ভালো অভিভাবক হবেন কীভাবে?(পর্ব-০১)

সন্তানের জন্মের পর থেকে অভিভাবকত্ব চালিয়ে যেতে হয় আজীবন। মনে রাখবেন, ভুল অভিভাবকত্ব সন্তানকে মানসিক বিকারগ্রস্ত করে তুলতে পারে, এমনকী সন্তানের জীবনহানিও ঘটতে পারে। তাই অভিভাবকত্বের বিষয়টি ভীষণ চ্যালেঞ্জিং। ভালোবাসা এবং শাসনের মধ্যে সামঞ্জস্য রেখে কীভাবে ভালো অভিভাবক হয়ে উঠবেন, সেই বিষয়ে তুলে ধরা হচ্ছে মনোবিদদের পরামর্শ।

ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট অপরূপা ওঝা বক্তব্য এবং পরামর্শ:

O ভারতীয় অভিভাবকরা শিশুদের শুধু শাসন করে অভিভাবকত্ব ফলান। কিন্তু যদি অভিভাবকরা শিশুদের সঠিক আচরণের জন্য পুরস্কৃতও করেন, তাহলে এতে সুফল পাওয়া যাবে।

O সন্তানের কাছ থেকে অযৌক্তিক প্রত্যাশা থাকলে, সন্তান ভারাক্রান্ত হয়ে উঠার সম্ভাবনা থাকে। যেমন— এক্ষেত্রে আপনার সন্তান আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলতে পারে এবং মানসিক চাপের মধ্যে পড়তে পারে, যা তার শারীরিক এবং মানসিক স্বাস্থ্যের উপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে। তাই সন্তানকে স্বাধীনতা দিন, তার যা ভালো লাগে তা করতে দিন। এক্ষেত্রে দেখে নেবেন সে যেন ভুল পথে পা না রাখে।

O অনেক অভিভাবক শিশুর আবেগকে অবহেলা করেন। যেমন— ছেলেদের কাঁদতে নেই’ ধরনের যুক্তি দিয়ে থাকেন। কিন্তু যখন অভিভাবকরা সন্তানের আবেগের যত্ন নেন না, তখন তারা প্রায়শই নিজেকে অবাঞ্ছিত এবং অযোগ্য মনে করে। এছাড়াও তারা অভিভাবকদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রাখতে পারে না। এর ফলে সে ধীরে ধীরে খুব একা এবং অসহায় মনে করে নিজেকে। অতএব, সন্তানের সুখ-দুঃখের কথা শুনুন মন দিয়ে এবং বন্ধুর মতো তাকে সুপরামর্শ দিন।

O কিছু অভিভাবক শুধু সন্তানের ভুলগুলি তুলে ধরেন কিন্তু তার বুদ্ধি এবং প্রতিভার প্রশংসা করেন না। এটি শিশুর আত্মসম্মানের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে এবং তারা নিজের সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা গড়ে তুলতে পারে। ফলে বিষয়টি মানসিক অসুস্থতার অন্যতম কারণ হতে পারে। তাই খোলা মনে সন্তানের প্রশংসা করুন ভালো কিছু করলে। এতে আপনার সন্তান উৎসাহিত হবে।

সন্তানকে অন্যদের সঙ্গে তুলনা করবেন না। এর ফলে আপনার সন্তানের মনে ঘৃণা এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতার মানসিকতা গড়ে উঠতে পারে, যা কাম্য নয়। বরং আপনার সন্তানকে চাপমুক্ত থাকার পরামর্শ দিন এবং নিজের মতো করে গড়ে উঠতে দিন— এর ফল ভালো হবে।

O অনেক অভিভাবক সন্তানের রাগের কাছে আত্মসমর্পণ করেন, যা তার খারাপ আচরণকে বাড়িয়ে তুলতে পারে। অভিভাবকদের উচিত সন্তানের চাহিদা মাথায় রেখে তার প্রয়োজন মেটানো। সে যাতে অপ্রয়োজনীয় দাবি না করে, সেই শিক্ষা দিন বন্ধুর মতো।

O কিছু অভিভাবক যারা অতিরিক্ত সুরক্ষামূলক, সন্তান ভুল করলেও প্রায়শই সব বিষয়ে সন্তানকে তারা রক্ষা করার চেষ্টা করেন। এর ফলে আপনার সন্তানের মধ্যে সঠিক শাসনের অভাব তৈরি করতে পারে এবং লাগামছাড়া করে তুলতে পারে। আর একবার যদি লাগামছাড়া হয়ে ওঠে, তাহলে অপরাধমূলক মানসিকতাও তৈরি হতে পারে। তাই বন্ধুর মতো এমন ভাবে হালকা শাসন করুন প্রয়োজনে, যাতে সে তার ভুল বুঝতে পারে এবং দুঃখ প্রকাশ করে নিজের ভুলগুলি শুধরে নেয়।

(ক্রমশ…)

সামান্য দেরিতে (পর্ব-০২)

একদিন প্রবচন চলাকালীন, অজান্তে করা পাপের পরিণাম কী হতে পারে তাই নিয়ে আলোচনা করছিলেন শম্ভুনাথজি। তাঁর কথা শুনে একতা চিন্তিত হয়ে পড়ে। ওর খালি মনে হতে থাকে ওর শিশুর মৃত্যুর জন্য অজান্তে করা তার নিজেরই কোনও পাপ-ই নিশ্চিত ভাবে দায়ী। শম্ভুনাথের প্রতিটা কথার জাদু একতাকে একরকম বশ করে নেয় এবং বাবাজির দেখানো রাস্তায় চলাটাই একতার কাছে সঠিক বলে মনে হতে থাকে।

আজ হঠাৎ-ই, সৎসঙ্গ প্রসঙ্গে প্রতীকের এই প্রশ্নটা একতার কাছে কুরুচিকর বলে মনে হল। ওর মনে হল যে, প্রতীক সবসময় ওর সিদ্ধান্তকেই সমর্থন করে এসেছে। আজ তাহলে প্রতীক ওকে নিয়ে যেতে চাইল না কেন? এই প্রথমবার সৎসঙ্গ যাওয়ার ব্যাপারে একতা দ্বিধান্বিত বোধ করল। সন্ধে অবধি প্রতীকের না-ফেরা পর্যন্ত একটা অস্থিরতার মধ্যে একতার সময় কাটতে লাগল। রাতের খাবার খেয়ে দুজনেই বিছানায় গা এলিয়ে দিয়ে নিজের নিজের চিন্তায় মগ্ন হয়ে রইল। হঠাৎ-ই নিস্তব্ধতা ভঙ্গ করে প্রতীক বলে উঠল, ‘আলমারিতে অনেক পুরোনো কাপড়-জামা জমেছে, সেগুলো কাজের মাসিকে দিয়ে দেব ভাবছি।”

—হ্যাঁ, অনেক নতুন জামাকাপড় কেনা হয়ে গিয়েছে, পরার তো জায়গাই পাই না। নতুন নতুন তাও পরা হয়, পরে পড়েই থাকে। কালই দিয়ে দেব। আচ্ছা শোনো কথায় কথায় মনে পড়ল, কাল আমাকে একটু টাকা দিও। আমাদের সৎসঙ্গ ভবনে গ্রুপ থেকে কিছু অর্থ সাহায্য দেওয়া হবে। শম্ভুনাথজি বলেছিলেন, দান করলে শুধু এই জীবনেই নয়, পরের জন্মেও কষ্ট আশেপাশে ঘেঁষতে পারবে না।

—একতা, তুমি নিজের জন্য খরচ করো আমার কোনও আপত্তি নেই। আপত্তি তো ছাড়ো বরং আমি চাই তুমি আনন্দ, ফুর্তি করো, খুশিতে থাকো। কিন্তু এই বাবাজির চক্করে টাকা বরবাদ করাটা আমার একেবারেই ঠিক বলে মনে হচ্ছে না।

