কোল্ড ড্রিংস নিয়ে ভুল ধারণা

কোল্ড ড্রিংস পান করতে অনেকেই ভালোবাসেন। যদিও জলের বিকল্প হতে পারে না কোল্ড ড্রিংক্স কিন্তু ভালোমন্দ খাবার খাওয়ার পরে, অনেকেরই মন খুঁতখুঁত করে এক বোতল কোল্ড ড্রিংক না পেলে।কোল্ড ড্রিংককে ঘিরে অনেকের মনেই কিছু কিছু ধারণা তৈরি হয়ে আছে, যার বেশির ভাগটাই ভুল৷ জেনে নিন কোল্ডড্রিংকস -এর সঠিক তথ্য৷

হজমে সহায়ক?

ভ্রান্ত ধারণা হল কোল্ড ড্রিংস খাবার হজমে সাহায্য করে। আসলে কোল্ড ড্রিংস খাবারে থাকা ফ্যাট জমাট বাঁধতে সাহায্য করে। ফলে তৈলাক্ত খাবার খাদ্যনালীতে জমতে থাকে। এছাড়া এতে থাকা সোডার পিএইচ ভ্যালু, অ্যাসিডিক হওয়ার কারণে, তা গ্যাসট্রিক জুসের কাজে বাধা সৃষ্টি করে। ফলে হজম হওয়ার বদলে পাচন প্রক্রিয়া বিঘ্নিত হয়।

সোডা গ্যাসের সমস্যা মেটায়?

এটাও একেবারেই ভুল ধারণা। উলটে সোডা আরও ক্ষতি করে। সোডা জাতীয় পানীয়তে থাকে কার্বন ডাই-অক্সাইড, যা পেটে গ্যাসের উত্পাদক। পেট ফাঁপার সমস্যায় এটি পেটের হজম না-হওয়া খাবারে ফার্মেন্টেশন সৃষ্টি করে, বড়ো বিপদ ডেকে আনে।

ডায়েট সোডায় ওজন বাড়ে না?

এই ভ্রান্ত ধারণা থেকে বেরিয়ে আসুন। কারণ যে-কোনও কৃত্রিম মিষ্টি আসলে চিনির চাহিদা পূরণ করতে পারে না। ফলে চিনির প্রতি আরও আসক্তি বেড়ে যায়। আর কৃত্রিম মিষ্টি যা কোল্ড ড্রিংস-এর অন্যতম উপাদান, তার পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়ায় ক্যানসার পর্যন্ত হতে পারে। ডায়েট সোডা এবং অন্য সমস্ত কোল্ড ড্রিংস, অতিরিক্ত চিনি ও ক্যালোরি সংযোজন করে। তাই মেটাবলিক সিনড্রোম বৃদ্ধি পায়। হার্ট অ্যাটাকের সম্ভাবনা বাড়ে। মেটাবলিক সিনড্রোম অর্থাৎ ফাস্টিং ব্লাড সুগার লেভেল ও ব্লাড প্রেশার নিমেষে বাড়িয়ে দেয়।

কোল্ড ড্রিংস-এর বিপদ হাড়ে হাড়ে

অস্টিওপোরোসিস বা হাড় ভাঙার কারণ হতে পারে কোল্ড ড্রিংস। এতে থাকা ফসফরিক অ্যাসিড ও ক্যাফিন, রক্তের ক্যালসিয়াম মেটাবলিজম এবং ক্যালসিয়াম শোষণের কাজে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। ফলে হাড়ের ক্ষয় হতে থাকে। অতিরিক্ত ফসফেট কিডনি ড্যামেজ করে।

ছোটোরা খেতে পারে?

কোল্ড ড্রিংস ওবেসিটির কারণ। এতে থাকা ক্যাফিন বাচ্চাদের খিদে কমিয়ে দেয়। ফলে পুষ্টির অভাব হয় কিন্তু ওজন বাড়তে থাকে। এছাড়াও এতে মিশে থাকা চিনি দাঁতের ক্ষতি করে। ফসফরিক অ্যাসিড থাকে প্রিজার্ভেটিভ-এ, যা দাঁতের ক্ষয়ক্ষতির অন্যতম কারণ।

অতএব অল্পে ক্ষতি নেই, বেশিতে বিপদ। কোল্ড ড্রিংস-এর বদলে, বাড়িতে তৈরি ফলের রস হাজার গুনে ভালো, পুষ্টিকরও।

ঊষা গাঙ্গুলি মঞ্চের উদবোধন করা হল সম্প্রতি

প্রিন্স আনোয়ার শাহ রোড-এ অবস্থিত, নবীনা সিনেমা হল-এর পাশে, ‘ঊষা গাঙ্গুলি মঞ্চ’-র উদবোধন করা হল সম্প্রতি। আনুষ্ঠানিক এই মঞ্চ উদ্বোধন অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন রঙ্গকর্মীর নতুন কার্যনির্বাহী দলের সদস্য হীরকেন্দু গাঙ্গুলি (সভাপতি), তৃপ্তি মিত্র (পরিচালক), অনিরুদ্ধ সরকার (সম্পাদক) প্রমুখ।

রঙ্গকর্মীর পুরোধা ঊষা গাঙ্গুলি এবং প্রধান কার্যনির্বাহী  প্রশাসক রাজেশ পান্ডের আকস্মিক মৃত্যুতে স্বাভাবিক ভাবেই দলে একটা শূন্যতা তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে রঙ্গকর্মীর বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার বিষয়ে কথা বললেন নব নির্মিত কার্যনির্বাহী দলের সদস্য এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বরা।

উষা গাঙ্গুলি মঞ্চের নকশা এবং রূপদান করেছেন আইআইটি-খড়গপুরের স্থপতি অমিতাভ ঘোষ। ভাবনায় অনিরুদ্ধ সরকার। এই নতুন থিয়েটার পারফর্মিং স্থানটির আয়তন ২০ফুট বাই ১৮ ফুট। এর গ্যালারিতে ৭০ জন দর্শক বসে নাটক দেখতে পারবেন।

সুসজ্জিত এবং শিল্পসম্মত ভাবে তৈরি এই মঞ্চের চারপাশে রয়েছে উন্নত মানের সাউন্ড সিস্টেম। রয়েছে সর্বাধিক ৫০ টি আলো প্রক্ষেপনের সুব্যবস্থা। আর এসব করা হয়েছে  প্রযোজনার গুণমান বাড়ানোর জন্য, নাট্যকর্মীদের সুবিদার্থে এবং সর্বোপরি দর্শকদের ভালো অভিজ্ঞতা প্রদানের জন্য। রঙ্গকর্মীর এই নব নির্মিত নাট্যমঞ্চটি দেখতে অনেকটা আখড়া বা গ্যালারির মতো। এখানে খুব ভালো ভাবে বসে নাটক দেখার সুব্যবস্থাও করা হয়েছে।

stage inauguration
A moment of the ‘Usha Ganguli Stage’ inauguration.

এই স্টুডিও থিয়েটারে অন্যান্য সুবিধাগুলির মধ্যে রয়েছে একটি সুসজ্জিত লাইব্রেরি, আলো ও সাউন্ড, মাইক্রোফোনস প্রভৃতি অপারেশনের ক্ষেত্র, প্রক্ষেপণ অঞ্চল, পুরুষ ও মহিলা শিল্পীদের জন্য পৃথক গ্রিন রুম, ফটোশুটের ব্যাকড্রপস এবং রিফ্রেশমেন্টের জন্য রয়েছে ক্যাফে।

রঙ্গকর্মীর বিদ্যমান থিয়েটার এবং অভিনয় কর্মশালা ছাড়াও, সংগীত, নৃত্য, যোগব্যায়াম সহ বিভিন্ন ধরণের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনারও প্রস্তাব রয়েছে। রঙ্গকর্মী শিল্প ও সংস্কৃতির এই সমস্ত নানা দিকে নজর দেবে এবং এই সংক্রান্ত কাজে উৎসাহ প্রদান করবে বলেও জানিয়েছে।

রং বদল

পৃথা দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকাল। রাত ১২টা বাজে। মিহির এখনও এসে পৌঁছল না দেখে চিন্তায় পড়ে গেল পৃথা। কিছুক্ষণ আগে পৃথা যখন মিহিরকে ফোন করেছিল, তখন উত্তর পেয়েছিল, দিস নাম্বার ইজ নট রিচেব্ল। এত দেরি তো করে না মিহির! আজ যে কী হল! কোনও দুর্ঘটনায় পড়েনি তো? নট রিচেব্ল কেন বলছে? চিন্তায় পড়ে যায় পৃথা।

শুধু খারাপ চিন্তা মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে পৃথার। খুব ঘাবড়ে যায় সে। কারণ, এই শহরটা তার কাছে নতুন। সে প্রায় কাউকেই চেনে না। কার সাহায্য নেবে ভেবে ঠিক করতে পারছে না। বাপের বাড়ির শহর কলকাতা হলে, সে এতক্ষণে দুচারজনকে ডেকে নিয়ে সাহায্য চাইত।

আসলে, মিহিরের সঙ্গে বিয়ে হওযার পর দিল্লি চলে আসে পৃথা। একটি মাল্টি ন্যাশনাল কোম্পানিতে সেল্স এগ্জিকিউটিভ হিসাবে কাজ করে মিহির। তা প্রায় বছর পাঁচেক হয়ে গেল মিহির এবং পৃথা দিল্লিতে ঘর ভাড়া নিয়ে থাকে। ওরা এখনও মা-বাবা হয়নি। বিয়ের পর ওরা এখনও গোল্ডেন টাইম পাস করছে। এবার হয়তো দুই থেকে তিনজন হওযার প্ল্যান করবে।

অফিস কলিগ ছাড়াও, মিহিরের অনেক বন্ধু আছে দিল্লিতে। তাদের সঙ্গে সন্ধেবেলা আড্ডাও মারে মিহির। কিন্তু দেরি হলে ফোন করে জানিয়ে দেয়। আজ যে কী হল… ভাবতে থাকে পৃথা।

অনেক সময় অবশ্য অফিস-এ বস্-এর সঙ্গে মিটিং করতে গিয়ে দেরি হয়। আর দেরি হলেই এসে নানা অজুহাত দেবে। কখনও বলবে, বস্ আমাকে একটা জরুরি কাজ করতে দিলেন অফিস ছুটির সময়। কোনও দিন হয়তো বলবে, আজ বস্-এর সঙ্গে কফি শপ-এ গিয়ে কফি খেতে গিয়ে দেরি হয়ে গেল।

মিহিরের কাজের প্রতি একাগ্রতা এবং অনেস্টির জন্য যে, মিহিরকে কিছুটা বেশি গুরুত্ব দেন ওর বস্, এটা জানে পৃথা। শুধু এটুকুই নয়, মিহিরের বস্-এর সম্পর্কে পৃথা জেনে গেছে আরও অনেক কিছু। মেয়েদের নিয়ে শপিং-এ যাওইয়া, ককটেল পার্টিতে যাওয়া, এসবও যে-বেশ পছন্দ করেন মিহিরের বস্, এসবও পৃথা জেনেছে মিহিরের মাধ্যমে। আসলে পৃথা এবং মিহির স্বামী-স্ত্রী হলেও, বন্ধুর মতো। তাই মিহির মজা করে পৃথাকে অনেকবার-ই বলেছে, পৃথা, তুমি তো একদিন শপিং-এ যেতে পারো আমার স্যার-এর সঙ্গে, তাহলে আমার ভালো প্রোমোশন হতো। এমনই সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে মোটর বাইকের শব্দ শুনতে পেল পৃথা। ছুটে গেল দরজার দিকে। দরজার আইহোল-এ চোখ রাখতেই পৃথা দেখতে পেল, মিহির এসে গেছে। এবার নিশ্চিন্ত হল সে এবং দরজা খুলে দাঁড়াল।

মোটরবাইক রেখে মিহির ঘরে ঢুকতে ঢুকতে পৃথা-র উদ্দেশ্যে বলল, খুব কাজের চাপ ছিল, ফোন করতে পারিনি, সরি। খুব খিদে পেয়েছে, খাবার রেডি করো, ফ্রেশ হয়ে আসছি।

ডিনার-এর সময় মিহির পৃথাকে জানাল, কাল আমাদের মুম্বই অফিস থেকে কয়েকজন স্টাফ আসবে। বস্-কে নিয়ে সবাই শপিং-এ যাবে। বাড়ির বউদের জন্য শাড়ি কিনবে সবাই। আমরা কেউ শাড়ি চিনি না। প্লিজ, তুমি একটু আমাদের সঙ্গে যাবে শপিং-এ?

