ঘোরানো সিঁড়ি (শেষ পর্ব)

পরাগ এরকম পরিস্থিতিতে এর আগে কখনও পড়েনি। তার মহিলা ভক্তের সংখ্যা অগণিত। মাধবীলতা তার সুডৌল বাহু দিয়ে পরাগকে জড়িয়ে ধরলেন। পরাগ সামলাতে না পেরে বিছানায় পড়ে গেলেন। মাধবীলতা তার সরু আঙুলগুলো পরাগের মুখে পাখির পালকের মতো বুলিয়ে বললেন, ‘আমি তোমাকে সব দেব। গাড়ি, বাড়ি, টাকা-পয়সা আমার যা আছে। আমার দিকে তাকাও।’

পরাগ মাধবীলতার স্পর্শে ক্ষণিকের জন্য চোখ বন্ধ করেছিল। পরাগের মনে হল যে, তার বুকের উপর বিষধর সাপের মতো মাধবীলতার অতৃপ্ত নিঃশ্বাস ফোঁস ফোঁস শব্দ করে পড়ছে। মাধবীলতার নেশা নেশা চোখে কামনার আগুন যেন সদর্পে জ্বলছে। মাধবীলতার দীর্ঘ একাকীত্বকে চোখ রাঙিয়ে সে আঙুল তুলে ধিক্কার জানাচ্ছে।

মাধবীলতার ছোঁয়ায় পরাগের বুকের ভিতর কেমন একটা ভয়, একটা শিহরণ খেলে গেল। ঠিক যেন ঘোর অমাবস্যায় হঠাৎ ভূত দেখার মতো। পরাগের দম বন্ধ হয়ে এল। তিনি জোরে শ্বাস নিয়ে মাধবীলতাকে বললেন, “তোমার কাছে আমি কিছু চাই না। তোমার চাহিদা পূরণ করার মতো ইচ্ছা বা আগ্রহ কোনওটাই আমার নেই। তুমি আমাকে জোর করতে পারো না।’ মাধবীলতাকে সজোরে ঠেলে পরাগ দরজার বাইরে বেরিয়ে যেতে চাইলেন।

মাধবীলতার চুলে জুঁই ফুলের মালা খসে পড়ল। তার অবিন্যস্ত চুলগুলো হাওয়ায় উড়তে লাগল। রাগে-অভিমানে তিনি পরাগের পথরোধ করে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘তুমি আমাকে আঘাত করলে! এত বড়ো স্পর্ধা তোমার! তুমি কী ভাবো নিজেকে! কীসের এত দেমাক তোমার! রূপ- গুণের এত অহংকার তোমার।”

পরাগ জোর গলায় বললেন, ‘নিজের চরিত্রের। এখন বুঝতে পারছি যে, ‘তুমি’ সম্বোধনের কারণ কী, বন্ধুত্বের কারণ কী। ছি! ছি!”

মাধবীলতা রাগে গজরাতে লাগলেন। মুখের উপর গাঢ় মেকআপের প্রলেপ ভেদ করে চোয়ালের হাড় কর্কশ ভাবে মাথা তুলে দাঁড়াতে চাইল। তিনি পরাগের গায়ে ঢলে পড়ে বললেন, ‘স্ক্যান্ডেল ছাড়া নামজাদা শিল্পীর দৃষ্টান্ত এ পৃথিবীতে বিরল। আর তুমি তো রক্ত মাংসের মানুষ। যদি কোনও প্রেস, মিডিয়া ঘুণাক্ষরে আজকের সন্ধ্যার কথা জানতে পারে, তাহলে কাল সকালের খবরে এটাই মুখরোচক শিরোনামে বার হবে সত্য মিথ্যা যাচাই না করেই।’

পরাগ বললেন, ‘আমি ওসব নিয়ে ভাবি না। নিজের কাছে নিজে পরিষ্কার থাকা জরুরি।’

মাধবীলতা ব্যঙ্গের হাসি হেসে বললেন, “পুরুষ মানুষের আবার চরিত্র! চরিত্রে যখন যে রং দেওয়া হয়, সেই রঙেই সে নিজেকে রাঙিয়ে নেয়।’ মাধবীলতা পরাগের মুখোমুখি তির্যক দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন, ‘পরাগ, শরীরের বয়স হলেও মনের বয়স অনেক সময় বাড়ে না। যাদের শরীরের সঙ্গে মনের বয়স বাড়ে, তাদের দলে আমায় ফেলো না। মানসিক চাহিদা কি অন্যায়! তোমার কি তাই মনে হয়! যদি তাই মনে হয়, তাহলে তোমার সৃষ্টিতে পুরুষ-নারীকে নিয়ে এত খেলা কেন!”

পরাগ বিরক্ত গলায় বললেন, ‘স্টপ দিস ননসেন্স। এসব শুনতে আমার ইচ্ছে করছে না।”

মাধবীলতা আদুরে গলায় বললেন, ‘ঠান্ডা মাথায় শুনলে তবে তো শুনতে ইচ্ছে হবে। পাগল ছেলে একটা। আমার কাছে এসো।’ মাধবীলতা তার উষ্ণ দু-হাতে অক্টোপাসের মতো পরাগের কোমর শক্ত করে জড়িয়ে ধরে তার বুকে চুমু খেলেন। মাধবীলতার ব্যবহারে পরাগের ধৈর্যচ্যুতি ঘটল। তিনি মাধবীলতাকে তার শরীর থেকে পৃথক করে সজোরে এক চড় মারলেন। তিনি রক্তচক্ষু বার করে বললেন, “তুমি বুঝতে পারছ না আমি কী বলছি। পথ ছাড়ো। তোমার কি লজ্জা বলে কোনও বস্তু নেই! মেয়েদের লজ্জা একটা অলংকার। তোমার তো সেসব ধাতেই নেই। অপমানবোধটাও তোমার মতো নারীদের নেই। সরে যাও।”

মাধবীলতা জোর গলায় বললেন, ‘যদি না সরে যাই তাহলে কী করবে! পরাগ, আমি তোমাকে ভালোবেসেছিলাম। ভেবেছিলাম যে, তুমি অন্তত আমার যন্ত্রণার কথা বুঝবে। আমার গায়ে তুমি হাত তুললে। আমাকে চড় মারলে।’

পরাগ বললেন, “আমার তোমাকে দেখে করুণা হচ্ছে। ভালোবাসা তো অনেক দূরের কথা। তুমি একজন স্বল্প পরিচিত অবিবাহিত পুরুষ মানুষের সঙ্গে যেরকম আচরণ করেছ বাড়িতে নিমন্ত্রণ করে, তাতে তোমার ওটাই প্রাপ্য। সরে যাও।”

পরাগ কথা শেষ করে মাধবীলতাকে ধাক্কা মেরে ফেলে ঘর থেকে বেরিয়ে ডাইনিং-এ এলেন। তারপর হুড়মুড় করে সিঁড়ি দিয়ে নেমে তার গাড়ির কাছে চলে এলেন। এসে ড্রাইভারকে বললেন, ‘গাড়ি স্টার্ট দাও।’

ওদিকে মাধবীলতা ধাক্কা খেয়ে উঠে দাঁড়ালেন। চিৎকার করে ডাকলেন, “পরাগ, তুমি এভাবে আমাকে ফেলে যেতে পারো না।” কোমরে বেশ চোট পেয়েছে। মুখে মেক আপের স্তর ম্লান হয়ে গেছে। পিঠ পর্যন্ত চুল এলোমেলো হয়ে গেছে। নীচে পরাগের গাড়ির স্টার্টের শব্দ শুনে ছুটে গেলেন বিস্তৃত ব্যালকনিতে। ব্যালকনি থেকে সামনে রাস্তাটার অনেকখানি অংশ দেখা যায়। ঘড়ির কাঁটা এগারোটার ঘর ছুঁয়েছে। ল্যাম্পপোস্টের আলো মাধবীলতার মতো নিস্তেজ, বড়ো ম্লান। দু-চারটে কুকুর রাস্তায় উদ্দেশ্যহীন ভাবে ‘ঘেউ ঘেউ’ করছে।

পরাগের গাড়ি মাধবীলতার বাড়ির গেট দিয়ে সশব্দে বেরিয়ে গেল। গাড়ির জানলা থেকে পরাগ ব্যালকনির দিকে তাকালেন। ব্যালকনির রেলিং-এ দু-হাত মেলে এলো চুলে মাধবীলতা এসে দাঁড়িয়েছেন। অস্তমিত যৌবন তাকে নিরন্তর শঙ্কা, দ্বিধা ও দ্বন্দ্বের গহ্বরে ফেলছে। তার মনের গহিন অরণ্যে কামনার দাবানল জ্বলছে। পরাগের মতো কোনও সুপুরুষ হয়তো ভুলবশত সেই আগুনে পুড়বেন। মাধবীলতার হাসি, চোখের চাহনি, শরীরী ভাষা, দীর্ঘসময় পুরুষ সান্নিধ্যে না আসা তারই ইঙ্গিত দিচ্ছে। তার প্রাসাদসম বাড়িকে পরাগের মনে হল একটা নিস্তব্ধতা ঢাকা আলো-আঁধারি প্রেতপুরী। মধ্যরাতে নিশি ডাকের মতো মাধবীলতার হৃদয়ের অতৃপ্ত বাসনা তাকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে। পরাগ গাড়ির জানলার কাচ তুলে দিয়ে ড্রাইভারকে বললেন, ‘গাড়ি জোরে চালাও।”

(সমাপ্ত)

ঘোরানো সিঁড়ি (পর্ব-০৩)

টিকটিক শব্দে ঘড়ির কাঁটা সাতটার ঘর ছুঁয়েছে। মাধবীলতা উৎকণ্ঠিত হৃদয়ে পরাগ অধিকারীর জন্য অপেক্ষা করছেন। মাধবীলতা ছত্রিশ বছর বয়সে স্বামীকে হারিয়েছেন। পূর্ণ যৌবনেই তার বুকের উপত্যকায় শূন্যতার গভীর গহ্বর সৃষ্টি হয়েছে। বাইশ বছর কোনও পুরুষ সংসর্গ তো দূরের কথা, তিনি কোনও পুরুষকে স্বপ্নেও ভাবতে পারেননি। লাইমলাইটের ঝলকানিতে আলোকিত সেলিব্রেটি ঔপন্যাসিক পরাগ অধিকারীর লেখার প্রতি আকর্ষিত হয়ে তিনি মানুষটার সান্নিধ্যে আসার সুযোগ হাতছাড়া করতে পারেননি। এতগুলো বছর পর কোনও এক পুরুষমানুষের সঙ্গে আড্ডা দেবেন। মন খুলে কথা বলার জন্য কাউকে তিনি আজ সন্ধেয় পাশে পাবেন। অদূরে গাড়ির হর্ণে তিনি সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। ব্যালকনি থেকে তিনি দেখলেন যে, পরাগ অধিকারীর গাড়ি তার বাড়ির সদর গেট দিয়ে ঢুকছে।