গ্রুপে বন্ধুদের তাহলে আমি কী বলব? উদাস হয়ে একতা জিজ্ঞেস করল।

—আমার মনে হয় ওদেরকেও তোমার সঠিক পথ দেখানো উচিত।

প্রতীকের কথা শুনে একতা নিরুত্তর থাকাই শ্রেয় মনে করল।

একতার গ্রুপের সদস্যরা শম্ভুনাথজিকে টাকাপয়সা দেওয়া ছাড়াও ফল-মিষ্টি ইত্যাদি অনেক কিছুই পাঠায়। একতাই শুধু চুপচাপ দেখত, কারণ হাজার বলা সত্ত্বেও প্রতীক কিছুতেই দান করার জন্য একতার হাতে টাকা দিত না। একতাও প্রতীকের ব্যবহারের কোনও অর্থ খুঁজে পেত না। অথচ প্রতীক বাড়ির পরিচারিকাকে জামাকাপড়, খাবার, কম্বল কিনে দিয়ে যেমন সাহায্য করত তেমনি ড্রাইভারের একমাত্র সন্তানের পড়াশোনার খরচ জোগাতেও কোনওরকম কার্পণ্য দেখাত না। কিন্তু দান, পুণ্যার্জন, এসবের উপর প্রতীক একেবারেই বিশ্বাস রাখত না।

এদিকে শম্ভুনাথজি হোয়াট্সঅ্যাপ গ্রুপ বানিয়ে বিভিন্ন উৎসব অনুষ্ঠানে দান করার জন্য গ্রুপে মেসেজ পাঠাতে থাকতেন। প্রত্যেকটি মেসেজেই দান করার কী মাহাত্ম্য, সবিস্তারে লেখা থাকত। সুখ, শান্তি, পাপ থেকে মুক্তির জন্য দান-দক্ষিণা দেওয়াটা যে কতটা জরুরি সেটা পরিষ্কার ভাবে মেসেজে বোঝানো থাকত।

গ্রুপের সদস্যদের মধ্যে একটা যেন প্রতিযোগিতার মনোভাব কাজ করত—। কে কতটা বেশি বাবাজিকে দান করতে পারে, যাতে নিজের সঙ্গে সঙ্গে পুরো পরিবারের সদস্যদের উপর বাবাজির আশীর্বাদ, বর্ষিত হতে পারে। একতাও চেষ্টা করত নানা ছুতোয় প্রতীকের থেকে টাকা নিয়ে সেটা বাবাজিকে দিতে। এটা একতার কাছে দোষের মনে হতো না কারণ ওর মনে এটাই ছিল যে এতে কোনও বিপদআপদ প্রতীককেও ছুঁতে পারবে না। সৎসঙ্গে বিভিন্ন আলোচনায় একতা মাঝেমধ্যে ভীত হয়ে উঠত এই ভেবে যে, ভাগ্যের চাকা যদি ব্যক্তিকে খারাপ দিন এনে দেয় তাহলে তাকে কতটা কষ্ট সহ্য করতে হয়। মনে মনে একতা শম্ভুনাথজির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার জন্য বান্ধবীদের ধন্যবাদ জানাত। ওর মনে হতো নয়তো এতদিনে ওকে নরকবাস ছিল অবধারিত।

একদিন অফিস থেকে ফিরতেই প্রতীকের মুখ দেখেই একতা বুঝল কিছু ভালো খবর আছে। জানতে পারল প্রতীকের প্রমোশন হয়েছে। চা-জলখাবার খেয়ে প্রতীক একতাকে তৈরি হয়ে নিতে বলল, রাত্রে বাইরে ডিনারে নিয়ে যাবে বলে।

রেস্তোরাঁর ডিম লাইটে বসে খাবার খেতে খেতে দুজনে ভবিষ্যতের স্বপ্নে বুঁদ হয়ে রইল। প্রতীক জানাল ও নিজেদের বড়ো একটা ফ্ল্যাট কেনার মনস্থির করে ফেলেছে। খুশিতে একতার সুন্দর মুখ আরও ঝলমলিয়ে উঠল।

প্রতীক খাবার শেষে মিষ্টি অর্ডার করবে বলে মেনু কার্ড দেখতে লাগল। একতাও মোবাইলে নতুন মেসেজগুলো পড়তে লাগল। শম্ভুনাথজিরও মেসেজ ছিল একটা। তাঁর মেসেজের বিষয়টি ছিল যে, কোনও কিছু ভালো হতে যাচ্ছে তার উপর লোকেদের কুনজর পড়ে এবং এর ফলে প্রায় হয়ে যাওয়া কাজও বরবাদ হতে দেরি লাগে না।

এটা কাটানোর উপায় অর্থ বা জিনিসের মাধ্যমে কুনজর কাটিয়ে সেটা দান করে দেওয়া। এতে অশুভ দোষ ওই জিনিসের সঙ্গে দান হিসেবে চলে যায়। গ্রুপের অনেকেই নিজেদের অভিজ্ঞতাও ওখানে শেয়ার করেছেন— কীভাবে তাদের জীবনেও কিছু ভালো ঘটার প্রাকমুহূর্তে, হঠাৎই তাদের অপ্রিয় ঘটনার সম্মুখীন হতে হয়েছে। ফোনের মেসেজ দেখতে দেখতে চিন্তায় ডুবে গিয়েছিল একতা। হঠাৎ খেয়াল করল প্রতীক ফোনে কারও সঙ্গে কথা বলছে।

সামান্য দেরিতে (পর্ব-০১)

সকাল থেকে বৃষ্টি বন্ধ হওয়ার নাম নেই। একতা কী করবে বুঝতে পারছিল না। স্বামী প্রতীক-কে ঘরে ঢুকতে দেখে বলল, ‘আমাকে প্লিজ একটু শোভাবাজারে সৎসঙ্গ ভবনে ছেড়ে দেবে? এত বৃষ্টি পড়ছে যে গাড়ি ছাড়া বেরোবার উপায় নেই!’

প্রতীক একতার কথায় একটু অবাক হল। জিজ্ঞেস করল, ‘সৎসঙ্গ? তুমি কবে থেকে আবার সৎসঙ্গ, প্রবচন — এসবে যাওয়া আরম্ভ করেছ? আমি দু’বছর ধরে যে একতাকে জানি সে তো জিম, বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে কিটি পার্টি— এসব করতেই ভালোবাসে। স্বামীর প্রিয়া হয়ে তার সারাদিনের ক্লান্তি দূর করে! সৎসঙ্গে কবে থেকে তোমার আগ্রহ জন্মাল? বাড়িতে বসে থাকতে যদি ভালো না লাগে, আমার সঙ্গে অফিস গিয়ে পুরোনো কাজ আবার নতুন করে সামলানো আরম্ভ করতে পারো। আমার তাতে আনন্দ হবে। এই সব সৎসঙ্গ সাধু-সন্ন্যাসীর চক্কর ছাড়ো।’

একতার গালে একটা চুম্বন এঁকে অফিসের ব্যাগটা হাতে নিয়ে দরজার দিকে এগোতে এগোতে প্রতীক বলল, ‘সন্ধেবেলায় ফিরে এসে তোমার হাতের মশলা চা আর গরম পকোড়া খাবো।’

প্রতীক বেরিয়ে যেতেই, একতা মেসেজ করে বান্ধবী রিক্তাকে জানিয়ে দিল যে, ও আজ সৎসঙ্গ যেতে পারবে না। আশাহত হয়ে বাইরের জামাকাপড় বদলে একতা খবরের কাগজটা হাতে করে বিছানায় এসে বসল। খবরের কাগজের পাতা ওলটাতে ওলটাতে নিজের পুরোনো দিনের কথাও মনে পড়তে আরম্ভ করল। দু’বছর আগে প্রতীকের সঙ্গে ওর বিয়ে হয় এবং প্রতীককে পেয়ে যেন ওর স্বপ্ন সত্যি হয়েছে। প্রতীক সেক্টর ফাইভে একটি মাল্টি ন্যাশনাল কোম্পানিতে অফিসার র‍্যাংকে কাজ করত আর একতা সেখানে এইচআর-এর কর্মী ছিল। প্রতীককে দেখতে সাধারণ হলেও ওর মধ্যে অনেক গুণ ছিল।

একতার চেহারা এবং সৌন্দর্য অপরকে খুব সহজেই আকর্ষণ করত। ফরসা রং, নীল চোখের মায়াবী দৃষ্টির মোহ সহজে কেউ এড়াতে পারত না। প্রতীকের সঙ্গে আলাপ হতেই দু’জনের মধ্যে একটা রসায়ন কাজ শুরু করে। আলাপ, তার পরেই প্রেম এবং কিছুদিনের মধ্যে উভয়ের পারিবারিক সম্মতিতে বিয়ের পিঁড়িতে বসা।

