মূল্যবোধের সঠিক শিক্ষা নিয়ে বড়ো হোক সন্তান

সঠিক উপলব্ধি এবং মূল্যবোধ-ই সন্তানকে জীবনে এগিয়ে যেতে প্রেরণা জোগায়। অথচ, আমাদের সমাজে মূল্যবোধ কমে যাচ্ছে। তবে, প্রতিযোগিতার ইঁদুর দৌড়ে সন্তানকে সব দিক দিয়ে সফল করতে মা- বাবা চেষ্টার কোনও ত্রুটি রাখেন না। একদিকে উপলব্ধি কিংবা বোঝার চেষ্টা আর অন্যদিকে জীবনের সঠিক মূল্যবোধগুলির সঠিক নির্মাণ করতে করতেই বাচ্চাদের জীবন চলতে থাকে। আসলে, মূল্যবোধের লিস্ট বিশাল লম্বা কিন্তু আমাদের দৈনন্দিন জীবনে কতটা কাকে গুরুত্ব দিতে হবে এটা নিয়ে বাচ্চারা কনফিউজড হয়ে পড়ে। কিছু কিছু মূল্যবোধ যেমন শালীনতা, নম্রতা, ত্যাগ, সহানুভূতি, দায়িত্ব,কর্তব্যপরায়ণতা, সততা ইত্যাদির সঠিক অর্থ অনেক মা-বাবাও জানেন না হয়তো।

সাইকোলজিস্টদের মতে, তোতা পাখিকে বুলি শেখানোর মতো বাচ্চাদের জীবনের মূল্যবোধ শেখানো যায় না। যদি মা-বাবা নিজেরা সৎ এবং ধৈর্য রেখে বাচ্চাদের ভালো কিছু শেখান, তবেই তারা জীবনে সফল হবে। আর তা যদি না হয়, অর্থাৎ মুখস্থবিদ্যার মতো করে যদি বাচ্চারা মূল্যবোধের শিক্ষা নেয়, তাহলে হয়তো এমন পরিস্থিতিতে বাচ্চাটিকে পড়তে হতে পারে, যেখানে তার শিখে আসা মূল্যবোধকে টিকিয়ে রাখা তার কাছে অসম্ভব হয়ে দাঁড়াতে পারে।

এই প্রসঙ্গে একটি ঘটনার উল্লেখ করছি। ইভা বাড়িতে মা-বাবার কাছে সবসময় বড়োদের সম্মান করার কথা শুনেছে এবং সেই মতো চলারও চেষ্টা করে। স্কুলে শিক্ষিকাদেরও যথেষ্ট সম্মান করে কিন্তু সামান্য একটা ভুল বোঝাবুঝির কারণে ওদের ইতিহাসের শিক্ষিকা ইভা-র উপর ক্ষুব্ধ হন। ইভা ক্ষমা চেয়ে নেওয়ার পরেও, পরীক্ষার খাতায় ইভা-র প্রতি বিদ্বেষ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। খাতা নিয়ে সরাসরি ইভা ওই শিক্ষিকার সঙ্গে কথা বলে এবং শিক্ষিকা মানতে না চাইলেও, মা-বাবার বারণ অগ্রাহ্য করে ইভা স্কুলের প্রধান শিক্ষিকার কাছে নালিশ জানায়। এখানে ইভা-র মূল উদ্দেশ্য কিন্তু শিক্ষিকাকে অসম্মান করা ছিল না। তার বিদ্রোহ ছিল নিজের উপর হওয়া অবিচারের বিরুদ্ধে।

প্রভাব পড়ে ব্যক্তিত্ব বিকাশের উপরেও

শিশু বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুরা একতাল ভিজে মাটির মতো। যেমন শেপ দিতে চাইবেন, সেই ছাঁচে ঢেলে নিতে হবে। এই দায়িত্বটা কিন্তু মা-বাবার। তাদের সন্তানকে কীভাবে তারা গড়ে তুলবেন, তা তাদের একান্তই নিজস্ব ব্যাপার। জীবনের মূল্যবোধগুলো বাচ্চারা শেখে বাড়ির চৌহদ্দির মধ্যে। এখনকার জেনারেশন নতুন টেকনিক্যাল গ্যাজেটস-এর উপর নির্ভরশীল। ছোটো বয়সেই শিশুদের হাতে মা-বাবারা স্মার্টফোন, আইপ্যাড, আইফোন, ল্যাপটপ ইত্যাদি তুলে দিচ্ছেন এই ভেবে যে, তাদের বাচ্চা স্মার্ট কিড তৈরি হবে। অথচ মা-বাবা সন্তানকে যা যা শেখাবার বা বলার চেষ্টা করেন, তার পঞ্চাশ শতাংশই বাচ্চারা কানে তোলে না। এইভাবেই স্কুল থেকে কলেজে এবং কলেজ থেকে চাকরির জায়গাতেও এই বাচ্চারাই অন্যের কথা শুনতে চায় না, এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে বড়ো হয়েও। এই ধরনের মানসিকতা শিশুর ব্যক্তিত্ব বিকাশের উপরেও প্রভাব ফেলে।

এখন অভিভাবককেরা বেশিরভাগই ওয়ার্কিং। সুতরাং স্ট্যান্ডার্ড অফ লিভিং-ও আগের তুলনায় অনেক উঁচু। বাচ্চা কিছু চাইলেই সঙ্গে সঙ্গে মা-বাবার কাছ থেকে সেটা সে পেয়ে যায়। চাইল্ড সাইকোলজিস্টদের মতে, স্ট্যান্ডার্ড অফ লিভিং না বাড়িয়ে বরং অভিভাবরকদের উচিত স্ট্যান্ডার্ড অফ গিভিং বাড়ানো। অবসর পেলেই বাচ্চাদের সঙ্গে সময় কাটানো উচিত, ওদের প্রয়োজনে সবসময় ওরা যেন মা-বাবাকে পাশে পায়। অন্যের মুখ থেকে না শুনে নিজের বাচ্চার থেকে শুনে তবেই কোনও মতামত দেওয়া উচিত বড়োদের।

আজকাল কোনও অনুষ্ঠান অথবা পার্টিতে বাচ্চারা জমায়েত হলে সেখান থেকে বাড়ি ফিরে মা-বাবার সঙ্গে আনন্দ শেয়ার না করে, নিজেদের মোবাইল ফোন নিয়েই ব্যস্ত হয়ে পড়ে। ফলে ভালো গল্প বলার ক্ষমতাও নতুন প্রজন্মের মধ্যে অনেকই কম। বাচ্চাদের কথার মধ্যে অ্যাগ্রেসিভ ভাব এখন অনেক বেশি। এই প্রজন্মের অ্যাগ্রেসিভনেস টোন করা খুব জরুরি। বাচ্চাকে কোনও কিছু করতে বারণ করা হলে তার কারণটা পরিষ্কার করে বুঝিয়ে বলাও খুব প্রয়োজন। বাচ্চাকে শিষ্টাচার শেখাতে চাইলে মা-বাবারও জীবনের মূল্যবোধ সম্পর্কে একটা স্পষ্ট ধারণা থাকা উচিত।

আত্মবিশ্বাসও প্রভাবিত হয়

এখন বেশিরভাগই নিউক্লিয়ার ফ্যামিলি, যেখানে বাচ্চারা শুধুমাত্র মা-বাবার সঙ্গেই মেলামেশা করার সুযোগ পায়। এক্সটেনডেড ফ্যামিলি বলতে আর কিছু থাকে না। দাদু, ঠাকুমা, অন্যান্য আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে বছরে হয়তো দেখাই হয় শুধু কয়েকবারের জন্য। জীবনের মূল্যবোধ শেখা শুরু হয় ডাইনিং টেবিলে বসে। কলেজ ক্যান্টিনে বন্ধুদের সঙ্গে একসঙ্গে বসে খাবার খাওয়াটা ‘টিমওয়ার্ক’ হয়ে ওঠে। এইসবের প্রভাব পড়ে বাচ্চার আত্মবিশ্বাস গঠনের উপরেও।

অভিভাবকেরা এর জন্য কতটা দায়ী

অভিভাবকরা বাড়িতে থেকেও, ‘বাবা-মা বাড়িতে নেই’ বলে বাচ্চাকে দিয়ে বাইরের লোকেদের বার্তা পাঠান। এই ধরনের ব্যবহার বাচ্চাদের আরও কনফিউজ করে দেয়।

মনোবৈজ্ঞানিক এবং পেরেন্টিং এক্সপার্টদের মতে, শিশু ছোটো থেকেই পরিবারের মধ্যে থেকে মূল্যবোধগুলো সম্পর্কে শেখে। তাই মা-বাবার উচিত নিম্নোক্ত কিছু জিনিস খেয়াল রাখা।

  • বাচ্চাকে সারাদিনে কম করে এক ঘণ্টা সময় দিন, যে-সময়টাতে আপনি শুধু বাচ্চার কথাই শুনবেন
  • বাচ্চাকে যেটা বলবেন করতে, সেটা নিজেও পালন করার চেষ্টা করবেন
  • বাচ্চার মধ্যে সহানুভূতির উদ্রেক করার চেষ্টা করুন। মুখে বলার থেকে কাজের মধ্যে দিয়ে শিশুর মনের গভীরে প্রবেশ করবার চেষ্টা করুন
  • নিজের মূল্যবোধগুলি সম্পর্কে বাচ্চাকে বলুন এবং সেগুলো কেন জরুরি সেটাও ওকে বুঝিয়ে দিন
  • জীবনে মূল্যবোধ থাকাটা কেন দরকার সেটা বিশ্লেষণ করাটা খুব প্রয়োজন
  • বাচ্চার সঙ্গে কথা বলুন, উপদেশ নয়। ভালো কিছু করলে তাকে বাহবা দিন
  • খাতা কলমে জীবনের মূল্যবোধকে আটকে রাখবেন না, বাচ্চা সেটা মানছে কিনা খেয়াল রাখুন। বাচ্চা সেটা না মানলে, কারণ অনুসন্ধান করুন। সমাধানের রাস্তা খুঁজুন এবং বাচ্চাকে বলুন
  • জীবনের মূল্যবোধের সঙ্গে সঙ্গে টাকার গুরুত্বও তাকে বোঝান।

পুরিতে পরি (পর্ব-০১)

শুনলাম ‘পরি’। কিন্তু এমনটা শোনার কথা নয়! প্রসঙ্গটা ছিল বেড়াতে যাওয়া, মানে ভ্রমণ। টেলিফোন বাহিত হয়ে যে কথাটা আমার কানে ঢুকেছিল, সেটা তো আগেই বলেছি। কিন্তু পরি কেন? পরি তো কোনও বেড়াবার জায়গা নয়। একজন মেয়ের নাম। হ্যাঁ, আমার পরিচিত। শুধু পরিচিত? তার চেয়ে হয়তো একটু বেশি, কিন্তু না, আর নয়। পরি যেখানে ছিল, সেখানেই থাক। এ ব্যাপারে আর একটি কথাও না। আমি একটু বোকা! কিন্তু এতটা বোকা নই যে, নিজেই নিজের হৃদয় খুঁড়ে বেদনাকে বেশ পরিপাটি করে জাগিয়ে তুলব। একেই বোধহয় ধান ভানতে শিবের গীত গাওয়া বলে।

কথা তো হচ্ছিল বেড়াতে যাওয়া নিয়ে, সেখানে এসব কী? আসলে ও-প্রান্তে যা বলতে চেয়েছিল, সেটা এখন জানলাম পুরী। ওহ পুরী, তাও আবার সেখানে বেড়াতে যাওয়া। বুঝলাম ওই জন্যই আমার কানে ঢুকেও ঢোকেনি কেন? আমার হাসি পাচ্ছিল। আজ পর্যন্ত ভারতবর্ষের কম জায়গা তো ঘোরা হয়নি। শুধু পুরীটা ব্যাগের এক কোণে কেমন করে যে পড়েছিল, বুঝতেই পারিনি। বুঝলাম আর দেরি করা উচিৎ নয়। সুতরাং ফাইনাল। সেই উপলক্ষ্যে কৃষ্ণনগর গেলাম। আমাদের দলের বাকি সদস্যরা ইতিমধ্যেই কৃষ্ণনগর চলে এসেছে। রাতের ট্রেন— গরিবরথ, হাওড়া থেকে ছাড়বে।

বাড়ি জমজমাট। ভালোই লাগছিল। বিকেলের দিকে ঘূর্ণিতে গেলাম। কখন যে দু’ঘণ্টা কেটে গেল বুঝতেই পারলাম না। মনে হল, ঘূর্ণি যারা না দেখেছে, তারা মাটির তৈরি অসাধারণ শিল্প-সৌকর্য দেখা থেকে বঞ্চিত। প্রায় ২০০ বছর ধরে মূর্তি তৈরির কাজ করছে ঘূর্ণির শিল্পীরা। কীভাবে বানায়! এ প্রশ্ন প্রত্যেকের মনে না আসাটাই অস্বাভাবিক। থাক, ঘূর্ণির ইতিহাস না হয় পরে কোথাও বলা যাবে। এখন পুরী, শুধুই পুরী।

