সিঁড়িতে পায়ের শব্দ (পর্ব-০২)

এদিক ওদিক পায়চারি করতে করতে আর স্বপ্নের জগতে ভাসতে ভাসতে, হঠাৎই কলিংবেলের শব্দ। ওফ, হার্ট অ্যাটাক হল বুঝি! নিঃশ্বাসও বন্ধ হয়ে আসছে। এত জোরে শব্দ! পাড়া-প্রতিবেশী সব শুনে ফেলল বুঝি। অনন্যা এসে গেছে। ছুটে যেতে চায় প্রীতম। তারপর নিজেকেই বোঝায়— শান্ত হতে হবে, সবকিছুতে তাড়াহুড়ো ভালো নয়। ধৈর্য ধরে সব ট্যাকল করতে হবে, ভদ্র ছেলে হতে হবে। অনন্যার কাছে নিজেকে ছোটো করতে পারবে না। কয়েক মুহূর্তেই দরজা খুলে দিল প্রীতম।

—এসে গেছি। ফিসফিস করে বলে, দরজা ঠেলে ঢুকে পড়ল অনন্যা। বাইরে এক ঝলক উঁকি মেরেই দরজা বন্ধ করে দিল প্রীতম। যাক কেউ দেখেনি। অনন্যা ঘরে ঢুকেই চেয়ারটায় বসে পড়ল। প্রীতম মনে মনে ভাবল – আহা, চেয়ারটা বুঝি ওর স্পর্শে সোনা হয়ে গেল।

—বাঃ, কী সুন্দর ফ্ল্যাট গো তোমার। কই ঘুরিয়ে দেখাও। অনন্যা বলে।

নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিল না প্রীতম। অনন্যা তারই ঘরে বসে আছে, নীল চুড়িদার, সাদা ওড়না, কী সুন্দর লাগছে ওকে। সেই অনন্যা, ওর প্রেমিকা অনন্যা। ফ্ল্যাটে শুধুমাত্র দুজনে, আর কেউ নেই। ঋষি কাপুরের ববি সিনেমার গানটা ওর মনে পড়ে গেল ‘হম তুম এক কামরে মে বন্ধ হো’। অবশেষে সেই দিন, সেই মুহূর্ত উপস্থিত। উত্তেজনায় সব গুলিয়ে যায় প্রীতমের, গলাটা কেঁপে যায় একটু তবু নিজেকে বোঝাতে চেষ্টা করে প্রীতম। বলে, ‘হ্যাঁ এসো। দেখবে এসো।”

দুজনে এ ঘর ও ঘর ঘুরে বেড়ায়। কিচেন, ডাইনিং, বাথরুম— সব উঁকি মেরে দেখল অনন্যা।

–বাহ, খুব সুন্দর সাজিয়েছ তো। এই পেন্টিংটা কার আঁকা? এই শোপিসটা কোথা থেকে কিনলে? এটা কি তোমার ছোটোবেলার ছবি? কী দুষ্টু দেখতে ছিলে! কী খাওয়াবে আমাকে? এইসব নানা কথা চলতে থাকল। পিছন পিছন হুঁ, হাঁ করতে করতে, বোকার মতো ঘুরতে থাকে প্রীতম। উফ, কখন যে … তর সয়না ওর। মাথায় শুধু একটাই চিন্তা।

—আর তোমার কবিতার বইগুলো দেখাবে বলেছিলে যে, কই দেখাও! অনন্যা উৎসাহী হয়। প্রীতম তখন আর কবিতার জগতে নেই, ধুত্তোর কবিতা। কবিতার থেকে বাস্তব অনেক অনেক সুন্দর। জড়িয়ে ধরতে চায় অনন্যাকে একা পেয়ে। নাঃ, থাক। কী ভাববে! যদি ভাবে সুযোগ নিচ্ছে। তার চেয়ে একটু অপেক্ষা করা ভালো, ভাবল প্রীতম।

একটু একটু করে জড়তা কাটছিল প্রীতমের। বলল, ‘কী খাবে বলো, কেক খাবে?’ কিছু তো কিনে রাখতে পারেনি অনন্যার জন্য! হাতে সে সময়-সুযোগও ছিল না। ফ্রিজে মায়ের তৈরি করা কেক ছিল কি ভাগ্যিস, তাই মুখরক্ষা। সেটাই বার করে অনন্যাকে একটা বড়ো টুকরো কেটে খাইয়ে দিতে গেল প্রীতম।

—আরে দাঁড়াও, দাঁড়াও। তুমি না? এত বড়ো টুকরো কেন কাটলে? আমি খেতে পারি এতটা? বলে ভেঙে ছোটো একটা টুকরো মুখে দিল অনন্যা। খাইয়ে দিতে না পেরে একটু দমে গেল প্রীতম। অনন্যা খুব তৃপ্তি করে কেকটুকু খেল। তারপরে বলল ওয়াও, দারুণ। তোমার মা করেছে বুঝি? এবার একটু জল দাও তো।

কাঁপাকাঁপা হাতে জল ঢেলে দিল প্রীতম। সাবধানতার সঙ্গে অনেক চেষ্টা করলেও, একটু জল চলকে টেবিলে পড়ে গেল।

—ছাড়ো, ছাড়ো, হয়েছে। ওতেই হবে। অনন্যা অল্প একটু জল খেল আলগোছে।

প্রীতম ভাবল— ধুর, ঠোঁটের ছাপটাও পড়ল না গেলাসে। অন্তত সেটাতেই ঠোঁট ঘষত পরে, তাও হল না!

ওকে ভাবতে দেখে অনন্যা হেসে বলল, ‘কী এত ভাবছ হাঁদাগঙ্গারাম? এবার কবিতার বইগুলো দেখাও।”

—ও হ্যাঁ! তাড়াতাড়ি বইয়ের আলমারির শাটার সরিয়ে হাতে অনেকগুলো কবিতার বই বের করে ফেলল প্রীতম, তারপর বলল চলো, ওই ঘরে বসি।

সামনের ঘরে দুজনে আসে। খাটের উপর কবিতার বইগুলো নামিয়ে দিল প্রীতম। অনন্যা এবার খাটে বসল। বইগুলো উলটেপালটে দেখতে থাকল। প্রীতম খাটের এক ধারে বসল, একটু দূরত্ব রেখে। আর একটু সময়, কী করে যে শুরু করবে ওর মাথায় আসে না, লজ্জা করে। অনন্যা ওকে হ্যাংলা না ভাবে, ওর চোখে যেন প্রীতম লোভী, সুযোগসন্ধানী আর পাঁচজনের মতো না হয়ে যায়।

কবিতার বইগুলো খাটে ছড়িয়ে দিল প্রীতম। গোটা খাট জুড়ে ছড়িয়ে পড়ল সুনীল, শক্তি, নীরেন, জীবনানন্দ, সুভাষ আর জয়। কবিতাভরা বিছানার দু’দিকে দুই প্রেমিক-প্রেমিকার কবিতাযাপন চলে। টুকটাক কথা, প্রীতম আর অপেক্ষা করতে পারছিল না, সময় চলে যাচ্ছে। হঠাৎ অনন্যার একটা হাত ধরে নিজের দিকে অল্প টান দিল। অনন্যা যেন প্রস্তুতই ছিল, বোধহয় এই টানটার জন্যই অপেক্ষা করছিল! ছিটকে প্রীতমের দিকে সরে আসে। প্রীতম জড়িয়ে ধরল অনন্যাকে, সঙ্গে সঙ্গে ঠোঁট ডুবিয়ে দিল ওর ঠোঁটে।

একটু বেকায়দায় অনন্যাও কিন্তু বাধা দেবার চেষ্টা করে না। পৌরুষের কাছে আত্মসমর্পণ করে। সেই সুযোগে অনন্যাকে কবিতার বইয়ে সাজানো বিছানাতেই শুইয়ে দিল প্রীতম। অনন্যা জড়িয়ে ধরল ওকে, কবিতার বইগুলোর উপরেই দুজনের জড়াজড়ি চলতে থাকে। প্রীতমের হার্টবিট দ্রুততর হল, এবার বুকটা ফেটেই যাবে বোধহয়! অনন্যার সম্মতি আছে। কোথায় গিয়ে পৌঁছোবে এই শারীরিক প্রেম, কে জানে!

হাঁটুতে একটা কবিতার বই খোঁচা দিচ্ছিল, জীবনানন্দ কি? সেটাকে পা দিয়েই সরিয়ে দিল প্রীতম। জীবনানন্দের চেয়েও ওর জীবনের আনন্দ এখন অনেক বেশি জরুরি, চুলোয় যাক কবিতা। কী নরম শরীর অনন্যার, প্রীতম ডুবে যায়। অনন্যার কপালে, গালে, ঠোঁটে, গলায়, ঘাড়ে চুমু খেতে খেতে নামতে থাকল প্রীতমের ঠোঁট। শরীরের গোপন জায়গাগুলো খুঁজে বের করে, পৌঁছোতে চাইছিল। উত্তেজনায় গরম নিঃশ্বাস পড়ছিল দুজনেরই।

(ক্রমশ……)

সিঁড়িতে পায়ের শব্দ (পর্ব-০১)

প্রীতম ফোনটা রেখে উত্তেজনায় হাঁফাচ্ছিল। অনন্যা আসছে ওর ফ্ল্যাটে, আর ফ্ল্যাটে সে এখন একা। অনন্যাই ক’দিন ধরে বলছিল- তোমাদের ফ্ল্যাটটা দেখতে যাব। কবে যাব বলো?