প্রতীকের মতো স্মার্ট, বুদ্ধিমান ছেলেকে স্বামী হিসেবে পেয়ে একতার জীবন সার্থক হয়ে গিয়েছিল। একতা নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে। বাবা খুবই সাধারণ চাকরি করতেন একটি মারোয়াড়ি ফার্মে। বাড়িতে মা-বাবা ছাড়াও দাদা বউদি ছিলেন। স্নাতক হওয়ার পর একতা অফিস ম্যানেজমেন্টে ডিপ্লোমা করে এইচআর-এর চাকরিটা পেয়েছিল।

প্রতীকও মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে। ওরা তিন ভাই। বড়ো দাদা শেয়ার কেনা-বেচা করে সেরকম একটি ছোটো কোম্পানিতে চাকরি করতেন আর ছোটো ভাই ব্যাংকের অফিসার ছিল। ওর যখন বিয়ে হয় মা-বাবা কেউই বেঁচে নেই। বিয়ের আগে ভাইদের সঙ্গে প্রতীক সন্তোষপুরে নিজেদের বাড়িতেই থাকত। একতার সঙ্গে বিয়ে হওয়ার পর লেকটাউনে একটি দু-কামরার ফ্ল্যাট ভাড়া করে চলে আসে।

বিয়ের পর একতা যথেষ্ট সুখী ছিল। প্রতীক ভালো রোজগার করত উপরন্তু প্রতীকের একটা বড়ো গুণ ছিল সে কখনও সম্পর্কের মধ্যে নিজের পদ বা টাকা পয়সার অহংকারকে আসতে দিত না। ধনী, গরিব সব ধরনের ব্যক্তিকেই ও সমান সম্মান দিত।

একতা ভেবেছিল, বিয়ের পর প্রতীক ওকে আর চাকরি করতে দেবে না। কারণ অফিসারের বউ হলে ওর অধীনস্থ কর্মচারীদের সঙ্গে একতার কাজ করাটা হয়তো প্রতীকের পছন্দ না-ও হতে পারে। কিন্তু প্রতীক একতাকে চাকরি ছাড়তেও বলেনি এবং অফিসে একতার প্রতি ব্যবহার ওর আগের মতোই ছিল।

এক বছরের মধ্যেই একতা সন্তানসম্ভবা হলে ওর শরীর খারাপ থাকতে আরম্ভ করল। হাই ব্লাড প্রেশার থাকার দরুন একতা চাকরি ছাড়তে বাধ্য হল। বাড়িতে সবসময়ের কাজের লোক আগে থেকেই ছিল, ফলে একতার সময় বেশিরভাগই ফেসবুক আর হোয়াট্স অ্যাপ করেই কেটে যাচ্ছিল। তবুও ওর শরীর ঠিক হচ্ছে না দেখে প্রতীক ওকে ডাক্তার দেখাবার জন্য জোর দিতে লাগল। কিন্তু একতা হোয়াট্স অ্যাপ গ্রুপে দেওয়া ঘরোয়া টোটকাই মানতে শুরু করল।

এর ফলে একতার শরীর আরও খারাপ হতে লাগল। একদিন জোর করেই প্রতীক ওকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেল। ডাক্তারের কথামতো চলাতে শরীর কিছুটা ঠিক হলেও, সময়ের আগেই ওর ডেলিভারি করাতে হল এবং বাচ্চাটিকেও বাঁচানো সম্ভবপর হল না। একাকিত্ব পেয়ে বসল একতাকে। একতার অবস্থা দেখে প্রতীক ওকে আবার কাজে জয়েন করতে বললেও, একতা কিছুতেই রাজি হল না।

প্রতিবেশী রুপালি, একতার সোসাইটির মহিলাদের গ্রুপে একরকম জোর করেই জয়েন করাল যাতে ওর একাকিত্ব কিছুটা হলেও কাটে। গ্রুপে সকলেই শিক্ষিত, ফলে একতারও ওদের সঙ্গে ভালোই সময় কাটত। গ্রুপ ডিসকাশন, পার্টি, পিকনিকে যাওয়া, একসঙ্গে মিলে কোথাও বেড়াতে যাওয়া। এসবের সঙ্গে শম্ভুনাথ নামে এক বাবাজির সৎসঙ্গেও গ্রুপের সদস্যরা একত্রিত হতো। পুরাণের নানা গল্প শোনাতেন বাবাজি যার থেকে মানসিক শান্তির খোঁজ পাওয়া যেতে পারে। এছাড়াও বাবাজির কথা, ‘শান্তির খোঁজ পেতে হলে দানধ্যান করাটা সবথেকে ভালো উপায়’ –এমনটাই সকলের মনে গেঁথে গিয়েছিল। অন্যান্যদের মতো একতাও ভাবতে শুরু করেছিল যে সামর্থ্য অনুযায়ী কিছু অর্থ শম্ভুনাথজিকে দান করলে জীবন সফল হয়ে যাবে, হারিয়ে যাওয়া খুশি আবার ফিরে আসবে।

উৎসবে মহাভোজ

শিউলি ফুলের গন্ধ নিয়ে শুরু হল আবেগ-উচ্ছ্বাসের শারদোৎসব। নতুন জামা-প্যান্ট, শাড়ি-সালোয়ার আর প্রসাধনে সাজ-পোশাক সম্পূর্ণ করে সবাই মেতে উঠতে শুরু করেছেন এই উৎসবে। মহা-মিলনের এই উৎসবে মণ্ডপ পরিক্রমা ছাড়াও জমবে আড্ডা আর খাওয়া।

এমন অনেকে আছেন, যারা উৎসবের কয়েকদিন বাড়িতে রান্না-র ঝামেলা নিতে চান না। পরিবর্তে, আর্থিক সামর্থ্য অনুযায়ী খাওয়ার জন্য বেছে নেন পছন্দের রেস্তোরাঁ। অনেকে আবার সারা বছর একটু-একটু করে টাকা জমিয়ে রাখেন বড়ো রেস্তোরাঁয় খাওয়ার ইচ্ছেপূরণের কথা মাথায় রেখে।

ভুরিভোজের জন্য যথেষ্ট খোঁজখবরও রাখেন অনেকে। কোথায় নতুন কী পদ পাওয়া যাবে, তার আগাম খবর সংগ্রহ করে তবেই সিদ্ধান্ত নেন তারা।

কেউ খেতে চান ইন্ডিয়ান, কেউ চাইনিজ, আবার কেউ চান মোঘলাই খাবার খেতে। লাইভ কাউন্টার থেকে গরম খাবার খেতেও ভালোবাসেন অনেকে। কলকাতা-র ‘দ্য ললিত গ্রেট ইস্টার্ন’ হোটেলের এক্সিকিউটিভ শেফ সুনয়ন  প্রামাণিক প্রসঙ্গত জানালেন, ‘শারদোৎসবে বেশিরভাগই খেতে আসেন দলবেঁধে। কিন্তু সবার পছন্দের খাবার এক হয় না। তাই সবার মন জয় করার জন্য উৎসবের ক’টা দিন সবরকম খাবারের আয়োজন করতে হয়। বাংলার গ্রামাঞ্চলের সুস্বাদু নস্টালজিক খাবারের সঙ্গে  রাখতে হয় রান্নার লাইভ কাউন্টারও। বেগুনের ভর্তা স্যালাড, ঝিঙে চিংড়ি’র মনোহোরা, চিতল মাছের মুইঠা, কচু লোতির চচ্চড়ি, ছানার মালাই কারি থেকে গাঁঠি কচু এবং কড়াইশুটির ভুনা পর্যন্ত, সমস্ত খাবারগুলি ঐতিহ্যগত ঘটি শৈলীতে নিখুঁতভাবে তৈরি করতে হয়। আবার মেনুতে পূর্ববাংলা স্পেশাল মাছের চোখা, গন্ধরাজ লেবু দিয়ে মাছের পিঠে, মোরগ রোস্ট স্যালাড এবং আরও অনেককিছুর আয়োজন করতে হয় এই সময়। শুধু তাই নয়, নিউমার্কেটের স্পেশাল চাট, পাও ভাজি কিংবা পানি পুরি-র কাউন্টারও রাখতে হয় সবাইকে খুশি করার জন্য।’

