ছুটির দিনে Snacking time

ছুটির দিন বা উইকএন্ড হলেই এটা ওটা খেতে মন চায়৷বিশেষ করে ছোটোদের আবদার তো মেনে নিতেই হয়৷ব্রেকফাস্টের পরেই হোক বা দুপুরে খাবার বেশ কিছু পরে, বাচ্চার জন্য যে কোনও একটা টিফিন কিন্তু জরুরি। নিয়মিত একটা ফল দেওয়ার কথা আমরা বারবারই বলে থাকি৷ কিন্তু সব দিন হেলদি খাবার খেতে ছোটোদেরও একঘেয়ে লাগে৷ তাই বাড়িতেই বানিয়ে ফেলুন কিছু হালফিল সময়ের জনপ্রিয় ডিশ৷ সঙ্গে শেক -এর মজা৷ এবারে ছুটির দিনগুলো হোক মজায় ঠাসা৷

মাটন চপ বার্গার

উপকরণ : ১ কাপ কিমা, ১/২ কাপ কাবলি মটর, ১/৪ কাপ গোটা গরমমশলা, ১টা পেঁয়াজ, ১টা কাঁচালংকা, ২ কোয়া রসুন, ১/২ ইঞ্চি আদাকুচি, ১ টেবিল চামচ ধনেপাতাকুচি, ১/৪ টেবিল চামচ পুদিনাকুচি, টম্যাটো ও পেঁয়াজের স্লাইস, অল্প লেটুসপাতা, চিজ স্প্রেড, ১টা ডিম, মাখন, ৪-৫টা বার্গার বান, ১ চা-চামচ নুন।

প্রণালী: কিমা, পেঁয়াজকুচি, রসুনকুচি, লংকাকুচি ও আদাকুচির সঙ্গে মেখে, কাবলি মটর সহযোগে গরমমশলা ও নুন দিয়ে প্রেশারে সেদ্ধ করুন। প্রেশারে ১ কাপ জল দিয়ে ৮-১০ মিনিট সেদ্ধ করলেই নরম হয়ে যাবে। এবার প্রেশার থেকে বের করে অল্প তেলে নাড়াচাড়া করুন একটি প্যানে। এবার গোটা গরমমশলাগুলো বেছে আলাদা করুন। বাকি মিশ্রণ মিক্সিতে পেস্ট করে নিন। এবার একটি পাত্রে ডিম গুলে রাখুন। প্যানে মাখন দিন। এবার মাংসের মিশ্রণ থেকে ছোটো ছোটো টিকিয়া গড়ে ডিমের গোলায় ডুবিয়ে প্যানে ভেজে নিন।

এবার বান ফালি করে এতে চিজ ও মাখন লাগান। পেঁয়াজ ও টম্যাটোর রিং রাখুন। লেটুসপাতা দিন। এর উপর মাটন টিকিয়া রেখে, বানের অন্য ফালি চাপা দিয়ে সার্ভ করুন।

 চিজ ফ্রিটার্স

Cheese Fritters recipe

 

উপকরণ : ১ কাপ ময়দা, ১/৪ ছোটো চামচ বেকিং পাউডার, কয়েকটি ব্রেড স্লাইস, ২ কোয়া রসুন, ডিম, পরিমাণমতো জল, ৩- ৪টি কাঁচালংকাকুচি, অল্প ধনেপাতাকুচি, ১/৪ ছোটো চামচ রাইসরষেগুঁড়ো, ১/২ গ্রেটেড চিজ, নুন স্বাদমতো।

প্রণালী : একটি বোল-এ সমস্ত উপকরণ মিশিয়ে গাঢ় মিশ্রণ তৈরি করুন। ব্রেড স্লাইসগুলি ৩টি ভাগে কাটুন। প্রত্যেক টুকরো মিশ্রণে ডুবিয়ে তেলে ডিপ ফ্রাই করুন। ভাজার পর বাঁধাকপির সরু কুচি ও টম্যাটো কেচআপ সহযোগে পরিবেশন করুন।

কেক শেক

Cake Shake recipe

উপকরণ : ১টি ফ্রুট কেক স্লাইস, ১/২ কাপ ক্রিম, ১/২ কাপ মিল্ক, ২ ছোটো চামচ চিনি।

প্রণালী : ক্রিম, দুধ, চিনি ও অল্প পরিমাণ কেক, মিক্সারে ব্লেন্ড করুন। এবার উপর থেকে কয়েকটি ছোটো কেকের টুকরো এতে ডুবিয়ে দিন। পরিবেশনের কাপে ঢেলে ফ্রিজে ঠান্ডা হতে দিন।

সমর্পিতা (শেষ পর্ব)

শেষ পর্ব

দিন দশেক ভালোই কাটল অন্বেষা আর শুভর। পুরীতে জগন্নাথ দর্শন, উদয়গিরি, খণ্ডগিরি, চিল্কা সঙ্গে সমুদ্রস্নান। চিন্তা, টেনশন থেকে একেবারে দূরে। পুরী থেকে ঘুরে আসার পরে ওদের একদিন নিমন্ত্রণ করলাম বাড়িতে। মা বিভিন্ন পদ রেঁধেছে ওদের জন্য। ওদের বিয়ের পর থেকে খেতেও বলা হয়নি একদিনও। তাই ওদের পছন্দমতো মাছ-মাংস নিয়ে এসেছিলাম। কেন জানি না, ওরা ভালো আছে দেখে আমার মনটাও ভীষণ ভালো হয়ে গেছে। হয়তো আমি একটা অপরাধবোধে ভুগছিলাম। হাজার হোক আমার হাত ধরেই তো ওদের আলাপ। কথা ছিল অন্বেষা আগে আমাদের বাড়িতে চলে আসবে, আর শুভ অফিস ফেরত।

সেইমতো অন্বেষা আসার মিনিট পঁয়তাল্লিশের মধ্যে পৌঁছে গিয়েছিল শুভ। তখন মা আমি আর অন্বেষা জমিয়ে গল্প করছি। শুভ আসতেই মা ওর জন্য চা বানাতে চলে গেল। মা ভিতর ঘরে চলে যাওয়ার পরেই একগাল হেসে বলল, ‘শোন শোন দারুণ খবর আছে। আজ অফিসে রেজিগনেশন জমা দিলাম!’

আঁৎকে ওঠে অন্বেষা, কী বলছ কী? পাগল-টাগল হলে নাকি। এটাকে তুমি দারুণ খবর বলছ?’

‘আরে আগে পুরো কথাটা তো শোনো,’ বলে শুভ।

আমিও বলে উঠলাম, ‘শুনবে আবার কী? কী শুনবে? আজকের বার্তা-র মতো হাউস তুই ছেড়ে দিলি! পাবি আর এরকম চাকরি?’

‘পাব আবার কী, পেয়ে বসে আছি বুঝেছিস।’ জোর গলায় বলে উঠল শুভজিৎ।

অন্বেষা বেশ অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে শুভর দিকে। বলে, ‘মানে?’

‘মানে একটা নতুন ডেইলি থেকে দারুণ অফার পেয়েছি। আজকের বার্তায় যা পাচ্ছি তার ডাবল দিতে রাজি হয়েছেন পত্রিকার মালিক। তবে কাজের সূত্রে মাঝেমাঝে বাইরে যেতে হতে পারে। আর প্রথম অ্যাসাইনমেন্ট-ই মুম্বইয়ের ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল। প্রায় মাস খানেকের ধাক্কা।

‘মাস খানেক!’ অজানা আশঙ্কায় বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে ওঠে অন্বেষার কপালে। বিস্মিত হয়ে আমিও বলে বসলাম, ‘এতদিন? অন্বেষার কী হবে?’

