প্রেম যখন অবসেশন

ভালোবাসা হল একটা সুন্দর অনুভতি। কিন্তু যখন ওবসেশন-এর মানসিকতা, ভালোবাসার অনুভতিকে দাবিয়ে রাখার চেষ্টা করে তখনই জানতে হবে সম্পর্কে প্রেম-ভালোবাসার জায়গা নিচ্ছে জেদ। ইচ্ছা অপরের উপর চাপিয়ে দেওয়ার মানসিকতা ব্যক্তিকে চালিত করছে। এও এক ধরনের পাগলামি বলা চলে।

প্রেম অবসাদের কারণ হয়ে উঠতে পারে : কারও জন্য প্রেম ওষুধের মতো কাজ করে নিজের আবার কারও জন্য ধ্বংস এবং প্রতিশোধের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। প্রেম মানুষকে অন্ধ করে। এর ফলে মানুষ নিজের আইডেন্টিটি, নিজের সবকিছু ভুল করে, বেশি গুরুত্ব দিয়ে ফেলে। সুতরাং সেখানে যদি কেউ তাকে ঠকায় তাহলে ওই ব্যক্তির মধ্যে আত্মহত্যার মনোভাব তৈরি হতে পারে, হত্যা করার ইচ্ছা, এমনকী মানুষ পাগলও হয়ে যেতে পারে!

ইমোশনালি আনস্টেবল: ইমোশনালি আনস্টেবল পার্সোনালিটির যারা অধিকারী, তারা অপরের উপর ডিপেন্ড করে। ভালোবাসার অর্থ তাদের কাছে হল, অপর ব্যক্তিকে তার খেয়াল রাখতে হবে, তাকে ভলোবাসতে হবে, তাকে সব পরিস্থিতিতে সামলাতেও হবে। এরা সাধারণত মানসিক ভাবে খুব দুর্বল হয়। খুশি হয় যেমন তাড়াতাড়ি, তেমনি তাড়াতাড়ি অবসাদেরও শিকার হয়।

হরমোন ফ্যাক্টর: হরমোনও আমাদের পার্সোনালিটিকে অনেক ক্ষেত্রেই প্রভাবিত করে। এক ধরনের এনজাইমের সঙ্গে প্রেমের একটা সম্পর্ক রয়েে। কেউ ভালো কথা বললে আমরা আনন্দ পাই। এই ক্ষেত্রে ডোপামিন হরমোনের সিক্রিশন বেশি হয় যা কিনা প্রেম, ভালোবাসার মতো ইমোশনকে কন্ট্রোল করে।

নিজেকে অসুরক্ষিত মনে করা: অনেকের মনেই প্রেম থেকে নিরাপত্তাহীনতার ভাবনা জন্ম নেয়। সবসময় সন্দেহ হতে থাকে পার্টনার তাকে ঠকাচ্ছে না তো? কেউ তাকালে মনে হয়, অপর ব্যক্তিটি পার্টনারকে ছিনিয়ে নিতে পারে। এই ক্ষেত্রে ব্যক্তি নিজের সবকিছু ভুলে সর্বক্ষণ পার্টনারের প্রতি পুরো কেন্দ্রিভূত করে।

নির্ভরশীলতা : পুরোপুরি অন্যের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়লে, ব্যক্তি নিজের পার্সোনালিটি হারিয়ে ফেলে। পার্টনারকে খুশি করার জন্য উন্মুখ হয়ে ওঠে। তার পছন্দমতো কথা বলা, পোশাক পরা, বাইরের কারও সঙ্গে তাকে নিয়ে আলোচনা করা, সারাদিন তারই চিন্তায় ব্যস্ত থাকা, চোখের সামনে না থাকলে ফোনের মাধ্যমে টাচ-এ থাকার চেষ্টা ইত্যাদি ইত্যাদি। এই সব ক্ষেত্রে পার্টনার যদি ওবসেসড মানসিকতা বুঝতে পারে তাহলে সে তার নিজের দরকারে ব্যবহার পর্যন্ত করতে পারে। ফলে সাইকোলজিক্যালি ড্রেন্ড আউট হয়ে পড়তে পারেন। এতে জীবনে একটা বড়ো পরিবর্তন আসতে পারে। হঠাত্ করে অপর এক ব্যক্তি আপনার জীবনকে যদি কন্ট্রোল করতে শুরু করে দেয়, তখন এক দমবন্ধ পরিস্থিতি তৈরি হয়। এই সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা দুষ্কর হয়ে ওঠে।

বাঁচার উপায়

  •  কোনও ব্যক্তিকে আপন ভেবে নিজের সব কিছু তার সামনে পরিষ্কার করে তুলে ধরা উচিত নয়। সব সময় একটা সীমার মধ্যে থেকে ভালোবাসার চেষ্টা করুন
  •  কারও জন্য নিজের আইডেন্টিটি হারিয়ে ফেলবেন না। মনে রাখবেন আপনার আইডেন্টিটি, আপনার আসল পরিচয়
  •  নিজের পছন্দের কাজ করতে থাকুন যাতে পার্টনারের অনুপস্থিতিতে আপনি ভেঙে না পড়েন এবং ধ্বংসের মুখে চলে না ।

মানসিক চাপ বাড়ছে মহিলাদের

নারীশক্তি ছাড়া আজ পর্যন্ত পৃথিবীতে কোন কিছুই সম্ভব হয়নি। যেমন মাতৃত্ব ছাড়া সন্তানের জন্ম ধারণ অসম্ভব ঠিক তেমনি এই নারীশক্তির প্রভাবেই সমাজ-সংসার, নানা সময়ে নানা পরিবর্তনের শরিক হয়েছে৷ পরিবর্তিত হয়েছে। নারীরা নিজেদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভাবে চতুর্দিকে বিছিয়ে রেখেছেন। যদিও নারীকে আমরা পুরুষের হাতে বেশির ভাগ সময়ই, অবমাননা এবং অত্যাচারে লাঞ্ছিত অবস্থায়  দেখতে অভ্যস্ত — তবু এই নারীই সংসারের অর্থনৈতিক দায়িত্ব এখন ভাগাভাগি করে নিয়েছেন, বাড়ির পুরুষ সদস্যটির সঙ্গে। ফলে কর্মরতা অথবা উপার্জনশীল মহিলাদের সংখ্যাটা এখন অনেক। জীবনকে মসৃণ করতে একদিকে যেমন মহিলাদের দায়িত্ব বেড়েছে, অন্যদিকে মানসিক চাপও কয়েকগুনে বৃদ্ধি পেয়েছে।

চাকরি বা ব্যাবসা, সংসারের হাতা-খুন্তি, বাচ্চার যত্ন, বয়স্কদের কেয়ার-গিভার– এমন নানা ভূমিকায় মেয়েরা যুক্ত থাকেন। প্রতিটি কাজেই প্রয়োজন ধৈর্য ও বুদ্ধির প্রয়োগ। যারা সেই চাপ সামলাতে পারছেন, তারা সমস্যায় পড়ছেন না। কিন্তু সমস্যা বাড়ছে তাদের, যারা সমস্ত কাজের সমন্বয় স্থাপন করতে পারছেন না। আপনি নিজেও যে অতিরিক্ত মানসিক চাপের শিকার হয়েছেন, এটা বুঝবেন তখনই — যখন মানসিক দুশ্চিন্তার ফলে কাজকর্ম ব্যাহত হবে। খিদে না পাওয়া, ভয় ভয় ভাব, অযথা টেনশন করা, ঘুম কমে যাওয়া, ঘন ঘন মলমূত্র ত্যাগ, এসবই মানসিক চাপ নিতে না পারার প্রাথমিক লক্ষণ।

আমাদের শরীরে বিভিন্ন হরমোনের মধ্যে, অন্যতম হল কর্টিজোল হরমোন। মানসিক চাপ বাড়ার ফলে এই হরমোনের ক্ষরণ বাড়তে থাকে। ফলে নানারকম রোগের সূত্রপাত হয়। করোনারি হার্ট ডিজিজ, হাই ব্লাড সুগার, রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমতে থাকা, ক্যানসার হলে তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়া, এমন নানা রোগ বাসা বাঁধে শরীরে।

চাপ এড়াবেন কী ভাবে?

  • টাইম ম্যানেজমেন্ট রপ্ত করতে হবে। কাজ আর বিশ্রামে যেন সমন্বয় থাকে
  • বাড়িতে থাকলে, বাড়ির অন্য সদস্যদের সাহায্য নিতে হবে সংসারের কাজে। অফিসে সহকর্মীদেরও সহযোগিতা চাইতে হবে
  • কতটা কাজের চাপ আপনি নিলে, তা সময়মতো শেষ করতে পারবেন সেটা নিজেকেই ঠিক করতে হবে। বাড়তি কাজের বোঝা চাপলে ‘না’ বলতে হবে
  • কঠিন সমস্যায় পড়লে অন্তত একজন বন্ধু বা শুভাকাঙ্খীর সঙ্গে সমস্যাটা ডিসকাস করুন। এতে সমাধান খোঁজা সহজ হবে
  • শত ব্যবস্ততার মাঝেও নিজের জন্য কিছুটা সময় বের করে নিতে হবে। যে-সময়টাতে নিজের ভালো লাগার জিনিসে ইনভলভড থাকতে পারবেন
  • প্রতিদিন প্রাণায়াম করুন ও পুষ্টিকর খাবার খান
  • টেনশন হলেই নেশার সামগ্রী আঁকড়াবেন না
  • মাঝেমধ্যে কাউন্সেলিং করান। মন হালকা হবে। 

কৃষ্ণগহ্বর

‘ডিভোর্স! কিছুতেই নয়।’

কাঁপা গলায় সিদ্ধান্ত জানাল রূপম। সবে অষ্টমঙ্গলা পেরিয়েছে। উপহারের প্যাকেটগুলোও সব খোলা হয়নি। ফুরোয়নি আয়োজনের প্রশংসাও। তারই মধ্য ডিভোর্স? আজকাল অবশ্য ডিভোর্স নিয়ে মানুষের সংকোচ অনেকটাই কম। পাত্র-পাত্রীর বিজ্ঞাপনে তাই প্রচুর ডিভোর্সি। আধুনিকমনস্ক মানুষ হতাশা প্রশ্রয় দেয় না, ‘লেটস্ ট্রাই অ্যাগেন’-এ বিশ্বাসী। একবার ফেলিয়োর হয়েছে তো কী? পরের বার নিশ্চয়ই ক্লিক করবে। কিন্তু বাবার সামনে এসব যুক্তি অচল। নিজের পছন্দ করা পাত্রীর সঙ্গে ছেলের বিয়ে টিকল না, কিছুতেই মানতে পারবেন না। আসলে মানতে পারবেন না যে, নিজের সিদ্ধান্তে কোনও গলদ থাকতে পারে। লোকের চোখে জেদি একগুঁয়ে ঠেকলেও, রূপম জানে মানুষটার আত্মবিশ্বাস প্রবল। শুনলেই গুম মেরে যাবেন, আত্মগ্লানিতে জর্জরিত হবেন, তারপর অসুস্থ। দু’বার হার্ট অ্যাটাক হয়ে গিয়েছে। আর ঝুঁকি নেওয়া যায়?

বিয়েটা হয়েছিল সম্বন্ধ করে, ঘটকমশাইয়ের সৗজন্য। পাত্রী বারাসতের। পালটি ঘর। ঠিকুজি ও রাজজোটক। চার হাত এক হতে দেরি হয়নি। বারাসত থেকে সাড়ম্বরে হাবড়ায় এসে উঠেছিল সালঙ্কারা মৃত্তিকা। তারপর রাজারহাটের ফ্ল্যাটে। ফ্ল্যাট বুকিংটা করেছিল বাবা-ই। স্কুল শিক্ষকের সামান্য মাইনেও বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি।   দূরদৃষ্টিতে বুঝেছিলেন, একসময় ছেলের কলকাতায় থাকার প্রয়োজন পড়বেই। তাই কষ্ট হলেও নিয়মিত মিটিয়েছেন কিস্তির টাকা। পড়াশুনায় রূপম বরাবরই ভালো। ক্লাসে ফার্স্ট ছাড়া সেকেন্ড হয়নি কখনও। জয়েন্টও এক চান্সেই। তারপর সেক্টর ফাইভে সফ্টওয়্যার ইঞ্জিনিয়র। বিয়ের আগেই ছেলের নামে ফ্ল্যাট লিখে দিয়েছিলেন বাবা। বেশিরভাগের মতো শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আঁকড়ে থাকেননি। নিজের জন্য হাবড়ার বাড়িই যথেষ্ট। এইরকম একজন আত্মত্যাগী মানুষ, যিনি সারাটা জীবন ব্যয় করলেন সন্তানের মঙ্গল কামনায়, তাঁকে কেমন করে বলবে ডিভোর্সের কথা? তাও বিয়ে মিটতে না মিটতেই!

প্রথমে রূপম, মৃত্তিকা, কেউই সমস্যাটা বুঝতে পারেনি। ফুলশয্যার রাত যেন ঘোর লাগা। দুজনেরই বিপরীত লিঙ্গের প্রথম সান্নিধ্য। স্বপ্ন, বাস্তব মিলেমিশে একাকার। আদরে, কথায়, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় রাত কাবার। পরদিনও বুঝতে পারেনি। তারপরদিনও না। মনে হয়েছিল নতুন-নতুন বোধহয় এরকমই হয়। আনকোরা অভিজ্ঞতায় অনভ্যস্ত শরীর-মনকে বোঝাপড়ার সময় দিতে হয়! প্রথম বুঝল মৃত্তিকা, অষ্টমঙ্গলায় বাপের বাড়ি গিয়ে। বান্ধবীদের কাছে তাদের বিবাহোত্তর অভিজ্ঞতা শুনে আশঙ্কা জাগল। ফিরে এসেই লজ্জা, সংকোচ ত্যাগ করে রূপমকে বাধ্য করল আপ্রাণ প্রচেষ্টায়। একবার নয় বারবার। অবশেষে ক্লান্ত অনুনয়, ‘আমি ডিভোর্স চাই’।

ডিভোর্সে সন্মতি না দিলেও চিকিৎসায় সন্মতি দিল রূপম। মেনে নিল নিজের অক্ষমতা। স্বাভাবিক ভাবেই বাতিল হল হনিমুনের প্ল্যান। মৃত্তিকার মায়ের আচমকা শরীর খারাপ অজুহাতের সুবিধে করে দিল। রূপম একাই ফিরে এল রাজারহাটে। খামোখা অফিসের ছুটি নষ্ট করার কোনও মানে হয় না।এই ধরনের সংকটে সাধারণত বন্ধুরাই সহায় হয়। কিন্তু রূপমের এমন কোনও বন্ধু নেই যার কাছে অকপট হওয়া যায়। রাজারহাটে ভালো করে পরিচয়ই হয়নি কারও সঙ্গে। স্কুল-কলেজের বন্ধুদের সঙ্গেও যোগাযোগ নেই বহুদিন। হাবড়ার পাড়াতেও তেমনভাবে মেশেনি কখনও। স্কুল, লাইব্রেরি আর পড়ার টেবিলেই সময় কাটিয়েছে। বাবারও কড়া নির্দেশ ছিল পাড়ায় না মেশবার। সবাই নাকি অপগণ্ড, মিশলে ভবিষ্যৎ দফারফা। নইলে প্রায় সব পাড়াতেই একাধিক যৗন বিশেষজ্ঞ থাকে। রূপমদের পাড়াতেও হয়তো ছিল। তাদেরই কেউ না কেউ নিশ্চিত একটা উপায় বাতলাতো।

