একটু সাহায্য, বিনিময়ে সঙ্গীর ভালোবাসা

সঞ্চারীর একটাই অভিযোগ স্বামীর বিরুদ্ধে, ‘অভিজিৎ বাড়িতে একটা কাজও করে না। আমিও ওর মতো অফিস করি কিন্তু বাড়ির প্রতিটা কাজ আমাকেই করতে হয়। যাওয়ার আগে কিংবা অফিস থেকে ফিরে। অভিজিৎ-কে কখনও এক কাপ চা বানিয়েও নিয়ে আসতে দেখলাম না।’

অভিজিৎ বহুবার এই অভিযোগ শুনেছে। একদিন সঞ্চারীকে সারপ্রাইজ দেওয়ার ইচ্ছায় অভিজিৎ সকাল সকাল উঠে ‘বেড টি’ বানিয়ে বউ-কে ঘুম থেকে ডেকে তুলল। সঞ্চারী অবাক! অভিজিতের হাত থেকে চায়ের কাপ নিয়ে চুমুক দিতেই মেজাজ তিরিক্ষি হয়ে উঠল ওর, ‘কে তোমাকে চা করতে বলেছিল? একগাদা পাতা ঢেলেছ। চিনি আর দুধ এত কম দিলে চলে? জঘন্য, মুখে দেওয়া যাচ্ছে না। সেই আমাকেই আবার বানাতে হবে, একটা কাজ দু’বার করে করা।’

অভিজিতেরও রাগ হয়ে গেল, ‘তোমার কাজ করে দিলেও দোষ, আবার না করলেও দোষ। আমার কোনও কাজ ভালো হয়েছে এটা তোমার মুখ থেকে কখনও শুনলাম না’, বলে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল অভিজিৎ।

এই দৃশ্য প্রতি ঘরেই উঁকি মারলে দেখা যাবে। ভারতীয় দাম্পত্যে এমন ঘটনায় কেউ অবাক বা বিচলিত হয় না। অনেক সময় স্বামী-রা চেষ্টা করেন, রান্না করতে না পারলেও রান্নার জন্য রাখা সবজিগুলো কেটে দিয়ে স্ত্রী-কে যতটা পারা যায় সাহায্য করতে কিন্তু সেখানেও কারও কারও কপালে জোটে স্ত্রীয়ের বিরক্তি। ‘ঠিক করে সবজি কাটতে পারো না যখন, তখন কাজ দেখাতে যাও কেন।’ হয়তো ফুলকপির পিসগুলো বেশি ছোটো কাটা হয়ে গেছে আর আলুগুলো রয়ে গেছে বড়ো।

আবার একটু অন্য দৃশ্যও চোখে পড়ে। রাহুল আর শালিনীর তিনমাস হল বিয়ে হয়েছে। ভোপাল ছেড়ে দুজনে ফ্ল্যাট নিয়ে দিল্লিতে থাকে চাকরির খাতিরে। কাজ থেকে ফিরেই রাহুল বসে পড়ে ল্যাপটপ নিয়ে, নিজের সোশ্যাল অ্যাকাউন্টের মেল চেক করে সব উত্তর দেওয়ার জন্য। এটা নাকি ওর মুড-কে ফ্রেশ রাখে। শালিনী এসে

হাত-মুখ ধুয়ে সোজা রান্নাঘরে ঢুকে যায়। চা-জলখাবার দিয়ে রাতের খাবার বানাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। রাহুলের পছন্দ জেনে নিয়ে মেনু ডিসাইড করে।

সেদিন ল্যাপটপে চোখ রেখেই রাহুল উত্তর দিল, ‘নিজের পছন্দের কিছু একটা বানিয়ে নাও।’

মটরপনির চলবে কিনা জেনে নিয়ে শালিনী রান্নাঘরে এসে জোগাড়ে মন দিল। ফ্রিজ খুলে দই-টা বাসি হয়ে যাচ্ছে দেখে মটরপনিরের বদলে দই দিয়ে পঞ্জাবি কাড়ি আর ভাত রান্না করল। রাত্রে খেতে বসে মটরপনিরের জায়গায় কাড়ি দেখে রাহুলের মেজাজ খারাপ হয়ে গেল। রাগ দেখিয়ে বলল, ‘যদি নিজের ইচ্ছেতেই রান্না করবে বলে ঠিক করেছিলে তাহলে আমাকে জিজ্ঞেস করার কী দরকার ছিল?’

রাহুলের ব্যবহারে শালিনীরও রাগ হয়ে গেল। উত্তর ওর জিভের ডগায় চলে এল, ‘বলতে কী চাও তুমি? রোজ তোমাকে জিজ্ঞেস করেই প্রতিটা রান্না করি। একটা দিন আমি নিজের মতো করেছি বলে এত রাগ হয়ে গেল তোমার।’ কাঁদতে কাঁদতে খাবার ছেড়ে শালিনী অন্য ঘরে চলে গেল। মুহূর্তের মধ্যে বাড়ির পুরো পরিবেশটাই বদলে গেল।

এই ঘটনাতেও কোনও নতুনত্ব নেই। হামেশাই চারপাশে ঘটছে। যেসব মহিলারা চাকরি করেন না তারা সন্ধেবেলা স্বামীর ফেরার অপেক্ষায় অধীর হয়ে থাকেন, সারাদিনের সবকথা শেয়ার করবেন বলে। আবার স্বামীর পছন্দের খাবার বানানোটাও স্ত্রীয়ের কাছে ভালো টাইমপাস। সংসারে আর্থিক স্বচ্ছলতা থাকলেও বেশিরভাগ মহিলাই ভেবে চিন্তে একটা সীমিত আর্থিক গন্ডির মধ্যে সংসারের খরচ বেঁধে রাখাটা নিজের দায়িত্ব মনে করে।

তাই তাদের চেষ্টা থাকে, যে-খাবারটার খারাপ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি, সেটা আগে রান্না করে ফেলা। সেখানে স্বামীর

পছন্দ-কে প্রাধান্য না দিয়ে নিজের বিচার-বিবেচনা দ্বারা প্রভাবিত হয় তারা। আবার কর্মরতারা চিন্তা করে সময় নষ্ট না করে, পুরো দায়িত্বটাই স্বামীর ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়। স্বামীর উত্তর যদি স্ত্রীয়ের মনের ইচ্ছার সঙ্গে ম্যাচ করে যায় তাহলে তো ঠিক আছে, কিন্তু যদি উত্তর সঙ্গে সঙ্গে পাওয়া না যায় তাহলে স্ত্রী অপেক্ষা না করেই নিজের মনের মতো খাবার বানিয়ে নেয়।

মজার বিষয় হল যদি বাড়ির গৃহিণীটি বুঝতে না পারে কী খাবার বানাবে, তাহলে সেই দোষটাও এসে পড়ে বেচারি স্বামীর উপর। স্ত্রীর মুখঝামটা তৈরি থাকে, ‘এই সামান্য কাজটাও তোমার দ্বারা হয় না। কী রান্না হবে সেটাও আমাকেই দেখতে হবে!’

উপায়ের সন্ধানে

এর কী উপায়? তাহলে কি স্বামীর কাছ থেকে সাহায্য পাওয়ার আশা করাটা স্ত্রীয়ের অন্যায়? নাকি কোনও প্রতিকার না করেই স্বামীকে স্ত্রীয়ের সব অনুযোগ স্বীকার করে নিতে বাধ্য থাকতে হবে? এই দুটোর কোনওটাই সুখী দাম্পত্যের সহায়ক নয়। তাহলে এর প্রতিকার কী?

স্ত্রীর কর্তব্যঃ

স্ত্রীর যদি মনে হয়, স্বামী তাকে সাহায্য করুক, তাহলে সব থেকে আগে দেখতে হবে সত্যি সত্যি স্বামীর কাছে স্ত্রীকে সাহায্য করার মতন সময় আছে কিনা

স্বামীকে ডমিনেট করে সাহায্য চাওয়ার থেকে তাকে রিকোয়েস্ট করাটা বাঞ্ছনীয়

প্রথম থেকেই স্পষ্ট করুন কী ধরনের সাহায্য পেতে আগ্রহী আপনি, অন্যথা পরে আশানুরূপ ফলাফল না হলে ঝগড়া, অশান্তি হওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হবে

স্বামী অফিস থেকে ফেরার সঙ্গে সঙ্গে কাজের ফর্দ ধরে বসে যাবেন না। স্বামীকে রিল্যাক্স হওয়ার সময় দিন তারপরেই নিজের বক্তব্য পেশ করুন

পছন্দমতো কাজ হলে স্বামীর প্রশাংসা করুন বিশেষ করে আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধবদের সামনে তো বটেই

সাংসারিক কাজে যদি স্বামীর আগ্রহ না থাকে, তাহলে বাচ্চাদের পড়াশোনাটা দেখে দিলেও আপনার অনেক সাহায্য হবে

আপনার মনের মতো কাজ না হলেও জিভে আগল রাখুন কারণ রাগ করলে কোনও লাভ হবে না বরং হতে পারে স্বামী দ্বিতীয়বার আর আপনাকে সাহায্য করার কথা ভাববে না

স্বামীর কর্তব্য

সব স্ত্রীরাই চান তাদের স্বামী তাদের কষ্টটা বুঝুক। তাই যখনই সুযোগ পাবেন স্ত্রীকে সাহায্য করুন। স্ত্রী চাকরি করুক কি না করুক, সকলেই স্বামীর কাছ থেকে সাহায্য পাওয়ার আশা রাখে। স্ত্রীর প্রতি সহানুভূতিশীল ব্যবহার করুন, ডমিনেট করার ভুল করবেন না

অত্যন্ত ব্যস্ত কর্মজীবন হলেও চেষ্টা করুন ছুটির দিনগুলোতে অন্তত স্ত্রীকে কিছুটা সাহায্য করার, যাতে স্ত্রী-ও কিছুটা স্বস্তি পায়

স্ত্রীর যে-কোনও কাজে সাহায্য করার আগে প্রথমে কাজটা সম্পর্কে পুরোপুরি জেনে নিন যাতে স্ত্রীর মনে না হয় যে কাজটা তার মনের মতো হল না

স্ত্রীকে যতই সাহায্য করুন, স্ত্রীয়ের বান্ধবীদের সামনে বলুন, ‘আমি আর কী করতে পারি, ওই বেচারাকেই সবকিছু করতে হয়। ইচ্ছে থাকলেও আমি ওকে কোনও সাহায্যই করতে পারি না।’ এরপর দেখুন স্ত্রীয়ের চোখে আপনার গুরুত্ব কতখানি বেড়ে গেছে

বাসন ধোয়া হয়ে গেলে সেটা গুছিয়ে রাখাটাও একটা বড়ো সাহায্য শুধু খেয়াল রাখতে হবে যাতে কিছু না ভাঙে

সবজি কেটে দেওয়া এবং ভালো করে ধুয়ে স্ত্রীকে রান্নার সময় সাহায্য করাটাও বিফলে যাবে না। রান্নার শখ থাকলে সপ্তাহে

এক-আধ দিন স্ত্রীকে ছুটি দিয়ে নিজেই ঝামেলাটা সামলান, দেখবেন স্ত্রী খুশী হবে। কাজ কিছু না করেও যদি রান্নাঘরে স্ত্রীর সঙ্গে কিছু সময় কাটান সেটাও অতিরিক্ত পাওনা হবে

তবে স্ত্রীয়ের কাজের চুলচেরা বিচার কখনও করতে যাবেন না। নিজের এলাকায় দখলদারি স্ত্রী কখনওই সহ্য করে না।

কালার ডায়েট বডি পারফেক্ট

শরীর সুস্থ রাখতে সবুজ শাকসবজির একটা বড়ো অবদান রয়েছে, একথা সকলেই জানেন। তবে শরীরের সার্বিক পুষ্টির জন্য শুধু সবুজ রঙের নয়, সব রঙের সবজিরই প্রাধান্য অস্বীকার করা যায় না। রঙিন পুষ্টিকর খাবারের একটি তালিকা এখানে দেওয়া হল, যা সঠিক ভাবে প্ল্যানমাফিক খেলে, আপনার শরীর সঠিক পুষ্টি পাবে।

লাল – পুষ্টিকর কিছু তত্ত্ব যেমন অ্যান্থোসায়ানিন, লাইকোপিন, পটাশিয়াম, ভিটামিন এ, বি, সি এবং ইলেক্ট্রোলাইটিস, লাল রঙের ফল এবং সবজিতে পাওয়া যায়। চেরি, তরমুজ, টম্যাটো, বেদানা, বিট ইত্যাদি ফল এবং সবজির স্যালাড বানিয়ে অথবা স্মুদি-তে মিশিয়ে খেতে পারলে উপকার পাওয়া যাবে।

লাল রঙের বিটে থাকে হার্টের জন্য পুষ্টিকর তত্ত্ব। এছাড়াও চোখের জন্য এবং শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতেও এটি যথেষ্ট কার্যকরী। কোলেস্টেরল কমায় এবং সূর্যের প্রখর তাপ-কে প্রতিরোধ করতে সাহায্য করে।

লাল চেরি-তে থাকে শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্টস্, যা কিনা শরীরে থাকা ফ্রি র‍্যাডিকল্স-এর সঙ্গে লড়তে সাহায্য করে। টম্যাটো-তেও রয়েছে অ্যান্টিঅক্সিডেন্টস যা ক্যান্সারের মতো রোগের জন্য দায়ী ফ্রি র‍্যডিকলস-কে শরীরের ক্ষতি করার থেকে আটকায়।

কমলা – বিটা ক্যারোটিন হল একটি হলুদ, কমলা ক্যারোটিনয়েড্‌স যা কিনা পাওয়া যায় টক ফল, পেঁপে, অ্যাপ্রিকট (খুবানি), গাজর, কুমড়ো ইত্যাদি কমলা রঙের ফল এবং সবজির মধ্যে। বিটা ক্যারোটিন ভিটামিন

এ-তে রূপান্তরিত হয় যা কিনা চোখের দৃষ্টি উন্নত করতে এবং শরীরে কোশগ্রন্থির বিকাশ ঘটাবার জন্য অত্যন্ত  গুরুত্বপূর্ণ। এটি ক্ষতিকারক ইউভি-রে থেকে শরীরকে সুরক্ষা দেয়। কমলা রঙের ফল সবজি শরীরের যৗবন ধরে রাখতে সাহায্য করে। এছাড়া কমলালেবু এবং কুমড়ো-তে রয়েছে ভরপুর ভিটামিন সি।

হলুদ – হলুদ ক্যাপসিকাম, ভুট্টা, লেবু, আম, কলা, আনারস, পাকা পেয়ারা, আপেল ইত্যাদি হলুদ ফল-সবজি দৈনন্দিন ডায়েটের অন্তর্ভূক্ত করুন। এতে হজমপ্রক্রিয়া উন্নত হয় এবং চর্মরোগের জন্য অত্যন্ত লাভদায়ক। ব্রোমেলেন নামক এনজাইম যা আনারসে প্রচুর পরিমাণে থাকে, হজম করাতে সাহায্য করে, ক্যান্সারের জন্য উপকারী এবং শরীরে কোথাও ফোলাভাব থাকলে সেটা কমাতে সাহায্য করে। ভুট্টায় রয়েছে নিকোটনিক অ্যাসিড যা শরীরের ফ্রি র্যাডিকল্স রোধ করতে সাহায্য করে। লেবুতে আছে ভিটামিন সি এবং সাইট্রিক অ্যাসিড। আম ভিটামিন এ দ্বারা সমৃদ্ধ।

সবুজ – সবুজ শাক-সবজি শরীরের জন্য উপকারী একথা কারওরই অজানা নয়। নানা ধরনের শাক, কড়াইশুঁটি, বাঁধাকপি, ব্রোকোলি, অ্যাসপারাগাস, শসা, ভিন্ডি, বরবটি, শিম ইত্যাদি যথেষ্ট পুষ্টিকর শরীরের জন্য। এতে শর্করার মাত্রা কম থাকে এবং ফাইবার বেশি থাকে। সবুজ শাকসবজি শরীরের সুগারের স্তর নিয়ন্ত্রিত রাখে এবং ফাইটোনিউট্রিয়েন্টস-এর খুব ভালো সোর্স। শাকে, বিশেষ করে পালংশাকে ক্যালশিয়াম, পটাশিয়াম, ভিটামিন এ এবং কে রয়েছে। ব্রোকোলি শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে।

নীলচে বেগুনি – ব্লুবেরি, আঙুর, আলুবোখরা, বেগুন ইত্যাদিতে অ্যান্থোসায়ানিনস নামক ফাইটো কেমিক্যালস মজুদ রয়েছে। হাই ব্লাডপ্রেশার, সর্দিকাশিতে, ইউরিনারি ট্র্যাক্ট ইনফেকশনে, ক্যান্সার এবং স্ট্রোক আটকাতে সাহায্য করে। টাইপ টু ডায়াবেটিস হওয়ার আশঙ্কাও অনেক কম করে। নীল এবং বেগুনি ফল-সবজিতে ভিটামিন সি, ভিটামিন কে, ফাইবার, ম্যাঙ্গানিজ প্রচুর পরিমাণ থাকে।

সাদা – সাদা রঙের ফল-সবজি শরীরের রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে। এতে বিটা গ্লুকোজ থাকে যেটা, শ্বেত-রক্তকণিকা বাড়ায়। সাদা রঙের ফল-সবজিতে যে-অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট থাকে সেটি ক্যান্সারের চিকিৎসাকে প্রভাবিত করে। কলা, ফুলকপি, আপেল, কড়াইশুঁটি, আলু, মাশরুম ইত্যাদি দৈনন্দিন ডায়েটে রাখলে উপকার পাবেন। নিয়মিত কলা খেলে মুড ঠিক হয় এবং এতে থাকা বিসিক্স ও পটাশিয়াম হার্টের জন্য উপকারী।

আলমারি

–হ্যাঁ মা বলো।

–কোথায় আছিস রে? এতক্ষণ ধরে ফোন করেই যাচ্ছি কোনও রেসপন্স নেই।

–কেন আমি তো টিউশনে ছিলাম। তোমাকে তো বলেই এলাম, কলেজ ফিরতি টিউশন করে ফিরব। কিছু কি দরকার আছে? এতগুলো মিস্ কল!

–তোর বাবার ফোন অনেকক্ষণ ধরে বন্ধ আছে। তোকে কি কিছু বলে গেছে?

–না তো। দুটো নম্বরই বন্ধ?

–হ্যাঁ। অনেকক্ষণ ধরে চেষ্টা করছি। সেই দুপুর থেকে।

–কোথাও গেছে হয়তো।

–আজ পর্যন্ত কোনও দিন তোর বাবা না বলে কোথাও গেছে? অফিসে দেরি হলেও ফোন করে জানিয়ে দেয়।

–তুমি চিন্তা কোরো না, আমি দেখছি। তুমি একবার বীরেনকাকুকে ফোন করে দ্যাখো।

–তিন্নি, অফিসে ফোন করেছিলাম। বলল, সেই দুপুরেই বেরিয়ে গেছে।

তিন্নি আর কথা না বাড়িয়ে ফোনটা কেটে বাবার নাম্বার ডায়াল করল। বাবা ওয়ান, বাবা টু। সুইচড অফ। মোবাইলে দেখল আটটা কুড়ি। স্ট্যান্ডে না গেলে অটো পেতে সমস্যা হবে। কিন্তু বাবা গেল কোথায়? একে একে ব্যাচের ছেলে মেয়েরা সব বাড়ির দিকে পা বাড়াল। তিন্নির সাথেও দুজন এল। একজন মাঝ রাস্তাতেই অটো পেয়ে গেল। তিন্নি অন্য আরেক ব্যাচমেটের সাথে কয়েকটা পা এগিয়ে এসে একটা এটিএম কাউন্টারের কাছে দাঁড়িয়ে সঙ্গীকে এগিয়ে যেতে বলে, নিজে এটিএম কাউন্টারের ভিতরে ঢোকে। টাকা তুলে স্ক্রীন-এ চোখ রাখতেই চমকে ওঠে। একি! এত টাকা! প্রিন্ট বের হল না। এই এক নতুন সমস্যা এসেছে, অর্ধেক কাউন্টারে প্রিন্ট বের হয় না। মেসেজটা বাবার মোবাইলে যাবে, তিন্নির নাম্বার ট্যাগ করেনি। কিন্তু এতগুলো টাকা হিসেব মিলছে না। কেউ কি, তাহলে ইচ্ছে করে এতগুলো টাকা ব্যাংকের আকাউন্টে ফেলে দিল? তাও আবার দু’লাখ। বাবার চিন্তার মাঝে আচমকা এই টাকার চিন্তাও পেয়ে বসল। এত সমস্যা এই ভাবে চলে আসবে ভাবেনি, তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরতে হবে। বাবা এতক্ষণেও না ফিরলে মা এখন একা।

(২)

এক কথা বলতে বলতে প্রকাশের জিভে পলি পড়ে গেল। একেক সময় রেগে যায়, পরেক্ষণেই নিজেকে বোঝায়, বেচারা এরাই বা কোথায় যাবে, কয়েকদিন আগেই সেই টাক মাথার ভদ্রলোক এসে প্রকাশের ডেস্কে চেল্লাতে আরম্ভ করেছিলেন, ‘এর থেকে আমাকে একটু বিষ এনে দিন, খেয়ে সবাই মিলে বাঁচি। কোথায় ছিল আর কোথায় এসে দাঁড়িয়েছে।’প্রকাশ সেদিন রাগেনি। ক্যাজুয়াল স্টাফ সমীরকে বলে, ‘এনাকে এক গেলাস ঠান্ডা জল দাও তো।’ জল পান করে ভদ্রলোক বেশ শান্ত স্বরেই বলেন, ‘বলুন তো ম্যানেজারবাবু, এভাবে ইন্টারেস্ট কমালে খাব কি? রাজ্য সরকারের চাকরি করতাম, রিটায়ার করে কতই বা পেয়েছি। এতে খাব, ডাক্তারকে দেব, না জমাব।’

ভদ্রলোকও সব বোঝেন, কিন্তু কী করা যাবে, নিয়ারেস্ট গায় দ্য গিলটি ওয়ান। এদিকে দিন দিন কাজের চাপটাও বাড়ছে। টিফিন খেতেই সময় পায় না। দুটো থেকে আড়াইটের সময় কিছু না কিছু কাজ এসে যায়। নিদেন পক্ষে লিংক ফেলিওর। একে ওকে ফোন করা তো আছেই। তবে কাস্টমাররা ভাবে এটা হয়তো ব্যাংকের লোকেদের ফাঁকিবাজির নতুন অস্ত্র। কথায় কথায় লিংক ফেলিওর। অর্ধেকজন বোঝে না এই ভার্চুয়াল ব্যাংকিং-এর যুগে অন্তর্জালই প্রধান স্তম্ভ। এত বোঝা সবার কম্ম নয়। ঘরের ভদ্রমহিলাই বোঝে না। কাজ করবার ফাঁকে একবার মোবাইলের স্ক্রীন-এ চোখ রাখল। না, এখনও পর্যন্ত মিস কল নেই। ভালোই আছে, দরকার হলে মিস্ কল দিয়ে ছেড়ে দেয়। কিছু বললে জবাব দেয়, ‘তুমি কেন্দ্রীয়, আমি রাজ্য। জানোই তো কতটাকা কম বেতন পাই।’ মায়ের দেখে মেয়েটাও হয়েছে ওইরকম। কথা বলতে না বলতেই, ‘বাপি কিছু ফান্ড ট্রান্সফার করে দেবে?’