মিহিরের কথা শুনে পৃথা খুব চিন্তায় পড়ে গেল। এতগুলো পুরুষ মানুষের সঙ্গে একা যেতে ওর মন চাইছে না। আবার ভাবল যে, মিহির অবশ্য সঙ্গে থাকবে। তাই, কিছুক্ষণ ভেবেচিন্তে হ্যাঁ বলে দিল পৃথা।

পরের দিন বিকেল পাঁচটার সময় ফোন এল মিহিরের। পৃথা তুমি তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে নাও। ঠিক তিরিশ মিনিট বাদে আমরা তোমাকে গাড়িতে তুলব।

পৃথা রেডি হয়ে ব্যাগটা নেবে, এমন সময় ডোরবেল বাজল।

দরজা খুলল পৃথা।

আসুন স্যার ভেতরে, বলেই মিহির ড্রইং-রুম-এ এনে বসাল অভিজিৎবাবুকে।

পৃথা একটু দূরেই দাঁড়িয়েছিল। মিহির ওর দিকে ঘুরে বলল, কাম হিযার পৃথা, আলাপ করিয়ে দিই আমার বস্ মিস্টার চ্যাটার্জী। আর স্যার, ও পৃথা, আমার স্ত্রী।

পৃথা এবং মিস্টার চ্যাটার্জী দুজনেই নমস্কার বিনিময় করলেন। হঠাৎ পৃথা-র কেমন যেন চেনা মনে হল ভদ্রলোককে। মিস্টার চ্যাটার্জীও পৃথাকে দেখে কেমন যেন চমকে গেলেন। তাঁরও যেন খুব চেনা মনে হল পৃথাকে। এভাবেই কেটে গেল কয়েক সেকেন্ড। তারপর মিস্টার চ্যাটার্জীই পৃথাকে প্রশ্ন করলেন, আরে তুমি সেই পৃথা না…? হাসপাতালে আলাপ হয়েছিল। মনে আছে, তোমার বাবা আর আমার বাবা একই হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন? হাসপাতালের ওয়েটিংরুম-এ আলাপ হয়েছিল আমাদের। একই দিনে আমাদের দুজনেরই বাবা মারা গিয়েছিলেন!

পৃথা-র সব মনে পড়ে যায়। কিন্তু সেও তো প্রায় দশ বছর আগের কথা। পৃথা এবার মিস্টার চ্যাটার্জীর উদ্দেশ্যে বলে, হ্যাঁ, মনে পড়েছে। আপনি তো অভিজিৎ তাই না?

এগ্জ্যাক্টলি। তোমার স্মৃতিশক্তি বেশ ভালো দেখছি, এখনও আমার নামটা মনে রেখেছ?

পৃথা এবং মিস্টার চ্যাটার্জী পরস্পরের চেনা দেখে বেশ খুশি হল মিহির। এবার সে সত্যিই ভাবতে শুরু করল, বস্ তার প্রতি এবার আরও সদয় হবেন এবং ওর প্রোমোশনও হবে।

আরও দু-চারটে বাক্য বিনিময়ের পর, ওরা তিনজনে গাড়িতে উঠল। ড্রাইভিং সিটে ছিলেন মিস্টার চ্যাটার্জী। তাঁর পাশে বসেছিল মিহির এবং পৃথা বসেছিল পিছনের সিটে। তারা তিনজনই তিন রকম ভাবনায় ডুবে ছিল। মিহির ভাবছিল, পৃথা এবং তার বস্-এর মধ্যে যোগাযোগ এবং সম্পর্ক ঠিক কতটা এগিয়েছিল? আর পৃথা ভাবছিল সেই ফেলে আসা দিনগুলির কথা।

অভিজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে হাসপাতালে যখন আলাপ হয়েছিল, তখন সে সবে কলেজে ভর্তি হয়েছিল। লেখাপড়ার পাশাপাশি, ভালো ছবি আঁকত সে। একটা বড়ো আঁকার স্কুলে ভর্তিও হয়েছিল। ওখানে আবার দেখা হয়ে গিয়েছিল অভিজিতের সঙ্গে। অভিজিৎ যেমন ভালো ছবি আঁকত, তেমনই ভদ্র এবং বিনয়ী ছিল। তাই, অভিজিতের প্রতি একটা বাড়তি আকর্ষণ ছিল পৃথার কিন্তু তা প্রকাশ করতে পারেনি। হয়তো অভিজিত্ও পছন্দ করত পৃথাকে কিন্তু সেও মুখ ফুটে কখনও বলতে পারেনি। তাই আজ দশ বছর পর আবার দেখা হয়ে যেতেই পৃথা একটু চঞ্চল হয়ে ওঠে। আবার পরক্ষণেই ভাবতে থাকে, তার দুর্বল হওযা উচিত নয়। কারণ, তার বিবাহিত জীবন সুখের। মিহির ভালো ছেলে। বন্ধুর মতো। তাই সে পুরোনো দিনের সব কথা মিহিরকে সময় মতো বলবে ঠিক করে।

আবার অভিজিৎ ভাবতে থাকেন, আঁকার স্কুলেও যে পৃথার সঙ্গে অনেকগুলি দিন পাশাপাশি কাটিয়েছেন, তা তো মিহিরের সামনে বলা গেল না। যাইহোক, এর মধ্যে পৃথা আবার ভাবতে থাকে, মিহির তার বস্ অভিজিতের সম্পর্কে যেমনটা বলেছে অর্থাৎ, অভিজিৎ ভালো কিন্তু মহিলাদের সঙ্গে শপিং করতে ভালোবাসেন, ককটেল পার্টি-তে যান, এসব যেন মেলাতে পারছে না পৃথা। কারণ সে জানে অভিজিৎ অত্যন্ত নম্র ভদ্র একজন মানুষ, যে-মেয়েদের চোখের দিকে সরাসরি তাকাতও না। গাড়িতে বসে এসব সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতেই হঠাৎ পৃথা মৌনতা ভেঙে প্রশ্ন করে অভিজিৎকে, ছবি আঁকা এখনও জারি আছে তো?

ওটা তো আমার প্রাণ। একদিন মিহিরকে নিয়ে আমার বাড়িতে এসো, সব দেখতে পাবে। তবে, আগের মতো রেগুলার আর আঁকা হয় না।

এসবের মধ্যে মিহির হঠাৎ বলে উঠল, স্যার, আমরা তো শপিংমল পিছনে ফেলে এসেছি।

মিহিরের কথা শুনে গাড়ির ব্রেক কষলেন অভিজিৎ। তারপর বললেন, নো প্রবলেম। বরং ভালোই হল। এখানে গাড়িটা ভালো ভাবে, নিশ্চিন্তে পার্ক করা যাবে। শপিংমল-এর পার্কিং খুব বাজে, বেরোতে সময় লেগে যায়। আর এইটুকু তো রাস্তা। আমি আর পৃথা হেঁটে মল-এর দিকে এগোচ্ছি। তুমি গাড়িটা পার্ক করে এসো।

মিহির গাড়ি পার্ক করতে চলে গেল বস্-এর কথামতো। আর অভিজিৎ এবং পৃথা পাশপাপাশি হাঁটতে শুরু করল। এমন সময় হঠাৎই অভিজিতের মোবাইল ফোন বেজে উঠল। ফোনে কথা যখন শেষ হল, তখন ওরা পৌঁছে গেছে শপিং মল চত্বরে। কথা শেষ করে অভিজিৎ জানালেন পৃথাকে, মুম্বই থেকে আসা আমাদের কলিগরা আর শপিং করতে আসতে পারবে না, কাজে আটকে গেছে। চলো পৃথা, মিহির না আসা পর্যন্ত ওই সামনের বেঞ্চে গিয়ে বসি।

এক সময় অভিজিৎ ক্রাশ ছিল পৃথার, তবুও আজ এতদিন পর অভিজিতের পাশে বসতে কেমন যেন একটু বাধো বাধো লাগছে তার। কারণ, সে এখন মিহিরের স্ত্রী, সুখের দাম্পত্য। অবশ্য এসব ভাবনার মধ্যেও সে কখন যেন বসে পড়েছে অভিজিতের পাশে।

কয়েক সেকেন্ড দুজনে চুপচাপ বসে থাকার পর মুখ খুললেন অভিজিৎ, পৃথা, দেখা যখন হয়ে গেল এত বছর পর, আমার জীবনের কিছু না-বলা কথা শেয়ার করতে চাই তোমার সঙ্গে। আজ না বললে আর কোনও দিন হয়তো বলাই হবে না।

অভিজিতের কথা শুনে পৃথা একটু ঘাবড়ে যায়। আজ এতদিন বাদে অভিজিতের মনের কথা শোনার পর সে যদি নতুন করে অভিজিতের প্রতি কোনও টান অনুভব করে, তাহলে তো মিহিরের সঙ্গে তার মনের দূরত্ব বেড়ে যাবে। কিন্তু অভিজিতের কথা না শুনেও তো উপায় নেই, আফটার অল তিনি তো মিহিরের বস্। বস্ রেগে গেলে কর্মক্ষেত্রে মিহিরের ক্ষতি হতে পারে। কিন্তু এরই মধ্যে যদি মিহির এসে পড়ে? এমনই কিছু ভাবনা যখন ঘুরপাক খাচ্ছে পৃথার মনে, ঠিক তখনই আবার অভিজিতের ফোনটা বেজে উঠল।

ফোনে কথা বলার পর অভিজিৎ পৃথাকে জানালেন, মিহিরের ফোন। আমাদের এক কলিগের-এর সঙ্গে দেখা হয়ে গেছে পার্কিং এরিযায়, তাই মিহিরের আসতে একটু সময় লাগবে জানাল।

মিহিরের দূরভাষ বার্তার পর অভিজিৎ এবং পৃথা দুজনেই হয়তো একটু নিশ্চিন্ত বোধ করল। তারপর অভিজিৎ পৃথা-কে বলতে শুরু করলেন, জানো পৃথা, চার বছর আগে আমি বিয়ে করেছিলাম। আমার স্ত্রীর নাম ছিল বিদিশা। খুব সুন্দরী ছিল। আমি খুব ভালোবাসতাম তাকে।

বিদিশা একা থাকত। বলেছিল, ওর মা-বাবা মারা গেছেন। টিউশন করে নিজের এবং ভাইবোনের লেখাপড়া-সহ সমস্ত দায়িত্ব বহন করত বলেই, শুনেছিলাম ওর থেকে। আমাদের এক ক্লাইয়েনট-এর অফিস-এ কাজ পেয়েছিল পরে। ওখানেই ওর সঙ্গে আলাপ হয়েছিল আমার। ওর দুঃখ-কষ্টের কাহিনি শুনিয়েছিল আলাপ পরিচয়ের পরে। বিয়ের আগে প্রায়ই আমাকে বলত, অভিজিৎ, আই লভ ইউ ফ্রম দ্যা কোর অফ মাই হার্ট। শুধু তাই নয়, বিদিশা আমাকে বলেছিল, এত খেটে, কষ্ট করে আর আমি পারছি না, বিয়ে করে তুমি আমার কষ্ট লাঘব করো প্লিজ। ওর এই কথা শোনার পর আমি আর দেরি করিনি, ওকে বিয়ে করে ঘরে এনেছিলাম।

 

বিয়ের আগে বিদিশার সঙ্গে পরিণয়-পর্বে আমার বন্ধুস্থানীয় দুতিনজন আমাকে বলেছিল, বিদিশা ভালো মেয়ে নয়, সরে যাও ওর থেকে। কিন্তু তখন আমি কারওর কথা শুনিনি। কারণ, বিদিশাকে খুব বিশ্বাস করেছিলাম। কিন্তু বিয়ের কয়েক মাস পরই ধীরে ধীরে ওর আসল রূপ দেখাতে শুরু করে দিল। প্রায় দিনই নতুন নতুন পুরুষ বন্ধুদের সঙ্গে পার্টি করে গভীর রাতে মাতাল হয়ে ফিরত। বিরক্ত হয়ে যখন আমি প্রতিবাদ করতে শুরু করলাম, তখন বিদিশা জানিয়েছিল, ওটা ওর পার্সোনাল লাইফ, তাই যা-ইচ্ছে করবে। অবস্থা এক সময় এতটাই চরমে উঠেছিল যে, প্রায় দিনই হাত তুলত আমার গায়ে।

পৃথা অবাক হয়ে শুনে চলেছে তার পুরোনো বন্ধু কিংবা বলা যায় এক সময়ের ভালোলাগা মানুষটার দুঃখের কাহিনি। আর অভিজিৎ বলে চলেছিল, বিয়ের মাস পাঁচেক পর একদিন হঠাৎ বিদিশা জানাল, সে মুক্তি চায়, উড়তে চায় বাঁধনহারা হয়ে। আমার কোনও অসম্পূর্ণতা কিংবা অন্যায় না থেকেও, শুধু সম্মান বাঁচানোর তাগিদে, চাহিদা মতো আমার থেকে মোটা টাকা নিয়ে ডিভোর্স দিয়েছিল বিদিশা। পরে জেনেছিলাম, আমি একা নই, আমার আগে প্রতারিত হয়েছিল আরও দুজন। আমি ছিলাম বিদিশার থার্ড হাজব্যান্ড।

এবার একটু থামলেন অভিজিৎ। তারপর আবার বলতে শুরু করলেন, আমি একা ছিলাম একাই হয়ে গেলাম। নেশায় ডুবিয়ে রাখলাম নিজেকে। সিগারেট আর মদ আমার বন্ধু হয়ে উঠল। মনটা শূন্যতা আর হাহাকারে ভরে গেল। কখন যেন আমি আমূল বদলে গেলাম। মেয়েরা সুযোগ নিতে শুরু করল। শূন্যতা কাটানোর জন্য আমি মেয়েদের সঙ্গে ক্লাব-এ, বার-এ, পার্টিতে গিয়ে আকণ্ঠ মদ গিলতে শুরু করলাম আর নেশা চড়ে গেলে আমার গাড়ির ড্রাইভার-এর হাত ধরে বাড়ি এসে শুয়ে পড়তাম। মেয়েরা দু-একজন আমার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হতে চাইত কিন্তু বিদিশার মুখটা ভেসে উঠলেই আমায রাগ চড়ে যেত। সব মেয়ে সমান নয় জেনেও, কেমন যেন বিদিশার মতো মনে হতো সবাইকে। কাউকে টাচ করার ইচ্ছেও এখন হয় না আমার। শুধু একরাশ ঘৃণা জমে আছে মনের মধ্যে। কিন্তু তোমার মুখোমুখি হতেই আমি কেমন যেন সেই পুরোনো আমি-কে ফিরে পেলাম। তোমার আর মিহিরের সুখী দাম্পত্য জীবন দেখে ভালো লাগছে। কত বিশ্বাসে ভরা তোমাদের দাম্পত্য! এমনই থেকো তোমরা চিরকাল। আজ তোমাদের দেখে কেন জানি না শুধরে যেতে ইচ্ছে করছে, নতুন করে বাঁচতে ইচ্ছে করছে।