শুধু কি তাই? শেষ পাতে মালাই চমচম, মালাই টোস্ট, ছানার দুধপুলি কিংবা উত্তর বাংলার স্পেশাল খিরের এবং গুড়ের খাজাও পাবেন অনেক রেস্তোরাঁয়। মোটকথা, স্বাদে-আহ্লাদে জমিয়ে তোলা চাই শারদোৎসব। অবশ্য শুধু ভালো কিছু খাওয়ার কথা ভাবলে চলবে না, পকেটে গচ্ছিত রাখতে হবে ভালো পরিমাণ টাকাও। যেমন টাকা খরচ করতে পারবেন, সেই অনুযায়ী রসনা-তৃপ্ত করতে পারবেন। তবে মোটামুটি দেড় থেকে আড়াই হাজার টাকা খরচ করতে পারলে তবেই নামীদামী হোটেলের অভিজাত রেস্তোরাঁয় খাওয়ার সাধ মেটাতে পারবেন। তাহলে আর দেরি না করে, উৎসবের শুরুতেই কিছু টাকা সরিয়ে রাখুন সুস্বাদু খাবারের স্বাদ গ্রহনের জন্য।

শিল্প, ঐতিহ্য এবং নারীর ক্ষমতায়ন

সারা বছর মানুষ যে উৎসবের প্রতীক্ষায় থাকেন, সেই সেরা উৎসবটি হল–শারদোৎসব। মহা-মিলনের এই উৎসবে প্রকাশিত হয় মানুষের আবেগ-উচ্ছ্বাস। সমন্বয় ঘটে শিল্প এবং ঐতিহ্যের। শুধু তাই নয়, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং রুটিরুজির ব্যবস্থাও হয়। শিল্পীরা তাদের প্রতিভা প্রদর্শন করে কিছু অর্থ উপার্জনের সুযোগও পান।

আবেগের এই উৎসবে উদ্যোক্তারা যে যেমন পারেন অভিনব কিছু করে দেখানোর সুযোগও করে নেন। পরিবেশ সুরক্ষিত রাখার উদ্যোগও নেন অনেকে। কেউ-কেউ আবার উৎসাহী হয়ে ওঠেন সমাজসেবায়। অনেকে মুখে অন্ন তুলে দেন অনাথ কিংবা অসহায় শিশু-কিশোরদের। আবার শিল্প ও ঐতিহ্যেকে মাধ্যম করে নারীদের ক্ষমতায়নের সুযোগও করেন দেন অনেকে। ব্যক্তিগত ভাবে কিংবা সংস্থার পক্ষ থেকেও এই ধরনের উদ্যোগে শামিল হতে দেখা যায় শারদোৎসবকে উপলক্ষ্য করে।

সম্প্রতি নজরে এল এমনই এক উদ্যোগ। কলকাতা-র ৬৬টি পল্লীর শারদোৎসব প্রাঙ্গণে তুলে ধরা হল ‘স্পাইস আর্ট’ ক্যাম্পেইন। আর এই ‘স্পাইস আর্ট’ ক্যাম্পেইন-কে কথায়, গানে এবং নৃত্য প্রদর্শনের মাধ্যমে নয়নাভিরাম রূপ দিলেন মূলত নারীরাই। মহৎ এই উদ্যোগের আয়োজক ছিল আইটিসি-এর সানরাইজ স্পাইসেস। ‘স্পাইস আর্ট’ ক্যাম্পেইন চালু করার মাধ্যমে, শিল্প ও ঐতিহ্যকে তুলে ধরার পাশাপাশি, নারীদের ক্ষমতায়নের সুযোগও করে দেওয়া হল সম্প্রতি। তিরিশ ফুট লম্বা মশলার আর্ট ইনস্টলেশন করে ইতিমধ্যেই নজর কেড়েছেন শিল্পীরা।

এই আর্ট ইনস্টলেশনটি বাঙালি ঐতিহ্যকে জাগিয়ে তোলার মাধ্যম বলেই দাবী করেছেন আয়োজকরা।  চিত্তাকর্ষক সেন্টারপিসটি নারীদের শক্তি এবং প্রতিভাকে শ্রদ্ধা নিবেদন করে। শুধু তাই নয়, শারদোৎসব উপলক্ষ্যে শক্তির আরাধনায় ‘দুর্গোতিনাশিনী’ এবং ‘দশভুজা’ সংগীত আয়োজনের ব্যবস্থাও করেছেন উদ্যোক্তারা। এই গানগুলি নারীর ক্ষমতায়নকে আরও আবেগময় করে তুলেছে।

‘স্পাইস আর্ট’ ক্যাম্পেইন-এর আয়োজক সংস্থার পক্ষ থেকে পীযূষ মিশ্র জানিয়েছেন, ‘বাঙালির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ঐশ্বর্যকে সম্মান করতে হলে নারীর শক্তি এবং প্রতিভাকে সম্মান ও শ্রদ্ধা জানাতেই হবে। আর এই সম্মান জানানোর সেরা সময় হতে পারে শারদোৎসব।’

টেলিভিশন অভিনেত্রী তৃনা সাহা ভট্টাচার্য এই উদ্যোগের অংশ হতে পেরে আনন্দ প্রকাশ করেছেন। জানিয়েছেন, ‘স্পাইস আর্ট’ ক্যাম্পেইন-এ শামিল হতে পেরে আমি ভীষণ খুশি এবং রোমাঞ্চিত। কারণ এই উদ্যোগের মাধ্যমে, মহিলাদের শক্তি এবং প্রতিভাকে সম্মান জানানো হয়েছে। আমি নিশ্চিত যে, এই উদ্যোগের ফলে  মহিলারা আরও উৎসাহিত এবং অনুপ্রাণিত হবেন। সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে মাধ্যম করে নারীদের  ক্ষমতায়ন এবং সৃজনশীলতাকে মূল্য দেওয়ার জন্য আয়োজকদের ধন্যবাদ জানাই।’

জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত শিল্পী প্রীতম মাইতি-র শিল্প-নির্দেশনায় তৈরি করা হয়েছে এই ‘স্পাইস আর্ট’-টি। আর এই শিল্পকর্মটি আনুষ্ঠানিক ভাবে তুলে ধরার মুহূর্তে, নৃত্য প্রদর্শন করেন ৪০০জন নৃত্যশিল্পী।

নিউমোনিয়া-র সমস্যা এবং পরিত্রাণের উপায়

অনেকেই হয়তো জানেন যে, নিউমোনিয়া প্রতিহত করার জন্য নিউমোনিয়া-প্রতিরোধক ভ্যাকসিন নেওয়া যেতে পারে। কোভিড পরবর্তী সময়ে মানুষের মধ্যে নিউমোনিয়া-প্রতিরোধক ভ্যাকসিন নেওয়ার বিষয়ে সচেতনতাও বেড়েছে। কিন্তু ভ্যাকসিন নেওয়া সত্ত্বেও, নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হওয়া কিংবা জীবন-সংকটে পড়া অস্বাভাবিক কিছু নয়।

এই প্রসঙ্গে একটি বিষয় মনে রাখতে হবে যে, নির্দিষ্ট কিছু ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধেই কাজ করে নিউমোনিয়া-প্রতিরোধক ভ্যাকসিন। এছাড়া আরও এমন কিছু ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া বা ছত্রাক থাকে— যেগুলির মাধ্যমে নিউমোনিয়ার সংক্রমণ হতে পারে। যা সঠিক সময়ে উপযুক্ত ব্যবস্থা না নিলে, ভয়াবহ রূপও নিতে পারে। সেক্ষেত্রে একমাত্র কাজ করে অ্যান্টিবায়োটিক সহ অন্যান্য লাইফ সাপোর্ট সিস্টেম।