–কত?

–বেশি নয়, হাজার পাঁচেক দিলেই হবে।

–হাজার পাঁচ! ভগবান, বাড়ি ভাড়া লাগে না নিজেরা রান্না করে খায়, তাও হাত খরচ হাজার পাঁচ, সেটা আবার শেষ মাসে। প্রথমে আরেক প্রস্থ পাঠানো হয়। মায়ের থেকে টাকা নেওয়া তো আছেই। প্রকাশ ঘড়িটার দিকে আরেকবার তাকাল। দুটো চল্লিশ। সিগারেট খেতে হবে। খিদেও পেয়েছে। কী টিফিন দিয়েছে কে জানে? প্রকাশ ব্যাগ খুলে টিফিন কন্টেনার বের করল। মুড়ি, একটুকরো শসা। প্রতিদিন এক। নিকুচি করেছে টিফিনের। উঠে ডাস্টবিনে পুরো টিফিনটা ফেলে সমীরকে বলল, ‘রায়বাবুকে বলবে খেতে যাচ্ছি। দেরি হবে একটু।’ম্যানেজার শোনে, কিন্তু রুমা শোনে না। ব্যাংকের দরজার বাইরে পা দেওয়া মাত্র মিস্ কল। একসাথে পাঁচবার। প্রকাশ একটু বিরক্তির সাথেই ফোন ডায়াল করে বলল, ‘কী হলটা কী? এত তাড়া কীসের?’

–কোথায় আছো?

–ভাগাড়ে। এইসময় কোথায় থাকি তুমি জানো না?

–শোনো আমি আজ বিকালেই তিন্নির কাছে যাচ্ছি। ওর শরীর খারাপ। তুমি এই কটা দিন একটু হোম ডেলিভারি থেকে আনিয়ে চালিয়ে নেবে। আমি কবে ফিরব জানি না।

–তিন্নির কী হয়েছে? চমকে ওঠে প্রকাশ।

–শরীর খারাপ বললাম না।

–শরীর খারাপ শুনলাম, কিন্তু কী হয়েছে সেটা তো জানতে হবে।

–তোমায় এইসব মেয়েলি ব্যাপারে নাক গলাতে হবে না।

–অদ্ভুত তো। মেয়েটা কি তোমার একার?

–শোনো অতো বকার সময় নেই। আমি রাখছি, আর হ্যাঁ কিছু টাকা ট্রান্সফার করে দেবে।

–কেন সিরিয়াস কিছু, ভর্তি করতে হবে?

–তুমি বড্ড ইনকুইজিটিভ হয়ে যাচ্ছ।

–এক কাজ করো কার্ড নিয়ে যাও সে রকম হলে কোথাও ভর্তি করে দেবে। ক্যাশলেস হয়ে যাবে।

–তোমাকে যা করতে বললাম তাই করো। এরকম বেসলেস কথা বোল না। আমি চিন্তা ভাবনা করে যেটা ভালো ভাবব, সেটাই করব। তোমাকে কিছু বলতে হবে না।

–ভালো। আমি টাকা দেব, কিন্তু কোনও আলোচনাতে থাকব না? আমার মেয়ে অথচ শরীর খারাপ হলে কী করবে সেটা বলবারও অধিকার নেই। এই না হলে বাবা। তা তুমি যাচ্ছ যে তোমার অফিস কী হবে?

–ইন্টিমেশন দিয়ে যাচ্ছি, ছুটি নিয়ে নেব। আর শোনো ডোন্ট বি সেন্টিমেন্টাল প্রকাশ। এখন ওসবের সময়ও নেই, লেট হার কিওর সুন।

প্রকাশ অনেকক্ষণ ধরে চেপে রাখা একটা শ্বাস ছাড়তে ছাড়তে বলল, ‘আমি একবার তিন্নিকে ফোন করছি।’

– না না। রুমা প্রায় চমকে উঠল।

–না না মানে?

–ওকে এখন ফোন করতে হবে না। আমি পৗঁছে সব কিছু তোমাকে জানাব।

রুমার ফোনটা রাখবার সঙ্গে সঙ্গে প্রকাশ কিছুসময় হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। কী হল তিন্নির! আর খাবার মুখে উঠবে না। এক কাপ চা বলল। বিস্কুটটা ভিজিয়ে মুখে তোলার আগেই মাটিতে পড়ে গেল। এরা বড্ড বেশি চিন্তা দেয়। রুমার এই স্বভাবটা ইদানীং হয়েছে। আগে এরকম করত না! কথাবার্তা সমস্ত কিছু শেয়ার করত। এমনকী চাকরি পাওয়ার বছর দুই পরে আপার ডিভিশনের একটা ছেলেকে ভালো লাগত। সে কথাও গোপন করেনি। তিন্নির স্কুলে পড়বার সময় অঙ্কে রিপিটেড কম নম্বর পাওয়া, বা এক বন্ধুর বার্থডে পার্টিতে ড্রিংক করে বাড়ি আসা, সবই প্রকাশের থেকে রুমাই বেশি বলত। সেসময় বরং প্রকাশ বোঝাত, শান্ত করবার চেষ্টা করত। এইচএস পাস করবার পরেই সব হিসাব কেমন যেন গোলমাল হয়ে যেতে আরম্ভ করল। উলটে যেতে লাগল সব কিছু। তিন্নি কোনওরকমে ফাস্ট ডিভিশনে পাশ করল। প্রকাশ বলল, ‘শোনো ওর যা মেরিট তাতে সাধারণ লাইনে গ্র্যাজুয়েশন করুক। তারপরে না হয় কোনও একটা প্রফেশনাল কোর্স করানো যাবে। রুমা প্রথমে সব কথা শুনেও ছিল। প্রকাশের কথাতে রাজিও হল। কিন্তু বাধা এল রুমার দিদির কাছ থেকে। দিদির ছেলেটাও হায়ার সেকেন্ডারি পাশ করেছে। জামাইবাবু একটা সরকারি জীবনবিমা কোম্পানির ডেভেলপমেন্ট অফিসার। হাবেভাবে টাকা আছে জাহির করে। কথায় কথায় বলে, ‘বুঝলে ভায়া সন্ধেবেলা ঠিক জল খেতে ইচ্ছে করে না।’ ঘরে ড্রিংক ক্যাবিনেটও আছে। বছরে দু’একবার প্রকাশও যায়। তবে দুইবোনের সাথে কী সব কথা হয় কে জানে?

একদিন অফিস থেকে প্রকাশ বাড়ি ফিরতেই রুমা বলে, ‘তিন্নিকে ইঞ্জিনিয়ারিং-এ ভর্তি করে দাও। রাকাও ভর্তি হচ্ছে।’

–কোথায়?

–কলকাতায়।

কথাগুলো শুনে প্রকাশ এক্বেবারে আকাশ থেকে পড়ল। রুমার দিকে তাকিয়ে বলে উঠল, ‘আরে দাঁড়াও, আমি সব কিছু আগে ভেবে দেখি। কোন কলেজ, কি তার ইনফ্রাস্ট্রাকচার, ক্যাম্পাসিং কী হচ্ছে, এই সব কিছু না দেখে শুনে তো আর ভর্তি করা যায় না। তাছাড়া এখন ইঞ্জিনিয়ারিং-এর বাজার ভালো নয়।’

–ও সব কিছু তোমাকে দেখতে হবে না। তুমি ও-সব বুঝবেও না, তার থেকে যে দেখছে তার ওপরেই সব কিছু ছেড়ে দাও।

–কার ওপর, তোমার জামাইবাবু? তা হলেই হয়েছে।

–সে তো হবেই দু দুটো ফ্ল্যাট, গাড়ি, সব তো তুমি কিনেছ তাই না?

– বাদ দাও।

–বাদ দেওয়ার কিছু নেই, জামাইবাবু সব কিছু দেখে এসেছে। খোঁজ খবরও নিয়েছে। রাকা তিন্নি দুজনেই ওখানে ভর্তি হবে।

–থাকবে কোথায়?

–কেন, গড়িয়াতে জামাইবাবু অতো বড়ো ফ্ল্যাট কিনেছে, ওখানেই থাকবে।

–শুধু দু’জন এই বয়সে এক সাথে! ব্যাপারটা ক্রুশিয়াল হয়ে যাবে না?

–তোমার কাছে হতে পারে, আমার কাছে নয়, ওদের কাছে তো নয়ই। তাছাড়া মাঝে মাঝে আমরা যাব, জামাইবাবুরা যাবে।

প্রকাশ আর কথা না বাড়িয়ে উত্তর দিল ‘ভালো। সবই যখন ঠিক করেই নিয়েছ তখন আর আমাকে বলবার কী আছে?’

রুমার কথামতোই তিন্নি ভর্তি হল। ক্লাসও চলল। সাত মাস কেটেও গেল। তারপরেই একদিন অফিসে ফোন করে রুমার এই সব কথা বলে, তিন্নির শরীর খারাপ নিয়ে এই রকম অদ্ভুত নাটক তৈরি করে, এই রকম আচমকা চলে যাওয়া।

রুমা ফোন করতে বারণ করলেও প্রকাশ তিন্নিকে ফোন করে। এক, দুই, তিন বার। না ফোন সুইচ অফ। রাকাকেও ফোন করে। বেজে গেল, ধরল না।

রুমার ফিরতে ফিরতে দিন দশ কেটে গেল। এর মাঝে প্রতিদিনই প্রকাশ ফোন করে যাওয়ার কথা বলতেই রুমা বলে ওঠে, ‘না না আমি যখন তোমাকে বারণ করেছি তখন তুমি আসবে না।’ একদিন অফিস ফেরত রাকাকেও ফোন করে এই ব্যাপারে জিজ্ঞেস করল। রাকাও কোনও স্পষ্ট উত্তর না দিয়ে ফোন কেটে দিল। সীমা আবার নিজের বোন রুমাকে দোষ দিয়ে বলল, ‘আমার বোনটাই বাজে। সাধারণ একটা ঘটনাকে তাল বানিয়ে দিল।’ ভাইরাভাই আবার হাসতে হাসতে বলে উঠল, ‘আমি আবার ওসব মেয়েলি ব্যাপারে থাকি না।’

তিন্নি বাড়িতে ফিরে আসার পরেও প্রকাশ কিছুই জানতে পারেনি। তিন্নি সব সময় চুপ থাকে। রুমাকে কিছু প্রশ্ন করলেই রেগে রেগে উত্তরটা দেয়, ‘তুমি বড্ড বেশি মেয়েলি স্বভাবের হয়ে যাচ্ছ। মেয়ের গাইনিকোলজিক্যাল প্রবলেম, তোমাকে সব জানতে হবে? যেগুলো মেয়েলি ব্যাপার সেগুলো আমাদের মধ্যেই রাখতে দাও। তুমি ফল টল আনো। ওকে এখন বেশি করে ফল খেতে হবে। আর একটু সুস্থ হলে এখানকার কোনও একটা কলেজে ভর্তি করে দাও, ও আর ওখানকার কলেজে পড়বে না।’

এরপর প্রকাশ আর একবারের জন্যেও কাউকে কোনও প্রশ্ন করেনি। অফিস থেকে দেরি করে বাড়ি ফিরে খেয়ে শুয়ে পড়ে। ছুটির দিনে কোনও না কোনও কাজ নিয়ে বাইরে বেরিয়ে যায়। রুমার কথা মতো তিন্নিকে একটা প্রাইভেট কলেজে একটু বেশি ফিজ দিয়ে ভর্তি করে দিয়েছে। এরপর শুধু ফল কেনা, টাকা পয়সা দেওয়ার কোনও রকম গাফিলতি করে না। প্রয়োজনের থেকে বেশিই কেনে। ফল পচে যায়, জামাকাপড় আলমারি ছাড়িয়ে যায়। কারওর সাথে কোনওরকম অতিরিক্ত কথা বলে না। একদিন শুধু একটা দরকারে তিন্নির আলমারি খুলে একটা ব্যাগ বের করে প্যান কার্ড আর আধার কার্ড বের করেছে, তাও অবশ্য তিন্নিকে বলেই। এর বেশি আর কিছু না।

(৩)

প্রকাশের নিরুদ্দেশ হওয়ার প্রায় মাস সাত হয়ে গেল। তিন্নি ও রুমা অনেক চেষ্টা করেও প্রকাশের কোনও ঠিকানা জোগাড় করতে পারল না। এমনকী মানুষটা বেঁচে আছে না মারা গেছে, প্রথম কয়েক দিন তো সেটাই বুঝতে  পারেনি। সাতদিন পরেই তিন্নির মোবাইলে ব্যাংকে দ্বিতীয়বারের জন্যে টাকা ক্রেডিট হওয়ার মেসেজ আসে। ব্র্যাঞ্চে গিয়ে শোনে ড্রপ বক্সের চেক থেকে ক্যাশ করা হয়েছে। যে ফেলেছে তার ঠিকানা বলা সম্ভব নয়। প্যান নম্বর দেওয়া থাকায় সমস্যা হওয়ারও কোনও কথা নয়। তবে ব্রাঞ্চের এক চেনাজানা কাকুকে প্রকাশের কথা জিজ্ঞেস করতে উনি বলেন, উনি তো ভিআরএস নিয়ে নিয়েছেন, এখন কোথায় আছেন কেউ জানে না। টাকা পাওয়ার আগে মাঝে মাঝেই আসতেন, সব টাকা পেয়ে যাওয়ার পরে আর তো আসেননি। এর মাঝে মা মেয়েতে অবশ্য অনেক জায়গায় ঘুরে বেড়িয়েছে। আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব বাদ পড়েনি কেউই। সবার মুখে সেই এক কথা। মাঝে অবশ্য বেশ কয়েকবার তিন্নির মোবাইলে টাকা জমা পড়বার মেসেজ এসেছে। রুমা ও প্রকাশের জয়েন্ট আকাউন্টেও টাকা জমা পড়বার মেসেজ এসেছে। এই কয়েকমাসে দিদির সাথে সম্পর্ক খারাপ হয়ে গেলেও দিদি জামাইবাবু এমনকী রাকাও এসেছে। সব শুনে পাশে থাকবার আশ্বাস দিয়ে গেছে। প্রকাশকে খোঁজার চেষ্টা করবার কথাও বলেছে। কিন্তু সেখানে কিছুই লাভ হয়নি।

দিনদিন তিনকামরার ফ্ল্যাটের ভিতরের শূন্যতা দুটি মানুষকে গ্রাস করে ফেলেছে। সেই একাকিত্ব এতটা তীব্র, কষ্টদায়ক, এর আগে কোনওসময় কেউই বোঝেনি। অথবা বোঝবার চেষ্টাও করেনি। প্রয়োজনের আগেই প্রয়োজন মেটানোর যে দায় একজন কাঁধে চাপিয়ে নিয়েছিল, তার কাঁধের ব্যথা বা না ব্যথার কথাও কেউ জিজ্ঞেস করেনি। কিন্তু আচমকা কাঁধ অর্ধেকটা সরে যাওয়াতে ভূমিকম্পের আরম্ভ। সেখান থেকেই টালমাটাল অবস্থা। রুমা বা তিন্নিকে হাতে হাতে সব কাজ করা আরম্ভ করতে হল। সেই দোকান, বাজার, ইলেকট্রিক বিল এমনকী ব্যাংকে লাইন দিয়ে টাকা তোলা। দুজন এক সাথে এই প্রথম তৃতীয় আরেকজনের জন্যে অকাতরে কাঁদতে আরম্ভ করল। অবশ্য এই কান্না তৃতীয়জনের অলক্ষে।

রুমা এই কয়েকমাসে নিজের অফিস আর বাড়ির চাপে আরও অসুস্থ হয়ে গেল। কথায় কথায় রেগে যায়, তিন্নির ওপর তো এক্বেবারে খাপ্পা হয়ে থাকে। মাঝে মাঝে হাতও চালিয়ে দেয়। তিন্নিও গুম হয়ে থাকে। কিছু বলতে পারে না। কলেজেও নিয়মিত যায় না, টিউশনেও অনিয়মিত। নিজেকেই সব সময় দোষারোপ করে, মাঝে মাঝে নিজেকে শেষ করে দেওয়ার কথাও ভাবে, পরেই আবার নিজেকে সামাল দেয়। মাকে মাঝে মাঝেই ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে হয়। এমনি চেক আপ হলেও ডাক্তার বলেন, টেনশনের থেকে হাই সুগার ধরেছে, সঙ্গে প্রেশার, কোলেস্টেরল, রক্তে ক্রিয়েটিনিন বেশি থাকায় কিডনিও কিছুটা আক্রান্ত হয়ে গেছে। নিশ্চিন্তের বিশ্রাম দরকার, শারীরিক ও মানসিক। অফিস থেকে ছুটি নেয়, কিন্তু মানসিক বিশ্রাম?

আরও দুই মাস পরে এক দুপুরে খেতে বসে ভাতের থালাতে আঙুল দিয়ে নাড়াচাড়া করবার সময় দিদির ফোন পেয়ে রুমা চমকে ওঠে। ফোনটা রেখেই মাখা ভাত ফেলে তিন্নিকে বলে, ‘রেডি হয়ে নে, মাসিরা আসছে। তোর বাবাকে খুঁজে পাওয়া গেছে, তবে কোথায় জানি না, মেসো জানে।’

কলকাতা শহর ছাড়িয়ে গাড়ি ছুটে যায় উত্তর চবিবশ পরগণার বাংলাদেশ সীমান্তের দিকে। রুমা, তিন্নি ছাড়াও দিদি জামাইবাবু এমনকী রাকাও সঙ্গে থাকে। অবশ্য রাকা আর তিন্নি দুজন বসে দু’প্রান্তে। একজন পিছনের সিটে  একজন সামনের সিটে। গ্রামের মেঠো রাস্তার বুক ধরে কিছুটা গিয়ে গাড়ি দাঁড়াল একটা ছোটোগাছ আর বাঁশের বেড়া দিয়ে ঘেরা জায়গায়। অনেকটা জায়গা। ভিতরে ছোটো ছোটো ঘর। গাড়িতে যেতে যেতে রুমা শুনল জামাইবাবু আগে একবার নিজে এসে সব খোঁজ খবর নিয়ে গেছে। প্রকাশের সাথেও দেখা করে সবাইকে নিয়ে আসবে কিনা জিজ্ঞেস করে গেছে। প্রকাশের একটা জীবনবিমার পলিসি ম্যাচিওর হয়ে যাওযার সূত্র ধরেই গোপনে খোঁজ খবর চালিয়ে প্রকাশের ডেরা খুঁজে পেয়েছে। গাড়ি থেকে নেমে দিদি জামাইবাবু, রুমা আর তিন্নিকে ভিতরে যেতে বলে নিজেরা বাইরে দাঁড়িয়ে থাকে। রুমা জিজ্ঞেস করলে উত্তর দিল, ‘তোমরা আগে যাও আমরা একটু পরে যাচ্ছি।’

বাইরে তখন পচা ভাদ্রের রোদ। শরীরে আছড়ে পড়া ঝলসানো আলো আর তাপ সহ্য করে রুমা আর তিন্নি এদিক ওদিক তাকিয়ে ঘেরা জায়গাটার ভিতরে ঢুকে এগিয়ে চলে। কিছুদূর যাওয়ার পরেই কমবয়সি একটা ছেলে জিজ্ঞেস করল, ‘আপনারা কি কাউকে খুঁজছেন?’

রুমা একটু আমতা আমতা করে সব কিছু বলতেই সেই নাম না জানা ছেলেটি একটা ঘরের দিকে আঙুল তুলে দেখিয়ে বলে, ‘উনি এখন ওই ঘরে ক্লাস নিচ্ছেন।’

– ক্লাস নিচ্ছেন!

