুনি…।

– হ্যাঁ, আসছি। আর এমনি কেমন আছে, কিছু বলল?

– স্টেবল, হসপিটালাইজড হয়েছে।

একটু চুপ থেকে জয় ভরসা জোগাল।

–তুমি একদম সোজা হসপিটালেই যাও। আর পারো তো, লোকাল থানায় যাচাই করে নাও। আমি আসছি। আর শোনো, সাবধানে।

মাল্টিন্যাশনাল এক্সিকিউটিভ-এর গলাকে অনেকদিন পর কেঁপে যেতে শুনল শ্রীদীপ্তা।

চার

হাসপাতালের সিঁড়িতেই বসে পড়েছে শ্রীদীপ্তা। একদিক থেকে চিন্তা মুক্ত হয়েছে। অন্যদিক থেকে চিন্তা শতগুণ বেড়ে গেছে। প্রাথমিক শোকের ধাক্বা কাটিয়ে এখন ও উদ্বেগের শিকার। একটু দূরে করিডরে দাঁড়িয়ে থাকা একজন পুলিশ অফিসার আর কনস্টেবল-এর সঙ্গে কথা বলছে জয়।।

ঘন্টা দু’য়েক হয়েছে হসপিটালে এসেছে শ্রীদীপ্তা। জয় আসার আগেই পৗঁছে গিয়েছিল। খবর পেয়ে একে একে পৌঁছে গিয়েছিল অনিরুদ্ধ, জিৎ আর মনীষ-এর বাবা-মাও। প্রত্যেকেরই চোখে জলের রেখা। উদভ্রান্ত চেহারা। গোটা হসপিটালটায় ভিড়েভিড়াক্বার। বেশ কিছু পুলিশ। খবর পেয়ে দু-তিনজন সাংবাদিকও এসে গেছে। মৃত্যুর খবর বিক্রি করে ব্যাবসা– এখনকার সমাজের নতুন ট্রেন্ড। হাত-পা থর-থর করে কাঁপছিল। অপেক্ষা বাঁধ মানছিল না। হাসপাতাল চত্বরে আসতেই এবার নিজেকে একা লাগছে শ্রীদীপ্তার।

টুকরো টুকরো আলোচনা আর ইনভেস্টিগেটিং অফিসারের কথা থেকে কাহিনিটা খাড়া করল কোনওক্রমে শ্রীদীপ্তা। পুলকার কোনও কারণে আজ আবার জিটি রোডের উপর বিগড়োয় স্কুল যাবার পথে। কিছু ছেলে ঠেলতে নেমেছিল। গাড়ি স্টার্ট হতে তারা আবার উঠেও পড়ে। হঠাৎই উলটোদিক থেকে আসা একটা লরি পুলকারটাকে ধাক্বা দেয়। আন্দাজ তখন সাড়ে আটটা। চারপাশের সব দোকান খোলেওনি। রাস্তায় সেভাবে ভিড়ও ছিল না। ভিড় জমার আগেই লরিটা পালিয়ে যায়। ড্রাইভার স্পটেই শেষ। অন্তত ছ’টা বাচ্চা মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছে এখন।

খুব তাড়াতাড়ি বাকি বাবা-মা’র সাথে এর্মাজেন্সি ইউনিটে পৗঁছেছিল শ্রীদীপ্তা। প্রত্যেকেরই পেটে আর বুকে সিরিয়াস চোট ছিল। একজনের ব্রেনে। ব্লাডের ব্যাগ, স্যালাইনের বোতল, ব্যান্ডেজ আর ছোপ ছোপ রক্তের মধ্যে আলাদা করে অর্পকে খুঁজে পাচ্ছিল না মা’র চোখ। কাচের দরজার উলটোদিকে দাঁড়িয়ে কেবলই ভগবানকে ডাকছিল শ্রীদীপ্তা। মস্তিষ্কে চোটটা যেন অর্প’র না লাগে। ওর ব্রেনের অনেক দাম। মুহূর্তে ও যেন স্বার্থপর হয়ে উঠছিল। দু’জন তাদের ছেলেকে চিহ্নিত করে আসার পরই শ্রীদীপ্তাকে ইশারা করে একজন নার্স। থর থর করে কাঁপতে থাকা পা দুটো নিয়ে এগিয়ে যায় শ্রীদীপ্তা।

একইরকম স্কুলড্রেস, ব্যান্ডেজ, আর ওষুধের গন্ধে হারিয়ে যাচ্ছিল সবকিছু। চোখে জলের ধারা কখন বন্ধ হয়ে গেছে। বমি পেয়ে যাচ্ছে তার বদলে। বার বার চোখের দৃষ্টি ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে চেনার চেষ্টা করছিল শ্রীদীপ্তা যুঝতে থাকা দেহগুলোর মধ্যে তার নিজের দেহের অংশটা কোথায়! ভীষণ অবাক হয়ে যাচ্ছিল ও। অন্য রকম অস্বস্তি গ্রাস করছিল ওকে। মা হয়েও চিনতে ভুল হবে!

জয় আসতে ও আবার ছুটেছে ওয়ার্ডে। জয়ও চেষ্টা করেছে। নাঃ, আহতদের মধ্যে অর্প নেই। পুলিশ ওদের কাছ থেকে সেইমতো স্টেটমেন্টও নিয়েছে। কিছুতেই শ্রীদীপ্তা বুঝতে পারছে না, ছেলেটা কোথায় গেল! গাড়িতে অর্পর ব্যাগ, বই, টিফিনবক্স, ডায়ারি– সবকিছুই রয়েছে। অ্যাটেন্ডিং ডাক্তার ওকে অ্যাসিওর করেছে, যে মারা গেছে সে ড্রাইভার-ই। তার বাড়ির লোক আইডেন্টিফাই-ও করেছে।

কথা বলা শেষ পুলিশের সাথে। জয় এগিয়ে আসছে। শ্রীদীপ্তা বলল, ‘কী বলছে ওরা?’

–ব্যাপারটা বেশ মিস্টিরিয়াস! ওরা বলছে, ব্যাগ গাড়িতে ছিল। গাড়ি ওরা মাইনুটলি সার্চ করেছে। আশে-পাশেও। বডি বা ইনজিওরড– কাউকেই ওরা পায়নি।

–টয়লেট করতে-টরতে–।

–মনে হয় না।

–আমাদের একবার গেলে হয় না!

–আমাদের থেকেও ওদের এসব সেন্স অনেক বেশি। এটা ওদের প্রফেশন। ওরা ঠিক যেটা দেখার দেখে নিয়েছে।

জয় বিপদেও মাথা ঠান্ডা রাখতে পারে। শ্রীদীপ্তা পারছে না। ছেলেটার মুখটা! উঃ! চোখে জলের ধারা বাঁধ মানছে না শ্রীদীপ্তার! মাতৃস্নেহ…।

–ওরা যে ঠিক বলছে, তার কী মানে?

সিঁড়িতে ওর পাশটাতেই বসে পড়ল জয় হঠাৎ। ফরসা মুখটা লাল। চোখেতে জল আসব আসব করেও উথলে ওঠেনি। বাবাদের কি কাঁদতে নেই! শ্রীদীপ্তার কাঁধে একটা হাত তুলে দিল।

–ভেবে দ্যাখো একবার। বেশ পাবলিক সিমপ্যাথি পেয়েছে ঘটনাটা। আর মিডিয়া তো এখন ঝাঁপিয়ে পড়েছে। পুলিশকে তার দায়িত্ব পালন করতেই হবে।

নরম জয়-এর গলা। এ গলার অাঁচ অনেকদিন পরে পাচ্ছে শ্রীদীপ্তা। ভালোবাসা বোধহয় মরে না। এতদিন পরে যেন খুব হালকা ছোঁয়া পাচ্ছে। অনেকটা দুধ কড়ায় ফোটালে পরিমাণে কমে যায়। তৈরি হওয়া সলিড ক্ষীরটা তখন বোধহয় আরও টেস্টি। এরকম বিপদে জয়কে পাশে পাচ্ছে। যেভাবে জয় ওর দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে, এও তো একধরনের প্রেমই। এ রকম দুর্ঘটনাই বোধহয় মানুষের মধ্যে বোধশক্তিকে জাগিয়ে দেয়। শ্রীদীপ্তা নতুন করে জয়কে আবিস্কার করছে। জয় আর ও আবার একসাথে লড়ছে। ঠিক যেভাবে বেশ কিছু বছর আগে বাড়ি থেকে বেরিয়ে শুরু করেছিল। লড়াইটা সেবারও ওরা জিতেছিল। এবারও…

আপনি কি জয় ঘোষ?

সামনে খেঁকুড়েপনা একটা লোক এসে দাঁড়িয়েছে। করিডরে দাঁড়িয়ে থাকা বাকি বাবা-মা’র দিকে একবার তাকিয়ে নেয় শ্রীদীপ্তা। জয় উঠে দাঁড়িয়েছে।

– হ্যাঁ, বলুন।

– আপনার সঙ্গে একটা কথা ছিল। আপনার মোবাইল নাম্বার তো…জ্ঝজ্জ্ব্ব….।

– হ্যাঁ, হ্যাঁ বলুন না, কী ব্যাপার।

জয়-এর ভ্রু কুঁচকে গেছে। বুকে এবার হাতুড়ি পিটছে ওর। জয় এগিয়ে গেল লোকটার সাথে। শ্রীদীপ্তাও হাঁটা দিল পেছন পেছন। কথাগুলো ভেসে আসছিল ওর কানে।

–আমার একটা চা-এর দোকান আছে। যেখানে অ্যাক্সিডেন্টটা হয়েছে, সেখান থেকে একটুখানি।

শ্রীদীপ্তা পা চালিয়ে ওদের মধ্যে পৗঁছে গেছে। জয় দাঁড়িয়ে গেছে। ওরা এখন হসপিটাল মেন গেটের কাছাকাছি।

–হ্যাঁ, কিন্তু আমার মোবাইল নাম্বার কী করে আপনার কাছে –!

লোকটা চারদিক তাকিয়ে নেয়। তারপর হেসে বলে ওঠে– আপনার ছেলে দিল।

–মানে!

জয় চিৎকার করে উঠেছে। শ্রীদীপ্তার মনে নতুন শঙ্কা। শেষে কি ছেলে অপহরণ হল!

–কিন্তু ও কোথায়?

জয় দাঁতে দাঁত ঘষছিল। অজান্তেই খামছে ধরেছে

জয়-এর জামাটা ও।

–বাইরেই রিকশায় বসে আছে। ফোনই করতাম। একটু কিন্তু কিন্তু লাগল।

–ওর কাছে নিয়ে চলুন।

এবার শ্রীদীপ্তা মুখ খুলেছে।

–হ্যাঁ, আসুন না।

লোকটার ব্যবহারে এবার একটু একটু করে সন্দেহ কমছে শ্রীদীপ্তার।

– হ্যাঁ, ব্যাপারটা কী হল! যেতে যেতেই পুরো ব্যাপারটার রহস্য ভেদ করতে চাইছে জয়।

লোকটাও যেন তৈরিই ছিল বলার জন্য।

–আসলে অ্যাক্সিডেন্ট হবার সময় আপনার ছেলেও গাড়িটাকে বাইরে থেকে ঠেলছিল। কোনও কারণে গাড়ি বা ওর বন্ধুরা এগিয়ে যায়। আর প্রায় সঙ্গে-সঙ্গেই ঘটনাটা ঘটে আপনার ছেলের চোখের সামনে। ভয়ে, আপনার ছেলে আমার দোকানে ঢুকে যায়। জ্ঞান হারিয়ে ফেলে।

মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনছিল শ্রীদীপ্তা। লোকটা থামতেই জয় বলে ওঠে, –তারপর?

–দোকানে তখন আমি আর আমার কর্মচারি ছিলাম। ওদিকে কিছুক্ষণের মধ্যেই ভিড় জমে গেল। এদিকে আপনার ছেলের এই অবস্থা। তখনও আমরা ভাবছি, ছেলেধরা-টরা হবে। দোকানের ঝাঁপ ফেলে দিলাম ভয়ে। দুধ খাইয়ে ওকে চাঙ্গা করতে আপনার নাম, ফোন নাম্বার পেলাম! খবর পেলাম, সব বাবা-মা’রা এখানেই আসছে। তাই…।

চোখে পড়েছে শ্রীদীপ্তা-র অর্পকে। চুপটি করে বসে আছে রিকশায়। দৗড়ে চলে যায় ছেলের কাছে। রিকশা থেকে ছেলে নেমে আসতেই ছেলেকে জড়িয়ে ধরে। একদম অক্ষত ছেলে। এগিয়ে আসে জয় আর লোকটি। জয় লোকটার একটা হাতকে দু’মুঠোর মধ্যে ধরে নিয়েছে।

–কী বলে যে আপনাকে…।

– না, না। কোনও ব্যাপার নয়। আসলে ভয়ই লাগছিল নিজেরও। না কেস খাই! নতুন দোকান। কারওর ভালো করতে যাওয়াটাও আজকাল বিপদ!

শ্রীদীপ্তা ছেলের দিকে তাকায়। আর পুলকার নয়। এবার নিজেই।

নাম, ঠিকানা জানার পর ভদ্রলোককে একদিন বাড়িতে আসতে বলল জয়। হঠাৎই দিনটাকে আবার ভালো লাগতে শুরু করেছিল শ্রীদীপ্তা-র। সব রাতের শেষেই যেমন দিন, সব টেনশনের শেষে একটা স্বস্তি লুকিয়ে থাকে। শ্রীদীপ্তা’র সব টেনশন এখন যেমন আছড়ে পড়েছে হসপিটাল চত্বরে দাঁড়িয়ে থাকা কিছু বাবা-মা’র উপর।

শ্রীদীপ্তা হালকা ঝাঁকুনি দেয় অর্পকে।

–ওরা তো দৗড়ে ঢুকে পড়েছিল গাড়ির ভেতর। তুই কোথায় ছিলিস! অর্পর মুখ নীচু।

–জুতোর ফিতেটা খুলে গেল! বাঁধছিলাম আর ঠিক…তখনই…  ঞ্জ

কৌশানি, মুন্সিয়ারি, চৌকরি

গাড়ি পাহাড়ি পথ ধরে এগিয়ে চলেছে। দুপাশে সারি সারি পাইন গাছ মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে। দীর্ঘ গাছগুলোর প্রায় প্রতিটি একই আকৃতির। গাছের তলায় মাটি সংলগ্ন অঞ্চলটি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। মাটির দিকে তাকাতেই চোখে পড়ল অসংখ্য পাইন কোন এদিকে ওদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে। আমরা গাড়ি না থামিয়ে পারলাম না।

কয়েকজন গাড়ি থেকে নেমে পড়লাম এবং প্রায় দুই তিন ব্যাগ বোঝাই করে ফেললাম পাইন কোন। এমন দৃশ্য আগে দেখিনি, পাহাড়ে ঘুরতে যাওয়া হয়েছে অনেক, কিন্তু এতো পাইন ফল আগে এভাবে চোখে পড়েনি। এটা উত্তরাঞ্চলের আলাদা কোনও বৈশিষ্ট্য কিনা জানি না। ওপরের দিকে তাকিয়ে দেখলাম গাছে গাছে, পাতার ফাঁকে ফাঁকে পাইন ঝুলে আছে। চমৎকার দৃশ্য।

আমরা চলেছি রানিক্ষেত হয়ে কৌশানির দিকে। রানিক্ষেত থেকে কৌশানির দূরত্ব প্রায় ৬০ কিলোমিটার। অসম্ভব সুন্দর মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশের মধ্যে দিয়ে বাঁক নিতে নিতে এগিয়ে চলেছি। কৌশানি বাগেশ্বর জেলায় অবস্থিত একটি আধা শহর। কথিত আছে মহাভারতের যুগে কৌশিক মুনি এখানে তপস্যা করেছিলেন বহুদিন, তাই এই অঞ্চলের নাম হয়েছে কৌশানি।

কৌশানি থেকে হিমালয়ের দৃশ্য বড়োই নয়নাভিরাম। প্রায় ৩৫০ কিলোমিটার ওয়াইড প্যানোরমিক ভিউ এখান থেকে পাওয়া যায়। কৌশানি থেকে হিমালয়ের বিস্তার কিছুটা হলেও বোঝা সম্ভব। হিমালয়ের প্রায় নয়টি শৃঙ্গ যেমন ত্রিশূল, নন্দাদেবী, চৌখাম্বা, পঞ্চচুল্লি ইত্যাদি এখান থেকে দেখা যায় এবং বলতেই হয় প্রত্যেকটি তার আলাদা আলাদা রূপ ও সৌন্দর্য নিয়ে অহংকারের সঙ্গে মাথা উঁচু করে বিরাজমান। অপূর্ব সুন্দর এই ধ্যানগম্ভীর হিমালয়ের সামনে সবকিছুই কেমন তুচ্ছ মনে হয়।

