উষ্ণতা উপভোগ করুন (পর্ব-০১)

চলছে ভ্যাপসা গরমের আবহ। আসলে, আবহাওয়ায় এক অদ্ভুত রকমের পরিবর্তন এসেছে, বলছেন আবহবিদরা। এই অদ্ভুত তাপমাত্রার হেরফেরের সঙ্গে শরীরকে অভ্যস্ত করাটা বেশ বড়োসড়ো একটা চ্যালেঞ্জ। এই সময় শরীরের সঠিক যত্ন নিলে, রোগভোগের থেকেও রেহাই পেতে পারেন। আবার ডিহাইড্রেশন, অ্যালার্জি, ব্রণ, ঘাম কিংবা ময়লা জমে ফাংগাল ইনফেকশন, চুলকানি, ঘামাচি, র‍্যাশ প্রভৃতি সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়ার উপায় জানা থাকলে, উষ্ণতাও হয়ে উঠতে পারে উপভোগ্য।

গরমের কুপ্রভাব পড়তে দেবেন না

রোদে বেরোলে ঘাম হয়, ত্বক জ্বালা করে। অনেকের ত্বকেই লাল চাকা চাকা র‍্যাশ বেরিয়ে ত্বক ফুলে ওঠে এবং দাগ হয়ে যায়। সংবেদনশীল ত্বকেই এই সমস্যা বেশি হয়ে থাকে। এই পরিস্থিতি এড়াতে হলে ত্বককে সরাসরি সূর্যের তাপ থেকে বাঁচানো দরকার। এছাড়া শরীরের যে-অংশ পোশাকে ঢাকা থাকে না, সেই খোলা ত্বকে নিয়মিত সানস্ক্রিন ক্রিম অথবা লোশন লাগান রোদে বেরোবার আগে। সাধারণত মুখ, ঘাড়, গলা এবং হাতে সানব্লক লোশন লাগাবার দরকার পড়ে। সুতির পোশাক গরমের দিনে আদর্শ। গরমে ত্বককে শীতল করতে সন্ধের সময় অ্যালোভেরা জেলের ফেসপ্যাক ব্যবহার করুন।

ডি-হাইড্রেশন-এর সমস্যা থেকে বাঁচুন

গরমে ঘাম হয়ে শরীর যেমন ডি-হাইড্রেটেড হয়ে পড়ে, তেমনই ত্বকের ডি-হাইড্রেশনের সমস্যাও হয়ে থাকে। ক্রমাগত ঘাম হতে থাকার কারণে শরীরে জল কমে যায়। জলের অভাব পূরণ করার জন্যে পর্যাপ্ত পানীয় নেওয়া আবশ্যক, নয়তো ত্বক রুক্ষ, শুষ্ক এবং নিষ্প্রাণ ও অনুজ্জ্বল হয়ে পড়ে। ঠোঁট ফেটে যায়। এই সমস্যা রোধ করার জন্য প্রতি আধ ঘণ্টা অন্তর জল খাওয়া উচিত। রসালো ফল, যেমন তরমুজ, ফুটির মতো ফল শরীর এবং ত্বকের জন্য গরমে খুব উপকারী। ত্বককে হাইড্রেট করার জন্য কিছু ডিপ হাইড্রেটিং ট্রিটমেন্ট রয়েছে, যেমন হাইড্রেটিং ইলেক্ট্রোপোরেশন থেরাপি, অক্সিজেন থেরাপি, জুভেডার্ম রিফাইন ইত্যাদি।

ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণ এড়িয়ে চলুন

গ্রীষ্মের আবহাওয়া, ব্যাকটেরিয়া এবং ভাইরাস গ্রোথের জন্য অনুকূল। সর্বত্র ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি থাকলেও খালি চোখে তাদের দেখা যায় না। যারা পাবলিক ট্রান্সপোর্ট ব্যবহার করেন, ভিড়, কনজেসর্টেড জায়গায় যাতায়াত করেন, তাদের ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণ হওয়ার ভয় বেশি থাকে। বাসে, ট্রামে ওঠার সময় হ্যান্ডেল ধরতে হয়, সিট কিংবা জানলায় হাতের স্পর্শ এড়িয়ে চলা মুশকিল হয়। আর এইসব জায়গায় ব্যাকটেরিয়া জমা হয়ে থাকে। পরে ওই হাত অসাবধানতাবশত নিজেদের মুখে দিয়ে ফেলি। এইভাবে সংক্রমণ ছড়াতে থাকে। সুতরাং হাত পরিষ্কার রাখার জন্য সঙ্গে হ্যান্ডওয়াশ রাখলে ভালো। কয়েক ঘণ্টা পরপর হ্যান্ডওয়াশ দিয়ে হাত ধুয়ে ফেললে সংক্রমণের ভয় থাকবে না। হাত ধুতে যদি অসুবিধা থাকে, তাহলে হ্যান্ড স্যানিটাইজারও ব্যবহার করা যেতে পারে এবং বারবার মুখে হাত দেওয়ার বদভ্যাস ছাড়তে হবে।

গরমে ব্রণ, ফুসকুড়ি হতে দেবেন না

গরমকালে ঘাম হলে ধুলো ময়লা এবং দূষণের কারণে ত্বক সবথেকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ঘর্মাক্ত কলেবরে ধুলো ময়লা সহজে আটকে ধরে এবং ত্বকের কোশ বন্ধ হয়ে যায়। ত্বকের এই অবস্থা, ব্রণ, ফুসকুড়ির মতো সমস্যা তৈরি করে। ত্বকের কোশ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ভিতরে ব্যাকটেরিয়াগুলি আরও সক্রিয় হয়ে ওঠে। ব্রণর সমস্যা হ্রাস করার জন্য ত্বক পরিষ্কার রাখা অত্যন্ত জরুরি। সঙ্গে সবসময় ফেসওয়াশ রাখা খুব দরকার। ত্বক পরিষ্কার রাখার জন্যে সারাদিনে কম করে চারবার মুখ ধোওয়া উচিত। ত্বকের রোমছিদ্র যাতে বন্ধ না হয়, সেজন্য রোজ সন্ধেবেলা ভালো কোয়ালিটির স্কিন ক্লিনজার অথবা ফেসওয়াশ দিয়ে মুখ পরিষ্কার করুন। রাত্রে মুলতানি মাটি অথবা চন্দন পাউডারের প্যাক লাগান, এতে ত্বক ঠান্ডা থাকবে। ত্বকে ব্রণর সমস্যা যদি ঘরোয়া উপায়ে ঠিক না হয়, তাহলে স্কিন স্পেশালিস্টের সঙ্গে পরামর্শ করুন, কারণ হরমোনাল ইমব্যালেন্স-এর জন্যও ব্রণর সমস্যা হতে পারে।

ঘামাচি রোধ করুন

গরমে ত্বক বেশিমাত্রায় সংবেদনশীল হয়ে পড়ে এবং ছোটো ছোটো কারণেই ত্বকে ইরিটেশন হতে থাকে। ঘামের সমস্যা শুরু হয়। রাস্তার ধুলোমাটি ঘামে আটকে রোমকূপের ছিদ্র বন্ধ করে দেয়, ফলে ত্বক শ্বাস নিতে পারে না। ত্বক লাল লাল র‍্যাশে ভরে যায় এবং চুলকোতে থাকে। এর থেকে বাঁচতে ত্বক পরিষ্কার রাখা বাঞ্ছনীয়। দিনে অন্তত তিনবার স্নান করুন। সারাদিনের ঘোরাঘুরির পর রাত্তিরে স্নান করা একান্ত জরুরি। স্নানের সময় অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল সোপ অথবা বাথ জেল ব্যবহার করুন। ত্বক সবসময় শুকনো রাখার চেষ্টা করুন। ত্বকে যেখানে ঘামাচি হয়েছে, সেই জায়গায় বরফ ঘষুন, এতে জ্বালা ভাব কিছুটা কমবে। পরিস্থিতি না বদলালে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

ট্যানিং-এর সমস্যা হতে দেবেন না

ত্বক সূর্যের আল্ট্রাভায়োলেট রশ্মির সংস্পর্শে এলে, ত্বকে উপস্থিত মেলানিন, ত্বককে বাঁচাতে একটা সুরক্ষাকবচ তৈরি করে। মেলানিনের কারণেই ত্বকে ডার্ক স্পটের সমস্যা হয়। কখনও কিছু কিছু জায়গায় আবার কখনও পুরো ত্বক জুড়ে এই সমস্যা হয়ে থাকে, যাকে স্কিন ট্যানিং বলা হয়। এই ধরনের সমস্যায় ৩০ এসপিএফ যুক্ত সানস্ক্রিন অল্প সময়ের ব্যবধানে ত্বকে লাগানো উচিত। ট্যানিং-এর প্রভাব দূর করার জন্য লেজার স্কিন রিজুভিনেশন, কেমিক্যাল পিলস অথবা মাইক্রোডার্মাব্রেজন-এর মতো চিকিৎসা পদ্ধতির সাহায্য নিন। এই ছোটো ছোটো অথচ গুরুত্বপূর্ণ টিপসগুলি মেনে চললে গরমে মন খুলে বেড়ানোর মজা যেমন উপভোগ করতে পারবেন, তেমনই স্বাস্থ্যোজ্জ্বল, সুন্দর ত্বকও বজায় রাখতে পারবেন।

(ক্রমশ…)

দুর্ঘটনা (পর্ব-০১)

ঘ্যাঁচ করে ব্রেক কষল সমর। মেয়েটা একেবারে সামনে। অনেক দূর থেকে লাউডস্পিকারে গানের কয়েকটা লাইন ভেসে আসছে ‘যদি তারে নাই চিনি গো…’। মনে হচ্ছে দূরে কোথাও বিয়ে বাড়ি থেকে আওয়াজটা আসছে। এই শীতের রাতে ঘন কুয়াশায় কাউকেই দেখা যাচ্ছে না। দেখে মনে হবে পুরো কলকাতা শহরটা ঘুমিয়ে পড়েছে। কেউ কোথাও নেই। রাস্তা একেবারে ফাঁকা।

সমর তাড়াতাড়ি গাড়ি থেকে নেমে এগিয়ে গেল গাড়ির সামনে। লাইট পোস্টের আলোয় দেখল মেয়েটা গাড়ির চাকার নীচে এসেও অল্পের জন্য বেঁচে গেছে, তবে ধাক্কাটা বেশ জোরে লেগেছে। রাস্তার অল্প আলোতে ভালো করে দেখাও যাচ্ছে না। এত রাতে আশেপাশে তাকিয়ে কাউকে চোখেও পড়ল না। কী করবে বুঝে উঠতে পারছিল না। মনে মনে ভাবল, তাহলে কি গাড়িটাকে ব্যাক করে পাশ কাটিয়ে নিয়ে চলে যাবে। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গেই ভিতরের মানুষটা বলে উঠল— কী করছ সমর? তুমি না একজন মানবদরদি বলে অহংকার করো? তাহলে এত রাতে অবলা একটা মেয়েকে রাস্তায় ছেড়ে পালাবে? কোথায় গেল তোমার সেই মন?