চাকরি পাওয়ার আগে প্রকাশ চাকরির পরীক্ষা দেওয়ার পাশাপাশি টিউশন করত। চাকরি পাওয়ার পরেও প্রথম দিকে অভ্যাসটা চালিয়ে গেছিল। তারপর টুকটাক একে ওকে এমনি দেখিয়ে দিলেও আর টিউশন আরম্ভ করেনি। তিন্নিকে পড়াত। নিজেও অবসর সময়ে চাকরির বিভিন্ন বইপত্র নাড়াচাড়া করত। রুমা কিছু জিজ্ঞেস করলে বলত, ‘আপডেট থাকা যায়।’

কিন্তু সেদিন কথাগুলো শুনে দুজনেই অবাক হয়ে একে অন্যের দিকে তাকিয়ে ছেলেটির দেখানো ওই ঘরটির দিকে এগিয়ে এসে দরজার সামনে দাঁড়াল। ঘরের ভিতর তখন তিন্নির বয়সি বা ছোটো বড়ো, জনা কুড়ি ছেলেমেয়ের সামনে ক্লাস নিচ্ছে প্রকাশ। দরজার বাইরে দুজনকে আকস্মিক দেখে প্রথমে কেউ কোনও কথা বলতে পারল না। কিছু সময় পরে প্রকাশ বলল, ‘আমার ঘরে গিয়ে বোসো আমি আসছি।’ তারপরেই একজন ছাত্র এগিয়ে এসে রুমা আর তিন্নিকে প্রকাশের ঘরে বসিয়ে এল।

রুমা ও তিন্নি ঘরের ভিতরে একটা তক্তার ওপর বসে চারদিকটা দেখতে লাগল। সাদামাটা ছিটে বেড়ার ঘর। দুটো জানলা আছে। একটা টুলের ওপর রাখা রয়েছে একটা টেবিল ল্যাম্প। চারদিকে ঝোলানো রয়েছে কয়েকটা শার্ট, প্যান্ট কয়েকটা গেঞ্জি। এককোণে থাক থাক করে বেশ কয়েকটা বই। দরজার বাঁদিকের দেয়ালে টাঙানো রয়েছে রুমার শ্বশুর-শাশুড়ির একসাথে একটা ছবি। নতুন ঘরে আসার পরে ছবিটা স্টোররুমের স্ল্যাবে তোলা ছিল।

কিছুসময় পরে প্রকাশ ঘরের ভিতর আসতেই রুমা বেশ উত্তেজিত ভাবে বলে উঠল, ‘এর মানে কী? এরকম ভাবে কাউকে কিছু না বলে চাকরি বাকরি ছেড়ে, এই অজ গ্রামে এসে তুমি কী আরম্ভ করেছ?’

–চা খাবে? এই কয়েকমাসেই তো খুব রোগা হয়ে গেছ।

–যা জিজ্ঞেস করলাম উত্তর দাও।

প্রকাশ একটা শ্বাস নিয়ে বলল, ‘আমাকে আর তোমাদের দরকার নেই এই সত্য উপলব্ধি করেই চলে এলাম। তবে তোমাদের কাউকে ঠকাইনি। ব্যাংক থেকে একপয়সাও তুলিনি। যা টাকা পেয়েছি সব দিয়ে দিয়েছি।’

–বাবা সব কিছু কি টাকার হিসাবে মেলে, না চলে?

–ঠিক তো আজ তোরা বুঝেছিস, কিন্তু যেদিন আমার আপত্তি অগ্রাহ্য করে মায়ের কথা শুনে রাকার সাথে থাকতে গেলি, তারপর…। প্রকাশ একটা লম্বা শ্বাস ফেলে কথা বন্ধ করে দিল।

পাশ থেকে তিন্নি বলে উঠল, ‘থামলে কেন? বলো…’

–থাক। আমার কাছে তো সব কথাই গোপন করেছিলি, তাই না। খুব রাগ হয়ে ছিল, ভাবলাম এবার তোরা তোদের মতো করে থাক আমি আমার মতো। তবে এখন আর অতটা রাগ নেই, তোদের খুব দেখতে ইচ্ছে করছিল।

প্রকাশের কথা শুনেই রুমা তিন্নি দুজন দুজনের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। কিছুসময় পরে তিন্নি বলে, ‘আমি তো কিছু গোপন করিনি বাবা।’

প্রকাশ মুচকি হাসে, ‘সবাই খরগোশ নয় রে। তারপর আবার কিছুসময় চুপ থেকে বলে, ‘জানিস আমাদের সমাজ, শাস্ত্র, কাছের আত্মীয়দের সাথে বিয়ের অনুমতি দেয় না, তবে আগে দিত। মহাভারতে অনেক উদাহরণ আছে। আবার তুতেনখামেন তার নিজের বোন আনাক-সু-নামুনকে বিয়ে করেছিল। দক্ষিণ ভারতের কয়েকটি সম্প্রদায়ের মধ্যে এই বিয়ে এখনও প্রচলিত।’

–এসব আমাকে বলছ কেন? আমি জেনে কী করব?

প্রকাশ তিন্নির মুখের দিকে তাকিয়ে বলে, আসলে এখানে ক্লাস নেওয়ার ফাঁকে শুধু তোর কথাই ভেবেছি, ভেবেছি ভুল কার তোর, না আমার?’

–তুমি যে কী বলছ কিছুই বুঝতে পারছি না।

একটা লম্বা শ্বাস ফেলে প্রকাশ বলে উঠল, ‘তোরা কিছু না বললেও আমি কিছুটা আন্দাজ করেছিলাম। তোর মনে আছে একদিন তোর আলমারি খুলে তোর প্যান কার্ড বের করেছিলাম, সেদিন ব্যাগের মধ্যে নার্সিংহোমের একটা ফাইল পাই। প্রথমে ভয় লেগে গেছিল তারপর কয়েকটা পাতা পড়তেই ব্যাপারটা পরিষ্কার হল। তাও রাকাকে ফোন করে ওর কলেজ গেলাম। প্রথমে রাকাও সব অস্বীকার করছিল, একটু জোর করতে হয়েছিল, বুঝলাম এত বড়ো ঘটনা যখন আমার কাছেই গোপন করা হল, তখন তোদের কাছে আমার কোনও মূল্যই নেই।’

রুমার গলাতে অবাক হয়ে যাওযার স্বর।

‘না শোনো তুমি ব্যাপারটা ওরকম ভাবে ভেব না। আসলে তিন্নির সাথে আমার নিজেরও খুব লজ্জা করছিল। তিন্নি যে এত বড়ো একটা ঘটনা ঘটিয়ে ফেলবে ভাবতে পারিনি।’

–এটা তোমার দূরদৃষ্টির অভাব রুমা। আমি কিন্তু প্রথমদিনেই বলেছিলাম। তুমি বিশ্বাস করোনি আমার ওপরেই রেগে উঠে বলেছিলে, ‘নোংরা হয়ে যাচ্ছ তুমি, ভাই বোন একসাথে থাকবে তাতে এরকম ভাবাটাই অন্যায়।’

–তুমি বিশ্বাস করো আমার খুব খারাপ লেগেছিল।

–খারাপ! কীসের খারাপ? সব কিছু হয়ে যাওয়ার পরে খারাপ? রুমা আমরা তো বুদ্ধি দিয়ে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ করি। এখানে খারাপ ভালোর তো কোনও প্রশ্ন নেই। দুটো টিনএজ ছেলেমেয়ে এক সাথে এক ঘরে থাকলে অনেক কিছুই হতে পারে, সেখানে অনেক সম্পর্কই গৌণ হয়ে যায়। আবার একটা দুর্ঘটনাও ধরা যায়।

–তোমার কথা শুনে মনে হচ্ছে, তুমি এখন সব সাপোর্ট করছ। এমনি ভাবে তুমি সবকিছু মেনে নেবে? তুমি এমন ভাবে বলছ যেন কোনও ব্যাপারই ঘটেনি। বিয়ে, মহাভারত সব কিছু নিয়ে আসছ।

–আমাদের এই বাংলার হিন্দু সমাজে এইরকম মাসতুতো ভাইবোনের মধ্যে বিয়ের প্রচলন নেই। তবে ওদের ক্ষেত্রে আমার মেনে নেবার বা না নেবার সাথে কি কিছু এসে যায়? যেটা ওরা ঠিক করবে সেটাই হবে। আমি অবশ্য এটাও জানি না ওদের এটা প্রেমশূন্য না অন্যকিছু?

–না, ওদের ঠিক করবার কিছু নেই। রাকার সাথে তিন্নি এখন আর মেশে না।

–বেশ ভালো তো। তবে বিপদের আগে সাবধান করতে হয়, কিন্তু বিপদে পড়লে তো সাহায্য করতেই হবে। প্রকাশ আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল।

তিন্নি থামিয়ে বলে উঠল, ‘বাবা, তুমি কবে ফিরে আসবে বলো?’

প্রকাশ হালকা হেসে উঠল, ‘মা’ রে তোদের জন্যে মন খারাপ করলেও এখানে দিব্যি আছি। সকালে একটা স্কুল চলে বিকালের দিকে আশেপাশের ছেলে মেয়েদের প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতি হয়। আজকে অবশ্য স্কুল ছুটি তাই ওরা এই সময় ক্লাস করছে। এরা সবাই আমাকে খুব ভালোবাসে, শ্রদ্ধা করে। বেশ ভালো আছি বুঝলি, বেশ ভালো।’

–তাহলে আমরা কী করব? রুমা প্রকাশের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল।

–তোমার দিদি জামাইবাবু এসেছে তো?

–রুমা কিছুসময় চুপ থেকে উত্তর দিল, হ্যাঁ। কথাতে জড়িয়ে থাকা কান্নাটা প্রকাশের কানে গেল।

–ওদের ডাকো। তারপরেই তিন্নির দিকে তাকিয়ে বলে উঠল, ‘কিরে তুই কি করবি? রাকাকেও ডাকব?’

রুমা তখন সেই মাত্র উঠে বাইরে দিদি জামাইবাবুদের ডাকতে যাচ্ছিল। তিন্নি পিছন থেকে ডেকে বলে উঠল, ‘মা, দাঁড়াও। মাসিদের ডাকতে হবে না।’ তারপরেই প্রকাশের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘বাবা যেটা বেরিয়ে গেছে সেটা শুধু মাত্র একটা প্রাণ ছিল না। তাও বলছি সব দোষও আমার, ভুলও। আমাকে আর একটা সুযোগ দেবে না? আমি আর ওই সম্পর্কের কথা ভাবতেও চাই না। শুধু তোমাকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে চাই। তুমি বাড়ি ফিরে চলো।’

বাইরে তখন দারুণ রোদ। গরম হাওয়া দরমার ঘরে ঢুকলেও প্রকাশের বেশ শান্তি লাগল। তিন্নিকে কাছে ডেকে মাথায় হাত বুলিয়ে বলে উঠল, ‘খেপি একটা।’

বাড়িতে থেকে রূপচর্চা

ত্বকের যত্ন : যেহেতু এখন বাড়ি থেকে কম বেরোতে হচ্ছে, ফলে গায়ে ধুলো-বালি কিংবা অতিরিক্ত ঘামের সমস্যাও কম। তাই, সাধারণ কিছু উপকরণ দিয়ে ত্বকের সৌন্দর‌্য রক্ষা করতে পারবেন।মনে রাখবেন  Home remedies কখনও বিফলে যায় না৷ এতে  Glowing Skin  পাওয়া অসম্ভব নয়৷

ত্বক রক্ষা এবং সৌন্দর্য ধরে রাখার প্রধান শর্ত হল, ত্বককে জীবাণুমুক্ত রাখা এবং ময়শ্চারাইজ রাখা। এর জন্য বেছে নিন স্নান করার সময়টাকে। যদি নিমপাতা জোগাড় করতে পারেন, তাহলে গরম জলে ফুটিয়ে ওই জল ছেঁকে নিয়ে স্নানের জলের সঙ্গে মিশিয়ে নিন। অথবা নিম-যুক্ত সাবান দিয়ে প্রাথমিক স্নান করুন। এর পর এক বালতি জলে শসার চারটে টুকরো, অথবা তরমুজের অল্প টুকরো এবং সম্ভব হলে কমলালেবুর খোসা ছিঁড়ে জলে ফেলুন এবং সামান্য নারকেল তেল (দুফোটা) জলে দিয়ে স্নান সারুন। এতে ত্বক উজ্জ্বল এবং নিরোগ থাকবে।

চুলের যত্ন : সৌন্দর্যের অন্যতম অংশ চুল। তাই, চুলকে স্বাস্থ্যোজ্জ্বল রাখতেই হবে। এর জন্য, বেদানা এবং আঙুরের রস মিশিয়ে চুলে মাখুন সপ্তাহে দুদিন এবং পনেরো মিনিট বাদে ভালো শ্যাম্পু দিয়ে চুল ধুয়ে নিন। অথবা, মেথি ভেজানো জলে একটু পাতি লেবুর রস এবং দুফোঁটা নারকেল তেল মিলিয়ে চুলে মেখে নিয়ে পনেরো মিনিট পরে শ্যাম্পু দিয়ে স্নান করে নিন।

তেল মাখা জরুরি

ভৃঙ্গরাজ বা নারকেল তেলের মতো জরুরি তেল ব্যবহার করে গরম অয়েল মাসাজ নিতে পারলে তা একদিকে মানসিক চাপ কমিয়ে রক্ত সংবহনে সাহায্য করে এবং অন্যদিকে স্ক্যাল্পে ও চুলে আর্দ্রতা পৌঁছে দেয়। এই সব তেল মাথায় শোষিত হয়ে সারা শরীরে তাদের পুষ্টিগুণ ছড়িয়ে দেয়। তবে প্রাকৃতিক, প্যারাবেন বিহীন, কোল্ড প্রেসড তেলই ব্যবহার করবেন যাতে তেলের সম্পূর্ণ পুষ্টিগুণ ও উপকারিতা বজায় থাকে।

রান্নাঘরে সমাধান

ত্বক ও চুলের স্বাস্থ্যের পক্ষে এর অসাধারণ উপকারিতার জন্য, সৌন্দর্যচর্চার অন্যতম প্রধান উপাদান ভাত সিদ্ধ করা জল বা মাড়। চীনের হুয়াংলুও গ্রামের ‘ইয়ায়ো’ উপজাতির মেয়েরা তাদের অত্যন্ত ঘন, দীর্ঘ ও ঝলমলে চুলের জন্য বিখ্যাত। বলা হয়, ভাতের পাতলা মাড় দিয়ে নিয়মিত চুল ধোয়াটাই তাদের এই মনভোলানো চুলের গোপন রহস্য।

খাদ্য এবং পানীয় : টাটকা শাকসবজি, ফল এবং প্রোটিন-যুক্ত খাবার খান ভারসাম্য রেখে। আর পান করুন পর‌্যাপ্ত জল। এতে ত্বক ও চুল ভালো থাকবে এবং সম্পূর্ণ হবে রূপচর্চা।

আদিম আম্বোসেলি

কলকাতা থেকে কেনিয়ার রাজধানী নাইরোবির কোনও সরাসরি উড়ান নেই।তাই প্রথমে কলকাতা থেকে মুম্বই তারপর মুম্বই থেকে নাইরোবি। মুম্বই থেকে নাইরোবি পৌঁছোতে সময় লাগল প্রায় সাড়ে ছয় ঘন্টা। কেনিয়ার সময় তখন রাত আটটা পঁয়তাল্লিশ। ভারতীয় সময় থেকে আড়াই ঘন্টা পিছিয়ে কেনিয়ার ঘড়ির কাঁটা। নাইরোবি বিমানবন্দর মাঝারি আকারের, খুব একটা ভিড় নজরে এল না। লাগেজ উদ্ধার করে ইমিগ্রেশন ইত্যাদির ঝামেলা মিটিয়ে যখন এয়ারপোর্টের বাইরে এলাম তখন রাত সাড়ে ন’টা বেজে গেছে।

ইতিমধ্যে কেনিয়ার সময় অনুযায়ী ঘড়ির কাঁটা ঘুরিয়ে নিয়েছি। এর আগে এয়ারপোর্টের অনুমোদিত কাউন্টার থেকে ডলারের বিনিময়ে কিছু কেনিয়ান কারেন্সি শিলিং নিয়ে নিয়েছি।

রাত ১১টা নাগাদ আমরা হোটেলে পৌঁছোলাম। তারপর ঘরে মাল তোলা, রাতের ডিনার খাওয়া। ডিনার অবশ্য খুবই মামুলি পি-রাইস, পরোটা, একটা পাঁচ মিশেলি সবজি, চিকেনের ঝোল আর কাটা ফল। হোটেলের ঘর পাঁচ তলায়, বেশ ভালোই ব্যবস্থা। আমার রুম পার্টনার আমাদের টুর ম্যানেজার অল্প বয়সি ছেলে অভ্র। রাতে বেশ ঠান্ডা, কম্বল গায়ে দিয়ে শুতে হল।

পরের দিন সকালে আমাদের যাত্রা শুরু হবে সকাল ৮ টায়। তার আগে স্নান করে ব্রেকফাস্টের টেবিলে। ব্রেকফাস্টের অবশ্য এলাহি ব্যবস্থা– ফ্রুট জুস, কাটা ফল যেমন পাকা পেঁপে, তরমুজ, আনারস, এছাড়া দুধ কর্নফ্লেক্স, টোস্ট, মাখন, জ্যাম, ডিম, চিকেন সসেজ আর চা-কফি তো আছেই। ব্রেকফাস্ট সেরে আমরা রওনা হব আম্বোসেলি ন্যাশনাল পার্কের উদ্দেশে। সেখান থেকেই আমাদের জঙ্গল ভ্রমণ শুরু হবে। আমাদের ২৫ জনের দল ৪টি টয়োটা গাড়িতে ভাগাভাগি করে চলেছি। এই গাড়িগুলি বেশ আরামদায়ক ও শক্তপোক্ত। সবচেয়ে সুবিধাজনক হল যে, এদের ছাদ উপরদিকে উঠে যায় আর দাঁড়িয়ে চমৎকার জঙ্গল সাফারি করা যায়। এই গাড়িগুলিই আমাদের আগামী সাত দিনের বাহন।

সকালে একটু ঠান্ডা রয়েছে, জুন-জুলাই মাস এখানে শীতকাল, একটা হালকা শীতবস্ত্র পরে নিতে হল। তবে বেলা যত বাড়বে তাপমাত্রাও তত বাড়বে। গাড়ি চলতে শুরু করল হাইওয়ে ধরে। নাইরোবি থেকে ২৪০ কিমি দূরত্বে অবস্থিত আম্বোসেলি ন্যাশনাল পার্ক। মাসাইদের ভাষা অনুযায়ী আম্বোসেলি শব্দের অর্থ নোনতা ধুলো। আম্বোসেলি জাতীয় উদ্যানের খ্যাতি প্রধানত হাতিদের জন্য। বিশাল এই হাতিদের দাঁত সবচেয়ে বড়ো বলে খ্যাতি আছে। এই অরণ্যের পশ্চাৎপটে সব সময়েই উপস্থিত মাউন্ট কিলিমাঞ্জারো। বরফের টুপি পরা এই শৃঙ্গ সমগ্র আফ্রিকার মধ্যে সর্বোচ্চ।

যাত্রা শুরুর ঘন্টাদুয়েক পরে একটু বিরতি– টয়লেট ব্রেক বা স্মোকিং ব্রেক। চায়ের দোকান ধারে কাছে চোখে পড়ে না, তাই

টি-ব্রেক বলা যাবে না। তবে এখানকার সুপার মার্কেট থেকে পানীয় জলের বোতল কিনে নেওয়ার পরামর্শ দিল আমাদের টুর ম্যানেজার।  মার্কেটের সামনেই বিরাট এক কিউরিও শপ। কেনিয়ার হস্তশিল্প বিখ্যাত– পর্যটকেরা নানা স্যুভেনির কেনাকাটা করে। হস্তশিল্পের মধ্যে রয়েছে কাঠের নানা মূর্তি, হাতি, গণ্ডার, জিরাফ, জেব্রা প্রভৃতির ছোটো বড়ো মূর্তি, আফ্রিকান মানুষের মুখ, কাঠের মুখোশ, মেয়েদের সাজসজ্জার উপকরণ– বালা, চুড়ি, গলার হার এছাড়া পাথরের নানা খোদাই করা শিল্প।

সফরের শুরুতেই কেনাকাটা কিছু হল না, পরে অনেক সময় ও সুযোগ পাওয়া যাবে। আবার যাত্রা শুরু হল। পথের বৈচিত্র্য বিশেষ কিছু নেই। মাঝে মাঝে ছোটো ছোটো গ্রাম, কিছু ঘরবাড়ি, তারপর মাইলের পর মাইল পতিত জমি ছোটো ছোটো কাঁটা গাছ আর ঘাসের ময়দান। চাষের জমি কমই চোখে পড়ল, আরও ঘন্টা আড়াই চলার পর গাড়ি হাইওয়ে ছেড়ে কাঁচা রাস্তা ধরল। ড্রাইভার জানাল এই রাস্তায় আরও ২২ কিমি যেতে হবে।

হাইওয়ে বেশ মসৃণ ছিল। এবার ভয়ংকর খারাপ রাস্তা। উঁচু নীচু পাথরে ভর্তি রাস্তা, তারই মধ্যে গর্ত হয়ে জল জমে আছে আর কাদা তো আছেই। গাড়ি নাচতে নাচতে চলেছে আর এর সঙ্গে রয়েছে ভীষণ ধুলো। পাশ দিয়ে কোনও গাড়ি চলে গেলে অথবা সামনে কোনও গাড়ি চললে যেন ধুলোর ঝড় চলছে বলে মনে হবে। গাড়ির জানলা বন্ধ তাই একটা দমবন্ধ অবস্থা। এছাড়া বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে গরমও অনেক বেড়ে গেছে।

আমাদের আজকের গন্তব্য কিবো সাফারি ক্যাম্প যা আম্বোসেলি জাতীয় উদ্যানের কিমানা গেট থেকে মাত্র ২ কিমি দূরে। জঙ্গল শুরু হয়ে গেছে, বড়ো বড়ো ঘাসের জঙ্গল। মাঝে মাঝে ইতস্তত ছড়িয়ে কাঁটাগাছ। ইতিমধ্যে আমাদের বন্যপ্রাণী দর্শনেরও বউনি হয়ে গেল– এক পাল হরিণ ছুটে চলে গেল, তার একটু পরেই একটি অস্ট্রিচ পাখি চকিতে একবার দেখা দিয়েই ঘাসের জঙ্গলে হারিয়ে গেল। সব কষ্টের শেষ হয়, আমরা অবশেষে ধূলিধুসরিত অবস্থায় কিবো সাফারি ক্যাম্পের গেটে উপস্থিত।

