ঘর (পর্ব-০১)

বৃষ্টিটা জোর নামল। মেট্রো থেকে বেরিয়ে ব্যাগ হাতড়ে ছাতা বের করেছে দীঘল। স্টেশন থেকে অটোতে উঠতে উঠতে ভিজে গেল খানিকটা। মাস্ক লাগিয়েও পাশেরজনের থেকে আর কত ডিস্ট্যান্স রাখা যায়? লকডাউন আছি আছি করেও কেমন গা ছাড়া ভাব। দীঘল ভাবল, এভাবে কতদিন বেঁচে থাকতে পারবে, কে জানে! সোহা সেদিন ডিমের পোচ খেতে খেতে মুচকি হেসেছে, ‘পুষ্টি দিয়ে আর কী হবে? বাঁচব না জানি। একদিন দমসে ফুচকা খেয়ে নেব। চরম ঝাল দিয়ে।”

দীঘল হেসেছে, ‘মানে, করোনা না পারলেও ফুচকা যেন মারতে পারে, এই তো ইচ্ছে? মরার ইচ্ছে হচ্ছে কেন? তোমার বুটিক এখন না খুললেও তোমার চলবে, এটা কনফার্মড। তাহলে আর ভয় কী? ভয় হল আমাদের মতো প্রাইভেট কোম্পানির অনাথ শিশুদের। কখন ছাঁটাই হয়ে যাই, হু নোজ৷’

পাশের লোকটি কেন যেন বড্ড উসখুস করছে। বিরক্ত লাগল দীঘলের। চেপেচুপে প্যাসেঞ্জার তুলেছে অটোর পাইলট। আরে, দুটো দিন ওয়েট কর না ভাই। এখন একটু ডিসট্যান্স মেনে দ্যাখ, যদি বাঁচতে পারিস, বাঁচাতে পারিস। দীঘল গলা কোনমওতে সামান্য বাড়িয়ে দেখে নিল কদূর এসেছে অটো। পাশের লোকটা এমন করছে কেন? হাঁচবে নাকি? মাই গড! মাস্কটা টেনে যতদূর ঢাকা যায়, ঢেকে নিল দীঘল। এই মাস্ক-ফাস্কে কত আর কাজ করবে? যাক, কোনওরকমে বাড়িতে পৌঁছোতে পারলে স্বস্তি। স্টে হোম, স্টে সেফ। কথাটা কতটা স্বস্তিদায়ক, দীঘল জানে।

কতদূর হেঁটে আজ একটা টু-বিএইচকে ফ্ল্যাটের মালিক হয়েছে দীঘল! তিনদিক খোলা আলো হাওয়ায় ভরপুর ফ্ল্যাট-এ ওয়াল হ্যাংগিং ওয়ার্ডরোব থাকাতে স্পেস প্রচুর। দীঘল গ্রামের ছেলে। খোলামেলা থাকতেই তো চেয়েছে বরাবর। তবে সোহা ফ্ল্যাট সাজিয়েছে প্রাণ ভরে। দেয়ালের রং লাইটের শেড, সোফার কুশন, ফ্লাওয়ার ভাস — ছোটো ছোটো বিষয় ভালো বোঝে। অ্যাকাডেমিক জ্ঞান না থাকলেও ওর মধ্যে একটা ক্রিয়েটিভিটি রয়েছে। দু-কামরার ভাড়ার ঘরে বাবা, মায়ের সঙ্গে জীবনের অনেকগুলো দিন কাটিয়েছে ও। এখন একটু হাঁপ ছড়িয়ে থাকতে চাইলে সেটা দোষের নয়। বলতে গেলে সাধারণ মধ্যবিত্ত ঘরের সোহা একটা নিজস্ব ফ্ল্যাটের জন্য হন্যে হয়ে গিয়েছিল। অবশেষে হয়েছে।

অফিস থেকে ফিরে নিজের প্রাইভেট স্পেসটুকুর জন্য অসীম আগ্রহ নিয়ে ডোর বেল-এ আঙুল রাখে দীঘল। আঙুল রাখতে রাখতে ওয়াশরুমের দরজার কাছাকাছি রাখা ওয়াশিং মেশিনটার কথা ভাবল ও। করোনা পরিস্থিতিতে বাড়ির নিয়ম হচ্ছে, বাইরে থেকে এসে পুরো পোশাক ওয়াশিং মেশিনে রেখে ওয়াশরুম থেকেই সোপ অপেরা সেরে নিতে হবে। তারপর কিচেনে গিয়ে কফি বানাবে দীঘল দু’জনের জন্য। কফির কাপ নিয়ে ছোটো বারান্দায় দাঁড়িয়ে রাস্তার লোকদের দেখবে। মনে মনে বলবে, “আহা, ইস, কী ভিজে ভিজে যাচ্ছে সবাই। একটা ছাতা তো নিতে পারিস। আর বাইরে এতক্ষণ থাকাই বা কেন? ঘরে থাক, ওরে ঘরে থাক।’

ইচ্ছে করে কফির কাপে শব্দ করে চুমুক দেয় দীঘল। সোহা হেসে হেসে হাত বাড়িয়ে বৃষ্টি ধরার চেষ্টা করে। দীঘল জানে এবারে দীঘলের গায়ে বৃষ্টি ছিটিয়ে দেবে সোহা, আর দীঘলকে তখন মুখে মেঘ ডেকে আনতে হবে। তবেই সোহার আনন্দ তীব্র হয়ে উঠবে। সোহা মেঘের দাপট বাড়াতে বাড়াতে একসময় দু’জনেই মেঘে বৃষ্টিতে একাকার হয়ে যাবে। তখন কোথায় কফির কাপ, কোথায় কে ভিজে যাচ্ছে, তা দেখা আর হয় নাকি? আসলে ফুল তো বৃষ্টির মধ্যেই ফুটে ওঠে। এই সময়ে ওরা বাইরের কাউকে অ্যালাউ করে না। সোহার কড়া নির্দেশ। ডোর বেলে আঙুল রেখেই কথাটা ফের ভাবল দীঘল। স্টে হোম শব্দটা খুব সুন্দর। দরজা খুলতে একটু দেরি করল সোহা। কিন্তু খুলেই হাসিমুখে তাকাল, ‘সারপ্রাইজ!’

সারপ্রাইজ মানে ইউটিউব দেখে কাঁঠালের আমসত্ত্ব বা ওইরকম কিছু বানিয়েছে সোহা। দীঘল এত সহজে শান্তি বিসর্জন দিয়ে সব মাটি করতে চায় না। ও দাঁত বের করল, “ইয়াপ্পি। বলো, বলো কী?’

—উঁহু, আগে ঘরে ঢোকো। সাবানকেলি সেরে তারপরে…! ভয় নেই, পালাবে না সারপ্রাইজ। দরজা ছেড়ে ওয়াশরুমের আলোর সুইচে আঙুল দিল সোহা। শব্দ হল, টিক। দীঘল সোহার লম্বাটে তর্জনীতে মুক্তোর আংটিটা দেখল। এটা সোহাকে কে যেন পরতে বলেছিল। মাথা ঠান্ডা থাকে বোধহয় মুক্তোয়। তা কাজ হয়েছে মনে হয়। নইলে লকডাউনের মধ্যে দরজা খুলে এমন নরম চাঁদের মতো আলো ছড়িয়ে বউ হাসতে পারে? কোন অ্যাস্ট্রোলজার? একবার দেখালে হয়। দীঘলের অবশ্য মাথা গরম নয়। আচ্ছা ওর কোন রত্ন চাই?

ফ্ল্যাটে ঢুকেই বাঁদিকে লিভিংরুম লাগোয়া ওয়াশরুমেই তিনমাস ধরে করোনা তাড়ানোর যাবতীয় ব্যবস্থা রয়েছে। টুক করে ঢুকেই সাফসুতরো হতে হতে বাইরে বৃষ্টির জমকালো শব্দের তাণ্ডব শুনতে পেল দীঘল। শাওয়ার নিতে নিতে গলায় মেঘ মল্লার খেলতে লাগল, “গহন ঘন ছাইল গগন ঘনাইয়া…! কী হবে, কে জানে…!’ বৃষ্টির গন্ধ ছেলেবেলায় নিয়ে যায় দীঘলকে। এক মেঘের বিকেলে কৃষ্ণাপিসিদের বাড়িতে গিয়েছিল দিদির সঙ্গে। কী বৃষ্টি! কী বৃষ্টি! সরু তত্তোপোশের উপরে বসে হারমোনিয়াম বাজিয়ে কৃষ্ণাপিসি গান গেয়েছিল, “এ গানের প্রজাপতির পাখায় পাখায় …!” পিসির পিছনের খোলা জানলা দিয়ে ভেজা গন্ধরাজ ফুলের গন্ধ আসছিল। এখনও হঠাৎ করে সেই গন্ধ নাকে এলেই সেদিনের বিকেলে চলে যায় দীঘল। এখন যেমন হল। গন্ধরাজ ফুলের গন্ধ নাকে এল। আহহ! এই আবাসনে কি গন্ধরাজ ফুটেছে?

ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে জোরে চেঁচাল দীঘল, “মেমসাব, কফি লাউ ক্যা?’

সোহা ছুটে এসে ঠোঁটে সেই মুক্তোখচিত তজনী ঠেকাল, ‘ডোন্ট শাউট।’

—মানে? দীঘল থমকে গেল। সোহার মধ্যে কেমন একটা গুপি গুপি ভাব। কী ব্যাপার ?

—সারপ্রাইজ। ও ঘরে যাও। দেখো।

( ক্রমশ…)

জেনে নিন কোন বয়সে কী ধরনের টিকা নেওয়া জরুরি

অনেকেই জানেন যে, আগস্ট মাসকে ‘জাতীয় টিকাদান সচেতনতা মাস’ (National Immunization Awarness Month-NIAM) হিসাবে ঘোষণা করা হয়েছে। তাই গত মাসটির কথা মাথায় রেখে, টিকা গ্রহণের বিষয়ে সচেতনতা জরুরি। কারণ, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে এবং সংক্রমণের বিস্তার রোধ করার জন্য শিশু, কিশোর-কিশোরী এবং প্রাপ্তবয়স্কদের টিকা নেওয়া সুফলদায়ক। কোন বয়সে কোন টিকা নিলে কী কী রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব, এই বিষয়ে বিস্তারিত জানিয়েছেন নেওটিয়া মেডিপ্লাস-এর কনসালট্যান্ট ফিজিশিয়ান ডা. শালিনী ভুট্ট এবং কনসালট্যান্ট পেডিয়াট্রিশিয়ান ডা. লোকেশ পান্ডে

কনসালট্যান্ট ফিজিশিয়ান ডা. শালিনী ভুট্ট-র দেওয়া তথ্য —

কিশোর-কিশোরীদের (১১-১৯ বছর)

 বুস্টার শট: টিডিএপি (টিটেনাস, ডিপথেরিয়া এবং কাশি) এবং মেনিংগোকোকাল কনজুগেট টিকা গুরুতর রোগ থেকে রক্ষা করার জন্য সুপারিশ করা হয়

 এইচপিভি ভ্যাকসিন: হিউম্যান প্যাপিলোমাভাইরাস (এইচপিভি) থেকে রক্ষা করে

 ইনফ্লুয়েঞ্জা ভ্যাকসিন: মৌসুমী ফ্লু প্রতিরোধের জন্য বার্ষিক ফ্লু টিকা সুপারিশ করা হয়।