বাবাকে বলার প্রশ্ন নেই। আত্মীয়স্বজনদের মধ্যেও তেমন ঘনিষ্ঠ কেউ নেই। থাকলেও নির্ঘাৎ ভ্রু কোঁচকাতো। এ আবার কী উটকো ঝামেলা? ছেলেমেয়ের বিয়ে হলে ক’দিন আমোদ-আাদ করবে, তারপর বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে নিশ্চিন্ত ঘরকন্না। এভাবেই ভাবতে অভ্যস্থ মধ্যবিত্ত আটপউরে মানসিকতা। সাহায্য তো মিলবেই না, অযথা উপদেশ সহানুভূতিতে প্রাণ ওষ্ঠাগত হবে। তাই ইন্টারনেটের সাহায্য নিল রূপম। অনেক খুঁজে-পেতে বিদেশি ডিগ্রিধারী একজন ডাক্তার নির্বাচন করল। শুরু হল চিকিৎসা। বিস্তর টেস্ট, ওষুধের সঙ্গে সপ্তাহে দু’দিন কাউন্সেলিং। ফল মিলবে মাসখানেক পর। শাশুড়ির শরীর খারাপ সারলেও মৃত্তিকাকে ফ্ল্যাটে আনল না রূপম। বিষাদ প্রতিমা দেখতে কারই বা ভালো লাগে? চিকিৎসার মেয়াদ পূর্ণ হতেই আকুল আহ্বান। সুখী দাম্পত্য সাকার করতে মৃত্তিকাও এগিয়ে এল। কিন্তু বারংবার চেষ্টাতেও সুখ ধরা দিল না কিছুতেই। এবার অনুনয়ের সঙ্গে কান্না, ‘আমার জীবনটা এভাবে নষ্ট কোরো না রূপম। আমাকে ছেড়ে দাও।’

হার না মানাটা বোধহয় কিছু মানুষের জন্মসিদ্ধ। পাশার দানে সর্বস্ব পণ রাখতেও দ্বিধা হয় না। অনেক বুঝিয়ে-সুঝিয়ে মৃত্তিকাকে নিরস্ত করল রূপম। চাইল আরও কিছু সময়। সাময়িক আবেগে ধবংসের স্পৃহা জাগালেও, ঠান্ডা মাথায় স্থির পরিস্থিতি অস্থির করা সহজ কথা নয়। তাই রূপমের প্রস্তাবে রাজি হল মৃত্তিকা।

এবার নতুন ডাক্তার। ট্রিটমেন্ট প্রসিডিওর একেবারেই আলাদা। টেস্ট এবং ওষুধের সঙ্গে স্বামী-স্ত্রী দুজনকেই প্রয়োজন। দ্রুত সিদ্ধান্তে পৗঁছোনোর তাগিদে সঙ্গ দিল মৃত্তিকা। ডাক্তার ওষুধের সঙ্গে দিলেন সুখী দাম্পত্যের গাইডলাইন। মেনে চললে অব্যার্থ ফল। নিষ্ঠা সহকারে মানাও হল বেশ কিছুদিন। তবুও দাম্পত্য সুখ অধরাই। এবার গর্জে উঠল মৃত্তিকা, ‘কালই আমি এ বাড়ি ছেড়ে চলে যাব।’

চলে গেলেও ফিরতে হল পরদিনই। বাবা নিজে এসে পৗঁছে দিয়ে গেলেন। বাড়ি ছাড়ার কারণটা একজন অপরিণত যুবতির পক্ষে অসামান্য হলেও, অভিজ্ঞ বাপ-মায়ের কাছে ততটা নয়। বাড়ির সন্মান, সমাজ, লোকলজ্জা, অনেক কিছুই ভাবতে হয়। এত সহজে রূপমের মতো পাত্র হাতছাড়া করাও কাজের কথা নয়। তা ছাড়া ডাক্তারি চিকিৎসাই তো একমাত্র উপায় নয়। ঈশ্বর আছেন, গুরুদেব আছেন, আছে শেকড়-কবচ-মহামূল্য রত্নও। পাড়ার গনশা প্রায় পাগলই হয়ে গিয়েছিল, সেরে উঠল তো তন্ত্র-মন্ত্রের জোরেই। বলাইবাবুরা দশ বছর সন্তানসুখ থেকে বঞ্চিত ছিলেন। গুরুদেবের আশীর্বাদে কোল আলো করে ছেলে এল। তাই মেয়েকে ফেরত পাঠিয়ে মা হত্যে দিলেন ঠাকুরের থানে, গুরুদেবের আশ্রমে, জ্যোতিষদের চেম্বারে। মিরাকেল আজও ঘটে।

ভয়ে বা লজ্জায় মানুষ প্রথমে পিছোতে থাকে। কিন্তু দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে আক্রমণই স্বাভাবিক প্রবৃত্তি। রূপম নিজের অক্ষমতা মেনে নিয়েছিল সাফল্যের বিশ্বাসে। আপাতত হেরে গেলেও, জিত সময়ের অপেক্ষামাত্র। কিন্তু নিরন্তর চেষ্টা করেও যখন ফল মিলল না, তখন রুখে দাঁড়াল। দায়ী করল মৃত্তিকাকে। মৃত্তিকার অসহযোগিতার জন্যই নাকি চিকিৎসার পূর্ণ ফল লাভ সম্ভব হচ্ছে না। মিথ্যে অনুযোগেও মৃত্তিকা নির্বিকার। ও-বাড়ি থেকে ফিরেই বিদ্রোহের আগুন নিভে গিয়েছে। জানা হয়ে গিয়েছে আজীবন গুমরে মরার ভবিতব্য। তাই রুপম চেষ্টা করতে চাইলে নির্দ্বিধায় সাড়া দেয়। অসাড় সাড়া। নগ্ন, শীতল দেহ এলিয়ে পড়ে থাকা। মৃত্তিকার নিস্পৃহভাব একসময় হিংস্র করে তুলল রুপমকে! কিছুতেই মানতে পারল না সামান্য এক নারীর কাছে পরাজয়ের গ্লানি। শুরু হল নির্যাতন। কখনও যৗন উৎপীড়ন। দু’বাড়ির কেউ জানতেও পারল না, ভরা নদীতে চর পড়ছে।

অত্যাচারে সাময়িক তৃপ্তি মিললেও, পরাজয়ের গ্লানি মোছে না। জেদ বাড়তে লাগল রূপমের। ইতিমধ্যে খান দশেক ডাক্তার পালটেছে। সকলেরই এক রা– স্ট্রেস, স্ট্রেন, অ্যাংজাইটি, টেনশনই মূল শত্রু। গুচ্ছের ওষুধ আর কাউন্সিলিংয়েই মুক্তি। কাউন্সিলিং তো নয়, যেন পুলিশি জেরা। মনটাকে নিয়ে ইচ্ছেমতো ফুটবল খেলা। একসময় বিরক্ত হল রূপম। তা ছাড়া টাকা, সময় নষ্টের ফল কী হচ্ছে, তাও জানার উপায় নেই। মৃত্তিকার মধ্যে সুখ খোঁজা অর্থহীন। মরা নদীতে জোয়ার আসে না।

কাগজে আজকাল নানারকম বন্ধুত্বের আহ্বান। তাদের মধ্যে থেকে কাউকে বেছে নিলেই হয়তো মিলতে পারে সুখের চাবিকাঠি। ভরসা পেল না রূপম। অজানা প্রলোভনে বিপদের সম্ভবনাও কম নয়। মাঝেমধ্যেই খবরের কাগজে স্পা, মাসাজ পার্লারের নানারকম কেচ্ছা বেরোয়। বাড়িতে জানাজানি হলে কেলেঙ্কারির একশেষ। সেদিক দিয়ে সোনাগাছি সুবিধেজনক। খোলা বাজারে ফেলো কড়ি মাখো তেল। আগে কখনও না গেলেও, জায়গাটা চেনা। কলেজের বন্ধুদের সঙ্গে গিয়েও গলির ভিতরে ঢোকেনি। প্ররোচনা, প্রলোভনও টলাতে পারেনি পিতৃদত্ত আদর্শ, নৈতিকতা। কিন্তু পরিস্থিতির চাপে এবার বেপরোয়া হতেই হল। রোগের ভয় থাকলে, সুরক্ষাও আছে। দ্বিধা,  দ্বন্দ্ব ঝেড়ে ফেলে পা বাড়াল সোনাগাছির দিকে।

সোনাগাছিতে ঢুকে চোখ ধাঁধিয়ে গেল রুপমের। একসঙ্গে এত মেয়ে জীবনে দেখেনি। রাস্তায় সার দিয়ে দাঁড়ানো মেয়ের দল। বিভিন্ন বয়সি। পোশোকও হরেকরকম। রুপমের অনভিজ্ঞতা ধরা পড়তে দেরি হল না ওদের অভিজ্ঞ চোখে। শুরু হল ইশারা, ইঙ্গিত, হাত ধরে টানাটানি। কেউ কেউ টোন-টিটকিরিও করল। কুঁকড়ে গেল রূপম। লজ্জা, ভয় যেন একসঙ্গে চেপে ধরতে চাইল। ফিরে যাবে কি যাবে না ভাবতে ভাবতেই, কে যেন কনুইয়ের পাশ দিয়ে হাত গলিয়ে দিল। অচেনা স্পর্শে শিউরে উঠল রূপম। দেখল লাল শাড়ি, লাল ব্লাউজ, খোলা চুলের একটি মেয়ে। ফরসা মুখে লাল লিপস্টিক। যেন লালপরি। লতার মতো জড়িয়ে ধরেছে। রুপম কিছু বুঝে ওঠার আগেই জাদুকণ্ঠে বলল, ‘চলো…’, যেন কতকালের চেনা।

মন্ত্রমুগ্ধের মতো চলল রূপম। কোথায় যাবে, কত টাকা দিতে হবে, কিছুই জিজ্ঞাসা করার কথা মাথায় এল না। লালপরি নিয়ে চলল রূপকথার রাজবাড়িতে। ব্রিটিশ আমলের জীর্ণ বাড়ি। লোহার ঘোরানো সিঁড়ি বেয়ে উঠতে হল দোতলায়। ছোট্ট একটা ঘরের তালা খুলে আলো জ্বালল মেয়েটি। তারপর যাদুকণ্ঠের আহ্বান, ‘ভেতরে এসো…’

নিশিতে পাওয়া মানুষের মতো এগিয়ে গেল রূপম।

‘জুতো বাইরে… জুতো বাইরে’, জাদুকণ্ঠে ইষৎ ভাটা।

বাইরে জুতো খুলে ঘরে ঢুকতেই দরজা বন্ধ।

‘টাকা বের করো’, জাদুকণ্ঠ উধাও হয়ে কেঠো ব্যাবসা।

ঘোর কাটল রূপমের। টাকা দিতে হবে জানত, কিন্তু সে প্রসঙ্গ যে প্রথমেই আসবে জানা ছিল না। ভেবেছিল সুখের চাবিকাঠি হাতে ধরিয়ে তারপর টাকা চাইবে। কাঁপা গলায় বলল, ‘কত?’

একটু থমকাল মেয়েটি। আপাদমস্তক রূপমকে জরিপ করে বলল, ‘সাতশো…’

মানিব্যাগ খুলে টাকা বের করে দিল রূপম। টাকা গুনতে গুনতে মেয়েটি বলল, ‘দাঁড়িয়ে রইলে কেন? তাড়াতাড়ি কাজ না সারলে আরও বেশি লাগবে কিন্তু…’

‘কাজ!’, অজান্তেই বলে ফেলল রূপম। বিষয়টা যে ‘কাজ’-এর পর্যায়ে পড়ে সেটা ওর কল্পনার অতীত।

‘ওরে আমার ন্যাকা চৈতন্য রে! কাজ করবে নাতো কী করবে? ওসব ছবি-টবি আমি তুলতে দিই না। কাজ করবে তো করো, নইলে কেটে পড়ো’, আচমকাই পরি যেন রাক্ষসী। ঠোঁটে সদ্য চোষা রক্ত।

দমে গেল রূপম। সুখের চাবিকাঠি যে এখানে মিলবে না নিশ্চিত হল।

বেরোতে গিয়েও বাধা। দরজা আগলে মেয়েটি বলল, ‘আরও শ’দুয়েক দাও। মেজাজ খিঁচড়ে গেছে, একটু মাল না টানলে মুড আসবে না’, মুরগি যখন মিলেইছে, তখন জবাই করতে দোষ কী? পরের খদ্দের নাও জুটতে পারে।

ন্যায্য যুক্তি মেনে আরও শ’দুয়েক খসাতেই হল রূপমকে।

নরম মাটি পেয়ে হালকা আঁচড় কাটল মেয়েটি। পিঠে হাত বুলিয়ে মোলায়েম আবদার, ‘পুরোপুরি হাজারই দাও…’

শরীর আর মন যেন হাত ধরাধরি করে চলে। শরীর খারাপ হলে মন খারাপ হয়, আবার মনের অসুখ শরীরকেও প্রভাবিত করে। মনের উত্তেজনা তো শরীরকে উসকে দেয়ই, শরীরও মাঝেমধ্যে মনকে উসকায়। রূপমের শরীর, মন কিছুতেই যেন একসঙ্গে চলতে চায় না। অথচ একটা সময় পর্যন্ত কিন্তু হাত ধরাধরি অটুটই থাকে। আগুন জ্বলে একসঙ্গেই। আদরে আদরে ভরিয়ে দিতে ইচ্ছে করে মনের মানুষকে। কখন যে আবরণ খসে যায় হুঁশও থাকে না। তারপরেই ছাড়াছাড়ি। শরীর উলটো মুখে হাঁটা লাগায়। হাজার ডাকে সাড়া মেলে না।

কারণটা যে একেবারেই অজানা তা নয়। ভাবলেই লজ্জা, অনুশোচনায় কুঁকড়ে যায় মন। কদর্য অতীত যে মন-মস্তিষ্ককে এইভবে ছেয়ে ফেলবে ভাবতেও পারেনি। তবুও অস্বীকার করতে চেয়েছে, ভুলে যেতে চেয়েছে। আপ্রাণ চেষ্টা করেছে মনকে বোঝাতে যে, কোনওরকম অন্যায় ঘটেনি। বৃথা চেষ্টা। তবে সেই কারণেই এই অক্ষমতা কিনা সঠিক জানা নেই। শুধুই অনুমান। কিনারায় পৗঁছে দেওয়ারও কেউ নেই। ডাক্তারবাবুরাও নয়। ওঁরাও তো মানুষ। মানুষের কাছে মনুষ্যতর আচরণের কথা বলা যায় কখনও?

বিছানা এক থাকলেও, শোয়ার ভঙ্গি পালটেছে অনেকদিনই। দু’পাশ ফিরে দু’কোনায়। সারাদিনে কেজো কথা ছাড়া কথাও হয় না। তবুও আজকাল বউকে কাছে পেতে ইচ্ছে করে রুপমের। সোনাগাছির অভিজ্ঞতার পরে বাইরের মেয়েমানুষে আর ভরসা নেই। সবাই লোভী, সুযোগসন্ধানী। কিন্তু বউকে কাছে পাবার উপায় আর নেই। মৃত্তিকা যেন ঘুমন্ত রাজকন্যা। রূপমের কাছে নেই জিওন কাঠি। তাই ফিরিয়ে নেয় প্রসারিত হাত। গুমরে কাটায় কালরাত্রি।

হঠাৎই এক হাকিমের সন্ধান পেল রূপম। মোগল আমলে হাকিমরা নাকি অসাধ্য সাধন করত। অন্তত প্রস্রাবগারের বিজ্ঞাপনে তেমনটাই দাবি করা হয়েছে। কয়েকজনের বাস্তব অভিজ্ঞতার বিবরণও রয়েছে। দেশি-বিদেশি ডিগ্রির পিছনে ছুটে লাভ কিছুই হয়নি, তাই মল্লিকবাজারের গলি-ঘুঁজি পেরিয়ে রূপম হাজির হল সেই হাকিমের কাছে। বৃদ্ধ হাকিমসাহেব মন দিয়ে সমস্যা শুনলেন, তারপর ওষুধ দিলেন। সপ্তাহ দুয়েক পরে আবার আসতে বললেন।

শ্বশুর-শাশুড়ি যেন গোদের উপর বিষফোড়া। রূপমের তীব্র আপত্তি সত্ত্বেও মেয়ে-জামাই দুজনকেই গুরুদেবের কবচ, জ্যোতিষিদের রত্ন ধারণ করিয়েছেন। বার বার স্মরণ করিয়েছেন পেঁয়াজ, রসুন যেন কিছুতেই না খাওয়া হয়। তা হলে কবচের ফল মিলবে না। শনিবার অবশ্যই নিরামিষ। অগ্রাহ্য করারও উপায় নেই। মাঝেমাঝেই উজিয়ে এসে বিরক্তিকর তদারক। বাবা এত কিছু জানেন না। তবুও, রূপমরা হাবড়ায় গেলে ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘তোমরা ভালো আছো তো?’