Animals of Amboselli

আম্বোসেলি ন্যাশনাল পার্কের পূর্বতন নাম ছিল মাসাই আম্বোসেলি গেম রিজার্ভ। এর অবস্থিতি কাজিয়াডো কাউন্টির মধ্যে। কেনিয়া-তানজানিয়া সীমান্ত ঘেঁষে এই পার্ক ৩৯২ বর্গ কিমি এলাকা জুড়ে। স্থানীয় মানুষ সাধারণত মাসাই, যদিও আফ্রিকার অন্যান্য এলাকার মানুষও এখানে বসতি স্থাপন করেছে পর্যটনকেন্দ্রিক অর্থনীতির সুবাদে। এছাড়া কিলিমাঞ্জারোর বরফগলা জল সৃষ্টি করেছে বেশ কয়েকটি লেক ও জলার। এই জলার আশপাশে চলছে চাষাবাদ। তবে বর্ষা ছাড়া অন্য সময়ে লেকের জল অনেকটাই শুকিয়ে যায়।

আয়তনে ছোটো হলেও আম্বোসেলি কেনিয়ার দ্বিতীয় জনপ্রিয় ন্যাশনাল পার্ক, মাসাইমারার পরেই। ১৯৭৪ সালে এই পার্ক জাতীয় উদ্যানের তকমা পায়। এই জনপ্রিয়তার কারণ অবশ্যই আছে। এখানে বিচরণ করছে অসংখ্য প্রজাতির জীবজন্তু। বিশাল হাতি ছাড়াও আছে বিপুল সংখ্যক জংলি মোষ, ওয়াইল্ড বিস্ট, জিরাফ, জেব্রা, অ্যান্টিলোপ আর অবশ্যই সিংহ, হায়না, লেপার্ড। এর সঙ্গে রয়েছে অসংখ্য প্রজাতির পাখি। শুধু উপস্থিতিই নয় এই জন্তু জানোয়ারের দেখা পাওয়া যায় সহজেই।

কিবো সাফারি ক্যাম্পের বিশাল গেট দিয়ে আমরা ভেতরে প্রবেশ করলাম। প্রথমেই রিসেপশন সেন্টার। সেখানে আমাদের সবাইকে পাসপোর্ট জমা দিতে বলল। অতিথিদের নাম নথিভুক্ত করা হবে পাসপোর্ট দেখার পরেই। ক্যাম্পের এক মহিলা কর্মচারী একে একে সকলের হাতে তুলে দিল ফলের রস ভর্তি গেলাস– ‘ওয়েলকাম

ড্রিংক’। ইতিমধ্যে গাড়ি থেকে সকলের মালপত্র নামিয়ে রাখা হয়েছে। এবার কটেজ বন্টনের পালা। এখানে সব বাসস্থানই টেন্টের মধ্যে।

বিশাল এলাকাজুড়ে এই সাফারি ক্যাম্প, ABCD চিহ্নিত নানা গলিপথ।  একটি মেয়ে আমার মালপত্র বহন করে পথ দেখিয়ে চলল। জঙ্গলের প্রাকৃতিক পরিবেশ অটুট রেখে তার মাঝে কিছু অঞ্চল পরিষ্কার করে রাস্তা ও টেন্টগুলো স্থাপিত হয়েছে। পৌঁছে গেলাম আমার নির্ধারিত টেন্টের সামনে। বাঁশের খুঁটি দিয়ে বারান্দা, সামনে উঠোন, বিরাট ডবল বেড ঘর। টেন্টের মাথায় খড়ের ছাউনি তবে তার নীচে ওয়াটারপ্রুফ টালি রয়েছে। বারান্দায় চেয়ার টেবিল পাতা। ঘরের মধ্যে দুটো খাট বিছানা ছাড়া চেয়ার, রাইটিং টেবিল, টেবিল ল্যাম্প ইত্যাদি। স্নানঘর, টয়লেট, সাজঘর সবেরই ব্যবস্থা আছে। মোটের ওপর স্বয়ংসম্পূর্ণ ব্যবস্থা। সোলার বিদ্যুতে আলো জ্বলে এমনকী মোবাইল আর ক্যামেরা ব্যাটারি চার্জের সকেটও রয়েছে বেশ কয়েকটা ঘরে। দরজা জানলা সব টেন্টের মতো চেন টেনে বন্ধ-খোলা করা যায়।

ঘর গুছিয়ে এবার কিবো ক্যাম্পটা একটু ঘুরে ফিরে দেখতে বেরোই। বেলা এখন দেড়টা, মধ্যাহ্নভোজ সেরে বেলা তিনটে নাগাদ আমরা ন্যাশনাল পার্কে গেম ড্রাইভে যাব। রিসেপশন ছাউনির বাইরে বাঁ-পাশেই বিশাল ডাইনিং হল। তার বিপরীতে রাস্তার অপর পারে বার ও রেস্তোরাঁ। বিভিন্ন লেনে টেন্ট তথা কটেজগুলি। কটেজের ফাঁকে ফাঁকে ঝোপজঙ্গল। রিসেপশন ছাউনির মধ্যেই অবশ্য কিউরিও শপ আছে আগে লক্ষ্য করিনি।

দুপুরে খাওয়ার মেনু বহু বিচিত্র। প্রথমে দু ধরনের স্যুপ, পি-রাইস, পরোটা, বেকড্ বিনস, আলু সিদ্ধ, চিকেন ও বিফের আলাদা আলাদা পদ। এছাড়া রয়েছে পাকা পেঁপে, আনারস, মুসম্বি ধরনের লেবু, তরমুজ ইত্যাদি ফলের টুকরো ও দু-তিন রকমের কেক। সবই ব্যুফে ব্যবস্থায়। লাঞ্চ সেরে আর বিশ্রামের সময় পাওয়া গেল না, আমরা প্রস্তুত হলাম আম্বোসেলির জঙ্গলে প্রথম গেম ড্রাইভের জন্য।

আমাদের গাড়ির ড্রাইভার কাম গাইড হল ক্রিস্টোফার সংক্ষেপে ক্রিস। বিরাট লম্বা চওড়া চেহারা জাতিতে মাসাই, মাথা কামানো মুখে ফ্রেঞ্চকাট দাড়ি। সুন্দর ইংরেজি বলতে পারে– বেশ একটা ব্যক্তিত্ব আছে। আমাদের দলের চারটি গাড়ি ক্যাম্প থেকে বেরিয়ে মিনিট দশেকের মধ্যে পৌঁছে গেলাম আম্বোসেলি ন্যাশনাল পার্কের প্রবশদ্বারের সামনে।

আফ্রিকা তথা কেনিয়ার ন্যাশনাল পার্ক সম্পর্কে দু-এক কথা বলে নেওয়া প্রয়োজন। বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের জন্যই জাতীয় উদ্যানের সৃষ্টি অর্থাৎ এই সব অরণ্যে মানুষের বসবাস, গবাদি পশু চরানো, অথবা শিকার করা নিষিদ্ধ। কেনিয়ার প্রথম জাতীয় উদ্যান প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৪৬ সালে– নাইরোবি ন্যাশনাল পার্ক। এর পরে আরও ২চ্টি ন্যাশনাল পার্ক কেনিয়ায় প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিষ্ঠার সময় মানুষের বসতি সরানো ও পোচিং নিয়ে অনেক অশান্তি হয়েছে। বর্তমানে তা অনেকটাই শান্ত।

পার্কের গেটে কয়েকটি কিউরিওর দোকান, এছাড়া স্থানীয় মহিলারা হস্তশিল্পের পশরা সঙ্গে বয়ে এনে গাড়ির কাছে চলে এসেছে বিক্রির আশায়। এদের কাছে বেশ দরদাম চলে। ফলে দোকানের চেয়ে অনেক সস্তায় হ্যান্ডিক্র্যাফট্ কেনা যায়। অনেকেই কেনাকাটা করছে। যাইহোক একটু পরেই আমরা জঙ্গলে প্রবেশ করলাম। ক্রিস জানাল এই জঙ্গলে পায়ে হাঁটা নিষিদ্ধ তাই কোনও অবস্থাতেই যেন কেউ গাড়ি থেকে না নামে। গাড়ির হুড এখন তুলে দেওয়া হয়েছে। এখন বসে বা দাঁড়িয়ে অরণ্যদর্শন ও ছবি তোলা যাবে।

অরণ্যের পথে গাড়ি চলল, পথের দুপাশে তৃণভূমি ছোটো বড়ো ঘাসের জঙ্গল কখনও দূর্বা ঘাস, কখনও বা বড়ো বড়ো সাবাই ঘাস আবার কখনও ছোটো ছোটো ঝোপ। এর মাঝখানে মাঝে মাঝে অ্যাকাশিয়া গাছ মাথা উঁচু করে রয়েছে। একে বলে সাভানা অঞ্চল– মাইলের পর মাইল এই ধরনের প্রকৃতি। আকাশ মোটামুটি পরিষ্কার, হালকা রোদ তবে গরম খুব একটা কষ্ট দিচ্ছে না। গাড়ি এগিয়ে চলেছে এই অরণ্যভূমির মধ্যে দিয়ে। আমাদের বন্যপ্রাণী দেখার এখনও বউনি হয়নি।

গাড়ি খুব ধীরে ধীরে চালাতে চালাতে ক্রিস বলছে এই অরণ্যে প্রায় সমস্ত জীবজন্তু দেখা যায়। এই অরণ্যে ‘বিগ ফাইভ’ বলা হয় সিংহ, হাতি, লেপার্ড, বুনো মোষ আর গন্ডারকে। এরা সবাই এই অরণ্যে বিচরণ করে। এছাড়া চিতা, নানা ধরনের হরিণ, জিরাফ, জেব্রা, ওয়াইল্ড বিস্ট, বাঁদর, বেবুন, ওয়াটার বাক, হিপোপটেমাস, হায়না, শেয়াল প্রভৃতি তো আছেই আর আছে অসংখ্য প্রজাতির পাখি।

আমাদের প্রথম দর্শন হল একপাল হরিণের সঙ্গে। ক্রিস বলল, এগুলির নাম থমসন গ্যাজেল। এদের পা-গুলি সরু লম্বা, খুব জোরে ছুটতে পারে, কেনিয়ায় এদের সংখ্যা প্রায় চার লক্ষ। হরিণের ছবি তুলে আমরা এগিয়ে চলি। আবার একপাল ওয়াইল্ড বিস্ট। এরা অনেকটা গরুর মতো দেখতে, গায়ে বিশেষত গলা ও পিঠের দিকে লম্বা লম্বা দাগ, মাথায় শিং। আফ্রিকার জঙ্গলে এরাই বোধহয় সংখ্যাগরিষ্ঠ, সব সময় দল বেঁধে চলাফেরা করে। খাবারের সন্ধানে এরা তানজানিয়া থেকে কেনিয়ার জঙ্গলে হাজারে হাজারে আসে গ্রেট মাইগ্রেশনের সময়।

হঠাৎ একদল জেব্রা কোথা থেকে এসে পড়ল পথের একেবারে মাঝখানে। সবাই হই হই করে উঠল জেব্রা জেব্রা। ক্যামেরা তুলতে তুলতেই তারা উধাও। তবে জেব্রার কোনও অভাব নেই। একটু এগিয়ে আর-একদল জেব্রার রাস্তার পাশেই জটলা। এবার আর ছবি তুলতে অসুবিধা হল না। জেব্রার গায়ের চামড়া চকচকে। গায়ের ডোরাকাটা দাগের জন্যই এরা সূর্যের তাপ সহ্য করতে পারে। এছাড়া এই সাদা কালো দাগ জেব্রাকে লুকিয়ে থাকতে সাহায্য করে। প্রতিটি জেব্রার ডোরা কাটা দাগ অন্যটির থেকে আলাদা, মানুষের আঙুলের ছাপের মতো। এখন এই জেব্রা আর ওয়াইল্ড বিস্টের দলই আমাদের চোখের সামনে।

African safari

আফ্রিকার সর্বোচ্চ শৃঙ্গ মাউন্ট কিলিমাঞ্জারো এখন অস্পষ্ট ভাবে ফুটে উঠছে। ভোরে আর বিকেলে কিলিমাঞ্জারো নাকি স্পষ্ট ভাবে আবির্ভূত হয়, অন্য সময়ে থাকে ছায়াচ্ছন্ন। এক এক দল জন্তু দেখা যাচ্ছে আর গাড়ির মধ্যে উল্লাসের ঝড় উঠছে। একটু পরেই চিৎকার ওমা এটা জিরাফ মনে হচ্ছে। আমি কিন্তু মোটেই দেখতে পেলাম না তাই বললাম, কোথায় কোথায়? উত্তর এল ওই যে শুধু মাথাটা দেখা যাচ্ছে। সত্যিই তো একটা কাঁটাগাছের পিছনে জিরাফের সারা শরীর ঢাকা হলেও গাছের ওপর দিয়ে মাথাটা দেখা যাচ্ছে। কিন্তু এভাবে তো ছবি তোলা যাবে না, একটু এগিয়েই অবশ্য চার-পাঁচটা জিরাফের দেখা পাওয়া গেল। একজন স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে বাকিরা গাছের মগডাল থেকে পাতা খাচ্ছে। প্রায় ৫ মিটার উঁচু হয় পূর্ণ বয়স্ক জিরাফ। এদের পায়ের এত জোর যে, এক লাথিতে সিংহকেও কাবু করে দিতে পারে।

ঘাসবনের মধ্যে গোটাদুয়েক অস্ট্রিচ ছুটে চলে গেল। গাড়িতে খুব একটা আলোড়ন সৃষ্টি হল না। তবে আমি চটপট ওদের ক্যামেরাবন্দি করলাম। এবার দেখা দিল এক পাল হাতি। কি বিশাল তাদের চেহারা আর প্রত্যেকেরই রয়েছে গজদন্ত। আফ্রিকার হাতি আর ভারতের বা এশিয়ার হাতির মধ্যে প্রধান তফাত হল, এদের গায়ের রং আর কানের মাপ। স্থলচরদের মধ্যে আফ্রিকার হাতি পৃথিবীর সবচেয়ে বড়ো। হাতির দল কিন্তু কাছে এল না, ধীরে ধীরে আরও দূরে চলে গেল। হাতিদেরও ফটাফট কিছু ছবি উঠে গেল। যতই বেলা গড়াচ্ছে ততই হাতির সংখ্যা যেন বেড়ে যাচ্ছে। যেদিকেই তাকাই সেদিকেই হাতির পাল, সারি সারি ওয়াইল্ড বিস্ট, জেব্রার পাল আর নানা ধরনের হরিণ তো সবসময়েই ছুটোছুটি করছে।

আমাদের বিস্ময়ের প্রথম আবেগ কেটে গেছে। উল্লাসের তরঙ্গ একটু স্তিমিত। এখন সকলের দৃষ্টি নতুন কিছু জন্তুজানোয়ার খুঁজে বেড়াচ্ছে জঙ্গলের মধ্যে। বুক সমান সাভানা তৃণভূমির প্রতিটি পদক্ষেপে রয়েছে বিপদ। এই ঘাসের জঙ্গলেই দেহের রং মিলিয়ে কোথাও আত্মগোপন করে রয়েছে আফ্রিকার মহারাজ সিংহ। ওত পেতে বসে আছে শিকারের অপেক্ষায়। কিন্তু আমরা এখনও তার দেখা পেলাম না। আবার হাতি এবার সঙ্গে মিষ্টি দুটো বাচ্চা, মা-র পায়ের মধ্যে ঢুকে যাচ্ছে বার বার।

একটু দূরেই একটা ছোটো ডোবার মধ্যে গায়ের অর্ধেক ডুবিয়ে বসে আছে দুটি বিশাল কেপ বাফেলো অর্থাৎ বন্য মহিষ। এরা এই জঙ্গলের অন্যতম শক্তিশালী প্রাণী। মাথায় বাঁকা সিং, সিংহরাও সমঝে চলে কেপ বাফেলোকে। গোল গোল চোখ করে আমাদের দিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। কিন্তু কোনও আক্রমণাত্মক উদ্যোগ দেখাল না। ক্রিস জানাল এরা কোনও বিশেষ কারণ না থাকলে শান্তই থাকে। একটু পরেই ক্রিস পরিচয় করিয়ে দিল সেক্রেটারি বার্ডের সঙ্গে। বিশাল এই পাখি কিন্তু উড়তে পারে না, গটগট করে হেঁটে গেল যেন গুরুত্বপূর্ণ মিটিং-এ যাচ্ছে। পাখির গায়ের রং সাদা, চোখের চারপাশটা লাল, মাথায় সামান্য ঝুঁটি ও পিছনে পুচ্ছ। এরই নাম সেক্রেটারি বার্ড।

দেখা হল গোটাদুয়েক দাঁতাল শুয়োরের সঙ্গে যার পোশাকি নাম ওয়ার্ট হগ। বিশাল এক জোড়া দাঁত আছে আত্মরক্ষার জন্য।

ছোটো-খাটো বাঁদর আগেও দেখেছি এবার গাছের ডালে বেশ বড়ো কয়েকটা বেবুন। একজন তো গাছ থেকে লাফিয়ে নেমে আমাদের গাড়ির অনেকটা কাছে চলে এল। হঠাৎই দেখা হয়ে গেল আমরা এতক্ষণ যাকে খুঁজছি সেই সিংহের সঙ্গে। তবে খালি চোখে খুব পরিষ্কার নয়, ক্যামেরার জুম লেন্সে অনেকটা কাছে চলে এসে পরিষ্কার দেখা গেল। দুটি সিংহী আর একটা বাচ্চা একটা গাছের নীচে শুয়ে রয়েছে। কাছাকাছি রয়েছে বেশ কয়েকটা জেব্রা ও ওয়াইল্ড বিস্ট। তাদের মধ্যে কোনও চঞ্চলতা চোখে পড়ল না। বোঝা গেল সিংহীদের এখন আর কোনও খিদে নেই। এখনই হয়তো ভোজন সমা৫ করেছে। সিংহীদের নড়নচড়নেরও কোনও লক্ষণ নেই। দিনের মধ্যে ১৬ থেকে ২০ ঘন্টা সিংহরা ঘুমোয়। অধিকাংশ শিকার করে সিংহীরা কিন্তু শিকারের সিংহভাগ সিংহের পেটে যায়। তবে দলের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব এই সিংহের।

সূর্য পশ্চিম দিকে হেলে পড়ছে। মাউন্ট কিলিমাঞ্জারো এখন কিছুটা পরিষ্কার। মাথায় বরফের মুকুট দেখা যাচ্ছে তবে এখনও ছবি তোলার পক্ষে আদর্শ নয়। আরও এক ধরনের হরিণ দেখা গেল। এদের নাম ওয়াটার বাক হলেও এরা জলচর নয়, জলে বা জলাভূমিতে থাকতেও পছন্দ করে না। এদের চেহারা বেশ বড়োসড়ো আর শক্তিশালী। শুধুমাত্র পুরুষ ওয়াটার বাকের প্যাঁচানো শিং থাকে।

এবার আমরা পৌঁছে গেছি আম্বোসেলির অরণ্যের এক কিনারে। সেখানে আছে আম্বোসেলি লেক। অনেকটা জায়গা জুড়ে লেক হলেও তার অধিকাংশই শুকনো। একমাত্র বর্ষায় লেকটি জলে পুরো ভরে যায়। অরণ্যের এই দিকে অল্প সংখ্যক ট্যুরিস্টই আসে। গাড়ির অল্প সংখ্যাই তার প্রমাণ। লেকে অনেক পাখির মেলা বসেছে তার মধ্যে

ফ্লেমিংগোরই আধিক্য। সাদা ও লাল রঙের এই পাখিগুলি নাচতে নাচতে ছুটে বেড়াচ্ছে। লম্বা গলা, লাল ঠোঁট, লাল বড়ো বড়ো চোখ সব মিলিয়ে রাজকীয় সৗন্দর্যের অধিকারী এরা। সাধারণত এরা একাকী থাকে না, কলোনি করে থাকে। দুরকমের ফ্লেমিংগো আছে এখানে, লেসার ফ্লেমিংগোরই সংখ্যাধিক্য। দৃষ্টিনন্দন এই পাখি যখন একসঙ্গে হাঁটাচলা করে বা ওড়ে তখন সত্যিই এক অপূর্ব দৃশ্যের সৃষ্টি করে। এছাড়া রয়েছে মারাবু স্টক– এরা দেখতে সুন্দর নয়, মাথায় আর গলায় পালক থাকে না। এরা জীবিত বা মৃত সব পশুপাখিই খায়। এ ছাড়া রয়েছে ক্যাটেল ইগ্রেট। এরা জলাজমিতে কলোনি করে বসবাস করে। আর ছোটো বড়ো পেলিক্যান। ক্রিস, লেকের ধারে বেশিক্ষণ সময় দিল না, এবার আমাদের ফিরতে হবে। সন্ধ্যার পর ন্যাশনাল পার্কে থাকা নিষিদ্ধ, আমরা অনেকটা দূরে চলে এসেছি।

সূর্য অস্ত যাচ্ছে। মায়াবী আলোয় ভাসছে আম্বোসেলি। ফেরার পথে আরো অনেক জীবজন্তু পাখি ইত্যাদি দেখা হল। জলার এক প্রান্তে দেখা মিলল ক্রাউন্ড ক্রেন। নানা রঙে রঙিন সারস পরিবারের এই পাখির মাথায় সোনালি পালকের মুকট। তার নীচে কালো কপাল, সাদা গাল, গলায় লাল ঝালর। পিঠ কালো আর পেটটা সাদা সোনালি মেশানো। সরু লম্বা লম্বা পা নিয়ে দুটি ক্রেন যেন সিনেমার পোজ দিচ্ছে। তারই কাছাকাছি দুটি রঙচঙে হাঁস। ক্রিসকে প্রশ্ন করায় ও জবাব দিল না, বোধহয় এখন ফেরার তাড়া। কিন্তু খুব তাড়াতাড়ি ফেরা হল না কারণ একটু এগিয়ে জলার মধ্যে অনেকগুলো হিপোপটেমাস। জলের মধ্যে সবুজ শ্যাওলার মধ্যে দুতিনটে দলে ভাগ হয়ে জলের সমান্তরাল ভেসে বেড়াচ্ছে। বিশাল এই প্রাণীগুলি আপাত শান্ত মনে হলেও মাঝে মাঝে হিংস্র হয়ে ওঠে। হিপোর পিঠে রয়েছে বেশ কয়েকটা ছোটো ছোটো বক জাতীয় পাখি, তারা পোকা খুঁটে খাচ্ছে। হিপোগুলি মাঝে মাঝে হাঁ করছে। তাদের বিশাল মুখগহ্বর দেখা যাচ্ছে।