আমরা কৃষ্ণনগর থেকে ভাড়া করা গাড়িতে চেপে সবাই যথাসময়ে হাওড়া স্টেশনে এলাম। এক্সপ্রেস ট্রেনও সময়মতো হাওড়া থেকে ছেড়ে দিল। ট্রেন ছাড়ার কিছুক্ষণ পরেই রুটি আর চিকেনকারি দিয়ে ডিনার। শেষ পাতে অবশ্যই কৃষ্ণনগরের সরপুরিয়া। শুরুতে ছিল সরভাজা, এখন সরপুরিয়া। সরভাজার টেস্ট একটু কড়া, খাঁটি গাওয়া ঘি দিয়ে ভাজা। আর সরপুরিয়া কিছুটা সন্দেশের মতো। হালকা পাকে তৈরি। এবার শোয়ার ব্যবস্থা।

রথ চলতে চলতে এক সময় ভোর হল। পার হল ভুবনেশ্বর। সাক্ষীগোপাল স্টেশন পার করে গরিবরথ এক সময় পৌঁছে গেল পুরী। সেই পুরী। ছোটোবেলা থেকে যার গল্প শুনে আসছি। ঠাকুমা আর আমার পিসতুতো দিদি শ্যামলী গিয়েছিল তীর্থ করতে। তখন তো আমি খুব ছোটো, সেই সময় শুনেছি গল্প। সেই স্বপ্নের দেশে আর কিছুক্ষণের মধ্যেই পৌঁছে যাব। কতদিনের অপেক্ষার সমাপ্তি। উত্তেজনায় টগবগ করে ফুটছি। কিন্তু কোনও শোরগোল তো নেই, কোথায় সেই জয় জগন্নাথ ধ্বনি। শুনেছিলাম পুরী স্টেশনে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে জয় জগন্নাথ ধ্বনিতে আকাশবাতাস মুখরিত হয়ে ওঠে। যে যার ব্যাগ বুঝে নিয়ে গেটের দিকে এগিয়ে গেলাম। সেইসঙ্গে অটোওয়ালারা ঘ্যান ঘ্যান করতে করতে পিছনে আসতে লাগল।

যত তাড়াতাড়ি সম্ভব স্টেশনের বাইরে এসে হোটেল মালিকের সঙ্গে যোগাযোগ করার জন্য মোবাইল বার করতে গিয়ে আটকে গেলাম। বেশ কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে থাকা একটি মেয়ে, ঠিক সেই সময় আমাদের দিকে মুখটা ঘোরাল। মৌটুসি না? ঠিক দেখছি তো? নিশ্চয়ই মৌটুসি, মানে আমাদের পরি! না না ভুল বললাম, আমাদের নয়, পরি নামটা শুধু আমরা জানতাম। আমি আর মৌটুসি। ততক্ষণে শান্ত আমার সামনে, হোটেল মালিকের সঙ্গে কথা হল কিনা জানতে চাইছে। যোগাযোগ করে যখন আবার তাকালাম, একটু আগে যেখানে পরি ছিল, সে জায়গা এখন ফাঁকা। কেউ নেই। সত্যিই ছিল তো? নাকি পুরোটাই আমার চোখের ভুল।

( দুই )

হোটেলে আমাদের পাঁচটা ঘর বুক করা ছিল। পুরীর স্বর্গদ্বারে দিগন্তগলির মধ্যে এই হোটেল। খুব সাধারণ, পুরোনো বাড়ি, অপরিছন্ন বাথরুম। তিনতলায় তিনটি এবং চারতলায় দু’টি ঘর। খুব কাছেই সি-বিচ। হোটেলের সামনেই চায়ের দোকান। মালপত্র রেখে সবাই চা খেলাম। এবার খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা। রান্নার মাসি ঠিক করা হল দু’বেলা রান্না করবে। সমস্ত সরঞ্জামের ব্যবস্থাও হয়ে গেল। আমি, শান্ত, সমর্পণ আর অরিত্র বাজারে গেলাম, কাছেই বাজার। এখানে মাছ বেশ সস্তা, বাকি সবজির দামও খুব বেশি নয়।

রান্নার মাসির রান্নার হাত বেশ ভালোই। বাড়ি কাটোয়ার কাছে পানুহাটে, আমাদের দেশের বাড়ির কাছেই। বোধহয় সেজন্যই আরও ভালো লাগছিল। কিন্তু গোল বাঁধল অন্য এক বিষয়ে।

যে-জায়গায় আমাদের হোটেল, ঠিক তার সামনেই মহাশ্মশান। সেখানে মৃতদেহের মিছিল- -একসঙ্গে তিন-চারটি চিতা জ্বলছে রাতদিন, বিরামহীন। বিরামহীন কটূ গন্ধ, তার সঙ্গে ছাই। জানলা, দরজা কালো হয়ে গেছে, চ্যাটচ্যাটে। প্রাণ ওষ্ঠাগত। যদিও সমুদ্র একেবারে হাতের নাগালে। সি-বিচ খুবই কাছে। বাজার-হাট কাছে। কিন্তু এতসব সুবিধায় জল ঢেলে দিচ্ছিল কালো ধোঁয়া। আর ফাউ হিসেবে মড়া পোড়ার কটূ গন্ধ! এককথায় এখানে থাকা অসম্ভব। অগত্যা হোটেল ত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নিতে হল, সর্বসম্মতিক্রমে। পাঁচ হাজার টাকা অ্যাডভান্স করা হয়েছিল। সব জলাঞ্জলি দিতে হল। খোঁজাখুঁজি করে একটা নতুন হোটেল পেলাম লাইট হাউসের কাছে। বাজার-হাট কোলাহল থেকে বেশ কিছুটা দূরে। প্রায় নতুন এই হোটেলটা বেশ আরামপ্রদ। ঘরগুলি প্রশস্ত, বাথরুম যথেষ্ট পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। খাওয়ার ব্যবস্থা ভালো নয়। তাই অন্য জায়গায় আমরা খেতাম।

দ্বিতীয়দিন হোটেলে খাওয়ার পর ওরা সবাই ফিরে গেল। আমি থেকে গেলাম, ইচ্ছে একটু ঘোরাঘুরি করা। হাঁটতে হাঁটতে বেশ কিছুটা এগিয়ে যাওয়ার পর একটা দোকানের দিকে চোখ চলে গেল, মনে হল পরির মতো কাউকে দেখলাম। সেই পুরীর স্টেশনে পরিকে অথবা পরির মতো কাউকে দেখার পর থেকে, আমার মধ্যে শুধু পুরী নয়, পরিও জেঁকে বসে আছে। দেখতে এসেছি পুরী কিন্তু পরিকে কিছুতেই সরাতে পারছি না।

তখন ইলেভেনে পড়ি, কাটোয়া কলেজে বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হয়েছি। মৌটুসি মানে পরিও আমাদের সঙ্গে। অসম্ভব সুন্দর। একবার দেখলে চোখ ফেরানো যায় না। একটু আধটু আলাপ হয়েছে, তেমন ঘনিষ্ঠতা তখন কোথায়? সে সময় আমি একটা অদ্ভুত কাণ্ড ঘটিয়েছিলাম। এখন ভাবি, কেমন করে পেরেছিলাম। ভাবতে ভাবতে পথ হাঁটছিলাম, হঠাৎ শ্যামের বাঁশি, মানে মোবাইল বেজে উঠল। তাড়াতাড়ি একটা অটোরিকশা চেপে হোটেলের দিকে রওনা হলাম।

( তিন )

এখানে প্রায় সকলেই ধাঁই কিরি কিরি শব্দটা ব্যবহার করছে। জিজ্ঞেস করে জানলাম এর মানে হল তাড়াতাড়ি। ইতিমধ্যেই আমরা পুরীর বেশকিছু দর্শনীয় জায়গা দেখে নিয়েছিলাম। প্রথমেই চন্দন সরোবর। সরোবরের মধ্যিখানে মন্দির। জগন্নাথদেবের পিসির বাড়ি। ওখানে যাওয়ার আগে আমাদের অটোচালক বারবার সাবধান করে দিল, বোবা হয়ে যাবেন, আর কালা হয়ে ফিরে আসবেন। অর্থাৎ কোনও জায়গাতে কিছু জিজ্ঞেস করা যাবে না, করলেই অর্থদণ্ড।

অরিত্র হাঁদার মতো এক জায়গায় দাঁড়িয়ে পড়েছিল, সঙ্গে সঙ্গে ওর হাতে মন্ত্রপূত কিছু গুঁজে দিয়ে নতুন কাপড় দাবি করে একজন পান্ডা হইচই বাঁধিয়ে দিল। ১১ টাকা দিয়ে কোনওরকমে সে যাত্রায় উদ্ধার পাওয়া গেল। অরিত্রদের বাড়িতে একটু ঠাকুর ঠাকুর বাই আছে, ধরা পড়েছিল সম্ভবত সেই ফাঁদে! এদিকে নিবেদন লিখিত নিষেধ অমান্য করে কোনও পারমিশন ছাড়াই মন্দিরের ফোটো তুলছিল। মন্দির কর্তৃপক্ষ জরিমানা করল। এরপর দু’টো সমাধি মন্দির, রাস্তার এপারে আর ওপারে।

(ক্রমশ…)

পয়লা বৈশাখ (শেষ পর্ব)

কেয়াদিদের বিপদে-আপদে দেবাঞ্জনরাই ছুটে আসে সবচেয়ে আগে। দেবাঞ্জন কেয়াদির চেয়ে প্রায় পাঁচ বছরের ছোটো বলে অবাধ মেলামেশায় কোনও বাধা ছিল না। কেউ ভাবতেই পারত না তখন কেয়াদি আর দেবাঞ্জন প্রেমিক-প্রেমিকা। রাস্তা দিয়ে গেলে লোকে অনুমান করত ওরা ভাই-বোন। ওরা দু’জনে দু’জনকে ভালোবাসে, একথা অতিবড়ো শত্রুও তখন বলতে পারত না।

সে রাতে হালখাতার পর্ব চুকিয়ে এসে পার্ট ওয়ান পরীক্ষার পড়ায় ব্যস্ত কেয়াদির চোখ টিপে ধরেছিল দেবাঞ্জন আচমকা। ফিলোসফির বইয়ের পাতায় চোখ থাকলেও কেয়াদির মন দেবাঞ্জনের প্রতীক্ষায় অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিল। তাই দেবাঞ্জন গুটিগুটি পায়ে ঘরে এসে পিছন দিক থেকে কেয়াদির চোখ টিপে ধরামাত্র কেয়াদি পিয়ানোর সুরে বেজে উঠল, ‘তোমার এতক্ষণে আসার সময় হল? তুমি কি জানো না তোমাকে একটা দিন দেখতে না পেলে আমার…’

—কী করব বলো। দোকানে আজ হালখাতা ছিল যে। বছরের এই একটা দিন না গেলে বাবা খুব রাগ করেন। দেবাঞ্জন তার চোখ থেকে হাত সরিয়ে নিয়ে বলল।

সে কথা শুনে কেয়াদি বলল, ‘তা ঢং দেখাতে এলে কেন?’

দেবাঞ্জন হাত থেকে রজনীগন্ধার মালা খুলে কেয়াদির খোঁপায় পরিয়ে দিয়ে বলল, “এলাম এই জন্য। আয়নার দিকে তাকিয়ে দেখো তোমায় কত ‘সুন্দর’ দেখাচ্ছে।’

ব্যস, দেবাঞ্জনের ওই একটা কথায় কেয়াদির সমস্ত রাগ একেবারে গলে জল হয়ে গেল। এমার্জেন্সি লাইটের আলোয় দেয়ালের গায়ে ফুটে ওঠা সিল্কের পাঞ্জাবি ও পাজামা পরা দেবাঞ্জনের ছায়ামূর্তিটা দেখে কেয়াদি পড়ার টেবিল থেকে উঠে পড়ল। তারপর মুগ্ধ দৃষ্টিতে দেবাঞ্জনের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে চাপাস্বরে বলল, ‘তোমাকে আর বাচ্চা ছেলে বলে মনেই হচ্ছে না। মনে হচ্ছে তুমি অনেক বড়ো হয়ে গেছ। এবার থেকে তুমি আর হাফ প্যান্ট পরবে না। পাজামা-পাঞ্জাবি পরবে, কেমন?’

—আচ্ছা। বলে দেবাঞ্জন কেয়াদিকে ড্রেসিং টেবিলের কাছে নিয়ে গিয়ে আবার বলল, খোঁপায় রজনীগন্ধার ফুলের মালা দিলে তোমায় কেমন সুন্দর লাগে দেখো।

কেয়াদি ড্রেসিং টেবিলের আয়নায় নিজেকে দেখে মুগ্ধ হল। খোঁপায় ফুলের মালা জড়ালে যে তাকে দেখতে আরও ভালো লাগে, তা তার জানা ছিল না। কস্তুরী মৃগ যেমন আপন গন্ধে মাতোয়ারা হয়ে বনের মধ্যে ছুটে বেড়ায়, ঠিক সেইরকম কেয়াদি নিজের রূপের আলোয় আলোকিত হয়ে খুশিতে ফিক্ করে হেসে উঠল। জানলা দিয়ে উড়ে এসে কখন একটা জোনাকি পোকা তার নাকের পাটায় এসে বসেছে খেয়াল নেই। হঠাৎ জোনাকিটা জ্বলে উঠতেই দেবাঞ্জনের মনে হল, কেয়াদি আজ লাল পাথর বসানো নাকছাবি পরেছে।

গত বছর গরমের ছুটিতে বাবার সঙ্গে খাজুরাহোর মন্দিরে পাথরে খোদাই করা ঠিক এরকম একটি মূর্তি সে দেখেছিল। কিন্তু এক বছর আগে দেখা পাথরের সেই অপূর্ব সুন্দরী নারীর সঙ্গে কেয়াদির চেহারার এমন আশ্চর্য মিল হল কী করে। তা হলে কি ভগবান পাথরে খোদাই করা খাজুরাহোর মন্দিরের সেই অপরূপ রূপসীকে জীবন্ত করে আজ দেবাঞ্জনের সামনে এনে দিয়েছে! এ-ও কি সম্ভব?