Doctor's photo

Dr Shalini Bhutta

প্রাপ্তবয়স্কদের (১৯-৬৪ বছর)

  • ইনফ্লুয়েঞ্জা ভ্যাকসিন: মৌসুমী ফ্লু প্রতিরোধের জন্য বার্ষিক ফ্লু টিকা সুপারিশ করা হয়
  • টিডিএপি ভ্যাকসিন: টিটেনাস, ডিপথেরিয়া এবং কাশি প্রতিরোধের জন্য প্রতি ১০ বছর অন্তর বুস্টার শট
  • Shingles ভ্যাকসিন: ৫০+ বছর বয়সি প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য Shingles সম্পর্কিত জটিলতা প্রতিরোধের জন্য সুপারিশ করা হয়
  • নিউমোকোকাল ভ্যাকসিন: নির্দিষ্ট কিছু রোগে আক্রান্ত বা ৬৫+ বছর বয়সের পর নিউমোকোকাল রোগ প্রতিরোধের জন্য।

বয়স্ক ব্যাক্তিদের ভ্যাকসিন (৬৫+ বছর)

  • ইনফ্লুয়েঞ্জা টিকা: মৌসুমি ফ্লু প্রতিরোধের জন্য বার্ষিক ফ্লু টিকা দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়
  • নিউমোকোকাল টিকা: নিউমোনিয়া সহ নিউমোকোকাল রোগ প্রতিরোধের জন্য সুপারিশ করা হয়
  • Shingles টিকা: Shingles সম্পর্কিত জটিলতা প্রতিরোধের জন্য সুপারিশ করা হয়
  • টিডিএপি টিকা: টিটেনাস, ডিপথেরিয়া এবং হুপিং কাশি থেকে সুরক্ষা বজায় রাখার জন্য প্রতি ১০ বছর অন্তর বুস্টার শট।

টিকার গুরুত্ব 

 গুরুতর রোগ প্রতিরোধ করে: টিকা গুরুতর রোগ, হাসপাতালে ভর্তি হওয়া এবং এমনকি মৃত্যুও প্রতিরোধ করতে পারে

 শারীরিক দুর্বলতা কাটাতে সাহায্য করে: টিকা প্রাপ্তবয়স্ক এবং ছোটো শিশুদের শারীরিক দুর্বলতা কাটাতে সাহায্য করে

 জটিলতার ঝুঁকি কমায়: টিকা নিউমোনিয়া এবং মেনিনজাইটিসের মতো রোগ থেকে জটিলতার ঝুঁকি কমাতে পারে

 রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়: টিকা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় এবং অসুস্থতার ঝুঁকি কমায়

 টিকা স্বাস্থ্য বজায় রাখার এবং জীবনকাল জুড়ে গুরুতর রোগ প্রতিরোধের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক

জীবনধারা-সম্পর্কিত এবং দীর্ঘস্থায়ী রোগ প্রতিরোধে টিকা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিশেষকরে HPV এবং নিউমোনিয়ার মতো রোগ প্রতিরোধে টিকা কীভাবে অবদান রাখে, তা জেনে নিন বিশদে—-

 হিউম্যান প্যাপিলোমাভাইরাস (HPV) টিকা: HPV টিকা HPV-এর কিছু স্ট্রেন থেকে রক্ষা করে যা জরায়ু, মলদ্বার এবং অরোফ্যারিঞ্জিয়াল ক্যান্সার, সেইসঙ্গে যৌনাঙ্গের আঁচিল প্রতিরোধ করে

 ক্যান্সার প্রতিরোধ: HPV সংক্রমণ প্রতিরোধ করে, টিকা। HPV-সম্পর্কিত ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকি হ্রাস করে

বয়স্কদের নিউমোনিয়া

 নিউমোকক্কাল টিকা: নিউমোকক্কাল টিকা স্ট্রেপ্টোকক্কাস নিউমোনিয়ার বিরুদ্ধে সুরক্ষা দেয়, একটি ব্যাকটেরিয়া যা নিউমোনিয়া, মেনিনজাইটিস এবং সেপসিস থেকে রক্ষা করতে পারে

 নিউমোনিয়া প্রতিরোধ: নিউমোকক্কাল সংক্রমণ প্রতিরোধ করে, এই টিকা নিউমোনিয়া হওয়ার ঝুঁকি হ্রাস করে, বিশেষকরে বয়স্কদের ক্ষেত্রে যারা গুরুতর অসুস্থতার জন্য বেশি সংবেদনশীল

 জটিলতার ঝুঁকি হ্রাস: নিউমোকোকাল ভ্যাকসিন নিউমোনিয়া থেকে জটিলতা, যেমন হাসপাতালে ভর্তি এবং মৃত্যুর ঝুঁকিও হ্রাস করে

অন্যান্য টিকা এবং দীর্ঘস্থায়ী রোগ

 হেপাটাইটিস বি ভ্যাকসিন: হেপাটাইটিস বি ভাইরাস থেকে রক্ষা করে, যা লিভার ক্যান্সার এবং সিরোসিসের কারণ হতে পারে

 ইনফ্লুয়েঞ্জা ভ্যাকসিন: মৌসুমী ফ্লু থেকে রক্ষা করে, যা হৃদরোগ এবং ডায়াবেটিসের মতো অন্তর্নিহিত দীর্ঘস্থায়ী রোগকে নিয়ন্ত্রণে রাখে

 টিডিএপি ভ্যাকসিন: কাশি থেকে রক্ষা করে প্রাপ্তবয়স্কদের।

টিকা নেওয়ার সুবিধা

 সংক্রামক রোগ প্রতিরোধ: ভ্যাকসিনগুলি সংক্রামক রোগ প্রতিরোধ করে, গুরুতর অসুস্থতা এবং জটিলতার ঝুঁকি হ্রাস করে

 দীর্ঘস্থায়ী রোগের ঝুঁকি হ্রাস: সংক্রামক রোগ প্রতিরোধ করে, ভ্যাকসিনগুলি ক্যান্সার এবং হৃদরোগের মতো দীর্ঘস্থায়ী রোগের ঝুঁকি হ্রাস করতে পারে।

সর্বশেষ উপলব্ধ টিকা 

  • শিংগ্রিক্স: ৫০ বছর বা তার বেশি বয়সিদের মধ্যে দাদ প্রতিরোধের জন্য একটি টিকা, ২০২৩ সালের এপ্রিলে ভারতে চালু হয়েছে
  • কোভোভ্যাক্স: ১২+ বছর বয়সি শিশুদের এবং প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য একটি COVID-19 টিকা উপলব্ধ
  • পোলিও ভ্যাকসিন (IPV): ভারতের সর্বজনীন টিকাদান কর্মসূচিতে (UIP) যুক্ত হয়েছে ত্রিমুখী মৌখিক পোলিও ভাইরাস ভ্যাকসিন (tOPV) থেকে দ্বিমুখী মৌখিক পোলিও ভাইরাস ভ্যাকসিন (bOPV)
  • হাম রুবেলা (MR) ভ্যাকসিন: হাম নির্মূল এবং রুবেলা নিয়ন্ত্রণের জন্য ভারতে চালু হয়েছে এই ভ্যাকসিন
  • ডেঙ্গিঅল: ভারতের প্রথম দেশীয় ডেঙ্গু ভ্যাকসিন, বর্তমানে তৃতীয় পর্যায়ের ক্লিনিকাল ট্রায়াল চলছে
  • HPV টিকা: HPV-সম্পর্কিত ক্যান্সার এবং রোগ প্রতিরোধের জন্য ২৬-৪৫ বছর বয়সিদের জন্য সুপারিশ করা হয়েছে
  • নিউমোকক্কাল কনজুগেট ভ্যাকসিন (PCV): PCV নিউমোকক্কাল রোগের প্রকোপ উল্লেখযোগ্য ভাবে হ্রাস পেয়েছে, যার ফলে অ্যান্টিবায়োটিক-এর প্রয়োজনীয়তাও কমেছে
  • হিমোফিলাস ইনফ্লুয়েঞ্জা টাইপ বি (Hib) ভ্যাকসিন: Hib ভ্যাকসিন Hib রোগ প্রায় নির্মূল করেছে, অ্যান্টিবায়োটিকের প্রয়োজনীয়তা হ্রাস পেয়েছে
  • ইনফ্লুয়েঞ্জা ভ্যাকসিন: ইনফ্লুয়েঞ্জা ভ্যাকসিন ফ্লুর প্রকোপ হ্রাস করে, যার ফলে সেকেন্ডারি ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণের জন্য অ্যান্টিবায়োটিক কম গ্রহণ করতে হয়।

Doctor's Photo

Dr Lokesh Pandey

কনসালট্যান্ট পেডিয়াট্রিশিয়ান ডা. লোকেশ পান্ডে-র দেওয়া তথ্য—-

জীবনযাত্রার সঙ্গে সম্পর্কিত এবং দীর্ঘস্থায়ী রোগ প্রতিরোধে টিকা অবদান রাখে। যেমন— কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে এইচপিভি। ৯ বছর থেকে ২৫ বছর বয়সিদের জন্য এইচপিভি সুপারিশ করা হয়। ৯ স্ট্রেনের টিকা আরও ভালো সুরক্ষা প্রদান করে।

প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য: ৫০ বছরের বেশি বয়সি সকলের জন্য নিউমোনিয়া টিকা। ৫০ বছরের বেশি বয়সি সকলের জন্য বার্ষিক ফ্লু টিকা, বিশেষকরে যাদের ফুসফুস, হৃদপিণ্ড বা কিডনির দীর্ঘস্থায়ী রোগ আছে।

কোভিডের সময় কোনও কারণে যে-সব শিশু টিকা মিস করেছে, সেগুলি দেওয়া যেতে পারে। এগুলিকে ক্যাচ আপ টিকা বলা হয়।

মনে রাখবেন, প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধই ভালো। সমস্ত শিশুদেরকে উপলব্ধ টিকা দেওয়া উচিত, যাতে তারা গুরুতর ভাইরাল এবং ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণ থেকে রক্ষা পায়। প্রাপ্তবয়স্কদের, বিশেষকরে ৫০ বছরের বেশি বয়সিদের গুরুতর, প্রাণঘাতী ফুসফুসের সংক্রমণের ঝুঁকি থাকে, তাই নিউমোকোকাল এবং ফ্লু ভ্যাকসিন নেওয়া উচিত।

অডিটরি হ্যালুসিনেশন (শেষ পর্ব)

এমনিতেই বেশ দেরি হয়ে গিয়েছিল, তাই একটা খালি ট্যাক্সি দেখতে পেয়ে শুভা তাতেই উঠে বসল। কিন্তু মিনিট পঁচিশ বাদেও ট্যাক্সি হিন্দুস্তান না পৌঁছাতে শুভার কেমন যেন সন্দেহ হল। ড্রাইভারটার ভাবগতিকও সুবিধের মনে হল না। ভয় পেয়ে তাকে ট্যাক্সি দাঁড় করাতে বলতে সে তার কথায় কর্ণপাত না করতে শুভা ভয়ে চেঁচিয়ে উঠল।

ড্রাইভার তাকে ধমক দিয়ে বলল— চুপচাপ ব্যায়ঠিয়ে, আপকো ঠিক পহুঁচা দুঙ্গা। তার ধমকে আরও ভয় পেয়ে গেল শুভা। সামনের একটা মোড়ে ঘোরার সময় গাড়ির গতি একটু কমতেই শুভা দরজা খুলে লাফিয়ে পড়ল নীচে। অমনি আশপাশ থেকে পথচলতি দু-একজন লোক ছুটে আসতেই ট্যাক্সিটা জোরে বেরিয়ে গেল।

রাস্তায় পড়ে গিয়ে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল শুভা। জ্ঞান ফিরতে চোখ মেলে দেখে সে শুয়ে আছে হাসপাতালের বেড়ে, পাশে দাঁড়িয়ে একজন নার্স। অমনি মনে পড়ে গেল ট্যাক্সির ঘটনার কথা, বড্ড বাঁচা বেঁচে গিয়েছে একটা বড়ো বিপদের হাত থেকে। লাফিয়ে না নামলে ট্যাক্সি ড্রাইভারটা তার কী যে দুর্গতি করত কে জানে। আপশোসও হল ওদের দু’জনকে হাতেনাতে ধরার এমন সুবর্ণ সুযোগ হাতছাড়া হওয়ায়। কিন্তু সে হাসপাতালে কী করে এল? কে নিয়ে এসেছে তাকে এখানে?