হাসতে হাসতে শুভ জবাব দেয়, ‘আরে কটা তো দিন, দেখতে দেখতে কেটে যাবে। না হয় কিছুদিন বাপের বাড়িতেই কাটিয়ে আসবে। ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল কভার করার সুযোগ তো সবসময় আসে না, তাই হাতছাড়া করতে চাইছি না।’

মুম্বই যাওয়ার পর প্রায় সপ্তাহ দুয়েক কেটে যায়। এর মধ্যে হাতেগুনে চার-পাঁচবারই কথা হয়েছে ওদের। ফোন করলেই কাজের চাপ আর ব্যস্ততা, নানান কারণ দেখিয়ে ফোন কেটে দেয় শুভ। এই ভাবেই কেটে যায় বাকি কটা দিন। কাজ সেরে ফিরে আসে শুভজিৎ।

একদিন অফিস যাওয়ার পথে রাস্তায় দেখা শুভজিতের সঙ্গে। উদভ্রান্তের মতো ঘোরাফেরা করছে। গালভরা খোঁচা-খোঁচা দাড়ি, অবিন্যস্ত চুল। চাউনিটাও যেন কেমন ছন্নছাড়া। জিজ্ঞাসা করলাম, “কীরে, ফিরে তো কোনও খবরই দিলি না। কাটল কেমন, আজ অফিস নেই?’

উত্তর না দিয়েই হাঁটা দিল শুভজিৎ। পরে জানলাম, চাকরিটা আর নেই। মদ তো ছিলই, মুম্বইতে এ-কদিন থেকেই জুয়ার নেশাটাও চেপে বসেছে। প্রচুর ধারদেনা করে ফেলেছে। অফিসের দেওয়া লাখ-খানেক টাকার ক্যামেরা বিক্রি করে সেই দেনা মেটায়। যার কারণে চাকরিটাও খুইয়ে বসেছে। সম্পাদক সাফ জানিয়ে দিয়েছে, ক্যামেরার দাম না মেটালে থানায় অভিযোগ করবেন। এমনকী অন্য সংবাদপত্রে যাতে শুভজিৎ কাজ না পায়, সে বন্দোবস্তও করবেন তিনি।

সঞ্চয় বলে কিছুই ছিল না শুভজিতের। বরাবরই দেখনদারির ব্যাপার ছির ওর মধ্যে। হাই-প্রোফাইল স্ট্যাটাস মেনটেন করতে আয়ের চেয়ে ব্যয়ই বেশি হয়ে যেত। শেষ পর্যন্ত অন্বেষা নিজের গয়না বিক্রি করে ও বন্ধুদের থেকে ধার করে শুভজিৎকে বাঁচায়। অথচ এ নিয়ে প্রচুর কটাক্ষ শুনতে হয়েছে অন্বেষাকে। টাকা কোথা থেকে এল, সে নিয়েও নোংরা ইঙ্গিত করেছে শুভজিৎ বহুবার।

অন্বেষার হাজারো চেষ্টা সত্ত্বেও বদলায়নি শুভজিৎ। কোনও কাজকর্ম করত না। সারাদিন মদের ঠেক আর জুয়ার আড্ডাতেই কাটাত। পয়সার টান পড়লেই মারমুখী হয়ে উঠত। তীব্র মানসিক যন্ত্রণায় গুমরে মরত অন্বেষা। হাসিখুশি মেয়েটাকে চোখের সামনে শেষ হয়ে যেতে দেখে খারাপ লাগত। ক্যানটিনে খেতে খেতে একদিন ওই-ই বলল, ‘ভানুদা আর পারছি না। এরচেয়ে মৃত্যুই ভালো। মারধর তো রয়েইছে, এখন কথায় কথায় চরিত্র নিয়েও টানাটানি করে। একজন মেয়ের কাছে স্বামীই সব। সে-ই যদি চরিত্র নিয়ে বাজে ইঙ্গিত করে, অপমান করে, এইভাবে বাঁচা যায় না!’

সান্ত্বনার ভাষা আমার জানা ছিল না। শুধু বললাম, ‘মনকে শক্ত কর। শুভকে বরং কোনও রি-হ্যাব সেন্টারে নিয়ে যা। কিছুদিন থাকুক, দ্যাখ না কী হয়। এখন তো অনেকেই ওভাবে নেশার কবল থেকে মুক্তি পাচ্ছে।’

একপ্রকার জোর করেই আমরা রি-হ্যাব সেন্টারে ভর্তি করলাম শুভজিৎকে। মাস চারেক থাকার পর অনেকটা সুস্থ হতে বাড়ি আনা হল। দিন দশেক বিশ্রাম নিয়ে স্টুডিয়োর বিজনেস আবার শুরু করল। টুকটাক কাজও পাচ্ছিল। তারপর পূর্ব পরিচিত এক বন্ধুর হাত ধরে মেগাস্টার সুবিমল রায়ের ছেলের বিয়ের ফোটোগ্রাফির অর্ডার। হারানো রাজ্যপাট ফিরে পেয়ে আবার আগের মেজাজ ফিরে এসেছে শুভজিতের।

এর মধ্যেই অ্যাক্সিডেন্ট। বেশ কয়েকদিন যমে মানুষে টানাটানি। প্রাণে বাঁচলেও চিরকালের মতো হারাতে হল দুটো হাতই। চালকের পাশেই বসেছিল শুভ। পিছন থেকে লরি ধাক্কা মারতেই কীভাবে যেন শুভর হাত দুটো স্টিয়ারিং হুইলে ঢুকে যায়। তারপর দু-তিন বার পাল্টি খেয়েছে গাড়িটা। হাতের একটা হাড়ও আর আস্ত ছিল না। একপ্রকার বাধ্য হয়েই হাত দুটো কেটে বাদ দেয় ডাক্তাররা।

কষ্ট পেতে পেতে মেয়েটা বোধহয় পাথর হয়ে গেছে। আজ আর কিছুই ওর মনকে ছোঁয় না। এই ঘটনা ওকে আরও শক্ত করেছে। খুব ইচ্ছে হল বলি, অন্বেষা তুই ডিভোর্স নিয়ে নতুন করে জীবনটা শুরু কর। কিন্তু ওর হাতদুটো ধরে কিছু বলার আগেই ও-ই বলে, “চিন্তা কোরো না ভানুদা। আজ থেকে তোমার বন্ধুর সব দায়িত্ব আমার। আমার বাকি জীবনটা তোমার বন্ধুকেই সমর্পণ করলাম।’

অজান্তে কখন যে দু-চোখ দিয়ে জল নেমে এসেছে বুঝতেই পারিনি।

 

ব্রিটেনে ভারতীয়রা কতটা সমাদৃত?

ভারতীয় বংশোদ্ভূত তথা ভারতীয় শ্বশুরের জামাই হওয়া সত্ত্বেও ঋষি সুনক কিন্তু ব্রিটেনে ভারতীয়দের প্রবেশের বিষয়ে নেতিবাচক পদক্ষেপই করছেন। ইংল্যান্ডের রক্ষণশীলরা ‘রেস, রিলিজিয়ন অ্যান্ড কালার’ বিষয়ে এখনও ততটাই বিভেদকামী, যেমন আমাদের দেশের প্রধানমন্ত্রী থেকে পাড়ার পুরোহিতের দৃষ্টিভঙ্গি । ঋষি সুনকদের ভয় গোটা ইংল্যান্ড আর গোরাদের দখলে রাখা সম্ভব হবে না যদি না এখনই এই নিয়ন্ত্রণ তৈরি করা যায়। ব্রিটেনে অবৈধ অনুপ্রবেশ রুখতে তাই কড়া পদক্ষেপ ঋষি সুনকের। তিনি স্পষ্টই জানিয়েছেন কোনও অবৈধ অভিবাসীর স্থান হবে না ব্রিটেনে। এমনকী শরণার্থী হয়ে থাকার জন্যও আবেদন করতে পারবেন না তারা।

ভারতের ভিসা নিয়ে ব্রিটেনে প্রবেশ করার জন্য ইতিমধ্যেই লম্বা লাইন। বহু মানুষ ইংলিশ চ্যানেলের বিপদ অগ্রাহ্য করে ইউরোপীয় মহাদেশে প্রবেশ করছেন ঘুরপথে। অবৈধ অনুপ্রবেশ ঠেকানো মুশকিল হয়ে যাচ্ছে। মানুষ নানা দেশে দুঃখ দুর্দশার শিকার। যুদ্ধ, বিদ্বেষের শিকার হয়ে লাখো মানুষ বর্তমানে শরণার্থী।

এই পরিস্থিতিতে ঋষি তাঁর ভারতীয় ভাইদের কথা ভেবে তাদের আশ্রয় দিলেন না— এতে সমালোচনার ঝড় উঠেছে। ঋষির মতো এমন মানুষ নানা দেশেই ক্ষমতার আসনে বসে আছেন, যারা নিজেকে বিপদমুক্ত রাখতে নিজেদের শিকড়কে অস্বীকার করতে দ্বিধা করেন না।

