ষষ্ঠ শতকের একটি উদীয়মান শহর ছিল মাণ্ডু। দশম ও একাদশ শতকে পরমারস রাজবংশের অধীনে মাণ্ডুর লক্ষণীয় উন্নতি সাধন হয়। এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অবর্ণনীয়।

মাণ্ডু

মধ্যপ্রদেশের মালোয়া এলাকায় অবস্থিত মাণ্ডু শহর, মুঘল শাসক বাজবাহাদুর ও তার প্রেয়সী রূপমতীর ঐতিহাসিক প্রেমকাহিনির সাক্ষ্য বহন করছে। এখানে এসেই আপনি রূপসী মাণ্ডুর সেই অরূপকথাকে হাওয়ায় অনুভব করতে পারবেন। মালোয়ার লোকগীতি গায়করা নবাব আর তার প্রেয়সীর প্রেমকে মূর্ত করে তোলেন তাদের গানের মধ্য দিয়ে।

সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে দু’হাজার ফুট উঁচুতে বিন্ধ্য পর্বতমালার কোলে অবস্থিত মাণ্ডুর প্রাকৃতিক শোভা মুগ্ধ করে দেওয়ার পক্ষে যথেষ্ট। মাণ্ডুকে ঘিরে রয়েছে পারমার এবং মুঘল শাসকদের নির্মিত অট্টালিকা, নর্মদা নদী, জলাশয়, ঝিল, বিশালাকার গাছ।

মাণ্ডুর আর-এক নাম শাদিয়াবাদ বা আনন্দের নগরী। নামটা অপাত্রে দান করা হয়েছে, এমন অভিযোগ কেউ করবেন না। মহানগরের ব্যস্তসমস্ত জীবনের বাইরে এসে, কয়েকদিনের শান্ত অবকাশ যাপনের জায়গা হিসাবে মাণ্ডু আদর্শ। একে অত্যন্ত স্বাস্থ্যকর স্থান, উপরন্তু এখানে থাকার খরচও তুলনায় বেশ কম।

মাণ্ডু জনপদটিকে ঘিরে রয়েছে ৪৫ কিলোমিটার লম্বা একটি দেয়াল। দেয়ালের গায়ে অসংখ্য দরজা, মাণ্ডুতে প্রবেশের জন্য। এখানকার দর্শনীয় জায়গাগুলির মধ্যে অন্যতম ১২০ মিটার লম্বা জাহাজ-মহল। দুটি কৃত্রিম জলাশয় দিয়ে ঘেরা জাহাজ-মহল বানিয়েছিলেন গিয়াসুদ্দিন খিলজি। নবাবি হারেম হিসাবে ব্যবহার করা হতো এই মহলটিকে। খোলা মণ্ডপ, হেলানো অলিন্দ, বড়ো বড়ো থাম মহলের সৌন্দর্যকে বাড়িয়ে তুলেছে।

আরও আছে। হিন্দোলা মহলকে দূর থেকে দেখলে মনে হয় যেন ঝুলে আছে। গিয়াসুদ্দিন খিলজি এখানেই আমজনতার সঙ্গে দেখা করতেন। মহলের গায়ে আশ্চর্য সব অলংকরণ। বালিপাথরের তৈরি ভবনের ঠিক মাঝখানে গরম ও ঠান্ডা জল রাখার বাদশাহি বন্দোবস্তও চোখে পড়বে।

আশর্কি মহলকে অনেকে স্বর্ণমুদ্রার মহলও বলে থাকেন। এটি মূলত একটি মাদ্রাসা। মহম্মদ শাহ খিলজি নির্মিত এই মহলের কয়েকটি কক্ষ এখনও বেশ মজবুত অবস্থায় রয়েছে। এখানে একটি সাততলা মিনার গড়ে তোলা হয়েছিল। এখন অবশ্য এর একটি মাত্র তলাই কোনওরকমে টিকে আছে।

ষোলোশো শতকের প্রারম্ভে নির্মিত বাজবাহাদুর মহল না দেখলে, আপনার মাণ্ডু-দর্শন অসম্পূর্ণ থাকবে। এই মহলের উচুঁ অলিন্দ থেকে দূরদুরান্তের গ্রামগুলির নয়নাভিরাম দৃশ্য চোখে পড়ে। রানি রূপমতী একান্তে যে-মণ্ডপ থেকে বাজবাহাদুরের মহলটি দেখতেন, সেটিও এখানেই।

মাণ্ডুর আর-এক দর্শনীয় স্থান হোশংগাবাদের সমাধিক্ষেত্র। মার্বেল পাথরে নির্মিত এই সমাধিক্ষেত্রটি আফগান স্থাপত্যশৈলীর একেবারে গোড়ার দিকের অনুপম দৃষ্টান্ত।

সমাধিক্ষেত্রের গায়ে খোদাই করা ডিজাইন নজর কেড়ে নেবে। শোনা যায়, তাজমহল নির্মাণের আগে শাহজাহান তাঁর সময়ের শ্রেষ্ঠ স্থাপত্যবিদ উস্তাদ হামিদকে চারজন অন্য স্থাপত্য বিশেষজ্ঞের সঙ্গে এখানে পাঠিয়েছিলেন।

এগুলি ছাড়াও মা মাণ্ডুতে দেখতে পারেন জুমা মসজিদ, নীলকণ্ঠ মহল, লোহানি গুহা, সেবাকুণ্ড প্রভৃতি। মাণ্ডু সফরের জন্য প্রকৃত সময় হল জুলাই থেকে পরের বছরের এপ্রিল। মাণ্ডুর মন সম্যকভাবে বুঝতে গেলে ৪-৬ দিন এখানে থেকে যান। চাঁদনি রাতে মাণ্ডুর রূপ চিরকাল মনে থাকবে আপনার।

মাণ্ডুর সবচেয়ে কাছের বিমানবন্দর ও রেলস্টেশ নদুটিও একশো কিলোমিটার দূরে ইন্দোরে অবস্থিত। ১২৪ কিলোমিটার দূরে রুলাম জংশনে নেমেও মাণ্ডতে আসা যায়।

কয়েকটি সাধারণ অসুবিধা মাণ্ডুতে রয়েছে। গ্রীষ্মে পানীয় জলের অভাব তার মধ্যে অন্যতম। যেসব মরশুমে পর্যটক কম আসেন, সেইসব সময়ে অনেক খাবারের দোকানও সাময়িকভাবে ঝাঁপ ফেলে দেয়। তবে মরশুমে থাকার সমস্যা নেই। সাধারণ হোটেলগুলি ছাড়াও পর্যটন বিভাগের হোটেল রয়েছে।

কোথায় থাকবেন, যোগাযোগের ঠিকানা

মধ্যপ্রদেশ রাজ্য পর্যটন দফতর

চিত্রকূট, রুম ৭, ৬ষ্ঠ তল,

২৩০এ, এজেসি বোস রোড

কলকাতা – ৭০০০২০

 

 

Tags:
COMMENT