অবেলায় দেখা হয়ে গেল টোপির সঙ্গে। এরা এক ধরনের অ্যান্টিলোপ, বেশ বড়ো এদের আকার। বেলা পড়ে আসছে। হাতিরা দলে দলে পথ পার হয়ে ফিরে চলেছে তাদের আস্তানার দিকে। একেকটা দলে আট দশটা করে হাতি, কোনও দলে তিনটে-চারটে করেও আছে। বড়োদের পিছনে চলছে বাচ্চা হাতিরা। ক্রিস এবার গাড়ির গতি বাড়াল। একটু পরেই আমরা পৌঁছে গেলাম পার্কের গেটে তখন সন্ধে নেমে এসেছে।

এলাহি রাতের ডিনার সেরে কটেজের বারান্দায় সোফায় বসে ধূমপান করছি আর সারা দিনের ছবিগুলো মনের মধ্যে সাজিয়ে রাখছি। আকাশে জ্বলজ্বল করছে তারা। এত পরিষ্কার আকাশ তো সচরাচর আমরা দেখতে পাই না। চারদিকে নিকশ অন্ধকার শুধু ক্যাম্পের রাস্তার আলোগুলি টিমটিম করে জ্বলছে।

পরের দিন ভোর ছ’টায় এক কাপ চা খেয়ে আমরা আবার আম্বোসেলি ন্যাশনাল পার্কে গেম ড্রাইভে বেরিয়েছি। কনকনে ঠান্ডা হাওয়া দিচ্ছে, জুলাই-আগস্ট মাস এখানে শীতকাল। সূর্য উঠছে, মাউন্ট কিলিমাঞ্জারো উদ্ভাসিত হয়ে উঠছে। টিলার নীচ থেকে সূর্য বেরিয়ে আসছে। অরণ্যের পশুপাখি সব বেরিয়ে পড়ছে। একটা ন্যাড়া গাছের ডালে অনেকগুলি শকুনের স্যিলুয়েট। রংচঙে স্টারলিং পাখি নেচে বেড়াচ্ছে। জিরাফ, ওয়াইল্ড বিস্ট, হরিণের পাল ঘাস পাতা খাওয়া শুরু করে দিয়েছে। হায়নার দলও ইতস্তত খাবারের সন্ধানে ঘুরছে।

ক্রিস রেডিও টেলিফোনে কোনও বার্তা পেল, তারপরই ঊধর্বশ্বাসে ছুটল এক বিশেষ দিকে। দূর থেকেই দেখি রাস্তার ধারে গাড়ির জমায়েত। একটু দূরে ঘাসের মাঠে অনেক জন্তুর জমায়েত সেখানে যেন একটা ঝটাপটি হচ্ছে, প্রচুর ধুলো উড়ছে আকাশে। আরও কাছে এগোয় গাড়ি। দেখি এক অবিশ্বাস্য দৃশ্য, শ’খানেক কি তারও বেশি ওয়াইল্ড বিস্ট ঘিরে রয়েছে একটা সিংহকে। একাকী সিংহটি কাউকে আক্রমণ করতে ভরসা পাচ্ছে না। এই চক্রব্যুহ থেকে বেরিয়ে যাবার পথ খুঁজছে। আশ্চর্য! পশুরাজের এই অবস্থা। সামান্য ওয়াইল্ড বিস্ট বিরাট সংখ্যায় জোট বেঁধে প্রতিহত করেছে সিংহকে। সিংহটি চক্রব্যুহ থেকে বেরিয়ে হাঁটতে হাঁটতে আমাদের গাড়ির একেবারে সামনে দিয়ে রাস্তা পেরিয়ে চলে যাচ্ছে ওপারের ঘাসবনের দিকে। চারদিক নিস্তব্ধ শুধুমাত্র ক্যামেরার শাটারের কটকট ধবনি। সবাই যেন নিশ্বাস বন্ধ করে ছিল এখন সকলে একসঙ্গে কথা বলতে শুরু করল। না আর কিছু দেখার নেই। ক্রিস গাড়ির মুখ ঘুরিয়ে ফেরার পথ ধরল। ব্রেকফাস্ট সেরেই আমাদের নতুন গন্তব্যের দিকে পাড়ি দিতে হবে।

প্রয়োজনীয় তথ্য

  • নাইরোবি পৌঁছোনোর সহজ উপায় কলকাতা থেকে মুম্বই আর মুম্বই থেকে সরাসরি কেনিয়া এয়ার ওয়েজের বিমানে নাইরোবি। মুম্বই থেকে ইথিওপিয়ান এয়ারওয়েজের বিমানও নাইরোবি যায়, তবে সরাসরি নয় ইথিওপিয়ার রাজধানী আদিস আবাবা হয়ে।
  • কেনিয়া সফরের আগে হলুদ জ্বরের প্রতিষেধক ও পোলিওর প্রতিষেধক নেওয়া বাধ্যতামূলক।
  • কেনিয়া ভ্রমণ, প্যাকেজ টুরেই করা সুবিধাজনক, সব ব্যবস্থাই ভ্রমণ সংস্থা করে দেয়।
  • নিজের ব্যবস্থায় গেলে কেনিয়ার প্রচুর ট্রাভেল এজেন্সি জঙ্গল সাফারির ব্যবস্থা করে। টুর নির্বাচন করে নিজেকে নির্বাচন করতে হবে।
  • সেরা সময় জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর।
  • কেনিয়ার ভিসা (ই-ভিসা) অনলাইনে পাওয়া যায়।
  • কেনিয়ার মুদ্রা কেনিয়ান শিলিং ১ ডলার ১০৩ কেনিয়ান শিলিং।
  • কেনিয়ার সময় ভারতের সময় থেকে আড়াই ঘন্টা পিছিয়ে।
  • শুধু কেনিয়া ভ্রমণে খরচ পড়বে আনুমানিক ১ লক্ষ ৪০ হাজার থেকে ১ লক্ষ ৮০ হাজার টাকার মতো ৭ থেকে ৯ দিনের জন্য।

জাংক ফুড-এর থেকে বাচ্চাদের দূরে রাখুন

বাড়ির খাবারের বদলে বার্গার, পিৎজা, হটডগ, নুডল্স, পাস্তা, চিপ্স প্রভৃতির দিকেই বাচ্চাদের বেশি লোভ। এই ধরনের জাংক ফুডের স্বাদ তাদের আকর্ষণ করে। কিন্তু এগুলি স্বাদে যত ভালো, পুষ্টিগুণে ততটাই নিম্নমানের। উলটে এগুলি বেশি খেলে শরীরে মেদ জমার সম্ভাবনা থাকে। তাই চিকিৎসকরা এই ধরনের খাবার খেতে নিরুৎসাহই করেন। এই ধরনের খাবার বেশি করে খেলে, যে যে সমস্যা হতে পারে, তার অন্যতম হল কোলেস্টেরল বৃদ্ধি। এইসব খাবারে ফ্যাটের পরিমাণ বেশি থাকায় এই সমস্যা তৈরি হয়। এই ধরনের খাবারে অভ্যস্তরা, স্থূলত্ব, ডায়াবেটিজ, হাই ব্লাড প্রেশার, হার্ট ও লিভারের নানা সমস্যার শিকার হয় খুব অল্প বয়সেই।

তাই মা হিসেবে আপনাকে দায়িত্বশীল হয়ে উঠতে হবে। চেষ্টা করতে হবে বাড়িতেই সুস্বাদু খাবার বানিয়ে দিতে, যাতে খাদ্যগুণ অক্ষুণ্ণ থাকবে এবং এর স্বাদের গুণে বাচ্চারা বাইরের খাবার খাওয়ার জন্য জেদ করবে না।

  • ছোটোরা চাউমিন খুব ভালোবাসে। পাস্তা বা নুডল্স কেনার সময় নিশ্চিত ভাবে আটার তৈরি পাস্তা-নুডল্স কিনুন। এই খাবারটাকে কালারফুল করার জন্য নানা রঙের ক্যাপসিকাম, ব্রোকোলি, গাজর, কড়াইশুঁটি, টম্যাটো প্রভৃতি হ্যান্ড চপারে কুচিয়ে দিন।
  • সব বাচ্চারাই কুলফি, আইসক্রিম প্রভৃতি ঠান্ডা জিনিস খেতে পছন্দ করে। বিকল্প হিসাবে আপনি সব রকম ফল, মিহি করে কুচিয়ে দুধের মধ্যে কলা বা আম সহযোগে শেক তৈরি করুন। একইভাবে ফল দিয়ে বাড়িতেই আইসক্রিম বা মেওয়া দিয়ে কুলফি তৈরি করে বাচ্চাদের দিতে পারেন।
  • স্যান্ডউইচ বাচ্চাদের খুব প্রিয়। পনির বা চিকেন হলে তো কথাই নেই। স্যান্ডউইচকে আকর্ষণীয় করতে, তিনরঙের ক্যাপসিকাম কুচি করে দিন।
  • বাচ্চাদের জন্য রুটি তৈরি করার সময় আটা মাখুন সবজি সেদ্ধ বা ডাল দিয়ে। গমের আটার সঙ্গে মাল্টিগ্রেন আটা মিশিয়ে নিতে পারেন। মাল্টিগ্রেন আটা বাড়িতে বানাতে পারেন জবের আটা, রাগির আটা, বাজরার, ভুট্টার আটা, ছোলার আটা ইত্যাদি একসঙ্গে মিশিয়ে। এটি পুষ্টিতে ঠাসা আর খেতেও সুস্বাদু।
  • বাচ্চাদের বাড়িতেই পপকর্ন বানিয়ে দিতে পারেন। নুন, মশলা ছড়িয়ে দিলে, আনন্দ করে খাবে।
  • ফ্রোজেন ভেজিটেবিল্স, সুইটকর্ন ইত্যাদি ভাপিয়ে নিয়ে কাটলেট, বার্গার বানাতে পারেন, শুধু ডিপ ফ্রাই করার বদলে শ্যালো ফ্রাই করাই ভালো। বার্গারে টম্যাটো, পেঁয়াজ, পনির, লেটুসপাতা রেখে পরিবেশন করুন। দেখতে আকর্ষণীয় ও খেতে সুস্বাদু হবে।
  • রাজমা, সেদ্ধ ছোলা, বরবটি, কাবলি ছোলা সেদ্ধ করে আলু, টম্যাটো, পেঁয়াজ ও অন্যান্য সবজির সঙ্গে মিশিয়ে হটডগের পুর তৈরি করুন। বাচ্চারা দোকানের হটডগের বদলে, এটাই খেতে পছন্দ করবে।
  • ঋতু অনুযায়ী ফল খাওয়াতে হলে, কমলা লেবু, তরমুজ, স্ট্রবেরি ক্রাশ, খরবুজা, খস শরবতের সঙ্গে মিশিয়ে, গ্লাসে ঢেলে কাঠি আটকে ফ্রিজারে জমতে দিন। নতুন স্বাদের এই কাঠি লাগানো আইসক্রিম ছোটোদের ভালোই লাগবে।
  • বাড়িতে আলুর চিপ্স বানিয়ে শ্যালো ফ্রাই করুন। এর জন্য এয়ারফ্রায়ারও ব্যবহার করতে পারেন। ফ্যাটমুক্ত এই চিপ্স বাচ্চারা ভালোবেসে খাবে। অল্প তেলে বাদাম ভেজেও ওদের দিতে পারেন। ঞ্জ

ফ্যাশন যখন স্কার্ট

  আপনার বডির ফিগার যে রকমেই হোক না কেন, আপনি যদি সঠিক ডিজাইন ও রঙের স্কার্ট পরেন, আপনাকে ভালো দেখতে লাগবেই।পুরোপুরি ওয়েস্টার্ন স্টাইলের স্কার্ট না পরতে ইচ্ছে করলে, এটা ফিউশন পোশাক হিসাবেও পরা যায়। এর জন্য লং স্কার্টের সঙ্গে ভারতীয় কুর্তির স্টাইলিশ মিক্স অ্যান্ড ম্যাচ করে নিলেই হল।

স্কার্ট পোশাকটি কিন্তু ফিগার-সংবেদনশীল পোশাক। অর্থাৎ সব ধরনের ফিগারে কিন্তু সব ধরনের স্কার্ট মানায় না। তাই আপনার ফিগারের সাথে মিল রেখে স্কার্ট নির্বাচন করুন।

বর্তমানেলং স্কার্টমিনি স্কার্টমাইক্রো স্কার্টজিপসি স্কার্টপ্লিটেড স্কার্টপেপলাম স্কার্ট- এরকমের হরেক রকমের স্কার্ট এখন মেয়েদের ওয়াড্রোবে খুললেই দেখা যেতে পারে। কিন্তু পরার আগে জেনে নেওয়া দরকার, কোন স্কার্ট কেমন দেখতে। তারপর ঠিক করুন সেটা আপনাকে মানাবে কিনা।

 

পুফ স্কার্ট: এই স্কার্টের সাইজ মাঝারি হয়। আর নিচের দিকটা অসমান থাকে। এই অ্যাসিমেট্রিকাল স্কার্ট এখন ভীষণ রকমের ইন। নিচের দিকটা সামঞ্জস্যহীন থাকায় এই স্কার্টটিকে বেশ ফ্যাশানেবল দেখায়।

 

লং স্কার্টঃ- আমাদের দেশের মেয়েরা লং স্কার্ট পরতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। লং স্কার্টের সাথে টি-শার্ট বা কুর্তি পরতে পারেন। যারা স্লিম তারা নির্বাচন করুন ছোট টপ বা টি-শার্ট। যারা একটু মোটা তারা নির্বাচন করুন হিপের নিচ পর্যন্ত লম্বা কুর্তি। লং স্কার্টের সাথে মানানসই টপস পরলে দেখতে বেশ ফ্যাশনেবল লাগে।

 

সার্কুলার স্কার্ট: এর ঘের বৃত্তাকার। ঘের বৃত্তাকার হওয়ার কারণে এই স্কার্ট কোমরের তুলনায় নীচের কুঁচির ঘের, অনেকটাই বেশি হয়। সার্কুলার স্কার্ট সব ধরনেরই হয়ে থাকে। যেমন- লং সার্কুলার স্কার্টশর্ট সার্কুলার স্কার্ট বা থ্রি-কোয়ার্টার। এই স্কার্টে তিনটি স্তরে নেট কাপড় দেওয়া থাকে। এই ধরনের স্কার্টের সাথে, বডি হাগিং টপস ভালো মানায়। তবে যারা টাইট পরেন না, তারা একটু লুজ ফিট কিন্ত শর্ট টপ পরলে মানাবে ভালো।

 

প্লিটেড স্কার্ট: আধুনিক মেয়েদের জন্য এই স্কার্ট খুব মানানসই। এ স্কার্টের ঘের অনেক বেশি থাকে এবং ভাঁজ ভাঁজ করা থাকে। স্কার্টটি লম্বায় কম থাকেহাটুর একটু নিচ পর্যন্ত। এই স্কার্টের সাথে ট্যাঙ্ক টপ পরতে পারেন।যারা অতটা সাহসি নন তারা ট্যাঙ্ক টপ-এর উপরে জিন্সের জ্যাকেটও পরতে পারেন।

 

একটা কথা মনে রাখবেন পোশাক সুন্দর লাগে তখনই, যখন আপনি সেটা কনফিডেন্সএর সঙ্গে ক্যারি করেন। তাই আপনাকে যদি পোশাকটি মানায় তবেই পরুন। হুজুগে গা ভাসাবেন না। সাজের রুটিশীলতায় আপনি অনেকেরই ফ্যাশন আইকন হয়ে উঠতে পারেন।  

সেদিনের সেই দিনগুলি

অনবরত চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়তে লাগল স্নেহার। বারবার ফিরে যাচ্ছিল অতীতের ফেলে আসা দিনগুলোয়। আনন্দের মুহূর্তগুলো বারবার স্নেহার স্মৃতিকোঠায় ফিরে আসছিল। আর কিছুক্ষণ পরই বিয়ের পিঁড়িতে বসবে সে তাই বোধহয় এত স্মৃতি ভিড় করে আসছে মনে।

কলেজের সেই প্রথম দিনটা। কেমিস্ট্রি-র ক্লাস চলছিল। প্রফেসর নতুন ছাত্র-ছাত্রীদের কেমিস্ট্রির জ্ঞান পরখ করার চেষ্টা করছিলেন। একটার পর একটা প্রশ্ন করে যাচ্ছিলেন। স্নেহার আজও মনে পড়ে, ঋদ্ধ একাই প্রত্যেকটা প্রশ্নের উত্তর দিয়েছিল। ঋদ্ধর বিষয়ের প্রতি এতটা গভীর জ্ঞান দেখে সেদিনই স্নেহা ঋদ্ধর প্রতি আকর্ষণ অনুভব করে।

কলেজে ওদের ক্লাসে সকলেই নতুন, তাই ছাত্র-ছাত্রীদের একে অপরের সঙ্গে পরিচয় হতে বেশ কয়েকটা দিন কাটল। একদিন স্নেহা কলেজে ঢুকতে গিয়ে দেখল ঋদ্ধ কলেজের গেটে দাঁড়িয়ে আড্ডা মারছে। স্নেহা-কে দেখে ঋদ্ধ এগিয়ে এল, ‘এত তাড়াতাড়ি কলেজে কী ব্যাপার। ক্লাস তো প্রায় একঘন্টা পর।’

‘বাবার, এদিকে একটা কাজ ছিল তাই আমিও বাবার সঙ্গেই বেরিয়ে পড়লাম। একটু না হয় লাইব্রেরিতে বসে সময় কাটাব’, হেসে জবাব দিল স্নেহা।

‘তাহলে চল, একটু ক্যান্টিনে বসা যাক’, ঋদ্ধকে না বলতে পারল না স্নেহা। প্রথম দিন থেকেই ঋদ্ধ-র প্রতি একটু বেশি দুর্বলতা বোধ করছিল স্নেহা।

ক্যান্টিনে বসে দু’জনে কফি খেতে খেতে গল্প করছিল। মাঝেমধ্যেই স্নেহা অনুভব করছিল ঋদ্ধর দৃষ্টি ওর মুখের উপর এসে কিছু যেন খোঁজার চেষ্টা করছে। ক্লাসের সময় এগিয়ে আসাতে দু’জনে ক্যান্টিন ছেড়ে ক্লাসরুমে এসে পাশাপাশি বসে পড়ে।

বিকেলে ক্লাস শেষ হবার পর ঋদ্ধ স্নেহা-কে বলে, ‘একটু দাঁড়া। স্যারকে বইটা দিয়ে এক্ষুনি আসছি। একসঙ্গে বেরোব।’

গেট অবধি পৌঁছোতেই ঋদ্ধ চলে আসে। দু’জনে হেঁটে বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছে যায়। স্নেহা বলে, ‘ঋদ্ধ তুই এবার যা, বাস এলে আমি উঠে পড়ব। কিন্তু তুই তো এখান থেকে বাস পাবি না। তোকে তো একটু হাঁটতে হবে।’

‘হ্যাঁ যাচ্ছি। স্নেহা তোকে একটা কথা বলার ছিল। তোকে আমার খুব ভালো লাগে, সবসময় তোকে দেখার জন্য, কথা বলার জন্য ব্যাকুল হয়ে থাকি। এটাই বোধহয় ভালোবাসা। আমি নিশ্চিত যে আমি তোকে ভালোবাসি।’

স্নেহা ঘটনার আকস্মিকতায় থ হয়ে যায়। কী বলবে বুঝে উঠতে পারে না। লজ্জায় লাল হয়ে ওঠে ওর মুখ। নিজের হূৎস্পন্দন যেন নিজের কানকেই আঘাত হানছে মনে হয় ওর। বাসটা এসে পড়ায় মুহূর্তের লজ্জার হাত থেকে নিজেকে কিছুটা বাঁচাতে পারে স্নেহা। সিটে বসে জানলা দিয়ে খেয়াল করে, ঋদ্ধ তখনও দাঁড়িয়ে বাসস্ট্যান্ডে।

বাড়ি ফিরে এক মুহূর্তের জন্যও ঋদ্ধর চিন্তা মন থেকে দূর করতে পারল না স্নেহা। ওর চোখের গভীর চাহনির আকর্ষণ যেন প্রতিক্ষণেই স্নেহাকে মনে মনে চঞ্চল করে তুলতে লাগল। প্রতীক্ষার প্রহর গুণতে গুণতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছে স্নেহা ঠিকমতো মনে করতে পারল না। ঘুম ভাঙল একেবারে সকালবেলায়। অভ্যাসমতো মোবাইল-টা ঘাঁটতেই চোখে পড়ল ঋদ্ধর পাঠানো ছোট্ট মেসেজটায়, ‘সুপ্রভাত। দেখা হওয়ার অপেক্ষায় রইলাম।’

রোমাঞ্চ অনুভব করল স্নেহা। ভালোবাসার প্রথম অনুভূতি বুঝি এমনটাই হয়, স্নেহার মনে হল। অনেক ভেবেও উত্তরে কী লিখবে বুঝতে পারল না। চিন্তা করার শক্তিও যেন লোপ পেয়েছে। ‘সুপ্রভাত’ লিখে পাঠিয়ে দিল স্নেহা।

শুরু হল স্নেহার জীবনের নতুন অধ্যায়। ঋদ্ধর সঙ্গে আলাপ হওয়া, রোজ কলেজে একসঙ্গে বসে ক্লাস করা, ভালোবাসার উড়ানে গা ভাসিয়ে দেওয়া এই সবকিছুই স্নেহার ভালো লাগতে আরম্ভ করল। উভয়ের দেখা না হওয়া পর্যন্ত মন অস্থির হয়ে উঠত। ক্লাস অফ থাকলেই পার্কে, কখনও গঙ্গার ধারে কখনও আবার কোনও মল-এ ওদের দুজনের একসঙ্গে দেখা পাওয়া যেত। কলেজেও দুজনকে নিয়ে ভালোই চর্চা শুরু হয়েছিল।

স্নেহা জানত, ঋদ্ধর মা-বাবা গাড়ি অ্যাক্সিডেন্টে মারা যান এবং কাকা-কাকিমার কাছে ও মানুষ হয়েছে। গ্রামের বাড়িতে থাকেন

কাকা-কাকিমা। শহরে একটা ঘর ভাড়া করে ঋদ্ধ থাকে। টিউশন করে কলেজের মাইনে দেয় ঋদ্ধ। পড়াশোনায় ভালো বলে প্রফেসররা নোট এবং বই দিয়ে ঋদ্ধকে সাহায্য করতেন একথাও অজানা ছিল না স্নেহার।

সেদিন কলেজে গিয়ে স্নেহা ঋদ্ধকে কোথাও দেখতে পেল না। একটা ক্লাস হয়ে যাওয়ার পর রীতিমতো চিন্তায় পড়ল স্নেহা। এতদিন হয়ে গেল ঋদ্ধ এরকম কখনও করেনি। ফোনেও কোনও মেসেজ করেনি। স্নেহা ঋদ্ধ-র নম্বরে ফোন করল। ফোন সমানে বেজে চলেছে ওপাশ থেকে কোনও উত্তর নেই। ভয় পেয়ে গিয়ে মরিয়া হয়ে আবার ফোন করল স্নেহা। এবার উত্তর এল। অস্ফুট কণ্ঠে উত্তর এল, ‘স্নেহা আজ আমি কলেজ যেতে পারব না। প্রচণ্ড জ্বর, উঠতে পারছি না। চিন্তা করিস না। জ্বরটা কমলেই কলেজ যাব।’

পরের দিনও ঋদ্ধ কলেজ আসতে পারল না। ক্লাসে কিছুতেই মন লাগল না স্নেহার। খালি মনে হচ্ছিল একবার ঋদ্ধ-কে দেখতে যাওয়া খুব দরকার। এত জ্বরে একা একা সবকিছু কী করে সামলাচ্ছে ঋদ্ধ।

ঠিকানা জানাই ছিল। বাড়ি খুঁজে পেতে তবুও বেশ কষ্ট হল। অনেকবার দরজায় ধাক্বা দেওয়ার পর ঋদ্ধ এসে দরজা খুলল। জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে, চোখদুটো জবাফুলের মতো লাল। ঋদ্ধকে দেখে কষ্ট হওয়ার বদলে রাগই হল স্নেহার। ‘এতটা জ্বর আর তুই কিছুই জানাসনি? ওষুধ খেয়েছিস? বাড়ির কাউকে জানিয়েছিস?’