দু’সপ্তাহ ওষুধ খাবার পর আবার মল্লিকবাজারে গেল রূপম। হাকিমসাহেব অনেকক্ষণ নাড়ি ধরে বসে রইলেন। তারপর গম্ভীর মুখে জানালেন, ওষুধের কাজ শুরু হয়েছে। তবে কতটা কাজ হয়েছে সেটা বাস্তব অভিজ্ঞতা দিয়েই বুঝতে হবে। ফ্যাসাদে পড়ল রুপম। মৃত্তিকার সঙ্গে আর এক্সপেরিমেন্ট সম্ভব নয়। এদিকে পরীক্ষা না করেও উপায় নেই। বলা যায় না, বিজ্ঞাপনের কথা হয়তো মিথ্যে নয়। সমাধান বাতলালেন হাকিমসাহেব।

আবার ও-পাড়ায় যেতে হল রূপমকে। এবার হাড়কাটা। হাকিমসাহেবের কথা মতো নির্দিষ্ট বাড়িতে গিয়ে চপলামাসির সঙ্গে দেখা করল। তিনিই নিয়ে এলেন বছর কুড়ির প্রতিমাকে। দেখেই পছন্দ হল রূপমের। ফরসা রং, গোল মুখ, টানা চোখ, অনেকটাই যেন আসল প্রতিমা। সারাক্ষণ মুখে হাসি লেগেই রয়েছে। রেটও কম, পাঁচশো। সানন্দে রাজি হয়ে গেল রূপম। ঠিক করল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে কিছু বকশিশও দেবে।

বেশ খাতির করেই ঘরে নিয়ে এল প্রতিমা। ঘর আহামরি কিছু না হলেও চলনসই। দুষ্টু হেসে বলল, ‘বিয়ার খাবে?’

‘আমি তো… মানে… মদ খাই না…’, বলতে যেন বাধল রূপমের।

‘ওমা বিয়ার আবার মদ নাকি! তা হলে একটা সিগারেট দাও’, প্রতিমার আদুরে আবদার।

‘সিগারেট মানে…আমি তো খাই না’, লজ্জায় যেন মাটিতে মিশে যেতে ইচ্ছে করল রুপমের।

‘তুমি তো ভালো ছেলে গো! তা এ পাড়ায় কেন? বউয়ের সঙ্গে ঝগড়া?’, হাসিতে ঢলে পড়ল প্রতিমা।

রুপম উত্তর দিল না। প্রতিমার ব্যবহারে প্রথম থেকেই মুগ্ধ। প্রতিটা কথাই হাসিমাখা, আন্তরিক। টাকাও চায়নি। মনে মনে ধন্যবাদ জানাল হাকিমসাহেবকে। শরীরও জেগে উঠছে। নিশ্চিত সাফল্যর আশায় শিহরণ জাগল।

‘কী গো… চুপ করে রইলে যে? বউয়ের সঙ্গে ঝগড়া করেছ, না?’, প্রতিমা প্রায় মুখের কাছে। রূপমের ইচ্ছে করল জড়িয়ে ধরতে। তখনই ফোন। সামান্য ‘হ্যাঁ’, ‘হুঁ’ করেই ফোন ছাড়ল প্রতিমা। তারপর রূপমের গাল টিপে বলল, ‘তুমি একটুখানি বোসো, আমি এক্ষুনি আসছি।’ আপত্তি করল না রূপম। মানুষের দরকার থাকতেই পারে। তা ছাড়া মেওয়া ফলাতে গেলে একটু সবুর করতেই হয়। প্রতিমা দরজা ভেজিয়ে চলে গেলে বিছানায় আধশোয়া হল। মজে গেল সুখস্বপ্নে।

‘ওমা… তুমি একলা যে! প্রতিমা কোথায়?’

চমকে উঠল রূপম। দরজায় চপলামাসি, সঙ্গে মাঝবয়সি এক মহিলা। তড়াক করে উঠে দাঁড়াল। আমতা-আমতা করে বলল, ‘একটু বাইরে গেছে… দরকারে।’

‘দরকার না ছাই… গেছে ওই অটোওয়ালা কানুর খাঁই মেটাতে’, ঝাঁঝিয়ে উঠল সঙ্গের মহিলাটি।

‘তা বলে ঘরে খদ্দের বসিয়ে চলে যাবে?’, চপলা বিরক্ত।

‘যাবে না কেন? কানু যে বিয়ের লোভ দেখাচ্ছে’, মহিলার মুখ বিকৃতি।

‘থাক… আমায় আর শেখাস না মালতী। মাগি পাড়ার মেয়ে নিয়ে সংসার পাতবে ওই হারামজাদা? অত ধক আছে ওর?’ গর্জে উঠল চপলা। জীবনে পুরুষমানুষ কিছু কম দেখল না।

‘আমার অত জানার দরকার নেই মাসি। কাস্টমার দাঁড়িয়ে আছে। তোমার ঘর হবে, নাকি অন্য ঘর দেখব?’ মালতীর সাফ কথা।

বিচলিত হল চপলা। ভেবেছিল প্রতিমার ‘কাজ’ হয়ে গিয়েছে, মালতীকে ঘর দিতে সমস্যা হবে না। এখন মালতী অন্য ঘরে যাওয়া মানে সাধা লক্ষ্মী পায়ে ঠেলা। কিন্তু এই খদ্দের হেকিমসাহেবের পাঠানো। অবহেলা করলে অসন্তুষ্ট হবেন। আগে নিয়মিতই আসতেন। এখনও প্রয়োজন পড়লে আসেন, মেয়েদের চিকিৎসা করেন। ভালো মানুষটাকে চটাতে মন চাইল না। অথচ প্রতিমাও যে কতক্ষণে আসবে তারও কোনও ঠিক নেই। পরিস্থিতি সামলাতে রূপমকে বলল, ‘আমি বাইরে চেয়ার দিচ্ছি, তুমি একটু বোসো বাছা। প্রতিমা আসুক, তারপর…’

ছিটকে বেরিয়ে এল রূপম। অপমানে মাথা ঝাঁঝা করছে। হাকিমসাহেবের সুপারিশে এসেছে, তাও ঘর থেকে বের করে দিল? বললে নয় বেশি টাকাই দিত। সব রাগ গিয়ে পড়ল হাকিমসাহেবের উপর। ফোনে যাচ্ছেতাই গালাগাল করল। ওখানে যে আর কখনওই যাবে না, সেটাও জানিয়ে দিল। রাগে গজগজ করতে করতে আনমনেই চলে এল মেডিকেল কলেজের সামনে। তারপর ছানাপট্টির পাশের গলিটায়। হঠাৎই চোখে পড়ল, প্রসন্নময়ী ঔষধালয়। আয়ুর্বেদীয় প্রতিষ্ঠান। স্থাপিত ১৯২৫। প্রতিষ্ঠাতা – বৈদ্যনাথ কাব্যতীর্থ (যৗনরোগ বিশেষজ্ঞ)। ‘শালা… এটাই বা বাদ থাকে কেন?’, দপদপিয়ে ঢুকে পড়ল রূপম।

কবিরাজমশাই ষাটের কোঠায়। ফাঁকা দোকানে পেসেন্স খেলছিলেন। রূপম ঢুকতেই মুচকি হাসলেন। বাধ্য হয়েই প্রপিতামহের নামের তলায় বন্ধনির বাক্যটা জুড়েছেন। এলাকায় কদর পেতে সুবিধে। ছেলেটি যে ওইটির জন্যই ঢুকেছে বুঝতে অসুবিধে হয়নি। নইলে আজকাল আর বিশেষ কেউ কবিরাজি চিকিৎসায় ভরসা রাখে না। ইয়ং জেনারেশন তো নয়ই। রূপমকে বসতে ইশারা করলেন। তারপর মুখে এক খিলি পান ফেলে বললেন, ‘এ পাড়ায় এলে রোগ হবেই, বুঝলেন। শিবের বাপেরও সাধ্যি নেই আটকায়। তবে আমি যতক্ষণ আছি ততক্ষণ চিন্তা নেই। যত ইচ্ছে রোগ বাধান, ঠিক সারিয়ে দেব।’

‘এডস্ হলেও?’, গরম মাথায় হামবড়াভাব সহ্য হল না রূপমের। প্রশ্নটা করেই ফেলল।

‘হয়েছে নাকি?’, চশমার ফাঁক দিয়ে কবিরাজের কৗতূহল।

‘হয়নি… কিন্তু হলে সারাতে পারবেন?’, রূপম চ্যালেঞ্জের ভঙ্গিতে।

‘পরীক্ষা?… টেস্ট?’, ভ্রু কোঁচকালেন কবিরাজ। ‘শুনুন মশাই, আমরা পাঁচ পুরুষের কবিরাজ। যমেও ভয় পায় আমাদের।’

রূপম বুঝল কথা বাড়িয়ে লাভ নেই। খামোখা ঝগড়া বাধবে। মাথা নেড়ে সায় দিল। খুশি হলেন কবিরাজ। ইশারায় পাশের চেম্বারে ডাকলেন। ঢুকতেই নিরুত্তাপ নির্দেশ, ‘নিন…খুলে ফেলুন।’

‘মানে?’, ঝাঁঝিয়ে উঠল রূপম। প্রথম থেকেই লোকটার হাবভাব কেমন যেন গা জ্বালানো।

‘প্যান্ট না খুললে রোগ বুঝব কী করে?’, ডাক্তারের মুখে মুচকি হাসি। ‘শালারা মাগিদের সামনে উদোম হবে, অথচ ডাক্তারের কাছে লজ্জা!’

‘না না… ওসব রোগের ব্যাপার নয়। আমার অন্য সমস্যা’, তাচ্ছিল্য ঝরাল রূপম। অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস অসহ্য।

‘সমস্যাটা কী?’

বছর নয় কি দশ। গরমের ছুটিতে খাওয়া-দাওয়ার পর বিছানায় শুয়ে গল্পের বই পড়ছিল। পড়তে পড়তেই তলিয়ে গেল গভীর ঘুমে। কারও নড়াচড়ার শব্দে আচমকাই ঘুম ভাঙল। চোখ মেলেই সঙ্গে-সঙ্গে বন্ধ। ততক্ষণে বুকের মধ্যে হাতুড়ি পেটা শুরু হয়েছে। খানিক বাদে চোখ খুলতেই হল। প্রথমে পিটপিট, তারপর ড্যাবড্যাব। দশ হাত তফাতেই মা কাপড় বদলাচ্ছে। ঘর একটাই, অন্য সময় হলে বাইরেই যেতে বলত। কিন্তু কচি ছেলের ঘুম ভাঙাতে বোধহয় মন চায়নি। মায়ের কাছে বয়স না বাড়লেও, মহিলাদের কাপড় বদলানোর দৃশ্য যে দেখা উচিত নয়, সে জ্ঞান তখন রূপমের হয়েছে। তবুও সংবরণ করতে পারল না। হয়তো অ-দেখার কৗতূহল অথবা নিষিদ্ধের স্বাদ আহরণ। একসময় আনমনেই ঘুরে দাঁড়াল মা। সন্মোহিত রূপম ভুলে গেল চোখ বন্ধ করতে। প্রথমে বিষ্ময় তারপর একরাশ ঘৃণা ঠিকরে উঠল মায়ের মুখে। কোনওরকমে কাপড় সামলে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল। মাসখানেকের মধ্যেই গলায় দড়ি দিল মা। পাপ, অপরাধবোধ গ্রাস করল রূপমকে।

আসল ঘটনাটা জেনেছিল অনেক পরে। মা সংসারে সচ্ছলতা চেয়েছিল। দিনরাত বাবাকে তাগাদা দিত প্রাইভেট টিউশনের জন্য। বাবার বন্ধুরা অনেকেই করত। কিন্তু বাবা নীতিগত কারণে কিছুতেই প্রাইভেট টিউশন করবেন না। টিভি নেই, ফ্রিজ নেই, টেলিফোন নেই, ভালো শাড়ি বা গয়নাও নেই। নেই-রাজ্যে কিছুতেই মানাতে পারল না মা। তার উপর বাড়িটাও শেষ করলেন না বাবা। তার আগেই ছেলের ভবিষ্যতের কথা ভেবে রাজারহাটে ফ্ল্যাট বুক করে বসলেন। ইটের গাঁথনির উপর অ্যাসবেস্টসের চালে থাকতে মায়ের সন্মানে বাধত। রোজই ঝগড়া, অশান্তি। কিন্তু বাবা নিজ সিদ্ধান্তে অটল। ছেলেকে কিছুতেই হাবড়ার এঁদো পাড়ায় থাকতে দেবেন না। উচ্চশিক্ষিত করে কলকাতায় প্রতিষ্ঠিত করবেন। যদি কলকাতার বাইরেও যায়, তা হলেও তো ফ্ল্যাটটা ছেলের ইনভেস্টমেন্ট হয়ে থাকবে। এই সব যুক্তি মানতে মা নারাজ। বর্তমান ছেড়ে ভবিষ্যতের পিছনে ছোটে কোন আহম্মকে? অশান্তি চরমে পৗঁছোল যেদিন বাবা, মায়ের এক আত্মীয়ের বিয়েতে সোনার গয়না দিতে অস্বীকার করলেন। বাবার সরল যুক্তি, নিজের ক্ষমতায় সীমাবদ্ধ থাকা। এদিকে সোনার গয়না না দিলে বাপের বাড়িতে মায়ের মান থাকে না। সেদিন রাতেই আত্মহত্যা করল মা।।

‘আপনার মা বুঝি খুব সুন্দরী ছিলেন?’

উত্তর করল না রূপম। স্মৃতিতে নাড়াচাড়া পড়ায় বিহ্বল। যে কথা আজ পর্যন্ত কাউকে বলেনি আজ রাগের মাথায় কবিরাজকে উগরে দিয়েছে।

‘আমি বলছিলাম… আপনার মা নিশ্চয়ই ফরসা ছিলেন। মুখশ্রী সুন্দর, ফিগার দারুণ, তাই না? চুল কি মাঝারি ছিল, নাকি বড়ো?’, হঠাৎ করেই কবিরাজ যেন পিঁপড়ে। রসের সন্ধান পেয়েছে। একঘেয়ে জীবনে এরকম খোরাক বড়ো একটা জোটে না।

রূপমের বুঝতে অসুবিধে হয়নি কবিরাজের উদ্দেশ্য। তবুও আমল দিল না। বহু বছর বাদে মায়ের চেহারাটা ভাবতে চেষ্টা করল। আবছা ছেঁড়া-ছেঁড়া টুকরো মনপর্দায় ভেসে উঠলেও, সম্পূর্ণ অবয়বটা কিছুতেই গড়তে পারল না। নিজের জন্মদাত্রীকে ভুলে গেল! আশ্চর্য লাগল রূপমের। মায়ের মৃত্যুর পর বাবা ঘরে কোনও ছবি রাখেনি। হয়তো ইচ্ছে করেই। কুড়ি বছরের উপর না দেখা একটা চেহারা ভুলে যাওয়াই তো স্বাভাবিক। তবে চেহারাটা মনে করতে পারলে বোধহয় ভালোই হতো। একবার যদি মায়ের হাসি মুখের একটা ছবি দেখতে পেত, তা হলে হয়তো কিছুটা স্বস্তি মিলত। শত চেষ্টাতেও রূপম মায়ের কোনও ছবি আঁকতে পারল না।

কিন্তু চেহারা ভুলে গেলেও, রূপম ভুলতে পারেনি ছোটোবেলার সেই অবাঞ্ছিত ঘটনা। মায়ের আত্মহত্যার আসল কারণ জেনেও নিজেকে পুরোপুরি নির্দোষ ভাবতে পারেনি। কখন যে ভাবনাটা মনের গভীরে চারিয়ে গিয়েছে বুঝতেও পারেনি। পারল বিয়ের পর। মৃত্তিকা আবরিত থাকলে কোনও অসুবিধেই নেই। স্বাভাবিক মানুষের মতোই উত্তেজনা জাগে। কিন্তু আবরণহীন হলেই মনে পড়ে সেই অমার্জনীয় অপরাধ। জাগে পাপ, অপরাধবোধ। চোখের সামনে তখন নিকষ কালো অন্ধকার। বিদ্যুৎগতিতে শরীর ধাবিত হয় সেই অন্ধকারের দিকে। মনের কথা মনেও পড়ে না।

‘আপনার মা কী অভিনয়-টভিনয় করতেন? মানে ফিল্ম অ্যাকট্রেস বা…’, রসের নাগাল পেতে পিঁপড়ে মরিয়া।

‘আমার মা খুবই কুৎসিত ছিলেন’, নিস্পৃহ গলায় বলল রূপম। বুড়োর ভিমরতি না থামালেই নয়।

‘ও… আচ্ছা আচ্ছা…’, নিজেকে সামলে নিলেন কবিরাজ। খদ্দের চটলে লক্ষ্মীও বিরূপ হবেন। মোলায়েম হেসে বললেন, ‘তা… কী চান আমার কাছে?’

