পালিয়ে যাওয়ার গল্প

বাইশ বছর বয়সের এই বিকেলকে আমি কী নামে ডাকব? এই তো সেই পশ্চিম আকাশে সূর্য-ডুবুরির শেষ ডুবের আলো। এই তো, এখানে, স্মৃতিতে কিংবা ভুলে যাওয়া এক গতকাল-এ মফস্সল শহরের গা ঘেঁষে, আধা-শহর আধা-গ্রামের বিবর্ণ এই ইস্কুলবাড়ি ছাড়িয়ে, পথের রেখায়, ছাড়া ছাড়া ঘরবাড়ির নকশা সমেত জংলা ঘুপচিতে-বাঁশঝাড়ের ভুলভুলাইয়া, মাদুর কাঠির খেত বা বিরহী শীতের শিনশিনে দুখ-জাগানিয়া হাওয়ায় দাঁড়িয়ে আছে সেই বিকেল, যেন অকাল বিধবাটি, জীবনপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে আসা যাওয়ার পথের ধারে।

এমনই এক বিকেলে আমরা পালাব ঠিক করেছিলাম। আমাদের চারদিকে ছিল সতর্ক পাহারা। রাস্তার ধারের ঝুপড়ি দোকানের বুড়িটিকে বলা হয়েছিল আমরা পালাতে পারি এবং সে যেন ঝটিতি খবরটা জানিয়ে দেয়। যাকে জানাবে সেও তৈরি হয়ে ছিল। আমাদের ধরে যার হাতে তুলে দেওয়া হবে সেও তৈরি থাকত। সে এক ঝানু পাহারাদার। বলা যেতে পারে মাস মাইনের পাহারাদার।

আজ, পরিণত বয়সে সেই বিকেলের দিকে ফিরে তাকাবার সাহস আমার নেই। আবার না তাকিয়ে অবহেলায় চলে যাবার সাহসও আমি রাখি না। এ যেন ভূতপূর্ব দুঁদে খুনির খুনের জায়গায় বারবার ফিরে আসার গল্প। তা সেই বিকেলে আমি আমার জীবনের প্রথম পাপটি করেছিলাম। আর এই বিকেলে সেই পাপের কথা লিখছি। কী পাপ করেছিলাম আমি?

আজ মনে পড়ে বা গতকাল তারও গতকালে মনে পড়েছিল ভয়ংকর সেই ঘটনার কথা। আমি ঘটনার সিঁড়ি বেয়ে যেন এক পোড়ো মন্দিরের একেবারে ওপরে উঠে যাচ্ছি। ওপরে মানে আরও পেছনে। হিলহিলে হাওয়া দিচ্ছে। মাদুর কাঠির খেতের বুক চিরে এক অষ্টাদশী দউড়োচ্ছে আমার দিকে। সন্ত্রস্ত, তার চোখ আতঙ্কে নীল, পাছে কেউ দেখে ফেলে আমাদের।

তারপর? দেখা হল দুজনায়। মাদুর কাঠির খেত হাঁ হয়ে দেখল। কাছের বাঁশঝাড়ে বুঝি বা তক্ষক ডেকে উঠল। কোথায় ছিল একটা ঘুঘু, এই শেষ শীতের কামড় উপেক্ষা করে গেয়ে উঠল কৃষ্ণগোকুল। আর লাল ঘেরের চমৎকার একটা ফ্রক পরে এক অষ্টাদশী, যে দু’বিঘে  জমিনের মাদুর কাঠির খেত সাঁতরিয়ে এসেছে চুরি করা পাঁচ মিনিট সময়ে আমার সঙ্গে দেখা করার জন্য… সে হাঁপাচ্ছে, তার চোখে মুখে কী একটা তেষ্টা, কী এক অনির্দেশ যাত্রার উদাসীনতা… অথচ তার চিবুকে এক আকাশ মুক্তির নীলিমা। তারপর সে আমার সামনে। কিছুই বলে না শুধু চুপচাপ আমার দিকে চেয়ে থাকে। আমি, বাইশ বছরের তরতরে যুবা, সবেমাত্র ইংরেজির শিক্ষক হয়ে তার বাবার ইস্কুলে পড়াতে এসেছি, তা প্রায় মাস ছয়েক হবে তখন। আমি স্থাণুর মতো দাঁড়িয়ে। কিছু যে বলব, কিছু যে… মনে মনে ফুটছি, বিকেলের পড়ন্ত রোদ্দুরে ওর লাল ফ্রক জ্বলে জ্বলে উঠছে, আমি ভয়ে কাঠ, ঘনঘন শ্বাস পড়ছে ওর আর আমার… তারপর, কে যেন বলে উঠল আমায়, এই ছোকরা, ও কী বলছে শোন!

তারপর কী যে হয়ে গেল, প্রতি অঙ্গ প্রতি অঙ্গের জন্য এমনভাবে কেঁদে উঠল যে আনাড়ি ছোঁড়া আমি, এক ঝটকায় ওর অশান্ত বুক, ওর উড়ন্ত খোলা চুল ওর ততোধিক লজ্জা রাঙা লাল ফ্রক, ওর ফুলে ওঠা নাকের পাটা, ওর হরিণ চোখ– সববাইকে চমকে দিয়ে জীবনের প্রথম পাপটি করে বসলাম। তারপর হঠাৎ সম্বিৎ ফিরে পেয়ে পেছন দিক থেকে সাইকেলের ক্রিং ক্রিং শুনে ভয় কাতর নিজেকে যখন থাবড়িয়ে সোজা করলাম, ততক্ষণে লাল ফ্রক বিদ্যুল্লেখার মতো অদৃশ্য হয়ে গেছে। বিরক্ত মাদুর কাঠির সংসারে তখন নিজেদের গুছিয়ে নেওয়ার পালা। ঘাড় সোজা করে উঠে দাঁড়াচ্ছে ওরা।

তার নাম ইতি। বাস রাস্তার পাশে উদাসীন দাঁড়িয়ে-থাকা ওই উচ্চমাধ্যমিক ইস্কুলটায় ও বারো ক্লাসে পড়ত। ছিপছিপে, মাঝারি লম্বা, ফুলো ফুলো সুখী মুখ। দেখে মনে হতো ‘আহ্লাদি’! চোখ দুটো বড়ো বড়ো, কিছুটা গোরুর ড্যাবড্যাবা ভাবও ছিল। কিন্তু এক অনিবার্য আকর্ষণ ছিল তার। ও তাকালে ওর চোখ দুটোতে কোথা থেকে যেন এসে জড়ো হতো রাজ্যের মায়া। ওকে দেখলে কঠিন সন্ন্যাসীও হঠাৎ মাটির দিকে তাকাতে বাধ্য হবে। কোনও কারণে যদি কেউ ওর শরীরে চোখ দেয় তাহলে দেখতে পাবে এক অপরূপ ভাস্কর্য। রামায়ণের মতো সে বিড়বিড় করে বলবে, ‘মুনিঋষিও এই ভাস্কর্যে মাথা কুটে মরবে’। আমার যেমন প্রথম দর্শনেই মনে হয়েছিল খাজুরাহোর গুহাগাত্রের কোনও ছবি জ্যান্ত হয়ে আমার সামনে এসেছে। আমি অবাক। এই আধা-গাঁ আধা-গঞ্জে এলেবেলে বিনুনি-দোলানো তেল জবজবে মাথায় বসানো বাক্সখোঁপাটি বেশ দেখতে ছিল। সব মিলে ও ছিল আলাদা।

ইতি পড়াশোনায় তেমন ভালো ছিল না। হয়তো বড়োলোক বাবার লাডলি বলে, হয়তো এ অঞ্চলের সবচেয়ে বড়ো পরিবহণ ব্যবসায়ীর মেয়ে বলে। বা পড়াশোনা করার তেমন কোনও ইচ্ছে ওর মধ্যে কেউ চারিয়ে দেয়নি বলে। প্রথম দিনই, অর্থাৎ যেদিন আমি এই ইস্কুলে

ইংরেজির শিক্ষক হয়ে এলাম, পড়াশোনার ব্যাপারে ওর দুর্বল জায়গাটায় ঘা দিলাম। একচোট জ্ঞান গিলে ও মাথা নীচু করে বসে রইল। আমার মনে আছে, প্রথম দিনের ক্লাসেই ‘কী পড়া আছে’ জিজ্ঞেস করতে ক্লাসের অর্ধপক্ব সবজান্তা ছাত্ররা আমাকে এনে ধরিয়ে দিল পোয়েট্রি এবং ড্রামা সিলেকশনের একটা একাঙ্ক নাটক– দি ডেথ ট্র্যাপ বাই এইচ এইচ মানরো বা সাকী। রামকৃষ্ণ মিশনে, সায়েব অধ্যাপকের নিরলস প্রচেষ্টায় ইংরেজি উচ্চারণটা আমার কিছুটা সায়েবি হয়ে উঠেছিল। আমি চোস্ত উচ্চারণে এক ঘণ্টা ধরে একাঙ্ক নাটক পড়ালাম। অভিনয় করে দেখালাম। ছাত্রছাত্রীরা তেমন ভাবে স্বরটা না বুঝলেও আমাতে মুগ্ধ হয়ে গেল। আমি তখন আমার মোক্ষম অস্ত্রটি প্রয়োগ করলাম। আমি বলি ‘মোটিভেশন’। ওদের মধ্যে আমি কেরিয়ারের স্বপ্ন বুনে দিলাম। বললাম, স্বপ্ন দেখতে শেখো। পৃথিবীর সফলতম মানুষটিও একদিন স্বপ্ন দেখত। যে মানুষ স্বপ্ন দেখতে জানে না, সে মৃত।

তারপর শুরু হল আমার মজা তৈরি করার কসরত। জিজ্ঞেস করলাম, তোমাদের জন্ম হয়েছে কীসের জন্য? উত্তর হল বড়ো হবার জন্য। আমি মেয়েদের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন ছুড়ে দিলাম এবং বললাম, তোমাদের এক বন্ধু বলেছে বড়ো হওয়ার জন্য। তা মেয়েরা, তোমরা আবার এমন বড়ো হোয়ো না যাতে বড়োলোকের হেলেদেলে ছেলের হেলেদেলে ইয়া-মোটা বউ হয়ে কাঁঠাল গাছ হয়ে গেলে।

ক্লাসে বিপুল হাসি। ইতিও তখন হাসতে হাসতে নদী হয়ে গেছে।

একটা ছেলে বেশ জোরে জোরেই জিজ্ঞেস করল, ও স্যার, ‘কাঁঠাল গাছ’ কথাটার মানে বুঝলাম না।

হুঁ, মেলায় যাও তো, দেখতে পাও না, গণ্ডাকয়েক কাচ্চা-বাচ্চা নিয়ে মায়েরা আসছে। আর সেই মায়েদের গা থেকে ঝুলছে কত্ত কাঁঠাল।

আবার হাসির তুফান।

আমি আড়চোখে ইতিকে দেখছি– মনে হল ইতি বা তার নাম ঋতি হোক না, সে কেমন নিজের ভেতর থেকে বেরিয়ে এসে, এই বিবর্ণ ক্লাসরুম ছাড়িয়ে অনেক উঁচুতে উঠে গিয়েছে। তার চোখে শ্রদ্ধাবিগলিত এক অদ্ভুত আবেগ। আমি আবার যোগ করলাম, ওঠো, জাগো, এগিয়ে চলো। তা না হলে তুমি অন্ধকারে ফুটবে, অন্ধকারেই ঝরে পড়বে। আর দুঃখে কাদা হয়ে নজরুলের মতো গাইবে– আমি পথমঞ্জরি, ফুটেছি অাঁধার রাতে। তুমি চঞ্চল হও, সুদূরের পিয়াসী হও।

ছাত্রছাত্রীরা বেশ খেয়ে গেল।

দিন পনেরো বাদে একদিন হেডমাস্টারমশাই তাঁর ঘরে ডেকে নিলেন। থাকবার কোনও ঘর না পেয়ে তখন আমি বোর্ডিং-এ আছি।

হেডমাস্টারমশাই তাঁর কাজে ব্যস্ত থেকেও বললেন, আপনার স্টুডেন্ট ফিডব্যাক ভালো। আপনাকে একটা দায়িত্ব নিতে হবে। হায়ার সেকেন্ডারির ইংলিশটা এবার থেকে আপনি নেবেন।

কিন্তু ওটা তো স্যার কে কে নিচ্ছেন? (কে কে, মানে কমল কিশোরবাবু, অর্থনীতির শিক্ষক, ওনার ধারণা, উনি ইংরেজিটা সবথেকে ভালো জানেন। আমি অনার্স গ্র্যাজুয়েট, উনি মাস্টার্স। কারণ তখনও আমার মাস্টার্স হয়নি)।

আমি কে কে কে বলব। কোনও অপ্রীতিকর কিছু ঘটবে না। দায়িত্ব আমার। আমার ওপর ছেড়ে দিন।

আমি ঘর ছেড়ে বেরিয়ে আসছিলাম। উনি আবার ডাকলেন।

আর একটা কথা। আপনার তো থাকবার জায়গা নেই। আপনি এক কাজ করুন না– আপনি আজ থেকেই সেক্রেটারির বাড়িতে থাকুন। ওঁরা অনুরোধ করেছেন। বিশেষ করে ইতির হায়ার সেকেন্ডারি পরীক্ষা নিয়ে ওঁরা খুব উদ্বিগ্ন। আরও দুচারটে ছেলে-মেয়ে ওঁদের আছে, একটু গাইড করে দেবেন।

আমি ঠিক রাজি ছিলাম না, কিন্তু ঠিক তখনই ইতি এসে উপস্থিত। ইতি যেন সেই জেবড়ে বসে থাকা মেয়েটি নয়। উত্তেজনায় ফুটছে টগবগ করে। মনে হল ঝড় ঠেলে চলে এসেছে।

স্যার, আজকে আমার বাড়িতে আসছেন তো?

আমি গলে গেলাম।

আমি ঝরণার শব্দ শুনলাম। নদীর কলকল শুনলাম। পাতার ফাঁকে কোকিলের ডাক শুনলাম। আমতা আমতা করেও রাজি হলাম।

পরদিন থেকে ইতির রুটিন বদলে গেল। আমার জীবনে একটা অধ্যায় যুক্ত হল। ইতি বাধ্য ছাত্রীর মতো পড়াশোনা করে। আমার বকুনি শুনলে চোখ দিয়ে হাসে। আমি শরীরচর্চা করি, ও বোধহয় লুকিয়ে দ্যাখেট্যাখে। ইতি-ও শরীরচর্চা শুরু করে দেয়। আমি ওকে একটা মেয়েদের ব্যায়ামের বই এনে দিই। কাছাকাছি শহরে গিয়ে ডায়েট চার্ট এনে দিই। ও পরিমিত খায়, পরিমিত কথা বলে। নিজেকে ছুরির মতো ধারালো করতে চেষ্টা করে। ওর মায়ের চোখ এড়ায় না। সারাক্ষণ তিনি ভুরু কুঁচকে থাকেন।

আর আমি? আমার শরীরচর্চায় কবিতার ছন্দ। পেশিতে পাখি এসে বাসা বাঁধে। আমি উড়ানে যাই। আকাশটা হঠাৎ আরও নীল। আমি খরগোশের মতো ক্ষিপ্র। ওদের বড়ো পুকুরটায় সাঁতার কাটি। দুবার এপার ওপার করার জায়গায় চার বার করি। ওদের বাড়ির পশ্চিমে দিগন্তবিস্তৃত মাঠ। আমি ক্ষুদে ছাত্রছাত্রী বা একটু ডাঁসা আভাকে নিয়ে মাঠে দৗড়োতে যাই। ইতি যন্ত্রচালিতের মতো পায়ে পায়ে আমাদের পেছনে। ওকে দেখে আমার বুকের ভেতরের দম বেড়ে যায়। অনেক দূরের মাঠে ছুটছি আমি, ইতি দূর থেকে অস্পষ্ট ছায়া হয়ে গিয়েছে। আবার ফিরতি রাউন্ডে এসেছি, ইতি সোনালি রোদ্দুর মেখে সিল্যুয়েট ছবি। তার খোলাচুল উড়ছে হাওয়ায়। আমরা ক্লান্ত ঘর্মাক্ত হয়ে বাড়ি ফিরছি, ইতি দাঁড়িয়ে রয়েছে অভিবাদনের ভঙ্গিমায়। আমি পড়াচ্ছি– ইওর এইম ইন লাইফ। বলছি হালবিহীন নৗকো আর লক্ষ্য বা গন্তব্যহীন মানুষ দুয়ে এক।

ইতি মুগ্ধ হয়ে শুনছে।

আমি বলছি – গন্তব্যে নিয়ে চলো জীবনের নৌকো।

ইতি প্রশ্ন করে, যদি ঝড়ে পড়ে যাই?