এখানকার অন্যতম একটি আকর্ষণীয় স্থান হল গান্ধি আশ্রম। ১৯৩৯ সালে গান্ধিজি এখানে এসেছিলেন। এই স্থানের সৌন্দর্যে মোহিত হয়ে তিনি প্রায় ১৪ দিন এখানে কাটান। গান্ধিজির ভাষায় কৗশানি হল ভারতের সুইটজারল্যান্ড। এই আশ্রমে থেকে তিনি ‘অনাসক্তি যোগ’-এর ওপর একটা বই লেখেন। সেই থেকেই এই আশ্রমের নামকরণ করা হয় অনাসক্তি আশ্রম।

খানিকটা চড়াই পথ উঠে পৌঁছোতে হয় গান্ধি আশ্রমে। এখান থেকে সূর্যোদয়ের দৃশ্য চমৎকার। চারিদিকে মেঘ আর পাহাড় ঘেরা আশ্রমটির পরিবেশ খুবই শান্তিপূর্ণ। কৌশানিতে থাকার জন্য অনেক হোটেল আছে। তবে সূর্যোদয় দেখার জন্য গান্ধি আশ্রমই শ্রেষ্ঠ। এই আশ্রমেই থাকা এবং খাওয়ার ব্যবস্থা আছে। আশ্রমের সন্নিকটে কিছুটা হেঁটে গেলেই চোখে পড়ে পাইন, ফার, দেবদারু ইত্যাদি সরলবর্গীয় গাছের অরণ্য। শান্ত নিরিবিলি পরিবেশে প্রকৃতির কোলে বেশ খানিকটা সময় কাটিয়ে নিতে চাইলে কৗশানি আসা সার্থক।

কৌশানি থেকে প্রায় ১২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত রুদ্রধারি জলপ্রপাত ও মন্দির। প্রাচীন গুহা পরিবেষ্টিত এই মন্দিরে যেতে অবশ্য অনেকটা পথ হাঁটতে হয়। এছাড়া এখানে চা বাগান উল্লেখযোগ্য দর্শনীয় স্থান। তবে দার্জিলিং ও জলপাইগুড়ির তুলনায় এটি নিতান্তই ছোটো মনে হতে পারে। এখানে এক দিন থেকে পরদিন আমরা রওনা হলাম মুন্সিয়ারির উদ্দেশে। যাওয়ার পথে ১৯ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত প্রাচীন ঐতিহ্যশালী পার্বতীমন্দির বৈজনাথ। মন্দিরটি  গোমতী নদীর পাশে অবস্থিত। মন্দিরটি  দ্বাদশ শতকে তৈরি। এখানে একই সাথে শিব, গণেশ, পার্বতী, কুবের ইত্যাদি দেবদেবীর মূর্তি রয়েছে। মন্দিরের প্রাচীনত্ব এবং নির্মাণ শৈলী আমাদের মুগ্ধ করল।

কৌশানি থেকে বাগেশ্বর হয়ে মুন্সিয়ারির দূরত্ব প্রায় ১১৫ কিলোমিটার। মুন্সিয়ারির উচ্চতাও অনেকটাই বেশি। দুর্গম পাহাড়ি রাস্তা ধরে আমরা এগিয়ে চললাম। আজ সকাল থেকেই আকাশের মুখ গোমড়া, –দূরের পাহাড়গুলো মেঘের আবরণে ঢেকে গেছে। আমাদের ড্রাইভার ভাই প্রমাদ গুনলেন, বললেন, ‘আবহাওয়ার অবস্থা ঠিক নয়, বৃষ্টি হতে পারে।’ ধীরে ধীরে মেঘের রাজ্যে প্রবেশ করলাম। চারপাশ অদৃশ্য হয়ে পড়ল। সঙ্গে শুরু হল টিপ টিপ বৃষ্টি।

অভিজ্ঞ ড্রাইভার সুদক্ষ ভাবে গাড়ি ড্রাইভ করে চলেছেন। তবে ওনার মুখ দেখে বুঝলাম উনি সম্ভবত দুশ্চিন্তা করছেন এবং তা হওয়াটাই স্বাভাবিক। এমন দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় চিন্তা হওয়াটাও অমূলক নয়। কোথা থেকে ঘন মেঘের পাহাড় এসে যেন আমাদের পথ অবরুদ্ধ করে ফেলল। চার-পাঁচ হাত দূরে আর কিছু দেখা যাচ্ছে না। তার ওপর এমন কঠিন দুর্গম রাস্তা। এই খারাপ আবহাওয়ায় পাহাড়ি পথে ড্রাইভ করতে যথেষ্ট এলেম লাগে। এমন দুর্যোগে তো আমাদের প্রাণ হাতে এসে ঠেকল।

গাড়ি যত এগিয়ে চলেছে বৃষ্টি তত বাড়তে লাগল। আমরা এবার আতঙ্কিত হয়ে পড়লাম। বললাম গাড়িটা রাস্তার একপাশে থামিয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়ালে হয় না। ড্রাইভার ভাইয়া এখানকার লোক, আমাদের থেকে ওনার অভিজ্ঞতাও বেশি। উনি বললেন– এক পাশে দাঁড়ালে উলটোদিক থেকে গাড়ি এসে ধাক্বা মারতে পারে, তাছাড়া এখানে পাহাড়ে যখন তখন ধস নামে। বৃষ্টি হলে তো কথাই নেই, মাটি আলগা হয়ে পড়ে এবং মাটির সঙ্গে বড়ো বড়ো গাছগুলো খড়কুটোর মতো নীচে গড়াতে থাকে। আমাদের সকলের তখন যে ঠিক কি অবস্থা তা কথায় প্রকাশ করা খুব কঠিন।

ওদিকে দুর্যোগ ক্রমে বেড়েই চলেছে। বৃষ্টির সঙ্গে বড়ো বড়ো বরফের ফোঁটা পড়তে লাগল, প্রকৃতি মহারোষে যেন শিলাবৃষ্টি শুরু করল। আমরা বারবার জিজ্ঞাসা করলাম, কাছাকাছি কোনও বসতি অঞ্চল, বাজার আছে কিনা, একবার সেই পর্যন্ত পৌঁছোতে পারলে জীবনটা এ যাত্রা রক্ষা পায়! যা অবস্থা যে-কোনও সময় গাড়ির চাকা স্লিপ করে অতল খাদে গড়িয়ে পড়লে আমাদের চিহ্নমাত্র অবশিষ্ট থাকবে না। প্রকৃতি যদি কৃপা করে তবেই এই যাত্রা বাঁচা সম্ভব। কিন্তু তেমন কোনও আভাস নেই। গাড়ির সামনের কাচে বরফের বড়ো ফোঁটা এসে পড়ছে। বাইরের দিকে তাকিয়ে দেখলাম বরফের

আস্তরণ-এ রাস্তা ঢেকে গেছে।

খুব ধীরগতিতে সন্তর্পণে আমরা বেশ খানিকটা পথ পার করে এলাম। সামনের একটা বাঁক নিতে দেখলাম দু একটা গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। এখানে রাস্তাটা বেশ চওড়া। বৃষ্টি আগের চেয়ে একটু ধরেছে। ড্রাইভার ভাইয়া সামনের গাড়ির পিছনে আমাদের গাড়ি দাঁড় করালেন। কিছুটা দূরে একটা দুটো দোকানঘর, কিন্তু সবগুলোই বন্ধ। গাড়ি থেকে নেমে একটু খোঁজ নিয়ে জানা গেল সামনে কিছুটা দূরে

দু-একটা হোটেল আছে। রাস্তায় আমাদের অনেকটা সময় লেগে গেছে। এখনও আমরা অর্ধেক রাস্তাও পৌঁছোতে পারিনি। তাছাড়া যে-বিপর্যয়ের মধ্যে দিয়ে বেঁচে ফিরেছি, আজ আর যাত্রা করা ঠিক হবে না হয়তো। রাস্তা লাগোয়া হোটেলে ঘর পাওয়া গেল। সুতরাং ঠিক করা হল আজ রাতটা এখানে কাটিয়ে কাল মুন্সিয়ারির উদ্দেশ্যে রওনা হওয়া যাবে।

পরদিন সকালে উঠে দেখলাম মেঘের পর্দা সরে গেছে, পরিষ্কার আকাশে যাত্রা শুরু হল। বৃষ্টিস্নাত পাহাড়ের চূড়াগুলো দূর আকাশে উঁকি দিচ্ছে। কাছের পাহাড় উপত্যকায় সাদা পেঁজা তুলোর মতো মেঘ যত্রতত্র ছড়িয়ে আছে। এ এক অভাবনীয় দৃশ্য। নীল আকাশ ধূসর সাদা মেঘ, মিলেমিশে এক অকৃত্রিম স্বর্গীয় সৗন্দর্য তৈরি করেছে। আমি চোখ ফেরাতে পারছি না! এই দৃশ্য ক্যামেরায় ধরার চেষ্টা বৃথা।

গাড়ি পাকদন্ডি পথে চড়াই-উতরাই পার করে এসে দাঁড়াল বির্থি জলপ্রপাতের সামনে। পাহাড়ের বুক চিরে দুধ সাদা জল উচ্ছল গতিতে নীচে এসে পড়ছে। ১চ্৬ মিটার উঁচু জলপ্রপাত মুন্সিয়ারি থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। এখানে কিছুক্ষণ কাটিয়ে আমরা গন্তব্যের দিকে যাত্রা শুরু করলাম। আমাদের পৗঁছোতে প্রায় দুপুর গড়িয়ে গেল।

মুন্সিয়ারি পিথোরাগড় জেলায় অবস্থিত, উচ্চতা ২চ্ঙ্ম০ মিটার। স্থানটির প্রাকৃতিক সৗন্দর্য অতুলনীয়। মুন্সিয়ারি শব্দটি তিববতি শব্দ ‘মুন’ অর্থ তুষার কণা এবং ‘শিয়ারি’ অর্থ খেত থেকে এসেছে। এর

ইংরেজি অর্থ– ‘দ্য প্লেস অফ স্নো’। পাহাড় এবং উপত্যকা জুড়ে বসতি, দূরে হিমায়িত তুষার শৃঙ্গ এক মনোমুগ্ধকর শৈল্পিক সৗন্দর্য নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

বিকেলে আড়াই কিলোমিটার দূরে বিখ্যাত এবং প্রাচীন নন্দাদেবী মন্দিরে গেলাম। প্রায় সাড়ে সাত হাজার ফুট উঁচু পাহাড়ের উপর সমতল জায়গা, তার শেষ প্রান্তে অবস্থিত পাহাড়ের এক কোণে মন্দিরটি অবস্থিত। পাথুরে সরু রাস্তা মন্দির পর্যন্ত চলে গেছে। মন্দিরটি আকারে ছোটো, বাইরে ফুলে ফুলে ছেয়ে আছে। দূরে-কাছে হিমালয়ের বিভিন্ন শৃঙ্গ। ওপাশের কাছের পাহাড় জুড়ে ধাপ চাষ করা হয়েছে। দূর থেকে দেখে মনে হচ্ছে কতকগুলো সবুজ সমান্তরাল রেখা পাহাড়ের গায়ে অাঁকা হয়েছে। এই বিশাল হিমালয়ের সামনে দাঁড়িয়ে বাকরুদ্ধ হয়ে গেলাম।

পরদিন খুব ভোরে ঘুম ভাঙল। আবছা আলোয় বরফচূড়াগুলো জেগে আছে। পূর্ব আকাশ লাল হতে শুরু করেছে। ধীরে ধীরে আলোর রশ্মি পর্বতচূড়ায় এসে পড়ল। সে এক অভাবনীয় দৃশ্য। ধূসর পর্বতের শৃঙ্গগুলি গেরুয়া আভায় যেন জ্বলে উঠেছে। যেন পাণ্ডবরা আরও একবার রন্ধন কার্য সম্পন্ন করতে চুলায় আগুন ধরাল। এই হল বিখ্যাত পঞ্চচুল্লি। আমার মনে হল নামটা বড়ো সার্থক। গনগনে আগুনে কেবলমাত্র পর্বতের উপরের অংশের শৃঙ্গগুলির লাল আভা যেন চারিপাশে সকালের বার্তা বহন করে আনল। এ দৃশ্য ভোলার নয়। তবে দিনের বিভিন্ন সময়ের আলোতে পঞ্চচুল্লির সৗন্দর্য বিভিন্ন রকম।

এখানকার অন্যান্য দর্শনীয় স্থানগুলোর মধ্যে ট্রাইবাল হেরিটেজ মিউজিয়াম অন্যতম। মুন্সিয়ারি বাজার থেকে দুই কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই মিউজিয়ামটিতে স্থানীয় মানুষদের ব্যবহার্য বিভিন্ন জিনিসপত্র রয়েছে। যেমন রান্নার পাত্র, হুঁকো, গয়না, কয়েন, সংগীতের বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ইত্যাদি। এছাড়া প্রায় সাত কিমি দুরে অবস্থিত খালিয়া টপ,  রয়েছে কালামুনি মন্দির ইত্যাদি।

মুন্সিয়ারির স্বর্গীয় স্মৃতি সঙ্গে নিয়ে আমরা চললাম পরের গন্তব্য পাতাল ভুবনেশ্বর এর উদ্দেশ্যে। এটি পিথোরাগড় জেলায় অবস্থিত। নিকটবর্তী শহর ৩৮ কিলোমিটার দূরে চৗকরি। হোটেলে লাগেজ রেখে আমরা রওনা হলাম রোমাঞ্চের সন্ধানে, পাতাল ভুবনেশ্বর-এর উদ্দেশ্যে।

দূর থেকে দেখা যায় পাইন, ফার, দেবদারু গাছে ঢাকা পাহাড়ের গায়ে ছোটো মন্দির পাতাল ভুবনেশ্বর। এটি ১ছ০ মিটার দীর্ঘ এবং ৯০ ফুট গভীর চুনাপাথরের গুহা। অন্ধ্রপ্রদেশের আরাকুর উপত্যকার বোরা কেভ-এর কথা মনে পড়ছিল। কিন্তু এই গুহার প্রবেশপথটি বড়োই

সংকীর্ণ কোনওমতে বসে, শুয়ে বা হামাগুড়ি দিয়ে একজন প্রবেশ করতে পারে। অনেককে দেখলাম ভয়ে আর সেই ঝুঁকি নিতে চাইলেন না।

আমি জিজ্ঞাসা করলাম কতদূর পর্যন্ত এই ভাবে যেতে হবে? একজন বললেন, অসুবিধা নেই ভেতরে গাইড আছে, সে-ই আপনাদের সব রকম সাহায্য করবে। দুই আড়াই ফুটের সংকীর্ণ পথ দিয়ে ১ঙ্ম০ ফুট নীচে যেতে হয়। প্রবেশপথ বড়োই ছোটো, নীচে অবশ্য অনেকটা বৃহৎ জায়গা রয়েছে। কপাল ঠুকে নামতে শুরু করলাম। ভেতরে মোটা চেন ঝোলানো আছে যাতে গুহার ভেতরে প্রবেশকারীরা ওটার সাহায্য নিয়ে নীচে নামতে পারেন। কোনও মতে ওই সরু পথ বেয়ে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ, অবশ্যই মাথা বাঁচিয়ে নীচে নেমে এলাম। গুহার মধ্যে বিদ্যুতের আলো রয়েছে। তবে তা বড়োই নিস্তেজ।

নীচের জায়গাটি বেশ প্রশস্ত। চারিদিকে চুনাপাথরের নানান প্রাকৃতিক কারুকার্য রয়েছে। তবে গাইড আমাদের নিয়ে গেলেন সেই পৗরাণিক যুগে। ত্রেতাযুগের সূর্য বংশের রাজা ঋতুপর্ণ প্রথম এই গুহা আবিষ্কার করেন। উনি এখানে প্রবেশ করে দেবাদিদেব মহেশ্বর এবং ৩৩ কোটি দেবদেবীর দর্শন পেয়েছিলেন। এই গুহার পরতে পরতে বহু দৈবীক কাহিনি চিত্রিত রয়েছে। এখানে রয়েছে শেষনাগ, যার মুখগহ্বর ভিতর দিয়ে গুহার বাকি পথ চলতে হয়। চলতে চলতে দর্শন মেলে আদিগণেশ, সহস্রদল কমল, যজ্ঞকুণ্ড, কালভৈরব ইত্যাদি দেবতা এবং তাদের আখ্যান। অনেকটা এগিয়ে দর্শন পাওয়া যায় কেদারনাথ, বদ্রিনাথ, অমরনাথ তথা চারধামের। দেখা মেলে হস্তীপদ এবং আরও কত কি।

