নব পরিণয় (পর্ব-০২)

নমিতা ভবিষ্যতে কী করতে চায় এটা না জিজ্ঞেস করেই ওর রেণুদিদি তার নিজের অজান্তেই নমিতাকে জীবনের এমন একটা কঠিন সত্যির মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল যেটাকে অস্বীকার করা কোনওভাবেই সম্ভব ছিল না নমিতার। আমেরিকা থেকে ফিরে আসার পরেই নমিতার বাবার এক বন্ধু তাঁর এক আত্মীয়ে সম্বন্ধ নিয়ে নমিতাদের বাড়ি এলেন।

—সঞ্জয়ের নিজের গ্লাস ফ্যাক্টরি রয়েছে, ছেলেটা ভালো ব্যাবসা করছে। এখন বিয়ে করতে চায় কিন্তু একটাই ইচ্ছে যে ভালো পদে ভালো কোম্পানিতে চাকুরিরতা পাত্রী হওয়া চাই।

নমিতার ছোটো ভাই ওনাকে থামিয়ে জিজ্ঞেস করল, কেন কাকু?

—দূরদর্শিতা বলতে পারো। সঞ্জয় জানে ব্যাবসা যে-কোনও সময় খারাপ অবস্থায় পেঁছোতে পারে। সুতরাং পরিস্থিতি সামলে দেওয়ার জন্য সেকেন্ড লাইন অফ ডিফেন্স অর্থাৎ স্থায়ী একটা রোজগারের ব্যবস্থা থাকা দরকার বলে ও মনে করে। সেক্ষেত্রে প্রফেশনালি কোয়ালিফায়ে পাত্রীর সঙ্গে বিয়ে করাটাই হল সঠিক সামাধন ওর কাছে। তোমাদেরও সমস্যা হবে না এখানে বিয়ে হলে কারণ নমিতা মা-ও তো চাকরি ছাড়তে হবে বলে বিয়ে করতে রাজি হচ্ছে না। এক্ষেত্রে সঞ্জয়ও ওকে চাকরি ছাড়ার কথা কোনওদিন বলবেও না। একটু থামলেন ভদ্রলোক। গেলাসে রাখা জলটা এক নিঃশ্বাসে পান করে বন্ধুর স্ত্রীর দিকে তাকালেন, বউদি আমার মনে হয় একবার যদি, আপনারা পাত্রর সঙ্গে দেখা করেন।

—দাদা আমি আর কী বলব, নমিতা যা বলবে তাই হবে, নমিতার মা উত্তর দিলেন।

নমিতা চুপচাপ বসে সব শুনছিল। শ্যামলকাকুই নমিতাকে জিজ্ঞেস করলেন, কী রে মা, তোর কী মত?

—আপনি যেটা ভালো বুঝবেন, মাথা ঝুঁকিয়ে উত্তর দিল নমিতা।

—ঠিক আছে, আমি ওদের সঙ্গে দেখা করে একটা সময় ঠিক করে জগদীশ তোকে জানিয়ে দেব। বন্ধুর দিকে তাকিয়ে উঠতে উঠতে কথাগুলো বলে শ্যামল, নমিতাদের বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলেন।

—দিদি, তুই কী করে শ্যামলকাকুকে হ্যাঁ বলে দিলি রে, নমিতার ছোটো ভাই নিখিল অবাক হয়ে দিদিকে জিজ্ঞেস করল।

—পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে ছেলেটার মধ্যে নয় আত্মবিশ্বাসের অভাব আছে আর নয়তো ও বউয়ে রোজগারের টাকায় ভাগ বসাতে চায়। তুই এরকম একজন লোকের জন্য নিজের সময় কেন নষ্ট করবি?

—শ্যামলকাকুর সামনে যখন কথা হচ্ছিল তখন মা-বাবা-তুই যখন কিছু বললি না তখন আমি কী করে প্রতিবাদ করব। ভাইকে কোনওরকমে এড়িয়ে নমিতা ওখান থেকে উঠে পড়ল।

সাইকোলজিতে ডক্টরেট করা ভাইকে কী করে নমিতা বলবে যে, এখন ওর জীবনবোধ সম্পূর্ণ বদলে গেছে। বিয়ে না করে জীবন ব্যর্থ করতে চায় না এখন ও, বরং সঞ্জয়ের দূরদর্শীতার মনে মনে তারিফ না করে পারেনি নমিতা।

নিখিলের আশঙ্কা ভুল প্রমাণিত হল যখন সঞ্জয় নিজের মুখে জানাল, আমার ব্যাবসা খুবই ভালো চলছে বরং আমি এখন এটা বাড়াবার কথা ভাবছি। তবে আমাকে এর জন্য আরও অনেক বেশি সময় দিতে হবে।

অবশ্য বিয়ে না করে ব্রহ্মচারী থাকব এমন বাসনাও আমার নেই কিন্তু আমি এমন মেয়ে বিয়ে করতে চাই যে নিজেও স্বাধীন থাকতে পারবে এবং নিজের কেরিয়ার নিয়ে সে ব্যস্ত থাকলে বাড়িতে আমার সময় কম দেওয়া নিয়ে ঝগড়া, অশান্তিও লেগে থাকবে না। বিশ্রামের প্রয়োজনীয়তার কতটা দরকার হতে পারে তাহলে সে সেটা বুঝতেও পারবে আর আমাকেও এই নিয়ে বিরক্ত করবে না। বিয়ে পর সংসারের কথা ভেবে অনেকেই রিস্ক নিতে ভয় পায় কিন্তু স্ত্রী যদি চাকুরিরতা হয় তাহলে কিছুটা রিস্ক নেওয়াই যেতে পারে।

কুকিং Secrets

সঠিক পদ্ধতিতে রান্না করা ও তা পরিবেশনের মধ্যেই কিন্তু রযেছে সুস্বাস্থ্যের চাবিকাঠি। অনেকসময় ছোটোখাটো ভুলের কারণে আমরা স্বাস্থ্যকর খাবার আরও অস্বাস্থ্যকর করে ফেলি।এমন কিছু বিষয় নিয়েই আজকের এই লেখা।

খাবার রান্নার সময় সঠিক তেল বাছাই করা খুবই জরুরি। কারণ ভুল তেল খাবারের স্বাদ নষ্ট করার পাশাপাশি পুষ্টিগুণও অনেক কমিয়ে আনে।স্যালাডে ব্যবহারের জন্য ওয়ালনাট এবং অলিভ অয়েল বেশি উপকারী। এছাড়াও ব্যবহার করা যায় নারকেল তেল, তিল তেল এবং সূর্যমুখীর তেল। ভাজা এবং গ্রিলে তৈরি খাবারের জন্য এই তেলগুলো খুবই ভালো।

প্রচলিত একটি ধারনা হল, বেশি তেল দিয়ে রান্না করলেই খাবার সুস্বাদু হয়। তবে অতিরিক্ত তেল স্বাস্থ্যের জন্য ভালো নয়। আর বেশি তেল মেদ জমানোর জন্যও দায়ী। তাই কম তেলে রান্না সারুন। রান্নার পাত্রে খাবার আটকে যাওয়া রোধ করতে, ঠিক যতটুকু তেল প্রয়োজন ততটুকুই ব্যবহার করা উচিত। এর থেকে বেশি তেল ব্যবহার করা কখনোই ঠিক নয়। খাবারে ক্যালরির পরিমাণ কমাতে ভাজার চাইতে বেইক করা বা সেদ্ধ করে অল্প তেলে সঁতে করা ভালো।

খাবারের স্বাদ বাড়ানোর জন্য চিনি,নুন এবং অন্যান্য ক্যালরিযুক্ত উপাদানের উপর নির্ভর করি আমরা। কিন্তু অতিরিক্ত চিনি, নুন, ঘি বা বাটারজাতীয় উপাদানের ব্যবহার, খাবারের পুষ্টিগুণ কমিয়ে দিতে পারে। সেই সঙ্গে এইসব উপাদান মোটা হওয়ার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

আভেনে রান্নার সময় অবশ্যই একটি রোস্টিং প্যান বা তারের জালির উপর মাংস বা মাছ বেক করতে হবে। এতে চর্বি গলে নিচে পড়ে যাবে। সাধারণ প্যানে বেক করলে চর্বির অংশ পুরোটাই খাবারের ভিতরে শুষে যায়। আর সেই খাবার খেলে শরীরে লাভের চেয়ে ক্ষতি বেশি।

খাবারে স্বাদ বাড়ানোর জন্য বিভিন্ন ধরনের মসলা ব্যবহার করা যেতে পারে। তাছাড়া নানান ধরনের হার্বস বা বিভিন্ন লতাপাতা, যেমন পুদিনা, লেটুস বা ধনেপাতা খাবারের স্বাদ বাড়িয়ে দেয় বহুগুন। পাশাপাশি ওজন কমাতে এবং খাবারের পুষ্টিগুণ বাড়াতেও কার্যকর এইসব হার্বসগুলো।

রান্নায় সুবিধা হবে ভেবে অনেকেই আগে থেকে পেঁয়াজ ও রসুন কেটে রাখেন। আগে থেকে কেটে রাখা হলে তা থেকে কড়া গন্ধ বের হয় এবং খাবারের স্বাদ নষ্ট করে। তাই খাবারের স্বাদ বাড়াতে রান্নার ঠিক আগে পেঁয়াজ ও রসুন কেটে নিন।

প্রতিটি রান্নারই একটা আলাদা নিয়মথাকে, সেই অনুযায়ী রান্না করলে খাবারের স্বাদ ও ঘ্রাণ বজায় থাকে। যদি বলা হয়ে থাকে প্রথমে তেল ও পরে পেঁয়াজ, রসুন ও শুকনা মসলা দিতে, তাহলে তা-ই করুন। এতে নিজেই পার্থক্য বুঝতে পারবেন। রান্নার স্বাদ বাড়াতে রেসিপিতে ব্যবহৃত মসলা, মাখন বা তেল দিয়ে আগে থেকে দু-এক মিনিট ভেজে নিন। এটা রান্নার স্বাদ বাড়াতে সাহায্য করে।

সব শেষে বলি, রান্নার জন্য চাই ধৈর্য্য। আর প্রথম ধাপ হল পাত্র ভালোভাবে গরম করে নেওয়া। রান্নার উপকরণ দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই পাত্রের তাপমাত্রা কমতে থাকে। তাই পাত্র আগে পর্যাপ্ত গরম করে তাতে রান্না করলে খাবারের স্বাদ ও ঘ্রাণ বজায় থাকবে।

আর পরিবেশনেরও একটা নিয়ম আছে। গরম খাবার মজাদার। কিন্তু মনে রাখতে হবে আমাদের জিভ তাপ সংবেদনশীল। তাই খাবার পরিবেশনের সময় দেখবেন যেন তা জিভ পুড়ে যাওয়ার মতো গরম না থাকে।

সন্তানের কি Confidence-এর অভাব ?