—এখন কেমন লাগছে?

হঠাৎ চেনা কণ্ঠস্বর শুনে শুভা মুখ ঘুরিয়ে দেখে নির্মল, কখন ভিতরে এসেছে বুঝতে পারেনি। ‘ভালো’ বলে তাকিয়ে রইল তার মুখের দিকে। ও কীভাবে খবর পেল? নিশ্চয় কেউ তার মোবাইল থেকে নম্বর নিয়ে ওকে জানিয়েছে।

—কাল সন্ধ্যায় বাইপাসে কেন গিয়েছিলে? আমাকে ফলো করতে? ধন্যি মেয়ে তুমি !

শুভার মুখে উত্তর নেই।

—কিন্তু তোমাকে কে বলল আমি ওখানে যাব?

–কেন, তুমিই তো কাল রাতে ফোনে একটা শাকচুন্নিকে বললে সন্ধ্যায় ওকে নিয়ে পাটুলি থেকে হিন্দুস্তানে উকিলের বাড়ি যাবে।

—আরে বাবা শাঁকচুন্নি নয়, কবীর ফোন করেছিল। আজ ও ছুটি নিয়েছে, তাই অফিসের একটা জরুরি ফাইল নিয়ে কালই উকিলের সাথে পরামর্শ করতে যাওয়ার কথা বলছিল। তোমার ঘুমের ব্যাঘাত হবে, তাই পাশের ঘরে গিয়ে কথা বলছিলাম। আর তুমি কিনা শুনতে পেলে আমি কোনও মেয়ের সঙ্গে পাটুলিতে উকিলের কাছে যাওয়ার মতলব করছি? কী মানুষ তুমি বলো তো? তোমার এই উলটোপালটা শোনার রোগ কবে বন্ধ হবে ?

শুভা নিরুত্তর।

—ভাগ্যিস লোকগুলো তোমার ফোনে নম্বর বের করে আমাকে ফোন করল। তা না হলে তোমার কী হত একবার ভেবে

—দেখেছ?

( 3 )

শুভা মুখ ঘুরিয়ে চুপ করে পড়ে রইল। চোখের কোণ দিয়ে গড়িয়ে পড়ল দুফোঁটা জলের ধারা।

নির্মল আর কিছু বলল না। শুভার দরকারি কয়েকটা টেস্ট করিয়ে বিকেলেই তাকে নিয়ে ঘরে চলে এল।

কিন্তু ঘরে গিয়েও শুভার বিশেষ পরিবর্তন হল না। সপ্তাহ খানেক পর থেকেই আবার শুরু হল সেই অশান্তি। নিরুপায় হয়ে নির্মল এক বন্ধুর মাধ্যমে শুভাকে নিয়ে গেল এক মনোবিদের কাছে। ম্যাডাম, নির্মলের মুখে বাপারটা শুনে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জিজ্ঞেস করলেন বিয়ের পর থেকে সমস্ত কথা। তারপর আলাদা করে কথা বললেন শুভার সঙ্গে। জানতে চাইলেন নির্মলের কী ধরনের কথা সে শুনতে পায়, কত ঘনঘন শোনে, কবে থেকে এরকম হচ্ছে, ইত্যাদি। আরও জিজ্ঞেস করলেন কখনও কিছু দুর্ঘটনা হয়েছিল কিনা, কোনওরকম মানসিক আঘাত পেয়েছিল কিনা, কানে কোনও সমস্যা আছে কিনা, বংশে কারও এধরনের সমস্যা কখনও হয়েছিল কিনা ইত্যাদি।

শুভার মনে পড়ে গেল বিয়ের কয়েক বছর আগে তার সবথেকে কাছের মানুষ ঠাকুমার হঠাৎ মৃত্যুর পর মানসিক আঘাত পেয়ে কিছুদিন মুষড়ে থাকার কথা। আর নির্মল জানাল, কয়েক বছর আগে সন্তানধারণে তার অক্ষমতার কথা জানার কিছুদিন পর থেকে তার ডিপ্রেশনে চলে যাওয়ার কথা।

ম্যাডাম সব শুনে শুভার একটা টেস্ট নিলেন, গত কয়েক বছরের মেডিকেল রিপোর্টগুলোও দেখলেন। শেষে নির্মলকে বললেন— এটা অডিটরি হ্যালুসিনেশন। এতে রোগীর মনে এক ধরনের ভ্রান্ত ধারণা তৈরি হয়, শুধু মনে হয়, সে যেন কারও কথা শুনতে পাচ্ছে, কেউ যেন তাকে বা তার সম্বন্ধে কিছু বলছে বা কোনও খারাপ কাজ করছে, যদিও বাস্তবে তার কোনও ভিত্তি নেই। এটা শারীরিক, মানসিক নানা কারণে হতে পারে। তবে এর ক্ষেত্রে হয়েছে মানসিক আঘাত ও ডিপ্রেশন-এর কারণে। অবশ্য চিন্তার কিছু নেই, কিছুদিন একটু নিয়মে থাকলে, একটু হাসিখুশিতে রাখলে ধীরে ধীরে ঠিক হয়ে যাবে। ম্যাডাম কয়েকটা ব্যায়াম দেখিয়ে দিলেন। নির্মলকে একটু বেশি করে ওর খেয়াল রাখতে বললেন। তারপর আরও কিছু প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিয়ে দিন কুড়ি পর আবার আসতে বললেন।

এইভাবে চলতে লাগল শুভার কাউন্সেলিং ও চিকিংসা। ধীরে ধীরে শুভার আচরণে আসতে লাগল পরিবর্তন, কিছুদিনের মধ্যে পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়ে গেল।

(8)

এরপর কেটে গেছে চারটে বছর। নির্মল-শুভার সংসারে কয়েক মাস আগে এসেছে একটি ছোট্ট মেয়ে, তবে নিজেদের নয়, অনাথ আশ্রম থেকে। কিন্তু দেখে বোঝার উপায় নেই এতই আপন হয়ে উঠেছে বছর তিনেকের মেয়েটি। তারই প্রথম জন্মদিনের আয়োজনে হুলস্থুল পড়ে গেছে বাড়িতে। পাড়ার কচিকাঁচা, আত্মীয়, বন্ধুবান্ধব সবাইকে নিমন্ত্রণ করছে দু’জনে। মেয়েকে খাইয়ে সকালের জলখাবার খেতে খেতে দু’জনে চোখ বোলাচ্ছিল আমন্ত্রিতদের তালিকায়। শুভা হঠাৎ বলে উঠল, “একি, তোমার অফিসের রঞ্জনা, পারমিতাদের নাম কোথায়? ওদেরকে বলোনি? আর আমার খুড়তুতো বোন শ্যামাও তো নেই! তাকেও বলোনি নাকি?”

স্ত্রীর কথা শুনে অবাক হয়ে তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল নির্মল। যে রঞ্জনা-পারমিতার নাম শুনলে কিছুদিন আগেও তেলেবেগুনে জ্বলে উঠত, তাদের সঙ্গে ফষ্টিনষ্টি করার, লুকিয়ে কথা বলার শব্দ শুনতে পেত, যে শ্যামার সঙ্গেও সে কথা বলছে, প্রেম করছে বলে সন্দেহ করে ঝগড়ায় তুলকালাম করত আর তাদের সঙ্গে যোগাযোগ প্রায় বন্ধই করে দিয়েছিল, আজ তাদেরকেই ডাকতে বলছে?

—কিগো, কী হল? বলোনি কেন ওদের?

সম্বিৎ ফিরল নির্মলের। মৃদু হেসে বলল, “ওদেরকে বলা কি ঠিক হবে? ওদের দেখে শেষে যদি আমার পুরোনো অভিসারের কথা…?’

ইঙ্গিতটা বুঝতে পারল শুভা। ‘আমাকে খোঁচা দিয়ে কথা বলা? তবে রে?” বলে স্বামীর কানটা ধরতে যেতেই সে উঠে পালাতে গিয়ে পা-টা টেবিলের কোনায় লেগে পড়ে গেল মেঝেয়, আর পিছু ধাওয়া করে আসা শুভাও হুড়মুড়িয়ে পড়ল তার গায়ের উপরে।

—বাবার সঙ্গে খেলছ মা? আমিও খেলব।

মুখ তুলে শুভা দেখে মেয়ে, কখন যে এসে দরজায় দাঁড়িয়েছে বুঝতে পারেনি। লজ্জায় জিভ কেটে ‘কী যে করো না?’ বলে ধড়ফড় করে উঠে আলুথালু বেশে দৌড়ে ঘরে পালিয়ে গেল কাপড় ঠিক করতে।

অডিটরি হ্যালুসিনেশন (পর্ব-০১)

বৃহস্পতিবারের সকাল। চা খাওয়ার পর শুভা তাড়াতাড়ি চান করে ঠাকুরঘরে বসেছিল পূজায়, ঠাকুরের কাজ সেরে রান্না চাপাবে। নির্মল শোবার ঘরে বসে মোবাইল ঘাঁটছিল, কিছুক্ষণ পরে হঠাৎ চমকে উঠল কারও গর্জনে!