চোখের পাতা খুলে রাখতে পারছিল না ঋদ্ধ। সেই অবস্থাতেই শিথিল স্বরে জবাব দিল, ‘কাকা-কাকিমাকে জানিয়ে কী হবে? শুধু শুধু অত দূরে ওনারা চিন্তা করবেন। আর ডাক্তারে কাছে যাওয়ার অবস্থা আমার ছিল না।’

দুদিনেই ঋদ্ধ অনেকটা দুর্বল হয়ে পড়েছিল। চোখের নীচে কেউ যেন কালি ঢেলে দিয়েছে মনে হচ্ছিল। ঋদ্ধর অবস্থা দেখে স্নেহার কান্না পাচ্ছিল। হয়তো দুদিন কিছুই খাওয়া হয়নি ঋদ্ধর কারণ ও নিজেই রান্না করে খেত। এতক্ষণে ঘরের চারপাশে তাকিয়ে দেখল স্নেহা। জিনিসপত্র এধার-ওধার ছিটিয়ে পড়ে আছে। ছোটো একটা কাঠের টেবিলের উপর কাচের গেলাসে অর্ধেকটা জল পড়ে রয়েছে আর একটা বিস্কুটের খোলা প্যাকেট রাখা আছে।

স্নেহা প্রথমে একটা বাটিতে জল ভরে, রুমালের সাহায্যে ঋদ্ধর কপালে জলপট্টি দিতে লাগল যাতে জ্বরটা একটু কম হয়। কপালটা একটু ঠান্ডা হয়েছে বলে মনে হলে উঠে ঘরদোর পরিষ্কার করে, জায়গার জিনিস জায়গায় গুছিয়ে রাখল। বাইরে বেরিয়ে সামনের দোকান থেকে ব্রেড আর দুধ নিয়ে ফিরে এল। দুধ ফুটিয়ে, ব্রেড সেঁকে ঋদ্ধকে জোর করে খাওয়াল তাও একটাই ব্রেড খেতে পারল ঋদ্ধ।

নিজেদের পারিবারিক ডাক্তারকে ফোন করে স্নেহা ঋদ্ধর অবস্থা জানাল। ডাক্তারের কাছ থেকে ওষুধের নাম জেনে দোকান থেকে ওষুধ কিনে এনে ঋদ্ধকে খাওয়াল। সন্ধে অবধি ঠায় বসে রইল ঋদ্ধর পাশে। ঋদ্ধর কৃতজ্ঞতা ভরা চোখের দিকে তাকিয়ে কপট রাগ দেখাল স্নেহা। ‘আমার পক্ষে যেটুকু করা সম্ভব সেটুকুই করলাম। তোকে আর কৃতজ্ঞতা দেখাতে হবে না।’

‘জানিস স্নেহা, ছোটো বেলায় মা-বাবা মারা যাওয়ার পর আমার জীবন থেকে খুশি উধাও হয়ে গিয়েছিল। কাকু-কাকিমা আমাকে আশ্রয় দিয়েছেন ঠিকই কিন্তু ওদের জন্য আমি বোঝা। তুই আমার জীবনে আসাতে আবার আমি নতুন করে ভালোবাসা পেয়েছি। তুই আমার যা সেবা করলি হয়তো আমার মা বেঁচে থাকলে এতটাই করত। তাই কৃতজ্ঞতা নয়, এটা আমার অনেস্ট কনফেশন।

অবশ্য কাকু-কাকিমার বিরুদ্ধে আমার কোনও নালিশ নেই। আমি তো তাদের নিজের সন্তান নই। তাঁরা যে আমাকে আশ্রয় দিয়েছেন এটাই আমার পক্ষে যথেষ্ট’, ঋদ্ধর চোখ জলে ভরে আসে।

‘তুই চুপ করবি ঋদ্ধ। এইসব কথা বলার সময় নয় এটা। শরীরটা আগে। নিজেকে একলা ভাবিস না, আমি সব সময় তোর পাশে আছি।’ পাশে রাখা ভিজে তোয়ালে দিয়ে ঋদ্ধর মুখটা ভালো করে মুছে দিয়ে স্নেহা উঠে দাঁড়াল। ঋদ্ধর জ্বরটা একটু কমেছে বোধ হল। এদিকে সন্ধেও হয়ে এসেছে। দেরি হলে বাড়িতে সকলে চিন্তা করবে। নিজের কলেজের ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে নিল স্নেহা, ‘ঋদ্ধ আজ আসি। দুধ আর ব্রেড রাখা রইল। পাত্রে দুধটা একটু গরম করে খেয়ে নিস। ওষুধটাও খাবি। রাত্রে কোনওরকম অসুবিধা হলে ফোন করিস। আমি একা মেয়ে রাত্রে কী করব এই ভেবে আবার সমস্যা নিয়ে বসে থাকিস না। আমি তোর জন্য সব কিছু করতে পারি।’

বাড়িতে এসেও ঋদ্ধর চিন্তাটা কিছুতেই মন থেকে সরাতে পারল না স্নেহা। রাত্রে সবাই ঘুমিয়ে পড়লে ঘরের দরজা বন্ধ করে ঋদ্ধকে ফোন করল। ঋদ্ধ অনেকটাই সুস্থ বোধ করছে জানতে পেরে নিশ্চিন্ত হল স্নেহা। বিছানায় গা এলাতেই ঘুমের জগতে পৌঁছে গেল।

চারদিনের দিন সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠল ঋদ্ধ। এই দুদিন স্নেহা সকলের দৃষ্টি এড়িয়ে বাড়ি থেকে ঋদ্ধর জন্য খাবার নিয়ে গিয়ে ওকে খাইয়ে আসত। ঘন্টার পর ঘন্টা ঋদ্ধ-র কাছে বসে ওর সঙ্গে গল্প করত। পঞ্চম দিন থেকে ঋদ্ধ কলেজ আসতে আরম্ভ করল। এই ক’দিনে ওরা দুজন আরও বেশি করে পরস্পরের কাছাকাছি এসে পড়েছিল এবং দুজনেই বুঝতে পারল একে অপরজনকে ছাড়া আলাদা থাকা তাদের কারও পক্ষেই সম্ভব নয়।

দেখতে দেখতে কলেজে তিনটে বছর কেটে গেল। এই তিনটে বছর স্নেহার জীবনে সবথেকে সুখের যার স্মৃতি আজও স্নেহার মনে উজ্জ্বল। কলেজ শেষ হতেই ঋদ্ধ হায়ার এডুকেশনের জন্য অন্য একটি কলেজে অ্যাডমিশন নিল। স্নেহার বাবা মেয়েকে আর পড়াশোনা করাতে রাজি হলেন না। সুতরাং ঋদ্ধ-র সঙ্গে দেখা করাটা সমস্যা হয়ে উঠল স্নেহার কাছে। ঋদ্ধ-র সঙ্গে দেখা না হলেই মন খারাপ হয়ে যেত স্নেহার। ফোনে কথা বলে আশ মিটত না ওর।

স্নেহার মা-বাবাও মেয়ের বিয়ের জন্য পাত্র খোঁজা শুরু করে দিল। মেয়ের দায়িত্ব কতদিন আর বয়ে বেড়ানো যায়! বাড়ি থেকে বেরোতে হলে হাজার কৈফিয়ত। দিনের বেলা ঋদ্ধ-র কলেজ সুতরাং দেখা করতে হলে সেই সন্ধেবেলা। সেটাও স্নেহার বাবার জন্য বন্ধ হয়ে গেল। সন্ধেবেলায় বাড়ির মেয়ের রাস্তায় কী কাজ? রোজ মিথ্যা বলা সম্ভব নয়। একপ্রকার বন্দি জীবন হয়ে উঠল স্নেহার। সুযোগ পেলেই ঋদ্ধকে ফোন করে কিছু একটা উপায় বার করার জন্য অনুরোধ জানাত স্নেহা যাতে দুজনে একসঙ্গে থাকতে পারে। কিন্তু চাকরি ছাড়া কীভাবে বিয়ে করা সম্ভব সেটা ঋদ্ধ কিছুতেই ভেবে পেত না।

ছেলের বাড়ি থেকে কেউ দেখতে এলেই স্নেহার চোখে জল চলে আসত। ঋদ্ধকে ছাড়া অন্য কারও সঙ্গে জীবন কাটানোর কথা ও ভাবতেই পরত না। এদিকে

মা-বাবাকে ঋদ্ধ-র সম্পর্কে জানাতেও কিছুতেই সাহসে কুলোতে পারছিল না স্নেহা। বাবা পুলিশে ছিলেন সুতরাং শক্ত ডিসিপ্লিনের মধ্যে মানুষ হতে হয়েছিল স্নেহাকে। যদিও একটিমাত্র কন্যা হওয়ার কারণে মা-বাবার আদরের সন্তান ছিল স্নেহা। স্নেহা মনে করতে পারে না, ওর সঙ্গে বাবা কোনওদিন উঁচু গলায় কথা বলেছেন বলে।

একদিন স্নেহার মা ওকে জানালেন পাত্রপক্ষ ওকে সন্ধেবেলায় দেখতে আসবে। পাত্র ডাক্তার। মন অশান্ত হয়ে উঠল। ঋদ্ধকে ফোনে সব কিছু জানিয়ে দেখা করার জন্য সময় নির্দিষ্ট করে নিল। বন্ধুর বাড়ি যাওয়ার মিথ্যা অছিলায় বাড়ি থেকে বেরিয়ে ঋদ্ধ-র সঙ্গে দেখা করল স্নেহা। ঋদ্ধকে দেখে চোখের জল বাধ মানল না।

‘ঋদ্ধ, প্লিজ তুই কিছু একটা কর। বাবার কাছ থেকে আমাকে চেয়ে নে। তোকে ছাড়া আমি বাঁচতে পারব না।’

স্নেহার মানসিক অবস্থা দেখে ঋদ্ধও কিছুক্ষণ কোনও উত্তর দিতে পারল না। স্নেহা একটু শান্ত হলে ঋদ্ধ বলল, ‘স্নেহা, আজ আমার নিজেরই দাঁড়াবার মতো সামর্থ্য নেই, আমি কোন মুখে তোর বাবার কাছে তোর হাত চাইব? উনি যদি মানা করে দেন তাহলে আমাদের দুজনেরই আশা ভেঙে যাবে। যতক্ষণ না আমি নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারছি ততক্ষণ তোকে ধৈর্য রাখতেই হবে। যোগ্য হয়ে উঠতে দে, ততদিন কিছু বলে মা-বাবাকে বুঝিয়ে রাখ। খুব শিগগির তোর বাবার কাছে যাব।’

‘যদি সত্যি সত্যি এরকম করতে পারতাম। শেষ নিঃশ্বাস নেওয়া পর্যন্ত তোর জন্য অপেক্ষা করতে পারতাম! জানি না কেন বাবা-মা আমার বিয়ে নিয়ে উঠে পড়ে লেগেছে? তুই একটু তাড়াতাড়ি কর, আমি সারা জীবন তোর কাছে কৃতজ্ঞ থাকব।’ একটু দম নেয় স্নেহা, ‘ঋদ্ধ আমি আর কাউকে বিয়ে করতে পারব না। তোকে না পেলে আমি আত্মহত্যা করব।’

ঋদ্ধ ঘাবড়ে গেল, ‘এই ভুল খবরদার করিস না। তোকে ছেড়ে থাকার কথা আমিও ভাবতে পারি না। কিন্তু আপাতত আমাদের অপেক্ষা করা ছাড়া আর কোনও উপায় নেই।’

ঋদ্ধ-র কাছে আশ্বাস পেয়ে এক বুক আশা নিয়ে স্নেহা বাড়িতে ফিরে এল। ঋদ্ধ প্রমিস করেছে, আর কয়েকটা দিন। তারপরেই ওরা দুটিতে একসঙ্গে সংসার পাতবে। সন্ধেবেলায় পাত্রপক্ষ এসে স্নেহাকে দেখে গেল। কলের পুতুলের মতো ওদের সব প্রশ্নের উত্তর দিয়ে গেল স্নেহা। আর কয়েকটা দিনের অপেক্ষা।

কয়েক দিন পরেই স্নেহার স্বপ্নের সংসার গুঁড়িয়ে চুরমার হয়ে গেল। স্নেহার মা এসে জানালেন পাত্রপক্ষ স্নেহাকে পছন্দ করেছে। ছেলে এবার নিজে আসবে স্নেহাকে দেখতে। ঘাবড়ে গিয়ে স্নেহা ঋদ্ধকে ফোন করল। কিন্তু একি? রিং হয়ে যাচ্ছে অথচ ওধার থেকে কেউই কল রিসিভ করছে না। ঋদ্ধ-র হল কী? ফোন ধরছে না কেন? উৎকণ্ঠা বাড়তে লাগল স্নেহার।

মনে হল হয়তো কোনও কাজে ব্যস্ত রয়েছে। ফোন রেখে খানিকক্ষণ অপেক্ষা করল স্নেহা। আবার ফোন করল কিন্তু ঋদ্ধ ফোন ওঠাল না। এরকম তো ঋদ্ধ কখনও করে না। সেই মুহূর্তে ধরতে না পারলেও পরে পরেই ফোন করে নেয়। ঘড়ি দেখল স্নেহা। মধ্যরাত, এত রাতে বাইরে থাকারও কথা নয় ঋদ্ধর। চোখের পাতায় কিছুতেই ঘুম এল না। চেষ্টা করতেই লাগল। শেষমেশ উলটো দিকে ফোন সুইচ অফ হয়ে গেল। কোনও উপায় না দেখে বালিশ অাঁকড়ে স্নেহা কান্নায় ভেঙে পড়ল।

পরের দিন সকালে বাবা কাজে বেরিয়ে গেলে মিথ্যা বাহানা করে স্নেহা বাড়ি থেকে বেরিয়ে সোজা ঋদ্ধ যে বাড়িতে ভাড়া থাকে সেখানে গেল। দরজায় তালা দেখে আশেপাশে জিজ্ঞেস করাতে জানতে পারল, ঘর খালি করে নিজের জিনিসপত্র নিয়ে ঋদ্ধ কোথাও চলে গেছে। কিন্তু কোথায় গেছে কেউ-ই বলতে পারল না। কী করবে, কোথায় যাবে কিছুই ভেবে পেল না স্নেহা। কাউকে কিছু না বলে ঋদ্ধ কোথায় যেতে পারে? ও যে এরকম করতে পারে কিছুতেই বিশ্বাস হচ্ছিল না স্নেহার।

সন্ধে হয়ে আসতে মায়ের জোরাজুরিতে স্নেহাকে সেজেগুজে তৈরি হতে হল। ডাক্তার ছেলেটির দেখতে আসার কথা। স্নেহার খালি মনে হচ্ছিল ছেলেটির যদি ওকে দেখে পছন্দ হয়ে যায় তাহলে ও নিজের মনকে কী করে এই বিয়েতে রাজি করাবে? ঋদ্ধ ছাড়া আর কাউকে বিয়ে করাটা ওর পক্ষে কখনওই সম্ভব হবে না।

মনকে কিছুতেই মানাতে পারছিল না, ঋদ্ধ-র হঠাৎ করে কোথাও চলে যাওয়ার ঘটনাটা। তাহলে কি শুধু ফূর্তি করার জন্যই স্নেহার সঙ্গে ভালোবাসার নাটক করল ও, না, না, এটাও কী সম্ভব! ঋদ্ধ-র চোখে ওর জন্য ভালোবাসা স্পষ্ট দেখেছে স্নেহা, সুতরাং নিজের চোখকে কী করে অবিশ্বাস করে স্নেহা? তাহলে কোনও কিছু না জানিয়ে হঠাৎ-ই ঋদ্ধ-র অন্তর্ধান হওয়ার পেছনে কী রহস্য লুকিয়ে থাকতে পারে?

ছেলে এসে স্নেহাকে পছন্দ করে গেল। স্নেহার বিয়ে নিয়ে বাড়িতে সকলেই ব্যস্ত হয়ে পড়ল। চারিদিকে খুশির পরিবেশ। স্নেহার মা, আত্মীয়স্বজন সকলকেই মেয়ের বিয়ের ঠিক হওয়ার খবরটা জানিয়ে রাখলেন। বাবাও ধুমধাম করে একমাত্র মেয়ের বিয়ে দেওয়ার আয়োজন শুরু করে দিলেন। এই হইচই-এর পরিবেশ থেকে স্নেহা নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখল কারণ রোজ একটাই প্রার্থনা করত স্নেহা, যাতে এই বিয়েটা কোনওভাবে ভেঙে যায়।

এই ভাবেই প্রায় এক মাস পার হতে চলল। ঋদ্ধ-র কোনও খবর পেল না স্নেহা। তবে একটা এমন ঘটনা ঘটল যাতে স্নেহার সমস্যা কিছুটা হলেও মিটল। হঠাৎই পাত্রপক্ষ স্নেহার সঙ্গে বিয়েটা নিয়ে কিন্তু কিন্তু শুরু করে দিল। স্নেহার বাবা ভিতর থেকে খবর আনলেন যে টাকার লোভে ছেলের অভিভাবকেরা অন্য জায়গায় ছেলের সম্বন্ধ ঠিক করেছে। খবরটা পেয়ে স্নেহা সবথেকে আনন্দ পেল। বহুদিন পর ওর মুখে হাসি ফুটল।

ঘুরতে ফিরতে ঋদ্ধকে ফোন করাটা অভ্যাস হয়ে গিয়েছিল স্নেহার। কিন্তু এত কিছুর পরেও সেই ‘সুইচ অফ’ ছাড়া ওপার থেকে কোনও উত্তর পাওয়া গেল না। মেসেঞ্জার-এও মেসেজ পাঠাল স্নেহা কিন্তু উত্তর এল না। কয়েকদিন পর স্নেহা খেয়াল করল ঋদ্ধ ওকে ফেসবুকেও ব্লক করে দিয়েছে। খুব রাগ হল ওর, যাকে কাছে পাওয়ার জন্য ও মরিয়া হয়ে উঠেছে সেই-ই ওকে দূরে সরিয়ে রাখার প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। যদি বিয়ে করার ইচ্ছা ছিল না তাহলে প্রথমে বলে দিলেই হতো, এভাবে ভীতুর মতো কিছু না জানিয়ে পালিয়ে যাওয়ার কী অর্থ ছিল?