সমর কোনও কিছু না ভেবেই গাড়ির হেডলাইটটা জ্বালিয়ে মেয়েটির দেহটাকে গাড়ির তলা থেকে বের করে আনল। মেয়েটি তখন অচৈতন্য অবস্থায়। মাথায় এবং হাতে বেশ চোট লেগেছে মনে হচ্ছে। মেয়েটির দেহটিকে পিছনের সিটে শুইয়ে দিয়ে হাতটা নাকের কাছে নিয়ে দেখল এখনও নিঃশ্বাস চলছে। খুব তাড়াতাড়ি হাসপাতালে পৌঁছাতে হবে। যে করে হোক মেয়েটাকে বাঁচাতে হবে। সমর হাসপাতালে পৌঁছেই ইমারজেন্সিতে মেয়েটিকে ভর্তি করে দিল। বাইরে এসে হাসপাতালের সব ফরমালিটি করে যখন ইমারজেন্সির বাইরে এসে বসল, তখন প্রায় মাঝ রাত। কিছুই ভালো লাগছিল না।

আজকাল ওর এই হয়েছে এক জ্বালা। অফিসে অডিটিং চলছে বলে রোজই বেশি রাত হয়ে যাচ্ছে বাড়ি ফিরতে। তার উপর অডিটরদের ফাইফরমাশ আর আবদার মেটাতে মেটাতে একেবারে ক্লান্ত হয়ে গেছে। আজ অডিটরদের সঙ্গে সিনেমা দেখতে গিয়েই এত রাত হয়ে গেল ফ্রিতে। কোথা থেকে আবার এক উটকো ঝামেলা এসে জড়ো হল। একটাই নিশ্চিন্তি যে, আগামীকাল রবিবার, ছুটির দিন। আর এই ছুটি বলেই তো অডিটরদের আবদার মেনে নিতে হল সমরকে। ভাবতে লাগল কী করে এর থেকে রেহাই পাওয়া যায়। এত রাতে কোনও বন্ধু-বান্ধব বা অফিস কলিগকেও ফোন করাটা ঠিক হবে না। এসব আবোল তাবোল ভাবতে ভাবতে হঠাৎ কানে ভেসে এল কেউ যেন চিৎকার করে কিছু বলছে। তাকিয়ে দেখল, ইমারজেন্সি থেকে ডাক্তার বেরিয়ে এসে জোরে জোরে বলছেন, পাঁচ নম্বর বেডের পেশেন্টের সঙ্গে কে আছেন? সমর এগিয়ে গেল।

—আজ্ঞে আমি, সমর সামন্ত।

—আপনি সম্ভবত ওঁর হাজব্যান্ড? আচ্ছা আপনি ওঁকে মারধর করেননি তো? এত চোট পেল কী করে বলুন তো? —আজ্ঞে, রাস্তা পার হতে গিয়েই এই বিপদ৷

—হাতে পায়ের চোটগুলো খুব সাংঘাতিক নয়। ওগুলো সেরে যাবে কিন্তু মাথায় মনে হয় খুব চোট লেগেছে। তাই জ্ঞান আসতে দেরি হবে। প্রয়োজনে অপারেশনেরও প্রয়োজন হতে পারে। আপনি একটা অপারেশনের কনসেন্ট দিয়ে যান। দরকার হলে আমরা আপনাকে জানিয়ে দেব। আপনার নম্বর তো আমাদের রেকর্ডে দিয়েছেনই। আপনি আর এত রাতে শুধু শুধু কেন বসে থাকবেন। বাড়িতে গিয়ে রেস্ট নিন। আগামীকাল সকালে বড়ো ডাক্তার আসবেন, তখন বিস্তারিত ভাবে আপনাকে সব জানিয়ে দেব। তবে ভয়ের কিছু নেই। মনে হচ্ছে রাতেই জ্ঞান ফিরে আসবে। আমরা ড্রিপ শুরু করে দিয়েছি। আপনার স্ত্রী-র নামটা কী? সমর এত তাড়াতাড়ি কিছু ভেবে না পেয়েই বলে ফেলল— অনামিকা।

—ঠিক আছে, আপনি এখন যেতে পারেন। আমরা তো আছি। চিন্তার কোনও কারণ নেই।

সমর কিছু বলার আগেই ডাক্তার ভিতরে চলে গেলেন। সমরের শরীরটা যেন বড়ো ভারী বোধ হতে লাগল। কিছু খাওয়াও হয়নি। খুবই ক্লান্ত লাগছে। এ আবার কোন ঝামেলায় আটকে পড়ল কে জানে। এ সব ভাবতে ভাবতে গাড়িতে স্টার্ট দিয়ে বাড়ির দিকে রওনা হল।

( দুই )

পরের দিন সকালবেলা সব কাজ সেরে নিয়ে, ব্যাংক-এর চেক বই, এটিএম কার্ড সঙ্গে নিয়ে রওনা হল সমর। হাসপাতালে পৌঁছেই খবর নিল বড়ো ডাক্তার এসে অনামিকা-কে দেখে গেছেন কিনা। রিসেপশনে খবর নিতেই তাকে জানাল — গতকাল রাতেই আপনার পেশেন্টের জ্ঞান ফিরে এসেছে, তাই রুমে শিফ্‌ট করে দেওয়া হয়েছে। বড়ো ডাক্তার আপনার জন্য অপেক্ষা করছেন, রুম নম্বর ১০৭-এ।

সমর আর দেরি না করে ডাক্তারবাবুর সঙ্গে দেখা করলেন। ডাক্তারবাবু বললেন— মি. সামন্ত, অনামিকা-কে আমি দেখেছি। এখন ওর জ্ঞান এসেছে। আগামীকাল সকালেই আপনি এসে ওকে নিয়ে যেতে পারেন। ভয়ের কিছু নেই। বাইরের চোটগুলোও তাড়াতাড়ি সেরে যাবে। তবে ট্রিটমেন্ট চালিয়ে যেতে হবে সম্পূর্ণ না সেরে ওঠা অবধি।

সমর ভেবে দেখল, জ্ঞান যখন এসে গেছেই তখন আর দেখা করে লাভ নেই। বরং আগামীকাল সকালে এসে ওর সব বিল চুকিয়ে দিয়ে চলে যাবে। ওর জ্ঞান এলে মেয়েটা নিশ্চয়ই ওর বাড়ির লোকেদের সঙ্গে যোগাযোগ করে নেবে। ওর হঠাৎ মনে পড়ল, আচ্ছা মেয়েটির ঠিকানাটা তো ওরও জানা নেই। যাক, ওতে কিছু যায় আসে না। ওর কর্তব্য ও করে দিয়েছে। আগামীকাল হাসপাতালে গিয়ে টাকাটা চুকিয়ে দিলেই হবে।

সমর দিল্লিতে বড়ো হলেও, চাকরি করতে কলকাতায় আসার পর থেকেই সে কলকাতার ছেলেই হয়ে গেছে। দিল্লিতে মা, বাবা যে ক’দিন বেঁচেছিলেন সে ক’দিন দিল্লিতে যাতায়াত ছিল। আর এখন অফিসের কাজ ছাড়া মোটেই দিল্লি যাওয়া হয় না। সব পাট চুকে গেছে দিল্লির সঙ্গে। ব্যাংক-এর চাকরিটা নিয়ে যখন কলকাতায় এসেছিল, তখন থেকেই মানিকতলা মেইন রোডে একটা ফ্ল্যাট নিয়ে আছে। কখনও নিজে রান্না করে আবার কখনও হোটেলে খেয়ে নেয়। অফিস থেকে ফিরতে প্রায় রোজই দেরি হয় বলে রান্নার লোকও রাখতে পারেনি। মাঝে মাঝে খুব একা যে লাগে না তা নয়। সে কারণেই গতকাল সিনেমা দেখে মনটা একটু পরিবর্তন করতে গিয়ে কী বিপদটাই না হল !

( তিন )

পরের দিন মোবাইলের রিং-টা বেজে উঠতেই ঘুমটা ভেঙে গেল সমরের। ভাবল এত ভোরে কে আবার ফোন করল।

—হ্যালো, কে বলছেন?

—আজ্ঞে, আমি হাসপাতাল থেকে বলছি। আপনার স্ত্রী, অনামিকা দেবীকে আজ ছেড়ে দেওয়া হবে। আপনি ঠিক দশটায় এসে বিল মিটিয়ে দিয়ে আপনার স্ত্রীকে নিয়ে যাবেন। উনি এখন সুস্থ আছেন।

—হাসপাতালে পৌঁছেই সব বিল ‘ক্লিয়ার’ করে দিয়ে বাড়ির দিকে রওনা হল। হাসপাতাল থেকে কিছু দূরে আসতেই আবার হাসপাতাল থেকে ফোন এল। গাড়িটা রাস্তার একপাশে দাঁড় করিয়ে ফোনটা ‘অন করল। অন্যদিক থেকে রিসেপশনিস্ট-এর কণ্ঠস্বর ভেসে এল –আপনি কোথায়? আপনার স্ত্রী, অনামিকাদেবী আপনার জন্য হাসপাতালে অপেক্ষা করছেন।

সমর কী করবে ভেবে উঠতে পারছিল না। একবার ভাবল, হাসপাতালে আর সে ফিরে যাবে না। কিন্তু পরক্ষণেই ভাবল, হাসপাতালের রেকর্ডে তো ওর নাম ঠিকানা সবই লিখিয়েছে সে। কিছুক্ষণ গাড়ি-র স্টার্ট অফ করে চুপ করে ভাবতে লাগল, কী করা উচিত হবে। অনেক ভেবে আবার গাড়িটা নিয়ে ফিরে চলল হাসপাতালের দিকে। এখন তো ওর জ্ঞান ফিরে এসেছে, তাই ওকে গিয়ে ওর বাড়ির ঠিকানায় পৌঁছে দিলেই হল। এসব ভাবতে ভাবতে হাসপাতালে পৌঁছে ওর কামরায় পৌঁছেই দেখল অনামিকা হাসপাতাল ছাড়ার জন্য একেবারে তৈরি হয়েই বসে আছে।

সমর বলল— চলুন, এবার আপনাকে বাড়ি পৌঁছে দিই। কিন্তু অনামিকার চোখ দুটো সমরের দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে আছে।

উত্তর দিল— চলো।

গাড়িতে বসে সমর জিজ্ঞাসা করল – আপনার বাড়ি কোথায়?

—কী সব আবোল তাবোল বলছ। আমি কিছুই মনে করতে পারছি না। আমি কী করে হাসপাতালে এলাম তাই…ই মনে করতে পারছি না। ডাক্তারবাবু যে বললেন, তুমি আমার স্বামী। তবে আপনি, আজ্ঞে এসব করছ কেন? হেঁয়ালি ছেড়ে সোজাসুজি বলো। আমি তো তোমার সঙ্গেই যাব। কোনও স্ত্রী কি অন্য বাড়িতে যায়?

(ক্রমশ…)

মুগ্ধ করবে মরিশাস (পর্ব-০১)

বেশ কিছুদিন আগের কথা। আমার এক মাসতুতো দাদার ছেলে বিয়ের পর সস্ত্রীক মরিশাস গিয়েছিল হনিমুনে। মরিশাস ঘুরে আসার পর একদিন চায়ের আড্ডায় বসে তাদের কাছ থেকে অনেক কথাই শুনেছিলাম মরিশাস সম্বন্ধে। সেখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ভ্রমণপিপাসুদের মুগ্ধ করে। প্রকৃতির রঙ্গশালায় নব-নব রূপের প্রাচুর্য, ফুল-ফলের নানা রঙের অনুপম বৈচিত্র্য যেন অনেক দেশের থেকে স্বতন্ত্র।

যদিও দেশ-বিদেশের নানান জায়গায় ঘুরে বেড়িয়েছি আমি, তবুও ওদের মুখে মরিশাসের অপূর্ব কাহিনি শুনে কেন জানি না আমার মনের মধ্যে একটা সুপ্ত বাসনা জেগে উঠেছিল। মরিশাসের নয়নাভিরাম সৌন্দর্য থেকে আমি-ই বা বঞ্চিত হই কেন?