আধুনিক চিকিৎসাক্ষেত্রে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের ক্ষেত্রেও বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে হচ্ছে চিকিৎসকদের। যেমন— ‘অ্যান্টি মাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স’। আমাদের দেশে বর্তমানে অ্যান্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ ব্যবহার বেড়েছে। বহুক্ষেত্রে দেখা যায়, কোনওরকম সংক্রমণ না হলেও, শুধু অনুমানের ভিত্তিতে অ্যান্টিবায়োটিকের অবাধ ব্যবহার হচ্ছে। কিংবা অনেক সময় অ্যান্টিবায়োটিক কম ডোজের এবং কম দিনের জন্যও খাওয়া হয়। যা আদতে সাময়িক ভাবে সুস্থ করলেও, খুবই ক্ষতিকারক। এতে জীবাণু সম্পূর্ণ ভাবে ধ্বংস হয় না। পরিবর্তে বার বার বিবর্তন ঘটিয়ে ওই নির্দিষ্ট অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে লড়াই করার ক্ষমতা অর্জন করে প্রতিরোধক ক্ষমতা বা রেসিস্ট্যান্স (Resistance) তৈরি করে ওই জীবাণু। তখন ওই নির্দিষ্ট অ্যান্টিবায়োটিক আর মানবদেহে কাজ করে না।

তাই, অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার সঠিক ভাবে করা না হলে, এক বা একাধিক ধরনের অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে ওই নির্দিষ্ট জীবাণুও গড়ে তুলতে পারে প্রতিরোধ ক্ষমতা। নিউমোনিয়া যেহেতু ভাইরাস, ব্যকটেরিয়া বা ছত্রাক সংক্রমণের ফলে হয়, তাই শরীরে এই ধরনের কোনও অসুবিধা থাকলে তা চিকিৎসার ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি করে। পরিস্থিতি জটিল হলে তখন ভেন্টিলেশনের মতো লাইফ সাপোর্ট ব্যবহার করা হয়।

ইতিমধ্যেই ঘরে ঘরে সর্দি কাশির প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। এই সময় সদ্যোজাত শিশু ও বয়স্কদের মধ্যে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার সংখ্যাও বাড়ে। Streptococcus pneumonia, Haemophilus in- fluenza, Maraxella Catarrhalis, Klebsiella -সহ নানাবিধ জীবাণুর প্রভাব এই রোগের কারণ।

নিউমোনিয়ার প্রধান লক্ষণগুলি হল— কাঁপুনি দিয়ে জ্বর আসা, কাশি, কফের সমস্যা এবং বুকে যন্ত্রণা। এছাড়াও বয়স্কদের ক্ষেত্রে আচমকা আচ্ছন্ন বা জ্ঞানহীন হয়ে পড়াও নিউমোনিয়ার লক্ষণ হতে পারে। আপাতদৃষ্টিতে একে হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোক বলে মনে হলেও, সিটি স্ক্যানে ধরা না পড়লে নিউমোনিয়া হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এছাড়াও শিশু ও বয়স্ক ব্যতীত যাদের শরীরে রোগ প্রতিরোধক ক্ষমতা কম, তারাও নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হতে পারেন। যারা দীর্ঘদিন ডায়াবেটিস, সিওপিডি, উচ্চ রক্তচাপ, এইডস, কিডনির অসুখে ভুগছেন— তাদের রোগ প্রতিরোধক ক্ষমতা কম থাকে।

তাই বেশ কিছু সাবধানতা আগে থেকে অবলম্বন করলে নিউমোনিয়া এড়ানো যেতে পারে। যেমন— শীতকালে মাথায় টুপি, মাফলার বা স্কার্ফ জড়িয়ে বাইরে বেরোনো। হঠাৎ করে ঠান্ডা লাগানো থেকে নিজেকে রক্ষা করা, মাথায় ঠান্ডা জলের ব্যবহার না করা প্রভৃতি। আর নিউমোনিয়ার প্রধান চিকিৎসাই হল অ্যান্টিবায়োটিক। তবে ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস বা ছত্রাকের দ্বারা এই সংক্রমণ হলে প্রতি ক্ষেত্রে আলাদা রকমের অ্যান্টিবায়োটিক ব্যাবহার করা হয়। যেমন— Streptococcus নিউমোনিয়ার ক্ষেত্রে পেনিসিলিন বা একই গোত্রের অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হয়। ছত্রাক দ্বারা সংক্রমণ হলে অ্যান্টি ফাংগাল ওষুধ দেওয়া হয়।

এর পাশাপাশি রোগীর ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ থাকলে তা নিয়ন্ত্রণে রাখা, রক্তে অক্সিজেনের পরিমাণ কমে গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া, হার্ট, ফুসফুস বা কিডনির সমস্যা থাকলে উপযুক্ত ব্যাবস্থা নেওয়া। পাশাপাশি রোগীর শরীরে অ্যান্টি মাইক্রোবিয়াল রেসিস্ট্যান্স থাকলে দ্রুত তা সনাক্ত করে ব্যবস্থা গ্রহণ করা ইত্যাদি।

ডা. অনির্বাণ সরকার, কনসালট্যান্ট পালমোনোলজিস্ট আইএলএস হসপিটাল, দমদম।

চোরের বদলা (শেষ পর্ব)

রাত যখন দুটো বাজে একটি ট্রেন জোরে হুইশেল বাজাতে বাজাতে স্টেশন ছাড়ে, ঠিক তখনই ব্যালকনির গ্রিল কেটে কাচের জানলা ভেঙে ঘরে প্রবেশ করে আরও একজন। সে দরজার সামনে এসে দেখে দরজা লক করা কিন্তু তালা অ্যাসিড দিয়ে নষ্ট করা। দরজায় নক করে তৃতীয় জন, ঠক্ ঠক্ ঠক্।

প্রথম চোর আওয়াজ শুনে— ক্যাডারে? ভূত-টুত নাকি! না এই বাড়ির লোক?

দ্বিতীয় চোর— দাঁড়া দেখতাছি! এগিয়ে দেখে দরজার সামনে পিঠে ব্যাগ নিয়ে আরও এক চোর হাজির।

দরজা খুলে প্রথম চোর বলে— তুইও কী চোর?

তৃতীয় জন— কেন কী মনে হইতাছে?

দ্বিতীয় চোর— না মানে…

প্রথম চোর— তোরা কী করে জানলি এই বাড়িতে কেউ নাই বাইরে গ্যাছে?

তৃতীয় চোর— আমি সবরকম খুঁজ নিইয়া আইছি।

দ্বিতীয় চোর— আর কী করে বুঝলি যে এই ঘরে উন্য চোর ঢুকছে?

তৃতীয় চোর— বুঝুম না! এই লাইনে আজকা বিশ বছর, আর দ্যাখলাম তো বাইরের তিনটা তালাই অ্যাসিড অ্যাটাক! ব্যস সুন্দেহ দূর।

তৃতীয় চোর— বুঝলি? আমরা তিনজনে চুরির মাল সব তিন ভাগ করি, ভোর হইতে আর বেশি দেরি নাই। আর দ্যাড় ঘন্টার মতো আছে। তার আগেই আমাদের এই বাড়ি ছাড়তে হইবো।

প্রথম ও দ্বিতীয় চোর— হ্যাঁ ঠিক কথা কইছিস।

চুরির জিনিসপত্র ব্যাগে ঢোকাতে ঢোকাতে প্রথম চোর বলে ফ্রিজে কী আছে দ্যাখ তো, বাইর কর, খুব খিদা পাইতাছে আমার। দ্বিতীয় চোর ফ্রিজ খুলে দেখে তাতে শরবত, আইসক্রিম বার, পায়েস, কেক আর দামি কিছু বিদেশি মদ রাখা আছে।

তৃতীয় চোর— আমারও খুব খিদা পাইতাছে রে। আজকা শালা সব খামু বাইর কর!

