আবার আমরা বন্ধুরা

ছোটোবেলার বন্ধুরা এক এক করে সবাই দূরে সরে যাচ্ছে। ছুটির দিনের আড্ডাটা এখন আর বসে না। দিনে দিনে নিঃসঙ্গতা চেপে ধরছে সুজনকে। অনির্বাণ, ব্রজেশ সেই কবেই দূরে সরে গিয়েছে। বছর দুই হল ফারুকও আর আড্ডায নেই। পুরোনো বন্ধুদের কথা, একসঙ্গে কাটানো দিনগুলোর কথা, আজকাল খুব মনে পড়ে সুজনের।

পুরুলিযার অযোধ্যা পাহাড়, বাগমুন্ডি, চড়িদা, সুন্দরবনের ধুচুনিখালি, কোরাকাটি, সন্দেশখালি, মরিচঝাঁপি, কিংবা ডুযার্সের চালসা, সামসিং, সান্তালেখোলা কত জাযগায যৌবনের দস্যিপনায চষে বেড়িয়েছে একসঙ্গে। সব যেন মনে হয়, এই তো সেদিনের কথা। দেখতে দেখতে বযসটা যে আটান্নতে পৌঁছে গিয়েছে, খেযালই হয়নি!

প্রায় আটত্রিশ বছর আগে বন্ধুত্বের শুরু। হোস্টেল-এর দিনগুলো কেমন যেন জুম ইন করে চোখের সামনে চলে আসে। একটুও ফিকে হয়নি সেই সুখের মুহূর্তগুলো। রং-বেরঙের খুশি, দুষ্টুমি ভরা ঘটনা, সব মনের পর্দায চলচ্ছবি হয়ে এসে সুখের অনুভতিতে ভরিযে দেয়। একাকী অন্ধকার ঘরে চোখ বুজলেই, অতীত স্মৃতিগুলো নড়েচড়ে বসে বন্ধুদের কাছে নিয়ে আসে। অনির্বাণ, ব্রজেশ, ফারুক সবাই তখন তার চারপাশে ঘিরে এসে বসে। হোস্টেল, কলেজ, ইউনিভার্সিটি শেষে চাকরি জীবন, কত না ঘটনা গল্পে জুড়ে যায়।

বন্ধুদের মধ্যে অনির্বাণ ছিল সবথেকে হ্যান্ডসাম। ছয ফুট এক ইঞ্চি লম্বা, সুন্দর পেটানো স্বাস্থ্য। সুন্দর মুখে উজ্জ্বল হয়ে থাকা হাসি। অনির্বাণই সবার আগে চাকরি পেয়েছিল। সেরিকালচার অফিসার, কালিম্পং-এ পোস্টিং। ছুটি পেলেই চলে আসত বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিতে। অফিসের নেপালি সুন্দরী সহকর্মীর সঙ্গে প্রেমের গল্প শোনাত বন্ধুদের। তার ওখানে বেড়াতে যাওযার আমন্ত্রণ জানাত। শুনে শুনে বন্ধুদের বুক জ্বলত। বেকারদের হাতে তখন পযসা কোথায! কারওরই স্টাডি কমপ্লিট হয়নি, ফারুক ছাড়া আর কারওর গার্লফ্রেন্ডও নেই।

অনির্বাণ সাযে্নস-এর পাস কোর্সে পড়ত, ফারুকও তাই। ওরা একই ক্লাসের কলেজ-পড়ুযা ছিল। ব্রজেশের কেমিস্ট্রি অনার্স আর সুজনের ছিল বোটানি অনার্স। ওদের মধ্যে ফারুক ছিল সব থেকে প্রাণবন্ত। নিয়ম ভাঙার সব কিছু ওর কাছেই শেখা। সেই সমযে ও ছিল অন্যদের থেকে অনেকটা এগিয়ে সবার আগে কোরিযান জিনস ওই কিনেছিল ফ্যান্সি মার্কেট থেকে। আর জাতি ধর্ম নির্বিশেষে ওর ছিল অগুনতি গার্লফ্রেন্ড।

(দুই)

পুরোনো স্মৃতিটা উস্কে দেয ব্রজেশ। মনে আছে সেই ঘটনাটা ফারুকের কোনও এক বান্ধবীর বাবা নেভিতে চাকরি করতেন। সেই বান্ধবী এক বোতল বিদেশি হুইস্কি প্রেজেন্ট করেছিল। অতি যত্নে ফারুক একটা ছোটো ব্রিফকেস-এ ঢুকিযে তালাবন্দি করে লুকিযে রেখেছিল সেটা। হুইস্কির ঘটনাটা সবাই জানত কিন্তু জিনিসটা যে কোথায লুকানো আছে, জানত না কেউ। কোনও এক বিশেষ দিনেই নাকি সেটা খোলা হবে! কিন্তু ব্রজেশ আর অনির্বাণের দেরি সহ্য হচ্ছিল না।

ফারুকের অনুপস্থিতিতে সুযোগ পেলেই অন্য বন্ধুরা সেটা খুঁজে বের করার চেষ্টা করত। এক শীতের রাতে ফারুক তখন ডিনারে গিয়েছে, এদিক ওদিক খুঁজতে খুঁজতে সুজন ফারুকের বেডের নীচে লম্বা ড্রযারের মধ্যে বইপত্র, জামা কাপড়ের পিছনে খুঁজে পেল খবরের কাগজে মোড়া ব্রিফকেসটা। হাতে নিয়ে নাড়িযে তার মধ্যে হুইস্কির বোতলের উপস্থিতি প্রায় নিশ্চিত হল। ফারুক ঘরে ফেরার আগেই সুজন আর ব্রজেশ ব্রিফকেস নিয়ে দিল চম্পট। খবর পেযে ফারুক আর অনির্বাণ ধাওযা করেছে ওদের। শীতের কনকনে ঠান্ডায মাঝরাত্রিতে হোস্টেল-এর সামনের ফুটবল মযদানে, এপাশ থেকে ওপাশ ব্রিফকেস বুকে জড়িযে ছুটছে সুজন। সাথে সাথে ছুটছে ব্রজেশ। তাদের পিছনে পিছনে অনির্বাণ আর ফারুক। এক সময ফারুক ধরেই ফেলল ব্রিফকেসের হ্যান্ডেলটা। সেই অবস্থাতেই ছুটছে সুজন। টানাটানি জোরাজুরিতে হ্যান্ডেল খুলে চলে এল ফারুকের হাতে, আর সে সজোরে আছড়ে পড়ল মযদানে। অনির্বাণ তাড়াতাড়ি টেনে তোলে ফারুককে।

আবার ছুট… দৌড়াতে দৌড়াতে হাঁপিযে উঠেছে সুজন-ব্রজেশ। দাঁড়িযে পড়ে ওরা। এবার ব্রিফকেস নিয়ে টানাটানি, একদিকে ব্রজেশ-সুজন অন্যদিকে অনির্বাণ-ফারুক। টানাটানিতে ব্রিফকেস খুলে, পড়ে ভেঙে গেল হুইস্কির বোতল। সবাই চুপ, যেন দোষীরা সব কাঠগড়ায দাঁড়িযে ফারুকের কি সে ভীষণ মন খারাপ! তার মধ্যেই আবার সকলে মিলে টর্চ জ্বেলে মযদান থেকে একটা একটা করে ভাঙা কাচের টুকরো তুলে পরিষ্কার করতে হল। সকাল হলেই যে এই মাঠেই দৌড়াতে, খেলতে হবে সকলকে।

এরপর ফারুক দুদিন কথা বলেনি কারও সঙ্গে। সুজন ফারুকের ঘরে গিয়ে কান ধরে উঠ-বস করে এসেছে, তা-ও না। ফারুকের পচ্ছন্দের হরিদার দোকানের মোগলাই পরোটা এনে খাওযানোর পর রাগ কমেছিল। আবার সম্পর্ক স্বাভাবিক। হোস্টেল-এর নেড়া ছাদে উঠে চারজনে মিলে জমিযে তাস খেলা। এমনই ছিল বন্ধুত্ব। ওরা কেউই কিন্তু মদ্যপানে আসক্ত ছিল না। এটা একটা অনাস্বাদিত বস্তুর প্রতি কৌতূহলী আকর্ষণ। যাক বোতলটা পড়ে ভেঙে ভালোই হয়েছিল।

(তিন)

হোস্টেল জীবনটা ছিল একটা স্বঅভিভাবকত্বের সংসার। এখানে ছিল না কোনও হোস্টেল সুপারিন্টেন্ডেন্ট, না ছিল কোনও অ্যাডমিনিস্ট্রেশন-এর নজরদারি। ছাব্বিশটা ঘরের দোতলা হোস্টেল। বাহান্নজনের বাস, সকলেই স্বঅভিভাবক। হোস্টেল-এর বাহান্নজনের সকলেই এসেছে ১৯৭৮-৭৯ তে। ব্রজেশ আর কযেজন মিলে ১৯৭৮-এ প্রথম হোস্টেলকে নতুন ভাবে চালু করেছিল। ওদের বন্ধুবান্ধবরাই পরে এসে একে একে সংখ্যা বাড়িয়েছে।

সুজন এসেছিল ব্রজেশের যোগাযোগে, ওরা হাযার সেকেন্ডারিতে এক সঙ্গে পড়ত। শুনেছে, ১৯৭১-এর রাজনৈতিক অস্থিরতার সমযে কোনও এক ভোরবেলায কেযারটেকার পাম্প চালাতে গিয়ে দেখে, হোস্টেল-এর পিছনের দিকে পাম্প হাউসের পাশে এদিকে ওদিকে ছড়িযে পড়ে রয়েছে পাঁচটা ডেডবডি। রাত্রিতে কোথাও মার্ডার করে ওদের ওখানে ফেলে রেখে গিয়েছে। অন্ধকার না কাটা ভোরে খবর পৌঁছে গেল ঘরে ঘরে। পুলিশি ঝামেলার ভযে আতঙ্কিত হয়ে তখনই যে-যার মতো ঘর খালি করে পালাল হোস্টেল ছেড়ে। ঘরে ঘরে আলো জ্বলছে, পাখা চলছে।  পোড়ো হোস্টেলটায় কেউ আর পা মাড়াযনি সাত-আট বছর। কলেজ অফিসিযাল বা ইলেক্ট্রিক অফিসের কেউ-ই আর আসেনি এদিকে।

রাজনৈতিক পালা বদলের পরে শান্ত সময়ে ১৯৭৮-এর শেষ দিকে ব্রজেশ আর অন্য কযেজন কলেজের দূরের ছাত্র, সাহস করে হোস্টেল খুলে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করিযে থাকতে শুরু করে। হোস্টেল ফিস দিতে হয় না, কোনও ইলেকট্রিক বিল আসে না তাই তাও দিতে হয় না। নিজেদের খাওযার খরচাটাই একমাত্র খরচা। এমন মজার জাযগা কার না পছন্দ!

ব্রজেশ প্রথমে হোস্টেল-এ এসেছিল বলে এলাকার লোকজনের সঙ্গে ভালো পরিচিতি তার। তাছাড়া ডাকাবুকো ব্রজেশের মধ্যে একটা দাদা দাদা ভাবও ছিল। ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগান-এর ফুটবল খেলা টিভিতে দেখার জন্য ব্রজেশের সঙ্গে ফুটবল মাঠের শেষ কোণায মোহনদার বাড়ি যেত সুজনরা। মোহনদার বাড়ির সকলে মোহনবাগান-এর সমর্থক আর হোস্টেল-এর ওরা ইস্টবেঙ্গল সমর্থক।

খেলা শুরু হতেই দুপক্ষের চিৎকার চ্যাঁচামেচি শুরু। মোহনদার মা ছিলেন বড়ো ভালো মানুষ। সকলকে আদর করে বসিযে মুড়ি চানাচুর খাওযাতেন। সুজনের মনে পড়ে, মোহনদাদের বাড়িতে একটা বড়ো লিচুগাছ ছিল। লিচুর সময লিচুর থোকাগুলো কাপড় দিযে বেঁধে রাখত, যাতে পাখিতে বা বাদুড়ে না খেতে পারে।

এরকম সমযে একদিন সকালে দেখা গেল ফারুক-অনির্বাণ ব্যাগ ভর্তি লিচু নিয়ে হোস্টেল-এর সকলকে লিচু বিতরণ করছে। কেউ জিজ্ঞাসা করতে ফারুক বলল, কাল মামারবাড়ি থেকে দিয়ে গিয়েছে। রাত্রিতে সময পাইনি, তাই সকালে…। লিচু পেযে তো সকলেই বেশ খুশি। কিন্তু সে খুশি বেশিক্ষণ স্থাযী হল না।

সেদিনই বিকেলে সুজনরা সাত-আট জন মিলে মোহনদার বাড়ি গিয়েছে খেলা দেখতে। সেই দলে ফারুক, অনির্বাণও আছে। মোহনদাও সেদিন বাড়িতেই ছিল কিন্তু মেজাজটা যেন ঠিক ভালো নেই। মোহনদার মা মন খারাপ করে এসে বললেন, জানো তো বাবা, কাল একদল বদমাইশ ছেলে মাঝরাত্রিতে সব লিচু চুরি করে নিয়ে গিয়েছে। ভেবেছিলাম তোমাদের সকলকে এবার লিচু খাওযাব, সে আর পারলাম না।

সুজন মুখ ফসকে বলেই ফেলছিল, না মাসিমা আজই তো লিচু খেয়েছি। ফারুক পিছন থেকে জোরে চিমটি কাটে। সুজন পিছন ঘুরতে ইশারায চুপ করতে বলে। সেদিন হস্টেলে ফিরে সুজন, ব্রজেশ-এর সঙ্গে ফারুক আর অনির্বাণ-এর হেভি ঝামেলা। শালা যার বাড়িতে প্রতিদিন টিভি দেখতে যাচ্ছিস তার বাড়িতেই চুরি। নিমক হারাম। আরও কত কী খারাপ খারাপ কথা।

অনির্বাণ বলে, সে গাছে চড়েনি, নীচে টর্চ হাতে দাঁড়িযে ছিল।

ব্রজেশ প্রশ্ন করে, তবে লিচুগুলো কুড়োল কে?

ফারুক মিনমিনে গলায় বলে, জগন্নাথ আর মাধব ছিল সাথে।

ব্রজেশ আরও ক্ষেপে যায়, দলটা বেশ বড়োই বানিয়েছিস। এবার তাহলে ডাকাতি করতে নেমে পড়। মোহনদাকে সব বলব আমি, তোদের টিভি দেখার পাট চুকাব।

ফারুক, অনির্বাণ, ব্রজেশের হাতে পাযে ধরে মিনতি করে, না বলার জন্য। ব্রজেশ শর্ত দেয, সব ঘর ঘুরে ঘুরে যার কাছে যতগুলো লিচু বেঁচে আছে সেগুলো জোগাড় করে নিয়ে আসতে হবে। ওগুলো সে মোহনদাদের বাড়িতে গিয়ে দিযে আসবে। বলবে, চোরেরা একটা লিচুর ব্যাগ হোস্টেল-এর পিছন দিকে ফেলে গিয়েছিল, সেটা নিয়ে এসেছে। সে রকমই হল। কিন্তু মোহনদা বোধহয় কিছু একটা আঁচ করতে পেরেছিল।

পরের দিন দলশুদ্ধ খেলা দেখতে গেলে বলে দিল, খেলা দেখা যাবে না, টিভি খারাপ। তারপর আর টিভি ঠিক হল কিনা খবর পাওয়া গেল না। টিভি তে খেলা দেখার পাটও উঠল।

(চার)

কলেজ পাশ করার পর সবাই আলাদা হয়ে গেল হাযার স্টাডিজের জন্য। মাঝেমধ্যে চিঠিতে যোগাযোগ হতো। তবে পুজোর ছুটিতে, বড়োদিন আর নিউ ইযারের ছুটিতে সকলে মিলে নির্ঘণ্ট মেনে আড্ডা দেওয়াটা ছিল অনিবার্য। একসঙ্গে ঘোরা, খাওয়া, আড্ডা সব মিলিযে পুরোনো হোস্টেল-এর দিনগুলো যেন আবার ফিরে আসত তখন। অনেক কিছু পরিবর্তনের মধ্যেও ওদের বন্ধুত্বটা ছিল সেই আগেরই মতন।

এর মধ্যে সুজন ব্যাংক-এ চাকরি পেযে হুটপাট বিযে করে ফেলল বাড়ির অমতে। কালিম্পং থেকে ট্রান্সফার হওযার পর, অনির্বাণের আগের প্রেম কেটে গেছে, এখন আবার সিঙ্গেল। বাড়ির দেখা মেয়েছেই বিযে করবে মত দিয়েছে, দেখাশোনা চলছে। ব্রজেশ চাকরি-বাকরির ইঁদুর দৌড়ে নাম না লিখিযে পারিবারিক ব্যবসাতেই ঢুকে গিয়েছে। সুজন চাকরি পাওযার বছর খানেক পর ফারুকও চাকরি পেয়েছে, সিবিআই অফিসার-এর। বন্ধুদের মধ্যে ওর এখন ভাও বেশী।

বছরগুলোর এগিয়ে চলার সঙ্গে সঙ্গে বন্ধুত্বের বযসও গড়িযে গিয়েছে বছর ত্রিশ। এখন সকলের সংসার হয়েছে। নিয়ম করে বছরে দুবার চার বন্ধু পরিবারের সকলকে নিয়ে ঘুরে আসে কাছে দূরে কোথাও। সুজন আর ফারুক কাছাকাছি থাকে। সেজন্য দুজনের নিযমিত যোগাযোগ আছে, মন করলেই এ ওর বাড়ি পৌঁছে যায়।

ফারুকের দেশের বাড়ির পাশের গ্রামে অনির্বাণ-এর বাড়ি। ছুটির দিনে ফারুক নিয়ম করে দেশের বাড়ি যায়, সে সময অনির্বাণ-এর বাড়ির খোঁজখবরও পায। সেই রবিবার দেশের বাড়ি গিয়ে খবরটা পেয়েছিল, গতকালই অনির্বাণ মারা গিয়েছে, লাং ক্যান্সার হয়েছিল। হঠাৎ বেশি অসুস্থ হয়ে কয়েক দিন আগে হসপিটালে ভর্তি হয়েছিল।

ফারুকের সামনেই অনির্বাণ-এর ডেডবডি এল। বাড়ির লোকজন, আত্মীয-স্বজন কাউকেই এতদিন জানায়নি নিজের অসুস্থতা। বন্ধুরাও কেউ জানত না ওর অসুস্থতার কথা। এত কষ্ট নিজের বুকে চেপে রেখেছিল ও, সে কষ্টের ছোঁযা যেন না লাগে নিকট কারও। ফারুকের মুখে খবরটা শুনে আঁতকে ওঠে সুজন, বিশ্বাস হয় না। পরদিন সুজন আর ফারুক কারওরই অফিস যাওয়া হল না।

বুকের মাঝে যেন একটা গভীর ক্ষত অনবরত ব্যথা জাগিয়ে তুলছে। হোস্টেল-এর নেড়া ছাদে বসে লুকিযে তাস খেলার চার সঙ্গীর একজন কেটে পড়ল। স্টেশনের বেঞ্চে দুই বন্ধু হাতে হাত রেখে অনেকক্ষণ বসে থাকে। একটার পর একটা ট্রেন আসছে, থামছে আবার তার গন্তব্যে চলে যাচ্ছে। স্টেশনে নামা মানুষজন ভীড় ভেঙে যে-যার মতো চলে যাচ্ছে। ওদের দুনিযাটা যেন থমকে দাঁড়িযে গিয়েছে। ফারুক-ই প্রস্তাব রাখে, চল। ব্রজেশের কাছে যাই।

সে-রাতটা ব্রজেশের বাড়িতে কাটিয়ে পরদিন সকালে বনগাঁ থেকে ট্রেন ধরে অফিস করেছিল সুজন আর ফারুক। কোনও কোনও সময সবকিছু যেন কেমন দ্রুত বদলে যায়। নাটকের শেষ দৃশ্যে পেঁছোনোর জন্য খুব তাড়াহুড়ো।

অনির্বাণের মৃত্যুর পর বছর ঘুরতে না ঘুরতে, একদিন ব্রজেশও টেলিভিশন, খবরের কাগজে খবর হয়ে এল। মহালয়া সবে পার হয়েছে, চারিদিকে পুজো পুজো ভাব। অফিস যাওযার আগে সকালে টিভিতে খবর দেখতে গিয়ে সেই নিদারুণ কষ্টের খবরটা পেল সুজন। সঙ্গে সঙ্গে ফারুককে জানায়।

ব্রজেশদের বাড়ি বাংলাদেশ সীমান্তের শহর বনগাঁয়ে। সেখানে ওদের অনেক রকম ব্যাবসা। মেডিসিন, শাড়ি, রেডিমেড পোশাক, জুযোরির ব্যাবসা ছাড়াও, আরও অনেক রকমের ব্যাবসা। এলাকার প্রভাবশালী ব্যবসাযী পরিবার ওরা। এলাকার নব্য তোলাবাজদের দাবিমতো দুর্গাপুজোর জন্য ধার্য এক লাখ টাকা চাঁদা না দেওযায়, সন্ধের অন্ধকারে বেশ কযেজন এসে দোকানের মধ্যেই, ব্রজেশকে পয়েন্ট ব্ল্যাংক থেকে গুলি করে মার্ডার করেছে।

আবার দলছুট একজন! দুর্গার যেন কিছু করার নেই, এখন সব ক্ষমতা অসুরের। এখন যে অসুররাজ চলছে! সুজন-ফারুক যেন নিজেরাও মনে মনে মরে যাচ্ছে একটু একটু করে। এক একটা মৃত্যু যেন, বন্ধুত্বের গুচ্ছ ফুলের তোড়া থেকে খসে পড়া এক একটা ফুল। তোড়াটাকে দিন দিন হালকা করে ফেলছে।

দুই বন্ধুকে হারানোর পর শূন্যতা ভুলে থাকতে দুই বন্ধু যেন আরও কাছের হয়েছে। আর সেই বৃত্তে সামিল হয়েছে দুই বন্ধুর পরিবার। বছর পাঁচেক হল ব্রজেশ নেই। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বন্ধু হারানোর ক্ষতটা এখন অনেকটা নরম হয়েছে। কিন্তু সব তো মানুষের মর্জিতে চলে না!

