‘লেখাপড়া করে যে, গাড়িঘোড়া চড়ে সে’– এমন প্রবাদ শুনতে শুনতে বড়ো হয়েছি আমরা। অর্থাৎ, শিক্ষালাভের মাধ্যমেই যে জীবনে সাফল্যলাভ করা যায়, এই সারমর্মটুকু ছোটোবেলাতেই মাথায় গেঁথে দিতে চেয়েছেন আমাদের মা-বাবা কিংবা শুভাকাঙক্ষী গুরুজনেরা।
আসলে, সন্তানকে উচ্চশিক্ষিত করে তোলা কিংবা সঠিক শিক্ষাদানের জন্য যে-ভাবে কঠিন পরিশ্রম করতে হয় বাবা-মাকে এবং যে-পরিমাণ অর্থের জোগান দিতে হয় তাদের, তা যাতে সার্থকতালাভ করে,– সেই বিষয়টিই নানা কথায় স্মরণ করিয়ে দিতে চান সন্তানকে। অবশ্য, সন্তানের বোধবুদ্ধি হওয়ার পর তবেই তারা মা-বাবার পরামর্শ মেনে চলতে চেষ্টা করবে কিন্তু মা-বাবাকে দায়িত্ব পালন করতে হবে সন্তান জন্মলাভের পর থেকেই।
আধুনিক সমাজব্যবস্থায় শিক্ষার ধরন বদলেছে। তাই মা-বাবারাও চিন্তাধারার পরিবর্তন আনতে বাধ্য হয়েছেন। এখন বাংলা মাধ্যমের তুলনায় ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে লেখাপড়া ভালো হয়, এমন ধারণা থেকে ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে পড়ানোর প্রবণতা বাড়ছে। তাছাড়া ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে পড়লে ইংরেজি ভাষাটা ভালো ভাবে র৫ করতে পারবে এবং পৃথিবীর যে-কোনও প্রান্তে কর্মজীবনকে সাফল্যমন্ডিত করতে পারবে, এমন ধারণাও তৈরি হয়েছে অভিভাবকদের মনে। অপ্রিয় হলেও, হয়তো কথাটা সত্যি। তাই ইংরেজি মাধ্যম স্কুুলের চাহিদা বাড়ছে এবং এই সুযোগে স্কুল কর্তৃপক্ষও পঠনপাঠনের জন্য আর্থিক বোঝা চাপিয়ে চলেছে অভিভাবকদের ওপর। আর সন্তানের শিক্ষাখাতে খরচ হওয়া এই বিপুল পরিমাণ অর্থের জোগান দিতে হিমসিম খাচ্ছেন মা-বাবারা। কিন্তু যদি পরিকল্পনামাফিক ব্যয়বরাদ্দ করা যায় সন্তানের শিক্ষাখাতে, তাহলে আর্থিক ঝামেলায় পড়ার সম্ভাবনা কমবে। যেমন অনেকে বড়ো কোনও স্কুলে ছেলেমেয়েকে ভর্তি করিয়ে দুই-তিন ক্লাস পড়ানোর পর আর আর্থিক বোঝা না নিতে পেরে ওই স্কুল থেকে ছাড়িয়ে নেন। আবার অনেক পরিবারে, বিশেষকরে গ্রাম বা মফস্সলের কিছু অভিভাবক টাকাপয়সা না জমিয়ে ছেলেমেয়েকে পড়াতে গিয়ে বিফল হন। বাংলা মাধ্যম স্কুলে পড়িয়েও আট-দশ ক্লাস-এর বেশি আর টানতে পারেন না ছেলেমেয়ের লেখাপড়ার খরচ। ফলে, অর্ধসমা৫ থেকে যায় সন্তানের শিক্ষা। তাই এরা জীবনে তেমন প্রতিষ্ঠা পায় না। অতএব, সন্তানের শিক্ষাখাতে সঠিক ব্যয়বরাদ্দের জন্য আগাম পরিকল্পনা জরুরি।
সন্তানের শিক্ষাজীবনকে তিনটি পর্বে ভাগ করে নিন প্রথমে। প্লে স্কুল থেকে ক্লাস ফোর পর্যন্ত ধরে নিন প্রথম পর্ব। ফাইভ থেকে টেন পর্যন্ত দ্বিতীয় পর্ব এবং তারপরের উচ্চশিক্ষা কিংবা পেশাগত শিক্ষাকে রাখুন তৃতীয় পর্বে। এবার সঞ্চয় পর্ব।
সন্তান জন্ম নেওয়ার পর থেকে টাকা জমানো শুরু করুন। এক্ষেত্রে আগাম সময় পাবেন আড়াই বছর। কারণ, সন্তানের আড়াই বছর বয়স থেকে শুরু হয় শিক্ষাজীবন।
ডায়ারি, পেন অথবা কম্পিউটার কিংবা ল্যাপটপ নিয়ে বসুন প্রথমে। প্রথমে লিখুন আপনার মাসিক আয়ের পরিমাণ। তারপর নানা খাতে ব্যয়ের পরিমাণ হিসাব করার পর দেখুন কতটা টাকা বাঁচাতে পারলেন। এরপর সন্তানের আড়াই বছর বয়স পর্যন্ত, অর্থাৎ ত্রিশ মাস টাকা জমাতে থাকুন। এরই পাশাপাশি, খোঁজ নিন বিভিন্ন স্কুলের ভর্তি বাবদ এবং টিউশন ফিজ ইত্যাদি খরচের পরিমাণের বিষয়ে। এবার আপনার আর্থিক সামর্থ্যের কথা মাথায় রেখে সিদ্ধান্ত নিন, কোন স্কুলে ভর্তি করলে নিশ্চিন্তে সন্তানকে সঠিক শিক্ষাদান করতে পারবেন। এক্ষেত্রে মাথায় রাখবেন, নিউক্লিয়ার ফ্যামিলিতে স্বামী-স্ত্রী দু’জনেই যদি চাকুরিজীবী হন, তাহলে সন্তানকে হয় ডে-কেয়ার অথবা ক্রেশ-এ কিংবা ‘আয়া-মাসি’র কাছে রাখতে হবে এবং এরজন্য আরও পাঁচ-সাত হাজার টাকা খরচ হবে প্রতি মাসে।
এই প্রসঙ্গে উল্লেখ্য, বাচ্চার অ্যাডমিশন বাবদ মোটামুটি পঞ্চাশ হাজার টাকা থেকে এক লক্ষ টাকা খরচ আছে ভালো ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়াতে গেলে। এরপর আছে স্কুল ড্রেস, বইখাতা এবং মান্থলি স্কুল ফিজ। প্রায় সব ভালো ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে এক থেকে দু’হাজার টাকা মান্থলি ফিজ নিয়ে থাকে নার্সারি থেকে ক্লাস ওয়ান পর্যন্ত। এরপর ক্লাস ফোর পর্যন্ত তা দাঁড়ায় মোটামুটি আড়াই হাজার টাকার মতো।
ক্লাস ফাইভ থেকে খরচ কিছুটা বাড়বে। কারণ, বেশিরভাগ স্কুলে ক্লাস ফাইভ থেকে সবরকম ফিজ বাড়িয়ে দেওয়া হয়। এরসঙ্গে পড়ার চাপ বাড়লে হোম ওয়ার্ক-এর জন্য যদি হোম টিউটর রাখেন তাহলে খরচ আরও কিছুটা বাড়বে এবং এই ব্যয়ের পরিমাণ প্রতিবছরই কিছুটা বাড়তে থাকবে। তাই সেইমতো ব্যয়বরাদ্দও করতে হবে মা-বাবাকে।
তৃতীয় পর্ব, অর্থাৎ দশ ক্লাস পাশ করার পর যেমন ‘বিভাগ’ বেছে নেবে আপনার সন্তান, খরচের পরিমাণটাও তেমনই হবে। অর্থাৎ, আর্টস, কমার্স এবং সায়েন্স এই তিন বিভাগে পড়ার খরচও আলাদা। সবচেয়ে বেশি খরচ সায়েন্স বিভাগে। এছাড়া, স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর পর্যায়ের খরচের পরিমাণ বাড়বে ক্রমান্বয়ে। আর যদি ডক্টর, ইঞ্জিনিয়ার, চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্ট বানাতে চান কিংবা অন্য কোনও কারিগরী শিক্ষা দিতে চান আপনার সন্তানকে, তাহলে খরচের বিষয়ে খোঁজ খবর করে সেইমতো ব্যয়বরাদ্দ করুন। এরজন্য শিক্ষামূলক যোজনায় টাকা জমান অথবা রেকারিং অ্যাকাউন্ট-এ টাকা রাখুন। এরপরও যদি আর্থিক ঘাটতি থাকে, তাহলে এডুকেশনাল লোন নিতে পারেন। উচ্চশিক্ষার প্রয়োজনীয় পেপার্স ব্যাংক-এ সাবমিট করে লোনের জন্য আবেদন করুন। এক্ষেত্রে অবশ্য আপনার সন্তানকে মেধাবী হতে হবে এবং ভবিষ্যতে উপার্জনের প্রবল সম্ভাবনা থাকতে হবে।
অনেকেই হয়তো ‘সোরিয়াসিস’ শব্দটির সঙ্গে পরিচিত নন। অবশ্য পরিচিতি না থাকাটাই স্বাভাবিক। কারণ, এটি চিকিৎসা পরিভাষা। আসলে, সোরিয়াসিস হল এক ধরনের চর্মরোগ। সাধারণ ভাবে পুরুষদের তুলনায় এই রোগ বেশি হয় মেয়েদের। তবে রোগটি সাধারণ হলেও, এর ব্যাপক কুপ্রভাব পড়তে পারে শরীরে এবং মনে। তাই, সতর্কতা জরুরি। ডা. অভিষেক দে রোগটি সম্পর্কে বিস্তারিত জানালেন সম্প্রতি।
সোরিয়াসিসে আক্রান্ত হওয়ার কারণ কী?
একমাত্র বংশগত কারণ ছাড়া, সোরিয়াসিস রোগের নির্দিষ্ট কোনও কারণ নির্ণয় করা দুরূহ। তবে এটি ত্বকের প্রদাহজনিত একটি রোগ। কোশ বৃদ্ধির হার অস্বাভাবিক হারে বেড়ে গেলে এই রোগ হয়।
সোরিয়াসিস-এ আক্রান্ত হলে বোঝা যাবে কীভাবে?
সোরিয়াসিস-এ আক্রান্ত হলে দেহের বিভিন্ন অংশ যেমন– হাত, পা, বাহু, কনুই এবং হাঁটুর চামড়া ফেটে যায়, আঁশযুক্ত ও লাল-লাল দাগ হয়ে যায়। অনেক সময় ফুসকুড়ি বেরোয়।
এই সময় কী রকম সমস্যা হয় রোগীর?
সোরিয়াসিস-এর লক্ষণ দেখা গেলে নানারকম শারীরিক অস্বস্তি হয়। চামড়ার ওই অংশে চুলকানি হতে পারে, জ্বালা ভাব হতে পারে, এমনকী রক্তও পড়তে পারে।
কী প্রভাব পড়ে শরীরে?
সোরিয়াসিসের প্রভাব পড়তে পারে দেহের হাড়ের সন্ধির ওপর। এতে চলাফেরায় অসুবিধা হতে পারে এবং অক্ষমও হয়ে পড়তে পারেন। এছাড়া, যাদের সোরিয়াসিস রয়েছে তাদের ডায়াবেটিস, হার্টের রোগ, চোখের অসুখ এমনকী মানসিক অবসাদে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়।
বিশেষজ্ঞ হিসাবে কী পদক্ষেপ নেন প্রথমে?
চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ হিসাবে, যখন প্রথম আমরা কোনও রোগীকে দেখি, তখন আমাদের প্রাথমিক গুরুত্ব থাকে চামড়ার ওপর সোরিয়াসিসের দৃশ্যমান লক্ষণগুলিকে পরীক্ষা করে দেখা, অবস্থাটাকে নির্ণয় করা এবং উপযুক্ত চিকিৎসার পরামর্শ দেওয়া। আমরা প্রায়ই এটা দেখতে পাই যে, একাধিক কারণে মহিলাদের ওপর সোরিয়াসিসের নেতিবাচক প্রভাব বেশি পড়ে। ফলে আমাদের দায়িত্ব এসে পড়ে সেই সমস্যাগুলির মোকাবিলা করা এবং এটা নিশ্চিত করা যাতে রোগীরা প্রয়োজনীয় যত্ন পান।
সোরিয়াসিসে আক্রান্ত হলে কতটা মানসিক অবসাদ আসতে পারে?
যাদের সোরিয়াসিস নেই, তাদের তুলনায় যাদের সোরিয়াসিস রয়েছে, তাদের মানসিক অবসাদে ভোগার সম্ভাবনা দেড়গুণ বেশি। রোগীরা যখন অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়েন, তাদের সোরিয়াসিসের লক্ষণগুলি আরও খারাপের দিকে যায়। এর উলটোটাও হতে পারে। অর্থাৎ যখন সোরিয়াসিসের লক্ষণগুলি বেড়ে ওঠে, তা থেকেও মানসিক অবসাদ ছড়াতে পারে। সোরিয়াসিস ও মানসিক অবসাদের মধ্যে একটা জীববৈজ্ঞানিক যোগাযোগ রয়েছে। দেহের যে-রাসায়নিকগুলি চামড়ার ওপর নানা উপসর্গ ফুটে ওঠার পিছনে সক্রিয় থাকে– সেইগুলোই মানসিক অবসাদে আক্রান্তদের শরীরে আরও বেশি পরিমাণে দেখা যায়। তাছাড়া, চামড়ার ওপর দাগ-দাগ হয়ে থাকার দৃশ্যটা রোগী বা অন্যদের কাছে উদ্বেগজনক কিংবা বিরক্তিকর হতে পারে। এটাও জানা তথ্য যে, মদে আসক্তি এবং সোরিয়াসিসের মধ্যেও সম্পর্ক রয়েছে, যা থেকে আরও অবসাদগ্রস্ত ভাব আসতে পারে।
স্বাভাবিক ভাবেই এটা সব রোগীদের কাছেই একটা সমস্যা। বিশেষত যে-সব মহিলা কর্পোরেট কিংবা রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্রে কাজ করেন এবং যাদের অন্যদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলতে হয়, তাদের কাছে এটা সমস্যা তো বটেই। বেশিরভাগ মহিলা চান, তাদের চেহারা যেন নিখুঁত থাকে। যাদের সোরিয়াসিস রয়েছে তারা সবসময় চামড়ার সেই অংশটি ঢেকে রাখার বিষয়ে সচেতন থাকেন, যাতে অন্যরা তা দেখতে না পান। কখনও কখনও মোটা কোনও কাপড় বা স্কার্ফ দিয়ে তারা জায়গাটা ঢেকে রাখেন। এতে ফল আরও খারাপ হয়।
সোরিয়াসিস কি ছোঁয়াচে?