এক্ষেত্রে ঋষির চেয়ে ট্রাম্প অনেক গুনে ভালো বলে মানতেই হবে। তিনি অন্তত হিউস্টনে মোদির ডাকা অনাবাসি ভারতীয়দের সভায় মোদির পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। কোভিড ১৯ সংক্রমণে গোটা পৃথিবী আক্রান্ত হওয়ার আগে ট্রাম্প ভারতে এসেছিলেন, আহমেদাবাদে মোদি তার হয়ে গলাও ফাটিয়েছিলেন ‘এক বার ফির ট্রাম্প সরকার’।

ঋষি সুনক ও কমলা হ্যারিস, পুজোপাঠের উদ্দেশ্যে কখনও সখনও ভারতে আসেন। তাই বলে তাদের ভারত-অনুরাগীর তকমা মোটেই দেওয়া যাবে না। আমরা দেখেছি ভারতীয় বংশোদ্ভূত সুয়েলা ব্রেভারম্যানকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের দায়িত্ব দিয়েছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ঋষি সুনক। আর তাঁর এই পদক্ষেপের জেরে রীতিমতো হতবাক রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তবে কী এবার ভারত-ব্রিটেন ‘মুক্ত বাণিজ্য’ চুক্তি হওয়ার সব সম্ভাবনাই ধীরে ধীরে বন্ধ হতে চলেছে?

ভারতীয় বংশোদ্ভূত হলেও কনজারভেটিভ পার্টির হয়ে রাজনীতি শুরু করার পর থেকেই ভারত বিরোধী অবস্থান নিতে দেখা গিয়েছে সুয়েলাব্রেভারম্যানকে। ভারত-ব্রিটেন ‘মুক্ত বাণিজ্য’ চুক্তি নিয়েও বিতর্কিত মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর কথায়, “এই বাণিজ্য চুক্তি হয়ে গেলে ভারতীয়দের ব্রিটেনে আসার পরিমাণ অস্বাভাবিক হারে বাড়বে।” বর্তমানে অনেক ভারতীয় বেআইনিভাবে ব্রিটেন-এ থাকছেন বলেও মন্তব্য করেছিলেন তিনি।সুয়েলাব্রেভারম্যানকে সুনকের প্রশ্রয় দেওয়ার অর্থ একটাই৷ ভারতীয়দের প্রতি মোটেই ভ্রাতৃত্বপূর্ণ মনোভাব দেখাচ্ছেন না সুনক৷

জটিল রহস্যের জট সৃজিতের দশম অবতারে

পুজোর ঠিক আগেই ১৯ অক্টোবর মুক্তি পাচ্ছে সৃজিত মুখোপাধ্যায় পরিচালিত দশম অবতার। সদ্য মুক্তি পাওয়া এই ক্রাইম থ্রিলার ঘরানার ছবির ট্রেলার বুঝিয়ে দিল রহস্য প্রিয় বাঙালিকে কতটা  চমক দেবে এই ছবি৷ একই সঙ্গে নস্টালজিয়া এবং টানটান রহস্যের গন্ধ পাওয়া গেল ট্রেলার থেকে।সঙ্গে রয়েছে রূপম-অনুপমের কণ্ঠে দুই গানের ঝলক।যা অচিরেই মনে পড়াবে বাইশে শ্রাবণ ছবির গান, যা একসময় ছিল তুমুল জনপ্রিয়।

তা দশম অবতার ছবির গল্পটা ঠিক কেমন? এ এক সিরিয়াল কিলিং-এর মর্মান্তিক কাহিনি যেখানে শহরের বুকে ঘটে যাচ্ছে একটার পর একটা খুন। আর তিনটি খুনেই রয়েছে একই প্যাটার্ন। দুঃখের বিষয়, তিনটি খুনের পরও সিরিয়াল কিলারকে ধরতে নাজেহাল পুলিশ। কোনও ক্লুই নেই তাঁদের কাছে খুনিকে নিয়ে।

এমন সময় একজন মহিলা এক বিচিত্র খবর বয়ে আনলেন।এই সাইকো কিলার বিষ্ণুর দশম অবতার মনে করেন নিজেকে। পৃথিবীর জঞ্জাল সরাতে কয়েকদিনের জন্যই নাকি তিনি পৃথিবীতে এসেছেন। এই খুনগুলি তারই অপকীর্তি বলে দাবি করেন মহিলা।

এই কেসের দায়িত্ব এসে পড়ে অফিসার প্রবীর রায়চৌধুরীর উপর। তাঁর সঙ্গী হন ইন্সপেক্টর পোদ্দার। ট্রেলার সাজানো হয়েছে এমন নানা ঘটনা প্রবাহে৷ বন্দুকের গুলি থেকে খাঁড়া, মৃত্যু থেকে ধাওয়া করা, রহস্য থেকে মুখোশ কী নেই ট্রেলারে! শুরু হয় তদন্ত। কিন্তু সত্যিই সেই ব্যক্তিই খুনি তো, নাকি… থেকে গেল রহস্য।

২০১১-র পর ২০২৩-এ  আবারও প্রবীর রায়চৌধুরী হয়ে ফিরলেন প্রসেনজিৎ। পাল্টায়নি এতটুকু মেজাজ, চলন বলন। রোজকার খাবারের বদলে বিরিয়ানি চেয়ে খাচ্ছেন! আর তাঁর সঙ্গী ইন্সপেক্টর পোদ্দারের মধ্যে দেখা মিলল ‘খোকা’র ছায়া। জয়া আহসানই সেই মহিলা যাঁর হাত ধরেই অপরাধীর খোঁজ পায় পুলিশ। বাঁক নেয় তদন্তের মোড়। কিন্তু এই গল্পে যিশু আসলে কে? তিনি কি সত্যিই বিষ্ণুর দশম অবতার এবং খুনি নাকি…?

সব মিলিয়ে রহস্যের পর্দা ফাঁস হবে ১৯ অক্টোবর। এই ছবি আসলে সৃজিতের কপ ইউনিভার্সের দুই জনপ্রিয় ছবি ‘বাইশে শ্রাবণ’ ও ‘ভিঞ্চিদা’-র প্রিক্যুয়েল।প্রবীর চৌধুরী ও ডিসিডিডি পোদ্দার অর্থাৎ প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় ও অনির্বাণ ভট্টাচার্যের যুগলবন্দিও নজর কাড়বে একথা নিশ্চিত। ডিসিডিডি পোদ্দারের মুখে উঠে এসেছে জনপ্রিয় দ্বিতীয় পুরুষের খোকার সংলাপ। এটার জন্য বেশ আঁটঘাঁট বেঁধেই মাঠে নেমেছেন নির্দেশক। লুক থেকে অভিনয় ও সংলাপে ‘বাইশে শ্রাবণ’-এর স্মৃতি যাতে ফেরাতে পারেন প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়, চিত্রনাট্যে সেই সুযোগ তৈরি করেছেন সৃজিত৷ প্রসঙ্গত, সৃজিতের ছবিতে অনেকদিন পর দেখা যাবে যীশু সেনগুপ্তকে।  ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর ইন্দ্রদীপ দাশগুপ্তর। ছবির ডিওপি সৌমিক হালদার।

সমর্পিতা (পর্ব-২)

পর্ব-২

এরপর দুজনের মেলামেশা, ঘোরাফেরা। মাস ঘুরতে না ঘুরতেই বিয়ের সিদ্ধান্ত। অন্বেষার বাবার, এই বিয়েতে একদমই মত ছিল না। দুজনের পীড়াপীড়িতে যখন মেশোমশাইয়ের সঙ্গে কথা বলতে গেলাম ওনার বাড়িতে, উনি স্পষ্ট ভাষায় বলে দিলেন, ‘দ্যাখো ভানু, তোমার বন্ধুকে তোমার ভালো লাগতেই পারে। কিন্তু আমার মনে হয়, নিজের জীবনসঙ্গী বেছে নেওয়ার মতো অতটাও ম্যাচিওর হয়নি অনু। তাছাড়া খবর নিয়ে দেখলাম, তোমার বন্ধুটির তো নিয়মিতই বার-এ বসার অভ্যেস। এমন ছেলের সঙ্গে বিয়ে দিয়ে তো আর মেয়েটাকে জলে ফেলে দিতে পারি না।’