—কী হল? প্রেমালাপ চালিয়ে যাও, ফোন রাখলে কেন? মুখ তুলে দেখে সামনে রণরঙ্গিনী মূর্তিতে দাঁড়িয়ে শুভা।

—কী যা তা বলছ? কারও সঙ্গে প্রেমালাপ করিনি।

—একদম মিথ্যা কথা বলবে না, ঠাকুরঘর থেকে আমি স্পষ্ট শুনলাম তোমাদের রঙ্গরসের কথা।

ভীষণ রাগ হল নির্মলের। ফোনটা রেখে বলে উঠল, ‘আজকাল তোমার কী বাতিক হয়েছে বলো তো? খালি আজেবাজে কথা, কেউ কিছু না বললেও তুমি সব শুনতে পেয়ে যাও? মাঝেমাঝে লুকিয়ে আমার ফোন চেক করো। তোমার কি মাথা খারাপ হল?’ স্বামীর কথায় রেগে উঠল শুভা, ‘হ্যাঁ, একথা বলবেই তো। হাতেনাতে ধরা পড়ে গিয়ে এখন কথা ঘোরানো হচ্ছে। তবে জেনে রেখো, যতই লুকোচুরি করো আমার কানকে ফাঁকি দিতে পারবে না।’

আরও রেগে গেল নির্মল। ‘ধেত্তেরিকা, সবসময় খালি উলটোপালটা কথা, যা বলিনি তাই খালি শুনতে পেয়ে যায়। যত্তো সব।’ বলে তড়াক করে বিছানা থেকে নেমে খবরের কাগজটা নিয়ে বারান্দায় চলে গেল।

—চোরের মায়ের বড়ো গলা। দোষ করে আবার রাগ দেখানো হচ্ছে। বলে শুভাও প্রস্থান করল রান্নাঘরের উদ্দেশ্যে।

—এক রোববারের কথা। ছুটির দিন, স্বভাবতই রান্নাবান্না একটু বেশি আছে, তাই জলখাবার খেয়েই শুভা ব্যস্ত হয়ে পড়েছে রান্নাঘরে। হঠাৎ কানে এল শোবার ঘর থেকে নির্মলের কথা বলার শব্দ। ধক করে উঠল বুকটা, ঠিক কোনও বান্ধবীর ফোন। অমনি উনুনটা নিভিয়ে হাজির হল ঘরে, দেখল বাবু কথা বলতে বলতে হেসে একেবারে লুটিয়ে পড়ছেন।

—তুমি এমন করে বোলো না তো, লজ্জা লাগে…।’ মাথাটা গরম হয়ে গেল শুভার, খেঁকিয়ে উঠল!

—শুয়ে শুয়ে কোন বান্ধবীর সঙ্গে হিহি হোহো হচ্ছে শুনি? নিশ্চয় শ্যামা?

চমকে উঠল নির্মল। মুখ ঘুরিয়ে দেখে সামনে সাক্ষাৎ যমদূত দাঁড়িয়ে। উঠে বসে ফোনে হাত চাপা দিয়ে উত্তর দিল, “কী যা তা বলছ? শ্যামা কেন হবে? ওতো লীলাদি।’

—আর শাক দিয়ে মাছ ঢাকতে হবে না, কোন লীলার সঙ্গে কী লীলাখেলা চলে সব বুঝি আমি।

—কী বোঝো তুমি? রেগে উঠল নির্মূল। সবসময় খালি সন্দেহ আর সন্দেহ।

—সন্দেহ নয়, ঠিকই ধরেছি আমি, শুভাও চেঁচিয়ে উঠল।

বিরক্ত হয়ে ‘এ তো মহা মুশকিল হল’ বলে নির্মল উঠে চলে গেল বসার ঘরে। ‘আমি পরে কথা বলছি লীলাদি’ বলে লাইনটা কেটে দিয়ে এসে দাঁড়াল বউয়ের সামনে। বলে উঠল, “কেন তুমি আমাকে সবসময় সন্দেহ করো বলো তো? যা বলিনি তাই শুনতে পাও? তোমার মাথায় কি বাতিক ঢুকেছে?”

স্বামীর কথায় তেলেবেগুনে জ্বলে উঠল শুভা, ‘একদম বাজে কথা বলবে না। আমার বাতিক নয়, তোমার মুদ্রাদোষ, খালি মেয়েদের পিছনে ঘুরঘুর করা। আমি এখন পুরোনো হয়ে গেছি, তাই এখন নতুন নতুন মেয়েদের সঙ্গে রসালাপ চলে।” কী আজেবাজে কথা বলছ? কোথায় রসালাপ করি আমি? কে বলল তোমাকে?

—কে আবার বলবে? সব আমি নিজের কানে শুনেছি।

কবে শুনলে? আরও রেগে উঠল নির্মল। ‘যত সব মিথ্যা কথা।’

—দাঁড়াও, একদিন ধরি হাতেনাতে, তারপর মিথ্যা কি সত্যি বুঝিয়ে দেব। ঝেঁটিয়ে বিষ ঝেড়ে দেব দু’জনের। বলে রাগে গজগজ করতে করতে শুভা রান্নাঘরে চলে গেল।

—ঠিক আছে, তাই দিও বলে বিরক্ত হয়ে নির্মল খবরের কাগজটা খুলে বসল।

এই হল শুভা-নির্মলের নিত্যদিনের রুটিন, ঝগড়া অশান্তি লেগেই রয়েছে। বিয়ের পর কিন্তু এমনটা ছিল না, ভালোবেসে বিয়ে করে দু’জনে কয়েকটা বছর বেশ আনন্দেই ছিল। তারপর ধীরে ধীরে শুভা কেমন যেন হয়ে গেছে। বিয়ের আট বছরেও সন্তানহীনতা তাতে অন্য মাত্রা যোগ করেছে। বিয়ের মধুযামিনীর মধুর স্থান নিয়েছে অশান্তির হলাহল। এমন একটা দিনও যায় না যেদিন দু’জনের মল্লযুদ্ধ হয় না। তবে এত বিবাদের মাঝেও দু’জনের শোবার বিছানা কিন্তু এখনও আলাদা হয়নি, কেউ কাউকে ডিভোর্সের কথাও বলেনি।

( 2 )

দিন কয়েক পরের কথা। পরদিন সকালে বাপের বাড়ি যাবে, তাই একটু তাড়াতাড়ি খেয়ে শুভা শুয়ে পড়েছিল, আর নির্মল পাশের ঘরে গিয়ে অফিসের কিছু পেন্ডিং কাজ করতে লাগল ল্যাপটপ খুলে। ঘণ্টা দেড়েক পরে এসে শুতে যাবে, হঠাৎ ফোনটা বেজে উঠল। বউয়ের ঘুমের ডিসটার্ব হবে ভেবে ফোনটা নিয়ে উঠে পাশের ঘরে গিয়ে নিচু গলায় কথা বলতে লাগল নির্মল। শুভা কিন্তু ঘুমায়নি, চুপচাপ পড়েছিল চোখ বুজে। এত রাতে ফোনটা পাওয়ার পর স্বামীকে পাশের ঘরে উঠে যেতে দেখে সন্দেহ হল, কান খাড়া করে শুনতে লাগল কী কথা হচ্ছে। কানে এল স্বামীর কথা— ঠিক আছে কাল অফিস ফেরতা পাটুলির মোড়ে চলে এসো, ওখান থেকে দু’জনে হিন্দুস্তান মোড়ে দিবাকর উকিলের বাড়ি চলে যাওয়া যাবে।

উকিলের বাড়ি দু’জনে একসঙ্গে যাবে শুনে ধক করে উঠল শুভার বুকটা। তবে কি দু’জনে বিয়ের ব্যাপারে কথা বলতে যাবে? তাকে ডিভোর্স দিয়ে দেবে? এতদূর গড়িয়েছে ব্যাপার? সে কাল বাপের বাড়ি যাবে দেখে সেই সুযোগে এই প্ল্যান হচ্ছে দু’জনের? মনটা রাগে দুঃখে কেঁদে উঠল শুভার। না এত সহজে সে হার মানবে না, এর শেষ দেখে ছাড়বে।

সকালে গড়িয়ায় বাপের বাড়ি এসে সারাটা দিন ভীষণ অস্বস্তির মধ্যে কাটল শুভার। কখনও স্বামীর উপরে রাগ হতে লাগল, কখনও বা দুঃখ হতে লাগল নিজের ভাগ্যের উপরে। মা তার চঞ্চল ভাব দেখে একবার কী হয়েছে জিজ্ঞেস করতে ‘কিছু না’ বলে এড়িয়ে গেল। তারপর সন্ধে হতেই মাকে ‘একটু বন্ধুর বাড়ি থেকে আসছি’ বলে বেরিয়ে গেল।

পাটুলির মোড়ে গিয়ে ঘড়ি দেখল সন্ধে প্রায় সাতটা বাজে। ও অফিস থেকে বেরোয় সাড়ে ছ’টা নাগাদ, এইবার এসে পড়বে। বাস স্টপেজে এদিক ওদিক দেখল কিন্তু কোনও মেয়েকে অপেক্ষা করতে দেখল না। তার মানে মেয়েটাও এখনও আসেনি। চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল শুভা। কেবল বাস থেকে নামা যাত্রীদের দেখে, আর মাঝেমাঝে ঘড়ির দিকে তাকায়। এইভাবে ক্রমশ রাত বাড়তে লাগল, সাতটা থেকে সাড়ে সাতটা, তারপর আটটা বাজল, কিন্তু তখনও নির্মলকে আসতে না দেখে মনটা চঞ্চল হয়ে উঠল শুভার!

তবে কি ও তাড়াতাড়ি অফিস থেকে বেরিয়ে এসে আগেই চলে গিয়েছে? তাহলে এখন সে কী করবে? খুঁজে খুঁজে চলে যাবে দিবাকর উকিলের বাড়ি? সেটাই ভালো হবে, সেখানে গিয়ে একেবারে হাতেনাতে ধরবে দু’জনকে। এই ভেবে বাস থেকে নামা একজনকে হিন্দুস্তান মোড় কোথায় জিজ্ঞেস করতে বলল— সে তো বেশ খানিকটা দূরে, বাইপাস ধরে কামালগাজী মোড়ে পৌঁছে, সোজা ডানদিকে, ট্যাক্সিতে গেলে মিনিট পনেরো কুড়ি লাগবে।

(ক্রমশ…)

রোমান্টিক ডেস্টিনেশন্‌স

মনের আঙিনায় যখন ভালোবাসার সংগীত গুঞ্জরিত হয়, প্রাণে প্রতিধ্বনিত হয় প্রেম, তখন ভাবনার এক নতুন জগতে বিচরণ করেন প্রেমিক-প্রেমিকারা। আর মন তখন শুধু বলে, ‘সে’ আর আমি, আমি আর ‘সে’– মাঝখানে শুধু নির্জন প্রকৃতি, আর কেউ নয়।

যদি হন নতুন প্রেমিক যুগল কিংবা হনিমুন কাপল, তাহলে চলে যান কুর্গ কিংবা সিমলা। আর ওখানে মজুবত করে আসুন দু’জনের সম্পর্কের ভিত। আপনাদের জন্য এই দুটি রোমান্টিক ডেস্টিনেশন-এর বিবরণ দিচ্ছেন সুরঞ্জন দে।

 

কুর্গ

কুয়াশায় ঢাকা পাহাড়, ঘন জঙ্গল, কফি, চা, কমলালেবুর বাগান আর মনোরম আবহাওয়া— এই হল একনজরে কুর্গ। কুর্গের আর এক নাম কেন্ডাসু, যার অর্থ হল পাহাড়ের উপর ঘন জঙ্গল। কুর্গের অন্য নাম মদিকেরি। কর্ণাটকের দক্ষিণ-পশ্চিম প্রান্তে প্রায় চার হাজার একশো দুই বর্গ কিমি জুড়ে কুর্গ অবস্থিত। প্রচুর কফির বাগান থাকার জন্য একে কফিল্যান্ডও বলে। আবার একে ‘ভারতের স্কটল্যান্ড’ও বলা হয়ে থাকে। এখানে কফিতে চুমুক দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রোমান্সের গন্ধও বাহিত হয়। এপ্রিল থেকে নভেম্বর এখানে যাওয়ার উপযুক্ত সময়। কুর্গে পাহাড় আর জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে খুব সুন্দর ট্রেকিং রুট আছে। কাবেরী নদীর ব্যাকওয়াটার ভালামুরেতে আপনি মাছও ধরতে পারেন। এছাড়াও আপনি এলিফ্যান্ট ক্যাম্প এবং অদূরে অবস্থিত জলপ্রপাতের আনন্দও উপভোগ করতে পারেন।