পৃথার হঠাৎ চোখ পড়ে অভিজিতের চোখে। তার চোখ তখন জলে টইটুম্বুর। অভিজিতের ওই অবস্থা দেখে পৃথা কিছুটা আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ে। মনের একটা স্তর বলছে, অভিজিতের মাথাটা ধরে নিজের কাঁধে রাখতে, আবার মনের অন্য স্তর মনে করিয়ে দিচ্ছে, সে মিহিরের বিশ্বাস, মিহিরের ভালোবাসা, মিহিরের স্ত্রী। তাই পৃথা আবেগ কাটিয়ে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, তোমার সঙ্গে যা ঘটেছে তা খুব বেদনাদায়ক। আমার খুব খারাপ লাগছে তোমার জন্য। কিন্তু এখন কী-ই বা করতে পারি আমি? বড়োজোর তোমার ভালো বন্ধু হতে পারি। তোমার যখন মন চাইবে ফোন করবে নির্দ্বিধায়। মিহির আমার হাজব্যান্ড হলেও, খুব ভালো বন্ধু। ওকে আমি সময় মতো সব বুঝিয়ে বলব। আমি নিশ্চিত, মিহির আমাকে সাপোর্ট করবে। আশাকরি, অফিসে তুমি ওর বস্ হলেও, বাইরে মিহির তোমার ভালো বন্ধু হয়ে উঠবে। প্লিজ তুমি অবসর সময়ে আঁকায় মনোনিবেশ করো আবার। তোমার দুঃখ-যন্ত্রণা ফুটিয়ে তোলো ক্যানভাসে, প্লিজ…।

অসহ্য গরমের পর ঝেঁপে বৃষ্টি নামলে শরীরে এবং মনে যে-শান্তি আসে, পৃথার কথা শুনে অভিজিতেরও সেই অনুভতি হল হঠাৎ। এমন সময় আবার মিহিরের ফোন। ফোনটা রিসিভ করে মিহিরের কথা শোনার পর অভিজিৎ জানালেন, না, আমরা শপিং করিনি। মুম্বইয়ে কলিগরা কাজে আটকে গেছে, শপিং-এ আসতে পারবে না জানিয়েছে। আমরা তোমার জন্য মল-এর বাইরে বেঞ্চ-এ অপেক্ষা করছি। তুমি গাড়ি নিয়ে এসো।

 

এক সন্ধেবেলা মিহির বাড়ি ঢুকল হাসিমুখে। একটা প্রিন্টেড পেপার পৃথা-র হাতে দিয়ে বলল, দ্যাখো এটা, আমার প্রোমোশন লেটার।

পৃথা প্রোমোশনাল লেটারটি খুলে এক ঝলক দেখে বলল, বাহ্, দারুণ ব্যাপার, কনগ্র‌্যাচুলেশন্স।

স্যালারিও বেড়েছে অনেকটাই, বলেই পৃথাকে জড়িয়ে ধরে চুমু খেল মিহির।

পৃথা বলল, রেস্তেরাঁয় খাওয়াতে হবে কিন্তু।

চলো আজই যাব। রেডি হয়ে নাও। জানাল মিহির।

সত্যিই সেদিন পৃথাকে নিয়ে গিয়ে একটা বড়ো রেস্তোরাঁয় ডিনার করিয়েছিল মিহির। আর সেদিনের শপিং মল-এর বাইরের বেঞ্চে বসে যে-জীবনকাহিনি শুনেছিল অভিজিতের থেকে, রাতে মিহিরের পাশে শুয়ে সবটাই জানিয়েছিল পৃথা। সব শুনে মিহির বলল, স্যার-এর জীবনে যা ঘটেছে তা সত্যিই বেদনাদাযক। কিন্তু কী আশ্চর্য, স্যার-এর জীবনে যে-এত বড়ো ঝড় বয়ে গেছে, তা আমরা অফিসে এতটুকুও টের পাইনি। তাই, সব শুনে যেন অবিশ্বাস্য লাগছে।

এটাই সত্যি। তাই, তোমাদের বস্ মহিলাদের সঙ্গে ককটেল পার্টিতে গেলেও, একটা চাপা ঘৃণার ভাব রয়েছে মহিলাদের প্রতি। কারণ, সব মেয়েকে দেখে এখন তাঁর, স্ত্রী বিদিশার মতো প্রতারক মনে হয়। আমি পুরোনো বন্ধু বলেই হয়তো তাঁর ধারণা কিছুটা হলেও বদলাতে পেরেছি। কথাগুলো মিহিরকে জানাল পৃথা।

একটু থামার পর পৃথা মিহিরকে বলল, একটা কথা বলব?

হ্যাঁ, বলো…

যদি তুমি অনুমতি দাও তো আমি তোমার বস্-এর সঙ্গে ফোনে মাঝেমধ্যে কিছু কথা বলব, মানুষটা বড়ো একলা। আমি কথা বললে তোমার খারাপ লাগবে না তো?

পৃথার কথার উত্তরে মিহির জানাল, দ্যাখো, তুমি আমার স্ত্রী। আমরা ভালো বন্ধুও পরস্পরের। আমাদের সম্পর্কে বিশ্বাস এবং ভালোবাসা রয়েছে। তোমার উদ্যোগে যদি আমার বস্-এর জীবনে কোনও পরিবর্তন আসে, তাহলে আমার ভালো লাগবে। বন্ধু হিসাবে তোমাকে ভরসা করে তিনি যখন সবকিছু জানিয়েছেন, তাই তুমি যদি দশটা কথা বলে কাউন্সেলিং করো, তাহলে আমি কেন মন খারাপ করব? এতে আমার পূর্ণ সম্মতি রইল।

মিহির তার প্রতি বিশ্বাস এবং আস্থা রাখার জন্য খুব ভালো লাগল পৃথার এবং আবার নতুন করে বুঝতে পারল, তাদের দাম্পত্য সত্যিই সুখের।

 

এক ছুটির দিনে সকালে মিহির এবং পৃথা দুজনে পরিকল্পনামাফিক পৌঁছে যায় অভিজিতের ফ্ল্যাটে। দরজা খুলে অভিজিৎ প্রথমে একটু ঘাবড়ে যায় ওদের দেখে। তোমরা হঠাৎ!

সারপ্রাইজ ভিজিট। ভেতরে আসতে বলবে না? হাসতে হাসতে জানাল পৃথা।

উত্তরে অভিজিৎ জানালেন, তোমরা এসেছ দেখে খুবই ভালো লাগছে। আসলে ঘরে সব অগোছালো তো…। আচ্ছা, এসো তোমরা ভেতরে।

ঘরে ঢুকে পৃথা দেখল, বসার ঘরের সোফার উপর মদের বোতল, গেলাস, ছাইদানি সব ছড়ানো রয়েছে। অভিজিৎ কিছুটা লজ্জা পেয়ে গিয়ে সবকিছু অন্য ঘরে সরাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন এবং ওদের সোফায় বসার ব্যবস্থা করে দেন।

স্যার, আমি একটু আসছি, গাড়িটা লক করতে ভুলে গেছি বলে ছুতো করে সরে যায় মিহির। আসলে পৃথার সঙ্গে এই পরিকল্পনা করে রেখেছিল মিহির। যাতে ওর বস্ নিরিবিলিতে পৃথার সঙ্গে দুটো মনের কথা বলে হালকা হতে পারেন নির্দ্বিধায়।

কী খাবে চা নাকি কফি? প্রশ্ন করল অভিজিৎ।

একটু আগেই আমরা চা খেয়ে বেরিয়েছি। বরং ব্যস্ত না হয়ে তুমি বসো একটু কথা বলি। জানাল পৃথা।

অভিজিৎ একটা চেযার টেনে বসল পৃথার সামনে। তারপর পৃথা বলতে শুরু করল, তোমার আঁকার নেশাটাকে বাড়াও অভিজিৎ। আমি খুব খুশি হব যদি তুমি আগের মতো রং তুলি নিয়ে ব্যস্ত থাকো।

খুব বিষাদ মাখা কণ্ঠে অভিজিৎ জানাল, এখন আর ধৈর্য রাখতে পারি না আঁকতে গিয়ে।

কিন্তু জীবনটা তো আর সাদা-কালো করে রাখতে পারো না তুমি। ভুলে যাও কী ঘটেছে। যে-তোমায় ঠকিয়েছে, তাকে জিততে দিও না। তুমি এভাবে দিন কাটালে আদতে বিদিশা-ই জিতে যাবে। জীবনের রং ছড়িয়ে দাও তোমার ক্যানভাসে। এমন আরও অনেক প্রেরণামূলক কথা বলে অভিজিতের আরও ভালো বন্ধু হয়ে উঠেছিল পৃথা।

এরপর মাঝেমধ্যে পৃথা ফোনে কথা বলত অভিজিতের সঙ্গে। একদিন মিহির এবং পৃথা একটা পেইন্টিং এগ্জিবিশন-এ নিয়ে যায় অভিজিৎকে। আর ওই প্রদর্শনীতে গিয়ে মন ভালো হয়ে যায় অভিজিতের এবং তিনি যেন নতুন ভাবে মানসিক শক্তি সঞ্চয় করেন মনে। এরপর অবসর সময়ে রং-তুলি নিয়ে ব্যস্ত থাকতে শুরু করেন অভিজিৎ।

সময় বয়ে চলে। এভাবেই মিহির এবং পৃথার সঙ্গে অভিজিতের বন্ধুত্ব আরও গাঢ় হয়। কিন্তু হঠাৎই মুম্বই ট্রান্সফার হয়ে যান অভিজিৎ। স্বাভাবিক ভাবে যোগাযোগ কিছুটা কমে যায় তাদের মধ্যে। এরই মধ্যে একদিন হঠাৎ একটা চিঠি এল কুরিযার-এ। খামের উপর মিহির এবং পৃথা-র নাম লেখা।

চিঠি খুলে ওরা দেখল, অভিজিতের চিঠি। তাতে লেখা,

প্রিয মিহির ও পৃথা,

দূরভাষে এই খুশির খবরটা দিতে ইচ্ছে হল না, তাই চিঠিতে জানাচ্ছি। এটা রেখে দিও যত্নে। তোমাদের প্রতি এ আমার কৃতজ্ঞতা স্বীকার। তোমাদের প্রেরণায আমি নতুন জীবন পেয়েছি। সবাই যে বিদিশা নয়, তার প্রমাণ পেয়েছি আমি। তোমাদের প্রেরণায় আমি জীবনে নতুন করে পেয়েছি সাগরিকাকে। ও ছবি আঁকে আমার মতো। আমরা বিয়ে করব আগামী সপ্তাহে। আর ওই বিয়ের রিশেপশন-এ আমাদের একটা যৌথ চিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন থাকবে। উদ্বোধক হিসাবে চাই তোমাদের দুজনকে। আমি ফ্লাইট টিকিট পাঠিয়ে দেব। আসতে হবে দুজনকেই।

অভিজিৎ ও সাগরিকা।

চিঠিটা পড়ার পর মিহির এবং পৃথা দুজনে আনন্দে জড়িয়ে ধরল পরস্পরকে। তারপর মিহির বলল, পৃথা তুমি জিতে গেছ। তোমার উদ্যোগ সফল। সত্যিই গর্ব হচ্ছে তোমার জন্য।

সেদিন আনন্দে আবার ওরা ডিনার করেছিল বাইরে রেস্তোরাঁয়।

 

‘বেঙ্গল এক্সিলেন্সি অ্যাওয়ার্ড ২০২০’-র শরিক হয়েছিল ‘গৃহশোভা’

যারা সমাজ জীবনে বিশেষভাবে দাগ রেখেছেন বা খ্যাতি লাভ করেছেন, তাঁদের কৃতিত্বকে সম্মান জানালো ‘গীতাঞ্জলী’। এই সংস্থা সম্প্রতি প্রদান করল ‘বেঙ্গল এক্সিলেন্সি অ্যাওয়ার্ড ২০২০’। অনুষ্ঠানটির আয়োজন করা হয়েছিল নেহেরু চিলড্রেন্স মিউজিয়াম-এ।

প্রথমে মুম্বাই থেকে ভার্চুয়াল মাধ্যমে পুরষ্কৃত হলেন নৃত্যশিল্পী শ্রীনন্দী। এরপর চিকিৎসক অরুণাভ লালা,  সংগীত পরিচালক সুধীর দত্ত, সমাজসেবী সাবির আহমেদ, কাশীনাথ দাস ও লক্ষী দাস। এছাড়া  শিশু সাহিত্যিক মৃগাঙ্ক বন্দ্যোপাধ্যায়, অর্থনীতিবিদ সুবীর কুমার ঠাকুর, সমাজকর্মী জয়দেব সিকদার, চলচ্চিত্র সংগঠক সমু মিত্র, সংগীতশিল্পী ঝুমকি সেন,   এশিয়ায় সোনাজয়ী ক্রীড়াবিদ প্রণব বর্ধন প্রমুখ।

bengal excellency award
A moment of ‘Bengal Excellency Award 2020’

