আপনার সন্তানের চাই সঠিক ঘুম

বিশ্বজুড়ে বহু পরীক্ষা-নিরীক্ষায় দেখা গেছে যে, যেসব বাচ্চারা রাত্রে তাড়াতাড়ি ঘুমোয় এবং তাড়াতাড়ি সকালে ওঠে, তারা অনেক বেশি সজাগ, স্মার্ট হয় এবং মোটা হওয়ার প্রবণতা কম হয়। যত দিন যাচ্ছে ততই বাচ্চাদের রাত অবধি জাগিয়ে রাখার রাস্তা প্রশস্ত হচ্ছে। ওদের হাতে এখন আছে রাত জাগার নানারকম সরঞ্জাম। টেলিভিশন, ইন্টারনেট, ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফোনের মাধ্যমে কথা বলা, ভিডিও গেমস ইত্যাদিতে আসক্তি, বাচ্চাদের চোখে ঘুমের পরিমাণ মারাত্মক ভাবে কমিয়ে দিচ্ছে।

আসলে, শহরে, মফস্‌সলে এখন ট্রেন্ড হচ্ছে, বাড়ির অভিভাবকেরা সকলেই চাকুরিজীবী। তাই তাদের বাড়ি ফিরতে ফিরতে সাতটা, আটটা কিংবা ন’টা বেজে যায়। সুতরাং বাড়ি ফিরে বাচ্চাদের সঙ্গে কথা বলে, , তাদের প্রয়োজনীয় পড়াশোনা করিয়ে, খাইয়ে বিছানায় ঘুমোতে পাঠাতে পাঠাতে ঘড়ির কাঁটা গভীর রাত্রি ছুই ছুই। সকালে তাড়াতাড়ি উঠেই আবার স্কুল, অফিস বেরোবার তাড়া। সুতরাং চাপ সৃষ্টি হয় ঘুমের সময়টার উপরেই। তাড়াতাড়ি শোওয়াতে গেলে বাচ্চারা হয়তো প্রতিবাদ করতে পারে, চ্যাঁচাতে পারে। কিন্তু মা-বাবার উচিত সপ্তাহের পাঁচ-ছ’টা দিন রাত্রে একটাই সময় ঠিক করে তাড়াতাড়ি বিছানায় শুইয়ে দেওয়া বাচ্চাদের। খেয়ালও রাখতে হবে তারা যেন জেগে না থেকে সঙ্গে সঙ্গে ঘুমিয়ে পড়ে। তাহলেই ঘুমটা ওদের পর্যাপ্ত হবে। তবে সপ্তাহে একটা দিন ওদের কিছুটা ছাড় দেওয়া যেতেই পারে এবং সেদিনটা একটু বিলম্বে ঘুমোতে যাওয়ার অনুমতি দিতেই পারেন।

ঘুমোনোটাকে আনন্দদায়ক করে তুলুন

তিনটে জিনিস খেয়াল রাখুন। বাচ্চার ঘুমোবার জায়গা, ঘুমোবার সময় এবং সকালে ওঠার সময়। বাচ্চারা যখন ঘুমোয়, তখন মা-বাবা আশপাশে থাকলে ওরা নিজেদের খুব নিরাপদ মনে করে। তাই ওদের রাত্রে শোয়াবার একটা প্যাটার্ন ঠিক করে দিন। তাড়াতাড়ি নির্দিষ্ট সময়ে বাচ্চাকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে ওর কাছে ১৫-২০ মিনিট থাকুন। সম্ভব হলে ওই সময়টাতে ওকে গল্প বলুন অথবা গল্প পড়ে শোনান। মাথায় ধীরে ধীরে হাত বুলিয়ে দিন এবং ঘুমিয়ে পড়লে নিশ্চিত হয়ে ঘরের আলো নিভিয়ে দরজা ভেজিয়ে বেরিয়ে আসুন।

বদভ্যাসগুলি মেনে নেবেন না

টেলিভিশন, কম্পিউটার, মোবাইল ইত্যাদি যদি বাচ্চাদের নেশার বস্তু হয়ে ওঠে, তাহলে সেগুলির ব্যবহার কমিয়ে দেওয়া আপনার দায়িত্ব। অন্য বদভ্যাসেও যেন সে অভ্যস্ত না হয়ে পড়ে, তার খেয়ালও আপনাদেরই রাখতে হবে। যেমন— স্ন্যাক্স, ক্যাফেন, ফাস্টফুড ইত্যাদি খাওয়া থেকে আপনার সন্তানকে বিরত রাখতে হবে।

নিয়ম মেনে চলতে শেখান বাচ্চাদের

বাচ্চাকে যদি একা শোয়াতে চান, তাহলে হঠাৎ করে তাদের আলাদা ঘরে ব্যবস্থা না করে, ধীরে ধীরে তাদের অভ্যাস গড়ে তুলতে সাহায্য করুন। প্রথমে নিজের পাশে আলাদা একটি খাটে ওদের শোয়ানোর ব্যবস্থা করুন। একটা নাইট-লাইট জ্বালিয়ে রাখুন এবং তার মাথার কাছে একটা অ্যালার্ম বেল রাখুন, যাতে রাত্রে ভয় পেলে তারা ওটা বাজাতে পারে। ধীরে ধীরে এভাবে অভ্যাস হলে আলাদা ঘরে ওকে শিফট করতে পারেন। ঘরটি সম্পূর্ণ বাচ্চাকে ছেড়ে দিন, যাতে নিজের জিনিসপত্র সে নিজের ঘরে রাখতে পারে এবং একা যখন থাকতে চাইবে, তাকে একা থাকার সেই অধিকারটুকু দিন। কিন্তু দু’জন শিশু একটা ঘরে ঘুমোতে গেলে সাধারণত দু’জনেরই ইচ্ছে হবে একে অপরকে বিরক্ত করার এবং তাতে ওদের ঘুমেরও ব্যাঘাত ঘটবে। ঘুমোতে যাওয়ার আগে

রুটিনের মধ্যে, শোওয়ার আগে ব্রাশ করা, হাত-পা-মুখ ভালো করে ধুয়ে বিছানায় ওঠা, গল্পের বই পড়া ইত্যাদি অভ্যাসগুলি বাচ্চাদের করাতে পারেন।

কিছু সতর্কতা

রাতে ঘুম থেকে উঠে বাথরুম-এ যেতে পারে বাচ্চারা। তাই বাড়ির জিনিসপত্র এমন ভাবে গুছিয়ে রাখুন, যাতে ঘুম চোখে বাথরুম-এ যাওয়ার পথে কোনওরকম আঘাত না পায়। ছোটো বাচ্চা হলে ধীরে ধীরে হাত ধরে ওকে বিছানায় শুইয়ে দিন প্রয়োজনে।

রিল্যাক্স রাখার টেকনিক

যেসব বাচ্চাদের অমনোযোগী হওয়ার সমস্যা থাকে, তারা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে প্রচণ্ড হাইপারঅ্যাক্টিভ হয়, ফলে ঘুমেরও প্রবলেম হয় তাদের। চেষ্টা করুন সন্তানকে মেডিটেশন, যোগা ইত্যাদিতে ব্যস্ত রাখতে। এগুলি রিল্যাক্স থাকার নানান উপায়। এছাড়াও রাতে ঘুমোতে যাওয়ার আগে খাওয়ার অন্তত একঘণ্টা পরে) ৩০ মিনিটের হালকা ব্যায়াম করাতে পারেন বাচ্চাদের। এর ফলে, ব্যায়াম শেষে সে ক্লান্ত হয়ে পড়বে এবং ভালো ঘুম হবে। বিকেলেও কিছুটা সময় খেলার সুযোগ করে দেবেন বাচ্চাদের, যাতে রাতে ঘুম ভালো হয়।

অভিভাবক হিসাবে সন্তানের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করা আবশ্যক

অভিভাবকত্ব শুধু একটি দায়িত্ব নয়, এ এক অঙ্গীকার—যা আপনি প্রতিদিন নতুন করে পালন করেন। বাবা-মা হিসেবে আমরা আমাদের সন্তানদের জীবন সব থেকে সুন্দর করে তুলতে চাই। কিন্তু শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও দৈনন্দিন প্রয়োজনের ক্রমবর্ধমান খরচ অনেক সময় আমাদের নিত্যদিনের দায়িত্বভার আরও বাড়িয়ে তোলে। তাই, অনেক সময় এমন দুশ্চিন্তা হয় যে, ‘আমার যদি হঠাৎ কিছু হয়ে যায়!  আমার অবর্তমানে আমার সন্তানরা কি পারবে তাদের স্বপ্নকে পূরণ করতে?’