সিমলা

বিশুদ্ধ আবহাওয়া এবং অতুলনীয় নৈসর্গিক সৌন্দর্যের জন্য হিমালয়ের পাদদেশে অবস্থিত সিমলা, রোমান্সের জন্য অনুকূল স্থান। দূরে বরফের চাদরে ঢাকা পর্বতমালা, প্রকৃতি যেন তার যাবতীয় রোমান্টিক সৌন্দর্য ঢেলে দিয়েছে। ব্রিটিশ যুগের ভারতের চিত্রাবলি ভাইস রিগল লজে দেখতে পাবেন। ‘লক্কড়’-এ আপনি লকড়ি বা কাঠের তৈরি অপূর্ব শিল্পকলা দেখতে পাবেন। মল রোড ছাড়াও, সিমলায় রয়েছে জাখু হিল, সামার হিল, অবজারভেটারি হিল, হিমাচল স্টেট ওয়াটারফলস। সিমলার কাছাকাছি বেড়ানোর জায়গা হল চেল, কসৌনি, কুফরি, নলদেহরা, রামপুর এবং রেণুকা লেক। চলে যেতে পারেন কুলু-মানালি। স্কি, প্যারাগ্লাইডিং, আইস স্কেটিং অর্থাৎ উইন্টার স্পোর্টসের মজাও নিতে পারেন মানালির সোলাং ভ্যালি-তে। সিমলায় যাওয়ার সবচেয়ে ভালো সময় হল সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর মাসের মধ্যে।

আইন কিংবা শাস্তির তোয়াক্কা করে না এই অপরাধীরা

‘প্রোটেকশন অফ চিলড্রেন ফ্রম সেক্সুয়াল অফেন্সেস অ্যাক্ট ২০১২’ (পকসো অ্যাক্ট) আইন সম্পর্কে সুপ্রিম কোর্ট ব্যাখ্যা দিয়েছে যে, আইন অনুসারে শুধুমাত্র চাইল্ড পর্নোগ্রাফি তৈরি করা-ই অপরাধ নয়, মোবাইল ফোন বা কম্পিউটারে রাখা কিংবা দেখাও অপরাধ। পকসো আইনের ধারাগুলিকে খুব লঘু ভাবে বিবেচনা না করে, চাইল্ড পর্নোগ্রাফি সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করার প্রয়াসে সুপ্রিম কোর্টের পকসো আইনের ২০০ পৃষ্ঠার ব্যাখ্যাটি কঠোর ভাবে আইন প্রয়োগ করার একটি মহৎ প্রচেষ্টা বলা যায়। চাইল্ড পর্নোগ্রাফি- র বিরুদ্ধে কাজ করার বিষয়টি সমাজ, সরকার এবং বিশ্বজুড়ে শিশু সুরক্ষা নিয়ে কাজ করা সংস্থাগুলির কাছে অবশ্যই এক বিশাল চ্যালেঞ্জ। লক্ষ লক্ষ মানুষ শিশুদের সঙ্গে যৌন মিলন করে বা তাদের সঙ্গে হওয়া যৌন মিলনের যে ভিডিয়ো দেখে মজা পায়, তা অত্যন্ত বিকৃত মানসিকতার হলেও, এটাই চরম বাস্তব। লক্ষ লক্ষ শিশু পর্নোগ্রাফির সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে এবং তাদের দিয়ে ব্যাবসা করে মোটা টাকা উপার্জন করে শয়তানরা।

শিশু পাচারের একটা বড়ো বাজার রয়েছে, যেখানে সারা বিশ্ব থেকে নিষ্পাপ শিশুদের নিয়ে যাওয়া হয় এবং তাদের মারধর এবং যৌন নির্যাতনের পর এই ব্যাবসায় নামতে বাধ্য করা হয়। এসব শিশুদের কোথা থেকে তুলে আনা হয়েছে কিংবা কোথায় রাখা হচ্ছে, তা জানতেও দেওয়া হয় না। আসলে এর চাহিদা এত বেশি যে, এই ব্যাবসায় ঝুঁকি থাকলেও প্রচুর মুনাফার জন্য কাজ করে শয়তানরা।

মাদ্রাজ হাইকোর্ট কিছুদিন আগে জানিয়েছিল যে, শিশুদের নিয়ে ব্লু ফিল্ম তৈরি করা বা বিক্রি করা অপরাধ। তবে এটি দেখার জন্য আপনার মোবাইলে রাখা কোনও অপরাধ নয়। নতুন সিদ্ধান্তে, চাইল্ড পর্নোগ্রাফি ডাউনলোড করে নিজের মোবাইলে রাখাকেও অপরাধ বলে বিবেচনা করেছে সুপ্রিম কোর্ট। তাই, এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত বলা যায়।

কিছু শয়তানের যৌনক্ষুধা এতটাই যে, তারা আইন কিংবা শাস্তির তোয়াক্কা না করেই নিরপরাধ শিশুদের অত্যাচার করে। আসলে নির্যাতিতারা এই শয়তানদের সামনে অসহায় এবং তারা জানে না যে, তাদের সঙ্গে কি ঘটছে! কখনও কখনও শয়তানরা বাচ্চাদের এই বলে চুপ করিয়ে দেয় যে, তারা কোনও শব্দ করলে তাদের বাবা-মা কিংবা ভাইবোনদের হত্যা করবে। প্রায়শই, মায়েরা যখন তাদের সন্তানদের নির্যাতনের কথা জানতে পারে, তখন তারা তাদের মুখ বন্ধ রাখে, কারণ সমাজ মা এবং শিশু উভয়কেই দোষারোপ করতে শুরু করে এবং নির্যাতিতা শিশুটি সবার রসিকতার লক্ষ্যে পরিণত হয়। আমাদের সমাজ এ ধরনের বিষয়ে খুবই নিষ্ঠুর এবং শিশুকে উত্যক্ত করে আনন্দ পায়।

কখনও কখনও শিশুটিকে দোষী হিসাবে বিবেচনা করা হয়। বলা হয়— ‘সে হয়তো কিছু লোভের বশবর্তী হয়ে এমন কাজে রাজি হয়েছে। এর ফলে, অভিভাবকরা বিব্রত, ভাই-বোনেরাও নিজের বাড়িতে ভিকটিমদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করে অনেক সময়। তবে সুপ্রিম কোর্ট যেভাবেই আইনের ব্যাখ্যা করুক না কেন, এই ধরনের মামলাগুলি শুধুমাত্র সেই পুলিশ সদস্যরাই আদালতে নিয়ে যাবে, যারা থানায় অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে এবং অপরাধী এবং অভিযোগকারীর সঙ্গে সমান আচরণ করে, সে প্রাপ্তবয়স্ক-ই হোক কিংবা শিশু।

আদালতের কাছে সাক্ষীদের বক্তব্য শোনা ছাড়া আর কোনও উপায় থাকে না। আর নির্যাতনের শিকার হওয়া মেয়েটিকে কয়েক ডজন লোককে জানাতে হবে— তার সঙ্গে কী, কখন এবং কীভাবে ঘটেছে। ভিকটিম সেই সমস্ত মুহূর্তগুলিকে পুনরুজ্জীবিত করতে বাধ্য হবে, যা সে ভুলে যেতে চায়।

অনিল মাঝি আর সেই ভাঙা পাঁচিল (শেষ পর্ব)

অনিল কেমন যেন মন্ত্রমুগ্ধের মতো এগোতে শুরু করল তার পিছে পিছে। তার যেন জানা হয়ে গিয়েছে জীবনের সারমর্ম। এখানেই তার মৃত্যু, এখানেই জন্ম বার বার। আর যা করে যাচ্ছে তা সব পূর্বনির্ধারিত। তাহলে আর ভাবনা কীসের। যা করতে বলছে করে যাও। আর শুধু সে কি একা নাকি, তার মতো এমন আরও জনা দশ কী বারো লোক এসে হাজির হয়েছে। সবারই এক চাহিদা, সামান্য কিছু বেশি টাকা। তাদের মধ্যে কেউ কেউ এ কারখানাতেই ঠিকা শ্রমিক। সকালে তাদের শিফট চলে। বিকালে কিছু উপরি ইনকাম। অনিল এদের কাউকে কাউকে চেনে। মুখ চেনা।

—এখান দিয়ে যে কেবলগুলো গিয়েছে তাদের কাটতে হবে। তারপর সেগুলো গুটিয়ে একটা বাঁশের মাঝে ঝুলিয়ে নিয়ে যেতে হবে। বুঝেছেন?

—‘আপনি’ বলছে। তাহলে নিশ্চয়ই ছেলে নয়। বা এমনও হতে পারে, ছেলে কিন্তু পরিচয় লুকাবার জন্য ‘আপনি’ সম্বোধন। অনিল তাকিয়ে থাকে ছেলের দিকে। সত্যি কি সে, নাকি সে ভুল করছে?

—চিন্তা নেই, আমরা দু’জন দু’দিকে থাকব।

অনিল দেখে তার ছেলের মতো আরও একটা ছেলে রয়েছে, সে খেয়াল করেনি। বা ভেবেছিল তার মতো লেবার। কিন্তু না এ তার মালিকের ছেলে। তারা যখন বাঁশে করে কেবল ঝুলিয়ে নিয়ে যাবে, এরা একজন সামনে, একজন পিছনে থাকবে। এদের হাতে থাকবে দেশি কাট্টা ওয়ান সর্টার। এরাই তাদের প্রোটেকশন, এরাই মাই বাপ।

অনিল এক ভাবে তাকিয়ে থাকে, মুখে কিছু বলে না। সে জানে কাল না এলেও, আজ বেরোনো অসম্ভব। আজ যখন ঢুকে গেছে তখন এদের কথা শুনতেই হবে। কিন্তু কেবল কাটবে কারা। এ তো মনে হচ্ছে লাইভ লাইন।

—কেবল কাটার জন্য লোক আছে অন্য। তারা আসবে দুপাশের জয়েন্টকে শর্ট করে মাঝের লাইন বাইপাস করে দেবে। তারপর ঠিক দশ কী পনেরো মিনিট। কেবল কাটার জন্য এটুকুই টাইম পাওয়া যাবে।

—আর যদি তার মাঝে না হয় ।

—কোম্পানির লোক টের পেয়ে যাবে। তারপর আপনি নিজে মালিক।

( চার )

সব কিছু ঠিকঠাক চলছিল। কেবল কাটা চলছিল অন্ধকারে। আগে থেকেই বাইপাস করা হয়েছে। তারা আসার আগেই সে কাজ সারা হয়ে গেছে। তাদের হাতে সময় কম। হয়তো দশ কী বারো মিনিট। এর মধ্যেই কাজ সারো। হঠাৎ একটা ধাম করে ব্লাস্ট হল। হয় কাজের চাপে, নয় অন্ধকারে — ঠিক বোঝা সম্ভব নয়। পাশের লাইভ লাইন টাচ করে গেছে। ব্যস একটা ব্লাস্ট, যে-দু’জন কাটছিল সিঁড়ি থেকে নীচে। অনিল দাঁড়িয়ে দেখছিল। তার হাতে বাঁশ। মুখে রুমাল। বাকিরা ততক্ষণে পালিয়েছে।

আমি দেখলাম একটা আলোর ঝলক খেলে গেল আমার চোখের সামনে দিয়ে। আর দু’জন উপর থেকে পড়ে গেল আচমকা। তারা যেন তাদের কৃতকর্মের জন্য আকাশ থেকে পড়ল মাটিতে। আমার হাত জোড়া। পাশে কেউ নেই। সবাই যে যেদিকে পেরেছে পালিয়েছে। সামনে দু’জন প্রায় অজ্ঞান। এখন?