প্রীতম বলেছিল— ফ্ল্যাটে আসবে! বাবা মা তো সন্দেহ করবে তাহলে! কী পরিচয় দেব?

—বোকার মতো কথা বলছ কেন? তোমার বাবা-মা যখন থাকবে না, তখনই যাব। তাহলেই হল তো?

—ও, তাহলে ঠিক আছে, বলেই ঢোঁক গিলল প্রীতম। বলছে কী মেয়েটা! প্রেমিকের ফ্ল্যাটে প্রথম আসবে, তাও যখন প্রেমিক একা! কী সাহস!

—কী হল? ভয় পাচ্ছ নাকি? আমি বাঘ ভাল্লুক নই, যে তোমাকে খেয়ে ফেলব। অনন্যার গলায় শ্লেষ!

—না, না, ভয় পাব কেন? ঠিক আছে। বাবা মা তো দু’একদিন পরেই ছোটোমাসির বাড়ি যাবে। তখন আমি তোমাকে ফোন করে দেব। তুমি চলে এসো।

—বাহ, দারুণ মজা হবে। তোমার সব কবিতার বই দেখব সেদিন।

—সাবধানে আসবে কিন্তু, কেউ যেন কিছু জানতে না পারে। শেষে কে কী ভাববে!

—ঠিক আছে, ঠিক আছে, অত বলতে হবে না। ভীতুর ডিম একটা।

এসে গেল সেই দিন। সকাল থেকেই খালি ভেবেছে প্রীতম, কখন সেই কাঙ্ক্ষিত সময়টা আসবে, গতকাল রাতে টেনশনে ভালো ঘুম পর্যন্ত হয়নি। বিকেলে প্রীতম জানিয়ে দিল চলে এসো, বাবা মা নেই, রাস্তা ক্লিয়ার!

অনন্যা বলল, “ওকে ডার্লিং। এখনই আসছি, পাঁচ মিনিটের মধ্যে।’ প্রীতমের বুকের মধ্যে হার্টটা যেন তখন উত্তেজনা আর আনন্দে লাফাচ্ছে।

বাবা-মা তো এই সবে বেরোলেন। আসতে এখনও ঘন্টা দুয়েক। ছোটো মাসির বাড়িতে ওদের গুরুদেব আসছেন। কী সব অনুষ্ঠান হবে। সকালেই প্রীতম জিজ্ঞেস করেছিল দুরুদুরু বুকে— মা, ছোটো মাসির বাড়ির অনুষ্ঠান কবে যেন?

মা বলেছিলেন— আজই তো, তুই যাবি নাকি? তাহলে চল, সবাই একসঙ্গেই যাই।

প্রীতম বলেছিল— না, না, আমার পড়া আছে। আর তাছাড়া ওইসব গুরুদেবের গানটান আমার ভালো লাগে না। বলেই ভাবল বাবা- মা কিছু আবার সন্দেহ না করে! প্ল্যানটা না বিগড়ে যায়। এ সুযোগ কিছুতেই হাতছাড়া করা যাবে না। শেষ পর্যন্ত অবশ্য কোনও সমস্যা হয়নি। বাবা-মা বিকেল বিকেলই বেরিয়ে গেলেন। যাওয়ার সময় প্রীতমকে বলে গেলেন — বাইরে বেরোবি না কোথাও। এখানেই পড়বি। আর না দেখে কাউকে দরজা খুলবি না। আমরা এক-দেড় ঘন্টার মধ্যেই ফিরে আসছি।

প্রীতম জানে দেড় নয় পাক্কা দু’ঘণ্টা লাগবে। তবুও সাবধানের মার নেই, এক ঘণ্টার মধ্যেই অনন্যাকে ছেড়ে দিতে হবে। কিন্তু এই এক ঘন্টা কী করবে দুজনে? অনন্যাকে জড়িয়ে ধরে কিস করবে? ধুর, সে তো কতই করেছে। আজ আরও বেশি কিছু চাই। কিন্তু অনন্যা যদি রাজি না হয়? যদি বাবা-মা এসে যায়? আগামী একটা ঘন্টা কী কী ঘটতে পারে, ভাবতেই পারছিল না প্রীতম।

আর মাত্র পাঁচ মিনিট। তাড়াতাড়ি বারমুডাটা ছেড়ে জিন্‌সটা পরে নিল প্রীতম, উপরে একটা দারুণ দেখতে হলুদ টি শার্ট পরল, ক’দিন আগেই কেনা। এখন বেশ দেখাচ্ছে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে, চুলটায় হাত চালিয়ে আলগা ভাবে গুছিয়ে নিল, একটু কেয়ারলেস থাক। হঠাই ও ভাবল, আরে এত সেজেগুজে কি কেউ বাড়িতে থাকে নাকি? তার চেয়ে সাধারণ নীল স্যান্ডো গেঞ্জিটাই ভালো। ওর ব্যায়াম করা পেটানো চেহারা, বেশ স্মার্ট আর সেক্সি দেখাবে, আবার ঘরোয়াও।

আবার টি শার্ট ছেড়ে ও স্যান্ডো গেঞ্জিটা পরে ফেলল। ডিও মাখবে নাকি? নাঃ, সেটাও থাক। অনন্যা যেন না ভাবে, ও আসবে বলে প্রীতম সেজেগুজে রেডি হয়ে রয়েছে! খুব লজ্জার ব্যাপার হবে সেটা। অনন্যা যা স্মার্ট মেয়ে, ওকে ল্যাজেগোবরে করতে ছাড়বে না। তার চেয়ে সাধারণ ভাবে থাকাই ভালো। কোন ঘরে বসাবে? খুবই সাধাসিধা ফ্ল্যাট। সামনের ঘরটাই ভালো। একটা চেয়ার আর বড়ো খাটটা আছে। খাটেই বসবে দুজনে, তারপর খাটেই… আর ভাবতে পারে না প্রীতম।

বারান্দার কাছে গিয়ে আলতো উঁকি মেরে বাইরে দেখে নিল অনন্যা আসছে নাকি। কেউ দেখে ফেলবে না তো ওকে ফ্ল্যাটে আসতে, তাহলেই চিত্তির। যদি বাবা-মার কানে যায় সর্বনাশ হবে, ভাবতেই শিউরে উঠল ও। কিন্তু এখন আর ফিরে যাবার উপায় নেই, একটু রিস্ক তো নিতেই হয়। মনে মনে সাহস সঞ্চয় করল প্রীতম। ধুর, কেউ জানতে পারবে না। মাত্র তো এক ঘণ্টার ব্যাপার !

কী করবে দুজনে? খাটে বসে গল্প? কীসের গল্প? নতুন কেনা কবিতার বইগুলো তো কবে থেকেই অনন্যা দেখতে চেয়েছিল। ফ্ল্যাটটাও দেখতে চেয়েছে। কী যে দেখার আছে এই ম্যাড়মেড়ে ফ্ল্যাটটাতে! দুটো ঘর, ডাইনিং, কিচেন বাথরুম আর বারান্দা। তার মধ্যে বারান্দায় বের হওয়া যাবে না। ওপাশের ফ্ল্যাটগুলো থেকে সবাই দেখে ফেলবে। বারান্দার দরজাটা তাড়াতাড়ি বন্ধ করে দিল প্রীতম। বার বার ঘড়ি দেখতে থাকল। পাঁচ মিনিট তো হয়ে গেছে, এখনও আসছে না কেন অনন্যা? আসবে তো! যদি না আসে কোনও কারণে? ইস্, তাহলে তো সুযোগটাই নষ্ট। আর কি এমন দিন আসবে?

আর বারান্দা দিয়ে বাইরে দেখা যাবে না, দরজা বন্ধ করে দিয়েছে। সদর দরজার কাছে সিঁড়িতে, কান খাড়া করে শুনতে চেষ্টা করে প্রীতম কেউ কি আসছে? সিঁড়িতে পায়ের শব্দ ওকে ঝাঁকিয়ে দিয়ে যায়। এই বুঝি আসছে অনন্যা, আর মাত্র কয়েকটা মিনিট। বুক দুরদুর করে অজানা আশঙ্কায়— কী হয়, কী হয়।

(ক্রমশ……)

আইভিএফ পদ্ধতির চাহিদা হয়তো বাড়বে

১৯৭৮ সালের আগে যত বাচ্চার জন্ম হয়েছে, তারা সবাই মাতৃগর্ভে শুক্রাণু এবং ডিম্বাণুর স্বাভাবিক মিলনেই জন্ম নিয়েছেন। কিন্তু তারপর থেকে আইভিএফ পদ্ধতি চলে আসার ফলে পুরো ছবিটা বদলে গেছে। আর এখন প্রতি মিনিটে অন্তত একজন বাচ্চার ভ্রূণ তৈরি হচ্ছে টেস্টটিউব-এ পুরুষের স্পার্ম এবং নারীর এগ ফার্টিলাইজ করে। তাই বলা যায়, সারা পৃথিবীতে অসংখ্য ভ্রূণ মাতৃগর্ভে তৈরি না হয়ে, আইভিএফ অর্থাৎ ইনভিট্রো ফার্টিলাইজ পদ্ধতিতে হচ্ছে।