মাধবীলতা দোতলা থেকে তাড়াহুড়ো করে নেমে এলেন। পরাগ গাড়ি থেকে বেরিয়ে মাধবীলতাকে বললেন, ‘কেমন আছেন? জ্যামে পড়ে গিয়ে আমার আসতে একটু দেরি হয়ে গেল৷’

—না, কিছু দেরি হয়নি। আবার আপনি! পরাগ, এটা কিন্তু খুব খারাপ হচ্ছে।

—ওহ, সরি। একদম খেয়াল ছিল না।

মাধবীলতা পরাগকে ডান হাত বাড়িয়ে বললেন, “এসো, উপরে এসো।’

মাধবীলতার পা অনুসরণ করে পরাগ উপরে উঠলেন। সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে পরাগ বললেন, “বাহ, খুব সুন্দর বাড়ি তোমার। রাজপ্রাসাদ একদম।’

মাধবীলতা বললেন, “আমার স্বামী নিজে পছন্দ করে দেখেশুনে এই বাড়ি বানিয়েছিলেন। নামকরা ইন্টেরিয়র ডেকরেটর দিয়ে ডেকরেশন করানো হয়েছিল। কিন্তু কী লাভ! উনি তো অকালেই চলে গেলেন।”

পরাগ কথা না বাড়িয়ে নিঃশব্দে উপরে উঠলেন।

মাধবীলতা পরাগকে ডাইনিং রুমে বসতে দিলেন। মাধবীলতা পরাগকে বললেন, ‘তুমি একটু বোসো। আমি চট করে দু-কাপ কফি নিয়ে আসি। পরাগ বললেন, “আমার সুগার ছাড়া ব্ল্যাক কফি।’ মাধবীলতা স্মিত হেসে চলে গেলেন।

পরাগ ঘুরে ঘুরে ঘরের কারুকার্য, দেয়াল আলমারিতে দেশি-বিদেশি সাহিত্যের বিভিন্ন বই, শো কেসে অ্যান্টিক পিসের বিভিন্ন কালেকশন দেখতে লাগলেন। কিছুক্ষণ পরই মাধবীলতা দু-কাপ কফি আর এক প্লেট কাটলেট, ফিশ কবিরাজি নিয়ে এলেন। । তিনি টেবিলে খাবারগুলো নামাতেই পরাগ একটু চমকে উঠে বললেন, “ওরে বাবা রে। এত খাবার কে খাবে! এত কী করেছ!”

—এটুকু খাবার খেতেই হবে পরাগ। তুমি আমার বাড়ি আজ প্রথম এলে।

—আমি এত খাবার খেতে পারব না। আমার অভ্যাস নেই।

—এটা কি ফিগার মেইনটেইন করতে! এগুলো কিন্তু একদম ঘরে বানানো। আমি নিজে তোমার জন্য বানিয়েছি। একটু অন্তত টেস্ট করে দ্যাখো।

—ফিগারের কথা অত চিন্তায় থাকে না। এত স্পাইসি খাবার আমার পছন্দ নয়। আমি একটু টেস্ট করছি।

—আচ্ছা। খাওয়ার জন্য তোমাকে জোর করব না।

—তুমি আমাকে গল্প শোনাবে বলেছিলে। গল্প কি রেডি আছে!

—উফ, তুমি একদম প্রফেশনাল রাইটারের মতো কথা বলছ আমার বাড়ি এসে। সময় কি পেরিয়ে গেছে গল্প শোনানোর! আমার পরিচয় তো প্রফেশনাল রাইটারেরই।

—একদম স্মার্টলি উত্তর।

কফি, কাটলেট, কবিরাজির পর্ব শেষ হলে মাধবীলতা রহস্যপূর্ণ হাসি হেসে পরাগের হাত ধরে সোফা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে ব্যস্ততার সঙ্গে বললেন, “ওঠো। এসো আমার ঘরে এসো।” সোফা ছেড়ে পরাগ উঠতে বাধ্য হল।

মাধবীলতা পরাগকে নিজের বেডরুমে নিয়ে গেলেন। তিনি খাটের উপর পরাগকে বসতে দিলেন। তিনি পরাগের শরীর ঘেঁষে বসে বললেন, “আমার গল্প বড়ো সাদা-কালো। পরাগ, এত রোম্যান্টিক লেখা তোমার কলমে আসে কী করে! তোমার উপন্যাসের প্রত্যেকটা নায়ককে ছুঁয়ে দেখতে ইচ্ছে করে জানো। কেন এমন শরীর মন আনচান করে?’ পরাগের কাঁধে বাম হাত রেখে তিনি বললেন, “আমার দিকে তাকাও।”

মাধবীলতার স্পর্শে পরাগের একটা অস্বস্তিবোধ করছিল। পরাগ বললেন, ‘আমার একটু তাড়া আছে। তোমার লেখাটা বার করো।’ মাধবীলতা পরাগের ঠোঁট হাত দিয়ে চেপে ধরলেন। পরাগকে বিছানায় ঠেলে ফেলে তিনি বললেন, ‘চুপ। আমার কাছে কোনও বাহানা নয়। তুমি আমার গল্প লিখবে। আমি তোমার উপন্যাসের চরিত্র হব।”

তার বুকের শাড়ির আঁচল খসে পড়ল। অর্ধউন্মুক্ত বুকে তিনি পরাগের হাতটা জোর করে চেপে ধরে বললেন, ‘আমার মনে ঝড় উঠেছে দ্যাখো। এই ঝড় একমাত্র তুমিই থামাতে পারো।”

পরাগ জোর করে হাত ছাড়িয়ে নিয়ে বললেন, ‘কী করছ! কেন আমাকে এসব বলছ?”

মাধবীলতা বাঁকা হাসি হেসে বললেন, ‘কেন বলছি বুঝতে পারো না! আমি ক্ষুধার্ত। তোমার এত কাছে এসে আমার বুকে ছাইয়ের ভিতর চাপা পড়ে থাকা আগুনটা দাউদাউ করে জ্বলছে। এই আগুন সবকিছু ছারখার করে দিতে চায়। আমি চাই যে, আমার হৃদয়ের অতলে লুকানো যত অনুভূতি তুমি বার করে আনো।”

পরাগ মাধবীলতাকে সরিয়ে দিয়ে বললেন, ‘তোমার স্পর্শে আমার অস্বস্তি হচ্ছে। একবার ভেবে দেখেছ কি, তোমার আমার বয়সের তফাৎ? এটা পাগলামো।’

মাধবীলতা তার শাড়ির আঁচল গায়ে তুলে পরাগের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বললেন, ‘আমার তোমাকে ভালোলাগাটা পাগলামো! তোমার লেখা গল্প-উপন্যাসের চরিত্রগুলো তো তাহলে সকলেই বদ্ধ পাগল।”

পরাগ বললেন, “ওটা সাহিত্য। আমি বুঝতে পারছি না যে, তোমার মতো একজন কেন এসব বলছে!”

মাধবীলতা দু-হাতে পরাগের দু-গালে হাত দিয়ে বললেন, ‘আমি বেশি সময় চাইছি না। কয়েক ঘণ্টা সময় আমাকে দাও। তুমি জানো না, একাকীত্বের চেয়ে বড়ো যন্ত্রণা কিছু নেই। বাইশ বছর ধরে এই যন্ত্রণায় আমি কাতর। যেদিন থেকে বিভিন্ন ম্যাগাজিনের পাতায় তোমার ছবি দেখেছি, সেদিন থেকে আমার মন ব্যাকুল হয়ে উঠেছে।’

(ক্রমশ…)

ঘোরানো সিঁড়ি (পর্ব-০২)

মাধবীলতার পাশে পরাগ অধিকারী বসলেন। গাড়ি চলতে শুরু করল। পরাগ অধিকারীকে চুপচাপ বসে থাকতে দেখে মাধবীলতা নীরবতা ভেঙে বললেন, ‘আপনি কি চুপচাপ থাকতে ভালোবাসেন?’

পরাগ অধিকারী স্মিত হেসে বললেন, ‘না, তা নয়।”

—একটা কথা বলি, আমি বেশিক্ষণ ‘আপনি’-তে থাকতে পারি না। যে-কোনও মুহূর্তে ‘তুমি’-তে ফিরতে পারি। তাছাড়া বয়সে ছোটো কাউকে ‘আপনি’ সম্বোধন করতেও কিন্তু কিন্তু ঠেকে।

–আমাকে ‘আপনি’ না বলে ‘তুমি’-ই বলুন।

—তোমাকে আর একটা পরিচয় দিই আমার। আমার মেয়ে রম্ভা। তুমি পুরোদমে লেখার আগে যেখানে চাকরি করতে সেখানে ও চাকরি করত। রম্ভা তোমার কথা খুব বলত। অবশ্য রম্ভা জব জয়েন করার দু-বছরের মধ্যেই তুমি জব ছেড়ে দাও।

—রয় গ্রুপ অফ ইন্ডাস্ট্রিতে আমি চার বছর ম্যানেজিং ডিরেক্টরের পোস্টে ছিলাম। আপনি রম্ভার মা জেনে ভালো লাগল। —ওহ, এই সেলেব্রিটি লোকজনরা মানুষকে আপন ভাবতে পারে না। বৈঠকখানার লোকের মতো দীর্ঘসময় আপনি, আজ্ঞে ইত্যাদি চালায়। আমাকে কি তুমি বলা যায় না? বয়সের গণ্ডি পেরিয়ে কি বন্ধু ভাবা যায় না?

—আচ্ছা ঠিক আছে। ‘তুমি’-ই বলব।’

পরাগের মুখ থেকে মাধবীলতা কথাটা শুনে সহাস্যে বললেন, ‘দ্যাটস লাইক আ গুড বয়। আমি খুব খুশি হয়েছি। আমার একটা অনুরোধ আছে। তোমাকে রাখতেই হবে পরাগ। পরশু সানড়ে সন্ধ্যায় আমার বাড়িতে তোমার চায়ের নিমন্ত্রণ। শুধু চা নয়, আমার লেখা একটা বড়ো গল্প আছে। সেটা তোমাকে একটু চেক করতে হবে। এটাই ধরো তোমার মূল কাজ।’

পরাগ আমতা আমতা করে বললেন, ‘পরশু! দেখছি।”

মাধবীলতা পরাগের ডান হাতটা জড়িয়ে ধরে জোরাজুরির সুরে বলল, “দেখছি নয়। কথা দাও আসবে।”

—আচ্ছা যাব।

গাড়িতে যেতে যেতে দু’জনের ফোন নাম্বার বিনিময় হল।

মাধবীলতা বললেন, “একটা কথা জানতে ইচ্ছে করছে। পরাগ, বাড়ি না গিয়ে কোথায় যাবে এখন?’