জীবন নাটকের এক অঙ্কের পর, অন্য অঙ্ক লেখা হচ্ছে অন্য কোনও নাট্যকারের মর্জিতে। তার নাটকের একটি দৃশ্যও পরিবর্তনের ক্ষমতা নেই অন্য কারও। সে-ই নাট্যকার, সে-ই পরিচালক।

(পাঁচ)

অফিসে কাজের মাঝে হঠাৎ ফোনটা পেল সুজন। ফারুকের স্ত্রী সানা ফোন করেছে মুম্বই থেকে। চেনা গলা কেমন যেন অচেনা লাগছে। ওরা দুদিন আগে মুম্বই গিয়েছিল এলএফসি টুরে। মুম্বই-গোয়া ঘুরে দিন সাতেক পরে ফেরার কথা। সানা বলল, টাটা ক্যান্সার সেন্টার থেকে বলছে। কালকে খুব অসুস্থ হওযায় ফারুকের কথামতো ওই হসপিটালে ভর্তি করিয়েছিল। হসপিটাল থেকে বলেছে, ওখানে নাকি ও আগে থেকেই ট্রিটমেন্ট করাত, বাড়িতে কাউকে কিছু বলেনি। আজ কিছুক্ষণ আগেই মারা গিয়েছে ফারুক।

খবরটা শুনে স্তব্ধ হয়ে যায় সুজন। এত সিরিযাস খবরটা সে জানত না! তেমন হলে সেও তো সঙ্গে যেতে পারত। খবর পেযে ফারুকের মুম্বই অফিসের কযেকজন কলিগ সানার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। তারাই ডেথ সার্টিফিকেট নিয়েছে, কফিন জোগাড় করেছে, ফ্লাইট-এর টিকিটের ব্যবস্থা করেছে। কফিনবন্দি ফারুকের মৃতদেহ নিয়ে একাই ফিরছে সানা। এযারপোর্টে ফ্লাইট আসার অনেক আগে থেকেই সস্ত্রীক উপস্থিত সুজন। ফারুকের বাড়ির লোকজনও সেখানে উপস্থিত। এই এযারপোর্টে সুজন আগেও এসেছে ফারুকের সঙ্গে দেখা করতে, আড্ডা দিতে। তখন সে এখানে ইমিগ্রেশন অফিসার হিসাবে পোস্টেড ছিল।

খেযালি ঝোড়ো হাওযা স্মৃতির পাতাগুলো উড়িযে দিযে দাঁড় করায রুক্ষ বাস্তবের সামনে। এযারলাইন্সের দুজন কর্মী ট্রলি ঠেলতে ঠেলতে ফারুকের কফিন বযে নিয়ে আসছে। সাথে পা মিলিযে এগিয়ে আসছে বিধ্বস্ত, ক্লান্ত, নিঃসঙ্গ এক মহিলা! ফারুকের স্ত্রী সানা, দেখে মনে হচ্ছে এই কদিনে সে যেন কযেটা বছর পার করে এসেছে।

দূর থেকে দেখে সুজন এগিয়ে যায় গেটের কাছে। নিরাপত্তারক্ষীরা গেটের সামনে থেকে ঠেলে সরাতে গেলে, সুজন ব্যালেন্স হারিযে পড়ে যায় পাশের লোহার রেলিং-এর উপর। চোট লাগে মাথায়। লোকজন ধরে উঠিযে জল দেয় মাথায়। এযারপোর্ট থেকে ফেরার পথে সারাটা পথ শববাহী গাড়িতে কফিনের পাশেই বসে ছিল সুজন।

কবরে মাটি দেওযার পর থেকে কেমন যেন নির্বাক, নিশ্চুপ হয়ে গিয়েছে সে। দিন-মাস এগিয়ে যায়, সুজন যেন আরও একাকিত্ব অনুভব করে। মাথার ভিতর টিশটিশ ব্যথাটা যেন তার মধ্যে মিলন সুখের বাসনা জাগায়। অফিস শেষে কোথাও আড্ডা না মেরে সোজা বাড়ি ফেরে। রবিবার আর ছুটির দিনে সকালের আড্ডাও এখন বন্ধ, আড্ডার সঙ্গীই যে নেই!

অনেক দিনই রাত্রিতে বাড়ির ছাদে উঠে আকাশের তারাদের দিকে তাকিযে থাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। হয়তো ওদের মাঝেই খোঁজে অনির্বাণ, ব্রজেশ এবং ফারুককে। মেঘেদের বাধা সরিযে কখনও দিনের আলোয়, কখনও বা তারাদের আলোর পথ বেয়ে দেশ-পৃথিবীর এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্ত ঘুরে আসে, অনির্বাণ-ব্রজেশ-ফারুক-সুজন-এর উত্তরসূরিদের আকাশযান।

ওদের কি কখনও দেখা হয় আকাশ পথে বা আকাশ জুড়ে ছড়ানো বন্ধুত্বের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে? ওদের বুকেও কি বয়ে যায় পাহাড়ি নদীর মতো নুড়ি পাথরের মধ্যে দিযে বয়ে চলা বন্ধুত্বের স্রোত? সুজন মাথার উপর ঝোলানো তারার শামিইয়ানা ছেড়ে নেমে আসে ছাদ থেকে নিজের অন্ধকার ঘরে।

মাথার ভিতরের টিশটিশ করা ব্যথাটা যেন ঘুমের দেশে ডেকে নিয়ে যায়। বিছনাতে শুয়ে আলতো করে চোখের পাতা বন্ধ করতেই যেন অনির্বাণ-ব্রজেশ-ফারুক এসে তার চারপাশ ঘিরে দাঁড়ায। হাসতে হাসতে বলে, একা একা কী করছিস? মন খারাপ, বোর হচ্ছিস? চল আমাদের সঙ্গে। আবার আমরা বন্ধুরা সবাই মিলে একসঙ্গে হুল্লোড় করব, মজা করব।

ওরা সুজনের হাত ধরে টানতে থাকে! মাথার মধ্যে জেগে থাকা টিশটিশ ব্যথাটা হঠাৎ শান্ত হয়ে যায়। সুজন ঠোঁটের কোণে হাসির রেখা টেনে দুহাত বাড়িয়ে দেয়।

 

 

শিশুকে সম্মান দিন

শিশুর মন হল একতাল মাটির মতো। তাকে কী আকার দেবেন সেটা নির্ভর করছে আপনার উপর। বাচ্চা বড়ো হয়ে ভালো ব্যক্তিত্বের অধিকারী হোক, জীবনে উন্নতি করুক, মা-বাবার নাম উজ্জ্বল করুক এই ইচ্ছা সব মা-বাবার মনেই থাকে। এটা তখনই সম্ভব যখন বাচ্চার বেড়ে ওঠায় মা-বাবা সম্পূর্ণ সচেতন থাকবেন।

বাচ্চাকে সম্মান দিন

  শিশুর সম্পূর্ণ খেয়াল রাখলেও বেশিরভাগ অভিভাবকই একটি বিষয়ে গুরুত্ব দেন না –সেটা হল বাচ্চাকে সম্মান দেওয়া।শিশুকে কখনও তার ছোটো ভাই বা বোনের সামনে বকবেন না ৷ আপনার সন্তান যদি আপনার কথামতো কাজ না করে অথবা কোনও দুষ্টুমি করে থাকে, পরীক্ষায় নম্বর কম পায় কিংবা বাচ্চার মুখে মিথ্যা শুনে আপনার প্রচণ্ড রাগ হয়– যেটাই ঘটুক না কেন, বাচ্চাকে কখনও তার ছোটো ভাই বা বোনের সামনে অপমান করবেন না। বড়ো ভাই, বোনকে যদি ছোটোরা মা-বাবার কাছে বকাঝকা, মার খেতে দেখে, তাহলে একটা পর্যায়ে এসে তারা বড়োদের সম্মান করা ছেড়ে দেবে। তাদের নিয়ে ঠাট্টা, ইয়ার্কি করবে, ফলে বড়ো সন্তানটি ক্রমশ আত্মবিশ্বাস হারাতে থাকবে। তাদের মানসিক বিকাশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই শাসন করার হলে সন্তানকে সকলের সামনে নয়, একা ডেকে শাসন করুন।

অপরের সামনে মেজাজ হারাবেন না

 মনে করুন আপনার সন্তান আপনার কোনও দামি জিনিস হারিয়ে দিয়েছে অথবা বড়োসড়ো কোনও একটা অন্যায় করে ফেলেছে যেটা সম্পর্কে আপনি বাইরের কারও কাছ থেকে জানতে পারলেন। খবরটা জানতে পেরেই সঙ্গে সঙ্গে বাচ্চার উপর চ্যাঁচামেচি করা কখনওই উচিত নয়। বাইরের লোকজনের সামনেও বাচ্চাকে কখনও বকাঝকা করা উচিত নয়। বাচ্চাকে একলা ডেকে ওর সঙ্গে কথা বলুন। মেজাজ ঠান্ডা রেখে ও কী অন্যায় করেছে সেটা ওকে বলুন এবং ও কী উত্তর দেয় ধৈর্য ধরে শুনুন। এমনও হতে পারে পরিস্থিতি আপনার সন্তানকে বিপথে যেতে বাধ্য করেছে। ওই বিষয়ে ওর কী বলার আছে সেটা ওকে বলার সুযোগ দিন। ওর কথা পুরোটা শোনার পরই সিদ্ধান্ত নিন আপনার বাচ্চার দোষ আছে কি নেই। ওর যদি দোষ থাকে, তাহলেও সন্তানকে মারধর না করে মৌখিক ভাবে বোঝাবার চেষ্টা করুন। ওর অন্যায় কী, সেটা ওকে বোঝান এবং ওকে দিয়ে প্রতিজ্ঞা করান যাতে ও এই কাজ আর কখনও না করে। ভালোবেসে কোনও কথা বোঝানো হলে সেটার প্রতিক্রিয়া অনেক গভীর হয়। মারধর, বকাঝকা করলে বাচ্চার মধ্যে ক্ষোভ এবং বিদ্রোহের সৃষ্টি হয় আর নয়তো বাচ্চা অবসাদের শিকার হয়ে পড়ে।

বাচ্চার মনে নেতিবাচক ভাবনা নিয়ে আসবেন না

বাচ্চাকে নিজের নেতিবাচক মানসিকতায় প্রভাবিত করবেন না। এমন কথা বলে ওকে সম্বোধন করবেন না যা, বাচ্চার নরম মনকে আঘাত করতে পারে। ‘তুই কিছু পারিস না, অলস, গাধা, বজ্জাত, শয়তান’ ইত্যাদি শব্দ বাচ্চার সঙ্গে ব্যবহার করবেন না। যত আপনি এসব কথা বাচ্চাকে বলতে থাকবেন, বাচ্চার খামতিগুলো বারবার বাচ্চার চোখে আঙুল দিয়ে দেখাতে থাকবেন, ততই বাচ্চার বিপথে চলে যাওয়ার সম্ভাবনা বাড়তে থাকবে। অনেক বাড়িতেই, মা-বাবা বাচ্চাদের খালি দোষ ধরতে থাকেন। বাইরের লোক, প্রতিবেশী এবং আত্মীয়স্বজনদের সামনেও বাচ্চাদের খামতিগুলো তারা তুলে ধরেন। এর ফলে বাচ্চাদের মধ্যে নেতিবাচক ভাবনা মাথাচাড়া দেয়। বরং যদি বাচ্চার গুণগুলো সকলের সামনে প্রকাশ করে বাচ্চার প্রশংসা করা হয়, তাহলে বাচ্চার মধ্যে সদর্থক মানসিকতা বাড়বে। আরও ভালো ভালো কাজ করে বেশি প্রশংসা পাওয়ার লোভ বৃদ্ধি পাবে। বাচ্চার মনে ক্ষোভ, গ্লানি, প্রতিযোগিতার মনোভাব উৎপন্ন হওয়ার বদলে উৎসাহ, চেষ্টা এবং হেলদি কম্পিটিশন-এর মনোভাব বাড়বে।

বাচ্চার ইচ্ছার মর্যাদা রাখুন

প্রত্যেকটি বাচ্চা একে অপরের থেকে আলাদা। প্রত্যেকটি বাচ্চার মধ্যেই আলাদা আলাদা গুণ রয়েছে। আলাদা সম্ভাবনা রয়েছে। বাচ্চার যেদিকে ইন্টারেস্ট, বাচ্চা যেটা করতে পছন্দ করে, ভবিষ্যতে সে যেটা হতে চায়– সেটাতে ওকে নানা ভাবে সাহায্য করুন। সে যা হতে চায় সেটাই ওকে হতে দিন। অনেক বাড়িতেই, ছোটো বলে বাচ্চার ইচ্ছা দাবিয়ে রাখা হয়। তাকে বোঝানো হয় ভালো-মন্দের জ্ঞান তার হয়নি। কিন্তু বড়োদের এই আচরণ বাচ্চাকে সঠিক দিশা দেখাতে পারে না। সন্তানের উপর নিজের মতামত চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করবেন না। সম্মানের সঙ্গে তাকে নিজের জীবন এবং জীবনের সঙ্গে যুক্ত যে-কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা দিন যাতে বড়ো হয়ে ফ্রাস্ট্রেশন এবং রাগের বদলে তার আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়। তার জীবন খুশিতে, আনন্দে ভরে ওঠে এবং অন্যকেও আনন্দে ভরিয়ে তোলে।

যা নাম সেই নামেই সম্বোধন করুন

অনেক ক্ষেত্রেই মা-বাবা এমনকী আত্মীয়স্বজনেরা বাচ্চার যা নাম সেই নামে না ডেকে, আসল নামটাকে ভেঙেচুরে একটা ছোটো নাম নিজেরাই ঠিক করে নেন নিজেদের সুবিধার্থে। সেটা অনেক সময়ই অপভ্রংস হয়ে একটা বিধঘুটে নাম হয়ে দাঁড়ায়৷ জনসমক্ষে এ নামে ডাকলে বাচাচা অস্বস্তিতে পড়ে৷কন্যা সন্তানের ক্ষেত্রেও এই একই নিয়ম খাটে। এমনকী শারীরিক দুবর্লতা বিচারেও নামের তারতম্য ঘটে। যেমন বাচ্চা কালো হলে বা মোটা হলে কালু, মোটু ইত্যাদি যা নাম মুখে আসে সেই নামেই বড়োরা বাচ্চাকে সম্বোধন করে। মনে রাখবেন ভুলেও বাচ্চাকে এরকম নামে ডাকবেন না এবং পরিচিত কাউকে যদি এমন করতে দেখেন তৎক্ষণাৎ তাকে বারণ করুন। এই ধরনের নামে বাচ্চাকে সম্বোধন করলে তার প্রভাব অবশ্যই সেই বাচ্চার ব্যক্তিত্বের উপর পড়বে। সুতরাং বাচ্চার সঠিক নামেই তাকে ডাকুন যাতে বাচ্চার ভিতর ইতিবাচক এনার্জি প্রবাহিত হতে পারে।

বাচ্চার সঙ্গে শালীন ভাষায় কথা বলুন

অনেক সম্ভ্রান্ত পরিবারে দেখা যায় বড়োরা বাচ্চাদের সঙ্গে অত্যন্ত কুরুচিকর ভাষায় কথা বলেন। এর ফলে বাচ্চার মধ্যে শিষ্টাচার এবং সভ্য ব্যবহারের ভিত গড়ে ওঠে না। বাচ্চাদের সামনে গালিগালাজ দিয়ে কথা বললে বাচ্চাও, শিখবে ওটাই ৷ওই ভাষা অন্যদের সঙ্গে,এমনকী আপনার সামনেও  প্রয়োগ করবে। এর ফলে বাইরের লোকের কাছে আপনাকে লজ্জিত হতে হবে। সুতরাং বাচ্চাকে সম্মান দিন, বিনিময়ে বাচ্চাও আপনাকে সম্মান করবে।

অ্যাসিডিটি-গ্যাসট্রিক-এর সমস্যা বাড়লে

আধুনিক জীবনশৈলীর কারণে অধিকাংশ মানুষ এখন পেটের নানা সমস্যায় ভোগেন । বদহজমের সমস্যায় আমরা শুরুর দিকে সেভাবে গুরুত্ব দিই না। পরে পেটে ব্যথা গ্যাস, বমি বমি ভাব এবং গরমে জ্বালাপোড়ার মতো সমস্যা হতে পারে।ভালো হজমের জন্য খাবার সঠিকভাবে চিবিয়ে খাওয়া প্রয়োজন। আপনি যখন খাবারকে ভালোকরে চিবিয়ে খাবেন, তখন এটি আপনার পরিপাকতন্ত্রের কাজকে সহজ করে তুলবে। তাই খাবার খাওয়ার একটু সময় দিনন। তাড়াহুড়ো করে শেষ করবেন না, কারণ এটি বদহজম হতে পারে।অনেক কারণেই এই সমস্যাগুলি হয়ে থাকে। কী কী কারণে এই সমস্যা হয়ে থাকে, কী এর লক্ষন, প্রতিকারই বা কী, আসুন জেনে নিই।

কারণ

  • দুপুরে এবং রাতের খাবার খুব ভারী খেলে এবং একটা মিল-এর পরেই সঙ্গে সঙ্গে শুয়ে পড়লে
  • বেশি ওজনের জন্য এবং ওবেসিটি-র কারণে
  • খুব হেভি মিল খাওয়ার পর পিঠ বিছানায় রেখে শুয়ে পড়লে অথবা কোমর থেকে নীচের অংশ ঝুঁকিযে রাখলে
  • শুতে যাওয়ার আগে স্ন্যাক্স জাতীয় ভাজাভুজি খেলে
  • বিশেষ কিছু খাবার, যেমন টক জাতীয় খাবার, টোম্যাটো, চকোলেট, রসুন, পেঁয়াজ  পুদিনা অথবা খুব মশলা-যুক্ত বা ফ্যাট-যুক্ত খাবার খেলে

লক্ষণ

  • খাওয়ার পরেই পেট ও বুকে জ্বালা-ভাব
  • GERD গ্যাস্ট্রোএসোফেগাল রিফ্লাক্স ডিজিজ
  • রাত্রে শোওয়ার অসুবিধা। সমস্যা বাড়তে থাকা
  • বারবার চোঁযা ঢেঁকুর ওঠা
  • গলায় খাবার আটকে রযেছে মনে হওয়া
  • বমি বমি ভাব
  • বমি হওয়া

প্রতিকার

  • সকালে উঠেই ৩-৪ গেলাস জল পান করুন
  • খালি পাযে ঘাসের উপর হাঁটুন
  • সকালে ৩০ মিনিট মেডিটেট করুন
  • নানা ধরনের ফল অথবা স্প্রাউট খান, কাঁচা অবস্থায় (সেদ্ধ অথবা ভাপানো কোনওটাই চলবে না)
  • ব্যালেন্সড ডাযেট নিন
  • সবরকমের সবজি দিযে বানানো রায়তা এবং নারকেলের শাঁস খান
  • সবুজ অথবা লাল লংকা, গোলমরিচ, আচার, ক্যান্ডি, কোল্ড ড্রিংক, প্যাকেটবন্দি ফলের রস, ময়দার তৈরি খাবার ইত্যাদি খাওয়া একেবারেই উচিত নয়
  • তৈলাক্ত এবং মশলাদার খাবার যেমন লুচি, পরোটা, পকোড়া, মিষ্টি, দুধ ইত্যাদি খাওয়া বর্জন করুন।

মায়াময় নগরী ম্যাঙ্গালোর

গত দু’দিন হল ম্যাঙ্গালোর এসেছি। কাল উদিপি দেখতেই সারাটা দিন কেটেছে। সঙ্গে দেখেছি মালপে আর কৌপের মতো অল্প চেনা অসাধারণ সব সৈকত। আজ ভেবেছি মন ভরে দেখব ম্যাঙ্গালোর। সকালে স্নানপর্ব মিটিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। হোটেল সন্নিকটে একটি রেস্টুরেন্টে সারলাম প্রাতরাশ। এবার একটা অটো ভাড়া করে শহর দর্শনে বেরিয়ে পড়লাম।

বন্দর নগরী ম্যাঙ্গালোর বেশ বড়োসড়ো আধুনিক শহর। ভৌগোলিক ভাবে এর অবস্থান আরবসাগরের তীরে নেত্রবতী ও গুরুপুর নদীর সঙ্গমে। মধ্যযুগে ইবনবতুতা ঘুরে গেছেন এ শহর থেকে। দীর্ঘ দিন পর্তুগীজদের দখলে থাকা এ শহরের সঙ্গে কেরালার অনেকটাই সাদৃশ্য রয়েছে। ১৭৬৩ খ্রিস্টাব্দে হায়দার আলি ম্যাঙ্গালোর অধিকার করে মহীশূর রাজ্যের অর্ন্তভূক্ত করেন। এ শহরে টিপুর সঙ্গেই ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ১৭৮৪ খ্রিস্টাব্দে ম্যাঙ্গালোর চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চতুর্থ ইঙ্গ-মহীশূর যুদ্ধে টিপুর মৃত্যুর পর ইংরেজরা এই শহরের দখল নেয়। সব যুগের স্মৃতি ও স্মারক ম্যাঙ্গালোরকে উপভোগ্য পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত করেছে। এটাই ভারতের কাজু, কফি ও মশলা রফতানির মুখ্য ঘাঁটি। শহরের ইতিউতি ছড়িয়ে আছে উঁচুনীচু পাহাড়। পথঘাটে অনেক বাঁক, নানাদিকে চলে গেছে সংকীর্ণ গলিপথ। সমুদ্র ছাড়াও এখানে রয়েছে অনেক মন্দির, মসজিদ ও গির্জা।