আমি ধাক্বা খাই। ধীরে ধীরে বলি, নেপোলিয়নের সৈন্যবাহিনী তাদের সামনে আল্পস পর্বতমালা দেখে চমকে দাঁড়িয়েছে, তাদের গতি রূদ্ধ। নেপোলিয়ন তাদের বললেন, দেয়ার ইজ নো আল্পস! এগিয়ে চলো, চরৈবেতি।

তুমিও এগোবে ইতি, চারপাশকে অস্বীকার করে, সমস্ত বাধাকে তুচ্ছ করে। নিজের ওপর বিশ্বাস বাড়াও। তোমার স্থান হেথা নয়, হেথা নয়, অন্য কোথাও, অন্য কোনওখানে। কোনও কিছুর সঙ্গে কম্প্রোমাইজ নয়, কোনও সমঝোতা নয়। ইতি মুগ্ধ। আমি বলে চলি, ওই দ্যাখো, সামনে লাইটহাউস। ওই আলোকস্তম্ভ দেখে দেখে দাঁড় বেয়ে চলো। কোলরিজের অ্যালবেট্রস-এর মতো কেউ না কেউ তোমাকে পথ দেখাবে। ইতির চোখ লাইটহাউসের দিকে। চোখের পলক পড়ছে না। চা দিতে আসা ওর মায়ের চোখ কিন্তু ছোটো ছোটো হয়ে গেল। একবার আমার দিকে, একবার ওর দিকে তাকালেন। তারপর তাঁর চোখে অসহায় রাগ দেখতে পেলাম।

এরপর যা শুরু হল তাতে বলা যেতে পারে নিশ্ছিদ্র পাহারা। আমি যেখানেই যাই, যেদিকেই যাই, কোনও না কোনও ফেউ লেগে থাকত। আমার দম বন্ধ হয়ে যাওয়ার দশা।

মেয়েকে তাঁরা কী কী বলেছিলেন, কোনওদিন জানতে পারিনি। তবে সে মেয়ে জেদি, একরোখা হয়ে উঠল। আমার সঙ্গে তার কথাবার্তা স্বাভাবিক, ভেতরে কোথায় কী হচ্ছে, বাড়ি থেকে তাকে কোনও চাপ দিচ্ছে কিনা, কিছুই বুঝে উঠতে পারছি না। মাঝে মাঝে দেখতাম আভাও, বারো তেরো বছরের পুঁচকে মেয়ে, আমার দিকে কেমন চোখে যেন দেখছে। আমি ভ্রূক্ষেপ করতাম না। ইতির পড়াশোনা আগের থেকে ভালো হচ্ছে, এটাই আমার প্লাস পয়েন্ট।

ওদের বাড়ির বেশ লম্বাচওড়া দাওয়ায় ধানের মস্ত বড়ো মরাই। বাড়ির দেয়াল থেকে মরাইয়ের মাঝখানে একটা ছোট্ট চৗকোণা জায়গা। ঘর বললে ঘর। ওটাই ছিল আমার অস্থায়ী শোবার জায়গা। এখনও আমি ছবির মতো দেখতে পাই সেই ঘরটাকে। ওটার সঙ্গে জড়িয়ে আছে কত না স্মৃতি।

পরীক্ষার আগে, অন্তত মাসখানেক ধরে, আমার কড়া নির্দেশ ছিল ছেলেমেয়েরা রাত তিনটে থেকে উঠে পড়াশোনা করবে। ওদের বাড়িতেও দেখলাম আমার নির্দেশ মান্যতা পেল। ওরা পড়াশোনা শুরু করবে, লম্বা মাদুর পেতে, সামনে জলচৗকি নিয়ে বসতে যাবে– এমন সময় প্রথম চৗকিটা অধিকার করল ইতি। ঠিক আমার বিছানার পাশটিতে। আমি মাটিতে বিছানা পেতে শুতাম। আমাকে আড়াল করে থাকত জববর এক মশারি। প্রথমদিন থেকেই ওদের দিদি বসবে প্রথমে। তারপরে ওরা। এর কোনও ব্যতিক্রম হতো না। ইতি হতে দিত না। আমার কাজ ছিল ওদের পড়াশোনার তদারকি করা। কেউ ভুল পড়লে মশারির ভেতর থেকেই ‘অ্যায়’– বলে শুধরে দেওয়া। কেউ ঢুলছে দেখলে তাকে হাসি মশকরা করে জাগিয়ে দেওয়া। তবে এবার একটা মজার ব্যাপার ঘটল। এবারে পাহারায় এলেন ইতির কাকা– হূষ্টপুষ্ট, গর্দান-বিশিষ্ট দৈত্যের মতো একটি লোক। বেচারিও রাত তিনটে থেকে উঠে একটা গোটা চওড়া বেঞ্চ জুড়ে শুয়ে থেকে, আমাকে নজর রাখতে শুরু করলেন। আমার কিন্তু বেশ লাগত ওঁদের এই বাড়তি তৎপরতা। একধরনের চোর-পুলিশ খেলা।

ইতির ওখানে বসে পড়াশোনা করাটা আমার কাছে যেন উৎসবের মতো ছিল।

ও এসে বসলেই আমার শেষ রাতটা অন্যরকম হয়ে যেত। মনে হতো হাজার হাজার কোকিল আমার চারপাশে ডাকতে শুরু করেছে। আলাদা একটা ঘ্রাণ রাতের খাঁজে খাঁজে ছড়িয়ে যেত। আমার সারা শরীর জুড়ে উৎসব শুরু হয়ে যেত। আমি বিছানায় জেগে জেগে মশারির ফাঁক দিয়ে ইতিকে দেখতাম। ইতিও মাঝে মাঝেই চমকে উঠত আমার মশারির সামান্য খসখস শব্দে। ওর কাকার ঝিমোনো চোখে মাঝেমধ্যেই অস্থির ইতি ধরা পড়ে যেত। কিন্তু ও কম চালাকি করত না, সামনের জলচৗকি তুলে নিজের বসবার জায়গাটা মিথ্যে মিথ্যে ঢুঁড়ে ফেলে দেখত, যেন কোনও পোকামাকড় হঠাৎ এসে পড়ে হাঁটছে।

একদিন দেখি ওর কাকা নাক ডাকছে, পেছন ফিরে দেয়ালের দিকে মুখ করে বেঘোরে ঘুমোচ্ছে। সেদিন কী তিথি ছিল মনে নেই। গোটা পৃথিবীটা চাঁদের আলোয় ভাসছে। উঠোনের আমগাছটা ভিজছে রুপোর তরল স্রোতে। চমৎকার হাওয়া দিচ্ছে। সামান্য গরম ছিল, হাওয়ায় ভেসে গিয়েছে। আমি মশারির ভেতর থেকে ইতিকে দেখতে গিয়ে দেখি ও আমার দিকে মগ্ন হয়ে তাকিয়ে রয়েছে।

আমার কী হল আমি জানি না, সমস্ত নিষেধকে তুড়ি মেরে বেপরোয়া হয়ে উঠলাম। মশারির বাইরে আমার অশান্ত হাত। আমি ওর বাঁহাতের আঙুল ভয়ে ভয়ে আলতো ছুঁয়ে দিলাম। ও কেঁপে কেঁপে উঠল।

তারপর হঠাৎই উঠে ঘরের ভেতর চলে গেল। আমি প্রমাদ গুনলাম। এবার বুঝি আমার মান সম্মান কেরিয়ার সব যাবে। চরিত্রে কালির দাগ পড়বে। চাকরিটা যাবে। হাড়গোড় আস্ত থাকবে না। খুনও হয়ে যেতে পারি। কিন্তু তেমন কিছু ঘটল না।

মিনিট দুয়েক বাদে ও ফিরে এল। কেমন ওলট-পালট হয়ে গিয়েছে। এসে বসল একেবারে আমার মশারির গা ঘেঁষে। ওর থেকে আমার দূরত্ব মাত্র এক ইঞ্চি। আমি নিজের সাহস (বা দুঃসাহস) ফিরে পাচ্ছি। ক্রমশ দুঃসাহসী হচ্ছি। নিজেকে আর নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারছি না। আমার ভেতরে এক অশান্ত যুবকের উত্থান হচ্ছে। আমি ভুলে গেলাম আমার বাস্তব।

আমার হাত একটু একটু করে এগোল। এগোতে এগোতে ওর কোমর ছুঁল, প্রতিরোধহীন মসৃণ এই যাত্রায় আমি আরও এগোলাম। আমার উদগ্রীব আঙুল কিলবিল করে ওপরে উঠছে এবং… ও গড, ওর সম্পূর্ণ মুক্ত বক্ষ, ব্রা বিহীন, অপরূপ দুটি অমৃতভান্ড টানটান হয়ে উঠেছে এবং এই প্রথম, এই অমৃতভাণ্ডের স্বাদ গ্রহণ করলাম আমি… ও থরথর করে কাঁপতে লাগল। ওর প্রহরী কাকার নাক তখনও ডেকে চলেছে।

এভাবে ভয়ে আতঙ্কে, নিষিদ্ধ আনন্দের শিহরণে, নেশায় আমাদের দুজনের দিনগুলি ব্রহ্মানন্দে কেটে যাচ্ছিল। আমি সতর্ক, কিছুটা সংযত থাকি। আমি জানি নিয়ন্ত্রণ রেখার এপারে থাকাই এখন শ্রেয়। আমার চাকরি বাঁচল, ওর পরীক্ষা। দুজনে দূরে থাকি কিন্তু হূদয়ের কাছে, যেন এই মাত্র ওর উষ্ণ শ্বাসপ্রশ্বাসের শব্দ শুনলাম। ওর শাড়ির খসখস, চটির শব্দ, হাসির উচ্ছ্বাস বা বুকের ওঠানামায় আমার আত্মা প্রাণিত হচ্ছে গভীর ভাবে, বেঁচে আছি আমি। হঠাৎ বজ্রাঘাত।

একদিন ইস্কুলে যাচ্ছি। ওদের বাড়ি থেকে বেরিয়ে একটা ছোট্ট জংলা ভুলভুলাইয়া পার হয়ে ইস্কুলে যেতে হতো। এই জায়গাটা ছিল আমাদের চকিত দেখা, চকিত চলে যাওয়ার মঞ্চ। হঠাৎ পেছন থেকে চটির শব্দ। পেছন ফিরে দেখি একজোড়া লম্বা বিনুনি, সাদা ফিতে, সাদা শাড়ি, হালকা প্রসাধনে ইতি। ইতি অনেক বড়ো হয়ে গেছে। অনেক সপ্রতিভ। আমার হাতে ঝটপট একটা চিরকুট… গুঁজে দিয়ে হরিণীর মতো দ্রুত চলে গেল।

‘কাল বিকেলে পালাব বাড়ি থেকে। ওরা আমাকে টর্চার করতে শুরু করেছে। পরশু ওরা কোন এক ব্যবসায়ীর ছেলেকে নিয়ে আসছে আমাকে দেখানোর জন্য। পরীক্ষার পরে বিয়ে। পাকা কথা হয়ে থাকবে। আমি তোমার সঙ্গে পাতালে যেতেও রাজি। আমি এই জীবনকে অস্বীকার করতে চাই। আমি কলেজ-ইউনিভার্সিটি-পোস্ট গ্রাজুয়েট-গবেষণা… অনেকটা ধাপ এগোতে চাই। গাড়ি ব্যবসায়ী, মাতালদের বউ হয়ে কাঁঠালগাছ হওয়ার জন্য আমার জন্ম হয়নি। তুমি আমাকে এখান থেকে নিয়ে কলকাতা পালাবে। টাকা-পয়সা, ভবিষ্যৎ কোনওকিছুই চিন্তা করবে না। ও চিন্তার ভার আমার। ঠিক বিকেল তিনটেয়, আমি রেডি হয়ে ইস্কুল থেকেই উড়ে যেতে চাই। আমি বাসস্টপে, বুড়িমাসির পানের দোকানে দাঁড়িয়ে ওর সঙ্গে গল্প করতে থাকব। তুমি ওখানে আসবে পান খাওয়ার আছিলায়। তিনটে কুড়িতে একটা এক্সপ্রেস বাস আসে। তুমি হঠাৎই পেছনের গেটে উঠে পড়বে, আমি সামনের গেটে। জীবন-মরণের ব্যাপার। আশাকরি মনে থাকবে।’

ক্লাসে মন বসাতে পারলাম না। বারবার অন্যমনস্ক হলাম।

সারারাত চিন্তা করেও কূলকিনারা খুঁজে পেলাম না। এক মুহূর্তের জন্যও ওকে কাছে পেলাম না যে কিছু জিজ্ঞেস করব। শেষরাতে সিদ্ধান্তে এলাম, জীবনে ঝুঁকি না নিলে কিচ্ছু হবে না। আমি পাপ করছি না। নাবালিকা হরণও করছি না। কোর্টে দাঁড়িয়ে যা বলার বলব দুজনে। পরের দিন। শতাব্দী পেরিয়ে যেন বিকেল এল। আমি অন্যমনস্কতার ভান করে বাসস্টপের দিকে এগোচ্ছি। ওকে দেখলাম দূর থেকে বুড়িমাসির সঙ্গে গল্প করছে আর এদিক ওদিক তাকাচ্ছে। কিন্তু হা হতোস্মি! হঠাৎ কোথা থেকে এসে পড়লেন তার দৈত্য কাকা।

এই, এখানে কী করছিস?

চকোলেট কিনছি।

ঠিক আছে। চকোলেট-এর পয়সা দিয়ে দে। বাইকে ওঠ। আমি তো বাড়ি যাচ্ছি।

না– আমি –

না– আমি, কী? চল চল। দেরি হচ্ছে।

বাইকে চলে গেল। আমি মাঝপথে আটকে রইলাম।

পরের পরের দিন ছেলেটি এল ওকে দেখতে। বাড়িতে সাজো সাজো রব। কিন্তু ইতি তার বিছানা ছেড়ে উঠল না। ওর ধুমজ্বর।

এই উঠতি-আধুনিক-হওয়া গ্রামে বসন্ত এল। কোকিল-কূজনে ভরে গেল বাতাস। পলাতক ঘুঘুরা ঘরে ফিরল। রাস্তার দুপাশের ন্যাড়া গাছগুলো নতুন পোশাক পরে সেজে উঠল। বকুল-শিরিষ-অর্জুন-বয়েড়া এমনকী বাঁশ ঝাড়েও ফুটে উঠল আহ্লাদ। ফাল্গুনে আম্রমুকুল বিকশিত হল কিন্তু আমাদের দুজনের মধ্যে ফুটে ওঠা জীবনমুকুল বুঝিবা শুকোতে লাগল। আমি নিজেকে কঠিন করে ভেতরের নিজেকে চাবকাতে লাগলাম। বারবার বললাম, এই খুচরো খেলায় নিজেকে ধিকিধিকি জ্বলতে দেওয়া উচিত নয়।

কিন্তু যতই কঠিন হতে যাই ততই ইতির স্নিগ্ধ প্রত্যয়ী চোখ আমাকে নরম করে দেয়। এদের বাড়ির পাহারা এখন আরো আঁটওসাঁটও।

যে বসন্তের কথা বলছি, সেই বসন্তকালে দুটি ঘটনা ঘটল। একটি ভেতরে আরেকটি বাইরে।

আমি প্রাণপণে চেষ্টা করে যাচ্ছি ইতির সঙ্গে একটিবারের জন্য দেখা করতে। নির্জনতা খুঁজছি কিন্তু নির্জনতা নির্বাসিত তখন জীবন থেকে। এখন ইস্কুলে পৗঁছিয়ে দিয়ে আসেন ইতির মা আর নিয়ে আসেন সেই দৈত্যকাকা।

হঠাৎ একদিন ইতি, ইতির বাবা মা এবং কাকা বাড়ি থেকে উধাও। আমার প্রবল কৗতূহল কিন্তু পরিবারের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে নাক গলানোটা আমার মতো সামান্য ‘মাস্টার’ এর উচিত নয়। দগ্ধাতে লাগলাম। আমার এক পূজনীয় বাংলার মাস্টারমশাই যখন ‘রাবণের রণশয্যা’ পড়াতেন তখন একটা বর্ণনা দিতেন পুত্রশোকাতুর রাবণের মনের বেদনা বোঝাতে।

মাস্টারমশাই আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, বলতো দেখি কেমন সে ব্যথা?

আমি বলেছিলাম হুতাশনের মতো তাঁর বুকের ভেতর জ্বলছে শোক।

ইয়েস মাই বয়, ইউ আর কারেক্ট। এটা স্রেফ আগুন নয়, এটা হুতাশন। গভীর থেকে গুমরনো আগ্নেয়গিরি!

এই টেস্ট পরীক্ষার আগে ইতি কোথায় গেল? নাকি ইতির এখানেই ইতি হয়ে গেল?

কেউ একজন বললেন, আজ মনে নেই, ইতিকে ডাক্তার দেখাতে নিয়ে যাওয়া হয়েছে টাটায়। আমার মনে খটকা, এত ভালো ভালো ডাক্তার কলকাতায় থাকতে টাটায়?

চারদিন পরে ইতি একা ফিরে এল বিধবস্ত চেহারা নিয়ে। একেবারে ইস্কুলের আগে। আমি ইস্কুলে বেরোচ্ছি, ইতিকে একা ফিরতে দেখে চমকে গেলাম। ইতি কোনও উত্তর না দিয়ে ইস্কুল যাওয়ার জন্য তৈরি হতে গেল।

আমার বুক ফেটে যাচ্ছিল কিছু জানার জন্য, কিন্তু ক্লাসে খাতা দেখতে গিয়ে ওর খাতার দুলাইন পেলাম। ‘জোর করে টাটায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল আরও একটা সম্বন্ধের জন্য। আজ ছেলের আমাকে দেখতে আসার কথা। আমি বাবা মাকে পুরোপুরি চুক্বি দিয়ে পালিয়ে এসেছি। আজ রাতে আমার মৃত্যু লেখা আছে। ওরা ফিরলেই আমি শেষ।’

আমি লিখলাম একটা লাইন, ‘রাতে একবার দেখা কোরো।’

কিন্তু পরীক্ষার ঠিক আগে বলেই বোধহয় ইতিকে কেউ ঘাঁটাল না। সব চুপচাপ হয়ে গেল। সন্ধে থেকেই আমার অপেক্ষা। ঘন্টা… মিনিট…. সেকেণ্ড… অনন্তকাল অপেক্ষা করে আছি। ইতি, একবারটি এসো… ইতি, প্লিজ…।

রাত ন’টা নাগাদ আমার মাথা ধরল। মাথা তুলতে পারছিলাম না। মরাইয়ের একেবারে শেষ প্রান্তে গিয়ে একটা মাদুর পেতে শুয়ে রইলাম মাথায় রুমাল বেঁধে।

ইতি আসছে না। একটু বাদেই তো খেতে ডাকবে। তারপরে রাত। রাতের পরে দিন। ক্লাস… কী হল ইতির?

ঘুমিয়ে পড়লাম ক্লান্তিতে।

ইতি কখন এল টের পাইনি। টের পেলাম যখন দুটি দরদি হাত আমার কপালের রুমাল খুলে দিয়ে আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে।

আমার মধ্যে অনেকদিনের আগল খুলে নির্গত হতে লাগল আবেগ। আমি কী করব ভেবে না পেয়ে ওর মুখটা যত্নে নামিয়ে আনলাম আমার মুখের ওপর। আনাড়ির মতো চুমুতে চুমুতে ওকে পাগল করে দিলাম। কিন্তু কয়েক সেকেণ্ড মাত্র। হঠাৎ ছিটকে চলে গেল অন্ধকারে। আসরে এসে গেলেন ওর মা, একটা হ্যারিকেন নিয়ে। আমি চোখ বন্ধ করে পড়ে আছি। উনি কিছুক্ষণ দাঁড়ালেন তারপর চলে গেলেন বিফল হয়ে।

পরেরদিন গৃহকর্তা ঠাণ্ডা চোখে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, এবার আপনাকে একটু বোর্ডিং-এ থাকতে হবে। আমার আত্মীয়রা আসছে। তাদের জায়গা দিতে পারছি না, বেশ কয়েক মাস থাকবে ওরা। আমার ছেলেমেয়েদের আপনি যেরকম গাইড করতেন সেরকমই করবেন। ওরা গিয়ে ওখানে পড়ে আসবে। মাসে মাসে মাইনেটা পাঠিয়ে দেব। আমার মুখে এসে গিয়েছিল, কিন্তু এখন যে পরীক্ষা। এখন কোনরকম ডিসপ্লেসমেন্ট হলে ওদের মনের ওপর চাপ পড়বে। কিন্তু বলতেই পারলাম না। নাহ্, ওদেরকে কোনও সুযোগ নয়। আমাকে সংযত হতে হবে। কিন্তু এখন যে আমি মুগ্ধ বালক। ভূতগ্রস্ত বা আলেয়াগ্রস্ত। আলেয়া কী? ঠিক বুঝতেও পারি না এসব ধনবান ব্যক্তিদের আহ্লাদী কন্যার মতিগতি। কিন্তু ইতি তো আর পাঁচটা মেয়ের মতো নয়? ওর অনুরাগ শ্রদ্ধা-ভালোবাসার মধ্যে তো কোনও খাদ নেই?