সুযোগ এল হাতের মুঠোয়। কলকাতার এক অভিজাত ক্লাবের সদস্য হিসেবে একদিন পৌঁছে গেলাম মরিশাস। মরিশাসের আয়তন ২০৪০ বর্গ কিলোমিটার। বিশ্বের ক্ষুদ্রতম দেশগুলির মধ্যে এটিও একটি। মাদাগাস্কারের পূর্ব দিকে ভারত মহাসাগরের মাঝে এই দ্বীপদেশের অবস্থান।

মরিশাসের রাজধানীর নাম পোর্ট লুইস। এটি একটি উন্নতমানের সংস্কৃতি সমৃদ্ধ শহর। বিভিন্ন ধরনের বুটিকের দেখা মিলবে এখানে এলে। দেখতে পাবেন নানারকমের রেস্তোরাঁ, পাবেন সুস্বাদু খাবার। শপিং এবং বিনোদনেরও প্রচুর জায়গা রয়েছে এখানে। ব্লু পেনি নামের একটি মিউজিয়াম রয়েছে, যা প্রত্যেক ভ্রমণার্থীদের কাছে অতি প্রিয় দর্শনীয় স্থান। এখানকার আপ্রবাসী ঘাট দেখতে ভুলবেন না কেউ। এটি ইউনেস্কোর একটি ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটও বটে।

নয়টি জেলা নিয়ে গঠিত এই মরিশাস দ্বীপ। এগুলি হল – গ্র্যান্ড পোর্ট, ব্ল্যাক রিভার, ফ্ল্যাক, প্যম্পেলমাউসেস, মোকা, পোর্ট লুইস, প্লেইনস, উইলহেমস, সাভান ও রিভিয়েরে ডু রেম্পার্ট।

মরিশাস দ্বীপটিকে এক সময় আগ্নেয়গিরির দ্বীপ বলা হতো। সেটা বহু বছর আগের কথা। এখন আর আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত দেখা যায় না। স্থানীয় মানুষদের কেউ কেউ বলেন— এই আগ্নেয়গিরিটি যেন কুম্ভকর্ণের বড়ো ভাই বা তুতো ভাই। ঘুমিয়ে পড়েছে, আর কোনওদিন জাগবে না। দ্বীপের অনেকটা অংশ পাহাড় দিয়ে ঘেরা। কিছু অপেক্ষাকৃত নিচু, কিছু উঁচু পাহাড়। পাহাড়ের নীচে রয়েছে তৃণভূমি। যাইহোক, নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক দৃশ্য পর্যটকদের মনে আনন্দের ঢেউ তুলবেই।

মরিশাস দ্বীপের সাদা বালির সৈকত অবশ্যই দর্শনীয় স্থান। মরিশাস দ্বীপে রয়েছে একটি অতি সুন্দর হ্রদ। নাম তার ভ্যাকোয়াস হ্রদ। এটি দ্বীপবাসীদের কাছে জলের প্রধান উৎসও বটে। এই দ্বীপের প্রধান তিনটি নদী হল গ্র্যান্ড রিভার, সাউথ ইস্ট এবং ব্ল্যাক রিভার।

গ্র্যান্ড বেই: এটি একটি অতি মনোরম সৈকত। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অতি প্রিয়জনদের নিয়ে সময় কাটানো যায়। পর্যটকদের কাছে অত্যন্ত প্রিয়। নাইটলাইফের জন্যও বিখ্যাত।

ব্ল্যাক রিভার গর্জেস ন্যাশনাল পার্ক: এটি মরিশাসের পার্বত্য দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত। এটি মরিশাসের একটি জাতীয় উদ্যান। প্রায় ৬৮ বর্গ কিলোমিটার জায়গা জুড়ে রয়েছে। অনেকেই আসেন অভূতপূর্ব এই উদ্যান তথা পার্ক দর্শনে।

ইলে অক্স সার্ফস: এটি হল ফ্ল্যাক জেলার অর্থাৎ মরিশাসের পূর্ব উপকূলের কাছের একটি দ্বীপ। এটি প্রায় ৮৭ হেক্টর জায়গা জুড়ে রয়েছে। রয়েছে প্রচুর গাছগাছালি এবং সাদা বালুকাময় সৈকত।

চামারেল: চামারেল হল মরিশাসের এক বিশেষ গ্রাম। এটির নামকরণ করা হয়েছিল জনৈক ফরাসি ব্যক্তি চার্লস অ্যান্তোনি দে চাদি দে চামারেলের নামে। চামারেল সাহেব ১৮০০ সাল নাগাদ এই এলাকায় বসবাস করতেন। এক সময় সুন্দর এই গ্রামটি ছিল তাঁরই দখলে।

লে মর্ন ব্রাবাস্ত (Le Morne Brabant): এটি মরিশাস দ্বীপের দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে অবস্থিত, একটি উপদ্বীপ। ১২ হেক্টরের বেশি জায়গা জুড়ে অবস্থান। এর খাড়া ঢালে অনেক গুহা আছে।

গ্র্যান্ড বেসিন: এটি সাভান জেলার একটি নির্জন পাহাড়ি অঞ্চলে অবস্থিত। এটিকে অনেকে মরিশাসের গঙ্গা পুকুরও বলে থাকেন। আসলে এটি একটি হ্রদ। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে এর উচ্চতা প্রায় ১৮০০ ফুট। এটিকে মরিশাসের সবচাইতে বেশি পবিত্র স্থান হিসেবে গণ্য করা হয়। হ্রদটির তীরে সাগর শিব মন্দির অবস্থিত। অনেকে বলেন এটি ভগবান শিবের কাছে নিবেদিত।

সেভেন কালার্ড আর্থ (Seven Coloured Earth ): এই জায়গাটি খুবই সুন্দর। বিশেষ দর্শনীয় স্থান। এই জায়গাটিতে রামধনুর মতোই সাতটি রঙের বিচ্ছুরণ সত্যিই মন মাতায়। এখানে প্রবেশ করতে গেলে নির্দিষ্ট প্রবেশ মূল্য ধার্য করা হয়। মরিশাসের দ্বীপবাসী এবং অনাবাসীদের ক্ষেত্রে তা আলাদা। অনাবাসী প্রতি প্রাপ্ত বয়স্কদের ক্ষেত্রে দিতে হয় ২২৫ টাকা এবং শিশুদের জন্য ৭৫ টাকা। কাছেই রয়েছে সুন্দর জলপ্রপাত, যা দৃষ্টিনন্দন তো বটেই, অবশ্যই দর্শনীয় স্থান।

চামারেল কালার্ড আর্থ (Chamarel Coloured Earth ): এটি মরিশাসের আরও একটি বিশেষ আকর্ষণ। এখানে সমুদ্র সৈকতে সাত রঙের বালুকণা দেখা যায়। একসঙ্গে লাল, হলুদ, নীল, সবুজ, বাদামি, বেগুনি রঙের সমাবেশ দেখতে কার না ভালো লাগে?

(ক্রমশ…)

উইপোকা (শেষ পর্ব)

সুলগ্না ক্ষণিকের জন্য শিশির কাকার মুখটা মনে করে বলল – ‘একজনকে উচিত শিক্ষা দেওয়ার আছে। শাস্তি দেওয়ার আছে।’ সুনীতা কপাল সংকুচিত করে বললেন, ‘উচিত শিক্ষা! শাস্তি! তুই কী বলছিস কিছুই তো আমার মাথায় ঢুকছে না।’

সুলগ্না বলল, ‘একজন আমার ক্ষতি করেছে পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে। আমার অসহায়তার সুযোগ নিয়ে আমাকে মলেস্ট করেছে। আমার সারা শরীর তার নোংরা হাতে স্পর্শ করেছে। এতদিন মুখ বুজে সহ্য করেছি। আর নয়।’

সুনীতা বললেন, ‘কী বলছিস তুই? তোর মাথার ঠিক আছে!’

সুলগ্না বলল, ‘হ্যাঁ মা, আমি ঠিকই বলছি। একবর্ণ মিথ্যে বলছি না।’ সুনীতা বললেন, “যে তোর এত বড়ো সর্বনাশ করল কে সে? বল মা।’

সুলগ্না আর্দ্র গলায় বলল, ‘মা, বাবার বন্ধু শিশির কাকা।’

সুনীতা চমকে উঠে বললেন, ‘শিশিরদা! তুই আমাকে বলিসনি তো আগে!’

সুলগ্না বলল, ‘বাবার দুর্ঘটনার সময় তুমি প্রায়ই বাবার সঙ্গে হসপিটালে থাকতে একথা শিশির কাকা আমার মুখ থেকে শুনেছিল। বাড়িতে তুমি আর বাবা না থাকার সুযোগে শিশির কাকা একদিন সন্ধ্যায় আমাকে জোর করে শারীরিক নির্যাতন করে। ভয় দেখিয়ে খারাপ আচরণ করে আমার সঙ্গে। দিদি কিছুটা হয়তো জানে। কিন্তু ও তো অসহায়। আমি মুখ খুলব বলে শিশির কাকা আমায় ভয় দেখায় যে, সে গ্রামের সকলকে জানিয়ে দেবে আমি কতটা নোংরা। শিশির কাকা ভয় দেখায় এই বলে যে, গ্রামের সকলে আমাদের একঘরে করে দেবে। আমি তখন অনেকটা ছোটো ছিলাম। ভয়ে মুখ খুলতে পারিনি। কিন্তু দশ বছর কেটে যাওয়ার পরও ওই লোকটার নোংরা চোখ আমার দিকে চেয়ে আছে। আজ সকালে টোটো থেকে নেমে আসার সময় নোংরা ইঙ্গিত করছিল। অর্পণের সঙ্গে সংসার বাঁধার আগে ওই লোকটাকে উচিত শিক্ষা দিতে চাই।’

সুনীতা বললেন, ‘জানোয়ারটা ওই কারণে সপ্তাহ দুয়েক আগে আমার কাছে তোর খোঁজ নিচ্ছিল। আমি বুঝতেই পারিনি।” সুনীতা সুলগ্নাকে বুকে জড়িয়ে ধরে বললেন, ‘তুই এত বড়ো একটা ঘটনা কী করে আমার থেকে লুকিয়ে রাখলি! মেয়ের বয়সি একটা মেয়ের সঙ্গে অসভ্যতার ফল ওকে ভোগ করতেই হবে।’ সুলগ্নার কানে কানে কী যেন বললেন সুনীতা। তারপর দু’জনেই দু’জনের দিকে তাকিয়ে স্মিত হেসে শুয়ে পড়লেন।

পাঁচদিন সুলগ্নার গতানুগতিক ভাবেই বাবা-মা-দিদির সঙ্গে কেটে গেল। পাঁচদিন পর সুলগ্না পাড়ার দোকানে কিছু জিনিস কিনতে গেল। সেখানে পাড়ার এক কাকিমার সঙ্গে সুলগ্নার দেখা হতেই তার বাড়ির খবরাখবর নিতে শুরু করল। কথায় কথায় সুলগ্না সজোরেই বলল, ‘মায়ের শরীর ভালো নেই। আজ বিকেলে বাবাকে নিয়ে মা-ও ডাক্তার দেখাতে যাবে।’ অদূরে চায়ের দোকানে বসে শিশির কাকার কানে গেল সুলগ্নার কথাগুলো। তার মুখের লালায় দীর্ঘক্ষণ আটকে থাকা গুটখা ফেলে উঠে দাঁড়াল।

শিশির কাকা সুলগ্নার পা অনুসরণ করতে করতে ফাঁকা রাস্তায় দাঁড়াল। সে সুলগ্নাকে জোর গলায় ডাকল— ‘এই শোন৷’ সুলগ্না হাঁটতে হাঁটতে দাঁড়িয়ে গেল। সে বলল, ‘পিছু ডাকলে কেন?’