হিয়ার বয়স ৯। ক্রিকেট খেলা দেখতে ও ভালোবাসে ছোটো থেকেই। বাড়ির সামনে রাস্তায় খেলা হলেই ‘অন্য বাচ্চাদের সঙ্গে খেলবে বলে রোজই বায়না করে। শ্রাবণী দোনামনা করলেও মেয়েকে অন্য বাচ্চাদের সঙ্গে খেলতে পাঠায়। সেদিন কাঁদতে কাঁদতে মেয়ে ঘরে ফেরায়, শ্রাবণী কারণ জিজ্ঞেস করাতে একরাশ হতাশা ঝরে পড়ে হিয়ার গলায়। ব্যাট করতে গেলেই খালি আউট হয়ে যায় তাই নাকি কেউই ওকে দলে নিতে চায় না। শ্রাবণী মেয়ের চোখের জল মুছিয়ে দিয়ে ওকে কোলে টেনে নিল। মেয়েকে বোঝাল, চেষ্টা করতে থাকলে ওর বন্ধুদের থেকেও অনেক বেশি ভালো ব্যাটিং করতে পারবে ও। মেয়েকে আশ্বাস দিল, ‘দেখবি একদিন ওরাই তোকে দলে নেওয়ার জন্য নিজেদের মধ্যে ঝগড়া, মারামারি করবে।’ শ্রাবণী মেয়েকে মনে করাল আগে সুইমিং শিখতে গিয়ে জলে নামলেও হিয়া ভয়ে সাঁতার কাটতে চাইত না। কিন্তু মা বাবার সাহস পেয়ে ভয়কে জয় করে নিজের চেষ্টায় ভালো সাঁতারু এখন হিয়া। সবকিছুই সম্ভব হয়েছে হিয়ার Confidence অটুট থাকার জন্য এবং এই আত্মবিশ্বাস গড়ে তোলার পেছনে শ্রাবণী ও তার স্বামীর অবদানও কিছু কম নয়।

মা-বাবার উৎসাহ এবং সাকারাত্মক জীবনবোধ বাচ্চার আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। বাচ্চার নিজের উপর এবং অন্যান্য সবকিছুর ওপরে একটা ধারণা তৈরি হয়, যেটা ওই ছোটো বয়স থেকেই বাচ্চার Confidence বাড়িয়ে তুলতে সাহায্য করে। বাচ্চা কী ভাবছে, আশেপাশে কী দেখছে, কী শুনছে, পারিপার্শ্বিক ঘটনায় কী প্রতিক্রিয়া দিচ্ছে –এই সব কিছুই বাচ্চার সম্পূর্ণ চরিত্র গঠনে সাহায্য করে এবং তার চরিত্রের পূর্ণাঙ্গ রূপ প্রকাশ পায়। যদি কোনও বাচ্চা দুশ্চিন্তা, ভয়, অসন্তোষ অথবা অবসাদের শিকার হয়ে পড়ে তাহলে মানসিক ভাবে সে খিটখিটে স্বভাবের হয়ে উঠবে এবং আত্মবিশ্বাসও হারাবে। বাচ্চার ভীত, চিন্তিত, অবসাদগ্রস্ত হওয়ার অনেক কারণ হতে পারে। স্কুলে অথবা টিউশনে ঠিকমতো পড়াশোনা বুঝতে অসফল হলে অথবা কঠিন কোনও কাজ করার সময় আপত্তিজনক কোনও পরিস্থিতির সম্মুখীন হলে, বাচ্চারা অবসাদের শিকার হতে পারে। নিজে ভালো কিছু করতে না পারলে, যদি সে নিজের বয়সি অন্য বাচ্চাদের সেটা সফল ভাবে করতে দেখে, তাহলেও অনেক সময় তাদের মধ্যে আত্মবিশ্বাসের অভাব দেখা যায়।

বাচ্চার দুর্বল আত্মবিশ্বাস তাদের নিজের মনের মধ্যে গুটিয়ে থাকা মনোভাব তৈরি করে এবং তাদের, চুপচাপ হয়ে যাওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। মা-বাবাকে বাচ্চার এই মানসিক পরিস্থিতির সংকেতগুলো বুঝতে হবে এবং সেইমতো পরিস্থিতির মোকাবিলা করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে। এভাবে বাচ্চারও Confidence বাড়বে এবং সেইমতো সমস্যার মুখোমুখি হয়ে সেটা সমাধানের সাহস সে খুঁজে পাবে। অভিভাবকদের চেষ্টা করতে হবে বাড়ির পরিবেশ বন্ধুত্বপূর্ণ রাখতে যাতে বাচ্চা নিশ্চিন্ত বোধ মনে করে। এছাড়া বকুনির ভয় ছাড়াই বাচ্চা যেন নিজের মনের কথা বড়োদের কাছে খুলে বলতে পারে।

 

নতুন দাম্পত্য ও Money Management

নতুন বিয়ের পর অনেক দম্পতি-ই স্বচ্ছ ভাবে নিজেদের মধ্যে টাকা নিয়ে অথবা উভয়ের রোজগার নিয়ে খোলাখুলি আলোচনা করতে পারে না। অনেক সময় ট্রান্সপেরেন্সির এই অভাব সুখী দাম্পত্যে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। প্রয়োজন হচ্ছে ভবিষ্যতের কথা ভেবে একে অপরের সঙ্গে খোলাখুলি ভাবে নিজেদের রোজগার, সঞ্চয় এবং কোথায় কে কী ভাবে ইনভেস্ট করতে আগ্রহী সে বিষয়ে একটা স্পষ্ট ধারণা তৈরি করা এবং সেই মতো লক্ষ্যে এগিয়ে চলা।

লক্ষ্য স্থির করুন

প্রথম থেকেই দম্পতিদের কিছুটা করে আর্থিক সাশ্রয় করা উচিত যাতে প্রয়োজনের সময় সেটা কাজে আসতে পারে। সব থেকে ভালো হয় যদি প্রথমেই ‘সেভিং বাজেট’ ঠিক করে নেওয়া হয়। প্রতি মাসে এটা ঠিক করে নেওয়া উচিত। এই পদ্ধতিটিকে বলা হয়, ‘পে ইওরসেল্ফ ফার্স্ট’। এই কনসেপ্ট-এর পিছনে রয়েছে সরকারের ট্যাক্স, ব্যাংকের সুদ, রেস্তোরাঁর বিল এবং অন্যান্য সমস্ত খরচা মেটাবার পর দেখা যায় সব থেকে নেগলেকটেড পার্সন-টা কিন্তু আপনি নিজে, যে কিনা কিছুই পায়নি। সুতরাং নিজের মাসিক উপার্জন থেকে প্রথমেই কিছুটা অর্থ আগেই সঞ্চয় করে রাখুন লক্ষ্য স্থির রেখে এবং অবশিষ্ট অর্থ থেকে নির্দ্বিধায় খরচ করুন। Money Management করার ফলে কিছুদিন পরেই লক্ষ্য মিট-আপ করার জন্য, সঞ্চিত অর্থ যথেষ্ট পরিমাণ হয়ে উঠবে এবং অন্যান্য খাতেও টাকা বিনিয়োগ করার মতো পরিস্থিতিও গড়ে উঠবে।

লক্ষ্যে পৌঁছোতে ইনভেস্ট করুন

দম্পতিদের উচিত বিনিয়োগের লক্ষ্য শর্ট, মিডিয়াম এবং লং টার্ম—এই তিন ভাগে ভাগ করে নেওয়া। সেভ এবং ইনভেস্ট করে গাড়ি কেনা (২ বছরের মধ্যে গাড়ি কিনে নেওয়া যায়) হল শর্ট টার্ম গোল। ফ্যামিলি স্টার্ট করার জন্য ইনভেস্টমেন্ট করা (স্ত্রী চাকরি ছেড়ে দিলে এবং সংসারের খরচা উত্তরোত্তর বাড়তে থাকলে) অথবা বাড়ি কেনার জন্য ডাউন পেমেন্ট করতে টাকা বাঁচানো হল মিডিয়াম টার্ম গোল (২ থেকে ৫ বছর)। এছাড়া সন্তানের এডুকেশন এবং ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয় করা এবং চাকরি থেকে অবসর গ্রহণের পর জীবন অতিবাহিত করার জন্য সেভ করা হচ্চে লং টার্ম গোল (৫ বছরের বেশি সময়ের জন্য)।

এই তিনটি টার্ম ছাড়াও আরও একটা ফান্ড তৈরি করার খুব দরকার যেটা থেকে ভবিষ্যতের অনিশ্চিয়তা বা অঘটনের জন্য টাকা জমানো হবে। হঠাৎ চাকরি চলে গেলে, অ্যাক্সিডেন্টের জন্য সাময়িক কর্মবিরতি হলে, এই ফান্ড থেকে টাকা তুলে কিছুদিন অনায়াসে চালানো যায়। এই ফান্ড যে ব্যক্তি করছেন, সেই ব্যক্তির জন্য ৬ মাসের নিজস্ব সমস্ত খরচা যাতে ইএমআই, ইন্সিওরেন্স পলিসির প্রিমিয়াম এবং অন্যান্য ফিক্স খরচাগুলো ধরে নিয়ে যত টাকা হয় তার সমান সমান অর্থ এই ফান্ডে রাখাটা খুব জরুরি। দুই মাসের সঞ্চয় সেভিংস অ্যাকাউন্টে রেখে দেওয়া উচিত, যাতে প্রয়োজন পড়লেই সঙ্গে সঙ্গে তোলা যায়। আর বাকি টাকাটা লিকুইড মিউচুয়াল ফান্ডে রাখা বাঞ্ছনীয় যেখান থেকে ১ দিনের নোটিশে টাকা তুলে নেওয়া যেতে পারে।

এক্সপিরিয়েন্স-এর উপর ইনভেস্ট করুন

আজকের ফাস্ট মুভিং ওয়ার্ল্ড-এ সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে সময় দেওয়াটা খুব জরুরি। প্রয়োজনে এক্সপিরিয়েন্স-এর উপর ভরসা রাখুন এবং কোয়ালিটি টাইম পারচেস করতে ইনভেস্ট করুন। ফান্ড তৈরি করুন এবং অ্যাক্টিভিটি প্ল্যান করুন যাতে দুজন মিলেই এনজয় করতে পারেন। এই ফান্ড দিয়ে বিশ্বভ্রমণ করতে পারেন, বাঞ্জি জাম্পিং, ডিপ সি ডাইভিং ইত্যাদি করতে পারেন। আগে থেকে প্ল্যান করুন। একটা ফিক্স অ্যামাউন্ট প্রতি মাসে লিকুইড ফান্ডে সরিয়ে রাখুন যাতে বেড়াতে যাবার মুখে স্ট্রেস নিতে না হয় ফান্ড জোগাড় করার জন্য।