পরাগ স্মিত হেসে বলল, ‘এক বন্ধুর বাড়ি।’

গাড়ি সল্টলেক ঢুকতেই পরাগ বললেন, “এখানে রাখো। আমি নামব।” গাড়ি থেকে নেমে তিনি মাধবীলতাকে বললেন, “ধন্যবাদ দিদি পৌঁছে দেবার জন্য।’

মাধবীলতা বললেন, “ঠিক আছে। রবিবার আসছ কিন্তু আমার বাড়ি।”

পরাগ দৃষ্টির বাইরে চলে গেলেন। মাধবীলতা যখন বাড়ি ফিরলেন তখন ঘড়ির কাঁটা তিনটের ঘর ছুঁয়েছে।

বাড়ি ফিরে স্নান সেরে বার্থ রোব গায়ে জড়িয়ে মাধবীলতা তার ঘরে ঢুকলেন। স্বামীর তৈরি প্রাসাদোসম তিনতলা বাড়িতে তিনি একেবারে একা। একমাত্র মেয়ে রম্ভা দশ বছর চাকরিসূত্রে বেঙ্গালুরুতে থাকে। মাধবীলতার স্বামী বাইশ বছর হল মারা গেছেন। বড়ো বাড়ির নির্জনতা মাধবীলতাকে যেন একাকীত্বের গহ্বরে নিয়ে যায়। দিনের বেলায় তবু কাজের দুটো লোক থাকে। সন্ধের পর বাড়ি যেন নিস্তব্ধতার চাদর মুড়ি দিয়ে ঘুমায়। বড়ো বাড়িতে মাধবীলতা সম্পূর্ণ একা। তার অর্থের কোনও অভাব নেই। বলা যায়, অর্থের প্রাচুর্য এতই যে, মাধবীলতার পরবর্তী দুই প্রজন্ম উপার্জন না করলেও স্বাচ্ছন্দ্যেই চলে যাবে।

মাধবীলতার সঙ্গীর অভাব। তার সুখ-দুঃখের কথা বলার লোকের অভাব। বাইশ বছর তিনি যে কীভাবে একা কাটিয়েছেন তিনিই জানেন। কথা বলার মনের মতো সঙ্গী পেলে তার মন ব্যাকুল হয়ে ওঠে। তার বয়স হয়েছে ঠিকই। কিন্তু আজ পরাগের মতো পুরুষের মুখ থেকে তাঁকে ‘দিদি’ সম্বোধন একদম মেনে নিতে পারেননি। বন্ধু হিসাবে পরাগ তো তাকে নাম ধরেই ডাকতে পারতেন।

আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে বার্থ রোব ছেড়ে মাধবীলতা অন্য পোশাক পরতে গিয়ে অর্ধ অনাবৃত শরীর দেখে কিছুটা শঙ্কিত হলেন। মাধবীলতার পূর্বের চেহারার সঙ্গে বর্তমান চেহারার আমূল পরিবর্তন হয়েছে। ড্রেসিং টেবিলে রাখা তার সাতাশ বছর বয়সের বড়ো করে বাঁধানো ছবিটা হাতে তুলে নিয়ে উৎকণ্ঠিত দৃষ্টিতে কী যেন খুঁজতে লাগলেন। বর্তমানে তার বয়স আটান্নর ঘরে পা দিয়েছে। বার্ধক্য নির্মম আঁচড় কেটেছে তার সর্বাঙ্গে। কাঠ পালিশের মতো জৌলুস টানটান চামড়ায় কোঁচকানো ধুতির মতো অজস্র ভাঁজ পড়েছে। অমাবস্যার মতো ঘন কালো লম্বা চুল পুজোর শুভ্র চামরের মতো রং নিয়েছে। সেই চুল ঢাকতে নানান রং ব্যবহার করলেও সে রং বড়োই ক্ষণস্থায়ী।

মাধবীলতার মুক্তোর মতো দাঁতগুলো অকালে সামনে কয়েকটা পড়ে যাওয়ায় বাঁধানো দাঁতে কাজ চালাতে হয়। স্বপ্নে ভাসা টানা টানা দুটি চোখ আজ নিস্তেজ, জৌলুসহীন। চোখের নীচে কালি পড়েছে। তার পূর্বের মেদহীন শরীর দখল করে ফেলেছে কিছু অপ্রয়োজনীয় চর্বি। গালের কোঁচকানো চামড়ায় পুরনো বসন্তের দাগ এবং মেচেতা সখ্যতা করে তাদের অস্তিত্ব নিয়ে প্রকটিত হয়েছে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে। মাধবীলতার অজান্তেই ধীর পায়ে বার্ধক্য যৌবনকে চুরি করেছে। সূর্যাস্তের সময় হয়ে এসেছে। মাধবীলতা একটা শীত ঘুম থেকে ওঠা সাপের মতো দীর্ঘনিঃশ্বাস ছাড়লেন।

রবিবার সকাল থেকে মাধবীলতার ব্যস্ততার সীমা নেই। ঔপন্যাসিক পরাগ অধিকারী তার নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে আজ সন্ধ্যা সাতটায় আসছেন। রান্নার লোককে দিয়ে অনেকরকমের পদ রান্না করিয়েছেন মাধবীলতা। কাজের দুটো লোককে বিকালের আগেই তিনি বিদায় করে দিয়েছেন। বার্ধক্যের কর্কশ নখরাঘাতে ক্ষত-বিক্ষত হওয়া শরীরকে মাধবীলতা মনের মাধুরী মিশিয়ে সাজিয়েছেন। পেস্তা রঙের এমব্রডারি ডিজাইন করা শাড়িতে তিনি নিজেকে আবৃত করেছেন। গালের উপর গাঢ় মেক-আপ আবরণ তার বয়সকে গোটা দশ বছর কমিয়ে দিয়েছে। তার রং করা চুলের খোঁপায় বেঁধেছেন জুঁই ফুলের মালা। ঘন বাদামি লিপস্টিক তার ঠোঁট রাঙিয়েছে। নিস্তেজ দুটি চোখ ঘন কাজল আর মাসকারায় মোহময়ী রূপ নিয়েছে। ঈষৎ কোঁচকানো চামড়ায় ঢাকা মাংসল হাতে সোনার ভারী কঙ্কন। আঙুলে হিরের আংটি। গলায় মুক্তোর হার। কানে মীনা করা সোনার দুল। চওড়া কপালে বড়ো শাড়ির রঙের সঙ্গে মানানসই হালকা সবুজ টিপ। পায়ে একজোড়া রুপোর নূপুর। সবমিলিয়ে মাধবীলতা নিজেকে সুসজ্জিত করতে কোনও খামতি রাখেনি। বার্ধক্যকে ঢাকতে তার প্রচেষ্টা নেহাৎ কম নয়।

(ক্রমশ…)

এক মর্মস্পর্শী বিষয়ে সমৃদ্ধ হয়ে মুক্তি পেতে চলেছে বাংলা ছবি—‘প্রশ্ন’

মৃত্যু রহস্য উন্মোচিত হয় না সর্বদা। থেকে যায় অনেক প্রশ্ন এবং সেইসব প্রশ্নের উত্তরও পাওয়া যায় না বেশিরভাগ ক্ষেত্রে। কিন্তু কেন এমনটা ঘটে? এই প্রশ্নের উত্তর অবশ্য অনেকাংশে প্রায় সকলেরই জানা আছে।

আসলে, ক্ষমতাবানরা যে কুকর্মই করুন না কেন, তাদের প্রশ্ন করলেই বিপদ! শুধু অত্যাচারিত হওয়াই নয়, জীবন বিসর্জনও দিতে হতে পারে। এই যেমন এক তরুণী চিকিৎসক যে হাসপাতালে সেবা দিত, সেই হাসপাতালেই অত্যাচারিত হয়ে প্রাণ বিসর্জন দিতে হয়েছে তাকে।

মর্মান্তিক! আর এমন মর্মান্তিক ঘটনার সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে। অবশ্য এইসব মর্মান্তিক ঘটনা সমাজে যথেষ্ট প্রভাবও ফেলছে। সাধারণ মানুষ রাস্তায় নেমে প্রতিবাদে সোচ্চার হচ্ছেন। কিন্তু অপরাধীরা জনগণের প্রতিবাদে কতটা ভয় পেয়েছে, সেই বিষয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। কারণ, রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকলে, অপরাধীদের মনে ‘ভয়’ শব্দটা জায়গা পায় না। তবুও থেমে থাকলে চলবে না, প্রতিবাদে আরও সরব হতে হবে প্রত্যক্ষে কিংবা পরোক্ষে। সাহিত্য, সংস্কৃতি সমস্ত মাধ্যমে তুলতে হবে— প্রশ্ন। আর এভাবেই প্রশ্ন করে উত্তর পাওয়ার আশায় তৈরি হয়েছে ‘প্রশ্ন’ শিরোনামে একটি বাংলা ছবি। মর্মস্পর্শী বিষয়ে সমৃদ্ধ এই ছবির পরিচালক মিলন ভৌমিক।

দক্ষিণ কলকাতা-র বৈষ্ণবঘাটা অঞ্চলে পরিচালক এবং অভিনেতা-অভিনেত্রীদের উপস্থিতিতে সম্প্রতি লঞ্চ করা হল ‘প্রশ্ন’ ছবির পোস্টার।

‘কেএসএম ফিলম কম্বাইন’-এর প্রযোজনায় তৈরি হওয়া ‘প্রশ্ন’ ছবিটি চলতি মাসের ২৫ তারিখে মুক্তি পাবে বলে জানিয়েছেন পরিচালক মিলন ভৌমিক। এই ছবিতে মুখ্য ভূমিকায় অভিনয় করেছেন পায়েল সরকার। ছবিটির অন্যান্য চরিত্রে রূপদান করেছেন রাজ, খরাজ মুখোপাধ্যায়, রাজেশ শর্মা, তুলিকা বসু, বিডি মুখোপাধ্যায়, সুদীপ মুখোপাধ্যায়, স্বাগতা মুখোপাধ্যায়, পাপিয়া অধিকারী, সুমন বন্দ্যোপাধ্যায়, নন্দিনী চট্টোপাধ্যায়, অনিশা সরকার, অভিরূপ ভট্টাচার্য, কৃষ্ণেন্দু চট্টোপাধ্যায়, অভীক , শবনম, সৈকত ঘটক, দীপ মহালনবিশ, প্রসেনজিৎ, সৌরদীপ, অগ্নিপর্ণা, তিতিক্ষা, ময়ুখ ভট্টাচার্য প্রমুখ।