শিশির কাকা সুলগ্নার কানের কাছে মুখ এনে বলল— ‘তোকে পিছু ডাকব না তো কাকে ডাকব। তুই তো আমার পিছুটান। তোর জন্যে আমি মরেও শান্তি পাব না রে। আজ বিকালে তোর বাপ-মা চলে গেলে সদর দরজাটা খুলে রাখিস। তোকে অনেকদিন ভালো করে দেখিনি। তোর পরিপুষ্ট ডগডগে গতরটা বহুদিন দেখিনি। এখন তো শহুরে জলে গতরে চিকনাই ধরেছে।’

সুলগ্না বলল, ‘ছি! ছি!’

শিশির কাকা বলল, ‘ছি ছি করিস না। যদি দরজা না খোলা দেখি তাহলে কী করব তোর নিশ্চয়ই মনে আছে। গ্রামের মানুষ তোকে দেখলে ছি ছি করবে। কথাটা মাথায় রাখিস।’

বিকালে সুলগ্নার বাবাকে বাড়ি থেকে বার করা হল। সুনীতাও সকলের দৃষ্টির আড়ালে চলে গেল। ধীর পায়ে সন্ধ্যা নামছে। এমন সময় সদর দরজায় মৃদু আওয়াজ হল। শিশির কাকা এল। সে ঘরগুলো চারদিক চেয়ে দেখল একটি ঘরে সুলগ্নার দিদি হুইল চেয়ারে বসে ঝিমুচ্ছে। সে ক্রূর হাসি হেসে সুলগ্নার কাছে এসে বলল— ‘বাগান খালি, আমিই মালি। ‘

সুলগ্না বলল— ‘কাকা, তুমি এসব বন্ধ করো। আমাকে মুক্তি দাও।’

শিশির কাকা সুলগ্নার পিঠে কাঁধে হাত বুলিয়ে বলল – ‘খোলাই হল না কিছু, বন্ধ করব কী রে! মুক্তি আমি মরলেই পেয়ে যাবি।’ সে হাসতে হাসতে সুলগ্নার গায়ের ওড়নাটা টান মেরে ফেলে দিল। সুলগ্নাকে জাপটে ধরে বলল – “তোকে না আমার খুব খেতে ইচ্ছে করে। খিদে পেয়েছে রে।’

সুলগ্না জোরে বলল, ‘আমাকে ছেড়ে দাও কাকা। দোহাই তোমার।’

শিশির কাকা বলল— ‘বহুদিন পর বাঘ হরিণ শিকার করলে কি ছেড়ে দেয় পাগলি!’

সুলগ্না সজোরে বলল— ‘ভালো হবে না কিন্তু কাকা৷’

শিশির কাকা ঠেলে সুলগ্নাকে বিছানায় ফেলে বলল— ‘ভালো হবে না খারাপ হবে সেটা দেখছি।’ সুলগ্না শিশির কাকার হাত থেকে বেরোবার প্রাণপণ চেষ্টা করে বলল, “ছেড়ে দাও আমাকে।’

সুনীতা সজোরে দরজা ঠেলে ঘরে ঢুকে বলল, ‘শিশিরদা, ছেড়ে দিন আমার মেয়েকে। আপনি যা অন্যায় করেছেন আমার মেয়ের সঙ্গে তার উপযুক্ত সাজা আপনি পাবেন। মানুষের মতো দেখতে হলেই সে মানুষ হয়ে যায় না। আপনার মধ্যে মনুষ্যত্ব বলে কিছু নেই।’ সুনীতাকে দেখে শিশির কাকার হাত আলগা হতেই সুলগ্না তার মায়ের পিছনে এসে দাঁড়াল।

শিশির কাকা বলল— ‘কী প্রমাণ আছে আমি তোর মেয়ের সঙ্গে অন্যায় করেছি। কিন্তু আমি যদি সকলকে ডেকে বলি ওই তোর শহুরে ফেরত মেয়ে আমাকে ডেকেছিল শারীরিক চাহিদা পূরণের জন্য।’

সুনীতা শিশির কাকার গালে একটা সজোরে থাপ্পড় মেরে বলল, ‘আর একটা নোংরা কথা আমার মেয়ের নামে নয়। আর প্রমাণ আমি দেব। এই দ্যাখো, তুমি যা যা একটু আগে আমার মেয়ের সঙ্গে করেছ, তার পুরো ভিডিও আমি জানালার বাইরে থেকে এই ফোনে তুলে রেখেছি। পুলিস এলেই হাতে তুলে দেব।’

শিশির কাকা সুনীতাকে রক্তচক্ষু বার করে বলল – ‘তবে রে শালি। দে ফোন দে।’

সদর দরজা ঠেলে স্থানীয় পুলিস অফিসার তার দলবল সহ বাড়িতে প্রবেশ করলেন। সুনীতা বললেন— ‘স্যার, আমি আপনাকে ফোন করেছিলাম। নিয়ে যান এই শিশির দাস-কে। আমার মেয়েকে ভয় দেখিয়ে তার অনেক ক্ষতি করেছে। আমার মেয়ের সঙ্গে অসভ্য আচরণ করার ভিডিও এই ফোনে আছে।’

শিশির কাকা হুমকি দিয়ে বলল – ‘তোদের মা-মেয়ে কাউকেই আমি ছাড়ব না। এর প্রতিশোধ আমি নেবই।’

সুলগ্না বলল, ‘আগে তো জেলের ঘানি টেনে এসো, তারপরে প্রতিশোধের কথা ভাববে।’

অফিসার তার দলবলকে বললেন, ‘এই লোকটাকে গাড়িতে তোলো। আর আপনারা কাল সকালে থানায় একবার দেখা করবেন।’

শিশির দাস-কে গাড়িতে তুলে নিয়ে চলে গেল পুলিস। পূর্ণিমার গোলাকার চাঁদের আলো সুনীতার বাড়িকে তখন যেন ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। সুনীতার বুকে সুলগ্না একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে অস্ফুট কণ্ঠে ডাকল— ‘মা।’ সুনীতা মেয়ের কপালে সোহাগ চুমু খেয়ে মৃদু হাসলেন।

টেস্টি-টেস্টি স্ন্যাকস

বাড়িতে নিজের হাতে তৈরি খাবার খাওয়ার মজা-ই আলাদা। সকাল-বিকেল যখনই হোক, খেতে পারেন হাক্কা নুডলস কিংবা ভেজিটেবল ডাম্পলিংস। এই খাবারগুলো সুস্বাদু এবং স্বাস্থ্যকর। রইল রেসিপিজ।

হাক্কা নুডলস

উপকরণ: ২০০ গ্রাম নুডলস, ২০ গ্রাম গাজরের কুচি, ২০ গ্রাম বাঁধাকপির কুচি, ৩০ গ্রাম লাল-হলুদ-সবুজ ক্যাপসিকামের টুকরো, ১০ গ্রাম পেঁয়াজের টুকরো, ৫ মিলিলিটার সোয়া সস লাইট, সামান্য গোলমরিচের গুঁড়ো, সাদা তেল পরিমাণ মতো, ধনেপাতার কুচি, শসাকুচি এবং স্বাদমতো নুন।

প্রণালী: হালকা গরম জলে সামান্য তেল দিয়ে নুডলস সেদ্ধ করে জল ঝরিয়ে রাখুন প্রথমে। এরপর একটা কড়াইতে তেল গরম করে পেঁয়াজ, বাঁধাকপির কুচি, গাজর, লাল-হলুদ-সবুজ ক্যাপসিকাম এবং স্বাদমতো নুন দিয়ে ২ মিনিট ভাজুন। এবার ওর মধ্যে জল ঝরিয়ে রাখা নুডলস এবং সোয়া সস দিয়ে ভালো ভাবে মিক্স করে ভাজুন। একটু লাল লাল রং এসে গেলে, সুন্দর একটি চাইনিজ প্লেটে ঢেলে নিয়ে, গোলমরিচের গুঁড়ো, শসা এবং ধনেপাতা কুচি দিয়ে গরম গরম পরিবেশন করুন।

ভেজিটেবল ডাম্পলিংস

ডাম্পলিংস ফিলিংএর জন্য উপকরণ: ২০ গ্রাম বেবিকর্ন, ২০ গ্রাম গাজরের কুচি, ১০ গ্রাম আজোয়ান, ১০০ গ্রাম আলু সেদ্ধ, দুটো কাঁচালংকার কুচি, সামান্য গোলমরিচের গুঁড়ো, সামান্য মাখন, সামান্য তিলতেল এবং নুন স্বাদমতো।

ডাম্পলিংসএর জন্য উপকরণ: ১৩০ গ্রাম ময়দা, ১৭০ গ্রাম কর্নফ্লাওয়ার, পরিমাণমতো জল। ডাম্পলিংস সস-এর জন্য উপকরণ: ২০ এমএল বারবিকিউ সস, ২০ গ্রাম চালের পেস্ট, ৭৫ মিলিলিটার জল, ১০ এমএল সোয়া সস, ৫ গ্রাম তিল এবং ১৫ গ্রাম চিনি।

প্রণালী: ডাম্পলিংস সস তৈরির সমস্ত উপকরণ মিশিয়ে নিয়ে হালকা আঁচে ফুটিয়ে নিন। এবার ডাম্পলিংস ফিলিং-এর জন্য কেটে রাখা গাজর, বেবিকর্ন ভেজে নিয়ে, সেদ্ধ করে রাখা আলুর সঙ্গে ভালো ভাবে মিশিয়ে নিন। ওর মধ্যে গোলমরিচের গুঁড়ো, কাঁচালংকার কুচি, তিল, স্বাদমতো নুন মিশিয়ে নিয়ে মাখন দিয়ে ভাজুন। ডাম্পলিংস-এর এই ফিলিং বা পুর তৈরি হয়ে গেলে, ময়দার সঙ্গে কর্নফ্লাওয়ার মিশিয়ে জল দিয়ে মেখে, ছোটো ছোটো লুচির আকারে বেলে রাখুন। এরপর ওর মধ্যে পুর ভরে মোমোর আকার দিন। এবার মোমো শেপ দেওয়া ওই ডাম্পলিংস ৭-৮ মিনিট স্টিম করে রাখুন। সবশেষে চিনামাটির পাত্রে রেখে, তৈরি করে রাখা পাতলা সস ঢেলে, ওর উপর ধনেপাতা কুচি এবং গোলমরিচের গুঁড়ো ছড়িয়ে দিয়ে গরম গরম পরিবেশন করুন।

উইপোকা (পর্ব-০১)

বেঙ্গালুরু থেকে সুলগ্না বিএসসি নার্সিং পড়া শেষ করে বাড়ি ফিরছে। বহুকষ্ট স্বীকার করে, প্রতিকূল পরিস্থিতির সঙ্গে লড়াই করে সে কোনওরকমে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে। বছর দশের আগে পরিস্থিতি এতখানি খারাপ ছিল না। সুলগ্নার বাবা প্রভাসবাবু আমেদাবাদে একটা টেক্সাইল মিলে কাজ করতেন। তাঁর ভালো উপার্জন ছিল। সুলগ্নার মা সুনীতা সুনিপুণ হাতে সংসার চালাতেন।

সুলগ্নার বাড়িতে একটা জায়গা কমজোরি ছিল তার বড়ো দিদিকে নিয়ে। বড়ো দিদি জন্ম থেকেই প্রতিবন্ধী। হুইল চেয়ারে বসেই সে সাতাশ বছর কাটিয়ে দিল। তবু সেই ব্যাপারে সুলগ্নার বাবা-মা-র কোনও আক্ষেপ অথবা কোনও অনুতাপ ছিল না। তাঁদের একটা মানসিক কষ্ট ছিল। বাবা-মা ভাবতেন যে, তাঁরা মারা গেলে তাঁদের মেয়েকে কে দেখবে। বড়ো মেয়ে আর পাঁচটা সাধারণ মেয়ের মতো হলে তাঁদের আর ভাবতে হতো না। আর্থিক সচ্ছলতা অনেক কমজোরিকে অতিক্রম করার সাহস জোগায়। কিন্তু এক্ষেত্রে তা ঘটেনি।

