ফাঁদ

হাতকাটা গোপাল ঘরে বসে ভোজালিটা একটু ধার দিয়ে নিচ্ছিল। গোপাল জীবনে এমন কোনও বাজে কাজ করতে বাদ রাখেনি। এক সময়ে টাকার জন্য ওয়াগন ব্রেকারদের সাথে রাতের পর রাত কাজ করেছে। তারপর একটা রাজনৈতিক দলে ঢুকে সত্তর-একাত্তর সালে অনেক বোমাবাজি করেছে। তাদের হয়ে বোমা বেঁধেছে। কয়েক বছর আগে বোমা বাঁধতে গিয়ে ওর একটা হাত উড়ে যাওয়ায় সবাই ওকে হাতকাটা গোপাল হিসেবেই চেনে।

কিছুদিন বর্ষাতিয়ার দলেও কাজ করেছে। এখন নিজের দল

বানিয়ে কাজকর্ম চালায় তাই বর্ষাতিয়ার সাথে প্রায়ই গণ্ডগোল লেগেই থাকে। আজকাল অপরাধ জগতে বেশ নাম-ডাকও হয়েছে। তবে গর্ব করে বলে যে গোপাল বা তার দল কোনও মেয়ের দিকে ফিরেও তাকায়নি। আর ওর এই গুণটার জন্য পাড়ার লোকেরাও ওকে নিয়ে মাথা ঘামাত না।

হঠাৎ দরজা খোলার আওয়াজ হতেই ঘরের এককোণে ভোজালিটা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে গেল। কারণ ওর দলের সকলকে বলা আছে, কেউ দরজায় আওয়াজ না দিয়ে ঘরে ঢুকবে না। দরজার দিকে তাকিয়ে দেখল ‘জাসসি’ ঘরে ঢুকছে। মুখে সেই ভুবন ভোলানো হাসি। জাসসি এখন অপরাধ জগতের ‘বিউটি কুইন’ নামেই পরিচিত। গোপাল জাসসি-র দিকে তাকিয়ে ভাবছে– মেয়েটা সুন্দরী এতে কোনও সন্দেহ নেই। শ্যাম্পু করা কালো রেশমের মতো চুল ঘরের আলোয় চকচক করছে। ওকে দেখে আর যাই হোক কুখ্যাত একটা চোরের দলের সদস্য বলে মনে হয় না।

–কিরে তুই এই অসময়ে? আমি-তো অন্য কেউ ভাবছিলাম।

–এসেছি একটা কাজে। বলেই হাতের ব্যাগটা টেবিলে রেখে একটা চেয়ার টেনে বসে পড়ল।

ভুবন ভোলানো হাসি দিয়ে গোপালকে কাত করার চেষ্টা করল। এই হাসিটাই ওর একটা বড়ো সম্পদ। বলল– গোপাল, আমার ধারণা আমরা একজন আর একজনকে ভালোমতো বুঝতে পারি। সেটা বুঝতে পেরেছি বর্ষাতিয়ার দলে একসাথে কাজ করতে গিয়ে। আর এখন এটাও জেনে গেছি যে বর্ষাতিয়ার সাথে তোর

সাপে-নেউলের সম্পর্ক।

–তা তোর আসার উদ্দেশ্যটা কী বল। কী খাবি? ঠান্ডা না গরম?

–না থাক। আজ হাতে সময় নেই। তাছাড়া কেউ জানতে পারলে এতক্ষণে খবর পৗঁছে যাবে বর্ষাতিয়ার কাছে।

–তুই তো আজকাল বর্ষাতিয়ার খুব ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠেছিস। এমনকী শুনেছি তুই নাকি বর্ষাতিয়ার লাইফ পার্টনার হতে চলেছিস?

–সব বাজে কথা। আজকাল বর্ষাতিয়া রুমি-র সাথে খুব ঢলাঢলি করছে। অযোগ্য মেয়েটার প্রেমে মজে ওর পরামর্শে আমাকে দল থেকে বের করে দিয়েছে। এত খারাপ লাগছে তোকে কি বলব। আমার মাথায় এখন অপমানের আগুন দাউ-দাউ করে জ্বলছে। আর সে জন্যই তোর কাছে এসেছি।

–বলে ফ্যাল। তুই কি আমার দলে যোগ দিতে এসেছিস? তা যদি ভেবে থাকিস তাহলে সরি, আমি তোকে নিতে পারব না। আমার দলে আমি জেনেশুনেই কোনও মেয়েকে রাখি না। শালা, মেয়ে এলেই লাফরা শুরু হয়ে যাবে। আর তুই তো এমনিতেই মক্ষীরানি। তাই ঝগড়াটা বেশ ভালোই হবে। তুই তো সবাইকে খেলিয়ে বেড়াবি সিনেমার নায়িকাদের মতো।

মৃদু হেসে জাসসি জবাব দিল– বোকার মতো কথা বলিস না গোপাল। কোটি টাকা দিলেও আমি তোর দলে কাজ করব না। ধূর্ত শিয়ালকে বিশ্বাস করা যায় কিন্তু তোকে যায় না। যাক সে কথা। আমি এসেছি তোকে সাবধান করে দিতে।

মৃদ শিস দিতে দিতে গোপাল বলল– বল, কী বলতে এসেছিস।

–ভাবিস না হঠাৎ তোর প্রেমে পড়ে গিয়ে তোকে সব বলতে এসেছি। আমি এসেছি বর্ষাতিয়ার অবিচারের বদলা নিতে। তুই তো জানিস, দিল্লি থেকে অ্যান্টিক জিনিসের ব্যবসায়ী রামলাল আগরওয়াল এসেছে শহরে নিলামে একটা অ্যান্টিক দামি হরিণ বিক্রি করার জন্য, যেটার দাম এর মধ্যেই পঞ্চাশ লাখের ওপর উঠে গেছে। বড়ো অঙ্কের বিমা পলিসিও করিয়েছে জিনিসটার জন্য…।

–জানি, অ্যান্টিক হরিণটা সোনার তৈরি আর ওটার গায়ে নানা রকম দামি দামি রত্ন বসানো। সম্রাট আকবরের আমলের জিনিস ওটা। আগের আমলে মুখশুদ্ধি বা মশলা-দানি হিসেবে ব্যবহার করা হতো ওই হরিণটা। শুধু তাই নয়, ওই হরিণটার পেটের জায়গাটাতে যেখানে মশলা রাখা হতো সেখানে একটা দামি হিরাও রাখা আছে।

ধানাই-পানাই ছেড়ে তুই আমাকে কেন এসব শোনাচ্ছিস সেটা বল।

–বর্ষাতিয়া জেনে গেছে যে তুইও হরিণটার পেছনে লেগে আছিস।

–জেনেছে তো কি হয়েছে? বয়েই গেলো। তুই কি আমাকে সাবধান করতে এসেছিস? এটা হল বিজনেস। আমি শালা বর্ষাতিয়ার বাবার পয়সায় খাই না বুঝলি। গিয়ে বলে দিস তোর বসকে। আসল কথাটা বল।

–শোন তাহলে,  রামলাল আগরওয়াল যে-বাড়ির ফ্ল্যাটে উঠেছে, সেই বাড়ির ঠিক ওপরের ফ্ল্যাটে তুই তোর দলের আববাসকে ভাড়াতে থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছিস কারণ তুই আগেই ওই রেনডিয়ারটা হাতাতে চাস। বর্ষাতিয়ার ধারণা যে ওই রামলাল আগরওয়ালকে চোখে চোখে রাখার জন্যই তুই এটা করেছিস। তোকে সে সুযোগ দিতে চায় না বর্ষাতিয়া। আগামীকাল রাতেই বর্ষাতিয়া ওটা চুরি করতে চায়। এখন তোর উচিত, তার আগেই কাজটা সেরে ফেলা। বর্ষাতিয়া, আগরওয়ালের ফ্ল্যাটের নকল চাবি বানিয়ে ফেলেছে। ওর আয়রন সেফ খোলার পিন নম্বরও জোগাড় করে ফেলেছে। আমি সেগুলো চুরি করে নিয়ে এসেছি।

আমি জানি আমাকে ধরে ফেললে বর্ষাতিয়া আমাকে মেরে ফেলবে তাই আগামীকাল শহর ছেড়ে দেব ঠিক করেছি। তবে ভাবিস না আমি বিনা স্বার্থে এটা করছি। আমার বদলা নেওয়াও হবে আর আমার অর্ধেক ভাগ চাই আগামীকাল সকালে। তোকে আজ রাতের মধ্যেই কাজটা করতে হবে। হাতে সময় বেশি নেই। রামলাল আগরওয়াল এখন গ্র্যান্ড হোটেলে গেছে। সেখানে মদ খেয়ে নাচানাচি করছে। ফিরতেও অনেক রাত হবে। তাই আজই সবচেয়ে ভালো সুযোগ। দেরি করিস না। কাজটা চুপচাপ করে ফেল। আর আমি জানি একমাত্র তুই-ই পারবি এটা করতে। তুই যদি ওটা বিক্রির টাকা আমাকে না-ও দিস আমার দুঃখ নেই। আমি বর্ষাতিয়ার থেকে প্রতিশোধ নিতে পারলেই খুশি।

–আমাকে একটু ভাবতে দে জাসসি।

গোপাল কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। নীরবে ভোজালিটার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল। কিন্তু মনটা অন্য কোথাও পড়ে আছে। দেখেই বোঝা যায় কি একটা চিন্তা করছে। এমন সময় বাইরে থেকে হরবোলা মন্টুর আওয়াজ শোনা গেল। মন্টুকে এলাকার সবাই চেনে। মুখ দিয়ে নানা রকম আওয়াজ করে কিছু উপার্জন করে আর বাচ্চাদের আনন্দ দেয়। উঠে গিয়ে জানলার সামনে দাঁড়াল গোপাল। দেখল মন্টু ওর দিকে তাকিয়ে আছে। গোপাল বুঝল, ওকে কোনও জরুরি খবর দিতে এসেছে। মাঝে মাঝেই দেয়। কারণ, মন্টু হরবোলা ওর চর।

জাসসি কে উদ্দেশ্য করে বিরক্তির ভঙ্গিতে বলল– দেখলি তো কি রকম আওয়াজ শুরু করেছে। টাকা না দিলে যাবে না, এরকম ভ্যা ভ্যা করতে থাকবে। যাই, দুটো টাকা দিয়ে আসি।

ঘরের বাইরে সামনের গেট দিয়ে না বেরিয়ে পেছনের গেট দিয়ে নিঃশব্দে বেরিয়ে গেল। দেয়ালের ছায়ায় দাঁড়িয়ে রাস্তার অন্য পাড়ে তাকিয়ে দেখল বেশকিছু বাচ্চার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে মন্টু হরবোলা। ইশারায় কাছে ডাকল। পকেট থেকে একটা একশো টাকার নোট বের করে মন্টুর দিকে এগিয়ে দিয়ে জিজ্ঞাসা করল– কি গো মন্টুদা, কোনও খবর আছে নাকি?

পাঞ্জাবির ছেঁড়া পকেট থেকে ডান হাতটা বেরিয়ে এল মন্টুর। গোপালের হাত থেকে টাকাটা নেওয়ার সময় একটুকরো কাগজ গুঁজে দিল গোপালের হাতে।

–সাবধানে থাকবেন, গোপালদা, এই কাগজে সব লিখে দিয়েছি, পড়লেই বুঝতে পারবেন। তারপর গোপালের দেওয়া ক্র্যাচে ভর দিয়ে খোঁড়াতে খোঁড়াতে চলে গেল।

গোপাল আবার বাড়ির দরজার কাছে ফিরে এল। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে কাগজটা ভালো করে পড়ে ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে বড়ো হাইড্রেনে ফেলে দিল। দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে দেখল জাসসি টিভিটা খুলেছে। গোপাল ঘরে ঢুকতেই জাসসি জিজ্ঞাসা করল– গোপাল, কী ঠিক করলি? হাতে কিন্তু তোর বেশি সময় নেই। আজ রাতের মধ্যেই কাজটা সারতে হবে।

গোপাল মাথাটা ঝাঁকাল। বলল– কাজটা হয়ে যাবে জাসসি। কাল সকালে খবর পেয়ে যাবি।

জাসসি একটু মুচকি হাসল, বলল– আমি জানতাম একমাত্র

তুই-ই পারবি, তাই তো তোর কাছেই এলাম। বলে ব্যাগ থেকে একটা চাবি আর এক টুকরো কাগজ বের করে টেবিলে রাখল। বলল– চাবিটা আগরওয়াল-এর ফ্ল্যাটের আর কাগজে লেখা আছে ঘরের ভেতরে যে সেফটা আছে, তার কোড নম্বর। আমি চলি রে। আমাকে এগিয়ে দেওয়ার দরকার নেই। কেউ দেখে ফেলতে পারে। সাবধানে থাকিস। বলেই বেরিয়ে গেল জাসসি। যাওয়ার সময় দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে গেল।

( দুই )

অনেকক্ষণ চুপচাপ দেয়ালের দিকে তাকিয়ে রইল গোপাল। কী যেন চিন্তা করছে। পরিস্থিতিটা বেশ মজার। মোবাইল থেকে  আববাসকে ফোন করল। অনেক কথা হল, কথার শেষে বলল– আববাস, আমি তোর ফ্ল্যাট-এ আসছি। দুজনের কথা হল ফোনে। তারপর চাবিটা আর কাগজে লেখা পিন কোডটা সঙ্গে নিল। রাস্তায় নেমে হাঁটতে শুরু করল অলোকনন্দা অ্যাপার্টমেন্টের উদ্দেশে। বাড়িটা খুব দূরে নয়। হেঁটে যেতে অল্প কয়েক মিনিট লাগল। বাড়ির গেটে পৌঁছে দেখল গার্ড গুমটির ভেতরে বসে বসে ঘুমোচ্ছে। নিঃশব্দে মূল গেটের কোনায় লাগানো ছোটো দরজার পাল্লাটা খুলে ঢুকে পড়ল গোপাল। খুব দ্রুত গতিতে আববাসের ফ্ল্যাটে গিয়ে পৌঁছোল। আববাস সেখানে অপেক্ষা করছিল গোপালের।

গোপাল– আববাস, আমি আগরওয়ালের ফ্ল্যাট-এ যাচ্ছি। তুই ওপরের জানালা থেকে নজর রাখ। কেউ এলে সিগন্যাল দিবি। সিঁড়ি দিয়ে নীচের ফ্ল্যাট-এ নেমে এসে দরজায় কান পেতে বোঝার চেষ্টা করল যে কেউ আছে কিনা। যখন বুঝল ভেতরে কেউ নেই তখন জাসসির চাবি দিয়ে দরজা খুলে ঘরে ঢুকল।

কুড়ি মিনিট পর ঘর থেকে বেরিয়ে, নিঃশব্দে দরজাটা লাগিয়ে, মৃদু শিস দিয়ে আববাসকে ডাকল। সিঁড়িতেই নেমে এল আববাস। তারপর ঘুমন্ত গার্ডের পাশ কাটিয়ে বাইরে বেরিয়ে গেল দুজনে। হন হন করে হাঁটতে হাঁটতে বলল– আববাস, শরবতের সাথে মনে হয় তোর ঘুমের ওষুধটা একটু বেশিই দিয়ে দিয়েছিস। তোর আর ওখানে থাকা চলবে না। বলেই নিজের ফ্ল্যাটের দিকে রওনা হল।

–ঘটনাটা কী গুরু? তুমি যখন আগরওয়ালের ফ্ল্যাটে ঢুকলে, তখন আমি দু-জন লোককে রাস্তার অন্যদিকে দাঁড়িয়ে এই ফ্ল্যাটের দিকে নজর রাখতে দেখেছি। মনে হল সাদা পোশাকে পুলিশের লোক। তুমি পিছনে লক্ষ্য করো, ওরা আমাদের ফলো করছে। হাসল গোপাল, কোনও উত্তর দিল না।