ইতিতে মগ্ন আমি এক উদ্ভ্রান্ত পথিক। বোর্ডিং-এর এই খাঁ খাঁ জীবনে শূন্য হয়ে যাই।

বারো ক্লাসের টেস্ট পরীক্ষা হয়ে গেল। এতদিন ইতি নামক একটি মেয়ে চলমান ছবির মতো আমার সামনে দিয়ে যেত আসত। তার চোখ আমাকে খুঁজত। নানান ছুতোনাতায় আমরা নিঃশব্দে কাছাকাছি হতাম। ওর শরীরের ঘ্রাণ নিতাম। ও হাসত পূর্ণতার হাসি।

কিন্তু এখন কী হবে? জয় করে তবু ভয় যায় না যে!

একদিন বাদে হেডমাস্টারমশাই আবার তাঁর ঘরে একা আমার সঙ্গে কথা বলতে চাইলেন।

আপনার ওপর অনেকটাই ভরসা করেছিলাম।

ভরসা হারানোর তো কোনও কারণ দেখছি না স্যার।

কালকের ছোকরা আপনি। সামনে এতবড়ো জীবন পড়ে আছে। এমন ভাবে জীবনটাকে একটা ছোট্ট গণ্ডির মধ্যে বেঁধে ফেলে নষ্ট করছেন কেন?

মানে, বুঝলাম না স্যার।

আপনার সঙ্গে ইতির কোনও সম্পর্ক তৈরি হয়েছে?

এটা আমার ব্যক্তিগত ব্যাপার স্যার। এর সঙ্গে ইস্কুলের ভূমিকার কোন ক্ল্যাশ হওয়া উচিত নয়।

যা জিজ্ঞেস করছি সরাসরি উত্তর দিন। ব্যক্তিগত অনেক সময় সমষ্টির জান-মান নিয়ে টানাটানি করে। বেঘোরে প্রাণটা দিতে চান না নিশ্চয়ই?

অবশ্যই না।

তাহলে শুনুন, এসব ভুলে গিয়ে নিজের কাজে মন দিন।

আমার কাজে কি আপনি অসন্তুষ্ট?

না, একেবারেই না। তবে কাজের লোককে অকাজে নষ্ট হতে দেওয়া আমার কাজ নয়।

আমি তো স্যার কোনও অকাজ করিনি। কোনো অভিযোগ আছে আমার বিরুদ্ধে?

আছে। আপনি বোধ হয় জানেন, এক সপ্তাহ ধরে ইতি আপনার পাশের ঘরে শুত এবং ওর বাবা মায়ের রিপোর্ট অনুযায়ী ওর ঘরের দরজা ভেজানো থাকত সাতদিন ধরে।

স্ট্রেইঞ্জ! আই নো নাথিং অফ ইট!

ভান করবেন না। আপনাদের মধ্যে কোনও শারীরিক সম্পর্ক হয়েছে?

না স্যার, একেবারেই না।

ঠিক বলছেন তো? এটার ওপর কিন্তু অনেক কিছু নির্ভর করছে।

হান্ড্রেড টেন পার্সেন্ট স্যার। বিলিভ মি।

অবাঞ্ছিত কোনওকিছু ঘটলে আপনার কেরিয়ার শেষ। ফিজিক্যাল অ্যাসল্টও হতে পারে। আমি কিন্তু আপনাকে বাঁচাতে পারব না।

রেস্ট অ্যাসিওর্ড স্যার।

ডিসগাস্টিং। নিজের ওপর, সারা দুনিয়ার ওপর রাগ হচ্ছে।

ইতির মুখটা ভুলে যেতে চেষ্টা করলাম। বোর্ডিং-এ, নিজের বিছানায় মুখ খুঁজে পড়ে রইলাম। জানালা দিয়ে আকাশটা বিষণ্ণ দেখাচ্ছে। গাছপালাগুলো ধূসর। পাখির ডাক বিস্বাদ। ইস্কুল বিল্ডিংটা অন্ধকারে ডুবে আছে। সন্ধের আগেই সন্ধে ঘনিয়ে এসেছে। জানালা দিয়ে একটা দলা পাকানো কাগজ এসে পড়ল আমার ওপর। চকিতে সরে গেল সান্ধ্য অবয়ব।

এর মধ্যে মামাতো দাদা আরেকজন পাত্র নিয়ে এসেছিল। সেদিনও আমার ধুমজ্বর এল। ওরা আমার খেলা ধরে ফেলেছে। ওরা বড়োসড়ো কিছু ঘটিয়ে দেওয়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। হায়ার সেকেন্ডারি পরীক্ষার পরই আমার জারিজুরি শেষ। কিন্তু আমি এত সহজে হার মেনে যাবার পাত্রী নই। তুমি আমায় বলেছিলে না, আলোর দিকে যেতে হবে? তুমি আমার হাত ধরলে আমি কাউকে ভয় পাই না। পরীক্ষা যেদিন শেষ হবে, তার পরের দিনই আমি পালাব। আমি মরিয়া। মনে মনে প্রস্তুতি নিয়ে নাও। পরের পরিকল্পনা পরে জানাব। পালিয়ে আমি যাবই। ওরা কেউ আমাকে ধরে রাখতে পারবে না।

টিউশন পড়তে এসে ইতি কোনও টাস্ক দিল না। পড়া শেষ হয়ে গেলে ওঠার সময় বলল, স্যার, আমার এই এসে-টা একটু দেখে দেবেন? খাতাটা রইল, পরে নিয়ে নেব। ওর চোখ আমাকে কিছু বলতে চাইল।

আমি কিছুক্ষণ পরে খাতার ভেতর থেকে আর একটা চিরকুট নিয়ে টয়লেট-এ গিয়ে পড়লাম ‘পরীক্ষার পরের দিনই ঠিক রইল। এখানে নয়, পরের বাসস্টপে গিয়ে আমি দাঁড়াব। তুমি, যে বাসটার কথা বলেছি, তাতেই উঠবে এখান থেকে। পরের বাসস্টপে একটু নেমেই তুমি আমাকে দেখতে পাবে। টুক করে উঠে পড়বে বাসে। কেউ যেন না দেখে।’

আমি প্ল্যান মতো পরের বাসস্টপে নেমে গেলাম। ইতিকে খুঁজলাম। ইতি নেই। অনেকগুলি বাসে উঠলাম। একটি ছাত্র আমাকে দেখে ফেলল। স্যার, কোথাও যাবেন?

না, আমার এক বন্ধু আসার কথা আছে, তাই-ই।

ওহ্, স্যার, পরীক্ষা ভালো হয়েছে আমার।

আমার কানে কিছুই ঢুকছিল না। হ্যাঁ, হু করে গেলাম।

ব্যর্থ, পরাজিত মানুষের মতো ফিরে এলাম বোর্ডিং-এ।

ইতি এল কয়েকদিন পরে। স্যার, খাতাটা নিতে এলাম। আর একটা খাতা দেব স্যার। এর পরে আর জ্বালাতন করব না। ওকে দেখে মনে হল এক বিপন্ন ত্রস্ত মানুষের মতো। ও চলে গেল।

আমি ওর দিকে তাকাতেও পারলাম না। অভিমান, ক্ষোভ, রাগ অনেক কিছু আমাকে আটকে দিল নিজের ভেতরে।

খাতাটা খুলেই ধপ করে বসে পড়লাম বিছানায়।… তারিখে আমার বিয়ে।

আমি তলিয়ে যাচ্ছি। ডুবে যাচ্ছি। আমার হাতটা ধরে রাখুন না…!

ভোরবেলা উঠে একটা ছোট্ট চিঠি লিখে ওর খাতায় আটকে দিলাম, ‘আমি এখনও তোমার হাত ধরে আছি। কিন্তু তুমি কি পারো না– আর একটু সাহস দেখিয়ে মুখোমুখি রুখে দাঁড়াতে? বিয়ের মালাটা লোহার বেড়ি নয়। পারো না ওটাকে ছুড়ে ফেলতে? তাহলে এতদিন এই মারণ খেলায় মেতেছ কেন? পালিয়ে বেড়ানোটা কোনও কাজের কথা নয়!’

এই প্রথম ব্যতিক্রম হল। ওর বোন এসে খাতাটা নিয়ে গেল। আমার চিঠিটা আমি আঠা দিয়ে এমন ভাবে আটকে দিয়েছি যে কেউ তার হদিস পাবে না।

আমি ওর বোনকে বলে দিলাম, খাতাটা অবশ্যই যেন দিদিকে গিয়ে দিয়ে দেয়। আমি কারেক্ট করে দিয়েছি।

আজ ওর বিয়ে। আমি কীভাবে নিজের বর্ণনা দেব? দেবদাস? নিজেকে নানান প্রশ্নে ক্ষতবিক্ষত করছি আমি। হঠাৎ দেখি বাস রাস্তা থেকে কাঁদো কাঁদো মুখে কীসব বলতে বলতে ওর দাদা এবং কিছু লোক ছুটে আসছে ইস্কুলের দিকে। বুকটা ছাঁৎ করে উঠল।

একজন সিনিয়র টিচার আমার কাছে দ্রুত এসে গেলেন।

শোনো, এই গলি রাস্তা দিয়ে, মেঠো পথ ধরে, পালিয়ে যাও। দৌড়োও। এক মুহূর্তও দেরি কোরো না।

যাও–

কী হয়েছে স্যার?

ইতি সুইসাইড করেছে। যাও, পালাও !

আমি পালিয়ে গেলাম।

সেদিন থেকে আজ পর্যন্ত, যখনই ইতির মুখ মনে পড়ে যায়, আমি নিজের থেকে পালিয়ে পালিয়ে বেড়াই। কত দূরের পথ আমি জানি না, কিন্তু পালানো ছাড়া আর যে কিছুই করার নেই আর আমার!

জীবনের জলছবি

সন্ধে হয়ে আসছে দেখে দীপিকা বিছানা ছেড়ে তাড়াতাড়ি করে বালিশ, চাদর গোছানোতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। শ্যাম্পু করা রেশমের মতো হালকা চুলগুলো ইতিউতি ওর গোলাপি গালে বারবার উড়ে আসাতে ও বিরক্ত বোধ করছিল আর বারবারই শেপলি কোমল আঙুলগুলো দিয়ে চুলগুলো কানের পাশে ঠেলে দিতে চেষ্টা করছিল।

‘প্লিজ উঠে পড়ো… চাদর ভাঁজ করতে হবে’, বলতে বলতে দীপিকা শুভ্র-কে ধাক্বা দেয়। শুভ্র তখনও বিছানা অাঁকড়ে পড়েছিল।

‘থাকতে দাও না চুলগুলো মুখের উপর… মনে হচ্ছে যেন মেঘ চাঁদকে ঢাকবার চেষ্টা করছে, দীপিকার আপ্রাণ চেষ্টা দেখে শুভ্র শুয়ে শুয়েই মন্তব্য করল।

‘সন্ধে হয়ে আসছে শুভ্র, এবার যদি মেঘেদের বাড়ি না পাঠাই তাহলে আজ তোমার এই চাঁদকে একেবারে অস্ত যেতে হবে, বুঝেছ সোনা?’

‘তোমার আবার কীসের ভয়? না তোমার থাকার জায়গার অভাব আর না তোমাকে থাকতে দেওয়ার লোকের অভাব… যেদিন তুমি হ্যাঁ করবে সেদিনই আমি…’

‘ব্যস ব্যস, হ্যাঁ তো বলেইছি… এখন বাড়ি যাও। উদয় আসার সময় হয়ে গেছে… ততক্ষণ আমি সবকিছু ঠিকঠাক করে নিই’, যত দ্রুত সম্ভব অবিন্যস্ত ঘরটা গোছাতে গোছাতে দীপিকা জিজ্ঞেস করল, ‘কাল কখন আসবে?’

‘ওই একই সময়, বারোটার কাছাকাছি, বলেই শুভ্র একটু সিরিয়াস হল, ‘দীপা, এই ভাবে লুকিয়ে লুকিয়ে দেখা করতে আর ভালো লাগছে না, মনে হয় যেন কোনও অন্যায় করছি।’

‘অন্যায় তো আমরা করছি বটেই শুভ্র। আমরা দুজন যদি বিবাহিত স্বামী-স্ত্রী হতাম তাহলে অন্য কথা ছিল, কিন্তু এখন আমি উদয়ের স্ত্রী… তুমি এখানে আসো আমার সংগীতশিক্ষক হিসেবে। এই পরিস্থিতিতে আমাদের এই সম্পর্ক গড়ে তোলাটা অন্যায় নয়-তো কী?’

‘এরকম কেন বলছ?

উদয়ের অনেক আগেই আমি তোমার জীবনে এসেছি। যদি

জাত-ধর্ম তুলে আমাদের দু’জনের বাড়ির লোকেরা বাধা না দিত আমাদের প্রেমে, আর অন্য শহরে তোমার বিয়ে না দিয়ে দিত জোর করে, তাহলে হয়তো…’

‘ছাড়ো পুরোনো কথা। এটাই তো ভাগ্য বলতে হবে যে অন্য শহরে এসেও তোমার সঙ্গে হঠাৎ-ই দেখা হয়ে গেল। ভগবানও আমাদের দুজনের প্রেম দেখে উপায় একটা করেই দিয়েছেন।’

অফিস থেকে ফিরে উদয় বারান্দায় চেয়ারে বসে চায়ে চুমুক দিচ্ছিল, দীপিকা সামনে বসে উল বোনায় নিজেকে ব্যস্ত রেখেছিল। শুভ্র বরাবরই দীপিকার হাতের তৈরি জিনিস খুব পছন্দ করত তাই কখনও সোয়েটার, দস্তানা ইত্যাদি বানিয়ে দীপিকা শুভ্রকে উপহার দিত। উদয় জিজ্ঞেস করলে বলত, বান্ধবী বা ছোটো ভাইয়ের জন্য তৈরি করছে।

দু’বছর হয়ে গেল উদয়ের সঙ্গে দীপিকার বিয়ের। প্রথম প্রথম দীপিকা খুব চুপচাপ থাকত, উদয় ভাবত নতুন শহরে এসে নতুন মানুষদের মধ্যে দীপিকার মন খারাপ লাগছে। আসলে শুভ্রকে ছেড়ে আসার জন্যই দীপিকা সবসময় উদাস থাকত।

বারবার দীপিকার মনে পড়ত সেই দিনটার কথা। ও আর শুভ্র সিনেমা দেখে হাত ধরাধরি করে হল ছেড়ে বেরোচ্ছিল হঠাৎ বড়দা-র সঙ্গে মুখোমুখি হয়ে যায়। বড়দাই দীপিকার হাত ধরে টানতে টানতে বাড়িতে এনে ফেলেছিল। বাবা জানতে পারায় ঘরে ওকে গৃহবন্দি করে রাখা হয়েছিল। কোথাও যাওয়া-আসা বা কারও ওর সঙ্গে দেখা করতে আসা একেবারে বারণ হয়ে গিয়েছিল। অবশ্য দীপিকা প্রতিবাদ জানাবার চেষ্টা করেছিল। প্রায় আড়াই দিন খাবারে হাত ছোঁয়ায়নি, খিদে সহ্য করে ঘরে পড়েছিল কিন্তু কাউকে এতটুকু নরম হতে দেখেনি। অগত্যা খিদের জ্বালা সহ্য করতে না পেরে শেষমেশ ওকেই হার মানতে হয়েছিল। শুভ্র-র জাত আলাদা এই অজুহাতে বাড়ির কেউই এই সম্পর্কটা মেনে নিতে পারেনি।

ধীরে ধীরে দীপিকার মনোবল কমতে থাকে। ১৫ দিনের মধ্যে ওর বিয়েও ঠিক করে ফেলা হয়। কে ওর স্বামী হতে চলেছে বা কোন পরিবারে ওর বিয়ে হচ্ছে এইসব জানার কোনও আগ্রহ বোধ করেনি ও। উদয়ের সঙ্গে বিয়ে হয়ে যায় দীপিকার। বিয়ের পর উদয়ের সঙ্গে রায়পুর চলে আসে দীপিকা। কোম্পানির ফ্ল্যাট, ওখানেই থাকার ব্যবস্থা। ওর শ্বশুরবাড়ি ওর ফ্ল্যাটের থেকে বেশ খানিকটা দূরেই ছিল।

উদয় ছেলেটি খুবই ভালো। সামান্য গম্ভীর প্রকৃতির হলেও অত্যন্ত সহজ সরল। যে-কোনও মেয়েই ভাগ্য মনে করবে উদয়ের মতো স্বামী পেয়ে। নিজের স্ত্রী-র ভালোমন্দ সবকিছুর খেয়াল রাখত উদয়। এমনকী ফুলশয্যার রাতে দীপিকার মন ভালো নেই দেখে সামান্য মৗখিক ভদ্রতাটাকু সেরে দীপিকাকে একটু একা থাকার সুযোগ পর্যন্ত করে দিয়েছিল ও। নতুন পরিবেশে যাতে দীপিকা নিজেকে মানিয়ে নিতে পারে তার সমস্ত সুযোগ সুবিধাগুলিও নিজের উদ্যোগেই ব্যবস্থা করেছিল। ধীরে ধীরে শুভ্রর চিন্তা মন থেকে মুছে ফেলাই নিজের জন্য শ্রেয় মনে করল দীপিকা। নিজের নতুন সংসারে নতুন করে নিজের সুখ-শান্তি খুঁজে নিতে মনঃসংযোগ করল ও।

অফিসে প্রোমোশন পাওয়ার খুশিতে উদয় বাড়িতে একটা ছোট্ট পার্টির আয়োজন করল। আমন্ত্রিত অতিথিদের, মধ্যে সকলেই উদয়ের বন্ধুবান্ধব। পার্টিতে অতিথিদের বিশেষ করে উদয়ের অনুরোধে দীপিকাকে গানও গাইতে হল সকলের সামনে। সকলেই দীপিকার সুরেলা কণ্ঠের প্রশংসা করল।

অতিথিরা চলে যেতে উদয় এসে দীপিকার কাজে হাত লাগাল বাড়ি পরিষ্কার করতে। কাজ করতে করতেই বলল, ‘আমি জানতামই না যে আমার বউয়ের গানের গলা এত সুন্দর। তুমি গান শিখছ না কেন? তোমার মনও ভালো থাকবে আর শখও মেটানো হবে।’

শুভ্রর কথা মনে হল দীপিকার। গানের ক্লাসেই শুভ্রর সঙ্গে ওর আলাপ। ওদের দুজনের গলার দ্বৈতস্বরের মিলিত সুধা সকলকে মুগ্ধ করে দিত। একসঙ্গে ক্লাস করতে করতে কবে যে একে অপরের প্রতি আকর্ষিত হয়ে পড়ে তা আজ আর ঠিক করে মনে করতে পারে না দীপিকা। শুধু মনে পড়ে দুজনে মিলে উজ্জ্বল সংগীত জীবনের স্বপ্ন দেখত ওরা। কিন্ত ফেলে আসা ওই একটি দিনের ঘটনা জীবনের সব স্বপ্নকে তছনছ করে দিয়ে চলে গেছে আজ এই সত্যটাই সবচেয়ে বড়ো বাস্তব দীপিকার জীবনে। আজ এতদিন বাদে হঠাৎ উদয়ের মুখে গানের কথা ওঠাতে দীপিকা কোনও উত্তর দিতে পারল না।

উদয়-ই এদিক ওদিক খোঁজ করে শুভ্রকেই বেছে দিল দীপিকার নতুন মাস্টার হিসেবে। সত্য না জেনেই ওকে বাড়িতে নিয়ে এল স্ত্রীর সঙ্গে পরিচয় করাতে, ‘দীপিকা, ইনি আজ থেকে তোমাকে গান শেখাবেন। এই অঞ্চলে শিল্পী হিসাবে উনি বেশ শোরগোল ফেলে দিয়েছেন। ওনার নাম শুভ্র রায়।’

এদিকে দীপিকাও হঠাৎ শুভ্রকে সামনে দেখে বিস্ফারিত চোখে শুধু তাকিয়ে থাকে। ঠোঁট থেকে গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে ওঠে। কথা বেরোয় না গলা দিয়ে। উদয় ওদিকে লক্ষ্যই করে না। দুজনের পরিচয় করিয়ে দিয়েই উদয় অফিসের জন্য বেরিয়ে পড়ে।

‘তুমি এখানে কী করে? এক শহর থেকে অন্য শহরে আমার পিছু নিয়েছ নাকি?’