এখন মেয়েরা যেহেতু ঘরে-বাইরে নানা কাজে ব্যস্ত থাকেন বেশিরভাগ সময়, তাই তাদের কাছে বাচ্চার জন্ম দেওয়ার বিষয়টি এক বিড়ম্বনায় পরিণত হয়েছে। কীভাবে সবকিছু সামলে উঠে বাচ্চা নেবেন একজন কর্মরতা নারী, এটা ভাবতে ভাবতেই বয়স ৪০ বছর পার হয়ে যায়। আর বাচ্চা নেওয়ার সঠিক বয়স পার হয়ে যাওয়ার পর যদি স্বামীর স্পার্ম কাউন্ট কিংবা স্ত্রী-র এগ্ প্রোডাকশন কমে যায় কিংবা ইউটেরাস-এ কোনও সমস্যা দেখা দেয়— তাহলে তখন তারা নিরুপায় হয়ে আইভিএফ সেন্টারগুলির দ্বারস্থ হন।

আসলে কেরিয়ার গড়ার জন্য অতি ব্যস্ততা এবং প্রতিযোগিতার ইঁদুর দৌড়ে শামিল হতে গিয়ে পারিবারিক জীবন এবং স্বাভাবিক শারীরিক ও মানসিক চাহিদা পূরণের বিষয়টি ভাবতে ভুলে যাচ্ছে মানুষ। আর যখন ভাবার অবসর পান কিংবা ভাবতে বাধ্য হন, তখন সময় অনেকটা পার হয়ে যায়— স্বপ্ন আর পূরণ হয় না স্বাভাবিক পন্থায়। কারণ যাই হোক না কেন, স্বাভাবিক ভাবে বাচ্চার জন্ম দিতে অক্ষম হচ্ছেন এখন অসংখ্য নারী। আর তাই ইনভিট্রো ফার্টিলাইজেশন বা আইভিএফ-এর চাহিদা বাড়ছে সারা পৃথিবীতে। সমীক্ষা অনুযায়ী, এখন ১২৫জন বাচ্চার মধ্যে ১জন বাচ্চা হয় আইভিএফ পদ্ধতিতে। তবে আশা করা হচ্ছে, আগামী দিনে আইভিএফ-এর সংখ্যা হয়তো আরও বাড়বে।

এখন সবকিছুই হয় প্ল্যান মাফিক। বাচ্চার জন্ম থেকে শুরু করে স্কুলে ভর্তি, এমনকী ডক্টর, ইঞ্জিনিয়ার ইত্যাদি কী হবে ভবিষ্যতে, তার সবটাই যেন পূর্ব নির্ধারিত! অতএব বাচ্চা জন্মানোর বিষয়টিও যে স্বাভাবিক ভাবে না হয়ে আইভিএফ পদ্ধতিতে হবে, এ আর আশ্চর্যের কী? আর এই আইভিএফ-এর বিষয়টি যত বাড়বে, বিবাহিত দম্পতির কাছে তা খরচাসাপেক্ষ কিংবা বিপর্যয়ের হলেও, আইভিএফ সেন্টারগুলির রমরমা ব্যাবসা চলতে থাকবে।

নবজাতকের মা যদি হন কর্মরতা

বাঙালি পরিবারে সন্তানের জন্ম দেওয়ার পর, সাধারণত আঁতুড়ঘরে থাকার প্রথা চলে আসছে যুগ যুগ ধরে। এই বন্দিদশার সময়কাল সাধারণত নির্ভর করে মা এবং সন্তান কতটা ভালো ভাবে সুস্থ জীবনে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে তার উপর। আর অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে প্রসব করানো হলে, এই সময়কাল কিছুটা বেড়ে যেতে পারে। আবার এই সময়কালটি আরও প্রলম্বিত হয়ে উঠতে পারে, যদি প্রসবের সময় মা এবং সন্তানের মধ্যে কেউ কিছু জটিলতার মুখোমুখি হয়ে থাকেন। সে ক্ষেত্রে স্বাভাবিক হয়ে উঠতে আরও বেশ কিছুটা সময় লাগে। তবে পরিস্থতি যেমনই হোক, একজন মাকে তার নিজের যত্ন নেওয়ার জন্য যথেষ্ট সময় দিতে হয়। সাধারণ ভাবে মোটামুটি ৪০ দিনব্যাপী সময়সীমাকে স্বাভাবিক বলে বিবেচনা করা হয়।

আধুনিক সময়ে অবশ্য মায়েরা প্রসবের পরবর্তী সময়টাতে বিশেষ কোনও আঁতুড়ঘরে থাকার ব্যাপারে বিশ্বাসী নন। যেই মুহূর্তে তারা ভালো বোধ করেন, সেই মুহূর্তেই তারা তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসেন। এটি সাধারণত ঘটে থাকে কর্মরতা প্রচুর মায়েদের ক্ষেত্রে। পর্যাপ্ত ছুটি না থাকলে অথবা তারা যত দ্রুত সম্ভব তাদের কাজের জগতে ফিরতে চাইলে— এই মানসিক প্রস্তুতি তো নিতেই হবে।

আঁতুড়ঘরে কিংবা সাধারণ শুশ্রূষায় বাড়িতে থাকার বিষয়টি কার্যকর হয় তখনই, যখন একজন সদ্য হয়ে ওঠা মা তার স্বাস্থ্যের দিক থেকে সম্পূর্ণরূপে আরোগ্যলাভ করেননি কিংবা স্বাস্থ্যবতী ও বলিষ্ঠ হয়ে ওঠেননি। চিকিৎসকরা এই পর্যায়ে বাড়ির মধ্যেই থাকার পরামর্শ দেন। পরিবারের সদস্যরা এই সময়ে নানা কাজে অপরিণত মাকে সাহায্য করেন, তার যত্ন নিতে ব্যস্ত থাকেন এবং শিশুর পরিচর্যা ও যত্নের জন্য প্রয়োজনীয় জিনিসের জোগান দিয়ে থাকেন।

কিন্তু একটা সময়ের পর নতুন মা-কে সবটুকুই নিজে হাতে সামলাতে শিখে ফেলতে হয়। কাজে যোগ দেওয়ার আগে শিশুর দেখাশোনা কীভাবে করবেন, তারও একটা পরিকল্পনা করে ফেলতে হয়। আর এর জন্য বিশেষ ভাবে কাজে লাগে মাতৃত্বকালীন ছুটির সময়টা। বস্তুত ওটাই হল সঠিক ভাবে বাচ্চার ধাত বোঝার সময়। তাই ওই সময়ই যতটা সম্ভব শিশুর দায়িত্ব নিজে নেওয়ার অভ্যাস করতে হবে।

অনেক গবেষণায় দেখা গেছে, জন্মের পর শিশুদের কিছু সময় মায়ের সঙ্গে একান্তে কাটানো প্রয়োজন। ফলে একজন মায়ের মাতৃত্বকালীন ছুটি নেওয়ার ফলে সন্তান উপকৃত হয়। মা যদি বেশিরভাগ সময়টাই বাড়িতে থাকেন, তাতে সন্তানের যত্ন বেশি ভালো হয়— এ ধারণার কোনও মানে নেই। সন্তানকে যেমন অভ্যাস করাবেন, সে তাতেই অভ্যস্ত হয়ে উঠবে। তবে সন্তানের সঙ্গে সময় কীভাবে কাটাচ্ছেন, তার ওপর নির্ভর করে মায়ের সঙ্গে বাচ্চার কেমন মানসিক যোগাযোগ থাকবে, সেই বিষয়টি।

বহুজাতিক একটি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন আবিরা বিশ্বাস। তিনি মাতৃত্বকালীন ছুটি পেয়েছেন প্রায় তিন মাস। সেই মেয়াদ শেষ। ছোট্ট শিশুকে বাড়িতে রেখে কাজে ফিরতে হবে আগামী মাসে। কী করে সামলাবেন সেই সময়টা, এই বিষয়ে তিনি ভীষণ চিন্তিত। যদিও শিশুকে দেখাশোনা করার জন্য ভরসা দিয়েছেন তাঁর মা। তবুও এত ছোটো সন্তান, সংসার, কর্মক্ষেত্র, সদ্য মা হওয়ার ধকল— সব মিলিয়ে যেন চেনা জগতে অচেনা ভাবে পা রাখা।

কর্মজীবী মায়েদের নতুন সন্তানকে রেখে কাজে ফিরতে মানসিক টানাপোড়েনে ভুগতে হয়। অনেকে বিষাদগ্রস্ত হয়ে পড়েন। সরকারি চাকরিজীবী মায়েরা ৬ মাস ছুটি পেলেও, বেসরকারি চাকুরেদের বেলায় ৩-৪ মাসের বেশি ছুটি মেলা ভার। তবে কিছু প্রতিষ্ঠান অবশ্য সরকারি নিয়ম মেনেই ছুটি দেয়। এরপরও এই ছুটির পর কাজে যোগদানে মায়ের সবচেয়ে বেশি যে দুশ্চিন্তা, সেটি হল শিশুর দেখাশোনা কে করবে? আয়া বা বাচ্চা সামলানোর লোক পেলেও, সে শিশুর যত্ন ঠিকমতো করছে কিনা এই দুশ্চিন্তাতেও ভুগতে হয় মায়েদের।