ধীরে ধীরে স্বপ্ন দেখা বন্ধ করে দিল স্নেহা। মোবাইলে ঋদ্ধ-র ফোন নম্বরটা টাইপ করতেও আর আঙুল চলত না স্নেহার। রোজই মনে হতো ঋদ্ধ-র ফোন আসবে। কিন্তু না একটা ফোন কল আর না যে নিজে একবারের জন্যেও স্নেহার সামনে এল। দু মাস ধরে লাগাতার চেষ্টা করে করে স্নেহা অবশেষে হার মানল। মোবাইলে ঋদ্ধর নম্বর ডায়াল করাই বন্ধ করে দিল। একদিন ঋদ্ধ-র নম্বরটাই মুছে দিল নিজের মোবাইল থেকে।

সময়ের স্রোত নিজের গতিতে বইতে লাগল। ইতিমধ্যে স্নেহার বাবারও বদলির খবর এল। শিলিগুড়িতে নতুন বদলি। সুতরাং পুরো পরিবার নিয়ে স্নেহার বাবা শিলিগুড়ি চলে এলেন।

ঋদ্ধকে পাওয়ার আশা স্নেহা পুরোপুরি ত্যাগ করে দিল। শিলিগুড়িতে এসে স্নেহার মনে হল এবার অতীতকে ভোলা অনেক সহজ হবে। বাড়িতে যখনই ওর বিয়ের কথা উঠত স্নেহা নিজের ভিতরে নিজেই গুটিয়ে যেত। বিয়ে এবং ভালোবাসা এই দুটো শব্দের সঙ্গে ওর শত্রুতা তৈরি হয়েছিল। স্নেহা বাড়িতে বিয়ে নিয়ে কোনওরকম আলোচনা করতে মা-কে বারণ করে দিল।

দু’বছরের উপর স্নেহা-রা শিলিগুড়িতে কাটিয়ে ফেলল। মাঝেমধ্যেই স্নেহার মনে হতো, আদৗ কি ঋদ্ধ কখনও ওর কথা মনে করে? পুরোটাই ওর যদি ছলনা ছিল তাহলে মিথ্যা প্রতিশ্রুতি কেন দিল? একবার যদি ও নিজের মনের কথা জানাত তাহলে মনে হাজার দুঃখ পেলেও ও ঋদ্ধকে ক্ষমা করে দিতে পারত। সত্যিকারের ভালোবাসা যে আজও আছে, এই ভুলটা অন্তত ওর ভাঙত।

শিলিগুড়ি আসার পর থেকে বাড়ির বাইরে খুব একটা বেরোত না স্নেহা। ওর কিছু ভালো লাগত না। একদিন ওর মা জোর করে ওকে প্রতিবেশী কাকিমার বাড়ি নিয়ে গেল। একটা ছোটোখাটো অনুষ্ঠান ছিল। কাকিমার মেয়ে রূপা-কে পাত্রপক্ষের দেখতে আসার কথা ছিল।

মায়ের মন, তাই মনে হল বিয়ের পরিবেশ দেখে মেয়ের মনে যদি কোনও পরিবর্তন আসে। সন্ধ্যাকে সাজিয়ে পাত্রপক্ষের সামনে আনার দায়িত্ব এসে পড়ল স্নেহার উপর। নিজে সাজতে ভুলেই গিয়েছিল স্নেহা। রূপাকে সামনে পেয়ে অতীত এসে আবার স্নেহার সামনে দাঁড়াল। এমনই সেজেগুজে ঋদ্ধ-র কাছে যেত স্নেহা। নিশ্চয়ই ওরই মধ্যে কোনও কিছুর অভাব ছিল যার কারণে ঋদ্ধ ওর জীবন থেকে সরে গেল।

ছেলের বাড়ির সকলেই এসে গিয়েছিল। ইচ্ছে না থাকলেও কাকিমার ইচ্ছেমতো রূপার শৃঙ্গার শেষ করে ওর হাত ধরে স্নেহা বসার ঘরের দিকে পা বাড়াল।

সামনে সোফায় বসা ছেলেটির দিকে তাকাতেই স্নেহার চোখের সামনে সব অন্ধকার হয়ে এল। প্রতিটা ক্ষণ যার অপেক্ষা করে থেকেছে, যার জন্য এত চোখের জল ফেলেছে, নিজের সুখ-শান্তি সব ছেড়েছে আর যে কিনা ভীরুর মতো চুপিচুপি ওর জীবন থেকে পালিয়ে গেছে, সেই বিশ্বাসঘাতক ঋদ্ধ ওর সামনে বসে আছে। আজ সে আর একটা মেয়ের জীবন নষ্ট করবে বলে এসেছে।

‘স্নেহা… স্নেহা…’ চোখ খুলতেই সেই পরিচিত মধুর আওয়াজ স্নেহার কানে এসে প্রবেশ করে। আবেশে চোখ বন্ধ হয়ে আসে। কেউ ওর মুখে জলের ঝাপটা দিচ্ছে। বহু পরিচিত একটা স্পর্শ অনুভব করতে পারছে স্নেহা। পরিচিত বাহুর বেষ্টনী ওকে ঘিরে রয়েছে।

‘চোখ খোল স্নেহা…’ আবার সেই মধুর আওয়াজ কানে আসে।

‘ঋদ্ধ না?’ না চাইতেও মুখ ফসকে বেরিয়ে আসে নামটা।

‘হ্যাঁ, আমি ঋদ্ধ।’

অঝোরে অশ্রু গড়িয়ে পড়তে থাকে স্নেহার চোখ বেয়ে। মনের ভিতর জমে থাকা অভিমান কথার মধ্যে বেরিয়ে আসে, ‘তুই কেন এভাবে আমাকে ঠকালি ঋদ্ধ? কেন আমাকে না জানিয়ে তুই পালিয়ে গেলি? আজও তোকে আমি খুঁজে যাচ্ছি। তোর জন্য অনেক কেঁদেছি, অনেক কষ্ট পেয়েছি। যদি আমাকে ছেড়ে চলেই যাবি ভেবেছিলি তাহলে আমাকে মুখের উপর বলে দিতে পারতিস। আমিই বোধহয় পাগল ছিলাম যে তোকে নিজের করে পেতে চেয়েছিলাম।’

‘স্নেহা, তোকে ছেড়ে এসে আমিও প্রচুর কেঁদেছি’, ঋদ্ধ বলে, ‘যেদিন তুই শেষবার আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলি সেই দিনটার কথা তোর মনে আছে?’

‘হ্যাঁ… কেন?’

‘সেদিন তুই চলে যাওয়ার পর, তোর বাবা চার-পাঁচজন লোক নিয়ে আমার ওখানে আসেন। সবারই গায়ে পুলিশের পোশাক ছিল।’

‘সে কী…’, বিস্ফারিত চোখে ঋদ্ধর দিকে তাকায় স্নেহা।

‘হ্যাঁ, তোর বাবা এসে আমাকে শাসান, আমি যেন তোর সঙ্গে কোনওদিন আর দেখা না করি। তোর কাছ থেকে আমি যেন অনেক দূরে চলে যাই। নয়তো ফল ভালো হবে না। ওনার কোনও সহকর্মী আমাদের দুজনকে পার্কে বসে থাকতে দেখেছিল এবং তোর বাবাকে বলে দেয়। তোর বাবা চেয়েছিলেন আমাকে দূরে পাঠিয়ে তোর তাড়াতাড়ি বিয়ে দিয়ে দেবেন। আমার এখানে কিছুই করার ছিল না। পুলিশের সঙ্গে কী করে লড়ব বিশেষকরে যেখানে তোর বাবা উপস্থিত। তোর জীবনে যাতে ঝড় না আসে তাই আমি চলে যেতে বাধ্য হয়েছিলাম।

নিজের সিম কার্ড ভেঙে ফেলে দিয়ে দিল্লি চলে যাই। ওখানে বন্ধুর বাবার মাধ্যমে একটা চাকরি জোগাড় করি আর বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষাগুলোর জন্য নিজেকে তৈরি করতে থাকি। একবছর বাদে পরীক্ষা দিয়ে ব্যাংক-এ অফিসার পদে নির্বাচিত হই। কিন্তু সবকিছু হলেও তুই আমার জীবনে ছিলি না তাই স্বাচ্ছন্দ্য থাকলেও সুখ ছিল না। এই ভেবে মনকে শান্ত রাখতাম যে, এতদিনে নিশ্চয়ই তোর বিয়ে হয়ে গেছে আর তুই নতুন জীবনে সুখে আছিস। আবার কখনও এও মনে হতো, তুই আমার ছাড়া অন্য কারও কিছুতেই হতে পারিস না।

একবার তো সাহস করে কলকাতায় যাই এই ভেবে যে, হয়তো তুই আজও আমার অপেক্ষায় রয়েছিস। কিন্তু গিয়ে দেখি সপরিবারে তোরা অন্য কোথাও চলে গিয়েছিস। অনেক চেষ্টা করার পরেও তোদের খোঁজ না পেয়ে কাকু-কাকিমার জেদ আর ভাগ্যের হাতে নিজেকে ছেড়ে দিই। এখানে কাকিমার এই আত্মীয়ার সঙ্গে আমার বিয়ের কথাবার্তা হয়েছিল তাই আমার এখানে আসা। কিন্তু তোকে যখন একবার খুঁজে পেয়েছি, আর আমি তোকে হারাতে চাই না।’

স্নেহার পুরোটাই স্বপ্ন মনে হচ্ছিল। আজ ওর বিশ্বাস হল, সত্যিকারের ভালোবাসা অটুট হয়। ঋদ্ধকে নিয়ে গর্ববোধ করল যে, এত বছরেও ঋদ্ধ ওকে ঠকায়নি।

লুপ লপেটায় নয়া জুটি তাপসী -তাহির

এবার একটি কমেডি থ্রিলার ছবিতে অভিনয় করতে দেখা যাবে অভিনেত্রী তাপসী পন্নুকে ৷ ‘লুপ লপেটা’ নামের এই ছবিটি,  তাপসীর আপাত গম্ভীর ভাবমূর্তির চেয়ে আনেকটাই আলাদা ৷ এর আগে, ‘ষাঁণ্ড কি আঁখ’ দর্শকদের মন জয় করে নিয়েছিল ৷ তাই একটা আত্মবিশ্বাসের জায়গা থেকে এবার এই নতুন ঘরানার ছবিতে কাজ করেছেন তাপসী ৷ ছবিতে তাপসীর বিপরীতে দেখা যাবে অভিনেতা তাহির রাজ ভাসিন-কে ৷  লুপ লপেটা বস্তুত একটি জার্মান ছবি ‘রান লোলা রান’- এর গল্প-কে আশ্রয় করে তৈরি হয়েছে ৷ মূল ছবিটি ছোটোবেলায় দেখেছেন তাপসী এবং তাহির। এ বার সেই ছবিরই হিন্দি ভার্সনে কাজ করার সুযোগ পেয়ে উত্তেজিত তাঁরা। তাপসী তাঁর ইন্সটাগ্রামে জানিয়েছেন ছবিটি মুক্তি পেতে চলেছে নতুন বছরে ৷

ছবিটি নিয়ে যথেষ্ট উত্তেজিত অভিনেতা তাহির৷ তাঁদের অন স্ক্রিন রসায়ন দর্শকদের মন জয় করে নেবে বলেই তাঁর বিশ্বাস ৷ গত এপ্রিলে ছবিটির শুটিং হওয়ার কথা ছিল৷ কিন্তু করোনার কারণে কাজ ভেস্তে গিয়েছিল ৷ এখন নতুন করে সেটে ফিরে এই জুটি খুবই খুশি ৷ তাহির তো বলেই ফেললেন, “রোল সাউন্ড ক্যামেরা  আ্যাকশন— এই চারটে শব্দে যে- ম্যাজিক লুকিয়ে আছে, তেমন আর কিছুতে নেই ৷ গত কয়েক মাস ধরে জোর কদমে ছবির প্রস্তুতি চলেছে হোয়াটসআ্যপ ও জুম-এ ৷ কিন্তু বাস্তবে সেটে গিয়ে শুটিংয়ের মজাই আলাদা ।”

তাপসী নিজে একজন এনার্জেটিক অভিনেত্রী ৷ ফলে সেট-এ এসে তিনি অসম্ভব  ছটফটে থাকেন ৷ দুই প্রোযোজক, তরুণ গর্গ ও  অতুল কসবেকর এবং নির্দেশক আকাশ ভাটিয়াও এত মাসের নষ্ট হওয়া সময়টাকে উসুল করতে, জোর কদমে মাঠে নেমেছেন ৷ তাপসী প্রথমবার কাজ করছেন তাহিরের সঙ্গে ৷ ফলে তিনিও চেষ্টা করেছেন সহ-অভিনেতার সঙ্গে যতটা সম্ভব ভালো ভাবে চরিত্রটাকে ফুটিয়ে তুলতে ৷

তাপসীর ছবি ‘থাপ্পড়’ মুক্তি পেয়েছিল বেশ কিছুদিন আগে৷। তার পরেও নায়িকার হাতে রয়েছে ‘রশ্মি রকেট’, ‘হাসিন দিলরুবা’র মতো ছবি। ক্রিকেটার মিতালি রাজের বায়োপিক ‘শাবাশ মিঠু’তেও নামভূমিকায় রয়েছেন তাপসী। অন্য দিকে, তাহিরকে ‘এইট্টি  থ্রি’ ছবিতে দেখা যাবে সুনীল গাওস্করের চরিত্রে। এখন দর্শকরা স্ক্রিনে কতটা ভালেবাসা দেবেন তাপসী-তাহির জুটিকে, তারই আপেক্ষায় রয়েছে টিম লুপ লপেটা ৷

 

 

 

 

উড়ান

প্রায় তিনমাস হতে চলল সমীরণের সিয়াটেল আসার। দিনগুলো বেশ ভালোই কাটছে। এটাই তো সমীরণ বরাবর চেয়ে এসেছিল। মা-বাবা দুজনেই ডাক্তার। বাড়িতে সবথেকে ছোটো ও। ছোটো থেকেই মেধাবী। দিল্লি আইআইটি থেকে মাস্টার্স কমপ্লিট করেই মাইক্রোসফ্ট-এর নতুন এই চাকরিটা ও পেয়ে যায়। স্কুলে থাকতেই টিভি-তে আমেরিকান সিরিয়াল এবং ফিলমগুলো দেখতে ও পছন্দ করত। আমেরিকা সম্পর্কে জানার আগ্রহ ওর মধ্যে যতটা ছিল ততটা বোধহয় নিজের দেশ নিয়ে ছিল না। স্বপ্ন দেখত আমেরিকা যাওয়ার এবং শেষমেশ পৌঁছেও গেল চাকরির সুবাদে। সিয়াটেলের সৗন্দর্যে সমীরণ একেবারে মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিল। চারিদিকে সবুজের সমারোহ, যতদূর চোখ যায় পরিষ্কার নীল আকাশ, বড়ো বড়ো লেক, সমুদ্র, পাহাড়। প্রকৃতি যেন নিজের সবটুকু সৗন্দর্য উজাড় করে দিয়েছে শহরটাকে সাজিয়ে তুলতে। সমীরণের দেখেও আশ মিটত না। সারাটা সপ্তাহ কাজে ডুবে থাকত আর উইকএন্ড-এ বেড়াতে বেরিয়ে পড়ত ও। কখনও গ্রিন লেক পার্ক তো কখনও লেক ওয়াশিংটন, মাউন্ট বেকার, কাসকেড রেঞ্জ, স্নোকোয়ালমি ফল্স আরও কত কী।

সমস্ত দেশের খাবারেরও অঢেল দোকান সারা শহর জুড়ে। সমীরণ এমনিতেই খাদ্যরসিক, তার ওপর দুপা এগোলেই একটা করে খাবারের দোকান। সুতরাং কখনও চিজ ফ্যাক্টরি, কখনও অলিভ গার্ডেন আবার কখনও বা কাবাব প্যালেস-এর মতো রেস্তোরাঁগুলোতে ও মোটামুটি চেনা মুখ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

মাইক্রোসফ্ট কোম্পানির হেড কোয়ার্টার যেহেতু সিয়াটেল-এর কাছেই রেডমন্ডে ছিল, সমীরণ কাছেই একটি ওয়ান বেডরুম অ্যাপার্টমেন্ট ভাড়া করে থাকত। মাইক্রোসফ্ট-এ কাজের সুবাদে বিভিন্ন দেশের এবং বিভিন্ন ধর্মের মানুষের সহাবস্থান সেখানে। নানা বর্ণের মানুষেরও আনাগোনা লেগে থাকত জাগয়গাটায়।

সমীরণের অফিসে ভারতীয় প্রচুর ছিল। দক্ষিণ ভারতীয় বেশি তবে ভারতের অন্যান্য জায়গা থেকেও বহু ভারতীয় এখানে কাজ করতেন। চেনা জানা না থাকলেও হাসিমুখে একে অপরকে অভিবাদন জানানো এখানকার একটা পরম্পরা ছিল।

ট্রেনিং শেষ হতেই সমীরণ প্রোজেক্টের দায়িত্ব পেল। পাঁচজনের একটা টিম। একজন দক্ষিণ ভারতীয়, দু’জন বিদেশি এবং একটি মেয়ে। মেয়েটি সম্ভবত আমেরিকান, নাম ‘এমন’। প্রথম দেখাতেই সমীরণ মেয়েটির স্বভাব এবং সৗন্দর্যে প্রভাবিত হয়। মেয়েটি তন্বী, লম্বা, একমাথা কোঁকড়ানো চুল, চোখের রং নীল। আমেরিকান অ্যাক্সেন্টে কথা বলে, কথাবার্তা এবং পোশাক-আশাক অত্যন্ত শালীন-মার্জিত। অফিসে সকলেই ওকে ‘এমি’ সম্বোধন করত।

একসঙ্গে কাজ করতে করতে সমীরণও বুঝতে পারে এমি নিজের কাজে অত্যন্ত দক্ষ এবং বুদ্ধিমতীও বটে। ফলে ওদের পাঁচজনের টিমে স্বাভাবিক ভাবেই একটা সহূদয়তা গড়ে ওঠে সকলের মধ্যে।

একদিন দুপুরে সমীরণ এমিকে একসাথে লাঞ্চ খাওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানাল। এমি রাজি হয়ে গেল। কোম্পানির ক্যান্টিনে সমীরণ একটা বার্গার অর্ডার দিল আর এমি স্যালাড। সমীরণ লক্ষ করেছিল এমি দুপুরে হালকা খেতেই পছন্দ করে। গল্প করতে করতে সমীরণ প্রশ্ন করল, ‘এখানে ভালো খাবার কোথায় পাওয়া যায়?’

‘আই লাইক কাবাব প্যালেস’, এমির উত্তর।

সমীরণ আশ্চর্য হল। এমি আমেরিকান অথচ ওর পছন্দ ভারতীয় খাবার। কৗতূহল চাপতে না পেরে জিজ্ঞেস করল, ‘ইন্ডিয়ান খাবার তোমার ভালো লাগে?’

‘ইয়েস, ইন্ডিয়ান অ্যান্ড পাকিস্তানি কুইজিনস্ আর অলমোস্ট অ্যালাইক। আই লভ্ দেম বোথ।’ সমীরণ একটু আশ্চর্য হল। অনেকদিন ধরে যে-প্রশ্নটা ওর মাথায় ঘুরছিল সেটা ওর মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল, ‘এমি, তোমার ন্যাশনালিটি কি? তুমি কী আমেরিকান?’

সমীরনের প্রশ্ন শুনে এমি হেসে ফেলল, ‘হ্যাঁ, আমি আমেরিকান। ১৯৬০ সালে আমার ঠাকুরদা পাকিস্তান থেকে আমেরিকায় এসে এখানকার ন্যাশনালিটি গ্রহণ করেন।’

এমিকে দেখে কারও পক্ষেই বলা সম্ভব ছিল না যে ও মুসলিম ধর্মাবলম্বী। ধর্মের কোনওরকম গোঁড়ামি ওর মধ্যে ছিল না। এমিকে দেখে সমীরণের মুক্ত আকাশে ওড়া বিহঙ্গের কথাই মনে পড়ত। ধীরে ধীরে দুজনেই একে অপরের প্রতি আকর্ষণ অনুভব করতে শুরু করে। এতদিন সমীরণ সারা সপ্তাহের কাজের পর একাই উইক এন্ডগুলোতে ঘুরে বেড়াত, এখন এমি ওর সঙ্গী হল। এমি ওকে আরও নতুন নতুন জায়গায় নিয়ে যেত। সারাদিন ঘুরে ঘুরে বেড়াত, কখনও সমুদ্রতটে হাত ধরাধরি করে বসে থেকে প্রকৃতিকে উপভোগ করার চেষ্টা করত। কখনও আবার এমির পছন্দের রেস্তোরাঁগুলোতে গিয়ে নানা ধরনের কুইজিনের স্বাদ গ্রহণ করত।

এরই ফাঁকে ফাঁকে গল্প করতে করতে দুজনেই একে অপরের সম্পর্কে অনেক কিছু জানতে পারল। এমির ঠাকুরদার পরিবার ১৯৪৭ সালে লখনউ ছেড়ে ভারত থেকে করাচি চলে যায়। এমির ঠাকুরমা লখনউ-র মেয়ে ছিলেন। ওনার আত্মীয়রা এখনও লখনউ-তে রয়েছেন আর ঠাকুরদার পরিবার ১৯৬০ সালে নিউইয়র্ক চলে আসে তখন এমির বাবা আর জেঠু দুজনেই ছোটো।

আমেরিকার উন্মুক্ত বাতাসেও এমির ঠাকুরদা দুই সন্তানকে নিজের সংস্কৃতির শিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলেন। অনুশাসনের গন্ডিতে বেঁধে রাখেন যাতে খোলা হাওয়ায় যত্রতত্র তারা ভেসে বেড়াতে না পারে। বড়ো সন্তানের প্রতি শাসন বেশি করার ফলে এমির জ্যাঠামশাই অল্প বয়সেই ধার্মিক পথ অবলম্বন করে মৌলবি হয়ে যান। এখনও তিনি নিউইয়র্কেই থাকেন।

এমির জ্যাঠামশাইকে কট্টর ধর্মাবলম্বী হয়ে উঠতে দেখে এমির ঠাকুরদা ছোটো ছেলেকে অর্থাৎ এমির বাবার উপর অতটা শাসন চাপাবার সাহস করেননি। এমির বাবা ইকোনমিক্সের প্রফেসর এবং তিনি নিজের আমেরিকান সহপাঠিনীকে পরবর্তী কালে বিয়ে করেন। ‘ন্যান্সি’ নাম ও ধর্ম পরিবর্তন করে ‘নার্গিস’ নাম নেন এবং মুসলিম পরিবারের আদর্শ বউমা হয়ে ওঠেন। এমির ঠাকুরদা আজ আর বেঁচে নেই কিন্তু ঠাকুমা আজও জীবিত এবং এমির পরিবার অত্যন্ত সুখী পরিবার।

এমি বড়ো হয়ে ওঠে আমেরিকা ও ভারতীয় সংস্কৃতির সংমিশ্রণে। বাড়িতে উর্দু ভাষায় কথা বলার চলন ছিল। এমি উর্দু ভালো মতোই জানত কিন্তু ইংরেজিতে কথা বলতেই ও বেশি স্বচ্ছন্দ বোধ করত। নানা বিষয়ের উপর এমির দক্ষতা ও জ্ঞান সমীরণকে মুগ্ধ করত। সমীরণ বেশ বুঝতে পারত ওর নিজের মনের অনেকখানি জায়গা জুড়ে রয়েছে এমি। কিন্তু মনের ভিতর চলতে থাকা দ্বন্দ্বটাও সমীরণ অস্বীকার করতে পারত না –এই সম্পর্কের পরিণাম কী? হিন্দু ও মুসলিম পরিবারের মানুষরা কী চোখে দেখবেন এই বন্ধুত্বের গভীরতাকে, বিশেষ করে দুটি ভিন্ন দেশের ধর্মাবলম্বী দুটি মানুষের মধ্যে গড়ে ওঠা প্রেমকে?