‘প্রশ্ন’ ছবির চিত্রগ্রহণের দায়িত্বে ছিলেন পার্থসারথি চক্রবর্তী এবং সম্পাদনায় ছিলেন নির্মল পাড়ুই। ছবিটির সংগীত পরিচালনা করেছেন দেবজ্যোতি কর এবং সৌমিত্র কুণ্ডু। ছবিটির কাহিনি এবং চিত্রনাট্য রচনা করেছেন বিশ্বনাথ হালদার। কার্যনির্বাহী প্রযোজক সৈকত ঘটক।

ছবির মুখ্য অভিনেত্রী পায়েল সরকার পোস্টার লঞ্চ অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে প্রসঙ্গত জানিয়েছেন, ‘এই ছবিতে আমি যে চরিত্রে অভিনয় করেছি, তা খুবই চ্যালেঞ্জিং ছিল আমার কাছে। কারণ, আমার অভিনীত চরিত্রটি বহুচর্চিত। অবশ্য আমি আপ্রাণ চেষ্টা করেছি আমার সেরা পারফর্মেন্স দেওয়ার।’

সন্তানহীনতার সমস্যা বাড়ছে

এদেশের ২ কোটি ৭৫ লক্ষ দম্পতি এখন বন্ধ্যাত্বের সমস্যায় ভুগছেন। অন্যদিকে আমাদের রাজ্যে অর্থাৎ পশ্চিমবঙ্গে, বাচ্চার জন্মের হার (২.১১২) দেশের অন্যান্য রাজ্যের তুলনায় অনেক কম (১.২)। তবে আশার কথা হল এই যে, বন্ধ্যাত্বের চিকিৎসায় অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে, সমস্যার মোকাবিলা করতে পারে অনায়াসেই।

‘ইন্ডিয়ান সোসাইটি ফর অ্যাসিস্টেড রিপ্রোডাকশন’-এর (ISAR, Bengal) পশ্চিমবঙ্গ শাখার উদ্যোগে, বন্ধ্যাত্বের যাবতীয় অত্যাধুনিক চিকিৎসা নিয়ে East India Fertility Conclave 2025 অনুষ্ঠিত হবে ১১ এপ্রিল থেকে ১৩ এপ্রিল কলকাতা-র রাজারহাট অঞ্চলের এক অভিজাত হোটেলে। কলকাতা সহ দেশের বিভিন্ন অংশের নামী ইনফার্টিলিটি ফিজিশিয়ানরা এই সম্মেলনে অংশ নিয়ে তাঁদের গবেষণা ও অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেবেন, কলকাতা প্রেস ক্লাব-এ আয়োজিত সাংবাদিক সম্মেলনে জানালেন  ISAR, Bengal এর চেয়ারপার্সন ডা. সুদীপ বসু।

নারী পুরুষ দুজনেরই বন্ধ্যাত্বের কারণ বিশ্লেষণ করতে অত্যাধুনিক পেলভিক আলট্রাসাউন্ড, ফার্টিলিটি স্ক্যান, থ্রি-ডি টুলস, ওভারিয়ান প্যাথলজি সহ অন্যান্য পরীক্ষা নিরীক্ষা সম্পর্কে সবিস্তার আলোচনায় অনেক নতুন নতুন তথ্য উঠে আসবে, যা আগামী দিনে সন্তান ধারণে ইচ্ছুক দম্পতিদের আশার আলো দেখাবে—এমনটাই জানালেন সংস্থার চেয়ারপার্সন বন্ধ্যাত্ব বিশেষজ্ঞ ডা. সুদীপ বসু।

সন্তানহীন দম্পতির জেনেটিক কোড বিশ্লেষণ করে বন্ধ্যাত্বের সুনির্দিষ্ট কারণ জানা গেলে, চিকিৎসায় ভালো ফল পাওয়া যাবে বলে জানালেন ডা. দিব্যেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়। আইভিএফ পদ্ধতিতে ভ্রূণ উৎপাদনের পরে হবু মায়ের শরীরে নানান সমস্যা দেখা যেতে পারে। এক্ষেত্রে হাই রিস্ক প্রেগনেন্সি এবং যথযথ ব্যবস্থা না নেওয়া হলে, মিসক্যারেজের ঝুঁকি বাড়ে। এই বিষয়টি নিয়ে আলোকপাত করবেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা, জানালেন ডা. সুপর্ণা ভট্টাচার্য এবং ডা. ঐন্দ্রী সান্যাল। 

ক্যানসারের চিকিৎসা করালে ডিম্বাণু ও শুক্রাণুর গুণগত মান নষ্ট হয়ে যাওয়ায়, ভ্রূণ সৃষ্টিতে সমস্যা হয়, এক্ষেত্রে ফার্টিলিটি প্রিজার্ভেশন সম্পর্কে সচেতনতা জরুরি। কেমোথেরাপি বা রেডিওথেরাপির আগে ডিম্বাণু এবং শুক্রাণু সংগ্রহ করে হিমায়িত করে রাখলে, পরবর্তীকালে আইভিএফ এর সাহায্যে সন্তান উৎপাদন অনেক সহজ হয় হতে পারে—এমনটাই জানালেন ডা. সুপর্ণা বন্দ্যোপাধ্যায়।

অতি সম্প্রতি বন্ধ্যাত্বের চিকিৎসায় AI –এর ব্যবহার এবং সন্তান ধারণ সুগম করতে, প্রোবায়োটিক ব্যবহার নিয়ে নতুন গবেষণা আগামী দিনে সন্তানাকাঙ্খী দম্পতির কাছে আশার আলো দেখাবে বলে জানালেন ডা. সুজয় দাসগুপ্ত ও ডা. পরাগ নন্দী।  আইভিএফ এর খরচ মাত্রাতিরিক্ত হওয়ায় অনেকের সন্তানের আকাঙ্খা পূরণ হয় না, তাই ন্যায্য মূল্যে আইভিএফ চিকিৎসার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে বলে জানালেন ডা. এসএম রহমান। তাই, ডা. সুদীপ বসু, ডা. সুপর্ণা বন্দ্যোপাধ্যায়,ডা. সুপর্ণা ভট্টাচার্য এবং ডা. ঐন্দ্রী সান্যাল-এর মতে, আগামী দিনে সন্তানহীন দম্পতির মুখে হাসি ফোটাতে East India Fertility Conclave 2025 এর আলোচনা এক নতুন দিগন্ত খুলে দেবে।

পয়লা বৈশাখে স্পেশাল খাবার

বাংলা নববর্ষ উদযাপনের জন্য প্রস্তুতি এখন তুঙ্গে। কোথাও নাচগানের আসর বসানোর প্রস্তুতি চলছে তো, কোথাও আবার চলছে স্পেশাল খাবার পরিবেশনের প্রস্তুতি। তবে, যাদের ভালোবাসা এবং যত্ন বাংলার খাবারকে জনপ্রিয়তা দিয়েছে, সেই ঠাকুমা-দিদিমা এবং গ্রামীণ রাঁধুনিদের স্মরণ করতে, গ্রাম-বাংলার ঐতিহ্যবাহী খাবারের স্বাদ নিতে পারেন এবারের পয়লা বৈশাখ উপলক্ষ্যে। যেমন–

• রাধুনির সঙ্গে মাছের ঝোলঃ রাধুনি (রান্নায় ব্যবহৃত দ্রব্য)এবং সরষে দিয়ে তৈরি একটি প্রাচীন মাছের তরকারি, যার একটি স্বতন্ত্র স্বাদ রয়েছে। আজকাল খুব কমই পাওয়া যায়।

• মাছের স্টু: মাছের মাথা দিয়ে তৈরি একটি খুব সাধারণ গ্রাম্য মাছের স্টু। সাধারণত রুই অথবা কাতলার মতো মাছ দিয়ে তৈরি করা হয় ন্যূনতম মশলা দিয়ে।

• কাঁচা আমের সঙ্গে পোলাও: কাঁচা আম দিয়ে তৈরি সামান্য টক পোলাও, যা সাধারণত গ্রীষ্মের মাসগুলিতে তৈরি করা হয়। এই খাবার মূলধারার বাঙালি খাবার থেকে প্রায় অদৃশ্য হয়ে গেছে এখন।

• মাছের মালাই (নারকেলের দুধে মাছ): এই বিরল খাবারটিতে নারকেলের দুধের উপকরণের সঙ্গে মাছ দিয়ে দারুণ একটি পদ তৈরি করা যায়।

• ভুনা খিচুড়ি (মশালাযুক্ত ভাত এবং মসুর ডাল): মশলা দিয়ে রান্না করা একটি সুস্বাদু ভাত এবং মসুর ডাল এই পদের প্রধান উপকরণ। কখনও কখনও মাটন সহযোগেও এই খাবার পরিবেশন করা হয়।

• আম-আদা সরষে বাটা: কাঁচা আম এবং আদা দিয়ে তৈরি একটি চাটনি, যা সরিষেবাটা সহযোগে তৈরি করা হয়।  এটি টক এবং ঝাঁঝালো স্বাদ তৈরি করে।

• পোস্ত মাংস: মাটনের একটি সুস্বাদু পদ। এই পদটিতে প্রধান উপকরণ হিসাবে থাকে পাঁঠার মাংস এবং পোস্তবাটা। এটি খেতে দারুণ লাগে।

পয়লা বৈশাখ উপলক্ষ্যে এই খাবারগুলি এবার পরিবেশিত হবে কলকাতার পোলো ফ্লোটেল-এ। ঐতিহ্যবাহী খাঁটি বাঙালি খাবারের হারিয়ে যাওয়া স্বাদ এবং ভুলে যাওয়া খাবারগুলিকে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা হবে এখানে। এবার এমন কিছু খাবার থাকবে এখানে, যা মানুষকে বাংলার সাংস্কৃতিক পরিচয়ের হৃদয় ও আত্মার সঙ্গে সংযুক্ত করবে। বাংলার ভুলে যাওয়া খাবারের স্বাদগুলিকে ফিরিয়ে আনবে। সেইসঙ্গে, মনোমুগ্ধকর লাইভ বাউল গান পরিবেশনার মাধ্যমে মনোরঞ্জনের ব্যবস্থা করা হবে বলেও জানিয়েছেন কলকাতার পোলো ফ্লোটেলের জেনারেল ম্যানেজার সৌমেন হালদার। টানা তিন দিন চলবে এই খাদ্য-উৎসব। আর এই উৎসব মাটির রান্নাঘর, কাঠের চুলা এবং তাজা বাটা মশালার সুবাসের দিনে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে।