আমি যেতে যেতে ভাবছি ভেতরে যতটা দেখতে পেলাম গুহাটা তার চেয়ে না জানি কত বড়ো। গাইড-কে জিজ্ঞাসা করে জানলাম, ভেতরের ফাঁকফোকরের সংকীর্ণ পথ যে কোথায় শেষ হয়েছে, তা তারাও জানে না। কথিত আছে এই পথ কৈলাস পর্বতে গিয়ে মিশেছে। মহাভারতের যুগে পাণ্ডবরা এই গুহায় বহুদিন কাটিয়েছিলেন।

সে যাই হোক রামগঙ্গা, সরযূ, গুপ্তগঙ্গা ইত্যাদি নদী এই চুনাপাথরের পাহাড়ের উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে চুনাপাথরের গর্ভে যে অসামান্য স্ট্যালাকটাইট, স্ট্যালাগমাইট এবং অন্যান্য ভাস্কর্য তৈরি করেছে তা যে-কোনও বড়ো ভাস্কর্যশিল্পী কে-ও অবলীলায় হার মানাবে। আমি মুগ্ধ, বিস্মিত, অভিভূত এবং অবশ্যই রোমাঞ্চিত। ফিরে এলাম হোটেলে।

চৌকরি পাহাড়ে ঘেরা ছোট্ট একটি জনপদ। এখানকার স্থানীয় মানুষরাও সরল এবং আন্তরিক। এই স্থান থেকে সূর্যাস্তের দৃশ্য বড়োই আকর্ষণীয়। চৌকরি যে-পাহাড়ে অবস্থিত, সেখানে থেকে সামনে দেখা যায় বহু স্তরের পর্বতমালা। একেবারে কাছে পাহাড়গুলি গাঢ় সবুজ। তার পেছনে যে-পর্বত রয়েছে সেগুলো ধূসর রঙের। আর একেবারে শেষে শ্বেতশুভ্র হিমালয় পর্বত। যেন নীল আকাশের গায়ে স্তরে স্তরে কেউ তুলি দিয়ে ছবি এঁকে রেখেছে। এখান থেকে নন্দাদেবী, নন্দাকোট, চৗখম্বা, ত্রিশূল এবং পঞ্চচুল্লির দেখা পাওয়া যায়।

এখানে দেবদারু, পাইন বনে দেখা মেলে বিভিন্ন ধরনের পাখির। গাছের ছায়ায় পাহাড়ি রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে আপনি পৗঁছে যেতে পারেন এক কল্পনার স্বর্গরাজ্যে। এখানের অরণ্যে কস্তুরী মৃগর দেখা পাওয়া যায়। চৗকরি-তে বেশ কয়েকটা দর্শনীয় মন্দিরও রয়েছে। এই নিরিবিলি নৈসর্গিক স্থান ছেড়ে যেতে মন চায় না। তবে যেতে তো হবেই। আমরা আলমোড়া হয়ে কাঠগোদাম স্টেশনে পৗছোলাম। এবার বাড়ি ফেরার পালা।

কৌশানি, মুন্সিয়ারি এবং চৌকরির সঙ্গে রানিক্ষেত এবং নৈনিতাল, ভীমতাল, আলমোড়া, জিম করবেট ইত্যাদি একসঙ্গে ঘুরে আসা সম্ভব। শুধু হাতে একটু বেশি সময় নিয়ে যাত্রা শুরু করতে হবে। তবে বলতেই হয় কুমায়ুন হিমালয়ের সৗন্দর্য মনের মাঝে পাকাপাকি জায়গা করে নিল। এ স্মৃতি বহুদিন মনের গভীরে থেকে যাবে।

কীভাবে যাবেন – হাওড়া বা কলকাতা স্টেশন থেকে উত্তরাখন্ড পৗঁছোনোর জন্য অনেক ট্রেন আছে। কাঠগোদাম স্টেশনে নেমে প্রাইভেট গাড়ি ঠিক করে রানিক্ষেত হয়ে কৌশানি পৗঁছোনো যায়। প্রাইভেট গাড়ি ভাড়া করেই মুন্সিয়ারি এবং চৌকরি যাওয়া ভালো। এছাড়া বায়ুপথেও উত্তরাখন্ড যাওয়া সম্ভব।

কোথায় থাকবেন – কৌশানি, মুন্সিয়ারি ও চৌকরি-তে থাকার জন্য বহু হোটেল আছে। তবে আগে থেকে বুক করে যাওয়াই সুবিধাজনক।

কখন যাবেন – বর্ষাকাল ছাড়া বছরের যে-কোনও সময় কুমায়ুন গাড়োয়াল হিমালয়ের সৌন্দর্য অবলোকন করতে রওনা হওয়া যায়। তবে বর্ষাকালে পাহাড়ের সৌন্দর্য অন্যরকম।

গুজব ছড়ালে বিপদে পড়বেন

আজকাল সবচেয়ে দ্রুতগতির বার্তা-বাহক বা প্রেরণ-মাধ্যম হিসাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে সোশ্যাল মিডিয়া। ফেসবুক, হোয়াট্‌স অ্যাপ, টুইটার, লিংক্ডইন্ প্রভৃতি সোশ্যাল সাইটস-এ এত দ্রুত সবকিছু ছড়িয়ে পড়ছে যে, ইলেক্ট্রনিক মিডিয়াও হার মেনেছে। এখন বাচ্চা থেকে শুরু করে বয়স্ক মানুষ, সবার হাতেই রয়েছে স্মার্ট ফোন। মহিলারা তো কাজকর্ম ভুলে গিয়ে সারাদিন শুধু চ্যাট-এ ব্যস্ত থাকছেন। কোনও মেসেজ মোবাইল-এ ঢুকতে না ঢুকতেই তা গ্রুপ-এ ফরওয়ার্ড হয়ে যাচ্ছে।

জোক্স, রাশিফল, ছবি, ধর্মীয় খবর, স্বাস্থ্যরক্ষার উপদেশ, রেসিপিজ প্রভৃতি হরেক কিসিমের বার্তা শেয়ার হয়ে যাচ্ছে মুহূর্তের মধ্যে। এমনকি ছড়িয়ে পড়ছে কোনও না কোনও বিখ্যাত ব্যক্তির মিথ্যা মৃত্যু সংবাদও। এখন কারও হাতে অবসর সময় বলে কিছু নেই। ২৫০ মিলিয়ন ইউজার্স এখন হোয়াট্‌স অ্যাপ-এ সক্রিয়। বলতে গেলে জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে হোয়াট্‌স অ্যাপ।

বন্ধু, আত্মীয় এবং পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার জন্যও এখন মাধ্যম করা হচ্ছে সোশ্যাল নেটওয়ার্ক-কে। আবার এই সোশ্যাল নেটওয়ার্ক-এরই অপপ্রয়োগ করা হচ্ছে ফেক নিউজ, ছবি ইত্যাদি ছড়িয়ে। কে, কী পোস্ট করছে, কেন করছে, কী উদ্দেশ্যে করছে, এসবের ভালোমন্দ বিচার না করে, সবকিছু ফরওয়ার্ড করার প্রবণতা বাড়ছে।

অনেকসময় দেখা যায় যে, কোনও মিথ্যে বা গুজব ছড়িয়ে নিরপরাধ কাউকে ফাঁসিয়ে দেওয়া হচ্ছে। অথচ মজার কথা হল, যে-ব্যক্তি কৗশলে প্রথম গুজবটা ছড়াল, সে ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে গেল।

এখন পরিত্রাণ নেই

সাবধান! উচ্চ আদালত কড়া পদক্ষেপ নিতে পারে। যদি কেউ কোনও পোস্ট-এর ভালোমন্দ বিচার না করে তা ফরওয়ার্ড কিংবা শেয়ার করে, তাহলে সেই ব্যক্তি কিংবা ব্যক্তিবর্গ দোষী সাব্যস্ত হতে পারেন। দক্ষিণ ভারতের এক অভিনেতা এবং ভাজপা নেতা এস ভি শেখর-কে সম্প্রতি উচ্চ আদালত দোষী সাব্যস্ত করেছে এবং তার আগাম জামিনের আবেদনও খারিজ করেছে। কারণ, এই ব্যক্তি মহিলাদের উদ্দেশ্যে অপমানজনক মেসেজ তার ফেসবুক অ্যাকাউন্ট-এ শেয়ার এবং ফরওয়ার্ড করেছেন।

গত এপ্রিল মাসে, মহিলা মিডিয়াকর্মীদের উদ্দেশ্যে অপমানজনক উক্তি নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট-এ শেয়ার এবং মেসেঞ্জার-এ ফরওয়ার্ড করেছিলেন দক্ষিণ ভারতের অভিনেতা এবং গণ্যমান্য এই ভাজপা নেতা এস ভি শেখর। তিনি নিজে না লিখলেও, যেহেতু উনি কুরুচিকর মন্তব্য ভাইরাল করেছেন, তাই তিনি অপরাধী সাব্যস্ত হয়েছেন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে তিনি গ্রেফতার এড়াতে চেন্নাই হাইকোর্ট-এর দ্বারস্থ হন কিন্তু তার জামিনের আবেদন খারিজ হয়ে যায়। এরপর তিনি উচ্চ আদালতে গেলে ওখানেও তাকে রেহাই দেওয়া হয়নি, জামিনের আবেদন বাতিল করা হয়েছে।

এস ভি শেখর-এর কুুরুচিকর উক্তি ছড়ানোর প্রেক্ষিতে চেন্নাই হাইকোর্ট-এর মন্তব্য, কোনও খারাপ উক্তি শেয়ার কিংবা ফরওয়ার্ড করার অর্থ, ওই উক্তিকে স্বীকার এবং সমর্থন করে নেওয়া।

যদি কোনও বিশিষ্ট ব্যক্তি কিছু শেয়ার কিংবা ফরওয়ার্ড করেন, তখন তা সাধারণ মানুষ আরও বেশি বিশ্বাস করেন এবং ভেবে নেন, সত্যিই হয়তো তাই ঘটেছে। তাই বিশিষ্ট ব্যক্তিদের আরও বেশি সতর্ক থাকা উচিত। এস ভি শেখর-এর ফরওয়ার্ড করা পোস্ট-এ কুরুচিকর মন্তব্য পরোক্ষ নয়, প্রত্যক্ষ ছিল। তাই তাকে কঠিন আইনি জটিলতায় পড়তে হয়েছে।

আদালত স্পষ্ট জানিয়েছে যে, একজন গণ্যমান্য ব্যক্তির উচিত সমাজের জন্য ভালো কিছু করা কিন্তু তার পরিবর্তে তিনি আদর্শচ্যুত হয়ে ভুল এবং আপত্তিকর মন্তব্য ছড়িয়েছেন। অবশ্য শুধু এস ভি শেখর-ই নন, এইরকম ভুল করে অনেকেই গ্রেফতার হয়েছেন ইতিমধ্যে।

ফেক মেসেজ এক কঠিন সমস্যা

ফেক নিউজ, মেসেজ ইত্যাদি সোশ্যাল মিডিয়াতে ভাইরাল হওয়া এত বেড়ে গেছে যে, এই সমস্যার সমাধান করার বিষয়টি সরকারের কাছে এখন সবচেয়ে বড়ো চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর এই সমস্যা যত বাড়ছে, কিছু মানুষকে এর কুফল ভোগ করতে হচ্ছে। কখনও আবার প্রাণ হারাতে হচ্ছে এর পরিণামস্বরূপ।

মহারাষ্ট্রে বাচ্চা-চোর সন্দেহে পাঁচজনকে পিটিয়ে মেরে ফেলা হয়েছে। তাও আবার এই একটা ঘটনাই নয়, সোশ্যাল মিডিয়ায় গুজব ছড়িয়ে পড়ার কারণে, নিরীহ মানুষের প্রাণ কেড়ে নেওয়া হয়েছে বহুবার। সবচেয়ে বড়ো সমস্যা হল, খবর সত্যি নাকি মিথ্যে, তা যাচাই না করে, অবিবেচকরা মাঝেমধ্যে কিছু মানুষের প্রাণহানি পর্যন্ত করছেন অমানবিক ভাবে।

দেশের মধ্যে প্রায় কুড়ি কোটি হোয়াট্‌স অ্যাপ ইউজার্স, ভুল খবর ভাইরাল করে চলেছেন প্রতিদিন। বিবেচনা না করে, যাচাই না করে কীভাবে কিছু সংখ্যক মানুষ গুজব ছড়াচ্ছেন, তা ভাবলেই অবাক হতে হচ্ছে। যারা কোনওকিছু শেয়ার কিংবা ফরওয়ার্ড করছেন, তাঁরা একবারও ভাবছেন না যে, গুজব ছড়ানোর পরিণাম কী হতে পারে!

ভয়ংকর পরিণাম

না ভেবেচিন্তে হোয়াট্‌স অ্যাপ-এ মেসেজ ফরওয়ার্ড করলে কী পরিণাম হতে পারে, তারও প্রমাণ পাওয়া গেছে বহুবার। চার বছর আগের এক পুরোনো মেসেজ ফরওয়ার্ড করতে করতে যখন সত্যটা সামনে এল, ততক্ষণে যা ঘটার ঘটে গেছে।

বেঙ্গালুরুর বানশংকরী অঞ্চলের বাসিন্দা এক ব্যবসায়ীর হোয়াট্‌স অ্যাপ-এ মেসেজ এল– ‘কেম্পাগৗড়া ইন্সটিটিউট অফ মেডিকেল সায়েন্সেজ হস্পিটাল-এ এক অচেনা বাচ্চা মাথায় চোট পেয়ে ভর্তি আছে। মেসেজ ছড়িয়ে দ্রুত ওই বাচ্চার মা-বাবার কাছে খবর ছড়িয়ে দিন।’ এই মেসেজ এবং বাচ্চার ছবি দেখে ওই ব্যবসায়ী বিচলিত হয়ে পড়েন, কারণ তার বোনের ছেলের সঙ্গে ওই বাচ্চার ছবির মিল আছে। তিনি তখনই তার বোনকে ফোন করে খবর দেন। বোন ঘাবড়ে গিয়ে বাচ্চার স্কুলে যান, কিন্তু দেখেন যে, বাচ্চাটি ঠিক আছে।

এই ঘটনার পর ওই ব্যবসায়ী খোঁজ খবর নেন। জানতে পারেন, তারই এক পরিচিত লোক নতুন স্মার্ট ফোন কিনে, পুরোনো ফোন থেকে ব্যাক-আপ নেওয়ার পর, নতুন ফোন-এ হোয়াট্‌স অ্যাপ ঠিক মতো কাজ করছে কিনা দেখার জন্য ওই মেসেজ ফরওয়ার্ড করেছিলেন। তিনি ভেবে দেখেননি, এর পরিণাম কী হতে পারে। এভাবেই অনেকে অবিবেচকের মতো কাজ করে চলেছেন।

সাবধান হওয়া জরুরি

সত্যি-মিথ্যে যাচাই না করে, আপনারও যদি কোনও কিছু ফরওয়ার্ড করার অভ্যাস থাকে, তাহলে সাবধান হয়ে যান। কারণ, আদালত এখন এইরকম গুবজ ছড়ানোর ঘটনায় কড়া পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছে। পুলিশও যদি এইরকম অভিযোগ পায়, তাহলে দ্রুত মামলা শুরু করে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেবে।

সম্প্রতি লখনউ নিবাসী এক ব্যক্তি গ্রেফতার হয়েছেন অন্যের হোয়াট্‌স অ্যাপ-এ আপত্তিজনক কার্টুন পাঠিয়ে।

গুজব ছড়াবেন না

রোগব্যধির চিকিৎসা থেকে শুরু করে ভক্তিলাভের উপায় তুলে ধরা হচ্ছে ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ এবং মেসেঞ্জার-এ। আয়ুর্বেদ-এ টিবি কিংবা ক্যানসার নিরাময় হয়ে যাবে, এমন বার্তাও দেওয়া হচ্ছে সোশ্যাল সাইট-এ। দেবদেবীর ছবি এবং বাণী দশজনকে ফরওয়ার্ড করলে ইচ্ছেপূরণ হবে, এমন মেসেজও ভাইরাল করা হচ্ছে। ‘এটা খাবেন না, ওটা খাবেন না, অমুক অসুখ হবে, অমুক জায়গায় বাচ্চা চুরি হচ্ছে’ –এমন হাজারও গুজব ছড়ানো হচ্ছে প্রতিদিন। আর এরফলে ক্ষতি হচ্ছে বৃহত্তর সমাজের। তাই, গুজব ছড়ানো বন্ধ করুন। আপনার এবং আপনার আত্মীয়স্বজনেরও ক্ষতি হতে পারে এই রকম গুজবে, কিংবা গুজব ছড়ানোর কারণে আপনি গ্রেফতারও হতে পারেন, একথা ভেবে অন্তত গুজব ছড়ানো বন্ধ করুন।