আসলে, ভবিষ্যৎ কেউই নিশ্চিত ভাবে বলতে পারে না, কিন্তু জীবনবিমা এমন এক নিরাপত্তা দেয়, যারফলে আমরা মানসিক শান্তি নিয়ে বাঁচতে পারি। এ শুধু বর্তমানকে সুরক্ষিত করার বিষয় নয়— বরং এ হল আগামীকেও গড়ে তোলার এক সঠিক পরিকল্পনা। এই বিষয়ে বিস্তারিত পরামর্শ দিয়েছেন বীমা বিশেষজ্ঞ অখিল আলমেইদা।

মনে রাখবেন, আপনার অভিভাবকত্বের ভূমিকা পালনে একজন বিশ্বস্ত সঙ্গী হতে পারে জীবনবিমা। আর আধুনিক জীবনবিমা পরিকল্পনাগুলো এখন আর শুধু অকাল মৃত্যুর ক্ষেত্রে একটি অর্থপ্রদানেই সীমাবদ্ধ নয়। আজকের বিমা পলিসিগুলি এমনভাবে তৈরি করা হয়, যাতে আপনি আপনার আর্থিক পরিকল্পনা করতে পারেন, সম্পদ গড়তে পারেন এবং একই সঙ্গে আপনার পরিবারের স্বপ্নগুলোকেও সুরক্ষিত করতে পারেন— বলা ভালো,  সব কিছুই একসঙ্গে করতে পারবেন।

প্রয়োজন ভিত্তিক পরিকল্পনা

প্রত্যেকটি পরিবারই আলাদা। তেমনই তাদের আর্থিক লক্ষ্যও ভিন্ন। সৌভাগ্যবশত, প্রতিটি প্রয়োজনের জন্যই একটি জীবনবিমার সমাধান রয়েছে। যেমন–

  • টার্ম ইন্স্যুরেন্স: জীবনবিমার সবচেয়ে মৌলিক এবং অত্যাবশ্যক একটি রূপ। এটি স্বল্প প্রিমিয়ামে উচ্চ কভারেজ প্রদান করে—তরুণ বাবা-মায়েদের জন্য আদর্শ, যারা তাদের ভবিষ্যতের জন্য আর্থিক পরিকল্পনার যাত্রা শুরু করছেন। আপনার যদি কিছু হয়ে যায়, তবে এটি আপনার পরিবারের তাৎক্ষণিক আর্থিক চাহিদা পূরণ সুনিশ্চিত করবে।
  • ইউলিপ (ইউনিট লিঙ্কড ইন্স্যুরেন্স প্ল্যান): এগুলি বিমা ও বিনিয়োগের যুগ্ম সুবিধা দিয়ে থাকে। আপনার প্রিমিয়ামের একটি অংশ বাজার-সংযুক্ত ফান্ডে বিনিয়োগ করা হয়, যা আপনার সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য একটি সম্ভাব্য সম্পদভাণ্ডার তৈরি করতে পারে— তা উচ্চশিক্ষাই হোক কিংবা কোনও স্বপ্নের প্রকল্প।
  • গ্যারান্টিড ইনকাম প্ল্যানস: এই পরিকল্পনাগুলি লাইফ কভারের পাশাপাশি নিয়মিত অর্থপ্রদানের বিষয়টিও সুনিশ্চিত করে। স্কুলের ফি, কোচিং ক্লাস বা সহ-পাঠ্যক্রমিক কার্যকলাপের মতো পর্যায়ক্রমিক খরচ সামলানোর ক্ষেত্রে এগুলো আদর্শ—একই সঙ্গে একটি আর্থিক সুরক্ষা বলয়ও তৈরি হয়। কিছু পলিসি আছে, যা ব্যবহার করে আপনি আপনার সন্তানের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ মাইলস্টোন যেমন শিক্ষা, বিয়ে বা বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্যও প্রস্তুতি নিতে পারেন। আপনি যদি না-ও থাকেন, তবুও এই পরিকল্পনাগুলি নিশ্চিত করে যে, আপনার সন্তানের স্বপ্ন থেমে থাকবে না।

 

সঠিক বিমা সংমিশ্রণ গঠন

প্রথমে একটি টার্ম প্ল্যান দিয়ে ভিত্তি তৈরি করুন। তারপর আপনার লক্ষ্য অনুযায়ী—যেমন কলেজের জন্য সঞ্চয়, বাড়ি কেনা, বা আপনার জীবনসঙ্গীর জন্য একটি ছোটো ব্যবসা শুরু করা—আপনি এর সঙ্গে একটি ইউলিপ বা সেভিংস প্ল্যান যুক্ত করতে পারেন। এই অতিরিক্ত পরিকল্পনাগুলি শুধুমাত্র আপনার কভারেজ বৃদ্ধিই করে না, উপরন্তু আপনার পরিবারের আর্থিক বিকাশের রূপরেখাও তৈরি করে।

সহজ সূত্র

একটি সহজ সূত্র হল–আপনার জীবনবিমার কভারেজ হওয়া উচিত আপনার বার্ষিক আয়ের ১০ থেকে ২০ গুন। অর্থাৎ, যদি আপনার বার্ষিক আয় দশ লাখ টাকা হয়, তবে আপনার লক্ষ্য হওয়া উচিত এক থেকে দেড় কোটি টাকার কভারেজ। এই কভারেজ হতে পারে টার্ম ইন্স্যুরেন্স এবং ইনভেস্টমেন্ট-লিঙ্কড প্ল্যান এর সমন্বয়ে—আপনার ঝুঁকির মানসিকতা ও দীর্ঘমেয়াদি প্রয়োজন অনুযায়ী।

অনলাইন ইন্স্যুরেন্স ক্যালকুলেটর কিংবা কোনও বিশ্বস্ত আর্থিক পরামর্শদাতার সঙ্গে কথা বলেও আপনি উপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে পারেন।

পরিকল্পনার সঠিক সময়

জীবনবিমা যত আগে কিনবেন, ততই লাভজনক। অর্থাৎ, সন্তান জন্ম নেওয়ার পর থেকেই এই পরিকল্পনা করা উচিত। এরফলে বেশি সুবিধা পাবেন, এবং জমা টাকার পরিমাণও বাড়বে। এরমধ্যে দুটি প্রধান লাভ হল– কম প্রিমিয়াম এবং দীর্ঘমেয়াদি কভারেজ। এছাড়াও, যত আগে শুরু করবেন, আপনার ইনভেস্টমেন্ট-লিঙ্কড প্ল্যানগুলোর বৃদ্ধির জন্য তত বেশি সময় পাওয়া যাবে, আর স্বাস্থ্যগত কারণে বিমা না পাওয়ার আশঙ্কাও অনেক কমে যাবে।

কর্তব্য পালন এবং দূরদর্শিতা

জীবনবিমা শুধুই টাকা-পয়সার ব্যাপার নয়। এটি এক ধরনের অঙ্গীকার, ভালোবাসা এবং দূরদর্শিতার প্রতীক। এটি এক রকম ভাবে বলা যায়, ‘আমি সবসময় তোমার পাশে নাও থাকতে পারি, কিন্তু আমার ভালোবাসা তোমাকে নিরাপত্তা দেবে সবসময়।’

আমরা বাবা-মা হিসেবে, যেভাবে সন্তানদের বড়ো করি, নিরন্তর ভালবাসা দিয়ে থাকি—ঠিক সেই ভাবেই তাদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করার দায়িত্বও আমাদের উপরেই বর্তায়।

অতএব, দীর্ঘস্থায়ী ভালোবাসার জন্য আজই নিয়ে ফেলুন এক সুদৃঢ় পদক্ষেপ। কারণ, পেরেন্টিং শুধুমাত্র আজকের বিষয় নয়—এটি এমন এক জীবন-সফর, যেখানে আমরা আমাদের সন্তানকে এমন ডানা দিয়ে থাকি, যাতে সে জীবনের যে-কোনও পরিস্থিতিতেই  উড়তে পারে।

শিশুদের চাই সম্পূর্ণ পুষ্টি

ভিত মজবুত করা জরুরি। তাই, শিশুদের চাই সম্পূর্ণ পুষ্টি। কিন্তু যারা মা হতে চলেছেন কিংবা হয়েছেন, তারা তাদের বাচ্চাদের কী খাওয়াবেন, তাই নিয়ে চিন্তায় থাকেন। কারণ, বাচ্চারা সব খাবার খেতে চায় না, কিন্তু তাদের শরীরে পুষ্টির জোগান দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। শরীর এবং মস্তিষ্কের বিকাশের জন্য কোন বয়সের বাচ্চাদের কী খাওয়ানো উচিত, সেই হেলদি ডায়েট প্রসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিয়েছেন কনসালটেন্ট জিআই সার্জন ডা. সঞ্জয় মণ্ডল।

শিশুর প্রথম আহার

সদ্যোজাতদের প্রথম এবং প্রধান আহার হল মায়ের বুকের দুধ। হালকা হলুদ রং-এর এই দুধ শিশুর আদর্শ খাবার। এই দুধকে বলা হয় অ্যান্টিবায়োটিক। শিশুদের ইমিউন সিস্টেমকে মজবুত করে এই দুধ। অর্থাৎ, ভবিষ্যতে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তুলতে সাহায্য করে এবং শরীরে পুষ্টি ও শক্তি জোগায়। মা হওয়ার এক ঘণ্টা পর থেকে শিশুকে খাওয়াতে পারেন এই দুধ। মনে রাখবেন মাতৃদুগ্ধের কোনও বিকল্প নেই।