সম্ভব-অসম্ভবের মধ্যে দেবাঞ্জন যখন দোদুল্যমান অবস্থায় রয়েছে, ঠিক তখন কেয়াদি আরও কাছে সরে এসে বলল, ‘কী দেখছ অমন করে?’

—লাল পাথর সেট করা নাকছাবিটায় তোমায় খুব সুন্দর মানিয়েছে। দেবাঞ্জন বলে উঠল।

কেয়াদি নাকে হাত দিয়ে বলল, “কই নাকছাবি তো পরিনি।”

কেয়াদির হাতের ছোঁয়ায় জোনাকি পোকাটা জানলার বাইরে উড়ে যেতেই দেবাঞ্জন বলল, “ইস, দিলে তো জোনাকি পোকাটাকে উড়িয়ে। তোমার নাকে বসে ওটা যখন জ্বলছিল তখন আমি ভাবলাম বুঝি তুমি আজ লাল পাথর বসানো নাকছাবি পরেছ। সত্যি নাকছাবি পরলে কিন্তু তোমাকে খুব ভালো লাগবে।’

সে কথা শুনে কেয়াদি হাসতে হাসতে দেবাঞ্জনের গলা জড়িয়ে ধরে বলে উঠল, ‘তুমি যখন বলছ তখন এ মাসেই একটা নাকছাবি বানাব। জানো, আমার মাঝে মাঝে ভীষণ ভয় করে।’

—কেন? দেবাঞ্জন প্রশ্ন করল।

কেয়াদিকে বলতে শোনা গেল, ‘যদি আমাদের ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়?

দেবাঞ্জন বলল, “দূর, তা কখনও হয় নাকি? তা ছাড়া তোমার সঙ্গে ছাড়াছাড়ির কথা ভাবতেই পারি না।”

সে কথা শুনে কেয়াদি ফিসফিস করে বলল, ‘সৃষ্টিকর্তা কেন যে আমার চাইতে তোমাকে বয়সে ছোটো করলেন বুঝি না। তাঁর কী এমন ক্ষতি হতো তোমাকে আমার চেয়ে দু-তিন বছরের বড়ো করলে? লোকে যখন জানবে আমি একটা পুঁচকে ছেলের সঙ্গে প্রেম করছি, তখন তারা আমার নামে নিন্দে করবে!”

তার উত্তরে দেবাঞ্জন বলল, ‘আমি লোকের কথাকে কেয়ার করি না। বড়ো হয়ে যখন নিজের পায়ে দাঁড়াব, তখন আমি তোমাকেই বিয়ে করব। কে কী বলল আমার কিছু যায় আসে না।”

আধো আলো আধো অন্ধকারে কেয়াদির কান্নাভেজা স্বর শোনা গেল, “ঠাকুর যেন তাই করেন!”

দেবাঞ্জন কেয়াদির মুখটা দু’হাতে তুলে বলল, “তুমি কিছু ভেবো না তো। সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে। এখন তুমি এই চেয়ারে চুপটি করে বোসো। তোমাকে আজ আমি নিজের হাতে সাজাব। আমার মনের মতো করে।”

কেয়াদিকে কেন্দ্র করে দেবাঞ্জন যত ছেলেমানুষি করত, কেয়াদির প্রেম তত গভীর হতো। সে সময় দেবাঞ্জনের আন্তরিক ব্যবহার, চালচলন কেয়াদিকে এমনই আকৃষ্ট করেছিল যে, সে অন্য কোনও পুরুষকে কল্পনাই করত না। অথচ অনেক বড়োলোকের ছেলে কেয়াদির পিছনে লাইন দিয়েছিল প্রেম করার জন্য। কেয়াদি তাদের কাউকে পাত্তা দেয়নি। তার ধ্যানজ্ঞান শুধু দেবাঞ্জন। দেবাঞ্জনকে একদিন দেখতে না পেলে সে কেঁদে ভাসিয়ে দিত। আসলে দেবাঞ্জনের সহজ সরল রোমান্টিক কথাবার্তা ও অত্যন্ত ছেলেমানুষি ভাবটাই কেয়াদিকে পাগল করে তুলেছিল।

তা না হলে সে দিন মধ্যরাতে দেবাঞ্জন হঠাৎ কেয়াদিকে সাজাবে বলে যে বায়না ধরল সেটা কি ওর কম ছেলেমানুষি? আর আশ্চর্য, কেয়াদিও ওর হাতে সাজবে বলে ড্রেসিং টেবিলের সামনে চুপচাপ বসে পড়ল ছোটো মেয়েটির মতো। কেয়াদির মতো সুন্দরী নারীকে একান্ত করে কাছে পেতে গেলে প্রেমের যে-জাদুবিদ্যা জানা দরকার, তা দেবাঞ্জনের ছিল। ছিল বলেই দেবাঞ্জন তখন পাউডারকে জলে গুলে দেশলাই কাঠি দিয়ে কেয়াদির কপালে বিন্দু বিন্দু ফোঁটা দিয়ে চন্দনের আকারে সাজিয়ে দিল।

শুধু কি তাই। সে যখন আলতার শিশি নিয়ে কেয়াদির পা রাঙাতে বসল, তখন কেয়াদি না বলে পারল না, ‘এ কী করছ। তুমি আমার পায়ে হাত দিলে যে আমার পাপ হবে।’

সে কথা শুনে দেবাঞ্জন বলল, “কিছু হবে না। তুমি জানো, রাধার পায়ে শ্রীকৃষ্ণ কতবার আলতা পরিয়ে দিয়েছে। কৃষ্ণ যদি পারে, তা হলে আমি পারব না কেন?”

—কৃষ্ণ অবতার পুরুষ। ওঁর কোনও দোষ নেই। কিন্তু আমি মানুষ। আমি বলছি তুমি আমার পায়ে হাত দিলে আমার পাপ হবে। লক্ষ্মীটি আমার কথা শোনো। কেয়াদি দেবাঞ্জনের হাতটা ধরে মিনতি করল।

কিন্তু যে প্রেমকে স্বর্গীয় রূপ দিতে চায়, সে কি কখনও কারও কথা শোনে। তাই বুঝি সে কেয়াদির ফুলের মতো নরম পা দু’খানি হাতে তুলে নিয়ে সযত্নে আলতা পরাতে বসল। এমন যার শিশুসুলভ মন তাকে কি ভালো না বেসে পারা যায়। দেবাঞ্জনের এই হঠাৎ পাগলামোটাই তো কেয়াদির কাছে পরম রতন।

আলতা পরানো হলে দেবাঞ্জন কেয়াদির একটি রাঙানো পায়ের ঘ্রাণ নিয়ে বলল, ‘আহা পা তো নয়। যেন সরোবরে ফোটা পদ্মফুল।’

দেবাঞ্জনের কথা শুনে কেয়াদি লজ্জায় রাঙা হয়ে উঠল। ফর্সা মেয়ে যদি লজ্জায় লাল হয়, তাহলে তার সৌন্দর্য আরও বেড়ে যায়। কপালে চন্দনের আকারে রচিত গলন্ত বিন্দু বিন্দু ফোঁটা আর খোঁপায় রজনীগন্ধা ফুলের মালা জড়ানো এবং পায়ে আলতা পরার জন্য কেয়াদিকে ঠিক বিয়ের কনের মতো মনে হচ্ছিল। বাইরের ঝোপঝাড় থেকে ভেসে আসা ঝিঁঝি পোকার ডাক শুনে কেয়াদির মনে হল যেন সানাই বাজছে।

একটু পর আবেগের বশে সে পাশের ঘরে গিয়ে লক্ষ্মীর পট থেকে গলন্ত সিঁদুর আঙুলে করে নিয়ে এসে বলল, “আজ পয়লা বৈশাখ শুভদিন। আজ তুমি আমার সিঁথিতে সিঁদুর পরিয়ে দাও। কেউ না জানুক ঠাকুর জানেন তুমিই হলে আমার স্বামী।’

দেবাঞ্জন যেন তখন আর কিশোরটা নেই। তার মনে হল, সে অনেক বড়ো হয়ে গেছে। যেই ভাবা সেই কাজ। সে পরিপূর্ণ যুবকের মতো কেয়াদির সিঁথিতে সিঁদুর পরিয়ে দিল। কেয়াদি উঠে দাঁড়াতেই দেবাঞ্জনের অশান্ত ঠোঁট দুটো লুটিয়ে পড়ল কেয়াদির রাঙা ঠোঁটে। কেয়াদি তাকে বাধা না দিয়ে এমার্জেন্সি লাইটের আলোটা কমিয়ে দিল। আস্তে আস্তে দেবাঞ্জনের উন্মত্ত ঠোঁট নেমে এল কেয়াদির উন্নত অনম্র স্তনচূড়ায়, তারপর মাখনের মতো নরম নাভিকুণ্ডে। তারও পর পয়লা বৈশাখের রাতে দুটি অসম বয়সের প্রেমিক-প্রেমিকার দেহ-মন এক হল।

বৈশাখ বরণের বহমানতা

১৪৩১-কে বিদায় জানিয়ে আমরা বরণ করে নিয়েছি ১৪৩২-কে। আর এই বাংলা নববর্ষকে বরণ করে নেওয়ার পাশাপাশি, জেনে নিন এর বহমানতা এবং রীতি-নীতির পরিবর্তনের বিষয়ে।

বাংলা পঞ্জিকার প্রথম মাস হল— বৈশাখ। আর বাংলা মাস বৈশাখের ১ তারিখ অর্থাৎ বঙ্গাব্দের প্রথম দিনটিকেই বলা হয় বাংলা নববর্ষ। বাংলা এবং বাঙালির ঐতিহ্যবাহী বর্ষবরণের দিন। তবে শুধু ভারতের পশ্চিমবঙ্গেই নয়, ত্রিপুরা এবং বাংলাদেশেও বিশেষ উৎসব হিসাবে পালিত হয় নববর্ষ। প্রবাসী বাঙালিরাও অংশ নিয়ে থাকেন বৈশাখ বরণের উৎসবে। সেই হিসেবে এটি বাঙালিদের একটি সর্বজনীন লোক-উৎসব হিসাবে বিবেচিত। কিন্তু একটা সময় ছিল যখন পয়লা বৈশাখকে বলা হতো—‘পহেলা বৈশাখ’।

এখন যেমন নববর্ষ নতুন বছরের সূচনার নিরিখে পালিত একটি সর্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়েছে, এক সময় এমনটা ছিল না। তখন নববর্ষ বা পহেলা বৈশাখ ঋতুধর্মী উৎসব হিসেবে পালিত হতো। এর মূল তাৎপর্য তখন ছিল কৃষিকাজ। কারণ প্রযুক্তির প্রয়োগের যুগ শুরু না হওয়া পর্যন্ত কৃষকদের ঋতুর উপরই নির্ভর করতে হতো।

আবার মোঘল সম্রাট আকবর রাজস্ব বা কর আদায়ের উদ্দেশ্যে নববর্ষের আগের দিন অর্থাৎ চৈত্র-র শেষ দিনটিকে রাজস্ব জমা দেওয়ার শেষ দিন নির্ধারণ করেছিলেন বলে জানা যায়। আর কৃষকরা তাই চৈত্রে রাজস্ব জমা দেওয়ার হাত থেকে মুক্তি পেয়ে, পরের দিন অর্থাৎ পয়লা বৈশাখ উৎসব পালন করতেন বলে জানা গেছে।

অনেকের মতে, বাংলা সন গণনা শুরু হয় আকবরের রাজত্বকাল থেকে। প্রথমে অবশ্য বলা হতো— ফসলি সন। পরে ‘বঙ্গাব্দ’ বা বাংলা বর্ষ নামে পরিচিত হয়।

আবার এই আকবরের সময়কাল থেকেই পহেলা বা পয়লা বৈশাখ উদ্যাপন শুরু হয়। এই উপলক্ষ্যে বিভিন্ন উৎসবের আয়োজন করা হতো। একসময় এই উৎসবটি একটি সামাজিক অনুষ্ঠানে পরিণত হয়। যার রূপ পরিবর্তন হয়ে বর্তমানে এই পর্যায়ে এসেছে।

তবে, আকবরের সময়কালের আগেও দুটো শিব মন্দিরে নাকি ‘বঙ্গাব্দ’ শব্দটি পাওয়া গেছে। অর্থাৎ, বাংলা দিনপঞ্জির অস্তিত্ব আকবরের সময়ের আগেও ছিল। আবার এও অস্পষ্ট যে, আকবর বা হুসেন শাহ-র দ্বারা এটি গৃহীত হয়েছিল কিনা। বাংলা দিনপঞ্জি ব্যবহারের রীতি আকবরের আগে হুসেন শাহ-র দ্বারাই হয়ে থাকতে পারে, এমনও মতপ্রকাশ করেন অনেকে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলা দিনপঞ্জির প্রচলন যিনিই করে থাকুন না কেন, ঐতিহ্যবাহী বাংলা দিনপঞ্জির উপর ভিত্তি করে বসন্তের ফসল সংগ্রহের পর রাজস্ব আদায়ের জন্য সহায়ক ছিল। কেননা, ইসলামি হিজরি সনের ক্ষেত্রে রাজস্ব সংগ্রহের দিন ঠিক করতে প্রসাশনিক জটিলতা তৈরি হতো বলে জানা গেছে বিভিন্ন তথ্য অনুসন্ধান করে।