উড়ো খবরের ছড়াছড়ি

নোটবন্দির পর তো এমন খবরও ছড়িয়েছিল যে নোট অর্থাৎ টাকার মধ্যে ‘চিপ’ বসানো রয়েছে। কখনও আবার এমন খবরও ছড়িয়েছিল যে, নুন-এর ঘাটতি দেখা দিতে পারে। এই খবর ছড়িয়ে পড়ার পর, রাতারাতি বাজার থেকে নুন উধাও হয়ে গিয়ে কালোবাজারি শুরু হয়ে গিয়েছিল। কুড়ি টাকা কিলোগ্রাম নুন প্রায় ২ঙ্ম০ টাকা দামেও বিক্রি হয়েছে কিছু জায়গায়।

‘আর কিছুদিন পর পৃথিবী ধবংস হয়ে যাবে’– এমন খবরও ছড়িয়েছে সোশ্যাল সাইট-এ। শুধু তাই নয়, গুজবের ফলে সাম্প্রদায়িক সম্প্রতি নষ্ট হয়ে কোথাও হয়তো দাঙ্গার পরিস্থিতিও তৈরি হয়েছে কখনও।

আসলে, কিছু কুমতলবী মানুষ মাঝেমধ্যে এইরকম গুজব ছড়িয়ে আনন্দ পায়। তারা বেশ ভালো মতো বুঝে গেছে যে, অনেক অবিবেচক মানুষ আছেন, যাদের মগজধোলাই করে গুজব ছড়িয়ে অশান্তি বাঁধানো সম্ভব। সভ্য সমাজের কাছে এটা খুব-ই লজ্জার! অতএব, সতর্ক থাকুন। কুমতলবীদের উড়ো খবরে বিভ্রান্ত না হয়ে, আসল সত্য উদ্ঘাটন করুন। বাঁচান নিজেকে এবং সমাজ তথা দেশকে।

চকোলেট কোকোনাট ফাজ

কোকো বা ডার্ক চকোলেট আমাদের দেহের সংবহন তন্ত্রের উপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। বহু গবেষণায় দেখা গেছে,স্বরূপ দেখা গেছে যে, চকোলেট আমাদের নির্দিষ্ট কিছু হৃদযন্ত্রের সমস্যা কমিয়ে আনতে পারে এবং মোটা কিংবা ক্ষীণকায়া, সব ধরনের  মানুষের রক্তচাপ কমাতে সক্ষম।ডার্ক চকোলেট প্রাপ্তবয়স্কদের কোলেস্টেরল মাত্রা কমাতে পারে।  কিছু গবেষণা প্রাথমিকভাবে সাক্ষ্য দিয়েছে যে,চকোলেটের পলিফেনল,শরীরের এলডিএল -এর জারন প্রক্রিয়া প্রতিরোধ করতে পারে৷এই রান্নায় দেওয়া হয়েছে ডার্ক চকোলেট চিপ্স, পুষ্টিগুণ বাড়ানোর জন্য৷

উপকরণ : ২ কাপ নারকেলকোরা, ১ বড়ো চামচ ঘি, ১/২ কাপ ক্যাস্টর সুগার, ১/৪ কাপ দুধ, ১ কাপ ডার্ক চকোলেট চিপ্স, ১/৪ কাপ ক্রিম, ১/২ ছোটো চামচ এলাচগুঁড়ো।

প্রণালী : ঢিমে আঁচে প্যান গরম করে, এতে নারকেলকোরা ও ঘি দিয়ে নাড়াচাড়া করুন। দুধের সঙ্গে ক্যাস্টর সুগার এবং নারকেলকোরা-টা মিশিয়ে রান্না করুন যাতে মসৃণ হয়ে যায়। এবার মাইক্রো আভেনের পাত্রে চকোলেট ও ক্রিম মিশিয়ে ৪০ সেকেন্ড বেক করুন। বের করে আনুন, দেখুন গ্লসি মিক্সচারে রূপান্তরিত হয়েছে কিনা। এবার এতে এলাচগুঁড়ো ছড়িয়ে ভালো ভাবে মিশিয়ে নিন। মোল্ডস-এ ঘি বুলিয়ে অল্প করে কোকোনাট মিক্সচার দিন। এটা ৩ ঘন্টা ফ্রিজে রেখে দিন। ঠান্ডা হলে মিশ্রণ জমে যাবে। তখন টুকরো করে উপর থেকে চকোলেট ও ক্রিমের মিক্সচার ঢেলে সার্ভ করুন।              ঞ্

অবনীবাবুর গ্রাম

জিনিসটা কাল থেকে খুঁজে পাচ্ছেন না অনুপমা। এত গুরুত্বপূর্ণ জিনিস কী করে যে হারিয়ে ফেললেন ভেবেই অবাক হচ্ছেন। অবশ্য একে হারিয়ে ফেলা বলা চলে না। ঘরের মধ্যেই হয়তো কোথাও রেখে ভুলে গিয়েছেন। কিন্তু কোথায়? সকাল থেকে এখনও অবধি সম্ভাব্য সমস্ত জায়গায় খুঁজে দেখেছেন।

ইদানীং ভুলে যাওয়ার সমস্যাটা চরমে গিয়ে পৗঁছেছে। কিছুদিন আগের ঘটনা। ঘুম থেকে উঠে চশমা খুঁজে পাচ্ছিলেন না। চোখের যা অবস্থা চশমা ছাড়া সমস্তটাই ঝাপসা লাগে। সেই ঝাপসা দৃষ্টি দিয়েই সকাল থেকে বাড়ি ওলটপালট করলেন। দুপুরে কাজে এসে চুন্নি চশমা পেল ডালের কৗটোর ভেতর। এরকম বহু ঘটনা আছে। তাই সেই গুরুত্বপূর্ণ জিনিসগুলো টেবিলের উপর নির্দিষ্ট একটা বাক্সের মধ্যে রাখার ব্যবস্থা করে দিয়েছিল সুশান্ত।

ড্রেসিং টেবিলের উপর থেকে টর্চটা নিয়ে অনুপমা এবার খাটের তলায় আলো ফেললেন। স্তূপীকৃত ব্যাগ, বাসন, ট্রাঙ্কের ফাঁকফোকর দিয়ে আলো যতটুকু পৗঁছোল তাতে কোথাও সেই জিনিস নজরে এল না। অনুপমা ক্লান্ত বোধ করলেন। আজকাল একটুতেই ক্লান্ত হয়ে পড়েন। টর্চ অফ করে এসে বসলেন খাটের উপর।

বাতের ব্যথার জন্য শরীর নড়াচড়াতে কষ্ট। তবুও মরিয়া হয়ে খুঁজে যাচ্ছেন সকাল থেকে। নইলে সন্ধ্যার পর থেকে আর নিস্তার নেই। অনুপমা চোখ বন্ধ করে মনে করার চেষ্টা করলেন। দিন চারেক আগে সুশান্ত এসে যখন জিনিসটা দিয়ে গেল তারপর ঠিক কোথায় রাখলেন…।

আচমকা মনে হল জিনিসটা চুরি হয়নি তো? কিন্তু চুরি কে করবে? চুন্নি? পাঁচ বছর ধরে কাজ করছে। ও ঘর মুছতে গিয়ে এক টাকার কয়েনও কুড়িয়ে পেলে ফেরত দেয়। আর থাকল রামলাল। রামলাল কবে এই ঘরে ঢুকল অনুপমা মনে করার চেষ্টা করলেন। ধুসস! যতসব আজেবাজে ভাবনা। প্রতিদিন বাজারটা পৗঁছে দিয়েই বেরিয়ে যায় ও। বাড়িতে বিশেষ কেউ আসে না। তাই চুরির প্রশ্নও আসে না। তাছাড়া এই জিনিস আদৌ কি চুরি হবার মতো..? ভাবনায় ছেদ পড়ল। পাশের ঘর থেকে বিকট এক চিৎকার ভেসে এল হঠাৎ।

‘ফুটো করে করে সব শেষ করে ফেলল। ভেঙে পড়বে এবার’ অবনীবাবু আর্তনাদ করে উঠলেন।

অনুপমা দরজার সামনে এসে বললেন ‘কী হল আবার?’

‘সব শেষ করে ফেলল।’

‘কে?’

‘শুনতে পাচ্ছ না নাকি? কখন থেকে ঠোকর মেরেই যাচ্ছে’

অনুপমা কান পেতে শুনলেন একটা কাঠঠোকরা পাখি অনবরত ঠোকর মারছে গাছে।

‘বাবার নিজে হাতে লাগানো গাছ। ঢিল মেরে তাড়াও ওটাকে।’

‘তাড়াচ্ছি দাঁড়াও। অত চিৎকার কোরো না’ বিরক্ত কণ্ঠে কথাটা বলে অনুপমা বেরিয়ে গেলেন বাইরে।

অবনীবাবু নিশ্চিন্ত হলেন। ঠোকরের আওয়াজ আর পাওয়া যাচ্ছে না। নিশ্চিন্তে আবার পা নাচানো শুরু করলেন। সব গাছ বাবার নিজে হাতে লাগানো। রোজ ঘন্টার পর ঘন্টা রোদ, বৃষ্টি, মাটি মেখে নিজের শখের বাগান বাড়িয়ে তুলতেন বাবা। সার সার সুপুরি বাগানের পেছনের জঙ্গলেই আম, কাঁঠাল, পেয়ারা, নারকেলের ভিড়। বেলা বাড়লে অনেক চেনা-অচেনা পাখির ডাক শোনা যায়।

নারায়ণগঞ্জের পনেরো বিঘে জমি ঠাকুরদার নিজের কষ্টের পয়সায় কেনা। এত জায়গা এ তল্লাটে আর কারও নেই। সুপুরি, আর মাঠের ফসলের ব্যাবসায় টাকাও আসত ভালো। সেই টাকায় এলাকার সবচেয়ে প্রথম পাকা বাড়ি হল তালুকদার বাড়ি। পাকা বাড়ি হলেও বাবা ইচ্ছে করেই ছাদ দিতে দেননি।

ঝিরঝির করে বৃষ্টি শুরু হল। টিনের চালে বৃষ্টি আছড়ে পড়ার আলাদা একটা শব্দ আছে। সেই শব্দ শুনেই বোঝা যায় বৃষ্টির গতি। অবনীবাবু বুঝলেন জোরে নয়। হালকা, ঝিরঝিরে বৃষ্টি।

বর্ষার সময়। যখন তখন বৃষ্টি নামে। প্রতিবার রাস্তার ওপাশের ডোবাটা এই সময় জল, কচুরিপানায় টলমল করে। পিন্টুদের পুকুরের সাথে যুক্ত থাকায় প্রচুর মাছ আসে সেখানে। টাকি, রুই, খোলসা, কই। বিকেলে গ্রামের বাচ্চাগুলোর মাছ ধরার শব্দ স্পষ্ট শুনতে পান অবনীবাবু। কথাটা মনে হতেই চেঁচিয়ে উঠলেন ‘বাচ্চাগুলো এলে গোটা কয়েক মাছ দিয়ে যেতে বলো তো। অনেকদিন ভাজা খাই না। আগে আমি ধরতাম, আর মা ভাজত। ঘি, মাছ ভাজা…’ বলে অবনীবাবু হাসলেন। বেশ জোরেই। কিন্তু ও-ঘর থেকে কোনও প্রত্যুত্তর শোনা গেল না।

(দুই)

কথাটা অনুপমার কানে এসে পৌঁছোল না। সারাদিনই কিছু না কিছু বলতে থাকেন অবনীবাবু। আর সেই অনুযায়ী উত্তর দিয়ে যেতে হয় তাকে। কিন্তু আজ ও-ঘরে বসে থেকে উত্তর দেওয়ার মতো মানসিক অবস্থা নেই। জিনিসটা পাওয়া না গেলে আজ রাতেও ঘুমোতে পারবেন না।

ছালবাকল ওঠা মান্ধাতা আমলের ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট ফোন থেকে নম্বর বের করে কারও সাথে কথা বলা কষ্টসাধ্য ব্যাপার। কানে ঠেসে না ধরলে কিছুই ঠিকঠাক শোনা যায় না। ছেলে অর্কপ্রভ অনেকবার বলেছিল টাচ ফোন কিনে দেবে। অনুপমা প্রত্যেকবারই প্রসঙ্গ এড়িয়ে বলেছেন, ‘তিনকাল গিয়ে এককাল আছে। এখন আর টাচ ফোন দিয়ে কী করব?’

অর্ক মাকে বোঝানোর চেষ্টায় বলেছে, ‘অনেক সুবিধে হয় তাহলে। অ্যানড্রয়েড ফোন দিয়েই আজকাল সব কাজ হয়।’

অনুপমা প্রতিবারই প্রবল আপত্তি জানিয়ে না করে দিয়েছেন, ‘এর মাথা-মুন্ডু কিছুই বুঝব না। যেভাবে চলছে বরং সেভাবেই…’

অর্ক আর কথা বাড়ায়নি। সে কথা বাড়াতে পছন্দ করে না। ছোটোবেলা থেকে প্রখর বুদ্ধি সম্পন্ন গম্ভীর প্রকৃতির অর্কপ্রভ বাইরের নামি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ থেকে বিটেক করেছে। এখন চাকরি সূত্রে বছর সাতেক ব্যাঙ্গালোরে বউ বাচ্চা নিয়ে সেটেলড। দেড় বছর আগে যখন ঘটনাটা ঘটল চাকরি ছেড়ে বাড়ি চলে আসতে চেয়েছিল। অনুপমা বাধা দিয়ে বলেছিলেন ‘বললাম তো আসতে হবে না। আমি সামলে নিতে পারব। তাছাড়া চুন্নি, রামলাল তো আছেই।’

অর্কপ্রভ আসেনি। ফোনের ওপাশ থেকেই যতটা পারা যায় দায়-দায়িত্ব পালন করার চেষ্টা করে।

অনুপমা লোহার মতো শক্ত কি-প্যাড গুঁতিয়ে ফোন লাগালেন। দু’বার রিং হয়ে কেটে গেল। তিন নম্বর বার অর্ক ফোন তুলে বলল, ‘মিটিং-এ আছি। বেরিয়েই কল ব্যাক করছি।‘ আর কিছু বলার সুযোগ পেলেন না অনুপমা।

ভেবেছিলেন ছেলেকে বলে যদি কিছু উপায় বের করা যায়। অনুপমা আবার চেষ্টা করলেন সুশান্তকে। সুইচড অফ। ওর দেওয়া দুটো নম্বরেই কাল থেকে অসংখ্যবার ট্রাই করেছেন। কোনওটাতেই পাচ্ছেন না। এসব ভাবতে ভাবতে আচমকা একটা বুদ্ধি খেলে গেল মাথায়। সুশান্তর ওখানে গিয়ে উপস্থিত হলে কেমন হয়? তাহলেই তো সমস্যা চুকে যায়। টেবিলের উপর রাখা কার্ডটা ভালো করে দেখলেন। কন্ট্যাক্ট নম্বরের নীচে ঠিকানা লেখা। ছয় মাস আগে অর্ক যখন এসেছিল তখন দু’বার গিয়েছিলেন তার সাথে। চিনতে অসুবিধে হবে না।

পরক্ষণেই মাথায় আসল অবনীবাবুর কথা। ঘরে একা রেখে যাবেন কীভাবে! আরেকটু পরেই চুন্নি কাজে আসবে। ওর উপর ভরসা করে রেখে যাওয়াটা কি ঠিক হবে? এছাড়া আর উপায়ও বা কী! সুশান্তকে কবে ফোনে পাওয়া যাবে তার নেই ঠিক। অতদূর থেকে অর্কও মনে হয় না বিশাল কোনও সাহায্য করতে পারবে। এর চেয়ে ভালো সশরীরে নিজে গিয়ে নিয়ে আসা। তাহলে অন্তত কিছুদিনের জন্য রেহাই।

অনুপমা মনস্থির করলেন চুন্নিকে রেখেই বেরোবেন। ও সমস্তটাই জানে। তাও আরও একবার বলে যেতে হবে। বাসন মাজা, কাপড় কাচার সাথে ওর আজকের এক্সট্রা কাজ হবে দাদুর সাথে বসে গল্প করা। অ্যাক্সিডেন্টে চোখ দুটো খোয়ানোর পর থেকেই অবনীবাবু রোজ জানালার দিকে মুখ করে ইজিচেয়ারে বসে পা নাচান। আশপাশ থেকে ভেসে আসা গ্রামের এক একটা শব্দ খুব মন দিয়ে শোনেন। শুকনো পাতা মাড়িয়ে যাবার শব্দই হোক বা বর্ষাকালে কাদা মাখা স্যান্ডেলের চটচট শব্দ। কোনও কিছুই কান এড়ায় না তার। চোখে দেখতে না পারলেও শব্দ শুনেই চলমান গ্রাম অনুভব করেন।

সকালে মোরগের ডাকে ঘুম ভাঙার পরই অবনীবাবুকে ধরে ইজিচেয়ারে বসিয়ে দেন অনুপমা। তারপর চা নিয়ে এসে নিজেও বসেন পাশে। সেই থেকে শুরু হয় কথা। সুপুরির খোল পড়ার আওয়াজ পেলেই অবনীবাবু শুরু করেন ছোটোবেলায় কীভাবে সেটাকে টানা গাড়ি হিসেবে ব্যবহার করতেন সেই গল্প। ‘একজন খোলের উপর চড়ে বসত আর সামনের জন মাটিতে টেনে হিঁচড়ে এগিয়ে নিয়ে চলত’, বলে অবনীবাবু হাসেন। অনুপমাও হো হো করে হেসে ওঠেন।

সবচেয়ে মুশকিল হয় নারকেল পড়লে। ঝুপ করে নারকেল পড়া মাত্রই অবনীবাবু নাড়ু খাওয়ার হাজারটা গল্প জোড়েন। সাথে বারবার খাবার আবদার। অনুপমা ক্লান্ত বোধ করেন। শরীরের বয়স তেষট্টি হলেও তিনি আরও বেশি বুড়িয়ে গেছেন। মাথা ভর্তি পাকা চুল, কুঁচকে যাওয়া চামড়ার সাথে বাড়তি পাওনা বাতের ব্যথা। এত ধকল আর সইতে পারেন না। তবুও জান ঢেলে যতটা সম্ভব করার চেষ্টা করেন। একাত্তর বছরের এই বৃদ্ধ মানুষটার জন্য। এতগুলো বছর ধরে শুধু…

‘দিদা ঝাঁটা কোথায়?’ অনুপমা পেছন ফিরে দেখলেন চুন্নি এসে গেছে।

(তিন)

‘তোর দিদা বকুলদের বাড়ি থেকে কখন ফিরবে?’ অবনীবাবু প্রশ্ন করলেন।

‘বলেছে সন্ধ্যা হবে।’

‘কটা বাজে এখন?’