মাস পর্যন্ত শিশুদের আহার

জন্ম নেওয়ার পরই শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার তন্ত্র বিকশিত হয় না এবং খাবার হজম করানোর ব্যাক্টেরিয়াও পাকস্থলীতে থাকে না। তাই শিশুখাদ্য এমন হওয়া চাই, যা হালকা, সুপাচ্য এবং পুষ্টিকর। মায়ের বুকের দুধে থাকে সঠিক মাত্রায় শর্করা, জল এবং প্রোটিন। এসব শিশুর স্বাস্থ্য এবং বিকাশের জন্য জরুরি। মায়ের দুধে এইসব উপাদান থাকার কারণে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) পরামর্শ দিয়েছে, ৬ মাস পর্যন্ত শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানো আবশ্যক ।

থেকে ১২ মাস পর্যন্ত বেবি ডায়েট

৬ থেকে ১২ মাস পর্যন্ত শিশুদের মিনারেলস, ভিটামিন প্রভৃতির ভীষণ দরকার। কারণ এই বয়স সঠিক বিকাশের সঙ্গে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে ওঠার সময়। অনেক বাচ্চা এই সময় অ্যানিমিয়াতে আক্রান্ত হয়। তাই অ্যানিমিয়া আটকাতে পুষ্টিকর খাবার জোগান দেওয়া জরুরি। বাচ্চা সঠিক পুষ্টি পাচ্ছে কিনা, তা দেখার দায়িত্ব মা-বাবার। তাই এই বয়সের শিশুদের খাদ্য তালিকায় রাখতে হবে কলা, গাজর, রাঙাআলু, আলু, মটর প্রভৃতি। এসবের মিশ্রণে তৈরি চিকেন স্যুপ খাওয়ানো জরুরি। সেইসঙ্গে চিনি ছাড়া দই, ওটস প্রভৃতি খাওয়ানো যেতে পারে।

থেকে বছর বয়স পর্যন্ত

সকালের খাবার: ভালো মানের বিস্কুট জলে ভিজিয়ে খাওয়ান প্রথমে। তারপর দুধে ভিজিয়ে খাওয়ান স্যাঁকা ব্রেড এবং কাঠালি কলার অর্ধেক।

দুপুরের খাবার: ভাতের সঙ্গে আলু, পেঁপে, গাজর, বিন্‌স প্রভৃতি সেদ্ধ করা সবজি চটকে, অল্প মাখন মাখিয়ে খাইয়ে দিন। সেইসঙ্গে খাওয়ান সেদ্ধ ডিমের কুসুম।

রাতের খাবার: ডাল, ব্রাউন রাইস, সবজি প্রভৃতির খিচুড়ি বানিয়ে খাইয়ে দিন।

থেকে ১২ বছর বয়স পর্যন্ত

স্তন্যপান বন্ধ হওয়ার পর শিশুকে পুষ্টিকর খাবার খাওয়ানো জরুরি। কারণ এই সময় শরীর এবং মস্তিষ্ক দ্রুত বিকশিত হয়। তাই, জেনে নিন কোন বয়সের শিশুর কতটা ক্যালোরির প্রয়োজন-

২ থেকে ৩ বছর : ১০০০-১১০০ ক্যালোরি

৩ থেকে ৫ বছর : ১১০০-১২০০ ক্যালোরি

৫ থেকে ৮ বছর : ১২০০-১৪০০ ক্যালোরি

৮ থেকে ১২ বছর : ১৪০০-১৬০০ ক্যালোরি (মেয়েদের জন্য) এবং ১৬০০-১৯০০ ক্যালোরি (ছেলেদের জন্য)।

পুষ্টির মাত্রা

কার্বোহাইড্রেট— সবজি থেকে ৩৩ শতাংশ

ভিটামিন এবং মিনারেলস— ফল এবং সবজি থেকে ৩৩ শতাংশ

আমিষ নিরামিষ প্রোটিন— ১২ শতাংশ

ডেয়ারি প্রোটিন— ডেয়ারিজাত দ্রব্য থেকে ১৫ শতাংশ

শর্করা— মিষ্টিজাতীয় দ্রব্য থেকে ৭ শতাংশ।

জল

২ থেকে ৩ বছর: ১ থেকে ২ গেলাস ৩ থেকে ৫ বছর : ২ থেকে ৩ গেলাস

৫ থেকে ৮ বছর: ৩ থেকে ৪ গেলাস ৮ থেকে ১২ বছর : ৪ থেকে ৫ গেলাস

(১ গেলাস: ২৫০ মিলিলিটার)।

পর্যাপ্ত প্রোটিন এবং ভিটামিনের জন্য অঙ্কুরিত মুগ, অঙ্কুরিত ছোলা, আপেল, বেদানা, আঙুর, ডিমের কুসুম প্রভৃতি উপযুক্ত আহার।

সতর্কতা

আজকাল জাংক ফুড খুব পছন্দ করে বাচ্চারা। কিন্তু এই জাংক ফুড অত্যন্ত ক্ষতিকারক। জাংক ফুড বেশি খেলে শরীরে তার কুপ্রভাব পড়তে বাধ্য। এই জাংক ফুড-এ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় লিভার। তাই, জাংক ফুড থেকে দূরে রাখুন বাচ্চাদের। ওদের খাওয়ান বাড়িতে তৈরি স্বাস্থ্যকর খাবার। সবুজ শাকসবজি এবং ফল খাওয়ান যাতে পুষ্টির ঘাটতি না হয়, সেই বিষয়ে সতর্ক থাকুন। সফ্‌ট ড্রিংক যাতে বেশি পান না করে, তাও দেখা উচিত। বিশুদ্ধ জল পানে যাতে ঘাটতি না হয়, সেই ব্যাপারেও সতর্ক থাকতে হবে। প্রতিদিন অন্তত একবার, বিশেষ করে দুপুরে খাওয়ানোর পর, ফলের জুস খাওয়াতে হবে বাচ্চাদের। খাদ্য তালিকা থেকে মাছ, মাংস এবং ডিমও যাতে বাদ না যায়, সেই ব্যবস্থা নিশ্চিত করা চাই।

শিশু, খাদ্য এবং পুষ্টি

শিশুরা খুব চটকদার খাবার খেতে ভালোবাসে। তারা কী খেতে চায়, অনেক সময় তা বোঝা খুব কঠিন।

আমাদের দেশে নিম্ন আর্থ-সামাজিক স্তরে প্রায়ই দেখা যায় যে, শিশুদের নিয়মিত খাবারের সুযোগ নেই। এটি প্রায়শই দরিদ্র এবং অন্যান্য সামাজিক কারণে ঘটে। তাই তারা অপুষ্টিতে ভুগছে এবং প্রচুর ভিটামিনের ঘাটতি রয়েছে। সমাজের এই স্তরের বেশিরভাগ পিতামাতার মধ্যে এটি একটি খুব সাধারণ এবং ভুল ধারণা যে, খাবার দামি মানেই ভালো এবং কম দামি খাবার ভালো নয়।

অনেকগুলি খাদ্যপণ্য রয়েছে যা খুব স্বাস্থ্যকর এবং পুষ্টিকর কিন্তু মোটেই ব্যয়বহুল নয়। যেমন ডিম, সাধারণ শাকসবজি, চিনাবাদাম, গুড় ইত্যাদির মতো খাবার, দামেও সস্তা এবং স্বাস্থ্যকর ও পুষ্টিকর। মরশুমি ফল স্বাস্থ্যের জন্য সমান ভাবে ভালো এবং অনেক সময় খুব একটা দামিও হয় না। মাছ আবার এমন একটি পণ্য, যা খুব স্বাস্থ্যকর এবং সব মাছ ব্যয়বহুল নয়। ব্যয়বহুল মানে সবসময় স্বাস্থ্যকর নয়।

অন্যদিকে উচ্চতর আর্থ-সামাজিক স্তরে প্রচুর সমস্যা রয়েছে। যদিও সেখানে পুষ্টির অভাবও রয়েছে। তবে বেশিরভাগ শিশুই প্রচুর পরিমাণে অস্বাস্থ্যকর জাঙ্ক ফুড খায়, যা ব্যাপক ওজন বৃদ্ধি এবং স্থূলতার দিকে পরিচালিত করে। আর এই অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের কারণে শিশুরা শরীরে রোগজীবাণু নিয়ে প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে ওঠে। একবার এই শিশুরা এই ধরনের অস্বাস্থ্যকর খাবারে অভ্যস্ত হয়ে গেলে, তারা পরবর্তী পর্যায়ে স্বাস্থ্যকর খাবারে পরিবর্তন করতে পারে না।

বিশেষ পরামর্শ

শিশুরা আমাদের ভবিষ্যৎ। আমরা তাদের যা শেখাই, তারা তা-ই শেখে। খাবার খাওয়ার বিষয়টিও একইরকম ভাবে শিক্ষণীয় বিষয়। তাই তাদের খাদ্যাভ্যাস এবং তাদের জীবনধারা কোনও অংশে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। কারণ, তারা ছোটোবেলায় যা শিখবে, যেভাবে শিখবে, ভবিষ্যৎ প্রজন্মও তাদের থেকে ঠিক একই ভাবে শিখবে এবং প্রভাবিত হবে। অতএব, শিশুদের শারীরিক বৃদ্ধি এবং মস্তিষ্কের বিকাশের জন্য প্রচুর প্রোটিন এবং কার্বোহাইড্রেট-এর প্রয়োজন। নিউক্লিয়ার ফ্যামিলি এবং স্ট্রেসফুল লাইফস্টাইলের কারণে