সোরিয়াসিস বিষয়টি সম্পর্কে সাধারণ মানুষের ধারণা অসম্পূর্ণ। লোকে মনে করে, সোরিয়াসিস ছোঁয়াচে এবং তাদেরও এই রোগ ধরবে যদি তারা সোরিয়াসিস আছে এমন কোনও মহিলার সংস্পর্শে থাকেন। এথেকে এমন একটা ভয় জন্ম নিতে পারে, যার ফলে সামাজিক মেলামেশার ক্ষেত্রে তারা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে পারেন। যেমন স্কুলের কোনও অনুষ্ঠানে, সোরিয়াসিস রয়েছে এবং তা দেখা যাচ্ছে এমন কোনও মেয়েকে বাবা-মায়েরা আলাদা করে দিতে পারেন। কিংবা, সোরিয়াসিস রোগীর কাছ থেকে সহকর্মীরা দূরত্ব বজায় রাখতে পারেন। এতে রোগীর মানসিক কষ্ট আরও বেড়ে যায় এবং তাতে অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়ার সম্ভাবনা বাড়ে। বিশেষত মহিলারা এর ফলে আত্মবিশ্বাস হারাতে পারেন, তাদের আত্মবিশ্বাস তলানিতে ঠেকতে পারে এবং নিজেদের সম্পর্কে তারা একটা খারাপ ধারণা নিয়ে বসে থাকতে পারেন।
কেউ যদি মনে করেন তার জীবনের সব আশা শেষ হয়ে গেছে, যদি তার কাজে তিনি মনঃসংযোগ করতে না পারেন, যদি অন্যদের চেয়ে বেশি ক্ষুধার্ত বোধ করেন কিংবা যদি আদৌ কোনও খিদে না থাকে, ক্লান্তি ও অবসাদে ভোগেন এবং কোনও কিছুতেই উৎসাহ না পান, যদি তার ঘুমোতে অসুবিধা হয় কিংবা আদৌ না ঘুমোন, তাহলেই ধরে নিতে হবে তিনি অবসাদগ্রস্ত। তবে কিছু সময় অনেকে নানারকম কারণে খুব স্বাভাবিক ভাবেই চিন্তায় থাকেন। অবশ্য তার মানে এই নয় যে, সেই ব্যক্তি অবসাদগ্রস্ত। কিন্তু যদি একই অবস্থা দীর্ঘ সময় ধরে চলতে থাকে, তাহলে বুঝতে হবে, চিকিৎসকের পরামর্শ মতো চিকিৎসা করানোর প্রয়োজন হয়ে পড়েছে।
গর্ভাবস্থায় এবং মা হওয়ার পর কোনও বাড়তি সতর্কতা নিতে হবে কি রোগীকে?
যেসব মহিলারা সোরিয়াসিসে আক্রান্ত হওয়ার পর গর্ভবতী হয়েছেন, তাদের উদ্বেগের বড়ো বিষয় হল, এই রোগের কারণে তাদের সন্তানধারণে এবং সন্তান হলে তাকে বুকের দুধ খাওয়াতে কোনও সমস্যা হবে কিনা! রোগীদের আমি এই আশ্বাস দিতে চাই যে, সোরিয়াসিসের ফলে গর্ভধারণে কোনও সমস্যা হয় না। তাই সন্তানধারণের পরিকল্পনা তারা করতেই পারেন। তবে গর্ভাবস্থার সময় হরমোন ও শারীরবৃত্তিয় পরিবর্তন কীভাবে ঘটবে এটা আগে থেকে বলা খুবই কঠিন। আবার বুকের দুধ খাওয়ালে, শারীরিক অবস্থার ওপর তার প্রভাব পড়তে পারে। কিছু মহিলার ক্ষেত্রে লক্ষণের কোনও পরিবর্তন হয় না। আবার অন্যদের ক্ষেত্রে কারওর সোরিয়াসিসের লক্ষণ ও চামড়ার ওপর তার প্রকোপ বা প্রভাব পড়তে পারে কিংবা আরও খারাপও হতে পারে। অনেক মহিলার আবার সন্তানের জন্ম দেওয়ার পর-পরই তাদের সোরিয়াসিসের লক্ষণগুলি আরও বেড়ে যেতে পারে।
এসব কারণে মহিলাদের পক্ষে এটা প্রয়োজনীয় যে, যদি তারা গর্ভধারণ করতে চান, তাহলে সেটা চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ ও ধাত্রীবিদ্যা বিশারদকে বিষয়টি জানাবেন। গর্ভাবস্থার সময় কিছু রোগের চিকিৎসা করানোটা উচিত নয়, কারণ তাতে বেড়ে ওঠা ভ্রূণের ক্ষতি হতে পারে। কিংবা বলা যায়, এই ধরনের চিকিৎসায় বেড়ে ওঠা শিশুর ক্ষতি হতে পারে কিনা সে বিষয়ে যথেষ্ট গবেষণা হয়নি। শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানোর সময়, মহিলাদের সাধারণ ভাবে পরামর্শ দেওয়া হয় যাতে স্তনের ওপর তারা যেন কোনও ওষুধ না লাগান। ওই চিকিৎসার প্রভাব সরাসরি ওই শিশুর শরীরে যাতে চলে না যায়, সেটা আটকাতেই এই পরামর্শ দেওয়া হয়।
আদর্শ ব্যবস্থা হল, রোগীর সহযোগিতায় চিকিৎসক বিভিন্ন ধরনের বিকল্প চিকিৎসার সুবিধা ও ঝুঁকি দুটি বিষয়েই বিবেচনা করবেন এবং তার মধ্যে থেকে সেরা বিকল্পটা বেছে নেবেন। গর্ভধারণের সময় কিছু সংশ্লিষ্ট চিকিৎসা ও হালকা থেরাপির (ফোটোথেরাপি) সুপারিশ করা যেতে পারে। বায়োলজিক্স ও মুখে খাওয়া যায় এমন ওষুধের মাধ্যমে চিকিৎসার প্রেসক্রিপশন দেওয়া যেতে পারে।
শারীরিক ঘনিষ্ঠতায় সোরিয়াসিস কোনও প্রভাব ফেলতে পারে কি?
যাদের চামড়ায় সোরিয়াসিস ফুটে ওঠে, এটা সোরিয়াসিসের সবচেয়ে সাধারণ রূপ, তেমন ১০ জনের মধ্যে ৬ জন রোগীর জননেন্দ্রিয়ে কিছু সময়ের জন্য সোরিয়াসিসের দাগ দেখা যেতে পারে। এতে যন্ত্রণা হতে পারে, অস্বস্তি হতে পারে, ওই জায়গায় কিছু ফোটানোর মতো বা জ্বালাপোড়ার মতো অনুভূতি হতে পারে। এটা হতে পারে যৌন মিলনের সময় কিংবা তার পরে। যাদের সোরিয়াটিক আর্থারাইটিস রয়েছে,তারা ক্লান্তি অনুভব করতে পারেন বা তাদের হাড়ের সন্ধিতে ব্যথা হতে পারে। ফলে তাদের পক্ষে যৌন মিলন উপভোগ করাটা বেশ কঠিন হয়ে পড়ে। এছাড়াও, যদি জননেন্দ্রিয়ের আশপাশে চামড়ার ওপর কোনও লাল দাগ নাও থাকে, সোরিয়াসিসের দরুণ মানসিক অস্বস্তি, কোনও দম্পতির মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে বাধা হয়ে উঠতে পারে। এসবের জেরে মেয়েদের যৌন ভোগান্তি অনেক বেশি হয়। এর মধ্যে পড়ে চুলকানি, লিবিডো বা যৌন আকাঙক্ষা কমে যাওয়া ইত্যাদি। এরফলে সম্পর্কের পরিণাম ভয়ংকর হতে পারে। যাইহোক, এব্যাপারে আমাদের সংশ্লিষ্ট ও পদ্ধতিগত চিকিৎসা রয়েছে, যার সাহায্যে এই ধরনের সমস্যা মেটানো যেতে পারে। জীবনশৈলীতে কিছু পরিবর্তন, যেমন হালকা ক্লিনজার ব্যবহার করা, সুগন্ধিযুক্ত কন্ডোম ব্যবহার না করা, কিংবা টাইট অন্তর্বাস ব্যবহার না করা। এই নিয়ম মেনে চললে সুফল পাওয়া যেতে পারে।
সোরিয়াসিস রয়েছে এমন রোগীদের কী পরামর্শ দেবেন?
আমি বলতে চাই যে, তাদের অনুভূতি কী রকম বা নতুন কোনও লক্ষণ দেখা গেল কিনা, সেগুলো শারীরিক নাকি মানসিক, এ নিয়ে কথা বলার সময় চিকিৎসকদের কাছে বিব্রত হওয়ার দরকার নেই। বিশেষ করে চিকিৎসকদের কাছে মহিলাদের খোলাখুলি সব কথা বলতে হবে, তাদের দৈনন্দিন জীবনে সোরিয়াসিসের প্রভাব সংক্রান্ত সবকিছু খোলাখুলি জিজ্ঞেস করতে হবে। সেইসঙ্গে, চিকিৎসকের দেওয়া সব ওষুধ প্রতিদিন নিয়ম করে খেতে হবে। চিকিৎসক এই পরামর্শও দিতে পারেন যে, রোগী কোনও মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের কাছে যান বা যৌন স্বাস্থ্য বিষয়ে বিশেষজ্ঞ কারও কাছে যান। তাদের পরামর্শে পরিস্থিতির মোকাবিলায় আরও ভালো ভাবে সাড়া দিতে পারেন রোগীরা।
আপনার ঘর আপনার যেমন মনের প্রতিফলন আবার উলটোটাই সমান ভাবে সত্যি। অর্থাৎ ইন্টিরিয়র আপনার মনকে নিমেষে উৎফুল্ল করে তুলতে পারে। তাই থাকতে থাকতে ঘরের দৃশ্যপট যখন একঘেয়ে লাগে, সেই মনোটনি কাটাতে কিছু পরিবর্তন আনুন। দেখবেন নিজের বাসস্থানটিকে আরও বেশি ভালোবাসতে ইচ্ছে করবে। নতুন রূপে সহজে সাজাবার কিছু পরামর্শ দেওয়া হল এখানে, আপনাকে সাহায্য করতে।
পর্দায় বাড়ান আকর্ষণ
ঘরের পর্দা আমরা চট করে বদলাই না। টাঙানো থাকতে থাকতে পর্দায় একটা ম্যাড়মেড়ে ভাব চলে আসে, যা ভীষণ ভাবে ঘরের মেজাজে একটা প্রভাব ফেলে। তাই পরদা মাঝে মাঝেই বদলান। বসন্ত আসছে। তাই ঘরের ইন্টিরিয়ারে কিছু রং এনে ফেলুন। পর্দায় উজ্জ্বল ফ্লাওয়ার প্রিন্ট বা একরঙা উজ্জ্বল কোনও রং-ই এই ঋতুর পক্ষে আদর্শ সাজ। আপনার ঘরের দেয়ালে যদি ডিজাইন পেইন্ট করা থাকে, চেষ্টা করুন পর্দার ক্ষেত্রে একই ধরনের ডিজাইন প্যাটার্ন ফলো করতে। ফ্লোরাল প্রিন্ট পছন্দ না হলে মডার্ন কার্টন ডিজাইনগুলি দেখুন। মার্কেটে বোল্ডপ্যাটার্ন-এর প্রচুর পর্দা পাবেন। কিন্তু যেটাই ব্যবহার করুন, সেটার যেন ঘরের রঙের সঙ্গে সামঞ্জস্য থাকে।
পেন্টিং দেয়ালের রূপ খোলে
আপনি যদি ক্রিয়েটিভ হন, নিজের সৃষ্টি করা কোনও পেইন্টিং সুন্দর করে বাঁধিয়ে দেয়ালে ঝোলাতে পারেন। চাইলে অ্যামব্রোস পেইন্টিং কিনে নিতে পারেন থ্রিডি এফেক্ট-এর জন্য। এছাড়া নিজেও এমবস করে বানাতে পারেন। এমবস করার জন্য রং ও ছাপ কিনতে পাওয়া যায়। যদি ফোটোগ্রাফির শখ থাকে, তাহলে ছবি তুলে ওয়াশ করে বাঁধিয়ে নিতে পারেন। দেয়ালের রূপ নিমেষে খুলে যাবে।
কুশন কভারে পরিবর্তন
আপনার কুশন কভারগুলো কি বহু ব্যবহারে মলিন হয়ে গেছে? তাহলে এখনই ওগুলো বদলাবার সময় এসেছে। আপনি পুরোনো কভারগুলির উপর ব্লক প্রিন্ট বা অ্যাপ্লিক করে অন্য লুক নিয়ে আসতে পারেন। পুরোনো সিল্কের শাড়ি থেকে নিজেই প্যাচওয়ার্ক করে কুশন বানাতে পারেন। প্লেন একরঙা কুশন হলে এতে ফেব্রিক পেইন্ট করতে পারেন। সব মিলিয়ে আপনার চিরচেনা ঘরটা নতুনত্বের ছোঁয়া পাবে।
ইন্ডোর প্ল্যান্টস-এর সবুজ সংসার
গাছপালা শুধু বাড়ির বাইরেটাকেই নয়, অন্দরমহলকেও নিমেষে সতেজ সুন্দর করে তুলতে পারে। তাই ঘরটাকে শ্যামলিমায় ভরে দিতে ইন্ডোর প্ল্যান্টস লাগান। মানি প্ল্যান্ট, এয়ার পিউরিফায়ার, অ্যালোভেরা, ব্যাম্বু প্রভৃতি ঘরের সৗন্দর্য বাড়ায়। গাছ থাকার ফলে আপনার ঘরের পরিবেশটাও বিশুদ্ধ হাওয়ায় ভরে উঠবে। যে-কোনও অতিথি আপনার রুচির প্রশংসা করবেন।
ওয়ালপেপার-এ রূপ বদল
আজকাল নানারকম ওয়ালপেপার পাওয়া যায় মার্কেটে। পেইন্ট করা ব্যয়সাপেক্ষ, সেই সঙ্গে একটু ঝামেলাও। তারই সুবিধাজনক বিকল্প ওয়ালপেপার আটকানো। এটুকু বদল করলেই আপনার চেনা ঘরটা একেবারে ঝকমকে নতুন হয়ে উঠবে। তাই স্টিকার বা ওয়ালপেপার এখন বিপুল ভাবে জনপ্রিয়।
ফার্নিচার সেটিং
আপনি হয়তো ঘরের যাবতীয় আসবাব বহুদিন ধরে একই পজিশনে দেখছেন। সেটাও একঘেয়েমির একটা কারণ হতে পারে। একটু জায়গা অদলবদল করে দেখুন, চেনা ঘরটাই নতুন লাগবে। আলমারি, খাট, চেয়ার সবই একটু স্থান পরিবর্তন করলে ঘরের ধুলোও ঝাড়া হবে, আর আলো হাওয়াতেও পরিবর্তন হবে।
লাইটিং আনে উজ্জ্বলতা
দীর্ঘদিন একই ধরনের লাইট সেটিং ঘরটাকে ম্লান করে তোলে। পুরোনো টিউব বদলে এলইডি নিয়ে আসুন। ঘরের আলো উজ্জ্বল করলে ঘরটা দেখতেও ভালো লাগবে। সুন্দর ল্যাম্পশেড, দেয়ালে লাগানোর ল্যাম্প শেড সবই সৗন্দর্যে আলাদা মাত্রা আনে। ঘর এবং বারান্দা– দুই-ই সুন্দর আলো দিয়ে সাজাতে পারেন।
ঘর সাজাতে ফুলের ব্যবহার
আজকাল বহু রকমের আর্টিফিশিয়াল ফ্লাওয়ার কিনতে পাওয়া যায়। ঘরের কোণায় বড়ো ভাস-এ সাজান বা টেবিলের উপর, ফুল কিন্তু ঘরের সৗন্দর্যে দারুণ পরিবর্তন আনতে পারে। যদি ফ্রেশ ফ্লাওয়ার পছন্দ হয় আপনার, তাহলে জারবেরা বা ডালিয়া, চন্দ্রমল্লিকা, গোলাপ এসব তো আছেই। সেন্টেড, ফ্লোটিং ক্যান্ডলস্ আর ফুল, নিমেষে একটা সুন্দর পরিবেশ তৈরি করবে আপনার ঘরে।