অ্যাসেট তৈরি করতে ধারে ডুববেন না।

অ্যাসেট করার জন্য লোন নিতে গেলে নিজের লিমিট সম্পর্কে ওয়াকিবহাল থাকতে হবে। কারও গাড়ি এবং বাড়ির উপর নেওয়া টোটাল লোন অ্যামাউন্ট-এর ইএমআই, ওই দম্পতির গ্রস ইনকামের ৩০ শতাংশ হওয়া উচিত। এর বেশি হওয়া যুক্তিসঙ্গত নয়। এতে ক্যাশ ফ্লো সমস্যা হতে পারে। উপার্জন অনুযায়ী এবং স্টেবল জব থাকলে সেই অনুযায়ী গাড়ি, বাড়ি কিনুন।

পর্যাপ্ত ইন্সিওরেন্স থাকা খুব জরুরি

লাইফ ইন্সিওরেন্স : পরিবারে আপনার উপর নির্ভরশীল কেউ থাকলে (যার স্ত্রী চাকরি করে না, বয়স্ক নির্ভরশীল মা-বাবা, সন্তান) দম্পতির উচিত পর্যাপ্ত লাইফ ইন্সিওরেন্স করিয়ে রাখা। টার্ম ইন্সিওরেন্স পলিসি কিনুন (অনলাইন পলিসির দাম কম) লাইফ ইন্সিওরেন্স-এর প্রয়োজন মেটাতে। ইনভেস্টমেন্ট ওরিয়েন্টেড ইন্সিওরেন্স প্রোডাক্ট, যেগুলিতে বছরে হাই প্রিমিয়াম দিলেও পর্যাপ্ত লাইফ কভার পাওয়া যায় না, সেগুলিতে বিনিয়োগ করবেন না। আপনার ফিন্যান্সিয়াল প্ল্যানার-ই বলে দেবে কতটা কভার আপনার প্রয়োজন, আপনার উপর যিনি নির্ভরশীল তার কত ইনকাম, আউটস্ট্যান্ডিং লায়াবিলিটি, ফিউচার ফিন্যান্সিয়াল গোল ইত্যাদি সব কিছুর হিসেবনিকেশ করে।

হেল্থ ইন্সিওরেন্স : কোম্পানি থেকে হেল্থ ইন্সিওরেন্স প্রোভাইড করলেও, উভয়ের জন্য ইন্ডিভিজুয়াল হেল্থ ইন্সিওরেন্স করানো খুব দরকার। এছাড়াও অ্যাক্সিডেন্ট কভার এবং ক্রিটিক্যাল ইলনেস পলিসিও কিনে রাখা যায় বেশি প্রোটেকশনের জন্য। হেল্থ পলিসি কেনার আগে উচিত একজন ফিন্যান্সিয়াল প্ল্যানার-এর অ্যাডভাইস নেওয়া অথবা অনলাইন ফিন্যান্সিয়াল প্ল্যানিং প্ল্যাটফর্মের সাহায্যও নেওয়া যেতে পারে যাতে নতুন দম্পতি যুগল নিজেদের একটা রোডম্যাপ ছকে ফেলতে পারেন আর্থিক স্বাধীনতা পাওয়ার লক্ষ্যে।

নতুন রূপে সেজে উঠেছে দক্ষিণ আফ্রিকা

ভ্রমণ পিপাসুদের জন্য দক্ষিণ আফ্রিকা বরাবরই আকর্ষণের কেন্দ্রে। তবে, ২০২২ সালে ভারতীয়দের জন্য দক্ষিণ আফ্রিকা হয়ে উঠেছিল অন্যতম ভ্রমণ গন্তব্য। আরও প্রচারের ফলে ভারতীয় পর্যটকদের মধ্যে দক্ষিণ আফ্রিকাকে অ্যাডভেঞ্চার গন্তব্য হিসেবে বেছে নেওয়ার তাগিদ ক্রমশ বাড়ছে। পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় ভারত থেকে পর্যটকদের সংখ্যা বৃদ্ধি হয়েছে ২০০ শতাংশ। গত বছর নভেম্বর পর্যন্ত এই রেনবো নেশন প্রায় ৫০,০০০ ভারতীয়কে স্বাগত জানিয়েছে নিজের দেশে। এই বৃদ্ধির ফলে সাউথ আফ্রিকান ট্যুরিজম তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে এর ৩৩,৯০০-র বেশি ভ্রমণার্থী নিয়ে আসার লক্ষ্য অতিক্রম করেছে বছরের একেবারে শুরুতেই।

ট্যুরিজম-এ গতিশীলতা ধরে রাখতে এবং এগিয়ে নিয়ে যেতে কলকাতা, চেন্নাই, হায়দরাবাদ, মুম্বই প্রভৃতি ভারতের প্রধান শরগুলিতে ১৩ থেকে ১৬ ফেব্রুয়ারি রোড শো আয়োজন করেছিল সাউথ আফ্রিকান ট্যুরিজম। এর সঙ্গে ছিল ৩৫ সদস্যের ট্রেড ডেলিগেশন। ২০২২-এ, সাউথ আফ্রিকার পর্যটনে ভারত হয়েছে ষষ্ঠ বৃহত্তম আন্তর্জাতিক সোর্স মার্কেট। ২০২৩-এর জন্য এর স্ট্র্যাটেজিক রোডম্যাপের ওপর নির্দেশিকা প্রদান করে ট্যুরিজম বোর্ডের লক্ষ্য তাদের পূর্ববর্তী লক্ষ্যের চেয়ে ৭২ শতাংশের বেশি ভারতীয় পর্যটক অর্জন করা।

সাউথ আফ্রিকান ট্যুরিজম, এমইআইএসইএ, হাব হেড নেলিস্বা এনকানি জানিয়েছেন, ‘এটা হল আমাদের ১৯তম বার্ষিক ইন্ডিয়া রোড শো এবং প্রতিবার আমরা অভিনন্দিত হই এদেশের পর্যটকদের থেকে দক্ষিণ আফ্রিকার চমৎকার গন্তব্যের জন্য। বৈশ্বিকভাবে আমাদের সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ বাজারের মধ্যে ভারত রয়েছে একেবারে সামনের সারিতে। এই গতিশীলতা আরও এগিয়ে নিয়ে যেতে, সম্প্রতি আমরা চালু করেছি আমাদের ‘মোর অ্যান্ড মোর’ ক্যাম্পেনের দ্বিতীয় পর্ব, যা ভারতের ভেতরে আমাদের টার্গেট অঞ্চলের ভ্রমনার্থীদের যুক্ত করবে দেশী ও স্থানীয় উপাদানের মাধ্যমে। আমাদের কাস্টমাইজড এনগেজমেন্ট মডেলের মধ্য দিয়ে আমরা আশা করি ভ্রমণের আকাঙ্ক্ষা ও ইচ্ছে আরও বৃদ্ধি করতে পারব। চলতি বছরে, আশা করা হচ্ছে কলকাতা হয়ে উঠবে ভারতের মধ্যে অন্যতম দ্রুততম বিকাশীল সোর্স মার্কেট। অতিমারির পর ভ্রমণবিধিতে ছাড় হল বৃহত্তম সাফল্য।’

ভারতের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ৩০ বছর উদযাপনের প্রেক্ষাপটে, সাংবাদিক সম্মেলনে, সাউথ আফ্রিকান ট্যুরিজম আনন্দ প্রকাশ করেছে সমৃদ্ধ ঐতিহ্য ও আন্তরিক অতিথি পরায়ণ সংস্কৃতিকে, যা দুই দেশকে একত্রিত করেছে। বর্তমানে ভারত থেকে বেশ কয়েকটি স্টপ-ওভার উড়ান দক্ষিণ আফ্রিকায় যাচ্ছে। এছাড়া, সুবিধা দিচ্ছে এমিরেটস, কাতার এয়ারওয়েজ, ইথিওপিয়ান এয়ারলাইন্স, কেনিয়া এয়ারওয়ে ও এয়ার সেসেলস। এবার জেনে নিন, দক্ষিণ আফ্রিকার নবরূপে সেজে ওঠা আকর্ষণীয় স্থানগুলি সম্পর্কে।

ভৌগলিক এবং সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের কারণে দক্ষিণ আফ্রিকাকে বলা হয় ‘এক দেশে বিশ্ব’। কেপটাউন এবং ডারবানের মতো দক্ষিণ আফ্রিকার শহরগুলির সংস্কৃতি একেবারে স্বপ্নময়। দক্ষিণ আফ্রিকার জলবায়ু প্রধানত শুষ্ক এবং রৌদ্রোজ্জ্বল। আপনার সফরের সময়, বিনিময় হারের উপর নির্ভর করবে দক্ষিণ আফ্রিকা ভ্রমণের খরচ কত। কেপটাউন তালিকায় না থাকলে দক্ষিণ আফ্রিকার যে-কোনও সফর সম্পূর্ণ হতে পারে না। এটি দক্ষিণ আফ্রিকার তিনটি রাজধানীর মধ্যে একটি। পর্যটকরা কেপ টাউন পছন্দ করেন। এই শহরটি দ্বিতীয় সর্বাধিক জনপ্রিয় শহর, যেখানে ঐতিহ্য এবং আধুনিকতা পাশাপাশি বাস করে।প্রকৃতিতে ঘেরা এই সুন্দর শহরটি। এখানে রয়েছে বোটানিক্যাল বিস্ময়, উঁচু চূড়া পর্বত এবং ফিরোজা রঙের সমুদ্র। কেপটাউনে থাকাকালীন আপনি যদি টেবিল মাউন্টেন পরিদর্শন করেন, তাহলে আপনার মন ভরে যাবে।

আফ্রিকান পেঙ্গুইন দেখতে চাইলে আপনাকে অবশ্যই বোল্ডারের বিচ পেঙ্গুইন কলোনীতে যেতে হবে। আপনি শহরের কেন্দ্র থেকে বো কাপ পর্যন্ত ১০ মিনিটের জন্য হেঁটে যেতে পারেন। ক্যানাল ওয়াক এবং ভিক্টোরিয়া ওয়ার্ফ শপিং সেন্টারের মতো শহুরে মল এবং দুর্দান্ত রেস্তোরাঁগুলি আপনাকে এই বড়ো শহরের রাতের জীবনকে ভুলতে দেবে না। কেপ টাউনে দেখার মতো অন্যান্য স্থান হল ভিক্টোরিয়া, আলফ্রেড ওয়াটারফ্রন্ট, টু ওশান অ্যাকোয়ারিয়াম এবং লায়নস হেড।