প্রত্যুত্তরে বিনয়ের সঙ্গেই বললাম, ‘দেখুন দু-এক পেগ মদ্যপান করলে কেউ খারাপ হয়ে যায় না। আজকাল কাজের ক্ষেত্রে এসব একটু-আধটু খেতেই হয়। তাছাড়া ওরা দুজন-দুজনকে জানে ও ভালোবাসে। আপনি মত দিলেও ওরা বিয়ে করবে, না দিলে রেজিস্ট্রি ম্যারেজ…। কাজেই এবার আপনি বুঝুন কী করবেন। মেয়ে আপনার কাছে চিরদিন ছোটোই থাকবে, আফটার অল আইনের চোখে ওরা তো অ্যাডাল্ট এবং নিজেদের জীবন সম্পর্কে নিজেরা ডিসিশন নেওয়ার অধিকারী।’

অগত্যা… অনিচ্ছা সত্ত্বেও মেয়ের ভালোবাসার কাছে হার মানতেই হল। সম্মতিক্রমে বিয়েটাও হয়ে গেল।

বিয়ের কয়েকদিন পরেই শুভজিতের আসল চেহারাটা ধরা পড়ে অন্বেষার কাছে। একদিন নিজের ঘরে বসে খবরের কাগজ পড়ছি, অন্বেষা ঢুকল। কেমন যেন বিষাদগ্রস্ত মনে হল। জিজ্ঞাসা করলাম, ‘কী রে কখন এলি? বাঁদরটা কোথায়?’

“তার কথা আর বোলো না। যা কাণ্ডটা বাধাল কাল। শুধু মামা অসুস্থ, না এলেই নয় তাই বাধ্য…।’

রীতিমতো ঘাবড়ে গিয়ে প্রশ্ন করলাম, ‘কেন রে কী হয়েছে?’

‘কাল রাত ১টা নাগাদ খবরের কাগজের সম্পাদক বিকাশবাবুর ফোন। জানাল রিজিওনাল বিজনেস পার্ক উদ্‌ঘাটন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি মুখ্যমন্ত্রীর ছবি তোলার জন্য পাঠিয়েছিল শুভকে। কিন্তু রাত ১টা নাগাদও অফিসে কোনও ছবি পাঠায়নি শুভ। তাঁর হাউসের তো একটা রেপুটেশন আছে। এসব গুরুত্বপূর্ণ খবর যদি ছাপা না হয়, তো কম্পিটিশনের বাজারে তাঁর টিকে থাকাই দায় হবে।’

উত্তরে শুধু তখন ওর বাড়িতে না ফেরার কথাটা বলতে পেরেছিলাম। ভীষণ ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। যেখানে কাগজের রেপুটেশন-এর প্রশ্ন, সেখানে শুভর চাকরি নিয়ে পর্যন্ত টানাটানি হতে পারে। চিন্তায় সারারাত দু-চোখের পাতা এক করতে পারিনি।’

‘তারপর। তারপর কী হল?’ বলে উঠলাম।

‘ফোনের পর ফোন করে গেছি ভানুদা। সমানে নট রিচেবল আসছিল।। ভাবছিলাম অন্য কিছু।’

বললাম, ‘আমাকে ফোন করলি না কেন?’

‘তোমাকে ফোন করার জন্যই ফোনটা সবে হাতে নিয়েছি, ঠিক তখনই ডোরবেলটা বেজে উঠল। রাত তখন আড়াইটে হবে। বাবু ফিরলেন। বেহেড অবস্থা।’

অফিসে ছবি না পাঠানোর কারণ জানতে চাইলে বলল, অনুষ্ঠান থেকে ফেরার পথে নাকি অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছিল। সেখানেই ক্যামেরা পড়ে গিয়ে সিস্টেমে গণ্ডগোল। আসল সত্যিটা হল, ও অনুষ্ঠানে যায়ইনি। ওর চোখমুখের অবস্থা দেখে বোঝাই যাচ্ছিল সারারাত নেশায় বুঁদ হয়ে পড়েছিল কোথাও।’ বলার পরে একটা দীর্ঘনিশ্বাসের শব্দ কানে এল। চোখদুটোও ছলছল করছে অন্বেষার ।

পরের প্রশ্নটা কী হতে পারে সেটা ভেবেই শিউরে উঠলাম আমি। যা ভাবা ঠিক তাই, খানিক থামার পর প্রশ্ন করল, ‘ও কি আগাগোড়াই এমনই ছিল ভানুদা?’

বোবার মতো চেয়ে থাকলাম ওর দিকে। কে যেন বাকরুদ্ধ করে রেখেছে আমাকে।

এমন নয় যে, এই প্রথমবার শুনলাম শুভ নেশার জন্য কোনও কাজ করেনি। একবার আমার এক বন্ধুর বাবার বার্ষিকীর কাজে ছবি দরকার। সেইজন্য দায়িত্ব নিয়ে ছয় বাই ছয় সাইজের ল্যামিনেটেড ছবি বানাতে দিয়েছিলাম শুভকে। কথা ছিল পরের দিনই ডেলিভারি দেবে।

রাত্তিরে যখন ওর বাড়িতে গেলাম, দরজায় তখন তালা ঝোলানো। দু-দিন পরে যখন আমার সঙ্গে দেখা করতে এল, রীতিমতো রাগারাগি। ‘তুই যখন সময় মতো দিতেই পারবি না, পরিষ্কার বলে দিতিস। তোর জন্য কতটা লজ্জিত হতে হল আমাকে।’

শুভ তখন কেমন সহজভাবে বলে ফেলল, “ইয়ার ছবির কথা একদম মাথা থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল। প্রেস ফোটোগ্রাফারদের একটা পার্টি ছিল। ওখানেই একটু বেশি চড়ে গিয়েছিল। বাড়ি ফিরে আর কাজ করার মতো অবস্থায় ছিলাম না। বরং একটা সরি জানিয়ে দিস।’

কোনও সদুত্তর না পেয়ে অন্বেষা আবার জিজ্ঞাসা করল, ‘কী হল ভানুদা, কই কিছু বললে না তো!

‘অ্যাঁ, অ্যা কী যেন বলছিলিস?’

‘ওই-ই শুভর নেশা।’

‘হ্যাঁ হ্যাঁ দ্যাখ, ওর যে আগেও দু-এক পেগ চলত এটা তো তুইও জানতিস। কিন্তু সেটা যে এই পর্যায়ে চলে গেছে, সেটা আমারও অজানা।’

‘বাবা জানলে কী যে হবে কে জানে!’

ওর টেনশন দেখে বললাম, ‘দ্যাখ অন্বেষা এখন ওসব ছাড়। আমার মনে হয়, যা হয়েছে ভুলে যা। তুইও ওকে একটু সময় দে। কদিন অফিস থেকে ছুটি নিয়ে দুজন মিলে কোথাও ঘুরে আয়। ওকে বোঝা। দেখিস সব ঠিক হয়ে যাবে।

ক্রমশ…

ডিপ্রেশন– Pre & Post Pregnancy

সন্তান প্রসবের পরে কোনও মহিলা আত্মহত্যা করলেন। তার স্বামী পুলিশকে অনেক বোঝাতে চেষ্টা করলেন যে, তিনি নির্দোষ, বরং তার স্ত্রীই কয়েকদিন ধরে কেমন অদ্ভুত আচরণ করছিলেন। তা সত্ত্বেও পুলিশ স্বামী ও তার পরিবারের সকলকে গ্রেফতার করে বিচারে পাঠাল। এরকম ঘটনা আমাদের দেশে অসংখ্য। কিন্তু মহিলাটির আত্মহত্যার প্রকৃত কারণ কী? এ প্রশ্ন থেকেই যায় ।

বিষয়টা বুঝতে হলে প্রথমে জানতে হবে ডিপ্রেশন কাকে বলে? এটা কিন্তু কয়েক দিনের মন খারাপের থেকে অনেক বড়ো ব্যাপার। ডিপ্রেশন বা মানসিক অবসাদ একটি সিরিয়াস সাইকোলজিক্যাল অসুখ। দুঃখ, উদ্বেগ ও শূন্যতার অনুভূতি এক্ষেত্রে দৈনন্দিন কাজকর্মের ব্যাঘাত ঘটায়। এই অনুভূতিগুলো হালকা থেকে গভীর হতে পারে এবং একমাত্র সঠিক চিকিৎসায় তা দূর করা যায়।

প্রশ্ন : কী করে আমরা বুঝব পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশন হয়েছে?