এক প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জানানো হয়েছে, ঐতিহ্যবাহী খাঁটি বাঙালি খাবার, এবার পয়লা বৈশাখের বিশেষ মেনুর মাধ্যমে বাংলা নববর্ষকে স্বাগত জানানো হবে। হারিয়ে যাওয়া রেসিপিগুলি – যা আমাদের ঠাকুমা-দিদিমারা তৈরি করতেন, সেইসব ঐতিহ্যবাহী খাবারগুলিই এবার পয়লা বৈশাখ উপলক্ষ্যে থাকবে মেনুতে।পয়লা বৈশাখের স্পেশাল মেনুর মধ্যে রয়েছে রাধুনির সঙ্গে মাছের ঝোল, কাঁচা আমের সঙ্গে পোলাও, মিষ্টি মাছের মালাই, ভুনা খিচুড়ি, আম-আদা সরষেবাটা, পোস্তো মাংস, মেটে চচ্চড়ি, পাপদা কাসুন্দি, আম তেল পারশে প্রভৃতি। আর জানেনই তো, গঙ্গা নদীর তীরে বসে বাঙালি খাবারের স্বাদ গ্রহণের মজা-ই আলাদা। আবার খাবারের সঙ্গে যদি থাকে বাংলার মাটির গান পরিবেশনের ব্যবস্থা, তাহলে তো পয়লা বৈশাখ একেবারে জমে ক্ষীর হয়ে যাবে।

ঘোরানো সিঁড়ি

সকালের খবর কাগজে চোখ বোলাতেই মাধবীলতার চোখ আটকে গেল শিল্প ও সাহিত্যের পাতায়। মাধবীলতা অল্পবিস্তর সাহিত্যচর্চার সঙ্গে জড়িত। রাজনীতি, খেলা, আবহাওয়ার খবর বাদ দিয়ে শিল্প ও সাহিত্যের পাতায় তার ঝোঁক এবং আকর্ষণ দুইই বেশি। সিনেমার কেচ্ছা কেলেঙ্কারি তার আজকাল ভালো লাগে না। যখন তার বয়স অল্প ছিল, তখন ওসবে মন বসত। তার কাছে সংবাদপত্রে আজকের হট খবর এই যে, কলকাতার প্রেস ক্লাবে এ যুগের সেলিব্রেটি ঔপন্যাসিক পরাগ অধিকারীর প্রথম ইংরেজি উপন্যাস ‘আ সানডে নাইট’-এর আনুষ্ঠানিক প্রকাশ সকাল এগারোটায়। অনুষ্ঠানে পাঠক এবং লেখকদের সাদর আমন্ত্রণ।

পরাগ অধিকারী অল্প বয়সে বাংলা সাহিত্যে বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করার পর সদ্য ইংরেজি সাহিত্যে পা রেখেছেন। তাকে নির্বাচিত কয়েকটি সাহিত্যানুষ্ঠান ছাড়া পাওয়া দুষ্কর। তাছাড়া তাকে নিয়ে অনুষ্ঠান হলেও সকলের সেখানে প্রবেশাধিকার থাকে না। সাংবাদিকরা তার ইন্টারভিউ নেওয়ার জন্য সপ্তাহখানেক ঘোরেন। পৃথিবীতে যে জিনিস দুর্লভ, তার প্রতি আকর্ষণ সবসময় বেশি থাকে। এক্ষেত্রেও পরাগ অধিকারীকে নিয়ে সেই ক্রেজ তৈরি হয়েছিল। শোনা যায় বেশ কয়েক বছর তিনি আমেরিকাতে ছিলেন। মাধবীলতার বহুদিনের সুপ্ত ইচ্ছা পরাগ অধিকারীর সঙ্গে পরিচয় করার।

মাধবীলতা ড্রাইভারকে সকাল এগারোটায় গাড়ি রেডি রাখতে বললেন। সকাল এগারোটা পনেরোয় তিনি প্রেস ক্লাবে পৌঁছালেন। গাড়ি পার্কিং-এর জায়গায় লম্বা লাইন। প্রচুর সাংবাদিক এদিক ওদিক ঘুরছে। মাধবীলতা সানগ্লাসটা চোখ থেকে মাথায় তুলে ড্রাইভারকে নির্দিষ্ট জায়গায় থাকতে বলে ভিতরে ঢুকে গেলেন। হলের ভিতর চারিদিকে আলোর মোহময় পরিবেশ। পরাগ অধিকারী অনুষ্ঠানের মধ্যমণি। তাঁকে সামনাসামনি চোখের দেখা দেখতে প্রচুর লোকজনের সমাগম হয়েছে। শাড়ির আঁচল ঠিক করে মাধবীলতা দর্শকাসনে বসলেন।

পরাগ অধিকারীকে বিভিন্ন খবরের কাগজ অথবা বইয়ের ছবিতে যা দেখতে লাগে, তার থেকে তিনি হাজার গুনে সুন্দর। বয়স প্রায় সাঁইত্রিশের ঘরে। ফর্সা দীর্ঘকায় সুঠাম শরীর। ধারালো নাক। শ্রাবণের মেঘের মতো কালো মাথাভর্তি ঢেউ খেলানো চুল ঘাড় পর্যন্ত নেমে এসেছে। চোখ দুটোতে শান্ত সমুদ্রের গভীরতা। ঈষৎ লালচে পুরু ঠোঁট। মুখে ক্লিন সেভ না করা দু-দিনের দাড়ি। চেহারায় একটা অদ্ভুত আভিজাত্য। সবমিলিয়ে পরাগ অধিকারীর নায়কোচিত চেহারা বললেও ভুল হয় না। তার রূপ এবং গুণের সমন্বয় সোশ্যাল মিডিয়ায় মহিলা ভক্ত সংখ্যার পারদকে দিন দিন চড়িয়েছে।

মাধবীলতা পরাগ অধিকারীর উপন্যাসের একজন বড়ো ভক্ত। সামনে থেকে সুদর্শন সুপুরুষ পরাগ অধিকারীকে দেখে তার মন ব্যাগ্র হয়ে উঠল আলাপ পরিচয় করার জন্য। এক ঘণ্টা পর পরাগ অধিকারীর ইন্টারভিউ এবং বই প্রকাশের অনুষ্ঠান শেষ হল। প্রচুর ভক্ত পরাগ অধিকারীকে মৌমাছির মতো ছেঁকে ধরল অটোগ্রাফ আর সেলফির আশায়। মাধবীলতার ওই ভিড়ের মধ্যে যেতে ইচ্ছে করল না। সে পরাগ অধিকারীর জন্য প্রেস ক্লাবের বাইরের লনে পায়চারি করতে লাগল। বাঘ শিকারের সময় স্থির দৃষ্টিতে যেমন ওঁত পেতে শিকার ধরে, মাধবীলতার চোখের চাহনিও ছিল ঠিক সেইরকম। পরাগ অধিকারী দ্রুত পায়ে মিডিয়ার লোকজন ও ভক্তদের এড়িয়ে বড়ো ফ্রেমের সানগ্লাসে চোখ ঢেকে বেরিয়ে এলেন। তিনি বাইরের লন পেরোতেই তার ড্রাইভার বলল, ‘স্যার, গাড়ির স্টার্ট নিচ্ছে না বলে আমি দশ মিনিট আগে গ্যারেজে পাঠিয়েছি। এক ঘণ্টা লাগবে। আপনি একটু অপেক্ষা করুন।’

—রাবিশ। গাড়ি বার করার আগে কি চেক করোনি? সময় নষ্ট করে আমি এক ঘণ্টা ওয়েট করব? দেখেছ চারিদিকে মিডিয়ার লোকজন ঘুরে বেড়াচ্ছে। আমি কোনওরকমে তাড়াতাড়ি বেরিয়ে এসেছি।

—স্যার, আমি যখন আপনাকে নিয়ে এলাম তখন তো গাড়ি ঠিকই ছিল। গ্যারেজে আমি ফোন করে দেখছি আর কতক্ষণ লাগবে।

—হারি আপ। ফোন করো।

মাধবীলতা পরাগ অধিকারীর কাছে আসার সুযোগ পেলেন। সে পরাগ অধিকারীর কাছে এসে বলল, ‘এসকিউজ মি।”

—ইয়েস। বলুন।

—আমি মাধবীলতা গোস্বামী। আপনার লেখার একজন গুণগ্রাহী। আমিও একটু-আধটু লেখালিখি করি। আপনার আর আপনার ড্রাইভারের কথাগুলো আমি শুনেছি। এখানেই দাঁড়িয়েছিলাম বলে কানে এল। যদি কিছু না মনে করেন আমার সঙ্গে গাড়ি আছে। আমি লিফট দিতে পারি।

—নো, নো… ইটস ওকে। আমার গাড়ি চলে আসবে। তাছাড়া আপনার আমার ডেস্টিনেশন এক নাও হতে পারে। আমি যাব সল্টলেক। এনিওয়ে, থ্যাঙ্ক ইউ।

—ধন্যবাদ কী জন্য! আমার বাড়ি লেক গার্ডেনস। ডেস্টিনেশন নিয়ে আমার কোনও প্রবলেম হবে না। আপনার ড্রাইভারের মুখে শুনলাম যে, এক ঘণ্টার আগে গাড়ি আসবে না। আপনাকে পৌঁছে দিতে পারলে ভালো লাগবে। আপনার আপত্তি থাকলে অবশ্য জোর করার কিছু নেই।

—না তা নয়। আপনি বলেছেন এটাই যথেষ্ট।

পরাগ অধিকারীর ড্রাইভার কিছুক্ষণ পর এসে বলল, ‘স্যার, গাড়ি সারাতে দেরি লাগবে গ্যারেজে ফোন করে জানলাম। বড়োসড়ো বিগড়েছে। আপনি বরং ওনার সঙ্গেই চলে যান। উনি যখন বলছেন।’

পরাগ অধিকারী হালকা নিঃশ্বাস ছেড়ে বললেন, ‘ঠিক আছে। আমি ওনার সঙ্গে চলে যাচ্ছি। তুমি গাড়ি সারানো হলে নিয়ে যেও। আর বাড়িতে বলে দিও যে, আমি লাঞ্চ করে ফিরব।’

পরাগ মাধবীলতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বললেন, ‘চলুন। কোথায় আপনার গাড়ি?’ মাধবীলতা অদূরে ডান হাত বাড়িয়ে তার গাড়িটাকে দেখিয়ে বললেন, ‘ওই তো ওখানে। আসুন।’ দু’জনে গাড়ির কাছে যেতেই ড্রাইভার দরজা খুলে দিল।

(ক্রমশ…)