ক্রুগার ন্যাশনাল পার্ক দক্ষিণ আফ্রিকায় দেখার জন্য সেরা জায়গাগুলির মধ্যে একটি। এটি ২০,০০,০০০ হেক্টর এলাকা জুড়ে দক্ষিণ আফ্রিকার প্রাচীনতম এবং বৃহত্তম পার্কগুলির মধ্যে একটি। ক্রুগার শত শত প্রজাতির প্রাণীর আবাসস্থল। তাদের মধ্যে প্রধান আকর্ষণ হল বিগ ফাইভ— সিংহ, চিতাবাঘ, হাতি, কেপ মহিষ এবং গন্ডার। পার্কটিতে সাফারি করতে পারেন দিনে এবং রাতে। এখানে উপলব্ধ সমস্ত গেম ড্রাইভের অভিজ্ঞতা পেতে আপনাকে কমপক্ষে ৩-৪ দিন থাকতে হবে।

গোল্ডেন রুট দক্ষিণ আফ্রিকার দক্ষিণ-পূর্ব উপকূল বরাবর চলে। এটি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের দিক থেকে বিশ্বের অন্য যে-কোনও ড্রাইভিং রুটকে কিছুটা তুচ্ছ করে দিতে পারে। এই সুন্দর পথটি প্রায় ২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এবং মোসেল বে এবং স্টর্মস নদীর লাগোয়া।  Knysna রিজার্ভ পার্ক হল হাতিদের সান্নিধ্য পাওয়ার আদর্শ জায়গা।

আপনি যদি শান্তিপূর্ণ কোনও শহরে কিছু দিন কাটাতে চান, তাহলে বেছে নিন স্টেলেনবোশ শহর। দক্ষিণ আফ্রিকার একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় শহর, স্টেলেনবোশও দ্বিতীয় প্রাচীনতম। এই শহরের ইতিহাস ১৬৭৯ সাল থেকে শুরু হয়েছে এবং আপনি ভিলেজ মিউজিয়াম এবং স্টেলেনর্ক মিউজিয়ামে গিয়ে সেই ইতিহাসের স্বাদ নিতে পারেন। এছাড়াও আপনি রেস্টুরেন্ট, নাইটক্লাব, ক্যাফে এবং আর্ট গ্যালারীও উপভোগ করতে পারেন।ড্রাকেন্সবার্গ বা ড্রাগন পর্বত দক্ষিণ আফ্রিকার সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ। লেসোথো রাজ্য এবং কোয়াজুলু নাটাল প্রদেশের মধ্যে বিস্তৃত এই অঞ্চলটি প্রায় ২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এবং জলপ্রপাত, গুহা, পর্বত প্রভৃতিতে সমৃদ্ধ। জায়ান্টস ক্যাসেল গেম রিজার্ভে, আপনি প্রায় ৮০০ প্রজাতির ফুল গাছ দেখতে পাবেন। পর্বত ট্রেইলগুলি গ্রীষ্মে হাইকিং, বাইক চালানো, রক ক্লাইম্বিং, প্যারাসেইলিং এবং রিভার রাফটিং এর জন্য বিখ্যাত। ওয়েটল্যান্ড পার্ক, কোয়াজুলু নাটাল প্রদেশের উত্তর উপকূলে অবস্থিত। ৫২৬টিরও বেশি প্রজাতির পাখি এবং অন্যান্য প্রাণীর সঙ্গে প্রকৃতির বিস্ময় দেখার জন্য এটি সেরা জায়গা। এই জলাভূমি পার্ক জল-প্রেমী প্রাণী যেমন জলহস্তী, কুমির এবং কচ্ছপের জন্য স্বর্গ। আপনি গন্ডার, জেব্রা, বেবুন এবং মহিষও দেখতে পাবেন এখানে।

পিলানেসবার্গ ন্যাশনাল পার্ক হল জোহানেসবার্গের একটি জাতীয় উদ্যান। জোহানেসবার্গ থেকে এটি মাত্র আড়াই ঘন্টা দূরে। বিস্তৃত তৃণভূমি এবং কৃত্রিম হ্রদ মানকওয়ে বাঁধ এই অঞ্চলটিকে বন্যপ্রাণীদের বসবাসের জন্য নিখুঁত করে তুলেছে। এই জাতীয় উদ্যানে জেব্রা, আফ্রিকান বন্য কুকুর, হরিণ, জিরাফ এবং শত শত প্রজাতির পাখি রয়েছে।

হারমানাস পশ্চিম কেপের একটি ছোটো পর্যটন শহর। এটিকে দক্ষিণ আফ্রিকার তিমি রাজধানী বলা হয়। শুধুমাত্র তিমি ও ডলফিন দেখার জন্য পর্যটকরা এখানে ভিড় করেন। তিমি দেখার বোট ট্যুর অসাধারণ, তবে আপনি পাহাড় থেকেও দেখতে পারেন। হারমানাসে তিমি দেখার সেরা সময় জুন থেকে ডিসেম্বর। হারমানাস প্রতি বছর সেপ্টেম্বর মাসে দর্শনার্থীদের জন্য একটি তিমি উৎসবেরও ব্যবস্থা করে। তিমি এবং ডলফিন দেখা ছাড়াও, সন্ধ্যায় পাহাড় লাগোয়া হাঁটা পথ ধরেও আপনার দক্ষিণ আফ্রিকা সফরকে স্মরণীয় করে তুলতে পারেন।

ট্রান্সন্যাশনাল পার্ক দক্ষিণ আফ্রিকার উত্তর অংশে দক্ষিণ আফ্রিকা এবং বতসোয়ানার মধ্যে অবস্থিত। এই পার্কটি ২০০০ সালে কালাহারি জেমসবক ন্যাশনাল পার্ক এবং বতসোয়ানা জেমসবক ন্যাশনাল পার্ককে একীভূত করে তৈরি হয়েছিল। কালাহারি সিংহ, চিতা এবং হায়েনার মতো শিকারীও এখানে পাওয়া যায়। অনুর্বর প্রান্তর, লাল টিলা এবং অসাধারণ বন্যপ্রাণী এই জাতীয় উদ্যানটিকে অনন্য করে তুলেছে।

জনসংখ্যার দিক থেকে জোহানেসবার্গ দক্ষিণ আফ্রিকার বৃহত্তম শহর। এটি সোনার খনির বসতি হিসাবে শুরু হওয়ায় এটিকে ‘সোনার শহর’ বলা হয়। এই শহরের কিছু শীর্ষ আকর্ষণ হল বর্ণবাদী যাদুঘর, কনস্টিটিউশন হিল এবং গোল্ড রিফ সিটি।জোহানেসবার্গে কালেক্টরস ট্রেজারি একটি আটতলা বিল্ডিং, যা দুর্লভ বই সমৃদ্ধ। আপনি যদি কেনাকাটা করতে এবং একটি প্রাণবন্ত পরিবেশ পছন্দ করেন, তবে আপনার নেবারগুডস মার্কেটে যাওয়া উচিত।আপনি যদি জোহানেসবার্গে যান, তাহলে অবশ্যই নেলসন ম্যান্ডেলার জন্মস্থান সোয়েটো শহর ঘুরে আসতে পারেন। সোয়েটোতে দুটি অরল্যান্ডো টাওয়ার রয়েছে, যেগুলি ২০০৯ সাল থেকে বাঞ্জি জাম্পিংয়ের জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে।

মোসেল বে দক্ষিণ আফ্রিকার সেরা কিছু সমুদ্র সৈকতের জন্য বিখ্যাত। সান্টো সৈকত তাদের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য। এছাড়াও, বার্থোলোমিউ ডায়াস মিউজিয়াম এবং পোস্ট অফিস ট্রি দেখতে ভুলবেন না। জাদুঘর কমপ্লেক্সে অবস্থিত, পোস্ট অফিস ট্রি একটি প্রায় ৬০০ বছরের পুরানো মিল্কউড গাছ এবং এটি বিশ্বাস করা হয় যে, এই গাছটি দক্ষিণ আফ্রিকার প্রথম ডাকবাক্স। কেপ সেন্ট ব্লেইজ লাইটহাউস কমপ্লেক্স, গার্ডেন রুট ক্যাসিনো এবং পয়েন্ট অফ হিউম্যান অরিজিন হল পর্যটকদের প্রিয় স্পট।

কেপ টাউন থেকে মাত্র ৪৫ মিনিটের দূরত্বে, পার্ল হল বিশাল ঐতিহাসিক এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সহ একটি ছোটো শহর। শহরটি পার্ল পর্বতমালার চূড়ায় দাঁড়িয়ে আছে। জর্জিয়ান, ভিক্টোরিয়ান, এডওয়ার্ডিয়ান এবং কেপ ডাচ ভবনগুলি শহর জুড়ে ছড়িয়ে আছে। শহরের প্রধান সড়কের ধারে আপনি ক্যাফে এবং রেস্তোরাঁও পাবেন। ড্রাকেনস্টাইন কারাগার, যেখানে নেলসন ম্যান্ডেলা তার বন্দী জীবন কাটিয়েছেন, শহরের উপকণ্ঠে অবস্থিত।পারল-এ দেখার জায়গাগুলি হল ফেয়ারভিউ চিজ অ্যান্ড ওয়াইন ফার্মের গোট টাওয়ার, আফ্রিকান ভাষা স্মৃতিস্তম্ভ এবং ওয়াইন এস্টেট।

ডারবান একটি সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক সংমিশ্রণ সহ দক্ষিণ আফ্রিকার একটি শহর। এই শহরটি আদিবাসী এবং ইউরোপীয় উভয় সংস্কৃতির মিশ্রণ। আপনি গোল্ডেন-এর চারপাশে হাঁটতে পারেন বা মেরিন ওয়ার্ল্ড বা ডারবান বোটানিক্যাল গার্ডেনে যেতে পারেন। স্থানীয় সুস্বাদু যেমন বানি চাউ, শিসা নায়ামা, বোম্বে ক্রাশ এবং অন্যান্য ঐতিহ্যবাহী আফ্রিকান ও জুলু খাবারের স্বাদ না নিয়ে আপনার ডারবান ভ্রমণ অসম্পূর্ণ থাকবে।পোর্ট এলিজাবেথ হল পূর্ব কেপ প্রদেশের একটি বন্দর শহর। এটি বাকেন্স নদীর তীরে অবস্থিত। এখানকার সৈকতগুলি দক্ষিণ আফ্রিকার সবচেয়ে পরিপাটি এবং সেরা। আপনি ওয়েলস এস্টেট ব্রিজ, হিউমউড বিচ বা কিংস বিচে সাঁতার কাটতে যেতে পারেন।