‘আরে না, না। ভুল বুঝছ তুমি। আমি তো এখানে এসেছিলাম কাজ করতে। আমার এক বন্ধু ওর অফিসে ফ্রিল্যান্স কিছু কাজের খোঁজ দিয়েছিল। সেই সুবাদেই এখানে এসে পড়ি। অফিসের অনুষ্ঠানে গান গেয়ে খুব জনপ্রিয় হয়ে গেছি দীপু।

‘আমি এখন আর তোমার ‘দীপু নই। সেই অধিকার তুমি হারিয়েছ। আমি এখন বিবাহিত, উদয়ের বিবাহিত স্ত্রী।

নিয়তির খেলা বোঝে কার সাধ্য? শুভ্র আর দীপিকার হঠাৎ করে এইভাবে দেখা হওয়াটা নিয়তি ছাড়া আর কীবা হতে পারে? নিজের নিজের জীবন নিয়ে দু’জনে যেখানে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টায় ছিল সেখানে হঠাৎ এই অপ্রত্যাশিত ঘটনা আবার দু’জনকে একই জায়গায় মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিল।

‘দীপু প্লিজ, সরি ‘দীপিকা’। গান শেখাতে আসতে আমাকে না কোরো না কারণ শেখাবার জন্য যে টাকাটা পাব সেটাতে আমার খুব উপকার হবে। উদয় অতীত সম্পর্কে কিছু জানতে পারবে না আমি তোমাকে কথা দিচ্ছি, শুভ্রর গলায় আকুলতা ঝরে পড়ে।

শুভ্রর প্রয়োজন আছে বুঝে দীপিকা চাইলেও ‘না’ বলতে পারে না।

প্রায় তিনঘন্টা কেটে যায়, দুজনেই মেতে ওঠে গানের সাধনায়। পুরোনো দিনের স্মৃতি ফিরে আসে। সেই হাসি, ঠাট্টা তারই মাঝে সুরের মূর্ছনায় ডুবে যাওয়া।

পরের দিন শুভ্রকে উদাস দেখে দীপিকা নিজেকে ঠিক রাখতে পারে না, ‘অতীত নিয়ে কেন এতটা ভেঙে পড়েছ শুভ্র? যা হওয়ার সেটা হয়েই গেছে। বরং ভবিষ্যৎ আমাদের যা দিতে চলেছে সেটাকেই দ্বিধাহীন হয়ে গ্রহণ করার চেষ্টা করো।’ শুভ্রর উদাসীনতা দীপিকার ভিতরটা কুরে কুরে খেতে শুরু করেছিল।

‘চোখের সামনে তোমাকে অন্যের হতে দেখে আমার যে কতটা কষ্ট হয় সেটা তুমি কী বুঝবে! তুমি আমার ছিলে আর এখন…’ বলতে বলতে শুভ্র দীপিকার হাত শক্ত করে জড়িয়ে ধরে।

পরিণয়ে আবদ্ধ হওয়া পর্যন্ত নারীকে কুমারীত্ব, বাঁচিয়ে রাখার শিক্ষা দেওয়া হয়। দীপিকাও নিজের ইচ্ছেতে না হলেও বিয়ের পর সেই সীমা লঙঘন করে নিয়েছিল কিন্তু আজ দীপিকার মনে হল যে-কাজ একদিন নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে ওকে করতে হয়েছিল সেটা আজ নিজের খুশির জন্য করলে ক্ষতি কি? আর বাড়ির চার দেয়ালের বাইরে কারওরই ব্যাপারটা জানতে পারার কথা নয়। তাছাড়া উদয় নিজের হাতেই শুভ্রকে বাড়িতে নিয়ে এসে একপ্রকার দীপিকার জিম্মায় সব ছেড়ে দিয়েছে। শুভ্র আর দীপিকার লোভাতুর মন এই লোভ সংবরণ করতে পারল না। প্রেমের জোয়ারে সব বাধা ভেঙে ফেলে দুজনে উদ্দাম প্রেমের খেলায় মত্ত হয়ে উঠল।

এই ঘটনার পর দীপিকা আবার সেই পুরোনো দীপিকা হয়ে উঠল। উদয়ের মনে হল গানের জগতে ফিরে যেতে পেরেই দীপিকার এই পরিবর্তন ঘটেছে।

‘আমাকেও এরকম একটা সোয়েটার বানিয়ে দিও কখনও’, দীপিকার হাতে নীল রঙের উলটা দেখে উদয় বলে উঠল, ‘ডিজাইনটাও খুব সুন্দর হচ্ছে।’

‘ঠিক আছে, পরেরটা তোমার জন্য বুনব। এটা কাকার ছেলের জন্য তৈরি করছি। আসলে পরের মাসে ওর জন্মদিন।’

‘তাহলে কয়েকদিনের জন্য বাপের বাড়ি ঘুরে এসো। বহুদিন হল যাওনি।’

‘না, না। আমি গেলে তোমার খাওয়া-দাওয়ার খুব অসুবিধা হবে আর তাছাড়া…’

‘আমি কি বাচ্চা নাকি যে এত চিন্তা করছ? বাপের বাড়ি কোন মেয়ে না যেতে চায়? তুমি কিছু চিন্তা কোরো না, আমি ঠিক কয়েকটা দিন চালিয়ে নিতে পারব’, উদয় জোর করাতে দীপিকা চুপ করে যায়।

‘এবার কী হবে? কী করে আমরা দ্যাখা করব? বাপের বাড়ি থেকে, তোমার সঙ্গে দ্যাখা করা অসম্ভব। কেউ দেখে ফেললে কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে’, দুপুরে শুভ্র আসাতেও কিছুতেই দীপিকা গানে মন বসাতে পারে না।

‘চিন্তা কোরো না। আমিও তোমাকে না দেখে থাকতে পারব না। আমাকে ভাবতে দাও…’ শুভ্র একটা উপায় শীঘ্রই বার করে ফেলে। ‘এক কাজ করব। এই শহরেই দু-তিনদিনের জন্য হোটেলে একটা ঘর ভাড়া করে থেকে যাব। নিজের মোবাইল থেকে মাঝেমাঝেই তুমি উদয়কে ফোন করে কথা বলে নেবে। আমরা যদি হোটেল থেকে বাইরে না বেরোই তাহলে কেউ আমাদের দেখে ফেলারও ভয় থাকবে না’, দীপিকার শরীরে অাঁকিবুকি কাটতে কাটতে শুভ্র বলে।

ট্রেনের টিকিট হাতে ধরিয়ে উদয়, দীপিকাকে ট্রেনে তুলে দিল। পরের স্টেশনেই শুভ্র অপেক্ষা করছিল। ট্রেন থেকে নেমে দীপিকা শুভ্রর সঙ্গে হোটেল অভিমুখে রওনা দেয়। ঘর নেওয়াই ছিল। হঠাৎ-ই শুভ্রর সঙ্গে হোটেলের ঘরে যেতে গিয়ে দীপিকার মনে হল এই সম্পর্কটার শেষ কী? ও তো শুভ্রর রক্ষিতা নয় তাহলে কেন ওকে এত লুকিয়ে চুরিয়ে, সিসিটিভির ক্যামেরায় মুখ লুকিয়ে শুভ্রর সঙ্গে হোটেলের ঘরে ঢুকতে হচ্ছে?

‘শুভ্র, আগে যদি জানতাম হোটেলে উঠতে এতটা খারাপ লাগবে তাহলে আমি কিছুতেই তোমার সঙ্গে এখানে আসতাম না’, ঘরে ঢুকতে ঢুকতে দীপিকা বলে।

‘চিন্তা কী? এখন তো আমরা ঘরের ভিতরে এসে গিয়েছি। আর কথা ভালো লাগছে না। যার জন্য আমাদের এখানে আসা সেটাই আমাদের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত, দীপিকার মনে হয় কথাগুলো বলতে বলতে লোভে শুভ্রর চোখগুলো অস্বাভাবিক চকচক করে উঠল। যেন এটা ওদের ফুলশয্যার রাত।

‘দাঁড়াও, আগে উদয়কে ফোন করে নিই, যে আমি পৌঁছে গেছি।’

‘আরে আরে, কী করছ? তোমার বাপের বাড়ি তো কাল সকালে পৌঁছোবার কথা। ভুলে গেছ যে এখন তুমি ট্রেনে রয়েছ?’

‘শুভ্রর তির্যক হাসি দীপিকার ভালো লাগল না। একই ঘরে, লোকচক্ষুর আড়ালে থেকেও দীপিকার যৗবন শুভ্রর মুক্ত আহ্বানকে কোনওভাবেই স্বীকার করতে পারল না। মাথাব্যথার মিথ্যা অজুহাত দেখিয়ে দীপিকা তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়ল।

সকালে ঘুম ভাঙতে দীপিকা ঘরেতেই চায়ের অর্ডার দিল। বেয়ারা এসে চা দিয়ে চলে গেল। চা খেয়ে দীপিকা উদয়কে ফোন করল। দীপিকাকে বলার সুযোগ না দিয়েই উদয়ের কণ্ঠস্বর ভেসে এল, ‘উফ্ দীপিকা আমি চিন্তায় মরে যাচ্ছিলাম। তোমারও ফোন কিছুতেই লাগছিল না। চা-ব্রেকফাস্ট খেয়ে নিয়েছ? বুঝতে পারছি না, এই

ট্রেন-টা এত লেট রান করছে কেন? সাধারণত টাইমেই এটা পৌঁছোয়।’

ফোন ছেড়ে হাফ্ ছাড়ে দীপিকা। ভাগ্যিস উদয়কে বলে ফেলেনি ঠিকঠাক পৌঁছে গেছে বলে। ভগবানই বাঁচিয়েছেন। শুভ্রকে খুলে বলে ও।

শুভ্র স্ত্বান্না দেয়, ‘এত ঘাবড়িও না। বলোনি তো কিছু সুতরাং চিন্তা কোরো না। চলো নীচের রেস্তোরাঁ থেকে কিছু খেয়ে আসি। এইভাবে লুকিয়ে লুকিয়ে থাকার জন্য দু’জনেরই ঘরের মধ্যে দমবন্ধ হয়ে আসছিল।

দীপিকা সকালের জলখাবারে টোস্ট আর অমলেট বা পোচ খেয়েই অভ্যস্ত হয়ে উঠেছিল উদয়ের সঙ্গে থেকে থেকে। এখানেও ওই একই খাবারের অর্ডার দিল দীপিকা। শুভ্র আলুর পরোটা আর দই আনিয়ে নিল নিজের জন্য।

‘এত অল্পে পেট ভরবে দীপু’, শুভ্র খেতে বসে দীপিকাকে জিজ্ঞেস করল।

‘এখন আমরা কেউ কলেজে পড়ি না। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে খাওয়াদাওয়াটাও বদলানো খুব দরকার। উদয় সবসময় বলে…’ নিজেকে সামলিয়ে নিয়ে দীপিকা চুপ করে যায়।

এটা কী হচ্ছে ওর… বারবার উদয়ের কথা মনে পড়ছে, ওর কথা বলে ফেলছে। উদয়ের নাম শুনে শুভ্রর মুখটা রক্তশূন্য হয়ে যায়। চুপচাপ দুজনে খেয়ে উপরে নিজেদের ঘরে ফিরে আসে ওরা।

সারাদিন টিভি দেখে কাটিয়ে দেয় দীপিকা। শুভ্র দুপুরে বেরিয়ে যায় নিজের একটা কাজ নিয়ে। দীপিকা একাই ঘরে দুপুরের লাঞ্চ আনিয়ে খেয়ে নেয়। সন্ধেবেলায় শুভ্র ফিরলে দীপিকা তৈরি হয়ে ওর সঙ্গে বাইরে একটু বেড়িয়ে আসে। সারাদিন বসে বসে বোর হয়ে উঠেছিল ও। রাত্রে ডিনার শেষে ঘরে ফিরে আসে। পোশাক বদলে বিছানায় শুয়ে পড়ে এসে। আশ্চর্য হয় দীপিকা, শুভ্রর কাছে নিজেকে সঁপে দেওয়ার কোনও ইচ্ছাই জাগে না ওর মনে। বরং একটা অপরাধ বোধের ভাবনা মনের কোণে সমানে ছুরিকাঘাত করে মনকে রক্তাক্ত করতে থাকে।

শুভ্রকে এড়াতে পারে না দীপিকা। যন্ত্রচালিতের মতো শুভ্রর কাছে নিজেকে সমর্পণ করে। নালিশ জানাতে ছাড়ে না শুভ্র, ‘আজ কী হয়েছে তোমার দীপু? এরকম মেশিনের মতো ব্যবহার করছ কেন?’

দীপিকার মুখে উত্তর জোগায় না। ওর নিজের মনই কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছিল না। যেটা পাওয়ার জন্য ও এত উতলা হয়ে পড়েছিল আজ সেটা ওর হাতের নাগালে অথচ ও কেন দৗড়ে সেটা ধরার চেষ্টা করছে না, সেটা কিছুতেই বোধগম্য হয় না দীপিকার।

পরের দিন দীপিকা দু’বার উদয়কে ফোন করল। দ্বিতীয়বার যখন কথা হল, উদয়ের গলায় এমন কিছু ছিল যেটা দীপিকাকে চিন্তিত করে তুলল।

‘জানো শুভ্র, সকালে উদয়ের সঙ্গে যখন কথা বললাম তখন তো নর্মালই লাগল ওর গলা কিন্তু একটু আগে কেমন যেন ওকে চুপচাপ মনে হল। কী হতে পারে বলো তো?’

‘অফিসের কোনও টেনশন হতে পারে। তোমার যদি উদয়কে নিয়ে এত চিন্তা, তাহলে আমার সঙ্গে এসেছ কেন?’ বিদ্বেষ উগরে দেয় শুভ্র। যে উন্মুক্ত ত৫ যৗবনের স্পর্শ পেতে শুভ্র, দীপিকাকে সঙ্গে নিয়ে আসার এতটা সাহস দেখিয়েছিল সেটাই কেমন অপূর্ণ রয়ে গেল। শয্যসঙ্গিনীর শরীরের স্পর্শ অনুভব করতে পারলেও শুভ্র খুশি হতে পারল না কারণ সঙ্গিনীর শরীরে প্রাণের স্বতঃস্ফূর্ততার অভাব লক্ষ্য করল শুভ্র। তার ওপর হোটেলের এতগুলো টাকা খরচা। পরের দিনই ওরা ফিরে আসবে ঠিক করে নিল।

‘উদয় জিজ্ঞেস করলে বলে দেব ওর জন্য মনখারাপ হচ্ছিল তাই তাড়াতাড়ি ফিরে আসা’। দীপিকার কথায় শুভ্র ওর চোখের দিকে সরাসরি তাকায়,  ‘এটাই সত্যি নয়তো দীপু?’

দীপিকা উত্তর দেয় না। ওর নত দৃষ্টি-ই ওর উত্তর দিয়ে দেয়। দীপিকাকে বাড়িতে নামিয়ে দিয়ে শুভ্র নিজের বাড়ি চলে যায়।

সন্ধেবেলায় বাড়ি ফিরে দীপিকাকে দেখে উদয় অবাক হয়ে যায়।

‘সারপ্রাইজ’, বলে উদয়ের গলা জড়িয়ে ধরে দীপিকা।

‘তোমার তো দু’দিন পর আসার কথা ছিল। হঠাৎ এত তাড়াতাড়ি চলে এলে?’ উদয়ের কথায় কোনও আবেগ ছিল না।

‘তোমার কথা শুনে মনে হচ্ছে তুমি খুশি হওনি। তোমার কথা খুব মনে পড়ছিল, তাই তাড়াতাড়ি চলে এলাম’, খাবার টেবিলে দিতে দিতে দীপিকা উত্তর দিল। উদয় টেবিলে খেতে বসতেই দীপিকা বলল, ‘তোমাকে খুব ক্লান্ত দেখাচ্ছে শরীর ঠিক নেই নাকি?’

‘হ্যাঁ, একটু ক্লান্ত লাগছে। তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়লে হয়তো সকালে ঠিক হয়ে যাবে।’

পরের দিন সকালে উদয় অফিস যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছে, শুভ্র এসে উপস্থিত হল। উদয় হঠাৎই জিজ্ঞেস করে বসল, ‘কী ব্যাপার শুভ্র, আজ এত তাড়তাড়ি চলে এলে? দীপিকাকে ছেড়ে আর থাকতে পারছ না? কতদিন আর চলবে তোমার এই গানের ক্লাস?’