প্যান্ডিমিকের জেরে এখন অনিয়মিত অফিস যেতে হচ্ছে। বেশিরভাগ দিনই বাড়িতে থেকে কাজ করছেন অনেকে। আর সেটা করতে গিয়ে, অসচেতন ভাবে গড়ে উঠছে যখন তখন মুখ চালানোর হ্যাবিট। ফল ওভার ইটিং। এটা-ওটা খাওয়ার দরুন ওজন বেড়ে যাচ্ছে। একদিকে ঘাম ঝরানো পরিশ্রম কমে যাওয়া, অন্য দিকে ওজন বেড়ে যাওয়া এই দুয়ের মধ্যে ব্যালেন্স করবেন কী করে, জেনে নিন।
ব্রেকফাস্ট–এরাখুনপ্রোটিন
একটি গবেষণায় জানা গেছে, প্রাতরাশে প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবার খেলে ডোপামিন হরমোনের স্তর বৃদ্ধি পায়, যার ফলে দীর্ঘক্ষণ খিদে পায় না। তাই ব্রেকফাস্ট আর লাঞ্চ-এর মাঝখানে যাতে খাবার ইচ্ছে তৈরি না হয়, ব্রেকফাস্ট-এ অবশ্যই প্রোটিন রাখুন। ডিম, সোয়াবিন,অঙ্কুরিত মুগ, ব্রেকফাস্ট-এ সামিল করুন।
খাবার খাওয়ার ইচ্ছে সংযত করুন
বিটুইন মিল্স খাবার খাওয়ার ইচ্ছেকে দমন করলে, তবেই ওভার ইটিং-এর সমস্যা এড়াতে পারবেন। চেষ্টা করুন খাবার জিনিসের কথা না ভাবতে। চিনি ছাড়া ব্ল্যাক কফি খেলে মুখ চালানোর ইচ্ছে বা ক্রেভিং-টা খানিকটা কাটিয়ে উঠতে পারবেন।
অল্পখাওয়াঅভ্যাসকরুন
যখনই খান না কেন, পরিমাণে কম খাওয়া অভ্যাস করুন। অতিরিক্ত খাবার খাওয়া মানেই, হয় হজমের সমস্যা, আর নয়তো ওজনের সমস্যা। সুতরাং কম খান। ভাজাভুজির ক্ষেত্রেও এটা প্রযোজ্য। একান্ত লোভ সামলাতে না পারলে খুব অল্প করে খান শ্যালো ফ্রায়েড বা বেকড আইটেম।
জলেরসাহায্যনিন
ওভার ইটিং ঠেকাতে সাহায্য করবে জল। যখনই খাই খাই মন হবে, খানিকটা জল খেয়ে নিন। এতে একদিকে যেমন খিদে বোধ চলে যাবে, অন্যদিকে আপনার ইন্টার্নাল সিস্টেম হাইড্রেটেড থাকবে। তবে কোল্ড ড্রিংকস না খাওয়াই ভালো।
ফলখেয়েপেটভরান
ভরপেট খাবার খাওয়ার কিছুক্ষণ পরেই যদি আবার খিদে পেয়ে যায়, তাহলে যে-কোনও ফল গোটা খান। এটার দরুন বাড়তি কিছু ক্যালোরি গেইন করার ভয়ও থাকবে না, আবার পেটও ভরবে। গোটা ফল খেতে ইচ্ছে না করলে, নানা রকমের ফল দিয়ে তৈরি ফ্রুট স্যালাড খেতে পারেন। সুস্বাদু করতে একটু চাটমশলা ছড়িয়ে নিন৷
বেশিক্ষণধরেচিবিয়েখান
একটি গবেষণায় জানা গেছে, খাবার বেশি করে সময় নিয়ে চিবিয়ে খেলে, মিল প্রতি ৭০ ক্যালোরি কম ইনটেক হয়। তবে এর অন্য সুফলটি হল, এর দরুন আপনি ওভার ইটিং এড়াতে পারবেন৷
বাচ্চার বায়নাক্বা বেশিরভাগ অভিভাবকদেরই মাথাব্যথা, অবসাদ, চিন্তা এবং ফ্রাস্ট্রেশন-এর কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বাচ্চাকে কন্ট্রোলে রাখা এইক্ষেত্রে খুব সহজ কাজ নয়।
বায়না করতে করতে বাচ্চারা রেগে ওঠে। কোনওভাবে, বড়োদের দিয়ে নিজেদের চাহিদা মিটিয়ে নিতে বদ্ধপরিকর হয়ে ওঠে। তারজন্য রাগ দ্যাখানো থেকে শুরু করে ফ্রাস্ট্রেশন, কেঁদে ভাসানো, চ্যাঁচানো, জিনিসপত্র ভাঙা, মাটিতে শুয়ে পড়া, পালিয়ে যাওয়া, নিঃশ্বাস আটকে রাখা, বমি করে দেওয়া এমনকী অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার অভিনয় করতেও তারা দ্বিধা করে না।
সাধারণত এক-দেড় বছর থেকে শুরু করে তিন-চার বছর বয়সি বাচ্চাদের মধ্যে ট্যানট্রাম-এর সমস্যা বেশি দেখা যায়। কারণ এই বয়সে বাচ্চার সোশ্যাল এবং ইমোশনাল স্কিল্স ডেভেলপ হওয়া শুরু হয়। ইমোশনকে প্রকাশ করার মতো শব্দ তাদের জানা থাকে না। তারা স্বাধীন হতে চায় অথচ অভিভাবকদের থেকে দূরে যেতেও ভয় পায়। এই পরিস্থিতিতে বাচ্চা এমন রাস্তা খুঁজে বার করতে চায় যার মাধ্যমে নিজের আশেপাশের জগৎ-কে সে বদলাবার চেষ্টা করতে পারে আর নিজের দাবিও মানাতে পারে।
বাচ্চার ট্যানট্রাম দেখানোর প্রধান কারণ
টেম্পারামেন্ট – যে-বাচ্চা খুব তাড়াতাড়ি আপসেট হয়ে পড়ে তারাই বেশি বায়না করে অশান্তি বাড়ায়।
স্ট্রেস – একাকিত্ব, ক্ষিদে, ক্লান্তি এই ধরনের কিছু পরিস্থিতি বাচ্চা একেবারেই পছন্দ করে না। এটা তাদের কাছে প্রিয় খেলনা কেড়ে নেওয়ার মতো।
স্ট্রংগ ইমোশন – ভয়, চিন্তা, রাগ, সন্দেহ ইত্যাদি ইমোশনস বাচ্চার বিকাশ প্রক্রিয়ার একটি স্বাভাবিক অঙ্গ সুতরাং এগুলো বাচ্চার মধ্যে থাকবেই কিন্তু চেষ্টা করলে এই ইমোশনগুলি অনেকটাই কন্ট্রোল করা সম্ভব। মনে রাখতে হবে একজন বাচ্চার সঙ্গে অপর বাচ্চার কোনও মিল নেই। বাচ্চার ট্যানট্রাম আয়ত্তে আনার জন্য একটা বাচ্চার উপর যে-ট্রিক্স কার্যকরী হচ্ছে, সেটা অপর একটা বাচ্চার উপর কার্যকরী নাও হতে পারে।
তবে কমন কিছু উপায় অবলম্বন করে এই সমস্যাগুলো কিছুটা এড়ানো সম্ভব
বাচ্চাকে ব্যস্ত রাখুন – বাচ্চা যদি বোর ফিল করে তাহলে হতে পারে তার ভিতরের ছটফটানি কোনও না কোনও ভাবে বাইরে বেরিয়ে আসতে চাইবে সুতরাং কারণ ছাড়াই বাচ্চা চ্যাঁচামেচি, কান্নাকাটি শুরু করে দিতে পারে। এর একমাত্র সমাধান বাচ্চাকে ব্যস্ত রাখা। ছোটো ছোটো মজাদার অ্যাক্টিভিটির মধ্যে তাকে ব্যস্ত রাখুন বা অন্য বাচ্চাদের সঙ্গে তাকে খেলার সুযোগ করে দিন। এতে বাচ্চার মন ভালো থাকবে ফলে রাগের মতো ক্ষতিকারক ইমোশন বশে থাকবে।
কারণ বোঝাবার চেষ্টা করুন – বাচ্চা কোনও জিনিস নিয়ে জেদ বা বায়না শুরু করা মাত্র ওকে বোঝাবার চেষ্টা করুন যে ওর জেদ মেনে নেওয়া কেন সম্ভব নয় আপনার পক্ষে। কিন্তু যদি বাচ্চা অতিরিক্ত চ্যাঁচামেচি বা কান্নাকাটি করতে থাকে তাহলে সেটা ওকে বোঝাবার সঠিক সময় নয়। বাচ্চা যেটা নিয়ে জেদ করছে, কোনও ভাবে তার মনটাকে সেই জিনিসটা থেকে সরিয়ে আনা খুব দরকার। জেদ করার সময় তার মুখের উপর ‘না’ বলে দেওয়া ঠিক নয় বরং কেন তাকে সেটা দেওয়া যাবে না সেটা বিস্তারিত ভাবে খুলে বললেই সেটা বাচ্চা বুঝতে পারবে আর তার ইগো-ও হার্ট হবে না।
দীর্ঘশ্বাস নিতে বলুন – বাচ্চা ট্যানট্রাম একবার শুরু করলে সঙ্গে সঙ্গে একটি ব্যায়াম ওকে করাতে চেষ্টা করুন। নিজের কাছে বসিয়ে বাচ্চাকে লম্বা করে শ্বাস টানতে বলুন। এর ফলে বাচ্চার ইমোশনাল রিয়াকশন কিছুটা শিথিল হয়ে পড়বে। বাচ্চা যদি করতে রাজি না হয় তাহলে আপনি নিজেই সেটা করে দেখুন। ডিপ ব্রিদিং ইমোশনকে কন্ট্রোলে রাখতে সাহায্য করে। স্ট্রেস কম করে এবং পাল্স ও ব্রিদ রেট-কে কন্ট্রোল করা যায়।
শাস্তি দেবেন না – অভিভাবকেরা যেটা সবথেকে বড়ো ভুল করে থাকেন, বাচ্চা জেদ দেখালে তাকে শাস্তি দেওয়া। এতে কোনও লাভ হয় না। বরং বড়োদের মনে হয় তাদের শিক্ষায় কোনও দোষ থেকে যাচ্ছে যার ফলে বাচ্চা বেয়াদপ তৈরি হচ্ছে আর নয়তো মনে করেন, তাদের বাচ্চার মধ্যেই কোনও অসংগতি রয়েছে। ঘাবড়ে না গিয়ে স্বামী-স্ত্রী উভয়ে বিষয়টি আলোচনা করে নিজেরাই একটা রাস্তা খুঁজে বার করুন।
শান্ত করাবার চেষ্টা করবেন না – বাচ্চার জেদ কোনও ভাবে কমাতে না পারলে বাচ্চাকে ইগনোর করুন অবশ্য খেয়াল রাখবেন জেদের বশে বাচ্চা নিজের ক্ষতি না করে বসে। বাচ্চা যদি রাগের মাথায় কামড়ানো, লাথিমারা, জিনিস ছুড়ে ফেলে দেওয়া এইসব করতে থাকে, তাহলে সঙ্গে সঙ্গে ওই জায়গা থেকে ওকে সরিয়ে নিয়ে যান। ওকে বুঝতে দিন, কাউকে ব্যথা দেওয়া বা জিনিস ভাঙা কিছুতেই বরদাস্ত করা হবে না। নিজের প্রতিক্রিয়া বাচ্চার সামনে প্রকাশ করবেন না। এতে বাচ্চা বুঝতে পারবে আঁচড়ে কামড়ে সে বড়োদের নিজের কথা মেনে নেওয়াতে পারবে না। তবে অনেক সাইকোলজিস্ট-দের মতে বাচ্চার ভিতরের ফিলিংস বাইরে প্রকাশ করতে পারলেই সে অবসাদমুক্ত থাকতে পারবে।
বাচ্চার প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করতে কার্পণ্য দেখাবেন না – বাচ্চা জেদ করতে গিয়ে উত্তেজিত হয়ে পড়লে তাকে কাছে টেনে নিয়ে জড়িয়ে ধরুন, বুঝতে দিন আপনি ওকে ভালোবাসেন। অনেক ক্ষেত্রেই এটা ম্যাজিকের মতো কাজ করে। বাচ্চা নিজেকে সুরক্ষিত মনে করে এবং ওর বিশ্বাস হয় যে ওকে সকলে ভালোবাসে।
ক্লান্তি এবং ক্ষিদে সবথেকে বেশি, বাচ্চাকে জেদী করে তোলে। সুতরাং সময় সময়ে বাচ্চার খাবারের খেয়াল রাখুন এবং পর্যাপ্ত ঘুম যাতে হয় তাও নজর দিন। বাচ্চার কমফর্টের সঙ্গে আপস করবেন না।
অবশেষে ওটিটি প্ল্যাটফর্মে দেখা যাবে কাজলকে। তিনি ওটিটি প্ল্যাটফর্মে পদার্পণ করতে চলেছেন এ নিয়ে গতবছর থেকেই কানাঘুষো চলছিল। এবার অনুরাগীদের আশা পূরণ করতে কাজল, স্বামী অজয় দেবগনের প্রযোজনায় পা রাখছেন এই নতুন মাধ্যমে।অর্থাৎ অজয় দেবগনের প্রযোজনা সংস্থার ডিজিটাল ডেবিউ হচ্ছে এই ছবির সূত্রে। ছবির নাম ‘ত্রিভঙ্গ’। প্রসঙ্গত, নেটফ্লিক্সের সঙ্গে এরপরও বেশ কিছু কাজ করবেন অভিনেতা তথা প্রযোজক অজয় দেবগন। রেণুকা সাহানিও এই প্রথম ছবি পরিচালনা করছেন। এবং এক ওড়িশি নৃত্যশিল্পীর চরিত্রে প্রথমবার ধরা দেবেন কাজল।
সেই সিনেমার টিজারই প্রকাশ্যে এল নতুন বছরের প্রথম দিনে। আগামী ১৫ জানুয়ারী নেটফ্লিক্সে মুক্তি পাবে ছবিটি। তিনটি নারী চরিত্রকে ঘিরে গড়ে উঠেছে ‘ত্রিভঙ্গ’ –এর গল্প। মুম্বইয়ে প্রেক্ষাপটে, ত্রিভঙ্গ একটি জটিল কাহিনী যা একই পরিবারের তিন প্রজন্মের মধ্য দেখানো হয়েছে। ১৯৮০ এর দশকের শেষ থেকে আজ অবধি কীভাবে পরিবর্তিত হয়েছে তিনটি জীবন, কী ভাবে সময়ের সঙ্গে নানা ওঠা পড়ায় সামিল হয়েছে তারা, তা-ই উঠে আসবে ছবিতে।
রেণুকা সাহানির মতে, তিন প্রজন্মের নারীর গল্প বলবে এই ছবি। মা, মেয়ে ও দিদিমার মধ্যেকার সম্পর্কের জটিলতা তুলে ধরবেষ এ আসলে হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়া এক কাহিনি যা দৈনন্দিন জীবনে পরিবারের গুরুত্বকে তুলে ধরবে। কাজল, তন্বী এবং মিথিলা তাঁদের চরিত্রের জন্য মন প্রাণ ঢেলে দিয়েছেন ‘ত্রিভঙ্গ’র চরিত্রগুলিতে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করার জন্য। তিনি যা চেয়েছিলেন, চরিত্রগুলিকে তার থেকেও অনেক বেশি কিছু দিয়েছেন এই অভিনেত্রী।
বস্তুত অনু, নয়ন ও মাশা – এই তিনজনের চলার পথগুলো কোথায় এক জায়গায় মিলছে তাই দেখাতে চলেছে এই ছবি। পারস্পরিক লড়াই ও বিরোধিতা ভুলে,কীভাবে ক্লান্ত পরিশ্রান্ত তিনটি মানুষ সমাজের সঙ্গে লড়াই করে পরিবারের ভীত পোক্ত করতে থাকে, তা নিটোল ভাবে বোনা হয়েছে এ ছবির কাহিনিতে।
টিজারেই কাজলের চরিত্রের মধ্যে দিয়ে এক মানসিক টানাপোড়েনের ইঙ্গিত দিয়েছেন পরিচালক। কাজলের মেয়ের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন মিথিলা পালেকর এবং তাঁর মায়ের ভূমিকায় দেখা যাবে কুণাল রায় কপূর এবং তন্বি আজমিকে। পরিচালক রেণুকাই এই ছবির গল্পকার।
এই ছবির প্রযোজনা সংস্থা অজয় দেবগণ সহ বন্নিজয় আসিয়া এবং সিদ্ধার্থ পি মালহোত্রর এত্যন্ত আশাবাদী এই প্রোজেক্ট নিয়ে।নেটফ্লিক্স ইনস্টাগ্রামে এই ছবির ট্রেলার প্রকাশ করার পর থেকেই দর্শকদের চাঞ্চল্য বেড়েছে। পোস্টের ক্যাপশনে লেখা “পরিবার, তাঁদের সঙ্গে থাকতে পারে না। অবশ্যই তাঁদের ছাড়া বাঁচতে পারে না।“ এই ট্রেলার শেয়ার করেছেন কাজল নিজেও।নতুন এই মাধ্যম এবং এই চরিত্র, দুই-ই তাঁর কাছে চ্যালেঞ্জিং, স্বীকার করেছেন কাজল।