আপনি যদি বন্যপ্রাণী পছন্দ করেন তবে আপনি অ্যাডো এলিফ্যান্ট ন্যাশনাল পার্ক, কেপ রেসিফ নেচার রিজার্ভ এবং ক্রাগা কাম্মা গেম রিজার্ভ দেখতে পারেন।পোর্ট এলিজাবেথ তার পার্কগুলির জন্যও বিখ্যাত। সেন্ট জর্জ পার্ক তার মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য। ডনকিন রিজার্ভ, রুট ৬৭, স্টর্মস রিভার ব্রিজ এবং বোর্ডওয়াকও দেখার মতো অন্যান্য উল্লেখযোগ্য স্থান।

দক্ষিণ আফ্রিকার আরেকটি সুন্দর গ্রাম ফ্রান্সচয়েক। সুন্দর রাস্তা, স্ট্রিট ক্যাফে, মোটর মিউজিয়াম এবং ফ্রাঞ্চহোক ওয়াইন ট্রাম সহ, কিছু দিনের জন্য বিশ্রাম নেওয়ার জন্য এটি আপনার সেরা গন্তব্য হতে পারে। ওয়াইন ট্রাম আপনাকে বিভিন্ন ওয়াইন এস্টেটের মধ্য দিয়ে নিয়ে যাবে। এছাড়াও অনেক ইন-ভিলেজ রেস্তোরাঁ রয়েছে যেখানে আপনি সুস্বাদু খাবার খেতে পারেন। অতএব, নতুন রূপ নিয়ে আপনাকে স্বাগত জানাচ্ছে দক্ষিণ আফ্রিকা। আপনাকে যা করতে হবে, তা হল আপনার ব্যাগ গুছিয়ে কয়েক দিনের জন্য আপনার একঘেয়ে জীবনকে বিদায় জানাতে হবে।

মোবাইল ফোন যখন যন্ত্রণার মূলে

মোবাইল ফোন এক বিপ্লবেরই নামান্তর। তথ্য থেকে নিত্যদিনের জীবনশৈলী, সবই এখন মোবাইল নির্ভর৷ কেনাকাটা ছাড়াও নানা পরিষেবার জন্য আমরা মোবাইল ফোন-এর মুখাপেক্ষী— এটাই ডিজিটাল ইন্ডিয়ার সার্থকতা।

কিন্তু একথা ভুললে চলবে না যে সাইবার জালই সবচেয়ে বেশি করে হরণ করছে আপনার গোপনীয়তা। আপনি কী করছেন, কোথায় যাচ্ছেন, আপনার ব্যাংক-এ কত অর্থ রয়েছে, আপনি কত টাকা উপার্জন করছেন— বিশ্বাস করুন কিছুই আসলে গোপন নেই এই ডিজিটাইজেশন-এর কল্যাণে।

মহিলাদের জীবনে বাড়তি অশান্তি এনে দিয়েছে এই মোবাইল। পারিবারিক ঝগড়া বিবাদ, সমাজে দেখনদারি, অপমান, লাঞ্ছনা, ব্ল্যাকমেল— সবেরই কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে এই মোবাইল এবং জনসংযোগ। আপনি কী খাচ্ছেন, কতক্ষণ জাগছেন রাতে, কী কথা বলছেন— সবই কোনও কোনও ভাবে নথিবদ্ধ হচ্ছে।

চলছে সাইবার ক্রাইম-এর নানা চক্রান্ত, আপনার মেডিকেল অ্যাপ, ইন্সুরেন্স অ্যাপ, সুইগি, উবর— যে-কোনও কিছু থেকেই আপনার তথ্য পৌঁছে যাচ্ছে এই ঠগজোচ্চরদের কাছে। তারা নিত্যদিন তৈরি করছে আপনার আর্থিক ক্ষতির ষড়যন্ত্র। দেশের প্রতিটা শহরে বাড়ছে সাইবার ক্রাইমের সংখ্যা। যারা আপনাকে লোনের প্রলোভন দিচ্ছে, তারাই আপনার আত্মীয় বন্ধুদের কনট্যাক্ট জোগাড় করে ফেলছে বৃহত্তর ক্রাইম-এর জাল ছড়ানোর জন্য, যার কারণ অসচেতন ভাবে হয়ে উঠছেন আপনি। কলকাতায় সম্প্রতি এক শিক্ষিকা চাকরি খুইয়েছেন কারণ তাঁর ইনস্টাগ্রামে সুইমিং সুট পরা কিছু ছবি ছিল যা লিক হয়ে যায়। অর্থাৎ আপনার কোনও কিছুই কোনও মিডিয়াতে আসলে গোপন নয়।

যে-কোনও মানুষের সঙ্গে সচেতন বা অসচেতনতাবশত একটি সেলফি তোলাও আপনার পক্ষে বিপজ্জনক হতে পারে। আপনার বাড়ির একান্ত গোপন কোনও মুহূর্ত, পারিবারিক ঝগড়া— সবই ভাইরাল হতে মুহূর্ত সময় নেবে না।

আসলে আমাদের হয়তো আবার সেই পুরোনো ফোনেই ফিরে যাওয়া উচিত হবে। ইন্টারনেট নেই বলে দুঃখ পাবেন হয়তো কিন্তু আপনার ব্যক্তিগত তথ্য চিন বা আমেরিকান সার্ভারে আর বন্দি হয়ে যাবে না।

নব পরিণয় (পর্ব-০১)

২০১৬ সালের কথা। পল্লবী অফিসে এসেই নমিতাকে বলল, নমিতা, আমাদের কোম্পানির বানানো জিনিসগুলোর মার্কেট রিসার্চ করার জন্য আমেরিকার বাজারটা ঘুরে দেখা দরকার। আমি তো যাচ্ছিই, তোমাকেও আমার সঙ্গে যেতে হবে। কোম্পানির মার্কেটিং হেড পল্লবী বলল, সমস্যা হচ্ছে যে-শহরে আমরা যাব সেখানে আমি আমার পরিচিত ব্যক্তির কাছে গিয়ে উঠব, তোমার থাকার ব্যবস্থা আমি হোটেলে করিয়ে দেব। একলা থাকতে পারবে তো?

—তার প্রয়োজন হবে না ম্যাডাম।

শহরের লিস্ট-টার উপর একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে নমিতা বলল, যেখানে যেখানে আমরা যাব সেখানে আমারও অনেক পরিচিত আছে। প্রায়শই তারা আমাকে ওখানে যেতে আমন্ত্রণ জানায়। আমি তাদের কাছেই থেকে যাব।

—তাহলে তো ভালোই হল। অবশ্য আজকাল প্রায় সকলেরই কেউ না কেউ পরিচিত আমেরিকাতে থাকেই, পল্লবী হাসল।

আমেরিকায় যাওয়াটা ব্যাবসার দিক থেকে খুবই লাভজনক হওয়ায় দুজনেই খুব আনন্দিত ছিল।

—আপনার কি মনে হয় না ম্যাডাম যে নিউইয়র্কে, আমাদের স্থায়ী অফিস থাকা দরকার? ফেরার পথে নমিতা প্লেনেই পল্লবীকে জিজ্ঞেস করল।

—হওয়া তো উচিত কিন্তু দেশের থেকে এখানে স্থায়ী সিনিয়র ম্যানেজার এবং স্টাফ পাঠানো খুবই খরচাসাপেক্ষ, পল্লবী উত্তর দিল।

—স্থায়ী স্টাফ পাঠাবার কী দরকার? কিছুদিনের জন্য একজন সিনিয়র ম্যানেজার এবং দু-তিনজন সহকর্মী পাঠিয়ে এখানকার লোকাল লোকেদেরকেই ট্রেনিং দেওয়ার ব্যবস্থা করে দিন।

—বাঃ ভালো বলেছ তো নমিতা, পল্লবী হাসল। এভাবে যদি চিন্তা করো, জীবনে অনেক উন্নতি করবে। আমেরিকা কেমন লাগল বললে নাতো?

—যা ভেবেছিলাম তার থেকেও ভালো। যাদের সঙ্গে ছিলাম তারা অনেক জায়গায় ঘুরিয়েছে। আপনার ম্যাডাম?

—ব্যাবসায় সাফল্য, সকলের সঙ্গে দেখা হওয়া, ঘোরাফেরা সবই ভালো ছিল কিন্তু ব্যক্তিগত ভাবে যদি জিজ্ঞেস করো তাহলে বলব কিছুই ঠিক যেন এনজয় করতে পারিনি। বাচ্চাদের কথা, ওদের বাবার কথা সারাক্ষণ মনে হচ্ছিল। ওদের খুব মিস করেছি। পল্লবী একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

নমিতার বলতে ইচ্ছে করছিল যে, এই কটা দিন ওর জীবনের আসলে একটা স্বর্ণালি অধ্যায়। ভবিষ্যতের যে-চেহারাটা ও স্বপ্নেও কল্পনা করেনি, ওর রেনুদিদি সেই অজানা পাতাটাই স্পষ্ট করে দিয়েছে ওর চোখের সামনে।

রেনু নমিতার কাকার মেয়ে নমিতার থেকে বেশ অনেকটাই বড়ো। নমিতা যখন স্কুলে রেনু চাকরি নিয়ে আমেরিকা চলে এসেছিল।

দুই-তিন বছর দেশে না ফেরাতে নমিতার কাকা-কাকিমা মেয়ে জন্য চিন্তিত হয়ে পড়েন। বিয়ে সম্বন্ধের জন্য অনেক পাত্রের ছবি পাঠিয়ে রেনুদিদির মন ওনারা টলাতে পারেননি। রেনু বিয়ে করতে এমনকী দেশে ফিরতেও রাজি ছিল না।

আমেরিকায় থাকার প্রায় চারবছর পর রেণু প্রথমে নিজের মা-বাবাকে ওখানে নিয়ে গিয়েছিল, তার পরের বছর বোন আর ভাইকেও নিজের কাছে ডেকে নিল। ওখানেই বোনের বিয়ে দিয়ে দিয়েছিল রেণু আর ভাইকে এমবিএ পড়ার ব্যবস্থা করেছিল।

আজ সেই রেণুদিদিই আমেরিকার একটি নামি সফটওয়্যার কোম্পানির প্রেসিডেন্ট। সুসজ্জিত বিশাল বাংলো প্যাটার্নের বাড়ি, গাড়ি, অর্থ কিছুরই অভাব ছিল না রেণুদিদির জীবনে। কাকা-কাকিমা বড়ো মেয়ে কাছেই থাকতেন।

—সারাদিন কাজের পর ক্লান্ত হয়ে তোমার বাড়িতে এলে খুব শান্তি পাওয়া যায় দিদি, নমিতা রেণুকে উদ্দেশ্য করে বলল।

—সে কিছুদিনই ভালো লাগবে, তারপর দেখবি একাকিত্ব তোকে গ্রাস করবে।

—এরকম কেন বলছ?