রূপম শেষভাগটাও বলল। সবটা শোনার পর কিছুক্ষণ থম মারলেন কবিরাজ। তারপর বললেন, ‘আপনাকে একটা ওষুধ দিচ্ছি। তিনদিন এক দাগ করে দু’বেলা খাবেন। যদি সমস্যা না মেটে ফোনে আমাকে জানাবেন।’

সেই এক গেরো। বউয়ের সহযোগিতা যে পাওয়া যাবে না, স্পষ্টই জানিয়ে দিল রূপম। কবিরাজ একগাল হেসে অভয় দিলেন, বেশ… সে দায়িত্বও নিলাম।’

ক’দিনের জন্য বারাসত যাব। মায়ের শরীরটা বিশেষ ভালো নয়। দিন চারেকের রান্না ফ্রিজে রাখা আছে, মাইক্রোতে গরম করে নিও।’ আপত্তি করল না রূপম। গুমোট পরিবেশে কারই বা ভালো লাগে? রাজারহাটের মতো নির্জন জায়গায় একা একা বেরনোও ভয়ের ব্যাপার। সারাদিন তাই ফ্ল্যাট বন্দি হয়েই কাটাতে হয় মৃত্তিকাকে। আগে রেস্টুরেন্ট বা শপিংমলে গেলেও, অনেকদিনই সে পাট চুকেছে। এক ছাদের তলায় থেকেও, দুজনে যেন ভিন গ্রহের বাসিন্দা।

প্রথমদিন খেয়েই রূপম বুঝল ওষুধটা অন্যরকম। কাজ হবার সম্ভবনা আছে। খাওয়ার কিছুক্ষণ পর থেকেই কেমন যেন অদ্ভুত অনুভূতি। কেউ যেন শরীরময় সুড়সুড়ি দিচ্ছে, চিমটি কাটছে। মনও ফুরফুরে। দ্বিতীয়দিন আরও নিশ্চিত হল। তৃতীয়দিন পুরোপুরি আত্মবিশ্বাস তুঙ্গে, তাই কবিরাজকে আর ফোন করার প্রয়োজন বোধ করল না। আবার কী ফ্যাসাদে পড়তে হয় কে জানে! ছুটল শ্বশুরবাড়ি। আচমকা আগমনে মৃত্তিকা অবাক। গাঁইগুঁই করলেও, শাশুড়ি জোর করেই পাঠিয়ে দিলেন। বউ নিয়ে সোজা শপিংমলে। মৃত্তিকাকে একটা দামি শাড়ি কিনে দিল রূপম। তারপর রেস্টুরেন্টে খাওয়া। অবাক হলেও প্রকাশ করল না মৃত্তিকা। হয়তো খুশিই হল। অসহায় মেয়েদের অ-সুখের মধ্যেই ক্ষণিকের সুখ খোঁজা ছাড়া উপায় কি?

ফ্ল্যাটে ঢুকেই ঝাঁপিয়ে পড়ল রূপম। মৃত্তিকাও সাড়া দিয়ে ফেলল। শরীর নিজের প্রয়োজনেই নিরস মনকে সরস করে তুলল। সারাদিন রূপমের ব্যবহারেও অন্যরকম ইঙ্গিত। হয়তো চিকিৎসায় ফল মিলেছে। তা ছাড়া মিথ্যের জোয়ারেও কি কখনও কখনও ভাসতে ইচ্ছে করে না? মরীচিকা তো মানুষই দেখে। মৃত্তিকাও দেখল। চাতকের মতো ছুটে গেল তৃষ্ণা নিবারণের আশায়। শৃঙ্গারের চরম পর্যায়ে খসে পড়ল আবরণ। তারপরেই বিপত্তি। নির্দ্বিধায় মনের সঙ্গ ত্যাগ করে শরীর ছুটল অন্ধকার পানে। কিছুতেই মোড় ঘোরাতে পারল না রূপম। মৃত্তিকা আবারও রূপান্তরিত হল পাষাণ প্রতিমায়।

ওষুধের উত্তেজনাও অতিক্রম করতে পারল না মনের অপরাধবোধ। তবুও হাল ছাড়ল না রূপম। শরীরের অনুভূতিই বলে দিচ্ছে কাজ হবে। হয়তো মাত্রা একটু বাড়াতে হবে। কোর্স শেষ হলেও রয়ে গিয়েছে বেশ খানিকটা ওষুধ। একসঙ্গে দু’দাগ গলায় ঢালল রূপম। অ্যাকশন শুরু হতেই আবার ঝাঁপাল। তবুও ফিরে এল অন্ধকার। এবার পুরো বোতলটাই শেষ করল। শরীর যেন আগুনের গোলা, হৃদপিণ্ডে অশ্বের গতি। টলোমলো পায়ে আবারও ঝাঁপাল। এবার আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না মৃত্তিকা। হিংস্র বাঘিনীর মতো থাবা বসাল রূপমের গালে। আকস্মিক আক্রমণে রূপম হতভম্ব। সম্বিৎ ফিরতেই বেরিয়ে গেল ফ্ল্যাট ছেড়ে।

‘করেছেন কি মশাই? মারা পড়বেন যে!’

রূপমের ফোনে আঁতকে উঠলেন কবিরাজ। ওষুধটা নিজস্ব আবিষ্কারই বলা যায়। আয়ুর্বেদ, ইউনানি, অ্যালোপ্যাথির অদ্ভুত মিশ্রণ। নিজের উপরেও প্রয়োগ করেছেন। ফল ভালোই। বাজার চলতি ওষুধগুলোর চেয়ে তো বটেই। পঞ্চাশেও পঁচিশের জোশ এনে দেয়। তাই মওকা বুঝে দামও নিয়েছেন চড়া। কিন্তু ছেলেটির যে কেন কাজ হল না, বুঝতে পারলেন না। তা ছাড়া মাত্রাতিরিক্ত সেবনে কী রিঅ্যাকশন হতে পারে একেবারেই জানা নেই। জানার প্রয়োজনও পড়েনি কখনও। তবে ভালো কিছু যে হবে না সেটা নিশ্চিত। ছেলেটিও যে কেন অসহযোগী বউয়ের সঙ্গে খামোখা লিপ্ত হতে গেল, ভেবে পেলেন না।

ফ্রি-স্কুল স্ট্রিটে মারিয়া গোমসের সঙ্গে তোফা ব্যবস্থা করে রেখেছিলেন। অভিজ্ঞ, লাস্যময়ী, ছোকরার আড় ভাঙতে দশ মিনিটও সময় নিত না। নিজেরও ফাউ জুটত। কিন্তু সেসব চুলোয় দিয়ে এখন প্রাণ বাঁচানোই দায়। ফোনে যে পরিমাণ উত্তেজনার আঁচ পেলেন, তাতে দোকানে ঝামেলা অবধারিত। তড়িঘড়ি ঝাপ বন্ধ করা ছাড়া উপায় নেই। আপনি বাঁচলে বাপের নাম।

‘শালা… আটশো টাকা নিয়ে জোচ্চুরি!’ বন্ধ দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে আস্ফালন করা ছাড়া উপায় রইল না রূপমের। বেগতিক বুঝে কবিরাজ ফোনও সুইচ-অফ করে দিয়েছেন। কবিরাজকে ধমক-ধামক, মারধর দিলে হয়তো উত্তেজনা কিছুটা কমত। তা না হওয়াতে দিশেহারা হয়ে পড়ল রূপম। শরীরময় যেন হাজারও সাপের ছোবল। ইচ্ছে করছে পৃথিবীটা ভেঙে-চুরে, তছনছ করে ফেলতে। আচমকাই প্রতিমার কথা মনে পড়ল। ও-ই পারবে যন্ত্রণার অবসান ঘটাতে। হন্তদন্ত হয়ে চলল চপলামাসির বাড়ি। কিন্তু বিধি বাম, প্রতিমা অন্য খদ্দেরে ব্যস্ত। অপেক্ষা করতে বললেও মানতে নারাজ রূপম। পাগলের মতো দরজায় লাথি, ধাক্বা, সঙ্গে গালাগাল। বাড়িময় হইচই। কিছুতেই সামলানো যাচ্ছে না উন্মত্ত খদ্দেরকে। শেষে পাড়ার ছেলেদের ডেকে একরকম জোর করেই রূপমকে বাড়ি থেকে বের করে দিল চপলা।

ক্রমাগত ব্যর্থতায় রূপম হতোদ্যম। টলোমলো পায়ে হাঁটতে হাঁটতে ফিরিঙ্গি কালীবাড়ির সামনে। হোঁচট খেয়ে পড়েই যাচ্ছিল। সামলালেন এক বৃদ্ধা মহিলা। ধমকের সুরে বললেন, ‘কী রে ছেলে, সামলাতে পারিস না তো মদ গিলিস কেন?’

মাথায় রক্ত চড়ল রূপমের। জীবনে কোনওদিন মদ ছুঁয়েও দেখল না, আর এই মহিলা কিনা বলছেন মদ গিলেছে? ঝাঁঝের সঙ্গে বলল, ‘কী ভুলভাল বকছেন। কে আপনি?’

‘আমি তোর মা রে’, অবলীলায় বললেন মহিলা।

গায়ে কাঁটা দিল রূপমের। মন যেন তৈরি হয়েই ছিল। চুম্বকের মতো ‘মা’ শব্দটা গেঁথে নিল। নিমেষে এঁকে ফেলল পূর্ণ অবয়ব। লালপাড় ঘিয়ে শাড়ি, মাথায় জটা, গলায় রুদ্রাক্ষের মালা, এই তো মা! কই মায়ের মুখে তো কোনও ঘেন্না নেই? বরং মিটিমিটি হাসছেন। তা হলে কি ক্ষমা করেছেন অবোধ সন্তানকে? অপ্রকৃতিস্থ হলেও মস্তিষ্ক যেন দ্বিধাগ্রস্ত। ঘোর লাগা চোখে রূপম বলল, ‘আপনি আমার… কে বললেন?’

‘মা রে মা… আমি তোর মা। এখন দশটা টাকা দে তো, ঘুগনি-মুড়ি খাই।’

‘মা’ ছাড়া আর কোনও শব্দই কানে ঢুকল না রূপমের। মস্তিষ্কও মেনে নিল মনের কথা। অপলকে চেয়ে রইল মহিলার দিকে। মহিলার হাসি যেন পবিত্র জলের ধারা। পাপ, অপরাধবোধ ধুয়ে-মুছে সাফ।

‘কী রে ছেলে… দে। দোকান বন্ধ হয়ে যাবে যে…’, মহিলা আন্তরিক। যেন নিজের ছেলের কাছেই চাইছেন। সম্মোহিতের মতো পঞ্চাশ টাকা দিল রূপম। হাসিমুখে আশীর্বাদ করলেন মহিলা, ‘স্ত্রী-পুত্র নিয়ে সুখী হও বাবা’। তারপর জনারণ্যে মিলিয়ে গেলেন। রূপমকে দিয়ে গেলেন পরম প্রাপ্তি। কদর্য অতীত রূপান্তরিত হল নির্মল বর্তমানে।

দুশ্চিন্তায় ঘুম নেই মৃত্তিকার। আপশোশও হচ্ছে। অতটা বাড়াবাড়ি না করলেও চলত। নিজের অক্ষমতায় তো কোনও হাত নেই রূপমের। বরং কাটিয়ে ওঠার আপ্রাণ চেষ্টা করেছে। তারই মন্দ ভাগ্য যে, এইরকম একজনের সঙ্গে বিয়ে হল। তবে বিয়ের আগে রূপম যে সমস্যার কথা জানত না এটা নিশ্চিত। তবুও মাথা ঠিক রাখা মুশকিল। এত বড়ো বঞ্চনা মেনে নেওয়া বড়োই যন্ত্রণার। কিন্তু অপমানিত হয়ে রূপম যদি কিছু করে বসে? কী জবাব দেবে সবার কাছে? মোবাইলে ফোন করলেও ধরছে না। মেসেজ করলেও উত্তর আসছে না। অনুতপ্ত মৃত্তিকা ক্রমাগত ঘর-বারান্দা করতে লাগল।

ভোর রাতে রূপম ফিরল। শান্ত, সমাহিত। চুপ করে সোফায় বসে রইল। যেন বসেই থাকবে। অনন্তকাল। রূপমের এমন রূপ মৃত্তিকার অদেখা। কেমন যেন মায়া হল। সরাসরি ক্ষমা চাওয়ার অনভ্যস্ততায় হাত রাখল রূপমের কাঁধে। বোঝাতে চাইল আপশোশ, অনুতাপ। সমাহিত রূপম গ্রাহ্য করল না। কানে ক্রমাগত বেজেই চলেছে, ‘স্ত্রী-পুত্র নিয়ে সুখী হও…’। এমন করে তো কেউ কোনওদিন বলেনি!

নিশ্চুপ রূপমকে এবার ভয় পেল মৃত্তিকা। মেন্টাল শক পেল নাকি? বউ গায়ে হাত তুললে পৗরুষে আঘাত লাগাটা খুবই স্বাভাবিক। মানসিক ভারসাম্য হারালে দায়ভার কি তার উপরেই বর্তাবে? এক ঝটকায় রূপমের মাথাটা বুকে চেপে শক্ত করে বেড় দিল মৃত্তিকা। তারপর আদরে আদরেই যেন ক্ষমা প্রার্থনা করতে লাগল। কখন যে নিজের শরীরে মিশিয়ে নিয়েছে টেরও পেল না। একসময় রূপম অনুভব করল শরীর, মন নিশ্চিন্তে হাত ধরাধরি করে চলেছে। পাড়ি দিয়েছে অনন্ত পথ। অতিক্রম করেছে কৃষ্ণগহ্বর।

 

অন্যদের সম্মান করতে শেখান ছোটো থেকেই

কাউকে ভালো কিছু শেখাবার উপযুক্ত সময় হল শৈশব। কারণ, একমাত্র শৈশবেই কাঁচা বাঁশ বা কাদার মতো থাকে সবাই। ফলে ওইসময় যেমন খুশি গড়ে নেওয়া যায়। তাই, অন্যদের সম্মান করার বিষয়টিও শেখাতে হবে ছোটো থেকেই। মনে রাখবেন, চারিত্রিক সুনাম বজায় রাখা কিংবা ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল করার অন্যতম উপায় হল অন্যকে সম্মান করা।