ওক পাইন ঘেরা পাহাড়ি আলোছায়ার মাঝে আকাশে আনমনা মেঘ কথা কয়। কুয়াশার আবডালে জেগে থাকে গ্রামগুলি দূরে দূরে। কুমায়ুন হিমালয়। কুমায়ুন মানেই বরফাবৃত পাহাড় ও হিমবাহ। হরিতবর্ণ অরণ্য ও পার্বত্য ঢালে শ্যামল বুগিয়াল। হ্রদ ও ফেনায়িত জলপ্রপাত। পাখপাখালি ও পশুখামার। প্রজাপতি ও ফুল্লকুসুমিত প্রান্তর। মেলা ও উৎসব। পুরাণকথা ও ইতিহাস। এই সমস্ত কিছুই একত্রে উদ্বেলিত হয় কুমায়ুনের প্রায় প্রতিটি শৈলশহরে।
উত্তরাখণ্ডের উত্তরপূর্ব হিমালয়ের অংশটুকু নিয়ে কুমায়ুনের বিস্তার। হিমালয়ের কোলে ৬টি পাহাড়ি জেলা আলমোড়া, বাগেশ্বর, চম্বাবত, নৈনিতাল, পিথোরাগড়, উধম সিং নগর নিয়ে কুমায়ুনের বিস্তৃতি। যেখানে রযেছে একাধিক শৈলশহর, যেমন নৈনিতাল, আলমোড়া, বিনসর, কৌশানি, মুক্তেশ্বর, রামগড়, রানিখেত, মুন্সিয়ারি, চকৌরি, দিনাপানি, বৈজনাথ, ধওলছিনা ইত্যাদি।
আলমোড়া:
কাশ্যপ পাহাড়কোলে পাইন, ওকের সরলবর্গীয অরণ্যের মাঝে, কুমায়ুন হিমালয়ের দ্বিতীয বৃহত্তম এবং মহাব্যস্ত বাণিজ্যিক শহর আলমোড়া। ইতিহাসের পাতা উলটে দেখা যায়, অতীতে চাঁদ সাম্রাজের রাজা কল্যাণ চাঁদ-এর হাতে ১৫৬০ সালে গড়ে ওঠে এই ছোট্ট পাহাড়ি রাজ্যটি। ৫৯৪২ ফুট উচ্চতায়, ৭.৬ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে রাজ্যটি চাঁদ সাম্রাজ্যের অধীনে থাকলেও পরে ১৭৮৯ সালে গোর্খা, তারও পরবর্তীতে ব্রিটিশ শাসনের অধিকারে আসে।
লোকশ্রুতি আলমোড়া পাহাড়ি অঞ্চলে এক ধরনের পিঙ্গলবর্ণের ক্ষুদ্র উদ্ভিদ দেখা যায়, যার স্থানীয নাম কিলমোড়া বা ভিলমোড়ি গাছও বলা হয়। সেই কিলমোড়া বা ভিলমোড়ি থেকে পরে আলমোড়া হয়েছে। তবে চাঁদ সাম্রাজ্যের পূর্বে এই অঞ্চলের নাম ছিল রাজপুর। সেই সময়ে রাজা ভীষ্ম চাঁদ অঞ্চলটির নাম পালটে রাখেন আলমনগর। আলমোড়া নামটি সেখান থেকেও আসতে পারে বলে দ্বিমত রয়েছে।
আলমোড়াকে কুমায়ুনের সাংস্কৃতিক রাজধানী বলা হয়। বর্তমানে অত্যাধিক যানজট, ফলত ওয়ান ওয়ে ট্র্যাফিক, জনবসতি, দোকানবাজার, হোটেল, জনবহুল শৈলশহর। আলমোড়া থেকে এক্কেবারে খালি চোখে বাধাহীন ভাবে দেখা যায় বরফাবৃত পঞ্চচুল্লি, নন্দাদেবী, নন্দাকোট, ত্রিশূল, চৌখাম্বা ছাড়াও আরও বেশ কিছু দিগন্তব্যাপী হিমশৃঙ্গরাজি। হিমালয়ের কাছে নতজানু হলেই পালটে যায় জীবনবোধ।
travelogue
শহরের প্রাচীন ঘড়িমিনারটি ১৮৪২ সালে ব্রিটিশদের দ্বারা নির্মিত। প্রায় ৫ কিলোমিটার প্রশস্ত কিছুটা লম্বাটে আকারের গড়ন শহরটির। শহরের চারপাশ ঘিরে সুউচ্চ পাহাড়। হিন্দু অধ্যুষিত এই অঞ্চলের প্রতিটি পাহাড়চূড়ায় একটি করে মন্দির। স্কন্দপুরাণ মতে সালমেল ও কৌশিকী নদীর মাঝে অবস্থানরত কাশ্যপ পাহাড়ে স্বযং বিষ্ণুর অধিবাস। শহর জুড়ে রযেছে একের পর এক মন্দির। রঘুনাথ মন্দির, মুরলীমনোহর মন্দির, কাঁসারদেবী থান, মহাবীর মন্দির, রত্নেশ্বর মন্দির, বনারীদেবী, পাতালদেবী, ভৈরবীদেবী, ত্রিপুরদেবী মন্দির, নন্দাদেবী মন্দির, চিতাই গোলু মন্দির, কাটরমল সূর্যমন্দির ইত্যাদি অগণিত মন্দির।
আলমোড়া শহরের দশেরা উৎসব, নন্দাদেবী মেলা, ফুলদেই মেলা, হারেলা মেলায় দূর-দূরান্ত থেকে আসেন ভক্তের দল। মেলার প্রাচুর্যে তখন ঝলমলে হয়ে থাকে ছোট্ট শৈলশহরটি। এখানকার বাসিন্দরা মূলত কুমায়ুনি ভাষায় কথা বললেও, পর্যটকদের সঙ্গে কথ্য হিন্দি ভাষায় কথা বলেন।
আলমোড়া শহরের মধ্যেই এক ছোট্ট পাহাড়-টিলার টঙে কুমায়ুন মন্ডল বিকাশ নিগম-এর পর্যটকবাস। কলকাতায় থাকতেই অনলাইন বুকিং-এর মাধ্যমে দুদিনের ঘর স্থির করা ছিল। নীচের সড়ক থেকে হঠাৎই অনেকটা খাড়াই টপকে কেএমভিএন হলিডে হোমের দোরগোড়ায পৌঁছোতে হয়। বযস্কদের পক্ষে এতটা খাড়াই পায়ে হেঁটে উঠে হলিডে হোমে পেঁছোনো বেশ কষ্টকর। ভাগ্যিস আমাদের কাঠগোদাম থেকেই ভাড়াগাড়ি সঙ্গে ছিল। হলিডে হোমের রিসেপশনের মহিলাটি কম্পিউটারে নথিপত্র দেখে আমাদের দোতলার ২০৪ নম্বর ঘরে পাঠিয়ে দিলেন।
সরকারি ব্যবস্থাপত্র বেশ ভালোই। কাচের জানলার ভারী পর্দা সরাতেই নীচে শহর ও দূর পাহাড়ের ঝলক। জিনিসপত্র ঘরে রেখেই সময় নষ্ট না করে চলে গেলাম সিমতোলা ইকো পার্ক। উদয়শংকর সুদীর্ঘকাল সিমতোলা এলাকায় তাঁর নাচের প্রতিষ্ঠান চালিয়েছেন। সেখানে শিক্ষাব্রতী ছিলেন অমলাশংকর, রবিশংকর, জোহরা শেহগল, গুরু দত্ত, রুমা গুহঠাকুরতা এমন কতজন। আলমোড়ার ৩ কিলোমিটার দূরে অশ্বখুরাকৃতি একটি পাহাড়চূড়ায় রযেছে উদযশংকর নামাঙ্কিত এই নাচের স্কুল। পাইন ও দেওদার ছাওয়া মনোরম সিমতোলা এখানকার একটি নামকরা পিকনিক স্পটও।
গুণী ও বিশিষ্টজনদের আনাগোনা ছিল এই শহরে। এখানে বিবেকানন্দ এসে থেকেছেন। এই শহরেই জন্ম বিশিষ্ট স্বতন্ত্রতা সেনানী গোবিন্দবল্লভ পন্থ, রোনাল্ড রস, পিসি যোশী প্রমুখ ব্যক্তিত্বের। এখানে কিছুদিন বসবাস করে গেছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, অ্যালেন গিন্সবার্গ, জহরলাল নেহেরু, ইন্দিরা গান্ধি। ১৯৩৭ সালে রবীন্দ্রনাথ এখানে থেকেই লেখেন শিশু কাব্যগ্রন্থের নয়টি কবিতা। কিছু ছবিও আলমোড়ায় বসে আঁকেন কবি। ক্যান্টনমেন্ট এলাকার একটি পাহাড়চূড়ায় রবীন্দ্র স্মৃতিধন্য ঔপনিবেশিক এই কুঠি, টেগোর ভবন নামে পরিচিত। স্থানিক দৃশ্যও অসাধারণ। হিমালয়ের নৈসর্গিক শোভা বুঁদ করে রাখে আমাদের মতো সমতলে বসবাসকারী পর্যটকদের।
বাসস্ট্যান্ডের কাছেই অতীতে কাতু্য়রি বংশ ও চাঁদ রাজাদের দুর্গ ছিল। আজ যদিও এখানেই আদালত বসেছে। বিগত আমলের কুমায়ুনি ঐতিহ্য ও শিল্পসংস্কৃতির ধারক একটি অসাধারণ সংগ্রহশালা হল ১৯৮০ সালে পুনর্নির্মিত গোবিন্দ বল্লভ পন্থ পাবলিক মিউজিয়াম। এখানে কতু্য়রি ও চাঁদ সাম্রাজ্যের নানান চারুকলার নিদর্শন রযেছে। এগুলির মধ্যে দুর্লভ শিল্পকৃতি, কাষ্ঠ শিল্পকলা ও ভাস্কর্য, কুমায়ুনি ঐতিহ্যবাহী আইপেন যেটি মূলত জ্যামিতিক ডিজাইনে দেবদেবীর মূর্তি ও প্রাকৃতিক সামগ্রীর উপাদান এইসব শিল্পকলা সযত্নে রক্ষিত রয়েছে। সাধেই কী আর কুমায়ুনের সাংস্কৃতিক পীঠস্থান বলা হয় আলমোড়া শৈলশহরকে। আলমোড়ার তামতা বা তামার বাসনকোশনের খ্যাতি আছে। আঙ্গোরা খরগোশের লোম থেকে প্রস্তুত আঙ্গোরা বস্ত্র এখানকার উল্লেখযোগ্য বস্ত্রসম্ভার।
আলমোড়া মূল শহর থেকে ২ কিলোমিটার দূরে দ্য ব্রাইট এন্ড কর্ণার যা এখন বিবেকানন্দ কর্ণার নামেই সমধিক পরিচিত। সড়কপথ থেকে ১৪৬ টি সোপান নেমে ১৯১৬ সালে স্বামী তূরীয়ানন্দ মহারাজ প্রতিষ্ঠিত শ্রীরামকৃষ্ণ আশ্রম। স্বামী বিবেকানন্দের কিছু দিন বসবাসের স্মারক এখানকার ওকলে হাউস। এখানেই স্বামীজি ভগিনী নিবেদিতাকে ব্রহ্মচর্যে দীক্ষাদান করেছিলেন। এক অনির্বচনীয শান্তি এখানকার প্রতিটি কোণায় কোণায়।
ব্রাইট এন্ড কর্ণার ভিউপয়েন্ট থেকে তুষারাচ্ছাদিত হিমালয়ের অনাবিল দৃশ্য স্রেফ টুকে রাখার মতো। মেঘের উপদ্রব না থাকলে পঞ্চচুল্লি, নন্দাদেব্ নন্দাকোট, ত্রিশূ্ চৌখাম্বা ও অন্যান্য শিখরসমূহ এক্কেবারে চোখের আঙিনায। দূর পাহাড়ের কোলে আকাশ জুড়ে মারকাটারি রঙের খেলা দেখিয়ে সূর্যদয় ও সূর্যাস্তের উদয়-অস্ত শোভা অতুলনীয়।
আলমোড়ার মেথোডিস্ট চার্চটি ম্যালের উত্তরদিকের শেষ প্রান্তে। ১৮৯৭ সালে নির্মিত পাথরে স্থাপিত চার্চটি রেভারেন্ট বার্ডেন, যিনি কুমায়ুন অঞ্চলে ৪০ বছর ধর্মপ্রবর্তক ছিলেন, তাঁর স্মরণে। রাজা উদ্যোত্ চাঁদ আলমোড়ায় অনেকগুলি হিন্দুমন্দির স্থাপন করেন। যেমন ত্রিপুরসুন্দরী মন্দির, চন্দেশ্বর মন্দির, পর্বতেশ্বর মন্দির। পর্বতেশ্বর মন্দিরটিই বর্তমানে নন্দাদেবী মন্দির নামে পরিচিত। মূল শহর থেকে ১৯ কিলোমিটার দূরে কতু্য়রি কাটরমাল্লা নির্মিত ২১১৬ মিটার উচ্চ সূর্যমন্দিরের স্থাপত্যও দেখার মতো। কাঠের খোদাই করা তোরণ, কপাট অপূর্ব সৃষ্টি নৈপুণ্যের দাবি রাখে।
হোটেলে ফিরতি পথে গেলাম ২০০ বছরের প্রাচীন লালাবাজার। আদপে এটি একটি পথের পাশের বিখ্যাত বাজার। সবসময় ভিড়ে ঠাসা। এখানে যোগলাল শাহ শপ থেকে আলমোড়ার বিখ্যাত বাল মিঠাই অল্প পরিমাণে কেনা হল। ৩০০ টাকা কেজি। তবে অত্যাধিক মিষ্টি। যদিও আমাদের যাওয়া হয়ে ওঠেনি, ৪ কিলোমিটার দূরে কারকানৌলি ও ফুলসীমা। এখানে প্রাচীন রক পেন্টিং দেখার মতো।
১৮ কিলোমিটার দূরে বড়েচিন্না গ্রামে লাখুদিয়ার একটি অত্যন্ত দ্রষ্টব্যস্থান। লাখুদিয়ার শব্দটির আক্ষরিক অর্থ হল এক লাখ গুহা। এখানে সুয়াল নদীর ধারে শতাব্দীপ্রাচীন গুহাকন্দর আছে। প্রস্তরযুগে নির্মিত এই অঞ্চলে গুহাচিত্রগুলি নাকি অসাধারণ। আগামীকাল যাব বিনসর, ওখানেই এক রাত থাকা। আলমোড়ার মায়াময় সৌন্দর্যে কেটে যায় ভালো লাগায় বিভোর দুটি দিন।
বিনসর:
বিনসরকে কুমায়ুনবাসীরা বলেন ঝান্ডিধার। পর্যটকমহলে অবশ্য স্থানটি বিনসর নামেই পরিচিত। আলমোড়া থেকে ৩১ কিলোমিটার দূরবর্তী ৭৯৩৯ ফুট উচ্চতায় প্রত্যন্ত এলাকা বিনসর। নিরেট পাইনের জঙ্গল নিয়ে অভয়ারণ্যে ঢোকার কিছুটা পর থেকেই দেখি কিছু গাছের মাথা কেমন লালে লাল। ওগুলো রডোডেনড্রন গাছ। যত ওপরে উঠি লাল রডোডেন্ড্রনের বাহার। ঘন জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে এগিযে চলার পথটি বেশ রোমাঞ্চকর। সেখানে হিমালয়ের হরেক অচিন পাখিদের ওড়াওড়ি। নিস্তব্ধতা এখানে প্রকৃতির অলংকার।
আলমোড়া থেকে বিনসর যাওয়ার পথে আমাদের গাড়ি এসে থামল একটি মন্দিরের সামনে। মন্দিরে ওঠার প্রধান প্রবেশদ্বারে একটি বিশাল ঘণ্টা। পুরো মন্দিরচত্বর লাল ফিতে বাঁধা ছোটো, বড়ো, মাঝারি ঘন্টায় ছয়লাপ। ঘন্টার সঙ্গে চিরকুটে বাঁধা ইচ্ছাপূরণের আর্তি ও প্রার্থনা। রযেছে বিবিধ স্ট্যাম্পপেপার লটকানো। কুমায়ুনের অত্যন্ত জাগ্রত চিতোই গোলু মন্দির এটি। ন্যায় বিচারের দেবতা। কুমায়ুনিদের বিশ্বাস সংসারে যখন ন্যায় ভেঙে পড়ে তখন গোলু মন্দিরের চাতালে বা গাছে মনস্কামনা জানিয়ে চিঠি বেঁধে রাখলে সুবিচার পাওয়া যায়। এই পথেই কাঁসারদেবীর মন্দির। স্বামী বিবেকানন্দ এখানে থেকেই অনুভব করেন তাঁর আধ্যাত্মিক জীবন মানুষের সেবায় নিযোজিত করা কর্তব্য।
যে-গুহায় স্বামীজি ধ্যান ও আধ্যাত্মসাধনা করেছিলেন, সেটি বর্তমানে উত্তরাখণ্ড সরকার সুন্দর করে সাজিয়ে রেখেছে। প্রচুর বিদেশি পর্যটক এখানে নিপুণ প্রকৃতি সান্নিধ্যে আসেন।