—ঠিকই বলছি নমিতা। এসব নাম-যশ এখন অর্থহীন মনে হয়। একা মানুষ কতটা আনন্দ নিতে পারে? নিজের আপনজনেরা যখন নিজেদের জীবনে সেটল করে তাতেই মশগুল হয়ে ওঠে তখন তাদের কাছে তোর প্রয়োজনটা ফুরিয়ে যায়। এখানে আসার কারওর কাছেই এখন সময় নেই। কিন্তু তাই বলে আমি ওদের জীবনে অবাঞ্ছিত, এমন নয় কিন্তু ওদের লাইফস্টাইলে আমিই বেমানান বোধ করি। সব কিছু করারই একটা সঠিক সময় আছে। একবার যদি তোমার হাত থেকে সেটা পিছলে যায় তাহলে সারা জীবনভর একলা চলো রে ব্যানার নিয়ে ঘুরতে হবে, সামান্য হাসি ফোটে রেণুর ঠোঁটে, আমি হাসছি ঠিকই কিন্তু এ বড়ো বেদনাদায়ক। যোগ্যতা এবং ক্ষমতা থাকলে সময় সুযোগ বুঝে লক্ষ্যে ঠিকই পেঁছে যাবি কিন্তু কারও সান্নিধ্য যখন চাইব তখন পাব এটা ভেবে নেওয়া মুর্খামি ছাড়া কিছু নয়।

পারফেক্ট ফাউন্ডেশন বাছুন

কোনও বিশেষ অনুষ্ঠান বা পার্টিতে যাওয়ার আগে মেয়েরা একটু সাজগোজ করে নিতে ভালোবাসে। এতে চেহারার স্বাভাবিক সৌন্দর্য আরও আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। কিন্তু কারও মুখে যদি দাগছোপ থাকে এবং তার যদি সঠিক মেক-আপ করার নিয়মগুলো সঠিক না জানা থাকে— তাহলে মেক-আপের সাহায্যে কীভাবে মুখের দাগছোপ লুকোনো সম্ভব সেটাও তার অজানা রয়ে যাবে। এর ফলে নয় তাকে পার্টিতে যাওয়া ক্যানসেল করতে হবে আর নয়তো সে নিজেকে আর সমস্ত অতিথিদের মাঝে ঠিক ভাবে প্রেজেন্ট করতে পারবে না।

সর্বপ্রথম জেনে রাখা ভালো যে, কোন স্কিন প্রোডাক্ট নিজের স্কিনের টাইপ অনুযায়ী কেনা উচিত। ত্বকের সঙ্গে যদি মেক-আপ ভালো করে ব্লেন্ড ও ম্যাচ না করে তাহলে দেখতে অত্যন্ত কুশ্রী লাগতে পারে।

মেক-আপ করার সময় বিশেষ খেয়াল রাখতে হবে Foundation-এর উপরে। ত্বকের সৌন্দর্য এবং আকর্ষণ বাড়াতে ফাউন্ডেশন সবথেকে কার্যকরী। সুতরাং নিজের ত্বকের ধরন এবং টোন ভালো ভাবে জেনে নিয়ে তবেই ফাউন্ডেশন বাছুন।

ফাউন্ডেশন কত রকমের

লিকুইড ফাউন্ডেশন: যারা প্রথমবার ফাউন্ডেশন ব্যবহার করছেন এবং যাদের ত্বক শুষ্ক, তাদের অবশ্যই লিকুইড ফাউন্ডেশন ব্যবহার করা উচিত। এটি ব্যবহার করা খুবই সহজ এবং সহজে এটি ত্বকের সঙ্গে ব্লেন্ড করে যায়। অয়েল এবং ওয়াটারবেস ফর্মুলার মিশ্রণে লিকুইড ফাউন্ডেশন তৈরি করা হয়।

রোমছিদ্র এবং মুখের দাগছোপ লুকোবার সঙ্গে সঙ্গে লিকুইড ফাউন্ডেশন, স্কিন টোনকে ন্যাচারাল লুকও দেয়। এছাড়া ত্বক উজ্জ্বল দেখাতেও এটি যেমন সাহায্য করে, তেমনি সব ধরনের ত্বকের জন্যও এটি সমান কার্যকরী।

বিভিন্ন ব্র্যান্ডস: ল্যাকমে পারফেক্টিং লিকুইড ফাউন্ডেশন, মেবেলিন ফিট মি ফাউন্ডেশন, রেভলন কালার স্টে লিকুইড ফাউন্ডেশন, লোরিয়েল ইনফ্যানিবল ফাউন্ডেশন।

খেয়াল রাখুন: লিকুইড ফাউন্ডেশন ত্বকে মাত্র চার থেকে পাঁচ ঘন্টা স্টে করে। কিন্তু যদি দীর্ঘ সময় আপনি এটা ত্বকে লাগিয়ে রাখেন তাহলে ত্বকে ঘাম হওয়া শুরু হবে এবং ত্বক তৈলাক্ত হয়ে পড়বে। ফলে ত্বকের উপর প্যাচেস ফুটে উঠবে। সুতরাং লিকুইড ফাউন্ডেশন লাগাবার সময় এই অসুবিধাগুলি মাথায় রাখবেন।

পাউডার ফাউন্ডেশন: তৈলাক্ত ত্বকের জন্য পাউডার ফাউন্ডেশন চয়ন করুন। কারণ এটি একটি ড্রাই সলিউশন। পিগমেন্টস এবং মিনারেল-এর মিশ্রণে এটি তৈরি হয়। ত্বকের অতিরিক্ত তেল শুষে নিতে এটি সাহায্য করে, সেই সঙ্গে ত্বকের লুক-এ এনে দেয় ন্যাচারাল ফিনিশ। ব্রাশ বা স্পঞ্জের সাহায্যে খুব সহজে এই ফাউন্ডেশন আপনি ত্বকে প্রয়োগ করতে পারবেন।

মার্কেটে প্রেসড বা লুজ ফর্ম-এ এই ধরনের ফাউন্ডেশন খুব সহজে পাবেন। যাদের ত্বক ড্রাই তাদের এই ফাউন্ডেশন লাগানো উচিত নয় কারণ ত্বকের বলিরেখা, ডার্ক স্পটস ভালো করে কভার না হওয়ার ফলে, আপনার লুক নষ্ট হয়ে যেতে পারে।

বিভিন্ন ব্র্যান্ডস: মেবেলিন ফিট মি পাউডার ফাউন্ডেশন, লোরিয়েল প্যারিস ট্রু ম্যাচ প্রেসড পাউডার, ম্যাক্স স্টুডিও ফিক্স পাউডার প্লাস ফাউন্ডেশন, এভন মিনারেল ফাউন্ডেশন।

খেয়াল রাখুন: অয়েলি ত্বকে ব্রন, মেচেতা, দাগছোপ বেশি হয়ে থাকে। আপনার যদি এই সমস্যাগুলি থেকে থাকে তাহলে মিডিয়াম কভারেজ-এর জায়গায় ফুল কভারেজ দেবে, এমন ফাউন্ডেশন বেছে নিন। এই ধরনের ফাউন্ডেশন দুই থেকে তিনঘন্টার বেশি সাধারণত স্টে করে না।

ক্রিম ফাউন্ডেশন: একে তো ড্রাই স্কিনের সমস্যা, সঙ্গে যদি একটা গোটা দিন ধরে কোনও ইভেন্ট অ্যাটেন্ড করতে হয়— তাহলে ক্রিম ফাউন্ডেশন ব্যবহার করে ফেস-কে দশ থেকে বারো ঘন্টা কভারেজ দিতে পারেন। দীর্ঘ সময় ধরে আপনার মুখশ্রীর গ্লো বজায় থাকবে। এটি ত্বককে হাইড্রেট রাখতেও সাহায্য করে কারণ ফাউন্ডেশনে এসেনসিয়াল অয়েলও ব্যবহার করা হয়।

বিভিন্ন ব্র্যান্ডস: মেবেলিন মুজ ফাউন্ডেশন, ল্যাকমে নাইন টু ফাইভ মুজ ফাউন্ডেশন, ম্যাক মিনারালাইজ ফাউন্ডেশন, কালার গার্ল ৩৬০ ক্লিন হুইপড ক্রিম ফাউন্ডেশন।

খেয়াল রাখুন: ত্বক যদি বেশি ড্রাই হয় তাহলে Foundation ব্রেক হওয়া রুখতে, প্রথমে মুখে ময়েশ্চারাইজার অবশ্যই লাগান।

সিরাম ফাউন্ডেশন: এটির চাহিদা এখন তুঙ্গে কারণ এটি ত্বককে পুষ্টি দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ফেস-এ এনে দেয় ফ্রেশ এবং গ্লসি লুক। এর কারণ হচ্ছে বাজারে উপলব্ধ বেশিরভাগ সিরাম ফাউন্ডেশনে থাকে ভরপুর অর্গান অয়েল।

এটির সিলিকোন বেসড ফর্মুলা এটিকে জলের মতো পাতলা বানায়। এর ফলে লাগানো যেমন সহজ, তেমনি খুব সুন্দর ভাবে সহজে ত্বকে এটি সেট করে যায়। বিশেষ করে তৈলাক্ত ত্বকের সমস্যাকে মাথায় রেখে এটি ডিজাইন করা হয়েছে। দুই থেকে তিন ঘন্টার মতো এটি স্টে করলেও এর রেজাল্ট খুব ভালো।

বিভিন্ন ব্র্যান্ডস: লোরিয়েল প্যারিস এজ পারফেক্ট রেডিয়েন্ট সিরাম ফাউন্ডেশন, ল্যাকমে অ্যাবসোলিউট অর্গান অয়েল সিরাম ফাউন্ডেশন, ডিওর ডিআরএক্স নিউড এয়ার সিরাম ফাউন্ডেশন।