রেসপিরেটরি ডিজিজ

চরম তাপপ্রবাহ, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, বৃষ্টিপাতের পরিবর্তন ইত্যাদির ফলে কখনও খরা, তো কখনও বন্যা হয়। আর জলবায়ু পরিবর্তন প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে মানুষের স্বাস্থ্যকে প্রভাবিত করে। তাপমাত্রা এবং বৃষ্টিপাতের পরিবর্তনে কীটপতঙ্গ আচরণকে পরিবর্তন করে, যা সংক্রামক রোগের কারণ হতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তন খাদ্য নিরাপত্তাকেও প্রভাবিত করে, তাই মানুষ দূষিত খাবারের সংস্পর্শে আসে। যার ফলে খাদ্যজনিত অসুস্থতার শিকার হতে পারে মানুষ। এছাড়াও, জলবায়ুর পরিবর্তন মানসিক স্বাস্থ্যের উপর কুপ্রভাব ফেলতে পারে। তবে, বায়ু দূষণের মাত্রা বেড়ে যাওয়ার কারণে শ্বাসযন্ত্র এবং কার্ডিওভাসকুলার অবস্থার উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এর ফলে রেসপিরেটরি ডিজিজ বা শ্বাসযন্ত্রের রোগের শিকার হচ্ছেন অনেক মানুষ। এই বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য এবং বাঁচার উপায় তুলে ধরেছেন ডা. দেবরাজ যশ।

শ্বাসযন্ত্রের রোগ হল শ্বাসনালী এবং ফুসফুসের এমন রোগ, যা মানুষের শ্বাস-প্রশ্বাসকে প্রভাবিত করে। শ্বাসযন্ত্রের যে-কোনও অংশ সংক্রমিত বা রোগাক্রান্ত হতে পারে এবং এর প্রভাবে বিভিন্ন ধরনের জটিলতা দেখা দিতে পারে। ফলস্বরূপ, হাইপারেমিয়া এবং মিউকাস আস্তরণের ফুলে যাওয়া, শ্বাস-প্রশ্বাসে অসুবিধা এবং হাইপোভেন্টিলেশনের সমস্যা তৈরি করে। যদি শ্বাসকষ্ট দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে ফাইব্রোসিস দেখা দিতে পারে। সেইসঙ্গে, অক্সিজেন গ্রহণ ব্যাহত হয় এবং কার্বন ডাই অক্সাইড জমা হতে থাকে। ফুসফুসের টিস্যুগুলি আর ভালো ভাবে কাজ করে না এবং সাধারণ স্বাস্থ্য বিঘ্নিত হয়, ফলে রোগী সহজেই ক্লান্ত হয়ে পড়ে। আর প্রদাহজনিত সমস্যার পাশাপাশি, শ্লেষ্মা নিঃসরণ বৃদ্ধি পায়, যার ফলে ফুসফুসের টিস্যু ব্লক হতে পারে।

আসলে, শ্বাসযন্ত্রের রোগ এমন এক রোগ, যা ফুসফুস এবং শ্বাসযন্ত্রের অন্যান্য অংশকে প্রভাবিত করে। শ্বাসযন্ত্রের রোগগুলি সংক্রমণের কারণে হতে পারে, ধূমপানের কারণে হতে পারে, অথবা বায়ু দূষণের কারণে হতে পারে। শ্বাসযন্ত্রের রোগের মধ্যে রয়েছে হাঁপানি, ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজ (সিওপিডি), পালমোনারি ফাইব্রোসিস, নিউমোনিয়া এবং ফুসফুসের ক্যান্সার।

এই সময় ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়া সক্রিয় হয়ে ওঠে। যার ফলে শরীরে ভাইরাল সংক্রমণ হয়। আগে সাধারণ অ্যান্টিবায়োটিকের প্রয়োগ করে ভাইরাল জ্বর সহজেই নিয়ন্ত্রণে আনা যেত কিন্তু এখন নানারকম পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর উপযুক্ত অ্যান্টিবায়োটিক না দিলে, ভাইরাল ফিভার থেকে মুক্তি পাওয়া যায় না।

শ্বাসযন্ত্রের রোগের ক্ষেত্রে প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধই ভালো উপায়। টিকা দেওয়া সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা। ইনফ্লুয়েঞ্জা ভ্যাকসিন দুই বছরের বেশি বয়সি কাউকে দেওয়া যেতে পারে। অন্যদিকে, নিউমোনিয়া ভ্যাকসিন জীবনে দুবার সুপারিশ করা হয়। ৬৫ বছরের বেশি বয়সি ব্যক্তিদের জন্য পিভিসি থার্টিন (PCV 13) ভ্যাকসিন দেওয়া হয় এবং তারপরে পিপিএসভি টুয়েন্টি-থ্রি (PPSV 23) টিকা দেওয়া হয় বারো মাস পরে। এটি ৫০ বছরের বেশি বয়সিদের জন্য বিশেষভাবে উপকারী।

টিকা দেওয়ার পাশাপাশি, প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা যেমন মাস্ক পরা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট-সমৃদ্ধ সুষম খাদ্য সবুজ শাক-সবজিতে পাওয়া যায়। এছাড়া, অ্যান্টিঅক্সিডেন্টে ভরা ফল এবং প্রোটিন-সমৃদ্ধ খাবার শ্বাসযন্ত্রের রোগের বিরুদ্ধে লড়াই করতে সাহায্য করতে পারে। শ্বাসযন্ত্রের রোগ প্রধানত অক্সিডেশন এবং অ্যান্টিঅক্সিডেশনের ভারসাম্যহীনতার কারণে হয়। তবে এক্ষেত্রে মনে রাখা দরকার যে, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ট্যাবলেট খাওয়ার চেয়ে, খাবার থেকে পাওয়া অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট বেশি উপকারী। আর যাদের নিয়মিত শ্বাসকষ্ট হয়, তাদের জন্য ইনহেলারের সঠিক ব্যবহার অত্যাবশ্যক ।

আমাদের একটি ভুল ধারণা আছে যে, ইনহেলার দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যের ক্ষতি করতে পারে এবং কেউ একবার ইনহেলার ব্যবহার করা শুরু করলে তা ছেড়ে দেওয়া কঠিন। কিন্তু বাস্তবে, ইনহেলারের ওষুধ ব্যবহারের সময় শরীরের অন্যান্য অংশকে প্রভাবিত না করে শুধুমাত্র উইন্ডপাইপে কাজ করে। একজন স্বাস্থ্যসেবা কর্মীর কাছ থেকে ইনহেলার ব্যবহার করার সঠিক কৌশল শিখে নেওয়া উচিত।

শ্বসনতন্ত্র তিনটি অংশ দিয়ে তৈরি— শ্বাসনালী, ফুসফুস এবং শ্বাস-প্রশ্বাসের পেশী যা ডায়াফ্রাম নামে পরিচিত। শ্বাসনালীতে নাক, মুখ, গলবিল, স্বরযন্ত্র, শ্বাসনালী এবং ব্রঙ্কিওল অংশ রয়েছে, যা ফুসফুসের ক্ষুদ্র থলিতে শেষ হয় এবং যাকে অ্যালভিওলি বলা হয়। আমরা যে বায়ু গ্রহণ করি, তা নাক বা মুখের মধ্য দিয়ে শ্বাসযন্ত্রের ট্র্যাক্টের মাধ্যমে ক্ষুদ্রতম ব্রঙ্কিওলগুলিতে যায় এবং অ্যালভিওলি পূরণ করে, যা গ্যাসীয় বিনিময়ের কাজ করে। স্বরযন্ত্র পর্যন্ত শ্বাসনালীকে উপরের শ্বাসনালী বলা হয়।

অ্যালভিওলি ফুসফুসের লেসের মতো গঠন হয়, যা ইন্টারস্টিটিয়াম নামে পরিচিত। ফুসফুস ‘প্লুরাল মেমব্রেন’ নামে একটি নরম ডবল লেয়ারযুক্ত আবরণ দ্বারা বেষ্টিত থাকে, যার মধ্যে একটি তরল থাকে, যাকে ‘প্লুরাল ফ্লুইড’ বলা হয়। ঝিল্লির মধ্যবর্তী স্থানকে ‘প্লুরাল ক্যাভিটি’ বলে। যে কোষগুলি ‘প্লুরাল গহ্বরকে’ রেখাযুক্ত করে, তারা ‘মেসোথেলিয়াম’ নামে পরিচিত। শ্বাসযন্ত্রের ট্র্যাক্ট অনেক রোগ দ্বারা প্রভাবিত হতে পারে, যা সিস্টেমের বিভিন্ন অংশে দেখা দিতে পারে।

শ্বাসনালীকে প্রভাবিত করে এমন কিছু সাধারণ রোগের মধ্যে রয়েছে—

হাঁপানি

শ্বসনতন্ত্রের একটি সাধারণ রোগ, যার ফলে হঠাৎ করে কাশি এবং শ্বাসকষ্ট হয়। ব্রঙ্কিওলের অভ্যন্তরীণ আস্তরণের প্রদাহের কারণে হাঁপানি হয়, যার ফলে এই টিউবগুলি সরু হয়ে যায় খিঁচুনিজনিত কারণে। এটি সাধারণত শিশু বা অল্প বয়সিদের মধ্যে বেশি দেখা যায়। ধুলো, ফুলের রেণু, খড়ের ফাংগাস, ধোঁয়া ইত্যাদির কারণে হাঁপানি শুরু হয়। এটি ওষুধ এবং সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা যায়।

সিওপিডি (ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি রোগ)

এটি ফুসফুসের একটি রোগ যা শ্বাসতন্ত্রের টিস্যুগুলির দীর্ঘমেয়াদী প্রদাহের কারণে ঘটে এবং যা ফুসফুস থেকে বায়ুপ্রবাহে বাধা সৃষ্টি করে। এটি শ্বাসকষ্ট, ক্রমাগত কাশি, অত্যধিক শ্লেষ্মা এবং শ্বাসকষ্টের মতো লক্ষণগুলির সঙ্গে যুক্ত। এটি সাধারণত সিগারেটের ধোঁয়ার মতো বিরক্তিকর দীর্ঘস্থায়ী এক্সপোজারের কারণে ঘটে। সিওপিডি সঠিক ব্যবস্থাপনা এবং জীবনধারা পরিবর্তনের মাধ্যমে চিকিৎসা করা যেতে পারে।

ব্রংকাইটিস

ব্রংকাইটিস একটি প্রদাহজনক রোগ। এটি দীর্ঘ সময়ের কাশি এবং শ্বাসকষ্ট দ্বারা চিহ্নিত করা হয়। দীর্ঘস্থায়ী ব্রঙ্কাইটিসের একটি নির্ণয় সাধারণত করা হয়, যখন বছরে অন্তত তিন মাস এবং অন্তত দুই বছর সময় ধরে কাশির ইতিহাস থাকে। উপযুক্ত ওষুধ এবং জীবনধারা পরিবর্তনের মাধ্যমে রোগটি নিরাময়যোগ্য।