এদিনের মুখ্য আকর্ষণ ছিল—লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড।এই সম্মান দেওয়া হল রাজনীতিবিদ ও রাজ্যের মন্ত্রী  সাধন পান্ডে এবং চলচ্চিত্রের কিংবদন্তী অভিনেত্রী মাধবী মুখোপাধ্যায়-কে। এদিন গীতাঞ্জলী-র পক্ষ থেকে পুরষ্কার প্রদান করলেন সাংসদ শতাব্দী রায় এবং চিত্র পরিচালক রেশমি মিত্র। সংগীত পরিবেশন করেন সুজয় মুখোপাধ্যায়,  রাখী দত্ত এবং পল্লবী ঘোষ। অনুষ্ঠান সঞ্চালনার দায়িত্বে ছিলেন মহুয়া ভট্টাচার্য। নৃত্য পরিবেশন করে নজর কেড়েছেন শতাব্দী-কন্যা সামিয়ানা বন্দ্যোপাধ্যায়। সমগ্র অনুষ্ঠানটির মিডিয়া পার্টনার ছিল ‘গৃহশোভা’ ম্যাগাজিন।

——

 

ইটাচুনা রাজবাড়ির অন্দরে

শীতের রোদ গায়ে মেখে চট করে ঘুরে আসার মতো জায়গা ইটাচুনা। কয়েকটা দিন প্রাচীন ঐতিহ্য, আড়ম্বরে, রাজকীয় মেজাজে কাটাব বলে সদলে রওনা হলাম হুগলির বিখ্যাত ইটাচুনা রাজবাড়ির উদ্দেশ্যে। খন্যান স্টেশন-এ নেমে মিনিট দশেকের পথ। কলকাতা থেকে গাড়িতে আড়াই-তিন ঘন্টার মধ্যে রাজবাড়ি পৌঁছোনো সম্ভব।

গেট দিয়ে ঢুকেই নজরে পড়ল বেশ খানিকটা দূরে লাল রঙের প্রাসাদ, মাঝে সাদা কারুকার্য করা বিশাল তোরণ, ডান দিকে প্রস্ফুটিত সূর্যমুখীর দল আমাদের স্বাগত জানাল। সুসজ্জিত বাগান টপকে রিসেপশনে গিয়ে উঠলাম। এক ভদ্রলোক রাজবাড়ির ভুল ভুলাইয়া পথ পার করে আমাদের ঘর দেখিয়ে দিলেন। দেখলাম প্রতিটি ঘরের একটি নাম রয়েছে এবং নামগুলো সব পরিবারের মানুষদের নাম অনুসারে। যেমন, ছোটো বউদির ঘর, ঠাকুমার ঘর, কাকিমার ঘর ইত্যাদি। ঘরগুলো পুরোনো আসবাবে সুসজ্জিত, তবে সব রকম আধুনিক সুবিধাও রয়েছে।

ইটাচুনা নামটি যখন প্রথম শুনেছিলাম বড়োই অদ্ভুত লেগেছিল। মনে হয়েছিল এ আবার কেমন নাম, আসলে অতীতে এই স্থানে অনেক জলাশয় ছিল। সেই জলাশয়ে প্রচুর শামুক-ঝিনুক, গুগলি জন্মাত। এই জীবগুলির দেহাবশেষ গুঁড়ো করে সেই আমলে চুন তৈরি করা হতো। জলাশয় খোঁড়ার ফলে যে-মাটি উঠত, সেগুলো দিয়ে ইট তৈরি করা হতো। এই অঞ্চলে চুন ও ইটের ব্যাবসাই ছিল প্রধান জীবিকা। সেই থেকে এই অঞ্চলটি ইটাচুনা নামে পরিচিত।

স্নান সেরে খাবার টেবিলে এসে বসলাম। এবার সত্যিই নিজেদের কেমন একটা জমিদার বাড়ির সদস্য মনে হচ্ছে। সামনে রাজকীয় আয়োজন দেখে তো আমাদের চোখ প্রায় কপালে উঠল। কাঁসার বিশাল থালায় পঞ্চব্যঞ্জন সাজানো। কী নেই তাতে! শুক্তো থেকে শুরু করে পোস্ত, ডাল, ভাজা, মাছ, মাংস, ডিম, চাটনি, মিষ্টান্ন, রসগোল্লা, ফলের রেকাবি ভর্তি ফল আরও কত কি। কোনটা ছেড়ে কোনটা খাব, মনটা আনন্দে ভরে উঠল। ভোজন রসিক হলে তো কথাই নেই।

 

দুপুরের খাওয়া সেরে সবাই বিছানায় গা এলিয়ে দিল। আমার তো কিছুতেই ঘরে মন টিকছে না। দেয়ালে টাঙানো ছবিগুলো জীবন্ত হয়ে যেন আমায় হাতছানি দিল। নিঃশব্দে বেরিয়ে পড়লাম প্রাসাদোপম বাড়ির আনাচ-কানাচ দর্শনে।

নীচে ঠাকুরদালান, বিশাল নাটমন্দির, চারিদিকে ঘেরা ইমারত। এখানে এককালে যাত্রা, নাটক, নাচ-গানের অনুষ্ঠান হতো। বাড়ির মেয়েরা চারপাশের দোতলায় বিশাল বারান্দায় বসে সেই আনন্দ উপভোগ করতেন। আমিও কিছুক্ষণ বসে রইলাম। চারদিক নিঝুম নিস্তব্ধ, কেবল পায়রার বকম বকম শব্দ আর শালিকের কিচিরমিচির ঝগড়া। অচেনা কিছু পাখির ডাকাডাকিও শোনা যাচ্ছে। বারান্দা লাগোয়া পরপর ঘর আবার ওপাশে লম্বা ঝুল বারান্দা। আলো-অাঁধারি পথ টপকে সিঁড়ি। কিছুটা ফাঁকা ছাদ। তার একদিকে দালান ঘর। কোথা থেকে কোথায় যাচ্ছি কিছুই ঠাহর করতে পারছি না।

মনে হল অসংখ্য ঘর, তোরণ, বিশাল বারান্দা, সিঁড়ি ইত্যাদির মাঝে পথ হারিয়ে ফেলব না তো। বা কোনও গুম ঘরে পৌঁছে যাব না তো! একটা রোমাঞ্চকর গা ছমছমে পরিবেশে এদিক সেদিক করতে করতে সিঁড়ির সামনে এসে পড়লাম। চারিদিকে কেউ কোথাও নেই। দাঁড়িয়ে ভাবছি উপরে উঠব কিনা, একবার ভাবলাম ফিরে যাই, মনে হল কী আর হবে, সাহস নিয়ে ধীর পায়ে উপরে উঠতে লাগলাম। সিঁড়ির শেষ প্রান্তে লাগানো পুরোনো দরজা। একটু চেষ্টা করতেই সশব্দে দরজা খুলে গেল।

কয়েকটা পায়রা ছটফট করে এদিক ওদিক গিয়ে বসল। সামনে বিশাল দৈত্যাকার ছাদ। প্রায় ৬ ফুট উঁচু পাঁচিল ঘেরা। কোনওমতে মাথা উঁচু করে চোখে পড়ল বাড়ির পেছনে বড়ো পুকুর। বহুদূর পর্যন্ত চাষের জমি। খালি ধু ধু মাঠ, গ্রামের বসতি, দূরের আবছা দৃশ্য। আলো কমে আসছে, এবার নিজের ঘরের দিকে যাত্রা করা ভালো। কেমন যেন মনে হল, সব অশরীরীরা এদিক সেদিক থেকে নজর রাখছে। আর কালবিলম্ব না করে দ্রুত নীচে নেমে এলাম।

নীচের দিকে ছাউনি দিয়ে ঘেরা বসার জায়গায় চা ও স্ন্যাক্স এর সাথে আমাদের সান্ধ্য আড্ডা জমে উঠল। হঠাৎ সুরেলা বাঁশির আওয়াজ কর্ণকুহরে প্রবেশ করে মনের দরজায় করাঘাত করল। সুরের মূর্ছনায় হারিয়ে যেতে যেতে চায়ে চুমুক দিলাম। আমাদের কয়েকজন ব্যাডমিন্টন কোর্টে নেমে পড়ল। আর কয়েকজন ক্যারাম পেটাতে গেল। তবে এখানে সবচেয়ে আকর্ষণীয় বস্তুটি হল দাবার ছক। এটিকে দানবীয় দাবা বললেও ভুল বলা হবে না। প্রায় চার ফুট বাই চার ফুট তো হবেই। পক্ষ এবং প্রতিপক্ষ ছাড়াও দাবার চাল দিতে অন্তত দুই পাশে দুজনকে দাঁড়াতে হবে। তা না হলে ছকে চাল দিতে হাত পৌঁছোনো সম্ভব নয়।

রাতে খেতে নেমে শুনলাম এই মহল লাগোয়া অন্য আরেকটি মহল পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। ওপাশে কেউ বড়ো একটা যায় না। ম্যানেজারবাবু বললেন কাল সকালে আপনাদের পুরো মহল ঘুরে দেখাব। বাঃ এই আশাতেই বসে ছিলাম।

পরদিন পরতে পরতে রাজবাড়ির অতীত রহস্য উন্মোচিত হতে হতে জানলাম এই রাজবাড়ির পূর্বপুরুষরা আসলে বর্গি ছিলেন। সঙ্গে সঙ্গে সেই ছড়ার লাইনটি মনে পড়ে গেল– ‘খোকা ঘুমাল পাড়া জুড়াল বর্গি এল দেশে’। এরা এসেছিলেন মহারাষ্ট্র থেকে। রামদাস কুন্দন ছিলেন সেই বর্গি জাতির দলপতি। এরা দলবদ্ধ ভাবে লুটপাট চালাত। লুটতরাজ করতে গিয়ে স্থানীয় মানুষদের বিরোধিতার সম্মুখীন হতে হতো বহু সময়ে। ফলে ধীরে ধীরে এদের ক্ষমতা সীমিত হতে থাকে।

এরা বুঝেছিলেন এখানে থাকতে পারলে সব দিক থেকেই এরা লাভবান হবেন। তাই স্থানীয়দের সঙ্গে আপস করে নেন। এইভাবে প্রায় চার পুরুষ কেটে গেল। সময়টা ছিল ১৭৬৬ সাল। এই পরিবারের তৎকালীন প্রধান সাফল্যরাম কুন্দন– এই বাড়ি ও ঠাকুরদালান প্রতিষ্ঠা করেন। এরা ছিলেন শিবের উপাসক। পরে শিবের আরাধনা ছেড়ে শ্রীধর প্রতিষ্ঠা করেন। ধীরে ধীরে এরাই গ্রামবাসীদের রক্ষাকর্তা হয়ে উঠলেন। তাদের সুবিধা-অসুবিধা এমনকী ডাকাতের হাত থেকে এরাই গ্রাম্য নিরীহ মানুষদের রক্ষা করতেন। এরাই নিজেদের দেশের আত্মীয়, বিধবা, দুস্থদের এখানে আশ্রয় দেন। এভাবে জমিদার তন্ত্র শুরু হয়।

ব্রিটিশ যখন এদেশে এসে মধুপুর ও গিরিডি-র রেললাইন পাতার কাজ শুরু করেন তখন এই রাজবাড়ির সদস্যরাই প্রধানত সেই দায়িত্ব নিয়েছিলেন। এটাই ছিল তাদের অর্থ উপার্জনের রহস্য। এরা মধুপুরেও জমিদারি প্রতিষ্ঠা করেন। কিন্তু সেই জমিদারি বেহাত হয়ে যায়। একসময় মধুপুরের নায়েব জমিদারির দখল নিয়ে নেন।

গল্প শুনতে শুনতে পৌঁছে গেলাম শূন্য আস্তাবল, গোশালা এবং মেয়েদের পালকি ঘরের দিকে। পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। এই বাড়িটির তিনটি মহল রয়েছে– কাছারি মহল, দেবত্র মহল এবং বসতি মহল। সম্পূর্ণ মহল এবং বাগান নিয়ে প্রায় কুড়ি বিঘা জমি হবে। এই গ্রামটিতে প্রায় ৩৫টি পুকুর ছিল। রাজবাড়ির পিছনে বড়ো পুকুরটির কাছে এসে দাঁড়ালাম। এই পুকুরে একসময় কুড়ি পঁচিশ কিলো ওজনের মাছ ছিল। রাজমহলের সদস্যরা এদের বিভিন্ন নামে ডাকতেন। এমন কাণ্ড কখনও শুনিনি মাছেদেরও নাম থাকে। ব্যাপারটা বেশ অভিনব।

ঘুরতে ঘুরতে আমরা প্রায় রাজবাড়ির বাইরের দিকে এসে পড়লাম। রাস্তার অপর দিকে একটি প্রাচীন মন্দিরের সামনে এসে দাঁড়ালাম। মন্দিরের হাল দেখে মনে হচ্ছে এখানে পূজার্চনা বহুদিন বন্ধ। ম্যানেজারবাবু বললেন, ‘এই ধরনের শিবের বিগ্রহ ভূ-ভারতে দুটি নেই। সত্যি বড়ো আশ্চর্য ধরনের মূর্তি। সাদা মার্বেল পাথরের তৈরি মনে হল। বেশ নাদুসনুদুস ভুঁড়ি নিয়ে জীর্ণ মন্দিরে একা বসে রয়েছেন। মাথার জটা কাঁধ ছাড়িয়ে মাটি পর্যন্ত নেমে এসেছে। লম্বা সাপ গলা জড়িয়ে রয়েছে। জমিদার বাড়ির কোনও এক সদস্য গিরিডি জঙ্গল থেকে এই মূর্তিটি পেয়েছিলেন। এখানে প্রতিষ্ঠা করার পর ভদ্রলোকের মৃত্যু হওয়ায় পুজো বন্ধ হয়ে যায়।

travel Itachuna

রাজবাড়ির পেছনে অনেকগুলো মাটির কুটির নজরে এল। এই মাড হাটগুলো ২০১৫ সালে তৈরি করা হয়। এখানে থাকার ব্যবস্থাও আছে। বর্তমানে এই জমিদার বংশের ১৪৩ তম বংশধর ধ্রুব নারায়ণ কুন্ডু এবং তাঁর স্ত্রী এই বিশাল জমিদার বাড়ির একাংশে বসবাস করেন। এদের প্রকৃত পদবি ছিল কুন্দন পরে অপভ্রংশ হয়ে কুন্ডু-তে পরিবর্তিত হয়। ওনার সঙ্গে কথা বলে জানলাম এরা দীর্ঘদিন বিদেশে ছিলেন। তারপর এখানে চলে এসেছেন। কলকাতায়ও এদের বাড়ি রয়েছে। এনার ঠাকুরমা বিলাস মঞ্জরি দেবী ছিলেন তৎকালীন সংস্কৃত ভাষায় পন্ডিত। পরিবারের সকলেই কমবেশি মেধাবী ছিলেন। এই অঞ্চলের সব স্কুল কলেজ এরাই প্রতিষ্ঠা করেন।