দশ মিনিট পর আববাসকে নিয়ে নিজের বাড়িতে ঢুকল গোপাল। বেরোনোর সময় ঘরের লাইট, ফ্যান ও টিভিটা অন করে গিয়েছিল। গোপাল বলল– আববাস, আজ বর্ষাতিয়ার প্রেমিকা জাসসি এসেছিল। আমাকে বেশ ভালো একটা গল্প শোনাল। বর্ষাতিয়া নাকি অন্য একটা মেয়ের প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে আর তাই জাসসিকে তাড়িয়ে দিয়েছে। জাসসি প্রতিশোধ নিতে চায়, তাই আগরওয়ালের ফ্ল্যাটের নকল চাবি আর আয়রন সেফের কোড নম্বর লেখা কাগজ চুরি করে এনেছে বর্ষাতিয়ার থেকে। সেগুলো আমার হাতে তুলে দিয়ে বলেছে আজই যেন ওই দামি হরিণটা চুরি করে সরিয়ে ফেলি। তাহলে বর্ষাতিয়া আর সেটা পাবে না আর জাসসি-র-ও প্রতিশোধ নেওয়া হবে।

 

জানিস, আমার গল্পটা শুনে খুব কাঁচা মনে হয়েছে। ওটা চুরি করতে হলে আমাকে দিয়ে কেন? জাসসি তো নিজেই চুরি করতে পারত। আপন মনে যখন এসব কথা ভাবছিলাম, তখন হরবোলা মন্টুদা আমাকে সংকেত দিল। আর তখন জাসসি আমার ঘরে বসেছিল। মন্টুদাকে ভিক্ষে দেওয়ার নাম করে নীচে নেমে গেলাম। মন্টুদা কাগজে লেখা একটা মেসেজ দিল। আমাকে সাবধান করে দেওয়ার জন্য। দুদিন আগে মন্টুদা বর্ষাতিয়া, আগরওয়াল আর জাসসি-কে মিটিং করতে দেখেছে। জানলার পাশের টেবিলে বসে কথা বলছিল ওরা। সন্দেহ হওয়ায় মন্টুদা কান পেতে ওদের কথা শুনেছে।

 

আমাকে ফাঁদে ফেলার পরিকল্পনা করছিল ওখানে বসে। জাসসি যখন বলেছিল ও টাকা চায় না, তখনই আমার সন্দেহ হয়েছিল। ও তো টাকার জন্য সব কিছু করতে পারে, তবে টাকার কথা বলাতে আমার সন্দেহটা বেড়ে গিয়েছিল। আর মন্টুদার খবরটা পেয়ে আরও নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিলাম। ওরা জানত, আগরওয়ালের হরিণটার ওপর আমার নজর আছে। ওরা ঠিক করেছিল আমাকে চুরি করার সুযোগ করে দেবে আর পুলিশ ইন্সপেক্টর বদ্যিনাথ দত্ত-কেও জানিয়ে রাখবে। পুলিশ আমার ওপর নজর রাখবে। এভাবে পথের কাঁটা সরাতে চেয়েছে বর্ষাতিয়া। অর্থাৎ কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলা আর কি!

–গুরু, আজকাল তুমি তো বেশ পোড় খাওয়া লোকের মতো কথা বলছ। তোমার দিমাকটাও আজকাল বেশ চলছে।

–তুই আর তেল লাগাস না তো! ওরা বুঝতে পারেনি যে আমি ওদের ফন্দিটা বুঝতে পেরেছি। ওরা হয়তো ভাবছে আমি ওদের ফাঁদে পা দিয়েছি। দেখবি একটু বাদেই হয়তো পুলিশ আসবে আমার কাছে। শুনলাম ওই দামি হরিণটা নাকি ইন্স্যুরেন্স করিয়ে রেখেছে মোটা টাকার। যাতে চুরি গেলে আগরওয়ালের কোনও ক্ষতি না হয়, বেশি টাকা পায়। এককথায় বলতে পারিস, ওরা চেয়েছিল যাতে সাপও মরে লাঠিও না ভাঙে। ওরা এখনও হাতকাটা গোপালকে চেনেনি। ওরা চলে ডালে ডালে আর আমি চলি পাতায় পাতায়। তুই খালি মজাটা দেখে যা। আমি যা যা বলব তাই করে যা।

আববাস জিজ্ঞাসা করল– হরিণটা কি তুমি সঙ্গে করে নিয়ে এসেছ?

–পাগল হয়েছিস? এসব জেনেও সঙ্গে আনব? জায়গা মতো সেট করে এসেছি। তোকে বলব তবে এখন নয় পুলিশের চলে যাওয়ার পর।

আববাস একটু থেমে বলল– আচ্ছা, আমি বুঝতে পারছি না এতে রামলাল আগরওয়ালের কী স্বার্থ আছে?

এমন সময় দরজায় টোকা পড়ল– দরজা খোল। দরজা খোল, নয়তো দরজা ভেঙে ফেলব।

আববাস-এর দিকে তাকিয়ে চোখ মেরে গোপাল এগিয়ে গিয়ে দরজাটা খুলে দিল। দেখল দরজার সামনে সাদা পোশাকে আরও তিনজন পুলিশ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ইন্সপেক্টর বদ্যিনাথ দত্ত। বদ্যিনাথ দত্তকে চেনে না এই শহরে খুব কম লোকই আছে। বিশেষ করে বদ্যিনাথ দত্ত অপরাধ জগতের সবার কাছে এক বিভীষিকা। দরজাটা খুলে দিতেই ঝড়ের মতো ঘরে ঢুকে বলল– মালটা বের করে দে।

–কোন মালটা স্যার?

–ভেবেছিস আমি কোনও খবর রাখি না? রামলাল আগরওয়ালের চুরি যাওয়া দামি হরিণটা। আমি ওটা চাই। তোকে ওখান থেকে বেরোতে দেখেছি।

–স্যার, আমি তো আববাসের কাছে গিয়েছিলাম। বিশ্বাস করুন আমাকে। আপনি যখন এতই শিওর তাহলে খুঁজে দেখুন।

চারজন মিলে তন্নতন্ন করে খুঁজে দেখল ঘরগুলো। জিনিসপত্রগুলো তছনছ করল, ওলট-পালট করে ফেলল। কিন্তু কোথাও সেই দামি হরিণটা খুঁজে পেল না। একঘন্ট৆া ধরে কঠোর পরিশ্রমের পর ঘর্মাক্ত হয়ে হাল ছেড়ে দিল চারজনে। রুমাল দিয়ে কপালের ঘাম মুছতে মুছতে ইন্সপেক্টর বদ্যিনাথ দত্ত হতাশার ভঙ্গিতে সহকারীদের দিকে তাকালেন।

গোপাল হাসিমুখে বলল– স্যার আমি তো আগেই বলেছিলাম যে আমি জিনিসটা নিইনি। প্রথমেই যদি আমার কথা বিশ্বাস করতেন তবে অকারণে আপনাদের এই কষ্টটা করতে হতো না। বরং যদি আমাকে সব ঘটনাটা খুলে বলতেন তাহলে হয়তো অনুমান করতে পারতাম যে ওটা কারা উড়িয়েছে।

ইন্সপেক্টর রেগে গিয়ে বললেন– চুপ কর শালা, আমি কি মজা করছি এতক্ষণ? তোর হিম্মত দেখে অবাক হচ্ছি। আমি চাইলে তোকে ধরে নিয়ে গিয়ে এনকাউন্টার করে দিতাম কিন্তু ওই জিনিসটা না পাওয়া অবধি তোকে মারতে পারব না। দেখ, পালাতে যাস না। পালাতে চেষ্টা করলে কিন্তু কুত্তার মতো মারব।

আমি যে সোর্স থেকে শুনেছি তাতে শিওর ছিলাম যে ওটা এখানেই পেয়ে যাব। আমার ইনফরমেশন ভুল হতে পারে না। দু’ঘণ্টা আগে তুই রামলাল আগরওয়ালের ফ্ল্যাটে গিয়েছিলি আর হরিণটা তুইই চুরি করেছিস।

গোপাল– স্যার, আমার মনে হয় আপনাকে কেউ ভুল বুঝিয়েছে বা ভুল ইনফরমেশন দিয়েছে। মনে হয় রামলাল আগরওয়াল থানায় রিপোর্ট করেছে আর বর্ষাতিয়া বলেছে যে আমিই ওটা লোপাট করেছি। আমি আপনাকে কথা দিচ্ছি আমি পালাব না। তবে আপনাকে কথা দিচ্ছি, আপনি নিশ্চিন্ত হয়ে গিয়ে ঘুমোন। আগামীকাল আমি বারোটা নাগাদ আপনার সাথে দেখা করব। হরিণটা কোথায়, কার কাছে আছে আপনি জেনে যাবেন।

কঠোর দৃষ্টিতে ইন্সপেক্টর গোপালের দিকে তাকালেন। রুক্ষকন্ঠে বললেন– চুপ কর শালা, তুই একটা মহা ধড়িবাজ, শয়তান। তুই ভাবছিস তোকে আমি চিনি না। আমার আগেই ভাবা উচিত ছিল যে তুই তো এত বোকা নয় যে হরিণটা নিজের কাছে রাখবি। আমি শহরের চারিদিকে পাহারা বসিয়ে দিচ্ছি যাতে তুই পালাতে না পারিস। যাই হোক, আমি আজ যাচ্ছি। কাল থানায় ১চ্টায় তোর জন্য অপেক্ষা করব। তুই তো জানিসই ওটা না পেলে বদ্যিনাথ দত্ত কী করতে পারে। তোর ছাল ছাড়িয়ে নেব, হতভাগা। মনে থাকে যেন।

–জানি স্যার, এনকাউন্টার। আপনি নিশ্চিন্তে থাকুন কাল আপনি ওটা পেয়ে যাবেন।

ইন্সপেক্টর বেরিয়ে যাওয়ার পর গোপাল আববাসকে বলল– দেখে নে তো আপদগুলো চলে গেছে কিনা?

–তুমি ঠিকই করেছ গুরু। আজ মালটা হাতছাড়া হয়ে যেত আর তুমিও ফেঁসে যেতে। বেফালতু শালা আমাকেও দুটো ডান্ডা মেরে গেল। তোমার ওটা পেলে যে কি ক্যালাত তা বুঝতে পারছ?

–তাই তো মালটা নিয়ে আসিনি। যা আজ গিয়ে শুয়ে পড়। কাল একটু কাজ আছে।

( তিন )

পরের দিন সকাল দশটায় গোপাল পৌঁছে গেল স্থানীয় ইনসিয়োরেন্স কোম্পানির অফিসে। অফিসে ঢুকেই বলল– ম্যানেজারের সাথে দেখা করতে চাই। পাঁচ মিনিট পর ডেকে পাঠালেন। ম্যানেজার বললেন– বলুন, আপনার কী বলার আছে?

গোপাল– আজ সকালে বিশাল একটা অঙ্কের চুরির ক্লেইম হয়তো আপনি পেয়েছেন। রামলাল আগরওয়ালের কাছ থেকে। কারণ কাল রাতেই আগরওয়াল-এর দামি হরিণটা চুরি হয়ে গেছে আর তাই গতকাল রাতেই আগরওয়াল থানায় ডায়ারি লিখিয়ে এসেছে। গলাটা একটু নীচু করে ফিস ফিস করে গোপাল বলল– জিনিসটা কোথায় আছে আমি জানি।

ম্যানেজার বিস্ময়ের চোখে তাকালেন, বললেন– আপনি জানেন? তাহলে সঙ্গে নিয়ে এলেই পারতেন। বসুন, আমি পুলিশকে খবর দিচ্ছি।

–ওসব এখনই করতে যাবেন না। পুলিশের সাথে আমার কথা হয়ে গেছে। আজই জেনে যাবেন।

–মশাই, যে করে হোক ওটা আমার চাই, নয়তো আমার কোম্পানির অনেক ক্ষতি হয়ে যাবে। আজই আমি একটা প্রেস রিলিজ পাঠিয়েছি তাতে লিখেছি ওই দামি হরিণটার সন্ধান যে দিতে পারবে, তাকে সাত লক্ষ টাকা পুরস্কার দেওয়া হবে। বলেই ফাইল থেকে একটা কপি বের করে দেখালেন। বললেন – আপনি ওটা পাইয়ে দিলে আপনিও টাকাটা পেতে পারেন। তবে আগে নয়।

–ঠিক আছে, আপনি আমাকে চেক দিয়ে ব্যাংকে বলে দিন যাতে আপনার অনুমতির আগে যেন ওটা রিলিজ না করে। কারণ আপনি তো জানেনই আমরা কখন, কোথায় থাকি তার ঠিক নেই। তাছাড়া আমরা অ্যাডভান্স না নিয়ে কাজ করি না।

–ঠিক আছে, তাহলে এই নিন চেক। এতটা ভরসা তো আপনাকে করতেই হবে। তবে মনে রাখবেন চালাকি করতে গেলে কিন্তু একটা পয়সাও পাবেন না বরং জেল যেতে হবে।  বলেই একটা সাত লাখ টাকার চেক লিখে খামে ভরে দিয়ে দিলেন।

গোপাল যেতে যেতে দরজা থেকে আবার ফিরে এসে বলল– আর হ্যাঁ, বেশি চালাকি করবেন না, যদি জিনিসটা পাওয়ার পরও চেকটা ক্যাশ না হয় তবে আমরা কিন্তু কোর্টে কেস করি না। আমাদের হিসেবটা একটু অন্যরকম হয়। এই পৃথিবী থেকেই তাকে সরিয়ে দিই। বিশ্বাস না হয়, এই শহরে যে কাউকে হাত-কাটা গোপালের সম্পর্কে জেনে নেবেন। বলেই দ্রুতবেগে বেরিয়ে গেল।

গোপাল বেরিয়ে যেতেই ভদ্রলোক ব্যাংকে ফোন করে বলে দিলেন যে ওনার সাথে কথা না বলে যেন, চেকটার পেমেন্ট না করা হয়।

গোপাল একটা ট্যাক্সি ভাড়া করে ফিরে এল নিজের বাড়িতে। দেখল বারোটা বাজতে আর বেশি দেরি নেই, তাই যা করার তাড়াতাড়ি করতে হবে। ফোন করে পুলিশ ইন্সপেক্টর ও ইনসিয়োরেন্স কোম্পানির ম্যানেজারকে-কেও কিছু বলল। এরপর ফোন করল কয়েকজনকে।

ঠিক পৗনে বারোটার সময় জাসসি যে হোটেলে থাকে, সে লিফট দিয়ে উঠতে দেখা গেল ওই হোটেলের দারোয়ানকে। হাতে

রং-বেরঙের ফুল দিয়ে সাজানো একটা সুন্দর ফুলের তোড়া। জাসসির ফ্লোরে নেমে ঘরের সামনে গিয়েই কলিং বেলটা বাজাল দারোয়ান। জাসসি দরজা খুলে দিলে তোড়াটা তার হাতে দিল। বলল– কয়েক মিনিট আগে এক ভদ্রলোক তোড়াটা আপনাকে দিতে বলেছেন। না, তাঁর নাম, ঠিকানা কিংবা পরিচয় কিছুই জানাননি ভদ্রলোক। দারোয়ানকে দশটাকার একটা নোট বকশিশ দিয়ে দরজাটা ভেজিয়ে দিল জাসসি। আর ঠিক সেই সময় মোবাইলটা বেজে উঠতেই দৗড়ে গেল মোবাইলটা ধরতে। নম্বরটা অজানা। তাড়াহুড়োতে দরজাটা লক করতেই ভুলে গেল। ফোনটা তুলে নিতেই অন্য দিক থেকে কণ্ঠস্বর ভেসে এল– হ্যালো, জাসসি, আশাকরি ফুলের তোড়াটা তোর ভালো লেগেছে। পরের বার আমাকে ঠকাতে আসার আগে ভেবেচিন্তে আসিস। গুড লাক।