আলমোড়া থেকে দিনাপানি ছুঁয়ে বিনসর যাওয়ার পথটি অসামান্য সৌন্দর্যের দাবি রাখে। কাপরখান নামের জনপদ থেকে পথটি দুভাগে ভাগ হয়ে গেছে। উত্তরমুখী পথটি চলে গেছে সরযু ও গোমতী নদী সঙ্গমে পবিত্র শৈবতীর্থ বাগেশ্বরের দিকে। ডাইনের পথটি পাহাড় বেয়ে বিনসর অভয়ারণ্যের দিকে। দিনাপানি থেকে ঝান্ডিধার-বিনসর স্যাংচুয়ারি গেট পর্যন্ত, সমস্ত পথটুকুই পাইনে ছাওয়া। বিনসর অভয়ারণ্যের প্রবেশদ্বার থেকে আরও ১১ কিলোমিটার জঙ্গলঘেরা পথে সন্তর্পণে গাড়ি চলে এল। আমরা উশখুশ করছিলাম কিছু বন্যপ্রাণী অন্তত চোখে পড়বে। এই অরণ্যে উল্লেখযোগ্য প্রাণী হল চিতা, বন্য শুয়োর, কালো ভল্লুক, বার্কিং ডিয়ার, বনবিড়াল, বাঁদর, হনুমান। কিন্তু কোথায কী! কিচ্ছুটি নজরে এল না।
কুমায়ুন বিকাশ নিগমের,বিনসর টু্রিস্ট রেস্ট হাউস আমাদের রাত্রিবাসের ঠিকানা। এই অঞ্চলের একমাত্র পর্যটক আবাস। এই সরকারি পর্যটক আবাসে থাকতে না পারলে কিন্তু বিনসর ভ্রমণের মজাটাই খানিক বিফল। নির্জন অরণ্য, নিঃশব্দ প্রকৃতি, জঙ্গল পথে অজস্র রডোডেনড্রন। প্রবেশমাত্রই রডোডেনড্রন ফুলের নির্যাস দিযে তৈরি স্বাগত পানীয দিযে আপ্যাযনপর্ব। লাল টালির রঙে ওপরটা, সাদা দোতলা বিল্ডিং। পুরো পরিসরটাই ফুলের সমাহার, লতাগুল্ম দিযে সুন্দর ভাবে সাজানোগোছানো। আপাদমস্তক শান্ত একটি সুসজ্জিত বসতবাড়ি। ওপাশে সাদা চাদরে ঢাকা আদিগন্ত হিমালয়। এখানকার পর্যটক আবাসে বিদ্যুৎ সরবরাহ নেই। জেনারেটর সহযোগে আলো জ্বলে সন্ধ্যা ৬ থেকে রাত ৯ পর্যন্ত। দু-হাত প্রসারিত করলেই যেন হিমালয়ের ওই বিশাল বৈভবকে ছুঁয়ে ফেলা যাবে। বাউন্ডুলে শহুরে মন আর দিগন্ত বিস্তৃত হিমালয়, সামযিক দূরে সরিযে রাখে দৈনন্দিন জীবনের আটপৌরে পরাজয়গুলোকে।
একটা অদ্ভুত মনোরম জায়গা এখানে সূর্যোদয় দেখার। সেটা হল এই আবাসের ছাদ। পাথরে বাঁধানো দারুণ পথ চলে গেছে ছাদের কাছ পর্যন্ত। এখান থেকে চোখের নাগালেই ধরা দেয ৩৫০ কিলোমিটার বিস্তারিত বরফশৃঙ্গগুলি নন্দাঘুটি, নন্দাকোট, ত্রিশূল, মৃগথুনি, নন্দাদেবী, পঞ্চচুল্লি এমনকী নেপাল হিমালয়ের কযেটি শৃঙ্গও দৃশ্যমান। ছাদে বসেই কেটে যাবে সময়ের অনেকখানি। এখানেই আমাদের বেড-টি দেওয়া হল সূর্যোদয় দেখার সময়। তাহলে আর কী? জমাটি ঠান্ডায় হাতে-গরম চায়ের কাপ নিয়ে অর্ক দেবের বিচ্ছুরণ-দৃশ্য, মনের ঝাঁপিকে সমৃদ্ধ করে নিল আগামী দিনের জন্য।
সবুজে সবুজ প্রাচীন গাছেদের মধ্যে দিযে এবড়োখেবড়ো পথে হাঁটতে বড়ো ভালো লাগে। জিরো পয়েন্ট এর পথ, যেটা নজরমিনার পর্যন্ত গেছে, বেশ গা ছমছমে। আলোছায়া মেশানো এ পথের নির্জনতাই একমাত্র সম্বল। সন্ধ্যায় পাহাড়মুখী ছাদে বসে চা পান করতে করতে কত যে দার্শনিকতা মন ভারাক্রান্ত করে। পাশের জঙ্গল-পাহাড়গুলি হয়ে ওঠে তখন জোনাকিময়। আঁধারে প্রকৃতির কাছে একলা বসে থেকে কত সুখ-দুঃখের কথা মনে মনে আওড়াই।
কৌশানি:
কুমায়ুনের আরও এক নিরিবিলি জনপদ ৬২০০ ফুট উচ্চতায় পাইন, ওক, ফারে ছাওয়া শৈলশহর কৌশানি। সেই সঙ্গে দেওদার, রডোডেনড্রন, বিভিন্ন প্রজাতির ক্যাকটাস ও রঙবাহারি বুনো ফুলের মেলা। কথিত আছে এই স্থানে কৌশাম্বি ঋষি তপস্যা করেছিলেন, তাই এই পাহাড়ি জনপদের নাম কৌশানি।
অনুকূল আবহাওয়ায এখান থেকে ৩৬০ ডিগ্রি দৃশ্যময়তায় চোখে পড়ে উত্তর দিগন্তে তুষারধবল গিরিশৃঙ্গ চৌখাম্বা, কামেট, নন্দাদেবী, নন্দাঘুন্টি, ত্রিশূল, মৃগথুনি, নন্দাকোট, পঞ্চচুল্লি। সারা দিনমান এইসব শৃঙ্গে রং বদলের খেলা চলে। যেমন এখানকার সূর্যোদয় দৃশ্য, তেমনি সূর্যাস্ত। আঁক কেটে যায় পাহাড়ি বন্য ফুল, ফার্ন, আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথ, দূরের উপত্যকা, শ্রুতিকথন, পৌরাণিক কাহিনি, মনোরম পাহাড়ি শোভা।
আমরা এখানে কুমায়ুন মণ্ডল বিকাশ নিগমের পর্যটক আবাস কটেজ ৫-এ আছি। পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে সুন্দর সব কটেজ। কটেজে ঢুকেই একটা এক শয্যাঘর ও ঘরের আগাপাশতলা কাচের জানলা। ওপারেই আদিগন্ত হিমালয় ও নীচে গরুড় উপত্যকা। ভেতরে দ্বিশয্যা বিশাল ঘর, ছোটো সাজঘর, বেশ বড়ো স্নানাগার। কটেজে বসেই সামনের পাহাড়শ্রেণি ও গরুড় উপত্যকার দৃশ্য দুর্দান্ত দেখাচ্ছে।
বিকেলে গেলাম কৌশানির বিখ্যাত অনাশক্তি আশ্রম। লাল রঙের একটি লম্বাটে ঘর। সামনে গান্ধিজির পূর্ণাবযব মূর্তি। রযেছে বহুল পরিচিত তিন বাঁদর মূর্তিও। ১৯২৯ সালে মহাত্মা গান্ধী এখানে দুই সপ্তাহ কাটান এবং এখানে বসেই অনাশক্তি যোগ নিয়ে নিবন্ধ লেখেন। প্রতিষ্ঠিত হয় অনাশক্তি আশ্রম, যেটি গান্ধি আশ্রম নামেও পরিচিত। সামনে পাহাড়মুখী দুটি সিমেন্টের বসার জায়গা। এখানকার সংগ্রহশালায় গান্ধিজি ব্যাবহৃত চরকা, চিঠিপত্র, পুস্তক ও প্রচুর ছবি রয়েছে। কয়েকধাপ সিঁড়ি উঠে হিমালয় দর্শন নামে একটি মঞ্চ। পাশেই বিদেশিনী ক্যাথারিন হিলম্যান অর্থাৎ গান্ধিজির প্রিয় শিষ্যা সরলাবেন, ১৯৬৪ সালে একটি আশ্রম নির্মাণ করেন। অনুন্নত মেয়েদের জন্য স্কুল ও স্বাবলম্বী হওয়ার হস্তশিল্পকেন্দ্র গড়ে তুলেছিলেন।
অদূরেই রযেছে একটি ইকো পার্ক। একটু উতরাই পথে নেমে কৌশানি চৌরাহা ও বাজার এলাকা। একটি ফুটপাথের দোকানে চা ও ম্যাগি সহযোগে বিকেলের জলখাবার সেরে একটু আরও চড়াই উঠে এলাম কৌশানি খাদিভাণ্ডার। মোমের সুগন্ধি সামগ্রী এইসব অঞ্চলে খুব বিখ্যাত। বিভিন্ন হস্তশিল্প সামগ্রী ও শীতবস্ত্র পাওয়া যায়। সন্ধ্যা গাঢ় হয়ে এসেছে। পাহাড়ি এলাকায় সন্ধ্যা নামে তাড়াতাড়ি। কটেজে ফিরে আসি কেনাকাটা করে। রাত বাড়ে কৌশানির নিভৃত চরাচরে।
ভোর-সকালে কৌশানির সূর্যোদয় মন ভরিযে দিল। প্রাতরাশ সাঙ্গ করে চললাম, মূল বাজারের কাছেই প্রখ্যাত হিন্দি কবি সুমিত্রানন্দন পন্থের জন্মভিটে ও তাঁর নামে গড়ে তোলা সংগ্রহশালা দেখতে। একটি পুরাতন কুমায়ুনি বসতবাড়ি। এখানে রক্ষিত হাজারের ওপর হিন্দি ও ইংরাজি বইয়ের সংগ্রহ ঈর্ষা করার মতো। মলিন সৌধফলকে কবির লেখা পংক্তি উদ্ধৃত রয়েছে। প্রতিবছর ২০ মে এখানে কবিদের আলোচনাসভা বসে।
কৌশানি চা-বাগিচাটিও দেখার মতো। জাযগাটার নাম পিংলাকোট। কৌশানি মূল শহর থেকে ৩ কিলোমিটার দূরে। বাগানের প্রবেশপথের উলটোদিকেই উত্তরাঞ্চল টি স্টোর অ্যান্ড ন্যাচারাল অর্গ্যানিক প্রোডাক্টের দোকান। বিভিন্ন মানের গিরিয়াস চা পাতার সম্ভার এখানে। বাড়ির জন্য কিনে নিলাম এখানকার গ্রিন টি, সাদা মধু, অর্গ্যানিক হলুদ, হার্বস। এছাড়াও পাওয়া যাচ্ছিল হরেক ধরনের আচার, জ্যাম, জেলি, ভেষজ মশলা, আযুর্বেদিক তেল ইত্যাদি।
শহরের ৫ কিমি দূরে পিনাট ও বুদা-পিনাট নামে আরও দুটি চা বাগান আছে। মার্চের মাঝামাঝি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত চা-বাগান খোলা থাকে। শহর থেকে ৯ কিলোমিটার দূরে দেওদার, পাইনে ঘেরা পথে রুদ্রধারী শিবমন্দির। স্থানীয়দের বিশ্বাস এইখানেই ছিল কৌশাম্বি মুনির তপস্যাক্ষেত্র।
গোটা কুমায়ুন অঞ্চলটাই প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আকর। প্রায় প্রতিটি জায়গা থেকেই হিমালয় দেখা যায়। পাহাড় আমাদের নতমস্তক হতে শেখায়। হিমালয়ের তুষারধবল শৃঙ্গগুলির রমনীয দৃশ্য কৌশানিকে সেরা করে রেখেছে। মুগ্ধতার চূড়ান্ত অধিকারটুকু অচিরেই কেড়ে নেবে কুমায়ুনের হৃদয় উদ্যত কৌশানি-আলমোড়া-বিনসর। বেবাক আমি, সফরনামা খুলে শুধু দুই হাত পেতে বসে থাকি। বেশ টের পাই, ঋণী হয়ে পড়ছি রূপসি কুমায়ুনের কাছে।
কীভাবে যাবেন: রেলপথ ও সড়কপথে কুমায়ুন হিমালয়ের প্রধান প্রবেশপথ কাঠগুদাম। সেখান থেকে স্থানীয বাসের ভরসা না করে, আলমোড়া বা কৌশানি বা বিনসর গাড়ি ভাড়া করে চলে আসা যায়। পর্যটন মরশুমে গাড়ি ভাড়া দরদাম চলে।
কখন যাবেন: সারা বছরের জন্যই সুন্দর। তবে ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি যথেষ্ট শীত পোশাক থাকা জরুরি। গ্রীষ্মে আর শরতে মনোরম তাপমাত্রা। তবে সন্ধ্যার পর তাপমাত্রা কমতে শুরু করে।
কোথায থাকবেন: কুমায়ুন মন্ডল বিকাশ নিগমের পর্যটক আবাসগুলি সবচেযে স্থানিক আকর্ষণীয় জায়গায়। অনলাইনের মাধ্যমে বুক করে নেওয়া যায়। এছাড়াও আলমোড়া ও কৌশানি অঞ্চলে প্রচুর হোটেল, রির্সট, রিট্রিট আছে। বিনসরে জঙ্গলের ভেতর শুধুমাত্র কেএমভিএন-এর সরকারি আবাস আছে। ইকো বিনসর নামের জায়গাটি অরণ্যের বাইরে।
কেনাকাটা: উলের শীতবস্ত্র, ভেষজ মধু, চা পাতা, ভেষজ মশলা, রডোডেনড্রন ফুলের নির্যাস দিয়ে প্রস্তুত শরবত, নানান ধরনের আচার, সুগন্ধি মোমবাতি, মোমের গিফট আইটেম, আযুর্বেদিক তেল ইত্যাদি। এছাড়াও আলমোড়ায় প্রসিদ্ধ বাল মিঠাই ইত্যাদি কেনা যেতে পারে।
এখন বেপরোয়া জীবনযাপন মানেই জীবনহানির আশঙ্কা প্রবল। কারণ, এই অতিমারীর আবহে, সামগ্রিক জীবনধারণ পদ্ধতিটাই বদলে গেছে। তাই, প্রচলিত স্বাস্থ্যবিধির পাশাপাশি, বিশেষ কিছু নিয়মকানুন মেনে চলা আবশ্যক হয়ে উঠেছে। সতর্ক থেকে সামগ্রিক স্বাস্থ্যবিধি মেনে, শারীরিক এবং মানসিক ভাবে নিজেকে যত বেশি সুস্থ রাখতে পারবেন, আখেরে লাভ আপনারই। কারণ, করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে গেলে, টীকা নেওয়ার পরও সুরক্ষার স্বাস্থ্যবিধিগুলি এড়িয়ে চললে বিপদ আছে৷এই রোগের কবল থেকে সুস্থ থাকা এখন অত্যন্ত জরুরি। ডা. দিব্যেন্দু মুখোপাধ্যায় এ প্রসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিলেন।
ছোটোবেলা থেকে আমরা যা শিখে এসেছি, সেইসঙ্গে আর সামান্য কিছু নিয়ম মানলেই, প্রাথমিক দাযিত্ব পূরণ করতে পারবেন। অর্থাত্, বাইরে থেকে এসে হাত-পা-মুখ যেমন সাবান দিয়ে ধুতেন, তেমনই ধোবেন। আর সেইসঙ্গে, বাইরে বেরোলেই মুখে ত্রিস্তরীয় মাস্ক পরবেন এবং বাড়ি ফিরে সেই মাস্ক ও পরনের পোশাক সাবান দিয়ে ধুয়ে কড়া রোদে শুকিয়ে নেবেন। আর রোদ না থাকলে মাস্ক এবং জামাকাপড় গরম জলে সাবান সহযোগে ধুয়ে নেবেন অথবা শুকিয়ে যাওয়ার পর প্রেস (আয়রন) করে নেবেন। সেইসঙ্গে মনে রাখবেন, অন্তত কুড়ি সেকেন্ড হাতে সাবান রেখে হাত ধোবেন, রাস্তায় বেরোলে চোখে-মুখে হাত ছোঁয়াবেন না এবং হাতে ভালোমানের ব্র্যান্ডেড স্যানিটাইজার ব্যবহার করবেন। আর বাড়ি কিংবা অফিসে দরজা-জানলার হাতল, সিঁড়ির রেলিং, টিভির রিমোট, কম্পিউটার কী-বোর্ড প্রভতি অবশ্যই স্যানিটাইজ করবেন।
এখন অনেককেই কর্মক্ষেত্রে যেতে হচ্ছে এবং অফিস-এর কমন টয়লেট ব্যবহার করতে হচ্ছে। এক্ষেত্রে কী ধরনের সাবধানতা বজায় রাখা জরুরি?