শিশুরোগ বিশেষজ্ঞরা বলেন, শিশুকে পূর্ণ ছয় মাস কেবল বুকের দুধই পান করানো উচিত। শিশুর বয়স ৬ মাস পেরিয়ে গেলে বুকের দুধের পাশাপাশি বাড়িতে তৈরি করা সব ধরনের খাবার শিশুকে একটু একটু করে খেতে দেওয়া উচিত। শিশু যদি ২৪ ঘণ্টায় ৬ বার প্রস্রাব করে, বুঝতে হবে, শিশু ঠিকমতো বুকের দুধ পাচ্ছে।

কর্মরতা মায়েদের কাজে ফেরার জন্য সরাসরি মায়ের বুক থেকে দুধ পান করানো সম্ভব না হলেও, মায়েরা ব্রেস্ট পাম্প ব্যবহার করেন। যন্ত্রটি কিন্তু জীবাণুমুক্ত করে ধুয়ে তবেই দুধ পাম্প করে কয়েকটি আলাদা আলাদা কাপে করে সংরক্ষণ করতে হবে। যাতে প্রতিবার একটি কাপের দুধ শেষ করতে পারে শিশু।

শিশুর খাবার সময় হলে পরিষ্কার চামচের সাহায্যে শিশুকে মায়ের বুকের দুধ পান করাতে হবে। মায়েরা বাড়িতে থাকা অবস্থায়, শিশুকে এক পাশের বুকের দুধ পান করানোর সময় অন্য পাশের বুকের দুধ সংরক্ষণ করতে পারেন। এমনি রাখলে ৬ ঘণ্টা আর ফ্রিজে সংরক্ষণ করলে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত বুকের দুধের গুণ অটুট থাকে।

যেভাবেই সংরক্ষণ করা হোক না কেন, যখন শিশুকে দুধ পান করানো হয়, তখন একটা পাত্রে কুসুম গরম জল নিয়ে তাতে দুধের কাপ চুবিয়ে রাখতে হবে। কিছুক্ষণের মধ্যে দুধ হালকা গরম হয়ে যাবে, সেটি চামচের সাহায্যে শিশুকে দিতে হবে। কোনও ভাবেই ফিডারে নয়।

কর্মস্থল বাড়ির কাছাকাছি হলে যে-কোনও একসময় এসে শিশুকে বুকের দুধ দিতে পারলে খুব ভালো। মাকে বেশি বেশি করে খাবার খেতে হবে ফিডিং করার পর্যায়ে, এতে শিশুর জন্য পর্যাপ্ত খাবার তৈরি হবে। মাকে মানসিক ভাবে শক্ত থাকতে হবে, উৎফুল্ল থাকতে হবে, হাসিখুশি থাকতে হবে। যেহেতু মা চাকরিজীবী, কাজের ও শিশুর যত্নের ফাঁকেও পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিতে হবে। খুব জরুরি বিষয়, মাকে প্রতিদিন পরিচ্ছন্নতার সঙ্গে স্নান করতে হবে। অনেকেই প্রতিবার খাওয়ানোর আগে স্তন ধুয়ে ফেলেন, যেটি একেবারেই ঠিক নয়। তাতে শিশু মায়ের গায়ের গন্ধ খুঁজে পায় না, মাকে চিনতে শিশুর অসুবিধা হতে পারে।

তবে শিশুর খাবারের পাশাপাশি পরিচ্ছন্নতাও খুব জরুরি। বাইরে থেকে ফিরেই সাবানজলেই শুধু নয়, জীবাণুনাশক দিয়ে হাত জীবাণুমুক্ত করে তবেই শিশুকে কোলে নেওয়া যাবে। শিশুকে দিনেরবেলা ডায়াপার না পরিয়ে রাখাই সুবুদ্ধির পরিচয়। ক্লান্ত চাকুরে মায়ের ঘুমের কিছুটা সুবিধার জন্য রাতে ডায়াপারে ভরসা রাখাই ভালো।

শিশুর যত্নের বিশেষ টিপস

  • ডায়াপার যেন অতিরিক্ত আঁটসাঁট না হয়। আরামদায়ক ও উচ্চশোষণ ক্ষমতাসম্পন্ন হওয়াটা জরুরি। ডায়াপারে ঢাকা অংশে র‍্যাশ বের হচ্ছে কিনা বা লাল হয়ে যাচ্ছে কিনা- খেয়াল রাখতে হবে। এটা ভারী হলেই জায়গাটা পরিষ্কার করে নতুন ডায়াপার পরাতে হবে।
  • ছোটো শিশুরা সাধারণত সামনে যা পায়, তা-ই মুখে দেয়। তাই শিশুর সামনে থাকা প্রতিটি জিনিস পরিষ্কার থাকা উচিত। কোনও খেলনা শিশুর সামনে দিলে বিশেষ খেয়াল রাখবেন। সূঁচালো, খড়খড়ে বা এবড়োখেবড়ো খেলনা না দেওয়াই উচিত। মুখে ঢুকে আটকে যেতে পারে, এমন কিছুর সামনে থেকে শিশুকে দূরে রাখতে হবে।
  • শিশুর দেখভালের দায়িত্বে যিনিই থাকুন না কেন, দায়িত্বশীলতার সঙ্গে বিষয়গুলো তাঁকে খেয়াল রাখতে হবে। শিশুকে খুব বেশি সময় কোলে না রেখে স্বাভাবিক বেড়ে ওঠার পরিবেশ দিতে হবে।
  • বিছানা বা উঁচুতে রাখলে শিশু পড়ে গিয়ে ব্যথা পেতে পারে। আবার সরাসরি মেঝেতেও শিশুকে শুইয়ে বা বসিয়ে রাখা উচিত নয়। মেঝেতে বিছানা পেতে সমাধান করা যেতে পারে এমন সমস্যার।

সারাদিন কাজের পর মায়েরা ক্লান্ত অবসন্ন থাকবেন এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু মনে রাখবেন, মাতৃত্ব এক দারুণ অনুভূতি। বাচ্চার বেড়ে ওঠার পর্যায়গুলো মিস করবেন না। তাই মায়ের হাসিখুশি, দুশ্চিন্তামুক্ত থাকাটা খুবই জরুরি। এতে বাচ্চাও নিশ্চিন্ত বোধ করবে।

এ কি সত্য!(শেষ পর্ব)

—অ্যাই শোনো! মেলা লেকচার মেরো না তো। আজকাল বড্ড বেশি আমাকে কন্ট্রোল করতে চাইছ।

–এ্যাই! ঠিক করে কথা বলো। শিক্ষিত মানুষের মুখে এসব মানায় না। আর মা আমাদের সম্বন্ধেই কী ভাববেন সেটা ভেবে দেখেছ? আগে বলো ভালোবাসা দুঃখের রক্তকে স্পর্শ করে, না দুঃখের রক্ত ভালোবাসাকে স্পর্শ করে? রিমা স্পষ্ট ভাবে বাবির চোখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল।

—ডিসগাস্টিং! এখন কবিত্ব ভালো লাগছে না রিমা। স্ন্যাক্স দাও। আই অ্যাম হাঙ্গরি। মাথা গরম করে দেওয়া ছাড়া কি তোমার আর কোনও কাজ থাকে না?

রিমা কথাটা শুনে বিড়বিড় করতে করতে রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে গেল। কারণ সেও তার শাশুড়িমার মতন অশান্তি পছন্দ করে না। রিমা নীরব থাকে। নীরব থাকাটাই এ মুহূর্তের দস্তুর। শব্দহীনতা শ্রেষ্ঠ সম্মতি। ছেলে কফিরুমে জানলার দিকে বসে পড়ল চুপচাপ।

এই কফিরুমটার আবার গল্প আছে বেশ। টিনাদেবী যখন জমি কিনে বাড়ি তৈরি করছিলেন সেই সময় সব ঘর হয়ে যাবার পর রান্নাঘরের পাশের ব্যালকনিটা বিশাল লাগছিল। তাই দেখে টিনা তাঁর স্বামীকে বলেছিলেন, ‘বাবি যখন বড়ো হবে — হয়তো বিদেশে যাবে নয়তো, একটা বড়ো চাকরি করবে তখন একটা ঘরে বসে বাবি আর বাবির বউ চা খাবে অফিস থেকে এসে বা ভোরবেলা। ওনার স্বামী হেসে বলেছিলেন, আর আমি আর তুমি? বলে এদিক ওদিক তাকিয়ে ওনার ফসা গালটা টিপে বুকের কাছে টেনে নিয়েছিলেন। অনেকদিন পর হঠাৎ করে একটা শিহরণ অনুভব করলেন টিনা।

টিনাদেবী একটা গল্প পড়ছিলেন প্রতিভা বসুর লেখা— জীবনের জলছবি। মনে মনে ভাবলেন তিনি যদি লিখতে পারতেন প্রতিভা বসুর মতো করে লিখে ফেলতেন নিজের জীবন কথা। নিজের এই সংসারের উত্তরণের কথা।

পরের দিন প্রমোটার এল দশটার সময়। চারিদিকে কেমন যেন থমথমে। মেঘে আকাশ ঢেকে গেছে। বৃষ্টি হবো হবো করেও হচ্ছে না। বাবি অফিস গেছে এক ঘন্টা পরেই আসবে বলে গেছে। টিনাদেবী চুপচাপ কাগজে সাইন করবার জন্য হাত বাড়ালেন। একটা কথাও উচ্চারণ করলেন না। শুধু ফ্যালফ্যাল করে এদিক ওদিক দেখতে থাকলেন।