উদয়ের কথা শুনে শুভ্র আর দীপিকা দু’জনেই মনে মনে শঙ্কিত হয়ে উঠল। বরাবর শুভ্রকে দেখে উদয় খুশিই হতো, গান নিয়ে নানারকম আলোচনা করত। দীপিকাকে নিয়ে একটা অনুষ্ঠান আয়োজন করার জন্য অনুরোধ করত। কিন্তু আজ সেসব কিছু না করেই উদয় অফিস বেরিয়ে গেল।

উদয় চলে যেতেই দীপিকা শুভ্রর দিকে তাকাল, ‘একটা কথা আমি বলতে চাই শুভ্র, আমার জীবনে তুমি আবার হঠাৎই ফিরে এসেছ। আগের মতোই আমাকে আনন্দে রাখবার চেষ্টা করছ যার জন্য হয়তো বিয়ের পরেও আমি প্রতীক্ষা করে থেকেছি। এই আনন্দ পাওয়ার লোভেই হয়তো ছুটে বেড়িয়েছি। এই লোভটাকেই কখনও দমন করার চেষ্টা করিনি। তুমিই আমার সেই শূন্য ঝুলি ভরিয়ে তোলার চেষ্টা করে গেছ। আজ প্রথম আমি বুঝতে পারছি, আমার এই জীবনটা নিয়ে আমি কী করতে চাই। মরীচিকার পিছনে ছুটে না বেড়িয়ে শক্ত মাটিতে পা রেখে সংসারধর্ম পালন করতে চাই আমি।

শুভ্র আমি বিবাহিতা। এই কথাটা আমি বোধহয় ভুলেই গিয়েছিলাম। প্রেমিকের হাতে নিজেকে সঁপে দিয়ে সংসার করার স্বপ্ন দেখছিলাম। তুমি যদি আমাকে আমার এই সংসারটার থেকে দূরে একটা হোটেলের ঘরে না নিয়ে গিয়ে তুলতে, তাহলে আমি কোনওদিনই বুঝতে পারতাম না যে আজ এই সংসারটাই আমার রক্তের মধ্যে, আমার প্রতিটা রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে পড়েছে আর আমি টেরও পাইনি। এই বাড়িতে তুমি যখন আসা আরম্ভ করেছিলে তখন এই বাড়িটাকে ছেড়ে যাওয়ার ভয় আমার মনের মধ্যে ঢোকেনি। কিন্তু একবার এই বাড়ির বাইরে পা রাখতেই বুঝেছি, এই বাড়ির পরিচয় ছাড়া আমার আজ আর কোনও অস্তিত্বই নেই।

উদয় কী দোষ করেছে? বিয়ের পর থেকে ভালোবাসায়, যত্নে ও কোনও ত্রুটি রাখেনি। আমাকে যথেষ্ট সম্মান দিয়েছে, পরিবারে স্থান করে দিয়েছে। নিজের স্বার্থের জন্য আমি ওর সম্মান, ওর জীবন নষ্ট করতে পারব না। তুমি চলে যাও শুভ্র। আমাদের আর দেখা না হওয়াটাই আমাদের দুজনের জনেই মঙ্গল’, দীপিকা চুপ করে।

‘আমাদের বিয়ে হয়ে গেলে আমি কখনওই তোমাকে আমার থেকে আলাদা হতে দিতাম না দীপু… কিন্তু আজ আমার জোর করার মতো কিছুই নেই শুধুমাত্র ভালোবাসাটুকু ছাড়া। সুতরাং তোমার ইচ্ছেটাকেই সম্মান জানাতে আমি এখান থেকে চলে যাচ্ছি। চেষ্টা করব আর যেন আমাদের কোনওদিন দেখা না হয়…’ বলে শুভ্র বাড়ির বাইরে বেরিয়ে এল।

সারাটা দিন দীপিকা বাড়ির ভিতর এটা-ওটা করাতে নিজেকে ব্যস্ত রাখল। মনটা অস্থির হয়ে উঠছিল বারবার। কিছুতেই ভেবে পাচ্ছিল না এতবড়ো একটা ভুল ও কী করে করতে পারল। অনেক চিন্তার পর ঠিক করল ও উদয়কে সবকিছু খুলে বলবে কারণ মনের মধ্যে এত বড়ো একটা বোঝা বয়ে বেড়িয়ে পুরো জীবন কাটানো ওর পক্ষে কিছুতেই সম্ভব নয়।

সন্ধেবেলায় উদয় বাড়ি ফিরতে উদয়কে জলখাবার দিয়ে দীপিকা সামনে এসে বসল। ধীর শান্তস্বরে সমস্ত কিছু খুলে বলল ওকে। বিয়ের আগে শুভ্রর সঙ্গে পরিচয়, তারপর আবার গান শেখার বাহানায় ওর সঙ্গে অন্তরঙ্গতা, হোটেলে একসঙ্গে সময় কাটানো কিছুই লুকোনোর চেষ্টা করল না দীপিকা। উদয় একটা কথাও বলল না। ওকে চুপ থাকতে দেখে দীপিকাই আবার বলল, ‘আমাকে ক্ষমা করে দাও উদয়। আমি অন্যায় করে ফেলেছি। কথা দিচ্ছি এবার থেকে তুমি যা বলবে আমি তাই করব।’

উদয় চুপচাপ খানিকক্ষণ বসে থেকে উঠে চলে গেল। রাত্তিরটা বসার ঘরে সোফায় শুয়েই কাটিয়ে দিল। দীপিকা নিজের ঘরে শুতে চলে গেল। উদয়ের চোখের সামনে দু’দিন আগের ঘটনাগুলো ভেসে বেড়াতে লাগল। অফিসের কাজে পাশের শহরে গিয়েছিল। ফেরার পথে দীপিকার জন্য মিষ্টি কিনতে বাজারে গিয়ে দেখে শুভ্রর হাত ধরে দীপিকা একটা দোকানে কোনও জিনিস দেখছে। শুভ্রর গায়ে ওর স্ত্রীরই হাতে বোনা একটি সোয়েটার।

এত বড়ো বিশ্বাসঘাতকতা উদয় মেনে নিতে পারেনি। মনের মধ্যে রাগ আর প্রতিশোধস্পৃহা নিয়ে বাড়ি চলে আসে। তখন থেকেই কীভাবে দীপিকাকে শাস্তি দেওয়া যায় সেই চিন্তাতেই ব্যস্ত হয়ে যায় ওর মন। কিন্তু আজ দীপিকা সব কিছু স্বীকার করে নিতে উদয়ের মনের মধ্যে একটা দ্বন্দ্ব শুরু হয়ে যায়। ও প্রতীক্ষাতেই ছিল যে দীপিকা নিজে থেকে ওই অবৈধ সম্পর্ক নিয়ে মুখ খোলে কিনা। আজ ওর আত্মসমর্পণের সঙ্গে সঙ্গে চোখের ভাষায় প্রায়শ্চিত্ত করার সিদ্ধান্ত দেখতে পেয়ে, উদয়ের মন ধীরে ধীরে শান্ত হতে থাকে।

সারাটা রাত দোনামনায় কাটিয়ে দেয় উদয় যে, এই অন্যায়ের জন্য শাস্তি কি প্রাপ্য দীপিকার নাকি প্রায়শ্চিত্তের আগুনে পুড়ে শুদ্ধ হয়ে ওঠা দীপিকা ক্ষমার যোগ্য? কিন্তু এত কিছু হওয়ার পর ও কি সত্যিই পারবে দীপিকাকে নতুন করে আবার বিশ্বাস করতে?

সকালে উঠে রোজকার মতোই দীপিকা বাড়ির কাজে হাত লাগাল। উদয় চা আর খবরের কাগজ নিয়ে বসল। হাত মুছতে মুছতে দীপিকাও এসে পাশে বসল, ‘কিছু ভাবলে? তুমি যা ঠিক করবে সেটাই আমি মাথা পেতে নেব।’

‘দীপিকা এটা আমি আগেই জানতাম। বাপের বাড়ি যাওয়ার নাম করে শুভ্রর সঙ্গে একসঙ্গে থাকাটা। আমি তোমাদের দু’জনকে একসঙ্গে বাজারে দেখে ফেলেছিলাম। এছাড়া তোমার বাপের বাড়িতে ফোন করেও জেনে ফেলেছিলাম তুমি ওখানে যাওনি। আমি শুধু তোমার মুখ থেকে শোনার অপেক্ষা করছিলাম’, উদয় লক্ষ্য করে দীপিকার চোখ জলে ভরে উঠেছে।

‘তোমাকে যদি আমি ক্ষমা না করতে পারি তাহলে সেই আগুনে আমিও সারাজীবন জ্বলে মরব। কিন্তু ক্ষমা করা এত সহজ নয়। আমি জানি না আদৗ কোনওদিন তোমাকে বিশ্বাস করতে পারব কিনা। কিন্তু নিজের সংসারটা আমি এভাবে ভেঙে দিতে চাই না। সারা রাত ভেবেছি। তোমার চোখে যে প্রায়শ্চিত্তের আগুন দেখতে পাচ্ছি তাতে করে তোমার পাপ অনেকটাই কম হয়ে গেছে সুতরাং তোমাকে আর একটা সুযোগ আমি দিতে চাই। তুমি কীভাবে এটাকে কাজে লাগাবে সেটা সম্পূর্ণই তোমার ব্যাপার’, বলে উদয় থামে।

সত্যিই তো, বর্ষায় কর্দমাক্ত বাড়ির উঠোন কি আমরা ভেঙে ফেলতে উদ্যত হই? না। বরং জায়গাটা পরিষ্কার করে ধুয়েমুছে ঝকঝকে করে তুলি। বর্ষায় কাদা এমনিই হয় সুতরাং এতে বাড়ির উঠোনের দোষ কোথায়? শুধু প্রয়োজন হচ্ছে একটু বেশি খেয়াল রাখা যাতে উঠোনে কাদা জমতে না পারে।

 

পাঁচশো টাকার নোট

হাঁটুতে খুব ব্যথা বুঝি! খুব কষ্ট হল! আর আমাদের সিঁড়িও একদম স্বর্গের মতো খাড়া। চড়তে খুব কষ্ট হয়। দেখুন না, আমার স্ত্রীরও দুটো হাঁটুই একবারে অকেজো হয়ে গেছে। ডাক্তার রিপ্লেসমেন্টের কথা বলেছে। টাকা পয়সার ঝুঁকি নিয়ে না হয় পালটেই দিলাম, কিন্তু সেরে যাবার গ্যারান্টি কেউই দিচ্ছে না। বাজারের জড়িবুটির তেল-টেল তো সব টেস্ট করা হয়ে গেছে। কিচ্ছুটি কমেনি ব্যথা। এক গেলাস জল খাবেন? হরিহরবাবু, এঁদের একটু জল খাওয়ান তো। খান, জল খেলে শরীরে, মনে বল পাবেন। জানেন তো শরীরের ব্যথা ব্যথাই নয়, মনের জোর যদি বহাল থাকে।

না না, আপনি ব্যস্ত হবেন না। আমি ঠিক আছি একদম। এতক্ষণ মনীশবাবু কথা বলছিলেন না। মানে বেশ হতচকিত হয়ে বেহালা থানার মেজোবাবুর গড়গড় করে বয়ে যাওয়া কথার পানসির সামনে নিজের খড়কুটোর অবস্থানটি নিজে নিজে লক্ষ্য করছিলেন। কিন্তু এক্ষণে মাস্টারমশাই দেখলেন কথা না বললে নয়। কথা না বললে, কয়েকদিনের এঁটো, নোংরা গ্লাসের সত্তর রকমের জীবাণুবাহিত জল নির্ঘাত খেয়ে নিতে হবে। তিনি মেজোবাবুর সিনের ভেতরেই কুণ্ঠিত পায়ে এন্ট্রি নিলেন।

মনীশবাবুর অপ্রতিভতার থেকে তার মেয়ে, আঠাশ বছরের হেমন্তিকার অবস্থা আরও খারাপ। সে মনে মনে প্রস্তুত হয়ে এসেছিল। খ্যাঁ খ্যাঁ করে হাসির পান-দোক্তা কবলিত ক্ষয়াটে দাঁতের কোনও ভুঁড়ি উসকানো মাঝারি বয়সের পুলিসের খপ্পরে দিনটাকে বরবাদ করতে হবে। মনে মনে একটা প্রতিরোধের বাতাবরণ তৈরি করেই পা রেখেছিল বেহালা থানার সিঁড়িতে। বুড়ো একাত্তর বছরের বাবাকে তো এমনি এমনি আনেনি, এতটা পথ! আনতে বাধ্য হয়েছে। মানসিক দিক থেকে অন্তত কিছুটা সিকিউরিটি আপলোড করা যাবে।

কিন্তু এই হ্যান্ডসাম, বছর পঞ্চাশের সুশ্রী পুলিস আর তার মাখন দিয়ে মাখা স্বরের বৈপরীত্য, সাজানো চিত্রনাট্যে চিড় ধরাল। হিসেব মেলে না। পাসপোর্টের জন্য পুলিস ভেরিফিকেশন দরকার। চাকরির শর্তের মধ্যে আছে, ড্রাইভিং লাইসেন্স আর আন্তর্জাতিক পাসপোর্ট দেখাতে হবে কল ডেটে। ফলে হেমন্তিকা এই ক’দিন ঝড়ের গতিতে ছুটেছে। আর একটি সপ্তাহ হাতে। ভেরিফিকেশনের গেরোটা টপকালেই আপৎকালীন পাসপোর্ট-এর সাথে তার নতুন জীবনের দরজা হাতের কাছে এসে যাবে। এই এমএনসি-র কাজটাই গোটা পৃথিবী জুড়ে। রিটায়ার্ড স্কুল মাস্টারের বারান্দায় রাখা সাইকেলের উপর দিয়ে, মানে মাথার খুব উঁচু দিয়ে তখন ঘন ঘন প্লেনের উড়ে যাওয়ার আওয়াজ হবে।

কিন্তু এত ভালো পুলিস তো হেমন্তিকার ধারণার ভেতরেই ছিল না। অন্যান্য জায়গায় দৌড়ঝাঁপ, তদবির – সব তো বয়ফ্রেন্ড করে দিয়েছে। কিন্তু এখানে পাড়ায়, থানায়, তো বয়ফ্রেন্ড নিয়ে আসা যায় না। গার্জিয়ান চাই। তাই-ই তো অত কষ্ট করে বাবাকে রিক্সায় করে টেনে আনতে হয়েছে। বুক টিপ্ টিপ্ করেছে, শেষ মুহুর্তে এসে কাজটা  কেঁচিয়ে না যায়। বিশেষ করে পুলিসটি তার বাবার পায়ের ব্যথার প্রতি এতটা সমব্যথা জানাচ্ছে দেখে মনটা ভরে উঠল। আছে আছে সমাজে ভালো মানুষও আছে, ভালো পুলিস আছে, না হলে সমাজটা টিকে থাকত না। ভেঙেচুরে ছত্রাখান হয়ে যেত।

কপালের অনাবশ্যক ঘাম সেসময়ে ছোট্ট রুমাল দিয়ে মুছে ফেলেছে হেমন্তিকা। আর ঘাম জমে ওঠার দরকার নেই। কাঠের চেয়ারে বসে পুলিশ অফিসারটি সাদা কাগজের উপরে বলপেনে, অল্প অল্প লিখতে লিখতে কথা বার্তা চালিয়ে যাচ্ছে। ভেরিফিকেশনের জন্য ওটুকু লিখতে হয়। আর তার, হেমন্তিকার যে-কোনও ক্রিমিনাল রেকর্ড থাকবে না, তা তার মুখমন্ডলের মতো ধবধবে পরিষ্কার। শুধু তো ধবধবে সাদা নয়, হেমন্তিকার চেহারায় একটা জ্যোতির্ময়তাও ঘুরঘুর করে।

অফিসার লোকটি একেবারে ধার কাছ দিয়েই গেলেন না। অন্যান্য বন্ধুদের ভেরিফিকেশনের কোশ্চেন-আনসার কণ্ঠস্থ করে এসেছিল হেমন্তিকা। সে বলবে, না, পড়াশোনার জন্য মুখ তুলে ভালো করে সংবাদপত্র পড়ার সময়ই পাইনি তো রাজনীতি করব কি! বাংলায় কী কী দল চলেটলে তাই-ই তো তেমন করে জানি না। আর ছাত্র অবস্থায় রাজনীতি করা উচিতও না, তাই না! ভেবেছিল, উত্তরের সাথে এরকম কোশ্চেন ঠুকে দেবে পুলিসের দিকে। কিন্তু সেসব চেনা কোশ্চেনের কিচ্ছুটি করছেন না পুলিস লোকটি। তেমন করে তাকাচ্ছেনও না পর্যন্ত তার দিকে। যেমনটি ভেবে এসেছিল, যে চোখে চেটে পুলিস তো তার বাপের সামনে তাকে ফালাফালা করে দেবে। নাহ! এই লোকটার এলেম আছে। বাবাকে নিয়েই পড়ে আছে মিনিট পনেরো ধরে।

মেয়ের বিয়েটা দেখে যেতে সাধ হয় না মাস্টারমশাই? খুব ক্যাজুয়াল আর খুব আন্তরিকতা এক সঙ্গে মিক্সিতে পেস্ট করে যে টোনটা আসে, তাতেই একটা দান ফেললেন অফিসার। কারো মুখের দিকে তাকাননি। টেবিলের উপরে রাখা কাগজটির উপর নোট নিতে নিতে বলা।

খুব হয়। কিন্তু ওই তো সিঙ্গল থাকবে বলে বেঁকে বসে আছে।

কথাটা বলে ফেলার পর মনীশবাবু মনে মনে হাত কামড়ালেন। না না, বলাটা উচিত হয়নি। বাড়ি থেকে আসার সময় বাতের ব্যথায় কাবু তাঁর স্ত্রী পই পই করে বলে দিয়েছিলেন, অযথা গল্প-গাছা করে ঘরের কথা পরের কানে তুলে দেয়াতে তোমার তো জুড়ি নেই, তা থানায় গিয়েও সেই কম্মটি করতে বোসো না। মুখে একদম কুলুপ এঁটে থাকবে। কোথা দিয়ে কী বেফাঁস বলে বসবে, কে জানে ….। পুলিসে ছুঁলে তো শুনেছি ৩৬ ঘা।

সহধর্মিণীর কথাটাকে এট্টুসখানিকের জন্য তিনি মান্যতা দিতে পারলেন না ভেবে মরমে মরে যাননি, কিন্তু উলটো দিকে গল্পের দরজা খুলে গেছে। প্রায় শেষ করে ফেলেছিল অফিসারটি ফর্ম ফিল আপ করা। আর একটা দুটো পয়েন্ট লিখে, সই করিয়ে ছেড়ে দেবার কথা। কিন্তু কী থেকে কী যে হয়ে গেল। খোলা কলম টেবিলের ওপর নামিয়ে রেখে মেজোবাবু মনীশবাবুর ঘোলাটে চশমার উপর নিজের চোখ ফেলে বললেন, সেকি! একা একা একটা মেয়ে কি সমাজে বাঁচতে পারে। তার হাটবাজার, হাসপাতাল-ডাক্তার, রাত-বিরেত কে সামলাবে! আরে আপনি তো আর মেয়েকে সারা জীবন পাহারা দেবার জন্য উবু হয়ে বসে থাকবেন না। না, না না, না মাস্টারমশাই, আপনার এই কথাটাতো শিক্ষকসুলভ হল না।