ছাদে এসে ম্যানেজারবাবু বললেন, এখানে ভিউ খুব ভালো, ছবি তোলার থাকলে তুলে নিতে পারেন। তারপর বললেন, রাজবাড়ির একাংশে আপনাদের নিয়ে যেতে পারব না, ওটা সম্পূর্ণ পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। আমাদের মধ্যে একজন একটু ইতস্তত করে জিজ্ঞাসা করে ফেলল, এই রাজবাড়িতে ভূত আছে নাকি? আমরা এখানে আসার আগে একটু একটু শুনেছিলাম। কথা শেষ করার আগেই ম্যানেজার বাবু বললেন, আমি তো এখানে বহুদিন আছি এমন কোনও ঘটনার সাক্ষী হতে হয়নি কখনও। যাক এমন অভিজ্ঞতা না থাকলেই ভালো। তবে অশরীরীরা এসব কথায় ক্ষুণ্ণ হলেন কিনা তা অবশ্য জানি না। রাজবাড়ির পরিত্যক্ত অংশ বাদ দিলে বাকিটা খুব সুন্দর এবং বহু হিন্দি ও বাংলা ছবির শুটিং হয়েছে এই রাজবাড়িতে। যেমন লুটেরা, কৃষ্ণকান্তের উইল ইত্যাদি। বেশ কিছুটা সময় কাটিয়ে আমরা ধীরে ধীরে অতীতের সিঁড়ি বেয়ে বর্তমানে এসে দাঁড়ালাম।

পরদিন সকালে ঘুম ভাঙলে সুরেলা বাঁশির আওয়াজ কানে এল। এই গ্রামের এক ভদ্রলোক সকাল সন্ধ্যা এখানে আসেন। অসাধারণ সুর তাঁর বাঁশিতে। আজ আশেপাশে দর্শনীয় স্থানগুলি যাব ঠিক হল।

প্রথমে যে-মন্দির দর্শন করলাম সেটি হুবহু দক্ষিণেশ্বরের আদলে তৈরি শুধু আকারে ছোটো। তবে তথ্য নিয়ে জানলাম রানি রাসমণি এই মন্দিরটির আদলে দক্ষিণেশ্বরের মন্দির নির্মাণ করেছিলেন। এরপর গেলাম খ্রিস্টীয় তেরো শতকে নির্মিত বিখ্যাত পান্ডুয়া মসজিদে। মসজিদটি ৭০.৪ মিটার দৈর্ঘ্য এবং ১২.৮৩ মিটার প্রস্থ বিশিষ্ট ইমারত। এখানে তিনটি বারান্দা এবং সামনের দিকে  ২১টি ও পাশে তিনটি দরজা আছে। ছাদে হিন্দু নকশাযুক্ত পাথরের স্তম্ভের উপর নির্মিত ৬৩টি গম্বুজ আছে।

১৩৪০ খ্রিস্টাব্দে পান্ডুয়া মসজিদের সামনে বিজয় সড়ক হিসেবে মিনার পান্ডুয়া তৈরি হয়। এর উচ্চতা প্রায় ৩৮.১০ মিটার। তবে সবটাই কালের গহ্বরে হারিয়ে যেতে বসেছে। দেখে কোনও ধবংসস্তূপ মনে হয়।

ইচ্ছে থাকলে ঘুরে আসা সম্ভব অতি সুসজ্জিত ব্যান্ডেল চার্চ, অসামান্য কারুকার্য করা হংসেশ্বরী মন্দির, বৃন্দাবন চন্দ্রের মঠ, প্রতাপেশ্বর মন্দির, কৃষ্ণ মন্দির, লালজি মন্দির এবং ১০৮টি শিব মন্দির। এইসব মন্দিরগুলির দেয়ালে টেরাকোটার অপূর্ব কাজ মুগ্ধ করল আমাদের।

বছরের যে-কোনও সময় এই রাজবাড়িতে এসে থাকা সম্ভব। তবে আসার আগে অবশ্যই বুক করে নিতে হয়। এখানে দোল এবং জন্মাষ্টমী খুব বড়ো করে পালন করা হয়। যদিও ওই সময় বাইরের লোকের প্রবেশের অনুমতি থাকে না। সে যাই হোক দুই-তিনদিন ইতিহাসের পাতা উলটে জমিদার তন্ত্র উপভোগ করতে চাইলে বর্তমান-কে পেছনে ফেলে চলে আসুন ইটাচুনা রাজবাড়ির অন্দরে।                        ঞ্জ

কীভাবে যাবেন – হাওড়া বা শিয়ালদা স্টেশন থেকে বর্ধমান মেন লাইনের যে-কোনও ট্রেনে খন্যান স্টেশন। ট্রেনে ঘন্টা দেড়েকের রাস্তা। স্টেশন থেকে টোটো বা রিকশা ১০ মিনিটের পথ। এছাড়া প্রাইভেট গাড়িতেও সরাসরি হুগলি জেলায় অবস্থিত এই রাজবাড়ি যাওয়া যাবে।

কখন যাবেন – বছরের যে-কোনও সময় ইটাচুনা রাজবাড়ি যাওয়া যায়। তবে যাওয়ার আগে অবশ্যই বুকিং করে নিতে ভুলবেন না।

সাপ-লুডো

মোবাইল ফোনটার তীব্র আওয়াজে, ঘুমটা ভেঙে গেল শ্রীরাধার। কোনও রকমে চোখ খুলে জানলার বাইরেটা দেখার চেষ্টা করল সে। না, এখনও খুব দেরি হয়ে যাযনি। কাঁচা একটা আলোর রেখা ঘরের মেঝেতে প্রবেশ করে, গ্রিলের জ্যামিতিক ছাযা আলপনার সৃষ্টি করেছে। সুজিতও উঠে বসেছে বিছানায়।

শ্রীরাধা ফোনটা ধরতে গিয়ে মোবাইলে দেখল পৌনে ছটা বাজে।

হ্যালো

শ্রীরাধা মিত্র বলছেন?

হ্যাঁ, কে কথা বলছেন?

আমি কানপুর আইআইটির হোস্টেল থেকে বলছি।

হ্যাঁ বলুন, কী ব্যাপার?

প্রশান্ত বসু আপনার কে হয়?

ভাই। কেন? কী হয়েছে প্রশান্তর? উদ্বেগটা লুকোতে পারে না শ্রীরাধা। সুজিতও কিছু বুঝতে না পেরে অধৈর্য হয়ে তাকিযে আছে তার দিকে, অনেক প্রশ্ন নিয়ে। এবার একটু থেমে ওপারের কণ্ঠস্বর একটু কিন্তু কিন্তু করে বলল,

আজ সকালে ঘরে ঢুকে দেখি উনি সুইসাইড করেছেন।

সে কি!

প্রায় চিৎকার করে ওঠে শ্রীরাধা। ফোনটা হাত থেকে পড়ে যাওয়ার উপক্রম হয়। তার অবস্থা দেখে সুজিত ফোনটা কেড়ে নিয়ে বাকি কথা শোনে। তারপর বলে,

ঠিক আছে, আমরা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব যাওয়ার চেষ্টা করছি।

ডুকরে ডুকরে কাঁদতে শুরু করে শ্রীরাধা। তাদের ৯ বছরের ছেলে জিৎ-ও উঠে বসেছে মাযের কান্না শুনে। ঘুম ভেঙেই এরকম একটা দৃশ্য দেখে কেমন যেন হতভম্ব হয়ে গেছে সে। শ্রীরাধার পিঠটা কান্নায ফুলে ফুলে উঠছে। সুজিত তার পিঠে হাত বুলিয়ে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করে।

সত্যি বলতে কী, এই ঘটনার জন্য একেবারেই প্রস্তুত ছিল না শ্রীরাধা। প্রশান্ত তার নিজের ভাই নয কিন্তু নিজের ভাইযের চেয়ে বেশি আপন। বহরমপুরে তার বাপের বাড়ির সরকারি কোযার্টারে পাশাপাশি থাকত তারা। প্রশান্তর মা স্বামীহারা হওয়ার কারণে স্বামীর চাকরিটা পেয়েছিলেন। ওই কোযার্টারেই ছেলেকে নিয়ে থাকতেন। শ্রীরাধার কোনও ভাই-বোন ছিল না। প্রশান্তকেই ছোটো থেকে ভাইফোঁটা দেওয়া, রাখি পরানো, পুজোয জামাকাপড় দেওয়া এসব চলত। দুই বাড়ির মধ্যে অন্তরঙ্গতা এমন ছিল যে, কেউ বলে না দিলে বোঝা সম্ভব ছিল না, এরা পরস্পরের প্রতিবেশী। নিকট আত্মীযের মতোই ছিল এই পারিবারিক সম্পর্ক।

প্রশান্ত তার চেয়ে প্রায় আট বছরের ছোটো হলেও, শ্রীরাধা তার সঙ্গে খেলাধুলো করেই বড়ো হয়েছে। ছোটো থেকেই পড়াশোনায় দারুণ ভালো প্রশান্ত। ক্লাসে কখনও দ্বিতীয হয়নি। শ্রীরাধা নিজে অত ভালো ছাত্রী না হলেও, ভাই-কে নিয়ে তার গর্বের শেষ ছিল না। ভাইয়ের পাওয়া মেডেল নিয়ে সারা স্কুলে ঘুরে বেড়াত প্রশান্তর কৃতিত্ব তুলে ধরার জন্য।

বিয়ে হয়ে কানপুরে চলে আসার পরও, ভাইযের জন্য ভীষণ মন কাঁদত শ্রীরাধার। ঈশ্বর হয়তো সেই কষ্টের কথা ভেবেই ভীষণই মেধাবী ছাত্র প্রশান্তকে একটা সুবর্ণ সুযোগ করে দিলেন। অল ইন্ডিয়া জয়েন্ট-এ দারুণ রেজাল্ট করল প্রশান্ত এবং আইআইটি কানপুরে ইঞ্জিনিযারিং পড়ার সুযোগ পেয়ে গেল।

দিনটা আজও মনে আছে। খবরটা পাওয়া মাত্র, শ্রীরাধা ফ্ল্যাটের সকলকে মিষ্টি খাইযে এসেছিল। ভর্তি হওয়া ইত্যাদির প্রক্রিযা চলাকালীন প্রশান্ত আর তার মা রুবিমাসি, শ্রীরাধার ফ্ল্যাটে এসে কদিন ছিলেন। শ্রীরাধা অনেকবার বলেছিল প্রশান্তকে, হোস্টেল-এ ঘর নেওয়ার দরকার নেই। কিন্তু শ্রীরাধার ছোটো ফ্ল্যাটে অসুবিধা হবে ভেবে, কিছুতেই রাজি হয়নি প্রশান্ত। তবে ছুটিছাটা পেলেই সে চলে আসত তার রাধাদিদির কাছে। দুজনে জমিযে আড্ডা দেওয়া, সিনেমা দেখা এসবও বহুবার হয়েছে।

আজ খবরটা পাওয়ার পর কিছুতেই যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিল না শ্রীরাধা। এত ব্রিলিযান্ট একটা ছেলে, কেন নিল এরকম সিদ্ধান্ত! কী ছিল তার মনে? কেন একবারের জন্যও বুঝতে পারেনি শ্রীরাধা! চোখের জল বাধা মানছে না। রুবিমাসিকে কীভাবে খবরটা দেবে, সেটাও ভেবে পাচ্ছে না। দিশাহারা অবস্থাটা কীভাবে সামলাবে যখন বুঝতে পারছে না, তখন সুজিত ধীর স্বরে বলল,

রাধা ওঠো তৈরি হয়ে নাও। আমাদের তাড়াতাড়ি ওখানে পৌঁছনো দরকার।

সম্বিত ফিরল শ্রীরাধার। সত্যিই তো এভাবে বসে থাকলে তো চলবে না। তাকে শক্ত হতেই হবে। অনেকগুলো কাজ বাকি। বডি পুলিশ নিয়ে যাবে মযনাতদন্তের জন্য। হোস্টেল থেকে প্রশান্তর জিনিসপত্র নিয়ে আসতে হবে। ঘর ছেড়ে দেওয়ার জন্য কিছু ফর্মালিটিজ আছে। খাতায-কলমে তারাই প্রশান্তর লোকাল গার্জেন। কিন্তু সবচেয়ে আগে ফোন করা দরকার রুবিমাসিকে। তারপর ফোন করা দরকার আরও একজন-কে। সুমনা। প্রশান্তর সঙ্গে তার সম্পর্কের কথা একমাত্র শ্রীরাধাই জানত। কে জানে, খবরটা শুনে কী অবস্থা হবে মেয়েটার। একটু নিজেকে সামলে নিয়ে রুবিমাসির নম্বরটা ডাযাল করে শ্রীরাধা।