রিমা দেখল কীভাবে অসহ্য-কে মুখ বুজে সহ্য করতে হয়। বুকের ভেতরটা যেন ছারখার হয়ে যাচ্ছিল টিনার। এই ওনার ছেলে ভাবতেও খুব খারাপ লাগছিল সেই মুহূর্তে। আর থাকতে না পেরে রিমা প্রমোটার-এর কাছে এসে বলল সোজাসুজি, ‘এ বাড়ি আমরা বিক্রি করব না। ভুল ডিসিশন নেওয়া হয়ে গেছিল। যখন করব, তখন আমরা ভেবে দেখব। এখন আপাতত স্থগিত থাক।”

নাতি নাতনি বাড়িতে কালো কোট পরা লোক দেখে উঁকিঝুঁকি মারতে শুরু করল। ওরা স্কুলে শুনেছে বন্ধুদের পেরেন্টসরা ঠাম্মা-দাদুর বাড়ি বিক্রি করে এখন ছোট্ট ফ্ল্যাটে থাকে। তাই ওরা ওদের বাড়ি আসতে খুব ভালোবাসে।

ওরা দুই ভাই-বোন এসে ঠাম্মির গা ঘেঁষে বসল। ঠাম্মি মুখ নীচু করে বসে আছেন। নাতনি ঠাম্মির কানে কানে বলল, “ঠাম্মি, কোনও চিন্তা নেই। আমরা এই বাড়ি ছেড়ে কিছুতেই যাব না, দেখো।”

প্রমোটার রিমাকে বললেন, ‘কী বলছেন আপনি? আমাকে তো মিঃ কল্পতরু রায় আজকেই সাইন করার কথা বলেছিলেন।

—বলেছিলেন, কিন্তু আমরা আজকেই এই সিদ্ধান্তে এসেছি। উনি এখুনি এসে পড়বেন। প্লিজ! কিছু মনে করবেন না, আপনার সময়ের অপচয় করিয়ে দিলাম। কিন্তু আমরা অপারগ। হাত দুটো জড়ো করে রিমা প্রমোটর-কে বিদায় জানাল। এত তাড়াতাড়ি ঘটনাটা ঘটে যাবে বুঝতে পারেনি রিমা ও টিনাদেবী।

—আমি জানি, বাবি আসলেই এক যুদ্ধ শুরু হবে। আমার মনের ভিতর তাই সেই যুদ্ধের প্রস্তুতি চলছে অবিরাম। ক্রমশ বড়ো হয়ে উঠছি আমি। সত্যিকারের বড়ো, ম্যাচিওরড। শাশুড়ি-বউয়ের কেমিক্যাল ইকোয়েশন যে এক, তা জানাতেই কি?

বাবি গাড়ি পার্কিং লটে রাখতে না রাখতেই প্রমোটরের গাড়ি পাশ দিয়ে চলে গেল। বাবি ঘরে ঢুকেই দেখে— মায়ের কাঁধে মাথা রেখে রিমা বসে আছে সোফা সেটে৷ দু’জনের চোখেই জল।

—সাইন করে দিয়েছ মা? গলাটা কেঁপে উঠল বাবি-র।

মায়ের দু’চোখে জল। রিমা মাথা তুলে লো ভেলোসিটিতে বলল, ‘না বাবি! ওনাকে ফিরে যেতে বলেছি।”

—ফিরে যেতে বলেছ? কিন্তু কেন? এই কথাটা বলতে এত দ্বিধা? আমি অনেক ভেবেচিন্তে এই সিদ্ধান্তেই তো এসেছিলাম। তা তুমি সেই কাজটি নিজেই করেছ। একেই বলে বোধহয় অর্ধাঙ্গিনী! বাবি-র হাসি মুখ রিমার বুকের বোঝা অনেকখানি নামিয়ে দিল।

মা স্তম্ভিত। এই ছেলেই কি তাঁর ইচ্ছের গাছ নাকি? যে-ছেলেকে প্রথম হাঁটি হাঁটি পা করে চলতে শেখানো, কথা বলতে, লিখতে শেখানো, তারপর মহিরুহ বাবিতে পরিণত করা। সব সম্ভব হয়েছে মিষ্টি বউ, না… না… আমার মেয়ে আমার রিমা মা-র জন্য! চারদিকে একবার চোখ বুলিয়ে আবার টিপটপ সাজানো লিভিংরুমের সোফায় টিনাদেবী গা এলিয়ে দিলেন। রিমার রুচিবোধ আছে।

বাবি আর একটিও কথা না বাড়িয়ে মাথা নীচু করে শুধু মা’কে প্রণাম করল। ফ্যাল ফ্যাল করে দেখছে বাবি রিমাকে। তিরতির সুখ কাঁপছে রিমার অশ্রুভরা

দু-চোখে। ওই কাঁপন ছড়িয়ে গেল তারও বুকে। শিরায়। উপশিরায়। সুখমুক্তোয় স্বপ্নের মালা গাঁথছে মা আর রিমা। হ্যাঁ, সুখের স্বপ্ন। যে স্বপ্নগুলো নিয়ে মা, রিমারা বেঁচে থাকে আজীবন। শুধু একটু পারস্পরিক বোঝাপড়াই তো সাংসারিক সুখের চাবিকাঠি হয়।

—রিমা আর দাঁড়িয়ে থেকো না প্লিজ! যাও দেখি গরম গরম পকোড়া করো। কী বলো মা। আজ আমরা বাইরে খেতে যাব। কেমন?

উচ্চতার তুলনায় আমি একটু মোটা, কীভাবে স্লিম হব?

উচ্চতার তুলনায় আমি একটু মোটা। পাঁচ মাস পরে আমার বিয়ের দিন ঠিক হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে কীভাবে স্লিম হতে পারব যদি জানান তাহলে উপকৃত হব।

আপনার ওজন এবং বয়সের উল্লেখ আপনি কোথাও করেননি। সাধারণ ভাবে বাড়িতে বসে যদি ওজন কমাতে চান তাহলে রেগুলার এক্সারসাইজ করুন। এতে মনসংযোগ করতে ফাস্ট মিউজিক চালাতে পারেন। মিউজিকের তালে তালে ডান্স অথবা অ্যারোবিক্স করুন। ডায়েটিং করবার দরকার নেই কিন্তু ফ্রায়েড খাবার একেবারেই খাবেন না। পুষ্টিকর খাবার খান। খাবারে পানীয় বেশি রাখুন। সবুজ শাকসবজি এবং প্রচুর পরিমাণে স্যালাড খান। সারাদিনে অন্ততপক্ষে ১০ থেকে ১২ গেলাস জল পান করুন। রাতে খাবার পর আধ ঘন্টা হাঁটবার অভ্যাস করুন।

আমি একজন কর্মরতা মহিলা। এয়ারপোর্টে কাজ করি। ওখানে খোলা জায়গায় সবসময়ে হাওয়া, ধুলো গায়ে লাগে। আমার ঠোঁটে কোটিং পড়ে যায়। ঠোঁট স্বাভাবিক রাখতে আমার কী করা উচিত?

ঠোঁটে কোটিং পড়া মানে আপনার ঠোঁটে ময়েশ্চারাইজারের দরকার রয়েছে। রাতে ঘুমোতে যাওয়ার আগে অবশ্যই লিপবাম লাগান। এই লিপবাম ১৫ এসপিএফ যুক্ত হওয়া দরকার। নরম ব্রাশে ক্রিম লাগিয়ে সেটি ঠোঁটে লাগিয়ে নিন। ঠোঁটে আলতো করে ব্রাশ বোলান, এতে ঠোঁটের ডেড স্কিন চলে যাবে। আর ঠোঁটও আগের মতো পরিষ্কার দেখাবে।

আমার ত্বক তৈলাক্ত। গালে অনেক স্পর্টস এবং হোয়াইট হেডস আছে। দেখতে খারাপ লাগে। কীভাবে এই সমস্যার সমাধান হতে পারে?

আপনার প্রধান সমস্যা হচ্ছে তৈলাক্ত ত্বক। সুতরাং তৈলাক্ত ত্বকের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য দিনে ৩-৪ বার গোলাপজল দিয়ে মুখ পরিষ্কার করুন। এরপর আটা দিয়ে মুখ ধুয়ে ফেলুন। এর বদলে অবশ্য ভেজপিল ক্রিমও ব্যবহার করতে পারেন। ১০ মিনিট মুখে লাগিয়ে রেখে আলতো করে ঘষে মাসাজ করুন। এর পর ভালো করে মুখ ধুয়ে ফেলুন। অয়েলি স্কিনের সমস্যা দূর হলে আপনা থেকেই ব্ল্যাক এবং হোয়াইট হেডস-এর সমস্যা মিটে যাবে।

এ কি সত্য! (পর্ব-০২)

শাশুড়িমার কাছেই শুনেছিল রিমা— এই বাড়িটা অনেক শখ করে দু’জনে মিলে করেছিলেন যাতে ভবিষ্যতে নাতি-নাতনিরা হেসে খেলে বেড়াতে পারে। নানান দেশের নানা রকমের ফল-ফুলের গাছ সংগ্রহ করে সাজিয়েছিলেন মনের মতো করে। কত স্মৃতি জড়িয়ে আছে এই বাড়িটায়, সময় পেলেই বলেন রিমাকে।