যেন এটা মাস্টারমশাইয়ের সিদ্ধান্ত। যেন মাস্টারমশাই সারাজীবন বিয়ে না করে বসে আছেন। তাই তাকে বোঝাতে লেগে পড়েছেন অফিসারটি।

তাছাড়া দিনকাল যা পড়েছে, দেখছেনই তো। আর এই বেহালা এলাকাটা তো নচ্ছারতম প্রদেশ। রোজ খুন-খারাবির খবর পাবেন-ই পাবেন। এখানকার লোকজনও নতুন নতুন করে বাড়ছে।

মনীশবাবুর এই সময় নিজেকে একটু দুর্বল লাগল। অনেকদিন হয়েছে রিটায়ার করেছেন, তবুও সফল মাস্টারমশাই হিসেবে এই অঞ্চলের হাটে-ঘাটে এখনও তাঁর জন্য কুশল জিজ্ঞাসা, দাঁড়িয়ে দু’দন্ড কথাবার্তা বলার লোকজন কমে যায়নি। আর ছাত্ররা তো অনেকেই এখন এখানে আছে, যারা প্রতিষ্ঠিত। এটা ওঁর জোরের জায়গা। নাহলে একা একা এখনও এই একাত্তর বছর বয়সে বাজারে যান।

পাঞ্জাবির পকেট থেকে রুমাল বের করলেন। মুখটা মুছলেন, গলা মুছলেন। অফিসার এটাই চেয়েছিলেন যেন। টেবিলের উলটোদিকের লোকজনকে অ্যাকিউস্ড হিসেবে দেখা তার অভ্যেস। কিন্তু বাপ-বেটির কাউকেই তেমন ম্লান লাগছিল না। তার অভ্যস্ত চোখে এবার ধরা পড়ল মনীশবাবুর মেজাজি মনের এক চিলতে ঠুনকো প্রদেশ। হঠাৎ তৈরি হওয়া এই চাপটা তিনি মেয়েটার দিকেও চারিয়ে দিতে চাইলেন।

কী কোনও কেস আছে নাকি? এই প্রথম হেমন্তিকার চোখে চোখ রাখলেন অফিসার। হেমন্তিকা বাবার ঘাম মোছা বিবর্ণ মুখের দিকে চেয়ে হঠাৎ একটু শঙ্কা টের পেল। কিন্তু কথাটা তেমন করে ধরতে পারেনি। কয়েক মুহূর্ত বোবা চোখে তাকাতেই অফিসার বলে উঠলেন, আরে এ বয়সে একশোটার মধ্যে সাড়ে নিরানববইটারই কেস থাকে। তা সেই বয়ফ্রেন্ডকেই….

মেয়েটার ধবধবে সাদা মুখে রঙের লাল ছোঁয়া জেগে উঠতে দেখে অফিসার গলার স্বরে অদ্ভূত একটা মায়া সম্পাত করে বলে উঠলেন, জানো মা, আমারও একটা মেয়ে ছিল, তোমার মতোই। মানে এসময় তোমার বয়সি হতে পারত।

মানে, ছিল মানে! মনীশবাবুর শিক্ষকতার অভ্যেস যায়নি। আর থানার আবহে তিনি আছেন যে, সেটা দিব্যি ভুলে মেরে দিয়েছেন।

অফিসার ম্লান এবং অহংকার দুরকম ভঙ্গি ঠিকঠাক পেশ করলেন। তার থাকা না-থাকার অবস্থানটি এই সময়ে আমার কাছে অপ্রাসঙ্গিক বলেই আমি ছিল কথাটি বলেছি। ওই একটা দিনের পর আমার কাছে সে পাস্ট টেন্স।

মনীশবাবুর হাঁ-করা মুখের উপর তিনি বলতে লাগলেন, গল্পটা এরকম মাস্টারমশাই, গানের মাস্টার গান শিখিয়ে চলে গেছে। থানা থেকে বাড়ি ফিরেছি। ধড়াচূড়া ছাড়তে ছাড়তে স্ত্রীর সাথে কথা হচ্ছিল। স্ত্রী বলছিলেন কিছু টাকার দরকার, গিফ্ট কিনতে হবে। সুমন চ্যাটার্জীর মেয়ে, আইটিও, মানে ইনকাম ট্যাক্স অফিসার, নাকি রেজিস্ট্রি করে বর নিয়ে ঘরে ঢুকেছে।

তা বরটা কে?

আরে আমাদের প্রাইমারি স্কুলের মাস্টার প্রশান্ত দুলের ছেলে। কলকাতায় ফার্স্ট ডিভিসনে না কি ফুটবল খেলে।

আমি বলেছিলাম, অমন মেয়ে আমার হলে আমি গলা টিপে মেরে ফেলতাম। জাত-বেজাত দেখবে না! শিক্ষিত-অশিক্ষিত দেখবে না! প্রেম করলেই হল! ছ্যাঃ ছ্যা!

তার পরদিনই আমার মেয়ে ঘর ছেড়েছিল। মেয়ে নাকি আগেরদিন পাশের ঘর থেকে আমার কথা শুনতে পেয়েছিল। যাবার সময় মাকে বলেছে, এমন বাবার পয়সায় খেতে তার নাকি ঘেন্না হয়। কোথায় যেন গানের স্কুল খুলে দিয়েছে সেই গানের মাস্টার। জুটিতে বেশ পসার-টসারও হয়েছে। কিন্তু আমার কাছে তার থাকা না-থাকার কোনও মূল্য নেই।

হেমন্তিকা এই নিপাট ভদ্রগোছের চেহারার লোকটির ভেতরের আস্ফালন দেখে কেঁপে উঠল মনে মনে। মনীশবাবুও থ মেরে গেছেন। অফিসার কলমের পেছন দিকটা দিয়ে টেবিলে ঠুকে চলেছেন। হেমন্তিকার মনে হচ্ছে এক একটা হাতুড়ির ঘা পড়ছে তার বুকের ভেতর। যন্ত্রণা হচ্ছে। বাবার মলিন মুখের উপর চোখটা ঘুরিয়ে নিয়ে এসে চেয়ারে পিঠ এলিয়ে দিল। এইমাত্র তার মনে হল, তরবারির এক কোপে তার গলাটি কেটে নিয়ে চুলের মুঠি ধরে টেবিলের উপর ঠুকছে ওই অফিসার। হেমন্তিকার চেতনা গুলিয়ে যাচ্ছে।

আরে, হামিদুর কোথায়! দেখতে পাচ্ছি না। হামিদুর হামিদুর…। ওকেও কি মেরে ফেলেছে এই অফিসারের দল! একেই কি বলে অনার কিলিং! কুলকুল করে ঘামছে হেমন্তিকা। ওরা দুজনে টেকনো ইন্ডিয়ায় একই ব্যাচের। ক্যাম্পাসিং-এ একই এমএনসি-তে সিলেক্টেড। ঢাকার ছেলে হামিদুর রহমান। কলকাতায় ইঞ্জিনিয়ারিং করতে এসে সেই প্রথম বছর থেকেই মিষ্টি শান্ত স্বভাবের ছেলেটি হেমন্তিকার বুকের ভেতর ঢুকে আছে। যতটা সম্ভব লুকিয়ে রেখেছে তাকে হেমন্তিকা। কাউকে কিছুই বুঝে উঠতে দেয়নি। ভটচাজ ব্রাহ্মণের সাথে মুসলমান ছেলের বিয়ে কিছুতেই মেনে নেবে না আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী। তা হেমন্তিকার বাবা যতই উদারমনস্ক শিক্ষক হোন না কেন, পরিপার্শ্ব বলে তো একটা কথা আছে। হামিদুর আর হেমন্তিকার সম্পর্কের শিলমোহরের হাইফেনটুকুর জন্য গত ছবছর বড়ো কম সময় নয়। এখন পড়ে পাওয়া চৗদ্দো আনার মতো এই চাকরিটা ওদের সামনে মসিহা হয়ে এসেছে। প্রথম পোস্টিং স্টেটস-এ। দুজনেরই। ওখানে গিয়ে হিন্দু বা মুসলিম যে-কোনও একটা মতে বিয়েটা সেরে নেবে।

কী হয়েছে মা? শরীর খারাপ লাগছে? মনীশবাবু হেমন্তিকার কাঁধে হাত রাখলেন। কী বিড়বিড় করছিস? একটু জল খাবি?

হেমন্তিকা মাথা উপর-নীচ করল। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে আছে। ভয়ে, যেন একটা মৃতের ভেতরে সে এতক্ষণ বসেছিল। তার সাদা চুড়িদার ভিজে সপসপ হয়ে গেছে। ঘামের ঝরনার ভেতর ভিজে যাচ্ছে হেমন্তিকা।

দরজায় থ্রি নট থ্রি সামনে রেখে কনস্টেবলের দাঁড়ানোর ভঙ্গি এখন বাঁকা শ্যামের মতো। সে যতটা সম্ভব ট্যারা হয়ে হেমন্তিকাকে অপাঙ্গে চাটছে। তার চোখ হেমন্তিকার ঘামে ভেজা সাদা চুড়িদারের ভেতর থেকে ফুটে ওঠা কালো অন্তর্বাসে আঘাত হানছে। আর তখনও অফিসার বল পেনের পেছন দিকটা ঠুকে চলেছেন টেবিলে। মানে তখনও মেয়ের অপকর্মের আঘাত ওইভাবে ফিরিয়ে দিচ্ছেন।

মনীশবাবু কঁধের ঝোলা ব্যাগ থেকে জলের বোতল বের করে, কাঁপা হাতে ছিপি খুলে হেমন্তিকার দিকে এগিয়ে দিলেন। স্যার একটু তাড়াতাড়ি করা যায় না! মেয়েটার শরীর খারাপ করছে।

হাঁ, হাঁ, হয়ে এসেছে। অফিসার নিজের মেয়ের স্মৃতি ঝেড়ে ফেলে কলমের পজিশন ঘুরিয়ে নিলেন। তারপর মুখ তুলে বললেন, আচ্ছা মাস্টারমশাই, আপনি যে পরিবারের ডিটেলস দিলেন, তাতে তো দেখছি মেয়ে চাকরি নিয়ে বিদেশে চলে গেলে বুড়োবুড়ি একলা হয়ে পড়বেন। এই বয়সে পারবেন তো নিজেদের সামলাতে! আজকালকার ছেলে-মেয়েরা শুধু নিজের কেরিয়ারের কথা ভাবে। বাপ-মা-র কথা, তাদের বাঁচা-মরায় তেমন হেলদোল নেই।

মনীশবাবু শশব্যস্ত হয়ে বললেন, না না, আমাদের তেমন কোনও অসুবিধা নেই। আমার দাদার ছেলেমেয়েরা থাকে রবীন্দ্রনগরে। ওরা মাঝেমধ্যে এসে দেখে যায়।

কিন্তু এই দশকাঠা জায়গা নিয়ে আপনার বিরাট বাড়ি – একা একা সামলে উঠতে পারবেন তো সব?

হ্যাঁ, চলে তো যাচ্ছে। ঠিক চলে যাবে।

মনীশবাবু জানেন খুব কষ্ট হয়, হবে। পাড়ায় শক্ত চোয়ালের নতুন নতুন ছেলেদের আবির্ভাব হয়েছে। তারা বাইক সহ মাঝেমধ্যেই গেটের বাইরে দু-তিনজন এসে ভিড় করে, ফিসফাস করে। প্রোমোটিং-এর থাবা। যেভাবে এগোচ্ছে যে-কোনওদিন গেটের ভেতরে ঢুকে এসে প্রস্তাব দেবে। একবগ্গায় এতখানি জায়গা এতল্লাটে আর নেই। মেট্রো রেলের কাজ থমকে গেলেও, ওই কাঠামো দেখিয়ে হু হু করে দাম বাড়িয়ে নিয়েছে প্রোমোটারেরা। বেহালা অঞ্চলে এখন ছ’হাজারের নীচে স্কোয়ারফিট নেই।

অফিসার আবার কথা বাজালেন, হু হু করে পালটে যাচ্ছে সব। দিনকাল আর আগের মতো নেই মনীশবাবু। আমরাই চিনতে পারি না কার কোমরে কী গোঁজা রয়েছে। এখন আবার একটু সম্পন্ন ছোকরারা পাড়ায় পাড়ায় শুধু বাইক আর মোবাইল নিয়ে ঘুরতে পছন্দ করে না, আগ্নেয়াস্ত্র রাখাটা স্টেটাস হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাঁচ-সাত বছর আগেও একখানা মুঙ্গেরের ওয়ান শর্টার থাকলে যারা দর পেত, তারা সবাই আজ জার্মান, আমেরিকান, তা না পারলে চিনের মাল রাখছে, পাঁচঘরার নীচে নয়।

অফিসার ভদ্রলোকের ওই এক রোগ, কথা বলা শুরু করলে থামতে জানেন না। মনীশবাবু অব্যাহতি পাবার জন্য ছটফট করলেও অফিসার বলে যেতে থাকেন, কী করব বলুন, আমরা তো ঠুঁটো জগন্নাথ, এদের সবারই দাদা ধরা আছে। রাজনৈতিক দাদা। পুলিস এদের ধরতে গেলে ওই দাদা ঘন্টা বাজিয়ে দেবে পুলিসের। মানে নির্ঘাত সুন্দরবন বা জঙ্গলমহলে শান্টিং করে দেবে।

জলটল খেয়ে হেমন্তিকার নার্ভাস ব্রেক ডাউনটা নর্মাল হয়ে এসেছে। সে একটু গলা খাঁকারি দিয়ে গল্পের গতিতে লাগাম পরাতে গিয়ে বলে, স্যার যদি একটু তাড়াতাড়ি সেরে ফেলা যায়…। মানে, আমার আরও অনেকগুলি কাজ পড়ে আছে। ইউনিভার্সিটি থেকে সার্টিফিকেট তুলতে হবে…।

পরিস্থিতি একটু গম্ভীর হয়ে আছে দেখে, হেমন্তিকার দিকে ফিরে জিভ কেটে, অল্প করে মুচকি হেসে বলে উঠলেন, হ্যাঁ দেখছই তো মা, তোমার কাজটাই তো করছি। প্রায় শেষ করে ফেলেছি। ভেরিফিকেশন আর চোর-ডাকাতদের ইন্টারোগেশন তো এক নয় মা!

চোর-ডাকাতদের কাছ থেকে কথা বের করতে অনেক সহজে হয়ে যায়, এত হ্যাঁদাতে হয় না।

হেমন্তিকা বেশ বুঝতে পারছে নিজে নিজেই কৈফিয়ত দিচ্ছেন। কিছুটি করার নেই তার, শুনতে হবে। বাবার দিকে ফিরে সে-ও অপ্রতিভ না হওয়ার ভান করে অল্প হাসল, সমর্থনের ভঙ্গিতে মাথা নাড়ল। কিন্তু অফিসার হঠাৎ গলার স্বরে হিংস্র শার্দুলতা ঢুকিয়ে বলে যেতে থাকেন, গারদের ওই পারে ঢুকিয়ে দিলে না, জাঁহাবাজ অনেকেরই কাপড়ে-চোপড়ে হয়ে যায়। তারপর তো কপালে যা নাচে বোঝেনই তো…।

অফিসার স্বরের এলোকোয়েন্সির তারতম্য করে আবার আন্তরিকতা ফুটিয়ে তুললেন গলায়, জ্বালাটা জানেন তো, আমাদের দশা মারিচের মতো। রামে মারলেও মারবে, রাবণে মারলেও মারবে। পুলিসে চাকরি করছি মশাই, গণৎকার তো নই। কী করে জানব সাধাসিধে গোবেচারারা সব বিদেশে গিয়ে আইএস-এর জঙ্গী হয়ে যাবে! আমাকে তো আর ছেলেমেয়েরা কোম্পানির অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার দেখায় না! আর দেখাবেই বা কেন! পাসপোর্টের জন্য পুলিস ভেরিফিকেশনের সাথে অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটারের কী সম্পর্ক।

হেমন্তিকা দাঁতে দাঁত চেপে ওই ইঙ্গিত সহ্য করে নিল। ধরণী দ্বিধা করে নেওয়ার ত্রেতা যুগের থিয়োরি এই ঘোর কলিতে অবসলিট। তবে কাজে লাগতে পারে ভেবে স্পিড পোস্টে আসা কোম্পানির অ্যাপয়েন্টমেন্ট কাম কল লেটার হেমন্তিকা তার হাত ব্যাগেই রেখেছিল। সে ব্যাগের ভেতর চোখ অল্প নামিয়েই লেটারটি হাতে পেয়ে অফিসারের দিকে বাড়িয়ে দেয়।

পুলিশ অফিসার একটু খুঁটিয়ে দেখে এবার আকর্ণ হাসলেন। কনগ্রাচুলেশন্স মাই ডিয়ার। খুব বড়ো চাকরি, খুব বড়ো চাকরি। না না বাম হাতে নয় মা, বাম হাত শিষ্টাচারের বিরোধী, অশুভ হাত। ডান হাতেই সব শুভকর্ম যোগ।হেমন্তিকা নিজেকে লজ্জিত দেখিয়ে বাঁ হাত গুটিয়ে ডান হাতেই চিঠিটা ফেরত নিল।

অফিসার স্বরে এবার ফিসফিসানি এনে, মানে যাতে এই কথা ঘরের বাইরে না পৌঁছোয়, মায় গেটে দাঁড়িয়ে থাকা কনস্টেবলের কানেও না যায়, সেরকম নিশ্চিন্ততায় বললেন, তা মা মিষ্টি-টিষ্টি খাওয়াবে না আমাদের! তোমার সাফল্যে তো এই অঞ্চলের মানুষজনের মতো আমরাও গর্বিত! আর পুলিস ভেরিফিকেশনের কথাবার্তা বলতে এসে সবাই খুশিতে আমাদের মিষ্টি-টিষ্টি খাইয়েই যায়। এটাই রেওয়াজ, বুঝলে মা।

মনীশবাবু চটপট বুঝে ফেললেন কেন এতক্ষণ ফেনিয়ে চলেছেন অফিসারমশাই। তিনি তার ঝোলা ব্যাগের ভেতরে রাখা ওয়ালেট থেকে পাঁচশো টাকার একটা নোট বের করে এগিয়ে দিতেই তথাকথিত একটি অশিষ্ট বাঁহাত টেবিলের অন্য প্রান্ত থেকে এসে এই দিকের ডানহাতের নোটটিকে আত্যস্থ করে নিল ।