–গোপাল তুই কি বলছিস? এটুকু কথা বলার সাথে সাথেই ফোনটা কেটে গেল।

রাগে লাল হয়ে গেল ওর মুখটা। তোড়াটা ছুড়ে মারল মেঝেতে। মেঝেতে পড়েই তোড়াটার বাঁধন গেল খুলে। ফুলগুলো সব চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ল। আর মেঝেতে একটা ধাতব জিনিস পড়ার আওয়াজ হতেই চমকে উঠল জাসসি। সেটার দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে গেল। ছড়ানো ফুলগুলোর মধ্যে চকচক করছে মনিরত্ন খচিত একটা হরিণ। ওটা হাতে তুলে নিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে অবাক হয়ে দেখতে লাগল জিনিসটা।

ওর বিস্ময়ের ঘোর কাটার আগেই ঝটকা দিয়ে খুলে গেল দরজা। সাদা পোশাকপরা পাঁচজন অফিসারকে নিয়ে ঘরে ঢুকলেন ইন্সপেক্টর বৈদ্যনাথ দত্ত।

ইন্সপেক্টর বললেন– মিস জাসসি, আপনি যে রামলাল আগরওয়ালের দামি হরিণটা চুরি করেছেন তা হাতকাটা গোপাল আমাদের আগেই বলে দিয়েছে। আপনি আর বর্ষাতিয়া মিলে ওকে ফাঁসাতে চেয়েছিলেন।

–মিথ্যে কথা। এটার ব্যাপারে আমি কিছুই জানি না। এইমাত্র গোপালের পাঠানো ফুলের তোড়ার মধ্যে পেলাম। নিশ্চয়ই আমাকে ফাঁসানোর জন্য গোপালই একাজ করেছে।

–চোরাই মাল আপনার কাছে পাওয়া গেছে তাই আপনাকেই আমাদের অ্যারেস্ট করতে হবে। কে কী করেছে, সেটা তদন্ত করলেই বেরিয়ে যাবে। আপাতত আপনাকে আমাদের সাথে থানায় যেতে হবে। একটু থেমে ইন্সপেক্টর বললেন– আর একটা কথা, শুধু গোপাল নয়,  আপনার বস বর্ষাতিয়াও বলেছে, ওই হরিণটা আপনিই চুরি করেছেন।

( চার )

এই সুযোগে গোপাল পৌঁছে গেল ব্যাংকে। প্রায় এক ঘণ্টা বাদে ব্যাংক থেকে বেরিয়ে এল গোপাল। মুখে প্রশান্তির হাসি। হরিণটার সন্ধান দিতে পারার জন্য পুরস্কার হিসেবে চেকটা এনক্যাশ করার অনুমতি দিয়েছে ইনস্যুরেন্স কোম্পানি।

নিজের বাড়ির কাছে আসতেই দেখা হয়ে গেল ইন্সপেক্টর বৈদ্যনাথ দত্তর সাথে। কঠিন হাসি হেসে ইন্সপেক্টর বললেন– টাকাটা যত তাড়াতাড়ি পারিস খরচ করে ফেল গোপাল। তোকে খুব বেশিদিন আর বাইরে থাকতে দেব না। জেলে আমি তোকে ঢোকাবই। যত চালাকিই তুই করিস না কেন! আমি জানি যে ওই হরিণটা তুই-ই চুরি করেছিলিস। এখন শুধু সেটা প্রমাণ করা বাকি।

এটুকু বলেই রাগ দেখিয়ে ইন্সপেক্টর গট গট করে হেঁটে চলে গেলেন।

বিপরীত স্রোত

রান্নাঘরে অঞ্জনের টিফিন বানাতে বানাতে নমিতা টিভির পর্দায় মাঝে মাঝেই চোখ রাখছিল। কয়েকদিন ধরেই মিডিয়াগুলো ‘মি টু’ আন্দোলন নিয়ে পড়েছে। রোজই নতুন নতুন খবর উঠে আসছে। খবরটা নমিতা নিয়ম করেই দেখে। কোথায় কী হচ্ছে নয়তো জানবে কীভাবে?

অঞ্জন এসে শেল্ফ-এর সামনে দাঁড়াল। নমিতার ফ্ল্যাটে ওপেন কিচেনের ব্যবস্থা সুতরাং রান্না করতে করতে টিভি দেখাটাও নমিতার অভ্যাস হয়ে দাঁড়িয়েছিল। স্বামীকে দেখে জিজ্ঞাসু চোখে তাকাল।

‘সকাল সকাল এদের আবার শুরু হয়ে গেছে। দেশে বেকারত্বের সংখ্যা দিনে দিনে বাড়ছে, চাষি আত্মহত্যা করছে, দেশের অবস্থা দিনে দিনে খারাপ হচ্ছে। আর এই মহিলাদের দ্যাখো, এদের আর কোনও কাজ নেই, মি টু-তে সমস্বরে গলা মেলাচ্ছে। আমার শুধু এদের জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করে, যখন ঘটনাটা ঘটেছিল তখন কেন প্রতিবাদ করেনি, ব্যাপারটা গোপন করে গিয়েছিল? এখন চেঁচিয়ে কী লাভ? আসলে এরা চায় প্রচারের আলোয় থাকতে। এ হচ্ছে পুরুষদের বিরুদ্ধে চক্রান্ত। বন্ধ করো টিভি, খবরে আজকাল আর কিছুই দেখাবার নেই’, বিরক্ত বদনে নিজেই এগিয়ে গিয়ে টিভিটা বন্ধ করে দেয় অঞ্জন।

টিফিন কৗটোর ঢাকনা বন্ধ করতে করতে নমিতা উত্তর দেয়, ‘আচ্ছা এইসব মহিলারা মিথ্যা বানিয়ে বলছে আর তোমরা পুরুষরা সব ধোয়া তুলসীপাতা? আমাদের সমাজটা এইভাবেই মহিলাদের চুপ করিয়ে তাদের শালীনতায় মুড়ে রাখতে চায়। গলা তুলতে গেলেই, সেটা মিথ্যা প্রতিপন্ন করতে সমাজ উঠেপড়ে লেগে যায়।’

‘আমি ঠিক এটা বলতে চাইনি। কিন্তু ৩০ বছরের পুরোনো কাদা ঘেঁটে লাভটা কী হবে বলতে পারো? সেক্সুয়াল অ্যাসল্ট বা হ্যারাসমেন্ট যখন ফেস করেছিল তখনই দরকার ছিল প্রতিবাদ করার’, অফিসের শার্ট-টা পরতে পরতে জবাব দেয় অঞ্জন।

অঞ্জনের মনোভাব বুঝতে পেরে রেগে যায় নমিতা, ‘তোমার এটা চিৎকার-চ্যাঁচামেচি মনে হচ্ছে কারণ তুমি সত্যিটা দেখতে চাইছ না। আসলে এটা শুধু পুরুষদের দোষ নয়, সমাজের বানানো নিয়মে অত্যাচার করার পরেও ওই মেয়েগুলোকেই আবার চুপ করে থাকার জন্য ভয় দেখানো হয়।

অফিসে গিয়ে দ্যাখো মেয়েরা যৗন শোষণের বিরুদ্ধে সরব হলেই তাদের চাকরি চলে যাচ্ছে আর যারা বাড়িতে রয়েছে তাদের এত সাহস কোথায়? ছোটো থেকে মেয়েদের শেখানো হয় লজ্জাই মেয়েদের ভূষণ অথচ ছেলেদের স্বাধীনতা ছুট দিয়ে রেখেছে সমাজ।

আমার তো খুব আনন্দ হচ্ছে এই দেখে যে ভারতবর্ষের মতো দেশে এই প্রথম পুরুষরা কিছুটা ভয় পেয়েছে। আগে হয়তো এমন কোনও অপরাধ সে করে এসেছে, যেটা এই আন্দোলনের ফলে সবার সামনে ফাঁস হয়ে যাওয়ার ভয়ে সে মনে মনে ভীত হয়ে পড়ছে। সীতাকে আর অগ্নিপরীক্ষা দিতে হবে না, এবার রামের পালা’, গর্বের সঙ্গে বলে নমিতা।

‘আচ্ছা এবার বক্তৃতা দেওয়া বন্ধ করো… খেতে দেবে তো দাও নয়তো টিফিন নিয়ে আমি অফিস বেরিয়ে যাচ্ছি’, বিরক্ত মুখে বলে অঞ্জন।

ভাতের থালাটা অঞ্জনের সামনে নামিয়ে রাখতে রাখতে আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করল নমিতা, ‘কী ব্যাপার বলো তো, তুমি এত রেগে যাচ্ছ কেন? তুমিও কি কারও সঙ্গে… ভয় পাচ্ছ নাকী যে তোমারও পুরোনো পাপ ধরা পড়ে যাবে?’

নমিতার কথা শুনে ভাত আটকে যায় অঞ্জনের গলায়। এক ঢোঁক জল খেয়ে গলাটা পরিষ্কার করে বলে, ‘কী… পাগলের মতো বলছ? বিনা কারণে আমাকে এসবের মধ্যে টেনে আনছ কেন? দোষ কেউ করেছে আর সন্দেহ আমার উপর। সকলেই জানে আমি কীরকম, সুতরাং নিজের সম্পর্কে আমি কিছুই বলতে চাই না।’

‘হুঁ, এটা ভুলো না যাদের চরিত্রের সত্যিটা আজ সকলের সামনে খুলে গেছে তাদের সম্পর্কেও কিন্তু মানুষের আগে অন্যরকম ধারণা ছিল… হঠাৎ করেই হয়তো জানতে পারলাম তুমিও কোনও মেয়ের সঙ্গে… আর আমি এটা তো শুধু উদাহরণ দিচ্ছি’, টিফিন বক্সটা অঞ্জনের হাতে দিতে দিতে নমিতা বলল।

অঞ্জন জ্বলে উঠল নমিতার কথা শুনে। ইচ্ছে করছিল টিফিনটা ছুড়ে মারে নমিতার মুখের উপর। আবিশ্বের পুরুষরা সব খারাপ আর মহিলারা সব সতীসাধবী! নিজেকে সংযত করল অঞ্জন। নমিতার সামনে প্রতিবাদ করা মানে নিজেকেই সন্দেহের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো। বরং সুর নরম করল অঞ্জন, ‘এখন নিজের স্বামীকেও ভরসা করছ না? আমাকে তোমার এতটাই নীচ চরিত্রের মনে হয় যে, তুমি আমাকে এসব কথা বলতে পারছ?’

নমিতার মনে হল একটু বেশি-ই বলা হয়ে গেছে অঞ্জনকে। ও যাতে মনে দুঃখ না পায় তাই গলায় যথা সম্ভব মাধুর্য নিয়ে এসে বলল, ‘আমি তো এমনি-ই তোমাকে এইসব বলছিলাম, আমি কি তোমাকে চিনি না? আচ্ছা এবার অফিসে বেরোও, নয়তো পরে বলবে আমার জন্য তোমার অফিস যেতে দেরি হয়ে গেল।’

‘হুঁ, আজ আবার একটা মিটিং আছে অফিসে’, বলে বেরিয়ে আসে অঞ্জন। অফিস যেতে যেতে মনের মধ্যে তোলপাড় হতে থাকে ওর। ভয় বাসা বেঁধেছে ওর মনে। মি টু নিয়ে যা আরম্ভ হয়েছে তাতে ওর নিজের কেলেঙ্কারি ফাঁশ হবার আশঙ্কা কিছুতেই উড়িয়ে দিতে পারছে না। শিউরে ওঠে অঞ্জন। নমিতা কিছুতেই ওর অন্যায় বরদাস্ত করবে না, শাস্তি পাওয়ার সব ব্যবস্থা করে তবে ছাড়বে। বাচ্চাদের চোখেও ওর সম্মান ধুলোয় মিশে যাবে। এতদিনের চেষ্টায় সমাজে যে মান-সম্মান অর্জন করেছে, তাও আর বজায় রাখা সম্ভব হয়ে উঠবে না।

মিটিং-এও ঠিকমতো মন দিতে পারল না অঞ্জন। রোজকার মতো সবাইকে বকে ধমকে কাজ করিয়ে নেওয়ার এনার্জি কিছুতেই জোগাতে পারল না। অফিসে কিছুই ভালো লাগছিল না। সন্দীপ এসে কেবিনে উঁকি মারল।

‘কী হল, আজ এত চুপচাপ যে? ঢুকলি যখন আমার ‘গুডমর্নিং’-এ সাড়া দিলি না, আবার এখন এভাবে বসে থাকা, কারও ওপর চ্যাঁচামেচি করছিস না… কী হল কী তোর? কোনও মহিলা তোকে আবার ফাঁসিয়ে দেয়নি তো?’ সন্দীপ এমন ভঙ্গিতে কথাগুলো বলল, কেবিনের বাইরে যারা বসে তাদের মধ্যে হাসির রোল উঠল।

কেবিনের বাইরে থেকে কারও গলা ভেসে এল, ‘ছাড় না সন্দীপ, বউয়ের সঙ্গে হয়তো ঝগড়া হয়েছে। ওকে ওর মতো থাকতে দে না।’ সন্দীপ বেরিয়ে আসে ঘর থেকে।

অফিসে দিনটা কোনওমতে কাটিয়ে অঞ্জন বাড়িতে ফিরে আসে। হাত-মুখ ধুয়ে বসতে বসতে খেয়াল করে নমিতা ফোনে ব্যস্ত রয়েছে। নমিতার কথাগুলো কানে ভেসে আসে, ‘দেখিস লোকটা যেন কোনওমতেই ছাড়া না পায়, নিজেকে কী ভাবে বলতো? খুব তো ভদ্র সেজে ঘুরত। নাতি, নাতনি সব রয়েছে অথচ দেখ নিজের মেয়ের বয়সি একটা মেয়েকে… আচ্ছা এখন আমি রাখছি, অঞ্জন অফিস থেকে ফিরেছে’, বলে নমিতা ফোন নামিয়ে রাখে।

‘কী হয়েছে?’ অঞ্জন জানতে চায়। ‘আমি তোমাকে ফোন করতেই যাচ্ছিলাম। জানো, পাড়ার সুজিতদার উপর কোনও মেয়ে নাকি হ্যারাসমেন্টের কেস দিয়েছে, অথচ সুজিতদাকে দেখে ভদ্র বলেই মনে হতো। ভদ্রলোকের বউয়ের বক্তব্য, মেয়েটি মিথ্যা আরোপ দিচ্ছে, সুজিতদাকে নাকি বদনাম করতে চাইছে। বউদি সবাইকে বলেছে মেয়েটি সুজিতদার কাছে চাকরি করত। কোনও কারণে মেয়েটিকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করায় সুজিতদার উপর রেগে যায় মেয়েটি এবং মিথ্যা বদনাম দেওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে। আমার তো বউদির উপর রাগ হচ্ছে যে একজন অপরাধীকে বাঁচাবার চেষ্টা করছেন উনি। কিন্তু যতই চেষ্টা করুন না কেন সুজিতদাকে কিছুতেই বাঁচাতে পারবেন না। ওনার বউকেও জেলে পুরে দেওয়া উচিত’, রাগে নমিতার মুখ-চোখ লাল হয়ে ওঠে।

‘হতে তো পারে যে সুজিতদাই সত্যি কথা বলছেন আর মেয়েটি মিথ্যা…’