তিনজনে ফ্রিজে রাখা খাবার সব কিছু খেয়ে শেষ করে এবং মদের শেষ বিন্দুটুকুও ছাড়ে না। মদ খেয়ে দ্বিতীয় আর তৃতীয় চোর একদম মাতাল হয়ে যায়। তিন জনের কাড়াকাড়িতে প্রথম চোরের ভাগে মদের পরিমাণ একটু কম পড়ে। আর সেজন্য প্রথম চোর কম মাতাল হয়। ফ্রিজের সব কিছু খেয়ে তৃতীয় চোর বলে এত বুড়ো ঘর, শালা মুকমলের মুতো বিছানা! একটু রেস্ট নিয়া নি।

বিছানায় শোয়া মাত্রই তৃতীয় চোর নাক ডাকতে আরম্ভ করে গড় গড় করে, ঘুমে একেবারে অচেতন। দ্বিতীয় চোর— এই তো জীবন যাক না যেদিকে য্যাতে চায় মুন, গান গাইতে গাইতে ধপাস করে বিছানায় শুয়ে ঘুমিয়ে পড়ে নাক ডাকতে থাকে।

এদিকে প্রথম জনের ঘুম এলেও একটু কম মাতাল হয়েছে বলে সে অনেকক্ষণ চিন্তা ভাবনা করে তিন জনের চুরি করা মালপত্র, টাকা পয়সা, সোনার গয়না, হিরের নেকলেস সব নিজের ব্যাগে ঢুকিয়ে, দরজা বাইরে থেকে ভালো করে লক করে বাইরে বেরিয়ে আসে। উদ্দেশ্য নিকটবর্তী স্টেশনে পৌঁছে সাধারণের মতো হাবভাব নিয়ে মানুষের চোখে ধুলো দিয়ে ভোরের ট্রেন ধরে এলাকা থেকে চম্পট দেবে।

সকালের পাখির কিচিরমিচির শুনে বিছানা থেকে ধড়ফরিয়ে উঠে পড়ে ওই দুই চোর। তাকিয়ে দেখে চুরি করা ওদের ভাগের জিনিস নেই। ঘরও বন্ধ বাইরে থেকে। দ্বিতীয় চোর বলে, বুঝলি ওই চোর ব্যাটা আমাদের ডবল ক্রস করছে। উঁকি দিয়ে বাইরে তাকাতেই দেখে প্রায় জনা পঞ্চাশেক লোক বাইরে দাঁড়িয়ে আছে হাতে লাঠি নিয়ে, হই হট্টগোল চলছে।

পাবলিকের মার দুনিয়ার বার— ভেবেও ব্যালকনির ভাঙা জানলা দিয়ে দুজনে লাফ দেয় এবং গিয়ে পড়ে একদম লোকের মাঝখানে। আর যাবে কোথায়! দুম ধাড়াক্কা ঘুষি, লাথি, লাঠির মার সব পড়ে গিয়ে ওই দুই চোরের গায়ে।

পুলিশ এসে চোর দুটোকে প্রশ্ন করে— বল চুরির মাল কোথায় পাঠিয়েছিস? চোরেরা বলতে পারে না সে কথা। পুলিশ বুঝে নেয় চোরেদের কথা মিথ্যে, ওরা সব জানে। রাজীব সেনও ওনার কাজ সম্পূর্ণ করে সকালে পৌঁছে যান নিজ বাসস্থানে। পুলিশ চোরেদের ধরে নিয়ে যায় এবং চুরির দায়ে ওই দুই চোরের জেল হয়।

এরপর সাজা খেটে জেল থেকে ছাড়া পায় ওই দুই চোর। ছাড়া পেয়ে ওই দুই চোর, প্রথম চোরের প্রতি ক্ষোভ-বিদ্বেষে ফেটে পড়ে। তারা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয় যে করেই হোক এর বদলা নিতে হবে। না হলে চোর সমাজে তাদের মান থাকবে না! তাই তারা প্রথম চোরের ব্যাপারে অনুসন্ধান করতে থাকে। কিছুদিনের মধ্যেই তারা একাজে সফল হয়। প্রথম চোর এবং তার গ্যাং-এর সবকিছু তথ্য সংগ্রহ করে তারা থানায় যায়। থানায় গিয়ে প্রথম চোরের ঠিকানা আর ওদের গ্যাংয়ের গোপনীয় তথ্য সব ফাঁস করে দেয়। সেই সূত্র ধরে পুলিশ গ্রেফতার করে ওদের লিডার-সহ আরও ত্রিশ-চল্লিশজনের তিনটি গ্যাং-কে।

এলাকায় চুরি যাওয়া মূল্যবান সব জিনিস পুলিশ উদ্ধার করে। জনসাধারণও চুরি যাওয়া জিনিষপত্র ফিরে পাওয়ায় যারপরনাই আনন্দিত। এই ব্যাপারে সকলে পুলিশকে ধন্যবাদ জানায়। চোরেদের সম্পূর্ণ গ্যাং গ্রেফতার হওয়ায় এলাকায় তারপর থেকে ছোটো-বড়ো সব ধরনের চুরির ঘটনা একরকম প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। লোকজনের মন থেকেও আতঙ্ক দূর হয়। এরপর এলাকাবাসীও শান্তিতে বসবাস করতে শুরু করে।

(সমাপ্ত)

শারদোৎসব উপলক্ষ্যে আনুষ্ঠানিক ভাবে প্রকাশ করা হল ‘ROCK অঞ্জলি’

বাংলা রক মিউজিকের ৫০ বছরের গৌরবময় সময়কে আন্তরিক শ্রদ্ধা নিবেদন করার উদ্দেশ্যে, এবার শারদোৎসব উপলক্ষ্যে ‘Bingo! Tedhe Medhe’ প্রকাশ করল রক মিউজিক ‘ROCK অঞ্জলি’।

‘ROCK অঞ্জলি’ গানে সুরারোপ এবং কণ্ঠদান করেছেন ক্যাকটাস-এর সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায় (সিদ্ধু), অভিজিৎ বর্মণ (পোটা), লক্ষীছাড়া-র গৌরব চট্টোপাধ্যায় (গাবু) এবং চন্দ্রবিন্দু-র অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায়। ‘Bingo! Tedhe Medhe’-র এই সংগীত-শ্রদ্ধা নিবেদন শুধু বাঙালি রকের সাংস্কৃতিক তাৎপর্যই উদযাপন করে না, বরং বন্ধুত্ব এবং বন্ধনের শক্তিকেও তুলে ধরে। আর  থিম, যা শারদোৎসব চেতনার সঙ্গে গভীরভাবে অনুরণিত হয়।

‘ROCK অঞ্জলি’-র গায়করা মনে করেন, গানটি বাংলা রকের মর্মকে ধারণ করে, একইসঙ্গে নতুন প্রজন্মের সংগীত-প্রেমীদের অনুপ্রাণিত করে। এটি বাঙালি শিল্প ও সংস্কৃতিতে সংগীত ঘরানা-র প্রতি গভীর প্রভাব ফেলে, যা বিগত ৫০ বছরের একটি শক্তিশালী প্রতিফলন বলা যায়।

‘Bingo! Tedhe Medhe’ তাদের মূল গ্রাহকদের সঙ্গে সংযোগ বাড়াতে এবং অনুপ্রাণিত করতে, চালু করেছে ‘ROCK অঞ্জলি’ সংগীত প্রতিযোগিতা।  এই প্রতিযোগিতা তরুণ প্রতিভাবান সংগীতশিল্পীদের দক্ষতা প্রদর্শন এবং শারদোৎসবে বাঙালি রকের উত্তরাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর জন্যই এমন একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছে। প্রতিযোগিতাটিতে কলেজ থেকে ১২০-জনেরও বেশি শিক্ষার্থী যোগ দিয়েছে। এরা শীর্ষস্থানীয় ১৫টি ব্যান্ডে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সুযোগের জন্য প্রতিযোগিতায় লড়ছে। এই ফাইনালিস্টরা উৎসবের সময় শহরের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ পুজো প্যান্ডেলের মঞ্চে পারফর্ম করবেন, যা তাদের জীবনে প্রথমবার হাজারো মানুষের সামনে পারফর্ম করার সুযোগ দেবে। আর প্রথমবারের মতো, কলকাতা ‘ROCK অঞ্জলি পুজো ট্যুর’-এর অংশ হিসেবে একটি ‘কনসার্ট অন হুইলস’ -এর অভিজ্ঞতা লাভ করবে। চতুর্থী থেকে নবমী পর্যন্ত টানা ছয় দিন ধরে, এই সফরটি শহর জুড়ে ছয়টি বিখ্যাত পুজো প্যান্ডেল পরিদর্শন করবে, যা বাংলা রকের শক্তি ছড়িয়ে দেবে বহুদূর।