পুরুষরা ইউরিনাল ব্যবহারের আগে জীবাণুনাশক তরল ঢেলে নেবেন অবশ্যই এবং মহিলারা কমোড ব্যবহারের আগে জীবাণুনাশক তরল তো ঢালবেনই, সেইসঙ্গে, সিট কভার-এর উপর স্যানিটেশন স্প্রে ব্যবহার করবেন। ওষুধের দোকানে পাওয়া যায় এই স্যানিটেশন স্প্রে। সম্ভব হলে বড়ো ওষুধের দোকান থেকে শি-পি কিনেও ব্যবহার করতে পারেন মহিলারা। এই উপকরণটি ব্যবহার করলে মহিলারাও দাঁড়ানো অবস্থায় মূত্রত্যাগ করতে পারবেন। বিদেশের মতো আমাদের দেশেও এই উপকরণটির ব্যবহার বাড়ছে। আর সবসময় টয়লেট ব্যবহারের পর, অবশ্যই সাবান দিয়ে হাত ধোবেন। কারণ, শৌচালয়ে দরজার হাতলে, করোনা ছাড়াও থাকতে পারে অন্য ভাইরাস।
প্রথমে বাড়ির বাইরে জুতো খুলে রাখুন। তারপর জুতোর উপর-নীচে ভালো ভাবে স্যানিটেশন স্প্রে ব্যবহার করে, নির্দিষ্ট জায়গায় তুলে রাখুন। বাড়ির চাবি, গাড়ির চাবি, চশমা এবং ছাতা লিকুইড সাবানজলে ভালো ভাবে ধুয়ে শুকিয়ে নিন। ঘড়ি এখন না পরাই ভালো। আর যদি পরেন তাহলে কিছুটা তুলোয় বা শুকনো কাপড়ে স্যানিটেশন স্প্রে নিয়ে ঘড়ি মুছে নিন। মোবাইলের ক্ষেত্রে ক্যামেরার লেন্সটুকু বাদ দিয়ে ঘড়ির মতো একই ভাবে স্যানিটাইজ করে নিন। ব্যাগ-এ স্প্রে করুন স্যানিটাইজার। সাবান দিয়ে কেচে নিন ব্যবহৃত পোশাক। স্নান করুন সাবান মেখে। সম্ভব হলে হালকা গরম জলে মাথায় শ্যাম্পু করুন।
শারীরিকদূরত্ববজায়রাখারক্ষেত্রেকীকীকরণীয়?
দেখুন, আমাদের দেশে যেভাবে বাসে-ট্রামে যাতায়াত করতে হয়, সে ক্ষেত্রে বাস্তবিক ভাবে শারীরিক দূরত্ব খুব বেশি বজায় রাখা যায় না অনেক সময়। তাই, অফিস কিংবা বাড়িতে ঢুকে নিজেকে স্যানিটাইজ করে নেওয়াই প্রধান উপায়। তবে সতর্ক থাকতে হবে যতটা সম্ভব। হাঁচি-কাশি হচ্ছে, এমন ব্যক্তির থেকে দূরে থাকতে হবে। হোটেল, রেস্তোরাঁ, সেলুন, শপিং মল প্রভতি জায়গায় এখন না যাওয়াই ভালো। গণপরিবহন মাধ্যমকে যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলাই ভালো। আর তা যদি সম্ভব না হয়, তাহলে যানবাহনে বসার জায়গায় স্যানিটেশন স্প্রে ব্যবহার করে বসুন এবং নেমে স্যানিটাইজার দিয়ে হাত জীবাণুমুক্ত রাখুন। কারও সঙ্গে কথা বলার সময় অন্তত ছফুট দূরত্ব বজায় রাখুন। অফিসেও অন্যের থেকে একই ভাবে দূরত্ব রেখে বসুন। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে অন্যের মুখোমুখি বসে দীর্ঘসময় কাটাবেন না।
সাধারণস্বাস্থ্যবিধিরমধ্যেউপযোগীআরকীকীমেনেচলাউচিত?
কফ, থুতু, পানের পিক প্রভতিতে পা ফেলবেন না। ধূমপান, মদ্যপান কিংবা অন্য কোনও মাদকদ্রব্য গ্রহণ কঠোর ভাবে বন্ধ রাখুন। বাইরের খাদ্য এবং পানীয় এড়িয়ে চলুন। পরিবর্তে, বাড়ির খাবার খান। বাড়িতে এবং অফিসে নিজের খাবার এবং জলপানের পাত্র আলাদা রাখুন। জলের বোতলের বাইরের অংশ সাবানজলে ধুয়ে ব্যবহার করুন। পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট জলে মিশিয়ে শাকসবজি, ফলমূল ধুয়ে নিন অথবা কিছুক্ষণ রোদে রেখে তারপর রান্না করুন অথবা খান। লন্ড্রি থেকে আনা জামাকাপড় অন্তত দুদিন রেখে ব্যবহার করুন। রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে অবশ্যই টাটকা শাকসবজি এবং ফল খান। প্রোটিনও যেন থাকে খাদ্য-তালিকায়। আর শরীরচর্চা করতে ভুলবেন না।
মাথারচুলএবংহাত–পায়েনখকীভাবেজীবাণুমুক্তরাখতেহবে?
মাথার চুল জীবাণুমুক্ত রাখতে হলে বাইরে বেরোনোর আগে সার্জিক্যাল হেয়ার-ক্যাপ ব্যবহার করুন এবং বাড়ি ফিরে হালকা গরমজলে শ্যাম্পু করে নিন। আর হাত ও পায়ে নখ কেটে পরিষ্কার রাখুন সবসময় এবং মাঝেমধ্যে সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে নিন।
মুখগহ্বরেরস্বাস্থ্যরক্ষারউপায়কী?
সামান্য সুযোগ পেলেই মুখের ভিতরে ব্যাক্টেরিয়া বাসা বাঁধে। মুখগহ্বরে সঠিকমাত্রায় লালারস ক্ষরিত হলে, মুখে বাস করা ব্যাক্টেরিয়া অনেকটাই ধ্বংস হয়।
কিন্তু অতিরিক্তি ধূমপান ও মদ্যপান করলে এবং নির্দিষ্ট কিছু ওষুধ সেবন করলে, মুখের ভিতরে লালাক্ষরণ কমতে থাকে। তাই, সমস্যা সৃষ্টিকারী এইসব উপাদান পরিত্যাগ করতে হবে। সেইসঙ্গে, মুখগহ্বরে যাতে কোনও জীবাণুর সংক্রমণ না ঘটে, তার জন্য প্রতিদিন সকালে এবং রাতে খাওয়ার পর অবশ্যই ভালোমানের টুথব্রাশ ও টুথপেস্ট দিয়ে দাঁত মাজতে হবে। আর সম্ভব হলে মাঝেমধ্যে মাউথওয়াশ দিয়ে এবং হালকা গরম জলে গার্গল করতে হবে। এছাড়া, কোনও ভাবেই হাতের অপরিষ্কার আঙুল মুখে ঢুকিয়ে দাঁতের ফাঁকে আটকে থাকা খাবার বের করবেন না এবং দাঁত দিয়ে নখ কাটবেন না। দাঁতে আটকে থাকা খাবার বের করার জন্য পরিষ্কার টুথব্রাশ ব্যবহার করুন।
শারীরিকমেলামেশারক্ষেত্রেকীকীবিধিনিষেধমানাউচিত?
এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। কারণ, স্বামী-স্ত্রী একসঙ্গে বসবাস করলে, দীর্ঘদিন শারীরিক সম্পর্ক বন্ধ রাখা প্রায় অসম্ভব। তাই এই করোনার আবহে যতটা সম্ভব স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলুন। স্বামী-স্ত্রী দুজনে সাবান দিয়ে সম্পূর্ণ স্নান করে তারপর শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করতে পারেন। সেইসঙ্গে, কন্ডোম অবশ্যই ব্যবহার করবেন এবং শারীরিক মিলনের পর অবশ্যই নিজেদের পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখবেন।
গর্ভবতীমহিলাদেরকীকরণীয়?