আধঘন্টা পর হোস্টেল-এ পৌঁছে দেখে ভিড়ে ভিড়াক্কার। সহপাঠী, শিক্ষক সকলেই জমাযেত হয়েছেন সেখানে। প্রশান্তর বডিটা শোযানো আছে হোস্টেল-এর বড়ো দালানটায। শ্রীরাধা আর সুজিতকে দেখে এগিয়ে এলেন মেট্রন। বললেন প্রশান্তর খাটের উপর একটা সুইসাইড নোট পাওয়া গেছে। লেখা তার মৃত্যুর জন্য কেউ দাযী নয। সে স্বেচ্ছায এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কথাগুলো শুনতে শুনতে ঝরঝর করে কেঁদে ফেলে শ্রীরাধা। প্রশান্ত শুযে আছে মাটিতে। চোখ বোজা, কেউ বলবে না দেখে যে তার দেহে আর প্রাণ নেই। শ্রীরাধাকে সামলানোর ব্যর্থ চেষ্টা করে সুজিত। শ্রীরাধা বসে পড়ে মেঝেতে। জ্ঞান হারায। পুলিশ, পোস্টমর্টেম, জিজ্ঞাসাবাদ এই পর্বগুলো সুজিতই সামলায। রুবিমাসির কাছে এই মর্মান্তিক খবর পেঁছোনোর পর, তিনিও অসুস্থ হয়ে পড়েন। ফলে দাহকর্ম সুজিতকেই সারতে হয়।

 

দিন দুযেক পরের কথা, রুবিমাসি আজ কানপুর পৌঁছবেন। সকালে উঠেই সুজিত স্টেশনে গেছে তাঁকে আনতে। শ্রীরাধা খাবার টেবিলে বসে ভাবছে, কীভাবে ফেস করবে রুবিমাসিকে। এই ঘটনা যে তাঁরও কল্পনার অতীত। জিৎ একটা খেলনা রেলগাড়ি নিয়ে সারা ঘরে হুটোপাটি করছিল। ঠাস করে তার গালে একটা চড় লাগিয়ে দেয শ্রীরাধা। কোনও কিছুই তার ভালো লাগছে না যেন। চোখের সামনে খালি ভাসছে প্রশান্তর মুখটা। কী ভেবেছিল প্রশান্ত, গলায ফাঁস লাগানোর ঠিক আগের মুহূর্তটায? কেন সে একটিবার তার রাধাদিদি-কে ফোন করল না, চরম সিদ্ধান্তটা নেওয়ার আগে?

ভাবনার জাল ছিঁড়ে গেল কলিংবেল-এর আওয়াজে। রুবিমাসি এসে ঢুকলেন সুজিতের হাত ধরে। এই দুটো দিনে যেন আরও অনেকটা বযস বেড়ে গেছে তাঁর। মনের উপর দিযে যে-ঝড় বযে গেছে, তার ছাপ স্পষ্ট তাঁর চেহারায। শ্রীরাধা আর নিজেকে সামলাতে পারল না। রুবিমাসিকে জড়িযে ধরতেই দুজনে অঝোরে কাঁদতে লাগল।

একটা সপ্তাহ কেটে গেছে। রুবিমাসিকে জোর করে আটকে রেখেছে শ্রীরাধা। রুবিমাসির প্রেশার ফল করেছিল দিন দুযেক আগে। ঠিকমতো খাওয়াদাওয়া করেন না। শুধু জানলার বাইরে তাকিযে থাকেন শূন্য দৃষ্টি মেলে। জিৎ অনেকবার বায়না ধরেছে তাঁর কাছে গল্প শোনার। কিন্তু রুবিমাসি যেন আর সেই আগের মানুষটা নেই। ক্রমশ যেন অপ্রকৃতিস্থ হয়ে যাচ্ছেন। প্রশান্তর হোস্টেল থেকে আসা জিনিসগুলো জড়িযে ধরে মাঝেমধ্যেই কাঁদেন, তারপর আবার কেমন যেন গুম মেরে যান।

একটা অপরাধবোধ কুরে কুরে খায় শ্রীরাধাকে। কেন সে আরও একটু সজাগ হয়নি তার ভাইযের ব্যাপারে? গত দুসপ্তাহ প্রশান্ত আসেনি তার কাছে? কেন শ্রীরাধা নিজে চলে যাযনি হোস্টেল-এ তার সঙ্গে দেখা করতে? জিতের পরীক্ষার মতো তুচ্ছ কারণ তাকে কেন আটকে রাখল! যদি সে একবার জানতে পারত প্রশান্তর মনের কথা, তাহলে হয়তো রোকা যেত এই মর্মান্তিক ঘটনা।

আজ সে একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সুজিত অফিস বেরোনোর পর, তাড়াতাড়ি করে সব রান্নাবান্না সেরেছে। তার পরিকল্পনা আছে, দুপুরে রুবিমাসি আর জিৎ-কে খাইযে ঘুমোতে বলে, সে একবার সুমনার সঙ্গে দেখা করে আসবে। দশটা দিন হয়ে গেল, মেযেটা কীভাবে এই শোক সামলাচ্ছে কে জানে। কে বলতে পারে, হয়তো সুমনা বলতে পারবে প্রশান্তর আত্মহত্যার আসল কারণ।

একটা কফি শপে ঢুকে জানলার পাশে চেযারে গা এলিয়ে বসল শ্রীরাধা। মোবাইলে সুমনার সঙ্গে কথা হয়েছে। সে অটোতে আসছে। এসে পড়বে মিনিট পাঁচেকের ভেতর। এই অবসরে নিজেকে একটু গুছিযে নেওয়ার চেষ্টা করে শ্রীরাধা। ওযেটারকে দুটো ক্যাপিচিনো আর কিছু কুকিজ-এর অর্ডার দিযে জানলার বাইরে তাকাতেই দেখে সুমনা আসছে। কটা দিনে আরও যেন শীর্ণ হয়ে গেছে সে। একটু অন্যমনস্কও হয়ে গেছে। অনেকটা সময় নিল রাস্তা পার হতে। তারপর কফি শপের কাচের দরজা ঠেলে ভেতরে এসে শ্রীরাধার উলটো দিকের চেযারটা টেনে বসল।

মুখ নীচু করে টেবিলে আঙুল দিযে আঁকিবুঁকি কাটতে লাগল সুমনা। শ্রীরাধাও কিছুতেই কথা শুরু করতে পারছিল না। সুমনার হাতটা চেপে ধরতেই সে ঝরঝর করে কেঁদে ফেলল।

কী সব হয়ে গেল বলতো সুমনা!

কথাটা বলতে গিয়ে গলা ধরে আসে শ্রীরাধার। সুমনাকে সান্ত্বনা দেওয়ার কোনও ভাষা নেই। কফি দিতে আসা ওযেটার একটু অপ্রস্তুত হয়ে তাড়াতাড়ি কাপগুলো আর কুকিজ-এর প্লেটটা নামিযে রেখে চলে গেল।

সুমনা নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করতে লাগল। শ্রীরাধা কফিতে চুমুক দিযে বলল, সুমনা, কী হয়েছিল ওর তুই কিছু জানিস?

না রাধাদিদি। কিন্তু ও খুব বদলে যাচ্ছে এটুকু বুঝেছিলাম। ও খুব মেধাবী ছিল একথা সত্যি, না হলে এত ভালো প্রতিষ্ঠানে কী আর চান্স পায! কিন্তু ব্যাপারটা হল, এখানে ওর চেয়ে মেধাবী ছাত্র রয়েছে। একথা ও আমায মাঝেমধ্যে বলত। ওর কীসের ইনসিকিউরিটি আমি বুঝতে পারতাম না। ইদানীং বড্ড ডিপ্রেসড থাকত। দু-একজনের থেকে শুনেছি, মাঝেমধ্যে নাকি বুজিং করত। এক দুবার কোকেন-ও নিয়েছে।

কথাগুলো বলে আবার ফোঁপাতে লাগল সুমনা। একটু সামলে নিয়ে বলল, ইদানীং আমাকেও অ্যাভয়েড করছিল গো দিদি। আমি কতবার জানতে চাইলাম ক্যাম্পাসিং-এ কী হল, কিছুতেই বলল না আমায়। অথচ তুমি তো জানো রাধাদিদি, ও একটা ভালো চাকরি পেলে আমরা বিয়ে করব ভেবেছিলাম। সব এলোমেলো করে চলে গেল ও।

সুমনাকে জড়িযে ধরে একটু সামলানোর চেষ্টা করে শ্রীরাধা। সত্যি বলতে কী, প্রশান্তর এভাবে চলে যাওয়াটা ওরা দুজনের কেউই অ্যাকসেপ্ট করতে পারছিল না। পারবেও না কোনওদিন।

 

আরও দিন দশেক কেটে গেছে। না, অনেক চেষ্টা করেও সুমনার থেকে শোনা কথাগুলো রুবিমাসিকে বলতে পারেনি শ্রীরাধা। রুবিমাসি আগের চেয়ে খানিকটা শোক সামলালেও, এখনও হঠাৎ হঠাৎ কীরকম যেন লস্ট হয়ে থাকেন।

সেদিনও এভাবেই বসেছিলেন। জিৎ এসে সমানে বাযনা করছে, দিদুন আমার সঙ্গে একটু লুডো খেলো না দিদুন। প্লিজ খেলো না।

দুদুবার জিৎ-কে সরিযে দিয়ে, শেষে একটু বাধ্য হয়ে নিমরাজি হলেন রুবিমাসি।

যা আমার চশমাটা নিয়ে আয়।

জিৎ পরম উৎসাহিত হয়ে চশমা আর লুডোর ঘুঁটি নিয়ে চলে এল বারান্দায। কিছুক্ষণের মধ্যে শুরু হল সাপ-লুডো খেলা। দিদুনের লাল ঘুঁটি একবার সাপের মুখে পড়ে, তো জিতের নীল একবার ধরাশাযী। শ্রীরাধা ডাস্টিং করতে করতে আড়চোখে ওদের খেলা দেখতে দেখতে মুখ টিপে হাসে। এভাবেই খেলা এগোতে এগোতে একসময় জিতের ঘুঁটি ৯৯-এর ঘরে পৌঁছে, একটা বিরাট সাপের মুখে পড়ল। এমন দীর্ঘ সেই সাপ যে, তার লেজের শেষটা এসে পৌঁছেছে ৩-এর ঘরে। জিৎ অমনি কান্না জুড়ে দিল, না না আমি আবার চাল দেব। আমি সাপের মুখে পড়ব না…

রুবিমাসি তাকে দৃঢ় ভাবে বললে্‌ন, না, তোমার ঘুঁটিকে নীচে নামতেই হবে। আমি ওটা হতে দেব না।

শুরুতে বিষযটাকে আমল দেযনি শ্রীরাধা কিন্তু রুবিমাসি ওরকম অস্বাভাবিক জেদই-বা করছেন কেন একটা ৯ বছরের বাচ্চার সঙ্গে সেটা কিছুতেই মাথায ঢুকল না তার। শেষে জিৎ কান্না শুরু করেছে দেখে, শ্রীরাধা বাধ্য হয়ে বলল,

ওকে আবার চাল দিতে দিন না মাসি। বাচ্চার জেদ, শুধু শুধু কান্নাকাটি করছে।

এবার বেশ জোরের সঙ্গে বলে ওঠেন রুবিমাসি, না রাধা। ওকে বুঝতে হবে হারের মানে। জীবন মানে তো শুধু জেতা নয। হেরে যাওয়াও।

কিন্তু মাসি ও তো একটা শিশু। এই বয়সেই…

আমায ভুল বুঝো না রাধা। আমার ছেলে স্কুলে কখনও দ্বিতীয হয়নি, সেটা তুমি জানো। কিন্তু ও কেন আত্মহত্যা করল তুমি জানো?