 

গাজর আমলা পরোটা ও ক্যারট সঁতে

জলখাবারের উপযুক্ত গাজর দিয়ে তৈরি দুটি পুষ্টকর ও সুস্বাদু ডিশ রইল আপনাদের জন্য৷পেট ভরা ব্রেকফাস্ট, সঙ্গে পুষ্টিও৷

গাজর আমলা পরোটা

উপকরণ – ২ কাপ আটা, ২ বড়ো চামচ ঘি ময়ানের জন্য, আটা মাখার মতো ঈষদুষ্ণ জল, নুন স্বাদমতো।

পুরের জন্য – ২ কাপ গ্রেট করা গাজর, ৩ বড়ো চামচ বেসন, ২টো আমলকী মিহি করে গ্রেট করা, ১/২ ছোটো চামচ মৗরিগুঁড়ো, ১ ছোটো চামচ ধনেগুঁড়ো, ২ বড়ো চামচ ধনেপাতাকুচি, ২টো কাঁচালংকা কুচি করা, পরোটা ভাজার মতো তেল, লংকাগুঁড়ো ও নুন স্বাদমতো।

প্রণালী – গাজর ভালো ভাবে চটকে জল বের করে নিন। এই জল দিয়েই আটা মাখা যাবে। শুকনো কড়ায় বেসন নাড়াচাড়া করে এতে গাজর মেশান, তারপর বাকি উপকরণ মেশান। আটার মধ্যে ঘি দিন, গাজরের রস ও ঈষদুষ্ণ গরমজল দিয়ে মেখে নিন। ২০ মিনিট রেখে , লেচি কেটে বেলে নিন। দুটো পরোটার মাঝখানে গাজর-আমলকীর পুর ভরে চেপে দিন। এবার গরম তাওয়ায় অল্প তেলে ভেজে নিন। পরোটা দই বা চাটনির সঙ্গে পরিবেশন করুন।

ক্যারট সঁতে

উপকরণ – ৫০০ গ্রাম মাঝারি আকারের গাজর, ১ বড়ো চামচ কসুরি মেথি, ১/৪ ছোটো চামচ হিংগুঁড়ো, ২ বড়ো চামচ রিফাইন্ড তেল, চাটমশলা ও নুন স্বাদমতো।

প্রণালী – গাজরের খোসা ছাড়িয়ে ধুয়ে ২ ইঞ্চি লম্বা টুকরোয় কেটে, ফিংগার চিপ্স-এর আকারে কেটে নিন। একটা ননস্টিক প্যানে তেল গরম করে হিং ফোড়ন দিন। এই তেলে গাজর দিয়ে সঁতে করুন। ৬-৭ মিনিট নাড়াচাড়া করে কসুরি মেথি ছড়িয়ে দিন। এবার চাটমশলা ও নুন দিন। ধনেপাতা ছড়িয়ে চাটনি বা ডিপ-এর সঙ্গে পরিবেশন করুন।Carrot saute

 

জান বনাম শানু, বিতর্ক তুঙ্গে

 

বিগ বস ১৪-র ঘর থেকে শেষ পর্যন্ত বেরিয়ে গেলেন কুমার শানুর পুত্র জান।দিন কয়েক আগেই মারাঠি ভাষা নিয়ে মন্তব্য করে বিতর্কে জড়িয়েছিলেন জান। মহারাষ্ট্র নবনির্মাণ সেনা শো বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি অবধি দিয়েছিল। চাপের মুখে পড়ে ছেনের হয়ে ক্ষমা চাইতে এগিয়ে এসেছিলেন খোদ কুমার শানু।এর কিছুদিন পরেই ‘বিগ বস’-এর ঘরে আবার জানকে নিয়ে বিতর্ক উঠেছিল তুঙ্গে। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ, শোয়ের আরও এক প্রতিযোগী নিক্কি তাম্বোলিকে জোর করে চুম্বন করার।।

বসের ঘর থেকে বেরনোর পর এবার বাবা কুমার শানুকে নিয়ে মুখ খুললেন জান। একটি সংবাদমাধ্যমের সামনেই বাবার বিষয়ে বিভিন্ন মন্তব্য করেন, তাঁর পুত্র জান কুমার শানু। জান বলেন, তাঁরা তিন ভাই।  তিন ভাইকেই তাঁদের মা রিতা ভট্টাচার্য একা হাতে বড়ো করে তুলেছেন।তাঁদের জীবনে মা-ই সব, বাবার কোনও অবদানই নেই। তাঁর বাবার নাম-যশের উপর ভিত্তি করে তাঁকে যাচাই করা উচিত নয় কিংবা বসের ঘরে তাঁর প্রবেশ বা প্রস্থান নিয়ে কারও কোনও মন্তব্য করা উচিত নয়। এমনই এক অযাচিত মন্তব্য করে, গায়ক বাবাকে অস্বস্তিতে ফেলেছেন জান।

শানু-জান সম্পর্ক বিগ বস-কে কেন্দ্র করে, শুরু থেকেই বেশ তিক্ত। শানু প্রকাশ্যেই বলেছিলেন, তিনি আগাগোড়াই বিগ বস-এ জানের যোগদানের বিষয়ে ক্ষুব্ধ। তিনি বলেন, ‘আমি জানের বিগ বসের যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে শুরু থেকেই খুশি নই। তবে এটা পুরোপুরি ওর একার সিদ্ধান্ত। এই শোয়ের ও ভীষণ বড়ো ভক্ত এবং ও নিজে থেকেই অডিশন দিয়েছে শোতে যাওয়ার জন্য। এই ব্যাপারে আমি ওকে কোনওরকম সাহায্য করিনি’।

বিগ বসের একটি এপিসোডে প্রতিযোগী রাহুল বৈদ্য, জানকে কটাক্ষ করে ‘নেপোটিজমের প্রোডাক্ট’ বলায় অত্যন্ত অপমানিত বোধ করেছিলেন কুমার শানু। তিনি আক্ষেপ করেন যে,চার দশক ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করবার পর এই ধরনের কথা শোনাটা তাঁর পক্ষে সত্যিই দুর্ভাগ্যের।

বস্তুত এবারের ঘটনায়, বাবার উপর জমে থাকা ক্ষোভই উগরে দিয়েছেন জান। বিগ বস শো থেকে বিরিয়ে আসার পর, তাঁর বক্তব্য থেকে পরিষ্কার যে, তার মা ও ভাইদের প্রতি বাবার আচরণ তিনি কোনওদিনই মেনে নিতে পারেননি। এই প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বলিউডে এমন এনেক সেলেব রয়েছেন যাঁদের বিচ্ছেদ হয়ে গিয়েছে। বিচ্ছেদের পর অনেকেই প্রথম পক্ষের স্ত্রীর সঙ্গে কোনও যোগাযোগ না রাখলেও সন্তানদের কখনও অবহেলা করেননি। বিচ্ছেদের পরও তাঁরা সন্তানদের দায়িত্ব পালন করেছেন। কিন্তু তিনি এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম।কুমার শানু কোনওদিনই তাঁর দায়িত্ব নিতে চাননি বলে বিস্ফোরক দাবি জানের।

শুরুর দিকে বিতর্কের আগুনকে, বর্ষীয়ান সংগীত শিল্পী সামাল দিয়েছিলেন এই বলে যে– ‘আমার ছেলে ভালো মনের মানুষ। সবাইকে সাহায্য করতে এগিয়ে যায়। তবে বিগ বসের ঘরের পরিবেশটাই এমন যে, সে অনেক কিছুই বলে ফেলেছে যা সে বলতে চায়নি। ও খুব ছোটো এবং ওর মা ওকে ভালো ভাবে মানুষ করেছে। আমাদের সন্তানদের জন্য যা কিছু করা সম্ভব, সবই ও একা করেছে।‘ ব্যক্তিগত স্তরের এই বিবাদকে এবার কীভাবে সামলাবেন শানু, সেটাই এখন দেখার।

সংস্কারহীন জীবন কাটিয়েছি কিন্তু হবু স্বামী বিপরীত চরিত্রের

আমি আমার উড বি হাজব্যান্ড-এর সঙ্গে বর্তমানে ডেট করছি। ছেলেটি খুবই সহজ সরল। বাড়ি থেকে দেখে দেওয়া পাত্র, তাই কোর্টশিপ চলছে। আমি বরাবরই খুব আপরাইট মেয়ে। আমার একাধিক বয়ফ্রেন্ড ছিল। খুব খোলামেলা, সংস্কারহীন জীবন কাটিয়েছি এতদিন। কিন্তু আমার হবু স্বামী এর ঠিক বিপরীত চরিত্রের। ও খুব ইন্ট্রোভার্ট। ওর সংস্পর্শে এসে আমার নিজের পাস্ট লাইফ নিয়ে এক ধরনের গ্লানি বোধ হচ্ছে। ওকে আমি আমার লাইফস্টাইলের কথা কিছু বলতেও পারছি না। কারণ ওকে আমি ভালোবেসে ফেলেছি। হারাতে চাই না। কিন্তু এক এক সময় মনে হচ্ছে ওকে আমি ঠকাচ্ছি না তো?

আপনি নিজে কী ঠিক করছেন, কী সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন সেটাই গুরুত্বপূর্ণ। আপনি একাধিক বয়ফ্রেন্ডের সঙ্গে জীবন অতিবাহিত করবেন, নাকি বিয়ে করে সেটলড হবেন– সে ব্যাপারে যদি আপনি নিজে নিশ্চিত থাকেন–তাহলে বিগত সময়ে কী করেছেন, কী জীবনযাপনে অভ্যস্ত ছিলেন, এসব গুরুত্বহীন। অপরাধবোধ থেকে বেরিয়ে আসুন। পুরোনো কথা ভাববেন না। পুরোনো বয়ফ্রেন্ডদের সঙ্গে সম্পর্কও না রাখাই ভালো। একটা সুন্দর ভবিষ্যৎ আপনার জন্য অপেক্ষা করছে কারণ, আপনি নিজেই বুঝতে পেরেছেন যে এই মানুষটিকে বিয়ে করে আপনি ভালো থাকবেন। অতএব এগিয়ে যান, আনন্দে থাকুন।

 

ওয়ার্ক-ফ্রেন্ডলি কিচেন

স্বাস্থ্যের সঙ্গে রান্নাঘরের যোগাযোগটা অস্বীকার করা চলে না। শুধুমাত্র সুস্বাদু খাবার রান্না-ই নয়, সারা পরিবারের স্বাস্থ্য নির্ভর করে রান্নাঘরের উপর। কিন্তু স্বাদ এবং স্বাস্থ্যের সম্পর্ক তখনই টিকে থাকা সম্ভব যতক্ষণ রান্নাঘরের পরিবেশ স্বাস্থ্যসম্মত থাকে। খেয়াল রাখতে হবে রান্নাঘরের বৈদ্যুতিক উপকরণ যাতে ঠিকঠাক ভাবে কাজ করে, বাসনপত্র পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে, এছাড়াও রান্নাঘরকে পোকামাকড়-মুক্ত রাখাটাও একান্ত জরুরি।

বৈদ্যুতিক উপকরণের সঠিক দেখভাল

ইলেক্ট্রনিক অ্যাপ্লায়ান্সেস ছাড়া রান্নাঘরের যে-কোনও কাজ আজকের যুগে প্রায় অসম্ভব। সেই কারণে এমন উপকরণ বাছা উচিত যাতে বিদ্যুতের খরচটাও কম হয়। রান্নাঘরে সাধারণত বৈদ্যুতিক উপকরণ বলতে মিক্সি, ওভেন, টোস্টার, কফিমেকার, চিমনি, এয়ারফ্রায়ার, মাইক্রোআভেন ইত্যাদি ব্যবহার করা হয়। এগুলি ব্যবহার হয়ে যাওয়ার পর সঙ্গে সঙ্গে বন্ধ করে দেওয়া উচিত এবং মেন প্লাগ থেকে আলাদা করে খুলে রাখা উচিত। এগুলি বেশিরভাগই অটোমেটিক বন্ধ হয়ে গেলেও, নিজে থেকেও এইটুকু সাবধানতা অবলম্বন করা জরুরি।

> বারবার ফ্রিজ খোলা উচিত নয়, এতে বিদ্যুৎ খরচ বেশি হয়। ফ্রিজের দরজা অনেকক্ষণ ধরে খুলে রাখাও বাঞ্ছনীয় নয়

> খাবার গরম করতে মাইক্রোআভেনের ব্যবহার করা সবথেকে ভালো। ১-২ মিনিটে খাবার গরম করে। তবে খেয়াল রাখতে হবে প্লাস্টিকের বাসনে খাবার রেখে মাইক্রোওভেনে গরম করা একেবারেই উচিত নয়। মাইক্রোআভেনে সবসময় কাচের বাসন ব্যবহার করাই উচিত

>বৈদ্যুতিক উপকরণ সবসময় পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখাটা খুব জরুরি। যেমন টোস্টারে ব্রেড টোস্ট করে অথবা স্যান্ডউইচ বানাবার পর পাতলা কাপড় দিয়ে মুছে তারপর টোস্টার রাখা উচিত। মিক্সি অথবা হ্যান্ড ব্লেন্ডার ব্যবহার করা হয়ে গেলে লিকুইড সোপ জারে ঢেলে দিয়ে ধোয়া বাঞ্ছনীয়। সবশেষে শুকনো কাপড় দিয়ে ভিতরটা মুছে নিতে হবে

> সঠিক আলোর ব্যবস্থা রাখতে হবে কিচেনে। এগজস্ট ফ্যান অথবা চিমনির ব্যবহার জরুরি খাবার বানাবার সময়। মাঝে মাঝে এগুলিও পরিষ্কার করা খুব দরকার

> সঠিক বাসনপত্র বাছুন এবং পরিষ্কার রাখুন

> রান্নাঘরের পরিবেশ, ফ্রেন্ডলি করে তোলার জন্য সঠিক বাসনপত্র বাছুন এবং সেগুলি পরিষ্কার রাখার ব্যবস্থাও নিন। পেটের সংক্রমণ রোধ করার জন্য রান্নাঘর এবং বাসনপত্র পরিষ্কার রাখাটা খুব জরুরি।

> সিংক-এ পড়ে থাকা স্লঁটো বাসন, মিক্সার, জুসার গ্রাইন্ডারে লেগে থাকা খাবারের মধ্যে রোগ জীবাণু বাসা বাঁধে। সুতরাং এগুলো ব্যবহার করার আগে ভালো করে পরিষ্কার করুন

> মার্কেটে এখন বিভিন্ন ধরনের বাসনের সংগ্রহ চোখে পড়ে। বাসন পরিষ্কার হওয়া দরকার। খাবারে টক জাতীয় কিছু থাকলে অ্যালুমিনিয়াম বাসন ব্যবহার করা উচিত নয়। স্টিল অথবা কাচের বাসন ব্যবহার করুন। লোহার কড়াইতে রান্না করা সবথেকে ভালো

ননস্টিক বাসনের ব্যবহারই এখন বেশি হয়। এটাতে খাবার বাসনের গায়ে আটকে থাকে না আবার পুড়েও যায় না। কম তেলে রান্না করা যায়। তবে খেয়াল রাখতে হয় যে, এই ধরনের বাসনে যদি একবার কালির পরত পড়তে শুরু করে তাহলে তৎক্ষণাৎ এর ব্যবহার বন্ধ করে দেওয়া উচিত– নয়তো বাসনের কালি খাবারে সঙ্গে মিশে যাবে। এটি স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকারকও হতে পারে। ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া-র রিপ্রোডাকটিভ হেল্থ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট প্রোগ্রামের হেড ড. ট্রেসি উডরক-এর মতে, ননস্টিক বাসনে বানানো খাবারের জন্য মহিলাদের মধ্যে টেফনল-এর মাত্রা বেড়ে যায়, যার ফলে গর্ভধারণে অসুবিধা সৃষ্টি হতে পারে। একই সঙ্গে থাইরয়েড এবং ক্যান্সার হওয়ার ভয়ও বেড়ে যায়। সুতরাং ননস্টিক বাসন খালি অবস্থায় আগুনের উপর রেখে গরম করবেন না। তাছাড়া এর পরত একবার উঠতে আরম্ভ করলে এই ধরনের বাসন ব্যবহার করবেন না

 

 

৭-টি উপায়ে গড়ুন সন্তানের ভবিষ্যৎ

নিউক্লিয়ার ফ্যামিলির রমরমা এখন। এছাড়াও ছোট্ট সীমিত সদস্যের পরিবারে এখন পুরুষ ও মহিলা উভয়েই কর্মরত। সুতরাং তাদের শিশুদের শৈশব চার দেয়ালের মধ্যেই আবদ্ধ। খোলা জায়গায় তারা খেলাধুলোর বদলে বাড়িতে বসেই অভ্যস্ত ভিডিও গেম খেলতে। বন্ধু বলতে এখন আর সমবয়সি বাচ্চারা নয়, বরং টিভি, কম্পিউটার, মোবাইল প্রভৃতি গ্যাজেট। ভার্চুয়াল দুনিয়াকেই সে আঁকড়ে ধরেছে। এর ফলে বাচ্চার ব্যবহার এবং মানসিকতায় খারাপ প্রভাবই বেশি পড়ছে। বাচ্চা সামাজিকতা শিখে বড়ো হয়ে ওঠার গুরুত্ব বুঝতে পারছে না, তার ব্যক্তিত্বের স্বাভাবিক বিকাশ ঘটছে না।তাকে সামাজিক সম্পর্কগুলোর গুরুত্ব বোঝান শৈশবেই৷

Social skill-এর প্রয়োজনীয়তা

মানুষ হল সামাজিক প্রাণী। সমাজের থেকে আলাদা হয়ে থাকা তার পক্ষে সম্ভব নয়। সফল এবং ভালো ভাবে জীবন কাটাবার জন্য অন্যদের সঙ্গে মানিয়ে গুছিয়ে চলাটাও একান্ত জরুরি। সুতরাং সোশ্যাল স্কিল যদি বাচ্চার মধ্যে ডেভেলপ না হয়, তাহলে বড়ো হয়ে সুস্থ সম্পর্ক গড়ে তুলতে বাচ্চার সমস্যা হতে পারে।

সোশ্যাল স্কিল বাচ্চাদের মধ্যে partnership-এর ভাবনা বিকশিত করে এবং বাচ্চাকে আত্মকেন্দ্রিক হতে দেয় না। ফলে ভবিষ্যতে একাকী হয়ে পড়ার ভয় তার মনে স্থায়ী হতে পারে না।