মন্দির দর্শনের মধ্যে দিয়ে সকালটা শুরু হল। গাড়ি নিয়ে প্রথমেই চলে এলাম কাদরি মঞ্জুনাথ মন্দিরে। বাসস্ট্যান্ড থেকে চার কিমি দূরে এর অবস্থান। এই মন্দির নির্মিত হয় একাদশ শতকে। গাড়ি থেকে নেমে চললাম বিগ্রহ দর্শনে। এই মন্দিরকে ঘিরে রয়েছে সুবিশাল অঙ্গন। প্রবেশ সম্মুখে উঠে গেছে সিঁড়ি, যেটা পেরিয়ে তোরণদ্বার ছুঁয়ে প্রবেশ করলাম সুপ্রশস্ত সেই অঙ্গনে। মূল মন্দির ছাড়া এখানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে, অনেক দেবদেবীর মন্দির।

প্রথমেই ঢুকলাম নবগ্রহ মন্দিরে। পাশেই গণেশ মন্দির৷ একই চত্বরের মধ্যে রয়েছে শনি, সূর্য ও অন্যান্য মন্দিরশ্রেণী। পাশেই আচ্ছাদিত এক প্ল্যাটফর্মের উপর রুপোর রথ। অনেকটা ঘুরে আবার মূল মন্দিরে প্রবেশ করলাম। কেরলের লাল টালির ধাঁচের এই মন্দির চূড়া অবশ্য শ্বেতশুভ্র। এখানেই রয়েছে ব্রোঞ্জের প্ল্যাটফর্মের উপবিষ্ট লোকেশ্বর শিব। পাশেই অবস্থান করছে মঞ্জুরী মূর্তি। লোক সমাগম দেখেই উপলব্ধি হয়, কত জনপ্রিয় এই মন্দির।

মন্দিরের ভিতরে তখন বড়ো মেশিনের সাহায্যে ধোয়া-ধুয়ির কাজ চলছে। মন্দিরের সম্মুখে খাড়াই সিঁড়ির সারি। উঠেছে কাদরি পাহাড়ে। সিঁড়িতে পা দিতেই চোখ চলে যায় মন্দির সম্মুখে আকাশচুম্বী দীপস্তম্ভ-এর দিকে। একপাশে রয়েছে পবিত্র জলাশয়। মন্দির লাগোয়া সাতটি জলে চর্মরোগের নিরাময় হয় বলে ভক্তদের বিশ্বাস। কাছেই রয়েছে পান্ডবগুহা ও যোগীমঠ। আরও কয়েকধাপ এগিয়ে গেলেই নজরে পড়ে, পাহাড়ি চত্বরে সুন্দর করে সাজানো পার্ক। অন্য পাশে রয়েছে ছোট্ট চিড়িয়াখানা। ফেরার পথে চত্বরের মূল ফটকের কাছে শিবের মূর্তিটিও দৃষ্টি আকর্ষণ করে।

গাড়ি এবার চলে আসে মঙ্গলা দেবীর মন্দির সম্মুখে। মূল রাস্তার ধারেই এই মন্দির। বেশ খোলামেলা পরিবেশ। আড়ম্বরহীন মন্দির সম্মুখে এক প্রকাণ্ড অশ্বত্থগাছ। সেই গাছটি ঘিরেই ভক্তদের জটলা। দশম শতাব্দীতে এক রাজকন্যার স্মৃতিরক্ষার্থে নাকি এই মন্দিরটি নির্মিত হয়েছিল। শোনা যায়, এই দেবীর নাম অনুসারেই শহরের নাম হয় ম্যাঙ্গালোর।

এবার গাড়ি এগিয়ে চলে, হাল আমলের তৈরি গোরক্ষনাথ মন্দির দর্শনে। ১৯৯৫ সালে তৎকালীন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জনার্দন পূজারীর অর্থ আনুকূল্যে এই মন্দির নবরূপে আত্মপ্রকাশ করে। মন্দির গাত্রের সুচারু সৗন্দর্য দেখে সত্যিই চোখ আটকে যায়। মন্দির কমপ্লেক্স জুড়ে যেন অভিনবত্বের আতিশয্য। মোজাইক চত্বরে প্রবেশ করেই দেখে নিই পরপর মন্দিরগুলি। রয়েছে বজরংবলী, শনি, সাঁইবাবা, কার্তিকস্বামী ইত্যাদি মন্দির।  ফুল, বেলপাতা, কর্পূর, ধূপ, ধুনোর মিলিত চির-চেনা গন্ধটা নাকে আসে।মূল গোরক্ষনাথ শিব মন্দিরে তখন আরতি চলছে। বক্সে বাজছে আধ্যাত্ম সংগীত। সংগীতের তালটা যেন শরীরেও ভর করে। ফেরার পথে লক্ষ্য করি, মূল ফটকের কারুকার্যও দেখার মতো। শুনলাম, মন্দির জুড়ে দশেরাতে বিরাট উৎসবের আয়োজন করা হয়।

Mangalore

গাড়ি এবার দৌড়োল এক নতুন মন্দির দর্শনে।সম্প্রতি এই সূর্যনারায়ণ মন্দির পুণ্যার্থীদের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে। বোঝাই যাচ্ছে এই মন্দিরের মূল বিগ্রহ সূর্যদেব। আধুনিক শিল্পীদের হাতে গড়া এই মন্দিরের স্থাপত্য ও ভাস্কর্য অসাধারণ। খোঁজ নিয়ে জানলাম, পশ্চিমবঙ্গের বহু শিল্পীই এই মন্দিরে কাজ করেছেন। কেরলীয় ধাঁচে তৈরি এই নতুন মন্দিরের ভক্তসমাগম এর মধ্যেই বাড়তে শুরু করেছে।

ম্যাঙ্গলোরকে বোধহয় মন্দির নগরী বললেও অত্যুক্তি করা হবে না। তাই এবার গাড়ি ছোটে অন্য এক মন্দির অভিমুখে। এবারের আকর্ষণ সোমেশ্বর শিব মন্দির। মন্দির লাগোয়া দুর্দান্ত এক সৈকত। গাড়ি থেকে নামতেই দেখি, সামনে ছোটো-খাটো এক টিলা। টিলাশীর্ষে রয়েছে সোমেশ্বর শিব মন্দির। খাড়াই সিঁড়িপথটা উঠেছে মন্দির অবধি। মন্দির লাগোয়া গাছগাছালির ছায়াঘন পরিবেশ। পুণ্যার্থীর সমাগমও যথেষ্ট। ভক্তদের লম্বা লাইনটা সাপের মতো এঁকেবেঁকে সামনে এগিয়েছে।

সিঁড়ির সম্মুখভাগ দিয়ে অন্য একটা পথ পৌঁছেছে টিলার শীর্ষে। লাইনে দাঁড়িয়ে সময় নষ্ট না করে হাঁটতে হাঁটতে এগিয়ে চলি টিলার মাথায়। উপরে উঠতেই চোখাচোখি হয়ে যায় আরবসাগরের সঙ্গে। সামনেই ছবি হয়ে দাঁড়িয়ে সোমেশ্বর সি-বিচ। এখানে বিশ্রামের জন্য আছে আচ্ছাদিত কংক্রিটের প্লাটফর্ম। তাতে কয়েকটা চেয়ার পাতা। তার সম্মুখে বোল্ডার বিছানো পাহাড়ি প্রাকৃতিক পরিসর। সামনের ফ্রেম জুড়ে সফেদ ফেনিল জলরাশির জলছবি। ক্রমাগত আছড়ে পড়ছে বোল্ডার সর্বস্ব পাহাড়ের দেয়ালে। যতদূর চোখ যায় আদিগন্ত বিস্তৃত নীল-নীলিমার উদ্দাম লহরির খেলা। অশান্ত লোনা হাওয়ায় মন ভালো করা ষোলো আনা তৃপ্তি। জায়গাটা এতটাই নয়নাভিরাম আর নিরিবিলি যে, মনে হয় জীবনের শতব্যস্ততা থেকে মুক্তির ঠিকানা পেয়ে গেছি।

একটু এগোতেই দেখি, পাহাড়ের গা বেয়ে লাল রেলিংয়ের সিঁড়ি। নেমে গেছে সোজা সি-বিচে। শুনসান সি-বিচে লোকজন হাতে গোনা। বিচ জুড়ে আবার ঝাউয়ের বিন্যাস। উপলখন্ডের উপর উথালি-পাথালি ঢেউ অবলোকন করি অনেকক্ষণ ধরে। সমুদ্রের মাদকতার স্বাদ নিতে গিয়ে, সময় অনেকটাই চলে যায়। দুপুরের নিয়মের শাসনে সোমেশ্বর শিবমন্দির বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে বিগ্রহ দর্শন আর হয়ে ওঠে না। মন্দির চত্বরটা ঘোরাঘুরি করে, আবার গাড়িতে গিয়ে উঠি।

মধ্যাহ্ন ভোজনের পর পৌঁছোই এখানকার বিখ্যাত উল্লাল-সি-বিচে। গাড়ি থেকে নামতেই হাতছানি দেয় বিস্তৃত সোনালি বালুর দূর্দান্ত এক সৈকত। সামনে বালিয়াড়ির বিস্তৃতিটা কিছুটা উঁচু হয়ে সোজা নেমে গেছে সি-লেভেলে। এখানকার সৈকতের বিস্তৃতি খানিকটা সরলরেখায়। সৈকত জুড়ে সারি-সারি জেলে নৌকার সারি। সমুদ্রের দিকে মুখ করে চুম্বক শলাকার মতো শুয়ে আছে । রোদে শুকোচ্ছে মাছ ধরার জাল। সেই সঙ্গে টোটাল পরিবেশটা জুড়ে আছে একটা আঁশটে গন্ধ। আর বালিয়াড়ির পিছনে সবুজের নিবিড় সন্নিবেশ। সৈকত জুড়ে সীমাহীন ঢেউয়ের মস্তানি। রোদ থাকলেও বাতাসে একটা শীতল অনুভূতি। দু’একজন স্নানার্থী চোখে পড়ছে। তবে উত্তাল ঢেউয়ের মাঝে এখানে স্নান করার ঝুঁকি না নেওয়াই ভালো।

Beaches of Mangalore

সমুদ্রকে বাঁদিকে রেখে বালুজমি ধরে পায়ে-পায়ে এগিয়ে যাই। কিছুটা দূরেই শুরু হয়েছে জেলেদের পাড়া। বালিয়াড়ি জুড়ে কিছু অস্থায়ী দোকানপাট। সেই সব দোকানে বিক্রি হচ্ছে কাঁচা-মিঠে আম। আছে আনারসের মতো কাটা ফলও। বিকেলে এখানে স্থানীয় মানুষজনদের ভিড় হয় ভালোই।

সমুদ্র সৈকতের অদূরেই রয়েছে এক দরগা। চলে এলাম সেই সৈয়দ মহম্মদ শরীফুল মাদানী দরগায়। দরগা ও সংলগ্ন মূল ফটকের নান্দনিক সৗন্দর্য অসাধারণ। দরগা লাগোয়া প্রসস্ত চত্বর দেখেই বুঝে যাই এখানে একসঙ্গে বহু ধর্মপ্রাণ মানুষজন নামাজ পড়তে পারেন। মহিলাদের প্রবেশের ক্ষেত্রেও কোনও বাধা নেই দেখলাম। ফেরার পথে রেল স্টেশনের সন্নিকটে দেখে নিলাম মিলাগ্রেস চার্চ। শোনা যায় বিশপ থমাস এই রোমান ক্যাথালিক চার্চটি তৈরি করান। বিকালে গিয়েছিলাম পানাম্বুর সৈকতে। সাগর তীরে সূর্যাস্ত দেখে হোটেলে ফিরলেও, অনেক স্পটই এ যাত্রায় আর দেখা হল না।

কীভাবে যাবেন – কলকাতা থেকে সরাসরি ম্যাঙ্গালোর পৌঁছোতে ধরুন  সাঁতরাগাছি ম্যাঙ্গালোর সাপ্তাহিক বিবেক এক্সপ্রেস। অন্যথায় চেন্নাই, বেঙ্গালুরু অথবা মহীশূর থেকেও ম্যাঙ্গালোরের ট্রেন মিলবে। চেন্নাই থেকে পাবেন চেন্নাই ম্যাঙ্গালোর সুপার ফাস্ট এক্সপ্রেস। বেঙ্গালুরু বা মহীশূর থেকে পাবেন  যশোবন্তপুর-কুন্নুর এক্সপ্রেস এবং যশোবন্তপুর-কারওয়ার এক্সপ্রেস। মাদিকেরি থেকে ১৩৬ কিমি দূরে ম্যাঙ্গালোর। মাদিকেরি ঘুরে ম্যাঙ্গালোর গেলে গাড়ি ভাড়া করে যাওয়াই সুবিধা। অন্যথায় এই পথে সরকারি বাস মিলবে অহরহ।

রাজি থাকলে চলুন রাজিম

এনএইচ৬ ধরে ছুটে চলেছে গাড়ি। ল্যান্ডস্কেপে বন্ধুর প্রকৃতি। ধুলোওড়া রুখু-শুখু পরিবেশ। সামনে ছোট্ট এক জনপদ। কুশলপুর। হাত নেড়ে জানায় যেন সে কুশলবার্তা। আসলে লম্বা দৌড়ের কাউন্টডাউন শুরু রায়পুর থেকে। চলেছি মন্দিরতীর্থ রাজিম। সন্তোষী চক থেকে গাড়ি ছেড়ে দিল, উঠল জাতীয় সড়কে। এবার লিঙ্ক রোড। মিনিট সাতেক পরই দেবপুরী। আবার জাতীয় সড়ক। তবে এবার এনএইচ৩০। এই রাস্তাটা চলে গেছে বস্তারের জগদলপুর। এক ফসলি চাষজমি রাস্তার দুদিকে। শীতে ফসলহীন জমি খাঁ খাঁ করছে। যেন তেপান্তরের মাঠ! ভেজলিন না লাগানো পা-ঠোঁটের মতো ভমিরূপ। ফাটা-চটা। এপথে বলার মতো বড়োসড়ো গাছ বাবলা আর খেজুর। বাদবাকি ছোটো-খাটো ঝোপ-ঝাড়। যেন কমা, পূর্ণচ্ছেদ।

সেই তেপান্তরের মাঠ ছুঁয়ে চলে গেছে রেলপথ। মিটার গেজ। গতি মন্থর। যেন হাওড়া-শিয়াখালা মার্টিন রেলের প্রত্ননিদর্শন। দৌড় তার রায়পুর থেকে বাঘবেহেড়া। ওয়াই আকৃতির বামহাতি বাঁক ঢুকেছে চম্পারনে। এখান থেকে দৌড়টা পাক্কা সাতাশ কিমি। অন্যপথ ধরে একটু এগোলেই আমনপুর। বাজার আমনপুরের পরই আবার বামহাতি পথ। আর পড়ে মেরে-কেটে মাত্র ১৪ কিমি। রাজ্য-জয়ের হাসি নিয়ে শেষ পর্যন্ত রাজিম রাজ্যে প্রবেশ। মহানদীর মহাব্রিজের এপারটাই নবাপাড়া। ওপারে কাঙ্ক্ষিত রাজিম। রাজিম স্টেশন-ও নদীর এপারে। মিটার গেজের ছোট্ট স্টেশন। ৪৯ কিলোমিটার দৌড়ঝাঁপের পর এবার গাড়ি দৌড়ের ইতি। পার্কিং তার তেঁতুলবটের নিঝুম ছায়ায়।

Travelogue Rajim

মহানদী, পৈরি এবং সেন্দুর এই ত্রিবেণী নদী সঙ্গম পাড়েই রাজিম নগরী। যা আসলে ছত্তিশগড়ের প্রয়াগ তীর্থ। ফিবছরই চলে এখানে পূণ্যার্থীদের জনসমাবেশ। সময়টা মাঘি পূর্ণিমা থেকে মহাশিবরাত্রি। এক পক্ষকাল ধরে চলে এখানে উত্সবের আমেজ। চলে তর্পণ ও পূণ্যস্নান। সমবেত হয় দূর-দূরান্ত থেকে অসংখ্য পূণ্যার্থী। প্রতি বারো বছর অন্তর এখানে অনুষ্ঠিত হয় রাজিম মহাকুম্ভ। পুরী বার বার গেলেও ক্ষতি নেই। কিন্তু  পুরো কোটা পূরণে রাজিম অন্তত একবার আসতেই হবে। তাই পুরীর জগন্নাথ দর্শনের  পূর্ণতার জন্য রাজিমলোচন মন্দির দর্শন একান্তই পালনীয়। তাই তো রাজিমের আর এক নাম কমলাক্ষেত্র পদ্মাবতী পুরী।

চলে এলাম অষ্টম শতাব্দীতে তৈরি রাজিবলোচন মন্দির কমপ্লেক্সে। সিংহভাগ মন্দিরের অবস্থানই এই ঘেরাটোপের অন্দরে। তবে সঙ্গম ঘাট ও নদীর অন্য পারেও বেশ কযেটি মন্দির। জুতো খুলে চলে আসি মন্দির চত্বরে। এখানকার মধ্যমণি রাজিবলোচন মন্দির। ইটশৈলীর এই মন্দির উঁচু প্ল্যাটফর্মের উপর সুগঠিত। গঠনশৈলীতে সম্পূর্ণ আঞ্চলিকতার ছাপ। শ্বেতশুভ্র দেবগৃহের মাথায় উড়ছে লাল ধ্বজা। ধাপ সিঁড়ি উঠেছে মন্দির প্রকোষ্ঠে। মন্দিরের তিনটি ধাপ গর্ভগৃহ, অন্তরাল ও মণ্ডপ। গর্ভগৃহে অবস্থান করছেন রাজিবলোচন। অর্থাত্ ভগবান শ্রীবিষ্ণু। কালো কষ্টি পাথরের মূর্তি। চতুর্ভুজে তাঁর শঙ্খ, চক্র, গদা পদ্ম। এইরূপ মোটেই রুদ্র নয়। বরং শান্ত, সৌম্য, তথাগত টাইপের। মনে করা হয় যুদ্ধ পরবর্তী শান্ত রূপই এই রাজিবলোচন।

গর্ভগৃহের দ্বার সম্মুখের দেওয়া ভাস্কর‌্য অসাধারণ। যে-শিল্প নিপুণতা সহজেই চোখ টানে। দেওয়ালজুড়ে পৌরাণিক গল্পকথার পুঙ্খানুপুঙ্খ চিত্রায়ণ অনবদ্য। মণ্ডপ অংশের স্তম্ভস্থাপত্য শৈলীও এককথায় অসাধারণ। যা খাজুরাহো শিল্পরীতির সঙ্গে অনায়াসেই তুলনা করা যায়। স্তম্ভস্থাপত্য পৌরাণিক চরিত্র চিত্রণের সঙ্গে মিথুন চিত্রের মেলবন্ধন ঘটেছে। তাই নরসিংহ, বরাহ,

রাম-লক্ষণ, গঙ্গা-যমুনার সঙ্গে সহাবস্থান করছে অপরূপ অপ্সরাবৃন্দের অনবদ্য ভঙ্গিমামূর্তি। একটু লক্ষ্য করলেই অনুমেয় যে, এখানে ভাস্কর‌্য শিল্প তিনটি পর‌্যাযে। যার প্রথমভাগে আছে কল্পলতার চারুচিত্র। দ্বিতীয়তে বিভিন্ন মুদ্রা ও ভঙ্গিমায় মিথুন মূর্তি। আর শেষভাগে মেলে অর্ধমানবী রূপ ও নাগনাগিনী মূর্তি।

মণ্ডপ অংশের সম্মুখ ভাগেই চোখেপড়ে এক গরুড়মূর্তি। ললাট বিম্বের উপর এই শিলামূর্তির অবস্থান। মনে করা হয় গরুড় অপ্রতিম শক্তি ও শৌর‌্যের প্রতীক। মন্দিরের নিয়মনিষ্ঠা সম্পর্কে জানছিলাম মন্দিরের পুরোহিত বিজয়শর্মার কাছে। মন্দির খোলা হয় ভোর সাড়ে চারটায়। ভোগ পর্বের পর বেলা বারোটায় মন্দির বন্ধ হয়। বেলা তিনটায় খুলে রাত পর‌্যন্ত চলে ভক্তদের পূর্জার্চনা। মন্দিরের ইতিহাস সম্পর্কে  শুনছিলাম শর্মাবাবুর কাছে, মন্দির চাতালে বসে।

এক দরিদ্র তেলিনী ভোজ্য তেল বিক্রি করে সংসার প্রতিপালন করতেন। অন্যদিনের মতো সে দিনও তিনি রাস্তায় বার হয়েছেন। কিন্তু সেদিন ঘটলো এক অঘটন। এক প্রশস্ত পাথরখণ্ডে তিনি আঘাতপ্রাপ্ত হন। ফলে তাঁর পাত্রের সমস্ত তেলই মাটিতে পড়ে নষ্ট হয়। সেই পাথরের উপরই খালি পাত্রটি রেখে তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন। অগত্যা সেদিনের মতো গৃহে ফিরে যাবেন মনস্থির করেন। কথা মতো খালিপাত্র তুলতেই আশ্চর‌্য এক ঘটনা ঘটে যায়। দেখেন আগের মতোই, তেলে পরিপূর্ণ রয়েছে পাত্রটি! মহানন্দে তেল বিক্রি করে তিনি গৃহে ফিরলেন।

রাতে স্বামীকে বললেন, এই অত্যাশ্চর্য ঘটনা প্রবাহের কথা।

স্বামী-স্ত্রী মিলে শেষে এক সিদ্ধান্ত নিলেন ওই শিলাখণ্ডকে লোকচক্ষুর অন্তরালে বাড়িতে আনবেন। আর যাদুশিলার স্পর্শে পাত্র ভর্তি তেল বিক্রয় করে দরিদ্রতা মোচন করবেন। কথা মতো সেই শিলাখণ্ড মাটি থেকে সরাতেই ঘটল আরও একটা অত্যাশ্চর‌্য ঘটনা! তার তলদেশেই বিরাজ করছে কষ্টি পাথরের এক বিষ্ণু মূর্তি। মূর্তি ও শিলাখণ্ড নিজবাটিতে নিয়ে গেলেন রাজিম তেলিন পরিবার। কিন্তু নিম্ন সম্প্রদায়ভক্ত বলে মন্দির প্রতিষ্ঠায় দ্বিধান্বিত হলেন।