তথ্য অনুযায়ী— বাংলা সনের মূল নাম ছিল তারিখ-এ-এলাহী। মোগল সম্রাট আকবর ১৫৮৫ সালে তাঁর রাজত্বকালের ২৯তম বর্ষের মার্চ মাসে এক ডিক্রি জারির মাধ্যমে তারিখ-এ-এলাহী প্রবর্তন করেন। সিংহাসনে আরোহণের পরপরই তিনি একটি বৈজ্ঞানিক, কর্মপোযোগী ও গ্রহণযোগ্য বর্ষপঞ্জি প্রবর্তনের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেন, যেখানে দিন ও মাসের হিসাবটা যথাযথ থাকবে। এই উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে, তিনি তৎকালীন প্রখ্যাত বিজ্ঞানী ও জ্যোতির্বিদ আমীর ফতুল্লাহ সিরাজিকে নতুন বর্ষপঞ্জি তৈরির দায়িত্ব প্রদান করেন।

বিখ্যাত পণ্ডিত ও সম্রাট আকবরের মন্ত্রী আবুল ফজল এ সম্বন্ধে ব্যাখ্যা প্রদান করেন যে, হিজরি বর্ষপঞ্জি কৃষিকাজের জন্য মোটেই উপযোগী ছিল না। কারণ, চন্দ্র বছরের ৩১ বছর হয় সৌর বছরের ৩০ বছরের সমান। চন্দ্র বছরের হিসাবেই তখন কৃষকদের কাছ থেকে রাজস্ব আদায় করা হতো অথচ চাষবাস নির্ভর করত সৌর বছরের হিসাবের ওপর। চন্দ্র বছর হয় ৩৫৪ দিনে আর সেখানে সৌর বছর হয় ৩৬৫ বা ৩৬৬ দিনে। ফলে দু’টি বর্ষপঞ্জির মধ্যে ব্যবধান থেকে যায় বছরে ১১ বা ১২ দিন। তাই ধরে নেওয়া হয়, বাংলা সনের জন্ম ঘটে সম্রাট আকবরের এই রাজস্ব আদায়ের আধুনিকীকরণের প্রেক্ষাপটে।

তারিখ-এ-এলাহীর বারো মাসের নাম ছিল কারবাদিন, আর্দি, বিসুয়া, কোর্দাদ, তীর, আমাদাদ, শাহরিয়ার, আবান, আজুর, বাহাম, ইস্কান্দার ও মিজ। অতএব, কারও পক্ষে আসলে নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয় যে, কখন এবং কীভাবে এসব নাম পরিবর্তিত হয়ে বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠ, আষাঢ়, শ্রাবণ, ভাদ্র, আশ্বিন, কার্তিক, অগ্রহায়ণ, পৌষ, মাঘ, ফাল্গুন ও চৈত্র হয়। অনুমান করা হয়, বারোটি নক্ষত্রের নাম নিয়ে পরবর্তীকালে নামকরণ করা হয় বাংলা মাসের। বিশাখা নক্ষত্র থেকে বৈশাখ, জায়ীস্থা থেকে জ্যৈষ্ঠ, শার থেকে আষাঢ়, শ্রাবণী থেকে শ্রাবণ, ভদ্রপদ থেকে ভাদ্র, আশ্বায়িনী থেকে আশ্বিন, কৃত্তিকা থেকে কার্তিক, আগ্রায়হন থেকে অগ্রহায়ণ, পউস্যা থেকে পৌষ, ফাল্গুনী থেকে ফাল্গুন এবং চিত্রা নক্ষত্র থেকে চৈত্র।

ঐতিহাসিকদের মতে, পহেলা বা পয়লা বৈশাখ উৎসবটি ঐতিহ্যগত ভাবে বৈশাখী বা অন্য নামে পরিচিত।

বাংলাদেশে প্রতি বছর ১৪ এপ্রিল এই উৎসব পালিত হয়। কিন্তু আধুনিক বাংলা পঞ্জিকা অনুসারে, পশ্চিমবঙ্গে বাংলা নববর্ষ পালিত হয় ১৫ এপ্রিল। এছাড়াও দিনটি বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গে সরকারি ছুটির দিন। ব্যবসায়ীরা দিনটি নতুন ভাবে ব্যাবসা শুরু করার উপলক্ষ্য হিসেবে বরণ করে নেন। এই উৎসবটি শোভাযাত্রা, মেলা, পান্তাভাত খাওয়া, হালখাতা খোলা ইত্যাদি বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে উদ্যাপিত হয়। বাংলা নববর্ষের ঐতিহ্যবাহী শুভেচ্ছা বাক্য হল— ‘শুভ নববর্ষ”।

পয়লা বৈশাখ বা বাংলা নববর্ষ উপলক্ষ্যে পান্তা ভাতের সঙ্গে ইলিশ মাছ, বিভিন্ন ধরনের ভর্তা এবং কাঁচালংকা খাওয়ার রীতি প্রচলিত আছে অনেক জায়গায়।

একটা সময় ছিল যখন পয়লা বৈশাখের সবচেয়ে বড়ো বিষয় ছিল হালখাতা তৈরি। এই হালখাতা বলতে একটি নতুন হিসাব খাতা বোঝানো হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে হালখাতা হল বাংলা সনের প্রথম দিনে দোকানপাটের হিসাব আনুষ্ঠানিক ভাবে চালু করার প্রক্রিয়া। গ্রাম, শহর বা বাণিজ্যিক এলাকা, সর্বত্র পুরোনো বছরের হিসাবের খাতা বন্ধ করে, নতুন হিসাব খাতা খোলা হয়। হালখাতার দিনে দোকানদাররা তাদের ক্রেতাদের মিষ্টান্ন দিয়ে আপ্যায়ন করে থাকেন। এই প্রথাটি এখনও অনেকাংশে প্রচলিত।

“নববর্ষ” বা নতুন বছরের উৎসবের সঙ্গে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর কৃষ্টি ও সংস্কৃতির নিবিড় যোগাযোগ। গ্রামে মানুষ ভোরবেলায় ঘুম থেকে ওঠেন, নতুন জামাকাপড় পরেন এবং আত্মীয়স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবের বাড়িতে বেড়াতে যান। আগে থেকে বাড়িঘর পরিষ্কার করে রাখেন এবং সুন্দর করে সাজিয়ে রাখেন। বিশেষ খাবারের ব্যবস্থাও থাকে। কয়েকটি গ্রামের মিলিত প্রয়াসে, কোনও খোলা মাঠে বৈশাখী মেলার আয়োজন করা হয়। মেলাতে থাকে নানারকম কুটির শিল্পজাত সামগ্রীর বিপণন, থাকে নানারকম পিঠেপুলির আয়োজন। নাগরদোলা, পুতুল নাচ ও সার্কাসের আয়োজন করা হয়।

হুগলির চন্দননগরের এক মাঠে এখনও পিঠেপুলির মেলা বসে, সঙ্গে থাকে রণপা’র শৈল্পিক প্রদর্শন। আবার অনেক গ্রাম ও মফস্সলে মাছ দিয়ে পান্তা ভাত খাওয়ার রীতি আছে। আর এই দিনের একটি পুরোনো সংস্কৃতি হল— গ্রামীণ ক্রীড়া প্রতিযোগিতার আয়োজন। এর মধ্যে প্রচলিত আছে লাঠিখেলা, কুস্তি, ফুটবল, খোখো প্রভৃতি। এছাড়া, চৈত্রের শেষদিনে গাজনের মেলার দৃশ্যও দেখা যায় কিছু গ্রামে।

একটা সময় ছিল যখন পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জায়গায়, বিশেষ করে উত্তর কলকাতার বহু পরিবারে বর্ষশেষের দিন টক এবং তেতো ব্যঞ্জন খাওয়ার রীতি প্রচলিত ছিল। সম্পর্কের সকল তিক্ততা ও অম্লতা দূর করার জন্যই নাকি প্রচলিত ছিল এই প্রথা। আবার এর ঠিক পরের দিন অর্থাৎ পয়লা বৈশাখ প্রতিটি পরিবারে স্নান সেরে বয়ঃজ্যেষ্ঠদের প্রণাম করার রীতি ছিল। অবশ্য এসবের অনেক কিছুই এখন আর পালিত না হলেও, বাড়িতে বাড়িতে এবং ব্যাবসায়িক প্রতিষ্ঠানে মিষ্টি বিতরণের ধারা এখনও অব্যাহত।

এখনও আগের মতো অনেকে নতুন পোশাক পরেন, ই-কার্ড আদান-প্রদান করেন, উপহার দেন। ব্যাবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলিতে এখনও ক্যালেন্ডার দেওয়ার রীতি প্রচলিত আছে। লক্ষ্মী-গণেশের পুজোর পর দরজায় স্বস্তিক চিহ্ন আঁকার রীতিও চালু আছে এখনও।

এখনও, পয়লা বৈশাখ উদ্যাপনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছে কলকাতাও। বাংলা নতুন বছর শুরু হওয়া উপলক্ষ্যে বিভিন্ন জায়গায় সরকারি ভাবে কিংবা শহরের বিভিন্ন পাড়ার অলিতে গলিতে নানা সংগঠনের উদ্যোগে প্রভাতফেরি এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

পয়লা বৈশাখের দিন কলকাতার কালীঘাট মন্দিরে উল্লেখযোগ্য ভিড় চোখে পড়ে। ব্যবসায়ী ছাড়াও পরিবারের মঙ্গলকামনা করে দেবীর আশীর্বাদ প্রার্থনা করতে কালীঘাটে গিয়ে থাকেন অনেক গৃহস্থ। বাঙালির ঐতিহ্যবাহী পোশাক হিসাবে নতুন ধুতি-পাঞ্জাবি এবং শাড়ি পরার রীতি-রেওয়াজও রয়েছে কলকাতা এবং বাংলার সর্বত্র।

পয়লা বৈশাখ (পর্ব-০১)

ঘটনাটা আমার এক বন্ধুর। সেই বন্ধুর নাম দেবাঞ্জন। সঙ্গীত জগতে যাকে গীতিকার বলে সবাই জানে। তিন হাজার গান লিখে সে ইতিমধ্যেই খ্যাতির মধ্যগগনে বিরাজ করছে। বাংলাদেশের প্রখ্যাত শিল্পী থেকে শুরু করে কলকাতা এবং মুম্বইয়ের বিখ্যাত শিল্পীরা পর্যন্ত তার লেখা গান গেয়েছেন। আর ছোটোখাটো শিল্পীরা যে তার লেখা গান কত গেয়েছে, তার ইয়ত্তা নেই। এহেন মানুষটি যদি অতিমাত্রায় নারী-সঙ্গকামী হয়ে পড়ে, তাহলে কার কী বলার থাকে। যদিও দেবাঞ্জনকে কোনওদিন নারীর পিছনে ছুটতে হয়নি, নারীরাই তার পিছনে ছুটেছে।

গান লিখে আজ তার নামডাক হয়েছে বলে যে সুন্দরী নারীরা তার ফেউ হয়েছে এ কথা ঠিক নয়। সে যখন ক্লাস এইটে পড়ত তখন থেকেই তার পিছনে সুন্দরী মেয়ের ফেউ লেগেছে। তার যাকে মনে ধরেছে শুধু তার সঙ্গেই সে প্রেম করেছে। অন্য মেয়েদের সে কখনও লেজে খেলায়নি, সরাসরি উপেক্ষা করেছে। তার উপেক্ষা সহ্য করতে না পেরে কত মেয়ে যে নীরবে চোখের জল ফেলেছে তা আর কী বলব! এ ব্যাপারে প্রশ্ন করলে সে মৃদু হেসে জবাব দিয়েছে, “আচ্ছা আমার মন তো একটা। এই একটা মন নিয়ে ক’টা মেয়েকে খুশি করতে পারি বল তো?’ তার এ কথার কোনও উত্তর দিতে পারিনি।

আমরা যখন নেতাজি বিদ্যামন্দিরে অষ্টম শ্রেণিতে পড়ি তখন পাড়ার ক্লাবে ‘দুই মহল’ নাটক মঞ্চস্থ হয়েছিল। কলেজ পড়ুয়া কেয়াদি তখন ‘দুই মহল’ নাটকে নায়িকার অভিনয় করে রীতিমতো পাড়ার যুবকদের রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছে। সুন্দরী নারী যখন স্টেজে সুন্দর অভিনয় করে তখন পাড়ার উঠতি যুবকদের মাথা খারাপ না হয়ে উপায় কী। বাস্তবিকই কেয়াদি তখন কেয়া ফুলের মতোই সুন্দর ছিল। সে যখন সেজেগুজে সরকার পাড়ার রাস্তা দিয়ে হরিণীর মতো হেঁটে যেত তখন দেখতাম পাড়ার দাদারা তার দিকে মুগ্ধ দৃষ্টিতে চেয়ে থাকত। কেয়াদি তখন যদি ভুল করে কারওর দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসত, সে নিজেকে ধন্য মনে করত।

যে কেয়াদিকে নিয়ে তখন পাড়ার-বেপাড়ার উঠতি যুবকদের এত মাতামাতি, তাকেই কিনা প্রেমে পড়তে হল হাফপ্যান্ট পরা সতেরো বছরের কিশোর দেবাঞ্জনের সঙ্গে। সে সময় প্রেম কী জিনিস সে ব্যাপারে আমার কিছুই বোধগম্য ছিল না। অথচ সে সময় আমার বন্ধু কিশোর দেবাঞ্জন কেয়াদির সঙ্গে চুটিয়ে প্রেম করছে, যা ছিল আমার কাছে একদম অবিশ্বাস্য ব্যাপার!