এবার চমকানোর পালা শ্রীরাধার। সে অবাক চোখে তাকিযে আছে রুবিমাসির দিকে। রুবিমাসি সরাসরি তাকিযে আছেন তার চোখে। রুবিমাসির চোখ দিযে জল গড়িয়ে পড়ছে। গলাটা কেঁপে যাচ্ছে কথা বলতে গিয়ে, রাধা, ও আমায় মারা যাওয়ার একদিন আগে একটা মেইল করেছিল। লিখেছিল, আমি হেরে যাচ্ছি মা। ক্যাম্পাসিং-এ ভালো কোনও কোম্পানিতে চাকরি হয়নি আমার। অথচ এখানে অনেকেই অনেক ভালো ভালো জব অফার পেল।

চোখ মুছলেন রুবিমাসি। তারপর আবার বলতে শুরু করলেন, রাধা ও হেরে যাওয়া মেনে নিতে পারছিল না। কারণ ছোটো থেকে আমি কখনও ওকে হারতে দিইনি। ও ওর বাবা আর আমার সঙ্গে সাপ-লুডো খেলতে বসলে, ওকে আমরা জিতিয়ে দিতাম। সব কিছুতে জিতে যাওয়ার সুবিধা ও পেয়েছে। কিন্তু হারতে কেমন লাগে ওকে শেখাইনি। আজ তাই মাশুল দিতে হল আমায় রাধা। আঁচলে মুখচাপা দেন রুবিমাসি।

শ্রীরাধা তাঁর পিঠে হাত রাখে। সে বুঝতে পেরেছে খেলার মধ্যে দিযে সঠিক শিক্ষাটাই জিৎ-কে দিতে চাইছিলেন রুবিমাসি।

সাপ-লুডোর মই বেয়ে প্রশান্তর উত্থানটাও সে চোখের সামনে দেখেছে। কিন্তু প্রথম একটা সাপের মুখে পড়ার ক্রাইসিস সামলাতে পারল না প্রশান্ত। সে হেরে গেল। পালিয়ে গেল এই জীবন থেকে। নেশার কবলে পড়ে আর ও হেরে যেতে চাইছিল না বলেই, হয়তো এই চরম পথটা বেছে নিল।

জিৎও কিছুটা থতমত। খেলাটা যে শেষ হয়ে গেছে সে বুঝতে পেরেছে। নতুন করে বোর্ড সাজাচ্ছেন রুবিমাসি। এবার সবুজ ঘুঁটি নিয়ে শ্রীরাধাও খেলায় যোগ দিল।

‘মাই ডার্লিং’ ছবির ট্রেলার লঞ্চ করা হল সম্প্রতি

দাম্পত্য-জীবনে শরীরের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একজন যদি অন্যের চাহিদা পূরণ করতে না পারে,তাহলে শুরু হয়ে যেতে পারে দাম্পত্য অশান্তি। অনেক ক্ষেত্রে এই অশান্তি আদালত পর্যন্ত গড়ায়। বিবাহ-বিচ্ছেদ, এমন কী অপরাধমূলক ঘটনাও ঘটে যায়। ‘মাই ডার্লিং’ ছবিতেও দুই তরুণ-তরুণীর বৈবাহিক জীবনে তৃতীয় ব্যক্তির প্রবেশের পর, স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কে তৈরি হয় টানাপোড়েন। কিন্তু এরপর কী ঘটবে, তা-ই এই ছবির ক্লাইম্যাক্স বলে জানালেন ছবিটির পরিচালক এ. খান।

প্রসঙ্গত পরিচালক জানিয়েছেন, ‘ছবির কাহিনি আপাত সাধারণ মনে হলেও, ক্লাইম্যাক্স-এ চমক আছে।’

ছবির অন্যতম অভিনেত্রী কমলিকা চন্দ জানিয়েছেন, ‘ছবিটি নারীকেন্দ্রিক। স্বামী যদি স্ত্রীর মন এবং শরীরের চাহিদা উপলব্ধি করতে না পারেন কিংবা চাহিদাপূরণে অসমর্থ হন, তাহলে সুখের সংসারে ঘটে যেতে পারে অভাবিত পালাবদল! এমন একটি সুন্দর চরিত্রে অভিনয় করতে পেরে খুব ভালোলেগেছে আমার।’

Hindi film 'My Darling'.
‘মাই ডার্লিং’ ছবির ট্রেলার লঞ্চ-এ দুই অভিনেত্রী কমলিকা চন্দ ও অনু সিং।

কমলিকা ছাড়াও, এই হিন্দি ছবিটির অন্যান্য চরিত্রে রূপদান করেছেন অভিষেক রায়, দীপ কুমার সিং, জয়দীপ দাস, অনু সিং, প্রতীক প্রমুখ।

চলতি মাসের ১০ তারিখে ছবিটির প্রদর্শন শুরু হবে ওটিটি প্লাটফর্ম নিউফ্লিক্স-এ। ছবিটির নিবেদক ‘বায়োস্কোপ ফিল্মস’।

——

 

যে -খাবারে ত্বকের ক্ষতি

ঝকঝকে, উজ্জ্বল ত্বক পাওয়ার ইচ্ছে সকলেরই হয়৷কিন্তু আমাদের জীবনশৈলী ডেকে আনে নানা বিপদ। জানেন কী, আপনি যা খাচ্ছেন, তার উপরেই নির্ভর করে আপনার ত্বকের স্বাস্থ্য কেমন হবে? কিছু কিছু খাবার অতিরিক্ত পরিমাণে খেলে তার ছাপ সরাসরি পড়ে ত্বকের উপর৷ জেনে নিন কোন খাবার থেকে কী হতে পারে৷

নুন খাওয়ার বিপদ

হাই প্রেশারের সমস্যা থাকলে ডাক্তাররা সরাসরি কাঁচা অবস্থায় থাকা নুন খেতে নিষেধ করেন। বেশি নুন খেলে মুখ ফুলে থাকে৷ আমাদের চোখের চারপাশের ত্বক খুব কোমল ও পাতলা। অতিরিক্ত নুন খেলে চোখের চারপাশও ফুলে যায়৷ দিনে ৫০০ মিলিগ্রামের বেশি নুন না খাওয়ার চেষ্টা করুন৷

দুধ ও দুধজাতীয় খাবার

অতিরিক্ত দুধ বা দুধজাত খাবার খাওয়ার কারণেও চোখের গোড়া ফুলে যায়, ব্রণ হতে পারে, নাকের আশপাশে দেখা দেয় বলিরেখা। ক্রমশ তা ছড়িয়ে পড়ে মুখের অন্যত্র৷ অনেকেই রোজ দুধ খান না, কিন্তু দই বা ছানা রাখেন খাদ্যতালিকায়৷ তাঁরা লো- কার্ব ডায়েট গ্রহণ করার কারণে দুগ্ধজাত খাবারের পরিমাণ বাড়িয়ে দেন, আর তাতেই হয় বিপত্তি। দুধের মোট পরিমাণটা পুষ্টিবিদের সঙ্গে কথা বলে ঠিক করে নিন৷

চিনিতে ক্ষতি

অতিরিক্ত চিনি খেলে শুধু যে ওজনই বাড়ে তা নয়, কপালে বলিরেখা দেখা দেয়, ত্বক পাতলা হয়ে যায়, চোখের গোড়া ফোলে, ব্রণ ও দাগছোপের সমস্যাও বিব্রত করে৷ তাই সুগার ইনটেক কমাতেই হবে।

গ্লটেনসমৃদ্ধ খাবার

পাউরুটি, কোক ব্রেকফাস্ট সিরিয়ালে থাকে গ্লটেন। এগুলি বেশি পরিমাণে খেলে, ব্রণ হতে পারে, গালে লাল ছোপ পড়ে৷ গ্লুটেনে আপনার অ্যালার্জি আছে কিনা সেটা খতিয়ে দেখে নিন৷ গ্লটেন-অ্যালার্জিক হলে কিন্তু আটা ও ময়দা পুরোপুরি বাদ দিতে হবে খাদ্যতালিকা থেকে ৷

মদ্যপানের অপকারিতা

অতিরিক্ত মদ্যপান বলিরেখার কারণ, তা ত্বককে শুষ্ক করে তোলে ৷ মুখ ফুলে যায়, চোখের চারপাশের ত্বক কুঁচকোতে আরম্ভ করে ৷ মাঝেমধ্যে সামান্য একটু মদ্যপানে অবশ্য তেমন ক্ষতি হয় না ৷ কিন্তু মদ্যপানকে রেগুলার হ্যাবিট করে তুলবেন না।

ওল্ড স্কুল পেরেন্টিং-ও কার্য‌করী

এখনকার অভিভাবকেরা সন্তান পালনের ক্ষেত্রে মডার্ন মেথড ফলো করেন। অনেক নতুন নতুন নামে আমরা নতুন প্রজন্মের অভিভাবকদের ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করি। হেলিকপটার পেরেন্টস থেকে পান্ডা পেরেন্টস আরও কতো নাম। মডার্ন মা-বাবারা সন্তানকে বড়ো করে তোলার পুরোনো সব নিময় ছেঁটে বাদ দিযে দিতে চান সেগুলো পুরোনো, মডার্ন যুগে ওই নিয়ম আর চলে না বলে। অথচ সেই পুরোনো নিয়মের অনেকগুলোই আজও সন্তানকে মানুষ করার ক্ষেত্রে যথেষ্ট কার্য‌করী।

 

  • পরিবারের সকলে একসঙ্গে বসে খাওয়াদাওয়া করার অভ্যাস আজ প্রায় সকলেই ভুলতে বসেছে। যে-যার মতো কাজ মিটিযে একা একাই খাওয়া এখন বেশিরভাগ বাড়িতেই দৈনন্দিন রুটিন। দিনের যে-কোনও একটা সময় বেছে নিয়ে পরিবারের সব সদস্যের একসঙ্গে বসে একটা মিল অন্তত খাওয়া উচিত
  • জীবনে ব্যর্থতাকেও গুরুত্ব দেওয়া উচিত। হয়তো রিজেকশন এবং হার সন্তানকে ডিপ্রেসড করতে পারে। কিন্তু এতে সন্তান গভীর ভাবে ভাবতে চেষ্টা করবে কোথায় তার ভুল হয়েছে। আত্ম-বিশ্লেষণ করতে শিখবে বাচ্চা। আমরা অভিভাবকেরা যে-কোনও খারাপ সিচুযেশন থেকে সন্তানকে আড়াল করার চেষ্টা করি। অ্যাডভার্স সিচুযেশন থেকে বাচ্চাকে প্রোটেকশন দেওয়ার চেষ্টা করি। কিন্তু যদি সন্তানকে হারের সম্মুখীন হতে দেন, তাহলে ভবিষ্যতে সে অনেক বেশি ভালো ছাত্র হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারবে
  • বাড়ির বাইরে বেরিযে খেলাধুলো করতে প্ররোচিত করুন। এখন বাচ্চারা ইনডোর গেম্স-এই বেশি ইন্টারেস্ট দেখায়। কিন্তু জোর করেই বাচ্চাকে বাড়ির বাইরে খেলতে পাঠান। এতে যেমন শারীরিক শ্রম হবে, তেমনি প্রযোজনীয় টাটকা বাতাসে বাচ্চা নিঃশ্বাস নিতে পারবে
  • বাড়ির জন্য কিছু নিয়ম বলবৎ করুন। বাচ্চাদের স্বাধীনতা দেবার প্রযোজন যেমন আছে তেমনি প্রথম থেকেই বাড়ির কিছু নিয়ম মেনে চলতে শেখান। যেমন খাওয়ার টেবিলে ফোন আনা চলবে না, রাত্রি ৮টার মধ্যে বাড়ি ঢুকতেই হবে ইত্যাদি। এতে বাচ্চারাও বাড়ির নিয়মের গুরুত্ব বুঝতে শিখবে
  • বাচ্চাদের খাওয়া নিয়ে বায়না বরদাস্ত করবেন না। বাচ্চা বায়না করলেই তাকে জাংক ফুড দিতে হবে নয়তো সে খাবে না এই অভ্যাসে তৈরি হতে দেবেন না। হেলদি ফুড খেতে জোর করুন। সপ্তাহে একদিন তাকে নিজের পছন্দের খাবার দিতে পারেন
  • বাচ্চাকে বোঝান, অপরকে অসম্মান করা, মুখের উপর জবাব দেওয়া আপনি কিছুতেই মেনে নেবেন না। ভদ্র এবং বিনীত হতে শেখান সন্তানকে
  • বাচ্চাকে বোঝাতে হবে, ওর সব বায়না আপনারা মেনে নেবেন না। যেটা নিয়ে বায়না সেটা থেকে ওর মন সরিযে দেওয়ার চেষ্টা করুন। এতে বাচ্চাও বুঝতে পারবে কান্নাকাটি করেও আপনাদের ও রাজি করাতে পারবে না। বরং ওকেই মা-বাবার কথা শুনে চলতে হবে।

 

 

সংকটমোচনে বিমা ও বিনিয়োগ

জীবন বহমান। কিন্তু এগিয়ে চলার ক্ষেত্রে পরিস্থিতি সবসময় অনুকূল থাকবে এমন কোনও নিশ্চয়তা নেই।

যে-কোনও সময় প্রতিকূল পরিস্থিতির শিকার হতে পারি আমরা। এটাই বাস্তব। এই যেমন কয়েক মাস আগেও আমরা বুঝতে পারিনি আজকের ঘোর দুর্যোগের কবলে পড়ার বিষয়টি। কিন্তু হঠাৎই আমাদের জীবনের সবকিছু ওলটপালট করে দিয়েছে করোনা ভাইরাস। অনেকে আবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ঝড়ের তাণ্ডবে। আবার বিভিন্ন সংবাদ-মাধ্যমকে ভূ-তত্ত্ববিদরা জানিয়েছেন, কলকাতা-সহ পশ্চিমবঙ্গের আরও কয়েকটি জেলা ভূমিকম্পের কবলে পড়তে পারে পুজোর আগেই।

এ যেন বিরামহীন দুর্যোগের ঘনঘটা! আর এই সংকটপূর্ণ পরিস্থিতিতে দেখা দিয়েছে আর্থিক মন্দা। কেউ কর্মহীন, কারও কমেছে আয়। যাদের কিছু সঞ্চয়  ছিল তারা কিছুটা হলেও পরিস্থিতি সামলাতে পারছেন, আর যাদের ভাঁড়ার শূন্য, তারা আজ দিশাহারা। সেইসঙ্গে, গোদের উপর বিষফোঁড়া-র মতো বেড়েই চলেছে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণের মাত্রা। কেউ হয়তো স্বাস্থ্যসংকট কাটিযে উঠেছেন, কেউ-বা হযতো এখনও রয়েছেন স্বাস্থ্য-সংকটে। কেউ আবার করোনায় আক্রান্ত হতে পারেন এমন আশঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন। সব মিলেমিশে এ এক অস্থির, সংকটময় পরিস্থিতি। চলছে বেঁচে থাকার কঠিন লড়াই।