‘সাড়ে তিনটা’

‘শুনেই বুঝেছিলাম।’

‘কী?’ চুন্নি অবনীবাবুর দিকে তাকাল।

‘বালতির আওয়াজ। পটলার বাবা এই সময় মাঠ থেকে ফেরে। কুয়োর পারে বসে সাবান ঘষে ঘষে স্নান করে।’

কী কান রে বাবা! চুন্নি মনে মনে ভাবল।

‘আগে তো আমাকে আর পটলাকে এক সাথে বসিয়ে পিঠে সাবান ঘষে দিত। স্নান করাত, অবনীবাবু মুচকি হাসলেন। ঝগড়ার পর থেকে আর কথা বলে না। উঠোনে তো বেড়াও দিয়ে দিল।’

কিছুক্ষণ চুপ থেকে অবনীবাবু বললেন ‘যা মাড়টা ঢেলে দিয়ে আয়। গরুগুলো না খেয়ে আছে।’

‘দিচ্ছি’

‘অল্প পোয়ালও দিস।’

‘আচ্ছা’

আচমকা ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামল। টিনের চালে বৃষ্টি আছড়ে পড়ার তীব্র আওয়াজ। সাথে মেঘের ডাক।

‘জানালাগুলো আটকে দে’ অবনীবাবু চেঁচিয়ে বললেন।

এই সময় প্রচন্ড মনখারাপ হয়ে যায় অবনীবাবুর। বৃষ্টির জন্য অন্য কিছু শোনা যায় না। যদিও চুপচাপ চোখ বন্ধ করে বৃষ্টির আওয়াজ শোনার মধ্যে একটা মজা লুকিয়ে আছে। ছোটোবেলায় মাটির বারান্দায় বসে কাগজের ছোটো ছোটো নৗকা ভাসিয়ে দেওয়ার খেলা চলত। বৃষ্টি থামলে দেখা হতো কারটা কতদূর পৗঁছেছে। প্রতিবারই জিতে যেত শিমুল। এত জলের মধ্যেও কীভাবে যেন শুধু তার নৗকাই ডুবত না। অনেক চেষ্টা করেও তাকে কোনওবারও হারানো যেত না। অবনীবাবু শিমুলের অস্পষ্ট মুখ দেখতে পেলেন।

সেবার ঘোর বর্ষা। শিলাবতি নদী ফুলে ফেঁপে উঠেছে। পাড় ঘেঁষে ইতিমধ্যে অনেক ঘর জলের তলায়। অনেক ফসল নষ্ট হয়েছে। প্রচুর লোকসান। নদী আয়তনে বেড়ে উপরে উঠে এসেছে অনেকটাই। গ্রাম জুড়ে সতর্কতা। পারে যাতে কেউ না যায়। শিমুলের বাবা সামান্য ভাগচাষি। তারও প্রচুর লোকসান হয়ে গেছে।

একদিন বিকেলে শিমূল এল। সঙ্গে ওমু আর টিটু। বলল মাছ ধরতে যাবে। শিলাবতির পাড়ে। বাড়িতে না জানিয়েই ভয়ে ভয়ে সেখানে পৌঁছোল ওরা। চারিদিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে গেল। যেদিকেই চোখ যায় জল আর জল। পারের বট, ডুমুর সব কোমর জলে দাঁড়িয়ে। জলে ভেসে যাচ্ছে ভাঙা বাড়ি-ঘরের অবশিষ্টাংশ। নদীর এই ভয়ংকর রূপ দেখে ওরা তিনজন ঘাবড়ে গেলেও শিমুল ধার বরাবর আরও এগোতে থাকল। তখন অন্ধকার নেমে এসেছে। দূরের কিছু বাড়িতে দেখা যাচ্ছে কুপি, হ্যারিকেনের আলো। তিন বন্ধু বলল আর যাবে না। সামনে কিছুই দেখা যাচ্ছে না। শিমুল তাদের বাড়ি চলে যেতে বলে ছিপ হাতে এগিয়ে যেতে থাকল সামনে।

পরদিন সকাল। তুমুল বৃষ্টি। বৃষ্টির শব্দে কানের পর্দা ফেটে যাওয়ার উপক্রম। হঠাৎ দূর থেকে একটা হই হই শোনা গেল। অনেকেই ঘর ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে এসে দেখল শিমুলের বাবা সেই প্রচন্ড বৃষ্টির মধ্যে খালি গায়ে পাগলের মতো চিৎকার করতে করতে ছুটে যাচ্ছে। পেছনে তার দাদা, মা, গ্রামের আরও কিছু লোক। দুপুরে শোনা গেল শিমুলের লাশ পাওয়া গেছে। আগেরদিন সন্ধ্যায় মাছ ধরতে গিয়ে পাড়ের মাটি ভেঙে জলে ডুবে যায় শিমুল। বর্ষায় ফুলে ওঠা শিলাবতি সেই দেহ টেনে নিয়ে চলে যায় অনেকদূর। মাঝিরা লাশ দেখে খবর দেয় গ্রামে।

প্রচন্ড বৃষ্টিতে মনখারাপ হয়ে যায় অবনীবাবুর। শিমুলের বাবার সেই অসহায় চিৎকার কানে বাজে।

‘একি! কাঁদছ কেন?’ চুন্নি অবাক হল।

অবনীবাবু নাক টেনে একটু কেশে নিয়ে বললেন ‘শিমুলটা মারা গেল। কেন যে আটকাইনি আমরা।’

চুন্নি কী বলবে ভেবে পেল না।

দেখল চোখের কোণ বেয়ে এক বিন্দু জল গড়িয়ে এসে পড়ল ইজিচেয়ারের হাতলে।

(চার)

লোকগুলো দৌড়োচ্ছে। অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন। হাসপাতালের করিডোর।

আশপাশে বসে থাকা সমস্ত পেশেন্টের ভিড়, নার্সদের কোলাহল কাটিয়ে লোকগুলো এগিয়ে যাচ্ছে অপারেশন থিয়েটারের দিকে। স্ট্রেচারে শোয়ানো মানুষটার চোখ বন্ধ। মাথার পেছনে বাঁধা কাপড়ের টুকরো শুষে নিচ্ছে বেরিয়ে যাওয়া রক্তের স্রোত। আর এক মুহূর্ত দেরি হলেই বাঁচানো যাবে না। লোকগুলো দৌড়োচ্ছে।

‘আরে দিদি চেপে বসুন না একটু। এত জায়গা থাকতে…’

পরের কথাটা অনুপমার কানে গেল না। সাইড দিয়ে সাইরেন বাজাতে বাজাতে প্রচন্ড গতিতে একটা অ্যাম্বুলেন্স বেরিয়ে গেল। তাই শোনা গেল না। অনুপমা জানলার ধারে চেপে গেলেন। মহিলাটি পাশে এসে বসল।

বাসে উঠে ঘুম এসেছিল একটু। তিনরাত ধরে ঘুমোতে না পারার ফল। একটা মানুষ অনবরত একই কথা বলে গেলে কে-ই বা শান্তিতে ঘুমোতে পারে। তাই শরীরে হাজার ব্যথা, কষ্ট নিয়েও আজ সুশান্তর কাছে যেতে হচ্ছে।

শান্তি শব্দটা অনুপমার অভিধান থেকে লুপ্ত হয়ে গেছে অনেকদিন। বাসে উঠে চোখ বন্ধ হওয়া মাত্র আবার সেই আজেবাজে স্বপ্ন!

পরশুদিন অর্ক ফোন করে জানিয়েছিল ওর কথা হয়েছে ডক্টর চৌধুরীর সাথে। পরের মাসে একবার চেক আপ করিয়ে আনতে বলল।

জানলা দিয়ে শোঁ শোঁ হাওয়া ঢুকে পেকে যাওয়া চুলগুলো ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। অনুপমা জানলার বাইরে চোখ রাখলেন। অনেকদিন আসা হয় না এদিকে। বাজার হাট সব রামলালই করে দেয়। তাই বাড়ি থেকে বের হতে হয় না বিশেষ। রামলাল কাজে ব্যস্ত। তাই দু’দিনের বাজার আগেই করে রেখে গেছে। নাহলে আজ ওকেই পাঠানো যেত। ক্ষয়ে যাওয়া শরীরটাকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে চলতে হতো না।

অবনীবাবুকে বাড়িতে একা রেখে কোথাও বের হন না অনুপমা। একান্তই দরকারে চুন্নিকে রেখে…। গ্রামের ঠাকুর বকুল মাস্টারের বাড়িতে মনসা পুজোর নেমন্তন্ন আছে। কথাটা বলে বেরিয়ে আসতে হয়েছে। চুন্নি ঠিকঠাক সামলাতে পারছে তো? একরাশ দুশ্চিন্তা গ্রাস করল হঠাৎই। অনুপমা অন্যমনস্ক হয়ে গেলেন।

‘থাকেন কোথায়?’ প্রশ্নটা পাশ থেকে এল। সেদিকে না তাকিয়েই অনুপমা উত্তর দিলেন ‘নারায়ণগঞ্জ’।

‘বাপরে! সে তো অনেকদূর।’

জানলা থেকে চোখ ফিরিয়ে অনুপমা কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলেন। কিন্তু তার আগেই…

‘ওখানে আমার মামাবাড়ি ছিল বলে’ মহিলাটি হাসলেন।

অনুপমা আর কিছু বললেন না।

‘সেই ছোট্টবেলা থেকে ওখানকার মাটি মেখে বড়ো হয়েছি। মামাবাড়ি গেলেই হ্যারিকেনের আলোয় গল্পের বই পড়তাম। এখন তো বোধহয় ইলেক্ট্রিসিটি এসেছে।’

মহিলাটির ঠোঁটে লেগে থাকা হাসি দেখে অনুপমা বুঝলেন অনেক পুরানো স্মৃতি মনে পড়ে গেছে তার। মানুষ স্মৃতিমেদুর হলেই এভাবে হাসে।

‘হ্যাঁ এসেছে।’

‘শেষ গিয়েছিলাম আট-ন বছর আগে। মামা মারা যাবার পর সব জায়গা জমি বিক্রি করে দাদারা শহরে চলে এল। তারপর আর যাওয়া হয়নি।’

‘ওহ’

অনুপমা সংক্ষেপে উত্তর দিলেন।

কিছুক্ষণ চুপ থেকে মহিলাটি আবার বলল, ‘আচ্ছা গ্রামে কি এখনও সেই রেওয়াজটা আছে?’

‘কীসের?’

‘ওই যে জ্যৈষ্ঠের পূর্ণিমায় শিলাবতির পাড়ে খাওয়া-দাওয়া, রাত কাটানো। কী যে মজা হতো…’

কয়েক মুহূর্ত ভাবতেই বিদ্যুৎ ঝলকের মতো পরপর কিছু দৃশ্য ভেসে উঠল চোখের সামনে।

নারায়ণগঞ্জে বিয়ে হয়ে আসার মাত্র কয়েকমাস হয়েছে তখন। অনুপমা শহরের মেয়ে। প্রত্যন্ত গ্রাম নারায়ণগঞ্জে এসে প্রথম প্রথম বেশ অসুবিধে হতো। একদিন সন্ধ্যায় অবনীবাবু হাট থেকে বাড়ি ফিরে নদীর পাড়ে রাত কাটানোর কথা বললেন। সাথে জানালেন, খাওয়া-দাওয়া ওখানেই হবে। কথাটা অনুপমা ঠাট্টার সুরে নিলেও রাতে সত্যিই সেখানে বউ নিয়ে হাজির হয়েছিলেন অবনী তালুকদার। অনুপমা পরে জেনেছেন বছরের একটা দিন জ্যৈষ্ঠের পূর্ণিমায় প্রতিবছরই গ্রামের লোক জড়ো হয় সেখানে। নদীর পাড় দিয়ে গিজগিজ করে মানুষ। জায়গায় জায়গায় আগুন জ্বেলে করা হয় রান্না।

সেদিন চারিদিকের হই হই কাটিয়ে অনুপমার চোখ গিয়ে ঠেকল মেঘহীন আকাশের থালার মতো গোল চাঁদটার গায়ে। নিজেকে উন্মুক্ত করে সমস্ত আলো ঢেলে দিচ্ছে পৃথিবীর বুকে। পূর্ণিমার পূর্ণাঙ্গ চাঁদকে এত কাছে দেখে অনুপমার মনে হয়েছিল এক্ষুণি বোধহয় ছুঁয়ে ফেলা যাবে!

মাঝরাতে আচমকাই ঘুম ভেঙে গেল বিকট এক জন্তুর আওয়াজে। নদীর পাড় দিয়ে সমস্ত মানুষ তখন ঘুমিয়ে পড়েছে ঘাসের নরম বিছানায়। প্রচন্ড ভয় পেয়ে অনুপমা উঠে চুপচাপ বসেছিলেন। নদীর কুলকুল শব্দ, ঝিঁঝির ডাকের মাঝে জেগে থাকা চাঁদটাকে অপূর্ব লাগছিল দেখতে। কিছুক্ষণ পর অবনীবাবু টের পেয়ে বললেন– ‘শেয়ালের ডাক এটা। দূরের জঙ্গলে আছে। ভয় পাবার কিছু নেই।’

কিন্তু ভয়টা পুরোপুরি কাটেনি। ভেতর ভেতর ছিলই। অনুপমা কাছে চেপে এলেন। অনেক কাছে। অবনীবাবুর স্পর্শে কেমন যেন একটা সাহস পাচ্ছিলেন ধীরে ধীরে।

খোলা আকাশের নীচে দুটো না-ঘুমোনো মানুষ জোৎস্নার আলো মেখে পড়ে রইল সারারাত। কিন্তু কেউ কোনও কথা বলল না। শুধু সেই স্পর্শ! অনুপমা চোখ বন্ধ করলে আজও টের পান।

‘কী হল বললেন না তো?’

মহিলাটির কথায় সম্বিৎ ফিরল।

‘হ্যাঁ এখনও মানে…’ অনুপমা কথাটা শেষ করতে পারলেন না।

‘দেখি ভাড়াটা করবেন’ কনডাক্টর এগিয়ে এল। অনুপমা ব্যাগ থেকে দুটো দশের নোট বের করে বললেন ‘একজন’।

‘কোত্থেকে?’