প্রভাসবাবুর উপার্জনের টাকায় সংসারের চাকা সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ছুটছিল। সুলগ্নার এগারো ক্লাসে পড়ার সময় হঠাৎই তার পরিবারের উপর বিপর্যয় নেমে আসে। প্রভাসবাবু দুর্গাপুজোয় ছুটি নিয়ে বাড়ি ফেরার সময় ট্রেন দুর্ঘটনা ঘটে। তাঁর এক পা কাটা যায় ও মাথায় প্রচণ্ড আঘাত পান। বহু ডাক্তার দেখিয়ে, বহু অর্থ ব্যয় করে প্রাণে বেঁচে গেলেও তিনি আর স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারলেন না। সংসারের মোড় ঘুরতে লাগল।

প্রভাসবাবুর শারীরিক অবনতি ও আর্থিক দুরবস্থা সদাহাস্যমুখী সুনীতার চরিত্রের পরিবর্তন করে দিল। ভাগ্যের উপর দোষারোপ করতে করতে তাঁর মেজাজ খিটখিটে হয়ে গেল। তিনি দুই মেয়ের সঙ্গে কোনও সময় ভালো করে কথা পর্যন্ত বলতেন না। কারণে-অকারণে মায়ের মুখঝামটা খেতে খেতে দিন কাটত সুলগ্নার ও তার দিদির। সময়ের স্রোতে ভেসে কোনওরকমে উচ্চমাধ্যমিক পাশ হল সুলগ্নার। তাকে খুঁজতে হল স্বল্প সময়ের মধ্যে ভালো রোজগারের পথ।

রোজগারের পথ দেখালেন সুনীতার এক বন্ধু। তিনি সুনীতাকে পরামর্শ দিলেন মেয়েকে বিএসসি নার্সিং পড়ানোর। তিনি সুনীতাকে এই ভরসাও দিলেন যে, পাশ করার পর সুলগ্না যে-কোনও সরকারি অথবা বেসরকারি হাসপাতালে অনায়াসে চাকরি পাবে। সুনীতা তাঁর বিয়ের গহনা বন্ধক দিয়ে সুলগ্নাকে বেঙ্গালুরু পাঠিয়ে দিলেন বিএসসি নার্সিং পড়তে।

দেখতে দেখতে বেঙ্গালুরু থেকে সাত বছর হয়ে গেল সুলগ্নার ফিরতে। নার্সিং পড়া শেষ হওয়ার তিন মাস পরেই বেঙ্গালুরুর এক নামী বেসরকারি হাসপাতালে তার চাকরির সুযোগ আসে। সংসারের হাল ধরার জন্য সে চাকরিতে যোগ দেয়। তিন বছর হল তার চাকরি জীবন। বর্ধমান স্টেশনে ট্রেন থেকে নেমে সুলগ্না টোটো ধরে তার বাড়ি যাবার উদ্দেশ্যে।

বাড়ি ফেরার পথে অপ্রত্যাশিত ভাবে রাস্তায় শিশির কাকার সঙ্গে তার দেখা হয়। তাকে একই টোটো-তে দেখে কিছুটা ভয়ে কেঁচোর মতো কুঁচকে যায় সুলগ্না। সে একপলক শিশির কাকাকে দেখে চোখ নামিয়ে নেয়। কুড়ি মিনিট এক টোটোতে যেতে হবে ভেবে সে ওড়না দিয়ে মুখটা ঢেকে নেয়। বড়ো ফ্রেমের রোদ চশমায় সে চোখ ঢাকে। শিশির কাকা বিড়িতে সুখটান দিতে দিতে মাথাটা নাড়িয়ে টোটো চালককে বলল— ‘এ ভাই তাড়াতাড়ি চল।’

শিশির কাকা এবং সুলগ্না ব্যতীত একে একে যে-যার গন্তব্যস্থানে নেমে গেল কিছুক্ষণ পরেই। দশ মিনিট পর সুলগ্নাও নেমে টোটোচালককে বলল— ‘দাদা, টাকাটা ধরুন।’ শিশির কাকার সুখটানে হঠাৎ ছেদ পড়ল চেনা কণ্ঠস্বরে। বিড়ির শেষাংশ হাত থেকে ফেলে খ্যাকখ্যাঁক করে হেসে সে বলল – “আরে সুলগ্না তুই! কতদিন পর দেখলাম। বাড়ি এলি বুঝি। আমিও নেমে যাই। বাকি পথ হেঁটেই ফিরব।” শিশির কাকা টোটোচালকের হাতে টাকা দিয়ে তাকে বিদায় দিল।

সুলগ্না হনহন করে হাঁটছিল। শিশির কাকা বলল— এত তাড়া কিসের তোর! আমি তোর বাবার বন্ধু। বয়স তোর বাবার মতো। এত জোরে হাঁটলে দুটো সুখ-দুঃখের কথা বলি ক্যামনে!’

সুলগ্না বলল, ‘মা বাড়িতে আমার জন্য অপেক্ষা করছে। আমার ফিরতে দেরি হলে চিন্তা করবে।’

শিশির কাকা বলল— ‘তোর মায়ের অপেক্ষাটাই দেখলি শুধু! আমার অপেক্ষাটা দেখলি না। এতগুলো বছর তোকে দেখিনি। চিন্তা তো আমারও হয়। তুই চলে যাবার পর আমি তোদের বাড়িমুখো হইনি। স্মৃতি বয়ে একা পড়ে আছি জগৎ সংসারে।’

সুলগ্না বলল— ‘কাকা, আমার এসব কথা শোনার সময় নেই। আমি আমার পরিবার ছাড়া অন্য কারও কথা মনেও রাখি না।” শিশির কাকা তার সর্পিল লকলকে জিভ দিয়ে দুটো ঠোঁট চেটে বলল – “আচ্ছা, তোর পুরোনো দিনগুলোর কথা মনে নেই। আমার তো তোর গায়ের গন্ধ, চুলের গন্ধ, তোর স্পর্শ সব মনে আছে। হাওয়ায় ভাসে জানিস সব পুরোনো গন্ধগুলো। দেখবি এখুনি আমি বলতে পারব তোর গায়ে কোথায় কোথায় কতগুলো তিল আছে।’

সুলগ্না বিরক্তির সুরে বলল– ‘তুমি কী মানুষ কাকা! ছি!”

শিশির কাকা বলল— ‘মানুষ না অমানুষ সেটা বলতে পারব না। কিন্তু আমার একটা বড়ো মন আছে। যে মনে আমি সব পূর্বস্মৃতিকে জায়গা দিয়েছি।’

কথা না বাড়িয়ে শিশির কাকার মুখের উপর সুলগ্না বাড়ির ভিতরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল। শিশির কাকা উচ্চৈঃস্বরে হাঁক পেড়ে বলল— ‘আসব একদিন তোর হাতের চা খেতে।’

সুলগ্নার মা তাকে দেখে দাওয়া থেকে ছুটে উঠোনে এসে বললেন— ‘এসেছিস! আমি ভাবছি ট্রেন বোধহয় দেরি করেছে। তোর মুখ চোখ এমন কেন! কী হয়েছে! সদর দরজা বন্ধ করলি কেন ওভাবে?”

সুলগ্না বলল— “কিছু না মা। চলো ঘরে। কেমন আছো তুমি? বাবা-দিদি কেমন আছে?’

সুনীতা হতাশ সুরে বলল – ‘আমি আর কেমন থাকব তোর অক্ষম বাবা-দিদিকে নিয়ে! তুই যে টাকা পাঠাস সেটা দিয়ে চিকিৎসা তো চলছে। উন্নতির কোনও লক্ষণ নেই। কপালে আর কী লেখা আছে কে জানে।’

সুলগ্না মায়ের মেজাজ ঠিক করার জন্য বলল— “মা, কতদিন তোমার হাতের রান্না খাইনি। আজ জমিয়ে রান্না করো। আমি বাবা আর দিদির সঙ্গে দেখা করে আসি।’

সুনীতা বলল— “ঠিক আছে। তাই হবে। হাত মুখ ধুয়ে ওদের সঙ্গে দেখা করে আয়।”

সুলগ্না হাত মুখ ধুয়ে বাবার কাছে এল। শয্যাশায়ী বাবা করুণ দৃষ্টিতে দরজার দিকে তাকিয়েছিল। খাটের পাশে হুইল চেয়ারে দিদি বসে ঝিমুচ্ছিল। সুলগ্নাকে দেখে হুইল চেয়ারটা কিছুটা এগিয়ে এনে তার বাকশক্তিহীন দিদি হাস্যমুখে গোঁয়ানির স্বরে ‘আ-আ-আ’ করে উঠল। সুলগ্নার হাতটা চেপে ধরে সে যেন কিছু বলার চেষ্টা করল। দিদির এলোমেলো রুক্ষ্ম চুল দুহাতে সরিয়ে সুলগ্না বলল— ‘ভালো আছিস দিদি?’ দিদির কাছে এই প্রশ্ন করা নিরর্থক সে জানে। দিদি তার প্রশ্নের উত্তরে শুধু ডান হাতটা নাড়াল। দিদির চোখ দুটো সুলগ্নাকে দেখে আনন্দাশ্রুতে ভরে উঠল।

সুলগ্নার দিদির আওয়াজে প্রভাসবাবু সুলগ্নার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলেন। সুলগ্না বাবার পায়ের কাছে বসে বলল- “বাবা, কেমন আছো? চিনতে পারছ আমাকে?’

প্রভাসবাবু অস্ফুট কণ্ঠে বললেন— ‘ভালো আছি। তোমাকে তো চিনলাম না। কে তুমি? কোথায় বাড়ি তোমার?’

সুলগ্নার দুচোখ জলে ভরে এল। বাবার বুকে মাথা রেখে বলল— ‘বাবা, তোমার মেয়েকে তুমি চিনতে পারছ না!” কথা বলতে বলতে সুলগ্না ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। সে বলল – “বাবা, তোমার কি কিছু মনে পড়ে না। এই বাড়ি। তোমার নিজের তৈরি করা বাড়ি। মা-দিদি-আমার সঙ্গে কাটানো সময় তোমার কি কিছু মনে পড়ে না! মনে করো বাবা। মনে করার চেষ্টা করো।’

প্রভাসবাবু খেঁকিয়ে উঠে চিৎকার করে বললেন— “না আমার কিছু মনে নেই। কেন আমাকে সবাই বিরক্ত করছ দিনরাত? তোমাদের কাউকে আমি চিনি না।’ একটা স্মৃতিবিস্মিত মানুষের কাছে কিছু মনে করানো যে কত চাপের সুলগ্না বুঝতে পারল।

সুনীতা ঘরে এসে বললেন— ‘দেখলি তো আমি কত ভালো আছি! নিজের সবচেয়ে কাছের মানুষটা আজ তার স্ত্রী সন্তানদের মনে করতে পারে না। চিনতেই পারে না কাউকে।’ সুলগ্না কাঁদতে কাঁদতে মাকে জড়িয়ে ধরল। সুনীতা মেয়ের পিঠ চাপড়ে বললেন— ‘কাঁদিস না। ভাগ্যটাই খারাপ আমাদের।’

রাত্রে সুলগ্না মায়ের কাছে শোওয়ার পর তার ফোনের রিং বেজে উঠল। সুনীতা পাশ ফিরে ঘুমাচ্ছে। সুলগ্না ফোন রিসিভ করে বলল— ‘আরে বাবা, আমি বাড়ি এসেছি। এত ঘন ঘন ফোন কোরো না। আমি কবে ফিরব বলতে পারছি না।’

ফোনের ওপার থেকে পুরুষ কণ্ঠ শোনা গেল— ‘তোমাকে ছেড়ে থাকতে আমার ভালো লাগে না। চিন্তা হয় খুব। তুমি ভালো করে জানো। তুমি ছাড়া আমার কেউ নেই।’

সুলগ্না বলল— ‘ঠিক আছে। আমি খুব শিগগিরি তোমার কাছে ফিরব।’ ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করল সুলগ্না।

সুনীতা মেয়েকে প্রশ্ন করলেন— ‘ছেলেটা কে? কী সম্পর্ক তোদের?”