  • সম্মান শব্দটির মধ্যেই লুকিয়ে রযেছে সম-মান শব্দ দুটি। অর্থাৎ, আপনি যতটা সম্মান দেবেন অন্যকে, ঠিক ততটাই সম্মান ফিরে পাবেন। অন্যথায়, আপনারও সম্মানহানি ঘটতে পারে। আর দীর্ঘদিন অসম্মানিত হতে থাকলে, এক সময় মানসিক অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়ার প্রবল সম্ভাবনা থাকবে। অতএব, ছোটো থেকেই অন্যকে সম্মান প্রদর্শনের সুশিক্ষা দিন আপনার সন্তানকে। এবার জেনে নিন অন্যকে সম্মান প্রদর্শনের জন্য কী কী করতে হবে।
  • অন্যের কথা ধৈর্য দিয়ে শুনতে শেখান
  • ভেবেচিন্তে কথার উত্তর দিতে বলুন। যেন কাউকে মনে আঘাত না দেয়
  • শিক্ষক শিক্ষিকার আদেশ-উপদেশ মেনে চলতে বলুন
  • কারও কথায় রাগ হলে ধৈর্য ধরে বোঝানোর পরামর্শ দিন
  • রাগ হলে চট করে যাতে কারও গায়ে হাত না তোলে, সেই শিক্ষা দিন
  • মানবিক হতে শেখান। কারও বিপদে পাশে দাঁড়াতে না পারলেও যেন উপহাস না করে
  • অকারণে যেন অন্যের সম্পর্কে কুত্সা না রটায়
  •  মেয়েেদের যেন নীচু নজরে না দেখে, সেই শিক্ষা দিন
  • আত্মীয়স্বজনের দুর্দিনে সমব্যথী হতে শেখান
  • ভুল করলে দুঃখ প্রকাশ করতে বলুন
  • কেউ উপকার করলে তাকে ধন্যবাদ জানাতে বলুন এবং উপকার মনে রাখতে বলুন
  • ভালো কাজের প্রশংসা করুন মন খুলে৷

খাবারেই রয়েছে সৌন্দর্যের চাবিকাঠি

সৌন্দর্য যেমন মানুষের আত্মবিশ্বাস বাড়ায় তেমনি অপরের প্রশংসা কুড়োতেও সাহায্য করে। কিন্তু সৌন্দর্য ধরে রাখা খুব সহজ নয় যেখানে রাতদিন আমাদের স্ট্রেস, পলিউশন, দৗড়ঝাঁপের সঙ্গে রীতিমতন যুঝতে হয়। এর জন্য দরকার ভিতর থেকে শরীরকে হেলদি রাখা এবং এটা তখনই সম্ভব যখন আমরা খাওয়াদাওয়ায় প্রয়োজনীয় পরিবর্তন করতে পারব।

শরীর হেলদি থাকাটা পুরোটাই নির্ভর করে আমাদের লাইফস্টাইলের উপর। যেমন রেগুলার ওয়াক না করলে পেট ও কোমরের মেদ বাড়তে থাকে, ঘুম ঠিকমতো না হলে চেহারা শুকনো, রুক্ষ মনে হয় এবং পুষ্টিকর ডায়েটের অভাবে শত চেষ্টাতেও সৗন্দর্য ফুটিয়ে তোলা সম্ভব হয় না। সুতরাং প্রথম কাজ হল নিজের খাওয়াদাওয়ার সম্পূর্ণ খেয়াল রাখুন।

ব্যালেন্সড ডায়েট – পুষ্টিকর ব্যালেন্সড ডায়েটে, তেল, চিনি, ফ্যাট জাতীয় খাবারের পরিবর্তে শরীরের প্রয়োজনীয় পুষ্টিকর তত্ত্ব যেমন ভিটামিন, খনিজ এবং ফাইবারের মাত্রা বেশি থাকাটা বাঞ্ছনীয়।

প্রচুর জল খান – তেষ্টা মেটাতে ও ত্বকের ময়েশ্চার ধরে রাখতে সাহায্য করে জল। চোখের নীচে সূক্ষ্ম রেখা এবং বলিরেখা আটকাতেও জলের প্রয়োজন। যতটা জল আপনি রোজ খাবেন ততটাই বিষাক্ত পদার্থ শরীর থেকে বেরিয়ে যাবে, ফলে ত্বকও তরতাজা এবং উজ্জ্বল হয়ে উঠবে।

 অ্যান্টি অক্সিডেন্ট ফুড রাখুন ডায়েটে – বলিরেখা আটকাতে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট যুক্ত আহার নেওয়া যুক্তিযুক্ত। ডার্ক চকোলেট, স্ট্রবেরি, পালংশাক, বাঁধাকপি, বীটরুট ইত্যাদি ডায়েটে অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। স্ট্রবেরি, ব্রোকোলি, বাঁধাকপি, পালংশাকে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট তত্ত্বের সঙ্গে রয়েছে ভরপুর মাত্রায় ভিটামিন সি। এগুলি খেলে হার্টের অসুখ হওয়ার ভয় অনেকটাই কমে যায়।

ফাইবার-যুক্ত ডায়েট – পরীক্ষানিরীক্ষায় জানা গেছে, ব্রেকফাস্ট হওয়া উচিত ফাইবার-এ ভরপুর কারণ ফাইবার অ্যাসিডিটির সমস্যা রোধ করতে সাহায্য করে এবং একইসঙ্গে অ্যাকনে-র সমস্যা থেকেও অব্যাহতি পাওয়া যায়। ফাইবার-যুক্ত খাবার আমাদের শরীরের ভিতরকার ক্ষতিকারক তত্ত্ব বাইরে বার করে আমাদের স্বাস্থ্য এবং ত্বকের খেয়াল রাখে। শরীরের ওজনও নিয়ন্ত্রিত রাখে। সুতরাং সবুজ শাকসবজি, ফল, বাদাম, দই, স্যালাড ইত্যাদি বেশি পরিমাণে ডায়েটে রাখা দরকার।

আয়রন রিচ ডায়েট – ইউরোপিয়ান জার্নাল এবং ডার্মাটোলজিস্টের রিপোর্ট অনুযায়ী, শরীরে আয়রনের অভাবে চুল পড়ে যেতে থাকে। আয়রন রিচ ডায়েট, রক্তে অক্সিজেনের ফ্লো বাড়াতে সাহায্য করে ফলে চুলের  গোড়ায় এবং স্ক্যাল্পেও অক্সিজেনের সঙ্গে সঙ্গে পুষ্টিকর তত্ত্বও ঠিকমতো পৌঁছোয়। এর ফলে চুলের টেক্সচার এবং ডালনেস দূর হয়ে চুল হয়ে ওঠে স্বাস্থ্যোজ্জ্বল। সুতরাং আয়রন রিচ ডায়েট অবশ্যই নিন।

নখের যত্নে – ভঙ্গুর নখ এবং নখের হলুদ ভাব আমাদের হাতের সৗন্দর্য নষ্ট করে। এছাড়াও শরীরে ভিটামিন এবং খনিজ-এর অভাবেও এই লক্ষণগুলি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। দুধ এবং ডেয়ারি প্রোডাক্টস-এ প্রেটিন, ক্যালসিয়াম, জিংক এবং ভিটামিন বি-র ভরপুর মাত্রায় থাকে যা নখ-কে স্ট্রং করতে সাহায্য করে। টক জাতীয় ফল, সবজি ভিটামিন ‘সি’-তে পরিপূর্ণ এবং নখের সৗন্দর্য বাড়াতেও এগুলি সাহায্য করে।

হাড়ের স্বাস্থ্য বজায় রাখে ক্যালসিয়াম – হেলদি ডায়েট হাড় মজবুত করতে এবং সুস্থ রাখতে সাহায্য করে। এর জন্য প্রয়োজন ডায়েটে ক্যালসিয়াম রাখা। একই সঙ্গে ভিটামিন-ডি নেওয়াটাও আবশ্যক যাতে শরীরের কার্যক্ষমতা বাড়ে এবং খাবার থেকে পুরো ক্যালসিয়াম শরীর গ্রহণ করতে পারে।

ক্যালোরি-প্রয়োজনীয়তা – জেন্ডার, বয়স এবং সারাদিনে কতটা ফিজিক্যাল অ্যাকটিভিটি করতে হয় তার উপর নির্ভর করে একদিনে কতটা ক্যালোরি ইনটেক করতে হবে। মহিলাদের থেকে তুলনায় পুরুষদের বেশি  পরিমাণ ক্যালোরির প্রয়োজন হয়। অ্যাভারেজে মেয়েদের ২০০০ ক্যালোরি প্রয়োজন এবং পুরুষদের দরকার ২৫০০ ক্যালোরি যা তাদের শরীরের ওজন মেনটেন করতেও সাহায্য করে।

ঠোঁটের গোলাপি রং বজায় রাখুন – আপনার ঠোঁট যদি ডার্ক হয় বা ঠোঁটে পিগমেনটেশন থাকে, তাহলে বুঝতে  হবে আপনার ডায়েট ঠিক নয়। এর জন্য দরকার টম্যাটো খাওয়া। টম্যাটো-তে থাকে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট-এর গুণ যা ঠোঁটের সঙ্গে সঙ্গে ত্বকও ঠিক রাখে। আখরোটে ওমেগা থ্রি, ফ্যাটি অ্যাসিড থাকে, যা কোলোজেন উৎপাদন বাড়ায়। এতে ত্বকের ইলাস্টিসিটি ইমপ্রুভ করবে। আখরোট স্ক্রাব ঠোঁটে লাগিয়ে ডেড স্কিন এবং ডালনেস দূর করা যেতে পারে।

ফল – ফলে ন্যাচারাল সুগার থাকে যা ফলের টেস্ট উন্নত করে এবং শরীরের সমস্ত জরুরি পুষ্টিকর তত্ত্বের অভাবও পূরণ করে।

সবজি – সমস্ত প্রয়োজনীয় ভিটামিন এবং খনিজ থাকে সবজিতে। তাই ডায়েটে সবুজ শাকসবজি যেমন পালং, বিন্স, ব্রোকোলি ইত্যাদি বেশি পরিমাণে রাখা উচিত।

আনাজপাতি – হোল গ্রেন খাওয়া সব থেকে ভালো, তাতে পুষ্টিকর তত্ত্ব অনেক বেশি থাকে।

প্রোটিন – মাংসপেশি এবং মস্তিষ্কের বিকাশের জন্য প্রোটিন জরুরি। ডাল, মাংস, বাদাম, আখরোট, পনির, সোয়া  নির্মিত খাবার খান।

ডেয়ারি প্রোডাক্টস – এতে ক্যালসিয়াম, ভিটামিন ডি এবং অন্যান্য জরুরি পুষ্টিকর তত্ত্ব রয়েছে। ফিট থাকার জন্য এটি অত্যন্ত জরুরি।

ভিটামিন সি – এই ভিটামিন সি আমাদের ইমিউন সিস্টেম-কে স্ট্রং করতে সাহায্য করে। এছাড়াও ত্বক করে তোলে স্বাস্থ্যোজ্জ্বল এবং এজিং প্রসেস-কেও স্লো করে।

হেলদি ফ্যাটের প্রয়োজন – সব ফ্যাট-যুক্ত খাবারই যে শরীরের জন্য খারাপ এই ধারণা ভুল। হেলদি থাকার জন্য মোনোঅনস্যাচুরেটেড এবং পলিঅনস্যাচুরেটেড ফ্যাট খেতে পারেন। এতে সবরকম প্রয়োজনীয় ফ্যাটি অ্যাসিড থাকে, যা ত্বকের ন্যাচারাল ময়েশ্চারাইজার ধরে রাখতে সাহায্য করে।

৭-টি পাওয়ার ফুড বাড়ায় ইমিউনিটি

আমাদের মধ্যে অনেকেই খুব সহজে সর্দি-কাশি বা জ্বরে আক্রান্ত হই। এর কারণ হল শরীরের ইমিউন সিস্টেম অর্থাৎ শরীরের প্রতিরক্ষা প্রণালীর ক্ষমতা কম থাকা। সেই কারণেই রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়ে তোলা দরকার। আর এই কাজে অত্যন্ত কার্জকর হতে পারে কয়েকটি খাবার। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে, জবাব নেই এই ৭-টি ইমিউনিটি ফুড-এর। কী খেলে করোনার এই দুঃসময়ে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়বে, জেনে নিন বিশদে।

কোন খাবারের কী খাদ্যগুণ ? 

বাদাম : রোজ সকালে ৮-১০টি ভেজানো কাঁচা বাদাম খেলে, শুধু যে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে তা-ই নয়, বাদাম মগজের অতিরিক্ত চাপ সামলানোর কাজেও সাহায্য করে। এতে মজুত ভিটামিন ই, শরীরে থাকা ন্যাচারাল কিলার সেলস বৃদ্ধি করতে সাহা্য্য করে। ক্যানসার সেল বিনষ্ট করতেও এগুলি সহায়ক। এই ভিটামিন ই আবার বলিরেখা রোধ করতেও সক্ষম। সেই সঙ্গে হৃদয় ও শরীরের মাংসপেশি সংক্রান্ত রোগ থেকেও সুরক্ষা দেয়।

রসুন : এটা শরীরে বিপুল পরিমাণে অ্যান্টিবডি তৈরি করে এবং আমাদের ইমিউন সিস্টেমকে নানা অসুখের সঙ্গে যুঝবার শক্তি দেয়। এর মধ্যে রয়েছে এমনই এক তত্ব, যা শরীরকে সংক্রমণ ও ব্যাক্টিরিয়ার সঙ্গে লড়ার ক্ষমতা দেয়। রোজ সকালে ২ কোয়া রসুন খেলে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রিত হয় এবং দীর্ঘ সময়কাল ধরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা মজবুত থাকে।

টক ফল : কমলালেবু, পাতিলেবু, মুসম্বি, আনারস প্রভতি টক ফলে পর্যাপ্ত মাত্রায় ভিটামিন সি থাকে যা, যে-কোনও ধরনের সংক্রমণ থেকে সুরক্ষা দেয়। এই ফল খাওয়ার দরুণ যে-অ্যান্টিবডি শরীরে তৈরি হয়, তা শরীরে ভাইরাস প্রবেশ করতে দেয় না। ভিটামিন সি শরীরে এলডিএল অর্থাৎ গুড কোলেস্টেরল তৈরি করে যা, কার্ডিযো ভাস্কুলার ডিজিজ-এর শিকার হওয়ার থেকে সুরক্ষা দেয়। রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখে। তাই রোজ একটা করে টক ফল অবশ্যই খান।

পালংশাক : এই শাককে সুপার ফুড বললেও কম বলা হয়। খাদ্যগুণে ঠাসা এক অতি দরকারি উপকরণ হল পালং। এতে এমনই তত্ব আছে যা শরীরের কোশ তৈরিতে সাহায্য করে। সেই সঙ্গে কোশে মজুত ডিএনএ মেরামত করতেও সাহা্যয্য করে। পালংশাকে পাওয়া যায় আয়রন, অ্যান্টি অক্সিড্যান্টস, ফাইবার ও ভিটামিন সি, যা শরীরকে ভিতর থেকে মজবুত করে। সেদ্ধ করা পালংশাক খেলে পাচনতন্ত্র সুচারুরূপে সক্রিয় থাকে।

মাশরুম : এটি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর ব্যাপারে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শরীরের শ্বেতকণিকাগুলি সক্রিয় করতেও সহায়ক। মাশরুমে থাকে খনিজ পদার্থ, অ্যান্টি অক্সিড্যান্টস, নাইসিন ও ভিটামিন বি যা, অ্যান্টি ভাইরাল, অ্যান্টি ব্যাক্টিরিয়াল ও অ্যান্টি টিউমার তত্বে সমৃদ্ধ। তাই রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে খাদ্যতালিকায় অবশ্যই রাখুন মাশরুম।

ব্রোকোলি : এই সবজিটির মধ্যে থাকে ভিটামিন এ এবং ভিটামিন সি আর গ্লুটাথিয়ান নামক অ্যান্টি অক্সিড্যান্টস, যা আপনার ইমিউন সিস্টেমকে বাড়িয়ে তোলে। তাই আপনার খাদ্যতালিকায় এটিকে অবশ্যই শামিল করুন। পনিরের সঙ্গে ব্রোকোলি মিশিয়ে তৈরি হতে পারে সুস্বাদু এক স্যালাড যা, শরীরকে পর্যাপ্ত পরিমাণে প্রোটিন জোগান দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে, ক্যালসিয়ামও সরবরাহ করে।

লাল ক্যাপসিকাম : এই সবজিটি খাবারের স্বাদ যেমন দ্বিগুন করে, তেমনই আবার খাদ্যগুণে ঠাসাও। এতে রয়েছে ভিটামিন সি এবং পর্যাপ্ত পরিমাণে অ্যান্টি অক্সিড্যান্টস যা, শরীরের ইমিউন সিস্টেমকে বুস্ট করে। ফলে শরীরে চট করে রোগ বাসা বাঁধতে পারে না। ভিটামিন বি ৬-এরও এটি একটি ভালো সোর্স। স্যালাডে এই লাল ক্যাপসিকামকে অবশ্যই শামিল করুন।