সেই সময় কালচুরি বংশের সামন্ত রাজা ছিলেন জগত্ পাল। তিনি এক নতুন বিষ্ণু মন্দির তৈরি করেন। বিষ্ণুমূর্তি নিয়ে তিনি বিড়ম্বনায় পড়েন। নানান বাধা আসে মূর্তি তৈরিতে। এই সময় জগত্ পাল স্বপ্নে এক বিষ্ণু মূর্তির দর্শন পান। ইতিমধ্যে রাজিম তেলিনের মূর্তিপ্রাপ্তি লোকমুখে রাষ্ট্র হয়েছে। একদিন স্বযং রাজা রাজিম তেলিনের বাটিতে উপস্থিত হন। আর আশ্চর‌্য হয়ে যান বিষ্ণুমূর্তি দেখে। স্বপ্নের সঙ্গে অবিকল মিলে যাচ্ছে। রাজা এই মূর্তিটি তাঁকে দান করার কথা বললে, রাজিম অরাজি হন। এই অমূল্য সম্পদ তিনি হারাতে চান না। পরে অবশ্য শর্তসাপেক্ষে রাজাকে মূর্তিটি দান করেন। শর্তানুয়াযী বিষ্ণুমূর্তির নাম হয় রাবিজলোচন। রাজার প্রতিশ্রুতি অনুযাযী সস্ত্রীক রাজিম তেলিনের প্রস্তর মূর্তি আর এক মন্দিরে প্রতিস্থাপিত হয়।

চলে এলাম সেই রাজিম তেলিন মন্দিরে। রাজিবলোচন মন্দিরের সামনে ও মহাদেব মন্দিরের পিছনে এই মন্দির। মন্দিরের অভ্যন্তরে এক পুরুষ ও এক নারীর মূর্তি। করজোড়ে ধ্যানরত। এই মূর্তিই সস্ত্রীক রাজিম তেলিনের বলে মনে করা হয়। মূর্তির দুই দিকে রয়েছে দুই পরিচারিকাও। মন্দির কমিটির অফিস ঘুরে চলে এলাম এবার জগন্নাথ মন্দিরে। মন্দিরটি আবার আর এক আয়তকার ঘেরা জায়গার মধ্যে। সে চত্বরে যাওয়ার দ্বার চতুর্পার্শ্বের দেওয়া ভাস্কর‌্য থেকে চোখ ফেরানো অসম্ভব। জগন্নাথ মন্দিরের চত্বরে আবার সাধু-সন্তদের আখড়া। ফালি জমিতে সবজি চাষ। ছড়িযে ছিটিয়ে গৃহস্থালির টুকিটাকি।

ওখান থেকে ঘুরে এবার রামচন্দ্র মন্দির। এই মন্দিরের মণ্ডপ অংশের স্তম্ভ ভাস্কর‌্যেও পৌরাণিক কাহিনীর চরিত্র চিত্রায়ণের নৈপুণ্যতা অনবদ্য। এছাড়া দেখে নিলাম রাজেশ্বর মন্দির, দানেশ্বর মন্দির, বরাহ মন্দির, নরসিংহ মন্দির, বদ্রিনাথ মন্দির, বামন মন্দির ইত্যাদি। জগত্ পাল দেবের পৃষ্ঠপোষকতায় এই সকল মন্দির শ্রেণি তৈরি হয়েিল বলে মনে করা হয়। এর সত্যতা মেলে রাজিবলোচন মন্দিরের মহামণ্ডপের পাশে রাখা এক শিলাখণ্ডে। সেখানে উল্লেখ আছে রতনপুরের কলচুরি রাজার অধীনস্থ সামন্ত রাজা ছিলেন জগত্ পাল। প্রতিষ্ঠাকাল হিসাবে ১১৪৫ খ্রিষ্টাব্দের উল্লেখ আছে।

চলে এলাম সঙ্গম ঘাটে। ঘাট পথের ডানহাতি উঁচু ঢিপিতে ভতেশ্বরনাথ মন্দির। নাম লেখা পুরাতত্ত্ব বিভাগের বোর্ড ঝুলছে। তবে মন্দির সংস্কারের কাজে হাত পড়েনি আদৌ। ভাঙাচোরা মন্দির। দেয়াল ও স্তম্ভ জুড়ে সর্পের ছবি অাঁকা। তবে মন্দিরের আশপাশ খুঁজলে, মহাদেবের জ্যান্ত বাহনদের দুএকটা দেখা মেলা অস্বাভাবিক নয়। তার পাশেই পঞ্চেশ্বর মহাদেব মন্দির। সে মন্দিরের পঞ্চত্ব প্রাপ্তি ঘটেছে অনেকদিন আগেই। ইট শৈলীর মন্দির এখন সম্পূর্ণ পরিত্যক্ত। ঘাটপাড়ে অবশ্য অজস্র মন্দির। যেন মন্দিরমালা। আছে মহাদেব মন্দির,

দত্তাত্রেয়-মন্দির, মহামায়া মন্দির, লক্ষ্মী-নারায়ণ মন্দির, শীতলা মন্দির, ভৈরব মন্দির, বিশ্বকর্মা মন্দির, গরিবনাথ মন্দির, ইত্যাদি। এর মধ্যে মহাদেব মন্দির অভ্যন্তরে শেষনাগের মূর্তিটি বিশেষ উল্লেখের দাবি রাখে।

নেমে গেলাম নদীবক্ষে, ত্রিবেণী সঙ্গমে। ফল্গুর মতো করুণ অবস্থা মহানদীরও। নদীবক্ষে শুধু বালি আর বালি। পৈরি, সেন্দুরের বিভাজনও চোখে ধরা পড়ে না। ক্ষীণ বিভাজিত কযেটি জলধারায় নদী অস্তিত্ব বজায় রেখেছে। সেই জলধারাতে স্থানীয় মানুষজন কাপজ-চোপড় কাচছে। অতি কষ্টে করছে স্নান। এই বিস্তৃত বালু সমুদ্র ও হাঁটু জল পেরিযে দলে-দলে চলেছে ভক্তের দল। কুলেশ্বর মহাদেব মন্দিরে। যে মন্দির নদীর অপরপাড়া। আনুমানিক অষ্টম থেকে নবম শতকের। নির্মাতা সামন্ত রাজা জগত্পাল।

এই মন্দিরের আর এক নাম উত্পলেশ্বর মহাদেব মন্দির। রাম-সীতা ও লক্ষণ বনবাসকালে এই স্থানেই বিশ্রাম নিয়েিলেন বলে জনশ্রুতি আছে। শোনা যায় সীতা নিজহাতে সঙ্গমের বালি দিয়ে শিবালিঙ্গ বানিয়েিলেন। এবং নিষ্ঠাসহ পুজোপাঠ করছিলেন। এই পৌরাণিক প্রেক্ষাপটেই এই মন্দির। ভাবা হয় শৃঙ্খলা ও মহত্বের প্রতীক এই মন্দির। লোমশ ঋষির আশ্রম ছিল এরই সন্নিকটে। এখানকার এক শিলালেখে তা উল্লেখ আছে।

গাড়ি ছুটছে। ফেলে আসা পথ ধরে রুদ্ধশ্বাসে। পিছনে পড়ে মহানদী। আর নদী তীরে সমৃদ্ধ নগরীর অতীত কথা। না-ছোড় মন কিন্তু পড়ে আছে অতীতে। সঙ্গম ঘাটে। অথবা পোড়া মন্দিরের প্রকোষ্ঠে। চুন-সুরকির গন্ধমাখা মন্দিরগাত্রের অবাক ছবিতে। হাতে গাছশুদ্ধ কাঁচা ছোলা। রাজিম বাজার থেকে কেনা। এক-একটা ছিঁড়ে খাচ্ছি। যেন ভাবনায় ভর করে আরও চাইছি পিছুতে। মাত্র দশ কিলোমিটার গাড়ি দৌড় শেষে গন্তব্য। বৈষ্ণবতীর্থ চম্পারণে। চম্পারন ঢুকতেই রাস্তার ধারে ধর্মশালা। তাতে গুজরাতি মানুষজনেরই আনা-গোনা। এখানে সাধক বল্লভাচার‌্যের জন্মস্থান। চোখে পড়া

উত্সাহ-উদ্দিপনার নজির মেলে শ্রীচৈতন্যদেবকে নিয়ে নবদ্বীপ ধামে। তার চেযে কম উন্মাদনার নজির মিলল না, বল্লভাচার‌্যকে নিয়ে এখানকার শিষ্যদের। পার্কিং জোনে গাড়ি রেখে এগিযে যাই।

চম্পারনের প্রাচীন নাম ছিল চম্পাকার। শোনা যায় এক তেলুগু ব্রাহ্মণ সস্ত্রীক দাক্ষিণাত্য থেকে যাত্রা শুরু করেন। পদব্রজে তাঁরা চলেছেন গুজরাত। পথ মধ্যে পরে চম্পাকার নগরী সেই সময় এই অঞ্চল ছিল জঙ্গলে পরিপূর্ণ। ব্রাহ্মণ সেই সময় এক সমস্যার সম্মুখিন হন। অন্তঃস্বত্তা ব্রাহ্মণীর প্রসব বেদনা ওঠে। লোকালয় না মেলায় ব্রাহ্মণী এই জঙ্গল মাঝেই প্রসব করেন, এক পুত্র সন্তান। সেই পুত্রই বল্লভাচার‌্য। পরবর্তীতে জঙ্গল কেটে জনপদ গড়ে ওঠে, এই এলাকায়।

বল্লভাচার‌্য-পন্থীরা নির্মাণ করেন বিশাল এক মন্দির। নাম তার সুদামাপুরি।

পাযে পাযে চলে আসি সুদামাপুরিতে। সাধক বল্লভাচার‌্যের নামে উত্সীর্গীকৃত মন্দির প্রাঙ্গণে। দুদিকে একাধিক সুদৃশ্য কালারফুল অট্টালিকা। সবই ধর্মশালা, অথবা ওই সংক্রান্ত কার‌্যালয়। জুতো খুলে এগিযে যাই বাঁধানো মোজাযেের অলিন্দ ধরে। যেন দক্ষিণের রামেশ্বরম মন্দিরের প্রশস্ত অলিন্দপথ। অন্তরালে ঘেরাটোপে সুদামাধাম। মূল গর্ভগৃহের দ্বার রুদ্ধ। নিয়ম মেনে বিকাল পাঁচটার আগে খুলবে না। শুনলাম এর ভিতরে আছে বল্লভাচার‌্যের ব্যবহৃত খড়ম, বস্ত্র, উত্তরীয়, পুজোর সামগ্রী ইত্যাদি। এখন বেলা তিনটে। দুঘন্টা অপেক্ষা করা সম্ভব নয়। তাই ফেরার পথ ধরি।

শুনলাম বৈশাখ মাসে বল্লভাচার‌্যের জন্মতিথি উপলক্ষ্যে ফি-বছর বিশাল ভক্ত সমাবেশ হয়। জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতেও হয় উত্সব। এই সময় মেলা বসে মন্দিরকে কেন্দ্র করে। পার্কিং জোনের কাছে দেখি আবার হনুমানের দৌরাত্ম। হোল ফ্যামিলি রাস্তায় নেমে ফলাহার করছে। আসলে ভক্তদের উত্সর্গীকৃত দানেই কপিকুলের উদরপূর্তি। গাড়ির চাকা গড়ায়। চম্পকেশ্বর মহাদেব মন্দির দেখে এবার রায়পুরের পথে ছুটব। আজকের রাতের ট্রেনেই যে কলকাতা ফিরতে হবে।

ছবিঃ লেখক

কীভাবে যাবেন : কলকাতা থেকে ৮৩১ কিলোমিটার দূরে রায়পুর। ট্রেন পথে যেতে কম-বেশি ১২-১৩ ঘন্টার পথ। ট্রেন যাচ্ছে ১২৮৩৪ হাওড়া-আমেদাবাদ এক্সপ্রেস, ১২৮১০ হাওড়া-মুম্বই মেল, ১২১৩০ হাওড়া-পুণে আজাদ হিন্দ এক্সপ্রেস, ১২১৫২ হাওড়া-লোকমান্য তিলক এক্সপ্রেস, ইত্যাদি। আকাশ পথে গেলে নামতে হবে রায়পুর বিমানবন্দরে। রায়পুর থেকে গাড়ি নিয়ে রাজিম ও চম্পারন দিনে দিনে দেখে নেওয়া যায়।

কোথায় থাকবেন : রেলস্টেশন বা বাস টার্মিনাসের কাছাকাছি বেশকিছু হোটেল মিলবে। এর মধ্যে থেকেই একটু দেখে-শুনে বেছে নিন একটি। রয়েছে ছত্তিশগড় টু্য়রিজম বোর্ড পরিচালিত হোটেল – ছত্তিশগড় (ফোন : ৪২২৪৩৩৩, ০৯৩০০৬-৫২৫৪৮) ২০০০ থেকে ৩০০০ হাজার টাকার মধ্যে। রায়পুরের এসটিডি কোড : ০৭৭১।

অতিরিক্ত : এই সম্বন্ধে আরও জানতে ও রুম বুকিং-এর জন্য যোগাযোগ করুন : ছত্তিশগড় টুরিজম বোর্ড, ২৩০এ, এজেসি বোস রোড, রুম নম্বর-২৫, চিত্রকোট বিল্ডিং, কলকাতা-৭০০ ০২০।ফোন : (০৩৩) ৪০৬৬-২০৮১ / ৯৪৩৩৩-৭০০১১।ওয়েবসাইট : www.chhattisgarhtourism.net

অপেক্ষা

এটাই লাস্ট সেমিস্টার। সিদ্ধার্থ কিছুটা অধৈর্য হয়ে উঠছিল ধীরে ধীরে। বিবিএ পাশ করে ইচ্ছে ছিল এমবিএ-টা করে নেবে কিন্তু টাকা কোথায়? বাবা চাকরি থেকে রিটায়ার করেছেন। চাকরি থাকতেই বড়ো দুই দিদির বিয়ে শুধু বাবা দিতে পেরেছিলেন, তাও পিপিএফ থেকে বড়ো একটা অঙ্কের টাকা বার করে নিতে বাধ্য হয়েছিলেন। ছোড়দির বিয়ে দুমাস পরেই মা-ও হঠাৎই মারা যান।

বাবার পেনশনের টাকায় ওদের দুজনের ভালোমতোই চলে যায় সেটা সিদ্ধার্থ জানে। বাবার কথাতেই বিবিএ পড়তে ও রাজি হয়ে গিয়েছিল। সিদ্ধার্থ ভেবেছিল বিবিএ করে ব্যাবসার কিছু কিছু ও জেনে যাবে। সুতরাং চাকরি না পেলেও ক্ষতি নেই, কিছু একটা ব্যাবসা শুরু করবে। টাকা রোজগার করতে আরম্ভ করলে এমবিএ-টাও করে নেবে। বাবা অবশ্য সিদ্ধার্থকে বলে রেখেছেন, ওর প্রয়োজন পড়লে পড়াশোনার জন্য বাড়িটা বন্ধক রাখতেও রাজি আছেন। ওদের এই একটাই সম্বল, ঠাকুরদার বাবা এই বাড়িটা তৈরি করে গিয়েছিলেন।

এইসব নানা কথা ভাবতে ভাবতেই সিদ্ধার্থ বাড়ি থেকে বেরিয়ে রাস্তা দিয়ে হাঁটছিল। হঠাৎ-ই তার চোখে মুখে, কিছুটা জলের ছিটে এসে স্বপ্নভঙ্গ করল। বর্ষাকাল নয়, আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিটেফোঁটা মেঘও সে দেখতে পেল না। আবার একটু জলের ছিটে তার মাথায় আর মুখে এসে লাগল। উপরের দিকে তাকাতে গিয়ে নজর পড়ল যেখানে ও দাঁড়িয়ে ঠিক তার পাশের বাড়ির দোতলায় দাঁড়িয়ে একটি মেয়ে বারান্দায় তোয়ালে দিয়ে নিজের ভিজে চুল ঝাড়ছে।

চোখাচোখি হতেই মেয়েটির মুখে লজ্জিত হাসি ফুটে উঠল। ধীর স্বরে কিছু একটা বলল, যেটা সিদ্ধার্থর কানে এসে পেঁছোল না। তবে ওর মনে হল মেয়েটি সরি বলছে। সিদ্ধার্থর মাথায় একটু দুষ্টু বুদ্ধি খেলে গেল। সে হাত তুলে মেয়েটিকে আশ্বস্ত করার ভঙ্গিতে বলল, না না ঠিক আছে তবে আপনার হাসিটা কিন্তু বড়ো অমায়িক। আর একবার প্লিজ হেসে দিন।

সিদ্ধার্থের কথা শুনে মেয়েটি জোরে হেসে উঠল। তারপর হঠাৎই নিজের ব্যবহারে লজ্জিত হয়ে ভিতরে চলে গেল। সিদ্ধার্থও নিজের মুগ্ধতা কাটিয়ে আবার হাঁটা শুরু করল।

এই ঘটনার দুদিন পর ওই একই রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে নিজের অজান্তেই সিদ্ধার্থর চোখ চলে গেল আগের দিনের মেয়েটি যে-বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছিল, সেই বারান্দার দিকে। দেখল মেয়েটি দাঁড়িয়ে আছে রাস্তার দিকে তাকিয়ে আজ চুল বাঁধা আছে বলেই মনে হল সিদ্ধার্থর। হঠাৎই মেয়েটির চোখ পড়ল সিদ্ধার্থর উপর আর সঙ্গে সঙ্গে ওর সুন্দর মুখশ্রী মৃদু হাসিতে ঝলমল করে উঠল। অদ্ভুত এক ভালোলাগায় সিদ্ধার্থর বুক ভরে উঠল। এই অনুভূতি আগে কোনওদিন সিদ্ধার্থ অনুভব করেনি। এরপর প্রায় দুই সপ্তাহ মেয়েটিকে দেখতে পেল না সে।

হঠাৎই একদিন বাজারে গিয়ে আবার মেয়েটির মুখোমুখি হল। মেয়েটি সবজি কিনতে ব্যস্ত ছিল, ফলে সিদ্ধার্থকে দেখতে পায়নি। সিদ্ধার্থ-ই সাহস করে এগিয়ে গিয়ে প্রথম কথা বলল, কযেদিন আপনাকে দেখতে পাইনি, কোথাও গিয়েছিলেন বুঝি?