উত্তর : প্রেগন্যান্সির সময়ে বা প্রসবের পরে মন খারাপের অথবা কিছুই ভালো না লাগার অনুভূতি হতেই পারে। কিছু স্বাভাবিক পরিবর্তনের কারণে এরকম হয়। কিন্তু কতগুলো সিম্পটমের কোনও একটাও যদি দু-সপ্তাহের বেশি চলতে থাকে তাহলেই সাবধান হতে হবে, যেমন :

  • অস্থিরতা বা মুডের হেরফের
  • মন খারাপ বা অসহায় বোধ
  • অত্যধিক কান্না পাওয়া
  • উৎসাহ বা এনার্জির অভাব
  • অতিরিক্ত বা অতি অল্প খাওয়া বা ঘুম
  • মনসংযোগে বা সিন্ধান্ত নিতে অসুবিধা
  • স্মৃতিশক্তির সমস্যা
  • নিজেকে মূল্যহীন বা দোষী মনে করা
  • আগে উপভোগ করা বিষয়গুলোয় উৎসাহ বা আনন্দ হারানো
  • বন্ধুবান্ধব ও পরিবারের থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখা
  • ব্যথা, বেদনা, মাথা-যন্ত্রণা বা পেটের গোলমাল যা কিছুতেই সারছে না

প্রঃ পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশন কেন হয়?

উঃ কোনও কোনও পরিবারের সদস্যদের মধ্যে ডিপ্রেশনে ভোগার প্রবণতা থাকে। এরকম ডিপ্রেশনের ইতিহাস আছে এমন পরিবারের মহিলাদের প্রসবের আগে ও পরে ডিপ্রেশনে ভোগার সম্ভাবনা বেশি। অনেক সময় দেখা যায় যে পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশনের কারণ শরীরে হরমোনের মাত্রার তারতম্য। প্রেগন্যান্ট অবস্থায় শরীরে ইস্ট্রোজেন ও প্রজেস্টেরন নামক স্ত্রী হরমোনগুলির মাত্রা প্রচুর বেড়ে যায়। আবার সন্তান প্রসবের পরবর্তী চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে অতি দ্রুত সেই মাত্রা স্বাভাবিকে ফিরে আসে। এই বড়োসড়ো পরিবর্তন ডিপ্রেশনের অন্যতম কারণ বলে মনে করা হয়, ঠিক যেমন পিরিয়ডের সময় ছোটোখাটো হরমোনের মাত্রার তারতম্যের জন্য মুডের সমস্যা দেখা দেয়। এছাড়া অন্যান্য সম্ভাব্য কারণ হল :

  • প্রসবের পরে ক্লান্তি
  • ঘুমের অভাব
  • নবজাতককে নিয়ে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়া
  • ভালো মা হতে পারার ক্ষমতা নিয়ে মনে দ্বিধা-দ্বন্দ্ব
  • কর্মস্থলের ও ঘরের কাজের রুটিন পালটে যাওয়ার জন্য মানসিক চাপ বোধ
  • নিখুঁত মাতৃত্বের প্রতি অবাস্তব আকাঙ্ক্ষা
  • মা হওয়ার আগে নিজের অস্তিত্ব হারানোর কষ্ট
  • আকর্ষণীয়তা কমে গেছে মনে হওয়া
  • স্বাধীন ভাবে সময় কাটানোর অভাব

প্রঃ এর ফলে মা শিশুর কী কী সমস্যা হতে পারে?

উঃ অবহেলিত ডিপ্রেশনে মা ও শিশু উভয়ের ক্ষতি হতে পারে। ডিপ্রেশনে ভুগলে প্রেগন্যান্সির সময়ে নিজের প্রতি যত্নশীল হওয়া যায়। না। খাওয়াদাওয়া ঠিকমতো হয় না, ফলে সঠিক ওজন বাড়ে না। ঠিকমতো ঘুম হয় না, চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলা কঠিন হয় ৷ কেউ কেউ মাদকদ্রব্য ব্যবহার করে ফেলেন। এর ফলে সমস্যা আরও বেড়ে যায়। এই অবস্থায় প্রি-ম্যাচিওর ও কম ওজনের বাচ্চার জন্ম হতে পারে। এই অবসাদের জন্য মহিলাটির সঠিক ভাবে মাতৃত্ব দানের ক্ষমতা লোপ পেতে পারে এবং একজন মা হিসেবে তার আত্মবিশ্বাসে চিড় ধরতে পারে। মায়ের ডিপ্রেশনের জন্য শিশু সন্তানটিরও ক্ষতি হয়। তার ভাষা শিখতে দেরি হয়, মা ও সন্তানের বন্ধনে সমস্যা হয়, শিশুটির আচরণের সমস্যা হয় এবং কান্নাকাটি বেড়ে যায়।

প্রঃ কোনও কোনও মহিলার কি এই ডিপ্রেশনে ভোগার প্রবণতা বেশি থাকে

উঃ কিছু কিছু ব্যাপার এই সময়ে ডিপ্রেশনের সম্ভাবনা বাড়ায়, যেমন—

  • ডিপ্রেশন বা অন্য কোনও মানসিক রোগে ভোগার পারিবারিক বা ব্যক্তিগত ইতিহাস
  • পরিবার ও বন্ধুদের দিক থেকে সাপোর্টের অভাব
  • প্রেগন্যান্সি নিয়ে উদ্বেগ বা নেগেটিভ ধারণা
  • পূর্বের প্রেগন্যান্সি বা প্রসবের সময়ে কোনও সমস্যা
  • বৈবাহিক ও অর্থনৈতিক সমস্যা
  • জীবনের কোনও হতাশজনক ঘটনা
  • কম বয়স
  • মাদক দ্রব্য ব্যবহার
  • প্রেগন্যান্সির সময় ডিপ্রেশন থাকলে প্রসবের পরেও ভোগার সম্ভাবনা

প্রঃ এই ডিপ্রেশনের চিকিৎসা কী?

উঃ দু’ধরনের চিকিৎসা হয়

১. টকথেরাপি: কোনও সাইকোলজিস্ট বা কাউন্সেলরের সাথে কথা বলার মাধ্যমে ডিপ্রেশনের জন্য সৃষ্টি হওয়া ভাবনা-চিন্তা-অনুভূতি- কাজগুলোকে পালটে নিতে শেখা।

২. ওষুধ: চিকিৎসকেরা অ্যান্টি-ডিপ্রেসিভ ওষুধ প্রেসক্রাইব করেন। ডিপ্রেশনের লক্ষণগুলো কমাতে।

এই দু’ধরনের চিকিৎসার কোনও একটা অথবা দুটোই অবস্থা বুঝে প্রয়োগ করা হয়।

প্রঃ কিছু টিপ্ দিন কীভাবে চলব?

উঃ যা মেনে চলতে হবে তা হল

  • যত বেশি পারবেন বিশ্রাম নেবেন। বাচ্চা ঘুমোলে আপনিও ঘুমিয়ে নেবেন।
  • বেশি বেশি করার বা নিখুঁত হওয়ার একদম চেষ্টা করবেন না।
  • স্বামী, পরিবার ও বন্ধুদের সাহায্য চাইবেন
  • বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করার সময় বার করুন। জীবনসঙ্গীর সাথে কিছুটা সময় একান্তে কাটান।
  • অন্য মায়েদের সঙ্গে কথা বলে তাদের অভিজ্ঞতা থেকে শিখে নিন।
  • প্রেগন্যান্ট অবস্থায় বা তার ঠিক পরেই জীবনে বড়োসড়ো পরিবর্তন আনবেন না। এতে অপ্রয়োজনীয় স্ট্রেস তৈরি হয়। কিছু কিছু ক্ষেত্রে অবশ্য বড়ো পরিবর্তন এড়ানো সম্ভব হয় না।

সমর্পিতা (পর্ব-১)