আমি যখন পড়ার টেবিলে মুখ গুঁজে পরীক্ষার পড়া মুখস্থ করছি, তখন দেখতাম দেবাঞ্জন লাল ভেলভেটের হাফ প্যান্ট ও সাদা জামা পরে কেয়াদির সঙ্গে দেদার গল্প করছে। পড়া ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে এসে দেখতাম পরস্পর মুখোমুখি দুটো যুগল মূর্তি খোশগল্পে মশগুল। পৃথিবী লয় হয়ে গেলেও বুঝি ওদের হুঁশ হতো না, এমনই ওরা প্রেমালাপে মত্ত ছিল।

যাই হোক, দেবাঞ্জনকে খুঁচিয়ে কেয়াদির প্রেম সম্পর্কে যা জানতে পেরেছি তাই বলছি। দেবাঞ্জনের বাবার তখন কলকাতার বড়বাজারে একটা কাপড়ের দোকান ছিল। প্রতি বছর পয়লা বৈশাখের দিন সেই দোকানে খুব ধুমধাম করে হালখাতা হতো। বহু লোকের সমাগম হতো। নিমন্ত্রিত অতিথি এলেই দোকানের কর্মচারীরা গোলাপ জল স্প্রে করে জামায় ছিটিয়ে সাদরে অভ্যর্থনা জানিয়ে দোকানের ভিতর পেতে রাখা ধবধবে সাদা ফরাসে নিয়ে গিয়ে বসাত। বসতে না বসতে কেওড়া দেওয়া ঠান্ডা সরবত হাতে এসে যেত। তার পর একটি ক্যালেন্ডারের সঙ্গে মিষ্টির প্যাকেট উপহার দেওয়া হতো। এভাবেই দোকানের মালিকের সঙ্গে খরিদ্দারের একটা মধুর সম্পর্ক গড়ে উঠত। এখনও হয়। তবে এখন পয়লা বৈশাখের উৎসবের জাঁকজমটাই বেশি, আন্তরিকতার বড়ো অভাব। দোকানদারদের অতিথি আপ্যায়নের আদবকায়দাটা বড়ো মেকি।

দেবাঞ্জন তখন কলকাতার বড়বাজারের দোকানে খুব একটা যেত না। কেন না তাকে তখন মন দিয়ে লেখাপড়া করতে বলা হয়েছিল। সে জন্য বাড়িতে প্রাইভেট টিউটর রাখা হয়েছিল। স্কুলে যাওয়া আর নিয়মিত প্রাইভেট টিউটরের কাছে পড়তে বসা ছাড়া দেবাঞ্জন অন্য কোনও সময় পড়ার ধার দিয়েই যেত না। বাকি সময়টা সে ক্রিকেট খেলে কিংবা উদয়ন সিনেমায় ইংরেজি ছবি দেখে কাটাত। তা না হলে হেডলি চেজ, আগাথা ক্রিস্টি নয়তো নীহাররঞ্জন গুপ্তর বই তো আছেই। এ তো গেল তার দিনেরবেলার রুটিন। সন্ধে থেকে রাত এগারোটা পর্যন্ত ছিল কেয়াদির সঙ্গে গল্প করা। প্রায় পাঁচ বছরের ছোটো দেবাঞ্জনের মধ্যে কেয়াদি তখন কী খুঁজে পেয়েছিল কে জানে। অবশ্য যার সাথে যার মজে মন কিবা হাড়ি কিবা ডোম!

কথায় বলে প্রেম অন্ধ। প্রেম বয়স মানে না, কদর্য কুৎসিত চেহারা নিয়ে চুলচেরা বিচার করে না, মানে না কোনও সামাজিক বিধিনিষেধ। তাই বুঝি মানুষ বলে, প্রেমের বিচিত্র গতি। যার কোনও ধরাবাঁধা রাস্তা নেই। শেক্সপিয়রের ‘ওথেলো’ নাটকের নায়ক ওথেলো ছিল অত্যন্ত কুৎসিত কালো আর তার প্রেমিকা ডেসডিমোনা ছিল যেমন ফর্সা তেমনই সুন্দরী। ওথেলো কালো বলে ডেসডিমোনাকে কোনওদিন ভাবিয়ে তোলেনি। বরং ওথেলোর প্রতি তার প্রেম ছিল অত্যন্ত গভীর।

প্রতি বছরের মতো সেবারও পয়লা বৈশাখের দিন মোহনবাবু তাঁর ছেলে দেবাঞ্জনকে নতুন পাজামা-পাঞ্জাবি পরিয়ে মোটর চড়িয়ে বড়বাজারে তাঁর কাপড়ের দোকানে নিয়ে গেলেন। ব্যাপারীদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন ছেলের। লেখাপড়া শেষ করে দেবাঞ্জন ভবিষ্যতে এই দোকানের মালিকের আসনে বসবে, তার ইঙ্গিত দিয়ে রাখলেন মোহনবাবু তাঁর ব্যবসায়ী বন্ধুদের। ফরাস পাতা তাকিয়ায় হেলান দিয়ে দেবাঞ্জনের সে দিন নিজেকে যুবরাজ বলে মনে হয়েছিল। হালখাতা তো নয়, যেন মনে হচ্ছিল তার অভিষেক হচ্ছে!

সেই প্রথম মোহনবাবু দোকানের নতুন খাতাটি দেবাঞ্জনের দিকে বাড়িয়ে বললেন, ‘কোন খদ্দের কত টাকা জমা দিচ্ছে লিখে রাখবে। মনে রেখো, লেখাপড়ার পাট চুকলে তোমাকেই এ দোকানের হাল ধরতে হবে।’

দেবাঞ্জন তখন লাল মলাট দেওয়া খাতাটি হাতে নিয়ে যুবরাজের ভঙ্গিতে মাথা নেড়ে সায় দিয়েছে। সন্ধে হতে না হতেই আমন্ত্রিত অতিথিদের ভিড়ে গমগম করতে লাগল দোকান। এক এক করে খদ্দের এসে দেবাঞ্জনের হাতে টাকা দেয় আর দেবাঞ্জনকে সঙ্গে সঙ্গে নতুন খাতায় তাদের নাম ও টাকার অঙ্কটি লিখে রাখতে হয়।

যুবরাজের তখতে বসে দেবাঞ্জন লক্ষ্য করে তার বাবা মোহনবাবু সন্ধে থেকে প্রতিটি খদ্দেরের সঙ্গে হেসে কথা বলছেন। তাঁর অভ্যর্থনার কোনও খামতি নেই, কোনও ক্লান্তি নেই— টাকার নেশা বড়ো নেশা! ব্যবসায় লাভ করতে হলে খদ্দেরের সঙ্গে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বকতে হবে। বিরক্তবোধ করলে চলবে না। কেন না, সবুরে মেওয়া ফলে। অতিথি আপ্যায়নে ব্যস্ত থাকলেও দেবাঞ্জনের মন কিন্তু পড়েছিল সাতাশ কিলোমিটার দূরে মফস্বলে কেয়াদির কাছে। যাকে একদিন চোখে না দেখলে আর একটু কথা না বললে তার পেটের ভাত হজম হতো না!

এক সময় হালখাতার পাট চুকিয়ে হাতে রজনীগন্ধার মালা জড়িয়ে আর একটি মিষ্টির প্যাকেট নিয়ে যখন দেবাঞ্জন মফস্বলের বাড়িতে ফিরে এল, তখন রাত অনেক হয়েছে। লোডশেডিং বলে সুকান্ত পল্লীটা নিঝুম অন্ধকারের রূপ নিয়েছে। দেবাঞ্জন বাবার সঙ্গে বাড়িতে ফিরে তার মাকে উদ্দেশ্য করে বলল, ‘মা, এই মিষ্টির প্যাকেটটা কেয়াদিকে দিয়ে আসি।’

—আচ্ছা। আর শোন কেয়ার মা শিবতলায় যাত্রা দেখতে গেছেন। তুই ততক্ষণ কেয়াদির বাড়িতে থাকিস। উনি যাত্রা দেখে ফিরে এলে তখন তুই চলে আসিস। দেবাঞ্জনের মা বলল।

—ঠিক আছে। বলে দেবাঞ্জন একেবারে খুশিতে ডগমগ হয়ে কেয়াদির বাড়ির দিকে পা বাড়াল।

দেবাঞ্জনদের মতো কেয়াদিরাও ছিল এক সময়ে উদ্বাস্তু। দেশভাগের পর কেয়াদিরা সপরিবারে পূর্ব বাংলা থেকে উদ্বাস্তু হয়ে ধুবুলিয়া ক্যাম্পে এসে উঠেছিল। ক্যাম্পে থাকাকালীন কেয়াদির বাবা যক্ষ্মা রোগে মারা যান। তারপর অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে মফস্বলের এই কলোনি, সুকান্ত পল্লীতে তাদের চার কাঠা জমি বরাতে জুটেছে। কেয়াদিরা দু’বোন, এক ভাই। বড়ো বোন ঝুনুদির বিয়ে হয়েছে বিহারের বেগুসরাই জেলায়। আর তার দাদা আসামে বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্সে চাকরি করেন। বলতে গেলে বছরের বেশিরভাগ সময় তিনি বাইরেই থাকেন।

(ক্রমশ…)

ইতিহাসের শহর জাকার্তা (পর্ব-০৪)

আজ জাকার্তাতে আমাদের চতুর্থ দিন। সকালে উঠে হোটেলের লবিতে এসে দাঁড়াতেই হোটেল ম্যানেজার মুখে এক গাল হাসি নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “জাকার্তা কেমন লাগছে আপনাদের? আমাদের ড্রাইভার ঠিকমতো ঘোরাচ্ছে তো?’

আমি বেশ খুশি মুখে জবাব দিলাম, ‘ভীষণ ভালো লাগছে আপনাদের জাকার্তা। আর ড্রাইভার ছেলেটিও খুব ভালো। আমি ওকে কয়েকটা ইংরেজি শব্দ শিখিয়ে দিয়েছি।”

ম্যানেজার আমার কথা শুনে হেসে জিজ্ঞেস করলেন, “আপনারা আজকে কী করবেন, কিছু প্ল্যান করেছেন?”

আমি নিরাশ গলায় জানালাম, ‘না, সেজন্যই তো সাত সকালে আপনার কাছে আসা। কোথায় যাওয়া যায় বলুন তো?”

ম্যানেজার ভদ্রলোক একটু ভেবে নিয়ে বললেন, “ওল্ড জাকার্তা ঘুরেছেন?”

আমি মাথা নেড়ে ‘না’ বলতেই উনি বললেন, “তাহলে আজ আপনারা ওল্ড জাকার্তা ঘুরে আসুন। প্রথমে চায়না টাউন দিয়ে শুরু করুন, তারপর ওল্ড জাকার্তা, যাকে আমরা ওল্ড বাটাভিয়া বা কোটা টুয়া বলে থাকি। ওখানে ডাচ কলোনিয়াল পিরিয়ডের সব ইতিহাস ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। ওখানকার বিল্ডিংগুলো তিনশো বছরেরও বেশি পুরোনো। জায়গাটা আপনাদের ভালো লাগবে।”

—আপনি যখন বলছেন, তখন অবশ্যই যাব।

—ঠিক আছে, আমি ড্রাইভারকে সব কিছু বুঝিয়ে বলে দেব। তাহলে আপনার গুগল ট্রান্সলেটর নিয়ে হিমশিম খেতে হবে না। ম্যানেজার বেশ রসিক বোঝা গেল। তবে আমি এই কয়েকদিনে গুগল ট্রান্সলেটর ব্যবহার করতে শিখে গেছি। প্রয়োজন মানুষকে সব কিছু শিখিয়ে দেয়।

হোটেল ম্যানেজারের কথামতো চায়না টাউন দিয়েই শুরু হল আজকের জাকার্তা ভ্রমণ। চায়না টাউন নেই এমন কোনও দেশ হয়তো এই পৃথিবীতে বিরল। ওল্ড জাকার্তার তামান সারি অঞ্চলে অবস্থিত, গ্লোডোককে ইন্দোনেশিয়ার বৃহত্তম চায়না টাউন হিসাবে চিহ্নিত করা হয়। ওল্ড বাটাভিয়া সিটির এই অংশটি চিনা বংশোদ্ভূত লোকেদের বাসস্থান এবং ডাচ ঔপনিবেশিক যুগ থেকে চায়না টাউন বা পেসিনান নামে পরিচিত। তবে আজকাল গ্লোডোক জাকার্তার ইলেকট্রনিক ট্রেডিং সেন্টার হিসেবে বেশি পরিচিত। ডাচ ঔপনিবেশিক আমলে চায়না থেকে অনেক লোক এখানে এসেছিল। তারা সাধারণত চিনির কল আর ছোটোখাটো ব্যবসায় যুক্ত ছিল।