‘মিথ্যা…?’ অঞ্জনের কথার মাঝখানেই নমিতা ওকে থামিয়ে দেয়। ‘কেন কোনও মেয়ে শুধু শুধু নিজেকে বদনাম করবে? নিশ্চয়ই ওর সঙ্গে কিছু ঘটেছে বলেই না ও গলা তুলেছে। সাধারণত মেয়েরা প্রতিবাদ করে না বলেই পুরুষরা বেঁচে যায়। আর বউগুলোকে দ্যাখো, স্বামী দোষী জেনেও তাকে বাঁচাবার চেষ্টা করতে থাকে। সত্যি বলছি অঞ্জন, আমার স্বামী যদি এরকম করত, আমি ছাড়তাম না, জেলে পাঠিয়ে তবে বিশ্রাম নিতাম।’ নমিতার কথা শুনে ভিতরে ভিতরে শিউরে উঠল অঞ্জন।

‘একবার ভেবে দ্যাখো, আমাদেরও মেয়ে রয়েছে। কেউ যদি ওর সঙ্গে এরকম করত তাহলে? ছিঃ মেয়েরা জড়পদার্থ নাকি যে, তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে যার যেরকম ভাবে ইচ্ছে তাকে ব্যবহার করবে? এটা সমাজের পক্ষে লজ্জাকর, অঞ্জন’, নমিতা কিছুটা আবেগপ্রবণ হয়ে ওঠে।

কথা শেষ করে নমিতার দৃষ্টি পড়ে অঞ্জনের ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া মুখটার উপর। ‘একী, তোমার কী হল, মুখটা এত শুকনো লাগছে কেন? আমি জানি তোমারও ব্যাপারটা শুনে খুব খারাপ লাগছে,

যে-কোনও ভদ্রলোকেরই ঘটনাটা জেনে ঠিক এরকমই মনোভাব হবে। আসলে কারও চরিত্র সম্পর্কে হলফ করে কিছু বলা আজ আর সম্ভব নয়’, বলে নমিতা রান্নাঘরের দিকে পা বাড়ায়।

মনের মধ্যে ঝড় চলতে থাকে অঞ্জনের। আজ সুজিতদা পাড়ায় আলোচনার বস্তু হয়ে উঠেছেন, যে-কোনও দিন অঞ্জনের নামও আলোচনার বিষয় হয়ে উঠতে পারে। নিজের সন্তানদের কাছে মুখ দেখাবে কী করে? ঘেমে ওঠে অঞ্জন, চুপচাপ এসে শোবার ঘরে শুয়ে পড়ে।

রাতের খাওয়া-দাওয়া মিটিয়ে নমিতা আর বাচ্চারা তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়লেও, হাজার চেষ্টা করেও অঞ্জন দুচোখের পাতা এক করতে পারল না। নানা চিন্তা এসে ওকে ঘিরে ধরছিল। ওর খালি মনে হচ্ছিল সকলে এমনকী বাড়ির প্রতিটা আসবাবপত্র পর্যন্ত ওকে উপহাস করছে, বলছে, ‘দেখছ তো অঞ্জন, এতদিন স্রোতে গা ভাসিয়ে চলে এসেছ আজ স্রোতের বিপরীতে দাঁড়িয়ে কীরকম বোধ করছ? বাঁচতে তো তুমিও পারবে না। হ্যাঁ দেরি হয়েছে বটে কিন্তু সকলেই নিজের নিজের কর্মের ফল একদিন পাবেই, তুমিও বাদ যাবে না।’ ঘেমে নেয়ে বিছানাতেই উঠে বসে অঞ্জন। জোরে জোরে নিঃশ্বাস পড়তে থাকে। ভয় যেন সম্পূর্ণ গ্রাস করে ওকে কিন্তু কাকে বলবে এইসব কথা এবং কী-ই বা বলবে? ওর করা অপরাধের কথা যদি সবাই জানতে পেরে যায়, তাহলে এতদিনের সংসারটা ওর তছনছ হয়ে যাবে।

নিজের মনেই হাজারো প্রশ্ন উঠতে থাকে অঞ্জনের। আবার নিজেই নিজেকে স্ত্বান্না দেয়। মন বলে এরকম কিছুই ঘটবে না, বেকার কেন ও এত চিন্তা করছে? শ্রেয়া কখনওই নিজের মুখ খুলবে না, আর যদি খোলে ওকে মিথ্যা প্রমাণ করতে কতটুকুই বা পরিশ্রম হবে? ও প্রমাণ জোগাড় করার চেষ্টা করতে পারে কিন্তু কার সাহস হবে অঞ্জনের বিরুদ্ধে কিছু বলতে? ও বরং নিজেই শ্রেয়াকে দোষী প্রমাণিত করে দেবে। অঞ্জনের চোখের সামনে ৭-৮ বছর আগেকার ঘটনাগুলো ভেসে উঠতে থাকে। শ্রেয়ার উপর করা এক-একটা অত্যাচারের পাতা পরপর খুলে যেতে থাকে অঞ্জনের চোখের সামনে।

সাত-আট বছর আগে যে কোম্পানিতে ছিল অঞ্জন, সেখানেই শ্রেয়া অঞ্জনের অধীনে কাজ করত। তন্বী চেহারার মেয়েটির এক মাথা ঘন কালো চুল, ডাগর দুটো চোখ এবং ত্বকের গোলাপি আভা অঞ্জনের দুর্নিবার আকর্ষণের কারণ ছিল। শ্রেয়াকে দেখলেই ওকে পা থেকে মাথা পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ করত অঞ্জন যা শ্রেয়ার কাছে অস্বস্তির কারণ হয়ে উঠেছিল। ওর সামনে এলে শ্রেয়া কিছুতেই সহজ হতে পারত না, জামাকাপড় ঠিক করতে ব্যস্ত হয়ে উঠত যেন।

শ্রেয়া বুঝতে পারত, অঞ্জনের ওর প্রতি দুর্বলতার কারণ ওর শরীরটা ছাড়া আর কিছু নয়। আপ্রাণ চেষ্টা করত সময়ের মধ্যে সব কাজ গুছিয়ে ছুটি হলেই অফিস থেকে বেরিয়ে যেতে, কিন্তু রোজ সেটা সম্ভব হয়ে উঠত না। অন্য কোনও কাজের অছিলায় অঞ্জন মাঝেমধ্যেই ওকে নিজের কেবিনে ডেকে পাঠাত। ছুটির পরেও ওকে আটকে রাখত। কাজ করতে করতেও শ্রেয়া বেশ বুঝতে পারত ওকে ঠিক কী নজরে দেখছেন অঞ্জন স্যার। মাঝে মাঝে চোখ পড়ে যেত স্যারের চোখে কিন্তু তাতেও অঞ্জন বিন্দুমাত্র বিচলিত হতো না বরং বাধ্য হয়ে লজ্জায় শ্রেয়াকেই দৃষ্টি ফিরিয়ে নিতে হতো।

ধীরে ধীরে সাহস বাড়তে আরম্ভ করে অঞ্জনের। ছলছুতো করে শ্রেয়ার গায়ে হাত দিতেও শুরু করে দেয়। কখনও পিঠে, ঘাড়ে, বুকে অনাবশ্যক হাত দিয়ে ফেলে আবার অমায়িক একটা ‘সরি’ ছুড়ে দিতেও কসুর করত না।

শ্রেয়ার রক্তাক্ত মনে অশ্রু ঝরত শুধু, প্রতিবাদ করে উঠতে পারত না। মেয়ে হয়ে জন্মানো পাপ বলে মনে হতো। বাবার হঠাৎ মৃত্যুর পর মা আর ভাইয়ের দায়িত্ব না নেওয়া ছাড়া উপায় কিছু ছিল না আর অঞ্জন স্যার ওর বাড়ির অবস্থা পুরোটাই জানতেন এবং সেই সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে মুহূর্ত সময় নষ্ট করেননি।

সেদিনও এমনি এমনি মিথ্যা কাজের বাহানায় অঞ্জন শ্রেয়াকে নিজের কেবিনে বসিয়ে রেখেছিল। অফিস অনেকক্ষণ ছুটি হয়ে গিয়েছিল। অঞ্জন ওকে বাড়ি ছেড়ে দেবে এই অজুহাতে শ্রেয়াকে আটকে রেখেছিল। শ্রেয়া তাড়াতাড়ি কাজ সেরে বাড়ি যাওয়ার চেষ্টা করছিল, হঠাৎ-ই অঞ্জন পিছন থেকে এসে ওকে জড়িয়ে ধরে নিজের দিকে জোর করে টেনে নেয়। শ্রেয়ার সারা শরীরে, মুখে ত৫ চুম্বনের রেখা স্লঁকে দিতে থাকে।

শ্রেয়া নিজেকে ছাড়াবার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। কোনওমতে মুখ সরিয়ে প্রতিবাদ করার চেষ্টা করে, ‘স্যার, এটা কী করছেন আপনি? ছাড়ুন আমাকে।’

‘শ্রেয়া, এই দিনটার জন্য কতদিন আমি অপেক্ষা করেছি। আজ কী করে তাড়াতাড়ি ছেড়ে দেব বলো’, শ্রেয়ার চুলে মুখ ঘষতে ঘষতে বলে অঞ্জন।

হঠাৎ-ই কেবিনের দরজায় টোকা। অবাক হয়ে সঙ্গে সঙ্গে ছেড়ে দেয় শ্রেয়াকে। ‘কাম ইন’, বলাতে অফিসের পিওন এসে ঢোকে যাকে আগেই ছুটি দিয়ে দিয়েছিল অঞ্জন।

‘কী ব্যাপার, তুমি ফিরে এলে যে?’

‘না স্যার, আমার টিফিনের কৗটোটা নিয়ে যেতে ভুলে গিয়েছিলাম। সেটাই নিতে এসেছি’, কাঁচুমাচু ভাবে জবাব দেয় পিওন।

‘ঠিক আছে, নিয়ে নাও’, বিরক্তি সহকারে জবাব দেয় অঞ্জন।

শ্রেয়া কিন্তু মনে মনে ধন্যবাদ জানায় পিন্টুকে। হোক না অফিসের পিওন কিন্তু সবসময় সম্মান দিয়ে কথা বলে শ্রেয়া ওর সঙ্গে। ওর কেন জানি না মনে হয় কিছু একটা অঘটনের অাঁচ পেয়েই পিন্টুদা অফিসে ফিরে এসেছে। টিফিন কৗটোটা একটা বাহানা মাত্র। পিন্ঢু৆দার জন্য আজ ও বেঁচে গেল এই জঘন্য লোকটার হাত থেকে।

অঞ্জন কিন্তু মোটেই খুশি হল না। ওর এই ব্যর্থতার জন্য দায়ী করল পিন্টুকেই এবং সুযোগ বুঝে শ্রেয়াও অফিস ছেড়ে বেরিয়ে এল। অঞ্জন এখানেই থেমে থাকল না, সুযোগ খুঁজতে লগল শ্রেয়াকে নিজের জালে ফাঁসাবার।

সুযোগ এল খুব শিগগির। শহরের বাইরে কাজ পড়ল অঞ্জনের। তৎক্ষণাৎ ফোন করল শ্রেয়াকে, ‘শ্রেয়া কাল তৈরি হয়ে অফিসে এসো। দুদিনের জন্য আমার সঙ্গে তোমাকে অফিসের কাজে শহরের বাইরে যেতে হবে।’

‘কিন্তু স্যার, আমার পক্ষে যাওয়া…’, শ্রেয়ার না-যাওয়ার বাহানা না শুনেই ওকে থামিয়ে দেয় অঞ্জন, ‘শ্রেয়া তোমার ইচ্ছে, অনিচ্ছে জানতে চাইনি আমি। ইট্‌স মাই অর্ডার। বসের সঙ্গে তোমার যাওয়ার সুযোগ হচ্ছে নয়তো তোমার মতো মেয়েদের সকলে জুতোর তলায় রাখে।’

শ্রেয়া ভালো করেই জানত ওকে সঙ্গে করে নিয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যই হচ্ছে ওর শরীরটাকে ভোগ করা। অঞ্জনের হাত থেকে ওর নিস্তার নেই। অফিসে থাকতে গেলে অঞ্জন স্যারের কথামতো চলতে হবে আর নয়তো চাকরি হারাতে হবে। এই সত্য বুঝতে পেরে গিয়েছিল শ্রেয়া। মুহূর্তে নিজের মনকে তৈরি করে নিল ও। পদত্যাগপত্র লিখে জমা করে বেরিয়ে এল অফিস ছেড়ে। বুক ভরে নিঃশ্বাস নিল। অনেকদিন ধরেই অন্য চাকরির সন্ধান করছিল কারণ অঞ্জনের সঙ্গে এক অফিসে চাকরি করতে পারবে না বেশ বুঝতে পারছিল শ্রেয়া। জানে কটা দিন একটু কষ্ট করতে হবে কিন্তু পার্থ আছে ওর পাশে। কটা দিন পরেই পার্থর সঙ্গে বিয়ে ঠিক হয়ে আছে। একদিক দিয়ে ভালোই হল বলে শ্রেয়ার মনে হল। এই অফিসের কেলেঙ্কারির কথা যদি বিয়ের পর পার্থ-র মা-বাবা জানতে পারতেন তাহলে কতটা লজ্জার সম্মুখীন হতে হতো সেটা ভেবে শ্রেয়া শিউরে ওঠে।

কয়েকদিন ঘোরাঘুরি করে একটা ভালো চাকরিও পেয়ে গেল শ্রেয়া। নতুন চাকরিতে জয়েন করার তিনমাস পরেই পার্থর সঙ্গে শ্রেয়ার বিয়ে হয়ে গেল। বিয়ের পর নিজের ফোনের নম্বর বদলে ফেলল ও, যাতে অঞ্জন কোনও ভাবেই ওকে কনট্যাক্ট করতে না পারে। অতীতের দুঃস্বপ্ন কাটিয়ে নতুন জীবনের সুখে নিজেকে ভাসিয়ে দিল শ্রেয়া। অঞ্জনের স্মৃতি মন থেকে মুছে ফেলতে বদ্ধপরিকর হল ও।

শ্রেয়া জানতে পারল না, একদিন যেখানে ও অঞ্জনের মুখোমুখি যাতে না হতে হয় তার জন্য পালিয়ে বেড়াত, সেখানে আজ অঞ্জন শ্রেয়ার ভয়ে ভীত হয়ে রয়েছে। সবসময় অঞ্জনের মনে হতো এই বুঝি শ্রেয়া এসে সকলের সামনে অঞ্জনের আসল চেহারার উপর থেকে পর্দাটা সরিয়ে দেবে। রাত্রে ভালো করে ঘুমোতেও পারত না। অজানা, অচেনা কেউ বাড়িতে এলেও ভয়ে কুঁকড়ে যেত অঞ্জন। কলিংবেল বাজলে বুক কেঁপে উঠত ওর, ভাবত ওই বুঝি শ্রেয়া ওর দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে ওর কুকীর্তির সাক্ষী হয়ে।

একদিন অফিস থেকে ফিরতেই নমিতা জানাল একটি লোক অঞ্জনের নামে একটা মুখবন্ধ খাম দিয়ে গিয়েছে।

‘কোথায় রেখেছ খামটা। কী থাকতে পারে ওতে?’ শঙ্কিত হয়ে অঞ্জন নমিতার দিকে প্রশ্ন ছুড়ে দিল।

‘জানি না, হয়তো ফোটো বা ওই ধরনের কিছু হবে। দেখি খামটা খুলে’, বলে খামটা হাতে নিতেই অঞ্জন ছোঁ মেরে নমিতার হাত থেকে খামটা ছিনিয়ে নিল।

‘আমার চিঠি তুমি খুলছ কেন?’ নমিতা অঞ্জনের কান্ডকারখানা দেখে অবাক হয়ে গেল। তোমার কী হয়েছে বলো তো। আগে তোমার সব চিঠি আমি-ই তো খুলতাম, আজ হঠাৎ হল কী? তুমি তো এমন ভয় পাচ্ছ যেন মনে হচ্ছে এর মধ্যে তোমার গোপন কোনও তথ্য লুকোনো রয়েছে?’