দূর থেকে টর্চের আলো দেখা যাচ্ছে। দু’জন সিআইএসএফ ছুটে আসছে। এখন কী করি। আমিও কি পালাব? যে-ছেলেটি ঢুকিয়ে ছিল সে দূর থেকে বলল পালাও। কিন্তু যারা পড়ে থাকল। আমি তাকালাম তাদের দিকে। ছেলেটি ইশারায় যা বলল, এদের এখন কোম্পানির লোকই বাঁচাতে পারবে। তুলে নিয়ে যাবে প্ল্যান্ট মেডিকেলে। তুমি জান থাকতে পালাও।

—পালাব! কিন্তু এভাবে আমারই সঙ্গীকে মাঝপথে ফেলে রেখে। ততক্ষণে ছেলেটি ইশারা করছে। আমি কিছু না বুঝে তার পিছু নিলাম। আমার পিছু নিল একজন সিআইএসএফ। অন্ধকারে ছুটতে থাকলাম। হারিয়ে গেল ছেলেটি। আমি তাও ছুটতে থাকলাম, ছুটতে থাকলাম। সেই ভাঙা পাঁচিলটার দিকে ছুটতে থাকলাম। ছেলেটি যেভাবে হারিয়ে গেছিল, সেভাবে আবার না জানি কোন রাস্তা দিয়ে সামনে এসে দাঁড়াল।

মুখোমুখি আমরা দু’জন, পিছনে সিআইএসএফ। ছেলেটি কেন জানি না আমাকে আরও অন্ধকারে ঠেলে ছুটে গেল বাঁ পাশের একটা রাস্তা দিয়ে। যেখানের অল্প আলোয় তাকে দেখা যাচ্ছিল। সিআইএসএফ ছুটে গেল তার পিছে পিছে। তারপর আর কিছু জানি না। কিছুক্ষণ পর একটা জলের শব্দ হল। কেউ একজন পুকুরে ঝাঁপিয়ে পড়লে যেমন আওয়াজ হয়।

শব্দটা শুনলাম, শুনলাম সিআইএসএফ-এর হুইসল। আস্তে আস্তে হেঁটে বেরিয়ে এলাম পাঁচিলের ফাঁক দিয়ে।

ছেলেটি কি কোনও পরিত্যক্ত পুকুরে ঝাঁপাল? ওদিকটা তো ইস্কোর বন্ধ হয়ে যাওয়া পুরোনো কারখানা ছিল। পুরোনো ব্লাস্ট ফার্নেসের চার্জিং সাইড। দু-তিন তলা নীচে পর্যন্ত না বোজানো গর্ত রয়েছে সেখানে। কিন্তু এখন? ঘরে গিয়ে ছেলে-মেয়ের মাকে কী বলব? কী বলে নিয়ে আসব হসপিটালের মর্গে?

সে খুব ধীরে ধীরে ঘরের সামনে এসে দাঁড়াল। দরজা খোলা। এমনিতে খোলাই থাকে। কিন্তু এখন কেমন যেন মনে হল! খোলা দরজা দিয়ে উঁকি দিল ঘরে। উদ্দেশ্য বিছানাখানি দেখা। সেখানে ছেলে শুয়ে থাকে। কিন্তু না, ছেলে নেই। বাইরে থেকে ডাকল মেয়ের নাম নিয়ে। এগিয়ে এল বউ।

—এত দেরি করে এলে। ছিলে কোথায়?

সে জানতে চাইল ছেলে এসেছে? বউ বলল, এসেছিল আবার চলে গেছে।

—এসেছিল? কখন?

—এই তো ঘণ্টাখানেক আগে। কাল রাতে ঘরে ফেরেনি।

যাক তাহলে সব ঠিক আছে। ছেলের মাকে আর কিছু বলার নেই। ছেলে ঘরে যখন, তখন আর ও পথে যাওয়াও নেই। ও কাজ করাও নেই।

—কিন্তু আবার বেরোল কেন?

—কিছু বলে যায়? যাওয়ার সময় আবার বোনকে নিয়ে গিয়েছে। কেন জানি না।

ঘড়ির কাঁটা কিছুটা ঘুরে এসে হোঁচট খেল আবার। মেয়েকে নিয়ে গেছে? ততক্ষণে জানলার পাশে তার এক প্রতিবেশী এসে

দাঁড়িয়েছে। সে-ও এক সময় বার্ন স্ট্যান্ডার্ডের শ্রমিক ছিল। তার পাশে ধরনায় বসত কিছুদিন আগেও। বলল, “কিছু খবর শুনেছেন?’ শুনেছি? কিন্তু…

—কিন্তু নয়, কাল ইস্কোতে আমাদের একজন মারা গেছে।

—জানি, কিন্তু…

—কিন্তু কী? তার জায়গাটা ভরতে চান, নাকি ভাঙা পাঁচিলটা বন্ধ করতে চান?

অনিল ঘর থেকে বেরিয়ে এল।

(সমাপ্ত)

অনিল মাঝি আর সেই ভাঙা পাঁচিল (পর্ব-০১)

( এক )

অনেকটা সময় নিয়ে বসে থাকলাম। দেখি কাউকে দেখা যায় নাকি। দেখি কোনও শব্দ কানে আসে কিনা। কিন্তু না কোনও শব্দ কানে এল না। দেখাও গেল না কাউকে। বন্ধ কারখানার গেট, কেই-বা আর অপেক্ষায় থাকবে। না কোনও আশা আছে, না সামান্য আলো। এক অন্ধকার ঘিরে রেখেছে জীবনকে।

এখানেই একদিন সব ছেড়েছুঁড়ে বসে থেকেছি। সব দেনা-পাওনা থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে, বসে থেকেছি। সামান্য জল আলোর জন্য। হ্যাঁ, সে একদিন ছিল। কারখানার ওভার টাইম ছিল বেশ ভালো। সে সময় একজন সামান্য লেবারের বেতন, একজন ফাস্ট স্টাফের থেকেও বেড়ে যেত। রোয়াবই আলাদা ছিল সে দিনের। হাত থেকে পয়সা উড়েও যেত তত তাড়াতাড়ি। ইনকামের হাত যখন একটা, খরচের হাত দশটা হয়ে যায়।

অনিল মাঝি এইসব ভাবতে ভাবতে পেরিয়ে যাচ্ছে স্কব গেট, পেরিয়ে যাচ্ছে এলডব্লিউ অফিস, পেরিয়ে যাচ্ছে বার্ন স্ট্যান্ডার্ড কারখানার মেইন গেট। আর একটু গেলেই নয়া রাস্তা। সেখান দিয়ে ঢুকে গেলেই বস্তি। কোনও কালে কোম্পানি কোয়াটার ছিল। এখন না জল আছে, না কারেন্ট। অন্ধকারে সব কেমন যেন ঝিমিয়ে আছে। আজ মন খুব বিষণ্ণ বা বলা ভালো মনে এক ভয় কাজ করছে।

ছেলেটা স্কুলে যেত কিন্তু কখন যে স্কুল ছেড়ে দিয়েছে সে জানতেই পারেনি। সে শুধু দেখেছে তার মেয়েটা একদিন নিজের রাস্তা নিজে দেখে নিল। তারপর হারিয়ে যেতে লাগল সেই অন্ধকারে। তাকে আর বোঝানো গেল না। ভালোমন্দের মধ্যে তফাৎটা দেখানো গেল না। একদিন ইস্কো কোম্পানি তাদের জল লাইট কেটে দিল। নিজের কোম্পানি বার্ন স্ট্যান্ডার্ড তো কবেই বন্ধ হয়ে গিয়েছে। ইস্কো থেকে যেটুকু সাহায্য আর কী। তাও ইস্কো এতদিন জল আর কারেন্ট সাপ্লাই দিচ্ছিল। চালিয়ে নেওয়া যাচ্ছিল কোনও ভাবে। কিন্তু এখন?

বউ এসে বলেছিল— আর কী হবে, চলো অন্য কিছু দেখি। কিন্তু অন্য কিছু সেও কি আর এ বয়সে এসে সম্ভব বলে মনে হয়? এমনই কয়েক শত প্রশ্নের কাছে যখন নিজেকে বিলিয়ে দিচ্ছিল সে, হীরাপুর থানার ছোটোবাবু এসে জিজ্ঞাসা করল, অনিল, ছেলেকে কতদিন ঘরে দেখোনি?”

—ছেলে তো এখন ঘরেই আসে না। কোথায় যে থাকে কে জানে?

—চলো ছেলেকে দেখে আসবে।

অনিল ছেলেকে দেখতে গিয়েছিল। ছেলে বলে চিনতে পারেনি। ইস্কো কারখানার ভিতরে একটা অ্যাক্সিডেন্টে তার ছেলে বা হয়তো ছেলের মতো দেখতে এক তরতাজা প্রাণ শেষ হয়ে গিয়েছে। শুয়ে আছে জেলা হাসপাতালে। কিন্তু তার ছেলে তো কারখানায় কাজ করে না। তাহলে তাকে কেন দেখানো হচ্ছে? যদিও মনে সংশয় তাও সে জিজ্ঞাসা করেছে। দেখেছে একটা মৃতদেহ কিন্তু কিছু বলেনি। মাথাটা খুব ভারী কিছুতে আঘাত লেগে থেঁৎলে গেছে। ছেলে বলে চিনতে পারা যে এতটাই দুরূহ হয়ে যাবে, এ জীবনে কে আর তেমন বুঝতে পেরেছে।

অনিল বলল, “ঠিক বুঝতে পারছি না।’

—তাহলে তার কাপড় দেখে কি কিছু চেনা যাচ্ছে?

—কাপড় দেখে কি এ জিনিস বলা যায়? একজন মানুষ মারা গেল। কাপড় দেখে আর কতটুকু বলব। যদি ভুল বলি!

অনিল বলল, সে ছেলের মাকে ডেকে নিয়ে আসবে। সে যদি কিছু একটা উত্তর দেয়।

( দুই )

এই অন্ধকার ঘরগুলোর পাশ দিয়ে হেঁটে এসে মনে হয়, এরা ঠিক ঘাত লাগিয়ে বসে আছে কোনও এক নির্দিষ্ট সময়ের জন্য। ঠিক একটা মোমেন্ট যখন শিকার আর শিকারি এক ঘরে মুখোমুখি হবে। ছেলে ঘরে ফিরে কিছু টাকা গুঁজে দেবে মায়ের হাতে। ছেলে আজকাল দেরি করে ঘরে ফেরে। মা যদি কিছু জিজ্ঞাসা করে, তাকায় শুধু, মুখে কিছু বলে না। মায়ের হাতে টাকা। টাকা আর এই অন্ধকার ঘর। টাকা আর এই পেটের সংগ্রাম।

রাত থাকতে ফিরে আসে ঘরে, তারপর অনেক বেলা পর্যন্ত ঘুমায়। অনিল জানে কোথায় কী পাওয়া যায়। কোন গলি কোন অন্ধ কোণে শেষ হয়। অথচ সেও তো ক্লান্ত !