খেয়াল রাখুন: সিরাম Foundation ড্রাই এবং অয়েলি দুই ধরনের ত্বকেই ব্যবহার করা যায়। সুতরাং কেনার সময় নিজের ত্বকের ধরন সম্পর্কে আগে শিয়োর হন, তবেই এটির সুফল আপনি পাবেন।

মুস ফাউন্ডেশন: এটিকে হুইপড ফাউন্ডেশনও বলা হয়। এটি খুবই হালকা এবং ত্বকে এটির প্রয়োগে সফট টাচ অনুভূত হয়। ত্বককে এটি ম্যাট ফিনিশ প্রদান করে এবং ত্বকের যে-কোনও দাগছোপ, ফাইন লাইনস এটা দিয়ে খুব সহজে কভার করা যায়। এটির সফট টাচ-এর কেরামতি স্কিন টোন ইমপ্রুভ করতেও সহায়তা করে। সব ধরনের ত্বকে এটি স্যুট করে কিন্তু মাত্র তিন ঘন্টা এটি ত্বকে স্টে করে।

বিভিন্ন ব্র্যান্ডস: ল্যাকমে অ্যাবসোলিউট মুস ফাউন্ডেশন, ফেসেড মুস ফাউন্ডেশন, ব্ল্যাক রেডিয়েন্স কালার পারফেক্ট এইচডি মুস ফাউন্ডেশন।

ফাউন্ডেশন লাগাবার নিয়ম

মুখে ফাউন্ডেশন যখনই অ্যাপ্লাই করবেন, তার আগে ত্বক ভালো করে ক্লিনজারের সাহায্যে পরিষ্কার করে নেবেন যাতে ত্বকে জমে থাকা ধুলোমাটি, নোংরা পরিষ্কার হয়ে যায়।

ত্বকের রোমছিদ্রের মুখ টাইট করার জন্য টোনার অবশ্যই ব্যবহার করবেন। এরপর ময়েশ্চারাইজার অ্যাপ্লাই করুন। যদি রোমছিদ্রের মুখ বড়ো হয় তাহলে প্রাইমার ব্যবহার করুন। এটি ত্বকে স্মুদ বেস বানাতে সাহায্য করে এবং ত্বককে সুরক্ষিতও রাখে।

এর উপর ড্রপ ড্রপ ফাউন্ডেশন অ্যাপ্লাই করুন। বিউটি ব্লেনডার-এর সাহায্যে সারা মুখে ফাউন্ডেশনটি স্মুদ করে চারিয়ে দিন এবং ত্বকের সঙ্গে যাতে ভালো করে ব্লেন্ড করে যায় সেদিকে খেয়াল রাখুন। এতে মুখের টোনে সামঞ্জস্যতা বজায় থাকবে। ত্বক অতিরিক্ত ফরসা দেখাবার অভিপ্রায় নিয়ে বেশি পরিমাণে ফাউন্ডেশন লাগাবেন না কারণ তাতে আপনার পুরো মেক-আপটাই নষ্ট হয়ে যাবে।

ফাউন্ডেশন কেনার সময়

যখনই আপনি নিজের ত্বকের ধরন অনুযায়ী ফাউন্ডেশন কিনবেন, সবসময় স্কিন টোন-এর থেকে এক-দুই টোন হালকা কিনবেন তাহলেই সেটা আপনার স্কিন টোন-এর সঙ্গে ম্যাচ করবে।

কখনও হাতে ফাউন্ডেশন লাগিয়ে চেক করবেন না কারণ ওখানকার ত্বক মুখের ত্বকের তুলনায় উজ্জ্বল হয়। সেজন্য সঠিক শেড বেছে নিতে জ-লাইন থেকে গলা অবধি লাগিয়ে চেক করুন।

মুখে দুইটি পরতের বেশি ফাউন্ডেশন অ্যাপ্লাই করবেন না। এরকম করলে মুখে ফাউন্ডেশন শক্ত হয়ে ফুটে উঠবে। ফাউন্ডেশন সারারাত লাগিয়ে রাখবেন না, এতে ত্বকে ওপেন পোরস, ব্রন এবং ব্রেকআউট- এর মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।

এ বিষয়ে বিশেষ খেয়াল রাখতে হবে যে, মেক-আপ রিমুভার দিয়েই ফাউন্ডেশন পরিষ্কার করতে হবে কারণ তাহলে ত্বক অকালে বুড়িয়ে যাবে না।

 

প্রেম আজ-কাল ( শেষ পর্ব )

আসলে সেযুগে প্রেম ছিল উত্তম-সুচিত্রার সিনেমার মতো, রবি ঠাকুরের কবিতার মতো। সরস্বতী পুজোর অঞ্জলির ফুলের মতো মুঠোয় পড়ে থাকত সেই প্রেম, যার কথা কেউ কোনওদিন জানতেও পারত না। প্রেম নিয়ে লেখেননি এমন কবি মেলা ভার, প্রেমের ছবি আঁকেননি এমন চিত্রকরও দুর্লভ। শিল্পীদের একটা সুবিধা আছে, তারা যেটুকু আড়াল করার, সেটুকু লুকিয়ে রেখে বাকিটা প্রকাশ করে ফেলতে পারেন। এতে শ্যামও থাকে, কুলও যায় না। কিন্তু বাকিদের কষ্ট বোধহয় আরও বেশি। কেউ কেউ প্রেমে প্রত্যাখ্যাত হয়ে বিয়ে করতেন না। আজীবন সেই যন্ত্রণা বুকে নিয়ে জীবন কাটিয়ে দিতেন। কী মহিমা প্রেমের!

আসলে প্রেমের সবটুকু স্ফূরণ বোধহয় ট্র্যাজেডিতেই সম্পূর্ণ হয়। মানুষ তো আজীবন বিচ্ছেদ আর অপ্রাপ্তিকেই সেলিব্রেট করেছে। কী শিল্পে, কী জীবনে। যা জীবনে সফল, স্মৃতিতে বা শিল্পে তার দাম মেলেনি। তাই রোমিও অ্যান্ড জুলিয়েট আজও প্রেমের শ্রেষ্ঠ উপাখ্যান হয়ে থেকে গেছে। পথ যেখানে আলাদা হয়ে যাচ্ছে, সেখান থেকেই তো রাস্তা শুরু। তা সে নহন্যতে-র মির্চা আর রু-এর কাহিনিই হোক, কিংবা শেষের কবিতার অমিত-লাবণ্য। এমন বহু যুগলেরই বাস্তবে একসঙ্গে থাকা হয় না, নানা কারণে। কিন্তু ভালোবাসাটা থেকে যায় অমলিন। আর এই বিচ্ছেদই নানা সময়ে কবিদের দিয়ে লিখিয়েছে প্রেমের কবিতা বা উপন্যাস।

কে না জানে কাদম্বরী দেবীর প্রতি রবিঠাকুরের অন্ধ মুগ্ধতা আর নির্ভরতার কথা। বৌঠানের অকালপ্রয়াণের পর রবির হাজারো লেখায় তার ছায়া ফিরে ফিরে আসার কথা। তার পরও রবীন্দ্রনাথ ভালোবেসেছেন, আর সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু অত গভীর রেখাপাত আর কোনও সম্পর্ক ফেলতে পেরেছে কি? সম্ভবত পারেনি। তিনিও সারাজীবন বিচ্ছেদের উৎসবে মেতেছেন।

সময় দ্রুত পালটে যাচ্ছে। বিপণনী দুনিয়া বলে, প্রেম ভেঙেছে তো কী হয়েছে, মুভ অন। সময়টাকে কবজিতে বেঁধে রাখো। মতের অমিল হলেই চিরতরে আড়ি, তোমাকেও ছেড়ে যেতে পারি। বিষাদের উদযাপনের জায়গাটা হয়তো বেপরোয়া ভাবে হাইওয়েতে এসে দাঁড়িয়েছে। এখন আর পেছন ফিরে তাকানোর অবকাশ বা ইচ্ছে নেই এই প্রজন্মের। যা গেছে তা যাক, অন্য কোথাও অন্য কোনও খানে আবার বাঁধা পড়বে মন। এটাই তো মনের চরিত্র। এটাই জেট যুগের গতিবিধি।

চিঠি নয়, এটা চ্যাটিং-এর যুগ। ইন্টারনেটের মাধ্যমে স্বল্পখরচে চ্যাটিং করেই গড়ে উঠছে সম্পর্ক। এক সম্পর্কের ভিত পোক্ত হতে না হতেই সুনামির মতো এসে পড়ছে অতিরিক্ত চাহিদা বা প্রত্যাশার ঝড়। ফল অবধারিত, বিপর্যয়। এর কারণ বোধহয় পরস্পরের মধ্যে কোনও আড়াল বা নান্দনিক রহস্য না থাকা। এখন উভয়ে আলাপচারিতা দূরভাষেই সীমাবদ্ধ থাকে না। বরং ভেসে বেড়ায় ওয়ে ক্যামেরার মাধ্যমে, মনিটরের পর্দায়।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশের ফলে আমরা ইন্টারনেট, ই-মেইল, ভয়ে মেইল, চ্যাটিং, ফোন ও মোবাইল-এর নানা অ্যাপ পেয়েছি কিন্তু হারিয়েছি আরও বেশি। হারিয়েছি রোদ মরে আসা বিকেলে ঘন হয়ে হেঁটে যাওয়ার আনন্দ, দুদণ্ড পরস্পরকে ছেড়ে থাকার বেদনা, হঠাৎ চিঠিতে প্রেম নিবেদনের ভালোলাগা। এখন প্রেম-ভালোবাসা, রিলেশন আসলে ফোর জি কানেকশনের মতো সুলভ হয়ে গিয়েছে। এই চাইলাম, ভালোবাসলাম, আবার হুটহাট ব্রেকআপ করে ফেললাম।

অপ্রেম বা ভাঙা-প্রেমের আঙিনায় যুক্ত হয়েছে এক নতুন কনসেপ্ট, ব্রেক-আপ পার্টি। অর্থাৎ কিনা বিচ্ছেদের সিদ্ধান্তের সামাজিক অনুমোদন। সেলিব্রিটিরাও বাদ পড়ছেন না এই বিচ্ছেদের উদ্যাপন থেকে। সেই ছবি ফেসবুকে আপলোড করে অনায়াসে বিজয়ে হাসি হাসছেন সদ্য বিচ্ছিন্ন যুগল। আবার একই সময়ে ফেসবুক, টুইটার, ইনস্টাগ্রামে নিজের ভালোবাসার মানুষকে কমপ্লিমেন্ট দিয়ে হরবকত প্রেমের ঘোষণা করছেন সেলিব্রিটিরা। প্রয়োজনে প্রেমও ভাঙছেন সগর্বে। সবই ভীষণ পাবলিক, সবই বড়ো প্রকট। বাইরের লোকের তোয়াক্কা না করে পাবলিক ডিসপ্লে অব অ্যাফেকশন কিংবা ডিসস্যাটিসফ্যাকশন।