নমিতার কথা শুনে চমকে ওঠে অঞ্জন। নমিতা কি ওকে সন্দেহ করতে শুরু করেছে? কাঁপা কাঁপা হাতে খামটা খুলে স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়ে। খামটাতে অন্য কিছু প্রয়োজনীয় কাগজপত্র রয়েছে যেটা ওরই বন্ধু পাঠিয়েছে।

অঞ্জনের ব্যবহারে নমিতা প্রায়শই আশ্চর্য হয়ে পড়ত। মাঝেমধ্যেই মনে হতো অঞ্জনের মাথার কোনও গোলমাল হল না তো? সত্যিটা নমিতা জানবেই বা কী করে? অতীতে করে আসা পাপের দংশনই যে অঞ্জনকে ভীত, ত্রস্ত করে তুলছে। অঞ্জনের সব সময় মনে হতো একবার শ্রেয়ার সঙ্গে দেখা করে ও ক্ষমা চেয়ে নিলেই সব ঠিক হয়ে যেতে পারত। অথবা পুরোনো দিনগুলো যদি ফেরত আনা যেত তাহলে নিজের চরিত্রটা শুধরে নেওয়ার একটা সুযোগ থাকত। কিন্তু অতীত-কে ফিরিয়ে আনা কি সম্ভব?

অঞ্জন সিদ্ধান্ত নেয়, যেভাবেই হোক শ্রেয়ার সঙ্গে দেখা করে ওকে ক্ষমা চাইতেই হবে। নয়তো সারাজীবন এই অশান্তিতে ওকে কাটাতে হবে যে, কবে ও ধরা পড়ে যাবে। চেষ্টা করে শ্রেয়ার ঠিকানাও জোগাড় করে ফেলে। যাবে যাবে করতে করতে একদিন হঠাৎই শ্রেয়াকে ও দেখে একটা থানায় ঢুকতে। দেখেই মনের মধ্যে পুরোনো ভয়টা আবার মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। ওর মনে হয় শ্রেয়া নিশ্চয়ই ওর বিরুদ্ধে রিপোর্ট লেখাতেই থানার দ্বারস্থ হয়েছে নয়তো শ্রেয়ার মতো মেয়ের থানায় কী কাজ থাকতে পারে?

থানার বাইরে অনেকক্ষণ অপেক্ষা করে অঞ্জন, শ্রেয়ার বাইরে বেরোবার জন্য কিন্তু কোনও লাভ হয় না। বাধ্য হয়ে ও ওখান থেকে চলে আসে। খালি মনের মধ্যে একটাই প্রশ্ন বারবার ঘুরেফিরে আসতে থাকে যে শ্রেয়া থানায় কেন গিয়েছিল?

এই ভাবেই কেটে যায় দু-তিন সপ্তাহ। এর মধ্যে অঞ্জন জানতে পারে শ্রেয়ার থানায় আসার কারণ। ওর ভাইয়ের বউ, শ্রেয়ার মা ও ভাইয়ের বিরুদ্ধে থানায় রিপোর্ট লিখিয়েছে মানসিক ও শারীরিক অত্যাচারের। সেই পরিপ্রেক্ষিতেই শ্রেয়ার থানায় আসা।

একটু যেন স্বস্তি পায় অঞ্জন। শ্রেয়া পুলিশে জানালে এতদিনে নিশ্চয়ই পুলিশ বসে থাকত না, আইনি পদক্ষেপ অবশ্যই নিত। কিন্তু বলা যায় না। নমিতার কাছেই শুনছিল পাড়ার সুজিতদা আপাতত বাড়িতে ফিরেছে ঠিকই কিন্তু কোর্ট-কাছারি করতে হচ্ছে। নমিতা তো বেশ জোর গলায় বলল, যে-পাপ লোকটি করেছে তার সাজা অবশ্যই একদিন লোকটাকে পেতেই হবে। এটাই ওর ভরাডুবির কারণ হবে।

আজ অঞ্জন মনে করছে ও শ্রেয়ার হাত থেকে বেঁচে গেছে কিন্তু ভয়, আশঙ্কার খাঁড়াটা সারা জীবন ওর ঘাড়ের উপর ঝুলতে থাকবে। যে-কোনও মুহূর্তে ওটা লক্ষ্যে নেমে আসতে পারে। স্রোতের বিপরীতে থাকতে পারার জন্য মুহূর্তের আনন্দ বিষাদে বদলে যেতে পারে যদি শ্রেয়া ‘মি টু’ আন্দোলনে নিজেকে শামিল করে নেয়। এই সবই অঞ্জন ভালো করেই বুঝতে পারছিল এবং এই সত্যটাও ওর অজানা ছিল না যে, এখন থেকে সারাটা জীবন ওকে ভয়ে ভয়েই কাটাতে হবে। ভবিষ্যতে ওর ভাগ্যে কী আপেক্ষা করছে সেটা জানার আজ আর কোনও উপায় নেই।                                           ঞ্জ

সিমলা থেকে সাংলা

সড়কপথে চলেছি সিমলা। দূরত্ব ৯০ কিমি। শুরুর সকালটা ছিল ঝলমলে, রৗদ্রোজ্জ্বল। সমতল থেকে পাকদণ্ডি পথে উঠতেই মনটা খুশিতে ভরে ওঠে। টয় ট্রেনের লাইনের সঙ্গে লুকোচুরি খেলা চলে বেশ কিছুক্ষণ। পথে চায়ের জন্য একবার বিরতি পড়ে। পুনরায় পাকদণ্ডি পথে চাকা গড়ায়। কিন্তু সিমলা ঢোকার আগেই জ্যামে আটকে পড়ি। ভরা সিজনে রাস্তা জুড়ে গাড়ির মেলা। অতিকষ্টে যখন কালীবাড়ির গেস্ট হাউসে পৌঁছোই, বেলা তখন বেলা ৩-টে।

বিকেলে পায়ে পায়ে পৌঁছোই ম্যাল চত্বরে। শহরের প্রধান কেন্দ্রস্থল এই ম্যাল। অসংখ্য দেশি-বিদেশি পর্যটকের ভিড়ে ম্যাল চত্বর সরগরম। নিওগথিক শৈলীতে নির্মিত অ্যাংলেসিয়ান চার্চের সামনে ও তার আশেপাশে, কিছুটা সময় কাটিয়ে ফিরে আসি মন্দিরে। কালীবাড়ির চত্বরে বসেই সাক্ষী হই অপূর্ব এক সূর্যাস্তের। মগ্ন হয়ে দেখি সন্ধ্যারতিও। পরদিন আমরা যাব কিন্নরের পথে।

সিমলা থেকে সারাহান ১৭২ কিমি। ২২ নম্বর জাতীয় সড়ক ধরে এগিয়ে চলেছি। ঘন্টাখানেক পরে দাঁড়াই গ্রিনভ্যালি ভিউ পয়েন্টে। ঘন সবুজ উপত্যকা দেখে চোখ জুড়িয়ে যায়। গ্রিনভ্যালির অপার্থিব সৌন্দর্যকে লেন্সবন্দি করে, ছুটি কুফরির পথে। স্থানীয়রা ইয়াক নিয়ে রাস্তার ধারে পর্যটকদের অপেক্ষায়। এখান থেকে হিমালয়ের অসাধারণ রূপ ধরা পড়ে। পেরিয়ে গেল ফাগু, নারকান্ডা। পথ চলতি পাহাড়ি ঢালে রয়েছে আপেল বাগান। কিছুস্থানে শিলাবৃষ্টির হাত থেকে আপেল সুরক্ষিত রাখার জন্য নেট দিয়ে পুরো বাগান ঢাকা হয়েছে। দূর থেকে মনে হচ্ছে, পাহাড়ের ঢালে সার্কাসের তাঁবু পড়েছে।

পথে দেখা শতদ্রু নদীর সঙ্গে। নদীর উদ্দাম প্রবাহধারা দেখতে দেখতে এগিয়ে চলি। শতদ্রুর ভাঙা পাড় জুড়ে রয়েছে অসংখ্য৷বড়ো-বড়ো বোল্ডার। একটা ঝোলা ব্রিজও চোখে পড়ে। এই নদীতে বাঁধ দিয়ে জলবিদ্যুৎ তৈরি হচ্ছে। ঘন্টা পাঁচেক পথ পেরিয়ে এলাম রামপুর। রামপুরকে বলা হয় কিন্নর রাজ্যের প্রবেশদ্বার। শহরের এক প্রান্ত দিয়ে বয়ে চলেছে শতদ্রু। রামপুর ছিল বুশাহার রাজাদের রাজধানী৷এক সময় হিমাচলের প্রাচীন বাণিজ্যকেন্দ্র হিসাবে খ্যাতি ছিল। এক হোটেলে মধ্যাহ্ন ভোজন সেরে প্যালেস দেখতে চলি। ১৯ শতকে তৈরি পদম প্যালেস অবশ্য বাইরে থেকে দেখেই ক্ষান্ত হই। প্যালেস অভ্যন্তরে ঢোকার অনুমতি মেলে না। রামপুর থেকে ২৩ কিমি দূরে জিওলি। জিওলিতে জাতীয় সড়ক ছেড়ে এবার ডানদিকের চড়াই পথ ধরি। পাহাড়ি নিস্তব্ধতাকে ভেদ করে উঠতে থাকে গাড়ি। পাকদণ্ডি পথ শেষে পৌঁছোয় সারাহানের সীমানায়।

৭৫৮৯ ফিট উচ্চতায় পাহাড় ঘেরা নৈসর্গিক সৗন্দর্যে ভরপুর এক ছোট্ট জনপদ সারাহান। ভীমাকালী মন্দিরের কাছেই আমাদের বুকিং করা হোটেলের অবস্থান। আসলে এই মন্দিরকে কেন্দ্র করেই এখানকার পর্যটন বিকাশ। শীতে এখানে প্রবল তুষারপাত হয়। একসময়ে এখানে বুশাহার রাজাদের রাজ্যপাট ছিল।

সারাহানের প্রধান দ্রষ্টব্য ভীমাকালি মন্দির। এটি ৫১ পিঠের অন্যতম। এখানে সতীর কান পড়েছিল। মন্দিরটির আকার অনেকটা প্যাগোডা ধর্মী। মন্দিরের গায়ে কাঠ ও পাথরের অপূর্ব কারুকাজ। কিংবদন্তী ছড়িয়ে মন্দিরের পাথরে পাথরে। মন্দিরের ডানপাশে ও উলটোদিকে গেস্ট হাউস। আর মন্দিরের প্রধান ফটকের সন্নিকটে সুন্দর ফুল বাগিচা। দিনের আলোয় টান পড়ে। ফেরার পথে আপেল বাগানের মাঝে দুর্দান্ত সূর্যাস্তের সাক্ষী হই।

পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠেই ছুটি হোটেলের ছাদে। যদি শ্রীখন্ড পর্বতের দর্শন মেলে। কিন্তু প্রকৃতি বিরূপ। মেঘে ঢাকা আকাশে শ্রীখণ্ডের খণ্ডাংশও কপালে জোটে না। এবার চা খেয়ে চলি বুশাহার রাজবাড়ি পদম প্যালেস দেখতে। মন্দিরের পিছনের দিকে অল্প কিছুটা দূরেই এই প্রাসাদ। আপেল বাগানের মধ্য দিয়ে গেছে পথ। স্থানীয় মানুষজন বাগানে কাজ করছে। গাছে গাছে কাঁচা আপেল ধরে আছে থরে থরে। পাথর ও কাঠ দিয়ে তৈরি রাজপ্রাসাদ। উপরে ঢেউ খেলানো টিনের ছাদ।

পরের গন্তব্য সাংলা। সারাহান থেকে বেরিয়েছি সকাল সাড়ে ৯টায়। ১৭ কিমি জিগজ্যাগ রাস্তা শেষে জিওরি। আরো ৬ কিমি পাকদণ্ডি পথ পেরোতেই কিন্নর জেলায় প্রবেশ। জেলা বিভাজিত নদী শতদ্রু। ব্রিজ সংলগ্ন তোরণদ্বার। কাছেই এক ঝরনার সঙ্গে দেখা। গ্রীষ্মে তার স্লিম শরীর। বহু পর্যটক দেখি, ফলসের জলে পা ডুবিয়ে সেলফি তুলছে। ভাবনগর, ওয়াংটু টপকিয়ে টোপরি। মিলিটারি অধ্যুষিত এলাকা। এই পথেই শুভদৃষ্টি হল কিন্নর কৈলাসের সাথে। যদিও তার আবছা অবয়বই কেবল অবলোকন করি। আরও ১০ কিমি ভাঙাচোরা পথ পেরোতেই করছাম। শতদ্রু ও বসপার মিলনস্থল। করছাম থেকে ভয়ংকর সুন্দর প্রকৃতিকে অনুসঙ্গ করে আরও ২৮ কিমি পাড়ি ।

সামনে হিন্দুস্থান টিবেট হাইওয়ে। সোজা পথটা গেছে রেকং হয়ে কল্পায়। ডান দিকের অন্য পথটা সাংলায়। চলেছি সেই পথেই। বসপাকে সঙ্গী করে গাড়ি ওঠে পাহাড় শীর্ষে। একপাশে অতল খাদ। অন্য পাশে খাড়াই পাথুরে দেয়াল। কোথাও আবার কোনও রকমে পাথর কেটে বানানো রাস্তা। অতি সন্তর্পণে এগিয়ে চলা। খাদের দিকে তাকাতেই মেরুদণ্ড বেয়ে হিমশীতল স্রোত বয়ে যায়। প্যাঁচানো পথটা ওঠে ওপরে। প্রকৃতি আরও সুন্দর ভাবে সামনে আসে। দুধারের পাইন আর দেওদারের জঙ্গল যেন জাপটে ধরে।

শেষে সাংলার সঙ্গে সত্যি দেখা হয়ে যায়। বসপা নদীর বাঁধের পাশ দিয়েই সাংলা গ্রামে প্রবেশ করি। দু’দিকে পাহাড় ঘেরা পরিমন্ডল। মাঝে টিয়া সবুজ উপত্যকা, বহমান বসপা, আর পাহাড় কোলে স্থানীয়দের রঙিন ঘরবাড়ি। এই নিয়েই স্বপ্নের সাংলা। উপত্যকার মাঝখানে আমাদের বুকিং করা হোটেলের অবস্থানটা অসাধারণ। জানালা খুললেই দেখা মেলে ঝলমলে বরফশৃঙ্গ। ওপর থেকে ভ্যালির ভিউ, বয়ে চলা বসপা, নদী পাড়ের জমাটি সবুজ আর স্থানীয়দের ঘরবাড়ির এক অনবদ্য কোলাজ ছবি হয়ে ধরা দেয়।

কিন্নর জেলার সেরা উপত্যকা সাংলা। শহুরে সভ্যতার ক্লান্তিতে বিষণ্ণ, ভাঙাচোরা মনকে সারিয়ে তোলার সেরা ডেস্টিনেশন। স্থানীয় মানুষের কাছে অবশ্য বসপা উপত্যকা বলে বেশি পরিচিত। চারপাশে সবুজে মোড়া পাহাড়ের সারি। হিমাচলের এক টুকরো স্বর্গ বললেও হয়তো ভুল বলা হবে না। উপত্যকাকে আরও সুন্দর করেছে বসপা নদী। শীতে এই উপত্যকা পুরো বরফে ঢেকে যায়। তখন বরফ প্রসাধনে তার সৗন্দর্য  আরও খোলতাই হয়ে ওঠে। সেই সুন্দরের মাঝে নিজেকে হারিয়ে ফেলা যায় সহজেই। ডটকম তাড়িত জীবনের গতি আর ব্যস্ততার মাঝেও চিরশান্তির সাকিন হয়ে ওঠে।