বাবা-মায়েরা বাচ্চাদের রেডিমেড ইনস্ট্যান্ট ফুড প্রোডাক্ট দিয়ে সহজ উপায় বের করার প্রবণতা রাখেন। এছাড়াও বাচ্চাদের সন্তুষ্ট রাখতে তারা প্রচুর চিনিযুক্ত খাবার, যেমন— চকোলেট, বিস্কুট, সিন্থেটিক জুস, কোল্ড ড্রিংকস ইত্যাদি খাওয়ান, যা স্পষ্টতই বাচ্চাদের জন্য খুব লোভনীয় হয়ে ওঠে। এছাড়াও নুডলস, পিজ্জা, বার্গারের মতো খাবারগুলি প্রায়ই খাওয়ানো হয় বাচ্চাদের এবং এগুলি কেবল বর্তমান নয়, ভবিষ্যতের জন্যও অত্যন্ত ক্ষতিকারক। যে খাবারগুলো নতুন করে তৈরি করা হয় না, সেগুলোতে প্রিজারভেটিভ, কেমিক্যাল কালার থাকে, যা খুবই ক্ষতিকর। এই পণ্যগুলি শৈশবে রোগের সম্ভাবনা বাড়িয়ে তোলে।

এটা গুরুত্বপূর্ণ যে, তাজা তৈরি করা পুষ্টিকর স্ট্যান্ডার্ড ভারতীয় খাবার যেমন ভাত, শাকসবজি, ডাল প্রভৃতি শিশুদের জন্য খুবই ভালো। পশ্চিমের খাবারগুলি স্বাস্থ্যের জন্য একেবারেই ভালো নয়। যেমন ব্রেড-এর পরিবর্তে প্লেইন আটার রুটি খাওয়ানো উচিত। সংরক্ষিত খাবার, জাংক ফুড, কোল্ড ড্রিংকস ইত্যাদি একেবারে এড়িয়ে চলতে হবে। এটা গুরুত্বপূর্ণ যে, বাচ্চাদের প্রিয় জাংক ফুড খাওয়ার চাহিদা না বাড়িয়ে, তাদের স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়ানোর অভ্যাস তৈরি করানো উচিত। তাই, বাড়িতে জাংক ফুড রাখা বন্ধ করুন এবং পরিবর্তে টেবিলে ফল রাখুন, যাতে বাচ্চাদের খিদে পেলে জাঙ্ক ফুড, স্ন্যাকস, চকোলেট বা সফট ড্রিংকস-এর পরিবর্তে স্বাস্থ্যকর তাজা ফল খেতে বাধ্য হয়। শিশুরা তৃষ্ণার্ত হলে তাদের সাধারণ জল পান করতে উৎসাহিত করুন অথবা সম্ভব হলে ডাবের জল খাওয়ান।

সংগীতের মাধ্যমে মানসিক অস্থিরতা দূর করতে কলকাতা-য় আসছেন অমেয়া দাবলি

নানারকম কারণে এখন এমন এক অস্থির অবস্থা কিংবা আবহের মধ্যে আছেন অনেকে, যার জেরে তাদের মানসিক সুস্থতা প্রায় কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে। তাই, এইসব মানুষ ক্রমশ মানসিক চাপ মোকাবেলার বিকল্প উপায়ের দিকে ঝুঁকছেন। আর এই বিকল্প উপায়ের মধ্যে অন্যতম হল—মিউজিক থেরাপি।

দেখা যাচ্ছে, ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে এই মিউজিক থেরাপির জনপ্রিয়তা। আর একথা মাথায় রেখেই মানুষের সেবায় ভারত জুড়ে এক আধ্যাত্মিক সংগীত সফরে রয়েছেন ‘একম সত্ত ফাউন্ডেশন’-এর প্রতিষ্ঠাতা এবং বিশ্বখ্যাত সংগীতশিল্পী অমেয়া দাবলি। তাঁর ‘কৃষ্ণ সংগীত– ব্লিস অ্যান্ড বিয়ন্ড’ একাধিক শহরে জনপ্রিয়তা পেয়েছে ইতিমধ্যেই। আর এবার তিনি কলকাতা-র সায়েন্স সিটিতে সংগীতের মাধ্যমে মঞ্চ মাতিয়ে তুলতে আসছেন আগস্ট-এর ২ তারিখে। বিকেল ৪টে ৩০ মিনিটে এবং সন্ধে ৭টা ৩০ মিনিটে দুটি মিউজিক শো-তে শ্রোতাদের আনন্দ দেবেন অমেয়া দাবলি।

‘মিউজিক থেরাপি’ শব্দটি সোশ্যাল মিডিয়ায় জনপ্রিয় হওয়ার অনেক আগে থেকেই, অমেয়া দাবলি তাঁর কনসার্টের জন্য দেশের সবচেয়ে কঠিনতম অঞ্চলগুলিতে যে উদ্দেশ্য নিয়ে ভ্রমণ করছিলেন, তা হল—সংগীতের মাধ্যমে ভারতের সশস্ত্র বাহিনীর জওয়ানদের মানসিক স্বস্তি প্রদান। বছরের পর বছর ধরে, অমেয়া এবং তাঁর ২৫ জন সহ-সংগীতশিল্পীর লাইভ ব্যান্ড এক সেনানিবাস থেকে অন্য সেনানিবাসে সফর করেছে। দেশের সীমান্তে, এমনকি কার্গিল বিজয় দিবসের মতো গুরুত্বপূর্ণ সামরিক অনুষ্ঠানেও সংগীত পরিবেশন করেছেন অমেয়া এবং তাঁর সহ-শিল্পীরা। এরফলে, যুদ্ধ-ক্লান্ত সেনা-জওয়ানরা উজ্জীবিত হয়েছেন দ্রুত। অর্থাৎ, অমেয়া-র সংগীত ব্যথানাশক মলমের মতো কাজ করেছে সেনা-জওয়ানদের ক্ষতে। আর অমেয়া দাবলি-র এই মহৎ অবদানের জন্য, প্রতিরক্ষা প্রধান জেনারেল অনিল চৌহান ব্যক্তিগত ভাবে প্রশংসা করেছেন বলে জানানো হয়েছে এক প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে।

সংগীতের এই থেরাপিউটিক শক্তি সম্পর্কে অমেয়া জানিয়েছেন, ‘ভারতীয় সংগীতের থেরাপিউটিক মূল্য অপরিসীম। সঠিক ফর্ম্যাট-এ ব্যবহার করলে, সংগীত ম্যাজিক-এর মতো কাজ করে, মানসিক শান্তি দেয়। আত্মাকে এমন ভাবে স্পর্শ করে, যা অন্য কোনও কিছু পারে না। আসলে সংগীত আমাদের আবেগগত নোঙর। আমার ‘কৃষ্ণ-সংগীত’ শুধু একটি সাধারণ সংগীতানুষ্ঠান নয়, তার চেয়েও বেশি কিছু। এই সংগীতানুষ্ঠান তাজা বাতাসের মতো কাজ করছে শ্রোতাদের হৃদয়ে। এটি আমার বিনীত প্রচেষ্টা, যাতে শ্রোতারা এমন মিউজিক থেরাপির একটি ডোজ পাবেন, যা তাদেরকে মানসিক ভাবে স্বস্তি দেবে।’

উল্লেখ্য, অমেয়া দাবলি ইতিমধ্যেই ১৫-টিরও বেশি দেশে ৪,০০০ এরও বেশি কনসার্টের মাধ্যমে শ্রোতাদের আনন্দ দিয়েছেন।  এ.আর. রহমান, ওস্তাদ জাকির হুসেন, সেলিম সুলেমান, শান প্রমুখ সংগীতশিল্পীদের সঙ্গে এক মঞ্চে একাধিকবার সংগীত পরিবেশন করেছেন অমেয়া।   তিনি বর্তমানে ‘কৃষ্ণ সংগীত–ব্লিস অ্যান্ড বিয়ন্ড’ নিয়ে ভ্রমণ করছেন, যা আধ্যাত্মিক মিউজিক সিরিজ হিসাবে খ্যাতি পেয়েছে।

সংক্রামক রোগ এবং হজমের সমস্যা থেকে কীভাবে মুক্তি পাবেন বর্ষাকালে?