তাকেও একই ভাবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে এবং বাড়তি গুরুত্ব হিসাবে, তাকে নির্দিষ্ট গাইনিকোলজিস্ট-এর পরামর্শ মেনে চলতে হবে।
আরশোলা আপাত নিরীহ একটি পোকা হলেও, এটি অত্যন্ত ক্ষতিকারক। কারণ, নোংরা আবর্জনার মধ্যে ঘুরে বেড়ায় আরশোলা এবং শরীরের মাধ্যমে ক্ষতিকারক জীবাণু বহন করে তা ছড়িয়ে বেড়ায়। অতএব, বাড়িঘর আরশোলা-মুক্ত করা অত্যন্ত জরুরি। আর এই ব্যবস্থা নিতে পারবেন মাত্র দুটি সহজ উপায়ে
আরশোলা মিষ্টির গন্ধে আকৃষ্ট হয় এবং মিষ্টি খেতে ভালোবাসে। তাই আরশোলাকে আকৃষ্ট করাতে হবে চিনি, গুড়, মধু ইত্যাদি দিয়ে আর এই মিষ্টিজাতীয় উপকরণের সঙ্গে সামান্য বেকিং সোডা মিশিয়ে ওই মিশ্রণ কাগজ কিংবা প্লাস্টিকে রেখে দিন ঘরের প্রতিটি কোণায়। বিশেষ করে রান্নাঘরে গ্যাস অ্যাভেনের নীচে এবং ড্রেনের মুখে রেখে দিন। বেকিং সোডা মিশ্রিত ওই মিষ্টি উপাদান খেলেই আরশোলার মৃত্যু নিশ্চিত। টানা সাতদিন এই পদ্ধতি অবলম্বন করলে আরশোলা নির্মূল হবেই।
ক্ষতিকারক হলেও আরশোলা অনেকে মারতে চান না, শুধু তাড়িয়ে দিতে চান। এইরকম মানুষদের বাড়িঘর আরশোলা-মুক্ত করার জন্যও এক মোক্ষম অস্ত্র আছে। আর এই অস্ত্রটি হল তেজপাতা। একগুচ্ছ তেজপাতা গুঁড়ো করে ঘরের প্রতিটি কোণায় রেখে দিন কাগজের উপর। তেজপাতার তীব্র গন্ধ সহ্য করতে পারবে না আরশোলা। এর ফলে বাড়ি ছেড়ে পালাবে।
রাউরকেলা-ভুবনেশ্বর ইন্টারসিটি এক্সপ্রেস ১০ মিনিট দেরি করে প্ল্যাটফর্ম ছাড়ল ভোর ৫টা ২০ নাগাদ। কাক-ভোরে চেপে বসেছি ট্রেনে। প্রথম গন্তব্য ঢেনকানল। সেখান থেকে সপ্তশয্যা, কপিলাস ও জোরান্ডা যাওয়ার ইচ্ছে।
সকাল পৌনে ৬টায় রাজগাঙপুর এবং সোয়া ৬টায় বামরা পেরিয়ে গেলাম। শুরু থেকেই কাচের জানলার বাইরে দেখছি গাছে গাছে রক্তবর্ণ পলাশের মেলা। ফসল-কেটে-নেওয়া চাষজমি। শাল, মহুয়া, আম ও বাঁশ গাছই চোখে পড়ছে বেশি। মাঝে মাঝে তাল ও খেজুর গাছ। কখনও আবার ইউক্যালিপ্টাস প্ল্যান্টেশন। ধীরে ধীরে ঘুম ভাঙছে লোকালয়ের। গাড়ি ধুতুরা পৌঁছোল ৬টা ৪৫-এ। মাঝে দুটো সিমেন্ট কারখানা পেরিয়ে ঝাড়সুগুদায় ট্রেন এসে থামল আরও ১০ মিনিট পরে। রেনগালি পেরিয়ে ট্রেন সম্বলপুর সিটি জংশনে পৌঁছোল পৌনে ৮টায়। ফ্লাস্ক থেকে গরম চা নিলাম, সঙ্গে বিস্কুট। ঢেনকানল স্টেশনে এসে পৌঁছোলাম বেলা ১১টা ২০ মিনিটে।
ওভার ব্রিজ পেরিয়ে প্ল্যাটফর্মের বাইরে এলাম। স্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে ছিল ৪-৫টা অটো। আগে থেকে ঠিক করা এক হোটেলের নাম বলে অটোয় চড়ে বসলাম। প্রায় ১৫ মিনিট গাড়ি চলার পর আমরা এসে পৗঁছোলাম জাতীয় সড়ক ৫৫-র পাশেই অবস্থিত সুন্দর, বাগান-ঘেরা হোটেল। হোটেলের প্রকৃত অবস্থান সম্বলপুর-কটক হাইওয়ের পাশে ঢেনকানলের মহিসাপোত রোড-এ।
আমাদের বুকিং আগেই করা ছিল তাই একতলায় আমাদের জন্য নির্ধারিত ঘর পছন্দ না হওয়ায় আমাদের লাগেজ দোতলার একটি ঘরে পাঠানো হল। এই ঘরটি চমৎকার। কাচের জানলার পর্দা সরাতেই চোখে পড়ে নীচে সুদৃশ্য বাগান, দৃষ্টি প্রসারিত করলে হাইওয়ে এবং তার পিছনে সবুজ জঙ্গল।
একে একে স্নান সেরে নিলাম। বেশ খিদে পেয়েছে– সেই কাক-ভোরে বেরিয়েছি যে! নীচে নেমে চলে এলাম সাজানো ডাইনিং রুমে। সরু চালের ভাত, ডাল ফ্রাই, মিক্সড ভেজিটেবল এবং ফিশ কারিতে জমিয়ে লাঞ্চ সারলাম। তখনই হোটেল কর্মচারীর ফোন এল। সপ্তশয্যা যাওয়ার জন্য গাড়ির কি ব্যবস্থা হল জানতে চাইলে সে বলল, একটা অটো জোগাড় করা হয়েছে। আমি বললাম, কোনও অসুবিধে হবে না। মাত্র কয়েক কিলোমিটারের পথ তো। ঠিক হল, বিকেল ৪টের আগেই আমরা রওনা হব।
হোটেলে অটো চলে এসেছে বিকেল পৌনে ৪টে নাগাদ। ক্যামেরা ও জলের বোতল নিয়ে চড়ে বসলাম গাড়িতে। গন্তব্য ১০ কিলোমিটার দূরের সপ্তশয্যা। অটো হাইওয়েতে এসে বাঁ দিকে কিছু দূর এগিয়ে চলে এল ইস্ট ইন্ডিয়া মার্কেট কমপ্লেক্স-এ। সেখান থেকে আবার বাঁ দিকে এগিয়ে চলে এলাম মহিসাপোত রোড-এ। এবার ফাঁকা রাস্তা। ডান দিকে দূরে দেখা যাচ্ছে পূর্বঘাটের ছোটো ছোটো পাহাড়। রাস্তার দুপাশেই চাষজমি। রাস্তা প্রায় জনহীন। কিছু দূর এগোতেই রাস্তার বাঁ পাশে দেখি ‘কৃষি বিজ্ঞান কেন্দ্র, যা ‘ওড়িশা ইউনিভার্সিটি অফ এগ্রিকালচার অ্যান্ড টেকনোলজি-র ঢেনকানল শাখা।
অটো এগিয়ে চলল, কৃষি বিজ্ঞান কেন্দ্রের মহিসাপোত ক্যাম্পাস যেন আর শেষ হয় না! আরও প্রায় ৫-৬ কিলোমিটার যাবার পর পৌঁছোলাম সপ্তশয্যা গ্রামে। আর-পাঁচটা গ্রামের সঙ্গে এই গ্রামের আপাতদৃষ্টিতে তেমন কোনও প্রভেদ নেই। মাঝে মাঝে ছোটো পুকুর, কুঁড়ে ঘরের পাশে মুরগি ছুটে বেড়াচ্ছে, পথের পাশে কোথাও অলস কুকুর শুয়ে আছে। গ্রাম ছাড়াতেই পথের দুপাশে জঙ্গল শুরু হল। অটোচালক দীপু জানাল, চোরা কারবারিদের দৌরাত্মে পথের দুপাশে জঙ্গল হালকা হয়ে গিয়েছে। আরও কিছুদূর এগোতেই বাঁ পাশে সপ্তশয্যা স্যাংচুয়ারির গেট।
আমাদের অটো এগিয়ে চলল। আরও প্রায় ১ কিলোমিটার এগোনোর পর গাড়ি এসে থামল অটোস্ট্যান্ডে। এখান থেকেই চড়াই শুরু, তাই অটো আর এগোবে না। সঙ্গে কার থাকলে এগোতে পারতাম আরও প্রায় ২ কিলোমিটার রাস্তা। প্রথমে সিমেন্ট বাঁধানো রাস্তা কিছুদূর পর্যন্ত, বাকিটা মাটির পথ। সপ্তশয্যা গ্রাম পঞ্চায়েতের অন্তর্গত সর্দার ব্লকের অধীনে গাড়ি পার্কিং-এর ওই জায়গা।
কেমন যেন থমথমে লাগল জায়গাটা। পথের পাশে অদূরে কয়েকটি লোক বোধ হয় তাস খেলায় ব্যস্ত। পদযাত্রার শুরুটা ভালো লাগল না মোটেই। পথের দু’পাশে গাছের ছায়ায় বিকেল সাড়ে ৪টেতেই আলো কমে এসেছে। দীপু অভয় দিল, আপনারা এগিয়ে যান। সে তার ফোন নাম্বার দিয়ে দিল, যাতে হঠাৎ দরকার পড়লে ওর সাহায্য চাইতে পারি। নিস্তব্ধ, নির্জন বনাঞ্চল। তাই হাঁটা শুরু করলাম একটু জোরেই।
আমার কাছে এই চড়াই সামান্য, বরং ভালো লাগছিল দুই পাশে জঙ্গল দেখে। গৃহিণীর মুখ ভার। জানাতে ভুলল না, গাড়ি নিয়ে এলে এই চড়াই পথটা পেরিয়ে যেতে পারতাম অনায়াসে। বুঝলাম, ওর কষ্ট হচ্ছে। এদিকে গন্তব্যে তাড়াতাড়ি পৌঁছোতে না পারলে সন্ধে হয়ে যাবে। অস্বীকার করছি না, আমিও কিছুটা অস্বস্তিতে রয়েছি। নিরাপত্তার কথা ভেবে। দীপুর কাছ থেকে কিছু উদ্বেগদায়ক তথ্য জেনেছি যে। ‘এই তো সামান্য দূরত্ব’ বলে তাকে উৎসাহ দিতে থাকি।
কিছু দূর এগোনোর পরেই উপর থেকে নীচে নেমে এল মোটর সাইকেলে চাপা দুই যুবক। সে ভীত, আমি কিন্তু একটুও উদ্বেগ প্রকাশ করলাম না। আরও দশ-বারো মিনিট হাঁটার পর দেখি, বাইকে চেপে নেমে আসছে আরও তিন যুবক। আমি তাদের থামতে অনুরোধ করি, তারা থামেও। ভদ্রসন্তান মনে করে তাদের একজনকে জিজ্ঞেস করি, পথ আর কতটা? সে জানায়, এক কিলোমিটারও বাকি নেই। অন্য জন জানায়, বাকি পথটুকু চলা একটু মুশকিল। আড়চোখে তার দিকে তাকিয়ে নিয়ে ধন্যবাদ জানাই তাদের। আমাদের আশ্বস্ত করে তারা জানায়, উপরে আরও দু-তিনটে ফ্যামিলি এসেছে বেড়াতে। এবার তার মুখে হাসি ফেরে।
আরও মিনিট দশেক চড়াই ভেঙে এক প্রশস্ত জায়গায় এসে পৌঁছোলাম। সেখানে বাঁ পাশে পার্ক করা রয়েছে একটি কার ও একটি জিপ। উলটো দিক থেকে সিঁড়ি উঠে গেছে একেবারে সোজা। সে সেখানেই বসে পড়ে বিশ্রাম নিতে। আমি এবার নির্ভয়ে সিঁড়ি চড়তে থাকি। উপর থেকে নেমে আসছিল ৬-৭ জনের এক বাঙালি পরিবার। আমি তাদের উদ্দেশ্যে জিজ্ঞেস করি, আর কতগুলো সিঁড়ি চড়তে হবে মন্দিরে পৗঁছোতে? এক অল্পবয়সি মেয়ে জানায়, ঠিক ১০০টা সিঁড়ি।
চওড়া সিঁড়ি, বাঁ পাশে রেলিং। আমি দ্রুত উঠতে থাকি। উপরে এসে দেখি এক প্রশস্ত চাতাল। সেখানে এক পাশে সপ্তঋষির আশ্রম, আসন বা শয্যা, তাই এই অঞ্চল ‘সপ্তশয্যা’ নামে পরিচিত। মতান্তরে, এই গ্রাম চারিদিক সাতটি পাহাড় দিয়ে ঘেরা, তাই গ্রামের ওই নাম। এই অঞ্চলকে নিয়ে প্রচলিত আছে আরও ‘মিথ’ বা পুরাণকাহিনি। যেমন, বনবাসকালে শ্রীরাম এই স্থানে সাত দিন অতিবাহিত করেন। আরও এক কাহিনি জানায়, পাণ্ডবেরা তাঁদের ১২ বছর অজ্ঞাতবাসকালে এই সাত পাহাড়কে পছন্দ করেন আশ্রয়স্থল হিসেবে।
কারণ যাই হোক, আমি এগিয়ে গিয়ে আরও কিছু সিঁড়ি ভেঙে পৌঁছে গেলাম রঘুনাথ মন্দিরে। ভারি সুন্দর শান্ত পরিবেশ। শ্রীরামের সুন্দর মূর্তি সামনে। অন্যান্য দেবদেবীর বিগ্রহগুলিও ভারি সুন্দর। পুরোহিতকে পুজোর প্রণামী এবং যজ্ঞের জন্য কিছু অনুদান দিয়ে নীচে নামতেই দেখি সেও উপস্থিত। আমি বললাম, মন্দির ও বিগ্রহ দর্শন করে তাড়াতাড়ি নীচে নেমে আসতে। আলো কমে আসছে, অথচ আরও কয়েকটা জায়গা দেখা বাকি তখনও। আমরা দুজনে দ্রুত নামতে লাগলাম।
হঠাৎ কিছু মনে হওয়ায় পিছন ফিরতেই দেখি, ৩-৪টি বাঁদর সামান্য দূরত্ব রেখে গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে আসছে। বুঝলাম, আমার হাতের পলিথিন প্যাকেটটাই তাদের লক্ষ্য। এবার পথের পাশে গাছের ডাল থেকে নেমে এল আরও দু’টি বাঁদর। অবস্থা বেগতিক দেখে পথে পড়ে থাকা লাঠি সদৃশ একটা ডাল তুলে নিলাম হাতে। লাঠি দেখালে তারা পিছিয়ে যায়, পরক্ষণেই এগিয়ে আসে।
এই সময় নীচের গাড়ি স্ট্যান্ড থেকে এক স্থানীয় ব্যক্তি হাতে একটা মোটা লাঠি নিয়ে উঠে এসে আমাদের সঙ্গ দিল এবং বাঁদরকূলকে ভয় দেখিয়ে আমাদের গাড়ি স্ট্যান্ডে নিয়ে এল। জানাল, এটা তার রুটিন কাজ– বিনিময়ে তার কিছু রোজগার হয়। আমরাও খুশি হয়ে উপকারী, গরিব মানুষটিকে কিছু অর্থ সাহায্য করলাম।
অটোয় চড়ে বসলাম। ড্রাইভার দীপু একেবারে সোজা এসে গাড়ি থামাল সপ্তশয্যা ওয়াইল্ড লাইফ স্যাংচুয়ারির গেট-এ। মাত্র ২০ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের এই স্যাংচুয়ারি একটি ইকো ট্যুরিজম কমপ্লেক্স ও রিজার্ভ ফরেস্ট। ছোটানাগপুর প্লেটোতে অবস্থিত এই মিশ্র পর্ণমোচী অরণ্যে শাল গাছেরই আধিক্য। রয়েছে মহুয়া, পলাশ, আম এবং আরও কিছু চেনা-অচেনা গাছ। ১৯৭০ সালে এই রিজার্ভ ফরেস্ট স্যাংচুয়ারির মর্যাদা পায়। জঙ্গলে দেখা যায় গরু, ছাগল, মোষ ও লেপার্ড। বহু রকমের পাখি এই ছোটো জঙ্গলের প্রধান আকর্ষণ।
সন্ধে ঘনিয়ে আসছে। অটোয় চেপে চলে এলাম আইসিএআর অধীনস্থ সপ্তশয্যা ম্যাঙ্গো জার্মপ্লাজম ব্যাংক যেখানে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে সৃষ্টি করা হয়েছে উন্নত প্রজাতির আম গাছ। একটু এগিয়েই দেখি হর্টিকালচার ডিপার্টমেন্ট-এর সেগুন গাছের বাগান এবং বি-ফার্ম। উলটো দিকে তাকালেই অপরূপ প্রকৃতি, সপ্তশয্যার সাত পাহাড়। ছবি তুলে গাড়িতে এসে বসলাম। গাড়ি এসে থামল সীতারাম মন্দির কমপ্লেক্স-এ। এই স্থানে অন্নপূর্ণা মন্দির, কালী মন্দির এবং সূর্যনারায়ণ মন্দির স্থাপিত হয় যথাক্রমে ১৯৮২, ১৯৮৫ এবং ১৯৯০ সালে। এই মন্দির কমপ্লেক্স-এ আরও রয়েছে রামেশ্বরম শিব, গণেশ এবং মহাবীর মন্দির। ভারি সুন্দর নবগ্রহ মন্দিরটি। দেখা শেষ করে আবার অটোয় চড়ে বসলাম।