ছেলে বলে— বাবা আজ ধরনায় যাবে না?

মা তাকায় ছেলের দিকে। হয়তো কিছু বলবে কিন্তু সাহস হারিয়ে গিয়েছে। ছেলে কিন্তু কোনও দিন বাবাকে ধরনায় যেতে না করেনি। বরং সে শুধু জানতে চায় বাবা এখনও ধরনায় যায় কিনা।

মেয়ে বলে— বাবা গেলেই বা কী আর না গেকেই বা কী। মেয়ে জানে তাকে তার ব্যবস্থা করে নিতে হবে। আর কোনও পথ নেই।

এই তো সেদিন তার পরিচয় হল কী যেন নাম ছেলেটির। জানা নেই। বা হয়তো জানা তেমন দরকারি নয়। শুধু জানা চাই তার ঠিক মতো ইনকাম আছে কিনা। সে তাই জেনেছে, দাদা এখন অনেক রাত করে ঘরে ফেরে। আর বাবা ধরনায়।

তারপর সেদিন যখন অনিলের কলিগ মারা গেল, তার মৃতদেহের দিকে তাকিয়ে কেমন যেন বেঁচে থাকার ইচ্ছেই চলে গেল। ছেলেকে জানাল সে আজ একটু দেরি করে ঘরে ফিরবে। দেরি বলতে কিছুক্ষণ রিভারসাইডে একটা কলোনিতে বসে থাকা। আর ভাবতে থাকা কেন যে এখানে রয়ে গেলাম।

সেখানেই পরিচয় জিতেন ঠাকুরের সঙ্গে। এক কন্ট্রাক্টর যে সদ্য ইস্কোতে নতুন কন্ট্রাক্ট পেয়েছে। সে জানাল, কাজ আছে কিন্তু অত সোজা নয়। অনেক লোক মরে, তাই কেউ কাজ নিতে চায় না। তবে কাজ প্রচুর। প্রতি রাতে সাতশো থেকে হাজার।

সে হিসেব করে দেখল, আরে তাহলে তো প্রতিমাসে কুড়ি কি পঁচিশ হাজার হয়ে যাবে। ভাবাই যায় না। কিন্তু এই বয়সে তাকে কি কাজে নেবে কেউ।

(তিন)

একটা ভাঙা পাঁচিলের মাঝ দিয়ে চলে যেতে হবে রাত থাকতে। রাতে রাতে কাজ। কাজ করে রাতেই ঘরে ফেরা। জিতেন তার সামনে দাঁড়িয়ে। সে এপারের দায়িত্বে, ওপারে অন্য কেউ একজন। সে বাকিটা বুঝিয়ে দেবে। বাকিটা বুঝে গেলেই হয়ে গেল। বেশি কিছু না। যা দেবে ওখান থেকে তা তুলে আনতে হবে কাঁধে করে। এটুকুই কাজ। তারপর আবার পাঁচিলের ফাটল দিয়ে পাস করানোর দায়িত্ব এই জিতেনের।

—এ কাজ কি করা যাবে? এক চিন্তার রেখা অথচ পয়সা কিছু একটা কম নয়। অনিল ওপারে দাঁড়িয়ে বলে কিন্তু সিআইএসএফ?

—আরে ওসব ভাবতে কে বলেছে। আমরা কি কিছু না দিয়েই কাজ করছি নাকি? সব সেটিং। কাজ পেয়েছ যখন লেগে যাও। এত বছর সে কারখানায় কাটিয়েছে। কোনওদিন একটা পেরেক পর্যন্ত ঘরে আনেনি। আর এই পাঁচিলের ফাটলের এপারে দাঁড়িয়ে! সত্যি কী অদ্ভূত এ জীবন? পেটের কাছে কতটা সে পরাধীন। অনিল ভাবতে থাকে, সে কি জীবনে কিছুই ভালো করেনি। তাহলে কেন তাকে এই ফাটা পাঁচিলের সামনে দাঁড়াতে হচ্ছে।

ঠিক তখনই সেই আবছা থেকে বেরিয়ে এল একটি ছেলে। মুখে কালো কাপড় বাঁধা। ঠিক তার নিজের ছেলেটির বয়সি। তেমনই রোগা। তেমনই তীক্ষ্ণ চোখ। তাকিয়ে থাকল অনেকক্ষণ ধরে। অনিল ভাবল ছেলে হলে নিশ্চয়ই কিছু কথা বলবে। জানতে চাইবে কেন এই ঝুঁকি। সে তো নিয়ে যাচ্ছে ঘরে। তারপরও কেন তাকে না জানিয়ে সে এসেছে। অথচ সে কিছুই বলল না। একটা শব্দও উচ্চারণ করল না মুখ দিয়ে। শুধু ইশারায় জানাল, কী করতে হবে।

(ক্রমশ…)

হতাশাগ্রস্ত মানুষদের রক্ষা করবে কে?

কোনও মানুষের জীবন যদি লাইনচ্যুত হয়, তখন ঘটে যেতে পারে মর্মান্তিক কোনও ঘটনা। যেমন, দিল্লিতে ৪২ বছর বয়সি এক মহিলা তার ৫ বছর বয়সি এবং ১৮ বছর বয়সি দুই মেয়েকে নিয়ে আত্মহত্যা করেন। প্রকাশিত তথ্য অনুসারে, ওই মহিলার প্রথম বিয়ে ভেঙে যাওয়ার পর, অনেক পুরুষের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি হয়। তিনি দিল্লির মোলারবন্দ এলাকায় এক কক্ষের ফ্ল্যাটে থাকতেন। লিভ-ইন পার্টনারকে হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছিল ওই মহিলার বিরুদ্ধে। যার কারণে তাকে এবং তার ২৫ বছর বয়সি ছেলেকে জেলে যেতে হয়েছিল। অবশ্য একসময় মা-ছেলে জামিন পেয়ে যান কিন্তু জেল থেকে ফেরার পর আর কোনও চাকরি করতে পারেন না ওই মহিলা। এরপর ওই মহিলার আরও এক লিভ-ইন পার্টনারও হঠাৎ মারা যান। আবার সন্দেহ দানা বাঁধে। হতাশ মহিলা তার দুই মেয়েকে নিয়ে সম্প্রতি আত্মহত্যা করেছেন। এখন প্রশ্ন হল, কেন এমন মর্মান্তিক পরিস্থিতির শিকার হন কিছু মানুষ ?

২৫ বছরের ছেলে, ১৮ বছরের বড়ো মেয়ে এবং ৫ বছরের ছোটো মেয়েকে নিয়ে ভাড়ায় এক ঘরের ফ্ল্যাট-এ থাকা, মহিলার একাধিক সম্পর্ক, লিভ-ইন পার্টনার-এর মৃত্যু— সব মিলে রহস্য ঘনীভূত হয়। কিন্তু কেন?

এখন এই ধরণের ঘটনার সংখ্যা বাড়ছে। আর এইসব ঘটনার কেন্দ্রে মেয়েদেরই বেশি দেখা যাচ্ছে। সবচেয়ে দুঃখের বিষয় হল– মর্মান্তিক ঘটনার সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পেলেও, হতাশাগ্রস্ত মানুষদের রক্ষা করার উপায়ও যেমন অধরা, ঠিক তেমনই রক্ষাকারী কাউকেও চোখে পড়ছে না। সমীক্ষায় দেখা গেছে যে, অসহায় মানুষ, বিশেষকরে মহিলাদের ভরণপোষণের জন্য পরিবারের সদস্যরা দায়িত্ব এড়িয়ে যেতে চাইছেন। যদি বাবা-মা বেঁচে না থাকেন, তাহলে সম্ভবত তারা অভিভাবক হিসাবে ঠিকমতো দায়িত্ব পালন করছেন না, কিংবা আলাদা ভাবে বসবাস করছেন। অথবা সন্তানদের যত্ন না নিয়ে এবং অতিরিক্ত স্বাধীনতা দিয়ে ফেলেছেন মা-বাবা এবং তারা নিজেদের নিয়েই ব্যস্ত থাকছেন। ফলত, অসহায় মানুষের জীবন পরিচালনা করার কেউ থাকছে না। আর এই অসহায়ত্বের কারণে, কেউ-কেউ দিশাহারা হয়ে পড়ছেন এবং অনেক সময় বিপথে চালিত হচ্ছেন। অবশেষে ঘটে যাচ্ছে, খুন কিংবা আত্মহত্যার মতো ঘটনা।

সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হল এই যে, সমাজ, সরকার, এমনকী মানবাধিকার সংগঠনের কর্মীরাও সঠিক ভাবে এবং সঠিক সময়ে এই বিগড়ে যাওয়া কিংবা অসহায় এবং হতাশাগ্রস্ত মানুষগুলোর কাছে পৌঁছাতে পারেন না। এক্ষেত্রে সমাজ যেমন নিষ্ঠুর, সরকার তেমনই কর আদায়ে ব্যস্ত থাকে এবং ধর্মগুরুরা মানুষকে ঈশ্বর লাভের প্রলোভন দেখিয়ে দান নিতে ব্যস্ত থাকে। অর্থাৎ, কেউই যেন কারওর জীবনরক্ষার দায়িত্ব নিতে চায় না!

আসলে যারা ঠিক-বেঠিকের পার্থক্য ভুলে যান, বিগড়ে যাওয়া সেই মানুষগুলোই অবসাদের শিকার হন এবং অবশেষে মর্মান্তিক মৃত্যুবরণ করেন অথবা মৃতপ্রায় হয়ে বেঁচে থাকেন। এই যেমন দিল্লির ওই আত্মহত্যাকারী মহিলা হয়তো স্বামী কিংবা প্রেমিকদের দ্বারা ঠকেছেন কিংবা হয়তো ওই মহিলাই ন্যায়- অন্যায়ের তফাত ভুলে গিয়ে বড়ো ধরণের অপরাধ করে ফেলেছেন।

সমাজ, সংসার, সরকার সবাই কি তাহলে দায়মুক্ত? কেউ কি তাহলে বিগড়ে যাওয়া মানুষদের সঠিক পথ দেখানোর জন্য হাত বাড়াবে না? এর ফলে তো অপরাধ প্রবণতা কিংবা অপরাধীর সংখ্যা বাড়তেই থাকবে? কেউ হয়তো কিছু ভুল করেছে, কেউ হয়তো কারওর চক্রান্তের শিকার হচ্ছে এবং যার পরিণতিতে ঘটে যাচ্ছে মৃত্যু কিংবা হত্যার ঘটনা। এ বড়ো মর্মান্তিক!

ভাসান

“ঠাকুর থাকবে কতক্ষণ?

ঠাকুর যাবে বিসর্জন!”

প্রতি বছর বিজয়া দশমীতে দেবীমূর্তির বিসর্জনের সময় এই লাইন দুটো শুনলেই ক্ষেপে যেত বৈদেহী, রেগে গিয়ে বলত — আচ্ছা, এটার মানেটা কী বলো তো মা! অসুরের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জিতেও মা দুগ্‌গার ভাসান হয় কী করে? শুভ শক্তির কি আদৌ কখনও বিসর্জন হয় নাকি?