লাঞ্চের পর রওনা দিলাম কামরু গ্রামের দিকে। কামরুতে আছে ইতিহাস সাক্ষী কামরুদুর্গ। আমাদের হোটেল থেকে বেশ খানিকটাই পথ। পথ চলতে মিলল আলু ও মটরশুঁটির খেত। লাগোয়া চিলগোজা ও আপেল বাগান।  পথের ধারে পড়ল এক তোরণদ্বার। এখান থেকেই উঠে গেছে দুর্গ-শীর্ষ পর্যন্ত চড়াই সিঁড়ি পথ।

সংকীর্ণ গলিঘুঁজি পথ পেরিয়ে দুর্গের দেখা মেলে। লোহার গজাল দেওয়া প্রকাণ্ড দুর্গ প্রাসাদের গেট। দরজায় আওয়াজ করতেই কেয়ারটেকার ভিতর থেকে শিকল খুলে দিল। রীতি মেনে কোমরে মোটা সুতলি বেঁধে ও মাথায় হিমাচলি টুপি পরে ভিতরে প্রবেশ করি। চারশো বছরের পুরানো কাঠের পাঁচতলা দুর্গ। রাজা বীরভদ্র সিংহ নির্মাণ করেন।

পায়ে পায়ে এগিয়ে যাই সাংলা বাজারের দিকে। দিনের আলো ক্রমশ ম্লান হয়। সূর্য বিশ্রামে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতেই, কনকনে হাওয়ার দাদাগিরি শুরু হয়। আবছা বিকালে দেখি বেরিনাগের মন্দির। আর ব্রিজের উপর থেকে গর্জনরত প্রবাহমান বসপাকে। স্থানীয় বাজারটা বেশ বড়োসড়ো। সমতলের প্রায় সমস্ত জিনিসিপত্র-ই মজুত। অবশ্য দাম একটু বেশি। বাজার ঘুরে এবার হোটেলের পথে। ঠান্ডার প্রভাব ক্রমশ বাড়ছে।

Sunset Kinnar Kailash

রাতের পাহাড়ি প্রকৃতি, নদীর বয়ে চলা শব্দ আর অসীম আকাশে অগুণতি তারা যেন এক অন্য জগতে নিয়ে যায়। রাত গভীর হতে চাঁদের আলো ছড়িয়ে পড়ে সমগ্র উপত্যকায়।  চারপাশে বরফের মুকুট পড়া পাহাড় সারি তার মাঝে বিভোর হয়ে দাঁড়িয়ে। প্রকৃতি যেন এক অপার্থিব রূপ ধারণ করে।যেদিকে তাকাই সেইদিকেই তুষারাবৃত শৃঙ্গের অনিন্দ্য শোভা। যেন শিল্পীর তুলিতে আঁকা ছবির প্রদর্শনী। মনে হচ্ছিল যতটা সম্ভব চোখ ভরে, মন ভরে, এমনকী অন্তরাত্মা দিয়ে অবলোকন করি।

ধীরে ধীরে প্রথম আলোর ছটা পড়ে তুষার মুকুটের গায়ে। উষার আলস্য ভেঙে পাখিরা বেরিয়ে পড়ে বাসা ছেড়ে। কুয়াশা ভেজা বাতাসে কনকনে ঠান্ডার আমেজ। যেন এক স্বপ্নের দেশে পৌঁছে গেছি। ততক্ষণে দিনের আলো ফুটতে শুরু করেছে। আলোর তারতম্যে পালটাচ্ছে প্রকৃতির রূপ-রং।

কীভাবে যাবেন – হাওড়া থেকে  কালকা মেলে সরাসরি কালকা। সেখান থেকে টয় ট্রেন অথবা সড়ক পথে গাড়িতে সিমলা পৌঁছোতে হবে। বিকল্পে আকাশ পথে ট্রেনে দিল্লি অথবা চন্ডীগড়। উভয় স্থান থেকে সড়কপথে গাড়িতে সিমলা পৌঁছোতে হবে। দিল্লি থেকে কালকা-চন্ডীগড় শতাব্দী এক্সপ্রেস চলে। সিমলা থেকে গাড়ি বুকিং করে সারাহান ও সাংলা দেখতে হবে। এই রুটে বাস চললেও নিজস্ব গাড়ি থাকলেই সুবিধা।

মাছ দিয়ে পার্টি ডিশ

পরিস্থিতি নর্মাল হলে হয়তো অনেকেই বাড়িতে ছোট্টো ৫-৬ জনের জমায়েত করে, পটলাক-এর আনন্দ গ্রহণ করবেন৷ সকলে বাড়ি থেকে কিছু না কিছু রান্না করে এনে এক সঙ্গে খাওয়াই হল পটলাক-এর মজা৷ মাছ খেতে বাঙালিরা ভীষণ  ভালোবাসেন৷ এখানে দেওয়া হল  মাছ দিয়ে তৈরি এমন দুটি পার্টি রেসিপি, যা  আপনি সকলকে খাইয়ে চমকে দিতে পারেন৷ কোনও অনুষ্ঠান ছাড়াই, বাড়িতে বিকেলে চায়ের সঙ্গে খাবার হিসেবে তৈরি করুন এই ডিশ৷

চিলি গার্লিক ফিশ

উপকরণ – ৩ বড়ো চামচ তহিনি পেস্ট (তহিনি বাড়িতেই বানিয়ে রাখুন। ১/২ কাপ সাদা তিল ১৮০ ডিগ্রি প্রিহিটেড আভেনে বেক করে মিক্সারে পেস্ট করে নিন, ১/৪ কাপ অলিভ অয়েলের সঙ্গে), ২ বড়ো চামচ রসুন কুচি করা, ১ ছোটো চামচ কাঁচালংকাকুচি, ১ ছোটো চামচ চিলি ফ্লেক্স, ৩০ মিলি সানফ্লাওয়ার অয়েল,১ ছোটো চামচ সেলারি, ১ ছোটো চামচ তিল, ২টো ছোটো চামচ বেদানার দানা, ৫০০ গ্রাম কাঁটা ছাড়ানো বাসা মাছ, নুন স্বাদমতো।

প্রণালী – কাঁটা ছাড়িয়ে মাছটা চৗকো টুকরোয় কেটে রাখুন। একটা পাত্রে সমস্ত মশলা মিশিয়ে নিয়ে পেস্ট তৈরি করুন। এই পেস্ট মাখিয়ে মাছটা ২ ঘন্টা ম্যারিনেট করে ফ্রিজে রেখে দিন। এবার ফ্রিজ থেকে বের করে স্বাভাবিক তাপমাত্রায় এলে, শিকে গেঁথে গ্রিলারে গ্রিল করুন। স্টার্টার হিসাবে অতুলনীয় এই মাছের ভিনদেশি প্রিপারেশনটি।

Starter prawn dish

ট্যাম্পুরা ফ্রায়েড প্রন্স

উপকরণ – ৫-৬টা চিংড়ি মাছ, অল্প অ্যাসপারাগাস, ১/২ বাটি চালগুঁড়ো, ব্যাটার তৈরির জন্য জল, কোটিং-এর জন্য অল্প বেসনগুঁড়ো, ভাজার জন্য তেল।

ট্যাম্পুরা সসের জন্য – ১/২ কাপ সোয়া সস, ৪ ছোটো চামচ চিনি,২ ছোটো চামচ হোয়াইট ওয়াইন।

প্রণালী – একটা বোল-এ চালগুঁড়োয় জল মিশিয়ে ব্যাটার তৈরি করে নিন। এবার একটা প্যানে তেল গরম করে নিন। চিংড়িগুলো চালগুঁড়ো মাখিয়ে ব্যাটারে ডুবিয়ে ভেজে নিন। একটা অন্য প্যানে সোয়া সস-এ চিলি ও হোয়াইট ওয়াইন মিশিয়ে রান্না করে নিন৷প্রন-এর উপরে এই সস ঢেলে পরিবেশন করুন।

প্রেগন্যান্সিতে মেক-আপের সাইড এফেক্টস

প্রেগন্যান্ট অবস্থাতেও নিজেকে সুন্দর দ্যাখানো অন্যায় নয়। সুন্দর করে সেজে থাকলে নিজেরই ভালো লাগে। তাই অনেক মহিলাই এখন কুণ্ঠাহীন ভাবে অন্তঃসত্ত্বা অবস্থাতেও নানা অনুষ্ঠানে যান এবং প্রয়োজনে মেক-আপও করেন। কিন্তু এই সময় মেক-আপ করতে হলে কয়েকটি সতর্কতা অবশ্যই মেনে চলা উচিত। কারণ বিউটি প্রোডাক্ট প্রস্তুত করার সময় এগুলিতে এমন কিছু রাসায়নিক দেওয়া হয়, যা আপনার ত্বকের সঙ্গে মিশে শুধু আপনার নয়– গর্ভস্থ শিশুর উপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই কিছু প্রসাধনী ব্যবহার করার ব্যাপারে সাবধান থাকুন।

ডিয়োডারেন্ট বা পারফিউম

প্রেগন্যান্সির সময়, অতিরিক্ত কড়া সুগন্ধী ব্যবহার না করাই ভালো। তাই ডিয়ো, পারফিউম বা ফ্রেশনার কেনার সময় অবশ্যই মাইল্ড ফ্র্যাগরেন্স-যুক্ত সুগন্ধী কিনুন। এর কারণ হল কড়া গন্ধযুক্ত এই প্রসাধনীতে হানিকারক কেমিক্যালস্ থাকে, যা আপনার ও শিশুর জন্য ক্ষতিকারক হতে পারে। এটা শুধু যে আপনার ত্বকেরই ক্ষতি করবে তা নয়, শিশুর শরীরে হরমোনাল ইমব্যালান্স পর্যন্ত সৃষ্টি করতে পারে।

লিপস্টিক

এই প্রসাধনীটি প্রায় সমস্ত মহিলাই ব্যবহার করে থাকেন। কিন্তু প্রেগন্যান্ট অবস্থায় লিপস্টিক লাগানো অনেক সময় গর্ভস্থ শিশুর পক্ষে ক্ষতিকারক হতে পারে। লিপস্টিকে সীসা থাকে, যা খাবার খাওয়ার সময় শরীরে প্রবেশ করে। এই সীসা শরীরের ভিতর বাড়তে থাকা ভ্রূণের বিকাশে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। এছাড়াও এর নানারকম পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হবারও সম্ভাবনা থাকে। তাই লিপস্টিকের প্রয়োগ এড়িয়ে চলুন।

ট্যাটু

ট্যাটু আজকাল দারুণ ইন। যুবতিরা সকলেই এই ট্রেন্ডে গা ভাসিয়েছেন। প্রেগন্যান্সির সময় বা প্ল্যানিং করার পর্যায়ে ট্যাটু করার ভাবনা ত্যাগ করুন, কারণ এর ক্ষতিকারক প্রভাব শিশুর উপর পড়তে পারে। ট্যাটু থেকে অনেকসময় ইনফেকশন হয়। এর কারণ ট্যাটুতে ব্যবহূত রাসায়নিক, যা আপনার ত্বকের গভীরে প্রবেশ করে বড়ো ধরনের সমস্যা তৈরি করতে পারে।

সানস্ক্রীন ময়েশ্চারাইজার

আজকাল সব মহিলাই রোদে বেরোনোর আগে সানস্ক্রীন-এর প্রলেপ মুখে লাগান। কিন্তু প্রেগন্যান্ট মহিলাদের এই প্রসাধনী যতটা সম্ভব কম প্রয়োগ করা উচিত। কারণ এতে থাকে রেটিনিল পামিটেট, বা ভিটামিন পামিটেট। এটা রোদে বেরোনোর পরই ত্বকের উপর কেমিক্যাল রিয়্যাকশন ঘটায়। দীর্ঘসময় রোদে থাকার ফলে স্কিন ক্যানসারেরও সম্ভাবনা সৃষ্টি করে। তাই সানস্ক্রীন ব্যবহারের আগে অবশ্যই দেখে নিন, এতে এই দুটি রাসায়নিক নেই তো?

হেয়ার রিমুভাল ক্রিম

হেয়ার রিমুভাল ক্রিম-এ থিয়োগ্লাইকোলিক অ্যাসিড থাকে। এটি গর্ভাবস্থায় হানিকারক হতে পারে। গর্ভাবস্থায় শরীরে নানা ধরনের হরমোনাল চেঞ্জ ঘটে। যার কারণে, কেমিক্যাল-যুক্ত হেয়ার রিমুভাল ক্রিম থেকে অ্যালার্জি হবার সম্ভাবনা বৃদ্ধি পায়। এটি আপনার গর্ভস্থ শিশুর পক্ষেও ক্ষতিকারক হতে পারে। তাই নিজের ও সন্তানের কথা ভেবে এগুলি এড়িয়ে চলাই শ্রেয়।

নেল কালার

প্রেগন্যান্সির সময় নেল প্রোডাক্টস-ও ব্যবহার না করাই ভালো। এর কারণ এর মধ্যেও এমন কিছু রাসায়নিক থাকে, যা খাবার খাওয়ার সময় আপনার শরীরে প্রবেশ করে শিশুর ক্ষতি করতে পারে। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, নেল পেইন্ট তৈরির কারখানায় কর্মরতা মহিলাদেরও প্রেগন্যান্সির সময় নানা সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছে রাসায়নিক বিক্রিয়ার ফলে। ভ্রূণ বিকাশে সমস্যা, বা জন্মের পরেও শিশু স্বাভাবিক গতিতে বড়ো না হওয়া, এই সমস্যাগুলির অন্যতম।

ফেয়ারনেস ক্রিম

আপনি যদি কোনও ফেয়ারনেস ক্রিম ব্যবহার করে থাকেন সাধারণত, তাহলে এই সময়গুলিতে তা এড়িয়ে চলুন। এর প্রয়োগ আপনার গর্ভস্থ শিশুর পক্ষে ক্ষতিকারক। এই ক্রিমে থাকে হাইড্রোকুইনিন নামক একটি রাসায়নিক, যা গর্ভস্থ শিশুর উপর ক্ষতিকারক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে। তাই হোয়াইটনিং ক্রিম বা ফেয়ারনেস ক্রিম-এর ব্যবহার এসময় বন্ধ রাখুন।

একটি সূত্রে জানা গেছে, প্রেগন্যান্ট মহিলারা অতিরিক্ত মেক-আপ ব্যবহার করার ফলে নির্দিষ্ট সময়ের আগে প্রসবের সম্ভাবনা বেড়ে যায়। প্রিম্যাচিয়োর বেবি হওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়।

শিশুর জন্য শপিং-এর ৭টি টিপস

শিশুদের পোশাক-আশাক থেকে শুরু করে নানা ধরনের অ্যাক্সেসরিজের নানা বিকল্প রয়েছে সমস্ত মার্কেটে। তবে বিজ্ঞাপনের চাকচিক্যে সবকিছু ভুলে না গিয়ে বাচ্চার জন্য সেটাই কেনা উচিত যেটা থেকে বাচ্চার কোনওরকম ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা নেই।

বেবি কেয়ার প্রোডাক্টস বাছার আগে কয়েকটি বিষয়ে খেয়াল রাখুন

নিজের পেডিয়াএট্রিশিয়ান-এর সঙ্গে কথা বলুন

বেবিকেয়ার প্রোডাক্টস কেনার আগে নিজের বাচ্চার ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলুন। আপনার বাচ্চার জন্য উপযুক্ত এবং সুরক্ষিত প্রোডাক্ট সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য ডাক্তারই দিতে পারবেন। বাচ্চার জন্য যাই কিনুন না কেন, প্রোডাক্টটি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য প্রোডাক্টটির গায়েই লেখা পেয়ে যাবেন। প্রোডাক্ট-টিতে কী কী কেমিক্যাল্স ব্যবহার করা হয়েছে তা ওখান থেকেই জেনে যাবেন। বাচ্চার যে-জিনিসে ক্ষতিকারক কেমিক্যাল্স ব্যবহার করা হয়েছে, সেই জিনিস একেবারেই কিনবেন না।