সুলগ্না একটু চমকে উঠল। সে বলল— “তুমি জেগে আছো মা !”

সুনীতা বললেন— ‘যার মাথার উপর এত দায়িত্ব তার কি নিশ্চিন্তে ঘুম হওয়ার জো আছে! সুলগ্না চুপ করে গেল। সুনীতা মেয়েকে পুনরায় একই প্রশ্ন করলেন।

সুলগ্না না বোঝার ভান করে বলল— ‘কোন ছেলেটা?”

সুনীতা বললেন— ‘যার সঙ্গে একটু আগে ফোনে কথা বলছিলি। আমি তোর মা। আমাকে আড়াল করে কোনও কাজ করলে আমি ঠিকই জানতে পারব। মাকে কিছু লুকাতে নেই।”

সুলগ্না একটু ঢোক গিলে বলল— “মা, ওর নাম অর্পণ। আমরা একই হসপিটালে চাকরি করি। অর্পণ ওই হসপিটালে প্রায় দশ বছর চাকরি করছে। ওর বাবা-মা পাঁচ বছর হল মারা গেছে। আমাকে খুব ভালোবাসে। আমাদের সম্পর্ক দু’বছরের। বেঙ্গালুরুতে ওর নিজের ফ্ল্যাট আছে।’

সুনীতা সুলগ্নাকে জড়িয়ে ধরে বললেন— ‘তোর ভুল হচ্ছে না তো কোনও! অর্পণ তোকে সত্যিই ভালোবাসে তো? কেন জানি না ভালো কিছু শুনলেও আজকাল বিশ্বাস করতে কেমন ভয় হয়। কিছু শুরু হলেই মনে হয় কোনও অঘটনের সূচনা।’

—অর্পণ ভালো ছেলে। ও আমাকে ঠকাবে না। এইটুকু বলতে পারি। ও তো যে কোনও দিন রেজিস্ট্রি ম্যারেজ করতে রাজি। আমি বাধা দেওয়ায় সেটা হচ্ছে না।

—রেজিস্ট্রি ম্যারেজ করলেই তো ভালো ছেলে তা প্রমাণ হয় না। নিজের জীবনটা বড়ো অগোছালো হওয়ায় আতঙ্ক হয় তোর জীবন নিয়েও। একটা ভুল মানুষের সবকিছু বদলে দিতে পারে। ধরে নিলাম তোর কথা মতো অর্পণ ভালো ছেলে। তা বিয়েতে কেন তুই বাধা দিচ্ছিস?

মাতৃস্নেহ-ই হোক সন্তানের রক্ষাকবচ

শিশুর জন্মের সঙ্গে সঙ্গে মা ও শিশুর মধ্যে গড়ে ওঠে এক অটুট বন্ধন, মায়ের ভালোবাসা সে বন্ধনকে আরও দৃঢ় করে। মায়ের কোমল স্নেহের স্পর্শেই শিশু নিজেকে সব থেকে সুরক্ষিত মনে করে। শিশুর জন্মের সঙ্গে সঙ্গে তার সুরক্ষার পুরো দায়িত্ব মা নিজের হাতে তুলে নেন এবং দায়িত্ব সামলাতে সামলাতেই শিশুর প্রতিটি প্রয়োজন আসে মায়ের আয়ত্বে। নিজের উপর পূর্ণ আস্থা রেখে মা তার সন্তানকে সবদিক থেকে সুরক্ষা দিতে নিজেকে প্রস্তুত করে তোলেন। স্নান করানো থেকে শুরু করে তাকে খাওয়ানো, ঘুম পাড়ানো, ব্যথায় স্নেহের প্রলেপ লাগানো— সবই মা নিজের দায়িত্ব মনে করে পালন করেন।

খাওয়া, ঘুম বাদ দিয়েও সর্বক্ষণের জন্য মায়ের নজর থাকে সন্তানের দেখভালের উপর। অতিরিক্ত গরমে শিশুর যাতে কষ্ট না হয় বা খেলনা নিয়ে খেলতে গিয়ে দুধের শিশু যাতে নিজের কোনও ক্ষতি না করে ফেলে, তার প্রতিও থাকে মায়ের সজাগ দৃষ্টি। তাই বাচ্চাকে মানুষ করতে একজন নতুন মায়ের দরকার সর্বপ্রথম নিজের কনফিডেন্স গড়ে তোলা।

পরামর্শ

এই গরমের মরশুমে বাচ্চাদের ঘামাচির সমস্যা হয়ে থাকে। তবে সাবধানতা অবলম্বন করলে ঘামাচি রোধ করা সম্ভব। এই সময় যা যা করবেন—

  • গরমের সময় বাচ্চাকে ঢিলে এবং মোলায়েম সুতির পোশাক পরান। শিশুর শরীরে অস্বস্তি তৈরি করবে এমন কোনও পোশাক বাচ্চার জন্য বাছবেন না
  • বাচ্চার জন্য সবধরনের ট্যালকম পাউডার উপযুক্ত নয়। খালি রাইস স্টার্চ-যুক্ত পাউডারই লাগাবেন, যাতে বাচ্চাকে ফুসকুড়ি এবং র‍্যাশেজ থেকে বাঁচানো যায়
  • যেখানে ঘামাচি হয়েছে সেখানে সারাদিনে ২ থেকে ৩ বার পরিষ্কার জল দিয়ে ধুয়ে দিন বা স্পঞ্জ করে দিন
  • বাচ্চার জন্য অত্যন্ত সুগন্ধি সাবান বা তেল ব্যবহার করবেন না। কারণ এতে কেমিক্যাল থাকে, যেটা বাচ্চার স্পর্শকাতর ত্বকের ক্ষতি করতে পারে
  • বাচ্চার পা থেকে মালিশ শুরু করুন। হাতে তেল নিয়ে থাই থেকে মালিশ করা শুরু করে ক্রমশ নীচের দিকে নামুন বাচ্চার হাঁটু, গোড়ালি সর্বত্র মালিশ করুন। পায়ে আঙুল চক্রাকারে ঘোরান
  • বাচ্চার হাত-বুক-পিঠ মালিশ করুন
  • মালিশ করতে করতে বাচ্চা যদি কাঁদে, তাহলে কোলে নিয়ে বাচ্চাকে চুপ করান। দুধ খাওয়ার পর বা বাচ্চার শোওয়ার সময় মালিশ করবেন না।
  • বাচ্চার খাটের সঙ্গে লাগানো যায় সেরকম ঝুলন্ত খেলনা কিনুন। যাতে রঙিন ছোটো ছোটো হাতি, ঘোড়া, বাঘ, ভাল্লুক ইত্যাদি ঝোলানো থাকে সেটি বাচ্চাদের জন্য খুব ভালো। এটা দেখে বাচ্চা আনন্দ পায় এবং চোখের দৃষ্টির মাধ্যমে বাচ্চার কনসেনট্রেশনও বাড়ে
  • অনেক খেলনায় ঘণ্টা লাগানো থাকে। প্লাস্টিকের একটা রিং-এর মধ্যে ঘণ্টাগুলো থাকে। খেলনাটা খুব নরমও হয়। হাওয়ায় যখন ঘণ্টাগুলো নড়ে তখন তার থেকে মিষ্টি টুংটাং আওয়াজ হয়, যেটা শুনতে শুনতে বাচ্চা কান্না ভুলে চুপ হয়ে যায়
  • বাচ্চাদের হাতে খেলনা দেওয়ার আগে বড়োদের উচিত নিজেদের সেটা একবার পরীক্ষা করে নেওয়া। সঠিক মনে হলে তবেই বাচ্চার হাতে দেবেন
  • ৩-৪ মাস পর্যন্ত বাচ্চাদের মুখ থেকে লালা পড়ে। বিশেষ করে দুধ খাওয়াবার সঙ্গে সঙ্গে মুখ থেকে • দুধ ওগরাতে থাকে
  • দুধ খাওয়াবার পরে পরেই বাচ্চার সঙ্গে খেলা করা উচিত নয় বা বাচ্চাকে বেশি নাড়ানো, ঝাঁকানো উচিত নয়। দুধ খাওয়াবার পর বাচ্চাকে কাঁধে ফেলে ধীরে ধীরে পিঠ চাপড়ানো দরকার, যাতে বাচ্চার তাড়াতাড়ি ঢেকুর ওঠে এবং এতে দুধ হজম হতেও সুবিধা হয়
  • অনেক সময় ঠান্ডা দুধ খাওয়ালেও বাচ্চা মুখ থেকে দুধ তোলে, কারণ ঠান্ডা দুধ খেতে ভালো লাগে না বাচ্চার।

পরিবেশ দূষণের জন্য দায়ী কে বা কারা?

দিল্লির ক্রমবর্ধমান দূষণ নিয়ে উদ্বিগ্ন ‘কমিশন অন এয়ার কোয়ালিটি ম্যানেজমেন্ট’ এবং ‘দিল্লি দূষণ নিয়ন্ত্রণ কমিটি’। এই দুই ক্ষেত্র থেকে তিরস্কার করা হচ্ছে যে, শহরের ‘রেসিডেন্টস ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন’ শীতের রাতে প্রহরীদের হিটার সরবরাহ করে না। যার কারণে তারা কাঠ, পাতা, গাড়ির টায়ার ইত্যাদি পোড়ায় এবং পরিবেশে বায়ুদূষণ ছড়ায়। কৃষকরাও নাকি আবর্জনা জমা করে পরিবেশকে দূষিত করছে। আসলে, নৈশপ্রহরী, কৃষক এবং ‘রেসিডেন্টস ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন’-কে সফট টার্গেট করে, তাদের দোষারোপ করা হচ্ছে।

এই কমিশন এবং কমিটির যদি সাহস থাকে, তাহলে তাদের উচিত সেইসব ভণ্ড ধার্মিকদের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠা, যারা প্রতিদিন শহরের কোণায় কোণায় ধর্মের নামে যজ্ঞ করে ঘি, কাঠ, তেল পোড়ায়। রাস্তার ধারে অবৈধ ভাবে নির্মিত ধর্মক্ষেত্রগুলোতে বৈদ্যুতিক বাল্বের নীচেও প্রতিমার সামনে দিনরাত বর্জ্য তেল দিয়ে জ্বালানো হয় প্রদীপ। জ্বলতে থাকে অসংখ্য ধূপকাঠি এবং মোমবাতিও। এইসবের মাধ্যমেও যে পরিবেশ দূষিত হচ্ছে, সেই বিষয়ে কারও কোনও ভ্রুক্ষেপ নেই। আসলে, ধর্মের নামে যে দূষণ হয় এবং সেই দূষণও যে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়, তা কখনও দূষণ নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের নজরে পড়ে না। সেইসঙ্গে, পুজোয় ব্যবহৃৎ ফুলপাতা এবং অন্যান্য সামগ্রী জলে বিসর্জন দিয়ে জলকে যেভাবে দূষিত করা হচ্ছে, তা নিয়েও ভাবার সময় এসে গেছে।