বর্ষা যেমন গরমের অস্বস্তি থেকে কিছুটা মুক্তি দেয়, ঠিক তেমনই সঙ্গে নিয়ে আসে রোগ-জীবাণু। যার মধ্যে রয়েছে সংক্রামক রোগ এবং হজমের সমস্যা। আসলে, বর্ষায় জল জমে সমস্যা তৈরি করে, যার ফলে মশার বংশবৃদ্ধি হয় এবং এর ফলে ম্যালেরিয়া ও ডেঙ্গু জ্বর ছড়িয়ে পড়তে পারে। অবশ্য, সমস্যা যেমন আছে, তেমনই রয়েছে সমাধানের উপায়ও। আপনি যদি স্বাস্থ্য সচেতন হন, তাহলে কিছু সাবধানতা অবলম্বন করলেই বর্ষার সময় বিভিন্ন শারীরিক সমস্যা অনেকাংশেই কাটিয়ে উঠতে পারবেন।

মশার বংশবৃদ্ধি রোধ করার জন্য কোথাও জল জমতে দেওয়া যাবে না এবং শিশু সহ সকলেরই মশা প্রতিরোধক ব্যবহার করা উচিত। এই বিষয়ে আরও অনেক রকম পরামর্শ দিয়েছেন সল্টলেক-এ অবস্থিত মণিপাল হাসপাতালের কনসালটেন্ট জিআই সার্জন ডা. সঞ্জয় মণ্ডল।

বর্ষার মরশুম। এই সময়ের আবহাওয়ায় কি আর বিশ্বাস আছে! এই রোদ, এই বৃষ্টি। সকালে গুমোট গরম তো বিকেলে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি। তার উপর  বাতাসে আর্দ্রতার দাপট তো রয়েইছে। যদিও বর্ষা ঋতু তাপ থেকে স্বস্তি নিয়ে আসে, তবুও আর্দ্রতা এবং ভ্যাপসা গরম বজায় থাকে এবং এর ফলে রোগজীবাণু বৃদ্ধি পেতে পারে, যা গ্যাস্ট্রোএন্টেরাইটিস এবং টাইফয়েড জ্বরের কারণ হতে পারে। তাই বাড়িতে রান্না করা টাটকা খাবার যেমন খাওয়া উচিত, ঠিক তেমনই খাবার সঠিক ভাবে গরম করে খাওয়া উচিত। অস্বাস্থ্যকর পদ্ধতিতে প্রস্তুত রাস্তার ধারে রাখা খোলা খাবার খাওয়া এড়িয়ে চলুন। বিশুদ্ধ জল সঙ্গে রাখুন, এরফলে জলজনিত সংক্রমণ প্রতিরোধ করতে পারবেন।

How to get rid of infectious diseases and digestive problems during the rainy season?
Dr. Sanjoy Mandal

বর্ষাকালে অন্যান্য সংক্রামক রোগগুলি হল– হেপাটাইটিস বা সংক্রামক জন্ডিস। এটি মূলত হেপাটাইটিস ‘এ’ এবং হেপাটাইটিস ‘ই’ ভাইরাসের ফলে হয়। আবার অস্বাস্থ্যকর ভাবে প্রস্তুত এবং সংরক্ষণ করা খাবার এবং জল এড়িয়ে চললে এটি প্রতিরোধ করা যেতে পারে। বেশিরভাগ হেপাটাইটিস সংক্রমণ হালকা এবং নিজে থেকেই সেরে যায় তবে কিছু অংশ অত্যন্ত মারাত্মক এবং লিভারের গুরুতর সমস্যা দেখা দিতে পারে, এমনকি জীবনহানিও ঘটতে পারে।  আবার এও গুরুত্বপূর্ণ যে, বার্গার, পিৎজা, পেস্ট্রি, কোল্ড ড্রিংকস, এনার্জি ড্রিংকস ইত্যাদির জাঙ্ক ফুড এড়িয়ে চললে পেটের অনেক সমস্যাকে দূরে রাখা যাবে। এর পরিবর্তে আপনার খাদ্য-তালিকায় তাজা ফল এবং শাকসবজির পাশাপাশি, প্রোটিন এবং কম পরিমাণে প্রক্রিয়াজাত কার্বোহাইড্রেট জাতীয় খাবার থাকা উচিত। সেইসঙ্গে, সর্বদা প্রিজারভেটিভ-যুক্ত খাবার এড়িয়ে চলুন। নিয়মিত ব্যায়াম করা আবশ্যক। সম্ভব হলে সকাল-বিকেল হাঁটুন এবং যোগ ব্যায়াম করুন।

শরীরে যেন জলের অভাব না ঘটে, তা নিশ্চিত করতে হবে। হার্বাল টি, মরশুমি বিভিন্ন ফলের রস দারুণ লাভদায়ক। সেইসঙ্গে, প্রতিদিন অন্তত ১০-১২ গ্লাস জল পান করুন।

বন্ধ্যাত্ব এবং পরবর্তী সমস্যা নির্ণয়ে জেনেটিক স্ক্রিনিং-এর গুরুত্ব

প্রচলিত মেডিক্যাল টেস্ট-এ যখন বন্ধ্যাত্বের কারণ এবং পরবর্তী পর্যায়ের সমস্যা সনাক্তকরণ সম্ভব হয় না, তখন জেনেটিক স্ক্রিনিং গুরুত্বপূর্ণ ডায়াগনোস্টিক স্পষ্টতা প্রদান করতে পারে। তাই, জেনেটিক স্ক্রিনিং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। বিশ্ব আইভিএফ দিবস উপলক্ষ্যে অম্বুজা নেওটিয়া হেলথকেয়ার ভেঞ্চার লিমিটেডের একটি ইউনিট, জিনোম – দ্য ফার্টিলিটি সেন্টার, ‘Decode Infertility With Genetics’ শীর্ষক এক আলোচনা সভার  আয়োজন করেছিল সম্প্রতি। সেই সম্মেলনে, অ্যাসিস্টেড রিপ্রোডাক্টিভ টেকনোলজি-র(এআরটি)ফলাফল উন্নত করার ক্ষেত্রে জেনেটিক স্ক্রিনিংয়ের গুরুত্ব কতটা, সেই বিষয়ে জানালেন দুই চিকিৎসক।

আইভিএফ সাফল্য বৃদ্ধি, উর্বরতা নির্ণয় এবং প্রমাণ-ভিত্তিক প্রজননে জেনেটিক্স-স্ক্রিনিং-এর গুরুত্ব অপরিসীম। আইভিএফ বিশেষজ্ঞ ডা. সুজয় দাশগুপ্ত এবং মেডিকেল জেনেটিসিস্ট  ডা. এমিলি বন্দ্যোপাধ্যায় বন্ধ্যাত্বের অন্তর্নিহিত কারণগুলির সনাক্তকরণ এবং উর্বরতা মূল্যায়নে জেনেটিক স্ক্রিনিং-এর গুরুত্বের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য দিলেন সম্প্রতি।

The importance of genetic screening in diagnosing infertility and subsequent problems
Dr. Sujoy Dasgupta and Dr. Emili Banerjee

ডা. সুজয় দাশগুপ্ত এই প্রসঙ্গে জানিয়েছেন, ‘যদিও আইভিএফ বন্ধ্যাত্ব দূরীকরণে বিপ্লব এনেছে, তবুও এটা স্বীকার করা গুরুত্বপূর্ণ যে, বারবার ইমপ্লান্টেশন ব্যর্থতা এবং বারবার গর্ভাবস্থার ক্ষতি প্রায়ই অন্তর্নিহিত জেনেটিক  কারণে হয়, যা স্ট্যান্ডার্ড ক্লিনিকাল মূল্যায়নের মাধ্যমে নির্ণয় করা যায় না। আইভিএফ একটি জটিল এবং বহুমুখী প্রক্রিয়া, যার জন্য ভ্রূণতত্ত্ববিদরা ভ্রূণের যত্ন সহকারে পরিচালনা এবং মূল্যায়ন নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করেন। Decode Infertility With Genetics-এর মাধ্যমে আমরা তুলে ধরেছি যে, কীভাবে উন্নত জেনেটিক স্ক্রিনিং কৌশলগুলি – যেমন প্রি-ইমপ্লান্টেশন জেনেটিক টেস্টিং (PGT), ক্যারিয়ার স্ক্রিনিং এবং প্রসবপূর্ব ডায়াগনস্টিকস – লুকানো ক্রোমোজোমাল অস্বাভাবিকতা এবং থ্যালাসেমিয়া এবং স্পাইনাল মাসকুলার অ্যাট্রোফির মতো জেনেটিক ব্যাধিসমূহ সনাক্তকরণ সম্ভব। তাই, জেনেটিক স্ক্রিনিং শুধু রোগ নির্ণয়ের নির্ভুলতাই বাড়ায় না, বরং চিকিৎসা পরিকল্পনাগুলিকেও সহজতর করে।’

জেনেটিক কাউন্সেলর ডা. এমিলি বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছেন, ‘একজন জেনেটিক কাউন্সেলর হিসেবে আমি প্রায়ই দেখেছি যে, স্বাভাবিক ক্লিনিকাল এবং ডায়াগনস্টিক রিপোর্ট থাকা সত্ত্বেও, বন্ধ্যাত্বের মূল কারণগুলি নির্ণয় করা যায় না। এই ব্যবধান পূরণে জেনেটিক স্ক্রিনিং একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে—বিশেষকরে বন্ধ্যাত্ব, বারবার গর্ভাবস্থার ক্ষতি কিংবা বারবার আইভিএফ  ব্যর্থতার ক্ষেত্রে। এটি জেনেটিক ব্যাধি সনাক্ত করতে সাহায্য করে এবং ক্রোমোজোমাল কিংবা একক-জিন অস্বাভাবিকতাগুলি আবিষ্কার করে, যা প্রচলিত পরীক্ষায় সনাক্ত না-ও হতে পারে।’