থিম সং সম্পর্কে কথা বলতে গিয়ে ‘আইটিসি ফুডস, স্ন্যাকস, নুডলস ও পাস্তা’ বিভাগের ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং মার্কেটিং হেড সুরেশ চন্দ জানয়েছেন, ‘ROCK অঞ্জলি’-র সঙ্গে ‘Bingo! Tedhe Medhe’ এবারের শারদোৎসবে বিশেষকিছু তৈরি করতে চেয়েছিল। ‘ROCK অঞ্জলি’ গানটি বাংলা রক সংগীতের সমৃদ্ধ ঐতিহ্যকে সম্মান করে এবং তরুণ, উদীয়মান প্রতিভাকে উজ্জ্বল করার জন্য একটি প্ল্যাটফর্ম দিতে উদ্যোগী। ‘ROCK অঞ্জলি পুজো ট্যুর’ এবং প্রতিযোগিতার মাধ্যমে, ‘Bingo! Tedhe Medhe’ কলকাতার সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ পুজো প্যান্ডেলগুলির মধ্যে একটিতে তরুণদের সঙ্গে সংযোগ করতে এবং পরবর্তী প্রজন্মের রকস্টারদের উৎসাহিত করতে চায়।’

চন্দ্রবিন্দু ব্যান্ড-এর গায়ক ও সুরকার অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায় জানিয়েছেন, ‘বাঙালি রক সবসময়ই আমাদের মানুষের গভীরতম আবেগ, আমাদের সংগ্রাম, আমাদের সুখ, আমাদের বন্ধুত্বকে প্রকাশ করে। ‘Bingo! Tedhe Medhe’-র সহযোগিতায় নির্মিত ‘ROCK অঞ্জলি’ গানটি বাঙালি রকের চেতনা এবং ভক্তদের প্রতি একটি শ্রদ্ধা, যারা এটিকে ৫০ বছর ধরে বাঁচিয়ে রেখেছে। অনেক আইকনিক কণ্ঠের সঙ্গে এই প্রকল্পের অংশ হতে পারাটা আমার কাছে ভীষণ ভাবে সম্মানীয় মনে হয়েছে।’

‘ROCK অঞ্জলি’-র স্রষ্টারা মনে করেন, সংগীত, সংস্কৃতি এবং প্রতিযোগিতার সমন্বয়ে,  ‘ROCK অঞ্জলি’ একটি অনন্য অভিজ্ঞতা প্রদান করতে প্রস্তুত, যা শহরের সাংস্কৃতিক আবহের সঙ্গে অনুরণিত হবে এবং একটি দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব তৈরি করবে। গানটি পরবর্তী প্রজন্মের সংগীতজ্ঞদের জন্য একটি গেটওয়ে হিসেবে কাজ করবে, যা বাংলার ভবিষ্যৎ রক তারকাদের জন্য মঞ্চ তৈরি করবে।

স্বাদে-আহ্লাদে জমে উঠুক শারদোৎসব

প্রায় সকলের প্রিয় ঋতু শরৎ। শরতের আগমনে নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা ভাসতে দেখলেই মন কেমন উড়ুউড়ু হয়ে ওঠে। কারণ, শরতকাল থেকেই সূচনা হয় উৎসবের। শারদোৎসব দিয়ে শুরু হয়ে পরপর চলতে থাকে উৎসব। আর উৎসব মানেই তো হই-হুল্লোড়। অবশ্য হইচই-হুল্লোড় তো তখনই জমবে, যখন খাবারের মজা নেবেন পেট ভরে।

একথা অনেকেই স্বীকার করবেন যে, পোশাক আর প্রসাধনে নিজেকে সাজিয়ে তোলার পর আর রান্নার ঝামেলা নিতে মন চায় না। কিন্তু তাই বলে উৎসবে ভালো খাবার খাওয়ার ইচ্ছে তো কমে যায় না, বরং বেড়ে যায়। তবে উৎসব উপলক্ষ্যে পেট ভরানোর পাশাপাশি, মন ভরানোর ইচ্ছে থাকে ষোলআনা।

যদি ঢাকের সুর, বাউল গান চলে লাইভ, আর তার সঙ্গে গঙ্গাবক্ষে ভাসমান থেকে খাবারের স্বাদ নেওয়া যায়, তাহলে তো ষোলোকলা পূর্ণ-ই বলা যায়। স্কাই ডেকে লাইভ সিংগিং থেকে, গঙ্গায় শান্তিপূর্ণ নৌকা-ভ্রমণের সঙ্গে ঐতিহ্যবাহী খাঁটি বাঙালি খাবারের স্বাদ গ্রহণ অবশ্যই এক অন্য অনুভূতি দেবে বলেই মনে হয়। আর তাই উৎসব উদযাপনের জন্য প্রস্তুতি নিয়েছে পোলো ফ্লোটেল। এখানে ঐতিহ্য এবং আরামের মেলবন্ধন ঘটবে।

কলকাতার পোলো ফ্লোটেলের জেনারেল ম্যানেজার সৌমেন হালদার প্রসঙ্গত জানিয়েছেন, ‘এগিয়ে আসছে বাঙালির প্রিয় শারদোৎসব। তাই আমরাও সুস্বাদু খাবার নিয়ে প্রস্তুত সবার মন জয় করতে। পোলো ফ্লোটেল-এ আমাদের কাছে যা আছে তা শেয়ার করতে পারলে আমরা আনন্দ পাব। এই বছর, আমরা ঐতিহ্যগত এবং সমসাময়িক অভিজ্ঞতার মিশ্রণে উৎসবটিকে প্রাণবন্ত করে তুলতে চাইছি। লাইভ ঢাকের সুর, বাউল গান আর তার সঙ্গে গঙ্গাবক্ষে ভাসমান থেকে যদি খাবারের স্বাদ নেন, তাহলে জমে উঠবে এবারের শারদোৎসব। স্কাই ডেকে লাইভ সিংগিং থেকে, গঙ্গায় শান্তিপূর্ণ নৌকা-ভ্রমণের সঙ্গে ঐতিহ্যবাহী খাঁটি বাঙালি খাবারের স্বাদ গ্রহণ অবশ্যই এক অন্য অনুভূতি দেবে বলেই মনে হয়।’

অতএব, ১,৮০০ টাকা থেকে ২,০০০ টাকা খরচ করলেই ভাত, ডাল, বেগুন ভাজা, আলু পোস্ত, বাসন্তি পোলাও থেকে শুরু করে চিংড়ি মাছের মালাইকারি, মাটন কষা, দই, মিষ্টি আরও নানারকম লোভনীয় খাবারে বেশ জমে উঠবে এবারের শারদোৎসব। তাহলে আর সময় নষ্ট না করে, এখনই মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে রাখুন।

চোরের বদলা (পর্ব-০১)

দার্জিলিং জেলার একদম সমতলে অবস্থিত খড়িবাড়ি নামক স্থান। এখানকার অধিকাংশ মানুষই বিত্তবান। তাদের চালচলনেই মনে হয় এই জায়গায় চাকুরিজীবী লোক যেমন আছে, তেমন আছে ব্যবসায়ী, সম্পন্ন কৃষক, জোতদার থেকে বিভিন্ন পেশার ধনী লোক। কিন্তু বেশ কিছুদিন হল এখানে এক অশান্তি সকলকে খুব চিন্তায় রেখেছে। বেড়েছে পেশাদারি চোরের উৎপাত। একেকটা ভয়ানক চুরির ঘটনা মানুষের ঘুম কেড়ে নিয়েছে। স্থানীয়রা চুরির ঘটনায় আতঙ্কে রাতে বিছানায় বল্লম, বড়ো হাত-দা, লাঠি নিয়ে শোয় — যা ক্রমে স্থানীয় মানুষের দৈনন্দিন অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।

পাড়ার মোড়েই নাকি খবর পেয়ে যায় চোরেদের গ্যাং। কোথায় কোন অনুষ্ঠানে বেড়াতে গিয়েছে এলাকার মানুষজন বা কোন বাড়ির লোক ভ্রমণে গিয়েছে দূরে কোথাও, কারাই বা হেল্থ চেকআপে গিয়েছে রাজ্যের বাইরে। তারপর সুযোগ বুঝে ওই ফাঁকা বাড়িতে বা অন্য কারও ঘরে চুরির প্ল্যান তৈরি করে, প্রস্তুতি নিয়ে চোরেরা প্রবেশ করে। অপারেশন চলে প্ল্যানমাফিক রাতভর। কিন্তু আশেপাশের লোকজন কোনও কিছুই টের পান না ওই চোরেদের চুরির কৌশল আর বুদ্ধির জোরে।