চমকে তাকাতেই সিদ্ধার্থর দিকে চোখ পড়ল মেয়েটির। সঙ্গে সঙ্গে একমুখ হাসি নিয়ে সে জবাব দিল,হ্যাঁ , ছুটি ছিল। দিদির কাছে বেড়াতে গিয়েছিলাম। গতকালই ফিরেছি।

সিদ্ধার্থ ভাবতেই পারেনি মেয়েটি ওর প্রশ্নের উত্তর এত সাবলীল ভঙ্গিতে দেবে। মেয়েটির হাতে দুটো ব্যাগ-ভর্তি সবজিপাতি ছিল। মেয়েটি দুই হাতে ব্যাগদুটো ভাগ করে নিয়ে সিদ্ধার্থের সঙ্গে হাঁটতে শুরু করল। সিদ্ধার্থ ওর হাত থেকে ব্যাগ নেওয়ার চেষ্টা করল কিন্তু মেয়েটি কিছুতেই রাজি হল না, না না আপনাকে কষ্ট করতে হবে না। আমার দুটো ব্যাগ নিতে কোনও অসুবিধা হচ্ছে না। বাড়ি তো কাছেই আর অসুবিধা বোধ করলে একটা রিকশা নিয়ে নেব।

মেয়েটির কথায় সিদ্ধার্থ আমল না দিয়ে ওর হাত থেকে একটা ব্যাগ একপ্রকার ছিনিয়ে নিয়ে নিজের হাতে নিল, আরে এতে কষ্টের কী আছে? আর রিক্শার পয়সা বাঁচিযে রাখুন, চা খাওয়া যাবে।

বলতে বলতেই সামনে চায়ের দোকান দেখে সিদ্ধার্থ বেঞ্চের উপর সবজির ব্যাগ নামিয়ে রেখে দুটো স্পেশাল চায়ের অর্ডার দিল। চা খেতে খেতে দুজনে নিজেদের মধ্যে পরিচয় আদান-প্রদান করে নিল। মেয়েটি জানাল তার নাম সুলগ্না। মায়ের সঙ্গে থাকে। বাবা অনেকদিন হল মারা গেছেন। কম্পিউটার নিয়ে পড়াশোনা করে একটি প্রাইভেট স্কুলে কর্মরতা। সিদ্ধার্থও নিজের পড়াশোনা আর ভবিষ্যতের ইচ্ছের কথা মন খুলে মেয়েটিকে জানাল। চায়ের পয়সা দেওয়ার জন্য পার্স বের করতেই মেয়েটি সিদ্ধার্থের হাত চেপে ধরল, রিকশার টাকা বেঁচে গেছে সুতরাং চায়ের টাকা আমি দেব।

সুলগ্নার চায়ের টাকা দিয়ে দেওয়াটা সিদ্ধার্থর ভালো লাগল না। তবুও সে আর কিছু বলল না। দাম মিটিয়ে বাড়ির পথ ধরল ওরা। প্রথমে সুলগ্নার বাড়ি। বাড়ির দরজায় এসে সিদ্ধার্থর হাত থেকে ব্যাগটা নিয়ে ওকে থ্যাংকস জানিয়ে সুলগ্না বাড়ির ভিতর ঢুকে গেল। সিদ্ধার্থ নিজের বাড়ির দিকে পা চালাল।

এরপর প্রায়শই সুলগ্না আর সিদ্ধার্থ বাড়ির বাইরে দেখা করতে শুরু করল। সুলগ্নার ভালো চাকরি ছিল ঠিকই কিন্তু সিদ্ধার্থ কিছুতেই মনের মতো চাকরি পাচ্ছিল না। বিবিএ-র রেজাল্ট তার ভালো হওয়া সত্ত্বেও যে-চাকরিগুলো পাচ্ছিল সেগুলো কম মাইনের। ব্যাবসা শুরু করার কথাও মাথাতে ছিল সিদ্ধার্থর। সুলগ্নাও সবসময় ওকে উৎসাহ জোগাতে থাকত, নানা লোকের উদাহরণ দিত, যারা জীবনের প্রথমে কঠিন সংঘর্ষ করলেও পরে তারা সকলেই জীবনে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে।

সিদ্ধার্থ দিনের অনেকটা সময় ল্যাপটপে কাটিয়ে দিত চাকরি খুঁজতে আর নয়তো বিকল্প কোনও ব্যাবসার সন্ধানে। মাঝেমধ্যে সুলগ্নার সঙ্গে ওর বাড়িতেও যেত সিদ্ধার্থ। সুলগ্নার মা ওকে খুবই স্নেহ করতেন। একদিন সুলগ্না এসে জানাল যে, ওদের স্কুলে প্রাইভেটে কম্পিউটার ক্লাস খোলার কথা চলছে, যার জন্য অনেক কম্পিউটার একসঙ্গে স্কুল কিনবে। এই সংক্রান্ত একটা প্রোজেক্ট রিপোর্ট আর টেন্ডার তৈরি করতে বলে, সুলগ্না।

সিদ্ধার্থর কম্পিউটার অ্যাপ্লিকেশনের কোর্স করাই ছিল এবং পড়ার সময় টেন্ডার, মার্কেটিং বিষয়ে অনেক কিছু শিখেও ছিল। সিদ্ধার্থর বাবা ছেলেকে এই সুযোগ না ছাড়ার পরামর্শ দিলেন।

সিদ্ধার্থ টেন্ডার ভরল। ভাগ্যও ওর সহায় ছিল। জীবনে প্রথম সুযোগ পেল ভালো কিছু করে দেখানোর। সিদ্ধার্থর টেন্ডার পাস হয়ে গেল। সুলগ্নাদের স্কুলের অনেকগুলো ব্রাঞ্চ ছিল সারা রাজ্যজুড়ে এবং এই কম্পিউটার প্রোজেক্টটার প্রধান ইনচার্জ ছিলেন সুলগ্নার স্কুলের প্রিন্সিপাল। প্রিন্সিপাল সিদ্ধার্থ-কে ডেকে জানালেন, তিনি সিদ্ধার্থর কাজে খুশি হলে রাজ্যের বাইরে তাঁদের যতগুলি স্কুল আছে সেখানেও সিদ্ধার্থর নাম রেকমেন্ড করবেন। যখন তাদের স্কুলেও একই প্রোজেক্ট নিয়ে কাজ শুরু হবে, তখন সিদ্ধার্থর কাজের আরও সম্ভাবনা বাড়বে।

সুলগ্নার সঙ্গে দেখা হলে সিদ্ধার্থ ওকে জানাল, সুলগ্না, আমি কিন্তু টিচার হতে চাই না। আমি একটা কাজ করে দিতে পারি, সেটা হচ্ছে কম্পিউটারগুলো ইন্সটল করে নেটওয়ার্কিং ইত্যাদি। এরপর বেসিক-টা না হয় একজন টিচার এবং কযেজন স্টুডেন্টকে শিখিয়ে দেব। তারপর তোমরা কী করে এগোবে সেটা কিন্তু সম্পূর্ণ তোমাদের দায়িত্ব। এই নিয়ে তোমার স্কুলের সঙ্গে কোনও কথা হয়নি।

ঠিক আছে, তুমি আমাকে পুরোটা শিখিয়ে দিও। আমারও কম্পিউটার নিয়ে অল্প পড়াশোনা আছে সেটা তুমি ভালো করেই জানো।

এই প্রথম কাজটাতেই সিদ্ধার্থ আশাতীত সাফল্য পেল। সিদ্ধার্থর কাজে প্রিন্সিপাল এতটাই খুশি হলেন, তিনি সিদ্ধার্থকে বাকি বারোটা স্কুলের টেন্ডার জমা দিতে বললেন। সুযোগটা পেয়ে সিদ্ধার্থর আনন্দের সীমা থাকল না। খবরটাতে সিদ্ধার্থর বাবাও অত্যন্ত খুশি হলেন। তিনি ছেলেকে ডেকে বললেন, মেয়েটি তোর জন্য অত্যন্ত শুভ। ওর সঙ্গে আলাপ হতে না হতেই এত বড়ো কাজটা হাতে পেলি। আমার মনে হয় সিদ্ধার্থ তোরা দুজনে একসঙ্গে মিলে কাজটা কর। একটু চুপ করে থেকে আবার বললেন, সিদ্ধার্থ, এটা আমার মনের কথা, মেয়েটাকে বড়ো পছন্দ আমার। তোর সঙ্গে ওকে মানাবে ভালো।

সুলগ্নার মায়েরও মনে এই ইচ্ছেটাই শাখা-প্রশাখা বিস্তার করছিল। সিদ্ধার্থ, সুলগ্নাকে নিজের করে পাওয়ার ইচ্ছে অনেকদিন ধরেই মনের মধ্যে সুপ্ত রেখেছিল, কাউকেই বুঝতে দেয়নি। সে জানত আগে তাকে নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে, তবেই চাঁদের দিকে হাত বাড়ানোর যোগ্য হয়ে উঠবে।

বাবার আশীর্বাদ আর ব্যাবসায় সাফল্য পেযে সিদ্ধার্থ নিজের বাড়ি থেকেই, নতুন কোম্পানির উদ্বোধন করল, সিদ্ধার্থ ডট কম। বাকি স্কুলের টেন্ডারগুলো আগেই সিদ্ধার্থ ভরে জমা দিয়ে দিয়েছিল। ওই কাজগুলোও সে পেল। ছেলেকে ব্যাবসায় প্রতিষ্ঠিত হতে দেখে তার বাবা সুলগ্নার মায়ের সঙ্গে দেখা করে, ওদের দুজনের বিয়ের কথা পাকা করে ফেললেন। শুভদিন দেখে ওদের বিয়ের ভালোমতো ব্যবস্থা করলেন। ধুমধাম করে বিয়ে দিয়ে সুলগ্নাকে বাড়ির বউ করে বাড়িতে নিয়ে এলেন।

বিয়ের পর দিনগুলো ভালোই কাটতে লাগল সিদ্ধার্থর। প্রচুর কাজও পেতে আরম্ভ করল সে। কাজের চাপ এতটাই বেড়ে গেল, একা আর সবদিক দেখা তাদের পক্ষে সম্ভবপর হল না। দুজন লোক রাখতে সিদ্ধার্থ বাধ্য হল। বাড়ি থেকে অফিস শিফট করে একটু বড়ো জায়গা নিল ভাড়ায়। বাইরের ঘরটায় দুজন স্টাফের বসার বন্দোবস্ত করল আর ভিতরের ঘরটায় নিজের বসার। প্রয়োজনমতো অফিসটাকে কাজের জন্য গুছিয়ে সাজাল। সুলগ্নাও সময় করতে পারলে মাঝেমধ্যেই সিদ্ধার্থর অফিসে চলে আসত তার কাজে সাহায্য করতে। বেশ সুখেই কাটতে লাগল তদের দাম্পত্য জীবন।

দুবছর এ ভাবেই কাটার পর সুলগ্না সন্তানসম্ভবা হল। সিদ্ধার্থর জীবনে নতুন করে আনন্দর জোয়ার সব বাধা অতিক্রম করে গেল। কাজের চাপে বাড়িতে আগে বেশি সময দিতে পারত না সে। এখন সেই সিদ্ধার্থই কাজ ফেলে সুলগ্নার কাছাকাছি সবসময় থাকার চেষ্টা করতে লাগল, যাতে সুলগ্নার যত্নের কোনও ত্রুটি না হয়। বরং সুলগ্নাই বকাবকি করত সিদ্ধার্থর এই অবুঝ ব্যবহারের জন্য, আমি কি পালিযে যাচ্ছি নাকি আমি নিজের যত্ন ঠিক করে নিতে পারব না? তুমি কাজ ফেলে বাড়িতে সময বেশি দিচ্ছ, এটা ঠিক হচ্ছে না। এতে তোমার কাজের ক্ষতি হবে।

সিদ্ধার্থও বুঝত এতে কাজের ক্ষতি হচ্ছে। বাজারে একবার বদনাম হয়ে গেলে কেউ তাকে আর কাজ দেবে না। কিন্তু তাও নিজেকে শোধরাবার চেষ্টা করল না সে। এরই মধ্যে সুলগ্নার মা হঠাৎই মারা গেলেন। সুলগ্না শোকে যেন পাথর হয়ে গেল। দুর্ভাগ্যবশত গর্ভাবস্থা চারমাসে পড়তেই সুলগ্নার মিসক্যারেজ হয়ে গেল। এই ঘটনার পর সে পুরোপুরি ডিপ্রেশনে ডুবে যেতে থাকল।

এমন দুঃসময়ে সিদ্ধার্থ আরও বেশি করে সুলগ্নার কাছে থাকতে শুরু করল। সুলগ্না চেষ্টা করত নিজে থেকেই ডিপ্রেশন কাটিয়ে উঠতে। সিদ্ধার্থকেও বোঝাবার চেষ্টা করত কাজে যাওয়ার জন্য। কিন্তু সিদ্ধার্থর সেই এক গোঁ, তুমি সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে যাও, তারপরেই আমি কাজে যাব।

সিদ্ধার্থ কারও কথা শুনল না। এই করে তার প্রোজেক্টগুলোও ডেডলাইন মিস করতে লাগল। নতুন কাজ আসা প্রায় বন্ধ হয়ে গেল। পুরোনো ক্লায়েন্টরাও আর তার উপর ভরসা রাখতে পারল না। সুলগ্নার শরীর ধীরে ধীরে ঠিক হতে আরম্ভ করলেও সিদ্ধার্থর ব্যাবসার ভরাডুবি ঘটল।

দুজন স্টাফকে ছাঁটাই করতে বাধ্য হল সিদ্ধার্থ। ভাড়ার অফিস ছেড়ে দিয়ে আবার বাড়ি থেকেই কাজ করা আরম্ভ করল সে। তবে কাজ বলতে, এখন নতুন কাজের অনুসন্ধান। কারণ সিদ্ধার্থর হাতে কোনও কাজই ছিল না। সুলগ্নাও তাকে নতুন কাজ খোঁজার জন্য চাপ দিতে শুরু করল। এটা সিদ্ধার্থর কিছুতেই সহ্য হতো না, সম্মানে বাধত। এতদিন সে সবাইকে কাজ দিয়ে এসেছে, এখন লোকের দরজায় কড়া নেড়ে কাজ খুঁজতে যাওয়াটায় তার অপমান বোধ হতো। মনে হতো এটা নিয়ে সুলগ্নার সঙ্গে ওদের যত দ্বন্দ্বের সূত্রপাত।

একদিন কাজের সন্ধানে বেরিয়ে বাড়িতে ফিরে সিদ্ধার্থ দেখল সুলগ্না বাড়িতে নেই। টেবিলে তার লেখা একটা কাগজ পড়ে আছে। তাতে লেখা, আমি তোমাকে ছেড়ে, এমনকী এই শহর ছেড়েও চলে যাচ্ছি। আমাকে নিয়ে চিন্তা করা ছেড়ে দাও। আমি তোমার জীবনে ফিরে আসব কিনা এখনই বলতে পারছি না। তবে প্রতি মুহূর্তে তোমার কথা আমার মনে পড়বে এবং এটাই আমার বেঁচে থাকার জন্য যথেষ্ট। একটা কথা মনে রেখো সিদ্ধার্থ জীবন কাটানো খুব সহজ কাজ নয়। লড়াই ছাড়া কেউ প্রতিষ্ঠা পেতে পারে না। সোনাকেও আগুনে পুড়িয়ে হাতুড়ির বাড়ি মেরে তবেই আকার দেওয়া যায়। তুমিও চেষ্টা ছেড়ো না। পরিশ্রম করে যাও, ফল একদিন পাবেই, এই আমার বিশ্বাস। ভগবানের কাছে প্রার্থনা করি যাতে জীবনে তুমি সফল হও। তোমার জন্য রইল আমার শুভকামনা।

এত বড়ো আঘাতের জন্য সিদ্ধার্থ প্রস্তুত ছিল না। সুলগ্না কেন এই সিদ্ধান্ত নিল কিছুতেই বোধগম্য হল না সিদ্ধার্থর। বাবাকেও জিজ্ঞেস করল, সুলগ্না কিছু বলেছে কিনা কিন্তু বাবাও মাথা নাড়লেন। সিদ্ধার্থর মতো তিনিও সম্পূর্ণ অন্ধকারে।

আঘাতের উপর আঘাত। খড়কুটোর মতো একমাত্র বাবাকেই আঁকড়ে ধরল সিদ্ধার্থ, ডুবন্ত জাহাজের নাবিকের মতো। সুলগ্নার স্কুলে খোঁজ করেও তার কোনও ঠিকানা জোগাড় করতে পারল না। তার মনে আশা ছিল অন্য শহরের ব্রাঞ্চে হয়তো সে ট্রান্সফার নিয়েছে। কিন্তু সেখানেও আশাহত হতে হল। কাজে কিছুতেই মন বসাতে পারছিল না সিদ্ধার্থ। বাবা পরামর্শ দিলেন, এক কাজ কর সিদ্ধার্থ, কাজের ব্যাপারে এখন ভাবা ছেড়ে দে, বরং ম্যানেজমেন্ট-টা করেনে। গ্র‌্যাজুয়েশন তো করাই আছে, মাস্টার্স কমপ্লিট কর। তাহলে মাস্টার্সের পর অনেক দিক তোর কাছে খুলে যাবে। আমি, বাড়ি বন্ধক রেখে তোর পড়ার ব্যবস্থা করে দিচ্ছি।

পড়াশোনায় বরাবরই সিদ্ধার্থ ভালো ছিল। সুতরাং কটা মাস প্রচণ্ড পরিশ্রম করার পর পরীক্ষা দিয়ে আহমেদাবাদে আইআইএম-এ ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেল। নিজেকে পড়াশোনার মধ্যে ডুবিয়ে দিল সে। পড়তে পড়তেই দ্বিতীয় বছরেই একটা নামি মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে ভালো প্লেসমেন্ট পেয়ে গেল সিদ্ধার্থ। পড়া শেষ হতেই ছয় মাসের জন্য কোম্পানি তাকে লন্ডন পাঠাল ট্রেনিংয়ের জন্য। কোম্পানির নিয়ম অনুযায়ী ট্রেনিংয়ের পর ইচ্ছেমতো বিদেশে ওদের যতগুলো অফিস আছে, সেখান থেকে বেছে কোনও একজায়গায় সিদ্ধার্থ চাকরি করার সুযোগ পাবে।

লন্ডনে তিন বছর চাকরি করে সে আরও অনেক জায়গায় পোস্টিং পেল। দুই-তিন বছর পর পরই ওকে জার্মানি, ফ্রান্স, অস্ট্রেলিয়া পোস্টিং দেওয়া হল আর সঙ্গে প্রতিবারই প্রোমোশন। এভাবেই দশ-দশটা বছর কাটিয়ে ফেলল সিদ্ধার্থ। প্রথম প্রথম সুলগ্নার কথা খুবই মনে পড়ত। কিন্তু প্রোমোশনের সঙ্গে সঙ্গে টার্গেট পুরণ করার চাপে সিদ্ধার্থ তার নিজের জীবন সম্পর্কে ভাবার আর সময় পেত না। বাবার সঙ্গে ফোনে মাঝেমধ্যে কথা হতো।

দু-তিন বছর পর পর সময় করে বাবাকে এক সপ্তাহের ছুটি নিয়ে দেখে যেত। মনের মধ্যে শুধু একটা ক্ষীণ আশা বেঁচে ছিল যে, হযতো কোনও এক দিন সুলগ্না আবার তার জীবনে ফিরে আসবে।

সিদ্ধার্থদের কোম্পানি মুম্বইতে একটা নতুন ব্রাঞ্চ খোলার পরিকল্পনা নিলে, ঠিক হয় সিদ্ধার্থকে ওই অফিসের চিফ করে পাঠানো হবে। অফিস পুরো সেট-আপ হয়ে গেলে সিদ্ধার্থর এক জুনিয়র কলিগকে মুম্বই পাঠায় কোম্পানি, ওখানকার সব কাজ সুষ্ঠু ভাবে তদারকি করার জন্য। নতুন অফিসের জন্য কিছু সফ্টওয়্যার ইঞ্জিনিয়রের প্রয়োজন ছিল। এটার জন্য সিদ্ধার্থর জুনিয়র কলিগই প্রথম রাউন্ড ইন্টারভিউ নিয়ে তার সম্পূর্ণ ডিটেলস সিদ্ধার্থকে পাঠিয়েরাখত। ফোন এবং ভিডিও কনফারেন্সে ফাইনাল ইন্টারভিউ করার দায়িত্ব সিদ্ধার্থর উপরে ছিল।

মোট বারো জনের লিস্ট তৈরি করে সিদ্ধার্থকে পাঠানো হলে, লিস্ট দেখে ও চমকে উঠল। প্রথম নামটাই সুলগ্নার। বারোজনের মধ্যে সাতজনকে সিলেক্ট করার দায়িত্ব তার কাঁধে। প্রথমে সন্দেহ ছিল অন্য কোনও সুলগ্না হবে হয়তো কিন্তু সিভি দেখার পর সে নিশ্চিত হয়ে গেল, এ তারই সুলগ্না। সে এমসিএ করে গত ছবছর ধরে একটি কোম্পানিতে সফ্টওয়্যার ইঞ্জিনিয়র হিসেবে কাজ করছে।

সিদ্ধার্থ ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে সুলগ্নার ফাইনাল ইন্টারভিউ নিল। এই দশ বছরে সিদ্ধার্থ দাড়ি রাখতে আরম্ভ করেছিল, চোখে চশমা উঠেছিল। কানের পাশের চুলগুলো সব সাদা হয়ে গিয়েছিল। আগের সিদ্ধার্থকে চেনার কোনও উপায় ছিল না। অফিসকেও ইন্সট্রাকশন দেওয়া ছিল যেন সিদ্ধার্থের নাম প্রকাশ না পায়। শুধু চিফ এগজিকিউটিভ বলেই সুলগ্নাকে জানানো হয়।

বহুদিন পর সুলগ্নাকে দেখে সিদ্ধার্থ চোখের জল লুকোতে পারল না। সুলগ্না আগের মতোই সুন্দর আছে। নিজেকে খুব ভালো মেইনটেন করেছে। সিদ্ধার্থও সিলেকশন লিস্টের প্রথমে সুলগ্নার নামটাই রাখল। ওকে এখনও ভালোবাসে বলে নয় বরং পোস্টটার জন্য ওর যোগ্যতাই সবচেয়ে বেশি বলে।

মুম্বই অফিস সেট করার জন্য সিদ্ধার্থের যে-কলিগ গিয়েছিল, সে কোম্পানিতে জুনিয়র হলেও সিদ্ধার্থর অতীত সম্পর্কে সে সবই জানত। অফিসের বাইরে ওরা বন্ধুই ছিল। ওকে সিদ্ধার্থ জানাল যে, এই সুলগ্নাই তার এক সময়ের স্ত্রী। ভাগ্য আজ আবার দুজনকে মুখোমুখি এনে ফেলেছে।

তাকে অনুরোধ করল সিদ্ধার্থ, সুলগ্নার মনের কথা যদি কোনও ভাবে জানতে পারে, তাহলে যেন অবশ্যই তাকে জানায়। কিন্তু কাজটা এমন ভাবে করতে হবে যাতে সুলগ্নার মনে কোনও সন্দেহ না জাগে।

কিছুদিন পরেই সিদ্ধার্থ জানতে পারল, সুলগ্না আজও সিংগল। ওর ফ্যামিলি বলতে ও একাই। তবে সুলগ্না আজও নিজেকে বিবাহিতাই মনে করে। যদিও দশ বছরের উপর হয়ে গেছে স্বামীর সঙ্গে তার কোনও সম্পর্ক নেই। সে নাকি আজও সিদ্ধার্থকেই সম্মান করে, ভালোবাসে। সে চেয়েছিল সিদ্ধার্থ জীবনে অনেক উন্নতি করুক, যেটা তার জন্যই সম্ভব হচ্ছিল না। সে সিদ্ধার্থর উন্নতির পথে কাঁটা হয়ে উঠেছিল। তাই ভালোর জন্যই সিদ্ধার্থকে ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়েছিল। কিন্তু এই দশ-বারো বছরে দূরত্ব এতটাই বেড়ে গেছে যে, সিদ্ধার্থ কোথায় আছে, কী করছে জানার কোনও উপায়ই তার ছিল না,কারণ ততদিনে সিদ্ধার্থরা বাসস্থান বদলে ফেলেছে।

সুলগ্না শুধু এটুকুই জেনেছিল মুম্বই-তে তার যে ইন্টারভিউ নিয়েছে সেই ভদ্রলোক সিদ্ধার্থর পুরোনো বন্ধু। সুলগ্নাকে জিজ্ঞেস করেছিল সে, আমার বন্ধুর সঙ্গে যদি দেখা হয়ে যায় তাহলে আপনি কি তার কাছে ফিরে যাবেন? তাতে সুলগ্না বলেছে, আমার ছেড়ে যাওয়াতে যদি সিদ্ধার্থ নিজের পথ খুঁজে পেয়ে জীবনে সফল হয়ে থাকে, তাহলে বুঝব আমার এই ত্যাগ স্বীকারই সত্যি করে একজন মানুষের জীবন তৈরি করে দিতে পেরেছে। আমি নিজেকে ভাগ্যবান মনে করব।

কিন্তু সে কোথায় রয়েছে আজকাল? আমি শুনেছিলাম যে, এমবিএ করে বিদেশ চলে গেছে? সুলগ্না জানতে চেয়েছিল।

বন্ধুটির উত্তর ছিল, আমিও ঠিক জানি না। তবে কোনও খবর জানতে পারলে আপনাকে নিশ্চয়ই জানাব কথা দিচ্ছি। এরপর জয়েনিং লেটার তৈরি করে সুলগ্নার হাতে ধরিয়ে দিয়েছিল।

আজ শুক্রবার, আপনি সোমবার থেকে কাজে জয়েন করুন। আমাদের চিফ-ও উইক-এন্ডে মুম্বই পৌঁছোবেন। সোমবার থেকে উনিও এখানে অফিস জয়েন করবেন। শেষ অবধি এই কথাই হয়েছিল ওদের দুজনের মধ্যে।

সোমবার সিদ্ধার্থ নিজের কেবিনে বসেছিল।  তার পিএ ফোনে জানাল, স্যার, সুলগ্না ম্যাম হ্যাজ কাম। শি ইজ গোয়িং টু রিপোর্ট ইউ।

প্লিজ সেন্ড হার ইন।

গুড মর্নিং স্যার। দিস ইজ সুলগ্না, ইয়োর কোম্পানিজ নিউ সফ্টওয়্যার ইঞ্জিনিয়র, সুলগ্না জানাল।

ওয়েলকাম ইন আওয়ার ফ্যামিলি।

আমার কোম্পানিই আমার এখনকার ফ্যামিলি।

সুলগ্না এখনও সিদ্ধার্থকে চিনতে পারল না, এতটাই পরিবর্তন হয়েছিল তার চেহারায়। সিদ্ধার্থই বলল, আপনি আপনার কেবিনে গিয়ে বসুন। আপনাকে কাজ বুঝিযে দেওয়া হবে। কাল সকালে যখন আসবেন, আমি বাকি সব কাজ বুঝিযে দেব।

পরের দিন সিদ্ধার্থ কেবিনের সামনে নিজের নেমপ্লেট সিদ্ধার্থ সেন ঝুলিয়ে  দিয়ে চেয়ারে এসে বসল। আজ সে ক্লিন শেভ হয়ে অফিস এসেছে। সুলগ্না নক করে কেবিনে ঢুকতেই সিদ্ধার্থকে দেখে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেল। আজ আর সিদ্ধার্থকে চিনতে কোনও অসুবিধাই হচ্ছে না। অস্ফুটে সুলগ্না বলে উঠল, সিদ্ধার্থ তুমি?