প্রথম সারির অভিনেতা সুবিমল রায়ের একমাত্র ছেলের বিয়েতে ফোটোগ্রাফির অর্ডার পাওয়াটা তো আর চাট্টিখানি কথা নয়। অহংকারে মাটিতে পা পড়ছিল না শুভজিতের। বদলে মুচকি হেসে বলেছিলাম, ‘তা ভাই বেশ তো, আশপাশের মানুষগুলো যদি উন্নতির শিখরে পৌঁছোতে পারে এবং সেটা যদি আবার বন্ধুবান্ধব হয়, শুনে ভালোই লাগে।’

তারপর কেটে গেছে তিনটে দিন। কাল থেকে গা-টা কেমন যেন ম্যাজম্যাজ করছে। সেদিন শুভজিৎদের বাড়ি থেকে ফেরার পথে বৃষ্টিতে ভিজেছিলাম বটে। তাই বুঝি, হালকা টেম্পারেচার এসেছে। তার উপর ইয়ার এন্ডিং এর কারণে অমানুষিক কাজের চাপ। শরীর আর দিচ্ছিল না। তাড়াতাড়ি ডিনার সেরে শুয়ে পড়েছিলাম। মাঝরাতে হঠাৎ-ই অন্বেষা, মানে শুভজিতের বউয়ের ফোন। উৎকণ্ঠিত গলায় খবর দিল শুভজিতের অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে। সুবিমল রায়ের ছেলের বিয়েতে, ফোটোগ্রাফির কাজ সেরে ফেরার সময়, যে-গাড়িতে ফিরছিল সেটা লরির ধাক্কায় উলটে গেছে। জরুরি অবস্থায়, স্থানীয় লোকেরা পাশেই একটি সরকারি হাসপাতালে ভর্তি করেছে। এখন আইসিসিইউ-তে।

এরকম একটা খবর শুনে কি থাকা যায়? শরীরের কথা ভুলে অগত্যা ছুটে গেলাম হাসপাতালে। আমাকে দেখা মাত্রই অন্বেষার দু-চোখ দিয়ে জল গড়াতে লাগল। খানিক আশ্বস্ত করার জন্য এগোব, ঠিক তখনই অপারেশন থিয়েটার থেকে বেরিয়ে ডাক্তার জানালেন, পেশেন্টের অবস্থা যথেষ্ট সংকটজনক, ৭২ ঘন্টা না কাটলে কিছু বলা সম্ভব নয়।

অতএব অপেক্ষা ছাড়া আর কিছু করণীয় নেই আমাদের। সবকিছু এখন উপরওয়ালার হাতে। অপেক্ষমান মূর্তির মতো আইসিসিইউ-এর সামনের বেঞ্চে বসে রইলাম আমরা দুজনে। অন্বেষাকে ভীষণ বিধ্বস্ত লাগছিল।

একবার জিজ্ঞাসাও করলাম, ‘একটু চা খাবি? ভালো লাগবে।’ কোনওরকমে ঘাড় নাড়িয়ে না বলেই বেঞ্চে মাথাটা ঠেকিয়ে চোখ দুটো বুজল। সত্যিই মেয়েটাকে দেখলে ভারি কষ্ট হয়। বিয়ের পর থেকে একটা দিনও সুখ পেল না।

মনে পড়ে অতীতে শুভজিৎ আর অন্বেষার প্রথম সাক্ষাতের কথা। অন্বেষা তখন বিকম পাশ করে চাকরি খুঁজছে। এ-অফিস সে-অফিসে দরখাস্ত জমা দিয়ে বেড়াচ্ছে। আমাকেও বলেছিল, ‘ভানুদা তোমার তো অনেক চেনাজানা আছে, দেখো না কোথাও যদি কোনও সুযোগসুবিধা থাকে।’

ভানু আমার ডাকনাম। আমার ঠাকুমার দেওয়া বড়ো আদরের নাম। আমাদের বাড়ির পাশেই অন্বেষার মামারবাড়ি। ছোটোবেলায় মা মারা যাওয়ায় ও মামার বাড়িতে দিদার কাছেই বেশি থাকত। সেই থেকেই আমি ওর ভানুদা। আমার থেকে বছর সাতেকের ছোটো। কোনও অসুবিধা হলেই ভানুদা আছে।

সেই সময় আমাদের অফিসেই অ্যাকাউন্টস্ ডিপার্টমেন্টে একটা পদ খালি ছিল। মালিককে বলেকয়ে একটা চাকরির বন্দোবস্ত হয়েছিল। তার জন্য ধন্যবাদ জানাতে এসেছিল অন্বেষা। ঘটনাক্রমে ওইদিন শুভজিৎও হাজির। সেই প্রথম দেখা দুজনের।

অন্বেষা খুব সুন্দরী না হলেও বেশ একটা আলগা চটক রয়েছে। কথাবার্তায়ও পারদর্শী। কথার মারপ্যাচেই বিশ্বজয় করতে পারে সে। তার উপর অল্পবয়সি অমন চটপটে মেয়েকে ভালো লাগাই স্বাভাবিক।

জয়েনিং ডেট অনুযায়ী ৩ অক্টোবর অফিস জয়েন করল অন্বেষা। দায়িত্ব নিয়ে অন্যান্য স্টাফদের সঙ্গে পরিচয় করানো ছাড়াও ওর কাজও বুঝিয়ে দিলাম আমি। সপ্তাহ ঘুরতে না ঘুরতেই এক কর্মচারী রিপোর্ট দিয়ে গেল, ‘সাহেব, নতুন ম্যাডাম খুব ভালো। এত মিষ্টি কথা বলেন যে অন্যান্য সাহেবরাও খুব তারিফ করেন ওনার।’

শুভজিৎ মাঝেমধ্যে আমার অফিসেও আসত। খেয়াল করে দেখেছি, ও আমার সঙ্গে কথা বলত ঠিকই, কিন্তু ওর চোখ থাকত অন্বেষার দিকে। একদিন তো বলেই ফেলল, “আরে বস, এটা ওই মেয়েটা না, সেদিন যাকে তোদের বাড়িতে দেখেছিলাম?’

‘হ্যাঁ, ঠিকই ধরেছিস। আসলে সেদিন ও বাড়ি ফেরার জন্য এত তাড়াহুড়ো করছিল, যে তোর সঙ্গে ওর পরিচয় করানোটাই সম্ভব হয়নি। তবে মনে হচ্ছে তোদের পরিচয়টা খুব শিগগিরি করাতে হবে।’

ঠিক সেই সময় দেখলাম অন্বেষা ফাইল হাতে অ্যাকাউন্টট্যান্ট রতনদার টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছে। রতনদা অন্য কিছু কাজ নিয়ে ব্যস্ত। তাই সামনে দাঁড়িয়ে উশখুশ করছে অন্বেষা। এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে। আমার দিকে তাকাতেই ইশারা করে ডাকলাম। দু’এক কথায় রতনদাকে মনে হয় কিছু বলল, হয়তো আপনি ফ্রি হলে আসছি’ এমন কিছু। তারপর সোজা আমার টেবিলে।

‘আরে দাঁড়িয়ে রইলি কেন? বস।’

একটু হেসে অন্বেষা জবাব দিল, ‘না না ঠিক আছে। কিছু বলবে?’

‘বলছি বলছি আগে বস। খানিক বসলে তোর কাজের এমন কিছু ক্ষতি হবে না।’

বসতেই হল অন্বেষাকে। এদিক-ওদিক টুকটাক কিছু কথা হওয়ার পর, সপ্রতিভ ভাবে বললাম ‘দেখেছিস তোদের আলাপটাই করানো হয়নি। অন্বেষা এ হল শুভজিৎ।’ একে-অপরের দিকে তাকিয়ে মিষ্টি হাসি বিনিময় হল দুজনের। বললাম, ‘আমার কলেজের বন্ধু, ‘আজকের বার্ত’-র ফোটোগ্রাফার। পাশাপাশি অবশ্য একটা স্টুডিয়োও চালায়। আর এই হল অন্বেষা। আমার কলিগ কাম বোন, আবার বন্ধুও বলতে পারিস। ভারি মিষ্টি মেয়ে।’

লজ্জায় লাল হয়ে ওঠে অন্বেষার মুখ। বলে, ‘সত্যি ভানুদা তুমিও না ।

ক্রমশ…

অমৃতের অন্বেষণ (শেষ পর্ব)

আমি বাধা দিয়ে বললাম, “না না সেসব কিছু নয়। ও অনেক বড়ো প্রতিভার মালিক, আমি ওর তুলনায় কিছুই নই! কিন্তু আপনি কী করে শুভকে, আই মিন ড. পাণ্ডেকে জানলেন?’