সিস্টিক ফাইব্রোসিস

এটি এমন একটি রোগ, যা একটি ত্রুটিপূর্ণ জিনের কারণে ঘটে। যা শরীরের কোষের ভিতরে এবং বাইরে লবণের চলাচল নিয়ন্ত্রণের প্রোটিনকে পরিবর্তন করে। এই রোগটি শ্বাসনালীতে ঘন এবং আঠালো শ্লেষ্মা জমিয়ে শ্বাসকষ্ট তৈরি করে। ব্যাকটেরিয়া এবং ছত্রাক থেকে তৈরি হওয়া সংক্রমণ, সংবেদনশীলতার দিকে নিয়ে যায়।

ইনফ্লুয়েঞ্জা

এটি নাক, গলা এবং ফুসফুসের সঙ্গে জড়িত শ্বাসযন্ত্রের একটি ভাইরাল সংক্রমণ। ‘ফ্লু’ নামেও পরিচিত। এটি বেশিরভাগই কয়েকদিন বাদে সেরে ওঠে নিজে থেকেই।

বায়ু থলিকে প্রভাবিত করে এমন কিছু সাধারণ রোগের মধ্যে রয়েছে—

যক্ষ্মা: এটি ব্যাকটেরিয়া দ্বারা সৃষ্ট ফুসফুসের একটি সংক্রামক রোগ। এই রোগটি সংক্রামক, অর্থাৎ এটি কাশি বা হাঁচির ফোঁটার মাধ্যমে একজন থেকে অন্য ব্যক্তিতে ছড়িয়ে পড়ে।

নিউমোনিয়া: এটি একটা বা উভয় ফুসফুসে বায়ু থলির একটি প্রদাহজনক সংক্রমণ। থলিতে তরল বা পুঁজ ভর্তি হয়ে যায়। যার ফলে কফ বা পুঁজ সহ কাশি হয়। এটি জ্বর, ঠান্ডা এবং শ্বাসকষ্টের মতো উপসর্গও সৃষ্টি করতে পারে। এটি ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস এবং ছত্রাকের মতো অনেক জীবের কারণে হতে পারে।

এমফিসেমা: ফুসফুসে বাতাসের থলির ক্ষতি হলে অ্যালভিওলির অতিরিক্ত স্ফীতি ঘটে, যার ফলে শ্বাসকষ্ট হয়।

ফুসফুসের ক্যান্সার: ফুসফুসের ক্যান্সার ব্রঙ্কি বা ফুসফুসের অন্যান্য ছোটো অংশ, যেমন ব্রঙ্কিওল বা অ্যালভিওলির আস্তরণের কোষগুলিতে উদ্ভূত হয়।

শ্বাসযন্ত্রের সমস্যা, কারণ এবং লক্ষণ

শ্বাসযন্ত্রের সমস্যা এমন একটি অবস্থা, যেখানে আপনার রক্তে পর্যাপ্ত অক্সিজেন থাকে না কিংবা বলা যায়, খুব বেশি কার্বন ডাই অক্সাইড থাকে। কখনও কখনও আপনার উভয় সমস্যা হতে পারে। আপনি যখন শ্বাস নেন, আপনার ফুসফুস অক্সিজেন গ্রহণ করে। অক্সিজেন আপনার রক্তে যায়, যা আপনার অঙ্গে বহন করে। আপনার হৃদপিণ্ড এবং মস্তিষ্কের মতো অঙ্গগুলিকে ভালো ভাবে কাজ করার জন্য এই অক্সিজেন- সমৃদ্ধ রক্তের প্রয়োজন।

শ্বাস-প্রশ্বাসের আরেকটি অংশ হল— রক্ত থেকে কার্বন ডাই অক্সাইড অপসারণ এবং অক্সিজেন প্রদান। আপনার রক্তে অত্যধিক কার্বন ডাই অক্সাইড থাকা আপনার অঙ্গগুলির ক্ষতি করতে পারে। এই অবস্থায় পেশী, স্নায়ু, হাড় বা টিস্যুগুলির উপর প্রভাব পড়ে, অথবা সরাসরি ফুসফুসকে প্রভাবিত করতে পারে।

পরীক্ষানিরীক্ষা এবং চিকিৎসা

পালস অক্সিমেট্রি: এটি একটি ছোটো সেন্সর, যা আপনার রক্তে কতটা অক্সিজেন আছে তা পরিমাপ করতে একটি আলো ব্যবহার করে। সেন্সরটি আপনার আঙুলের শেষে বা আপনার কানের দিকে যায়। এছাড়া, পরীক্ষায় বুকের এক্স-রেও অন্তর্ভুক্ত থাকে। যদি আপনার অ্যারিথমিয়া হয়, তাহলে ECG (ইলেক্ট্রোকার্ডিওগ্রাম) করা হতে পারে।

ভেন্টিলেটর: এটি এমন এক শ্বাসযন্ত্র, যা আপনার ফুসফুসে বায়ু প্রবাহিত করে। এটি আপনার ফুসফুসকে কার্বন ডাই অক্সাইড থেকেও মুক্ত করে।

অন্যান্য চিকিৎসা: নন-ইনভেসিভ পজিটিভ প্রেসার ভেন্টিলেশন (NPPV), যা আপনার ঘুমানোর সময় আপনার শ্বাসনালী খোলা রাখতে হালকা বায়ুচাপ ব্যবহার করে।

জলঢাকা নদীর মিশেলে বিন্দুখোলার একাকী পথ (শেষ পর্ব)

চঞ্চলা নদীর জলস্রোতকে লকগেটের শাসনে বেঁধে রেখে তৈরি হয়েছে জলঢাকা হাইড্রেল প্রজেক্ট। এখানেই তৈরি হচ্ছে জলবিদ্যুৎ। উত্তরবঙ্গের বিদ্যুতের চাহিদা অনেকটাই মেটে এই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে। ৩৬.৯ মেগাওয়াট শক্তি ধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন সেই বিদ্যুতের ভাগ পায় ভুটানও। কেন না, ভারত ও ভুটানের পারস্পরিক সহযোগিতায় তৈরি এই জলবিদ্যুৎ প্রকল্প। ভারতের জলঢাকা এবং ভুটানের বিন্দু নদীর সংযোগস্থলে বাঁধটি। নদীর এপারে ভারত, ওপারে ভুটান। ইন্দো-ভুটান সীমান্তের এই জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে সাধারণের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। সাকুল্যে চারটি গেট রয়েছে। অঝোর ধারায় জল গড়িয়ে যাচ্ছে। জলকণায় সৃষ্টি হচ্ছে অনন্যমাত্রা। গুছিয়ে যে ছবি তুলব, ক্যামেরার লেন্সে ঝরে পড়ছে উড়ন্ত জলকণার ছিটে। সব কিছুই যেন বদলে যাচ্ছে, রোদ্দুরের রং, পাতার সবুজ।

দু’পা ফেললেই বিদেশের চৌকাঠ ছোঁয়া যায় এখানে। না, মানে বিদেশ কিন্তু সেভাবে বিদেশ নয়। নদীর প্রস্থ বরাবর একটু ওপরেই সেতুপথ। সফরনামা দেশান্তরী হয়, সেতু পেরিয়ে বিন্দুর ঠিক ওপারে ভুটান গ্রাম বকবাকি। তুখোড় অরণ্য, পাহাড় ও নদীর আড়ালে লুকিয়ে থাকা আশ্চর্য নিরিবিলি এই গ্রাম। এখানে মূলত ভুটানি অধিবাসীদের বাস। তারা সযত্নে আগলে রেখেছেন তাঁদের সংস্কৃতি, লোকাচার, জীবনদর্শন।

সীমানায় দাঁড়ালেই গরম মোমোর গন্ধ উড়ে আসে এপারে। সেখানে এক ভুটানি জলপানের গুমটি থেকেই ভেসে আসছিল মোমোর সুবাস। ধূমায়িত স্যুপ সহযোগে খেলাম এক প্লেট ভেজ মোমো। পায়ের তলায় বিদেশের মাটি ছুঁয়ে ভুটানের তেভু অঞ্চল পর্যন্ত চলে যাওয়া যায় বহুবর্ণ সবুজের পর্দা সরিয়ে। কোনও ভুটানি বালক বা যুবা নিজেরাই পথ দেখিয়ে নিয়ে যাবে তেন্ডু গ্রামের আদ্যপ্রান্ত। নিজেরাই দেখিয়ে দেবে সেখানকার ভুটান সামরিক প্রশিক্ষণকেন্দ্রের ঘাঁটি। পর্যটন এইভাবেই চেনায় দেশ, সীমানা, সীমানার ওপার।

বতুল প্রস্তরখণ্ড নিয়ে নদীর বিস্তীর্ণ প্রবাহপথ জুড়ে বিন্দু লকগেটের নীচে নির্মিত হয়েছে জমা জলের চিত্তাকর্ষক ঠমক। বিন্দুতে মিলিত তিনটি নদী হল— বিন্দুখোলা, দুধপোখরি এবং জলঢাকা। সফেদ ফেনায়িত লাবণ্য সুষমাশোভিত সে জলের রং আকাশের ছায়া মেখে হয়ে উঠেছে আসমানি নীল। অপরূপ প্রকৃতিই এখানে স্বাগত জানাবে পর্যটককে। ইদানীং নদী পারাপার, ট্রেকিং, নদীর জলে মাছ ধরার মতো ক্রিয়াকলাপ বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে এখানে। বহুল পরিচিত জায়গা ছেড়ে, ওরকম হাটখোলা নদীচত্বর আর প্রকৃতি পেলে আকাশ, মেঘ, পিচ গাছের ঝিরিঝিরি পাতা বিলি কাটবেই।

শহুরে বাস্তবের সাথে অপার ফারাকে হাতের কাছে স্বর্গ জুটে যাচ্ছে যেন। পাথর টপকে টপকে সাবধানে নেমে এলাম জলঢাকা নদীটির কোলে। শীতল বারির স্রোতে পা ডুবিয়ে বসি। এক নবীন উদারতায় পেলব শীতল আশ্রয়। অদ্ভুত মনকেমন করা জলধ্বনি ছড়িয়ে যাচ্ছে কর্ণকুহকে। সূর্যের আলো কমে এলে বিন্দুর চারপাশের প্রকৃতি হয়ে উঠল আরও মায়াবী। তবে বিনিসুতোয় বুনতে থাকা এই সম্মোহন ক্ষণিকের। খেয়াল করি অপরাহ্ণের আলোককণার সমস্তটাই তো শুষে নিচ্ছে ওই ঘাই মারা নদীজল।