পরিবেশে কার্বন ডাই-অক্সাইড যতটা সম্ভব কমানোর চেষ্টা করতে হবে, এটাই তো আশা করা যায় ‘দূষণ নিয়ন্ত্রণ’ কমিশন-এর থেকে। আসলে ধর্মের মোহর লাগানো থাকায়, সবার মুখ বন্ধ। কিন্তু মনে রাখতে হবে, অপকর্ম করে হাজার-লক্ষ প্রদীপ জ্বালিয়েও ভগবানকে খুশি করা যাবে না। এর ফলে শুধু দূষিত হবে পরিবেশ।

বাড়িতে খাবার রান্না হলে গ্যাস জ্বালাতেই হবে, এটুকু বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজন কিন্তু ধর্মস্থানে দিনরাত মোমবাতি জ্বালিয়ে রাখা বোকামি। এ শুধু বাতিক বা কুসংস্কার ছাড়া আর কিছু নয়। এর ফলে যে কতটা দূষণ ছড়াবে, সেই হিসেব করার সাহসও কারও নেই। আর নৈশপ্রহরীদের ঠান্ডার হাত থেকে বাঁচানোরও বিকল্প ব্যবস্থা করতে হবে। নয়তো কাঠ, পাতা কিংবা গাড়ির টায়ার জ্বালানো বন্ধ করা যাবে না।

মনে রাখতে হবে, পোশাক আবিষ্কৃত হওয়ার আগেও বিশ্বজুড়ে মানুষ কয়েক শতাব্দী ধরে উষ্ণতার জন্য কাঠ, পাতা জ্বালিয়ে আগুনের প্রয়োজন মেটাতো। কিছু প্রাণী মাটির নীচে গিয়ে ঘুমোয়, কিছু প্রাণীর গায়ে এত লোম থাকে যে, তারা প্রবল ঠান্ডায়ও বেঁচে থাকতে পারে। তাই, নৈশপ্রহরী কিংবা কৃষকদের বেঁচে থাকার বিষয়টিও সহানুভূতির সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত।

মহিলাদের রন্ধন প্রতিভার প্রশংসা করুন

একটা সময় ছিল যখন রান্নার বিষয়টি সীমাবদ্ধ ছিল শ্বশুরবাড়ির হেঁসেলে। অর্থাৎ, বিয়ের আগে মায়ের বাড়িতে থেকে মেয়েদের রান্না করা শিখতে হতো বাধ্যতামূলক ভাবে। কারণ, শ্বশুর বাড়িতে গিয়ে রান্না করতেই হতো তখন। কিন্তু এখন ছবিটা বদলে গেছে। নিজের সংসারে রান্না করা কিংবা না-করা এখন মেয়েদের নিজস্ব সিদ্ধান্তের উপর নির্ভর করে। কেউ যদি না চান তাহলে তিনি রান্নার লোক রেখে রান্না করিয়ে নিতে পারেন কিংবা রেস্তোরাঁ থেকে খাবার আনিয়ে নিতে পারেন। আর এটা এখন সম্ভব হচ্ছে কারণ মেয়েরাও এখন উপার্জন করেন। তাই তাদের সংসার এখন অনেকটাই আর্থিক ভাবে সচ্ছল। তাছাড়া, রান্না কিংবা সংসারের কাজে এখন স্বামীরাও অনেকটাই সাহায্য করেন। তাই, মেয়েরাও এখন ঘরে-বাইরে সমান তালে কাজ করার সুবিধে পাচ্ছেন।

আবার যারা নানারকম পদের রান্নায় পারদর্শী, তারা তাদের এই গুণটিকে কাজে লাগিয়ে অর্থ উপার্জন করার কথা ভাবতে পারেন। অবশ্য শুধু ভাবনার স্তরেই আটকে নেই বিষয়টি। এমন অনেকে আছেন, বিশেষকরে যারা ভালো রান্না করতে পারেন কিংবা শিখেছেন, অর্থাৎ রান্নার কাজটি বেছে নিয়েছেন প্যাশনেটলি— তারা এটিকে পেশায় পরিবর্তন করে নিয়েছেন কিংবা নিতে উদ্যোগ নিয়েছেন। কেউ বড়ো হোটেলের হেঁশেল সামলাচ্ছেন, কেউ আবার রান্না করে বাড়ি বাড়ি খাবার পাঠিয়ে আয় করছেন কিংবা রেস্তোরাঁ খুলে নিয়েছেন। মোটকথা, রান্না করার বিষয়টির মধ্যে এখন কোনও লজ্জার বিষয় নেই, বরং এর মাধ্যমে কর্মসংস্থান হচ্ছে, ব্যবসায়িক ভিত শক্ত হচ্ছে।

সম্প্রতি একটি বিষয় নজরে এসেছে, এখন কুকিং কম্পিটিশন বেশ চলছে। কোথাও এই ধরনের রান্নার প্রতিযোগিতা হলেই দেখা যাচ্ছে হাজার হাজার আবেদনপত্র জমা পড়ছে। শুধু তাই নয়, আরও বেশি মানুষকে অংশগ্রহণে আগ্রহী করে তুলতে হোয়াটসঅ্যাপ-কেও রেজিস্ট্রেশনের মাধ্যম করা হচ্ছে এবং দারুণ সাড়াও পাচ্ছেন কুকিং কম্পিটিশন-এর আয়োজকরা। প্রতিযোগিতায় রাখা হচ্ছে কাস্টমাইজড রেসিপি। অংশগ্রহণকারীরা এইসব রেসিপির সাহায্যে তাদের পছন্দের পদ রান্না করে তার ছবি শেয়ার করতে পারছেন সোশ্যাল মিডিয়ায়। রান্না করা প্রতিটা পদের জন্য প্রতিযোগী পাচ্ছেন পুরস্কার, উপহার এবং সম্মান।

রান্নাবান্নার এই জমজমাট অনুষ্ঠানগুলি বিভিন্ন ওটিটি প্ল্যাটফর্ম-এ এমনকী সোশ্যাল মিডিয়ায়ও সম্প্রচার করা হচ্ছে এখন এবং জনপ্রিয়তাও পাচ্ছে। অতএব, যেসব মহিলারা খাওয়াদাওয়া এবং রান্নাবান্না নিয়ে কোনও উদ্যোগ গড়ার স্বপ্ন দেখেন, তাদের উৎসাহ প্রদান করা উচিত। এতে ওরা যেমন অনুপ্রাণিত হবেন, ঠিক তেমনই ওরা খুশি থাকলে সংসার সুখের হবে এবং পরিবারের সদস্যরাও খুশি থাকবেন।

মিষ্টি গল্প

জানলার কার্নিশে চুপটি করে বসে আছে দিতি। ও বাড়ির ছাদে মিনু বউদির চার বছরের ছেলেটি খেলছে। অন্যদিন দিতি ডেকে ডেকে ওর সাথে কথা বলে। কিরে শুটকি কী করিস, কী খেলিস? ভারি মিষ্টি লাগে শুনতে আধো আধো কথা। আজ দিতি চুপ করেই রইল। ওর মনে আজ অন্য সুর।

কত কী ভেবেছিল! আজকের দিনটি স্পেশাল হবে সবার জন্য! বিশেষ করে কাকাই-এর জন্য একটা সারপ্রাইজ থাকবে, সারপ্রাইজটা পেয়ে কাকাই ওকে জিজ্ঞেস করবে, ‘কী খাবি বল তো দিতি মা!’ দিতি ফস করে বলবে, “আম সন্দেশ, নলেন গুড়ের রসগোল্লা, ফুচকা, আইসক্রিম।’ খুব মজা হবে হই-হুল্লোড় হবে। কিন্তু হিসেব গরমিল হয়ে গেল। কাকাই যে ওর উৎসাহে এমন ভাবে… কাকাই ওর রোল মডেল, অথচ…!

বাবা, মা বাড়িতে কেউ নেই, থাকলেই বা কী হতো! আকাশ পাতাল কত কী ভাবছে দিতি। হঠাৎ হাওয়ায় সরসর করে টেবিলের উপর থেকে পেনটা ঠকাস করে মেঝেতে পড়ল। বড্ড বিরক্ত দিতি। এক লাফে মেঝেতে নেমে কলমটা তুলে প্রায় ছুঁড়ে ড্রয়ারে রেখে দিল। খাতাটাও ড্রয়ারে রেখে দিল। যাহ! সব বাদ, সব বন্ধ! এখন ওর একটাই চিন্তা হবে একটা ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে কোনওরকমে ঢুকে, ডিগ্রি নিয়ে চাকরি জোগাড় করা। দেয়ালে ওর হাতে আঁকা রোনাল্ডিনহোর মুখ। পেনসিল স্কেচ আঁকা রোনাল্ডিনহোর মুখে মিষ্টি একটা হাসি, একেবারে যেন জীবন্ত। ও এঁকেছিল। কাকাই দেখে অবাক, খুব খুশি হয়ে কাকাই ছবিটাকে বাঁধিয়ে রেখেছে। আরিব্বাস এ মেয়ে তো ভার্সেটাইল জিনিয়াস।

মাকে বলেছিল, ‘বউদি, আমি ওকে গড়েপিটে তুলব। দেখবে দারুণ হবে তোমার মেয়ে, দশের মধ্যে এক।”

অথচ সেই কাকাই! মানুষের কত রূপ, কত পরিবর্তন। মানুষও যেন ক্যামিলিয়ানের মতো রং বদলায়।

ক’দিন ধরেই দিতির মনে খুশির হিল্লোল ছিল তবে কাউকে বুঝতে দেয়নি, জানতে দেয়নি। সারপ্রাইজটা সেইদিনই দেবে ঠিক করে রেখেছিল। ওর লেখা একটি গল্প এক জনপ্রিয় পত্রিকায় ছাপা হবে। সম্পাদকমশাই নিজে ফোন করে জানিয়েছেন, শুনেই খুশিতে ডগমগ হয়ে উঠেছে দিতি।

ওহ, এত আনন্দ! এত আনন্দ! এমন একটি ঐতিহ্যমণ্ডিত পত্রিকা! কাকাইও লিখত। খুব শখ ছিল ওই পত্রিকা কাকা-র লেখা নেবে, কিন্তু হয়ে ওঠেনি। দিতির এই গল্পটা কাকাই এডিট করেছিল। পড়ে বলেছিল ভারি মিষ্টি গল্পটি। দিতি গল্পটির নাম দে, ‘মিষ্টি গল্প’। সেই মিষ্টি গল্পটিই ছেপে বেরোচ্ছে। কাকাই খুব খুব খুশি হবে।

গতরাতে তো ঘুমই হয়নি দিতির। কখন যে সকাল হবে! একটু চোখ লাগতে না লাগতেই ঘুম ভেঙে যায়। বারান্দায় যাচ্ছে আর আসছে। ঘর বার করছে, কখন পেপার দাদু আসবে! সাত সকালে টিং টিং বেল বাজতেই ছুটে এসেছে,

—বইটা এনেছ পেপার দাদু?

—হ্যাঁ হ্যাঁ, তোমার জিনিস ভুলি কী করে দিদি? সেই হিম্মত কি আমার আছে!