বেস্ট টেস্ট Egg Recipes

এগ অ্যান্ড ভেজিটেবল প্যানকেক

উপকরণ : ১টা ডিম, ১/২ ছোটো চামচ ‘সুমন’ ব্র্যান্ড-এর ধনেগুঁড়ো, ১/২ ছোটো চামচ জিরেগুঁড়ো, ১/২ ছোটো চামচ গরমশলাগুঁড়ো, ১ কাপ আটা বা ময়দা, প্রয়োজনমতো জল, অল্প পেঁয়াজকুচি, ২টো কাঁচালংকাকুচি, ১ বড়ো চামচ কর্ন, অল্প লাল ক্যাপসিকাম কুচানো, অল্প সবুজ ক্যাপসিকাম কুচানো, অল্প ধনেপাতাকুচি, ২ বড়ো চামচ ঘি বা সাদা তেল, নুন স্বাদমতো।

প্রণালী : একটা বোল-এ ডিম, ধনেগুঁড়ো, জিরেগুঁড়ো, আর নুন দিয়ে গুলে নিন। এবার এতে ময়দা মেশাতে থাকুন। আর প্রয়োজনমতো জল। একটু পাতলা ব্যাটার তৈরি হলে এতে বাকি সবজিকুচি দিয়ে ভালো ভাবে মেশান। এবার মিডিয়াম আঁচে ফ্ল্যাট ফ্রাইং প্যান বসিয়ে তেল বা ঘি দিন। একটা হাতায় করে অল্প করে ব্যাটার নিয়ে প্যানের উপর চারিয়ে দিন। সময় নিয়ে এপিঠ-ওপিঠ করে প্যানকেক ভেজে নিন। আচার বা সসের সঙ্গে গরম গরম পরিবেশন করুন।

অ্যাভোকাডো ডেজ অ্যান্ড এগ স্যান্ডউইচ

উপকরণ : ২ টো অ্যাভোকাডো, ১টা আইসবার্গ লেটুসপাতা, ১ বড়ো চামচ ‘সুমন’ ব্র্যান্ড-এর সরষের তেল, ৪-টে সেদ্ধ ডিম, ১টা রোস্টেড লাল ক্যাপসিকাম, ১টা পেঁয়াজ কুচি করা, ২ টো টম্যাটো কাটা, ১টা লেবু, অল্প সবুজ পেঁয়াজকুচি, স্বাদমতো নুন ও মরিচগুঁড়ো, ১ বড়ো চামচ মাস্টার্ড সস, ৪টে পাউরুটির পিস, অল্প গ্রেট করা রসুন, অল্প শসার টুকরো, অল্প ধনেপাতাকুচি।

প্রণালী : অ্যাভোকাডো কেটে একটা পাত্রে বীজ বের করে রাখুন। এবার এতে নুন ছড়িয়ে, কাঁটাচামচের সাহায্যে ভালো করে চটকে নিন। এই পেস্টের সঙ্গে ধনেপাতা, টম্যাটো, পেঁয়াজ আর রসুন দিয়ে ভালো ভাবে মেখে নিন। এতে প্রয়োজনমতো লেবুর রস দিন ও স্বাদ অনুযায়ী মাস্টার্ড সস।

এবার তাওয়ায় অল্প অলিভ অয়েল দিয়ে, পাউরুটিগুলো এপিঠ ওপিঠ সেঁকে নিন। স্লাইস ব্রেড-এর উপর লেটুসপাতার লেয়ার তৈরি করুন। এর উপর অ্যাভোকাডোর মিক্সচার ভালো ভাবে চারিয়ে দিন। উপরে শসা ও অল্প পেঁয়াজকুচি ছড়িয়ে দিন। এই স্যান্ডউইচের উপর অন্য ব্রেড পিস দিয়ে চাপা দেওয়া হয় না।

আইন কিংবা শাস্তির তোয়াক্কা করেন না অনেকে

“প্রোটেকশন অফ চিলড্রেন ফ্রম সেক্সুয়াল অফেন্সেস অ্যাক্ট ২০১২’’ (পকসো অ্যাক্ট) আইন সম্পর্কে সুপ্রিম কোর্ট ব্যাখ্যা দিয়েছে যে, আইন অনুসারে শুধুমাত্র চাইল্ড পর্নোগ্রাফি তৈরি করা-ই অপরাধ নয়, মোবাইল ফোন বা কম্পিউটারে রাখা কিংবা দেখাও অপরাধ। পকসো আইনের ধারাগুলিকে খুব লঘু ভাবে বিবেচনা না করে, চাইল্ড পর্নোগ্রাফি সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করার প্রয়াসে সুপ্রিম কোর্টের পকসো আইনের ২০০ পৃষ্ঠার ব্যাখ্যাটি কঠোর ভাবে আইন প্রয়োগ করার একটি মহৎ প্রচেষ্টা বলা যায়। চাইল্ড পর্নোগ্রাফি- র বিরুদ্ধে কাজ করার বিষয়টি সমাজ, সরকার এবং বিশ্বজুড়ে শিশু সুরক্ষা নিয়ে কাজ করা সংস্থাগুলির কাছে অবশ্যই এক বিশাল চ্যালেঞ্জ। লক্ষ লক্ষ মানুষ শিশুদের সঙ্গে যৌন মিলন করে বা তাদের সঙ্গে হওয়া যৌন মিলনের যে ভিডিয়ো দেখে মজা পায়, তা অত্যন্ত বিকৃত মানসিকতার হলেও, এটাই চরম বাস্তব। লক্ষ লক্ষ শিশু পর্নোগ্রাফির সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে এবং তাদের দিয়ে ব্যাবসা করে মোটা টাকা উপার্জন করে শয়তানরা।

শিশু পাচারের একটা বড়ো বাজার রয়েছে, যেখানে সারা বিশ্ব থেকে নিষ্পাপ শিশুদের নিয়ে যাওয়া হয় এবং তাদের মারধর এবং যৌন নির্যাতনের পর এই ব্যাবসায় নামতে বাধ্য করা হয়। এসব শিশুদের কোথা থেকে তুলে আনা হয়েছে কিংবা কোথায় রাখা হচ্ছে, তা জানতেও দেওয়া হয় না। আসলে এর চাহিদা এত বেশি যে, এই ব্যাবসায় ঝুঁকি থাকলেও প্রচুর মুনাফার জন্য কাজ করে শয়তানরা।

মাদ্রাজ হাইকোর্ট কিছুদিন আগে জানিয়েছিল যে, শিশুদের নিয়ে ব্লু ফিল্ম তৈরি করা বা বিক্রি করা অপরাধ। তবে এটি দেখার জন্য আপনার মোবাইলে রাখা কোনও অপরাধ নয়। নতুন সিদ্ধান্তে, চাইল্ড পর্নোগ্রাফি ডাউনলোড করে নিজের মোবাইলে রাখাকেও অপরাধ বলে বিবেচনা করেছে সুপ্রিম কোর্ট। তাই, এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত বলা যায়।

কিছু শয়তানের যৌনক্ষুধা এতটাই যে, তারা আইন কিংবা শাস্তির তোয়াক্কা না করেই নিরপরাধ শিশুদের অত্যাচার করে। আসলে নির্যাতিতারা এই শয়তানদের সামনে অসহায় এবং তারা জানে না যে, তাদের সঙ্গে কি ঘটছে! কখনও কখনও শয়তানরা বাচ্চাদের এই বলে চুপ করিয়ে দেয় যে, তারা কোনও শব্দ করলে তাদের বাবা-মা কিংবা ভাইবোনদের হত্যা করবে। প্রায়শই, মায়েরা যখন তাদের সন্তানদের নির্যাতনের কথা জানতে পারে, তখন তারা তাদের মুখ বন্ধ রাখে, কারণ সমাজ মা এবং শিশু উভয়কেই দোষারোপ করতে শুরু করে এবং নির্যাতিতা শিশুটি সবার রসিকতার লক্ষ্যে পরিণত হয়। আমাদের সমাজ এ ধরনের বিষয়ে খুবই নিষ্ঠুর এবং শিশুকে উত্যক্ত করে আনন্দ পায়।

কখনও কখনও শিশুটিকে দোষী হিসাবে বিবেচনা করা হয়। বলা হয়— ‘সে হয়তো কিছু লোভের বশবর্তী হয়ে এমন কাজে রাজি হয়েছে। এর ফলে, অভিভাবকরা বিব্রত, ভাই-বোনেরাও নিজের বাড়িতে ভিকটিমদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করে অনেক সময়। তবে সুপ্রিম কোর্ট যেভাবেই আইনের ব্যাখ্যা করুক না কেন, এই ধরনের মামলাগুলি শুধুমাত্র সেই পুলিশ সদস্যরাই আদালতে নিয়ে যাবে, যারা থানায় অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে এবং অপরাধী এবং অভিযোগকারীর সঙ্গে সমান আচরণ করে, সে প্রাপ্তবয়স্ক-ই হোক কিংবা শিশু।

আদালতের কাছে সাক্ষীদের বক্তব্য শোনা ছাড়া আর কোনও উপায় থাকে না। আর নির্যাতনের শিকার হওয়া মেয়েটিকে কয়েক ডজন লোককে জানাতে হবে— তার সঙ্গে কী, কখন এবং কীভাবে ঘটেছে। ভিকটিম সেই সমস্ত মুহূর্তগুলিকে পুনরুজ্জীবিত করতে বাধ্য হবে, যা সে ভুলে যেতে চায়।