‘এভিনিউ রোড।’

কনডাক্টর থুথু লাগা টিকিট সমেত চার টাকা খুচরো ফেরত দিয়ে বললেন– ‘সামনের দিকে এগিয়ে যান’।

অনুপমা সিট ছেড়ে বেরিয়ে আসার সময় পেছনে না তাকালেও বুঝতে পারলেন সেই মহিলা ঠিক তার দিকেই তাকিয়ে আছে।

(পাঁচ)

‘মারা যাবে কেন? বললাম তো সব বেঁচে আছে।’ বেশ বিরক্ত হয়ে কথাটা বলে পাশ ফিরে শুল চুন্নি। এই নিয়ে চার বার একই কথার উত্তর দিতে দিতে মাথাটা চটে গেছে।

অবনীবাবু নম্র ভাবে বললেন– ‘এত বৃষ্টি হল কিন্তু একটা ব্যাঙেরও ডাক শুনতে পেলাম না।’

চুন্নি কোনও কথা বলল না। চোখের পাতা জুড়ে ঘুম ঘুম ভাব। এক হাত মাথার নীচে দিয়ে মেঝেতে শুয়ে আছে ও। ঘর অন্ধকার। অবনীবাবু খাটে হেলান দিয়ে বসে চোখ বন্ধ করে আছেন।

ঝিঁঝিগুলো একনাগাড়ে কিছুক্ষণ ডেকে কয়েক সেন্ডেকের বিরতিতে আবার ডেকে উঠছে। সেই শব্দ ভেসে বেড়াচ্ছে ঘরময়। বর্ষাকালে ঝিঁঝির ডাক আরও তীব্র হয়। রাত বাড়লে ডাকও বাড়ে অবনীবাবু মুচকি হাসলেন।

রাতের অন্ধকারে ঘরে বসে ঝিঁঝির ডাক শোনায় যে কী আনন্দ! পড়া ফাঁকি মেরে দুই ভাই, দিদি-বোন সবাই একসাথে লুকোচুরি খেলার কথা মনে পড়ল অবনীবাবুর। বাবা ওই সময় তনুদের বাড়ি যেত আড্ডা দিতে। বারান্দায় বসে মা উনুনে সবে ভাত চড়িয়েছে। সেই সুযোগেই দুরন্তপনা শুরু। ফুটন্ত ভাতের গন্ধ নাকে ধাক্বা মেরে বাড়িয়ে দিত খিদে। সেই জন্য আরও জোরে দৗড়। একবার গোয়ালঘরের পেছনে লুকোতে গিয়ে দাদাকে সাপে কাটল। সে কী চিৎকার! কোনওমতে জানে বেঁচে গিয়েছিল। দাদা সুস্থ হওয়ার পর বাবা সবক’টা ভাইবোনকে পরপর দাঁড় করিয়ে কাঁচা কঞ্চি দিয়ে পিটিয়েছিলেন। বাবা মারা যাবার পর কঞ্চিটা গোয়াল ঘরের বেড়াতে বেঁধে রাখা হয়েছিল। হঠাৎ করে সেই কঞ্চির কথা মনে পড়ল। খাটের থেকে উঠে মেঝেতে পা বাড়াতেই হাত লেগে কিছু একটা পড়ল। সেই শব্দে ঘুম ভেঙে গেল চুন্নির।

‘কী হল? কোথায় যাচ্ছ?’

‘গোয়াল ঘরে গিয়ে দেখতে কঞ্চিটা আছে কিনা। অনুপমা ফেলে দেয় যদি…’

‘তুমি বসো। আমি দেখে আসছি।’

অবনীবাবু আশ্বস্ত হয়ে খাটে হেলান দিলেন।

ক্লান্ত বিধবস্ত অনুপমা যখন ঘরে এসে লাইট জ্বালালেন ঘড়ির কাঁটা তখন আটটার ঘর ছুঁয়ে ফেলেছে। ভয়ংকর জ্যামের জন্য এত দেরি হল ফিরতে। সমস্ত শরীর টনটন করছে ব্যথায়। বাস যেখানে নামিয়ে দিয়েছিল সেখান থেকে আরও অনেকটা হাঁটতে হয়েছে। চুন্নিকে বিদায় দিয়ে দরজা লাগিয়ে দিলেন। ধীর পায়ে এসে দেখলেন অন্ধকারে খাটের উপর হেলান দিয়ে বসে আছে এক ছায়ামূর্তি।

অনুপমা ধীর কণ্ঠে বললেন– ‘প্রসাদ খেয়ে আস্তে দেরি হয়ে গেল।’

অবনীবাবু তার কথায় ভ্রুক্ষেপ করলেন না ‘সব ব্যাঙগুলো কি মারা পড়ল নাকি? এত বৃষ্টি হল কিন্তু…’

অনুপমা পাশের ঘরে এসে ব্যাগ থেকে জিনিসটা বের করলেন। কয়েক সেকেন্ড উলটে পালটে দেখে গুঁজে দিলেন মেশিনটার ফুটোয়। ইউএসবি পোর্টে পেনড্রাইভটা ঢোকানো মাত্রই অসংখ্য ব্যাঙের ছন্দবদ্ধ ডাকে ভরে উঠল ঘর। অনুপমা দরজা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে দেখলেন সেই অন্ধকারের মধ্যেই অবনীবাবু হেসে যাচ্ছেন আপনমনে।

ক্লান্ত বিধবস্ত শরীরের উপর দিয়ে একটা শিহরণ বয়ে গেল আচমকা। ব্যাঙের ডাক লোড করা পেনড্রাইভটা কাল থেকে খুঁজে না পাওয়ার জন্যই আজ সুশান্তর কাছে যেতে হল। বেন্টিং স্ট্রিটে ওর বিশাল স্টুডিও। ওখানেই এডিটিং আর সাউন্ড ডিজাইনিং-এর কাজ করে। অনুপমা রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে গেলেন।

নারায়ণগঞ্জ ছেড়ে এভিনিউ রোডের এই টুবিএইচকে ফ্ল্যাটে চলে আসার আটবছর হয়ে গেল। জায়গা জমির ভাগ নিয়ে ভাইবোনদের মধ্যে তুমুল অশান্তি। শেষে অনুপমাই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন শহরে চলে আসার। অবনীবাবুকে একপ্রকার জোর করে নিয়ে এলেও বারবার ফিরে চলে যেতেন সেখানে। বিক্রি হয়ে যাওয়া সাতপুরুষের ভিটেটাকে ছুঁয়ে দেখতে চাইতেন। এভাবেই বেশকিছু বছর কাটল। কিন্তু দেড় বছর আগের সেই দুর্ঘটনা দুম করে বদলে দিল সব।

অনুপমা রান্নাঘরের লাইট জ্বাললেন। শেল্ফ থেকে একটা বাটি নিয়ে কিছু নাড়ু ঢাললেন তাতে। ফেরার সময় কিনেছিলেন। লাইট অফ করে বেরিয়ে এলেন বাইরে।

দুর্ঘটনায় চোখ খোয়ানোর সাথে ব্রেনেরও কিছু পার্ট ড্যামেজ হয়েছিল অবনীবাবুর। অপারেশনের পর কাউকেই ঠিকঠাক চিনতে পারতেন না। শুধু উন্মাদের মতো নারায়ণগঞ্জের বহু পুরোনো কথা আউড়ে যেতেন দিনরাত।

ডক্টর চৗধুরী বলেছিলেন– মেমরি ডিসঅর্ডার। নতুন কিছুই মনে থাকবে না। পুরোনো স্মৃতিই আঁকড়ে বেঁচে থাকবেন। এসব কেসে রিকভারির চান্স কম।

অবস্থা আরও খারাপ হল কিছুদিন পর। চোখের আড়াল হলেই রাস্তায় বেরিয়ে পড়তেন। ঘরে আটকে রাখা যেত না।

অবস্থা দেখে ডক্টর চৌধুরীই বুদ্ধিটা দিলেন। সাউন্ড থেরাপি। রিকভারি হবে না কিন্তু পাগলামিটা অনেকাংশেই কমতে পারে।

অর্ক খোঁজ লাগিয়ে সুশান্তকে পেল। বিভিন্নরকম সাউন্ড মেকিং, ডিজাইনিং, ফোলি নিয়ে ওর কারবার। টুবিএইচকে ফ্ল্যাট সাউন্ডপ্রুফ করার জন্য চার দেওয়ালে লাগানো হল অ্যাকুস্টিক ফোম প্যানেল। গাড়ির হর্ন, শহরের কোলাহল, লোকের চিৎকার কোনওকিছুই আর ঢুকতে পারল না ভেতরে।

নাড়ুর বাটিটা অবনীবাবুর হাতে ধরিয়ে অনুপমা বললেন– ‘সেদিন যেই নারকেলটা পড়ল। সেটা দিয়ে বানিয়েছি।’

অবনীবাবু কোনও উত্তর দিলেন না। মুচকি মুচকি হাসলেন।

ঘরের চারিদিকে সেট করা সাউন্ড সিস্টেম থেকে ছিটকে বেরোচ্ছে অজস্র ব্যাঙের ডাক, ঝিঁঝির আওয়াজ। থ্রিডি সাউন্ড এফেক্টে তা যেন আরও জীবন্ত হয়ে উঠেছে। যন্ত্রের কী অসীম ক্ষমতা! অনুপমা মনে মনে ভাবলেন।

পাঁচদিন ধরে বর্ষার সমস্ত আওয়াজ শোনানো হচ্ছে অবনীবাবুকে। এত বৃষ্টি অথচ ব্যাঙের ডাক নেই কথাটা বলে বলে মাথা খেয়ে ফেলেছিলেন। তাই শরীরে হাজার কষ্ট নিয়েও অনুপমা আজ বেরোলেন।

প্রতিদিন অবনীবাবুর সাথে গ্রাম নিয়ে হাজার হাজার মিথ্যে কথা বলা অভ্যেসে পরিণত হয়ে গেছে। চুন্নিও ব্যাপারটা জানে। সকাল হলেই পেনড্রাইভ পোর্টে গুঁজে দেন অনুপমা। এক একদিনের জন্য মার্ক করে রাখা এক একটা পেনড্রাইভ। সেগুলোই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে শোনাতে হয়। গ্রামের অনেক শব্দই নিপুণ ভাবে ডিজাইন করে দিয়েছে সুশান্ত। মোরগের ডাক, বৃষ্টির শব্দ, বালতির আওয়াজ, সাইকেলের বেল… এসব শুনতে শুনতে অনুপমার নিজেরও মাঝে মাঝে মনে হয় শহর নয়, এটা সত্যিই যেন সেই প্রত্যন্ত গ্রাম নারায়ণগঞ্জ। মুখ ফসকে অনেক সময় বেরিয়েও যায়। আজকে বাসের সেই মহিলাটার কথাগুলো মনে পড়ল অনুপমার।

অনেক রাত। অদ্ভুত একটা উত্তেজনায় ঘুম ভেঙে গেল। মাথার ভেতর অসংখ্য দৃশ্য চিলের মতো পাক খাচ্ছে। অনুপমা পাশ ফিরে দেখলেন অবনীবাবু নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছেন। হালকা ভলিউমে ঝিঁঝির ডাকে গমগম করছে ঘর। চাঁদের আলো ঠিকরে পড়ছে কাচের জানালায়।

অনুপমা টের পেলেন অস্বস্তিটা পুরো শরীর জুড়ে হচ্ছে। জানালার দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে উঠে পাশের ঘরে গেলেন। তারপর কাঁপা হাতে টেবিলের উপর রাখা বাক্সের ভেতর শেয়ালের ডাকের পেনড্রাইভটা খোঁজা শুরু করলেন।

পশ্চিম মুলুকের সাগরপাড়ে

ভারতের পশ্চিম মুলুকে মহারাষ্ট্র। সনাতনী ঐতিহ্য, পুরাতত্ত্ব, রাজকাহিনি, সহ্যাদ্রি পর্বত, আরবসাগর, প্রস্রবন, হ্রদ, সৈকত, দুর্গ, জঙ্গল, মন্দির, গুহাকন্দর– বিপুলা মহারাষ্ট্রে রয়েছে সবই।

বিগত বছর দশেক মুম্বইয়ে থাকার সুবাদে প্রায়শই মুম্বই মহানগরতলির কাছেপিঠে অজস্র অবসরের তথা পর্যটকপ্রিয় স্থানগুলিতে চলে যেতাম সপ্তাহান্তিক ছুটিছাটায়। আবার মাঝে মাঝেই চলে আসতাম আরবসাগরের একেবারে কাছের সৈকতগুলিতে ভালোবাসা বিনিময় করতে। লক্ষ্মণের গণ্ডি মুছে কেবল বেরিয়ে পড়তে হবে। এবারের গন্তব্য হোক মুম্বইয়ের প্রায় নাগালেই আলিবাগ সৈকত ও আলিবাগের নিকটবর্তী আরও কিছু অসাধারণ সৈকত।

আলিবাগ সৈকত

আলিবাগ সৈকতে এসে ঢেউয়ের সঙ্গে ভাব জমিয়ে গল্প করি।  লবণাক্ত জল ধীর লয়ে এগিয়ে এসে পায়ের পাতা ভিজিয়ে ফিরে যায়। দূরত্ব তো আর তেমন বেশি কিছু নয়। মুম্বই থেকে গাড়ি ভাড়া করেই চলে আসা যায় দক্ষিণ মুম্বই থেকে মাত্র শ-খানেক কিলোমিটার দূরে অলিবাগ সৈকতে। রায়গড় জেলার ছোট্ট সৈকতশহর আলিবাগ। ঐতিহাসিক শহরও। মায়াময় সাগরবেলার ঈষৎ শক্ত বালির জমিতে পরতে পরতে আরবসাগরের অন্তরঙ্গতা কখনও আবার জোয়ার-ভাটার খেলা।

অর্ধচন্দ্রাকারে বাঁক খেলে গেছে সৈকতরেখায়।  বালিয়াড়ির বুকে ঝুঁকে আসা পাম ও নারকেলবীথির সারি ও তার নিরন্তর ছায়া। সৈকতভূমির অদূরেই ঢেউয়ের ছলাৎছলের ছিটে নিয়ে সাগরজলে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে ইতিহাস নিংড়ানো কোলাবা দুর্গ। মুম্বইকর ও পুণেকরদের উইক এন্ড গেটঅ্যাওয়ে আলিবাগ সৈকতের অন্যতম আকর্ষণও হল, মারাঠা বীর শিবাজিরাজ ভোঁসলে নির্মিত এই কোলাবা দুর্গটি। বহু ইতিহাসের সাক্ষর নিয়ে কোলাবা দুর্গটি অটুট আছে আজও।

আলিবাগ বেলাভূমি থেকে প্রায় কিলোমিটার খানেক দূরে সমুদ্রের মাঝে এই কোলাবা দুর্গ। ১৬৫২ সালে ব্রিটিশ ও পর্তুগিজ নৗসেনাদের উপর নজরদারি জারি রাখতে ও জলদস্যুদের আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য, ছত্রপতি শিবাজি দুর্গটি নির্মাণ করেন। শিবাজি মহারাজের নৗসেনা-প্রধান সরখেল কানহোজি আংরে ছিলেন স্থানীয় রামনাথ গ্রামের বাসিন্দা। অতি বিশ্বস্ত ও দুর্গের দায়িত্বভারপ্রাপ্ত কানহোজি আংরে, যথেষ্ট সাহসিকতার সঙ্গে প্রভূত দায়িত্ব পালন করেছিলেন। প্রসঙ্গত, কানহোজি নিজের নামে সেইসময় কিছু রৗপ্যমুদ্রার প্রচলন করেন। লোকমুখে উচ্চারিত ‘আলিবাগ রুপাইয়া’ তখন সেই অঞ্চলে কিছুকাল পর্যন্ত হিসেবনিকেশে ব্যবহূত হতো।

পঁচিশ ফুট উঁচু দুর্গের তোরণদ্বার দুটি। সমুদ্রের দিকে মুখ করে একটি, অন্যটি আলিবাগ সৈকত-শহরের দিকেই। রয়েছে তোষাখানা, শুঁড়িপথ, প্রাসাদ, উচ্চ আধিকারিক ও তাঁদের পরিবারের বসবাস স্থল, শস্যভাণ্ডার, যুদ্ধ সামগ্রী ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র রাখার নিরাপদ স্থান। বহিরাগত শত্রুদের থেকে আত্মরক্ষার জন্য যে বৃহৎ কামানগুলি ব্যবহূত হতো, তা আজও সারি দিয়ে রাখা আছে। কোলাবা দুর্গে ইতিহাসের ভাঁজে ভাঁজে ছুঁয়ে থাকা নানান কাহিনি। বিগত বহু যুদ্ধের সাক্ষী কোলাবা দুর্গ। কখনও কানহোজি আংরের নেতৃত্বে সিদ্দিদের যুদ্ধ। কখনও ব্রিটিশ ও পতুর্গিজ ঔপনিবেশিকদের সঙ্গে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ।