মাইল্ড প্রোডাক্টস-বাছুন

বাচ্চাদের জন্য বিশেষ ভাবে তৈরি সাবান, শ্যাম্পু, তেল, ক্রিম ইত্যাদি কিনুন যেগুলি খুবই মাইল্ড এবং বাচ্চার কোমল ত্বকে কোনও ক্ষতি করে না। অর্গ্যানিক অথবা প্রাকৃতিক কম্পোনেন্টস দ্বারা এগুলি তৈরি হওয়া বাঞ্ছনীয় এবং দেখে নেওয়া দরকার কোনও কার্সিনোজেনিক সাবস্টেনসেজ-এর ব্যবহার এতে করা হয়েছে কিনা। শিশুর ত্বক এমনিতেই খুব সংবেদনশীল, তাই খারাপ জিনিস ব্যবহার করলেই বাচ্চার ত্বকে ফুসকুড়ি হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। র‍্যার্শ যাতে না হয়, বাচ্চার জন্য সবসময় কটন বেসড স্পঞ্জ এবং কটন তোয়ালে কেনা উচিত।

এ ছাড়াও বাচ্চার জন্য সবসময় বায়োডিগ্রেডেবল ডায়াপার ব্যবহার অপরিহার্য। এতে শুষে নেওয়ার ক্ষমতা বেশি থাকে এবং বাচ্চার ত্বক শুষ্ক, কোমল রাখতে সাহায্য করে। ফলে র‍্যাশেজ হয় না। ডায়াপার বেশি হেভি হওয়া একেবারেই বাঞ্ছনীয় নয়, এতে শিশুর অসুবিধা হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়।

প্লাস্টিক ফ্রি অথবা ননটক্সিক প্রোডাক্টস

শিশুর বয়স যত বাড়তে থাকে তাদের মধ্যে সব কিছু মুখে পুরে দেওয়ার একটা অভ্যাস লক্ষ্য করা যায়। এই সময় বাচ্চাদের জন্য এমন জিনিস কেনা উচিত যেটা বাচ্চা মুখে দিয়ে চেবালেও তার ক্ষতির কোনও সম্ভাবনা থাকবে না। এই ধরনের খেলনাগুলোকে ‘টিথার’ বলা হয়। বাচ্চার দাঁত ওঠার সময় এই খেলনাগুলো চিবোলে বাচ্চা মাড়ি-তে আরাম পায়। নানা আকার, ডিজাইন এবং রঙে এই খেলনাগুলো পাওয়া যায়। এগুলি সাধারণত তৈরি হয় সিলিকন, কাঠ, ন্যাচারাল রাবার অথবা প্লাস্টিক দিয়ে। তবে প্লাস্টিক ফ্রি খেলনাই বাচ্চার জন্য সবথেকে সুরক্ষিত।

ননটক্সিক মেটেরিয়াল দিয়ে তৈরি খেলনা বাচ্চার স্বাস্থ্যের ক্ষতি করে না। বাচ্চার ফিডিং বোতল-ও ভালো কোয়ালিটির হওয়া উচিত। প্লাস্টিকের ফিডিং বোতল যদিও বহুদিন পর্যন্ত ব্যবহারযোগ্য থাকে তবুও শিশুর শরীরের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকারক। সবসময় বড়ো দোকান থেকেই বাচ্চার জিনিসপত্র কেনাটা বাঞ্ছনীয়।

বাচ্চার সাইজ

বাচ্চার গ্রোথ খুব তাড়াতাড়ি হয়। বাচ্চার জন্য একসঙ্গে অনেক জিনিস কেনাটা কখনওই উচিত নয়। বাচ্চার প্রয়োজন অনুসারে শপিং করুন। কোনও কিছু কেনার আগে বাচ্চার সাইজের খেয়াল অবশ্যই রাখুন। নবজাতকের জন্য ‘জিরো’ সাইজের পোশাক পারফেক্ট হয় তবুও কেনার সময় বাচ্চার সাইজের থেকে এক সাইজ বড়ো কেনাটাই সব থেকে ভালো।

পরানো সহজ

বাচ্চার ত্বক অত্যন্ত সংবেদনীল। সুতরাং তার জন্য এমন পোশাক কেনা উচিত যা সহজে পরানো এবং খোলা যাবে। পোশাকের গলা কখনওই ছোটো বাছবেন না কারণ খোলা-পরানোর সময় বাচ্চার গলায় যেন পোশাকটি আটকে না যায়। খেয়াল রাখতে হবে বাচ্চার আঙুল অথবা কান-ও যেন পোশাকে আটকে না যায়।

অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিস

বাচ্চাদের অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিস যেমন বিব্স, তোয়ালে, রুমাল, মুখ মোছাবার কাপড় ইত্যাদি কেনা জরুরি যাতে ফিডিং-এর সময় বাচ্চার জামাকাপড় নষ্ট না হয়। বাচ্চাদের জন্য ডায়াপার ওয়াইপস কিনে রাখা খুব দরকার। মাল্টিপার্পাস ইউটিলিটির সঙ্গে সঙ্গে, এটি ক্যারি করাও সহজ। শীতকালের জন্য উলের পোশাক এবং কম্বল বাচ্চার জন্য অত্যন্ত জরুরি। এগুলি নরম এবং আরামদায়ক হওয়াটা খুব দরকার।

 ফ্যাব্রিক

বাচ্চার নরম ত্বকের জন্য ফ্যাব্রিক বেছে ব্যবহার করাটা খুব প্রয়োজন। নরম সুতির পোশাক বাচ্চার ত্বকের জন্য সব থেকে ভালো। বাচ্চারা প্রায়শই মুখ থেকে দুধ তোলে অথবা মুখ থেকে লালা বেরিয়ে সামনের জামা ভিজিয়ে ফেলে। তাই এমন ফ্যাব্রিক কেনা উচিত যেটা ধোয়া সহজ। বাচ্চার কাপড় ধোয়ার জন্য অ্যান্টিব্যাকটিরিয়াল ডিটারজেন্ট ব্যবহার করা উচিত, যা বাচ্চাদের জামাকাপড় ধোয়ার জন্যেই বিশেষ ভাবে তৈরি। এই ডিটারজেন্ট ব্যবহার করলে বাচ্চার জামাকাপড় নরম এবং জীবাণুমুক্ত থাকবে।

 চিনি খাওয়া কমান

এই মুহূর্তে ভারতে ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা ৬৫ মিলিয়ন, আগামী ১৫ বছরে তা ১০০ ছাড়িয়ে যাওয়ার কথা! এমনিতেই আমরা ভারতীয়রা ডায়াবেটিস প্রবণ, তার উপর পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ওবেসিটি৷ আগের চেয়ে প্রসেসড খাবার এবং নরম পানীয় খাওয়ার মাত্রাও অনেকটাই বেড়ে গিয়েছে৷ ফল হচ্ছে মারাত্মক, শিশুরাও এখনও বাড়তি ওজনের চাপ সামলাতে গিয়ে নাজেহাল হয়ে পড়ছে৷

পরিস্থিতি এতটাই সঙ্গীণ যে, চিনি খাওয়া ছাড়তে পারলে কিন্তু নেহাত মন্দ হয় না! প্রতিদিনের খাদ্যতালিকা থেকে বাদ দিন প্যাকেটজাত খাবার।পাউরুটি, সস, জ্যাম, জেলি, আচার, কর্নফ্লেক্স, বিস্কিটেও কিন্তু প্রচুর পরিমাণে চিনি থাকে, যেটা আমরা না বুঝেই খেয়ে ফেলি৷

অনেক সময়ে প্যাকেটজাত খাবারের গায়ে লেখা সতর্কীকরণ আমরা পড়েই দেখি না৷ আসলে কিন্তু সেটা বোকামি ছাড়া কিছু নয়৷ লক্ষ করে দেখবেন, খুব ছোটো পয়েন্ট-এ হয়তো লেখা আছে যে, খাবারটিতে গ্লুকোজ, ফ্রুকটোজ, মোলাসেস ইত্যাদি হরেক উপাদান ব্যবহৃত হয়েছে৷ এগুলির প্রতিটিই মিষ্টি এবং এই ধরনের জিনিস যত বেশি থাকবে খাবারটি তত অস্বাস্থ্যকর হবে৷

তবে মিষ্টি ছাড়াটা রাতারাতি সম্ভব নয়। ধীরে ধীরে চিনির পরিবর্তে মধু ব্যবহার আরম্ভ করুন৷ চিনির বিকল্প হতে পারে গুড়।  প্রতিদিনের চা বা কফিতে চিনি খাওয়ার মাত্রা কমান প্রথমে৷

যাঁদের মিষ্টি ছাড়া মোটেই চলে না, তাঁরা সপ্তাহে একবার একটা মিষ্টি খান৷ মাঝেমধ্যে নিয়ম না ভাঙলে ডায়েট মেনে বেশিদিন চলা কঠিন, কিন্তু একেবারে একগাদা খেয়ে ফেলবেন না, ছোট এক স্লাইস কেক বা একটা রসগোল্লাতেই ইতি টানুন৷প্যাকেটজাত আইসড টি, কোল্ড কফি, প্যাকেটবন্দি ফলের রস ইত্যাদি থেকে শত হস্ত দূরে থাকুন৷

নিয়মিত নিন ত্বকের যত্ন

সুন্দর ত্বকের রহস্য লুকিয়ে আছে তার যথাযথ পরিচর্যার উপর। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সরাসরি গিয়ে পড়ে ত্বকে। শীতের বাতাসে আর্দ্রতার অভাবে ত্বক রুক্ষ, নিষ্প্রাণ এবং খসখসে হয়ে ওঠে।বিয়েবাড়ি বা  উৎসবের কথা মাথায় রেখেই  ত্বকের বিশেষ যত্নের সঙ্গে সঙ্গে দৈনন্দিন জীবনশৈলীতেও পরিবর্তন আনা একান্ত জরুরি হয়ে পড়ে।

ত্বকের পরিচর্যা

ত্বক স্বাভাবিকের থেকে রুক্ষ হলে সাবান অথবা জল দিয়ে মুখ ধোয়া সমীচীন নয়। বদলে অ্যালোভেরা-যুক্ত ক্লিনজিং জেল ব্যবহার করা যেতে পারে। এতে ত্বকের আর্দ্রতা বজায় রেখেই ত্বক পরিষ্কার করা যায়। তুলোর সাহায্যে এই ক্লিনজিং জেল দিয়ে ত্বক পরিষ্কার করা যাবে।

তৈলাক্ত ত্বকের জন্য তুলসী, নিম, অথবা চন্দন ক্লিনজিং লোশনযুক্ত ফেস ওয়াশ ব্যবহার করা যেতে পারে। ক্লিনজিং-এর পরে ত্বককে টোন করার জন্য গোলাপজল লাগাতে পারেন। তুলো ভিজিয়ে গোলাপজলে ডুবিয়ে ত্বক পরিষ্কার করে নিতে পারেন।

গোলাপজল খুব ভালো প্রাকৃতিক স্কিন টোনার এবং সব রকম ত্বকের জন্য এটি উপযুক্ত। রুক্ষ ত্বকের পুষ্টি ফেরাতে রাতে ত্বক ক্লিনজিং করুন, এতে ত্বকের আর্দ্রতা বজায় থাকে। মুখে ক্রিম লাগিয়ে ২-৩ মিনিট ত্বক মালিশ করুন এবং ভিজে তুলো দিয়ে মুখ পরিষ্কার করে নিন।

ত্বকের সুরক্ষার জন্য ময়েশ্চারাইজার-এর ব্যবহার অত্যন্ত লাভজনক। দিনের বেলায় বাইরে বেরোতে হলে, সানস্ক্রীন লাগিয়ে বেরোনো বাঞ্ছনীয়। সূর্যের আলো ত্বকের আর্দ্রতা শুষে নেয়। যদি ত্বক তৈলাক্ত হয় তাহলে সানস্ক্রীন জেল লাগানো দরকার। তৈলাক্ত ত্বকে বেশি ক্রিম লাগাবার প্রয়োজন নেই কারণ ক্রিমের কারণে রোমছিদ্র বন্ধ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে। এর ফলে মুখে ব্রণ, ফুসকুড়ি হওয়া শুরু হয়।

নিয়মিত ভাবে মুখে ফেসিয়াল মাস্ক ব্যবহার করলেও অনেক লাভ পাবেন। ২ ছোটো চামচ আটার ভুসি, ১ চামচ বাদাম বা অলিভ অয়েল এবং ১-১ চামচ মধু, দই এবং গোলাপজল মিশিয়ে বাড়িতেই তৈরি করুন ফেস মাস্ক। সপ্তাহে এটি ২ থেকে ৩ বার ত্বকে লাগিয়ে আধঘন্টা রেখে দিন। তারপর জল দিয়ে রগড়ে ধুয়ে ফেলুন।

মু্খের অন্য অংশের পরিচর্যা

ত্বকের যত্নের সঙ্গে সঙ্গে মুখের বিশেষ কিছু অংশের আলাদা করে খেয়াল রাখাটা খুব জরুরি। যেমন ঠোঁটের ত্বক খুব পাতলা এবং ত্বককে মসৃণ রাখার গ্রন্থির অভাব রয়েছে ঠোঁটে। এই কারণেই ঠোঁট তাড়াতাড়ি শুকিয়ে যায় এবং বিশেষ করে শীতকালে ঠোঁট ফাটার সমস্যা শুরু হয়। মুখ ধোয়ার পর মৃত ত্বক সরিয়ে ফেলার জন্য নরম তোয়ালে দিয়ে ধীরে ধীরে ঠোঁট রগড়ান।  রোজ ঠোঁটে দুধের সর লাগিয়ে ১ ঘন্টা রেখে দিন। যদি ঠোঁটের রং কালো হয়, দুধের ক্রিম-টা তুলে নিয়ে কয়েক ফোঁটা লেবুর রস মেশান এবং মিশ্রণটি ঠোঁটে লাগান। রাতে ঠোঁটে রোজ শুদ্ধ বাদাম তেল অথবা বাদাম ক্রিম লাগিয়ে রাতভর রেখে দিন। ম্যাট লিপস্টিক একেবারেই ব্যবহার করবেন না।

রুক্ষ পা এবং ফেটে যাওয়া গোড়ালির যত্ন নেওয়া বিশেষ জরুরি। না হলে শীতকালে যতই স্টাইলিশ জুতো পরুন, পায়ের শ্রী ফিরবে না। রাতে শোবার আগে ২০ মিনিট মতো গরমজলে পা ডুবিয়ে রাখুন। গরমজলে আগে থেকে নুন এবং শ্যাম্পু মিশিয়ে নিন। গরমজলে গোড়ালির মৃত ত্বক নরম হয়ে যাবে। তারপর হিল স্ক্রাবার -এর সাহায্যে ত্বকের মৃত কোশ তুলে ফেলুন ধীরে ধীরে রগড়ে। মেটাল স্ক্রাবার ব্যবহার করবেন না।

পা ধুয়ে নেওয়ার পর ভালো ক্রিম দিয়ে গোড়ালি এবং পায়ের পাতা মালিশ করুন। ময়েশ্চারাইজিং ক্রিম বা পায়ের জন্য তৈরি ক্রিম গোড়ালিতে লাগান। সুতির পাতলা কাপড় বা সার্জিকাল গেজ গোড়ালিতে বেঁধে সুতির মোজা পরে নিন। এর ফলে শুয়ে পড়লেও ক্রিম গোড়ালিতে লেগে থাকবে, সারা বিছানায় লেগে যাবে না। সারা রাত গোড়ালিতে ক্রিম লাগিয়ে রাখার ফলে গোড়লিও নরম থাকবে।