এই এলাকায় আর আশেপাশের বড়ো এলাকার চোরেদের গ্যাং-মাস্টার নাকি নির্বাচিত হয়েছে কুখ্যাত ছিনতাইকারী শাম্মি সিং ওরফে শেল্টো মস্তান। চোরেরা যাকে গুরু বলেই সম্বোধন করে। এটাই নাকি গ্যাংয়ের রীতি। এখানকার রীতি অনুযায়ী চুরি করা সমস্ত জিনিসপত্র নিলাম হয়। তারপর জিনিসপত্রের নিলাম মূল্যবাবদ প্রাপ্য অর্থ ভাগাভাগি হয়ে সব চোরেদের হাতে এসে পৌঁছোয়।

খড়িবাড়ির এক স্কুলের সহকারি শিক্ষক মনোতোষ সাহা টিফিন করতে রামদাস বাইনের রেস্টুরেন্টে আসেন। সেখানে এসে দেখেন অভিজিৎবাবু আর দ্বিজেনবাবু রংবাহারি টেবিলে বসে একমনে সাম্বার আর নারকেলের চাটনিতে চুবিয়ে ইডলি মুখে তুলছেন। পাশে কয়েকটি দৈনিক সংবাদপত্র এবং একটি ফিল্মি ম্যাগাজিন অগোছালো ভাবে রাখা।

মনোতোষবাবু বলে ওঠেন— আরে অভিজিৎবাবু যে! কী খবর?

—এই তো। বলুন কেমন আছেন?

—ভালো ভালো। কিন্তু চুরির ঘটনা চারদিকে যেভাবে থাবা বসাচ্ছে আর ভালো লাগছে না! খুবই দুঃশ্চিন্তায় আছি।

—শুনলাম পুলিশের লোক নাকি সিভিল ড্রেসে সর্বত্র ঘুরে বেড়াচ্ছে। চোরেদের গোপন ডেরা আর ওদের খোঁজ পেতে পুলিশ নাকি একেবারে ঝাঁপিয়ে পড়েছে।

দ্বিজেনবাবু বললেন— রাতে কয়েকটি দল সব দিকে পাহারাদারিও করছে। যাক গে ভালোই! কী বলেন?

দ্বিজেনবাবু শিলিগুড়ির এক রাষ্ট্রায়ত্ব ব্যাংক-এ কর্মরত অফিসার। প্রতি রাতে মনোতোষবাবু আর ওনাদের বন্ধুবান্ধবরা তাদের অফিস, আদালত, স্কুল, কলেজ থেকে ফিরে, একটু কিছু খেয়ে বেরিয়ে পড়েন নিজেদের গল্প, কবিতা, অণুগল্প পাঠচক্রের আসরে। এই তো সেদিন ওই আসরেই আলোচনার মধ্যে উঠে এল চোরের উৎপাতের বিভিন্ন ঘটনা।

সেই আসরে অভিজিৎবাবু জানালেন— শুনেছ নাকি ভায়া, পনেরো-ষোলো দিন আগের কথা? নিতিন চাকলাদার, একটি পত্রিকার সিনিয়র এডিটর। স্ত্রী-পুত্র-কন্যাকে নিয়ে গিয়েছিলেন রাজ্যের বাইরে এক বড়ো হাসপাতালে তার চেকআপ করাতে। চারতলা বাড়ি ছিল ফাঁকা। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে চোর ওনার বাড়ির ভেতর ঢুকে দামি দামি সব জিনিসপত্র চুরি করে নিয়ে যায়।

সকাল সকাল নিতিনবাবু ফিরে এসে প্রতিবেশীর মুখে সব কথা শুনে মাথায় হাত দিয়ে মাটিতে শুয়ে পড়েন। ওনার স্ত্রীও কাঁদতে আরম্ভ করে দেন চিৎকার করে। একটু পরে লোকজন দেখে ঘরের চারটি তালাই অ্যাসিড দিয়ে নষ্ট করা। মোটর সাইকেলের ইঞ্জিন, গ্যারেজে রাখা ফোর হুইলার কারের ইঞ্জিন, কম্পিউটার সব উধাও।

বিপ্লব রায় বলেন— আরে মশাই চোরের আতঙ্কে এখন রাতে বাইরে বেরুতেই ভয় হয়। মনে হয় এই বুঝি পেছন থেকে এসে ব্লেড বা ছুরি চালিয়ে দিল।

ভূপেন বোস যোগ দিলেন— আচ্ছা তোমাদের মনে আছে সেবার বিশ্বকর্মা পুজোর রাতে পালপাড়ার রবীন ভট্টাচার্য, তার শোরুমের লকার ভেঙে বহু মূল্যবান সোনা ও হিরের গহনা চুরি করে চোরেরা গা ঢাকা দেয় ?

দ্বিজেনবাবু বলে ওঠেন— হ্যাঁ হ্যাঁ মনে আবার থাকবে না! সেই খবর পরের দিন দৈনিক সংবাদপত্রে বেরিয়েছিল। নিউজ চ্যানেলগুলিতেও দেখিয়েছিল। আলোচনা শেষে সকলে মিলে চা, ডিম টোস্ট খেয়ে, সিগারেট টানতে টানতে, মুখে জরদা খয়ের দেওয়া পান চিবোতে চিবোতে বাড়ি ফেরেন।

পরের দিন এখানকার এক কলেজ প্রফেসার রাজীব সেন কলেজ সেমিনারে অংশগ্রহণ আর সেইসঙ্গে সমুদ্র সৈকতে মধুচন্দ্রিমায় যাবেন বলে নববিবাহিতা স্ত্রীকে নিয়ে বেরিয়ে পড়েন মুম্বাইয়ের উদ্দেশে। পাশের বাড়ির পার্থ ব্যানার্জীকে বলে যান— পার্থদা একটু লক্ষ রাখবেন বাড়ির দিকটা। একরাশ দুঃশ্চিন্তা নিয়ে ইষ্টদেবকে স্মরণ করে রামকৃষ্ণকে প্রণাম করে, বাগডোগরা থেকে ফ্লাইট ধরে স্ত্রীকে নিয়ে রাজীববাবু বেরিয়ে পড়েন মুম্বাইয়ের উদ্দেশ্যে।

যাবার ঠিক দুদিন পর এক চোর দেয়াল টপকে প্রবেশ করে রাজীবাবুর বাড়িতে। প্রথমে পাইপলাইন বেয়ে তিন তলায় ওঠে চোর। গেটের লক ভেঙে প্রবেশ করে তিন তলার বেডরুমে। চুরি করা সামগ্রী গুছিয়ে রাখতে অনেকটা সময় লেগে যায় চোরের। কিছুক্ষণ পর হঠাৎ একটা আওয়াজ হয় পাশের রুমে, চমকে ওঠে চোর। পিছন ফিরে দেখে কালো মুখোশ পরা বিভৎস আকৃতির কে একজন দাঁড়িয়ে আছে তার পেছনে। চোর তাকে জিজ্ঞাসা করে— – তুই ক্যাডারে ব্যাটা? এত রাতে এখানে কী করতাছিস?

ওই ব্যক্তির তখন পালটা প্রশ্ন— আগে তুই ক তুই কে?

—আমি চোর। আর তুই?

—দেইখ্যা কী মনে হচ্ছে? ওই চোর!

দ্বিতীয় চোর— ঠিক, আমি চোর। কিন্তু তোর গ্যাঙের না।

চুরির জিনিস নিয়ে দুজনের মধ্যে বহুক্ষণ বচসা হয়। মারপিটও হয় কে কোন জিনিস নেবে এই প্রশ্নে। শেষে সমঝোতায় আসে তারা- সোনা-গয়না, টাকা-পয়সা সব ভাগ করে নেয় তাড়াতাড়ি। এরপর অন্য জিনিসপত্রের দিকে হাত বাড়ায়।

(ক্রমশ…)

পড়ার জন্য সীমাহীন গল্প-নিবন্ধসাবস্ক্রাইব