পেপারের সাথে পত্রিকাটি হাতে নিয়ে নিজের ঘরে ঢুকে ময়ূরের মতো কিছুক্ষণ নেচে নিল। খুলে নিজের লেখাটির উপর হাত বোলাল। দুই পাতার ‘মিষ্টি গল্প’। বাহ, কেমন সুন্দর ছবি দিয়েছে। মন ভরে গেল। আনন্দে উত্তেজনায় বুকের ভিতর ধুকপুকুনিটা বেড়েই চলছে। বই বুকে জড়িয়ে দে ছুট দোতলায় কাকাইয়ের ঘরে। ঘরের সামনে এসে থমকে গেল, দরজা বন্ধ। ঘুমোচ্ছে? ডেকে তোলা ঠিক হবে না। কাল অনেক রাত পর্যন্ত এই ঘরে লাইট জ্বালানো ছিল। কাকাই অনেক রাত পর্যন্ত পড়াশোনা করে, কাম্মা অবশ্য ঘুমিয়ে পড়ে। থাকুক ডেকে কাজ নেই, বরং ঘরে গিয়ে অন্য লেখাগুলো দেখা যাক৷ ভালো করে পড়া যাক।

ঘরে নিজের বিছানায় গা এলিয়ে বইয়ের মধ্যে ডুবে গেল দিতি। অনেকগুলো গল্প প্রবন্ধ কবিতা! হঠাৎ কান্নার ডাকে হুশ ফিরল,

—কিরে ন’টা যে বেজে গেল কখন উঠবি? আজ এত দেরি কেন রে? কলেজ ছুটি তাই?

হুড়মুড় করে উঠে বসল দিতি। সত্যি অনেক বেলা হয়ে গেল। বইটা দেখতে দেখতে ঘুমিয়েই পড়েছিল।

–কাম্মা, কাকাই উঠেছে?

—উঠেছে মানে! বাজার করে পর্যন্ত ফিরে এসেছে। একটু আগে তোর মায়ের ফোন এসেছিল, ওরা খুব ভালো আছে আর খুব ঘুরছে।

বইটা বুকে চেপে ছুট লাগাল। কাম্মা চিৎকার করে উঠল, “ওরে পাগলি ধীরে ধীরে, পড়বি তো! দেখিস যেন হাত পা না ভাঙে।’ একদমে ছুটে এসে কাকাই-এর সামনে দাঁড়াল। দুই হাতে বুকের উপর বইটা পরম সোহাগে জড়ানো। চোখ বড়ো বড়ো করে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ কাকাইয়ের দিকে। চোখে পলক পড়ে না। নিঃশ্বাস-প্রশ্বাস দ্রুত ওঠানামা করছে। কাকাই কী বলবে এবার! দারুণ সারপ্রাইজ! ফিস ফিস করে বলল, “কাকাই সেই, মিষ্টি গল্প দেখো পত্রিকায়…।’ কাকাই কেমন যেন ভাবলেশহীন।

—কিছু বলবি? কী হয়েছে?

—সেই মিষ্টি গল্প। তুমি এডিট করেছিলে। দেখো ছবিটাও কেমন মিষ্টি। তোমার প্রিয় পত্রিকায় আজ বেরিয়েছে।

—তাই নাকি। আচ্ছা। বেশ।

—কখন পড়বে কাকাই?

—আজ খুব ব্যস্ত আছি রে মা। রেখে দে টেবিলে, পরে দেখব।

—তোমার সবচাইতে প্রিয় পত্রিকা কাকাই।

—হ্যাঁ আগে খুব পড়তাম, এখন আর সে মান নেই। এখন লেখাগুলো আগের মতো ধারালো নয়, শাঁসালো নয়। যা পায় তাই ছাপে। রেখে দে, রেখে দে, পরে দেখব।

দিতির দুই চোখের উজ্জ্বল দ্যুতি হঠাৎ নিভে গেল। একেবারে কেমন পালটি খেল কাকাই! ওর উৎসাহে এমন ভাবে জল ঢেলে দিল! ওর লেখার মান নেই! যেই না ওর লেখা বেরোল সেই সঙ্গে পত্রিকার মান নেমে গেল! ধোপা যেমন পাথরে কাপড় বাড়ি মারে ঠিক তেমনই ওর বুকে কেউ যেন ঠাস ঠাস করে মারল। এত কান্না পাচ্ছে, পা আর সরছে না।

নিজের ঘরে এসে বসল, খুব কান্না পাচ্ছে। দু’ফোঁটা জল গড়িয়েই পড়ল, আটকাতে পারল না দিতি। এত আনন্দ, উত্তেজনা, এক ফুৎকারে একেবারে নিভে গেল। অথচ কাকাই …! বাবা-মাকে জানায়নি এখনও দিতি। আর জানাবেও না। কী হবে! মা তো বলেই বসবে, “লিখে কি আর তোমার পেট ভরবে? মন দিয়ে পড়াশোনা করো। ভালো নম্বরে ভালো চাকরি। এখন এসব শখ ছাড়ো। লিখে পেট ভরবে না।’

মা একেবারে মিছে অবশ্য বলে না। ঠিকই, রোজগার তো করতেই হবে নইলে উদরপূর্তি হবে কী করে? সবাই কেবল উদরপূর্তির কথাই ভাবে। মনের ফুর্তির কথা কেউ ভাবে না। একজন লেখকই জানে লিখে তার কতটা মনের ফুর্তি হয়। সেটির কি কোনও দাম নেই! ঠিকই, লেখক-এর যেন কোনও পাত্তাই নেই! এক একটি লেখার পিছনে এত এত পরিশ্রম থাকে অথচ কারও হুঁশ নেই, সবার-ই টাকার চিন্তা। কত পেলে? যখন শোনে খুবই সামান্য কিংবা কিছুই হয়তো পায় না, তখন বলতে তাদের মুখে এতটুকু বাধে না— তবে তো এ সবই ভুতের বেগার খাটা, নাই কাজ তো খই ভাজ। লেখা যেন সহজলভ্য জল-ভাতের মতো হয়ে দাঁড়ায়।

আজ মনে অনেক উথাল-পাথাল হচ্ছে। ভাবছে লেখাটা ছেড়েই দেবে। কিন্তু ছেড়ে দিতে চাইলেই কি আর ছেড়ে দেওয়া যায়? এ তো দমকা হওয়ার মতো মনের ভিতর থেকে স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে ছুটে আসে। কেউ কি আটকাতে পারে নাকি আটকানো যায়? না আটকানো উচিত? জোর করে বন্ধ করা মানে, লেখক সত্তাকে গলা টিপে হত্যা করা। একটি সুস্থ মানুষের সুচিন্তিত সুস্থ ভাবুক মন পঙ্গু করে দেওয়া।

সারাটা দিন বড়ো ম্যাড়মেড়ে কাটল। সন্ধের আগে একটু বেরোল দিতি। একাই চক্কর কেটে এল খানিকক্ষণ। বাড়িতে দম বন্ধ হয়ে আসছে। মণিদা আর লিনি পিসির সাথে দেখা হল। কাউকেই ওর লেখার কথা কিছু বলল না। কাকাই-এর কাছ থেকে এত বড়ো আঘাত পাওয়ার পর আর ওর মুখে রা-টি নেই। মন ভেঙে গেছে, বড়ো হতাশ লাগছে। সন্ধের পর ছাদে মাধবীলতার পাশটিতে গিয়ে দাঁড়াল। চারিদিকে গভীর অন্ধকার। মাধবীলতার দিকে খানিক তাকিয়ে রইল, একটু হাত বুলিয়ে দিল সোহাগে। আহারে এই মাধবীলতা ওর গল্পে বেশ কয়েকবার উঠে এসেছে, কত ভাবে বর্ণনা করেছে। ওরও কপাল মন্দ। ভেবেছিল মাধবীলতাকে গল্পে বাঁচিয়ে রাখবে, ওর প্রিয় গাছ।

দুই চোখে জল টলটল করছে এমন সময় কান্নার কথা কানে এল। পাশেই কাকাই-এর ঘর। দিতি মোটেই আড়ি পাতেনি, আড়ি পাতা ওর স্বভাব নয়। তবে কথাগুলো স্পষ্ট ওর কানে বাতাসের সাথে ভেসে এল।

কাম্মা বলছে, “কী গো তুমি মেয়েটাকে অমন আঘাত দিলে কেন? সারাদিন মনমরা হয়েছিল? ঠিক যেন চাবুকের বাড়ি মেরেছ। এত আনন্দ নিয়ে এসেছিল! মনটাই খারাপ করিয়ে দিলে।’

—গিন্নি, জানো তো ঘোড়াকে চাবুক মারতে হয়। শুধু চাবুক নয়, যোদ্ধাদের পায়ের জুতোর সামনে লোহার একটা ভোঁতা পেরেক থাকে। দরকারে ওটা দিয়ে মারে।

—সেই তো! কেন যে এত নিষ্ঠুরতা!

—গিন্নি, ঘোড়াকে যত চাবুক মারবে, যত আঘাত করবে, তত ছুটবে। তত সে নিজের লক্ষ্যে পৌঁছোবে এবং পৌঁছোতে পারে। নইলে ঘোড়া বিন্দাস হাওয়া খেতে খেতে এলোমেলো ঘুরতে থাকে।

—তার সাথে এর কী সম্পর্ক?

—আরে বাবা তুমি উকিলের বউ হয়েও কিছুই বুঝলে না। এখনই যদি দিতি-কে অনেক বাহবা দিই, “দারুণ’, ‘দারুণ’ বলি, ওর লেখার মান একই জায়গায় থেমে থাকবে। ও বেশি দূর এগোতে পারবে না। ও অতটুকুতেই সন্তুষ্ট থাকবে।

—তাই বলে…!

—হ্যাঁ, তাই এমন আঘাত দিলাম। দেখবে ওর জেদ আরও বাড়বে, এই আঘাতই ওকে তাড়িয়ে নিয়ে যাবে। তুমি কী ভেবেছ? গতকাল রাতেই আমি পত্রিকাটি কিনে এনে বারে বারে পড়েছি। চমৎকার লিখেছে আমার দিতি। যেমন শব্দ চয়ন, তেমনই সহজ সরল, তেমনই আবেগ। দারুণ দারুণ দারুণ, অফিসে সবাইকে দেখালাম। গর্বে আমার বুক ভরে উঠেছে। ওর গল্পগুলো যেন নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা, সহজ সরল মিষ্টি গল্প।

—কিন্তু ও কি বুঝবে! দিতি কিন্তু ভারী অভিমানী। পরে যদি সেই অভিমানটাই মনে ধরে বসে থাকে!

—আরে দাঁড়াও না, দু’দিন দেখি। পরে ঠিক আমি ওকে বুঝিয়ে বলব। তুমি চিন্তা কোরো না। দিতি যথেষ্ট বুদ্ধিমতী মেয়ে।

মাধবীলতার পাশে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দিতির হঠাৎ আকাশ সমান আনন্দ হল। মনটা ভালো হয়ে গেল। উফ দারুণ খুশি। মাধবীলতাকে আরেকবার ছুঁয়ে নিল। ছুটে নিজের ঘরে পা বাড়াতেই, উহ মাগো। ওর লম্বা একগুচ্ছ কালো চুল মাধবীলতায় পেঁচিয়ে গেছে। দিতির লেখক মন বুঝে নিল মাধবীলতাও মনের আনন্দে ওকে পেঁচিয়ে ধরেছে। কোনওরকমে চুল ছাড়িয়ে নিয়ে নিজের ঘরে এল। উত্তেজনায় থরথর! কী করবে! কাকাই-কে আজ আরেকবার নতুন করে জানল, নতুন করে চিনল, আরও যেন শ্রদ্ধা বেড়ে গেল।

টেবিলের ড্রয়ারের ফাঁক দিয়ে কলমটা উঁকি দিচ্ছে, ওর প্রিয় অস্ত্র। হাতে চেপে ধরল, কলমটায় চুমু খেল। লিখবে ও আবার লিখবে, অনেক অনেক লিখবে। নিজের মনকে উজাড় করে দেবে। ভরে উঠবে সাদা কাগজ একের পর এক। কিন্তু কী লিখবে! আচ্ছা আজকের এই হাসি-কান্না ভরা খুশির দিনটাই না হয় লেখা যাক, মিষ্টি একটা গল্প হবে।

পড়ার জন্য সীমাহীন গল্প-নিবন্ধসাবস্ক্রাইব