কোজাগরি (শেষ পর্ব)

শঙ্খশুভ্র কাল প্রাইভেট টিউশনের পাঁচ হাজার টাকা পেয়েছে। পকেটে এখনও দু হাজার টাকা আছে। হিসেবের কড়ি থেকে সে পাঁচটা একশো টাকার নোট কোজাগরির হাতে তুলে দিল। যদিও টাকাটা দেওয়ার পর মনে একটা খটকা লাগল। মেয়েটা তাকে ব্ল্যাকমেল করছে না তো? তা ছাড়া সে কি ওর কেনা গোলাম যে, টাকা চাইলেই দিতে হবে। হঠাৎ পট পরিবর্তন। কোজাগরি টাকাটা নিয়ে সিগারেটের দোকানের লুঙ্গি আর শার্ট পরা হিন্দুস্তানি লোকটাকে দিয়ে বলল, ‘তোর মালিককে বলিস আর যেন আমার পিছনে না লাগে।’

সে কথা শুনে লোকটা মুখিয়ে উঠল, ‘যা যা রেন্ডী কাঁহিকা।’

কোজাগরি হঠাৎ ত্রিনয়নী দুর্গা হয়ে রাগে জ্বলে উঠে হিন্দুস্তানি লোকটাকে একটা চড় মেরে বসল।

—এই রেন্ডী মাগির পা চাটতে আসিস কেন? লজ্জা করে না?

—ঠিক হ্যায়, দেখ লেগা। লোকটা চড়টা হজম করে বলল।

কোজাগরি রেগে গেলে যে সাংঘাতিক ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারে শঙ্খশুভ্রর জানা ছিল না। কোজাগরি তার মুখে থুতু ছুঁড়ে দিয়ে বলল, “যা যা, ঘাস ছিঁড়বি’।

এই মুহূর্তে ওকে দেখে শঙ্খশুভ্রর দশভুজা দেবী দুর্গার কথা মনে এল। একটু পর কুলিয়া ট্যাংরা বস্তির সরু গলির মধ্যে এসে কোজাগরি থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। শঙ্খশুভ্র অনেকটা পিছিয়ে পড়েছে। এখানে এলে কে বলবে কলকাতা ভারতবর্ষের একটা বড়ো শহর। উন্নয়নের ছিটেফোঁটা যে নেই তা এবড়ো খেবড়ো রাস্তায় চলতে গিয়ে মনে হল। আবছা আলো আর পচাখালের দুর্গন্ধে ভরা রাস্তায় চলতে গিয়ে শঙ্খশুভ্রর মনে হল যেন সে প্রাগৈতিহাসিক যুগে ফিরে এসেছে। চারিদিকের নোংরা পরিবেশ দেখে মনে হয়। এখানে মনুষ্যত্বকে কেউ কবর দিয়েছে।

একটা বাচ্চা ছেলে ঝুপড়ির কাছে বসে তারস্বরে চিৎকার করছে। বোধহয় ওর খিদে পেয়েছে। ওকে খেতে দেবে তেমন কেউ ধারে কাছে নেই। কে যে ওর মা আর কে যে ওর বাবা বোঝা মুশকিল। অথচ ছিটেবেড়ার ঝুপড়ির ভিতর কারা যেন হুল্লোড় করছে। চোলাই মদের গন্ধে বাতাস ভারী হয়ে আছে। উকি দিতেই বোঝা গেল ঘরের মানুষগুলো এখন নেশায় মত্ত। মেয়েমানুষের উচ্চস্বরে হাসির শব্দও ভেসে এল কানে। বাচ্চাটির দিকে ফিরে তাকাবার ফুরসত কারওর নেই।

শঙ্খশুভ্রর বুক ফুঁড়ে একটা করুণ দীর্ঘশ্বাস ঝরে পড়তেই, কোজাগরি তার হাত ধরে একটা দরমার বেড়া দেওয়া রে নিয়ে এল। ছিটে বেড়ার ঘর, মাথার উপর টালি। একটা ঘরকেই পার্টিশন করে দু-ভাগ করা হয়েছে। পাশের ঘরের মেঝেতে কে যেন শুয়ে আছে। জিরো পাওয়ারের আলোয় স্পষ্ট দেখা যায় তার কঙ্কালসার চেহারাটা যেন ঠিক ঘাটের মড়ার মতো। কোজাগরির সাড়া পেয়ে সেই মৃতদেহে প্রাণের সঞ্চার হল। মানুষটা একটু নড়েচড়ে উঠল।

কোজাগরি আলোটা জ্বালিয়ে বলল, ‘তুমি আমাকে আজ বাঁচালে।ঘর ভাড়ার টাকাটা দিতে না পারলে কালই এ ঘর ছেড়ে রাস্তায় চলে যেতে হতো। আচ্ছা বলতে পারো অসুস্থ স্বামীকে নিয়ে আমি কোথায় যাই।’

—তোমার স্বামীর কী হয়েছে?

—চামড়ার কারখানায় কাজ করে টিবি রোগ বাঁধিয়েছে।

—হাসপাতালে দাওনি কেন?

—যেতে চায় না। ও আমার কাছে থেকেই মরতে চায়। তুমি তক্তপোশে উঠে বোসো। আমি সন্ধেটা দিয়ে নিই।

টেবিলে লক্ষ্মী-নারায়ণের বাঁধানো ফটো। কোজাগরি শাঁখ বাজিয়ে গলায় আঁচল দিয়ে গড় করে প্রণাম করল। একটা ধূপ জ্বালিয়ে ফটোর কাছে রেখে দিল। আশ্চর্য এখন ওকে দেখে কে বলবে সেই হিন্দুস্তানি লোকটার অশ্লীল কথা শুনে সে জ্বলে উঠেছিল। সন্ধ্যারতি সেরে কোজাগরি হাতের ইশারায় শঙ্খশুভ্রকে অপেক্ষা করতে বলে পাশের ঘরে চলে গেল।

কান পাততেই কোজাগরির গলা শোনা গেল— দুধ পাউরুটি খেয়েছিলে?

কঙ্কালসার মানুষটা ক্ষোভে ফেটে পড়ল, ‘খেয়ে আর কী হবে। আমি মরলে তো তোমার হাড়মাস জুড়োবে। চুটিয়ে ব্যাবসা করতে পারবে।’

—চুপ করো। পাশের ঘরে লোক আছে।

—ও আজকাল ঘরেও লোক আনা শুরু করেছ।

—হ্যাঁ এনেছি। তা নইলে তো কাল আমাদের রাস্তায় দাঁড়াতে হতো। ওই লোকটাই ভাড়ার টাকা দিয়ে আমার ইজ্জত বাঁচিয়েছে। লোকটা চুপ করতেই মনে হল যেন জোঁকের মুখে নুন পড়ল।

একটু পরে আবার কোজাগরির কথা শোনা গেল, ‘ওষুধটা খেয়ে নাও।”

কিছুক্ষণ চুপচাপ। পচাখালের ঝোপঝাড় থেকে ঝিঁঝি পোকার একটানা ডাক ভেসে আসছে। বস্তির মানুষগুলোর হুল্লোড়ও গেছে কমে। জানলা দিয়ে জোনাকি পোকা ঢুকে উড়তে শুরু করে দিল মনের আনন্দে। শঙ্খশুভ্রর হাতের ঘড়িতে এখন সাড়ে আটটা বাজে। বেশি রাত করে বাড়ি ফেরা তার স্বভাব নয়। তার কারণ সে বাড়ি না ফেরা পর্যন্ত তার পথ চেয়ে বসে থাকে মা। কোজাগরির তো দরকার মিটে গেছে। তাহলে তাকে বসিয়ে রাখার কারণটা কী। ওর কি অন্য কোনও মতলব আছে। নারী চরিত্র বোঝা বড়ো মুশকিল। শঙ্খশুভ্র বাড়ি ফেরার জন্য উসখুস করতেই কোজাগরি ঘরে ঢুকে দরজাটা বন্ধ করেই বলে উঠল, ‘মানুষটাকে আজ রাতের মতো ঘুমের ওষুধ খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছি। কাল সকালের আগে ওর ঘুম ভাঙবে না।”

—আমি তা হলে যাই। বলে শঙ্খশুভ্র ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে উঠে পড়তেই কোজাগরি বলল, “তা কি হয়। কিছু নিলে কিছু দিতে হয়। তোমাকে তো আমার কিছু দেওয়া হয়নি।”

এরপর কোজাগরি যা করল তার জন্য শঙ্খশুভ্র একেবারেই প্রস্তুত ছিল না। তাকে অবাক করে দিয়ে কোজাগরি নিজেকে সম্পূর্ণ বিবস্ত্র করে কাছে এসে বলল, ‘তুমি আজ আমার জন্য যা করেছ, জীবনে কোনওদিন ভুলব না। আমার এই দেহটা ছাড়া তোমাকে দেওয়ার আর কিছু নেই।’