আইরিন আর নিজেকে সামলাতে পারল না। ছোটো মেয়েটির মতো কেঁদে ফেলল, ‘ড. মিত্র, আমিই সেই হতভাগিনী যে জানকী আর শুভঙ্করকে আলাদা করে দিয়েছিল।’

আমি তোতলাতে তোতলাতে উচ্চারণ করলাম, ‘আইরিন, তুমি, মানে আপনি… আর কথা খুঁজে পেলাম না আমি।” আইরিন এবার নিজেকে সামলে নিয়ে দৃঢ়স্বরে বলল, ‘আপনি নয়, তুমি! ড. মিত্র আপনি শুভঙ্করের প্রিয় বন্ধু, সত্যিকারের একমাত্র বন্ধু। আপনি বলে আমাকে অপমান করবেন না প্লিজ।’

আমিও নিজেকে সামলে নিয়ে বললাম, আইরিন, “ওটা তোমার ভুল ধারণা ভাই। শুভ ওদের মানে জানকী আর রাহুলকে নিয়ে যেতে চেয়েছিল, ওরাই যেতে চায়নি। আর তুমি না থাকলে শুভ আজ যেখানে পৌঁছেছে তার কাছাকাছিও পৌঁছোতে পারত না।’ আইরিন মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে রইল।

আমি পরিস্থিতি বদলাবার ইচ্ছায় বললাম, ‘কিন্তু তুমি এখন যাচ্ছ কোথায়? একা কেন? সেই বিশাল বৈজ্ঞানিকের বুঝি দু’দিনের জন্যও ছুটি নেই?’

আইরিন এবার জোরে কেঁদে উঠল। আমি অবাক হয়ে বোকার মতো তাকিয়ে রইলাম। বাইরের দিকে তাকিয়ে আমি আকাশ-পাতাল ভাবছি— কী হল, হঠৎ কেন এমন করে কাঁদছে?

এমন সময় রাত্রি শেষের ফিসফিসানি হাওয়ার স্বরে আইরিন বলে উঠল, ‘সে যে আমাদের সবার কাছ থেকে ছুটি নিয়ে চিরদিনের মতো চলে গেছে দাদা’, বলে আইরিন আমার দু’হাত দিয়ে মুখ ঢেকে অঝোরে কাঁদতে লাগল। আমি বজ্রাহতের মতো স্থবির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম, মুখ দিয়ে কোনও কথা বের হল না। কেবল অশ্রুতে আমার শার্টের বুকটা ভিজে গেল।

তাহলে কি সংবাদপত্রে বেরনো সত্ত্বেও, আমার চোখ এড়িয়ে গিয়েছিল এত বড়ো খবরটা!

অনেক পরে আইরিন নিজেকে সামান্য সামলে নিয়ে ওর সিটের কাছে গিয়ে একটা ব্যাগ খুলে ছোট্ট একটি স্টিলের কলশি বের করে আমার হাতে দিয়ে বলল, ‘এতেই রয়েছে আপনার প্রিয় বন্ধু শুভ, আই মিন ওর দেহ-ভস্ম, নিয়ে যাচ্ছি মাধোপুরের মাঠেঘাটে আর দশাশ্বমেধ ঘাটে ছড়িয়ে দিতে। এটাই ছিল ওঁর শেষ ইচ্ছা।’

আমি সজল নয়নে কলশিটাকে সজোরে জড়িয়ে ধরে আর নিজেকে সামলাতে পারলাম না। সিটের উপর অসহায়ের মতো বসে পড়ে অঝোর ধারায় কাঁদতে লাগলাম।

একটু পরে ক্লান্ত ট্রেনটাও যেন পা ঘষটাতে ঘষটাতে অতি ধীরে বারাণসী স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে এসে দাঁড়িয়ে গেল!

আমি হাত ধরে আইরিনকে নামতে সাহায্য করছিলাম এমন সময় আমার নাতি মানু দৌড়ে এসে হাত ধরে নামিয়ে আমাদের প্রণাম করল। ওর সঙ্গে প্রায় ওরই বয়সি একটি ছেলে এসে আমাকে আর আইরিনকে প্রণাম করল। আমি জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে মানুর দিকে তাকাতেই ম্লান হেসে আইরিন বলল, ‘ও, রাহুল, আমি আসতে লিখেছিলাম।’

আমি একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলাম রাহুলের পানে। যেন ঠিক শুভঙ্কর দাঁড়িয়ে! কয়েক যুগ আগে সেই অনিন্দ্যসুন্দর হাসি হেসে যেন বলল, “মিত্র সাব, নাও তোমার জন্যে অমৃত নিয়ে এসেছি।’ আমার হাতে তখনও আইরিনের দেওয়া কলশিটা। রাহুল কলশিটা স্পর্শ করে ভক্তিভরে প্রণাম করল।

আমি ফিসফিসিয়ে আপন মনে উচ্চারণ করলাম, ‘শুভ, আমার প্রিয় মিত্র, আমার বন্ধু, আমার সখা – আমি জানি না অমৃত কী? কেমন দেখতে? কী তার রং, গন্ধ বা কেমন তার স্বাদ! কিন্তু এই যদি অমৃত লাভের আরাধনা হয়, তাহলে কাজ নেই ভাই আমার এমন অমৃতে।’

মানু এগিয়ে এসে আমাদের জিনিসপত্র তুলে নিল। যাত্রীদের ধাক্কা থেকে আমাকে রক্ষা করার জন্য রাহুল আর আইরিন এসে দু’পাশ থেকে আমাকে ঘিরে চলতে চলতে বলল, ‘সাবধানে চলো।”

স্টিলের কলশিটা তখনও বুকে চেপে ধরে আমি যন্ত্রচালিতের মতো হেঁটে চললাম বারাণসী স্টেশনের প্ল্যাটফর্মের ভিড়ে।

(সমাপ্ত)

অমৃতের অন্বেষণ (পর্ব-০৬)

আমি ই-মেইলে উত্তর দিয়েছিলাম, “ইয়েস স্যর, তুমি যখন চাও তখন দেখা হবেই। তা আমার চাকরি থাকে আর যায়!” চাকরি অবশ্য যায়নি, আসলে আমার তখনকার বস ছিল শুভ’র খুব গুণমুগ্ধ আর বেনারসেরই মানুষ। ওনাকে যখন জানালাম শুভ’র ইচ্ছা তখন উনি আপত্তি তো দূরের কথা উনিই জোর করে আমাকে অফিসিয়াল টুর বানিয়ে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন।

মনে পড়ে, শুভ সেমিনারের গাড়ি নিয়ে স্টেশনে এসেছিল আমাকে নিয়ে যেতে। কী ভীষণ খুশি হয়েছিল ও। স্টেশনে ভিড়ের মাঝেও আমাকে জড়িয়ে ধরে বলেছিল, ‘শোভন, আমি খুব খুশি তুমি এসেছ বলে।”

আমি দুষ্টুমি করে বলেছিলাম, ‘প্রফেসর পাণ্ডে ডেকেছে, আমি না এসে পারি?’

বেকায়দায় পড়ে গিয়েছিলাম কথাটা বলে। ও সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল, ও কে, প্রফেসর পান্ডে বলছে, কাম টু আমেরিকা টু ওয়ার্ক উইথ হিম।”

আমি ধরা পড়ে গিয়ে বলেছিলাম, “ওকে, সে দেখা যাবে। সব কথা কি স্টেশনেই বলবে না হোটেলে যাবে?”