অবশ্য এ তো গেল বিশেষ সংকটের বিষয়। ধরে নিন এই বিশেষ সংকট জীবনে হয়তো ঘন ঘন আসবে না। কিন্তু এ ছাড়াও তো রয়েছে অনিবার্য প্রযোজন মেটানোর তাগিদ, রয়েছে সাধারণ সংকটে পড়ার সম্ভাবনা। যেমন ধরুন স্থায়ী বাসস্থানের প্রয়োজন মেটানোর তাগিদ, বার্ধক্যে খেয়ে পরে থাকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সন্তানের বিয়ে কিংবা হঠাৎ করে পরিবারের কেউ বড়ো কোনও দুর্ঘটনা কিংবা অসুখে পড়লে তার থেকে বাঁচার উপায় প্রভৃতি। এছাড়া জীবনের শখ-আহ্লাদ পূরণ এবং সামাজিকতা রক্ষার জন্য ব্যয় বরাদ্দ করার বিষয়টি তো রয়েছেই। অতএব, অনিবার্য প্রয়োজন মেটানো এবং সংকটমোচনের জন্য সঠিক বিনিয়োগ, সঞ্চয়, স্বাস্থ্য ও জীবনবিমা করার পরিকল্পনা করতেই হবে। অন্তত বর্তমান সংকটপূর্ণ পরিস্থিতি থেকে শিক্ষা নিয়ে বিনিযোগের মাধ্যমে সঞ্চয় এবং স্বাস্থ্যরক্ষার জন্য বিমা করা বাঞ্ছনীয়।

বিনিয়োগের ধরন

সবচেয়ে আগে নিশ্চিত করতে হবে আপনার উপার্জন এবং তারপর ভাবতে হবে বিনিয়োগের বিষয়টি। চাকরি কিংবা ব্যাবসা যাই করুন না কেন, যদি আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত থাকে, তাহলে কোনও চিন্তা নেই। কিন্তু তা যদি না থাকে, তাহলে উদ্যোগ নিতে হবে নতুন ভাবে। আপনার শিক্ষা এবং অভিজ্ঞতাকে মাথায় রেখেই নতুন করে জীবিকা নির্বাচন করতে হবে। যদি চাকরি না পান, তাহলে ভাবতে হবে ব্যাবসার কথা। কিন্তু ব্যবসাযয়ক ক্ষেত্র যদি আপনার কাছে নতুন হয়, তাহলে বন্ধু, আত্মীয় কিংবা বিশেষজ্ঞের মাধ্যমে যথেষ্ট খোঁজখবর নিয়ে নামতে হবে ময়দানে।

বর্তমান সংকটময় পরিস্থিতিতে লাভজনক হতে পারে এডুকেশনাল কিংবা হেল্থ রিলেটেড ব্যাবসা। কোনও কোচিং সেন্টার কিংবা ওষুধের হোলসেল বা রিটেল বিজনেস করতে পারেন। পুঁজি কম থাকলে কিংবা না থাকলে হতে পারেন সাপ্লায়ার। অর্থাৎ, ওষুধ কিংবা অন্যান্য নিত্যপ্রয়জনীয় সামগ্রী বাড়ি বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার পরিষেবা দিয়ে অর্থ উপার্জন সুনিশ্চিত করতে পারেন। খুব কম অর্থব্যয় করার উপায় কিংবা ভাবনা থাকলে খুলতে পারেন হেয়ার-কাটিং সেন্টার। দুই থেকে তিনজন হেয়ার-কাটার কমিশনের ভিত্তিতে নিয়োগ করলে ভালো লাভ থাকবে। এছাড়া, বহুতল আবাসনে কংক্রিট, প্লাম্বিং, ইলেক্ট্রিক্যাল প্রভৃতির রিপিয়ারিং-এর কাজ চুক্তিভিত্তিক নিয়ে উপযুক্ত পেশাদারদের দিয়ে করিয়ে ভালো আয়ের ব্যবস্থা করতে পারেন।

মোট কথা, নানা ভাবে আয় সুনিশ্চিত করে তারপর বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আর মনে রাখা দরকার, বিনিয়োগ এবং সঞ্চয় দুটি আলাদা শব্দ বা বিষয় হলেও, সঠিক বিনিয়োগ-ই সঞ্চয়ের পথ প্রশস্ত করে, সুনিশ্চিত করে।

অর্থনীতি বিশেষজ্ঞের মতে, বিনিয়োগ-কে মূলত তিনটি ভাগে ভাগ করে নেওযা উচিত। শর্ট, মিডিয়াম এবং লং টার্ম এই তিনটিই হল বিনিয়োগের ধরন। যদি গাড়ি কিনে কোনও অ্যাপ-ক্যাব কোম্পানিকে ভাড়ায় দেন, তাহলে এটা শর্ট-টার্ম বিনিযোগ। কারণ, গাড়ি কেনার জন্য যে-টুকু টাকা ঋণ নিতে হবে, তা দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে শোধ করে দিয়ে আয় বাড়ানো যায়।

মিডিয়াম টার্ম-এর মধ্যে রয়েছে বাড়ি কেনা, হোল সেল ডিস্ট্রিবিউশন নিয়ে আয় করা ইত্যাদি। এক্ষেত্রে বাড়ি কিনে বাড়ি ভাড়া দিয়ে কিংবা হোলসেল ডিস্ট্রিবিউটরশিপ নিয়ে আয় সুনিশ্চিত করতে গেলে যে-পরিমাণ অর্থ ঋণ নিতে হবে, তা পরিশোধের জন্য পাঁচ থেকে দশ বছর সময় লাগবে।

আর সন্তানের উচ্চশিক্ষার জন্য ঋণ নিয়ে ব্যয়, স্থায়ী আমানত (ফিক্সড ডিপোজিট) প্রভৃতি হল লং-টার্ম ইনভেস্টমেন্ট। কারণ, সন্তানের উচ্চশিক্ষা নিয়ে উপার্জন করতে যেমন দীর্ঘ সময় লাগবে, ঠিক তেমনই সে কর্মজীবনে প্রবেশের পর দীর্ঘজীবন উপার্জন করবে। স্থায়ী আমানতের ক্ষেত্রেও বিষযটি একই। এককালীন অনেক টাকা ব্যাংক-এ দীর্ঘদিন রাখতে পারলে, অবসরকালীন দীর্ঘ জীবনের জন্য সঞ্চয় সুনিশ্চিত করা যাবে।

তবে ব্যাংকিং-বিনিযোগ-এর মধ্যেও আবার তিনটি ভাগ আছে। একটা লিকুইড ফান্ড, দ্বিতীয়টি মানিব্যাক পলিসি এবং তৃতীয়টি হল রিটাযারমেন্ট পলিসি। এর মধ্যে লিকুইড ফান্ড-এর মধ্যে পড়ে মিউচুয়াল ফান্ড। কারণ, এই টাকা একদিনের নোটিশে তুলে ফেলা যায়। আর মাসে মাসে কিংবা বছরে দুই বা চার পর্বে টাকা জমা রেখে মাঝেমধ্যে সুদের টাকা হাতে পাওযার বিষয়টি হল মানিব্যাক পলিসি।

এছাড়া, চাকরি কিংবা উপার্জনের শুরু থেকে প্রতি মাসে কিছু টাকা ৬০ বছর পর্যন্ত জমিয়ে তার সুদ এবং আসল টাকা অবসরকালীন জীবনে কাজে লাগানোর বিষয়টি হল রিটায়ারমেন্ট প্ল্যান বা পলিসি। এই প্রসঙ্গে জানিয়ে রাখার প্রয়োজন, একমাত্র গাড়ির ব্যাবসার জন্য বিনিয়োগ কিছুটা ঝুঁকি সাপেক্ষ।

বিমার সুবিধা

মনে রাখবেন, বিমার কোনও নেতিবাচক দিক নেই। এর পুরোটাই ইতিবাচক। বলা যায়, সংকটমোচনের অন্যতম সহায়ক মাধ্যম। একবার কষ্ট করে এককালীন কিছু টাকা ব্যয় করতে পারলেই, বিপদের মুহূর্তে ভালো বন্ধুর ভমিকা পালন করবে।

বিমার-ও অনেকগুলি ধরন রয়েছে। গাড়িবিমা, বাড়িবিমা, স্বাস্থ্যবিমা এবং জীবনবিমা ইত্যাদি। একমাত্র স্বাস্থ্যবিমা ছাড়া বাকি সবরকম বিমা-ই দুর্ঘটনাসাপেক্ষে। কিন্তু স্বাস্থ্যবিমার ক্ষেত্রে দুর্ঘটনা ছাড়াও, গুরুতর অসুস্থতা এবং সার্জারির ক্ষেত্রেও ক্যাশলেস-এর সুবিধা পাওয়া যায়।

গাড়ি এবং বাড়িবিমার ক্ষেত্রে দুর্ঘটনাজনিত ক্ষতিপূরণ পাওয়া  যায়। বিবাহবিমা-র ক্ষেত্রে শুধু বিয়ের দিন যদি চুরি, ডাকাতি কিংবা জীবনহানি ঘটে, তাহলে সেই ক্ষতিপূরণ দেবে বিমা কোম্পানি। এক্ষেত্রে বিবাহবাসরে থাকা অর্থ-সম্পত্তির পরিমাণের লিখিত বিবরণ দিতে হয় এবং সেই অনুযায়ী বিমার জন্য প্রদেয় অর্থ ধার্য হয়। শুধু তাই নয়, বিবাহবাসরে উপস্থিত কতজনের জীবনবিমা করছেন তার উপরও নির্ভর করবে বিমার জন্য প্রদেয় অর্থের পরিমাণ।

আর ভ্রমণবিমা এবং জীবনবিমার ক্ষেত্রে দুর্ঘটনা এবং জীবনহানির জন্য পাওয়া যায় এককালীন আর্থিক ক্ষতিপূরণ। তবে এসবের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল স্বাস্থ্যবিমা। কারণ, বর্তমান পরিস্থিতি কিন্তু তেমনই ইঙ্গিত দিচ্ছে। অবশ্য এই অতিমারী ছাড়াও মানুষের সাধারণ রোগভোগও বাড়ছে। আর চিকিৎসার ক্রমবর্ধমান খরচ সামলাতে হলে স্বাস্থ্যবিমা ছাড়া গতি নেই। তবে স্বাস্থ্যবিমা করার সময় সতর্ক থাকা জরুরি।

এখন বাজারে কিছু প্রতারক বিমাসংস্থাও গজিয়ে উঠেছে। তারা আপনার অর্থ আত্মসাৎ করতে পারে কিংবা আপনাকে ঠিকমতো পরিষেবার ব্যবস্থা থেকে বঞ্চিত করতে পারে। অতএব, জেনেবুঝে এবং রেপুটেশন-এর বিষয়ে খোঁজখবর নিয়ে তবেই স্বাস্থ্যবিমা করা উচিত। আর স্বাস্থ্যবিমা করার আগে দেখে নেবেন, ওই বিমাসংস্থার চুক্তির তালিকায় ভালো হাসপাতাল এবং ক্যাশলেস-এর ব্যবস্থা আছে কিনা।

বযস বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে স্বাস্থ্যবিমার জন্য প্রদেয় অর্থের পরিমাণও বেড়ে যাবে। এ প্রসঙ্গে এক বিমাসংস্থার প্রতিনিধি সঞ্জয সরকার জানিয়েছেন, ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিমা করার থেকে পারিবারিক স্বাস্থ্যবিমা করা বেশি লাভদায়ক। কারণ, একজনের জন্য যে-টাকা ব্যয় করতে হবে স্বাস্থ্যবিমার ক্ষেত্রে, তুলনায় কম খরচ পড়বে পারিবারিক স্বাস্থ্যবিমায়। তবে,স্বাস্থ্যবিমার বাৎসরিক পরিষেবার জন্য বরাদ্দ মোট অর্থের পরিমাণ এবং বিমাকারীর বয়সের উপর নির্ভর করবে প্রিমিয়াম-এর অঙ্ক।

ধরুন, ৩৫ থেকে ৪৫ বছর বয়সের কোনও ব্যক্তি যদি বছরে এক লক্ষ টাকার ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিমা করেন, তাহলে তাকে এককালীন দিতে হবে ৪,৬০০ টাকার মতো। আবার তিনি যদি বছরে পাঁচ লক্ষ টাকা স্বাস্থ্যবিমা করেন, তাহলে তাকে দিতে হবে প্রায ৬,৫০০ টাকার মতো। কিন্তু যদি ৩৫-৪৫ বছর বয়সের মধ্যে স্বামী-স্ত্রীর বয়স হয় এবং তাদের ১২ বছর বয়সের সন্তানের একসঙ্গে পারিবারিক স্বাস্থ্যবিমা করতে চান, তাহলে বছরে এক লক্ষ টাকার বিমার জন্য ব্যয় করতে হবে প্রায় ৮০০০ টাকা এবং পাঁচ লক্ষ টাকার স্বাস্থ্যবিমার জন্য ব্যয় করতে হবে প্রায় ১২,০০০ টাকা।

অবশ্য স্বাস্থ্যবিমার জন্য প্রদেয় অর্থের পরিমাণ কমবেশি হবে সংস্থাভেদে। প্রত্যেকেরই এক্ষেত্রে আলাদা আলাদা পরিষেবার সুবিধা রয়েছে, অর্থাৎ কে সারা দেশে কতগুলি হাসাপাতালে ক্যাশলেস পরিষেবা দিতে পারবেন, তার উপর নির্ভর করে বরাদ্দ থাকে প্রদেয় অর্থের পরিমাণ। তাই স্বাস্থ্যবিমা করার আগে, যাচাই করে নেওযা আবশ্যক।

——-

পড়ার জন্য সীমাহীন গল্প-নিবন্ধসাবস্ক্রাইব