এখানকার চিনি কলের কর্মচারীদের একটা করুণ ইতিহাস রয়েছে। ১৭৪০ সালে ডাচ সরকার অন্যান্য দেশের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করার জন্য ইন্দোনেশিয়াতে চিনির দাম তৎকালীন বাজার মূল্য থেকে পঞ্চাশ শতাংশ কমিয়ে দিলে চাইনিজ চিনিকল কর্মীদের সঙ্গে ডাচ সরকারের বিরোধ শুরু হয়। শোনা যায় চাইনিজ কর্মীরা ৫০ জন ডাচ সৈন্যকে হত্যা করেছিল। তবে ডাচদের সঙ্গে এই বিরোধের মূল্য চাইনিজদের যে চুকাতে হবে সেটা সবাই জানত। এরপর ডাচ সৈন্যরা চাইনিজদের বাড়িতে গুলি চালিয়ে প্রায় দশ হাজার চাইনিজকে হত্যা করে। কত মা সন্তানহারা, কত স্ত্রী স্বামীহারা, আর কত শিশু যে অনাথ হয়েছে, তার খবর কিন্তু ডাচ পত্রিকায় প্রকাশ করা হয়নি।

গ্লোডোকেই আছে জাকার্তার সব থেকে পুরোনো বৌদ্ধ মন্দির ‘জিন দে ইউয়ান’ বা ‘বিহার ধর্ম ভক্তি’। ১৬৫০ সালে চাইনিজ লেফটেন্যান্ট কুই হোয়েন দ্বারা নির্মিত এই মন্দিরটির নাম ছিল ‘কোয়ান ইম টেং’। দেবী কোয়ান ইমকে উৎসর্গ করে এই মন্দির তৈরি হয়েছিল। ১৭৪০ সালের চাইনিজ গণহত্যার সময় এই মন্দিরটিও ভেঙে দিয়েছিল ডাচ সৈন্যরা। এরপর ১৭৫৫ সালে মন্দিরটি আবার তৈরি করা হয়। এবং এর নাম দেওয়া হয় ‘জিন দে ইউয়ান’ (যার অর্থ সোনালি জ্ঞান)। পরে এর নামটি ইন্দোনেশিয়ান ভাষায় অনুবাদ করা হয়, যা এখন ‘বিহার ধর্ম ভক্তি’ নামে পরিচিত।

মন্দিরের ভিতরে কয়েক ডজন ব্রোঞ্জের মূর্তি এবং লাল রঙের মোমবাতি দিয়ে সাজানো। মূল মন্দিরের সামনে তিনটি ছোটো মন্দির রয়েছে। প্রতিটি মন্দিরে বিভিন্ন তাও এবং কনফুসিয়ান দেবতা রয়েছে, এ থেকে বোঝা যায় মন্দিরটি মহাযান বৌদ্ধধর্ম অনুসরণ করে। মূল মন্দিরে প্রবেশ করার আগে সবাই ধূপকাঠি জ্বালিয়ে নিজের মনের ইচ্ছা ভগবানের কাছে জানায়। মন্দিরের ভিতরে সূক্ষ্ম ক্যালিগ্রাফি, ড্রাগন এবং অন্যান্য পৌরাণিক প্রাণীর সুন্দর ভাস্কর্য রয়েছে। ভিতরে ঢুকে দেখলাম অনেকেই প্রার্থনা করছে। ভিতরের শান্ত পরিবেশ, ধূপকাঠির মন মাতানো গন্ধ, মন্দিরের সুন্দর রঙিন সাজসজ্জা, সব মিলিয়ে একটা মন কেমন করা অনুভূতি নিয়ে বেশ কিছুক্ষণ বসে রইলাম। এই সুন্দর শান্ত পরিবেশে বসে থেকেও মনটা বার বার ছুটে যাচ্ছিল প্রায় তিনশো বছর আগে যখন এই মন্দির প্রাঙ্গণে কত নিরীহ মানুষকে ডাচ সরকারের পৈশাচিক অত্যাচারের শিকার হতে হয়েছিল।

মন্দির থেকে বেরিয়ে নজরে পড়ল চওড়া রাস্তার দুই ধার দিয়ে অসংখ্য দোকান। একটু এগিয়ে গিয়ে নজরে পড়ল বড়ো শপিং কমপ্লেক্স। অনেক দেশের চায়না টাউন দেখেছি, এতে আর তেমন কোনও নতুনত্ব নেই। তাই আর সময় নষ্ট না করে আমরা গাড়িতে গিয়ে বসলাম। আধ ঘণ্টার মধ্যেই পৌঁছে গেলাম ডাচ কলোনিয়াল পিরিয়ডের রাজধানী ওল্ড বাটাভিয়া, স্থানীয় লোকেরা বলে ‘কোটা টুয়া’, ইন্দোনেশিয়ান ভাষায় যার অর্থ ‘ওল্ড টাউন’। প্রথমেই গেলাম ফাতাহিল্লাহ স্কোয়ার। এটাই ছিল ডাচ কলোনির প্রাণবিন্দু। এর আশেপাশে ছিল সব সরকারি অফিস, দোকানপাট, চার্চ, কোর্ট, টাউন হল, ব্যাংক, আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ অফিস। তবে এই সব পুরোনো বিল্ডিংগুলোতে এখন মিউজিয়াম তৈরি করা হয়েছে। এখানেই দেখতে পেলাম ফাতাহিল্লাহ মিউজিয়াম, ওয়েয়াং মিউজিয়াম, মিউজিয়াম অফ আর্টস অ্যান্ড সেরামিক্স, মিউজিয়াম অফ ব্যাংক ইন্দোনেশিয়া এবং মেরিটাইম মিউজিয়াম।

হাতে সময় কম ছিল বলে শুধু জাকার্তা হিস্ট্রি মিউজিয়াম, যার স্থানীয় নাম ফাতাহিল্লাহ মিউজিয়ামেই অনেকটা সময় কাটালাম। সপ্তদশ শতকে তৈরি টাউন হলে এখন এই মিউজিয়াম তৈরি করা হয়েছে। তিনশো বছরের ডাচ কলোনির অনেক কালো ইতিহাসের নজির এই মিউজিয়ামে দেখতে পাওয়া যাবে। ইউরোপীয় শক্তিগুলো উপনিবেশের নামে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ ও তার লোকেদের উপর যে অত্যাচার, শোষণ আর শাসন করেছে তা প্রায় সব জায়গায় একইরকম; তা সে অস্ট্রেলিয়া, ইন্ডিয়া বা ইন্দোনেশিয়া— যে দেশই হোক না কেন। তবে সব থেকে মজার বিষয় চোখে পড়ল, যে শাসক গোষ্ঠী ইন্দোনেশিয়ার লোকেদের উপর এত অত্যাচার করেছে, ইন্দোনেশিয়ার লোকেরা আজও সেই ডাচ শাসকদের সাজ পোশাক অনুকরণ করে, শরীরে সাদা রং মেখে ফাতাহিল্লাহ স্কোয়ারে বসে ট্যুরিস্টদের মনোরঞ্জন করছে।

পেরেন্টিং Tips

প্রত্যেকটি শিশু তার মা-বাবার সঙ্গে হেসেখেলে কিছুটা সময় কাটাবে, এটাই কাম্য। কারণ, বাবা-মায়ের মতো প্রকৃত বন্ধু আর কেউ হতে পারে না। তাই সারাদিনের কর্মব্যস্ততার মধ্যে যতটা সম্ভব বন্ধুর মতো যেমন মেলামেশা করা উচিত সন্তানের সঙ্গে, ঠিক তেমনই সময় সুযোগ বুঝে সুশিক্ষা দেওয়া উচিত সন্তানকে। কারণ, তারা সবচেয়ে বেশি কমফর্টেবল থাকে মা-বাবার সঙ্গে থাকার সময়টাতে। তাই বন্ডিং টাইম-টাকে কাজে লাগিয়ে, সন্তানের মানসিক নির্ভরতার আধার হয়ে উঠুন। আপনি সমস্ত অ্যাটেনশন দিয়ে বাচ্চাকে আগলে রাখলে, সেও ইমোশনালি এবং ফিজিক্যালি অনেক নিশ্চিন্তবোধ করবে। এটাই তাকে মানসিক ভাবে ভালো থাকার রসদ জোগাবে এবং সন্তান সুশিক্ষিত কিংবা বলা যায় প্রকৃত শিক্ষা পাবে।

কখন, কী করবেন:

  • সকাল থেকে রাত— কীভাবে সময় কাটাবেন সন্তানের সঙ্গে, সে বিষয়ে সন্তানের সঙ্গে আলোচনা করে নিন। বেশিরভাগ বাচ্চারা বেশ বুদ্ধিমান। তাদের সম্পূর্ণ পরিস্থিতি বুঝিয়ে বললে তারা ঠিকই বুঝতে পারবে।
  • প্রত্যেকদিন একটা নির্দিষ্ট সময় বের করে নিন, যখন সন্তানের সঙ্গে সময় কাটাবেন। এই সময়টায় দু’জনে একসঙ্গে গান শুনুন কিংবা দাবা খেলুন। কোনও গল্প পড়েও শোনাতে পারেন বাচ্চাকে।
  • এখনকার বাচ্চাদের মধ্যে বই পড়ার অভ্যাস খুব কমে গিয়েছে। আপনার ছুটির দিনে ওদের বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলার চেষ্টা করুন। বই পড়ার অভ্যাস না থাকলে কোনও ভালো গল্প পড়ে শোনান, কিন্তু সম্পূর্ণ করার আগেই থেমে যান। সন্তানকে বলুন বাকি অংশ ও যেন আপনাদের পড়ে শোনায়। শিশু-সাহিত্যিকদের লেখা একটা করে গল্প পড়ে শোনানোর ফলে মাতৃভাষার প্রতি ধীরে ধীরে আগ্রহও বাড়বে।
  • আপনার ল্যাপটপ বা ডেস্কটপ-এ সন্তানের সঙ্গে সেরা মুহূর্তগুলির ছবি অ্যালবাম-এ সেভ করে রাখুন। খুব মন খারাপের দিনগুলোয় যাতে সে ওগুলো দেখে আনন্দ পায়৷
  • সন্তান মা-বাবার কেয়ার করে, এই ভাবনাটুকুই সন্তানকে বাইরের নানা অপ্রীতিকর পরিস্থিতির সঙ্গে মোকাবিলা করতে সাহায্য করে। তাই ওর মনের ইনসিকিয়োরিটি দূর করতে, খারাপ-ভালো পরিস্থিতিতে ওর পাশে থাকুন।
  • সন্তানের ছোটো ছোটো সাফল্য সেলিব্রেট করুন।
  • ডিনার করুন একসঙ্গে। এর ফলে সারাদিন সে কী করল, তা শেয়ার করার সুযোগ পাবে।
  • অতিরিক্ত শাসন না করে তার সমস্যাগুলো বোঝার চেষ্টা করুন। এতে সমাধানের পথ খুঁজে পাবেন।
  • একটা ছোট্ট ডায়ারি তৈরি করুন। আপনার সন্তানের ছোটোখাটো কোনও কৃতিত্বের ঘটনা ঘটলে, দু- চার লাইন সেখানে লিখে রাখুন। যদি জীবনের কোনও পর্যায়ে সন্তান ডিমোটিভেটেড হয়ে পড়ে, এই ডায়ারি-টি তাকে মানসিক শক্তি জোগাবে।

স্মোকি আই লুক

আপনি যদি আয়নার সামনে বসে নিজেকে খুঁটিয়ে দেখেন এবং দেখার পর যদি মনে হয়, আপনার সৌন্দর্যের সবচেয়ে বড়ো প্লাস পয়েন্ট হল— আপনার দুটি চোখ, তাহলে বাজিমাত করতে পারবেন অনায়াসে। কারণ, আপনার চোখের সৌন্দর্যে মোহিত হয়ে, জীবনের ওঠাপড়া-কে সহজতর করে দেবে আপনার চারপাশের মানুষজন। তবে চোখ দুটিকে সুন্দর করে তোলাটা খানিকটা নিজের মেক-আপ করার কৌশলের উপরেও নির্ভর করে। অর্থাৎ সঠিক মেক-আপ-এর জাদুবলে, অনায়াসে চোখের সম্মোহনী শক্তি বাড়িয়ে তোলা যায়। এবার জেনে নিন কীভাবে মেক-আপের সাহায্যে বাড়াবেন আপনার চোখের সৌন্দর্য।

প্রথমেই জেনে রাখা ভালো যে, চোখের মেক-আপের জন্য কয়েকটি জিনিস অত্যন্ত জরুরি। যেমন আইশ্যাডো ব্রাশ, আই অ্যাপ্লিকেটর, মাসকারা, কাজল পেনসিল, লিকুইড আইলাইনার, কমপ্যাক্ট আর ফাউন্ডেশন ক্রিম। এই উপকরণগুলির সাহায্যে চোখের সৌন্দর্য কয়েকগুন বাড়িয়ে তোলা যায়। বর্তমানে চোখের মেক-আপের ফ্যাশন-এর সবচেয়ে জনপ্রিয় ট্রেন্ড হল— স্মোকি আইজ। পর্যায়ক্রমে সেই লুক আনবেন কীভাবে, রইল সেই পরামর্শ।