—ওকে, বলে আমার হাত ধরে স্টেশনের বাইরে নিয়ে এসেছিল। কি ভীষণ একাগ্রতা আর ঘনিষ্ঠতা ছিল ওর মধ্যে তখন। সেমিনারের তিনটি দিন আমরা ছিলাম এক সঙ্গে। ট্রেনিং-এর দিনগুলোর মতো।

এলাহাবাদ ছেড়ে গাড়ি কখন অনেক দূর চলে এসেছে জানতেই পারিনি। পুরোনো দিনের মধুর স্মৃতিচারণে এতই মগ্ন ছিলাম। ক্রমে গাড়ির গতি কমে আসছিল। বোধহয় কোনও স্টেশন আসছে। কিন্তু হঠাৎ ব্রিজের আওয়াজ কানে আসতেই বুঝতে পারলাম আমাদের ট্রেন গঙ্গার ব্রিজে উঠে গেছে। অতএব, আমাদের গন্তব্যস্থল প্রায় এসে গেছে। আইরিনকে ডাকতে গিয়ে দেখি ও ইতিমধ্যেই উঠে তৈরি হয়ে নিয়েছে। বুঝলাম, আমি নিজের ভাবনায় আর স্মৃতি রোমন্থনে এতই মগ্ন ছিলাম যে আর কিছুই জানতে পারিনি। উঠে পড়ে, ওকে সুপ্রভাত জানালাম। ধন্যবাদ জানিয়ে ম্যাগাজিনটা ফেরত দিয়ে বাথরুমে গেলাম জামা-কাপড় চেঞ্জ করতে।

বাথরুম থেকে ফিরে আসতেই আইরিন আমার দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘আপনি কি ড. পাণ্ডের উপর লেখা আর্টিকেলটা পড়ছিলেন?’

আমি মাথা নেড়ে সায় জানলাম, ‘হ্যাঁ, কিন্তু আপনি কী করে জানলেন?”

আমার জিজ্ঞাসার সরাসরি উত্তর না দিয়ে আইরিন এবার আমার মুখের দিকে সোজা তাকিয়ে বলল, ‘আপনি নিশ্চয়ই ড. পাণ্ডেকে জানতেন।’

আমি কয়েক ঘণ্টার অগোছালো সংসার আমার ছোটো ব্যাগটাতে গোছাতে গোছাতে বললাম, “শুভকে! একটা ঢোক গিলে বললাম, আই মিন, ড. পাণ্ডেকে কে না চেনে?’

এবার আইরিন এক অদ্ভুত দৃষ্টিতে সোজা আমার দিকে তাকিয়ে আমার চোখে চোখ রেখে জিজ্ঞেস করল, “আপনি কে? আপনি কি ড. শোভন মিত্র ?’

আমি ইতস্তত করছি দেখে আইরিন আবেগভরে আমার হাতদুটো ওর কাছে টেনে নিয়ে কান্নাভেজা গলায় বলল, “কেন না আমি জানি, এ পৃথিবীতে দু’জন মানুষ ড. পাণ্ডেকে ওই নামে ডাকে। একজন ওঁর বাবা যিনি আর বেঁচে নেই আর একজন ওর পরম বন্ধু ডক্টর শোভন মিত্র। আপনি নিশ্চয়ই ড. শোভন মিত্র। শুভঙ্কর প্রায়ই আপনার কথা বলতেন। বলতেন আপনি ওর থেকেও বেশি ব্রাইট স্টুডেন্ট ছিলেন। কিন্তু কেবল নীতি বা প্রিন্সিপ্যাল-এর কারণে আপনি ওর সঙ্গে বিদেশ যেতে রাজি হননি।”

অমৃতের অন্বেষণ (পর্ব-০৫)

ইতিমধ্যে খবর পেয়েছিলাম, ও এক আমেরিকান মহিলাকে বিয়ে করেছে আর অনেক বড়ো বড়ো নামিদামি পুরস্কার পেয়েছে। পুরস্কারের কথা তো খবরের কাগজ, রেডিও-টিভি মারফত পেয়েই যেতাম। বড়ো বড়ো সেমিনারে যখন দেশে আসার খবর পেতাম তখন আমি সবার শেষে ‘হলে’ পৌঁছে একেবারে পিছনের বেঞ্চে গিয়ে বসতাম। কখনও সখনও চোখে চোখ পড়ে গেলে কেবল হাত তুলে ‘হাই” জানাত। ব্যস ওই টুকুই- শুধু চিনতে পেরেছে এটুকুই জানিয়ে দেওয়া।

আমাদের মধ্যে তফাতটা অনেক বেশি হয়ে গেছে। আকাশ পাতাল না হলেও যেন সমুদ্র আর ঢাকুরিয়া লেক! আমি সেমিনার শেষ হবার কয়েক মিনিট আগেই বেরিয়ে পড়তাম যাতে ওর সঙ্গে দেখা না হয়ে যায় আর ও অপ্রস্তুতে না পড়ে যায়। কেন-না ওর পক্ষে আমার জন্য সময় দেওয়া সম্ভব ছিল না। সব সময়ই কেউ না কেউ কাছাকাছি ঘিরে থেকে বার্তালাপ করতে ব্যস্ত থাকত।

আজ এই টাইম ম্যাগাজিনে ওর কৃতিত্বের কাহিনি পড়ে আমার নিজেকে গর্বিত বোধ হচ্ছিল এই ভেবে যে, একদিন আমারা দু’জন কত কাছের বন্ধু ছিলাম। একই কামরাতেই থাকতাম দিনরাত।

ওর স্ত্রী-পুত্র থাকা সত্ত্বেও আবার একটা আমেরিকান মেয়ে বিয়ে করাটা জানা-শোনা মহল সমর্থন করত না। অনেকরকম সমালোচনা আর নিন্দাবাদ করে শান্তি পেত। সরবে প্রচার করত, সেই “অবিচার আর অন্যায়ের’কাহিনি। আমার কিন্তু একবারও মনে হয়নি যে শুভ, জানকী আর পুত্র রাহুল-এর প্রতি অবিচার করেছে। শুভ তো ওদের নিয়ে যেতেই চেয়েছিল কিন্তু ওরাই তো দেশ ছেড়ে অতদূর বিদেশে যেতে চায়নি। বিশেষ করে সম্পূর্ণ নিরক্ষর আর গ্রামের মেয়ে জানকীর সাহসহীনতা।

আবার ওদেশে নোঙ্গর-বিহীন নৌকা হয়ে থাকাও যায় না। আর উপরে উঠতে গেলে যে অনুপাতে সামাজিক সিঁড়ি চড়তে হয় সে অভিজ্ঞতা বা প্রশিক্ষণ কোনওটাই শুভ’র ছিল না। তাছাড়া শুভ’র চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যই এমন ছিল যে ওর প্রার্থিত জিনিসের সামনে যে-কোনও বাধাই ও সুনামি’র বেগে অতিক্রম করে চলে যেত। তাইতো যখন প্রফেসর স্যান্ডারসনের কাছ থেকে ডাক এসেছিল। তখন তাতে সাড়া দিতে ওর এক মিনিটও সময় লাগেনি।

টাইম ম্যাগাজিনে শুভ’র গড়া ওর গ্রামের স্কুল আর আমেরিকায় প্রতিষ্ঠিত বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক প্রতিষ্ঠানগুলিরও অনেক উল্লেখ আর প্রশংসা করেছে বড়ো করে। গ্রামের স্কুল ওর বাবার নামেই করেছিল। এইসব প্রতিষ্ঠানই ওর কাছ থেকে নিয়মিত অর্থ সাহায্য পেত, এখনও নিশ্চয়ই পায়। টাকার প্রতি লোভ ওর কোন দিনই দেখিনি।

ট্রেনটা জোরে চলতে চলতে হঠাৎ আস্তে হয়ে একেবারেই থেমে গেল। আমি মাথা নীচু করে স্টেশনের নাম পড়ার চেষ্টা করলাম অতি কষ্টে অল্প আলোতে নামটা পড়লাম, এলাহাবাদ। একটু পরে অবশ্য প্ল্যাটফর্ম থেকে সুর করে আওয়াজ এল, ইয়ে ইলাহাবাদ স্টেশন হ্যাঁয়। খুব বড়ো আর সুন্দর স্টেশন। মনে পড়ে গেল অনেক বছর আগে একটা সেমিনারে এসেছিলাম এখানে। শুভও আসছিল আমেরিকা থেকে ওই সেমিনারে। ওই খুব আগ্রহ নিয়ে লিখেছিল — মিত্রসাব, আই ওয়ান্ট ইউ টু কাম, আই ওয়ান্ট টু সি ইউ। শুভ কিছুদিন থেকেই আমাকে ওই নামেই ডাকতে শুরু করেছিল। আর তখন সদ্য আমেরিকায় গেছে। কথায় কথায় ইংরাজি বলা অভ্যাস হয়ে গিয়েছিল বোধহয়।

পড়ার জন্য সীমাহীন গল্প-নিবন্ধসাবস্ক্রাইব