সেই বাড়ি যদি আজ বিক্রি করে দেয় বাবি, তাহলে শাশুড়িমা খুবই কষ্ট পাবেন। হয়তো বেশিদিন আর বাঁচবেন না! এই শাশুড়ি যে কতখানি তার মনের বল, তা বুঝিয়ে বলা যাবে না কাউকে। কিছুই বলবেন না নিজের মুখে, অনেক ভাগ্য করে এইরকম শাশুড়ি পেয়েছে রিমা। যবে থেকে বউ হয়ে এসেছে এ বাড়িতে, তবে থেকে দেখে আসছে কী অদ্ভুত এক মহিলা! ওনার সবকিছুই যেন রিমার পছন্দের মতো। রিমা যেটা ভাবে উনি ঠিক সেটাই বলেন। সবাই খুব হিংসা করে সেই জন্য।

আজকালকার দিনে শাশুড়ির কথামতো সংসার চলছে শুনলে বন্ধু-বান্ধবরা সব টিক্‌স-টিপ্পনি মারে। সবাই তো খালি শাশুড়িদের দোষই দেখে। সেখানে রিমা যদি তাদের বলে যে, “দ্যাখ, দোষ কখনও একতরফা হয় না। কষ্ট করে ছেলে মানুষ করেছেন, ওনাদের না হয় একটু দাবিদাওয়া থাকুক না। আমরা মডার্ন যুগের মেয়েরা একটু ওনাদের সেন্টিমেন্টকে সাপোর্ট করি, তাতে তো ক্ষতি কিছু নেই বরং দেখিস লাভ বেশি। আমাদেরও তো একদিন শাশুড়ি হতে হবে, ভেবে দেখেছিস সেটা?’

বন্ধুরা হেসে বলে— তুই পাগল নাকি? কী ভাবছিস আমরা ছেলে বউ-এর কাছে থাকব নাকি বার্ডেন হয়ে? তোর মতন না। রিমা নিজের শাশুড়িকে প্রাণের চেয়েও ভালোবেসে ফেলেছে। উনি যে ভালোবাসার মানুষ।

তাই এই বাড়ি ভেঙে দেবে শুনে অবধি মনে প্রাণে যেন বড্ড কষ্ট পাচ্ছে। এই কষ্ট-টা যেন নিজের অন্তর দিয়ে অনুভব করছে রিমা, আর দুচোখ জলে ভরে যাচ্ছে। রাতে সারা বাড়ি যখন নিস্তব্ধ, সেই সময় জলভরা দু’চোখ নিয়ে পায়ে পড়ার উপক্রম বাবি-র। কিন্তু গোঁয়ারগোবিন্দ ছেলের এক কথা….

—বাড়ি আমি বিক্রি করে দেবই। আমার এক কথা। আমার কাছে বেশি ঘ্যানর ঘ্যানর কোরো না তো, বুঝলে। আবার বলছি, তোমাদের ভালোর জন্যই করছি। আমার নিজের জন্য না। শুয়ে পড়ো।

—আমাদের ভালোর জন্য? না নিজের স্বার্থ উদ্ধারের জন্য? পরে যদি মা বাড়িটা আমার নাম-এ করে দেন। বুঝি না কিছুই বলো? রাতদিন তো শুনেছি— মা-কে সব সময় সাপোর্ট করো কেন? কোনও ফল হবে না। সব বুঝি বাব্বা, সব বুঝি। আমার নামে করে দিলেও সেটা কিন্তু তোমার-ই বাড়ি।

—ছিঃ ছিঃ বাবি, ছিঃ! তোমার মাকে ভালোবাসি বলে তোমার মুখে এই কথা শুনতে হবে, তা আমি কল্পনাও করতে পারিনি। এমন যার মা, কোনও কিছুতেই মানা নেই, বারণ নেই। সেই মা-কেও? এই তো বিয়ের আগে যখনই দেখা হতো, শোনাতে তখন লম্বা লম্বা বাত। এখন মাঝে মাঝে তাই ওসব কথাই ভাবি। মানুষ কত পালটে যায়। বলতে, “আমার মা ছাড়া জীবনে আর কেউ নেই। সেই মা-কে ভালোবাসলেই আমাদের সংসার সুখের হবে। আমরা সুখী হব!’

—আমি অনেক মডার্ন ভাবে মানুষ হয়েছি বলেছিলাম তোমাকে। আর তুমি জানোও সে কথা ভালোভাবে। বাবা ইউরোপে কাজ করার দরুন বাবার সঙ্গে গরমের আর বড়োদিনের ছুটি ওখানেই কাটাতাম। শাশুড়ি নিয়ে ঘর করা আমার দ্বারা হবে না, আমি তা-ও বলেছিলাম তোমাকে। ভুলে গেছো? আমিই বলেছিলাম, তোমার মা তোমাদের বাড়ি থাকুন। আমরা কোনও ফ্ল্যাটে থাকি নিজের মতন করে। তখন বলেছিলে, ‘রিমা তা হয় না, আমি ছাড়া মায়ের আর কেউ নেই। মা কে খালি ভালোবেসো, এটাই আমার একমাত্র রিকোয়েস্ট। মা আমাদের কারুর কাছে কিছু আশা করেননি, আর আজও করবেন না।”

—তো ভালোবাসছি মা-কে। ভালোবাসা মানে এই নয় যে, খালি তাকে ওপর ওপর ভালোবাসা দেখানো। ভালোবাসা মানে হল তার সখ-শৌখিনতা, মন-শরীর সব দিকের নজর রাখা। সবাই বলে ছেলের বউরা আপনার হয় না। সত্যিই কি তাই? না ছেলেরা আপন থাকে না বিয়ের পর? আর আমাদের ভালোর জন্যেই তো উনি করেছেন। গরমের ছুটিতে যখন অন্য বাচ্চারা ফ্ল্যাটের চার দেয়ালে আটকা থাকে আর তোমার ছেলে-মেয়ে তখন টাটকা আম পেড়ে খাচ্ছে। জাম, করমচা পেড়ে খাচ্ছে। নিজেদের পুকুরে সাঁতার কাটছে। টাটকা মাছ খাচ্ছে। আম, জাম, পেয়ারা গাছের ডালে কাঠবেড়ালি আর কত নাম না জানা পাখিদের ব্যস্ত ছোটাছুটি দেখছে, শিখছে। একটুও বোঝো না, তাই না? আমিও তো কনভেন্টে পড়েছি কই নিজেকে তো বদলাই নি? সবাই বদলায় না, বদলায় আত্মবিশ্বাস আর চরিত্র। সব গল্প মনে হয়, তাই নয় কি? আদতে একটা উদ্দেশ্য। উদ্দেশ্য পূরণ হলে পেট ভরার মতো শান্তি, পেট খোলসা হওয়ার মতোও।

—সেদিন কাজের মাসি আমাকে ডেকে দেখাল রান্নাঘরের জানলা দিয়ে, ‘দেখুন বউদি, মা কেমন আপনমনে গাছগুলোয় হাত বুলিয়ে বুলিয়ে কী যেন বলছেন।’ মেয়েরা বা বউরা শুনেছি বদমাস হয়, এ তো উলটো ইকোয়েশন। মাসি গরিব মানুষ মাসিরও চোখে জল এসে গেছিল। না, এ বাড়ি আমি কিছুতেই বিক্রি করতে দেব না আমার প্রাণ থাকতে, এই আমি বলে দিলাম বাবি। তাতে তোমার সুবিধা না হয়, অন্য জায়গায় থাকতে পারো। আমি পারব না এই অন্যায় করতে।

(ক্র্মশ…)

এ কি সত্য!(পর্ব-০১)

মা মা মা… কোথায় গেলে? বাড়িতে ঢুকেই চিল চিৎকারে সারা বাড়িকে একেবারে মাতিয়ে দিল। গম গম করে উঠল বাড়ি। দুপুরবেলা মায়ের চোখে সবে একটু ঝিমধরানো ঘুম এসেছে। ছেলের ডাকে তড়িঘড়ি বাইরের ঘরে এলেন।

—কী হয়েছে রে বাবি? এইভাবে হন্তদন্ত হয়ে বাড়ি এলি? শরীর-টরীর ঠিক আছে তো। দেখি, বলে ছেলের কপালে হাত দিয়ে দেখলেন। ঠিক আছে তো সব, তাহলে। কিন্তু এইভাবে এলি কেন হন্তদন্ত হয়ে? মায়ের মন তো। ভয় লাগে আজকাল। যা দিনকাল পড়েছে। বুঝিস না?

—মা এসো। আমার কাছে আগে এসে বসো, তারপর শুনো কী হয়েছে!

—রোজই তো ‘রিমা রিমা’ করে ঢুকিস,তাই একটু অবাক হয়েছিলাম রে। তুই তো জানিস, রিমা এই সময়ে বাড়িতেই থাকে। অভিমান যেন চুঁইয়ে চুইয়ে পড়ে গেল!