ছয় মাসের বেশি হয়ে গিয়েছিল দুজনের পরিচয়ের। এর মধ্যেই সমীরণ আর এমি একে অপরকে পাওয়ার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠল। নিজের বাড়ির সকলের সঙ্গে পরিচয় করাবার জন্য এমি সমীরণকে বাড়িতে নিমন্ত্রণ করল। অফিসের কলিগ এবং বন্ধু হিসেবেই বাড়ির সকলের সঙ্গে সমীরণের পরিচয় করিয়ে দিল। এমির ঠাকুমাকে দেখে সমীরণের নিজের ঠাকুমার কথা মনে হল। এমির বাবা প্রফেসর হলেও অত্যন্ত হাসিখুশি একজন মানুষ। সমীরণের সঙ্গে বন্ধুত্ব হতে বেশি সময় লাগল না। তার ওপর আবার দুজনেই ফুটবলপ্রেমী। বিশেষ করে সিয়াটেল-এর নিজস্ব ফুটবল টিমের প্রশংসায় দু’জনেই একমত।

এমির মা-কেও সমীরণের খুব ভালো লাগল। অত্যন্ত রুচিশীল এবং শালীনতা বোধ সম্পন্ন। এমিও একদম ওর মায়ের মতনই হয়েছে বলেই মনে হল সমীরণের। এমির ঠাকুমা নিজের দেশের লোক পেয়ে একেবারে গদগদ হয়ে পড়লেন। লখনউ শহরে ছোটোবেলার কাটানো নানা গল্পের ঝোলা খুলে বসলেন সমীরণকে পেয়ে।

সমীরণ লক্ষ্য করল সকলে ওর সঙ্গে উর্দু মিশ্রিত হিন্দি ভাষায় কথা বললেও নিজেদের মধ্যে শুধুমাত্র উর্দুতেই কথা বলছেন অবশ্য সমীরণের বুঝতে খুব একটা অসুবিধা হচ্ছিল না। হস্টেলে থাকতে সমীরণের দু’তিনজন উর্দুভাষী বন্ধু ছিল, ফলে আজ এমির বাড়িতে ওর খুব একটা অসুবিধা হল না। আর একটা জিনিস খেয়াল করল সমীরণ, এমির সঙ্গে সকলে উর্দুতে কথা বললেও এমি উত্তরগুলো সবই ইংরাজিতে দিচ্ছে এবং মাঝেমধ্যে হিন্দিও ব্যবহার করছে ও।

সবমিলিয়ে এমির বাড়ির পরিবেশে এমন একটা আপনত্ব ছিল যেটা প্রবাসের মাটিতে সমীরণের একাকিত্ব সম্পূর্ণ মুছে দিল। সারাটা দিন হাসি-গল্পে কাটিয়ে সন্ধের মুখে সকলের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে সমীরণ বাড়ি ফেরার জন্য উঠে পড়ল। এমির পরিবারও সমীরণের কাছ থেকে আবার আসার প্রতিশ্রুতি নিয়ে তবে সমীরণকে ছাড়ল।

সমীরণ চলে যাওয়ার পর এমি নিজের পরিবারের মুখোমুখি হল, সমীরণ সম্পর্কে সকলের মতামত চাইল। সকলেরই সমীরণকে ভালো লেগেছিল। সকলে একমত হলে এমি এই প্রথম সকলকে জানাল যে ও সমীরণকে বিয়ে করতে চায়।

‘কিন্তু ছেলেটি হিন্দু এবং ভারতীয়। সুতরাং ওর সঙ্গে তোমার বিয়ে কখনওই সম্ভব নয়’, এমির বাবা প্রথম প্রতিবাদ জানালেন।

এমির মা-ও এতক্ষণ চুপ করে মেয়ের কথা শুনছিলেন। এবার তিনিও মুখ খুললেন, ‘এমি, ছেলেটির সঙ্গে তোমার পরিচয় মাত্র কয়েক মাসের। এমনও তো হতে পারে, গ্রিন কার্ড পাওয়ার লোভে ও তোমাকে বিয়ে করতে চায়। আমেরিকান সিটিজেন না হলে তোমার হুটহাট কাউকে বিয়ে করা উচিত নয়।’

সবার কথা শোনার পর এমি ধীরে ধীরে সমীরণ সম্পর্কে সব কথা খুলে বলল বাড়ির সকলকে। সমীরণ হিন্দু, ভারতীয় এবং ওর পুরো পরিবার ভারতে থাকে। চাকরিসূত্রে ও আমেরিকায় এসেছে এবং যে-কোনও দিন ও ভারতবর্ষে ফেরত যেতে পারে।

এমির কথা শুনে ওর মা-বাবা আর ঠাকুমা সকলেই এক বাক্যে আপত্তি জানাল যে, হিন্দু ছেলের সঙ্গে এমির বিয়ে কিছুতেই হতে পারে না।

‘কিন্তু এতক্ষণ তো তোমাদের সকলেরই খুব পছন্দ ছিল সমীরণকে। এখন ও হিন্দু আর ভারতীয় হওয়াতে হঠাৎ কী করে খারাপ হয়ে গেল সেটা আমি কিছুতেই বুঝতে পারছি না’, এমি না বলে পারে না। ‘ড্যাডি, তুমি আর মম-ও তো আলাদা আলাদা ধর্মের হওয়া সত্ত্বেও বিয়ে করেছিলে। তাহলে তোমরা কী করে এই কথা বলতে পারছ?’

‘এমি, আমি তোমার মম-কে বিয়ে করে নিজের বাড়ি নিয়ে এসেছিলাম। এই পরিবারের সংস্কৃতিকে ও আপন করে নিয়েছিল। এছাড়াও ইসলাম ধর্মে ও ধর্মান্তরিত হয়েছিল। কিন্তু তুমি বিয়ে করে অন্য বাড়িতে যাবে সুতরাং তফাত তো আছেই। ছেলেটি যদি তোমাকে হিন্দু ধর্ম গ্রহণ করতে বাধ্য করে তাহলে তো তোমার আখরত (মৃত্যুর পর জীবন)-ও বরবাদ হয়ে যাবে।’

এমি বুঝতে পারে, এই মুহূর্তে তর্ক চালিয়ে কোনও লাভ নেই বরঞ্চ সমীরণের সঙ্গে বসে একটা সিদ্ধান্তে আসা দরকার।

পরের দিন অফিস ছুটির পর এমি সমীরণের সঙ্গে বেরিয়ে একটা রেস্তোরাঁয় এসে মুখোমুখি বসল। ‘সমীরণ আমার বাড়িতে কারও মত নেই যে আমি তোমাকে বিয়ে করি। এর একমাত্র কারণ হচ্ছে তুমি হিন্দু এবং ভারতীয়। আমার জীবনের এত বড়ো একটা টার্নিং পয়েন্টে আমি চেয়েছিলাম বাড়ির সকলে আমার পাশে থাকুক। ধর্ম বা দেশ নিয়ে আমাদের যেখানে কোনও প্রবলেম নেই সেখানে ওদের অসুবিধাটা কোথায়? আমরা যখন খুশি বিয়ে করতে পারি, কেউ আমাদের আটকাতে পারবে না। কিন্তু সমীরণ আমি চাই আমাদের দুজনের ফ্যামিলি খুশিমনে আমাদের বিয়েতে মত দিক।’

এমির কথা শুনে সমীরণ এমিকে আশ্বাস দেয়, ‘চিন্তা কোরো না, শুধু বলো তুমি আমার পাশে আছো তো?’

‘অবশ্যই, সমীরণ।’

‘ঠিক আছে। তাহলে একটা কাজ করো, তোমার বাড়ির সকলের সঙ্গে আমার আর একটা দিন দেখা করার ব্যবস্থা করে দাও।’

রবিবার সমীরণ এমিদের বাড়ি যাওয়ার জন্য তৈরি হয়ে নিল। ঠাকুমা হিন্দি সিনেমার ভক্ত সুতরাং নতুন কয়েকটা ছবির ডিভিডি আর এমির মায়ের জন্য কাবাব কিনে সমীরণ ওদের বাড়ি গিয়ে পৌঁছোল। ডিভিডি এবং কাবাব পেয়ে ওনারা খুশি হলেন, সমীরণকে ধন্যবাদ জানালেন। এমির বাবার ঠান্ডা ব্যবহারে সমীরণ বিন্দুমাত্র বিচলিত হল না। প্রফেসর সাহেবের সঙ্গে বসে ওনার পছন্দের ফুটবল খেলা নিয়ে নানা আলোচনা করতে করতে মানুষটিকে অনেক সহজ করে তুলল সমীরণ।

পরিবেশ কিছুটা স্বাভাবিক হলে সমীরণ সোজাসুজি যে-জন্য এখানে আসা সেই বিষয়টি উত্থাপন করল, ‘আন্টি, আংকল, দাদি, আপনারা তিনজনেই জানেন আমি আর এমি পরস্পরকে ভালোবাসি, বিয়ে করে সারাজীবন একসঙ্গে থাকতে চাই। কিন্তু বিয়ের জন্য আপনাদের সম্মতি পাওয়া আমাদের জন্য খুব জরুরি। সিটিজেনশিপ পাওয়ার জন্য আমি এই বিয়ে করছি না। আপনাদের জেনে রাখা ভালো, যে-কোম্পানিতে আমি আছি ওরাই আমার গ্রিন কার্ডের জন্য অ্যাপ্লাই করে দিয়েছে। হ্যাঁ আমি হিন্দু এবং আমি ভারতীয় যেটা আমি বদলাতে পারব না বা বলতে পারেন বদলাতে চাই-ও না। ইন্ডিয়া আমার দেশ সুতরাং মাঝেমধ্যেই আমি ওখানে যাব।

আর মা-বাবার প্রয়োজনে আমি নিশ্চয়ই তাঁদের পাশে গিয়ে দাঁড়াব… একই ভাবে আপনাদের প্রয়োজনেও আমি আপনাদের পাশে থাকব। আর ধর্ম নিয়ে আপনাদের আপত্তি কিন্তু ধরুন আমি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করলাম কিন্তু মনে মনে হিন্দুই রয়ে গেলাম, এই ক্ষেত্রে আপনারা কি কিছু করতে পারবেন? ধর্মের নামে আমরা মনে মনে যার পুজো করি বা মানি তাকে কি আমরা কেউ চোখে দেখেছি? শুধু কোন নামে তাকে ডাকা হবে সেই নিয়ে লড়াই। দুটো মানুষ একে অপরকে ভালোবাসে অথচ তারা ঈশ্বরকে আলাদা আলাদা নামে ডাকে বলে তারা বিয়ে করতেপারবে না, এ কেমন ধর্মের বিচার?’ সমীরণ চুপ করে।

সমীরণের বলা শেষ হলেও সকলে অনেকক্ষণ চুপচাপ বসে থাকে কারণ সকলেই মনে মনে জানে সমীরণ যা বলেছে তা পুরোপুরি সত্যি।

কিন্তু প্রফেসরের মনে ভয় ছিল ওখানকার মুসলিম সমাজ এবং তাঁর নিজের বড়ো দাদা এই বিধর্মী বিয়েতে মত দেবে কিনা। আমেরিকাতে এসেও একটা আলাদা পাকিস্তানি মুসলিম সমাজ কেমন করে যেন নিজে থেকেই গড়ে উঠেছিল। সব ধর্মের লোক পাশাপাশি থাকলেও বিয়ে এবং অন্যান্য রীতি রেওয়াজ নিজের নিজের ধর্মের মধ্যেই করাটা সকলে পছন্দ করত।

হ্যাঁ, স্কুল, কলেজ, অফিসের বন্ধু-বান্ধবদের মধ্যে বিয়ে হয় না এমন নয়, সে আলাদা আলাদা জায়গারই হোক না কেন, তবুও মন্দির বা মসজিদে যারা নিত্য সঙ্গী তারা এই ব্যাপারটা পছন্দ করে না এটা ঠিক। প্রফেসরের ভয় এদেরকে নিয়েও ছিল না। তাঁর প্রধান ভয়ের কারণ ছিল নিজের বড়ো দাদা…

এমির পরিবার ধীরে ধীরে সমীরণকে আপন করে নিল। প্রায়শই আসা-যাওয়া করতে করতে নিজের স্বভাবের গুণে সকলের মন জয় করে নিল সমীরণ। ছুটির দিনে এমির বাড়িতে এসে ঠাকুমাকে হিন্দি ফিলম দ্যাখানো থেকে শুরু করে প্রফেসর সাহেবকে নানা কাজে সাহায্য করা এমনকী এমির মা-কেও কিচেনে হেল্প করত সমীরণ।

এমির বাবা মাঝে মাঝে হেসে বলতেন, ‘এতদিন বাড়িতে তিনজন মহিলার তত্ত্বাবধানে আমাকে থাকতে হতো… সমীরণ তুমি আসাতে আমি নিঃশ্বাস ফেলে বাঁচছি।’

বাড়ির বড়োরা আশেপাশে না থাকলে সমীরণ এমির কাছে দুঃখ করত, ‘এমি তোমাকে ভালোবেসে আমি বাড়ির জামাই তো এখনও হতে পারলাম না, কিন্তু রামু হয়ে উঠছি। তুমি যদি আমাকে ডিচ্ করে পাকিস্তানি কাউকে বিয়ে করে নাও তাহলে?’

এমিও সঙ্গে সঙ্গে হেসে উত্তর দিত, ‘ইউ নেভার নো।’

প্রফেসর, মনের আয়নায় সমীরণ আর এমিকে একসঙ্গে কল্পনা করতেন। সমীরণকে দেখে এমির চোখে মুখে খুশি উপচে পড়তে দেখতেন। নিজের মনকে বোঝাতেন, আল্লাহ্-কে কেউ যদি ঈশ্বর বলে তাতে দোষের কি আছে? পুজো করাটা তার নিজের ইচ্ছে… এমিকে তো সমীরণ জোর করছে না পুজো করতে…

সাহস করে একদিন নিউইয়র্কে নিজের দাদাকে ফোন করলেন প্রফেসর, ‘ভাইজান, এমি বিয়ে করবে বলে নিজেই একটি ছেলেকে পছন্দ করেছে। ওরা খুব তাড়াতাড়ি বিয়েটা করতে চাইছে। তবে ছেলেটি হিন্দু।’

‘হিন্দু ছেলে কেন? পাকিস্তানি ছেলের কি আকাল পড়েছে?’

‘এমির সমীরণকেই পছন্দ।’

‘হ্যাঁ হবেই তো, আমেরিকান মায়ের মেয়ে তো।’

‘ভাইজান, ছেলেটি খুবই ভালো।’

‘কী বলছিস তুই? কাফের-কে জামাই করবি?’ ভাইজান চিৎকার করে ওঠেন।

প্রফেসর ভাইজানকে শান্ত করার বৃথা প্রচেষ্টা চালিয়ে যান,’ ভাইজান আপনি তো জানেন এখানে বাচ্চারাই কোনও কথা শুনতে চায় না, বেশি জোরজবরদস্তি করলে কল করে পুলিশ ডেকে নেয়। আর বড়ো হয়ে তো ওরা আরও স্বাধীনচেতা হয়ে ওঠে। এমি আমাদের সম্মতি চাইছে এটাই তো বড়ো কথা। আমরা হ্যাঁ করলেই ওদের লাইফটা সেটল হয়ে যায়।’

ভাইজান কী ভেবে সম্মতি জানান, ‘ঠিক আছে। ছেলেটি যদি ইসলামে ধর্মান্তরিত হয় তবে এই বিয়ে হওয়া সম্ভব।’

‘না ভাইজান, ছেলেটি এতে রাজি নয়। ও তো এমিকেও ধর্ম পরিবর্তন করতে বলেনি।’

ফোনের ভিতরেই বাজ পড়ল মনে হল। ভদ্রতার মুখোশ খসে পড়ল ভাইজানের। চিৎকার করে উঠলেন ফোনের ওপার থেকে, ‘কাফেরের সঙ্গে নিকাহ্ কিছুতেই হতে পারে না। তুমি যদি এই বিয়ে দাও তাহলে আমার সঙ্গে তোমার আর কোনও সম্পর্ক থাকবে না… আমাকেও সমাজে মাথা উঁচু করে চলতে হবে। যদি সবাই জেনে যায় আমার ভাইয়ের মেয়ে হিন্দু বিয়ে করেছে, তাহলে সমাজে আমার সম্মান থাকবে না।’

ভাইজানের সম্মতি না পাওয়াতে প্রফেসর মনে মনে আরও দমে গেলেন। চিন্তায় চিন্তায় রাতের ঘুম চলে গেল। অসুস্থ হয়ে পড়াতে এমি জোর করে হাসপাতালে ভর্তি করে দিল। সমীরণ আর এমি পালা করে প্রফেসরের দেখাশোনা করতে লাগল এমনকী মা আর দাদিকেও বেশি হাসপাতালে দৌড়াদৌড়ি করতে দিত না ওরা।

কিছুদিন পর হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়ে প্রফেসর বাড়ি চলে এলেন। কিন্তু তখনও শরীর সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে না ওঠাতে যত্নের যেমন প্রয়োজন ছিল, তেমনি খাবারদাবারেও প্রচুর রেস্ট্রিকশন ডাক্তার বেঁধে দিয়েছিল। সমীরণ ছেলের সমস্ত দায়িত্ব পালন করল এমনকী অফিসে এমির কাজেও সাহায্য করে দিত, যাতে মেয়ে বাবাকে বেশি সময় দিতে পারে।

প্রফেসরের বন্ধুবান্ধব দু’একবার এসে ওনার খোঁজখবর নিয়ে গেল। ভাইজানও ফোনেই ভাইয়ের খবরাখবর করলেন।

অসুস্থ অবস্থায় কেউ দেখতে এলে ভালোই লাগে তবে আমেরিকায় এসবের জন্য কারও কাছেই সময় থাকে না। সমীরণ প্রতিদিন প্রফেসরকে দেখতে আসত অফিস ফেরত। প্রফেসরের ভালো লাগত। ওনার মনে হতো নিজের ছেলে থাকলেও সেও বোধহয় সমীরণের মতো এতটা যত্ন করত না। সবার যত্নে প্রফেসর তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে উঠলেন। সুস্থ হয়েই সমীরণকে ডেকে ডিজ্ঞেস করলেন, ‘বাড়ির সঙ্গে বিয়ের ব্যাপারে কথা বলেছ? ওনাদের কী মত?’

সমীরণ জানাল, ‘মা-বাবার সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। আমি ওনাদের রাজি করিয়ে নিয়েছি… প্রথমটা একটু অমত করেছিলেন কিন্তু এমির সঙ্গে কথা বলাতেই ওদের এমিকে খুব ভালো লেগে যায়। আমার মা-বাবা ধর্ম, জাতি এইসব নিয়ে একেবারেই মাথা ঘামান না। শুধু পাকিস্তানি বলে একটু দ্বিধায় ছিলেন। ওনাদের কাছে আমার পছন্দই শেষ কথা।’

সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠে প্রফেসর একটা পার্টির আয়োজন করলেন। যেখানে সমস্ত বন্ধু, প্রতিবেশীদের সামনে এমি এবং সমীরণের বিয়ের ঘোষণাও করে দিলেন। প্রফেসর খুব ভালো করেই জানতেন এই বিয়েতে খুব বেশি অতিথি আসবে না। দুই পরিবারের উপস্থিতিতে স্পেশাল ম্যারেজ অ্যাক্ট-এ কোর্টে রেজিস্ট্রি করে সমীরণ আর এমির বিয়ে হয়ে গেল। বিয়ের পর হোটেলে রিসেপশন রাখা হল যেখানে পরিচিতরা এবং অফিসের কলিগরা এসে পার্টি জমজমাট করে তুললেন।

ভাইজান এবং তাঁর বিচারধারায় বিশ্বাসী কিছু মানুষ নিজেদের দূরত্ব বজায় রেখে অনুষ্ঠানে যোগদান করলেন না। কিন্তু তাতে কিছুই আটকাল না। শুধু দুজন মানুষ প্রেমের উড়ানে স্বপ্নের জগৎ গড়ে তুলতে আরও কয়েক ধাপ অগ্রসর হল।

পড়ার জন্য সীমাহীন গল্প-নিবন্ধসাবস্ক্রাইব