আলিবাগ সৈকতে জোয়ার-ভাটার খেলা চলে উদয়াস্ত। এই খেলা আলিবাগের একান্ত নিজস্ব। সাগরজলে ভাটার টানে জল যখন কিছুটা মন্থর, সে সময় কোমরজল টপকে পায়ে হেঁটেই দুর্গে পৌঁছোনো যায়। ভাটা শুরু হতেই সৈকতে টাঙাওলাদের বিস্তর হাঁকাহাঁকি শুরু হয়ে যায়। ঘোড়ায় টানা টাঙাগুলি পৌঁছে দেয় দুর্গের প্রবেশদ্বার পর্যন্ত। জোয়ারের সময় দুর্গে পৌঁছোনোর জন্য ডিঙি নৗকাই ভরসা। তবে বেশিরভাগ পর্যটকই এক্বাগাড়িতেই যাতায়াতের মনোরঞ্জন খুঁজে পান।

তিনদিক সাগরজলে ঘেরা, তাই স্থানীয় পর্যটকরা আলিবাগকে ভালোবেসে ডাকেন, ‘মহারাষ্ট্রের গোয়া’। মারাঠি শব্দ ‘আলিচাবাগ’ অর্থাৎ ‘আলিসাবেহের বাগান’। অতীতে স্থানীয় এক সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি বেলে ইসর্যয়লি জিউস আলির নিজস্ব আম ও নারকেল বাগিচা থেকে স্থানীয়দের কাছে ‘আলিচাবাগ’ ক্রমে আলিবাগ হয়েছে। সৈকতে অঢেল বিনোদন ছাড়াও ঐতিহাসিক শহর আলিবাগে রয়েছে ১জ্জচ্০ সালে কনহোজি নির্মিত হিরাকোট দুর্গ।

কালো বাসল্ট পাথরের প্রাচীর নিয়ে দুর্গটি তৎকালে আংরের অস্ত্রাগার ছিল। এখন এটি রায়গড় জেলার সদর কারাগার হিসেবে ব্যবহূত হয়। শহরের ভেতর ‘ছত্রিবাগ’নামে পাথরের ছাতা আকৃতির সৌধ আছে। দর্শনীয় স্থানগুলির মধ্যে রয়েছে  ম্যাগনেটিক অবজার্ভেটরি, এশিয়ার মধ্যে প্রথম ও সমগ্র বিশ্বে ১৩-তম। সৌরমণ্ডলের চৌম্বকগতি নিরীক্ষণ করা হয় এখান থেকে।

আলিবাগের প্রসিদ্ধ দত্তা মন্দিরটি রাষ্ট্রীয় কেমিক্যাল অ্যান্ড ফার্টিলাইজার কোম্পানির সহযোগিতায় নির্মিত। আলিবাগে ইন্দো-রাশিয়ান সৗহার্দ্যের প্রতীক হিসাবে একটি সৗধ আছে, রাশিয়ান অফনিসি নিকিতিনের ৫ঙ্ম০ বছর আগে পদার্পণের চিহ্নস্বরূপ। শহরের এইসব খুঁটিনাটি দ্রষ্টব্যস্থল দেখানোর ফাঁকেই অত্যুৎসাহী পর্যটকদের স্থানীয় অটোরিকশা চালকই দেখিয়ে দেবেন বলিউডের নানান সেলেব্রিটিদের মহার্ঘ্য সব অবসর কাটানো বাংলোবাড়িগুলিও।

আলিবাগের কিছুটা দূরেই আছে আরও অনেকগুলি সৈকত। সেগুলোও ঘুরে আসা যায় সহজেই। যেমন ৩ কিমি দূরে আকাশি সৈকত, ১৩ কিমি দূরে রেওয়ান্দা সৈকত, ৭ কিমি দূরে নাগাঁও সৈকত, ১৮ কিমি দূরে মান্ডোয়া সৈকত, ১১ কিমি দূরে কিহিম সৈকত। প্রতিটি সৈকতই নিজের মনোরম সৗন্দর্যের ডালি নিয়ে পর্যটক ভোলাতে সদা তৎপর।

কিহিম সৈকত

প্রকৃতির নিজের হাতে গড়া এই কিহিম সৈকত। উজাড় করা একরাশ প্রকৃতি তার চারপাশে সৈকত জুড়ে নৈঃশব্দ্যের ঝাঁপি আগলে রাখে। আর মাথার ওপর পুরো আকাশ জুড়ে রোদ্দুরের নিস্তেজ আভা। সাগরপাড়ে বসে থাকাতেই আনন্দ-আরাম। সময় গড়িয়ে যায়।

মুম্বই থেকে মাত্র ১৩৬ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে পৌঁছে যাওয়া যায় কিহিম সৈকতে। বহু দূর পর্যন্ত গড়িয়ে গেছে কিহিমের সাগরজলের ভরা সংসার। মিহি বালুতট। মাঝখানে মসৃণ যাত্রাপথের উলটোদিকেই কিহিম গ্রাম। নারকেল আর অন্যান্য গাছগাছালি ছাওয়া শান্তশ্রীমণ্ডিত সে গ্রামে গাছের সামান্য পাতা ঝরলেই যেন কোলাহল। স্থানীয় এলাকাবাসী মাছ ধরার জীবিকা ও ঘরকান্না নিয়েই থাকেন। সৈকত ধরে নগ্ন পায়ে হেঁটে চলা। তাতেই একরকমের উৎসব। এক ধরনের মন ভালো করে দেওয়া।

Beach near Alibag

নাগাঁও সৈকত

পর্যটকদের দেওয়া আদুরে নাম ‘মিনি গোয়া’। এমনই এক অনাঘ্রাতা সৈকত আরবসাগরের কোলে নাগাঁও। ছুটির দিনগুলো কাছেপিঠের স্থানীয়রা লং ড্রাইভে চলে আসেন, ভিড় জমান। সাগর উপকুলবর্তী নাগাঁও বিনোদনের ঝাঁপি আগলে রাখে।

৩ কিমি লম্বা সৈকত। আদিগন্ত নীলকান্তিতে জেগে ওঠা সাগর। লোনা হাওয়ার ঝাপটা। ইদানীং ছবির খাতা থেকে তুলে আনা চমৎকার কিছু কটেজ। পর্যটকদের আয়েশি আমেজে বিশ্রামের ঠেক। সাগরপাড়ে গাছগাছালির সমাহার। বর্ষার প্রখর সময়টুকু ছাড়া নাগাঁও সৈকতে হরেক ওয়াটার স্পোর্টসের ব্যবস্থা আছে। বাম্বার টিউব রাইড, জেট স্কাই রাইড, কায়াকিং, বানানা রাইড, প্যারাসোলিং, মোটরবোট। এছাড়াও রঙিন ঝালর দেওয়া টাট্টু ঘোড়া এবং ঝলমলে সাজানো হাওদায় চড়ে উটের পিঠে ভ্রমণে মেতে থাকেন নাগাঁও সৈকতে বেড়াতে আসা তামাম দর্শক।

কিছুটা দূরেই বিক্রম ইস্পাত কারখানা এলাকায় বিড়লা মন্দির। স্থানীয়দের দেওয়া নাম– ‘মিনি গোয়া-গোয়ালিবাগ’। শেষ নাম বিশেষণটিতে অত্যন্ত জনপ্রিয় সৈকত আলিবাগ নামের সঙ্গে সাযুজ্য রেখেই রাখা, বলাই বাহুল্য।

আক্সি সৈকত

নাগাঁও ও আলিবাগের মধ্যে স্যান্ডউইচ হয়ে আছে আক্সি সৈকত। এখানকার শক্ত মাটিতে বাইক রাইডিং বেশ উপভোগ্য। সময় সাপেক্ষে বাইক ও খেলনাগাড়ি ভাড়ার ব্যবস্থা আছে। পরিচ্ছন্ন সৈকত আর অপরূপ সূর্যাস্ত উপহার দেওয়া নিয়েই আক্সির গরিমা।আক্সি আদপে ধীবর গ্রাম। মাছ ধরাই যাদের প্রাত্যহিক

রুজি-রুটি। বালিয়াড়ির ধারে বাঁধা রঙিন নৗকোগুলি। মূল সড়ক থেকে টালি বাঁধানো পথ গেছে সৈকত পর্যন্ত। সে পথে সার দিয়ে সিমেন্টের বসার জায়গা। গাছের ডালে আড়াআড়ি লটকানো দড়ির দোলনা কিছু। রয়েছে খাবার স্টলও। সৈকতের এক্বাগাড়ি চালকরা কাছে এসে অনুরোধ করছেন সওয়ার হওয়ার জন্য। আক্সি সৈকতটি হঠাৎই প্রখর ঢালু হয়ে সাগরে নেমে গেছে। ফলত সতর্ক থাকা জরুরি। যদিও সৈকতের নজরমিনারের টঙে বসে সজাগ নজর রাখেন সৈকতরক্ষীরা।

বোটিং, সূর্যস্নান, সমুদ্রস্নান উপযোগী। তবে আগেই বলেছি সমুদ্রস্নানে সতর্ক থাকতে হয়। একটি নির্দিষ্ট সীমা অতিক্রম করার নিষেধ আছে, রঙিন পতাকা পোঁতা স্থলের ওপারে না যাওয়ার। পক্ষীপ্রেমীদের খুবই পছন্দের জায়গা আক্সি। নানা প্রজাতির পরিযায়ী পাখিদের আড্ডা জমে শীতে। সিগাল, বার-টেল, ট্রোনস্, গডউইট, প্লোভার, ডানলিন, ওয়েসটার ক্যাচার ও বহুল রকমারি পাখিদের মৗরসিপাট্টা তখন আকাশি সৈকতে।

মুরুদ-জঞ্জিরা

আলিবাগকে পাশ কাটিয়ে আরও ৫০ কিলোমিটার দূরত্বে মুরুদ। সর্পিল পথটিও অনুপম। ডানদিকে আরবসাগরকে রেখে পথ চলছে। কখনও পথের বাঁকে উধাও হয়ে যাচ্ছে সাগর, কখনও আবার ফিরে পাওয়া। মুরুদের পাথুরে সাগরবেলা ও নারকেলবাগিচার ছায়াঘেরা ধীবর গ্রামে রয়েছে পবিত্র ‘কোটেশ্বভরি ও ‘দত্তা’ মন্দির।

অতীতের স্মৃতিধন্য নবাব প্যালেসের খানদানি সাক্ষর এখন ভারত সরকারের রক্ষণাবেক্ষণে। মাত্র ৩ কিমি দূরেই রাজাপুরি ফেরিঘাট থেকে পালতোলা নৗকোয় জলদুর্গ ডিম্বাকৃতি জঞ্জিরা দুর্গ। এই কেল্লাটিকে ‘মুন ফোর্ট’ বা ‘চন্দ্রদুর্গ’ও বলা হয়। একসময় ভারতের পশ্চিম উপকূলে এটিকে সর্বাপেক্ষা সুরক্ষিত

সমুদ্র-দুর্গ হিসেবে গণ্য করা হতো। জঞ্জিরা দুর্গের স্থাপত্যশৈলী এমনই অভিনব প্রযুক্তিতে নির্মিত যে, দুর্গের একদম নাগালে পৌঁছোলেই প্রবেশতোরণটি নজরে আসে। আনুমানিক দ্বাদশ শতকে হাবসি রাজা সিদ্ধি জোহার এই দুর্গ স্থাপন করেন। আজ দুর্গের অবস্থা খুবই জরাজীর্ণ। চারিদিকে আগাছার জঙ্গল। দুর্গের ভেতর রয়েছে মিষ্টি জলের তালাও, শিশমহল, দরবার মহল, কামান, তোপখানা, দরগাশরিফ, নজরমিনার, নকশাদার কাঠের দরজা ইত্যাদি।

মারাঠি শব্দ ‘অজিনকা’ মানে ‘অজেয়’। স্থানীয়রা প্রাচীন দুর্গটিকে বলেন অজিনকা। এমনকী শিবাজি-পুত্র শম্ভাজি বহুবার চেষ্টা করেছেন দুর্গটি জয় করতে। কিন্তু কখনওই সফল হতে পারেননি। মুরুদ-রাজাপুরি কিঞ্চিত উঁচু পাহাড়ি পথ থেকে অতলজলে অবস্থিত জঞ্জিরা দুর্গের অভিজাত রূপ ক্যামেরায় ধরে রাখার মতো।

Beach in Maharashtra

মান্ডোয়া সৈকত

মান্ডোয়ার নিরিবিলি সৈকতে আপনমনে খেলা করে ঢেউ। রায়গড় জেলার মান্ডোয়া একটি জনপ্রিয় ও পছন্দসই সৈকত।  মুম্বই থেকে মান্ডোয়া সৈকতের সড়ক দূরত্ব মাত্রই ১০১.৪ কিলোমিটার। নিয়মিত ফেরি যোগাযোগও রয়েছে মুম্বই-মান্ডোয়া। স্নানের উপযোগী সৈকত। বেশ কিছু খাবার স্টল, ডাব বিক্রেতা থাকলেও কী ভীষণ পরিচ্ছন্ন সৈকত। পর্যটকরা মূলত আসেন বিভিন্ন রকমের ওয়াটার স্পোর্টসের মজা নিতে। কায়াকিং, জেট স্কি রাইডিং, বাম্পার রাইড, বানানা রাইড আরও কত কী যে বিনোদন রয়েছে এখানে।

মান্ডোয়ার সফেদ বালিয়াড়ি ধরে হেঁটে যেতে মন্দ লাগে না। সূর্যোদয়-সূর্যাস্ত দুইই মনোরম এখানে। ও হ্যাঁ, পুরোনো ও নতুন দুই ‘অগ্নিপথ’ সিনেমারই শুটিং হয়েছিল এই মান্ডোয়ায়। নতুন অগ্নিপথের কাঞ্চা চরিত্রটিকে যে গাছে ঝোলানো দৃশ্যটি গৃহীত হয়েছিল, অনিবার্য কারণে সেই গাছটিকে কেটে ফেলা হয়েছে।

রেভান্দা সৈকত দুর্গ

প্রতিটি বিকেল অসাধারণ নজির সৃষ্টি করে রেভান্দার সূর্যাস্ত দৃশ্যের। সাপ্তাহান্তিক ছুটি কাটানোর সেরা ঠিকানা হতেই পারে রেভান্দা। নিপাট শান্ত ও পরিচ্ছন্ন সৈকতটির কালচে রঙা বালিয়াড়ি যেন একটু অন্যরকম। ঐতিহাসিক স্থল রেভান্দা। শিবাজির আমল থেকেই কুন্তলিকা নদী পাড়ের এই স্থানটির গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। এখন একটি ভগ্নস্তূপ মাত্র হলেও পাথরের মজবুত প্রাচীর দেখেই ঠাহর হয় রেভান্দা দুর্গটি একসময় যথেষ্ট জাঁকালো ও বিশাল স্থাপত্য ছিল। এখানকার প্রাচীন শিতলাদেবী মাতা মন্দিরটি পুনঃসংস্কার করা হয়। প্রায় দেড় হাজার সিঁড়ি টপকে পৌঁছোতে হয় পাহাড় শীর্ষে প্রসিদ্ধ দত্তা মন্দিরে। এই মন্দিরটি শিবাজির আমলে নির্মিত হয়েছিল। মন্দিরে ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বর ত্রিমূর্তি বিরাজ করছেন। মন্দির চত্বর থেকে সম্পূর্ণ রেভান্দার চিত্রপট ফ্রেমে বাঁধিয়ে রাখার মতো।

ইদানীং রেভান্দা সৈকতে ‘বিচ ক্যাম্পিং’ হয় বিভিন্ন প্যাকেজ-টুর কোম্পানির ব্যবস্থাপনায়। তাঁবুতে রাত্রিবাস, ক্যাম্প ফায়ার, বার-বি-কিউ ও হরেক আধুনিক আয়োজন থাকে। নব্য বয়সিদের খুবই পছন্দের ঠেক এই বিচ ক্যাম্পিং আসর।

কাশিদ সৈকত

মুম্বই থেকে মাত্রই ১২৫ কিমি দূরের ‘মনোরম প্যরাডাইস’ বলে খ্যাত কাশিদ সৈকতের। নীল সাগর, পাথুরে সৈকতে আছড়ে পড়া ঢেউ, সফেদ বালুকারাশি নিয়ে টানা তিন কিমি ব্যাপ্তি কাশিদ সৈকতের। একদিকে ক্যাসুরিনা ও গুল্মলতার ঝোপঝাড়। জলজ স্পোর্টসের এলাহি ব্যবস্থা সৈকত চত্বরে। প্রচুর রিসর্ট ছাড়াও আছে নীল দিনান্তের খোলা আকাশের নীচে তাঁবুতে রাত্রিবাসের অদ্ভুত রোমাঞ্চ।

ভারসোলি সৈকত

ছোট্ট ‘হ্যামলেট’ বলা যায় আলিবাগ শহর থেকে মাত্র তিন কিলোমিটার দূরত্বে ভারসোলি অঞ্চলটিকে। ১৭ শতকে শিবাজির বিশ্বস্ত নৗসেনানায়ক কনহৗজি আংরের নৗঘাঁটি ছিল ভারসোলি। সুকৗশলী অবস্থানের জন্য আজও ভারতীয় নৗসেনাবাহিনি এলাকাটি ব্যবহার করেন। ভারসোলিতে এখন একটি সুন্দর উপনগরীও গড়ে উঠেছে।