—জানো মা? আজ একটা কথা তোমাকে না বলতে পারলে যেন শান্তি পাচ্ছি না। অফিসে আজ একটা কনফিডেন্সিয়াল মিটিং ছিল, তাই কোনওরকমে সেটা শেষ করেই ছুটে এলাম। কো-অপরেটিভ থেকে নোটিস এসেছে যে, সব পুরোনো বাড়ি ভেঙে ওরা মডার্ন মাল্টিস্টোরিড ফ্ল্যাট করবে। যাদের জমি তাদের চারখানা ফ্ল্যাট দেবে আর সেই ফ্ল্যাটগুলো তাদের সুবিধা মতো করে দেবে। জানো তো আমি তোমাকে সারপ্রাইজ দেব, ভেবেছিলাম। তুমি কিন্তু না কোরো না মা, প্লিজ মা আমার। সব শুনলে তুমি না করবে না তাও আমি জানি।

—কিন্তু বাবি, তোর বাবার শেষ স্মৃতিটাও আমার কাছ থেকে কেড়ে নিতে চাইছিস? চারিদিকে যে ওনার স্মৃতি আর তোদের হাঁটি হাঁটি পা-এর সব ছাপ। আমি তো এই স্মৃতিটুকু আঁকড়েই বেঁচে আছি রে। আমি চলে গেলে না হয় এসব করিস। সোনা ছেলে আমার ভুল বুঝিস না মা-কে!

—এই দ্যাখো তুমি আবার সেন্টিমেন্টাল কথা শুরু করলে! বাড়িটার তো কিছু কিছু জায়গা ভেঙেও গেছে। আর অনেক পুরোনোও হয়ে গেছে। এত বড়ো বাড়ি নিয়েই বা কী করব আমরা বলো? ক’দিন পরে বুবাই, টুম্পি-ও যে যার মতো বাইরে চলে যাবে। তারপর সবার ওপরে বড়ো কথা হল, সব ঠিক করাতেও বেশ কয়েক লাখ টাকা লাগবে। শুধু টাকা পয়সা না, দেখাশোনাও তো করতে হবে। কে করবে বলো ? রিমাও পারবে না এত করতে। আমার তো সময় নেই দেখতেই পাচ্ছ। আর এতখানি জায়গা নিয়ে আমরা কী-ই বা করব? ভাবো মা! তাছাড়া কো-অপারেটিভ-এর কাছে আমরা কোনও অজুহাত-ই দেখাতে পারব না। বেশি করলে ওরা বেআইনি ভাবে ভাঙার কাজ শুরু করে দেবে, বুঝলে? তখন হাত পা কামড়ানো ছাড়া আর কিছু করার থাকবে না। তখন কিন্তু দু’কূল-ই যাবে। কাজেই না কোরো না, বুঝলে মা! আমি অনেক ভেবে চিন্তে দেখেছি, এগ্রিমেন্ট সাইন করে দিই। তোমাকে না বলে কোনওদিন কোনও কাজ করিনি তো। করেছি কি?

রিমা রান্নাঘর থেকে সব শুনে নিজের ঠোঁট নিজেই কামড়াচ্ছিল। আর ঘন ঘন পাশ ফিরে দেখছিল মা আর ছেলেকে। লিভিং রুমটা একেবারে রান্নাঘর ঘেঁষা। এইজন্যেই করেছিলেন ওনারা যাতে রান্না করতে করতেই সব দেখা বা গল্প শোনা যায়। মা সব শুনে ‘হ্যাঁ বা না’ কিছু বলছে না দেখে কল্পতরু ওরফে বাবি উঠে পড়ল। তুমি চিন্তা করে আমাকে জানিও মা। পজিটিভ বলবে আমি জানি৷

এইবার কল্পতরু তাদের ঘরে আসলে রিমা সালোয়ার কামিজের ওড়না গায়ে দিয়ে একরকম ছুটে ঘরে এল। দুনিয়ার সব দাপাদাপি ক্রুদ্ধ লোভ ভেঙে দিল অবিশ্বাস আর বাবির ছদ্মবেশী রূপ।

—বাবি! এটা কিন্তু তুমি ঠিক করছ না। মা যতদিন বেঁচে আছেন, না হয় একটু কষ্ট করেই থাকলাম। আর কষ্ট-ই বা কী? কি সুন্দর খোলামেলা বাড়ি। আজকাল তো হয়েছে সব ঘুপচি… আর বুবাই, টুম্পি-ও বেশ ন্যাচারাল পরিবেশে মানুষ হচ্ছে। দিদার সাথে হেসে খেলে বড়ো হচ্ছে। কত কষ্ট করে এত সব জানা অজানা গাছ লাগিয়েছিলেন। শুধু আমাদের মুখ চেয়ে তাই না? আমাদের মতন বাগানটাও মা-এর এক বন্ধন। আমরা বেরিয়ে গেলে ওই বাগান নিয়েই উনি থাকেন, বাড়ি আসলে একগাল হেসে দেখান বাগানে তাঁর হাতের ফসল। আলু, বেগুন, ঝিঙে, চালকুমড়ো। আবার কখনও বা এঁচোড়, কাঁচা আম। না, না আমি এটা কিছুতেই হতে দেব না। প্লিজ, একবার ভেবে দ্যাখো। মা তোমার নাম যে কেন কল্পতরু রেখেছিলেন, আমি বুঝি না!

—দ্যাখো তুমি এসবের কিছু বোঝো না। কাজেই চুপ করে থাকো। আমি যা করছি, আমাকে করতে দাও। আমাকে টেক্কা দিতে যেও না। তোমার আমার ভালোর জন্যেই করছি। কেবল নিজের জন্য না, বুঝলে?

—আমি তো চুপ করেই আছি। আর তোমাকে টেক্কা দিতে আমার বয়েই গেছে। আমার দাদারাও তো সব পুরোনো বাড়িতে আছে। কই শুনছি না তো যে, কো-অপারেটিভ বাড়ি নিয়ে নেবে।

—তোমার দাদারা কী করছে না করছে তা দেখার আমার প্রয়োজন নেই। আর কথায় কথায় দাদারা দাদারা কোরো না তো। ডিসগাস্টিং— বলেই বাথরুমে ঢুকে গেল কল্পতরু। যেতে যেতে বলল, আমাদের বাড়ির ঝুট ঝামেলা কি তোমার দাদারা সামলাবেন এসে? রিমা এই কথার জবাব দিল না। জানে জবাব দিলে তর্ক আরও বেড়ে যাবে। মায়ের কাছে শুনেছিল, একজন রেগে গেলে অন্য জনকে চুপ করে যেতে হয়। তাহলেই আর ঝগড়াটা এগোয় না।

(ক্রমশ…)

খুশকির সমস্যা থেকে মুক্তি পাব কীভাবে?

আমি একজন অভিনেত্রী। আমার বয়স ২৮ বছর। আমি প্রচণ্ড খুশকির সমস্যায় ভুগি। সবসময় ত্বকে এবং জামাকাপড়েও খুশকি লেগে থাকে। স্ক্যাল্পেও অনেক সময় কিছুটা জায়গা নিয়ে খুশকির একটা পরত পড়ে যায়। শীতকালে এই সমস্যা আরও বৃদ্ধি পায়। এর থেকে মুক্তি মুক্তি পাব কীভাবে?

আপনার চিঠি পড়ে মনে হচ্ছে, আপনার খুশকির ধরন তৈলাক্ত। অনেক সময় ফাংগাল ইনফেকশন থেকেও স্ক্যাল্পে খুশকির প্রকোপ বাড়ে। এর চিকিৎসা হিসেবে ত্বকের প্রকার বুঝে অ্যান্টিড্যানড্রাফ শ্যাম্পু ব্যবহার করুন। মাথার ত্বক পরিষ্কার রাখা উচিত এবং অয়েলি ত্বকে রোজ শ্যাম্পু করার প্রয়োজন। সপ্তাহে দু’বার স্ক্যাল্পে হট অয়েল মাসাজ করুন এবং তোয়ালে জড়িয়ে গরম ভাপ নিন। সমস্যা বাড়লে ত্বক বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।

আমি আধুনিকা এবং অফিসে কর্মরতা। নিয়মিত আমাকে পার্টি অ্যাটেন্ড করতে হয়। খোলামেলা পোশাক পরতে পছন্দ করি। কিন্তু নিয়মিত বডি পলিশিং করা সম্ভব হয়ে ওঠে না। ত্বক উজ্জ্বল রাখতে চাই। ত্বক উজ্জ্বল করার কোনও উপায় থাকলে জানান৷

সবথেকে আগে, শরীরের যেসব অংশ পোশাকে ঢাকা পড়ে না, সেগুলো স্নান করার সময় স্ক্রাবার দিয়ে ঘষুন। বিশেষ করে বাহু এবং বাহুমূল। নিয়মিত ঘষে পরিষ্কার রাখলে ত্বক আগের থেকে পরিষ্কার হয়ে উজ্জ্বল দেখাবে। পার্টিতে যাওয়ার আগে দেহের খোলা অংশে হ্যান্ড অ্যান্ড বডি লোশন ব্রোঞ্জর মিশিয়ে লাগান। এতে ত্বকের খোলা অংশ উজ্জ্বল দেখাবে।

লিপস্টিক বাছতে হলে আমি কনফিউজড হয়ে যাই, কোন রং বাছব! কী করে বুঝব কোন রং-এর লিপস্টিক আমাকে মানাবে?

চিঠিতে আপনার বয়স এবং গায়ের রং জানাননি। তবে লিপস্টিকে রেড কালারের শেড কখনও আউট অফ ফ্যাশন হয় না। আপনি স্টাইল মেনটেন করতে চাইলে রেড থেকে মেরুন যে-কোনও শেড কিনতে পারেন। সব রঙের জামাকাপড়ের সঙ্গে এই রং ম্যাচ করবে। তবে বয়স বেশি হলে হালকা শেডই ব্যবহার করা ভালো।

কয়েকদিনের মধ্যেই আমার বিয়ে। এখন আমাদের বাঙালিদের মধ্যেও মেহেন্দি লাগাবার ফ্যাশন শুরু হয়েছে। আমিও চাই মেহেন্দি লাগাতে কিন্তু ট্র্যাডিশনাল ডিজাইন ছাড়াও মেহেন্দিতে আর কী ধরনের ডিজাইন করানো যায়?