গাড়ি চালানোর মাঝে দীপু জানাল কাছাকাছি গ্রামগুলোর নাম বদ্রপল্লী, কামনিং, পদ্মনাভপুর ও পত্রভাগ। সপ্তশয্যা গ্রাম পেরিয়ে চলে এলাম মহিসাপোত রোড-এ। অটো দ্রুত ফিরে চলেছে আমাদের হোটেলের পথে। পর পর কয়েকটি সরকারি কার্যালয়, কলেজ বিল্ডিং এবং কৃষি বিজ্ঞান কেন্দ্র পেরিয়ে চলে এলাম ইস্ট ইন্ডিয়া মার্কেট কমপ্লেক্স। কয়েক মিনিটের মধ্যেই পৗঁছে গেলাম আমাদের হোটেলে।
ঘরে এসে মুখ-হাত ধুয়ে বাতানুকুল পরিবেশে আরাম পেলাম। ফোনে অর্ডার দিতে পাঁচ মিনিট পরেই ঘরে এসে গেল গরম চা। চা পান করার একটু পরেই অমরেশ পারিডা-র ফোন এল। জানাল, আমাদের ইচ্ছেমতো পরদিন সকাল ৯টার মধ্যেই গাড়ি প্রস্তুত থাকবে হোটেল প্রাঙ্গণে। গাড়ি আমাদের কপিলাস মন্দির কমপ্লেক্স, জুলজিক্যাল পার্ক, সাঁই মন্দির দেখিয়ে নিয়ে যাবে জোরান্ডায়। রাতে আমাদের পৗঁছেও দিয়ে আসবে ঢেনকানল স্টেশনে। কার-এ পুরো ট্রিপ-এর খরচা পড়বে ২৫০০ টাকা। আমি তৎক্ষণাৎ রাজি হয়ে গেলাম। ডিনার ঘরেই আনালাম গরম তাওয়া রুটি ও চিকেন কড়াই। সুস্বাদু খাবার খেয়ে রাত ১০টাতেই বিছানায়।
সকাল ৬টায় ঘুম থেকে উঠে চলে এলাম নীচে, হোটেলের সুন্দর বাগানে। হালকা ঠান্ডা বাতাসে ভারি ভালো লাগছিল। হোটেলের গেট পেরিয়ে চলে এলাম হাইওয়ের কাছে। একের পর এক লরি চলেছে কটক-ভুবনেশ্বরের পথে। একটু পরে ঘরে ফিরতেই গরম চা পেয়ে গেলাম। চা খেয়ে একে একে স্নান সেরে নিলাম। সকাল ৮টা নাগাদ চলে এলাম ডাইনিং রুমে। কমপ্লিমেন্টারি ব্রেকফাস্ট-এ আমাদের পছন্দমতো গরম ইডলি-বড়া চলে এল সাম্বার-চাটনি সমেত। পরে গরম কফি। ঘরে ফিরে সদাসঙ্গী ক্যামেরা ও দুটো ঠান্ডা জলের বোতল নিয়ে নীচে নেমে এলাম। রিসেপশন পেরিয়ে বাইরে এসে দেখি, বাগানের পাশে গোলাকার পথে আমাদের গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে।
আমরা গাড়িতে চড়ে বসলাম। হোটেল থেকে একটু এগিয়েই গাড়ি চলে এল হাইওয়েতে। যে দিকে সপ্তশয্যা গিয়েছিলাম তার উলটো পথে গাড়ি চলতে লাগল। কিছুদূর এগিয়ে গাড়ি বাঁদিকের সরু পিচ রাস্তায় ঢুকে পড়ল। ডান পাশে শ্যামাচরণপুর স্টেশন, খুরদা রোড ডিভিশনে ঢেনকানলের বাইপাস স্টেশন। আমাদের গাড়ি এগিয়ে চলল সোজা পথে। ডান পাশে গভর্নমেন্ট আইটিআই বিল্ডিং ছাড়িয়ে চলে এলাম কাইমাটি গ্রামে। রাস্তার দুই দিকেই দৃষ্টি প্রসারিত করে মুগ্ধ হচ্ছি পূর্বঘাটের ছোটো-বড়ো পাহাড়ের অসাধারণ সৗন্দর্যে। কিছুদূর এগিয়ে বাঁপাশের পেট্রল পাম্প থেকে গাড়িতে তেল ভরা হল।
কপিলাস-এর দূরত্ব ঢেনকানল থেকে ২৬ কিলোমিটার। পথের দুপাশে বড়ো, বড়ো সবুজ গাছ– আম, বট, খেজুর, তাল, নারকেল, শাল ও মহুয়া। আর দেখছি, সবুজ চাষজমি। দিগন্তে পাহাড়। গাড়ির ড্রাইভার চিত্রসেন মহান্তি ভারি ভালো লোক। যেখানে বলছি সেখানেই গাড়ি দাঁড় করাচ্ছে সে। আর আমরা নেমে এসে ফটো তুলছি প্রকৃতির।
আমাদের গন্তব্য কপিলাস। কপিলাসকে বলা হয় ‘ওড়িশার কৈলাস’। চারদিকেই পূর্বঘাটে ঘেরা কপিলাস যেন ছবির মতো সুন্দর! পথের দু’পাশেই জঙ্গল– শাল, সেগুন, কেন্দু, জারুল ও মহুয়া ছাড়াও আরও বহু প্রকার গাছ সেখানে। জঙ্গলে রয়েছে প্রধানত বাঁদর, জংলী বিড়াল, ময়ুর ও কাঠবিড়ালী। স্থানীয় মানুষ বিশ্বাস করেন, কপিলাস স্বয়ং মহাদেব চন্দ্রশেখরের আসন।
গ্রামের সমতল পথ ছাড়িয়ে উঠে এসেছি অনেকটা উঁচুতে। এখন পাহাড়কে পাক দিয়ে পথ ক্রমশই উপরে উঠছে। সমতল থেকে কমপক্ষে ১৩৫২-টি সিঁড়ি ভেঙেও মন্দিরে পৗঁছোনো যায়। আমরা এলাম বড়াবাংকি হয়ে মোটর পথে। এবার বাঁপাশে কিছুদূর এগোতেই কপিলাস মন্দিরের প্রবেশ তোরণ। একটু এগিয়ে ডান দিকে বাঁক নিতেই গাড়ি স্ট্যান্ড। ঘড়িতে সকাল সোয়া দশটা। গাড়ি থেকে নেমে চলে এলাম সারিবদ্ধ দোকানগুলোর একটাতে। সেখানে
চটি-জুতো রেখে কিনে নিলাম পুজো সামগ্রী। ধীরে ধীরে এসে পৌঁছোলাম শ্রীচন্দ্রশেখর মহাদেব মন্দিরে। গত তিন বছর ধরে মনের মধ্যে পোষণ করা ইচ্ছা বাস্তব রূপ পেল আজ। চন্দ্রশেখর মহাদেব মন্দিরের প্রধান অংশের উচ্চতা ৬০ ফুট। গঙ্গা বংশের রাজা প্রথম নরসিংহদেব ১২৪৬ খ্রিস্টাব্দে এই মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। মন্দিরের বাম পাশে ‘পয়মন্ত কুণ্ড’এবং ডান পাশে ‘মারীচি কুণ্ড’। চন্দ্রশেখর মন্দিরের চারিপাশে বিভিন্ন দেব-দেবীর মন্দির এবং প্রতিটি মন্দিরেই বহু সংখ্যায় বাঁদরের উদ্বেগজনক উপস্থিতি। লম্বা লাইনে দাঁড়ালাম পুজোর জিনিস সমেত যথেষ্ট সতর্কতায়।
মিনিট কুড়ির মধ্যেই নন্দীকে প্রণাম জানিয়ে, ঘণ্টা বাজিয়ে প্রবেশ করলাম মহাদেব মন্দিরে। গর্ভগৃহে বিরাট শিবলিঙ্গ রূপে পূজিত হচ্ছেন শ্রীচন্দ্রশেখর মহাদেব। মন্দিরে রয়েছেন কাঠের তৈরি জগমোহন, শ্রীগণেশ, কার্তিকেয় এবং গঙ্গাদেবী। পতিতপাবনী শ্রীজগন্নাথ পূজিত হচ্ছেন পার্শ্বদেবতা হিসেবে। মন্দিরের পাণ্ডারা ভদ্র এবং যথেষ্ট শৃঙ্খলা-পরায়ণ। এবার চললাম শ্রীবিশ্বনাথ মন্দিরে। প্রায় ১৫-২০টা সিঁড়ি ভেঙে উঠে ডান দিকে এগিয়ে পৌঁছে গেলাম মন্দিরে।পণ্ডিতগণের মতে বিশ্বনাথ মন্দির চন্দ্রশেখর মন্দিরের চেয়েও বেশি পুরোনো। এগিয়ে গেলাম শ্রীনারায়ণ মন্দিরে। তারপর অন্য পথ দিয়ে নীচে নেমে এলাম। পৌঁছোলাম শ্রীপার্বতী মন্দিরে। এখানেও অনেক পূণ্যার্থী পুজো দিচ্ছিলেন। আমরাও তাই করলাম। মন্দির চত্বরে দাঁড়িয়ে আরও একবার ভালো করে দেখে নিলাম শ্বেতবর্ণের মন্দিরগুলিকে।
কিছুদূর হেঁটে পৗঁছে গেলাম আমাদের জন্য অপেক্ষারত সিয়াজ গাড়িতে। ড্রাইভারকে প্রসাদ দিয়ে আমরাও প্রসাদ নিলাম। মনে ভারি আনন্দ নিয়ে চড়ে বসলাম গাড়িতে। চিত্রসেন জানাল, আমরা এবার যাব কপিলাস জু দেখতে। ছোট্ট এই জু-এর বিশেষত্ব হল, প্রায় সব জন্তু, সরিসৃপ ও পাখিই ঢেনকানল অঞ্চলের জঙ্গল থেকে উদ্ধার করা। মাত্র ৭-৮ মিনিট পরেই আমরা পৌঁছে গেলাম জু ও ডিয়ার পার্ক সহ কপিলাস বায়োলজিকাল পার্ক-এর প্রবেশদ্বারে।
ঘড়িতে তখন বেলা সোয়া ১রটা। জন প্রতি ২০ টাকার টিকিট কেটে প্রবেশ করলাম এক অতি সুন্দর জুলজিক্যাল গার্ডেনে। সাজানো জু-তে দেখলাম অনেক রকম পাখি, সরীসৃপ ও জন্তু। শেষে প্রায় ৫-৬ মিনিট হেঁটে পৌঁছোলাম বিশাল ডিয়ার পার্কে। সেখানে চরে বেড়াচ্ছিল অন্তত ৩৫টা চিতল হরিণ ও কয়েকটা শিঙাল শম্বর। কিছুটা সময় বেশ ভালো কাটল বায়োলজিকাল পার্কে। সেখান থেকে বাইরে এসে চড়ে বসলাম আমাদের কারে। ড্রাইভার জানাল, এবার চলেছি সাঁই মন্দিরে। মিনিট পাঁচেক গাড়ি চলার পর এসে পৌঁছোলাম গন্তব্যে।
বিরাট প্রবেশদ্বার দিয়ে ভিতরে এসে মনে হল, মন্দির কোথায়! এতো কয়েকটি বিশাল অট্টালিকার সমাবেশ। ভক্তি তো দূরের কথা, এত বৈভব ভালো লাগল না মোটেই। আমি এক জায়গায় বসে ভাবছিলাম, সিরডি সাঁইবাবার ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তার কথা। গৃহিণী ঘুরে ঘুরে সব দেখে দশ মিনিট পরে ফিরলেন কল্পতরুর নীচে, যেখানে আমি বসেছিলাম। বাইরে এসে চড়ে বসলাম কারে। গাড়ি চলতে শুরু করার পরই চিত্রসেন জিজ্ঞেস করল, আমরা এবার কোথায় যাব? আমি জানাই, আমাদের হোটেলে।
দুপুর সাড়ে ১২টা বেজেছে। আমাদের হাতে পর্যাপ্ত সময়। সন্ধের আগে হোটেলে ফিরলেই চলবে– ঘরে ফেরার ট্রেন সেই রাত ১১টায়। গাড়ি ঘুরিয়ে সোজা চলে এলাম হোটেলে। মুখ-হাত ধুয়ে চলে এলাম ডাইনিং রুমে। ভাত, ডাল, মিক্সড ভেজিটেবলস এবং মিষ্টি দই সহযোগে সেরে নিলাম তৃপ্তিদায়ক লাঞ্চ। সোয়া ১টা নাগাদ গাড়িতে এসে বসলাম। ‘জোরান্ডা গাদি’বা মন্দির কমপ্লেক্স কপিলাস থেকে ৩২ কিলামিটার দূরত্বে অবস্থিত। প্রায় ঘণ্টাখানেকের রাস্তা।
ঢেনকানল জেলার গোন্ডিয়া তহশিলে জোরান্ডা গ্রাম। কপিলাস রোড ধরে যাত্রা শুরু করলাম। গাড়ি চলছে দ্রুত গতিতে। নেউলাপোই এসে পৌঁছোলাম আধ ঘণ্টা পরে। এবার দেওগাঁও গ্রাম্য রোড ধরে এগিয়ে চললাম। রাস্তার অবস্থা ভালোই। তাই জোরান্ডা গাদি-তে পৌঁছে গেলাম দুপুর ২টো-র পরেই। জোরান্ডা, নাতিমা ও পাটনা– এই তিন গ্রামের মিলনস্থলে মন্দির কমপ্লেক্স অবস্থিত। এই স্থানেই বিশ্বব্যাপী মহিমা আন্দোলনের কেন্দ্রীয় দফতর।
‘জোরান্ডা গাদি’ হল ‘সর্বোচ্চ প্রভু’-র প্রতি উৎসর্গীকৃত কয়েকটি অসাধারণ মন্দিরের সমাবেশ। ‘মহিমা ধর্ম’-এ বিশ্বাসী ভক্তজনেরা প্রভুর পুজো করেন শূন্য ব্রহ্ম বা নিরাকার দেবতা হিসেবে। এই ধর্মগোষ্ঠীর মধ্যে
মূর্তি-পুজো নিষিদ্ধ।
নির্দিষ্ট জায়গায় গাড়ি পার্ক করা হল। গাড়ি থেকে নেমে এগিয়ে গেলাম শ্বেত বর্ণের মন্দিরগুলির কাছে। মন্দিরের প্রাচীরও শ্বেত বর্ণের। বেশ কয়েকজন দর্শনার্থীকে দেখলাম মন্দিরের বাইরে। মন্দির চত্বরে প্রবেশ করে কয়েকজন কৗপীনধারী মহিমা ধর্মগোষ্ঠীভুক্ত সাধুরও দর্শন পেলাম। এই মন্দিরগুলি নির্মিত হয় ২০ শতকের শুরুতে, যদিও ১৪ শতকের শুরুতেই এই স্থানে পুজোস্থল ছিল। মহিমা ধর্মের প্রবর্তক মহিমা গোস্বামীর সমাধিপীঠও এই স্থানে। প্রথাগত ভারতীয় ধর্মগুলির তুলনায় মহিমা ধর্ম ছিল সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র। তবে এই ধর্মের রীতি-নীতির সঙ্গে কিছু সাদৃশ্য লক্ষ্য করা যায় পঞ্চশাখা, বৌদ্ধ ধর্ম, তন্ত্র এবং জৈন ধর্মের সঙ্গে।
ঢেনকানলের মহারাজা ভগীরথ মহীন্দ্রা বাহাদুর, মহিমা স্বামীকে তাঁর অবস্থান ও মতধারা প্রচার করার জন্য এই অঞ্চল দান করেন। প্রায় ৮০ একর জায়গা জুড়ে ‘মহিমা গাদি ধাম’অবস্থিত। মহিমা গাদি মন্দির, উন্মুক্ত মন্দির, অগ্নিপূজা মন্দির এবং আশ্রম এই ধামে অবস্থিত। এখানে শোভা পাচ্ছে এক অনির্বান অগ্নিশিখা। প্রধান মহিমা পুজোস্থলে গাদি মন্দির, ধুনি মন্দির, অখণ্ডবাতি মন্দির এবং ঘণ্টা মন্দির অবস্থিত। এই আশ্রমে রয়েছেন বিভিন্ন শ্রেণীর তপস্বী, সাধু এবং তাঁদের অনুগামীরা, যাঁরা নিষ্ঠা সহকারে পুজোর দৈনিক কার্যবিধি পালন করে চলেছেন। এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা লাভ করে গাড়িতে এসে বসলাম। গাড়ি ফিরে চলল ফেলে আসা পথে।
ঘড়িতে দেখি বিকেল সাড়ে ৩টে বেজে গেছে। মসৃণ রাস্তায় গাড়ি ছুটে চলল। দু’পাশেই চাষের খেত। দেখছি অজস্র খেজুর গাছ। এবার নজরে এল পর পর কয়েকটি কাজু প্ল্যান্টেশন। মন হারিয়ে যাচ্ছে দূরের পূর্বঘাটে। গরমের দাবদাহ নেই, এত হাওয়া! ফিরে এলাম সুন্দর কাইমাটি গ্রামে। একটু পরেই গ্রাম ছাড়িয়ে চলে এলাম শ্যামাচরণপুর স্টেশনের কাছে। সেখান থেকে গাড়ি চলে এল এনএইচ-৫৫তে। আরও ৪-৫ কিলোমিটার দূরন্ত গতিতে চলার পর বিকেল পৗনে ৫টা নাগাদ পৌঁছে গেলাম হোটেলে।
রাত সাড়ে ৮টায় চলে এলাম ডাইনিং রুমে। পনির মশালা ও তাওয়া রুটিতে ডিনার সেরে নিলাম এবং হোটেলে থাকাখাওয়ার বিল মিটিয়ে দিলাম। ঘর থেকে লাগেজ নিয়ে এসে যখন অপেক্ষমান গাড়িতে চড়ে বসলাম, তখন ঘড়িতে রাত প্রায় ১১টা। মিনিট ২০ পরে পৌঁছে গেলাম ঢেনকানল স্টেশনে। এক মনের মতো ভ্রমণ সেরে ফিরে চললাম রাউরকেলার দিকে।