দরজার বাইরে নেমপ্লেট দ্যাখোনি?

ঠিক খেয়াল করিনি।

সুলগ্না, এটাই আমার কোম্পানি, আমার ফ্যামিলি। আজ থেকে তুমিও এই ফ্যামিলির একজন বিশিষ্ট সদস্য। আমার আশা ছিল একদিন না একদিন তুমি নিশ্চয়ই ফিরে আসবে। তোমাকে ছাড়া অন্য কারও কথা আমি কোনওদিন ভাবতেই পারিনি।

কিন্তু তুমি… সুলগ্না থেমে যায়।

হ্যাঁ সুলগ্না, আমার এই বন্ধুই তোমার সম্পর্কে সব জানায় আমাকে, বিশেষ করে আমাকে ছেড়ে চলে যাওয়ার কারণ। তোমার আত্মত্যাগের জন্যই আজ আমি সাফল্যের চূড়া, ছুঁতে পেরেছি। এর পুরো ক্রেডিট তোমার প্রাপ্য।

সিদ্ধার্থ চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে সুলগ্নাকে কাছে টেনে নিয়ে ওর চুলে মুখ রাখে। কাচের দরজার বাইরে কলিগের সঙ্গে চোখাচোখি হতেই সিদ্ধার্থ আর ওর বন্ধুর মুখে হাসি ছড়িয়ে পড়ে। হাতে থামস আপ সাইন দেখিয়ে সিদ্ধার্থের কলিগ দুজনকে একটু একা থাকার সুযোগ দিয়ে ওই ঘরটা ছেড়ে চলে যায়।

সুস্থ থাকুন বছরভর

স্বাস্থ্য-ই যে সম্পদ, এ বিষয়ে দ্বিমত থাকা উচিত নয়। কারণ, অর্থ, সম্পত্তি, খ্যাতি, লোকবল, ভালোবাসার মানুষ যা-ই থাকুক না কেন, সবই গৌণ হয়ে যায় যখন বড়ো কোনও রোগ বাসা বাঁধে শরীরে। তখন প্রাধান্য পায় শুধু সুস্থ হওয়ার তাগিদ। বাঁচতে ইচ্ছে করে সবকিছুর বিনিময়ে। কিন্তু তখন হয়তো শত চেষ্টাতেও আর আগের মতো সুস্থ স্বাভাবিক শরীর কিংবা জীবন ফিরে পাওয়া সম্ভব হয়ে ওঠে না। হয়তো তখন সম্পূর্ণ সুস্থতা ফিরে পাওয়া যায় না আধুনিক চিকিৎসা পরিষেবা নেওয়ার পরেও। সঠিক সময়ে সঠিক পদক্ষেপ না নেওয়ার জন্য, সুস্থতার চাবিকাঠি হয়তো আয়ত্তে থাকে না তখন। অতএব, আজ এখন-ই সুস্থ থাকার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

কী হয়নি, কী হতে পারত, কীসের অভাবে আপনার শরীর সম্পূর্ণ সুস্থ রাখতে পারেননি, এসব নিয়ে এখন বেশি মাথা ঘামিয়ে লাভ নেই। বরং, এই নতুন বছরে নতুন কিছু করার সংকল্প নিন। আর সেই সংকল্প হোক স্বাস্থ্যরক্ষার।

প্রথমে মনে রাখতে হবে, সুস্বাস্থ্যের কিছু মানদণ্ড আছে। এই মানদণ্ড নির্ধারণ করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। যেমন–

১) কর্মশক্তিঃ স্বাভাবিক ভাবে কাজ কিংবা পরিশ্রম করার শক্তি।

২) দৃষ্টিভঙ্গিঃ প্রতিটি কাজের ইতিবাচক মনোভাব।

৩) বিশ্রামঃ পরিশ্রমের নিরিখে প্রয়োজনীয় আরাম এবং ঘুম।

৪) ভারসাম্যঃ প্রকৃতি, আবহাওয়া, জলবায়ু এবং মনুষ্য-প্রকৃতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়া।

৫) প্রতিরোধ শক্তিঃ সাধারণ সর্দি-কাশি এবং সংক্রমণ প্রতিরোধক ক্ষমতা।

৬) উপযুক্ত ওজনঃ বয়স এবং উচ্চতা অনুযায়ী শরীরের সঠিক ভার।

৭) দৃষ্টিশক্তিঃ চোখের স্বাভাবিক উজ্জ্বল দৃষ্টি।

৮) দুর্গন্ধহীনতাঃ মুখের ভেতর এবং শরীর থেকে দুর্গন্ধ বের না হওয়া।

৯) ঔজ্জ্বল্যঃ খুসকিবিহীন উজ্জ্বল চুল এবং তেলবিহীন মুখমন্ডল।

১০) ব্যথাহীনতাঃ  ব্যথা-যন্ত্রণাহীন শরীরের হাড় এবং পেশিসমূহ।

এই দশটি মানদণ্ড বিচার করলেই বুঝে যাবেন, শারীরিক ভাবে আপনি কতটা সুস্থ। আর আপনার সুস্থতায় যদি ঘাটতি থাকে, তাহলে প্রস্তুতি নিন সুস্বাস্থ্য ফিরিয়ে আনার। এরজন্য অবশ্য নিষ্ঠার সঙ্গে কিছু নিয়ম মেনে চলতে হবে। দিনে-রাতে এইসব নিয়ম মেনে চললে, ২০২১ সালের মধ্যে আপনার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ অর্থাৎ সুস্বাস্থ্য পুনরুদ্ধার করতে পারবেন কিংবা নতুন করে স্বাস্থ্যসুন্দর হতে পারবেন।

২০২১-এর জন্য টিপসঃ 

  •  ঘুম থেকে উঠুন সকাল ৬টার মধ্যে। মৌরি ভেজানো জল কিংবা ত্রিফলার জল, অথবা পাতিলেবুর রস হালকা গরম জল দিয়ে অথবা চিরতার জল (প্রতিদিন নয়, মাঝেমধ্যে) পান করুন, মেদবিহীন পেটও পরিষ্কার থাকবে
  • ঢিলেঢালা পোশাক পরে অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটুন অথবা ১৫ মিনিট দৌড়োন, এতে হূদরোগ আটকাতে পারবেন
  • সকাল থেকে রাত্রি পর্যন্ত খাবার খান সঠিক সময়ে। ৭টার মধ্যে ব্রেকফাস্ট, ১টার মধ্যে লাঞ্চ, ৪টে–৬টার মধ্যে টিফিন এবং ৯টার মধ্যে ডিনার সারুন, শরীর ভালো থাকবে
  •  খাবারে শাকসবজির পরিমাণ যেন বেশি থাকে। মাছ বেশি খাবেন, মাংস কম খাবেন। প্রতিদিন অন্তত দুটো ফল খাওয়া জরুরি। কমলালেবু, কিউই, খেজুর, পাকা পেঁপে এসব অবশ্যই খাবেন মাঝেমধ্যে। এতে পেট পরিষ্কার থাকবে এবং শরীরও সঠিক ভিটামিনের জোগান পাবে
  •  প্রতিদিন এক কাপ দুধ খাবেন। মাঝেমধ্যে ডাবের জল খাবেন। আর, দিনে-রাতে অন্তত ৩-৪ লিটার (প্রা৫ বয়স্ক) জল পান করবেন।

দুধ-চায়ের পরিবর্তে গ্রিন-টি পান করুন, শরীর রোগমুক্ত থাকবে

  • দুপুরে না ঘুমোনোই ভালো। রাতে অবশ্যই ১০টা ৩০ মিনিটের মধ্যে ঘুমোতে যাবেন। ৬-৮ ঘন্টা গভীর ঘুম চাই রাতে। এর ফলে ফুরফুরে মেজাজ থাকবে
  •  গায়ে সাবান মেখে পরিপূর্ণ স্নান করুন প্রতিদিন। সপ্তাহে অন্তত ২ দিন ভালোমানের শ্যাম্পু দিয়ে চুল ধোবেন। সকালে এবং রাতে খাওয়ার পরে টুথপেস্ট দিয়ে ভালো ভাবে ব্রাশ করুন, দুর্গন্ধমুক্ত থাকবেন
  •  ধুয়েমুছে পরিষ্কার রাখুন ঘরবাড়ি। ঘরে পর্যা৫ আলো-হাওয়া ঢুকতে দিন, জীবাণুমুক্ত রাখুন। বাড়ির চারপাশ যেন জঞ্জালমুক্ত থাকে। ছুটির দিনে বালিশ, বিছানাকে পর্যা৫ রোদ খাওয়ান, নিরোগ, সুস্থ থাকবেন
  •  ধোয়া জামাকাপড় কড়া রোদে শুকিয়ে নিন, নয়তো ত্বক-সমস্যা হতে পারে
  •  কর্মক্ষেত্রে একনাগাড়ে বসে থাকবেন না। মাঝেমধ্যে হাঁটাচলা করুন এবং সুযোগ থাকলে একটু ফ্রি-হ্যান্ড এক্সারসাইজ করে নিন, স্থূলত্ব এবং হূদরোগ এড়াতে পারবেন
  •  শরীর থেকে অতিরিক্ত ক্যালোরি ক্ষয় করার জন্য ঘাম-ঝরানো পরিশ্রম করুন অবশ্যই
  •  যতটা সম্ভব কম ব্যবহার করুন ইলেক্ট্রনিক গ্যাজেট। একটানা বেশিক্ষণ মোবাইলে কথা বলবেন না এবং কোনও কিছু বেশি সময় ধরে দেখবেন না। এতে চোখ এবং মস্তিষ্কের রোগ এড়াতে পারবেন
  • একঘেয়েমি কাটাতে পরিবারের সবাই কিংবা বন্ধুবান্ধব মিলে বেড়াতে যান মাঝেমধ্যে। সর্বদা হাসিখুশি থাকার চেষ্টা করুন
  • বন্ধ করুন ধূমপান এবং মদ্যপান, আয়ু বাড়বে
  •  উপযুক্ত ফোরপ্লে-র মাধ্যমে নিয়মিত যৗনতৃিঀ৫ লাভ করুন। সুরক্ষিত যৌনসম্পর্কের জন্য কন্ডোমের ব্যবহার আবশ্যক
  • ৬ মাস অন্তর ব্লাড টেস্ট করিয়ে দেখে নিন সুগার, থাইরয়েড, কোলেস্টেরল ইত্যাদি আয়ত্বে আছে কিনা। আর সেইসঙ্গে, মাঝেমধ্যে ব্লাড প্রেসার (বিপি) চেক করিয়ে নিন, সুস্থ এবং নিশ্চিন্ত থাকতে পারবেন
  •  চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ কিনে খাবেন না। বিজ্ঞাপনে প্রভাবিত হয়ে নিজের ইচ্ছেমতো ওইসব ওষুধ খাবেন না, বিপদে পড়বেন
  •   যৌনরোগ এড়াতে বাড়ির শৌচালয় পরিষ্কার রাখুন এবং বাড়ির বাইরে অপরিষ্কার শৌচালয় ব্যবহার করবেন না
  •  পেটের অসুখ এড়ানোর জন্য ফুটপাথ-এ খোলা জায়গায় রাখা কাটা ফল কিংবা অন্যান্য খাবার কিনে খাবেন না
  • ভালোমানের জুতো ব্যবহার করুন। একদিকে ক্ষয়ে যাওয়া জুতো পরবেন না, এতে নার্ভ-এর চাপ এড়াতে পারবেন।

—–সুরঞ্জন দে।

মূত্রনালির সংক্রমণ

চিকিৎসা পরিভাষায় মূত্রনালির সংক্রমণ-কে ইউরিনারি ট্র্যক্ট ইন্ফেকশন বা ইউটিআই বলা হয়। পুরুষদের তুলনায় মহিলারা বেশি আক্রান্ত হন এই অসুখে। অনেক সময় অ্যান্টিবায়োটিক খেয়ে হয়তো এই রোগের হাত থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। সবচেয়ে বড়ো কথা, একবারও মূত্রনালির সংক্রমণ হয়নি, এমন মহিলার সংখ্যা খুবই কম। তবে, কতটা সচেতন থাকলে এই সংক্রমণ এড়ানো যায়, কিংবা কীভাবে এই রোগের সঠিক চিকিৎসা করা হয়, সেই সম্পর্কে সমস্ত প্রশ্নের উত্তর দিলেন ডা. সুদর্শন কান্তি বৈশ্য।

মূত্রনালি সংক্রমিত হয় কীভাবে?

এ হল এক ধরনের (ই-কোলি এবং অন্যান্য) ব্যাকটেরিয়াঘটিত সংক্রমণ। এর ফলে মূত্রনালি আংশিক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এক্ষেত্রে যদি মূত্রনালির নিম্নাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে চিকিৎসা পরিভাষায় বলা হয় সিস্টাইটিস এবং যদি মূত্রনালির ঊধর্বাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে বলা হয় পায়েলোনেফ্রাইটিস। এই পায়েলোনেফ্রাইটিস আসলে কিডনির সংক্রমণ। মহিলারাই বেশি আক্রান্ত হন এই অসুখে। পুরুষরা অনেক সময় বাহক হন এই রোগের। মহিলাদের শারীরিক গঠন এবং অসুরক্ষিত যৗনমিলন-ই এই ধরনের সংক্রমণের প্রধান কারণ। সেইসঙ্গে অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, অপরিচ্ছন্ন পাবলিক টয়লেট ব্যবহার, ডায়াবেটিস মেলিটাস, ইউরিনারি ইন্সট্রুমেন্টেশন, ট্রমা, ক্যাথেটারাইজেশন-এর কারণেও ঘটতে পারে সংক্রমণ।

মূত্রনালি সংক্রমণের উপসর্গগুলি কী কী এবং কীভাবে রোগ নির্ণয় করা হয় এই ক্ষেত্রে?

মূত্রনালির নিম্নাংশের সংক্রমণের ক্ষেত্রে যেসব উপসর্গগুলি দেখা যায়, তার মধ্যে রয়েছে বারবার প্রস্রাবের বেগ পাওয়া এবং প্রস্রাবের পরে জ্বালা হওয়া আর ঊধর্বাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হলে পেটে ব্যথা এবং জ্বর আসতে পারে। বয়স্ক এবং শিশুদের ক্ষেত্রে উপসর্গগুলি প্রকট হয় না অনেক সময়। তাই, প্রস্রাবের পরিমাণ কমে গেলেই মূত্র পরীক্ষা করে রোগ নির্ণয় করা উচিত। এ প্রসঙ্গে আরও জানিয়ে রাখা প্রয়োজন, ভ্যাজাইনাল ডিসচার্জ না হওয়া এবং অসহ্য মাথা যন্ত্রণাও এই ধরনের সংক্রমণের নীরব উপসর্গ হতে পারে। এছাড়া, রক্তাভ প্রস্রাব এবং পিউবিক বোন-এর উপরের অংশে ব্যথা কিংবা লোয়ার ব্যাক পেইন-ও উপসর্গ হতে পারে এই রোগে। শিশুদের ক্ষেত্রে বমিভাব, বেশি সময় ধরে ঘুম, ক্লান্তি এবং প্রস্রাব ধরে রাখতে না পারার সমস্যাও দেখা দিতে পারে।

মূত্রনালি সংক্রমণের ঝুঁকিগুলি কী কী?

বারবার মূত্রনালি সংক্রমিত হলে কিডনি ইনফেকশন, সেপসিস (পচন) ও সেপটিসেমিয়া-র (রক্ত দূষণ) দিকে মোড় নিতে পারে। শুধু তাই নয়,

প্রি-ম্যাচিওর ডেলিভারি কিংবা কম ওজনের শিশুর জন্ম দেওয়ার সমস্যাও দেখা দিতে পারে।

মূত্রনালি সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়ে যায় কোন ক্ষেত্রে?

মাত্রাতিরিক্ত যৌনক্রিয়ার ফলে মূত্রনালি সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে প্রায় ৭৫ থেকে ৯০ শতাংশ। বিশেষ করে অল্পবয়সি যৗন-সক্রিয় মেয়েদের মূত্রনালির সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে অনেকটাই। চিকিৎসা পরিভাষায় একে বলে ‘হনিমুন সিস্টাইটিস’। ভ্যাজাইনা উন্মুক্ত অবস্থায় বাইরের আবহে বেশি সময় থাকা এবং যৗনসুরক্ষার উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ না করা, হস্তমৈথুন, লেহন প্রভৃতি, ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ। আর মেনোপজ-এর পর মহিলাদের শরীরে যখন ইস্ট্রোজেন-এর মাত্রা কমতে থাকে, তখনও এই ঝুঁকি বাড়ে।

মূত্রনালির সংক্রমণ এড়ানোর জন্য কী ধরনের সতর্কতা আবশ্যক?

সতর্কতা যে-কোনও সমস্যা থেকে মানুষকে মুক্ত করে। এক্ষেত্রেও সতকর্তার প্রথম পদক্ষেপ হচ্ছে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকা। যেমন পরিষ্কার জলে বিশুদ্ধ স্নান করা, ভ্যাজাইনা পরিষ্কার রাখা, পরিচ্ছন্ন অন্তর্বাস (নিম্নাংশে) ব্যবহার করা, সঙ্গমের সময় উন্নতমানের কন্ডোম এবং ঋতুকালীন উন্নত স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহার করা। সেইসঙ্গে, পরিমাণ মতো জলপান করতে হবে। এছাড়া, ব্যবহার করতে হবে পরিষ্কার শৌচালয়।

মূত্রনালি সংক্রমণের চিকিৎসা কীভাবে করা হয়?