কীভাবে যাবেন: হাওড়া, শিয়ালদহ বা কোলকাতা থেকে নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশন। স্টেশন চত্বর থেকে ভাড়াগাড়িতে জাতীয় সড়ক ১৭ ধরে বিন্দু ব্যারেজের দূরত্ব ১০৪.৯ কিলোমিটার। সময় লাগে কম বেশি তিন ঘণ্টার মতো। শিলিগুড়ি থেকে উত্তরবঙ্গ রাষ্ট্রীয় পরিবহণ নিগমের বাস, ভুটান সরকারি বাসেও যাওয়া চলে। মাল জংশন থেকে ৫৫ কিলোমিটার। লাটাগুড়ি থেকেও সড়কপথে ২০ কিলোমিটার দূরে চালসা পৌঁছে, গৈরিবাস হয়ে ঝালং, প্যারেন পেরিয়ে বিন্দু। ঝালং থেকে বিন্দু মাত্র ১২ কিলোমিটার। উড়ানপথে বাগডোগরা বিমানবন্দরে নেমে গাড়িতে বিন্দু।

কোথায় থাকবেন: পশ্চিমবঙ্গ সরকারের (WBFDC) River Camp-এর তাঁবুতে থাকা এক সুন্দর অভিজ্ঞতা। ঝালং বাজার ও প্যারেনেও নানা বাজেটে বেশ কিছু হোমস্টে হয়েছে এখন। এছাড়াও রয়েছে, জলঢাকা ফরেস্ট রেস্ট হাউস।

সেরা সময়: বছরের যে-কোনও সময়ই উত্তরবঙ্গের বিন্দু ঝালং যাওয়া যেতে পারে। তবে ভরা বর্ষা মরসুমে উত্তরবঙ্গের বেশ কিছু পথ বিপদসংকুল হয়ে পড়ে। সেই মতো উচিত হবে আগাম খবরাখবর নিয়ে যাত্রা শুরু করা।

জলঢাকা নদীর মিশেলে বিন্দুখোলার একাকী পথ (পর্ব-০১)

বসুন্ধরার নিপুণ টানে জব্দ হব বলেই বোধহয় এই নদীটির কাছে আসা। দূর আকাশের ছায়াতলে চঞ্চলা নদীর নূপুরধ্বনির রিনরিন ও নদী-অববাহিকা সমূহ যেন রোদ্দুর ও ছায়ামাখা সংলাপ। আমি সেই জলজ মজলিশের পানে বুঁদ হয়ে শুনে যাচ্ছি অসম্ভব এক নদীগান। কখনও উথলে উঠছে তার কোমল বাচালতা। কখনও বেবাক নিরিবিলি।

কালিম্পং তালুকের, প্যারেন-গোদক খাসমহলে, ভুটান সীমান্তে ফুটে আছে অপরূপ একফালি গ্রাম বিন্দু। বিহ্বল করে দেওয়া স্থানিক দৃশ্য। যেখানে জলঢাকা নদীর মিশেলে থেমে গেছে বিন্দুখোলার একাকী পথ চলা। ২০০০ ফুট উচ্চে বিন্দু জলাধার বা জলঢাকা জলাধার ভারত ও ভুটানের সংযোগ চিত্র। বাংলায় ‘বিন্দু” অর্থাৎ “ফুটকি” বা “বিন্দু চিহ্ন’। জলঢাকা নদী এখানে সংযোজিত করেছে জলের সঙ্গে আরও জল জমিয়ে বিন্দুখোলা, দুধপোখরির সঙ্গে বিশুদ্ধ মিলনে। দিগন্তের দিকে তার আশ্চর্য ভ্রমণ। মনোহর পার্বত্য দৃশ্যপটে দেখা হয়ে যায় জলঢাকা ও বিন্দুখোলা নামের দুই পাহাড়ি নদীর সঙ্গে।

আমরা রয়েছি পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ঝালং বনবিশ্রামাগারে। ঝালং, জলঢাকা জলবিদ্যুৎ প্রকল্পকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা লোকালয়। শহরের প্রবেশপথে ঝালং নদী। অপাঙ্গে বিছিয়ে থাকা নুড়ি ও পাথরে ঝালং-এর ছলাৎছল। ঝালং সেতুপথ পেরোতেই চেকপোস্ট। অঞ্চলটি ভুটান সাম্রাজ্য লাগোয়া হওয়ায়, অনুমতিসাপেক্ষে ঝালং পার হতে হয়। চেকপোস্ট পেরিয়েই নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের খুচরো বাজার। বুধবারে হাট বসে। বাজার পেরিয়ে উত্তরের পথ ধরে আরও ৯.৩ কিলোমিটার পথ উজিয়ে বিন্দু। ঝালংয়ের পরে জলছবির মতো আরেক পাহাড়িয়া জনপদ প্যারেন। এবার আঁকাবাঁকা পথটা আগাগোড়াই আরোহণের।

পথের ডানদিকে নাব্যতা, গান ও ছন্দ উৎসবে আমার সহযাত্রী জলঢাকা নদীর চলন। সুন্দর মসৃণ রাস্তাটা ডানপাশে জলঢাকা নদীকে রেখে আপন খেয়ালে চলেছে। ভিউপয়েন্ট দেখে গাড়ি থামিয়ে ছবি তোলা হল। গৈরিবাস ভিউ পয়েন্ট থেকে আগেই দেখা পেয়েছিলাম পাহাড়ের নীচে এঁকেবেকে বয়ে চলা জলঢাকা নদীর। চারদিকে পাহাড়ের সারি। পাহাড়ের ওপাশেই নাকি ভুটান। অবাক হয়েছি, একটা পাহাড়ি নদী, জলঢাকা, দুটো দেশের প্রাকৃতিক সীমানা, মাঝে কোনও কাঁটাতার নেই। পাহাড় ঘেঁষে ওপারেই ভুটান সাম্রাজ্যের টেন্ডু নামের এক অরণ্যছায়া অঞ্চল।

মজা হিম ঘাপটি মেরে আছে, জলঢাকার ডানায়। নদী এখানে স্রোতস্বিনী। উচ্ছল কিশোরীর মতো প্রাণবন্ত। ছোটো বড়ো পাথরে ধাক্কা খেয়ে চঞ্চল হয়ে উঠেছে আরও। এই পথে রয়েছে গাছেদের নিস্তব্ধ কোলাহলে আরও এক সুন্দর গ্রাম প্যারেন। প্যারেন থেকে উত্তর-পশ্চিমে নিস্তব্ধ উচ্চারণে পথ চলে গেছে ছোট্ট পাহাড়গ্রাম গোদকে নির্জনে সীমান্তের অন্য পারে ভুটান। ঝালং থেকে দীর্ঘ পাকদণ্ডী পথে গোদক ১৫ কিলোমিটার। এখানকার আদিবাসী মানুষজন একটি পাথরকে সরল বিশ্বাসে দেবতাজ্ঞানে পুজো করেন। জলধারা অবিরত আছড়ে পড়ায়, পবিত্র পাথরটি কখনও শুকিয়ে যায় না। ১ কিলোমিটার দূরেই রয়েছে উৎকৃষ্ট এলাচের ক্ষেত্র। এখানকার এলাচ প্রক্রিয়াকরণের পর দেশের সেরা এলাচ হিসাবে বিদেশে পাঠানো হয়।

গোদক থেকে আরও উত্তরে ৭ কিলোমিটার দূরে তোদে। উপজাতি অধ্যুষিত জনজাতির ঘরবসত, খেতি জমি। আরও একটু হাঁটাপথেই চলে যাওয়া যায় তাংতা। এখানে একটি পাহাড়ি নদীর নাম “দাবাইখোলা”। স্থানীয়স্তরে বিশ্বাস এই জলে রোগের নিরাময় হয়। পাশেই কেরামটার। “টার’ অর্থে পাহাড়ের সমতল অঞ্চল। গ্রীষ্মের মাঝামাঝি থেকেই তোদে-তাংতা হয়ে ওঠে নানান রূপে বর্ণে ফুল্লকুসুমিত। রুকস্যাক কাঁধে এই পথটিতে তখন পাড়ি জমান তামাম পর্যটক। যাত্রাপথের উজান সাঁতরিয়ে উত্তরে আরও কিছুটা গেলেই রোচে-লা-পাস। আমরা অবশ্য এযাত্রায় ওদিকে যাইনি। আমাদের গন্তব্য প্যারেন থেকে এবার বিন্দু অভিমুখী ৬ কিলোমিটার উতরাই ইন্দো-ভুটান সীমান্তের বিন্দু।

‘ভারতের শেষ গ্রাম’ বিন্দুর রূপে সম্মোহিত হতে তখনও বাকি ছিল। গাড়ি যেখানে নামিয়ে দিল, তার দুই পাশে শাল, শীতের রকমারি পোশাক, হোমমেড চকোলেট, হরেক প্রজাতির ক্যাকটাসের সম্ভারে নার্সারি, হস্তশিল্প সামগ্রীর দোকান ইত্যাদি। দোকানিরা এন্তার হাঁকডাক দিচ্ছেন তাদের দোকানে এসে দেখার জন্য। দরদামও চলে বিস্তর। ঝালং হিমালয়ান ড্রাইভার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনকে গাড়ি রাখার জন্য ৩০ টাকা দিতে হল। সেখান থেকে প্রায় ৫০ ডিগ্রি খাঁড়াই হাঁটাপথ বেয়ে সংগ্রহযোগ্য ভ্রমণটুকু নিয়ে কিছুটা উঠে যাই। খুবই সংবেদনশীল এলাকা। আধাসামরিক বাহিনীর নিরাপত্তারক্ষীরা অতন্দ্রপ্রহরায়।

ওপাশে ভুটানের অরণ্যাবৃত পাহাড়। বিন্দু সত্যিই এক ব্যতিক্রমী সৌন্দর্যবিন্দু। জলঢাকার উদ্দাম জলধারা ও লাবণ্য নিয়ে অসামান্য পরিবহ। বিন্দুর আসল চমকটা ঠাহর হল বাঁধের কাছে এসে। বাঁধের ওপর পোক্ত রেলিং দেওয়া চওড়া পথ চলে গেছে অন্যদেশ, অন্য সাম্রাজ্যে। নীচে আধখোলা লকগেট। নদীর উত্তাল জলধারা উচ্ছ্বাসে জড়ো হচ্ছে নীচে। ডাইনে ভুটান পাহাড়ের গিরিখাত বেয়ে প্রবাহিত হচ্ছে ক্ষীণতনু অন্য এক নদী। অসংখ্য ছোটো-বড়ো-মাঝারি পাথরে ধাক্কা খেয়ে খেয়ে তার বয়ে চলা। কুলকুল সুরে ধ্বনিত হচ্ছে চারপাশ। সুরেলা সেই নদীটির নাম— বিন্দু।

(ক্রমশ……)

পড়ার জন্য সীমাহীন গল্প-নিবন্ধসাবস্ক্রাইব