তিরিশ পেরোলে ত্বকের যত্ন

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীরে শুধু তার প্রভাব পড়ে তা নয়, ত্বকেও বিরাট একটা পরিবর্তন দেখতে পাওয়া যায়। এর ফলেই বলিরেখা, ত্বক ঝুলে পড়া এমন নানা সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। ৩০-এর পরেই সাধারণত বয়স বাড়ার লক্ষণগুলো ফুটে উঠতে দেখা যায় মুখে। তাই এটাই সময় একটা দৈনন্দিন স্কিন কেয়ার রুটিন তৈরি করে, সেটা ফলো করার। এছাড়া গর্ভবতী অবস্থাতেও এবং শিশুর জন্মের পরে, মেয়েদের ত্বকের যত্ন নেওয়া একান্ত জরুরি। এখানে কিছু টিপ্স দেওয়ার চেষ্টা করলাম যার সাহায্যে বয়স বাড়তে থাকলেও, আপনার সৌন্দর্য বজায় রাখতে পারবেন।

১)  জেন্টল ফেস ক্লিনজার ব্যবহার করুন যাতে আপনার ত্বকের প্রাকৃতিক উপাদান সঠিক থাকে। হার্ড ফেসওয়াশ ব্যবহার করলে ত্বকে টাইট ভাব আসতে পারে। এর কারণ হল হার্ড কসমেটিক মুখের ত্বকের স্বাভাবিক তেল নষ্ট করে দেয়

২)  সিরাম ট্রাই করে দেখতে পারেন। ভিটামিন সি-এর সঙ্গে সিরাম প্রয়োগ করুন। এটি অ্যান্টি অক্সিড্যান্টস্-এ ভরপুর থাকে। ফলে ত্বকের রোমছিদ্র পরিষ্কার রাখতে সাহায্য করে

৩)  সম্প্রতি মাতৃত্ব অর্জন করে থাকলে দেখবেন, ত্বক আগের থেকে অনেক বেশি শুষ্ক হযে পড়ছে। হাইড্রেটিং টোনার ব্যবহার করুন। এটি ত্বকের পিএইচ লেভেল কম করে সামঞ্জ্যস্য বজায় রাখতে সাহায্য করবে। অ্যালকোহল-যুক্ত টোনার ব্যবহার না করাই বাঞ্ছনীয়

৪)  রাতে শুতে যাওয়ার আগে নাইট ক্রিম অবশ্যই লাগানো উচিত। এটি সারাদিনের পরে ত্বককে রাতভর রিকভার করতে হেল্প করবে। ত্বকের আর্দ্রতা পুরোপুরি বজায় রাখতে সাহায্য করবে। দিনের বেলাতেও স্কিন হাইড্রেটেড থাকবে

৫)  আন্ডার আই ক্রিম লাগাতে যেন ভুল না হয়। কারণ চোখের চারপাশের ত্বক খুবই সংবেদনশীল হয়। রেগুলার যে-ক্রিম ব্যবহার করেন বা বিশেষ কোনও আন্ডার  আই ক্রিম চোখের চারপাশে লাগাতে পারেন। আস্তে আস্তে মালিশ করবেন যাতে চোখের  আশেপাশের ত্বক হাইড্রেটেড থাকে

৬)  সানস্ক্রিন লাগাতে একেবারেই ভুলবেন না, গরমকাল হোক বা শীতকাল। সূর্যের  ক্ষতিকারক আলট্রা-ভাযোলেট রে ত্বকের দাগছোপ এবং ত্বকের ফাইনার লাইন্স-গুলো বাড়িযে তোলে। সুতরাং বাড়ির বাইরে পা রাখতে হলে ভালো সানস্ক্রিন লাগিযে বেরোনো খুব জরুরি।

আলস্য কাটানোর সহজ উপায়

এই কোভিড পরিস্থিতে যখন সারাদিনই টিভি আর সোশাল মিডিয়ায় মন খারাপ করা খবর, নিরন্তর  ডিপ্রেশন বাড়ছে মানুষের৷ কাজ করার ইচ্ছে, ভালো থাকার ইচ্ছে দুই-ই চলে যাচ্ছে ৷ সবকিছু থেকে আগ্রহ হারিয়ে ফেলা, বেশি আরামপ্রিয় হয়ে পড়া, অতিরিক্ত ঘুম প্রভৃতি হল অলসতার লক্ষণ। এসব লক্ষণ দেখা দিলেই, প্রথমে এর প্রকৃত কারণ খোঁজার চেষ্টা করুন এবং আলস্য দূর করুন।

অনেকে হয়তো ভাবছেন এটা সাময়িক আলস্য৷ কিন্তু এখনই এই কর্মবিমুখতা থেকে না বেরোলে, বড়সড়ো ডিপ্রেশনের শিকার হবেন৷ তাই চনমনে থাকুন৷ ইতিবাচক মানসিকতা থেকে আলস্য কাটিয়ে উঠুন৷

> নিজে যদি আলস্যের কারণ খুঁজে না পান, তাহলে চিকিত্সকের পরামর্শ নিন। রক্ত, মল, মূত্র, কফ, থুতু ইত্যাদি পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে একমাত্র চিকিত্সকই দেখে বুঝবেন, আপনার শরীরে কোনও রোগ-জীবাণু বাসা বেঁধেছে কিনা। মনে রাখবেন, অলসতার প্রথম এবং প্রধান কারণ কিন্তু শারীরিক রোগ-ব্যাধি। আর যদি তাই হয়, তাহলে অবশ্যই উপযুক্ত চিকিত্সা করান যত তাড়াতাড়ি সম্ভব

> শারীরিক দুর্বলতা বা অসুস্থতা ছাড়া যদি সাধারণ আলস্যের শিকার হন, তাহলে অবশ্যই প্রথমে বাইরের জগতের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করুন। বন্ধুদের সঙ্গে ফোনে কথা বলুন, বাড়ি থেকে বেরিয়ে প্রযোজন হলে নিছক আড্ডা দিয়ে শারীরিক এবং মানসিক জড়তা কাটান

> রাতে ১১টার মধ্যে ঘুমোতে যান এবং ভোরবেলা উঠুন। যোগ ব্যাযাম অভ্যাস করুন অথবা, বাড়ির বাইরে বেরিয়ে অন্তত তিরিশ মিনিট হেঁটে আসুন

>  ঘরদোর, নিজের জিনিসপত্র গুছিয়ে রাখুন। কারণ, অগোছালো পরিবেশ আলস্য বাড়িয়ে দেয়

>  ধূমপান বন্ধ করুন। কারণ, ধূমপান মস্তিষ্ক কোশের সক্রিয়তা নষ্ট করে এবং রক্তবাহী নালী ব্লক করে দেয়। ফলে, আলস্য গ্রাস করে

> পেট পরিষ্কার রাখুন। এর জন্য টাটকা শাক-সবজি, ফলমূল প্রভতি ফাইবার-যুক্ত খাবার খান

>  নিজেকে সারাদিন কর্মব্যস্ত রাখার চেষ্টা করুন। নিজের শখ-আহ্লাদ পূরণ করার কথা ভাবুন। ডিপ্রেশনকে মনে ঠাঁই দেবেন না।

পাঁচ ফলে রূপের দেখভাল

শীতে ত্বকের যত্ন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এই সময় ত্বক হয়ে পড়ে বেশি স্পর্শকাতর, খসখসে ও প্রাণহীন। শীতের দাপটে প্রাকৃতিক ঔজ্জ্বল্যও হারিয়ে ফেলে আমাদের ত্বক। তখন প্রয়োজন হয় ত্বকের বিশেষ যত্নের। ফলে থাকা নানা ভিটামিন, মিনারেলস, ত্বক ও চুল ভালো রাখতে সাহায্য করে। জেনে নিন কোন ভিাটামিন এবং মিনারেলস, আমাদের ত্বকের পক্ষে জরুরি। আর কোন ফলে তা পাওয়া যায়।

লেবু : লেবুতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি। এটি ত্বক ভালো রাখতে সহায়ক। ত্বকের অ্যাসিড-অ্যালকালাইন ব্যালেন্স বজায় রাখতে সাহায্য করে লেবু। তবে লেবুর রস, সরাসরি মুখে না লাগানোই ভালো। এতে জল বা অন্য কোনও তরল মিশিয়ে নিন। যাদের ত্বক তৈলাক্ত ও সেনসিটিভ, তারা লেবুর রসের সঙ্গে গোলাপজল মেশাতে পারেন। চিনির সঙ্গে লেবুর রস মিশিয়েও লাগাতে পারেন। কনুই বা হাঁটুর কালো দাগ তুলতে, সরাসরি লেবু ঘষা যেতে পারে। চুলের তেলতেলে ভাব কাটাতে, অর্ধেক মগ জলে লেবুর রস মিশিয়ে ঢালতে পারেন। চুলে লাগানোর হেনার সঙ্গে লেবুর রস মিশিয়ে ব্যবহার করলে, এটা কন্ডিশনার-এর কাজ করবে।

আপেল : ভিটামিন ও মিনারেলস ছাড়াও, আপেলে থাকে পেকটিন ও ট্যানিন, যা স্কিন টাইট করতে সাহায্য করে। স্পর্শকাতর ত্বকের জন্য পেকটিন খুব ভালো৷এটি অক্সিডেশন ড্যামেজ কন্ট্রোল করে এবং ত্বকে বয়সের ছাপ পড়তে দেয় না। অ্যান্টি অক্সিড্যান্টস্ থাকার কারণে আপেল ব্যবহারের ফলে, ত্বক সজীব হযে ওঠে। আপেলে মজুত অ্যাসিড, সমস্ত মৃত কোশ দূর করে ত্বক পরিষ্কার রাখে।

পেঁপে : পেঁপেতে থাকে প্যাপেন, যা এক ধরনের এনজাইম। এটি ত্বকের পক্ষে খুবই উপকারী। ত্বকের ডেড সেল নির্মূল করতে অত্যন্ত সহায়ক। পেঁপের পাল্প সরাসরি মুখে লাগানো যায়। অথবা ওটমিল, দই ও মধুর সঙ্গে মিশিয়ে, মাস্ক হিসাবেও ব্যবহার করা যায়।

আম : আমে থাকে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন এ ও সি, যা স্কিন রিজুভিনেশনে সাহায্য করে। ত্বকে বয়সের ছাপ পড়তে দেয় না। আমের পাল্প ত্বক মসৃণ করে। চুলের জন্যও আম ব্যবহার করা যায়। চুলের গোড়া মজবুত করে। আম খুব ভালো অ্যাস্ট্রিনজেন্ট, যে-কোনও ত্বকেই প্রয়োগ করা যায়। কোনও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হয় না।

কমলালেবু : কমলালেবুতেও প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি থাকে। কমলালেবুর পাল্প ফেস মাস্ক হিসাবে দারুণ কার্যকর। আবার খোসাটাও রোদে শুকিয়ে গুঁড়ো করে আপনার নিজস্ব ফেসমাস্ক-এর সঙ্গে মিশিয়ে ব্যবহার করতে পারেন। হাতের ত্বক উজ্জ্বল করতেও এটা ব্যবহার করা যায়। নখের হলদেটে ভাব দূর করতে, কমলালেবুর খোসা নখের উপর ঘষুন। নখের স্বাভাবিক রং ফিরে আসবে।

সিদ্ধান্ত

অফিসে পৌঁছে টেবিলে ফাইলগুলো একপাশে সরিয়ে রেখে দীপান্বিতা কাজে বসে পড়ল। এমাসে দুটো ফুল-ডে আর একটা হাফ-ডে লিভ এরমধ্যেই নেওয়া হয়ে গেছে। তার উপর মার্চ মাস পড়তে মাত্র নয় দিন বাকি। এর মধ্যে জমা কাজগুলো শেষ করে ফেলতে হবে। ঘড়ি দেখল দীপান্বিতা। আজকে লাঞ্চের আগে অনেকটা কাজ সেরে ফেলতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হল ও।

টেবিলে নামিয়ে রাখা মোবাইলটা হঠাৎ-ই বেজে উঠল। বিরক্ত হল দীপান্বিতা। স্ক্রিনে চোখ রেখে দেখল রঞ্জনের নাম। নামটা দেখেই ও শঙ্কিত হয়ে উঠল। রোজই কোনও না কোনও বাহানায় দীপু-কে বাড়িতে ডেকে নিয়ে যাওয়াটা রঞ্জনের রুটিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই নামেই রঞ্জন ওকে ডাকে। দুমাস হল ওদের বিয়ে ঠিক হয়েছে, শুধু রঞ্জনের একটা প্রেমোশনের আপেক্ষা। তারপরেই ও বিয়েটা সারতে চায়। অথচ প্রায়দিনই রঞ্জনের কোনও না কোনও আত্মীয় দীপান্বিতার সঙ্গে দেখা করতে চায়, এই অজুহাতে রঞ্জন দীপু-কে জোর দেয় ওর বাড়ি আসতে। এটা দীপান্বিতার একেবারেই পছন্দ নয়। অথচ মা-বাবা দেখেই এই বিয়ে ঠিক করেছেন তাই রঞ্জনের সঙ্গে দেখা না করলে

মা-বাবা মনে কষ্ট পাবে এই ভেবে দীপান্বিতাও হবু বরের হ্যাঁ-তে হ্যাঁ মেলাতে থাকে।

‘হ্যালো’, ফোনটা কানের কাছে নিয়ে আসে দীপান্বিতা।

‘দীপু, আমি বলছি। আজ প্লিজ হাফ ডে নিয়ে নাও অফিসে। মাসি হঠাৎ-ই গতকাল রাতে আমাদের বাড়ি এসেছে। মাত্র দু’দিন থাকবে। তোমাকে খুব দেখতে চাইছে। আগে শুধু একদিন তোমাকে দেখেছিল। আমি ঠিক দুটোর সময় তোমাকে অফিস থেকে তুলে নেব। আর হ্যাঁ, বাড়ি গিয়ে ড্রেস চেঞ্জ করে শাড়ি পরে নিও। আমি অপেক্ষা করব। মাসি আবার একটু সেকেলে ধরনের মানুষ। তোমাকে অন্য পোশাকে দেখলে কিছু একটা মন্তব্য করে বসতে পারে।’

‘শোনো রঞ্জন, আজ আমি কিছুতেই ছুটি নিতে পারব না, আর হাফ-ডে মাসে একটাই নিতে পারি। সেটাও তো নেওয়া হয়ে গেছে।’

‘দীপু, আমি মা-কে কথা দিয়ে এসেছি যে তোমাকে নিয়েই আসব। সুতরাং ছুটি তুমি কীভাবে ম্যানেজ করবে সেটা তোমার ব্যাপার। কিন্তু আসতে তো তোমাকে হবেই। এছাড়াও তুমি এলে রান্নাঘরেও মা-কে একটু সাহায্য করে দিতে পারবে।’

‘আমাকে কিছু না জানিয়েই তুমি কীভাবে কথা দিয়ে দিলে রঞ্জন?’ বিরক্ত হয়ে জিজ্ঞেস করল দীপান্বিতা।

‘তোমাকে জিজ্ঞেস করার কী আছে? সব কাজ কি তোমাকে জিজ্ঞেস করে করতে হবে নাকি?’

‘হ্যাঁ রঞ্জন, আমার সঙ্গে যে-কাজটার সম্পর্ক থাকবে সেটা অবশ্যই আমাকে জিজ্ঞেস করতে হবে বই কি… একে তো মাঝেমাঝেই তুমি কারও না কারও সঙ্গে দেখা করাতে আমাকে তোমাদের বাড়ি নিয়ে যাও আর নিজে কোথায় উধাও হয়ে যাও। তোমার আত্মীয়স্বজন আমার সঙ্গে দেখা করতে চাইতেই পারেন। কিন্তু রঞ্জন, বারবার তোমাদের বাড়ি যাওয়াটা কি দেখতে আদৗ ভালো লাগে?’