সাদা বালুকাবেলা, ঈষৎ তৈলাক্তরঙা সাগরজল।  আলিবাগের দূরন্ত ভিড় এড়িয়ে ভারসোলির রম্য রিসর্ট ও হোমস্টেতে অবসর কাটিয়ে যান। ভারসোলি সৈকতে সকাল ও বিকেলটা ভারি মনোরম।  সৈকতে প্রচুর ওয়াটার স্পোর্টসের রমরমা। ভারসোলি সৈকতে জমে ওঠে স্থানীয় তরুণদের বিচ ভলিবলের আসর।

ডিপ্রেশনে রাখি সাওয়ান্ত

এর আগে নানা বিতর্কে জড়িয়ে রাখি সাওয়ান্ত উঠে এসেছেন খবরে৷সম্প্রতি মিডিয়াকে দেওয়া এক ইন্টারভিউতে, তাঁর চূড়ান্ত অর্থকষ্টের কথা প্রকাশ করেছেন তিনি৷ কিছুদিনের মধ্যেই আসতে চলেছে বিস বস-এর ১৪তম পর্ব। তাতে অংশগ্রহণ করার কারণ হিসাবে রাখি বলেছেন, এই শো থেকে প্রাপ্ত টাকাই এখন তাঁর এই মুহূর্তের অর্থকষ্ট লাঘব করতে পারে৷

সলমন খানের এই শোয়ে চ্যালেঞ্জার হিসেবে প্রবেশ করতে চলেছেন রাখি। এর আগে প্রতিযোগী হিসেবে তিনি অংশ নিয়েছিলেন বিগ-বসের একেবারে প্রথম সিজনে।রাখি নিজেও এক সময় হোস্ট করেছিলেন কিছু বিজ্ঞাপনি শোয়ের৷ কিন্তু আপাতত মানসিক ভাবে বেশ বিপর্যস্ত হয়ে আছেন রাখি এবং এর কারণ হিসেবে তাঁর অসুখী দাম্পত্যকেই দায়ী করেছেন অভিনেত্রী৷

গত জুলাই মাসে, মু্ম্বইয়ের একটি পাঁচতারা হোটেলে প্রবাসী ব্যবসায়ী রীতেশকে বিয়ে করেছিলেন রাখি সাওয়ান্ত। কীভাবে রীতেশের সঙ্গে তাঁর আলাপ ও প্রেম, সেকথাও বেশ ফলাও করে জানিয়েছিলেন নিজেই। রাখি বলেন, ”আমার ফ্যানেদের থেকে প্রচুর মেসেজ আসে প্রত্যেকদিন। সব যে সব সময় পড়া হয় তা নয়। একদিন আমি খুব মনমরা ছিলাম। তখনই দেখলাম একটি মেসেজ এল, এত মনমরা হয়ে আছো কেন। আমি খুব অবাক হয়ে লিখলাম যে ও কী করে বুঝল। তখন ও লেখে যে আমি অনেকদিন ধরেই আপনার ফ্যান। আপনার মন খারাপ হলে সেটা বুঝতে পারি। সেইদিন থেকেই আমি ওর প্রেমে পড়ে যাই। আমি তখনই জানতাম যদি কোনওদিন বিয়ে করি তবে ওকেই করব।”

এর পর ইউ কে –তেই সংসার পাতেন রাখি৷কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে সোশাল মিডিয়ায় স্বামীর সঙ্গে কোনও ছবিতে দেখা যায়নি তাঁকে৷ প্রশ্ন করা হলে বলেছেন, “বিয়ে তো পরিবারের ভিতরের বিষয়৷সারা দুনিয়াকে জানানোর প্রয়োজন আছে কি?” কিন্তু এবার সত্যটা সামনে এসেছে৷ স্বামীর ব্যাপারে মুখ খুলেছেন রাখি৷ জানিয়েছেন, “আমার স্বামী জনসমক্ষে আসতেই চান না। বছর ঘুরে গেল তিনি ভারতেই আসেননি, ইউকে-তেই রয়ে গিয়েছেন। বিয়েটা আমার জীবনের আরও একটা ট্র্যাজেডি”।

ঘনিষ্ঠ মহলে রাখি জানিয়েছেন যে, তিনি বিপুল অর্থ সঙ্কটে রয়েছেন, কিন্তু এই অবস্থার মধ্যেও তাঁকে পরিবারের সমস্ত দায়িত্ব পালন করে যেতে হচ্ছে। এমনকী নিজের বিয়েটাকেও তিনি একটা বড়ো ভুল হিসেবে বর্ণনা করেছেন পরিচিতদের কাছে। তিনি বলছেন, “বিয়েটা আমার একটা ভুল সিদ্ধান্ত ছিল। আমার মনে হয়েছিল একজন ধনী ব্যক্তিকে বিয়ে করলে অরেথ কষ্টগুলো কাটিয়ে উঠতে পারব৷কিন্তু তা ঘটেনি”।

রাখি বলেন, “আমি জীবন বিমুখ হচ্ছি না, আমি সুখে জীবন কাটাতে চাই এবং নিজের কাজও করে যেতে চাই৷ কিন্তু এখন ডিপ্রেশন গ্রাস করছে আমায়। ডিপ্রেশনে থাকার সময় অনেকেই নানা ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে ভুল করে ফেলেন। অনেকে তো জীবনই শেষ করে ফেলেন। কিন্ত আমি তেমন কিছু করার কথা ভাবছি না। কখনোই ভাববও না। ঈশ্বর এই মূল্যবান জীবন দিয়েছেন”।

রাখির সংযোজন, “অর্থ চিরকাল থাকে না কিন্ত আমি বিশ্বাস করি ট্যালেন্ট থাকলে তা মানুষ আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারে৷। মানুষ চিরকাল আমায় ঠকিয়েছে৷ কিন্তু এবারও আমি ঘুরে দাঁড়াবই”।

দু-দশক ইন্ডাস্ট্রিতে কাটিয়েছেন রাখি৷তাঁর নাচ তাঁকে পরিচিতি দিয়েছিল৷রাখি কা স্বয়ম্বর নামের টেলিভিশন শো থেকে কফি উইথ করণ–এর সাক্ষাতকার– কোনও বক্তব্য নিয়েই রাখঢাক করেননি৷ এবার জানা গিয়েছে, তাঁর ঘনিষ্ঠ কোনও পরম আত্মিয়ই নাকি তাঁকে সর্বস্বান্ত করেছে৷ তাই এবার দেউলিয়া হয়ে যাওয়ার খবরটাও প্রকাশ করলেন রাখি সাওয়ান্ত৷আর্থিক প্রয়োজন মেটাতেই তাঁর বিগ বস –এ অংশগ্রহণ, এ সত্য তাঁর কথায় স্পষ্ট৷

মেঘের বাসা মেঘমালাই

‘বৃষ্টি পড়ে এখানে বারোমাস

এখানে মেঘ গাভির মতো চরে

পরান্মুখ সবুজ নালিঘাস

দুয়ার চেপে ধরে…’

তখন মনসুন সবে সরকারি ভাবে এসে পড়েছে। কোথাও কোথাও বর্ষার প্রকৃতি আরও সবুজ, আরও সজীব। তেমনই একটি অঞ্চল পশ্চিমঘাট পর্বতমালা। অফবিট জায়গার খোঁজে তাই প্রথমেই মনে এল মেঘমালাইয়ের নাম। তামিল ছবি ‘রাভানন’-এর অনেকখানি অংশ শুট করা হয়েছিল এই মেঘমালাইয়ে। তাই রুট ম্যাপ ঠিক করে নিয়ে চেন্নাই পৌঁছে, থেনি যাওয়ার রাতের বাসে চড়ে বসলাম।

নৈশসফরের পুরোটাই কাটল অঝোর ধারার বৃষ্টিকে সঙ্গী করে। বর্ষায় যারা রোমান্টিকতা অনুভব করেন– মেঘমালাই তাদের শূন্য হাতে ফেরায় না বলেই শুনেছিলাম। রাত ৯টায় বাস ছাড়ার পর সেই যে ঘুমিয়েছি, ভোর বেলায় ডিন্ডিগুল পৌঁছে ঘুম ভাঙল। এখান থেকে ঠিক ঘন্টাখানেকের দূরত্ব থেনি। বৃষ্টি থেমে তখন মিহি একটা রোদের রেখা উঁকি মারছে আকাশে।

সকাল সাড়ে সাতটায় থেনি পৌঁছোতেই দেখি অগ্রিম বুক করা ক্যাব ড্রাইভার হাজির। প্রথম ডেস্টিনেশন চিন্না সুরুলি ফলস-এর উদ্দেশে আমাদের যাত্রা শুরু হল। এই ফলসটির অন্য নাম মেঘমালাই ফলস। ঘন্টা দুয়েকের দূরত্ব। দুপাশে আশানুরূপ সবুজের সমারোহ মন ভালো করে দিল। ছোটো ছোটো গ্রাম দুপাশে ফেলে এগিয়ে চলল আমাদের গাড়ি পাইথন পিচ-রাস্তা ধরে।

গাড়ি থামল ঝরনার বেশ কিছু আগে। জঙ্গুলে পথ পেরিয়ে একটু এগোলেই হবে ঝরনার সঙ্গে মোলাকাত। কয়েকটি রেলিং বাঁধানো সিড়ির ধাপ পেরিয়ে সম্মুখের প্যানোরামায় উন্মুক্ত হল ঝরনাটি। বর্ষার জলে টইটুম্বুর। মন সম্পূর্ণ রিফ্রেশড্। এবার এগোলাম মেঘমালাইয়ের পথে। পথে সাধারণ ব্রেকফাস্ট পর্ব সেরে আরও ঘন্টা দুয়েক পরে পৌঁছোলাম মেঘমালাইয়ের নিরালা নিসর্গের কোলে। যেমন ভেবেছিলাম জায়গাটা তার চেয়েও সুন্দর। বছরে প্রায় ১০ মাসই এখানে বৃষ্টি হয়। উপচানো সবুজ, ঠান্ডা হাওয়ার ছোঁয়া আর অজস্র পাখির ডাক নিয়ে মেঘমালাই, প্রথম দেখার প্রেমের মতো।

বস্তুত মেঘমালাই একটি দক্ষিণ ভারতীয় গ্রাম, যার সমস্ত পথ জুড়েই চা বাগিচার পরিপাটি বিন্যাস। আ হিল স্টেশন উইথ টি প্ল্যান্টেশন বললে এক কথায় বুঝিয়ে দেওয়া যায় এর চরিত্র। বিকেল ৪-টে বাজতে না বাজতেই তাই হিমেল আমেজ চেপে ধরে। মেঘের খেলা অবিরাম চলতে থাকে বাগিচার প্রান্ত ছুঁয়ে। সেই মেঘের কিনারেই আমাদের টি-এস্টেট কটেজ। পথেই পড়ল একটা ড্যাম ও সংলগ্ন ইন্সপেকশন বাংলো। সামান্য চা-বিরতি সেরে একটু এগোতেই চোখে পড়ে বিরাট এক হ্রদ। সে এক অপূর্ব ল্যান্ডস্কেপ। এর অদূরে মানালর অঞ্চলে আমাদের নির্দিষ্ট কটেজ।

পুরো রাস্তাটাই যেন পিকচার পোস্টকার্ড-এর সমতুল্য। পাহাড়ের ব্যাকড্রপ, একেবেঁকে চলা এই প্রকাণ্ড হ্রদ আর মেঘের খেলা। মেঘমালাই জুড়ে প্রায় ৬টি ড্যাম-এ ঘেরা এই হ্রদ।

কটেজে পৌঁছোনোর আগে শেষ বিকেলে ঝেঁপে বৃষ্টি নামল। আমাদের জন্য সুস্বাদু রান্না তৈরিই ছিল। বৃষ্টি নামতে ক্যাম্প ফায়ার-এর আয়োজনও হল। পরদিন সকালে উঠে থিরুথল একটি ওয়াটার ফলস দেখতে যাওয়ার প্ল্যান হল। ম্যাগি খেয়ে শুরু হল যাত্রা। এ ঝরনাটিও অপূর্ব। ফেরার পথে চা কারখানা ও মহারাজা মেট্টু ভিউ পয়েন্ট দেখাতে ভুলল না আমাদের গাড়ির চালক। ভিউ পয়েন্ট থেকে দেখলাম চরাচর জুড়ে চা-বাগিচার চোখ জুড়োনো বিস্তার। কুয়াশা আর মেঘের স্তরে এক অদ্ভুত রহস্যময়তার চাদর জড়ানো প্রকৃতি।

ফেরার পথে আরও একটা গন্তব্য স্থির হল ইরাভাঙ্গালার ড্যাম। এই স্পটটা মিস করলে সত্যিই মেঘমালাইয়ের সৗন্দর্য অদেখাই থেকে যেত। সবুজ কার্পেটে মোড়া ল্যান্ডস্কেপ-এর সঙ্গে সঙ্গত করছে এই নীল জলাধার। এমন কোলাহলহীন প্রকৃতির বাসরে গেলে, শহুরে জীবনে আর ফিরতে ইচ্ছে করে না। একটা উইকএন্ড যেন যথেষ্ট মনে হয় না।

কটেজে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল গরম ইডলি ও সম্বর। প্রতিটি রান্নাই অনবদ্য। সারাদিন বই পড়ে, পাখির ডাক শুনেই কাটিয়ে দেওয়া যায় মেঘমালাইতে। বলতে ভুলেছি, ভোর বেলা ছোট্ট একটা ফরেস্ট ট্রেল সেরে আসুন ভালপারাইতে। কপালে থাকলে হাতির হার্ড-এর দেখা মিলবে। যারা আরও দুটো দিন সময় নিয়ে যেতে চান, সুরুলি ছাড়াও কুম্বাক্বরাই, সথুপরাই ফলসগুলিও দেখে নিন। মাত্র ৪টি থাকার জায়গা রয়েছে মেঘমালাইতে। দুটি টি-এস্টেট কটেজ উডব্রায়ার গ্রুপ-এর তত্ত্বাবধানে। স্যান্ড রিভার ও ক্লাউড মাউন্টেন। একটা পঞ্চায়েত গেস্ট হাউস, অন্যটি ইন্সপেকশন বাংলো।

‘আকাদেমি থিয়েটার’-এর ভার্চুয়াল নিবেদন ‘আলোয় ফেরার গান’

অসহায় পথ-শিশুদের সাহায্যার্থে এবং মানুষের মন ভালো রাখার জন্য এক অভিনব উদ্যোগ নিয়েছে ‘আকাদেমি থিয়েটার’। এই সংস্থা আগামী ১২ ডিসেম্বর ২০২০-র রাত ৯টা থেকে ভার্চুয়ালি নিবেদন করতে চলেছে ‘আলোয় ফেরার গান’। সহযোগিতায় রয়েছে ‘ঋদ্ধি বন্দ্যোপাধ্যায় মিউজিক আকাদেমি’। শুধু বাংলার নয়, আমেরিকা, কানাডা, ইংল্যান্ড প্রভৃতি দেশের শিল্পীরা ভার্চুয়ালি পরিবেশন করবেন বহুধারার গান, নাটক এবং কবিতা। স্প্যানিস ভাষায় রবীন্দ্র-রচনাও পরিবেশিত হবে। তবে, নির্দিষ্ট অর্থের বিনিময়ে এই ভার্চুয়াল অনুষ্ঠান উপভোগ করতে পারবেন দর্শক-শ্রোতারা। আর এই অনুষ্ঠান থেকে সংগৃহীত অর্থ পথ-শিশুদের কল্যানে ব্যয় করা হবে বলেও এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে আয়োজকদের পক্ষ থেকে।

অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন সুস্মিত বসু, তনুশ্রী গুহ, মধুশ্রী মিত্র ঘোষ, কাঞ্চণা মৈত্র, অভিরূপ সেনগুপ্ত, রেশমি মিত্র, রিচা শর্মা, রেশমি বাগচি, মালবিকা ভট্টাচার্য, মনিজা রহমান, শৌভিক দত্ত, সুজয়া রায়, শাশ্বত সান্যাল, মহুয়া সাহা, মহাশ্বেতা মুখোপাধ্যায়, সোমা বসু, ফায়সাল কাদের, অরুন্ধতী সান্যাল, শ্রাবণী আলো নন্দী প্রমুখ। সমগ্র অনুষ্ঠানটির ভাবনা ও নির্মাণে আছেন দেবজিত এবং ঋদ্ধি বন্দ্যোপাধ্যায়।

——

পড়ার জন্য সীমাহীন গল্প-নিবন্ধসাবস্ক্রাইব