আর প্রেমে সফল হয়েছেন বলে মনে করছেন যাঁরা, তাঁদের ক্ষেত্রেও সঙ্গীর সঙ্গে কোনও ঘনিষ্ঠ মুহূর্তের ছবি সোশ্যাল মিডিয়াতে না দিলে যেন, সম্পর্কের বিজ্ঞাপনটাই সম্পূর্ণ হয় না। সঙ্গে প্রেমে গদগদ ক্যাপশন প্রিয়তম বা প্রিয়তমার উদ্দেশ্যে। তবেই বুঝি ষোলো কলা পূর্ণ হয়। শেক্সপিয়রের নাটকে নায়ক অর্ল্যান্ডো গাছের গুঁড়িতে লিখেছিলেন প্রেমিকা রোসালিন্ডের নাম। আধুনিক সময়ে সেই গাছ হয়ে উঠেছে সেশ্যাল মিডিয়ার দেয়াল। সেখানেই নতুন প্রজন্ম দেখনদারির নেশায় মেতেছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় আটকে গিয়েছে জীবনের প্রতিটি অভিজ্ঞতা, মুহূর্ত, অনুভূতি।

কিন্তু এত আয়োজন সত্ত্বেও প্রেমটাই যে মিসিং। আর সেই জন্যই এখন প্রেম হয় যত তাড়াতাড়ি, রিলেশনশিপ স্টেটাস বদল হয় তার চেয়ে দুরন্ত গতিতে। প্রেমটাকে আগলানোর বদলে, আগল খোলাতেই যেন বেশি আনন্দ। বদলে গেছে প্রেমের উপপাদ্য। কোনও সম্পর্কই চিরস্থায়ী নয়, এমনই একটা ধারণাকে সঙ্গে নিয়ে যেন তৈরি হয় এখন সম্পর্কগুলো। এক দিকে প্র‌্যাকটিকাল বলতেই হবে এই প্রজন্মকে। তাই বিরহ তাদের স্পর্শ করে না, বিচ্ছেদ তাদের কাঁদায় না। গভীর রাতের অগভীর সিনেমায় প্রেম চায় নাটুকে বিদায়…।

আসলে আমরা এখন একটা নিজস্ব স্পেসে এসে দাঁড়িয়েছি। সেই স্পেস জুড়ে শুধুই আয়না। কেবল নিজেরই প্রতিবিম্ব। তাই আমরা আর কোনও মুখ খুঁজি না। অন্য কোনও সম্পর্কের মুখাপেক্ষী নয় এই প্রজন্ম। নিরন্তর এক্স ইকুয়ালস টু প্রেম ধরে নিয়ে অঙ্ক কষে চলেছে তারা। ফলাফল? থাক, এই উত্তর আজ নয়। অন্য কোনওদিন না হয় দেব। এখন সেলিব্রেশন-এর সময়, উৎসবটা যে ভ্যলেনটাইন্স ডে!

প্রেম আজ-কাল (Valentines Day- পর্ব ১)

ঝড়ের মতো এসে পড়ল আর একটা প্রেম!

এখন একে কোথায় বসাই

একটা ঘরে ঘর পরিজন, অন্যটাতে

লেখার কাগজ বইপত্তর

বারান্দাভর

অতিথিস্বজন!

কোথায় বসাই?

—জয় গোস্বামী

একবারের পরিবর্তে সনকা আজ চায়ে দু-দুবার চিনি দিয়ে ফেললেন। মেয়ে বলল, আজ নাকি ভ্যালেনটাইন্স ডে, অর্থাৎ প্রেম দিবস। আর তারপরেই সে করে বসল সেই অব্যর্থ, অস্বস্তিকর, অমোঘ প্রশ্নটা মা তোমার কোনও বয়ফ্রেন্ড ছিল না?

উত্তর দিতে গিয়ে কেমন হোঁচট খেলেন সনকা। সময় সত্যিই তো এমন সাবলীল ছিল না প্রেমের কথা বলা। প্রেম যেন এক রুহ-খাস আতরের মতো অনুভতি যা সঙ্গোপনে রুমালের খুঁটে বেঁধে রাখতে হতো, অথচ তার সুগন্ধ ঘিরে থাকত দিনভর। যে-মানুষটাকে সনকা বিয়ে করেছেন, তাঁর সঙ্গে এই এতবছরের গাঁটছড়ায় সত্যই কি বুঝেছেন, কোনটা মায়া আর কতটাই বা প্রেম? কোন উঠোনটুকু পেরোলে তবে এক গভীর-গোপন পুকুরঘাট মেলে, নীরব অবগাহনের জন্য!

প্রথম প্রেম। শব্দবন্ধটা শুনলেই একটা চমৎকার ঘুমভাঙা সকাল, একটা পাটভাঙা আঁচলের খসখসানি, রজনীগন্ধার মিঠে মৌতাত মনে পড়ে। সনকাদের সময়ে প্রেমপর্বটা শুরু হতো বিয়ের পর। তবে এদিক-সেদিক নিয়ম ভেঙে প্রেম কি হতো না? নিদেনপক্ষে একটা হাতে লেখা চিঠির সারপ্রাইজ ভিজিট! হতো অবশ্যই। কিন্তু সেসব প্রেমের পরিণতি অধিকাংশ সময়ে পরিণয় অবধি পৌঁছোত না। বাড়ির রক্ষণশীল মনোভাব ভেঙে কার সাধ্যি ছিল ‘লভ-ম্যারেজ করব’, একথা বলার!

ফলে অবশেষে যা হওয়ার, তাই হতো। বাড়ির মনোনীত পাত্রের সঙ্গে, অচেনা আনন্দ আর দুশ্চিন্তার স্রোতে ভাসতে ভাসতে একটা নতুন জীবনে প্রবেশ করা। সনকাদের প্রজন্মে প্রথম প্রেমগুলো একটা কল্পনাবিলাসই হয়ে থেকে যেত। যেখানে কল্পনায় উড়াল দিলেই হৃদয়ের গভীরে টলটলিয়ে উঠত একখানা দীঘি- আর দীঘিভরা এক অপার্থিব মুখ, যার দিকে তাকিয়ে থাকাই জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য বলে মনে হতো। এবং থাকত দুটো আশ্চর্য হাতের স্পর্শ, যার ঘেরাটোপে পৃথিবীর সেরা নিশ্চয়তা লুকানো। কিংবা একটা বিশেষ গন্ধ, যা কিনা নিমেষে চিনিয়ে দিত সেই প্রাণের মানুষটিকে। এভাবেই কোনও অলীক কণ্ঠস্বরে, বিশেষ ডাকনামে গেরস্থালি সাজাত দুটি মানুষ। কল্পনায় আর বাস্তবে, প্রাপ্তি আর অপ্রাপ্তির হিসেবনিকেশ করা হতো না এই-ই ছিল তখনকার প্রেম।

সে যুগে চিঠিই ছিল প্রেমকাব্যের মূল নায়ক। চিঠিতেই জানানো হতো ভালোবাসার নিবেদন। নির্জন দুপুরে ডাকপিয়নের প্রতীক্ষা থাকত, বারবার লেটার বক্স খুলে দেখার একটা আনন্দ থাকত। একই চিঠি বারবার, বহুবার পড়ার মধ্যেও একটা সুখ মিশে থাকত। কোনও গোপন টিনের বা কাঠের বাক্সে জমা হতো সেই সব চিঠি। মুখ ফুটে সরাসরি প্রেমের আবেদন জানানো সাহসে না কুলোলে চিঠির মাধ্যমে প্রেম নিবেদন করা, তারপর অপেক্ষার প্রহর গোনা প্রত্যুত্তরের আশায় এই ছিল রীতি।

লেখক বুদ্ধদেব গুহ-র বই বুকে চেপে যাদের একফালি বযঃসন্ধি কেটে গেছে, তারা জানেন, এই সব চিঠির ভাষা-মাধুর্য। বাংলায় পত্র সাহিত্যের এক দিগন্ত উন্মোচিত করেছিলেন এই লেখক। শুধুমাত্র ভাষার ব্যঞ্জনায় বলা হয়ে যেত কত না বলা কথা। লেখার এবং পড়ার অভ্যাস সেসময় যেন একটি প্রজন্মের মূল হাতিয়ার ছিল, যার বুনিয়াদে চলত মন চেনাচিনির খেলা। আসলে প্রেম তো শুধু সামনে বসে কথা বলাতেই ফুরিয়ে যায় না। বরং দূরে থেকেও অনেক না-বলা কথার মধ্যে দিয়ে বয়ে যায় সেই ভালোলাগার ফল্গুধারা।

প্রেমের চিঠি আদান-প্রদানে সাধারণত সাহায্য করত বন্ধু বা বান্ধবীরা। প্রতিবেশী বা আত্মীয়দের শ্যেনদৃষ্টি এড়িয়ে সেই পত্র জায়গামতো পৌঁছোনো ছিল একটা বড়ো চ্যালেঞ্জ। তখন সকলেই প্রায় সকলের আত্মীয়স্বরূপ ছিলেন, প্রতিবেশীরা ছিলেন আপনজনের মতো। ফলে একই পাড়ায় থেকে প্রেম করার জো ছিল না। তাহলেই ঢিঢি পড়ে যেত। এত বাধা বিঘ্ন পেরিয়ে সেই সব চিঠিপত্র সংরক্ষণ করার নিতান্ত কোনও উপায় না থাকলে, অগত্যা চিঠি ছিঁড়ে বা পুড়িয়ে ফেলতে হতো।

অনেকেই নিজে চিঠি লেখার বা লেখানোর পরও বারবার পাঠ করে শুনতেন বা শোনাতেন যাতে কোনও তথ্য অসম্পূর্ণ না থাকে। বাহকের কাছ থেকে যে-কোনও ভাবে জায়গামতো না গিয়ে অভিভাবক বা মুরব্বি কারও হাতে চিঠি গেলে, দুর্গতির শেষ থাকত না। তবে এর চেয়ে দুর্গতি হতো প্রেমে প্রত্যাখ্যান জুটলে। আবেগ আর কান্নার সেই সব সংগোপন মুহুর্ত, আমৃত্যু যন্ত্রণা হয়ে বুকের এক গোপন কুঠুরিতে যেন চেপে বসে থাকত।

পড়ার জন্য সীমাহীন গল্প-নিবন্ধসাবস্ক্রাইব