‘দীপু, এখনও আমাদের বিয়ে হয়নি এর মধ্যেই তুমি আমাদের বাড়ি যেতে চাইছ না? নাকি আমার বাড়ির লোকেদের তোমার আর পছন্দ হচ্ছে না?’ বেশ রেগেই প্রশ্নটা করে রঞ্জন।

‘তুমি আমাকে ভুল বুঝছ রঞ্জন। আমি মোটেই একথা বলিনি। বরং আমি তোমার সঙ্গে আরও বেশি সময় কাটাতে চাই। তোমাকে আরও জানতে চাই যাতে আমরা একে অপরকে আরও ভালো ভাবে বুঝতে পারি, পছন্দ-অপছন্দগুলো জানতে পারি’, বোঝানোর বৃথা চেষ্টা করে দীপান্বিতা।

‘কোনও দরকার নেই অত বোঝবার। বোঝা-শোনার জন্য সারাটা জীবন পড়ে আছে। আমার বাড়ির লোকেরা তোমার সঙ্গে কিছুটা সময় কাটাতে চায় আর তোমার উচিত ওদের মনের ইচ্ছা পূরণ করা। আমি ঠিক দুটোয় তোমাকে নিতে আসব, গেটে দাঁড়িও’, বলে ফোন কেটে দেয় রঞ্জন।

রঞ্জনের অফিস দীপান্বিতার ঠিক পাশের বিল্ডিং-এই। প্রথম প্রথম আসতে যেতে দুজনের প্রায়ই দেখা-সাক্ষাৎ হতো। আগে আলাপ, তারপর বন্ধুত্ব। রঞ্জনের বাড়ি থেকেই দীপান্বিতার মা-বাবার কাছে মেয়ের বিয়ের প্রোপোজালটা আসে। যেহেতু রঞ্জন মেয়ের ভালো বন্ধু, তাই ওনারাও সম্মতি দিতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করেননি। দেড় মাসের মধ্যে বিয়ের কথা হয়ে যায়। কিন্তু তারপরেই কারও না কারও সঙ্গে দেখা করাতে দীপান্বিতাকে নিজেদের বাড়ি নিয়ে যেতে জোর দেওয়া শুরু করে রঞ্জন। প্রথম প্রথম দীপান্বিতার ভালোই লাগত যে শ্বশুরবাড়ির সকলেই ওকে দেখতে চায় কিন্তু পরে সেটাই ওর গলার কাঁটা হয়ে উঠল।

দীপান্বিতা চাইত রঞ্জনের সঙ্গে সময় কাটাতে যেটার সত্যিই প্রয়োজন ছিল। সব জিনিস নিয়েই রঞ্জন নিজের মতামত পোষণ করত। এমনকী দীপান্বিতা কী পোশাক পরবে, বাড়িতে কী রান্না হবে, এমনকী টিভির চ্যানেল কী থাকবে সবটাই রঞ্জনই নিয়ন্ত্রণ করত।

একদিন বাড়িতে ছুটির দিনে দীপান্বিতা খাবার টেবিলে সবেমাত্র বসেছে মা-বাবার সঙ্গে একসাথে মধ্যাহ্নভোজ সারবে বলে, হঠাৎই রঞ্জন বাড়িতে এসে হাজির।

ওকে দেখে দীপান্বিতার মা শশব্যস্ত হয়ে উঠে দাঁড়ালেন। তাড়াতাড়ি হাত ধুয়ে চেয়ার এগিয়ে দিলেন রঞ্জনের দিকে, ‘এসো বাবা, তুমিও আমাদের সঙ্গে বসে পড়ো।’

‘না-না মাসিমা, আজ আর খাওয়া হবে না। এখুনি আমাকে বেরোতে হবে। তাছাড়া দেখছি মাছ রান্না করেছেন। ওটা আমি আবার একদম খেতে পারি না’, বিরক্তির ভঙ্গিতে উত্তর দেয় রঞ্জন।

এবার দীপান্বিতার বাবা পাশ থেকে বলে ওঠেন, ‘আমার মেয়ের আবার মাছ দারুণ পছন্দের।’

‘তাতে কী হয়েছে?’ রঞ্জন জবাব দেয়, ‘এখন পছন্দ যত খুশি খেয়ে নিক, বিয়ের পর তো আর খাওয়া হবে না, আমার পছন্দ মতোই ওকে খেতে হবে।’

‘তার মানে?’ চমকে ওঠেন দীপান্বিতার বাবা।

রঞ্জনের ভুরু সামান্য কুঁচকে উঠল, ‘মানে আবার কি মেশোমশায়ই, স্বাভাবিক ভাবেই বিয়ের পর দীপুকে আমার পছন্দ অপছন্দ অনুযায়ী তো চলতে হবে… আমার কথা শুনে চলবে আমার বউ এটাই তো আমাদের সমাজের রীতি।’

‘উঁহু রঞ্জন’ কথার মাঝেই দীপান্বিতা বলে উঠল, ‘সবকিছু আমি তোমার ইচ্ছেমতোই বা করব কেন? আমার জীবন আমি আমার মতন করে কাটাতে চাই। তোমার ইশারায় আমি নাচব না’, দীপান্বিতার দুই চোখে কৗতুকের ঝলক।

‘দীপু, একটা কথা ভালো করে শুনে রাখো। আজও সমাজে পুরুষের মর্যাদা নারীর থেকে অনেক বেশি। সুতরাং বিয়ের পর তোমার নয়, আমার কথাই…’

‘আরে আরে রঞ্জন রাগারাগি বন্ধ করো’, মা, রঞ্জনকে কথার মাঝেই থামিয়ে দেন… ‘তুমি বাইরের ঘরে গিয়ে বসো, দীপু খেয়ে উঠেই যাচ্ছে।’ রঞ্জন বাইরে চলে গেলে মা বললেন, ‘দেখ দীপু, প্রথম প্রথম রঞ্জন হয়তো তোর উপর একটু অধিকারবোধ দেখাতে চাইছে। পরে দেখবি সব ঠিক হয়ে গেছে। সংসার মানেই দুটো মানুষের মধ্যে অ্যাডজাস্টমেন্ট। চিন্তা করিস না। খাওয়া সেরে দুজনে বাইরে থেকে কোথাও ঘুরে আয়, ভালো লাগবে।’

দীপুকে বুঝিয়ে বললেও মায়ের চোখে চিন্তার গাঢ় ছায়া ঘনিয়ে এল।

রঞ্জনের প্রোমোশন হতেই ওদের বিয়ের দিন স্থির করা হয়ে গেল। দুই বাড়ির ইচ্ছেতে শীতকালটাই বাছা হল বিয়ের অনুষ্ঠানের জন্য। এর মধ্যে দীপান্বিতা আর রঞ্জন কিছুটা করে সময় নিজেদের জন্য বার করে নিত, দেখা করত অফিসের বাইরে সুবিধামতো। পোস্ট গ্র্যাজুয়েশন পাশ করে এমবিএ করেছিল দীপান্বিতা। ওর নিজস্ব কিছু ভাবনা, কিছু স্বপ্ন ছিল। কিন্তু বেশিরভাগ সময় রঞ্জনের কথাই ওকে শুনে চলতে হতো। কেমন জানি স্বার্থপর হয়ে উঠত রঞ্জন। বাধ্য হতো রঞ্জনের কথামতো চলতে।

একদিন রঞ্জন জানাল, অফিসের পর ওর কিছু বন্ধুবান্ধব দীপান্বিতার সঙ্গে দেখা করতে চায়। দীপান্বিতাও রাজি হল আসতে যেহেতু অফিসের পরই পুরো ব্যাপারটা অ্যারেঞ্জ করা হয়েছিল। কিন্তু ভাগ্যের এমনই পরিহাস যে ঠিক সেদিনই অফিস ছুটির কিছু আগে কোম্পানির এমডি কয়েকজনকে নিয়ে মিটিং কল করলেন যার মধ্যে দীপান্বিতারও নাম ছিল। ও সঙ্গে সঙ্গে রঞ্জনকে ফোন করে খবরটা জানাল। তা-সত্ত্বেও রঞ্জন জোর করতে লাগল আসার জন্য যেটা একেবারেই সম্ভব ছিল না। মোবাইল সাইলেন্ট মোড-এ রেখে দীপান্বিতা মিটিং-এ ব্যস্ত হয়ে পড়ল। দেখতে দেখতে সন্ধে গড়িয়ে গেল। রঞ্জন বন্ধুদের সঙ্গে অপেক্ষাই করতে থাকল। অভ্যাসবশত বারবার মোবাইলে ফোন করতে থাকল রঞ্জন। মোবাইল সি্্ক্রনে রঞ্জনের নাম ফুটে উঠতে দেখেও দীপান্বিতা মিটিং-এর মাঝে ফোন তুলতে পারল না।

এদিকে বারবার ফোন করলেও দীপান্বিতা ফোন না ধরায় রঞ্জনের রাগ বাড়তে লাগল। মিটিং শেষ হতে আটটা বেজে গেল। কাজের থেকে ফ্রি হয়েই মোবাইলে চোখ রাখল দীপান্বিতা। রঞ্জনের বাইশটা মিস্ড কল দেখে ঘাবড়ে গেল ও। সঙ্গে সঙ্গে ফোন করল রঞ্জনকে।

ফোন বাজতেই নিজের রাগ সামলাতে পারল না রঞ্জন, ফোনেই দীপান্বিতার উপর চেঁচিয়ে উঠল, ‘তুমি নিজেকে কী ভাবো? আমরা তোমার জন্য অপেক্ষা করছি আর তুমি আসবার দরকারই মনে করলে না। বন্ধুদের সামনে আমাকে অপমান না করলেই চলছিল না? আমি কতবার তোমাকে ফোন করেছি… একবারও তুলতে পারলে না… এতই ব্যস্ততা তোমার?

রঞ্জনের চ্যাঁচামেচিতে ঘাবড়ে গিয়ে দীপান্বিতা প্রথমে কোনও উত্তরই মুখে আনতে পারল না। তারপর নিজেকে একটু গুছিয়ে নিয়ে বলল, ‘রঞ্জন, আমি তো মিটিং আছে জানতে পেরেই তোমাকে ফোন করেছিলাম। জানিয়েছিলেম যে আজ কিছুতেই আসা সম্ভব হবে না। এমডি-র সঙ্গে মিটিং… তুমি তো ভালো করেই জানো এই ধরনের মিটিং-এ ফোন সাইলেন্ট-এ রাখতে হয়।’

‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, আমি সব জানি। আমাকে শেখাবার কোনও দরকার নেই। তোমাকে আমি যখন আসতে বলেছি তখন আসতে হবে… আমার কাছে তোমার কাজটা সেকেন্ডারি’ রাগের মাথায় রঞ্জনের মুখে যা এল তাই দীপান্বিতাকে বলে গেল।

রঞ্জনের ফোনটা আসার পর থেকেই দীপান্বিতা মনে মনে একেবারে ভেঙে পড়ল। আজকেই সকালে নিজের প্রোমোশনের খবরটা পেয়েছিল দীপান্বিতা। উদগ্রীব হয়ে ছিল কতক্ষণে রঞ্জনকে খবরটা জানাবে কিন্তু সে সুযোগটুকুও ওর কপালে জুটল না। বিয়ের দিন যতই এগিয়ে আসতে লাগল ততই দীপান্বিতার মনে হতে লাগল একটা বোঝা যেন ওর মাথার উপর চেপে বসছে যেটার ভার সহ্য করার ক্ষমতা ওর নেই। আজও ওর মনে হল, ও মস্ত কোনও ভুল করে ফেলছে না-তো রঞ্জনকে বিয়ে করবে স্থির করে।

বাড়ি যখন ফিরল ক্লান্তিতে ভেঙে পড়ছে শরীর। মানসিক ভাবে নিজেকে বড়ো বিপর্যস্ত মনে হল ওর। বাড়িতে ফিরে দেখল মা কোথাও বাইরে বেরিয়েছেন, বাবা একাই বাড়িতে। দীপান্বিতাকে দেখে বাবা তাড়াতাড়ি রান্নাঘরে গেলেন মেয়ের জন্য চা তৈরি করতে। দীপান্বিতা ফ্রেশ হয়ে এসে দেখল চা অলরেডি টেবিলে হাজির।

‘বাবা, তুমি কেন চা তৈরি করতে গেলে? আমি তো আসছিলামই’, চেয়ার টানতে টানতে বাবাকে বলে দীপান্বিতা।

‘মা, তোকে খুব ক্লান্ত দেখাচ্ছে। অফিসে খুব বেশি চাপ ছিল? মিটিং কেমন হল? শরীর খারাপ লাগছে নাকি? আজও রঞ্জনের সঙ্গে ঝগড়া করে এসেছিস?’ বাবার একের পর এক প্রশ্নবাণের সম্মুখীন হতে হল দীপান্বিতাকে।

‘বাবা, তোমার কি মনে হয় আমিই সবসময় ঝগড়া করি? আজকে তো রঞ্জনের সঙ্গে ফাটাফাটি ঝগড়া হয়ে গেছে। আজকে ওর বন্ধুদের সঙ্গে আমার দেখা করার কথা ছিল কিন্তু এমডি-র সঙ্গে মিটিং ফিক্স হওয়ার পর আমি ওকে আগাম জানিয়ে দিই যে, আমি কোনওভাবেই আজ যেতে পারব না। তা-সত্ত্বেও ও কতগুলো যে কল করে গেছে তার ইয়ত্তা নেই। মিটিং শেষ হতেই আমি ওকে ফোন করেছি কিন্তু ভালো ভাবে কথা বলা তো দূরের কথা, এমন চ্যাঁচামেচি শুরু করল যে, আমার কথা বলারই কোনও সুযোগ হয়নি। এখনও আমাদের বিয়ে হয়নি… কোন অধিকারে ও আমার উপর এভাবে চ্যাঁচাবার সাহস পায়? ও নিজেও চাকরি করে সুতরাং আমার অসুবিধে ও কেন বোঝার চেষ্টা করবে না? স্বামী বলেই ও আমার উপর বসিং করবে আর আমার দোষ না থাকলেও স্ত্রী বলে সব শুনে যাব? এভাবে তো চলতে পারে না’, দ্বীপান্বিতার কথায় ওর মনের ভাব পরিষ্কার ফুটে ওঠে।

বাবা কোনও উত্তর না দিয়ে চুপ করে মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকেন। যে-মেয়েকে তিনি সবসময় আগলে এসেছেন, তাকে আজ এতটা অসহায় দেখে কী বলবেন, ভেবে পেলেন না।

দু’জনে চুপচাপ বসে থাকতে থাকতেই দ্বীপান্বিতার মা-ও চলে এলেন। দুজনকে চুপ করে বসে থাকতে দেখে মেয়েকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কীরে মিটিং থেকে কখন ফিরলি?’

‘আধ ঘন্টার উপর হয়ে গেছে মা।’

‘সকালে প্রোমোশনের কথা বলছিলিস, কিছু জানতে পারলি কি?’

‘হ্যাঁ মা, আমার প্রোমোশন হয়েছে। স্যার আজকে জানালেন।

দু-দিনের মধ্যে কাগজ হাতে পেয়ে যাব।’

‘বাঃ, এ তো খুবই খুশির খবর। কিন্তু তুই এরকম মনমরা হয়ে রয়েছিস কেন? রঞ্জনকে ফোন করে আসতে বললে পারতিস তো, বাড়ির জামাই বলে কথা। এতে আমাদের খুশি আরও দ্বিগুন হতো’, মা উঠতে উঠতে বললেন।

দীপান্বিতা ‘না’ করা সত্ত্বেও মা জোর দিতে লাগলেন রঞ্জনকে খেতে ডাকার জন্য। বাধ্য হয়ে বাবা উঠে রঞ্জনকে ফোন করলেন কিন্তু রাত্রি হয়ে যাওয়াতে রঞ্জন জানাল ও পরের দিন আসবে। রাত্রে ওদের সঙ্গেই খাওয়াদাওয়া করতে রাজি হয়ে গেল ও।

পরের দিন দীপান্বিতা অফিসের কাজ নিয়েই সারাদিন ব্যস্ত থাকল। ইচ্ছে হল না রঞ্জনকে একটা ফোন করে কথা বলে। সারাদিনই মনটা বিষণ্ণ রইল। সন্ধেবেলায় মা-কে রান্নাঘরে একটু সাহায্য করে দেওয়ার জন্য তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে এল।

ওর বাড়ি ফেরার প্রায় এক ঘন্টা পর রঞ্জন এসে পৌঁছোল। এসে জানতে পারল নিমন্ত্রণের কারণটা। দীপান্বিতার প্রোমোশনের খবরটা পেয়ে খুশি হয়েছে বলে মনে হল না। বরং আরও গম্ভীর হয়ে উঠল ওর চোখমুখ। বাড়িতে কারওরই নজর এড়াল না। দীপান্বিতার মা জিজ্ঞেস করেই বসলেন, ‘কী হল রঞ্জন, তুমি খুশি হওনি?’