নারী যখন শাড়ি পরে থাকে তার আসল রূপ ধরা পড়ে না। নগ্ন হলেই তার রূপ যৌবন প্রস্ফুটিত হয় পদ্মের পাপড়ির মতো। কোজাগরিকে দেখতে খুবই সুন্দর, তার উপর সম্পূর্ণ উলঙ্গ হয়ে সামনে দাঁড়ানোয় যৌবনের দ্যুতিতে তাকে স্বর্গের অপ্সরা বলে মনে হল। আর্ট কলেজের ক্লাসে বসে দূর থেকে নগ্ন নারীর মডেলকে দেখে শঙ্খশুভ্রকে একবার ছবি আঁকতে হয়েছিল। তাও মাত্র আধ ঘণ্টা সময় বেঁধে দেওয়া ছিল। এত অল্প সময়ের ব্যবধানে কি তুলির আঁচড়ে ক্যানভাসে মনের মতো জীবন্ত ছবি আঁকা যায়। আজ এই মুহূর্তে কোনারকের খোদাই করা নগ্ন নারীর মূর্তির মতো কোজাগরিকে দেখে শঙ্খশুভ্রর শিল্পীমন সৃষ্টির নেশায় মেতে উঠল। সে মোহগ্রস্তের মতো কাঁধ থেকে ব্যাগটা নামিয়ে রেখে কোজাগরির চিবুকটা তুলে ধরে বলল, ‘আমাকে একটু সময় দেবে? তোমার একটা ছবি আঁকব।’

—তুমি আর্টিস্ট? বেশ তো বলো আমি কেমন পোজ নিয়ে দাঁড়াব? আজ তো সারারাত আমি শুধু তোমার। কোজাগরি শঙ্খশুভ্রর গলা জড়িয়ে ধরে বলল।

শঙ্খশুভ্র তাকে টুলে বসার অনুরোধ করে মেঝেতে বসে পড়ল। ব্যাগ থেকে আর্ট পেপার বার করে পেন্সিল দিয়ে সামনে বসা নগ্ন কোজাগরির স্কেচ আঁকতে শুরু করল। অনেক রাত হয়ে গেছে তার খেয়াল নেই। সে তখন কোজাগরির হরিণের মতো চোখ, গ্রীবা, বটফলের মতো স্তনবৃত্ত আর পদ্মফুলের মতো যোনিদ্বার আঁকতে ধ্যানমগ্ন।

ছবিটা আঁকা শেষ হলে শঙ্খশুভ্র কোজাগরিকে দেখিয়ে বলল, “দ্যাখো তো তোমার ছবি ঠিক আঁকতে পেরেছি কি না।”

কোজগরি ছবিটা হাতে নিয়ে বলল, “ওমা তুমি আমার কী সুন্দর ছবি এঁকেছ গো। তুমি সত্যি খুব বড়ো আর্টিস্ট।আচ্ছা ছবি এঁকে তোমার যখন নাম ডাক হবে তখন তোমার আমার কথা মনে থাকবে তো?”

শঙ্খশুভ্র কোজাগরির হাত থেকে ছবিটা নিয়ে ফোল্ড করে ব্যাগে ঢুকিয়ে বলল, ‘সত্যি যদি আমার তেমন কিছু হয় আমি আবার তোমার কাছে ফিরে আসব। প্রমিস।’

—একটু দাঁড়াও, বলে কোজাগরি শাড়িটা পরে টিনের ট্রাংক থেকে একটা ভেলভেটের ব্যাগ বার করল। তারপর ব্যাগের চেনটা খুলে একটা বাদামি রঙের মৃগনাভি বার করে শঙ্খশুভ্রর হাতে তুলে দিয়ে বলল, আমাকে ভুলে গেলেও এই সামান্য উপহারটা তোমাকে আমার কথা মনে করিয়ে দেবে। ভয় নেই এটা কোনও চুরি করা জিনিস নয়। একজন আমেরিকান সাহেব আমার ঘরে এসেছিল। সে আমাকে দিয়েছে।

শঙ্খশুভ্র বাইরে বেরিয়ে দেখল আকাশে আজ পূর্ণিমার চাঁদ উঠেছে। মৃগনাভির গন্ধে ম ম করছে সমস্ত পৃথিবীটা।

(সমাপ্ত)

 

‘গান-জীবনের ৩০’-এ রূপংকর

অনেক চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে নিজেকে সংগীত জগতে প্রতিষ্ঠিত করেছেন রূপংকর বাগচি। ‘জাতিস্মর’ ছবিতে ‘এ তুমি কেমন তুমি’ গেয়ে জিতে নিয়েছেন জাতীয় পুরস্কার। কিন্তু সংগীত-জীবনের সূচনালগ্নে যে-সব প্রতিকূলতা কাটিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে নিজের পায়ের নীচের মাটি শক্ত করেছেন রূপংকর, সেই কাহিনিও উল্লেখযোগ্য। বুকের গভীরে জমে থাকা অনেক মান-অভিমান, আক্ষেপ তিনি আবেগবসত উগরেও দিয়েছেন অনেক সাক্ষাৎকারে। আবার সাফল্যের জোয়ারে অনেক সময় সবকিছু ভুলে গিয়ে শুধু মেতে থাকতে দেখা গেছে গান নিয়ে। কখনও শ্রোতাদের ভালোবাসার জোয়ারে ভেসে গিয়ে উপহার দিয়েছেন অসাধারণ সব গান, আবার কখনও বিতর্কেও জটিয়েছেন আচমকা। তবে সব প্রতিকূলতা  কাটিয়ে, বিতর্কের অবসানও ঘটাতে পেরেছেন কণ্ঠ উজাড় করা গান উপহার দিয়ে। অর্থাৎ, গান-ই তাঁর সাফল্য এবং ছন্দে ফেরার মাধ্যম।

নব্বইয়ের দশকে গানের জগতে রূপংকরের আত্মপ্রকাশ। রূপংকরের প্রাথমিক শিক্ষগুরু ছিলেন তাঁর মা এবং বাবা দুজনেই। তাঁর আধুনিক থেকে বাংলা ছবির গানের জার্নি নজর কাড়ার মতো। আর বাংলার এই সংগীতশিল্পী রূপংকর বাগচি সম্প্রতি সম্পূর্ণ করেছেন তাঁর গান-জীবনের ৩০বছর। এই উপলক্ষ্যে, এক অভিনব সংগীত-সন্ধ্যা উপহার দিতে চলেছে ‘দ্য ড্রিমার্স’। আগামী ১৮ জুলাই, সন্ধ্যা ৬টা ৩০ মিনিটে জিডি বিড়লা সভাঘরে, ‘সংস্কৃতি সাগর’-এর সহযোগিতায় অনুষ্ঠিত হবে রূপংকরের গান জীবনের ৩০ বছর। আর এই অনুষ্ঠানটির নিবেদক—‘শ্যাম সুন্দর কোং জুয়েলার্স’।

অনেকেই জানেন যে, রবীন্দ্রসংগীত, লোকসংগীত, পাশ্চাত্যসংগীত এবং ভারতীয় রাগসংগেতের অনুরাগী রূপংকর। রবীন্দ্রসংগীতে কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের গান যেমন তাঁর প্রিয়, অন্যদিকে রাহুল দেব বর্মন-এর অনুরাগীও তিনি। ফ্র্যাঙ্ক সিনাট্রা, হ্যারি বেলা ফন্টে, ন্যাট কিং কোল, বিটলস এবং মাইকেল জ্যাকসনেরও ভক্ত তিনি। বিশ্বের বিশিষ্ট সংগীতশিল্পীদের থেকেও তিনি পেয়েছেন অনুপ্রেরণা।

গান গাওয়া থেকে সুর করা, লেখা, গানকে সাজিয়ে তোলার ভূমিকাতেও রূপংকর বাগচি সাবলীল। কৃষ্টি পটুয়া-র নাটকের দলে তিনি প্রাণ পুরুষ। নাটকে অভিনয়ের পাশাপাশি করেছেন আবহ নির্মাণ এবং গেয়েছেন গান। ওটিটিতে অভিনয় থেকে বিজ্ঞাপনের গান, এই তিরিশ বছরের সফরে এসেছে জাতীয় পুরস্কার, এসেছে অজস্র মনে রাখার মতো গান আর এসেছে সংগীত-মুখর ‘তিরিশটা বৃষ্টি’।  ফেলে আসা জীবনের কথায় এবং গানে সমৃদ্ধ হয়ে তাই ১৮ জুলাই জিডি বিড়লা সভাঘরে রূপংকর মুখোমুখি হবেন শ্রোতাদের। আর ওই দিনের অনুষ্ঠানে আলাপচারিতায় থাকবেন বাচিকশিল্পী সুজয় প্রসাদ চট্টোপাধ্যায়।

রূপংকর বাগচি জানিয়েছেন, ‘এই অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা, পরিবেশনা হবে একদমই অন্যরকম। সচরাচর যে গান গাওয়া হয়ে ওঠেনা, এই অনুষ্ঠানের উপস্থাপনা ভিন্ন ভাবে ধরা দেবে শ্রোতাদের কাছে।’ সুজয় প্রসাদ-এর ফেসবুক পেজ-এ ইতিমধ্যেই এই অনুষ্ঠানের প্রচার শুরু হয়ে গেছে।

পড়ার জন্য সীমাহীন গল্প-নিবন্ধসাবস্ক্রাইব