বাড়ির একমাত্র মেয়ের নাম ‘বৈদেহী’ রাখায় আপত্তি করেছিলেন ঠাকুমা উমাদেবী। ছেলের বউ কৃষ্ণা মানে বৈদেহীর মাকে বলেছিলেন, রামায়ণের সীতামাতা যে জনমদুঃখিনী ছিলেন, বউমা তার নামে মেয়েটার নাম রাখবে? শুনে কৃষ্ণা উত্তরে বলেন, আমার নামটাও তো আপনার মহাভারতের দ্রৌপদীর নামে মা, উনিই বা কী এমন সুখী ছিলেন! তা আমি কি কিছু খারাপ আছি এখন, বলুন তো?

কথাটা অবশ্য তখন কিছু ভুল বলেননি কৃষ্ণা। অন্তত বছর ছয়েক আগে অবধি তো বৃদ্ধা শাশুড়ি, সরকারি চাকুরে স্বামী আর গবেষণারত একমাত্র মেয়েকে নিয়ে ভরা সংসার ছিল ওনার। ছিল, কিন্তু এখন আর নেই, এখন শুধু অতীতের সুখস্মৃতিটুকু পড়ে রয়েছে ঠাকুর ভাসানের পর জল থেকে ভেসে ওঠা কাঠামোর মতোই!

এইতো ক’দিন আগে বিতান এসেছিল ওর মাকে নিয়ে নিজের বিয়ের নেমন্তন্ন করতে। সামনের নভেম্বর মাসেই বিয়ে; অক্টোবরে পুজোর মধ্যে তো আর এসব কাজ এগোনো সম্ভব নয়, তাই আগেভাগেই বেরিয়ে পড়েছে নিমন্ত্রণপত্র বিলোতে। ম্যাট্রিমনিয়াল সাইট থেকে সম্বন্ধ করে বিয়ে হচ্ছে পোস্ট ডক্টরেট রিসার্চ স্কলার বিতানের। বৈদেহীর ইউনিভার্সিটির সহপাঠী ছিল বিতান। শুধু বন্ধুত্বই নয়, দু’জনের সম্পর্কটা এগিয়েছিল আরও খানিকটা। যার জেরে কৃষ্ণার মনে হল— বিয়ের কার্ডটায় তো কনের জায়গায় ওনার মেয়ের নামটাও থাকতে পারত আজ !

—আচ্ছা, ও কি সবাইকে ছেড়ে চলে যাওয়ার আগে একবার অন্তত কিছু জানিয়েছিল বিতানকে?” অনেকবার জিজ্ঞেস করবেন ভেবেও কখনও করা হয়ে ওঠেনি প্রশ্নটা।

‘ন্যাশনাল এলিজিবিলিটি টেস্ট’ বা সংক্ষেপে ‘নেট’ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে জুনিয়র রিসার্চ ফেলো হিসেবে “সিএসআইআর’ থেকে স্কলারশিপ পেতে কোনও অসুবিধে না হলেও, রিসার্চ পেপারগুলো ঠিকমতো পাবলিশ না হওয়ায় একটু দুশ্চিন্তাতেই ছিল অন্তর্মুখী বৈদেহী; গবেষণাপত্র প্রকাশনা, ল্যাবে কাজ, থিসিস লেখা ইত্যাদি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারে নানান সমস্যার সম্মুখীন হওয়ায় বেশ কিছুদিন থেকেই খানিকটা চুপচাপ হয়ে গিয়েছিল সে।

তবে সেবারটা যেন একটু বেশিই থম মেরে গিয়েছিল মেয়েটা! কারণ জিজ্ঞেস করেও কোনও যুৎসই উত্তর না পেয়ে কৃষ্ণারা ভেবেছিলেন, হয়তো বা রিসার্চের পড়াশোনার চাপ। মেয়ে তাঁর বরাবরই বড্ড মিতভাষী, চাপা স্বভাবের, তাই মা হয়েও মেয়ের মনে কী ঝড় বইছে তা ঘুণাক্ষরেও কিছু টের পাননি কৃষ্ণা! ঝড়ের আগের সেই ছিল ওর শেষ নিস্তব্ধতা। আর তারপরই তো জন্ম এক অকালপ্রয়াণের অনন্ত নীরবতার!

বহুকাল আগে নিজের অল্প বয়সে সাহিত্যিক শংকরের লেখা ‘কত অজানারে’ বইটা পড়বার সময় কৃষ্ণা একবারও ভাবেননি যে ভবিষ্যতে ষাটের কাছাকাছি বয়সে এসে প্রায় ছয় বছর ধরে নিয়মিত যাওয়া আসায় সেই উপন্যাসে বর্ণিত কলকাতা-র সুপ্রাচীন ‘লাল বাড়িটি’র আনাচ-কানাচ প্রায় একরকম মুখস্থই হয়ে যাবে তার! তবে আজ দীর্ঘ ছয় বছরের অপেক্ষার অবসানে শুনানি, নির্দেশ আর রায়দানের পর নিজের পক্ষের উকিলের সাথে কথা বলে কলকাতা হাইকোর্ট থেকে বেরিয়ে আসতে এই প্রথমবারের মতো যেন একটু স্বস্তিই পাচ্ছিলেন উনি।

প্রখ্যাত রিসার্চ ইনস্টিটিউটের ল্যাবরেটরি থেকে নিজের একমাত্র মেয়ে বৈদেহীর প্রাণহীন ঝুলন্ত নিথর দেহটাকে নামিয়ে প্রাপ্ত সুইসাইড নোটে দায়ী-অপরাধীর নাম উদ্ধারের পরও যখন পিএইচডি গাইড অ্যাসোসিয়েট প্রফেসরটিকে ‘বিশাখা অ্যাক্টের’ আওতায় গড়ে ওঠা “ইন্টারনাল কমপ্লেইন্টস কমিটি’ সামান্য শোকজ নোটিসটুকুও ধরাল না আর পুলিশ ও প্রাথমিক পর্যায়ের তদন্ত সেরেই দায় ঝেড়ে ফেলল, তখন বৈদেহীর বাবা মৃতা মেয়ের বদনামের আশঙ্কায় প্রথম দিকে কোর্টে কেস ফাইল করতে মত দেননি। পরে অবশ্য মেয়ের আত্মার শান্তি কামনায় আর স্ত্রী কৃষ্ণার কথায় নিমরাজি হলেও পোড়খাওয়া নিরীহ মানুষটির ধারণা ছিল যে, মেধাবী ছাত্রীর মধ্যবিত্ত পরিবারকে একদিন ওই টাকা আর ক্ষমতার কাছে হার মানতেই হবে। কিন্তু যে চলে গেল সব কিছু ছেড়ে, সে তো আর ফিরে আসবে না। তাই আর কী দরকার এইসব আইন- আদালতের ঝুট-ঝামেলার? উমাদেবী কিন্তু তখন নাতনির সুবিচার পাওয়ার আশায় কেস চালাতে নিজের হাফ-পেনশনের টাকাটা নিজেই দিতে চেয়েছিলেন, যদিও সেটার প্রয়োজন পড়েনি কখনও।

মেয়ে বৈদেহীর হয়ে ন্যায়ের লড়াইয়ে অনেক আইনি জটিলতার মারপ্যাচ এই ক’বছরে ভালোই বুঝতে শিখেছেন কৃষ্ণা। কিন্তু আজও বুঝে উঠতে পারলেন না যে, এখনও যখন এই ধরনের কোনও ঘটনা ঘটে তখন আমাদের দেশের ক্রমশ অগ্রগামী সুসভ্য সমাজ কেন হঠাৎ পক্ষপাতদুষ্ট হয়ে পুরুষ বনাম নারীতে ভাগ হয়ে যায়? কেন এই ভাগাভাগিটা সত্যি- মিথ্যা, ঠিক-ভুল, উচিত-অনুচিত বা ন্যায়-অন্যায়ের মধ্যে ঘটে না ? মানবিকতার ঊর্ধ্বে কেন স্থান পায় পুরুষতন্ত্র কিংবা নারীবাদ?

আইনের ফাঁকফোকর আর দীর্ঘসূত্রতার মতোই এই বিবাদও কিন্তু সাহায্য করে আসল অপরাধীকে শাস্তির হাত থেকে ছাড়া পেয়ে পালিয়ে যেতে, সে তার সামাজিক লিঙ্গ-পরিচয় যাই হোক না কেন! প্রায় সবাই সম্ভাব্য নির্যাতনকারী অথবা নির্যাতিতার চরিত্র ও স্বার্থ বিশ্লেষণ করতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। কিন্তু সত্যিই ঠিক কী এবং কেন ঘটেছিল— সেই সত্য উদ্ঘাটনের তাগিদ বা আসল সমস্যা প্রতিকার করার উপায়ের খোঁজ কারওর মধ্যেই চোখে পড়ে না।

আসলে রসালো ‘কেচ্ছা-কেলেঙ্কারি’র গুজব যে নিরপেক্ষ খবরের চেয়ে অনেক বেশি মুখরোচক; কিন্তু, কেউই ভেবে দেখেন না যে, ঠিক কীরকম মানসিক অবস্থা কোনও সুস্থ, স্বাভাবিক মানুষকে আত্মহননের দিকে ঠেলে দিতে পারে! সত্য সেলুকাস, বড়ো বিচিত্র দেশ…!

নামের সামনে ডক্টরেট আর পিছনে আরও নানান ডিগ্রি ও দেশি-বিদেশি অ্যাওয়ার্ডধারী উচ্চশিক্ষিত সমাজের তথাকথিত সম্মানীয় ‘ভদ্রলোক’টি হাইকোর্টের অর্ডারে সাসপেন্ড হয়ে আজ থেকে পুলিশি হেফাজতে থেকেই যে আরও নামী এবং দামি উকিল ধরে উচ্চতর আইনি স্তরে আবেদন করবে, তা ভালোভাবেই জানেন কৃষ্ণা। তবে তিনিও এখন প্রস্তুত মেয়ের হয়ে আরও বড়ো লড়াইয়ের জন্যে….

আচমকা খেয়াল হয়-— আজ রাত পোহালেই তো কাল ভোরে মহালয়া। দেবীপক্ষের শুরু, প্রায় এক সপ্তাহ পর মায়ের বোধন আর ঠিক তার ক’দিন পরই প্রতিমা নিরঞ্জন। এখন তো কলকাতাতে মহালয়ার দিন থেকেই পুজো-প্যান্ডেলের উদ্বোধন শুরু হয়ে যাচ্ছে কোথাও কোথাও। দেবী দশভুজাকেও আজকাল ক্লাবের পুজো পাওয়ার জন্য সেলিব্রেটিদের হাতে ফিতে কাটার অপেক্ষা করতে হচ্ছে— ভেবেই একচিলতে তির্যক হাসি খেলে যায় কৃষ্ণার ঠোঁটে!

হাইকোর্ট চত্বর থেকে বেরিয়ে বাসে বাড়ি ফেরার পথে ঢাকের বাদ্যি সমেত ছোটো ট্রাকের পেছনে মণ্ডপগামী মা দুর্গার কাগজ ঢাকা মুখটার দিকে তাকিয়ে মনে মনে বিড়বিড় করে উঠলেন কৃষ্ণ—

‘অসুর থাকছে কতক্ষণ ?

অসুর যাবেই বিসর্জন।’

পড়ার জন্য সীমাহীন গল্প-নিবন্ধসাবস্ক্রাইব