প্রথমে রোগ নির্ণয় করতে হবে। অর্থাৎ, ইউটিআই বা মূত্রনালির সংক্রমণ হয়েছে কিনা কিংবা কোন পর্যায়ে আছে, তা বুঝে নিতে হবে উপসর্গ জেনে এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে। এরজন্য রুটিন এগ্জামিনেশন এবং ইউরিন কালচার করা প্রয়োজন। যদি পজিটিভ হয়, তাহলে প্রথাগত চিকিৎসা, অর্থাৎ, অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগ করা হয়ে থাকে। এতে রুগির অবস্থার উন্নতি হলে, নিয়মিত ব্যবধানে ফলো-আপ চলবে। আর যদি রুগির অবস্থার উন্নতি না হয়, তাহলে ‘ইমেজিং’, করতে হতে পারে। এছাড়া, ইউরিনারি ট্র্যাক্ট-এ অন্য কোনও সমস্যা থাকলে অস্ত্রোপচারও করতে হতে পারে।

চিকিৎসকের সঙ্গে কথোপকথনেঃ সুরঞ্জন দে   

লাইফস্টাইল টেনশন-মুক্ত রাখুন

অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, বেকারত্ব, চাকরি চলে যাওযার ভয, শিশুদের মানসিক অস্থিরতার সম্মুখীন হওযা– এই সবই বাড়ির বড়োদের টেনশন এবং স্ট্রেস বাড়িযে তুলছে। যারা চাকুরিজীবী তাদের টেনশন আরও দ্বিগুন। বাড়ির ঝঞ্ঝাট মিটিযে অফিসের কাজের দাযিত্ব, যেখানে ভুল  হওযার কোনও উপায নেই। সুতরাং এই সবকিছুর মধ্যেও নিজেকে টেনশন ফ্রি রাখতে পারলেই, তবে ঘর ও অফিস সামলে নিজেকে সারাদিন প্রাণবন্ত রাখতে পারবেন। আর নিজে যদি খুশিতে থাকতে পারেন, তবেই আপনার আশেপাশের মানুষদের এবং পরিবেশকে অনেকটাই স্ট্রেস-মুক্ত করতে পারবেন।

বিশেষ করে মহিলাদের পক্ষে সংসারের নানা অসুবিধা সামলে অফিস করাটা একপ্রকার চ্যালেঞ্জ। অথচ এরই মধ্যে অনেক মহিলাই বুদ্ধি ও বিবেচনা দিযে সুন্দর ভাবে নিজেকে ও কাজের পরিবেশকে মেইনটেন করতে পেরেছেন এবং এটা সকলের জন্যই শিক্ষণীয। সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ যেটা, সেটা হল অ্যাডজাস্টমেন্ট।

প্রপারলি ড্রেস-আপ করে যদি বাড়িতেও থাকতে হয, তাহলেও কাজের একটা উৎসাহ তৈরি হয। রোজ নতুন কিছু ভাবনা মনে আসে, নতুন করে নিজেকে আবিষ্কার করা যায। কাজেও উত্তেজনা আসে।

সাবধানতা অবলম্বন করুন

বাড়ি থেকে অফিসের কাজ করার সমযও কিছ কিছু সাবধানতা অবলম্বন করা একান্ত জরুরি

১) অনলাইন-এ কাজ করতে হলে ভিডিও কল, চ্যাটিং, কনফারেন্স সব কিছুই অ্যাটেন্ড করতে হতে পারে। সুতরাং ঠিক করে চুল বাঁধা থেকে শুরু করে পরিষ্কার প্রেস করা জামাকাপড় পরে কাজে বসাটাই বাঞ্ছনীয

২) পুরুষ হলে রোজ শেভ করাটা দরকার এবং মহিলাদের উচিত মুখে সামান্য মেক-আপ করে তারপর কাজে বসা। এতে যারা আপনাকে দেখতে পাচ্ছে তাদের কাছে আপনি প্রেজেন্টেবল হযে উঠবেন এবং আপনি যা বলবেন তা গুরুত্ব দিযে অপরজন শুনবে

বাড়ি থেকে কাজ করার অসুবিধা

বাড়ি থেকে কাজ করার অনেক অসুবিধারও সম্মুখীন হতে হয কর্মরতাদের। পরিচারিকা না আসার কারণে বাড়ির সমস্ত কাজ এবং পরিবারের দেখাশোনা তাকেই করতে হয।

কাজে বসেও শান্তি নেই। বাচ্চাকে অনলাইন ক্লাস করতে হবে, স্বামীকেও বাড়ি থেকে কাজ করতে হবে আর আপনারও ল্যাপটপেই কাজ অথচ বাড়িতে একটি কি দুটি মাত্র ল্যাপটপ। এই ক্ষেত্রে বাচ্চার প্রযোজন আগে মিটিযে স্বামী-স্ত্রীকে কাজে কিছুটা কম্প্রোমাইজ করতে হতে পারে।

এছাড়াও নেটের সমস্যা লেগেই থাকে। ইলেক্ট্রিসিটি না থাকা, ঝড়ে লাইন খারাপ হযে যাওযা, নেটের ইন্টারনাল কিছু গণ্ডগোল অথবা ল্যাপটপে সমস্যা হলেই কাজেও তার প্রতিফলন ঘটবে।

মহিলাদের ক্ষেত্রে আরও সমস্যা হল, তারা বাড়িতে থাকলেই বাড়ির লোকেদের ফরমাযেশ থাকে, নতুন কোনও খাবার বানানোর। এর ফলে সামগ্রিক চাপ সামলাতে হয। অবসাদ দূরে রাখা, একই সঙ্গে বাড়ি ও অফিসের কাজ সমযে শেষ করা, দুই-ই সুচারুরূপে সামলাতে হয।

ভারসাম্য বজায রাখা জরুরি

বাড়ি এবং অফিস, দুটোরই দাযিত্ব ভালো ভাবে পালন করতে হলে, কাজে ভারসাম্য রেখে চলতে হবে। নযতো টেনশন এবং কাজের স্ট্রেস মানসিক ভারসাম্য নষ্ট করে, শারীরিক ক্ষতির কারণ হযে উঠতে সময নেবে না।

১) যে-কোনও কাজের জন্য শেডিউল তৈরি করা খুব জরুরি। শেডিউল তৈরি করে কাজ করলে বাড়ি এবং অফিস দুটোরই কাজ সমযে শেষ করতে সুবিধা হবে

২) প্রযোজনের নিরিখে কোন কাজটা বেশি ইম্পর্টেন্ট সেটা দেখে নিযে কাজের একটা সূচি তৈরি করাটা বাঞ্ছনীয। এতে কাজের উপর ফোকাস করা যাবে। ঠিক সময কাজ শুরু করে শেষ করা সম্ভব হবে। কাজের শেষে কাজের রিভিউ করাটা খুব জরুরি

৩) আপনি যদি বাড়িতে একাকী হন এবং ছোটো বাচ্চা থাকে আপনার, তাহলে সহকর্মীদের নিজের পরিস্থিতি জানিযে রাখা উচিত। যদি আপনার কোনও কাজে কোনওদিন অফিসের কাজে সামান্য দেরি কখনও হযে যায, আপনি সহকর্মীদের সাহায্য চাইতে পারেন

৪) যৌথ পরিবারের যদি সদস্য হন, তাহলে অফিসের কাজে বসার আগে যতটা সম্ভব বাড়ির কাজ শেষ করে ফেলার চেষ্টা করুন। তারপর কোনও দ্বিধা না করে কাজে বসুন এবং বাচ্চাকে দেখাশোনার দাযিত্ব বাড়ির অন্য সদস্যদের উপর ছেড়ে দিন

৫) বাড়ির দেখাশোনার দাযিত্ব স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ভাগাভাগি করে নেওযার চেষ্টা করুন। একা সব দাযিত্ব সামলাবার চেষ্টা করবেন না। যৌথ পরিবার হলে রান্নাঘর বা বাড়ি পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখার কিছুটা দাযিত্ব অন্য সদস্যদের উপরেও ছাড়তে হবে। সব নিজে নিজে করার চেষ্টা করলে বাড়ি এবং অফিসের কাজের প্রেশারে অসুস্থ হযে পড়ার সম্ভাবনা বাড়বে।

পিণ্ডদান

স্কুল থেকে বাড়ি ফিরেই একটা চটের থলি গোছানো দেখে তোতোন একটু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে, ‘ওমা কোথাও যাবে? দিদির বাড়ি, না মামার বাড়ি?’

–আমি না তুই যাবি।

–আমি! কোথায়?

–পদ্মার বাড়ি।

–দিদির কাছে? বেশ মজা। কিন্তু এখন যে স্কুলে পরীক্ষা চলছে।

–চলুক গে, পদ্মার ওখানেই স্কুলে ভর্তি হবি।

–কেন মা আমি এখন তো কিছু করি না, কোনও বদমায়েশি করি না, তাতেও চলে যাব?

মা কিছু সময় উত্তর না দিয়ে রান্না ঘরে চলে যায়। তোতোনও মায়ের পিছন পিছন রান্না ঘরে গিয়ে বেশ জোরেই বলে ওঠে, ‘ওমা, কিছু বলো গো, তুমি যে চুপ করে আছো?’

–তোর বাবা বলেছে তাই যাবি, এর বেশি আমি আর কিছু জানি না। কিছু প্রশ্ন করবার থাকলে বাবাকে করবি।

এখানেই তোতোনের সমস্যা। বাবা যেন সব সময় রেগেই থাকে। কথায় কথায় বকে, মারে। কয়েকমাস আগেই হেডমাস্টারমশাই অফিস ঘরের বাইরে ঘন্টা দুই কান ধরে দাঁড় করিয়ে রেখেছিলেন। তোতোন সেদিন প্রার্থনার সময় জামার হাত গুটিয়ে রেখেছিল। কথাগুলো বাড়িতে বলতেই বাবা মারতে মারতে বলে, ‘তোর মতো ছেলেকে এমনটাই করা দরকার।’

–কিন্তু বাবা, আমি তো কিছু করিনি।

–আমি কিছু বলতে যাব না, তোর জন্য বলতে গিয়ে স্কুলের পুজোটা হারাব নাকি?

বাবা বেশ কয়েকবছর ধরে স্কুলের সরস্বতী পুজো করে বলে তোতোনের বন্ধুরা তোতোনকে দেখলেই বলে, ‘কলাবামুনের ব্যাটা।’ তোতোন কিছু বলতে গেলে মারামারি হয়, জানতে পারলে স্কুলের স্যার ম্যাডামরা বকেন, মারেন। বাড়িতে বললে বাবাও মারে। অথচ দরকারের সময় ঘরের সবাই তোতোনকেই ডাকে। বড়দি বিয়ের আগে ডাকত, এখন ছোড়দি, দাদা এমনকী মা বাবাও দরকারের সময় তোতোন তোতোন। বাবা গতবছরেই সরস্বতী পুজোর দিন তোতোনকে পয়সা কুড়োতে নিয়ে গেছিল। দাদাকেও বলেছিল কিন্তু দাদা যায়নি। সব কিছু গুছোবার পর বাবা তোতোনের হাতে দশ টাকা দিয়ে বলে, তিন ভাইবোন মিলে কিছু খাবি। ’

–দশ টাকায় তিনজন?

তোতোন টাকাটা বাকি দাদা দিদিদের না দিয়ে নিজের পকেটেই রাখে। জানতে পেরে বাবা ঠাস করে তোতোনের গালে একটা চড় কষিয়ে বলে, ‘যেদিন রোজগার করবি সেদিন এই রকম করবি।’

দুচোখ দিয়ে জল গড়িয়ে আসে। দশ টাকাটাও ফেরত দিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়। অনেক রাতে বাড়ি ফিরে বাবার তর্জন শুনেছিল, ‘এত দেরি, ঘরটা হোটেল নাকি?’

–বিসর্জন দেখছিলাম।

–তোকে না বেশি রাত পর্যন্ত বাইরে ঘোরাঘুরি করতে বারণ করেছি।

তোতোন কোনও উত্তর না দিয়ে এমন ভাবে ঘরে ঢুকেছিল, যেন কিছুই হয়নি। ছোড়দি, দাদা দুজনেই রেগে গেছিল। তক্তাতে বসতে গেলে দাদা বলে ওঠে, ‘এখানে বসিস না, তোর জামা কাপড় নোংরা।’ তোতোন রেগে গিয়ে বাইরে থেকে ধুলো তুলে তক্তাতে ছড়িয়ে দিয়ে বলে, ‘এই নে তোদের পরিষ্কার।’ বাবা একটু পরে জানতে পেরে আবার মেরেছিল। মার খাওয়াটাকে জীবনের সাথে এক্বেবারে জড়িয়ে ফেলেছিল তোতোন।

ঘরে বাইরে কারণে অকারণে শুধু মার জুটত। কখনও স্যার ম্যাম কখনও বা বাবা। স্কুলে কিছু হলেই হেডমাস্টারমশাই প্রথমে আচ্ছা করে মেরে বাবাকে ডেকে পাঠাতেন। বাবাও অমনি লেজ নাড়তে নাড়তে হেডমাস্টারমশাই-এর ঘরের দরজার কাছে হাতজোড় করে দাঁড়াত। ক্লাস থেকে তোতোনকে ডেকে পাঠানো হতো। তোতোনের সামনেই হেডমাস্টারমশাই বাবাকে অপমান করতেন। বাবা স্কুলের সবার সামনেই মারত, তাও তখন তোতোনের, বাবার জন্য খারাপ লাগত।

আস্তে আস্তে স্কুল, বাড়ি পাড়া সব জায়গাতেই বদমায়েশি কমিয়েছিল। নিয়মিত স্কুল যেত, বিকেল ছাড়া মাঠে যেত না, টুকটাক পড়াও করতে আরম্ভ করেছিল। স্যার ম্যামরা অবাক হয়ে বলত, ‘কিরে তুই ভালো হয়ে যাচ্ছিস?’ তোতোন হাসত। কিন্তু কখনও ভাবেনি বাবা-মা বড়দির কাছে পাঠিয়ে দেবে। তোতোনের চলে যাওয়ার কথা শুনে দাদা ছোড়দি কিছু বলে না, চুপ করে থাকে।

তোতোনও কাউকে কিছু বলতে পারে না, শুধু রাতে শুয়ে গুমরে গুমরে কাঁদে। ঘুমের ভান করে বাবা মায়ের কথা শোনে। জামাইবাবুর কি একটা রোগ আছে, ছেলে মেয়ে হচ্ছে না। তোতোন কিছু বলেনি, কিছু জানেও না। পরের দিন ভোর হতেই মাকে জড়িয়ে ধরে বলে, ‘না আমি তোমাদের ছেড়ে যাব না, এখানে থাকব।’

সকাল বলেই মা কোনও উত্তর দেয় না। অন্য সময় হলে ঠিক বলে দিত, ‘যাবি না তো কি করবি শুনি, আমার হাড় মাংস খাবি। তোকে জন্ম দিয়ে কি কাল যে করেছিলাম।’

বাকি দাদা দিদিরাও ভালো করে কথা বলে না। বড়দিই একমাত্র তোতোনকে ভালোবাসত। রাতে শুয়ে তোতোনের মাথায় হাত বুলিয়ে বলত, ‘কেন এমন করিস বলতো, সবাই বকে মারে আমারও তো খারাপ লাগে।’

বড়দির বিয়ের দিন আর কেউ না কাঁদলেও তোতোন লুকিয়ে কেঁদেছিল। জামাইবাবু খুঁড়িয়ে চলে, তবে সরকারি চাকরি করে, বাড়ির অবস্থাও খুব ভালো, চাষবাস আছে। বাড়ির লোকজনও কেউ নেই। শুধু জামাইবাবুর বাবা বেঁচে আছেন। বড়দি বিয়ের পর এলে লুকিয়ে তোতোনের হাতে টাকা দেয়। তবে এক্বেবারে বড়দির কাছে থাকাটা কিরকম লাগে। রাতে শুয়ে তোতোনের ঘুম আসে না। একটা চাপা গুমোট ভাব শরীরটাকে জাপটে ধরে। বড়দির বিয়ের পর ছোড়দি বলে, ‘এবার থেকে একটা পেট বাঁচল, বলো মা।’ মা কিছু না বললেও মনে মনে খুশিই হয়। দুটো মন্দিরে নিত্যপুজোয় সংসারটা কোনওরকমে চললেও বকি সবদিকই বন্ধ।

পরের দিনেই বাবা তোতোনকে সঙ্গে করে বড়দির বাড়ি দিয়ে আসে। দোতলা বাড়ি, থাকবার লোক মাত্র তিনজন। দিদি, শ্বশুরমশাই, আর একজন চাকর। জামাইবাবু কলকাতার একটা অফিসে কাজ করে। এতদিন বাড়ি থেকে যাতায়াত করলেও পাঁচ বছরের জন্যে বাইরে কোথাও চলে যাচ্ছে। বড়দি তাই এই ক’বছর তোতোনকে নিজের কাছে রাখবার কথা ভেবেছে। তোতোনের করবার কিছু নেই, বন্ধু, স্কুল, খেলা সব কিছু ছেড়ে নতুন জায়গায় যেতে হবে। বড়দির শ্বশুর বেশ ভালো, প্রথম দিন তোতোনকে দেখতে পেয়েই মাথায় হাত বুলিয়ে বলেন, ‘আমি হেডমাস্টার মশাইকে বলে রেখেছি। কালই সঙ্গে করে নিয়ে গিয়ে ভর্তি করে দেব।’

এর আগে দিদির বাড়ি অনেকবার এলেও এবার এসে কীরকম একটা অনুভূতি হয়। বাড়িতে থাকা অবস্থার সব কিছু মনে পড়ে, আর কান্না আসে। সেই সময় সেখানে দাঁড়িয়ে ছিল, টুটুলদা। নিজের থেকেই এসে পরিচয় করে বলে, ‘আমি দুলু পণ্ডিতের ছেলে।’

আলাপ করবার কিছুক্ষণের মধ্যেই তোতোনকে মাঠে নিয়ে চলে যায়। দিদি বারণ করলেও সে কথা শোনে না। দুলু পণ্ডিত প্রতিদিন দিদির বাড়ি পুজো করে। প্রথমদিনেই তোতোনের টুটুলকে খুব ভালো লেগে যায়। সেদিনই পুকুরের ধার থেকে দুটো হাঁসের ডিম কুড়িয়ে, গোবর মাখিয়ে কুটি জ্বেলে সেদ্ধ করে দুজনে খায়। তোতোনের খুব ভালো লাগে।

এই স্কুলটাও বেশ ভালো। হেডমাস্টারমশাই অতটা রাগি নন। তোতোন যেতেই কাছে ডেকে নাম জিজ্ঞেস করেন। তোতোন নাম বলতেই নিজেই সঙ্গে করে ক্লাস সেভেনের ক্লাসে বসিয়ে আসেন। বড়দির শ্বশুরের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘আপনি বাড়ি চলে যেতে পারেন।’

প্রথম দিনেই ক্লাসে তোতোনের দুজন বন্ধু হয়। তবে দুজনের কাউকেই তোতোনের ভালো লাগে না।

দেখতে দেখতে কয়েক সপ্তাহ পেরিয়ে যায়। প্রতিদিনই তোতোন বড়দিকে জিজ্ঞেস করে, ‘মা ফোন করেছিল?’ বড়দি আমতা আমতা করে মাথা নাড়ে। তোতোন আস্তে আস্তে বড়দিকে সবার কথা জিজ্ঞেস করা বন্ধ করে দেয়। স্কুল থেকে ফিরে বা স্কুল যাবার আগে বড়দির সাথে হাতে হাত লাগিয়ে কাজ করতে হয়। স্কুলে একাই বসে থাকে, কখনও এদিক সেদিক ঘুরে বেড়ায়। টুটুলদার সাথে দিদির বাড়িতে আলাপ হলেও আর দেখা হয় না, দিদির মুখে শোনে, ‘ও কোথাও একটা গেছে।’ তাও টুটুলদার সাথে থাকতে ভালো লাগত।

বাইরে থেকে টুটুলদা ফিরতেই প্রথমে টুকটাক খেলা তারপর আস্তে আস্তে আরম্ভ হয় এদিক সেদিক টোটো কোম্পানি। গ্রাম ছাড়িয়ে পাশের গ্রামে মেলা, হাট কিছুই বাদ যায় না। দিদি বকে, দিনের বেলা স্কুল থেকে ফিরতে একটু দেরি হলেই বকে, ছুটির দিনে বাইরে বেরোলে ফিরতে দেরি হলে বকে। তোতোন চুপ করে শোনে।

নতুন স্কুলের হেডমাস্টারমশাইও একদিন ক্লাস থেকে তোতোনকে ডেকে পাঠিয়ে অনেক কথা বলেন। এই স্যারকে তোতোনের প্রথমদিন থেকেই ভালো লাগে। আস্তে আস্তে কথা বলেন, বোঝান। আগের স্কুলের স্যারের মতো বকেন না। তোতোনেরও ওনার কাছে গেলেই পড়তে ইচ্ছে করে, সব কথা শুনতে ইচ্ছে করে। কিন্তু সেদিন বকুনিটা ভালো লাগেনি, কেমন যেন আগের স্কুলের স্যারের মতো লাগছিল। একটা কথাও শুনতে ইচ্ছে হয়নি। ছুটির আগেই স্কুল থেকে বেরিয়ে যায়। মাঠে বসে থাকে, সেই সময় টুটুলদা আসে।

টুটুলদা ক্লাস সেভেনের পর আর পড়েনি। শুধু ঘুরে বেড়ায় আর এর-ওর গাছের ফল চুরি করে। তোতোনের সাথে দেখা হলে চুরির ফল দেয়। তোতোনের ভালো লাগে। আস্তে আস্তে টিফিনের সময়েই ব্যাগ কাঁধে স্কুল থেকে বেরিয়ে যায়। টুটুল স্কুলের বাইরে অপেক্ষা করে। দুজনে ঘুরতে আরম্ভ করে, এদিক সেদিক। সন্ধে মাথায় বাড়ি ফিরতেই দিদির বকুনি শোনে। তোতোন কোনও কিছু কান করে না। পরের দিন আবার ঘুরতে চলে যায়। দিদির বাড়ি ফিরে সেদিন দিদির হাতে মার খায়। রাগ বাড়ে তোতোনের, গুমরে থাকে, রাতে কিছু খায় না!