আগেকার দিনে শুধু, হাতেই মেহেন্দি লাগাত মেয়েরা। এই ট্রেন্ড-এ এখন পরিবর্তন এসেছে। হাতে এবং পায়ের সঙ্গে সঙ্গে সারা শরীরেই মেহেন্দি লাগানোর ফ্যাশন এখন ইন। এর জন্য বাজারে এসেছে ট্যাটু মেহেন্দি। এই মেহেন্দির সৌন্দর্য বাড়াবার জন্য রঙিন স্টোন্স-এর ব্যবহারও করা হয়। হাতে মেহেন্দি দিয়ে, হবু দম্পতির নামের সঙ্গে ডিজাইনের সামঞ্জস্য করে আঁকা এখন খুবই জনপ্রিয় হয়েছে। তাই যদি চান, আপনি এই ডিজাইনটা ট্রাই করে দেখতে পারেন। ভালোই মানাবে বলে মনে হয়।

ছোটোদের জন্য দীপাবলির বিশেষ উপহার

দীপাবলি মানেই উপহার এবং মিষ্টান্নের আদান-প্রদান। কিন্তু কারও জন্য উপহার কেনাটা খুব সহজ কাজ নয়। সব সময় উপহার দিতে গিয়ে মনে হয় নতুন কিছু করা বা কেনা দরকার। কিন্তু করতে গিয়ে কাজটা খুব সহজ হয় না। পরিচিত, আত্মীয়, বন্ধুবান্ধবদের উপহার কিনতে গিয়ে সেই জামাকাপড়, ড্রাই ফ্রুটস, মিষ্টি ইত্যাদি ছাড়া আমরা আর কিছু ভাবতে পারি না। বাচ্চাদের পছন্দকে তো আমরা গুরুত্বপূর্ণ মনেই করি না! অধিকাংশ সময়েই আমরা ছোটোদের উপহার নিয়ে মাথা ঘামাই না। অথচ দীপাবলির মতো বিশেষ উৎসবে একটা ছোটো উপহারও শিশুদের আনন্দে ভরিয়ে তুলতে পারে। উপহার যে সবসময় কোনও জিনিস হতে হবে, তার কোনও মানে নেই।

ঈশিতার মা একজন সিংগল মাদার। তিনি একটি বড়ো কোম্পানিতে ভালো পদে চাকরি করেন। পাঁচ বছরের মেয়ের কোনও ইচ্ছাই অপূর্ণ রাখেন না। অনেকদিন ধরেই তিনি লক্ষ্য করছিলেন, ছোট্ট ঈশিতা কোথাও কোনও গান বাজলেই আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের মতো নাচতে থাকে অথচ বাড়িতে আর কেউ নাচ জানে না। ঈশিতার মায়ের মনে হয়েছিল মেয়ের নাচের প্রতি বিশেষ। ভালোবাসা রয়েছে। ফলত তিনি মেয়েকে বাড়ির কাছেই একজন ভালো কত্থক ডান্সারের কাছে ভর্তি করিয়ে দিয়েছেন ঠিক দীপাবলির আগেই।

ঈশিতা যখন জানতে পেরেছে এটাই মায়ের তাকে দেওয়া দীপাবলির গিফ্ট, তখন ও এতটাই আনন্দ পেয়েছে, যা সে জীবনে আর কখনও পায়নি।

পছন্দের উপহার

ধীরাজ ভট্টাচার্যের দুই ছেলে। ছোটো ছেলে জয় ১৭ বছরের , রান্নার প্রতি অসম্ভব আকর্ষণ। এই বয়সেই একজন দক্ষ রাঁধুনে হয়ে উঠেছে ও। ইচ্ছে হলেই রান্নাঘরে গিয়ে নিজের মতন কিছু রান্না করে সকলের সামনে পরিবেশন করে। যে-পদটি রান্না করে সেটি দেখতে যতটা লোভনীয় হয়, খেতেও ঠিক ততটাই সুস্বাদু। মা-বাবার উৎসাহে জয় ইনস্টাগ্রাম এবং ইউটিউবে নিজের চ্যানেল খুলেছে যেখানে তার তৈরি প্রতিটি রান্নার পদ সকলের সাথে শেয়ার করে। এটা দারুণ সমাদৃত হচ্ছে।

ধীরাজ ছেলের ট্যালেন্টকে আরও উৎসাহ দিতে দীপাবলির উপহার হিসেবে ওকে ওর পছন্দের সেলিব্রিটি কুক-এর কুকারি ক্লাসে ভর্তি করে দিয়েছেন। এতে জয়ও খুব খুশি কারণ তার পরিবারের সদস্যরা সকলে তার গুণের কদর করছে। ধীরাজও মনে মনে জানেন, ছেলে যদি এই ফিল্ডে ভবিষ্যতে এগিয়ে যেতে চায়— তাহলে এটাই হবে ওর লক্ষ্যের দিকে প্রথম এবং সঠিক পদক্ষেপ। কলকাতায় শান্তনু মুখার্জি এবং রিচার ছোটো মেয়ে রুমি, হায়ার সেকেন্ডারি তে হিউমানিটি সাবজেক্ট-এ ৯৯ শতাংশ নম্বর নিয়ে পাশ করেছে। এছাড়াও সিইউইটি (কিউট)-এর পরীক্ষায় ‘বেস্ট ফোর’ বিষয়ে ১০০ শতাংশ নম্বর পেয়েছে। স্কুলে রুমি বরাবরই টপার ছিল। সুতরাং এই দীপাবলিতে ওর জন্য সুন্দর একটি উপহার মা-বাবার থেকে প্রা প্য বটেই।

উপহার একটাই কিন্তু কাজ দুটো

রুমির সাফল্যে শান্তনু আর রিচা ঠিক করেন মেয়েকে ভালো ক্যামেরা-যুক্ত মোবাইল ফোন উপহার দেবেন দীপাবলিতে। কারণ রুমির ছবি তোলার শখ প্রচণ্ড। পাবলিক বাসে, ট্রামে মেয়েকে এখন ট্রাভেল করতে হবে। ফলে মোবাইল সঙ্গে থাকাও জরুরি। ওই একই মোবাইল দিয়ে সে নিজের শখও পূর্ণ করতে পারবে।

যে-কোনও উৎসবেই মানুষ নিজের বাজেট অনুযায়ী খরচ করে। কিন্তু যদি বাচ্চার জন্য কোনও গিফ্‌ট কিনতে হয় তাহলে বাচ্চার পছন্দ এবং প্রয়োজনের কথাটাও মাথায় রাখা উচিত।

ভালোবাসায় মোড়া উপহার

বাচ্চা ট্যালেন্টেড হলে তবেই সে স্পেশাল গিফ্ট পাওয়ার যোগ্য এমনটা কিন্তু ঠিক নয়। যে-কোনও উৎসবেই বাচ্চাকে উপহার থেকে বঞ্চিত রাখা উচিত নয়। তাকে তার নিজের পছন্দের বই, ম্যাগাজিন, চকোলেট ইত্যাদি কিনে দিতে পারেন— এতে পড়ার প্রতিও তার আগ্রহ বাড়বে। এখন বই পড়া মানেই বেশিরভাগই স্কুল কলেজের টেক্সট বইয়ের চাহিদামতো জ্ঞান সীমিত রাখা। হায়ার এডুকেশনও অনেক সময় কোনও কাজে আসে না। গল্পের বই তাকে এক অন্য ভুবনে এনে ফেলবে।

আসলে উৎসবেই সুযোগ ঘটে সকলের সঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার। বাচ্চাদের উৎসব ভালো লাগে কারণ নিজের প্রিয়জনদের কাছ থেকে পাওয়া উপহারে ভালোবাসার ছোঁয়া লুকিয়ে থাকে।

ভারতের অন্যতম জনপ্রিয় উৎসব হল দীপাবলি। এটি সংস্কৃত শব্দ থেকে উদ্ভূত এবং এর অর্থ হল সজ্জিত প্রদীপের সারি। দীপাবলি মানেই অন্ধকারের উপর আলোর আধিপত্য, অজ্ঞতার উপর জ্ঞান, হতাশার উপর আশা এবং খারাপের উপর ভালোর জয়। অথচ এই সময় শব্দদূষণ, বায়ুদূষণের প্রকোপে ক্ষতিগ্রস্ত হয় শহর এবং পরিবেশ। শব্দদূষণ, উৎসবের সঙ্গে শব্দবাজির তাণ্ডবের মেলবন্ধন বর্তমানে প্রকৃতির জন্য ভাবনার বিষয়। সকলকে সোচ্চার হতে হবে দূষণ প্রতিরোধে। তাই বাচ্চাদের হাতে শব্দবাজি উপহার হিসেবে তুলে না দিয়ে, আসুন উৎসবকে পরিবেশবান্ধব ও সুন্দর করে তুলি। এই উপলক্ষ্যে ভেষজ পণ্য উপহার হিসেবে বাছতে পারেন। উপভোগ করুন দীপাবলি— তবে শব্দে নয়, আলোয়।

পড়ার জন্য সীমাহীন গল্প-নিবন্ধসাবস্ক্রাইব