আইশ্যাডো নির্বাচন

সবচেয়ে আগে প্রয়োজন সঠিক আইশ্যাডো নির্বাচন করা। এক্ষেত্রে নিজের গায়ের রঙের ব্যাপারে সচেতন হওয়া একান্ত জরুরি। সাধারণত স্মোকি লুক-এর জন্য ব্ল্যাক আর গ্রে রং— দুটিই ব্যবহৃৎ হয়। কিন্তু আধুনিকারা মাত্র দুটি রঙেই আর সীমাবদ্ধ থাকতে চান না। তাই বেগুনি, কফি, ডার্ক পিংক, কপার, ডার্ক গ্রিন, ডার্ক ব্লু আর পার্পল রঙেরও সাহসী ব্যবহার চোখে পড়ছে।

আইশ্যাডোর রং যেমনই বাছুন না কেন, বেসিক শেড লাগানোর আগে নিজের স্কিন টোন, চোখের পাতার রং ইত্যাদি বিবেচনা করা বিশেষ জরুরি। আর সেই সঙ্গে যে-পোশাকটি পরছেন, তার রং সম্পর্কেও সচেতন থাকুন চোখের মেক-আপ শুরুর আগে। স্মোকি লুক-এর জন্য সামঞ্জস্যপূর্ণ দুটি রঙের আইশ্যাডোর পরত ব্লেন্ড করা হয়। দুটো রঙের ক্ষেত্রে একটা গাঢ়, অন্যটি একটু হালকা-শেড বেছে নেওয়া ভালো।

ধরুন যদি নীল রঙের উপর জোর দিতে চান তাহলে বেস কালার হিসাবে ব্ল্যাক আর গ্রে বাছুন। বিকল্পে বেগুনি, পার্পল বা ডার্ক ব্লু ব্যবহার করতে পারেন। যদি বাদামি রঙের লুক দিতে চান চোখ দুটিতে, তাহলে ব্ল্যাক, গ্রে, কপার বা কফি শেড নির্বাচন করুন আকাঙ্খিত স্মোকি লুক-এর জন্য।

হালফিল সময়ে, সুন্দরীরা দুটি রঙের পরিবর্তে সিঙ্গল কালারেও এক্সপেরিমেন্ট করছেন। এক্ষেত্রে হালকা রঙের আইশ্যাডো বাছাই করা ভালো। স্মোকি লুক-এর জন্য ক্রিম আইশ্যাডোর বদলে পাউডার আইশ্যাডোই ব্যবহার করুন, কারণ ক্রিম শ্যাডো ব্লেন্ড করা মুশকিল।

আইলাইনার পেনসিল

শ্যাডোর রঙের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আইলাইনার পেনসিলের রং নির্বাচন করুন। আজকাল বাজারে পাউডার আইলাইনারও পাওয়া যায়। এর সঙ্গে থাকে একটি স্পঞ্জ টিপ ব্রাশ, যার সাহায্যে লাইনার ব্লেন্ড করা সহজ হয়ে যায়। স্মোকি লুক-এর জন্য লিকুইড আইলাইনার কখনওই ব্যবহার করবেন না।

ফাউন্ডেশন

সাধারণ ভাবে মেক-আপ শুরুর প্রথম ধাপ হল সমস্ত শরীরে ফাউন্ডেশন লাগানো। আই মেক-আপের ক্ষেত্রেও এটা প্রযোজ্য। অর্থাৎ স্মোকি লুক দেওয়ার আগে ফাউন্ডেশনের একটি হালকা পরত, বন্ধ চোখের উপর ও চোখের পাতার আশেপাশে দিন। এর পর ফাউন্ডেশন দীর্ঘস্থায়ী করার জন্য ফেস পাউডারের হালকা পরত লাগান। এবার আপনার চোখ মেক-আপ করার জন্য উপযুক্ত ক্যানভাস বলে বিবেচিত হবে। ফাউন্ডেশন বেস ভালো হলে, চোখের উপর আইশ্যাডোর পরত কুঞ্চিত হবে না।

আইলাইনার

আইলাইনার পেনসিলের সাহায্যে চোখের উপরের পাতায় আর নীচের পাতায় আউটলাইন করে নিন। চিরাচরিত কালো আর ব্রাউন পেনসিলের বিকল্পে, আইশ্যাডোর রঙের সঙ্গে সাযুজ্য রেখে লাইনারের রং নির্বাচন করতে পারেন। উপরের পাতার গোড়ার অংশ জুড়ে লাইনারের রেখা টানুন ও শেষ অংশটা একটু মোটা করে স্মাজ করে দিন। শেষ অংশে লাইনার পেনসিলের বদলে ডাস্ট লাইনার ব্যবহার করুন স্মাজিং-এর সুবিধার জন্য।

আইশ্যাডো

বড়ো চওড়া ব্রাশের সাহায্যে বোজা চোখের উপর শ্যাডোর পরত লাগান। একটু গাঢ় শেড-টি এরপর ছোটো ব্রাশের সাহায্যে লাগিয়ে নিন। বড়ো ব্রাশ ব্যবহারের সময় বোজা চোখের উপর থেকে রেখা টানুন ভ্রূ’র নীচে পর্যন্ত। ডার্ক শেডের আইশ্যাডো শুধুমাত্র লাইনারের রেখা টানা অংশটুকুতেই সীমিত রাখুন। এবার দুটি শ্যাডোকেই আলতো করে ব্লেন্ড করে দিন। এমন ভাবে ব্লেন্ড করুন দুটি শেড, যাতে আইলাইনার আর আইশ্যাডো পৃথক ভাবে প্রকট না হয়।

মাসকারা

মাসকারা লাগানোর আগে চোখের পাতা কার্ল করে নিন। এর ফলে চোখ বড়ো বড়ো দেখাবে। এরপর মাসকারার ২- ৩টি পরত লাগান। পরত যেন কোনও এক জায়গায় জমে না থাকে বরং চোখের উপর সমান ভাবে চারিয়ে যায়।

স্মোকি লুক-এর জন্য বিশেষ পরামর্শ

চোখে স্মোকি লুক দিলে, সর্বাঙ্গীন মেক-আপে একটা আলাদা মাত্রা যোগ হয়। আবার উলটো দিক থেকে ভাবলে স্মোকি লুক-টাকে পারফেক্ট করে তোলার জন্য মেক-আপও সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া উচিত। সবচেয়ে জরুরি ধাপ হল সঠিক পন্থায় ফাউন্ডেশন লাগানো। ঠোঁটের মেক-আপ-এরও একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ঠোঁটের আউটলাইন করার সময় ফ্ল্যাট টোনড লিপলাইন পেনসিল বা লিপস্টিক ব্যবহার করুন। লিপস্টিক বা লিপগ্লসের রং পিংক বা ক্যারামেল হওয়াই বাঞ্ছনীয়।

আইব্রোর জন্য আইব্রো পেনসিলই আদর্শ, তবে স্মোকি লুক-এর ক্ষেত্রে পেনসিলের রং একটু গাঢ় হওয়াই ভালো। চিক বোন আপনার সৌন্দর্যের স্ট্রং পয়েন্ট হতে পারে যদি তাতে রোজ কালারের ব্লাশার লাগান। হেয়ারলাইন অবধি এটা ভালো ভাবে ব্লেন্ড করে নিন।

স্মার্ট টিপস

  • স্মোকি লুক, উৎসবে এবং নাইট পার্টির জন্য আদর্শ
  • স্মোকি লুক-এ গ্লিটার কখনও ব্যবহার করবেন না
  • একসঙ্গে সব শেডগুলি লাগাবেন না, বরং একের পর এক পরত দিয়ে ব্লেন্ড করুন
  • মনে রাখবেন, ব্লেন্ড করার সময় শেড যেন আইব্রো বোন অবধি না পৌঁছায়
  • চোখের পাতার কাছে গাঢ় রঙের আইশ্যাডো ব্যবহার করে, ক্রমশ উপরের দিকে হালকা শেডগুলির পরত দিতে থাকুন

• স্মোকি লুক সার্থক করতে হলে ঠোঁটে নিউড মেক-আপ করুন।

ঘোরানো সিঁড়ি (শেষ পর্ব)

পরাগ এরকম পরিস্থিতিতে এর আগে কখনও পড়েনি। তার মহিলা ভক্তের সংখ্যা অগণিত। মাধবীলতা তার সুডৌল বাহু দিয়ে পরাগকে জড়িয়ে ধরলেন। পরাগ সামলাতে না পেরে বিছানায় পড়ে গেলেন। মাধবীলতা তার সরু আঙুলগুলো পরাগের মুখে পাখির পালকের মতো বুলিয়ে বললেন, ‘আমি তোমাকে সব দেব। গাড়ি, বাড়ি, টাকা-পয়সা আমার যা আছে। আমার দিকে তাকাও।’

পরাগ মাধবীলতার স্পর্শে ক্ষণিকের জন্য চোখ বন্ধ করেছিল। পরাগের মনে হল যে, তার বুকের উপর বিষধর সাপের মতো মাধবীলতার অতৃপ্ত নিঃশ্বাস ফোঁস ফোঁস শব্দ করে পড়ছে। মাধবীলতার নেশা নেশা চোখে কামনার আগুন যেন সদর্পে জ্বলছে। মাধবীলতার দীর্ঘ একাকীত্বকে চোখ রাঙিয়ে সে আঙুল তুলে ধিক্কার জানাচ্ছে।

মাধবীলতার ছোঁয়ায় পরাগের বুকের ভিতর কেমন একটা ভয়, একটা শিহরণ খেলে গেল। ঠিক যেন ঘোর অমাবস্যায় হঠাৎ ভূত দেখার মতো। পরাগের দম বন্ধ হয়ে এল। তিনি জোরে শ্বাস নিয়ে মাধবীলতাকে বললেন, “তোমার কাছে আমি কিছু চাই না। তোমার চাহিদা পূরণ করার মতো ইচ্ছা বা আগ্রহ কোনওটাই আমার নেই। তুমি আমাকে জোর করতে পারো না।’ মাধবীলতাকে সজোরে ঠেলে পরাগ দরজার বাইরে বেরিয়ে যেতে চাইলেন।

মাধবীলতার চুলে জুঁই ফুলের মালা খসে পড়ল। তার অবিন্যস্ত চুলগুলো হাওয়ায় উড়তে লাগল। রাগে-অভিমানে তিনি পরাগের পথরোধ করে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘তুমি আমাকে আঘাত করলে! এত বড়ো স্পর্ধা তোমার! তুমি কী ভাবো নিজেকে! কীসের এত দেমাক তোমার! রূপ- গুণের এত অহংকার তোমার।”

পরাগ জোর গলায় বললেন, ‘নিজের চরিত্রের। এখন বুঝতে পারছি যে, ‘তুমি’ সম্বোধনের কারণ কী, বন্ধুত্বের কারণ কী। ছি! ছি!”

মাধবীলতা রাগে গজরাতে লাগলেন। মুখের উপর গাঢ় মেকআপের প্রলেপ ভেদ করে চোয়ালের হাড় কর্কশ ভাবে মাথা তুলে দাঁড়াতে চাইল। তিনি পরাগের গায়ে ঢলে পড়ে বললেন, ‘স্ক্যান্ডেল ছাড়া নামজাদা শিল্পীর দৃষ্টান্ত এ পৃথিবীতে বিরল। আর তুমি তো রক্ত মাংসের মানুষ। যদি কোনও প্রেস, মিডিয়া ঘুণাক্ষরে আজকের সন্ধ্যার কথা জানতে পারে, তাহলে কাল সকালের খবরে এটাই মুখরোচক শিরোনামে বার হবে সত্য মিথ্যা যাচাই না করেই।’

পরাগ বললেন, ‘আমি ওসব নিয়ে ভাবি না। নিজের কাছে নিজে পরিষ্কার থাকা জরুরি।’

মাধবীলতা ব্যঙ্গের হাসি হেসে বললেন, “পুরুষ মানুষের আবার চরিত্র! চরিত্রে যখন যে রং দেওয়া হয়, সেই রঙেই সে নিজেকে রাঙিয়ে নেয়।’ মাধবীলতা পরাগের মুখোমুখি তির্যক দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন, ‘পরাগ, শরীরের বয়স হলেও মনের বয়স অনেক সময় বাড়ে না। যাদের শরীরের সঙ্গে মনের বয়স বাড়ে, তাদের দলে আমায় ফেলো না। মানসিক চাহিদা কি অন্যায়! তোমার কি তাই মনে হয়! যদি তাই মনে হয়, তাহলে তোমার সৃষ্টিতে পুরুষ-নারীকে নিয়ে এত খেলা কেন!”