তারপর দিন থেকে অবশ্য ঘোরা বন্ধ করে না। আস্তে আস্তে টুটুলের সাথে ঘোরার পরিমাণ বাড়ে, যেদিন স্কুল থাকে সেদিন টিফিনেই বেরিয়ে যায়, স্কুল না থাকলে আরও মজা। সকালে কয়েকঘন্টা প্রাইভেট পড়ে, বাড়ি এসেই বেরিয়ে পড়ে, দিদির বাড়ির সামনের মাঠে, কোনওদিন মাঠে ফুটবল বা গুলিডাং খেলে, তোতোনদের আরও বন্ধু জোটে। খেলা না হলে এদিক ওদিক ঘুরতে থাকে। টুটুলদার সাথে মাঝে মাঝে একটু আধটু বিড়িতেও টান দিতে আরম্ভ করেছে।

দেখতে দেখতে মাস চার পেরিয়ে যায়। স্কুল ছাড়াও গ্রামে তোতোন এখন পরিচিত মুখ। মাঠে খেলার পাশে আশেপাশের অনেকের বাগানে তোতোনের এখন অবাধ যাতায়াত। এমনকী কারওর বাগানে একটা টব উলটে গেলেও সবাই তোতোনের দিদিকে বলে। দিদির হাতে মার খাওয়াটা তোতোনের কাছে এখন ভাত খাওয়ার সমান হয়ে গেছে। কোনও কিছুতেই গা করে না। তবে টুটুলদার সাথে এখন মাঠের থেকে নদীর ধারে বেশি যায়। তাদের সঙ্গে আরেকজন থাকে পিঙ্কি দিদি। টুটুলদা তার সাথে তোতোনের আলাপ করিয়ে দিয়ে বলে, ‘এই যে আমার গার্লফ্রেন্ড, তোরও হবে, আরও কয়েকটাদিন যাক।’

তিনজনে ঘন্টার পর ঘন্টা নদীর বালিতে বসে থাকে। কয়েকদিন পর থেকেই তোতোনকে নদীর বালিতে বসিয়ে রেখে বাকি দুজন নদীর ধারের একটা পুরোনো ভাঙা বাড়ির ভিতরে ঢুকে যায়। যাবার আগে প্রতিবারেই বলে যায়, ‘এখানে বসে থাকবি, কাউকে এদিকে দেখতে পেলেই আমাকে জানাবি, কুকুরের মতো ডাকবি, তবে নিজে ওদিকে হুট করে চলে যাবি না। গেলেই তোর দিদিকে সেদিনের তোর বিড়ি খাবার কথাগুলো বলে দেব।’ তোতোন টুটুলদার কথা শোনে, ওরা দুজন বাড়িটার ভেতরে গেলেও তোতোন নদীর তীরেই বসে থাকে।

একদিন তোতোন ভয় পেয়ে যায়। টুটুলদা আর পিঙ্কিদি ভাঙা বাড়িটাতে চলে যাবার কিছুক্ষণ পরে কয়েকটা কুকুর নদীর বালি থেকে বাচ্চা ছেলের মরা শরীর নিয়ে টানাটানি করে, নিজেদের মধ্যে মারামারি করতে করতে তোতোনের কাছে এসে যেতেই তোতোন ভয় পেয়ে তাড়াতাড়ি বাড়িটার দিকে চলে যায়। কিন্তু কাছে এসে অবাক হয়ে যায়, ‘কী ব্যাপার কোনও সাড়া শব্দ নেই যে! তাহলে কি ওরা অন্য কোথাও চলে গেছে!’

একটু ভিতরে ঢুকে এদিক ওদিক ঘুরতেই হালকা আওয়াজ শোনে। একটা জানলা দিয়ে ভিতরে দেখতেই দেখে টুটলদা আর পিঙ্কিদি মাটিতে শুয়ে আছে, দুজনের গায়ে কোনও জামাকাপড় নেই।

নিজের চোখদুটোকে বিশ্বাস করতে পারে না তোতোন। কয়েকদিন আগেই টুটুলদা কোথা থেকে একটা অসভ্য বই এনেছিল, তোতোনও দেখেছে। প্রথমে একটু লজ্জা করছিল, টুটুলদাই খেঁকিয়ে ওঠে, ‘লজ্জাবতি, যেন এখনও কিছু গজায়নি।’ তোতোন বইটা প্যান্টের পকেটে ভরে বাড়ি নিয়ে আসে। পড়ার বই-এর ভেতরে রেখে পড়ে। কী সব গল্প। পড়তে পড়তে শরীরে কেমন একটা হয়, চুপ করে বসে থাকতে পারা যায় না। প্যান্টে টান পড়ে, কিছুক্ষণের মধ্যেই প্যান্ট ভিজে যায়।

তোতোন পুরোটা বোঝে না। কয়েকদিন পর টুটুলদাকে জিজ্ঞেস করতেই দাদা হাসে, ‘তবে! তোতোন বড়ো হয়ে গেল, বেশ বেশ, তোর দিদিকে বলে, এবার বিয়ে দিতে হয়।’ টুটুলদাটা এমনিই, কারও কোনও ভালো কথা বা কাজে আসে না, সব সময় মুখে শুধু বাজে কথা, মাঝে মাঝে তোতোনের রাগ হয়।

পিঙ্কিদির সাথে টুটুলদাকে ওরকম ভাবে দেখবার কয়েক দিন পরেই টুটুল আবার তোতোনকে স্কুলের রাস্তায় দাঁড় করিয়ে বলে, ‘শোন, আজ টিফিনেই বেরিয়ে যাবি, নদী যাব, পিঙ্কি থাকবে।’ তোতোন মাথা নেড়ে বলে, ‘না, আমি যাব না, তোমরা আমাকে পাহারাতে বসিয়ে ওই বাড়িটাতে চলে যাও। আগের দিন তোমাদের দুজনকেই ওখানে ল্যাংটো দেখেছি।’ টুটুলের চোখ মুখ শক্ত হয়ে যায়, ‘কী দেখেছিস?’

তোতোন আস্তে আস্তে সব কথাগুলো বলে। টুটুলদা মন দিয়ে সবটা শুনেই হালকা হেসে ওঠে, ‘আমাকে বলবার আগে তোর দিদিকে বল।’

–মানে? কী বলব?

–থাক, আমি আর বলছি না, তবে জেনে রাখ তোর দিদিটাও তুলসীপাতা নয়।

তোতোন সেদিন আর স্কুল যেতে পারে না, একাই নদীর ধারে চলে যায়, ঘুরে বেড়ায় এদিক সেদিক, এমনকী সেই বাড়িটাতেও। বাড়ি ফিরে কয়েকদিন চুপ থাকে, বাইরেও বেরোয় না, খেলতে যায় না, স্কুল যায় না। দিদি এসে শরীর খারাপ কিনা জিজ্ঞেস করে, তারপর কয়েক দিনের জন্যে বাড়ি যেতে বলে। তোতোন যেতে চায় না। দিদির কাছে দু’বেলা খাবার তো আছে। বাড়িতে তো তাও নেই। তাও যেতে হয়, মাত্র তিনদিনের জন্য, এর বেশি রাখতেও মা বাবা কেউ পছন্দ করে না।

ওখানকার বন্ধুরাও কেমন যেন হয়ে গেছে। এড়িয়ে প্রশ্ন করে, খেলতে নিতেও কেমন যেন যেন একটা অনীহা প্রকাশ করে। রাস্তায় আগের স্কুলের হেড মাস্টারমশাই-এর সাথে দেখা হয়। তোতোনকে দেখতে পেয়েই মোটর বাইক থামিয়ে রাস্তার মাঝে বলে, ‘কিরে আবার আমাদের জ্বালাতে ফিরলি নাকি?’ তোতোন কোনও উত্তর না দিয়ে এক ছুটে বাড়ি চলে আসে। পরের দিনেই বাবাকে বলে, ‘আমাকে বাসে চাপিয়ে দাও আমি দিদির বাড়ি ফিরে যাই।’

–দিদির বাড়িতে পৌছনোর পর তোতোনকে দেখে দিদিও কিছুটা অবাক হয়। জিজ্ঞেস করে, ‘কী রে তুই! এত তাড়াতাড়ি চলে এলি?’

দিদির শ্বশুর তখন তোতোনের হয়ে কথা বলে, ‘ঠিক আছে, এসেছে ভালোই করেছে, এখন আবার নন্দটাও নেই।’

নন্দকাকা দিদির শ্বশুরবাড়িতে ফরমায়েশ খাটে, গরু দেখে, দিদির সাথে রান্নার জোগাড় করে। বছরে দুবার নিজের বাড়ি যায়। পনেরো কুড়ি দিন করে থাকে। তখন তার বদলে নন্দকাকার গ্রামের বাড়ি থেকে, নন্দকাকার দূর সম্পর্কের ভাই আসে। তোতোন তাকে এই প্রথম দেখে, তবে তার নাম আগে শুনেছে। মন্টুকাকা। খুব তাড়াতাড়ি মন্টুকাকার সঙ্গে আলাপও হয়ে যায়। কম বয়স পেটানো শরীর, হাতে একটা তামার বালা, চোখ মুখে সব সময় একটা ফূর্তি ভাব। দিদিও কাজের ফাঁকে মন্টুকাকার সাথে খুব কথা বলে। সব সময় ডাকে, নিজের হাতে দুপুরে খেতে দেয়। একটা আলাদা ভালোলাগা বোধ দিদির চোখে মুখে ফুটে ওঠে, তোতোন সেটা বেশ বুঝতে পারে।

রাতে দিদির শ্বশুর তাড়াতাড়ি খেয়ে নেয়, খাবারের সাথে বেশ কয়েকটা ওষুধও খেতে হয়। তোতোন এখানে আসার পর থেকে এটাই দেখে আসছে। রাতে কখনও ঘুম থেকে উঠতে দেখেনি। সবাই ঘুমিয়ে পড়বার পর টুটুলদার সাথে পাঁচিল ডিঙিয়ে বেশ কয়েকবার পাশের গ্রামে যাত্রা শুনতে গেছে। দিদি, শ্বশুর বা নন্দকাকা কারওরই ঘুম ভাঙেনি। দিব্যি যাত্রা শুনে, ভোরের আগে বাড়ি ফিরে নিজের ঘরের বিছানায় শুয়ে পড়েছে। পরের দিনেও কেউ টের পায়নি।

সেদিন দিদির বাড়িতে নিজের ঘরের বিছানায় শুলেও অনেক রাত অবধি তোতোনের ঘুম আসে না। মাথার ভিতর হাজার হাজার প্রশ্ন, উত্তর, খেলা মাতুনি সব ঘুরে বেড়াতে থাকে। তারপর নিজেরই অজান্তে একটু তন্দ্রা মতন এলেও একটা শব্দ শুনে আবার চোখ দুটো খুলে যায়। ঠিক একটা দরজা বন্ধ করবার শব্দ শুনতে পায়। প্রথমে একবার তারপরে আবার। ভয়টা তোতোনের শরীরে কোনও কালেই নেই। একবার টুটুলদার সঙ্গে যাত্রা দেখতে যাবার সময় চোরের সামনে পড়েছিল, দুজনেরই ভয় লাগেনি। তবে চোরটা তাড়া করেছিল। তাড়াতাড়ি অন্য গ্রামে যাবার জন্যে অনেক দিনই রাতের অন্ধকারে কবরতলা দিয়ে যেত। কোন দিনও ভয় পায়নি।

সেদিনও তোতোন আস্তে আস্তে নিজের ঘরের দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এসে এদিক ওদিক দেখতে থাকে। না কেউ কোথাও তো নেই। তার মানে কি ভুল শুনল। নিজের ঘরের দিকে আবার পা বাড়াতেই দিদির ঘর থেকে একটা ফিশফিশানি আওয়াজ শুনতে পায়। এতরাতে দিদির ঘরে, চোর ঢুকল নাকি?

তোতোন দিদির ঘরের বারান্দার দিকের জানলাটার কাছে দাঁড়ায়। জানলাটা ঠেলতেই বুঝতে পারে ভিতর থেকে বন্ধ করা আছে। কান পেতে কিছুক্ষণ দাঁড়ায়। ভিতর থেকে স্পষ্ট কথা বলবার আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। তার মানে দিদির ঘরে কেউ একজন আছে। জামাইদা কি রাতে এসেছে? তোতোন আবার নিজের ঘরে ফিরে আসে, কিন্তু ঘুম আসে না, ব্যাপারটা গোলমেলে লাগছে, ভিতরে কে থাকছে, কে আছে? দিদির সাথে এত আস্তে আস্তে কী কথা বলছে?

আবার দরজা খুলে বাইরে আসে। কিছুসময় পা টিপে টিপে বারান্দায় এদিক ওদিক করে উঠোনে নেমে আসে। তারপর বাড়ির পিছনে গিয়ে আস্তে আস্তে জানলা আর পাইপ ধরে ধরে দিদির ঘরের জানলাতে লুকিয়ে মুখ রাখতেই চমকে ওঠে। এখানেও দুজন ল্যাংটো! একবার, দুবার দেখে, নিজের দুটো চোখকেই বিশ্বাস করতে পারে না।

সেইরাতে আর ঘরে ফেরে না। রাতেই ছুটতে ছুটতে সেই নদীর ধারে এসে বসে। চারদিকে অন্ধকার। ঝোপ থেকে শেয়ালের ডাক শোনা যাচ্ছে। বয়ে চলা নদীর জলের দিকে তাকাতেই একদিকে টুটুলদা পিঙ্কিদি অন্যদিকে দিদি আর…। চোখ ফেটে জল গড়িয়ে পড়ে। তার মানে টুটুলদা সব কিছু জানে, অনেকদিন ধরেই চলছে।

আস্তে আস্তে ভোরের আলো ফুটতে আরম্ভ করে। নদীর জলে চোখ মুখ ধুয়ে উঠে দাঁড়াতেই দিদির প্রতি খুব রাগ হয় তোতোনের। বাড়ি গিয়ে মা, বাবা অন্য দাদা দিদিদের চিৎকার করে সব কিছু বলে দিতে ইচ্ছে করে। পরক্ষণেই নিজেকে বোঝায়। দিদি যদি রেগে যায়, যদি বাড়িতে রেখে দিয়ে আসে। তারমানেই তো সেই আবার বাবা, মা, আর স্কুলের স্যারদের মুখ ঝামটা সহ্য করে বেঁচে থাকা। তার থেকে এই ভালো। যা দেখেছে সেটা শুধু চোখদুটোই জানুক।

দিদির বাড়ি ফিরতেই তোতোনকে দেখে দিদি চমকে ওঠে, ‘কী রে কোথায় গেছিলিস?’

–মাঠে, একটু ছোটাছুটি করছিলাম।

–তা বলে রাত থাকতে।

–রাতে নয়, ভোরেই গেছিলাম।

–কিন্তু মন্তু যে বলল তোকে যেতে দেখেনি।

তোতোন হালকা হেসে বলে ওঠে, ‘কাকার হয়তো খেয়াল নেই।’

বেলা বাড়লে টুটুলদার বাবা নিত্য পুজো করতে আসে। তোতোনকে দেখেই জিজ্ঞেস করে, ‘কবে এলে, টুটুল তোমার কথা জিজ্ঞেস করছিল।’

–টুটুলদা বাড়িতে আছে?

‘হ্যাঁ’ শুনতেই তোতোন বলে ওঠে, ‘আমি দেখা করে আসব।’

টুটুলদার সাথে আবার কয়েকটা দিন স্কুল কামাই, ঘোরাঘুরি চলতে থাকে, সঙ্গে চলে নদীর তীরে বসে থাকা। দুপুরের দিকে পিঙ্কিদি এলে নিয়ম করে টুটুলদা পুরোনো বাড়িটাতে চলে যায়, তোতোন কিছু বলে না। একা একা নদির তীরে বসে থাকবার সময় রাতের কথাগুলো সব চোখের সামনে ভেসে ওঠে।

তারপরের দিন জামাইদা আর নন্দকাকু দুজন একসাথেই ফেরে। মন্টুকাকা নিজের গ্রামে চলে যায়। রাতে জামাইদার সাথে গল্প হয়, তোতোনের জন্য একটা নতুন জ্যামিতি বক্স কিনে এনেছে।

আরও কয়েকটা মাস পেরিয়ে যায়। তোতোনের ইচ্ছে না থাকলেও এখন প্রতিদিন স্কুল যেতে হয়। তোতোন এখন অনেকটা একা হয়ে গেছে। দুলু পণ্ডিততো টুটুলদাকে এক যজমানের বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছে। দিদির বাড়িতে এসে বলে, ‘ওখানেই থাকুক এখানে ঠায় ঘুরে বেড়ায়, তার থেকে ওখানে কিছু কাজকর্ম করুক, তাছাড়া ওদের নিত্যপুজোটা তো আছেই।’

কয়েকটা সপ্তাহ পরেই দিদির ঘরে রান্নার নতুন লোক আসে। আরও কয়েকদিন পর মা’ও আসে। তোতোন নন্দকাকার কাছ থেকে শোনে, ‘তোমার দিদি যে এখন পোয়াতি গো।’

তোতোন আজ খুব ব্যস্ত। দিদির মেয়ের অন্নপ্রাশন। চারদিকে লোকজন। জামাইবাবুও খুব ব্যস্ত। তোতোন সকাল থেকে উঠে পুকুর পাড়ে দাঁড়িয়ে থেকে মাছ ধরিয়েছে। শহর থেকে মাংস, মিষ্টি নিয়ে এসেছে। মাঝে মাঝে রান্নার ওখানেও গেছে। বাড়ি থেকে বাবা-মা, দাদা-দিদিরা এসেছে। তোতোনকেই সব দেখাশোনা করতে হচ্ছে। শুধু আসতে পারেনি টুটুলদা।

কাজের ফাঁকে একবার একটা দরকারে দু’তলায় দিদির ঘরে ঢুকতে গিয়ে থমকে দাঁড়ায় তোতোন। দেখে দিদি একটা কিছু বুকে চেপে ধরে খুব কাঁদছে, মেয়েটা একতলায়। তোতোন ওপরে উঠে আসার সময় দেখেও এসেছে। দিদিকে কাঁদতে দেখে কাছে যেতেই দিদি চমকে ওঠে, তাড়াতাড়ি চোখদুটো মুছে জিজ্ঞেস করে, ‘কিছু বলবি?’

–তোকে নীচে সবাই ডাকছে।

দিদি তাড়াতাড়িতে হাতের মধ্যে লুকিয়ে রাখা জিনিসটা বিছানার নীচে লুকিয়ে একতলায় নেমে যায়। ঘরে তখন একা তোতোন। দিদি নেমে যাওয়ার পর বিছানার সেই দিকটা তুলতেই চমকে ওঠে। একটা তামার বালা। চোখের সামনে কয়েকটা ছবি ভেসে ওঠে। পুরো ব্যাপারটা পরিষ্কার হয়ে যায়। তবুও কাউকে কিছু বলে না।

অন্নপ্রাশন শেষ হয়। আত্মীয়রা সবাই একে একে বাড়ি চলে যায়। জামাইবাবুও কাজের জায়গায় ফিরে যায়। একরাতে খাওয়া দাওয়ার পর সবাই শুয়ে পড়লে তোতোন আস্তে আস্তে দিদির ঘরে যায়। দিদি তখন মেয়েকে দুধ খাওযাচ্ছিল। তোতোন ভিতরে যেতেই দিদি জিজ্ঞেস করে, ‘কিছু বলবি?’

–একটা কথা জিজ্ঞেস করব? রেগে যাবি না তো?

–না না, বল।

–এক রাতে তোর ঘরে আমি একজনকে দেখেছিলাম।

দিদির চোখ মুখে চমকে ওঠার ছাপ ফুটে ওঠে। কিছু সময় তাও চুপ থেকে বেশ স্বাভাবিক ভাবেই বলবার চেষ্টা করে, ‘তুই ভুল দেখেছিস।’

–না’রে দিদি আমি স্পষ্ট দেখেছি।

–চুপ কর। পেকে গেছিস খুব, কালই বাবাকে ফোন করছি, এসে নিয়ে যাক তোকে।

–দিদি আমি যে নিজের চোখে তোদের দুজনকে এই বিছানাতে শুয়ে থাকতে দেখেছি, অন্নপ্রাশনের দিনও তোকে কাকার বালাটা নিয়ে কাঁদতে দেখলাম। তার মানে কি জামাইবাবু!

দিদির চুপ করে থাকা দেখে তোতোনও চুপ করে যায়। কিছুক্ষণ পর বলে, ‘তবে আমি কাউকে কিছু বলব না। তুই নিশ্চিন্তে থাক।’

–তুই তোর নিজের ঘরে যা।

এর আগে দিদি অনেকবার বকেছে, মেরেছে। এখানে আসার পরেও মেরেছে, কিন্তু এই গলা সম্পূর্ণ অলাদা।

দিদির এমন কঠিন গলা তোতোন আগে কখনও শোনেনি, ভয় লাগে তোতোনের। আস্তে আস্তে নিজের ঘরে চলে যাবার রাস্তা ধরতেই দিদি পিছন ডাকে, ‘আমার তোকে এখানে নিয়ে আসাটাই ভুল হয়েছিল, আজ বুঝছি।’

–কিন্তু দিদি আমি তো কিছু করিনি।

–কিছু করিসনি মানে, এইসব কথা কেউ কখনও দিদিকে বলে?

–আমি তো কিছু ভুল বলিনি, যা দেখেছিলাম, তাই বললাম।

–কি হতো একবার ভেবে দেখেছিস যদি আমি তোকে না নিয়ে আসতাম, না খেতে পেয়ে মরতিস, সেটাই ভালো হতো, কালই বাবাকে বলছি তোকে নিয়ে যাক।

তোতোন মুচকি হেসে বলে, ‘দিদিরে, আমাদের বাকি দুজন ভাইবোনও আছে, তারাও ওখানে থাকছে, আমি কালকেই চলে যাব। তোকে আর কষ্ট করে আমাকে ফিরিয়ে নিয়ে যাবার কথা কিছু বলতে হবে না। মরি বাঁচি ওটা আমার বাবার বাড়ি, দিদির বাড়ি নয়। আর না খেতে পেয়ে মরবার কথা বলছিস, না’রে দিদি মরব না, তাহলে তো তুইও মরে যেতিস।’

সকাল থেকেই তোতোনের মায়ের মনটা ভালো নেই। বার বার বলছে, ‘আজ তোতোনটার জন্য খুব মন খারাপ করছে, একবার নিয়ে এসো না।’

তোতোনের বাবা রেগে যায়, ‘এই তো অন্নপ্রাশনের দিন দেখলে, আবার মাস দুই পরে নিয়ে আসব।’

–সে ঠিক আছে কিন্তু আজ মনটা কেমন যেন হচ্ছে, এমন তো হয় না। ছেলেটা কতদিন বাইরে, কোনও দিনও এমন হয়নি। তোতোনের বাবা বা অন্য দিদি দাদারা মায়ের কথাতে কোনও গুরুত্ব না দিয়ে নিজের নিজের কাজে বসে। একটু বেলাতেই বড়দি ফোন করে। তোতোনের ছোড়দি ফোনটা ধরেই উত্তেজিত হয়ে জিজ্ঞেস করে, ‘তোর মেয়ে কী করছে? খুব দুষ্টু হয়েছে?’

উলটো দিকে থাকা দিদি কিছু সময় কোনও জবাব দেয় না, তারপর পর চাপা গলায় বলে, ‘কাল রাতে তোতোন গলায় দড়ি দিয়েছে।’

 

 

 

 

পড়ার জন্য সীমাহীন গল্প-নিবন্ধসাবস্ক্রাইব