বাচ্চাদের ব্যবহার দিনে দিনে violent হয়ে উঠছে। কীভাবে লাগাম লাগানো যায় এই ধরনের ব্যবহারে? এই বিষয়ে আলোচনায় ডা. সন্দীপ গোয়েল জানালেন, ‘বাচ্চাদের মধ্যে এই ধরনের ব্যবহার এখন খুব কমন সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। একাকিত্ববোধ, টিভি, ইন্টারনেটে হিংসাত্মক ঘটনাভিত্তিক অনুষ্ঠান দেখা, পড়াশোনার চাপ, অথবা দূরে পরিবার থেকে আলাদা ভাবে হোস্টেলে মানুষ হলে, বাচ্চার মধ্যে আক্রমণাত্মক ব্যবহার বেশি চোখে পড়ে। সমাজের মূল ধারার থেকে এরা আলাদা হয়ে পড়ে। অন্য বাচ্চারাও এদের এড়িয়ে চলে ফলে চ্যাঁচামেচি করে এরা অন্যের আকর্ষণ ধরে রাখার চেষ্টা করে। অশ্লীল শব্দ প্রয়োগ করা এমনকী মারামারি করতেও পিছপা হয় না। বেশি রেগে গেলে হিংস্র হয়ে উঠতেও এদের দেরি লাগে না।’

শৈশব থেকেই যদি বাচ্চাকে সামাজিক হয়ে ওঠার শিক্ষা দেওয়া হয় তাহলে এই ধরনের প্রবৃত্তি বাচ্চার মধ্যে জন্ম নিতে পারে না। কিন্তু এক দিনে এই পাঠ পড়ানো সম্ভব নয়। ছোটো থেকেই তাই জন্য বাচ্চার সামাজিক শিক্ষার উপর জোর দেওয়া একান্ত জরুরি। Child psychology বোঝা উচিৎ অভিভাবকদের।

বাচ্চা যখন ছোটো থাকে

নিউক্লিয়ার ফ্যামিলির বাচ্চারা পাঁচ বছর পর্যন্ত সাধারণত মা-বাবার সঙ্গে অথবা ঠাকুমা-ঠাকুর্দার সঙ্গে খুব ক্লোজ থাকে। সবকিছুতেই তাদের প্রয়োজন পড়ে একজন অভিভাবকের। অথচ উচিত হচ্ছে ওই বয়স থেকেই তাদের, অপরের উপর থেকে নির্ভরতা কমিয়ে এনে সামাজিক ভাবে অ্যাক্টিভ করে তোলা।

নিজের বাচ্চার সঙ্গে সবসময় কথা বলুন

চাইল্ড সাইকোলজিস্টদের মতে, ‘বাচ্চা একদম ছোটো থাকতেই তার নাম ধরে তাকে সবসময় সম্বোধন করা উচিত এবং অনবরত তার সঙ্গে কথা বলে যাওয়া খুব জরুরি। ওর আশেপাশে যা-কিছু রয়েছে সেই বিষয়ে তাকে সবসময় বলতে থাকুন। কোনও খেলনা নিয়ে খেলা করলে, খেলনার নাম জিজ্ঞেস করুন। খেলনার কী রং, কেন ওই খেলনাটা আপনার বাচ্চার পছন্দ এই ধরনের প্রশ্ন সমানে করতে থাকুন। একই খেলার বিভিন্ন পদ্ধতি বাচ্চাকে শেখান যাতে একা একা খেলার অভ্যাস বাচ্চার গড়ে না ওঠে।

বন্ধু, প্রতিবেশী সকলের সঙ্গে বাচ্চার  আলাপ করান

ছুটির দিনে চেষ্টা করতে হবে নতুন বন্ধু, আত্মীয় অথবা প্রতিবেশীদের সঙ্গে বাচ্চাকে পরিচিত করাবার। পার্টি বা কোনও অনুষ্ঠানে একসঙ্গে অনেক মানুষের ভিড়ে বাচ্চা মাঝেমধ্যে ঘাবড়ে যায়। কিন্তু যদি আগে থেকেই বাচ্চাকে সকলের সঙ্গে পরিচয় করাতে থাকেন এবং মাঝেমধ্যেই বাচ্চার সঙ্গে তাদের সাক্ষাৎ হতে থাকে, তাহলে বড়ো হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সকলের সঙ্গে মিলেমিশে থাকতে বাচ্চা নিজেই শিখে যাবে।

অন্য বাচ্চাদের সঙ্গে খেলতে এবং মেলামেশা করতে দিন

আপনার বাচ্চাকে আশেপাশের এবং স্কুলের অন্য বাচ্চাদের সঙ্গে মেলামেশা করতে সাহায্য করুন। এতে বাচ্চারা যেমন অপরকে সাহায্য করতে শিখবে তেমনি পার্টনারশিপ-এর গুরুত্বও বুঝতে শিখবে। বাচ্চারা খেলতে খেলতে একে অপরের সঙ্গে কথা বলতে থাকে। এতে সম্পর্ক মজবুত হয়, আত্মীয়তা বাড়ে। বাচ্চার দৃষ্টিকোণ বিকশিত হয়, অপরের সমস্যা বুঝতে শেখে। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত এই গুণগুলি একজন মানুষের মধ্যে থেকে যায়।

বাচ্চার গ্রোয়িং এজ-

বাচ্চার লালন-পালনে মাঝেমধ্যে পরিবর্তন আনাটা জরুরি। প্রয়োজনে যেমন বাচ্চাকে মানসিক এবং শারীরিক সাপোর্ট দেওয়া দরকার, তেমনি তাদের স্পেস দেওয়াটাও খুব জরুরি। চব্বিশ ঘন্টা তাদের সঙ্গে ছায়ার মতো লেগে থাকবেন না। বড়ো হবার সঙ্গে সঙ্গে বাচ্চার ব্যবহারে নানা পরিবর্তন আসে। ৩ বছরের বাচ্চা এবং ১৩ বছর বয়সি বাচ্চার সঙ্গে একই রকম ব্যবহার করা সম্ভব নয়। বাচ্চার ব্যবহারে পরিবর্তন অনুযায়ী, তার সঙ্গে আপনার আচরণেও পরিবর্তন আনাটা জরুরি।

গ্যাজেট্‌নিয়ে বেশিক্ষণ সময় কাটাতে দেবেন না

গ্যাজেট্‌স-এর অত্যধিক ব্যবহার বাচ্চাকে বাহ্যিক পরিবেশ থেকে অনেক দূরে সরিয়ে রাখে। মস্তিষ্কে অবসাদের স্তর বাড়তে থাকে। এর ফলে বাচ্চার ব্যবহার আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে। বাচ্চার সামাজিক স্থিতি বিঘ্নিত হয় এবং বাচ্চা কিছুতে মনঃসংযোগ করতে পারে না। এছাড়াও সারাক্ষণ গ্যাজেট্‌স নিয়ে পড়ে থাকলে বাচ্চা নিজের সঙ্গে যেমন যোগাযোগ স্থাপন করতে পারে না তেমনি অপরের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলতেও তার অসুবিধা হয়। দিনে ২ ঘন্টার বেশি টিভি কখনওই দেখতে দেওয়া উচিত নয়।

সংস্কারাচ্ছন্ন মনোভাব থেকে বাচ্চাকে দূরে রাখুন

প্রথম থেকেই বাচ্চাকে সায়েন্স এবং টেকনিক নিয়ে বলুন, তাকে এই দুটো বিষয়ে শিক্ষিত করুন। অন্ধ বিশ্বাস,পূজাপাঠ, অবৈজ্ঞানিক ধ্যানধারণা থেকে দূরে রাখুন বাচ্চাকে।

মাঝবয়সেও ফিট থাকার মন্ত্র

আমাদের চারপাশে এমন বহু মহিলাই রয়েছেন ,যারা প্রায় পঞ্চাশের কোঠায় পা রাখতে চলেছেন। এদের মধ্যে অনেকেই জীবনের প্রতি উদাসীন। তারা মনে করেন জীবনে আনন্দ করার দিনগুলি তারা পিছনে ফেলে এসেছেন।সংসারের দায়দায়িত্ব সামলাতে সামলাতে তাদের আর নিজের দিকে তাকানোর অবকাশই হয় না৷ যখন খেয়াল হয়, দেখা যায় অনেকটা সময় গড়িয়ে গিয়েছে৷কিন্তু এই পরিস্থিতি হলেও একটা কথা ভুলবেন না যে, বয়স বেশি হোক কিংবা কম, সকলেরই নিজের ইচ্ছেমতো জীবন উপভোগ করার অধিকার রয়েছে। বয়স চল্লিশের কোঠা পার হলেই স্বাস্থ্যের উপর খেয়াল রাখাটাও খুব জরুরি। এই সময়টায় শারীরিক পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মানসিক পরিবর্তনও হতে থাকে। সুতরাং কয়েকটি ব্যাপারে খেয়াল রাখা বাঞ্ছনীয়।

কী খাচ্ছেন খেয়াল রাখুন

এমন খাবার খান যাতে আপনার শরীরের প্রয়োজনীয় নিউট্রিশন রয়েছে। ৪০ বছর বয়সের পর সাধারণত হজমশক্তি কম হতে থাকে। শরীরের মাংসপেশি ৪৫ শতাংশ কম হয়ে পড়ে যার ফলে শরীরে মেদ বাড়তে থাকে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীরের মেটাবলিজম স্লো হয়ে যেতে থাকে, ফলে আগের তুলনায় কম ক্যালোরি ইনটেক-এর প্রয়োজন পড়ে। সুতরাং যাই খান ক্যালোরি ইনটেক কতটা করছেন অবশ্যই খেয়াল রাখুন।

রেগুলার ব্যায়াম করুন

 ব্যায়াম করলে শরীরও সুস্থ থাকবে এবং বয়সও অনেকটা কমে গেছে বলে মনে হবে। মাংসপেশির শক্তি ফিরে পাবেন, ঘুম ভালো হবে, আত্মবিশ্বাস বাড়বে এবং অনেক বেশি অ্যাক্টিভ থাকতে পারবেন। ৪০-এর পর অনেক সময় জয়েন্ট পেন শুরু হয়ে যায় এবং সেই কারণে জিমে গিয়ে ব্যায়াম করা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। হাঁটতেও অসুবিধা হয়। এই অবস্থায় ওয়াটার এক্সারসাইজ খুবই লাভজনক। যে-কোনও ভাবেই আপনি ব্যায়াম করতে পারেন যেমন মর্নিং ওয়াক, অ্যারোবিক্স, নাচ, সুইমিং ইত্যাদি। এছাড়াও একত্রে জুম্বা ডান্স-ও করতে পারেন অথবা মিউজিকের সঙ্গে বন্ধুদের নিয়ে নৃত্যের আনন্দও নিতে পারেন।

হরমোন-এ পরিবর্তন

 ৪০ বছর বয়সের পর মেনোপজ শুরু হওয়ার ফলে হরমোনাল চেঞ্জ আসাটা স্বাভাবিক। ফলে শরীরের ওজন বেড়ে যায়। কিন্তু হরমোনের উপর অতটা মনোনিবেশ না করে ফিটনেসের খেয়াল রাখুন যাতে শরীরে হওয়া হরমোনাল চেঞ্জেস-কে ব্যালেন্স করতে পারেন।

প্রোটিন-যুক্ত ভোজন

 বয়সের সঙ্গে সঙ্গে নখ খারাপ হতে থাকে, চুল পড়ার সমস্যা দেখা দেয়, ত্বকে বলিরেখার প্রভাব পড়া শুরু হয়ে যায়। এই সময় খাবারে বেশি করে প্রোটিন রাখা উচিত যাতে করে মাংসপেশি, চুল, ত্বক এবং কানেকটিভ টিশু ভালো থাকে। অনেকক্ষণ পর্যন্ত খিদেও পায় না। প্রোটিন যুক্ত খাবারে আপনি দুধ, দই, ডাল, ছোলা, পালংশাক, রাজমা, স্প্রাউট্‌স, সোয়াবিন, ডিম, চিকেন, মটন, বাদাম, আখরোট এই সবকিছুই খেতে পারেন।

সোশ্যাল হওয়া জরুরি

যারা ফ্যামিলির সঙ্গে থাকেন তারা তাও লোকজনের সংস্পর্শে থাকেন কারণ বাড়িতে অতিথিদের আসা-যাওয়া লেগে থাকে। কিন্তু যে মহিলারা একাকী থাকেন তাদের জন্য মেলামেশা করাটা অনেক সময় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। অফিসে কিংবা অন্যান্য কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকলে কথা বলার সঙ্গী হয় কিন্তু যারা বাড়িতে একাই থাকেন এবং বাইরে কাজেও ঘোরেন না তাদের উচিত পাড়া-প্রতিবেশীদের সঙ্গে মেলামেশা করা, পাড়ার  যে-কোনও কাজ বা অনুষ্ঠানে নিজে থেকে এগিয়ে এসে যুক্ত হওয়া। এতে অনুষ্ঠান সফল করতে যেমন আপনার যোগদান থাকবে তেমনি পাড়াতেও আপনার পরিচিতি বাড়বে। আপনার ইন্টারেস্ট দেখে অন্যান্য জায়গা থেকেও আপনি আমন্ত্রণ পাওয়া শুরু করবেন। এতে করে অনেকের সঙ্গে আপনার পরিচয় বাড়বে। আপনার একাকিত্ব দূর হবে।

অফিসে কর্মরতারা পিকনিকের আয়োজন করতে পারেন এবং কোনও একটা গুরুদায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিতে পারেন। পাড়ার মহিলাদের নিয়ে ক্লাব খুলতে পারেন। প্রতি মাসে সকলে বাড়িতেই, ঘুরে ঘুরে মিটিং ফিক্স করতে পারেন এবং নানারকম সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজনও করতে পারেন। এর ফলে সকলেই নিজের় নিজের ট্যালেন্ট জনসমক্ষে দেখাবার সুযোগ পাবে। অফিসের সহকর্মী এবং প্রতিবেশীদের সঙ্গে আলাপ পরিচয় বাড়ালে ভবিষ্যতে উপকার পাবেন আপনিই। এগুলো ছাড়াও নিজের খেয়াল নিজেকেই রাখতে হবে। মাঝেমধ্যে নিজেকেই জাজ করতে হবে যে আপনি অবসাদের শিকার হয়ে পড়ছেন না তো? সুতরাং সোশ্যাল সার্কেল বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি। আনন্দে বাঁচুন, ফিট থাকুন ।

সৌন্দর্য বাড়ায় বেসন

আপনার বাড়িতে বেসন কি শুধু বড়া আর পকোড়া বানানোর কাজেই লাগে? আজ থেকে বদলে ফেলুন আপনার ধারণা। ন্যাচারাল ফেস প্যাক হিসাবে জুড়ি নেই বেসনের। এর সাহায্যে আপনি পেতে পারেন ঝকঝকে ত্বক। এবার জেনে নিন আপনার ত্বক অনুযায়ী বেসনকে কীভাবে কাজে লাগাবেন।

তৈলাক্ত ত্বকে আনে ম্যাজিক

১ চামচ বেসন ও ১ চামচ অ্যালোভেরা ভালো ভাবে মিশিয়ে নিন। এই পেস্ট ত্বকে লাগিয়ে ১০ মিনিট রেখে দিন। এর পর জল দিয়ে মুখ ধুয়ে নিন। তৈলাক্ত ত্বকের তেলতেলে ভাব কমে ফ্রেশ লুক আসবে। সপ্তাহে ২-৩ বার এই প্যাক অবশ্যই লাগান। অ্যালোভেরা ত্বকের দাগ ছোপ যেমন দূর করবে, ব্রণর প্রকোপও কমবে। এছাড়া অ্যালোভেরাতে রয়েছে ভিটামিন ও খনিজ পদার্থের গুণ, সঙ্গে অ্যান্টি অক্সিড্যান্ট যা ত্বকের দ্যুতি ফেরাতে সক্ষম।

শুষ্ক ত্বকে নবজীবন এনে দেয়

ড্রাই স্কিনে সবরকম প্রসাধনী ব্যবহার করা যায় না। তাই আপনার প্রয়োজন এমন প্রাকৃতিক উপকরণ যা, ত্বককে আরও শুষ্ক করে তুলবে না। বেসনের সঙ্গে দুধ, মধু ও কাঁচা হলুদবাটা মিশিয়ে নিন। এটা মুখের ত্বকে ১৫ মিনিট লাগিয়ে রাখুন। শুকিয়ে এলে জলের ঝাপটায় ধুয়ে নিন। এই মিশ্রণের ব্যবহারে ত্বক নমনীয় হয় এবং তাতে লাবণ্যও যুক্ত হয়।

ত্বক ঝলমল বেসনে

স্কিনে গ্লো আনার জন্য ১ কাপ দই ও এক চামচ বেসন একসঙ্গে মিশিয়ে পেস্ট বানান। এই পেস্ট মুখে লাগিয়ে অন্তত ১৫-২০ মিনিট অপেক্ষা করুন। তারপর ধুয়ে নিন। এই ফেস প্যাক দিনে দু’বার করতে পারলে দ্রুত সুফল পাবেন। রোদ, ধুলোময়লা ও দূষণজনিত কারণে ত্বকের কালচে ভাব দূর করতে সহায়ক এই প্যাক।

ব্রণ হঠাতে বেসন

মুখে ব্রণর সমস্যা থাকলেও বেসনে হতে পারে আপনার সমস্যার সমাধান। একটা পাত্রে বেসন ও শসার পেস্ট মেশান। এবার এই প্যাক, মাস্ক-এর মতো মুখে লাগান। ২০ মিনিট রেখে দিন। তারপর ঈষদুষ্ণ গরম জলে মুখ ধুয়ে, পরিষ্কার টাওয়েল দিয়ে মুখ মুছে নিন। এই প্রক্রিয়া সপ্তাহে অন্তত ২ দিন করুন। সুফল পাবেন।

স্কিন ট্যান সরাতে বেসন

রোদে অত্যধিক ঘোরাঘুরির ফলে সূর্যরশ্মির প্রভাবে মুখের ত্বক কালচে হয়ে যেতে পারে। এই সমস্যাতেও আপনাকে সাহায্য করতে পারে বেসন। এর জন্য বেসনের সঙ্গে মিশিয়ে নিন টম্যাটোর কাত্থ। এবার এই প্যাকে ১ চামচ লেবুর রস মেশান। খেয়াল রাখুন টম্যাটো যেন পাকা হয়, আর বীজ বের করে নেবেন।

ব্যথার দাওয়াই বেসন

বেসনের অনেক গুণের মধ্যে এটাও অন্যতম। তাই বেসনকে সৗন্দর্যের উপচার হিসাবে কাজে লাগানোর পাশাপাশি, ব্যথা কমাতেও কাজে লাগান। শরীরের যে-কোনও অংশে চোট আঘাত লাগলে তৎক্ষণাৎ বেসন লাগান। বেসনের প্রলেপে ব্যথা লাঘব হবে।

পড়ার জন্য সীমাহীন গল্প-নিবন্ধসাবস্ক্রাইব