পরাগ বিরক্ত গলায় বললেন, ‘স্টপ দিস ননসেন্স। এসব শুনতে আমার ইচ্ছে করছে না।”

মাধবীলতা আদুরে গলায় বললেন, ‘ঠান্ডা মাথায় শুনলে তবে তো শুনতে ইচ্ছে হবে। পাগল ছেলে একটা। আমার কাছে এসো।’ মাধবীলতা তার উষ্ণ দু-হাতে অক্টোপাসের মতো পরাগের কোমর শক্ত করে জড়িয়ে ধরে তার বুকে চুমু খেলেন। মাধবীলতার ব্যবহারে পরাগের ধৈর্যচ্যুতি ঘটল। তিনি মাধবীলতাকে তার শরীর থেকে পৃথক করে সজোরে এক চড় মারলেন। তিনি রক্তচক্ষু বার করে বললেন, “তুমি বুঝতে পারছ না আমি কী বলছি। পথ ছাড়ো। তোমার কি লজ্জা বলে কোনও বস্তু নেই! মেয়েদের লজ্জা একটা অলংকার। তোমার তো সেসব ধাতেই নেই। অপমানবোধটাও তোমার মতো নারীদের নেই। সরে যাও।”

মাধবীলতা জোর গলায় বললেন, ‘যদি না সরে যাই তাহলে কী করবে! পরাগ, আমি তোমাকে ভালোবেসেছিলাম। ভেবেছিলাম যে, তুমি অন্তত আমার যন্ত্রণার কথা বুঝবে। আমার গায়ে তুমি হাত তুললে। আমাকে চড় মারলে।’

পরাগ বললেন, “আমার তোমাকে দেখে করুণা হচ্ছে। ভালোবাসা তো অনেক দূরের কথা। তুমি একজন স্বল্প পরিচিত অবিবাহিত পুরুষ মানুষের সঙ্গে যেরকম আচরণ করেছ বাড়িতে নিমন্ত্রণ করে, তাতে তোমার ওটাই প্রাপ্য। সরে যাও।”

পরাগ কথা শেষ করে মাধবীলতাকে ধাক্কা মেরে ফেলে ঘর থেকে বেরিয়ে ডাইনিং-এ এলেন। তারপর হুড়মুড় করে সিঁড়ি দিয়ে নেমে তার গাড়ির কাছে চলে এলেন। এসে ড্রাইভারকে বললেন, ‘গাড়ি স্টার্ট দাও।’

ওদিকে মাধবীলতা ধাক্কা খেয়ে উঠে দাঁড়ালেন। চিৎকার করে ডাকলেন, “পরাগ, তুমি এভাবে আমাকে ফেলে যেতে পারো না।” কোমরে বেশ চোট পেয়েছে। মুখে মেক আপের স্তর ম্লান হয়ে গেছে। পিঠ পর্যন্ত চুল এলোমেলো হয়ে গেছে। নীচে পরাগের গাড়ির স্টার্টের শব্দ শুনে ছুটে গেলেন বিস্তৃত ব্যালকনিতে। ব্যালকনি থেকে সামনে রাস্তাটার অনেকখানি অংশ দেখা যায়। ঘড়ির কাঁটা এগারোটার ঘর ছুঁয়েছে। ল্যাম্পপোস্টের আলো মাধবীলতার মতো নিস্তেজ, বড়ো ম্লান। দু-চারটে কুকুর রাস্তায় উদ্দেশ্যহীন ভাবে ‘ঘেউ ঘেউ’ করছে।

পরাগের গাড়ি মাধবীলতার বাড়ির গেট দিয়ে সশব্দে বেরিয়ে গেল। গাড়ির জানলা থেকে পরাগ ব্যালকনির দিকে তাকালেন। ব্যালকনির রেলিং-এ দু-হাত মেলে এলো চুলে মাধবীলতা এসে দাঁড়িয়েছেন। অস্তমিত যৌবন তাকে নিরন্তর শঙ্কা, দ্বিধা ও দ্বন্দ্বের গহ্বরে ফেলছে। তার মনের গহিন অরণ্যে কামনার দাবানল জ্বলছে। পরাগের মতো কোনও সুপুরুষ হয়তো ভুলবশত সেই আগুনে পুড়বেন। মাধবীলতার হাসি, চোখের চাহনি, শরীরী ভাষা, দীর্ঘসময় পুরুষ সান্নিধ্যে না আসা তারই ইঙ্গিত দিচ্ছে। তার প্রাসাদসম বাড়িকে পরাগের মনে হল একটা নিস্তব্ধতা ঢাকা আলো-আঁধারি প্রেতপুরী। মধ্যরাতে নিশি ডাকের মতো মাধবীলতার হৃদয়ের অতৃপ্ত বাসনা তাকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে। পরাগ গাড়ির জানলার কাচ তুলে দিয়ে ড্রাইভারকে বললেন, ‘গাড়ি জোরে চালাও।”

(সমাপ্ত)

ঘোরানো সিঁড়ি (পর্ব-০৩)

টিকটিক শব্দে ঘড়ির কাঁটা সাতটার ঘর ছুঁয়েছে। মাধবীলতা উৎকণ্ঠিত হৃদয়ে পরাগ অধিকারীর জন্য অপেক্ষা করছেন। মাধবীলতা ছত্রিশ বছর বয়সে স্বামীকে হারিয়েছেন। পূর্ণ যৌবনেই তার বুকের উপত্যকায় শূন্যতার গভীর গহ্বর সৃষ্টি হয়েছে। বাইশ বছর কোনও পুরুষ সংসর্গ তো দূরের কথা, তিনি কোনও পুরুষকে স্বপ্নেও ভাবতে পারেননি। লাইমলাইটের ঝলকানিতে আলোকিত সেলিব্রেটি ঔপন্যাসিক পরাগ অধিকারীর লেখার প্রতি আকর্ষিত হয়ে তিনি মানুষটার সান্নিধ্যে আসার সুযোগ হাতছাড়া করতে পারেননি। এতগুলো বছর পর কোনও এক পুরুষমানুষের সঙ্গে আড্ডা দেবেন। মন খুলে কথা বলার জন্য কাউকে তিনি আজ সন্ধেয় পাশে পাবেন। অদূরে গাড়ির হর্ণে তিনি সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। ব্যালকনি থেকে তিনি দেখলেন যে, পরাগ অধিকারীর গাড়ি তার বাড়ির সদর গেট দিয়ে ঢুকছে।

মাধবীলতা দোতলা থেকে তাড়াহুড়ো করে নেমে এলেন। পরাগ গাড়ি থেকে বেরিয়ে মাধবীলতাকে বললেন, ‘কেমন আছেন? জ্যামে পড়ে গিয়ে আমার আসতে একটু দেরি হয়ে গেল৷’

—না, কিছু দেরি হয়নি। আবার আপনি! পরাগ, এটা কিন্তু খুব খারাপ হচ্ছে।

—ওহ, সরি। একদম খেয়াল ছিল না।

মাধবীলতা পরাগকে ডান হাত বাড়িয়ে বললেন, “এসো, উপরে এসো।’

মাধবীলতার পা অনুসরণ করে পরাগ উপরে উঠলেন। সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে পরাগ বললেন, “বাহ, খুব সুন্দর বাড়ি তোমার। রাজপ্রাসাদ একদম।’

মাধবীলতা বললেন, “আমার স্বামী নিজে পছন্দ করে দেখেশুনে এই বাড়ি বানিয়েছিলেন। নামকরা ইন্টেরিয়র ডেকরেটর দিয়ে ডেকরেশন করানো হয়েছিল। কিন্তু কী লাভ! উনি তো অকালেই চলে গেলেন।”

পরাগ কথা না বাড়িয়ে নিঃশব্দে উপরে উঠলেন।

মাধবীলতা পরাগকে ডাইনিং রুমে বসতে দিলেন। মাধবীলতা পরাগকে বললেন, ‘তুমি একটু বোসো। আমি চট করে দু-কাপ কফি নিয়ে আসি। পরাগ বললেন, “আমার সুগার ছাড়া ব্ল্যাক কফি।’ মাধবীলতা স্মিত হেসে চলে গেলেন।

পরাগ ঘুরে ঘুরে ঘরের কারুকার্য, দেয়াল আলমারিতে দেশি-বিদেশি সাহিত্যের বিভিন্ন বই, শো কেসে অ্যান্টিক পিসের বিভিন্ন কালেকশন দেখতে লাগলেন। কিছুক্ষণ পরই মাধবীলতা দু-কাপ কফি আর এক প্লেট কাটলেট, ফিশ কবিরাজি নিয়ে এলেন। । তিনি টেবিলে খাবারগুলো নামাতেই পরাগ একটু চমকে উঠে বললেন, “ওরে বাবা রে। এত খাবার কে খাবে! এত কী করেছ!”

—এটুকু খাবার খেতেই হবে পরাগ। তুমি আমার বাড়ি আজ প্রথম এলে।

—আমি এত খাবার খেতে পারব না। আমার অভ্যাস নেই।

—এটা কি ফিগার মেইনটেইন করতে! এগুলো কিন্তু একদম ঘরে বানানো। আমি নিজে তোমার জন্য বানিয়েছি। একটু অন্তত টেস্ট করে দ্যাখো।

—ফিগারের কথা অত চিন্তায় থাকে না। এত স্পাইসি খাবার আমার পছন্দ নয়। আমি একটু টেস্ট করছি।

—আচ্ছা। খাওয়ার জন্য তোমাকে জোর করব না।

—তুমি আমাকে গল্প শোনাবে বলেছিলে। গল্প কি রেডি আছে!

—উফ, তুমি একদম প্রফেশনাল রাইটারের মতো কথা বলছ আমার বাড়ি এসে। সময় কি পেরিয়ে গেছে গল্প শোনানোর! আমার পরিচয় তো প্রফেশনাল রাইটারেরই।

—একদম স্মার্টলি উত্তর।

কফি, কাটলেট, কবিরাজির পর্ব শেষ হলে মাধবীলতা রহস্যপূর্ণ হাসি হেসে পরাগের হাত ধরে সোফা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে ব্যস্ততার সঙ্গে বললেন, “ওঠো। এসো আমার ঘরে এসো।” সোফা ছেড়ে পরাগ উঠতে বাধ্য হল।

মাধবীলতা পরাগকে নিজের বেডরুমে নিয়ে গেলেন। তিনি খাটের উপর পরাগকে বসতে দিলেন। তিনি পরাগের শরীর ঘেঁষে বসে বললেন, “আমার গল্প বড়ো সাদা-কালো। পরাগ, এত রোম্যান্টিক লেখা তোমার কলমে আসে কী করে! তোমার উপন্যাসের প্রত্যেকটা নায়ককে ছুঁয়ে দেখতে ইচ্ছে করে জানো। কেন এমন শরীর মন আনচান করে?’ পরাগের কাঁধে বাম হাত রেখে তিনি বললেন, “আমার দিকে তাকাও।”

মাধবীলতার স্পর্শে পরাগের একটা অস্বস্তিবোধ করছিল। পরাগ বললেন, ‘আমার একটু তাড়া আছে। তোমার লেখাটা বার করো।’ মাধবীলতা পরাগের ঠোঁট হাত দিয়ে চেপে ধরলেন। পরাগকে বিছানায় ঠেলে ফেলে তিনি বললেন, ‘চুপ। আমার কাছে কোনও বাহানা নয়। তুমি আমার গল্প লিখবে। আমি তোমার উপন্যাসের চরিত্র হব।”

তার বুকের শাড়ির আঁচল খসে পড়ল। অর্ধউন্মুক্ত বুকে তিনি পরাগের হাতটা জোর করে চেপে ধরে বললেন, ‘আমার মনে ঝড় উঠেছে দ্যাখো। এই ঝড় একমাত্র তুমিই থামাতে পারো।”

পরাগ জোর করে হাত ছাড়িয়ে নিয়ে বললেন, ‘কী করছ! কেন আমাকে এসব বলছ?”

মাধবীলতা বাঁকা হাসি হেসে বললেন, ‘কেন বলছি বুঝতে পারো না! আমি ক্ষুধার্ত। তোমার এত কাছে এসে আমার বুকে ছাইয়ের ভিতর চাপা পড়ে থাকা আগুনটা দাউদাউ করে জ্বলছে। এই আগুন সবকিছু ছারখার করে দিতে চায়। আমি চাই যে, আমার হৃদয়ের অতলে লুকানো যত অনুভূতি তুমি বার করে আনো।”

পরাগ মাধবীলতাকে সরিয়ে দিয়ে বললেন, ‘তোমার স্পর্শে আমার অস্বস্তি হচ্ছে। একবার ভেবে দেখেছ কি, তোমার আমার বয়সের তফাৎ? এটা পাগলামো।’

মাধবীলতা তার শাড়ির আঁচল গায়ে তুলে পরাগের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বললেন, ‘আমার তোমাকে ভালোলাগাটা পাগলামো! তোমার লেখা গল্প-উপন্যাসের চরিত্রগুলো তো তাহলে সকলেই বদ্ধ পাগল।”

পরাগ বললেন, “ওটা সাহিত্য। আমি বুঝতে পারছি না যে, তোমার মতো একজন কেন এসব বলছে!”

মাধবীলতা দু-হাতে পরাগের দু-গালে হাত দিয়ে বললেন, ‘আমি বেশি সময় চাইছি না। কয়েক ঘণ্টা সময় আমাকে দাও। তুমি জানো না, একাকীত্বের চেয়ে বড়ো যন্ত্রণা কিছু নেই। বাইশ বছর ধরে এই যন্ত্রণায় আমি কাতর। যেদিন থেকে বিভিন্ন ম্যাগাজিনের পাতায় তোমার ছবি দেখেছি, সেদিন থেকে আমার মন ব্যাকুল হয়ে উঠেছে।’

(ক্রমশ…)

পড়ার জন্য সীমাহীন গল্প-নিবন্ধসাবস্ক্রাইব