এবার নয়া অবতারে মিলিন্দ সোমন

কখনও নগ্ন হয়ে সমুদ্র সৈকতে ছুটে উঠে আসছেন বিতর্কে, তো কখনও আবার করোনা মহামারীকে থোড়াই কেয়ার করে, পাহাড়ি পথে ম্যারাথন দৌড়ে  যোগ দিয়ে ,তাক লাগিয়ে দিচ্ছেন সুপার মডেল মিলিন্দ সোমন। ৫৫-তেও ঝকঝকে ‘তরুণ’ মিলিন্দ, ঈর্ষণীয় তাঁর দেহসৌষ্টব৷

তবে এবার একেবারে অন্য অবতারে ধরা দিলেন তিনি। যা দেখে বেশ অবাক বনে গিয়েছেন নেটিজেনরা। নাকে নাকছাবি, কপালে লাল টিপ, খোলা চুল, গলায় হার– প্রথমবার এমন ছবি পোস্ট করায়,তা নিয়ে ভক্তদের মধ্যে জল্পনা  ছিল তুঙ্গে।বিষয়টি তখন খোলসা করে  জানাননি মিলিন্দ । শিগগিরই নতুন কিছু সবার সামনে আসবে বলে জানিয়েছিলেন।

মিলিন্দের ওই নতুন ছবি দেখে  অক্ষয় কুমারের ‘‌লক্ষ্মী’র সঙ্গে অনেকে মিল পেতে শুরু করেন। সম্প্রতি ‘‌লক্ষ্মী’‌–তে অক্ষয় কুমারকে দেখা গিয়েছে তৃতীয় লিঙ্গের একটি চরিত্রে অভিনয় করতে।  ওই ছবিতেই  কোনও ভূমিকায় মিলিন্দ সোমন অভিনয় করছেন, এমনও ভাবতে থাকেন অনেকেই। কিন্তু সব কৌতুহলের নিরসন ঘটিয়ে প্রকাশ পেয়েছে আসল কথাটা। এবারে একটি ফার্স্ট লুক প্রকাশ পেয়েছে অভিনেতার।

মিলিন্দ জানিয়েছেন, এটা হল তাঁর নতুন ওয়েব সিরিজের নয়া লুক। অল্ট বালাজি ও জি-ফাইভের যৌথ উদ্যোগে আসছে ‘‌পৌরষপুর’‌৷ পৌরানিক প্রেক্ষাপটে তৈরি কাল্পনিক এক সাম্রাজ্যের কাহিনিই এই সিরিজের বিষয়। আর এই ওয়েব সিরিজে মিলিন্দ ,তৃতীয় লিঙ্গের একটি চরিত্রে অভিনয় করেছেন। মিলিন্দের চরিত্রের নাম ‘‌বরিস’‌।এই নয়া অবতারের লুক শেয়ার করে মিলিন্দ লিখেছেন, ‘‌এমন কোনও চরিত্র আগে কখনও করিনি। পৌরুষপুরের  চিত্রনাট্যে তৃতীয় লিঙ্গের মানুষরা সবসময়ই অধিকারের লড়াই করে। বরিস চরিত্রটি আকর্ষণীয় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে,  তিনি একজন বুদ্ধিমান মানুষও বটে। তাঁর চরিত্রের নানা ডাইমেনশনের সাক্ষী থাকুন’‌।

একতা কপুরের প্রযোজনায় ‘‌পৌরুষপুর’‌–এ মিলিন্দ ছাড়াও গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে রয়েছেন প্রাক্তন বিগ বস সদস্য শিল্পা শিণ্ডে, শাহির শেখ ও অন্নু কপুর। এছাড়াও টেলিভিশনের বেশ কিছু চেনা মুখও এখানে উঠে আসবে। ওটিটি প্ল্যাটফর্ম হোক বা  বলিউড ছবি, অভিনেতাদের কাছে এই তৃতীয় লিঙ্গের চরিত্রে অভিনয় করা এক প্রকার চ্যালেঞ্জের ব্যাপার। আশুতোষ রাণা, পরেশ রাওয়াল বা গুলশন গ্রোভার — সকলেই কোনও না কোনও সময়ে এই চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছেন। এবার এই চরিত্রটি ওয়েব পর্দায় ফুটিয়ে তুলতে কতটা সফল হন মিলিন্দ, সেটাই এখন দেখার।  ডিসেম্বরের শেষে, সম্প্রচারিত হবে ‘পৌরষপুর’ সিরিজটি, এমনই জানিয়েছে প্রযোজনা সংস্থা।

মেনোপজ-এর পর হাড়ের স্বাস্থ্যসমস্যা

বয়স বাড়লে স্বাস্থ্যগত সমস্যাও বেড়ে যায়। এটা খুবই সাধারণ শারীরবৃত্তিয় প্রক্রিয়া। তবে বয়স বাড়লে পুরুষদের তুলনায় মহিলারা বেশি স্বাস্থ্যসমস্যার শিকার হন। আর এই সমস্যার ক্ষেত্রে অন্যতম ভূমিকায় থাকে মেনোপজ। কারণ, মেনোপজ শুধু শরীরী মিলনে বিড়ম্বনা তৈরি করে কিংবা সন্তানধারণে অক্ষমতা তৈরি করে, বিষয়টা শুধু তাই নয়। মেনোপজ-এর পর সবচেয়ে বেশি কুপ্রভাব পড়ে শরীরের সমস্ত হাড়ে। এই সময় হাড়ের ক্ষমতা হ্রাস পেতে থাকে অস্বাভাবিক ভাবে। তাই সতর্কতা জরুরি।

বয়স বাড়লে, বিশেষ করে মেনোপজ-এর পর, কী ধরনের হাড়ের সমস্যায় আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে মহিলাদের?

বয়স বাড়তে থাকলে মহিলাদের দুটি প্রধান সমস্যায় আক্রান্ত হতে হয়। একটি হল অস্টিয়োআর্থ্রাইটিস, অর্থাৎ হাঁটুর আর্থ্রাইটিস, অন্যটি হল অস্টিয়োপোরোসিস অর্থাৎ এমন একটি অবস্থা যখন হাড় ক্রমেই ভঙ্গুর হতে থাকে। প্রাথমিক ভাবে এটি বেদনাহীন রোগ হলেও, অস্টিয়োপোরোসিস হয় মুখ্যত হাড়ে ক্যালসিয়াম ও মিনারেল হ্রাস পেতে থাকলে বা হাড়ের ছিদ্রতা বৃদ্ধি পেতে থাকলে। অন্যভাবে বললে, হাড়ে অধিক ছিদ্র হলে হাড়ের শক্তি কমে যেতে থাকে।

শরীরের কোন কোন হাড়ে বেশি কুপ্রভাব পড়ে এই সময়?

হাড়ের ক্ষয়িষ্ণুতার ফলে নিতম্বে, শিরদাঁড়ায় জোর কমে যায়, ফলে এ সময়ে রোগী ঝুঁকে যান। ফ্র্যাকচার হতে পারে সামান্য আঘাতেই, যেমন কবজি, কাঁধ বা অন্যত্র। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, অস্টিয়োপোরোসিস হল হাইপারটেনশন ও ডায়াবেটিসের মতো কিছু বেদনাহীন রোগের মতোই একটি বেদনাহীন রোগ। রোগীর হাড়ের অবস্থা কতটা ভালো বা খারাপ তা জানার জন্য বোন ডেনসিটি টেস্ট অথবা ডেক্সা স্ক্যান করিয়ে নেওয়া প্রয়োজন।

আর যে-রোগটিতে মহিলারা আক্রান্ত হন তা হল, অস্টিয়োআর্থ্রাইটিস। অস্টিয়োআর্থ্রাইটিস ও অস্টিয়োপোরোসিসের মধ্যে প্রধান পার্থক্য হল, প্রথমটি একটি বেদনাহীন রোগ। এটি একটি ডিজেনারেটিভ ডিজিজ যা অস্থিসন্ধিকে প্রভাবিত করে, যেখানে লাইনিং কার্টিলেজ ক্ষয়প্রা৫ হয় এবং বেদনা হয় অস্থিসন্ধিতে আর্থ্রাইটিক (বাতজনিত) পরিবর্তনের জন্য। অস্টিয়োপোরোসিসের মতো না হলেও, এটি শুধু শরীরের অস্থিসন্ধিতে প্রভাব ফেলে, সব হাড়ে নয়। এই রোগের ফলে শরীরের যেসব গুরুত্বপূর্ণ অংশ প্রভাবিত হয় সেগুলি হল হাঁটু, শিরদাঁড়া (যেখানে তা সাধারণত স্পন্ডিলাইটিস ঘটায়) বা বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠের গোড়া ও পায়ের বুড়ো আঙুল। এগুলি হল সবচেয়ে সাধারণ অংশ যেসব স্থান অস্টিয়োআর্থ্রাইটিসে আক্রান্ত হয়।

হাড়ের স্বাস্থ্যসমস্যায় মেনোপজ-এর প্রধান ভূমিকা কী?

যেহেতু মহিলাদের হাড়ের স্বাস্থ্য প্রভাবিত হয় এমন দুটি প্রাথমিক রোগের কথা জানলাম, এখন আমাদের বুঝতে হবে হাড়ের স্বাস্থ্য বিনষ্ট করার ব্যাপারে মেনোপজের ভূমিকা কী। মহিলাদের সারাজীবনে তাদের হাড়ের ক্যালসিয়াম কনটেন্টের দিকে ভালো ভাবে লক্ষ্য রাখলে এটা জানা যাবে যে, ২প্ত-্ব০ বছর বয়সের মধ্যে যে-পরিমাণ হাড় গঠিত হয়, অন্যদিকে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তা ক্রমে ক্রমে পুণঃশোষিত হতে থাকে। ৩০ বছর বয়স পর্যন্ত অস্থিগঠন হয় অস্থিশোষণ বা হাড়ের ক্ষয়ের চেয়ে বেশি, যার ফলে এক পজিটিভ মেটাবলিজম ঘটে। তবে, ৩০ বছর বয়সের পর হাড় ক্রমেই হ্রাস পেতে শুরু করে, অর্থাৎ অস্থিগঠন কম হয় অথচ অস্থিক্ষয় ক্রমেই বৃদ্ধি পায় বা স্থির থাকে।

মহিলাদের ক্ষেত্রে, ফিমেল হরমোনের প্রোটেকটিভ এফেক্ট অস্থিশোষণের পরিমাণ প্রতিরোধ করে। কিন্তু, একবার মেনোপজ শুরু হলে, মহিলাদের হরমোনের এই প্রোটেকটিভ এফেক্ট দূরীভূত হয় এবং হাড়ের ডিসর্পশন হার বৃদ্ধি পায়, এমনকী বেশ দ্রুতগতিতেই। এই কারণে ভারসাম্য আরও বাধাপ্রা৫ হয় এবং মেনোপজের পর দ্রুতহারে হাড়ের ক্ষয় হতে থাকে। ৬০ বছর বয়সের পর একসময় তা জটিল অবস্থায় পৌঁছোয়, অবশ্য তার আগেও হতে পারে।

হাড়ের স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধারের জন্য কী করা উচিত?

বোন ডেনসিটি যথাযথ রাখা এবং ফ্র্যাকচারের ঝুঁকি কমানোর জন্য ডেক্সা স্ক্যান বা বিএমডি টেস্টের মতো সহজ পরীক্ষা করিয়ে নেওয়া জরুরি। এইসব টেস্টের ফলে বুঝে নেওয়া যাবে হাড়ের অবস্থা কেমন, ঠিক যেমন ব্লাড সুগার টেস্টের দ্বারা ডায়াবেটিসের মাত্রা বোঝা যায়। এরসঙ্গে, ব্লাড ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি পরিমাপ ও অন্যান্য রক্ত পরীক্ষার দ্বারা রোগীর স্বাস্থ্যের অবস্থা জেনে নেওয়াও প্রয়োজন। এইসব পরীক্ষার ফলাফলের উপর নির্ভর করে চিকিৎসক বুঝতে পারবেন ওই অবস্থার কারণে চিকিৎসার প্রয়োজন আছে কিংবা নেই।

প্রধান ঝুঁকিগুলি কী কী?

আমরা আগেও বলেছি, অস্টিয়োপোরোসিসের প্রধান ঝুঁকি হল ফ্র্যাকচার, যা আর্থিক দিক থেকে বেশ ব্যয়সাপেক্ষ এবং রোগীর সচলতা বিনষ্টকারক। দুর্ভাগ্যক্রমে, কিছু ক্ষেত্রে এর ফলে মারাত্মক পরিস্থিতি দেখা যায়। যদি উরু, নিতম্ব প্রভৃতি জায়গায় ফ্র্যাকচার হয়, তা নিরাময় করা বেশ কঠিন, বিশেষ করে বয়স্কদের ক্ষেত্রে।

চিকিৎসক হিসাবে কী পরামর্শ দেবেন রোগীদের?

সুখের কথা, আজকাল আমাদের হাতে প্রচুর ওষুধপত্র রয়েছে অস্টিয়োপোরোসিস চিকিৎসার জন্য। রোগী তার রোগের কোন পর্যায়ে রয়েছেন, তার উপর নির্ভর করে অর্থোপেডিক সার্জন ও ফিজিশিয়ানগণ এই দৗর্বল্যজনক রোগের চিকিৎসা পদ্ধতির ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।

যদিও সবরকম ওষুধপত্র ও চিকিৎসার ব্যবস্থা রয়েছে, তবুও সবসময় উচিত হল নিরাময়ের আগেই এই অবস্থার প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া। অস্টিয়োপোরোসিস রোধ করার জন্য মহিলাদের জীবনশৈলীর যে লক্ষ্যণীয় পরিবর্তন মেনে নেওয়া প্রয়োজন, তা হল জীবনের প্রথম ৩০ বছরে অধিকতর ভালোমানের অস্থিগঠন নিশ্চিত করা। এরফলে পরবর্তী জীবনের ক্ষতি আটকানো সম্ভব হবে, যখন হাড়ের ক্ষয় আরম্ভ হবে। এছাড়াও, আরও যেসব দিকে নজর রাখা উচিত সেগুলি হল–

  •  ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্য গ্রহণ করুন। এতে আধ লিটার দুধ ও দুগ্ধজাত প্রোডাক্ট থাকা উচিত
  • যথেষ্ট পরিমাণে ব্যায়াম প্রয়োজন, কারণ এর ফলে হাড়ের মান ও স্বাস্থ্য উন্নত হয়
  •  ধূমপান, অতিরিক্ত মদ্যপান ও অতিরিক্ত রোগা হওয়া এড়িয়ে চলুন, যা অস্টিয়োপোরোসিসের একটি কারণ হতে পারে। দেখা গেছে, বিএমআই খুব কম হলে তা বেশি বয়সে অস্টিয়োপোরোসিস ডেকে আনে
  •   যদি কারও কমবয়সে মেন্সট্রুয়াল ইরেগুলারিটি থাকে, তাহলে একজন স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞর সঙ্গে পরমর্শ করা উচিত, কারণ এরফলে হাড়ের স্বাস্থ্যের ব্যাপারে ফিমেল হরমোনের প্রোটেক্টিভ এফেক্ট বাধাপ্রা৫ হয় এবং সংশ্লিষ্ট মহিলার অস্টিয়োপোরোসিস-এ আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা বৃদ্ধি পায়

যদি জীবনের গোড়ার দিকে লাইফস্টাইল ভালো রাখা যায়, তাহলে তাড়াতাড়ি অস্টিয়োপোরোসিসে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা তুলনামূলক ভাবে কম থাকে। অবশ্য, অস্থি সংক্রান্ত রোগের ব্যাপারে সন্দেহ হলে একজন ফিজিশিয়ানের সঙ্গে পরামর্শ করা ও প্রয়োজনীয় পরীক্ষাগুলি করিয়ে নেওয়া আবশ্যিক।

পড়ার জন্য সীমাহীন গল্প-নিবন্ধসাবস্ক্রাইব