‘একটা প্রোমোশনে এত খুশি হওয়ার কী আছে? বাড়িতে তো ওকে কোনও কাজ করতে হয় না… সব কাজ আপনিই করেন। সুতরাং কোম্পানির কাজ ও মন দিয়ে করতে পারে। মন দিয়ে কাজ না করলেও প্রোমোশন যখন হবার তখন হবেই’, তাচ্ছিল্যের সঙ্গে উত্তর দেয় রঞ্জন। দীপান্বিতার মুখের দিকে চোখ পড়তেই ওকে উদ্দেশ্য করে বলে, ‘দীপু এখানে যা করছ করে নাও, আমার বাড়িতে এসব চলবে না। বাড়ির সব কাজ তখন তোমাকে করতে হবে। বউ এলে মা আরাম করবে… ওখানে যা ইচ্ছে তাই করতে পারবে না। বাড়ির বউ, বউয়ের মতোই থাকবে, মেয়ে হয়ে ওঠার চেষ্টা কোরো না…’। আরও অনেক কিছুই বলে যাচ্ছিল রঞ্জন আর বাকি তিনজন অবাক হয়ে ওর মুখের দিকে তাকিয়েছিল। হঠাৎ বাবা বলে উঠলেন, ‘একী রঞ্জন, এসব তুমি কী বলে যাচ্ছ? আজকালকার ছেলে তুমি, এরকম সংকীর্ণ মানসিকতা কী করে হয় তোমার? আমি অবাক হচ্ছি… দীপু তোমার বউ হতে চলেছে… ওকে অপমান অন্তত কোরো না।’

‘প্লিজ মেশোমশাই, আপনি আমাদের দুজনের মধ্যে পড়বেন না। দীপুকে আগে থেকে আমি সব বলে দিতে চাই যাতে পরে গিয়ে ও আমাকে দোষারোপ না করতে পারে।’

ঘটনাক্রম কোথা থেকে কোথায় পৌঁছে গেল মুহূর্তের মধ্যে। সবাই বিনা বাক্যব্যয়ে চুপ করে খাবার খেয়ে নিল। আনন্দের পরিবেশ বিষাদে পরিণত হল। খাবার খেয়েই রঞ্জন বেরিয়ে গেল, পেছনে ফেলে গেল অনেকগুলো প্রশ্ন।

দেখতে দেখতে বিয়ের দিন কাছে এগিয়ে আসতে লাগল। মাত্র আর এক মাস বাকি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রঞ্জনের স্বভাবের সত্যিটাও সকলের দৃষ্টির সামনে স্পষ্ট হয়ে উঠল। জেদ, স্বার্থপরতা, হীন মনষ্কতা মানুষকে কতটা নীচে নামাতে পারে তার উদাহরণ প্রতিনিয়ত সকলের সামনে ফুটে উঠতে লাগল। ও কারও কথা শুনতে প্রস্তুত নয়, অথচ সকলকে ওর ইচ্ছা অনুসারে চলতে হবে।

রঞ্জনের মা ভালোমানুষ, বহুবার দীপান্বিতাকে বলেছেন, রঞ্জন যেমন ব্যবহার করে দীপান্বিতাও যেন ওর সঙ্গে ওই একই রকম ব্যবহার করে। একমাত্র ওই উপায়তেই রঞ্জনকে বোঝানো যাবে ও যা করছে ভুল করছে।

কিন্তু দীপান্বিতার মন সায় দেয়নি। একটা মানুষকে সঠিক রাস্তায় আনতে এটা কখনও স্থায়ী সমাধান হতে পারে না। রঞ্জনের মতো ব্যবহার করতে থাকলে জীবনযুদ্ধে যে ও জয়ী হবেই তার নিশ্চয়তা কী?

অশান্ত মন-কে শান্ত করার কোনও উপায় ছিল না দীপান্বিতার কাছে। কীভাবে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবে, প্রতিনিয়ত তার সন্ধান করতে থাকত ও। অফিসের কাজে নিজেকে ব্যস্ত রাখার চেষ্টা করত। প্রতিদিনের মতো সেদিনও অফিস যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছিল, তখনই মোবাইলটা বেজে উঠল। দীপান্বিতা তাকিয়ে দেখল রঞ্জনের ফোন। তুলতে ইচ্ছা হল না… রিং বাজতেই থাকল, তারপর একসময় কেটে গেল। দ্বিতীয়বার ফোনটা বাজতেই মা এসে ফোনটা ধরে দীপান্বিতার হাতে ধরিয়ে দিলেন। বাধ্য হয়ে ওকে কথা বলতেই হল।

‘হ্যালো, কী করছিলে? ফোন তুলছিলে না কেন? আচ্ছা শোনো আজকে একবার দেখা করতে চাই। পুরো ছুটি নিতে পারলে ভালো নয়তো হাফে বেরিও। কী করবে ফোন করে আমাকে জানিয়ে দিও। আর হ্যাঁ, অ্যাভয়েড করার চেষ্টা কোরো না, নয়তো আমি তোমার অফিসে পৌঁছে যাব।’

রঞ্জনের শাসানি শুনে দীপান্বিতা ভয় পেল। বুঝতে পারল ছুটি না নিলে রঞ্জন সত্যি ওর অফিস পৌঁছে যাবে। বাধ্য হয়ে অফিস পৌঁছে হাফ-ডে-র জন্য দরখাস্ত করল। ছুটি মঞ্জর হতেই রঞ্জনকে ফোনে জানিয়ে দিল। তাড়াতাড়ি করে দেড়টার মধ্যে অফিসের সব কাজ গুছিয়ে নিয়ে রঞ্জনের অপেক্ষায় বসে রইল।

ঠিক দুটোর সময় রঞ্জন নিজের গাড়িতে ওকে তুলে নিয়ে পরিচিত একটি রেস্তোরাঁয় এসে বসল।

‘কী ব্যাপার, হঠাৎ ছুটি নিতে বললে কেন?’ দীপান্বিতা জিজ্ঞেস না করে পারল না।

‘আসলে তোমাকে কিছু জরুরি কথা বলার ছিল’, একটু ভেবে উত্তর দিল রঞ্জন, ‘দীপু, আর কয়েকদিনের মধ্যেই আমাদের বিয়ে। তারপর তুমি আমাদের বাড়ির সদস্য হয়ে যাবে। যদিও এখনও তোমার ওখানে আসা-যাওয়া রয়েছে তবুও কয়েকটা জিনিস আমি পরিষ্কার করে বলে দিতে চাই। আমার বাড়িটা তোমার শ্বশুরবাড়ি, বাপের বাড়ি নয় সুতরাং বউয়ের মতন তোমাকে থাকতে হবে। বাপের বাড়ির মতো স্বাধীনতা ওখানে থাকবে না, বাড়ির সব কাজও তোমাকেই করতে হবে। আমি এত কথা তোমাকে বলছি কারণ আমার মনে হয় বাড়ি আর অফিস দুটো একসঙ্গে সামলানো তোমার পক্ষে সম্ভব নয়। তুমি বরং চাকরি-টা ছেড়ে দাও।’

চমকে উঠল দ্বীপান্বিতা, ‘কী বলছ রঞ্জন তুমি? চাকরি কেন ছাড়ব? বাড়ি আর চাকরি দুটোই আমি একসঙ্গে ভালো ভাবে সামলাতে পারব, এই বিশ্বাসটুকু আমার নিজের উপরে আছে। তোমাকে এই নিয়ে ভাবতে হবে না, শুধু আমার উপর বিশ্বাস রাখো’, আত্মপ্রত্যয়ের সঙ্গে দীপান্তিতা বলে। যদিও রঞ্জনের যা স্বভাব, তাতে ও যে এই কথাগুলো মেনে নেবে না সেটা দীপান্বিতা খুব ভালো ভাবেই জানত, তবুও ও শেষ চেষ্টা একবার করে দেখতে চাইল।

‘দীপু, আমি তোমার মতামত নিতে বা তোমার সঙ্গে পরামর্শ করার জন্য এখানে আসিনি। আমি কি চাই, সেটা তোমাকে পরিষ্কার করে বলব বলে এখানে ডেকেছি। চাকরি তোমাকে ছাড়তে হবে আর জেনে রাখো আমার বাড়ির নিয়ম হচ্ছে সব সিদ্ধান্ত পুরুষরাই নেবে… নিজের কাজের দক্ষতা দেখাতে চাও বাড়িতে বসে দেখাও। আমার উপর ছড়ি ঘোরাবার চেষ্টা কোরো না। আমার বাড়িতে আমি যা বলব তাই মানতে হবে, এটা তুমি যত তাড়াতাড়ি মেনে নেবে ততই তোমার জন্য মঙ্গল। আজ এখন উঠব, একটা কাজ আছে’, বলে রঞ্জন উঠে দাঁড়াল এবং দীপান্বিতা-কে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই রেস্তোরাঁ ছেড়ে বেরিয়ে গেল।

পেছন থেকে দুবার ডাক দিতেও যখন রঞ্জন ফিরে তাকাল না, একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে দীপান্বিতা উঠে দাঁড়াল। রেস্তোরাঁর বিল মিটিয়ে ধীর পায়ে বেরিয়ে এসে রাস্তায় দাঁড়াল। বাড়ি ফিরতেই বাবা মেয়েকে দেখে বুঝে গেলেন বড়োসড়ো কোনও ঝড় বয়ে গেছে মেয়ের উপর। মেয়েকে বসিয়ে ভিতর থেকে ওর জন্য খাবার জল এনে সামনে রাখতেই দীপানিবতা নিজেকে আর সামলাতে পারল না। বাবার বুকে মাথা দিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ল।

‘কী হয়েছে দীপু, কাঁদছিস কেন মা?’

‘বাবা, আজ রঞ্জন দেখা করতে এসেছিল’, চোখ মুছে দীপান্বিতা পুরো ঘটনা বাবাকে খুলে বলল। সব শুনে উনি চিন্তায় পড়ে গেলেন, এখনই বিয়ের আগে যদি রঞ্জনের এরকম ব্যবহার হয় তাহলে বিয়ের পর কী হবে?

‘বাবা, বিয়ের পর আমি কিছুতেই রঞ্জনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারব না… আমার মন কিছুতেই এই বিয়েতে সায় দিচ্ছে না, কী করব কিছুই বুঝতে পারছি না’, কান্নাভেজা গলায় বাবাকে জানায় দীপান্বিতা।

‘এত উতলা হোস না মা। তোর মা বাড়িতে ফিরুক, আলোচনা করে দেখি। তুই গিয়ে হাত-মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে নে।’

হাত-মুখ ধুয়ে বসার ঘরে বসতেই মা ফিরে এলেন। দীপান্বিতা উঠে গেল তিনজনের জন্য চা বানিয়ে আনার জন্য। চা করে এনে বসে পড়ল সোফায়। বাবাই রঞ্জনের কথাটা তুললেন চা খেতে খেতে, ‘শুনছ, আজ রঞ্জন এসেছিল দীপুর সঙ্গে দেখা করতে। দীপুকে চাকরি ছাড়তে বলেছে। দীপু রঞ্জনকে বিয়ে করতে চাইছে না… কী করা যায়? বাবা জানতে চাইলেন।

মা তাকাল মেয়ের দিকে, বলল, ‘দীপু, প্রথম থেকেই রঞ্জনের স্বভাব, ওর ব্যবহার আমার অদ্ভুত মনে হয় কিন্তু তাও আমার মনে হতো সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সব ঠিক হয়ে যাবে। তোরা দুজন দুজনকে চিনবি, বুঝতে পারবি। কিন্তু আজ তুই অন্য কথা বলছিস। বিয়ের আর এক মাসও বাকি নেই। আত্মীয়-স্বজন, বন্ধুবান্ধব সবাইকে বলা হয়ে গেছে… সবকিছু গোছানো শেষ… এই সময় সম্বন্ধ ভেঙে গেলে সবাই মেয়ের দোষই ধরবে।’ বেশ চিন্তিত মনে হল মায়ের কণ্ঠস্বর!

মায়ের কথায় লজিক ছিল এটা অস্বীকার করতে পারল না দীপান্বিতা। ভারাক্রান্ত মনে রাতের খাবার খেয়ে বিছানায় এলিয়ে দিল ক্লান্ত শরীরটাকে। চেষ্টা করেও বিয়ের জন্য মনটাকে কিছুতেই রাজি করাতে পারল না ও। রঞ্জনের প্রতি মনজুড়ে বিতৃষ্ণা ভরে গেছে ওর, এই অবস্থায় কী করে ও রঞ্জনকে স্বামী বলে মেনে নেবে ভেবে পেল না।

সকালে উঠে প্রতিদিনের মতো টেবিল থেকে চা আনতে গিয়ে বাবার মুখোমুখি হল দীপান্বিতা। ইশারায় টেবিলে বসতে বললেন ওকে তারপর উঠে এসে মেয়ের পাশে বসে ওর হাত দুটো তুলে নিলেন নিজের হাতে। আশ্বাসের সুরে বললেন, ‘অনেক ভেবে দেখলাম বুঝলি মা, রঞ্জনকে ফোন করে বলে দে যে তুই ওকে বিয়ে করবি না… তারপর যা হবে আমি আর তোর মা বুঝে নেব।’

‘বাবা তুমি এটা কি বলছ? সত্যিই আমি রঞ্জনকে বলে দেব যে ওকে আমি বিয়ে করব না?’ অবাক হয়ে প্রশ্ন করে দীপান্বিতা।

‘হ্যাঁ মা, কাল অনেক রাত পর্যন্ত আমি আর তোর মা এই নিয়ে অনেক ভেবেছি। মেয়ে সুখে থাকুক, মনের মতো স্বামী পাক এটাই সব মা-বাবার ইচ্ছা থাকে। যে-সম্পর্কটাকে বিয়ের আগেই বোঝা মনে হচ্ছে আমার মেয়ের, বিয়ের পর সেই সম্পর্কটাই হয়তো মেয়ের জন্য প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে। এর থেকে ভালো সম্পর্কটা ছেড়ে বেরিয়ে আসা। যা মা যা, তুই আর দেরি করিস না। এখনই ফোনটা কর।’

দীপান্বিতার হঠাৎ-ই মনে হল মাথাটা খুব হালকা লাগছে। মাথার উপর চেপে থাকা ভারী বোঝাটা নেমে গিয়ে বেশ ফুরফুরে মনে হল নিজেকে। মা-বাবার আশীর্বাদ রয়েছে যে ওর উপর।

মোবাইলটা হাতে তুলতেই ওটা বেজে উঠল। রঞ্জন ফোন করছে। একটু শ্বাস নিয়ে দীপান্বিতা এপাশ থেকে উত্তর দিল, ‘হ্যালো…’ রঞ্জনের অধীর কণ্ঠ ভেসে এল, ‘দীপু, কী ঠিক করলে তাহলে? আজ রেজিগনেশনটা দিচ্ছ না, দিচ্ছ না?’

‘না রঞ্জন, রেজিগনেশন আমি দেব না। এই মুহূর্তে আমি তোমার সঙ্গে আমার সমস্ত সম্পর্ক ত্যাগ করছি। আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে তোমাকে আমি বিয়ে করব না।’

রঞ্জন ‘হ্যালো… হ্যালো…’ করতে করতেই দীপান্বিতা ফোনটা কেটে দিল। একটা সম্পর্ক শুরু হওয়ার আগেই শেষ হয়ে গেল অথচ দীপান্বিতার মনে তার বিন্দুমাত্র রেখাপাত ঘটল না।

 

পড়ার জন্য সীমাহীন গল্প-নিবন্ধসাবস্ক্রাইব